Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

মঞ্চ পরিকল্পনা : একটি পর্যালোচনা

Written by কামালউদ্দিন কবির.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

ইংরেজি ‘সেট ডিজাইন’ এর বাংলা পারিভাষিক নাম ‘মঞ্চ পরিকল্পনা’। ‘মঞ্চসজ্জা’তেও অনেক সময় বিষয়টি বোঝানো হয়ে থাকে কিন্তু অর্থ ও তাৎপর্যের দিকে লক্ষ্য রাখলে দেখা যাবে সেট ডিজাইন সাজানোর ব্যাপার নয়। আধুনিক ধারণা ও তার প্রয়োগমতে মঞ্চ পরিকল্পনার পশ্চাতে থাকে একটি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য এবং সেই উদ্দেশ্য অনুযায়ী মঞ্চ নির্মাণের পেছনে থাকে সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া।

নাটক মঞ্চায়নে সেট এর আবশ্যকতা কতখানি- নাট্যকর্মীদের এরকম এক আলোচনা মাঝে মধ্যে তর্কে বিতর্কে পর্যন্ত গড়ায়। কিন্তু নাট্য প্রযোজনার নানা উপাদান বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে সেট বা মঞ্চ বিন্যাস বিষয়টি প্রযোজনার অপরিহার্য ভিত্তিরূপ। দৃশ্যায়নই যেহেতু নাটকের অন্যতম ধর্ম, তাই এর দৃশ্যগত দিকটাকে কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যাবে না। পোশাক, আলো, রূপরচনা ও আবহসঙ্গীত প্রভৃতি উপাদান যথার্থ শিল্পপ্রাণ পায় কোনো না কোনো দৃশ্যে। যখন কেউ বলেন সেট ছাড়া নাটক করা সম্ভব- তখন তা নিতান্ত ভুল বাহাদুরিই মাত্র। কেননা নাটক যে আয়তন বা পারিপার্শ্বিকতায় উপস্থাপিত হয়, তখন তা-ই নাটকের সেট। সেট ছাড়া যে নাটক মঞ্চায়ন অসম্ভব, সে প্রসঙ্গে নাট্যবিদ সৈয়দ জামিল আহমেদ চমৎকার একটি উদাহরণ দিয়েছেন। ‘মঞ্চের পেছনের সাদা দেয়ালের সামনেই আপনার নাটক হোক। নাটকের কেন্দ্রীয় কোনো চরিত্র যদি সেই সাদা দেয়ালের সামনে সাদা পাজামা পাঞ্জাবি পরে দাঁড়ায়, এবং পাশে কোনো গৌণ চরিত্র যদি লাল মাফলার পরে থাকে তবে চোখ আপনার ঐ লাল মাফলারওয়ালা গৌণ চরিত্রের দিকেই বেশি যাবে। এক্ষেত্রে আপনার নাটকের লাভ নয়, ক্ষতি হচ্ছে। এ দৈন্য কেবল আর্থিক নয়, শিল্পেরও বটে’। (নাটকে সেট ডিজাইন : একটি আলোচনা, প্রসঙ্গ, সংকলন ২ ভাদ্র ১৩৯৩, চট্টগ্রাম)।

নাট্যশিল্পের আদিম প্রয়াসের যে বর্ণনা আমরা পাই সেখানে পাহাড়ের পাদদেশে বা উন্মুক্ত প্রান্তরে প্রকৃতির সহজ ছন্দেই তৈরি হতো নাট্যায়তন। আদিম মানুষের শিকার নৃত্য, যাদু নৃত্য বা যাবতীয় কৃত্যের (Rituals) মধ্য দিয়ে মূর্ত হয়ে উঠছিলো নাট্যের বীজ। আহারাদি ও বসবাসের ব্যবস্থার পরপরই আদিম মানুষ অবকাশ মুহূর্তে মেতে উঠতো আনন্দ উৎসবে। আবেগ অভিব্যক্তিতে ফুটিয়ে তুলতো নানা গল্পকথা। বিনিময় হতো অভিজ্ঞতার, আনন্দের। হয়তো তা সম্পন্ন হতো শিকারের সাফল্য বর্ণনা বা শিকার পূর্ব মানসিক-শারীরিক প্রস্তুতির সেই কৃত্য পর্বের নানা দেহভঙ্গিমায়। তাদের কারো গায়ে চাপানো আছে মৃত পশুর চামড়া, মুখে পশুর মাথা বা মুখোশ। দু’হাতে লাঠিতে ভর করে কখনো চারপেয়ে জন্তু কখনো-বা শিকারীর সেই ভূমিকা রূপায়ণ। দর্শক (মানে গুহাবাসি সঙ্গীদল) দাঁড়িয়ে যেতো চারপাশে, বৃত্তাকারে। স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হতো বৃত্তাকার অভিনয় ক্ষেত্র (Acting area)। আদিম বা প্রাথমিক নাট্য প্রয়াসের এই অভিনয় ক্ষেত্রকে বলা হয় আদিম অ্যারেনা (Primitive Arena)

বাংলা নাটক বা নাট্যের দেশজ যে আঙ্গিক এখনো বর্তমান আছে, যাত্রা, পালা, পাঁচালি, কিসসা, হাস্তর গান, গাজীর গান ইত্যাদি সবতেই দেখা যায় প্রায় শূন্য আয়তনে বহুব্যঞ্জনাধর্মী নাট্যাভিনয়। আধুনিক নাট্য অভিজ্ঞানে নিরাভরন মঞ্চের যে উল্লেখ আমরা দেখি, তা বাংলা দেশজ নাট্য আঙ্গিকেতো বটেই, পৃথিবীর সকল জাতি-সংস্কৃতির নিজস্ব (Indigenous) নাট্যরীতিতেই বর্তমান রয়েছে। সম্প্রতি প্রণিত ‘বাঙলা নাট্য কোষে’ (ড. সেলিম আল দীন) বাংলা নিজস্ব মঞ্চরূপের উল্লেখ পাওয়া যায় যেমন, গৃহাঙ্গন থিয়েটার, ভূমি সমতল বৃত্তমঞ্চ, চৌকোণ খোলা মঞ্চ/চৌপথ খোলা মঞ্চ। এখানেই ‘সেট ছাড়া নাট্যায়নে’র সেই আলোচনাটি চলে আসতে পারে। অনেকেই হয়তো বলবেন-যাত্রার শূন্য মঞ্চে কত শক্তিশালী অভিনয়তো আমরা দেখি! কিন্তু সামান্য লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে যাত্রা মঞ্চেই কত সুচারুরূপে প্রয়োগ হচ্ছে চির আধুনিক সেট ডিজাইন। যাত্রা পালায় রাজা চরিত্রটি মঞ্চে প্রবেশের পূর্বক্ষণে কেউ একজন মঞ্চে এসে একটি ঝলমলে রঙিন কাপড় মোড়নো চেয়ার বসিয়ে যায়। রাজার প্রস্থানের সঙ্গে সঙ্গে আসনটিও সরিয়ে নেয়া হয়। আবার উজির চরিত্রের অভিনয় যখন শুরু হবে তখনো মঞ্চে চেয়ার বসানো হবে ঠিকই কিন্তু এবারে সেই ঝলমলে কাপড়টি আর থাকবে না। এই নিয়ম স্বতসিদ্ধ কিছু নয়। যে আসরে যেমন ব্যবস্থা হবে সে অনুযায়ী অর্থাৎ ইম্প্রোভাইসড সেট প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। এই সেদিন (১ বৈশাখ ১৪০৬) রাজধানীর একটি নাট্য প্রতিষ্ঠানে যাত্রাপালা (বিশ্বেশ্বরী অপেরা’র ‘কমলার বনবাস’) দেখলাম। ওমর বাদশাহ মঞ্চে আসার পূর্বক্ষণে সেখানে বসানো হলো একটি হাতাওয়ালা আধুনিক চেয়ার। কিন্তু কুস্বভাবী উজির এর জন্য মঞ্চে বসানো হয় কাঠের তৈরি ছোট ফোল্ডিং চেয়ার। ঝলমলে কাপড় ব্যবহার করা না করার মধ্য দিয়ে বা দু’ধরনের চেয়ার ব্যবহারের মধ্য দিয়ে দর্শকরা ঠিক ঠিক ধরে নিতে পারেন চরিত্রায়নের রকমফের।

