Full premium theme for CMS
থিয়েটার গেইমস্ : অভিনয় প্রশিক্ষণের নতুন ভাবনা [দ্বিতীয় কিস্তি]
Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..
অনুবাদ: অসিত কুমার
চলন ও ভারসাম্য
স্নায়ুতন্ত্রের আগত উদ্দীপনাসমূহের বেশিরভাগই আসে মাধ্যাকর্ষ বল প্রভাবিত পেশী ক্রিয়া থেকে। তাই অঙ্গসংস্থিতি বা শরীরভঙ্গি কেবল বিবর্তনেরই নয়, মস্তিষ্ক ক্রিয়ারও সূত্র ধরিয়ে দেয়। [ফেলডেনক্রাইস]
মানবদেহের তাবৎ চলনের মূলে যদি থাকে পৃষ্ঠতলে (space) দেহভারের ভারসাম্য স্থানান্তরের বিরামহীন প্রক্রিয়া, তাহলে আমাদের সবার আগে বুঝতে হবে কীভাবে ভারসাম্য রক্ষিত হয় এবং কীভাবে তা স্থানান্তরিত হয়। (এটা তাহলে কোনো দুর্ঘটনা নয় যে, কারো মানসিক পরিপক্কতা বোঝাতে গিয়ে ভারসাম্যের শারীরিক রূপক দিয়ে আমরা বলি- he is a balanced person.)
ভারসাম্য রক্ষণ ও স্থানান্তর প্রক্রিয়া সাধিত হয় শারীরবৃত্তিকভাবে- দুই কানের মাঝ বরাবর নল দিয়ে অনবরত তরলপ্রবাহ এবং মাধ্যাকর্ষ বলের বিপরীতে ক্রিয়াশীল পেশীসমূহের সংকোচন-সম্প্রসারণের মাধ্যমে। মনের সচেতন বা অবচেতন অভিপ্রায় ছাড়া শরীর এক বিন্দুও সরে না। আবার মনে কোনো চিন্তা রেখাপাত করলে তার শারীরিক প্রকাশ ঘটবেই সেটা দৃষ্টি গোচর হোক বা না হোক। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার মধ্যেও কল্পিত কেন্দ্রের উভয় দিকে বিপরীতমুখি আন্দোলন নিয়ন্ত্রণের জটিল ক্রিয়াগুচ্ছ সক্রিয় থাকে। ভারসাম্য এবং চলন এই দুইটি ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য সারা শরীর জুড়ে পেশী প্রবাহ অনবরত সচল থাকে। সেটাই হচ্ছে পৃষ্ঠতলে দেহভার স্থানান্তরের বিরতিহীন ক্রিয়ার মূল কথা।
পূর্ণ স্থিতাবস্থা বলতে কিছু নেই যতক্ষণ না মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সমগ্র দেহ-প্রণালী নিষ্ক্রিয় হয়। এমনকি শরীরের একাংশের পক্ষাঘাতের মতো অস্বাভাবিক অবস্থায়ও, অভিব্যক্তির সমান্তরালে শরীর আন্দোলিত হয় যতক্ষণ না পক্ষাঘাতে সারা শরীর নিশ্চল হয়ে পড়ে। কোনো একটি অঙ্গ কেটে বাদ দিলেও অনেক সময় মস্তিষ্ক সেটা উপেক্ষা করে। ফলে যার অঙ্গচ্ছেদ করা হয়েছে সে স্নায়ুতন্ত্রের ক্রিয়ার মাধ্যমে হারানো অঙ্গের উপস্থিতি অনুভব করে।
সাবলিলভাবে ভারসাম্য স্থানান্তর করতে হলে চাই মাধ্যাকর্ষ-বিরোধী-পেশীসমূহে প্রয়োজনীয় টান যার সাথে সুযুক্ত থাকে শরীরের সুসমন্বিত প্রাংশু অবস্থান। এখানেও এসে পড়ে ফেলডেনক্রাইস এর কথা:
যেকোনো ক্রিয়ার বর্ণনা করাই কষ্টসাধ্য কারণ শরীরের কোনো একটি অংশকে আলাদাভাবে সঞ্চালন করা সম্ভব নয় অপর অংশসমূহের অবস্থা পুনসমন্বয় না করা পর্যন্ত। শরীরের যেকোনো ক্রিয়ার অন্তরালেই থাকে এতসব পেশী এবং সব মিলে এমন পূর্ণাঙ্গ একটি প্রয়াস যে, কর্মের সাধন পদ্ধতির চেয়ে কর্মের বর্ণনাই সহজতর ও কার্যকর। এবং সেটি হল এই যে, সেটাই শরীরের সঠিক অবস্থান:
১) যে অবস্থান থেকে যেকোনো দিকে সক্ষম-আয়াসে শরীরকে সঞ্চালিত করা সম্ভব;
২) যে অবস্থান থেকে শরীর পূর্ব-সমন্বয় ছাড়াই যেকোনো ধরনের চলনের প্রয়াস করতে পারে;
৩) যে অবস্থান থেকে ন্যূনতম প্রয়াসে সর্বোচ্চ কার্যকারিতা লাভ করা যায়।
প্রকৃষ্ট শরীর নিয়ন্ত্রণক্ষম মানুষেরা পূর্ব সমন্বয় ছাড়াই দাঁড়ানো অবস্থা থেকে হাঁটা বা হাঁটা থেকে দৌড় শুরু করতে পারেন। শুধু তাই নয়, এর বিপরীতক্রমেও তারা চলতে পারেন অন্য মানুষের চেয়ে অনেক সহজে। এইভাবে একটি চলনক্রিয়া থেকে অন্যটিতে যাবার ক্ষেত্রে কোনোরূপ মধ্যবর্তী স্থিতি-সমন্বয় ছাড়াই সকল দিক তাদের অভিলক্ষে উন্মুক্ত।
সব মানুষের ক্ষেত্রেই যেটা হয় তা হলো, ছকে বাধা কিছু প্যাটার্ন উপরে বর্ণিত প্রক্রিয়াকে ব্যহত করে। প্রথমে মন নিজেকে নতুন পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেয় যতক্ষণ না ‘প্রয়োগ’ ‘অভ্যাস’-এ পরিণত হয় এবং অভ্যাসগত প্রয়োগে অস্বাভাবিকতাকে স্বাভাবিক বলে মনে হয়।
আমার মনে হয় না এ ব্যাপারে কেউ দ্বিমত করবে যে, আমাদের সমাজে বিকৃত শরীর-ভঙ্গির ব্যাপক বিস্তার ঘটছে অত্যন্ত বিশ্রীভাবে। কুঁজ কাঁধ বা খাড়া ধালু কাঁধ, বাকা শীড়দাঁড়া, সংকুচিত ঘাড় ইত্যকার অসামঞ্জস্যপূর্ণ দৈহিক গঠনের মানুষদের আমরা সর্বত্রই দেখি। কিন্তু এদের কাছে অভ্যস্ততার কারণে এই অস্বাভাবিকতাগুলোই স্বাভাবিক বলে মনে হয়। এবং এই ‘অভ্যাস’ ভাঙা অত্যন্ত কঠিন কাজ। অন্য অর্থে, শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পী অঙ্গসমূহের বিশেষ ধরনের সমন্বয় লাভের জন্য প্রশিক্ষণ নেন যাতে করে তিনি তার শরীরের উপর নৃত্যশৈলীর অস্বাভাবিক দাবী পূরণ করতে পারেন। এবং প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে অর্জিত নতুন অঙ্গ-সমন্বয় তার দ্বিতীয় স্বভাবে পরিণত হয়। মুখাভিনয় শিল্পী শরীরের বিভিন্ন অংশকে আলাদা করে কাজে লাগিয়ে অভিব্যক্তিকে পরিস্কার ও তীব্র করার উদ্দেশ্যে প্রশিক্ষণ নেন। অভিনেতার জন্য মুখাভিনয় শিক্ষার গুরুত্বটা এখানেই যে, ক্রিয়াকে একবার যদি আলাদা করে নিতে শেখা যায় তাহলে সেগুলোকে পরবর্তী সময়ে প্রয়োজন অনুযায়ী আবার পুনসমন্বনিত করা যায়। প্রকৃতপক্ষে, অঙ্গ সঞ্চালনের কিছু কিছু ভঙ্গির পৃথকীকরণ বা তাদের সুনির্দিষ্ট সংবেদন লাভ না করা পর্যন্ত, শরীরের উপর কাজ করা কঠিন।
সমন্বয় নীতিমালা
বইয়ের পরবর্তী পর্যায়ে যেসব প্রারম্ভিক খেলাগুলোর কথা বলবো তার বেশিরভাগই করা হয়েছে সহজ স্বাভাবিক প্রাকৃতিক পন্থায় শ্রেয়তর অঙ্গ-সমন্বয় সাধনের প্রবণতা তৈরি করবার উদ্দেশ্যে। এই প্রক্রিয়ায় লব্ধ প্রাথমিক অভিজ্ঞতাকে উদ্দেশ্য নিরপেক্ষভাবে (objectivise) প্রয়োগ করা যেতে পারে। তার আগে চলন (movement) সমন্বয়ের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। এর মধ্যে প্রধান হচ্ছে মাথা-ঘাড়-মেরুদণ্ড-পেলভিস্ (শ্রোণী: মেরুদণ্ডের নিচের অংশ এবং নিতম্বের মধ্যকার অস্থিকাঠামো) সমেত যে পেশী-চাপ-কেন্দ্রসমূহ (tension-stops) আছে সেগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক।
