Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

নেপালী থিয়েটার : বিহঙ্গ দৃষ্টিতে

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

নেপালী নাটকের কিছু খোঁজ-খবর করতে গিয়ে একটা চিন্তা মনের মধ্যে প্রশ্নবোধক চিহ্নের মুদ্রায় আমাকে একটু বিচলিত করে। নেপাল আমাদের ঘরের কাছের দেশ। ভাষা ও সাংস্কৃতিক প্রকরণে যা কিছু তফাৎ তাকে দূরত্ব না বলে বৈচিত্র্য বলাই যৌক্তিক ও শ্রেয়। ধীরে উচ্চারিত হলে নেপালী ভাষা বাঙালির কাছে দুর্জ্ঞেয় বা দুর্বোধ্য নয়; নাচ-গান দেখলে বোঝা যায় তার সবই উপমহাদেশীয় বৃত্তের অন্তর্গত। কিন্তু এটা তো সত্য কথা যে, আমাদের ঢাকার মঞ্চে এ পর্যন্ত কোনো নেপালী নাটক বা তার রূপান্তর মঞ্চায়িত হয় নি। অথচ বহু সংখ্যক ইউরোপীয় নাটক নিয়ে আমরা কাজ করেছি। শেক্সপীয়রকে না হয় আমরা উপনিবেশবাদী উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছি, কিন্তু জার্মানীর ব্রেশট বা ফরাসী দেশের মলিয়ের তো কম হয় নি। বেশ কিছু (বাংলা ছাড়াও) ভারতীয় নাটকের প্রযোজনা দেখেছি আমরা। অথচ কোনো দল কোনো নেপালী নাটক বা পালা মঞ্চায়নে উদ্যোগী হল না। এর কারণ অনুসন্ধান খুব শ্রমসাধ্য নয়। এর মৌলিক কারণ ওই উপনিবেশবাদের দীর্ঘস্থায়ী প্রচ্ছায়ার অন্তর্ভুক্ত। ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের সূত্র ধরে আমরা ইংরেজি ভাষা আয়ত্ত করেছি এবং তারই মাধ্যমে অন্যান্য দেশের সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি, সে উত্তর ইউরোপের হেনরিক ইবসেন হোক অথবা চীনের গাও জিয়াং জিন যিনিই হোন না কেন। পেঙ্গুইন বা অমন গোত্রের আন্তর্জাতিকতাবাদী প্রকাশনা সংস্থা নেপালী নাটকের তেমন কোনো সংকলন বের করেছে কি না জানি না। বা তেমন করলেও আমরা যে আমাদের এই প্রতিবেশী এবং সমজাতীয় দেশটির নাট্যমঞ্চায়নে তেমন উৎসাহী হতাম, একথা হলপ করে বলতে পারি না। কারণ হাইনেমান ও অন্যান্য কয়েকটি প্রকাশনা সংস্থা অনেক সংখ্যক আফ্রিকান নাটকের বা গল্পের বই প্রকাশ করলেও আমরা তো সেসব কাহিনীর মঞ্চায়নে কোনো আগ্রহ দেখাই নি।

আমাদের এমন পছন্দ-অপছন্দ ও অগ্রাধিকার নির্দিষ্ট করার ক্ষেত্রেও উপনিবেশবাদী মানসিকতা ক্রিয়াশীল আছে বলে আমার বিশ্বাস। ব্রিটিশদের সৃষ্ট ও পৃষ্ঠপোষিত সমাজকাঠামো থেকেই আমরা বিশেষভাবে উচ্চম্মন্যতার পাঠ শিখেছি। তাই আমরা পড়াশোনা ও গবেষণার জন্য ইউরোপ ও আমেরিকার পথে পাড়ি দেয়াকেই অধিকতর যৌক্তিক মনে করেছি এবং তার মাধ্যমে আমাদের সমাজের হীনযান পড়শিদের প্রতি যেমন, তেমনি পাশের দেশ যেহেতু দরিদ্র বলে চিহ্নিত, তাই তার প্রতি কিঞ্চিৎ করুণার চোখে তাকিয়েছি। তাদের কাছ থেকে কিছু গ্রহণ করার ইচ্ছেটা মনের ভেতর সায় পায় নি। এরই ফলে আমরা ইউরোপের অনেক নাট্যকারকে যেমন সমাদরে আমাদের মাঝে আসন পেতে দিয়েছি, তেমনি নেপাল অথবা শ্রীলঙ্কার অথবা মায়নমারের ক্ষেত্রে ঘটে নি। ইউরোপীয় নাট্যকারবৃন্দ অবশ্যই তাঁদের নিজেদের খ্যাতি ও গুণপনার জন্য এখানে আদৃত ও মঞ্চায়িত হবেন। কিন্তু এজন্য প্রতিবেশীর প্রতি অনাগ্রহ তো অযৌক্তিক।

অতি সম্প্রতি নেপাল গিয়েছিলাম। ইবসেনের মৃত্যুশতবর্ষ উপলক্ষে ১২ দিনব্যাপী এক নাট্য মহোৎসবে। স্বভাবতই ১২ দিনে সকাল-সন্ধ্যা জুড়ে যেসব নাট্যপ্রদর্শনী দেখেছি, তার সব কটিই ইবসেনের জীবন ও কর্মকে ঘিরে। আবার, সেখানে ছিল নরওয়ে, ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ ও বাংলাদেশের প্রযোজনা। নেপালী ভাষায় ইবসেনের অ উড়ষষ’ং ঐড়ঁংব এর পুননির্মিতি দেখেছি। এই প্রযোজনাটি ঢাকার ইবসেন উৎসবেও প্রদর্শিত হয়েছিল। অন্যান্য উপস্থাপনার মধ্যে যেটি আমার কাছে অসাধারণ ও বিস্ময়কর মনে হয়েছিল, তা হল ইবসেনের ৩ টি কবিতার সমন্বয়ে এক সুচয়িত আখ্যাননাট্য। বীরেন্দ্র নামে এক তরুণের নির্দেশনায় এই প্রযোজনায় নেপালের পূর্বাঞ্চলের জনগোষ্ঠীর বহু শতাব্দীপ্রাচীন বিশ্বাস ও আচার, আচরিত নানা ধরনের বৌদ্ধিক সম্মেলক গান, যৌথ কোরিওগ্রাফি, আধুনিক শারীরিক কসরৎ এবং প্রকৃতি ও মানুষের সুগভীর সম্পর্কের অবিচ্ছিন্নতা ইত্যাদি নানা বিষয়ের অন্তর্ভুক্তি ঘটেছে। অইউরোপীয় এক কবির মৃত্যুচিন্তার মৌলিক ভাবনাকে প্রাচ্যের পাহাড়ী ও বিচ্ছিন্ন জনপদের লালিত ধারণার সঙ্গে মিলিয়ে বীরেন্দ্র যে সৌহার্দ্য করেছেন. যে অসাধারণ নৈপুণ্য ও সুচিন্তিত সংগঠন প্রক্রিয়ায়, তা আমাকে মুগ্ধতার শেষ সীমানায় পৌঁছে দিয়েছিল। এমন প্রযোজনা দেখা সত্যিই এক অপরূপ অভিজ্ঞতা।

