Full premium theme for CMS
হাবিব তানভীর ও তাঁর ‘নয়া থিয়েটার'
Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..
কোনো কোনো ব্যক্তি তার জীবদ্দশাতেই হয়ে ওঠেন কিংবদন্তী। এরকম ঘটনা খুব বিরল। সদ্যপ্রয়াত হাবিব তানভীর ছিলেন সেরকম একজন মানুষ। হাবিব তানভীর ছিলেন সমকালীন ভারতীয় নাট্যকলার এক প্রবাদ পুরুষ। গত ৮ জুন ২০০৯ মঞ্চমায়া ত্যাগ করে চলে গেছেন চিরদিনের মতো। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৫ বৎসর।
পেশোয়ার থেকে আসা হাফিজ আহমেদ খানের পুত্র হাবিব আহমেদ খান তানভীরের জন্ম ১৯২৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর ছত্তিশগড়ের রায়পুরে। রায়পুরের লউরি মিউনিসিপ্যাল হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন ও নাগপুরের মরিস কলেজ থেকে বি.এ পাশ করেন ১৯৪৪ সালে। তারপর ১৯৪৫ সালে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.এ প্রথম বর্ষে পড়াকালীন পড়াশুনা ফেলে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য চলে যান বোম্বাই। বোম্বেতে তাঁর সাথে যোগাযোগ ঘটলো বিখ্যাত বোখারীভাইদের একজন অল ইন্ডিয়া রেডিও বোম্বাই কেন্দ্রের কর্ণধার জুলফিকার বোখারীর সাথে। তিনি হাবিব তানভীরকে রেডিওতে প্রযোজক ও অভিনেতা হিসেবে কাজ করবার কথা বললে তিনি রাজী হয়ে যান।
কোনোরকম পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই তাঁর শুরু হয় এক নতুন কর্মজীবন। অবশ্য এক্ষেত্রে তাঁকে সাহায্য করে তাঁর কবিতা লেখার চর্চা। জীবনের শুরুতেই তিনি তাকাল্লজ ছদ্মনামে উর্দূ কবিতা লিখতে শুরু করেন। পরবর্তীকালে তাঁর এ নামটি আর স্থায়ী হয় নি। হাবিব তানভীর নামেই তিনি পরিচিতি লাভ করেন।
বোম্বাই এর জীবনের শুরুতে জুলফিকার বোখারীর অনুকরণে তিনি আফ্রো স্টাইলে চুলও রাখতে শুরু করেন। কিন্তু ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির ফলে জুলফিকার বোখারী পাকিস্তানের লাহোরে চলে গেলে ছন্দপতন ঘটে হাবিব তানভীরের জীবনে। এসময় তাঁকে জীবিকার জন্যে এক কঠিন সময় পার করতে হয়। চলচ্চিত্র ও বিজ্ঞাপনের জন্য লেখা, পত্র-পত্রিকার জন্য লেখা ইত্যাদি নানারকম কাজ করতে হয়। যে উদ্দেশ্য নিয়ে বোম্বাই যাওয়া অর্থাৎ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে খ্যাতিমান হওয়া, তা আর হয়ে ওঠে না। চলচ্চিত্রে প্রতিষ্ঠা না পেলেও, এ সময়ে এমন কিছু অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তির সাথে তাঁর সম্পর্ক হয় যা পরবর্তী জীবনে ‘হাবিব তানভীর’ হয়ে ওঠার পেছনে বিশেষ ভূমিকা রাখে। হাবিব তানভীর বোম্বাই আসার কিছুকাল আগেই গঠিত হয় ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার এসোসিয়েশন (আইপিটিএ)। হাবিব