শৈশবে মেরুদণ্ড কার্যত সোজাই থাকে। এমন কি, গর্ভাশয়ের ঢালও তৈরি হতে শুরু করে পিঠের নিচের অংশে বাক ধরার আগেই। সে-অর্থে কাঁচা বয়সের ত্র“টিপূর্ণ প্রয়োগের কারণে কাঁধ, ঘাড় ও মেরুদণ্ডের নিতম্বগামী প্রান্তে প্রতিবন্ধকতা বাসা বেধে থাকে। যন্ত্রকৌশলের কোণ থেকে শরীরের এই জায়গাগুলোতেই সব থেকে বেশি পেশী সমন্বয় প্রয়োজন। কারণ, শরীরের এইসব স্থুুলদেশের মধ্যে অত্যন্ত অনুপুঙ্খতার সাথে রৈখিক সমন্বয় সাধনের প্রয়োজন হয়। উপরন্তু, এখানকার পেশীগুলো একাধিক গ্রন্থির উপর কাজ করে এবং এদের নিয়ন্ত্রণ অতি সূক্ষ্ম প্রকৃতির। শরীরের ভরকেন্দ্রের মধ্য দিয়ে কল্পিত উল্লম্ব অক্ষের চারিদিকে শরীরকে পাক খাওয়ানোর ক্রিয়াটি মূলত এই দুই অংশেই সম্পন্ন হয়।
মাথাকে ডানে-বায়ে ঘুরতে না দিয়ে এবং মেরুদণ্ডের নিম্নাংশ শক্ত করে রেখে শরীর ঘোরাতে গেলে বোঝা যায় ব্যাপারটা কতটা বেখাপ্যা, ক্লান্তিকর এবং কালক্ষেপী। এতে অন্ততপক্ষে তিনটি প্রয়াসের প্রয়োজন। অথচ এই অংশগুলোর সাবলীল সমন্বয়ের ভিত্তিতে শরীর ঘোরাতে জানলে ব্যাপারটা কত অনায়াসসাধ্য। [ফেলডেনক্রাইস]
নমনীয় অঙ্গ সঞ্চালনে প্রতিবন্ধকতার ক্ষেত্রগুলো খতিয়ে দেখা যাক। অনেকের ক্ষেত্রে এই প্রতিবন্ধকতার কারণসমূহের শেকড় গজায় শৈশবে। পেশীতে প্রয়োজনীয় তাগদ তৈরি হবার আগেই শিশুদের সোজা হয়ে দাঁড়াতে উৎসাহিত করা এবং শিশুদের উপর সামাজিক ও লেখাপড়ার চাপ সৃষ্টি করা এর অন্যতম কারণ। স্কুলে শিশুকে বলা হয় মাথা সোজা টান টান করে রাখতে। এই কথার ভুল অর্থ করে শিশু তার মাথার সম্মুখ ভাগ উঁচিয়ে রাখে। এর ফলে তার ঘাড়ের পেশী সংকুচিত হতে থাকে। পরিণামে মাথার সাথে মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক সম্পর্ক ব্যহত হয়। মাথার সম্মুখ ভাগ উঁচিয়ে ধরতে গেলে শরীরের ভর কেন্দ্ররেখা থেকে বিচ্যুত হয়ে পিছন দিকে ঝুকে পড়ে। এই অবস্থায় পেছন দিকে পড়ে যাওয়া সামলাতে শিশু তার পিঠের পেশীতে একটি বিপরীত টান সৃষ্টি করে। এই পৃষ্ঠ-পেশী-টান এর বিপরীতে আবার আরো একটি উল্টো টান তৈরি হয় হাঁটুর উপরে যা কিনা তাকে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে যাওয়া থেকে বিরত করে। এখানেই শেষ নয়। তৃতীয় এবং চূড়ান্ত একটি টান তৈরি হয় পায়ে যা শরীর রেখাকে সামনের দিকে হেলিয়ে দেয়। পরিণামে শরীরের নানা অংশে উচ্চচাপ গুটি বাধতে থাকে যা মনের চাহিদা মত শরীরের সহজ স্বাভাবিক চলন নিয়ন্ত্রণে বাধার সৃষ্টি করে। এই প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে পুনরায় চলনশীল হতে হলে নতুন করে পেশী ক্রিয়া বা পেশী প্রবাহের অসঙ্গতি দূর করে ভারসাম্যের পূর্ব-সমন্বয় প্রয়োজন হয়।
বেশিরভাগ মানুষ এই অভিযোজন-প্রতিযোজন প্রক্রিয়াকে প্রাকৃতিক বা স্বাভাবিক বলে ভুল করেন। একবার শরীর চর্চাকালে বারলো (W. Barlow) লক্ষ্য করেন যে, একশো পাঁচ জনের মধ্যে একজন ছাড়া বাকি সবাই বসা অবস্থায় ঘাড়ের পেছনের পেশী খিচে থাকে। ‘বসে থাকা’ নামক ক্রিয়ায় বা চলনে ঘাড়ের পেশীচাপ অনর্থক- একথা বোঝানোর পরও মাত্র এগারজন এর থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছিল।
প্রত্যেকটি নাট্য পাঠশালা তার প্রায় প্রতিটি ছাত্রের ক্ষেত্রে কম-বেশি এই সমস্যার মুখোমুখি হয়। কারণ, ভারসাম্যের কোনো না কোনো রকম গণ্ডগোল না বাধিয়ে কেউ কখনো প্রশিক্ষণে যোগ দিয়েছে এটা অতি বিরল এবং ভবিষ্যতে দেবে সেটাও অকল্পনীয়। এই সমস্যার সাথে যুক্ত হয় উদ্বেগ-আকুল-পরিস্থিতিজাত চাপ, বিশেষ করে যেখানে অভিনেতা মনে করে ‘নিজেকে তুলে ধরতে হবে’ বা ‘প্রমাণ করতে হবে’।
অভিনেতার স্নায়ুচাপ
মঞ্চের উপরে গিয়ে সমস্যাগুলোর প্রকাশ ঘটে দুই উপায়ে: চাল চলনে আটোসাটো ভাব এবং ঘাড়ে টান ধরা যার দরুণ চাপে পড়ে স্বরযন্ত্র কশেরুকার উপরিভাগে উঠে যাওয়া এবং কণ্ঠস্বর ক্ষীণ হয়ে উচ্চগ্রামে উঠে যাওয়া। এই অবস্থায় কেউ যদি সবার কাছ থেকে আলাদা হয়ে চাপমুক্ত হবার চেষ্টা করে তাহলে দেখা দেয় নতুন সমস্যা: শরীরের এক জায়গার চাপ কমাতে গিয়ে অন্য জায়গায় চাপ তৈরি হয়। গলার পেশীর চাপ কমাতে গিয়ে দেখা যায় বুকের বা পরিপাকতন্ত্রের বা পায়ের পেশীতে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। বিচ্ছিন্নভাবে কোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গার চাপ কমানো একদমই অসম্ভব। এক অংশের বড়সড় চাপ হ্রাসের সাথে সাথে অন্য অংশে বিপরীত চাপ তৈরি হয় যাতে করে ভারসাম্য রক্ষিত হয়।
এই ধরণের চাপ হ্রাসের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক আকৃতি বিকৃত হয়, শরীর একটি অতি সর্পিল রেখার রূপ লাভ করে এবং চলাচলে আড়ষ্টতা আসে (চিত্র: ২)। এটা শুধু এই জন্যই নয় যে, প্রতিটি নতুন চলনে প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের অপেক্ষা থাকে; বরং এই জন্য যে, মস্তিষ্ক থেকে মেরুদণ্ড হয়ে যেসব আজ্ঞা আসে তা নানা জায়গায় গুটি বেধে থাকা চাপের বাধার সম্মুখিন হয়। কী অভিনেতা কী সাধারণ মানুষ সকলের ক্ষেত্রেই যে দুটো চাপ-কেন্দ্র প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে সেগুলো হলো ঘাড় ও পেলভিস্। মস্তিষ্ক থেকে দেহকাণ্ড ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের শৃঙ্খলে ঐ ঘাড়ই হচ্ছে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পেশী-চাপ-কেন্দ্র (tension-stops)। বৃদ্ধাঙ্গুলি ও তর্জনী দিয়ে মাথার পেছনের অংশে উপ-অক্সিপিটাল স্নায়ুপেশী কেন্দ্রে চাপ দিয়ে একটা মানুষকে প্রায় নিষ্ক্রিয় করে ফেলা যায়। আর পেলভিস্-র গুরুত্ব এখানেই যে, তার গ্রন্থিসমূহ চলাচলে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে।
