Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

আলাপনে উৎপল দত্ত [প্রথম কিস্তি]

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

[সাক্ষাৎকারটি পুনর্মুদ্রণ করা হলো। কলকাতা থেকে প্রকাশিত পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত, শিল্প সাহিত্য বিষয়ক ত্রৈমাসিক ‘পর্বান্তর’- এর দ্বিতীয় বর্ষ, জানুয়ারি ১৯৯৫, প্রথম সংখ্যায় নাট্যব্যক্তিত্ব উৎপল দত্তের একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার ছাপা হয়। এই সাক্ষাৎকারটি ১৯৮৮ সালে গ্রহণ করা হয় এবং সম্পাদকের ভাষ্য অনুযায়ী এটি একটি অসম্পূর্ণ সাক্ষাৎকার, কেননা, নানা জটিলতায় সাক্ষাৎকারটি পূর্ণতা পাবার আগেই এই মহান নটরাজ প্রয়াত হন। তারপরও সাক্ষাৎকারটি পড়েই বোঝা যায়- এটি এক অমূল্য কাজ করেছেন পর্বান্তরের সম্পাদক। অনুমান হয়, বাংলাদেশের তো বটেই, কলকাতারও অনেক নাট্যজন এই বিশেষ সাক্ষাৎকারটির সাক্ষাৎ পাননি- বিশেষ করে নবীন নাট্যজনেরা। সাক্ষাৎকার গ্রহণকালে আরও উপস্থিত ছিলেন সুবীর মুখোপাধ্যয় এবং প্রবীণ অভিনেত্রী শোভা সেন। শোভা সেন আলাপচারিতার মাঝে-মধ্যে প্রবেশ করে সাক্ষাৎকারটিকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন নিঃসন্দেহে। কলকাতার সদ্যপরিচিত লেখক মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়ের কল্যাণে উক্ত সংখ্যাটি থিয়েটারওয়ালার হস্তগত হয়। মলয় দা’র মাধ্যমে সম্পাদক পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৌখিক অনুমতি নিয়ে এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটি দুই কিস্তিতে ছাপবার সুযোগ নিয়েছে থিয়েটারওয়ালা। এই সংখ্যায় থাকছে প্রথম কিস্তি।- সম্পাদক]

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
১৯২৯ সালে আপনার জন্ম। আর ১৯৫৩-তে আপনি লিটল থিয়েটার তৈরি করলেন।

উৎপল দত্ত
না। লিটল থিয়েটার হয়েছিল ইংরেজি ১৯৪৭ সালে।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
তা আপনি যে নাটকে এলেন, মানে আকর্ষণ বোধ করলেন, কীভাবে?

উৎপল দত্ত
সে-তো স্কুল জীবনের ব্যাপার। আমরা সেন্ট জেভিয়ার্সে পড়তাম- তো, সেখানে ফাদার উইলবাট ছিলেন। প্রতিবছর নাটক হতো। বিরাট কাণ্ড! শেক্সপীয়র-টেক্সপীয়র অভিনয় হতো, আর আমরা ছোট ছোট পার্ট করতাম। তখন থেকেই আগ্রহ, কিন্তু কোনোদিনই আমার আগ্রহটা সৌখিন আগ্রহ নয়। আমি গোড়া থেকেই ধরে নিয়েছিলাম যে, পেশাদার অভিনেতা হব।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
গোড়া থেকে মানে? কখন থেকে?

উৎপল দত্ত
বারো, চোদ্দ হবে। আর সেইটেকে জীবনে সফল করতে পেরে আমি খুবই আনন্দিত।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
আচ্ছা উৎপল দা, আপনারা যখন এল.টি.জি গড়লেন তখন কত জনে মিলে দল করেছিলেন?

