Full premium theme for CMS
মিলিতে হবে দুইজনে [১]
Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..
‘একাকী গায়কের নহে তো গান, মিলিতে হবে দুইজনে;
গাহিবে একজন খুলিয়া গলা, আরেকজন গাবে মনে।’
গান হয়ে ওঠা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের এই ভাষ্য অনুষ্ঠেয় সকল শিল্পনন্দনেরই বুঝি মৌলসূত্র। নাট্য বা থিয়েটার নিয়েও তো বলা হয় : অভিনেতৃ ও দর্শকের পারস্পরিক ক্রিয়ায়, মিথষ্ক্রিয়ায়ই কেবল তার রূপায়ণ ঘটে। এই কথা নিয়ে বোধহয় বিতর্ক নেই কোনো। সোজা কথায়, দর্শক ছাড়া থিয়েটার হয় না, হতে পারে না। সবাই আমরা জানি মানি কথাটা।
স্বাধীনতার পর থেকে নিয়মিত নাট্যচর্চার শুরুতেই তাই দর্শকের প্রতি আহ্বান করা হয় : দর্শনীর বিনিময়ে নিয়মিত নাটক দেখুন। তার ফলে নবনাট্যের সঙ্গে সঙ্গে নবীন এক দর্শককুলও তৈরি হয়ে ওঠে। দর্শকের পক্ষ থেকে সানন্দ স্বীকৃতি ও অভিনন্দনেই নাট্যজন অনুপ্রাণিত হয়ে হয়। একের পর এক গড়ে ওঠে একেক দল। নিজ নিজ আদর্শ উদ্দেশ্য নিয়ে নাটক মঞ্চায়ণ করে চলে। দর্শকের কথা মনে রেখেই বুঝি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আন্তঃহল নাট্যপ্রতিযোগিতা-৭২ এ প্রদর্শিত ‘ব্যতিক্রমী’, ‘নিরীক্ষাধর্মী’ অভিনব নাট্যসকল মহিলা সমিতির সাধারণ মঞ্চে ভিন্ন চেহারা নেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিত তরুণ ছাত্র-দর্শকের সামনে একবারের জন্য করা সৃজনস্পর্ধিত ‘আধুনিকতা’ সাধারণ দর্শকের কাছে নিয়মিত করতে গিয়ে নাট্যজন মনে রাখে দর্শকরুচির কথাও। তার ফলে নাট্য বিষয়-রীতিতে নবীন হয়েও সাধারণ-গ্রাহ্য হতে চায়। ক্রমান্বয়ে দর্শক-রুচি গড়ে তোলার দায় নেয় নাট্যজন। তার ফলে দেখি, মহিলা সমিতি মঞ্চে ‘থিয়েটার’ নাট্যদলের সুবচন নির্বাসনে নাট্যটি দর্শকের পক্ষ থেকে সর্বাধিক সমর্থন পায়। নতুন দেশ-সমাজ-সময়ের সাধারণ এক মানস-সংকটের মঞ্চে উপস্থাপনকে দর্শক নিজেদের জীবন-নাট্য হিসেবে গ্রহণ করে। - প্রচলিত আদর্শ-নীতির সুবচন তখন যে ব্যর্থ, অচল হয়ে গিয়েছিল। ‘নাটক সমাজের দর্পণ’- সাধারণ এই ধারণাটিও দর্শকের মনে জায়গা পায়। মঞ্চে তার প্রয়োগ রূপায়ণ থেকে তাই তারা থিয়েটারের সঙ্গে নিজেদের একটি অঙ্গাঙ্গী যোগ দেখে খুশি হয়। এভাবে বাংলাদেশে নবীন থিয়েটারের একটি সামাজিক ভিত্তি গঠিত হয়। তারই প্রণোদনায় ‘থিয়েটার’ দলটি ’৭৪ এর বন্যার সময় নতুন নাটক এখন দুঃসময় করে। অথচ তারা তখন অন্য নাটক তৈরি করছিল। সময়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে নাটক করার একটা দায়পালনের আদর্শনীতিই তারা গ্রহণ করে। ‘ঢাকা থিয়েটার’-ও যেমন তাদের প্রথম প্রদর্শিত নাট্যদ্বয়ের একটি সংবাদ কার্টুন এ রঙ্গ-ব্যঙ্গ-নৃত্য ক্যারিকেচারের কমেডিতে তৎকালীন দিশেহারা উদভ্রান্ত দৈনন্দিনকে মঞ্চে উপস্থাপন করে। বিদেশী রীতির এই রূপায়ণও দর্শকের উল্লসিত সমর্থন পায়। যদিও তাদের অন্য নাটক সম্রাট ও প্রতিদ্বন্দ্বীগণ রূপক প্রতীকের থিয়েটার ছিল। দর্শক সেটিতেও স্বৈরাচারিতার এক চেনা আখ্যান দেখতে পায়। দর্শনীর বিনিময়ে নিয়মিত নাটক হিসেবে ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়’ করে বাদল সরকারের বাকি ইতিহাস। অগ্রসর, সুশিক্ষিতজনের মানসে তৎকালীন বিশ্বপরিস্থিতিতে জায়মান ইউরোপ-বাহিত এক অস্তিত্ব চেতনা-দর্শন অভিব্যক্ত হচ্ছিল, বাংলায় বাদল সরকার, সাঈদ আহমদ, মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের নাটকে তার নানা আদল দেখি। ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়’ ঢাকার মঞ্চে তার প্রয়োগ করে। তাদের স্বশ্রেণীর এক দর্শককুল তাতে আপ্লুত হয়। ব্রিটিশ কাউন্সিল মঞ্চে পরপর সাত রোববার সকালে নাটক করে উৎসাহিত হয়ে নিয়মিত তার মঞ্চায়ন উপযোগী মঞ্চ হিসেবে মহিলা সমিতি মিলনায়তন খুঁজে পায়। দীর্ঘদিন যেটি ছিল ঢাকার সবেধননীলমণি-মঞ্চ।
এভাবে শুরু হয় ঢাকার শিক্ষিত উচ্চমধ্যবিত্ত-মধ্যবিত্ত বিশেষ শ্রেণীর দর্শকের সঙ্গে গ্রুপ থিয়েটারের সম্পর্ক, পরিচয়। অভিনেতৃ ও দর্শককুলের একটি সাধারণ বিনিময় যোগকেন্দ্র যারফলে রচিত হয়।
ইংরেজ-প্রবর্তিত কলকাতা-কেন্দ্রিক নাগরিক থিয়েটার স্বাধীনতা পূর্বকালে অনিয়মিত সৌখিনভাবে হলেও বাংলাদেশের শহরে শহরে প্রচলিত ছিল। বাৎসরিক নানা উৎসব-অবকাশে শিক্ষিত-স্বচ্ছল একদল অভিনেতৃ তাতে অভিনয় করতেন। সাধারণ মধ্যবিত্ত দর্শককুলের একধরনের নাগরিক নাট্যরুচি এভাবে গড়ে উঠেছিল। - যার সঙ্গে দেশের, জনসমাজের নিজেদের মানসনন্দনের বিচিত্ররীতির কোনো যোগ ঠিক ছিল না। গ্রামের সম্পন্ন কি মাঝারি কৃষককুলের সন্তানটি ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে চাকুরি-ব্যবসা সূত্রে নগরে বাস করতে শুরু করে মধ্যবিত্ত শ্রেণী হিসেবে নবগঠিত হয়ে ওঠে। এই প্রক্রিয়ায় সে তার গ্রামীণ পৈতৃক পরিচয়, শিক্ষাদীক্ষা, মানসরুচির সমূহ নন্দনভাষাযোগটি হারায়, খোয়ায়, বিচ্ছিন্ন হয়। ঐতিহাসিকভাবে যেন অনিবার্যই ছিল গ্রহণ-বর্জনের এই রসায়ণ-বিক্রিয়াটি। এই নিয়ে নগরজন তার নবজন্মের মাতম-উল্লসে ছিল উদ্বেলিত। কোনো পিছুটান তাকে এতটুকু বিচলিত করতে পারেনি। গ্রামসমাজ ও তার কৃষক-উত্তরাধিকার সে মরীয়া বিকারে ঝেঁটিয়ে খেদায়। মানস ও মগজ ধোলাইয়ে পারঙ্গমতাই হয়ে ওঠে তার নাগরিক বৈষয়িক অবস্থানের মূলসূত্র।
