Full premium theme for CMS
মঞ্চে আলোর ইতিহাস : পাশ্চাত্য কেন্দ্রীক
Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..
অনুবাদ : মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন
নাট্যানুষ্ঠান যেকোনো স্থানে যেকোনো সময়েই হোক না কেন আলো তার জন্য অপরিহার্য। দিবালোকের নাট্যানুষ্ঠানে কৃত্রিম আলো ব্যবহৃত হয় না বটে কিন্তু আলো তো থাকে! সেটা সূর্যের আলো। কোনো পরিকল্পক রাত্রি বেলায় শুধুমাত্র চন্দ্রালোকেও নাট্য উপস্থাপন করতে পারেন। তবে মঞ্চালোক বা নাট্যালোক বলতে প্রচলিত অর্থে কৃত্রিম আলোর ব্যবহারকেই বোঝানো হয়। অত্র আলোচনায় আমরা এই প্রচলিত অর্থেই ‘মঞ্চালোক’কে গ্রহণ করবো।
নাট্যানুষ্ঠানকে আলোকিত করার মনোরম ধারণাটি সম্ভবত কোনো এক স্মরণাতীতকালে ঘটেছিলো, যার ফলে আমরা দর্শকের চোখে আলোহীন উপস্থাপনাকে দৃষ্টিগোচর করতে পেরেছি। নাট্য উপস্থাপনায় প্রাকৃতিক আলোকে ছাড়িয়ে কৃত্রিম আলোর প্রয়োজনীয়তা অনিবার্য হয়ে উঠতে সম্ভবত দীর্ঘ সময় লেগেছিলো। আজকের দিনে আলোহীন উপস্থাপনা প্রায় অসম্ভব।
আলোর উজ্জ্বলীকরণ স্বতঃসিদ্ধ। কিন্তু একথা বলার মধ্য দিয়ে মঞ্চালোকের ক্ষেত্রে মঞ্চ উপস্থাপনাকে শুধুমাত্র আলোকিত করাই বোঝায় না, বরং একে শৈল্পিকভাবে দৃষ্টিগোচর করে ‘সুখময় অভিজ্ঞতাপূর্ণ’ করার নান্দনিক দায়িত্বও বোঝায়। একাজটি করার জন্য কল্পনার বড় ধরনের ভূমিকা রয়েছে। মূলত কল্পনার যথাযথ বহিঃপ্রকাশ সাপেক্ষেই আলোকপরিকল্পনার কার্যকারিতা ও গুরুত্ব প্রতীয়মান হয়ে ওঠে। এ কারণেই বলা হয় পরিকল্পনা কথাটি শিল্পের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। আর মঞ্চালোক শিল্প হিসেবেই গ্রহণযোগ্য। বাস্তবিকপক্ষে অগ্রগতির বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে আলোক পরিকল্পনা আজ একটি আলাদা শিল্পক্ষেত্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। অগ্রগতির সেই নথিসমূহকে একসূত্রে গ্রথিত করে বলা হয় মঞ্চালোকের ইতিহাস।
আদিম মানুষ শিকার করতো। পশু শিকার। কোনো এক সময় সম্ভবত শিকার করা পশুটির মাংস ভক্ষণের প্রস্তুতিকালীন সময়ে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গী, চিৎকার ইত্যাদির দ্বারা তারা নিজেদের শিকারের সময়ের অভিজ্ঞতার অভিনয়ধর্মী উপস্থাপনা করতো বলে পন্ডিতগণ মনে করেন। আর এটাই সম্ভবত প্রথম নাট্য উপস্থাপনা। এক সময় মানুষ আগুন জ্বালাতে শিখলো। আগুন তাদের নিরাপত্তার প্রতীক হয়ে উঠলো। রাত্রিকালে আগুন জ্বালিয়ে তারা হিংস্র জীব-জন্তু হতে নিজেদের নিরাপদ রেখে বিশ্রাম গ্রহণ করত। আর ঐ বিশ্রামকালীন সময়ে আগুনের পাশে তারা উপরোল্লিখিত অভিনয়ও করত। লক্ষ্যনীয়, এখানে উপস্থাপনাকে আলোকিত করার জন্য আগুন জ্বালানো হয়নি। নিরাপত্তার লক্ষ্যে সৃষ্ট আগুন নাট্য উপস্থাপনায় আলো সরবরাহ করত অনেকটা অজান্তে।
