Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

নাট্যগ্রন্থ সমালোচনা- ‘দুই বাংলার নাটকে প্রতিবাদী চেতনা (১৯৪৩-১৯৯০)’

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

দুই বাংলার নাটক ও নাট্যচর্চা নিয়ে বেশ কিছু গবেষণা হয়েছে আমাদের দেশে। বাংলাদেশের নাটকের কথা বলতে গেলে আমরা পশ্চিমবঙ্গের নাটকের কথাও বলি। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের নাট্যগবেষণায় বাংলাদেশের নাটকের প্রসঙ্গ কতটা আন্তরিকভাবে উঠে আসে, তা নিয়ে প্রশ্ন রাখা যেতে পারে। আমাদের জানামতে- অরুণ সেন, আশিস গোস্বামী এবং প্রভাতকুমার দাস যথাক্রমে বাংলাাদেশের নাট্যকার সেলিম আল দীন, বাংলাদেশের সংগঠন আরণ্যক নাট্যদল এবং বাংলাদেশের নাট্যপত্রিকা ‘থিয়েটার’ নিয়ে গবেষণাগ্রন্থ রচনা করেছেন। এর বাইরে বাংলাদেশের থিয়েটার নিয়ে উল্লেখযোগ্য গবেষণা হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই।

নৃপেন্দ্র সাহা সম্পাদিত ‘বাংলাদেশের থিয়েটার’ গ্রন্থে বাংলাদেশের থিয়েটারের কিছুটা ধারণা পাওয়া যাবে। বাংলাদেশের অনেক গবেষকই পশ্চিমবঙ্গে থিয়েটার নিয়ে গবেষণা করেছেন। থিয়েটার নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে বাংলাদেশের থিয়েটারের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের থিয়েটারের প্রসঙ্গও এসেছে যথাগুরুত্বে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের গবেষকদের গবেষণায় বাংলাদেশের থিয়েটারের উল্লেখ তেমন একটা পাওয়া যায় না। অজিতকুমার ঘোষের ‘বাংলা নাটকের ইতিহাস’, দর্শন চৌধুরীর ‘বাংলা থিয়েটারের ইতিহাস’, ড. দীপক চন্দের ‘বাংলা নাটকে আধুনিকতা ও গণচেতনা (১৯২৩-১৯৭০)’, প্রভৃতি গ্রন্থে কি বাংলাদেশের নাটকের কথা পাওয়া যায়? কিন্তু আমরা আনন্দের সঙ্গে লক্ষ্য করি যে, বাংলাদেশের গবেষক যখন বাংলা নাটক নিয়ে গবেষণা করেন তখন পশ্চিমবঙ্গের নাটকের কথা তুলে আনেন। ড. মো. জাকিরুল হকের ‘দুই বাংলার নাটকে প্রতিবাদী চেতনা (১৯৪৩-১৯৯০)’ নামের গ্রন্থটি হাতে নিয়ে এই কথাগুলো মনে এলো। আমাদের ড. বিপ্লব বালা, ড. রাহমান চৌধুরী, ড. মো. জাকিরুল হক যখন নাটক নিয়ে লেখেন, তখন কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের নাটককেও অঙ্গীকার করেন।

