Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

পুনর্জন্ম (হোয়েন উই ডেড এ্যায়োকেন)

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

অনুবাদ : শহীদুল মামুন

প্রথম দৃশ্য

মায়া
(রুবেকের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টায় হাত থেকে খবরের কাগজ ফেলে দিয়ে প্রায় আর্তনাদ করে ওঠে) ওহ! আ.. আহ! হাহ....হ

রুবেক
মায়া, আবার কী হোল?

মায়া
শুনতে পাচ্ছো? চারদিকে কেমন দমবন্ধ করা চুপচাপ?

রুবেক
(প্রশ্রয়ের ভঙ্গীতে) তুমি শুনতে পাচ্ছো?

মায়া
কী?

রুবেক
এই যে বললে- নীরবতা?

মায়া
(গোঁয়ার্তুমির ভঙ্গিতে) পাচ্ছিই তো।

রুবেক
হতে পারে- মানুষ সত্যিই হয়তো নীরবতার শব্দ শুনতে পায়।

মায়া
কেনো শুনবো না? এরকম একটা জায়গায় নৈঃশব্দের গর্জন-ই শোনা যায়। শহরে এত ব্যস্ততা এত হট্টগোল, অথচ সেখানে কেমন সবকিছু সেই নিষ্প্রাণ- কোথায় যেন কিছু একটা নেই। সবকিছু কেমন হলুদ খসে পরা পাতার মতো শব্দহীন।

রুবেক
(চোখে প্রশ্নবোধক চিহ্ন) এখানে ফিরে এসে তুমি খুশি হওনি মায়া?

মায়া
তুমি হয়েছো? এতোদিন যাযাবর জীবন কাটিয়ে এখানে আবার ফিরে এসে?

রুবেক
এতোকাল বিদেশে কাটিয়ে এখানকার ঘরোয়া জীবন কেমন অপরিচিত ঠেকছে।

মায়া
চলো না আবার বেড়িয়ে পড়ি। এক্ষুণি। আমাদের নতুন বাড়ি হয়েছে- কত আরমে থাকবো।

রুবেক
তুমি সবসময়ই ‘বাড়ি’ বলো, আমার কাছে অবশ্য ওটা শুধু ‘গৃহ’ই। (প্রসঙ্গ পাল্টে) জানো মাঝে মাঝে তোমাকে কেমন অপরিচিত ঠেকে আমার কাছে।

মায়া
কেনো? আমি তোমার সাথে এখানে প্রথম থেকেই আসতে চাইনি বলে?

রুবেক
তাহলে কে এখানে আসার জন্য অত গোঁ ধরেছিল? আমি নিশ্চয়ই নই।

মায়া
হয়তো আমিই চাইছিলাম! কিন্তু, কীভাবে জানবো (হতাশাগ্রস্থের ভঙ্গীতে) কীভাবে যে, এখানে সবকিছু এভাবে বদলে গেছে? অথচ, মাঝে শুধু চারটি বছর।

রুবেক
অর্থাৎ তোমার বিয়ের পরের বছরগুলো। যখন থেকে তুমি অধ্যাপক সাহেবের স্ত্রী হয়ে উঠলে, গৃহকর্ত্রী- স্যরি, একটি বাড়ির কর্ত্রী হয়ে উঠলে, তার পর থেকেই সব বদলে গেল। আসলে এরই মধ্যে তুমি স্বাধীন, বিলাসী জীবন-যাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছো।

মায়া
ও তাহলে আমিই বদলে গেছি শুধু- আর কিছু না, এখানকার লোকজন কিছুই বদলায়নি?

রুবেক
না আসলে ওরাও অল্প স্বল্প বদলে গেছে নিশ্চয়ই- কিন্তু সেটাও ভালোর দিকে কিছু না।

মায়া
খুশি হলাম- সহজে স্বীকার করলে, তাই।

রুবেক
(প্রসঙ্গ পাল্টে দিয়ে) এখানকার লোকজন আর তাদের জীবন-যাপন দেখলে একটা কথা মনে পড়ে যায়।

মায়া
কী সেটা?

রুবেক
মনে পড়ে, ট্রেনে করে যখন ফিরছিলাম- ছোট ছোট স্টেশনগুলো কীরকম চুপচাপ ঘুমিয়ে ছিল যেন। আমিও তোমার মতোই তখন (কিছুটা আত্মপ্রত্যয়ী) নিঃশব্দের কোলাহল শুনছিলাম। ক্রমেই বুঝতে পারছিলাম, বাড়ির কাছকাছি পৌঁছে গেছি। ট্রেনটা কোথায় কোথায় যেন থামল- কিন্তু কেউ নামলো না- কেউ উঠলো না।

মায়া
আচ্ছা, কেউ উঠছিলো না- কেউ নামছিলোও না, তাও কেনো সেটা থামছিলো শুধু?

রুবেক
আর প্রতিটা স্টেশনে দু’জন লোক প্ল্যাটফর্ম ধরে হাঁটছিল- একজনের হাতে লণ্ঠন- কথা বলছিল ওরা রাতের অন্ধকারে- একঘেঁয়ে স্বরে, অর্থহীন কিছু শব্দ।

মায়া
আমিও শুনছিলাম- সবসময় দু’জন ছিল ওরা- একসাথে হাঁটছিল- কথা বলছিল।

রুবেক
উদ্দেশ্যহীনভাবে, যেন গন্তব্যে পৌঁছানোর কোনো তাড়া নেই। (কণ্ঠস্বর পরিবর্তন করে, উৎফুল্ল যেন) যাকগে, এসব নিয়ে আর ভাবছি না। শুধু আগামীকালটা পর্যন্ত অপেক্ষা। তারপর বন্দরে জাহাজ ভিড়লেই বেড়িয়ে পড়বো আমরা। ঘুরে বেড়াবো গোটা দক্ষিণ সমুদ্র। হয়তো আরো দূরে।

মায়া
তাহলে তোমার মানুষ কিংবা দেশ, কোনোটাই তো দেখা হবে না। অথচ, সে জন্যই তুমি এসেছিলে।

রুবেক
(সংক্ষেপে, কিছুটা বিরক্ত) না, না ওসব অনেক দেখা হয়েছে।

মায়া
সমুদ্রে বেড়াতে গেলে তোমার ভালো লাগবে?

রুবেক
হয়তো, কিছুটা পরিবর্তন ...

মায়া
বেশ তো- এতে তোমার যদি ভালো হয় ....

রুবেক
ভালো হয়, আমার? আমার কিছু হয়নি তো!

মায়া
(উঠে কাছে যায়) হয়েছে রুবেক- আর তুমিও তা জান ।

রুবেক
ঠিক আছে- আপনিই বলুন প্রিয়তমা, কোথায় কী ছন্দপতন ঘটল?

মায়া
(রুবেকের চেয়ারের পেছনে গিয়ে সামনে ঝুকে পড়ে) সেটা আপাতত তোমাকেই বলতে হবে। আমিতো দেখতে পাচ্ছি- কেমন অস্থির বালকের মত, ঘুরে বেড়াচ্ছ, ঘরে-বাইরে- অশান্ত, ছটফট করছ। লোকজন এড়িয়ে চলছো।

রুবেক
তাও লক্ষ্য করেছো?

মায়া
একটা সময় ছিল, সকাল থেকে রাত অব্দি তুমি বিরামহীন কাজ করতে।

রুবেক
হ্যাঁ তা পারতাম, একসময়।

মায়া
কিন্তু তোমার সেই শ্রেষ্ঠ কাজটি যখন শেষ হলো...

রুবেক
(মায়া নেড়ে) ‘পুনরুত্থানের দিন’!

মায়া
সারা পৃথিবীতে যার প্রদর্শনী হল- তোমাকে বিখ্যাত করে তুলল যে কাজটা।

রুবেক
দুর্ভাগ্যটা ঠিক তখন থেকেই শুরু হল।

মায়া
কী বলছ তুমি!

রুবেক
যখন আমি শেষ করলাম ‘পুনরুত্থানের দিন’ (হাত নেড়ে একটা আবেগপূর্ণ ভঙ্গী করে) একটা মাস্টারপিস, হয়ত একসময় ওটা তাই ছিল। না, না, ওটা এখনো একটা সেরা কাজ বলতেই হবে।

মায়া
(অবাক হয়ে তাকয়ে) কেনো রুবেক, সারা পৃথিবীর লোক তাই জানে- মহত্তম সৃষ্টি তোমার।

রুবেক
(যেন তেড়ে আসে এক বুনো মোষ) সারা পৃথিবী- পৃথিবীর মানুষ- ওরা কিছু জানে না, কিছু বোঝে না।

মায়া
কিন্তু মানুষ তো অন্তত অসাধারণ কিছু একটা অনুভব করতে পারে।

রুবেক
এমন একটা অনুভব, যার অস্তিত্বই আসলে নেই। যা আমার কল্পনাতেও কখনো ছিল না। আর তাই নিয়ে জগৎ সংসার হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। এসব হুজুগে লোকজন- আমজনতাকে খুশি রাখার জন্য জীবন বাজী রেখে কাজ করে কী লাভ?

মায়া
তুমি এখন যা নিয়ে ব্যস্ত সেগুলো কি তোমার উপযুক্ত কিছু? তুচ্ছ কতগুলো আবক্ষ মূর্তি গড়ে যাচ্ছ একটার পর একটা- বলো?

রুবেক
(একরকম ধূর্ত ঠাণ্ডা হাসি) ওগুলো তুচ্ছ নয়, সাধারণ আবক্ষ মূর্তি নয়, মায়া!

মায়া
কী তবে ওগুলো- গত কয়েক বছর ধরে ক্রমাগত গড়ে যাচ্ছ! কেন, কী উদ্দেশ্যে?

রুবেক
আবার তাকিয়ে দেখ, একদম মামুলী মূর্তি নয় এগুলো। (বেশ আত্মপ্রত্যয়ী আর প্রসন্নচিত্তে) এর অর্থ আলো-আঁধারীর অনিশ্চয়তায়, এর রহস্য সবাই ভেদ করতে জানে না।

মায়া
কী বলছো এসব?

রুবেক
আমি, কেবল আমিই জানি এর রহস্যভেদ- আমার একান্ত, আনন্দ-মুহূর্তের সাক্ষী এরা (মুচকি হাসি)। লোকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে এগুলোর বাইয়ের দিকে- বলে ‘আশ্চর্য সাদৃশ্য’ রয়েছে সেই আবক্ষ মূর্তি আর সত্যিকার মানুষটির মধ্যে। (স্বর নামিয়ে ফেলে নিচুতে) শুধু আমিই জানি এর গভীরে খোদাই করা কখনো এক দেমাগ দেখানো ঘোড়ার মুখ, কখনো হয়তো কান-ঝোলা ভুরু কোচকানো কুকুর কিংবা ধরো মোটকা হলুদ কুৎকুৎ শুয়োর। আর না হয় তো আদি, অকৃত্রিম গোঁয়ার কোনো মোষ!

মায়া
আহা গোবেচারা জন্তুগুলো... এদের...

রুবেক
হ্যাঁ, গোবেচারাও বলতে পার। দেখ মায়া, এসব জন্তুকে মানুষ হিসেবে কেমন কুৎসিত লাগে- আবার মানুষগুলোকেও জন্তুর আদলে মনে হয় পশু। মানুষ আর পশু, দু’জন দু’জনের জুড়ি। আর এই কথাটাই আমি শিল্পের মোড়কে দিচ্ছি বলেই আমার এত কদর, আর নগদ পয়সায় তার দাম- হা হা হা!

মায়া
তাতো নিশ্চয়ই! এতে যদি তোমার আনন্দ হয় তো খুবই ভালো!

রুবেক
(মাথায় হাত রাখে। শ্যাম্পেনের গ্লাস খালি করে) সত্যি আমি সুখি মায়া। নিজেকে মুক্ত আর স্বাধীন ভাবতে পারার মধ্যে একরকম সুখ আছে নিশ্চয়ই আর তার সাথে যা কিছু চাই তা পাবার স্বাধীনতা- কী বলো?

মায়া
ঠিক আছে মানছি তোমার কথা। কিন্তু আমাকে দেয়া প্রতিশ্রুতির কথা তুমি কি ভুলে গেছো?

রুবেক
মনে করতে পারছি না তো? কোন প্রতিশ্রুতির কথা বলছো?

মায়া
বলেছিলে (একটু কাব্যিক ভাবেই যেন) অনেক দূরে এক উঁচু পাহাড়চুড়া, পৃথিবীর সব কিছু দেখা যায়- তেমন এক জায়গায় নিয়ে যাবে।

রুবেক
তোমাকেও এই প্রতিশ্রুতিটা দিয়েছিলাম নাকি?

মায়া
আমাকেও? আর কাকে বলেছিলে এই কথা?

রুবেক
(গুরুত্ব না দেয়ার ভান) না, না, আমি বলছিলাম- তোমাকে কি সেরকম কোনো কথা দিয়েছিলাম কিনা?

মায়া
তুমি তাই বলেছিলে- বলেছিলে ঐ সৌন্দর্য হবে শুধু তোমার আর আমার।

রুবেক
মায়া শোনো- এই পুরো ব্যপারটাই একটা কথার কথা, একটা নাটুকেপনা।

মায়া
শুধুই কথার কথা।

রুবেক
সত্যি বলছি স্কুলে থাকতে যখন চাইতাম যে পাশের বাড়ির বাচ্চারা এসে আমার সাথে খেলুক, তখন বানিয়ে বানিয়ে বলতাম এসব কথা।

মায়া
আমাকেও তাহলে তোমার খেলার সাথী হিসেবেই চেয়েছিলে- তাই না?

রুবেক
(কথাটা হাল্কা করার চেষ্টা) দেখোতো, বেশ মজার খেলা- তাই না?

মায়া
(ঠাণ্ডা গলায়) আমিতো শুধু তোমার খেলার সাথী হতে চাইনি।

রুবেক
না আমিও সেভাবে কখনো ভাবি না।

মায়া
কিন্তু, সেই উচুঁ চূড়ায় তো তুমি আমাকে কখনোই নিয়ে যাওনি!

রুবেক
(এবার বেশ ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে) পৃথিবীর সব সৌন্দর্যের কথা বলছ? তাহলে শুনে রাখ- সেসব সৌন্দর্য দেখার জন্য তুমি গড়ে ওঠোনি, মায়া।

মায়া
(নিজেকে সংযত করে) হ্যাঁ। কিন্তু একসময় তো তুমি তাই ভাবতে।

রুবেক
(চেয়ারে নিজেকে এলিয়ে দিয়ে) আর ঘটনাগুলোও সেই কবে- চার পাঁচ বছর আগের কথা।

মায়া
তোমার কাছে সময়টা কি খুব দীর্ঘ মনে হয়?

রুবেক
(হাই তুলে) হ্যাঁ আজকাল একটু বেশিই লম্বা সময় বলে মনে হচ্ছে।

মায়া
(নিজের জায়গায় ফিরে গিয়ে) ঠিক আছে- তোমাকে আর বিরক্ত করব না।

রুবেক
(কনুইয়ে ভর করে রুবেক তাকায়) তা অধ্যাপক-পত্নী কি খুব রাগ করলেন নাকি?

মায়া
(শীতল কণ্ঠে) মোটেই না!

(চারপাশে দিয়ে লোকজন হেঁটে যাচ্ছে। ওয়েটার খাবার দেয়, এমন সময় ইন্সপেক্টর এর প্রবেশ)

ইন্সপেক্টর
সুপ্রভাত, আপনাদের সাথে দেখা হওয়ায় খুব ভাল লাগছে। কেমন কাটল (মায়াকে) রাতটা? নতুন জায়গায় ঘুমাতে টুমাতে পারছেন তো? প্রফেসর আপনি?

মায়া
ঘুম আমার সবসময়ই পছন্দ- এখানেও তাই।

রুবেক
না, না আজকাল আমার ঘুম এত কমে গেছে!

ইন্সপেক্টর
ঘাবড়াবেন না স্যার। কয়েকদিন আয়েশ করে আমাদের এখানে কাটালেই সব ঠিক হয়ে যাবে।

রুবেক
(সপ্রশ্ন দৃষ্টি) আচ্ছা, এখানে এমন কেউ আছে যে রাত্রে পার্কে ঘোরাঘুরি করে, কিংবা হয়ত রাস্তায় পায়চারী করে বেড়ায়?

ইন্সপেক্টর
না তো- এরকম কারো কথা তো আমি জানি না- আমি নিশ্চিত এরকম কেউ নেই।

মায়া
ওফ্! রুবেক আজ সকালেই তো তোমাকে বললাম- এগুলো তোমার দেখবার ভুল- স্বপ্ন দেখছিলে।

রুবেক
(শুষ্ক কণ্ঠে) ও হ্যাঁ তাই হবে হয়তো, আসলে ব্যপারটা হয়েছে কী, কাল রাতে ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ার পর আর ঘুম আসছিল না- তাই ভাবলাম রাতের শহরটা কেমন লাগে একটু দেখে আসি- ঠিক তখুনি...

