Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

নাট্যগ্রন্থ সমালোচনা- ‘বাংলাদেশের নাটক ও নাট্যদ্বন্দ্বের ইতিহাস’

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

‘বাংলাদেশের নাটক ও নাট্যদ্বন্দ্বের ইতিহাস’ প্রণেতা শান্তনু কায়সার বিশিষ্ট নাট্যভাবুক- ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষক; দীর্ঘকাল যাবৎ সমাজ-সংস্কৃতি-নন্দনের অক্লান্ত ভাষ্যকার। তাঁর মতে, বাংলাদেশের নাটকের দীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্য- অখণ্ড বঙ্গ, অবিভক্ত ভারতবর্ষ ও সারা বিশ্বের। বাংলাদেশের জন্ম, তার পূর্বাপর শিল্প হিসেবে নাট্যের প্রয়োজন ও সার্থকতা- দেশ ও বিশ্ব প্রেক্ষাপটেই বুঝতে চান তিনি। যেহেতু এই রাষ্ট্র ও তার মানুষের সত্তা বিশ্ব বাস্তবতা ও পরিস্থিতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়- সেভাবেই অভিব্যক্ত নাট্য ইতিহাস ও তার দ্বন্দ্ব। প্রাক-কথনে স্পষ্ট করেন তার এই ব্যাপ্ত পর্যবেক্ষণ-পট।

অধ্যায় এক।। প্রেক্ষাপট : সংস্কৃৃত নাটক

উপমহাদেশের নাট্যচর্চায় সংস্কৃত নাটক প্রধানতম। এর স্বরূপ বুঝতে ঐতিহাসিক সূচনা ও বিকাশ জানা চাই- বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনা থেকেই সাম্প্রতিক চর্চায় তার প্রাসঙ্গিকতা শনাক্ত হবে। এ বিষয়ে দুটি প্রচলিত প্রবণতা ভুল সিদ্ধান্তে প্ররোচিত করে। এক. একে রক্ষণশীল মনে করে অপ্রাসঙ্গিক জ্ঞান, দুই. এর অনুসরণ ও আক্ষরিক অনুকরণ- দুই-ই ভ্রান্ত। ধ্রুপদী সংস্কৃত নাট্যধারায় রক্ষণশীল স্থিতাবস্থা থাকলেও প্রথাবিরোধী সমান্তরাল ধারাও ছিলো।- যাকে উৎখাত ও নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছে যদিও ক্ষমতা। বৃহৎ জনসমাজ তার লালন, বিকাশ ও উত্তরাধিকারের দায় নিয়েছে। যদিও এর বিপুল অংশ হারিয়ে গেছে।- একথা উল্লেখ করেই তিনি উপনিবেশকালের নাগরিক বাংলানাটকে এর গ্রহণ-বর্জন-স্বীকরণের কথা তুলেছেন- মধ্যযুগের দীর্ঘ আখ্যানধারার খোঁজ না নিয়ে। বাংলানাটক বলতে তিনি তাহলে অনতিঅতীতকালের নাগরিক নাট্যধারা মনে করেন কি তাহলে? রামনারায়ণ-মাইকেল-গিরিশচন্দ্রের উল্লেখ করেই রবীন্দ্র-প্রবর্তনার কথা তোলেন- ঋদ্বেদ ও সংস্কৃত সাহিত্য ভাণ্ডার কীভাবে তাঁর সাহিত্য-নাট্য উভয়কে উদ্বুদ্ধ করেছিল। রামায়ণ ও কালিদাসেও ছিলো তাঁর একাগ্রতা। এরপরেই লেখক একালে সংস্কৃতনাট্যের অভিভবের উদাহরণ টানেন। ১৯৭৫-এ তুলসীদাসের ‘রামচরিতমানস’-এর ৫০০ বছরের জয়ন্তীতে ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সাহিত্য আকাদেমির উদ্যোগে এশিয়ার ৪০ পণ্ডিতের ৩০ ঘন্টার বৈঠকে রামায়ণের নানা বিষয়ের সঙ্গে আলোচিত হয় নাট্যপ্রসঙ্গও। আশির দশকে রতন থিয়াম এর ভাসকৃত ‘উরুভঙ্গম’-এর মণিপুরী অনুবাদ-মঞ্চায়ন সংস্কৃত নাট্যচর্চার ভিন্ন প্রেক্ষাপট ও প্রাসঙ্গিকতা প্রমাণ করে। সংস্কৃত নাট্যের পরিবর্তিত রূপরীতি ভারতের সাম্প্রতিক নাট্যচর্চায়ও প্রভাব ফেলে। কেরালার ‘করিমকুট্টি’ সংস্কৃত ও মাললায়ম ভাষায় রচিত নাটক।  এর নাট্যকার-নির্দেশক পানিকরের মতে: একালের বক্তব্যবুদ্ধিধর নাট্যধারার ইঙ্গিত নাট্যশাস্ত্রেই আছে- যা থেকে সহায়তা পেয়েছেন তিনি। উপর্যুক্ত নাটকে তিনি ‘কোডিয়াট্রস’ নাট্যরীতির প্রয়োগ করেন। দশম শতকে ভারতে সংস্কৃত নাট্যধারার ভাঙ্গনকালে উদ্ভূত এ নাট্যধারা। এতে স্থানীয় আচার ও লোক-আঙ্গিক যুক্ত। মনীন্দ্র রায় তার বাংলা কাব্যনাটক ‘নাটকের নাম ভীষ্ম’ দু-স্তরে বিন্যস্ত করেন। তাতে সমকালের সঙ্গে মহাভারতীয় বাস্তবতার সাদৃশ্য পান।

লেখকের মতে: সংস্কৃত নাটক এভাবেই পরিবতির্তত রূপে বাংলা ও উপমহাদেশীয় নাট্যধারায় সংযুক্ত। বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় তার কোনো খোঁজ তিনি অবশ্য করেন না।

এর পরে আবার পিছিয়ে গিয়ে সংস্কৃত নাটক বিষয়ে নতুন করে আবার শুরু করেন।

সংস্কৃত প্রধান নাট্যকার সকলেই খ্রিস্ট-পরবর্তী। হর্ষ-ভবভূতি-বিশাখ দত্ত ৭ম-৮ম-৯ম শতকের। কালিদাসকে ৬ষ্ঠ শতকের বলে বিবেচনা করলেও অনেকে তাঁকে খিস্টপূর্ব ৩য় শতক থেকে খ্রিস্টিয় ৩য় শতকের মধ্যকার ভাবেন। শূদ্রক খিস্টপূর্ব ১ম শতকের আগের নন। ভাসকে খ্রিস্টপূর্ব ভাবা হলেও ইউরোপীয়রা তাকে খ্রিস্টিয় ৩য় শতকের আগের মনে করেন। ভরতের নাট্যশাস্ত্র খ্রিস্টিয় ৩য় শতকের। সংস্কৃত নাটকে রামায়ণ- রূপায়ণের চেষ্টা লক্ষণীয়। মহাভারতে রামায়ণের কথা থাকলেও রামায়ণে মহাভারতের কথা নেই- তাই মনে হয় রামায়ণ প্রাচীনতর। বলাও হয় ত্রেতা যুগের সীতা দ্বাপরে হন দ্রৌপদী। মহাভারতের হরিবংশে বলা হয়, অভিনেতৃরা রামায়ণ থেকে নাট্যরচনা করছেন। রামায়ণে নট-নটীগণকে নাট্যচর্চারত দেখা যায়। পাণিনির ব্যাকরণে ‘নটসূত্র’ রচনার কথা আছে। খ্রিস্টপূর্ব দেড়শতকে পতঞ্জলির ‘মহাভাষ্য’-এ নাটকের অস্তিত্বের প্রমাণ মেলে। বলা হয়, রামায়ণের লব-কুশের নাম থেকেই ‘কুশীলব’ কথাটা এসেছে। মৌখিক পরম্পরা থেকেই রামায়ণ-কাহিনীর অভিনয় করতো চারণদল। বেদপাঠে অনধিকারী বৈশ্য-শূদ্র-নারীর জন্যই দৃশ্যকাব্য নাট্যবেদের জন্ম বলা হয়। অন্ত্যজের চাপে এই আপোষ-ফর্মুলা; লেখক এর সমান্তরাল বলে উল্লেখ করেন: যেমন প্রজাবিদ্রোহের ফলেই প্রজাসত্ত্ব আইন করে ইংরেজ ১৮৮৫ সালে। সংস্কৃত নাটকে মৃত্যু-হত্যা-যুদ্ধ-বিপ্লব নিষিদ্ধ ছিল।

এর বিপরীতে লোকায়ত দর্শন ভিন্নধারা গড়ে তোলে। মহাকাব্য পূর্বকাল থেকে লোকায়ত-জীবন ক্ষমতার প্রতিস্পর্ধী। নাটকের মূল কথাও তো দ্বন্দ্বই। রামায়ণেও দেখি অসুর-বিরোধ। লোকায়ত চার্বাক মহাভারতে ‘বীভৎস রাক্ষস’। ব্রাত্য লোকায়ত সভ্যতা প্রথাবিরোধী নাট্যচর্চা লালন করেছে- পরে তা ধ্রুপদীদেরও প্রভাবিত করেছে। আর্যসভ্যতায় বিরোধের বীজ থেকেই বৌদ্ধ ধর্ম- যা নতুন ইতিহাস রচনা করেছে। বৌদ্ধ মতে আত্মা নেই, কর্মই একমাত্র সত্য (reality)। বৌদ্ধ জাতক কাহিনিতে ১৮ শ্রমজীবী শ্রেণীর কথা আছে।

দশরূপকের ‘ভাণ’ প্রথাবিরোধী সংস্কৃত নাটক। শূদ্রকের ‘মৃচ্ছকটিক’-এ নায়িকা বসন্তসেনা গণিকা, নায়ক চারুদত্ত ব্রাহ্মণ। এতে নাট্যশাস্ত্রের নির্দেশ অমান্য হয়। বর্ণাশ্রমকে আঘাত করে। ‘চতুর্ভানী’-তে ব্রাহ্মণ-বৌদ্ধ-বৈষ্ণব-স্নার্ত পণ্ডিতদের বিদ্রুপ করে। ‘ভাণ’-এর ভাষা সরল, স্পষ্ট জীবন্ত প্রাকৃত ভাষা। ‘মৃচ্ছকটিক’-এ ব্রাহ্মণ-মন্ত্রী সংস্কৃতভাষী হলে নারী ও সাধারণজন প্রাকৃত বলে। দ্রাবিড় সভ্যতায় দেবতা ও পুরোহিত নারী ছিলেন- তাঁরা ধনী ও স্বাধীনা হতেন। বৈদিক যুগে নারীদেবতা অপ্রধান।

সংস্কৃৃত নাটক মিলনান্তক- বর্ণাশ্রম শাসিত দর্শেেকর সামনে দ্বন্দ্ব ট্র্যাজেডি বিপদ্জনক বলে।

এই হলো ১ম অধ্যায়ের মূল কথা।

দ্বিতীয় অধ্যায়।। নীলদর্পণের ঐতিহাসিক ভূমিকা

১৮৬০ সালে নীলচাষীদের বিক্ষোভ-বিদ্রোহে ভীত হয়ে ইন্ডিয়াগো কমিশন নিয়োগ করে ইংরেজ। দীনবন্ধু মিত্র’র নাটক ‘নীলদর্পণ’ সে বছরই প্রকাশিত। এক বছরের মধ্যেই ইংরেজিতে অনূদিতও হয়। মুদ্রাকর-প্রকাশক রেভারেন্ড জেমস লঙ। অনুবাদে বলা হয়: এ নেটিভ নাট্যকার ‘কস্যচিৎ পথিকস্য’ ছদ্মনামে লিখিত। এর আগে লঙ নীলকর-স্বরূপ ও বিদ্রোহী কৃষকদের গান সংবলিত করেন। তার বিরুদ্ধে মান-হানির মামলা হয়। শাস্তি ১ মাসের জেল ও ১ হাজার টাকা জরিমানা। কালীপ্রসন্ন সিংহ সেই টাকা দেন। বঙ্গীয় সরকারের সেক্রেটারি সিটন কার অনুবাদটি সরকারি প্রেসে ছেপে তিরস্কৃত ও পদত্যাগে বাধ্য হন। পোস্টমাস্টার জেনারেল পদ থেকে অপসারিত হবার আগে দীনবন্ধু মিত্র নানা বড় পদে ছিলেন। নীলচাষ বিষয়ে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ছিল তাঁর- যশোর-খুলনা-নদীয়ায় বেশি চাষ হ’ত। নীলচাষের বৃহৎ পটে লেখা হলেও ভদ্রলোকের করুণ কাহিনী হয়েছে- শোষণ-প্রতিরোধে সম্ভাবনার ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত ধরা হয়নি বলে- লেখক এই  মত দেন। নাটকে জমিদার ও কৃষকের ভূমিকা নেপথ্যে- মধ্যশ্রেণী হয়ে ওঠে প্রধান কুশীলব। নায়েক-গোমস্তরাও একই শ্রেণীর- তারা উচ্চবিত্ত হতে চায়; যার জন্য কিছু করতে বাধে না তাদের। অথচ নাটকে সাধারণ চাষী তোরাপ-রাইচরণের নায়ক হবার কথা। ‘হিন্দু প্রেট্রিয়ট’ সম্পাদক হরিশচন্দ্র একমাত্র প্রতিবাদী- তাঁর পাশে স্বশ্রেণীর কেউ ছিল না। সেই তাদের প্রতিই মোহ নাট্যকারের- ইংরেজপ্রীতিও। ভূস্বামী ও মহাজনের প্রশংসা নাটকে। নবীনমাধব নাট্যকারের আদর্শ চরিত্র- তার ভাষা ও জীবনাচরণ কৃত্রিম। তার পাশে মাইকেলের ‘বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ’ নাটকের চরিত্রাবলী জীবনানুগ- কথ্য ভাষ্যে জীবন্ত।

