Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

এইবার কিতা করতাম- সুশীল যত নাট্যজন

Written by বিপ্লব বালা.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

‘আমার স্বপ্নের কোনো বাস্তব ছিলো না
তাই বাস্তবে নেই কোনো স্বপ্ন’- শঙ্খ ঘোষ

বছর দুই ধরে বাংলাদেশ নবতর এক ভয়াল ভীষণ বাস্তব বীভৎসার মুখোমুখি। তার আগে বাজার-সভ্যতা এতকালের সংস্কৃতি-মানস ছিন্নভিন্ন পর্যুদস্ত করে ছেড়েছে। এহেন বাস্তবতায় নাট্যজন উপযুক্ত কোনো নান্দনিক রীতি-পদ্ধতি আয়ত্ত করতে পারেনি। প্রতিক্রিয়ায় কোনো ক্রিয়া উদ্ভাবনের সৃজন সামর্থ্য তার অনর্জিত। কেবলি কৃতার্থ দোহার মাত্র হয়েছে সে, আর তাতে তেমন কোনো নৈতিক সংকটবোধও জাগেনি তার। আর বর্তমানকার জঙ্গী-বাস্তবতা তাকে হতবিহ্বল কিংকর্তব্যবিমূঢ়ই করে ফেলেছে! দলীয় সংঘ-সংহতি তো আগেই ভেঙ্গে পড়েছিল- এ কথা বুঝি বলা যায়।

অথচ নাট্যদল বা গ্রুপ গঠিত হয়েছিল সামাজিক নান্দনিক নানা দায়ের কথা মাথায়-মনে নিয়েই। নবীন দেশ-সমাজ রূপায়ণ, রূপান্তরণের প্রায় রাজনৈতিক নীতি আদর্শ অঙ্গীকারের উচ্চ ঘোষণায়। তাতে করে স্বাধীনতার পর থেকে নবনাট্য চর্চা বা আন্দোলন সামাজিক মর্যাদা অর্জন করেছিল। তাহলে গোড়ায় ছিল কি গলদ নানা, যা কারো চোখে তেমন পড়েনি? এটা যে নয় সরল ইচ্ছাপূরণের সহজ-সাধ্য কর্ম কোনো- তা কি বিবেচনায় ছিল তত? কিংবা শিল্পনন্দন-কর্ম নয় যে, রাজনীতিসম্ভব শ্লোগান-ঘোষণা মাত্র, তা যে ভিন্ন করণ-ক্রিয়ার দীর্ঘ আয়াসলভ্য ধীরগতির দীর্ঘতর প্রক্রিয়া বিশেষ- সে জ্ঞান আজও কি অর্জিত নাট্যজনের? সমাজ-মনের নিহিত গভীরে চলে যে তার সঞ্চারণের ধীর ক্রিয়াবেগ- সদা পরিবর্ত জীবন বাস্তবতার সমান্তরালে- তার চেতনহুঁশ অনায়ত্ত তাই বুঝি। মুক্তিযুদ্ধে বিজয় যে এক প্রাথমিক অর্জন মাত্র- যার পরিপ্রেক্ষিতে আছে যে বহুস্তরমাত্রার পূর্বাপর-ধৃত কার্যকারণ; তারই তলে সমাজ-মনের জটিল ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াদির রসায়ন- সেই সঙ্গে চলে শিল্পসংস্কৃতিক্রিয়ার জটিলতর এক অভিভব, অভিঘাতের নান্দনিক দ্বৈরথ- জনমনের নিহিত অতলে; রাজনৈতিক কী শিল্পনন্দন ঘোষণা মাত্রই যথেষ্ট নয় সে রণ-রঙ্গভূমে। রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপের বাস্তবতায় ঘটে যে তার করণ-সিদ্ধির পরিমাপ। সরল কোনো ইচ্ছাপূরণের ঘোষণা সেখানে কোনোই কাজে ঠিক লাগে না।

তার জন্য চাই যে কঠিন এক দায় গ্রহণ ও পালনের দীর্ঘতর প্রস্তুতি ও প্রয়োগ- নাট্যজন ও দর্শকের পারস্পরিক মিথষ্ক্রিয়ায়। নাটকের বিষয় ও রীতির যৌগপত্যে সংঘটিত হয় সে ক্রিয়াকলাপ- দর্শকের সঙ্গে মিলিত চেতাবনিতে। নাট্যদলে নাট্যজনের পরস্পর সম্পর্কের চরিত্র তাতে মৌল অনুঘটকের ভূমিকা গ্রহণ করে। নাট্যনন্দনের এক সৃজনস্ফূর্তি তাতে করে ঘটে থাকে। সংগঠনে ক্ষমতা-কাঠামোর ধরনধারণ আর নাট্য-নির্মাণে নির্দেশক-অভিনেতৃর পারস্পরিকতা তার চরিত্র নির্ধারণ করে। রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক আদলের থেকে ভিন্নতর কোনো ধরন তাকে আয়ত্ত করতে হয়। মানবিক সম্পর্কের অন্যতর ধারাপাত তার জন্য অবশ্যম্ভাবী করে তোলা চাই। অথচ নাট্য দলগুলো আর নাট্যনির্মাণের প্রক্রিয়া কীভাবে সংঘটিত হয়- আমরা তেমন ভেবে দেখেছি কি? যে-সব ঘোষণা-সম্বলিত নীতিআদর্শ আমরা বলি তার সঙ্গে উপর্যুক্ত প্রক্রিয়াদির কেমন কী সাযুজ্য থাকে বুঝতে চেয়েছি কি? সেখানেই রয়ে যায় নি কি গলদ আর ফাঁকির মৌলিক ফাঁক-ফোকর? দলীয় উচ্চাবচ ক্ষমতা-কাঠামোর নিয়ন্ত্রণ আর নাট্যনির্মাণ প্রক্রিয়ায় নির্দেশকের একাধিপত্যের একনায়কতায় নিহিত আছে না কি সে গলদ-সূত্রাদি- যার সুলুকসন্ধান আজ জরুরি সাংস্কৃতিক কর্ম।- যদি চাই আজকের বাস্তব সংকট নিরূপণ নিরাকরণের পন্থাদি?

