Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

সমকালীন নাট্যের রাজনৈতিক মানচিত্র

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

উপোদ্ঘাত
সমকালীন রাজনৈতিক নাট্যচর্চা ও চিন্তার হালহকিকত তালাশের জন্য এই লেখা। সময় খুব বৈরী। এই বৈরিতার ভেংচিতে যেকোনো লেখাই দুমড়ে মুচড়ে যেতে বাধ্য। এ এমনি এক সময় যখন শিল্প, নাট্যচিন্তা, এই সবকিছুই নিজেদের অভীষ্ট লক্ষ্যের স্ববিরোধিতায় রক্তাক্ত। আরো বেশি আক্রান্ত হবার, আরো কুঁকড়ে যাবার ভয়ে ওগুলো পলাতক। আজকের ভাবুকেরা, নাট্যশিল্পীরা বর্তমানকে মোকাবিলা করার ভাষা হারিয়ে নিজেরা অত্যন্ত দীনহীন, দায়গ্রস্ত ও দেউলিয়া। এমন বিদীর্ণ পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতের ভাবনা খুঁজবো কোথা থেকে, কার কাছ থেকে? সময়ের তরবারিতে এফোঁড়-ওফোঁড় হতে থাকা কিছু বিদীর্ণ সন্ধ্যায় আশার খুঁদকুড়ো সঞ্চয় করা গিয়েছিল এমন চারটি প্রযোজনা (ট্র্যাজেডি পলাশবাড়ি, মেড ইন বাংলাদেশ, ম্যাকাব্রে ও কবর) নিশ্চয় তর্কের দাবি রাখে প্রাণের কাছে। প্রাণ সাড়া না দিলে বুদ্ধি আড়ষ্ট হয়ে বুদ্ধু সাজে। সময়ের কুশীলবেরা পরার্থের নামে ছল-বল-চাতুরিতে ‘ন জানে নিলয়’। তবে শিল্প তার দর্শকের বোধে অবশিষ্ট থেকে যায় জ্ঞানচৌতিশায় অর্থাৎ চিন্তার ছন্দে অর্থপূর্ণ হবার আশায়।

এই মুহূর্তে নাট্যচিন্তাকে ভাষা দিতে অগাস্তো বোয়ালের ক্লাসিক ভাবনার অন্দরে শরণ নেয়া যেতে পারে। আপনাদের নিশ্চয় মনে পড়বে ‘অত্যাচারিতের নাট্যে’র মুখবন্ধে তুলে ধরা তাঁর বিখ্যাত তর্ক: “সব থিয়েটারই রাজনৈতিক। কারণ, মানুষের সব কর্মকাণ্ডই রাজনৈতিক, আর থিয়েটার তাদেরই একটি। যারা থিয়েটারকে রাজনীতি থেকে আলাদা করতে চায়, তারা আসলে আমাদেরকে ভুলের মধ্যে নিক্ষেপ করতে চায়। আর এটিও একটি রাজনৈতিক কৌশল (আমার অনুবাদ) ।”১ নাট্য ও রাজনীতির চিরকালীন অঙ্গাঙ্গি সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে আমাদের মুঠিতে ঢাকার সমকালীন নাট্যচর্চা থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু চিহ্ন কেবল তুলে নিতে সক্ষম হতে পারি। বাছাইয়ের এই সক্ষমতা নিশ্চিতভাবেই একটি সমালোচকীয় অবস্থানের রাজনৈতিকতাকে নির্দেশ করে। যেকোনো বাছাই অন্তস্থ প্রক্রিয়ার কারণেই সীমাবদ্ধ। এ জন্যই এই লেখার তত্ত্বগত গঠনপ্রণালী প্রশ্নাতীত নয়। আর সে কারণেই তর্কস্বরূপ চারটি প্রশাখায় লেখাটি বিন্যস্ত হলো। বিশ্বাসে বস্তু মিলে, তর্কে মিলে নির্বস্তুক ভাব। ভাব স্বভাবতই প্রশ্নবিদ্ধ হতে অভিলাষী। 

১ম তর্কের প্রসঙ্গ ‘ট্র্যাজেডি পলাশবাড়ি’ : আবেগের রাজনৈতিক ফাঁদ

যৌবনের রক্তপ্রবাহে সঞ্জীবিত একটি দল প্রাচ্যনাট। তাদের সাম্প্রতিক প্রযোজনা ‘ট্র্যাজেডি পলাশবাড়ি’। নৈর্ব্যক্তিক বর্ণনা ও চরিত্রাভিনয়ের ভেদ-অভেদাত্মক দেশজ নাট্যকৌশলের প্রয়োগ এর পাণ্ডুলিপি ও মঞ্চরূপায়ণের ভাষাকে গড়ে তুলেছে। এটি লিখেছেন ও পরিচালনা করেছেন আজাদ আবুল কালাম। পোশাক, কারখানা-ভবনধ্বসের সাম্প্রতিক বিভীষিকাময় ঘটনাগুলোর বয়ান, এমনকি পাণ্ডুলিপি/নাটক, অভিনয়, ডিজাইন ও পরিচালনার কারিগরি দিকগুলোর তথাকথিত সার্থকতা-ব্যর্থতার কাসুন্দি গাইবো না। প্রযোজনাটির নৈতিক শক্তি ও রাজনৈতিক তাৎপর্য উপলব্ধির প্রয়োজনীয়তা আছে। এই ফুরসত নিশ্চয় আমাদেরকে ভুলতে দেবে না যে, কেবল তখনি একটি শিল্পকর্মের ব্যাখ্যা প্রসারিত হয়, যখন সর্বাগ্রে এটি শিল্প হয়ে ওঠে, শিল্পের দায় পূরণের নানা শর্তের সাথে বোঝাপড়া করতে এটি পারঙ্গম থাকে।

আমেরিকান নাট্যকার আর্থার মিলার ১৯৪৯ সালে ‘ডেথ অফ এ সেলসম্যান’ নাটকের ভূমিকা হিসেবে ‘ট্র্যাজেডি এ্যান্ড দ্য কমন ম্যান’ প্রবন্ধে যা যা বলেছিলেন, তার টুকরো টুকরো এখানে আমার নিজের অনুবাদে দরকারমাফিক তুলে ধরবো। মিলার যেমন বলছেন, আমি মনে করি, এটাই সেই সময়, যখন আমাদের কোনো রাজন্য নেই কিন্তু আমরা আমাদের ইতিহাসের উজ্জ্বলতম [ট্র্যাজেডির] ধারাটিকে তুলে ধরতে পারি, একে এগিয়ে নিতে পারি একমাত্র সাধারণ মানুষের হৃদয় ও মনমানসিকতা প্রতিফলিত করে আর এতে আমাদের সময়কেও আমরা চিনে নিতে পারবো।২ আজাদ আবুল কালাম এই সাধারণ মানুষের স্পিরিটকেই ‘পলাশবাড়ির ট্র্যাজেডি’তে তুলে ধরেছেন। পোশাক কারখানার শ্রমিক, যে আবার একই সাথে নারী, সে হলো শ্রমিক শ্রেণী বা সর্বহারার মধ্যেও সর্বহারা। শ্রমিকেরা দুনিয়ার দলিত শ্রেণী। দলিতদের মধ্যে দলিততম হলো নারী শ্রমিক। আমেরিকা অভিবাসী ভারতীয় বাঙালি বুদ্ধিজীবী গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক দলিত বা নিম্নবর্গ নারী ভুবনেশ্বরী ভাদুড়ীর আত্মহত্যার একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। বাঙালি রাজনৈতিক কর্মী ভাদুড়ী ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে দলের নির্দেশে একটি খুন করতে নারাজ ছিলেন। পরিস্থিতি এমন হয় যে, আত্মহত্যা ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকে না তার কাছে। আত্মহত্যার জন্য মাসিক ঋতুস্্রাব পর্যন্ত অপেক্ষা করেছেন ভাদুড়ী যাতে কেউ তাকে সতীত্বহানির অপবাদ দিতে না পারে। যদিও তার মৃত্যুর পর ক্ষমতাবান অভিজাত শ্রেণী ও তাদের কুক্ষিগত মিডিয়া প্রচার করেছিল যে, সে গর্ভবতী হয়ে শোক সইতে না পেরে আত্মহত্যা করে। উচ্চ শ্রেণীর এই বানানো গল্প তখন বিশ্বাসযোগ্যও হয়েছিল পাবলিকের কাছে।  ভাদুড়ি নিজের আত্মহত্যার রাজনৈতিক মাত্রা উন্মোচন করে নিজের স্বর শোনাতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। এই দৃষ্টান্তের মাধ্যমে গায়ত্রী স্পিভাকের চিন্তার যে সরল মর্ম আমরা উদ্ধার করতে পারি তা হলো, নিম্নবর্গ বা দলিত শ্রেণী সর্বদা সামজিক চলিষ্ণুতার বাইরে থাকে, চিহ্নিত করা যায় এমন ক্রিয়ার গড়ন-ধরন কখনোই নিম্নবর্গকে এর ভেতরে ঢুকতে দেয় না। নিম্নবর্গ নিজের ক্রিয়াকর্মকে কখনোই শক্তপোক্ত ভিত্তিও দিতে পারে না। তথাপি মধ্যবিত্তের সাংস্কৃতিক চর্চার ভেতরে দলিত নারীর জীবনকে হাজির করতে ও তার স্বর শ্রুতিগোচর করাতে প্রাচ্যনাট ‘ট্র্যাজেডি পলাশবাড়ি’ নাটকটির মাধ্যমে তৎপর হয়েছে।

