Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

শহীদুল জহিরের সাথে কথোপকথন

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

[১৭-১২-০৪ খ্রিঃ সকালে কথাসাহিত্যের ছোটকাগজ কথা-র জন্য সদ্যপ্রয়াত কথাশিল্পী শহীদুল জহিরের একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়। তাঁর বাসভবনে এটি গ্রহণ করেন কথা সম্পাদক কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর। এরই কিছু নির্বাচিত অংশ কথা' সম্পাদকের অনুমতি নিয়ে ছাপানো হলো থিয়েটারওয়ালা-র পাঠকের জন্য- সম্পাদক]

এটি তো আমাদের বিজয়ের মাস, গতকালই আমরা পালন করলাম তেত্রিশতম মহান বিজয় দিবস। সমকালীন রাষ্ট্রীয়-সামাজিক বাস্তবতায় আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ, এ-সব সম্পর্কে আপনার সমুদয় ভাবনা জানতে চাচ্ছি।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার চাইতে বড় অর্জন আমাদের আর নাই। তা সত্ত্বেও আমার তো মনে হয় বর্তমান প্রেক্ষাপটে  মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গটা বেশ জটিল রূপ নিয়েছে। কারণ এর বিভিন্ন ব্যাখ্যা, বিভিন্ন কথা তো আসছে। এটা তো সত্যি যে, মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন দল, গ্রুপ অংশ গ্রহণ করেছে। একটা অংশ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ তো করেই নাই বরং বিরোধীতা করেছে। এখানে এ কথাও বলতে হয়, স্বাধীনতার পরে বিভিন্ন দল বা গ্রুপ তখন মুক্তিযুদ্ধের জন্য এক হয়েছিল এবং এই একতার জন্য যুদ্ধ এভাবে চালায়া যেতে পেরেছিল। তবে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী গ্রুপপগুলার ভিতর ভাবনার দিক থেকে মৌলিক পার্থক্য ছিল, যা এখনও আছে। এদের বিভিন্ন আইডিয়া ছিল। তবে সাধারণ মানুষ যারা যুদ্ধে গিয়েছিল তারা কিন্তু দেশ স্বাধীন করার স্বপ্ন নিয়াই গিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে তাদের অংশগ্রহণকে কোনো আদর্শিক তত্ত্বের দ্বারা আদর্শায়িত করা যাবে না। তবে আমার বিশ্বাস সাধারণ মানুষ কোনো তত্ত্বের বাস্তবায়নের জন্য যুদ্ধে না গেলেও তাদের স্বতঃস্ফূর্ততার কারণে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সীমিত অর্থে একটা জনযুদ্ধই ছিল। সব কিছু মিলায়া বর্তমান রাজনৈতিক এবং সামাজিক অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধ নিয়া খোলামেলাভাবে কথা বলাও প্রায় অসম্ভব হয়া গেছে।

তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করল তাদের কোনো রাজনৈতিক আকাক্সক্ষা ছিল না! কিন্তু যুদ্ধের ভিতর দিয়ে কী সার্বিকভাবে কিছু প্রগতিশীল বোধ গড়ে ওঠেনি?

অনেকের হয়ত পলিটিকেলি কোনো  নির্দিষ্ট ভাবনা ছিল না, দেশ স্বাধীন করার বিষয়টা ছাড়া। তবে নেতৃত্বের দিক থেকে একটা রাজনৈতিক দলতো ছিলই। এ ছাড়া বামপন্থী যারা তারা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। একটা তো ছিল জাতীয়তাবাদী অংশ, এরা স্বাধীনতার ব্যাপারটা মোটা দাগেই বুঝত। মুক্তিযুদ্ধের পরে এরা ঠিক প্রগতিশীল বা আদর্শগতভাবে তেমন কোনোকিছু করতে পারল বলে মনে হয় না। না পারার কারণও হয়তো ছিল। তবে এ-সব ব্যাপারে সঠিক কমিটমেন্ট থাকা অনেক বড় ব্যাপার বলে মনে করি। স্বাধীন হওয়ার পর যে দায়িত্ব পালন করা দরকার ছিল তা করা যায় নাই। আসলে দেশের স্বাধীনতা অর্জিত হওয়ার পর নেতৃত্বদানকারী মূল দলটির সামনে কিছু করার থাকল না। কারণ তাদের টার্গেট ছিল স্বাধীনতা। আর ছোট ছোট যে সব বাম রাজনৈতিক দল ছিল তারাও সমাজবিপ্লব এবং প্রগতিশীলতার বিষয়টা আগায়া  নিতে পারে নাই।  জনগণ যারা ক্ষেত-খামার, কল-কারখানা, স্কুল-কলেজ থেকে উঠে এসে এই যুদ্ধে সরাসরি অংশ গ্রহণ করলো তারা ১৬ ডিসেম্বরের পর যার যার জীবনে ফিরা গেল। ব্যাপার হচ্ছে, যারা যুদ্ধের বিরোধীতা করল, তারা ছাড়া, বিভিন্ন আইডিয়োলোজির লোক যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করল। কিন্তু তারাও বলা যায় যুদ্ধের পর বা বিজয়ের পর ছত্রভঙ্গ হয়া গেল, সত্যিকার অর্থে ছত্রভঙ্গ হলো না তারা যারা যুদ্ধের বিরোধীতা করল। যুদ্ধের ব্যাপারটা কিন্তু অতি তাড়াতাড়ি শেষ হয়া গেল, দেশ স্বাধীন হলো, পরে দেখা গেল নানা রকম সমস্যা, নানাবিধ দ্বন্দ্ব থেকে গেছে, যুদ্ধের ভিতর দিয়া এগুলার সমাধানের সময় পাওয়া যায় নাই।

তবে এখানে আমার একটা ব্যাপার মনে হয়, আমি বিষয়টা একটু ভেঙে বলি, আমরা যদি কিউবার দিকে লক্ষ্য করি তা হলে দেখব, প্রথমে সেখানে ফিদেল ক্যাস্ট্রোর নেতৃত্বে একধরনের প্রগতিশীল বুর্জোয়া আন্দোলন দেখা গেল। তাদের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন বাতিস্তা সরকারের পতন ঘটিয়ে ধীরে ধীরে পরিপূর্ণ প্রগতিশীল সমাজব্যবস্থার দিকে নিয়ে যাওয়া হলো, মানে ফিদেল ক্যাস্ট্রো ওই দিকে দেশটাকে নিয়ে গেলেন। স্বাধীনতার পর-পরই আমাদেরও এমন লিডারশীপের প্রয়োজন ছিল, আমরা বোধহয় তা পাইনি। আপনার মন্তব্য জানতে চাচ্ছি।

আমাদের নেতৃত্বের প্রকৃতি কিউবার মত ছিল না। যে মূল নেতৃত্ব আমাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের সময় পরিচালিত করেছিল তাদের আদর্শিক অবস্থান কোনো গোপন বিষয়ও ছিল না। তারা কিছু লুকায় নাই, তারা তাদের আদর্শের বিষয়ে পরিষ্কারভাবে বলেই নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত হয়েছিল। এটা তো সত্যি যে, আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলন ৭০-এর নির্বাচন পর্যন্ত সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন ছিল না, এটি ছিল পাতি বুর্জোয়ার নেতৃত্বে দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। সঙ্গে উঠতি বুর্জোয়ারাও ছিল। প্রগতিপন্থী  জাতীয় ইস্যুগুলাকে শনাক্ত করা বা আগায়া নিয়া যাওয়ার ক্ষেত্রে বাম দলগুলা চিন্তার সমন্বয় বা নানান বিষয় চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে কাজ করেছে। কিন্তু তাদের কাঠামোগত বা সাংগঠনিক দুর্বলতার দরুণ তারা মূল নেতৃত্বে যেতে পারে নাই। স্বাধীনতার বিষয় নিয়া কথাবার্তা বলা বা কাজ করা, বামদলগুলো কিন্তু বহু আগে থেকেই করছিল। অনুমান করি যে, এদের কাজের ফলে সমাজতন্ত্রের ধারণার বিষয়ে মানুষের মধ্যে হয়তো এক ধরনের আগ্রহ তৈরি হয়েছিল, হয়তো আকাক্সক্ষারই জন্ম হয়েছিল। যে-কারণে আওয়ামী লীগ সমাজতন্ত্রের কথা বলতে শুরু করেছিল। সংবিধানে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে সমাজতন্ত্রকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এর কারণ তো স্পষ্ট যে এই আইডিয়াটা নিশ্চয়ই পপুলারিটিও অর্জন করছিল। কিন্তু এটুকুই। এই দেশের মানুষের ব্যাপারে একটা বিষয় আপনি খেয়াল করবেন, তারা রুটি-রুজির জন্য আন্দোলন করে না; বড় বড় বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী বিষয় নিয়া আন্দালন করে, ভাষার জন্য আন্দোলন করেছে, জাতিগত সম্মানের জন্য আন্দোলন করেছে, কিন্তু মজুরির ব্যাপারে, ভাত কাপড়ের ব্যাপারে, কাজের ব্যাপারে আন্দোলন দানা বান্ধে নাই! সেই রকম কিছু হলে বামদলগুলো আন্দোলন-সংগ্রাম করতে পারত, নেতৃত্বে চলে আসতে পারতো। কথা হচ্ছে, তখন আন্দোলনটা ছিল বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদী ধারার এবং এর নেতৃত্বে ছিল আওয়ামী লীগ। স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ বললো সমাজতন্ত্র করলে তারাই করবে। আওয়ামী লীগের এই অবস্থান পরিবর্তনের ফলে অন্য বামদলগুলার সমস্যা হয়ে গিয়েছিল। কারণ আওয়ামী লীগের যে জনসমর্থন ছিল তা ছাপিয়ে বামদলগুলার প্রগতিশীল সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ায় কঠিন ছিল।

৭১-এ আপনার বয়স কত ছিল আর যুদ্ধবিষয়ক আপনার স্মৃতিটাই-বা কেমন?

তখন কিন্তু আমি যুদ্ধে যেতে পারতাম, তখন আমার বয়স ছিল ১৯ বছর। কিন্তু যাওয়া হয় নাই। এটা খুবই সংক্ষিপ্ত একটা যুদ্ধ ছিল। ইনটেনসিটি হয়তো খুব বেশি ছিল। যুদ্ধটা যদি আরও দীর্ঘ হইতো, তাহলে আরও অনেক লোক মুক্তিযোদ্ধা হইতো। একটা যুদ্ধে মোবিলাইজেশনের জন্য যে সচেতন প্রস্তুতি দরকার, আমাদের তা ছিল না। তবে এর ভিতরই একটা ছোট সচেতন ও সক্রিয় অংশও ছিল। আমরা যুদ্ধের মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম। এ কারণেই হয়ত পাকিস্তানি সামরিক সরকারের পক্ষে ২৫ মার্চের রাতের এত বড়ো একটা ম্যাসাকার ঘটানোর পরিকল্পনা করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু এ জাতি পাকিস্তানি মিলিটারি হত্যাকাণ্ড চালানোর পরপরই ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল। কিছু অংশ সরাসরি যুদ্ধে গেল, তাদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে; জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের নিজস্ব একটা গতিশক্তি থাকে, দাবানলের মত, একবার শুরু হইলে এ নিজে নিজেই ছড়ায়, আমাদের মুক্তিযুদ্ধে তাই ঘটছিল। আমার প্রাথমিক পারিবারিক বিষয়গুলা গুছায়া নেওয়ার পর, আমি ঢাকায় এসে একা বাস করছিলাম এবং পথ খুঁচ্ছিলাম যুদ্ধে যাওয়ার। অথবা হয়তো বলা মুশকিল কি করতাম, হয়তো যুদ্ধে যেতামই না, হয়তো সে সাহসই ছিল না, কারণ কত লোকই তো যেতে পারলো, মরেও যেতে পারলো, মহল্লায় বান্দর ... গল্পের আব্দুল হালিম কিন্তু আমার পরিচিত, ওর নাম আসলে কাঞ্চন, যুদ্ধ জয়ের পর ফেরার পথে বুড়িগঙ্গায় নৌকা ডুবে খামাখা মরে যেতে পারলো, আমি পারলাম না!  তবু মনে হয় যে, আমি হয়তো যুদ্ধে যেতাম, কিন্তু যুদ্ধ আমার জন্য অপেক্ষায় থাকে নাই, কোন দিক দিয়ে কীভাবে যাব, এ-সব করতেই করতেই যুদ্ধ কিন্তু শেষ হয়া গেল।

আপনার বাবাতো সরকারি চাকরি করতেন?