পারিবারিক নাট্যঐতিহ্যের অধিকারী ড. জাকিরুল হক অভিনেতা হিসেবেও অবদান রেখেছেন। বাংলাসাহিত্যের অধ্যাপনার সুযোগে তিনি নাট্যসাহিত্য পাঠের ও পাঠদানের সুযোগ পেয়েছেন। তত্ত্বীয় ও ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা নিয়েই গবেষণাকর্মে অগ্রসর হয়েছেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. বাসবী রায় এবং ড. শম্পা চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে প্রণীত ডক্টরাল অভিসন্দর্ভের পরিমার্জিত রূপ এই বই। বইটি শুরুতেই একটা খটকা তৈরি করে। ১৯৪৩ কেন? ১৯৪৭ হলে বুঝতাম যে দেশবিভাগের পর থেকে গবেষণার সূচনাবিন্দু ধরা হয়েছে। ভূমিকায় লেখক বলেছেন যে, তাঁর কাজটি শুরু হয়েছে চল্লিশের দশক থেকে। তাহলে ১৯৪০ সাল থেকে শুরু হলেই যথার্থ হতো। চল্লিশের দশককে লেখক নির্দিষ্ট করেছেন ‘নাট্যগুরু বিজন ভট্টাচার্যের নবান্ন দিয়ে শুরু’ বলে। কিন্তু ‘নবান্ন’র প্রথম প্রযোজনার কাল ১৯৪৪। তার আগের বছর অর্থাৎ ১৯৪৩ সালে বিজন ভট্টাচার্যের ‘আগুন’ নাটক মঞ্চে আনে গণনাট্য সংঘ। যদি লেখক ১৯৪৩ সালকেই শুরু ধরেন, তবে ‘নবান্ন’-এর প্রযোজনার কথা না বলে ‘আগুন’-এর প্রযোজনার কথা বললেই যৌক্তিক হতো। ওই ১৯৪৩ সালেই তো বিনয় ঘোষের ‘ল্যাবরেটরি’ আর দিগিন্দ্রচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দীপশিখা’ প্রযোজিত হয় গণনাট্য সংঘের মাধ্যমে। তাহলে ‘নবান্ন’কে কেন সূচনাবিন্দু ধরা হলো তার ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না। কিংবা ওই ১৯৪৩ সালেই পূর্ববঙ্গে রণেশ দাশগুপ্তের ‘আমন ধান’ ও ‘ওরা ঘর বাঁধতে চায়’, মুনীর চৌধুরীর ‘বেশরিয়তি’, ‘স্বামী সাহেবের অনশনব্রত’ এবং নূরুল মোমেনের ‘রূপান্তর’ ও ‘নেমেসিস’ মঞ্চস্থ হয়ে গেছে। আলোচিত নাটক হিসেবে ‘নবান্ন’ গুরুত্ব পেলেও গবেষণাকালের শুরু হিসেবে ১৯৪০ সালকে বিবেচনা করা যেত এবং প্রযোজনাকাল বিবেচনায় আকবরউদ্দীনের ‘সিন্ধু-বিজয়’ (১৯৪০) কিংবা নফরউদ্দিন আহমেদের ‘এজিদবধ’ (১৯৪০)-কে গুরুত্ব দিলে ইতিহাসের ধারাক্রমকেই সম্মান জানানো হতো।

সাতটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত হয়েছে লেখকের গবেষণা। প্রথম অধ্যায়ে পটভূমিতে চল্লিশের দশকের নাটক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। দ্বিতীয় অধ্যায়ে পঞ্চাশ ও ষাট দশকে পূর্ববঙ্গের প্রতিবাদী চেতনার নাটক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তৃতীয় অধ্যায়ে রয়েছে একই সময়কালে পশ্চিমবঙ্গের নাটক নিয়ে আলোচনা। চতুর্থ অধ্যায়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নাটক নিয়ে আলোচনা রয়েছে। পঞ্চম অধ্যায়ে রয়েছে সত্তর ও আশির দশকে বাংলাদেশের এবং ষষ্ঠ অধ্যায়ে একই সময়ে পশ্চিমবঙ্গের নাটক নিয়ে আলোচনা প্রাধান্য পেয়েছে। আর সপ্তম অধ্যায়ে রয়েছে দুই বাংলার প্রতিবাদী নাটকের তুলনামূলক আলোচনা। অধ্যায়-বিন্যাসের ক্ষেত্রে কালানুক্রমকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এই রীতি মান্য। কিন্তু গবেষণার বিষয় যেহেতু প্রতিবাদী চেতনার নাটক, তাই প্রতিবাদের বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করলে পাঠকের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠত। যেমন ব্রিটিশবিরোধিতা, দেশভাগ, সাম্প্রাদায়িকতা-বিরোধিতা, সাম্যবাদী চেতনা, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ- এরকম যেসকল বিষয় নিয়ে প্রতিবাদ কিংবা গণচেতনা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে নাটক রচিত হয়েছে, তাকেই অধ্যায় বিবেচনা করা গেলে পাঠকের লাভ হতো বেশি। তবু যেভাবেই হোক আলোচনাটি উঠে এসেছে, এতেও আমরা খুশি।

