Full premium theme for CMS
থিয়েটার গেইমস্ : অভিনয় প্রশিক্ষণে নতুন ভাবনা [পঞ্চম কিস্তি]
Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..
অনুবাদ: অসিত কুমার
শারীরিক বিপর্যয় রোধে বীমা পলিসি
প্রায় প্রত্যেক মানুষই কোনো না কোনোভাবে নিজের দেহ সম্পর্কে সচেতন। এবং এর জটিলসব কারণও আছে। আমরা মনের চোখে নিজেদের একটা ছবি দাঁড় করাই। এই শরীর-চিত্রকল্পটি তৈরি হয় নিজের অক্ষমতা বা অপ্রতুলতা সম্পর্কে কড়া আত্মসমালোচনামূলক দৃষ্টি দিয়ে। এক্ষেত্রে আমাদের ইতিবাচক দিকগুলো কোনো বাহবা পায় না বললেই চলে। মহড়ায় এবং মহড়ার বাইরে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতিতেও বিশেষ বিশেষ শারীরিক ক্রিয়া সম্পাদনে আমরা অস্বীকৃতি জানাই। আমাদের জোর বিশ্বাস জাগে যে ‘আমার পক্ষে ওটা অসম্ভব’। এর কারণ খুঁজলে ব্যর্থতার একটা ইতিহাস ধরা পড়ে। হতে পারে যে, ‘পড়ে যাবেতো/ব্যথা পাবেতো’ অনবরত বড়দের এই জাতীয় সাবধানবাণী শিশু হিসেবে আমাদের ভিতর আড়ষ্টতা বা সংবাধ সৃষ্টি করেছে যার ফলে আমাদের অবচেতনে পরিণাম-ভীতি দানা বেঁধেছে। কখনো আবার, ‘একটা সময় ছিল যখন এসব পারতাম’, কিন্তু এখন আর চর্চা নেই - এরকম একটা আত্ম-চিত্রকল্প আমাদের দিয়ে বলিয়ে নেয় যে, ‘এখন আর পারবো না।’ অর্থাৎ অসফলতার ছবিটা মনে গাঁথাই থাকে। এমনকি যে-সব শিক্ষানবিশ প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে সেই সব শারীরিক দক্ষতা পুনরুদ্ধারে আগ্রহী, তারাও রণে ভঙ্গ দিতে পারে যদি সমস্যা সমাধানের পথ না দেখিয়ে শুরুতেই থিয়েটারী খেলায় বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এই অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করেই আমি আমার প্রশিক্ষণ পদ্ধতি নির্মাণ করেছি। আমি দেখেছি অনেকেই প্রশিক্ষণের সুযোগ পেতে অপেক্ষা করে যদি-না শুরুতেই তাদের ভড়কে দেয়া হয়।
সমস্যার মূলটা হচ্ছে এখানেই যে, নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতাসমূহের কারণে আমরা নিজের যে-কটু ভাবমূর্তি গড়ি তার পাশাপাশি ক্রিয়াশীল থাকে আরেকটি রূপ; দ্বিতীয় এই রূপটি আমরা তৈরি করি আমরা যেমনটা ‘হতে চাই’ তার চূড়ান্ত কাল্পনিক আদর্শ দিয়ে। সেকারণে তরুণ শিক্ষানবিশদের ক্ষেত্রে বিশেষ করে প্রথমেই যা করণীয় তা হলো তাদেরকে এটা বোঝানো যে তাদের শরীর আদৌ প্রতিবন্ধক নয় বরং যা আছে তা নিয়েই কাজ শুরু করা যায়; তাদের শরীর কোনো অনতিক্রমনীয় পর্বত নয়, বড়জোর সেটা একটা অনাবিস্কৃত দেশ; শরীর নিস্ফলা জমিন নয় বরং অবারিত সম্পদের অখননকৃত খনি। প্রাথমিক পর্যায়ে, তারা ‘কী পারে না’ সেটাকে বড় করে না তুলে বরং দেখাতে হবে তারা ‘কী কী পারে’ (এবং থিয়েটারক্রীড়ার যৌক্তিকতা এখানেই)। সাথে সাথে, ইন্দ্রিয় উপলব্ধির মধ্য দিয়ে বোঝানো দরকার তাদের নিজ নিজ শরীর কী-কী-ভাবে কাজ করে। মাধ্যাকর্ষ বলের প্রভাবে শরীরে যে চাপ তৈরি হয় তা দূর করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত অনুশীলনগুলো প্রশিক্ষণস্থলে ‘দেখিয়ে দেয়া’ হয়; কিন্তু, সচেতন প্রয়াসজাত আড়ষ্টতা ভাঙার জন্য যে শরীরচর্চা প্রয়োজন সেগুলো প্রথমে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের দিয়ে শিক্ষাণবিশকে ‘করিয়ে দেয়া’ হয়।
মালিশ-মর্দন
প্রশিক্ষণার্থীরা জোড়ায় জোড়ায় ভাগ হবে। প্রতি জোড়ার একজন মেঝেতে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়বে এবং শরীরকে একশোভাগ শিথিল করার জন্য মেরুদণ্ড সোজা রাখবে। পিঠের খাদ মাটিতে মিশে থাকবে। ঘাড়ের পেশিতে যাতে খিল না ধরে সেজন্য মাথার ভারসাম্য নিশ্চিত করতে হবে। দুই কাঁধ দুই পাশে এলিয়ে দিতে হবে। নিতম্বসন্ধি আরামে রাখতে হবে যাতে দুই পায়ের পাতা বাইরের দিকে হেলে পড়ে। তবে, পিঠের ঢাল মাটি থেকে আলগা না করে যারা দুই পায়ের পাতা ছেড়ে দিতে পারে না তাদের ক্ষেত্রে প্রথম দিকে হাঁটু ভাজ করে পায়ের পাতা মেঝের সাথে লাগিয়ে রেখে কাজটা করতে দেয়া যেতে পারে। একজন এই অবস্থানে আসার পর অপরজনের কাজ হলো সঙ্গীর শরীরের অস্থিসন্ধি ও পেশিগুলোকে ধীরে ধীরে আলতোভাবে মালিশ করে শিথিল করে দেয়া। অস্থিসন্ধিগুলোকে যতদিকে যতটুকু সম্ভব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সঞ্চালন করতে হয়। বিভিন্ন অঙ্গ ও হাড়ের সংযোগস্থলে মৃদু ঝাঁকুনি দিতে হবে।