আসা যাক প্রাচীন গ্রীক নাট্যে। আজকের দিনের স্টেডিয়াম জাতীয় থিয়েট্রন নামক এক ধরনের উন্মুক্ত মঞ্চে গ্রীক নাট্যানুষ্ঠান হত। এবং তা হত দিনের বেলায়। তাই কৃত্রিম কোনো আলোক প্রক্ষেপনের প্রয়োজন এতে ছিল না। তবে কিছু কিছু উপস্থাপনায় হ্যান্ড প্রপ্স্ হিসেবে জ্বলন্ত মশাল বা অন্য কোনো আলোক উৎস থাকত। কিন্তু একটা সমস্যা দেখা দিল- দিবালোকে মশাল বা অন্য আলোক উৎস দর্শকের দৃষ্টিগোচর হত না। এ সমস্যা সমাধানকল্পে আয়োজকবৃন্দ এমন একটি সময়ে নাট্য উপস্থাপনা করত যেন জ্বলন্ত মশাল ইত্যাদি ধারণের দৃশ্যটি সন্ধ্যা অথবা রাতের অন্ধকারে গিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। এখানেও নাট্যানুষ্ঠানে আলোর উপস্থিতি দেখা যায়। কিন্তু সেটা উপস্থাপনাকে আলোকিত করার উদ্দেশ্যপূর্ণ বলে প্রমাণিত হয় না।
যে সময়ে গ্রীকগণ নাট্য বিষয়ে পরম আগ্রহ ও উৎকর্ষতার শিখরে অবস্থান করছিলো সে সময়ে রোমানগণ ততটা ছিলো না। তারা বরং স্থাপত্য বিষয়ে অধিকআগ্রহী ছিলো। তাদের প্রাসাদ বা গীর্জাগুলোতে স্থাপত্যকলার অংশ হিসেবে আলোর জন্য মোমবাতির সুপরিকল্পিত সংযোজন ছিলো। অবশ্য মধ্যযুগে রোমের প্রার্থনা বা আচার নাট্যগুলো গীর্জা এলাকার অভ্যন্তরে হলেও সাধারণত দিনের বেলায় পর্যাপ্ত আলো প্রবেশক্ষম স্থানে হত। গীর্জার দেয়ালে সমন্বিত মোমবাতি যে কখনো কখনো কোনো ভূমিকা পালন করত না তা বলা যাবে না। কিন্তু তার চাইতেও লক্ষণীয় হচ্ছে এ সকল প্রার্থনা বা আচার নাট্যে প্রায়শই একটি নরকের দৃশ্য সংযুক্ত থাকত। ফলে ভৌতিক আবেদন সৃষ্টির যুক্তিতে ঐ সকল দৃশ্যে আগুনের ব্যবহার সাদরে গৃহীত হত। ফলে এ ক্ষেত্রেও নাট্যানুষ্ঠানে আলোর উপস্থিতি অভিনয়কে দৃষ্টিগোচর করার উদ্দেশ্যে এসেছে বলে নিশ্চিত হওয়া যায় না।
উপরোক্ত আলোচনার সাথে যদি কমেডিয়া ডেল আর্ট বা প্রাচীন বুদ্ধ নাট্য যুক্ত করি তাতেও কোনো লাভ নেই। কারণ, এ নাট্যগুলোতে আগুন, মশাল বা মোমবাতি ব্যবহারের কোনো প্রমাণ নেই।
এতো গেল মঞ্চ পরিবেশনাকে আলোকিত করার জন্য কৃত্রিম আলো ব্যবহার না করার ইতিহাস। এরপর আমরা আলো ব্যবহার করার ইতিহাসের দিকে মনোযোগ দেব। কিন্তু তার পূর্বে আলো ব্যবহার করা ও না করার সন্ধিক্ষণের দিকে একটু দৃষ্টি দেয়া যাক।
