Full premium theme for CMS
বাংলাদেশের কাব্যনাটক : বিষয়-বৈচিত্র্য ও প্রকরণশৈলী [প্রথম কিস্তি]
Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..
নাট্যসাহিত্যের ইতিহাস মানব সমাজের আদিপর্বের শিল্পসংস্কৃতির বিকাশধারার সাথে প্রযুক্ত এবং তা বর্তমানকাল পর্যন্ত সম্প্রসারিত। সাহিত্যের অন্যান্য শাখার তুলনায় নাট্যসাহিত্যের ইতিহাস অধিকতর সমাজ ও জীবনঘনিষ্ঠ। ফলে নাটক সাহিত্যের ইতিহাসে বিশেষ মর্যাদার দাবীদার। নাট্যসাহিত্যের ইতিহাস অনুসন্ধানে জানা যায় আধুনিককালের নাটকে ব্যবহৃত গদ্য সংলাপ প্রাথমিক স্তরের নাটকে ছিল না। আদিপর্বের নাটকে সংলাপ রচিত হতো পদ্যে। পদ্যে রচিত সংলাপ বিবর্তনের ধারাক্রমে আধুনিককালে পরিপূর্ণ গদ্যে রূপান্তরিত হয়েছে। আধুনিককালে বাস্তববাদী নাটকের বন্ধ্যা সময়ে নাট্যসাহিত্য কাব্যকেও আত্মস্থ করে; এর ফলে আধুনিক কবিতা ও নাটকের সমন্বয়ে নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসে ‘কাব্যনাটক’ নামক নতুন একটি ধারা সৃষ্টি হয়। সাহিত্যের নবোদ্ভূত এই ধারাকে অমিত সম্ভাবনার ক্ষেত্র হিসেবে সমালোচকগণ বিবেচনা করেন।
নাট্যসাহিত্য প্রায় আড়াই হাজার বছর পূর্বে সাহিত্যের একটি বিশেষ শাখা রূপে আত্মপ্রকাশ করে এবং অল্পকালের মধ্যে বিষয়-বৈচিত্র্যে বিকশিত হয়ে সাহিত্যাঙ্গনে সুসংহত আসন দখল করে নেয়। সাহিত্যের সব শাখাই প্রাচীন ও মধ্যযুগে ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদির মধ্যদিয়ে চর্চিত ও বিকশিত হয়েছে। নাট্যসাহিত্যের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয় নি। প্রাচীনকালে গ্রীসে Dionysus দেবতার পূজা উপলক্ষে এক ধরনের গান-বাজনার আয়োজন করা হতো; এই সঙ্গীত থেকেই গ্রীক ট্র্যাজেডির উদ্ভব ঘটে। ভারতীয় নাট্যশাস্ত্রেরও উদ্ভব ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান থেকে; এ ধারণা এখন প্রতিষ্ঠিত। এখনো উপমহাদেশীয় লোকাচারগুলোর মধ্যে কলাচর্চা সাধারণত ধর্মীয় উৎসবাদি কেন্দ্রিক। এ থেকেও বোঝা যায়, নাট্যশাস্ত্রের জন্ম-ইতিহাসও ধর্মীয় জীবনাচরণের সঙ্গে ওতোপ্রতোভাবে যুক্ত।১ প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে নাট্যসাহিত্য বর্তমানকাল পর্যন্ত বিকাশ-পরিক্রমায় গঠনগত এবং বিষয়গত দিক থেকে বিচিত্র ধরনের। নাট্যসাহিত্যের প্রাচীন যুগে সাধারণত পঞ্চাঙ্ক বিশিষ্ট নাটক রচিত হয়েছে; আধুনিককালে চার এবং তিন অঙ্ক বিশিষ্ট নাটকের পাশাপাশি একাঙ্কিকাও জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। নাট্যসাহিত্যে আকৃতিগত বৈচিত্র্যের সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই প্রাচীনকাল থেকে রসবিচারই ট্র্যাজেডি, কমেডি, প্রহসনের মাপাকাঠি ছিল। আধুনিকযুগে নাট্যসাহিত্যের প্রকরণগত এবং বিষয়গত বৈচিত্র্য আরো প্রসারিত হওয়ায় নাট্যসাহিত্যের শ্রেণীবিভাজন ও নামকরণের তালিকা আরো স্ফীত হয়েছে। নাট্যকার ব্যক্তিগত চিন্তাচেতনা ও জীবনবোধের ভাষাগত রূপদানের মাধ্যমে পাঠকের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের পাশাপাশি নট-নটীদের সহায়তায় রঙ্গমঞ্চে নাট্যমাধ্যমে দর্শকের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপনে সক্ষম। দ্য নিউ এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকায় উল্লেখ করা হয়েছে, 'Play wright can exercise better control both over speech and movement of his actors and over the responses of his audience by using the more subtle and rhythms good petry.’২ অর্থাৎ নাট্যসাহিত্য মঞ্চায়নযোগ্য শিল্প। অন্য যে-কোনো পাঠ্যসাহিত্যের তুলনায় নাট্যসাহিত্য পাঠক অথবা দর্শকের মনে অধিকতর প্রভাব বিস্তার করে। এজন্য নাট্যসাহিত্যে মঞ্চায়নের গুরুত্ব অপরিসীম। ‘সাহিত্যশিল্পের অন্যসব শাখায় স্রষ্টা ও উপভোক্তার মধ্যে সম্পর্ক সরাসরি। উপন্যাস, ছোটগল্প, কাব্য, প্রবন্ধ ইত্যাদি যাই-হোক-না কেন, তার সঙ্গে পাঠকের রঙ্গমঞ্চে অভিনীত হয়ে দর্শকের সামনে হাজির হয়। দর্শক অভিনয়ের মাধ্যমে সেই নাটকের রস উপভোগ করেন, আনন্দ লাভ করেন। নাটকের এই ‘থিয়েট্রিক্যাল ভ্যালু’ তার সবচেয়ে বড় সম্পদ। অবশ্য নাটকের ‘লিটারারি ভ্যালু’ নির্ণয়ের জন্য ‘রিডিং ড্রামা’ বলে নাটকের বিচার করা হয়। সাহিত্যের শিল্পগত বিচারে সেখানে নাটকের পাঠ্যরূপের বিচার চলে।’৩ তবে শৈল্পিক বিচারের মানদণ্ডে কোনো নাটকের নান্দনিকতা সম্পূর্ণভাবে মঞ্চসাফল্যের ওপর নির্ভরশীল নয়; কিন্তু মঞ্চায়নের দ্বারা নাট্যসাহিত্য থেকে বাড়তি শিল্পরস পাওয়া যায়। অর্থাৎ লিখিত নাটকটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও পূর্ণাঙ্গ শিল্পমাধ্যম। ফলে নাট্যকারের মঞ্চজ্ঞান থাকা আবশ্যক নয়। কেননা লিখিত নাটক মঞ্চস্থ না হলেও রসের বিচারে নাট্যসাহিত্য স্বয়ংসম্পূর্ণ বিধায় তা থেকে পূর্ণ শিল্পরস গ্রহণ করা যায়।
সাহিত্যের ইতিহাসে প্রাচীনকাল থেকে আরম্ভ করে সমকালেও কাব্যশাখার প্রভাব-প্রতিপত্তি-মর্যাদা অক্ষুণ্ন রয়েছে। তবে অনন্তকাল পরিক্রমায় কবিতার শক্তি-সামর্থ্য মাঝেমধ্যে খানিকটা ম্লান হয়েছে এবং অল্প সময়ের ব্যবধানে কাব্যশাখা তার হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করেছে। কবিতা সবসময় যুগের চেতনা এবং মানবমনের আকাঙ্খার সাথে নিজেকে ভেঙেছে, গড়েছে এবং মানিয়ে নিয়েছে। অর্থাৎ ভিন্ন ভিন্ন যুগপরিবেশে কবিতা নিজেকে ভেঙেচুরে নির্মাণ করেছে। উনিশ শতকে কবিতার রূপান্তর-পরিবর্তন এবং বিনির্মাণ প্রক্রিয়ায় তা আরো সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত। প্রচলিত আঙ্গিকে কাব্যকলা যেন যুগবাস্তবতা প্রকাশ করতে পারছে না। ফলে কাব্যকলার আঙ্গিকগত পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছে। ‘কবিতার গঠনগতরূপে এই আঙ্গিকগত পরিবর্তন পাঠককে দিশেহারা করেছে, আবার পাঠকের কথা ভেবেই এমন এক আঙ্গিকের কথা ভেবেছেন কবিরা যাতে পাঠকের সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া যোগ নতুন করে প্রতিষ্ঠার সুযোগ ঘটে। এই অন্বেষণেরই ফল কাব্যনাট্য। কবি আর নাট্যকারের দ্বৈতসিদ্ধি সমাহৃত হয়েছে এখানে। কবিকে জানতে হয়েছে নাট্যকারের প্রয়োগ কৌশল আবার নাট্যকারকে বুঝতে হয়েছে কবিতার তাৎপর্য।’৪ কবিতার শিখরস্পর্শী শক্তি-সামর্থ্য-মর্যাদার সঙ্গে নাট্যগুণের কৌশলগত সমন্বয়ে কাব্যনাটকের সৃষ্টি; সুতরাং বলা যায় কাব্যনাটক হচ্ছে কবিতা ও নাটকের সংমিশ্রণে পাওয়া সমন্বিত শিল্প। যে নাটকের অন্তর গীতিকবিতার সুরমূর্ছনায় ঝংকৃত হয় এবং চরিত্রসমূহের সংলাপে কবি-মানসের বিচিত্র ভাব-কল্পনার প্রকাশ ঘটে, সহজ কথায় তাই কাব্যনাটক। এ ধরনের নাটকে কবির কল্পনা-আবেগ-উচ্ছ্বাস বহুবর্ণিল রঙের উজ্জ্বল আলোকছটায় একক রূপ লাভ করে এবং অনেক সুরও একটি ঐক্যতানের সৃষ্টি করে। তবে এ ধরনের নাটকে সাধারণ নাটকের মতো গতিময়তা এবং ঘটনার যৌক্তিক বিন্যাস ও কার্যকারণ আবিষ্কৃত নাও হতে পারে। কাব্যনাটকে চরিত্রসমূহের অন্তর্গত চিন্তা-চেতনা কবি গভীরভাবে বিশ্লেষণ সাপেক্ষে কবিতার মায়াজাল রচনা করেন; ফলে কাব্যনাটকে সামগ্রিক ঘটনা-বিশ্লেষণ ধারাবাহিক পরম্পরায় নাও ঘটতে পারে। অথবা নাট্যরসের পরিণামের দিকে মনোসংযোগ না করেই নাট্যকার কাহিনীর বিচ্ছিন্ন শতছিন্ন অংশগুলোকে ভাব-কল্পনার অজস্র ধারায় প্রবাহিত করতে পারেন। কাব্যনাটকে গীতিকবিতার আবেগ-উচ্ছ্বাসজনিত নাট্যিক দুর্বলতা থাকাও অস্বাভাবিক নয়। কেননা কাব্যনাটক রচনার ক্ষেত্রে নাট্যকার প্রত্যক্ষভাবে চরিত্রের মনোজগত বিশ্লেষণের সময় উপস্থিত থাকেন বলে, এখানে ‘লিরিক’-এর প্রাধান্য থেকেই যায়। ফলশ্রুতিতে সাধারণ নাটকের ন্যায় কাব্যনাটকে ঘটনার সুবিন্যস্ত সমাবেশ, আবর্তন এবং পরিণতি পরিলক্ষিত হয় না। এখানে নাট্যকারের নিকট কাহিনীর কাঠামোটিই একমাত্র উপাদান বা উপজীব্য। অতঃপর সেই কাহিনীটুকু নির্মাণের জন্য চরিত্রসমূহের সংলাপের সহায়তায় নাট্যকার গন্তব্য অনুসন্ধান করতে থাকেন। এজন্যই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কাব্যনাটকের পরিসমাপ্তি সন্তোষজনক হয় না। কেননা এখানে নাট্যকারের প্রধান লক্ষ্য থাকে, চরিত্রের অন্তর্রহস্য উদ্ঘাটন করে দর্শক-পাঠকের সামনে উপস্থাপন করা। ‘লক্ষ্য তার সুপ্রিম বিউটি অথবা পরমম্ নিকাসায় পশ্যম্।’৫
আধুনিককালে কাব্যশাখার অমিত শক্তি-সামর্থ্যকে টি.এস. এলিয়ট (১৮৮৮-১৯৬৫) নাট্যসাহিত্যে সুচিন্তিত প্রাকরণিক কৌশলে প্রয়োগ করেছেন। তিনিই কবিতাকে নতুন আঙ্গিকে ঢেলে সাজিয়ে কাব্যনাট্যের জন্ম দিয়েছেন। এই অর্থে সাহিত্যের ইতিহাসে কাব্যনাটক সম্পূর্ণ আধুনিককালের সৃষ্টি। তবে প্রাচীনকালের সাহিত্যেও কাব্যনাটকের কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য বা উপাদান খুঁজে পাওয়া সম্ভব। কেননা যেকোনো পরিবর্তন-রূপান্তর কখন আকস্মিক নয়; সকল পরিবর্তনই ধারাবাহিক বিবর্তনের ফল। প্রাচীনকালের নাট্যসাহিত্য শুধু নয়; সাহিত্যের সকল শাখাই কাব্যধর্মী বা কবিতার আঙ্গিকে রচনা করা হত। এজন্যই বৃহত্তর অর্থে প্রাচীনকালে রচিত নাটকগুলোর মধ্যেও কাব্যনাটকের উপাদান খুঁজে পাওয়া সম্ভব। তথাপি আধুনিক-অর্থে সেগুলোকে কাব্যনাটক হিসেবে অভিহিত করা সমীচীন নয়। কেননা আধুনিক যুগপরিবেশের জটিলতায় ব্যক্তির চিন্তাচেতনা প্রকাশের বাহন হিসেবে কাব্যনাটকের সৃষ্টি হয়েছে। আধুনিককালে কবিরা যুগমানসের জটিলতা প্রকাশ করতে গিয়ে ক্রমাগত দুর্বোধ্য হয়ে উঠেছেন। যুগপরিবেশের প্রভাবে কবিদের ব্যক্তিগত দুর্বোধ্য প্রকাশরীতি এবং চিন্তাচেতনা পাঠককে ক্রমাগত অসহায় করে তুলেছে এবং কবিতার ভাষাগত-চিন্তাগত দুর্বোধ্যতায় কবির সঙ্গে পাঠকের ক্রমাগত দূরত্ব বেড়েছে। কবির কথা যদি পাঠক না বোঝে এবং পাঠকের প্রত্যাশা যদি কবি না বোঝে, তাহলে শিল্পসাধনা অর্থহীন। তাই দুর্বোধ্যতার প্রতিক্রিয়ায় কবিতাবিমুখ পাঠককে পুনরায় কবিতামুখী করতে কবিরা নতুন আঙ্গিকের অন্বেষণে ছুটলেন, আবিষ্কৃত হলো কাব্যনাটক।