২৩ নম্বর ছবির মতো করে দুই হাত হাঁটুর নিচ দিয়ে নিয়ে গিয়ে মেরুদণ্ড হাল্কাভাবে উপর-নিচে উঠিয়ে নামিয়ে প্রত্যেকটি কশেরুকা একে একে ঝাঁকিয়ে দেয়া হয়। প্রত্যেক কশেরুকার ঝাঁকুনির সময় তার ঠিক উপরের কশেরুকাটি কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করে। এইভাবে একের পর এক কশেরুকার কাজ শেষ হলে আবার উল্টো দিক থেকে মেরুদণ্ডের ঝাঁকুনি শুরু করা যায়। সেক্ষেত্রে শুয়ে থাকা ব্যক্তির পায়ের প্রান্ত থেকে সরে মাথার দিকে এসে তার বগলের নিচ দিয়ে হাত-বাহু গলিয়ে দিয়ে কাজটি করতে হয়। লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন তার মাথা যেন মাটি ঠুকে আঘাত না পায়। তবে সম্পূর্ণ ক্রিয়াটিকে পর্বে ভাগ করে নিলে সেরা ফলটা পাওয়া যায়। যেমন, পায়ের আঙুল থেকে ধাপে ধাপে কটি পর্যন্ত যাওয়া; হাতের আঙুল থেকে কাঁধের দিকে অগ্রসর হওয়া; পরে মাথা ও ঘাড় এবং সবশেষে মেরুদণ্ড। চিৎ হয়ে শুয়ে থাকা নিষ্ক্রিয়জন এবার উপুড় হয়ে শোবে এবং সক্রিয়জন তার পিঠের পেশি মালিশ করে করে সুপ্ত চাপগুলোকে অসার করতে করতে অপসারণ করে ফেলবে। এই অনুশীলনের ধারায় শরীরকে সম্পূর্ণ নিথর রেখে শরীরের প্রতিটি অংশে যে-সব ইন্দ্রিয় অনুভূতি সঞ্চার হবার কথা সেগুলো সম্পর্কে সজাগ হতে হবে। পেশি-আন্দোলন চলাকালে তাকে কখনো কখনো বলা হবে আত্ম-সচেতন না হয়ে মুখ দিয়ে শব্দ করতে; কোনোরূপ অষ্ফুট ধ্বনিও যদি না বেরিয়ে আসে তাহলে বুকের খাঁচায় সামনে পেছনে এবং পিঠের উর্ধ্বাংশে দুইপাশের পাখনায় হাতের তালু দিয়ে আলতো করে ছন্দে ছন্দে বাদ্য বাজাতে হবে। সাবধান, শিরদাঁড়ায় কখনোই আঘাত করা যাবে না। পরবর্তীসময়ে তাকে দাঁড় করিয়েও বাদ্য-মালিশ চলতে পারে। এরপরে হবে পালাবদল। পুরো প্রক্রিয়াটি বেশ দীর্ঘ। কখনো কখনো একেক জনের জন্য এক ঘন্টারও বেশি সময় লাগতে পারে। তাই বলে এ নিয়ে তাড়াহুড়া করা উচিত নয়।
আরাম-অন্তরণ-পৃথকিকরণ
একেবারে একই রকম অবস্থায় দলকে বলা হয় তাদের শরীরের বিভিন্ন অংশে অনুভূত চাপসমূহকে তরল পদার্থরূপে কল্পনা করতে; বলা হয় যে, এই তরল পদার্থকে নালাপথে নির্গমণ করা সম্ভব। পর্বটি জমিয়ে তুলবার পর কথায় কথায় আবিষ্ট করে পায়ের আঙুল থেকে পায়ের পাতা দিয়ে গোড়ালি হয়ে পা পর্যন্ত বিস্তৃত নালাপথে তরল পদার্থবৎ চাপ প্রবাহিত করে আনা হয় পা পর্যন্ত। এতে শরীরের নিম্নাংশের পেশিসমূহ ভারী হয়ে ওঠে, স্থুলতা আক্রান্ত হয় এবং অস্থিসন্ধি নি®প্রাণ হয়ে পড়ে। চাপপ্রবাহ ধীরে ধীরে নিম্নাংশ থেকে নিতম্ব হয়ে উর্ধ্বাংশের দিকে উঠে এসে কটিদেশে অবস্থান করে। একইভাবে হাতের আঙুল থেকে হাত-বাহু-কাঁধ হয়ে চাপ প্রবাহ এসে জমা হয় দুই বাহুপেশির মধ্যবর্তী স্থানে। এরপর মাথা ও চিবুক-পেশির চাপ নির্গমণ করা হয় ঘাড় হয়ে বাহুপেশির সংযোগস্থলের দিকে। এখানে জমা হওয়া সকল চাপ প্রবাহিত হয় বুক-পাকস্থলী-পিঠ হয়ে মিলিত হয় কটিদেশে ইতোপূর্বে জমা হওয়া তরলীকৃত চাপের সাথে। এই অবস্থায় উন্নীত হবার পর উর্ধ্ব ও নিম্নাংশের মিলিত চাপ শরীর থেকে মেঝের দিকে উদ্গীরণ করে দেয়া হয় পিঠের তলায় কল্পিত একটি ছিদ্র পথে। এই প্রক্রিয়ায় সময় নেয়া এবং শরীরের কোনো কোনো জায়গা থেকে চাপ নির্গমণ করা হচ্ছে তা যতটুকু সম্ভব সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা অত্যন্ত জরুরি। যিনি প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করছেন তার কণ্ঠস্বর এবং কথার ছন্দ প্রক্রিয়াটির সহজ ও মসৃণ পরিসমাপ্তিতে সহায়ক। কন্ঠস্বরের মান যখন যথোপযুক্ত হয় তখন পরিচালক নিজেও যে কতটা হাল্কা বোধ করেন তা বিস্ময়কর। বাক্ ও চিন্তার সম্মিলনে যে-ভৌতশক্তি সৃষ্টি হয় তা অবাক করার মতো।
উপর্যুক্ত অনুশীলনের পরবর্তী ধাপ হিসেবে দলটিকে বলা যেতে পারে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ আলাদা আলাদাভাবে আন্দোলিত করতে। যেমন, ডান হাতের কনে আঙ্গুল (কথার কথা) নাড়ানো থেকে শুরু করে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য অঙ্গসঞ্চালনের বিচিত্র অনুশীলন। এবং এ ক্ষেত্রেও পরিচালক সমগ্র কাজটিকে পর্বে ভাগ করে নিবেন। এটা করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। অভিনেতাকে যখন বলা হয় বিভিন্ন ধরনের সঞ্চালন উদ্ভাবন করে নিজে নিজে অনুশীলন করতে তখন পুরো প্রক্রিয়াটি স্থবির হয়ে যায়; নিরেট ও অখণ্ড আত্ম-চিত্রকল্পটি ভেসে ওঠে নিশ্চলতা সৃষ্টি করে। বেশ কিছুদিন ধরে অন্যসব অঙ্গ নিষ্ক্রিয় করে বিচ্ছিন্নভাবে একটি অঙ্গকে সঞ্চালন করার অনুশীলন করলে তবেই সম্ভব তাকে নিজের মত করে কাজ করতে দেয়া। নির্দিষ্ট যে-অঙ্গটির অনুশীলন করা হবে আর সব অঙ্গ থেকে সেই অঙ্গটির পৃথকিরণই কৌশলগত শরীরচর্চার সমস্যার জায়গা। মাথা না দুলিয়ে এবং পিঠ বাঁকা না করে হাঁটু আনত করা শিক্ষানবিশের জন্য অসম্ভব না হলেও প্রায়শ অত্যন্ত দুরূহ হয়ে উঠে। অবিভাজ্য বা নিরেট আত্ম-চিত্রকল্পটি মনে ভেসে ওঠে বলে শরীরের চেনা-জানা যে-চাপগুলো সে দূর করার চেষ্টা করছে সেগুলোই আরো বেশি করে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে।