আমার বার বার মনে হচ্ছিল, বীরেন্দ্র যে এই কাজটা করতে পেরেছেন, তা শুধুই তার ব্যক্তিপ্রতিভার নিদর্শন বা অর্জিত কোনো নাট্যপ্রশিক্ষণের লক্ষণ নয়, এর পেছনে নিশ্চয়ই সক্রিয় আছে এই দেশ বা সমাজের নাট্যপরিবেশনার ঐতিহ্য। আর নেপাল দেশটা আমাদের এত কাছের হওয়া সত্বেও, দারিদ্র্যের বহমানতায় সমগোত্রীয় হওয়া সত্বেও অথবা ভাষার দিক থেকে, অন্তত শ্র“তিতে অনেক নৈকট্য থাকা সত্বেও, আমাদের এই দুই দেশের মধ্যে তেমন কোনো আদান প্রদানের রীতি গড়ে ওঠে নি। বেশ কয়েক বছর আগে সার্ক দেশসমূহের সাংস্কৃতিক লেন-দেন কর্মসূচির আওতায় আমাদের টেলিভিশনের পর্দায় অন্যান্য ৬ টা দেশের সঙ্গে নেপালের নাচ-গানের খুবই স্বল্পদৈর্ঘ্য একটা অনুষ্ঠান দেখা যেত। সেই অনুষ্ঠানের চরিত্র ছিল একদিকে সরকারি, তেমনি ফরমায়েশ অনুযায়ী বানানো। তার মাধ্যমে এক চামচ সাংস্কৃতিক রসের স্বাদ পাওয়া গেলেও, তা যে দেশটির সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও ঐতিহ্যকে বিশ্বস্তভাবে প্রতিফলিত করে এমন মন্তব্য করা যাবে না। বলে রাখা ভালো, বিগত কয়েক বছরে এমন অনুষ্ঠানের প্রচারও আমরা দেখতে পাচ্ছি না। প্রকৃতপক্ষে এমন আদান-প্রদানের পক্ষে বেসরকারি উদ্যোগই ফলপ্রসূ হতে পারে এবং তা-ই আমাদের কাম্য।

২০০৪ সালে ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইন্সটিটিউট নেপাল কেন্দ্র সেমিনার ও নাট্যোৎসরেব আয়োজন করেছিল, যেখানে নেপাল, ভারত, বাংলাদেশ অংশ নিয়েছিল। এমন উদ্যোগ একবার বাংলাদেশে আয়োজিত হলে আমরা হয়তো নেপালের দু’একটি প্রযোজনা দেখার সুযোগ পেতে পারি। একটা অন্যধরনের তথ্য এখানে উল্লেখ করতে চাই। নেপালের যে সংস্থার আমন্ত্রণে আমি এবার কাঠমাণ্ডু গিয়েছিলাম এবং যেটির উদ্যোগে এই ইবসেন নাট্যমহোৎসব আয়োজিত হয়েছিল, সেটি প্রধানত একটি থিয়েটার প্রশিক্ষণ স্কুল। আদি ঐতিহ্যের অনুকরণে স্কুলটির নাম গুরুকুল। স্কুলের প্রধান ও সংগঠন শিরোমণি সুনীল পোখারেল নেপালের অত্যন্ত বিখ্যাত ও অগ্রগণ্য অভিনেতা, নির্দেশক ও শিক্ষক। সুনীল খুবই একটি পরিচিত নাম, নেপাল ও প্রতিবেশী দেশসমূহে। বাংলাদেশের নাট্যজনরাও তাঁকে বহুদিন ধরেই চেনেন। সুনীলের নিজস্ব একটা নাটকের দল আছে, নাম ‘আরোহণ’। অনেক তাৎপর্যবহ প্রযোজনা আছে এই দলের। পথনাটক ও গণনাটক প্রযোজনাও এই দলের কর্মকাণ্ডের অন্তর্ভুক্ত। এ থেকে একটা কথা সহজেই বোঝা যায় যে, গুরুকুল ও আরোহণ নামের এই দুই সংগঠন আমাদের দেশের অধিকাংশ নাটকের দলের মত সমাজে বিশেষভাবে দায়বদ্ধ ভূমিকা পালন করে থাকেন এবং এরা প্রগতিশীল রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী। অধ্যাপক-সমালোচক-নাট্যকার অভি সুবেদীর কাছ থেকে শুনছিলাম, কীভাবে বিভিন্ন নেপালী নাট্যসংগঠনের নেতাকর্মীবৃন্দ গণতান্ত্রিক সংগ্রামে অংশ নিতে রাস্তায় নেমে আসেন এবং ২০০৬ সালের ১২ এপ্রিল যখন কাঠমাণ্ডুতে রাজতন্ত্রবিরোধী বিক্ষোভ গণবিস্ফোরণে রূপান্তরিত হয়েছিল সেদিন রাজকীয় সেন্যরা গুরুকুল ও আরোহণ থিয়েটারে ধ্বংসের তাণ্ডবে মেতে উঠেছিল।

কাঠমাণ্ডু শহরের পুরোনো বানেশ্বর এলাকার একটা ছোট টিলাকে ঘিরে গুরুকুল আর আরোহণ-এর কার্যক্রম চলে। দু’পাশে দুটো প্রেক্ষাগৃহ, মুখোমুখি নয়, ওখানকার ভূগোলটাও বেশ আগ্রহোদ্দীপক। ডান দিকে অনেকটা সুপরিসর রিমাল নাট্যগৃহ। আমাদের শিল্পকলা একাডেমীর নিরীক্ষামূলক হলের মত প্রয়োগের দিক থেকে অতটা আধুনিক না হলেও, সুবিধাজনকভাবে এই নাট্যগৃহের মঞ্চব্যবস্থাপনা পরিবর্তন করা যায়। অন্য মিলনায়তনের নাম সামা নাট্যঘর। আসলে এটি ছিল একটা গুদামঘর। সুনীল পোখারেল ও আরোহণ নাট্যসংগঠনে তাঁর অনুসারীরা নাটকের প্রতি গভীর ভালোবাসায় ও অক্লান্ত শ্রমে এমন একটি পরিত্যক্ত গুদামঘরকে প্রসেনিয়ামের আদলে একটি নাট্যমঞ্চে রূপান্তরিত করেছেন এবং তাদের সাধ্যমত এর মধ্যে আধুনিক সুযোগসুবিধা সংযোজিত করেছেন। গুরুকুলের এই যে বলতে গেলে যুগল মঞ্চ, এই দুটির নামকরণ করা হয়েছে নেপালের দুই প্রধান নাট্যব্যক্তিত্বের স্মৃতিতে। গোপাল প্রসাদ রিমাল আধুনিক নেপালী নাটকের একজন কীর্তিমান পুরুষ। বালাকৃষ্ণ সামাও একাধিক কারণে নেপালী নাট্যজগতের এক অবিস্মরণীয় নাম। গুরুকুল তাঁদের স্মরণে প্রতিষ্ঠিত মিলনায়তন দুটির কথা বলে নেপালী নাট্যইতিহাসের কিছুটা বর্ণনা দিতে চাই। কিন্তু অতীতের কিছু বিষয় তো উল্লেখ করতেই হবে।

