Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

মঞ্চায়নের সীমাবদ্ধতা : প্রসঙ্গ কাব্যনাটক

Written by অনুপম হাসান.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

সাহিত্য ভূঁইফোড় কোনো বিষয় নয়; সমাজ উদ্ভূত ঊর্বর চিন্তাচেতনাজাত ভাবগত সৃষ্টি। অর্থাৎ সৃষ্টিশীল বা প্রতিভাবান মানুষের মননসৃষ্ট সামাজিক উপরিকাঠামো (সুপার স্ট্রাকচার) হচ্ছে সাহিত্য। সমাজে বসবাসরত মানবগোষ্ঠীর আচরিত জীবনযাপন, বিশ্বাস, কর্ম-প্রয়াস ইত্যাদি সাহিত্যের উপাদান। সাহিত্য উন্নত-পরিশীলিত জীবনযাপন প্রণালী এবং রুচিসম্পন্ন জীবনদর্শনের ইঙ্গিত দেয়।

উপরন্তু প্রতিনিয়ত জীবনজিজ্ঞাসার মুখোমুখি মানবগোষ্ঠী সাহিত্যে জীবন সহায়ক দিকনির্দেশনা পায়। এছাড়াও মানবজীবনের রুচি সংস্কৃতি ঐতিহ্য পরিবর্তন-পরিশীলনে সাহিত্যের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। ব্যক্তি নিজেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন মনে করলেও, সে কখনই তার প্রতিবেশ পৃথিবীর সাথে সম্পর্কহীন অথবা স্বজন-প্রিয়জন, বন্ধু-বান্ধব, জাতি, প্রাকৃতিক পরিবেশবিহীন একাকী অসামাজিক জীবনযাপন করতে পারে না। কিন্তু বস্তুজগতের সংস্পর্শে থেকেও মানবমননে কল্পনার এক মায়াবীজগত রয়েছে।

ব্যক্তিমানুষের অনুভূতি বস্তুবিশ্বের রূপে রসে গন্ধে শব্দে স্পর্শে অনুরণিত হয়ে জাগতিক জীবনযাপন, পরিবেশ-প্রতিবেশের প্রভাবে সৃষ্টিশীল মানুষের হৃদয় উৎসারিত বক্তব্যবিষয় যে সুরে প্রকাশিত হয়, তাই সাহিত্য। মানুষের জীবন-যাপনের রীতি-নীতি-পদ্ধতি, সামাজিক ইতিহাস ঐতিহ্য সংস্কৃতি রুচিবোধ প্রভৃতি এক রকম, নয় বৈচিত্র্যপূর্ণ। বিচিত্র মানবজীবনের প্রকাশক সাহিত্যও নানান শাখা-উপশাখা এবং শ্রেণী-উপশ্রেণীতে বিভক্ত। উপমহাদেশীয় বা সংস্কৃত আলংকারিকগণ ‘সাহিত্য’ অর্থে শুধুমাত্র ‘কাব্য’ শব্দটি গ্রহণ করে, তাঁরা কাব্যকে (সাহিত্য অর্থে) দুই শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন। তাঁদের মতে, কাব্য বা সাহিত্য দুই প্রকার- দৃশ্যকাব্য এবং শ্রব্যকাব্য। ‘শ্রব্যকাব্য’ অর্থে সংস্কৃত আলংকারিকগণ সমস্ত পাঠ্যসাহিত্যকে বোঝাতে চেয়েছেন। নাট্যশাস্ত্রবিদ ভরত বলেন, ‘নাটক ছাড়া কবিতা নেই।’ সংস্কৃত পণ্ডিতগণের বিভাগ অনুযায়ী নাট্যসাহিত্য দৃশ্য ও শ্রব্যকাব্যের সমন্বয়ে রচিত। আশুতোষ ভট্টাচার্য মনে করেন:

আধুনিক বাংলা সাহিত্য কোন বিষয়েই সংস্কৃত অলঙ্কার শাস্ত্রের সংজ্ঞাকে গ্রহণ করে নাই, করিবার কথাও নহে; আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সকল বিভাগই প্রত্যক্ষভাবে ইংরেজি সাহিত্যের প্রভাবজাত, সংস্কৃতের ভাব-জাত নহে। অতএব নাটককেও সংস্কৃতের অনুযায়ী দৃশ্যকাব্য বলিয়া নির্দেশ না করিয়া ইংরেজি সাহিত্যের অনুরূপ drama বা নাটক বলিয়া নির্দেশ করা সঙ্গত।

আধুনিকতার নামে ইউরোপীয় সাহিত্যের অন্ধ-অনুকরণ প্রবণতা বাংলা সাহিত্যের পায় দাসত্বের শৃঙ্খল পরিয়ে দিয়েছে; যা সর্বার্থে গ্রহণীয় হতে পারে না। পাঠ্যসাহিত্য গীতিকবিতা, কাহিনীকবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প প্রভৃতি ভাগে বিভক্ত। বিষয়গত ও প্রকরণগত নিরিখে নাট্যসাহিত্যেরও নানান শ্রেণী-উপশ্রেণী রয়েছে। নাট্যকার দৃশ্যগুণ এবং শ্রব্যগুণের সমন্বয়ে রঙ্গমঞ্চে গতিশীল মানবজীবনের কাহিনী কুশীলবগণ অভিনয় নৈপুণ্যে নাট্যসাহিত্যে ফুটিয়ে তোলেন। নাট্যসাহিত্যের অভিনয় প্রসঙ্গে বিরূপ সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও নাটক সাধারণত দর্শকের সামনে মঞ্চায়নের উদ্দেশ্যে রচিত হয়। তবে লিখিত নাটকটির সাহিত্যের অন্যান্য শাখার মতোই পাঠ্যমূল্য বর্তমান। এজন্যই শুধুমাত্র পাঠেও নাটকের সাহিত্যরসোপলব্ধি ঘটতে পারে। কিন্তু নট-নটীর সহায়তায় রঙ্গমঞ্চে নাটক অভিনীত হলে নাট্যকার একই সময় অনেক সংখ্যক দর্শক-শ্রোতার মনে সাহিত্যরস সঞ্চার করতে পারেন। প্রসঙ্গত একথাও সত্য :

অভিনয় নাটকের একটি প্রধান লক্ষ্য হইলেও, ইহা যে একমাত্র লক্ষ্য তাহা বলিতে পারা  যায় না। সংস্কৃত নাটক কোনদিন কোথাও অভিনীত হইয়াছিল কি না, তাহা জানিতে পারা যায় না; সম্ভবত অধিকাংশ নাটকই অভিনীত হয় নাই,- পাঠ্যরূপেই শিক্ষিত সমাজের মনোরঞ্জন করিয়াছে। অথচ সংস্কৃত নাটক শত শত বৎসর ধরিয়া চলিয়া আসিতেছে। বাংলা নাটকের সম্পর্কে সংস্কৃত নাটকের কথা বাদ দিলেও দেখিতে পাওয়া যায় যে, আধুনিক ইউরোপীয় নাটকে দৃশ্যগুণ অপেক্ষা পাঠ্যগুণই অধিকতর বর্ধিত হইয়াছে। ... অতএব যথার্থ শিল্পগুণ নাটকের ভিতর দিয়া প্রকাশ পাইলে কেবলমাত্র পাঠ্যরূপেও তাহা রসিকমনকে আনন্দ দিতে পারে। সুতরাং রঙ্গমঞ্চের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ব্যতীত কেহই নাটক রচনার প্রেরণা অনুভব করিতে পারেন না- এরূপ ধারণার কোন সঙ্গত কারণ দেখিতে পাওয়া যায় না। বিশেষত আধুনিক Reading Drama বা Literary Drama-র সঙ্গে রঙ্গমঞ্চের কোন সম্পর্ক নাই।

নাট্যসাহিত্য পাঠক-দর্শক-শ্রোতার সাথে যোগাযোগের (কম্যুনিউকেশন) মাধ্যম হিসেবে সাহিত্যের অন্যান্য শাখার চেয়ে অধিকতর সফল ও কার্যকরী। পাঠ্যসাহিত্য সাধারণত পাঠক একা পাঠ করেন এবং এককালীন প্রকাশিত সংখ্যার চেয়ে বেশি সংখ্যক পাঠকের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে না। কিন্তু যেকোনো নাটকের একেকটি মঞ্চায়নেই ততোধিক দর্শক-শ্রোতা-পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব। প্রায়োগিক ক্ষেত্রে সাহিত্যের অন্যান্য শাখার চেয়ে নাট্যকলা (পারফর্মিং আর্ট) অগ্রবর্তী, কেননা নাট্যসাহিত্য পাঠ্যসাহিত্যেরও অন্তর্গত। উপরন্তু রঙ্গমঞ্চের অভিনয়ে নাট্যসাহিত্য পাঠক-দর্শক-শ্রোতার নিকট জীবন্ত হয়ে ওঠে এবং সাহিত্যরস সঞ্চার করে।

এক.

