Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

নাট্যগ্রন্থ সমালোচনা- ‘চরিত্র সৃষ্টি এবং অভিনয়’

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

মঞ্চে দাঁড়ালেই অভিনয় করা যায়, এরকম একটা ধারণা যখন প্রায় সর্বত্র বিরাজমান, তখন রাহমান চৌধুরীর ‘চরিত্রসৃষ্টি এবং অভিনয়’ একটু বিস্ময় জাগায় বৈকি। বইটি পড়তে পড়তে আরো বিস্মিত হতে হয় লেখকের পরিশ্রমের কথা ভেবে। পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিলো বাংলাভাষায় এমন একটি গ্রন্থ যদি ত্রিশ-চল্লিশ বছর আগে থাকতো, তাহলে আমাদের অভিনয় শিল্পীদের অভিনয়ের কাজটা আরো অনেক সহজ হতো! গ্রন্থটির নামকরণেই লুকিয়ে আছে গ্রন্থ রচনার উদ্দেশ্য এবং তাৎপর্য। অভিনয় এবং চরিত্রসৃষ্টি দুটি শব্দকেই অনেক নবীন অভিনেতৃ, এমনকি প্রবীণ অভিনেতৃগণও এক করে ফেলেন। মহড়ায় বসে থেকে মহড়া দেখতে দেখতে এ-দুটোর ফারাক বুঝতেই আমাদের কেটে গেছে অনেক সময়।

লেখক গ্রন্থটিতে নাটকের শুরু থেকে সমকাল পর্যন্ত অভিনয়ের ইতিহাসটাকে ধারাবাহিকভাবে ধরবার চেষ্টা করেছেন। প্রাচীন গ্রিসের থেসপিস, প্যাটিনাস, ক্র্যাটিনাস থেকে শুরু করে শেক্সপীয়র, ব্রেখট, স্তানিস্লাভস্কি হয়ে বাংলা নাটকের শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্ত অবধি অভিনয়ের বিভিন্ন ধারা, বাঁক-বদল আর বৈশিষ্ট্যগুলো গ্রন্থটিতে তুলে ধরেছেন। বিভিন্ন সময়ে সাহিত্যিক, রাজনৈতিক মতবাদ কিভাবে নাটকের বিষয়বস্তু ও অভিনয়কে প্রভাবিত করেছে তারও একটি ধারণা পাওয়া যায় গ্রন্থটিতে।

আমাদের মাঝে এমন একটি ধারণা প্রচলিত যে, অভিনয় শেখার প্রয়োজন নেই। অভিনয় মানুষের স্বভাবের অন্তর্গত একটি বিষয়। আবার অনেকে মনে করেন অভিনয় শেখা যায় না। প্রশিক্ষণ নিয়ে নাট্যকার হওয়া যায় না। তাই নাট্যকার তৈরির জন্য কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই। একইভাবে কবি-সাহিত্যিক-উপন্যাসিক তৈরিরও কোনো বিদ্যালয় নেই। কিন্তু এসবের সাথে অভিনয় শিল্পকে গুলিয়ে ফেললে সমস্যা অনেক। নাট্যকার আর অভিনয় শিল্পীর মাঝে একটা পার্থক্য আছে। একজনের কাজ সৃষ্টি আর একজনের কাজ পুনঃসৃষ্টি। সেকারণেই সারা পৃথিবীতে মহৎ নাট্যকারের সংখ্যা হাতে গোনা যায় অথচ অভিনয় শিল্পীর সংখ্যা অজস্র। অভিনয় হলো অনুকরণ, মানুষের একটি সহজাত প্রবণতা। তাই নাটকে অভিনয় করা নাট্যকার হওয়ার মতো দুরূহ বিষয় নয়। প্রশ্নটি হলো আগ্রহের। অভিনয় শেখা যায় না, এ কথাটি বলা তাই খুব একটা যুক্তিযুক্ত নয়। তবে অভিনয় শিখলেই বড় অভিনেতা হওয়া যায় না। এই প্রশিক্ষণের সাথে নিজস্ব সৃজনশীলতা যুক্ত করতে না পারলে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কাজে লাগে না। প্রকৃতপক্ষে প্রশিক্ষণ নিয়ে অভিনয়ের জন্য দক্ষতা অর্জন করা যায়। এই দক্ষতার ক্রমাগত অনুশীলনই একজন অভিনেতা বা অভিনেত্রীকে বড় শিল্পী করে তোলে। অভিনয় শিল্পী তখন অভিনয় দিয়ে তার চরিত্রসৃষ্টিতে কুশলী হয়ে ওঠেন।

গ্রন্থটির বিভিন্ন অংশে এযাবৎকালের বিশিষ্ট নাট্যকার, নির্দেশক ও অভিনয় শিল্পীর কাজের ধরন, সমস্যার সমাধান, সাফল্য ও ব্যর্থতার চিত্রগুলো উঠে এসেছে ধারাবাহিকভাবে। চরিত্রসৃষ্টিতে বিভিন্নজনের মত ও পথ পারস্পরিক নৈকট্য ও বৈপরীত্য দুটোই লেখক গল্পের মতো করে তুলে ধরেছেন।