১৪৫০ এর পর ইটালি তথা সমগ্র ইউরোপ জুড়ে জ্ঞান বিজ্ঞান, শিল্প- সংস্কৃতি সহ সকল ক্ষেত্রে আধুনিকায়নের জোয়ার দেখা দেয়, যাকে বলা হয় রেনেসাঁ। ঐ সময়ের প্রচেষ্টা ছিলো প্রথা ভেঙে প্রথার নব রূপায়ন। তারই ধারাবাহিকতায় কমেডিয়া ডেল আর্ট এবং প্রার্থনা বা আচার নাট্য গ্রীক ও রোমান নাট্যের প্রথাগত পদ্ধতির সাথে ক্রমাগত আদান প্রদানের মাধ্যমে নাটকের নিত্য নতুন অবয়ব সৃষ্টি করছিলো। রেনেসাঁকালীন মানুষ রাতের অন্ধকারকে দূর করার জন্য মোম বা মশাল ব্যবহার করত। প-িতেরা মনে করেন এই রেনেসাঁকালীন কোনো এক সময় রাত্রিকালীন মঞ্চ পরিবেশনাকে আলোকিত করার জন্য পরিকল্পিতভাবে মোম বা মশালের আগমন ঘটে। কেউ কেউ উক্ত সময়ে ইংল্যান্ডের ‘টিউটর হল’-এর নাট্য উপস্থাপনাকে এর প্রমাণ হিসেবে উত্থাপন করেন। টিউটর হল ছিলো তৎকালীন ইংল্যান্ডের এক বিশাল বিনোদনগৃহ, যেখানে সে সময়ের রাজপুরুষ ও ধনাঢ্য ব্যক্তিগণ সান্ধ্য বা রাত্রিকালীন বিনোদনের জন্য জমায়েত হতেন। সেখানে নৈশভোজকে আনন্দদায়ক করে তোলার জন্য হাস্য রসাত্মক সংলাপ সম্বলিত নৈশ নাট্য অনুষ্ঠিত হত। টিউটর হলের দেয়াল ছিলো মোমের আলোতে বিন্যস্ত। তাছাড়া শীত রাত্রিতে উষ্ণতার জন্য মেঝেতে আগুন প্রজ্জ্বলিত হত। এই নাট্যগুলো উপস্থাপনের সময় পর্যাপ্ত আলো সরবরাহের জন্য দেয়ালের মোমবাতি কিংবা মেঝের অগ্নিকু-কে যথাস্থানে স্থাপন, প্রতিস্থাপন কিংবা পূনর্বিন্যাসের কিছু কিছু তথ্য পন্ডিতগণ উপস্থাপন করেন। তবে টিউটর হলের ঘটনাকে মঞ্চালোকের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে গ্রহণ না করলেও রেনেসাঁকালীনই যে মঞ্চালোকের প্রথম ঘটনা ঘটেছিলো সে বিষয়ে বেশিরভাগ প-িত একমত।
বর্তমানকালে আমরা ‘লাইট ডিজাইনার’ অর্থে যাদেরকে গ্রহণ করি তাঁদের মধ্যে প্রথম ব্যাক্তি হিসেবে ইটালির সিবাসটিআনো সেরলিও (১৪৭৫-১৫৫৪) -র নাম উল্লেখ করা যায়। সেরলিও ছিলেন স্থপতি। তিনি থিয়েটার নিয়েও সমান উৎসাহী ছিলেন। সেরলিও একটি আয়তাকার নাট্যগৃহ নির্মাণ করে সেখানে মঞ্চের সম্মুখভাগে একসারি মোমবাতি স্থাপনের ব্যবস্থা রাখেন। তিনি মঞ্চের পেছনের দিকে অঙ্কিত পশ্চাৎপট স্থাপন করে পশ্চাৎপটের কিছু কিছু অংশ দর্শকের দিকে সামান্য বর্ধিত করে বিশেষ কৌশলে আলোক সম্পাত করেন যাতে করে মঞ্চকে মনে হত অনেক গভীর। সেরলিও মোমবাতির পেছনে আয়না বা চকচকে গামলা স্থাপন করে আলো অধিকতর তীব্র করে তুললেন। মঞ্চে রঙ্গিন আলো প্রক্ষেপনের জন্য তিনি মোমবাতির সামনে রঙ্গীন তরলপূর্ণ বোতল স্থাপন করেন। এভাবে সেরলিও থেকেই নাটকের শৈল্পিক আলোর যুগ শুরু হয়।
এরপর ইনিগো জোন্স (১৫৭৩-১৬৬২) নামক ইংল্যান্ডের একজন ডিজাইনারকে আমরা পাই। ইনি সেরলিওর উদ্ভাবনগুলো নিয়ে ব্যাপক কাজ করেন। উল্লেখ্য, উক্ত দু’জন লাইট ডিজাইনারের মধ্যবর্তী সময়ে আর কোনো ডিজাইনার ছিলেন না এমন নয়। তবে এ দু’জন উল্লেখযোগ্য। পরবর্তী আলোচনাও আমরা এ প্রক্রিয়ায় করব।
