Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

রবীন্দ্রনাথের ‘বিসর্জন’ পাঠ: বিশ্বাসের রাজনীতি বনাম বিশ্বাসের আধ্যাত্মিক নীতি

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

‘বিসর্জন’ নাটকের পূর্বপাঠ ও বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগের সমস্যাজনক গ্রন্থপরিচয়

“[রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বিসর্জন’] নাটকে বরাবর এই দুটি ভাবের বিরোধ বেধেছে- প্রেম আর প্রতাপ। রঘুপতির প্রভুত্বের ইচ্ছার সঙ্গে গোবিন্দমাণিক্যের প্রেমের শক্তির দ্বন্দ্ব বেধেছিল। রাজা প্রেমকে জয়যুক্ত করতে চান, রাজপুরোহিত নিজের প্রভুত্বকে। নাটকের শেষে রঘুপতিকে হার মানতে হয়েছিল। তাঁর চৈতন্য হল, বোঝবার বাধা দূর হল, প্রেম হল জয়যুক্ত।”১- বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ এইভাবেই ‘বিসর্জন’ নাটকের পরিচয় তুলে ধরেছে।

কিন্তু নাটকটির নিবিড় পাঠে আমরা দেখতে পাব গোবিন্দমাণিক্যের প্রেম এবং রঘুপতির প্রতাপের দ্বন্দ্বের নাটক এ নয়। এর মধ্যে দ্বন্দ্ব আছে। এ দ্বন্দ্ব প্রেম এবং প্রতাপের নয়, রাজার প্রতাপের সাথে রাজপুরোহিতের প্রতাপের দ্বন্দ্ব। তবে প্রতাপের সাথে প্রতাপের দ্বন্দ্ব-বিরোধ খোঁজার মাধ্যমে ‘বিসর্জন’ নাটকের প্লট হাতড়ানোই কেবল হবে। নাটকের অন্তে জয়সিংহের প্রাণ বিসর্জনের ভেতর দিয়ে জীবিতদের মনে যে অসামান্য জীবনবোধনের আবিষ্কারপর্ব আসে তাকে নিতান্তই উপেক্ষা করা হবে। বরং এভাবে বিসর্জনে’র পরিচয় তুলে ধরার মধ্যে নাটককে কেবল মানবদ্বন্দ্বের প্রতিরূপায়ণ বলেই স্বীকার করে নেয়া হয়। কিন্তু এর ফলে (বিসর্জন) নাটক যে অবশেষে কবিতাও তাই অস্বীকার করা হয়।

বিসর্জনে’র অন্তরালবর্তী কবিত্বের আবহ খুঁজে পাওয়ার শর্তে এই লেখার শুরুতেই আমরা অনুমানরূপে প্রস্তাব করব এ আসলে মৃত্যুর নাটক। জয়সিংহের প্রাণ বিসর্জন অর্থাৎ তার স্বেচ্ছা-মৃত্যু-বরণ এর ভেতরের নাটক ঘনিয়ে তুলেছে। তাই এই লেখায় গোবিন্দমাণিক্যের প্রেম এবং রঘুপতির প্রতাপের দ্বন্দ্বের রেখায় ‘বিসর্জন’ পাঠ থেকে সরে গিয়ে বরং আমরা জয়সিংহের চরিত্র নির্মাণ, এই চরিত্রায়নের ধারণাগত কাঠামো ও পরিণতি নির্ধারণের কৌশলগত এবং ভাবগত প্রেক্ষিতগুলোর উন্মোচনে মনোনিবেশ করবো।

মৃত্যুর মতো বেদনাময় সৌন্দর্য

আমরা দেখছি জয়সিংহ মৃত্যুবরণ করেছে। মৃত্যু দিয়ে জীবিতের পক্ষে কী ফায়দা হাসিল করা সম্ভব? কিন্তু এই নাটকে ‘মৃত্যু একটা উপলক্ষ্য মাত্র’। এই উপলক্ষের প্রকৃত লক্ষ্য নির্ণয় করতে বিশ্বভারতীর গ্রন্থনবিভাগ নয়, কবি শঙ্খ ঘোষের দোহাই দিতে পারি আমরা-