ইন্সপেক্টর
(অধৈর্য্য) হ্যাঁ ... তারপর?

রুবেক
আমার জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম- গাছ-পালার মধ্যে যেন একটা মানুষ, হাঁটছে।

ইন্সপেক্টর
আচ্ছা ওটা পুরুষ না নারী মূর্তি ছিল এব্যপারে...

রুবেক
নারী মূর্তি- এব্যাপারে আমি প্রায় নিশ্চিত। কিন্তু তার পেছনে অস্পষ্ট ছায়ার মত আরেকটা মূর্তিও যেন এগিয়ে আসছিল।

ইন্সপেক্টর
কী বললেন? কালো আর অস্পষ্ট?

রুবেক
হ্যাঁ, আমার তো তাই মনে হয়।

ইন্সপেক্টর
আর হাঁটছিলো মূর্তিটার ঠিক পেছন পেছন। তাই না?

রুবেক
অনেকটা তাই- বেশ কাছ থেকে যেন অনুসরণ করছিলো।  

ইন্সপেক্টর
তাহলে বোধহয় আমি ব্যাপারটার একটা ব্যাখা দিতে পারবো।

রুবেক
কে ছিল ওটা?

মায়া
(একই সাথে বলে উঠে) আপনি বলতে চান ও তাহলে স্বপ্ন দেখছিল না?

ইন্সপেক্টর
শ..শ..শ... চুপ চুপ। ওই যে দেখুন, ওরা এদিকেই আসছে।

(সাদা পোশাকে একজন দীর্ঘাঙ্গী নারী এবং সাথে নান্। নানের বুকে ক্রুশ ঝুলছে)

রুবেক
(অনেকটা অনিচ্ছাকৃত উঠে দাঁড়ায়) কে ইনি?

ইন্সপেক্টর
নতুন এসেছেন এখানে। আর ঐ অংশটা ভাড়া নিয়েছেন।

রুবেক
এখানকার স্থানীয় কেউ না?

ইন্সপেক্টর
খুব সম্ভব তাই। সপ্তাহখানেক হল এসেছেন- আর এদের আগে দেখেছি বলেও মনে হয় না।

রুবেক
(বেশ নিশ্চিত হয়ে) আমি একেই দেখেছিলাম পার্কের ভেতর গতকাল রাতে।

ইন্সপেক্টর
কোনো সন্দেহ নেই। আমিও শুরু থেকে তাই ভাবছি।

রুবেক
আচ্ছা ভদ্রমহিলার নামটা বলতে পারবেন?

ইন্সপেক্টর
খাতায় নাম লিখেছেন মাদাম দ’ সাতো এবং সঙ্গিনী- এর বেশি কিছু বলতে পারছি না।

রুবেক
(স্মৃতি হাতড়াচ্ছে) সাতো, সাতো...

মায়া
(ঠাট্টার ছলে) এ নামে কাউকে খুব চেন মনে হয়, রুবেক? হ্যাঁ!

রুবেক
(প্রবল মাথা নেড়ে) না কাউকে না। নামটা কোন অঞ্চলের হতে পারে? আচ্ছা উনি কোন ভাষায় কথা বলছিলেন?

ইন্সপেক্টর
ভদ্রমহিলা আর তার সঙ্গী যখন কথা বলছিলেন তখন আমি তার বিন্দু-বিসর্গও বুঝতে পারিনি। অবশ্য মাঝে মাঝে তা বিশুদ্ধ নরওয়েজিয়ান বলেই মনে হচ্ছিলো।

রুবেক
নরওয়েজিয়ান? আপনি ঠিক নিজে শুনেছেন তো?

ইন্সপেক্টর
আহা!!! আমিতো নিজেই কয়েকবার ওর সাথে কথা বলেছি- অবশ্য গোটাকয় শব্দ মাত্র, কিন্তু ভদ্রমহিলা মুখ খুলতেই চাইছিলেন না।

রুবেক
কিন্তু নরওয়েজিয়ান ভাষায় কথা বলছিলেন?

ইন্সপেক্টর
একদম খাঁটি নরওয়েজিয়ান, অবশ্য এরমধ্যে খানিকটা উত্তরের টান রয়েছে।

রুবেক
(অবাক, সামনে স্থিরদৃষ্টি) সেটাও আছে?

মায়া
(একটু যেন আহত স্বরে) হয়তো উনি কখনো তোমার মডেল ছিলেন। ভেবে দেখ তো!

রুবেক
(তীর্যক দৃষ্টিতে তাকিয়ে) আমার মডেল?

মায়া
(উস্কানীমূলক হাসি) মানে বলছিলাম, যখন তুমি তরুণ ছিলে তখনকার কথা- শুনেছি অসংখ্য মডেল ছিল তোমার!

রুবেক
(তীর্যক দৃষ্টি, শুষ্ক কণ্ঠে) ভুল শুনেছ। আসলে একটি মডেলই ছিল আমার। যত কাজ করেছি তার সবগুলোর জন্য ঐ একমাত্র মডেল।

ইন্সপেক্টর
(হঠাৎ তাকিয়ে চমকে ওঠে) ওরে বাপরে! কিছু মনে করবেন না। যিনি আসছেন তার সামনে না পড়াটাই ভালো (মায়ার দিকে অসহায় ভঙ্গীতে) তাও আপনার সামনে...

রুবেক
(একই দিকে একটু তাকিয়ে) যা-ব্বাবা, ইনি আবার কে?

ইন্সপেক্টর
উলফ্। অঢেল সম্পত্তির মালিক, এখানকার জমিদার। আবার (একটু রুবেকের দিকে ঝুঁকে) জবরদস্ত শিকারীও বটে। লোকে ভালুক-শিকারী বলেই ডাকে।

রুবেক
তা উনি এখানে কেন?

ইন্সপেক্টর
প্রতি বছর শিকারে যাবার পথে এখানে কয়েকদিন থেকে যান। কিছু মনে করবেন না- আমাকে এবার উঠতেই হচ্ছে।

(যাওয়ার জন্য ঘুরে যায়)

উলফ্
(শুধু কণ্ঠস্বর শোনা যায়) আরে আরে এই যে, থামুন- গোল্লায় যাক সব, কী হলো। কী ব্যাপার- আমাকে দেখলেই আপনি এরকম ল্যাজ গুটিয়ে পালান কেন?

ইন্সপেক্টর
(থামে) আমি? আমি মোটেও পালাচ্ছি না- মিঃ উলফ্।

(উলফ্ এর প্রবেশ। শিকারীর পোশাক। সাথে চাকর লারস্ আর এক পাল কুকুর)

উলফ্
(যেন ইন্সপেক্টরের উপর হামলে পড়ে) এটা কেমন ভদ্রতা? কোথায় অতিথিকে অভ্যর্থনা করবেন- না, দেখে মনে হচ্ছে যমদূত আপনার পেছনে ছুটছে।

ইন্সপেক্টর
(প্রশ্নটি এড়িয়ে) স্যার কি স্টিমারে এসেছেন?

উলফ্
(রীতিমত গর্জন) স্টিমার? আপনার ঐ তেল চিটচিটে কোনো স্টীমার দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। (এবার কোমরে হাত) কেন আপনার জানা নেই- আমি সবসময় আমার ব্যক্তিগত বোট নিয়েই ঘুরে বেড়াই। লারস্! (লারস্- কে উদ্দেশ্য করে) জাতভাইদের একটু যত্ন আর খাতির কর! তাই বলে খুব বেশি খেতে দিস না। সবসময় আধপেটা করে রাখবি। টাটকা হাড্ডি আর মাংস- তবে বেশি গোসত যাতে না লেগে থাকে। খেয়াল রাখিস মাংস আর হাড় যেন কাঁচা, রক্তমাখা হয়; তোর নিজের পেটেও কিছু দিস। (শূন্যে লাথি ছুঁড়ে) এখন যা, ভাগ এখান থেকে (লারস্ কুকুরগুলো নিয়ে রেরিয়ে যায়)।

ইন্সপেক্টর
স্যার কি একবার ডাইনিং হলে যাবেন?

উলফ্
ঐ সব ভ্যানভ্যানে মাছি আর আধমরা মানুষের মধ্যে? না- তার প্রয়োজন নেই।

ইন্সপেক্টর
ঠিক আছে, ঠিক আছে-

উলফ্
আপনার ঐ ম্যানেজারকে বলুন সবকিছু ঠিকঠাক ব্যবস্থা করতে। যথেষ্ট খাবার দাবার- কোনো কিপ্টেমি দেখতে চাই না। আর হ্যাঁ প্রচুর ব্র্যান্ডি আর মদ চাই। মহিলাকে বলবেন আমি আর লারস্ সবকিছুর বারোটা বাজিয়ে ছাড়ব যদি না সে...

ইন্সপেক্টর
(মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে) না, না, আপনাকে একদম ভাবতে হবে না। আপনি আগেও যখন এসেছেন- তখন থেকেই এসব জানি স্যার। (রুবেকও মায়ার দিকে তাকিয়ে) আপনাদের জন্য কিছু পাঠাতে বলবো ওয়েটারকে?

রুবেক
না, আমার কিছু দরকার নেই।

মায়া
আমারও না,

(ইন্সপেক্টর হোটেলে চলে যান)

উলফ্
(রুবেক ও মায়ার দিকে তাকিয়ে) পোড়া কপাল। আমার মত গেঁয়োভূত কিনা শেষ পর্যন্ত এরকম মানুষের সামনে।

রুবেক
(চোখ তুলে) কিছু বলছেন মিঃ উলফ?

উলফ্
(বেশ বিনীত) নিশ্চয়ই বিখ্যাত শিল্পী রুবেক এর সামনে দাঁড়িয়ে আমি?

রুবেক
আমাদের বোধহয় আগেও দেখা হয়েছে।

উলফ্
সেও তো বেশ কয়েক বছর আগে। তখন অবশ্য আপনি অত বিখ্যাত হননি- আর তাই হয়তো আমার মত এক নগণ্য শিকারীও আপনার কাছে ভিড়তে পারতো।

রুবেক
(হেসে) কামড়ে দেয়ার অভ্যেস কিন্তু আমার এখনো নেই।

মায়া
(আগ্রহ নিয়ে উলফের দিকে তাকায়) আপনি শিকারী? শিকার করতে ভালোবাসেন?

উলফ্
(পাশের টেবিলে বসে পড়ে) আমার পছন্দ অবশ্য শেষ পর্যস্ত ভালুকই। কিন্তু তা না পাওয়া গেলে বন্য যেকোনো টাটকা কিছু। রসালো আর শিরায় রক্ত বইছে তেমন- ঈগল, নেকড়ে, হরিণ, নারী- সব! (প্যান্টের পকেট থেকে ফ্লাস্ক বের করে এবং পান করে)

মায়া
(উলফ্কে মনযোগ দিয়ে দেখছে) কিন্তু তবুও ভালুক শিকার করাটা নিশ্চয়ই আপনার সবচে প্রিয়!

উলফ্
হ্যাঁ ওটাই। আর তেমন কোনো গড়বড় হলে ছুরি তো হাতের কাছে রয়েছেই। (একটু হেসে) আসলে ম্যাডাম আপনার স্বামী এবং আমি আমরা দুজনেই কঠিন কিছুর সাথে লড়াই করতে ভালোবাসি। ওনার লড়াই মার্বেলের টুকরোর সাথে- ঠিক বলছি তো? আর আমার লড়াই ভালুকের টান টান সতর্ক পেশীর সাথে। শেষের জিতটা অবশ্য আমাদেরই। যতক্ষণ না শিকার হার মানছে- হাল ছাড়ি না কখনো- তা শিকার যত গোঁয়ারই হোক না কেন।

রুবেক
(চিন্তিত) আমি একমত, আপনার সাথে। ঠিকই বলেছেন।

উলফ্
মরা পাথর হাতুড়ির বাড়িতে জাগিয়ে প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়া- সেও তো এক লড়াই। পাহাড়ের গুহার ভেতর থেকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ভালুক বের করার মতই ব্যাপারটা।

মায়া
আপনি এখন কি বনে শিকারে যাচ্ছেন?

উলফ্
ওই পাহাড়ের উঁচুতে যাচ্ছি আমি। মিসেস রুবেক পাহাড়ের চূড়ায় উঠেছেন কখনো?

মায়া
না, কখনো উঠিনি।

উলফ্
কী বলছেন ম্যাডাম। চলুন না, এবারই তাহলে যাওয়া যাক। আমি খুশি মনে আপনাকে আর আমাদের অধ্যাপককে নিয়ে যেতে রাজি।

মায়া
না, না তা কী করে হয়? রুবেক এবার সমুদ্র যাত্রার কথা ভাবছিলো।

উলফ্
সমুদ্রযাত্রা কোথায়- তেল চিট্চিটে স্টীমারে লোনা এঁদোপুকুরে ঘুরে বেড়ানো, এই তো? আর যা জল সেও তো- একেবারে বাসন ধোওয়া আর কী।

মায়া
রুবেক, শোনো কী বলছে।

উলফ্
তারচে’ বরং আমার সঙ্গে পাহাড়ে চলুন। চারদিক ফাঁকা- লোকজনের ভিড় আর গুঁতোগুঁতি নেই। আমার কাছে এর অনেক মূল্য। অবশ্য আপনার মত ... (নান হোটেল থেকে বের হয়ে আবার ঢুকে যায়) দেখেছেন? কেমন বিদঘুটে, কালো পোশাক। কাউকে কবর দেয়া হল নাকি?

রুবেক
আমার পরিচিত কেউ নয়।

উলফ্
তবে নিশ্চয়ই কেউ শিগগীরই পটল তুলতে যাচ্ছে। যেসব লোকজন রোগা আর হাড় জিরজিরে হয়ে বেঁচে আছে তাদের উচিৎ খামোখা সময় নষ্ট না করে কবরে গিয়ে শুয়ে পড়া।

মায়া
আপনি কখনো অসুস্থ হননি মিঃ উলফ্?

উলফ্
কখনোই না, অসুস্থ হলে আজ আর আমাকে এখানে থাকতে হতো না। অবশ্য আমার কয়েকজন কাছের বন্ধু অসুখে পড়েছিল, বেচারাগুলো!

মায়া
আর আপনি নিজে তাদের জন্য কী করেছেন?

উলফ্
সব কটাকেই গুলি করে খতম করে দিয়েছি।

রুবেক
(অপলক তাকিয়ে থেকে) খতম করে দিয়েছেন?

মায়া
(চেয়ার ঠেলে দাঁড়িয়ে পড়ে) গুলি করে মেরে ফেললেন?

উলফ্
(মাথা নাড়ে) আমার নিশানা কখনো ভুল হয় না, ম্যাডাম ।

মায়া
তাই বলে মানুষ মারবেন?

উলফ্
মানুষের কথা আবার কে বললো?

মায়া
আপনার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুদের কথাই তো বলছিলেন।

উলফ্
আহ্হা, আমি তো আমার কুকুরগুলোর কথা বলছিলাম।

মায়া
ওরাই আপনার সবচে ঘনিষ্ট বন্ধু নাকি?

উলফ্
ওদের চেয়ে ঘনিষ্ট আর কেউ নেই। সৎ, বিশ্বস্ত আর প্রভুভক্ত কুকুরগুলো আমার! আর ওরাই যখন অসুস্থ হয় কিংবা নিস্তেজ হতে শুরু করে- দুম! ব্যাস শেষ! সোজা সবকিছু গুটিয়ে ওপারে।
 
(এমন সময় নান বের হয় হাতের ট্রে-টা রেখে আবার চলে যায়)

উলফ্
(তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে) এগুলোকে মানুষের খাবার বলতে চান? ছ্যাঃ! জল মেশানো দুধ আর স্যাঁতস্যাঁতে বাসি রুটি। আমার সঙ্গীদের খাওয়ানোর দৃশ্যটা দেখা উচিত আপনার। যাবেন নাকি?

মায়া
(রুবেকের দিকে তাকিয়ে একটু হাসার চেষ্টা করে। চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ে) হ্যাঁ চলুন! বরং খুশিই হব।

উলফ্
(দাঁড়িয়ে পড়ে) এইতো তেজী মহিলার মত কথা। আসুন আমার সাথে। দেখবেন কীভাবে থলথলে হাড়-মাংস গবগব করে একেবারে মুখে পুরে গিলে ফেলছে। দেখবার মত দৃশ্যই বটে। চলুন, যেতে যেতে পাহাড়ে ওঠার ব্যাপারেও কথা বলা যাবে।

(উলফ্ বেরিয়ে যায়। মায়া তার পেছনে। সাদা পোশাকে এক মহিলা এসে ট্রে রাখা টেবিলে বসে। গ্লাস থেকে কিছু একটা খেতে গিয়ে থেমে যায়। নির্বিকারভাবে রুবেককে দেখে)

রুবেক
(স্থির দৃষ্টিতে দেখে, চেয়ার থেকে উঠে গিয়ে নিচু স্বরে বলে) তোমাকে ঠিকই চিনতে পেরেছি ইরিন।

ইরিন
চিনতে পারলে শেষ পর্যন্ত! আর্নল্ড।

রুবেক
তুমিও আমাকে চিনতে ভুল করনি।

ইরিন
তোমার চিনতে পারাটাই অবাক করবার মত।

রুবেক
কেন?