মোমবাতি দিয়ে নাট্যানুষ্ঠানকে আলোকিত করার ব্যাপক নিরীক্ষার এক পর্যায়ে মোমবাতির সঙ্গ হয়ে মঞ্চে আসে তৈল সলতেযুক্ত প্রদীপ। যাকে ইংরেজীতে বলে Oil floot lamp এর floot কথাটি থেকে ‘ফুট লাইট’ কথাটি এসেছে বলে অনেকে মনে করেন। পনের শ’ ষোল শ’ সালের দিকে snuff boy নামক কিশোর নাট্যকর্মীদের হাতে করে Oil floot lamp প্রতিনিয়ত মঞ্চে উঠানামা করত। এ সময়ের আরেকটি পদক্ষেপ হচ্ছে উন্মুক্ত অগ্নিশিখাকে আবরিত করা। ক্যামপাইন বা আর্গন নামক এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থযুক্ত কাঁচের চিমনি দিয়ে মোমবাতি বা তৈলবাতিকে ঢেকে দিয়ে অধিক উজ্জ্বলতা পাওয়া গেল। এর ব্যবহার আঠারো শতক পর্যন্ত ছিলো। এই দীর্ঘ সময়ে বাতিগুলোকে সামনে পিছনে, পাশের উইংসের মইগুলোতে, মঞ্চের উপরে ঝাড়বাতির মত বিন্যাস করে নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হল। জোসেফ ফোর্টিনবিচ (১৫৯১-১৬৬৭) নামক একজন জার্মান স্থপতি ও ডিজাইনার আলোর লম্বালম্বি সারির নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন।
এতদিনে তৈলবাতি এবং মোমবাতি কাঁচের চিমনীতে আবৃত হয়ে যথেষ্ট ঐজ্জ্বল্য নিয়ে মঞ্চে স্থাপিত হল। কিন্তু দর্শকের চোখে ঐ উজ্জ্বলতা পীড়ার কারণ হয়ে উঠল। তাই প্রয়োজন হল আলোর উৎসকে লুকানো। নিকোলা সাবাতিনি (১৭১৭-১৭৭৯) বেলুনাকার আবরনী দিয়ে মোমবাতি বা তৈলবাতিকে ঢেকে দিয়ে আলোর উৎস লুকানোর পদ্ধতি আবিষ্কার করলেন। এরপর ডেভিড গেরিক (১৭১৭-১৭৭৯) এসে ফুট লাইটগুলোকে মঞ্চ হতে সামান্য নিচে স্থাপন করলেন। এই নিচের স্থানটি মূলত মঞ্চের সামনে অধিকতর খাড়া ও ঢালু একটি অংশ দর্শকের দিক হতে ঐ গর্তকে আবরিত করে রেখেছিলো।
সাবাতিনি ও গেরিকের আলোক উৎসকে আবরিত করার পদ্ধতি আলোর মঞ্চমুখীকরণ এবং আলোর তীব্রতা বৃদ্ধিকরণে যথেষ্ট সফলতা লাভ করল।
আঠারো শতক পর্যন্ত মঞ্চালোক ছিলো ব্যয়বহুল এবং কষ্টসাধ্য। গ্যাস বাতির ব্যবহারের ফলে এ সমস্যার সমাধান হয়। গ্যাসবাতি ১৭৮১ সালে আবি®কৃত হলেও মঞ্চে প্রথম ব্যবহৃত হয় ১৮১৭ সালে। এটা মোমবাতি বা তৈলবাতির চাইতে অধিকতর মসৃন এবং উজ্জ্বলভাবে মঞ্চকে আলোকিত করল। মঞ্চে গ্যাসবাতির ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ আরও একটি কারণে, তা হচ্ছে- ‘গ্যাসটেবিল নামীয় একটি টেবিল থেকে রাবার পাইপের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত গ্যাস ইচ্ছামত বাধা দিয়ে বা মুক্ত করে আলোর তীব্রতা কমানো -বাড়ানো গেল। আর এ কাজটি করা গেল নাট্য উপস্থাপনাকে কোনোরূপ বাধা না দিয়েই মঞ্চে আলোর তীব্রতা নিয়ন্ত্রণের উল্লেখযোগ্য কাজগুলো হয়েছে হেনরী ইরভিং (১৮৩৮-১৯০৫) নামক এক শিল্পীর