কিন্তু নারী, বিশেষ করে যখন সেই নারী নিম্নবর্গ বা দলিত তখন তার স্বরটি শ্রেণীগত ও পুরূষতন্ত্রগত কারণে বাস্তবে কতটুকু শোনা যায়? আজাদ প্রতিরূপায়ণে (রিপ্রেজেন্টেশনে) দলিত নারীর স্বর শোনাতে [নিশ্চিতভাবেই দেখাতে] এই নাটক লিখেছেন ও প্রাচ্যনাটের অধিকতর তরুণদের নিয়ে উপস্থাপনও করেছেন। কাব্যের আঙ্গিকে বর্ণনা ও সংলাপের মিশেলে ঢাকায় বর্তমানে খুব চালু ফর্মটিকেই তিনি বেছেছেন। নাটকের দলিততম নারীর স্বর শোনাবার লক্ষ্যে আজাদ উপলক্ষ্য হিসেবে বেছে নিয়েছেন আন্তর্জাতিক লগ্নির যোগসাজশে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের পোশাক ব্যবসার একটি ক্ষেত্রকে, পোশাক কারখানার একটি ভবনধ্বসের ঘটনাকে, ধ্বসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে এক নারীর অন্তিম জীবনকে। নাটকের তারাভান নামের মেয়েটি জীবন ও মৃত্যুর চরমতম সন্ধিস্থলে একটা রুদ্ধশ্বাস উৎকণ্ঠার আবহে নিজের জীবনের কথা বলছে, যখন ওর নিজেরই জীবন নিঃশেষ হতে চলেছে। গার্মেন্টস শ্রমিক মেয়েটির প্রাণান্ত কথনের ভেতরে দগদগে হয়ে ওঠে ব্যক্তি হিসেবে সমাজে ওর যথার্থ অবস্থান খুঁজে পাবার বাসনা। এটা হলো মানুষ হিসেবে মেয়েটির মর্যাদার প্রশ্ন। আর্থার মিলার একে যেমন বলেন, সেন্স অফ পার্সোনাল ডিগনিটি।৩  “ওরেস্তেস থেকে হ্যামলেট, মিডিয়া থেকে ম্যাকবেথ প্রত্যেকের নিহিত সংগ্রামের মধ্যেই লক্ষ্য করা যায় নিজের সমাজে যথাযথ অবস্থান অর্জন করতে ব্যক্তি প্রাণপণে চেষ্টারত।”৪ গাইবান্ধার পলাশবাড়ি থেকে সাভারের পলাশবাড়ি পর্যন্ত আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে মেয়েটির একজীবনপরিক্রমার মধ্যে বিধৃত হয় এই তীব্র প্রচেষ্টা। এভাবেই এই নাটকের ট্র্যাজেডি সংঘটিত হয়। ‘ট্র্যাজেডি পলাশবাড়ি’ উপলক্ষে মিলারের চিন্তার প্রাসঙ্গিকতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বলা যাবে, “তাহলে নিজেকে ন্যায়সঙ্গতভাবে মূল্যায়নের জন্য ব্যক্তির সর্বাঙ্গীন বাধ্যবাধকতারই ফলাফল হলো ট্র্যজেডি।”৫ পলাশবাড়ির মেয়েটির বাধ্যবাধকতা স্ফূট হয় গ্রাম থেকে শহরের অভিবাস, আবার প্রেম, পুনরায় বিয়ে, বাঁচার জন্য কাজের উল্লাসের মধ্যে তার দুই জীবনের রূপান্তরের প্রক্রিয়ায়। ধ্রুপদী গ্রিক ট্র্যাজেডির মহান রাজন্যদের মহিমময়জীবন যেমন অদৃষ্টের ক্রীড়নক, তেমনি মতই যেন ‘ট্র্যাজেডি পলাশবাড়ি’র শ্রমজীবী সাধারণ মেয়েটির জীবনের পরিণতি যেন বড়ই নিয়তিচালিত। অথচ এই নাটকের আদিতে কেন্দ্রীয় চরিত্র তারাভানের জীবনের আর্থ-সামাজিক প্রতিকূলতার শর্তগুলো এতে শুঁড় তুলছিল। তবুও অবশেষে মেয়েটির জীবনের পরিণতি আমাদেরকে, আমাদের সময়কে, আমাদের তুচ্ছ অস্তিত্ত্বকে করুণা ও ভীতি জাগানিয়া ট্র্যাজেডিরই মুখোমুখি করে। কারণ, ভবনধ্বসে মেয়েটির মৃত্যুকে সমস্যাজনকভাবেই নিয়তিতাড়িত মনে হয়। অথচ নাটকের আদি-মধ্য জুড়ে কী অসাধারণভাবেই না মেয়েটিকে ইচ্ছা ও কর্মের স্বাধীনতা দিয়ে চালিত হতে দেখা গেছে। কিন্তু নাটকটি ক্রমে ক্রমে এমন এক পরিসমাপ্তির দিকে গেছে, যাতে শেষপর্যন্ত মনে হয় মেয়েটি কপালকুণ্ডলা, ভাগ্যলাঞ্ছিতা, নিয়তির ক্রীড়নক নিদারুণ অসহায়া অবলা পুত্তুলি। নাটকের এই পরিণতি ও দর্শকের মধ্যে এই বোধের সৃষ্টির মধ্যদিয়ে পলাশবাড়ি উপরতলে ট্র্যাজেডি। কারণ এই নাটক, এর অভিনয় ও উপস্থাপনার অন্যান্য অনুষঙ্গ সবকিছুই যথেষ্টভাবে তৎপর থেকেছে দর্শককে কেন্দ্রীয় চরিত্রের সাথে সমানুভূতিপ্রবণ (এমপেথিক) করতে। দর্শকের বুকের কাঁপন চোখের ছলছল কেন্দ্রীয় চরিত্র  (প্রোটাগনিস্ট) মেয়েটির জীবনের বিয়োগান্তকতার প্রতি সমানুভূতিমূলক এক সর্ম্পককেই হাজির করে। কিন্তু এর ফলে এই নাটকের এই ট্র্যাজেডির সম্ভাব্য আরেকটি মাত্রা, আরেকটি কেন্দ্রীয় [খল] চরিত্র আমাদের আপ্লুত হওয়ার অবকাশযাপনের প্রক্রিয়ার ভেতরতল দিয়ে ফসকে গেছে। বেমালুম গায়েব হয়ে যাওয়া এই চরিত্রটি কোনো ব্যক্তি নয়। এক ব্যবস্থা। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। নাটকের ভবনধ্বস নিছক কোনো দুর্ঘটনা নয়। পুংলিঙ্গীয় উত্তেজনাতাড়িত উদ্বৃত্তমূল্যতাত্ত্বিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার (লিবিডোনাস ইকোনোমিকসের) মুনাফাখোর দাঁতাল কপাটির প্রতীক এই ভবনধ্বস। অথচ এই ট্র্যাজেডির সংঘটনের অর্থনীতিক ও সমাজতাত্ত্বিক শর্তগুলোই ক্ষীণতর হয়ে অবশেষে অব্যাখ্যাত থেকে যায়। এমনকি, প্রযোজনায় প্রজেকশনের মাধ্যমে বহির্দেশীয় বিশ্লেষকের আবির্ভাব ঘটানো হলেও তা ব্যাখ্যামূলক নয়, বরং মিমিক্রি হয়ে ওঠেছে।

গরিবি, শোষণ, অস্থিরতা, ক্ষমতার অসম বিন্যাস, অধস্তনতা, পরিবেশের নিঃশেষকরণ, সম্পদ ও ক্ষমতার অসাম্য এই সবই পুঁজিবাদের অবিচারকে তুলে ধরে। এই অবিচারের নানান ভয়ঙ্কর প্রকাশের একটি এই ভবনধ্বস। পুঁজিতান্ত্রিক এই অবিচারের ব্যবস্থাগত ইতিহাসের একটি বিশেষ পর্যায়ে, এ ধরনের ট্র্যাজেডি অনিবার্য হয়ে ওঠে। এই ট্র্যাজেডি পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার সমুদয় শর্তের যোগফল। অথচ এই নাটকে ট্র্যাজিক ফলাফল তৈরি হয়েছে কিন্তু এর সেইসব আর্থ-রাজনৈতিক-সামাজিক শর্ত ও পুঁজিতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটি উন্মোচিত হয়নি।

লুই আলথুসার ‘অন আইডিওলজি’ বইয়ে ভাবাদর্শ বিষয়ে বলতে গিয়ে শিল্প ও ভাবাদর্শের সম্পর্ক নিয়ে যা লিখেছেন তা থেকে আলোকিত হয়ে এখানে প্রসঙ্গক্রমে বলা যায়: “আমি জানি শিল্পী ও শিল্পপ্রেমীরা সৃষ্টির লক্ষ্যে নিজেদেরকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশ করে। এটা একটা ‘স্বতঃস্ফূর্ত’ ভাষা কিন্তু মার্কস ও লেনিন থেকে আমরা জানি প্রতিটা ‘স্বতঃস্ফূর্ত’ ভাষা আাদতে একটা ভাবাদর্শিক ভাষা।”৬ কিন্তু প্রশ্ন হলো আলোচ্য নাট্যকর্মটি কোন ভাবাদর্শের ভাষা? আমার তর্ক হলো, এই প্রযোজনা সজ্ঞানে (কনশাসলি) যে ভাবাদর্শের বিরোধিতা করেছে অজ্ঞানে (আনকনশাসলি) সেই ভাবাদর্শেরই ভাষা হয়ে ওঠেছে। কিন্তু সেটি কীভাবে? আবারও আলথুসারকে ভর করে এই প্রস্তাবকে পর্যালোচনা করা যেতে পারে। আলথুসার বলেন, শিল্পের ব্যতিক্রমী দিকটি হলো এটি “আমাদেরকে দেখায়” (মেক আস সি), “আমাদেরকে অনুধাবন করায়”  (মেক আস পারসিভ), “আমাদেরকে অনুভব করায়” (মেক আস ফিল) এমন কিছু যা বাস্তবকে পরোক্ষে ইঙ্গিত করে।”৭ বালজাক ও সোলঝেনেৎসিনের উপন্যাসের দৃষ্টান্ত দিয়ে তিনি বলেছেন, এগুলোও তাই করেছে। কিন্তু যা করেনি তা হলো, বাস্তবকে জ্ঞাত করেনি (নট নো)। জ্ঞাত করানোর প্রক্রিয়াটি তখনি শুরু হয়, যখন ভাবাদর্শিক স্বতঃস্ফূর্ততার ভাষার সাথে, আর সকল জ্ঞানের মতোই, শিল্প সংক্রান্ত [অধিপতিশীল] জ্ঞানেরও একটি বিচ্ছেদ ঘটানো বা ফাটল তৈরি করা সম্ভবপর হয়।৮ “আমি এখন বিশ্বাস করি শিল্পের সত্যকার জ্ঞানে পৌঁছানোর একমাত্র পথ হলো একটি শিল্পকর্মের প্রজাতিগত পুঙ্খানুপুঙ্খতার নির্দিষ্টতার এক্কেকবারে গভীরে যাওয়া, কোনো কৌশল/অবস্থা/পরিস্থিতি ‘নান্দনিকতার প্রভাব/ইফেক্ট’ তৈরি করে তা জানা।”৯ আলথুসারের মোদ্দা কথা হলো  শিল্প সংক্রান্ত আধিপত্যকামী জ্ঞানের বিরোধিতার মাধ্যমে অন্য জ্ঞানের হদিশ নেওযা। প্রচলিত অধিপতিশীল জ্ঞানের ক্রীতদাসত্ব বরণ না করে শিল্পের আলোচনা-পর্যালোচনাকেই কেবল শিল্প বিষয় ওই অন্য জ্ঞান বলা যথেষ্ট নয়। বরং এই নাটকের পুরো প্রেক্ষাপট, এই ট্র্যাজেডি সংঘটনের সামগ্রিক বাস্তবতা সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়াও শিল্পসৃষ্টি সংক্রান্ত ওই অন্য জ্ঞানেরই অন্বেষণ করা। সেকারণেই পলাশবাড়ির ট্র্যাজেডি সংঘটনের ব্যবস্থাগত বাস্তবতার হদিশ নেওয়া দরকার, অথচ সে খোঁজ অনায়াসে আমরা এই নাটক থেকেই পেতে পারতাম।

রবিন হুহনেলের ‘অল্টারনেটিভস টু ক্যাপিটালিজম: প্রপোজালস ফর এ ডেমোক্রেটিক ইকোনমি’ বইয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে উঠে এসেছে পুঁজিবাদ বিরোধী পার্টিসিপেটরি ইকোনমিক্স বা অংশগ্রহণমূলক অর্থনীতির একটি মডেল।১০ এই মডেল থেকে আমরা অবশ্যই জ্ঞাত হতে পারি যে, শ্রমিক এবং সোপানে সোপানে বিভক্ত শ্রম সংগঠন অংশগ্রহণমূলকভাবে অর্থনীতিকে গড়ে তুলতে থাকে। কিন্তু এর ফলভোগের একচেটিয়া ধরন একে কার্যত অগণতান্ত্রিক ও বৈষম্যের এক ব্যবস্থায় পরিণত করে। আদতে বাজার ব্যক্তিগত, মালিকানা ও প্রাধান্যপরম্পরাভিত্তিক (হায়ারার্কিক্যাল) শ্রম বিভাজনের বিভীষিকাময় ব্যবস্থাই স্পেকট্রাম ফ্যাক্টরি ভবনধ্বসকে সংঘটিত করে। এই ভবনধ্বস ও পলাশবাড়ির এই মেয়েটির মৃত্যু পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার অর্ন্তনিহিত প্যারাডক্স বা নৈতিকতাজনিত অস্বীকারেরই প্রকাশ।