আমরা যে বলে থাকি নাট্যকলা এক যৌথকর্ম বা যৌথশিল্প, তা কি কেবল এই যে: নাট্যকলা রূপায়িত হয় নানা মাধ্যমের যৌথতায়- নাটক-অভিনয়-সংলাপ-সংগীতধ্বনি বাদ্য-আলো-মঞ্চসজ্জা আর তা সম্পন্ন করে বহুজন মিলে বলেই?

যূথ পারস্পরিতার চরিত্রই নির্ধারণ করে না কি সৃজন-ক্রিয়া ও তার অভিভবের চারিত্র্য? দর্শকের সঙ্গে বোঝাবুঝি, অভিনেতৃ ও দর্শকমনের নিহিত বাস্তব কি নয় তার মৌল পরিপ্রেক্ষিত? সেই সম্পর্কের যোগযুক্ততার চরিত্র যার মুখ্য নিয়ামক? আজকের বাজার আর জঙ্গী বাস্তবতা- যার মধ্যে পড়ে নাট্যকর্ম আজ হয়ে উঠেছে প্রান্তিক/পতিত দশাগ্রস্ত। সামাজিক মন বা তার যৌথ অবচেতন সেখানে ভেঙ্গেচুরে অষ্টাবক্র- এক ঊনপঞ্চাশ বায়ুচড়া তা-বে। সর্বগ্রাসী এই ভাঙ্গন-ধ্বংস্তুপের মধ্য থেকেই জিয়নকাঠি সৃজ্যমান করে তোলার দায়গ্রহণ ব্যতীত গত্যন্তর নেই আজ। নীতি-আদর্শের কোনো উচ্চঘোষণায় কেবল আর পার মিলবে না। কঠিন এই সত্য সবার আগে অনুধাবন করতে হবে। আমরা তো মনে ভাবি, নাট্য-সংস্কৃতিজন অধিক চেতন জনসমাজের চেয়ে- যাদের রাজনৈতিক পরিভাষায় বলা হতো ‘ভ্যানগার্ড- যারাই উদ্বোধিত করে সাধারণে। বলে থাকি; দর্শক তৈরি করতে হবে, তাদের মন-বুদ্ধি সক্ষম সম্পন্ন করে তুলতে হবে- যাতে তারা নাট্য-সমর্থ দর্শক-ভোক্তা হয়ে উঠতে পারে। নাট্যের নানা রীতি-পদ্ধতি টেকনিকের উদ্ভাবন তো তারই কারণে সৃজ্যমান হয়ে ওঠে; নাট্যের বিষয় যাতে দর্শকের গভীর মনে সাড়া জাগায়।

তার জন্য চাই যে, দর্শক-মনের আতিপাতি সুলুকসন্ধান- তার চেতন-অবচেতন-অচেতনের যত গূঢ়, জটিল অন্ধিসন্ধি থাকে- তা বুঝেই করতে হয় নাট্য বিষয়-রীতির রূপায়ণ। তবে সে দর্শক-মন অনুধাবন নিজের মনের জ্ঞান ভিন্ন হয় না- তাই তো বলা হয় ‘আপনারে চিনলে পরে যায় অচেনারে চেনা।’ তার জন্য সবার আগে চাই আত্মসনাক্তিকরণ- নিজেদের জানা চেনা বোঝা। সেখানেই রয়ে গেছে না কি মৌল দুর্বলতা? এক অহং বিকারে আমরা তো বড়োই তুষ্ট, তৃপ্ত থাকি। নিজেকে অগ্রসর আধুনিক ভাবি। সেটা যে কোন দিক দিয়ে বা কতটুকু তা বিবেচনা তত করি না। চলতি নীতি-আদর্শের পন্থী হয়ে ভাবি- কতই প্রগতিমান আমরা।

