Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় লোকনাট্যরীতি [প্রথম কিস্তি]

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

আশির দশকের শুরু থেকে শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় লোকনাট্য উপাদান প্রয়োগের একটি প্রবণতা সক্রিয় হয়ে উঠতে দেখা যায়। ক্রমান্বয়ে এই ধারাটি দেশের নাট্যকর্মীদের মাঝে যথেষ্ট আশার সঞ্চার করতে সমর্থ হয়। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে , এই ধারার চর্চা শুধুমাত্র নাটক রচনা এবং পরিবেশনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, পাশাপাশি সৃষ্টি হয়েছে বেশ কিছু সমৃদ্ধ তাত্ত্বিক নির্মিতি। দেশের বেশ কয়েকজন প্রসিদ্ধ নাট্যজন এই ধারার সম্ভাবনা এবং গুরুত্ব নির্ণয়ের লক্ষ্যে প্রকাশ করেছেন তাদের সমৃদ্ধ নাট্যচিন্তা। এসকল নাট্যচিন্তা একদিকে যেমন লোকনাট্যের প্রয়োগ ভাবনার সুনির্দিষ্ট পথ নির্দেশ করে, তেমনি কিছু কিছু বিষয় আবার বিতর্কেরও অবতারণা করে। আর এই বিতর্কের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ‘দেশজ নাট্যরীতি’, ‘জাতীয় নাট্য আঙ্গিক’, ‘বাংলা নাট্য আঙ্গিক’ প্রভৃতি নামবাচক বাক্যসমূহের অন্তর্নিহিত ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ। যেহেতু ‘দেশজ নাট্যরীতি’ বা ‘জাতীয় নাট্য আঙ্গিক’ প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে সুনির্দিষ্ট কোনো মডেল বা রূপরেখা প্রণয়ন করা এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য নয়, তাই এ বিষয়ের আলোচনাকে এক্ষণে প্রাসঙ্গিক মনে করি না।

তবে এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায় যে, সকলেই শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় লোকনাট্যের উপাদান প্রয়োগের বিষয়ে একমত। আর এই বিষয়টির সাথে অর্থাৎ লোকনাট্য উপাদান প্রয়োগের ক্ষেত্রে বর্তমান প্রবন্ধের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কোনো বিরোধ সৃষ্টি করে না বরং গবেষণার সহায়ক হিসেবে তত্ত্বগত আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করা যায়। এদিক থেকে শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় লোকনাট্য উপাদান প্রয়োগের যে সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গিটির সাথে সকলে একমত হতে পারেন বলে বিশ্বাস করি, সেটি হচ্ছে- স্থানীয় নাট্যকলার ঐতিহ্যের ওপর দাঁড়িয়ে বিশ্ব নাট্যকলার ডানা প্রসারিত করে বিশ্ব নাট্যসভায় আঙ্গিক ও বৈশিষ্ট্যগত একটি স্বতন্ত্র অবস্থান সৃষ্টি করতে পারে বাংলাদেশের নাটক। কিন্তু সেক্ষেত্রেও একটি প্রশ্ন থেকে যায়। কতটুকু গ্রহণ-বর্জনের মাধ্যমে স্থানীয় নাট্যকলার ঐতিহ্যের ওপর দাঁড়ানো সম্ভব? কেননা লোকনাট্য ঐতিহ্যে বহু বিচিত্র রীতি ও বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। অভিনয় উপাদান, পরিবেশনা রীতি, ঘটনা বিন্যাস রীতি, আসর পরিকল্পনা, ছন্দ, গীত, নৃত্য, বস্তুগত নানান দ্রব্যাদি প্রভৃতি বিষয়ে রয়েছে বৈচিত্র্যপূর্ণ ব্যবহার। সুতরাং শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় লোকনাট্যের উপাদান প্রয়োগের গুরুত্ব ও সম্ভাবনা বিষয়ে যারা ভাবছেন এবং সক্রিয়ভাবে সচেষ্ট তাঁদের মতামতের ওপর দৃষ্টি দেয়া যেতে পারে।

এ পর্যায়ের আলোচনায় দেশের চারজন নাট্য ব্যক্তিত্বের মতামতসমূহ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এদের মধ্যে এই নবতর ধারা নির্মাণে অগ্রজ একজন নাট্যনির্দেশক ও একজন নাট্যকার রয়েছেন এবং বর্তমান প্রজন্মের একজন নাট্যকার ও একজন নির্দেশক রয়েছেন। এঁরা হলেন- সেলিম আল দীন, সৈয়দ জামিল আহমেদ, জাহিদ রিপন ও সায়মন জাকারিয়া।

সেলিম আল দীন

জাতীয় নাট্য আঙ্গিক নির্মাণের লক্ষ্যে বর্তমানে যিনি সক্রিয় রয়েছেন তিনি হলেন সেলিম আল দীন। ছাত্র জীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যচর্চার সাথে যুক্ত হয়ে নাটলিপি রচনার মাধ্যমে এই অঙ্গনে তাঁর পদচারণা ঘটে। চরকাঁকড়ার ডকুমেন্টারী, সর্পবিষয়ক জটিলতা, মুনতাসির ফ্যান্টাসী, জণ্ডিস ও বিবিধ বেলুন প্রভৃতি তাঁর উল্লেখযোগ্য নাটলিপি যার মঞ্চায়ন তৎকালীন সময়ে যথেষ্ট দর্শকপ্রিয়তা লাভে সমর্থ হয়। সেলিম আল দীন’র প্রথম দিককার নাটলিপিতে লোকনাট্যের উপাদান-বৈশিষ্ট্যের প্রয়োগ ছিল সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। আশির দশকে সর্বপ্রথম ঢাকা শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় কেরামতমঙ্গল নাটকের মাধ্যমে নাটলিপিতে লোকনাট্যের বর্ণনাত্মক অভিনয় উপাদানের প্রয়োগ ঘটে। তারপর হাত হদাই থেকে শুরু করে, চাকা, যৈবতী কন্যার মন, হরগজ, প্রাচ্য প্রভৃতি নাটলিপিতে এই বর্ণনাত্মক নাট্যউপাদান ব্যবহার উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি লাভ করে।

সেলিম আল দীন জাতীয় নাট্য আঙ্গিক নির্ণয়ের লক্ষ্যে শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় লোকনাট্যের ঐতিহ্য ‘বর্ণনাত্মকরীতি’ প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তাই বর্তমানকালে রচিত তাঁর নাটকের বিষয়বস্তু, ভাষা বিন্যাস, ঘটনা বিন্যাস প্রভৃতি সকল ক্ষেত্রে লোকনাট্যের উপাদান-বৈশিষ্ট্যের প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় লোকনাট্যের গুরুত্ব ও সম্ভাবনা নির্ণয়ের জন্য একদিকে তিনি রচনা করেছেন দর্শক সমাদৃত একাধিক নাটক, অন্যদিকে বিভিন্ন গবেষণামূলক প্রবন্ধ ও গ্রন্থের মাধ্যমে ব্যক্ত করেছেন সুচিন্তিত তাত্ত্বিক নির্মিতি। শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় লোকনাট্যের উপাদান-বৈশিষ্ট্যের ব্যবহার তিনি মূলত ‘কথকতা’, ‘কথানাট্য’ এবং ‘পাঁচালি’-রীতিকে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করেছেন। এর প্রতিফলন দেখা যায় তাঁর রচিত নাটকসমূহে। কখনো তার নাটককে ‘কথানাট্য’ (চাকা, হরগজ, যৈবতী কন্যার মন) বলেছেন আবার কখনো তার নাটককে ‘পাঁচালির প্রেরণাজাত’ বলে অভিহিত করেছেন (বনপাংশুল ও প্রাচ্য)। সেলিম আল দীন জাতীয় নাট্য আঙ্গিক নির্ণয়ে লোকনাট্যের সম্ভাবনা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে যে মত প্রকাশ করেছেন ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্ব’ এবং ‘পাঁচালি’ তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি তার রচিত একটি নাটক প্রাচ্য-কে পাঁচালির আঙ্গিক দ্বারা প্রভাবিত বলে তিনি দাবী করেছেন। পাশাপাশি তিনি পাঁচালিরীতি বিষয়ে সুস্পষ্ট অভিমত প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন গবেষণা গ্রন্থে। বর্তমান প্রবন্ধে শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় পাঁচালির সম্ভাবনা এবং গুরুত্ব বিষয়ে আলোচনা করবো। এ ছাড়াও দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্ব ও পাঁচালি বিষয়ে আলোচনার মধ্য দিয়ে নাট্যকার ও গবেষক সেলিম আল দীন-এর শিল্প চেতনা এবং প্রায়োগিক ভাবনার একটি সুস্পষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়, যা বর্তমান প্রবন্ধে আলোচনা করা হবে।

সেলিম আল দীন লোকনাট্যের ঐতিহ্য ‘বর্ণনাত্মক রীতি’র গুরুত্ব এবং সম্ভাবনাকে ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদী’ শিল্পতত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করেন। এই তত্ত্বের আলোকে শিল্পাঙ্গিক-এর স্বরূপ সম্পর্কে তিনি বলেন-

এই মতবাদে আধুনিককালে সংজ্ঞাভুক্ত নানা শিল্প মাধ্যমের কোনো একটির আঙ্গিক ও রীতির পরিবর্তে, একটি মুক্ত আঙ্গিক গ্রহণ বা সৃজনের কথা বলা হচ্ছে। যার অর্থ সকল দ্বৈত শিল্পরীতিভেদ অস্বীকারপূর্বক রচনার কাঠামো, ভঙ্গি ও সর্বোপরি শিল্পের নানা উপাদানের একটি স্বতঃস্ফূর্ত মিশ্রণ যা সর্বাংশে মৌলিক এবং নানা রীতির সংযোগ সত্ত্বেও অভেদাত্ম। ১

আর এই অভেদাত্ম শিল্প আঙ্গিকের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন -

দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্বে একের মধ্যে বহু এবং বহুর একের মধ্যে লীন হবার দৃষ্টান্তরূপে মধ্যযুগের বাঙলা সাহিত্য থেকে প্রভূত দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করা যায়। ধরা যাক পাঁচালি, এ একই সঙ্গে নাট্য, নৃত্য, গীত, কৃত্য, কথা, কাহিনী, উপাখ্যান, রাগরাগিনীর বিচিত্র সঞ্চয়, তার একদেহে যেন নিখিলের সমস্ত বৈচিত্র্য, এক আভিজাত্য স্বর্ণ-সঙ্কেতে জ্বলজ্বল করে। ২

দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্প সম্পর্কে তাঁর আলোচনা থেকে এই শিল্পতত্ত্ব বিষয়ে সুস্পষ্ট দুটি ধারণা পাওয়া যায়। প্রথমত, এটি একটি ‘অভেদাত্ম’ শিল্পরীতি যেখানে সকল শিল্পরীতিভেদ অস্বীকার করে এবং দ্বিতীয়ত, এটি এমন এক শিল্প আঙ্গিক যেখানে ‘বহুর একের মধ্যে লীন হওয়ার’ মত বিদ্যমান। সুতরাং দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্বের উক্ত সংজ্ঞা বিবেচনায় বলা যায়, এ এমনই এক সর্বগ্রাসী শিল্পতত্ত্ব, যেখানে কথা, কাব্য, সুর, নৃত্য, গীত, সংলাপ, বর্ণনা ইত্যাদি সকল কিছু একটি কাব্যিক আধারে একাকার হয়ে যায়। তিনি তাঁর একটি নাটক প্রসঙ্গে বলেন- ‘কেউ যদি কাব্য বলেন আপত্তি করবো না, গল্প বললেও অখুশী হবো না। আমি সব সময়ে চেয়েছি আমার লেখা নাটকগুলো নাটকের বন্ধন ভেঙে অন্য সব শিল্পতীর্থগামী হোক, কারণ শিল্পে আমি দ্বৈতাদ্বৈতবাদী।’৩ সেলিম আল দীন-এর এই নাট্যচিন্তা বর্তমান সময়ের শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় অত্যন্ত সময়োপযোগী। কেননা, শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় নাটলিপি রচনা এবং পরিবেশনারীতি উভয় ক্ষেত্রে এই মুক্তচিন্তা সামগ্রিক নাট্যচর্চায় বিকল্প ভাবনা উদ্বুদ্ধ করে। তথাপি একটি প্রশ্ন থেকে যায়। তিনি এই শিল্পতত্ত্বকে একটি ‘মুক্ত আঙ্গিক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। সেই মুক্ত আঙ্গিকের স্বরূপ কি? এই প্রশ্নের জবাবে সেলিম আল দীন মধ্যযুগীয় লোকনাট্যের ‘পাঁচালি’ রীতির কথা বলেন। তিনি এই পাঁচালিরীতির মধ্যদিয়েই এই দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্প আঙ্গিকের পূর্ণতম বিকাশ সম্ভাবনা লক্ষ্য করছেন।

পাঁচালির মধ্যে বর্ণনাত্মক ও নাট্যমূলক রীতির সঙ্গে, উপকাহিনীর শাখা পল্লবিত হবার ফলে একদিকে তা স্বতন্ত্র গল্পরস সৃজন করতো, অন্যদিকে ক্রমবিস্তারে তা মহাকাব্যোপম রূপ লাভ করতো। পাঁচালির এই সংশ্লেষণ ক্ষমতার কারণেই দেখা যায় স্বতন্ত্রভাবে শিল্পের শ্রেণীভেদে বিবেচ্য, এমন কোনো বাঙলা আঙ্গিক স্বতন্ত্ররূপ লাভে সমর্থ হয়নি।৪ পাঁচালি তার নিজস্ব আঙ্গিক-শক্তির জোরে অন্যান্য সকল আঙ্গিককে একই অঙ্গে ধারণ করতে সক্ষম এই অভিমতের ব্যাখ্যায় অন্যত্র তিনি বলেন-

পাঁচালির বিপুল প্রাণশক্তি ও সর্বগামিতার মূলে এই কয়টি উপাদান (বর্ণনা, সংলাপ, নৃত্য, গীত, ধুয়া বা দিশা এবং সর্বোপরি উপস্থিতমত গদ্যে উক্তি-প্রত্যুক্তি) সক্রিয়। একটি মাত্র আঙ্গিকে বর্ণনা, সংলাপ, নৃত্যগীত ও তাৎক্ষণিক গদ্যভাষণ সংস্থিত হবার ফলে একই কাহিনীতে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকের একীভূত রস আস্বাদন করা সহজতর হত। ৫
 
পাঁচালি সম্পর্কে তাঁর এই চিন্তার প্রতিফলন দেখা যায় পরবর্তীকালে রচিত নাটলিপিসমূহে। সম্প্রতি তার দুটি নাটক, প্রাচ্য ও বনপাংশুল-এ পাঁচালি উপাদান প্রয়োগের কথা উল্লেখ করে বলেন- ‘প্রাচ্য’র আঙ্গিক আমার অন্য উপাখ্যান বনপাংশুল’র মতই পাঁচালির প্রেরণাজাত।’৬ দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পরীতি হিসেবে পাঁচালির গুরুত্ব এবং এর আঙ্গিক ও পরিবেশনারীতি সম্পর্কে তার এই মতের প্রেক্ষিতে কিছু বিষয় আলোকপাত করা প্রয়োজন মনে করি।

প্রথমত, দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পের আলোকে পাঁচালিরীতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যেখানে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ্য করা যায়। ক. ‘পাঁচালির সংশ্লেষণ ক্ষমতার কারণে বাংলা আঙ্গিক স্বতন্ত্ররূপ লাভে সমর্থ হয়নি।’ খ. পাঁচালির সর্বগ্রাসী শক্তির গুণে ‘একটিমাত্র আঙ্গিকে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকের একীভূত রস আস্বাদন করা সম্ভব’- পাঁচালি সম্পর্কে এরূপ সিদ্ধান্তের কারণে লোকনাট্যের বিভিন্ন স্বকীয় ও স্বতন্ত্র আঙ্গিক-বৈশিষ্ট্যের বৈচিত্র্য প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে ওঠে।” উক্ত উদ্ধৃতি দুটি বিশ্লেষণে যে অর্থ দাঁড়ায় তাতে পাঁচালি’ই হচ্ছে দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পের এমন এক শক্তির আধার যেখানে লোকনাট্যের ‘বহু’ বিচিত্র আঙ্গিক, বৈশিষ্ট্য, উপাদান এক (পাঁচালি)-এর মধ্যে লীন হয়ে যায়। বস্তুত পাঁচালির এই সর্বগামিতাকে মেনে নিলে লোকনাট্যের নানান শাখা প্রশাখায় গড়ে ওঠা অসংখ্য স্বকীয় শিল্প আঙ্গিক গৌণ হয়ে যায়। কিন্তু লোকনাট্যের প্রতিটি রীতির বিকাশ স্থান ও কাল সাপেক্ষ অথবা সার্বিকভাবে বলা যায় স্থানীয় জীবনের কৃত্য, রুচি, আচার, ভাষা প্রভৃতির সমন্বিত সামাজিক জীবন সাপেক্ষ। এসকল ক্ষেত্রে লোকনাট্যের আঙ্গিক ও বিষয় কখনো পরস্পরকে বিচ্ছিন্ন করে না। সামগ্রিকভাবে স্থানীয় জীবনেরই প্রতিফলন ঘটে ঐসকল নাট্যে। লোক সংস্কৃতি বিকাশের এই ধারাকে অস্বীকার করা যায় না।

মনুষ্য জীবনের অর্জিত স্বভাবের সার্বিক অভিব্যক্তিই সংস্কৃতি। তবু সূক্ষ্ম, পরিশ্রুত ও সুন্দর-শোভন অভিব্যক্তিকেই আমরা বিশেষভাবে সংস্কৃতি বলি। কাজেই সংস্কৃতি ভাব-চিন্তা-কর্মে ও আচরণে প্রকটিত জীবনেরই লাবণ্য। এই তাৎপর্যে সাহিত্যও সংস্কৃতিরই প্রসূন।৭

অর্থাৎ শিল্পের আঙ্গিক ও বিষয় স্থানীয় সামাজিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন নয় বরং পরস্পরের সাথে সম্পর্কযুক্ত। বিষয় ও আঙ্গিকের এই অদ্বৈতচর্চার সুনির্দিষ্ট দৃষ্টান্ত আমাদের লোকনাট্যে কদাচিৎ নয়। বিষয়, আঙ্গিক, অভিনয় উপাদানের প্রয়োগ, ভাব-রস, আসর পরিকল্পনা প্রভৃতি সকল দিক থেকে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের ‘পালাগান’ এবং উত্তরবঙ্গের ‘আলকাপ’ যেমন ‘ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকের একীভূত রস আস্বাদন’ করায় না, তেমনি একই বিষয় আশ্রিত আখ্যান ‘মনসা’কেন্দ্রিক পরিবেশনা দক্ষিণাঞ্চলের ‘রয়ানী’ এবং উত্তরবঙ্গের ‘ঝুমুর’, দর্শক অনুভূতিতে সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে ভিন্ন স্বাদের রস নিস্পত্তি ঘটায়। এই আঙ্গিক বৈচিত্র্য সম্পূর্ণই স্থানীয় রুচি, ধর্ম, বিশ্বাস স্বাপেক্ষ। তাই দেখা যাচ্ছে লোকনাট্য বিষয় ও আঙ্গিকে অদ্বৈত কিন্তু স্থান সাপেক্ষে তা দ্বৈত। আঙ্গিক ও বিষয়ের এই অদ্বৈত বিষয়ে সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ বলেন - ‘বেশি আঙ্গিক-সচেতন থাকলে কথাবস্তুকেই আঙ্গিক গ্রাস করে ফেলে। কথাবস্তু নিজেই কলমের ডগায় আঙ্গিক এনে দেয়। কনটেন্ট-ফর্ম অবিচ্ছেদ্য। কনটেন্ট আছে ফর্ম নেই, কিংবা কনটেন্ট নেই ফর্ম আছে, এমনটা হয় না।’৮ সুতরাং পাঁচালির আঙ্গিক বৈশিষ্ট্যের সীমায় তাবৎ লোকনাট্যরীতি ও আঙ্গিকের ‘একীভূত রস’ আস্বাদনের চেষ্টা করানো হলে, তাতে সহস্র বছরের পরিক্রমায় নানা শাখা প্রশাখায় পল্লবিত লোকনাট্যের স্বকীয় বিচিত্রতাকে অস্বীকার করা হয়।