অবশ্য যাত্রা এবং অন্যবিধ দেশজ বা লোক নাট্য আঙ্গিক সমূহে মঞ্চে কোনোরূপ দৃশ্য উপকরণ (Set element) প্রয়োগের চেয়ে শূন্য আয়তনে অভিনয় উপস্থানই মুখ্য। বাচনভঙ্গী, দেহ ভঙ্গিমা ও পোশাক পরিচ্ছদের বিশেষত্বে ওই ধরনের নাট্যানুষ্ঠানে দর্শকের সঙ্গে সংযোগ প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। মঞ্চ উপাদান সেক্ষেত্রে নিতান্তই গৌণ প্রসঙ্গ। লোক অভিনয়শিল্পীর ব্যবহৃত বিভিন্ন প্রপস এর বহুমাত্রিকতা নাট্যরীতির সেই চির আধুনিকতাকেই প্রমাণ করে। কিসসা বা পালা অনুষ্ঠানে গায়েনের বালিশটির বহুবিচিত্র অর্থে ব্যবহার যথার্থই সৃষ্টিশীল নাট্য মুহূর্ত তৈরি করে। গায়েনের কোমরে পেঁচানো শাড়ি দিয়ে নানা রকম আকর্ষণীয় চরিত্রায়ন ও নাট্যদৃশ্য রূপায়িত হয়। এমনকি দোহারের ব্যবহৃত বাঁশিটি গায়েনের হাতে কখনো লাঠি কখনোবা কলম রূপে উপস্থাপিত হয়। অনবরত বৈচিত্র্যধর্মী নাট্য মুহূর্ত নির্মাণ বোধহয় একেই বলা যায়।

মঞ্চ পরিকল্পনার মূল কথা বা এর উদ্দেশ্যই বা কী, এর উত্তরে এক কথায় বলা যায়- নাট্য প্রযোজনার আধার এই  মঞ্চ পরিকল্পনা। এখানে অবশ্য উল্লেখ প্রয়োজন যে, মঞ্চ পরিকল্পনা বিষয়টি এককভাবে কখনো বিচার্য নয়। সেট, আলো, পোশাক, রূপসজ্জা, আবহ-সব উপাদানের সমন্বয়ের ফলেই যথার্থ নাট্য প্রযোজনা তৈরি হয়। কোনো একটি উপাদান ভিন্নভাবে আকর্ষণের বিষয় হলে তা সমগ্র প্রযোজনার হানিকর দিককেই প্রমাণ করে।

ডিজাইন বা পরিকল্পনার উদ্দেশ্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় যাবার আগে আর একটি বিষয় বলে নেওয়া জরুরি। প্রযোজনার বিভিন্ন উপাদানের সঙ্গে অন্য শিল্প সাহিত্য মাধ্যমের বিকাশ বৈশিষ্ট্যের যোগসূত্র আছে কী নেই-তা বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। কেননা শিল্পরীতি বা শৈলী স্থির-আবদ্ধ কোনো ব্যাপার নয়। রীতিগত ও পদ্ধতিগত পরিবর্তনশীলতা এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। নতুন থেকে নতুনতর শিল্প চৈতন্যের উদ্ভাসই এর প্রাণধর্ম। সেই ত্রিশ বা চল্লিশের দশকের পেইন্টিং, ড্রয়িং, ভাস্কর্যের সঙ্গে এই সময়ের চারুশিল্পের নিশ্চয়ই অনেক অনেক ভিন্নতা রয়েছে। তা বিষয় বিন্যাস থেকে শুরু করে শৈলী বা প্রকরণ অবধি। তেমনি আধুনিক পাঠকের কাছে প্রাচীন প্রথা নির্ভর কথা শিল্পের চেয়ে নতুন বিষয় ও আঙ্গিকের পাঠ গ্রহণীয় হবে। অথচ বর্তমানের নাট্যাঙ্গনে এ এক অনুতাপের বিষয় যে- নাটকের বিষয়বস্তুতে যেমন প্রাচীনকতা বা প্রথাবদ্ধতা গেড়ে বসেছে, তেমনি উপস্থাপনের প্রায় প্রতিটি উপাদানে, বিশেষ করে মঞ্চ পরিকল্পনাতে দেখা যায় গাতানুগতিকতা ও স্থূলতার স্পষ্ট ছাপ।

এই সময়ের যে কোনো আর্ট গ্যালারির প্রদর্শনীতে গেলে নতুন নতুন শিল্প সমাহারে আমাদের চোখ মন ধাঁধিয়ে যায়। রঙ-রেখার বিচিত্র বিন্যাস আমাদেরকে বিমোহিত করে বা নিদেনপক্ষে মনোযোগী করে তোলে। অবশ্য এও সত্য যে, শৈলীর নতুনত্ব কখনোবা দর্বোধ্যতার আড়াল তৈরি করে। এক্ষেত্রেও মনে রাখা প্রয়োজন-শিল্প শাখার প্রতিটি বিষয়কে দেশ কাল পাত্র ভেদে নানাভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। নাট্য প্রযোজনার কথাই যদি ধরি দেখবো যে, একই নাটকের নানান মঞ্চ পরিকল্পনা হতে পারে। কোনোটিতে হয়েতো পাণ্ডুলিপিতে বর্ণিত পরিবেশের হুবহু প্রকাশ, কোনোটিতেবা নাট্যক্রিয়া সম্পাদনের লক্ষ্যে ন্যূনতম উপাদানের প্রয়োগ। এক্ষেত্রে নাট্য নির্দেশকের ভূমিকা বা তাঁর শিল্প চিন্তার ভূমিকা মুখ্য। কোন দৃষ্টিভঙ্গিতে তিনি নাটককে বিশ্লেষণ করছেন এবং কোন রীতিতেই-বা তা প্রকাশ করবেন ইত্যাদি নানা প্রসঙ্গ তখন জরুরি হয়ে দেখা দেয়।