হ্যাঁ, আমার বাবা সরকারি চাকুরি করতেন। থানা লেভেলে সার্কেল অফিসার উন্নয়ন নামে তখন একটা পদ ছিল। পঁচিশে মার্চ রাতে তিনি আমাদের সঙ্গে ঢাকাতেই ছিলেন। তিনি যুদ্ধে না গেলেও ২৫ মার্চের পর চাকরি করেন নাই। তবে যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণের তুলনায় সে-সবকে তো বড় ব্যাপার বলা যায় না। অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করাটাই তখন অনেক বড় ব্যাপার ছিল।

তখন আপনি কোথায় ছিলেন?

যুদ্ধের শুরুর দিকে ঢাকায় নয়াটোলাতে আমাদের বাসায় ছিলাম। আমার মেঝ ভাইটা ছাড়া আমরা সকলেই তখন এখানে। তারপর ধরেন ২৫ তারিখের পর অন্য দিকে চলে যাই। কারণ ঢাকা তখন ছিল চরম অনিশ্চিত আর নিরাপত্তাহীনতার শহর। সেই সময়, হয়তো ছাব্বিশ কিংবা সাতাইশ তারিখে দেখলাম মহল্লার সব লোকজন চলে যাচ্ছে। আমরা তখন বাড্ডায় একটা বাসায় যায়া থাকলাম একটা রাইত, আসলে আমার পরিবার, মা বাপ ভাই বোন যায়া  থাকলো, আমি এবং অন্য বাসার একজন লোক আমাদের গলির বাসাগুলা দেখে রাখার জন্য মহল্লায়ই থাকলাম। রাইতে আমি এই লোকের বাসায় যায়া ঘুমালাম এবং সেখানে আমার একটা মজার অভিজ্ঞতা হয়। দুই এক দিন পরে, একটা পর্যায়ে আমরা বুঝলাম এখানে থাকা যাবে না, পরে জিঞ্জিরার দিকে চলে গেলাম। সেখানে পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যাকাণ্ডের পরে আমরা আবার ফিরে এলাম। জিঞ্জিরার কথা আমি ভুলতে পারি না। আমার লেখায় বার-বার জিঞ্জিরার কথা আসে।

ওই ম্যাসাকার ঠিক কী ধরনের ছিল?

জিঞ্জিরায় থাকলাম একটা বাসায়, চরাইল নামের একটা গ্রামে একদিন থাকলাম, পরের দিন বের হয়া আসতে হইলো। দ্বিতীয় দিনের খুব সকালে পাকিস্তানি মিলিটারি তাদের অপারেশন শুরু করে, জিঞ্জিরার কোথাও বুড়িগঙ্গা নদীর কিনারা থেকে মিলিটারিরা গানবোট দিয়া গোলা ছোড়ে। হয়তো এটা অপারেশন শুরু করার সিগনাল ছিল। তার আগেই পায়ে হাঁটা সৈনিকেরা তাদের অবস্থান গ্রহণ করেছিল। তখন প্রচণ্ড শব্দ করে গোলা ফাটলো। আমরা সকলে তখন ঘুমের মধ্যে ছিলাম, গোলার শব্দে জেগেই দেখি এই বাসায় আশ্রয় নেওয়া পনর বিশটা পরিবারের সকলে বাসা থেকে বের হয়া কোথাও পালায়া যেতে চাচ্ছে। এবং আমি দেখলাম আমার আব্বা সকলকে নিয়া বারায়া যাচ্ছে, তখন চিন্তা করার সময় ছিল না, হয়তো মনে হয়েছিল এই দুর্যোগের জায়গা থেকে ভেগে আরো দূরে কোনো দিকে চলে যাব আমরা। ফলে কোনো কিছু ভেবে ওঠার আগেই দেখলাম আমি আমার পরিবারের সকলের সঙ্গে মাঠের ভিতর দিয়া দৌড়াচ্ছি। তখন মাঠে ফসল ছিল না, হয়তো কেবল কোনো একটা ধান কাটা হয়া গেছিল, হয়তো আউস, কিন্তু মাঠের মধ্যে তখনো ধান গাছের মোথাগুলা রয়া গেছে। আমার পরিষ্কার মনে আছে আমার মা তার দুই হাত দিয়া বুক চেপে ধরে আছে আতঙ্কে, আব্বার কোলে আমার ছোট ভাই এবং আমার কোলে আমার একদম ছোট বোন। আমি দেখতে পাচ্ছিলাম মাঠের ভিতর দিয়া ট্রেসার বুলেটের মত লাল গুলি চলে যাচ্ছিল, পাকিস্তানি মিলিটারি হয়তো তাক করে গুলি ছুড়ছিল না, কিন্তু এগুলা ফাকা গুলিও ছিল না, মাঠের ভিতর দিয়া পলায়নরত মানুষের শরীরে লাগার মত করেই এগুলা এলোপাতাড়িভাবে ছোড়া হচ্ছিল। আমার মনে আছে, যেদিক থেকে গুলি আসছিল আমি আমার বোনটাকে কোলের উল্টা দিকে নিলাম, কারণ, মনে হয়েছিল তাহলে গুলি লাগলে আমার গায়েই লাগবে আমার বোনের গায়ে লাগবে না। যাহোক, তখন দেখা গেল যে দৌড়ায়া অন্য কোথাও পলায়া যাওয়ার রাস্তা নাই, মিলিটারি বৃত্ত তৈরি করে নিয়েছিল, আমার দেখলাম দূরে আমাদের সামনের দিকেও মিলিটারি আছে। তখন আমরা অন্য একটা অপরিচিত বাসায় যায়া উঠলাম। একতলা দালান, কিন্তু নিচা ধান ক্ষেত থেকে লম্বা সিঁড়ি বায়া এখানে উঠতে হয়। সেদিন শুক্রবার ছিল। দুপুর পর্যন্ত অপারেশন চললো। তারপর আমরা পুনরায় চরাইল গ্রামে চেয়ারম্যান বাড়িতে ফিরা গেলাম। যায়া দেখি অন্য সকলেও ফিরা আসছে। হয়তো দুই একজনকে পাওয়া গেল না। সেদিন রাত কাটায়া পরদিন আবার ঢাকায় চলে এলাম, মগবাজার, নয়াটোলায়। সম্ভবত এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে আমার পরিবারের সঙ্গে আমি গ্রামের বাড়ি চলে যাই। সম্ভবত জুলাই আগষ্টে আমি আব্বার সঙ্গে আবার ঢাকা আসি, তারপর আব্বা সিরাজগঞ্জে ফিরা যান, কিন্তু আমি ঢাকায় একা থেকে যাই।

এই বিষয়টা নিয়ে কথা বলতে হয় এই জন্য যে, এ তো আমাদের সামগ্রিক সত্তার সাথে মিশে আছেই; তারপর কথা হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধ আপনার লেখালেখিতে ধারাবাহিকভাবে আসছে। আপনার দ্বিতীয় ও তৃতীয় গল্পগ্রন্থে এবং প্রথম দুইটি উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টা গভীরভাবে এসেছে। এও বলা যায়, আপনি নিত্যমুক্তিযুদ্ধময়। আমরাও কিন্তু ওই সময় দেখেছি, আমিই নিজে তখন ক্লাস ফাইভে পড়লেও খেয়াল করতে পারতাম যে কলেজের শুধু নয়, হাইস্কুলের ছেলেরাও পলিটিক্সে জড়িয়ে পড়ছে। আপনি কি তখন কোনো ধরনের রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েছিলেন?

পড়ি নাই। স্কুলে আমি ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়ায়া পড়ি নাই। ক্লাশ ফাইভ পর্যন্ত আমি ঢাকায় ছিলাম, তারপর পুরাটা সময় আমি আমার বাপের সঙ্গে গ্রামে-গ্রামে ছিলাম, প্রথমে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া, তারপর চিটাগাংয়ের সাতকানিয়ায়। আমার খেয়াল পড়ে না যে এই থানা সদরের গ্রামগুলাতে স্কুলে তখন রাজনীতি কেউ প্রবলভাবে করত। ফুলবাড়িয়ায় কোনো কলেজ ছিল না, সাতকানিয়ায় কলেজ ছিল, সেখানে ছাত্র রাজনীতি হইতো, কিন্তু স্কুলে তখন আমি রাজনীতি দেখি নাই। ফলে, আমার বাবাকে কোনোদিনই, একবারের জন্যও আমাকে রাজনীতির বিষয়ে কিছু বলতে হয় নাই। বলতে হয় নাই, রাজনীতি কইরো না বা করতে পারো। তবে উনসত্তরের উত্তাল সময়টাতে আমি সিলেটের মাধবপুরে বসে আছি সাতকানিয়ায় যায়া ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়া আসার জন্য। আব্বা তখন বদলি হয়া মাধবপুরে। তখন মাধবপুরে মিছিল দেখেছি। কিন্তু আমি মাধবপুর স্কুলের ছাত্র ছিলাম না। ফলে এই স্কুলে ছাত্র রাজনীতির অবস্থা কী ছিল আমার জানা নাই। অবশ্য আব্বার চাকরিস্থলে স্কুলে ছাত্র রাজনীতি থাকলে এবং তাতে জড়াইতে চাইলে আমার মনে হয় না সম্ভব হইতো। তবুও আমার মনে হয় যে বাবার চাকুরিজীবন আমাকে খুব একটা প্রভাবিত করে নাই। আমার মনে পড়ে যে, এইসব জায়গায় আমি আব্বার পরিচয়ে চলার চেষ্টা করতাম না। বিশেষ করে মাধবপুরে অনেকে জানতোই না আমি কে। আমার আসলে রাজনৈতিক সচেতনতা আসে কলেজে ঢোকার পরে। যখন আমি ঢাকা কলেজে পড়ি, লাল বই পড়া শুরু হয় তখন। পকেট সাইজের বই লাল প্লাস্টিকের মলাট দেওয়া। আমার কয়েক বন্ধুর সঙ্গে আমি ছাত্র ইউনিয়ন করতে শুরু করলাম। এ সম্পর্কে আমি এখনও সিয়োর না যে কেন আমি ছাত্র ইউনিয়ন করা শুরু করলাম, কেন ক্রাউডের সঙ্গে গেলাম না। অথবা হয়তো তখন স্বপ্ন ছিল, হয়তো মাও সেতুংয়ের লেখা ডাক্তার নরম্যান বেথুনের জীবন প্রভাবিত করেছিল, হয়তো প্রভাবিত করেছিল মাওয়ের এই কথা যে- ‘কিছু কিছু মৃত্যু আছে হাঁসের পালকের মত হালকা, অর্থাৎ অর্থহীন এবং কিছু কিছু মৃত্যু আছে স্থায়ী পাহাড়ের মত ভারি।’ তবে সত্য হচ্ছে সংঘের জীবন আমার জন্য ছিল না।

তখন তো ছাত্র ইউনিয়নের বেশ কিছু গ্রুপ ছিল, আপনি কোন অংশের সাথে ছিলেন?