দ্বিতীয়ত, পাঁচালির ‘বিপুল প্রাণশক্তি ও সর্বগামিতার’ মূলে যে সকল উপাদানের (বর্ণনা, সংলাপ, নৃত্য, গীত, ধুয়া বা দিশা এবং সর্বোপরি উপস্থিতমত গদ্যে উক্তি-প্রত্যুক্তি) উল্লেখ করা হয়েছে, ঐসকল উপাদান লোকনাট্যের স্বতন্ত্র কোনো আঙ্গিক নির্দেশ করে না। বরং যেকোনো লোকনাট্য আঙ্গিকের স্বরূপ অন্বেষণে এগুলো ‘অভিনয় উপাদান’ হিসেবে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। প্রসিদ্ধ লোকনাট্য গবেষণা গ্রন্থ Acinpakhi Infinity ; Indigenous Theatre of Bangladesh-এ সকল অভিনয় উপাদানের উল্লেখ সাপেক্ষে মোট ৮টি উপাদানের উল্লেখ করে এগুলোকে ‘অভিনয় উপাদান’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। মূলত এসকল উপাদানের সমষ্টিগত উল্লেখ কোনো নির্দিষ্ট পরিবেশনারীতির স্বরূপ উন্মোচন করে না। বরং এসকল উপাদানের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ প্রয়োগ বৈচিত্র্যই আঙ্গিকের স্বরূপ তুলে ধরে। আর সে কারণেই একই বিষয়-ভিত্তিক আখ্যানের ভিন্ন ভিন্ন শিল্প আঙ্গিক এবং রস আস্বাদন করা সম্ভব। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, ‘পালাগান’-এ মূলগায়েন ও ডায়না (সহ-অভিনেতা)-এর সম্পর্ক সার্বিক পরিবেশনায় যে ভিন্ন আঙ্গিক নির্ণয় এবং রস আস্বাদন করায়, ‘মাদারপীরের গান’-এর মূল গায়েন ও সহ- অভিনেতা জুম্মল এর পারস্পরিক সম্পর্কের ভিন্নতার কারণে পরিবেশনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিক এবং রস তৈরি করে। এই ভিন্নতার মূল কারণ অভিনয় উপাদানের প্রয়োগ বৈচিত্র্য।

তৃতীয়ত, পাঁচালির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য এর আখ্যান বা কাহিনী যা সম্পূর্ণ নাটলিপিনির্ভর মৌখিক অথবা লিখিত।

মৌখিক সাহিত্যধারার অন্তর্গত গদ্য ব্রতকথাগুলি যখন কোনো কোনো ক্ষেত্রে লিখিত হইবার প্রয়োজন দেখা দিল, তখন তাহাদের গদ্যরূপ পরিহার করিয়া বৈচিত্র্যহীন পয়ার ত্রিপদী বা পাঁচালী-লাচাড়ী ছন্দে পদ্যাকারে সেগুলি লিখিয়া লইবার প্রবৃত্তি দেখা দিল। ইহার কারণ, সেকালের বাংলা সাহিত্যে গদ্যের কোনো লিখিত রূপ ছিল না- যাহা কিছু লিখিত হইত, তাহাই পদ্যে লিখিত হইত। সেই জন্য লক্ষ্মীর ব্রতকথার যখন আমরা মৌখিক আবৃত্তি শুনি, তখন ইহা গদ্যেই শুনিতে পাই, কিন্তু যখন ইহার কোনো লিখিত রূপ পাঠ করিতে শুনি তখন তাহা পদ্যেই শুনিতে পাই। ... তবে সাধারণভাবে এ কথা এখানে বলা যাইতে পারে যে, আখ্যায়িকামূলক পদ্য রচনাকেই মধ্যযুগে পাঁচালি বলিত। ৯

আশুতোষ ভট্টাচার্যের মত সুকুমার সেনও পাঁচালি (তাঁর ভাষায় “পাঞ্চালী”) বলতে লিখিত নাটলিপির রূপ বা ফর্মকেই বুঝিয়াছেন-

পুরানো বাঙ্গালা সাহিত্য ত্রিধারায় প্রবাহিত। প্রথম গীতিকবিতা, দ্বিতীয় পৌরাণিক গেয় অথবা পাঠ্য আখ্যায়িকা, তৃতীয় অ-পৌরাণিক গেয় কবিতা-আখ্যায়িকা। শেষ দুই ধারার রচনার রূপ বা ফর্ম প্রায় একই রকম এবং সে ফর্মের নামও এক, ‘পাঞ্চালী’। দেবতার আখ্যানময় পাঞ্চালী কাব্যের নামে নয়- দেবতার নামের পরে ‘মঙ্গল’ কথাটি যুক্ত থাকে (কখনও কথনও ‘বিজয়’, ক্বচিৎ ‘মঙ্গল’ ও ‘বিজয়’ দুই-ই)। এইজন্য এগুলোর এখন নাম দাঁড়াইয়াছে ‘মঙ্গল’ কাব্য।১০

এ কথাও স্মর্তব্য যে পাঁচালি উদ্ভবের মূলে সমাজের একশ্রেণীর অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন শিক্ষিত ও উচ্চকোটি মানুষের সক্রিয় অবদান ছিল। সে কারণে সেলিম আল দীন বলেন - ‘মধ্যযুগে পাঁচালি নিরবলম্ব মৌখিকরীতির লোকনাট্য নয়, কারণ তা উচ্চকোটির লেখ্য কাব্যের রীতি। সাধারণ গ্রামীণ আসর থেকে রাজদরবারের সম্ভ্রান্ত আসর পর্যন্ত এর প্রভাব বি¯তৃত হতে দেখা যায়।’১১  এই উচ্চকোটির লেখ্যকাব্যের বিষয় সম্পর্কে আহমেদ শরীফ বলেন -

আমাদের আলোচিত পাঁচালি কাব্যগুলো মুখ্যত রাজপুত্র-রাজকন্যার কাহিনী। সে সূত্রে উজির-কোটাল-সওদাগরের কথাও কিছু রয়েছে। ক্বচিৎ মালিন-পরিচারিকার কথাও মেলে। আর অশুভ প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে উপস্থিত রয়েছে দেও, দৈত্য, রাস ক্বচিৎ সাপ, বাঘ, পাখি। কারণ, এ হচ্ছে সামন্তযুগের সাহিত্য।১২

এতক্ষণের আলোচনা থেকে কয়েকটি বিষয় লক্ষ্য করা যায়। প্রথমত, পাঁচালি হচ্ছে লেখ্যকাব্য এবং ছন্দ (পয়ার, ত্রি-পদী, একাবলী) যার মাধ্যম। দ্বিতীয়ত, এই কাব্য হচ্ছে উচ্চকোটি ও শিক্ষিত জনের রচনা। তৃতীয়ত, এই কাব্যের আখ্যান দেব-দেবী এবং রাজা-উজির তথা সমাজের উচ্চশ্রেণীর আশা-আকাঙ্খা, চাওয়া-পাওয়া নিয়ে রচিত হয়। চতুর্থত, পাঁচালি হচ্ছে আখ্যায়িকামূলক পদ্য, যার লিখিত বা মৌখিক রূপ রয়েছে। পাঁচলির স্বরূপ-বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বিভিন্ন গবেষকের আলোচনা থেকে যে সাধারণ বৈশিষ্ট্যটি লক্ষ্য করা যায়, তা হচ্ছে- আখ্যান বা কাহিনী, যা লিখিত ও মৌখিক উভয় ধারায় বিকশিত হয়। সুতরাং পাঁচালির উদ্ভব ও বিকাশের মূলে রয়েছে একটি আখ্যান। এই আখ্যানের ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণে তা উচ্চকোটির রচনার স্থান লাভ করেছে এবং একই সাথে তা বিভিন্ন লোকনাট্য পরিবেশনারীতির মাধ্যমে বিকাশ লাভ করেছে এ ধারণা অযৌক্তিক নয় বলে মনে করি। ‘মধ্যযুগের শেষ ভাগ থেকে আরম্ভ করে আধুনিক কাল পর্যন্ত এই শ্রেণীর তিনটি পাঁচালি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।’১৩ এই তিনটি পাঁচালি হচ্ছে সত্যনারায়ণের পাঁচালি, শনির পাঁচালি এবং ত্রিনাথের পাঁচালি। আশুতোষ ভট্টাচার্যের মতের সত্যতা স্বীকার করে নিলে দেখা যায় সত্যপীর বা সত্যনারায়ণের পাঁচালি’ই সর্বাধিক প্রচার লাভ করেছিল। তবে এর প্রাচীনত্ব খুব বেশি নয় কারণ খ্রিষ্টীয় অষ্টাদশ শতকের পূর্বে এই পাঁচালির কোনো পুঁথি পাওয়া যায় না। অন্য দুটি পাঁচালি তেমন ব্যাপকতা লাভ করেনি। বর্তমানে রঙ পাঁচালি, শাস্ত্রীয় পাঁচালি, মনসা’র পাঁচালি প্রভৃতি নামে বেশ কিছু পরিবেশনারীতির প্রচলন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে আজও দেখা যায়। সুতরাং পাঁচালি সম্পর্কে এই দীর্ঘ আলোচনায় দেখা যায় আখ্যায়িকা বা আখ্যান হচ্ছে পাঁচালির মৌলিকতা, যার বিকাশে ছন্দবদ্ধ লেখ্যরূপ হচ্ছে একটি মাধ্যম। এই লেখ্য কাব্য বা নাটলিপির ওপর নির্ভর করে যদি বলা হয় যে, ‘পাঁচালির এই সংশ্লেষণ ক্ষমতার কারণেই দেখা যায় স্বতন্ত্রভাবে শিল্পের শ্রেণীভেদে বিবেচ্য, এমন কোনো বাঙলা আঙ্গিক স্বতন্ত্ররূপ লাভে সমর্থ হয়নি’ - তাহলে এই কথাটিকে সর্বাংশে মেনে নেয়া যায় না। এখানে সেলিম আল দীন প্রদত্ত পাঁচালির সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আলোকপাত করা যেতে পারে।

ক.    ‘মধ্যযুগে পাঁচালি-আখ্যানের কোথাও পদ, দিশা ও নাচাড়ি ব্যতিরেকে পরিবেশনার অন্য কোনো নির্দেশ লভ্য নয়। ... ইতিহাসদৃষ্টে এ কথা সুস্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয় যে, কোনো সুনির্দিষ্টরূপ নির্ণায়ক শাস্ত্রের অধীনে বাঙলা নাট্যরীতি গড়ে ওঠেনি। পাঁচালি অভিনয়ের ক্ষেত্রেও এই কথা প্রযোজ্য। মূলত শিথিলভাবে তিন অঙ্গের (পদ বা শিকলি, দিশা ও নাচাড়ি) প্রয়োগেই পাঁচালির অভিনয় পরিবেশিত হতো।’১৪
 
এই সংজ্ঞায় কোনো পরিবেশনায় তিনটি উপাদানের (পদ বা শিকলি, দিশা ও নাচাড়ি) প্রয়োগ থাকলে তাকে পাঁচালি বলা যায়। এখানে পদ বা শিকলি অর্থ কথার সঙ্গে কথা, ছোট ছোট পদ,১৫  দিশা অর্থ ধুয়াপদ যা গায়েন ও দোহার কণ্ঠে পৌনঃপুনিক আবৃত্তি করা হয়১৬  এবং নাচাড়ি অর্থ তিন চরণ বিশিষ্ট পদ। পাঁচালির এই ব্যাখ্যায় অভিনয়রীতি সম্পর্কে যে ধারণা পাওয়া যায় তাতে এই অনুমান করা যায় যে, একজন গায়েন দোহার পরিবেশিত ধুয়া সহযোগে নৃত্যযুক্ত অভিনয় করেন।

খ.    ‘বাস্তবে - বর্ণনা, সংলাপ, নৃত্য, গীত, ধুয়া বা দিশা এবং সর্বোপরি উপস্থিতমত গদ্যে উক্তি-প্রত্যুক্তি (যা গায়েনের স্ব উচ্চারিত) এই হল পাঁচালির উপাদান।’১৭
 
এই সংজ্ঞাতেও পুনরায় পাঁচালি আঙ্গিকের উপাদান নির্দেশ করা হয়েছে- বর্ণনা, সংলাপ, নৃত্য, গীত, ধুয়া বা দিশা এবং সর্বোপরি উপস্থিতমত গদ্যে উক্তি-প্রত্যুক্তি প্রভৃতি। অর্থাৎ যদি কোনো পরিবেশনায় উক্ত উপাদানসমূহের প্রয়োগ বা উপস্থিতি থাকে তাকে পাঁচালি নামে আখ্যায়িত করা যায়। এই সংজ্ঞায় বর্ণনা, সংলাপ এবং উপস্থিত উক্তি-প্রত্যুক্তি এই তিনটি উপাদানের অতিরিক্ত প্রয়োগ দেখা যায়। উক্ত অতিরিক্ত উপাদানের নির্দেশ প্রথম সংজ্ঞায় উক্ত ‘মধ্যযুগে পাঁচালি আখ্যানের কোথাও পদ, দিশা ও নাচাড়ি ব্যতিরেকে পরিবেশনার অন্যকোনো নির্দেশ অধিকাংশ ক্ষেত্রে লভ্য নয়’- এই মতের সাথে অসংগতি তৈরি করে।

গ.    ‘মধ্যযুগের পাঁচালিতে মোট তিন কি চারটি পরিবেশনামূলক শব্দ প্রায় সর্বত্র লভ্য। সেগুলো হল - ধুয়া, পয়ার, ত্রিপদী বা নাচাড়ী, এর সঙ্গে থাকতো শিকলি। পাঁচালি পূর্বাপর নাট্যরূপ বিবেচ্য। এতে গীত ও গদ্যে উক্তি-প্রত্যুক্তি আছে, সঙ্গে নৃত্য তবে পাঁচালির প্রকৃত রসনিষ্পত্তি গায়েনের অভিনয়ে।’১৮
 
এখানে পাঁচালির আঙ্গিক বৈশিষ্ট্যের আরও কিছু উপাদানের উল্লেখ করা হয়েছে এবং অতিরিক্ত একটি উপাদান হিসেবে ‘পয়ার’-এর উল্লেখ দেখা যায়। কিন্তু এই উপাদানটির প্রয়োগ পরিবেশনা রীতি অনুযায়ী ‘বর্ণনা বা বর্ণনাত্মক অভিনয়ের’ সমার্থক নয় বলে মনে হয়। কেননা পয়ার এর ব্যাখ্যায় সেলিম আল দীন নিজেই বলেছেন- ‘পয়ার হচ্ছে পাঁচালির ছন্দ যা মধ্যযুগে প্রায় সকল পরিবেশনামূলক কাব্যের বিস্তৃত অংশ জুড়ে এই ছন্দের একাধিপত্য।’১৯  অন্যভাবে একে ‘অক্ষরবৃত্ত ছন্দও বলা যায়।’২০  পয়ার ছন্দ মধ্যযুগের সাহিত্য রচনার প্রধান বাহন এবং বর্ণনাত্মক অভিনয়রীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যা বর্ণনাত্মক কাব্যাভিনয় বা গীতাভিনয় রূপে পরিবেশিত হয়। কিন্তু সেলিম আল দীন-এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী ‘বর্ণনাত্মক অভিনয়রীতি নাট্যস্থিত বর্ণনাকে সংলাপের রীতিতে উপস্থাপন করে। এবং বর্ণনাত্মক নাট্য বর্ণনা ও সংলাপের মাধ্যমে পাঁচালি ও কথকতার ধারায় খানিকটা আধুনিককালের উপন্যাস বা কথা সাহিত্যের ধাঁচে রচিত নাটক। এই শ্রেণীর নাট্যের মধ্যে চাকা, হরগজ, যৈবতী কন্যার মন, নাথবতী অনাথবৎ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।’২১  এই সংজ্ঞায় ‘বর্ণনাত্মক অভিনয়রীতি’-এর ব্যাখ্যায় ‘বর্ণনাকে সংলাপের রীতিতে উপস্থাপন করে’ বলা হলে সেখানে পয়ার, ত্রি-পদী বিভিন্ন ছন্দ সম্পূর্ণ গৌণ হয়ে যায়। কেননা এই সকল ছন্দ এমন এক মাধ্যম যা কাব্যাভিনয় অথবা গীতাভিনয়ের মাধ্যমেই কেবল উপস্থাপন করা যায়। অর্থাৎ বর্ণনাত্মক অভিনয়ের এই ধরনের ব্যাখ্যায় ‘বর্ণনাত্মক অভিনয়রীতি’ এবং ‘পয়ার’ দুুটি ভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপিত হয় বলে মনে করা যায়। কিন্তু মধ্যযুগের পাঁচালি তো বটেই, অন্যান্য নাটলিপি রচনায় ‘পয়ার’ হচ্ছে প্রধান মাধ্যম। তাছাড়া পাঁচালির উপাদান হিসেবে যে সকল গীত, ধুয়া, নাচাড়ি প্রভৃতি উপাদানের কথা বলা হচ্ছে নাটলিপিতে তা ‘পয়ার’, ‘ত্রি-পদী’, প্রভৃতি ছন্দে বিন্যস্ত হয়ে থাকে। তবে নাচাড়িকে কেউ কেউ ত্রিপদী ছন্দ নামে ব্যাখ্যা করেছেন। সুতরাং ‘বর্ণনাত্মক অভিনয়রীতি’ এবং ‘পয়ার’ সম্পর্কে এই ভিন্ন ব্যাখ্যা পাঁচালি এবং বর্ণনাত্মক অভিনয়রীতি সম্পর্কে নতুন জটিলতা তৈরি করে।

স্পষ্টতই, সেলিম আল দীনের ব্যাখ্যায় পাঁচালির আঙ্গিক ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কোনো সুুস্পষ্ট ধারণা প্রদান করে না। অধিকন্তু পাঁচালি সম্পর্কে আরও একটি সংজ্ঞায় তিনি বলেন ‘গায়েন-বায়েন-দোহার মঞ্চে উপস্থিত হয়ে আখ্যান পরিবেশন করে তবেই তা পাঁচালি। পাঁচালি পূর্বকৃত নয়, আসরে পরিবেশন ছাড়া পাঁচালি হয় না।’২২  যদি পাঁচালি সম্পর্কে এরূপ সাধারণীকৃত সংজ্ঞা প্রদান করা হয়, তাহলে বাংলাদেশের তাবৎ আখ্যানধর্মী লোকনাট্যকে পাঁচালির সংজ্ঞাভুক্ত করা যায়। সেক্ষেত্রে গীতিকাসমূহ কেন পাঁচালি নয়? এই প্রশ্নের জবাবে সেলিম আল দীন বলেন ‘পাঁচালিকার এবং পালাকার এক অর্থে ব্যবহৃত না হওয়াই বাঞ্ছনীয়। কারণ, পূর্ববঙ্গীয় গীতিকাসমূহ পালা, পাঁচালি নয়।’২৩  পালা’কে পাঁচালি না বলার এই সিদ্ধান্তের পেছনে তিনি কোনো যুক্তি দেননি। তার এই সিদ্ধান্ত খণ্ডন করে বলা যেতে পারে যে, পালা’য় একটি সম্পূর্ণ আখ্যান আছে। গায়েন, বায়েন, দোহার-এর উপস্থিতিসহ নৃত্য, গীত, বর্ণনা, উক্তি-প্রত্যুক্তিমূলক সংলাপ প্রভৃতি সকল উপাদানই পালা পরিবেশনারীতির আঙ্গিক ও উপাদান পূরণ করে।