তানভীর যুক্ত হন এর সাথে। এ সময় তিনি বলরাজ শাহানী, দিনা পাঠক প্রমুখের সাথে নাটক নিয়ে কাজ করেন। সে সময় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের জন্য ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ঘোষিত হলে আইপিটিএ নেতারা একের পর এক জেলে বন্দি হচ্ছিলেন। তখন তাঁকে সংগঠনের নেতৃত্ব নেয়ার জন্য বলা হলেও রণদিভে লাইনের কারণে তা আর সম্ভব হয় নি। আইটিপিএ প্রায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। এ রকম একটি পরিস্থিতিতে হাবিব তানভীর ১৯৫৩ সালে বোম্বাই ছেড়ে চলে আসেন দিল্লীতে।
দিল্লীতে এলিজাবেথ গুবার পরিচালিত একটি স্কুলে নাটকের শিক্ষকতা শুরু করেন। এ সময় সাথী ছিলেন তাঁর সাথে বোম্বাই থেকে আসা এম.এস সাথ্যু। তখন তাঁরা দুজনে মিলে যুক্ত হন বেগম কুদসিয়া জায়েদীর হিন্দুস্থানী থিয়েটারে। সেখানে তাঁরা মঞ্চস্থ করতে থাকেন ইউরোপীয় ক্লাসিক্যাল ও সংস্কৃত নাটক।
এ সময় দিল্লীর জামিয়া মিল্লিয়ার কিছু তরুণ মিলে তৈরি করেন একটি নাট্যদল। হাবিব তানভীর তাঁদের জন্য লিখলেন ‘আগ্রাবাজার’, ১৯৫৪ সালে। কুদসিয়া জায়েদীর হিন্দুস্থানী থিয়েটার ও ‘আগ্রাবাজার’ নাটক করবার সময় তাঁর সাথে যুক্ত হন সহনির্দেশক ও পরবর্তীকালে তাঁর স্ত্রী মনিকা মিশ্রে। নাট্যকার হিসেবে ‘আগ্রাবাজার’ তাঁকে এনে দেয় বিশেষ খ্যাতি। উনিশ শতকের বিখ্যাত উর্দু কবি নাজিব আকবরাবাদীর সময় ও কর্ম নিয়ে রচিত এই নাটকে দিল্লীর ওখলা গ্রামের লোকশিল্পী ও অধিবাসীদের নিয়ে আসেন মঞ্চে। সেই সাথে মঞ্চে নিয়ে আসেন দিল্লীর জামিয়া মিল্লীর ছাত্রদের। যা ভারতীয় নাটকের ইতিহাসে আর কখনো ঘটে নি। নাটকটি তিনি কোনো মঞ্চে না এনে মঞ্চস্থ করেন বাজারের খোলা জায়গায়।
বলা যেতে পারে এভাবেই তিনি অভিজ্ঞতাহীন ও অপ্রশিক্ষিত অভিনেতৃ আর লোকশিল্পীদের নিয়ে যে পরীক্ষ-নিরীক্ষা শুরু করেন, তার ভেতরেই লুকিয়ে ছিল তাঁর ছত্তিশগড়ের নয়া থিয়েটারের ভ্রুণ।
‘আগ্রাবাজার’ নাটকে হাবিব কবিতা ও সংগীতকে ব্যবহার করেছেন অবলীলায়। কবিতা ও সংগীত এখানে ব্যবহৃত হয়েছে নাটকের অন্তর্নীহিত শক্তি হিসেবে, বাইরের অলঙ্কার হিসেবে নয়।
‘আগ্রাবাজার’ মঞ্চায়নের পরপরই তিনি নাটক নিয়ে পড়তে চলে যান ইংল্যান্ডের ‘রয়েল একাডেমি অব ড্রামাটিক আর্টস’ (RADA)- এ। সে সময় তিনি ব্রিস্টল ওল্ডভিক থিয়েটার স্কুলে নাটকের নির্দেশনাও দেন। এ সময় তিনি ঘুরে বেড়ান সারা ইউরোপ জুড়ে। তাঁর ইউরোপ ভ্রমণকালীন ১৯৫৬ সালে দীর্ঘ ৮ মাস কাটান জার্মানির বার্লিনে। ব্রেখটের মৃত্যু হয়েছে সামান্য কিছু আগে, আর তাই, সে সময় বেশ জোরেসোরেই অভিনীত হচ্ছিল ব্রেখটের নাটকগুলো। ব্রেখটের নাটকগুলো তাঁকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করে। RADA-র শিক্ষা তাঁর কাছে গুরুত্ব হারাতে থাকে। তখনই তাঁর ভাবনায় আসে নিজস্ব সংস্কৃতির পরিমণ্ডলে নাটক করবার ভাবনাটি। উপনিবেশিক ভাবনা থেকে সরে আসেন তিনি। ইউরোপ থেকে ফিরে তিনি প্রথম মঞ্চে আনেন শূদ্রকের ‘মৃচ্ছকটিক’-র অনুবাদ ‘মিট্রি কা গাড়ি’।