আমি মেনন গ্রুপ করতাম। মেনন তো তখন ছাত্র ছিলেন না, তখন মাহবুবউল্লাহ বা অন্যরা ছিলেন। আমি পোষ্টার লিখেছি, মিছিল মিটিংয়ে গেছি, বিশেষ করে মওলানা ভাসানীর মিটিংয়ে। মনে আছে সম্ভবত সত্তরের অক্টোবরে তখনকার রেসকোর্সে মওলানা ভাসানীর বিরাট মিটিংয়ে যায়া আমরা কাকের মত ভিজলাম। অক্টোবরে কেন বৃষ্টি ছিল মনে পড়ে না। আমি ফর্মালি ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য হয়েছিলাম কিনা আমার ঠিক মনে নাই। আব্বা এসব জানতেন কিন্তু আমাকে কখনো কিছু বলেন নাই। মেনন ছাত্র ইউনিয়ন সম্ভবত স্বাধীনতার আগেই ভেঙে যায়। পূর্ববাংলা ছাত্র ইউনিয়ন আর বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন হয়। একদিকে মাহবুউল্লাহ, নুর মোহাম্মদ খান, অন্যদিকে আতিকুর রহমান সালু, এরা। আমি পূর্ববাংলা ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে থাকলাম। একই  সাথে কমিউনিস্ট পার্টিও কিন্তু ভাগ হচ্ছে। এইদিকের কমিউনিস্ট পার্টিতে ছিল দেবেন সিকদার, আবুল বাশাররা। আমার মনে হয় যে, সংগঠন করতে পারার দক্ষতা আমার এমনিতেই কম ছিল, তার উপরে ভাঙাভাঙির এই প্রক্রিয়ায় আমি আর তাল মিলাইতে পারি নাই। এইসব স্পি­ন্টার গ্র“প একে অন্যকে যে ভাষায় আক্রমণ করতো তা ছিল এক কথায় ভয়াবহ, ঢাকার দেওয়ালের চিকার বক্তব্য এবং ভাষা পড়লেই সেটা বোঝা যাইতো। এ-সবের ভিতর নিুপর্যায়ের কর্মীদের পক্ষে কাজ করা মুশকিলই ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অধিকাংশ সময় তাই ছাত্র রাজনীতিতে আমি আর সক্রিয় ছিলাম না। তারপর তো চাকরিতেই চলে গেলাম।

একটা বিষয় আমি ভাবছি, আপনি তো সরকারি কর্মকর্তার সন্তান, আপনি নিজেও এখন তাই, মানে একহিসেবে আপনি একধরনের অফিসিয়াল স্ট্রাকচারের ভিতরই জীবনযাপন করছেন। কিন্তু আপনার লেখালেখিতে এর কোনো প্রভাবই নেই। আপনার সামগ্রিক জীবনটা একরকম আবার লেখার জীবনটা আলাদা; একদম পরিচ্ছন্নভাবে এত আলাদা হয়ে থাকা কী করে সম্ভব হচ্ছে!

এটা এই রকমই দাঁড়ায়া গেছে। অফিসিয়াল স্ট্রাকচারের মধ্যে জীবনযাপনের কথাও ঠিক। বাপের চাকরি নিয়া আমার কখনো সমস্যা হয় নাই, আমার বাপ চাকরি করেছে, আমি স্কুল জীবনে সঙ্গে থেকেছি, কিন্তু কোনো অসুবিধা হয় নাই, তখনো আমার নিজস্ব একটা ভুবন ছিল। আমার নিজের চাকরির ব্যাপারে বলা যায় যে, আমি প্রবন্ধ লিখি না, লিখি ফিকশন। দ্বিতীয়ত, সরকারি চাকরির যে প্রথম দাবী কর্মক্ষেত্রে নৈর্ব্যক্তিক নিরপেক্ষতা, আমার ধারণা আমি তা রক্ষা করতে সক্ষম এবং রক্ষা করেছি। তাছাড়া আমার সাহিত্য জীবনের শুরু সরকারি চাকরিতে ঢোকার অনেক আগে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে বিষয়বস্তুর দিক দিয়া  আমার লেখায় চাকরিজীবীর জীবনের প্রসঙ্গ কেন নাই, বা খুবই কম কেন, যদিও আমার বাপ চাকরিজীবী ছিল এবং আমি নিজেও তাই। এটা কাকতালীয় হয়তো না। আমি যখন থেকে সিরিয়াসলি সাহিত্য চর্চা শুরু করি, তখন মার্কসীয় দর্শনের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়া গেছে, আমার এমন মনে হয়া থাকতে পারে যে, এই মনে হওয়াটা ভুলও হইতে পারে, হয়তো মনে হয়েছিল সাহিত্যে সাধারণ জীবনের সন্নিবেশ বেশি থাকা প্রয়োজন। তবে আমার মনে হয় চাকরি জীবন কিংবা চাকরিজীবীর জীবন ভালো সাহিত্যের উপাদান হইতে পারে, রাহাত খানের রচনায় যেমন আমার মনে হয় কখনো কখনো থাকে। আমি হয়তো কখনো এই জীবন নিয়া লিখব, অথবা হয়তো লেখা হবে না, ঠিক জানা নাই। এখানে লেখকের সক্ষমতারও একটা ব্যাপার আছে। দুইটা বিষয় হয়তো এরকম পরিচ্ছন্নভাবে আলাদাই থেকে যেতে পারে।

আচ্ছা, এবার আপনার প্রথম গল্পগ্রন্থ পারাপার নিয়ে কিছু কথা বলি- আমার এই মুহূর্তে যদ্দূর মনে পড়ছে এতে আছে পাঁচটি গল্প- মাটি ও মানুষের রং, তোরাব শেখ, ঘেয়ো রোদের প্রার্থনা নিয়ে, পারাপার আর ভালোবাসা। এইগুলোতে শহুরে মধ্যবিত্ত বা মানুষের জীবন তেমন আছে কি?

হয়তো নাই, সে অর্থে আমার লেখালেখিতেই শহুরে নাগরিক তেমন নাই। শহুরে ঢাকাইয়া আছে। পারাপার বইটাই গরিব লোকদের নিয়া লেখা, শহরের গরিব, গ্রামের গরিব। ভালোবাসা গল্পটা বাবুপুড়া বস্তি এলাকার গল্প।

পারাপার-র প্রথম গল্প তো মাটি ও মানুষের রং, এটি নিয়ে কিছু কথা আমি বলতে চাই- এখানে আম্বিয়া নামের মেয়েটি বাপের বাড়ি বেড়াতে এসে তার কোলের বাচ্চা লালকে নিয়ে পাশের বাড়িতে বেড়াতে গেল, তখন প্রতিবেশি চাচী সম্পর্কের মহিলা আম্বিয়াকে বলে- আম্বিয়া বা ওর স্বামীওতো কালো; তাহলে তাদের বাচ্চাটা লাল হলো কী করে। তখন আম্বিয়া জানায় যে, ওরা বাচ্চার বাবার ন্যাংটি ওদাম করে দেখলে বুঝত, ওর সাথে মেলামেশা করলে এদের বাচ্চাও এমন লাল হতে পারত। তখন এই নিয়ে চাচী তাকে ছিনাল বলে গালি দেয়। আমার কাছে মনে হয়েছে এটা বাংলাদেশের জনসংস্কৃতির নিবিড় পাঠ থেকেই ভাবনাসমূহ উঠে এসেছে। এই জায়গাটা আমার খুবই প্রিয়। এ ব্যাপারে আপনার মতামত জানতে চাচ্ছি।

ধন্যবাদ, বিষয়টা লক্ষ্য করার জন্য। এই গল্পটা অবশ্য আমার লেখা প্রথম গল্প না। যাহোক সন্তানের জন্ম নিয়া কথা বলা, আপনি যেমন বললেন আমাদের জনসংস্কৃতি, তার অংশ। বিশেষ করে গ্রামের মানুষের। শহুরে সমাজের আচরণে একটা আবরণ থাকে, এটা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সুবিধাজনক ভণ্ডামি, গ্রামের জীবনে আবরণ রাখা মুশকিল। গ্রামে গেলে হয়ত আপনাকে জিজ্ঞাস করবে, আপনের বেতন কত? গ্রামের মানুষজন অলওয়েজ ইনফর্মড থাকতে চায়। ইনফর্মেশনের অনেক কিছু আসে সরাসরি, অনেক কিছু আসে গল্পগুজবের ফলে। শহরের লোক আনইনফর্মড থাকার ভান করে, কারণ তার জন্য এটা আরামদায়ক, ব্যক্তিগত বিষয়ের নাম করে শহরের লোক নিজের দুর্বলতা ঢেকে রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু তারাও অবশ্যই গসিপ মংগার, তারা বরং গ্রামের লোকদের চাইতেও খারাপ এই অর্থে যে, তারা কাউকে প্রশ্ন করে না, গ্রামের লোকদের মত তারা সামাজিক বিষয়ে গুজব এবং গালগল্পের উপর বহুলাংশে নির্ভর করে। বাচ্চা নিয়া কথা বলা, মানে বাচ্চার জন্ম নিয়া কথা বলা, নোংরামি করা, কাউকে আঘাত করার বেশ মোক্ষম একটা অস্ত্র বলে আমার মনে হয়। এটা আমাদের জাতীয় বিষয়, এখানে শহর কিংবা গ্রামের পার্থক্য সামান্য। সেকারণে সব মা এবং মায়ের পরিবার দেখবেন সব সময় এটা বোঝানোর চেষ্টা করে যে, বাচ্চাটা ওর বাবার মত হয়েছে, রঙটা বাপের মত, কিংবা কানগুলা বাপের মত দেখতে, কিংবা বাপের মত করে হাসে। কখনো বলে না বাচ্চাটা মার মত দেখতে, কারণ সেটা প্রমাণ করার কিছু নাই। এখানে ভয় কাজ করে, ভয়টা সামাজিক, নোংরা এবং বিভৎস, সন্তানের জন্মদান একসময় শুধুমাত্র জৈবিক ব্যাপার ছিল, মানুষ এটাকে অনেক কিছুর মতই জৈব-সামাজিক বিষয়ে রূপান্তর করেছে। এখন মানুষ নিজের তৈরি ফান্দের ভিতরে থাকে। মৌলিক কথা হচ্ছে প্রকৃতির বিচারে কোনো জন্মই অনাকাক্সিক্ষত না- সত্তা অনেক বড় ব্যাপার।

তাহলে পারিবারিক বন্ধন, সোশ্যাল ভ্যালুজ এ-সব সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কি?