ধর্ম যে মানবমনের বড়ো এক অবলম্বন। বলা হয়, সংস্কৃতি হোল শিক্ষিতজনের ধর্ম আর সাধারণের সংস্কৃতি ধর্ম। অথচ ধর্ম আমাদের বিবেচনায় বড়োই অনগ্রসর কুসংস্কারাচ্ছন্নের অন্ধত্ব- এককথায় খারিজ যথাযোগ্য হিসাবনিকাশ ব্যতিরেকেই-  আমাদের মনের গভীরে তার যে কতই প্রতাপ বুঝে দেখি না। কতকগুলো উদার বুলির বুকনিতে যে তার পার মেলে না। সময় মতো তার নীরব অন্তর্ঘাত কত অনিবার্য, মোক্ষমই না হয়ে ওঠে। ‘গণজাগরণ মঞ্চে’র অমন যে অমিত উজ্জ্বল উদ্ভাসন- যা-কিনা নবীন-প্রবীণকে মিলিত একটি চেতাবনিতে একত্র করেছিল- জেগেছিল এক জোয়ারই বুঝি। সেই যে মুক্তিযুদ্ধ-প্রাণনার নিহিত বিক্রম- কী করে অবসিত হলো ‘নাস্তিক’ অপবাদের একটিমাত্র ফুৎকারে? সেই সঙ্গে দলীয় রাজনীতির অপবাদে মুখ থুবড়ে পড়লো সে হঠাৎ আলোর ঝলকানি। কোনোই বিবেচনার ফুরসত মিললো না- কারণ আর কেন তুললো কারা হেন বিদ্বেষ-অপঘাত। খুব কি অচেনা ছিল তারা যাতে বিভ্রান্ত হয়েই এহেন নির্বাপণ যে আগুন জ্বলেছিল কতকালের প্রতীক্ষায়? ‘নাস্তিক’ কথাটির তাহলে এমনই পরাক্রম- যাতে করে অবসিত করে ছাড়ে তাবৎ জন-জাগরণকেও। তখন কি একে কেবল ধর্মভীরুজনের অনিবার্য দুর্বলতা বলেই বিবেচনা করেই পার মিলবে?

তাছাড়া অগ্রসর আমাদের মনের খবরই বা কী? তার হদিস কি জানি আমরা? জানতে চাই? বছর কয়েক ধরেই তো মহাতাত্ত্বিকজনের পাশাপাশি নাট্যবোদ্ধা মহাপণ্ডিত কেউ কেউ বলে আসছেন- জঙ্গি জেহাদিদের সঙ্গেও করা চাই ‘ডায়ালগ’- সর্বরোগহর নাকি সে নিদান। আজ তো তত্ত্বজ্ঞান-বুদ্ধি রফতানি বিশ্বে ‘ডায়ালগ-ডিসকোর্স-প্যারাডাইম’ এর জয়জয়কার। যেমন ছিল একদিন মার্কসীয় দ্বন্দ্ব-দ্বান্দ্বিকতা-ডায়লেক্টিসের। এরকম একেক বুলির আশ্রয়েই চলে তো আমাদের দিনগত মনন-বমনপাত। আর তা দিয়েই আড়াল করা যায় নিজেদের মনের যত অন্ধিসন্ধি, রিপুরাজী। নাট্যজনের সাধ্য আছে কি তার মুখোমুখি হই- যা-কিছু অন্ধকারে ঢাকা আছে তার উদ্ঘাটন করি অয়দিপাউস-প্রায় বীরত্বে? নাট্যে কঠিন সে সত্যের সন্ধান-রূপায়ণ ভিন্ন আর কী থাকে প্রয়োগ-প্রকাশযোগ্য বিষয়? আদি কবির তাই কি বিনতি ছিল না; হে পূষণ, তোমার অন্ধকার আবরণ উন্মোচন করো- দেখি সত্যের হিরন্ময় সমগ্র মুখ।
 