এই দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে সেলিম আল দীন-এর শিল্পচিন্তা ও প্রয়োগ ভাবনা বিষয়ে একটি মূল বক্তব্যে আসা যেতে পারে। শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চার নাটক রচনা এবং পরিবেশনার ক্ষেত্রে এমন একটি মুক্ত আঙ্গিক গ্রহণ করা উচিত, যেখানে শিল্প সৃষ্টিকে উদ্বেলিত করবে দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পচিন্তা এবং প্রয়োগ রূপায়ণকে সম্ভব করে তুলবে পাঁচালির আঙ্গিক ও বৈশিষ্ট্য। তাঁর পাঁচালি ও দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পচিন্তা সম্পর্কে যে দীর্ঘ বিশ্লেষণ করা হয়েছে সেখানে দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্বকে শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় সময়োপযোগী চিন্তা বলে মনে করি। শিল্প সৃষ্টির মূলে তাঁর দ্বৈতাদ্বৈতবাদী দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কেননা তা পরিবেশনায় বহুমুখী রস সৃষ্টি করতে সক্ষম। তাছাড়া দীর্ঘ দু’শো বছরের প্রসেনিয়াম মঞ্চ নির্ভর ইউরোপীয় ধারার বিকল্প একটি নাট্য ভাবনাকে উজ্জীবিত করতে সক্ষম এই দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্ব। কারণ, এই শিল্পতত্ত্বের আলোকে আধুনিক নাট্য অনুষঙ্গের সাথে বর্ণনা, সংলাপ, নৃত্য, গীত প্রভৃতি উপাদানের সমম্বয় ঘটানো সম্ভব। কিন্তু দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্বের প্রয়োগে পাঁচালির আঙ্গিক সম্পর্কে প্রদত্ত সংজ্ঞা সূত্রকে মেনে নিলে শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চার এই ধারাটি অচিরেই একঘেঁয়ে হয়ে ওঠার সম্ভাবনা প্রবল হয়ে ওঠে। এর মূল কারণ প্রদত্ত পাঁচালির সংজ্ঞা লোকনাট্যের পরিবেশনরীতিসমূহকে একটি সাধারণীকৃত দৃষ্টিভঙ্গিতে গ্রহণ করে। অর্থাৎ গায়েন, দোহার, ধুয়া, পদ, নৃত্য, গীত প্রভৃতি উপাদানের সমষ্টিগত উল্লেখ পূর্বক পাঁচালির সংজ্ঞা প্রণয়ন লোকনাট্য সম্পর্কে একটি সাধারণ ধারণা প্রদান করে। এই ধারণা লোকনাট্য পরিবেশনারীতির স্বতন্ত্র, স্বকীয় এবং সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য অম্বেষণে সহায়তা করে না বরং সুক্ষ্ম বৈশিষ্ট্যগুলো হারিয়ে যায়। ফলে লোকনাট্যের এই সাধারণীকৃত ধারণা শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় কতটুকু বৈচিত্র্যদানে সক্ষম সে বিষয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ থেকে যায়। সুতরাং নাট্যচর্চাকে সমৃদ্ধ করতে এই মুহূর্তে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি জরুরি বলে মনে করি সেটি হচ্ছে লোকনাট্য পরিবেশনারীতির উপাদান বৈশিষ্ট্যের অন্বেষণ এবং তার সুক্ষè বিশ্লেষণ। প্রয়োজন নাট্যক্রিয়ার সেই অচিন পাখিকে ধরতে চেষ্টা করা, যে পাখির রহস্যময় রঙিন সুতায় গাঁথা মনসার আখ্যান দর্শনে অমাবশ্যার গহীন অন্ধকার উপেক্ষা করে হাজারো মানুষের মিলন মেলায় পরিণত হয় কোনো এক গ্রামের বয়ানী’র আসর।

আমাদের বর্ণনাত্মক অভিনয়ে গায়েন বা কথক যখন কোনো ‘গল্প’ বলেন, দর্শক শ্রোতা তন্ময় হয়ে শোনেন এবং দেখেন। দর্শকবৃন্দের সঙ্গে অদৃশ্য যোগসূত্র স্থাপন করে, অহরহ তাঁদের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া এবং সর্বক্ষণ দৃষ্টি বিনিময়ের মাধ্যমে এই দক্ষ ‘কথক’ এমন এক সুক্ষ্ম কাহিনীর জাল বিস্তার করে চলেন সেখানে তিনি বাস্তব স্থান ও কাল থেকে গল্পের স্থান ও কালে অনায়াসে বিচরণ করেন।২৪
 
অতএব এই দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, সেলিম আল দীন-এর দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্ব শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় লোকনাট্যের প্রয়োগ সম্ভাবনাকে সার্থক করে তুলতে সহায়ক। কেননা এই শিল্পতত্ত্বের মুক্ত অঙ্গিনায় বিভিন্ন নাট্য অনুষঙ্গ পরস্পরের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করতে সক্ষম।

সৈয়দ জামিল আহমেদ

জাতীয় নাট্য আঙ্গিক নির্ণয়ে যে ব্যক্তি বাংলা নাট্যচর্চায় নিরীক্ষাধর্মী নিদর্শন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি সৈয়দ জামিল আহমেদ। পরদেশে নাট্যবিষয়ে অধ্যয়নকালীন সময়ে তাঁর কিছু অভিজ্ঞতা এবং উপলব্ধি পরবর্তী সময়ে তার নাট্যচর্চায় বড় ধরনের পরিবর্তন বয়ে আনে।

১৯৭৫ থেকে ’৭৯ সাল পর্যন্ত ভারতের ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা’য় (এন.এস.ডি) অধ্যয়নের সময় থেকেই আমি ঈর্ষাম্বিত হয়েছি ভারতীয় নাট্যকর্মীদের রামায়ন-মহাভারতের মৌল-উপাদানের সম্ভাবনার ক্ষেত্র দেখে এবং দীর্ঘদিন ভেবেছি বাংলাদেশের এমন একটি জাতীয় নাট্য পরিচয় উপস্থাপন করা কি সম্ভব যা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ‘সাধারণ জমিন’-এর উপর দাঁড়িয়ে বর্তমান জীবনের মৌলিক মানবিক চাহিদা মেটাতে সক্ষম হবে?২৫

এই উপলব্ধির বহিঃপ্রকাশ লক্ষ্য করা যায় তাঁর নির্দেশিত বিভিন্ন প্রযোজনায়, যার মধ্যে চাকা, বিষাদ সিন্ধু এবং কমলারাণীর সাগর দীঘি উল্লেখযোগ্য। জামিল আহমেদ মনে করেন শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় লোকনাট্যের উপাদান প্রয়োগের ক্ষেত্রে সমকালীন ব্যাখ্যা মুখ্য বিচার্য হওয়া উচিত। তাঁর সমৃদ্ধ গ্রন্থ Acinpakhi Infinity ; Indigenous Theatre of Bangladesh গ্রন্থের শুরুতেই তিনি বলেন, ‘Why should not Bangladesh have a national theatre idiom rooted in its indigenous theatre tradition which be capable of reflecting the hopes dreams and aspirations of the people of the country - a theatre both popular as well as meaningful?’২৬ তাঁর এই কথারই রূপায়ন দেখতে পাওয়া যায় বিষাদ সিন্ধু প্রযোজনার মাধ্যমে। সমকালীন বৃহত্তর বাঙালি মানসের মানবিক চাহিদাকে ছুঁয়ে যাবার জন্য তিনি বিষয় হিসেবে কারবালার মর্মস্পর্শী ঘটনাকে নির্বাচন করেন। কারণ, একদিকে আখ্যান হিসেবে বিষাদ সিন্ধু’র প্রতি এ দেশের অধিকাংশ মানুষের রয়েছে তীব্র আবেগ, পাশাপাশি এই মর্মস্পর্শী ঘটনার নানান ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ সমকালীন প্রেক্ষাপটের অনেক মৌলিক প্রশ্নকে স্পর্শ করতে সক্ষম।

বিষাদ সিন্ধু স্পষ্টতই ঊনবিংশ শতাব্দির মুসলিম বাঙালি মানসের চেতনার ফসল যা স্বকীয় পরিচয়ের অন্বেষণে ছিল সদা ব্যস্ত। এদের মূল কথাই যেন আমি ‘হিন্দু’ নই। বহু পণ্ডিত একে গোঁড়ামী আখ্যায়িত করলেও এর মূলে রয়েছে আত্মসচেতনতা। যে ব্রাহ্মণ্যবাদ বৌদ্ধধর্মকে গ্রাস করেছিল তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। বিষাদ সিন্ধু সেই প্রতিরোধের ফসল যা অবশ্যই মৌলবাদী নয়।২৭
 
লোকনাট্যের বিষয় ও আঙ্গিক লোকজীবনের সমসাময়িক কালকে অস্বীকার করে না বরং জীবনের অংশীদার হয়ে পরিবেশনাকালীন ঘটমান বর্তমান অস্তিত্বমান হয়। এই উপলব্ধিটি তিনি তাঁর সকল কাজে সমসাময়িক কালকে সম্পর্কিত করার মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কখনো কখনো তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁর নির্দেশিত নাটক কমলারাণীর সাগর দীঘি সম্পর্কে বলেন -

I consider our greatest failure was we did not challange and subvert the male centered worldview, which dominates the performence text. Kamala is a faithful and dutiful wife, who sets aside her intelligence for meaningless male chauvinism of her husband Dharma Raj. I certainly do not mean that we shoule have changed the entire story. but we could have questioned the values, which sets Dharma Raj to force Kamala to follow his whims. If all these could have been done kamala Ranir Sagar Dighi would present what I consider to be a model of how tradition could be contemporaneous২৮

সরাসরি গ্রামীণ আসর থেকে তুলে আনা এবং লোকশিল্পীদের দ্বারা প্রশিক্ষিত একটি প্রযোজনা এই কমলারাণীর সাগর দীঘি। প্রযোজনায় ‘পালাগানে’র উপাদান ও পরিবেশনারীতির মৌলিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুণœ রেখে নির্দেশক তাঁর নাট্যচিন্তার সমন্বয় করেন যা ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা লাভে সক্ষম হয়। তবে নাটকটির সমকালীন ব্যাখ্যার অপূর্ণতার পাশাপাশি আরও একটি লক্ষ্যণীয় বিষয় হ্েচছ, এই প্রযোজনার ঘটনা-বিন্যাস বা প্লট। লোকনাট্য এবং শহরকেন্দ্রিক আধুনিক নাট্যের পার্থক্য ও সীমাবদ্ধতার নিদর্শন হিসেবে কমলারাণীর সাগর দীঘি হতে পারে একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। নাটকটির ঘটনা-বিন্যাস প্রসঙ্গে নির্দেশকের বক্তব্য হচ্ছে -

I decided to fix the story and try no inprovisations for topical comments. I also decided to have the students perform only a part of Islamuddin Bayati's narrative from the beginning, where Dharma Raja is married Kamala to her drowning in the rising water of the tank. This simplified the task for the students by focussing on one central chracter, i.e. Kamala and building towards a dramatic end.২৯

উদ্ধৃতিতে দেখা যাচ্ছে তাঁর নির্দেশিত কমলারাণীর সাগর দীঘি’র আখ্যান মূল পালার আখ্যান থেকে সংক্ষিপ্ত ও সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে, যেখানে আখ্যানটি একটি নির্দিষ্ট চরিত্র কমলা কে কেন্দ্র করে নাটকীয় পরিণতিতে গমন করে। ফলে নাটকটি প্রচলিত শহরকেন্দ্রিক নাটলিপি অনুবর্র্তী অন্যান্য নাটকের মতই পরিবেশিত হয়। লোকনাট্যের যে সীমাহীন নমনীয়তা, যেখানে গায়েন তার ইচ্ছা এবং দর্শকের মানসিক চাহিদা অনুযায়ী আখ্যানের গতি, ভাব-রস পরিবর্তন করে আখ্যান পরিবেশন করেন, তার পরিবর্তে আখ্যান নির্দিষ্টকরণের ফলে ‘পালাগানের’ অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের অক্ষুণœতা সত্ত্বেও আখ্যানের নমনীয় গতিশীলতা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। প্রযোজনাটি সমকালীন ব্যাখ্যায় দাঁড়াতে না পারার পেছনে এটাও একটি কারণ বলে মনে করি। সুতরাং শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় লোকনাট্য উপাদানের প্রয়োগ সম্বলিত দৃষ্টিনন্দন প্রযোজনা নির্মাণই একমাত্র বিবেচনা নয়, পাশাপাশি ঐ সকল উপাদানসমূহের সমকালীন ব্যাখ্যা উপযোগী হয়ে ওঠাও সমান বিবেচ্য হওয়া উচিত। এই প্রযোজনাটির ক্ষেত্রে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে পরিবেশনার কুশীলববৃন্দ বিশেষ করে মূল গায়েন। বহুল পরিবেশিত এই নাটকটির আখ্যানের গতি, ভাব ও রস নিয়ন্ত্রণে মূল গায়েন কতটুকু দক্ষতা অর্জন করেছিলেন? প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ, লোকশিল্পীর ন্যায় শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায়ও নৃত্য, গীত, বর্ণনা, সংলাপের সমন্বিত কুশলতায় দক্ষ হয়ে ওঠা একজন পূর্ণাঙ্গ শিল্পীর পক্ষেই একটি বিষয়কে সমকালীন ব্যাখ্যা উপযোগী করে তোলা সম্ভব।

লোকনাট্য অভিনয় উপাদান এর প্রয়োগ এবং বিষয়বস্তুর সমকালীনতা তৈরির ক্ষেত্রে আসর বা মঞ্চ পরিকল্পনার বিষয়টি জড়িত। কেননা লোকনাট্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে দর্শক ও অভিনেতার সহ-অবস্থান ও পারস্পরিক সম্পর্ক। আর এই সম্পর্ককে ঘনিষ্ট করে তোলে আসর পরিকল্পনা। সুতরাং শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় লোকনাট্যের উপাদান প্রয়োগে নাট্যশালার কাঠামোগত দিক থেকেও ব্যাপক পরিবর্তন প্রয়োজন। বর্তমানে ঢাকা শহরকেন্দ্রিক নাটকের অধিকাংশ প্রদর্শনী নাটক সরণীস্থ মহিলা সমিতি এবং গাইড হাউজ নাট্যশালায় পরিবেশিত হয়। এ দুটোর মধ্যে শুধুমাত্র মহিলা সমিতি নাট্যশালায় প্রসেনিয়াম থেকে বেরিয়ে এসে নিরীক্ষাধর্মী কাজ করা যায়। কিন্তু নাট্যশালার অপরিসর আয়তন এবং আনুষঙ্গিক অন্যান্য সুবিধাদির অপ্রতুলতার কারণে বৃহৎ পরিসরের নিরীক্ষাধর্মী কোনো নাট্যভাবনা প্রয়োগ করা সম্ভব হয় না। এরকম একটি প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের জাতীয় নাট্যশালার গঠন কাঠামো কি হওয়া উচিত, এ প্রসঙ্গেও জামিল আহমেদের সুস্পষ্ট অভিমত রয়েছে। তাহলে কেমন হবে আমাদের জাতীয় নাট্যশালা? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন - ‘যা একাধারে আধুনিক একান্তভাবে বাংলাদেশের নিজস্ব আদলে নির্মিত এবং স্বল্প ব্যয়ে পরিচালিত হবে।’৩০ এখানে ‘নিজস্ব আদল’ বলতে তিনি লোকনাট্যের আসর নির্মাণ রীতিকে বুঝিয়েছেন। এই বিষয়ে তার সমস্ত আলোচনায় লোকনাট্যের আসর পরিকল্পনার প্রকারভেদ এবং স্থায়ী আসর পরিকল্পনার (নাট্যশালা) গঠনরীতি তুলে ধরে সে আলোকে আমাদের জাতীয় নাট্যশালার গঠন কাঠামো প্রস্তাব করেছেন যা একাধারে আধুনিক এবং স্বল্প ব্যয়ে পরিচালিত হতে পারে। (বিস্তারিত ‘নাটমণ্ডপ ও বাংলাদেশের জাতীয় নাট্যশালা’ বিষয়ক প্রবন্ধ, নাট্যপত্র, ঢাকা-১৯৯৫)

নির্দেশক ও গবেষক সৈয়দ জামিল আহমেদ-এর আলোচনা থেকে তিনটি বিষয়ের প্রতি আলোকপাত করা যায়। ক. শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় সমকালীন ব্যাখ্যা ছাড়া লোকনাট্য উপাদানের প্রয়োগ কেবল অলংকার মাত্র। খ. নাটলিপি রচনায় লোকনাট্যের নমনীয়তাকে গ্রহণ করা এবং গ. পরিবেশনাকে যথাসম্ভব দর্শক সান্নিধ্য করে তোলা। এই বিষয়সমূহের আলোকে সুম্পষ্টভাবে এই কথাটিই প্রতিয়মান হয় যে, শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় লোকনাট্য উপাদান প্রয়োগের মাধ্যমে একটি দৃষ্টিনন্দন প্রযোজনার মঞ্চায়নই একমাত্র বিচার্য নয়, পাশাপাশি সমান গুরুত্বে বিবেচ্য হওয়া উচিত একটি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মৌলিক মানবিক চাহিদা স্পর্শ করার ক্ষমতা অর্জন করা। ‘আমাদের অবশ্যই স্মরণ রাখতে হবে যে, বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসন পূর্বে বাংলাদেশের থিয়েটার অর্থই ছিল শিক্ষা, উৎসব, ধর্ম এবং তাবৎ অর্থে প্রকৃতি ও বৈরি রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রামের হাতিয়ার। ষোড়শ শতকে চৈতন্যের যাত্রা ছিল উপাসনার মাধ্যম এবং ব্রাহ্মণ-মুসলমান শোষণের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিরোধের ব্যবস্থা।’৩১  সুতরাং বর্তমান শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় লোকনাট্যের উপাদান-বৈশিষ্ট্যের প্রয়োগ সম্ভাবনার দৃষ্টিকোণ থেকে উল্লেখিত চারটি বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা যেতে পারে।