নাট্য ঘটনার প্রেক্ষাপট দৃশ্যায়নই মঞ্চ পরিকল্পনার প্রথম উদ্দেশ্য। কোথায় হচ্ছে এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, অর্থাৎ দর্শকের সম্মুখে সমগ্র পারিপার্শ্বিকতাকে উন্মোচন করা। পুরনো আমলে মঞ্চ বা দৃশ্য পরিকল্পনা করা হতো মস্ত পেইন্টিং এর আদলে। প্রসেনিয়াম মঞ্চে যেমন, চতুষ্কোণ ফ্রেম, সেই ফ্রেমের পেছনে বিশাল আকৃতির চিত্রপট। মঞ্চের দু’পাশে এবং পশ্চাৎপটে বড় থেকে ক্রমশ ক্ষুদ্র আকৃতির অর্থাৎ দর্শনানুপাত রীতিতে অঙ্কিত দৃশ্যপটের ব্যবহার ছিলো। পরবর্তী সময়ে প্রসেনিয়ামে যুক্ত হলো উইংস। সম্মুখভাগের উইংস থেকে ক্রমশ পেছনের উইংস ও পশ্চাৎপটে ব্যবহৃত হতো দর্শনানুপাত রীতিতে অঙ্কিত চিত্র। এই প্রক্রিয়াতে রাজপ্রাসাদ, বনজঙ্গল বা পথ-প্রান্তরের দূরত্ব ও গভীরতা (দৃশ্য বিভ্রম) তৈরি হতো। এ সময়ে সেট তৈরি হতো সর্বজনীন সর্বকালীন আদর্শের সাপেক্ষে। ফলে একই সেট একাধিক প্রযোজনায় ব্যবহৃত হতো। সপ্তদশ শতাব্দীর অন্তিম পর্যায় থেকে বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিক পর্যন্ত চিত্রাঙ্কন প্রক্রিয়ায় মঞ্চ পরিকল্পনার প্রচলন ছিলো। ইউরোপ, মার্কিনসহ সমগ্র বিশ্ব নাট্যচর্চাতে ওই ধারা ব্যাপ্ত ছিলো। এ শতাব্দীতে আমরা পাবলো পিকাসো, সালভাদর দালী এবং মার্ক শাগাল প্রমুখ প্রখ্যাত চিত্রীদের পেয়েছি, যারা নাট্য প্রযোজনায় দৃশ্য নকশা করেছেন।   

নাট্যবিষয়ের ভাব, প্রযোজনার শৈলী এবং সর্বোপরি নাটক দিয়ে যা বোঝাতে চাওয়া হয় সেই অর্থ বা মেসেজ মঞ্চ বিন্যাসে স্পষ্ট হতে হবে। মঞ্চ উপাদান সমূহের রঙ ও রেখায় মূর্ত হবে নাটকের মূল সুর ও মূল বক্তব্য। উদাহরণ স্বরূপ ঢাকা থিয়েটারের ‘কেরামত মঙ্গলের’ মঞ্চ পরিকল্পনার কথা বলা যেতে পারে। কেরামত বারবার গণ্ডী ভেঙে বের হতে চায়। তাই মঞ্চের বৃত্ত পরিকল্পনা ও বৃত্ত বিভাজন নাটকের মূল সুরকেই ব্যক্ত করে। সৈয়দ জামিল আহমেদ কৃত এই সেট নাটকের নানা চিত্রকল্প ও বহুমাত্রিকতাকে দৃশ্যমান করেছে। চাকা লাগানো বেদীতে স্থির অভিনয়শিল্পী দূরে সরে যায়। নাট্যিক আয়তনে তা কখনো সমতল ভূমি, কখনোবা জলে ভাসা নৌকা। মঞ্চ, আলো ও অভিনয়শিল্পী অদ্বৈতরূপে তৈরি হয় এক সার্থক কবিতা।

বাস্তব বা অবাস্তব যে রীতিতে মঞ্চ পরিকল্পন হোক না কেন, তা অবশ্যই দর্শকের কাছে স্পষ্ট করবে যে, নাট্যঘটনা কোথায় এবং কখন হচ্ছে। ঘরে বাইরে, পথে প্রান্তরে, শহরে বন্দরে ইত্যাদি নানা স্থান বোঝাতে যেমন ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের মঞ্চ উপাদানের প্রয়োগ হয়, তেমনি গঠন প্রকৃতি ইত্যাদিতে নির্দেশ করবে সেটি কোন সময়কার? মঞ্চ পরিকল্পনা নাট্যের চরিত্রায়ন সম্পর্কেও দ্রুত ইঙ্গিত দেয়। সামান্য উঁচু নিচু তলে দাঁড়ালে চরিত্রে চরিত্রে যে রকমফের বা চরিত্রের সঙ্গে চরিত্রের যে সম্পর্ক তা প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব।