উৎপল দত্ত
এল.টি.জি ইংরেজি দলের প্রতিষ্ঠাতা বলতে আমি আর প্রতাপ রায়। প্রতাপ এখন বোম্বেতে থাকে। তারপরে দল, মানে ইংরেজি বলা বাঙালি ছেলে খুব কম তো, শুদ্ধ উচ্চারণে শেক্সপীয়র অভিনয় করতে হবে। তারপর এলো রণেন রায়, জেরিচ খান- বিখ্যাত স্পোর্টসম্যান, হানড্রেড মিটার রেকর্ড হোল্ডার ভারতবর্ষের। এবং অনেক ছেলে-মেয়েরা এলো যারা বাঙালি নয়। যারা ইহুদী, আর্মেনিয়ান। আর তখন কলকাতায় ইংরেজি নাটক করত ড্রামাটিক ক্লাব অব ক্যালকাটা- যেটা হচ্ছে ইংরেজদের সংগঠন, আর পাশাপাশি আমরা।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
আপনাদের প্রথম প্রোডাকশন কী?

উৎপল দত্ত
রিচার্ড দ্য থার্ড- শেক্সপীয়র।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
আপনার পরিচালনায়?

উৎপল দত্ত
হু। প্রথম অভিনয় ১৫ আগস্ট ১৯৪৭। যেদিন ভারতবর্ষ, মানে তথাকথিত স্বাধীন ভারতবর্ষ জন্মগ্রহণ করে।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
এল.টি.জি-তে পরবর্তীকালে বাংলা নাটক শুরু করলেন কোন সাল থেকে?

উৎপল দত্ত
তারিখগুলো সঠিকভাবে মনে করে বলা মুশকিল, তবে মোটামুটি সালটা ৫২/৫৩ হবে। ১৯৫২ সালে। এই সময় আমরা লিটল থিয়েটারকে ইংরেজি থেকে বাংলায় চেঞ্জ করলাম এবং তখন অনেক ছেলে-মেয়ে দল ছেড়ে দিতে বাধ্য হলো, কারণ তারা বাংলা বলতে পারে না। কিন্তু প্রতাপ, আমি আর রণেন মিলে বাংলা দল তৈরি করলাম। তার প্রধান কারণ, ইংরেজি নাটকের দর্শক তখন শোচনীয়ভাবে কমে যেতে লাগলো। যখন আমরা শুরু করেছিলাম, তখন ইংরেজি নাটকের প্রচুর দর্শক ছিল, কিন্তু পরবর্তীকালে দর্শকসংখ্যা এত কমে যেতে লাগলো যে আমরা ভেবে দেখলাম, এমনভাবে সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয় না। বাংলা নাটক করতে হবে, কেননা পেশাদার হতে হবে তো।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
বাংলায় আপনাদের প্রথম নাটক কী ছিল?

উৎপল দত্ত
বাংলায় আমাদের প্রথম নাটক হচ্ছে ডলস হাউস- এর বাংলা। নামটা কী যেন ছিল- হ্যাঁ, পুতুলের সংসার। তারপরে ঘোস্টস- ইবসেন পরপর দুটো। যেহেতু আমরা ইংরেজি দল থেকে বাংলায় আসছি, তাই আমরা প্রথম দিকে কেবল ইংরেজি নাটকই অভিনয় করেছি।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
এই নাটক দুটো প্রথম কোথায় অভিনীত হয়েছিল?

উৎপল দত্ত
নিউ এম্পায়ারে শুরু হয়েছিল, তারপর নানান জায়গায় হতো আর কি। নিউ এম্পায়ারের তো প্রচুর দান আছে নাট্য আন্দোলনের পেছনে। হেক্টর মার্শাল ছিলেন ম্যানেজার। খুব সাহায্য করতেন। ভাড়াটাড়া কমিয়ে দেয়া, ভাড়া বাকি রেখেছি তাও হয়েছে।

পার্থ বন্দোপ্যাধ্যায়
উৎপল দা, এরপরে আপনারা বাংলা নাটক, পিওর বাংলা নাটক কবে থেকে আরম্ভ করলেন?