কথা হচ্ছে, মানুষ শুধুই সত্যান্বেষী প্রাণি না। মানুষ নিজের প্রয়োজনে সমাজ, সংঘ ইত্যাদি তৈরি করেছে। এগুলা ফান্দের মত। মূল্যবোধের ফান্দও আছে। যাহোক, যৌথ বিবেচনা এবং মূল্যবোধের কাছে মানুষ তার অনেক ব্যক্তিগত বিবেচনা বিসর্জন দিয়েছে। ব্যক্তি এবং সমষ্টি একটা ইন্টার-এ্যাকটিভ পথ বায়া চলে। ব্যক্তি মেনে নেয় আবার সুযোগ পেলেই অন্য পথে যায় বা যেতে চায়, কিন্তু সমাজ বাধা দেয়। সমাজ মানুষকে একটা খাতের মধ্যে ধরে রাখে, নৈরাজ্য থেকে বাঁচায়, আবার ব্যাক্তির সঙ্গে ক্রমাগত সংঘর্ষের ফলে সমাজের এই বহমান ধারা পরিবর্তীত হয়। মানুষের মূল্যবোধের জীবন আমার কাছে খুবই জটিল একটা বিষয় বলে মনে হয়, মানুষ ফেরেশতা কিংবা শয়তান না, মূল্যবোধের দিক দিয়া মানুষ সব সময় সঠিক এবং সত্যের পথে থাকে না, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ হারামি দি গ্রেটও না। মূল্যবোধের মূল পরীক্ষাটা হয় যখন কোনো একটা সামাজিক জটিলতা নিজের জীবনে কিংবা নিজের পরিবারে সরাসরি উঠে আসে। অনেক মানুষ এই পরীক্ষায় ফেল করতে পারে, আমিও পারি, কারণ মানুষ পুরাপুরি শুদ্ধ জীবন যাপন করে না, সব সময় সত্যের সন্ধানে থাকে না, তা করতে পারে না, অনেক প্রাইমোরডিয়াল বিষয় মানুষের মাথার ভিতরে রয়া গেছে, ভয়, লালসা, ক্রোধ, শঠতা, হয়তো আত্মত্যাগও- সমষ্টির জন্য। সমাজ ক্রমান্বয়ে নরকযন্ত্রণার মত হয়া উঠতাছে, জর্জরিত হয়া যাইতাছে ব্যক্তি মানুষ, মানে আমরা, তবু মানুষ হয়তো তার প্রয়োজনেই আরো বহুদিন সমাজের মধ্যেই থাকবে, তুড়ি দিয়া এই সব বন্ধন এবং মূল্যবোধকে উড়ায়া দেওয়া যাবে না, তার দরকারও হয়তো নাই, কারণ সমাজহীন হইলেই মানুষের সঙ্কটের সব সমাধান হয়া যাবে এমন ভাবার কারণও দেখি  না।

ধুলোর দিনে ফেরা-র ওয়াহিদ আমার খুব প্রিয় এক চরিত্র, একধরনের মানবিক ইমোশন জড়িয়ে আছে এতে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ আর সামাজিক প্রেরণায় একটা অবস্থা এমনই হয় যে একটা সশস্ত্র সংগ্রামের তাড়না যেন বহমান ছিল, এর সীমাবদ্ধতাও আমি ভুলছি না। এই ধরনের ওয়াহিদরা কী কেবলই ব্যর্থ বলে মনে হয় আপনার?

একদমই ব্যর্থ মনে হয় না আমার, যারা একদা স্বপ্ন দেখেছিল, তাদেরকে ব্যর্থ বলতে পারি না আমি। গল্পের ভিতরে কিংবা বাস্তবে মরে যাওয়াই ব্যর্থ হয়ে যাওয়া না। আমাদের রাজনৈতিক সামাজিক ইতিহাস যারা জানেন, তারা জানেন ব্যক্তিগণ ব্যর্থ হয়ে গেলেও, এমনকি স্বপ্ন এবং প্রচেষ্টার ব্যর্থতার পরেও, আমাদের রাজনৈতিক এবং সামাজিক কাঠামো তৈরিতে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার এই স্বপ্ন ও প্রচেষ্টার ফলাফল একেবারে অদৃষ্টিগ্রাহ্য না। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ভিতরও কি দেখা যায় না? তারপরেও আমি বলছি না যে, আব্দুল ওয়াহিদরা সফল ছিল, তারা তা ছিল না, কিন্তু সেটাই শেষ কথা না।

আপনার গল্পসমূহে এমন কোনো চরিত্র কি আছে যা আপনার লাইফস্টাইলকে বহন করে?

গল্পকার বারে বারেই তার লেখায় নিজের কাছে ফিরা যায়, নিজের অভিজ্ঞতার ঘটনা থেকে ধার নেয়, নিজের প্রবণতাকে ব্যবহার করে, চরিত্র তৈরিতে। আমার লেখায় সব কল্পনার ফাঁক ফোকরের ভিতরে আমি আছি। আবার আমাকে নিয়াই আমার লেখা না। আমার লেখা আত্মজীবনী না। আমার একটা বড় সমস্যা হচ্ছে সোসাল স্কিলের অভাব, চরিত্রের কথা বললে, চতুর্থমাত্রা-র আব্দুল করিমের ভিতরে তার ছায়া আছে, যদিও আমি কোনোভাবেই আব্দুল করিম না, অথবা আব্দুল করিম, শহীদুল জহির না।

আচ্ছা, আপনি তো শহীদুল হক নাম নিয়েই লেখা শুরু করলেন, নামটা কেন বদল করলেন?

দেখা গেলো যে, শহীদুল হক নামে লোকে আমাকে চিনতে পারছে না, আমার লেখা ছাপানোর পরেও ভাবছে যে, আমি, আমি না। কারণ, তখন অন্য একজন শহীদুল হক ছিলেন, টাইমসের সম্পাদক, লেখালেখি করতেন, আরেকজন আছেন শহীদুল হক খান। এদের দুই জনের সঙ্গে আমাকে প্রায়ই গুলায়া ফেলা হচ্ছিল। আমি বুঝলাম যে, এরা আমার সমস্যার জন্য নিশ্চয়ই তাদের নিজের নাম বদলাবেন না, আমি অখ্যাত, আমাকেই বদলাইতে হবে। জহিরউদ্দিন আমার দাদার নাম।

এবার ভিন্ন প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলা যাক, ইদানীং আপনার লেখায় লক্ষ্য করা যায়, ভাষার কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। আপনার কি মনে হয় আমাদের বাংলাদেশের তথা পূর্ববাংলার ভাষার কোনো পরিবর্তন দরকার।

ভাষা নিয়া পূর্ববঙ্গ-পশ্চিমবঙ্গ বিতর্কে আমি যেতে চাই না। আমি শুধু বলতে চাই যে, ভাষা শুধু ব্যবহার নয়, ভাষায় অংশগ্রহণের অধিকার আমার আছে। তোরে একটা ভাষা দিলাম ব্যবহার কর, কিন্তু খবরদার নষ্ট করবি না- ব্যাপারটা এই রকম হইতে পারে না। কেউ কেউ এরকম ভাবে হয়তো, ফলে তারা পাহারা দেওয়ার চেষ্টা করে। আলাদা হওয়ার চেষ্টা বা প্রয়োজনীয়তা না, বাংলাভাষার প্রবাহমানতার স্বার্থেই ভাষায় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। তবে এ বিষয়ে শতর্ক থাকার প্রয়োজন আছে, কিন্তু তার মানে এই না যে, ভয় পায়া হাতপাও গুটায়া বসে থাকা লাগবে। আমি আগেই বলেছি, প্রয়োজন মনে করলে ভাষায় অংশগ্রহণের অধিকার আমার আছে। এটাকে আমি বলতে চাই, রাইট টু পার্টিসিপেট। এটা প্রপাগাণ্ডার বিষয় না, এটা প্রয়োজনীয়তার  বিষয়। এখন কথা হচ্ছে এই রাইট টু পারটিসিপেশনের কারণে ভাষা বদলায়া যাইতে থাকলে কি হবে? ভাষা পরিবর্তন হওয়া দরকার, নাকি দরকার নাই? ভাষাতো নিশ্চয়ই চিরস্থায়ী আসমানি কোনো ব্যাপার না, আমার জীবনের অভিজ্ঞতা, জীবন যাপন পদ্ধতি, আচরণ, কাজ এবং অকাজ, সংস্কার এবং কুসংস্কার, আমার বুলি এবং গালি আমার ভাষায় আসবে না? গল্প লিখিয়ে হিসেবে আমার মনে হয়েছে আমাদের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ভাষা রক্তাল্পতায় আক্রান্ত এবং জীর্ণ হয়া গেছে। ভাষার এই প্রবাহে নতুন পরিসঞ্চালন লাগবে। আমি কথা সাহিত্যের শুধু সংলাপ না, টেকস্টের ক্ষেত্রেও নতুন বাক্য বিন্যাস এবং ভাষা প্রয়োগ করতে চাচ্ছি। এই চাওয়ার সঙ্গে বর্তমান বাংলা ভাষাকে ফেলে দেওয়ার, নাকচ করে দেওয়ার কোনো ব্যাপার নাই, এর সঙ্গে বিভাজনের চিন্তা কিংবা দুশ্চিন্তাও আমার নাই। নদী নদীই থাকে, কিন্তু নদীকে বহমান থাকতে হলে অনেক পানি জোগাড় করতে হবে। ভাষাতত্ত্ববিদরা এসব অনেক ভালো জানেন। বাংলা ভাষার এই নদী কোন ঘাট থেকে কোন ঘাটে এসেছে, তা আমাদেরও জানা আছে। মান চলতি ভাষাকে ভেঙে ঢাকার মানুষেরা একটা শোভন ব্যবহারিক কথ্য ভাষা তৈরি করেছে, এখনো করছে। আমাদের প্রয়োজনেই আমরা এই ভাষাটাকে তৈরি করেছি। আমার মনে হয় যে, এটা আমাদের জীবনের প্রাণবন্ততাকে ধারণ করতে পারছে। আমি এটাকে গল্পের টেকস্টের গদ্য হিসেবে ব্যবহার করতে আগ্রহী, পুরাতন ভাষার জীর্ণতা আমার ভালো লাগছিল না। প্রবন্ধের গদ্যে এটা ব্যবহার করার বিষয়ে হয়তো আমাকে আরো ভাবতে হবে, যদিও ব্রাত্য রাইসু এবং এবাদুর রহমান এবং আরো অনেকে ব্যবহার করছেন, এবং আমার খারাপ লাগছে তাও বলতে পারি না। এটা একেবারে আঞ্চলিক গ্রামীণ ভাষা নয়, আঞ্চলিক গ্রামীণ ভাষায় ইতিপূর্বে ইমদাদুল হক মিলন একটা গোটা উপন্যাসই লিখে ফেলেছিলেন। সৈয়দ হক লিখেছিলেন তার অসাধারণ পরাণের গহীন ভিতর- আমারে সুন্দর তুমি কও নাই কোন একদিন, ইত্যাদি। তবে মনে রাখতে হবে সৈয়দ শামসুল হক পল্লী কবি নন, এবং তার পরাণের গহীন ভিতর-ও পল্লী কবিতা না, তিনি শহুরে আধুনিক কবি এবং এই বই আধুনিক কবিতার বই। যাহোক আমি ঢাকার শোভন নাগরিক ভাষাটাকে টেকস্টে ব্যবহার করতে চাই। যে ভাষাটা আনিসুল হক তার নাটকে ব্যবহার করেন।

আপনার সাহিত্যকর্ম নিয়ে আবারও কথা বলা যাক, আপনার গল্পের কৃৎকৌশল সম্পর্কে জানতে চাচ্ছি।

আমার লিখতে অনেক সময় লাগে। হুট করে শুরু করে গল্প নামায়া ফালানোর মেধা আমার নাই। দীর্ঘ দিন আগে বিচিত্রায় সৈয়দ শামসুল হকের ‘মার্জিনে মন্তব্য’ লেখার একটা বিষয় আমার কাছে খুবই প্রণিধানযোগ্য মনে হয়েছিল। তিনি লিখেছিলেন যে, কী লিখব তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, কী লিখব না সেটা ঠিক করাও একই রকম গুরুত্বপূর্ণ। আমি এই বক্তব্যের ফান্দে আটকা পড়ে আছি। আমার অনেক সময় লাগে কী-লিখব-না এর অরণ্য থেকে কী লিখব তা খুঁজে নিতে। দ্বিতীয়ত কী লিখব সেটা ঠিক করার পরও আমি অনেক সময় নেই, জিনিসটাকে ভিজতে দেই, কাই বানানোর আগে। লিখতে শুরু করার পরও অবশ্য অবয়ব বদলায়া যায় প্রায়ই।

আচ্ছা, আমি একজন সাধারণ পাঠক হিসেবেই বলতে পারি, আপনার গল্পে যে সমন্বিত চেতনাপ্রবাহের ধারায় ‘হয়ত-বা’ ‘মহল্লার’ বা ‘সুহাসিনী’র লোকদের অনবরত ব্যবহার করছেন, পাঠক এতে তো রিপিটেশনের ঝামেলায় ভুগতে পারে?