ইরিন
তুমি এখনো বেঁচে আছ তাই।

রুবেক
(বুঝতে না পেরে মাথা নাড়ে) এখনো বেঁচে আছি?

ইরিন
ভদ্রমহিলাটি কে?

রুবেক
(অনেকটা অনিচ্ছায়) ওর কথা বলছ? আমার স্ত্রী।

ইরিন
ও আচ্ছা, তাইতো। তাহলে এমন কেউ, যে আমার জায়গায় এসে বসেছে!

রুবেক
ইরিন, কী বলছ এসব?

ইরিন
আমার মৃত্যুর পরও বেঁচে আছো- আর আমাদের সন্তান? শুনেছি সেও ভালো আছে। যশ, আর খ্যাতি হয়েছে তার।

রুবেক
(মৃদূ হেসে, যেন সুদূরের কোনো সুখস্মৃতি হাতড়ায়) আমাদের সন্তান। হ্যাঁ আমরা তাই তো ডাকতাম সেটাকে এক সময়।

ইরিন
এক সময়- যখন বেঁচেছিলাম।

রুবেক
(একটু পরিবেশ হালকা করার চেষ্টা) হ্যাঁ সত্যিই শুনেছ, সারা দুনিয়া জোড়া ওর এখন নামডাক, পড়েছ নিশ্চয়ই কোথাও।

ইরিন
আর তোমাকেও বিখ্যাত করেছে- তোমার স্বপ্নও তাই ছিল।

রুবেক
(একটু তরল, আবেগময়) এ সব কিছু তোমার জন্যই হয়েছে, সবকিছু তোমারই প্রাপ্য ইরিন।

ইরিন
(এক মুহূর্তের জন্য হলেও চিন্তায় হারিয়ে যায়) যা করার অধিকার ছিল, তাই যদি করতাম!

রুবেক
কী করতে চেয়েছিলে?

ইরিন
যদি আমাদের সন্তানকে হত্যা করতে পারতাম!

রুবেক
হত্যা করতে চেয়েছিলে? তুমি?

ইরিন
(ফিসফিসিয়ে) তোমাকে ছেড়ে যাওয়ায় আগে যদি হত্যা করতে পারতাম, ভেঙ্গে চুরে ধুলোয় গুঁড়িয়ে দিতে পারতাম!

রুবেক
সেটা তুমি করতেই পারতে না, অতটা নির্মম তুমি কখনো ছিলে না, ইরিন।

ইরিন
না, অতটা নির্মম আমি তখন হতে পারিনি।

রুবেক
পরে হতে পেরেছিলে বলছ?

ইরিন
পরে আমি ওকে অসংখ্যবার হত্যা করেছি- দিনে রাতে, ঘৃণায়, প্রতিহিংসায়, যন্ত্রণায়।

রুবেক
(টেবিলের কাছে যায়) ইরিন এতগুলো বছর পর আজকে অন্তত বলো- কেন সেদিন আমাকে ছেড়ে গিয়েছিলে? কোনো চিহ্ন না রেখে, একবারে বুদ্বুদের মত হারিয়ে গিয়েছিলে কেন?

ইরিন
(ধীরে মাথা নাড়ে) মৃত্যুর এ পাড় থেকে এ কথা শুনিয়ে কী লাভ, বলো?

রুবেক
অন্য কেউ কি তোমার?

ইরিন
একজন ছিল- যার কাছে আমার ভালোবাসা, আমার জীবনের প্রয়োজন দু'টোই ফুরিয়ে গিয়েছিল।

রুবেক
(প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে) পুরনো দিনের কথা না হয় থাক। বরং বল, কোথায় ছিলে তুমি ইরিন? তোমায় খোঁজার সব চেষ্টা পণ্ড করে দিয়ে কোথায় হারিয়ে গেলে?

ইরিন
আমি আশ্রয় পেয়েছিলাম অন্ধকারে, ঠিক যখন আমাদের সন্তান আলোর মাঝে গিয়ে দাঁড়াল, তখন।

রুবেক
আর কী করেছো?

ইরিন
পৃথিবীময় ঘুরে বেড়িয়েছি (রুবেকের দিকে ঘুরে তাকায়) দাঁড়াও, ভাবতে দাও। হ্যাঁ কখনো দাঁড়িয়েছি খোলা মঞ্চে, নগ্ন হয়ে কখনো দাঁড়িয়েছি মডেলের ভূমিকায়- আর টাকার পাহাড় গড়েছি। পুরুষদের পাগল করেছি- যা তোমার সাথে কখনো পারিনি, কী কঠিন সংযম ছিল তোমার!

রুবেক
(এই কথাটাকেও একটু ঘুরিয়ে দিয়ে) আর হ্যাঁ, তারপর তো তুমি বিয়ে করলে, তাই না।

ইরিন
করেছিলাম, ওদেরই একজনকে।

রুবেক
কে সেই ভদ্রলোক?

ইরিন
নামজাদা কূটনীতিক ছিলেন, জানো ওকে আমি উন্মাদ, বদ্ধ উন্মাদ বানিয়ে ছেড়েছিলাম। একটা মজার খেলা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ব্যাপারটা আমার কাছে।

রুবেক
কোথায় আছেন উনি এখন?

ইরিন
তার কবরের ওপর এখন এক স্মৃতিসৌধ- আর খুলির ভেতর ঝনঝন করছে বুলেট।

রুবেক
আত্মহত্যা করেছিলেন?

ইরিন
হ্যাঁ, আমাকে বাঁচিয়ে গেছেন।

রুবেক
(সহানুভূতির স্বরে) তোমার ছেলেমেয়েরা?

ইরিন
হ্যাঁ, অনেক ছেলেমেয়ে আমার।

রুবেক
কোথায় তারা? সাথে তো কাউকে দেখছি না।

ইরিন
ওদেরও, ওদেরও হত্যা করেছি আমি।

রুবেক
(একটু রূঢ় হয়ে) এবার তুমি মিথ্যা বলতে শুরু করেছ।

ইরিন
বলছিই তো! কোনো মায়া না দেখিয়ে ওদের আমি হত্যা করেছি। যে মুহূর্তে ওরা পৃথিবীতে এসেছে, সেই মুহূর্তেই। না, না, তারও বহু আগে- একজন একজন করে।

রুবেক
(এবার আবার নরম হয়ে) তুমি যাই বলছো, তার ভেতর যেন অন্য কোনো অর্থ লুকিয়ে আছে।

ইরিন
আর কোনো উপায় যে আমার নেই রুবেক। তোমাকে বলা প্রতিটা শব্দ কে যেন আমার কানে কানে বলে দিচ্ছে।

রুবেক
হয়তো আমিই শুধু এর অর্থ বুঝতে পারি।

ইরিন
হ্যাঁ, শুধু তোমারই পারা উচিত।     

রুবেক
(ইরিনের চোখে গভীর দৃষ্টিতে তাকায়) তোমার ভেতরের কোনো একটা সুর কেটে গেছে ইরিন।

ইরিন
(শান্ত স্বরে) ভালোবাসার উষ্ণতায় আর তারুণ্যে ভরা ছিল যার জীবন, মরে যাওয়ার পর তার তো এরকমই হয়ে যাওয়া স্বাভাবিক, তাই না?

রুবেক
ইরিন, ওহ ইরিন- জেগে ওঠো তোমার এই কল্পনা থেকে, দ্যাখো তুমি বেঁচে আছো, বেঁচে আছো তুমি।

ইরিন
(থরথর করে কাঁপছে) বহু বছর ধরেই তো আমি মৃত। সেই তখন থেকে, যখন ওরা এসে আমাকে হাত মুচড়ে বেঁধে ফেলল। তারপর আমাকে নামিয়ে দিল ঠাণ্ডা, লোহার গরাদওয়ালা এক কবরে- যেখান থেকে কোন চিৎকার পৃথিবীর কারো কাছে গিয়ে পৌঁছায় না। কিন্তু এখন যেন আবার জেগে উঠছি নতুন করে।

রুবেক
(একটু থেমে) তুমি কি আমাকে দোষী ভাবো?

ইরিন
হ্যাঁ।

রুবেক
তুমি যাকে তোমার মৃত্যু বলছ তার জন্য?

ইরিন
হ্যাঁ, কারণ এরকম মৃত্যুই আমার নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। (যেন কিছু হয়নি) বসছো না কেন আর্নল্ড? ভয় নেই- আমি এখনো বরফের মত ঠা-া হয়ে যাইনি।

রুবেক
(কাছাকাছি এসে বসে) পুরনো দিনগুলোতে আমরা ঠিক এভাবেই বসতাম, তাই না?

ইরিন
বেশ খানিকটা দূরত্বও থাকত।

রুবেক
(নিশ্চিত হয়ে) একটা দূরত্বের তখন প্রয়োজন ছিল, ইরিন।

ইরিন
সত্যিই ছিল?

রুবেক
তোমার মনে আছে, আমি যখন জিজ্ঞেস করেছিলাম বাইরের এই খোলা দুনিয়াটা ঘুরে দেখতে চাও কিনা- তুমি কী বলেছিলে?

ইরিন
প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, তোমার সাথে পৃথিবী আর জীবনের শেষ পর্যন্ত যাব- তোমার সব কাজ, সব সৃষ্টির সঙ্গী হব।

রুবেক
হ্যাঁ, ইরিন তুমি মডেল হয়েছ আমার কাজের- কোনো অনুযোগ, কোনো আক্ষেপ ছাড়াই কাজ করে গেছো।

ইরিন
তারুণ্যের সব উষ্ণতা নিয়ে।

রুবেক
সত্যি, সত্যিই তাই।

ইরিন
আমি তোমার পায়ের কাছে বসে সেবা করেছি, আর্নল্ড! আর তুমি, তুমি...

রুবেক
আমি তো কখনো তোমার কোনো ক্ষতি করিনি।

ইরিন
তুমি আমার এখানে (বুকের দিকে হাত) এক গভীর ক্ষত এঁকে দিয়েছ।

রুবেক
আমি?

ইরিন
হ্যাঁ তুমি। তোমার জন্য, তোমার সৃষ্টির জন্য আমি কতবার নিজেকে নগ্ন করে দাঁড়িয়েছি, অথচ তুমি কখনো ছুঁয়েও দেখনি। শুধু উপেক্ষা ... ওহ! শুধু উপেক্ষাই করেছ।

রুবেক
ইরিন তুমি বোঝনি, তোমার লাবণ্য, তোমার রূপ আমাকে মাতাল করে তুলতো? মনে হতো যেন এক মায়াবী ইন্দ্রজালে আটকা পড়ে আছি।

ইরিন
(বলে যেতে থাকে) আর যদি স্পর্শ করেই বসতে তাহলে তোমাকেও হয়তো খুন করতাম তক্ষুণি! কিন্তু তবু কীভাবে তুমি এই উপেক্ষা...

রুবেক
(অবাক চোখে তাকায়) আমি শিল্পী ছিলাম, ইরিন।

ইরিন
সত্যিই, শিল্পী-ই শুধু- আর কিছু ছিলে না তুমি।

রুবেক
সবার আগে এক শিল্পী। আর মহৎ একটা কিছু করার জন্য প্রায় উন্মাদ হয়ে উঠেছিলাম। (স্মৃতিতে তলিয়ে যাওয়ার স্বরে) ভেবেছিলাম তৈরি করব ‘পুনরুত্থানের দিন’- যেন এক যুবতী মৃত্যুর মত দীর্ঘ এক ঘুমের পর জেগে উঠেছে।

ইরিন
আমাদের সন্তান!

রুবেক
(বলে যেতে থাকে) এ যেন পৃথিবীর মাঝে জেগে ওঠা এক পবিত্র, শুভ্র পরিপূর্ণ নারী। আর তোমার মধ্যে পেয়ে গেলাম যা চেয়েছিলাম তার সব কিছু- তুমিও তোমার ঘর আর পরিচিতদের ছেড়ে চলে এলে আমার সাথে।   

ইরিন
মনে হয়েছিল যেন আবার নতুন করে জীবন শুরু হোল। যেন আবার আমার ছেলেবেলার পুর্নজন্ম হল।

রুবেক
ঠিক এটাই আমি চেয়েছিলাম যা অন্য কারো মধ্যে পাইনি। তোমাকে আমি দেখতে শুরু করলাম কোনো অপাপবিদ্ধ পবিত্র নারীমূর্তি রূপে- যাকে শুধু পূজা করা যায়, স্পর্শ করা যায় না। আমিও তখন তরুণ- আমার বিশ্বাস জন্মে গেল যে তোমাকে যদি স্বার্থপরের মত নিজের করে নিই, তাহলে যার জন্য এত আয়োজন তার সব কিছু ব্যর্থ হয়ে যাবে।

ইরিন
(কণ্ঠে শ্লেষ) প্রথমে তাহলে তোমার সৃষ্টি, তারপর জীবনের প্রয়োজন।

রুবেক
তোমার সব রায় আমি আজ মাথা পেতে নেব। কিন্তু সৃষ্টির সেই মুহূর্তগুলো, কী আনন্দেই না ডুবেছিলাম! প্রেমে, সৃজনে!

ইরিন
তোমার সব আকাক্সক্ষার সমাপ্তি হলো।

রুবেক
(বলতে থাকে) ... ‘পুনরুত্থানের দিন’-এর মধ্যে দিয়ে আমি এক সম্পূর্ণ নারীকে দেখতে চেয়েছিলাম- কোনো নতুন, অজানা, কিংবা আমাদের পরিচিত পৃথিবী দেখে অবাক হবে এমন কেউ নয়- অথচ যার মধ্যে একটা বাঁধনছেড়া খুশির হাওয়া বইছে- যে দীর্ঘ স্বপ্নহীন ঘুমের পর নতুন মুক্তির ছন্দে নিজেকে আবিষ্কার করে। আমি ওকে তোমার প্রতিচ্ছবিতেই গড়েছিলাম ইরিন!

ইরিন
(হেলান দিয়ে বসে) সেই সাথে তোমার কাছে আমার প্রয়োজনও ফুরালো।

রুবেক
ইরিন! একথা কেমন করে তুমি বলতে পারলে?

ইরিন
অবশ্য ততদিনে তুমি নতুন আরেক আদর্শ মূর্তি খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছ।

রুবেক
তোমার পরে আর কেউ আসেনি, আর কাউকে খুঁজে পাইনি ইরিন।

ইরিন
আর কোনো মডেলই নয়?

রুবেক
তুমি তো শুধু মডেল ছিলে না- তুমি ছিলে আমার সকল সৃষ্টির প্রেরণা!

ইরিন
(কিছু সময় চুপ থেকে) তোমাকে ছেড়ে আসার পর আর কোনো কাব্য তুমি লিখেছ? মানে তোমার পাথরের কবিতার কথা বলছিলাম।

রুবেক
তারপর থেকে আর কোনো কবিতাই লেখা হয়নি। কিছু তুচ্ছ বাজে কাজ করেই সময়টা পার করে দিয়েছি।

ইরিন
তোমার স্ত্রী- তার সাথে কোথায় যেন যাবে?

রুবেক
হয়তো আবারো দীর্ঘ, ক্লান্তিকর কোনো ভ্রমণে।

ইরিন
(ঠোঁটে হালকা হাসির ছোঁয়া, ফিসফিসিয়ে বলে) উচুঁতে আরো উঁচুতে উঠে যাও আর্নল্ড, যতদূর ওঠা যায়।

রুবেক
(আগ্রহভরে জিজ্ঞাসা করে) তুমিও যাবে ওই চূড়ায়?

ইরিন
আবার দেখা করার সে সাহস তোমার আছে?

রুবেক
(নিজের সাথে যেন যুদ্ধ করে) আবার, আবার যদি পারতাম!

ইরিন
কেনো পারব না- আর্নল্ড, এসো- চলো আমার সাথে।

(মায়ার প্রবেশ। খুশিতে উচ্ছ্বল, ডগমগ করছে। না তাকিয়েই কথা বলে)

মায়া
তোমার যা ইচ্ছা তাই বলতে পার, কিন্তু (ইরিনকে দেখে থেমে যায়) ... তোমাদের দেখতেই পাইনি। পরিচয় হয়ে গেছে?

রুবেক
আমাদের আগে থেকেই পরিচয় ছিল। ... কী যেন বলছিলে?

মায়া
বলছিলাম, আমি কোনোমতেই ওই বিচ্ছিরি স্টিমারে করে কোথাও যাচ্ছি না।

রুবেক
হঠাৎ স্টিমার আবার কী করল?