উৎপল দত্ত
আমাদের তৃতীয় প্লে-ই অচলায়তন- রবীন্দ্রনাথ। ওই তিপ্পান্নতেই হবে। তারপর গিরিশবাবুর ‘সিরাজদ্দৌলা’ হয়। এইভাবেই আস্তে আস্তে বাংলা নাটকে...

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
৫৩/৫৪- তে এই নাটকগুলো যখন করছেন, তখন আমরা আজকের দিনের যে-সমস্ত অভিনেতাদের কথা জানি, ওঁরা সব এসে গেছেন তো লিটল থিয়েটারে?

উৎপল দত্ত
রবি, মানে রবি ঘোষ, সত্য, শেখর চট্টোপাধ্যায়, তরুণ মিত্র- রবি আর সত্য তো ইংরেজি দলেই এসে গেছিল। ওরা ওথেলো নাটকের সময়ে লিটল থিয়েটারে যোগ দেয়।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
আচ্ছা, আপনার নাট্যশিক্ষা তো সব সময়ে বলেছেন জেফরি কেন্ডেলের কাছে। জেফরি কেন্ডেলের কাছে আপনি কোন সময়টায় শিখেছিলেন?

উৎপল দত্ত
ওই বাংলা নাটক করতে করতে আমি চলে গেলাম। কেননা, কেন্ডেল তাঁর দল নিয়ে আবার ভারতবর্ষে এলেন, এবং আমি মাদ্রাজে গিয়ে ওঁদের সঙ্গে যোগদান করলাম। সেটা ৫৩/৫৪ সালে। এই বছর আমি কেন্ডেলের সাথে ভারত এবং পাকিস্তান সফর করি। তার আগেও একবার এসেছিলেন- ফরটি সেভেনে।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
মানে সেই সময়ে আপনি ওদের সঙ্গে অভিনেতা হিসেবে যোগ দিলেন তো?

উৎপল দত্ত
হুঁ। তার আগে এসেছিলেন ফরটি সেভেনে। ওঁদের এখানে সিজন হলো ভারতবর্ষে পুজোর পর।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
তারপর আপনাদের দল তৈরি হয়। ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ সালে।

উৎপল দত্ত
দ্বিতীয়বার এলেন ৫৩ সালে, ৫৩ থেকে ৫৪, এই এক বছর আমি ওদের সঙ্গে ভারত এবং পাকিস্তান সফর করলাম। সবই শেক্সপীয়রের নাটক- নানা পার্ট।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
উৎপল দা, এই সময়ে তো ৪৩-এর গণনাট্য আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে- ধনঞ্জয় দাসের বইতে দেখলাম, ওই সময় আপনি ৪৬ নম্বর ধর্মতলা স্ট্রীটেও যাচ্ছেন। এই গণনাট্য আন্দোলন সেই সময়ে আপনাকে কী রকম প্রভাবিত করেছিল?

উৎপল দত্ত
গণনাট্য আন্দোলনই তো সব। সেই তো মূল কেন্দ্র। তার থেকেই তো প্রেরণা আসছে চারদিকে। আমরা যখন প্রথম নাটক শুরু করলাম, ব্যাপার হচ্ছে আমি একটু এঁচড়েপাকা বলে থিওরিটিক্যাল অনেক কিছু পড়ে ফেলেছিলাম। অন্তত খানিকটা পড়েছিলাম, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মানে হেগেল পড়েছি, মার্ক্স পড়েছি, এঙ্গেলস পড়েছিলাম। তাই আমি তত্ত্বগতভাবে প্রস্তুত ছিলাম কোনো নাট্য সংস্থায় যোগদানের জন্য। কিন্তু শুধু তত্ত্বে তো হয় না। হাতে-কলমে কাজ করতে শেখালো গণনাট্য সঙ্ঘ। আমি যোগদান করেছিলাম মধ্য কলকাতা শাখায়, কেন্ডেলের দল থেকে ফিরেই। কিন্তু মোটে ৮ মাস আমি থাকতে পারলাম, এবং গণনাট্য সঙ্ঘের সঙ্গে কাজ করে হাটে-বাজারে-গ্রামে-গঞ্জে-শহরে- জনসাধারণের জন্য নাটক করতে হবে, সেটা শিখলাম ওদের কাছ থেকে।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
গণনাট্যে যে আপনি অভিনয় করেছেন, বেশিরভাগই কি পথনাটিকা?