নেপালী নাটক ও সংস্কৃতির আলোচনায় স্থানিক পরিচয়ে নেপাল মাণ্ডালার উল্লেখ পাওয়া যাবে বিভিন্ন গ্রন্থ ও প্রবন্ধ-নিবন্ধে। নেপাল মাণ্ডালা বলতে কাঠমাণ্ডু উপত্যকার তিন প্রধান ও প্রাচীন শহরের কথা বোঝানো হয়; এই তিন শহর হলো কাঠমাণ্ডু, পাটান ও ভক্তপুর। এই সব শহরের প্রধান দর্শনীয় স্থানগুলো পরিভ্রমণের তালিকায় সুনিশ্চিতভাবেই থাকবে বিভিন্ন আদ্যিকালের মন্দির ও স্থাপত্য এবং স্বাভাবিকভাবেই এগুলোর গায়ে খোদিত শিল্পকর্মে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ভাবনা, ধারণা ও বিশ্বাসের প্রতিফলন দেখা যায়। আর সাধারণ দৃষ্টিতেই এই সব মন্দিরগাত্রে ধর্মীয় দেবদেবীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা আছে। এই শহরগুলোর বিভিন্ন ধর্মীয় কিংবা ধর্মনিরপেক্ষ সামাজিক উৎসবের কর্মকাণ্ডে একটা অ-পার্থিব নাট্যক্রিয়ার আভাস পাওয়া যায়। এই উৎসবসমূহের অংশগ্রহণকারীরা এমনভাবে দেবদেবীর ভূমিকায় অভিনয় করে অথবা কাহিনী রচনা করে যে, মনে হবে ওইসব দেবদেবী তাদের চেনা-অচেনা ঘরের মানুষ, যারা এই কয়েক বছর আগেও হয়ত তাদের দাদা-দাদী নানা-নানীর সঙ্গে খেলাধূলা করত। নেপালের একজন নামকরা নাট্যসমালোচক সুদর্শন রাজ তেওয়ারি এমনভাবেই একটা ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেন।

যাই হোক, এমন ধরনের অভিজ্ঞতা ও ব্যাখ্যা থেকে যা সহজেই বোঝা যায় তা হলো, ধর্ম-বিশ্বাস এবং তা পালনের আধুনিকতা নাট্যক্রিয়ার প্রাথমিক ও পরবর্তী বিবর্তনে প্রভাব বিস্তার করেছে। কিন্তু একথা বলার পর উল্লেখ করতে চাই যে, এই ধর্মচারী জনগোষ্ঠীসমূহ ছিল প্রধানত কৃষিজীবী। অতএব, আমাদের দেশের মত তাদের জীবনযাত্রায়ও বীজ রোপণ ও ফসল ঘরে তোলার বিবিধ সামাজিক আয়োজন ছিল বা আছে, এবং সেই সব ক্ষণ উদযাপনের সূত্রে ধর্ম ও সমাজজীবন যূথবদ্ধ হয়ে উঠতো। ধর্ম তার নিজস্ব এলাকা থেকে সরে এসে মানুষের সাধারণ ক্রিয়াকর্মের অংশ হয়ে উঠত। পালা-পার্বণ ক্রমেই ধর্মের বাঁধনকে আলগা করে সামাজিক অনুষ্ঠানরীতির বৃত্তের মধ্যে প্রবেশ করতো। নেপালের শহরগুলোর আদি কেন্দ্রভূমির ভৌগোলিক বিন্যাস ভালো করে লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে, এর পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছিল বিভিন্ন অনুষ্ঠান পরিবেশনার কথা মাথায় রেখে। রাস্তা, তার পাশের জায়গা, রাস্তার মিলনস্থল অথবা নগরনকশায় যে জায়গাটাকে স্কোয়ার বলে চিহ্নিত করা হয়, এসবই নাট্যক্রিয়া উপস্থাপনার বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে নির্মাণ করা হয়েছে। আর এই সব উপস্থাপনার একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল কৃষিভিত্তিক বর্ষপঞ্জির বিভিন্ন সন্ধিক্ষণ, যার সঙ্গে আবার সৌর বা চান্দ্র তিথির সংযোগ মান্য করার প্রবণতা ছিল। এভাবেই পৃথিবীর অন্য অনেক জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইতিহাসের মতো নেপালেও ধর্ম, জীবন, আনুষ্ঠানিকতা এবং সেসবের গোষ্ঠীগত পালনরীতি থেকে নাট্যক্রিয়ার বিবর্তন ঘটেছিল।

আজকের যে বিপুলায়তন ও ঐক্যবদ্ধ নেপালকে আমরা জানি তার এই সংগঠিত রূপের সঙ্গে নাট্য উপস্থাপনার ইতিহাস যুক্ত হয়ে আছে। কাঠমাণ্ডু উপত্যকার এই নেপাল মাণ্ডালার সৃষ্টি হয়েছিল যখন রাজা পৃথ্বীনারায়ণ শাহ ১৭৬৮ সালে এই ভূখণ্ড জয় করে নেন। সেই বিশেষ দিনটিতে ছিল এই অঞ্চলের ইন্দ্রযাত্রা উৎসব। এখানকার জনসাধারণ সেদিন আনন্দ ও নৃত্যগীতে মেতেছিল। রাজা পৃথ্বীনারায়ণের বাহিনী সেদিন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন শিল্পীদের উপর আক্রমণ চালায়। স্থানীয় নেওয়ার রাজা জয়প্রকাশ মাল্লা প্রাণ ভয়ে পালিয়ে যান। কিন্তু শিল্পীরা এই আক্রমণের মুখেও ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় তাদের পরিবেশনা অব্যাহত রাখেন। তা প্রত্যক্ষ করে শাহ রাজা বিস্মিত ও বিমুগ্ধ বোধ করেন। পূর্বের পরিকল্পনা অনুযায়ী অনুষ্ঠানের প্রধান কেন্দ্রে একটি রথ ছিল এবং রাজা জয়প্রকাশ মাল্লা সেই রথ ত্যাগ করে পালিয়ে যাবার পর বিজয়ী রাজা পৃথ্বীনারায়ণ তার উপর আরোহণ করেন এবং ইন্দ্রযাত্রা উৎসবে অংশগ্রহণকারী শিল্পী ও জনসাধারণ সেই রথ নিয়ে শহর প্রদক্ষিণ করে।

উপস্থাপনার বৈচিত্র্যে, শক্তি ও জনঅংশগ্রহণ নেপালী মাণ্ডালার নাট্যপ্রক্রিয়ার প্রধান বৈশিষ্ট্য। উৎসব চলাকালীন দর্শকদের যে কেউ নাচে অংশ নিতে পারে, পৌরাণিক চরিত্রগুলোর অভিনয়ে দর্শক তাদের আধা-মানবিক অস্তিত্ব অনুধাবন করতে পারে এবং তার ফলে ধর্মবিশ্বাস ও লঘুরস একীভূত হয়ে যায়। নেপালী থিয়েটার সংগঠিত হয়ে ওঠার আদি পর্বে ভারতীয় ধ্র“পদী নাটকের প্রভাব লক্ষ করা যায়, কিন্তু দেশীয় সাংস্কৃতিক আঙ্গিকের মধ্য দিয়ে তার প্রকাশরীতি যখন স্থানীয় জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে, তখনই তার একটি নির্দিষ্ট ও ভিন্নতর চরিত্র গড়ে ওঠে এবং যেসব স্থানে বিভিন্ন উপলক্ষে অনুষ্ঠানাদি পরিবেশিত হত সেখানেই নাটকের এই নবতর সাংগঠনিক অবতারণা ঘটে, ফলে সাধারণ মানুষ এই সংস্কৃতি পরিক্রমাকে ইতিবাচকভাবে স্বাগত জানায়। নাটকের মূলমন্ত্র যে গোষ্ঠীজীবন থেকেই উৎসারিত, এই সত্য সেই আদি পর্বের নাট্যনির্মিতির মধ্যে ফুটে উঠেছিল।