বিশুদ্ধ নাটক এবং কাব্যনাটকের মধ্যে পার্থক্য আছে- একথা আজ আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না; টিএস এলিয়টের ‘দ্য রক’ [১৯৩৪] রচনার পর প্রায় শতাব্দী গত হতে চলেছে। ফলে নাট্যকার, নাট্যনির্দেশক, নাট্যাভিনেতা সকলেই নাটক আর কাব্যনাটকের মধ্যে যে ফারাক রয়েছে, তা মেনে নিয়েছেন এবং এ বিভিন্নতা মেনে নিয়েই তা মঞ্চে আবির্ভূত হয়েছে। সাহিত্যের প্রায় সব শাখারই প্রাচীন ও মধ্যযুগে ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদির মধ্য দিয়ে চর্চার সূত্রপাত, বিকাশ ঘটেছে। নাটকের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয় নি। প্রাচীনকালে গ্রীসে ডাইয়োনিসিস দেবতার পূজা উপলক্ষে এক ধরনের গান-বাজনার আয়োজন করা হতো, এখান থেকেই গ্রীক ট্র্যাজেডির উদ্ভব ঘটেছে বলে ধারণা করা হয়। ভারতীয় নাট্যশাস্ত্রেও দেখা যায় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের ভেতর থেকেই এর উদ্ভব; ভারত উপমহাদেশের লোকাচারে ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্য এখনো বিদ্যমান। এ থেকেও বোঝা যায়, নাট্যশাস্ত্রের জন্ম-ইতিহাসও ধর্মীয় জীবনাচরণের সঙ্গে প্রযুক্ত। প্রাচীন কাল থেকে নাটকে বর্তমান পর্যন্ত বিকাশের ধারাপরম্পরায় এর গঠন এবং বিষয়গত দিক বিচিত্র ধরনের। সেকালের নাটক সাধারণত পঞ্চাঙ্ক বিশিষ্ট ছিল; একালে চার-তিন অঙ্ক বিশিষ্ট নাটকের পাশাপাশি একাঙ্কিকাও জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।

নাটকে মূলত নাট্যকার তাঁর ব্যক্তিগত চিন্তাচেতনা ও জীবনবোধকে সংলাপের দ্বারা দর্শকের সাথে [পাঠকও হতে পারে] সংযোগ স্থাপন করেন। এজন্য তিনি নট-নটীর সহায়তা নিয়ে ঘটনাকে মঞ্চে উপস্থাপন করেন। দ্য নিউ এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকায় বলা হয়েছে : ‘প্লে রাইট ক্যান এক্সারসাইজ বেটার কনট্রোল বোথ ওভার স্পিচ এ্যান্ড মুভমেন্ট অব হিজ এ্যাক্টোর্স এ্যান্ড ওভার দ্য রেসপন্স অব হিজ অডিয়েন্স বাই ইউজিং দ্য মোর সাবটেল এ্যান্ড রাইমস গুড প্রেটি।’ এনসাইক্লোপেডিয়ার এ বক্তব্য থেকে স্পষ্টই বোধগম্য হয় যে, নাটক মঞ্চায়নযোগ্য শিল্প। যেকোনো পাঠ্যসাহিত্যের তুলনায় নাটক দর্শক তথা পাঠকের মনে সরাসরি প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম তার প্রকরণগত কারণে। ফলে নাটকে মঞ্চায়নের ব্যাপারাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমালোচক এজন্যই বলেন :

সাহিত্যশিল্পের অন্যসব শাখায় স্রষ্টা ও উপভোক্তার মধ্যে সম্পর্ক সরাসরি। উপন্যাস, ছোটগল্প, কাব্য, প্রবন্ধ ইত্যাদি যাই-হোক-না কেন, তার সঙ্গে পাঠকের রঙ্গমঞ্চে অভিনীত হয়ে দর্শকের সামনে হাজির হয়। দর্শক অভিনয়ের মাধ্যমে সেই নাটকের রস উপভোগ করেন, আনন্দ লাভ করেন। নাটকের এই ‘থিয়েট্রিক্যাল ভ্যালু’ তার সবচেয়ে বড় সম্পদ। অবশ্য নাটকের ‘লিটারারি ভ্যালু’ নির্ণয়ের জন্য ‘রিডিং ড্রামা’ বলে নাটকের বিচার করা হয়। সাহিত্যের শিল্পগত বিচারে সেখানে নাটকের পাঠ্যরূপের বিচার চলে।

শৈল্পিক বিচারের মানদণ্ডে কোনো নাটকের নান্দনিকতা সম্পূর্ণভাবে মঞ্চসাফল্যের ওপর নির্ভরশীল- এমন কথা একবাক্যে বলা না গেলেও তা অনেকখানিই নির্ভরশীল। কারণ, একটি নাটক মঞ্চে ভালো নট-নটীদের দ্বারা মঞ্চস্থ করা না গেলে ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে; এক্ষেত্রে দর্শক যদি রঙ্গমঞ্চের অভিনেতা-অভিনেত্রীর অভিনয়ে সন্তুষ্ট না হয়- সেক্ষেত্রে নাট্যকারের মূল বক্তব্যও হয়তো দর্শকের কাছে নাও পৌঁছাতে পারে। লিখিত একটি ভালো নাটকেরও এক্ষেত্রে মন্দ পরিণাম গুনতে হতে পারে! যদিও মঞ্চায়নই নাটকের একমাত্র শিল্প-বিচারের মানদণ্ড নয়; তথাপি একথা সত্য যে, মঞ্চায়নের দ্বারা নাটক থেকে বাড়তি শিল্পরস পাওয়া যায়। এ বিবেচনায় লিখিত একটি নাটক সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এবং তা পূর্ণাঙ্গ শিল্পও বটে! নাট্যকারের মঞ্চজ্ঞান থাকা আবশ্যক না হলেও তাঁর মঞ্চ-ধারণা নাটকটির সর্বাঙ্গ সুন্দর করে তুলতে যে সহায়তা করে তা নিঃসন্দেহ।

নাট্যকার লিখিত নাটকটির মাধ্যমেই তাঁর বক্তব্যবিষয় ব্যক্ত করেন। কিন্তু কোনো নাটক মঞ্চায়নের জন্য প্রযোজকের অর্থায়নে পরিচালক-নির্দেশক, কুশীলব নিয়োগ এবং পরিশেষে পরিচালক-নির্দেশকের ইচ্ছা ও পরিকল্পনা অনুযায়ী কুশীলবগণ রঙ্গমঞ্চে স্বীয় অভিনয় নৈপুণ্যে নাট্যকাহিনী ফুটিয়ে তোলেন। ‘নাট্যকার নাটক লেখেন, সেই লিখিত নাটক রঙ্গমঞ্চের মাধ্যমে দর্শকের সামনে হাজির হয়। আর নাটক অভিনীত হতে গেলেই, নির্দেশক, রঙ্গমঞ্চ, রঙ্গমঞ্চের নানা উপকরণ ও প্রস্তুতি, অভিনেতা-অভিনেত্রী- এসব কিছুর প্রয়োজন হয়। তাই লিখিত নাটক তার এক-তৃতীয়াংশ মাত্র। দুই-তৃতীয়াংশ রয়েছে নাট্য প্রযোজনার বিবিধ প্রস্তুতি ও সহযোগিতার মধ্যে।’ ফলে মঞ্চস্থ নাটকটির সাথে নাট্যকারের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। এজন্য কখনো কখনো মঞ্চস্থ নাটকের সঙ্গে নাট্যকারের মতবিরোধও দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ মঞ্চস্থ নাটক একটি স্বতন্ত্র শিল্প হিসেবে বিচার্য বিষয়। সামগ্রিক বিচারে মঞ্চস্থ নাটক নাট্যকারের একক সৃষ্টি নয়; বরং পরিচালক-নির্দেশক-কুশীলব সকলের যৌথ ও সমন্বিত শিল্প প্রয়াস। কেননা প্রযোজক-পরিচালক-নির্দেশক ও কলা-কুশলীদের সার্বিক সহায়তায় মঞ্চস্থ হয়। তবে পাঠ্যনাটকটি সবসময় স্বাধীন। কেননা লিখিত নাটকটিও সাহিত্যের অন্যান্য শাখার মতোই পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে এবং পাঠক পূর্ণ সাহিত্যরস আস্বাদন করে থাকেন। অতএব বলা যায়, মঞ্চায়ন বাদ দিয়েও নাটক থেকে স্বতন্ত্র শিল্পরূপে সাহিত্যরস আস্বাদন করা সম্ভব। তবে মঞ্চস্থ নাটক [পারফর্মিং আর্ট] সামাগ্রিক বা যৌথ শিল্পপ্রয়াস। এজন্য মঞ্চস্থ নাট্যশিল্পকে [পারফর্মিং আর্ট] সমন্বিত দলীয় কর্মপ্রয়াস বা ‘টিম-ওয়ার্ক’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। টিমের কোনো একটি অংশের বিশেষ সফলতায় মঞ্চস্থ নাট্যকলার সামগ্রিক সাফল্য নির্ভর করে না; ‘নাট্যায়ন একটি যৌথশিল্প, নাটকের স্ক্রিপ্ট সেখানে একটি অবলম্বন বা সংকেত মাত্র। অভিনেতা অভিনেত্রীদের অভিনয় কুশলতা বাক্য প্রক্ষেপণের ঢঙ্ আবহ ধ্বনির ব্যবহার, মঞ্চ সজ্জা এ সবকিছুর সম্মিলিত ফল হল নাটক।’ কিন্তু নাট্যসাহিত্য একক এবং স্বাধীন শিল্পমাধ্যম। তবে নাট্যসাহিত্যকে মঞ্চস্থ হতে হলে, সুক্ষ্ম এবং নানামুখি সীমাবদ্ধতার মধ্যদিয়ে পথ চলতে হয়। এক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার, নাট্যসাহিত্য শুধুমাত্র মঞ্চস্থ হওয়ার সময় নানা ধরনের সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়, অন্যথায় নয়।