মঞ্চ পরিকল্পনার নানা উপাদান, যেমন রেখা, রঙ, আকৃতি ইত্যাদি সব মিলিয়ে স্বতন্ত্র সম্পূর্ণতা তৈরি হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে ডিজাইনার সমগ্র পরিকল্পনায় একটি কেন্দ্রীয় চিত্রকল্প বা রূপক প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। উদাহরণ: ‘ইঁদারা’ নাটকটি। গ্রামের এক পরিত্যক্ত ইঁদারা থেকে অকস্মাৎ মানুষের কান্না ভেসে আসে। সেই কান্নাকে কেন্দ্র করে গ্রামবাসি দুই ধর্মের দুইদল মানুষ উদ্ভট এক সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। দাঙ্গা হাঙ্গামায় ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয় সমগ্র জনপদ। এই নাট্য বিষয়ের মঞ্চ পরিকল্পনা স্বভাবিকভাবেই, খসে যাওয়া সিমেন্টের আস্তর, ভাঙাচোড়া ইট বেরিয়ে আছে (হার্ড বোর্ডে আঁকা)- এরকম একটি বাস্তবানুগ ইঁদারা মঞ্চকেন্দ্রে স্থাপনের মাধ্যমে অভিনয় উপস্থাপন করে আসছিলো ‘থিয়েটার সেন্টার’। অনেকগুলো প্রদর্শনীর পর, আধুনিক মঞ্চ শৈলীর এক আলোচনা পর্বে সকলে সম্মত হলেন যে, ওই বাস্তবানুগ মঞ্চ বিন্যাস (ইঁদারা) বড় বেশি এক মাত্রিক। ভিন্ন কোনো অর্থ, ভিন্ন কোনো ব্যঞ্জনা তৈরিতে ওই মঞ্চ একেবারেই অক্ষম। তাই নতুন পরিকল্পনায় দেখা গেলো-সমগ্র মঞ্চ তলে শুকনো বড় বড় পাতা। এর মানেটা এরকম যে- প্রাচীন কোনো বৃক্ষতলেই ঘটবে নাটকের নাট্যক্রিয়া। যদিও একটি দৃশ্যেই নাট্যকাহিনী আবর্তিত হয়, তবু শুরু থেকে এই মঞ্চে ইঁদারার চিহ্ন মাত্র নেই। আছে শুকনো পাতা আর মঞ্চের বিভিন্ন স্থানে চার-পাঁচটি ভাঙা স্তুপ। চটের তৈরি এ উপাদানকে এবড়ো থেবড়ো মাটির স্তুপ মনে হচ্ছিলো। আর মঞ্চের উপরের ফ্লাই সংলগ্ন পাইপ থেকে বিভিন্ন দূরত্বে, দড়ি ও বটের ঝুল-শিকড় সহযোগে তৈরি একটি উপকরণ, ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। এই ডিজাইন করার ফলে নাটকস্থিত নাট্যক্রিয়ারও অনেক পরিবর্তন হলো। অশিক্ষা ও অন্ধ বিশ্বাসের কারণে জনজীবনে যে হানাহানি-তাকে নাট্য ঘটনায় নিয়ে আসার জন্য নাটকের সরাসরি সংঘাত দৃশ্য এড়িয়ে প্রথমে-অন্ধকার, ভূতুরে পরিবেশ (পরিত্যক্ত ইঁদারা, মায়ের কান্না, শুকনো পাতার খস খস শব্দ, ঝুলন্ত শিকড় নড়ে ওঠা), রহস্য আতঙ্ক ইত্যাদি নানা অভিব্যক্তিমূলক নাট্যক্রিয়ার মাধ্যমে এক ভিন্ন নাট্য পরিবেশ তৈরি হয়। দর্শক তখনো জানে না ইঁদারা কোথায়। আতঙ্কগ্রস্থ পরিবেশে গুটি সুটি মেরে গ্রামবাসিরা মঞ্চে আসে, শরীরে নানা কষ্টকর ভঙ্গিমা, অশিক্ষা-কুশিক্ষা-কুসংস্কারের অন্ধকার যেন জাপটে ধরে সকলকে, এরকম অবস্থায় কৌশলে অভিনয়শিল্পীরা সেই ভাঙা স্তুপগুলোকে পাশাপাশি জড়ো করে তৈরি করে এক ইঁদারা। অর্থাৎ গ্রামবাসিরা এতোক্ষণ যেনো এই ইঁদারার কাছে আসছিলো। সব মিলিয়ে সে এক বিপন্ন জনজীবনের চিত্রমালা তৈরি হচ্ছিলো একের পর এক। নাট্যকার বর্ণিত কাহিনীবিন্যাস মঞ্চ প্রয়োগে এসে নির্দেশক ও ডিজাইনারের কর্মকুশলতায় পেলো ভিন্নতর ব্যঞ্জনা।

মঞ্চ পরিকল্পনার উদ্দেশ্য প্রসঙ্গে সর্বোপরি যা উল্লেখ প্রয়োজন, তা হলো মঞ্চ উপকরণ-সমূহের যথাযথ সমন্বয়। পাণ্ডুলিপির কাঠামো ও অভিনয় যদি হয় স্টাইলাইজ নির্ভর, তাহলে মঞ্চ পরিকল্পনাতে গতানুগতিক সাধারণ এবং একঘেঁয়ে কোনো প্রয়োগ থাকা ঠিক হবে না। আবার নাটক ও অভিনয় বাস্তবানুগ হলে প্রযোজনার অন্য উপাদানের চেয়ে সেট ভিন্ন ব্যতিক্রমী হলে চলবে না। অর্থাৎ নাটকের বিষয়, অভিনয়, আলো, মঞ্চ ইত্যাদি প্রত্যেকের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে দৃশ্য পরিকল্পনা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। তবে একটি বিষয় এখানে আলোচনার দাবি রাখে, তা হলো, কোনো নাটকে অভিনয়, পোশাক আলো ইত্যাদির সঙ্গতিপূর্ণ বাস্তবানুগ উপস্থাপনাতে মঞ্চ বিন্যাসে কতটুকু বাস্তবানুগ থাকতে হয়? নাটককার বর্ণিত ডিটেইল পরিবেশ রচনাই কি সেখানে মুখ্য? নাকি নাট্যক্রিয়ায় অনিবার্য প্রয়োজন কেবল এমন সব উপকরণই স্থাপন যথেষ্ট?