স্লোভেনিয় মার্কসবাদী চিন্তক স্লাভো জিজেক মুক্তবাজার ব্যবস্থাকে একধরনের মৌলবাদ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।১১ নিউ এপিপিএস অর্থাৎ আর্ট পলিটিক্স ফিলসফি সাসেন্স নামের এই ব্লগে তিনি গণতন্ত্র ও পুঁজিবাদের ‘চিরস্থায়ী’ বিবাহবন্ধনকে তালাকের কাছাকাছি বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে বৈশ্বিক পুঁজিবাদ একটি জটিল প্রক্রিয়া। এতে একেক দেশ একেকভাবে আক্রান্ত হচ্ছে। আজকের বৈশ্বিক পুঁজিবাদের সাধারণ প্রবণতা হলো বাজারের আরো বিস্তৃতি, সর্বজনের জায়গাগুলোর দখল, সর্বজনের সেবাখাতগুলোর [যেমন স্বাস্থ্য শিক্ষা সংস্কৃতির] ক্রমে ক্রমে সংকোচন এবং ধাই ধাই করে বাড়ন্ত কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক ক্ষমতা। প্রদর্শিত নাটকটির পরিণতির বিপরীতে এসে আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারি, পলাশবাড়ির তারাভানের ট্র্যাজেডির কারণ চরিত্রের অদৃষ্টে নয়, বরং বৈশ্বিক পুঁজিবাদের উল্লিখিত এই জটিল প্রক্রিয়ার ভেতরে সুপ্ত আছে। ব্যথিত হওয়ার ব্যাপার হলো, এই কারণ যেটি নাটকে নেই কিন্তু বাস্তবের সম্যক বিশ্লেষণে দেখতে পাওয়া যায় তা আছে। বাংলাদেশ শুধু সস্তা শ্রম বাজার নয়, সস্তায় শ্রম কেনার মাধ্যমে, বৈশ্বিক পুঁজির লগ্নিতে উৎপাদিত নানা পণ্য কেনার জন্য স্থানীয়ভাবে একটি নতুন বাজারেও পরিণত হতে চলেছে। এর মাধ্যমে গার্মেন্টস শ্রমিকেরাও শ্রম বিক্রি ও ভোগের একটা লিবিডোনাস অর্থনীতির চক্করে পড়ে। বার্টল্ট ব্রেখটের ‘দ্য মেজারস টেকেন’ নাটকের ‘মানুষ কী’ নামক পঞ্চম দৃশ্যে একজন ব্যবসায়ী তার কাছে অভ্যাগত তরুণ কমরেডকে বলে, আমি আমার কারখানার শ্রমিককে ততটুকুই মজুরি দিই, যাতে সে আমার ক্যান্টিন থেকে নিম্নমানের চাল কিনে খেয়ে আমার জন্যই আবার কাজ করতে পারে। আসলে একজন ব্যবসায়ী একজন শ্রমিককে যতটুকু মজুরি দেয়, আবার খাবার [পণ্য] বিক্রির মাধ্যমে ততটুকু সে হাতিয়েও নেয়। কারণ, মানুষ কী তা একজন ব্যবসায়ী জানে না, তবে মানুষের বাজারদর কত তা সে জানে। এই দর-ধরা বাজারে হারায় শুধু শ্রমিক। উৎপাদিত পণ্য থেকে মুনাফার মাধ্যমে, উদ্বৃত্ত মূল্যের স্ফীতির চক্রের মাধ্যমে, পুঁজিপতির লগ্নি ও সঞ্চয় কেবলি কুষ্ঠরোগীর দগদগে অসুখের মতন আরো স্ফীত হতে থাকে। শ্রমিকের সর্বহারা হবার প্রক্রিয়া তো তাই। রাষ্ট্রের মধ্যস্থতা, আমেরিকা ও ইউরোপের ‘ট্রেড ইউনিয়ন’ ও ‘মানবাধিকার’ ওষুধপত্র প্রভৃতি চাপসৃষ্টিকারী উপাদানগুলোর উপস্থিতিতে বাংলাদেশের অতি দারিদ্রকবলিত ও পুরূষতান্ত্রিকতা দিয়ে শাসিত গ্রামগুলোর মেয়েরা আপাতভাবে ‘স্বনির্ভরতার সুখ’ ও ফেয়ার এন্ড লাভলীর ফর্সা মুখের দাওয়ায় নাগালে পেলেও, বাসনার নতুন নতুন চক্কর কিন্তু তাদেরকে ছাড়ে না। ভোগ-বাসনার সৃষ্টি ও বাজার বৃদ্ধিও পারস্পরিক সম্পর্কিত কায়দা আাসলে দর-ধরা ব্যবসায়ী ব্যবস্থারই একটি অভিব্যক্তি মাত্র। এমনকি বৈশ্বিক পুঁজির যে স্থানীয় মধ্যস্বত্বভোগী গার্মেন্টস মালিক শ্রেণী, তারাওতো এই বাজারদরভিত্তিক বাস্তবতার ঈশ্বরতুল্য স্থানীয় নিয়ামক। ফলে এই শর্ত ও প্রক্রিয়াকে অনুধাবন নিশ্চিতভাবেই রাজনৈতিক শিল্পের জ্ঞানগত কর্ম। এই কর্ম সম্পন্ন হয়েছি কি? প্রযোজনাটি ঘিরে আমাদের সেই প্রশ্নের উত্থাপন করা দরকার।

মোদ্দাকথা হলো, আবেগের ঘনীভবন নিশ্চিতভাবে পুঁজিবাদের ভাবাদর্শিক ভাষাকেই তুলে ধরে। কারণ সমানুভূতি, [ট্র্যাজেডি পলাশবাড়ি] নাটকে নির্মিত কাহিনীর প্রতি আপ্লুত করে রাখে দর্শককে। দর্শক তখন বাস্তব থেকে মুখ ফিরিয়ে শোকে বিহ্বল থাকে। আর পুঁজিবাদের লক্ষ্যই তাই। দর্শকের চিন্তার পক্ষাঘাতগ্রস্ততার ভাবাদর্শই পুঁজিবাদের সাংস্কৃতিক ভাবাদর্শ। এমপেথি অর অসমোসিস অধ্যায়ে বোয়ালের বিশ্লেষণ পাঠের মাধ্যমে আমরা তাই শিখতে পারি।১২ বার্টল্ট ব্রেখট যেমন এপিক থিয়েটার ও ড্রামাটিক থিয়েটারের পার্থক্য উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন, নান্দনিক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে দর্শককে সেনসেশন বা সংবেদনগ্রস্ত করার বিপরীতে বরং পৃথিবীর বাস্তবতা সম্পর্কে একটা সম্যক চিত্র তুলে ধরে, যুক্তিশীল সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা জাগিয়ে দর্শককে সমাজ রূপান্তরের কর্মে উদ্বুদ্ধ করা যায়। ট্র্র্যাজিক ফলাফলরূপে ট্র্রাজেডি পলাশবাড়ি পুঁজিতন্ত্রের সাংস্কৃতিক ভাবাদর্শের ইচ্ছামাফিক নিজের অজান্তেই অতিশয় আবেগ উৎপাদনে যারপর নাই নিবিষ্ট থেকেছে। এর ফলে, দর্শক শোকার্ত হয়েছে, সম্যক বাস্তবতা নিয়ে চিন্তিত হয়নি। নিশ্চিতভাবেই আবেগপ্রবণতা ও চিন্তাশীলতার দ্বান্দ্বিক বিরোধ এই নাটকের মৌলিক প্রভাব হতে পারতো। পুঁজিতন্ত্রের আবেগ-উৎপাদনী সাংস্কৃতিক রাজনীতির ফান্দে পড়া ‘ট্র্যাজেডি পলাশবাড়ি’-র দর্শককে আস্তিনে লুকানো আবেগের পুঁটলি হিসেবে [আনকনশাসলি] অনুমান করেনি শুধু, দর্শককে এমন মানুষ হিসেবে ভাবা হয়েছে যে, সে এক স্থির বিন্দু। অথচ মানুষ এক প্রক্রিয়া। তার রূপান্তরের শক্তি অসীম।১৩

২য় তর্কের প্রসঙ্গ ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ : শ্রেণীলুপ্তির অনৈতিহাসিকতার খপ্পর