জাহিদ রিপন

এই প্রজন্মের তরুণ নির্দেশক জাহিদ রিপন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করে নিজ এলাকায় ‘ফরিদপুর থিয়েটার’ নাট্যদলের সাথে যুক্ত হন। দলে নির্দেশনার দায়িত্ব লাভ করে জনাব রিপন নাট্যচর্চায় তার মত ও চিন্তার প্রয়োগ করে অল্প কিছুদিনের মধ্যে নিজ এলাকায় যথেষ্ট পরিচিতি লাভ করেন। তার নির্দেশিত কাজলরেখা এবং ত্রিংশ শতাব্দী নিজ এলাকায়ই শুধু নয় বিভিন্ন শহরে যথেষ্ট দর্শকপ্রিয়তা লাভে সক্ষম হয়। নাট্যচর্চায় লোকনাট্যের গুরুত্ব প্রসঙ্গে তিনি মনে করেন - লোকনাট্যের আধুনিকীকরণের মধ্য দিয়ে বাঙলার নিজস্ব নাট্য আঙ্গিক খুঁজে পাওয়া সম্ভব। তিনি বাংলা একাডেমী’র তরুণ লেখক প্রকল্পের অধীনে প্রকাশিত ‘লোকনাট্যের আধুনিক উপস্থাপনরীতি : মৈমনসিংহ-গীতিকা’র কাজলরেখা গ্রন্থে লোকনাট্যের আধুনিকীকরণ প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি লোকনাট্যের বিবর্তন সম্পর্কে গুরুত্ব আরোপ করে বলেন -

আদিম সমাজ থেকে উপর্যুক্ত ক্রমবিবর্তনের পান্থ বাঙলা লোকনাট্যের গন্তব্যাভিমুখী সম্মুখ যাত্রাপথে অপ্রত্যাশিত মধ্যখণ্ডন ঘটেছে দেশ-কাল প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সম্পর্কহীন পাশ্চাত্যের বিজাতীয় উন্মুল শিল্পরীতিরূপী উপপ্লব দ্বারা, অষ্টাদশ শতাব্দীর অন্তে। সে হঠাৎ বজ্রপাতের ঝলকানিতে সাময়িক অন্ধত্ব প্রাপ্ত হয়েছিলেন পাশ্চাত্যপ্রেমী বাঙালিরা এবং তৎসঙ্গে বাঙলার নিজস্ব নাট্যও সম্মুখ অগ্রসরমানতার অবলম্বন হারিয়ে পথিমধ্যেই মুখ থুবড়ে পড়েছিল।’৩২

এইরূপ একটি প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় লোকনাট্যের গুরুত্ব প্রসঙ্গে তাঁর সুস্পষ্ট অভিমত হচ্ছে -

এখনই সময় আত্ম অনুসন্ধানের। কেননা শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চার উন্নয়নে লোকনাট্যের প্রয়োজনীয়তা আজ স্বীকৃত। তাই একসময়ে ‘শুধু বাঙালির অবহেলা’র কারণে যে নাট্য ঘরের নিভৃত কোণে ঠাঁই নিতে বাধ্য হয়েছিল, আজ সচেতনভাবেই সেই ‘দুয়োরাণী'কে তার পর্ণকুটির থেকে সসম্মানে তুলে নিয়ে এসে ‘রাজপুরী’তে স্থান প্রদান করা উচিত। ‘সুতরাং বাঙালির বিস্মৃতপ্রায় লোকনাট্যসমূহকে আধুনিক জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়ে পরিশীলনের মাধ্যমেই কেবলমাত্র বাঙলার নিজস্ব নাট্যরীতি তথা ‘বাঙলা নাট্যাঙ্গিক’ খুঁজে পাওয়া সম্ভব। আর এ কারণেই বর্তমান সময়ে আধুনিক জ্ঞান-বুদ্ধি-বিবেচনা ও আন্তরিকতা সহকারে লোকনাট্যের আধুনিক উপস্থাপনরীতি উদ্ভাবনে অগ্রসর হওয়া একান্তই জরুরী। ৩৩

তাই লোকনাট্যের আধুনিকীকরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন -

বাঙলা লোকনাট্যের আধুনিক উপস্থাপনার ক্ষেত্রে উপস্থাপনাকে অবশ্যই আধুনিক কাল ও শিল্পরুচির সমান্তরালে হাল নাগাদ শিল্প সমসাময়িক বা আধুনিকীরকণ আবশ্যক। এক্ষেত্রে শিল্প যুক্তি ও প্রয়োজনানুযায়ী বহির্বিশ্বের যেকোনো নাট্যরীতির সাফল্যের অনুষঙ্গসমূহকে লোকনাট্যের সঙ্গে এর মত সংযুক্ত করার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করে দেখা যেতে পারে।৩৪
 
তবে লোকনাট্যের এই আধুনিকায়নে তার কিছু বিধি নিষেধ রয়েছে। কেননা যেকোনোভাবে আধুনিকীকরণ লোকনাট্যকেই ক্ষতিগ্রস্থ করবে। সেক্ষেত্রে তিনি সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেন-

আধুনিককালের শিল্পরীতিসমূহ হতে বাঙলা লোকনাট্যের আধুনিকীকরণে ঠিক সে মাত্রায় গ্রহণ করা সঙ্গত হবে যাতে লোকনাট্যের ক্রম-অগ্রসরমানতার প্রেরণা-নবগতি-সুবিকাশ অর্জিত হয় এবং তৎসঙ্গে তার স্বকীয়তাও পূর্ণমাত্রায় রক্ষিত হয়।৩৫

লোকনাট্যের আধুনিকীকরণের উল্লেখিত প্রক্রিয়া এবং ধারণার উপর ভিত্তি করে তিনি ময়মনসিংহ গীতিকা অবলম্বনে কাজলরেখা নাটকটি পরিচালনা করেন। কাজলরেখা’র আধুনিকায়নের প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন -

নাট্য গবেষণাগারে নির্মিত লোকনাট্য কাজলরেখা’র আধুনিক উপস্থাপনারীতি সম্পর্কিত আলোচনার পূর্বেই ‘মৈমনসিংহ-গীতিকা’র মূলপালাটির কাহিনী-সংলাপ-ভাষা তথা সাহিত্যগত দিকের প্রেক্ষিতে সংঘটিত সংযোজন-বিয়োজনসমূহ এবং এর যৌক্তিকতা আলোচিত হবার দাবী রাখে। বলাবাহুল্য, এ পরিবর্তনসমূহ লোকনাট্যের মূল কাঠামোকে অবিকৃত রেখে নাটকীয় উদ্দেশ্য পূরণে তথা আধুনিক দর্শকদের রুচির সমান্তরালে সংস্থাপনের নিমিত্তেই। আর লোকনাট্য যেহেতু অজর শাস্ত্রসূত্রের রক্তচক্ষুকে অগ্রাহ্য করে এবং তা প্রতিকালে যুগরুচির সমান্তরালে অবস্থান গ্রহণের বিষয়ে নৈতিক বাধামুক্ত, তাই এ সংশ্লেষ প্রয়াস অযৌক্তিক নয়। তাছাড়া, পূর্বেই উল্লেখিত হয়েছে, প্রাপ্ত গীতিকাগুলো সম্পূর্ণরূপে সংকলিত হয়নি এবং স্থান-কাল-গায়েন ভেদে প্রতি আসরে এর আংশিক পরিবর্তন বা সমকালীনতার সংযুক্তি নিয়ম বহির্ভূত নয়।৩৬
 
লোকনাট্যের আধুনিক উপস্থাপনার জন্য কাজলরেখা’র নির্মাণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে জাহিদ রিপন উক্ত গ্রন্থে যে ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন তার ওপর আলোকপাত করা প্রয়োজন বলে মনে করি।

কাজলরেখা’র আধুনিক উপস্থাপনরীতি সম্পর্কে যে ধারণা পাওয়া যায় তাতে দেখা যায়, লোকনাট্যের একটি ‘মূল কাঠামো’র ওপর ভিত্তি করে নাটকটি নির্মিত হয়েছে। আর এই কাঠামোর মধ্যে থেকেই কাজলরেখা’র ঘটনা বিন্যাস, ভাষা বিন্যাস, আঙ্গিক ও অভিনয়রীতি প্রভৃতি বিষয়ে লোকনাট্যের উপাদান-বৈশিষ্ট্যের সাথে আধুনিক নাট্যের নানা অনুষঙ্গকে গ্রহণ, বর্জন বা সমন্বয় সাধন করা হয়। ঘটনা বিন্যাস-এর ক্ষেত্রে মূল আখ্যান বা গীতিকার পালাটিকে সংযোজন-বিয়োজনের মাধ্যমে একটি সু-নির্দিষ্ট নাটলিপিতে রূপান্তর করা হয়, যেখানে সমকালীন বিভিন্ন বিষয় ও ঘটনা অন্তর্ভুক্ত হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে গায়েনের ব্যাখ্যা বা দোহারদের উক্তি-প্রত্যুক্তির মাধ্যমে সমকালীন বিষয় ও ঘটনাসমূহ উপস্থাপিত হয়। সমগ্র নাটলিপিটি ফরিদপুরের আঞ্চলিক ভাষায় রচনা করা হয়। ভাষার এই পরিবর্তনের মাধ্যমে আখ্যানটিকে আঞ্চলিক মানসের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার একটি সচেতন প্রয়াস লক্ষ্যণীয়। কাজলরেখা’র এই নাটলিপি বর্ণনাত্মক এবং সংলাপাত্মক মিশ্র অভিনয় রীতিতে পরিবেশিত হয় যেখানে গায়েনের বর্ণনাত্মক অভিনয়ের পাশাপাশি দোহারদের উক্তি-প্রত্যুক্তি এবং চরিত্রের সংলাপাত্মক অভিনয় দেখা যায়। এছাড়া দোহারগণের যৌথ অংশগ্রহণের মাধ্যমে দৃশ্য নির্মাণ ও পরিবর্তন করা হয়। সুতরাং কাজলরেখা’র এই নির্মাণ প্রক্রিয়াটি নিঃসন্দেহে একটি দক্ষ নাট্যচিন্তার ফসল।


কিন্তু এই নির্মাণ প্রক্রিয়ায় লোকনাট্যের ‘আধুনিকীকরণ’, ‘স্বকীয়তা রক্ষা’ ও ‘মূল কাঠামো’ বিষয়ে জাহিদ রিপন যে ব্যাখ্যা প্রদান করেন তা বেশ কিছু প্রশ্নের উদ্রেক করে। তিনি লোকনাট্যের ‘মূলকাঠামো’র কথা উল্লেখ করে বলেছেন যে এই কাঠামোকে অবিকৃত রেখে লোকনাট্যের আধুনিকীকরণ এবং একই সাথে স্বকীয়তাও রক্ষা করা সম্ভব। কিন্তু লোকনাট্যের ‘মূল কাঠামো’ কি, তা আদৌ রয়েছে কিনা জাহিদ রিপনের আলোচনায় সেটা স্পষ্ট নয়। তবে লোকনাট্যের কাঠামো বলতে তিনি গ্রন্থের ১৮-নং পৃষ্ঠায় ‘লোকনাট্যের অভিনয় ফর্ম’ শীর্ষক একটি ছক চিত্র প্রদান করেছেন। ছক চিত্রে লোকনাট্যের ফর্ম বা কাঠামোর দুটি ভাগ দেখানো হয়েছে। প্রথম ভাগে লোকনাট্যের পরিবেশনারীতিকে চারটি স্তরে (প্রস্তাবনা, সমবেত যন্ত্রসঙ্গীত, বন্দনা এবং মূলকাহিনী) দেখানো হয়েছে। দ্বিতীয় ভাগে ‘মূল কাহিনী’কে আবার ছয়টি স্তর বা অঙ্গে ভাগ করা হয়েছে। এই ছয়টি স্তরে রয়েছে - অভিনয়, নাচ, গান, কথা, বাদ্য এবং হাস্যকৌতুক। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে ‘অভিনয়’ নামে এখানে পৃথক একটি উপাদানের উল্লেখ করা হয়েছে। অনুমান করা যায় লেখক এখানে ‘অভিনয়’ বলতে সংলাপাত্মক অভিনয়কে বুঝিয়েছেন। কেননা ‘কথা’ নামে আরেকটি স্তর রয়েছে যাকে বর্ণনাত্মক অভিনয় হিসেবে ধরে নেয়া যায়। তথাপি অন্য সকল স্তর যেমন নাচ, গান এবং হাস্যকৌতুক কেন অভিনয় নয়? অথবা ‘অভিনয়’ নামে পৃথক উপাদান নির্দেশের যুক্তি কি তার কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা তিনি করেননি। অন্যদিকে লোকনাট্যের ‘মূল কাঠামো’ বলতে যে সকল স্তর বিভাগ করেছেন তা লোকনাট্যের একটি সাধারণীকৃত রূপ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ দেশের প্রায় সকল লোকনাট্য পরিবেশনায় এই সকল উপাদানের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু স্থান সাপেক্ষে উল্লেখিত উপাদানসমূহের ভিন্ন ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ প্রয়োগের কারণে আঙ্গিক ও বিষয়বস্তু উভয় ক্ষেত্রে পরিবেশনা রীতিটি স্বকীয় হয়ে ওঠে। ‘পালাগান’ এক্ষেত্রে একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে। মৈমনসিংহ অঞ্চলের ‘পালাগানে’ আজও সুঁচ রাণীর পালা অথবা কাজলরেখা নামে এই জনপ্রিয় অখ্যানটি পরিবেশিত হতে দেখা যায়। আবার কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ অঞ্চলে ‘পালাগান’ নামে এক পরিবেশনায় নছিমনের পালা নামে একটি আখ্যান উপস্থাপিত হয় যা উক্ত অঞ্চলে আজও ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়। উভয় পালা পরিবেশনায় উল্লেখিত ছয়টি স্তর বিন্যাস অনুযায়ী উপাদানসমূহের সাধারণ উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু দুটি পালারই পরিবেশনারীতি ও অভিনয়রীতি সম্পূর্ণ পৃথক। মৈমনসিংহের ‘পালাগানে’র মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এটি একটি গায়েন প্রধান পরিবেশনারীতি। এখানে একজন মূলগায়েন মুখ্য ভূমিকা পালন করে। তিনি শুধুমাত্র একজন সহ-অভিনেতার (ডায়না) সহায়তায় এবং দ্রবসামগ্রীর বৈচিত্র্যপূর্ণ ব্যবহার করে সংলাপাত্মক অভিনয় করেন। এছাড়া আখ্যানের অন্যান্য অংশ দোহারদের সহযোগিতায় একাই বর্ণনাত্মক অভিনয়ের মাধ্যমে উপস্থাপন করেন। অন্যদিকে কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ অঞ্চলের নছিমনের পালা’য় একাধিক কুশীলবের অংশগ্রহণ করেন এবং সংলাপাত্মক অভিনয় এর মুখ্য উপাদান। এছাড়াও নৃত্য, গীত, পোষাকের ব্যবহার প্রভৃতি সকল ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ পৃথক বৈশিষ্ট্য নিয়েই উভয় পরিবেশনা স্বকীয়তা বজায় রেখে চলেছে। তাই লোকনাট্য পরিবেশনারীতির যে মূল কাঠামোর বিশ্লেষণ করা হয়েছে তা একান্তই সাধারণীকৃত স্তর বিন্যাসে যেখানে স্বতন্ত্র পরিবেশনারীতি হিসেবে প্রতিটি লোকনাট্য পরিবেশনার স্বকীয়তা গৌণ হয়ে যায়।

এই পার্থক্য সত্বেও শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় লোকনাট্যের উপাদান প্রয়োগে জাহিদ রিপন প্রদত্ত ‘লোকনাট্যের মূল কাঠামো’ অনুসারে নাটক নির্মাণ প্রক্রিয়ায় কোনো বিধি নিষেধ আছে বলে মনে করি না। কিন্তু এই সাধারণীকৃত মূল কাঠামো বিবেচনায় নির্মিত নাটকের মাধ্যমে লোকনাট্যের ‘ক্রম অগ্রসরমানতা’, ‘সুবিকাশ’ এবং ‘স্বকীয়তা’ কতটুকু রক্ষা করা সম্ভব বা আদৌ সম্ভব কিনা তা প্রশ্নের দাবী রাখে। কেননা লোকনাট্য প্রবাহমান। সে তার আপন গতিতেই নানান ধারা-উপধারা গ্রহণ বর্জনের মাধ্যমে নিজের স্বকীয়তা, বিকাশ ও অগ্রসরমানতা বজায় রাখে। একথা স্বীকার করতে হয় যে, জাহিদ রিপন বহির্বিশ্বের নাট্যরীতির বিভিন্ন অনুষঙ্গ ও লোকনাট্যের মধ্যে সেতুবন্ধনের যে ধারণা প্রদান করেছেন, তা বর্তমান শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় অত্যন্ত সময় উপযোগী। কিন্তু এই ধরনের নাট্যচর্চার মাধ্যমে লোকনাট্যকেই আধুনিক করা হয় এই মত গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, বৃহত্তর জনগণের কাছে সেই নাটকটি কতটুকু গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে সক্ষম তা মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। বরং এই প্রক্রিযায় নির্মিত শহরকেন্দ্রিক নাটককে আধুনিক বাঙলা নাট্য (যাকে বিভিন্ন জন ‘দেশজ’, ‘জাতীয়’, ‘শেকড় সন্ধানী নাট্য’, ‘বাঙলা নাট্য’ প্রভৃতি বিশেষণে চিহ্নিত করতে চান) অথবা নির্দেশক কথিত ‘বাঙলা নাট্যাঙ্গিক’ বলাই অধিক সঙ্গত।

সুতরাং এ কথা বলা সঙ্গত যে, লোকনাট্যের ‘স্বকীয়তা’ লোকসমাজের জীবনচর্চার সাথে যুক্ত ভাষা, ধর্ম, কৃত্য, আচার প্রভৃতির মাধ্যমে বজায় থাকে। স্থান সাপেক্ষে তা বিভিন্ন আঙ্গিক ও কাঠামোয় বিকশিত হয় এবং কালের প্রবাহমানতায় এর রূপ বদল হয় মাত্র। এই প্রবাহমানতাই লোকনাট্যের আধুনিকতা। তাই শহুরে শিক্ষিত ‘আধুনিক’ মানুষের শিক্ষা ও সংস্কৃতি দ্বারা লোকনাট্য চর্চার মাধ্যমে পরিবেশিত নাট্যকর্মকে ‘লোকনাট্যের আধুনিক উপস্থাপন’ বলা বা এই প্রক্রিয়ায় নির্মিত নাট্যকর্মের দ্বারা লোকনাট্যেরই আধুনিক উপস্থাপন করা সম্ভব এই যুক্তির মধ্যে কোনো সঙ্গত কারণ রয়েছে বলে মনে করি না।

কাজলরেখা নাটকের আলোচনার মাধ্যমে জাহিদ রিপনকে মূলত তিনটি বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করতে দেখা যায়। প্রথমত, বিষয়বস্তুর সাথে সমকালীন সংযুক্তি স্থাপন করা। দ্বিতীয়ত, বহির্বিশ্বের নাট্যরীতির সাথে লোকনাট্যের সেতুবন্ধন রচনা করা। তৃতীয়ত, একটি ‘মূল কাঠামো’ বিবেচনায় লোকনাট্যের সাথে শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চার সমন্বয় তৈরি করা। প্রায়োগিক দিক থেকে শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় এই তিনটি বিষয়ই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি।