“তর্কে অথবা তত্ত্বে যেন অনেকটা অস্ফূট হয়ে আসে আমাদের জীবন, সহজ সম্পর্কের মাঝখানে একটা বাধা তৈরি হয় যেন। তেমন-কোনো তর্কের মধ্য দিয়ে নয়, সমগ্র সত্তার মধ্য দিয়ে জীবনকে পেতে চান একজন কবি, এ বিশ্বকে তিনি দেখতে চান তার সমগ্র স্বরূপে। এমন কবিস্বভাবের কয়েকটি মানুষকে প্রায়ই আমরা দেখতে পাব রবীন্দ্রনাথের নাটকে। কবি বলে তাদের কোনো পরিচয় দেওয়া হয়নি অবশ্য, তাদের পরিচয় আছে কেবল তাদের বেদনার গাঢ়তায়, অনুভবের সত্যে। ”২

শঙ্খ ঘোষ “আমাদের প্রিয় তেমনি কয়েকটি মানুষ” হিসেবে বির্সজনে’র জয়সিংহের নাম নিয়েছেন। জয়সিংহের মৃত্যুকে তিনি “সহজ সরল জীবনের অনন্ত প্রসারিত পথ” কেন বলছেন? কারণ জয়সিংহ একদিকে ভালোবাসে রঘুপতিকে, ভালোবাসতে পারে না ভ্রাতৃহত্যার ষড়যন্ত্রকে, তবে মনের ভেতরে ভিখারিণী অপর্ণার শুনতে পাওয়া ডাককে ভাবে প্রেম, দেবীকেও সে ছাড়তে পারে না। এই সব ভালোবাসার ভেতরে থেকে থেকে তার একটা উত্তরণ ঘটে। সেই উত্তরণ অন্তরের, দিব্যচোখে ব্যক্তিগত সীমা পেরোনো সত্য অবলোকনের পর্বে পৌঁছার। জয়সিংহ তখন অবসানের আসন্নতা পূর্ণভাবে অনুভব করে এবং রক্তে রক্তে টের পেয়ে যায় যে, “দৈনন্দিনের একটা ক্লীব আবর্ত আছে, সে আমাদের জড়িয়ে ফেলতে চায় গ্লানির পাকে, এর থেকে দূরে দাঁড়াবার মতো একটা আসক্তিহীনতার খুব দরকার।”৩ সেই প্রয়োজনেই নাট্যকার রবীন্দ্রনাথ জয়সিংহের মতন কবিচরিত্রগুলোকে সম্পর্কহীন করে রাখেন কিনা এই প্রশ্ন তুলে কবি শঙ্খ ঘোষ যে জবাব দেন তা হলো, “তখন তারা সংসার থেকে অল্প আলগা হয়ে দাঁড়াতে পারে হয়তো, জীবনের একটা দিক থাকে খোলা, আর সেই খোলা পথেই তারা সংসারকে দেখতে পায় তার সমগ্র স্বরূপে, তার বেদনাময় সৌন্দর্যে [...]।”৪ তাহলে ‘বিসর্জন’ হলো বেদনাময় সৌন্দর্যের নাটক। কারণ জয়সিংহ প্রাণ বিসর্জন দিয়ে মৃত্যুকে বরণ করেছে “মৃত্যুর অর্থে নয়, সুন্দরের অর্থে”।৫

প্রতাপ (রাজদর্প) বনাম প্রতাপ (ঠাকুরের প্রভুত্ব)