বইটি হাতে নিলে পাঠকের স্পৃহা জাগবে ‘প্রতিবাদী নাটক’ সম্পর্কে জানতে। প্রথম অধ্যায়ে এ সম্পর্কে সংজ্ঞার্থ ও ধারণা থাকা দরকার ছিল। কী কী বৈশিষ্ট্য জাগরূক থাকলে একটি নাটককে আমরা প্রতিবাদী নাটক বলব, তার রূপরেখা জানানোর দরকার ছিল। এমন কোনো নাটক কি পাওয়া যাবে, যাতে প্রতিবাদী বক্তব্য নেই? নিরেট হাসির নাটকেও খোঁচা কিংবা ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের মাধ্যমে কোনো বার্তা প্রদানের উদ্যোগ থাকতে পারে। সেটিও কি প্রতিবাদ নয়? প্রেমের নাটকেও থাকতে পারে প্রতিবাদ, সেই প্রতিবাদ হতে পারে সমাজে বিরাজিত ধর্মীয় ও সামাজিক সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে। এমনকি ধর্মীয় বা ভক্তিমূলক নাটকের মধ্য থেকেও প্রতিবাদী চেতনা খুঁজে বের করা যায়। পটভূমিতে লেখক একথা স্বীকারও করেছেন। প্রতিবাদ কী? প্রতিবাদী চেতনা কী? প্রতিবাদী চেতনার নাটক কোনগুলো? এই বিষয়গুলো খোলাসা করে নিলে আলোচনা জমে উঠত। লেখক কোন ধরনের নাটককে তাঁর বিশ্লেষণের আওতাভুক্ত করেছেন, তা আমাদের জানানোর প্রয়োজন মনে করেননি। তত্ত্বাবধায়কদ্বয়ও যদি এই খেইটুকু ধরিয়ে দিতেন, তবে তাঁদের দায়িত্ব পালনেও তাঁরা আরও সফল হতে পারতেন।
 
প্রথম অধ্যায়ে যে ‘পটভূমি’ নির্মাণ করেছেন তা নিতান্তই সংক্ষিপ্ত হয়ে গেছে। এত ছোট্ট পটভূমির উপর বিশাল অট্টালিকা নির্মিত হলে তা কি মানানসই হয়? বিশের দশকে জগন্নাথ হলের ছাত্র মন্মথ রায় ১৫টি নাটক লেখেন, যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিনীত হয়। তাঁর নাটক ‘মুক্তির ডাক’ ১৯২৩ সালে ঢাকার জগন্নাথ হলে এবং ১৯২৫ সালে কলকাতার স্টার থিয়েটারেও অভিনীত হয়। পটভূমিতে এই কৃতিত্ব পূর্ববঙ্গের নাটকের প্রাপ্য ছিল। কিন্তু মন্মথ রায়ের লেখা পরবর্তীকালের নাটকের নাম মৃদুস্বরে উচ্চারিত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের নাটক হিসেবে। প্রতিবাদী নাটকের অন্যতম রূপকার মন্মথ রায়ের উত্থান এই পূর্ববঙ্গেই, সেই সত্যটি জোরেসোরে উচ্চারণ করা যেত। চল্লিশের দশকে পশ্চিমবঙ্গে ‘ভারতীয় গণনাট্য সংঘ’-এর নাটক নিয়ে আলোচনাটি আবর্তিত হয়েছে। দিগিন্দ্রচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, বিজন ভট্টাচার্য, বিনয় ঘোষ ও তুলসী লাহিড়ী-ই এখানে আলোচিত। পক্ষান্তরে পূর্ববঙ্গের নাটকে নূরুল মোমেন, শওকত ওসমান, আসকার ইবনে শাইখ, মুনীর চৌধুরীর নাটক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। রণেশ দাশগুপ্তের ‘আমন ধান’ (১৯৪৩), ‘ওরা ঘর বাঁধতে চায়’ (১৯৪৩) এবং ব্রজগোপাল দাসের ‘মেশিন ও মানুষ’ (১৯৪৩)-এর নাম উল্লেখ করা হলেও আলোচনা করা হয়নি। ১৯৪৩ সালে এই নাটকগুলো মঞ্চায়ন করেছিল নবগঠিত ‘ঢাকা থিয়েটার’। এই কৃতিত্বের কথা জানা থাকলেও লেখক তার বিশ্লেষণ করতে উৎসাহী হননি। তাঁর গবেষণার সূচনাকালের এই তিনটি নাটক নিয়ে আরো কিছু কথা থাকলে ভাল হতো।