আধুনিককালে নাট্যসাহিত্যও বিশেষ এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করেছে। এ সময় কবিতার মতো নাটকও ঠিক যেন নিজেকে পাঠকের সামনে সম্পূর্ণ মেলে ধরতে পারছিল না। নাট্যকলারও পরিবর্তন-পরিমার্জন যুগের অবশ্যম্ভাবী চাহিদা হয়ে উঠেছিল। ‘ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষাংশ থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভিক কাল পর্যন্ত ইংল্যাণ্ড ও ইউরোপীয় বাস্তববাদী বন্ধ্যা নাট্যকলার প্রতিক্রিয়ার ফলে এলিয়ট প্রমুখের মধ্যদিয়ে কাব্যনাটক কথাটির বহুল প্রচার ঘটে।’৬ পাশ্চাত্য সাহিত্যে গ্রীক-নাট্যকলা ও এলিজাবেথীয় যুগের নাটক পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ (Classic) নাট্যসাহিত্য হিসেবে সুবিদিত। গ্রীক-নাট্যসাহিত্য এবং এলিজাবেথীয় যুগের রচিত নাট্যসমূহের আঙ্গিক কাব্যনাট্যের হলেও তখন পর্যন্ত নাট্যসাহিত্যে ‘কাব্যনাটক’ শব্দটির আলাদা ব্যবহার হয় নি। কেননা তখন সাধারণ নিয়ম ছিল কাব্যের (Poetry) ভাষায় নাটক রচনা করা। এজন্য তখন কাব্যনাটক কথাটি ব্যবহারের আলাদা প্রয়োজনও হয় নি। উইলিয়াম শেক্সপীয়র (১৫৬৪-১৬১৬) রচিত বিশ্বখ্যাত নাটকগুলোর মধ্যেও কাব্যনাটকের যথেষ্ট উপাদান ছিল। তথাপি সেগুলো আধুনিক-অর্থে কাব্যনাটকের আওতাভুক্ত নয়। এক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন, আধুনিককালে গদ্যনাটকের প্রবল ক্রান্তিলগ্নে কবিতাকে অভিনব বিষয়-বৈচিত্র্যে ও আঙ্গিকে সুসাহিত্যিক এলিয়ট নাট্যসাহিত্যে সুচিন্তিতরূপে আমদানী করেছেন। পাশ্চাত্যে উনিশ শতকের প্রায় সকল প্রধান কবিই কাব্যনাটক রচনার চেষ্টা করেছেন। এ সময় উইলিয়াম ওয়ার্ডস্ওয়ার্থ (১৭৭০-১৮৫০), এস.টি. কোলরিজ (১৭৭২-১৮৩৪), পি.বি. শেলী (১৭৯২-১৮২২), জন কীটস্ (১৭৯৫-১৮২১), লর্ড বায়রন (১৭৮৮-১৮২৪), আলফ্রেড টেনিসন (১৮০৯-’৯২), রবার্ট ব্রাউনিং (১৮১২-’৮৯), ম্যাথু আর্নল্ড (১৮২২-’৮৮), সি.এ. সুইনবার্ন (১৮৩৭-১৯০৯) এবং জি.এম. হপকিন্স (১৮৪৪-’৮৯) কাব্যভাষায় নাটক লিখেছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তাঁরা সকলেই আধুনিক-অর্থে সার্থক কাব্যনাটক রচনায় ব্যর্থ হয়েছেন। তথাপি তাঁরা ইউরোপীয় নাট্যসাহিত্যের বন্ধ্যাত্ব মোচনে শেক্সপীয়রীয় নাট্যরীতি অথবা প্রাচীন গ্রীক নাট্যশিল্পের সাদৃশ্যে যে-প্রয়াস গ্রহণ করেছিলেন, তারই ধারাবাহিক বিবর্তন প্রক্রিয়ায় নাট্যসাহিত্য সেকালের স্থবিরতা অতিক্রমে সক্ষম হয়। ইউরোপীয় নাট্যসাহিত্যে গদ্যনাটকের এই স্থবিরতা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে সাহিত্যিকগণের সচেতন প্রচেষ্টায় কাব্যনাটক নামক একটি নতুন ধারার বিকাশ ঘটে। প্রসঙ্গত কাব্যনাটক প্রসঙ্গে রাম বসু বলেন,-
কাব্যনাটক জীবনের আবিশ্ব সার্বিকতার সন্ধান, তাই কাব্যনাট্য কি নাট্যকাব্য এই তর্ক অর্থহীন। কাব্যনাটক জৈবিক ঐক্য ‘অর্গানিক হোল’। এলিয়ট ন্যাচারিলিস্ট নাট্যপদ্ধতিতে বিশ্বাসী হয়েও স্বীকার করেছেন কাব্যনাটকে কবিতা ও নাটক জৈবিক ঐক্যে একটি অনন্য।৭
এলিয়ট কবিতা ও নাটকের জৈবিক একাত্মতার কথা বললেও সর্বার্থে তিনি তা মেনে চলতে পারেন নি। ব্যক্তি এলিয়টের মতে তাঁর রচিত সার্থক কাব্যনাটকগুলোতে নাট্যগুণের আধিপত্য এতটাই বিস্তৃত করেছেন যে, সেখানে কবিতা একেবারেই গৌণ হয়ে পড়েছে। তিনি ‘... কাব্যনাটকের তত্ত্বকে টানতে টানতে গদ্যের রান্নাঘরে ঢুকে পড়েছেন।’৮
উনিশ শতকের পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রধান কবিগণ এলিয়টের পূর্বেই কাব্যভাষায় নাটক রচনার ব্যাপারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছিলেন। এ সময় কাব্যনাটক রচনার ক্ষেত্রে প্রধানত কবিগণ এগিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, কবিতায় কেন নতুন আঙ্গিক প্রয়োজন হলো? কাব্যনাটকের উৎসের এই সূত্র সন্ধান করলে দেখা যায়, আধুনিককালের জড়বাদী দর্শনের প্রভাবে বস্তুবিশ্বের সবকিছু থেকে মানুষ সম্পর্করহিত বিচ্ছিন্ন মানবসত্তায় পরিণত হয়েছিল। আধুনিক মানুষ জেনেছে, তার একটা স্থূল মানবিক অস্তিত্ব আছে। এছাড়া চিন্তার জগতেও নিজের অস্তিত্ব এবং টিকে থাকা নির্জলা সত্য। অস্তিত্ব বিষয়ক এই চিন্তাসূত্র মানুষকে স্বাধীনতা এবং স্বতন্ত্রসত্তা তথা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের কথা শিখিয়েছে। অর্থাৎ ব্যক্তি-মানুষের অস্তিত্ব তার একান্ত নিজের। তারপরও মানবসমাজের সামগ্রিক উন্নয়নে ব্যক্তির দায়দায়িত্ব আছে এবং সে-দায়িত্ব পালনের সজাগ চেতনায় তার মধ্যে তীব্র উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হয়। ফলে দায়িত্বশীল মানুষ বস্তুবিশ্বের সাথে সম্পর্কশূন্য বিচ্ছিন্নতার চেতনা দ্বারা সংক্রামিত হয়ে নিজেকে নিঃসঙ্গ ভাবতে শুরু করে; বিচ্ছিন্নতার অসহায়ত্বে নিমজ্জিত মানুষ নিজেকে পারিপার্শ্বিক অবস্থায় স্থাপন করতে চায়। ব্যক্তিমানুষ স্বীয় চেতনাকে অপরের মধ্যে সঞ্চালনের প্রবল বাসনায় অভিনব শিল্পসাধনায় নিযুক্ত হয়। ব্যক্তির চিন্তাচেতনা এবং ভাবনাকে দৃশ্যময় করতে গিয়ে নতুন আঙ্গিকের প্রয়োজন হয়েছে; এই প্রয়োজনীয়তা থেকেই কাব্যনাটকের সৃষ্টি। উনিশ শতকের ইউরোপীয় কবিগণ প্রথমত প্রাচীনকালের পদ্যে রচিত নাটকের পরিমার্জনে সচেষ্ট হন। দ্বিতীয়ত এ সময় তাঁরা কাব্যনাটকের তাত্ত্বিক দিক অর্থাৎ বিষয়গত, বিন্যাসগত, ভাষাগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও উন্নয়ন সাধনে মনোনিবেশ করেন। তাঁরা যান্ত্রিক যুগের দাবী মেনে নিয়ে, বাস্তববাদী নাটকের বহির্বাস্তবতার পরিবর্তে কাব্যনাটকের অন্তর্বাস্তবতার প্রতি আকৃষ্ট হন এবং তা গুরুত্বসহকারে নাট্যসাহিত্যে প্রয়োগ করেন। তাঁরা জাগতিক তথা বাহ্যিক সত্য প্রকাশের চেয়ে অন্তর্গত সত্য আবিষ্কার এবং অন্তর্লীন বাস্তবতা প্রকাশ অধিক জরুরি মনে করেন। কিন্তু নাট্যসাহিত্যের প্রচলিত প্রকরণে (Form) তা প্রকাশ করা সম্ভব ছিল না। সমসাময়িককালে ধনতান্ত্রিক শিল্পোন্নত দেশে জাগতিক বস্তুসম্পদের মোহমায়ায় শৃঙ্খলিত মানবাত্মা মুক্তির আকাঙ্খা প্রবল হয়ে ওঠে। অতএব বলা যায়, জীবনের গূঢ়ার্থ প্রকাশ করার প্রতিজ্ঞায় এবং সামাজিক জীবনের অভ্যন্তর বাস্তবতা উন্মোচনের দায়দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে কাব্যনাটকের ইতিহাস সূচিত হয়। এলিয়ট মনে করতেন, গদ্যসংলাপাত্মক নাটকের চেয়ে কাব্যভাষায় রচিত নাটকে জীবনের গূঢ়ার্থ প্রকাশ অধিকতর সহজ; অর্থাৎ এক্ষেত্রে কাব্যভাষা সহায়ক ভূমিকা পালন করতে সক্ষম। সোজা কথায়, গদ্যনাটকের চেয়ে কাব্যনাটকে জীবনের গভীরার্থ প্রকাশ করা সহজতর; এ কারণেও বিশ শতকের প্রথমার্ধে ইউরোপের অনেক কবি-সাহিত্যিক কাব্যনাটক রচনায় আকর্ষণ, উৎসাহবোধ করেছিলেন। আধুনিক যুগে অতিবাস্তবতা মানুষকে ক্লান্ত করেছে, অথচ মানুষ বারবার নিজের অভ্যন্তরে এবং চেতনার গূঢ়মূলে তাকাতে চেয়েছে। মানবজীবনের এই অন্তর্বাস্তবতা প্রচলিত কবিতা কিংবা নাটকে প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছিল না। ফলশ্রুতিতে সমকালীন জীবনাভিজ্ঞতার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় মানব-জীবনের অন্তর্লোকের রহস্য উদ্ঘাটনে মূলত কবিগণ সাহিত্যের এক অভিনব আঙ্গিক আবিষ্কার করলেন, যা ‘কাব্যনাট্য’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। তাঁদের এই উৎসাহী প্রয়াস, কাব্যনাটকের ব্যাপক প্রচার-প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।
ইয়েটস এবং এলিয়ট প্রবর্তিত কাব্যনাট্য বিষয়ক তত্ত্বের সমন্বয়ে সাহিত্যের ইতিহাসে সার্থক কাব্যনাটকের অস্তিত্ব সুদৃঢ় হয়েছে। উনিশ শতকে বাস্তববাদী নাটকের বিরুদ্ধস্রোতে কাব্যনাটক যে যাত্রা শুরু করেছিল, তা বিষয়-বৈচিত্র্যে অভিনব হলেও মঞ্চে শতভাগ সাফল্য অর্জন করতে পারে নি। নাট্যশিল্প বিচারের মানদণ্ডে এসব কাব্যনাটক অনেকাংশেই ব্যর্থ কিন্তু মঞ্চ-অসফল এই কাব্যনাটকগুলো রচনার মধ্যদিয়ে ভবিষ্যতে সার্থক কাব্যনাটক রচনার পথ প্রসারিত হয়েছিল। এলিয়ট কাব্যনাটক রচনায় উনিশ শতকের খ্যাতিমান কবিদের ব্যর্থতার কারণ হিসেবে মঞ্চ সম্বন্ধে তাঁদের অনভিজ্ঞতা এবং নাট্যকলা বিষয়ক সম্যক জ্ঞানের সীমাবদ্ধতাকে দায়ী করেছেন। কিন্তু যাঁদের নাট্যশিল্প এবং মঞ্চ সম্বন্ধে যথার্থ জ্ঞান ছিল, তাঁরা আবার প্রকৃত-কবি না হওয়ায় কাব্যভাষায় নাট্যসংলাপ রচনায় ব্যর্থ হয়েছেন। ইয়েটস-এর মতো শক্তিমান কবির পক্ষেও মঞ্চজ্ঞানের অভাবে সার্থক কাব্যনাটক রচনা করা সম্ভব হয় নি। অথচ জাপানি ‘নো’ নাটকের সাদৃশ্যে তিনিই প্রথম ‘এ্যাবি থিয়েটার’ হলে পৌরাণিক ও কিংবদন্তীর বিষয়াদি নিয়ে, কবিতার রূপক-প্রতীক সৌন্দর্যের আবহে নাটক মঞ্চায়নের মাধ্যমে কাব্যনাটকের সম্ভাবনা উজ্জ্বলতর করে তুলেছিলেন। কিন্তু ইয়েটস এই সম্ভাবনাকে সাফল্যমণ্ডিত করে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন নি; বরং পরবর্তীতে জে.এম. সীঙের কাব্যগুণ সমৃদ্ধ গদ্যভাষায় রচিত নাটকগুলো কাব্যনাট্যের বিকাশ-পর্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সীঙের পর ক্রিস্টোফার ইশারউড (১৯০৪-’৮৬), ডব্লিউ.এইচ. অডেন (১৯০৭-’৭৩), স্টিফেন স্পেন্ডার (১৯০৯-’৯৫) প্রমুখ সাহিত্যিকব"ন্দ কাব্যনাট্যের বিকাশ-পর্বের ইতিহাসকে আরো একধাপ এগিয়ে নিয়ে যান। তাঁরা কাব্যভাষায় নাটক চর্চার মাধ্যমে কাব্যনাটকের ইতিহাসকে সার্থকতার পথে ঠেলে দিয়েছেন। তাঁরা কাব্যনাট্য ধারার বিকাশপর্বের ইতিহাসে বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করে অবিস্মরণীয় হয়েছেন।