অতএব, বিশ্বভারতীর গ্রন্থপরিচয়ে প্রচারিত প্রেম আর প্রতাপের বিরোধ নিয়ে গড়ে ওঠা ‘বিসর্জন’ নাটক আমরা সতর্কভাবে পাঠ করে দেখছি যে, প্রেম আর প্রতাপের বিরোধ নয়, বরং এক প্রকার প্রতাপের সাথে আরেক প্রকার প্রতাপের বিরোধ ঘটে বলেই অবশেষে এই বেদনাময় সৌন্দর্যের নাটকের মুখোমুখি হই আমরা।
   
তবে প্লটনির্মাণে রবীন্দ্রনাথ পারংগম নন, এই বহুশ্রুত অভিযোগটিকে কমপক্ষে ‘বিসর্জন’ নাটকের ক্ষেত্রে সারবান নয় বলে, শঙ্খ ঘোষের সাথে যূথবদ্ধ হয়ে, এই লেখায় আমরা এও প্রস্তাব করতে পারি, জয়সিংহের বিসর্জনের উপরিভাগের নাট্যপ্রবাহ তৈরি হয়েছে গোবিন্দমাণিক্য আর রঘুপতির মধ্যকার ধর্মরক্ষা নিয়ে পারস্পরিক বিরোধের কারণে। নাটকের পরিশিষ্ট অংশে মুদ্রিত বিশ্বভারতীর ব্যাখ্যায় এই বিরোধ যথার্থভাবে চিহ্নিত হয়নি বলেই নাটকটির পাঠার্থ নিয়ে মরীচিকা উৎপন্ন হয়। এই নাটকের পরিশোধিত পাঠের প্রয়োজনে নাটকটি থেকেই নেয়া নিচে উদ্ধৃত সংলাপিকাগুলো পর্যালোচনা করতে পারি-
“রঘুপতি। রাজার ভাণ্ডারে এসেছি/বলির পশু সংগ্রহ করিতে।
গোবিন্দ। মন্দিরেতে জীববলি এ বৎসর হতে/হইল নিষেধ।
[...]
রঘুপতি। এ কি স্বপ্নে শুনি?
গোবিন্দ। স্বপ্ন নহে প্রভু! এতদিন স্বপ্নে ছিনু,/আজ জাগরণ। বালিকার মূর্তি ধ’রে/স্বয়ং জননী মোরে বলে গিয়েছেন,/জীবরক্ত সহে না তাঁহার।
রঘুপতি। এতদিন/সহিল কী করে? সহস্র বৎসর ধ’রে/রক্ত করেছেন পান, আজি এ অরুচি!
গোবিন্দ। করেন নি পান। মুখ ফিরাতেন দেবী/করিতে শোণিতপাত তোমরা যখন।
রঘুপতি। মহারাজ, কী করিছ ভালো করে ভেবে/ দেখো। শাস্ত্রবিধি তোমার অধীন নহে।
গোবিন্দ। সকল শাস্ত্রের বড়ো দেবীর আদেশ।
রঘুপতি। একে ভ্রান্তি, তাহে অহংকার! অজ্ঞ নর,/তুমি শুধু শুনিয়াছ দেবীর আদেশ,?আমি শুনি নাই?
[...]
গোবিন্দ। দেবী-আজ্ঞা নিত্যকাল ধ্বনিছে জগতে।/ সেই তো বধিরতম যেজন সে বাণী/ শুনেও শুনে না।”৬