উৎপল দত্ত
না, না। পথনাটিকা তো একেবারে শেষে এসে। আমি প্রথমে ‘ভাঙ্গা বন্দর’ নামে একটা নাটক, পানু পালের, তাতে অভিনয় করেছি। তারপর আমি পরিচালনা করলাম রবীন্দ্রনাথের ‘বিসর্জন’। তারপরে, ‘ইন্সপেক্টর জেনারেল’- গোগোলের। তারপরে পথনাটিকা, উমানাথ ভট্টাচার্য লিখল ‘প্রথম চার্জশিট’। বন্দিমুক্তি আন্দোলনের ওপর। পানু পাল ডিরেক্ট করল; পানু, আমি, উমানাথ, মমতাজ আহমেদ খাঁ- আমরা এই টিম নিয়ে সারা বাংলা ঘুরলাম বলা যেতে পারে। জলপাইগুড়ি থেকে ক্যানিং। বন্দিমুক্তি আন্দোলন চলছিল ৫১ সালের শেষ অবধি। ৫২ সালের ইলেকশন ক্যাম্পেনে নতুন পথনাটক করলাম- ‘ভোটের ভেট’। এই নাটক চলাকালীন সময়েই আমাকে গণনাট্য সঙ্ঘ থেকে বিদায় নিতে হলো। আমি আবার ফিরে গেলাম আমাদের দলে।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
এই ব্যাপারটা যদি একটু খুলে বলেন, কী ব্যাপার হয়েছিল?

উৎপল দত্ত
নানা রকম তর্ক। আমার বদমাইশি তো... মানে খুবই বিখ্যাত! কুখ্যাত! আমি এঁড়ে তর্ক আরম্ভ করে দিলাম আর কি। তখন স্তালিন, কমরেড স্তালিন ছিলেন সব বিতর্কের মূলে। কেন্দ্রস্থানে। কেননা, স্তালিন তখন সারা পৃথিবীর কমিউনিস্ট আন্দোলনের একচ্ছত্র নেতা। সেই ঐক্য তো এখন ভাবা যায় না। মানে, আর্জেন্টিনায় একজন কমিউনিস্টকে হত্যা করলে চীন থেকে গর্জন উঠেছে। এই ঐক্য স্তালিন তৈরি করেছিলেন। তাই স্তালিনের লেখা খুব ভালো করে পড়তে গিয়ে আমি এটাও বুঝেছিলাম যে, ট্রটস্কি না পড়লে স্তালিনকে ভালোভাবে বুঝে ওঠা যায় না, সম্ভব হয় না। যার বিরুদ্ধে লড়াই করছে স্তালিন, তার বক্তব্যটা বুঝতে হবে তো। তা, সেই ট্রটস্কি নিয়ে লাগতো গণ্ডগোল। আমার বক্তব্য ছিল যে, ট্রটস্কি সব পয়েন্টেই ভুল। স্তালিন সব পয়েন্টেই কারেক্ট। তার মানে এই নয় যে, ট্রটস্কির শত্রু স্তালিন। উনি একজন গ্রেট কমিউনিস্ট। ভুল করে ফেলেছিলেন। তা, ভুল কোন কমিউনিস্ট করেন নি? লেনিন করেছেন, স্তালিন করেছেন। মার্ক্স করেছেন।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
এটাই কি মূল কারণ?