হাতে। তিনি আরও কিছু উল্লেখযোগ্য নিরীক্ষণ কাজ করেন। যেমন- মঞ্চের বিভিন্ন স্থানে আলো বিন্যাস, মঞ্চের শীর্ষদেশ থেকে আলোক প্রক্ষেপণ, ভিন্ন ভিন্ন অর্থে ভিন্ন ভিন্ন রঙের ব্যবহার, নাট্য উপস্থাপনা চলাকালীন দর্শক সারির আলো বন্ধ রাখা ইত্যাদি। এ সকল পদ্ধতি পরবর্তীকালে ‘ইরভিং পদ্ধতি’ বলে পরিচিতি লাভ করে যার কিছু কিছু আজও অকাট্যরূপে ব্যবহৃত হচ্ছে।
উনিশ শতকের শেষ অর্ধেকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়। এ সময় সাধারণ আলোক ব্যবস্থায় প্রচুর দৃষ্টি আকর্ষক ঘটনা ঘটে। ১৮৭৯ সালে আবি®কৃত হল বৈদ্যুতিক বাতি যা মঞ্চে উঠে এসে পত্তন করল এক নব মঞ্চালোকের যুগ। কিছুদিন পর এলো বৈদ্যুতিক বাতির আবরণী, লেন্স ও প্রতিফলক। এতে করে বাতির আবরণ বাতির আলো নিজের ভেতর সীমাবদ্ধ করল, লেন্স আলোক বৃত্তকে এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত করে ফেলল আর প্রতিফলক আলোর তীব্রতাকে বাড়িয়ে দিল। এতে করে মঞ্চালোক ব্যবস্থার মৌলিক প্রযুক্তিগত কৌশল সম্পন্ন হল। বৈদ্যুতিক বাতির যুগের প্রথম দিককার দু’জন মঞ্চালোক শিল্পী হলেন সুইজারল্যান্ডের এডলফ এ্যাপিয়া (১৮৬২-১৯২৮) এবং ইংল্যান্ডের গর্ডন ক্রিজ (১৮৭২-১৯৬৬)। এ্যাপিয়া বস্তুর ত্রিমাত্রিক গুণাগুণ অবমুক্ত করার চেষ্টা চালান। এ জন্য তিনি প্রথমত পর্যাপ্ত পরিমানে আলোক রশ্মি বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রক্ষেপণ করেন; দ্বিতীয়ত এতদিন মঞ্চের পেছনে এবং পাশে ব্যবহৃত অংকিত পটগুলো অপসারণ করে বিকল্প হিসেবে কাঠ ইত্যাদির তৈরি বিভিন্ন উচ্চতা, আয়তন, ধাপ স্থাপন করেন। এ্যাপিয়ার ডিজাইনে আড়াআড়ি বিন্যাসের উপর বেশি জোর পরিলক্ষিত হত। অন্যদিকে গর্ডন ক্রিজ ল¤বালম্বি বিন্যাসের দিকে বেশি মনোযোগ দিতেন। ইনি মসৃন ভাঁজপূর্ণ পর্দাগুলোকে লম্বালম্বি ঝুলিয়ে আলো ছায়ার মসৃন মিশ্রণ ঘটাতেন।
ভারতের কলকাতায় সতু সেন নামক একজন ডিজাইনার ত্রিশের দশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে শিক্ষা সমাপন করে এসে মঞ্চে কাজ শুরু করেন। তিনি ফরাসী আমল থেকে ভারতের মঞ্চে কর্তৃত্বকারী পুরনো প্রযুক্তি ভেঙে দিয়ে আধুনিক আলোক চিন্তার পত্তন করেন। ইনি কলকাতায় ঘূর্ণায়মান মঞ্চেরও প্রবর্তন করেন। তারপর আমরা প্রখ্যাত আলোকশিল্পী তাপস সেনকে তাঁর সৃষ্টিশীল শিল্পসত্তা নিয়ে অবতীর্ণ হতে দেখি। তাপস সেনের নিকট পর্যাপ্ত আলোক যন্ত্রপাতি ছিলো না। কিন্তু তিনি তাঁর কল্পনার আলোকনক্সা মঞ্চে ফুটিয়ে তোলার জন্য অতি দ্রুত কোনো দেশজ উপাদানকে বিকল্পরূপে দাঁড় করাতেন যা একদিকে অত্যন্ত স্বল্প ব্যয়সাপেক্ষ অন্যদিকে হতভম্ব করে দেয়ার মত শৈল্পিক আবেদন সৃষ্টিক্ষম।