হেলেনা ওয়াল্ডমান ও ইকোটোপিয়া ড্যান্স প্রোডাকশন বাংলাদেশের উদীয়মান অর্থনীতির প্রধান খাত গার্মেন্ট পণ্য উৎপাদনী শ্রমিকদের নিয়ে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ নামে একটি শক্তিশালী নৃত্য [নাট্যের] নিরীক্ষা করেছে। তাদের এই প্রকল্পে সাহায্য করেছেন নাজমা আকতার। তিনি শিল্পখাতে শোষণের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী সুপরিচিত একজন প্রচারকর্মী। ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ২০১৪ সালের নভেম্বর থেকে জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, লুক্সেমবার্গ ও ভারতে উপস্থাপনের পর ‘সাধনা’ বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ও গ্যাটে ইনস্টিটিউটের সহযোগিতায় এ বছরের [২০১৫ সালের] জানুয়ারির ২৬ তারিখে ঢাকার জাতীয় নাট্যশালায় মঞ্চস্থ হলো। বার্লিনভিত্তিক কোরিওগ্রাফার হেলেনার ভাবনায় নির্মিত এই প্রযোজনার বিষয়বস্তু ‘নাচ ও শোষণ’-তাদের প্রচারপত্রে তাই উল্লেখ আছে। নাচ ও শোষণের সম্পর্কের বৈশ্বিক সাধারণীকরণ দেখাতে তারা বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্পের একটি কারখানা ও জার্মানির একটি ড্যান্স স্টুডিয়োর চালচিত্র উপস্থাপন করেছেন এথনোকোরিওগ্রাফিক পদ্ধতিতে। সামাজিক গবেষণার এই পদ্ধতি স্থানীয় কোনো জীবনধারাকে অংশগ্রহণের ভিত্তিতে নৃত্যের ভাষায় নথিবদ্ধ করতে জ্ঞানতাত্ত্বিক হাতিয়াররূপে ভূমিকা রাখে। গার্মেন্টশ্রমিকদের জীবন তুলে ধরতে এথনোকোরিওগ্রাফিক এই পদ্ধতি খুব যে কার্যকর হয়েছে তা এই অঞ্চলের অন্যতম নৃত্যাঙ্গিক কত্থকের প্রয়োগে প্রমাণিত হয়। প্রথমত নাচের অভিজাত আঙ্গিককে শ্রমিকের জীবনের ভাষায় পরিণত করার নিরীক্ষাটি নান্দনিকতার রাজনীতিকে স্পষ্ট করে। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে কত্থক এক উচ্চ মার্গীয় নৃত্যভাষা। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণীই মূলত এই নাচের শিল্পী ও এর নন্দনভোক্তা। অন্যদিকে, এদেশের সামাজিক স্তরবিন্যাসে গার্মেন্ট শ্রমিকেরা নিচুতলার মানুষ, ব্রাত্যজন। ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ নৃত্য প্রযোজনার গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অভিজাত শ্রেণীর কুক্ষিগত শিল্পভাষাকে এটি অনভিজাত শ্রেণীর জীবন রূপায়ণের ভাষায় পরিণত করেছে। সাংস্কৃতিক মাপকাঠিতে বিরাজমান বাস্তবের শ্রেণীপরিচয়, শিল্পে এসে এভাবেই উল্টে গেছে। যাহা [উচ্চ] মার্গ তাহা হয়ে উঠেছে ব্রাত্য। এতে উপলব্ধি করা যায় শিল্পভাষার চর্চা ও উপভোগ শ্রেণীসাপেক্ষ হলেও, শিল্পের ভাষা শ্রেণীনিরপেক্ষ। এই সাপেক্ষতার খোলস ভেঙে দিতে পেরেছেন হেলেনা, বিক্রম ইয়েঙ্গার ও তাদের দল। এই ভেঙে দেয়ার নান্দনিক প্রক্রিয়াটি বিধ্বংসী ও বিনির্মাণের। এইরকম নিরীক্ষার ভেতর দিয়ে গঠিত নান্দনিকতার ভাষাকেই রাজনৈতিক শিল্পভাষা বলা যায়। পেছনের স্থির পর্দায় শ্রমিকদের প্রতিদিনের কর্মসংক্রান্ত তথ্য-উপাত্তসহ অন্যান্য কিছুর ভিডিও প্রজেকশন, সাইকোডেলিক বৈশিষ্ট্যের শব্দকোলাজ যোগে বাংলাদেশের ১২ জন কত্থক নৃত্যশিল্পীদের শ্রমিকের চরিত্রাভিনয় এবং কত্থকের আঙ্গিক নির্ধারক পদবিক্ষেপ, হস্তমুদ্রা ও বোলের মাধ্যমে উপস্থাপিত এই এথনোগ্রাফিক রাজনৈতিক নান্দনিকতা কিন্তু একটি নৈতিক ক্রিয়াকেও অভিনীত করে। আমেরিকান পারফরম্যাান্স (পরিবেশনা) বিদ্যাবিশারদ ডুইট কংকারগুড পারফরম্যান্সের এথনোগ্রাফির নীতিগত মাত্রাগুলোর আলোচনায় অভিনয়কে একটি নৈতিক ক্রিয়া হিসেবেই দেখেছেন।১৪ ক্লিফোর্ড গিয়ারৎজ, ওয়ালেস বেকন ও মিখাইলে বাখতিনের ভাবনা-চিন্তায় অনুপ্রাণিত হয়ে কংকারগুড সাক্ষ্য দিচ্ছেন, জীবনের অর্থপূর্ণতাকে আরো গভীর ও স্বচ্ছ করার বিশ্বজনীন মানবিক খনিজ-উৎস হিসেবে সাংস্কৃতিক পরিবেশনার ঐক্য ও বৈচিত্র পাঠ করেন এথনোগ্রাফরগণ। দুই অংশে বিন্যস্ত মেড ইন বাংলাদেশেও আমরা দেখি এর নির্মাতা ও কুশীলবেরা কত্থকের প্রচলিত সাংস্কৃতিক শ্রেণীগত অর্থের বিপর্যাস ঘটিয়ে একটি নান্দনিক নিরীক্ষা করেছেন। গার্মেন্ট শ্রমিকদের জীবনের অর্থপূর্ণতাকেই আরো গভীর, আরো স্বচ্ছ করে তোলার লক্ষ্যেই তাঁরা তা করেছেন। এই লক্ষ্যের ভেতরে স্ফূট হয়ে ওঠে অভিনয়ের নৈতিক ক্রিয়া। কিন্তু এই নৈতিক ক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে যখন এই পরিবেশনার ১ম অংশের শেষে একটি অসাধারণ আতঙ্ক [ট্রমা] রূপায়িত একটি অনন্য খণ্ডদৃশ্যের শীর্ষাবস্থার পর এপিলগ হিসেবে বলে, ‘উই আর হ্যাপি।’ এই শেষ সংলাপের ফলে, পুঁজিতান্ত্রিক শোষণের ভেতর থেকে দর্শকের পক্ষে যে চাপা পরিহাস বা শ্লেষটুকু আহরণ করা সম্ভব হতে পারতো, তা সম্পূর্ণ চ্যাপ্টা ও নস্যাৎ হয়ে যায়। তাছাড়া, এই পরিবেশনার দ্বিতীয় খোড়ল হচ্ছে জার্মানির ড্যান্স স্টুডিয়োকে শ্রম শোষণের ক্ষেত্র হিসেবে বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্পের সাথে প্রতিতুলনার চেষ্টা করা। এই অংশটি এমনিতেই ভাবনাগত দিক থেকে প্রথম অংশের তুলনায় নিতান্ত দরিদ্র। সম্পদের দারিদ্র কবিকে মহান করে, চিন্তার দারিদ্র শিল্পকে খর্ব করে। এই দ্বিতীয়াংশে, পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার পূর্ব-পশ্চিমের ভেদাভেদহীন একটি সাধারণীকরণ ঘটেছে। বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্পের সাথে ইউরোপের শিল্পোন্নত একটি দেশ জার্মানির নৃত্যশ্রমখাতের সাদৃশ্য হাজির করার ফলে একটি ব্যবস্থা হিসেবে পুঁজিবাদের যে নানামাত্রিক প্রক্রিয়াগত ইতিহাস রয়েছে তা এক নিদারুণ হস্তক্ষেপের শিকার হয়। এখন প্রশ্ন হলো, ইতিহাসের সত্য রক্ষার দায় পূরণে শিল্পের আদৌ কোনো ঠেকা আছে কি? কারণ শিল্প তো মূলত কল্পনার শস্য। একটি নির্দিষ্ট শিল্পকর্মের বিষয়ভাবনা ও প্রকাশভঙ্গির ঐক্যযোগে তৈয়ার হওয়া এর কাঠামোই কল্পনার সীমারেখাটিও নির্দিষ্ট করে দেয়। সীমালঙ্ঘন করা বল্গাহীন কল্পনা ঔরসজাত শিল্পটিকেই টুঁটি চেপে ধরে। বাংলাদেশের শ্রমজীবী আর জার্মানির নন্দনজীবী উভয়েই জীবিকার জন্য শরীরকে লগ্নি করলেও এটাতো নিশ্চিত যে, তাদের উৎপাদিত পণ্যের তারতম্য ও ভোগের ধরন এবং সর্বোপরি দুই সমাজ-রাষ্ট্রের শ্রমজীবীর দুই ধরনের ঐতিহাসিক অবস্থান এক নয়, কারণ, বাংলাদেশ ও জার্মানির  সমাজ রূপান্তরের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াটাই আলাদা। তাছাড়া গার্মেন্ট শ্রমিকেরা নিতান্তই শ্রমিক। আর নৃত্য শ্রমিকেরা শিল্পীও বটে। যে শ্রমিক একই সাথে শিল্পী এবং যে শ্রমিক কেবলি শ্রমিক, এই দুই শ্রমিক প্রকৃতপক্ষে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীগত পরিচয়কে নিহিত বৈশিষ্ট্যের কারণেই বহন করতে অক্ষম। ফলে, শ্রমিক হওয়া সত্ত্বেও তারা দুটো শ্রেণীভুক্ত। উভয়কে সাধারণীকরণের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী শোষণ ও মানবাধিকারের ইস্যু সংক্রান্ত ইউরোপিয় ইউনিয়নের অফিসিয়াল ভাবনা ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ নামের এই নান্দনিক অভিব্যক্তির মোড়কে হয়তো বৈধতা পেয়ে যায়, কিন্তু এই দুই শ্রেণীর সামাজিক-ঐতিহাসিক-চারিত্রিক পার্থক্য সম্পূর্ণ লোপাট করা যায় না। নিরীক্ষার নতুনত্বে উদ্ভিন্ন প্রযোজনা ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ এই অনৈতিহাসিকতার খপ্পরে নিপতিত হয়েছে । 

   
৩য় তর্কের প্রসঙ্গ ‘ম্যাকাব্রে’ : কপালকুণ্ডলা সৃজনশীলতা

সেন্টার ফর এশিয়ান থিয়েটার (সিএটি)-এর সাম্প্রতিক প্রযোজনা সম্পর্কে তাদের প্রচারপত্র থেকে একটি উদ্ধৃতির মাধ্যমে এই তর্কের অবতারণা করা যায়: “ম্যাকাব্রে একটি প্রথাবিরুদ্ধ থিয়েটার পারফর্মেন্স, যেখানে ব্যবহৃত হয়েছে বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তি, বিশেষ করে ভিডিওগ্রাফি, অ্যানিমেশন, ত্রিমাত্রিক প্রজেকশন ম্যাপিং, স্থাপনা শিল্প এবং সেই সঙ্গে পূর্ব-পশ্চিমের লিভিং আর্ট।” এই বিবৃতির সাক্ষ্যে আমরা লক্ষ্য করতে পারি, সিএটি তাদের প্রযোজনাটিকে “প্রথাবিরুদ্ধ থিয়েটার পারফর্মেন্স” হিসেবে দাবি করেছেন। আর তাদের কাছে কেন সেটি ‘প্রথাবিরোধী’ তার যুক্তি হলো এখানে “ব্যবহৃত হয়েছে বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তি, বিশেষ করে ভিডিওগ্রাফি, অ্যানিমেশন, ত্রিমাত্রিক প্রজেকশন ম্যাপিং, স্থাপনা শিল্প এবং সেই সঙ্গে পূর্ব-পশ্চিমের লিভিং আর্ট।” এখন প্রশ্ন হলো ইত্যাদি প্রযুক্তির প্রয়োগেই কি একটি পারফরম্যান্স প্রথাবিরোধী হয়ে ওঠে? প্রথাবিরোধিতার দাবির মধ্যে আসলে এর নাট্যকার পরিচালক ও প্রযোজক সংগঠনের কি এমন আকাক্সক্ষা লুকিয়ে আছে যে এগুলো তারাই প্রথম ব্যবহার করেছেন? এবং এ কারণেই কি তা প্রথাবিরোধী? প্রযোজকদের অভিলাষের কুহকজাল ছিঁড়ে এই প্রযোজনার পাঠইবা কীভাবে নেয়া যেতে পারে? এই সব প্রশ্নের মীমাংসার প্রয়োজনে তাহলে আমাদের প্রথমেই হদিশ নিতে হবে ঢাকার নাট্যে প্রভৃতি প্রযুক্তি ব্যবহারের আদৌ কোনো প্রথা কি রয়েছে? যদি থাকে তবে সেটিকে প্রথা হিসেবে চিনবোই বা কী করে। আসলে আমাদেরকে খোঁজ করতে হবে প্রথা কী এবং এর বিরোধিতারই বা তাৎপর্য কী। তাছাড়া, এই প্রযোজনাটির অর্থইবা কী-এমন আরো অনেক কিছুরই সুলুক সন্ধান করতে হবে।

মাল্টিমিডিয়ার প্রয়োগ ঢাকার নাট্যচর্চায় এখন অভিনব কিছু নয়। ২০০৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার এ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ (তৎকালীন নাট্যকলা) বিভাগের উৎসবে রেহমুমা হোসেনের নির্দেশনায় স্যামুয়েল বেকেটের ‘ক্যাটাস্ট্রফি’ নাটকে ও আব্দুল কাইয়ুম ভূইয়াঁর নির্দেশনায় ফ্রানজ কাফকার ‘মেটামরফোসিস’ এবং ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে জিয়াউল হক তিতাস নির্দেশিত ‘উল্টোরথ’ প্রযোজনাতেও উল্লেখযোগ্য মাত্রায় মাল্টিমিডিয়ার ব্যবহার হয়েছে। বিশেষত ২০০৯ সালে প্রাচ্যনাট তাদের ‘রাজা এবং অন্যান্য...’ প্রযোজনায় ব্যাপকভাবে ইন্টারটেক্সুয়াল উপাদান হিসেবে এ ধরনের প্রযুক্তিকে ব্যবহার করেছে। এরও অনেক আগে, আশির দশকে, নাট্যদল ‘থিয়েটার’ তাদের ‘যুদ্ধ এবং যুদ্ধ’ প্রযোজনায় মাল্টিমিডিয়া ব্যবহার করে। থিয়েটারওয়ালা রেপাটরি প্রযোজনা ‘শাইলক এ্যান্ড সিকোফ্যান্টস’, প্রাচ্যনাটের নতুন নাটক ‘ট্র্যাজেডি পলাশবাড়ি’-সহ আরও অনেক নাটকের নাম উল্লেখ করা যায়, যেসব নাটকে এ ধরনের প্রযুক্তি বেশ প্রাসঙ্গিক ও সফলভাবে ব্যবহার করেছে। ২০১৩ সালে গ্যাটে ইনস্টিটিউট ‘অডিসি কমপ্লেক্স’ নামে একটি পারফরম্যান্স নাট্যশালায় প্রদর্শনের আয়োজন করে যার প্রধান সিনোগ্রাফিক উপাদান ছিল ভিডিওগ্রাফি। গত বছর আকরাম খান কোম্পানি ‘দেশ’ প্রযোজনায় ইত্যাদি প্রযুক্তির মহোৎসব দেখিয়ে গেছে ঢাকার দর্শককে। এখানে আরও উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করছি যে, কামালউদ্দিন নীলুরই নির্দেশনায় খোদ সিএটিই এর আগে কয়েকটি নাটক মঞ্চে এনেছে, যেগুলোতে মাল্টিমিডিয়া বা ভিডিওগ্রাফি, অ্যানিমেশন ইত্যাদি ইত্যাদির ব্যাপক ব্যবহার হয়েছে।

হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় বঙ্গীয় শব্দকোষ-এ প্রথা অর্থ দেখাচ্ছেন: পদ্ধতি, রীতি, ধারা যার ইংরেজি কাস্টম।১৫ যদি তাই হয় তাহলে ঢাকার নাট্যচর্চা ও দর্শকের অভিজ্ঞতার উদাহরণ “বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তি” ব্যবহারের পদ্ধতিকেই প্রতিষ্ঠিত করে এবং এটি এ ক’ বছরে চর্চার ভেতর দিয়ে এরই মধ্যে একটি ধারায় পরিণত হয়েছে। অতএব আনিকা মাহিনের লেখা ও কামালউদ্দিন নীলুর ভাবনা পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় ‘ম্যাকাব্রে’র বিভিন্ন প্রযুক্তিগত উপাদান ব্যবহারের নিরিখে একটি প্রথাবিরুদ্ধ প্রযোজনার তকমা গ্রহণ কি যথার্থ? এই প্রযোজনাটি নাট্যের সীমা ডিঙ্গিয়ে পারফরম্যান্স আর্টের অন্য নানান বৈশিষ্ট্য যে আত্মস্থ করেছে এর একটি পশ্চিমা ইতিহাসতত্ত্ব এই আলোচনায় প্রাসঙ্গিক। কারণ, প্রযোজক সংগঠন ‘ম্যাকাব্রে’কে একটি ‘থিয়েটার পারফরম্যান্স’ হিসেবেও আখ্যায়িত করেছেন। এই সূত্রে তারা একে কেন “প্রথাবিরুদ্ধ” বলছেন, এর অন্য একটি সূত্রও আমরা পেতে পারি। এই সূত্রটি কি যে, এটি শধু  থিয়েটার নয়, পাশাপাশি পারফর্মেন্সও। ফলে, একে শুধু থিয়েটার না বলে, পারফরম্যান্সও সঙ্গে জুড়ে দেবার রহস্য উদঘাটনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, যেখান থেকে এর জেনরিক ইমপিউরিটি বা প্রজাতিগত অশুদ্ধতার রূপ ও অর্থ-তাৎপর্য আরো ভালো মতন উপলব্ধ হতে পারে। আঙ্গিকগতভাবে পারফরম্যান্স, শিল্পের এমন ‘এক লুটের থলে যেখানে নাট্য, সংগীত, নৃত্য, চলচ্চিত্র বা দৃশ্যশিল্প কোনোটাই এককভাবে খাপ খায় না’১৬। এজন্য একে ইন্টারমিডিয়াম ও ইন্টারডিসিপ্লিনারি শিল্প নামে সম্বোধনের রেওয়াজ চালু আছে। রিচার্ড শেখনার থেকে জানা যাচ্ছে ১৯৭০এর দশকে ‘পারফরম্যান্স আর্ট’ পরিভাষাটির উদ্ভব।১৭ এই নতুন শব্দ একটি ছাতার মতন যা যেকোনো বর্গীকরণকেই প্রতিরোধ করতে বেপরোয়া। পাশ্চাত্যের উনিশ থেকে বিশ শতক জুড়ে আভাঁগার্দ শিল্পান্দোলনগুলোর বংশগতি খুঁজতে শেখনার বাস্তববাদ, স্বভাববাদ, প্রতীকবাদ, আগামবাদ [ফিউচারিজম], পরাবাস্তববাদ, গঠনবাদ, ডাডা, অভিব্যক্তিবাদ, ঘনবাদ (কিউবিজম), অ্যাবসার্ড থিয়েটার, হ্যাপেনিংস, ফ্লাক্সাস, পরিবেশ [এনভায়রনমেন্টাল] থিয়েটার, পারফরম্যান্স আর্ট... এমন আরো ম্যালা কিছুর একটা লম্বা ফর্দ হাজির করেছেন।১৮ এই রীতি পন্থাগুলা কখনো থিয়েটার, কখনো নৃত্য, কখনো সংগীত, কখনো দৃশ্যশিল্প, কখনো মাল্টিমিডিয়ায় ভর করে নিজস্ব প্রকাশের ভাষা গঠন করেছে। পাশ্চাত্যের বিমূর্ত অভিব্যক্তিবাদী চারুশিল্পীরা শিল্পবস্তুটির চেয়ে বরং শিল্পীর শিল্প সৃষ্টির প্রক্রিয়ার দিকে নজর ঘুরিয়ে দেয়ার ফলে, শিল্প সংক্রান্ত একটি প্রস্তাবনা চিত্রাঙ্গনে পুনরায় ফিরে এসেছিল। তাদের চারুশিল্প নিয়ে সেই প্রস্তাব থেকে জ্ঞাত হয়ে নাট্য বিষয়ক আলোচনার এই ক্ষণে আমরা  বলবো,  [নাট্য]শিল্প অস্তিত্বশীল থাকে বাস্তব পরিসরে বাস্তব সময়ে।১৯ পাশ্চাত্যে প্রধানত এই ভাবনাসূত্রে বিকশিত পারফরম্যান্স শিল্পের প্রাথমিক দুটো ধারণা অর্থাৎ বাস্তব ক্ষেত্র বা (রিয়েল স্পেস) ও বাস্তব সময় (রিয়েল টাইম)। থিয়েটারের ঘটমানতার এই বাস্তব ক্ষেত্র ও এটি চাক্ষুষের বা এর সাথে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় দর্শকের লিপ্ত থাকার বাস্তব সময়ের সাথেই নিবিড়ভাবে পারফরম্যান্সের সম্পর্ক। রিচার্ড শেখনার পারফরম (অভিনয়/পরিবেশন) করার ব্যাপারটিকে দুটো স্তরে ভাগ করে বুঝবার উদ্যোগ নিয়েছেন।২০ প্রথমত, দৈনন্দিন জীবনে ব্যবসা, খেলা বা যৌনতায় পারফরম/অভিনয় করার অর্থ হলো, একটি নির্দিষ্ট পরিসীমা বা স্ট্যান্ডার্ড পর্যন্ত কিছু করা। দ্বিতীয়ত, শিল্পে পারফরম/অভিনয় করার অর্থ কী তা আমাদের সকলেরই জানা। সেটা একটি প্রদর্শনী নাটক নাচ গান এমন অনেক কিছুই হতে পারে। ডুয়িং বা করা এবং শোয়িং বা দেখানো অর্থাৎ কোনো কিছু করা ও দেখার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক হলো পারফরমেন্স। পারফরম্যান্সকে আমরা দুভাগে ভাগ করে নিতে পারছি। দৈনন্দিন জীবনের পারফরম্যান্স ও শৈল্পিক পারফরম্যান্স। তাহলে আমরা পারফরম্যান্সের একটি পাশ্চাত্য চর্চার হদিস যেমন পাচ্ছি, তেমনি পারফরম্যান্স বিষয়ক জ্ঞানতাত্ত্বিক স্বচ্ছতার প্রয়োজনে আমরা এই প্রসঙ্গে আলোচনা আরেক প্রস্থ বাড়িয়ে নিতে পারি। রিচার্ড শেখনার পারফরম্যন্সের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য পারফরম্যাটিভ/পরিবেশনশীল ধারণাটির তত্ত্বতালাশ করতে শেকসপিয়রের ‘হ্যামলেট’ নাটকের দোহাই দিয়েছেন। এই প্রসঙ্গে শেখনার নাটকটির ৫ম অঙ্কের ১ম দৃশ্যের দুই গোরখোদকের আলাপচারিতার মর্ম নতুন চিন্তার আলোকে তালাশ করেছেন।২১ যার একটি সংলাপ হলো, “An act hath three branches- it is to do, to act, to perform.” একে শেখনার ব্যাখ্যা করছেন এভাবে, গোরখোদক একটি ক্রিয়াকে বিভাজিছেন এর শরীরধর্মিতা বা স্রেফ কিছু ‘করা’ (ডু), এর সামাজিক প্রেক্ষিত বা ক্রিয়া করা (এ্যাক্ট) এবং এর নাট্যিক গুণাবলি বা অভিনয় বা পরিবেশন করা (পারফর্ম)।২২  কিন্তু  শেখনার এখানে প্রশ্ন তুলছেন যে, গোরখোদক কেন প্রথমবার একটি সামগ্রিক ক্যাটাগরি হিসেবে আর দ্বিতীয়বার সেই ক্যাটাগরিরই একটি উপাদান হিসেবে ক্রিয়া শব্দটি দুইবার ব্যবহার করেছেন?২৩ প্রশ্ন উত্থাপনের পর শেখনার নিজেই এর উত্তর দিচ্ছেন, সচেতনভাবে অভিনীত বা পরিবেশিত প্রতিটি ক্রিয়া আসলে নিজেরই দোহাই দেয়। এটি এরই অংশ। এর পুনরাবৃত্তিই এর উৎস বা খোদ্ বা অরিজিন। সচেতনভাবে অভিনীত বা পরিবেশিত প্রত্যেকটি ক্রিয়া তাই একেকটি পুনরুদ্ধার করা আচরণেরই উদাহরণমাত্র। এই পুনরুদ্ধার করা আচরণ বা রিস্টোরড বিহ্যাভিয়ার শধু যে মঞ্চেই দেখা যায় তা নয়, বাস্তব জীবনেও তা ঘটে, একেই উত্তরকাঠামোবাদীরা বলেন, নিয়ত পরিবেশনশীল বা ‘পাফরম্যাটিভ’।২৪ তাদের তর্কমতে সবধরনের সামাজিক আত্মপরিচিতি যেমন, উদাহরণস্বরূপ জেন্ডার নিয়ত পরিবেশনশীল। তাই গোরখোদককে কোন দুঃখে বলতে যাব যে তিনি পুনরাবৃত্তি করেছেন। কারণ তিনি এমন এক পরিস্থিতির প্রস্তাব করছেন যেখানে ছোটটির আধারে বড়টির আশ্রয়। অর্থাৎ ‘ক্রিয়া করা’র মাধ্যমেই কেবল ‘একটি ক্রিয়া’র সৃষ্টি হয়, শুধু সৃষ্টিই নয় বরং সুসম্পন্নও হয়। এটি দৈনন্দিন জীবনের বেলায় যেমন প্রযোজ্য, তেমন মঞ্চেও এর কিছু কিছু অভিনীত হতে পারে। ‘ক্রিয়া করা’র চূড়ান্ত উদাহরণ হলো ‘অভিনয় করা’ বা ‘পরিবেশন করা’ যাতে কোনো ব্যক্তির ওই ক্রিয়া কর্মটিই প্রতিফলিত হয়।২৫ এই পুনরুদ্ধার করা আচরণ যা নিয়ত পরিবেশনশীলতার একটি আত্মিক উপাদান। এরই পর্যালোচনার সূত্রে আমরা খুঁজে পেতে পারি প্রতিটি পারফরম্যান্সেরই রয়েছে দৈহিক, সামাজিক ও সৃজনশীল (বা সাংস্কৃতিক) কয়েকটি পরস্পর সম্পর্কিত মাত্রা।

তাহলে আমরা দেখছি, সমকালীন পাশ্চাত্যে পারফরম্যান্স চর্চা ও বিদ্যায়তনে ব্যাখ্যার একটি প্রেক্ষাপট এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে। এমন অবস্থায় ‘ম্যাকাব্রে’ যখন বিভিন্ন প্রযুক্তির সমবায়ে নাট্য ও পারফনম্যান্সের সীমানাভাঙ্গা এক প্রযোজনা তখন একে পশ্চিমের নিরিখেও কি আমরা প্রথাবিরুদ্ধই বলবো?