আধুনিক কাব্যনাটকের অগ্রপথিক টি.এস. এলিয়ট বিশ শতকের তিরিশ-দশকে নাট্যসাহিত্যের বন্ধ্যাত্ব মোচনের লক্ষ্যে সুকৌশলে কবিতা ও নাটকের সুচিন্তিত সংমিশ্রণে দ্য রক (১৯৩৪) রচনা করেন। এলিয়টের দা রক প্রথম কাব্যনাট্য প্রয়াস। তিনি দ্য রক রচনাকালে মঞ্চ সম্পর্কে সম্যক অবহিত ছিলেন না; তাঁর মঞ্চ-জ্ঞানের অভাবে দ্য রক সার্থক কাব্যনাটক হয় নি। এলিয়ট থেমে থাকেন নি। তিনি পরবর্তীকালে মার্ডার ইন দা ক্যাথিড্রাল (১৯৩৫), দ্য ফ্যামিলি রিউনিয়ন (১৯৩৯), দ্য কনফিডেন্সিয়াল কার্ক (১৯৫৩) এবং দ্য এলডার স্টেট্সম্যান (১৯৫৮) নামক চারটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পসফল কাব্যনাটক রচনা করেন। তাঁর শিল্পসফল কাব্যনাটকগুলো সাহিত্যের এই নবীন শাখাকে বিশ্বব্যাপী সাহিত্যাঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত করতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করে। উপরন্তু ইউরোপীয় বাস্তববাদী নাটকের ধারাবাহিক ব্যর্থতায় সাহিত্যের ইতিহাসে কাব্যনাটকের অবস্থান উত্তরোত্তর সুদৃঢ় হয়েছে।
‘কাব্যনাটক’ কথাটি দ্বারা সাধারণ অর্থে বোঝায়- কবিতায় বা কাব্যভাষায় রচিত নাটক। ইংরেজিতে Verse Play ev Poetic Drama শব্দ দুটো ‘কাব্যনাটক’ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে ‘কাব্যনাটক’ শব্দটি সাহিত্যে আভিধানিক অর্থের পরিবর্তে পারিভাষিক অর্থে গ্রহণ করা হয়েছে। নাটকের আঙ্গিকে কবিতা পরিবেশিত হলেই তা কাব্যনাটক হয় না; তারও অধিক কিছু যেন কাব্যনাটকে আভাসিত। এ প্রসঙ্গে উত্তম দাশ বলেন,-
নাটকের আঙ্গিকে কবিতা একথা সত্য কিন্তু কবিতা ও নাটক এখানে পরস্পরে সম্পৃক্ত। নাটক এখানে তীব্র নাটকীয়তাকে দমন করেছে কবিতাও শুধু আবৃত্তিযোগ্য না হয়ে দৃশ্যরূপে উদ্ভাসিত।৯
কাব্যনাটকে নাটকীয় তীব্রতা, উৎকণ্ঠা অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত; কাব্যদেহের ব্যঞ্জনায় নাট্যঘটনা অনুভববেদ্য হয়ে ওঠে। ছন্দে রচিত হলেই যেমন সব রচনা কবিতা হয় না; তেমনি পদ্য-আঙ্গিকে রচিত হলেই তা কাব্যনাটক নয়। কেননা কবিতার ক্ষেত্রে ছন্দের চেয়েও কাব্যগুণ অধিক গুরুত্বপূর্ণ। তেমনি কবিতার মতোই গদ্যেও কাব্যগুণ থাকতে পারে, সেক্ষেত্রে কাব্যগুণ সমৃদ্ধ গদ্যকে ‘কাব্যধর্মী-গদ্য’ বলা হয়। কবিতার ছন্দ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও গদ্য এবং পদ্যের পার্থক্য স্বীকার করেন নি। তাছাড়া আধুনিককালের কবিতায় গদ্যের প্রভাব প্রবল হয়েছে। আপত-অর্থে ছন্দবিহীন তথা অন্ত্যমিলহীন এসব কবিতাকে আধুনিক যুগে গদ্যকবিতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সাধারণত কবিতায় ছন্দ প্রত্যাশিত; কিন্তু ছন্দে রচিত সকল রচনাই কবিতা নয়। কবিতায় ছন্দের চেয়ে অপরিহার্য কাব্যময়তা। তেমনি কাব্যনাটকের সংলাপেও ছন্দের চেয়ে কাব্যগুণ অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেননা কাব্যনাটকে কবিতাকে নাট্যাঙ্গিকে ব্যবহার করা হয়। সুতরাং সাহিত্যের এই শাখা কবিতা ও নাটকের শর্ত পূরণে উৎসাহী। কাব্যনাটকে সাহিত্যের একটি মাধ্যম অন্য একটি মাধ্যমকে আত্মস্থ করে নেয় এবং সকল বাহুল্য বর্জন করে একে অপরের জন্য অপরিহার্য হয়ে ওঠে। এই প্রক্রিয়ায় সাহিত্যের যে শাখা নিজেকে সমৃদ্ধ করে, তাই কাব্যনাটক। কবিতা ও নাটকের সুসমন্বয়ে কাব্যনাট্যের বিকাশ। অর্থাৎ যে সাহিত্য মাধ্যমে কবিতা নিজেকে ভেঙে নাট্যাঙ্গিকে এবং নাটক নিজেকে ভেঙে কাব্যাঙ্গিকে মিলেমিশে একাকার হয়েছে তাকে কাব্যনাটক বলে।
বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাস পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয়, বাংলা নাটক উত্তরাধিকার সূত্রে কবিতার সুর-ছন্দ-তাল-লয় আত্মস্থ করেছে। বাংলা নাটকের জন্মলগ্ন থেকেই কাব্যের সাথে নিবিড় যোগাযোগ ছিল।১০ ইউরোপীয় সাহিত্যের মতো বাংলা সাহিত্যেও আধুনিককালে নাটকের সঙ্গে কবিতার সুসমন্বয়ে ‘কাব্যনাট্যে’র উদ্ভব হয়েছে। এক্ষেত্রে দেখা যায়, বাংলা কাব্যনাটকেও সাহিত্যের দুটি স্বতন্ত্র ধারার সমন্বয় পরিলক্ষিত হয়। কাব্যনাটকের এই সমন্বিত প্রয়াস প্রসঙ্গে এলিয়ট যথার্থই বলেছেন, কাব্যময়তা নাট্যকলায় সংস্থাপিত হলে কাব্যনাটকের সৃষ্টি হয়। কাব্যনাট্যে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই শিল্পধারার সার্থক সমন্বয় একান্ত প্রয়োজন। এলিয়ট মনে করেন, কাব্যনাটকে কাব্যগুণ অবশ্যই নাট্যগুণের অনুসারী হবে। এলিয়ট আরো স্পষ্ট করে বলেছেন, 'It must justify itself dramatically, and not merely be fine poetry shaped into a dramatic form.'১১
কাব্যনাটকে কাব্যগুণ যতই মাধুর্যপূর্ণ ও চমৎকার হোক না কেন, যদি তা নাট্যঘটনায় অনিবার্য তথা অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠতে না পারে, সেক্ষেত্রে রচনার কাব্যিক অলংকরণ প্রয়োজনহীন এবং তা নাট্যঘটনায় বাহুল্য। আধুনিককালে অধিকাংশ সমালোচকই কাব্যনাটকে কাব্যগুণ নাট্যগুণের অনুবর্তী ক্রিয়া হিসেবে গ্রহণ করেছেন। যেসব ক্ষেত্রে গদ্যসংলাপে নাট্যঘটনা বা বিষয়বস্তু উপস্থাপন করা সম্ভব; সেক্ষেত্রে এলিয়ট কাব্যভাষায় নাটক রচনারই পক্ষপাতী নন। বরং এসব ক্ষেত্রে তিনি কাব্যনাটক না লেখার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন,- 'From this it follows that no play should be written in verse for which prose is dramatically adequate.'১২ অর্থাৎ যেসব বিষয়, ঘটনা বা কাহিনী গদ্যসংলাপাত্মক নাটকে প্রকাশ করা সম্ভব, সেক্ষেত্রে কাব্যভাষায় নাটক রচনা না করাই শ্রেয়। তবে আধুনিক যুগের জীবনবাস্তবতায় কাব্যনাটক রচনার উপাদান হরহামেশা পাওয়া সম্ভব। যান্ত্রিক যুগের এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে কবি ও নাট্যকারের একীভূতসত্তা কাব্যনাট্যের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেছে।
বাংলা কাব্যনাটকের উৎস-সন্ধান
আধুনিক বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাস দীর্ঘ নয়; বর্তমানকাল পর্যন্ত বাংলা নাটকের ইতিহাস মাত্র দুই শত বছরের। ভারত উপমহাদেশে একাদশ শতক পর্যন্ত সংস্কৃত নাটকের চর্চা সম্ভবত ছিল। কিন্তু দ্বাদশ শতকে উপমহাদেশে মুসলমান শাসকদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় উচ্চবর্ণের সংস্কৃত ভাষার পৃষ্ঠপোষেকেরা শাসনক্ষমতা হারিয়ে সংস্কৃত ভাষার বদলে আরবী-ফারসী ভাষা শিখতে বাধ্য হয়। কেননা মুসলমান আমলে রাজ্য পরিচালনায় এবং সরকারি কার্যক্রমে আরবী-ফারসী ভাষার প্রচলন ঘটে।১৩ এর ফলে মুসলিম শাসনামলে উপমহাদেশে সংস্কৃত ভাষা চর্চা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।১৪ ফলে এ সময় সংস্কৃত সাহিত্যের সব শাখার ন্যায় নাট্যসাহিত্যেরও বিলোপ ঘটে। তাছাড়াও সংস্কৃত নাট্যসাহিত্যের ক্ষয়িষ্ণুতার পশ্চাতে লোকমুখের ভাষার সাথে সংস্কৃত ভাষার বিস্তর তফাৎ এবং নাট্যসংলাপ রচনার অনুপযোগিতা অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত। মুসলিম শাসনামলে সংস্কৃত নাটকের প্রচার-প্রসার দ্রুত সঙ্কুচিত হতে থাকে। সংস্কৃত নাটকের এই পরিণতির জন্য অনেক সমালোচকই মুসলমান শাসকদের দায়ী করেছেন।১৫ তারা মনে করেন, মুসলিম শাসকেরা নাটক পছন্দ করতো না- ফলে দ্বাদশ শতাব্দী থেকে আরম্ভ করে প্রায় ছয় শত বছর নাট্যসাহিত্যের চর্চা বন্ধ ছিল। কিন্তু ড. নীলিমা ইব্রাহিম এ ব্যাপারে ভিন্ন মত পোষণ করে বলেছেন,
... মুসলমান আমলে যে নাটক বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং তার কারণ তাঁদের ধর্মীয় নিষিদ্ধতা এ যুক্তি খাটে না। যুগে যুগে সামাজিক পারিপার্শ্বিকতার প্রভাবে আমোদ প্রমোদ বিলাস ব্যসনেরও রূপ পরিবর্তিত হয়। সম্ভবতঃ সংস্কৃত থিয়েটার বা নাটকের অভিনয়রীতি পরিবর্তিত হয়ে এ রাজদরবার থেকে লোকালয়ে সাধারণ মানুষের সমাজে নেমে আসবার জন্যে এর প্রকৃতি পরিবর্তিত হচ্ছিল। পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক কাহিনী সম্বলিত সংস্কৃত নাটক ধীরে ধীরে সাধারণ লোকের মুখের ভাষা ও তার দাবির কাছে নি®প্র্রভ ও প্রভাবহীন হ’য়ে পড়ছিল। তাই সর্বজন বোধ্য আমোদ প্রমোদের দাবিতেই হয়ত সংস্কৃত নাটক তার স্থান হারিয়ে ফেলেছিল। ... সুতরাং মুলমান ধর্মাবলম্বী শাসকের প্রতিবন্ধকতায় যে নাট্যমঞ্চ থেকে সংস্কৃত নাটক বিদায় নিয়েছিল এ ধারণা সম্ভবতঃ সত্য নয়।১৬
আধুনিক বাংলা নাটকের বিকাশে সংস্কৃত নাট্যসাহিত্যের প্রত্যক্ষ কোনো প্রভাব নেই; তবে বাংলা নাটকের সঙ্গে সংস্কৃত নাটকের পরোক্ষ সম্পর্ক ও প্রভাবের কথা একেবারে অস্বীকার করা যায় না। কেননা ঊনিশ শতকের গোড়ার দিকে কিছু সংস্কৃত নাটক মঞ্চস্থ হয়; তবে এগুলো সংস্কৃত নাটক হলেও মঞ্চায়নের সময় নাটকগুলো বাংলা ভাষায় অনুদিত হয়েছিল। এছাড়া বাংলা নাটকের প্রাথমিক যুগে সংস্কৃত নাটকের অনুকরণে কেউ কেউ নাটক রচনার চেষ্টা করেছেন কিন্তু তাঁরা বাংলা নাট্যসাহিত্যের মূলধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারেন নি।
বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে ইউরোপীয় সাহিত্যের সরাসরি সম্পর্ক স্থাপনের পরই বাংলা নাটকের পথ চলা শুরু হয়। এই নিরিখে বলা যায়, ঊনিশ শতকের পূর্বে আধুনিক-অর্থে বাংলা সাহিত্যে নাট্যশিল্পের যথার্থ কোনো চর্চা হয় নি। ঊনিশ শতকে বাংলা নাটকের যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা কখন সংস্কৃত আর কখন পাশ্চাত্য নাট্যরীতি অনুসরণ করে বিকশিত হয়ে উঠছিল। বাংলা নাটক যখন স্বীয় ঐতিহ্যে সৃজ্যমান হলো, তখন বাংলানাটকেও সমাজ মানসচেতনার প্রবেশ ঘটে।১৭ বাংলা সাহিত্যের আদি-নিদর্শন ‘চর্যাপদ’ এবং মধ্যযুগের ধর্মনির্ভর মঙ্গলকাব্যে কিছু নাট্য-উপাদান ছিল। বিশেষত মধ্যযুগের দেব-দেবীর প্রশংসাসূচক মঙ্গলকাব্য, গাঁথাকাব্য, কাহিনীকাব্য ও ময়মনসিংহ গীতিকায় প্রচুর পরিমাণে নাট্যউপাদান পাওয়া যায়। বাংলানাটকের বিকাশে-বিবর্তনে এসব কাব্যের ভূমিকা একেবারে অস্বীকার করা যায় না।১৮ তারপরও দেখা যায়, বাংলা নাট্যসাহিত্যের বিকাশ ঘটেছে, ইউরোপীয় সাহিত্যের প্রত্যক্ষ প্রভাবে। মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-’৭৩) পাশ্চত্য নাট্যানুকরণে শর্মিষ্ঠা (১৮৫৯) নাটক রচনার মধ্যদিয়ে আধুনিক বাংলা নাটকের গোড়াপত্তন করেন।১৯ ‘মধুসূদনের পূর্বে বাংলানাটকের যথার্থ এবং পরিপূর্ণ রূপ দেখা যায় নাই। তাঁহার পূর্ব পর্যন্ত যে সব নাটক রচিত হয়েছিল, সেগুলিকে নাটক না বলিয়া নাটকের আভাস বলাই সঙ্গত।’২০ মধুসূদন রচিত নাটকগুলোতে কবিতার ছন্দ-তাল-লয়-সুর সবই ছিল, সাধারণ-অর্থে যা কাব্যনাটকের উপাদান হিসেবে বিবেচ্য। অর্থাৎ মধুসূদনের নাটকে কাব্যগুণ ও নাট্যগুণের সমন্বয় তাঁর অবচেতনে এবং অসচেতনতায় ঘটেছে। এছাড়া তাঁর তিলোত্তমাসম্ভব (১৮৬০) কাব্যগ্রন্থেও যথেষ্ট পরিমাণে নাট্যগুণ বিদ্যমান। মধুসূদন রচিত শর্মিষ্ঠা-য় বাংলা নাট্যসাহিত্যের যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতে সমৃদ্ধ হয়েছে।
বাংলা সাহিত্যে কাব্যনাটকের প্রাথমিক বিকাশপর্যায় থেকেই বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছিল। বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথমে কাব্যনাট্য চর্চার প্রয়াস পেয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের নাট্যপ্রতিভা সম্বন্ধে সন্দেহের অবকাশ না থাকলেও তাঁর রচিত কাব্যনাট্য বিষয়ে সমালোচকদের মধ্যে মতপার্থক্য আছে।২১ একথা সত্য যে, বাংলা নাট্যসাহিত্য ইউরোপীয় নাট্যসাহিত্যের প্রভাবে বিকাশ লাভ করেছে। অর্থাৎ বাংলা সাহিত্যে আধুনিক বাংলানাটক পাশ্চাত্য প্রভাবিত সাহিত্যের অভিনব সংযোজন। মাইকেল মধুসূদন দত্তই আধুনিক বাংলা নাটকের পথিকৃৎ। তিনি শর্মিষ্ঠা ছাড়াও পদ্মাবতী (১৮৬০), কৃষ্ণকুমারী (১৮৬১), মায়াকানন (১৮৭৪) প্রভৃতি নাটক রচনা করেছেন। তাছাড়া মধুসূদনের কাব্যগুলোতেও নাটকীয় গুণাবলির অভাব নেই। মধুসূদন সংস্কৃত নাটকের ঘোরবিরোধী ছিলেন, এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। তিনি বেলগাছিয়ার নাট্যমঞ্চে অভিনীত সংস্কৃত রত্নাবলী নাটককে অলীক এবং কুনাট্য বলে অভিযুক্ত করেছেন।২২ অথচ তাঁর প্রথম জীবনের রচনা শর্মিষ্ঠা-য় সংস্কৃত নাটক রত্নাবলী, মালবিকাগ্নিমিত্রম এবং প্রিয়দর্শিকা-র প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। তাছাড়া মধুসূদনের পদ্মাবতী নাটকের সঙ্গে মহাকবি কালিদাস রচিত অভিজ্ঞান শকুন্তলম নাটকের সাদৃশ্য কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। তাঁর কৃষ্ণকুমারী নাটকে সংস্কৃত নাটকের প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম। তথাপি মধুসূদনের নাট্যচিন্তায় সংস্কৃত নাটকের প্রভাব অনস্বীকার্য।
বাংলা নাট্যসাহিত্যে কাব্যনাটকের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও গঠনশৈলীর প্রাথমিক প্রভাব রবীন্দ্রনাথের নাট্যচর্চায় পাওয়া যায়। তখনো আধুনিক কাব্যনাট্যের জনক টি.এস. এলিয়টের কাব্যনাটকগুলো প্রকাশিত হয় নি, এমনকি কবি লোরকা’র সঙ্গে তখনো বাংলা সাহিত্যের পরিচয় ঘটে নি। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ স্বীয় প্রতিভা ও অভিজ্ঞতার আলোকে ‘কাব্যনাট্যে’র স্বরূপ বোঝার চেষ্টা করেছিলেন। তবে তিনি সাহিত্যের এই প্রকরণে খুব একটা মনোযোগী হন নি। এজন্য অবশ্য কবির যুগপরিবেশ এবং তাঁর নাট্যচেতনা দায়ী। তবে সামগ্রিক বিচারে দেখা যায়, রবীন্দ্রনাথের প্রায় সবগুলো নাটকেই কাব্যময়তা এবং কবিতার সুর বিদ্যমান। তিনি কাব্যনাটকের সচেতন চর্চা করলে হয়তো বা বাংলা সাহিত্যে সার্থক কাব্যনাটকের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটত।২৩
বাংলা নাট্যসাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের কাল পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাল। তারপরও বাংলা নাট্যসাহিত্যের মহিমা প্রতিষ্ঠায় রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বলা বাহুল্য, সাহিত্যের ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথ এক বিস্ময়কর প্রতিভা। যাঁর একক হাতে উপন্যাস, ছোটগল্প, কবিতা, নাটক, নৃত্যনাট্য, গীতিনাট্য, গান এবং আধুনিক-অর্থে না হলেও কাব্যনাটক রচিত হয়েছে। তাঁর একক সৃষ্টিসম্ভারে বাংলা সাহিত্যের প্রায় সকল শাখার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত, বিকশিত এবং সমৃদ্ধ হয়েছে। তবে তাঁর প্রধান পরিচয়, তিনি গীতিকবি। এ প্রসঙ্গে ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য মন্তব্য করেছেন,
... নাটক রবীন্দ্র-প্রতিভার স্বক্ষেত্র হইতে উৎসারিত হয় নাই, তাঁহার প্রতিভারও স্বক্ষেত্র ছিল গীতিকবিতা। তথাপি নাটক রচনার মধ্যে তাঁহার কবি-মানসের সমগ্র প্রেরণাই মুদ্রিত হইয়া আছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁহার কবি-মানসকে বিসর্জন দিয়া তাঁহার নাটক রচনা করেন নাই বলিয়াই তাঁহার নাট্যরচনা একান্ত গীতিধর্মী হইয়াছে। তবে এ’কথা সত্য মধুসূদন যেমন অন্যের অনুরোধে অন্যের মনস্তুষ্টির জন্য নাটক রচনা করিয়াছেন, রবীন্দ্রনাথ তাহা করেন নাই- রবীন্দ্রনাথ গীতিকবিতার প্রেরণাতেই নাটক রচনা করিলেও তাঁহার নিজের প্রেরণাতেই তাহা করিয়াছেন, অন্যের অনুরোধে, অন্যের মনস্তুষ্টির জন্য তাহা করেন নাই।২৪
রবীন্দ্র-প্রতিভার মূল ঝোঁক বা প্রবণতা ছিল কবিতা রচনায়। বিশেষত গীতিকবিতা রচনায় তিনি অসামান্য সাফল্যের সাক্ষর রেখেছেন। ফলে তাঁর সব ধরনের রচনায়, কাব্যসুরের অনুরণন আছে। তাঁর এই স্বভাবগত কাব্যধর্মিতা দ্বারা নাটকও প্রভাবিত হয়েছে। এজন্যই রবীন্দ্রনাথের প্রায় সবগুলো নাটকেই কাব্যোপাদান পাওয়া যায়। উল্লেখ্য, তাঁর হাতে আধুনিক-অর্থে সার্থক না হলেও বাংলা সাহিত্যের প্রথম কাব্যাঙ্গিকে প্রকৃতির প্রতিশোধ (১৮৮৪) নাটক রচিত হয়েছে। তিনি প্রকৃতির প্রতিশোধ-এর সফল মঞ্চায়নও করেছেন। সাহিত্যজীবনের শুরু থেকেই তিনি আখ্যানকবিতা, গীতিকবিতার পাশাপাশি নাটক রচনায় উৎসাহী ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ প্রথম জীবনে নাট্যকবিতা রচনাতেও আগ্রহবোধ করেছিলেন। এজন্য তাঁর হাতে গান্ধারীর আবেদন (১৮৯৭), সতী (১৮৯৭), নরকবাস (১৮৯৭), কর্ণ-কুন্তী সংবাদ (১৯০০) প্রভৃতি নাট্যকবিতাও রচিত হয়েছে। এসব কবিতার বাহ্যাবরণে নাট্যগুণ এবং অন্তর্প্রকৃতিতে কাব্যগুণ ফল্গুধারার ন্যায় প্রবহমান। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাব্যগুণই প্রাধান্য লাভ করেছে। ফলে এগুলো আধুনিক-অর্থে কাব্যনাটকের মর্যাদা পায় নি। ‘তবু রবীন্দ্রনাথ তাঁর স্বাভাবিক কবিধর্মের সঙ্গে নাট্যবোধ মিলিয়ে এমন এক ধরনের রচনা লিখেছেন, যার মধ্যে আধুনিক কাব্যনাটকের কিছু কিছু লক্ষণ ও পরবর্তী সম্ভাবনা আভাসিত হয়েছে।’২৫ তিনি সাহিত্যক্ষেত্রে আজীবন উদ্ভাবনী প্রক্রিয়ায় নিয়োজিত ছিলেন। একসময় নাট্যকবিতা ছেড়ে দিয়ে, তিনি স্বভাবসুলভ কাব্যধর্মী ভাষায় গদ্যনাটকেরও চর্চা করেছেন। ফলে বাংলাসাহিত্যে সার্থক কাব্যনাটক বিকাশ তরান্বিত হয়েছে। তাঁর গদ্যসংলাপাত্মক শারদোৎসব (১৯০৮), রাজা (১৯১০), ডাকঘর (১৯১২), মুক্তধারা (১৯২২), রক্তকরবী (১৯২৬) প্রভৃতি নাটকে কাব্যনাট্যের উপাদান উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বিদ্যমান। এই নাটকগুলো দৃশ্যত গদ্যভাষায় রচিত হলেও সংলাপে ব্যবহৃত গদ্য, কাব্যের উত্তুঙ্গ সীমাকে স্পর্শ করেছে। এসব নাটকের সংলাপে ব্যবহৃত ভাষা কাব্যধর্মী এবং নাট্যাভ্যন্তরে কাব্যময়তা জড়িয়ে আছে। রবীন্দ্রনাথের নাট্যকবিতা প্রসঙ্গে সমালোচক বলেন,-
রবীন্দ্রনাথের নাট্যকবিতায় সাধারণভাবে কাব্যগুণের প্রাধান্য থাকলেও কাব্যের ব্যবহার ঠিক সেই তাৎপর্যে ঘটে নি। কাব্য-সংলাপ সেখানে প্রকাশের একটি মাধ্যম মাত্র। ... মুক্তধারা, রক্তকরবী প্রভৃতি নাটক এদের বক্তব্য, পরিবেশ, ঘটনা সংস্থান, কাব্যময় সংলাপ ইত্যাদি নিয়ে একেবারে আদ্যন্ত কবিতায় সংস্থাপিত বলা যায়। আর এখানেই এরা আধুনিক কাব্যনাটকের সগোত্র হয়ে উঠেছে।২৬
রবীন্দ্রনাথের শারদোৎসব, রাজা, ডাকঘর, মুক্তধারা, রক্তকরবী প্রভৃতি নাটক সার্থক আধুনিক কাব্যনাটকের মর্যাদা পাওয়ার যোগ্য নয়। তবে রবীন্দ্রনাথ এসব নাটকের কাব্যগন্ধী গদ্যে নাটক রচনার প্রাথমিক প্রয়াস গ্রহণ করায়, বাংলা সাহিত্যে গদ্যসংলাপে কাব্যনাটক রচনার দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের পরে তিরিশের দশকের কবি বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-’৭৪) সর্বপ্রথম গদ্যসংলাপে কাব্যনাটক রচনার সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।২৭ বুদ্ধদেব বসুর পরেও স্বল্পসংখ্যক নাট্যকারের গদ্যসংলাপাত্মক নাটকে কাব্যনাটকের বৈশিষ্ট্য ও লক্ষণ পাওয়া যায়। অতএব সংখ্যায় নগণ্য হলেও গদ্যসংলাপাত্মক কাব্যনাটক বাংলা সাহিত্যে একেবারে দুর্লক্ষ্য নয়।
বাংলা সাহিত্যে পাশ্চত্য প্রভাবিত নাট্যসাহিত্যের হাত ধরেই যেহেতু কাব্যনাটকের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তাই বাংলাসাহিত্যের ক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার, ‘...কাব্যনাট্যকার, যদি বিকৃত আরবানাইজেশনের ফলে দ্রুত অপসৃয়মান লোকরীতি কবিত্বময় বাণী ইত্যাদি এবং (আধুনিক নয়) সাবেকী যাত্রা পালাগান অবলুপ্ত কীর্তন এবং লোককথা থেকে উপাদান সংগ্রহ করতে না পারেন, তবে বাংলা কাব্যনাটক কখন তার নিজস্ব ফর্ম খুঁজে পাবে না। ইওরোপের সংস্কৃতি বিশ্ব-সংস্কৃতি হতে পারে না। আইরিশ ও লোরকার নাটক তার বড় প্রমাণ।’২৮