আড়াই হাজারেরও বেশি সময়ের অভিনয় ভাবনা, প্রয়োগ ও তার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার দিকটিও উল্লেখ রয়েছে গ্রন্থটিতে। প্রাচীন গ্রিসের কোরাস থেকে যখন একটি দুটি করে চরিত্ররা বেরিয়ে আসছে, শুরুর দিকের সেই মুহূর্তগুলো যেমন এসেছে, তেমনি পরবর্তীকালে অভিনয়ের সহযোগী আলো, দৃশ্যপট ও নানা উপকরণের ব্যবহার অভিনয় ও চরিত্রায়ণে কী ভূমিকা পালন করেছে তার বর্ণনাও আছে গ্রন্থটিতে।

প্রাচীন ধ্রুপদী অভিনয় কিংবা ফরাসি বিপ্লব পরবর্তী স্বাভাবিকতাবাদী অভিনয় এসব বিষয় যেমন আছে, তেমনি প্রাচীন ভারতীয় নাট্যশাস্ত্র উল্লেখিত অভিনয়রীতি পদ্ধতির বিবরণও এতে আছে। আছে জাপানি ‘নো’ নাটকের অভিনয়ের কথাও।

ঊনবিংশ শতাব্দিতে বাংলা নাটকের অভিনয়ের ধারাটিও এসেছে বিস্তারিতভাবে। গিরিশ ঘোষ, শিশির ভাদুরী এঁদের পাশাপাশি শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের নাটকের অভিনয়ের বিষয়টিও এসেছে নানা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের ভিতর দিয়ে। আরো পরবর্তীকালের শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্তের অভিনয় ভাবনা ও প্রয়োগের বিষয়টিও এসেছে। শুধু নাটক নয়, যাত্রাভিনয়ের বিষয়টিও আলোচিত হয়েছে বিশদভাবে।

মঞ্চ ইতিহাসের দুই যুগান্তকারী প্রতিভা স্তানিস্লাভস্কি ও ব্রেখটের অভিনয় সম্পর্কিত ভাবনা, প্রয়োগ ও তাদের দুজনার নৈকট্য ও বৈপরিত্য দুটো দিকই চমৎকারভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন লেখক। অভিনয়শিল্পের শুরু থেকে আজ অবধি যতরকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা নাট্যাভিনয়ের উপরে হয়েছে তার সবটাই ধরতে চেয়েছেন তিনি। মেধাবী ও বহুমাত্রিক অভিনয়ের জন্য একজন অভিনেতার যতটুকু তথ্য উপাত্তের প্রয়োজন তার সবটুকু গ্রন্থটিতে পাওয়া না গেলেও সেসব প্রাপ্তির পথনির্দেশ আছে গ্রন্থটিতে।

বলাবাহুল্য, বইটি রচনা করতে গিয়ে লেখককে অনেক পরিশ্রম ও মেধার খরচ করতে হয়েছে। এজন্যে তাকে প্রাপ্য স্বীকৃতিটুকু দিতেই হবে। গ্রন্থটি অভিনয় ও চরিত্রসৃষ্টির নানা ভাবনা ও প্রয়োগের একটি সুগভীর আলোচনা। অভিনেতা নির্দেশক কলাকুশলী সবাই এই বইটি থেকে বিপুলভাবে উপকৃত হবেন বলে আমার বিশ্বাস। গ্রন্থকার বইটিতে তার নিজস্ব ভাবনা অনুপ্রবেশ করানোর খুব একটা চেষ্টা করেন নি। তিনি বরং অন্যদের ভাবনাগুলোই তুলে ধরেছেন।

গ্রন্থটির আলোচনায় প্রশংসাবাক্যের পাশাপাশি একটি কথা বারবার মনে হয়েছে, পুরো গ্রন্থটিকে যদি আরও কিছু ছোট ছোট অধ্যায়ে ভাগ করে উপস্থাপন করা হতো তাহলে এটি আরো সুখপাঠ্য হতো।

সর্বশেষ কথাটি হচ্ছে- এটি একটি প্রয়োজনীয় গ্রন্থ। ছাত্র, শিক্ষক, নির্দেশক, নাট্যকার, অভিনেতৃ কলাকুশলী তথা অভিনয়ের সাথে যুক্ত সকলের জন্য গ্রন্থটি অবশ্য পাঠ্য।

বইটির বহুল প্রচার আশা করি। রাহমান চৌধুরীকে ধন্যবাদ।

চরিত্রসৃষ্টি এবং অভিনয়
লেখক: রাহমান চৌধুরী।
প্রকাশক : জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ।
প্রচ্ছদ: সব্যসাচী হাজরা।
প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০১১। পৃষ্ঠা: ২৬৪। মূল্য: ৩৫০ টাকা।

আব্দুল্লাহেল মাহমুদ: নাট্যকার। সদস্য, আরণ্যক নাট্যদল, ঢাকা