এমনকি, বাংলাদেশের চারুশিল্পে নব্বই দশক থেকে পারফরমেন্স আর্টের যেসব চিহ্ন লক্ষ্য করা যাচ্ছে, এবং আশীষ খন্দকারের পরিবেশ থিয়েটার ও সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স আর্টের বিচিত্র উপাদানগুলো যেভাবে বর্তমানে বিভিন্ন নাট্যে দেহস্থ হচ্ছে সেগুলোর ঐতিহাসিক প্রবংশধারা পশ্চিমের বিকাশরেখার নানা চিহ্ন দিয়ে অনুপ্রাণিত হলেও, এর এদেশীয় সামাজিক বংশকুলধারা কিন্তু অত্যন্ত নবীনা নয়, বরং পুরনো, অতি প্রাচীন। এই প্রস্তাবের মর্ম বোঝার জন্য এই অঞ্চলের নিজস্ব জীবন-যাপন পদ্ধতির মধ্যে কৃত্য তথা পারফরমেন্সের বিভিন্ন দিকে আমাদের চোখ ফিরিয়ে নিতে পারি। এ অঞ্চলের জনপ্রিয় সংস্কৃতির নানান অভিব্যক্তি যেমন সাপখেলা, বানর খেলা, কবিরাজের ওষুধ বিক্রির মতন লোককলা [ফোকলোর] যেমন রয়েছে; পাশাপাশি তেমনি এখানকার সমাজের গভীরে কৃত্যের প্রভাবজাত পারফরম্যান্সেরও ব্যাপক ও জোরালো উপস্থিতি রয়েছে। প্রাক-বৈদিক যুগের যজ্ঞ, যেখানে আগুনে নানান দ্রব্যাদির মন্ত্রযোগে উৎসর্গ হতো সেই ধর্মীয় কৃত্যমূলক পারফরম্যান্স এখনো এ অঞ্চলের সমাজে জীবন্ত। শিবের নাচন যার অর্ধেক পুরুষভাব অর্থাৎ তা-ব ও অন্যভাগ নারীভাব অর্থাৎ লাস্যযোগে পৃথিবীর উদ্ভব বলে প্রচলিত পুরাণ এই অঞ্চলের ধর্মীয় সাংস্কৃতিক জীবনে এখনো সমাদৃত, জনপ্রিয়। কালীভিত্তিক ধর্মাচারে জৈবিক (অর্গানিক) নানান অঙ্কন দ্রব্য ও দেহের তুরীয় অবস্থা প্রত্যক্ষ করা যায়। এদেশে চৈত্রসংক্রান্তির চড়কপূজার নানান পর্যায়ে এরকম বহু পারফরমেন্স হয় যা দেহভিত্তিক এক্সট্রিম কৃত্যের নামান্তরমাত্র। দেবী মনসার ঘট পানিতে ভাসান দেয়া এখানকার আরেকটি কৃত্যমূলক স্থানাঙ্কিত (সাইট-স্পেসিফিক) পারফরম্যান্স। খরা ও অনাবৃষ্টির কালে গায়ে কাদা মেখে পানি ঢেলে গড়াগড়ি খেয়ে ‘আল্লা মেঘ দে, পানি দে ছায়া দে’ বলে ভিক্ষা মাগা ও চাল সংগ্রহ করা একটি জনপ্রিয় দেহভিত্তিক কমিউনিটি পারফরম্যান্স। বাংলার বৈষ্ণবদের ‘ভেক ধরা’ আরেকটি ভক্তিবাদী রূপান্তরমূলক কৃত্যভিত্তিক পারফরম্যান্স। বসন্ত, কলেরা ও মহামারী থেকে “সামাজিক দেহের” প্রতিরক্ষা ও পরিত্রাণের জন্য শীতলাপূজা আরেকটি পবিত্র (সেকরেড) পারফরম্যান্স। কারবালার বিষাদপূর্ণ ঘটনার অভিঘাতে মুসলমান শিয়াদের মধ্যে প্রচলিত মর্সিয়া গীত ও তাজিয়া মিছিল এমন এক ধর্মীয় কৃত্যমূলক পারফরম্যান্স ও স্থাপনা (ইন্সটলেশন) যেখানে শরীরকে স্বেচ্ছায় রক্তাক্ত করে হারানো খেলাফতের পুনরুদ্ধারের এক এবাদতের রূপায়ণ ঘটে। এতে শরীর চিহ্নিত হয় খেলাফতরূপে। বাউলদের আখড়াকেন্দ্রিক সাধন-ভজন এক স্থানাঙ্কিত কৃত্যমূলক যাপন-পরিবেশনা কেবল নয়, বরং জ্ঞান উৎপাদনী দর্শনের ধারা বা ভাবঘরও। বাংলার নদীয়া স্কুলে, দর্শনকে কেবল cogito principle হিসেবে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন একটি ক্যাটেগরি হিসেবে গণ্য করা হয় না। এখানে ভাব যাকে আমরা উপনিবেশিক অর্থে দর্শন বলতে পারি, সেটি আসলে দেহভিত্তিক কায়াসাধনা বা বডিলি পারফরম্যান্সের মাধ্যমেই সৃষ্টি হয়।২৬ পাশ্চাত্যে দর্শন বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার বিষয়। ভাবান্দোলনগুলোর দৃষ্টান্ত থেকে বলা যায়, পাশ্চাত্যের যা দর্শন, বাংলার তা জৈবিক ভাবানুশীলন। এই ভাবক্রিয়াই হলো কায়াসাধন বা পারফরম্যান্স। অতএব, এদেশের চারুশিল্পের ভুবনের নব্য প্রপঞ্চ পারফরম্যান্স আর্ট ও থিয়েটারে আত্মস্থ হতে থাকা পারফরম্যান্সের বৈশিষ্ট্যগুলোকে ঐতিহাসিকভাবে পাশ্চাত্য পারফরম্যান্স আর্টের ক্রমবিবর্তনের একটি পর্যায় হিসেবে যেমন বিচারের সুযোগ আছে, তেমনি এই অঞ্চলের জনপ্রিয় সংস্কৃতি অর্থাৎ রুরাল ও আরবান ফোকলোর এবং স্যাক্রেড রিচুয়াল তথা ধর্মভাবনাকেন্দ্রিক বিভিন্ন “দার্শনিক” স্কুলের বা ঘরানার মধ্যে পারফরম্যান্স বিচিত্র লক্ষণ নিয়ে সমাজের নানান বাস্তবতায় এখনো জীবন্ত থাকার ফলে, কেবল পাশ্চাত্য ক্রমবিবর্তনের ভাবনাচিন্তা দিয়ে একে বিচারের পুরো সুযোগ আবার নেইও। বহুজাতিক কোম্পানিকেন্দ্রিক ও ইন্টারনেটভিত্তিক বিশ্বায়নের প্রভাবে গড়ে ওঠা খুব জটিলতাপূর্ণ, বহুভাবে স্তরায়িত এই নতুন বিশ্বব্যবস্থায় প্রাক্তন-এবং-অথবা-নতুন উপনিবেশ বাংলাদেশের শিল্পের হিস্টরিওগ্রাফি বা ইতিহাসতত্ত্বের পর্যালোচনায় একটু আগে বলা প্যারাডক্স ও দোলাচলকে ভুলে গেলে জ্ঞানতাত্ত্বিক ফায়সালার পথ না পেয়ে আরো ঘনীভূত হবে। ফলে, পারফরম্যান্স আর্ট একটি শহুরে শিল্পচর্চার অধুনা প্রপঞ্চ হলেও, এটি আমাদের সমাজে নবাগত, অনুপ্রবিষ্ট ও  একেবারে অভিবাসী কিছু নয়। অধুনা পারফরম্যান্স আর্ট এই অঞ্চলের জৈন-বৌদ্ধ-বৈষ্ণব-শৈব-গাণপত্য-শাক্তধর্মের তান্ত্রিক বিকাশ, চর্যাপদ ও চুরাশি সিদ্ধার সাধন এবং সুফিতত্ত্ব, শ্রীচৈতন্যের লীলানাট্য সর্বোপরি, লালন, পদ্মলোচন, ফটিক গোঁসাই, যাদুবিন্দু, রশীদ, রাধাশ্যাম, পাঞ্জুশাহ, হাউড়ে গোঁসাই, অনন্ত গোঁসাই, দুদ্দু শাহ, হাসন রাজা, রাধারমণ, দ্বিজদাস, জালালউদ্দিন খাঁ, আলাউদ্দিন প্রমুখ সাধক-বাউল-কবিয়াল-বয়াতির ভাবান্দোলনভিত্তিক পারফরম্যান্সের সামাজিক বংশধারার সাথে কতটা আত্মীকৃত বা সমীকৃত বা ন্যূনতম সম্পর্কিত তা সিএটি’র ‘ম্যাকাব্রে’ নামক এই প্রযোজনায় সম্পূর্ণ অমীমাংসিত। এই প্রশ্নসাপেক্ষ তদন্তের আওতায় নেই বলেই প্রথাবিরুদ্ধতার তকমা অর্জনের দাম্ভিক ফানুস হতে চেয়েছে প্রযোজনাটি।