ইন্দ্রযাত্রা উৎসব এখনো নেপালে মহাসমারোহে উদযাপিত হয়ে থাকে। দেবাদিদেব ইন্দ্র কাঠমাণ্ডু শহরের পুরোনো অংশের মারুহিতি গলির একটা জায়গায় হাত-পা বাঁধা অবস্থায় বসে থাকেন। তাঁর অপরাধ, তিনি পুজো দেয়ার জন্য পারিজাত শাখা এবং মায়ের উপবাস ভাঙানোর জন্য নারকেল চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছেন। সাধারণ মানুষ ইন্দ্রের এই সলজ্জ অবস্থা দেখে হাসতে থাকে, কৌতুক করতে থাকে। তারা নানা রকমের রঙবেরঙের মুখোশ পরে নৃত্যগীত করতে থাকে। দেবারাজ ইন্দ্রের এই অবস্থা কিন্তু বলে দেয় যে, উৎসবই হোক আর নাটকই হোক, এসবই মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত। তা না হলে দেবরাজ ইন্দ্রের এই সৎ উদ্দেশ্যে কৃত অপরাধ আজও নেপালী জনগণের জন্য নাট্যরস সৃষ্টি করতে পারত না।

অধ্যাপক অভি সুবেদী আধুনিক সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এর একটা চমৎকার ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করেছেন তাঁর ঘবঢ়ধষর ঞযবধঃৎব ধং ও ঝবব গ্রন্থে। তিনি বলেছেন আধুনিক নেপালী তাঁকে (দেবরাজ ইন্দ্র) ক্ষমতাধর ও দুর্নীতিবাজ হিসেবে শনাক্ত করে যিনি নাকি তদন্ত কমিটির কাছে ধরা পড়েছেন, এই দৃশ্য আসলে দর্শকদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থাকে প্রতিফলিত করে। সাধারণ মানুষ এমন প্রধান দেবতার কবলে পড়ে নিত্যদিন নিরাপত্তাবোধের অভাব ও অসহায়ত্বে ভুগতে থাকে। এই উৎসবে মানুষ সঙ সাজে, গান গায়, সরস নাট্যপরিস্থিতি সৃষ্টি করে এবং এসবই তাদের জীবনের পরিহাসকেই সাংকেতিকভাবে প্রতিফলিত করে। কিন্তু সেই আদিকাল থেকেই এমন জনউৎসবের প্রধান লাভটা রাজার জন্য বরাদ্দ থাকে। আমাদের দেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে অদ্যাবধি পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে যে বৈসাবী উৎসব প্রচলিত আছে, তাতে সাধারণ জনগণ নানারকম আনন্দানুষ্ঠান ও বিবিধ ভোজে অংশ নিলেও ওইদিন রাজাকে খাজনা দেবার মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে সমগ্র উৎসবে তিনি সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়ে ওঠে নি। সমাজতত্বের এই সত্যটা আমরা অনেক বিস্মৃত হয়ে যাই।

১৭৬৮ সালের ইন্দ্রযাত্রা উৎসবের সময় রাজা পৃথ্বীনারায়ণ শাহের অভিযানের কথা একটু আগে উল্লেখ করেছি। জনশ্রুতি এরকম যে, ওই উৎসবের একটি বিশেষ ক্ষণে এক কুমারী নারী রাজা জয়প্রকাশ মাল্লার রথে উঠছিলেন ধীরে ধীরে। উদ্দেশ্য তিনি দেশের বা সমাজের ক্ষমতাধর ব্যক্তির কপালে জয়টীকা পরিয়ে দেবেন। ঠিক ওই মাহেন্দ্রক্ষণে পৃথ্বীনারায়ণ উৎসব স্থলে আসেন এবং তাঁর বাহিনীকে নেতৃত্ব দেন। ক্ষমতাধর জয়প্রকাশ তো রথ থেকে নেমে পাটান শহরের দিকে দৌড়। ঠিক তখনই পৃথ্বীনারায়ণ তাঁর কর্তৃত্ব প্রদর্শনের মোক্ষম সুযোগটা পেয়ে যান। তিনি সঙ্গে সঙ্গেই ওই রথে আরোহণ করেন এবং ওই কুমারী নারী উপবেশনকারী নয়া ক্ষমতাধরের কপালে টীকা পরিয়ে দেন। কুমারী ইন্দ্রযাত্রা উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা অনুসরণ করেছিলেন এবং তার মাধ্যমে পৃথ্বীনারায়ণের ক্ষমতাগ্রহণ একধরনের নিয়মতান্ত্রিকতা অর্জন করে। জনগণ দেখলো, নতুন রাজা রথে চড়েছেন যা স্বাভাবিক বিচারে সিংহাসনে আরোহণের সমর্থক। তারাও এটাকে সহজেই মেনে নিল। কিন্তু ইন্দ্রকে নিয়ে যে পুরাণ, তার একটা সদর্থক সমাপ্তি আছে। দেশের এই দুর্গতি দেখে তখন ইন্দ্রের মা নাট্যদৃশ্যে প্রবেশ করেন এবং জানান যে, ও হলো ইন্দ্র এবং তিনি ওই চুরির কারণ ব্যাখ্যা করেন। পুজো ও মায়ের উপবাস ভাঙানোর জন্য ওই পুণ্যকাজ তখন চৌর্যকর্ম থেকে মহৎ উদ্যোগে রূপান্তরিত হয়। কাঠমাণ্ডুর অধিবাসীরা এমন ‘মহৎ’ অপরাধে ইন্দ্রের হাত-পা দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখার জন্য গভীর অনুশোচনা ব্যক্ত করে। আর যাতে এমন অপকর্মের স্মৃতি মনে মধ্যে গেঁথে না যায়, সেজন্য ওখানেই বিশাল নাচ-গান-নাটকের উৎসবের আয়োজন করে যার মাধ্যমে ইন্দ্রকে এবং একই সঙ্গে এই উৎসবের প্রধান বর্তমান রাজাকে অতীব ক্ষমতাধর নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ক্ষমতার সমান্তরাল অধিষ্ঠান এ থেকে সহজেই বোধগম্য।

এখানে আর একটি কথা উল্লেখ করে নেয়া প্রয়োজন যে, পুরাকাল থেকেই নেপালী রাজারাজড়ারা নাটকের পৃষ্ঠপোষণা করেছেন। রাজপ্রাসাদগুলো এমনভাবে নির্মাণ করা হতো যে, নাট্যপরিবেশনার জন্য নির্দিষ্ট জায়গা যেন আবশ্যিকভাবেই বরাদ্দ থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাজপরিবারের মনোরঞ্জন এইসব পরিবেশনার একটি শর্ত হিসেবে বিবেচিত হতো। অনেক রাজপরিবারের সদস্য এমন অনুষ্ঠানে কুশীলব হিসেবে অংশগ্রহণ করত। রাজা প্রতাপ মাল্লা নিজেও অভিনয় করতেন, এমন সাক্ষ্য মেলে। এসব প্রযোজনার অনেকগুলোই ছিল নৃত্যনাট্য। রাজপ্রাসাদের নাট্যাভিনয়ের মধ্যেই প্রাথমিকভাবে ধ্রুপদী ও লোকঐতিহ্যের সম্মিলন ঘটেছিল।