জঙ্গি এক মন কি নয় সামাজিক ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার, অর্জন আমাদের? সমাজ-পরিবারে যাকে তো এক এক বাধ্য নিয়ন্ত্রণ-সংস্কৃতি। ছোটবেলা থেকেই আমরা বড় হই কতক ধারণা-বুলির আমূল সংস্কারে। ধর্মীয় এক বিদ্বেষ-বিভেদ গড়ে তোলে মনের মৌল ভিত। আপন-পর, আমরা আর ওরার চিরস্থায়ী ভেদাভেদ যাতে গড়ে ওঠে। অন্য ধর্মীয়রা যেখানে হয়ে ওঠে শত্রুর অধিক শত্রু। জীবনের যাবতীয় কর্ম-কৃত্যাদিতে চর্চিত হয় এক ভেদের সংস্কৃতি। অন্য ধর্মীয় যা-কিছু তাই হেয়, অবজ্ঞেয়- পরিত্যাজ্য। আমরাই একমাত্র সত্য, শ্রেষ্ঠ- অন্যেরা হীন, পতিত। এতকাল ভিন্ন ধর্মীয়দের চোখে যা ছিলাম- আজ দেশ-সমাজে সংখ্যাগুরুত্বের ক্ষমতায় তারই প্রতিশোধন চলে। সমাজ-মনস্তত্ত্বের এতো স্বাভাবিক নিয়ম: অন্যের কাছ থেকে যে-আচরণ পাই, তাই দিয়েই গঠিত হয় এমন এক মন- যাতে প্রত্যাঘাতে তা ফিরিয়ে দিতে চাই একই প্রতিক্রিয়ায়। পারস্পরিক ঘৃণার এক জমিন এভাবে গড়ে উঠেছে সমাজে, মনে। যদিও বাঙালির ইতিহাসে চিরকালই ছিল এই বিভেদের পাশাপাশি মানব-মিলনের এক ভাব-সংস্কৃতি- বাঙালির স্বভাব স্বধর্ম যাতে নিহিত। বহুতর ভিন্ন মত-পথ-ধর্মের বিভিন্নতা তাতে বাধামুক্ত হতে পেরেছিল- ‘যত মত তত পথ’- এর উদার এক মানবিকতায়। ক্ষমতা আর উচ্চ সমাজে যদিও ছিল চিরকাল একেক ধর্ম-মতের পরিপোষণ। শাস্ত্রীয় শরিয়তি সে ক্ষমতা মদমতার সঙ্গে নিজস্ব এক দ্বৈরথে স্বয়ম্ভর নানা মানব মত-পথ আচরিত হতো- তাবৎ মস্তানির বিপরীতে। উদার এক মানব সংস্কৃতি বিভেদ-বিদ্বেষ উত্তীর্ণ হয়েই আপনাপন সত্যে নির্ভর নির্ভয় ছিল। অন্য ভিন্ন মত-পথ ত্যাজ্য ছিল না সে ভাব মহিমায়। মুক্ত এক দেয়া-নেয়ায় ক্রম-সৃজ্যমান হয়ে উঠতো নব নব মানব ধর্ম-মত। পারস্পরিক বাহাস-বিতর্কের দার্শনিক আসরে নানা পন্থী দর্শক-শ্রোতা জ্ঞানতাত্ত্বিক বিবিধ ডিসকোর্সে- যাকে বলে অবগাহন কতো ধর্মীয়কৃত্যের মর্যাদায়। ক্ষমতা-ধর্ম অবশ্য চিরকালই একেক মত-পথ-বিশ্বাসের একাধিপত্য কায়েম করতেই চাইতো তবু অমলিন ছিল নানা ভাবের নিত্য-নব এষণা।
 
উপনিবেশকালে জটিল-কুটিল হয়ে ওঠে ক্ষমতার হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। ধর্ম-মত যে মানবমনের দুর্বল কোমল নাজুক অনুভূতি বিশেষ, ক্ষমতা-রাজনীতির মোক্ষম আয়ুধ হয়ে ওঠে মনের এহেন নরম, মোলায়েম অস্তিত্ব। অর্থনৈতিক চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে সমাজ, সামাজিক সম্পর্কাবলী ভেঙ্গে স্বার্থ-প্রতিযোগিতার নতুন বিন্যাস নেয়। বাংলা মনের আদি স্বভাব-ধর্ম প্রান্তিক পতিত হয়ে ওঠে। শাস্ত্রীয়-শরিয়তি যুধমান দুই ক্ষমতা-রাজনীতি দ্বিবিধ ধর্ম-মতের প্রতিস্পর্ধী প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। নবগঠিত ঔপনিবেশিক দেশ-রাষ্ট্রের উচ্চ সমাজ-শ্রেণী সে লড়াইয়ে জনসমাজের নিজস্ব নানা মত-পথ হেয় ত্যাজ্য করে দুই ক্ষমতা-ধর্মমতে একাট্টা করে তোলে প্রবল মরিয়া রোখে- ডাইরেক্ট অ্যাকসনের নৃশংসতায়। এর বাইরের তাবৎ মত-পন্থা উচ্ছেদ হয়ে ওঠে তার গ্রান্ড প্রজেক্ট- ক্ষমতার একমেবাদ্বিতীয়ম প্রতিযোগিতায়। বিভেদ-বিচ্ছেদের রাজনৈতিক সে ভাগ-বাটোয়ারায় বিভক্ত হয় উপমহাদেশ- ভারতবিভাগ আর বঙ্গভঙ্গ। ততদিনে দেশ-সমাজ বিভক্ত হয় হিন্দু-মুসলমানের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে।