উৎপল দত্ত
এটাই একটা মূল বিষয় ছিল। আর একটা ছিল- আমরা যে পথনাটিকা গণনাট্য সঙ্ঘে নামালাম, গণনাট্য সঙ্ঘের ব্যানারেই তো হচ্ছিল। তাতে কোনো কোনো গণনাট্য সঙ্ঘের নেতা বক্তব্য তুলেছিল। কেননা তার আগেই, তুমি জানো, ৪৮/৪৯-এ পার্টি ব্যানড হয়ে গেছিল। এবং তখন পার্টি বামপন্থি বিচ্যুতির ফলে সমস্ত গণসংগঠনকে পার্টির সঙ্গে এক করে ফেলে একটা বিশ্রী নজির সৃষ্টি করে। এইখানে আবার গণনাট্য সঙ্ঘ ডাইরেক্টলি কমিউনিস্ট পার্টির প্লাটফর্ম থেকে অভিনয় করছে। এতে অনেকে আপত্তি করেছিলেন, এবং আমি এটা সমর্থন করেছি। এটাও একটা কারণ ছিল।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
পার্টির প্লাটফর্ম থেকে না করার পক্ষে ছিলেন?

উৎপল দত্ত
না, করার পক্ষে ছিলাম।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
গণনাট্য সঙ্ঘের একটি আলাদা আইডেন্টিটি থাকবে না?

উৎপল দত্ত
থাকা উচিত। সেটা আমিও বিশ্বাস করি। নিশ্চয়ই থাকা উচিত, কিন্তু তাহলে অন্য নামে তো কারো। কিন্তু করবো না, এটা ঠিক না। পার্টির প্লাটফর্মে যাব না এটা কোনো যুক্তি হতে পারে না। অন্য নাম দাও। ‘লাল ঝান্ডা স্কোয়াড’ নাম দাও।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
আচ্ছা উৎপল দা, একটা জিনিস তো আমাদের দেখার সৌভাগ্য হয় নি, শুনেছি গণনাট্য সঙ্ঘ তাদের প্রয়োজনাগত দিক থেকেও অনেক নতুন চমক নিয়ে এসেছিল নাটকে এবং অভিনয়ের ক্ষেত্রেও নতুন ধারার সৃষ্টি করেছিল। সেইটে যদি একটু খুলে বলেন, মানে আপনার যা আছে স্মৃতিতে-

উৎপল দত্ত
প্রথমে দেখে চমকে যেতে হয়েছিল ক্রাউড সিন। বিশাল! ৮০/৮২ জন লোক অভিনয় করছে, স্টেজের ওপরে কোনো মঞ্চ নেই। পেছনে একটা চট ঝোলানো। ‘নবান্ন’ নাটকের কথা বলছি আমি, শুরুই তো হতো ৪২- এর আন্দোলনের ছবি দিয়ে। ৪২-এর আন্দোলনে পুলিশের গুলি চালনা, পুলিশ ছত্রভঙ্গ করে দিচ্ছে মানুষকে। সমস্ত স্টেজ জুড়ে মানুষ ছুটে পালাচ্ছে, আবার প্রতিরোধ করছে- সে এক চমকের মতো লেগেছিল আর কি!- তা প্রশ্ন হচ্ছে, কালের বিচারে, মুশকিল হচ্ছে যে, থিয়েটারে তো এগুলো থাকে না। ফিল্মে যেমন তোলা রইলো সারাজীবনের জন্য। থিয়েটারের বিরাট টিরাট পরিচ্ছদগুলো কয়েকজনের স্মৃতির ওপর পড়ে রইলো, স্মৃতিনির্ভর হয়ে থাকলো। সেই জন্য উচিত হচ্ছে সেই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলের স্মৃতিচারণ করা- নবান্ন-তে যাঁরা করেছিলেন। আমরা এপিক থিয়েটারের তরফ থেকে এটা চেষ্টা করেছি, যাকে যখন পেয়েছি, সকলকে দিয়ে প্রায় জোর করে লিখিয়েছি। গঙ্গাপদ বাবু, তৃপ্তি মিত্র, শোভা সেন, বিজন ভট্টাচার্য- মুশকিল হচ্ছে শম্ভুবাবু কিছু লিখবেন না তো! শম্ভুবাবু কিছু বলবেনও না, লিখবেনও না!

