Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

ঢাকার মঞ্চে মহাকাব্য-প্রাণিত নাট্য

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

কারণ জেনেছি পাই যে আঘাত সেও দুস্থ সভ্যতাবশত- বিষ্ণু দে।

বিশ্বের তাবৎ মহাকাব্যগুলো তো মানবের সাধারণ উত্তরাধিকার; যৌথ অবচেতনার মানস-ভাণ্ডার বিশেষ। তবে এক একটি মহাকাব্য আবার বিশেষ দেশকাল, ভূগোল ইতিহাসের লুপ্তসূত্রসমূহের আখ্যান-প্রতীকে বিন্যস্ত আকরও বটে। রামায়ণ ও মহাভারত, উপমহাদেশের এই মহাকাব্যদ্বয়ে ইতিহাস-সন্ধান-পাঠের কথা বলেন রবীন্দ্রনাথ। প্রাচ্য এক মহাজাতীয় মানসের মহা আধার এই মহাকাব্যদ্বয় একদিকে যেমন এই বিরাট ভূখণ্ডের বিচিত্র উৎস থেকেই সংগ্রথিত তেমনি আবার  উপমহাদেশের নানা ভাষার কাব্য-নাট্য-নৃত্য-সঙ্গীত-গল্পকথন এমনকি জ্ঞান বিজ্ঞান দর্শন শিল্পচর্চাও এই মহা উৎস থেকেই উৎসারিত- ক্রমসৃজ্যমান, স্বতোরূপান্তরণশীল। এছাড়া বিশ্বের আর সব মহাকাব্যের মধ্যে শাহনামাই অধিক গৃহীত, জারিত উপমহাদেশীয় জনমানসে। যদিও ক্ষমতা-রাজনীতির চিরস্থায়ী অন্তর্ঘাতে যৌথ সে অবচেতন মানসও জখমে চির রক্তাক্ত; গলন-পচন ক্রিয়া চলছে চলবে। বিচ্ছেদ বিদ্বেষ বিষ ক্রম সংক্রামিত তার  মনের তলে তলে। যদিও আদিযূথতার অবশেষ অশেষ হয়েই ফল্গুধারায় বহে চলে সাধারণের মানসভূমিতে। স্বদেশীয় ভাবদর্শন তার নিজ ভাষা, মুদ্রা নন্দন বাচনেই নিত্য অভিব্যক্ত হয়ে চলে। সেই সঙ্গে অবশ্য অন্তর্ঘাতও ক্রমমরিয়া নানা ছলের বলে- ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ায়।

আবহমান এই মানসভুমি থেকে ছিন্নভিন্ন বিচ্ছিন্ন যত নাগরিকগণ উপনিবেশিক শিক্ষা-দীক্ষা- সংস্কৃতিতে লাভের লোভে উপভোগীজন। ক্ষমতার বিভেদে সংঘাতে এই কথিত শিক্ষিত ধনমানে বলবানের আহৃত সত্তাস্বরূপ কলুষিত প্রতিবন্ধীতায় অষ্টাবক্র। সংখ্যাহীন জটিল, কুটিল ফাঁসে মরিয়া আত্মঘাতী, ঘৃণা জগুপ্সায় বিকৃত। বাংলাদেশের নাগরিক দর্শকমানস এহেন দশাগ্রস্ত, পক্ষুতায় বিভঙ্গ। তিন মহাকাব্য- রামায়ণ-মহাভারত- শাহনামা প্রাণিত, ভাষ্যযোগে অভিনীত হযেছে কতক নাট্য থিয়েটারে। নানা ক্রিয়া-প্রক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সহও মহাকাব্য প্রণোদিত নাট্যরূপায়ণের এক ধরনের অভিজাত ধ্রুপদী মর্যাদা আছে দর্শকের কাছে। সেটা একটা বড় নির্ভরতা। মহাকাব্য যে এমন গুণাধার- তা-ও হয়তো বিদেশ থেকেই শিখেছি, জেনেছি আমরা।

