Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

দ্রষ্টা নাট্য-চতুষ্টয়

Written by বিপ্লব বালা.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

করোনার আগে থেকেই ঢাকার বাইরে, তাতে অভাববোধ তেমন ছিল না। তবে খবর তো জানতাম, চোখে পড়ে- নতুন নতুন দলের নাটক বেশ হচ্ছে, দেশি-বিদেশি সাহিত্য নিয়ে হচ্ছে, ভালোই বলছে অনেকে। তার ফলে স্বভাবের মুদ্রাদোষে এসব দেখার একটা বাসনা জন্মায়। সুযোগ ঘটায় একটি নাটক দেখার দাবি- একটানা সপ্তাহখানেক হবে। তখনই বেশ কটি নাটক পরপর দেখি। তার মধ্যে চারটি নিয়ে লিখতে ইচ্ছে করে, যারা কেবল দ্রষ্টব্য নয় দিশারিও। তাই- দ্রষ্টা নাট্য-চতুষ্টয়। এগুলোর নবভাবন ও রূপায়ণ-ভিন্নতায় লেখাও নানারকম হলো, ভেবে বুঝে আগে থেকে ঠিক করা নয়।

নাজুক মানুষের সংলাপ
রচনা: শাহাদুজ্জামান
নির্দেশনা: সাইফ সুমন
প্রযোজনা: থিয়েটারওয়ালা রেপাটরি
প্রথম মঞ্চায়ন: ২০২৩

লেখক শাহাদুজ্জামানের একটি গল্পের সঙ্গে আরেকটি জুড়ে নাজুক মানুষের গল্প। নবীন যুবা- ‘এ জীবন লইয়া কী করিব’- চিরকালের এই ভাবনায় প্রাজ্ঞ এক প্রৌঢ়জনের মুখোমুখি হয়।

লেখক জানান:
কথোপকথনের ভেতর দিয়ে জীবনের নানা প্রশ্নের উত্তর খোঁজার উদাহরণ রয়েছে বিশ্বসাহিত্যে। আমাদের পঞ্চতন্ত্রের গল্পে, জাতকের গল্পেও এর চর্চা হয়েছে। আমি যখন গল্প লিখতে শুরু করি, তখন গল্পের বিষয়ের পাশাপাশি আঙ্গিক নিয়ে নানা নিরীক্ষায়ও আগ্রহী হই। গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, কবিতার দেয়ালগুলো ভেঙ্গে দিতে ইচ্ছা হয়।... এই কথোপকথনের আঙ্গিক ব্যবহার করে আরেকটি গল্প যুক্ত করি নাজুক মানুষের সংলাপ নামে। একটি গল্পে কিছু ভাবনাকে ভিন্ন-আঙ্গিকে উপস্থাপনা করতে গিয়ে এই কথোপকথন ধারাটিকে অনুসরণ করে একটি গল্প লিখেছিলাম মারাত্মক নিরুপম আনন্দ নামে।

গল্প দুটো লেখার প্রেক্ষাপট ভাবতে গিয়ে মনে পড়ে জীবনের নানা-পর্বে বিবিধ প্রশ্ন নিয়ে যখন তাড়িত হয়েছি, তখন মনে হয়েছে প্রশ্নগুলো নিয়ে কারো সঙ্গে নিবিড় আলাপে মগ্ন হতে পারলে বেশ হতো। কিন্তু যখন আশেপাশে তেমন আলাপে যুক্ত হবার মতো মানুষ খুঁজে পাই নি তখন নিজেই দুটো চরিত্র তৈরি করে নিয়ে তাদের ভেতর দিয়ে জীবনের এইসব অমীমাংসিত নানা-প্রসঙ্গের ভেতর বিচরণের একটা উপায় খুঁজে নিয়েছি।... তবে ঘটনাবিহীন, জটিল দার্শনিক আলাপের এই প্রায়-বিমূর্ত ধারার গল্পটি সাহিত্যের আঙ্গিনায় পাঠযোগ্যতা থাকলেও মঞ্চরূপে ঝুঁকি আছে বলে মনে হয়েছে আমার।

...তবে নির্দেশক সাইফের সঙ্গে আলাপের সূত্রে, মঞ্চে এই গল্পের একটি নতুন নাট্যজন্মের সম্ভাবনা আমি দেখতে পাই। বিশেষ করে নানা-ধারার মৌলিক নাটকের চর্চার ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের নাট্যমঞ্চের প্রাণ উজ্জ্বীবিত রাখাও জরুরি বলে মনে করি আমি। ফলে সাইফের সঙ্গে আলাপের প্রেক্ষিতে সংযোগ-বিয়োজনের মাধ্যমে নাজুক মানুষের সংলাপ গল্পটির একটি নতুন রূপ দেই।

নির্দেশকের কথা:
‘আমরা অনেকেই একটা কিছুর সন্ধানে পুরোজীবন কাটিয়ে দেই। কিন্তু তুমি যা চাও তা হয়ত এরই মধ্যে পেয়েছ। সুতরাং, এবার থামো (গৌতম বুদ্ধ)’। পৃথিবীগ্রহে প্রশ্নের উত্তর খোঁজা মানুষের সহজাত ও জ্ঞানতাত্ত্বিক স্বভাব।... মানুষ জানতে চেয়েছে, বুঝতে চেয়েছে! জীবনের সামাজিক সত্যকে উপলব্ধি করে জীবনকে দেখার অভিজ্ঞতা থেকে প্রাজ্ঞজনেরা দিয়ে গেছেন নানা প্রশ্নের উত্তর।

...চারদিকে সবার চোখে কী এক আতঙ্ক এখন। ক্রমশ তছনছ হয়ে যাওয়া সময়। বেঁচে থাকার লড়াই করতে করতে সবাই ক্লান্ত যেন। সে ক্লান্তিতে গুটিয়ে যাচ্ছে। আমরা যারা সতেজ থাকার ভান করছি তারাও জানি এটা ভানই।

মিথ্যাজীবী সমাজ এক আমাদের।... প্রচলিত ধারার গ্রুপ থিয়েটার চর্চা থেকে এখন অনেকেই বেরিয়ে আসতে চাইছেন। উপায়ও খুঁজছেন। তাগিদ থাকলে পথ বের হবেই।’

গল্প-ইঙ্গিত:
প্রশ্ন ও চিন্তা বিনিময়ের নাটক।
এক জিজ্ঞাসু, পথভ্রান্ত তরুণ মুখোমুখি হয় এক প্রাজ্ঞ প্রবীণের। গল্প আর কথোপকথনের ভেতর দিয়ে জীবনের নানা-দার্শনিক প্রশ্নের উত্তর খোঁজে প্রবীণের কাছে। প্রবীণ তাকে উত্তর খোঁজার বদলে প্রশ্নগুলোকেই উল্টেপাল্টে দেখতে উদ্বুদ্ধ করে চলে। চলে তাদের কথপোকথন। এর ভেতর দিয়েই তরুণ মুখোমুখি হয় কিছু সত্য, আর কিছু আপাত সত্যের।

এতদিনে হয়ত বাংলাদেশের থিয়েটার সাবালক হয়ে উঠছে, বাহির ছেড়ে ভেতরেও, নিজের যত প্রশ্ন-জিজ্ঞাসার সংকটগ্রস্ত বাস্তবদশার মুখোমুখি হতে চাইছে। সমাজ-দুনিয়া বদলে দেবার কৈশোরক ঘোষণা দিয়ে, দিনে দিনে বুঝে নিয়েছে কেবলই ইচ্ছাপূরণের গোবধানন্দ তা নয়। মঞ্চে টিনের তলোয়ার বাগিয়ে কারো কারো কেবল বদল হয়, আর-সকলে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে, যেমন হয়েছে রাজনীতির বিরাট সব ঘোষণা দিয়ে- যাতে দেশ-সমাজের কোনো উদ্ধার হয় নি, নিজেদের স্বরূপ কেবল দগদগে হয়ে উঠেছে- ‘মিথ্যাজীবী সমাজ একটা আমাদের’, নিজেদের কোনো স্বপ্ন-আশা-স্লোগানে আর চাপা দেয়া যাচ্ছে না জটিল কঠিন কুটিল বাস্তবতা- বিশ্বজোড়া ক্ষমতা আর বাজারের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই- ‘শিকারী-শিকার মানুষের ভয়াল জঙ্গলে’।

ভেঙ্গে পড়েছে তাবৎ আশ্রয়, প্রতিষ্ঠান-দেশ-সমাজ-পরিবার, মানবস্বভাব আর তার সম্পর্ক- দল বলে কিছু আর যেন থেকেও নেই। কী ভয়ানক একলা আজ মানুষ- তার যেন কেউ নেই, কিছু নেই- সর্বস্বহারা সর্বনাশ ঘটে গেছে যেন কোথাও।

তাই বুঝি কেবলই একলা হয়ে মুখোমুখি হতে হচ্ছে নিজের আর জীবনের বাস্তবসমূহে- এই প্রশ্ন-জিজ্ঞাসার নিরসনে কথা বলার মতো কেউ আর নেই কারো। লেখক তাই শরণাপন্ন হন গল্পে, কেবল দুজনে মিলে নবীন আর প্রবীণ- নতুন করে সব আতিপাতি খুঁজে ফেরা- বাঁচনের সুলুকসন্ধান, যদি কোনো সূত্র মেলে জীবনে- বাস্তববিশ্বে যেখানে নেই কোনো সংযোগ। নবীন-প্রবীণে তো নয়ই!