নাট্যকারের নাটক তৎকালীন ‘মঞ্চব্যবস্থার’ মধ্য দিয়ে দর্শকের কাছে উপস্থিত হয়। তাহলে নাটক ও দর্শকের মাঝে থেকে যাচ্ছে মঞ্চব্যবস্থা। ‘মঞ্চব্যবস্থা’ কথাটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। সংক্ষেপে ‘মঞ্চব্যবস্থা’ বলতে বোঝায়, সেই যুগের রঙ্গমঞ্চ স্টেজ (Stage); সেই রঙ্গমঞ্চের মধ্যে দৃশ্যসজ্জার ব্যবস্থা, রূপসজ্জা, সাজপোশাকের ব্যবস্থা, আলো ও তার নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা, সেট-সেটিংস, উইংস-এর ব্যবস্থা, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের যোগ্যতা ও প্রতিভা, মঞ্চাধ্যক্ষ তথা পরিচালকের নির্মাণ ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা, প্রযোজক বা অর্থলগ্নী করেন যে বা যারা তাদের মূলধন বিনিয়োগের প্রস্তুতি ও ব্যবস্থা এবং সমকালীন দর্শক সম্প্রদায়ের নাট্যরস উপভোগের মানসিক অবস্থা- এইসব নিয়েই গড়ে সেই সময়কার ‘মঞ্চব্যবস্থা’।

নাটক মঞ্চায়নে অনেক সীমাবদ্ধতা-জটিলতা থাকা সত্ত্বেও প্রাচীনকাল থেকে আরম্ভ করে সমসাময়িক কাল পর্যন্ত মঞ্চস্থ নাটকের তথা সামগ্রিকভাবে নাটকের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। বলা যায়, সমকালে নাটক শিখরস্পর্শী মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। উপরন্তু আধুনিক কালে নাটক অনন্য শিল্পমাধ্যম হিসেবে সাহিত্যরসিকদের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। নাট্যসাহিত্যের এই জনপ্রিয়তার পশ্চাতে নিঃসন্দেহে এর গঠনগত সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কেননা নাটক একাধারে পাঠ্য এবং অভিনয়যোগ্য শিল্প। সাহিত্যের অন্যান্য শাখার চেয়ে নাটকের গঠনগত উপাদান বেশি; গঠনগত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সুকুমার সেন বলেন :

এখনকার দৃষ্টিতে সাহিত্যশিল্প ষড়ঙ্গ : নাট্য প্রবন্ধ কবিতা উপন্যাস গল্প ও গান। এগুলির উপাদানের সংখ্যায় নাট্য অপর পাঁচটি অঙ্গ হইতে স্বতন্ত্র। নাট্যের মূল উপাদান তিনটি- লেখক, অভিনেতা ও দর্শক। অপরগুলিতে মূল উপাদান দুইটি করিয়া- প্রবন্ধে, উপন্যাসে ও গল্পে মূল উপাদান দুইটি, লেখক ও পাঠক। আর কবিতায় লেখক ও পাঠক অথবা শ্রোতা; গানে গায়ক ও শ্রোতা। বলা বাহুল্য সর্বত্রই উপাদান সমমাত্রিক।

নাটক মঞ্চায়নের খাতিরে অনেক নিয়ম-কানুন ও পদ্ধতি মেনে চলতে বাধ্য হয়, যা সাহিত্যের অন্য শাখার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। নাটক ত্রিমুখি গঠনগত উপাদানের ওপর ভর করে স্বীয় সামর্থ্যে সাহিত্যের অন্যান্য শাখার চেয়ে ঋদ্ধ ও গুরুত্বপূর্ণ; বিশেষত সমাজমানস গঠনের মতো প্রায়োগিক ক্ষেত্রে নাটকের ভূমিকাও সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। সাধারণত নাটকের জীবন আত্মকেন্দ্রিক কোনো ব্যক্তিজীবনের প্রতিফলন নয়; বৃহত্তর সামাজিক জীবন নাটক গভীর মমতায় ধারণ করে। সামাজিক জীবন আবার বিশেষ দেশ-কাল এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থার অধীন। ফলে নাট্যসাহিত্যে সমাজমানসের সামগ্রিক চিত্র প্রতিবিম্বিত হয়। আর যে সাহিত্যমাধ্যম সমাজমানসকে যত বেশি স্পর্শ করে, প্রয়োজনীয়তা তত বেশি বৃদ্ধি পায়।

জীবনের প্রায়োগিক ক্ষেত্রে নাট্যশিল্পের (পারফর্মিং আর্ট) ভূমিকা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ; বিশেষত সাহিত্যের অন্যান্য শাখার চেয়ে সমাজজীবনে নাট্যসাহিত্যের প্রভাব অধিকতর। নাট্যসাহিত্য একাধারে পাঠ্য ও দৃশ্য উভয় শিল্পের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায়, মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও নাটক অন্যান্য সাহিত্যমাধ্যমের চেয়ে অনেক বেশি প্রভাব ফেলতে সক্ষম। কিন্তু নাটককে দৃশ্যায়ন যোগ্যতা অর্জনে নানান শর্তের মুখোমুখি হতে হয়। নাট্যকলার (পারফর্মিং আর্ট) সীমাবদ্ধতাগুলো নিম্নরূপ :

ক.
নাটক মঞ্চস্থ হয় বলে নাট্যকার দর্শকের ধৈর্যচ্যুতির বিষয়টি বিবেচনায় রেখে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংলাপের সাহায্যে কাহিনীর উন্মেষ, বিকাশ ও পরিণতি ঘটাতে বাধ্য হন। অর্থাৎ নাট্যকার পূর্বনির্ধারিত সময় সংক্রান্ত ধরাবাঁধা নির্দিষ্ট ছক মেনে চলেন। সাহিত্যের অন্যসব শাখাতেই লেখকের সময়ের ব্যাপারে পূর্ণস্বাধীনতা থাকে; অথচ নাট্যকারের কাঁধের ওপর সময়ের খড়গ সর্বদা উদ্যত।

খ.
নাটক ও নাট্যকার প্রায়শই প্রযোজক-নির্দেশকের মুখাপেক্ষী থাকেন। এজন্য নাটক মানসম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও প্রযোজক আর্থিক সংকটের কারণে দক্ষ পরিচালক-নির্দেশক ও কুশীলব নিয়োগ করতে ব্যর্থ হলে- নাটকের বক্তব্যবিষয় ফুটিয়ে তোলা অসম্ভব হয়ে পড়ে। অতএব আর্থিক সংকটে পড়েও নাট্যশিল্প ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে।

গ.
নাটক সংলাপ-নির্ভর সাহিত্য; রঙ্গমঞ্চে নট-নটীর অভিনয়দক্ষতার ওপর নাট্যসংলাপের অন্তর্নিহিত ভাব প্রকাশ পায়। এক্ষেত্রে অভিনয়ে অনভিজ্ঞ কুশীলবগণ কর্তৃক নাটক অভিনীত হলে- নাটকের মূলভাব, বক্তব্যবিষয় নাও বিকশিত হতে পারে।

ঘ.
নাট্যশিল্পে মঞ্চসজ্জার ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিকল্পিত দৃশ্যের পরিবেশ তৈরি করার মতো মঞ্চের প্রযুক্তিগত ও কারিগরী সহায়তা প্রয়োজন। অর্থাৎ দৃশ্য উপস্থাপনের সহায়ক কারিগরী ও প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধা না থাকলে নাট্যশিল্প আরেক দফা হুমকির সম্মুখীন হয়।

ঙ.
ভাষার প্রাঞ্জলতা নাট্যসংলাপের অন্যতম প্রধান শর্ত। অভিনয়যোগ্য শিল্প বলে, নাটকের সংলাপ দর্শক-শ্রোতার বোধগম্য সহজ-সরল সাধারণ ভাষায় রচিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। সংলাপ রচনার ক্ষেত্রেও নাট্যকার যথেষ্ট সচেতন ও হিসেবি থাকতে বাধ্য হন। কেননা সংলাপের ভাষা দুর্বোধ্য হলে নাট্যকাহিনী, বিষয়বস্তু, এবং বক্তব্য থিয়েটার হলের সাধারণ দর্শক-শ্রোতা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হবে। পাঠ্যসাহিত্যের ক্ষেত্রে অভিধান দেখার সুযোগ থাকে এবং বারবার অধ্যয়নেরও অবকাশ আছে; কিন্তু নাট্যসংলাপ দর্শক-শ্রোতার সামনে মাত্র একবার প্রকাশের সুযোগ পাওয়া যায়। অর্থাৎ থিয়েটার হলে- দর্শক দ্বিতীয়বার নাট্যসংলাপ শোনার সুযোগ পায় না। তাছাড়া থিয়েটার হলে অভিধান দেখারও সুযোগ নেই। এজন্য সংলাপ রচনায় নাট্যকারকে ভাষাগত দুর্বোধ্যতা পরিহার করতে হয়। কেননা অপ্রচলিত শব্দবিন্যাসে সংলাপ রচিত হলে দর্শক শ্রোতা নাট্যকাহিনী উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হতে পারে। সুতরাং নাট্যকারের ক্ষমতা, ইচ্ছা থাকলেও মঞ্চায়নের স্বার্থে নাটকের সংলাপে জটিল শব্দবিন্যাসের পরিবর্তে সহজবোধ্য ভাষা ব্যবহার করতে বাধ্য হন।

এসব শর্তে প্রতীয়মান হয়, নাটক কঠোর নিয়মনীতি ও সীমাবদ্ধতার মধ্যে জন্ম লাভ করে। পাঠ্যসাহিত্য নয় বলেই নাটক অসংখ্য নিয়মনীতির বেড়াজালে আবদ্ধ। পাঠ্যসাহিত্যের অন্যতম সুবিধা হলো, সেখানে লেখকের ইচ্ছেমতো জটিল শব্দবিন্যাস ঘটলেও তা শুধু একটিবারের মতো কান বা চোখের সামনে দিয়ে বয়ে যায় না; পাঠক ইচ্ছানুসারে দ্বিতীয়বার কিংবা বারবার পাতা উল্টিয়ে জটিল শব্দ এবং দুর্বোধ্য অংশগুলো পুনরায় বুঝে নিতে পারেন। অভিনয়যোগ্য নাট্যশিল্পে ফিরে দেখার এই সুযোগ নেই। কবিতা, উপন্যাস, গল্প কত বড় বা ছোট হবে তার কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম নেই; কিন্তু নাটকের মাথার ওপর সময়ের খাঁড়া ঝুলে থাকে। নাট্যসাহিত্যের এ ধরনের অশৈল্পিক শর্ত কিংবা সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও এর প্রায়োগিক গুরুত্ব অধিক।

দুই.