অবসরে অঙ্গ-পৃথকীকরণের অনুশীলন নিজে নিজে করা সম্ভব হলেও আমি মনে করি সেটা আরো পরের ধাপের কাজ। প্রারম্ভিক পর্যায়ে, দলীয় অনুশীলন চলাকালে দলনেতা ঘুরে ঘুরে সবাইকে পর্যবেক্ষণ করবেন এবং দেহের অবস্থানগত বিচ্যুতি সংশোধন করে সমন্বয় ও ঐক্য সাধন নিশ্চিত করবেন। কাজের উচ্চতর পর্যায়ে উন্নীত হলে পর, অভিনেতাকে বলা হয় ‘কাজটি করে ফেলবার আগে করার কথা ভাবো’। তার মানে এই নয় যে, তাকে অঙ্গ সঞ্চলনের ‘সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণ’ করতে বলা হচ্ছে বা যেটা সে করতে যাচ্ছে সেটা না ভেবে ‘সেটা সম্পর্কে’ ভাবতে অনুপ্রাণীত করা হচ্ছে। বরং বলা হচ্ছে সে যা যা করবে তার পারম্পর্য সম্পর্কে সজাগ করে তোলার কথা। কাজটা যখন ঠিক শুরু হবে তখনই স্বাভাবিক গতিনন্দনবোধ নিষ্ক্রিয় করে দেয়া হয়। ভারমুক্তির আগে নির্দিষ্টকৃত অঙ্গটির সঞ্চালন ঠিক কতবার তাকে থামাতে হবে তা আগে থেকেই নির্ধারণ করে না দিলে অভিনেতার সচেতন মনো-প্রক্রিয়াদি সক্রিয় হয়ে উঠে পুরো ব্যাপারটিকে মাটি করে দিবে।
এই অনুশীলনে অভিনেতার করণীয়কে পেশিগুচ্ছের পরিভাষায় বয়ান করলে কখনো কখনো বুঝতে অসুবিধা হয় বিধায় অস্থিসন্ধি দিয়ে বোঝানোই শ্রেয়।
এই অনুশীলনের পরিসমাপ্তির পর অভিনেতা যতক্ষণ না অনুভব করে যে সে উঠে বসতে পারবে ততোক্ষণ পর্যন্ত তাকে উঠবার তাড়া দেবার দরকার নেই। যদি মনে হয় অভিনেতা শরীর-চিন্তন অনুভবের স্তরে পৌঁছে গেছে তাহলে তাকে উঠে দাঁড়ানোর কাজটা ধাপে ধাপে করবার পরামর্শ দেয়া হয়। দাঁড়িয়ে পড়বার প্রথম ধাপে উঠে বসতে হবে হাতল ছাড়া একটা চেয়ারে দুই পাশে পা ছড়িয়ে দিয়ে; উরুসন্ধি শিথিল করতে হবে যাতে করে দুই পা বাইরের দিকে সর্বোচ্চ প্রসারিত হতে পারে। এই বসাটা ঠিক চেয়ারের ‘উপর’ বসা নয়; এটা অনেকটা চেয়ারের পিঠে বসার মত; নিতম্বকে চেয়ারের পিঠ দিয়ে গড়িয়ে আসনে নামাতে হবে কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে পেলভিস যেন তার নিচে ঢালু না হয়ে পড়ে। অর্থাৎ এই অবস্থায় পেলভিসের শীর্ষ-বিন্দু-লাগোয়া কশেরুকাটি ভর করবে চেয়ারের পিঠের উপর, আসনের উপর নয়; ফলে শিড়দাঁড়া অনাকাঙ্খিতভাবে বক্র না হয়ে একই বিন্দুতে ভারসাম্য লাভ করবে। দুই পা ছড়িয়ে দেবার কারণে হাঁটু থেকে গোড়ালীসন্ধি পর্যন্ত রেখাটি উল্লম্বতা পায়, দুই কাঁধ পেছন দিকে হেলে পড়ে যার পরিণতিতে দুই বাহু কোমরের পাশ দিয়ে ঝুলে পড়ে। এই আসনে স্থিত হবার পর অভিনেতাকে দাঁড়াতে বলা হয়। দাঁড়াতে গিয়ে যে-অনুভূতি হয় তা অভিনেতাকে সংরক্ষণ করতে বলা হয়।
এইভাবে নিয়মিত কাজ করে গেলে আমি নিশ্চিত যে একজন অভিনেতার চলন এবং শরীরের উপর নিয়ন্ত্রণ অনেকাংশে বেড়ে যায়। এর জন্য চাই অনেক সময়। অথচ সময় আমাদের বরাবরই কম। দীর্ঘ মেয়াদী প্রক্রিয়া হিসেবে অভিনেতার প্রশিক্ষণের এটাই সঠিক পথ। কিন্তু সচরাচর টানা একটা কিছু করার মত সময় আমাদের হয় না। আর তাই বাধ্য হয়ে সহজপথ খোঁজা। সে যাই হোক, যথেষ্ট সময় মিললে তবেই উপরের অনুশীলন করতে হবে।
আবেগ নিয়ন্ত্রণে অক্ষমতার ভয় ও তার বিপরীতে বীমা
অভিনেতা স্বভাবতই তার সকল গোপনীয়তা নিয়ে জনসমক্ষে হাজির একজন ব্যক্তি। ফলে কোনো না কোনো ধরনের সংবাধ/সংস্কার দেখা দিলে একজন অভিনেতার প্রকাশ ক্ষমতা উধাও হয়ে যায়। এও মানতে হবে যে অভিনেতা একজন অনুভূতিসম্পন্ন ও চিন্তাশীল মানব এবং তার বিবেকের পরিধি আর সব মানুষের মতই। এমন কিছু কাজ আছে যেগুলো আমি মঞ্চে করবো না। সেটা এজন্য নয় যে আমার সংবাধ আছে বরং এজন্য যে আমার কিছু ব্যক্তিগত ও সামাজিক মূল্যবোধ আছে যাতে আঘাত লাগতে পারে। ব্যক্তিগত সততার কারণে আমি কিছু কিছু কাজে অংশগ্রহণ করি না। আশা করি আমাকে কখনো এমন কোনো নাটকে কাজ করতে বলা হবে না যা গণহত্যাকে উৎসাহিত করে; আর যদি বলা হয়ও তাহলে আমি তা প্রত্যাখ্যান করবো।
আবার কখনো অভিনেতা মানব আচরণের এমন কোনো ক্ষেত্রে বিচরণ করতে অস্বীকার করে যা তার ব্যক্তিগত ইতিহাস নির্মাণের কোনো না কোনো এক ধাপে বিপজ্জনক হয়ে দেখা দিয়েছিলো। যে-সব নাটক মানবিক আবেগ ও দায়বদ্ধতার সর্বোচ্চ ব্যাপ্তি দাবি করে সেখানে অভিনেতৃকে আমার প্রায়শ বলা লাগে- ‘এই নাটকের এই পরিস্থিতিতে এই চরিত্রটির সীমা দূরে থাক নিজের ক্ষেত্রে তুমি নির্মমতা, যৌনতা বা বিকৃতির চূড়ান্ত সীমা অতিক্রম করেছ তা আমি বিশ্বাস করি না”। প্রতিবাদী নাটকের কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় এই ধরনের সংবাধ নিরসনের প্রয়োজন পড়ে। অহিংস নীতির পক্ষে দায়বদ্ধতা নিয়ে কেউ যখন সমসাময়িক হিংসার চিত্র নাটকে দেখাতে চায় তখনও একই রকম সমস্যা হয়। অহিংস মানস সহিংসতার চরিত্রায়ন করতে গিয়ে সংবাধের কবলে পড়ে এবং মনের বাধা শেষ পর্যন্ত কাজের পথে বাধায় পরিণত হয়ে কাজটাকে আর হতে দেয় না।