দুই উরুর হাড়ের বৃত্তাকার প্রান্তের সাথে পেলভিস্-র দুই কোটর এমনভাবে সংযুক্ত যে সে যেকোনো দিকে সাবলীলভাবে চলাচল করতে সক্ষম। এই দুই সংযোগস্থল পালাক্রমে শরীরের সম্পূর্ণ ভর বহনে সমর্র্থ। এই দুই মুক্ত সংযোগস্থলে প্রয়োজনীয় দৃঢ়তা সৃষ্টি হয় পেশীর মাধ্যমে। আবার এই পেলভিস্-র উপরই মেরুদণ্ড স্থাপিত বিধায় চলাচলের ক্ষেত্রে পেলভিস্-র ভূমিকা অতি অগ্রণী। শরীরের ঊর্ধ্বাংশ সামনে ঝুকালে লুম্বার কার্ভেচার বেড়ে যায় এবং ভরকেন্দ্র অবনমিত হয়। পেলভিস্-র ঊর্ধ্বাংশের এই সামনে হেলানো সম্ভব হয় নীতম্ব সংযোগ-প্রণালীর সম্প্রসারণ এবং উদরের নিম্নাংশের খাদের পেশীসমূহের দ্বারা। পিঠের নিম্নাংশের খাদ আরো গভীর হয়ে যায় যখন পেলভিস্-র সামনের ঝোঁক সামলাবার জন্য বুকের পেশী বিপরীত দিকে ক্রিয়াশীল হয়। স্পেইসের সাপেক্ষে মাথার সতত স্বাভাবিক অবস্থান বজায় রাখতে হলে বুকের বিপরীত-বক্রতা আরো বাড়াতে হয়। [ফেলডেনক্রাইস]
বলা যেতে পারে যে, অভিনয়ই হচ্ছে একমাত্র খেলা যেখানে ভাল ফলাফলের স্বার্থে খেলোয়াড়কে সঠিক জায়গায় অবস্থান নিতে হয় না। গল্ফের জন্য চাই পেশীসূহের সঠিক সমন্বয়ে নিয়ন্ত্রিত স্টিক চালানো; বলের লাইনে আসা। এবং ক্রিকেট খেলায় ব্যাট্সম্যানের সাফল্যের মূলমন্ত্র হলো বলটা যেখানে পড়বে সেখানটার সাপেক্ষে পায়ের অবস্থান ঠিক করা। নমনীয় ভারসাম্য এবং সহজেই বলের বাউন্স অনুযায়ী ছুটে যাওয়া টেনিসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বক্সাররাতো অনুশীলনে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় দেয় প্রতিবর্তী ক্রিয়াদির সমন্বয় সাধনে। শারীরিক-মানসিক মনোসংযোগ এবং অঙ্গস্থিতি সমন্বয়ের ক্ষেত্রে অভিনেতার কাছে অভিনয় শৈলীর দাবীও নিতান্ত সামান্য নয়। অন্যসব ক্রীড়া-কসরতে একথা সকলেই স্বীকার করে নেয় যে গোড়ায় গলদ থাকলে যতই পরিশ্রম কর তাতে ফায়দা নেই। অন্যান্য সকল ক্ষেত্রেই স্থিতি-ভারসাম্য এবং নমনীয় চলনের জন্য ত্রুটিমুক্ত বুনিয়াদ নির্মাণের একটা প্রচণ্ড দায়বদ্ধতা থাকে। অথচ অভিনয়ের ক্ষেত্রে অভিনেতাকে যেন-তেন শারীরিক অবস্থাতেই কাজ শুরু করতে দিই আমরা। যেখান থেকে সবকিছুর সূত্রপাত সেই জায়গাটা বাদ দিয়ে আমরা পার্শ্বিক বিষয়াদি নিয়ে কাজ করি। হাতের ইশারা-ঈঙ্গিত অনেক সহজেই চিনিয়ে বা শুধরে দেয়া যায়; তারচে’ অনেক কঠিন শরীরের সামগ্রিক ভারসাম্যপূর্ণ চলন ; আমাদের হস্তযুগলের প্রয়োগ সম্ভব হতে পারে শরীরের মৌল ভারসাম্যের ভিত্তিতে। অথচ আমরা হয়তো দেহ-সমগ্রকে বাদ দিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে হাত নিয়ে বিস্তর মাথা ব্যথার প্রকাশ ঘটাই।
সহজ নমনীয় চলন ও ভারসাম্য স্থানান্তরের মূল বিষয় হচ্ছে প্রাংশু অবস্থান এবং একটি স্বাভাবিক ও আরামদায়ক ভরকেন্দ্র।
শরীরে ভরকেন্দ্রের অবস্থান
আগেই বলা হয়েছে মেরুদণ্ড বরাবর চাপ-কেন্দ্রের কথা যেগুলো স্থানচ্যুত হয়ে উলম্ব রেখাকে ঘিরে সাবলীল চলাচলে বাধা দেয়। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি ছক নামে কেন্দ্রীয় মেরুদণ্ডের কাল্পনিক রেখাভিত্তিক একটি ছক আছে যা দিয়ে শরীরের গঠন প্রকৃতির মূল্যায়ন করা হয়। সেখানে দেখা যায় যে, ন্যূনতম পূর্ব-সমন্বয়ে সকল দিকে সর্বোচ্চ উন্মুক্ত ও নমনীয় চলনের জন্য সবচেয়ে সহায়ক অঙ্গস্থিতি নিশ্চিত হয় যখন গোড়ালীর পার্শ্ব হাড় থেকে কর্ণদ্বার পর্যন্ত একটি উল্লম্ব রেখা কল্পনা করা যায়। এই রেখাটি যেখানে পেলভিস্-র উপরের প্রান্ত স্পর্শ করে সেটিই হচ্ছে শরীরেরে স্বাভাবিক ভরকেন্দ্র। মেরুদণ্ড এবং পেলভিস্-র উপর দেহের উর্ধাংশ এবং নিুাঙ্গের ভারসাম্য এই ভরকেন্দ্রের সম্পর্ক সাপেক্ষ। তাহলে শরীরের যেকোনো চলনের যথার্থ সমন্বয় নির্ভর করে পেলভিক অঞ্চলজাত প্রণোদনা যা উর্র্ধ্ব ও নিুাঙ্গে যুগপৎ সমন্বয় ঘটায়।
নিখাদ যন্ত্র-কৌশলের ভিত্তিতে এটা প্রমাণ করা যায় যে, শরীরের সামনের দিকে চলাচল সম্ভব হয় পেলভিস্-র উর্ধাংশের সম্মুখ-অভিসারী চলনের জন্য। [ফেলডেনক্রাইস]
অনেক সময়ই পেলভিস্-র উপর-প্রান্তটা ঠিক কোথায় তা অনুভব করা কঠিন হয়। কাজ কিছুদূর অগ্রসর হয়ে যাবার আগ পর্যন্ত মনে হতে থাকে ওটা বোধহয় নাভি ও তলপেটের মাঝামাঝি কোনো বিন্দুতে। যদিও আসলে সেটার অবস্থান তার ঠিক উল্টো দিকে পিছনে। ভয়ানক শারীরিক কসরত দাবী করে এমন নাটকে কাজ করার সময় সর্বক্ষণ শারীরিকভাবে ভরকেন্দ্রের আন্দাজ পাবার জন্য পেলভিস্ রেখা বরাবর পোষাকের নিচে ইলাস্টিক জড়িয়ে আমি উপকার পেয়েছি।
মেরুদণ্ড বরাবর যে চাপ-কেন্দ্রসমূহ ধড় ও মাথার ভরকে রেখাচ্যুত ও ভারসাম্যচ্যুত করে সেগুলোর বিপরীতে সটান থাকবার জন্য পায়ের উপরিভাগ ও পাতায় অতিরিক্ত টান সৃষ্টি করে ভরকেন্দ্র নামিয়ে আনতে হয়। এর ফলটা লক্ষ্য করা যায় তাদের ক্ষেত্রে যারা শরীরের উপরিভাগ সামনে ঝুঁকিয়ে হাঁটতে শুরু করে এবং এই ঝোকের প্রাবল্যে পড়ে যাওয়া ঠেকাতে কোনো মতে পা ঠেকিয়ে চলে। এর উল্টোটাও লক্ষণীয়: টলানো সামলাতে শরীরের উপরের ভাগে প্রচণ্ড টান সৃষ্টি করা হয় যার পরিণতিতে মেরুদণ্ডে বক্রতা বৃদ্ধি পায়, বুক সামনে ঝুঁকে পড়ে এবং ভরকেন্দ্র অস্বাভাবিকভাবে উপরে উঠে যায়। সেক্ষেত্রে চলনটা দাঁড়ায় এমন- সামনের দিকে প্রবলভাবে পা ছুঁড়ে ছুঁড়ে এগুনো, তার পেছনে শরীররটাকে টেনে টেনে আনা যার পরিণামে পিঠে চোট পড়া। আমার অভিজ্ঞতায় অভিনেতারা সাধারণত নিম্ন ভরকেন্দ্রের অধিকারী হন।