মহাভারত সূত্রনির্ভর বিশ্বসেরা এক সংস্কৃত নাটক শকুন্তলা; মহাকবি কালিদাসের এই নাটক ভিন্ন ভাষ্য ব্যাখ্যানে লেখেন সেলিম আল দীন, নির্দেশনা- নাসির উদ্দিন ইউসুফ, প্রযোজনা- ঢাকা থিয়েটার। মার্কসীয় শ্রেণীব্যাখ্যান তখনকার প্রচলিত অদ্বিতীয় বুলি বিশেষ ছিল। শকুন্তলা-য় স্বর্গ-মর্ত্য রূপান্তরণে উঁচু-নিচু শ্রেণী, দেশ। উচ্চ শ্রেণী সংসর্গজাত শকুন্তলা বয়ঃসন্ধিকালে এক অসুখে পড়ে- শরীরে, মনে। সে মর্ত্যবাসীদের ঘৃণা করে। জন্মসূত্র স্বর্গকল্পনায় বিভোর দিব্যোম্মাদ হয়ে ওঠে। এই নিয়ে, শ্রেণী সম্পর্কের নানা স্তর-মাত্রা, পূর্বতন গল্পকাঠামোর আধারে গড়ে ওঠে। আধুনিক এক কাব্যবচনে গুঢ়, গভীর জটিল নানা ভাবনা, কথা, চিন্তা, কল্পনায় আখ্যান গঠিত হয়। নতুন এক অভিজ্ঞতা পায় দর্শক। আংশিকশ্রুত কাহিনীর অভিনব ব্যাখ্যান মুগ্ধ করে তাকে। মঞ্চসজ্জায় নিরাভরণ এক কল্পদৃশ্য- রঙের নানা ব্যবহারে তা বিচিত্র প্রতিভাস জাগায়। প্রযোজনা আর অভিনয়ও ভালো। উদ্ভিন্ন যৌবনা এক নারীর শারীর আধিব্যাধি নানা কাব্যময় উপমা উৎপ্রেক্ষায় শৃঙ্গাররসের পুলক জাগায়, শিহরিত করে। তার ওপর তারকা নিয়ে সেই প্রারম্ভ মাতন- হিস্টিরিয়ার পার্শ্ব-সুবিধাও আদায় হয়। সুবর্ণা মুস্তাফা সে-ই তো উজ্জ্বল উন্মোচন। নানা রকম বিচার বিবেচনায় সমালোচনাও হয়। পাকিস্তানী জঙ্গী জোশে তীব্র আক্রমনও হয়- সত্তরের দশকেই খাপ খুলে মাঠে নেমে পড়েছে তাহলে তারা। সব মিলে শকুন্তলা বাংলাদেশের মঞ্চের স্মরণীয় কাজ।

মহাভারত আখ্যান নিয়ে যযাতি রূপায়ণ করে নবধারা (নাট্যদল), নির্দেশনা- শাহীন খান। সাহিত্যপড়–য়া দর্শকের একাংশ কাহিনীর বিষয়সার জানে- পিতা-পুত্রের জরা-যৌবন বিনিময় কথা। নবভাষ্যে নারীর আ-পৌরাণিক চির মর্মন্তুদ অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়। নারী-পুরুষ ক্ষমতা সম্পর্কের জটিলতা দেখতে পাই। অনুদিত বাচনের আড়ষ্টতা বাধা হলেও দর্শক এক নিদারুণ ট্র্যাজিক নাট্যের আস্বাদ পায়। প্রযোজনা অভিনয় সেই দায় পালনে সমর্থ হয়। নবীণ দল-নির্দেশক আশা জাগায়। দর্শক-সমালোচক একে একটি ভালো প্রযোজনার স্বীকৃতি দেয়।

