Full premium theme for CMS
রমরমা মধ্যবিত্ত এবং থিয়েটারওয়ালা-১
Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..
বাংলাদেশের নাটক এবং থিয়েটার জগত এখন অনেক সম্প্রসারিত। অনেক মানুষ এর সঙ্গে জড়িত এখন। টাকা পয়সাও যে এক্ষেত্রে প্রচুর আসছে যাচ্ছে সেটাও বোঝা যায়। গ্ল্যামার বলতে যা বোঝায় তা এখন অনেক বেশি। চাকচিক্য, স্বাচ্ছন্দ্য, পেশাদারীত্ব সবকিছুই এখন আগের তুলনায় অনেক ছড়ানো। তাহলে কোনদিকে যাচ্ছে এখন আমাদের নাটক, আমাদের থিয়েটার? আমাদের থিয়েটারওয়ালারাই বা আমাদের কোন দিকে নিতে চাইছেন?
থিয়েটার ‘ওয়ালা’ শব্দের মধ্যে যে একটা অভদ্র, গণ এবং ঘন ব্যাপার আছে কিংবা বলা যায় এই শব্দ দিয়ে যে ধরনের নাট্যকর্মী, উদ্যোক্তা বা সংগঠনকে বোঝানো যায় বর্তমান নাট্যজগতের প্রধান অংশ ঠিক সেরকম নয়। এখনকার নেতৃত্ব বা মূলধারার নাট্যজগত অনেক ‘অভিজাত’ অনেক ‘ব্রাহ্মণ’ অনেক ‘সাহেব’ অনেক ‘ভদ্রলোক’।
আবার অন্যদিক থেকে বিবেচনা করলে ‘ওয়ালা’ শব্দটি বেশ যুৎসই। ‘ওয়ালা’ যদি ফেরী করার অর্থে ব্যবহৃত হয়- কোনো কিছু নিয়ে বিক্রি করবার উদ্দেশ্যে নিয়োজিত ব্যক্তিকে ‘ওয়ালা’ দিয়ে বোঝানোর যদি ব্যাপার হয়, তাহলে ঠিক আছে। যেমন রিক্সাওয়ালা, ফেরীওয়ালা, মাছওয়ালা, তরকারীওয়ালা- অর্থাৎ এরা হচ্ছেন কোনো না কোনো সেবা বা পণ্য বিক্রি করবার উদ্দেশ্যে ধাবমান, ঘূর্ণায়মান ব্যক্তিবর্গ। সে হিসেবে থিয়েটারওয়ালা ঠিক ঠিক বোঝানো যায়। এখন ফেরী বা বিক্রিই তো প্রধান উদ্দেশ্য। কিন্তু তারপরও ব্যবসারও তো উত্তম-মধ্যম, অভিজাত-অনভিজাত, টাটা-কুদ্দুস ব্যাপার আছে। কাজেই বিজনেসম্যানরা ‘ব্যাপারী’ শব্দে খুশি না-ও হতে পারেন।
২.
মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের নাট্যচর্চাকে, এক পর্যায়ের ধরন বা চরিত্র স্মরণ করলে একে নাট্যচর্চা না বলে নাট্য আন্দোলন বলতে পারি, বিপুলভাবে প্রভাবিত করেছিল। বলা চলে বাংলাদেশের নাটককে গোড়া ধরে নাড়া দেয়া, তাকে আঙ্গিকের দিক থেকে মর্মবস্তুর দিক থেকে পুরো পাল্টে ফেলার ব্যাপারে উজ্জীবিত করেছিল মুক্তিযুদ্ধ, তার দ্বারাই পাল্টে যাওয়া এক তরুণ সম্প্রদায়কে। নাটক তাই হয়ে উঠেছিল সৃজনশীল আন্দোলেনের একটা রূপ।
পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছিল নানা রকমের। মঞ্চায়নের আগের ধরন, নাট্যদলের পুরনো ধাঁচ, নায়ক-নায়িকা, অভিনেতা-অভিনেত্রী ও নাট্যকর্মী সম্পর্কের প্রচলিত ধ্যান ধারণা, পরিচালক-কর্মী বিভাজন, নাটকের অর্থসংস্থান ও দর্শকের দায়দায়িত্ব, মঞ্চায়নের স্থান, নাটকের বিষয়বস্তু ইত্যাদি সবকিছু সম্পর্কিত প্রচলিত চিন্তাভাবনাই বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। সবকিছুকেই পাল্টে নতুন করে গড়ে তোলার এক মহাপণ তখন নাটকের সৈনিকদের মধ্যে। নাট্যশিল্পী, নাট্যকর্মী, পরিচালক সব তখন একাকার, সবাই কর্মী, সবাই অভিনয় শিল্পী, সবাই পরিচালক, সবাই অর্থযোগানদার, সবাই সংগঠক। এক অসাধারণ সামষ্টিক উজ্জীবন, আনন্দ, লড়াই, নির্মাণ, সৃষ্টি। ব্যক্তির ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা ছিল-আছে, কমবেশি ছিল-আছে, কিন্তু সামষ্টিক চেষ্টায় তা আরও বড়।
একরকম বিশাল ব্যাপার বিচ্ছিন্নভাবে যে ঘটেছিল তা নয়। পুরো দেশকেও এরকম খোলনলচে পাল্টে ফেলার উদ্যম নিয়ে তখন অনেকেই কাজ করছিলেন। বর্তমান সময়ের মতো স্বপ্নহীন সময়ে বাস করে সেই বিশাল স্বপ্নের সময়কে অনুভব করাও একটা কঠিন ব্যাপার।
বলাই বাহুল্য, পুরো দেশ, পুরো মানুষ, পুরো সমাজকে পাল্টে ফেলার বিশাল স্বপ্নে চিড় ধরলো অল্প সময়েই। চিড় ধরা থেকে ভেঙে পড়তেও সময় বেশি লাগলো না। চারদিকে স্বপ্ন দেখা ও তার পথে উজ্জ্বল সৃজনশীল চলাফেরার সামনে একের পর এক অচলায়তন সৃষ্টি হতে লাগলো। এই ভেঙে পড়ার কালের মধ্যেও, ভেঙে পড়ার চাপের মধ্যেও নাটক অগ্রসর হতে থাকলো কিন্তু সবার অলক্ষে দুমড়ে মুচড়ে যেতে লাগলো। চলতি ভাষায় যাকে বলে মূলধারার মূল প্রবণতায় ‘সাইজ’ হতে লাগলো ‘নাট্য আন্দোলন’। বলাই বাহুল্য, নাট্য আন্দোলন নিজে নিজে আর কতদূর যেতে পারে? কিংবা নাট্য আন্দোলনের সংগঠকদের মধ্যে যদি প্রচলিত মূলধারায় মিশে যাবার আকুলতা তৈরি হয় সেক্ষেত্রে তার আলাদা পথই বা তৈরি হয় কীভাবে?
৩.