তবে তরুণ যুবাটি এখনই চায় কোনো চটজলদি উত্তর। তবু ভালো, গল্পে বা নাটকে প্রবীণজন বলে না- ‘উত্তরে থাকো মৌন’।

বাস্তবে যখন লুপ্ত এহেন মানবিক কথোপকথন- মানবের গোটা সভ্যতা-সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে পারস্পরিক যে বিনিময়ে ভর করে। ‘আমি যে তোর ভাষা বুঝি না’- এটা তো কেবল চণ্ডালিকায় প্রকৃতির মায়ের বিপন্নতা নয়- প্রকৃতির নতুন জন্মের নবভাষার তল মেলে না যে মায়ের। নাজুক মানুষের সংলাপ নাট্যে তবুও মুখোমুখি দুই প্রজন্ম। মঞ্চ এতকাল কেবল তো নিজেকে বাদ দিয়ে কল্প যত সামাজিক কী বিশ্ববাস্তবের বিরাট সব ঘটনাঘটন বিচিত্র মঞ্চমুদ্রায়, মায়ার কুজ্ঝটি কুহকে, কোরিওগ্রাফিতে নাট্যকলা সৃজনঘোরে আচ্ছন্ন ছিল। তাতে কেবল মানবমন আর তার যত সম্পর্ক, ‘কথা’ কোথায় যে উধাও হয়েছে!

সেখানে দুজন মানুষের কথা বলাবলি, প্রশ্নোত্তর নিয়ে যে হতে পারে একটি নাট্য- সেটি অবিশ্বাস্য লাগে- গোটা জীবনে নেই যখন তার কোনোই বাস্তবতা! তবে শিল্প তো তাই চেয়ে এসেছে, জীবনের বাস্তবে যা অপ্রাপনীয়- সে হিসেবে তো গ্রাহ্য হতেই পারে এই নাটক। তবে শুরু থেকেই এমন সব কথা আর প্রশ্ন শুরু হয়- যা হয়ত কখনো কারো একলার আর্ত, একান্ত জিজ্ঞাসাই হতে পারে, যা কি না দার্শনিক বাতচিত বলে দূরে সরিয়ে রাখতেই অভ্যস্ত আমরা। যখন কি না আমরা কেউ কারো কথা আর শুনি না। হয়ত বলিও না- তেমন বলা বা শোনার মতো কেউ কারো নেই বলে- কারো কোনো কথাও হয়ত তাই নেই। তবুও দর্শক সাধ্যমতো মন দিয়ে এসব নতুন কথা শুনে কিছু বুঝতেও চেয়েছে নিজের মতো করে। তাতেই আশা জাগে, কথার মতো, তেমন কথা আজও না শুনে পারে না তাহলে কেউ কেউ- ‘মানুষ মরিছে কথা খুঁজে খুঁজে/না পারে বুঝিতে, আপনি না বুঝে।’ এটা কেবল তবে কবি-কথামাত্র নয়। তবু এমন সব ভারী কথা যা আমরা শুনতে বা বলতে অভ্যস্ত নই, তা বলা, শোনা ও শোনানো ভাবানো বোঝানো- জীবনের বাস্তবে তার তো কোনো চর্চা বা সুযোগ নেই। তাহলে শিল্প বা মঞ্চকেই সেই দায় নিতে হয়, বিশ্ব থেকে উধাও হয়ে গেছে বলে- মঞ্চে সেই সত্য বলা বা শোনার মহড়া বা রিহার্সাল করে চলতে হবে, নাটক করে করে। সেই প্রয়োগ-প্রক্রিয়ার সুলুকসন্ধান করে সত্যি সত্যি কেবল মঞ্চে কথোপকথনের চলতি মুদ্রায় বা মায়ায় নয়- তার সত্যকার আয়োজন করে, প্রয়োগ-প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করে। বাস্তব-জীবনে শ্রোতা হিসেবে বলার উপায় বের করা চাই। কোন কথা কেমন করে বলা গেলে, শ্রোতার স্বভাবমনের অভ্যেস বুঝে, নিজের অভিজ্ঞতায় তা বুঝে নিতে হবে। দস্যু রত্নাকরের মতো ‘মরা’ ‘মরা’ বলতে বলতে ‘রাম’ বলতে পারা, যেমন কি না জীবনানন্দ বলেন- ‘মানুষের ভাষা তবু, অনুভূতি-দেশ থেকে আলো না পেলে/ নিছক ক্রিয়া, বিশেষণ,/ এলোমেলো নিরাশ্রয় শব্দের কঙ্কাল।- কথা কথা আর কথার এই শব্দরৌরব, শব্দের এক খাঁচায় আটকে পড়া আমরা যে। তবে একা পড়ে যে-কথার তল মেলে, মঞ্চে কী করে সেই অন্য গভীর কথনও শোনানো যায় দর্শককেÑএই দায়ের কথা মনে পড়ায় এই নাটক, মঞ্চ যেন কোনো কলাকৌশলের বাহাদুরিতে তা পূরণ করার অভ্যস্ত পথ ছেড়ে নীরব হয়ে, নিজের আর অপরের মন বুঝে বলার যোগ্য হতে পারে। ‘মানুষের মন চায় মানুষেরই মন’ প্রাচীন এই বচন সত্য বলে যদি জানি, মানি। নাজুক মানুষের সংলাপ- সেই আশা জাগায়। নির্দেশক সাইফ সুমন একের পর এক নাটকে আজকের মঞ্চের নবীন-বাচন খুঁজে ফিরছেন। প্রাজ্ঞজনের ভূমিকায় গুণী নির্দেশক, শিক্ষক ইউসুফ হাসান অর্ক সচ্ছন্দ একাগ্রতায় অভিনয় করেছেন; নবীন নাট্যজন রুদ্র সাওজালও দেখি ভালোই যুগলবন্দির চাপান-উতর করেন- ‘তবু আশা, যেন মাতৃভাষা/চিরায়্ষ্মুতী তন্বী’।

এখন দরকার হলো, নাটকের ডায়লগ যেন সত্যিকার কথা করে তোলা যায়। মনে রাখা চাই, জীবনে তার বিরুদ্ধতার বিপত্তি আছে, সেটা তো থাকেই, তবে শিল্পের কাজ তো তাকেই সত্য করে তোলা। নইলে আর কেন এত বাধা পেরিয়ে নাটক করা; যদি না জীবনে যা না পাই তার সত্যকার পূরণ ঘটে। একটা কোনো মুক্তিপন্থা ক্রমে অর্জিত হয়।

অচলায়তন
রচনা: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নির্দেশনা: আজাদ আবুল কালাম
প্রযোজনা: প্রাচ্যনাট
প্রথম মঞ্চায়ন: ২০২৩

রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আমাদের যত বিড়ম্বনা- তাঁকে ছাড়তে, রাখতে বা ধরতে কেবলই অপারগ হতে হয়।-  ‘এ মণিহার আমায় নাহি সাজে/এরে পরতে গেলে লাগে, ছিঁড়তে গেলে বাজে’। নাটকের বেলা সেটা আরো বেশি। আধুনিকতার এক নিরীক্ষাপ্রবণতা মঞ্চে সচল তো, তবে রবীন্দ্রনাথের প্রতি ভক্তিপ্রবণতায় তাঁর নাটক আমরা যেমন আছে তেমন করতেই স্বস্তি পাই, এমনকি বেশভূষার এক কল্পচিত্র আছে- রাজা-রানি-ঠাকুরদা- অমল-কিশোর-পঞ্চক-নন্দিনীর বাঁধাধরা ছদ্ম রাবীন্দ্রিক হিন্দুয়ানির প্রশ্রয়- কলকাতা বা শান্তিনিকেতনের কিছু প্রযোজনার ছবি, বিশেষত তা যদি স্বয়ং রবীন্দ্র-অভিনীত হয়- তবে তো কথাই নেই। গানের সুরের মতোই নাটকের এসব যেন ঠিক করা আছে। অথচ এক চির পরিবর্তমান পুনর্নব রূপায়ণ যে রবীন্দ্রচারিত্র্যের মৌল পরিচয়, নাটকের বেলাও তো তার হেরফের হয় নি, মনেও রাখি না, কতবার যে বদলেছেন তিনি একেক নাট্য আখ্যানে, রূপান্তরণে।

বাংলাদেশে দুটো প্রযোজনা আমাদের ভিন্ন নন্দন-রুচির হদিস দেয়। এক, টেলিভিশনে বহুমুখী শিল্পকর্মা, মুস্তাফা মনোয়ার রক্তকরবী নাট্যের যে সৃজন-রূপায়ণ করেন; দুই, ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়’ প্রযোজিত অচলায়তন। পরে ‘প্রাচ্যনাট’ তারই বিস্তার করেন রাজা এবং অন্যান্য... প্রযোজনায়- বর্তমান বিশ্বরাজনৈতিক পটে ‘রাজা’ নাটকটি রূপান্তরণে।


অচলায়তন’র নির্দেশনা ভাবনা:
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তত্ত্বনাটক, প্রতীকী নাটক নিয়ে বড়ো বড়ো সমালোচকদের যে অস্পষ্টতার অভিযোগ তাকে খণ্ডন করে আমাদের অচলায়তন মঞ্চায়নের প্রয়াস স্পষ্ট এবং প্রতীকের ব্যবহার যথার্থ রূপে প্রকাশের ইচ্ছা কেবল।

অচলায়তন বিদ্যাপীঠকে আমরা কল্পনা করেছি একটি বালিকা বা নারী শিক্ষাগৃহ হিসেবে। আমাদের মতো পশ্চাদপদ এবং ধর্মীয়-সামাজিক চিন্তায় অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ‘নারী’। নারীকে কুসংস্কার আর নানা বিধি-নিষেধের মধ্যে আটকে রাখার নানান ষড়যন্ত্র বিদ্যমান এবং কখনো কখনো সেই ষড়যন্ত্রে নারী নিজেও যেন প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।