মায়া
আমি পাহাড়ে উঠতে চাই- ওই যে বনটা দেখতে পাচ্ছ, ওখানে। প্লিজ যেতে দাও আমাকে- দেখো, এরপর আমি একদম লক্ষ্মী মেয়ের মতো হয়ে থাকব। তোমাকে কোনো বিরক্ত করব না।

রুবেক
এসব চিন্তা তোমার মাথায় কে ঢুকিয়েছে?

মায়া
কেন? তোমাদের ওই বুনো শিকারীটা? তুমি ভাবতেই পারবে না পাহাড়ের ওপরে জীবন নিয়ে কী জমজমাট গল্পটাই না ও বলতে পারে। ভয়ংকর আর জঘণ্যরকম বিশ্রী ওসব গল্প- কিন্তু জানো, আমি বুঝতে পারছিলাম যে, ও ঠাট্টা করছে, তবুও কেমন যেন অদ্ভুত আকর্ষণ ঐ বানিয়ে বলা কাহিনীর মধ্যে। বলো আমাকে যেতে দেবে- শুধু দেখে আসব ও যা বলছে তা সত্যি কিনা। যাই, রুবেক?

রুবেক
আমার এ ব্যপারে কোনো আপত্তি নেই। যতদিন ইচ্ছে হয় থাকতে পার; আর আমিও হয়তো সেই দিকেই যাচ্ছি।

মায়া
না,না, না, আমার জন্য শুধু শুধু তোমাকে কষ্ট করতে হবে না।

রুবেক
কিন্তু আমি তো পাহাড়ে যাব বলেই ঠিক করেছি।

মায়া
তাহলে যাই বুনো শিকারীটাকে গিয়ে বলে আসি। ধন্যবাদ!

রুবেক
তোমার যাকে ইচ্ছে বলে এসো।

মায়া
ইশ! তোমাকে যে কী বলব! আজ তুমি যে কী ভীষণ ভালো হয়ে গেছো।

(রুবেকের হাত ধরতে গেলে রুবেক চমকে হাত ছাড়িয়ে নেয়। মায়া ছুটে চলে যায়। নিঃশব্দে দরজা খুলে যায়- নান এর প্রবেশ। সবকিছুর ওপর সতর্ক দৃষ্টি তার)

রুবেক
পাহাড়ের চূড়াতেই কি তাহলে আবার আমাদের দেখা হচ্ছে?

ইরিন
হ্যাঁ, আবার দেখা হবে আমাদের- কত খুঁজে খুঁজে শেষ পর্যন্ত তোমাকে পেলাম।

রুবেক
আমাকে খুঁজেছ? কবে থেকে?

ইরিন
(কণ্ঠে তিক্ততা মিশিয়ে) যখন থেকে আমি বুঝলাম যে, তোমাকে আমি এমন কিছু দিয়ে ফেলেছি যা কখনো হাতছাড়া করতে নেই।

রুবেক
(মাথা নুয়ে) তুমি তোমার যৌবনের শ্রেষ্ঠ ক’টি বছর আমাকে দিয়েছিলে।

ইরিন
তারচেয়েও বেশি কিছু দিয়েছিলাম- বেহিসাবীর মতোই।

রুবেক
সত্যিই তুমি বেহিসাবী ছিলে ইরিন। তোমার নগ্ন সৌন্দর্য দিয়ে আমাকে ...

ইরিন
পূর্ণতা দিতে চেয়েছিলাম।

রুবেক
আর অমর করে রাখতে...

ইরিন
তোমাকে আর আমাদের সন্তানকে।

রুবেক
তোমাকেও অমর করতে ইরিন!

ইরিন
কিন্তু সবচে’ দামী যে উপহারটা দিয়েছিলাম- তার কথা ভুলে গেলে?

রুবেক
কোন উপহারের কথা বলছ?

ইরিন
আমি তোমাকে আমার তারুণ্যে-ভরা হৃদয়টিকে দান করে নিঃস্ব হয়ে গেলাম- আর তাতেই আমার মৃত্যু হল।

রুবেক
(ফিসফিস করে) ইরিন!!!


দ্বিতীয় দৃশ্য

(বিরান পাহাড়ী এলাকা, পাথরের বেঞ্চে রুবেক বসে আছে। গ্রীষ্মের সন্ধায় সূর্যাস্তর ঠিক আগে। মায়া-র মাথায় ট্যুরিস্ট ক্যাপ; হাতে ছড়ি। দূরে বাচ্চাদের হুল্লোড়, লুটোপুটি আর হাসির শব্দ)

মায়া
(রুবেক-কে দেখতে পেয়ে, হাঁপাতে হাঁপাতে) এই যে, তুমি এখানে আর আমি সবখানে খুঁজে বেড়াচ্ছি।

রুবেক
হোটেল থেকে আসছ?

মায়া
উফ্ হোটেল না আর কিছু- মাছি ভন ভন করছে!

রুবেক
দুপুরে খাবার টেবিলে দেখলাম না তো!

মায়া
না, আসলে আমরা খোলা আকাশের নিচে লাঞ্চ করেছি তো।

রুবেক
আমরা!

মায়া
আমি আর- ঐ বুনো ভালুক শিকারীটা আর কী।

রুবেক
তাই বলো।   

মায়া
কাল সকালেই অবশ্য আমরা আবার বেরিয়ে পড়ছি।

রুবেক
ভালুকের পেছনে?

মায়া
হ্যাঁ সেই বাদামী বুনো, লোমশ জন্তুটা- ওটাকে মারবো।

রুবেক
তা পায়ের ছাপ-টাপ পেয়েছো কিছু?

মায়া
পাহাড়ের চূড়ায় ভালুক থাকে না, জানো না বুঝি?

রুবেক
কোথায় পাওয়া যায় তাহলে?

মায়া
অনেক নিচুতে, যেখানে সবচে ঘন ঝোপগুলো- যেখানে তোমার ঐ শহরের মানুষগুলো ঢুকতেই পারবে না।

রুবেক
তাহলে দু জনেই যাচ্ছ কাল?

মায়া
হ্যাঁ তাই তো ঠিক হলো। আজ সন্ধ্যাতেও যেতে পারি অবশ্য তাতে যদি তোমার কোনো আপত্তি না থাকে।

রুবেক
না না- আপত্তির তো কোনো কারণ দেখছি না।

মায়া
(তাড়াড়াড়ি যোগ করে) অবশ্য ওর চাকর আর কুকুরগুলোও যাচ্ছে আমাদের সাথে।

রুবেক
ঐ ভদ্রলোক আর তার কুকুরগুলোকে নিয়ে আমার মোটেও মাথা ব্যথা নেই। (প্রসঙ্গ পরির্বতন করে) আমার পাশে এসে বসবে?

মায়া
এই নরম ঘাসের উপরেই বরং ভালো লাগছে। (তন্দ্রাচ্ছন্ন) কী যে ভালো লাগছে! (হঠাৎ অধৈর্য) আচ্ছা তুমি কীভাবে এখানে বসে আছো? চারদিকে শুধু বাচ্চাদের চীৎকার আর চেঁচামেচি।

রুবেক
ওদের লাফালাফি হইচই- এর মাঝে কেমন যেন একটা ছন্দ, একটা ঐক্যতান খুঁজে পাই। সত্যি বলতে কী এই মুহূর্তগুলো আমাকে মুগ্ধ করে দেয় ।

মায়া
(একটু ঠাট্টা করেই যেন) তুমি সব সময়ই একজন শিল্পী।

রুবেক
এভাবেই থাকতে চাই আমি।

মায়া
(হঠাৎ ঘুরে) কিন্তু জানো, ওর মধ্যে কোনো শিল্পীসুলভ কল্পনা, সৃজনশক্তি- এগুলো একদম নেই!

রুবেক
তোমার বুনো শিকারীর কথা বলছো?

মায়া
আর এত বিচ্ছিরি! এত বন্য! ইশ!

রুবেক
সেজন্যই বুঝি ওই বুনোটার সাথে শিকারে যাবার জন্য এত উতলা হয়ে উঠেছো?

মায়া
জানি না। তুমিও তে বিশ্রী, কিম্ভূত, তাই না রুবেক?

রুবেক
সেটা কি এইমাত্র আবিষ্কার করলে নাকি?

মায়া
না অনেক দিন ধরেই লক্ষ্য করছি।

রুবেক
মায়া আমরা কেউই কিন্তু ধীরে ধীরে তরুণ, তরুণতর হই না- আমরা বুড়িয়েই যাই।

মায়া
আমি তোমার বুড়ো হয়ে যাওযার কথা বলিনি তো! বরং দেখছি আজকাল ক্লান্ত আর ঝিমিয়ে পড়া ভাব তোমার মধ্যে- তোমার চোখেমুখে একটা অশুভের ছায়া, যেন আমার বিরুদ্ধে একটা ফন্দি আটছো সবসময়।

রুবেক
হাঃ হাঃ সত্যি বলেছো- এসো পাশে বসো।

মায়া
বসবো? (কোলের উপর বসার উপক্রম) এভাবে?

রুবেক
(একটু সরে গিয়ে) এখানে বস।

মায়া
না, থাক, এখানেই ভালো লাগছে। কী যেন একটা বলছিলে তুমি।

রুবেক
আমরা ঠিক কেন বেড়ানোর জন্য এ জায়গাটা বেছে নিয়েছিলাম তোমার মনে আছে?

মায়া
তখন বলেছিলে আমার খুবই ভালো লাগবে এ জায়গাটা। যদিও এখন আর কথাটা বিশ্বাস হয় না।

রুবেক
তাহলে তুমিই বল কেনো এসেছি আমরা এখানে?

মায়া
হতে পারে সেই ফ্যাকাশে চেহারার মহিলার জন্যই- সব সময়ই তো আমাদের পেছন পেছন ঘুরছে। গতকাল সন্ধ্যায়ও এখানে তাকে দেখেছি বলে মনে হয়।

রুবেক
কার কথা বলছো?

মায়া
কেনো, তুমি তো তাকে চেন। আমার সাথে পরিচয়ের আগে থেকেই।

রুবেক
তাকে ভুলেও গিয়েছিলাম আর সেটাও তোমার সাথে পরিচয়ের আগেই।

মায়া
(উঠে বসে) তুমি সব কিছুই তাড়াতাড়ি ভুলে যাও, তাই না রুবেক?

রুবেক
খুব তাড়াতাড়ি- যখন সেটা আমার প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায়।

মায়া
এমকি তাকেও- যে কিনা এক সময় তোমার মডেল হয়েছে, সব ঐশ্বর্য উন্মোচন করে দাঁড়িয়েছে তোমার সামনে।

রুবেক
এই উন্মোচনে- আমরা যারা শিল্পসৌধ নির্মাণ করি- তাদের কিছুই যায় আসে না। (স্বর পরিবর্তন করে) তাছাড়া আমি কি করে জানবো যে সে এখানেই আছে?

মায়া
(যেন খুব ক্লান্ত এমন ভাব করে) কী জানি তাহলে হয়তো অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে- এই ভ্রমণের জন্য কোনো উদ্দেশ্য।

রুবেক
হ্যাঁ মায়া, সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্য। সেটা নিয়ে আগে হোক বা পরেই হোক একটা বোঝাপড়ায় আমাদের আসতেই হবে।

মায়া
(হাসি চেপে) কী সর্বনাশ! কেমন সিরিয়াস আর গোমড়ামুখো দেখাচ্ছে তোমাকে।

রুবেক
হ্যাঁ, যতটুকু সিরিয়াস হওয়া দরকার তার চেয়ে কিছুটা বেশিই। হয়তো সেটা আমাদের দু’জনের ভালোর জন্যই। একটু চিন্তায় পড়লে নাকি?

মায়া
মোটেই না তবে কৌতূহল হচ্ছে।

রুবেক
মনে পড়ছে তোমার, কিছুদিন ধরেই তুমি বলছিলে যে- আমি ধীরে ধীরে কেমন জরাগ্রস্থ আর নিস্তেজ হয়ে পড়ছি? কেনো এটা ঘটছে বলতে পারো?

মায়া
কী জানি কেনো হতে পারে আমাদের এই দীর্ঘ একঘেয়ে সম্পর্ক তোমার আর ভালো লাগছে না।

রুবেক
‘দীর্ঘ একঘেয়ে’ কেনো? কেনো বলছো না ‘চিরস্থায়ী, অন্তহীন, ধ্রুব, নৈমিত্তিক কালহীন’ এক সম্পর্কের কথা?

মায়া
গার্হস্থ্য পুনরাবৃত্তির কথা বলছ? হ্যাঁ, তাইতো আমরা এ ক’টি বছর কাটিয়েছি শুধু নিজেদের সান্নিধ্যে- শুধু আমরা দু’জন- তুমি আর আমি।

রুবেক
হ্যাঁ বলো তারপর?

মায়া
(একটু ভীত, দ্বিধাগ্রস্থ) মানুষের সান্নিধ্য তুমি কখনোই পছন্দ করতে না রুবেক। তুমি সব সময় নিজের ভাবনার ভেতর ডুবে থাকতেই পছন্দ করতে। আর আমার কথা যদি বলো- শিল্প, কল্পনা, এগুলো নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যাথা, কেনো কৌতূহল কখনো ছিল না, এখনো নেই।

রুবেক
অথচ দেখো কত সন্ধ্যা, কত বিকেল আমরা তোমার পছন্দের বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলেছি।

মায়া
কথা বলার মতো কোনো বিষয় আমার কখনো কি ছিল?

রুবেক
হয়তো সেসব তুচ্ছ বিষয় নিয়েই আমরা কথা বলে সময় কাটিয়েছি। সময় কোনো না কোনোভাবে কেটেই যায়, মায়া।

মায়া
হ্যাঁ, সময় কেটে যায় আর তুমি তার নাগাল পাচ্ছো না, তাই হয়তো তোমার এই অস্থিরতা, এই খেয়ালীপনা।

রুবেক
এই খেয়ালীপনা, এই অস্থিরতা- এই জীবন দুঃসহ আজ আমার কাছে।

মায়া
তুমি কি আমার কাছে থেকে রেহাই চাইছো? তাহলে বলেই ফেল সেটা।

রুবেক
রেহাই চাইছি! কী বলছ এসব?

মায়া
হ্যাঁ, যদি আমাদের মধ্যকার সম্পর্ক শেষ করতে চাও, তবে সোজাসুজি বললেই পার- আমি চলে যেতে রাজি আছি।

রুবেক
আমাকে ভয় দেখাচ্ছো মায়া?

মায়া
আমার কথার মধ্যে ভয় দেখানোর কিছু নেইতো।

রুবেক
(উঠে দাঁড়ায়) হয়তো ঠিকই বলছো। (একটু বিরতি) এভাবে আমাদের পক্ষে আর চালিয়ে নেয়া সম্ভব না।

মায়া
আমাকে নিয়ে কী করতে চাও বলে ফেল।

রুবেক
(দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে) একটা তীব্র আকাঙ্ক্ষা আমাকে সব সময় যন্ত্রণাবিদ্ধ করে রাখে- আমার এমন কাউকে দরকার, যে খুব কাছের।

মায়া
(তড়িঘড়ি বাধা দিয়ে) আমি কি তেমন কেউ নই, রুবেক?

রুবেক
(হাত নেড়ে অস্থির ভঙ্গিতে) ঠিক সেভাবে নয়। আমার দরকার এমন কাউকে যে আমাকে পরিপূর্ণ করে তুলবে; যা কিছু আমার মধ্যে নেই, তা পূরণ করে দেবে- যা কিছুর জন্য আমার এই লড়াই, সেই লড়াইয়ে আমার সারথি হবে।

মায়া
হ্যাঁ ... (ধীরে ধীরে) এসব বড় বড় কাজে আমি তোমার কোনো কাজেই আসব না। (রুবেককে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে) দেখে মনে হচ্ছে তুমি নিশ্চয়ই অন্য কারো কথা ভাবছো।

রুবেক
তোমার দৃষ্টি এত নির্ভুল- তাহলে তুমিই বলে দাও কার কথা ভাবছি।

মায়া
তুমি তোমার সেই মডেলের কথা ভাবছ। (হঠাৎ প্রসঙ্গ বদলে ফেলে) জানো এখানে সবাই না ওকে উন্মাদ ভাবে।

রুবেক
আর তোমার ও তোমার বুনো শিকারী সর্ম্পকে লোকজন কী ভাবে?

মায়া
এ দু’টো সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার। (পুরনো কথায় ফিরে গিয়ে) তাহলে বলো, তুমি ঐ মহিলার কথাই ভাবছিলে তাই না?