সাইমন জাকারিয়া

এ প্রজন্মের তরুণ নাট্যকার সাইমন জাকারিয়া। ঢাকা কলেজ থেকে বাংলা সাহিত্যে øাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করে বর্তমানে নাটলিপি রচনায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছেন। এ পর্যন্ত তার রচিত বিভিন্ন নাটলিপির মধ্যে - শুরু করি ভূমির নামে, ন নৈরামণি এবং মহামানবসংহিতা উল্লেখযোগ্য। নাটলিপি রচনার পাশাপাশি শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় লোকনাট্যের গুরুত্ব ও সম্ভাবনা বিষয়ে তার একাধিক প্রবন্ধ রয়েছে। তিনি সম্প্রতি ‘বাংলা জার্নাল’-এ ‘বাংলাদেশের লোকনাট্য’ বিষয়ক একটি প্রবন্ধে শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় লোকনাট্যের বর্তমান প্রেক্ষাপট সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। এই প্রবন্ধের আলোকে নাট্যকার সাইমন জাকারিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হলো।

বর্তমানকালের নাটচর্চার বর্ণনাত্মকরীতির প্রয়োগে তরুণদের আগ্রহ ও সংশ্লিষ্টতাকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে বর্ণনাত্মকরীতি প্রয়োগের বিষয়ে তাঁর দ্বিধা যুক্ত হচ্ছে : (ক) আধুনিক মঞ্চ (প্রসেনিয়াম) কতটা বর্ণনা ধারণে সক্ষম বা কী ধরনের বর্ণনা ধারণে সক্ষম? এবং (খ) দর্শক কী ধরনের বর্ণনা বা কী পর্যন্ত বর্ণনা গ্রহণে প্রস্তুত?৩৭  তাঁর এই প্রশ্ন মূলত বর্তমান সময়ের শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় বর্ণনাত্মক অভিনয়ের প্রয়োগ সফলতা সম্বন্ধে সন্দেহ প্রকাশ করে। তাহলে কী হওয়া উচিত আমাদের বর্ণনাত্মক অভিনয়ের রূপ? এই প্রশ্নের যথাযথ উত্তর প্রদান করতে গিয়ে তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাট্য বিষয়ক চিন্তাকে অধিক গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কয়েকটি উদ্ধৃতির আলোকে তিনি বাংলাদেশের বর্ণনাত্মক অভিনয়ের সম্ভাবনাকে বিশ্লেষণ করেছেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বর্ণনাত্মক অভিনেতা ও অভিনয় সম্পর্কে লোকনাট্যের ‘কাব্যরস’কে বিশেষ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে বলেছেন- ‘কাব্যরস, যেটা আসল জিনিস, সেইটেই অভিনয়ের সাহায্যে ফোয়ারার মতো চারদিকে দর্শকদের পুলকিত চিত্তের উপর ছড়াইয়া পড়ে।’৩৮  তাহলে ‘কাব্যরস’ কী? সহজ কথায় আখ্যানের ভাব, কল্পনা, আবেগ, অনুভবকে ‘কাব্যরস’ বলা যায়। সেক্ষেত্রে ‘অভিনয়কে কাব্যের অধীনতা স্বীকার করতেই হয়।’৩৯  এই যদি হয় আমাদের বর্ণনাত্মক অভিনয়ের কাব্য এবং রসের পারস্পরিক সম্পর্ক, তাহলে বর্ণনাত্মক অভিনেতাকে কী ধরনের যোগ্যতা বা দক্ষতা অর্জন করতে হয় সে বিষয়টিও মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। এই প্রশ্নের উত্তরে সাইমন জাকারিয়া পুনরায় রবীন্দ্রনাথকে ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘অভিনেতাকে অবশ্যই কাব্যের অনুবর্তী হতে হবে। কাব্যের ভাব, কল্পনা, আবেগ, অনুভবকে অভিনয়ের মাধ্যমে প্রকাশ হওয়া জরুরি।’৪০  তাহলে বর্ণনাত্মক অভিনয় এবং অভিনেতা সম্পর্কে যে ধারণা লব্ধ হল এই প্রেক্ষিতে তিনি সেলিম আল দীন-এর সাথে একমত প্রকাশ করে বলেন, ‘আধুনিক মঞ্চে বর্ণনাত্মক অভিনেতা বলতে নিরবলম্ব একজন বর্ণনাকারী নয়, একজন নাট্যশিল্পী একই সাথে নৃত্যক, গায়ক, কথক এবং অভিনেতা।’৪১  অর্থাৎ অভিনেতাকে নৃত্য, গীত, অভিনয় প্রভৃতি বিষয়ে হতে হবে একজন পূর্ণাঙ্গ অভিনয় শিল্পী। কেবলমাত্র তখনই অভিনেতা ‘কাব্যরস’ কে দর্শকের পুলকিত চিত্তের ওপর ফোয়ারার মত ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হবেন।

বর্ণনাত্মক অভিনয় এবং অভিনেতার এরকম একটি পূর্বশর্ত সাপেক্ষে শহরকেন্দ্রিক আধুনিক বর্ণনাত্মক রীতির নাটককে কি প্রবাহমান লোকনাট্যের অনুবর্তী বলা যায়? আর এই বর্ণনাত্মকরীতির নাটকে বর্ণনার ধরন-গঠনই বা কীরূপ থাকে? ধারা বর্ণনা, গল্প বা কাহিনী বর্ণনা, সংলাপ বা চরিত্র বর্ণনা ইত্যাদির কোনটি বর্ণনাত্মক অভিনয়ের মুখ্য উপাদান? এই প্রশ্নের উত্তরে সাইমন জাকারিয়া বলেন -

নিশ্চয় ধারা বর্ণনা নয়, নিরালম্ব কাহিনী বা গল্প বর্ণনাও নয়। তাহলে চরিত্র বর্ণনা? না, তাও নয়। আসলে বর্ণনাত্মক নাটকে কাহিনী একটা থাকে, তবে তা নাটকের প্রয়োজনে। অতএব নাটকের প্রয়োজনেই কাহিনী বর্ণনায় সংলাপ, গান, নাচ, চরিত্র, আর অভিনয়ের মধ্যে নাটকীয় সমন্বয় সাধিত হয় বর্ণনাত্মকরীতির নাট্যে।৪২

মূলত এই উক্তির মাধ্যমে আলোচনার শুরুতে সাইমন জাকারিয়ার উত্থাপিত দুটি প্রশ্নের একটি অস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। অর্থাৎ তিনি ‘নাটকের প্রয়োজনেই’ অভিনেতা এবং বর্ণনা, সংলাপ, নাচ, গান প্রভৃতির মধ্যে একটি নাটকীয় সমম্বয়ের কথা বলেছেন। কিন্তু নাটকের কোন প্রয়োজনে এই সমন্বয় দরকার তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা তিনি করেননি। কেননা বর্ণনাত্মক অভিনয়ে কাহিনী, গল্প, চরিত্র প্রভৃতির বর্ণনাকে তিনি অস্বীকার করেছেন। তথাপি তাঁর সমগ্র আলোচনার মধ্যে ‘কাব্যরস’ এবং ‘বর্ণনাত্মক অভিনেতা’ বিষয়ে দুটি শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। সেক্ষেত্রে এই দুটি বিষয়ের ওপর আলোকপাত করা যেতে পারে।

প্রথমত, বর্ণনাত্মক অভিনয়ে কাব্যের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এই বিষয়টি মূলত নাটলিপি রচনার কৌশল নির্দেশ করে, যেখানে নাটকের প্রয়োজনেই কাব্য এবং কাব্যরসের প্রয়োগের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, বর্ণনাত্মক অভিনয়ে বর্ণনাকারী কুশীলবের ভূমিকা ও গুরুত্ব সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। এখানে বর্ণনাকারী অভিনেতা বলতে একজন বর্ণনাকারী কুশীলবকে একই সাথে কথক, নৃত্যক, গায়ক, অভিনেতার মধ্যে লীন হয়ে একজন পূর্ণাঙ্গ অভিনয় শিল্পী হওয়ার কথা বলা হয়েছে। শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় প্রয়োগ সম্ভাবনার দিক থেকে এই দুটি বিষয় যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে।

এই দীর্ঘ বিশ্লেষণের মাধ্যমে লোকনাট্যের প্রয়োগ বা ব্যবহারের তত্ত্বগত যে পরিচয় পাওয়া গেল তা নিঃসন্দেহে স্বাধীনতাত্তোর শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় নিজস্ব আঙ্গিক অন্বেষণের প্রায়োগিক ভাবনাকে উজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে। তবে এ বিষয়টিও লক্ষণীয় যে, লোকনাট্যের আঙ্গিক ও উপাদানের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে যথেষ্ট মতপার্থক্য রয়েছে। তাছাড়া এই আলোচনা থেকে একটি বিশেষ প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। সেটি হচ্ছে, লোকনাট্যের উপাদান-বৈশিষ্ট্যের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে রয়েছে সাধারণীকৃত দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে লোকনাট্যের স্বতন্ত্র ও সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ অনুপস্থিত। এসকল কারণে শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় লোকনাট্য উপাদান প্রয়োগের মাধ্যমে আঙ্গিক ও বৈশিষ্ট্যগত একটি স্বতন্ত্র অবস্থান নির্মাণের এই দীর্ঘ যাত্রা কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানোর পথে এখনো দ্বিধাযুক্ত। তথাপি এই বিস্তৃত আলোচনা থেকে এমন কিছু সুচিন্তিত মতের সন্ধান লাভ করা যায়, শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় যার প্রয়োগের মাধ্যমে একটি গতিশীল ধারা সৃষ্টি করা সম্ভব। সামগ্রিক আলোচনার ভিত্তিতে এই মতামতগুলো তুলে ধরা হলো।

ক.    দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পদৃষ্টিতে এমন একটি মুক্ত আঙ্গিক নির্মাণ করা যেখানে, নাটলিপি রচনা ও পরিবেশনারীতি উভয় ক্ষেত্রে শিল্পের রসের বৈচিত্র্য সৃষ্টি করা সম্ভব হবে।

খ.    সমকালীন দৃষ্টিভঙ্গি এমন হওয়া উচিত যেখানে নাট্যচর্চা একটি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মৌলিক চাহিদা পূরণের মাধ্যম হয়ে ওঠে।

গ.    দর্শক ও অভিনেতার সম্পর্ক হওয়া উচিত ঘনিষ্টতর।

ঘ.    নাট্যচর্চায় লোকনাট্যের সাথে বিশ্বনাট্যের বিভিন্ন রীতির সেতু বন্ধন রচনা করা প্রয়োজন।

ঙ.     নাটলিপি রচনা বা ঘটনা বিন্যাসে লোকনাট্য পরিবেশনারীতির নমনীয়তা ধারণ করা উচিত।

চ.    শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় পূর্ণাঙ্গ অভিনেতার সৃষ্টি করা প্রয়োজন।

তত্ত্বগত দিক থেকে এসকল জোরালো চিন্তা সত্ত্বেও অদ্যাবধি শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চার এই ধারাটি কি যথেষ্ট সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে? কেননা আজও শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চার সিংহভাগ পাশ্চাত্য বাস্তবধর্মী নাট্যরীতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তাহলে কি শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চা ও চিন্তার সাথে লোকনাট্য পরিবেশনের ঘটনা বিন্যাস, বিষয়বস্তু, আঙ্গিক, উপাদান, বৈশিষ্ট্যের প্রায়োগিক ভাবনার মধ্যে কোনো মৌলিক পার্থক্য বা সমন্বয়ের অভাব রয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর অন্বেষণের জন্য এখন শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চার প্রায়োগিক দিকসমূহ বিশ্লেষণ করে দেখা যেতে পারে।

শহরকেন্দ্রীক নাট্যচর্চার প্রযোজনারীতি কী কী ধারায় প্রবাহিত সেটা দেখার জন্য প্রযোজনারীতিসমূহকে পাঁচটি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। এগুলো হচ্ছে -

ক.    পাশ্চাত্য দ্বন্দ্ব-ভিত্তিক নাট্যরীতি
খ.    পাশ্চাত্য বাস্তববাদ-উত্তর নাট্যরীতি
গ.    সংস্কৃত নাট্যরীতি
ঘ.    লোকজ নাট্যরীতি
ঙ.    পাশ্চাত্য ও লোকজ মিশ্রনাট্য রীতি

আমরা বিভিন্ন নাট্যদলগুলোর বিগত প্রযোজনাগুলোর দিকে লক্ষ্য করলে দেখতে পাবো পাশ্চাত্য দ্বন্দ্ব-ভিত্তিক নাট্যরীতির পাশাপাশি প্রায় সম সংখ্যক প্রযোজনায় লোকনাট্যের উপাদান প্রয়োগের প্রবণতা অত্যন্ত সক্রিয়। সুতরাং এ কথা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না যে, দীর্ঘ দুশো বছরের প্রচলিত পাশ্চাত্য দ্বন্দ্ব-ভিত্তিক নাট্যচর্চার পাশাপাশি শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চার ভিন্ন ধারা হিসেবে পাশ্চাত্য ও লোকজ মিশ্রনাট্য রীতির চর্চা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি লাভ করছে। কিন্তু এই মিশ্রধারার নাট্যচর্চায় লোকনাট্য উপাদান প্রয়োগের স্বরূপ ও প্রকৃতি কি সে বিষয়ে আলোকপাত করা প্রয়োজন। আর এই লক্ষ্যে পাশ্চাত্য ও লোকজ মিশ্রনাট্য রীতিতে প্রযোজিত নাটকগুলোর নাটলিপি সংগ্রহ করা হয়েছে। নাটলিপি বিশ্লেষণ এবং প্রযোজনার প্রদর্শনী প্রত্যক্ষ করলে এ সকল প্রযোজনার লোকনাট্যের উপাদান প্রয়োগের সাধারণ প্রবণতাগুলো পাওয়া যায়। নাটলিপি, মঞ্চ পরিকল্পনা এবং পরিবেশনারীতি এই তিনটি বিষয়ের আলোকে একটি সার্বিক আলোচনার মাধ্যমে চারটি প্রযোজনাকে প্রবন্ধের শেষ পর্যায়ে বিস্তৃত বিশ্লেষণ করার প্রয়াস পেয়েছি। নাটকগুলো হলো- শুরু করি ভূমির নামে, প্রযোজনা : বোধন থিয়েটার কুষ্টিয়া, প্রাচ্য, প্রযোজনা : ঢাকা থিয়েটার, ঢাকা, সঙক্রান্তি, প্রযোজনা : আরণ্যক নাট্যদল, ঢাকা, আবহমান বাংলা, প্রযোজনা : জিয়নকাঠি, ঢাকা।

শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় পাশ্চাত্য ও লোকজ মিশ্রনাট্যরীতির প্রযোজনাসমূহের একটি সাধারণ প্রবণতা হচ্ছে, নাটলিপির গদ্য রচনা। এই সকল প্রযোজনার প্লট বা ঘটনা-বিন্যাসে সুস্পষ্ট দুটি ধারা লক্ষ্য করা যায়। প্রথম ধারায় ঘটনা-বিন্যাসের মূল কাঠামোটি দ্বন্দ্ব-ভিত্তিক ও সংলাপাত্মক। অর্থাৎ এ সকল আখ্যানের মূল কাঠামোটি গড়ে উঠেছে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে এবং সংলাপাত্মকরীতিতে। প্রায় সকল বিন্যাস কাঠামোতেই পাশ্চাত্য দ্বন্দ্ব-ভিত্তিক নাট্যরীতি অনুসৃত প্রক্রিয়ায় দ্বন্দ্বকে পর্যায়ক্রমে সংকটশীর্ষে নিয়ে একটি যৌক্তিক পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা বিদ্যমান। প্লট নির্মাণের ক্ষেত্রে এই রীতি অনুসরণ করলেও নিত্যপুরাণ (প্রযোজনা : দেশ নাটক, ঢাকা) এবং দেহদাহ (প্রযোজনা : ঢাকা নাট্যনিকেতন, ঢাকা) নাটক দুটির বিন্যাসে বন্দনাগীত এবং বর্ণনাত্মক গদ্য ও গীত ব্যবহারের মাধ্যমে লোকনাট্য উপাদানের প্রয়োগ সুস্পষ্ট করার চেষ্টা কর হয়। অংক ও দৃশ্য বিভাগ বর্জন করে ঘটনা-বিন্যাস করা হলেও এই দুটি নাটকের এইসকল উপাদানের প্রয়োগ সমগ্র আখ্যান পরিবেশনায় অপরিহার্য হয়ে ওঠে না। সংলাপাত্মকরীতির গাঁথুনিই এই দুইটি প্রযোজনার মুখ্য উপাদান। নাটলিপি রচনায় নিত্যপুরাণ বর্ণনাত্মকরীতি অনুসৃত হলেও মঞ্চ পরিবেশনায় দেখা যায় দ্বন্দ্বভিত্তিক সংলাপাত্মক গাঁথুনিই মুখ্য এবং বর্ণনাত্মক উপাদান কাহিনীর নির্দিষ্ট দু’একটি অংশে সংক্ষিপ্তাকারে প্রয়োগ হতে দেখা যায়।

এছাড়া এই ধারার অন্যান্য প্রযোজনা যেমন- বাগ্দী ধিরুয়াল (প্রযোজনা : সংলাপ গ্র“প থিয়েটার), বাউপুরানী (প্রযোজনা : বাংলাদেশ থিয়েটার), কাল সকালে (প্রযোজনা : থিয়েটার আর্ট ইউনিট), বটবৃক্ষের ধরম করম ও সাদী সিরাজের পালা (প্রযোজনা : থিয়েটার, আরামবাগ), কইন্যা (প্রযোজনা : প্রাচ্যনাট), কৈবর্তগাথা (প্রযোজনা : কেন্দ্রবিন্দু থিয়েটার ও বিবর্তন, যশোর), লাশঘর (প্রযোজনা : বৃত্ত), পীরচাঁন ও রাজা (প্রযোজনা : সেন্টার ফর এশিয়ান থিয়েটার), পোষ্টমাস্টার (প্রযোজনা : মুক্তমঞ্চ থিয়েটার) প্রভৃতি প্রযোজনায় লোকগীতি, লোকসুর, লোকনৃত্য প্রভৃতি উপাদানের প্রয়োগ দেখা গেলেও এ সকল নাটকের প্লট নির্মাণ সম্পূর্ণই পাশ্চাত্য দ্বন্দ্বভিত্তিক সংলাপাত্মকরীতি অনুসৃত। তবে পীরচাঁন-এর কাহিনী সংলাপাত্মক হলেও সংলাপাত্মক কাব্যাভিনয়ের প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। উল্লিখিত নাটক সমূহের মঞ্চ পরিবশনায় নৃত্য ও গীত-এর প্রয়োগ বিদ্যমান। এক্ষেত্রে বাগদী ধিরুয়াল, কৈবর্তগাথা, দেহদাহ, কইন্যা প্রভৃতি প্রযোজনা তিনটি বিশেষ ধর্ম ও সম্প্রদায়ের জীবনভিত্তিক আখ্যান হওয়ার স্ব স্ব ধর্ম বা সম্প্রদায়ের বিভিন্ন কৃত্য আচার অনুষ্ঠানের সাথে সংগতিপূর্ণ নৃত্য ও গীত-এর ব্যবহার লক্ষণীয়। এই সকল গীত কাহিনীর বিশেষ কোনো মুহূর্তে বিশেষ বিশেষ কোনো আবেগ বা অনুভূতিকে প্রকাশ করে মাত্র। তাছাড়া কিছু কৃত্যানুষ্ঠানের ব্যবহার রয়েছে যা ঐ সকল সম্প্রদায়ের জীবন চর্চার পরিচয় তুলে ধরে। সাদী সিরাজের পালা’য় ঘোষক বা সূত্রধার হিসেবে চরিত্র থাকলেও চরিত্রটি নির্মাণ ও পরিবেশনায় সম্পূর্ণ পাশ্চাত্যরীতি অনুসরণ করে। এই প্রযোজনাটিতে অন্যান্য দেশী বিদেশী বিভিন্ন সংগীতের সাথে নৃত্য ও গীত যুক্ত কিছু লোকসংগীতের ব্যবহার রয়েছে মাত্র। এই ধারার আরও দুটি নাটক আমার বিষণ্ন মুখ (প্রযোজনা : মঞ্চ শ্রমিক) ও তীর্থঙ্কর (প্রযোজনা : সুবচন নাট্য সম্প্রদায়)-এর ঘটনা-বিন্যাসের মুখ্য উপাদান সংলাপাত্মক গদ্য তবে বর্ণনাত্মক উপাদানও বেশ গুরুত্ব বহন করে। তীর্থঙ্কর নাটকে একদল মরুযাত্রী তাদের চলার পথের বিভিন্ন বাঁকে সোহরাব-রুস্তমের যুদ্ধকাহিনী গল্পাকারে বর্ণনা করেন। অন্যদিকে আমার বিষণ্ন মুখ প্রযোজনায় ‘কথক’ এবং অন্যান্য কিছু চরিত্র ঘটনার সংলাপাত্মক অভিনয়ের সাথে অতীতের বিভিন্ন ঘটনাংশ বা স্মৃতি বর্ণনাত্মক অভিনয়ের মাধ্যমে পরিবেশন করে। মঞ্চ পরিবেশনায় এই দুই প্রযোজনায় কিছু গীতের ব্যবহারও লক্ষ্য করা যায়। এ ছাড়া উরুভঙ্গম্ (প্রযোজনা : সি এ টি) বিষয় সংস্কৃত নাট্যরীতি অনুসৃত। কিন্তু মঞ্চ পরিবেশনায় আধুনিক নাট্যচিন্তা ও প্রয়োগ এই প্রযোজনাটির মুখ্য বৈশিষ্ট্য।