নাটকটি ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সবমিলে দুর্বল মনে করেন লেখক।

তৃতীয় অধ্যায়।। লেবেদেফ ও দুশো বছরের বাংলা নাটক

নাগরিক বাংলা নাটকের আকস্মিক উদ্যোগের পথিকৃৎ রুশদেশীয় পরিব্রাজক লেবেদেফ। একে বলা চলে প্রথম দেশজ ভাব ও উপাদানের আন্তর্জাতিক নাট্যায়ন। ভিনদেশি হয়েও প্রায় একক উদ্যোগে কলকাতায় দেশি থিয়েটারের ভিত্তিস্থাপন করেন লেবেদেফ। নাম রাখেন তার ‘বেঙ্গলী থিয়েটার’। বিদেশি রূপান্তরিত নাটকের বিষয় ধর্মীয়-পৌরাণিক নয়- হাস্যরসাত্মক, সেকুলার নাটকে এক চরিত্রের ছদ্মবেশে নারীসত্তার প্রকাশ ঘটে। তৎকালে অভিনব অভিজ্ঞতা দর্শকের। বিজ্ঞাপনে ৩ জন অভিনেত্রীর কথা জানান- সামাজিক বিরূপতার ঝুঁকি নিয়েও- যেখানে ১৮৭৯ সালেও ঢাকায় বারাঙ্গনা অভিনেত্রী আনায় হৈচৈ হয়। এ নাটকেই প্রথম দেশজ-পাশ্চাত্যের সম্মিলন ঘটে। রুশ ঐতিহ্যের সঙ্গে দেশজ লৌকিক ধারা বিলাতি রঙ্গমঞ্চে অভিনীত হয়। গীতি-রস নির্ভর যাত্রা যেন নাগরিক রীতিতে পরিবেশিত। ১৮৭৩ সালে ঢাকার বজ্রযোগিনীতে ‘সীতাহরণ নাটকাভিনয় নিয়ে’ ঢাকা প্রকাশ- ‘নাটক ও নাটকাভিনয় কাহাকে কহে এবং যাত্রাগানের সহিত উহার কি কি বিভিন্নতা’- দৃষ্টান্ত দিয়ে লেখে। অর্থাৎ দুইয়ের ভিন্নতা নিয়ে সচেতনতা ছিল তখনই।

নাটকের পরিবেশনায় নান্দীমুখ ঐকতান সহযোগে ‘পালা’ শুরু হয়। অঙ্ক ও দৃশ্যের ফাঁকে গান-বাদ্য-ভাঁড়-সঙের ব্যবহার- প্রচলিত যাত্রারীতিবৎ। লেখক মনে করিয়ে দেন, অনেক পরের ‘নবান্ন’, ‘রক্তকরবী’, ‘রাজা’, ‘চার অধ্যায়’ নাট্যেও শুরু ও মধ্যবর্তী পর্যায়ে বাদ্যযন্ত্র-মিউজিক ব্যবহৃত হয়েছে একই ধারায়- এই দুইয়ের ভিন্নতা বলেন না লেখক অবশ্য। লেবেদেফপূর্ব যাত্রাপালায় অঙ্ক বা দৃশ্যবিভাগ ছিল না- দৃশ্যান্তর এমনিতেই ঘটতো। অভিনেতৃদের প্রবেশ-প্রস্থানের রীতিও তেমন ছিলো না। অভিনেতৃ পার্ট বলে বা গান গেয়ে আসরেই বসে পড়তেন। এ রীতি ‘মাধব মালঞ্চী কইন্যা’য় ব্যবহৃত বলে উল্লেখ করেন লেখক।

এর বেশ কয়েক বছর পর কলকাতায় বাবুদের বাগানবাড়িতে সৌখিন নাট্যশালা গড়ে ওঠে। বেলগাছিয়া থিয়েটারে মাইকেল মধুসূদনের বাংলা নাটক লেখা ও অভিনয়ের শুরু। সেখানে ‘শর্মিষ্ঠা’ অভিনীত হলেও তাঁর বিখ্যাত প্রহসন দুটি হতে পারে না। শহর-গ্রামের দুইদল বাবুই ছিল তাতে ব্যঙ্গবিদ্রুপের লক্ষ্যবস্তু বলেই। ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ জোড়াসাঁকো থিয়েটারে আর ‘বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ’ প্রথম সাধারণ রঙ্গালয় ন্যাশনাল থিয়েটারে অভিনীত হয়। এই প্রথম নাগরিক থিয়েটারে জাতীয় রুচি গড়ে তোলার কথা বলে নাট্যজন- a body of National Theatre. এখানেই ব্রিটিশবিরোধী নাটকের ধারাপাত হয়। ১৮৭৬ সালে তাইতো কুখ্যাত অভিনয় নিয়ন্ত্রণ বিল জারি করে ইংরেজ। উপেন্দ্রনাথ দাস, মতিলাল সূর ও অমৃতলাল বসু গ্রেপ্তার হন। পরিচালক অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফি ‘কিছু কিছু বুঝি’ নাটক করে বড়লোক আত্মীয়বাড়ি থেকে বিতাড়িত হন। অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইনের ফাঁস গলায় পরেই পেশাদার নাট্যের শুরু। জমিদার বাবুদের হাত থেকে তখন ব্যবসায়ীর হাতে পড়েছে থিয়েটার।- “নাটক বা কাব্য লিখিতে যে কয়েকটি বৃত্তির আবশ্যক হয় তন্মধ্যে স্বাধীনতার বৃত্তিই সর্বপ্রধান তাহাই ভারতে নাই তখন কোনোক্রমেই ‘সর্বাঙ্গসুন্দর’ নাটকের প্রত্যাশা করা যাইতে পারে না।” একদিকে দর্শক-তোষণ অন্যদিকে অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইনের ফলে থিয়েটার অস্তিত্ব বাঁচাতে নানা গোঁজামিলের বাধ্যতায় পড়ে। ১৯০৮ সালে রাজদ্রোহিতার অভিযোগে ‘নীলদর্পণ’ এর অভিনয় নিষিদ্ধ হলেও পাণ্ডুলিপি বাজেয়াপ্ত হয়নি। ইংরেজের মানহানিকর অংশ বাদ দিয়ে ১৮৭২ সালেই ন্যাশনাল থিয়েটারে অভিনয়ের অনুমতি পাওয়া গিয়েছিল।

পশ্চিমবঙ্গে এ আইন ১৯৪৭ এর পরে বাতিল হলেও ১৯৭২ সালে ‘টিনের তলোয়ার’ অভিনয় নিষিদ্ধ হয়- পেশাদার মঞ্চে যদিও তখন অশ্লীলতা সমানে চলেছে। বাংলাদেশের রজতজয়ন্তীতেও এ আইন বহাল ছিল।

নাগরিক বাংলা থিয়েটারে লেবেদেফই দেশজ উপাদন ব্যবহার শুরু করেন। রবীন্দ্রনাথের নাটকের বিষয়-রীতিতেও দেশজ নানা উপাদান। শিশিরকুমার যাত্রার মধ্যে জাতীয় নাট্যের রূপ দেখেছেন। গণনাট্যের সৃজনী শাখা যাত্রার আঙ্গিকে ‘বিসর্জন’ করে। ঢাকা থিয়েটার জাতীয় থিয়েটারের প্রবক্তা বাংলাদেশে।

‘নবান্ন’ নাটক পর্বে পর্বে বিবরণমূলক। ‘কিত্তনখোলা’ নাটকও তাই। সেখানে মেলার বিবরণ মাত্র নয়, বহুমানুষের জীবনের চলমান ছবি।

‘নবান্ন’ নাট্যে চটের পর্দা ব্যবহার নাগরিক মঞ্চসজ্জায় অভিনব। মহর্ষি মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য্যরে পরামর্শে শম্ভু মিত্রের এ প্রয়োগ। বাস্তবিক মঞ্চসজ্জা নয়- চিকিৎসালয় বোঝাতে চটের পর্দায় লাল সালুতে সাদা অক্ষরে লেখা ছিল ‘দাতব্য চিকিৎসালয়’। ‘অঙ্গার’ নাট্যে আলোর ব্যবহারে সৃজনশীল দৃশ্যক্রিয়া।- খনিতে জলোচ্ছ্বাস মূর্ত হতো মঞ্চে। ‘নবান্ন’ নাটকের পটভূমি মেদিনীপুর হলেও যশোরের আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহৃত। তবে শীলিত আঞ্চলিকতা। সেলিম আল দীন, মামুনুর রশীদও যেমন মার্জনা করে নেন ডায়লেক্ট। ‘ছেঁড়াতার’ নাটকের রহিমের সঙ্গে নূরলদীনের সংলাপের মিল- একই আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারের ফলেও বুঝি।

এরপর পরবর্তীকালের নাটকের নানা প্রসঙ্গ তোলেন লেখক। ‘কবর’, ‘বহিপীর’, ‘তরঙ্গভঙ্গ’-এ রাষ্ট্রকাঠামোর দ্বন্দ্ব, এর গভীরতর প্রত্যক্ষ বাস্তবতা। ‘নূরলদীনের সারাজীবন’ নাটক বিষয়ে নাট্যকারের কথা উদ্ধৃত করেন: ‘শিল্পে যেমন পুনর্বয়ন ঘটে, অতীতও তেমনি ভবিষ্যৎকে প্রত্যক্ষ করে। দুশো বছর পূর্বের নূরলদীন দু'শো বছর পরে আবার স্মরণ করবার প্রয়োজন হয়।’ নাট্যের ভাষায় কাব্য, সাধারণের ভাষার সারল্য ও শক্তি কাছাকাছি এ কাব্যনাট্যে। বারে বারে লেখক মনে করান- শিল্পের কাজ বস্তুর আত্মাকে আবিষ্কার। ‘রাষ্ট্র বনাম’ নাটকেও তেমন ঘটে মনে করেন তিনি।

‘ফণিমনসা’ বা ‘নানকার পালা’ কিসের বিচ্ছিন্ন উদাহরণ? ভাষার কাজ নাকি সংগ্রামের শক্তিমত্তায় বলেন না লেখক যদিও।

সাধারণ মানুষের চরিত্রাভিনয়ে নাগরিক অশ্রদ্ধা-অপারগতা-ক্যারিকেচার লক্ষ্য করেছেন তৃপ্তি মিত্র। তাঁর নন্দিনী-অভিনয়ে প্রকৃতি ও নারী-শক্তির concretization- অধরা মাধুরী নয়- গাঁয়ের মেয়েকে সত্য জীবন্ত করে। সুদর্শনার প্যাশনকে এতটা concrete করা বিস্ময়কর লেখকের মতে।

ফেরদৌসী মজুমদারের ‘কোকিলারা’ ত্রি-স্তর বিশিষ্ট অভিনয়, ‘কিত্তনখোলা’য় রাইসুল ইসলাম আসাদের অভিনয় স্বাতন্ত্র্যচিহ্নিত- বলেন তিনি।

তারপরে হঠাৎ তোলেন পেশাদার থিয়েটার ও গণনাট্যের বিরোধের প্রাথমিক পর্বের কথা। ‘নবান্ন’ করার জন্য পেশাদার মঞ্চ ব্যবহার পরে আর করতে না দেবার কথা তোলেন। সত্তরের দশকেও পেশাদার মঞ্চ কুরুচিসার হলে তৃপ্তি মিত্র-তাপস সেন-সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ‘নাট্যশিল্পীদের আবেদন’ বলে বিবৃতি দেন তার প্রতিরোধে। ঢাকাতেও এমত কিছু চেষ্টা গ্রুপ থিয়েটারের প্রবলতায় থেমে যায়। তবে পেশাদারদের মধ্যে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সুস্থ নাটক ‘নামজীবন’ করেন আশির দশকে।