পাকিস্তান আমল পর্যন্ত শহরে শহরে তবু গ্রামসমাজের আদলে এক পাড়াসমাজ আর কলকাতা-বাহিত এক শিল্প-সংস্কৃতিরুচি সাধারণ মধ্যবিত্ত’র মানসভিত্তি ছিল। অনিয়মিত বার্ষিক নাট্যানুষ্ঠানের দর্শককুল আর অভিনেতৃকুলের স্বাভাবিক যোগ-বিনিময় তার ফলে ঘটতো। শহরে নতুন এক নাটুকে বিনোদন সমান অংশীদারিত্বেই সম্পন্ন হতো। শহরের ক্ষয়িষ্ণু জমিদার জোতদার পুত্রদের সঙ্গে নতুন এক ব্যবসা-পেশাজীবী নাট্যামোদীর পাশাপাশি মধ্যবিত্ত এক অভিনেতৃকুলও দেখা যেত। তাদের অধিকাংশ সামান্য জীবিকায়। সাধারণ পেশাজীবী, বেকার বা পরজীবী লুম্পেন শ্রেণীর ছিল। তাই মঞ্চে তাদের অভিনয়-প্রতিভায় মুগ্ধ হলেও সামাজিকভাবে তেমন সম্মান ছিল না। নাগরিকসমাজে অভিনেতা-শিল্পীর মর্যাদা কখনো দেখা যায়নি। তাদের ব্যক্তিগত ও শিল্পীজীবনের এক অনাচারের মিথই সমাজে প্রচলিত ছিল। বিশেষত ভাড়াটে নটী-অভিনেত্রীদের সঙ্গে সচ্ছল নাট্যামোদীদের রঙ্গলীলা বাতাসে উড়ে বেড়াতো। মানুষ তাদের কেচ্ছাকীর্তির রগরগে কাহিনীতে অবদমিত কামতৃষ্ণা মেটাতো যদিও তাদের অভিনয়ে বুক ভাসাতে কারো বাঁধতো না। তখন তো নাট্যরসে আপ্লুত হয়ে তারা ব্যক্তিগত সংস্কার উত্তীর্ণ হতো। স্বভাবত পরক্ষণেই সাধারণ হীনমানসে তাদের প্রত্যাবর্তন ঘটতো। সেই ট্রাডিশন আজো চলছে সমানে। মনুষ্য সামাজিককুলের এই হয়তো অনিবার্য এক প্রজাতি-নিয়তি : এই বৈপরিত্য ও স্ববিরোধিতা। শ্রেণীগত অবস্থান ও সম্পর্কের একটি অর্থনৈতিক সামাজিক ক্ষমতা-সম্পর্কের আদি চরিত্রলক্ষণও বুঝি এটি। গ্রামসমাজেও তো অন্তঃজ, নিুবিত্তরাই শিল্পীসুজন, কারিগর। সেখানেও তাই একই গপ্পো। সাধারণ মানুষ যদিও উদার এক মানবিক সৌজন্যে মাথা নোয়ায় গুণী গায়েনবায়েন কথকের প্রতি। নাগরিক জটিল, কুটিল মানস-বিকৃতিতে সেটি লভ্য নয়। যদিও প্রতিষ্ঠিত নগরশিল্পী সংস্কৃতিজনের যে ক্ষমতা-অহং প্রণোদিত আচরণ তাতে করে স্বার্থসংশ্লিষ্ট ভক্ত না হলে তাদের প্রতি সম্মান রক্ষা করা কঠিন। একজন-দু’জন প্রয়াত মোহাম্মদ জাকারিয়া, নীলুফার ইয়াসমিন, নাজমা আনোয়ার, সোলায়মান বা স্বভাবসজ্জন কেউ কেউ কিংবা অনেকেই রাজনৈতিক-সামাজিক অভ্যাসেই হয়তো সভ্য-ভব্য-বিনীত। - এ সবই আমাদের নাগরিক উত্তরাধিকার। অথচ গ্রাম-সমাজের প্রায় যেকোনো শিল্পীসুজন আজও চিরকালের বিনয়ে বিনম্র- একান্ত নন্দনমুদ্রায়। উপস্থাপন-পূর্ব বন্দনা তাদের তো একটি নিত্য আচরিত কৃত্যবিশেষ।
