Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

বেইল্যার নাচাড়ি : ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যের অভিজ্ঞান

Written by ইসমত আরা ভূইঁয়া ইলা.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

ঐতিহ্যবাহী নাট্যধারা প্রত্যেক জাতির অমূল্য সম্পদ। সেই সূত্রমতে ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্য বাঙালি জাতির ঐতিহ্য স্মারক। আলোচ্য প্রবন্ধে ঐতিহ্যবাহী শব্দটি অত্যন্ত সচেতনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। কাজেই প্রথমত ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা আবশ্যক। বিশ্ব নাট্যাঙ্গনকে অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে পর্যালোচনা করলে অবগত হওয়া যায় যে, প্রত্যেক জাতির নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী নাট্য বিকশিত হয়ে মূল ধারার নাট্যে অধিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু বাঙালির নিজস্ব নাট্যধারা পণ্ডিতবর্গের নিকট বিতর্কের অবতারণা করে। কারণ ঔপনিবেশিক নাট্যধারা বাঙালির ঐতিহ্যবাহী নাট্যকে কোনঠাসা করে রেখেছিল সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কাজেই যারা বাংলা নাট্যের প্রকৃত ইতিহাসকে অনুসন্ধান করেননি তাঁরা ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যকে লোকনাট্য হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সে কারণে বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে লোকনাট্য শব্দটির সমার্থক শব্দ হিসেবে এবং বাংলা নাট্যকে সঠিক মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করার জন্যই মূলত ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্য শব্দগুলোর অবতারণা। এ পর্যায়ে ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যের স্বরূপ অনুসন্ধানের চেষ্টা করা হলো।

ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যের কাহিনী বা অভিনয় কলার উল্লেখযোগ্য লিখিত কোনো রূপ পাওয়া যায় না। এর কাহিনীর উদ্ভাবক, কলাকুশলী, পাত্র-পাত্রী, গীতক, বাদক, দর্শক-শ্রোতা সকলেই পল্লীর সাধারণ লোকসমাজ। আশুতোষ ভট্টাচার্যের মতে, ঐতিহ্যবাহী নাট্য লোকজীবনের কাহিনীর উপর ভিত্তি করে মুখে মুখে রচিত এবং অভিনীত নাটক।১ এর বিষয়বস্তু সম্পর্কে তিনি বিশেষভাবে বলেছেন, কোনো পৌরাণিক কিংবা ঐতিহাসিক কাহিনী তাঁর ভিতরে প্রবেশ করা সঙ্গত নয়।২ আবার অন্যত্র তাঁর স্ববিরোধী মতামত লক্ষ্যণীয়। যেমন : কোনো পৌরাণিক কিংবা ধর্মীয় বা ধর্ম প্রচারমূলক বিষয়বস্তু হলেও তা ঐতিহ্যবাহী নাট্য বলে গণ্য হতে পারে।৩ অজিত কুমার ঘোষের মতে, সাধারণ জনগণের দ্বারা অভিনীত এবং জনসাধারণের সম্মুখে পরিবেশিত নাটকই ঐতিহ্যবাহী নাট্য।৪ এছাড়াও তিনি ঐতিহ্যবাহী নাট্যের কতগুলো লক্ষণ নির্দেশ করেছেন। তাঁর নির্দেশকৃত বৈশিষ্ট্যগুলোকে নিুোক্তভাবে উল্লেখ করা যায়।
ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্য -

-গ্রামীণ লোকসমাজের মধ্যে উদ্ভূত, গ্রামীণ শিল্পীদের দ্বারা অভিনীত এবং গ্রামীণ সমাজের সম্মুখে উপস্থাপিত;
-সাধারণত সঙ্গীত সম্বলিত নৃত্য থেকে উদ্ভূত হয়;
-আঞ্চলিক ভাষাশ্রয়ী, আঞ্চলিক পটভূমি ও ঐতিহ্য এর মধ্যে বিদ্যমান;
-বিষয়বস্তু প্রধানত ধর্মমূলক ও গীতিমূলক। মানুষের ত্যাগ, বিশ্বাস ও ভিত্তি জাগিয়ে তোলাই এর উদ্দেশ্য;
-চারদিকে দর্শক, খোলা আসরে অভিনীত হয়। যেখানে অংশগ্রহণ করে অভিনেতা, বাদ্যযন্ত্রী, অভিনয়-সহায়ককর্মী ও দর্শকম-লী সকলেই;
-মৌখিক ঐতিহ্যবাহী লোকসংস্কৃতির ধারার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে মুখে মুখে রচিত হয়।৫

ইতিহাসের ধারায় ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যকে তিনটি যুগে ভাগ করা যেতে পারে। এ প্রসঙ্গে নাট্য শিক্ষক ড. লুৎফর রহমান নাটকের প্রকৃত ইতিহাস অনুসন্ধান করে প্রমাণ করেন যে, ৬৫০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৩৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের তথা ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যের প্রাচীন যুগ, ১৩৫০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৭৫০ খ্রিষ্টাব্দ সময় পর্যন্ত মধ্যযুগ এবং ১৭৫০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে বর্তমানকাল সময় পর্যন্ত আধুনিক যুগ হিসেবে চিহ্নিত করা সমীচীন।৬ পদ্মা পুরাণ বা মনসা মঙ্গলের বিষয়বস্তু ও ঐতিহ্য সম্বলিত টাঙ্গাইল অঞ্চলের বেইল্যার নাচাড়ি উক্ত মধ্যযুগ সময়কালের অন্তর্ভূক্ত।

ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যের শ্রেণিগত বিভাজনের ক্ষেত্রে এর বিষয়বস্তু আঙ্গিক ও পরিবেশনারীতির নিজস্বতা বিচার বিশ্লেষণ পূর্বক আটটি প্রধান শ্রেণিতে বিভক্ত করা যায়। যেমন-

রামায়ণ ও মহাভারতে বর্ণিত আর্যদেবতা ও অবতারগণের কাহিনীভিত্তিক পরিবেশনা;
মঙ্গলকাব্য সমূহে বর্ণিত স্থানীয় অনার্য বা লোক দেবদেবীর কাহিনী ভিত্তিক পরিবেশনা;
মুসলমানদের ঐতিহ্যবাহী বীর-পীর বা সাধকদের কাহিনী ভিত্তিক পরিবেশনা;
রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান ও ধর্ম নিরপেক্ষ লোক কাহিনী ভিত্তিক পরিবেশনা;
সামাজিক নকশা ও হাস্যরসাত্মক পরিবেশনা;
কবিগান বা দুইদলের গায়েন দোহার কর্তৃক বির্তকধর্মী দ্বান্দ্বিক পরিবেশনা;
যাত্রা পরিবেশনা এবং
পুতুল নাচ ও পটগান পরিবেশনা।৭

বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধের মূল আলোচ্য বিষয় বেইল্যার নাচাড়ি উল্লিখিত মঙ্গলকাব্যসমূহে বর্ণিত স্থানীয় অনার্য বা লোক দেবদেবীর কাহিনী ভিত্তিক পরিবেশনা শ্রেণির অন্তর্গত। কারণ, বেইল্যার নাচাড়ির কাহিনী মঙ্গল কাব্যের অর্থাৎ বিজয় গুপ্তের পদ্মা পুরাণের অনুরূপ।

ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যের আঙ্গিক গঠনের দিকে চোখ ফেরালে দেখা যায় একই বিষয় নির্ভর আখ্যানের রয়েছে ভিন্ন নাম, ভিন্ন আঙ্গিক ও বিচিত্র পরিবেশনারীতি। তবে এ নাট্যে সঙ্গীত এসেছে অপরিহার্যরূপে এবং তা অপরিহার্যভাবেই ব্যবহৃত হচ্ছে। গবেষক ড. সেলিম আল দীনের অনুসন্ধানে মধ্যযুগের বাংলা নাট্যের পরিবেশনারীতি স্পষ্টতর হয়েছে। মধ্যযুগে আমরা পাই ঐতিহ্যবাহী পাঁচালি আঙ্গিক, যার পাঁচটি অঙ্গ। যেমন-

পাঁচালি - পদচালনাপূর্বক ঘুরে ফিরে গান;
ভাবকালী - হাবভাব সুরসহ পদের ব্যাখ্যা;
নাচাড়ি - নৃত্যসহকারে আবৃত্তি ও গান;
বৈঠকী - উপবেশনপূর্বক রাগরাগিনীতে সঙ্গীতালাপ;
দাঁড়াকবি - দাঁড়ানো অবস্থায় দোহারের সমবেত সঙ্গীত।৮

অন্যদিকে সৈয়দ জামিল আহমেদ তাঁর Acinpakhi Infinity the Indigenous Theatre of Bangladesh গ্রন্থে ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্য উপস্থাপনার চারটি বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন-

বর্ণনাত্মক গদ্য -  গদ্যের মাধ্যমে বর্ণনা;
বর্ণনাত্মক গীত - গীত বা গানের মাধ্যমে বর্ণনা;
সংলাপাত্মক অভিনয় - সংলাপ বলে অভিনয় করা এবং
সংলাপাত্মক গীত - গীতের মাধ্যমে উক্তি প্রতুক্তি করা।৯

এতে মূলত দেখা যাচ্ছে যে ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যের পরিবেশনা, অভিনয়রীতি ও আঙ্গিক উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যসমূহের অনুরূপ।

বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধের শিরোনাম হলো বেইল্যার নাচাড়ি : ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যের অভিজ্ঞান। ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যের এই আঙ্গিকটির সরব পদচারণা বাংলাদেশের টাঙ্গাইল অঞ্চলে। মূলত বেইল্যার নাচাড়ি টাঙ্গাইল অঞ্চলের দেওয়া একটি আঞ্চলিক নাম। বেহুলার আঞ্চলিক নাম বেইল্যা আর নৃত্য, গীত, বাদ্য ও অভিনয়ের মাধ্যমে বেহুলা লক্ষিন্দরের আখ্যান উপস্থাপিত হয় বলে একে বলা হয় বেইল্যার নাচাড়ি।১০ আমরা জানি, মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যসমূহ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ঐতিহ্যের স্মারক। মঙ্গলকাব্যের মধ্যে মনসা মঙ্গল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। টাঙ্গাইল অঞ্চলের জনসাধারণ মধ্যযুগের সেই ঐতিহ্যবাহী মনসা মঙ্গলের কাহিনীকে বেইল্যার নাচাড়ি নামকরণ করে নৃত্য, গীত, বাদ্য, অভিনয়ের মাধ্যমে অন্তরে লালন করে আসছে। তাঁদের অন্তরের লালনকৃত সেই অভিজ্ঞান ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যের আলোকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের দাবী রাখে।

বেইল্যার নাচাড়ির প্রচলিত কাহিনী সংক্ষেপ

টাঙ্গাইল অঞ্চলে বেইল্যার নাচাড়ি সাধারণত সাতটি পালায় বা পর্বে পরিবেশিত হয়ে থাকে।১১ পালাগুলো হলো : শিব ও পার্বতীর পালা, পদ্মার পালা, বাজার পালা, বিয়ের পালা, মৃত্যুর পালা, ঘাটের পালা ও জিয়দানের পালা। উক্ত সাতটি পালার কাহিনী সংক্ষেপ তুলে ধরা হলো।

শিব ও পার্বতীর পালা

এ পর্বে শিবের ঔরষে পদ্ম পাতায় জন্মগ্রহণ করে পদ্মা। পদ্মা বড় হলে তার রূপে মুগ্ধ হয়ে শিব তাকে ঘরে নিয়ে আসে বিয়ে করার জন্য। কিন্তু শিবের স্ত্রী পার্বতীকে পদ্মা মা বলে সম্বোধন করে। অগত্যা শিবও তাকে মেয়ে হিসেবে মেনে নেয় এবং দেবী হিসেবে অধিষ্ঠিত করে। ফলে সকলেই পূজা দিতে আসে এই পদ্মা দেবীকে।

পদ্মার পালা

সকলেই পদ্মা দেবীকে পূজা দিলেও চান্দু সদাগর  পূজা দিতে নারাজ। কারণ পদ্মা ব্যাঙ ভক্ষণ করে। এ কারণে জন্ম নেয় পদ্মা দেবী ও চান্দু সদাগরের মধ্যে দ্বন্দ্ব। দ্বন্দ্বের ফলস্বরূপ মনসা ক্ষিপ্ত হয়ে চান্দু সদাগরের ছয়পুত্রসহ বাণিজ্য তরী ঝড়ের মাধ্যমে নদীগর্ভে ডুবিয়ে দেয়। নিঃস্ব চান্দু সদাগর বাড়ি ফিরে দেখে তার স্ত্রী সনেকার গর্ভে আরেক সন্তান জন্ম নিয়েছে। যার নাম লক্ষিন্দর।