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
এই নাটকে পরবর্তীকালে আমরা দেখেছি যে, যুক্ত পরিচালনায় বিজন ভট্টাচার্য ও শম্ভু মিত্র। তা, ওই যুক্ত পরিচালনার ব্যাপারটা কী ছিল?

উৎপল দত্ত
সেটা আমার থেকে শোভা আরো ভালো বলতে পারবে। আমি তো আর তখন ছিলাম না গণনাট্য সঙ্ঘে। বিজনবাবু প্রত্যেক অভিনেতাকে নিয়ে আলাদা করে কোচ করতেন। কিন্তু মঞ্চের পুরো জিনিসটা, কম্পোজিশন, ব্লকিং ইত্যাদি সব শম্ভুবাবু দেখতেন। তাই যুক্ত পরিচালনা সম্ভব হয়েছিল। তাতে কী হয়েছে, স্তানিস্লাভস্কি-দানচেস্কো-তো যুক্ত পরিচালনা করেছিলেন।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
যাক, আমরা লিটল থিয়েটারে ফিরে আসি। লিটল থিয়েটারে তারপরে, প্রথম দিকের বাংলা নাটকগুলোর পরে, আপনি মাইকেলের ‘বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ’ প্রোডাকশন কত সালে ধরলেন?

উৎপল দত্ত
এটা বোধহয় ৫৪ সালে হয়েছে। বঙ্গসংস্কৃতি সম্মেলন, না কী যেন একটা হয়, সেইখানে প্রথম অভিনীত হয় ‘বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ’। তারপর তো বহু শত শো হয়ে গেছে।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
তখন তো লিটল থিয়েটার পেশাদার গ্রুপ ছিল না সেই অর্থে?

উৎপল দত্ত
না না, কোনোদিনই পেশাদার থিয়েটার করে নি। দুটোর মধ্যে একটা জিনিস অভিনেতাকে দিতে হবে। হয় টাকা দিতে হবে, নয় তাকে একটা মতাদর্শ দিতে হবে, তাকে একটা আইডিওলজি দিতে হবে। তো, লিটল থিয়েটার যখন মতাদর্শগত ভিত্তি পেয়ে গেল তখন সে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে চলতে থাকলো। তখন আর এই পেশাদার হওয়া টওয়াটা অকিঞ্চিৎকর প্রশ্ন হয়ে গেল। তবে এটা ঠিক, হোলটাইম ছাড়া থিয়েটার করা যায় না। যেতে পারে না। বিপ্লবও হোলটাইম ছাড়া হয় না। হোলটাইম বিপ্লবী হচ্ছে লেনিনের গ্রেট আবিষ্কার। মানে পেশাদার বিপ্লবী, কমিউনিস্ট পার্টির বলশেভিকদের মাইনে দেওয়া হবে পার্টি থেকে, যাতে তারা সারাটা দিন, সারাটা রাত পার্টিরই কাজ করতে পারে, অন্য কাজ করবে না। এইটে তো একটা নতুন ধারণা নিয়ে এলেন লেনিন। আগে কোনো কমিউনিস্ট পার্টিতে বা সোশালিস্ট পার্টিতে এ কথা তো কেউ কখনো ভাবে নি যে, পার্টির সদস্যকে আবার মাইনে দিতে হবে। কেন? মতাদর্শই তো যথেষ্ট। একটা পতাকা, একটা নিশান, একটি গান, তার পেছনে জীবন উৎসর্গ করাই উচিত। এ-রকম করতে হবে লেনিন তা মানেন নি। লেনিন ছিলেন একজন বাস্তববাদী বিপ্লবী, উনি জানেন যে, তা হতে পারে না। লোকটার খাওয়া-পরার ব্যবস্থা করতে হবে পার্টিকে, নইলে সে কীভাবে লড়বে? সে তো খেতে পাবে না, কতগুলো অনাহারগ্রস্ত বুভুক্ষু সদস্য নিয়ে কি রেভিলউশন হবে? উনি তা বিশ্বাস করতেন না, তাই বিপ্লবীরই যখন পেশাদার বিপ্লবী হবার প্রয়োজন হয়, তখন অভিনেতাকে তো হতেই হবে।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
তা এল.টি.জি-তে কি সে সময়ে পেশাদার অভিনেতা কেউ এসেছিলেন?