স্বাধীনতা পরবর্তীকাল থেকে বাংলাদেশে নাট্যচর্চা শুরু হয়েছিল ‘আধুনিক’, ‘ব্যতিক্রমী’, ‘নিরীক্ষাধর্মী’ সমাজনন্দন চেতনার উচ্চ ঘোষণা দিয়ে। নতুন দেশ-সমাজ গঠনের একটা আবেগ তো তখন সত্য ছিল। সমালোচকদের অনেকে লিখতে শুরু করেন : ঢাকায় বসে কেবল নাটক করলে হবে না, সারা দেশে, গ্রামে গঞ্জে ছড়িয়ে পড়তে হবে। এসব হয়তো তখনকার এক রাজনৈতিক বুলি মাত্র ছিল। রাজনীতি করতে অনেকে তার চর্চা করলেও নাটক করতে কেউই প্রায় সেসব করেনি। অনেক পরে ‘গ্রাম থিয়েটার’ আর ‘মুক্ত নাটক’ বলে একধরনের চেষ্টা অবশ্য হয়েছিল। তবে শহরের অগ্রসর, শিক্ষিত উচ্চ বা মধ্য মধ্যবিত্তের বিশিষ্ট মানুষজনই বাংলাদেশের নাগরিক মঞ্চের দর্শক। একেবারে নতুন ধরনের এই থিয়েটার তারা খুবই আহলাদের সঙ্গে গ্রহণ করে। কিছুদিনের ভেতর নিয়মিত এক দর্শককুল তাই গড়ে ওঠে। একটা রুচিমান, সমাজচেতন নান্দনিক বিনোদন হিসেবেই নবীন এই নাট্যকে বিবেচনা করতো তারা।
অভিনেতৃ ও দর্শকের প্রাথমিক এই সম্পর্কপাত বা যোগসূত্র পরে কী কী ভাবে বিকশিত, বিবর্তিত হয়েছে তার সুলুক সন্ধান আজকের সবচেয়ে জরুরি কাজ।
মনে হয়, নতুন থিয়েটারের ‘আধুনিক’, ‘ব্যতিক্রমী’, ‘নিরীক্ষাধর্মী’ নামের আদি ঘোষণার মধ্যেই বিভেদের বীজ নিহিত ছিল। সাধারণ দর্শককুলের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতার শুরু বোধহয় সেই থেকেই। সকলে নয় কেউ কেউ দর্শক- এমন একটি ভাবনাই বোধহয় কাজ করেছিল। হয়তো অনিবার্য এই ঘবমধঃরড়হ কে ঘবমধঃরড়হ করার দায়টি গ্রহণের পরিণত সাবালকত্ব অর্জনের সচেতন, নান্দনিক চ্যালেঞ্জটি কেউই ঠিক নেয়নি। তরলায়িত ব্রেশট-মলিয়ের তার সমাধান নয়। এছাড়া অস্পষ্ট, অনির্দিষ্ট ‘আধুনিকতা’ বলতে কী যে মনে করা হতো, মনে করা হয় তেমন করে ভেবে দেখা হয়েছিল কি? ভেতরে ভেতরে উচ্চ এলিট শ্রেণীগত এক অহং বিবরেই বরং ফেলে দিয়েছিল তা নাট্যজনদের।
বিষয়রীতির অন্বিষ্ট-অভীপ্সার ভিন্ন ভিন্ন নান্দনিক দৃষ্টিকোণ গঠিত হয় দলগুলোর মধ্যে। ‘থিয়েটার’, ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়’, ‘ঢাকা থিয়েটার’ এবং ‘আরণ্যক নাট্যদল’,- ‘ঢাকা পদাতিক’- এ স্পষ্ট চারটি ধারা আমরা দেখতে পাই। বাকি দলগুলো এর কোনো কোনোটির অনুগামী। তবে ‘নাট্যকেন্দ্র’, ‘প্রাচ্যনাট’, ‘লোক নাট্যদল’, ‘থিয়েটার আর্ট ইউনিট’, ‘দেশনাটক’ বিশিষ্ট নাট্যভাবনা সম্পন্ন। তাদের প্রযোজনায় নান্দনিক অবস্থানের তারতম্য দেখতে পাই। দর্শককুলের মধ্যেও ক্রমে একধরনের