অনেক সময় নাট্যদলগুলোর মধ্যে একটা অলিখিত বোঝাপড়া তৈরি হয়ে যায় এই মর্মে যে তারা মানবিক মিথস্ক্রিয়ার বিশেষ কোনো দিক অপরাপর অভিনেতাদের সঙ্গে কাজের ক্ষেত্রে পরিহার করবে। আমাদের সবাইকেই এমন অনেক অভিনেতার সাথে কাজ করতে হয় যাদের আমরা ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করি না বা যাদের প্রতি কোনো না কোনো রকম তীব্র বিদ্বেষ রয়েছে। তা সত্ত্বেও অলিখিত সেই বোঝাপড়া একটা পরোক্ষ সহনশীলতার দিকে মোড় নেয় যা ব্যক্তি- সম্পর্কের পর্যায় থেকে মহড়া পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়ে মঞ্চে উপনীত হয়।
যেভাবেই হোক না কেন, আমাদের সমাজ শারীরিক ও মানসিকভাবে সংবাধগ্রস্থ। যে-জগতে আমরা বাস করি তার প্রভাবে আমাদের মধ্যে আদান-প্রদান, যোগাযোগ এবং বিশেষ করে স্পর্শের ব্যাপারে নানা রকম সংস্কার-প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। স্পর্শ চিকিৎসার মতো ভাবনাগুলোর উন্মেষ তো একটা ব্যাপক সামাজিক ও ব্যক্তিগত প্রয়োজনের উপলব্ধিরই সাক্ষাৎ প্রমাণ। দ্রুত চাপমুক্তির বেশ কয়েকটি ব্যয়াম ও খেলা রয়েছে যেগুলো আমি প্রয়োগ করি খুব অল্প সময়ে কোনো দলের আড়ষ্টতার বরফ ভাঙতে হলে এবং তাদের নিজেদের মধ্যকার প্রাচীরগুলোকে অতিক্রমযোগ্য উচ্চতায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যে। তবে এটাও পরিস্কার করা জরুরি যে এতে প্রাচীরগুলো ভাঙে কেবল, কোনো বন্ধন তৈরি হয় না। সম্পর্ক গড়ে তুলবার প্রক্রিয়াটি প্রায়শ ধীর এবং কঠিনতর হয়ে উঠে।
বছর কয়েক আগে কয়েকটি নিরীক্ষাধর্মী নাট্যদলের কাজ দেখার সময় জবরদস্তি করে সংবাধ দূর করার ভয়বহতা সম্পর্কে আমি বিশেষভাবে সজাগ হয়ে উঠি। দেখলাম ওরা নিজেদের সাথে দর্শকের এবং দর্শক স্বাতন্ত্রের সাথে দর্শক স্বাতন্ত্রের আড়ষ্টতার প্রাচীর ভাঙার চেষ্টা করছে। বেশিরভাগ দলগুলোই যে-সব কৌশল অবলম্বন করেছিল তার মধ্যে ছিল উচ্চস্বরে গীত-বাদ্যের তালে তালে একটা উত্তঙ্গ পরিস্থিতি সৃষ্টি করার পর দর্শকদের আমন্ত্রণ জানানো অভিনেতাদের সাথে যোগ দিয়ে পরস্পর আলিঙ্গনে, বস্ত্র ত্যাগে এবং ভালোবাসাবাসির খেলায় মেতে উঠতে। তাদের প্রথম লক্ষ্য অর্জন তুলনামূলকভাবে সহজ। কিন্তু ভালোবাসাতো অন্য কিছু। মানুষকে পরস্পরের কাছাকাছি এনে নৈকট্য সৃষ্টি করা একটি দুরূহ কাজ। আমার যে- ছাত্ররা ঐ আয়োজনে যোগ দিয়েছিল তাদের অন্তত তিনজনের মধ্যে মানসিক বিপর্যয় ও বিচ্ছিন্নতাবোধের লক্ষণ দেখা গিয়েছিল। আড়ষ্টতা ভেঙে গেলে পর তাদের জন্য নতুন কোনোরকম নির্ভরতা ও আস্থার কাঠামো গড়ে উঠে নি যার মাঝে তারা সংহত বোধ করতে পারে। এই কাঠামোটা দেবার কথা সংশ্লিষ্ট দলটির।
অন্য কারো সাথে পরিপক্ক সম্পর্ক গড়া তখনই সম্ভব যখন একজন ব্যক্তি সুরক্ষার জন্য অন্যকে আঁকড়ে না ধরে থেকে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাস নিয়ে নিজের জমিনে শক্ত হয়ে দাঁড়াতে পারে। পরিপক্ক হওয়া মানে বিচিত্র আহ্বানে উন্মুক্ত থাকা; সকল সম্পর্কের পরোক্ষে দেয়া-নেয়ার যে-প্রবাহ তাতে পূর্ণ সাড়া দিতে জানা; না অবরুদ্ধ করে না আত্ম-সচেতনতা বা স্বকীয়তা বিলিয়ে দিয়ে নিজের প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারা।
অন্যদিকে বয়ঃসন্ধি হচ্ছে এমন একটা পর্যায় যেখানে আমরা কাঁপিয়ে দেয়া অনেক বয়োসত্তীর্ণ পরিস্থিতির মুখোমুখি হই যেগুলো অনবরত জানিয়ে দিতে থাকে যে অনভিজ্ঞতার কারণে আমরা মানিয়ে নিতে অপারগ। এই অবস্থার বড় বৈশিষ্ট্য আত্ম-সচেতনতা যা নিজের সম্পর্কে আমাদের ছিদ্রান্বেষী করে তোলে। আমাদের মুখমণ্ডলে যদি কোনো দাগ থাকে তাহলে আমরা ভাবি সবাই বুঝি সেটার দিকেই তাকিয়ে আছে। নিজেদের প্রকৃত আচরণ-ভঙ্গি এবং যে আচরণ-ভঙ্গি দিয়ে সবাইকে মুগ্ধ করা যায় বলে কল্পনা করি এই দুইয়ের মাঝের ব্যবধান আমাদের কষ্ট দেয়। আমরা প্রকৃতপক্ষে যা, তার চেয়ে ভিন্ন কিছু হতে চাই এবং এই ভিন্নতাকে উত্তোরণ হিসেবে গণ্য না করে নিছক ভিন্নতা বলেই দেখি। এর আগে কুটিল দৃষ্টিতে গড়া নিজের আত্ম-চিত্রকল্প বলতে যা বুঝিয়েছি সেটা তৈরি হয় এই সময়েই। পরিস্থিতির শ্বাস এবং কষ্টের কারণটা হচ্ছে আদর্শ, অবাস্তবায়নযোগ্য সম্ভাবনা এবং অনুসরনীয় পন্থা- এই দুয়ের মাঝে ফারাক। তরুণ অভিনেতাদের নিয়ে প্রশিক্ষণের প্রারম্ভিক পর্যায়ের অন্যতম কাজ হচ্ছে তাদের বুঝিয়ে শুনিয়ে নিজের ব্যক্তিত্বকে গ্রহণ করিয়ে নেয়া এবং এও বোঝানো যে বর্তমান অবস্থায় তারা উন্নতির প্রথম ধাপে আছে যা থেকে আরো অনেক দূর বিকশিত হওয়া সম্ভব। কিন্তু অত সহজেই তারা সেটা মেনে নেবে মনে করলে সেটা হবে কল্পলোকে বসবাসের সামিল। বরং ধীর পর্যায়ক্রমিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই প্রকৃত শিক্ষা আসে। অভিনেতা অভীষ্টের কথা না ভেবে পন্থার দিকে মন দেবার আগ পর্যন্ত প্রাথমিক পর্যায়টির মধ্য দিয়ে সতর্কতার সাথে অগ্রসর হওয়া জরুরি। এই পর্যায়ে এমন একটি কাঠামো দাঁড় করানো প্রয়োজন যা একই সঙ্গে অভিনেতাকে তার নিজের ভিতরকার বাধাগুলোকে চিহ্নিত করতে সাহায্য করবে এবং নিজের ব্যক্তিত্বের অবদমিত দিকগুলোকে আবিস্কার করার মত আস্থাশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে তাকে আস্বস্ত করবে এবং সর্বোপরি দলের সদস্যদের মাঝে এমন একটা বান্ধব-বেষ্টনি তৈরি করবে যা তাকে ঝুঁকি নেবার জন্য নিরাপত্তা দেবে।