এ নাটকে তিনি নিয়ে আসেন ছত্তিশগড়ের ৬ জন লোকশিল্পীকে। ছত্তিশগড়ের লোকনাট্য নাচা’র কৌশল যুক্ত করেন মঞ্চায়নে। এভাবে তিনি বিষয় ও প্রকরণে ভারতীয় নাট্যশালায় উপহার দেন এক নতুন নাটকের। ভারতীর আঙ্গিক ও স্টাইলে এ এক অপূর্ব সমন্বয়।
তাঁর এ কাজের পেছনে যেসব ঘটনা ও অভিজ্ঞতা সহায়তা করেছে তা হলো- আইপিটিএ-র নাটকে মারাঠী ও গুজরাটী প্রবাদ প্রবচনের ব্যবহার, ‘আগ্রাবাজার’ মঞ্চায়নের অভিজ্ঞতা ও বার্লিনের আনসম্বলের ব্রেখটের নাটক।
‘মিট্রি কা গাড়ি’ সংস্কৃত পণ্ডিত ও সমালোচকদের মাঝে বিরূপ প্রতিক্রিয়া করলেও দর্শকদের কাছে তা ভীষণভাবে জনপ্রিয় হয়।
কুদসিয়া জয়েদীও নাটকে ছত্তিশগড়ী লোকশিল্পীদের ব্যবহার মেনে নিতে পারেন না। দুজনের মাঝে সৃষ্ট বিরোধের ফলে হাবিব তানভীর হিন্দুস্থানী থিয়েটার ত্যাগ করেন এবং মনিকা মিশ্রকে সাথে নিয়ে গড়ে তোলেন ‘নয়া থিয়েটার’। এবার ছত্তিশগড়েরর বাসিন্দা আর লোকশিল্পীদের নিয়ে শুরু হলো তাঁর নয়া থিয়েটার যাত্রা। গ্রামীণ শিল্পী নিয়ে দেশজ আঙ্গিক নিয়ে নাটক। যা একই সাথে পৌঁছে গেছে শহর ও গ্রামের দর্শকদের মাঝে। শুধু স্বদেশের গল্পগাথাই নয়, বিদেশী ক্লাসিক নাটকও নয়া থিয়েটারে পায় এক নতুন রূপ। হিন্দুস্থানী থিয়েটার থেকে এসে তিনি ‘মিট্রি কা গাড়ি’-র একটি নতুন প্রযোজনা মঞ্চে আনেন। তাঁর এ প্রযোজনা দেখার সময় ভুলে যেতে হয় এর প্রাচীনত্ব। প্রতিটি চরিত্রই সময়ের মর্যাদা, পোশাক ও অঙ্গসজ্জা যেমন ধরে রেখেছে, তেমনি প্রাচীন নাটকের আধুনিকত্বকেও তুলে ধরেছে। আর এই গতি এনে দিয়েছে মধ্য প্রদেশের লোকসংস্কৃতি। নাটকের অন্যতম চরিত্র শকার আবদুল করিম ঘরানার গান গাইতে চায় আর একবার বিচার সভায় এসে সকলের ‘এরিয়া’ ও ‘বোনাস’ মিটিয়ে দেবার প্রতিশ্রুতি দেয়। এভাবেই হাবিব তানভীর ক্লাসিক নাটকের নাটকের নতুন ব্যাখ্যা দেন।
কুরোসাওয়া যেমন ‘ম্যাকবেথ’কে ‘থ্রোন অঙ ব্লাড’ এ রূপান্তরিত করেন হাবিব তানভীরও সেভাবেই মূল কাঠামো নিয়ে ছত্তিশগড়ী রীতিতে আঁকেন তাঁর চালচিত্র। গ্রামীণ শিল্পীদের স্বাভাবিক নৈপুণ্যকে লাগান তাঁর সৃষ্টিতে। চমক লাগানোর জন্য যত্রতত্র নাচগান জুড়ে দেন না। যা আনেন, তা নাটকের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবেই নিয়ে আসেন। আর সে কাজটি করেন অত্যন্ত পরিমিতি বোধের মাধ্যমে।