পাণ্ডুলিপিতে বর্ণিত বহু বিস্তৃত পারিপার্শ্বিকতাকে মঞ্চশিল্পী অত্যন্ত সীমিত পরিসরে (নাট্যমঞ্চে) রূপায়িত করেন। এখানেই শিল্পীর সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গি ও দক্ষতার দিকটি চলে আসে। মদিনায় নবীজীর মসজিদ, দামেস্কে মাবিয়ার রাজগৃহ, জব্বারের বাড়ি, জয়নাবের বাড়ি, হোসেনের বাড়ি, মরুপথ, এজিদের রাজসভা, হযরতের রওজা, যুদ্ধক্ষেত্র, মারোয়ানের গুহা, মায়মুনার বাড়ি, জায়েদার ঘর, মুসলনগর, মদিনানগরে হাসিনা বানুর ঘর, হাসানের ঘর,- ‘বিষাদ সিন্ধু’র এই এতো এতো দৃশ্য পরিবেশ কী চমৎকার সাবলীলভাবে মহিলা সমিতি মঞ্চ ও প্রেক্ষাগৃহের অনেকখানি জায়গা জুড়ে মূর্ত হয়ে ওঠে। না, শূন্য আয়তনে কেবল বর্ণনা বা সংলাপ দিয়ে ওই দৃশ্যাবলি প্রতিষ্ঠিত করা হয়নি (যেমনটা যাত্রা মঞ্চে হয়ে থাকে); নাট্য প্রযোজনার আধুনিক শৈলীর সার্থক প্রয়োগ হয়েছে ঢাকা পদাতিকের এই নাট্যে। নির্দেশক ডিজাইনার সৈয়দ জামিল আহমেদ নাট্যস্থিত প্রতিটি দৃশ্যের দৃশ্যগত ন্যূনতম উপাদান ব্যবহার করে দর্শকের বোধগম্যতা এবং কল্পনা প্রসারণে সহায়তা করেন। প্রতিটি ইউনিটের নাট্যক্রিয়া দৃশ্যায়নের প্রয়োজনেই ওই দৃশ্যগত ন্যূনতম উপাদান প্রযুক্ত হয়েছে। সে কারণে তিনি ডিজাইন প্রক্রিয়াকরণের শুরুতেই ভাবলেন, ‘(মহিলা সমিতি) প্রেক্ষাগৃহের সিমেন্ট দ্বারা আস্তরকৃত মেঝের বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন প্রয়োজন; কারণ এটি সুস্পষ্টভাবে বিংশ শতকীয় শহুরে গন্ধের সঙ্গে যুক্ত। এখানে এমন কিছু চাই যা দ্বারা এটিকে দেখে ঢাকা শহরের একটি ইমারতের মেঝে মনে না হয়ে কারবালার মরুপ্রান্তরের কথা মনে হতে পারে। অথবা এখানে এমন কিছু চাই যার কারণে একে কারবালার মরুপ্রান্তর কল্পনার ক্ষেত্রে অন্তত বাধার সৃষ্টি করবে না। এর সহজতম সমাধান: বিবর্ণ হলুদাভ খয়েরি রঙের ম্যাট। এটি মেঝের সিমেন্ট নির্মিত চরিত্র মুছে ফেলতে সাহায্য করে এবং একই সঙ্গে প্লাটফর্মের তুলনায় অত্যন্ত সহজে বহনযোগ্য। এটি মরুভূমির বালু নয়; অথচ বালুর কাছাকাছি। বালুময় বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তৃষ্ণার্ত মানুষের কাহিনী উপস্থাপনের ক্ষেত্রে এটি বাধা স্বরূপ নয়। এটি রাজদরবারের কারুকাজমণ্ডিত মেঝে নয় কিন্তু প্রাসাদে ব্যবহৃত গালিচার কাছাকাছি।’ (সৈয়দ জামিল আহমেদ, বিষাদ সিন্ধু: গ্রন্থ থেকে নাট্যে, স্যাস-একাদশ বার্ষিকী সংখ্যা ১৯৯৪, কলকাতা)। মরুভূমি, আরব রাজপ্রাসাদ এবং হাসানের গৃহের আনুষঙ্গিক উপাদান হিসেবে অভিনয়ক্ষেত্রের একদিকে (প্রসেনিয়াম ওপেনিং বরাবর) একটি গালিচা ঝোলানো হয়েছে। হলুদাভ খয়েরি জমি এ্যারাবেস্ক নকশা শোভিত গালিচাটিতে আরব পরিবেশ তৈরি করেছে (আরব সংস্কৃতিতে গালিচা একটি পরিচিত উপাদান) অন্যদিকে দৃশ্যান্তরের প্রয়োজনে পর্দা হিসেবেও ব্যবহার করা সম্ভব হয়েছে। ম্যাট ও গালিচা ব্যতিরেকে চারটি নাতিদীর্ঘ প্লাটফর্ম একত্রে স্থাপন করে তার ওপর আর একটি গালিচা বিছিয়ে দেওয়া হয়। পত্নীসহ মাবিয়ার বসার জন্য প্লাটফর্মের দুই কোণে দু’টি কুশন রাখা হয়। একটি ফ্রেম সামান্য পরিবর্তনের মাধ্যমে জব্বারের বাসগৃহ এবং জয়নাবের পিত্রালয় দৃশ্য উপস্থাপিত হয়। অর্ধবৃত্তাকারে বিভিন্ন উচ্চতায় অভিনয়শিল্পীদের কালো ও ছাই রঙের কাপড়ে ঢেকে তৈরি করা হয় মারোয়ানের গুহা। বলা বাহুল্য, প্রতিটি দৃশ্য রূপায়নে মস্ত ফ্যাক্টর ছিলো আলোর বিশেষ প্রক্ষেপণ।

‘বিষাদ সিন্ধু’ মঞ্চায়নে দর্শকের আসন থাকে তিনদিকে। প্রসেনিয়াম মঞ্চ ব্যতিরেকে মহিলা সমিতির তিন দিকের দেয়াল সংলগ্ন চার সারিতে বসেন দর্শক। বাংলা নাট্যের মৌল অভিনয়রীতির আধুনিকায়নে ‘বিষাদ সিন্ধু’তে বর্ণনা ও সংলাপ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে। বন্দনা গীতের মাধ্যমেই এ নাট্যের শুরু। গায়েন বা মূল কথক দৃশ্য বা কাহিনী বর্ণনার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন চরিত্রে রূপদান করেন। তার হাতের চামড় (লোক অভিনয়ে ব্যবহৃত উপাদান) নাড়িয়ে নানান অর্থে সেটি ব্যবহার করে বৈচিত্র্যপূর্ণ অভিনয় সম্পন্ন হয়। দেশজ বা নিজস্ব নাট্য উপাদান সহযোগে নির্মিত আধুনিক বাংলা নাট্যের এক অনন্য উদাহরণ এই ‘বিষাদ সিন্ধু’।

সম্প্রতি দিল্লি থেকে আগত প্রখ্যাত নাট্য ও চলচ্চিত্র নির্দেশক এম. কে. রায়না, সেন্টার ফর এশিয়ান থিয়েটারে তৈরি করে গেলেন ‘বুনো হাঁস’। ইবসেন রচিত পাক্কা বাস্তববাদী ঘরানার নাটক এটি। নাটকে পারিপার্শ্বিকতার যে নিখুঁত বর্ণনা নাটককার দিয়েছেন তার যথার্থরূপই আমরা মঞ্চে দেখি। আর মঞ্চ সামগ্রীতে তো অবশ্যই। যথার্থই ‘অত্যাধুনিক বাড়ি’, ‘জাঁকজমকপূর্ণ ভিতরের অংশ’, ‘দোতলায় করিডোরের অংশ’, ‘দোতলা থেকে নেমে আসা সিঁড়ি’, ‘দেয়ালের গায়ে প্রশস্ত জানালা’, ‘কারুকার্য খচিত একটি প্রকা- দরজা’, ‘মঞ্চের সামনের অংশে বাঁ দিকে একটি বইয়ের শেলফ ... ইত্যাদি আরো অনেক অনেক নিখুঁত বাস্তবতা। সবিনয়ে জানাই, ওই উপস্থাপনা পর্যবেক্ষণে আমরা ধ্বন্ধে পড়ে যাই। ১৯৯৯ সালে আধুনিক শিল্পীদের কাজে কেন এতো নিরেট বাস্তবতা দেখতে হবে? প্রায় শত বছর পূর্বে আদ্রে আঁতোয়া (১৮৫৪-১৯৪৩) ‘বুনো হাঁস’ নির্দেশনা দিয়েছেন। আঁতোয়া মঞ্চে জীবন্ত ছবি তৈরির কর্মকার ছিলেন। তাঁর ‘বুনো হাঁস’, প্রযোজনার সেট-এ মেঝে ছিল কার্পেটসহ ফ্লোরক্লথ দিয়ে ঢাকা-যাতে মঞ্চের কাঠ না দেখা যায়। আরো ছিল কাঠের ঢালু ছাদ, কাঠের দেয়াল। বিছানা, চেয়ার, আসবাব পত্র অন্যান্য দ্রব্যাদি-এক কথায় যে সময়কার কথা নাটকে বলা হয়েছে, ঠিক সেই জীবন্ত ছবি।