মানব ও বাংলামনের সেই হোল নিদারুণ অন্ধ অধঃপতিত দশা। ভেদ-বিভেদ-বিদ্বেষের সংক্রামক মারণ-ব্যাধি রক্তবীজের চিরায়ুষ্মানতায়। পাকিস্তান খুলে দেয় লুটপাট আর দখলদারির এক অভয়ারণ্য। চির প্রতিদ্বন্দ্বী বাধা-বিপত্তি ঝেঁটিয়ে সীমান্ত পার করে দেয় সাধের পাকিস্তান। গড়ে ওঠে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত চাকুরে, ব্যবসায়ী- লক্ষ লক্ষ শূন্যস্থান আহ্লাদে আটখানা হয়ে পূর্ণ করে। তার জন্য মনে তাদের কোনোই অপরাধের গ্লানি থাকে কি? দ্বিধা-দ্বন্দ্বের কোনো অবশেষ? তবু শূন্য শূন্য নয়- বিদ্বেষ-বিভেদে পূর্ণ সে গগন। তার মধ্যেই অকস্মাৎ অতর্কিতে ভাষার অধিকারের বিষয়টি উঠে আসে। চাকুরি-ব্যবসায় আয়-উন্নতির পথে বাধার আশঙ্কায়। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আর রাজনীতির অগ্রসর অংশ সচেতন হয়, আন্দোলনে নামে। এই ভাষার সূত্রে জাতি-সংস্কৃতির আত্মপরিচয়ের প্রশ্নটি উঠে আসে। ততদিনে ধর্ম-রাজনীতির লাভের লোভে, মত্ততায় যা চাপা পড়েছিল। সে লাভের গুড়ে বালি পড়ে যেন রাষ্ট্রভাষা প্রণয়নের ঘোষণায়। মৌলিক এই অধিকার হারানোর আশঙ্কায় একে একে চাপা পড়া জাতি-সংস্কৃতির তাবৎ মৌল বিষয়াদি উঠে পড়ে। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের আবেগ জাগে- নিজদেশে পরবাসী হবার অশনি সংকেতে। তাতে ভিন্নতর রাজনৈতিক জাগরণ ঘটে।- ধর্মীয় বিভেদের সহজ সুলভ দখলদারির বিপরীতে। এই বৈপরীত্যের টানাপোড়েন হয়ে ওঠে যেন জাতীয় নিয়তি বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্তের। তারই নাছোড় দোদুল্যমানতায় ক্ষণেক এদিক ক্ষণেক ওদিকে সংক্রমণের নিত্য উল্লম্ফপাত ঘটে তার। এরই এক পর্যায়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন অভিযান তুঙ্গে ওঠে। বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি সূত্রে রবীন্দ্র-অবলম্বনও অনিবার্যতা অর্জন করে। পহেলা বৈশাখ আর রবীন্দ্র শতবর্ষপালন হয়ে ওঠে যেন বা তার অস্তিত্বস্মারক। কবেকার হারিয়ে ফেলা হিন্দু-মুসলমানের সমন্বিত বাঙালি সংস্কৃতির আত্মপরিচয়ই যে ছিল তার মৌল অবলম্বন- সে হুঁশ ফেরে।
    
‘ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা’। তাতে করে নাগরিক এক ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িকতা যেন বা অর্জিত হয় মধ্যবিত্তের। গণতন্ত্র আর স্বাধীকার, স্বায়ত্বশাসনের আন্দোলনের সেই তোড়ে উপনীত হয় সে মুক্তিযুদ্ধে। আবহমান বাঙলির সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতি যার মানস পরিপ্রেক্ষিত নির্ণয় করে। জাতীয় আবেগ-প্রাবল্যের বাহুল্য এক ঘোর উন্মাদনায় মরিয়া করে তোলে।

পাকিস্তান এত সহজে রেহাই দেবে কেন? ভারতীয় চর আর হিন্দুজুজু নিয়ে বিভ্রান্তি ঘুচিয়ে ছাড়বে না সে? আক্রমণের প্রথম ধাক্কায় তাবৎ বাঙালি-নিধন চললেও ক্রমে তা মুক্তি আর হিন্দু বিনাশে একাগ্র হয়। এক কোটি শরণার্থীর ভারতে অনুপ্রেবেশ ঘটে। শত্রুর শত্রু মিত্র বলে ভারত হয়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি। পাকিস্তানি প্রচারণা মোক্ষম হয়ে ওঠে- পাকিস্তান ভাঙ্গতে ভারতীয় ষড়যন্ত্রের নামই বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ। এই অভিযোগ কীভাবে নিয়েছিলাম আমরা মনে- তার হদিস তখন না নিলেও এখনও কি পাই নি? মুক্তিযুদ্ধে হিন্দু আর নারীর ওপর অধিকতর যুদ্ধাপরাধ কেমন কি বিবেচনা করি আমরা মনেরও অগোচরে অন্তত? লুটপাট, দখলদারি, বিতাড়ন আর ধর্ষণের অবাধ সুযোগ মনে পড়ায় নি কি সেই যে লুপ্তপ্রায় চাপাপড়া বিদ্বেষ-স্মৃতি চারিয়ে যায় না কি জনমনে? বীজতলায় নব অঙ্কুরোদগম হয় বুঝি- একদিন যা মহীরুহ হয়ে কাফনে মুড়ে দেবে স্বাধীন বাংলাদেশ- যার হওয়ার কথা ছিল হিন্দু-মুসলমান বাঙালির দেশ- সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘুর পাকিস্তানি দ্বিজাতিতত্ত্বের পরস্পর বিদ্বিষ্ট মনস্তত্ত্ব নয় তো। সেই অভিপ্রায়েই তো ঘোষিত হয় সংবিধানের মূলনীতি- গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা আর সমাজতন্ত্র। ধর্মের নামে রাজনীতি চিরতরে বাতিল, বর্জন করে।