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে পূর্ববঙ্গে মুনীর চৌধুরী, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, আসকার ইবনে শাইখ ও নূরুল মোমেন, আলাউদ্দিন আল আজাদ, সিকানদার আবু জাফর, সাঈদ আহমদ আর পশ্চিমবঙ্গে দিগিন্দ্রচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, তুলসী লাহিড়ী, ঋত্বিক ঘটক, বিজন ভট্টাচার্য, উৎপল দত্তের নাটক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই অধ্যায়টি বেশ সম্পন্ন  মনে হয়েছে।
 
চতুর্থ অধ্যায়ে সত্তর ও আশির দশকে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটকের ক্ষেত্রে মমতাজউদদীন আহমদ, কল্যাণ মিত্র, নীলিমা ইব্রাহিম, আলাউদ্দিন আল আজাদ, মোহাম্মদ এহসানউল্লাহ, রণেশ দাশগুপ্ত, সাঈদ আহমদ, সৈয়দ শামসুল হক, আল মনসুরের নাটক আলোচিত হয়েছে। এই সময়কালে রচিত আবদুল্লাহ আল-মামুন, মামুনুর রশীদ, সেলিম আল দীন, নিরঞ্জন অধিকারীর নাটক আলোচিত হলে লেখাটি পূর্ণতা পেত।

মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের সত্তর ও আশির দশকে সেলিম আল দীন, আবদুল্লাহ আল-মামুন, মমতাজউদদীন আহমদ, মামুনুর রশীদ ও সৈয়দ শামসুল হকের নাটক আলোচিত হলেও নিরঞ্জন অধিকারী, আ. ন. ম বজলুর রশীদ, ইন্দু সাহা, কল্যাণ মিত্র, রবিউল আলম, মিন্টু বসু, মলয় ভৌমিক, ফরিদ আহমদ দুলাল প্রমুখের লেখা নাটক আলোচনার দাবি রাখে। একই সময়ে পশ্চিমবঙ্গে বিজন ভট্টাচার্য, শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্ত, বাদল সরকার, মোহিত চট্টোপাধ্যায়, মনোজ মিত্রের নাটক আলোচিত হয়েছে। আলোচনার বাইরেও রয়েছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ নাট্যকার।  এঁদের প্রতিবাদী নাটকের কথা তুলে আনলে গবেষণাটি পূর্ণতা পেত।

সপ্তম অধ্যায়ে তুলনামূলক আলোচনা করা হয়েছে মাত্র সাড়ে আট পৃষ্ঠায়। এই অংশ আরো বেশি স্থান দাবি করে। বাংলাদেশের নাটক যে পশ্চিমবঙ্গের নাটকের তুলনায় দুর্বল, সেই কথাটি বলার জন্যই যেন এই অধ্যায়টি পরিকল্পিত হয়েছে। লেখক বলেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধকালে কিংবা মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পূর্বে ও পরে রচিত নাটকসমূহে স্বাধীনতার উত্তাপ মননের চেয়ে আবেগই বেশি প্রকাশিত। সংগত কারণেই শুধুমাত্র শিল্পের বিচারে এসব নাটক মূল্যায়ন করা যায় না।’ (পৃ. ৩৯৪)। মূল্যায়ন করার পর্যায়ে নেই, এমন নিম্নমানের নাটক রচিত হয়েছে এই দেশে ওই সময়ে! অথচ জিয়া হায়দারের ‘শুভ্র সুন্দরী কল্যাণী আনন্দ’ (১৯৭০), আসকার ইবনে শাইখের ‘প্রচ্ছদ’ (১৯৭০) নূরুল মোমেনের ‘রূপলেখা’, কল্যাণ মিত্রের ‘সাগর সেঁচা মানিক’ (১৯৭০), ‘জল্লাদের দরবার’ (১৯৭১), মমতাজউদদীন আহমদের ‘স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা’ (১৯৭১), মামুনুর রশীদের ‘পশ্চিমের সিঁড়ি’ (১৯৭১), রণেশ দাশগুপ্তের ‘ফেরি আসছে’ (১৯৭১), আ. ন. ম. বজলুর রশীদের ‘রক্তকমল’ (১৯৭২), নিরঞ্জন অধিকারীর ‘কালো অশোক লাল ফুল’ (১৯৭২), সেলিম আল দীনের ‘জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন’ (১৯৭২) প্রভৃতি নাটক রচিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের বছর ও আগে-পরের দুই বছরের মধ্যে। এই নাটকগুলো সামনে রেখে কি আমরা অমন আত্মঘাতী কথা বলতে পারি? নিজের কৃতিত্বকে ছোট করার ক্ষেত্রে কী গৌরব লুকিয়ে আছে ঠিক বোঝা গেল না! তিনি আরো বলেছেন, ‘বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পরে পশ্চিমবঙ্গের গ্রুপ থিয়েটারের অনুসরণে যে চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল তা ক্রমান্বয়ে নাট্যচর্চার ক্ষেত্রটিকে ব্যাপকভাবে প্রসারিত করেছিল।’ (পৃ. ৩৯৪)। আমার আপত্তি ‘অনুসরণে’ শব্দটির প্রতি। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ নিজস্ব যোগ্যতায়ই নাট্যচর্চার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। সেখানে ‘অনুসরণে’ করার প্রশ্ন আসে কেন? মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মীর মশাররফ হোসেন, দীনবন্ধু মিত্র, মন্মথ রায়, বিজন ভট্টাচার্য, তুলসী লাহিড়ী, বুদ্ধদেব বসুর মতো বাংলাদেশের, হ্যাঁ বাংলাদেশের, আমি এঁদেরকে সচেতনভাবেই বাংলাদেশের নাট্যকার বলতে চাই, এঁদের মতো নাট্যকার থাকতে অন্যের অনুসরণ করার দরকার হয় না। এরা অবিভক্ত বাংলারই যৌথ সম্পদ। এই পূর্বাধিকার থাকতে আমরা কেন ‘অন্যকে’ অনুসরণ করতে যাব?
 