বাজার পালা

লক্ষিন্দর বড় হয়। সে বাণিজ্যে যাওয়ার সময় কালিদাস সাগরের সানে বান্ধার ঘাটে বেইল্যাকে স্নান করতে দেখে তার প্রেমে পড়ে। লক্ষিন্দর তার মনের কথা বেইল্যাকে জানানোর জন্য ঘাটে গিয়ে বরশি দিয়ে মাছ ধরে, বেইল্যার মাটির কলসি ভেঙ্গে সোনার কলসি গড়ে দেয়। কিন্তু বেইল্যার মন পায় না সে। এমতাবস্থায় বেইল্যার দাসীর পরামর্শক্রমে লক্ষিন্দর ইছানীনগরে একটি বাজার বসায়। যার নাম প্রেমের বাজার। সেই বাজারেও লক্ষিন্দর বেইল্যাকে বিয়ের প্রস্তাব দিতে ব্যর্থ হয়। তখন লক্ষিন্দর বাজারের চারধারে জাদুর মাধ্যমে নদী তৈরি করে মাঝিবেশে নৌকায় বসে থাকে। বেইল্যা লক্ষিন্দরের নৌকায় নদী পার হওয়ার সময় লক্ষিন্দর বেইল্যাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। এবং সে বলে বেইল্যা বিয়েতে রাজী না হলে নৌকা মাঝ নদীতে ডুবিয়ে দেবে। ফলে বেইল্যা রাজি হয় বিয়েতে।

বিয়ের পালা

বাড়ি এসে লক্ষিন্দর তার বাবা-মাকে  বেইল্যার কথা জানায়। কিন্তু তার বাবা মা এ বিয়েতে রাজি নয়। কারণ বেইল্যার ছয় বোনের সাথে লক্ষিন্দরের ছয় ভাইয়ের বিয়ে হয়েছিল, যারা এখন মৃত। কিন্তু লক্ষিন্দর আত্মহত্যার হুমকি দিলে চান্দু সদাগর রাজি হয় এবং বেইল্যার বাবা সায়মন সদাগরকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু সায়মন সদাগর বিয়ে দিবে না বলে চান্দু সদাগরকে তিনটি কঠিন শর্ত দেয়। যেমন : (১) কয়েকটি দীঘি কেটে তা দুধ দিয়ে ভরে দিতে হবে, (২) বেইল্যার বাড়ি থেকে লক্ষিন্দরের বাড়ি পর্যন্ত সুসজ্জিত পাথরের রাস্তা তৈরি করতে হবে এবং (৩) পণ হিসেবে বেইল্যার সমপরিমান সোনা দিতে হবে। ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে শর্তে রাজি হয় চান্দু সদাগর। মহা ধুমধামের সহিত তাদের বিয়ে হয়।

মৃত্যুর পালা

বিয়ের খবর পেয়ে পদ্মা দেবী চান্দু সদাগরকে হুমকি দেয় যে, সে বাসর রাতেই লক্ষিন্দরকে হত্যা করবে। তাই চান্দু সদাগর লোহার বাসর ঘর বানায় কারিগর বিশ্বকর্মাকে দিয়ে। কিন্তু পদ্মা দেবী কৌশলী হয়ে বিশ্বকর্মাকে হুমকি দিয়ে বাসর ঘরে একটি ছিদ্র রাখতে বাধ্য করে। বাসর ঘরে বেইল্যা লক্ষিন্দর ঘুমিয়ে পড়লে পদ্মা লোহার বাসর ঘরের ছিদ্র দিয়ে সুতানলী সাপ পাঠায়। সাপে যখন লক্ষিন্দরকে দংশন করে বেইল্যা তখন ঘুমন্ত। ঘুম থেকে জেগে বেইল্যা লক্ষিন্দরকে বাঁচানোর জন্যে শত চেষ্টা করে। কিন্তু লক্ষিন্দর ভালো হয় না।

ঘাটের পালা

সতী নারীর পতি মরে না। এই বিশ্বাসকে ধারণ করে বেইল্যা তার স্বামীকে কলার ভেলায় নিয়ে ঘাটে ঘাটে ঘুরে বেড়ায়। বেইল্যা বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে একে একে উদাসিনী ঘাট, কাকের ঘাট, শিয়াল শকুনের ঘাট, গোদার ঘাট, বোয়ালের ঘাট, ধুবুনীর ঘাট অতিক্রম করে পৌঁছে যায় ইন্দু রাজার দেশে।

জিয়দানের পালা

ইন্দু রাজা বেইল্যাকে শর্ত দেয় যে, সে যদি নেচে গেয়ে তাকে খুশি করতে পারে তবেই বেইল্যা তার স্বামীকে ফিরে পাবে। একথা শুনে বেইল্যা শুরু করে ময়ূর নৃত্য। দেখে অত্যন্ত খুশি হয় ইন্দুরাজা। শর্তানুযায়ী ইন্দুরাজা পদ্মা দেবীকে ডেকে এনে লক্ষিন্দরের শরীর থেকে বিষ তুলে নিতে বাধ্য করে। জীবিত হয় লক্ষিন্দর। বেইল্যা এবার তার ছয় ভাসুরসহ জিয়দান প্রার্থনা করে। ফলে সকলেই জীবন ফিরে পায়। অতঃপর সবাই মিলে বাড়ি ফিরে আসে। বেইল্যার অনুরোধে চান্দু সদাগর বাম হস্তে পদ্মাদেবীকে পূজা দেয়।

অন্যদিকে বেইল্যার শ্বশুর-শাশুড়ী তাকে অসতী ভাবতে থাকে। কারণ সে অনেকদিন ঘরের বাইরে ছিল। শুরু হয় বেইল্যার সতীত্বের পরীক্ষা। বেইল্যা একে একে সকল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। অবশেষে তুলা পরীক্ষার আয়োজন করা হয়। এতে বেইল্যা সতী আস্তে আস্তে উপরে উঠতে থাকে। তখন লক্ষিন্দর বেইল্যা সতীর কেশ ধরে তার সাথে উঠতে থাকে। উঠতে উঠতে তারা হিমানী পর্বতে পৌঁছায় যেখানে তারা বর্তমানে পাথর হয়ে রয়েছে।১২