এই বিদ্যায়তনের সকল নিয়মকানুন এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে বাইরের পৃথিবীর আলো-বাতাস বা মুক্তি-চিন্তা কোনোভাবেই কোনো বিদ্যার্থীর ভাবনায় মননে স্থান না পায়। এখানে কাজের গতি মন্থর এবং যন্ত্রবৎ, যেন দম দেয়া পুতুল সবাই। ঠিক উল্টোচিত্র অচলায়তনের বাইরের  জগৎ- সেখানে কর্মমুখর সাধারণ মানুষ শোণপাংশু। তারা গতিশীল। কখনো জীবন গতির চেয়ে একধাপ আগানো তাদের চলন আর দর্ভক যারা- তারা কর্মে এবং ধর্মে নিবেদিত।

দৃশ্যমান দুই বিপরীত গতির সম্মিলন ঘটানোর চেষ্টা আছে প্রযোজনায়। চরিত্ররা গতকালের বা আজকের, হতে পারে আগামীর। মূল অচলায়তনের উগ্রবাদী দুষ্ট চরিত্র মহাপঞ্চকই যেমন দায়িত্ব পায় পুরনো ভাঙ্গা ভিতের উপর নতুন যাত্রা শুরু করার। সে যেন ভিলেন থেকে নায়ক হয়ে ওঠে রবীন্দ্রনাথের কলমে। আমরা তার বিপ্রতীপ অবস্থানে গিয়েছি।...আমাদের গুরু বা দাদাঠাকুর না নারী, না পুরুষ মুক্তিদাতা, যে আমাদের সাথে মিলতে চায়, সবার সাথে যুক্ত থেকে খেলায় অংশগ্রহণ করতে চায়। আমরাও দেখতে চাই খেলতে খেলতে শিখতে পারি কি না সত্যিকারের শিক্ষা।

প্রাচ্যনাটের নতুন প্রযোজনা- অচলায়তন। একেবারে বাংলাদেশ আর নগর-ঢাকায় ক্রমবর্ধমান অচলায়তনটি চিহ্নিত-নির্দিষ্ট দৃশ্যমান। আখ্যানের শিক্ষণাগারটি ঘেরাটোপে আবৃত্ত অধুনা নারীর বাস্তবের অধিক বাস্তব অচলায়তন হয়ে ওঠে। শ্রমজীবী শোণপাংশু-দর্ভক নগর-পরিচ্ছন্নকর্মী- তাদের বেশভূষা-কৃত্যকর্মাদির ক্রিয়াকলাপে। একুশ শতকীয় নাট্য ইডিয়মে, বাচন আর শারীর কোরিওগ্রাফির নৃত্যভঙ্গিমায় বিজ্ঞাপন-মিডিয়ার অনুগামী প্রতিস্পর্ধী। সেই সঙ্গে অধ্যাপক-কর্তৃপক্ষ-মহাপঞ্চক পরিচিত বিবিধ আলখেল্লাধারী। দাদাঠাকুর চিরকালের দেশি ফকিরের রঙিন লেবাসে। সমস্ত প্রতিবেশ গড়ে তুলতে নতুন গানও সংযুক্ত হয়েছে। সবার মাঝে পঞ্চক রূপে সানজিদা প্রীতি হয়ে ওঠে আরেক ‘নন্দিনী’- একালের নারীর হার-না-মানা স্ফূর্তিতে- চলায় বলায় নাচে গানে, ফিং দিয়া দেই হরেক লম্ফঝম্ফ- মঞ্চ-মিডিয়ার স্মার্টনেসে, আইটেম গার্লের অ্যাক্রোবেটিক ক্ষিপ্রতায়। তথাকথিত রাবীন্দ্রিকতার  ছদ্ম-অচলায়তন ডিঙিয়ে, উল্লঙ্ঘিয়ে- একুশ শতকীয় নাগরিক উল্লাসে।

তাতে যেন রবীন্দ্রনাথের পুনর্নব নাট্যমুক্তি ঘটে- ছন্নছাড়া এই আমাদেরও সমানবয়সি হয়ে ওঠেন তিনি, যেমন নাকি চেয়েছেন তিনি চিরকাল- নিত্য নব রূপে, রূপান্তরে। আমরাও তাঁকে পাই আমাদের অন্তরঙ্গ, হতাশ্বাস জীবনের বাস্তবে- কোনো কল্পস্বর্গে, অচলায়তনের যক্ষপুরে তাঁকে চির নির্বাসিত না করে। আমাদের নির্বীর্য ক্ষমতার ফাঁদপাতা দেশ-বিশ্বে এ বুঝি এক মিলিত মুক্তি- একইসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের আর আমাদের। একেই বলে নন্দন-পরাক্রম, প্রতিস্পর্ধা!

আমি বীরাঙ্গনা বলছি
রচনা: নীলিমা ইব্রাহীম
নির্দেশনা: সৈয়দ জামিল আহমেদ
প্রযোজনা: স্পর্ধা
প্রথম মঞ্চায়ন: ২০২৩

‘বীরাঙ্গনা’ কথাটি বা বিষয়টি সম্ভবত আমাদের জাতীয় ইতিহাসে, সমাজমনে, হয়ত যৌথ অবচেতনে সবচেয়ে নাজুক সংবেদনায় গভীর গোপনতর- যাকে বলে Culture of silence. নারী যেহেতু  মানবসংস্কৃতির আদি, জটিল কূটাভাস, ব্যক্তি ও সমাজমনের গূঢ়ৈষায় অষ্টাবক্র। যেকোনো যুদ্ধে তাই এহেন মনের দুর্বল অনুভূতিকে অন্তর্ঘাতে কাবু করতে মোক্ষম মারণাস্ত্র। মানবসম্ভ্রম হনন করে মনুষ্যপদবাচ্যকেই টলিয়ে দেওয়া হয় তাতে। জাতির সত্তামূলে, আবেগ-অনুভবের গোড়ায় পড়ে তাতে কোপ- যার ধকল সামলানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। অস্তিত্বের ভিত্তিভূমি ধসিয়ে দেওয়া এই সমবেত নারীধর্ষণ- যুদ্ধে যেন মনস্তাত্ত্বিক ধন্বন্তরী দাওয়াই।

মুক্তিযুদ্ধে পাকবাহিনী যে-শস্ত্র প্রয়োগ করেছে লাগাতার জৈবজীবাণু-প্রায় ব্যবহারে, আমরা পারতপক্ষে যুদ্ধদিনের নিদারুণ সে মানসবিপর্যয় মনে করতেও কুণ্ঠিত হই, কেবলই তা এড়িয়ে চলার এক ট্রমা জাতীয় মানসে সংক্রমিত, কলুষিত। দুই লক্ষ নাকি ছয় লক্ষ বলে কোনো সংখ্যা দিয়ে তার বীভৎসতা নিরূপণ অসম্ভব!

যদিও বাংলাদেশে প্রকাশ্য হয়েছে কেবল গ্রামদেশের যত গরীব দুঃখী, হতভাগিনীর ‘বীরাঙ্গনা’ পরিচয়। যুদ্ধকাল থেকে অদ্যাবধি যার ক্ষত বয়ে বেড়াতে হয়েছে তাদের। পাকবাহিনী, তাদের সহযোগী পাকবাঙালি আর সবশেষে পরিবার, সমাজের যত আপন-পর মানুষজন মিলিতভাবে যাদের বারাঙ্গনার অধিক করে ছেড়েছে। বঙ্গবন্ধু তাঁদের বীরাঙ্গনা নাম দিয়ে, সন্তানের পিতার নাম ‘শেখ মুজিব’ রেখেও, মানবিক গরিমা আরোপ করেও সমাজমনের ক্লীব কলুষতা কণামাত্র শোধন করতেও ব্যর্থই হয়েছেন- যেমন হয়েছেন তাঁর যত ‘সোনার বাংলার স্বপ্নসাধ’ পূরণের সরল পন্থার বাঙাল সহজিয়া নিদানসকল- ‘সে কি সহজ গান!’

এবারে আরও নাজুকতর প্রসঙ্গটি তোলা যাক! শহরদেশের মধ্যউচ্চ-শ্রেণির ভুক্তভোগী যত নারীকুল- যারা তাদের শ্রেণিসুবিধায়, কূটকৌশলে সবটা চিরকালের মতো সমাজমন থেকেও উধাও করে কবর দিতে পেরেছে- আর যারা আগবাড়িয়ে স্বধর্মীয় ক্ষমতাধরের কণ্ঠবাহুলগ্না হবার সুযোগসুবিধায় ধন্যা- ‘আফ্রিদি মেরি মি’-পরিবারের সহায়তায়, কী বাধ্যতায়। গাছেরও খাওয়া আর তলারও কুড়ানো চিরসুবিধাভোগীর সে শ্রেণিসম্ভোগ-মত্ততা।

সেই কবে, সবার আগে একজনই, নীলিমা ইব্রাহিম, সাধারণ নিরুপায় নারীসকলের দায়ভার গ্রহণ করেন- আমি বীরাঙ্গনা বলছি বইয়ের প্রাথমিক সেই বয়ানে। আমাদের সকলের সাহসে কুলায়নি তার সুলুকসন্ধান। যার জন্য সরকারকে তড়িঘড়ি গর্ভনিরোধ বিল আনতে হয়, বিদেশি সাহায্য সংস্থার কাছে সন্তান দত্তক দেওয়ার রাষ্ট্রীয় বিধান করতে হয়। গত ৫০ বছর অনিয়মিত হলেও জনাকয়েক নারী-পুরুষ কেবল স্বেচ্ছায় বহন করছেন সে দহনভার।

আমাদের থিয়েটারে কতক বাঁধাবুলির বীরাঙ্গনা-নাট্য, বিশেষত পথনাটকে দেখতে পাই। পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, যুদ্ধ এবং যুদ্ধ, লাল জমিন কিংবা রূপান্তরিত কোর্টমার্শাল নাট্যে বীরাঙ্গনাপুত্রের আর্তনাদ আমাদের অস্তিত্বমূলে কোথাও যেন লেগেছিল। কেরামতমঙ্গল নাটকে সম্ভবত গর্ভনাশের পরোক্ষতায় হলেও যথাগাম্ভীর্যে রূপায়িত হয় বিষয়টি।

