Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

এ ভাবেই চলে যাওয়া শিখেছে মানুষ

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

নিউরোলোজিস্টদের মতে মানুষের নিউরনে কালচার বিষয়টি সেঁটে আছে। চর্চার ভেতর দিয়ে সেই বোধ ওঠে, জাগাতে চায় আরো আরো বোধ। কখনও বা সেই বোধ পূর্বেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্পন্দিত থাকে। যার ফলে জাত শিল্পীর জন্ম হয়। তারপরও মানুষ কিভাবে, কোন বোধের কাছে বাঁধা পড়ে যায় কে জানে!
শিল্পবোধের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে মানুষ পৃথিবীতে এলেও তার চর্চা- সময়, সমাজ বা বাস্তবতায় কতখানি অগ্রসর হয় বা মানুষ করে তা সমাজের চেহারা দেখলে সহজেই অনুমেয়। বাংলাদেশে শিল্পের অন্যান্য ধারার মতো থিয়েটারকেন্দ্রীক নাট্যচর্চার স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থাপন ও প্রসার মুক্তিযোদ্ধত্তর সময়ে। নাট্যমানের চলমান অগ্রসরতা ও ক্রমবিকাশ চললেও বর্তমান সময়ে তার অনেকটা ভাটা পড়েছে। এককালে আমাদের নাট্যঙ্গনে নারীকর্মীর অংশগ্রহণ ছিলো শূন্যের কোটায়। এখনো, একবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নেও এই অবস্থার উন্নতি কতটুকুইবা হয়েছে। বাস্তবে নারী এখনো নিগৃহীত, সমাজে এখনো তারা পশ্চাৎপদ। আর থিয়েটারের মতো জায়গায় নারীর অবস্থান এখনো অপবাদের ভীতি থেকে কাটিয়ে উঠতে পারেনি। যেকোনো নাট্যদলে নারীকর্মীর সংখ্যা এ কথাই প্রমাণ করে।

আর ঠিক এসময়েই আমরা হারালাম এক নিবেদিতপ্রাণ নাট্যকর্মী, থিয়েটারকর্মী ‘সাকি’-কে।

আমাদের সমাজে মেয়েদের অনগ্রসরতা, অবস্থানগত জড়সড়তা, নিন্দাবাদ, আস্থার অভাব কোনো অমূলক ঘটনা নয়। সাকি এসব জেনে কাজ করেছে অবিরাম। সাকির সান্নিধ্যে এই কু-বোধ কখনই টের পাওয়া যেত না। কো-আর্টিস্টদের কাছে কখনই মনে হতো না সে একজন মেয়ে। আর তাতে তার সাহায্যের হাত ছিলো সব সময়ই খোলা। তার সাহায্যে-সহানুভূতিতে কো-আর্টিস্ট তার কাক্সিক্ষত জায়গাটিতে পৌঁছে যেতো।

ঠিক কোন বোধে মানুষ কোন কাজ কখন শুরু করে তা স্পষ্টভাবে কেউই বলতে পারে না। তারপরও কোনো না কোনোভাবে শুরু হয়, হয়ে যায়। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সাকির এই পদচারণার শুরু এরকমই এক অসম্পূর্ণ বাস্তব। ১৯৯৪-এ সাকি প্রথমে জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটার, সাভার-এর একজন নাট্যকর্মী হিসেবে যোগদান করে। কিন্তু ভাগ্য ও সময়ের হাত ধরে বড় অসময়ে সে আমাদের বলল যেন, ‘আমি এভাবেই আসি আবার এভাবেই চলে যাই...।’

একজন নিবেদিতপ্রাণ নাট্যকর্মী, থিয়েটারকর্মী, সংস্কৃতিসেবীকে হারানো আমাদের জন্য প্রকৃতই এক দুর্ভাগ্য! তার মেধা ও শ্রম যখন এ সমাজকে প্রেরণা জাগাতে শুরু করেছে তখনই প্রদীপের আলোটি নিভে গেল। গত ২১ মে ২০০০ হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে সে চলে গেল আমাদের ছেড়ে। রেখে গেল অপূর্ণতার ছায়া। মারা যাওয়ার কয়েক ঘন্টা আগেও তার সাথে থিয়েটার নিয়ে কথা হয়েছে। টের পাইনি সে বলেছে যে- ‘আমিতো শীগগীরই চলে যাব, বড় একা যাব, চুপচাপ, তোমাদের কাউকেই সহযাত্রী করব না নিরুদ্দেশ যাত্রায় আমার...।’

সাকির থিয়েটারভাবনা, নাট্যভাবনা, সংস্কৃতিভাবনা ছিলো রীতিমতো ঈর্ষণীয়। প্রচলিত কথায়- যে মাছটি বড়শী ছিঁড়ে পালায় সেটিই সবার থেকে বড় থাকে। কিন্তু সাকির ক্ষেত্রে প্রবাদটি প্রচলিত অর্থে ছিলো না, ছিলো যথার্থই। তার সহকর্মী হয়ে আজ এ বোধ উপলব্ধি করছি, সত্যিই আমরা বড় কিছু হারালাম। কাজের প্রতি, সময়ের প্রতি অকুণ্ঠ শ্রদ্ধায় সে দলে একজন আদর্শ থিয়েটারকর্মীর জায়গা দখল করে নিয়েছিলো। কাজের কথা বলতে গেলে যেন কাজটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো ক্লান্তি নেই, নেই কোনো সময়ের তাড়া। কাজের প্রতি আগ্রহ দেখে মনে হতো যেনবা তার থিয়েটার করা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই। নাটকের রিহার্সেল বা গ্রুপওয়ার্কে ‘সময়’ একটি বড় ফ্যাক্টর। একটা অপবাদ বাঙালিদের সবসময়ই আছে যে তারা বড় সময় অসচেতন। এ ক্ষেত্রে সাকি মনে হয় ‘বাঙালি ছিলো না’।