পরিবেশনা সময়ের বিবরণ 

বেইল্যার নাচাড়ি কার্তিক মাসে অমাবশ্যার রাতে কলার খোলের মধ্যে দুধ আর শবরী কলা দিয়ে ভোগ দেওয়ার পর উপস্থাপন করা হয়। এছাড়া সাপে দংশন, সাপের উৎপাত, মানত ইত্যাদি উপলক্ষে যে কোনো সময় হয়ে থাকে।১৩ এ পালা  হয়ে থাকে সাধারণত একদিন, তিনদিন, পাঁচদিন, সাতদিন, নয়দিন, এগারদিন, তেরদিন ব্যাপী আয়োজকের সিদ্ধান্ত, মানত ও সামর্থ্যরে উপর নির্ভর করে। মূলত রাতের বেলা খাবারের পর পালা শুরু হয়ে শেষ রাত্রি অবধি চলে। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পালা শেষ না করতে পারলে দিনের বেলাও হয়ে থাকে, বিশেষ করে বিকাল বেলা।১৪

নির্দেশনা কৌশল

মূলধারার নাটকের ধারণা অনুযায়ী বেইল্যার নাচাড়িতে কোনো নির্দেশক ব্যক্তি বা নির্দেশনারীতি লক্ষ্য করা যায় না। তবে সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণে একজন অদৃশ্য নির্দেশকের সত্তা অনুভব করা যায়। এই নির্দেশক ব্যক্তিটি দলের মূল গায়েন, কখনো প্রবীণ ব্যক্তি, কখনো দলের ম্যানেজার আবার কখনো দলের সম্মিলিত প্রয়াস। এই নির্দেশক দলের সকলকে একত্রিত করে মহড়া কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে থাকেন। তিনি নির্ধারণ করে দেন কে কোন ভূমিকায় অভিনয় করবেন, কোন চরিত্রের সংলাপ বলা কেমন হবে, কোন সময় কোন অভিনয় ক্রিয়া প্রদর্শন করা হবে, নৃত্য, গীত, বাদ্য, পোশাক ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণ কেমন হবে ইত্যাদি বিষয়ে। এবং যথা সাধ্যই অন্যান্য শিল্পীরা তার নির্দেশ অনুযায়ী চলে ও তাঁকে ভক্তি শ্রদ্ধা করে।১৫

কুশীলবের ভূমিকা ও তাঁদের অভিনয়ের বিবরণ

বেইল্যার নাচাড়ি দর্শক সম্মুখে উপস্থাপনার জন্য সাধারণত নিুলিখিত শিল্পী ও সহযোগী আবশ্যক। যেমন-
মূল গায়েন - ১জন
চরিত্রাভিনেতা - ৮/১০ জন
দোহার - ৫/৬ জন
ছুকরি - ৪ জন
বাদ্যযন্ত্রী (হারমোনিয়াম, ঢোল, খোল, জুড়ি-২ জন) - ৫জন।

উল্লেখ্য যে একটি দলে সাধারণ ১২-১৬ জন সদস্য থাকে। তাঁরা একজন একাধিক ভূমিকায় অংশ নেয়। যেমন : মূল গায়েন মাঝে মাঝে চরিত্রাভিনেতা, দোহার, কখনো কখনো বাদ্যযন্ত্র বাজায়, আবার চরিত্রাভিনেতারা ও কখনো কখনো দোহারের ভূমিকায় অংশগ্রহণ করে থাকেন।

কুশীলবগণ এ পালায় বর্ণনাত্মক অভিনয়ে অংশ নেন। তাঁরা প্রয়োজন অনুসারে সংলাপ, নৃত্য, গীত প্রয়োগ করেন ধারাবাহিকভাবে। মূল গায়েন সম্পূর্ণ পালাটিকে তাঁর আয়ত্বে রাখেন। তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয়, কাহিনীর বাঁক পরিবর্তনে ভূমিকা, অন্যান্য কলাকুশলী ও অভিনেতাদের তাৎক্ষণিক নির্দেশনা ইত্যাদি বিষয়ে সার্বক্ষণিক সুতীক্ষ্ম নজর। বেইল্যার নাচাড়িতে ছুকরিদের ভূমিকা রয়েছে ব্যাপক। তারা নারী চরিত্রে অভিনয় করার পাশাপাশি নাচ,গান পরিবেশনের মাধ্যমে দর্শকদের মনোরঞ্জন করেন। এছাড়া দোহার ও বাদ্যযন্ত্রীদের ভূমিকাও উল্লেখযোগ্য। কারণ সমস্ত পালাতে যেখানে গানের অংশ রয়েছে সেখানে মূল গায়েন গানের অন্তরা গেয়ে থাকেন এবং দোহারগান তাঁর সাথে গেয়ে যান ধুয়া। বায়েনরা গানের সময় বাজনা বাজানো ছাড়াও অভিনয় চলাকালীন পরিস্থিতি প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সৃষ্টি করেন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আবহ।

পরিবেশনায় নৃত্য, গীত, বাদ্য ও বর্ণনার সমন্বয়

বেইল্যার নাচাড়ি পালাতে নৃত্য, গীত, বাদ্য ও বর্ণনা অভিনয়ের প্রাণ। এক্ষেত্রে কুশীলবগণ এগুলো বিশেষ কৌশল খাটিয়ে উপস্থাপন করে থাকেন। পালার শুরু থেকে শেষ অবধি কখনো পর্যায়ক্রমিকভাবে, কখনো একই সঙ্গে নৃত্য, গীত, বাদ্য ও বর্ণনার সমন্বয় ঘটতে দেখা যায়। সম্পূর্ণ পালাতে গানের আধিক্য লক্ষ্য করা যায় এবং এর পাশাপাশি ঘুরে ফিরে আসে নৃত্য, গীত, বর্ণনা,। প্রাসঙ্গিক পরিবেশ, স্থান বৈচিত্র্য বুঝাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে সংলাপ ও বর্ণনা। যেমন : সায়মন সদাগরের বাড়ির সামনে গিয়ে চান্দু সদাগর বলে- ‘এইতো দেখা যায় সায়মন সদাগরের বাড়ি। সায়মন সদাগর বাড়ি আছেন’? এক্ষেত্রে সংলাপ দিয়েই বুঝানো হয়েছে সায়মন সদাগরের বাড়ি। ঠিক তার পূর্বেই অভিনেতাদের পরিক্রমনের সাথে বাদ্যের ঝঙ্কার তুলে চান্দু সদাগরের বাড়ি থেকে সায়মন সদাগরের বাড়ির যে দূরত্ব তা বুঝানো হয়েছে। এছাড়াও দৃশ্য পরিবর্তন, দর্শক আহরণ ও দর্শক ধরে রাখার ক্ষেত্রে বাদ্যের অপরিহার্য ভূমিকা লক্ষ্যণীয়। পালার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যেমন : বেইল্যা লক্ষিন্দরের প্রেম, বিয়ে, লক্ষিন্দরকে সাপে দংশন, তাকে বাঁচানোর জন্য বেইল্যার নানান প্রচেষ্টা, বেইল্যার লক্ষিন্দরের সুখ-দুঃখের অনুভূতি সবই প্রকাশ পায় গানের মাধ্যমে। প্রতিটি গানেই দোহার ও মূলগায়েনের নিবিড় সংযোগের ফলে গীত লাভ করে অসাধারণ প্রকাশ ক্ষমতা। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বেইল্যার গায়ে হলুদ মাখানোর দৃশ্যে সখিদের গানের মাধ্যমে বর্ণনা বাস্তব পরিস্থিতি তৈরি করে। যেমন-