এইটা লেখার একটা পদ্ধতি। এটা তুলনামূলকভাবে নতুন একটা পদ্ধতি, এই পদ্ধতির রচনার একটা বৈশিষ্ট্য হলো একরৈখিক ধারা বর্ণনায় না যাওয়া। এই পদ্ধতিতে একটা বিষয়ের বর্ণনা ভেঙে ভেঙে আসে, ফলে যতবার একটা বিষয়ের বর্ণনায় লেখা ফিরা যায় ততবার একটু পুনরাবৃত্তি দিয়া শুরু হয়, তারপর নতুনভাবে আগায়া যায়। এখানে পাঠকের সর্তকতা লাগে, মনযোগের খুব দরকার হয়। সরলরৈখিক বর্ণনা ভঙ্গির চাইতে ব্যাপারটা পাঠকের জন্য একটু জটিল, কিন্তু গল্প বলার এই পদ্ধতি আমাদের মুখে গল্প বলার যে পদ্ধতি তার কাছাকাছি এবং আমার মনে হয় যে, এই পদ্ধতিতে সময় এবং ঘটনার বিভিন্নতলে এক সঙ্গে যাতায়াতের সুবিধা পাওয়া যায়, অনুক্রমিকভাবে একটা বিষয় শেষ করে আরেকটাকে ধরার দরকার হয় না, অনেকগুলা বিষয় জড়ায়া প্যাঁচায়া এক সঙ্গে আগায়া যাইতে পারে। আমার কাছে ব্যাপারটা খুবই সুবিধার লাগে, তবে এটা সরল পাঠ হয় না। দ্বিতীয়ত, গ্রাম বা শহরে যা ঘটে তা সুহাসিনী কিংবা ভূতের গলিতেও ঘটতে পারে, ফলে একটা নতুন গল্প বলার জন্য নতুন পটভূমি এবং নতুন জায়গার নাম ব্যবহার আমার কাছে অপরিহার্য মনে হয় না। সুহাসিনীতে যা ঘটতে পারে না, আমি অবশ্যই তা সুহাসিনীর নামে লিখব না, সুহাসিনীতে ডলু নদী নাই, পাহাড় নাই, আমি এই গল্প সুহাসিনীতে নিয়া যাই নাই, এই গল্প সুহাসিনীর পটভূমিতে চলতো না। এ ধরনের রিপিটেশনের কথা যদি বলেন, আমি তো  বিভিন্ন গল্পে চরিত্রের জন্যও একই নাম ব্যবহার করি, আমার মনে হয় পাঠক পার্থক্য করতে পারে, অসুবিধা হয় না।

আপনার উপন্যাস সে রাতে পূর্ণিমা ছিল-তে প্রকাশ পেয়েছে বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনা, এর আছে নানান তল, বাঙালির জাতিসত্তার এক চমৎকার আখ্যান এটি, এপিক ধাঁচের এক আবহ লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু এর শেষটি যেভাবে প্রতীকায়িতভাবে শেষ হলো তা যেন খানিকটা অসম্পূর্ণ মনে হয়। মানে আমি বলতে চাচ্ছি, মোল্লা নাসিরুদ্দীন আর দুলালির লাশ পাশাপাশি রেখে চাঁদের আলোয় কবর দিয়ে ওইখানেই সিম্বলিক করে কবর দেয়া হলো, এবং এটি শেষ করা হলো। আমার কথা হচ্ছে, উপন্যাসটির যে বেগময়তা, ধারাবাহিক উদ্দীপ্ত-স্বর, সেখানে এটাকে কি অন্যভাবে মানে পজেটিভ কোনো ব্যঞ্জনা রেখে শেষ করা যেত না?

তা আপনের মনে হইতেও পারে। এইটা কি লেখা তা আমি জানি না। কিন্তু লেখাটাকে অন্য কীভাবে শেষ করা যেত সেটাও আমার কাছে পরিষ্কার না। আমার মনে হয় এই উপন্যাসের শেষটা পজিটিভ না নেগেটিভ তাও আমার জানা নাই। রচনা ঠিকমত শেষ করতে পারাটা  আমার কাছে বেশ টাফ ব্যাপার মনে হয়। আমি বিষয়টা নিয়া অনেক চিন্তাভাবনা করার পরই এইভাবে শেষ করেছি। রচনাটা শুধু রাজনীতির না, প্রেমেরও, এবং একটা সমষ্টিক বিহ্বলতার। কোনো ব্যক্তির ক্যারিশমাকে ঘিরা এধরনের বিহ্বলতা মানুষের মধ্যে তৈরি হয়। এই উপন্যাসে তাই হইছে। সব গ্রামেই এরকম চরিত্র থাকতে পারে যাকে নিয়া বিভিন্ন কারণে গ্রামের মানুষেরা এটা তৈরি করতে পারে। আমার এই উপন্যাসের গ্রামের মানুষের বিহ্বলতা মূল চরিত্রের সঙ্গে একটা লাভ-হেইট সম্পর্কের জন্ম দিয়েছে, ব্যাপারটা এমন প্রকাশিত না হইলেও, লাভ-হেইট আছে, কিন্তু মূলত তারা বিহ্বল, ফলে তারা নিস্পৃহও, তাই মেরে ফেললে তারা তেমন কষ্ট পায় না, আবার কেমন ভালোলাগা থাকে। তারা বিভিন্ন গল্পের মিথ তৈরি করে, এবং এই গল্প কচলায়া এর মধ্যে বাস করে। আমি এখানে চান্দের আলোর একটা লৌকিক ভাওতাবাজির অবতারণা করে তার ভিতরে এই লাভ-হেইট এর ব্যাপারটাকে ঢুকায়া দিতে চাইছি। চান্দের আলোয় বিহ্বল হয়া পড়া আমাদের সমাজের একটা প্রিয় ভাওতাবাজির কথা, চন্দ্রাহত বলে একটা শব্দ আছে আমাদের, সম্ভবত ইংরেজি শব্দ moonstruck থেকে ধার করা। উপন্যাসে মোল্লা নাসির এবং দুলালির ভালোবাসার একটা গাঢ় মিথ তৈরি করা হয়েছে, এবং এই বিষয়টার প্রতি জনসমষ্টিকে আবেগপ্রবণ করে রাখা হয়েছে। উপন্যাসের পরিণতি রচনায় আমি এটা ব্যবহার করতে চাইছি, এবং এই পরিণতির ঘটনাও চান্দের আলোর নিচে ঘটে, ফলে এটার সঙ্গেও বিহ্বলতা ছিল হয়তো, এবং বলা হয়েছে যে, এই সময় মানুষ কী করে তা সে নিজেই বোঝে না, ফলে গ্রামের মানুষ আসলে তখন কী করে বা করলো বা কেন করলো সেটা পরিষ্কার না। অস্পষ্টতা অনেক সময় সাহিত্যের জন্য আরামদায়ক, এবং প্রয়োজনীয়, অনেক কিছু পাঠকের বিবেচনার উপরে ছেড়ে দেয়া সাহিত্যের জন্য মঙ্গলকর, পাঠক নিজেও সার্বভৌম, তার ব্যাখ্যাও গুরুত্বপূর্ণ, সাহিত্যকে সাহিত্য হইতেই হবে, এটা প্রথম শর্ত, সে জন্যই পজেটিভ নেগেটিভের বিবেচনা সাহিত্যে থাকার দরকার আছে বলে মনে হয় না। লেখা পজিটিভ হইতে পারে, নেগেটিভও হইতে পারে, কোনোটাও না হইতে পারে, সবকিছুই জীবনের অংশ, নেগেটিভিটিও জীবনের অভিজ্ঞতার বাইরের কিছু না।

না, না, পুরো ব্যাপারটা আমার একধরনের স্রেফ ভাবনার ব্যাপার আর-কি; আপনার ব্যাপারটা তো মৌলিকভাবেই আপনার।

আমার মনে হয় যে, পাঠক হিসেবে আপনের সব অধিকার আছে নিজের মত করে কোনো লেখার মূল্যায়ন করার। আমার মনে হয় সৃজনশীল লেখার একটা মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে পাঠককে সম্পৃক্ত করা, পাঠক আবার মন এবং মননের অধিকারী। উপন্যাসটার ফিনিশিং নিয়া এই ধরনের ভাবনা আপনের তো হতেই পারে। বইয়ের গল্পের ভিতরে রাজনীতি-সমাজনীতি ছাড়াও প্রেম কাহিনীর একাধিক স্রোত আছে, এ বিষয়ে হয়তো পাঠকেরও একটা সম্পৃক্ততা হয়। নাসির উদ্দিন দুলালি একটা স্রোত। এ ব্যাপারে পাঠকের গড়ে ওঠা ইমোশনও লেখক ব্যবহার করার চেষ্টা করতে পারে। ফলে লেখার শেষে এসে সুহাসিনীর গণ-ইমোশন এবং হয়তো পাঠকের ক্রমান্বয়ে তৈরি হওয়া ইমোশনেরও একটা গতি হয়। দুলালি গৃহীত হয়, অথবা গ্রামের লোকেরাই তাদের আবেগ চরিতার্থ করার জন্য মৃত্যু পরবর্তী এই আয়োজন করে। কবরে পাশাপাশি থাকার মধ্যে মৃত দুলালির নিশ্চয়ই কোনো সুখ হয় না। এটা মৃতদের নিয়া জীবিতদের ভাবনার ফসল মাত্র। তবে, আমার কথা হচ্ছে গ্রামের লোকেরা যা করেছে তা তারা চান্দের আলোর নিচে করেছে এবং বইয়ে বলা হয়েছে যে- এ সময় মানুষ বোঝে না সে কি করে।

উপন্যাসটির মূলচরিত্র মফিজুদ্দি-এ কেউ শেখ মুজিবের ছায়ারূপ লক্ষ্য করতে চান?