স্বাধীনতার পর মঞ্চ নাটকের যে ধারা তৈরি হয় সেটা ছিল প্রায় আগাগোড়াই নতুন। নিয়মিত দর্শনীয় বিনিময়ে প্রদর্শনী, নাটক সেট এবং নাট্যরীতি নির্মাণ আন্তর্জাতিক এবং দেশীয় বহুকালের ধারা থেকে শিক্ষা গ্রহণের মধ্য দিয়ে নতুন একটি মাত্রা ঢাকা হয়। মঞ্চ নাটক যখন সামষ্টিক সৃজনশীলতার একটি চর্চাক্ষেত্রে পরিণত হয় তখন নাটককে আরও গতিশীল করবার বিষয়ও নাট্যকর্মীদের তাড়িত করতে থাকে। ঢাকাসহ প্রধান কয়েকটি শহরের মঞ্চ ছাড়াও এসব শহরের বাইরের নাটক সম্পর্কে উৎসাহী কর্মীদের তাগিদ, রাজনৈতিক কর্মীদের উৎসাহ সব মিলিয়ে মঞ্চ বহির্ভূত নাটকের বিষয়টিও যথেষ্ট গুরুত্ব পেতে থাকে। ৮০ দশকের একটি বড় অংশ জুড়ে আমরা এগুলোর সরব উপস্থিতি দেখি। দেখি পথনাটক, মুক্তনাটক, গ্রাম থিয়েটার।
পথনাটক, মুক্তনাটক এবং গ্রাম থিয়েটার এই তিনটিই প্রাতিষ্ঠানিকতার নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমতা ও শৃঙ্খলা থেকে মুক্তভাবে অগ্রসর হবার ক্ষমতা ধারণ করে। কথিত নিম্নবর্গের মানুষদের স্বতঃস্ফূর্ত ও সৃজনশীল অংশগ্রহণও এসব মাধ্যমে তুলনামূলকভাবে বেশি সহজ ও সম্ভব। হয়েছেও তাই। কয়েকটি বছর, বিশেষত ৮০ দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত শহরে, উপ-শহরে, গ্রামে, গঞ্জে এই নাট্যচর্চার ব্যাপক বিকাশ ঘটে। এসব নাট্যচর্চায় যেহেতু স্থানীয় কাহিনী, প্রতিবাদ-প্রতিরোধের, নির্যাতন-নিপীড়নের নিত্যদিনের বৃত্তান্ত, ধামাচাপা পড়া নিপীড়নের কোনো ঘটনা ইত্যাদিকে সামনে নিয়ে আসার উৎসাহই নাট্যকর্মীদের মধ্যে বেশি ছিল সেহেতু এসব নাটক নিছক অবসর যাপনের ব্যাপারে সীমাবদ্ধ থাকে নি, এটা সংশ্লিষ্ট সবার জীবনের অংশ হয়ে উঠার সম্ভাবনা তৈরি করেছিল।
এটা সবাই সহজেই বুঝতে পারেন যে, এই সম্ভাবনায় বিরক্ত, ক্ষুব্ধ এবং ক্রুদ্ধ যারা হতে পারেন তারাই সামাজিক-রাজনৈতিক ক্ষমতার শীর্ষে থাকেন। সুতরাং বাধা-বিপত্তি, সংঘাত খুব স্বাভাবিকভাবেই ঘটতে শুরু করেছিল। ক্রমে রাজনীতিকৃত হয়ে উঠা নাটকের সৃজনশীল ক্ষমতা এবং বিষয়বস্তুকে ধারণ করবার মতো রাজনৈতিক শক্তি বা প্রক্রিয়ার অনুপস্থিতি এই সংঘাতকে দিশাহীন অবস্থায় ফেলে দিয়েছিল। নাট্য আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সংগঠনসমূহ বা ব্যক্তিবর্গের সিদ্ধান্ত নেবার অবস্থায় আসতে হলো তারা কোনদিকে যাবেন; অগ্রসর হবেন যেদিকে নাটক ও জীবন একাকার হচ্ছে নাকি নাটককে ফিরিয়ে আনবেন প্রতিষ্ঠানের ঘেরাটোপে- শান্তি স্থিতিশীলতা আর বিনোদনের কাছে? ক্রমে সিদ্ধান্ত হল- তারা ফিরে এলেন দ্বিতীয়টায়। বলা বাহুল্য এসব সিদ্ধান্ত বৈঠকী নয়- প্রক্রিয়াগত। এক বৈঠকে হয় না, হতে থাকে। হওয়ার পেছনে অনেক উপাদান থাকে।
কেন মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর সৃষ্টিশীল সংগ্রামী নাট্য সংগঠকরা কাপুরুষের মতো সেঁটিয়ে গেলেন কিংবা কুঁকড়ে ছোট হয়ে বন্দীত্ব বরণ করে নিলেন পুঁজি ও প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলে, সেটা বুঝতে গেলে সেসময়কার এবং বর্তমান সময়কার আরও কিছু দিকও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
৪.