কাজটা এই নয় যে অভিনেতার অনুভূতি এবং আকাঙ্খাগুলোর একটা জোয়ার সৃষ্টি করতে হবে। বরং সেগুলোকে ক্রীড়া পরিমণ্ডলের সুকৌশল নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বদ্ধ দশা থেকে অবমুক্ত করতে হবে। ইতোপূর্বে বর্ণিত মালিশ ক্রিয়ায় অভিনেতা ব্যক্তিগত শারীরিক স্পর্শের অনুভূতি লাভ করে। এটা প্রায়শ তার যৌন সংবাধের মুক্তি ঘটায়। আমার নিজের বেলায় প্রথম যখন ব্যাপারটা হলো, কাজের অংশ নয় মনে করে আমি সেটা অবদমন করে গেলাম। পরিণামে অনুশীলনটা চালিয়ে যাওয়া আমার পক্ষে দুরূহ হয়ে পড়লো; সজ্ঞানে যৌন জাগরণের বিপরীতে যেন এক ধরনের বীমা পলিসি গ্রহণ করে নিজেকে সংযত করে রাখলাম। কাজটা বিধিনিষেধের বাধার মুখে পড়লো। কেউ যদি মেনে নিতে পারে যে ঐ অনুশীলনটির মধ্য দিয়ে অস্বস্তিকর অনুভূতিগুলোকে দূর করা যায় এবং পাশাপাশি সজ্ঞানে নিজেকে অবদমিত করা থেকে সে যদি বিরত থাকে তাহলে নিজের সহজতা ও নিয়ন্ত্রণে নিজেই অবাক হয়ে যাবার মত উন্নতি লক্ষ্য করবে। আমি নিজে কখনোই যেহেতু তাকে যৌন হয়রানির মধ্যে ফেলবো না, তাহলে তার কেন ভীত হওয়া? যেসব আবেগের বিপর্যয়ের কথা ভেবে বীমা সুরক্ষা নেয়া হয় সুগুলো স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে সঞ্চারিত হয় না, নাট্য পরিসরে তো নয়ই। ভয়ের সূত্রপাত তখনই হয় যখন কেউ কল্পনা করতে থাকে নিয়ন্ত্রণ হারালে কী-হবে। সেটা মানা যায় বাইরের জগতে যেখানে বাস্তব ক্রিয়ার সাথে বাস্তব পরিণতির সূত্রযোগ থাকে। কিন্তু নাট্য-পরিসর নিরাপদ। বরং থিয়েটার ক্রীড়ায় আবেগ নিঃস্বরণের মধ্য দিয়ে যে নিয়ন্ত্রণক্ষমতা অর্জিত হয় তা এমন একটা আত্মবিশ্বাস দেয় যা বয়ে নিয়ে যাওয়া যায় বাইরের জগতের বাস্তব পরিসরে। থিয়েটার ক্রীড়ার গুরুত্ব এখানেই যে সে শিক্ষা ও ব্যক্তিত্ব অর্জনের মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে ।
ভাঙন
একটি প্রশিক্ষণ বলয়কে ভাঙবার প্রথম পর্যায়গুলো খুবই সহজ অথচ কখনো কখনো ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। সেটা নির্ভর করে ‘হল্লা-বিল্লা’র উপর। কাজের পরিসরটা প্রথম পর্যায়ে নির্ভেজাল দৈহিক। এর সাথে আত্ম-চিত্রকল্পের সংশ্লেষের কারণে ব্যক্তিত্বের জটিল অনেক দিকে টান পড়লেও দলের পরিসরে নিরাপদ বোধ করার আগে সেগুলো সরাসরি উন্মোচিত হয় না। এর আগের সব ক্রীড়া উপাদানগুলোই এই প্রক্রিয়ায় অবদান রাখে। তবে বেশ কয়েকটি খেলা আছে যেগুলোর মূল উপলক্ষ্যই হচ্ছে ভাঙন।
মারো ঠেলা হেইও / গুড়ি গড়ানো
খেলোয়াড়রা লম্বা হয়ে গায়ে গা লাগিয়ে মাটিতে শুয়ে প’ড়ে পরস্পরকে পর্যায়ক্রমে মাথা দিয়ে মাথায় এবং পা দিয়ে পায়ে স্পর্শ করে। এরপর এক প্রান্তের প্রথম খেলোয়াড় তার পাশের জনের উপর দিয়ে গড়িয়ে উঠে পর পর শায়িত শরীরগুলোর উপর দিয়ে গড়াতে গড়াতে শেষ জনের পর মাটিতে পড়বে। এইভাবে প্রত্যেকে যখন প্রত্যেকের উপর দিয়ে গড়াতে থাকবে মনে হবে যেন একটা প্রকাণ্ড ক্যাটারপিলার ছুটছে।
স্রোতের তোড়ে ভেলা দখল
এটা মূলত শিশুদের দখল-সংগ্রামের খেলা। চক দিয়ে মেঝেতে ধারাবাহিকভাবে কয়েকটি চতুর্ভূজ আঁকা হয়। সব খেলোয়াড় গিয়ে ভীড় করে একটি চতুর্ভূজে। ‘চলো’ বলতেই শুরু হয়ে যায় সবার মধ্যে ধাক্কাধাক্কি যতক্ষণ না শেষ পর্যন্ত একজন টিকে থাকে। যাদের শরীরের কোনো না কোনো অংশ ঘরের বাইরে স্পর্শ করবে তারা বেরিয়ে গিয়ে হাঙর হবে। হাঙর হয়ে তারা ঘরে টিকে থাকাদের শরীরের যে অংশ ঘরের বাইরে পড়বে সে অংশ খপ করে ধরে ফেলবে। এইভাবে সব বেরিয়ে গিয়ে যখন কেবল একজন অবশিষ্ট থাকবে, তখন বাকিরা হয় চলে যাবে অন্য একটি চতুর্ভূজে অথবা একই বৃত্তে খেলাটির পুনরাবৃত্তি ঘটাবে। এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতার একমাত্র সফল উপায় হচ্ছে মেঝেতে পড়ে গিয়ে রগরানো একদলা মাংসপিণ্ডের অংশ হয়ে যাওয়া। উচ্চতর ভরকেন্দ্র নিয়ে দাঁড়ানো অবস্থায় টিকে থাকার সম্ভাবনা কম। ভাল কথা, এই খেলায় জুতা, আংটি, ঘড়ি বা চশমা পড়া যাবে না।
প্লেগ
এটা সর্বজন ব্যবহৃত একটি খেলা যা লিভিং থিয়েটার তাদের নাট্য প্রযোজনাতেও ব্যবহার করেছে। আগের তিনটি খেলার চেয়ে উচ্চতর পর্যায়ে পড়ে বলে প্রশিক্ষণার্থীরা একসাথে কিছুদিন কাজ করে ফেলবার পরই কেবল এই খেলাটি প্রয়োগ করার পরামর্শ থাকলো। দুইজন খেলোয়াড় দলের বাইরে থাকবে। অন্যরা তাৎক্ষণিক উদ্ভাবন প্রক্রিয়ায় প্লেগ আক্রান্ত মানুষের দুর্ভোগ ও মরণ যন্ত্রণা রূপায়ন করবে। এদের সবার মৃত্যু হলে পর, বাকি দুজন জড় দেহগুলো টেনে টেনে এক জায়গায় এনে স্তুপিকৃত করবে। এই প্রক্রিয়ায় তারা প্রথমে সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী দেহগুলোকে দিয়ে নিচের স্তর তৈরি করবে। প্রতিটি স্তরের পাশাপাশি শোয়ানো দুটি দেহের উপর সমকোণে রাখতে হবে উপরের স্তরের এক জোড়া দেহ।