উৎপল দত্ত
কোথায় আর ছিল! হলে কি আর এ অবস্থা হয়? হলে কি আর এল.টি.জি উঠে গিয়ে পি.এল.টি হয়? কিন্তু হওয়া উচিত ছিল। তৎক্ষণাৎ উচিত ছিল, কিন্তু মধ্যবিত্তদের বহুরকম পিছুটান থাকে। তারা কেউই সব পিছুটানগুলোকে মিটিয়ে দিয়ে, সব বন্ধনগুলো ছিঁড়ে ফেলে অভিনয় জীবনে ঝাঁপাতে পারে না। ভীষণ ইয়ে, মানে সিকিউরিটি, নিরাপত্তা- ওই যে চাকরি, ওদের ধারনা চাকরিতে বুঝি বিরাট একটি নিরাপাত্তা আছে। ওই যে সকাল ১০ টা থেকে বিকেল ৫টা, এই নিরাপত্তার লোভ ওরা কাটাতে পারে না। এ আমার দেখা হয়ে গেছে। এটা কাটাতে পারে শ্রমিক শ্রেণী, খুব তাড়াতাড়ি কাটাতে পারে, কেননা ওরা জানে যে, কারখানায় চাকরিটা আজ আছে কাল নেই। এই ছাঁটাই হলো বলে, এই লক-আউট হলো বলে। এসব ওরা জানে যে, স্ট্রাইক করেই বেরিয়ে আসতে হবে। সুতরাং ওরা বোধহয় অনেক তাড়াতাড়ি পেশাদার হতে পারে।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
তাহলে ধরুন, বাংলা থিয়েটারের সামনে একটা সমস্যা থেকেই যাচ্ছে। একদিকে আমরা দেখছি যে, পেশাদার মঞ্চগুলোতে যে ধরনের নাটক হচ্ছে, সাধারণভাবে সেগুলোকে নাটকই বলা যায় না। খুবই খারাপ ধরনের নাটক। দেখা যায় না? আর এদিকে অপেশাদার যে দলগুলো, সেখানে আবার পেশাদার অভিনেতা-অভিনেত্রীরা থাকছেন না। তাহলে এই সমস্যা বাংলা নাটককে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?