উপর্যুক্ত ষোলটি প্রযোজনায় কয়েকটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। প্রথমত- এ সকল প্রযোজনার নাটলিপি রচনার মাধ্যম গদ্য। দ্বিতীয়ত- আখ্যান পরিবেশায় মুখ্য অভিনয় উপাদান সংলাপাত্মক গদ্য। তৃতীয়ত- ঘটনা বিন্যাস ইউরোপীয় দ্বন্দ্বভিত্তিক এবং চতুর্থত- পরিবেশনা স্থান প্রসেনিয়াম মঞ্চ। এছাড়াও লোকনাট্যের উপাদান হিসেবে কয়েকটি প্রযোজনায় বন্দনা, নৃত্য ও গীতের ব্যবহার, কয়েকটি প্রযোজনায় কৃত্যমূলক নৃত্য ও গীতের ব্যবহার এবং অন্য সকল প্রযোজনায় আখ্যানের কিছু অংশে বর্ণনাত্মক গদ্য ও নৃত্য যুক্ত গীতের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়।

দ্বিতীয় ধারার প্রযোজনায় রয়েছে প্রাচ্য, হরগজ, (প্রযোজনা : ঢাকা থিয়েটার), আলাল দুলালের পালা, (প্রযোজনা : ঢাকা পদাতিক), শিবনী সুন্দরী (প্রযোজনা : মহাকাল নাট্য সম্প্রদায়), আবহমান বাংলা, শিশুতীথ’ (প্রযোজনা : জিয়নকাঠি), আরজ চরিতামৃত (প্রযোজনা : নাট্যকেন্দ্র) এবং সঙক্রান্তি (প্রযোজনা : আরণ্যক নাট্য দল)।

এই আটটি প্রযোজনায় ঘটনা-বিন্যাস এবং মঞ্চ পরিবেশনা উভয় ক্ষেত্রে লোকনাট্য উপাদানের সংমিশ্রণ পরিলক্ষিত হয়। আটটি প্রযোজনার মধ্যে হরগজ, আবহমান বাংলা এবং শিশুতীর্থ ভিন্ন অন্য পাঁচটি নাটকের নাটলিপি রচনার প্রধান মাধ্যম গদ্য। তবে এই গদ্য রচনা সংলাপাত্মক গদ্যাভিনয় ও বর্ণানাত্মক গদ্যাভিনয়ের মাধ্যমে পরিবেশিত হয়। তাছাড়া এই পাঁচটি আখ্যানের নির্দিষ্ট কিছু অংশ পদ বিন্যাসে রচিত যা পরিবেশনায় বর্ণনাত্মক গীতাভিনয়ের মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়। মঞ্চ পরিকল্পনার ক্ষেত্রে দেখা যায় প্রাচ্য এবং আরজ চরিতামৃত ভিন্ন অন্য ছয়টি নাটক প্রসেনিয়াম মঞ্চে পরিবেশিত হয়। তবে হরগজ প্রযোজনাটি প্রসেনিয়াম মঞ্চে পরিবেশিত না হলেও নাটকটির মঞ্চ পরিকল্পনা সম্পূর্ণ ইউরোপীয় নাট্যরীতি অনুসৃত। সঙক্রান্তি’র মুখ্য অভিনয় উপাদান সংলাপাত্মক গদ্য ও ঘটনা বিন্যাস ইউরোপীয় দ্বন্দ্বভিত্তিক হলেও বিষয় ও আঙ্গিকে লোকনাট্য পরিবেশনা ‘সঙ যাত্রা’কে প্রত্যক্ষভাবে অনুসরণ করা হয়েছে। অন্যদিকে প্রাচ্য নাটকে বর্ণনাত্মক ও সংলাপাত্মক অভিনয় উপাদানের মিশ্র ব্যবহার, মঞ্চ পরিকল্পনায় উন্মুক্ত অভিনয় আয়তনের ব্যবহার এবং বিষয়বস্তুতে মধ্যযুগের একটি জনপ্রিয় আখ্যান মনসা মঙ্গল’র সমকালীন ব্যাখ্যা লক্ষ্য করা যায়। সুতরাং উল্লেখিত বিষয়গুলো বিবেচনায় প্রাচ্য এবং সঙক্রান্তি’ নাটক দুটিকে আলাদাভাবে বিশ্লেষণের দাবী রাখে।

অন্যদিকে আবহমান বাংলা, হরগজ এবং শিশুতীর্থ প্রযোজনা তিনটির মুখ্য উপাদান বর্ণনাত্মক গদ্য। সংলাপাত্মক উপাদানের প্রয়োগ অত্যন্ত গৌণ। তবে আবাহমান বাংলা প্রযোজনায় বর্ণনাত্মক গদ্যাভিনয়ের পাশাপাশি কাব্যাভিনয় ও গীতাভিনয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োগ রয়েছে যা হরগজ নাটকে লক্ষ্য করা যায় না। শিশুতীর্থ প্রযোজনাটিতেও বর্ণনাত্মক গদ্যাভিনয়, গীতাভিনয় ও কাব্যাভিনয়ের মিশ্র প্রয়োগ দেখা গেলেও লোকছড়া, লোকনৃত্য, লোকখেলা প্রভৃতি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আবহমান বাংলা’র ন্যায় বৈচিত্র্যপূর্ণ নয়। সুতরাং এই সকল বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় উল্লিখিত তিনটি প্রযোজনা থেকে আবহমান বাংলা নাটকটিকে আলাদাভাবে বিশ্লেষণের তাগিদ অনুভব করছি।

পাশ্চাত্য ও লোকজ মিশ্রনাট্যরীতির উপর্যুক্ত চব্বিশটি প্রযোজনা থেকে নির্বাচিত তিনটি নাটক ছাড়াও আরও একটি শহরকেন্দ্রিক নাটক বিশ্লেষণ করার প্রয়াস পেয়েছি। প্রবন্ধের আকার সীমাবদ্ধতাকে স্মরণ রেখেও ঢাকাশহর বহির্ভুত জেলা পর্যায়ের একটি  নাটকও আলাদাভাবে বিশ্লেষণের আগ্রহ প্রকাশ করছি। এ ক্ষেত্রে কুষ্টিয়ার বোধন থিয়েটার প্রযোজিত শুরু করি ভূমির নামে নাটকটিকে অন্তর্ভুক্ত করছি। নাটকটি বর্ণনাত্মক ও সংলাপাত্মক উভয় উপাদানের মিশ্ররীতিতে পরিবেশিত হয়। তাছাড়া নাটকটির পরিবেশনায় লোকানৃত্য, লোকখেলার ব্যবহারসহ বিভিন্ন লোকনাট্য উপাদানের ব্যবহার রয়েছে।

সুতরাং শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় লোকনাট্যের উপাদান বৈশিষ্ট্য প্রয়োগের স্বরূপ বৈচিত্র্য বিশ্লেষণের জন্য সর্বমোট চারটি নাটক নির্বাচন করলাম। এগুলো হচ্ছে প্রাচ্য (প্রযোজনা : ঢাকা থিয়েটার, ঢাকা), সঙক্রান্তি (প্রযোজনা : আরণ্যক নাট্যদল, ঢাকা), আবহমান বাংলা (প্রযোজনা : জিয়নকাঠি, ঢাকা) এবং শুরু করি ভূমির নামে (প্রযোজনা : বোধন থিয়েটার, কুষ্টিয়া)।


প্রাচ্য
রচনা : সেলিম আল দীন
নির্দেশনা : নাসির উদ্দিন ইউসুফ
প্রযোজনা : ঢাকা থিয়েটার, ঢাকা

বাংলাদেশের প্রথম সারির দলগুলোর মধ্যে ঢাকা থিয়েটার অন্যতম। ১৯৭৩ ইংরেজি সনে এই দলটি জন্ম লাভ করে অদ্যাবধি দেশের নাট্যচর্চায় সক্রিয় এবং উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে চলেছে। বর্তমানে ঢাকা থিয়েটার নাটক রচনা ও পরিবেশনা উভয় ক্ষেত্রে দেশের লোকনাট্য ঐতিহ্যের আঙ্গিক, বৈশিষ্ট্য ও উপাদান প্রয়োগের মাধ্যমে একটি জাতীয় নাট্য আঙ্গিক নির্ণয়ের প্রচেষ্টায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এক্ষেত্রে বর্ণনাত্মকরীতি কার্যকরী মাধ্যম হতে পারে বলে ঢাকা থিয়েটার মনে করে। তবে সূচনালগ্ন থেকে দলের নাট্যচর্চা এই ধারার সাথে যুক্ত ছিল না। আশির দশকের মধ্যভাগে কেরামতমঙ্গল নাটকের মাধ্যমে এই রীতির প্রযোজনা নির্মাণের প্রথম পদক্ষেপ সূচিত হয়। তারপর থেকে ঢাকা থিয়েটার নিরবচ্ছিন্নভাবে জাতীয় নাট্য আঙ্গিক নির্ণয়ের ধারার সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছে। দলের একাধিক প্রযোজনার মধ্যে হাত হদাই, যৈবতী কন্যার মন, বনপাংশুল, চাকা এবং প্রাচ্য উল্লেখযোগ্য।

দলের প্রধান এবং নির্দেশক জনাব নাসির উদ্দিন ইউসুফ নাট্য প্রযোজনায় মঞ্চে Creative Art বা Creative Visual নির্মাণ করাকেই বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকেন।৪৩ এই Creative Visual নির্মাণের লক্ষ্যে লোকনাট্যকলার বিভিন্ন উপাদান ও বৈশিষ্ট্য ব্যবহারকেই তিনি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করেন। Indigenous Theatre : uses and Abuses- এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যদি আমার নিজস্ব দেশজ যে ফর্মটা আছে, আঙ্গিকটা আছে, যে উপাদানগুলো আছে, ব্যবহার করে একটা Creative performance করতে পারি, তবেই সেটা use হলো।৪৪ এখানে লোকনাট্যের উপাদান ও বৈশিষ্ট্যের use বা ব্যবহারের মূল উদ্দেশ্য Creative performance বা দৃষ্টিনন্দন সৃষ্টিশীল কোনো প্রযোজনা নির্মাণ করা। কিন্তু বিষয়টি সম্পূর্ণ আপেক্ষিক এবং ব্যক্তি নির্ভর। কেননা, কোনো শিল্পীর নন্দনতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি সকলের কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্যতা পাবে এমন কথা জোর দিয়ে বলা যায় না। তাই ঢাকা থিয়েটারের সাম্প্রতিক প্রযোজনা নিয়ে একঘেঁয়েমী ও ‘রিপিটেশন’-এর অভিযোগ উঠলে নির্দেশক তার উত্তরে বলেন -

হ্যাঁ সেট ঢাকা থিয়েটারে অলরেডি একটা দাঁড়িয়ে গেছে ... ইতিমধ্যেই যে ... ঢাকা থিয়েটার এইভাবে অভিনয় করে ... এটা কিন্তু আমি ভাল মনে করি না। হতে পারে এটা একটা স্টাইল ... কিন্তু রিপিট করলে ভবিষ্যতে ক্ষতি হবে ... এমনকি আমাদের নতুন যে জেনারেশন আসছে ঢাকা থিয়েটারে, তাদেরকেও ভাঙতে হবে। কারণ আমার যত কাজ আছে ... সেখানে যারা অভিনয় করছে তাদের নিজস্ব একটি স্টাইল ডেভেলপ করেছে ... এটা সত্যি।৪৫

এই অভিযোগ সত্ত্বেও সকলে একথা স্বীকার করবেন যে, দীর্ঘ দিনের চর্চার মধ্য দিয়ে ঢাকা থিয়েটার একটি ভিন্ন ধারার নাট্যচর্চাকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে, যে ধারাটি দেশের স্থানীয় নাট্যকলার ঐতিহ্য দ্বারা প্রভাবিত। পাশাপাশি নাটক প্রযোজনায় প্রসেনিয়াম মঞ্চের সীমাবদ্ধ আয়তন ছেড়ে দলের নাটক খুঁজে পেয়েছে উন্মুক্ত বৃহৎ পরিসর। ‘ঢাকা থিয়েটার নাটক মঞ্চায়ন ও নাটকের প্রায়োগিক চিন্তা ভাবনায় বিশাল বঙ্গদেশীয় ভূ-খণ্ডকে স্পর্শ করার প্রয়াসী।’৪৬  আর এই প্রয়োগ ভাবনার ধারাবাহিকতার সূত্র ধরে ঢাকার নাট্যমঞ্চে পরিবেশিত হয় দলের ২৮তম প্রযোজনা প্রাচ্য। জীবনের তীব্র মুহূর্তে মানুষের ক্রোধ, প্রতিহিংসা শেষাবধি প্রকৃতি সংলগ্ন হয়ে প্রকৃতির সাথে সহাবস্থান করে - এই বিষয়ে ভাবনার আবর্তনে রচিত হয়েছে প্রাচ্য। নাটকটির আঙ্গিক নির্মাণে নাট্যকার সেলিম আল দীন বলেন -

প্রাচ্য’র আঙ্গিক আমার অন্য উপাখ্যান বনপাংশুল’র মতই পাঁচালির প্রেরণাজাত। তবে প্রেরণাজাত বললে বোধহয় সত্য ভ্রষ্টতা ঘটে। দুটি রচনাতেই আমি পাঁচালির মহাকাব্যিক আঙ্গিকের শক্তিকে একালের পাশ্চাত্য নিবিষ্ট শিল্পরীতির মুখোমুখি দাঁড় করাতে চেয়েছি এবং এ প্রত্যয়ে দৃঢ় যে, সম্প্রদায় নির্বিশেষে বাঙালির সুনির্দিষ্ট এপিক না থাকলেও মঙ্গল পাঁচালি অর্থাৎ পাঁচালির কাঠামোতে আমাদের দেশজ রুচির অনুকূলে ‘কাঠামোগত মহাকাব্য’ বা ‘স্ট্রাকচারাল এপিক’ আছে।৪৭

নাট্যকারের এই উক্তির আলোকে প্রাচ্য নাটলিপি এবং পরিবেশনারীতির বৈশিষ্ট্য অনুসন্ধান করা যেতে পারে।

নাটলিপি

প্রাচ্য সম্পর্কে নাট্যকার প্রযুক্ত যে ধারণা পাওয়া গেল প্রাচ্য নাটলিপি সেই ধারণার বৈপরীত্য সৃষ্টি করে। প্রথমত, এই আখ্যান নির্মাণে ‘কাঠামোগত মহাকাব্য’র অবস্থান সুস্পষ্ট নয়। তাছাড়া ‘কাঠামোগত মহাকাব্য’র সুস্পষ্ট ব্যাখ্যাও তিনি প্রদান করেননি। মহাকাব্যের ব্যাপক সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্যের অন্বেষণ না করেও সাধারণ দৃষ্টিতে মহাকাব্যের দিকে তাকালে দেখা যাবে, ‘মহাকাব্য এক বিরাট খণ্ড চরিত্রের সমষ্টি যেখানে তার নায়কেরা নানা আলোয় উদ্ভাসিত। আমরা একই মানুষকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি এবং শুধু দেখি না, তাকে বিশ্লেষণে প্রবৃত্ত হই।’৪৮ দ্বিতীয়ত- পাঁচালি’র আঙ্গিক ও বৈশিষ্ট্য নিরূপণে মতভেদ থাকলেও পাঁচালি যে আখ্যায়িকা বা কাহিনীধর্মী কাব্য এ বিষয়ে প্রায় সকলেই একমত। সুকুমার সেন পৌরাণিক গেয় আখ্যায়িকা এবং অ-পৌরাণিক গেয় আখ্যায়িকা নামে উভয়কে ‘পাঞ্চালী’ নামে অভিহিত করেছেন।৪৯  আবার সেলিম আল দীন একে কৃত্য পাঁচালি এবং প্রণয় পাঁচালি এই দুই ধারায় অভিহিত করেছেন।৫০ পাঁচালি সম্পর্কে উভয় মতের আলোকে একটি বিষয় নিশ্চিত করে বলা যায় যে, পাঁচালি’র একটি প্রাথমিক শর্ত হচ্ছে আখ্যান বা কাহিনী। কিন্তু প্রাচ্য-তে প্রচলিত ধারার কোনো আখ্যান বা কাহিনী নেই। মূলত এখানে নির্দিষ্ট কয়েকটি ‘ঘটনা’ সুনির্দিষ্টভাবে বিন্যস্ত রয়েছে মাত্র। এ প্রসঙ্গে পরিচালক নাসির উদ্দিন ইউসুফ বলেন-

প্রাচ্য-এ কোনো পল্প নেই, শুধু একটি ঘটনা। ঘটনাটি এক লাইনে ঘটেছে - বিয়ে করেছে, (সয়ফর) বউকে সাপে কেটে মেরে ফেলেছে। (বধূ নিয়ে গমন যাত্রায় সয়ফরের অতীত ঘটনাবলী এখানে অনুষঙ্গ হিসেবে আসে।) সবাই বলে থিয়েটারে গল্পের প্রয়োজন আছে। আমি বলি থিয়েটারে গল্পের প্রয়োজন নেই। থিয়েটার যদি তার ‘মাধ্যমে’র মধ্য দিয়ে একটি অনুভব, একটি অনুভূতি, একটি শিল্পভাবনা, একটি বোধকে প্রকাশ করতে চায় তাও সম্ভব। এটা-ই-তো ঘটেছে।৫১