অভিনেতাদের নিয়ে কাজের প্রাথমিক পর্যায়ে নিু-ভরকেন্দ্র সম্পর্কে তাদের জাগ্রত করা কঠিন। মেরুদণ্ড বরাবর চাপ-কেন্দ্রসমূহের উপস্থিতি অনুভব করা এমনকি অপরের চলনে সেটা উপস্থিতি চাক্ষুস করার অভিজ্ঞতা তুলনায় সহজে লাভ করা যায়। কিন্তু ভরকেন্দ্রের ধারণাটি কিছুটা বিমূর্ত। চর্চায় দেখেছি ভরকেন্দ্রকে একটু নিচের দিকে কল্পনা করে নিলে লক্ষণীয় সুবিধা পাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে পেলভিস্কে শরীরের নিম্নাংশের সাথে যুক্ত বলে ধরে নিতে হয়। তাতে এমন আন্দাজ হয় যে, শরীর যেন পেলভিস্-র উপরপ্রান্ত থেকে আরো একটু উপরের কোনো জায়গা থেকে দ্বিখণ্ডিত। এটিই পিঠের নিুাংশের বক্রতলের কেন্দ্র (চিত্র-৪)। একারণে অভিনেতাদের সাথে কাজ করার ক্ষেত্রে সব সময়ই প্রমাণীত হয়েছে যে, প্রকৃত (নিম্ন) ভরকেন্দ্রের চেয়ে উচ্চ-শরীর-কেন্দ্র অনেক বেশি কার্যকর। এই উচ্চ-শরীর-কেন্দ্র সহজেই অনুভব করা যায়। মেরুদণ্ড ও উদর বরাবর হাতের উঠানামায় বোঝা সম্ভব কোন বিন্দুতে মেরুদণ্ড সবচেয়ে আরামের সাথে ভাজ হয়। এই জায়গাটি ছাড়া মেরুদণ্ডের আর সব চাপ-কেন্দ্রে খিল ধরে থাকে। শরীরের কেন্দ্রকে নামিয়ে আনার প্রচেষ্টায় ভরকেন্দ্র তার স্বাভাবিক অবস্থানে উন্নীত হয়।
অতি চেষ্টা
গতিশীল ও নমনীয় চলনে অন্তরায় সৃষ্টির ক্ষেত্রে উচ্চ-শরীর-কেন্দ্রের প্রভাব কতটা তা বোঝা যেতে পারে পর পর কয়েকবার দেয়ালে টেনিস বল ছোড়া-ধরার মধ্য দিয়েই। সব ধরনের চলনই সাধারণত নির্ভর করে কেন্দ্রমুখি ও বহির্মুখি প্রণোদনা প্রবাহের উপর। লাবান্ যাকে বলেন আহরণ ও বিচ্ছুরণ বা বিক্ষেপ। অর্থাৎ প্রতিটি বহির্মুখি ক্রিয়ার সাথে যুক্ত থাকে মৌল অবস্থানের ভারসাম্য পুনরুদ্ধার ক্রিয়া যার মাধ্যমে শক্তির পুনরুজ্জীবন ঘটে। বিক্ষেপ প্রক্রিয়ায় চলন যত ক্ষীপ্র, আহরণ প্রক্রিয়ায় ভারসাম্যে ফেরা তত বেশি জরুরী এবং কেন্দ্র বরাবর সামনে ও পেছনে ঝোঁকের ব্যাপ্তিও তত বেশি। বল্টিকে অতি জোরালোভাবে নিক্ষেপের জন্য শরীরকে আবার কেন্দ্রে ফিরে আসতে হয় পরবর্তী নিক্ষেপের প্রণোদনার শক্তি আহরণ করার উদ্দেশ্যে। তাই আহরণ দুর্বল হলে পরবর্তী বিক্ষেপ দুর্বল হতে বাধ্য। দেহের উর্ধাংশের চাপ-কেন্দ্রসমূহ বা উচ্চ-শরীর-কেন্দ্র এই পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া ব্যহত করে। পরিণামে নিক্ষেপ ক্রমশ দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়। শক্তির ঘাটতি পূরণ করতে গিয়ে শরীরে তৈরি হয় নতুনতর চাপ। এই চাপ কখনো অতি প্রবল হয়ে উঠতে পারে; শরীর কেন্দ্রের উপরে ও নিচে কশেরুকাসমূহ আটোসাটো হয়ে পড়তে পারে; চলনরেখা বরাবর ছোট ছোট পেশী গুচ্ছে সংকোচনের মাধ্যমে শক্তি উৎপাদনের প্রবণতা তৈরি হতে পারে। পরিণামে, অসহনীয় চাপে সামগ্রিক প্রক্রিয়াটি আরো ক্ষীণ হয়ে পড়তে বাধ্য।
সেই কারণেই অনভিজ্ঞ অভিনয়শিল্পীরা একটু কঠিন ধরনের পঙক্তিগুচ্ছের শেষে এসে আর শক্তি ধরে রাখতে পারে না। ধরা-ছাড়ার মাঝখানে ‘আহরণ’-র সুযোগ না নিয়ে তারা ক্রমশ প্রবল থেকে প্রবলতর প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে। শরীরের অমন ভুল ব্যবহারের পরিণামে যা হবার তাই হয়- আমাদের কানে আসে ক্রমশ ক্ষীণ হতে থাকা হাল্কা, দ্রুত, ছন্দভাঙা টুকরো টুকরো শব্দাবলী। এই প্রক্রিয়া যেসব সমস্যা সৃষ্টি করে তা অন্যান্য ক্রীড়াক্ষেত্রেও লক্ষণীয়। বক্সিং-এ দ্রুত হাত চালিয়ে পয়েন্ট পাওয়া যায়, নক-আউট করা যায় না; নক-আউট করতে হলে বক্সারকে অবশ্যই পুরো শরীরের ভর যুক্ত করে মুষ্টি বিক্ষেপ ঘটাতে হবে। অর্থাৎ, ঘুষি হাঁকাবার আগে ভারসাম্য-কেন্দ্রে ফেরার মধ্য দিয়ে শক্তি আহরণ করে পুরো শক্তি ঘুষির পেছনে প্রয়োগ করতে হবে। উপর্যপুরি ঘুষির জন্য কেন্দ্রকে ক্রমশ সামনের দিকে নিয়ে যেতে যেতে বল আহরণ-প্রক্রিয়া চলমান রাখতে হবে। তা না করলে বক্সার ভারসাম্য হারিয়ে সামনে ঝুঁকে পড়ে যেতে পারে। অভিনয় তার চাইতে অনেক বেশি জটিল মানব-ক্রিয়ার সমন্বয় যার মধ্যে অন্তর্ভূক্ত থাকে মানব ব্যক্তিত্বের সকল দিক। অতি-চেষ্টার ফলে শরীরের উর্ধাংশের ভর সামনে হেলে পড়ে যা অভিনেতার ক্রিয়া এবং সামগ্রিক উপস্থাপনায় নানা রকম সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে।
স্থানিক প্রসঙ্গে বলতে হয়, অতি চেষ্টার ফলে অভিনেতার শরীর থেকে মনোযোগ সরে যায় তার চলনরেখা অভিমুখে। ফলে অভিনেতা তার নিজস্ব অবস্থান-বলয় হারিয়ে ঝুঁকে পড়ে অন্য অভিনেতার পরিধির দিকে। যখন দুইজন অভিনেতা একই সঙ্গে এই কাজটি করেন, তখন মঞ্চের সব কিছুকে ছাপিয়ে চূড়ান্ত আকর্ষণ সৃষ্টি হয় দুইজনের মাঝখানের খালি জায়গায়। এমন অবস্থায় দর্শকের পক্ষে দুই অভিনেতার দুই কেন্দ্রে পর্যায়ক্রমে দৃষ্টিপাত করে, দুইজনকে আলাদাভাবে লক্ষ্য করা দুরূহ হয়ে পড়ে।
অভিনয় ক্রিয়ার ‘দেয়া-নেয়া’ বা ‘ছাড়া-ধরা’র জায়গা থেকে যদি বলি, অতি প্রয়াসে কেবল দেয়াই হয়, নেয়া হয় না। সবাই যদি কেবল দিতেই থাকে, নেবার কেউ না থাকে তাহলে মঞ্চের উপর এদিকে ওদিকে অবস্থানরত চরিত্রসমূহের মধ্যে স্বাভাবিক মিথস্ক্রিয়া ঘটে না; নাট্যক্রিয়া ভেঙে পরস্পর সম্পর্কহীন খণ্ডিত উক্তি ও একক ক্রিয়ায় পরিণত হয়। এই ধরনের একক ক্রিয়ার কোনো প্রভাবই যেন মঞ্চে উপস্থিত অন্য কারো উপর পড়ে না যেহেতু কেউই এর বিপরীতে সাড়া দেয় না বা প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে না। এমন পরিস্থিতি যদি দর্শকের জন্য কোনোরকম বোধগম্যতা সৃষ্টি করে থাকে তা নিতান্ত আক্ষরিক অর্থেই সীমাবদ্ধ। দর্শক-শ্রোতা শারীরিকভাবে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেন না। তারা দেখেন, ভাবেন এবং বুদ্ধি দিয়ে ব্যাখ্যা করেন। দর্শকাসনে বসে আমার মনে হয়, এই ধরনের অভিনেতা না অন্য চরিত্রের সাথে না আমার সাথে যোগাযোগ সৃষ্টিতে সক্ষম। এমন পরিস্থিতিতে চেয়ারে গা এলিয়ে বসে শুনতে শুনতে কখনো কখনো মাথাধরার অভিজ্ঞতাও হয় এবং নাটকের স্বাভাবিক ঘটনা প্রবাহে ডুবে যেতে আমি নিরুৎসাহিত বোধ করি। কথাগুলো শুনি এবং বুঝি। কিন্তু শব্দাবলীর তাৎপর্য হারিয়ে ফেলি। কারণ, প্রকৃত যোগাযোগ নির্ভর করে অভিনেতার কণ্ঠ নিস্রিত শব্দাবলী দর্শক-শ্রোতার পেশীতে কতটা গভীর ও সহানুভূতিশীল সংকোচন-প্রসারণ ঘটায় তার গভীরতার উপর।
শুরুতে দেয়া-নেয়া ঘটে উপস্থাপনার শারীরিক ক্রিয়া এবং দর্শকের প্রত্যক্ষণ করার সংবেদনশীল অঙ্গসমূহের মধ্যে। ঐন্দ্রিয়ক সাড়া ক্রমে সম্প্রসারিত হয় কল্পনায় ...
বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে উপস্থাপনকারী অনুধাবন করতে পারে ‘প্রেক্ষাগৃহ’ তাদের অনুকূলে আছে কি না। কারণ দর্শকের পেশী টানের মাত্রাই তার মনোযোগের গভীরতার নীরব বার্তা জানান দেয়। একথাতো বলাই যায় যে দর্শক তার চোখ দিয়ে দেখে না, দেখে তার ফুসফুস দিয়ে; কান দিয়ে শোনে না, শোনে তার ত্বক দিয়ে। আমরা সবাই জানি, আমরা যখন নাটকে মগ্ন হয়ে থাকি তখন শরীরের মধ্য দিয়ে অনুভূতি পরিবাহিত হয় এবং জটিল, চাঞ্চল্যকর মুহূর্তের প্রতিক্রিয়ায় আমাদের সংবেদনে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়। প্রতিক্রিয়ার প্রশ্নে নাটকীয় সংকেতগুলোকে মনে মনে আলাদা করে দেখবার প্রয়োজন নেই। প্রত্যক্ষণ ক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে উপ-প্রত্যক্ষণ - উদ্দীপনা সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে অবগত হবার আগেই আমরা উদ্দীপনার শারীরিক প্রতিক্রিয়া জ্ঞাপন করি। থিয়েটারে এই কথার অর্থ হচ্ছে, নাট্যক্রিয়া বুঝে উঠবার আগে থেকেই আমাদের শরীর নাট্যক্রিয়ার বুনন ও কাঠামোর বিপরীতে সাড়া দিতে শুরু করে। [ড. বেকারম্যান, ডায়নামিক্স অব ড্রামা, নিউইয়র্ক, কেএনও পিএফ, ১৯৭০]
অভিনেতার ক্ষেত্রে যে প্রক্রিয়াকে আমি ‘পশ্চাৎ মনের অবচেতন ক্রিয়া’ বলি, প্রদর্শনী চলাকালে সেই প্রক্রিয়া দর্শকের মনেও সচল থাকে। দর্শক হিসেবে সাধারণত আমার মনের ভিতর কী ঘটছে সে সম্পর্কে আমি ঠিক সচেতন থাকি না যতক্ষণ না সচেতন হয়ে ভাবি কী দেখলাম। এটুকু অবগতি থাকে যে, একটা মানসিক প্রয়াস চলছে; কিন্তু মনের ভিতর ঠিক কী ঘটছে সে সম্পর্কে সচেতন থাকি না। শুধু বুঝি, যখন মনোযোগ দিচ্ছি তখন কান খাড়া করে টান টান হয়ে বসছি; মনোযোগ হারিয়ে গেলে শরীর ছেড়ে দিচ্ছি এবং আমার সচেতন মন নাটক থেকে সরে গিয়ে অন্য চিন্তায় অন্যত্র পরিভ্রমণ করে বেড়াচ্ছে।
পূর্বস্থিরিকৃত অভিপ্রায়ে অভিনয়ের পরিণাম
অভিনেতার শরীর যে বাহ্যিক আকার ধারণ করে তা তার ব্যক্তিগত শারীরিক উন্নয়ন এবং শরীরের নৈমিত্তিক ব্যবহারের ফলস্বরূপ। তাছাড়াও বিষয়টি অভিনেতার মানসিক ক্রিয়ার সাথে দৃঢ়ভাবে সম্পর্কযুক্ত। মস্তিষ্কের দুই অংশের ক্রিয়া-প্রক্রিয়ার সাথে পেশীর যোগাযোগ বিষয়ে ইতোমধ্যেই কথা বলেছি। এর সাথে আরো একটু বলা দরকার, মস্তিষ্কের যেকোনো অংশেরই অতিরিক্ত ব্যবহার অঙ্গ সমন্বয় ও সংস্থিতির ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করে। সজাগ হয়ে সকল বহিঃউদ্দীপনায় সাড়া দেয়ার অবস্থার সাথে আমরা মাথা সোজা অবস্থায় শরীরের প্রাংশু অবস্থানকে মিলাই। এই অবস্থানকে কয়েকটি শব্দগুচ্ছ দিয়ে বোঝান হয়। যেমন ‘উৎকর্ণ হয়ে শোনা’র সাথে ঘাড় উঁচিয়ে কান খাড়া করার ক্রিয়া চলে; ‘অবাক হয়ে চারিদিকে লক্ষ্য করা’র সাথে ১৮০ ডিগ্রীরও বেশী কৌণিক সীমায় ডান থেকে বামে মাথার সর্বোচ্চ আবর্তন সংশ্লিষ্ট। শিশুকে বলা হল 'সোজা হয়ে বসে মনোযোগ দাও’ কিন্তু সেটা কীভাবে সম্ভব তা বোঝানো হল না - এতে ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। মনোযোগ দানের সাথে মেরুদণ্ডের সটান অবস্থান জড়িত। আবার ধ্যানস্থ হবার প্রক্রিয়াকে বোঝান হয় যেসব শব্দগুচ্ছ দিয়ে সেগুলো হচ্ছে ‘চিন্তায় মগ্ন’, ‘গভীর ধ্যান মগ্ন’ ইত্যাদি। ‘চিন্তা করা’ ক্রিয়াটি স্বয়ং মাথার আনত অবস্থা ঈঙ্গিত করে। ‘আমাকে একটু ভাবতে দাও’ কথাটার পরই বক্তাকে মাথা সামনের দিকে ঝুকিয়ে থাকতে দেখা যায়। রডিন-র দ্য থিংকার এই ভাবনা প্রক্রিয়ার যথার্থ সংজ্ঞা দান করে। সচেতন চিন্তায় মাথা ঘাড় মেরুদণ্ড এবং পেলভ্সি স্বাভাবিক সটান অবস্থান থেকে বিচ্যুত হয়- মাথা সামনের দিকে চলে আসে, মেরুদণ্ডে উত্তল বক্রতা তৈরি হয়, পেলভিস্ অসার হয়ে পড়ে। এই রকম অবস্থা যখন অভিনেতার ক্ষেত্রে তৈরি হয় তখন সে এর বিরুদ্ধতা ক’রে ঘাড়ের পেছনের মাংশপেশী সংকোচনের মাধ্যমে মাথা সোজা রাখার চেষ্টা করে। ফলাফল ঐ যে আগেই দেখিয়েছি - সর্পিল মেরুদণ্ডে নাজুক অবস্থান। এমনটা কেন হয় তার সূত্র রয়েছে প্রথম অধ্যায়ের শুরুতে - অভিনেতাকে ‘চাহিবা মাত্র’ বাস্তব জীবনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটমান মানব আচরণ ও মিথস্ক্রিয়ার নানা ধরন বিশ্বাসযোগ্যরূপে পুনঃপুনঃ উপস্থাপন করতে হয় যখন তখন যেখানে সেখানে নিয়মহীন নিয়মিত বিরতিতে।
অভিনয়ক্রিয়ার কেন্দ্রে রয়েছে একটি সত্যিকার স্ববিরোধীতা: অভিনেতাকে পরিণতি/ উপসংহার জানা সত্বেও স্বেচ্ছায় স্বতঃস্ফূর্ততার ভাব নিয়ে ক্রিয়া-কর্তব্য বিনির্মাণ করে যেতে হয়। পরিবেশনায় এমন কিছুই ঘটে না যাতে অভিনেতার নিমিত্ত-বোধ যুক্ত নয়। কিন্তু ‘রূপায়ণ’ আর ‘আরোপ’ এক কথা নয়। প্রায়শ যেটা হয় এবং যার থেকে অনেক সমস্যার জন্ম হয় সেটা হল এই যে, অভিনেতা মরিয়া হয়ে ‘সুসচেতনভাবে’ ক্রিয়াদি উপস্থাপন করার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। অথচ যে-মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় দৈনন্দিন জীবনের ক্রিয়াদি ঘটে এটা তার বিপরীত।
আগেই আমরা দেখেছি ‘সচেতন প্রয়াস’ স্বাভাবিক মনো-দৈহিক সমন্বয়ে অন্তরায় হয় এবং পরিণামে সাবলীলতা ও সচলতা হারিয়ে গিয়ে ক্লান্তি ও অতি-উদ্বেগের জন্ম হয়। অভিনয় প্রক্রিয়ায় ‘সচেতন প্রয়াস’ যুক্ত হয় উদ্দিষ্ট-তাড়না থেকে। অর্থাৎ অভিনেতা সচেতনভাবেই বুঝে নেয়, তার সামগ্রিক নাট্যক্রিয়ার মাধ্যমে কী প্রতীতী সে তৈরি করতে চায়; যে-লক্ষ্য সে তার অভিনয় ক্রিয়ার পরিণতিতে অর্জন করতে চায়, তার সচেতন মন সেটার একটি সুনির্দিষ্ট বাস্তব ও স্পর্শগ্রাহ্য সমগ্ররূপ দেখে নিয়ে কাজ শুরু করে। এইভাবে অন্তিম লক্ষ্য মাথায় নিয়ে কাজ করতে গিয়ে অভিনেতা স্বাভাবিক মনো-দৈহিক প্রক্রিয়াকে উপেক্ষা করে। অথচ এই প্রক্রিয়াই তাকে তার লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পারে। অভিনয় ক্রিয়ার চূড়ান্ত ফলাফল তার সম্মুখ মস্তিষ্কে গেঁথে থাকায় তার প্রাংশু অঙ্গস্থিতি ভারসাম্য হারিয়ে চিন্তামগ্নতার অবনত ভঙ্গিতে পরিণত হয়। এতে পশ্চাৎ-মনের প্রতিবর্তী ক্রিয়া এবং শরীরের সচলতা ব্যহত হয়। অভিনেতার সেই ‘ফলাফল’ আর অর্জিত হয় না, কখনোই অর্জিত হতে পারে না। অর্জনের ‘সচেতন প্রয়াস’ যত তীব্র হবে, স্বাভাবিক প্রক্রিয়া তত বেশি পরাহত হয়।