নেপালী থিয়েটারের বিবর্তনে পারসি থিয়েটারের একটি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য ভূমিকা আছে। ভারতে এই থিয়েটারের উদ্ভাবন হলেও নেপালের রাজা ও গোষ্ঠীতন্ত্রের ভোগবাদী প্রবণতার প্রশ্রয়ে এই রীতি বেশ দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। রাজা শাসকগোষ্ঠীর মাধ্যমে এই রীতি দরবারী ঘরানার বিনোদন হিসেবে বিশেষভাবে স্বীকৃতি ও পৃষ্ঠপোষকতা পায়। এই ধারার মধ্যে কল্পনার এক ধরনের প্রাধান্য থাকার জন্য দেশজ ধারার নাটকে স্থান ও কালের যে নিয়মবিধি মান্য ছিল, সেসব থেকে নাটকের কিছুটা মুক্তি ঘটল। নেপালের বিভিন্ন শহরের নাট্যপ্রযোজনায় ধীরে ধীরে পারসি থিয়েটারের প্রভাব লক্ষ করা যায়। বিংশ শতাব্দীর বিশ বা ত্রিশের দশকে পূর্ব নেপালের ধারন ও ধানকুটা শহরে এবং পশ্চিম নেপালের পালপা ও পোখরা শহরের নাট্যাভিনয়ে পর্দার ব্যবহার, মেলোড্রামা এবং হিন্দি-উর্দু মিশ্রিত সংলাপ ও সঙ্গীতের মাধ্যমে পারসি থিয়েটার রীতির অনুপ্রবেশ ঘটেছিল।

কিন্তু কাঠমাণ্ডু উপত্যকার বাইরে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা খুবই সীমিত ছিল, তাই এসব জায়গায় নাটকে দেশজ রীতি অনেক বেশি অক্ষুণ্ন ছিল। নেপালে পারসি থিয়েটার রীতির প্রধান প্রবক্তা ছিলেন মাণিক মান তুলাধর (১৮৭৫-১৯৫৩)। উঁচু ও অভিজাত বংশের সন্তান হওয়ার কারণে তিনি নাট্যাভিনয়ের নানা সুযোগ কাজে লাগাতে পেরেছিলেন। তাঁর ছেলে কেশব মান তুলাধরও পারসি থিয়েটার ঐতিহ্যকে দীর্ঘকাল সজীব রেখেছিলেন। পারসি থিয়েটার আবশ্যিকভাবে দেশের সংস্কৃতির শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। কিন্তু একথাও ঠিক যে, থিয়েটার শিল্পে যে কল্পনা ও বাস্তবতার নিরীক্ষা ও প্রয়োগ তাকে অনেকটা আধুনিক করে তোলে নেপালী নাট্যইতিহাসে এমন রীতির বিকাশ সম্ভবপর হয়ে উঠেছিল পারসি থিয়েটার পদ্ধতির প্রভাবের ফলেই। এবং এই প্রভাবকে পরবর্তীকালের নাট্যপ্রযোজনায় সদর্থকভাবে ব্যবহার করার অবকাশও সৃষ্টি হয়েছিল এর মাধ্যমে। কিন্তু তুলাধরদের নির্মিত পারসি থিয়েটারের অন্য ধরনের সীমাবদ্ধতা ছিল। তাঁদের একটি নাটক এক জায়গায় এবং মাত্র একবারই প্রদর্শিত হত। প্রদর্শনীর জন্য আলাদাভাবে মঞ্চ নির্মাণ করা হত। মঞ্চ তৈরিতে সময় লাগত ৩ ঘন্টা এবং নাটকও ৩ ঘন্টা চলতো। প্রধানত এইসব নাটক দরবারের ভেতর প্রদর্শিত হত, অবশ্য বাইরেও পারসি থিয়েটারের মঞ্চায়ন হয়েছে, এমন প্রমাণও পাওয়া যায়। কালের নিয়মে এই রীতিকে নতুন থিয়েটারের জন্য স্থান ছেড়ে দিতে হয়।

এই স্বল্পপরিসর রচনায় নেপালী নাটকের দীর্ঘ ইতিহাস কোনোভাবেই বিবৃত করা সম্ভব নয়। আধুনিক নেপালী থিয়েটারের দুই প্রধান পুরুষ সম্পর্কে অপেক্ষাকৃত বিস্তারিত আলোচনা করা প্রয়োজন। এই দুইজন খ্যাতকীর্তি নাট্যজনের স্মৃতিতেই গুরুকুল তাদের দুই মিলনায়তনের নামকরণ করেছে। এঁদের একজন হলেন বালাকৃষ্ণ সামা এবং অন্যজন হলেন গোপাল প্রসাদ রিমাল। এই দুইজনের কর্ষিত পথেই নেপালী থিয়েটার দিনে দিনে ফলবতী হয়ে উঠেছে।

নেপালী থিয়েটার ও ঐতিহ্য পাঠের ক্ষেত্রে বালাকৃষ্ণ সামা এক অবিচ্ছেদ্য নাম। তিনি ১৯০২ সালে জন্ম গ্রহণ করেন। বংশের দিক থেকে তিনি ছিলেন শাসক রাণা গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। তাঁর পিতামহ ডম্বর শামসের রাণা উনবিংশ শতকের শেষ দিকে কোলকাতায় গিয়ে নাট্যবিষয়ে শিক্ষালাভ করেন। বালাকৃষ্ণ সামাই হলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি নেপালে প্রথম প্রসেনিয়াম থিয়েটারের প্রচলন করেন এবং তাঁর মাধ্যমে নেপালী থিয়েটার আঙ্গিকের ক্ষেত্রে কিছু মৌলিক পরিবর্তন সূচিত হয়। নেপালের বহু ব্যক্তি তাঁকে সে-দেশের শেক্সপীয়র বলে অভিহিত করে থাকেন। কিন্তু সামা যে কারণে নেপালী থিয়েটারের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন তা হলো, তিনি আধুনিক নেপালী সমাজের নানা সংকটকে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন এবং তাঁর নাটকে সেসব বিধৃত করার মাধ্যমে তিনি নেপালী নাটকের ঐতিহাসিকতার সঙ্গে সমকালীন বাস্তবতাকে সংগ্রথিত করার প্রয়াস পেয়েছিলেন।

বালাকৃষ্ণ সামার জীবনের অভিজ্ঞতাও বেশ বিচিত্র। আধুনিককালের অনেক সমালোচক তাঁর সমাজদর্শনকে প্রত্যাখ্যান করতে চেয়েছেন শুধু এই জন্য যে, তিনি রাণা বংশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। সমাজ নিয়ে তাঁর ভাবনাকে তাই অনেকে প্রবঞ্চনাকর বলে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন। কিন্তু ভাগ্যের এমনি পরিহাস যে, শাসক রাণা গোষ্ঠী তাঁর নাটকের মধ্যে বিদ্রোহ ও প্রতিবাদের লক্ষণ দেখে তাঁকে কারাগারে নিক্ষেপ করেছিল এবং চল্লিশের দশকে তৎকালীন নেপালী প্রধানমন্ত্রী তাঁর নাটকের প্রদর্শনীর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। তবুও বাম পন্থায় বিশ্বাসী নেপালী সমালোচকরা তাঁকে অনেক সময়ই সন্দেহের চোখে দেখেছেন এবং তাঁর অবদানকে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। নিজের আত্মজীবনীতে বালাকৃষ্ণ সামা শৈশবের স্মৃতিচারণ করেছেন এইভাবে:

প্রকৃতপক্ষে আমাদের বাড়িটাই ছিল একটা থিয়েটার। ভোর থেকে মাঝরাত পর্যন্ত এ বাড়ির কোথাও না কোথাও সঙ্গীত পরিবেশনা শোনা যেত। এমন একটা আবহের মধ্যে জন্মগ্রহণের ফলে আমিও স্বভাবতই এর প্রতি আকৃষ্ট বোধ করতাম ... আমার শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের গভীরে নাটক বহমান ছিল, আমার প্রত্যেকটি অস্থির গ্রন্থিতে গড়ে উঠেছিল এক একটি মঞ্চ। আমার নিজের মাঝে এমন এক ধরনের অনুভব গড়ে উঠেছিল যে, প্রতিটি দর্শনীয় করুণ দৃশ্য, ঋতুর পরিবর্তন এবং প্রভাত, দিবস ও রজনী- সব কিছু হয়ে উঠত কাব্যিক। পাঁচ বছর বয়সে আমার হাতেখড়ির আগেই মঞ্চের পর্দা, নাচ ও অভিনয় আমার মনের মধ্যে উঁকি দিত এবং শিল্পিত কাব্যিক তত্ত্ববিষয় ও সঙ্গীতে আমার দৃষ্টি পরিপূর্ণ থাকত। আমার ক্ষুদ্র দেহটি ততদিনে একটা স্বল্পায়তন মঞ্চ হয়ে উঠেছে, যেখান থেকে গুঞ্জনের শব্দের মত তরঙ্গ ধ্বনিত হত, যেন মৌচাকে মৌচাকের ধাবমান স্বরধ্বনি।

বালাকৃষ্ণ সামার রচনা যেমন সাহিত্যগুণমণ্ডিত, তেমনি তা মঞ্চশিল্পের বিবিধ বৈশিষ্ট্যও প্রতিফলিত করে। সামার সংক্ষিপ্ত মঞ্চনির্দেশনা পরিচালকের অনেকটা স্বাধীনতা নিশ্চিত করলেও, তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হল নাট্যকারের কাব্যভাষা। তাঁর নাটকে পারসি থিয়েটারের  কিছু রীতিগত উত্তরাধিকার আবিষ্কার করতে পারি আমরা। কিন্তু তিনি এই পারসি ঐতিহ্যকে এক দৈশিক পরিপ্রেক্ষিতজাত পুরাণনির্ভর বাস্তবতার সঙ্গে গ্রথিত করেছেন। তাঁর অনন্যতা এখানেই। পারসি থিয়েটারের উচ্ছ্বাস ও রোমান্টিকতাকে তিনি এমন এক স্থানিক অবয়বের মধ্যে আবদ্ধ করেছেন যে, তার দ্বারা এক আলাদা ধরনের নান্দনিক কাঠামো গড়ে ওঠে। বালকৃষ্ণ সামা থিয়েটারকে এক সচেতন ও বিরতিহীন প্রয়াস বলেই গণ্য করতেন। বাস্তবকে তিনি মঞ্চে পরিবেশনার জন্য সচেতন ছিলেন, কারণ তিনি জানতেন, যাঁরা নাটক দেখতে আসেন তারা মঞ্চের দৃশ্যকে জীবনের অভিজ্ঞতা বা ইতিকথার সঙ্গে মিলিয়ে নিতে চান। আবার সমাজে যেসব কাহিনী বহু বছর ধরে প্রচলিত আছে, এর অনেকগুলো জীবনের সত্য থেকে দূরবর্তী হলেও, এসব কাহিনীর যুগ যুগ ধরে পুনরাবৃত্তি তাদের অবচেতন জগতে অন্যতর প্রভাব বিস্তার করে। সামা সত্য ও কল্পভাবনার এই সেতু রচনা করেছেন পারসি থিয়েটার ঐতিহ্যকে পুনরূজ্জীবিত করার মাধ্যমে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, বালকৃষ্ণ সামা ১৯৫৪ সালে শেক্সপীয়রের জুলিয়াস সিজার নাটকটি নির্দেশনা দেন এবং তা করতে গিয়ে তিনি আঞ্চলিক নান্দনিকতার বোধ ও প্রয়োগরীতি ব্যবহার করেছিলেন। ফলে তা এক ব্যতিক্রমধর্মী প্রযোজনা হয়ে ওঠে।

বিশ শতকের শুরুতেই জন্মগ্রহণ করলেও সামার মধ্যে সমসাময়িক নাট্যকারদের তুলনায় অনেক বেশি মঞ্চসচেতনতা লক্ষ করা গেছে। এর বড় কারণ, তিনি নাটক লেখার সময় সমগ্র নাট্যরূপটা মনে মনে সংগঠিত করে দেখতে পারতেন। তিনি ছিলেন, বলতে গেলে একজন অগ্রবর্তী নাট্যকর্মী, নিজে নির্দেশনা দিয়েছেন, অভিনয় করেছেন, মঞ্চ পরিকল্পনা করেছেন। সম্ভাব্য অভিনেতা-অভিনেত্রীদের দক্ষতা ও নৈপুণ্য সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব ধারণাও তাঁকে সাহায্য করেছে বলে মনে হয়।

আধুনিক নেপালী থিয়েটারের অন্যতম সংগঠক অধ্যাপক অভি সুবেদী মনে করেন যে, নেপালে আধুনিক প্রসেনিয়াম থিয়েটারের প্রবর্তনা অনেক পিছিয়ে যেত, যদি না বালাকৃষ্ণ সামা তার দরবারী নাট্যপরিবেশনার ঐতিহ্য, পারসি থিয়েটারের নাটকীয়তা ও স্থানীয় পুরাণ-নির্ভর সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যসমূহকে ত্রিবেণীসঙ্গমে সংগ্রথিত করতেন। নেপালী থিয়েটারকে আধুনিক প্রেক্ষাগৃহে সার্থকভাবে উপস্থাপনার ঐতিহাসিক কৃতিত্ব একান্তভাবেই বালকৃষ্ণ সামার। তাঁর মাধ্যমেই নেপালী দর্শক প্রথমবারের মত বুঝতে পারে যে, মানবিক দ্বন্দ্ব এবং অনুভব মঞ্চে প্রকাশ করার জন্য সংলাপে কাব্যভাষার ব্যবহার অর্থময় হয়ে উঠতে পারে। এবং এই রীতির মাধ্যমে তিনি মঞ্চনাটকের জন্য একটি রুচিবান দর্শকগোষ্ঠী তৈরিতেও সহায়তা করেছেন।