উক্ত উদ্ধৃতিসমূহের আলোকে এবার প্রাচ্য প্রযোজনা নাটলিপির কাহিনী সংক্ষেপ উল্লেখপূর্বক আখ্যান বিন্যাসে মূলত যে বিষয়সমূহ মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে তা দেখা যেতে পারে। সয়ফর নামক একজন দিন মজুরের বিবাহ করে বধূ নিয়ে যাবার পথের বিভিন্ন বাঁকে বাঁকে উঠে আসে তার অতীত জীবনের নানা ঘটনাবলী। পিতৃ মাতৃহীন সয়ফর মোড়ল জিতু মাতব্বরের চক্রান্তে পড়ে শেষ সম্বল জমিটুকু হারিয়ে নিদারুণ দুর্দশায় পতিত হয়। জিতু মাতব্বর তার মৃত্যুর পূর্বে সয়ফরের সকল সহায় ফেরত দিয়ে যায়। কিন্তু বাস্তবতার কঠিন জালে আবদ্ধ সয়ফর বিয়ের খরচ মেটাতে সেই জমিটুকু মাতব্বরেরই ছেলে আইজল-এর কাছে পুনরায় বন্ধক দিয়ে বিয়ে করতে বাধ্য হয়। ভাগ্যের পরিহাস, বাসর রাতেই সর্প দংশনে মৃত্যু হয় তার স্ত্রী নোলকের। ঘটনার আকস্মিকায় হতবাক সয়ফর সাপটির প্রতি তীব্র ক্ষোভ নিয়ে সর্প-নিধনে উদ্যত হয়। অবশেষে সাপটিকে ক্ষমা প্রদর্শনের মধ্যে দিয়ে এই নাটকের পরিসমাপ্তি ঘটে।

শামুকভাঙ্গা গাঁয়ের সয়ফরের যে জীবন এই নাটকে দৃষ্ট হয়, তাতে তিনটি অংশ মূলত কাহিনীর  পরিণতি নির্ণয়ে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। (ক) বিবাহ পূর্ববর্তী জীবনে জিতু মাতব্বর ও সয়ফরের দ্বন্দ্ব, (খ) বাসর রাতে সর্প দংশনে নোলকের মৃত্যু এবং (গ) সাপটির প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন।

প্রথমত- জিতু মাতব্বর ও সয়ফরের দ্বন্দ্বের মাধ্যমে জিতু মাতব্বরকে যেভাবে দেখানো হয়েছে তাতে বাংলার গ্রামীণ সাধারণের দৃষ্টিতে চিরাচরিত ‘শোষক’ অতিরিক্ত কোনো বিশেষ চরিত্র মনে হয় না।

বেবাক মাতব্বর যা করে আমিও তাই করছি। জমি থাকলেই কেনা বেচা থাকে সয়ফর। আমি যাইতাছি - যে দশ ডিসিম জায়গা, জাইগর এই বছর কাইড়া নিছিলাম বেবাক ফিরত দিলাম। আমার পোলা আইজল থাকল। তুইত বছর ঘুরতে আবার জমি বেচবি তয় ঐ দশ ডিসিম তুই আইজলের কাছেই বেচিস। মাফ করলি ত বাবা?৫২ এখানে জিতু মাতব্বর চরিত্রের উদারতা প্রকাশ পায়। তবে এই উদারতা তার চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য না মৃত্যুর মুখে পরকালের শঙ্কাযুক্ত জীবনের প্রকাশ তা উদ্ধৃতি দৃষ্টে বিবেচ্য। তাছাড়া এই অংশে সয়ফর নিতান্তই অসহায়-দরিদ্র একটি মানুষ যে জিতু মাতব্বরের চক্রান্তে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। সয়ফরের এই অসহায়ত্ব কখনো কখনো ক্ষোভেও পরিণত হয়ে ওঠে।

দ্বিতীয়ত- এই আখ্যানে সয়ফরের আকাঙ্খার জন্ম হয় অতীতে কোনো একদিন ভাসান যাত্রার আসরে নোলককে দেখার মাধ্যমে এবং বাসর রাতে সর্প দংশনে নোলকের মৃত্যুর মাধ্যমে এই আকাঙ্খার করুণ পরিণতি ঘটে।

আমি কইছিলাম আমি গরীব। কামলা খাটা পৈরাত জন। আমার সকল শক্তি দিয়া কাজ করুম যাতে অভাব আপনার সেই মুখখানা যা কিনা ভাসান যাত্রায় কাঁপা কাঁপা আলোয় দেখেছি তা ছুঁবার না পারে। ... কইছি না আপনের পায়ের কাঁটা দাঁতে কামড়ায়ে তুলব - সেই সুযোগ দিলেন কই।৫৩

আকস্মিক বিয়োগ যন্ত্রণার এই শোক তীব্র ক্ষোভে পরিণত হয়ে সর্প নিধনে ধাবিত করে সয়ফরকে।

তৃতীয়ত- তীব্র ক্ষোভ সত্ত্বেও সয়ফর অবশেষে সাপটিকে ক্ষমা প্রদর্শন করে। এই ক্ষমা প্রদর্শনের মাধ্যমেই মূলত প্রাচ্য’র মূল বক্তব্য উঠে আসে। ‘গর্ত থাকলে সাপ আসে। সাপ থাকলে ইন্দুর থাকে। ইন্দুর থাকে ধানের পিছে। ধান থাকলে ক্ষেত থাকে। ক্ষেত থাকলে ভিটা। ভিটার উপর আকাশ ও ফণা।’৫৪ অর্থাৎ  মানুষের  সাথে প্রকৃতিকে এক ও অভিন্ন দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে নাট্যকার বলেন ‘প্রাচ্যকে কেউ খুব সরলভাবে চরম ভাঙ্গনের মুখে প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের কাহিনী রূপেও গণ্য করতে পারেন।’৫৫ সয়ফরের জীবনে চরম ভাঙন নিঃসন্দেহে নোলকের মৃত্যু। কেননা নোলক ছিল সয়ফরের জীবনে এক দীর্ঘ আকাঙ্খার প্রাপ্তি, যাকে পাওয়ার জন্য তার দরিদ্র জীবনের সামান্য সহায়সম্বলটুকুও জিতু মাতব্বরের কাছে হারাতে হয়। বিনিময়ে সয়ফর পেয়েছে বিষের দংশনে নীল হয়ে যাওয়া নোলককে। ‘না গো নোলক এ জীবন জনম খোঁড়া না। এ প্রতিশোধের খোঁড়া। তবে তুমি দেখাও সাপটারে ধরে এনে দাও। আমি এক কোপে তারে দুই টুকরা করি। তার রক্তের টিপ পইরা আবার শূন্য বাসরে ঢুকি।’ এই চরম ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়েই সয়ফর প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে ওঠে। শাবল হাতে ছুটে চলে সাপটির আঁকাবাঁকা পথ ধরে এবং মুখোমুখি হয় দুজনে -

‘একবার ডানে একবার বামে নড়ে নড়ে ফণার প্রতাপ দেখায়। প্রতাপ না সৌন্দর্য রাঙা বাহার। ফাল্গুনের ভোরের রাঙা মেঘাবলী বিচিত্র ফণা। সে উদ্ভিদ। মাটি ভেদ করে উঠেছে। বৃক্ষরাও ভূমিভেদী বিচিত্র ফণা। সে ফণা দোলে চিকন বাতাসে। কোনটা তবে কি থেকে পৃথক হবে। হায়! সয়ফর দ্বিখণ্ডিত হয়।’৫৬

প্রতিশোধ পরায়ণ সয়ফরের জীবনে এ এক নতুন উপলব্ধি যার সূত্র ধরে সয়ফর সাপটিকে ক্ষমা করে দেয়। কিন্তু যে সকল ঘটনার কার্যকারণ সূত্র ধরে সয়ফরের জীবনে চরম ভাঙনের মুহূর্তটি উঠে আসে সেই ভাঙনের মুহূর্তে দাঁড়িয়ে সাপের ‘সৌন্দর্য রাঙা বাহার’ অবলোকন করা আর বৃক্ষদেরকে ‘ভূমিভেদী বিচিত্র ফণা’ হিসেবে দেখার এই নতুন উপলব্ধিটি কার্য-কারণ সত্য সিদ্ধ হতে দেখা যায় না। মুহূর্তেই যেন সয়ফরর তীব্র ক্রোধ আর প্রতিশোধ স্পৃহা এই নতুন উপলব্ধির কাছে দুর্বল হয়ে পড়ে, যা আদৌ অবশ্যম্ভাবী ফলাফল নয়। অন্যভাবে বলা যায়, এসময়ে সয়ফরের কথা, কাজ, আচরণ এমন কোনো পরিবর্তন দেখা যায় না যে এই উপলব্ধিটি অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে।

প্লটের সংগঠনের বেলায় যেমন চরিত্র অঙ্কনের সময়েও তেমনি, লক্ষ্য হওয়া উচিত হয় অবশ্যম্ভাবীর, নয়ত সম্ভাব্যের সৃষ্টি করা। বিশেষ চরিত্রের লোক যখন কথা বলবে বা কাজ করবে তখন তার নিজস্ব বিশেষ উপায়েই তা বলবে বা করবে, সেই কথা বা কাজ হবে তার চরিত্রের আবশ্যক বা সম্ভাব্য ফলশ্র“তি-ঠিক যেমনভাবে একটা ঘটনা আসে তার আগের ঘটনার আবশ্যক বা সম্ভাব্য ফল হিসেবে।৫৭

কিন্তু প্রাচ্য নাটকে সয়ফরের এই মহত্তর উপলব্ধিটি কোনো ঘটনার আবশ্যক বা সম্ভাব্য ফল হিসেবে উঠে আসে না। এখানে সয়ফর যুক্তির চেয়ে আবেগ দ্বারাই অধিক বেশি নিয়ন্ত্রিত যা এই চরিত্রটির একটি দুর্বলতাও বটে।

সুতরাং এরকম একটি নাট্য আখ্যানে সয়ফর নামক চরিত্রের যে জীবন উঠে আসে তা মহাকাব্যের বিশাল জীবন ও ব্যাখ্যা’র পাশে কতটুকু বিশালত্ব নিয়ে দাঁড়াতে সক্ষম তা প্রশ্নের দাবী রাখে।

কিন্তু প্রাচ্য নাটকের গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে সমকালীন ব্যাখ্যা। অর্থাৎ এই নাটকটির মাধ্যমে মধ্যযুগের মনসা মঙ্গলের এক ভিন্ন দৃষ্টি, ভিন্ন ব্যাখ্যা পাওয়া যায় যা একান্তই বর্তমানকালের। প্রাচ্যে সাপ আছে কিন্তু এই সাপ দেবীত্বের দাবী নিয়ে দাঁড়ায় না। মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে এক অবিচ্ছেদ্য সেতু বন্ধন তৈরি করে দেয় যেখানে মানুষ প্রকৃতির সন্তান হয়ে যায়। একটি যাত্রা আছে কিন্তু সেই যাত্রা মরা স্বামী নিয়ে ভেলায় ভাসা বেহুলা উজান পথের যাত্রা নয় বরং জীবনে পরম আনন্দ বিবাহের বধূ নিয়ে যাত্রা। বাসর রাতের দংশন আছে কিন্তু তা মনসার আকাঙ্খার পূর্ণতা দানের জন্য নয় বরং এই দংশন এক মহত্তর উপলব্ধির দুয়ার খুলে দেয়। যেখানে চরম হুমকির সম্মুখীন বর্তমান সময়ের প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতি মানুষের এক ধরনের বোধ জাগ্রত করে। প্রাচ্য নাটকের এই সমকালীন দৃষ্টিভঙ্গি শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় লোকনাট্যের প্রয়োগ সম্ভাবনার ক্ষেত্র হিসেবে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাচ্য নাটলিপির আর একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ দিক হচ্ছে ঘটনার বিন্যাস অনুযায়ী অভিনয় উপাদানের নামকরণ বা পারিভাষিক শব্দের ব্যবহার করা। এক্ষেত্রে ক্রিয়ার স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্যের প্রকৃতি বিচারে বিভিন্ন বৈচিত্র্যপূর্ণ নামকরণ দেখা যায়। ক্রিয়ার বিশেষণ হিসেবে এ সকল পারিভাষিক শব্দের ব্যবহার মধ্যযুগের বেশ কিছু আখ্যানে দেখা যায় যেমন- কথা, বোলাম, দিশা, পদ ও নাচাড়ি প্রভৃতি। মূলত শহরকেন্দ্রিক নাটলিপি রচনায় লোকনাট্য লিপির উপাদান ব্যবহারের এ এক সচেতন প্রয়াস।

অভিনয় উপাদান

প্রাচ্য প্রযোজনায় মোট ৫টি অভিনয় উপাদানের প্রয়োগ দেখা যায়। এগুলো হচ্ছে, বর্ণনাত্মক গদ্য, বর্ণনাত্মক কাব্য, বর্ণনাত্মক গীত, সংলাপাত্মক গদ্য এবং সংলাপাত্মক গীত। তবে বর্ণনাত্মক গদ্যাভিনয় এবং সংলাপাত্মক গদ্যাভিনয় এই প্রযোজনার মুখ্য অভিনয় উপাদান।

পরিচালক নাসির উদ্দিন ইউসুফ নাটকটির নির্মাণ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমরা কোনো একটি বিশেষ লোক আঙ্গিকের হুবহু অনুকরণ করার পক্ষপাতি নই। আধুনিক মনন, নাট্য বিজ্ঞান এবং লোকজ নাট্য শৈলীকে ক্রমাগত আত্মস্থ করার প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই প্রাচ্য’র উপস্থাপনা কৌশল আবিষ্কার করা হয়েছে।৫৮

প্রাচ্য পরিবেশনায় লোকনাট্যের অভিনয় উপাদান ব্যবহারের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ দিকটি পরিলক্ষিত হয় নাট্যের বর্ণনাত্মক অভিনয়াংশে। বর্ণনাত্মক অভিনয়ে মূলত দুই ধরনের কৌশল অবলম্বন করতে দেখা যায়। প্রথমত- এই নাট্যের বর্ণনাত্মক অভিনয়ে একাধিক কুশীলব অংশগ্রহণ করেন। তবে সমগ্র পরিবেশনায় ‘কথক’ নামে দুইজন কুশীলব বর্ণনাত্মক অভিনয়ে মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকেন। বর্ণনাত্মক অভিনয়ের পাশাপাশি এই দুইজন কুশীলব নির্দিষ্ট দুটি চরিত্রেও অভিনয় করেন। বর্ণনাত্মক অভিনয়ে অংশগ্রহণকারী সকল কুশীলব বর্ণনাত্মক গদ্য ও কাব্য ব্যবহার করলেও বর্ণনাত্মক গীত অভিনয়ে অংশগ্রহণ করেন মূলত দুইজন কুশীলব, কথক (নারী) ও পালকি নৃত্যক (পালকি যাত্রার নৃত্যশিল্পী) এবং যন্ত্রীদলসহ অন্যান্য কুশীলব ধুয়া পরিবেশনায় সহয়তা করেন। অবশ্য পুরুষ কথককেও একটি নির্দিষ্ট অংশে গীতাভিনয় করতে দেখা যায়।

দ্বিতীয়ত- এই প্রযোজনায় বর্ণনাত্মক অভিনয়ে ‘কথক’র ভূমিকা একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ দিক। এখানে ‘চরিত্র’ থেকে ‘কথক’কে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। চরিত্রের কথাই যেন অন্যকেউ (কথক হয়ে) বলে দিচ্ছে। অর্থাৎ কথক তৃতীয় পুরুষে চরিত্র বা দৃশ্যের ক্রিয়া নিরপেক্ষ বর্ণনা করলে পাত্র-পাত্রীগণ উক্ত বর্ণনা দৃশ্যে রূপায়ন করেন। কথক যেন চরিত্রাভিনেতার ভিতর থেকে বের হয়ে আসা একটি সত্তা যার বর্ণনা অনুযায়ী চরিত্রাভিনেতা দৃশ্য রচনা করেন। বর্ণনাত্মক অভিনয়ের এই ধরনের প্রয়োগরীতিকে নির্দেশক বর্ণনার আধুনিক রূপায়ণ বলে অভিহিত করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন-

প্রাচ্য’র ন্যারেটিভনেসের আধুনিক জায়গাটা হচ্ছে- যেটাকে দেবেশ রায় বলেছেন, ‘আধুনিকতার আধুনিক’। আধুনিক এইজন্যে যে, এখানে চরিত্রের ভিতর থেকে ন্যারেটর বেরিয়ে এসে কথা বলে আবার চরিত্রের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে। এবং মাঝে মাঝে চরিত্রের সাথেও ইন্টারাপশনে যাচ্ছে ন্যারেটর। এই কনসেপ্টটা আমি নিয়েছি- মানুষ কিন্তু কখনো কখনো নিজেই নিজের সাথে কথা বলে। যে লোকটি কথা বলছে সে কিন্তু তার মধ্যেই বাস করছে। সেই সত্তা মানুষটির ভিতরেই বাস করে। তার অনেক কথা আমরা বুঝিতে পারি না। কিন্তু অনেক কিছু ভাবি। এই ভাবনাটাও কিন্তু আরেকটা লোকের ভাবনা। এই রকম একটি জায়গা থেকে আমার মনে হয়েছে যদি ন্যারেটিভনেসটাকে এরকম একটি জায়গায় নিয়ে আসতে পারি, এরকম একটি আধুনিক ভাবনার মধ্যে অনুপ্রবেশ করাতে পারি, তাহলে কি দাঁড়ায়। এরকম একটি কনসেপ্ট থেকে ‘কথক’ চরিত্রটি নির্মাণ করেছি।৫৯

শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় বর্ণনাত্মক অভিনয়ের এই ধরনের আধুনিক ভাবনার প্রয়োগ নিঃসন্দেহে নতুনত্বের স্বাদ প্রদান করে। কিন্তু প্রায়োগিক ক্ষেত্রে সর্বত্র এর সফলতা দেখা যায় না। কখনো কখনো এই ধরনের বর্ণনাত্মক অভিনয়ে সাধারণ বিবৃতি বা ধারাবর্ণনামূলক একঘেঁয়েমী পরিলক্ষিত হয়। তাছাড়া এই ধরনের বর্ণনাত্মক অভিনয়ের প্রয়োগ লোকনাট্য ঐতিহ্যে একেবারেই দুষ্প্রাপ্য নয়।