স্পর্শ ক্রিয়া
প্রক্রিয়াটি যদি নির্বিঘ্নে চলতে থাকে তাহলে হৈহুল্লোড়-তামাসার জায়গা থেকে শৃঙ্খলাবিধানের দিকে যাবার প্রয়াস কাজটিকে নিয়ে যাবে স্পর্শেন্দ্রিয়ের বিচিত্র সংবেদন ও অন্য মানুষের সাথে শারীরিক সংস্পর্শের অভিজ্ঞতার দিকে। এই ক্ষেত্রে কাজটা সাজাতে হবে মোক্ষণ, হল্লা, নাট্যক্রীড়া এবং মালিশ দিয়ে।
একটি খোলামেলা পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে যেখানে খেলোয়াড়রা ইচ্ছেমত যে-কেউ দলের যে-কারো সাথে যে-কোনো ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে স্পর্শ-সংযোগ স্থাপন করতে পারবে। তবে একজনের শারীরিক সংস্পর্শ স্থাপনের ইচ্ছাকে আরেক জন প্রত্যাক্ষাণ বা উপেক্ষা করার অধিকার সংরক্ষণ করবে। দর্শনেন্দ্রিয় ছাড়া অন্য ইন্দ্রিয়গুলোতে মনোসংযোগের উদ্দেশ্যে এই অনুশীলনগুলোকে ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে করা যেতে পারে। কোনো কারণে মানুষের মধ্যে একটা জোড়ালো বিভ্রম আছে যে অন্ধকারে তাদের পরিচয় বিলুপ্ত হয় এবং সেকারণে স্বাভাবিক সংকোচ-সংবাধ-সংস্কারের উর্ধ্বে উঠে তারা আত্ম-অন্বেষণ করতে সক্ষম হয়ে ওঠেন। অন্য আরেকটি কারণে এটা গুরুত্বপূর্ণ। আমি নিজে এই অনুশীলনটা করবো না এবং প্রাথমিক কয়েকটি ধাপে অংশগ্রহণ করবো না। তাহলে তারা আশ্বস্ত বোধ করে যে দলের বাইরে একজন রয়েছেন যিনি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে শুরু করলে সুরক্ষা দেবেন। একারণে প্রাথমিক পর্যায়ে নেতা বিযুক্ত থাকেন যার ফলে কৌতুহল সৃষ্টি হয়। তার সাথে দলের সংযোগ এবং সম্পর্ক খোদ কাজের বাইরের বিষয়াদির প্রভাবে আছড়ে পড়ে। তার উপর নেতার সাথে দলের বয়সের ব্যবধান বেশি হলে সমস্যা বাড়ে। অন্ধকারে অনুশীলন করলে দলের সদস্যরা সুযোগ পায় নিরাপদ পরিস্থিতিতে নেতার সাথে সংযোগ স্থাপনের।
অনেক সময় অন্ধকারে কাজ করার পর দল নিয়ে সরাসরি খোলা আকাশের নিচে চলে আসলে দারুন একটা পরিসমাপ্তি ঘটে। হঠাৎ দৃষ্টি ফিরে আসার পর বাইরের পৃথিবীকে তীব্রভাবে অবলোকন বা অনুসন্ধান করার সুযোগ আসে। রঙ আর আকার আকৃতিসমূহ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় উজ্জ্বল ও জীবন্ত মনে হয়। অন্ধকারে অনুশীলনের শেষে আলো জ্বেলে দিলে খেলোযাড়দের মনে পার্টি শেষ হবার মত অনুুভূতি এবং অবসাদ সৃষ্টি হয়।
এই প্রক্রিয়ায় শারীরিকসংযোগ স্থাপনের ক্রিয়া সহজ ও উপভোগ্য এবং মনো-দৈহিক চাপ বিমুুক্তিতে ফলপ্রসু। সমগ্র কর্ম পরিকল্পনার ধাপে ধাপে এই অনুশীলনটিতে ফিরে ফিরে আসা প্রয়োজন। নিজের ও অন্যের সম্পর্কে ক্রমবর্ধমান সচেতনতার কারণে একটি দল একসাথে যত বেশি কাজ করবে এই খেলাটি তত বেশি কার্যকর হবে।
কাজটা কখনো কখনো বাধার মুখে পড়ে। যে-সহজতায় একটি দলের শারীরিক জড়তামুক্ত সংহতি গড়ে উঠতে পারে তাতে পারস্পরিক সম্পর্ক প্রকৃত অবস্থার চেয়ে গভীরতর বলে বিভ্রম হয়। বিষয়টা দলের প্রত্যেকের সাথে প্রত্যেকের শরীরের যে সংযোগ তার গভীরতার উপর নির্ভর করে। অন্যকে স্পর্শ করা হচ্ছে, অন্যের স্পর্শকে গ্রহণও করা হচ্ছে কিন্তু প্রকৃত গভীর মিলন বা বিনিময় হচ্ছে না। সেক্ষেত্রে সেটা নিতান্তই একটি আত্মকেন্দ্রিক শরীরক্রিয়া যা একই বলয়ের অপর সদস্যের উপস্থিতিকে গ্রাহ্যে আনে না। দলকে মনে করিয়ে দেয়া জরুরি যে কেবলি শরীর মানবের সমগ্রতা নয়। এই বইয়েরই পরের দিকে একগুচ্ছ খেলার কথা বলেছি যেগুলোকে সংস্পর্শ ক্রিয়ার দিকে নিয়ে গেলে আরো গভীর ও অর্থবহ ফল আসে।
শরীর-সংস্পর্শ-ক্রিয়া যত ভালো চলবে এবং সংযোগ যত অবারিত হবে, প্রক্রিয়াটিকে ব্যহত না করে সম্পর্কের সমস্যাগুলো পরিষ্কার করার সুযোগ তত বাড়বে। যেভাবেই হোক যত দ্রুত সম্ভব চাপ মুক্তির ব্যক্তিক পর্যায়কে অবশ্যই পরিচালিত করতে হবে নৈর্ব্যক্তিক শৃঙ্খলা বিধানের দিকে। এই উদ্দেশ্য সাধনে আমার পন্থাগুলোর কথা দশম অধ্যায়ে সাক্ষাৎ-ক্রীড়া ও অন্বেষণ-ক্রীড়ার মাধ্যমে বলেছি। এই বস্তুনিষ্ঠতা ও শৃঙ্খলাবিহীন চাপ বিমোক্ষণ প্রক্রিয়া অভিনেতাকে আত্ম পরিচয় বিলিয়ে দিয়ে দলীয় পরিচয়ে পরিচিত হবার প্রণোদনা জোগায়।