তারপরতো সময় অনেক গড়িয়েছে। বাস্তববাদী চিন্তাধারার বিরুদ্ধে রিচার্ড ওয়াগনার যাত্রা শুরু করলেন, এবং একে একে এডল্ফ আপ্পিয়া, গর্ডন ক্রেইগ, বের্টোল্ড ব্রেশট, জারজি গ্রটস্কি, রিচার্ড শেখনার, পিটার ব্রুক প্রমুখ নাট্যবিদগণ নতুন থেকে নতুনতর নাট্য অবদান রেখে চলেছেন। কেউ আর পুরনো প্রথার অনুগামী হন নি।

প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা প্রয়োজন- সেন্টার ফর এশিয়ান থিয়েটার ইতোপূর্বেও ইবসেনের নাটক মঞ্চে এনেছে। ‘গোস্টস’ এর বাংলা রূপান্তর ‘কৃষ্ণবিবর’। কামালউদ্দিন নীলু নির্দেশিত এ নাটকের মঞ্চ ও আলোক পরিকল্পনা করেছেন কুর্ট হারমেনসেন। বাস্তববাদী এ নাটকে ‘মফস্বলের একটি বাড়ি। বড় আয়তনের একটি বৈঠক ঘর। ঘরের আসবাব পত্রে বিত্ত ও বৈভবের ছাপ ইত্যাদি পারিপার্শ্বিকতা হুবহু বাস্তবের আদলে নির্মাণ করা হয় নি। বহু কোণসহ একাধিক তল বিশিষ্ট মেঝের মধ্যস্থানে দু’টি বেতের সোফা একটি বেতের টেবিল রয়েছে। মঞ্চের সম্মুখভাগেও বেতের চেয়ার টেবিল এবং মেঝেতে শীতলপাটি বিছনো রয়েছে। বিভিন্ন কৌণিক প্লাটফর্মের দু’কিনার ঘেঁষে নির্দিষ্ট দূরত্বে বেত বসানো কাঠের ফ্রেম। নাট্যক্রিয়া উপস্থাপনে এই ইঙ্গিতবহ দেয়াল বিশেষ ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করেছে। এই ডিজাইন খুব চমৎকারভাবে নাটকের চিত্রকল্প ও বিভিন্ন নাট্যমুহূর্ত দৃশ্যমান করেছে, ভিন্ন অর্থ ও রূপ যোগ করেছে। আলো, মঞ্চ এবং অভিনয়শিল্পী এক হয়ে এ প্রযোজনায় এক সফল থিয়েটার তৈরি করেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েল নাট্যকলা ও সঙ্গীত বিভাগে শ্রেণী প্রযোজনা হিসেবে তৈরি হয়েছে ইবসেনের বহুল আলোচিত ‘দ্য ডলস হাউস’। যথারীতি এ নাটকের পাণ্ডুলিপিতে বাস্তবতার অঢেল নিদর্শন মঞ্চে উপস্থাপনের নির্দেশ রয়েছে। মঞ্চায়ন রীতি বা অভিনয় শৈলীর ব্যাপারে এই প্রযোজনার কিছুটা কড়াকড়ি ছিলো। কেননা প্রযোজনা সংশ্লিষ্ট সকলেরই সর্বদা মনে রাখতে হচ্ছিলো- প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অভিনয় শিক্ষা কার্যক্রমের অংশ এটি।

কিন্তু মঞ্চ পরিকল্পনা প্রণয়নে দু’টি সমস্যা দেখা দিলো। এক, যে মঞ্চে (নাটমণ্ডল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) নাটকটি মঞ্চস্থ হবে সেখানে অভিনয় ক্ষেত্রের পরিমাপগত সমস্যা রয়েছে। পাণ্ডুলিপিতে বর্ণিত ডিটেল বাস্তবতা ওই আয়তনে সমস্যাজনক। এবং অন্য সমস্যা হলো- ডিজাইন ভাবনার শিল্পগত দিক। যুগের দাবির কথাই যদি মনে রাখি তাহলে এই সময়কার নাট্যচর্চায় বাস্তববাদী প্রয়োগ কতখানি এবং তা কীভাবে সম্ভব? মঞ্চায়নের তারিখ যতো ঘনিয়ে এলো, ভাবনার আলোড়ন ততো বাড়তে থাকলো। নিরেট দেয়ালের পরিবর্তে চিকন কাঠের বিট দ্বারা একাধিক জ্যামিতিক ফ্রেম ভাবা হলো। এর সঙ্গে মেঝেতে বিভিন্ন আসবাবপত্র ও এগুলোর ওপর বিভিন্ন আকৃতির অনেকগুলো পুতুল রাখার কথা ভাবা হলো। কিন্তু চিন্তার রশিতে টান পড়লো। বাস্তবাদী রীতির প্রযোজনায় এ বড় বেশি নিরীক্ষার মতো মনে হচ্ছে। একেতো মঞ্চায়ন সময় সন্নিকটে। এবারে গভীর অনুধ্যানের সঙ্গে ইবসেন প্রদত্ত পরিবেশ বর্ণনার মধ্য থেকে সরল বাস্তব অনুষঙ্গ বাছাই করা হলো। যেমন- ‘বেশ খোলামেলা আরামদায়ক একটি ঘর’। ‘আসবাবপত্র সেরকম দামী নয়, তবে রুচিশীল’। ‘(জানালার কাছে) একটি গোল টেবিল’। ‘হাতল চেয়ার ও ছোট্ট একটি সোফা’। ... ‘(দেয়ালের গায়ে লাগোয়া) স্টোভ’। ‘স্টোভের সামনে দু’একটা ইজি চেয়ার ও দোলনা চেয়ার’। ... ‘ছোট্ট একটি টেবিল’। ... ‘একটি ছোট্ট বই শেলফ। শেলফে চমৎকার বাঁধানো কিছু বই’। ... ‘বাইরে হলঘরের বেল’।