এই সংলাপিকাগুলো শুনে আমরা দেখতে পাচ্ছি ব্রাহ্মণ রঘুপতি ও রাজা গোবিন্দমাণিক্যের পরস্পর নির্ভরশীল একটি সম্পর্ক আছে। এই সম্পর্ক ব্রাহ্মণের দিক থেকে অর্থনৈতিক ও রাজার দিক থেকে সাংস্কৃতিক। ধর্মাচারের জন্য প্রথা অনুযায়ী বলিদান করতে ব্রাহ্মণকে রাজার উপরে নির্ভর করতে হয়, যা অর্থনৈতিক। আর শাস্ত্রবিধি জেনে ধর্মগত জীবনের জন্য পুরোহিতকে প্রভু সম্বোধন করে রাজাকেও নির্ভর করতে হয়, ব্রাহ্মণের উপরে রাজার এই নির্ভরশীলতা সাংস্কৃতিক। আকস্মিকভাবে, বলিদানে নিষেধাজ্ঞা জারির মাধ্যমে, রাজা গোবিন্দমাণিক্যের সাংস্কৃতিক নির্ভরতা যখন শেষ হয়ে যায়, তখন ব্রাহ্মণ রঘুপতির অর্থনৈতিক স্বার্থে আঘাত আসে। শাস্ত্রবিধির প্রতি এই আঘাতকে রঘুপতি চিহ্নিত করে “রাজদর্প” হিসেবে। প্রথাশাসিত রাজ্যে রাজা নিজের অস্তিত্বকে সংবিধিবদ্ধ করতে খোদ ধর্মকে নয়, নিষিদ্ধ করেন জীববলি। রাজা ধর্মাচারের প্রথাগত প্রণালী সংস্কার করতে চান। গোবিন্দমাণিক্যের এই সংস্কার-বাসনাকেই রঘুপতি ধর্মে প্রত্যাঘাত বিবেচনা করেন। এখানে দেখা যায় উভয়ই ধর্মরক্ষা করতে চান। এই বিরোধের তলে একটি প্রশ্নেরও অবতারণা ঘটে ধর্মের রক্ষাকারী কে? যাজক না রাজন? সেই প্রশ্নের প্রক্রিয়ায় ধর্মরক্ষার নামেই পরস্পরবিরোধী দুই শক্তির মধ্যে বিরোধ ঘটে। এই বিরোধের মূলে আমরা দেখছি ধর্মাচারের প্রণালী সংক্রান্ত রাজা ও ব্রাহ্মণের পরস্পরবিরোধী ব্যাখ্যার বিরোধ। আর ব্যাখ্যা যখন বিরোধ তৈরি করে তখন ক্ষমতার চর্চা অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। ফলে ব্যাখ্যার রাজনীতি পথ পায়। মৃত্যু নামের বেদনাময় সৌন্দর্যের এই নাটকের উপরিকাঠামো গড়ে ওঠে রঘুপতি ও গোবিন্দমাণিক্যের রাজনৈতিক বিরোধের ফলে। এটাই হলো জ্ঞানের রাজনীতি।
 
এখানে লক্ষ্য করবার বিষয় জ্ঞানচর্চার ফলিত ক্ষেত্র হলো নাটকের পাত্র-পাত্রীদের বিশ্বাসের ভূমি। এই নাটকে আমরা দেখছি জ্ঞানের রাজনীতি আাদতে বিশ্বাসের রাজনীতি। বিশ্বাস যখন রাজনৈতিক হয়ে ওঠে তখন বিশ্বাসীদের আধ্যাত্মিক সত্য মিথ্যার মরীচিকায় উৎপন্ন বিভ্রান্তির ঘোরে ভোগে। রাজনীতির ফ্যারে-ঘোরে আক্রান্ত বিশ্বাসের এই সহজ সত্য অপর্ণার স্বতঃস্ফূর্ত বোধনে ধরা পড়ে যায়। তাই অপর্ণা বিশ্বাসের রাজনৈতিক সত্য চিনিয়ে দিতে এই নাটকে ফিরে ফিরে ডাকে, “তুমি চলে এসো জয়সিংহ, এ মন্দির ছেড়ে, দুইজনে চলে যাই।”৭ এই সহজ সত্য চেনার পরে বন্দির হাহাকারের মতন জয়সিংহ আমাদেরকেও উপলব্ধি দেয় “সত্য” এক “কারাগার”।৮ এই কারাগার রচিত হয়েছে রাজদর্প বনাম ঠাকুরের প্রভুত্বজনিত মল্লযুদ্ধে।