চাইলে ভুল করবে।

আমার তো মনে হয় এতে বিভিন্ন মেজাজের জাতীয় বুর্জোয়ার চেহারাই উন্মোচিত হয়। তো, এর পটভূমি সম্পর্কে বলুন?

মফিজউদ্দিন চরিত্রটা মূলত সামন্ত চরিত্র। আমার তাই ধারণা। আসলে দুইটা বাস্তব ঘটনা আমি আমার কাহিনীতে জোড়া লাগাইতে চাইছিলাম। প্রথমত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নিদারাবাদ গ্রামের এক হিন্দু পরিবারের ছয়জনকে সম্পত্তির জন্য  খুন করে ড্রামের ভিতরে পুরে চুন দিয়া নদীর পানিতে ফালায়া দেওয়া হয়েছিল। মরে যাওয়ার পরে তারা ড্রামের ভিতরে চুন দেওয়া মাংসের টুকরায় পরিণত হয়, বস্তু মাত্র হয়া দাঁড়ায়। কিন্তু এই লোকগুলার সকলের জীবন ছিল, একেকটা কাহিনী ছিল প্রত্যেকের। দ্বিতীয়ত আশির দশকে সামরিক শাসকের কালে আমি দেখেছিলাম কীভাবে বিপ্লবীদের পরিবর্তন হয়। আসলে একজন প্রাক্তন বিপ্লবীকে আমি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে কাজ করার সময় পাইছিলাম, তিনি একটা ভালো ডিগবাজি দিয়া এসে মন্ত্রী হয়েছিলেন। আমি অবশ্য আমার লেখায় বিষয়টা আনতে পারি নাই, লেখা আমার হিসাবের গণ্ডির মধ্যে থাকে নাই, থাকতে চায় নাই, আমার কিছু করার ছিল না, এটা আমার অক্ষমতা, ফলে একটা মফিজউদ্দিনের চরিত্র দাঁড়ায়া যায়। মফিউদ্দিনের পরিবর্তনের সঙ্গে বিপ্লবীর বদলায়া যাওয়ার বিষয়টা মেলে নাই। আমি অবশ্য জোর করি নাই। মফিজউদ্দিন একটা গ্রামের মাতব্বর একজন লোক, সে একসময় অগ্রগামী থাকে, অন্য সময় এতে বাধা দেয়। নিজে ভূমিহীনের পরিচয় থেকে সামন্ত আভিজাত্যে উঠে আসে, কিন্তু দুলালিকে গ্রহণ করে না, বলে- জোলার মেয়ে। সমাজের চলমানতা আটকায়া রাখার চেষ্টা করে। বিকাশের আকাক্সক্ষাকে বুঝতে পারে না।

আপনার গল্প তোরাব শেখের জেদ, অস্তিত্বের সঙ্কট, তা থেকে দাঁড়ানোর স্পৃহা, এসব মিলে মফিজুদ্দিনকে কি তোরাব শেখের এক্সটেনশন বলা যায়?

এভাবে আমি ভেবে দেখি নাই, অবশ্য আপনি বলার পর এখন মনে হচ্ছে বুড়া বয়সের মফিজুদ্দিনের সঙ্গে মিল থাকতে পারে, ম্যানারিজমের দিক থেকে। কিন্তু ওইটুকুই, এর বেশি মনে হয় না আমার। আমার মনে হয় না মফিজুদ্দিন তোরাব শেখের এক্সটেনশন হইতে পারে।

পারাপার-এর পরবর্তী সাহিত্যকর্ম তো জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা? এটির সম্পর্কে আপনার ভাবনা বা প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাচ্ছি।

পারপার-র গল্পগুলা লেখার পর আমি কিছু লেখা লিখেছিলাম, সেগুলা আমি বই আকারে পরে ছাপাই নাই। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে দেশের রাজনৈতিক আবহ এবং এই সময়ে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির প্রকাশিত একাত্তরের দালালেরা কে কোথায় পড়ে আমার মনের এমন একটা অবস্থা হয় যে, আমাকে জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা বইটা লিখতে হয়।

ওইটা তো শাহরিয়ার কবিরের সম্পাদনায় করা?

হ্যাঁ। আমার কাছে এই রাজনৈতিক সুবিধাবাদ ভালো লাগে নাই। তখন আমি বইটা লিখি। এবং তখন আমি মার্কেজের ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিচ্যুড পড়ে ফেলায়, তার কাছ থেকে জাদু বাস্তবতার রচনা পদ্ধতিটা নেই, আমার মনে হয় যে, আমি আমার কাহিনী তৈরিতে অনেক দূর পর্যন্ত স্বাধীনতা নিতে পারি, আমার কল্পনাকে সম্ভাব্যতার প্রান্ত পর্যন্ত নিয়া যেতে পারি।

তখন সৈয়দ ওয়ালীউলাহ তো নিশ্চয়ই পড়া ছিল আপনার?

হ্যাঁ ছিল। কিন্তু  সৈয়দ ওয়ালীউলাহ প্রথম পড়ে আমি যাদু বাস্তবতার বিষয় অনুধাবন করতে পারি নাই। যদিও এখন কাঁদো নদী কাঁদো বা চাঁদের অমাবস্যা পড়ে আমার মনে হয়েছে তার লেখায় ম্যাজিক রিয়েলিজমের ব্যবহার আছে। এবং আমার  মনে হয়, সৈয়দ ওয়ালীউলাহর লেটিন আমেরিকান সাহিত্য পড়া ছিল, হয়তো মার্কেজের বইও পড়া থাকতে পারে।

সৈয়দ ওয়ালীউলাহর লেখা কি তারও আগের নয়?

মনে হয় সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ যখন এসব বই লিখছেন তখন মার্কেজও লিখছেন, এটা আমার এখন মনে হয় যে সৈয়দ ওয়ালীউলাহর ম্যাজিক রিয়েলিজম সম্পর্কে ধারণা ছিল। যাই হোক, আমি পদ্ধতিটা ব্যবহার করি। এটা আমি পাই মার্কেজের কাছ থেকে।

এই লেখার একটা বিষয় স্পষ্ট যে এই উপন্যাসে শুধু স্বাধীনতা বিরোধীদের বিষয়টা দেখালেন, এটা নিশ্চয়ই দরকারি কাজ। তবে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম তো একটা মহাকাব্যিক আয়োজন বলা যায়, তো আপনার এই উপন্যাসে মুক্তিযোদ্ধা, জনগণের এতে অংশগ্রহণ, নানাবিধ ভোগান্তি এ-সবকে সার্বিকভাবে আনলে কি আরও প্রাণময় হতো না এটি?

পাতা গুনলে এটা খুবই ছোট একটা উপন্যাস। এখানে অনেক কিছু নাই, কিন্তু আবার অনেক কিছু হয়তো আছে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়া নিশ্চয়ই মহকাব্যিক উপন্যাস লেখা যেতে পারে। আমি যে পরিপ্রেক্ষিতে বইটা লিখি, তার জন্য হয়তো আমার মনে হয়েছিল যে এটুকু হলে হবে। আমি এটাকে টেনে লম্বা করতে চাই নাই। বইটা আমি নিজেই প্রকাশ করি।

এটি তো পারাপার-র পরেই প্রকাশ করলেন। তাহলে এটি তো মুক্তধারা থেকেই প্রকাশ করতে পারতেন।

মুক্তধারাকে দেই নাই। পারাপার-র পাণ্ডুলিপি আমি মুক্তধারায় জমা দিয়েছিলাম ১৯৮০ সালে। এটা প্রকাশিত হয় জুন ১৯৮৫-তে। জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা আমি প্রকাশ করি ১৯৮৭ তে। আমি পরিচিত বিখ্যাত লেখক ছিলাম না। ফলে প্রকাশক পাচ্ছিলাম না। মুক্তধারাকে দেই নাই এই ভয়ে যে, আবার ৫ বছর লেগে যাবে।

আচ্ছা, আমাদের বাংলা কথাসাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এমন কোনো মহাকাব্যিক আয়োজন কি আছে বলে আপনার মনে হয়?

মহাকাব্যিক আয়োজন মানে কি সেটাই হয়তো আমার কাছে পরিষ্কার না। হয়তো ওয়ার এন্ড পীস মহাকাব্যিক রচনা। দি ওল্ড ম্যান এন্ড দা সী-কে কি বলব? মহাকাব্যিক মানে কি বড়, বিপুল আয়োজন? যেটা দরকার তা হচ্ছে ভালো কিছু লেখা। মুক্তিযুদ্ধ নিয়া আমাদের কিছু ভালো সাহিত্য কর্ম আছে বলে আমার মনে হয়। ধরেন সৈয়দ শামসুল হক এবং মাহমুদুল হকের উপন্যাস, হাসান আজিজুল হকের গল্প, ইত্যাদি। আমার পড়ার বাইরেও নিশ্চয়ই অনেক লেখা আছে। কিছুই হয় নাই এ কথা বলতে পারি না আমি।

সৈয়দ শামসুল হকের বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ কি আপনার পড়া আছে?

না। তবে  মুক্তিযুদ্ধ নিয়া তার কিছু ভালো কাজ আছে। সৈয়দ শামসুল হকের গল্পের প্লট কনসিভ করতে পারার অসাধারণ ক্ষমতা আছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই তিনি তার গল্পকে ভালোমত তুলে আনেন না, সে বিষয়ে যত্নবান হন না বলে আমার মনে হয়। তার আর একটা সমস্যা রচনায় যৌনতার ব্যবহার সম্পর্কিত। সৈয়দ শমসুল হক লেখায় যৌনতা ব্যবহার করতে খুবই আগ্রহী এটা বোঝা যায়, সেটা দোষের কিছু বলে মনে হয় না, কিন্তু তিনি বিষয়টা ব্যবহারে পারঙ্গম বলে আমার মনে হয় না, যেমন দ্বিতীয় দিনের কাহিনী-তে তার যৌনতা ব্যবহারের প্রচেষ্টা ভালো লাগে নাই।

মঈনুল আহসান সাবেরের কবেজ লেঠেল পড়েছেন কি? ব্যক্তিগতভাবে এটিকে আমি মুক্তিযুদ্ধের দরকারি কাজ মনে করি।

পড়া হয় নাই।

আমরা যখন আপনার কোনো কোনো গল্প বা উপন্যাস পড়ি, যেমন মুখের দিকে দেখি, প্রথম বয়ান বা কোথায় পাবে তারে ইত্যাদি কথাশিল্পে মৈমনসিং গীতিকা বা পূর্ববাংলার পালার একটা আধুুনিক গীতল রূপ দেখি, সেই সময়ের পালাকাররাও কিন্তু সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় বিষয় বা ঘটনা কিংবা জনকোলাহলকে রূপকথার আঙ্গিকে ফুটিয়ে তুলতেন। রূপকথার এই সব আঙ্গিক আপনাকে কীভাবে আপ্লুত করে?