রুবেক
হ্যাঁ তাই। যখন আমার কাছে ওর প্রয়োজন ফুরালো, ও যেন হঠাৎ উধাও হয়ে গেল, একটা শূন্যস্থান তৈরি করে দিয়ে।

মায়া
তুমি আমাকে দিয়ে সে শূন্য আবার ভরে তুলতে চেয়েছিলে।

রুবেক
হ্যাঁ, চেয়েছিলাম, সেই শূন্যতার মধ্যে আমি কয়েকটা মাস কাটালাম- নিসঙ্গ একাকী, নির্জনবাস শুরু হলো আমার। আর সেই নির্জনতায় জন্ম নিল ‘পুনরুত্থানের দিন’। এর প্রদর্শনী চলল সারা পৃথিবীতে, আমি যা কিছু চেয়েছিলাম- যশ, গৌরব- সবই পেলাম। কিন্তু নিজের সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা হারিয়ে ফেলেছিলাম ততদিনে। জনতার প্রশংসাবাক্য আর স্তুতি বিষাক্ত মনে হতে শুরু করলো এক সময়- আর আমি আশ্রয় নিলাম হতাশা আর নির্বাসনের অন্ধকারে। (মায়ার দিকে ঘুরে তাকিয়ে) তুমি তো আমার মনের সব কথাই জানো- বলতে পার, তখন আমি নতুন কোন ভাবনা শুরু করি?

মায়া
(হালকা স্বরে) ঠিক তখুনি তুমি ঠিক করলে মানুষের আবক্ষ মূর্তি তৈরি করবে।

রুবেক
হ্যাঁ ফরমায়েশী সব কাজ। মানুষের মুখের পেছনে থাকবে পশুদের মুখ- ওগুলো আমার পক্ষ থেকে একরকম উপহার ছিল বলতে পার। কিন্তু জানো, আমি আসলে সেটা চাইনি ।

মায়া
কী চেয়েছিলে তাহলে?

রুবেক
(সিরিয়াস ভঙ্গীতে) আমি চেয়েছিলাম... আসলে শিল্পীর কাজ, তার উদ্দেশ্য এইসব বুলি আমার কাছে শূন্যগর্ভ এমনকি অর্থহীন মনে হতে লাগলো।

মায়া
এর পরিবর্তে কী চেয়েছিলে- তুমি?

রুবেক
জীবন, জীবনকে চেয়েছিলাম- মায়া।

মায়া
জীবন?

রুবেক
ভেবে দেখো- এই যে আলোক সৌন্দর্যময় একটা জীবন, সেটা কি শতগুনে ভালো নয়- তোমার ঐ বদ্ধ, স্যাঁতস্যাঁতে গুমোট গুহার ভেতর অনন্তকাল মাটি পাথরের ঢেলার সাথে যুদ্ধ করে নিজেকে নিঃশেষ করে ফেলার চেয়ে?

মায়া
সত্যি, আমিও তাই ভেবে এসেছি।

রুবেক
ঐশ্বর্য আর আলস্যে জীবনটা পার করে দেয়ার মত যথেষ্ট উপার্জনও আমি করলাম। রাজধানীতে উঁচু দালান আর এখানে অবকাশ যাপন করার মত ভিলা- সবই হোল।

মায়া
পাশাপাশি, আমাকে উপভোগ করবার সামর্থ্যও তোমার হোল- বিনিময়ে তুমি অবশ্য আমাকে তোমার সম্পদ ভোগের অধিকার দিয়েছ- তাই না?

রুবেক
(কথা ঘুরানোর জন্য) তোমাকে আমি উঁচু এক পাহাড়ের চূড়ায় নিয়ে পৃথিবীর সব ঐশ্বর্য, সব সৌন্দর্য দেখাব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম।

মায়া
আমায় চূড়ায় এনেছ ঠিকই- কিন্তু কোথায় তোমার প্রতিশ্রুতির সেই সৌন্দর্য আর সেই ঐশ্বর্য?

রুবেক
(তিক্ত হাসি হেসে) তোমাকে খুশি করা এক অসম্ভব ব্যপার ‘মায়া’; (হঠাৎই আবেগে ফেটে পড়ে) কিন্তু কোন বিষয়টা আমাকে চূড়ান্ত নৈরাশ্যের অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে- কল্পনা করতে পার?

মায়া
(নির্বিকার, বেপরোয়া ভঙ্গীতে) এই সামান্য সত্যটি যে, তুমি চিরদিনের জন্য তোমাকে আমার সাথে বেঁধে ফেলেছ।  

রুবেক
মায়া তুমি কি জানো একজন শিল্পীর করোটিতে কত ঘাত প্রতিঘাত ঘটে যায়? একটা প্রচণ্ড গতির মধ্যে আমি, আমরা- শিল্পীরা বেঁচে থাকি। গত ক’বছরে আমার মনে হয়েছে আমি যেন কয়েকটি জীবন কাটিয়েছি তোমার সান্নিধ্যে। আমি জেনেছি- অলস, স্বচ্ছন্দ জীবনের মধ্যে আনন্দ খুঁজে পাওয়া আমার নিয়তিতে নেই। আমার এই যেন নিয়তি- আমাকে কাজ করে যেতে হবে সৃষ্টিশীল থাকতে হবে একেবারে মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত। আর শুধু সে কারণেই মায়া- তোমার সাথে আর পথচলা সম্ভব নয়।  

মায়া
সোজা কথায়, তুমি আমার ব্যপারে ক্লান্ত হয়ে পড়েছ।

রুবেক
তাই হবে- ক্লান্তি এসে ভর করেছে আমার সমগ্র সত্তায়- তোমার সাথে এই জীবন হয়ে গেছে যেন একঘেঁয়ে পুনরাবৃত্তি- জানি আমার এই বাক্য কর্কশ আর নির্দয় ঠেকবে তোমার কাছে। এতে অবশ্য তোমার কোনো দোষ নেই। এখানে যদি কারো রূপান্তর- কোনো পুনজর্ন্ম ঘটে থাকে তা কেবল আমার মধ্যেই হয়েছে- (স্বগত) এ যেন নতুন করে সত্যিকার জীবন ফিরে পাওয়া। আচ্ছা, একটা গোপন সত্য জানাব তোমাকে?

মায়া
বলো।

রুবেক
এখানে (নিজের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে), কোনো এক গহীন নির্জনতায় একটা ছোট্ট যাদুর বাক্স আছে- তালা লাগানো; যেটা কেউ খুলতে পারবে না। এর মধ্যে বন্দী আমার সমস্ত কল্পনা, আমার সব ভাস্কর-মূর্তি। একদিন সে যখন আমার জীবন থেকে মিলিয়ে গেল, ঐ বাক্সের তালাটিও বন্ধ হয়ে গেল। চাবিটা ওর কাছেই ছিল, আর চাবিটা নিয়েই চলে গেল সে। তোমার কাছে সেই চাবিটা নেই- তাই বন্দি যাদুর বাক্সের সব রহস্য- অলস পড়ে থাকে, সেই রত্নকুম্ভ- ওতে আমার স্পর্শেরও অনুমতি নেই!

মায়া
তাকে আবার ফিরিয়ে আনছো না কেনো? এই তো এখানেই তো আছে সে। আমার তো মনে হয় তোমার ঐ বাক্সের খোঁজেই সে আমাদের পেছন পেছন ঘুরছে।

রুবেক
কিন্তু ওর সাথে এসব নিয়ে একটি কথাও হয়নি।

মায়া
আচ্ছা রুবেক, এসব সামান্য বিষয় নিয়ে অকারণ হৈচৈ করে কী লাভ বলো তো?

রুবেক
সামান্য?

মায়া
আমি তো তাই মনে করি। দেখো, যাকে তোমার এত প্রয়োজন, তার সাথে তুমি থেকে যাও। যদি চাও আমরা তিনজনই শহরের নতুন বাড়িটাতে উঠে যেতে পারি।

রুবেক
এত কিছুর পরও যদি এতে কোনো কাজ না হয়?

মায়া
(যেন খুশিই হয়) তাহলে তো কথাই নেই- আমরা দু’জনে দু’জনের মতো চলব। নতুন কোনো জায়গা খুঁজে নেব- যেখানে আমি মুক্ত, বন্ধনহীন। ওসব নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। রুবেক, ঐ যে দেখো ... এ পথেই আসছে; যেন- এক প্রস্তর মূর্তি।

রুবেক
(চোখের উপর দু’হাত রেখে) এই তো সেই ‘পুনরুত্থানের দিন’- যেন প্রাণ ফিরে পাওয়া এক পাথুরে ভাস্কর্য। (স্বগতোক্তি) অথচ আমি ওকে ছায়ায় মিলিয়ে যেতে দিয়েছিলাম। এই ভুলের কোনো প্রায়শ্চিত্ব নেই। (হাত সরিয়ে নিয়ে) দেখো ইরিন ধীরে ধীরে এগুচ্ছে আর বাচ্চারা দৌড়ে গিয়ে তাকে ছুঁয়ে দিচ্ছে। বাচ্চারা অবাক হয়ে দেখছে ওকে। হাসছে সবাই, কেউবা লাজুক মুখে অপেক্ষা করছে। ইরিন কত সহজে মিশে গেছে শিশুদের মাঝে। এই তো ওর কথা শুনে বাচ্চারা বাঁয়ে ঢালু পথটা বেয়ে চলে গেল। ও বোধহয় শান্ত জলের পাশে একটু বিশ্রাম নিতে চায়- দেখো কেমন জলে হাত ডুবিয়ে বসে আছে।

মায়া
(শান্ত ঠাণ্ডা গলায়) তুমি ওর সাথে গিয়ে কথা বল রুবেক।

রুবেক
তুমি কোথায় যাবে?

মায়া
এখন থেকে আমার চলার পথ আমিই খুঁজে নেব। (মায়া নদীর জলের ধারে বসে থাকা ইরিন এর পাশে গিয়ে দাঁড়ায়) অধ্যাপক রুবেক আপনার জন্য ঐ পাশে অপেক্ষা করছেন।

ইরিন
তার কী দরকার আমাকে?

মায়া
একটা বন্ধ, মরচে-পড়া বাক্স খুলতে আপনার সাহায্য প্রয়োজন।

ইরিন
আমি?

মায়া
(চলে যেতে যেতে) হ্যাঁ, উনি বলছেন যে কাজটা কেবল আপনিই পারবেন।

(রুবেক নিচে নামছে। মাঝে নদীটিকে রেখে দু’জন দাঁড়িয়ে)

ইরিন
উনি জানালেন, তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করছো।

রুবেক
তোমার জন্য আমি অনেক বছর ধরে অপেক্ষায় আছি। বলতে পার নিজের অজান্তেই।

ইরিন
আমিও এক দীর্ঘ, স্বপ্নমাখা ঘুমের দেশে শুয়ে আছি।

রুবেক
কিন্তু তুমিতো জেগে উঠেছো।

ইরিন
আমার দু’চোখে এখনও ভারি তন্দ্রা।

রুবেক
আবার আমাদের আকাশ ভোরের সূর্যের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।

ইরিন
বিশ্বাস করি না।

রুবেক
(দ্রুত মাথা ঝাঁকিয়ে ) আমি বিশ্বাস করি। এই তো আশ্চর্য যে তোমাকে খুঁজে পেয়েছি ।

ইরিন
খুঁজে পেয়েছো মৃত নগরী থেকে ফিরে আসা এক...

রুবেক
এক রূপান্তরিত...

ইরিন
না কেবল মৃতদের মধ্য থেকে জেগে ওঠা...

(রুবেক লাফ দিয়ে ছোট বাধাটাকে অতিক্রম করে ইরিনের পাশে এসে দাঁড়ায়)

রুবেক
সারাদিন কোথায় ছিলে?

ইরিন
ঐ যে- অনেক দূরে, মৃত্যুর পোড়ো জমিতে।

রুবেক
(কথা ঘোরানোর চেষ্টা) তোমার সঙ্গী আজ নেই দেখছি তোমার সাথে।

ইরিন
আমার বন্ধুটি (হেসে) সবসময়ই আমার উপর নজরদারি করছে।

রুবেক
কীভাবে তা সম্ভব?

ইরিন
(চারপাশে তাকায়) ওর পক্ষে সেটা সম্ভব। আমি যেখানেই যাই না কেনো- আমি সবসময়ই তার দৃষ্টির সীমায়। আমাকে সে কখনও আড়াল হতে দেবে না- যতদিন না তাকে আমি হত্যা করছি।

রুবেক
খুন করবে নাকি?

ইরিন
(রহস্যময়ী ভঙ্গিতে) আনন্দের সাথে- শুধু যদি পারতাম!

রুবেক
কেন?

ইরিন
কারণ ও একটা পিশাচীনি। জানো আর্নল্ড, ও এখন আমার ছায়া হয়ে ঘুরে বেড়ায়।

রুবেক
ওহ, তাই বলো। (সান্ত্বনা দেয়ার মত বলে) আমরা সবাই শেষ পর্যন্ত আমাদেরই ছায়ার সঙ্গী।

ইরিন
কিন্তু আমি যে নিজেই নিজের ছায়া হয়ে পড়েছি। তুমি বুঝতে পারছো সেটা?

রুবেক
পারছি ইরিন, বুঝতে পারছি।

(রুবেক একটু সরে গিয়ে পাথরের উপর গিয়ে বসে)

ইরিন
তুমি ওভাবে আমাকে আড়াল করে বসে আছ কেন?

রুবেক
তোমার একটা ছায়া আমাকে দগ্ধ আর নিঃস্ব করে দেয়। একটা দম বন্ধ করা দুঃসহ অপরাধবোধ আমাকে...

ইরিন
(আনন্দের আতিশয্যে চীৎকার করে) আহ! শেষ পর্যন্ত!

রুবেক
ধীরে, ধীরে, ধীরে। (গভীর শ্বাস নেয়। যেন একটা বোঝা নেমে গেছে) এখন আমি মুক্ত। এসো, আমরা আবার সেই পুরনো দিনের মতো করে কথা বলি- সেই সব দিন, যখন হয়ত সত্যিই বেঁচেছিলাম।

ইরিন
সত্যিই যদি ফিরে পেতাম সেই সব দিন। (ইরিন উঠে এসে রুবেক-এর পাশে বসে) বহু দূরের দেশ থেকে আমি আবার তোমার কাছেই ফিরে এসেছি।

রুবেক
যেন অন্তহীন এক যাত্রার শেষে।

ইরিন
প্রভু আমার, প্রিয়তম সখা! ফিরে এসেছি।

রুবেক
কিন্তু আসলে তুমি যখন আমাকে ছেড়ে চলে গেলে, সেটা অন্য কারো জন্য চলে যাওনি- বলতে চাও?

ইরিন
যখন আমি আমার সব ঐশ্বর্য দিয়ে মন-প্রাণ দিয়ে তোমার পূজা করলাম- যখন পাষাণে প্রাণ পেল- জন্ম নিল আমাদের সন্তান- হ্যাঁ ‘সন্তান’ই তো বলতে তুমি, ঠিক তখুনি আমি আমার শ্রেষ্ঠ অর্ঘ্যটি রাখলাম আমার দেবতার পায়ের কাছে- নিজেকে মুছে ফেললাম, আমার আমিকে লয় করে আমার তপস্যার শেষ হলো।

রুবেক
(মাথা নুইয়ে ফেলে) আর আমার জীবনটাকে মরুভূমির মত নিঃস্ব করে দিলে।

ইরিন
ঠিক তাই চেয়েছিলাম আমি। আমি চাইনি যে তুমি আবার সেই সৃষ্টির খেলায় মত্ত হয়ে ওঠো। না ঈর্ষা নয়, ঘৃণা- ঘৃণা করেছি তোমার ঐ শিল্পী সত্তাকে, যে কেড়ে নিয়েছিলো আমার তারুণ্য, আমার হৃদয়ের উষ্ণতা, আমার প্রাণ- প্রেমও হয়তোবা! আর ফিকে হয়ে আসা সেই জীবনের বদলে জন্ম নিলো তোমার পাষাণ প্রতিমা! তোমার শিল্পসৌধ!

রুবেক
তুমি বলছ একথা? তুমি, যে কি না আমার এই শিল্প সৃষ্টির আয়োজনে দেবদূতের মত উচ্ছ্বলতা আর প্রাণ-প্রাচুর্য নিয়ে মেতে উঠেছিলে? যাকে আমরা দু’জনে প্রতিদিনের উন্মত্ত উপাসনার মধ্যে খুঁজেছি?

ইরিন
(ঠাণ্ডা অবিচলিত কণ্ঠে) তোমাকে একটা কথা বলতেই চাই আর্নল্ড!

রুবেক
আমি শুনছি।

ইরিন
তোমার সৃষ্টিকে আমি কখনোই ভালোবাসতে পারিনি।

রুবেক
কিন্তু শিল্পী- তাকেও না?

ইরিন
সবচে ঘৃণা করেছি তোমার ভেতরের সেই শিল্পীকে। যেদিন আমি নিজেকে উন্মোচন করে দিয়েছিলাম তোমার সামনে- সেদিনও তোমায় ঘৃণাই করেছিলাম।

রুবেক
না, হতে পারে না- আমি বিশ্বাস করি না।

ইরিন
ঘৃণা করেছি- কারণ এই নগ্ন উন্মোচন তোমার মধ্যে কোনো চপলতা, কোনো শিহরণ জাগাতে পারেনি কখনো।

রুবেক
(একুট হেসে) তুমি তাই ভাবতে বুঝি?