লেখক আবার লিখেছেন, ‘পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের নাটকের তুলনামূলক মূল্যায়নে আরো যে কথাটি বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার তা হলো, তিরিশ বছরের সমৃদ্ধ নাট্যচর্চা, নাট্যান্দোলন ও নাট্যঐতিহ্যকে ধারণ করে পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট নাট্যকারগণ সত্তর ও আশির দশকে নানান পরীক্ষা নিরীক্ষার মধ্যদিয়ে যেভাবে রাজনীতি ও সমাজভাবনাকে ধারণ করে বিষয়বৈচিত্র্যে, নানান আঙ্গিকে গভীর রসের শিল্পসমৃদ্ধ ও প্রতিবাদী চেতনাঋদ্ধ নাটক রচনা ও প্রযোজনা করেছেন, তার সমগোত্রীয় নাটক বাংলাদেশে সবসময় পাওয়া সম্ভব ছিল না।’ (পৃ. ৩৯৭)। গোটা গ্রন্থে নাট্যসাহিত্য নিয়েই আলোচনা হয়েছে, অথচ, তুলনা করার সময় নাট্যান্দোলন, প্রযোজনা প্রভৃতি বিষয় টেনে এনে আমাদের নাটককে ছোট করে দেখানোর প্রবণতা যেন একটু বেড়ে গেল। আমি হয়তো সেই অর্থে থিয়েটারের মানুষ নই, কিন্তু নাটকের একজন সামান্য পাঠক এবং দর্শক হিসেবে আমি মনে করি তুলনার এই ক্ষেত্রটাই অপ্রয়োজনীয়। কোন বিবেচনায় তিনি পশ্চিমবঙ্গের নাট্যচর্চার বয়স তিরিশ বছর হিসাব করলেন, তা আমাদের বোধগম্য হলো না। লেখকের আলোচনার সময়কাল থেকে ধরলে হয়তো তিরিশ বছর দাঁড় করানো যায়। নাট্যঐতিহ্য আরো প্রাচীন। সেই ষোড়শ দশক থেকেই তো নাটক হচ্ছে। ঐতিহ্য ধরলে তো আমরা আরো পেছনেই যেতে চাইব। কিন্তু লেখক যখন লেখেন, পশ্চিমবঙ্গের নাটকের সমগোত্রীয় নাটক যদি ‘সবসময়’ পাওয়া সম্ভবপর না হয়, তবে কোন সময়ে পাওয়া সম্ভবপর তা নির্দেশ করলে আমরা পাঠকেরা উপকৃত হতাম।