সামগ্রিক এই আলোচনায় প্রতীয়মান হয়, বাংলা সাহিত্যে কাব্যনাট্যের ধারা মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মোহিতলাল মজুমদার (১৮৮৮-১৯৫২), জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪), সুশীল রায় (১৯১৫-’৮৫), অমিয় চক্রবর্তী (১৯০১-’৮৭) প্রমুখ কবির বিভিন্ন রচনার মধ্যদিয়ে ক্রমশ বিকশিত হয়ে উঠেছে। প্রসঙ্গত মনে রাখা দরকার, বিশ শতকের পঞ্চাশ দশকের পূর্ব-পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যে কাব্যনাট্যধারা প্রতিষ্ঠা পায় নি। সুতরাং বলা যায়, বাংলা সাহিত্যে বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে কাব্যনাটকের সার্থক চর্চা হয়েছে।
কাব্যনাটকের মঞ্চায়ন
কাব্যনাটক যেমন শুধু কাব্য নয় তেমনি শুধু নাটকও নয়। এখানে কাব্য এবং নাটকের সুষম সমন্বয় ঘটা কাব্যনাটকের জন্য অপরিহার্য শর্ত। এলিয়টের কথা, কাব্যগুণ অবশ্যই নাট্যগুণের অনুগামী হবে। বাংলাসাহিত্য পাশ্চাত্যের তথা এলিয়টের অন্ধ-অনুকরণের মাধ্যমে যে আধুনিকতার চর্চা করেছে, সেখানে এলিয়টের কাব্যনাট্য বিষয়ক তত্ত্ব বেদবাক্যের ন্যায় মেনে নেয়া হয়েছিল।২৯ বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে এলিয়টের মত সর্বাংশে গ্রহণীয় হতে পারে না এবং হয়ও নি। অর্থাৎ বাংলা কাব্যনাটকের ক্ষেত্রে তাত্ত্বিক ফাঁক প্রথমাবধিই বিদ্যমান ছিল। যার ফলে বাংলা সাহিত্যে অধিকাংশ কাব্যনাটকে কবিত্বগুণ প্রাধান্য লাভ করেছে। সুতরাং বাংলা কাব্যনাটকের ক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের এই মতামত সর্বাংশে গ্রহণ করা সমীচীন নয়। বাংলা কাব্যনাট্য প্রাথমিক পর্যায়ে পাশ্চাত্যের প্রভাবে সৃষ্টি হলেও ধীরে ধীরে এদেশীয় রীতি-পদ্ধতির সাথে একাত্ম হয়েছে। সেক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের মতো বাংলা কাব্যনাটক সরাসরি নাট্যগুণের অনুগ, একথা বলা যায় না। বাংলা কাব্যনট্যের ক্ষেত্রে উভয় শিল্পরীতির প্রভাব প্রায়শ সমান সমান এবং কোনো কোন ক্ষেত্রে কাব্যই প্রাধান্য লাভ করেছে। কিন্তু এলিয়ট মনে করেন, সাধারণ নাটকের মতোই কাব্যনাটকের বাহ্যাবরণ থাকতে হবে। তবে নাটকীয় বাহ্যাবরণকে কাব্যনাটক অন্তরস্থ উপলব্ধিজাত গভীরতর জাগতিক বাস্তবতায় প্রকাশ করবে। সুতরাং কাব্যনাটকের প্রকরণ দ্বি-স্তর বিশিষ্ট; যা তাকে গদ্যনাটক থেকে আলাদা করেছে। তবে পরিকল্পিতভাবে রূপক-সাংকেতিক নাটকের মতো কাব্যনাটকে বাস্তবজগতকে প্রচ্ছন্ন করা হয় না; বরং কাব্যনাটকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বস্তুবিশ্বের বাস্তবতা অবলুপ্ত হয়। আর তাই কাব্যনাটকের ভাষা সম্বন্ধেও এলিয়ট যথেষ্ট উদ্বিগ্ন ছিলেন।৩০ তাঁর মতে, কাব্যনাটক এমন কাব্যভাষায় রচিত হবে, যে ভাষায় সব ধরনের বক্তব্যই নাট্যঘটনায় ও নাটকীয়তায় ফুটিয়ে তোলা যাবে। আবার সেই কাব্যভাষার প্রতি দর্শক-শ্রোতা যেন অতিমাত্রায় ঝুঁকে না পড়ে, সেদিকেও সচেতন থাকা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে নাট্যপরিস্থিতির কারণে কাব্যগ্রন্থি শিথিল হলেও অসুবিধা নেই; কিন্তু কাব্যভাষাকে অবশ্যই নাট্যপরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয়ে উঠতে হবে। এ প্রসঙ্গে কবি সমালোচক শঙ্খ ঘোষ উল্লেখ করেন,
যে কোনো মুহূর্তে ভাবনা বা অনুভব অনুকূল গাঢ়তায় প্রবেশ করতে পারে, এমন কাব্যভাষা তাই নির্মাণ করতে হবে কাব্যনাট্যে, তার জন্য স্থিতি-স্থাপক নম্য এক ছন্দের প্রয়োজন এবং এর দ্বারা একদিকে যেমন নাটকে জীবনচিন্তার সাময়িকতা ও কবিকল্পনার চিরন্তনতা যুক্ত হবে, অন্যদিকে তেমনি কবিতার জগৎ-ও প্রসারিত হবে বহুদূর। নিছক ব্যক্তিগত আবেগ থেকে কবিতাকে সরিয়ে আনা প্রয়োজন, তাকে স্থাপনা করা উচিত বস্তুগত ক্রিয়াশীলতার মধ্যে, এই আধুনিক কাব্যচিন্তারও একটি সক্ষম প্রকাশ তাই দেখতে পাব আধুনিক কাব্যনাট্যে।৩১
আধুনিক কাব্যনাটকের উৎসের দিকে তাকালে স্পষ্ট বোঝা যায়, পদ্যসংলাপাত্মক নাটক থেকেই এর যাত্রা শুরু হয়েছিল। তবে কালের বিবর্তনে কাব্যনাটকও পরিবর্তিত হয়ে আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতার বিজ্ঞানমনস্ক নাগরিক জটিল মানবজীবনের সঙ্গে ভাষাগত ও প্রকরণগত সমন্বয় করে নিয়েছে। আধুনিক যুগের কাব্যভাষায় যে দুর্বোধ্যতা, তা শুধু পাঠকের অশিক্ষার জন্য নয়; বরং শব্দার্থের সহায়ক ব্যঞ্জনায় স্বতঃস্ফূর্ত ভাব সঞ্চারণের অক্ষমতার জন্য অনেকে কবিতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু এ পরিস্থিতিতেও কমবেশি সকলেই নাটকের দর্শক। আধুনিক কবিতায় অদীক্ষিত মানুষকে পুনরায় কবিতামুখি করে তোলার জন্য কবিদের মধ্যে তীব্র তাড়না ছিল। এজন্যই আধুনিককালে কবিগণ কবিতার দৃশ্যরূপ রচনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। এছাড়াও অন্তর্নিহিত কারণ হিসেবে মনে করা যায়, কবির স্বীয় চেতনাকে দৃশ্যরূপে দেখার দুর্মর বাসনাও ছিল। ‘অনুভবেদ্য যে উপলব্ধি যা সত্য হয়ে ওঠে কবির চেতনায়, তার কি কোন শরীরী সত্তা আছে? সাধারণ অর্থে নিশ্চয়ই নেই। একজন পাঠক বহু সাধনায় তাকে হৃদয়ঙ্গম করেন শুধু। সেই রহস্যময় অন্তর্লোক, যাকে পরিস্ফূট দৃশ্যরূপে দেখা, বহুদিনের সেই ইচ্ছা, সম্ভব হল কাব্যনাট্যে। অন্তর্চেতনার বাণীরূপ এতদিন সত্য ছিল, তার দৃশ্যরূপ সম্ভব হল কাব্যনাট্যের আঙ্গিকে।’৩২
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিককালে বিষয়গত বৈচিত্র্যে কাব্যনাটক অন্তর্বাস্তবতাকে উচ্চতর বাস্তবতায় প্রকাশের তাগাদায় ঐতিহাসিক, পৌরাণিক কাহিনী, লোকায়ত জীবন কিংবা কাল্পনিক ঘটনা প্রকাশের মতো শিল্পাঙ্গিক খুঁজে নিয়েছে। পৌরাণিক কাহিনী এবং চরিত্রগুলোকে আধুনিককালের বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বিনির্মাণ করা হয়েছে। ফলে প্রাচীন পুরাণের ঘটনা ও চরিত্রেরও এ কালের মানবজীবনের আশা-আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটেছে। পুরাণকে আধুনিক বাস্তবতায় ব্যবহারও আধুনিক সাহিত্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কাব্যনাটকের জনক এলিয়ট নিজেও কাব্যনাট্যের বিষয়বস্তু হিসেবে দৈনন্দিন পারিবারিক জীবনের ঘটনা অবলম্বনে ককটেল পার্টি রচনা করেছেন। আবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনের মহল ছেড়ে মহান দেশনায়কের জীবনকাহিনীও গ্রহণ করেছেন। এলিয়টের কাব্যনাটকের বিষয় নির্বাচন থেকে প্রতীয়মান হয়, যেসব ঘটনার মধ্যে নাটকের উপাদান আছে সেসব ঘটনায় কাব্যনাট্যেরও উপাদান বিদ্যমান। তবে কাব্যনাট্যে বহির্বাস্তবতার চেয়ে অন্তর্বাস্তবতা প্রাধান্য পায়। অতএব পরিচিত বস্তুজাগতিক জীবনকাহিনীও কাব্যনাটকে উঠে আসতে পারে। তবে এতে চরিত্রের জাগতিক জীবনের অন্তর্নিহিত বাস্তবতার প্রতিফলন অবশ্যই ঘটবে। অর্থাৎ এলিয়ট চরিত্রের অন্তর্গত সত্যপ্রকাশের ওপর অধিক গুরুত্বারোপ করেছেন। কবিতায় দূর-নিকট, পরিচিত-অপরিচিত, জানা-অজানা ভিন্ন ভিন্ন কবির চেতনায়, প্রবণতায় নানা মাত্রালাভ করে। তাই কবির ভাষিক সৌকর্যে এবং কাব্যিক স্পর্শে পাঠকের নিকট কাছের জিনিসও কখন কখন দূরের হয়ে ওঠে আবার দূরের জিনিসও কাছের হয়ে উঠতে পারে।
কাব্যনাটক জীবন-ঘনিষ্ঠতা স্বীকার করে, তবে কাব্যভাষা ও ছন্দ তাকে কিছুটা সুদূরতা দান করে। এজন্য কাব্যনাটকের কাহিনী বাস্তবজীবন থেকে সংগৃহীত হলেও পরিণতিতে তা বিমূর্ত হয়ে ওঠে। কবি জাগতিক জীবনের গভীর, গূঢ় অন্তর্গত সত্যের সন্ধান করতে গিয়ে কাব্যভাষাকে নাট্যধর্মের গুণে সিক্ত করে যে শিল্প নির্মাণ করেন, তাই ‘কাব্যনাটক’। তবে কাব্যনাটকের ভাষা গদ্য না পদ্য হবে এ বিষয়ে বিতর্কের অবসান আজো হয় নি; কিংবা এ বিতর্ক অবান্তর। কেননা সাহিত্যে এ জাতীয় সমস্যা এবং বিতর্ক নিত্যকার ব্যাপার। তবে সন্দেহাতীত রূপে বলা যায়, আধুনিক কাব্যনাটক জীবনের যে অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির কথা বলতে চায়, তা 'discursive prose'-এর মাধ্যমে অর্থাৎ প্রবন্ধে ব্যবহৃত গদ্যে রচিত হতে পারে না। তাছাড়া সাধারণ কাব্যভাষাও আধুনিক কাব্যনাটকের সম্পূর্ণ ভাবপ্রকাশের সহায়ক বলে বিবেচনা করা যায় না। নাট্যসাহিত্যের ক্ষেত্রে সংলাপের ব্যঞ্জনা ও 'dramatic relevance' বা নাটকীয় প্রাসঙ্গিকতা থাকা বাঞ্ছনীয়। তথাপি এ কথা সত্য যে, নাট্যকাহিনীর অনিশ্চিত আকস্মিকতা, ঘটনার তীব্র প্রবাহ, সংঘাত এবং চরিত্রের দ্বন্দ্ব কাব্যনাটকে অনেক মৃদু। নাটকে কাহিনীর ওপর নির্ভরতা অধিক, কিন্তু কাব্যনাটকের ভাবতন্ময়তা বাচ্যার্থকে পেরিয়ে অনুভববেদ্য ব্যঞ্জনাকে ফুটিয়ে তুলতে চায়। ‘... কাব্যনাট্যে কবিতা ভাবের শরীরকে জড়িয়ে রাখে নাটক সেখানে সহায়, দুটি সত্তা সেখানে এক দেহে লীন। নাটকে কাহিনী বা চরিত্রকে প্রত্যক্ষ করে তোলা লেখকের কৃত্য, কবিতা সেখানে শুধু সহায়ক, কাব্যনাট্যে ভাবের শরীরেই কবিতা ব্যক্ত, কাহিনী কেবল তাকে ছুঁয়ে যায়।’৩৩ অনুভূতির অগম্য তীরে কবিতার পাঠক এবং নাটকের দর্শককে নিয়ে যেতে চায় বলে কাব্যনাটক বহির্বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে সর্বদা অন্তর্বাস্তবতা উদ্ঘাটনে সচেষ্ট। এই বিচারে কাব্যনাটককে এক ধরনের অন্তর্নাটক হিসেবে আখ্যা দেওয়া যায়। যার ফলে কাব্যনাটকের সংলাপে মানব-চরিত্রের অন্তর্সত্য প্রকাশের ওপর অধিক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এলিয়ট মনে করেন, চরিত্রের অন্তর্লোক উন্মোচনের অনিবার্য আকাঙ্খায় কাব্যনাট্যের সংলাপ যখন নাটকীয় পরিস্থিতির গভীরতায় প্রবেশ করে তখন কাব্যভাষাও স্বাভাবিক কথ্যভাষার মতোই অবলীলায় ব্যবহার করা যেতে পারে। অর্থাৎ সেই সংলাপ তখন শুধুমাত্র কবিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, নাট্যকলায় সমন্বিত হয়ে এক ভিন্ন কাব্যভাষার তৈরি করে নেয়। তবে সমকাল এবং বাস্তব জীবনের সাথে এই কাব্যভাষার যোগসূত্র একেবারে ছিন্ন হয়ে যায় না। কবিতার স্বাদ সঞ্চার কিংবা কাব্যসৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্যেই শুধু নয় বরং নাটকের পরিবেশকে সন্নিবদ্ধ করে তোলার জন্য কাব্যনাটকে এ ধরনের কাব্যভাষা অপরিহার্য হয়ে ওঠে।৩৪ গদ্য-পদ্য যাই হোক না কেন, নাট্যকার যখন কবির কল্পনাশক্তি এবং অন্তদদৃষ্টির সাহায্যে জগতজীবনরে কথা নাটকে কাব্যময় করে তোলেন, তখন সেই রচনা অমরত্ব লাভ করে। কবিত্বের প্রভাবেই সম্ভবত গ্রীক নাট্যকলা ও শেক্সপীয়র রচিত নাটকসমূহ ধ্রুপদী মর্যাদা লাভ করেছে। এই কাব্যময়তার জন্যই কাব্যনাটক আধুনিক সাহিত্যের ইতিহাসে সর্বাধিক সম্ভাবনাময় মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃত।