বুদ্ধিজীবীর কসরতে গ্রুপ থিয়েটার রক্তশূন্য হয়, দর্শক সরে পড়ে- ‘নামজীবন’ শত শত রজনী চলুক সাদামাটা মানুষদের সমর্থনে- বলেন উৎপল দত্ত। ১৯৭৮ সালে বাদল সরকার ঘোষণা করেন- গ্রুপ থিয়েটার বাজারের মাঝপথে পড়েছে।- আসল নীতি পড়েছে চাপা- কাজে ও কথায় তফাৎ তাদের। সততার অভাব ঘটেছে। রাজধানী-সহ প্রধান নগরে গড়ে ওঠা গ্রুপ থিয়েটার সমগ্র দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন। বাংলাদেশেও ঢাকার নকলনবিশীর ট্র্যাডিশনের ফলে নাট্যচর্চাকে ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে লেখকের শেষ মন্তব্য ‘নাট্যকে শিল্পঋদ্ধ হতে হলে তাকে এর সম্পূর্ণ সত্য, পূর্ণ কাঠামোর প্রতি বিশ্বস্ত হতে হবে’- এই তার রজতজয়ন্তীর ভাষ্য- এ রকম উল্লম্ব ধারাক্রমে সমালোচনা এলোমেলো হয়ে পড়ে।

চতুর্থ অধ্যায়।। রজতজয়ন্তী পেরিয়ে বাংলাদেশের নাটক

বাংলাদেশে নাগরিক থিয়েটার বঙ্গ-ভারতের অংশ হিসেবেই চর্চিত হতো। জনজীবনে ছিলো যাত্রা-কবির লড়াই-কথকতা-রামায়ণ গান-মনসার ভাসান।

পাকিস্তান পর্বে অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইনের চাপেই মূলত ‘ড্রামা সার্কেল’ বা মুনীর চৌধুরীর বিশ্ববিদ্যালয়-কেন্দ্রিক নাট্যচর্চা অনিয়মিত ছিল। জননাট্যধারাও ক্ষীয়মান হয়ে আসে। নাগরিক জীবনের সঙ্গে তার কোনো যোগ ঘটেনি। যাত্রাও পণ্যে পরিণত হতে থাকে। সৈয়দ শামসুল হক বলেন- ‘যে সমাজ মুক্ত নয় তার নাটক বিকশিত হতে পারে না। মুক্তিযুদ্ধেই তা হতে পারে। জনচিত্তের সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা ও দ্বন্দ্ব নাট্যেই প্রকাশ সম্ভব।’ পাক-পর্বে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ-মুনীর চৌধুরী পথিকৃৎ এহেন রূপায়ণের। নূরুল মোমেন বা আসকার ইবনে শাইখ নন। মন্বন্তর পটভূমিতে লেখা ‘নেমেসিস’ বা ১৮৫৭ বিপ্লব নিয়ে লেখা ‘রক্তপদ্ম’ নাটকে সমাজের প্রকৃত নাট্যদ্বন্দ্ব অধৃত। জেলে বসে লেখা মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ নাটকে তার প্রবল প্রকাশ ঘটে। সৈয়দ শামসুল হক একেই বলেন- **** রাত দশটার পরে জেলের বাতি নেভানোর পরে লণ্ঠনের আলোয় মঞ্চস্থ হতে পারে ‘কবর’ নাট্য। নানা বাধাবিপত্তি-শর্ত পেরতেই নবসৃজন উদ্ভাবন ঘটে শিল্পে। মুনীর চৌধুরীর ‘মানুষ’, ‘নষ্ট ছেলে’ ও ‘কবর’ মিলে এক সম্পূর্ণ ত্রয়ী-নাট্য। ‘নষ্ট ছেলে’ ৪৮ পরবর্তী কাল নিয়ে- আত্মগোপনকারী রাজনৈতিক কর্মীর জীবননাট্য। ১৯৫০-এর দাঙ্গার পটভূমিতে ‘মানুষ’। আমেরিকার এক বামপন্থী সৈনিক কুর্মিটোলায় মুনীর চৌধুরীকে পড়তে দেন আরউইন শ’র ‘বেরি দ্য ডেড’।- তার অবচেতন প্রভাব ‘কবর’ নাটকে- রচনাকালে সচেতনভাবে না হলেও। ৪৮-৪৯ সালে দুটি দুর্ভিক্ষ ঘটে পূর্ব বাংলায়- আসাম চলে যায় অনেক মানুষ। মুনীর চৌধুরীর ‘মানুষ’ নাটক এই পটভূমিতে। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘তরঙ্গভঙ্গ’ পঞ্চাশের মন্বন্তর পটে- আমিনা এ নাটকে স্বামী-সন্তান হত্যা করে।

লেখক তারই ঐতিহাসিক পরিণতি প্রত্যক্ষ করেন: মুনীর চৌধুরী ’৭১-এর শহীদ আর সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ মুক্তিযুদ্ধে শরিক বলে চাকরি হারিয়ে প্যারিসে প্রয়াত হন। নাটকে প্রকাশিত দ্বন্দ্ব তাদের জীবনেই সংগঠিত হয়। এই সততায় তাঁরা বাংলাদেশের নাগরিক নাট্যের পথিকৃৎ বিবেচিত হন। ‘বহিপীর’ নাটকে নেতি বা ‘তরঙ্গভঙ্গ’-র ইতির অন্বিষ্ট জনউত্থান।

‘নূরলদীনের সারাজীবন’ নাটকে কৃষকের-লড়াই মুক্তিযুদ্ধে গেরিলা-যুদ্ধের পূর্ব-প্রস্তুতি বুঝিবা। পিতার জোয়াল কাঁধে বইতে গিয়ে ‘গরুর হাম্বায়’ ডেকে মরা বাঙালি কৃষকের প্রতিকল্প; আম্বিয়া বলে- ‘আগুন, আগুন/ আগুন শাড়িতে নয়, প্যাটোতে প্যাটোতে। ... আগুনপাড়ের শাড়ি জ্বলি ওঠে তাঁতীর প্যাটোতে।/ আগুনপাটের শাড়ি দাউ দাউ করে জ্বলে সারা বাংলাদেশে।’- উদ্ভাসিত চিরকালের নিত্য বাংলাদেশের ইতিহাস- একাকার দু’শ বছরের আগে-পরে যেন-বা।

সাজেদুল আউয়ালের ‘ফণিমনসা’য় দুঃসহ বাস্তব মালো জীবনের। ‘ভাতের মাড় সবার বাড়’- সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ-মুনীর চৌধুরীর ভাষ্যের ধারাবাহিকতা।

আব্দুল্লাহেল মাহমুদের ‘নানকার পালা’-য় বলা হয়; ‘নানকার যুদ্ধ আইজোরে ভাই হয় নাই শ্যাষ/ কোটি কোটি নানকায় ভইরা গেছে দেশ।’

সেলিম আল দীনের ‘কিত্তনখোলা’, ‘কেরামতমঙ্গল’, ‘হাতহদাই’ নাট্যত্রয়ীর সবাই প্রায় তৃণমূলবাসী। মামুনুর রশীদের ‘ওরা কদম আলী’, ‘ওরা আছে বলেই’, ‘মানুষ’, ‘গিনিপিগ’, ‘রাষ্ট্র বনাম’- একই বাস্তবতার নানা দ্বন্দ্বপ্রকাশ।

নানা জাতিসত্তা সেলিম আল দীনের নাটকে। ‘কেরামতমঙ্গল’-এ হাজং ও গারো, ‘চাকা’-য় সাঁওতাল, ‘যৈবতী কইন্যার মন’-এ রাখাইন প্রসঙ্গ। ‘একটি মারমা রূপকথা’-য় মারমা কাহিনী-সুর-নৃত্যভঙ্গী ভিত্তি করে। নাম দেয়া হয় একে- কৃত্যনাট্য। মারমাদের ভ্রমণ প্রজ্ঞা ও বিবাহ নিয়ে পরপর পরিবেশিত পালা। গোষ্ঠীবদ্ধ পরিবেশনার মারমাই রীতি অনুসরিত। পাশ্চাত্যরীতির চরিত্রকেন্দ্রিক অভিনয় এ নাট্যে পরিত্যক্ত। ‘কেরামতমঙ্গল’-এ একই রীতির প্রবর্তনা। বাংলা বর্ণনাত্মক রীতির সঙ্গে ‘মনরি মহৎ সমুইর’ সাদৃশ্য। গীত-নৃত্য-অভিনয়ের ত্রিসঙ্গমজাত নাট্য। এ ধারা সর্বভারতীয় লোকনাট্যের সাধারণ উত্তরাধিকার। সেই সংস্কৃত নাট্যকাল থেকেই। ‘হাতহদাই’-এ ফেণী-নোয়াখালির উপকূলীয় ভাষা।

ঢাকার বাইরে আবদুল্লাহ আল-মামুনের নাটক বেশি অভিনীত। ‘সুবচন নির্বাসনে’ দিয়ে যার শুরু। এই দর্শকপ্রিয়তার মূল্য আছে। বিষয়-রীতির সরলীকরণ ও চমকের সঙ্গে বিনোদন যুক্ত তাতে। যদিও এসব সুবচনাবলী মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীকালে বেমানান, পশ্চাদপদ ও ভ্রান্তিপূর্ণ- কেউ কেউ এমন অভিযোগ তখনই করেছিলেন। ‘সেনাপতি’ নাটকের কাহিনিবিন্যাস ত্রুটিপূর্ণ। ‘তোমরাই’ নাটকে যুক্তি ও শৈল্পিক শৃঙ্খলার বদলে আবেগপ্রাবল্য; ‘এখনো ক্রীতদাস’- পুরনো ধারণায় অতিনাটকীয়- মনে করেন লেখক।

এসব নাটকের জনপ্রিয়তার কারণ নকলনবিশী ও অনুকরণ সহজ বলে মনে করেন তিনি। রাজধানীর অনুকরণ করতেই শ্রম-শক্তি ব্যয় তাদের। মফস্বলে দলনির্ভর নাট্যরচনায় চলে বন্ধ্যাত্ব।

চট্টগ্রামে রূপান্তরিত-অনূদিত নাটক দর্শকপ্রিয় হয়নি। শুরুতে তাদের নতুন আঙ্গিক ও নিজস্ব মৌলিক নাটকের চর্চা পরে বাতিল হয়। স্থানীয় ঐতিহ্য, লোকনাট্যধারা ও আঙ্গিক নিয়ে সন্ধান জরুরি মনে করে লেখক। বৃহত্তর জীবন ও তার দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হওয়া চাই।

অনুবাদে-রূপান্তরে অধিক মনোযোগী ‘নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়’- এলবি, ব্রেখট, বেকেট-সহ আরো অনেকের; অন্যদলে মলিয়ের, গোগল, দারিও ফো। শেক্সপীয়রের একত্র অভিনয় করে নাগরিক-থিয়েটার।

১৯৫০ থেকে চট্টগ্রামের ওয়াজিউল্লাহ ইন্সটিটিউটে অনিয়মিতভাবে দর্শনীর বিনিময়ে নাটক ও যাত্রা অভিনীত হতো। ১৯৫৪ সালে ‘বাবুল থিয়েটার’ নামে ভ্রাম্যমাণ যাত্রাদল নানা স্থানে দর্শনীর বিনিময়ে অভিনয় করেন- পূর্ববাংলা প্রথম; এই যাত্রাদলের পরিচালক-অভিনেতা ছিলেন নটবর অমলেন্দু বিশ্বাস। শাহজাদপুরে নারী-পুরুষ মিলে গড়ে তোলেন ‘বাসন্তী অপেরা’। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁরা দিনাজপুরের রাণীশৈংকল মেলায় অবরুদ্ধ হন। সেখানে তখন মুক্তাঞ্চল ছিল। পরে মধ্য-এপ্রিলে পশ্চিম দিনাজপুরে চলে যান। যাত্রাদলের সব সরঞ্জাম এপারে ছিল বলে ওপারে গিয়ে ধার করে আসরে অভিনয় করেন। অনিশ্চিত জীবনের বাস্তবতায় দল ভেঙ্গে দেওয়া হয়। ১৯৭৯-৮০ সালে শিল্পকলা একাডেমীর উৎসবে দুই বছর পর পর শ্রেষ্ঠ নটের শিরোপা অর্জন করেন অমলেন্দু বিশ্বাস। অথচ স্বাধীন বাংলাদেশে বছর কয়েক পরেই অশ্লীলতা ও জুয়ার অভিযোগে নিষিদ্ধ হয় ঐতিহ্যবাহী যাত্রাদলের আসর। লোকনাট্যের এই ধারা মুখ থুবড়ে পড়ে।

আরণ্যক নাট্যদল আশির দশকে গ্রামে গ্রামে ‘মুক্ত নাট্যদল’ গঠন করে- নাগরিক মঞ্চদাস না হবার অভিপ্রায়ে। নিরক্ষর দেশ বলে লিখিত পাণ্ডুলিপি বর্জন করা হয় মুক্ত নাট্যদলে। ঢাকা থিয়েটারের দেশজুড়ে ‘গ্রাম থিয়েটার’ গঠন প্রায় সমভাবী প্রবর্তনায়। নিরন্নদের মৌলিক রীতির নাটক করতে চান তারা। তাৎক্ষণিক উদ্ভাবনায় মৌলিক রীতির এইসব নাটকে সংলাপ জীবন্ত, অনাড়ষ্ট- নতুন ঘটনা যোগ করার সুযোগ থাকে। যদিও এতে সংলাপ দীর্ঘ ও প্রসঙ্গরহিত হবার বিপদও ঘটে। নিত্য নতুন ঘটনা-চরিত্র যোগ হওয়ায় নাট্যদ্বন্দ্বক্রিয়া শিথিল হয়ে পড়ে। এসব দলে শ্রমজীবীদের চেয়ে শহরের শিক্ষিত নাট্যজন অভিভাবক হয়ে ওঠে।