হাবিব তানভীরের সবচেয়ে আলেচিত, জনপ্রিয় এবং বিখ্যাত নাটক ‘চরণদাস চোর’। নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের সৌজন্যে বাংলাদেশের অনেক দর্শকেরই নাটকটি দেখার সুযোগ হয়েছে। নাটকটির কাহিনী রাজস্থানের একটি লোককাহিনী। প্রথম এর নাম ছিল ‘চোর চোর’। স্থিতি ছিল ৫০ মিনিট। নাটকের কহিনী কাঠামো আপাতদৃষ্টিতে খুবই সাধারণ। চরণদাস নামে এক চোর এক সাধুর কাছে ৩টি প্রতিজ্ঞা করে। তার মধ্যে একটি ছিল এই যে, কোনো রানী যদি কখনো তাকে বিয়ে করতে চান, চরণদাস তাতে রাজী হবে না। ঘটনাচক্রে দেশের রানী যখন সত্য সত্যই এ প্রস্তাব দিলেন চরণদাস তখন সত্যভঙ্গ করতে রাজী হলো না। তাকে রাজী করানো সম্ভব না দেখে রানী তাকে বললেন, সে যেন রানীর দেওয়া এ প্রস্তাবের কথা কাউকে না বলে। কিন্তু সত্য পালনে উদগ্রীব চরণদাস তাতে রাজী হয় না। অবশেষে উপায়ন্তর না দেখে রানী তার মুখ বন্ধ করবার জন্য অনুচরদের দিয়ে হত্যা করান। কিন্তু মরে গিয়েও চরণদাস সবার কাছে আরো প্রিয় হয়ে উঠলো। এই ঘটনাপ্রবাহের মাঝ দিয়ে ফুটে উঠেছে সমাজের বিভিন্ন কৌতুককর দিক। কিন্তু নাটকটি একারণেই বিশেষ উল্লেখ্য যে, কৌতুক কখনোই তীব্র হয়ে ওঠে নি। স্যাটেয়ারে পরিণত হয় নি। বরং একটা হালকা আমেজ ‘চরণদাস চোর’কে ধরে রাখে সারাক্ষণ। প্রচুর অভিনেতা অভিনেত্রী নিয়ে হাবিব তানভীরের এই নাটকটি দেশে বিদেশে অসংখ্য দর্শকের, সমালোচকদের মন জয় করেছে। ১৯৭৫ সালে মঞ্চে আসা নাটকটি তিনদশকেরও বেশি সময় ধরে সমান জনপ্রিয়।
নাট্যরস সৃষ্টি হাবিব তানভীরের কাছে সাধ্যবস্তু নয়, সিদ্ধবস্তু। আর তা সম্ভব হয়েছে নাটক সম্পর্কে তার ভাবানার জন্য। তার মতে- ‘এন্টারটেইন করা নয়, দর্শকের এনগেজ করাটাই হলো থিয়েটারের প্রাথমিক কাজ। থিয়েটার যারা করে তারা উত্তর যোগাতে পারে না ঠিকই কিন্তু প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারে। থিয়েটার যদি দর্শককে বিব্রত না করলো, তাকে যদি নিশ্চিন্তে বাড়িতেই ফিরে যেতে দেওয়া গেল দু’ঘন্টা পর, তাহলে কী আর হলো থিয়েটার করে।’ এ জায়গায় তাঁর ভাবনার সাথে সরাসবি মিল ব্রেখটের। যার পিছনে কাজ করে শিল্পীর সামাজিক দায়বদ্ধতা।
হাবিব তানভীরের নয়া থিয়েটার এক কথায় অনন্য। হাবিব তানভীর, স্ত্রী মনিকা ও কন্যা নাগিন ছাড়া দলে আর সকলেই রায়পুর, বিলাসপুর অঞ্চলের ছত্তিশগড়ী ভাষার মানুষ। বছরে তারা তিনমাস ছুটি পান দেশে যাওয়ার জন্য। কারণ সেটা তাদের ক্ষেতির সময়। হাবিব তানভীরের অবর্তমানে হয়তো আর সেরকম কোনো প্রযোজনা বেরিয়ে আসবে না দলটি থেকে। গ্রাম ও শহরের এই মেলবন্ধন কীভাবে সম্ভব হলো সে সম্পর্কে একবার এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন- ‘ওদের কাছ থেকে অনেক পেয়েছি। ওরাও আমার কাছ থেকে অনেক পেয়েছে। এটাকে বলা চলে চেতনার দুই স্তরের আদান প্রদান। সারা পৃথিবীতে অনেক নাটক দেখেছি। সবই যে আমার থিয়েটারে প্রভাব