আছিলি হলুদ তুই আলানে
আছিলি হলুদ তুই পালানে
আজ কেন হলুদ তুই
বেইল্যার বদনে।

এরই সাথে ছুকরিদের নৃত্য জনসাধারণকে বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্যের দ্বারে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

পোশাক

বেইল্যার নাচাড়ি পরিবেশনায় মূল গায়েন সাদা রঙের পাঞ্জাবি, সাদা ধূতি, কখনো লুঙ্গি ও গলায় গেরুয়া রঙের উত্তরীয় বা শীতকালে গ্রামীণ মাপলার পরিধান করে থাকে। ছুকরির পোশাকে গ্রাম বাংলার নারী চরিত্রের অবয়ব ধরা পড়ে। তারা সাধারণত পরিধান করে লাল ও গোলাপি রঙের শাড়ি, লাল ব্লাউজ, মাথায় রঙিন ওড়না, লাল রঙের সায়া। অন্যান্য চরিত্রাভিনেতারা তাঁদের দৈনন্দিন ব্যবহৃত পোশাক, আবার কেউ কেউ ফতুয়া ও ধূতির সাথে প্রয়োজন অনুযায়ী ওড়না বা গামছা ব্যবহার করে থাকে। উল্লেখ্য যে তাঁদের ব্যবহৃত ধূতিগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শাড়ি দিয়ে তৈরি করা হয়। এছাড়া অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রী ও দোহারগণ ব্যবহার করে থাকেন তাঁদের দৈনন্দিন ব্যবহৃত পোশাক।

সাজসজ্জা

আসর থেকে সামান্য দূরে একটি ঘরের মেঝেতে পাটি বিছিয়ে সাজ গ্রহণ করা হয়। এক্ষেত্রে তাঁদের প্রয়োজনীয় উপকরণ হলো আয়না, চিরুনী, হলুদ পিউরি সাদা-কালো জিংক অক্সাইড, সফেদা, সিঁদুর, জরি, কাঁঠালের পাতা, সরিষার তেল, নারিকেল তেল, তেলের প্রদীপ, কাজল, কাগজের ফুলের মালা, চুড়ি, ফিতা, ঘুঙুর ইত্যাদি।

সাধারণত বাদ্যযন্ত্রী ও দোহার ব্যতিত, সকল অভিনেতা সাজ গ্রহণের পূর্বে ভালো করে মুখ ধুয়ে দুই হাতের তালুতে সিঁদুর নিয়ে হালকাভাবে লাগিয়ে নেয়। এটা করা হয় মূলত মুখের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করার জন্য। এরপর পিউরির সাথে সফেদা, নারিকেল তেল ও অল্প পরিমাণে সিঁদুর মিশিয়ে মুখে লাগিয়ে নেয়। ঠোঁট রাঙানোর জন্য নারিকেল তেলের সাথে সিঁদুর মিশিয়ে ব্যবহার করা হয়। কাঁঠালের পাতায় সরিষা তেল মেখে তেলের প্রদীপের আলোতে ধরে কালি ফেলে ম্যাচের কাঠি দিয়ে সেই কালি লাগানো হয় চোখে ও ভ্রুতে। ছুকরিগণ মাথায় ও মুখে জরি ছিটিয়ে নেয় এবং কপালে ও গালে ম্যাচের কাঠি দিয়ে সিঁদুরের ফোটা ব্যবহার করেন। শেষে তারা মাথায় ফিতা, হাতে চুড়ি ও পায়ে ঘুঙুর পরে আসরে প্রবেশ করেন।

অভিনয়ে সম্পৃক্ত উপকরণ

বেইল্যার নাচাড়ি পরিবেশনায় অভিনয় উপকরণ হিসেবে ছোট্ট নৌকা, বৈঠা, বড়শিসহ কঞ্চির সিপ, মাছ রাখার খালুই, কলার গাছের খোল, জগ, ঝাড়–, ডুমুরের পাতা, বালিশ, নকশি কাঁথা, সাধারণ কাঁথা, কুলা, মুকুট, রুমাল, চিরুনী, আয়না, মালা, চশমা, মুকুট খেলনা সাপ ও বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র ইত্যাদি।

বাদ্যযন্ত্র

এই নাট্য পরিবেশনাতে হারমোনিয়াম বাদ্যযন্ত্রটি আবেগ অনুভূতি ও গানের স্কেল ঠিক করার জন্য অতীব প্রয়োজনীয় উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত। এছাড়া তালযন্ত্র হিসেবে ঢোল, খোল, জুড়ি ও কাঠের করতালের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়।

আলোক

দিনের বেলায় অনুষ্ঠিত পালাতে কোনো কৃত্রিম  আলোর প্রয়োজন পড়ে না। কারণ বেইল্যার নাচাড়ি উন্মুক্ত খোলা স্থানে পরিবেশিত হয়, যেখানে সূর্যের আলোই যথেষ্ট। কিন্তু এ পালা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রাতে অনুষ্ঠিত হয়। সেক্ষেত্রে হারিকেন, হ্যাজাগ এবং বর্তমানে বেদ্যুতিক বাতি আসরে মূল আলোর উৎস। উল্লেখ্য যে, আলোক বাতিগুলো আসরের চারিধারের খুঁটিতে মেঝে থেকে ৬/৭ ফুট উপরে ঝুলানো থাকে।