বিশ্বাসী জয়সিংহের সহজ সত্য ও আধ্যাত্মিক নীতি

রাজার প্রতাপের সাথে ব্রাহ্মণের প্রতাপের বিরোধে নির্মিত বিশ্বাসের রাজনৈতিক কারার লৌহকপাট ভাঙতে জয়সিংহ প্রাণ বিসর্জনের প্রথম প্রেরণা পায় অপর্ণার কাছ থেকেই। অপর্ণা যেন মন্দিরের বেদীতে শোভা পাওয়া দেবীর বিকল্পায়ন। এই নাটকের ফ্যাক্ট বা ঘটনা অনুযায়ী বিচার করলে ছাগশিশুর মাতারূপী অপর্ণা বিশ্বমাতার বিচার দাবি করতে এসেছে কারণ দেবীর তরে বলি দিতে ‘দরিদ্র এ বালিকার স্নেহের পুত্তলি’ ছাগলের বাচ্চাটিকে প্রতাপশালীর অনুচরেরা কেড়ে এনেছে। কিন্তু প্রথম অঙ্কের প্রথম দৃশ্যের শেষে অপর্ণার দুঃখে কাঁদতে থাকা জয়সিংহের অশ্রুকে অপর্ণা নিষ্ঠুরতার বিপরীতে মায়া হিসেবে চিহ্নিত করে। নিজের প্রতি জয়সিংহের এই মায়ায় অপর্ণার মনে অধিকারবোধ জন্মায়। নিজের মনে হঠাৎ জেগে ওঠা এই অধিকারবোধ হলো প্রেম। আর এই প্রেমের দাবিতেই অপর্ণা জয়সিংহকে ডাকে- “তবে এসো তুমি, এ মন্দির ছেড়ে এসো।”৯
 
অপর্ণার এই আবির্ভাব ও আহ্বান ‘বিসর্জন’ নাটকের বিষয়বোধ সৃষ্টিতে এমনকি এর সম্ভাব্য সকল পরিণতি এক বিন্দুতে মিলিয়ে দিতে প্রধান প্রভাবকের ভূমিকা রাখে। এর ফলে, দেবীরূপী বিশ্বমাতার সেবক জয়সিংহের মনে আত্মপ্রত্যয় জাগে। জয়সিংহ উচ্চারণ করে-“অতিথিরে দেবীরূপে আজিকে করিব পূজা করিয়াছি পণ।”১০

অতিথি অপর্ণাকে দেবীরূপে পূজা করার বাসনা প্রকাশের মাধ্যমে অপর্ণার বিকল্পায়ন ঘটে বিশ্বমাতায়। নিরাকার বিশ্বমাতা যেন সাকার অপর্ণা হয়ে ওঠে। কারণ অপর্ণাকে জয়সিংহ অতিথি ভাবে। রবীন্দ্রনাথও ‘মানুষের ধর্ম’ আলোচনায় বলেছেন-
“তাই আমাদের শাস্ত্রে বলে: অতিথিদেবো ভব। কেননা, আমার ভোগ সকলের ভোগ এই কথাটা অতিথিকে দিয়ে গৃহস্থ স্বীকার করে; তার ঐশ্বর্যের সঙ্কোচ দূর হয়। ব্যক্তিগত মানবের ঘরে সর্বমানবের প্রতিনিধি হয়ে আসে অতিথি, তার গৃহসীমাকে বিশ্বের দিকে নিয়ে যায়। [...] এই আতিথ্যের মধ্যে আছে সোহহংতত্ত্ব-অর্থাৎ, আমি তাঁর সঙ্গে এক যিনি আমার চেয়ে বড়ো। আমি তাঁর সঙ্গে মিলে আছি যিনি আমার এবং আমার অতিরিক্ত।”১১