এ প্রসঙ্গে আউটপাড়া-ভাদগ্রাম (মির্জাপুর, টাঙ্গাইল)-এ শ্রীকৃষ্ণ জন্মতিথিকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশিত হয়ে আসা একাধিক পুরাণ বিষয়ক পরিবেশনারীতির কথা বলা যেতে পারে। প্রতিবছর এইদিনে প্রায় সারাদিন ধরে পরিবেশিত হয়ে থাকে বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনীর কিছু কিছু অংশ। যেমন, রামায়ণ থেকে সীতার অগ্নি-পরীক্ষা, মহাভারত থেকে রাজা হরিশচন্দ্রের শ্মশান-মিলন, শ্রীকৃষ্ণ-কীর্তনের নৌকাবিলাস পালা, বস্ত্রহরণ এবং মনসা-মঙ্গলের বেহুলার ভাসান প্রভৃতি। মন্দির প্রাঙ্গণ, পার্শ্ববর্তী খোলা স্থান ও দুটি পুকুর হচ্ছে মূল পরিবেশনা স্থল। দর্শক যখন যেখানে পরিবেশনা হয় সেখানে ছুটে যান। যেমন, নৌকাবিলাস ও বেহুলার ভাসান পরিবেশনা স্থল ছিল পাশ্ববর্তী একটি পুকুর। এখানে একদল কুশীলব শ্রীকৃষ্ণ, রাধা ও তার সখীরূপে এবং বেহুলা ও তার মরা পতির সাজ-পোষাক গ্রহণ করে ছেলেরাই কেবল এধরনের পরিবেশনা করেন। শ্রীকৃষ্ণ একটি নৌকার মাঝি হয়ে ঘুরে বেড়ায়, যেখানে রাধা ও তার সখী দল পুকুরের চারপাশে ঘুরে ঘুরে নদী পার করে দিতে মিনতি জানায়। কিন্তু কৃষ্ণ তাদের পার তো করেই না বরং নানান ছলচাতুরী করে বৈঠার আঘাতে তাদের গায়ে পানি ছিটিয়ে দেয়। অন্যদিকে কলাগাছের ভেলায় চড়ে বেহুলা তার মরা স্বামী নিয়ে উজান পথে গমন দেখাতে পুকুরটির চারিপাশে ভেসে বেড়ায়। এবং এই চলার পথেই বাঁকে বাঁকে বেহুলা তার স্বামীর জন্য প্যালাও তোলেন। এই সকল পরিবেশনা মন্দিরে অবস্থানরত কিছু কুশীলব বর্ণনার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করেন। কখনো কখনো গীত পরিবেশিত হয় ‘পতি কেন রে মইল’ আবার কখনো গীত হচ্ছে ‘পার করে দাও আমারে’।৬০ তাছাড়া প্রথম অধ্যায়ের শুরুতে শিব ও কালী বিষয়ক দুটি পরিবেশনা বাইদ্যার নাচ (নগরভাদগ্রাম-টাঙ্গাইল) ও অষ্টক গান (মাদারিপুর)-এর উল্লেখ করা হয়েছে। এই দুটি পরিবেশনায় গায়েন কর্তৃক তৃতীয় পুরুষে বর্ণনাত্মক গীতাভিনয়ের সাথে কুশীলবগণ নৃত্যের মাধ্যমে দৃশ্যাভিনয় করে থাকেন যা সম্পূর্ণ মূকাভিনয়মূলক। এক্ষেত্রে উদাহরণ স্বরূপ অষ্টক গান’র কথা বলা যায়, যেখানে গায়েন কর্তৃক শ্রীকৃষ্ণের নৌকাবিলাস পর্বের বর্ণনাত্মক গীতাভিনয়ের সাথে একাধিক কুশীলব (সকলেরই রয়স ১২ থেকে ১৪) নৃত্যাভিনয়ের মাধ্যমে দৃশ্যটির রূপায়ণ করেন। এক্ষেত্রে তাঁরা দ্রব্যসামগ্রী হিসেবে বৈঠা ও রুমাল ব্যবহার করেন।

মঞ্চে প্রবেশ এবং প্রস্থানের মাধ্যমে প্রাচ্য’র সংলাপাত্মক অভিনয় পরিবেশিত হয়। প্রত্যেক কুশীলব স্ব স্ব চরিত্র অনুযায়ী সংলাপাত্মক অভিনয়ে অংশগ্রহণ করেন। আখ্যানের অধিকাংশ বর্ণনাত্মক অভিনয়ে অংশগ্রহণকারী দুজন কুশীলব কথকের ভূমিকা ছাড়াও কথক (নারী) এবং কথক (পুরুষ) যথাক্রমে, বেহুলা ও কণিকা রাণী এবং জিতু মাতব্বর ও লক্ষিন্দর চরিত্রে অভিনয় করেন। সংলাপাত্মক অভিনয়ে কুশীলবদের চরিত্র নির্মাণ প্রসঙ্গে নির্দেশক বলেন-

Body language, বিশেষত সয়ফর-এর মধ্যে এই ল্যাঙ্গুয়েজ কিন্তু একেবারেই এখানকার মানুষের নয়। এটা একটু আলাদা করে আমি ইচ্ছা করেই করেছি। ন্যারেটর কিন্তু আমাদের, আমাদের কথা বলছে। চরিত্রায়নে অনেক বেশি আধুনিকায়ন হয়েছে। কিন্তু আমার ইচ্ছা ছিল যদি আরও বেশি ন্যাচারাল বা ওদের হতো হতো তাহলে আরও ভাল হতো।৬১

অভিনয়ে একটি দৃশ্য থেকে আরেকটি দৃশ্যের পরিবর্তন প্রক্রিয়ায় মুখ্য ভূমিকা পালন করে বর্ণনাত্মক গদ্য। তবে বিশেষ দু’একটি ক্ষেত্রে বর্ণনাত্মক গীত-এর ব্যবহারও লক্ষণীয়। অভিনয় উপাদানের সাথে কিছু দ্রব্যসামগ্রী ব্যবহার এই পরিবর্তন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে।

দ্রব্যসামগ্রী

প্রাচ্য পরিবেশনায় পালকি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এক্ষেত্রে পালকি বোঝাতে বাঁশের সাথে ঝোলানো বিশেষভাবে তৈরি একটি নক্সীকাঁথার ব্যবহার করা হয়েছে। আখ্যানের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে বিবাহ-পরবর্তী গৃহে প্রত্যাবর্তন যাত্রা। এই যাত্রা পথের বাঁকে বাঁকে উঠে আসে সয়ফরের অতীত জীবেেনর নানান ঘটনা। ফলে এই যাত্রাপথের বিভিন্ন ঘটনাবলীর মধ্য থেকে অতীত এবং বর্তমানকে সুস্পষ্ট করে তুলতে এই পালকির ব্যবহার করা হয়। এছাড়া প্রপস্ হিসেবে এই নাটকে আরও দুটি সামগ্রীর উল্লেখযোগ্য ব্যবহার রয়েছে একটুকরো সাদা কাপড় এবং একটি বালিশ। কাপড়টি কখনো নৌকার পাল, সাপের ফণা আবার কখনো মৃত মানুষের লাশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে বালিশটি মৃত নোলকের লাশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। দৃশ্য পরিবর্তনে দ্রব্যসামগ্রীর ব্যবহার প্রসঙ্গে নির্দেশক বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে বর্ণনার (গদ্য ও গীত) সাথে অধিকাংশ ক্ষেত্রে দ্রব্যসামগ্রীর ব্যবহার করেছি। বর্ণনার সাথে হঠাৎ করে প্রপস্-এর ব্যবহার হলেই ভেঙে যাচ্ছে।৬২ এখানে ভেঙে যাওয়া, দৃশ্য পরিবর্তন অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে।

মঞ্চ পরিকল্পনা

মঞ্চ পরিকল্পনা এই নাটকের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক। প্রসেনিয়াম মঞ্চ থেকে বেরিয়ে দুই দিকে দর্শক অবস্থানে উন্মুক্ত অভিনয় আনয়নে প্রাচ্য পরিবেশিত হয়। তবে প্রাচ্য’র মঞ্চ নির্মাণ ও ব্যবহারের যে কৌশল অবলম্বন করা হয় তাতে এই প্রযোজনাটির সহজ পরিবেশন ক্ষমতা হারিয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে নির্দেশক নাসির উদ্দিন ইউসুফ বলেন, ‘হ্যাঁ এটা একটা সমস্যা, মঞ্চ পরিকল্পনায় নতুন করে ভাবা যেতে পারে।’৬৩

তবে মঞ্চ পরিকল্পনা প্রসঙ্গে নির্দেশক মন্তব্য করেন যে, ডিজাইনের সমান্তরাল রেখার মাঝে একটি ভাঙন রয়েছে, অর্থাৎ ডিজাইনটি এরকম যে, একটি রেখা মধ্যে ভেঙে গিয়েছে। জীবনের ভাঙন, মানুষের জীবনে যা হয়। আর এই স্থানের মধ্যেই যাত্রাপথে বিভিন্ন চরিত্র উঠে আসে। এরা অতীতের চরিত্র। কিন্তু থিয়েটারে এই আয়তনে সব বর্তমান হয়ে ওঠে।

[এখানে মঞ্চ পরিকল্পনার ছবি দিতে হবে]

মঞ্চ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট দুটি কৌশল অনুসরণ করতে দেখা যায়। প্রথমত- ‘বিবাহ যাত্রা’ অর্থাৎ বধূ নিয়ে গমন পথের একাধিক নাট্যিক আয়তন বর্ণনাত্মক অভিনয়ের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। এ ক্ষেত্রে যাত্রাদলের কুশীলববৃন্দ বর্ণনাত্মক অভিনয় উপাদানের সাহায্যে এই সকল দৃশ্য উপস্থাপন করেন। দ্বিতীয়ত- আখ্যানের বেশ কিছু ঘটনা যা গমন পথের বিভিন্ন বাঁকে সয়ফরের অতীত জীবনের ঘটনা উপস্থাপিত হয়। কুশীলবগণ এক্ষেত্রে মঞ্চের বাইরে থেকে প্রবেশ-প্রস্থানের মাধ্যমে ঘটনাসমূহ উপস্থাপন করেন।

আলো

আলোক পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও দুই ধরনের কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে। প্রযোজনার যেসকল নাট্যিক আয়তন পরিবর্তনে কুশীলবগণ প্রবেশ-প্রস্থান না করে অভিনয় উপাদান ব্যবহারের মাধ্যমে উপস্থাপন করেন, সেসকল ক্ষেত্রে আলো নির্বাপণ করা হয় না। এছাড়া নাট্যিক আয়তন পরিবর্তনের অন্যান্য ক্ষেত্রে আলো নির্বাপণের সাথে কুশীলবগণ মঞ্চে প্রবেশ করে দৃশ্যাভিনয় করেন। এছাড়া নাটকের নির্দিষ্ট কিছু চরিত্রের বিশেষ কিছু মুহূর্ত উপস্থাপনের জন্য আলোর বিশেষ প্রক্ষেপণ কৌশল প্রয়োগ করা হয়।

পোশাক

পোশাক পরিকল্পনায় চরিত্রানুগ পোশাকের ব্যবহারের পরিবর্তে ইউনিফর্মধর্মী পোশাক বা কোরাস কস্টিউম-এর ব্যবহার করা হয়েছে। পোশাকের বিশেষ কোনো পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয় না। তবে ভাসান যাত্রা দৃশ্যে উভয় কথকের দুটি উত্তরীয়’র ব্যবহার ভিন্ন অতিরিক্ত কোনো পোশাকের ব্যবহার বা পরিবর্তন দেখা যায় না।

পরিশেষে প্রাচ্য প্রযোজনারীতির সার্বিক বিশ্লেষণে এ বিষয়টি স্স্পুষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, নাট্য পরিবেশনায় সুনির্দিষ্ট কাহিনী বা গল্পই প্রথম শর্ত নয়। কিছু ঘটনার সুনির্দিষ্ট বিন্যাসের মাধ্যমেও একটি সম্পূর্ণ  প্রযোজনা উপস্থাপন করা যায়। মূলত নাট্য প্রযোজনার ক্ষেত্রে ঘটনার পর্যায়ক্রমিক ও পরম্পরাগত বিন্যাস অত্যাবশ্যক নয়; বর্ণনাত্মক অভিনয় উপাদান প্রয়োগের মাধ্যমে যুগপৎ-সংঘটিত একাধিক ঘটনাকেও উপস্থাপন করা যায়। প্রাচ্য প্রযোজনায় অতীত ও বর্তমান ঘটনাবলীর যুগপৎ উপস্থাপনাকে সাবলীল করে তুলতে বর্ণনাত্মক অভিনয় উপাদানের প্রয়োগ শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। এ প্রসঙ্গে নির্দেশক নাসির উদ্দিন ইউসুফ বলেন, ‘আমাদের নাট্যরীতি দিয়ে সবচেয়ে জটিল ভাবনাটাও প্রকাশ করা যায়। ওয়েস্ট যেমন বলে থিয়েটারে একটি গল্প থাকতে হবে। সে গল্পে কনফ্লিক্ট থাকতে হবে। তার একটি পরিণতি থাকতে হবে। আমরা এই নাট্যে সেগুলোও রাখিনি। আবার আমাদের গল্প বলার যে অভিনয়রীতি রয়েছে ওটাকেও রাখিনি। আমরা একটি ঘটনাকে আমাদের অভিনয়রীতি (উপাদান) দ্বারা প্রকাশ করতে পারি এটাই প্রাচ্য’র মধ্য দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছি।’৬৪

সূত্র তথ্য :

১. সেলিম আল দীন : বাঙলা দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পের পূর্বাপর, পৃষ্ঠা- ৯, ২. প্রাগুক্ত, ৩. সেলিম আল দীন : কথাপুচ্ছ, চাকা। ঢাকা গ্রন্থিক, ১৯৯৭, পৃষ্ঠা-৪৪, ৪. সেলিম আল দীন : বাঙলা দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পের পূর্বাপর, পৃষ্ঠা- ২০, ৫. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠাা- ২০, ৬. সেলিম আল দীন : প্রাচ্য- প্রযোজনা পাণ্ডুলিপি, পৃষ্ঠা-১, ৭. আহমেদ শরীফ : মধ্যযুগের সাহিত্য সমাজ ও সংস্কৃতির রূপ, পৃষ্ঠা-১৯, ৮. সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ : সাক্ষাৎকারের পরিবর্তে, অপর, পৃষ্ঠা-১২, ৯. আশুতোষ ভট্টাচার্য : বাঙলা কাব্যের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-১১৫, ১০.সুকুমার সেন : বাঙলা সাহিত্যের  ইতিহাস, ১ম খণ।ড, পৃষ্ঠা-১০৩, ১১. সেলিম আল দীন : মধ্যযুগের বাংলা নাট্য, পৃষ্ঠা-৮২, ১২. আহমেদ শরীফ : মধ্যযুগের সাহিত্য সমাজ ও সংস্কৃতির রূপ, পৃষ্ঠা-২০, ১৩. আশুতোষ ভট্টাচার্য : বাঙলা মঙ্গল কাব্যের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-১১৫, ১৪. সেলিম আল দীন : মধ্যযুগের বাংলা নাট্য, পৃষ্ঠা-৭৯, ১৫. সেলিম আল দীন : বাঙলা নাট্যকোষ, পৃষ্ঠা- ৩০৩, ১৬. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা- ১৮৩, ১৭. সেলিম আল দীন : থিয়েটার স্টাডিজ, পৃষ্ঠা- ২০, ১৮. সেলিম আল দীন : বাঙলা নাট্যকোষ, পৃষ্ঠা-২১৫, ১৯. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-২১২, ২০. আশুতোষ ভট্টাচার্য : বাংলা মঙ্গল কাব্যের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-২০, ২১. সেলিম আল দীন : বাঙলা নাট্যকোষ, পৃষ্ঠা-২২৮, ২২. সেলিম আল দীন : মধ্যযুগের বাংলা নাট্য, পৃষ্ঠা-৮১, ২৩.  সেলিম আল দীন : বাঙলা নাট্যকোষ, পৃষ্ঠা-২১৫, ২৪. সৈয়দ জামিল আহমেদ : বিষাদ সিন্ধু : গ্রন্থ থেকে নাট্য, পৃষ্ঠা-৮২, ২৫. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৮০,  ২৬.Ahmed : Acinpakhi Infinity; Indigenous Theatre of Bangladesh , p-xv, ২৭. সৈয়দ জামিল আহমেদ : বিষাদ সিন্ধু : গ্রন্থ থেকে নাট্য, পৃ-৮০,  ২৮. Ahmed : Contemprariety of Tradition; The Case of Pala Gan and Kamala Ranir Sagar Dighi, A seminar paper on Sanskrit Theatre. ২৯. প্রাগুক্ত, ৩০. সৈয়দ জামিল আহমেদ : নাটমণ্ডপ ও বাংলাদেশের জাতীয় নাট্যশালা, পৃ-১৩৯, ৩১. সৈয়দ জামিল আহমেদ : থিয়েটার কি, পৃ-১৫৩, ৩২. জাহিদ রিপন : লোকনাট্যের আধুনিক উপস্থাপনরীতি, মৈমনসিংহ গীতিকার কাজল রেখা, পৃ-১৪, ৩৩. প্রাগুক্ত, পৃ-১৪, ৩৪. প্রাগুক্ত, পৃ- ১৯, ৩৫. প্রাগুক্ত, পৃ- ১৯, ৩৬. প্রাগুক্ত, পৃ-২৪, ৩৭. সাইমন জাকারিয়া : বাংলা জার্নাল, ৩য় বর্ষ, ১ সংখ্যা, ভল্যুম-৩, নং-১, পৃ-১৯, ৩৮. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর : ‘রঙ্গমঞ্চ’, পৃ-৭৩, ৩৯. প্রাগুক্ত, পৃ-৭৪, ৪০. সেলিম আল দীন : সোপান নাট্যপত্র, বাংলাদেশ সংখ্যা, পৃ-৩৩, ৪১. সাইমন জাকারিয়া : বাংলা জার্নাল, পৃ-১১, ৪২. প্রাগুক্ত, পৃ-১১, ৪৩. নাসির উদ্দিন ইউসুফ : আলাপনে বনপাংশুল, থিয়েটারওয়ালা, ১ম বর্ষ জুলাই-সেপ্টেম্বর’৯৯ সংখ্যা, পৃ-১৯, ৪৪. নাসির উদ্দিন ইউসুফ : শিকড়ের হোক ডানা, থিয়েটারওয়ালা, ৩য় বর্ষ, জানুয়ারি-জুন’০১ সংখ্যা, পৃ-২৩, ৪৫. প্রাগুক্ত, পৃ-১৬, ৪৬. আফসার আহমেদ : মঞ্চের ট্রিলজি ও অন্যান্য প্রবন্ধ, পৃ-১২০, ৪৬. সেলিম আল দীন : কথাপুচ্ছ- ‘প্রাচ্য’ প্রযোজনা পাণ্ডুলিপি, ৪৮. সত্য বন্দ্যোপাধ্যায় : বের্টোল্ট ব্রেখট ও আধুনিক থিয়েটার, পৃ- ৬৩, ৪৯. সুকুমার সেন : বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস, পৃ-১০৩, ৫০. সেলিম আল দীন : বাঙলা নাট্যকোষ, পৃ-২১৪, ৫১ নাসির উদ্দিন ইউসুফ : সাক্ষাৎকার থেকে উদ্ধৃতি, ৫২.  সেলিম আল দীন : ‘প্রাচ্য’ প্রযোজনা পাণ্ডুলিপি, পৃ-১৮, ৫৩.প্রাগুক্ত, পৃ-৩০, ৫৪. প্রাগুক্ত, কথাপুচ্ছ, ৫৫. প্রাগুক্ত, কথাপুচ্ছ, ৫৬. প্রাগুক্ত, পৃ-৩৬, ৫৭. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : এ্যারিস্টটলের কাব্যতত্ত্ব, পৃ- ৬৭, ৫৮. নাসির উদ্দিন ইউসুফ : প্রযোজনা নির্দেশিকা, ঢাকা থিয়েটার প্রযোজনা-২৮, ৫৯. নাসির উদ্দিন ইউসুফ : উদ্ধৃতি সাক্ষাৎকার থেকে উক্ত, ৬০. সাইমন জাকারিয়া : আউটপাড়ার পুরাণ কর্মকাণ্ড, প্রথম আলো, ১১ জানুয়ারি ২০০২, পৃ-১৪, ৬১. নাসির উদ্দিন ইউসুফ : উদ্ধৃতি সাক্ষাৎকার থেকে উক্ত, ৬২. প্রাগুক্ত, ৬৩. প্রাগুক্ত।
[চলবে]

সাইদুর রহমান লিপন : অভিনেতা, নির্দেশক, শিক্ষক