এরকম প্রেক্ষাপটে সিএটি’র তাদের ব্যাপকমাত্রার (ব্যয় ও বিভিন্ন প্রযুক্তির ব্যবহার উভয় অর্থেই) প্রযোজনা ‘ম্যাকাব্রে’কে প্রথাবিরুদ্ধ দাবি করার ব্যাপারটি একপ্রকার অনৈতিহাসিক অর্বাচীনতামাত্র। বরং আমরা বলতে পারি, থিয়েটার ও চারুশিল্পের বর্তমান চর্চার বলয়ে দেখা দেওয়া নতুন প্রপঞ্চ পারফরম্যান্স আর্টের বংশগতির অন্তর্ভুক্ত ‘ম্যাকাব্রে’ ঢাকার নাট্যদর্শককে নতুন ধরনের নাট্যচর্চার এক শক্তিমন্ত রূপকল্পের দিকে আবাহন করেছে। আমাদের সাংস্কৃতিক চর্চার প্রবংশধারায় ও নতুন বিশ্বব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে এই প্রযোজনাটি বর্তমান সময়কে আমাদের জীবনের সাথে বিক্রিয়া করাতে উন্মুখ হয়েছে।  পারফরম্যান্স ও নিউ মিডিয়া আর্টের এমন কতগুলো উপকরণ এই প্রযোজনায় আত্মস্থ হয়েছে যেগুলো স্বয়ং একেকটি পাঠবস্তু/টেক্সট হয়ে ওঠে। তবে এই টেক্সটগুলো দর্শকের মধ্যে চিন্তার কিছু বিক্ষিপ্ত অভিক্ষেপ মাত্র তৈয়ার করতে সক্ষম। যদিও এই প্রযোজনার একটি গল্প আছে, “এটি একজন কয়েদীর ভ্রমণ কাহিনী; এমন একটি ভ্রমণ যেটির গন্তব্য মৃত্যু। পুরো নাটকটি একরাতের ঘটনা। এই রাতেই প্রকাশ পায় কয়েদীর যন্ত্রণা, দমন, পরাধীনতা এবং রাজনৈতিক যন্ত্রের হাতে তার অনিবার্য মৃত্যু। কয়েদী অবশেষে হয়ে পড়ে সমাজের অদৃশ্য কারাগারে বন্দি মানুষের প্রতিমূর্তি।” এর বিষয়বস্তু একটি একক গল্পকে অনুসরণ করেছে। কিন্তু এর উপস্থাপনের আঙ্গিক গল্পের এককত্বকে নস্যাৎ করবার উপযোগী হয়েছে। ফলে, বিষয়বস্তু ও আঙ্গিকের বিরোধিতা এই প্রযোজনাকে সমস্যাগ্রস্ত করেছে। কিন্তু বিষয়বস্তু ও আঙ্গিকের দ্বান্দ্বিক সম্পর্কটি যদি এই প্রযোজনার সৃজনপ্রক্রিয়ায় ধর্তব্যের বিষয় হতো, এবং এটি যদি কাঠামোবিরোধী একটি শিল্পভাষা গঠনের দিকে মনোযোগী হতো, তাহলে হয়তো এটি দর্শকের বোধে অন্য কোনো মাত্রা উৎপাদন করতে পারতো। কিন্তু এই প্রযোজনায় সেটি ইপ্সিত ছিল না, এটি তাদের উপস্থাপন ও ভাঁজপত্রের বক্তব্য থেকেই প্রতিভাত হয়। আবার, এর গল্পটি সার্ত্রীয় অস্তিত্ববাদী ভাবনা ও নাট্যাঙ্গিকের কথা মনে করিয়ে দেয়। অথচ ‘ম্যাকাব্রে’ উপস্থাপনার ধরন একেবারেই অস্তিত্ববাদী নয়, তাই আধুনিকতাবাদীও নয়। এটি নিশ্চিতভাবেই ত্রিমাত্রিক ক্ষেত্রের সাথে দ্বিমাত্রিক ভিডিও যা আবার ত্রিমাত্রিকতার মায়া তৈরি করে, এসবের ব্যবহারের মাধ্যমে পোস্ট আভাঁগার্দ ও আধুনিকতাত্তোর হাইব্রিড নাট্যচর্চার বা পারফরম্যান্সের নানান বৈশিষ্ট্য দক্ষতার সাথে আত্মস্থের দৃশ্যগত উদাহরণ তৈরিতে তৎপর হয়েছে। এটি অ্যানার্কিক অ্যাপ্রোচ বা নাট্যের আঙ্গিকগত শুদ্ধতার প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়তে সক্ষমতার চিহ্ন প্রদর্শন করেছে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, এটি একদিক থেকে আধুনিকতাবাদী নাটকে গল্পের যে এককত্ব থাকে সেটিও ধরতে চেয়েছে, আবার উপস্থাপনের ক্ষেত্রে আধুনিকতাবাদবিরোধী সমকালীন মাল্টিডিসিপ্লিনারি [পারফরম্যান্স] শিল্পের ধরন-ধারনকেও আত্মস্থ করতে মরিয়া হয়েছে। এর ফলে, এই প্রযোজনার সৃষ্টিপ্রক্রিয়ায় আত্মঘাতী একটি পিছুটান থেকেই গেছে। এমনকি এক পর্যায়ে মৃত্যুর নাচ নাচতে নাচতে হঠাৎ যখন একটি বাদ্যযন্ত্র দর্শকের সামনে উন্মোচিত হয়, তখন সেটি আধুনিকতাবাদী প্রথাশাসিত নাট্যের প্রতীকবাদী কৌশলকেই হাজির করে। এবং এই দৃশ্যটি অর্থ করতে সচেষ্ট হয় শেষপর্যন্ত সংগীত বা সৌন্দর্যেই জীবনের মুক্তি। এরকম একটি নির্দিষ্ট অর্থ আরোপ করার ব্যাপারটিও এই প্রযোজনার কনসেপচুয়াল ফ্রেমকে মাঠে মেরেছে। অথচ একটি একক গল্পের শাসনে বান্ধা না পড়ে, গল্পহীনতার অবাধ ভুবনে এর অভিনয়গত ও দৃশ্যগত বিভিন্ন উপাদান ও উপকরণ যদি স্বয়ং একেকটি ধারণা ও চিহ্ন হিসেবে ভূমিকা রেখে অনেকার্থের অনিশ্চয়তার জাদুময়তার ভেতরে নিয়ে যেতে পারতো তাহলে ঢাকার নাট্যচর্চায় কী অসাধারণ ঘটনাই না ঘটতো! ম্যাকাব্রের সৃজনপ্রক্রিয়ায় নিহিত অসাধারণ সব সম্ভাবনার কথা ভেবে ভেবে আফসোসে আক্রান্ত হতে হতে আপনার মনে পড়তে পারে- সফোক্লিসের নাটকে ইডিপাসের করুণ ও ভীতিকর পরিণতিতে-কোরাসের বিলাপ:
What man, what man on earth wins more
of happiness than a seeming
and after that turning away?
Oedipus, you are my pattern of this,
Oedipus, you and your fate!

অবশেষে আমাদের কপালকুণ্ডলা সৃজনশীলতার অর্থহারানো চিহ্ন হিসেবেই আমাদের স্মৃতিবিলাপের ভেতরে রয়ে যায় আমাদেরই ‘ম্যাকাব্রে’।   

৪র্থ তর্কের প্রসঙ্গ ‘কবর’ : স্মৃতির মহাফেজখানায় স্মৃতিবিভ্রাট

স্মৃতিভিত্তিক শিল্পের খোঁজ নিলে, ইউজিনিও বারবা ও নিকোলা স্যাভারেজ থেকে ‘কায়িক স্মৃতি’ (ইমপিরিক্যাল মেমোরি) ও ‘লিখিত স্মৃতি’ (লিরিক মেমোরি) নামের ভাবনাসূত্রগুলো সম্পর্কে অবহিত হওয়া যায়।২৭ এই দুটো ভাবনাসূত্রকে নিজস্ব বোঝাপড়া দিয়ে ভিজিয়ে বিনির্মাণের কায়দায় মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ নাটককেন্দ্রিক সংস্কৃতি পাঠে কাজে লাগানো যায়। নিশ্চিতভাবেই রাজনৈতিক স্মৃতি নিয়ে বোঝাপড়া রয়েছে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ নাটক ‘কবর’। বাংলাভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদার দাবিতে বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদের [আত্মোৎসর্গের] চেতনাকে এক বছর পর উপলব্ধি ও আবিষ্কার করতে কারাবন্দী মুনীর চৌধুরী কমরেড রণেশ দাশগুপ্তের অনুরোধে লিখেছিলেন ‘কবর’।২৮ আমেরিকান নাট্যকার আরভিন শ’র ‘বারি দ্য ডেড’ নাটকের প্রভাব এই নাটকে ছায়াপাত করলেও বিষয়বস্তুর স্থানীয় প্রাসঙ্গিকতা ও নিজস্ব চরিত্রচিত্রণ এবং ইতিহাসের একটি বিশেষ সময়কে রেসপন্ড করার মধ্য দিয়ে সামষ্টিক জীবনে সবসময় প্রাসঙ্গিক এমন একটি নাটক হয়ে ওঠেছে ‘কবর’।

লেখার পরপরই নাটকটি ১৯৫৩ সালে সেকালের রাজবন্দীরা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে মঞ্চস্থ করে। বাংলাদেশে প্রিজন থিয়েটার বা কারানাট্যের প্রথম চিহ্ন ‘কবর’ নাটকটিকে সদ্য সংঘটিত ভাষা আন্দোলনের ‘লিখিত স্মৃতি’ হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে।২৯ আবার, কয়েদিরা এই ‘লিখিত স্মৃতি’কে অভিনয় দিয়ে ‘কায়িক স্মৃতি’তে পরিণত করেছে। এই দুই স্মৃতির ১ম মিথস্ক্রিয়াটি নিশ্চিতভাবেই রাজনৈতিক এবং পাকিস্তানের জন্ম (১৯৪৭) ও মৃত্যু (১৯৭১)’র দর্শনকে ১৯৫৩ সালেই ‘কবর’ নাটকের কারা-প্রযোজনা ভবিষ্যদ্বাণী করতে পেরেছিল। ভাষা-সংস্কৃতিভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদ মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ নাটকটিকে রাজনৈতিক স্মৃতির আলেখ্যে পরিণত করেছে। কিন্তু গুরূত্বপূর্ণ হলো, কারাগারের বাইরে নাটকটি প্রথম প্রকাশ্যে মঞ্চস্থ হয়েছিল ১৯৫৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে। কার্জন হলে সাংস্কৃৃতিক জাতীয়তাবাদের আদি চিহ্ন ‘কবর’ নাটকের প্রথম পাবলিক পারফরম্যান্সের উপসর্গটিকে ‘লিখিত স্মৃতি’র সাথে ‘কায়িক স্মৃতি’র দ্বিতীয় মিথষ্ক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করাা যায়। এটি রাজনৈতিক স্মৃতির জাতীয়তাবাদী চেতনাকে পারফরম্যান্সের মাধ্যমে সর্বজনের সম্মুখে ইমিডিয়েট নিরীক্ষা করতে সচেষ্ট হয়েছিল। এই স্মৃতি নিরীক্ষার অর্থ হলো ধর্ম দিয়ে ‘জাতি’ [অর্থাৎ রাষ্ট্র] কল্পনার সমস্যার প্রতি সর্বজনের দৃষ্টিভঙ্গি যাচাই করা। এর ফলে, দ্বিজাতি তত্ত্বের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের সম্ভাব্য মৃত্যুর রূপকল্প এতে প্রতিফলিত হয়েছিল। পাশাপাশি ওই প্রযোজনায় শোনা গিয়েছিল ভাষা সংস্কৃতি ও অখণ্ড ভূগোলের ধারণা দিয়ে তৈরি হওয়া সম্ভব এক নতুন রাষ্ট বাংলাদেশের পদধ্বনি। 

আবার, ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেই কার্জন হলেই নীলা সাহা নির্দেশিত ‘কবর’ নাটকের ‘থিয়েট্রেক্স বাংলাদেশ’ নামের নতুন একটি নাট্যদলের অভিনয়ের পদক্ষেপকে বলা যায় লিখিত ও কায়িক স্মৃতির তৃতীয় মিথষ্ক্রিয়া। বর্তমানের সাথে অতীতের বিচ্ছেদ এবং রাজনীতির ও পারফরম্যান্সের স্মৃতিগুলোকে প্রামাণীকরণের প্রচেষ্টা নিয়ে থিয়েট্রেক্স ইতিহাসের পুনর্পাঠ করতে তৎপরতা দেখায়। এর ফলে, নাটকের আধার এবং আধেয় উভয়ের সংশ্লেষে একটি ইতিহাসভাবনার অবতারণা হয়। ঢাকা শহরের নাট্যচর্চায় ইতিহাসভাবনাগত এই নতুন লক্ষণটিকে পড়া যেতে পারে এর কাঠামো বিশ্লেষণ করে। এর কাঠামোর গড়নে দেখতে পাওয়া যায়, এখানে স্মৃতিই প্রধান উপাদান। এবং এই স্মৃতি ত্রিমাত্রিক। ১ম মাত্রা হলো, ‘কবর’ পাণ্ডুলিপি হিসেবে লিখিত স্মৃতির চিহ্ন; অভিনয়ের লক্ষ্যে কবরের মহড়া ও উপস্থাপনসহ পুরো সৃজন-প্রক্রিয়াকে কায়িক স্মৃতিচারণ যাকে ২য় মাত্রা বলা যায়; এবং ১৯৫৬ সালে ‘কবর’ প্রকাশ্য মঞ্চস্থের নিদর্শন হিসেবে কার্জন হলকে ২০১৪ সালে পুনরায় এই নাটকের অভিনয়স্থল বাছাই করায় এতে স্মৃতির তৃতীয় মাত্রা যুক্ত হয়েছে। এই তৃতীয় স্মৃতির ভেতরেই থিয়েট্রেক্সের ‘কবর’ উপস্থাপনের তাৎপর্য তালাশ করা যেতে পারে।