নেপালী নাটকের আরেক কীর্তিমান পুরুষ গোপাল প্রসাদ রিমাল। তাঁর অবিস্মরণীয় নাটক মাসান প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৪৫ সালে, কিন্তু এই নাটক অদ্যাবধি নেপালী নাট্যসাহিত্যের পাঠ্যসূচিতে যেমন, তেমনি মঞ্চপ্রযোজনায় এক অতুলনীয় আসনের দাবিদার। কিন্তু প্রকাশের অব্যবহিত পরেই এই নাটকের মঞ্চায়ন সম্ভবপর ছিল না। ১৯৫০ সালে নেপালের শাসনব্যবস্থায় গোষ্ঠীতন্ত্রের (রাণা শাসন) অবসানের পরই মাসান অভিনীত হয়েছিল। নেপালের নাট্যইতিহাসে এই নাটকের অসাধারণত্বের একটি প্রধান কারণ হল, এখানে এক বিদ্রোহী নারীর চরিত্র আঁকা হয়েছে। ইবসেনের এ ডলস হাউস-এর মত এই নাটকের নায়িকা হেলেন স্বামীগৃহ ত্যাগ করে চলে যায়। স্বাভাবিকভাবেই নেপালের নাট্যসমালোচকবৃন্দ এই নাটকে এই দুটি বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করতে উৎসাহী বোধ করেন। এক. গোপাল প্রসাদ রিমাল নরওয়েজীয় নাট্যকার ইবসেনের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন এবং দুই. এই নাটকের মধ্যে নারীবাদীর কণ্ঠস্বর শোনা যায়।

মাসান নাটকের সঙ্গে ইবসেনের ওই বিশ্বখ্যাত নাটকের সাদৃশ্য অবশ্যই আছে। রিমালের নাটকেও স্বামী তাঁর স্ত্রীকে পুতুলপ্রতিম নারী বলে বিবেচনা করে। কিন্তু স্ত্রীর ব্যক্তিত্বকে খাটো করে দেখা অথবা তাকে পুরুষের চেয়ে বুদ্ধিতে, শিক্ষায় ও দক্ষতায় অধঃস্তন করে দেখা এমন এক বৈশ্বিক সত্য যে, নেপালের কোনো নাটকে তার প্রতিফলন আমাদের নরওয়েজীয় পরিপ্রেক্ষিতকে স্মরণ করিয়ে দেবে- এমন ভাবনার মধ্যে শুধু অতিসরলীকরণের ছায়া দেখা যেতে পারে। রিমালের নাটকে স্ত্রী হেলেন নিজেই স্বামীর দ্বিতীয় বিবাহে উদ্যোগী হয়েছে, কারণ দ্বিতীয়া স্ত্রীর সূত্রে স্বামীর পিতা হবার আকাক্সক্ষা পূর্ণতা পেতে পারে। ইউরোপীয় সমাজব্যবস্থায় এমন এক উদ্যোগ নেহাতই অবাস্তব মনে হবে। কিন্তু যেকোনো দৃষ্টিকোণ থেকেই নেপালের সমাজে স্ত্রী স্বেচ্ছায় স্বামীকে ত্যাগ করে চলে যাবে, এমন ভাবনা গ্রহণযোগ্য ছিল না। এর মাধ্যমে যে বিদ্রোহের সংকেত ঘোষিত হয়েছে, নেপালের রাণা গোষ্ঠীতন্ত্রের কালে তা বড় ধরনের অপরাধী বলেই বিবেচিত হত। কিন্তু বিদ্রোহের ধারণাকে একটু সরিয়ে রাখলেই আমরা দেখতে পাব, এই নাটকে পুরোনো সমাজকাঠামোই স্থান পেয়েছে, এমনকি সাম্প্রতিককালে নেপালী সমাজেও তা আদ্যিকালের বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এই নাটকের নারীবাদী অবস্থানকে হ্রস্ব করে দেখা যাবে না। স্বামীর জন্য দ্বিতীয় বউ নিয়ে আসার মধ্যে পুরোনো কালের গন্ধ আছে তা ঠিক, কিন্তু সেই দ্বিতীয়া স্ত্রী যখন নারী হিসেবে স্বামীগৃহে তার দুর্বল অবস্থান বুঝতে পারে, যখন সে অনুধাবন করে যে, তাকে স্ত্রীর মর্যাদা দেবার বিপরীতে শুধুই সমাদর ও সংবেদনশীলতা প্রদান করা হচ্ছে আরো একজনের ঐচ্ছিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এবং এর স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় তার মধ্যে যে অবমাননাবোধের জন্ম হয়- এমন এক মানসিক বিবর্তনের পরিস্ফুটনে গোপাল প্রসাদ রিমাল যে দক্ষতা প্রদর্শন করেছেন, তার মাধ্যমে নেপালী থিয়েটারে নারীবাদের আবাহন ঘটেছে।

এই দুই প্রধান নাট্যকারের পথ ধরে নেপালী নাট্যচর্চা এক সদর্থক গতি অর্জন করে। এদেরই অনুসারী দুজন নাট্যকার, গোবিন্দ বাহাদুর মাল্লা গোথালে এবং বিজয় মাল্লা থিয়েটারে নারীর অবস্থানের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। নেপালী থিয়েটার ইতিহাসে মাল্লা ভ্রাতৃদ্বয় উল্লেখযোগ্য আসন অধিকার করে আছেন। তথ্যের দিক থেকে একটা মজার বিষয় হল, ছোট ভাই বিজয় মাল্লাই আগে নাটক রচনা ও নির্দেশনায় অংশগ্রহণ করেন এবং বড় ভাই গোবিন্দ বাহাদুর তার দ্বারা প্রভাবিত বোধ করেন। গোপাল প্রসাদ রিমালের প্রভাবও তার ওপর লক্ষ করা যায়। গোবিন্দ মাল্লার নাটকে নারীর অবস্থানের প্রসঙ্গ বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। একটি নাটকে দেখা যায় স্ত্রী স্বামী কর্তৃক বিতাড়িত হচ্ছেন। অন্য একটি নাটকে নায়িকা এমন এক স্বপ্ন পরিক্রমার মধ্য দিয়ে যায়, যেখানে নারীজন্মই যে অভিশপ্ত একটা ব্যাপার, তা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিজয় মাল্লার মধ্যে আমরা অধিকতর পেশাদারিত্বের পরিচয় পাই। তিনি নাটককে জনপ্রিয় করে তোলার জন্য সর্বদাই সচেষ্ট ছিলেন এবং সবসময়ই থিয়েটারকর্মীদের সঙ্গে কাজ করতেন। রাজকীয় নেপাল একাডেমীতে তিনি তাঁর নাটক মঞ্চস্থ করেছেন। মাল্লা ভ্রাতৃদ্বয়ের প্রধান অন্বেষা ছিল নেপালী নাটকে বাস্তবধর্মিতার প্রতিষ্ঠা। এই কাজে তাঁরা নাট্যকর্মীদের কাছ থেকে সক্রিয় সহযোগিতা পেয়েছিলেন। বিজয় মাল্লার নাটকে বাস্তববাদিতার ধারা অনুসৃত হলেও তিনি ব্যক্তিকে বিশেষভাবে প্রাধান্য দিয়েছেন, এভাবে তিনি আবার বাস্তববাদকে কিছুটা অস্বীকারও করেছেন। গোপাল প্রসাদ রিমাল, হরিপ্রসাদ রিমাল, গোবিন্দ বাহাদুর মাল্লা ও বিজয় মাল্লা দীর্ঘদিন একসঙ্গে কাজ করেছেন। তাঁরা সমাজের বিভিন্ন সমস্যাকে শনাক্ত করেছিলেন, কিন্তু ব্যক্তি ছিল তাঁদের কাছে সমাজের ক্ষুদ্র একক এবং তাঁরা মনে করতেন নাটকীয়তার প্রধান আবাসভূমিই হল ব্যক্তি। এঁরা বিশেষভাবে নাগরিক সমাজে নাটককে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। তাঁরা থিয়েটারকে একটা শক্তি কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করেছেন।