আরণ্যক নাট্যদলের পথনাটকে অবশ্য লিখিত পাণ্ডুলিপি থাকে। ‘ফেরারী নিশান’, ‘ক্ষুদিরামের দেশে’, ‘আদাব’ বা ‘শেকল’ তাদের জনপ্রিয় প্রযোজনা। মুক্তনাটকের অভিজ্ঞতা থেকে আব্দুল্লাহেল মাহমুদ লেখেন- ‘সাতপুরুষের ঋণ’।

১৯৮৬ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্তনাটকের প্রথম জাতীয় সম্মেলনে- ‘আমাদের গ্রামীণ শিল্পরূপ ও মুক্তনাটক’ প্রবন্ধে লেখক শান্তনু কায়সার মন্তব্য করেন; এ রীতি নমনীয় বলে ভুল ব্যবহারের আশঙ্কা; গম্ভীরা ও কবিগানের মতো স্থূল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে; নমনীয় বলেই হয়তো ভারতে থার্ড থিয়েটার লক্ষ্যবিচ্যুত। গ্রাম থিয়েটারের নাটক পাণ্ডুলিপিহীন নয়। তবে সাধারণের কথা ভেবে সহজ-সরল, তরল হয়ে পড়ে। শহুরে নাট্যজনের মনের মৌলিক অনাস্থায় এসব নাট্যে যুক্ত হতে দ্বিধা থাকে। আত্মসমালোচনায় বলা হয়- তাদের জীবন তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। ২৭ বছরের নাট্যচর্চায় পরিমানে দল বাড়লেও কথিত অর্জনে ফাঁকি থেকে যাচ্ছে।

এরপর লেখক নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হকের প্রখ্যাত কিছু নাটকের মৌলিক ত্রুটি উল্লেখ করেন: ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’-এর আখ্যানে অবাস্তবতা চিহ্নিত করেন- তখন ১৭ গ্রাম কোনো এক মাতব্বরের সঙ্গে দাসত্ব-সম্পর্কে বাঁধা ছিল না। ‘গণনায়ক’ ৭৫-পূর্ব রচনা- নাট্যকারের এহেন দাবী অযৌক্তিক মনে করেন তিনি। এ নাটকে দেশবন্ধু ওসমানের খুনিরা লেনিন-ক্যাস্ট্রোর নাম নেয় কীভাবে? ‘বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ’ উপন্যাসেও লেখকের অবাস্তব ভ্রান্তি লক্ষ্য করেন তিনি। ‘নূরলদীনের সারাজীবন’ নাটকে নবাব হবার মিথ ভেঙ্গে নূরলদীনের আত্মাহুতি গণনায়কসুলভ নয় বলেন। মৃত্যুতে বরং মিথ তৈরি হয় ভাঙ্গে না। ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ লেখার পরে ‘গণনায়ক’ লেখা কেন অনিবার্য তা অবোধ্য লাগে তাঁর। ১৯৭৬ সালেও সানাউল্লাহ হিরো হয় কী করে- প্রশ্ন করেন তিনি।

আরণ্যক-এর কতক প্রযোজনা বিষয়েও সমালোচনামুখর লেখক। ‘সমতট’ নাটকের বিরাট পটভূমি অপচয়িত হয়- বিপ্লবীমন ছিঁচকাঁদুনে মধ্যবিত্ত হয়ে ওঠে। ‘পাথর’ নাটকের রাজনীতিও অস্বচ্ছ- আবেগনির্ভর। ‘জয়জয়ন্তী’ নাটকের চরিত্রের প্রতীকায়ন ও তার ঐতিহাসিক অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ তাঁর কাছে। মান্নান হীরার ‘একজন লখিন্দর’ নাটকে ফতোয়াবাজ মওলানা লখিন্দরের মিথ খোঁজে কী করে?

তাঁর মতে, শিল্প madness বটে কিন্তু there is method in it. সমাজ-দ্বন্দ্ব শিল্প হয়ে ওঠে নাট্যে। নাট্যপাণ্ডুলিপি তার উপায় ও বাহন।

২৭ বছরের নাট্যচর্চায় সন্তুষ্টি বা হতাশা কোনোটি নয়- সংকট ও সম্ভাবনার এক পর্যায় থেকে পথ মিলবে নিশ্চয়- এমত আশা লেখকের।

পঞ্চম অধ্যায়।। বাঙালির নাট্যচর্চা ও রবীন্দ্রনাথ

শুরুতেই লেখক বিস্তৃত করেন সেলিম আল দীনের নাট্যভাবনা: বাংলানাট্য পাঁচালী, কথকতা, গাজীরগান,গম্ভীরা, আলকাপ, গাজন, সারি, ঘাটু ও পুতুল নাচ থেকে উদ্ভূত; এতে মঙ্গলকাব্য, পূর্ববঙ্গ গীতিকার ক্ষিপ্রতা ও গীতলতার ভূমিকা আছে; সোনাভানের পালার মতো নানা পালায় বাংলা নাট্যাঙ্গিকের অন্যতম প্রধান সূত্র ও উপায়। রূপকথা, শাস্ত্রকথা বা কথানাট্যও তাকে গড়েছে। বাংলা ভূখণ্ডে নানা নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা-সংস্কৃতির প্রভাব আছে। লেখকের মতে, সেলিম আল দীন কথিত উপর্যুক্ত উপাদানের সামগ্রিক প্রকাশ ও পরিণতি রবীন্দ্রনাট্যে। গানের সঙ্গে নাটকের, তার নানা আঙ্গিকের অর্থাৎ বাঙালির স্বভাব-রুচির বহু চিহ্ন তাঁর নাটকে। ঠাকুরদা, ফকির, রাজা, রসিক দাদা, বিশু পাগল- বাংলার আবহমান কালের লোকরুচির শিল্পসিদ্ধ চরিত্রাবলী। ‘নৃত্যসঙ্গীতের সঙ্গে দার্শনিক সংলাপের সঙ্গতিপূর্ণ মিশ্রণ’ সেলিম খুঁজে পেয়েছেন রবীন্দ্রনাট্যে। এমন কী তাঁর মতে ‘কবর’ নাটকের মুর্দাফকিরও রবীন্দ্র অন্তঃপ্রেরণাজাত। নজরুলের ‘মধুমালা’, ‘আলেয়ার গান’-এ ‘বাঙালির লোকপুরাণের চিহ্ন’। ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’-এর ছন্দে পাঁচালী কাব্যের ধারা। এস এম সোলায়মানের নাটকে যেমন গম্ভীরার কৌশল। ‘আমিনা সুন্দরী’ পালায় নৃত্যগীতের ব্যবহার। লোকনাট্যের নানা আঙ্গিক ‘বিষাদ সিন্ধু’ নাট্যে ভিন্ন মাত্রা পায়। মান্নান হীরার ‘ঘুমের মানুষ’ নাটকে কবির লড়াই নাট্যদ্বন্দ্বকে ঋদ্ধ করে। সেলিম আল দীনের ত্রয়ী নাটকে দেশজ নাট্যরূপের নানা নিরীক্ষা। তাতে ইউরো মডেল ছেড়ে বর্ণনা-সংলাপ মিলে বর্ণনাত্মক রীতিই প্রধান। বিভাস চক্রবর্তীর মতে যাত্রা bare stage, same space can be converted into anything, any location. রবীন্দ্রনাট্যে এর ব্যবহার যাত্রা থেকে পাওয়া।

বাঙালির নাট্যচর্চার সমগ্র পট আর তার সঙ্গে রবীন্দ্রযোগ বোঝা চাই। লেখক এবার বর্তমান ছেড়ে উনিশ শতকে আলো ফেলেন। বিদ্যাসাগরের মতে, বিধবা বিবাহ প্রবর্তন ও বহু বিবাহ-বাল্যবিবাহ রোধে নাট্য অবদান রাখতে পারে। নাট্যদ্বন্দ্বের মূল প্রকাশ তো জীবন। তাঁর পরামর্শেই জোড়াসাঁকো নাট্যশালা বহু বিবাহের কুফল নিয়ে নাটক লেখার জন্য বিজ্ঞাপন দেয়। এতে অবশ্য অন্যান্য জমিদারদের পোষকতা কমে। ‘কুলীনকুল সর্বস্ব’ নাটক না করতে ভয়ও দেখানো হয়। বিদ্যাসাগর ছিলেন তো মূলত ইহলৌকিক, পারলৌকিক পূজাবিরোধী। কারো কাছ থেকে কোনো দীক্ষামন্ত্র নেননি তিনি।

মাইকেলের প্রহসনদ্বয়ও অভিনীত হতে বাধা পায়। তাই তিনি জাতীয় নাট্যশালা চান, তার জন্য লিখে ফেলেন ‘কৃষ্ণকুমারী’। অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন নিয়ে ‘নীল দর্পণ’ নাট্যের অভিনেতা মঞ্চেই বলে ফেলেন ‘আবার যে নতুন আইন চলিবে শুনিতেছি তাহা হইলেই সর্বনাশ’- একথায় দর্শকও সোচ্চার সমর্থন জানায়। অর্থৎ সামাজিক দ্বন্দ্ব নাটকে প্রকাশ হয়ে সম্পন্ন করছে নাট্যক্রিয়ার সামাজিক অভিঘাত- নাটকের যা অন্বিষ্ট।

এরপরে লেখক তোলেন রবীন্দ্রনাট্য প্রসঙ্গ পুনরায়। রবীন্দ্রনাট্যের দুই বৈশিষ্ট্য: দর্শক ও নাটকের মধ্যকার বেড়া ভাঙ্গা, দূরত্ব ঘোচানো আর তার জন্য দেশজ নানা রূপ-আঙ্গিকের ব্যবহার। দেশজ যাত্রা আর পালাগান- দুটি রীতিই অনুসৃত। তবে রবীন্দ্রনাট্যের সূক্ষ্মতা ও অন্তর্মুখিতার জন্য সাধারণ মঞ্চে তা কমই অভিনীত হয়েছে। ‘রাজা’ নাটকে ‘রাজা অয়দিপাউস’-এর মতো নাটকীয় টেনশন নেই বলেও বুঝি- দর্শক যাতে অভ্যস্ত।

উৎপল দত্তের মতে, রবীন্দ্রনাথকে মঞ্চে আনার ক্ষমতা তাঁর হয়নি। ‘রক্তকরবী’ নাট্য প্রসঙ্গে তাঁর অভিমত: ‘বহুরূপী’ বাংলা মঞ্চের প্রকৃত ঐতিহ্যটি ধরেছেন। এই ঐতিহ্যে আছে দুটি ধারার মিলন- প্রথম দেশজ যাত্রার ও দ্বিতীয় ইউরোপীয় বাক্সবন্দী মঞ্চ। ... কোথায় যেন বহুরূপী খাঁটি বাংলা নাট্যরূপটা ধরেছেন- বাচিক অভিনয়ে বিশেষ করে। ... এখানেই বিশেষ করে তারা খাঁটি বাঙালি।’ শম্ভু মিত্রের মত হলো: ‘আমাদের নিজস্ব থিয়েটার গড়তে হলে রবীন্দ্রনাথের কাছে যেতেই হবে। তা ব্যতীত উপায় নেই’... ‘বাঙলা নাট্যের ভবিষ্যতে পৌঁছাতে গেলে রবীন্দ্রনাথকে হয়েই যেতে হবে। ওঁকে এড়িয়ে হবে না।’ ‘রবীন্দ্র চরিত্রায়ণ আত্ম আবিষ্কার’- ‘রাজা’ নাটকে সুরঙ্গমা অভিনয়সূত্রে বলেন শাঁওলী মিত্র।

‘রাজা’ নাটকের চরিত্র বলে- ‘রাজা পাইতে চাও তো সহস্র লোকের দুঃখকে আপনার দুঃখ বলিয়া গ্রহণ করো- এ যে করে সে-ই রাজা- আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে/ নইলে মোরা রাজার সনে মিলবো কী স্বত্বে।’

পাকিস্তান-পর্বে ষাটের দশকে ‘ড্রামা সার্কেল’ ‘রক্তকরবী’ নাটকের অভিনয় করে। ‘বহুরূপী’ ঢাকায় অভিনয় করতে আসে ১৯৫৬ সালে- ‘রক্তকরবী’ আর ‘ছেঁড়াতার’ নিয়ে। রবীন্দ্রনাথের গান-কবিতার চেয়ে নাটক কম চর্চিত- আমাদের সাংস্কৃতিক প্রবণতার কারণে- লেখকের মূল্যায়ন, তবে ‘শাস্তি’ গল্পের sentimental অভিনয় হয়।