সাহিত্যের ইতিহাসে প্রাচীনকাল থেকে আরম্ভ করে সমকালেও কাব্যশাখার প্রভাব প্রতিপত্তি তথা মর্যাদা অক্ষুণ্ন রয়েছে সমানভাবে। কালের পরিক্রমায় কবিতার শক্তি সামর্থ্য মাঝেমধ্যে খানিকটা ম্লান হলেও অল্প সময়ের ব্যাবধানে কাব্যশাখা তার হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করেছে কাব্যসাহিত্য। কবিতা সবসময় যুগের চেতনা এবং মানবমনের আকাঙ্ক্ষার সাথে নিজেকে ভেঙেছে, গড়েছে এবং মানিয়ে নিয়েছে। অর্থাৎ ভিন্ন ভিন্ন যুগপরিবেশে কবিতা নিজেকে ভেঙেচুরে নির্মাণ করেছে। উনিশ শতকে কবিতার রূপান্তর-পরিবর্তন এবং বিনির্মাণ প্রক্রিয়ায় তা সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত। প্রচলিত আঙ্গিকে কাব্যকলা যেন যুগবাস্তবতা প্রকাশ করতে পারছে না। ফলে কাব্যকলার আঙ্গিকগত পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছে। এজন্যই সমালোচক বলেছেন :

কবিতার গঠনগত রূপে এই আঙ্গিকগত পরিবর্তন পাঠককে দিশেহারা করেছে, আবার পাঠকের কথা ভেবেই এমন এক আঙ্গিকের কথা ভেবেছেন কবিরা, যাতে পাঠকের সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া যোগ নতুন করে প্রতিষ্ঠার সুযোগ ঘটে। এই অন্বেষণেরই ফল কাব্যনাট্য। কবি আর নাট্যকারের দ্বৈতসিদ্ধি সমাহৃত হয়েছে এখানে। কবিকে জানতে হয়েছে নাট্যকারের প্রয়োগ কৌশল আবার নাট্যকারকে বুঝতে হয়েছে কবিতার তাৎপর্য।

কবিতার শিখরস্পর্শী শক্তি-সামর্থ্য-মর্যাদার সঙ্গে নাট্যগুণের কৌশলগত সমন্বয়ে ‘কাব্যনাটক’ সৃষ্টি হয়েছে। সুতরাং বলা যায়, কাব্যনাটক হচ্ছে কবিতা ও নাটকের সংমিশ্রণে পাওয়া সমন্বিত শিল্প। যে নাটকের অন্তর গীতিকবিতার সুরমূর্ছনায় ঝংকৃত হয় এবং চরিত্রসমূহের সংলাপে কবি-মানসের বিচিত্র ভাব-কল্পনার প্রকাশ ঘটে, সহজ কথায় তাই কাব্যনাটক। এ ধরনের নাটকে কবির কল্পনা-আবেগ-উচ্ছ্বাস বহুবর্ণিল রঙের উজ্জ্বল আলোকছটায় একক রূপ লাভ করে এবং অনেক সুরও একটি ঐক্যতানের সৃষ্টি করে। তবে এ ধরনের নাটকে সাধারণ নাটকের মতো গতিময়তা এবং ঘটনার যৌক্তিক বিন্যাস ও কার্যকারণ আবিষ্কৃত নাও হতে পারে। কাব্যনাটকে চরিত্রসমূহের অন্তর্গত চিন্তা-চেতনা কবি গভীরভাবে বিশ্লেষণ সাপেক্ষে কবিতার মায়াজাল রচনা করেন; ফলে কাব্যনাটকে সামগ্রিক ঘটনা-বিশ্লেষণ ধারাবাহিক পরম্পরায় নাও ঘটতে পারে। অথবা নাট্যরসের পরিণামের দিকে মনোসংযোগ না করেই নাট্যকার কাহিনীর বিচ্ছিন্ন শতছিন্ন অংশগুলোকে ভাব-কল্পনার অজস্র ধারায় প্রবাহিত করতে পারেন। কাব্যনাটকে গীতিকবিতার আবেগ এবং উচ্ছ্বাসজনিত নাট্যিক দুর্বলতা থাকাও অস্বাভাবিক নয়। কেননা কাব্যনাটক রচনার ক্ষেত্রে নাট্যকার প্রত্যক্ষভাবে চরিত্রের মনোজগত বিশ্লেষণের সময় উপস্থিত থাকেন বলে, এখানে লিরিকের প্রাধান্য থেকেই যায়। ফলশ্রুতিতে সাধারণ নাটকের ন্যায় কাব্যনাটকে ঘটনার সুবিন্যস্ত সমাবেশ, আবর্তন এবং পরিণতি পরিলক্ষিত হয় না। এখানে নাট্যকারের নিকট কাহিনীর কাঠামোটিই একমাত্র উপাদান বা উপজীব্য। অতঃপর সেই কাহিনীটুকু নির্মাণের জন্য চরিত্রসমূহের সংলাপের সহায়তায় নাট্যকার গন্তব্য অনুসন্ধান করতে থাকেন। এজন্যই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কাব্যনাটকের পরিসমাপ্তি সন্তোষজনক হয় না। কেননা এখানে নাট্যকারের প্রধান লক্ষ্য থাকে, চরিত্রের অন্তর্রহস্য উদ্ঘাটন করে দর্শক-পাঠকের সামনে উপস্থাপন করা। ‘লক্ষ্য তার সুপ্রিম বিউটি অথবা পরমম্ নিকসায় পশ্যম্।’

আধুনিক কালে কবিতার সামর্থ্যকে টিএস এলিয়ট [১৮৮৮-১৯৬৫] নাট্যসাহিত্যে সুচিন্তিত প্রাকরণিক কৌশলে প্রয়োগ করেছেন। তিনিই কবিতাকে নতুন আঙ্গিকে ঢেলে সাজিয়ে কাব্যনাট্যের জন্ম দিয়েছেন। এই অর্থে সাহিত্যের ইতিহাসে কাব্যনাটক সম্পূর্ণ আধুনিককালের সৃষ্টি। তবে প্রাচীনকালের সাহিত্যেও কাব্যনাটকের কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য বা উপাদান খুঁজে পাওয়া সম্ভব। কেননা যেকোনো পরিবর্তন-রূপান্তর কখনো আকস্মিক নয়; সকল পরিবর্তনই ধারাবাহিক বিবর্তনের ফল। প্রাচীনকালের নাট্যসাহিত্য শুধু নয়; সাহিত্যের সকল শাখাই কাব্যধর্মী বা কবিতার আঙ্গিকে রচনা করা হতো। এজন্যই বৃহত্তর অর্থে প্রাচীনকালে রচিত নাটকগুলোর মধ্যেও কাব্যনাটকের উপাদান খুঁজে পাওয়া সম্ভব। তথাপি আধুনিক-অর্থে সেগুলোকে কাব্যনাটক হিসেবে অভিহিত করা সমীচীন নয়। কেননা আধুনিক যুগপরিবেশের জটিলতায় ব্যক্তির চিন্তাচেতনা প্রকাশের বাহন হিসেবে কাব্যনাটকের সৃষ্টি হয়েছে। আধুনিককালে কবিরা যুগমানসের জটিলতা প্রকাশ করতে গিয়ে ক্রমাগত দুর্বোধ্য হয়ে উঠেছেন। যুগপরিবেশের প্রভাবে কবিদের ব্যক্তিগত দুর্বোধ্য প্রকাশরীতি এবং চিন্তাচেতনা পাঠককে ক্রমাগত অসহায় করে তুলেছে এবং কবিতার ভাষাগত-চিন্তাগত দুর্বোধ্যতায় কবির সঙ্গে পাঠকের ক্রমাগত দূরত্ব বেড়েছে। কবির কথা যদি পাঠক না বোঝে এবং পাঠকের প্রত্যাশা যদি কবি না বোঝে, তাহলে শিল্পসাধনা অর্থহীন। তাই দুর্বোধ্যতার প্রতিক্রিয়ায় কবিতা বিমুখ পাঠককে পুনরায় কবিতামুখি করতে কবিরা নতুন আঙ্গিকের অন্বেষণে ছুটলেন, আবিষ্কৃত হলো নতুন আঙ্গিক ‘কাব্যনাটক’।