এঁদের পথ থেকে একটু সরে গিয়ে আধুনিক নেপালী নাটকে পরাবাস্তববাদ আনার প্রয়াসে তৎপর ছিলেন মোহন রাজ শর্মা। নাটক লিখেছেন প্রধানত নাগরিক বৃত্তের দর্শকদের কথা মনে রেখে। তিনি নাট্যমঞ্চে মেশিন, রোবট ও মানুষের এক বিচিত্র সংস্থাপন ঘটিয়ে সমকালের জটিলতাকে বোঝাতে চেয়েছিলেন। বিশ শতকের দ্বিতীয় অর্ধ থেকেই আধুনিক শিক্ষার বিস্তারের পরিপ্রেক্ষিতে নেপালী নাট্যজগতে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও আধুনিক প্রয়োগরীতির চর্চা বাড়তে থাকে। সারু ভক্ত শ্রেষ্ঠা হলেন এমন এক ব্যক্তি যিনি নাটকের মধ্য দিয়ে জীবনের দার্শনিক বিচার-বিবেচনায় আগ্রহী। এ বিষয়ে তাঁর নিজস্ব একটি তত্ত্ব আছে, যেটাকে তিনি বলেছেন, ‘শূন্যবাদী রঙ্গমঞ্চ’ (এই শব্দ যুগল বাংলা ও নেপালী ভাষায় অভিন্নার্থক)। কীভাবে নিঃশেষতাকে নাটকীয় মঞ্চায়নে পরিবেশন করা যায়, তা-ই হল শ্রেষ্ঠার অন্বিষ্ট। তিনি মনে করেন, মানুষ যা কিছু করে তার সবই হল আদিম ইচ্ছাতাড়িত, কিন্তু মানুষ যেহেতু এ বিষয়ে সার্বক্ষণিকভাবে সচেতন, তাই সে দ্বন্দ্বপ্রবণভাবে নিজেকে দেখতে শেখে। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, ভঙ্গির দিক থেকে সারু ভক্ত শ্রেষ্ঠার দুর্বলতা বাস্তববাদিতার প্রতি।

সাম্প্রতিক নেপালী নাটকের ধারায় যেমন তরুণ নাট্যকর্মীদের সতেজ পদচারণা লক্ষ করা যায়, তেমনি বিষয় ও পরিবেশনার ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য রচনায় তাদের প্রচেষ্টাও চোখে পড়ার মতো। আজকের কাঠমাণ্ডু ও অন্যান্য শহরের নাট্যচর্চা নিয়ে বিশদ বিবরণীর কোনো অবকাশ নেই এখানে। তবুও জনা তিনেকের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই। এদের একজন হলেন সুনীল পোখারেল। সুনীলের কাছে জীবন ও নাট্যচর্চা সমার্থক। একথা উনি নিজে বলেন কি না জানি না। কিন্তু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় ওঁর জীবনাচরণের যে পরিচয় পেয়েছি তাতে এমনটিই মনে হয়েছে আমার। নিজে দিল্লী স্কুল অব ড্রামার ছাত্র, সুনীল যে জীবন, সমাজ, সংগ্রাম ও নাটকের প্রতি কতটা সক্রিয়ভাবে দায়বদ্ধ তার জন্য দুটো দৃষ্টান্ত দিতে চাই। সাম্প্রতিক সময়ে যখন নেপালের রাজনীতিতে রাজার দমননীতি প্রবল হয়ে ওঠে এবং মৌলিক অধিকার নিয়ন্ত্রণ করার হুকুম তামিল হয়, তখন সুনীলের নেতৃত্বে নাট্য ও সংস্কৃতিকর্মীরা রাস্তায় মিছিল-সমাবেশ করে প্রতিবাদ জানায়। সেই মিছিলে ও পথে কর্মীরা যেমন স্লোগান দিয়েছেন, তেমনি নাট্যাংশ পরিবেশন করেছেন। এর জন্য সুনীলের নাট্যদল ‘আরোহণ থিয়েটার’ এবং নাট্যশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ‘গুরুকুল’-কে চড়া মূল্য দিতে হয়। পুরোনো বানেশ্বরের টিলার ওপর গড়ে তোলা সুনীলের এই দুই সংগঠনকে ধ্বংশ করে মাটিতে মিশিয়ে দেয় জ্ঞানেন্দ্রের সেনাবাহিনী।

সুনীল আবার দৃঢ় প্রত্যয়ে গড়ে তুলেছেন। একটি পরিত্যক্ত গুদামঘরকে তিনি নাট্যমিলনায়তনে রূপান্তরিত করেছেন। দেশ ও সমাজের প্রতি অবিচল দায়বদ্ধতা এই সংগঠনের। তাই বলে নাটকের শিল্পআঙ্গিকের প্রতি তাঁর কোনো অবহেলা নেই। দেশীয় ঐতিহ্য, বিদেশী নিরীক্ষা এবং ‘নাটক হল সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার’ এই বিশ্বাস থেকে সুনীল অদম্য শক্তি নিয়ে নাটকের কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত নাট্যশিক্ষালয় ‘গুরুকুল’-এ বিভিন্ন মেয়াদের নাট্যপ্রশিক্ষণ দেয়া হয়ে থাকে। সুনীল সফোক্লিসের রাজা ওয়াদিপাউস,  অভি সুবেদীর অগ্নিকো কথা, নির্দেশনা দিয়েছেন এবং এই এখন তাঁর নির্দেশিত হেনরিক ইবসেনের এ ডলস হাউস-এর নেপালী রূপান্তর পুতলিকা ঘর বিশেষভাবে আলোড়ন তুলেছে। এই নাটকের মূল চরিত্র নোরার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন নিশা শর্মা। ব্যক্তিজীবনে নিশা সুনীল পোখারেলের সহধর্মিনী। গার্হস্থ্যে যেমন, তেমনি নাট্যচর্চায় নিশা সংগঠক স্বামীর সার্বক্ষণিক সহচর। নিশা অবশ্য নিজের দল ছাড়া অন্য দলের নাটকেও অভিনয় করে থাকেন। আমাদের ঢাকার মত কাঠমাণ্ডুতে এ বিষয়ে তেমন কোনো সাংগঠনিক রক্ষণশীলতা নেই। নিশা এক অসামান্য অভিনেত্রী, যেন তাঁর রক্তের মধ্যে অভিনয় খেলা করে। বিশেষত নারীর অবস্থানগত বিপর্যয় যেসব নাটকের উপজীব্য, নিশা সেখানে অনবদ্য ও ঈর্ষণীয়ভাবে স্বতঃফূর্ত। কাঠমাণ্ডুর দাবালি থিয়েটারের প্রধান পুষ্কর গুরুঙ আগে ‘সর্বনাম থিয়েটার’ দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পুষ্করের থিয়েটার চিন্তার প্রধান কথা হল শুধু প্রসেনিয়ামের মাধ্যমে নাট্যশিল্পের সবটা পরিবেশন করা সম্ভব নয়। এতে থিয়েটার সীমানাবদ্ধ হয়ে যায়। ঐতিহ্যের নানা অংশ থেকে গ্রহণ করে আধুনিক জীবনের সংকট ও অনিবার্য বিবর্তনমানতাকে পরিচর্যিত করার প্রকাশভঙ্গিকে যুক্ত করার প্রচেষ্টাকেই পুষ্কর গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।


শফি আহমেদ : অধ্যাপক, ইংরেজী বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়