The meaning of Art- এ বলেন রবীন্দ্রনাথ: ‘The sign of greatness is great genious is their enormous capacity of borrowing, very often without knowing it... Only mediocratics are ashmed and afraid of borrowing, for they do not know how to pay back the debt in their own coin’- তাঁর বেলা ঘটে খুবই। তিনিই তো দেশি-বিদেশি নানা উপাদান আপন ও নিজের করে নিয়েছেন। দেশজ হয়েও রবীন্দ্রনাট্য তাই আন্তর্জাতিক ও বৈশ্বিক এবং সে অর্থে মানবিক।

ওয়ারশ ইহুদি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে দু’শ শিশুকে নিয়ে একমাস আগে থেকে ‘ডাকঘর’ অভিনয়ের মহড়া চলে শেখাতে- যন্ত্রণার অর্থ, মুক্তির প্রতিশ্রুতিতে মগ্ন হয়ে কী করে গ্যাসচেম্বারে মৃত্যুকেও সহজভাবে মেলে নেওয়া যায়- ‘এমন বিশ্বজোড়া দুঃসময়েও মানবিক আবেদন রবীন্দ্রনাট্যের।’

ষষ্ঠ অধ্যায়।। মুক্তিযুদ্ধ ও সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ

মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই প্যারিসে জনমত গড়ায় অগ্রণী ভূমিকা তাঁর। ১৯৬৭ থেকে ইউনেস্কোর প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন সেখানে। এর আগে পাক-দূতাবাসে ফার্স্ট সেক্রেটারি ছিলেন। ইউনেস্কোতে যোগ দেওয়ায় পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বন্দ্ব হয় তাঁর। তিনি তো ৪৬ সালে যুক্তবাংলার পক্ষেও স্বাক্ষর করেছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালে সেপ্টেম্বর মাসে দিল্লীতে অনুষ্ঠিত হয় International Conference on Bangladesh. আমন্ত্রিত বিশ্বলেখকদের সম্মতির দ্বায়িত্ব নেন সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ। তাই বুঝি ৭২ সালে তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ আহমদ তাঁর স্ত্রীর কাছে প্রেরিত শোকপত্রে লেখেন: Permit me to say that your personal loss is also a loss to Bangladesh and Begali language and literature.

এই তিনি ১৯৪৪-এর ‘নবান্ন’ নাট্যের প্রথম অভিনয়ে উপস্থিত ছিলেন বন্ধুবর জয়নুল আবেদীনসহ।

‘বহিপীর’ ও ‘তরঙ্গভঙ্গ’ তাঁর প্রধান নাট্যরচনা।

মধ্যপঞ্চাশে রচিত ‘বহিপীর’। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে ধর্ম পাকিস্তান রক্ষার স্লোগান অকেজো হয়, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃৃতিক অধিকার রক্ষার দাবি তখন তুঙ্গে ছিল। এই পরিপ্রেক্ষিত তাঁর নাটকে প্রকাশিত। নাটকের এক চরিত্র বলে- ‘পোশাক-পরিচ্ছদ, চেহারা অবয়ব আসল সত্য নয়- শয়তান সাধু সাজতে পারে’- সমাজে এ চেতনা চারিয়ে গিয়েছিলো তখন তবে? ধর্মের নামে তাই আর শোষণ চলবে না?

চাকরিসূত্রে বিদেশে থেকেও উপনিবেশ ও তার নিজের শ্রেণীর ব্যর্থতা বুঝেছেন, প্রকাশ করেছেন। তাঁর নাটকে ধৃত দ্বন্দ্ব মুক্তিযুদ্ধের ধারাপাত করে।

‘ড্রামা সার্কেল’ ১৯৬১ তে আর ১৯৭২-৭৩-এ ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়’ করে ‘বহিপীর’। এই নাটকের সঙ্গে পরবর্তীকালে অভিনীত ‘গ্যালিলিও’র কোথায় যেন যোগসূত্র আছে বলে ধারণা লেখকের।

‘তরঙ্গভঙ্গ’; মঞ্চায়নের কথা জানা যায় না। এ নাটকে ভিখারিনি কোরাস-বৎ ঘটনা উন্মোচন, মন্তব্য ও ব্যাখ্যা করে। সাধারণের ওপর এই দায়ভার দেয়া হয়। গ্যালিলিও বলে যেমন- ‘যুগের সাধারণ জ্ঞানের ভীষণ প্রভাব আছে মানুষের ওপর। আমি জানি যুক্তিকে শেষ পর্যন্ত ঠেকিয়ে রাখা যায় না।’ সাধারণ মানুষ যুক্তির কথা বুঝবে না, হতেই পারে না।’ ব্রেশটের কবিতায় সক্রেটিস বলে- ‘যা শোনো তাতে সন্দেহ করো। কারণ সে হয়তো পূর্ণ সত্য নয়।’

‘তরঙ্গভঙ্গ’ নাটকে বিচারক সত্যিকার আসামী ধরতে চান। গ্যালিলিও যেমন সন্ধান করেন প্রকৃত সত্য- ‘অপব্যবহারে’ কর্তৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে’, ... ‘সত্য সময়ের সন্তান, কর্তৃত্বের নয়।’ গ্যালিলিওর বন্ধু বলে- ‘ক্ষমতায় যারা আছে তারা সত্য মানা লোককে পছন্দ করে না।’ গ্যালিলিও বলেন- ‘যে লোক সত্য জানে না সে একটা গাধা কিন্তু যে সত্য জানে অথচ তাকে মিথ্যা বলে প্রচার করে, সে একটা জঘন্য অপরাধী।’ ‘তরঙ্গভঙ্গ’ নাটকে বৈরী বাস্তবে আত্মসমর্পণ করতে হয় সত্য সন্ধানীকে।

সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ ও বের্টল্ট ব্রেশটের জন্ম-মৃত্যুর স্মরণে এ লেখায় ‘গ্যালিলিও’র মতো ‘তরঙ্গভঙ্গ’ ও ‘বহিপীর’ এর সংলাপ উদ্ধৃত করলে ভালো হতো। দুই নাট্যকার ও নাটকের তুল্যমূল্য তাতে বোঝা যেত।

সপ্তম অধ্যায়।। দুই নাট্যকার- সেলিম আল দীন ও এস এম সোলায়মান

হাস্যে লাস্যে ‘মুনতাসির’ বা পুরাণের নবরূপ ‘শকুন্তলা’য় বিষয়রীতির নিরীক্ষা- ‘কিত্তনখোলা’য় নিজস্ব বাচন আবিষ্কার। ক্রম পরিণত, পরিশীলিত সৃজন-যাত্রা সেলিম আল দীনের। মঞ্চের মাপে নয় জীবনের সমান্তরাল দীর্ঘ আখ্যান। ‘কিত্তনখোলা’র দর্শকও নাটকের অংশ বা কুশীলব, মেলায় তারাও ঢুকে পড়ে যেন। বাংলা মঞ্চের সীমানা অতিক্রম করে বুঝিবা। দেশজ নাট্যরীতি অনুসৃত নবপ্রয়োগে।

‘পূর্বেতে এই কিসসা কইছে অনেক মহাজন/ সেই কিসসা কইলাম আমি সত্য ভাবি মন।/ এই কিসসা আইজ আছে, রইবো ভবিষ্যতে/ নানা ছন্দে নানা রীতি রইবো নানা মতে’;- নাটকে রবি দাস বলে- ‘এখানে কেউ অডিয়েন্স নয়, পাব্লিক।’ মঞ্চ ও জীবনের ভেদ সত্ত্বেও ‘পাব্লিক’কে অডিয়েন্স করতে চাওয়া; পারলে বুঝি গোটা দেশটাকেই তার দীর্ঘ ঐতিহ্য-সংস্কৃতিসহ তুলে আনতেন। ‘কিত্তনখোলা’য় তারই প্রবর্তনা।

‘স্বদেশী সমাজ’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন- ‘দেশের ভাষা ছাপিয়া, দেশের প্রথা ছাড়িয়া, কেবলমাত্র বিদেশীয় হৃদয় আকর্ষণের জন্য বহুবিধ আয়োজনকেই মহোপকারী পোলেটিকাল শিক্ষা বলিয়া গণ্য করা আমাদেরই হতভাগ্য দেশে প্রচলিত হইয়াছে।’ তিনি মনে করেন, দেশের হৃদয়ে প্রবেশ করতে চাইলে- ‘আমরা বিলাতী ধাঁচের এক সভা না বানাইয়া দেশী ধরনের একটা বৃহৎ মেলা করিতাম। যেখানে যাত্রা-গান-আমোদ-আহ্লাদে দেশের লোক দূর-দূরান্ত হইতে একত্রিত হইত।’ ‘মেলা’কে রবীন্দ্রনাথ আমাদের দেশে ‘স্বাভাবিক’ বলে মনে করতেন- পাশ্চাত্য প্রভাবিত মঞ্চে সেলিম আল দীন তারই সংস্কারমুক্ত প্রত্যাবর্তন চেয়েছেন। নাট্য-বর্ণনাকে দীর্ঘ করেন তাই। মেলার গণচরিত্রে মূল মনোযোগ তাঁর। ‘মেলায় সোন্দর হইতেছে দশজনের লগে চিন-পরিচয়।’ এ নাটকে অস্তিত্বের প্রয়োজনে চরিত্ররা পেশা বদল করতে বাধ্য হচ্ছে। তৃণমূলের মানুষকে লুম্পেন হতে দিতে চাননি বলে তাদের মেলার প্রবহমান জীবনের সমান করে তুলতে চেয়েছেন।

‘কেরামতমঙ্গল’- নানা খণ্ডে নিজের মৃত্তিকা, পারিপার্শ্ব ও মানুষকে চিনতে শেখায়। হাজং খণ্ডে তাদের সংগ্রামে যুক্ত হয় কেরামত- ‘আমার কি কপাল- বেবাক কপালপোড়ার নগে আমারই দেহা অয়।’ কিন্তু নিজের সত্য ও সত্তাকে ভোলে না সে। আদিবাসীদের প্রসঙ্গে প্রকৃত সত্যের মুখোমুখি হয়। ‘রাজাকার খণ্ডে’ তার কাণ্ডজ্ঞান ও প্রজ্ঞা মানুষের যৌথ ও যুগ্ম অর্জন। নাটকের এপিলগে সবার কল্যাণ ও পুণ্য চেয়েছেন- ‘যে এই নাটক দেখে- সামাজিক মঙ্গল সাধনে সে যেন তৎপর হয়। অন্যায়, অবিচার শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়।’ সবশেষে ‘বাংলা কাব্যের মধ্যযুগের মহান কবিদের’ যেমন তেমনি দান্তেকেও প্রণাম জানান।- তার নাটক মধুর হয়েও কঠোর। কাঠিন্যই তার মাধুর্য।

সেলিম আল দীনের নবনাট্য প্রবর্তনা লেখকের তারিফ পায়। এস এম সোলায়মানের নাটক- ‘খ্যাপা পাগলার প্যাচাল’, ‘ইলেকশন ক্যারিকেচার’, গণিমিয়া একদিন’ ও ‘এই দেশে এই বেশে।’ তবে শেষ নাটকটির ‘বাঙালি চেতনার শতবর্ষ উৎসবের আয়োজন’ তৎকালীন শাসকের ভ্রান্তি সৃষ্টি করার জন্যও করার কথা নয়। তবে স্বদেশ দীপকের ‘কোর্টমার্শাল’- এর রূপান্তর মৌলিক নাটকের মর্যাদা পেতে পারে। ‘আমিনা সুন্দরী’ ও ‘সুনাই কইন্যার পালা’য় এক নারীবাদী আখ্যান তুলে ধরে। নাটকের ইতিহাসের সঙ্গে মিলিয়েছেন ‘ইলেকশন ক্যারিকেচার’-এ- ‘পেটে ভাত নাই শুনি ভাষণ’- পাকিস্তানি সার্থক উত্তরাধিকার বুঝি।

এস এম সোলায়মানের নাটকের চারিত্র্য এভাবে তুলে ধরেন লেখক।

অষ্টম অধ্যায়।। রাজনীতি: সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ

রাজনীতি ও নাটক উভয়ের ভিত্তি দ্বন্দ্ব। বাস্তবকে আত্মসাৎ করে শিল্প, নাটক। পিসকাটর ‘রাজনৈতিক থিয়েটার’-এর কথা আলাদা করে বললেও নাট্যপ্রবণতাই রাজনৈতিক।

বৈদিক যুগে চতুর্বেদ থেকে সংলাপ, ক্রিয়া বা অভিনয়, গীত ও রস নিয়ে পঞ্চমবেদ অর্থাৎ দৃশ্যকাব্য বা নাট্যকলা। লব ও কুশ থেকে নাটকের কুশীলব কথাটা; রামের সঙ্গে বিরোধ ও দ্বন্দ্ব থেকেই আখ্যান গঠিত ও গেয়। শেক্সপীয়রের ট্র্যাজেডিও অরাজনৈতিক নয়। গ্রিসে দাস নাট্যে অধিকারহীন ছিলো বলে ট্র্যাজেডি নাটক করা গেছে; সংস্কৃত নাট্যে সাধারণের প্রবেশাধিকার ছিলো বলে বিয়োগান্ত নাটক নিষিদ্ধ।