এই প্রক্রিয়া স্বত-আরোপিত হয়ে নতুন অভিনেতাদের জন্য মর্মপীড়া সৃষ্টি করে। একটি প্রদর্শনী ভাল হলে পরবর্তী প্রদর্শনী খারাপ হওয়ার যে ব্যাপারটা সেটারও কারণ এখানেই নিহিত। আগের প্রদর্শনীর ভালত্বে অনুপ্রাণিত হয়ে অভিনেতারা পরের রজনীতে গিয়ে আগের রজনীর ভালত্ব হাতড়ে হাতড়ে হয়রান হয়। এই যে ‘প্রক্রিয়া’কে গুরুত্ব না দিয়ে ‘ফলাফল’কে গুরুত্ব দেয়া- এটাই হচ্ছে সমস্যার কারণ। নতুন অভিনেতাদের বেলায় মহড়ায়ও এই সমস্যা দেখা যায়। মহড়া পর্যায়ে অভিনেতার কাজ ক্রমশ উন্নততর পর্যায়ে যেতে পারে তার সাথে অপরাপর অভিনেতার ও নির্দেশকের মিথস্ক্রিয়া এবং তার নিজস্ব সৃজনী কল্পনার মধ্য দিয়ে। কিন্তু নবাগতরা, পশ্চাৎ-মস্তিষ্কের প্রতিবর্তী ক্রিয়ায় অর্জিত শিক্ষাকে আত্মস্থ করে তার উপর আস্থা স্থাপন করার পরিবর্তে বাড়ি গিয়ে ভাবে এবং পুরো প্রক্রিয়াটির একটি নিরেট ও স্থবির রূপকল্প নির্মাণ করে; পরবর্তী মহড়ায় গিয়ে তারা সেই স্থির ছবিটিরই প্রতিরূপ অন্বেষণে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে, আগের মহড়া যেখানে শেষ হয়েছিল তার থেকে অনেক নিচু একটা জায়গা থেকে পরবর্তী মহড়া শুরু হয়। নির্দেশকের জন্যতো এটা অত্যন্ত বিমর্ষ হবার মত ব্যাপার।
পূর্ব স্থিরিকৃত অভিলক্ষ অর্জনের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রক্রিয়া আর অন্য মানুষের সাথে মিথস্ক্রিয়া এক সাথে চলতে পারে না। তাতে মঞ্চে উপস্থিত অন্য অভিনেতার দিকে অব্যর্থ দৃষ্টি প্রক্ষেপ সম্ভব হয় না; অস্পষ্ট অনির্দিষ্ট দৃষ্টিরেখা সহ-অভিনেতার কানের পাশ দিয়ে চলে যায় বা বুকের পাঁজরের দিকে ঝাঁপসা ও দোদুল্যমান অবস্থায় ভাসতে থাকে। প্রাত্যহিক কথোপকথনের বেলায়ও দেখা যায়, যা বলবো বা যা শুনলাম সে সম্পর্কে সচেতন হয়ে ভাবতে হলে মাথা ও চোখ আনত হয়; সরাসরি দৃষ্টি সংযোগ সম্ভব হয় না।
এই সমস্যার প্রতিবিধানে নির্দেশকগণ মহড়ায় নানা পথ অবলম্বন করেন। তাদের বলতে শোনা যায়, “পরিণামটা দেখিয়ো না, প্রক্রিয়াটা দেখাও” বা “চরিত্রটা ‘করো’ না, ‘হও’ বা “অতটা মরিয়া হয়ো না, বাদ দাও” ...
অভিনয় পদ্ধতি
এটা একটা নির্মম পরিহাস যে, স্তানিস্লাভস্কি, যিনি অভিনেতার পথ ও পাথেয় অনুসন্ধানে পদ্ধতিগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা-ব্যাখ্যার প্রথম ও একমাত্র সূত্র ও সিদ্ধিদাতা, তিনি কি-না ভ্রান্ত প্রশিক্ষণের কারণে অনেক অভিনেতার কাছে প্রতিবন্ধকতাস্বরূপ। স্তানিস্লাভস্কি খুঁড়ে খুঁড়ে অভিনয় পদ্ধতির সূত্রাবলী বের করেছেন এবং তিনি যা উপলব্ধি করেছেন (অভিনয় একটি মনো-দৈহিক প্রক্রিয়া- এই উপলব্ধিটাই তার কাজের কেন্দ্রবিন্দু) সর্বজনগ্রাহ্য পরিভাষা প্রয়োগ করে সেগুলোর গ্রন্থনা করেছেন। অনেক সময় অভিনেতা ক্র্যাচে ভর করার মত করে সেই সব পরিভাষাকে আশ্রয় করে। তারা তাদের অভিনয় ক্রিয়াকে বৌদ্ধিকভাবে সংজ্ঞায়িত করে এবং তাদের অভিলক্ষকে স্নায়ু তাড়িত শরীরক্রিয়া বা প্রতিবর্তী ক্রিয়ায় রূপান্তরিত না করে পরিণতি অনুসন্ধানী সামগ্রিক ও নিরেট প্রকল্প হিসেবে দাঁড় করায়। কী মহড়ায় কী প্রদর্শনীতে, এই পথে একবার চলতে শুরু করে প্রত্যাশিত ইফেক্ট সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হলে তারা বাধ্য হয় অভিলক্ষ বা প্রণোদনা বা পরিবেশ-পরিস্থিতি বা রূপকল্প পুনর্বিবেচনা করতে। এই অবস্থায় তারা আরো কঠিনভাবে মনোসংযোগে উদ্যোগী হয়। অর্থাৎ এটি একটি নিখাদ বৌদ্ধিক ক্রিয়া যা তাদেরকে দৈহিক ক্রিয়ায় নিরুৎসাহিত করে। প্রত্যেক নির্দেশকই সেই সব অভিনেতাদের নিয়ে শংকিত হয়ে থাকেন যারা ‘পদ্ধতি’ বা ‘কৌশল’বাদী এবং যারা ঐ পদ্ধতি বা কৌশল দিয়ে নিজের করতে না-পারাকে ব্যাখ্যা করতে পারেন। এদের নিয়ে মহড়ায় অনবরত তর্ক-বিতর্ক, ভুল বোঝাবুঝি, বাগাড়ম্বরতা এবং পরিণামে হতাশার জন্ম হয়। এর পরিণামে অনেক প্রতিভাবান ও বুদ্ধিমান অভিনেতা শুধু স্তানিস্লাভস্কিকে নয় নাট্যপাঠশালাও পরিত্যাগ করেন। কারণ, এক সময় তাদের কাছে এটা পরিস্কার হয়ে যায় যে, তাদের ‘পদ্ধতি’ অকার্যকর। আগে হোক পরে হোক প্রত্যেক অভিনেতাই ‘পদ্ধতি’ বাদ দিয়ে চলবার মত অবস্থায় যেতে চায়; চায় প্রত্যেকটি পরিস্থিতিকে যখন-যেমন মোকাবেলা করতে; চায় কাজটা ‘এক রকম চালিয়ে যাওয়া’র মত ‘এই আসছি-যাচ্ছি-করছি, ব্যস্’ অবস্থায় পৌঁছতে। প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতায় কাজটা বুঝে নিয়ে প্রস্তুত হয়ে উঠবার আগেই প্রচুর সংখ্যক অভিনেতা এই পথ ধরেন। এতে অভিনেতা হিসেবে তাদের উন্নতি ভীষণভাবে ব্যহত হয়।
আমি বিশ্বাস করি, অভিনয় প্রশিক্ষণের সবচে’ শক্তিশালী ভিত্তি দিয়ে গেছেন স্তানিস্লাভস্কি। তবে তার তত্ত্ব উদ্ভাবনের পরবর্তী এ্যাতোগুলো বছর পার হবার পর সেগুলো পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন আছে কি-না সে বিষয়ে আমার কথা আছে। আমার দীর্ঘ প্রশিক্ষণ প্রদানের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিক্ষাণবিশদের স্তানিস্লাভস্কি-পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণদানের বিষয়ে অন্য সকলের সমর্থন লাভ করেছি। কাজটা খুব দক্ষতার সাথে করা হয়ে থাকে। সমস্যাটা তৈরি হয় তখনই যখন আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ শেষে অভিনেতাকে স্ব-তত্ত্বাবধানে ছেড়ে দেয়া হয়। আমার কোনো কাজেরই উদ্দেশ্য মোটেই স্তানিস্লাভস্কিকে প্রতিস্থাপন করা নয়। আমার লক্ষ্য সুকঠোর ও বিচ্ছিন্ন কর্ম পরিবেশে উদ্ভূত সমস্যার সমাধান আয়ত্ত করা।
আমার মনে হয় অভিনয় প্রশিক্ষণের অন্যান্য ক্ষেত্রেও এই সমস্যাগুলো দেখা দেয়। চলন উদ্দিষ্টকরণে (objectivisation) আমার কাছে লেবান (Laban)-পদ্ধতিই সবচে’ সেরা। লেবানকে মেনেই হোক না মেনেই হোক চালচলনের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রশিক্ষকরা ‘চলন’ শেখান, ‘পদ্ধতি’ শেখান না। পদ্ধতি আছে এবং সেটা শারীরিক ক্রিয়ার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে সর্বজনগ্রাহ্য পরিভাষারূপে উপযোগীও বটে। কিন্তু আবার সেই পরিভাষা কখনো কখনো চেপে বসতে শুরু করে, একটি নিরেট ধারণায় পরিণত হয়, একটি আটোসাটো শৃঙ্খলায় পরিণত হয় যা পূর্ব-স্থিরিকৃত অভীলক্ষ নির্ধারণ করে চলন ব্যহত করতে পারে।