দীর্ঘ বছরের ব্যবধানে দুটি দল মঞ্চায়ন করে মাধবী । নবীন দল ‘কালিক’, নিদের্শনায় ছিলেন নবীন নাট্যজন আবদুল্লা রানা। প্রবীণ দল ‘থিয়েটার’-এর প্রবীণ নির্দেশক রামেন্দু মজুমদার। মহাভারতকৃত আখ্যান থেকে এই নাটক, রচনাকার ভীস্ম সাহনী। পণ্য বিপণনের স্থায়ী মুদ্রাবিশেষ নারীশরীর নিয়ে ক্ষমতার যত কুৎসিত বীভৎস লোফালুফি, হাত বদল- যেন সে একালের খনিজ তৈল- যার ভোগ দখল নিয়ে চিরশতকীয় যুদ্ধবাজি, নখদন্তের সভ্য মানুষিক ব্যাদান। নাট্য এই ক্যারিকেচার রঙ্গে উন্মত্ত হয়ে ওঠে। অজানা আখ্যান তত বাধা হয় না। ব্রাক্ষ্মণ-ক্ষত্রিয়ের, বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে ক্ষমতার চতুর কূটরণের মহড়া চলে মঞ্চ জুড়ে। নারী-পুরষের আদি মানব-সম্পর্ক ভেসে যায় সেই কুরুক্ষেত্রে। ‘কালিক’ প্রযোজনায় তাজা তরুণ স্ফূর্তি নাট্যভাষায় রূপায়িত হয়। ‘থিয়েটার’ প্রযোজনায় নাট্য-ক্রিয়ার সচল চলচ্ছবি তত মঞ্চস্থ হয় না। তবে ত্রপার অভিনয়ে মাধবীর বাচন-সততায় দর্শক পূরণ করে অনেকটা।

মহাভারতীয় আখ্যানসূত্রে বুদ্ধদেব বসুর তপস্বী ও তরঙ্গিনী লিয়াকত আলী লাকী নির্দেশিত ‘লোক নাট্যদল’ প্রযোজনা। নারীর আত্মপরিচয় অর্জনের সংকটতীব্রতা এই নাট্যভাষ্যে রূপায়িত। প্রযোজনা ও অভিনয়ে দৃশ্যকাব্যটি দর্শকের তারিফ পায়।

‘দেশ নাটক’- এর ‌‘নিত্যপুরাণ’ মহাভারত আখ্যাণের নব ভাষ্য। নাট্যকার-নির্দেশক মাসুম রেজা। নাথবতী অনাথবৎ দ্রৌপদীর অস্তিত্ব- উন্মোচন ঘটে, ট্র্যাজিক প্রতীকপ্রতিম একলব্যের ক্ষিপ্রখর ডায়লগ তূণে; ক্ষমতা-পাণ্ডবও ধরাশায়ী তার আতীব্র নব্য ন্যায়বাচনে। সমর্থ আখ্যানের প্রযোজনাদৌবল্য ঢাকা পড়ে দীলিপ চক্রবর্তীর একলব্য অভিনয়ে। দর্শক-সমালোচক মোহিত এই নাট্যরূপায়ণে।

কাব্যনাট্যত্রয়ী- কর্ণকুন্তী সংবাদ, গান্ধারীর আবেদন আর বিদায় অভিশাপ- মহাভারতের রাবীন্দ্রিক ভাষ্য। নাগরিক নাট্যসম্প্রদায় প্রযোজিত এ নাট্যাবলীর নির্দেশক আতাউর রহমান। নাট্যরূপায়ণ-মান নিয়ে দর্শক হতচকিত, কিংকর্তব্যবিমূঢ়! তবু রবীন্দ্রমঞ্চায়নের নাগরিক  একাগ্রতার স্মারক বটে এ প্রযোজনা। রক্তকরবী তো মিথ-মহাকাব্যের নানা অনুষঙ্গে সভ্যতার নব পাঠ, ব্যাখ্যান, নাট্যভাষ্য; পুনর্ণব নান্দনিক এহেন বাচন সৃজন-মাহাত্ম্যে উচ্চতম মর্যাদায় আসীন। আতাউর রহমান নির্দেশিত এ নাগরিক নাট্যসম্প্রদায় প্রযোজনা মঞ্চ সফল হয়েও নানা প্রশ্নে দর্শক-সমালোচক জিজ্ঞাসামুখর।