যেন বিভাজন রেখা সূচিত হয়ে ওঠে। কোনো দলের নন্দিত প্রযোজনা হয়তো সকল দর্শকের আনুকূল্য পায়। দেশ-সমাজ-সময়ের বাস্তব পরিপ্রেক্ষিত এবং দর্শক মানস-আকাঙ্খা ক্রমে গৌণ বিবেচনা পেতে থাকে। দলীয় দৃষ্টিকোণ-উদ্ভুত বিষয়-আখ্যান আর প্রকাশের রূপরীতি দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পর্কের পারস্পরিকতায় তত রূপায়িত হতে দেখি না। বিষয় ও ফর্ম-টেকনিক সন্ধান ঠিক যেন কোনো ভিত্তিভূমি খুঁজে পায় না।
সুবচন নির্বাসনে বা এখন দুঃসময়-এর পর থিয়েটার বিষয়ের দিক থেকে রিয়ালিটির উপর-স্তরের কয়েকটি মূল্যবোধে আটকে যায়। পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, যুদ্ধ এবং যুদ্ধ, অরক্ষিত মতিঝিল বা এখনো ক্রীতদাস নাট্যে একধরনের উত্তরণ-প্রচেষ্টা দেখা যায়। স্পর্ধা বা মেরাজ ফকিরের মা সরল আবেগ সঞ্চারণে সমর্থ হয়। তবে প্রকাশরীতির নিত্যনব অভিনবত্বের সৃজনশীলতা তত চোখে পড়ে না। নাট্য বা থিয়েটারের ভাষা তাই যেন তত রূপায়িত হয় না। আন্তিগোনে নাটক বিষয়-অভিনয়ের গুণে নাট্যভাষা অর্জন করে। তবু সব মিলে ‘থিয়েটার’ দর্শককুলের সঙ্গে সম্পর্ক যোগাযোগ গড়েছে। ফেরদৌসী মজুমদার আর আবদুল্লাহ আল-মামুনের অভিনয় তার জন্য সহায়ক হয়েছে। ইদানীং ত্রপা মজুমদারের মুক্তি নাটক অন্য ধরনের এক সম্ভাবনা তৈরি করেছে। দর্শকের সঙ্গে বিষয়গত যোগাযোগের নতুন চ্যালেঞ্জেরও মুখোমুখি করেছে। দেখা যাক এই দায়টি কীভাবে পালন করে দল।
‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়’ প্রথম থেকেই দেশ-বিদেশের শ্রেষ্ঠ রচনা রূপায়ণ করে চলেছে। দর্শক তাতে নানা ধরনের নাট্য প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেয়েছে। প্রকাশের বিষয়ানুগ টেকনিকেরও নানা রূপায়ণ মঞ্চে দেখা যায়। তবে তাদের সেরা প্রযোজনা দেশ-কালের সঙ্গে প্রাসঙ্গিকতার সূত্রেই রূপলাভ করেছে। অচলায়তন, নূরলদীনের সারা জীবন, বা গ্যালিলিও নাট্যের কথা এ প্রসঙ্গে বলা যায়। বেকেটের গডোর প্রতীক্ষায়ও এধরনের প্রাসঙ্গিকতা পেয়েছিল। ঈর্ষা নাট্যের অভিনবত্ব ও অভিনয়গুণ বিশেষ দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল। জনপ্রিয়তম ‘দেওয়ান গাজীর কিসসা’ ব্রেশট- তরলায়নে অভিযুক্ত হয়। রক্তকরবী’র দর্শক আনুকূল্যের বিষয়টি নিয়েও নানা কথা উঠেছে। দর্শক এক্ষেত্রে দ্বিধাবিভক্ত। ‘নাগরিক’ সর্বদা থিয়েটারের শিল্পনন্দনের প্রশ্নটিই প্রাধান্য দিয়ে থাকে বলে মনে করে। দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি সম্পর্কে তাদের সাধারণ মত হলো- প্রযোজনা শিল্পগুণ সম্পন্ন হলেই দর্শক তা অভিনন্দিত করে।