বাংলাদেশে কেমন কী হলো তার প্রবর্তনা? পাকিস্তানিকালে অর্জিত বাংলা-মনের গতিক কী  হলো অতঃপর? তার জটিল নানা অন্ধিসন্ধির সুলুকসন্ধান করতে চেয়েছি কি আমরা তেমন করে? মুক্তিযুদ্ধকালে নয়মাসজুড়ে সে হত্যা-লুণ্ঠন-ধর্ষণ-বিতাড়ন ঘটে তার প্রতিক্রিয়ায় মানবমন অষ্টাবক্র, অস্বভাবী হয়ে ওঠে। নারী-শিশু ও হিন্দুমন অধিক বিকল বিকারগ্রস্ত হয়। সাধারণ খুনি, ধর্ষক, লুণ্ঠনকারী, বাড়ি-সম্পত্তি দখলদার সমাজে গড়িয়ে দেয় অনাচারের বীজতলা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে। নাগরিক মানুষজন গ্রামে পলায়নকালে সমাজে, মানুষের যে অভ্যর্থনা, আতিথেয়তা পায় তা ভুলতে সময় নেয় না। তারুণ-যুবাদের একাংশ হয়তো মনে লালন করে চলে নতুন দেশ-সমাজের স্বপ্নকল্পনা। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ক্ষমতা-রাজনীতির চক্রব্যূহে পড়ে পথে/বিপথে খুন-জখম-দেশছাড়া হয়। একদিন অবৈধ ধনে-ক্ষমতায় পাকিস্তানি উত্তরাধিকারী হয়ে ওঠে। অধিকাংশের নির্জীব প্রত্যাবর্তন ঘটে সংসারে-জীবিকায়। তাবৎ নৈতিকতা/মূল্যবোধ মুখ থুবড়ে পড়ে।
 
চোখের সামনে ঘটতে থাকে যথেচ্ছাচার- মুক্তিযুদ্ধ আর স্বাধীনতা পক্ষীয়ের নামে বেনামে। পাকিস্তানি দুঃস্মৃতি ভুলিয়ে দগদগে হয়ে ওঠে বর্তমান বাস্তব বীভৎসা। পাক-দানবদের প্রতি উপযুক্ত ক্রোধ-ঘৃণা অবসিত হতে থাকে। শ্রদ্ধেয়জন অপসৃত হয় সমাজে, জীবনে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান শত্রু হয়ে ওঠে ভারত-পাকিস্তানের বিপরীতে। তাদের বিরুদ্ধে সত্য-মিথ্যা যাবৎ প্রচার/অপ্রচার গৃহীত হয় ভঙ্গুর সমাজ-মনে। স্বাধীনতাবিরোধীরা নানা দলে ঢুকেই অন্তর্ঘাতের নীলনকশা প্রণয়ন-প্রয়োগ করতে থাকে। তাদের অনায়াস সাদর পুনর্বাসন ঘটে প্রশাসনে। অশুভ বিবাহাদি সম্পন্ন হয়ে চলে। দেশফেরৎ শরণার্থীদের মালামাল-সম্পত্তি ফিরে পেতে বিপত্তি ঘটে। ভারতীয় হাইকমিশন পর্যন্ত অভিযোগ পৌঁছয়। তাতে সরকারও বিব্রত হয়। দ্বিজাতিতত্ত্বের পুনরার্বিভাব ঘটে- সেই অজর অমর দানবের। মহাবিপ্লবী দলও হরতাল ডাকে- বাংলাদেশে ইসলাম বিপন্ন। জাসদ-মওলানা ভাসানী পত্রিকায়, সভায় ভারতবিরোধিতা হিন্দুবিরোধিতায় পর্যবসিত করে ছাড়ে। দেশ হয়ে ওঠে পাকিস্তানের অধিক পাকিস্তান; পাকিস্তানের অধম পাকিস্তান। দেশ সমাজে যতই নীতি-নৈতিকতা-বিবেকের বিসর্জন চলে তত নাম নেওয়া হয় ধর্মের। ধর্ম, মূলত ইসলাম যেনো একমাত্র কুশীলব হয়ে ওঠে। সবার মুখে একই বুলি- যত অধর্মপাত ততই ধর্মীয় জিগির, মাতম হিক্কা।