পশ্চিমে ১৯০০ থেকে ১৯১৪ সালের মধ্যবর্তী সময়ে আলোর প্রযুক্তিগত এবং শৈল্পিক প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়। আলাক প্রকৌশলীদের বিস্তারিত গবেষণার উল্লেখযোগ্য ফল সরূপ আমরা এক সময় পাই ‘স্পট লাইট’। যা দিয়ে আলোকবৃত্তের পরিধিকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আজ আমাদের রয়েছে Mirror spot, Ellipsoidal reflector spot, Fresnel spots, Bifocal spots, High powered optical projector, Linnebach projector, Mono plane lamp, Biplane lamp, Halogen lamp, Xenon arc, Prefocus, Bipost, Bipin cap, Alzak finish reflector, Fresnel lense, Pure color mediums - এরকম নাম জানা না জানা অসংখ্য আলোক যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ।
‘ডিমার’ নামক নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ব্যতীত উক্ত সকল যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ প্রায় অচল। এটাও আমরা মঞ্চালোকের অগ্রগতির পথে পেয়েছি। প্রথম দিককার স্বল্পদামী এবং জনপ্রিয় ছিলো Water/ Liquid dimmer. এটি একটি তরলপূর্ন পাত্রে দু’টি তার দ্বারা পরিচালিত হত। Resistence dimmer যা আজও অসংখ্য থিয়েটারে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশ দশকের শেষদিকে AC বিদ্যুৎ প্রবাহের সাথে সাথে চলে আসে Autotransformer dimmer. ত্রিশের দশকে পাওয়া গেল Reactor dimmer. এই ডিমারের উন্নত সংস্করণ হিসেবে চল্লিশের দশকে আসল থাইট্রন ডিমার। ষাট এর দশকের উদ্ভাবিত হল SRC ডিমার। বর্তমানে সর্বশেষ প্রাপ্তি হিসেবে আমাদের হাতে রয়েছে Digital dimmer. ডিমার ব্যবস্থাপনায়ও সময়ে সময়ে বিভিন্ন পরিবর্তন এসেছে। যেমন- Manual control, Master control, Remote control, Presetting memory circuts, Punch card system, Tape devices ইত্যাদি।
আলোক ব্যবস্থার উৎকর্ষতার জন্য আলোক প্রকৌশলী ও আলোক নক্সাকারদের জন্য এখনো তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ - (১) শক্তির উৎস হিসেবে বিদ্যুতের সর্বাধিক ব্যবহার, (২) যন্ত্রপাতির উন্নয়ন এবং (৩) মঞ্চালোক শিল্পীদের শৈল্পিক এবং সৃষ্টিশীল কল্পরাজ্য।
তবে আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশে একজন আলোক শিল্পীকে ব্যয়বহুল অত্যাধুনিক আলোক যন্ত্রপাতির চমকে বিচলিত না হয়ে ধৈর্য ও যত্ন নিয়ে নিজের শিল্পসত্তার সেবা করা যথাযোগ্য বলে অনুমিত হয়।
মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন : লাইট ডিজাইনার, জাতীয় নাট্যশালা, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, ঢাকা।