ইবসেনের বর্ণনা থেকে উপরোক্ত নির্বাচনে যা যা আপাতত বাদ পড়লো তা হলো- ‘পিছনের দেয়ালে দু’টি দরজা। ডানদিকের দরজা দিয়ে হলঘরের দিকে আর বাঁ দিকের দরজা দিয়ে হেলমারের পড়ার ঘরের দিকে যাওয়ার পথ। দু’টো দরজার মাঝখানে দেয়াল ঠেসে একটি পিয়ানো। ... বাঁ দিকের দেয়ালের মাঝ বরাবর অন্য একটি দরজা। দরজার কাছাকাছি জানালা। ডান দিকের দেয়ালে প্রায় পেছনের দিকে আর একটি দরজা। ... দেয়ালে কিছু খোদাই কাজের নিদর্শন। চেনা কারুকাজ করা একটি কেবিনেট এবং আরো কিছু আনুষঙ্গিক টুকিটাকি। ... মেঝেতে গালিচা।’

নাটম-লের অভিনয় স্থানের সীমাবদ্ধতা, সেট নির্মাণের অর্থ বাজেট এবং সর্বোপরি আজকের শিল্প চিন্তাকে সামনে রেখে অবশেষে ‘দ্য ডলস হাউস’-র, মঞ্চ পরিকল্পনা সম্পন্ন হলো। বলাবাহুল্য, কোনোরকম দরজা জানালা ব্যতিরেকে কেবল আসবাব সামগ্রী স্থাপনের মাধ্যমে হেলমার নোরার ‘খোলামেলা আরামদায়ক একটি ঘর’ রচিত হয়েছে। ‘হিস্ট্রি অব হাউস’ সহ ফার্নিচার এর বেশ কিছু কোষ গ্রন্থ অনুসন্ধানের পর স্কান্ডেনেভিয়ান আসবাবের আদলটি মুখ্য রেখে সামান্য পরিবর্তনের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে দু’টি হাতল চেয়ার ও একটি গোল টেবিল, একটি দোলনা চেয়ার, একটি ডিভান, একটি ছোট টেবিল, একটি ছোট্ট বই শেলফ, একটি কাপড় স্ট্যান্ড ও একটি স্টোভ। এখানে মনে রাখা প্রয়োজন, এই ডিজাইন প্রণয়ন ‘আজকের শিল্পচিন্তা’কেই সবিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সেট তৈরির বাজেট বা অভিনয় স্থানের সীমাবদ্ধতার জন্যে দেয়াল, দরজা, জানালা ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়নি- এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। বরং ন্যূনতম যেসকল উপকরণ না হলেই নয় অর্থাৎ যথাযথ নাট্যক্রিয়া সম্পাদনের জন্য যে যে উপাদান বা বস্তুসামগ্রী একান্ত প্রয়োজন সে-সবই মঞ্চে স্থাপন করা হয়েছে। অবশ্য সেক্ষেত্রেও লক্ষ্য রাখা হয়েছে যে, বাস্তবের জটিল গঠন-কাঠামো যতটা সরলভাবে মঞ্চে নিয়ে আসা যায়।

মঞ্চের সম্মুখভাগের বাম কোণে দেয়াল সংলগ্ন স্থাপিত হয়েছে লোহার তৈরি স্ট্যান্ডসমেত চিঠির বাক্স। আর কিছুটা সামনেই প্রায় পাঁচ ফুট উঁচু তিনপায়া রডস্ট্যান্ড তৈরি করে বেল ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। নাটকের শুরুতেই নোরা এখান থেকে বেল বাজিয়ে ঘরে প্রবেশ করে। মঞ্চে আসবাব সামগ্রীগুলো এমনভাবে রাখা থাকে, যেনো তিন দিকেই মুহূর্তে তৈরি হয় অদৃশ্য দেয়াল। নোরা এবং মিসেস লিন্ডে যখন ঘরে আলাপরত, তখন ডা. র‌্যাংক বাইরে (দর্শকের দিক) থেকে ঘরে প্রবেশ ক’রে যেভাবে স্টোভ, কাপড়স্ট্যান্ড ও বুক শেলফের পেছন দিয়ে এমন বিশ্বাসী পদক্ষেপে যান যে, মনেই হয় দেয়ালের পাশের সরু পথ দিয়ে হেলমারের পড়ার ঘরে যাচ্ছে। প্রেক্ষাপট ও আবহের অপরিহার্যতায় ‘পিয়ানোর’ বদলে বুক শেলফের ওপর একটি পুরনোকালের লংপ্লে রেকর্ডার রাখা হয়েছিলো। স্টোভটি ধূসর পাথর রঙ এবং অন্য সব সেট সামগ্রী পুরনো কাঠ রঙ (কফি রঙ) ব্যবহার করা হয়েছে।

আশির দশক থেকে বাংলাদেশের নাটকে সেট ডিজাইনের প্রসঙ্গটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হতে লাগলো। পরিবর্তনের সূচনা হলো ঢাকা থিয়েটারের ‘ফণিমনসা’ প্রযোজনায়। প্রসেনিয়াম ওপেনিং এর বাইরে এলো সেট। মঞ্চের সমতল পরিকল্পিত উপায়ে ভাঙা হলো। আর এক বড় পরিবর্তন সূচিত হলো নাগরিক প্রযোজনা ‘কোপেনিকের ক্যাপ্টেন’ দিয়ে। নাটক মঞ্চস্থ হলো প্রেক্ষাগৃহে। তিন দিকে ছিলো দর্শক। মঞ্চের বাইরে বিশাল আকৃতির সেট ব্যবহৃত হলো ‘কিত্তনখোলা’ নাটকে। পাশ্চাত্যরীতি নির্ভর সেট ছিল এটি। এই ডিজাইনে ছিলো বিভিন্ন উচ্চতায় অভিনয়ের সুযোগ। ফলে সৃষ্টি হয়েছিলো নতুন অর্থ ও তাৎপর্যের নাট্যক্রিয়াসহ নানামাত্রিক কম্পোজিশন।

আশির দশকের প্রায় পুরোটা সময় জুড়েই রয়েছে আধুনিক নাট্যমঞ্চায়নরীতির নানা উদাহরণ। যেমন ঢাকা থিয়েটার-এর ‘ফনিমনসা’ থেকে শুরু নাগরিক-এর ‘কোপেনিকের ক্যাপ্টেন’, পদাতিক-এর ‘মা’, ঢাকা পদাতিক-এর ‘তালপাতার সেপাই’, বহুবচন-এর ‘ইডিপাস’, ঢাকা থিয়েটার-এর ‘কিত্তনখোলা’, ‘কেরামত মঙ্গল’। অর্থাৎ এই সময়ে সেট ডিজাইনের উদ্দেশ্য, ডিজাইনের উপাদান, অভিনয় ক্ষেত্র ও কম্পোজিশন, পদ্ধতিগত ডিজাইন ও মডেল প্রণয়ন- ইত্যকার বিষয়গুলোর চর্চা ও প্রয়োগ শুরু হয়েছে। বলা যেতে পারে, এই পদ্ধতিগত চর্চা ও প্রয়োগের সূত্র ধরেই মধ্য আশি থেকে দেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