আধুনিককালে নাটক যখন বিশেষ এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছিল, ঠিক সে সময় নাটক যেন নিজেকে পাঠকের সামনে সম্পূর্ণ মেলে ধরতে পারছিল না। এর পরিবর্তন বা উপস্থাপনা কৌশল যুগের অবশ্যম্ভাবী চাহিদা হয়ে উঠেছিল। ‘ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষাংশ থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভিক কাল পর্যন্ত ইংল্যান্ড ও ইউরোপীয় বাস্তববাদী বন্ধ্যা নাট্যকলার প্রতিক্রিয়ার ফলে এলিয়ট প্রমুখের মধ্যদিয়ে কাব্যনাটক কথাটির বহুল প্রচার ঘটে।’ পাশ্চাত্য সাহিত্যে গ্রিকনাটক ও এলিজাবেথীয় যুগের নাটক পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ [ক্ল্যাসিক] নাট্যসাহিত্য হিসেবে সুবিদিত। গ্রীক-নাটক কিংবা এলিজাবেথীয় যুগের নাটকের বাহ্যাবয়ব কাব্যনাট্যের হলেও তখন পর্যন্ত ‘কাব্যনাটক’ শব্দটির আলাদা ব্যবহার হয় নি। কেননা তখন সাধারণ নিয়ম ছিল কাব্যের ভাষায় নাটক রচনা করা। এজন্য তখন কাব্যনাটক কথাটি ব্যবহারের আলাদা প্রয়োজনও হয় নি। উইলিয়াম শেক্সপীয়র [১৫৬৪-১৬১৬] রচিত বিশ্বখ্যাত নাটকগুলোর মধ্যেও কাব্যনাটকের যথেষ্ট উপাদান ছিল। তথাপি সেগুলো আধুনিক-অর্থে কাব্যনাটকের আওতাভুক্ত করার সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন, আধুনিককালে গদ্যনাটকের প্রবল ক্রান্তিলগ্নে কবিতাকে অভিনব বিষয়-বৈচিত্র্যে ও আঙ্গিকে সুসাহিত্যিক টিএস এলিয়ট নাটকে সুচিন্তিতরূপে আমদানী করে কাব্যনাটক রচনা করেছেন।

পাশ্চাত্যে উনিশ শতকের প্রায় সকল প্রধান কবিই কাব্যনাটক রচনার চেষ্টা করেছেন। এ সময় উইলিয়াম ওয়ার্ডস্ওয়ার্থ [১৭৭০-১৮৫০], এসটি কোলরিজ [১৭৭২-১৮৩৪], পিবি শেলী [১৭৯২-১৮২২], জন কীটস্ [১৭৯৫-১৮২১], লর্ড বায়রন [১৭৮৮-১৮২৪], আলফ্রেড টেনিসন [১৮০৯-’৯২], রবার্ট ব্রাউনিং [১৮১২-’৮৯], ম্যাথু আর্নল্ড [১৮২২-’৮৮], সিএ সুইনবার্ন [১৮৩৭-১৯০৯] এবং জিএম হপকিন্স [১৮৪৪-’৮৯] কাব্যভাষায় নাটক লিখেছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তাঁরা সকলেই আধুনিক-অর্থে সার্থক কাব্যনাটক রচনায় ব্যর্থ হয়েছেন। তথাপি ইউরোপীয় নাট্যসাহিত্যের বন্ধ্যাত্ব মোচনে তাঁরা শেক্সপীয়রীয় নাট্যরীতি অথবা প্রাচীন গ্রীক নাট্যশিল্পের সাদৃশ্যে যে প্রয়াস গ্রহণ করেছিলেন তার গুরুত্ব কম নয়; এরই ধারাবাহিক বিবর্তন প্রক্রিয়ায় নাট্যসাহিত্য সেকালের স্থবিরতা অতিক্রমে সক্ষম হয়। ইউরোপীয় গদ্যনাটকের স্থবিরতা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে সাহিত্যিকগণের সচেতন প্রচেষ্টায় কাব্যনাটক নামক একটি নতুন ধারার বিকাশ ঘটে। কেননা ‘কাব্যনাটক জীবনের আবিশ্ব সার্বিকতার সন্ধান, তাই কাব্যনাট্য কি নাট্যকাব্য এই তর্ক অর্থহীন। কাব্যনাটক জৈবিক ঐক্য ‘অর্গানিক হোল’। এলিয়ট ন্যাচারিলিস্ট নাট্যপদ্ধতিতে বিশ্বাসী হয়েও স্বীকার করেছেন কাব্যনাটকে কবিতা ও নাটক জৈবিক ঐক্যে একটি অনন্য।’ কবিতা ও নাটকের জৈবিক একাত্মতার কথা এলিয়ট বললেও সর্বার্থে তিনি তা মেনে চলতে পারেন নি। এলিয়ট তাঁর রচিত সার্থক কাব্যনাটকগুলোতে নাট্যগুণের আধিপত্য এতটাই বিস্তৃত করেছেন যে, সেখানে কবিতা একেবারেই গৌণ হয়ে পড়েছে। তিনি ‘... কাব্যনাটকের তত্ত্বকে টানতে টানতে গদ্যের রান্নাঘরে ঢুকে পড়েছেন।’

উনিশ শতকের পাশ্চাত্য সাহিত্যে প্রধান কবিগণ এলিয়টের পূর্বেই কাব্যভাষায় নাটক রচনার ব্যাপারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছিলেন। এ সময় কাব্যনাটক রচনার ক্ষেত্রে প্রধানত কবিগণ এগিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, কবিতায় কেন নতুন আঙ্গিক প্রয়োজন হলো? কাব্যনাটকের উৎসের এই সূত্র সন্ধান করলে দেখা যায়, আধুনিক কালের জড়বাদী দর্শনের প্রভাবে বস্তুবিশ্বের সবকিছু থেকে মানুষ সম্পর্করহিত বিচ্ছিন্ন মানবসত্তায় পরিণত হয়েছিল। আধুনিক মানুষ জেনেছে, তার একটা স্থূল মানবিক অস্তিত্ব আছে। এছাড়া চিন্তার জগতেও নিজের অস্তিত্ব এবং টিকে থাকা নির্জলা সত্য। অস্তিত্ব বিষয়ক এই চিন্তাসূত্র মানুষকে স্বাধীনতা এবং স্বতন্ত্রসত্তা তথা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের কথা শিখিয়েছে। অর্থাৎ ব্যক্তি-মানুষের অস্তিত্ব তার একান্ত নিজের। তারপরও মানবসমাজের সামগ্রিক উন্নয়নে ব্যক্তির দায়দায়িত্ব আছে এবং সে দায়িত্ব পালনের সজাগ চেতনায় তার মধ্যে তীব্র উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হয়। ফলে দায়িত্বশীল মানুষ বস্তুবিশ্বের সাথে সম্পর্কশূন্য বিচ্ছিন্নতার চেতনা দ্বারা সংক্রামিত হয়ে নিজেকে নিঃসঙ্গ ভাবতে শুরু করে; বিচ্ছিন্নতার অসহায়ত্বে নিমজ্জিত মানুষ নিজেকে পারিপার্শ্বিক অবস্থায় স্থাপন করতে চায়। ব্যক্তিমানুষ স্বীয় চেতনাকে অপরের মধ্যে সঞ্চালনের প্রবল বাসনায় অভিনব শিল্পসাধনায় নিযুক্ত হয়। ব্যক্তির চিন্তাচেতনা এবং ভাবনাকে দৃশ্যময় করতে গিয়ে নতুন আঙ্গিকের প্রয়োজন হয়েছে; এই প্রয়োজনীয়তা থেকেই কাব্যনাটকের সৃষ্টি। উনিশ শতকের ইউরোপীয় কবিগণ প্রথমত প্রাচীন কালের পদ্যে রচিত নাটকের পরিমার্জনে সচেষ্ট হন। দ্বিতীয়ত এ সময় তাঁরা কাব্যনাটকের তাত্ত্বিক দিক অর্থাৎ বিষয়গত, বিন্যাসগত, ভাষাগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও উন্নয়ন সাধনে মনোনিবেশ করেন। তাঁরা যান্ত্রিক যুগের দাবী মেনে নিয়ে, বাস্তববাদী নাটকের বহির্বাস্তবতার পরিবর্তে কাব্যনাটকের অন্তর্বাস্তবতার প্রতি আকৃষ্ট হন এবং তা গুরুত্বসহকারে নাট্যসাহিত্যে প্রয়োগ করেন। তাঁরা জাগতিক তথা বাহ্যিক সত্য প্রকাশের চেয়ে অন্তর্গত সত্য আবিষ্কার এবং অন্তর্লীন বাস্তবতা প্রকাশ অধিক জরুরি মনে করেন। কিন্তু নাটকের প্রচলিত প্রকরণে তা প্রকাশ করা সম্ভব ছিল না।