সৈয়দ জামিল আহমেদ বাংলাদেশের থিয়েটারের যেন যৌবন-জলতরঙ্গ রঞ্জন- সৌখিন নাট্যবিলাসিতার প্রতিস্পর্ধী- ‘স্পর্ধা’ নামের নব সংগঠন-সংঘটনে বড়োই মানানসই। তিনিই হিসাব করে বের করেছেন: ঢাকা শহরের নাট্যদর্শক সবমিলে  কতজন আর অভিনেতৃগণ- একটানা কতদিন কাজ করার ব্যবস্থা করতে পারেন জীবিকার দায় মিটিয়ে। একেক নাট্যের জন্য তাই তিনি প্রস্তুতি-কর্মশালা করে নির্বাচন করেনÑকে কে তাঁর সঙ্গে কাজ করার তাকদ রাখেন। স্বল্পকালীন এক লম্বা দৌড়, ম্যারাথনে পড়ে গিয়েও বেদম চেতাবনিতে দুরূহ নাট্য-রূপায়ণে স্পর্ধিত, যোগ্য হয়ে উঠতে পারেন। নাট্যক্রিয়া এভাবে হয়ে ওঠে স্বেচ্ছাসামরিক ঘাতসহ সৃজনকলা এক।

একটানা দিনকয়েক মিলনায়তন ভাড়া করে নাটক করার এক মরিয়া আয়োজন করেন তিনি হিসাব কষে। একের পর এক তারই অনুগামী হয়ে উঠছে একেক দল। তার ফল নিশ্চয় ফলছে। এনএসডির বীজতলায় যে পয়মন্ত বেছন তিনি জোগাড় করেছেন, নিরন্তর বিশ^থিয়েটার যোগে পুনর্নব নাটক রূপায়ণ করে চলেছেন- আরুণি-রঞ্জনের আসত্তা ব্রতপালনে। বাংলাদেশের থিয়েটারের চেহারাসুরত কতটা তাঁর একলব্য বিচিত্রবীর্যে ক্রমসৃজ্যমান হয়ে উঠেছে তার সুলুকসন্ধান হতে পারে প্রকৃত এক পিএইচডি গবেষণাÑযেমন হতে পারে গবেষণা, সেলিম আল দীন প্রবর্তিত নাটলিপির অভিভাব বাংলা নাট্যধারায়। তো দেশজুড়ে বিচিত্র যত নাট্যরীতি সংঘটিত হচ্ছে- সেই ‘অচিনপাখি’র হদিস জামিল করেছেন হাতে কলমে, সেইসঙ্গে বৈশি^ক বিচিত্র রীতিকলা ও ইসলামের বয়ানে নাট্যসঙ্গীত, শিল্প-সংস্কৃতি অনুধ্যান-সবটা যেন তার পুঁজিরশদের মালমসলা। তাই তাকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয় নি- নাট্যনির্মাণে, বিনির্মাণে। তালপাতার সেপাই, ইন্সপেক্টর জেনারেল, সমাধান বা আহ্ কমরেড-এর নবীশী পেরিয়ে বিষাদসিন্ধু হয়ত তার প্রথম পরিণত রূপায়ণ। তারপর চলছে নানা দেশে ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে প্রয়োগ থেকে ‘স্পর্ধা’ পর্যন্ত তার অনেকান্ত, ক্রমসৃজ্যমান নাট্যরূপায়ণ, রূপান্তরণ। বাংলাদেশের থিয়েটারে একালের নন্দিত-নিন্দিত দুর্বাসা মুনি যেন জামিল আহমেদ। জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে বর্তমানে যে যাত্রা নিরন্তর তার অনেকগুলির কথা কেবল শুনেছি বিস্ময়মুগ্ধ নানা দর্শকের কাছ থেকে, পত্র-পত্রিকায়। অবশেষে সুযোগ হলো দেখার তার সর্বশেষ সৃজনকর্মÑআমি বীরাঙ্গনা বলছি।

জামিল আহমেদ যখন তার ‘স্পর্ধা’ নামীয় প্রতিস্পর্ধায় অবলম্বন করেন- আমি বীরাঙ্গনা বলছি তখন অন্তত নাট্যামোদী মানুষজন নড়েচড়ে বসে। জামিলের স্বভাবসুলভ প্রবল গতিপ্রাবল্য কোন সে নাট্য ইডিয়মে ধারণ করেছেন ইতিহাসের মর্মন্তুদ সে ট্রমা ‘নরকের দাহ দাও নরকের আত্মগ্লানি!’ স্বভাবত আমি বীরাঙ্গনা বলছি নিয়ে দর্শকের একেবারে ভিন্নধরনের এক টেনশন বা আততি ছিল। জামিল আহমেদের কাজ বলে তো আলাদা সমীহ বা সম্ভ্রম থাকেই, বীরাঙ্গনা-বয়ান বলে ‘না জানি কী হয়’ ধরনের উদ্গ্রীব হয়েই দেখা এ নাট্য। প্রথমেই এহেন টানটান উত্তেজনায় শুরু হয় নাট্য। তীব্র এক গতিময় শারীরবিন্যাসের কোরিওগ্রাফিতে, আলোর জাদুকরি বুনন, ধ্বনির আখ্যানানুগ রণন এবং মঞ্চসজ্জা-দ্রব্যাদির কৌশলী ব্যবহার জামিলের কাজের পরিচিত ধরন। এ নাট্যের ঘটনাক্রম তো জানা, গ্র্যান্ড ন্যারেটিভের প্রতিষ্ঠিত বয়ানে। বীরাঙ্গনার নারীমেধযজ্ঞ এমন এক করুণ অসহায়, মর্মন্তুদ বীভৎসতা- যা থেকে আত্মরক্ষার এক বাধ্যতামূলক কন্ডিশনে অসাড়, অসার হওয়া ছাড়া গতি নেই। সেই সত্তাচেরা  অবিশ^উদাসী বিলাপ-হতাশ^াসের প্রতি জামিল প্রয়োগ করেন একালের এক আরোপণ- তারই স্বভাবানুগ ক্রুদ্ধ, ক্ষিপ্ত আদিনারীর একালের প্রতিস্পর্ধায়Ñকথায়, বর্ণনায়, কথকতা গানে কবিতায় কোরাসে, দৃশ্য-ধ্বনির যুগলবন্দিতে যা পৌঁছয় উচ্চ- আক্রমণে ‘আমি বারাঙ্গনা’- খানখান ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত আর্তনাদে, প্রত্যাঘাতে। যাত্রারীতির যৌথ গায়ন-গতিচ্ছন্দ মুভমেন্টের মঞ্চপ্রয়োগে, সেই সঙ্গে বিচিত্র দৃশ্য রূপায়ণের সামঞ্জস্যে, স্বল্প মঞ্চদ্রব্যাদি আর কসটিউমের ব্যবহারে মহাকাব্যিক নাট্য ইডিয়মের ক্ষিপ্র জাদুবুননের আতীব্রতায় ক্রমসৃজ্যমান হতে থাকে মঞ্চপরিসরটি। দর্শককুল তাতে বাধ্যত দলিত মথিত হতে থাকে- ট্র্রাজিক ক্যাথারসিসের বুকচাপা মুখচাপা বেদম পরিণতিতে-আসত্তা নাস্তানাবুদ হয়ে।

অকস্মাৎ আখ্যানে আরেক নারী, মেহেরজান, তার ভিন্ন বয়ান হাজির করে- আবার কেন যে শুরু থেকে, বোঝা যায় না! যেহেতু পশুপ্রায় লাগাতার ধর্ষিতা কিশোরী কোন কোন বা কী কী কার্যকারণের অপ্রতিরোধ্য টানে বা চাপে,  মধ্যবয়স্ক এক ধর্ষকের সঙ্গে যেতে চায়. পাকিস্তানে, আগাম অনুমান করে এদেশে হবে তার মনুষ্যত্বের নিগৃহণ: বিশেষ এই ধর্ষক কি তার জ্ঞাতিভাই ধর্ষকদের চেয়ে ভিন্ন কোনো মানবপরিচয়ে ধর্ষিতা কিশোরীর নির্ভরতার অবলম্বন হতে পারে- যার হাত ধরে পাকিস্তানে যাওয়াটাও তার পক্ষে বাঁচোয়া লাগে! জাতীয়তাবাদের বাইরেও এই ভিন্ন নারীমনস্তত্ত্বের কোনো দিশা বা তার মনের জটপাকানো ট্রমার কোনো হদিস মেলে না নাট্যে। দর্শক কিশোরীর হয়ে কোনো সমানুভূতির অবলম্বন তাই পায় না। একই নাট্য আখ্যানে, বহুতর সত্যের আরেক মুখ হাজির করার জন্য, দর্শকের জন্য কোনো ইশারাইঙ্গিতের যোগান মেলে না। ইতোমধ্যে সমাপ্ত সত্তার হেন আগাপাশতলা উৎপাটন-শেষে, দর্শকের পর্যুদস্ত মনে অধিক জটিল, জান্তব আখ্যান অবহ ঠেকে, যেখানে এই ভিন্নতর বাস্তবের তেমন কোনো যুক্তিবুদ্ধি, আবেগাবেগের ভাষ্য মেলে না। তার পর তো পাকিস্তানি পুরুষপুঙ্গবের বাস্তবাচরণ যেমন হবার তেমনি হয়। বাঙালিঘৃণার যথা প্রবণতায় সন্তানটি বাপের গ্রামীণ পরিবারে ন্যস্ত হয়- মেয়েটিও সহজেই মেনে নেয়- সে তো পিতৃসূত্রে তার বংশের উৎসেই ফিরবে! মাতৃপরিচয় বা আরেক উৎস বিষয়ে মেয়েটি না হয় লা-জবাব, তবে একালের রূপকার নির্মাতাও কোনো প্রশ্ন তুলবে না! তবুও ছেলের নাম তাজউদ্দীন রাখাটায় একটা পূরণ হয়- ইতিহাসের দায়পালন যেন হলো। আরেকটি ঘটনাও ঘটে। লেখিকা নীলিমা ইব্রাহীম এই কিশোরীকে নিষেধ করেছিল পাকিস্তানে যেতে, পরে দেশে বেড়াতে এসে মেহেরজানের আপনজনদের সঙ্গে পরিচয়ের অভিজ্ঞতা শুনে বলেন তিনি- ভালোই করেছিল সে পাকিস্তানে গিয়েই!