নাটকের মূল কাজ দ্বন্দ্বরূপায়ণ, তাই তাতে বাস্তব দ্বন্দ্ব প্রকাশ পাবেই। ব্রেশট তাই বলেন, এ যুগে মার্কসবাদ ছাড়া নাটক হতে পারে না। লেনিন উদ্ধৃত করেন- ‘ঘটনা বুঝতে পরস্পর বিরোধিতা বুঝতে হয়।’ গণনাট্য সংঘের মূল প্রেরণা ছিল রাজনীতি। তার ভাঙ্গন নিয়ে নবনাট্যের নিন্দা করেন লেখক।

লেখকের মতে- ‘নবান্ন’-এ ত্রুটিপূর্ণ রাজনীতি; ১৯৪২-এর আন্দোলন নিয়ে আবেগ, সাম্রাজ্যবাদ নিয়ে ধারণার অভাব; যদিও পেশাদার মঞ্চ তার দ্বারা প্রভাবিত হয়। ‘ছেঁড়াতার’ অগ্রসর রাজনীতি হজমের ফল। ‘থার্ড থিয়েটার’ ত্যাজ্য- অল্প লোকের সামনে করা বলে, বিচ্ছিন্নতা ও স্থিতাবস্থাকে লালন করে। গ্রোটস্কির কাছ থেকে উদ্ভূত এই রীতি যা সুংঃরপধষ আবেগ সৃষ্টি করে- বাউল-ফকিবৎ। মিনিমাম প্রপস গণনাট্য আগেই প্রয়োজনে করেছে- তত্ত্ব হিসেবে নয়- পুলিশ ও মস্তানের হাত থেকে বাঁচতেও।

উপর্যুক্ত সিদ্ধান্ত লেখকের। মুক্তনাটকের প্রথম সম্মেলনে প্রশ্ন তোলেন তিনি- গণজীবনের শরিক না হয়ে, তার মধ্য থেকে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় না জন্মালে সে শিল্পের গড়ন টেকসই হয় কি? টেরাকোটা বা গম্ভীরা যা পেরেছে। যদিও আগে তিনি গম্ভীরার তরল ব্যবহারের নিন্দাও করেছেন।

গ্রাম থিয়েটারের সমালোচনাও করেন লেখক: মাজার-হাটবাজার আশ্রয় করে শেকড় সন্ধানে ক্ষতিকর বিষয়ের আমদানি হয়। ধনীদের কাছ থেকে চাঁদা নিয়ে সামন্ত ও ভুল সংস্কৃতির নানা কিছু আত্মস্থ করে স্থিতাবস্থা টেকায় যে রাজনীতি- তা গন্তব্যে পৌঁছয় না।

মুক্তনাটক-গ্রাম থিয়েটারের স্তিমিতদশা বলে দেয় এভাবে এগনো যায় না।

এরপরে লেখক গত শতকের আটের দশকে পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় কতক নাট্যেরও সমালোচনা করেন: ‘জগন্নাথ’ নাটকে মূল বিষয় আড়াল করে কেবল চমক; ‘বেলা অবেলা কালবেলা’য় ওয়ার্কিং ক্লাসের উত্তাপ ও ব্যঙ্গের ধার থাকে না; ‘শেষ সাক্ষাৎকার’-ও ক্লান্ত করে- শেক্সপীয়রের ভাষায় বলা যায়- কথা, কথা আর কথা।

তারপরে চলে যান লেখক শিবপুরাণে। নাট্যসৃষ্টির গোড়ায় কৃষি ও ধর্মের ভূমিকা। শিকারের আগে-পরে অভিনয় কৃত্য হতো। শস্য বুনতে সূর্য ও বৃষ্টি কামনায় গীত-নৃত্য; শত্রুর থেকে বাঁচতে যুদ্ধ মহড়া, রোগ সারাতে ওঝার নানা কৃত্য;- সব কিছুর লক্ষ্যই বেঁচে থাকা। নাট্য এর থেকেই উদ্ভূত। মঙ্গলকাব্যে অন্ত্যজরা স্বীকৃত। চর্যাপদ-বৈষ্ণবগীতিকায় ব্রাহ্মণ্য-বিরোধী উক্তি আছে। পাঁচালী-কথকতা-কীর্তনের সংলাপ ও ব্যাখ্যায় নাট্যচেতনা কাজ করেছে। যা বিবর্তনে নাট্যিক চরিত্র অর্জন করে। সেন আমলেই গম্ভীরায় প্রতিবাদ ওঠে- পরে তা রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়। ১৯৪৩-৪৪-এ গোবিন্দ শেঠ ও ধরণী ডাক্তারের গান নিষিদ্ধ হয়। রংপুরের পূর্ণ অধিকারীর দল বেহুলার পদ্মাপুরাণ কৃষকজীবন নিয়ে করে। হুগলির কৃষককর্মী দুলাল রায় কীর্তনে সামাজিক দ্বন্দ্ব আনেন। কবিগান, জারিসারি, ভাটিয়ালি-ভাওয়াইয়া, ঢাকার বেদে-বেদিনির গান, সর্দার বাড়ির গান, ফরিদপুরের নীল গানের আঙ্গিকে সামাজিক বিষয় নতুন প্রাণ আনে। মুকুন্দ দাস স্বদেশী যাত্রার প্রবর্তক। শান্তিপুরের তরজা-গায়ক হাজারি লাল দাস বেদপুরাণের বিষয়কেও রাজনৈতিক-সামাজিক করে তোলেন। ১৯৪৭-এর দেশভাগের রাজনীতি নিয়ে নিবারণ পণ্ডিত ভাটিয়ালি-পাঁচালী-রামপ্রসাদী লেখেন। গানের আঙ্গিক সীমা থেকে নাট্যের সম্ভাবনা আবিষ্কার করেন। ঢেঁকির ছড়ায়ও মানুষের কথা থাকে।

গম্ভীরা গান অশ্লীলকরণ বা প্রতিবাদী কবিগান ফুলগান নামে স্থূল করে বিপক্ষীয়রা।

রুশ লেবেদেফও সাধারণের কথা মাথায় রেখে নাটক করেন। অভিনেতৃ ১৩ জনের ৩ জনই মেয়ে- সবাই সাধারণ তারা। বিজ্ঞাপনে নারীর অংশগ্রহণ জানানোর সাহস দেখান তৎকালেও। দৃশ্যের ফাঁকে গান-বাজনা-ভাঁড়-সঙ আনেন সাধারণের রুচি অভ্যাস মনে রেখে।

সাধারণের মনে নাটকের প্রতিক্রিয়ার ভয়েই করা হয় ‘অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন’- ১৮৭৬ সালে। ‘নীলদর্পণ’ নাটকে অভিনেতা নতুন আইনের কথা জানায় দর্শককে- তারাও সোচ্চার হয়।  

রবীন্দ্রনাটকেও সাধারণ আছে- ‘মুক্তধারা’, ‘রক্তকরবী’, ‘রথের রশি’তে।

‘ছেঁড়াতার’, ‘কবর’, ‘তরঙ্গভঙ্গ’- সাধারণের জীবনসত্য। ‘মাধব মালঞ্চী কইন্যা’য় রাজা-গজা সবাই সাধারণ। ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’-এ অবাস্তব তথ্য- মুক্তিযুদ্ধকালে ১৭ গ্রামের মানুষ পাক-সহায়ক ছিলো বলে। সেলিম আল দীন অন্য জাতিসত্তার পক্ষে দাঁড়িয়ে বাঙালি অহং-এ আঘাত দেন।

সব মিলে দেশ-বিদেশের বিস্তৃত পটভূমিকায় নাটকে সাধারণের সুলুকসন্ধান করেন লেখক।

নবম অধ্যায়।। কাব্যনাট্যে সৈয়দ শামসুল হক

সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাট্য বিষয়ে কবির লেখন, মন্তব্য, ভাষ্যে নানা অসঙ্গতি শনাক্ত করেন লেখক- বেশ খানিকটা বিরূপ মন নিয়ে।

‘উত্তরবংশ’ নাটকে মেয়ের বয়সের গরমিল লক্ষ্য করেন লেখক। জন্ম তার একবার বলা হয় ১৯৮০-এ আবার অন্যত্র ‘একাত্তরের আট বছর পরে।’ মেয়ের জন্মদিন কেন-ই বা বলা হচ্ছে এত করে- সে কি তা জানে না? মুক্তিযুদ্ধের হিসাব ভোলাও বিভ্রান্তি নয় কি- লেখকের মন্তব্য।- ‘অতীত যে ভোলে সে অগ্রসর হতে জানে না সম্মুখে’- নাটকের এক চরিত্রই বলে যদিও। ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ নিয়ে আগেও সমালোচক ইতিহাস বিচ্যুতির অভিযোগ করেছিলেন। এবার বলেন ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ শেষ করেই লেখার তাড়া কেন ‘গণশত্রু’- ঐ দিনই? সেখানে দেশবন্ধুর হত্যাকারীরা ইতিবাচক মন্তব্য করেন কীভাবে?- ‘মুক্তিও মূল্য ছাড়া প্রাপণীয় নয়।’ বলে লেনিন-চীন-ভিয়েতনামের উল্লেখ করা হয় কী করে, লেখকের প্রশ্ন- নাট্যকার কি ১৫ই অগাস্টের ইঙ্গিত পেয়েছিলেন? তারপর আরও সরাসরি অভিযোগ সৈয়দ হকের প্রতি- বুদ্ধিজীবীর দলীয় ঘেরাটোপে আটকে পরা ঠিক নয় বললেও নিজেই তিনি তা করেন না কি?- শেখ হাসিনাকে ‘ভাষাকন্যা’ অভীধা দিয়ে- কেন এই সুবিধাজনক স্ববিরোধিতা অথচ কবি নিজেই সাক্ষাৎকারে কবুল করেন-‘চাকরি বাকরি তো করিনি। টাকা পয়সার দরকার... এইরকম আমি করেছি যখন আই গো টু সারভাইভ, ঠিক আছে, আই ওয়াজ এ স্টুপিড ম্যান, তাতে কী হয়েছে, আমি ব্যাড পোয়েট?’ ১৯৯০-এ লেখক শিবিরের প্রথম সম্মেলনে সমালোচক প্রশ্ন তোলেন ‘বারো দিনের শিশু’তে একটি চরিত্র, যে ভাবে ‘কখনো কোনো নেত্রীকে দেখে আমার কি মনে হয় না কতকাল ঐ ঠোঁটে চুমু পড়েনি’- তার নৈতিকতা ও যৌক্তিকতা কী? ‘গণ-আন্দোলনের মিছিলের মধ্যে এই রকম ভাবনা কি বিকৃত অথবা অসুস্থতার পরিচায়ক নয়?’ আলোচক সৈয়দ হক উত্তেজিত ভাবে নাকি বলেন- ‘দর্জি টুপি ও অন্তর্বাস দুই-ই বানায়। আমি কেন শুধু অন্তর্বাস দেখি?’

সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাট্য নিয়ে ব্যাখ্যায় এ প্রসঙ্গ কেন এলো বোঝা যায় না। একে পার্টিজান দৃষ্টিভঙ্গিই বা কেন বলেন?- তৎকালীন রাজনীতির হাড্ডাহাড্ডি শিবিরভাগের আঁচ অবশ্য এতে পাওয়া যায়।

‘স্যাস’ পত্রিকার সাক্ষাৎকারে ‘খেলারাম খেলে যা’ মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করেছে বলেও লেখক পরে এর নায়ককে বলেন ‘সে সমাজ ও সময়ের কুসন্তান।’ কঠোর ভাষায় লেখক-বুদ্ধিজীবীর আত্ম-সমালোচনাও করেছেন লেখক- জীবিকার জন্য অনেক কিছু করতে হয় বলে- দীর্ঘদিনের কলোনির মেজাজ সহজে যায় না- ছোট দেশে গরিব লেখক তাই পুরস্কার সুবিধার প্রাপ্তির কথা শুনলে ও পেলে কুত্তার চোখের মতো চোখটা চকচক করে ওঠে- এতো বিস্ময়কর আত্ম-সমালোচনা!

দ্বিধা ও প্রত্যয়ের অভাব লেখককে ‘মানুষ’ করেনি- সমালোচকের ভাষায় তিনি খুব ভীতু মানুষ- অবরুদ্ধ স্বদেশে থাকেননি; কাব্যনাট্যের আলোচনায় এমনই সব ব্যক্তিগত আক্রমণ কতটা সঙ্গত ও শোভন? ভূতপূর্ব প্রথাগত বামপন্থী মেজাজ বলা যায় বুঝি একে!