চতুর্থ অধ্যায়
অভিনেতার প্রশিক্ষণ
আমার সাথে যে অভিনেতারা কাজ করে তাদের প্রত্যেকের কাছে একটি প্রতিজ্ঞা আমি করি। প্রশিক্ষণে আমি যাই করতে বলি তার সবকিছুই মহড়া বা প্রদর্শনীর সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত কেউ চাইলে আমি সেটা প্রমাণ করে দিতে পারি। খেলা ও অনুশীলনাদির উদ্দেশ্য অভিনেতার কাজের মধ্যে কী কী ঘটতে থাকে তা খোলাশা করা এবং তার কাজে যে মনো-দৈহিক প্রক্রিয়াদি চলতে থাকে সে সম্পর্কে অভিনেতাকে সজাগ করা। তার এই বোঝাটা সে কোন কাজে লাগাবে সেটা তার নিজের উপর নির্ভর করে। বিশেষ একটা অনুশীলন থেকে একজন অভিনেতা কতটা লাভবান হবে তা আগে থেকে বলা কখনোই সম্ভব না। একটা অনুশীলন বা খেলাকে সরাসরি ‘কাজে লাগানো’র চিন্তা করা কখনোই উচিত নয়। উচিত খেলাটা প্রস্তুত করে তাকে চলতে দেয়া; পরে খেলার অভিজ্ঞতাটা আলোচনা করা। আমি নিজে যেহেতু এইসব প্রক্রিয়ার সবকটির মধ্য দিয়েই গেছি, অন্য অনেকের সাথে মত বিনিময় করেছি আমার কাছে কী কী ঘটে তার পরিস্কার নির্দেশিকা আছে। কিন্তু শেষ বিচারে অতি সাধারণ পরিস্থিতিতেও যিনি নিজের ক্ষেত্রে কী কী ঘটেছে তা বলতে পারেন তিনি স্বয়ং অভিনেতা। অভিনয়ের অভিজ্ঞতাকে সাজিয়ে প্রকাশ করার ক্ষেত্রে যিনি নিজের ব্যক্তিগত ও ব্যক্তি নিরপেক্ষ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে সমর্থ তিনিই প্রকৃত অভিনেতা। বাস্তবে দেখা যায় যে, অভিজ্ঞতার সীমা অসীমও নয়, যথেচ্ছও নয়। কারণ, খেলা ও অনুশীলনাদি উদ্ভাবিত ও পরিচালিত হয় অভিনয়ক্রিয়া সম্পর্কে শিক্ষালাভ ও অনুসন্ধানের উদ্দেশ্যে। আলোচনার জন্য এটা একটা কাঠামোগত শব্দসমষ্টি সরবরাহ করে ও তাকে নিবদ্ধ করে।
পুরো কাজটার আসল কথা হচ্ছে এই যে, এটা একটা অনুসন্ধান ও আবিস্কারের প্রক্রিয়া; এটা প্রত্যক্ষভাবে প্রায়োগিক দক্ষতা অর্জনের কোনো পন্থা নয়। এই প্রক্রিয়ার বাই-প্রোডাক্ট হিসেবে দক্ষতা অর্জিত হতে পারে। এই প্রতীতী নিয়ে শুরু করে আমরা মনোনিবেশ করি ক্রিয়া পদ্ধতির উপর, অভীষ্টের উপর নয় বা আকাঙ্ক্ষিত ফলাফলের উপর নয়।
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় জোরটা দেয়া হয় ফলাফলের উপর, ফলাফল লাভের পন্থার উপর নয়, এমনকি সেটা যদি প্রয়োজনের চেয়ে বেশি প্রচেষ্টা দাবি করে তা সত্বেও। প্রচেষ্টার উচ্চতর পর্যায়ে শরীরী সংবেদনে সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো ধরা পড়ে না। সে কারণে একটা নির্দিষ্ট পর্যায়ের বেশি অগ্রগতি সাধন অসম্ভব। ফলে সবকিছু যেমন ছিল তেমনই থেকে যায়। অপরিশোধিত গতি-নন্দন-বোধ আরো অপরিশোধিত হয়; ক্ষীণ অনুভূতিগুলো আরো ক্ষীণ হয়ে যায়।
পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে ক্রিয়াদি অভ্যস্ততায় পর্যবসিত হয় যদি তাতে সাড়া দেয়া হয়। অভ্যাসগত ক্রিয়াকে সঠিক বলে মনে হয় পুনরাবৃত সম্মতির কারণে। [ফেলডেনক্রাইস]
এই প্রসঙ্গে ফেলডেনক্রাইসের অনুমানের কথা বলি: একবার অভিনেতা সঠিক পথে যাত্রা করলে, তার কাজটা স্ব-প্রণোদিত হয় এবং স্বাভাবিকভাবেই সেটা আরো উন্নতির দিকে ধাবিত হয়। এটাকে সত্য মানলে, নিশ্চয়ই আমরা ইতোমধ্যে অভিনেতার আত্ম-উন্নয়নের পথ খুলে দিয়েছি।
বর্তমান বাস্তবতায় অভিনেতা থিয়েটার স্কুলের আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ শেষ করবার পর আর তেমন কোনো প্রশিক্ষণ বা উন্নতি সাধনের প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ পায় না। তাই আমাদের এমন একটা পথ বের করা দরকার যে-পথ অনুসরণ করে অভিনেতা একাই সামনে এগিয়ে যেতে পারে। অভিনেতার শিক্ষা ও উন্নয়ন প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষভাবে জড়িত তার বেড়ে ওঠা এবং পরিপক্ক হয়ে ওঠার সাথে। থিয়েটার স্কুলে তাকে যা শেখানো হয় তার বোধগম্যতা নির্ভর করে তার নিজের টার্মস্ অব রেফারেন্স এবং সেটাকে জীবন ও কর্মে প্রয়োগের সামর্থের উপর। শিক্ষক যতই কুশলী হন না কেন শিক্ষাণবিশ অভিনেতাদের নিয়ে সমস্যা সব সময়ই তৈরি হয়। এর কারণ হচ্ছে এই যে, প্রশিক্ষণের শুরুতে তাদের যা শেখানো হয় তার মর্মার্থ তারা বুঝতে পারে কেবল অন্যান্য ক্ষেত্রে আরো অনেক কাজের মধ্য দিয়ে যাবার পর। শিক্ষক হিসেবে শিক্ষা-উপাদানগুলোকে অনবরত ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বিন্যাস-পুনর্বিন্যাস করে সবচে’ বেশি কার্যকর পাঠানুক্রম অনুসন্ধান করার অভিজ্ঞতা আমার আছে। যাদের সাথে কাজ করেছি তাদের প্রায় প্রত্যেকে গ্র“প প্রশিক্ষণের শেষে আমাকে বলেছে ‘এটার আগে ওটা করালে আরো উপকৃত হতাম’ ইত্যাদি ইত্যাদি। পুরো ব্যাপারটাই একটা বিভ্রম। পাঠ্যক্রমের যেকোনো বিন্যাসেরই প্রতিক্রিয়া একরকম। শিক্ষাণবিশ অভিনেতার টার্মস্ অব রেফারেন্স যেহেতু গড়ে ওঠে কাজের মধ্য দিয়ে এবং তার বেড়ে ওঠার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার সাথে সাথে, একই ব্যাপার ঘটে তার বোধগম্যতার উন্নতির ক্ষেত্রে। তরুণ অভিনেতারা থিয়েটার স্কুলের বিশেষ পরিবেশ-পরিস্থিতি থেকে পেশাদার কর্মপরিবেশে খাপ খাওয়াতে এবং অর্জিত জ্ঞানের প্রয়োগ ঘটাতে সমস্যায় পড়ে।
যেভাবেই হোক না কেন, অভিনেতা হিসেবে একজন মানুষের গড়ে ওঠা অবিচ্ছেদভাবে জড়িত তার নিজের সম্পর্কে এবং ব্যক্তিগত ও সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তিতে অপরাপর মানুষদের সম্পর্কে ক্রমবর্ধমান বোঝাপড়ার সাথে। কাঁচা অবস্থায় শিক্ষার ধারণাকে ‘অল্পসময়ে কৃৎ-কৌশল অর্জন’-র মধ্যে সীমাবদ্ধ করলে শিক্ষণ প্রক্রিয়াকেই ব্যহত করা হয়। নিজের ভিতরে নিজেকে বা অন্যের সাথে সম্পর্কের সাপেক্ষে নিজেকে আবিস্কারের মাধ্যমে এই উপলব্ধি হয় যে, সব কিছুকেই পরিবর্তন করা সম্ভব। মনের অবচেতনে সদা চলমান সমন্বয় প্রক্রিয়ার কুট প্রকৃতির কারণে পরিবর্তিত হবার সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগ পর্যন্ত এবং আত্ম-আবিষ্কারের উদ্দেশ্য নির্ণিত না হওয়া পর্যন্ত পরিবর্তন ঘটে না।
অন্ধকারে লড়াই