মঞ্চ বা আসর

বেইল্যার নাচাড়ির আসর বসে খোলা মাঠে যে কোনো উন্মুক্ত স্থানে, বাড়ির বাইরের উঠানে, যেখানে লোক সমাগম হয় খুব সহজেই। মঞ্চের জন্য নির্ধারণ করা হয় ১৬-২০ বর্গ ফুট সমতল ভূমি। এই সমতল ভূমির চারপাশে ১০-১৪ ফুট উচ্চতায় চারটি খুটি দিয়ে তার উপরে মঞ্চ সমপরিমান রঙিন সামিয়ানা টানানো হয়। কোনো কোনো স্থানে দর্শকদের জন্যেও সামিয়ানার ব্যবস্থা থাকে। মঞ্চে সাধারণত পাটি বিছানো থাকে। এছাড়া স্থান বিশেষে খড় বিছিয়ে তাতে নকশি কাঁথা পাতা হয়। মঞ্চের চারদিকে দর্শকের অবস্থান। কখনো কখনো মহিলা ও পুরুষ দর্শকদের জন্য আলাদা আলাদা সীমানা নির্ধারণ করা থাকে। মঞ্চের একপাশে দোহার ও বাদ্যযন্ত্রীদের অবস্থান। তার ঠিক সামনেই অভিনয় এলাকা। অভিনয় শিল্পীদের মধ্যে যখন কারো অভিনয় থাকেনা তখন তারা দোহার, বাদ্যযন্ত্রীর পাশে গিয়ে একটু জিরিয়ে নেয়। নিুে এর গ্রাউন্ড প্লান দেখানো হলো।

শিল্পী সমাজ

বেইল্যার নাচাড়ির সাথে টাঙ্গাইল অঞ্চলের সাধারণ জনগণ সম্পৃক্ত। তাঁরা বেশিরভাগই নিরক্ষর বা সামান্য অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন। তবে তাঁরা স্বশিক্ষায় শিক্ষিত। এদের মধ্যে বেশিরভাগ শিল্পীই ইসলাম ধর্মাবলম্বী, যারা কৃষি ও ছোটখাটো ব্যবসার সাথে জড়িত। মনসা দেবীকে এই শিল্পী সমাজ মনে প্রাণে বিশ্বাস করে। কাজেই তাঁরা কার্তিক মাসে অমাবশ্যার রাতে কলার খোলের মধ্যে দুধ আর কলা দিয়ে মনসা দেবীকে ভোগ দিয়ে থাকেন। এছাড়া শ্রাবণ সংক্রান্তিতেও তারা নিজে মনসার পূজা করেন।

দর্শক সমাজ

সাধারণ জনগণই বেইল্যার নাচাড়ির দর্শক। অত্র অঞ্চলের নিরক্ষর ও সামান্য অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তি যারা স্বল্প আয়ের মানুষ; কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী চায়ের দোকানদার, রিক্সা, ভ্যানচালক, দিনমজুর; সারাদিন  কর্মক্লান্তির অবসাদ দূর করে যাদের ঐতিহ্যবাহী নাট্যধারা আকৃষ্ট করে; যারা মনে প্রাণে এসব বিশ্বাস করে; সেসকল নারী-পুরুষ বেইল্যার নাচাড়ির আজীবন দর্শক। তবে অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন মানুষ, যারা নিজেদের শিক্ষিত বলে দাবী করে তারা বেইল্যার নাচাড়ি থেকে দূরে সরে আছে।

আয়োজক

মনসা পূজার বিশ্বাসী ব্যক্তিবর্গ সাধারণত বেইল্যার নাচাড়ির আয়োজন করে থাকে। এছাড়া মানত শোধ দেওয়ার জন্য, কাউকে সাপে দংশন করলে, বাড়িতে সাপের উৎপাত দেখা দিলে, যে কোনো বিপদে পড়লে, স্বপ্নে সাপের কামড় খেলে, কখনো কখনো আনন্দ ফূর্তি করার জন্য এসবে সম্পৃক্ত মুসলমান, হিন্দু ব্যক্তিরাই আয়োজন করেন।১৬

সম্মানী

আয়োজনকারীর সামর্থ্যের উপর ভিত্তি করে একটি দল দিবা-রাত্রি ২৪ ঘন্টা বেইল্যার নাচাড়ির সম্পূর্ণ পালা উপস্থাপনে ১০০০ টাকা থেকে ৫০০০ টাকা পর্যন্ত সম্মানী নিয়ে থাকে। যদি একাধিক রাত্রি সেই পালা চলে তাহলে প্রতি রাতের জন্য ১০০০/১৫০০ টাকা সম্মানী নির্ধারণ করা হয়। এছাড়া পালা শেষে শিল্পীরা শাড়ি, ব্লাউজ, সায়া, লুঙ্গি, গামছা, গেঞ্জি ইত্যাদিও সম্মানী হিসেবে পেয়ে থাকে। উল্লেখ্য যে, আয়োজনকারী সম্মানীর টাকা দিতে অপারগ হলে এলাকার লোকজন চাঁদা তুলে তা পূরণ করে থাকে।

বেইল্যার নাচাড়ির বিশ্লেষণ

বাংলাদেশে ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যের বৈশিষ্ট্য, আঙ্গিক, পরিবেশনারীতির ভিত্তিতে বেইল্যার নাচাড়ি বিশ্লেষণের প্রয়াস পাওয়া যায়। মূলত পর্ব-বিভাজন করে এই নাট্যিক বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যের একটি পালায় সাধারণত তিনটি অংশ বা পর্ব পাওয়া যায়। যেমন : ১ আখ্যান পূর্ব পর্ব, ২. আখ্যান পর্ব ও ৩. অন্তপর্ব।

আখ্যান পূর্ব পর্ব

এ পর্বে সাধারণত থাকে কনসার্ট, ভক্তিমূলক গান, সাম্প্রতিক জনপ্রিয় গান, দেশাত্মবোধক গান, পালা প্রদর্শনের কোনো উদ্দেশ্য (পূজা মানত প্রভৃতি) থাকলে তার বর্ণনা, পালার নাম ঘোষণা ও বন্দনা ইত্যাদি। বেইল্যার নাচাড়িতে আখ্যান পূর্ব পর্বে দেখা যায় প্রথমেই কনসার্ট, তারপর দেশাত্মবোধক গান। এরপর মূল গায়েন দাঁড়িয়ে পালার নাম ঘোষণা করেন এবং পালাটি কী উপলক্ষে পরিবেশিত হচ্ছে তা জানিয়ে দেন দর্শকদের। মূল গায়েনের কথা শেষে চারজন ছুকরি দাঁড়িয়ে চারদিকে ঘুরে ঘুরে বন্দনা গীত গেয়ে থাকেন। এ পর্যায়ে নবী-রাসূল, হিমালয় পর্বত, বেইল্যা সতীর চরণ, পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ, গুরুর চরণ প্রভৃতি বন্দনা গেয়ে থাকেন। যেমন-