নূরলদীনের স্বেচ্ছামৃত্যুতে মিথ নির্মূল না হয়ে তৈরি করে বরং বা গণনায়ক আত্মাহুতি দেয় না- সমালোচনায় এসব মন্তব্য- বিতর্ক মুখ্য হয়- নাটক বাদ দিয়ে।

১৯৭২-এ এক বৃদ্ধকে না জেনে অত্যাচার করা নাট্যকারের ভালো লাগেনি- সাক্ষাৎকারে এ কথা বলায়- সমালোচকের মন্তব্য- ‘তাই কি পায়ের আওয়াজের মাতব্বরের প্রতি sympathitic?- ‘সে আমারই লোক, তার এমনটা না হওয়ারই কথা ছিল। অন্তত এরকম না হলেও পারতো। এজন্য আমার চোখে জল আসে।’- ‘কেন সে হলো, সেটা রাজনীতিবিদ, স্যোসিওলজিস্ট, হিস্টিরিয়ান তারা বুঝবে। আমি তো লেখক।’- তাতে সমালোচকের অবশ্য সঙ্গত মন্তব্য: দ্বন্দ্বই যে মূল কথা সেটা কী করে এড়াবেন লেখক?- লেখক কি রাজনীতি-সমাজ-ইতিহাসের মূল নির্যাস গ্রহণ করেন না? করেন বলেই তিনি লেখক। ধরি মাছ না ছুঁই পানি দিয়ে কি তা অর্জন সম্ভব? খুনিদের প্রতি নমনীয় হওয়া কি ঠিক কর্ম? জাতিগত শত্রুর প্রতি নমনীয়তা আর তাকেই সমর্থন তো নিজের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। যারা বলে ‘সকলে আমরা ভাই (উত্তরবংশ)’ আর নাট্যকারের বলা ‘সে আমারই লোক’- তফাৎ কি- তীব্র প্রশ্ন লেখকের।

নাট্যকার বলেছেন- ‘What I want to examination is the situation... কিভাবে power can corrupt the whole thing’- তাহলে মাতব্বরের মানবিক ভিত্তিদান কেন- প্রশ্ন লেখকের।- যে তিনি বলেছেন- ‘আরো বড় মুক্তিযুদ্ধ ধর্মান্ধতা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে এ নাটক।’ ‘এখানে এখন’ নাটকের নিবেদনে ‘ব্যবহার করে ব্যবহৃত হওয়া।’ নাটকের চাবিশব্দ বললেও এটি যে জীবনানন্দের পঙক্তি তা উল্লেখ না করারও সমালোচনা করেন লেখক।

‘ঈর্ষা’ নাটকের প্রৌঢ় যে ‘মানুষ’ ও ‘শিল্পী’কে পৃথক বলেন- তা নিয়েও মন্তব্য লেখকের- ‘ওদুটো মিলে অভিন্ন না হলে বেশিদূর এগনো যায় না।’

সমালোচক কেবল তার আপত্তিকর প্রসঙ্গই তোলেন, গোটা নাটক ধরে নয় তত।- তাতে যেন, নাটকটাই খারিজ করে দেন- নিশ্চয়ই তিনি একেবারেই নস্যাৎ করেন না নাটকটি- সেটা ইঙ্গিতেও বলেন না বলে তেমন মনে হতে চায়। ‘যুদ্ধ এবং যুদ্ধ’ কে নাট্যকার play of argument বলায় লেখক বলেন, ‘ভুল argument কাব্যিক হলেও চলবে না যৌক্তিকও হতে হবে। প্রথমে যৌক্তিক হওয়া চাই- তাকে বিস্মৃত হলে জোর কমে- জীবনের প্রাথমিক শর্ত লঙ্ঘন করে শিল্পের কাছে যাওয়া যায় না। বস্তুর পরিশ্রুত রূপই শিল্প তবে বস্তু বাদ দিয়ে নয়।’

এরকম সব চুলচেরা বিচার এহেন চাঁছাছোলা ভাষায়- এমনই ছিল এককালে রাজনৈতিক কমিটমেন্টের প্রায় শুচিবায়ুগ্রস্ততা- সে এক ধুন্ধুমার নীতিবাগীশ কাল গেছে বটে!

দশম অধ্যায়।। গ্রামীণ শিল্পরূপ ও মুক্তনাটক

নাট্যক্রিয়ার উৎস কৃষি ও ধর্ম- নানা যাদুকরী কৃত্য। গ্রিসে বসন্ত ও শীতকালে ডায়োনোসিসের উদ্দেশে নাচ-গান হতো। শস্য-প্রকৃতি-পল্লীর দেবতা ছিলেন তিনি। ভারতবর্ষে শিবের গাজনেও নাচ-গান-অভিনয়ের বিচিত্র কৃত্য- যা আজও বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে হয়ে থাকে। মিশরে ওসিরিস কৃষির দেবতা; সিরিয়ায় পানি ও শস্যের দেবতা এ্যাডেনিস ও থামুস; বেবিলনে ঊর্বরতার দেবী ইস্থার ও স্বামী থামুসের নাট্যক্রিয়াকৃত্য উদভাবনের যোগ।

এরিস্টটল ও ভরত নাট্যকর্মকে মূলত ‘অনুকরণ’ মনে করেন। মানব-ক্রিয়ার অনুকরণ। মানুষের প্রাথমিক কাজই খাদ্য সংগ্রহ। নাট্যক্রিয়ায় ধর্মের ভূমিকাও ইহজাগতিক। শিকারের আগে ও পরে অভিনয়-কৃত্যাদি হতো, শস্যের জন্য সূর্য ও বৃষ্টির প্রার্থনা করে যেমন নাচ-গান, যুদ্ধের মহড়া, মহামারী রোধের কৃত্য সবই প্রাণ রক্ষার মৌল তাগিদে। নাট্য একই প্রণোদনায় উদ্ভূত।

ভারতীয় উপমহাদেশে সাধারণের বেদ-পাঠের অধিকার ছিলো না। তাদের জন্যই বেদের সহজ দৃশ্য-শ্রাব্য মাধ্যম হিসেবে নাট্য উদ্ভাবন করা হয়। ঋগবেদ থেকে কলা (সংলাপ?), যদুর্বেদ থেকে ক্রিয়া (অভিনয়), সামবেদ থেকে গীত আর অথর্ববেদ যোগে নাট্যবেদ- অর্থাৎ পঞ্চমবেদ উৎসারিত। নাট্য শাস্ত্রে তারই বর্ণনা, ব্যাখ্যান- ভরতমুনিকে ব্রহ্মার নাট্যপাঠদানের আখ্যান।

অনার্য শিবের উৎসব প্রাচীনকাল থেকেই- চৈত্রমাসে আজও শিবের গাজন হয়ে থাকে। গম্ভীরা গানে আছে-‘বৈশাখ মাসে কৃষাণ ভূমিতে দিলেন চাষ/ আষাঢ় মাসে শিব ঠাকুর বুনিলেন কার্পাস।’ আমাদের ধারণা সাধারণ মানুষ জটিল দার্শনিক তত্ত্ব বা কাব্যিক রসে অপারগ; অথচ দেহতত্ত্বের জটিল বয়ান দৈনন্দিন বাচনে তার নিত্যসঙ্গী। শিক্ষিতদের অজ্ঞাত পৌরাণিক প্রসঙ্গ হিন্দু-মুসলমান লৌকিক আখ্যান-গাথা সাধারণে সহজগ্রাহ্য। পটে-মধুবণীতে-টেরাকোটায় যে অ্যাবস্ট্রাকশন তা আমাদের হয়ত অনায়ত্ত, সাধারন্যে যা অনায়াসগ্রাহ্য। ব্রেশটীয় বিযুক্তিকরণ দেশজ পরিচিত এক শিল্পমুদ্রাবিশেষ- নানা পরিবেশনায় যা নিত্য চর্চিত।- আলকাপ নাট্যে, সঙযাত্রায় যার নাট্যপ্রয়োগ। এছাড়া গম্ভীরা, কৃষ্ণকীর্তন, হাপুগান, মানিকপীরের গান, গুজরাটের ‘ভাবাই’ বা মহারাষ্ট্রের ‘তামাশা’- বিশ্বের তাবৎ লোকনাট্যের একই প্রক্রিয়া- সংলাপ ও বর্ণনায় চরিত্র-বিযুক্তির নানা ধরন।

বলা হয় ‘নাটককে মুক্ত করার একটি প্রক্রিয়া’ মুক্তনাটক। ১৯৮৩-তে আরণ্যকের দশম বর্ষপূর্তিতে লেখা হয়- আমরা ‘যতটা না নাট্যকর্মী তার চেয়ে বেশি মঞ্চদাস।’ জনগণের থিয়েটার কী করে হতে পারে এমন আঙ্গিকের সন্ধান করেন তারা। কৃষকদের কাছ থেকে অপহৃত শিল্পকর্মের পুনঃসৃষ্টির প্রক্রিয়া- মুক্তনাটক। অবশ্য আরণ্যক বাস্তবের বা লোক শিল্পরূপের হুবহু অনুকরণ চায়নি। মুক্তনাটক শিল্পকর্ম বলে ‘এতে যোগ-বিয়োগ হয় প্রচুর।’ বোয়ালের Theatre of the oppressed-এর কাছাকাছি পৌঁছতে চেয়েছে। মুক্তনাটক ‘ঘরের আঙ্গিনায়, ফসলকাটা মাঠে যেকোনো জায়গায় হতে পারে এর অভিনয়। দিনের বেলায় কিংবা রাতে হারিকেন কুপিবাতি জ্বালিয়েও এর মঞ্চায়ন সম্ভব।’ তাদের ভাষ্য- নাটক ‘যতই শক্তিশালী হোক না কেন তা যদি দেশের ব্যাপক জনগণের আনুকূল্য লাভ করতে না পারে, তাহলে এক পর্যায়ে তার গতি রুদ্ধ হতে বাধ্য। একটি শিল্পমাধ্যম তখনই ব্যাপক জনগণের আনুকূল্য লাভে সক্ষম হয় যখন তা সামাজিক ক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে। ... মুক্তনাটক যদি জনজীবনের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিনিধিত্ব করতে না পারে তাহলে তা কাজ করবে জনগণের শত্রুর অস্ত্র হিসেবে।’

উপর্যুক্ত নাট্যক্রিয়ার ফলাফল লেখক বলেন এরপর: কৃষকের অপহৃত আঙ্গিক ফিরিয়ে আনছে শহুরে মধ্যবিত্ত তরুণরা। তাদের শ্রেণীচরিত্র এতে ছাপ ফেলছে। নাটকের বিষয়ে গ্রামপ্রধান প্রভাব ফেলে। গ্রামের নাট্যকর্মীদের ভাষ্য: শহুরে তরুণরা দুদিনে চলে যাবে- তখন আমাদের কথা শুনতে হবে। এসব নাট্যকর্ম কারো জীবনে গভীর কোনো ছাপ ফেলে না- মধুর মাত্র স্মৃতি হয়ে থাকে।

গ্রাম থিয়েটার মেলার আয়োজনে ধনী কৃষকের চাঁদা নেয়। মুক্তনাটকও বিদেশি সংস্থার সাহায্য নিয়েছে- যারা মূলত এর বিরোধী।

নিজস্ব আঙ্গিক শত বছর ধরে গড়ে ওঠে, বাইরে থেকে চাপানো শিল্প কি সম্ভব?- লেখকের স্পষ্ট অভিমত। মধ্যবিত্ত অহং থেকেই তরুণরা এহেন নাট্যকর্মে যুক্ত হয়। ১৯৮৪ সালে মুক্তনাটকের মূল্যায়ন করেন মান্নান হীরা: এ বছর করা যায়নি মামুনভাইয়ের টেলি-ব্যস্ততায়। গ্রাম থিয়েটার গ্রামে সরল নাটক করে আর শহরে ঢাকা থিয়েটারে জটিলতর নানা নিরীক্ষা চলে। গ্রাম-শহরের দূরত্ব মেনে নিয়েই কি এই ফাঁকি?- লেখকের প্রশ্ন। তাদের জীবনের রূপকল্প কোথাও পৌঁছয় না- কোনো যোগ-বিনিময় তাই ঘটে না।

নাটক ও সমাজের বিকাশ দ্বন্দ্বময়তায়। সেই প্রক্রিয়ার অভাবে নাটকে কৃত্রিম দ্বন্দ্বপাত। যথা রাজনীতি ছাড়া নাটকের সামাজিক ভিত্তি গড়ে ওঠে না। অবকাঠামো অবিচলিত রেখে আঙ্গিক বিকাশ অসম্ভব। যে বৃহৎ পটে এহেন শিল্প রূপায়ণ ঘটে তার দায় আগামী প্রজন্মের বলে লেখক এ অধ্যায় শেষ করেন।

অধ্যায় এগারো।। আরণ্যক ও মামুনর রশীদ

নিরন্ন মানুষের শক্তিই সৌন্দর্য, সৌন্দর্যই শক্তি তার নাটকে- আরণ্যক ও মামুনুর রশীদের নাটক প্রসঙ্গে একথা বলেন লেখক।- মার্কেজের মতোই নিরন্ন মানুষের বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করান বলে। ‘জীবনভর এত কান্দন কানছি যে গাহান গাইতে গেলেও কান্দনের সুর আইয়া পড়ে।’- নাটকের এক চরিত্রের কথা। তুলসী লাহিড়ীর ‘ ছেঁড়াতার’ যেন পূর্বজ মামুনুর রশীদের নাটকের। সে নাটকে হাকিমুদ্দি বলে- ‘তোমার হদীস ধরি তুমি বেহেস্তে যাও, মুই খেলাপ করি জাহান্নামে যামো।’

আঞ্চলিক ভাষা ও গানের ব্যবহারে নিরন্ন মানুষের সংগ্রাম ও সৌন্দর্য তুলে ধরে এসব নাটকে। বঙ্গীয় প্রগতি-ধারার উত্তরাধিকার যেমন- ছড়া-প্রবাদ-প্রবচন-কবিগান-শ্লোক, তেমনি নাটক ‘নীলদর্পণ’, ‘বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ’। নানা অঞ্চলের ভাষা মামুনুরের নাটকে- রংপুর, ঢাকা, নোয়াখালি, পাবনা, টাঙ্গাইল, বরিশাল। মৃত্তিকালগ্ন ভাষা ও সুরে তৃণমূলের দ্বান্দ্বিক ভাষ্য।

‘গিনিপিগ’ নাটকে বলা হয়: সা¤্রাজ্যবাদী দেশের সার-বীজ-কীটনাশক-সেচের ফাঁদে পড়ে জমির ঊর্বরতা ধ্বসায়- গরীবদেশ তাদের চাঁদমারি। তারজন্য চাই মানুষের সংগ্রামী প্রতিরোধ। ‘ওরা কদম আলী’ নাটকে সবাই আমরা হয়ে ওঠে- স্পার্টাকাসের মতো। ব্যক্তির সমষ্টি হয়ে ওঠার নন্দন একেই বলে। লেখকের একটাই প্রশ্ন: লড়াইয়ের বাস্তবতা দেশ-সমাজে আছে কি?