ইরিন
একটা কঠোর সংযম, কারাগারে বন্দি জীবনের মতই। (হঠাৎ কণ্ঠে উষ্ণ আবেগ) কিন্তু ভালোবেসেছিলাম ওই ভেজা কাদামাটির মূর্তিটাকে- সে যেন ধীরে ধীরে জেগে উঠছিল কাদামাটির ভেতর হতে। এ যেন এক পরিপূর্ণ মানুষ- আমাদের সন্তান- তোমার, আমারও।

রুবেক
কল্পনা আর বাস্তবে- আমাদের সন্তানই হয়ে দাঁড়িয়েছিল সেই ভাস্কর্য।         

ইরিন
আমার এই দীর্ঘ যাত্রা- তীর্থযাত্রাও বলতে পারো- সেটাও আমাদের এই সন্তানের জন্যই।

রুবেক
তুমি কি দেখতে চাও তাকে? অখণ্ড পূর্ণতায়- মার্বেলের কঠিন ছন্দে যা ধরা পড়েছে? হয়তো জানো না, ওকে রাখা আছে পৃথিবীর সুদূর প্রান্তে এক নামী মিউজিয়ামে।

ইরিন
সেরকমই কিছু একটা শুনেছি বোধহয়।

রুবেক
অথচ দেখো মিউজিয়ামকে এক সময় তুমি মৃত্যু-গুহা বলেই ডাকতে।

ইরিন
একদিন আমি এমনি এক তীর্থযাত্রার শেষে আমার সন্তানের সাথে একই সমাধিতে মিলিত হব।

রুবেক
(ভয় পেয়ে) না, তুমি আর কখনো ঐ মূর্তিটাকে দেখতে চাইবে না- কখনো না, বুঝতে পারছো ইরিন, Never!

ইরিন
ভাবছো, আমার বুঝি দ্বিতীয় মৃত্যু হবে?

রুবেক
জানি না কী ভাবছি কিন্তু আমি কীভাবে জানব সেই ভাস্কর্যের সাথে তুমি নিজেকে এভাবে এক করে ফেলবে? কাজটা শেষ করার আগেই তো তুমি চলে গিয়েছিলে তাই না?

ইরিন
তোমার কাজ শেষ হয়ে গিয়েছিল। তাই এমনি তোমাকে একলা ফেলে চলে যেতে পেরেছিলাম।

রুবেক
(বসে পড়ে- গালে হাত রেখে হাঁটুতে ভর দিয়ে) পরে যেটা হোল, তুমি যা দেখে গিয়েছিলে তা নয়- না, সেটা ছিল আসলে অন্য কিছু- নতুন এক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে...

ইরিন
(নিঃশব্দে ছুরি বের করে- কর্কশ স্বরে) তুমি কি আমাদের সন্তানের কোনো ক্ষতি করেছ?

রুবেক
জানি না, একে তুমি ক্ষতি বলবে কি না...

ইরিন
বলো, বলো কী করেছো আমাদের সন্তানের।

রুবেক
সব বলবো তোমাকে। বসো এখানে, শুধু তাকাবে না এদিকে- বলো?

ইরিন
বসছি এই যে, (পাথরের ওপর বসে পড়ে) ঠিক আছে- বলো।

রুবেক
(স্থির দৃষ্টিতে সামনে তাকায়) যখন তোমাকে প্রথম পেলাম আমি তখুনি বুঝেছিলাম কীভাবে তোমাকে দিয়ে আমার সারা জীবনের স্বপ্ন পূরণ করব।

ইরিন
তুমি তোমার স্বপ্নের নাম দিয়েছিলে ‘পুনরুত্থানের দিন’, আর আমি বলতাম আমাদের সন্তান।

রুবেক
আমি তখনো তরুণ, জীবনের কোনো অভিজ্ঞতাই তখনো সম্পূর্ণ হয়নি। আমি ভেবেছিলাম ‘পুনরুত্থানের দিন’ হবে আশ্চর্য সৌন্দর্যময়, এমন এক কৌমার্য আর কোমলতায় ভরা, যাকে আমাদের মৃত্তিকার কোনো মালিন্য স্পর্শ করেনি। যার ভেতর থেকে কোনো কদর্য কিংবা অশুচি আলাদা করার প্রয়োজন নেই।

ইরিন
এখন যেভাবে দাঁড়িয়ে, ঠিক সেভাবেই আমি সেখানে জেগে উঠেছি?

রুবেক
না- ঠিক তেমনি নয়, ইরিন।

ইরিন
(অস্থিরভাবে) আমি যেভাবে দাঁড়িয়েছি- সে ভঙ্গিমায় ভাস্কর্যটি তৈরি হয়নি বলছো?

রুবেক
তুমি চলে যাওয়ার পর জগৎ সংসার নিয়ে আমার জানার পরিধি আরো বাড়লো। আমার মনে হতে লাগলো যে ‘পুনরুত্থানের দিন’ যেন এক জটিল কুহেলিকা, যে বেদীর উপর ভাস্কর্যটি কল্পনা করেছিলাম, সেটিকে আর যথেষ্ট মনে হলো না। ঐ বেদীতে ধরে রাখতে চাইলাম চারপাশের পৃথিবীকে। আর তাই এর উপর রাখলাম এক টুকরো বিস্ফোরন্মুখ মৃত্তিকা। সেই বিদীর্ণ মৃত্তিকার কুণ্ডলী থেকে বের হল সারি সারি মানুষের মুখ- প্রতিটি মুখই যেন আবার পশুর মুখোশে অলংকৃত! মূখোশের রঙ্গালয়ে এ সব পশুকেই আমি চিনেছিলাম- আমার পরিচিত পৃথিবীরই মানুষ ওরা।

ইরিন
কিন্তু এই সব বিভৎসতা আর কোলাহল ছাপিয়ে মেয়েটি দাঁড়াল তার সমস্ত আলোচ্ছ্বটা নিয়ে। (ব্যাকুল হয়ে) আমিও কি সেভাবে দাঁড়াইনি?

রুবেক
ঠিক সবকিছু ছাপিয়ে এসে দাঁড়াল- একথা বলব না- আসলে ঐ নারীমূর্তিকে কিছুটা পেছনে সরাতে হয়েছিল। তা না হলে ঐ নারীমূর্তি কেমন খাপছাড়া মনে হচ্ছিল।

ইরিন
কিন্তু আমাকে তো এখনো সেই আগের মতোই আলোকজ্জ্বল মনে হয়- তাই না? বলো?

রুবেক
হয়তো। তবে আমার বদলে যাওয়া জীবনের সাথে মিল রেখে হয়তো কিছুটা আলোর ঘাটতিও রয়েছে।

ইরিন
(একটু রূঢ়) এই নতুন পরিকল্পনায় ভাস্কর্যটা, তোমার নতুনভাবে দেখা জীবনকে- প্রকাশ করতে পেরেছে?

রুবেক
আমিতো তাই মনে করি।

ইরিন
আর এই নতুন পরিকল্পনায় আমি এখন কেবল এক পটভূমিকা, একটা পশ্চাদপট- এর বেশি কিছু নই!  

রুবেক
না ঠিক তা নয়। বলতে পারো মূর্তিটা কতকটা মিডল-গ্রাউন্ড ফিগার বা তার কাছাকাছি কিছু একটা...

ইরিন
নিজের সর্বনাশের কথাটা তাহলে নিজেই উচ্চারণ করলে?

(ছুরি দিয়ে আঘাতে উদ্যত)

রুবেক
সর্বনাশ! দেখো এখানে ঝরণার এক পাশে বসে আছে একটি মানুষ- নতমুখ- কারণ এই কর্দমাক্ত পৃথিবীর মানুষ সেও। আমি এরও একটা নাম দিয়েছি- ‘হারিয়ে ফেলা জীবনের জন্য অনুশোচনা’। নদীর জলে সব গ্লানি ধুয়ে ফেলবে বলে যে জলে আঙ্গুল ডুবিয়ে বসে আছে- অথচ যে ভালো করেই জানে All the perfumes of Arabia shall not sweeten this little hands- অনন্তকালের অনুশোচনাতেও এই কারাগার থেকে তার মুক্তি নেই।

ইরিন
বাহ! কী অসাধারণ কবিত্ব! আমার জীবনের সব বর্ণময় সুরকে তুমি হত্যা করেছ অনেক আগেই। অথচ এখন তোমার আশ্রয় অনুশোচনা, বিলাপ আর প্রায়শ্চিত্তে। ভাবছো, এতেই সব দেনা চুকে গেল?

রুবেক
আমার দুর্বলতা আছে- মানছি। কিন্তু আমি তো এজন্য লজ্জিত নই! সৃষ্টির জন্যই আমার জন্ম- শিল্পী হওয়া ছাড়া অন্য কিছু করা আমার জন্য সম্ভব ছিল না, ইরিন।

ইরিন
তুমি শেষ পর্যন্ত কবিই! কেননা ঐ একটি শব্দে কেমন করে যেন সব অপরাধ ক্ষমা পেয়ে যায়- সব দুর্বলতার কালো মেঘ এক আকাশী চাদরে ঢাকা পড়ে। কিন্তু আমিতো মানুষ ছিলাম- রক্তে, মাংসে প্রেমে, তৃষ্ণায়! অথচ দেখো সব হাত ফসকে মিলিয়ে গেল- আমি হলাম তোমার দেবদাসী। এই আত্মহত্যা, এই পাপের কোনো প্রায়শ্চিত্ত নেই। (সামলে নেয়) আমার প্রয়োজন ছিল রক্তমাংসের শিশু, সত্যিকারের শিশুর জন্ম দেয়া- ঐ অন্ধকারে পড়ে থাকা ঠাণ্ডা পাথরের সন্তান জন্ম দেয়া আমার উচিত হয়নি। তোমাকে পূজা করা আমার ভুল হয়েছিল, কবি!

রুবেক
(আত্মনিমগ্ন স্বরে) কী আসাধারণ উজ্জ্বল দিনগুলো ছিল তখন, যখন পেছনে ফিরে তাকাই...

ইরিন
সত্যি? মনে পড়ে? তুমি আলতো উষ্ণতায় আমার দুটি হাত ধরলে- আমি স্তব্ধ নিঃশ্বাসে অপেক্ষা করছি কিছু ঘটবে; অথচ আচমকা বলে উঠলে- ‘তোমাকে গভীর কৃতজ্ঞতা জানাই, ইরিন। এই সাফল্য আমার জীবনে এক অমূল্য অধ্যায় হয়েই থাকবে’।

রুবেক
‘অধ্যায়’ বলেছিলাম? আমি এ শব্দটা তো সচরাচর ব্যবহার করি বলে মনে হয় না।

ইরিন
‘অধ্যায়’- ঠিক এই শব্দটিই তুমি বলেছিলে।

রুবেক
(কথাটা হাল্কাভাবে নেবার চেষ্টায়) আসলে দেখো ব্যাপারটা তো একটা ‘অধ্যায়’-ই ছিলো।

ইরিন
ঐ একটি শব্দই আমাকে বাধ্য করালো তোমাকে ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার জন্য।

রুবেক
যেকোনো কিছুকেই ব্যক্তিগত আঘাত হিসেবে নেয়া তোমার মধ্যে তো ছিলই- ইরিন।

ইরিন
থাক ওসব। শুধু হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগানো, এই তো? দেখো রুবেক, আমাদের পাখিগুলো- শুভ্র সরালগুলো কেমন ভেসে বেড়াচ্ছে- না, না ওগুলো সরাল না, ওগুলো আমাদের গাঙ্গচিল।

রুবেক
হ্যাঁ আমাদের গাঙ্গচিল- এখন আমি আমার সাম্পান ভাসিয়ে দিলাম ওদের পেছনে।

ইরিন
কিন্তু তোমার সাম্পানে কোনো হৃদয়হীন শিকারী যেন না থাকে- এই বলে দিচ্ছি!

রুবেক
না সেরকম কোনো শিকারী নেই-  আচ্ছা ইরিন তোমার মনে আছে, সেবার গ্রীষ্মে আমরা সেই খামার বাড়িটার উঠানে এভাবে কাটিয়ে দিয়েছি কত সময়?

ইরিন
হ্যাঁ। সেই অলস সন্ধ্যাগুলোয়- কাজ থেকে ফিরে অনেক রাত অব্দি।

রুবেক
একটা দীর্ঘ ভ্রমণ শেষ করে আমরা যখন সেই লেকটায় গিয়ে পৌঁছালাম- আর থেকে গিয়েছিলাম রবিবার পর্যন্ত।

ইরিন
আমার জীবনে একটা বিশেষ অধ্যায়-ই ছিল সেই সময়টা।

রুবেক
(যেন কিছু শোনেনি) তখনও তুমি এমনি ভাসিয়ে দিয়েছিলে- শ্বেতপদ্মগুলো।

ইরিন
(আনন্দে) শুভ্র রাজহাঁসে পারিণত হয়েছিল ওরা আমার হাতে।

রুবেক
হ্যাঁ যেনো কতগুলো শুভ্র মুরাল। মনে আছে, আমি একটা বড় পাতা বেঁধে দিয়েছিলাম একটির সাথে।

ইরিন
ওরা ভাসছিল- মনে হচ্ছিলো ময়ূরপঙ্খী নাও টেনে নিয়ে যাচ্ছে এক জলপরী।

রুবেক
তোমার খুব প্রিয় খেলা ছিল সেটা।

ইরিন
কতবার আমরা এ খেলা খেলেছি।

রুবেক
প্রতিটা সন্ধ্যায়- পুরো গ্রীষ্ম জুড়ে।

ইরিন
তুমি ঠাট্টা করে বলতে- আমিও এক জলপরী যে টেনে নিয়ে যাচ্ছে তোমার জীবনতরী।

রুবেক
(অন্যমনস্ক) তা ই বলেছিলাম হয়তো। দেখো দেখো, কেমন সাঁতার কাটছে গাঙ্গচিলগুলো?

ইরিন
(হেসে ফেলে) হ্যাঁ আর তোমার সাম্পানগুলো অবশ্য এখন চড়ায় আটকে আছে।

রুবেক
(আরও পাতা ছুঁড়ে দেয়) আছে, আরো আছে আমার কাছে অগুনতি সমুদ্র সাম্পান। জানো- সেই খামার বাড়িটা কিনে ফেলেছি। অবশ্য বাড়িটা আর নেই- সেখানে দাঁড়িয়ে আছে এক মাথা-উঁচু অট্টালিকা। এখনো আমরা- মানে আমি- গ্রীষ্মটা সেখানেই কাটাই।

ইরিন
সেই দিনগুলো কী চমৎকার ছিলো- তাই না? অথচ দিনগুলো আমরা হারিয়ে ফেলেছি- রাজহাঁসগুলো আমাদের ফাঁকি দিয়ে চলে গেছে।

রুবেক
আমরা আবার ওদের খুঁজে নিতে পারি না? খুব কি দেরি হয়ে গেছে, সবকিছু?

ইরিন
(দূর পাহাড়ের দিকে আঙ্গুল তুলে দেখায়) দেখ, সূর্য ডুবছে- পাহাড়ের পেছনে- গাছপালার উপর কেমন একটা লাল আভা গড়িয়ে পড়ছে।  (হেসে) অবশ্য একবার এক আশ্চর্য সূর্যোদয় দেখেছিলাম। মনে আছে তুমি আমাকে লোভী করে তুললে- আমরা উঠেছিলাম দূর পাহাড়ের একাকী চূড়ায়। তুমি প্রতিজ্ঞা করেছিলে যে, পৃথিবীর সব ঐশ্বর্য আমাকে দেখাবে, যদি আমি...  

রুবেক
(অধৈর্য্য) যদি তুমি... কী?

ইরিন
আমি তোমার পিছু পিছু পাহাড়ের ঐ চূড়ায় উঠেছিলাম। সেখানে নতজানু হয়ে সেবা, স্তব আর নৈবেদ্যে তোমার উপাসনা করেছিলাম। (একটু শান্ত-সমাহিতভাবে) হ্যাঁ, শেষ পর্যন্ত দেখেছিলাম সেই আশ্চর্য সূর্যোদয়!

রুবেক
(অস্থির) তুমি কি আবার আসবে, থাকবে আমাদের সাথে?

ইরিন
তোমার আর ঐ ভদ্রমহিলার সাথে?  

রুবেক
আমার সাথে। যেমনটি আমরা একসাথে ছিলাম আমাদের সৃষ্টিমুখর ঐ দিনগুলোতে। আমার ভেতরে যে সব বন্ধ দরজা আছে- তার সব তোমার স্পর্শে খুলে যেতে পারে- ইরিন!

ইরিন
(মাথা নেড়ে) সেই জিয়নকাঠি-তো আমার কাছে নেই যা তোমার কাজে আসবে!