‘ঢাকা থিয়েটার’-ও প্রথম থেকে নাট্যনন্দনের বিষয়টি মুখ্য বিবেচনা করে বলে স্পষ্ট ঘোষণা দেয়। বিষয়রীতির নানা নিরীক্ষার পর তারা একটি নান্দনিক অবস্থানে স্থিত হয়। ‘জাতীয় নাট্য আঙ্গিকের সন্ধান’ তাদের মুখ্য স্লোগান। হাজার বছরের বাংলা নাট্যের বিচিত্র রসদ থেকে তারা এই নাট্যভাষা অর্জন করেছে বলে মনে করে। বর্ণনাত্মক অভিনয়রীতির সঙ্গে বিশ্বের বিচিত্র উত্তরাধিকারের এক মেলবন্ধন তারা ঘটাতে চায়। একই সঙ্গে দেশজ ও আধুনিক-আন্তর্জাতিকতায় উত্তীর্ণ হওয়া তাদের অন্বিষ্ট। কিত্তনখোলা থেকেই তাদের এই অভিযাত্রা চলছে। জনসমাজের নানা বৃত্তি-পেশার মানুষজন মঞ্চে তাদের নিজস্ব বিচিত্র জীবন-যাপন-ধারা নিয়ে উপস্থিত হয়। আখ্যান-ব্যাখ্যান ও আঙ্গিক উপস্থাপন কাব্য-দর্শনের অভিনব এক বাচনভাষ্য রচনা করে। তবে দর্শকের সঙ্গে এই মিশ্রজটিল ভাষা ও প্রকাশ পরিবেশনার রূপরীতির কী স্তর-মাত্রায় নান্দনিক সংযোগ ঘটে তা একটি বিরাট প্রশ্ন। ঢাকা থিয়েটার সে দায়ভার বুঝি দর্শকের উপরই দিতে চায় : তাদের রুচিনন্দনের উত্তরণ ঘটতে হবে। এক্ষেত্রে নাট্যকার-অভিনেতৃ-নির্দেশকের ভূমিকা কী হবে সে বিষয়ে তারা তেমন কিছু বলেছে বলে জানি না। দর্শক তাদের নাট্য গ্রহণে সক্ষম বলে মনে করে বুঝি। অথচ বিষয়-ভাষা-আখ্যান-রূপায়ণ সবদিক দিয়ে অভিনব এই নাট্য দর্শকচেতনের লুপ্তস্মৃতির সঙ্গে সরল বিন্যাসে অন্বিতও নয়। যৌথ সাধারণ কোনো অতীত-বর্তমানের নান্দনিক-মানসসূত্রেও তা ঠিক সহজগ্রাহ্য নয়। নব্যধ্র“পদীবাস্তবতার এই সৃজন রূপায়ণ নিশ্চয় তারিফ যোগ্য। তবে লুপ্তশিকড়ছিন্ন নাগরিক দর্শককুলের সঙ্গে তার যোগসম্বন্ধের দায়টি নিশ্চয় রচনাকার-নির্দেশকের নান্দনিক দায়বিশেষ। দর্শক বিহ্বল বিমূঢ় বিস্ময়ে অবলোকন করুক কেবল আখ্যান-রূপায়নের হতবাক করে দেওয়া দৃশ্যশ্রাব্য অভিঘাত- এতেই কি সন্তুষ্ট হবেন প্রতিভাবান সৃজন-রূপকার? দর্শকের মানস-সমতলে কিঞ্চিৎ বিনতি নিয়ে অগ্রসর হতে চাইবেন না কি তারা শিকড়ের উড্ডীন ডানার উল্লাসে? নন্দনবিশ্বের এই দায় কি কখনোই অস্বীকার করেছেন মহত্তম শিল্পী-রূপকারগণও? জানি, সৃজনের এক অবাঙ্মানসগোচর আত্মহারা অতল নিমজ্জন আছে - তবু ভোক্তা নিরপেক্ষ নিরবলম্ব হয়ে কি তার সৃজনমাহাত্ম্য পরিণতির প্রজ্ঞাপারমিতায় উপনীত হতে পারে? বিশেষত নাট্য বা থিয়েটারের মতো দর্শকের পারস্পরিকতায় সম্পন্ন নন্দনমাধ্যমের ক্ষেত্রে? - এই বিনতি কি কোনো দর্শক করতে পারে না?