সচরাচর ব্যবহৃত আরেকটি চাপ-বিমোক্ষণ ক্রীড়া আমি কেবল একবার প্রয়োগ করেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যশিক্ষার্থীদের একটি দলে। একটানা দীর্ঘ সময় একসাথে কাজের শেষে বর্ধিত সময়ে জট লেগে যাওয়া কিছু চিন্তুার সূত্র খুঁজে খুঁজে সবাই হয়রান। সবার মুখ ঢেকে দেয়া হলো। উদ্দেশ্য, পরিচিতকে অপরিচিত করে তোলা। ঘরের মাঝে একটা বালতির মধ্যে কাদা মাটি জলে গুলানো হলো। সেটাকে ব্যবহার করে পঙ্ক-উৎসবে মেতে উঠতে বলা হলো সবাইকে। ব্যস্, আর যায় কোথায়; একটা যাচ্ছেতাই কাণ্ড হয়ে গেল; আইনের শাসনের পতন হলো। কারো কাজের সাথে কারো কাজের মিল থাকলো না। কেউ অন্যের গায়ে কাদা ছুঁড়ছে; কেউ আবার নিজের গায়ে নিজেই লেপছে; একটু দূরে থেকে কোনো একজন হয়তো ভাবছে ‘কেউ যদি আমার গায়ে কাদা লেপে দিতো!’ কেউ আবার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি নিশ্চিত হয়ে দলের নেতাকেই দিলো লেপ্টে। এর মধ্য দিয়ে শক্তিপ্রবাহের যে নির্গমণ ঘটলো তা আশ্চর্য হবার মতো। এর গুরুত্ব সবাই অনুভব করলো। তাছাড়া এই নাটক্রীড়ায় নিখাদ আনন্দ-উচ্ছ্বাসেরও একটা দিক পাওয়া গেল। এটাকে গুরুতর কোনো প্রশিক্ষণ উপাদান হিসেবে আমি ব্যবহার করি না। কিন্তু ঐ দিনের অভিজ্ঞতায় এর যে সুস্পষ্ট তাৎপর্য দেখেছি তা আমাকে ভাবায়। আরো কম হুল্লোড়-তা-ব করে কীভাবে একই মাত্রায় চাপ-বিমোক্ষণ ঘটানো যায় আজো সেই খেলাটা সাজাতে পারি নি।
সহিংসতা
এটাতো বলতে গেলে ক্লিশে হয়ে গেছে যে আমাদের সমাজ সহিংসতা রোধ করে। কিন্তু আমার কাজের ক্ষেত্রে আমি দেখেছি এর উল্টোটা; সহিংসতা বোধকে বের করে আনাই সবচে’ সহজ। সবচে কঠিন বরং কোমলতর অনুভূতির বিমোক্ষণ ঘটানো। আমরা দেখেছি সংবেদনশীল সংস্পর্শ-সংযোগ-ক্রীড়া ও মালিশ-ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে স্নেহবোধ বা সম্মানবোধজনিত আড়ষ্টতা অপসারণ করা যায়। সহিংসতা-সংবাধ দূর করা সহজতম হলেও অবাধ অবস্থাকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা সহজ নয়। সেজন্য সচরাচর যা করতে হয় তা হলো পুনরায় সংবাধ তৈরি করা। তবে এই ক্ষেত্রটিতে আমি খুব একটা কাজ করি নি কারণ সহিংসতা-সংবাধ মুক্তকরার ব্যাপারে আমার নিজের ভিতরেই সংবাধ বা বাধা আছে।
সহিংসতা-সংবাধ অবাধকরণে যা করণীয় তা’হলো মাধ্যম হিসেবে একটি উপকরণ নেয়া। একটি চরম জিঘাংসা নিয়ে সেই উপকরণটি শক্ত হাতে ধরে একজনকে আঘাত করতে হবে; তবে মনের এক কোণেতো এটা রাখতেই হবে যে আঘাতটা যেন সত্যি সত্যি না লাগে। উপকরণটা যদি বেলুন বা বালিশ হয় তাহলে সবচে ভালো। থিয়েটারে যুগ যুগ ধরে হিংস্রতালব্ধ মজার মধ্য দিয়ে সহিংসতা-সংবাধ দূর করা হয়ে আসছে। এ-কাজে রোল করা খবরের কাগজ ব্যবহার করা যেতে পারে। শিশুদের অনেক খেলার মধ্যেই এই উপাদান রয়েছে, যেমন দণ্ডহাতে দাঁড়িয়ে থাকা দুইজনের মাঝ দিয়ে দণ্ডিতরা একে একে যাচ্ছে এবং প্রহৃত হচ্ছে বা মারণাস্ত্র হাতে অপরাধীর পিছু নেয়া ইত্যাদি। এর একটি এখানে বর্ণনা করি। একজন ছাড়া সব খেলোয়াড় একটি বৃত্ত রচনা করে কেন্দ্রমুখি হয়ে চোখ বন্ধ করে দাঁড়াবে। তাদের সকলের হাত থাকবে পেছনের দিকে সম্প্রসারিত। অবশিষ্ট খেলোয়াড়টি হাতে একটি রোল করা খবরের কাগজ নিয়ে বৃত্তের বাইরে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে রোলটি সম্প্রসারিত যে-কোনো একটি হাতে ধরিয়ে দেবে। রোল পাওয়া খেলোয়াড় এখন চোখ খুলবে। রোলটি যদি ডান হাতে দেয়া হয়ে থাকে তাহলে ডান দিকের অথবা বাম হাতে দেয়া হয়ে থাকলে বাম দিকের খেলোয়াড়ের কাছে গিয়ে রোল দিয়ে মারতে শুরু করবে। মার খাওয়া খেলোয়াড়টি দৌড়াতে দৌড়াতে বৃত্তটি পূর্ণ এক আবর্তন ঘুরে নিজের জায়গায় ফিরে আসলে তবেই রক্ষা পাবে। আঘাতকারী খেলোয়াড় আঘাত করা বন্ধ করে প্রথমজনের মত বৃত্ত আবর্তন শুরু করে রোল হস্তান্তর করবে।
ভাঁড়-ক্রীড়া
সহিংসতা নিয়ে কাজের ক্ষেত্রে ভাঁড় কাঠামো ব্যবহার করা যেতে পারে। এর সবকটিই মনিব-দাস সম্পর্ক ভিত্তিক। মনিবের হাতে থাকবে খববের কাগজ রোল করে বানানো নল। এই খেলাগুলোর মধ্যে আমি প্রধানত দুইটিকে ব্যবহার করে থাকি। তার একটাতে দুইজন খেলোয়াড়। মনিব তার ভৃত্যকে নির্দেশনা দিচ্ছে কী-ভাবে সে তার ঘরটার আসবাবপত্র পুনর্বিন্যাস করবে এবং নতুন করে সাজাবে। ভৃত্য লক্ষ্মী ছেলের ভান করে মনিবের নির্দেশনা গ্রহণ করছে। সেটা করতে করতে সে সুযোগ পেলেই মনিবের অলক্ষ্যে মুখ ভেঙাবে বা ফোড়ন কাটবে বা মনিবের কথার উপর উস্তাদী ফলাবে। মনিব যদি ভেঙানো বা অন্য কোনো তেদরামি ধরে ফেলতে পারে তাহলে আর ভৃত্য যায় কোথায়; সেই কগজের নল দিয়ে মার। বাহ্যিক ও লুক্কায়িত সহিংসতা এবং ক্ষমতার (অপ)ব্যবহার সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতিতে মানব আচরণের অভিজ্ঞতা অর্জনে এই খেলাটা কার্যকর।