রুবেক
আছে, আছে- শুধু তা তোমার কাছেই আছে। (করুণা চাইবে) দাও, দাও তোমার সেই যাদুর স্পর্শ যাতে আমি আবার আমার জীবন ফিরে পেতে পারি।

ইরিন
শূন্য স্বপ্ন। অলস আর মৃত স্বপ্নেরা সব। আমাদের পুনরুজ্জীবন এখন অসম্ভব।

রুবেক
এসো তাহলে- সেই পুরনো খেলাই চালিয়ে যাই।

ইরিন
তাই হোক তবে- খেলা শুধু খেলা।

(বসে থাকে, পাতা ছিঁড়ে পানিতে ফেলে)        

রুবেক
ঐ যে মায়া। ভালুকশিকারীর সাথে বেরিয়েছে।

ইরিন
তোমারই সঙ্গিনী।

রুবেক
কিংবা ভালুকশিকারীর।

মায়া
(দূর থেকে চীৎকার) চললাম- হয়তো স্বপ্নেই শুধু দেখা পাবে আমার।

রুবেক
কিসের খোঁজে যাচ্ছো?

মায়া
(এবার দূরত্ব কমে এসেছে) খুঁজে নিতে এক জীবন, যা সবকিছুকে হঠিয়ে নিজের জায়গা করে নেবে।

রুবেক
বাহ! মায়া তাহলে এখন প্রস্তুত?

মায়া
শুধু তাই না- একটা গানও বেঁধেছি-

‘আমি বন্ধনহীন, আমি মুক্ত স্বাধীন
আর নয় কারাগার
বন্ধন হল ক্ষয়
অবশেষে ঘুম ভাঙ্গিল
বিহঙ্গ খুলে দিলো পিঞ্জর।’

আচ্ছা, দীর্ঘ ঘুমের পর জেগে ওঠার অনুভূতি কি এরকম স্বর্গীয় হয়?

রুবেক
শুভরাত্রি মায়া। তোমার কল্যাণ হোক।

উলফ্
আরে দাঁড়ান দাঁড়ান, থামেন তো মশাই। আপনার এই অলক্ষুণে মঙ্গল-বাক্যের দরকার নেই। দেখছেন না আমরা শিকারে বেরিয়েছি?

রুবেক
কী আনছো আমার জন্য, মায়া?

মায়া
একটা শিকারী পাখি। হয়তো একটা বাজপাখি, আর তুমি ওটাকে তোমার কাজের মডেল-ও করতে পার।

রুবেক
(তিক্ত হাসি) হ্যাঁ তাই। পাখি শিকারেই যাচ্ছ। যদিও তুমি হয়তো জানই না, এটার জন্যই অনেকদিন ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছিলে তুমি।

মায়া
(মাথা দুলিয়ে) আমার ভালো আমাকেই দেখতে দাও। শুভেচ্ছা রইল, আশা করি গ্রীষ্মেও রাতটা ভালোই কাটবে তোমাদের।

রুবেক
তাহলে তো বলতেই হয়, তোমাদের শিকার হোক দুর্যোগময়।

উলফ্
বাহ বাহ, এরকম দিলখোশ শুভেচ্ছাই তো চাই! চলো মায়া।

(মঞ্চের ডান দিয়ে ঝোপের আড়ালে চলে যায়)

রুবেক
গ্রীষ্মের একটি রাত্র- পাহাড়ে- এই তো চাই!

ইরিন
(হঠাৎ খুশি হয়ে) আমার সাথে একটি রাত- এখানে? এসো তাহলে।

রুবেক
ইরিন, ইরিনা।

ইরিন
প্রভূ আমার। প্রিয় আমার।

রুবেক
ইরিন... প্রিয়...

ইরিন
(কর্কশ স্বরে ছুরি হাতড়াতে হাতড়াতে) একটি রাত, শুধু একটি ঘটনা হয়েই থাকবে (হঠাৎ ফিসফিসিয়ে) ঘুরে তাকিয়ো না এদিকে, আর্নল্ড।

রুবেক
(ফিসফিস) কী হল?

ইরিন
একটা ছায়া, একটা মুখ, আমার দিকে তাকিয়ে...

রুবেক
কোথায়? (নান এর ছায়ামূর্তির দৃষ্টি ইরিন এর উপর স্থির) আহ!

ইরিন
এবার বিদায় তাহলে। (দাঁত চেপে যেন হিসহিসিয়ে- ঘাড় নিচু করে রুবেক-এর কানের কাছে মুখ রেখে) যেভাবে বসে আছো বসে থাকো- আমার সাথে যাবার দরকার নেই। (জোরে) আবার দেখা হবে পাহাড়ে, আজ রাত্রে।

রুবেক
তুমিও আসছো ইরিন?

ইরিন
আমিও। এখানে আমার জন্য অপেক্ষা করবে।

রুবেক
পাহাড়ে- গ্রীষ্মের রাত- তুমিও সাথে- তোমার সাথে- ইরিন, ওটাই হতে পারতো আমার জীবন, আর আমরা তা হারিয়ে ফেলেছি।

ইরিন
যা হারিয়ে গেছে তা আমরা তখনই বুঝতে পারি- যখন...

রুবেক
যখন?

ইরিন
যখন আমরা, মৃতেরা জেগে উঠি।

রুবেক
(বিষণ্ন মাথা নেড়ে) আমরা কি কিছু বুঝতে পারি?

ইরিন
বুঝতে পারি যে, আমাদের কখনো প্রাণ ছিল না- কখনো বাঁচিনি আমরা।

(ধীরে ঢালু বেয়ে ইরিন নেমে যায়। নান তাকে অনুসরণ করে। রুবেক মঞ্চে একা)

মায়া
(দূর হতে তার গান শোনা যায়)

‘আমি বন্ধনহীন, আমি মুক্ত স্বাধীন
আর নয় কারাগার
বন্ধন হল ক্ষয়
অবশেষে ঘুম ভাঙ্গিল
বিহঙ্গ খুলে দিলো পিঞ্জর।


তৃতীয় দৃশ্য

(বসতিহীন পাহাড়ী ঢালু এলাকা। পাথরের স্তুপের মাঝে জীর্ণ একটি কুটীর। ভোরের আলো ফুটছে, মায়া হাসতে হাসতে নেমে আসছে- পেছনে উলফ্- মায়ার ফ্রকের কিছুটা হাতের মুঠোয়)

মায়া
ছাড়ো ছাড়ো বলছি!

উলফ্
দাঁড়াও, আস্তে- আরে কামড়ে দেবে না কি? মেজাজখানা তো দেখছি খাশা!

মায়া
(উলফের হাতে থাপ্পর) ছেড়ে দাও- অসভ্যতা বন্ধ কর।

উলফ্
তা বন্ধ করলে কী আমার চলে?

মায়া
তাহলে আমি এক পা ও আর এগুবো না। শুনছো? এক পা ও না।

উলফ্
হো, হো- এখানে এই পাহাড়ের চূড়ায় আমার কাছ থেকে পালাবে কী করে?

মায়া
(নিচে আঙ্গুল দেখায়) দরকার হলে- ঐ নিচে খাদে ঝাঁপ দেব এই চূড়া থেকে।

উলফ্
হ্যাঁ? তাহলে রক্ত-মাংসের তালগোল পাকিয়ে কুকুরগুলোর খাবার উপযুক্ত হবে। একেবারে রসালো কুমড়ো হয়ে যাবে। (একটু বিরতি) ঠিক আছে যাও, পাহাড়ের উঁচু থেকে ঝাঁপ দাও- তবে দেখো নামার সময় মাথাটা একুট ঘুরে উঠতে পারে।

মায়া
(ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে) বাহ্ তোমার মতো লোকের শিকারে সঙ্গী হওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।

উলফ্
বলো খেলার সঙ্গী।

মায়া
আচ্ছা, তোমার কাছে এটা খেলা বুঝি?

উলফ্
জ্বি, মহামান্যা- এ খেলাটি আমি ভীষণ উপভোগ করি।

মায়া
(মাথা ঝাঁকিয়ে- সন্দেহের দৃষ্টি) আচ্ছা, তোমার কুকুরগুলোকে ছেড়ে দিলে কেন?

উলফ্
(চোখ পিট পিট- মুচকি হাসি) যাতে ওরা নিজেদের মত কিছু শিকার খুঁজে নিতে পারে তাই।

মায়া
মিথ্যে কথা। কুকুরগুলোকে এমনি এমনি যে তুমি ছেড়ে দিয়েছ- আমি বিশ্বাস করি না।

উলফ্
(হাসছে) তাহলে কেনো ওদের ছেড়ে দিয়েছি- জানাবেন দয়া করে?

মায়া
ছেড়ে দিয়েছ কারণ তাহলে ওগুলোর পেছনে রাখালটাও ছুটবে। ওর কাজই তো দলছুট কুকুরগুলোকে ফিরিয়ে আনা। আর এই ফাঁকে...

উলফ্
এই ফাঁকে... কী?

মায়া
(প্রসঙ্গ পাল্টে) কিচ্ছুু যায় আসে না।

উলফ্
(বেশ ঘনিষ্ঠ) যা বলতে চাচ্ছিলে বলে ফেলো লক্ষ্মীটি। আমাদের রাখাল খুব শিগগিরই ফিরে আসবে বলে মনে হয় না।

মায়া
(রেগে গিয়ে) আমারও সন্দেহ নেই তাতে।

উলফ্
(আবার মায়াকে ধরার চেষ্টা) ও অবশ্য আমার শিকার ধরার পদ্ধতিটা বেশ ভালো করেই জানে।

মায়া
(নাগাল এড়িয়ে গিয়ে) তোমাকে দেখতে এখন গল্পের সেই হুঁকোমুখো বোকা পাঁঠার মতো দেখাচ্ছে- তা জানো?

উলফ্
হুকো মুখো পাঁঠা? দৈত্য দানব কিছু না?

মায়া
অনেকটা সেরকমও। কেমন দাড়ি আর খুর বের হয়েছে। শিং-ও দেখতে পাচ্ছি।

উলফ্
ওটার শিং আছে নাকি?

মায়া
আছে। ঠিক তোমার মত বিদঘুটে এক জোড়া।

উলফ্
বলো কী- আমার মাথায় জোড়া শিং-ও দেখতে পাচ্ছো?

মায়া
পাচ্ছিই তো- বেশ স্পষ্ট, চকচক করছে।

উলফ্
(কুকুর তাড়ানোর চাবুকটা বের করে) তাহলে তো তোমাকে বেঁধে ফেলতেই হচ্ছে।

মায়া
একি পাগলামি! সত্যিই বেঁধে ফেলবে নাকি?

উলফ্
শিংওয়ালা জন্তুই যদি হই- তাহলে এটা করতে আর দোষ কী? শিং দু'টো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছ- তাই না?

মায়া
(একটু নরম স্বরে) ঠিক আছে উলফ্- আর পাগলামো করো না তো! আচ্ছা শিকারের সময় বিশ্রাম নেয়ার কুটিরের কথা বলছিলে- ওটা কোথায়? এদিকেই- তাই বলছিলে না?

উলফ্
(আঙ্গুল তুলে- যেন গর্বিত ভঙ্গীতে) ওই যে! ঠিক তোমার চোখের সামনে।

মায়া
(ঘুরে দাঁড়িয়ে) ঐ শুয়োরের খোঁয়াড়টা?

উলফ্
একাধিক রাজকুমারী এখানে রাত কাটিয়ে গিয়েছেন সুন্দরী (চাপা হাসি)!

মায়া
তুমি বলছিলে- ভালুকের ছদ্মবেশে ঐ ভয়ংকর লোকটা রাজকুমারীর কাছে এসেছিল- এটাই কী সেই জায়গা?

উলফ্
হাঁ গো সুন্দরী, এই সেই কুঞ্জবিথী- (আমন্ত্রণ জানানোর ভঙ্গীতে) আপনার অনুমতির অপেক্ষায়।

মায়া
ছিঃ! ওখানে পা ফেলব? ছিঃ!

উলফ্
দু’জনে মিলে বেশ আলসেমি আর আয়েশ করে একটা গ্রীষ্মের রাত- চাইকি পুরো গ্রীষ্মকাল এখানে কাটিয়ে দিতে পারি।

মায়া
আপনার অশেষ দয়া- কিন্তু তেমন ইচ্ছে আমার নেই। (অধৈর্য হয়ে) যথেষ্ট হয়েছে- এই শিকার আর অভিযান! লোকজন ঘুম থেকে জেগে ওঠার আগেই আমি ফিরে চললাম।

উলফ্
এত উঁচু থেকে নামবে কীভাবে?

মায়া
একটা পথ আছে নিশ্চয়ই।

উলফ্
আছে, আছে। ঐ যে, খাড়া খাদের মধ্যে গিয়ে পড়েছে যে পথটি।

মায়া
এই তো- এটুকু ভদ্রতা অবশ্য আশা করছিলাম।

উলফ্
যাও না- চেষ্টা করেই দেখ।

মায়া
(একটু সন্দেহ) ভাবছো, পারবো না?

উলফ্
আমার সাহায্য ছাড়া- সে সুযোগটাও নেই, সুন্দরী!

মায়া
(অস্বস্তি) তাহলে এসো- দাঁড়িয়ে কেন?

উলফ্
আমি বরং- তোমাকে পিঠে করে নিয়ে যাই?

মায়া
উফ্, আবার সেই পাগলামি।

উলফ্
তাহলে- দু’হাতে পাঁজাকোলা করে?

মায়া
এসব বাজে কথা বন্ধ করবে- না কি?

উলফ্
(হতাশা চেপে রেখে) একবার এক কাণ্ড ঘটেছিল, এক তরুণীকে এভাবেই কাদামাখা রাস্তা থেকে কুড়িয়ে দু’হাতে তুলে নিয়েছিলাম। এভাবেই হয়ত সারাজীবন ওকে বয়ে বেড়াতাম যাতে কোথাও হোঁচট খেয়ে না পড়ে। ওর পায়ের জুতাজোড়া ছিল শতছিন্ন।

মায়া
আর তুমি কাদামাখা মেয়েটাকে কোলে তুলে নিলে?

উলফ্
আমি ওকে এভাবে খুব সাবধানে উঁচুতে দু’হাতে তুলে ধরেছিলাম। এর পুরস্কার কি পেয়েছিলাম জানো?

মায়া
কি?

উলফ্
(হেসে মাথা নেড়ে) এই শিংদুটো- যেগুলো তুমি এখন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছ। গল্পটা বেশ মজার- তাই না?

মায়া
বেশ মজার! আমিও একটা গল্প জানি। এর চেয়েও মজার।

উলফ্
গল্পটা কেমন?

মায়া
এক বোকা মেয়ের গল্প। বাবা মা ছিল, কিন্তু বড্ড গরীব। কিন্তু একদিন বিশাল, সাহসী এক পুরুষ তাদের ভাঙ্গাচোড়া বাড়িতে এলো। তারপর মেয়েটিকে তার বাহুতে বন্দি করে নিয়ে গেল দূরে, বহুদূরে।

উলফ্
মেয়েটিও তার সাথে যাবার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েছিল নিশ্চয়ই।

মায়া
হ্যাঁ- বোকা, ভীষণ বোকা ছিল মেয়েটা।

উলফ্
আর ভদ্রলোক যিনি এসেছিলেন, তাকে দেখতে নিশ্চয়ই বেশ জমকালো আর সুদর্শন লাগছিলো।

মায়া
না, ঠিক তেমন অসাধারণ দেখতে কিছু না। কিন্তু মেয়েটিকে বিশ্বাস করাতে পেরেছিল যে তাকে উঁচু এক পাহাড়ের চূড়ায় নিয়ে যাচ্ছে- যেখানে রোদ সবসময় ঝলমল করছে।

উলফ্
ঐ যে লোকটা- বিশাল, সাহসী- নিশ্চয়ই পাহাড়ে ওঠা ওর নেশা- পর্বতারোহী- কি বলো?

মায়া
হ্যাঁ, বলতে পার, অনেকটা সেরকমই।

উলফ্
তো- মেয়েটাকে সাথে করে পাহাড়ের চূড়ায় উঠেছিল।

মায়া
(মাথা দোলানোর ভঙ্গীতে) মেয়েটিকে সাথে করে নিয়ে গিয়েছিল? ও হ্যাঁ, না! আসলে মেয়েটাকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে একটা নোংরা স্যাঁতস্যাঁতে খাঁচার মধ্যে নিয়ে ফেলল। মেয়েটির মনে হচ্ছিল সেখানে আর কোনোদিন সূর্যের আলো কিংবা নির্মল বাতাস গিয়ে পৌঁছাবে না। যদিও তার গিলটি করা দেয়াল ঘিরে পাথুরে ভূতের মত ছায়ারা সব ঘুরে বেড়াচ্ছিল।

উলফ্
আমার তো মনে হয়- মেয়েটির উচিত শিক্ষা হয়েছিল।

মায়া
ঠিকই বলছ, হয়তোবা। কিন্তু গল্পটা বেশ মজার না?