নাট্যকার লিখিত নাটকটির মাধ্যমেই তাঁর বক্তব্যবিষয় ব্যক্ত করেন। কিন্তু কোনো নাটক মঞ্চায়নের জন্য প্রযোজকের অর্থায়নে পরিচালক-নির্দেশক, কুশীলব নিয়োগ এবং পরিশেষে পরিচালক-নির্দেশকের ইচ্ছা ও পরিকল্পনা অনুযায়ী কুশীলবগণ রঙ্গমঞ্চে স্বীয় অভিনয় নৈপুণ্যে নাট্যকাহিনী ফুটিয়ে তোলেন। ‘নাট্যকার নাটক লেখেন, সেই লিখিত নাটক রঙ্গমঞ্চের মাধ্যমে দর্শকের সামনে হাজির হয়। আর নাটক অভিনীত হতে গেলেই, নির্দেশক, রঙ্গমঞ্চ, রঙ্গমঞ্চের নানা উপকরণ ও প্রস্তুতি, অভিনেতা-অভিনেত্রী- এসব কিছুর প্রয়োজন হয়। তাই লিখিত নাটক তার এক-তৃতীয়াংশ মাত্র। দুই-তৃতীয়াংশ রয়েছে নাট্য প্রযোজনার বিবিধ প্রস্তুতি ও সহযোগিতার মধ্যে।’৩৫ ফলে মঞ্চস্থ নাটকটির সাথে নাট্যকারের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। এজন্য কখন কখন মঞ্চস্থ নাটকের সঙ্গে নাট্যকারের মতবিরোধও দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ মঞ্চস্থ নাটক একটি স্বতন্ত্র শিল্প হিসেবে বিচার্য বিষয়। সামগ্রিক বিচারে মঞ্চস্থ নাটক নাট্যকারের একক সৃষ্টি নয়; বরং পরিচালক-নির্দেশক-কুশীলব সকলের যৌথ ও সমন্বিত শিল্প প্রয়াস। কেননা প্রযোজক-পরিচালক-নির্দেশক ও কলা-কুশলীদের সার্বিক সহায়তায় মঞ্চস্থ হয়। তবে পাঠ্য নাটকটি সবসময় স্বাধীন। কেননা লিখিত নাটকটিও সাহিত্যের অন্যান্য শাখার মতোই পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে এবং পাঠক পূর্ণ সাহিত্যরস আস্বাদন করে থাকেন। অতএব বলা যায়, মঞ্চায়ন বাদ দিয়েও নাটক থেকে স্বতন্ত্র শিল্পরূপে সাহিত্যরস আস্বাদন করা সম্ভব। তবে মঞ্চস্থ নাটক (Performing Art) সামাগ্রিক বা যৌথ শিল্পপ্রয়াস। এজন্য মঞ্চস্থ নাট্যশিল্পকে (Perfoming Art) সমন্বিত দলীয় কর্মপ্রয়াস বা ‘টিম-ওয়ার্ক’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। টিমের কোনো একটি অংশের বিশেষ সফলতায় মঞ্চস্থ নাট্যকলার সামগ্রিক সাফল্য নির্ভর করে না; ‘নাট্যায়ন একটি যৌথশিল্প, নাটকের স্ক্রিপ্ট সেখানে একটি অবলম্বন বা সংকেত মাত্র। অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অভিনয় কুশলতা বাক্য প্রক্ষেপণের ঢঙ্ আবহ ধ্বনির ব্যবহার, মঞ্চ সজ্জা এ সবকিছুর সম্মিলিত ফল হল নাটক।’৩৬ কিন্তু নাট্যসাহিত্য একক এবং স্বাধীন শিল্পমাধ্যম। তবে নাট্যসাহিত্যকে মঞ্চস্থ হতে হলে, সুক্ষ্ম এবং নানামুখি সীমাবদ্ধতার মধ্যদিয়ে পথ চলতে হয়। এক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার, নাট্যসাহিত্য শুধুমাত্র মঞ্চস্থ হওয়ার সময় নানা ধরনের সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়, অন্যথায় নয়। এ প্রসঙ্গে সমালোচক বলেন,
নাট্যকারের নাটক তৎকালীন ‘মঞ্চব্যবস্থার’ মধ্য দিয়ে দর্শকের কাছে উপস্থিত হয়। তাহলে নাটক ও দর্শকের মাঝে থেকে যাচ্ছে মঞ্চব্যবস্থা। ‘মঞ্চব্যবস্থা’ কথাটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। সংক্ষেপে ‘মঞ্চব্যবস্থা’ বলতে বোঝায়, সেই যুগের রঙ্গমঞ্চ (Stage); সেই রঙ্গমঞ্চের মধ্যে দৃশ্যসজ্জার ব্যবস্থা, রূপসজ্জা, সাজপোশাকের ব্যবস্থা, আলো ও তার নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা, সেট-সেটিংস, উইংস-এর ব্যবস্থা, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের যোগ্যতা ও প্রতিভা, মঞ্চাধ্যক্ষ তথা পরিচালকের নির্মাণ ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা, প্রযোজক বা অর্থলগ্নী করেন যে বা যারা তাদের মূলধন বিনিয়োগের প্রস্তুতি ও ব্যবস্থা এবং সমকালীন দর্শক সম্প্রদায়ের নাট্যরস উপভোগের মানসিক অবস্থা- এইসব নিয়েই গড়ে সেই সময়কার ‘মঞ্চব্যবস্থা’।’৩৭
নাট্যসাহিত্যের মঞ্চায়নে অনেক সীমাবদ্ধতা-জটিলতা থাকা সত্ত্বেও প্রাচীন কাল থেকে আরম্ভ করে সমসাময়িক কাল পর্যন্ত মঞ্চস্থ নাটকের তথা সামগ্রিকভাবে নাট্যসাহিত্যের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। বলা যায়, সমকালে নাট্যসাহিত্য শিখরস্পর্শী মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। উপরন্তু আধুনিককালে নাট্যসাহিত্য অনন্য শিল্পমাধ্যম হিসেবে সাহিত্যরসিকদের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। নাট্যসাহিত্যের এই জনপ্রিয়তার পশ্চাতে নিঃসন্দেহে এর গঠনগত সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কেননা নাটক একাধারে পাঠ্য এবং অভিনয়যোগ্য শিল্প। সাহিত্যের অন্যান্য শাখার চেয়ে নাটকের গঠনগত উপাদান বেশি। নাট্যসাহিত্যের গঠনগত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সুকুমার সেন বলেন,
এখনকার দৃষ্টিতে সাহিত্যশিল্প ষড়ঙ্গ : নাট্য প্রবন্ধ কবিতা উপন্যাস গল্প ও গান। এগুলির উপাদানের সংখ্যায় নাট্য অপর পাঁচটি অঙ্গ হইতে স্বতন্ত্র। নাট্যের মূল উপাদান তিনটি- লেখক, অভিনেতা ও দর্শক। অপরগুলিতে মূল উপাদান দুইটি করিয়া- প্রবন্ধে, উপন্যাসে ও গল্পে মূল উপাদান দুইটি, লেখক ও পাঠক। আর কবিতায় লেখক ও পাঠক অথবা শ্রোতা; গানে গায়ক ও শ্রোতা। বলা বাহুল্য সর্বত্রই উপাদান সমমাত্রিক।৩৮
নাট্যসাহিত্য মঞ্চায়নের খাতিরে অনেক নিয়ম-কানুন ও রীতি-পদ্ধতি মেনে চলতে বাধ্য। নাট্যসাহিত্য ত্রিমুখি গঠনগত উপাদানের ওপর ভর করে স্বীয় শক্তি-সামর্থ্যে সাহিত্যের অন্যান্য শাখার চেয়ে ঋদ্ধ ও গুরুত্বপূর্ণ; বিশেষত সমাজমানস গঠনের মতো প্রায়োগিক ক্ষেত্রে নাট্যসাহিত্যের ভূমিকা সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। সাধারণত নাটকে চিত্রিত জীবন আত্মকেন্দ্রিক কোনো ব্যক্তিজীবনের চিত্র নয়; বৃহত্তর সামাজিক জীবন নাট্যসাহিত্য গভীর মমতায় ধারণ করে। সামাজিক জীবন আবার বিশেষ দেশ-কাল এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থার অধীন। ফলে নাট্যসাহিত্যে সমাজমানসের সামগ্রিক চিত্র প্রতিবিম্বিত হয়। আর যে সাহিত্যমাধ্যম সমাজমানসকে যত বেশি স্পর্শ করে, তার জনপ্রিয়তা, প্রয়োজনীয়তা তত বেশি বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ জীবনের প্রায়োগিক ক্ষেত্রে নাট্যশিল্পের বা ‘পারফর্মিং আর্ট’-এর ভূমিকা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ; বিশেষত সাহিত্যের অন্যান্য শাখার চেয়ে সমাজজীবনে নাট্যসাহিত্যের প্রভাব অধিকতর। নাট্যসাহিত্য একাধারে পাঠ্য ও দৃশ্য উভয় শিল্পের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায়, মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও নাটক অন্যান্য সাহিত্যমাধ্যমের চেয়ে অনেক বেশি প্রভাব ফেলতে সক্ষম। কিন্তু নাট্যসাহিত্যকে দৃশ্যায়ন যোগ্যতা অর্জনে নানান শর্তের মুখোমুখী হতে হয়। নাট্যকলার সীমাবদ্ধতাগুলোকে এভাবে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে-
ক. নাটক মঞ্চস্থ হয় বলে নাট্যকার দর্শকের ধৈর্যচ্যুতির বিষয়টি বিবেচনায় রেখে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংলাপের সাহায্যে কাহিনীর উন্মেষ, বিকাশ ও পরিণতি ঘটাতে বাধ্য হন। অর্থাৎ নাট্যকার পূর্বনির্ধারিত সময় সংক্রান্ত ধরাবাঁধা নির্দিষ্ট ছক মেনে চলেন। সাহিত্যের অন্যসব শাখাতেই লেখকের সময়ের ব্যাপারে পূর্ণস্বাধীনতা থাকে; অথচ নাট্যকারের কাঁধের ওপর সময়ের খড়্গ সর্বদা উদ্যত।
খ. নাটক ও নাট্যকার প্রায়শই প্রযোজক-নির্দেশকের মুখাপেক্ষী থাকেন। এজন্য নাটক মানসম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও প্রযোজক আর্থিক সংকটের কারণে দক্ষ পরিচালক-নির্দেশক ও কুশীলব নিয়োগ করতে ব্যর্থ হলে- নাটকের বক্তব্যবিষয় ফুটিয়ে তোলা অসম্ভব হয়ে পড়ে। অতএব আর্থিক সংকটে পড়েও নাট্যশিল্প ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে।
গ. নাটক সংলাপ-নির্ভর সাহিত্য; রঙ্গমঞ্চে নট-নটীর অভিনয়দতার ওপর নাট্যসংলাপের অন্তর্নিহিত ভাব প্রকাশ পায়। এক্ষেত্রে অভিনয়ে অনভিজ্ঞ কুশীলবগণ কর্তৃক নাটক অভিনীত হলে- নাটকের মূলভাব, বক্তব্যবিষয় নাও বিকশিত হতে পারে।
ঘ. নাট্যশিল্পে মঞ্চসজ্জার ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিকল্পিত দৃশ্যের পরিবেশ তৈরি করার মতো মঞ্চের প্রযুক্তিগত ও কারিগরী সহায়তা প্রয়োজন। অর্থাৎ দৃশ্য উপস্থাপনের সহায়ক কারিগরী ও প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধা না থাকলে নাট্যশিল্প আরেক দফা হুমকির সম্মুখীন হয়।
ঙ. ভাষার প্রাঞ্জলতা নাট্যসংলাপের অন্যতম প্রধান শর্ত। অভিনয়যোগ্য শিল্প বলে, নাটকের সংলাপ দর্শক-শ্রোতার বোধগম্য সহজ-সরল সাধারণ ভাষায় রচিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। সংলাপ রচনার ক্ষেত্রেও নাট্যকার যথেষ্ট সচেতন ও হিসেবি থাকতে বাধ্য হন। কেননা সংলাপের ভাষা দুর্বোধ্য হলে নাট্যকাহিনী, বিষয়বস্তু, এবং বক্তব্য থিয়েটার হলের সাধারণ দর্শক-শ্রোতা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হবে। পাঠ্যসাহিত্যের ক্ষেত্রে অভিধান দেখার সুযোগ থাকে এবং বারবার অধ্যয়নেরও অবকাশ আছে; কিন্তু নাট্যসংলাপ দর্শক-শ্রোতার সামনে মাত্র একবার প্রকাশের সুযোগ পাওয়া যায়। অর্থাৎ থিয়েটার হলে- দর্শক দ্বিতীয়বার নাট্যসংলাপ শোনার সুযোগ পায় না। তাছাড়া থিয়েটার হলে অভিধান দেখারও সুযোগ নেই। এজন্য সংলাপ রচনায় নাট্যকারকে ভাষাগত দুর্বোধ্যতা পরিহার করতে হয়। কেননা অপ্রচলিত শব্দবিন্যাসে সংলাপ রচিত হলে দর্শক-শ্রোতা নাট্যকাহিনী উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হতে পারে। সুতরাং নাট্যকারের ক্ষমতা, ইচ্ছা থাকলেও মঞ্চায়নের স্বার্থে নাটকের সংলাপে জটিল শব্দবিন্যাসের পরিবর্তে সহজবোধ্য ভাষা ব্যবহার করতে বাধ্য হন।