এতেই সম্পন্ন হলো বীরাঙ্গনাদের অমানব নারীপরিণতির এক সমগ্রতা।

আতীব্র দুই বিপরীত বীরাঙ্গনা-আখ্যান একটি নাট্যে যদিও যথাবিন্যস্ত হয় না- প্রথমটির মরণান্তিক বয়ান সম্পূর্ণতায় পৌঁছানোর পরে কঠিনতরটি শুরু হয়- দর্শকের ধ্বস্ত মনে, পরিস্থিতির যুক্তি-মনস্তত্ত্বের তেমন কোনো সহায়তা ছাড়া। বোঝার ওপর শাকের আঁটিও চাপানো যায় না যেখানে, সেখানে অধিক ভারী বোঝা চাপানো তো চলে না।

এভাবে এই তুরন্ত প্রযোজনা তার ভারসাম্যের সামঞ্জস্য হারায়- আমরা মন খারাপ করি ভেতরে ভেতরে। সহজে এর বাইরে বেরুতে পারি না- যেহেতু প্রথম বয়ানটি আমাদের আছর করে রাখে তার নারকীয় বীভৎসতায়।

একারণেই হয়ত উঠে আসে নাট্যজনের, এমনকি জামিলের সঙ্গেও দর্শকের যথা পরিচয়-হীনতার বাস্তব একপাক্ষিক ডায়লগের ট্র্যাজেডি- যখন বুঝে দেখি না কতটুকু আর কতটা নিতে পারে না-পারে দর্শককুল। আমরা কি তবে তার ভাষা জানি না!? সামূহিক এই বিশ^বাস্তবতায় কেউ কারো মন জানি না, ভাষা বুঝি না- নাট্যজন-দর্শকও তেমন দূরদ্বীপবাসিনী!?

রিমান্ড
রচনা ও নির্দেশনা: শুভাশিস সিনহা
প্রযোজনা: হৃৎমঞ্চ
প্রথম মঞ্চায়ন: ২০২৩

মঞ্চে চলছে আরেক নাটক, নাম- রিমান্ড। শব্দটি শুনলেই আমাদের ¯œায়ুশিরা টানটান খাড়া হয়ে ওঠে। এ তো বর্তমান বিশ^জোড়া ক্ষমতাকাঠামোর এক দোর্দ-প্রতাপ অনিবার্য মুদ্রা- শারীরিক-মানসিক অত্যাচার করে অভিযোগের স্বীকৃতি আদায়। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মোক্ষম এই অস্ত্রটি।

নাটকের শুরুতেই দেখা যায়, ছোটো এক চেয়ারে বসা সত্তরের কাছাকাছি বয়সের এক কয়েদি। আর তাকে ঘিরে পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি তদন্তকারী কর্মকর্তা- নারীর ক্ষমতায়ণের সাক্ষাৎ উন্নয়ন বটে।

শুরুতেই তাঁর হুমকি- ‘আপনি তাহলে কোনোভাবেই স্বীকার করবেন না যে, আপনি ওইসব কেইসের মাস্টারমাইন্ড’। এও তো চলতি এক অভিযোগ- মাস্টারমাইন্ড- যদিও শুনি তারা সব নাকি ধরাছোঁয়ার বাইরেই থাকেন চিরকাল, তবে এমন শিরোপাই তো দেওয়া হয় যেকোনো অভিযুক্তজনে। এই নাটকে যেমন বলা হয়, কয়েদি নানাজনকে আত্মহত্যার প্ররোচক। তাতে কয়েদির স্পষ্ট জবাব- ‘প্রত্যেক মানুষের মনে থাকে ডেথ ইনস্টিংক্ট- জীবনে অসংখ্যবার সে আত্মহত্যা করতে চায়। প্রতীকী অর্থে বহুবার তা করেও। সব মৃত্যুই তাই ছদ্মবেশী আত্মহত্যা’।

অফিসার এসব ফ্রয়েডিয়ান কথাবার্তা ছাড়তে বলে কয়েদিকে।

তাহলে কি সত্তাসংক্রান্ত জটিল কোনো নাটক শুরু হলো? অফিসার বলে বসে- ‘এসব বেশিক্ষণ টলারেট করা হবে না, রাষ্ট্রের হাতে অনেক কাজ আছে। আপনার তো আবার দেশ নাই, রাষ্ট্র নাই’।
 
কয়েদির জবাব- ‘আমি শুধু বোঝাতে চেয়েছি, আলো বলে যা প্রকাশিত তার ভেতরটা পুরোটা অন্ধকার’।

অফিসারের সরাসরি প্রশ্ন- ‘টেল মি জাস্ট দ্য স্টোরি অফ রতন’। কয়েদির উত্তর, ‘আমি তাকে চিনতাম না, সে আমাকে চিনত- আমার একটা লেখা পড়ে, আমি তাকে শুধু বলেছিলাম- বেঁচে থাকা পশু বা জীবজন্তুর দর্শন’।
অফিসার    আর মানুষের দর্শন মরে যাওয়া!
কয়েদি      মানুষের জন্য মৃত্যুই অমৃত। যতদিন সে না মরে, সে স্বাধীন হতে পারে না। ল, পাবলিক অপিনিয়ন, কনসায়েন্স বাধা দিয়ে রেখেছে বলে সে অবদমন করে থাকে মৃত্যুর ইচ্ছাকে।

এই কি তবে চিরকালের মৃত্যুভাবনার মুখোমুখি মানব-অস্তিত্বের সংকটনাট্য?

অফিসার    ছেলেটা সাইকিক ডিস অর্ডারে ভুগছিল। আপনি তাকে সারভাইব করার চেষ্টা করেন নি। উল্টো নিহিলিস্ট করে তুলেছিলেন।
কয়েদি    এটা নিহিলিজম নয়, পজিটিজম।
 
এ তো বিংশশতকের পরিচিত দার্শনিক প্রপঞ্চ-বির্তক- নিহিলিজম-পজিটিজম।

কয়েদি    মানুষ যখন কোনো না কোনো চিন্তায় বন্দি হয়ে পড়ে, আমি তখন তাকে মুক্তি দেবার চেষ্টা করি।... আমার কাজ কাউন্টার ডিসকোর্স তৈরি করা।
 
এটা তো দেখি একুশশতকীয় টার্মেনলজি- ডিসকোর্স।
 
কয়েদি      দুনিয়ায় প্রতিবছর দশ লাখ লোক আত্মহত্যা করে। মানুষের নানান ধরনের মৃত্যুর ক্রমোলজিতে আত্মহত্যার অবস্থান থার্টিন। না খেয়ে মারা গেলে মৃত্যুকে অপমান করা হয়। মৃত্যুকে মহান করাই মানুষের ধর্ম।
অফিসার    রেশমা একজন উঠতি ফেমিনিস্ট ছিল। সোশ্যাল মুভমেন্ট করত।
কয়েদি      সে বাহাস করতেই এসেছিল। আমার একটা লেখায় নারীবাদের কিছু জেনুইন গলদ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলাম। রেশমা সেগুলোর মোকাবেলা করতে এসেছিল।...আমি তাকে মানুষের ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রি বুঝিয়েছি।
অফিসার    সে কেন আত্মহত্যা করল?
কয়েদি      মানুষ কেন আত্মহত্যা করে তা এখনও কেউ বলতে পারে না। রেশমার নিজের শরীরের প্রতি একটা ঘৃণা জন্মে গিয়েছিল। শরীরের একটা নতুন ইন্টারপ্রিটেশন তার মনে চলে এসেছিল।
অফিসার    কিন্তু, একটা অ্যাক্টিভিস্ট পজিটিভিস্ট কেন হঠাৎ সুইসাইড করতে যাবে, আপনার সাথে কন্ট্রাক্টে আসার কিছু দিনের মাথায়?...আপনি তাকে সেক্সুয়ালি অ্যাসোল্ট করেছেন।...আপনি তাকে ড্রাগস দিয়েছিলেন- আমরা তার ঘরে ড্রাগস পেয়েছি।
কয়েদি      এটা আপনাদের বানানো কাহিনি। আর পুলিশ কাস্টডিতে এটা খুব চেনা গল্পই। আমি একটা নতুন জ্ঞানের চারা রোপণ করতে চেয়েছি।
অফিসার    নৈরাজ্যের জ্ঞান। নলেজ অফ ইনটেলেকচুয়াল ভায়োলেন্স।...আপনি তো আইনকেও অচল মনে করেন, আইনই অপরাধের জন্ম দেয়। আপনি একজন রাষ্ট্রদ্রোহী।
কয়েদি      প্রত্যেক মানুষই রাষ্ট্রদ্রোহী। আমরা সত্য থেকে দূরে সরে এসেছি।...মানুষের পরম সত্য হলো একটা ঐক্য। অ্যান ইউনিভার্সেল ইউনিটি।...পরিবার সমাজ রাষ্ট্রে এইসব প্রতিষ্ঠান তাদের সেই ঐক্যের আকাক্সক্ষাকে গলা টিপে মারে।
অফিসার    তারিক-রেবেকা জুটি একসঙ্গে হাওয়া হয়ে যায়। তারেকের বাবা মুক্তিযোদ্ধা ছিল- সে তাকে নিয়ে ছোটোখাটো বই লিখেছিল। আপনি তাকে টার্গেট করেছিলেন।
কয়েদি     ব্রিলিয়ান্ট ছিল ছেলেটা। বাট মিসগাইডেড। মানুষ যখন দেশ বা অন্যকিছুর জন্য নিজের জান বাজি রাখে, তখন সে অপরাধ করে।...গণমানুষ একটা ইউটোপিয়া। ওটা ধারণায় থাকে মাত্র। কার্যত কোথাও থাকে না।...মানুষের চারপাশের বাস্তবতা যখন অর্থহীন হয়ে পড়ে, তার প্রতিবাদে মৃত্যুই তখন অর্থবহ হয়।

এ তো দেখি, পরিচিত অস্তিত্ববাদী বয়ান-কিয়েকেগার্ড-সার্ত্র-হাইডেগারীয়!