এই যে মনের বাস্তব, তার মধ্যেই চলে নাট্যচর্চা।- ‘বাকি ইতিহাস’, ‘সংবাদ কার্টুন’, ‘সুবচন নির্বাসনে’, ‘এখন দুঃসময়’, ‘ইবলিশ’, ‘ওরা কদম আলী’। দলে দলে জাগে জোয়ার। দেশ-সমাজের বিড়ম্বিত বাস্তবে ভিন্ন বিকল্প ইচ্ছাপূরণ-নাট্য। দর্শক গড়ে ওঠে, তৈরি হয়। মঞ্চনাট্য মর্যাদায় আসীন হয়। পঁচাত্তর-পরবর্তী বাংলাদেশ আরেক নতুন বাংলাদেশ হয়ে ওঠে। মধ্যপ্রাচ্যের টাকায় আধুনিক স্থাপত্যের মসজিদ নির্মিত হতে থাকে; হাজার হাজার মাদ্রাসায় ছেয়ে যায় গ্রাম-গঞ্জ-শহর-বন্দর। প্রতি শহরে সমাবেশ কী মঞ্চের আশেপাশে মসজিদ- তাতে করে আযানের সময় ফ্রিজ হয়ে যায় সভা-সমাবেশ-নাটক-গানবাজনা। মোক্ষম বর্ম হয়ে ওঠে আল্লার ঘর- ক্ষমতাদখল ত্বরান্বিত হয় সমাজ-দেশ-মনের দখলদারিতে। সবাই ভয়ে মরে- ধর্ম নিয়ে কোনো কথা চলবে না- সংখ্যাগরিষ্ঠের মনে আঘাত লাগবে। রাজাকার-আলবদরের চরিত্রে মুখে দাড়ি, মাথায় টুপি দেয়া চলবে না। ষাটের দশকে হঠাৎ-গজানো বামপন্থী ঝোঁকে চলতো যে ধর্ম নিয়ে নানা কথা- ঠাট্টা, তামাশা, বাহাস- তার বিপরীত প্রক্রিয়ায় জিয়া সংবিধানে বিস্মিল্লাহ্ বসায়, এরশাদ ‘রাষ্ট্রধর্ম’ চালায়। তা নিয়ে কথা বলার মুরোদ কিছু নগণ্য বামপন্থী দল, আর নারী সংগঠন ছাড়া কারো হয় না। দেশজুড়ে এত যে বুদ্ধিজীবী, ছাত্র-যুব নাট্য-সংস্কৃতি-শিল্পীজন- কোথায় যায় মুক্তিযোদ্ধার সেই বিক্রম? উদীচী তবু ‘ইতিহাস কথা কও’ করে আর এস এম সোলায়মান ‘ক্ষ্যাপা পাগলার প্যাচাল’, লিয়াকত আলী লাকীর ‘রয়েল বেঙ্গল টইগার’ কিছু বেফাঁস সত্য কথা বলে ফেলে। পথনাটকের সে সব বাতচিতে আমরা নিজেরা কিঞ্চিৎ পুলকিত হই- সমাজে তার ছাপ পড়ে ততটা কি? পড়েও নিশ্চয়, নইলে জাহানারা ইমামের আবেদনে সাড়া তো লাগে দেশজুড়েই, গণ-আন্দোলনে এরশাদের পতনও ঘটে। তারপর নাকি গণতন্ত্র আসে। কেমন সে গণতন্ত্র এতদিনে বুঝেছি নিশ্চয়। তার সুযোগে লাভের লাভ হয় কেবল জামায়াতের। দুটি আসন থেকে বিএনপি’র সঙ্গে জোট বেঁধে ক্ষমতার অংশীও হতে পারে। ‘যুদ্ধ এবং যুদ্ধ’, ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, ‘কোর্টমার্শাল’, ‘নূরলদীনের সারাজীবন’, ‘এই দেশে এই বেশে’ কী ‘মেরাজ ফকিরের মা’- অনেক সত্য বলে নিশ্চয়। ‘যুদ্ধ এবং যুদ্ধ’ তোলেও মোক্ষম প্রশ্নটি- ‘তোরা রাজাকার মন্ত্রী করতে পারিস, আমি কেন বিয়ে করতে পারবো না তবে?’ যদিও এটা কোনো অবিশ্বাস্য ঘটনা নয়- স্বাধীনতার পর থেকে মুক্তিযোদ্ধা বা স্বাধীনতা পক্ষের মানুষ আল্লার ওয়াস্তে সম্পন্ন করেছে সে শুভকর্মাদি। তাই বুঝি জাহানারা ইমামের অমন আকুতি ছিল; স্বাধীনতাবিরোধী পরিবারের সঙ্গে আত্মীয়তা না করতে। কেউ কি শুনেছে তাঁর কথা?- কেউ কি সে যুক্তি ঠিক মনে করেছে? কোনো সামাজিক ঘৃণা যে জাগেনি কখনোই তার কারণ খুঁজে দেখেছে কোনো সমাজ-মনোবিদ বা লেখক-বুদ্ধিজীবী-শিল্পী? সমাজে, জীবনে, মনে ন্যায়-নীতির বালাই না থাকলে তা যে না হয়ে যায় না। পরাজয় হয়েছে তো নৈতিকতার- কারো সে মুখ নেই যে, বুকে হাত দিয়ে কোনো সত্য বলে। অর্বাচীনের মতো বলতে গিয়ে তসলিমাকে দেশ ছাড়তে হয়; তাতে সর্বদলীয় জাতীয় সাংস্কৃতিক ঐক্য গড়ে ওঠে-  তার বাস্তবতা না বোঝা বা শিল্পী না হওয়ার দোহাই দিয়ে। তার মধ্যে তবু আহমদ শরীফ, কবীর চৌধুরী, শামসুর রাহমান মুরতাদ বলে ঘোষিত হন। হুমায়ুন আজাদ তো যেন কৈশোরক বিক্রমে জ্বলে উঠে সংশপ্তক অভিমন্যু-প্রায় শত্রু-ব্যূহে ধেয়ে আর ফিরতে পারেন না- তাঁরই লিখিত বর্ণনার অনুরূপ কিরিচ-ভোজালির কোপে ফালাফালা হন। এত বছরেও তার বিচার করার মুরোদ নেই কোনো আইন-রাষ্ট্র-সরকারের- জনমত সেভাবে গঠিত করা যায় নি যে। তারই পরিণামে ব্লগাররা একে একে খুন হয়। অভিজিতের বেলাও যেমন প্রতিবাদ করার সাহস দেখায় না তেমন কোনো দল-গোষ্ঠী-জোট। রাজনীতি না হয় ভোটের হিসাব করে- কিন্তু আর সবাই, মহাবিপ্লবী যারা সব আছেন বিবৃতি-বক্তৃতাজীবী সুশীল-মানবাধিকারীর দল; ‘নাস্তিক’ যে কতল-যোগ্য, তাকে খুন করা যে জায়েজ, জেহাদের বিশ্বজোড়া রঙ্গমঞ্চে- এটা কি কেবল একদা শ্রেণীসংগ্রামী ‘মহাত্মা’ ফরহাদ মজহারের উত্তর-উপনিবেশিক-উত্তরাধুনিক জারি করা বয়ান? জনমনে তার কি কোনোই সায় নেই? মনে করা হয় না কি- ধর্মভীরু ধার্মিক মনে এমনি প্রতিক্রিয়া হতেই পারে; কেন তাহলে তাদের উস্কে দেয় না- ফরমান যত ব্লগার-বালকেরা। এটা যে ইসলাম-বিরোধী, কোরানে নিষিদ্ধ- জোরের সাথে প্রবল ধর্মীয় আবেগে মানুষজন বলে না। নবীজীর শেষ হুঁশিয়ারিও মনে পড়ে কি কারও: ‘ধর্ম লইয়া বাড়াবাড়ি করিও না- অতীতে এমন করিতে গিয়া বহু জাতি ধ্বংস হইয়াছে।’ মনে কোথাও খটকা আছে বলেই তো মনে করে হয়তো ধর্মে জায়েজ- কেন আমেরিকার মতো সবাই ইসলামের পেছনে লাগে, দুশমনি করে। সাধারণের কথা ছেড়ে দিলাম। নাট্যজনের মনের খবর কতটা কেমন কি জানি আমরা? সাধারণের চেয়ে ভিন্ন হবে কি তাদের অনুপাত? সেই তারা কিন্তু একদা শ্রেণীসংগ্রামী জোশের মতো আজকের ঐতিহ্যবর্ণনাত্মক দেশজ-জোশে গ্রান্ড ন্যারেটিভের ডিসকোর্স ফালা ফালা করে থাকে মঞ্চে, লেখনে, টকশো বাহাসে! তাত্ত্বিকভাবে তারাই সমাজে-দেশে প্রতিষ্ঠিত। বাঙালি সংস্কৃতি-ওয়ালারা গো-হারা হেরে ভূত। মুখে কেবল লালন-রবীন্দ্র-নজরুল বুলিতে কি আর জয় হয়? শাস্ত্র-শরিয়তি যত ক্ষমতা-জঙ্গীদের সঙ্গে এক মতাদর্শগত লড়াই ছিল তাদের শিল্পকর্ম- মতাদর্শগত কঠিন লড়াই ছাড়া? মনে পড়ে, বছর দশেক আগেই বাংলা ভাইয়ের সঙ্গে সংলাপের প্রস্তাব নাট্যজনদের সভায় পেশ করা হয়েছিল- কারো মুরোদ দেখি নি তার প্রতিবাদ করে।- বাংলায় হাজার রূপের হাজার রাক্ষস’- যে।