যদিও, ‘কবর’ যেহেতু হিন্দুর শ্মশান বা খ্রিস্টানের সমাধিস্থল নয়; এমনকি, পাকিস্তানের অভিজাত মুসলমানের প্রতিনিধিরূপে নাটকের [খল] চরিত্র ‘নেতা’ যে-ভাষায় কথা বলে- অন্যদিকে, বাঙালি ও মুসলমান, এই দুই আত্মপরিচয়ের সংশ্লেষে দোলাচলে থাকা ‘মুর্দাফকির’ যে আবার বাউল বা বিবেকও নয়, সেও একই ধরনের শব্দ চয়নে সেই ভাষাতেই কথা কয়, বলে,- এই সব অকাট্য যুক্তির অনুসরণে নাট্য বিষয়ে সৈয়দ জামিল আহমেদ তর্ক হাজির করে বলছেন যে, কেউ পছন্দ করুক বা না করুক, ‘কবর’ নাটকের বাঙালি জাতীয়তাবাদ আদতে তৎকালীন পূর্ব বাংলা’র মুসলমানদের সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ। জামিল আহমেদের তর্কমতে, ১৯৪৭-পরবর্তী পূর্ববাংলার রাজনৈতিক পটভূমি ও বাঙালি মুসলমানের সামাজিক বাস্তবতা সরিয়ে নিলে ‘কবর’ নাটকের ক্ষুরধার কমে যায়।৩০

তথাপি, ২০১৪ সালে কার্জন হলের উপস্থাপনায় কবর স্মৃতিতাত্বিকভাবে এর ‘ক্ষুরধার’ নতুনভাবে অর্জন করে। কারণ, একটি টেক্সট বা পাণ্ডুলিপিতেই কেবল এর অর্থ চিরস্থায়ী বন্দোবস্তরূপে স্থির থাকে না। পাঠক/দর্শকের প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে অথবা বা রচয়িতার মৃত্যুর প্রক্রিয়ায় অর্থাৎ-এই আলোচনায় উত্থাপিত তর্কের ধারার সাথে মিল রেখে আমরা বলতে পারি-লিখিত স্মৃতির সাথে কায়িক স্মৃতির মিথষ্ক্রিয়া এবং স্থানের স্মৃতির যোগে একটি নাটক নির্দিষ্ট কোনো সংস্কৃতির জনস্মৃতিতে পরিণত হতে পারে। এই হতে পারার প্রক্রিয়া আসলে পুস্তক ছাপিয়ে অর্থ গঠনেরও প্রক্রিয়া। কেবল বই-পুস্তকে না, গোষ্ঠীস্মৃতির ভেতরেও সাংস্কৃতিক কর্মরূপে এর আরো নানান উপকরণসমেত একটি এক্সটেনডেড বা প্রসারিত অর্থ তৈরি হয়। কবর নাটকের এই অর্থান্তরের প্রবাহকে ‘থিয়েট্রেক্স’ তাদের কার্জন হলের উপস্থাপনায় চিহ্নিত করতে সচেষ্ট হয়। ফলে, কার্জন হল একটি স্মৃতিক্ষেত্র হিসেবে ২০১৪ সালের প্রযোজনায় কবর নাটকের প্রদত্ত অর্থ ছাপিয়ে গোষ্ঠীস্মৃতিকে সম্পর্কিত করার মাধ্যমে একটি নতুন টেক্সটের পত্তন করে। তখন কবর নাটকের সাংস্কৃতিক অর্থ কেবল এর রচনার পটভূমি ও পাণ্ডুলিপির প্রদত্ত সাহিত্যিক অর্থে আর আবদ্ধ থাকে না। কার্জন হল কবর নাটকের প্রকাশ্য মঞ্চস্থের স্মৃতির [আর্কাইভ] মহাফেজখানা হিসেবে একটি টেক্সট উৎপাদনের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করতে পারে এক্কেবারে আজকের দিনের নতুনতম নাট্যদর্শককেও। তবে, ২০১৪ সালের এই মুখোমুখিতা ১৯৫৬ সালের মতন যতটা না রাজনৈতিক মিথষ্ক্রিয়া, ততটাই আসলে সাংস্কৃতিক (অবশ্য সংস্কৃতির চর্চার মধ্যে যে রাজনৈতিকতা থাকে সেটি অস্বীকার না করে বরং কূটাভাসরূপে গন্য করে নেয়া হচ্ছে) মিথষ্ক্রিয়া। এভাবে, কবর নাটকের রাজনৈতিক পটভূমি ও বাঙালি মুসলমানের সামাজিক বাস্তবতায় প্রদত্ত অর্থ ছাপিয়ে বরং নান্দনিক প্রেরণায় সামাজিক চলিষ্ণুতার স্মৃতির মুখোমুখি হওয়ার ধারণা সামনে এলে নাটকটি এক বৃহত্তর এমনকি পরস্পরবিরোধী নানান অর্থ গঠনের শাণিত উপলক্ষ্য হয়ে ওঠে।

স্মৃতিভিত্তিক ইতিহাসভাবনার আলোকে কবর নাটকের মঞ্চায়ন শুধুমাত্র সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদকে জোরদার করতে তৎপর হয় না। বরং জনস্মৃতির রাজনৈতিক অর্থকে অভিনয়ের মাধ্যমে, সাংস্কৃতিক ক্রিয়াপদের মাধ্যমে, রাষ্ট্রকেন্দ্রিক ‘জাতীয়’ চেতনা ও এর নানান খপ্পরসমেত জনঅভিজ্ঞতাকে পুনর্গঠনের সম্ভাবনাও জারি করতে পারে। যদিও থিয়েট্রেক্সের এই স্মৃতিস্থানকেন্দ্রিক প্রযোজনায় সেটি ধারণাগতভাবে পরিস্ফূট নয়। টেক্সট হিসেবে কবর যা বলে এবং যা বলে না- এই দুয়ের বিরোধ ও মিলন উভয়ই অভিনয়ের মাধ্যমগত কারণেই দ্বন্দ্বের নিয়মে বাঙময় হতে পারে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মধ্যে বাংলা ভাষার অধিপতিশীল প্রমিত রূপের বাইরে আরো ‘অনেক জাতীয়’ বাংলা ভাষার রূপ রয়েছে। আবার উর্দু-ফার্সি প্রভাবিত বাংলার বাইরেও পুস্তকি বাংলা ভাষার উত্তরাধিকারও রয়েছে। এবং সর্বোপরি, অন্যান্য জাতিসত্ত্বার ভাষার মানচিত্রকে-যেগুলো সচরাচর অদৃশ্য সেগুলোকেও  দৃশ্যত-ব্যাখ্যার সুযোগ ভাষাকেন্দ্রিক এই নাটকের প্রযোজনায় সদাসর্বদা রয়ে যায়। এভাবে স্মৃতির সাংস্কৃতিক ক্রিয়ায় ‘জাতি’-উত্তর আত্মপরিচয়ের ধারণার অনুবর্তী বহুত্ববোধকতার তালাশ করার খোয়াব থিয়েট্রেক্সে’র স্মৃতিস্থানের ধারণার কাঠামোতে আত্মস্থ না হওয়ায় প্রযোজনার কনসেপচুয়াল ফ্রেমওয়ার্ক স্মৃতিবিভ্রাটে ভুগেছে। নাট্য-নৃবিজ্ঞানের আলোচনায় নিকোলা সাভারেজ যে-অর্থে, নস্টালজিয়া বা ফেরার তীব্র অনুরাগ প্রয়োগ করেছেন, এর থেকে শিথিল অর্থে, আমরা বলতে পারি, রাজনৈতিক রূপকল্পের জন্ম ও মৃত্যুর সন্ধিস্থলের [পরা]বাস্তব কবরের শর্তগুলোতে পুরোটা নয়, বরং এই শর্তগুলো প্রকাশ্যে উত্থাপিত হওয়ার পাবলিক পারফরম্যান্সের স্মৃতিস্থলে [কার্জন হলে] ফেরার অর্থ হলো, রাজনৈতিক স্মৃতি ও নান্দনিক [সাংস্কৃতিক] স্মৃতিগুলোর সমীকরণের মাধ্যমে বোঝা-পড়া করে জনস্মৃতি পুনর্গঠন করা। এই প্রক্রিয়ার ভেতরে নতুনভাবে বেঁচে থাকার সামাজিক-সংস্কৃতিক-রাজনৈতিক রসদ আহরণ করা যেতে পারে। আর এভাবে বিভিন্ন স্থানের স্মৃতিময়তাকে অভিনয়ের মাধ্যমে সক্রিয় মহাফেজখানায় পরিণত করা যেতে পারে। একভাবে চেনা একটি স্থানের অন্য স্মৃতিকে অভিনয়ের পন্থায় নতুনভাবে আবিষ্কারের মাধ্যমে একটি শহরের জীবনপ্রণালীতে যুক্ত হতে পারে স্মৃতি মারফত সঞ্জীবনী।

তথ্যসূত্র:  
১. Augusto Boal, Theatre of the Oppressed, (Translated from the Spanish by Charles A. & Maria-Odilia Leal McBride), Pluto Press, London 1979, p. ix
২. Arthur Miller, “Tragedy and the Common Man” , David Krasner ed. Theatre in Theory 1900-2000, Blackwell Publishing, USA, 2008,p. 269
 ৩. পূর্বোক্ত, p. 267
৪. পূর্বোক্ত,  p. 267
৫. পূর্বোক্ত, p. 267
৬.  Luis Althusser, On Ideology,p. 178
৭.  পূর্বোক্ত,  p. 174
৮.  পূর্বোক্ত,  p. 178
৯.  পূর্বোক্ত,  p. 179
১০.http://www.newleftproject.org/index.php/site/article_comments/alternatives_to_capitalism_introductio
১১.http://www.newappsblog.com/2013/07/slavoj-%C5%BEi%C5%BEek-on-todays-capitalism.html

১২. Augusto Boal, পূর্বোক্ত,pp. 113-115
১৩. John Willett (edited and translated), Brecht on Theatre The Development of an Aesthetics, Hill and Wang, New York, 1964 p.37
১৪. DwightConquergood, “Performing as a Moral Act: Ethical Dimensions of the Ethnography of Performance”, https://www.google.com/search?q=performance+as+moral+act+dwit&ie=u
১৫. হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় বঙ্গীয় শব্দকোষ (দ্বিতীয় খ-।। প-হ; সাহিত্য অকাদেমি অষ্টম মুদ্রণ ২০১১, নতুন দিল্লি, পৃ. ১৩৮৭)
১৬. Richard Schechner, Performance Studies: An Introduction (First edition), Routledge, London and New York, 2002, p 137.
১৭. Richard Schechner, Performance Studies: An Introduction (Third edition), Routledge, London and New York, 2002, p 39.
১৮. পূর্বোক্ত
১৯. Dr Virgmia B. Spivey,“Performance Art: An Introduction”, www.smarthistory.com
২০. Richard Schechner, Performance Studies: An Introduction (Third edition), Routledge, London and New York, 2002, p 28
২১. পূর্বোক্ত, p. 166
২৩. পূর্বোক্ত
২৪. পূর্বোক্ত
২৫.  পূর্বোক্ত
২৬. বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন ফরহাদ মজহার, ভাবান্দোলন,
২৭. বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন Augusto B Eugenio Barba and Nicola Savarese, A Dictionary of Theatre Anthropology [:] The Secret Art of the Performer, Routledge, London and New York, 1991
২৮. সৈয়দা খালেদা জাহান, বাংলাদেশের নাটকে রাজনীতি ও সমাজ সচেতনতা, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ২০০৩, পৃ. ৩৮
২৯. Syed Jamil Ahmed, “Designs of Living in the Contemporary Theatre of Bangladesh”, in Mapping South Asia through Contemporary Theatre: Essays on the Theatre of India, Pakistan, Bangladesh, Nepal and Sri Lanka” Edited by Ashis Sengupta, Palgrave Macmillan, 2014, p. 136.
৩০. we¯ÍvwiZ Rvb‡Z †`Lyb: Syed Jamil Ahmed, “Performing the Bengali Nation: Munier Chowdhury’s Kabar and Syed Huq’s Payer Awaj Pawa Jaye”, Depart, July-December 2013, Volume 4, Issue 14-15, pp. 73-79;I‡qewjsK: www.depart-mag.com

শাহমান মৈশান: নাট্যকার কবি ও প্রাবন্ধিক। সহকারী অধ্যাপক, থিয়েটার এন্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।