মহিলা সমিতি প্রেক্ষাগৃহের দর্শক আসন সরিয়ে ফেলা যায় বলেই সেখানে হয়তো অভিনয় স্থান নিয়ে নিরীক্ষাধর্মী বেশ ক’টি প্রযোজনা আমরা পেয়েছি। অবশ্য এটা তো সত্য যে, নির্দিষ্ট আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি, পরিবেশ ও অবস্থান অনুযায়ী গড়ে উঠবে সেই সময়কার নাট্যশিল্প। কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে নাটকের কাজে গিয়ে চমৎকার এক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। বদরুজ্জামান আলমগীর-এর বর্ণনাধর্মী টেক্সট ‘পূন্যাহ’ মহড়া করছিলাম একটি প্রায় পরিত্যক্ত অডিটোরিয়ামে। শুরুতে সিদ্ধান্ত ছিলো- বাজারে, যেখানে সভা সমাবেশ হয়, সেখানেই পূন্যাহ মঞ্চস্থ হবে। সমস্যা দেখা দিলো। যেহেতু দর্শনীর বিনিময়ে প্রদর্শনী হবে, তাই ওই অত বড় খোলা জায়গা টিন বা অন্য কিছু দিয়ে ঘিরে ফেলা দুঃসাধ্য হয়ে উঠল। পরে সিদ্ধান্ত হলো- অডিটোরিয়ামেই প্রদর্শনী হবে। কিন্তু এখানেতো মহাসমস্যা- কথা বললেই গম গম প্রতিধ্বনি। কিছুইতো বোঝা যাবে না। তারপর অভিনয়টা হবে কোনখানে? অর্থাৎ সেট ফেলবো কোথায়? অডিটোরিয়ামের মঞ্চ মানেতো কাঠের পাটাতন, ওটাও সামান্য অবশিষ্ট নেই। পেঁচা বাস করছে সেখানে। কী করা! মহড়া চলছে। শারীরিক অনুশীলন এবং স্বর ও বাচনের কাজ এগিয়ে চলছে। ব্লকিংএ যেতে হবে। কিন্তু সেট ডিজাইনতো এখনো হয়নি। ‘গল্প থিয়েটার’র উদ্যমী বন্ধুরা সিদ্ধান্ত নিলো মঞ্চের জায়গাটা (২৫ ফুট ২৫ ফুট ৪ ফুট) তারা মাটি দিয়ে ভরাট করবে। দুশ্চিন্তায় পড়লাম। দেশজ নাট্য আঙ্গিক নিয়ে কাজ করবো, তা ওই বাকস মতো জায়গাটিতে কীকরে সম্ভব! তার ওপর প্রতিধ্বনি সমস্যা তো আছেই। তাছাড়া প্রসেনিয়াম মঞ্চ পদ্ধতিতে এ-নাটক মঞ্চায়নের কথা এক মুহূর্তেও ভাবিনি। সিদ্ধান্ত নিলাম প্রসেনিয়াম ওপেনিং এর সম্মুখভাগে মাটি ফেলে পূন্যাহ’র সেট ডিজাইন করা হবে। ওই ভাঙা মঞ্চের জায়গাটিতে গোটা ত্রিশেক তালপাতা বিভিন্ন দূরত্বে ও লেবেলে দাঁড় করিয়ে দেয়া হলো। এই তালপাতার স্থাপনা কখনো অভিনয় স্থান হিসেবে সম্পৃক্ত হয়েছে, কখনো হয়েছে অফস্টেজ। দর্শকের চেয়ারের আনুভূমিক উচ্চতায় মাটি ভরাট করা হয়েছে। সামনের দিকটা সামান্য ঢালু রেখে, পেছনে অর্ধবৃত্তাকারে একফুট উঁচু এক আলপথ তৈরি করা হয়েছিলো। যে স্থানটিতে অভিনয় শিল্পীরা কখনো বসেছে দোহার হিসেবে, আবার কখনো তা হয়েছে পথ, কখনো কাকরগাছি গ্রামের ‘শেতলা পুকুরপার’। সব মিলিয়ে অপূর্ব এক আবহ তৈরি হয়েছিলো। বাজিতপুর গল্প থিয়েটারের নিবেদিতপ্রাণ বন্ধুদের সৃজনশীল শ্রম-প্রচেষ্টায় শেষ পর্যন্ত সেই ধ্বনি-প্রতিধ্বনির সমস্যাটিও কিন্তু ছিলো না। নাটকের অগ্রিম টিকেট বিক্রি হওয়াতে প্রদর্শনীর আগেরদিন ভৈরব থেকে নিয়ে আসা হলো প্রায় তিন হাজার টাকার চট। সেই চট কুচি দিয়ে পর্দার মতো করে অডিটোরিয়ামের দুই মস্ত বড় পার্শ্বদেয়াল ঢেকে দিয়ে শব্দ সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছিলো।  

এ সময়ের পাশ্চাত্য নাট্যবিদগণ শূন্য আয়তনে (Empty Space) বিচিত্র নাট্যমুহূর্ত নির্মাণের কথা বলেন। অথচ এমন এক নাট্য ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার আমাদের রয়েছে যেখানে যুগ যুগ ধরে জনপদের মাঠে ঘাটে নিরাভরণ ভূমি সমতল বৃত্ত মঞ্চ, গৃহাঙ্গণ মঞ্চ ইত্যাদি নাট্যকৃতি হয়ে আসছে। এ নাট্য ঐতিহ্যেই পাওয়া যাবে, স্বল্পতম উপকরণের সাহায্যে কত বিচিত্র মাত্রিক প্রকাশ যে সম্ভব-তার অনন্য উদাহরণ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বহু আগেই তাঁর ‘রঙ্গমঞ্চ’ প্রবন্ধে কৃত্রিম মঞ্চ, কৃত্রিম পট ইত্যাদির মাধ্যমে দর্শকের মনে বিভ্রম উৎপাদনের নিন্দা করেছেন। বর্তমান নাগরিক নাট্যচর্চায় একদিকে যেমন রয়েছে মঞ্চ সীমাবদ্ধতা, প্রথাবদ্ধ, নিষ্প্রাণ নাট্য প্রযোজনায় নগরমঞ্চ যেমন ভারাক্রান্ত হচ্ছে, তেমনি প্রকৃত নাট্যানুরাগী দর্শকের সংখ্যাও দিন দিন নাজুক অবস্থায় নেমে এসেছে। এ সঙ্কট থেকে উত্তরণের জন্য নিজস্ব নাট্য ঐতিহ্যের বহুবিচিত্র অনুষঙ্গ এখনকার নাট্যে গ্রহণ করা একান্ত অপরিহার্য।

কামালউদ্দিন কবির : নির্দেশক, সাংবাদিক- ভোরের কাগজ।