ফেলে তা নয়। ‘নাচা’ থিয়েটারে যেমন মঞ্চে এক সঙ্গে ছ’জনের বেশি চরিত্র কমই থাকে। দশ-বারোজনের বেশি মঞ্চে আসেই না। আমাদের থিয়েটারে মঞ্চে একসঙ্গে অনেক চরিত্র থাকে। তারা এক সঙ্গে কথা বলে। ইম্প্রোভাইজ করি প্রায়শই। কখনো আমি একটা ভিজ্যুয়াল ওদের বুঝিয়ে সেখান থেকেই শুরু করি। কখনো লিখে নেই। ওদের সাথে আলোচনা করি। ওদের কল্পনার সাথে আমার ব্যাখ্যার মিশ্রণ ধরা পড়ে আমাদের কাজে। শহরের দর্শকের কাছে ড্রামাটিক প্রজেকশনটা গ্রহণীয় হয়। তবে আগেই আমাকে দেখে নিতে হয় গ্রামের দর্শকরা নাটকটা নিতে পারছে কিনা।’ হাবিব তানভীরের নাট্যভাবনার পেছনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছেন ব্রেখট। তার এই শিকড় সন্ধানের পেছনে সবচেয়ে বড় প্রেরণা স্বয়ং ব্রেখট। হাবিব তানভীরের ভাষায়- ‘বেখট নিজে জার্মান হলেও বহুদেশ ও সংস্কৃতি থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছিলেন। চীন, আফ্রিকা, আমেরিকান জ্যাজ সবই তার চিন্তাকে পুষ্টি জুগিয়েছিল। তার সঙ্গীতবোধ ছিল অত্যন্ত আধুনিক। আরও একটা কথা, আমরা শহরের মানুষরা যা পারি নি গ্রামের মানুষেরা তা পেরেছেন। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটা ধারাবাহিকতা তারা রক্ষা করে চলেছেন। আমি তারই সঙ্গে নাট্যশাস্ত্রের ব্যাকরণ জুড়ে নাটক করতে চেষ্টা করেছি।’ হাবিব তানভীরের সাফল্যের রহস্যটা এখানেই, তিনি লোকশিল্পী বা শিল্পীদের এক্সপ্লয়েট করেন নি এক্সপ্লোর করেছেন। লোকআঙ্গিককে তিনি অলঙ্করণের জন্য ব্যবহার করেন নি।
হাবিব তানভীর তার দীর্ঘ সৃজনশীল জীবনে প্রযোজনা করেছেন বেশ কিছু কালোত্তীর্ণ নাটক। এ সবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ‘আগ্রাবাজার’, ‘লালা সোহরাত রাই’, ‘মিট্রি কা গাড়ি’, ‘গাও কা নাম শ্বশুরাল মোর নাম দামাদ’, ‘চরণদাস চোর’, ‘উত্তর রামচরিত’, ‘বাহাদুর কালারিন’, ‘পুঙ্গা পণ্ডিত’, ‘কামদেওকা আপনা বসন্ত ঋতু কা স্বপ্না’, ‘রাজরক্ত’ ইত্যাদি। চলচ্চিত্রেও তিনি অভিনয় করেছেন। তার অভিনীত চলচ্চিত্রগুলো হলো- ‘রাহী’, ‘চরণদাস চোর’, ‘স্টেয়িং অন’, ‘গান্ধী’, ‘ম্যান ইটারস অব কুমায়ুনত হিরো হীরালাল’ ইত্যাদি। হাবিব তানভীর তার জীবদ্দশায়ই পেয়েছেন বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা। এসবের মাঝে উল্লেখযোগ্য- সঙ্গীত নাটক একাডেমী পুরস্কার (১৯৬৯), পদ্মশ্রী (১৯৮১), কালিদাস সম্মান (১৯৯০), সঙ্গীত নাটক একাডেমী ফেলোশিপ (১৯৯৬), পদ্মভূষণ (২০০২)। এছাড়াও তিনি ভারতীয় রাজ্যসভার (১৯৭২-৭৮) সদস্যও ছিলেন। তার ’চরণদাস চোর’ নাটকটি এডিনবার্গ ইন্টারন্যাশনাল ড্রামা ফেস্টিভালে ফ্রিঞ্জ ফাস্ট এওয়ার্ড (১৯৮২ ও ২০০৭) লাভ করে।
আব্দুল্লাহেল মাহমুদ : নাট্যজন, নাট্যকার। সদস্য- আরণ্যক নাট্যদল