‘আরণ্যক নাট্যদল’ রাজনীতি ও নন্দনের যুগপৎ এক দায় থেকে থিয়েটার করে বলে ঘোষণা দেয়। দেশ-সমাজে শ্রেণীগত ক্ষমতা-সম্পর্কের আখ্যাননাট্য তারা করে চলেছেন। প্রাথমিক পর্যায়ে স্পষ্ট, সরল তীব্রতায় রূপায়ণ করেছেন নাট্যসকল। ওরা কদম আলী, ওরা আছে বলেই বা সাতপুরুষের ঋণ- এমত প্রযোজনা। বিশেষত সমতট থেকে তারা রাষ্ট্র-সমাজ ও সময়ের বিবিধ অভিঘাত এবং তার রূপায়ণে বিচিত্র রীতির সন্ধান করে চলেছেন। বিষয়ানুগ নাট্যভাষা উদ্ভাবনের নন্দন-দায় মান্য করছেন বলে মনে হয়। কেবল বিষয় নয় উপযুক্ত ফর্ম বা টেকনিক ভিন্ন সদিচ্ছাপূর্ণ রাজনীতিও অক্ষম হয়ে পড়ে শিল্পে, নাট্যে- মাও সেতুং এর এই মোক্ষম বিবেচনা বুঝিবা গ্রাহ্য করে চলেছেন। তাইতো নানকার পালা, পাথর, জয়জয়ন্তী, সঙক্রান্তি বা সর্বশেষ রাঢ়াঙ- এ সেই প্রণোদনা দেখতে পাই। দেশ-সমাজ ও সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে দর্শকদের সঙ্গে সম্বন্ধ সূত্রটি নাট্যক্রিয়ায় তারা সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন বলে মনে হয়। দর্শককুলের মনোযোগ এভাবেই তারা অর্জন করেছেন। তবু সেই দর্শকের ক্রমহ্রাসমানতার বিষয়টি তো বহু স্তরমাত্রার কার্যকারণের ফলাফল। যার সুলুক সন্ধান ভিন্ন গতি নাই অধিক সচেতন নাট্যজনের।
‘ঢাকা পদাতিক’ তরুণতর রাজনৈতিক স্পৃহায় রঙ্গ-ব্যঙ্গ-তীব্রতায় রাষ্ট্র-সমাজ-সময়ের নাট্যভাষ্যসকল রচনা করেছে। ইন্সপেক্টর জেনারেল, গণি মিয়া একদিন, ইঙ্গিত, এই দেশে এই বেশে, ক্ষ্যাপা পাগলার প্যাঁচাল বা আহ্ কমরেড এমত প্রযোজনা। গান-নাচ-প্যারোডি মুভমেন্টে বিচিত্র নাট্যক্রিয়া সম্পন্ন করে তারা। দর্শকদের একধরনের সহজ সমর্থন এভাবে তারা অর্জন করেছিল। তারপর ইবসেনের জনতার শত্রু, চট্টগ্রাম গীতিকা আমিনা সুন্দরী তাদের ভিন্ন ভাবনার থিয়েটার। তবে বিষাদ সিন্ধু নাট্যে বিশেষত নির্দেশক জামিল আহমেদ মৌলিক নাট্যভাবনায় দর্শকের বিষয়টি পরিণত গুরুত্বে বিবেচনা করেছে।
বিপ্লব বালা : নাট্যকার, নির্দেশক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা ও সংগীত বিভাগের শিক্ষক।