দ্বিতীয় খেলাটি প্রথমটির সম্প্রসারণ মাত্র। প্রথমে একটি পরিস্থিতি ঠিক করে সেখানে বিশেষ কী-করণীয় তা নির্ধারণ করে নেয়া হয়। যেমন ধরা যাক, কেন্ট-র ডাচেস এক সর্ম্বধনায় যোগ দিচ্ছেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যে মিলনায়তন গুছগাছ পরিপাটি করে প্রস্তুত থাকতে হবে। সেই অনুযায়ী ভৃত্যকে আদেশ দেয়া হয়। ধরে নেয়া হয় যে সে সেটা করতে সক্ষম। কিন্তু যদি সে ব্যর্থ হয় তাহলে তাকে পিটানো হবে। তার কাজ শুরু হয়ে যাবার পর একে একে ক্রম উচ্চমর্যাদা সম্পন্ন প্রভুরা আসেন কাজটা ঠিকঠাক সম্পন্ন হয়েছে কি-না দেখতে। প্রত্যেকজন এসে তার অধস্তন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। প্রত্যেক অধস্তন তার উর্ধ্বতনকে টেক্কা দেবার চেষ্টা করবে এবং ধরা পড়লে মার খাবে। খেলাটা ক্ষমতা কাঠামো এবং আমলাতন্ত্রের অন্তর্হিত সহিংসতার একটি অত্যন্ত জটিল পরিসর উন্মোচনের দিকে ধাবিত হয়। ক্রিয়া, পর্যবেক্ষণ এবং আলোচনার স্বাভাবিক ধারাবাহিকতায় খেলাটা বিন্যস্ত হয়। এ থেকে ধরা পড়ে কী-ভাবে ব্যক্তি ‘ব্যবস্থা’র প্রতি তার সহিংসতা বোধ থেকে মুক্ত হয় এবং ব্যবস্থা-কাঠামোর ভিতর তার প্রতি যে-সব হিংস্রতা তা থেকে কী-ভাবে সে নিজেকে রক্ষা করে। বিশ্বস্ততা, বিশ্বাসঘাতকতা, তোষামোদি, দায়িত্ববোধ এবং কী-ভাবে সমাজ কাঠামোর ভিতর দিয়ে এগুলোর লক্ষণ প্রকাশ পায় তা এই খেলার মধ্য দিয়ে ধরা পড়ে।
এই ধরনের ক্রীড়া বা কর্ম কাঠামোর একটি বড় গুরুত্ব এই যে এর মধ্য দিয়ে সামাজিক আচরণের ক্ষেত্রে ক্রিয়াশীল নিয়ম-নীতি-প্রথা পরীক্ষা করে দেখা যায় এবং এর বড় শক্তির দিকটা হচ্ছে এখানেই যে এই প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট সকলে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে তথ্য সরবরাহ করতে সচেষ্ট হয় ফলে ব্যাপক তথ্য সম্ভারে কাজটি জীবন্ত হয়ে উঠে।
প্রথমে অবাধ ঠাট্টা তামাশাযুক্ত সহিংসতার মধ্য দিয়ে এই অনুশীলনগুলো করে যেতে হয় বেদম যাতে করে লুকানো সংস্কারগুলো মুক্তি পায়। পরবর্তীতে হুল্লোড় কমিয়ে দিয়ে বাক্, মুখমণ্ডলের অভিব্যক্তি ও দৈহিক ইশারায় সীমাবদ্ধ রাখার বাস্তবানুগ কৌশল অবলম্বন করতে হবে। পরবর্তীতে সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি উদ্ভাবন করে তার অধীনে ক্রমশ সূক্ষ্মতর কৌশল আরোপ করে করে পরিস্থিতির সাথে সাজুয্য রেখে সহিংসতা আরো সংযত ও নিয়ন্ত্রিত করতে হবে।
হিংস্রতার অনুভূতিকে সুশৃঙ্খল করার উদ্দেশ্যে তৈরি একটি অনুশীলন আমি পেয়েছিলাম আলবার্ট হান্ট-র কাছ থেকে। তর্কের উদ্দেশ্যে দুই বক্তা একটি বিষয়ের বিপরীত বিন্দুতে অবস্থান নেয়। তারা মুখে যদ্দূর পারে পরস্পরের পিণ্ডি চট্কাবে কিন্তু কোনোভাবেই কোনো শারীরিক সহিংসতার পর্যায়ে যেতে পারবে না। আরো কয়েক জন খেলোয়াড়ের একটি দল ঐ দুইজনের বিরুদ্ধে চিৎকার চ্যাচামেচি করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে অবস্থান ধর্মঘট করবে। এরাও কোনোরূপ দৈহিক হিংস্রতায় যেতে পারবে না। পুলিশের ভূমিকায় তৃতীয় একটি দল অবস্থানকারীদের তুলে নিয়ে যাবে। সেটা করতে গিয়ে তারা যে-কোনো ধরনের আচরণ করতে পারে কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে যেন তাদের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ না ওঠে। প্রতিবাদকারীরা পুলিশের কাজ ব্যহত করতে পারে যে-ভাবে খুশি সে-ভাবে কিন্তু দেখতে হবে তারা যেন সহিংসতার অভিযোগে অভিযুক্ত না হয়। এটা আমি কাজে লাগিয়ে ছিলাম ‘দ্য ওয়ার্কহাউস ডাংকি’র শেষ দৃশ্যের প্রস্ততির অংশ হিসেবে। সেখানে আর্ট গ্যালারির উদ্বোধনী অনুষ্ঠান থেকে বাটারওয়াইট ও তার প্রতিবাদী জনতাকে বের করে দেয়া হয়।
ভাল কিছু বল
সম্ভবত ‘করার’ চেয়ে ’বলায়’ সংবাধ বেশি, বিশেষত বিভৎস ও করুণ রসের ক্ষেত্রে। বালিশ জাতীয় উপাদান একটা ধরিয়ে দিলে শারীরিক সংহিংসতা সহজেই অবাধ করা গেল। শারীরিক সংযোগের স্পর্শকাতরতা কঠিন কিছু নয়। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে কাউকে দিয়ে কিছু বলানো অতি দুরূহ। একটা খেলা দাঁড় করানো যায়। সবাই একটি বৃত্ত করে দাঁড়াবে। একে একে প্রত্যেকে তার পরের জনকে ভাল-মন্দ একটা কিছু বলবে। যাকে সুন্দর কিছু বলা হলো সে তার পরের জনকে জঘন্য কিছু একটা বলবে। এইভাবে শ্রুতিতিমধুর আর শ্রুতিকটু পর্যায়ক্রমে বৃত্ত আবর্তন করে। ‘কথা’ পরিহার করে ‘কাজ’ অবলম্বন করলে দেখা যাবে খেলাটা কত সহজ। কথার বেলায় একটা জোড়ালো প্রবণতা থাকে খুব মার্জিত একটা উক্তি তৈরি করার যেমন ‘আমার মনে হয় তুমি অপূর্ব’ বা ‘তোমাকে যে আমি খুব একটা পছন্দ করি তা নয়’ ইত্যাদি। ফলে দেখা যায় সবাই বেশ ভেবে চিন্তে ধৈর্য নিয়ে চেষ্টা কর যাচ্ছে।
এই অনুশীলনটি বা এর মত অন্য অনুশীলনগুলোর মূল্য এই যে এগুলো চলে খেয়ালেরবশে নির্বাচিত মনোভাবের উপর। ফলে এরা প্রত্যক্ষ ব্যক্তিত্ব-সংঘাত সৃষ্টির ঝুঁকিমুক্ত। এগুলো সম্পর্ক স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ এরা অন্যের প্রতি বা বাস্তব-উদ্দেশ্য-নিরপেক্ষ, কাল্পনিক ও নিয়ন্ত্রিত প্রতিক্রিয়ার উপাদানসমূহকে একত্রিত করে যা কি-না অভিনয়ের অন্যতম মূল কথা।
অসিত কুমার ( This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it. ): অনুবাদক, সদস্য- ঐকিক থিয়েটার, নারায়ণগঞ্জ।