নাটকের ক্ষেত্রে তার অবস্থান ছিলো মূলত কর্মীর মতো। এমনও অবস্থা হয়েছে যে, তার চরিত্রের সংলাপ মুখস্থ করে সেটা পরীক্ষা করে দেখার জন্য খাতায় লিখতো। এটাই প্রমাণ করে- নাটকের প্রতি, চরিত্রের প্রতি, কাজের প্রতি তার ভালোবাসা কতটা গভীর ছিলো। নাটকের অবস্থান, চরিত্র বিশ্লেষণে সে দ্বারে দ্বারে ফিরেছে। মন মতো না হওয়া পর্যন্ত যেন কিছুতেই স্বস্তি নেই। দায়িত্ববোধ মানুষকে যে কতটুকু আস্থাভাজন করে সাকির চালচলন, কথাবার্তা আর কাজ তার সাক্ষ্য। মানুষের চিন্তা-চেতনা বর্তমান সময়ে বড়ই নৈরাশ্যজনক। কিন্তু সাকিকে কখনো ‘না’ বলতে শুনিনি। ‘পারিব না’ কথাটি তার অভিধানে ছিলো না। পৃথিবীতে তাবৎ বিষয় যেন সঠিকভাবেই তৈরি হয়েছে। প্রতিটি প্রবাহে তার ছিলো ‘হ্যাঁ’ সূচক মনোভাব। এই পজিটিভিটি-ই মানুষের এগিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় পাথেয়, প্রেরণার উৎস। আমরা তার দ্বারা তাড়িত হয়েছি।

নাটকের রিহার্সেল-আলোচনা-আড্ডায় সে ছিলো যেন একজন ছায়া প্রদানকারী। কোনো সমস্যা হলে তার সহজ সমাধান যেন তার কাছেই। তার কথায় মনে হতো সমস্যাটা তৈরি হয়েছে সমাধানের জন্যই। ‘তুমি চেষ্টা করো পারবে না কেনো? এই দ্যাখো, না পারা পর্যন্ত তাকে ছাড়ছি নে’- এরকম সহযোগিতা আর সহমর্মিতায় সে ছিলো বড় চালক।

১৯৯৫-এ জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটার, সাভার আয়োজিত দেড়মাসব্যাপী প্রযোজনাভিত্তিক নাট্যকর্মশালায় সে নির্বাচিত হয়েছিলো শ্রেষ্ঠ চারজন নাট্যকর্মীর একজন। তখন ব্রেখট্ এর ‘গণ্ডী’ নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্রে (সোমা) তার অভিনয় দর্শক মহলে প্রচুর সাড়া জাগিয়েছিলো। তারপর একে একে অভিনয় করে ‘এখানে নোঙর’ নাটকের সাফুরা চরিত্রে, ‘রাজা অনুস্বারের পালা’-র রানী চরিত্রে, ‘জমীদার দর্পণ’ নাটকে নুরুন্নাহার চরিত্রে, দৃশ্যপট এর ‘নাগমণ্ডল’ নাটকে কুরুডব্বা চরিত্রে অভিনয় করে তার দক্ষতাকে প্রমাণ করেছে। শুধু অভিনয় নয়, নেপথ্যকর্মী হিসেবেও তার অবস্থান ছিলো সরল গতিতে। দৃশ্যপট প্রযোজনা ‘সক্রেটিসের জবানবন্দী’ নাটকে সে ছিলো আবহসঙ্গীত নিয়ন্ত্রক। যা শৈল্পিক বোধের অন্য ধারাতে তার পদচারণাকে ইঙ্গিত করে। শৈল্পিক আকাঙ্ক্ষা তার ছিলো প্রবল যা কিনা একজন বড় শিল্পীর পরিচায়ক। এ আকাঙ্ক্ষার উপর বিশ্বাসও ছিলো অটুট আর এ লক্ষ্যেই সে কাজ করতো নিজস্ব ভাবনায়।

সর্বদা হাসি-হাসি মুখ, যেনবা পৃথিবীর তাবৎ সুখ তাকে ঘিরে, কারোর সাথে কোনো মনোমালিন্য নয়। যেন- ‘তুমি তো আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু, তুমিও সুখী হও’। এরকম উচ্ছল-প্রাণবন্ত বন্ধুটি আমাদের মাঝ থেকে অসময়ে চলে গেল। জানিয়ে গেল- ‘পানে চাহিয়া বন্ধু আর আমি জাগিব না, কোলাহল করি সারা দিনমান কারো ধ্যান ভাঙিব না’। যখন তার কাছ থেকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বাড়তে লাগলো, ঠিক তখনই ‘বন্ধু বিদায়’ বলে চলে গেলো অজানার পথে।

কোনো কিছুই হয়তো কারো জন্য থেমে থাকে না। প্রকৃতি নিজেই সেই অসম্পূর্ণতা পুষিয়ে নেয়। হয়তোবা সবার শূন্যতা একসময় পূরণ হয়ে যায়। কিন্তু সাকি যে শূন্যতা সৃষ্টি করে গেল তা পূরণ করতে সময় লাগবে। সেই অসম্পূর্ণতাকে পূরণ করতে ‘জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটার, সাভার’ ও ‘দৃশ্যপট’কে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে।

সুবাস বিশ্বাস শুভ- অভিনেতা। সদস্য, জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটার, সাভার