মন্দিরের গৃহস্থ জয়সিংহ ভিখারিণী অপর্ণাকে অতিথি ভেবে দেবীরূপে পূজার বাসনা করার মাধ্যমে প্রথমত নিজেকে ক্ষুদ্র ভাবতে পেরেছে। দ্বিতীয়ত, নিজের চেয়ে অপর্ণাকে বড় বলে আবিষ্কার করতে পেরেছে। এতে জয়সিংহ নিজেও বড় হবার সাধনায় নিজেকে নিবেদন করার দিশা পেয়েছে। তৃতীয়ত, এই প্রেরণাবিন্দু থেকেই জয়সিংহ ক্ষুদ্র থেকে বৃহতে উত্তরণের সাহস পেয়েছে। এই সাহসের বলে জয়সিংহ পরিণতিতে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে। এই বিসর্জনে সে নিজের ও নিজের অতিরিক্ত বড় সত্ত্বার সাথে মিলনের ধর্মই পালন করেছে।
 
এখানে কৌতূহলের বিষয় হলো, গোবিন্দমাণিক্য আর রঘুপতি বিশ্বাসের যে রাজনীতিতে লিপ্ত থাকে সেখানে দেখা যায় “তাঁরা অহংকে বর্জন” করতে পারেনি, যে অহং বিষয়ে আসক্ত। তাঁরা সেই আত্মাকেও অমান্য করেছে “যে আত্মা সকল আত্মার সঙ্গে যোগে যুক্ত”।১২ কিন্তু বিপরীত দিকে জয়সিংহ “যে স্বাভাবিক জ্ঞানশক্তিকর্ম অন্তহীন দেশে কালে প্রকাশমান”১৩ তাকেই প্রাণ বিসর্জনের ভিতর দিয়ে আমাদের কাছে উন্মোচন করেছে। জয়সিংহের প্রাণ বিসর্জন তাই মৃত্যু নয়, অন্তহীন দেশকালের সমগ্রের সাথে খণ্ডিত অস্তিত্বের যোগেরই নামমাত্র। রবীন্দ্রনাথ মানুষের ধর্ম নিয়ে যা বলতে চেয়েছেন মানুষ হিসেবে জয়সিংহ যেন নিজের ধর্ম পালনে তাই করে দেখিয়েছেন। কারণ, মানুষের ধর্ম বলতে রবীন্দ্রনাথ বিশেষভাবে উচ্চারণ করেছেন, “আমার মন আর বিশ্বমন একই, এই কথাই সত্যসাধনার মূলে, আর ভাষান্তরে এই কথাই সোহহম্।”১৪
 
জয়সিংহ মানবসত্যের আদর্শ ধারণা দিয়ে রচিত এক চরিত্র। রবীন্দ্রনাথ নিজেও যেমন ‘মানবসত্য’ রচনায় লিখেছেন মানুষের জন্মভূমি তিনটি। মানুষের প্রথম বাসস্থান পৃথিবী। দ্বিতীয় বাসস্থান স্মৃতিলোক। তার তৃতীয় বাসস্থান আত্মিকলোক। সেটাকে তিনি বলেছেন সর্বমানবচিত্তের মহাদেশ। “অন্তরে অন্তরে সকল মানুষের যোগের ক্ষেত্র এই চিত্তলোক। কারো চিত্ত হয়তো বা সংকীর্ণ বেড়া দিয়ে ঘেরা, কারো বা বিকৃতির দ্বারা বিপরীত। কিন্তু, একটি ব্যাপক চিত্ত আছে যা ব্যক্তিগত নয়, বিশ্বগত। সেটির পরিচয় অকস্মাৎ পাই। একদিন আহ্বান আসে। অকস্মাৎ মানুষ সত্যের জন্যে প্রাণ দিতে উৎসুক হয়। [...] তখন বুঝি মনের মধ্যে একটা দিক আছে যেটা সর্বমানবের চিত্তের দিকে।”১৫
 