‘পাথর’ নাটকে গ্রামীণ ক্ষমতাবলয়ের ব্যাপারটি মোটামুটি স্বচ্ছ হলেও বস্তুভিত্তিটি অশনাক্ত মনে করেন লেখক। তবে নাটকে তিনি বিশাল হৃদয়ের সন্ধান পান- দেশ যা দীর্ঘদিন ধারণ করে আছে।

মান্নান হীরার লেখা ‘এবং বিদ্যাসাগর’ নাটক নিয়ে নানা অসঙ্গতির কথা তোলেন লেখক।

মামুনুর রশীদের সব নাটকের কথা এ অধ্যায়ে নেই। প্রতিনিধিত্বশীল কতক নাটকের অসঙ্গতি কেবল দেখান লেখক।

অধ্যায় বারো।। স্মৃতি, নাট্য ও অভিনয়: জিয়া হায়দার ও তৃপ্তি মিত্র

শুরুতে লেখক জানান- ‘ব্যক্তিগত বিষয়ও সাধারণ বিষয়কে একটু ভিন্নভাবে দেখতে সাহায্য করে। এবার সেই প্রসঙ্গ অতঃপর প্রসঙ্গ ভিন্নমাত্রার অভিনয়।

ক. স্মৃতি, পত্র, তত্ত্ব, নাট্য ও জিয়া হায়দার

লেখক জানান, ১৯৮৭ তে “‘বিদ্রোহী নাট্যতত্ত্ব: ত্রয়ী নাট্যকার’ রবার্ট ব্র্যাস্টেইনের ‘দ্য থিয়েটার অব রিভোল্ট’-এর বাংলা অনুবাদ হলেও এটি তার উপর ভিত্তি করে সচ্ছন্দ অনুবাদের স্বাধীন” বই।

মূল বইয়ে ইবসেন, স্ট্রিন্ডবার্গ, চেকভ, বার্নাড ’শ, ব্রেখট, পিরানদেল্লো, ইউজিন ও’নীল, আন্তনি আর্টড ও জ্যাঁ জেনে অন্তর্ভুক্ত হলেও তিন নির্বাচিত নাট্যকার- ব্রেখট, পিরানদেল্লা, ও জ্যাঁ জেনেকে নিয়ে অনুবাদ। মূল টীকার সঙ্গে অনুবাদকের টীকাও জোড়া হয় তাতে। বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে দীর্ঘ ভূমিকাও ছিলো। ‘উত্তরাধিকার’ পত্রিকায় এটি স্বতন্ত্র প্রবন্ধ হিসেবেও ছাপা হয় এটি। এটি পড়ে জিয়া হায়দারের ভালো লাগায় পোস্টকার্ডে তিনি তাঁর অনুভূতি জানান। কলকাতার ‘বহুরূপী’ পত্রিকার এককালীন সহযোগী সম্পাদক চিত্তরঞ্জন ঘোষ বইটি নিয়ে মতামত জানানোর আগের ঘটনা এটি। তিনি লেখেন- ‘ভারত-বাংলাদেশের ভূমিকায় আলোচনা- তবে পিরানদেল্লো ও জ্যাঁ জেনের সঙ্গে দুই বঙ্গের নাটকের যোগ বা সাদৃশ্য কম।- অনুবাদে তবু আগ্রহী কেন ভূমিকায় স্পষ্ট নয়।’ ‘দেশ’ পত্রিকায় বইটির আলোচনায় দিলীপকুমার মিত্র অবশ্য বলেন- ‘গ্রন্থটি বিদ্রোহীনাট্যতত্ত্বের ও শিল্পভাবনার এক সুন্দর বিশ্লেষণ।’

জিয়া হায়দার ‘থিয়েটারের কথা’য় সংস্কৃত নাটক নিয়ে বলেন- ‘যদি দশম-একাদশে সংস্কৃত নাটকের অবসান ঘটে এবং ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরু থেকে মুসলিম শাসন শুরু হয় ... মুসলিম শাসনের দুশ আড়াইশ বছর আগেই সংস্কৃত নাট্য বিলুপ্ত হয়ে গেছে বা বিলুপ্তির পথে। অতএব সংস্কৃত নাট্যকে ধ্বংস করার অভিযোগে মুসলিম শাসনকে অভিযুক্ত করা সম্পূর্ণ অর্থহীন।’ সংস্কৃত নাট্যধারার অবলুপ্তির সঠিক কারণ  অনুসন্ধান করতে গিয়ে সংস্কৃত ভাষার সার্বিক গণবিচ্ছিন্নতা ... ব্রাহ্মণ্য ধর্মের জাতি ও বর্ণভেদ প্রথা ও মানবিক ঐক্য বিরোধী ভূমিকার নির্মোহ ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ হওয়া প্রয়োজন মনে করেন লেখক।

দ্বন্দ্বের বাস্তবতার উপলব্ধি উত্তসূরীদের জন্য রেখে গেছেন জিয়া হায়দার-বলেন তিনি।

লেখক তাঁর কথায় Lope de Vega-র Fuente Ov ejona অনুবাদসূত্রে জিয়া হায়দারের সঙ্গে যোগাযোগের ইতিবৃত্ত জানান- মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা ‘সাজন মেঘ’-এর কথাও।

খ. তৃপ্তি মিত্র: অভিনয় ও অভিনয় ভাবনা

নাগরিক থিয়েটারে অভিনেত্রী সংকট সেই আদি কাল থেকে। অভিনেত্রী নেই বলে মাইকেল মধুসূদন ‘কৃষ্ণকুমারী’ নাটকটি তৎকালীন গুণীনট কেশব চন্দ্রের পরামর্শ মতো শেষ করতে পারেন নি। ১৯৮৭ তে ‘ঐতিহ্যময় থিয়েটার: সেকাল একাল’-এ তৃপ্তি মিত্র লেখেন- ‘প্রায় দলেই মহিলা শিল্পী সভ্য হিসেবে নেই।’ অথচ তিনি তো ১৯৪২-এ সতেরো/আঠারো বছর বয়সে ডাক্তারি না পড়ে গ্রহণ করেন নাট্যজীবন- আমৃত্যু। ১৯৪৪ সালে মেট্রিকুলেশনের ছাত্রী তিনি যোগ দেন গণনাট্য সংঘে। ‘আগুন’ ও ‘জবানবন্দী’ নাটকে অভিনয় করেন। দুর্ভিক্ষপীড়িতদের সেবায় চাঁদা তুলেছেন। সেই তিনি ‘বহুরূপী’ দলে নির্দেশনা ও সাংগঠনিক নানা দায় পালন করেন। তাঁর অভিনয় শিল্পময়তার তুঙ্গে পৌঁছয়- ‘রক্তকরবী’, ‘রাজা অয়দিপাউস’, ‘পুতুল খেলা’, ‘রাজা’, ‘দশচক্র’ এবং সবশেষে ভারতীয় নাগরিক মঞ্চের প্রথম একক অভিনয় ‘অপরাজিতা’য় ১৮/১৯ টি চরিত্রে অবিস্মরণীয় অভিনয় করেন।

নাট্যে-অভিনয় হয়ে উঠেছিরো তাঁর জীবন-যাপনের মৌল নির্ভর- আত্মকেন্দ্রিকতা-উত্তীর্ণ সে ব্রতযাত্রা।

উপসংহার

সবশেষে লেখক নাটক বিষয়ে তাঁর মূল তত্ত্ব পুনঃব্যাখ্যা করেন: নাট্যদ্বন্দ্বের অর্থ দ্বন্দ্বের দ্বন্দ্ব। সামাজিক দ্বন্দ্বসকল নিয়ে নাটকের বিষয় গঠিত; বিষয়ের এই দ্বন্দ্ব মিলে যে তৃতীয় দ্বন্দ্ব- তাতেই নাট্য বস্তুটি সম্পূর্ণ হয়ে ওঠে।

সংস্কৃত নাটকে ঘটমান বাস্তবতা বিদ্যমান দ্বন্দ্বকে স্পষ্ট করে। বেদ অনধিকারীর জন্য উদ্ভাবিত পঞ্চমবেদ স্বয়ং দ্বন্দ্বেরই প্রকাশ। ‘ভাণ’ নাটকে দেবতা ও ঊর্বশীদের নিয়ে কটাক্ষ বাস্তব দ্বন্দ্বগত। মিলনাত্মক আপাত দ্বন্দ্বহীন নাটকেও বিপজ্জনক সব বিষয় এসেছে। নাট্যগৃহে অন্ত্যজের প্রবেশ অবাধ ছিলো না, তা হলেও দ্বন্দ্ব এড়ানো হতো নাটকে। গ্রিসে দাসগণ বিযুক্ত ছিলো বলে নাটকে দ্বন্দ্ব স্পষ্টতর হতে পারতো।- এসব কথা আগেও বহুবার বলেছেন লেখক।

রবীন্দ্র নাটকে বিশেষত ‘রক্তকরবী’ প্রসঙ্গে লেখক নানাজনের তথ্য-উপাত্ত দিয়ে তার ভিন্নতর দ্বন্দ্ব-স্বরূপ ব্যাখ্যা করেছেন- ‘অতএব শিল্প সম্মত হয়েও কিংবা তার জন্যই ‘রক্তকরবী’ আমাদের নিজেদেরই নাট্য।’

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘তরঙ্গভঙ্গ’ নাটকে বাস্তব দ্বন্দ্ব নাট্যদ্বন্দ্বে রূপান্তরিত।

এস এম সোলায়মানের বাংলাদেশের নাট্যচর্চা বিষয়ে তির্যক কিছু মন্তব্য উল্লেখ করেছেন লেখক- ‘এখানকার দর্শক অন্য আমোদ-প্রমোদের পরিবর্ত হিসেবে নাটককে দেখে।’ বা ‘মঞ্চ না হলেও কিংবা মঞ্চের কিছু না হলেও মঞ্চের অনেকেরই অনেক কিছু হয়েছে।’

এভাবে নাটক অথবা নাট্যচর্চা দ্বন্দ্ব তথা নাট্যদ্বন্দ্বের অংশ ও শিকার হয়ে ওঠে মনে করেন লেখক।

‘আমরা যারা পথনাটক চর্চা করি তারা পথনাটককে প্রকৃত অর্থে করুণার চোখে দেখে থাকি।’- বলেন সোলায়মান।

সবশেষে লেখকের মন্তব্য: ‘পেশাদার হতে আপত্তি নেই, কিন্তু দ্বন্দ্বকে বিস্মৃত হয়ে নাট্য বা নাট্যচর্চা তার চারিত্র্য হারালে সে বড় সৌখিন মজদুরি হবে।’

- তাই কি হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের নাগরিক থিয়েটার?

বাংলাদেশের নাটক ও নাট্যদ্বন্দ্বের ইতিহাস
লেখক: শান্তনু কায়সার।
প্রকাশক : জসিম উদ্দিন, কথাপ্রকাশ, ঢাকা।
প্রচ্ছদ: সব্যসাচী হাজরা।
প্রকাশকাল: বৈশাখ ১৪২১, এপ্রিল ২০১৪। পৃষ্ঠা: ২৭০। মূল্য: ৩০০ টাকা।
 
বিপ্লব বালা- শিক্ষক, সমালোচক