সমসাময়িককালে ধনতান্ত্রিক শিল্লোন্নত দেশে জাগতিক বস্তুসম্পদের মোহমায়ায় শৃঙ্খলিত মানবাত্মা মুক্তির আকাক্সক্ষা প্রবল হয়ে ওঠে। অতএব বলা যায়, জীবনের গূঢ়ার্থ প্রকাশ করার প্রতিজ্ঞায় এবং সামাজিক জীবনের অভ্যন্তর বাস্তবতা উন্মোচনের দায়দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে কাব্যনাটকের ইতিহাস সূচিত হয়। এলিয়ট মনে করতেন, গদ্যসংলাপাত্মক নাটকের চেয়ে কাব্যভাষায় রচিত নাটকে জীবনের গূঢ়ার্থ প্রকাশ অধিকতর সহজ; অর্থাৎ এক্ষেত্রে কাব্যভাষা সহায়ক ভূমিকা পালন করতে সক্ষম। সোজা কথায়, গদ্যনাটকের চেয়ে কাব্যনাটকে জীবনের গভীরার্থ প্রকাশ করা সহজতর; এ কারণেও বিশ শতকের প্রথমার্ধে ইউরোপের অনেক কবিই কাব্যনাটক রচনায় আকর্ষণ, উৎসাহবোধ করেছিলেন। আধুনিক যুগে অতিবাস্তবতা মানুষকে ক্লান্ত করেছে, অথচ মানুষ বারবার নিজের অভ্যন্তরে এবং চেতনার গূঢ়মূলে তাকাতে চেয়েছে। মানবজীবনের এই অন্তর্বাস্তবতা প্রচলিত কবিতা কিংবা নাটকে প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছিল না। ফলশ্রুতিতে সমকালীন জীবনাভিজ্ঞতার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় মানবজীবনের অন্তর্লোকের রহস্য উদ্ঘাটনে মূলত কবিগণ সাহিত্যের এক অভিনব আঙ্গিক আবিষ্কার করলেন, যা ‘কাব্যনাট্য’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। তাঁদের এই উৎসাহী প্রয়াস, কাব্যনাটকের ব্যাপক প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।

ইয়েটস এবং এলিয়ট প্রবর্তিত কাব্যনাটক বিষয়ক তত্ত্বের সমন্বয়ে সাহিত্যের ইতিহাসে সার্থক কাব্যনাটকের অস্তিত্ব সুদৃঢ় হয়েছে। উনিশ শতকে বাস্তববাদী নাটকের বিরুদ্ধস্রোতে কাব্যনাটক যে যাত্রা শুরু করেছিল, তা বিষয়-বৈচিত্র্যে অভিনব হলেও মঞ্চে শতভাগ সাফল্য অর্জন করতে পারে নি। অর্থাৎ শুরুতেই মঞ্চস্থ হওয়ার ক্ষেত্রে কাব্যনাটক এক ধরনের হোঁচট খায়; নাট-বিচারের মানদণ্ডে এসব অনেকাংশেই ব্যর্থ হয়েছিল। তবে মঞ্চ-অসফল এ কাব্যনাটক রচনার মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতে সার্থক কাব্যনাটক রচনার পথ প্রসারিত হয়েছিল। পরবর্তীতে এলিয়ট উনিশ শতকের খ্যাতিমান কবিদের কাব্যনাটক রচনায় ব্যর্থতার কারণ হিসেবে মঞ্চ সম্বন্ধে তাঁদের অনভিজ্ঞতা এবং নাট্য-বিষয়ক সম্যক জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করেন। অন্যদিকে যাঁদের নাট্যশিল্প বা মঞ্চের যথার্থ জ্ঞান ছিল তাঁরা প্রকৃত কবি না হওয়ায় কাব্যনাটক রচনায় ব্যর্থ হয়েছিলেন। একথা সত্য যে, ইয়েটস-এর মতো শক্তিমান কবির পক্ষেও মঞ্চজ্ঞানের অভাবে সার্থক কাব্যনাটক রচনা সম্ভব হয় নি; অথচ জাপানি ‘নো’ নাটকের আদলে তিনিই প্রথম ‘এ্যাবি থিয়েটার’ হলে পৌরাণিক বিষয়াদি নিয়ে কাব্য-সৌন্দর্যের আবহে নাটক মঞ্চায়নের মাধ্যমে কাব্যনাটকের সম্ভাবনা উজ্জ্বলতর করে তোলেন। পরবর্তীতে জেএম সিঙের কাব্যগুণ সমৃদ্ধ গদ্যভাষায় রচিত নাটকগুলো কাব্যনাট্যের বিকাশপর্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেলি। ক্রিস্টোফার ইশারউড [১৯০৪-’৮৬], ডব্লিউএইচ অডেন [১৯০৭-’৭৩], স্টিফেন স্পেন্ডার [১৯০৯-’৯৫] প্রমুখ সাহিত্যিকবৃন্দ কাব্যনাটকের বিকাশপর্বের ইতিহাসকে আরো একধাপ এগিয়ে নিয়ে যান।

তিন.

আধুনিক কাব্যনাটকের অগ্রপথিক টিএস এলিয়ট বিশ শতকের তিরিশ দশকে নাটকের বন্ধ্যাত্ব মোচনের লক্ষ্যে কবিতা ও নাটকের সুকৌশলে সংমিশ্রণে ‘দ্যা রক’ রচনা করেন; ‘দ্যা রক’ প্রথম কাব্যনাটক রচনার প্রয়াস। ‘দ্য রক’ রচনার সময় এলিয়ট নাট্যমঞ্চ সম্পর্কে সম্যক অবহিত ছিলেন না; মঞ্চজ্ঞানের অভাবে ‘দ্য রক’ সার্থক কাব্যনাটক হয়ে উঠতে ব্যর্থ হয়। তিনি এই ব্যর্থতার উপর দাঁড়িয়ে এগিয়ে যান এবং রচনা করেন ‘মার্ডার ইন দ্য ক্যাথিড্রাল’ [১৯৩৫], দ্য ফ্যামিলি রিউনিয়ন’ [১৯৩৯], ‘দ্য কনফিডেন্সিয়াল ক্লার্ক’ [১৯৫৩] এবং ‘দ্য এলডার স্টেট্সম্যান’ [১৯৫৮] প্রভৃতি শিল্প ও মঞ্চসফল কাব্যনাটক। তাঁর কাব্যনাটকগুলো মঞ্চসাফল্য পাওয়ায় সাহিত্যের এ নবীন শাখাকে বিশ্বব্যাপী নন্দিত হয় এবং ইউরোপীয় বাস্তববাদী নাটকের ধারাবাহিক ব্যর্থতার বিপরীতে কাব্যনাটকের অবস্থান উত্তরোত্তর সুদৃঢ় হয়েছে। অতএব কাব্যনাটকের সূচনাপর্বের ইতিহাসে জড়িয়ে আছে মঞ্চের ব্যাপারটি। নাটক এবং কাব্যনাটকের মঞ্চসাফেল্যর মধ্যে যে সূক্ষ্মতর পার্থক্য রয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কেননা, কাব্যনাটকে লেখক ব্যক্তির অন্তর্জগতকে মঞ্চে প্রতিফলিত করতে চায়; যা কবিতার বিষয় ছিল তা মঞ্চে উপস্থাপন করেন। ফলে কাব্যনাটকের মঞ্চায়ন প্রসঙ্গে আলোচনার সুবিধার্থে এর সংজ্ঞা, বিষয় ও পরিধি সম্বন্ধে সম্যক ধারণা থাকা আবশ্যক।

কাব্যনাটক কথাটি দ্বারা সাধারণ অর্থে বোঝান হয় কবিতায় বা কাব্যভাষায় রচিত নাটক। ইংরেজিতে ভার্স প্লে বা পোয়েটিক ড্রামা শব্দ দুটো ‘কাব্যনাটক’ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে ‘কাব্যনাটক’ শব্দটি সাহিত্যে আভিধানিক অর্থের পরিবর্তে পারিভাষিক অর্থে গ্রহণ করা হয়েছে। নাটকের আঙ্গিকে কবিতা পরিবেশিত হলেই তা কাব্যনাটক হয় না, তারও অধিক কিছু যেন কাব্যনাটকে আভাসিত। ‘নাটকের আঙ্গিকে কবিতা একথা সত্য কিন্তু কবিতা ও নাটক এখানে পরস্পরে সম্পৃক্ত। নাটক এখানে তীব্র নাটকীয়তাকে দমন করেছে কবিতাও শুধু আবৃত্তিযোগ্য না হয়ে দৃশ্যরূপে উদ্ভাসিত।’