প্রশিক্ষণে যে খেলাগুলো আমি প্রয়োগ করি সেগুলো সহজে পুরানো হয় না। কারণ, অভিনেতা তার উন্নতির বিভিন্ন ধাপে ঐ খেলাগুলোতে ফিরে যায়; ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে সেগুলোর ব্যবহার করে। এর মাঝে একটি খেলা আমার কাজের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্ব লাভ করে। সে-কারণে আমি বারবার খেলাটিতে ফিরে যাই। খেলাটি একদিকে পর্যবেক্ষণ শিক্ষা অন্য দিকে গতিনন্দন বোধ (kinaesthetic) ও শরীর-চিন্তন এর বিস্তৃত প্রশিক্ষণে মূল্যবান ভূমিকা রাখে। খেলাটির নাম ‘অন্ধকারে লড়াই’। এক ‘পিকিং অপেরা’ থেকে আমি জিনিসটা বানিয়েছি।
চারিদিকে চেয়ার দিয়ে একটা চতুষ্কোণ জায়গা তৈরি করতে হবে। শুধু এক কোণে একটু জায়গা ফাঁকা থাকবে। বাইরের দিকে মুখ করা এই চেয়ারগুলোতে বসা থাকবে পর্যবেক্ষণকারীরা। এখন, চেয়ারের বেস্টনীর মাঝে যে জায়গাটা তৈরি হলো তার কেন্দ্রে পড়ে আছে একটা অতি মূলবান রত্ন। একজন খেলোয়াড় রত্ন পাহাড়া দিচ্ছে। আরেকজন হবে চোর, যে ঐ ফাঁকটা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে রত্ন চুরি করবে। কল্পনা করতে হবে জায়গাটা সম্পূর্ণ অন্ধকার।
চোর অন্ধকারে অদৃশ্যমান প্রহরীকে এড়িয়ে অদৃশ্যমান রত্ন খোঁজার চেষ্টা করে। প্রহরীও অন্ধকারে রত্নটা দেখতে পায় না বলে রত্নটার অবস্থান ঠাহর করতে পারে না। একটা শব্দে সে বুঝতে পারে চোর এসেছে। এখন তার দুটো কাজ- রত্ন খুঁজে পেয়ে সেটাকে সরিয়ে ফেলা এবং চোর খুঁজে বের করে তাকে মেরে ফেলা। প্রথমে কয়েকবার খেলাটা না হয়ে যাওয়া পর্যন্ত প্রহরী চাইলে এই দুইয়ের মধ্যে যেকোনো একটা কাজও বেছে নিতে পারে। প্রথমত অভিনেতাকে খেলাটা খেলবার উপায় নিজেকেই বের করে নিতে হবে। পরবর্তী সময়ে শর্ত আরোপ করে তাকে বিকল্প বাছায়ের সুযোগ দেয়া হবে বা খেলাটার ভেতর থেকেই পাওয়া কোনো নির্দিষ্ট পন্থা পরীক্ষা করে দেখা যাবে। শুরুটা অবশ্য হবে সোজাসুজি, খোলামেলা।
খেলাটা খেলতে হবে জোড়ায় জোড়ায় পালা করে যাতে করে প্রত্যেকে নিজে খেলার সুযোগ পাবে এবং অন্যকে খেলতে দেখারও সুযোগ পাবে। প্রথমে স্পষ্ট আলোতে চোখ খোলা রেখে খেলা। পরে চোখ বেঁধে।
[চিত্র-৫-৬- চোখ খুলে খেলা, দিতে হবে]
চোখ খুলে খেলা আর বেঁধে খেলার মধ্যে বিস্তর পার্থক্য, বিশেষ করে শারীরিক দিক থেকে। লক্ষ্য করা যায়, চোখ খোলা অবস্থায় বিকল হয়ে পড়া পেলভিস্ আর নুয়ে পড়া মাথার কারণে মাথা ঘাড় মেরুদণ্ড এবং পেলভিস্-র একটি উত্তল রেখা তৈরি হয়। চোখ বাঁধা অবস্থায় মাথা আগের তুলনায় খাড়া হয়, মেরুদণ্ডের নিচের অংশ সটান হয় যার দরুন মাথা ঘাড় মেরুদণ্ড এবং পেলভিস্ অনেকটা সোজা হয়ে আসে। চোখ বাঁধা অবস্থায় অভিনেতার শরীরের ভারসাম্যের উল্লেখযোগ্য উন্নতি লক্ষ্য করা যায়; চারিদিক হাতড়ে হাতড়ে অনুসন্ধান ক্রিয়ায় স্পেসের ব্যবহার সম্প্রসারিত হয়; ফলে দুই জনের পারস্পরিক সম্পর্কে নাটকীয় পরিবর্তন আসে।
চোখ খোলা অবস্থায় খেলতে গিয়ে অভিনেতারা যে জায়গা ব্যবহার করে সেটা যেন অনেকটা ঢিলেঢালা হয়ে থাকে। বক্র অঙ্গসংস্থিতির কারণে অভিনেতারা যেন কেন্দ্রহীন এক পরিধির প্রান্তে অবস্থান করে। ঘটনাক্রমে ঐ চতুষ্কোণ ক্ষেত্রে অবস্থান করার কথা বাদ দিলে দুই অভিনেতার মধ্যে কোনো পারস্পরিক সংযোগ তৈরি হয় না। অন্যদিকে, চোখ বাঁধা অবস্থায় উভয়েই যেন নিজ নিজ ক্ষেত্রের চিহ্নিত/ সুনির্দিষ্ট কেন্দ্রে ঘনিষ্ঠভাবে অবস্থান করে এবং কেন্দ্রবিমুখ সম্প্রসারণের মাধ্যমে একে অপরকে সংযুক্ত করে। দুজনের মধ্যবর্তী সুস্পষ্ট দূরত্বও এক বিপজ্জনক নৈকট্যের অনুভূতি সৃষ্টি করে। এটা দর্শকের মনে একটা নাটকীয় উৎকণ্ঠা তৈরি ক'রে তাদের মনোযোগ এবং উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়।
তবে খেলাটার দুই রকমের মাঝে সবচেয়ে বড় পার্থক্যটা হচ্ছে এই যে, চোখ খোলা অবস্থায় অভিনেতা সচেতনভাবে অন্ধকারের বিভ্রম সৃষ্টি করার প্রচেষ্টায় ‘পরিণতি’র ভাবনায় মনোযোগী হয়ে পড়ে। তার অভীলক্ষ বুদ্ধিবৃত্তিক সমগ্রতায় পর্যবসিত হয় যা কি-না শরীর-চিন্তন প্রক্রিয়াকে ব্যহত ক’রে তার শারীরিক ভারসাম্য নষ্ট করে। প্রায়শই দেখা যায়, অভিনেতা যা বিনির্মাণের চেষ্টা করছে তার একটা পূর্বস্থিরিকৃত রূপ সে বহন করে যাচ্ছে তার সম্মুখ-মনে।
চোখ বাঁধা অবস্থায় অভিনেতাকে পরিবেশ-পরিস্থিতির কথা ভাবতে হয় না কারণ চোখ বেঁধে তার জন্য অন্ধকারাচ্ছন্নতার পরিবেশ-পরিস্থিতি তৈরি করে দেয়া হয়েছে (বস্তুত থিয়েটারে এটা আদৌ কখনো করে দেয়া হয় না)। তার ক্ষেত্রে শরীর-চিন্তন প্রক্রিয়াদিই প্রাধান্য পায়। ফলে সে কেবল প্রহরীর দৃষ্টি এড়িয়ে অনুসন্ধানের শারীরিক ক্রিয়ায় অভিক্ষেপ করতে পারে। দৃষ্টি অবরুদ্ধ হলে অন্যান্য ইন্দ্রিয় তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে এবং মস্তিষ্কের শরীর ও কল্পনা সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রসমূহ অভিনেতার মনের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। ফলাফলের অনুগামী না হয়ে সে খেলাটা খেলে যেতে পারে। খেলার সময় অভিনেতাকে অবশ্যই কী ঘটছে সে সম্পর্কে ক্রিটিক্যাল হতে হবে। অনভিজ্ঞ ও শরীরের সীমিত ব্যবহারে অভ্যস্ত লোকেরা চোখ বন্ধ অবস্থায়ও মুখস্ত ফলাফল অন্বেষণে সচেষ্ট থাকে। আমার জানা মতে, শারীরিক ক্রিয়ার কাল্পনিক বিনির্মাণের কাজটিই প্রশিক্ষণের শ্রেষ্ঠ ক্ষেত্র। এটা গুরুত্বপূর্ণ এ কারণেই যে এখান থেকে অভিনেতার ক্রিয়া উঁচুমানের অনুকরণ শৈলীর দিকে যেতে শুরু করে।
খেলাটার কার্যকারিতা অনুমান করা অসম্ভব। এর অনেকটাই নির্ভর করে অভিনেতা কীভাবে আগেভাগে ঠিকঠাক করে রাখা ছক অনুসরণ না করে সহজাতভাবে পরিস্থিতি নির্মাণে প্রয়াসী হয়- তার উপর। অভিজ্ঞ অভিনেতাগণ প্রায়শ ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘরের কল্পিত পরিবেশ বাস্তবতা সহজাতভাবেই করে ফেলেন; সে-ক্ষেত্রে পার্থক্য রচনার উদ্দেশ্যে বুদ্ধিবৃত্তি কাজে লাগিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে খেলাটার পুনরাবৃত্তি ঘটানো হয়। অভিনেতা যদি সহজাতভাবে অন্ধকার ঘরের পরিবেশ-পরিস্থিতি কাল্পনিকভাবে বিনির্মাণ করার পথ খুঁজে পেয়ে যায় তাহলে আমরা যেতে পারি পিকিং অপেরা সূত্রে প্রাপ্ত অন্যান্য খেলার দিকে যেমন, নদী নেই- নৌকা নেই- লগি নেই- তবু মাঝির নদীতে লগি মেরে নৌকা চালিয়ে যাত্রি পারাপার করার খেলা, ইত্যাদি।
[চলবে]
অসিত কুমার: অনুবাদক, সদস্য- ঐকিক থিয়েটার, নারায়ণগঞ্জ।