অফিসার    বলুন, তারিক আর রেবেকার কথা।
কয়েদি    তাদের মধ্যে একধরনের ফ্যানাটিক প্রেম ছিল আমি তা ভেঙ্গে দেবার চেষ্টা করেছি।...প্রেম একটা ভুল ধারণা। মানুষ যখন প্রেমে পড়ে, তখন নিজেকে ভুলতে শুরু করে, এটা অ্যান্টিনেচার। আমার এই আমিটা ন্যাচারের একটা পার্ট, প্রকৃতির যত লেনদেন। অন্যের প্রতি প্রেম এটাকে শিথিল করে দেয়। আর সেটা পাপ।...আমি একদিন তারিককে বোঝালাম, রেবেকা ওর এন্টি-ইগো, তারিক আসলে একটা অল্টার-ইগো নিয়েই থাকে। যেটা সে নয়। তারিককে তার নিজের সত্তার কাছে ফিরতে হবে।
অফিসার    রেবেকাকে মেরে ফেলতে হবে?
কয়েদি      মন থেকে মেরে ফেলতে হবে।
অফিসার    মানুষ কি তাহলে ভালোবাসবে না?
কয়েদি      মানুষ কেবল তার নিজের দেহকে পূর্ণ করতে অন্য দেহকে গ্রহণ করবে। মানুষ কেবল নিজেকে ভালোবাসবে এবং প্রকৃতিকে। আমি জানতাম রেবেকার ওপর থেকে ওর প্রেমটাকে শেষ করে দিতে পারলে প্রেম-বিষয়ক ধারণায় একটা আমূল পরিবর্তন আসবে।...আদর্শ বলে যা কিছু মনে গেঁথে আছেÑসব একদম মুছে ফেলা যাবে।...মুক্তিযোদ্ধা বাবাকে নিয়ে যে গর্বটুকু ছিল, তাও ওর কাছে একটা অস্বস্তিতে পরিণত হয়েছিল।

কিছুক্ষণ পর আবার আমরা শুনি-
কয়েদি    ভালোবাসা, প্রেম সব তার শরীর-মনের রসায়ণ।
অফিসার    শরীর, শরীর শুধু? মন, হৃদয়?
কয়েদি    অল দে আর দ্য পার্টস অফ দ্য অর্গান।  

ঊনবিংশ-বিংশ শতকের পরিচিত নিহিলিস্ট ভাবনা শুনতে পাই যেন কয়েদির ভাষ্যে। এরপর ভিন্ন প্রসঙ্গ তোলে অফিসার, মুক্তিযোদ্ধা পিতার সন্তান অ্যাক্টিভিস্ট তারেক আর তার প্রেমিকা রেবেকার হাওয়া হয়ে যাওয়ায় অভিযুক্ত হন কয়েদি। যে তারেক বইও লেখে পিতাকে নিয়ে- তাকে টার্গেট করে কয়েদি।
 
মুক্তিযোদ্ধা পিতার অ্যাক্টিভিস্ট সন্তানকে টার্গেট করায় আমরা সজাগ হই। বর্তমানে ক্রমবর্ধমান একটা প্রাসঙ্গিক বিষয় যেন এল মনে হয়।
 
কয়েদির তারিককে মিসগাইডেড বলা, দেশ বা অন্য কোনো কিছু নিয়ে জানবাজি রাখা অপরাধ, ‘গণমানুষ’ একটা ইউটোপিয়া, একটা ধারণা মাত্র।- বড়ই নাজুক, বিপজ্জনক উত্তরাধুনিক এসব বুলি কপচানো!
 
তারপরই আবার ভিন্ন কথা বলে কয়েদি-মানুষের চারপাশের বাস্তবতা যখন অর্থহীন হয়, তার প্রতিবাদে মৃত্যুই অর্থবহ।
 
একেবারে ভিন্ন, বিপরীত কথাই কি হলো না- কোনোকিছু নিয়ে জানবাজি রাখা অপরাধ বলার পরে? এসব বৈপরীত্য স্পষ্ট ব্যাখ্যা করার বদলে আরেক ভিন্ন প্রসঙ্গে চলে যায় কয়েদি। সবই কি তবে তার কথার কথা, কথা দিয়ে বাজিমাত করা? নারী-পুরুষের প্রেমের সম্পর্কই ভুল ধারণা বলা হয়। কারণ হলো- প্রেমে পড়লে মানুষ নিজেকে ভুলে যায়, এটা অ্যান্টিনেচার। যে-আমি নেচারের অংশ প্রেম সেটা ভুলিয়ে দেয়। মানুষ কেবল তার নিজের দেহকে পূর্ণ করতে অন্য দেহকে গ্রহণ করবে।- এ কি তবে কেবল শরীরভোগের বিশ্বজোড়া এক ধর্ষমর্ষকাম-দর্শনই হলো না? মানুষ নাকি নিজেকে আর প্রকৃতিকে কেবল ভালোবাসবে বলে এক ছদ্ম-দার্শনিকতা যদিও আরোপ করা হয় এতে।

তারিকের প্রেম-বিষয়ক ভুল ধারণা ঘোচাতে পারলে যা কিছু তার মনে গেঁথে গেছে তা মুছে ফেলা যাবে। ভয়াবহ বিপজ্জনক ডিসকোর্স- মুক্তিযোদ্ধা বাবাকে নিয়ে তারিকের গর্বটুকু তার মনে একটা অস্বস্তি তৈরি করে।

বড়োই রাজনৈতিক নানা উদভ্রান্ত পরিকল্পনা দেখি কয়েদির। কে সে, তাকে কি চেনা-চেনা লাগে না? যেমন শুনি, দেখি নানা জ্ঞানতাত্ত্বিক আবরণে হরেক কৌশলজারি দেশজুড়ে? হাজার রূপে হাজার মুখোশের যত অন্তর্ঘাত!

তাই বুঝি, যত সব দেশ আবেগ অনুভূতি, প্রেম, দেশপ্রেম শেষ করলে বুঝি আসল মুক্তি আসবে- পাল্টা বাহাস করে অফিসার। তখন আরও দার্শনিক ধূর্ততায় কয়েদি বয়ান করে- ‘মানুষের প্রাণ, আত্মার কোনো চিরকালের দেশ আছে কি? খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’।
অফিসার    তারিক কোথায়?
কয়েদি      দেশান্তরি হতে চেয়েছিল, সে নিজেকে সব স্পেস থেকে মুক্ত থাকার উপায় খুঁজছিল।

একটা কোনো বিশ্বখেলাফতের পতাকাতলে কি?
 
অফিসার    রেবেকা কি বেঁচে আছে?
কয়েদি      পৃথিবীতে ১২ কোটি মেয়ে এখনও নিখোঁজ, রেবেকা হয়ত তাদেরই একজন।

এই নিখোঁজ মেয়েদের পরিসংখ্যান কয়েদি কী সূত্রে দিচ্ছে? নারীর নিরুদ্দেশের দুটি বড়ো সুত্র আছে- বিশ^বাজারে পাচার হওয়া আর খেলাফত-অভিমুখী নারী। এহেন বিশ^বাস্তবতায় কয়েদির এই পরিসংখ্যান কোনো সূত্রের হিসাবে যায় না- সবটাই কি তাহলে এক লাগসই ফেসবুকি অন্তর্ঘাত? কথাজীবীর হরেক তথ্যাবিষ্কার, ভয়াবহ সন্ত্রাসÑতারও কোনো ইঙ্গিত ইশারা নেই। এহেন দায়হীন কথা, কথা আর কথার অন্তহীন মার-প্যাঁচ যদিও এক বিশ^বাস্তবতা!
 
রেবেকাকে শেষবারে কয়েদি কঠিন এক সত্যভাষণ করে- তুমি যে তারিকেকে খুঁজছো সে মারা গেছে, যে তারিক তোমাকে খুঁজছে, তার রেজারেকশন ঘটেছে।- বড়ই উত্তরাধুনিক ডিসকোর্স।
 
অফিসার     এসবকিছুর জন্য দায়ী করে কয়েদিকে- আপনিই দায়ী, তারিককে সরিয়ে রেবেকাকে ভোগ করেছেন। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান অ্যাক্টিভিস্ট তারিককে নৈরাজ্যবাদী করেছেন। রেবেকাকে অ্যালকোহলিক করেছেন।
কয়েদি    নার্ভ ঠিক করার জন্য সে একটি ওষুধ খেতো।

তখন অফিসার রেবেকার একটি ডায়েরির পাতা থেকে পড়ে শোনায়- আমি মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছি, ফিরতে পারছি না- এক ভয়ংকর জাদুকর ফেরার সব পথ বন্ধ করে দিয়েছে। কয়েদি তখন তার কল্পআদর্শের বৈপ্লবিক মেনিফেস্টো বয়ান করে। বলে, রাষ্ট্র বলে কিছু থাকবে না, সব রাষ্ট্রের স্বভাব যখন মিলে যাবে তখন এমনিই সবই এক হয়ে যাবে, তখন কেবল মানুষ থাকবে, শূন্য থেকে সব শুরু হবে। পুরনো সব রীতিনীতি, বিপ্লবের ভুয়া চিন্তা মাথায় নিয়ে যারা বেঁচে আছে, তারা যত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায় তত মঙ্গল। মানুষের প্রাণ রিভাইভ করবে কোনো না কোনোভাবে।

একি তাহলে কোনো ছদ্ম-দার্শনিক প্রাণ-প্রকৃতিময় নতুন ইউটোপিয়া আরেক- ফেসবুক-ইউটিউব বাহিত হরেক ডিসকোর্সের জনপ্রিয় কল্পবিশ^?