কাব্যনাটকে নাটকীয় তীব্রতা, উৎকণ্ঠা অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত, এখানে মূলত কাব্যদেহের ব্যঞ্জনায় নাট্যঘটনা অনুভববেদ্য হয়ে ওঠে। ছন্দে রচিত হলেই যেমন সব রচনা কবিতা হয় না, তেমনি পদ্যে রচিত হলেই তা ‘কাব্যনাটক’ নয়। কেননা কবিতার ক্ষেত্রে ছন্দের চেয়েও কাব্যগুণ অধিক গুরুত্বপূর্ণ। তেমনি কবিতার মতোই গদ্যেও কাব্যগুণ থাকতে পারে, সেক্ষেত্রে কাব্যগুণ সমৃদ্ধ গদ্যকে ‘কাব্যধর্মী-গদ্য’ বলা হয়। কবিতার ছন্দ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও গদ্য এবং পদ্যের পার্থক্য স্বীকার করেন নি। তাছাড়া আধুনিককালের কবিতায় গদ্যের প্রভাব প্রবল হয়েছে। আপাত-অর্থে ছন্দবিহীন তথা অন্ত্যমিলহীন এসব কবিতাকে আধুনিক যুগে গদ্যকবিতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সাধারণত কবিতায় ছন্দ প্রত্যাশিত; কিন্তু ছন্দে রচিত সকল রচনাই কবিতা নয়। কবিতায় ছন্দের চেয়ে অপরিহার্য কাব্যময়তা। তেমনি কাব্যনাটকের সংলাপেও ছন্দের চেয়ে কাব্যগুণ অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেননা কাব্যনাটকে কবিতাকে নাট্যাঙ্গিকে ব্যবহার করা হয়। সুতরাং সাহিত্যের এই শাখা কবিতা ও নাটকের শর্ত পূরণে উৎসাহী। কাব্যনাটকে মূলত সাহিত্যের একটি মাধ্যম অন্য একটি মাধ্যমকে আত্মস্থ করে এবং বাহুল্য বর্জন করে একে অপরের জন্য অপরিহার্য হয়ে ওঠে। এই প্রক্রিয়ায় সাহিত্যের যে শাখা নিজেকে সমৃদ্ধ করে তাই কাব্যনাটক। কবিতা ও নাটকের সুসমন্বয়ে কাব্যনাটকের বিকাশ। অর্থাৎ যে সাহিত্য মাধ্যমে কবিতা নিজেকে ভেঙে নাট্যাঙ্গিকে এবং নাটক নিজেকে ভেঙে কাব্যাঙ্গিকে মিলেমিশে একাকার হয়েছে তাকে কাব্যনাটক বলে। কাব্যনাটকের সমন্বিত প্রয়াস প্রসঙ্গে টিএস এলিয়ট যথার্থই বলেছেন, কাব্যময়তা নাটকে সংস্থাপিত হলে কাব্যনাটকের সৃষ্টি হয়। সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই শিল্পধারার সার্থক সমন্বয় একান্ত প্রয়োজন কাব্যনাটকে। কাব্যনাটকে কাব্যগুণ অবশ্যই নাট্যগুণের অনুসারী হবে। ‘It must justify itself dramatically, and not merely be fine poetry shaped into a dramatic form’ কাব্যনাটকে কাব্যগুণ যতই মাধুর্যপূর্ণ ও চমৎকার হোক না কেন, যদি তা নাট্যঘটনায় অনিবার্য তথা অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠতে না পারে সেক্ষেত্রে রচনার কাব্যিক অলংকরণ প্রয়োজনহীন এবং বাহুল্য। যেসব ক্ষেত্রে গদ্যসংলাপে নাট্যঘটনা বা বিষয়বস্তু উপস্থাপন করা সম্ভব- সেক্ষেত্রে এলিয়ট নাটক রচনার পক্ষেই মত দিয়েছেন। যে বিষয়, ঘটনা বা কাহিনী গদ্যসংলাপাত্মক নাটকে প্রকাশ করা সম্ভব, সেক্ষেত্রে কাব্যভাষায় নাটক রচনা না করাই শ্রেয়। তবে আধুনিক যুগের জীবনবাস্তবতায় কাব্যনাটক রচনার উপাদান হরহামেশা পাওয়া সম্ভব। যান্ত্রিক যুগের এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে কবি ও নাট্যকারের একীভূতসত্তা কাব্যনাটকের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করে চলেছে।

কাব্যনাটকের ক্ষেত্রে উভয় [নাটক ও কবিতা] শিল্পরীতির প্রভাব প্রায়শ সমান সমান; কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাব্যই প্রাধান্য লাভ করেছে। এলিয়ট মনে করেন, সাধারণ নাটকের মতোই কাব্যনাটকের বাহ্যাবরণ থাকতে হবে। তবে নাটকীয় বাহ্যাবরণকে কাব্যনাটক অন্তরস্থ উপলব্ধিজাত গভীরতর জাগতিক বাস্তবতায় প্রকাশ করবে। সুতরাং কাব্যনাটকের প্রকরণ দ্বি-স্তর বিশিষ্ট; যা তাকে গদ্যনাটক থেকে আলাদা করেছে। তবে পরিকল্পিতভাবে রূপক-সাংকেতিক নাটকের মতো কাব্যনাটকে বাস্তবজগতকে প্রচ্ছন্ন করা হয় না; বরং কাব্যনাটকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বস্তুবিশ্বের বাস্তবতা অবলুপ্ত হয়। তাই কাব্যনাটকের ভাষা সম্বন্ধেও এলিয়ট যথেষ্ট উদ্বিগ্ন ছিলেন। তাঁর মতে, কাব্যনাটক এমন কাব্যভাষায় রচিত হবে, যে ভাষায় সব ধরনের বক্তব্যই নাটকীয়তায় ফুটিয়ে তোলা যাবে। সেই কাব্যভাষার প্রতি দর্শক-শ্রোতা যেন অতিমাত্রায় ঝুঁকে না পড়ে সেদিকেও সচেতন থাকা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে নাট্যপরিস্থিতির কারণে কাব্যগ্রন্থি শিথিল করার পক্ষেও মত দিয়েছেন এলিয়ট। কাব্যনাটকে অবশ্যই ভাষাকে নাট্যপরিস্থিতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হয়ে উঠতে হবে। এ প্রসঙ্গে কবি সমালোচক শঙ্খ ঘোষের [জ. ১৯৩২] মন্তব্য স্মরণীয় :

যে কোনো মুহূর্তে ভাবনা বা অনুভব অনুকূল গাঢ়তায় প্রবেশ করতে পারে, এমন কাব্যভাষা তাই নির্মাণ করতে হবে কাব্যনাট্যে, তার জন্য স্থিতি-স্থাপক নম্য এক ছন্দের প্রয়োজন এবং এর দ্বারা একদিকে যেমন নাটকে জীবনচিন্তার সাময়িকতা ও কবিকল্পনার চিরন্তনতা যুক্ত হবে, অন্যদিকে তেমনি কবিতার জগৎ-ও প্রসারিত হবে বহুদূর। নিছক ব্যক্তিগত আবেগ থেকে কবিতাকে সরিয়ে আনা প্রয়োজন, তাকে স্থাপনা করা উচিত বস্তগত ক্রিয়াশীলতার মধ্যে, এই আধুনিক কাব্যচিন্তারও একটি সক্ষম প্রকাশ তাই দেখতে পাব আধুনিক কাব্যনাট্যে।

আধুনিক কবিতায় অদীক্ষিত মানুষকে পুনরায় কবিতামুখি করে তোলার জন্য কবিদের মধ্যে তীব্র তাড়না ছিল। এজন্যই আধুনিককালে কবিগণ কবিতার দৃশ্যরূপ রচনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। এছাড়াও অন্তর্নিহিত কারণ হিসেবে মনে করা যায়, কবির স্বীয় চেতনাকে দৃশ্যরূপে দেখার দুর্মর বাসনাও ছিল। ‘অনুভবেদ্য যে উপলব্ধি যা সত্য হয়ে ওঠে কবির চেতনায়, তার কি কোনো শরীরী সত্তা আছে? সাধারণ অর্থে নিশ্চয়ই নেই। একজন পাঠক বহু সাধনায় তাকে হৃদয়ঙ্গম করেন শুধু। সেই রহস্যময় অন্তর্লোক, যাকে পরিস্ফূট দৃশ্যরূপে দেখা, বহুদিনের সেই ইচ্ছা, সম্ভব হল কাব্যনাট্যে। অন্তর্চেতনার বাণীরূপ এতদিন সত্য ছিল, তার দৃশ্যরূপ সম্ভব হল কাব্যনাট্যের আঙ্গিকে।’

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক কালে বিষয়গত বৈচিত্র্যে কাব্যনাটক অন্তর্বাস্তবতাকে উচ্চতর বাস্তবতায় প্রকাশের তাগাদায় ঐতিহাসিক, পৌরাণিক কাহিনী, লোকায়ত জীবন কিংবা কাল্পনিক ঘটনা প্রকাশের মতো শিল্পাঙ্গিক খুঁজে নিয়েছে। পৌরাণিক কাহিনী এবং চরিত্রগুলোকে আধুনিক কালের বাস্তবতার সাথে সঙ্গতি রেখে বিনির্মাণ করা হয়েছে। ফলে প্রাচীন পুরাণের ঘটনা ও চরিত্রেরও এ কালের মানবজীবনের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে। পুরাণকে আধুনিক বাস্তবতায় ব্যবহারও আধুনিক সাহিত্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কাব্যনাটকের জনক এলিয়ট নিজেও এর বিষয়বস্তু হিসেবে দৈনন্দিন পারিবারিক জীবনের ঘটনা অবলম্বনে ‘ককটেল পার্টি’ রচনা করেছিলেন। আবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনের মহল ছেড়ে মহান দেশনায়কের জীবনকাহিনীও গ্রহণ করেছেন। তাঁর বিষয় নির্বাচন থেকে প্রতীয়মান হয়, যেসব ঘটনার মধ্যে নাটকের উপাদান আছে সেসব ঘটনায় কাব্যনাটকেরও উপাদান বিদ্যমান। তবে কাব্যনাটকে অবশ্যই বহির্বাস্তবতার চেয়ে অন্তর্বাস্তবতা প্রকাশের ব্যাপারটি প্রাধান্য পায়। অতএব পরিচিত বস্তুজাগতিক জীবনকাহিনীও কাব্যনাটকে উঠে আসতে পারে। এতে চরিত্রের জাগতিক জীবনের অন্তর্নিহিত বাস্তবতার প্রতিফলন অবশ্যই ঘটবে।