মৈমনসিং গীতিকা অনেক বড় ব্যাপার। তবে এই সময়ে বসে মৈমনসিং গীতিকা লেখাও যায় না। তার মানেও হয় না। আমার মনে হয় না আমি রূপকথাও লিখতে চাই, তবে রূপকথা মানুষের জীবনকে অবলম্বন করে তৈরি করা হইতো, ফলে মানুষের জীবনের অনেক কিছু আমাদের কাছে রূপকথার মত মনে হইতে পারে। যে রচনাগুলার কথা আপনে বললেন এগুলার রচনা পদ্ধতিতে কিছুটা ভিন্নতা আছে, বিশেষ করে গল্প দুইটায়। এই গল্প দুইটা আমি লিখেছি কিছুই না লেখার জন্য, আমার মনে হইছিল লেখার ভিতরে কিছু লিখতেই হবে কেন। মেঘদূত-র ভিতরে তো কিছু দেখি না, মনে হয় আছে কিন্তু ধরতে পারি না। তবে মুখের দিকে দেখি উপন্যাস হওয়ায় হয়তো অতটা না। মেঘদূত-র সঙ্গে তুলনা করার জন্য মাফ চাই। যাহোক, এইসব লেখার মূল ফন্দি হচ্ছে পাঠককে আক্রান্ত করা, চান্দের আলোর মত- চালুনি দিয়া যদি চালেন কিছু পাবেন না, কিন্তু মানুষ কেমন আক্রান্ত হয়। মেধাবী পাঠককের জন্য অনেক সময় বড় আয়োজন লাগে না। লেখক পাঠকের চিন্তা করে লেখে না, কিন্তু পাঠকের জন্যই লেখে। রূপকথার ধরনে কথা সাহিত্য রচনা আমার লক্ষ্য না, কিন্তু আমি জানি জীবনের বাস্তবতা বহুদূর পর্যন্ত যায়, এর দূরবর্তী সীমা রূপকথার আমেজ নিয়া হাজির হইতে পারে, কিন্তু তা রূপকথা না, তা বাস্তব। যেমন কাঠুরে ও দাঁড়কাক। গাছের ফোকরের ভিতরে টাকা রাখা রূপকথার ডাকাতদের কাজের মত মনে হলেও এটা বাস্তবে কেন হইতে পারবে না? কল্পনার বিষয় পাঠক যতদূর পর্যন্ত বাস্তব হিসেবে গ্রহণ করতে রাজি থাকে ততটা ব্যবহার করা যেতে পারে। চাপ দিলে পাঠকের গ্রহণ ক্ষমতার পরিধি বিস্তৃৃত হয়, তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন জিনিসটা ফেটে গ্রহণযোগ্যতার বাইরে চলে না যায়। গেলে সেটা সামাজিক রূপকথার সাহিত্য হয়া যাবে। কথা সাহিত্য থাকবে না। যাদু বাস্তব, বাস্তবই, বাস্তবের একটা ভিন্ন তল মাত্র। যাদু বাস্তবতা অবশ্যই সামাজিক রূপকথা না।

একজন পাঠক হিসেবে আমি আমার একটা সমস্যার কথা বলি- মুখের দিকে দেখি’তে দুটো ঘটনা পাশাপাশি ঘটছে, এক হচ্ছে চাঁন মিয়ার বান্দরের দুধ খাওয়ার ব্যাপার আর মেয়েটার অতিলৌকিক আচরণ; অন্যদিকে মামুনকে ঘিরে রাষ্ট্রীয় সামাজিক অবক্ষয়, অবহেলা, ভয়াবহ সমাজবাস্তবতাকে চিহ্নিত করার ব্যাপার। একটা জীবন্ত লোককে কুলিরা ভুসি বা ব্ল্যাক-মার্কেটিংএর বস্তায় ভরে দিচ্ছে, অথচ তাদের মানবিক কোনো অনুভূতিই নেই। কিন্তু উপন্যাসটিতে লোকজ উপাদান অত বেশি ব্যবহার করা হলো তাতে তো আপনি যে সমকালীন সামাজিক-রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন দেখাতে চাইলেন তার সাথে আমি একাত্ম হতে পারি না।

মুখের দিকে দেখি লেখাটা এখনো শেষ হয় নাই, আরো লেখা লাগবে। এখানে কত কী আছে এবং কত কী থাকতে পারে। ভয়াবহ সমাজ বাস্তবতা সাহিত্যে না থাকার কোনো কারণ নাই, কিন্তু গল্পে ভয়াবহ অবস্থায় আমার অনেক সময় মশকারি করতে ইচ্ছা হয়, কারণ অন্যভাবে আমি সাহিত্যে বিষয়টা মিলাইতে পারি না। করাত কলের শ্রমিকরা মামুনকে নিয়া যা করে তাতে এই মশকারির ভাব আছে, আরো অনেক জায়গায় আছে, সমাজের পীড়নগুলা আমার শরীরে বিন্ধা যায়, কিন্তু লেখক হিসেবে আমাকে হিসাব ঠিক রাখা লাগে, সাহিত্যের পক্ষে সবসময় চাবুকের মত কাজ করা সম্ভব না। তাছাড়া সাহিত্যিকের সামর্থেরও তারতম্য থাকে। আমি আমার সাধ্যের মধ্যে থেকে কাজ করার চেষ্ট করেছি। লেখক যা লেখে, পাঠক লেখায় তা-ই দেখে বা দেখবে তাও ঠিক না। এই লেখাটায় আমি আসলে কী বলতে চাইছি তা হয়তো আমার কাছেও পরিষ্কার না। লেখার আনন্দেও লেখা যায়। কলাকৈবল্যবাদ না, এটা অন্য কিছু। কাফকা তার মেটামরফোসিস-এ আসলে কী বলতে চাইছে তা কি আমরা জানি? কিংবা কাফকা নিজেও  কি জানতো সেটা? অথবা জানলেও কি সেটাই মেটামরফোসিস সম্পর্কে শেষ কথা? আমার লেখাটা শেষ হওয়ার পরেও হয়তো আপনে একাত্ম হইতে ব্যর্থ হতে পারেন। পাঠক হিসেবে গল্পের বিচার বিবেচনায় আপনার বা অন্য কোনো পাঠকের সার্বভৌমত্ব আছে। আপনি পাঠক হিসেবে বিভিন্ন বিষয় খুঁজে বের করতে পারেন। আমি আমার বিবেচনা অনুযায়ীই একটা বিষয় দেখার চেষ্টা করতে পারি, যদি আদৌ পরিবেশন করার মত কিছু থাকে, লোকজ উপাদান ব্যবহার করে হোক বা মশকারির চাদর বিছায়া দিয়া হোক। আমি অন্য রকম কী করতে পারি? হয়তো কিছুই পারি না। আমাদের বকুল গল্পের ভিতরে যে ভয়াবহতা আছে সেটার সঙ্গে একাত্ম হওয়ার জন্য তো আমি ডাক দিয়া যেতে পারি না, আমি আঙ্গুল দিয়া দেখায়াও দিতে পারি না, সে চেষ্টা সাহিত্যে না করাই ভালো। এটা করতে হলে প্রবন্ধ লেখা লাগবে। এই বিষয়টা নিয়া হয়তো বিতর্ক হতে পারে।

এটা কিন্তু বোঝা যাচ্ছে যে তাকে সারের বস্তার ভিতর লুকিয়ে ফেলা হচ্ছে, ব্ল্যাক মার্কেটিং যেমন বোঝা যাচ্ছে, তেমনি বোঝা যাচ্ছে মানুষটাকেই এরা উঠিয়ে দিচ্ছে।

আমার উদ্দেশ্য ছিল ছেলেটাকে চিটাগাং পাঠানো, অথবা হয়তো করাত কলের কুলিদের কার্যকলাপের কারণেই আমার মনে হয় যে মামুনকে চিটাগাং নিয়া যাই, তাদের কারণেই হয়তো কাহিনীর এই মোচড়টা আসে, কাহিনীর অনেক বাঁকই আগে চিন্তা করে ঠিক করা থাকে না। কুলিরা বিষয়টা বুঝেছিল আমি বলি নাই, বোঝে নাই তাও বলি নাই। যাহোক আমাকে লেখাটা শেষ করতে হবে।

এতে কেমন পরিবর্তন কিংবা পরিবর্ধন করতে চান তা কি বলা যাবে?

আমাদের চলমান জীবনের কিছু বিষয় হয়তো থাকবে, মনে হবে স্বপ্ন, মনে হবে হয়তো স্বপ্ন না।

মার্কেজের ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অব সলিচিউড-র কথা আপনি আগেই বলেছেন। আমরা হয়ত সে রাতে পূর্ণিমা ছিল-তেও এটির কথা স্মরণ করতে পারি। বিদেশি ভাষার কথাসাহিত্যিকদের ভিতর অন্য কারও লেখা সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?

জ্যাক লন্ডন আমার প্রিয় লেখক, তার ট্যু বিল্ড এ ফায়ার আমার পড়া গল্পগুলার ভিতর অন্যতম  শ্রেষ্ঠ গল্প বলে মনে হয়। টলস্টয়, গোর্কি, হেমিংওয়ে, হেমিংওয়ের ছোট গল্প, শলোকভ, সিঙ্গার, সিঙ্গারের গল্প বোকা গিম্পেল-র কোনো তুলনা দেখি না, কাফকার কথা আর কী বলব, একটা মেটামরফোসিস লেখাই তার অবিস্মরণীয়তার জন্য যথেষ্ট ছিল, তুর্গেনিভের লেখা আমার প্রিয়, কত যে লেখক আছেন এবং কত যে ভালো লেখা আছে পৃথিবীতে, চেখভ খুব ভালো লাগে।

চেখভকে ঠিক কোন কারণে আপনার এত প্রিয় মনে হয়? সাধারণ ঘটনা বা অনুষঙ্গ নিয়ে অদ্ভুত সব গল্প লেখার জন্য; নাকি ...

তার লেখা কেরানির মৃত্যু অসাধারণ গল্প। কিন্তু এটাই শেষ কথা না। জীবনকে দেখার অসাধারণ চোখ ছিল তার, গল্প বলার ক্ষমতা তো ছিলই। আরো অনেক ভালো পিস আছে তার।

ম্যাক্সিম গোর্কির সাহিত্যকর্মের কোনো দিক কি আপনাকে টানে?