জুরি এসে জানায়- জনাকয়েক মিস্টিক টেরোরিস্টের নাম পত্রিকায় আসে, তাদের একজন মিরন মঈনুদ্দিন- যার টেলিফোন ইনডেক্সে কয়েদির নাম আছে।- বিশ^জোড়া টেররিজমের এক নেটওয়ার্ক তাহলে?

কয়েদি    আমার ভাবনা-চিন্তার কাউন্টার পার্টি আছে, মঈনুদ্দিন থেকে তা আলাদা। তরুণরা ইনস্পায়ার্ড হয়।
অফিসার    সেটা টেরোরিস্টিক অ্যাকটিভিটিজ। এরকম কুল ভায়োলেন্সের কত বীজ তাহলে রোপণ করা হয়েছে?
 
প্যান্ডোরার বাকস কি খুলবে এবার? তবে কয়েদির মতে সে নৈরাজ্যবাদী নয়, হৃদয়ের রাজ্য স্থাপন করতে চায়- মানুষ যেন তার আত্মার না-শোনা কথাগুলো শুনতে পায়। তারা এখন হৈ-হল্লা শোনে। নৈঃশব্দ নয়। গার্বেজ অব ওয়ার্ডস। ভায়োলেন্স অব ওয়ার্ডস। পৈশাচিক আওয়াজে মানুষ শান্ত, বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। ক্লাউড সাইলেন্স, দুঃসহ নীরবতা তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।

এটা তো হতে পারত নাটকের মৌল এক ভর- বর্তমান বিশ^বাস্তবতায় এসব কথার সাথে কয়েদির কাজের মিল পায় না অফিসার। যার কোনো বায়োগ্রাফি পাওয়া যায় না, ইন্টারভিউতে কিছু বলে না।
 
অফিসার    আপনি কি বাবা-মাকেও অস্বীকার করেন?
কয়েদি    আই অ্যাম আ বাইপ্রোডাক্ট অফ দেয়ার প্লেজার। পুরো একজিসটেন্স একটা বাই-প্রডাক্ট।

খুবই পরিচিত সিনিক স্মার্ট বয়ান তার। এরপর কয়েদিকে পড়ানো হয় দন্ডবিধির ১০৭ ধারার কথা, মৌখিক ও লিখিত দুরকম প্ররোচণায় মুহূর্তে মানুষ পাগলা কুকুর হয়ে যায়। একে অপরকে মেরে ফেলে। মন্দির-মসজিদ ভাঙ্গে।-একেবারে হাল আমলের লাগাতার দেশ-বিশ^পরিস্থিতি, বাস্তবতা।

কয়েদি অস্বীকার করে হেন কাজ। আত্মহত্যার প্ররোচণা দেয়া ফৌজদারি অপরাধ। তবে এভিডেন্স ছাড়া এমন অভিযোগ করা যায় না। পাল্টা অভিযোগ কয়েদির
কয়েদি    আপনারা একেকটি স্লেইভ, মানুষের বানানো আইন ও নিয়মনীতির গোলামি করছেন, সেই ক্ষমতায় মানুষকে অবমাননা করছেন।

এরপরই যেন মোক্ষম তূণটি ছোড়া হয়-
কয়েদি    আত্মহত্যা নিয়ে লেগেছেন- অথচ বছর বছর লাখ লাখ মানুষ নিজের অজান্তে হাওয়া হয়, তাদের খোঁজ পেয়েছেন? লাখ লাখ মানুষকে নানান ছুঁতোয় মেরে ফেলা হচ্ছে, সেসব গণহত্যা নিয়ে কে, কী করতে পেরেছে, হিসাব দেন। ১৮২১-১৯২১ এই ১০০ বছরে তুরস্কে অটোম্যান শাসনে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয়। ১৯৩৯-৪৫ সালে হিটলার ১১ মিলিয়ন ইহুদি হত্যা করে। হিরোসিমায় পারমাণবিক বোমায় নিহত ৭০ হাজার। চিনে মতাদর্শ-আধিপত্যে ৫ কোটি মানুষ মারা যায়। সার্বিয়া বাহিনী বসনিয়ায় কত লক্ষ মুসলমান মারে, রুয়ান্ডায়-ইরাকে-আফগানিস্থানে? দেশভাগের দাঙ্গায় ১০ লক্ষ, আর একাত্তরে?

বাদ যায় কেবল সোভিয়েটে স্ট্যালিন-কীর্তি।
 
স্বভাবত অফিসার বলে- হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট টু প্রুফ ব্রিফিং দিস ইনদিস কেইস? কয়েদির সোজাসাপ্টা উত্তর-দেয়ার ইজ নাথিং ইউ ক্যান ডু।
অফিসার    সো ইউ ক্যান ডু ওনলি সুইসাইড?
কয়েদি    হাজার হাজার বছর ধরে এসব গণহত্যা ঘটে চলেছে। আইন হয়, আইন বদলায়, কিছু কিছু বিচার হয়। কিন্তু যে মানুষ হত্যা করে, গণহত্যার নির্দেশ দেয় সে মানুষগুলোও তো ফিরে ফিরে জন্মায়। তাহলে বুঝতে হবে এটাই নিয়ম। মানুষ আসলে এটাই, এসব মানুষের ইগো থেকেই রিভাইভ করে। সো বেটার ইউ ক্যান বি দ্য অল্টার অলমাইটি ইওরসেলফ হু কন্ট্রোল দ্য ডেথ ওনসেল্ফ। রক্তের মসনদে বসা রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রপুঞ্জ আপনার মরা-বাঁচার রাখালদারি করার অধিকার রাখে না।

এহেন বিস্ফোরক ভাষ্যের পর প্রসঙ্গ ঘুরে যায়। অতি-নাটকীয়ভাবে বলে বসেন কয়েদি- আমার মা একজন পতিতা ছিলেন। এখনকার টার্মিলজিতে-কর্পোরেট প্রস্টিটিউট।
কর্পোরেট কেন, এ তো কয়েদির মায়ের কথা কেবল বলা, তিনি কি তাহলে কর্পোরেট প্রস্টিটিউট ছিলেন? ভিন্ন কোনো ইঙ্গিত দেন কি নাটককার?

জুনিয়র অফিসার ফাইল নিয়ে ঢোকে। জুন ১৯৮৩, ১২ জুন, একই জায়গায় এ দুটো মার্ডারের ঘটনা ঘটে। লেখার সিম্বলাইজেশন আর সময় মেলালে বোঝা যায়, ঐ ঘটনার সাথে এই লোকটার একটা কানেকশান আছে।
অফিসার    ইউ কিলড ইওর ঔন পেরেন্টস!

জুনিয়র মাঝবয়েসি একজনকে নিয়ে ঢোকে।
অফিসার    জামিল মাহমুদ। অনলাইন পত্রিকা আন্ডারটোনের সম্পাদক। রতন যেদিন মারা যায়, তার আগের দিন এই পত্রিকায় আত্মহত্যা নিয়ে কয়েদি একটা প্রবন্ধ লেখেন। লেখাটা ওইদিনই ছাপানোর জন্য প্রেসার দেন। সম্পাদক তাকে আর একটা ইস্যুতে লিখতে বলেন। কিন্তু কয়েদি নারাজ। ওইদিনই আত্মহত্যা নিয়ে লেখাটা ছাপতে বলেন। রতন তার পরের দিনই মারা যাবে। যাতে একটা কো-ইনসিডেন্স তৈরি হবে। লেখা ভাইরাল হলে পত্রিকারই লাভ।
 
পরের দিন রতনের আত্মহত্যার খবর এল।
অফিসার    এবার রেশমার কেইসটা ক্লোজ করার পালা। তাহলে কি নারীর শরীর স্বাধীন নয়- সবকিছু ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। কে রেশমার সবকিছু ওলটপালট করে দিয়েছিল? কথাগুলো লেখার তিনদিন পরই রেশমা আত্মহত্যা করে। ওই তিনদিনে সে প্রচুর ড্রাগস নেয়। ‘ঘুমে ঘুমে জীবনের সঞ্জীবনী সুধা’- আপনার বই থেকে সেই বাক্য খুঁজে পেয়েছি।