উপর্যুক্ত আলোচনায় প্রতীয়মান হয়, নাট্যসাহিত্য কঠোর নিয়মনীতি ও সীমাবদ্ধতার মধ্যে জন্ম লাভ করে। একই কথা কাব্যনাটকের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। পাঠ্যসাহিত্য নয় বলে, নাট্যকলা অসংখ্য নিয়মনীতির বেড়াজালে আবদ্ধ। পাঠ্যসাহিত্যের অন্যতম সুবিধা হলো, সেখানে লেখকের ইচ্ছেমতো জটিল শব্দবিন্যাস ঘটলেও তা শুধু একটিবারের মতো কান বা চোখের সামনে দিয়ে বয়ে যায় না; পাঠক ইচ্ছানুসারে দ্বিতীয়বার কিংবা বারবার পাতা উল্টিয়ে জটিল শব্দ এবং দুর্বোধ্য অংশগুলো পুনরায় বুঝে নিতে পারেন। অভিনয়যোগ্য নাট্যশিল্পে ফিরে দেখার এই সুযোগ নেই। কবিতা, উপন্যাস, গল্প কত বড় বা ছোট হবে তার কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম নেই; কিন্তু নাটকের মাথার ওপর সময়ের খাঁড়া ঝুলে থাকে।৩৯ নাট্যসাহিত্যের এ ধরনের অশৈল্পিক শর্ত কিংবা সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও এর প্রায়োগিক গুরুত্ব অধিক।
সাহিত্য ভূঁইফোড় কোনো বিষয় নয়; সমাজ উদ্ভূত উর্বর চিন্তাচেতনাজাত ভাবগত সৃষ্টি; অর্থাৎ সাহিত্য সৃষ্টিশীল-প্রতিভাবান মানুষের মননসৃষ্ট সামাজিক উপরিকাঠামো (Super Structure)। সমাজ এবং সমাজে বসবাসরত মানবগোষ্ঠীর আচরিত জীবনযাপন, বিশ্বাস, কর্ম-প্রয়াস ইত্যাদি সাহিত্যের উপাদান। সাহিত্য উন্নত-পরিশীলিত জীবনযাপন প্রণালী এবং রুচিসম্পন্ন জীবনদর্শনের ইঙ্গিত দেয়। উপরন্তু প্রতিনিয়ত জীবনজিজ্ঞাসার মুখোমুখি মানবগোষ্ঠী সাহিত্যে জীবন সহায়ক দিকনির্দেশনা পায়। এছাড়াও মানবজীবনের রুচি-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য পরিবর্তন-পরিশীলনে সাহিত্যের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। ব্যক্তি নিজেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন মনে করলেও, সে কখনই তার প্রতিবেশ-পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কহীন অথবা স্বজন-প্রিয়জন, বন্ধু-বান্ধব, জাতি, প্রাকৃতিক পরিবেশ বিহীন একাকী অসামাজিক জীবনযাপন করতে পারে না। কিন্তু বস্তুজগতের সংস্পর্শে থেকেও মানবমননে কল্পনার এক মায়াবীজগত রয়েছে। ব্যক্তিমানুষের অনুভূতি বস্তুবিশ্বের রূপে-রসে-গন্ধে-শব্দে-স্পর্শে অনুরণিত হয়ে জাগতিক জীবনযাপন, পরিবেশ-প্রতিবেশের প্রভাবে সৃষ্টিশীল মানুষের হৃদয়-উৎসারিত বক্তব্য-বিষয় যে সুরে প্রকাশিত হয়, তাই সাহিত্য। মানুষের জীবন-যাপনের রীতি-নীতি-পদ্ধতি, সামাজিক ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি-রুচিবোধ সকল ক্ষেত্রে এক রকম নয়; বরং বৈচিত্র্যে ভরা। এই বিচিত্র মানবজীবনের প্রকাশক সাহিত্যও নানান শাখা-উপশাখা এবং শ্রেণী-উপশ্রেণীতে বিভক্ত। উপমহাদেশীয় বা সংস্কৃত আলংকারিকগণ ‘সাহিত্য’ অর্থে শুধুমাত্র ‘কাব্য’ শব্দটি গ্রহণ করে তাঁরা, কাব্যকে (সাহিত্য অর্থে) দুই শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন। তাঁদের মতে, কাব্য বা সাহিত্য দুই প্রকার- দৃশ্যকাব্য এবং শ্রব্যকাব্য। ‘শ্রব্যকাব্য’ অর্থে সংস্কৃত আলংকারিকগণ সমস্ত পাঠ্যসাহিত্যকে বোঝাতে চেয়েছেন। নাট্যশাস্ত্রবিদ ভরত বলেন, ‘নাটক ছাড়া কবিতা নেই।’ সংস্কৃত পণ্ডিতগণের বিভাগ অনুযায়ী নাট্যসাহিত্য দৃশ্য ও শ্রব্যকাব্যের সমন্বয়ে রচিত। তবে বাংলা নাট্যসাহিত্যের বিকাশ প্রসঙ্গে ইতিহাস প্রণেতা আশুতোষ ভট্টাচার্য মনে করেন-
আধুনিক বাংলা সাহিত্য কোনো বিষয়েই সংস্কৃত অলঙ্কার শাস্ত্রের সংজ্ঞাকে গ্রহণ করে নাই, করিবার কথাও নহে; আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সকল বিভাগই প্রত্যক্ষভাবে ইংরেজি সাহিত্যের প্রভাবজাত, সংস্কৃতের ভাব-জাত নহে। অতএব নাটককেও সংস্কৃতের অনুযায়ী দৃশ্যকাব্য বলিয়া নির্দেশ না করিয়া ইংরেজি সাহিত্যের অনুরূপ ফৎধসধ বা নাটক বলিয়া নির্দেশ করা সঙ্গত।৪০
আধুনিকতার নামে ইউরোপীয় সাহিত্যের অন্ধ-অনুকরণ প্রবণতা বাংলা সাহিত্যের পায় দাসত্বের শৃঙ্খল পরিয়ে দিয়েছে; যা সর্বার্থে গ্রহণীয় হতে পারে না। পাঠ্যসাহিত্য গীতিকবিতা, কাহিনীকবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প প্রভৃতি ভাগে বিভক্ত। বিষয়গত ও প্রকরণগত নিরিখে নাট্যসাহিত্যেরও নানান শ্রেণী-উপশ্রেণী রয়েছে। নাট্যকার দৃশ্যগুণ এবং শ্রব্যগুণের সমন্বয়ে রঙ্গমঞ্চে গতিশীল মানবজীবনের কাহিনী কুশীলবগণ অভিনয় নৈপুণ্যে নাট্যসাহিত্যে ফুটিয়ে তোলেন। নাট্যসাহিত্যের অভিনয় প্রসঙ্গে বিরূপ সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও নাটক সাধারণত দর্শকের সামনে মঞ্চায়নের উদ্দেশ্যে রচিত হয়। তবে লিখিত নাটকটির সাহিত্যের অন্যান্য শাখার মতোই পাঠ্যমূল্য বর্তমান। এজন্যই শুধুমাত্র পাঠেও নাটকের সাহিত্যরসোপলব্ধি ঘটতে পারে। কিন্তু নট-নটীর সহায়তায় রঙ্গমঞ্চে নাটক অভিনীত হলে নাট্যকার একই সময় অনেক সংখ্যক দর্শক-শ্রোতার মনে সাহিত্যরস সঞ্চার করতে পারেন। তবে আশুতোষ ভট্টাচার্য মনে করেন-
অভিনয় নাটকের একটি প্রধান লক্ষ্য হইলেও, ইহা যে একমাত্র লক্ষ্য তাহা বলিতে পারা যায় না। সংস্কৃত নাটক কোনোদিন কোথাও অভিনীত হইয়াছিল কি না, তাহা জানিতে পারা যায় না; সম্ভবত অধিকাংশ নাটকই অভিনীত হয় নাই,- পাঠ্য রূপেই শিক্ষিত সমাজের মনোরঞ্জন করিয়াছে। অথচ সংস্কৃত নাটক শত শত বৎসর ধরিয়া চলিয়া আসিতেছে। বাংলা নাটকের সম্পর্কে সংস্কৃত নাটকের কথা বাদ দিলেও দেখিতে পাওয়া যায় যে, আধুনিক ইউরোপীয় নাটকে দৃশ্যগুণ অপেক্ষা পাঠ্যগুণই অধিকতর বর্ধিত হইয়াছে। ... অতএব যথার্থ শিল্পগুণ নাটকের ভিতর দিয়া প্রকাশ পাইলে কেবলমাত্র পাঠ্যরূপেও তাহা রসিকমনকে আনন্দ দিতে পারে। সুতরাং রঙ্গমঞ্চের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ব্যতীত কেহই নাটক রচনার প্রেরণা অনুভব করিতে পারেন না- এরূপ ধারণার কোনো সঙ্গত কারণ দেখিতে পাওয়া যায় না। বিশেষত আধুনিক Reading Drama ev Literary Drama-র সঙ্গে রঙ্গমঞ্চের কোন সম্পর্ক নাই।৪১
নাট্যসাহিত্য পাঠক-দর্শক-শ্রোতার সাথে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে সাহিত্যের অন্যান্য শাখার চেয়ে অধিকতর সফল ও কার্যকরী। পাঠ্যসাহিত্য সাধারণত পাঠক একা পাঠ করেন এবং এককালীন প্রকাশিত সংখ্যার চেয়ে বেশি সংখ্যক পাঠকের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে না। কিন্তু যেকোন নাটকের একেকটি মঞ্চায়নেই ততোধিক দর্শক-শ্রোতা-পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব। অর্থাৎ প্রায়োগিক ক্ষেত্রে সাহিত্যের অন্যান্য শাখার চেয়ে নাট্যকলা বা ‘পারফর্মিং আর্ট’ অগ্রবর্তী, কেননা নাট্যসাহিত্য পাঠ্যসাহিত্যেরও অন্তর্গত। উপরন্তু রঙ্গমঞ্চের অভিনয়ে নাট্যসাহিত্য পাঠক-দর্শক-শ্রোতার নিকট জীবন্ত হয়ে ওঠে এবং সাহিত্যরস সঞ্চার করে।
একথা মনে রাখা দরকার যে, প্রথাগত নাটক থেকে কাব্যনাটক সম্পূর্ণ আলাদা শিল্পমাধ্যম। যন্ত্রবিকশিত আনবিককালের জীবনাভিজ্ঞতায় কাব্যনাটকের পথ চলা শুরু হয়েছিল। কাব্যনাটকে নাটকের সাংগঠনিক শৈলীর সাথে কবিতা একাত্ম হয়েছে আর কাব্যিক সংহতিতে কাব্যনাট্যের শব্দ, চিত্রকল্প, প্রতীক প্রভৃতি নাট্যঘটনায় প্রবহমান হয়ে উঠেছে। কাব্যনাটকে রহভড়ৎসধঃরড়হ বা নাট্যঘটনার বদলে কবিতার আবেগে চরিত্রের অন্তর্গত সংকট উন্মোচন করা অত্যাবশ্যক। এই অপরিচিত অন্তর্লোকের রহস্য উন্মোচনের দায়িত্ব কাব্যনাট্যের। তবে এ প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার নাটক প্রায়শ দৈনন্দিন স্থূল বাস্তবতার মধ্যদিয়ে পথ চলে। এজন্য কাব্যনাট্যে কবিতাকেও বস্তুজাগতিক নিত্যদিনের জীবনযাপনের সমতটে ঝুঁকে পড়তে হয়। তাই কবির প্রদীপ্ত কাব্যপ্রতিভা দিয়ে জীবনের স্থূলতাকেও সূক্ষ্মতর কাব্যভাষায় তুলে ধরার অনন্যসাধারণ ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন। সামগ্রিকতা সকল শিল্পেরই বিষয়বস্তু হতে পারে। অথচ কাব্যনাটকের ক্ষেত্রে এই সামগ্রিকতা ভিন্নমাত্রার দ্যোতনাবাহী। ‘মানুষের বৈশ্বিক চেতনা বা কাব্যনাটকের অন্বেষণ হল জীবনের সামগ্রিকতার- যেন জন্ম হয় সেই ভয়ঙ্কর সুন্দরের।’৪২ এর কারণ মূলত কবিতা। কেননা শাব্দিক অর্থকে অতিক্রম করে কবিতা উপলব্ধি এবং অনুভবের চেতনালোকে অতিরিক্ত এক দ্যোতনার সৃষ্টি করে, যা শুধুই অনুভববেদ্য। কাব্যভাষা শুধুমাত্র অর্থের সীমাবদ্ধ গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়, কবিতার অধিকার সার্বভৌম। কাব্যের এই আধিপত্য কাব্যনাটক ছাড়া অন্যকোনো শিল্পমাধ্যমে নেই।