মহাভারতস্যূত ক’টি সংস্কৃত নাটক বাংলাদেশের মঞ্চে অভিনীত হয়। ভাস-কৃত ‌‘উরুভঙ্গম’ মঞ্চে এনেছিল সেন্টার ফর এশিয়ান থিয়েটার এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা ও সংগীত বিভাগ। সেন্টার ফর এশিয়ান থিয়েটারের উরুভঙ্গম ও বিক্রমোবর্শী নানা মিশ্ররীতির সমন্বয়ে জমকালো। ইস্রাফিল শাহীন নির্দেশিত নাট্যকলা বিভাগ প্রযোজনা শারীরিক অভিনয়ে তীব্র গতিনাট্য হয়ে ওঠে। মহাকাব্যিক কথন বাচন বরং অধরা রয়ে যায়। ওয়াহীদা মল্লিক জলি নির্দেশিত, বিপ্লব বালা পুনর্বাচিত ভাসের ‌‘মধ্যম ব্যায়োগ’ বিপাশা সোমের ধ্রুপদী ও লোক নৃত্যবিন্যাসে ভিন্ন দৃশ্যমাত্রা অর্জন করে। ভীম, ঘটোৎকচ ও হিড়িম্বারূপী তানিয়া সুলতানা, নাহিদা স্বাতী এবং ফরিদা আকতার লিমা অভিনয়ে মহাকাব্যিক মেজাজ আনে। দর্শক-সমালোচক তাতে মুগ্ধও হয়।

মহাভারতীয় বীর কর্ণ হয়ে ওঠে নবীন দল ‘অবয়ব’ এর কর্ণকথা নাট্যের নায়কপ্রবর-ক্ষমতা রাজনীতির অনিবার্য শিকার। নবীন নাট্যকার-নির্দেশকদ্বয়ের কিশোর-তরুণসুলভ কথন-বাচন ব্যাখ্যানে রূপায়িত এটি। রাগী কিশোরের অস্থির ছটফটানি নাট্যনন্দনে বাদ সাধে। তবু তার ভিন্ন অভিঘাত দৃশ্যশ্রাব্যতা পায়। নাট্যকার তানভীর আহমেদ সিডনী, নির্দেশক জসীম উদ্দিন। চেনা, পরিচিত দর্শকজনের উৎসাহ অর্জন করে কর্ণকথা।

মহাভারতীয় সূত্র ও রাবীন্দ্রিক ভাষ্যের যুগ্মতায় কচ-দেবযানীর শাপগাথা লেখেন গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশান আয়োজিত নাট্যরচনা কর্মশালার শিশিক্ষু নাট্যকার পার্থসারথী। দেবতা-দানবের চিরকালের ক্ষমতা রাজনীতির বলি হয় যে নারী, মানব-মানবী। ‘যারে তুমি নিচে ফেলো সে তোমারে ফেলিবে যে নিচে’- এমত অভিশাপবাণী এ নাটকে শোকদগ্ধা নারীর। প্রচলিত কাব্যভাষায়, পয়ার ছন্দে নাটক সর্বদা বিবিধ বিচিত্র শ্রেণীচরিত্রভাষ হয়ে ওঠে না। তবু এই রচনা তারিফযোগ্য।