মহিলা সাক্ষী আনা হয়, যার কাছ থেকে হেরোইন নিয়েছিল কয়েদি।
কয়েদি    এইসব মিথ্যা সাক্ষী দিয়ে আমাকে ফাঁসাতে চাইছেন, এটা করতে পারেন না- পিপল উইল প্রটেস্ট।
অফিসার    আজ এক দারুণ সত্য উন্মোচনের দিন। মনে করুন- সেই নারীর কথা, ‘আপন শয্যায় ধারণ করেছিল প্রেমময় মিলনের ভ্রুণ। গভীর মমতায় তিলে তিলে গড়ে তুলেছিল তাকে গর্ভের ভেতর’।- আপনারই কোনো নাটকের সংলাপ, ‘এরপর পিতৃপরিচয়হীন সে সন্তান বয়ে নেবে নিজ অস্তিত্বের ভার।...উপজাত সেই মেয়ে বড়ো হতে থাকে। মায়ের অশ্রুতে মানুষের প্রশ্নবাণে ক্ষত হতে হতে, সে তখন জানত না, তার পিতা নাই, সে তো মাত্র উপজাত এক- কারো পরিকল্পনায়’।- কেন পড়ছি আপনার নাটকের সংলাপ, আপনি পড়লে অথেনটিক হতো- আত্মজীবনী তো লেখকের কণ্ঠেই পরিপূর্ণ আবেদন তৈরি করে। নানান চরিত্রের মধ্য দিয়ে নিজের নানান কীর্তি তুলে ধরা আপনার একটা বাতিক।...আপনার চরম খামখেয়ালির শিকার যে মা আর মেয়ে তাদের কষ্ট, তাদের যন্ত্রণাও কী দরদ দিয়ে লিখেছেন আপনি। সন্তানের জন্য বাবা-মার পরিচয় একটা ফালতু ফিলোসফি, তাই আপনি ওই মা আর মেয়েকে ফেলে চলে গিয়েছিলেন। নিজের এনার্কিস্ট ফিলোসফিকে আরও কত জায়গায় যে অ্যাপ্লাই করেছেন! আপনি সেই লোক। একটা দেশের জন্ম, একটা শিশুর জন্ম- দুটোই আপনার কাছে মানুষের খেয়ালের উপজাত মাত্র।
কয়েদি    একটা মানবশিশু যেমন দুই নরনারীর যৌন খেয়ালের উপজাত, একটা দেশ বা রাষ্ট্রও তেমনি কিছু মানুষের উদ্ভট ভাবনার ফল, যে ভাবনায় থাকে কেবলই স্বার্থ- ক্ষমতার, ভোগের, অন্যকে বোকা বানানোর আনন্দ।
অফিসার    আপনার সেই স্ত্রী-সন্তান কেমন আছে, আপনি আর জানতেও চান নি। নামমাত্র করা সেই গোপন বিয়ের পরদিনই চলে যান অজ্ঞাতবাসে। পালটে ফেলেন নিজের অনেক কিছু। এমনকি নাম, বেশভূষা, সবকিছু।
কয়েদি    আমি নিজের জীবন দিয়ে, নিজের জীবনের লক্ষ্য, ঘৃণা, অস্বস্তি সবকিছু দিয়ে এই সত্য বুঝেছি- এইসব দেশ রাষ্ট্র জাতীয়তাবাদ, সবকিছু মানুষের আত্মপরিচয়ের একটা ভুল জায়গা থেকে জন্ম নিয়েছে। আমি সেই ভুলটাকে ভাঙবার চেষ্টা করেছি- মানুষকে তার নিজের তৈরি করা বন্দিত্ব থেকে মুক্ত করতে চেষ্টা করেছি। নিজের পতিতা মা, আপন স্ত্রী-সন্তান ত্যাগ, পরিচয় বদলে ফেলে- এহেন কনফেশন। এটা গোটা মানবজাতির জন্য একটা মহান তত্ত্বের আবিষ্কার হতে পারত।
 
বড়োই বৈপ্লবিক বিপজ্জনক ডিসকোর্স।

জুনিয়র জানায়- মিডিয়ায় প্রচুর লেখালেখি হচ্ছে। দেশ-বিদেশের একটা অংশ ওনাকে শেল্টার দেবার চেষ্টা করছে।
 
আবার এল বিশ^-বাস্তবতা- শেল্টার দেবার রাজনীতি। এখানে তাদের যুক্তিটা বা মিডিয়ায় নানা মত এলে হতো- তাহলে এহেন তথ্য-জ্ঞানকা-ের একটা হদিস মিলত। বিষয়টি বর্তমানে যুক্ত হতো, যথেচ্ছ চতুর চৌকস বুলি না হয়ে সংকটরাজি একটা সমগ্রতা পেত বর্তমানকার আবিশ^ মানবাস্তিত্বের।
অফিসার    হোয়াট আর দে সেয়িং?
জুনিয়র    ইনজাস্টিস।

খুবই চালু বয়ান।
 
জুনিয়র    প্রবলেম হলো, চার্জশিট করার মতো এখনও স্ট্রং এভিডেন্স আমাদের হাতে নেই।
অফিসার    এভিডেন্স আছে। পাপের বিচার বলে তো একটা কথা আছে। আত্মশ্লাঘা বলে তো কিছু আছে?

এরপর দক্ষ এক স্কেচ আর্টিস্টকে আনা হয়। অফিসার পঁচিশ বছর আগের ঘটনা বলে।Ñমেয়ে বাবাকে দেখেনি, তার কাছে বাবার কোনো ছবি ছিল না। মায়ের কাছে ডিটেইলস শুনে আর্টিস্ট মেয়েটার বাবার ছবি এঁকে দেয়।
অফিসার    দেখেন তো চাচা এই লোকটাই ছবির সেই লোক কিনা?
আর্টিস্ট    এর ছবিই তো আমি আঁকছিলাম।
জুনিয়র    ছবিটা এতদিন কার কাছে ছিল স্যার?
আর্টিস্ট    তারই সন্তান, না না, তার উপজাত সেই মেয়েটার কাছে।

তারপর তিনি বয়ান করেন অতি-নাটকীয় ঘটনাÑমেয়ের মাফলার পেঁচিয়ে মৃত মায়ের মুখ ঝোলানো বটগাছেÑসেই মেয়েটিই এই অফিসার। মেয়েটি ছবিটি দেখায় জুনিয়রকে।
কয়েদি    আমার যে একটা মেয়ে হয়েছিল, আমি জানতাম, এক-আধটুক খবরও রাখতাম...কেন? তার উত্তর আমি জানি না। আমরা কি সত্যের কারাগারে বন্দি অফিসার? এ এক অদ্ভুত কারাগার। এ থেকে আমাদের মুক্তি নেই।

তাহলে সেই মুক্তি পাওয়ার টালবাহানা থেকেই কি এই কথামালার দেরিদিয়-ফুকো প্রণোদিত বয়ান-বাহাস জারি? সেটাই হয়ত নাটকের ভরÑথ্রিলারসুলভ অতিনাটকীয় পিতা-পুত্রীর আখ্যান। সেটাই বরং ফিকে করে দেয় বিষয়টির লাগসই নাট্য-অভিমুখ।

এভাবে কেবলি তাই হারিয়ে যায় উত্থাপিত ডিসকোর্সের বাস্তবতাÑযেটা হয়ে উঠতে পারত বিশ^জোড়া ঊনপঞ্চাশ বায়ুচড়া অষ্টাবক্র বিবিধ জ্ঞানতাত্ত্বিক প্যারাডাইমের সংকট-তা-ব।

কিংবদন্তি অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূর দীর্ঘদিন পরে মঞ্চে নতুন কোনো নাটকে অভিনয় করলেন। সঙ্গে ধীমতী নটী জ্যোতি সিনহা। প্রবীণের সঙ্গে অনতিনবীনার যুগলবন্দি দ্বৈরথ দর্শককে শুরু থেকেই আবিষ্ট করে। অভিনয়কলায় মুহ্যমান হয় সে। তার ফলে নাটকের মুহুর্মুহু বিষয়ান্তর, কথাচালাচালির পিংপং খেলার পাল্টাপাল্টিÑকথা, কথা আর কথার চাতুর্য-চতুরতার ক্রীড়া কোনো বাস্তব আখ্যান-অভিমুখিতায় সংলগ্ন করে নাÑদর্শক অভ্যস্ত এই যন্ত্রবৎ কথা কাটাকুটির দায়হীনতায় আসক্ত হয়ে পড়ে। কোনো মানে, কিংবা বয়ানের সত্য-মিথ্যা বিচারে অসমর্থ করে তোলে। একপক্ষের সিনিক বাতচিত, দেরিদীয়-ফুকো তুল্য বিভ্রান্তিতে এনে ফেলে, মানবিক কোনো বিবেচনা তাতে নাটকীয় ক্রমাগ্রসরতার ক্রিয়ায় নাট্যনন্দন রসাস্বাদনে বাদ সাধে। দায়হীন পরম্পরারহিত উল্লম্ফনে দিশেহারা করে ছাড়ে।

আমরা তাই, কিংবদন্তি নটের সঙ্গে জ্যোতির সমানে সমান পাল্লাপাল্লির কসরতে মজে যাই। চরিত্র ছাপিয়ে প্রিয়তর নট নূরভাইকে মুগ্ধ বিস্ময়ে দেখিÑঅভিনেয় চরিত্রটির মাথামু-ের হদিস না পেয়ে। আর কেবলি মনখারাপ করিÑব্যবসায়িক বা রাজনৈতিক পেশাগত ভূমিকা তাঁকে কী করে, কেন এতদিন মঞ্চছাড়া অনিকেত করে ছেড়েছিল! এহেন প্রতাপান্বিত নটের সঙ্গে জ্যোতির যুগলবন্দি পরাক্রম বা দাপট অভিভূত করে আমাদের। আত্মচ্ছিন্ন বাস্তবে ছন্নছাড়া আখ্যান-চরিত্রের বিদিশার পূরণ খুঁজি অভিনয়-মায়ায়।

সংলাপ ধরে যা-কিছু বুঝে দেখা আখ্যান-চরিত্রাবলির নাটকীয়তা, তা অভিনয়-পরবর্তী পা-ুলিপি পাঠ-পর্যবেক্ষণসূত্রে। দর্শকসাধারণ নিশ্চয় এই অনুপুঙ্খ বিবেচনায় যুক্ত হতে তত পারবেন না, তাদের কিছু কিছু হয়ত মনে পড়বে কথা-সংলাপ-কথোপকথনÑসবমিলে এই বিবেচনার যাথার্থ্য বিচার যদিও ব্যাহত হবে।

তবুও সবমিলে ঢাকার মঞ্চে অভিনব এই নাট্য-আখ্যান আর এই পয়মন্ত যুগলবন্দি।

ড. বিপ্লব বালা ( This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it. ): নাট্যশিক্ষক, নাট্যসমালোচক