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রতিবাদী চেতনার নাটক নিয়ে আলোচনার সময় কেন পশ্চিমবঙ্গের কৃতিত্বকে এড়িয়ে গেলেন লেখক? ভূমিকা’য় লেখক উৎপল দত্তের ‘ঠিকানা’ ও ‘জয়বাংলা’ এবং বিজন ভট্টাচার্যের ‘সোনার বাংলা’ নাটকের কথা উল্লেখ করেছেন। ১৯৭১ সালেই মন্মথ রায় লেখেন ‘আমি মুজিব নই’, দিগিন্দ্রচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় লেখেন ‘দুরন্ত পদ্মা’, নরেশ চক্রবর্তী লেখেন ‘সংগ্রামী মুজিব’, নিরাপদ মণ্ডল লেখেন ‘মুক্তিফৌজ’, সত্যপ্রকাশ দত্ত লেখেন ‘বঙ্গবন্ধু মুজিবুর’, ছবি বন্দ্যোপাধ্যায় লেখেন ‘সাতকোটির মুজিব’। এছাড়া ‘সাতকোটির মুজিব’ নামে আরেকটি নাটকের নাম জানা গেলেও নাট্যকারের নাম জানতে পারিনি। ১৯৭২ সালে মৃণাল কর লেখেন ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’ নামের নাটক। এটি বাংলাদেশের মঞ্চেও অভিনীত হয়েছে। তুলনামূলক আলোচনা করতে গিয়ে কখনো কখনো পাওনার চেয়ে বেশি দিতে গেছেন আমাদের লেখক। অথচ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের নাট্যকারের চেয়ে তাঁদের ভূমিকা ছিল বেশি, সেই সত্যটি তিনি এড়িয়ে গেলেন। গবেষক হিসেবে এই নিরপেক্ষতা আমাদের কাম্য ছিল।

তবু আমি লেখককে ধন্যবাদ দেব এই কারণে, দুই দেশের বেশ কিছু নাটকের গ্রন্থ পাঠ করে তিনি তার মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছেন। দুই বাংলার প্রতিবাদী নাটকের একটা চেহারা আমাদের সামনে ভেসে উঠছে। বইয়ের শেষে বেশ কিছু আলোকচিত্র এবং নাটকের তালিকা যুক্ত হয়েছে, যা এই গ্রন্থের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে তুলেছে।

মো. জাকিরুল হকের শ্রমসাধ্য এই গ্রন্থটি অনেক তথ্যের যোগান দেবে। যেটুকু ঘাটতির কথা বললাম এ কেবলি অতৃপ্তির কারণে। এর বাইরের বাকিটুকু অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য। কারণ, এ-ও তো সত্য যে, মো. জাকিরুল হকের এই গবেষণার উপর ভিত্তি করে আরো নতুন গবেষণাকর্ম সৃষ্টি হতে পারে। সেক্ষেত্রে এই গবেষণা আকরগ্রন্থের মর্যাদা পেতে পারে। বইটি নাট্যকর্মী তো বটেই, সাধারণ পাঠকেরও মনের ও জ্ঞানের খোরাক যোগাবে।
 
নির্দিষ্ট সময়ে শেষ করার তাগিদে লেখক হয়তো তাড়াহুড়ো করেছেন, তাই কোথাও-কোথাও আলটপকা মন্তব্য ঝরে পড়েছে। কিন্তু এক-নাগাড়ে কলকাতায় থেকে তিনি পাঠ এবং পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন তার আলোকে আরো নতুন গবেষণা তিনি উপহার দিতে পারবেন, তাতে সবাই উপকৃত হবে। সেই প্রত্যাশা আমাদের থাকল।  আমাদের বিশ্বাস সেই প্রত্যাশা পূরণে তিনি তৎপর হবেন।

দুই বাংলার নাটকে প্রতিবাদী চেতনা
লেখক: মো. জাকিরুল হক।
প্রকাশক : বাংলা একাডেমি, ঢাকা।
প্রচ্ছদ: আনওয়ার ফারুক।
প্রকাশকাল: ২০০৭। পৃষ্ঠা: ৫০৩। মূল্য: ২৩০ টাকা।

ড. তপন বাগচী: লেখক, গবেষক। উপপরিচালক, বাংলা একাডেমি, ঢাকা