গোর্কিকে বাংলাদেশে আমরা জানি মূলত রাশিয়ান অনুবাদ বইয়ের সুবাদে। গোর্কি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে আস্থাশীল ছিলেন। আমার মনে হয় গোর্কি একমাত্র সাহিত্যিক যিনি সাহিত্যের সঙ্গে বিপ্লবকে যথাযথ মাত্রায় মিলাইতে পারছিলেন। হয়তো আমাদের হাসান আজিজুল হকও। গোর্কির মা-কে  বিপ্লবী বই বলে তাচ্ছিল্য করতে পারার কোনো উপায় আছে বলে আমার মনে হয় না। তার আত্মজৈবনিক তিনখণ্ড রচনা সাহিত্যের মানদণ্ডে অসাধারণ। গোর্কি হচ্ছেন বিপ্লবী সাহিত্যিক, তার মত কেউ আর আসে নাই। পৃথিবীও বদলায়া গেছে। তবে যারা আর মার্কসবাদ পড়বে না, তারা হয়তো মা পড়বে, পড়ে জানবে, পৃথিবীতে জীবনের একটা বিকল্প মানে ছিল একদিন।

এখন আমরা বাংলা কথাসাহিত্যের লেখকদের নিয়ে কিছু কথাবার্তা বলি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মানিক, সতীনাথ, সুবোধ ঘোষ, জগদীশ, কমলকুমার, অমিয়ভূষণ বা বাংলাদেশের ওয়ালীউলাহ্, ইলিয়াস, হাসান, কায়েস, মাহমুমুদুল হক, জ্যোতিপ্রকাশ,  হরিপদ, আব্দুল মান্নান সৈয়দ, সেলিনা হোসেন বা অন্যদের সম্পর্কে কিছু বলুন।

এদের অনেকের লেখা আমার পড়া নাই। রবীন্দ্রনাথকে ভালো লাগে, সব কিছুই। কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে নিয়া একটা কাল্ট তৈরি হয়া গেছে। আমি এই কাল্টের সদস্য না। আমার হিসেবে মানিক অনেক বড় মাপের লেখক। বঙ্কিম চন্দ্রের গল্প তৈরির ক্ষমতা ছিল বিস্ময়কর, কিন্তু তার সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতা নাই এটা মানা আমার পক্ষে মুশকিল হয়। বাংলাদেশে হাসান আজিজুল হক, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ বা ইলিয়াস অনেক বড় লেখক। এরা বিশ্বমানের লেখক। পৃথিবীর অনেক ভালো লেখা আমার পড়া আছে, আমি জানি। এদের  সঙ্গে আমি মাহমুদুল হক এবং কায়েস আহমেদকে যোগ করতে চাই। শওকত আলিও আছেন। বাংলাদেশের কথাসাহিত্য যে, কত সমৃদ্ধ সেটা নিয়া তর্ক করার কিছু নাই, যাদের নাম বললাম এদের লেখা পড়লেই সেটা জানা যাবে। তারা একটা বটমলাইন আমাদেরকে দিয়ে রেখেছেন, সেটা এত উঁচা যে এটা ক্রস করা খুব সহজ ব্যাপার হবে না। হাসান আজিজুল হক কোনো উপন্যাসই লেখেন নাই, কায়েস আহমেদ চিকন চিকন কয়েকটা বই লিখছেন, তারপরেও। কায়েস আহমেদ তার লাশকাটা ঘর নামের একটা গল্প লিখেছিলেন, তিনি সেটাকেই আবার উপন্যাস বানিয়েছিলেন, দিনযাপন, তারপরেও এটাকে মোটা করতে পারেন নাই। তার অস্থিরতা ছিল মনে হয়।

অন্য কোনো সিনিয়র লেখকের কথা বলবেন?

মাহমুদুল হকের কথা আবার বলি। মাহমুদুল হক খুবই ভিন্ন ধরনের একজন কথাশিল্পী। তার ভাষা শুধু নয়, দেখার বিষয়টাও আলাদা। মাহমুদুল হক এক অর্থে সাহসী লেখক ছিলেন, কারণ পৃথিবীর এমন একটা সময়ে যখন সাহিত্যের প্রগতিশীল দায়িত্ব পালনের পক্ষে শক্তিশালী অভিমত কার্যকর ছিল, মাহমুদুল হক সাহিত্যকে সাহিত্যের ভিতরে রেখে দিয়েছিলেন, দায়িত্ব পালন করেন নাই, জীবন আমার বোনে-ও একই কাজ করেছেন, মানে কোনো লোকপ্রিয় দায়িত্ব পালনের দিকে যান নাই, তার সাহিত্যের প্রসঙ্গ মানুষের মানবিকতা। সৈয়দ শামসুল হকের কথাও বলা যায়। তাকে আমার কেন যেন অপচয়িতই লাগে। খেলারাম খেলে যা দিয়া যে অপচয়ের শুরু। আমি রাহাত খানের কথাও বলতে পারি। আমার মনে হয় এই অসাধারণ শক্তিশালী লেখকও যথাযথভাবে তার শক্তিকে কাজে লাগান নাই। আমরা তার লেখায় তার প্রতিভার কিনারাটাই দেখেছি মাত্র।

আমি এখন আপনার সমকালের গল্পকারদের বিষয়ে জানতে চাই। মামুন হুসাইন, কাজল শাহনেওয়াজ, মহীবুল আজিজ, শহীদুল আলম, সেলিম মোরশেদ, ওয়াসি আহমেদ, নাসরিন জাহান, হুমায়ূন মালিক, সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ, পারভেজ হোসেন, তারেক শাহরিয়ার, দেবাশিস ভট্টাচার্য বা অন্যদের লেখালেখি সম্পর্কে আপনার মতামত কি?

এভাবে সকলের সম্পর্কে তো বলা মুশকিল- মামুন হুসাইনের গল্প বেশ ভালো, আমার মনে হয় তিনি পোস্টমডার্ন গল্প চমৎকার লিখে থাকেন।

ঠিক বুঝলাম না, তার গল্প পোস্টমডার্ন মানে!

ঝামেলা হইলো। সাহিত্যিক আলোচনা আমার জন্য খুবই কঠিন কাজ হয়া দাঁড়ায়। যা হোক, বিভিন্ন প্রবন্ধ পড়ে আমি জানতে পারছি যে, সাহিত্য ধারায় পোস্টমডার্ন বা উত্তর আধুনিক  নামের একটা ধারা আছে। এই ধারার রচনার বৈশিষ্ট হচ্ছে  গল্পে ডেফিনিট কোনো গল্প না থাকা, সবকিছু অসংবদ্ধ বা তরল হবে, গল্পে একটা নির্দিষ্ট ফোকাস থাকবে না, ইনডেফিনিট হবে, ইত্যাদি। মামুনের গল্পে আমি এগুলা দেখি। তিনি এভাবে চিন্তা করে লেখেন কিনা আমি জানি না, হয়তো পরিকল্পনা করেই লেখেন। তার গল্প সেই এক পুনরুত্থানের গল্প এমনই এক চমৎকার সাহিত্যকর্ম। আমার ধারণা এইটা এভাবে আর কারও পক্ষে লেখা সম্ভব ছিল না। ওয়াসির ডিটেইলের কাজ বা ভাষা ভালো। শুধু তাই বা কেন, ওয়াসি ভালো গল্প লেখেন। আমি একদম আলাদাভাবে কাজলের শাহনেওয়াজের কাছিমগালা-র কথা বলব। এটা আমাদের  গল্পসাহিত্যের অন্যমাত্রার একটা অসাধারণ গল্প।

এই সময়ের অন্য গল্পকার বা শাহাদুজ্জামান সম্পর্কে আপনার মতামত জানতে চাই।

শাহাদুজ্জামানের কয়েকটি বিহ্বল গল্প-র কথা তেমন মনে পড়ছে। একটি এরোপ্লেনের কাহিনী আমাকে বেশ বিহ্বল করেছিল। শাহাদুজ্জামান ভালো লেখেন এবং সম্ভবত তিনি একটা নতুন ধারা খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। এটাকে সম্ভবত মেটাফিকশন বলে। অদিতি ফাল্গুনীর মনে হয় জীবনকে দেখার বিস্তৃত অভিজ্ঞতা আছে, এ জীবন মিহিন জীবন না, তেড়াবেঁকা, তার গল্পে এর প্রতিফলন দেখা যায়। আমার মনে হয় একটা পরিষ্কার রাজনৈতিক দর্শন তার লেখার ভিত্তিমূলে থাকে। এটা মার্কসীয় দর্শন বলে আমার ধারণা। এবং তিনি তার সাহিত্যকে সাহিত্য করে তুলতে সক্ষম। প্রশান্ত মৃধার একটা দুইটা লেখা পড়েছি। এবাদুর রহমানের লেখার কথা তো আগেই বলেছি। তিনি সো ফার সো গুড। তার জন্য জরুরি হবে ফুরায়া না যাওয়া, আশা করি তা হবে না। সুব্রত অগাস্টিনের কালকেতু ও ফুল্লরা ওয়ান অফ হিজ ফাইন পিসেস। একজন নতুন গল্পকার রাশিদা সুলতানা বেশ ভালো লিখছেন, যদিও তিনি এখনো তার অভিজ্ঞতা বা অনুভবের ছোট একটা পরিধির মধ্যে বিচরণ সীমাবব্ধ রেখেছেন। এই পরিধিটা নারীর ব্যক্তিগত পরিধি, সব নারীই এটা চেনেন, হয়তো পুরুষরাও, এ জন্যই হয়তো তার গল্প বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে এবং পাঠককে ছুঁতে পারতাছে।

এখন আপনার ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। আচ্ছা, আপনি ঠিক কখন এবং কেন একাকি সংসারযাপনের সিদ্ধান্ত নিলেন?

এটা বলতে পারব না। এটা  এরকম হয়া গেছে।

কেন এমন হয়ে গেল তা কি জানা যাবে?

বলতে পারব না বলে মনে হয়। এইসব বিষয়ের মনোবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা থাকে। আমার মনে হয় যে, অনেক ডাক্তারি তথ্যই জীবন যাপনের জন্য প্রয়োজনীয় না। সুস্থ জীবন যাপন করতে পারলেই হয়া যায়।

একা থাকার কোনো সমস্যা আছে বলে মনে করেন না? কিংবা নির্জনতার আলাদা কোনো ফিলসফি অনুধাবন করেন বলে মনে হয়?

একা থাকার সমস্যাতো আছেই, কিন্তু সঙ্গের মধ্যে থাকারও কি সমস্যা নাই? মার্কেজ সম্ভবত তার পেয়ারার সুবাস-এ রকম বলছেন যে, তিনি দিনের বেলা লেখার সময় কোনো নির্জন দ্বীপে এবং সন্ধ্যায় নিউ ইয়র্ক শহরে থাকতে চান। কথা হচ্ছে নির্জনতা এবং সঙ্গ দুইটাই দরকার। আমি নির্জনতাকে উপভোগ করি, একাকিত্বকে করি, এর মধ্যে আত্মপীড়নের কিছু নাই। স্বল্পমাত্রার ইডিওসিনক্রেসি ছাড়া আর কোনো পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায়ও আক্রান্ত হই নাই। তবে সঙ্গও আমার লাগে, কিন্তু সঙ্গের জন্য আমি লাফ দিয়া পড়ি না। বাসায় একা সময় কাটায়া দিতে পারি। তখন বই পড়ি, হয়তো কিছু লেখি, কিংবা টিভি দেখি বা শুয়ে থাকি, অলসতার চাইতে ভালো বিনোদন আর কী আছে! নির্জনতার চাইতে অনুপম আর কী আছে! একসময় সিনেমা দেখার আমার খুব নেশা ছিল।

ঠিক কী ধরনের ছবি আপনি দেখেন?

এখন তেমন দেখা হয় না। আমার বাইরে থেকে সিডি এনে ফিল্ম দেখা হয় না। এখন মূলত ইংরেজি চ্যানেলের ছবি দেখি।

যৌন-কোলাহল কিম্বা একা থাকার ফলে সেক্স সম্পর্কে আলাদা কোনো তাড়না বোধ করেন কি? কিম্বা যৌনতার আলাদা কোনো সৌন্দর্য আবিষ্কার করতে পেরেছেন বলে মনে হয়?

আবিষ্কার করার মত অবস্থা নাই। বাংলাদেশে আপনি যদি একা থাকেন তাহলে যৌনতার বিষয়টায় সৌন্দর্যের চাইতে সমস্যা বেশি। শারীরিকভাবেও, সামজিকভাবেও। আপনে শরীরে আগুন বয়া বেড়াবেন। আর লোকেরা আপনের দিকে তাকায়া ভাবতে থাকবে, কী জানি করতাছে।

হাঃ হাঃ হাঃ, প্রায় ঘণ্টাতিনেক বোধহয় আমরা কথা বললাম, ভালোই লাগল। ধন্যবাদ আপনাকে।

হ্যাঁ। আমারও ভালো লাগলো। আপনাকেও ধন্যবাদ।