আমাদের মনে আছে কতকালের সিন্দাবাদের দৈত্য, মামদো ভূতের আছর। সে বুঝি ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের দায়ভার।

‘অপরে পাওনা আদায় করেছে আগে/আমাদের পরে দেনা শোধবার ভার।’

সেই সাধ্য, ইচ্ছা-আবেগ কি মুরোদ নাট্যজনের আছে? ‘রক্তকরবী’-নাটকের রাজার মতো নিজের বিরুদ্ধেই নিজের লড়াইয়ে নামতে নন্দিনী-রঞ্জনের হাতে হাত দিয়ে? মঞ্চে নিধিরাম সর্দার-বৎ ‘টিনের তলোয়ার’ ঘোরানো নয়- নিজেদের মানসলোকের কঠিন ভয়াল, বীভৎস বাস্তবের, সত্যের মুখোমুখি হওয়া ছাড়া শিল্পনন্দনের আর কী থাকে করার- কেবলি সত্য বলে যাওয়া ছাড়া? কাল্পনিক কোনো নাটুকে খলচরিত্র বা ভিলেনের মতোই ‘এখন আমরা হয়ে উঠেছি ওরা’ না তো? শিল্পে যে তাও প্রকাশ-কর্তব্য।
 
নাকি জঙ্গি-ভয়ে আত্মারাম খাঁচাছাড়া?- ‘ছাইড়া দে মা কাইন্দা বাঁচি’?

ড. বিপ্লব বালা: শিক্ষক ও সমালোচক