মহাকাব্য শাহনামা-কৃত সোহরাব রুস্তমের লোকশ্রুত ট্র্যাজিক আখ্যান একালের ভাষ্যে রাজনৈতিক মাত্রা পায়- ‌‘তীর্থঙ্কর’, নবীনা সামিনা লুৎফা নিত্রার প্রথম নাটক। ক্ষমতার হাতে নারী আর যত বীরপুরুষের দিশেহারা অসহায়তার চিরনাট্য হয়ে ওঠে- কেবল পিতা-পুত্রের একান্ত ট্র্যাজিক পরিণতি নয়। পিতার হাতেই নিহত হয় যে পুত্র, যৌবননাশের এই মানব নিয়তি নাট্যে রূপায়িত। ইতিহাসের ট্র্যাজিক কথকত্রয় বয়ান, দৃশ্যায়ন করে চলে বর্ণনা-সংলাপ-চরিত্র ঘটনার মিশ্র এক নাট্যক্রিয়ায়, ভাষ্যে। অনতিনবীন দলের এই প্রযোজনায় আপ্রাণ এক নাট্যজীবী নির্দেশক ফয়েজ জহির আখ্যানযোগ্য থিয়েটার রূপায়ণ করেন। দর্শক-সমালোচক তারিফ করে এই নাট্য।

বাঙালি জনসমাজে রামায়ণ কাহিনীই ছিল দৈনন্দিন গার্হস্থ্য জীবন-মানস যাপনের বড় অবলম্বন। যদিও আজ তার সেই যৌথতা বিপর্যস্ত। বিশেষ এক ধর্মসাম্প্রদায়িক পরিচয় কেবল রামায়ণ-র। বাবরি মসজিদ পরবর্তী উপমহাদেশে বিদ্বেষের মৌল প্রতীক যেন রাম, রামায়ণ। নাগরিক দর্শক মঞ্চে দেখতে পায় মহাভারত সূত্র থেকে কৃত নাট্যই কেবল। ক্ষমতা-সম্পর্ক আর মানবমনের বিচিত্র জটিলতা তাতে। মহাভারত প্রীতিতে নাগরিকজনের মানস রূপান্তরের এক পরিচয় স্পষ্ট হয়।

ঐতিহাসিক আখ্যান হলেও বিষাদসিন্ধু মহাভারত প্রণোদিত বাংলা মহাকাব্যের চারিত্র্য অর্জন করেছে বুঝি। সৈয়দ জামিল আহমেদের নির্দেশনা, বিপ্লব বালার ভাষ্য বাচনে বিষাদসিন্ধু ঢাকা পদাতিক এবং বাংলাদেশের থিয়েটারের মহাকব্যিক এক দৃশ্য রূপায়ণ হয়ে ওঠে। নবভাষ্য আর দেশি নানা স্বর-সুর নাট্যক্রিয়ার সঙ্গে নানা দেশীয় থিয়েটার মুদ্রায় ভাষ্যে এ নাট্য তার অভিনবত্বে বিহ্বল করে। বিষয়-রীতির অঙ্গাঙ্গি স্ফূর্তি  উত্তীর্ণ সমগ্রতা না পেলেও।