উলফ্
এখন আমার কথা শুনুন, প্রিয়ংবদা।

মায়া
এখন আবার কী?

উলফ্
(চোখের দিকে তাকিয়ে) চলো না, আমাদের এই ছেঁড়াখোঁড়া জীবনদু’টোকে একসাথে জোড়া লাগিয়ে দেই।

মায়া
মহামান্য কর্তামশায় কি হঠাৎ দরদী হয়ে পড়লেন?

উলফ্
মায়া, আমরা কি পারি না এই ছেঁড়া টুকরোগুলো জোড়া দিয়ে একটা সত্যিকারের জীবন তৈরি করতে?

মায়া
আর যখন এই পুরনো টুকরাগুলো একদিন ক্ষয়ে যাবে, ছিঁড়ে যাবে- সেদিন?

উলফ্
(বেশ খানিকটা মেনে নেয়ার ভঙ্গীতেই) সেদিন আমরা আমাদের সত্যিকার পরিচয় নিয়ে দাঁড়াব- মুক্ত, স্বাধীন অকুণ্ঠ- একজন পুরুষ, একজন নারী যেভাবে দাঁড়ায়!

মায়া
তোমার ঐ খুরওয়ালা ছাগলের পায়ের ওপর?

উলফ্
আর তুমি তোমার- যাক, বাদ দাও।

মায়া
চলো, এবার যাই তাহলে।

উলফ্
কোথায় বন্ধু?

মায়া
কেনো, শহরে ফিরে যাব।

উলফ্
তারপর?

মায়া
আমরা দু’জন দু’জনকে বিদায় জানাবো, একটা চমৎকার সময়ের সাথী হবার জন্য।

উলফ্
সত্যিই বিশ্বাস করো যে, আমরা বিদায় নিতে পারবো?

মায়া
তুমি তো সত্যিই আর আমাকে বাঁধতে পারোনি, পেরেছো?

উলফ্
আমি তোমাকে প্রাসাদ উপহার দিতে পারতাম।

মায়া
(কুঁড়ে ঘরটার দিকে আঙ্গুল) ওটার মতো?

উলফ্
এখনো তো সেটা ভেঙ্গে পড়েনি।

মায়া
পৃথিবীর সব ঐশ্বর্য, সব সৌন্দর্য- এসবও?

উলফ্
একটা প্রাসাদ- ভেবে দেখো।

মায়া
থাক, দরকার নেই অমন বায়বীয় প্রাসাদের।

উলফ্
চারপাশ জুড়ে মাইলের পর মাইল... শিকারের চমৎকার সুযোগ।

মায়া
তোমার প্রাসাদে কি বিখ্যাত সব চিত্রকলা, ভাস্কর্য- এগুলো থাকবে?

উলফ্
(ধীরে ধীরে) না, সেরকম কিছু তোমাকে দিতে পারব না অবশ্য।

মায়া
(হাঁপ ছেড়ে) যাক বাবা, বাঁচা গেল।

উলফ্
তুমি কি তাহলে আমার সাথে, আমি যতদূর যেতে চাই ততদূরে যাবে?

মায়া
(উৎকণ্ঠার সুরে) কারো এক পোষা বাজপাখি আমার উপর সবসময় নজর রাখছে।

উলফ্
ঐ বাজপাখিটাকে আমি শিকার করবো, মায়া।

মায়া
(উলফ্কে গভীরভাবে লক্ষ্য করে) তাহলে এসো, আমাকে তুলে নিয়ে যাও।

উলফ্
(মায়ার কোমর ধরে) এখুনি যেতে হবে। চারিদিকে কুয়াশা ঘনিয়ে আসছে।

মায়া
পথটা খুব বিপজ্জনক নাকি?

উলফ্
কুয়াশা ঘেরা পাহাড় আরও বিপজ্জনক (মায়া জোর করে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়- দূরে নিচু ঢাল দেখে। চমকে উঠে পেছনে ফিরে আসে) হায় হায়, কী হল? মাথা ঘুরে উঠলো বুঝি?

মায়া
হ্যাঁ, কিন্তু ঐ যে দেখ! ওরা দু’জন পাহাড়ী পথ বেয়ে উঠে আসছে।

উলফ্
তাইতো দেখছি। সেই বাজপাখি আর তার অদ্ভুত সঙ্গী।

মায়া
আচ্ছা, ওরা আমাদের দেখতে পাবে না, এমনভাবে নেমে যাওয়া যায় না?

উলফ্
সেটা বোধহয় সম্ভব হবে না। এখানে এই একটাই পথ, আর সেটাও খুবই সরু।

মায়া
বেশ, চলো তাহলে ওদের মুখোমুখি হই।

উলফ্
এই তো সত্যিকারের ভালুক-শিকারীর মত কথা।

(রুবেক আর ইরিন উঠে আসছে। রুবেকের গায়ে চাদর আর ইরিনের ফার কোট ও টুপি)

রুবেক
এই যে মায়া! আবার দেখা হয়ে গেল।

মায়া
(নিস্পৃহ কণ্ঠে) হ্যাঁ, উপরে উঠে আসবে না?

(রুবেক উঠে, ইরিনের দিকে হাত বাড়ালে ইরিনও উঠে আসে)

রুবেক
আমাদের মতো তোমরাও তাহলে সারারাত পাহাড়ে কাটিয়ে দিলে?

মায়া
শিকার করছিলাম আমরা, তুমিই তো অনুমতি দিয়েছো।

উলফ্
(নিচে আঙ্গুল দেখিয়ে) আপনি কি ঐ পথটা দিয়েই এলেন?

রুবেক
দেখলেনই তো।

উলফ্
আপনার সঙ্গীটিও?

রুবেক
নিশ্চয়ই। (মায়ার দিকে তাকিয়ে) আমরা আর কখনও আলাদা পথে চলবো না।

উলফ্
আপনি জানতেন না, যে পথ দিয়ে উঠে এলেন তা একরকম মৃত্যুফাঁদ?

রুবেক
ভাবলাম, চেষ্টা করেই দেখি। প্রথম অবশ্য অতটা কঠিন মনে হয়নি।

উলফ্
সত্যিই, প্রথম প্রথম কোনোকিছুই কঠিন মনে হয় না। কিন্তু তারপর এমন এক সংকট হাজির হয় যখন আপনি না পারেন এগুতে, না পারেন পিছুতে। আর সেখানেই হয়ত ফেঁসে গেলেন।

রুবেক
(মুচকি হেসে) কথাগুলো দৈববাণী হিসেবে নেব নাকি উলফ্?

উলফ্
ঈশ্বর ক্ষমা করুন, গনৎকার হবার ইচ্ছা আমার কোনোকালেই ছিল না (উঁচু স্থানে আঙ্গুল নির্দেশ) একটা প্রচণ্ড ঝড় ঘনিয়ে আসছে- দেখছেন না? শুনছেন না বাতাসের চিৎকার?

রুবেক
এই চিৎকার যেন পুনরুত্থানের আগমনী। এই মহাকল্লে¬াল যেন এক পূর্বাভাস।

উলফ্
না! এই শব্দ পাহাড়ের বুক চিরে বের হয়ে আসা লুকিয়ে থাকা ঝড়ের গর্জন। দেখুন, ঐ যে মেঘগুলো কীভাবে ফুঁসে উঠেছে। একটু পরেই এগুলো এসে আমাদের চারপাশে ঘিরে ধরবে।

ইরিন
(ভয় পেয়ে) আমি জানি, সেই ভয়ংকর মুহূর্তের কথা। যখন কেউ তোমাকে এসে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে।

মায়া
(উলফ্কে টেনে ধরে) চল, তাড়াতাড়ি নেমে পড়ি।

উলফ্
(রুবেককে উদ্দেশ্য করে) একজনের বেশি নিয়ে আমি নামতে পারব না। আপনারা ঐ ঘরটায় ঢুকে অপেক্ষা করুন। ঝড় থামলে আমি লোকজনকে পাঠাচ্ছি, আপনাদের নামিয়ে আনার জন্য।

ইরিন
আমাদের ধরে নেবার জন্য... ওদেরকে পাঠাচ্ছে... না, না, না...

উলফ্
(রুক্ষ স্বরে) দরকার হলে জোর করে নামিয়ে নিয়ে যাবে। জীবন-মরণের প্রশ্ন এটা। (মায়ার দিকে ঘুরে) ভয় পেয়ো না, আমার ওপর ভরসা রাখো।

মায়া
(জড়িয়ে ধরে) আহ্ সত্যি যদি হাড়গোড় নিয়ে নিচে নামতে পারি, তাহলে কী যে আনন্দ!

উলফ্
(নিচে নামতে নামতে চিৎকার করে বলে) আপনারা ঘরটাতে অপেক্ষা করুন। দড়ি আর যন্ত্র নিয়ে লোকজন না আসা পর্যন্ত নড়বেন না।

(মায়াকে জড়িয়ে নিয়ে দ্রুত কিন্তু সাবধানে নামতে থাকে)

ইরিন
(ভীত, সন্ত্রস্ত চোখে রুবেক-এর দিকে তাকায়) শুনলে? লোকজন এসে আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাবে। ওরা এখানে আসছে।

রুবেক
শান্ত হও ইরিন, কোনো ভয় নেই।

ইরিন
(আরও ভয় পেয়ে) ঐ কালো পোশাক পরা মেয়েটিও আসবে। নিশ্চয়ই আমাকে ও খুঁজছে। এসে আমার হাতগুলো ধরবে, তারপর ঢুকিয়ে দেবে পাগলদের আটকে রাখার ঐ আঁটোসাঁটো পোশাকের ভেতর। ওর কাছে সেরকম একটা পোশাক আছে, আমি দেখেছি- সত্যি বলছি আর্নল্ড।

রুবেক
কেউ তোমাকে স্পর্শও করতে পারবে না।

ইরিন
তার দরকার নেই (ছুরি বের করে) এই দেখো।

রুবেক
একি! ছুরি?

(ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে)

ইরিন
এটা সবসময়, দিন-রাত, আমার সঙ্গী।

রুবেক
ছুরিটা দাও বলছি ইরিন।

ইরিন
(লুকিয়ে ফেলে) দেবো না। আমার দরকার আছে এটার। তোমার জন্যই এটা এনেছিলাম, আর্নল্ড!

রুবেক
আমার জন্য!

ইরিন
মনে আছে, কাল রাতে আমরা বসে ছিলাম- রাজহাঁস আর জলপদ্ম নিয়ে সেই খেলাটা খেলছিলাম?

রুবেক
হ্যাঁ, খেলছিলাম আমরা।

ইরিন
ঠিক তখনি তুমি কবরের মত নিস্পৃহ আর বরফের মত ঠাণ্ডা গলায় বলে উঠলে যে, আমি তোমার জীবনে একটি অধ্যায় মাত্র ছিলাম, তারচেয়ে বেশি কিছু না।

রুবেক
একথা তুমিই বলেছিলে ইরিন- আমি না।

ইরিন
(রুবেকের কথা উপেক্ষা করে বলতে থাকে) আমিও তখনি ছুিরটা বের করি। তোমার পিঠে সেটা বসিয়ে দিতে চেয়েছিলাম।

রুবেক
(গম্ভীর কালো কণ্ঠে) কেনো সেটা করলে না?

ইরিন
কারণ, হঠাৎ করেই বুঝতে পারলাম, অনেক বছর ধরেই তুমি মৃত।

রুবেক
মৃত?

ইরিন
মৃত, আমারই মতো। তাই আমরা দুই শবদেহ বসে খেলছিলাম- দু’জনের সাথে।

রুবেক
আমি একে মৃত্যু বলব না- অবশ্য এটা বোঝার সাধ্য নেই তোমার।

ইরিন
তাহলে কোথায় হারিয়ে গেল তোমার সেই আগুনে পুড়ে যাওয়া ভালোবাসা, যা তোমার মধ্যে দেখেছিলাম সেই দিনগুলোতে, যখনি আমি তোমার সামনে এসে দাঁড়াতাম আমার সব সৌন্দর্য উন্মোচন করে?

রুবেক
আমাদের প্রেম তো মরে যায়নি, ইরিন!

ইরিন
সেই প্রেম- যা কিনা আামাদেরই ছিল- আশ্চর্য সুন্দর এক পৃথিবীতে, যা কিনা দিয়েছিল এক অদ্ভুত জীবন- যে প্রেম, যে জীবন আজ আর আমাদের নেই।

রুবেক
(আবেগ আপ্লুত হয়ে) তুমি কি জানো, সেই প্রেম আমাকে এখনও দগ্ধ করে যাচ্ছে?

ইরিন
তুমি কি ভুলে গেছো, আমি কে? আজ?

রুবেক
তুমি যেই হও, যাই হয়ে থাকো, আমার কাছে  তুমি সেই রমণী, যাকে আমি বহুবার স্বপ্নে দেখেছি, বহু রূপে জেনেছি, তোমাকে-  

ইরিন
কিন্তু আমি যে বহুবার দাঁড়িয়েছি খোলা বেদিতে; যেখানে আমার নগ্ন দেহের মডেল দেখে বহু ভাস্কর আর শিল্পী তৈরি করেছে তাদের শিল্প। আর এসবই হয়েছিল তোমাকে ছেড়ে আসার পর।

রুবেক
আমি, এই অন্ধ আমি তোমাকে সেই যাযাবর জীবনের দিকে ঠেলে দিয়েছিলাম। একটা মেকি, প্রাণহীন প্রতিমাকে আঁকড়ে ধরে ছিলাম- প্রেম আর ভালোবাসাকে ধূলোয় ছুঁড়ে ফেলে।

ইরিন
(মুখ নিচু করে) বড্ড দেরি হয়ে গেল।

রুবেক
যা কিছু ঘটুক, আমার চোখে তোমার মূল্য এতটুকুও কমেনি।

ইরিন
(মাথা উঁচু করে) আমার চোখেও না।

রুবেক
তাহলে তো আমরা এখনো স্বাধীন, আমরা আবারো নতুন করে সব কিছু শুরু করতে পারি।

ইরিন
(বিষণ্ন চোখে তাকায়) আমার ভেতরে সব কিছু মরে গেছে, আর্নল্ড। মৃত্যুর নৈঃশব্দ থেকে জেগে উঠে আমি তোমাকে খুঁজলাম; তোমাকে খুঁজে পেলামও। কিন্তু দেখলাম তুমি, তোমার জীবন, মৃত- যেমন করে আমিও মরে গিয়েছি।

রুবেক
তুমি ভুল করছো, ভুল! জীবন এখনো তেমনি টগবগে ঐশ্বর্যে ভরপুর হয়ে আছে- আমাদের মাঝে, আমাদের চারপাশেও।

ইরিন
(মৃদু হেসে মাথা নাড়ায়) যে নারীকে তুমি পুনরুত্থানের আস্বাদ দিয়েছো, তার কাছে জীবন এখন এক হিম শীতল শবাধার মাত্র।

রুবেক
(ইরিনকে কঠিন আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে) তবে এসো, মৃত্যুর অতল গহ্বরে তলিয়ে যাবার আগে আবার আমরা কিছুক্ষণের জন্য হলেও জীবনকে আমাদের হাতের মুঠোয় বন্দি করি।

ইরিন
আর্নল্ড!

রুবেক
কিন্তু এই আধো অন্ধকার, বিভৎস, নোনাধরা, মৃত্যুর কুয়াশাঘেরা- এখানে নয়।

ইরিন
(ব্যগ্র এক অনুপ্রেরণায়) চলো, ঐ যে আলোর ঝলকানির মাঝে। ঐ সেই চূড়া।

রুবেক
এসো তবে, ঐ চূড়াতেই হোক আমাদের জয়োৎসব।

ইরিন
আর সূর্য চেয়ে চেয়ে দেখুক আমাদের।

রুবেক
দেখুক চেয়ে আমাদেরকে, আলো আর অন্ধকারের সব শক্তি। (ইরিন-এর হাত চেপে ধরে) তুমি কি যাবে আমার সাথে, বঁধু হে... প্রেয়সী আমার!

ইরিন
(এক অদ্ভুত রূপান্তর ঘটে গেছে) প্রভু, প্রিয় আমার!

রুবেক
(পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়) আমাদের এই কুয়াশা পেরিয়ে যেতে হবে প্রথমে, তারপর...

ইরিন
কুয়াশার এই মেঘ পার হয়ে, তারপর উঁচুতে, ঐ উঁচুতে যেখানে রোদ আলো-ঝলমল করছে।

(বহুদূর থেকে মায়ার গান ভেসে আসে)

মায়া
‘আমি বন্ধনহীন, আমি মুক্ত স্বাধীন
আর নয় কারাগার
বন্ধন হল ক্ষয়
অবশেষে ঘুম ভাঙ্গিল
বিহঙ্গ খুলে দিলো পিঞ্জর।’

শহীদুল মামুন : শিক্ষক, অনুবাদক। সদস্য- প্রাচ্যনাট, ঢাকা