প্রথমে বন্দনা গো করি
রাসুলের চরনেরে
ওরে বন্দি আমি লোহার বাসরে।

আখ্যান পর্ব

আখ্যান পর্বই একটি পালার মূল পর্ব। এ পর্বে পালার মূল কাহিনী উপস্থাপন করা হয়। এজন্য অভিনেতারা নিুোক্ত বিষয় সমূহের আশ্রয় গ্রহণ করে থাকেন। যেমন : ১ বর্ণনাত্মক গদ্য, ২. বর্ণনাত্মক গীত ৩. সংলাপত্মক অভিনয় ও ৪. সংলাপাত্মক গীত।

বর্ণানাত্মক গদ্য

বেইল্যার নাচাড়ি লিখিত কোনো পাণ্ডুলিপি থাকে না। বিজয়গুপ্তের পদ্মাপুরাণ অনুযায়ী প্রচলিত কাহিনীকে অবলম্বন পূর্বক অভিনেতারা তাৎক্ষণিকভাবে সংলাপ তৈরি করে গদ্যের মাধ্যমে পরিবেশ পরিস্থিতি বর্ণনা করে থাকে। উদাহারণস্বরূপ উল্লেখ্য যে, যখন পরিস্থিতি অনুযায়ী কাহিনী পরিবর্তন ও সংক্ষিপ্ত করা হয় তখন কথকের মুখে শোনা যায়- দর্শকবৃন্দ বেইল্যার কথা থাকে এখানে পড়ি, ঐদিকে চান্দু সদাগরের কি যে হইলো, শুন হয়ে মনোযোগী। বর্ণনা শেষে কথক চরিত্রাভিনয়ে অংশ নেয়।

বর্ণনাত্মক গীত

এক্ষেত্রে গায়েন ও দোহারগণ গানের মাধ্যমে বর্ণনা করে থাকেন। বেইল্যার নাচাড়ি, পালায় গীতের মাধ্যমে বর্ণনা করা হয় বহুবার। লক্ষিন্দরকে যখন সাপে কামড় দেয় তখন বেইল্যা ঘুমন্ত লক্ষিন্দর গানে গানে ঘুমন্ত বেইল্যাকে জাগানোর চেষ্টা করে এবং গানের মাধ্যমেই বর্ণনা করে যে কিভাবে সাপের বিষ ছড়িয়ে যাচ্ছে তার সারা শরীরে। এরকম সময় গায়েন প্রথম দুই লাইন করে গেয়ে থাকে এবং দোহারগণ গেয়ে থাকে স্থায়ী বা ধুয়া।

গায়েন
ওঠ ওঠ ওঠ বেইল্যা
দেখনা গো চক্ষু মেইলা

দোহার
হায় তবু বেইল্যা না পাইলা চৈতন
তবু বেইল্যা...

গায়েন
সকালে কাঁদবা উইঠ্যা
মরা পতি বুকে লইয়া

দোহার
হায় তবু বেইল্যা না পাইল্যা চৈতন
তবু বেইল্যা...

সংলাপাত্মক অভিনয়

এ রীতিতে বেইল্যার নাচাড়ির অভিনেতারা বিষয়বস্তু ঠিক রেখে তাৎক্ষণিক উদ্ভাবনের মাধ্যমে দৃশ্য ও পরিস্থিতি অনুযায়ী সংলাপ সহযোগে অভিনয় ক্রিয়া সম্পাদন করে। উদাহারণস্বরূপ উল্লেখ্য চান্দু সদাগর ও সায়মন সদাগরের কথোপকথন।

চান্দু সদাগর
আমি আইছি আমার ছেলে লক্ষিন্দরের সাথে তোমার মেয়ে বেইল্যার বিয়ার প্রস্তাব নিয়া। তুমি কি রাজি?

সায়মন সদাগর
যদি তুমি সাতটি পুকুর কাইটা দুধ দিয়ে ভইরা দ্যাও, পণ হিসেবে বেইল্যার ওজনে সোনা দিতে পার, শুধু তাই নয়, তোমার আমার বাড়ির যাতায়াতের রাস্তা যদি পাথর দিয়া গড়াইয়া দিতে পার, তবেই আমি রাজি।

সংলাপাত্মক গীত

এক্ষেত্রে বেইল্যার নাচাড়িতে অভিনেতারা গানের মাধ্যমে সংলাপে অংশগ্রহণ করে। কোনো কোনো দৃশ্যের প্রায় সম্পূর্ণ অংশই গান আকারে উত্তর প্রত্যুত্তরের মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়ে থাকে। যেমন : নদীর ঘাটে বেইল্যা লক্ষিন্দরের কথা বার্তা গানের মাধ্যমে হয়।

বেইল্যা
অদিক সইরে ফালাওনা বরশি
ভালো জাইলা রে

লক্ষিন্দর
অধিক সইরে বুরাওনা কলসি
সুন্দর বেইল্যারে।

পরিক্রমণ

পরিক্রমণ বা পরিভ্রমণ ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। বেইল্যার নাচাড়িতেও পরিক্রমণের মাধ্যমে স্থান, পরিবেশ, পরিস্থিতি, চরিত্র, বিষয় প্রভৃতির পরিবর্তন লক্ষণীয়। যেমন : চান্দু সদাগর মঞ্চে একবার ঘুরে সায়মন সদাগরের বাড়ি গিয়ে বলে, সায়মন সদাগর বাড়ি আছেন? এক্ষেত্রে একই সাথে স্থান ও দৃশ্যের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। বেইল্যার নাচাড়ি উপস্থাপনে এরকম পরিক্রমণ অসংখ্য।