কাব্যনাটক জীবনঘনিষ্ঠতা স্বীকার করে, তবে কাব্যভাষা ও ছন্দ তাকে কিছুটা সুদূরতা দান করে। এজন্য কাব্যনাটকের কাহিনী বাস্তবজীবন থেকে সংগৃহীত হলেও পরিণতিতে তা বিমূর্ত হয়ে ওঠে। কবি জাগতিক জীবনের গভীর, গূঢ় অন্তর্গত সত্যের সন্ধান করতে গিয়ে কাব্যভাষাকে নাট্যধর্মের গুণে সিক্ত করে কাব্যনাটক। এর ভাষা গদ্য না পদ্য হবে এ বিষয়ে বিতর্কের অবসান আজো হয় নি; অথবা এ বিতর্কই অবান্তর।

আধুনিক কাব্যনাটক জীবনের যে অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির কথা বলতে চায়, যা ডিসকার্সিভ প্রোজ-এ বা প্রবন্ধের গদ্যে রচিত হতে পারে না। তাছাড়া সাধারণ কাব্যভাষাও আধুনিক কাব্যনাটকের সম্পূর্ণ ভাবপ্রকাশের সহায়ক বলে বিবেচনা করা যায় না। নাটকের ক্ষেত্রে সংলাপের ব্যঞ্জনা ও নাটকীয় প্রাসঙ্গিকতা [ড্রামাটিক রিলেভেন্স] থাকা বাঞ্ছনীয়। তথাপি একথা সত্য যে, নাট্যকাহিনীর অনিশ্চিত আকস্মিকতা, ঘটনার তীব্র প্রবাহ, সংঘাত এবং চরিত্রের দ্বন্দ্ব কাব্যনাটকে অনেক মৃদু। নাটকে কাহিনীর ওপর নির্ভরতা অধিক, কিন্তু কাব্যনাটকের ভাবতন্ময়তা বাচ্যার্থকে পেরিয়ে অনুভববেদ্য ব্যঞ্জনাকে ফুটিয়ে তুলতে চায়। এজন্য বলা হয় :

[...] কাব্যনাট্যে কবিতা ভাবের শরীরকে জড়িয়ে রাখে নাটক সেখানে সহায়, দুটি সত্তা সেখানে এক দেহে লীন। নাটকে কাহিনী বা চরিত্রকে প্রত্যক্ষ করে তোলা লেখকের কৃত্য, কবিতা সেখানে শুধু সহায়ক, কাব্যনাট্যে ভাবের শরীরেই কবিতা ব্যক্ত, কাহিনী কেবল তাকে ছুঁয়ে যায়।
 
অনুভূতির অগম্য তীরে কবিতার পাঠক এবং নাটকের দর্শককে নিয়ে যেতে চায় বলে কাব্যনাটক বহির্বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে সর্বদা অন্তর্বাস্তবতা উদ্ঘাটনে সচেষ্ট। এই বিচারে কাব্যনাটককে এক ধরনের অন্তর্নাটক হিসেবে আখ্যা দেওয়া যায়। যার ফলে কাব্যনাটকের সংলাপে মানবচরিত্রের অন্তর্সত্য প্রকাশের ওপর অধিক গুরুত্বারোপ করা হয়। চরিত্রের অন্তর্লোক উন্মোচনের অনিবার্য আকাঙ্ক্ষায় কাব্যনাট্যের সংলাপ যখন নাটকীয় পরিস্থিতির গভীরতায় প্রবেশ করে তখন কাব্যভাষাও স্বাভাবিক কথ্যভাষার মতোই অবলীলায় ব্যবহার করা যেতে পারে। সংলাপ তখন শুধুমাত্র কবিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, নাটকে সমন্বিত হয়ে এক ভিন্ন কাব্যভাষার তৈরি করে নেয়। তবে সমকাল এবং বাস্তবজীবনের সাথে এই কাব্যভাষার যোগসূত্র একেবারে ছিন্ন হয়ে যায় না। কবিতার স্বাদ সঞ্চার কিংবা কাব্যসৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্যেই শুধু নয় বরং নাটকের পরিবেশকে সন্নিবদ্ধ করে তোলার জন্য কাব্যনাটকে এ ধরনের কাব্যভাষা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। নাট্যকার যখন কবির কল্পনাশক্তি এবং অন্তর্দৃষ্টির সাহায্যে জগতজীবনরে কথা সংলাপে কাব্যময় করে তোলেন- তখন সেই রচনা অমরত্ব লাভ করে। কবিত্বের প্রভাবেই সম্ভবত গ্রিকনাটক ও শেক্সপীয়রের নাটকসমূহ ধ্রুপদী মর্যাদা লাভ করেছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, কাব্যময়তাকে মঞ্চে দৃশ্যযোগ্য করে তোলা সাধারণ নাটকের সীমাবদ্ধতাকেও অতিক্রম করে যায়। শক্তিমান অভিনয় শিল্পী ছাড়া কাব্যময়তাকে বাঙ্ময় করে তোলা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

নাটকের সাংগঠনিক শৈলীর সাথে কবিতা একাত্ম হয়েছে আর কাব্যিক সংহতিতে কাব্যনাটকে শব্দ, চিত্রকল্প, প্রতীক প্রভৃতি প্রবহমান হয়ে ওঠে। কাব্যনাটকে নাট্যঘটনার [ইনফর্মেশন] বদলে কবিতার আবেগে চরিত্রের অন্তর্গত বিষয়াদি উন্মোচন করাই প্রধান লক্ষ্য। অপরিচিত অন্তর্লোকের রহস্য উন্মোচনের দায়িত্ব অভিনয় শিল্পীর উপর নির্ভর করে। এ প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার, নাটক যেহেতু প্রায়শ দৈনন্দিন স্থূলতার মধ্য দিয়ে পথ চলে সেজন্য কাব্যনাটকও কখনো কখনো নিত্যদিনের জীবনযাপনের সমতটে ঝুঁকে পড়ে। সামগ্রিকতা সকল শিল্পেরই বিষয়বস্তু; অথচ কাব্যনাটকের ক্ষেত্রে এ সামগ্রিকতাও ভিন্নমাত্রার দ্যোতনাবাহী। ‘মানুষের বৈশ্বিক চেতনা বা কাব্যনাটকের অন্বেষণ হল জীবনের সামগ্রিকতার- যেন জন্ম হয় সেই ভয়ঙ্কর সুন্দরের।’২৪ এর কারণ মূলত কবিতা। কেননা শাব্দিক অর্থকে অতিক্রম করে কবিতা উপলব্ধি এবং অনুভবের চেতনালোকে অতিরিক্ত এক দ্যোতনার সৃষ্টি করে, যা শুধুই অনুভববেদ্য। ফলে কাব্যনাটকের ক্ষেত্রে অভিনয় শিল্পীকে অনুভববেদ্যতাও দৃশ্যযোগ্য করে তোলার ক্ষমতা যেমন থাকতে হয়, তেমনি মঞ্চসজ্জাও এর সহায়ক হতে হয়।

নাটকের ক্রিয়া বা এ্যাকশনের অনিবার্য শর্তও কাব্যনাটক মানতে বাধ্য নয়; কেননা কাব্যনাটকে এ্যাকশনের দায়িত্ব সংলাপও পালন করতে পারে। কাব্যনাটকে বস্তুজাগতিক জীবনের অভ্যন্তর-বাস্তবতাকে রঙ্গমঞ্চে দর্শনযোগ্য করে তুলতে চায়। এজন্যই কাব্যনাটকের এ্যাকশন শুধুমাত্র কাহিনীরই হতে হবে এরকম ধরাবাঁধা কোনো নিয়ম নেই; বরং শব্দের চিত্রকল্পের এবং সংকটের গতিময়তাও এক্ষেত্রে এ্যাকশনের মাত্রা পেতে পারে।

তাছাড়া কাব্যনাটক সরাসরি প্রতীকী ব্যঞ্জনায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠতে পারে। এখানে বস্তুজাগতিক স্থূল জীবনযাপন, যা নিতান্তই নৈর্ব্যক্তিক বিষয়, তাও কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতীকী ব্যঞ্জনায় মূর্ত হয়ে ওঠে। কাব্যনাটকে ব্যক্তির একক সত্তা সার্বিক সত্তায় উত্তীর্ণ হয়, যা বৃহত্তর অর্থে কাব্যের অনুষঙ্গ। এলিয়ট তাই মনে করেন : ÔPoetry is essentially dramatic and the greatest poetry always moves toward drama; drama is essentially poetic and the greatest drama moves towards poetry.’ গ্রিক ও শেক্সপীয়রীয় যুগের নাটক কাব্যগুণে ভরপুর বলেই সাহিত্যের ইতিহাসে চিরন্তনত্ব লাভ করেছে। কালোত্তীর্ণ নাট্যসাহিত্যের জন্য কাব্যগুণ অত্যন্ত জরুরি বিষয়। অতএব নাটকের সকল সীমাবদ্ধতাসহ বাড়তি সীমাবদ্ধতা থাকে কাব্যনাটক মঞ্চায়নের ক্ষেত্রে; নাট্যশিল্পের সীমাবদ্ধতার সাথে কাব্যের জটিলতাকে অঙ্গীভূত করেই কাব্যনাটক সমকালে সফল শিল্প হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

অনুপম হাসান : সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, শাহ্ মখদুম কলেজ। ফোন : ০১৭১৩৩৩৭৮৬১, ই-মেইল : This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.