ব্যক্তিগত চিত্তের সংকীর্ণ স্বার্থদ্বন্দ্বে বিদীর্ণ যখন গোবিন্দমাণিক্য ও রঘুপতি, বিশ্বাসের সহজ সত্যের জন্যে প্রাণ বিসর্জন দিয়ে তখন জয়সিংহ প্রমাণ করে যে এমন মৃত্যু আদতে সর্বমানবের চিত্তলোকের দিকে শুধু অভিযাত্রা নয়, গন্তব্যেরও নির্ধারক। আমরা যদি প্রশ্ন তুলি জয়সিংহ সত্যের জন্যে নিজের প্রাণ বিসর্জনের আত্মশক্তি সঞ্চয় করল কীভাবে? এই উত্তরের সপক্ষে আবারও রবীন্দ্রনাথকেই উচ্চারণ করব-
“কিসের জোরে মানুষ প্রাণকে করছে তুচ্ছ, দুঃখকে করছে বরণ, অন্যায়ের দুর্দান্ত প্রতাপকে উপেক্ষা করছে বিনা উপকরণে, বুক পেতে নিচ্ছে অবিচারের দুঃসহ মৃত্যুশেল। তার কারণ, মানুষের মধ্যে শুধু কেবল তার প্রাণ নেই, আছে তার মহিমা।”১৬ প্রাণটুকু ফিজিক্যাল বা শারীরিক, কিন্তু মহিমা শরীর-উত্তীর্ণ মেটাফিজিক্যাল, আর সেই কারণেই তা স্পিরিচুয়াল বা আধ্যাত্মিক। এই পার্থিব সংসারে বিশ্বাসের রাজনীতি দিয়ে জর্জরিত প্রাণকে বিসর্জনের মাধ্যমে জয়সিংহ অবারিত জগতের সাথে নিজেকে স্থাপন করেছে বিশ্বাসেরই আধ্যাত্মিক নীতির প্রয়োগে।

এই ভাবনা পর্যালোচনার পর আমরা তো এ কথা বলতেই পারি জয়সিংহ প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে এটিও ‘বিসর্জন’ নাটকের প্রধান বিষয় নয়। প্রাণ বিসর্জনের বিনিময়ে জয়সিংহ আবিষ্কার করেছে মানুষের মহিমা। ‘বিসর্জন’ নাটকের অর্থ হলো মানুষের মহিমা অর্জন। তাই বিসর্জন হলো অর্জন। অন্তর্গত অর্থের নিরিখে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বিসর্জন’ নাটক বিয়োগান্তক নয়, মিলনান্তক। এই নাটক আমাদেরকে দেখায় মৃত্যুর দূতিয়ালিতে ব্যক্তির সাথে বিশ্বের যোগ।

তথ্যসূত্র:
১.    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিসর্জন, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, কলকাতা, অগ্রহায়ণ ১৪১১, পৃ. ১২২,
২.    শঙ্খ ঘোষ, কালের মাত্রা ও রবীন্দ্র নাটক, দে’জ পাবলিশিং , কলকাতা, ১৯৮৫, পৃ. ১৬৬
৩.    পূর্বোক্ত, পৃ.১৬৮
৪.    পূর্বোক্ত
৫.    পূর্বোক্ত, পৃ.১৭১
৬.    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পূর্বোক্ত, পৃ. ২০-২১
৭.    পূর্বোক্ত, পৃ. ৬৪
৮.    পূর্বোক্ত
৯.    পূর্বোক্ত, পৃ. ১৯
১০.    পূর্বোক্ত
১১.    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মানুষের ধর্ম, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, ১৯৯৯, পৃ.৪৫-৪৬
১২.    পূর্বোক্ত, পৃ.৪৬
১৩.    পূর্বোক্ত
১৪.    পূর্বোক্ত, পৃ.৪৭
১৫.    পূর্বোক্ত, পৃ.৫৪
১৬.    পূর্বোক্ত, পৃ.৫০

শাহমান মৈশান: নাট্যকার নির্দেশক ও প্রাবন্ধিক। সহকারী অধ্যাপক, থিয়েটার এন্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়