রস

ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যে প্রতিটি পালাতে একটি মূল রস থাকে কিন্তু পালা শেষ হয় সাধারণত অন্য রসের মাধ্যমে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পরিলক্ষিত হয় মিলনাত্মক পরিণতি। বেইল্যার নাচাড়ি এই বৈশিষ্ট্যটি ধারণ করে সম্পূর্ণরূপে। আমরা জানি, বেইল্যার নাচাড়িতে করুণ রসের প্রাধান্য বেশি। যেমন : বিয়ের রাতে লক্ষিন্দরের সাপের কামড়ে মৃত্যু, মৃত স্বামীকে নিয়ে বেইল্যার কষ্টের সাগর পাড়ি এবং অবর্ণনীয় দুঃখ দুর্দশার শিকার ইত্যাদি বিষয়। কিন্তু এ পালার চূড়ান্ত পরিণতি হয় মিলনাত্মক। কারণ শেষ পর্যন্ত বেইল্যা তার মৃত স্বামীর জীবন ফিরে পায় এবং চান্দু সদাগর ফিরে পায় তার প্রাণ প্রিয় সাত ছেলেকে।

অন্তপর্ব

এ পর্বে সাধারণত ভুলত্রুটির জন্য গান বা সংলাপের মাধ্যমে উপস্থিত দর্শকের নিকট ক্ষমা চাওয়া হয় এবং ঘোষণার মাধ্যমে পালা শেষ করা হয়। বেইল্যার নাচাড়িতে মূল গায়েন সংলাপ আকারে ভুলত্রুটির জন্য দর্শকের কাছে ক্ষমা চেয়ে থাকেন এবং আগামীতে আবার এই পালা দেখার আমন্ত্রণ জানিয়ে পালা শেষ করার ঘোষণা দেন। সবশেষে বেইল্যার নাচাড়ির প্রচলিত সুরে একটি জনপ্রিয় গান, নৃত্য ও কনসার্ট এর মাধ্যমে তা শেষ হয়।

বেহুলা লক্ষিন্দরের আখ্যান নিয়ে বাংলাদেশের যে ঐতিহ্যবাহী নাট্যধারা তা স্থান-কাল পাত্রভেদে বিভিন্ন নাম গ্রহণ করেছে। যেমন : মনসার গান, বিষহরির পালা, পদ্মার নাচন, বেহুলার ভাসান, রয়ানি প্রভৃতি। বৈচিত্রপূর্ণ এই নাট্যাঙ্গিক স্বমহিমায় ভাস্বর। কিন্তু দুঃখের বিষয় বাংলাদেশে নাগরিক নাট্যচর্চায় কোনো কোনো নাট্যজন মনে করেন বাংলা নাটকের ইতিহাস দুইশত বছরের। বাংলা নাটকের প্রকৃত ইতিহাসকে অবজ্ঞা করে এই ধরনের মন্তব্য আত্মহত্যার শামিল। তবে আশারবাণী এই যে, বর্তমান শিক্ষিত নাট্য সমাজ বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা ও নাট্যতত্ত্ব বিষয়ের শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীরা বাংলা নাট্যের প্রকৃত গবেষণায় এগিয়ে এসেছে। যার ফলে আমরা হয়ত ফিরে পাব আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যকে। এবং আমাদের নিজস্ব নাট্য ঐতিহ্যকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে পারব নির্দিদ্ধায়।

তথ্যপঞ্জি :
১. আশুতোষ ভট্টাচার্য, বাংলার লোকসংস্কৃতি, ন্যাশলান বুক ট্রাস্ট, ইন্ডিয়া, ১৯৮২, পৃষ্ঠা-১২৯।
২. প্রাগুক্ত, পৃষ্টা-১২৯।
৩. আশুতোষ ভট্টাচার্য, উত্তর বাংলার গ্রামীণ লোকনাট্য, চতুষ্কোণ, বৈশাখ, ১৩৮৩, পৃষ্ঠা-১৩১।
৪. ধ্রুবদাস, ভারতের লোকনাট্য, প্রতিভাস, ১৯৯২, ভূমিকা, পৃষ্ঠা-৯।
৫. শ্রীসনৎ কুমার মিত্র (সম্পাদনা), বাঙলা গ্রামীণ লোকনাটক, লোক সংস্কৃতি গবেষণা পরিষদ, পশ্চিমবঙ্গ, প্রথম প্রকাশ, ডিসেম্বর-২০০০, পৃষ্ঠা-১৬।
৬. লুৎফর রহমান, বাঙলা নাটকের প্রকৃত ইতিহাস অনুসন্ধান, থিয়েটার স্টাডিজ, ১৯৯৮, সম্পাদনা : সেলিম আল দীন, নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা, পৃষ্ঠা-৬৬-৬৭।
৭. বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, নাট্যকলা ও চলচ্চিত্র বিষয়ক বিভাগ (ব্যবস্থাপনা) কর্তৃক প্রকাশিত ব্রোশিওর, লোকনাট্য সপ্তাহ-২০০৭, ভূমিকা অংশ।
৮. সেলিম আলদীন, মধ্যযুগের বাঙলা নাট্য, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ, জুন-১৯৯৬, পৃষ্ঠা-৭৭।
৯. Syed Jamil Ahmed, Acinpakhi Infinity, Indigenous Theatre of Bangladesh, The Univsristy press limited, First published 2000, page-144.
১০. মোঃ তাহের আলী, মূল গায়েন, বেইল্যার নাচাড়ি দল, মধুপুর, টাঙ্গাইল (অডিওতে ধারণকৃত সাক্ষাৎকার)।
১১. মোঃ কুরবান আলী, প্রবীণ শিল্পী, বেইল্যার নাচাড়ি দল, মধুপুর, টাঙ্গাইল (অডিওতে ধারণকৃত সাক্ষাৎকার)।
১২. প্রাগুক্ত।
১৩. মোঃ তাহের আলী, মূল গায়েন, বেইল্যার নাচাড়ি দল, মধুপুর, টাঙ্গাইল (অডিওতে ধারণকৃত সাক্ষাৎকার)।
১৪. প্রাগুক্ত।
১৫. লুৎফর রহমান, চরিত্রাভিনেতা, বেইল্যা নাচাড়ি দল, মধুপুর, টাঙ্গাইল (অডিওতে ধারণকৃত সাক্ষাৎকার)।
১৬. হুমায়ুন কবির, চরিত্রাভিনেতা, বেইল্যা নাচাড়ি দল, মধুপুর, টাঙ্গাইল (অডিওতে ধারণকৃত সাক্ষাৎকার)।

ইসমত আরা ভূঁইয়া ইলা : নাট্যকলা সঙ্গীত বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়- এম.ফিল গবেষক