৮০ দশক প্রায় পুরোটাই ছিল প্রত্যক্ষ সামরিক শাসনের কবলে। সামরিক শাসন সমাজ-অর্থনীতির কর্তৃত্বশালী অংশকে অধিকতর এবং একচ্ছত্র ক্ষমতাদান করে ক্ষমতার একচেটিয়া বলয় গঠনকে সহযোগিতা ও ত্বরাণ্বিত করে। এটি সাধারণভাবে যেমন সত্য, বাংলাদেশের বেলাতেও তাই।
বাংলাদেশের ৮০ দশকে একচেটিয়া অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতাধর কয়েকটি গোষ্ঠী দোর্দ- প্রতাপের ক্ষমতা অর্জন করে; কালো টাকা এবং খেলাপী ঋণ যাদের উপার্জনের প্রধান উৎস। এছাড়া অর্থনীতিতে শিল্পায়নের দুর্বলতা অটুট থেকে অধিকতর আন্তর্জাতিকীকরণ এদেশে দোকানদারী অর্থনীতির বিকাশ ঘটায়। নতুন নতুন পেশার উদ্ভব হয়। এনজিওর অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে যা ‘প্রজেক্ট’-এর অধীনে নিয়ে আসে সব কিছু। এই সময়ে ধর্মভিত্তিক ফ্যাসিবাদী রাজনীতি রাষ্ট্রে সমাজপ্রভুদের ঘিরে বেড়ে উঠে, এই সময়ে কালো টাকাই সামাজিক মর্যাদা ও ক্ষমতার প্রধান অবলম্বন হয়ে উঠে। ধর্ম, এনজিও, ব্যবসা, বিজ্ঞাপনী সংস্থা, কোচিং বা ক্লিনিক যে নামেই হোক একটা লুম্পেনীকৃত মধ্যবিত্তের রমরমা অবস্থার সৃষ্টি হয় ৮০ দশকে। সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন সমাজের অনেক শক্তির নতুন উত্থানের ক্ষেত্র তৈরি করে কিন্তু এ লুম্পেনাইজেশন প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে তা আঘাত করতে ব্যর্থ হয়।
রমরমা মধ্যবিত্তের আকর্ষণী ক্ষমতাকে প্রতিরোধ করার ক্ষমতা নাট্য আন্দোলনের ছিল ৭০ দশকের প্রথম দিকে কিন্তু ৮০ দশকের মধ্যে সামগ্রিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যে ধরনের পরিবর্তন দেখা দেয় তা নাট্য জগতের ক্ষয়কেও ত্বরাণ্বিত করে। নাট্যজগত এর মধ্যে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে কিছু ব্যক্তির উপর, কিছু বিজ্ঞাপনী সংস্থার উপর এবং কিছু বহুজাতিক সংস্থার অর্থবল যোগানের উপর। শেকড় থেকে বিচ্যূত হয়ে তহবিল যোগানদারদের প্রভু হিসেবে মেনে নেবার ফলাফলও এখানে ভূমিকা রেখেছে। আরাম আয়াশ এসেছে, খ্যাতি এসেছে, চাকচিক্য বেড়েছে, হাসি খুশি বেড়েছে কিন্তু নাটকের ভেতরটা ক্ষয়ে গেছে। পুনরাবৃত্তি, ফাঁকিবাজি, প্রতারণা, ইতিহাস, লড়াই মানুষদের নিয়ে প্রহসন বাখোয়াবাজি এগুলোই ভরে তুলেছে নাট্যাঙ্গণ। ‘নাট্য ব্যক্তিত্বরা’ এখন দারুণ ক্ষমতাধর, দারুণ গ্ল্যামারাস কিন্তু প্রাণহীন, ক্ষমতাহীন, ব্যক্তিত্বহীন। এবং একই সঙ্গে নতুনদের জন্য জায়গা ছেড়ে দিতে প্রচণ্ড রকম অনিচ্ছুক।
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতির শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্বদ্যালয়