এই হয়তো বাংলাদেশের থিয়েটারে মহাকাব্যস্যূত অভিনয়। ঢাকা থিয়েটারের বনপাংশুল সেলিম আল দীন রচিত, নাসির উদ্দিন ইউসুফ নির্দেশিত। মান্দাই জাতিগোষ্ঠীর মানসে মিথ-পুরাণের ভিন্ন অনার্য বাচন। মঞ্চ রূপায়ণে তাই বর্ণন-কৃত্য-ক্রিয়ায় এক মহাকাব্যিক চারিত্র্য। যেমন তাদের প্রাচ্য নাট্য মনসামঙ্গলের উল্টাপুরাণকল্প দৃশ্যকাব্যে অন্যতর অভিভব জাগায়। প্রাচ্যমানসের এক ভাব-দর্শন নাট্যভাষ্যে রূপায়িত। সেলিম আল দীন তার নবনাট্যাবলীতে এক ধ্রুপদী বাস্তবকে ধরতে চান দেশীয় নানা রীতির এক অভিনব অদ্বৈতে। কাব্য-নাট্য-নৃত্য-বাদ্য-সঙ্গীত ও ইতিহাস-পুরাণ-দর্শনের এক সমগ্রতার সন্ধান করেন। সৃজনচারিত্র্যে তা মহাকাব্যোপম হয়ে ওঠে। যেমন কেরামতমঙ্গল, হাতহদাই। এমত বিস্তার বৈচিত্র্যের আখ্যান তার মতে কেবল-নাট্য-পরিচয়ের ইউরোপীয় মুদ্রায় সংকুচিত- সমগ্রতার ধ্যানে তাই তার এই মহাকাব্যযাত্রা। দেশ-বিদেশের নানা মিথ-পুরাণ-মহাকাব্য সংবদ্ধ সে রূপায়ণের তত্ত্ব নির্ণয় করেন তিনি ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদ’ অভীধায়। বাংলাদেশের থিয়েটার এই আয়োজনে পূর্বতন প্রচলিত ঔপনিবেশিক নাট্যসীমা উত্তীর্ণ হয়ে যায়। - এই অর্জন নিশ্চিতই নান্দনিক বিরাট এক জয়। মহাকাব্য-মানস তার ভিত্তিমূল।

বিড়ম্বিত ইতিহাসের বাস্তব দীর্ঘ কার্যকারণ সূত্রেই দেশি-বিদেশি মহাকাব্যসকলের সঙ্গে বাংলাদেশের থিযেটারের এহেন অসমঞ্জস সম্পর্ক। গ্রীক পুরাণ তবু কবিতায় প্রচল-ব্যবহৃত ত্রিশ পরবর্তী কাল থেকেই। অগ্রসর কবিতা-পাঠক তার তৃপ্ত মুগ্ধ ভোক্তা। আন্তিগোনে, ইডিপাস প্রযোজনা হয়েছে যদিও বাংলাদেশের মঞ্চে তবু তার সঙ্গে দর্শকের সম্পর্ক তত সচ্ছন্দ নয়। বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগসমূহে অধীত বিষয় হিসেবে গ্রীক নাটক এবং সেই সঙ্গে ইলিয়াড, অডিসি ক্রমে অন্তরঙ্গ হয়ে উঠছে। পরীক্ষা প্রযোজনায় দর্শক-সাধারণও দেখছে সে নাটক। নব পরিচয়ের অনভ্যস্ততা নিয়েও। এ সম্পর্কপাত দিনে দিনে ঘনিষ্ট হবে মনে হয়।

যদিও ছোট হয়ে আসা এ বিশ্বে, ভঙ্গুর ক্ষীয়মান একুশ শতকীয় মানস মহাকাব্যের বিচিত্রবীর্য প্রবল বিক্রমের সামনে বামন-লিলিপুট সদৃশ; কম্পিউটারের বিপুল তথ্যভারে ন্যূব্জমুখ নত শিরদাঁড়ায় তাই বুঝি সৃজন সামর্থ্যে পুনর্ণব নন্দন-রূপায়ণের স্ফূর্তিতে পারঙ্গম হতে পারছে না। তাই বুঝি মুক্তিযুদ্ধ ও তৎপরবর্তী সমূহ বিপর্যয়ক্রম নাট্যে ধারণের মহাকাব্যিক সৃজন-পরাক্রম অনায়াত্ত তার। ক্ষমতা আর বাজারের বিশ্বজোড়া বিপণন ঘোরে, যুদ্ধস্ত্রস্ত আতঙ্কে ক্রমজরায়মান সে। মানবস্পৃহার উৎস বন্ধ্যা নপুংশকতায় উত্থানরহিত। আদি মানস-ভাণ্ডার মহাকাব্যসকল আজ যেন দুর্গম দুর্লঙ্ঘ পর্বত বিশেষ পঙ্গু প্রতিবন্ধী খঞ্জের সমীপে।  

ড. বিপ্লব বালা : নাট্যজন, শিক্ষক ও সমালোচক।