নাট্যশিল্পের ‘এ্যাকশন’-এর অত্যাবশ্যকীয় শর্তও কাব্যনাটক মানতে বাধ্য নয়। কেননা কাব্যনাটকে এ্যাকশনের দায়িত্ব সংলাপও পালন করতে পারে। মানুষ স্বীয় সত্তাকে কাব্যনাটকে বস্তুজাগতিক জীবনের অভ্যন্তর বাস্তবতাকে রঙ্গমঞ্চে দর্শনযোগ্য করে তুলতে চায়। কাব্যনাটকের এ্যাকশন শুধুমাত্র কাহিনীরই হবে, এ রকম ধরাবাঁধা কোনো কথা নেই বরং শব্দের-চিত্রকল্পের এবং সংকটের গতিময়তাও এক্ষেত্রে এ্যাকশনের মাত্রা পেতে পারে। তাছাড়া কাব্যনাটক সরাসরি প্রতীকী ব্যঞ্জনায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠতে পারে। এখানে বস্তুজাগতিক স্থূল জীবনযাপন, যা নিতান্তই নৈর্ব্যক্তিক (Objective) বিষয়- তাও কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতীকী ব্যঞ্জনায় মূর্ত হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে অবশ্য ব্যক্তিসত্তা সার্বিক সত্তায় উত্তীর্ণ হয়, যা বৃহত্তর অর্থে কাব্যের অনুষঙ্গ। এজন্য এলিয়ট যথার্থ বলেছেন, 'Poetry is essentially dramatic and the greatest poetry always moves toward drama; drama is essentially poetic and the greatest drama moves towards poetry.'৪৩ এলিয়টের বক্তব্যের সঙ্গে উপমহাদেশের সংস্কৃত আলংকারিকগণের মতামতের যথেষ্ট মিল আছে, তাঁরও মনে করেন, যথার্থ কবিত্বগুণেই প্রকৃত নাটক হয়।৪৪ অর্থাৎ কালোত্তীর্ণ নাট্যসাহিত্যের জন্য কাব্যগুণ অত্যন্ত জরুরি বিষয়। উদাহরণস্বরূপ গ্রীক ও শেক্সপীয়রীয় নাট্যসাহিত্যের কথা বলা যেতে পারে- এই উভয় যুগের নাট্যকলাই কাব্যগুণে ভরপুর বলেই সাহিত্যের ইতিহাসে চিরন্তনত্ব লাভ করেছে। নাটকের কবিত্বগুণ প্রসঙ্গে অজিতকুমার ঘোষ বলেছেন,
নাটকের ভাষা গদ্য হউক, কিংবা পদ্য হউক, নাট্যকারকে কবির কল্পনাশক্তি ও অন্তর্দৃষ্টি আয়ত্ত করিতেই হইবে, তবেই তিনি বড় নাট্যকার হইতে পারেন। নাটকে বাস্তব জীবনের কথাই লিখিত হয়, কিন্তু সেই বাস্তব জীবনের কথা যখন কবিকর্তৃক চিত্র ও সংগীতের মধ্যে সমর্পিত হয় তখনই তাহা অমরত্ব লাভ করে।৪৫
এই বিচারে সাহিত্যের ইতিহাসে আধুনিককালে সৃষ্ট কাব্যনাট্য শাখার ‘ক্ল্যাসিক’ মর্যাদায় উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল। প্রসঙ্গত স্মরণীয় যে, নাট্যসাহিত্যের ন্যায় কাব্যনাটকের ক্ষেত্রেও মঞ্চায়নের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ; তবে কাব্যনাট্যের মঞ্চায়ন অনিবার্য নয়। আনবিক-কালে সৃষ্ট সাহিত্যের এই নবতর মাধ্যমের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে গবেষক, সাহিত্য-সমালোচকগণ প্রচণ্ড আশাবাদী; তবে আনবিক-যুগের জটিলতায় বিকশিত কাব্যনাটকের ভবিষ্যৎ এখনো অনির্দিষ্ট। তারপরও সাহিত্যের এই নবীন-শাখা ক্রম-অগ্রসরমান একথা সুনিশ্চিতরূপে বলা যায়।
তথ্যসূত্র ও টীকা :
১. অজিতকুমার ঘোষ, বাংলা নাটকের ইতিহাস, সংশোধিত ও পরিবর্ধিত ৮ম সং, কলিকাতা : জেনারেল প্রিন্টার্স য়্যাণ্ড পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, ১৯৯৯; পৃ. ১-২
২. The New Encyclopaedia Britanica, Volume-৫, ১৫ Edition, P. ৯৫২
৩. দর্শন চৌধুরী, বাংলা থিয়েটারের ইতিহাস, ৩য় পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত সং, কলকাতা : পুস্তক বিপণি, ২০০৩; পৃ. ১১
৪ উত্তম দাশ, বাংলা কাব্যনাট্য, ১ম প্র, দক্ষিণ ২৪ পরগণা : মহাদিগন্ত প্রকাশ সংস্থা, ১৯৮৯; পৃ. ৯
৫. রাম বসু, ‘কাব্যনাটক’, তরুণ কুমার মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত নন্দনতত্ত্ব-জিজ্ঞাসা ১ম প্র, কলকাতা : পুস্তক বিপণি, ১৯৯৪; পৃ. ৩০৬
৬. শান্তনু কায়সার, কাব্যনাটক, ২য় প্র, ঢাকা : বাংলা একাডেমী, ১৯৮৯; পৃ. ৯
৭. রাম বসু, পূর্বোক্ত, পৃ. ৩০৭
৮. তদেব, পৃ. ৩১২
৯. উত্তম দাশ, পূর্বোক্ত, পৃ. ১০
১০. আধুনিক বাংলা নাটকের স্রষ্টা মধুসূদন তাঁর নাটকে অমিত্রার ছন্দ ব্যবহার করেছেন। তিনি অমিত্রার ছন্দে নাট্যসংলাপ রচনার মধ্য দিয়ে, এই ছন্দের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছিলেন। তাঁর শর্মিষ্ঠা’য় সাধারণ পয়ার ছন্দের ব্যবহার লক্ষণীয়। মধুসূদনের নাটক আঙ্গিকগত দিক দিয়ে ইউরোপীয় নাটক দ্বারা প্রভাবিত হলেও তদানীন্তন বাংলা কাব্যধারার ঐতিহ্য তিনি একেবারে অস্বীকার করতে পারেন নি।
১১. T.S. Eliot, On Poetry and Poets, London : Faber and Faber, 1961; P. ৭৪
১২. Ibid,P. ৭৪
১৩. ‘সেকালে রাজভাষা ছিল ফারসী। সরকারিকর্ম লাভে ইচ্ছুক সবাইকে ফারসী শিখতে হত। ষোল শতকের কবি জয়ানন্দ তাঁর কালের বর্ণনায় লিখেছেন যে, ব্রাহ্মণেরা দাড়ি রাখত ও ফারসী পড়ত। রুমীর মসনবী ছিল তাদের প্রিয় পাঠ্য বই। আঠার শতকে মুর্শিদকুলী খাঁ হিন্দুদের ব্যাপক হারে রাজকার্যে নিযুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিলে তাদের মধ্যে ফারসী শেখার ধূম পড়ে যায়। ফারসী না-শেখায় ভারতচন্দ্র তিরস্কৃত হয়েছিলেন শুভাকাঙ্খীদের কাছে।’- ড. সাঈদ-উর রহমান, সামন্তযুগে বাঙালী-সংস্কৃতি : কয়েকটি প্রসঙ্গ, ১ম প্র, ঢাকা : মৌলি প্রকাশনী, ২০০১; পৃ. ৩৫
১৪. ভাষা সাহিত্যের বাহন। কোনো ভাষার চর্চা কোনো কারণে বন্ধ হয়ে গেলে অবশ্যম্ভাবী ফলস্বরূপ সেই ভাষায় সাহিত্যচর্চাও বন্ধ হয়ে যায়।
১৫. ‘সমগ্র মুসলমান রাজত্বে নাটকের পুনর্বিকাশ এবং রঙ্গালয়ের পুষ্টি হয় নাই। মুসলমানগণ নাট্যকলা ও অভিনয়-প্রথার ঘোর বিরোধী।’ - অজিতকুমার ঘোষ, পূর্বোক্ত, পৃ. ৩-৪
১৬. ড. নীলিমা ইব্রাহিম, বাংলা নাটক : উৎস ও ধারা, ১ম সং, ঢাকা : নওরোজ কিতাবিন্তান, ১৯৭২; পৃ. ৪-৫
১৭. কেননা নাট্যসাহিত্যে প্রায় ক্ষেত্রেই সমাজ-জীবনের চলমান ঘটনাবলির প্রত্যক্ষ প্রতিফলন ঘটে থাকে। এই বিবেচনায় সাহিত্যের প্রায়োগিক ফলাফল নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় নাট্যসাহিত্য-ই এগিয়ে থাকে।
১৮. আধুনিক বাংলা নাটকের উদ্ভব ইউরোপীয় নাট্যসাহিত্যের প্রভাবজাত, এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। তবে এ দেশের প্রাচীন এবং মধ্যযুগের সাহিত্যেও যথেষ্ট পরিমাণ নাট্যউপাদান ছিল। এ প্রসঙ্গে সেলিম আল দীন বলেন, - আমাদের নাটক পাশ্চাত্যের মতো ‘ন্যারেটিভ’ ও ‘রিচুয়্যাল’ থেকে পৃথকীকৃত সুনির্দিষ্ট চরিত্রাভিনয় রীতির সীমায় আবদ্ধ নয়। তা গান, পাঁচালি, লীলা, গীত, গীতনাট, পালা, পাট, যাত্রা, গম্ভীরা, আলকাপ, ঘাটু, হাস্তর, মঙ্গলনাট, গাজীর গান ইত্যাদি বিষয় ও রীতিকে অবলম্বন করে গড়ে উঠেছে। - সেলিম আল দীন, মধ্যযুগের বাঙলা নাট্য, ১ম সং, ঢাকা : বাংলা একাডেমী, ১৯৯৬; পৃ. ৪
১৯. ‘শর্মিষ্ঠা নাটক বাঙ্গালা ভাষায় প্রথম দস্তুরমতো নাটক। ইহার পূর্বে যে সকল নাটক প্রকাশিত হইয়াছিল সেগুলির প্লট সুকল্পিত নয়, এবং অধিকাংশই সংলগ্ন-অসংলগ্ন কতকগুলি দৃশ্যের সমষ্টিমাত্র।’ - সুকুমার সেন, বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস (তৃতীয় খণ্ড), ৭ম সং, ২য় মু, কলকাতা : আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, ১৪০৩; পৃ. ১১০
২০. অজিতকুমার ঘোষ, পূর্বোক্ত, পৃ. ১৭
২১. ‘আধুনিককালেও কেহ কেহ পদ্যছন্দে নাটক লিখিতে চেষ্টা করিতেছেন বটে, কিন্তু খুব সার্থক নাট্যকাব্য আজও তেমন চোখে পড়ে নাই।’ - তদেব, পৃ. ৪৮৭
২২. মধুসূদন বাংলা নাট্যসাহিত্যের দৈন্য দৃষ্টে সংস্কৃত নাটক প্রসঙ্গে সখেদে শর্মিষ্ঠা নাটকের প্রস্তাবনায় বলেন,-
অলীক কুনাট্য রঙ্গে মজে লোক রাঢ়ে বঙ্গে
নিরখিয়া প্রাণে নাহি সয়।
২৩. উত্তম দাশ, পূর্বোক্ত, পৃ. ১৫-১৬
২৪. আশুতোষ ভট্টাচার্য, বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাস (প্রথম খণ্ড), ৫ম সং, কলিকাতা : এ.মুখার্জী অ্যাণ্ড কোং প্রাইভেট লিমিটেড, ২০০২; পৃ. ১১৩
২৫. ড. কণিকা সাহা, পূর্বোক্ত, পৃ. ৪৬
২৬. তদেব, পৃ. ৪৭
২৭. বুদ্ধদেব বসুর কাব্যনাটকগুলো সম্বন্ধেও পরস্পর বিরোধী মন্তব্য রয়েছে। অজিতকুমার ঘোষ মনে করেন, - বুদ্ধদেব বসুর প্রথম তপস্বী ও তরঙ্গিণী পুরোপুরি কাব্যনাট্য নয়, আংশিক কাব্যনাট্য। কিন্তু ওই নাটকে তাঁর প্রবণতা সুস্পষ্ট। অর্থাৎ, তিনি তাঁর কবিসত্তার পরিপূর্ণ শক্তি নাটকের মাধ্যমে প্রকাশ করিতে চাহিলেন। - অজিতকুমার ঘোষ, পূর্বোক্ত, পৃ. ৪৯১
২৮. রাম বসু, পূর্বোক্ত, পৃ. ৩০৮
২৯. ‘... আমরা দ্বিধাহীনভাবে এলিয়টকেই পথপ্রদর্শক হিসাবে মেনে নিয়েছি। কারণ ঔপনিবেশিক সভ্যতায় পালিত বলে আমাদের অর্থাৎ, তিরিশ ও তার পরবর্তী যুগের আধুনিকদের সংস্কৃতি জিজ্ঞাসা চলেছে ইওরোপের অনুকরণে।’ - তদেব
৩০. T. S. Eliot, On Poetry and Poets, Ibid, P. ৭৪
৩১. শঙ্খ ঘোষ ‘কাব্যনাট্য’, অলোক রায় সম্পাদিত সাহিত্যকোষ (নাটক), ১ম সং, কলিকাতা : ১৯৬৩; পৃ. ২২
৩২. উত্তম দাশ, পূর্বোক্ত, পৃ. ১১-১২
৩৩. তদেব, পৃ. ১৫
৩৪. T.S. Eliot, 'A Dialigue on Dramatic Poetry', Selected Essays, Reprint, London : Faber and Faber, 1963; P. ৪৬
৩৫. দর্শন চৌধুরী, পূর্বোক্ত, পৃ. ১১
৩৬. আলী আনোয়ার, আধুনিক ইউরোপীয় নাটক, ২য় সং, ঢাকা : বাংলা একাডেমী, ১৯৮৯; পৃ. ২১
৩৭. দর্শন চৌধুরী, পূর্বোক্ত, পৃ. ১১
৩৮. সুকুমার সেন, পূর্বোক্ত, পৃ. ৩১২
৩৯. সৌমিত্র বসু, ‘বাংলা নাটকের সাহিত্যমূল্য : ’৬৩-৯৯’, অনিল আচার্য সম্পাদিত ‘অনুষ্টুপ’, চতুস্ত্রিংশ বর্ষ, ২য় ও ৩য় যুগ্ম সংখ্যা, কলকাতা : ২০০২; পৃ. ৫০
৪০. আশুতোষ ভট্টাচার্য, পূর্বোক্ত, পৃ. ১২
৪১. তদেব, পৃ. ১৩
৪২. রাম বসু, পূর্বোক্ত, পৃ. ৩০৫
৪৩. T.S. Eliot, 'A Dialogue on Dramatic Poetry', Ibid, P. ২৩৫
৪৪. ‘ভরত নাট্যকে বলেছেন- ‘লোকবৃত্তানুকরণম্’, ‘লোকবৃত্তানুবর্তনম্’, ‘ভাবনুকীর্তনম্’। এই সব বলায় এই কথাই বলা হয়েছে যে, নাট্য বা দৃশ্যকাব্যে- অর্থাৎ কাহিনী-কাব্যে জীবনের রূপকেই 'men-in-action' বৃত্তবন্ধে উপস্থাপিত করা হয়। ... রসবাদে মুখ্যতঃ জীবনকেই, 'men-in-action'-কেই কাব্যের উপস্থাপ্য বিষয় বলে গণ্য করা হয়েছে এবং এই সিদ্ধান্তেই পৌঁছানো হয়েছে যে জীবনের রূপকে খণ্ড বা অখণ্ড আকারে প্রকাশ করাই কাব্যের উদ্দেশ্য। এই দৃষ্টি থেকেই কাব্যের লক্ষণ করা হয়েছে- “বাক্যং রসাত্মকং কাব্যম্”।’ - ড. সাধনকুমার ভট্টাচার্য, এ্যারিস্টটলের পোয়েটিক্স ও সাহিত্যতত্ত্ব, ৩য় সং, কলকতা : দে’জ পাবলিশিং, ১৯৯২; পৃ. ১৪৮-১৪৯
৪৫. অজিতকুমার ঘোষ, পূর্বোক্ত, পৃ. ৪৮৬
[লেখকের গবেষণা-অভিসন্দর্ভ ‘বাংলাদেশের কাব্যনাটক : আঙ্গিক ও বিষয়-বৈচিত্র্য’ এর পরিমার্জন ও পুনর্লিখিতরূপ পাঠকদের জন্য ধারাবাহিকভাবে ছাপা হচ্ছে]
অনুপম হাসান : পিএইচ.ডি. গবেষক ও প্রাবন্ধিক, বাংলা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়