উৎপল দত্ত
বিরাট সঙ্কটের দিক। অবশ্য এ সঙ্কটের মূল কারণ সেটা নয়, মূল কারণ, মানে পেশাদার না হলেও আমাদের বাংলা নাট্য-আন্দোলনে এমন কিছু লোক আছেন নেতৃস্থানে, যাঁরা জীবনে কোনোদিন থিয়েটার ছাড়বেন না, তাঁরা থাকবেনই। তাঁরাই বহু ত্যাগ স্বীকার করে নাট্য-আন্দোলনকে এতটা টেনে এনেছেন, কিন্তু একটি লিমিট পর্যন্ত আসে, তারপর আর আসতে পারে না, তারপর সঙ্কটের পর সঙ্কট আসতে শুরু করে। আমার ধারনা প্রধান কারণ হয়েছে, এই হঠাৎ ইন্টেলেকচুয়াল সাজার প্রচ- মোহ আমাদের নাট্য-আন্দোলনকে গ্রাস করছে। এটা পেটি বুর্জোয়ার চিরদিনের একটি বিপদ থাকে। সে ইন্টেলেকচুয়াল হবার লোভটা সামলাতে পারে না। কোনো ‘যাত্রা’র অভিনেতা কখনো স্বপ্নেও ভাবতে পারে না যে, সে জাঁ পল সার্ত্রের নাটক যাত্রায় অভিনয় করবে। কারণ, সে জানে, তাকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছতে হবে। প্রতি মুহূর্তে সাধারণ মানুষ যদি কিছ বুঝতে না পারে, তাহলে ‘পালা’ চাপা দিয়ে লোকে উঠে পড়বে। কিন্তু এরা কলকাতা শহরের আশ্রয়ে সব বিদেশী নাটকের অনুবাদ শুরু করলো। বাংলা নাটক নাকি নেই- তারা বলেন। এরকম বিদেশী নাটকের নির্বিচার অনুবাদ, অভিনয়, যার ঘটনা ভারতবর্ষের সঙ্গে মিলুক না মিলুক, তার কোনো রকম রেলেভেন্স, প্রাসঙ্গিকতা থাকুক বা না থাকুক, তারা অনুবাদ করে চললো। এর ফলে দর্শক সংখ্যা  কমতে শুরু করলো। স্পষ্ট আমাদের চোখের সামনে ঘটনাটা ঘটলো। যাঁরা সিরিয়াসলি খাঁটি বাংলা নাটক করেছেন, তাঁরা কখনই দর্শকের অভাব বোধ করে নি। কিন্তু যাঁরা যথেচ্ছাভাবে বিদেশী নাটকের অনুবাদের জোয়ার বইয়ে দিলেন, তাঁদের হাউস ফাঁকা হয়ে গেল। এবং হবেই তো। লোকে বুঝতে পারছে না। এখন, টিকিট কিনে হাউসে ঢুকে মাথা ধরাতে তো কেউ চায় না। এ্যাসপিরিনের পয়সা তো দেবে না লোকটা! তো আমি বলছিলাম, অনুবাদ নাটক নিশ্চয় করবো, কিন্তু অনুবাদ নাটক কখনো দেশজ নাটকের বিকল্প হতে পারে না । অনুবাদ নাটক তো মাঝে মাঝে করতেই হবে। শ্রেষ্ঠ বিদেশী ক্ল্যাসিক। বেছে বেছে। শেক্সপীয়র করতে হবে, ভিক্টর হিউগো করতে হবে। ভিক্টর হিউগো আজ পর্যন্ত কেউ অভিনয় করে নি বাংলায়। কী লজ্জা! চেকভ করতে হবে। নিশ্চয়ই। কিন্তু শুধু ওইগ্রলোকে উপজীব্য করলে এ অবস্থা হবে, যা আজকে হয়েছে। এবং একাডেমিতে যদি যাও, তাহলে পরে ৭ দিনের মধ্যে একদিন থাকে ‘মাধব মালঞ্চী কইন্যা’ সেদিন হাউস ফুল। এবং আত্মশ্লাঘা না করে বলতে পারি, যদি পি. এল. টি-র নাটক থাকে, ‘আজকের শাজাহান’- তাহলে হাউস ফুল হবে। আর বাকি ৫ দিন দেখবে হাউস ফাঁকা। দোতালাটা বন্ধ করে দেয়। একাডেমির মতো ওইটুকুনি হাউস ভর্তি হয় না, দোতলাটা বন্ধ করে দিয়ে সবাইকে নিচে এনে বসায়, যদি হলটা ভরা দেখায়। তাও হয় না, গুনে গুনে ৩১ জন দর্শক বসে আছে। নাটক হচ্ছে একটা- মানে, বহু মানুষের সান্নিধ্যের ব্যাপার।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
উৎপল দা, এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে যাই। আপনি তো নিজে দীর্ঘদিন অভিনয় করেছেন এবং বহু অভিনেতাকে পরিচালক হিসেবে অভিনয় শিখিয়াছেন। তো, একজন অভিনেতার কী কী গুনাবলী থাকা দরকার, যার ফলে তাকে একজন সত্যিকারের অভিনেতা মনে হয়? মানে আমি বলতে চাইছি, যে গুণাবলীগুলো অভিনেতাকে অর্জন করতেই হবে। না হলে সে অভিনয় করতেই পারবে না।

উৎপল দত্ত
সামাজতান্ত্রিক দেশের নজির ধরলে আমরা এই জিনিসটা বুঝতে পারি যে, অভিনয়ের যেগুলো বেসিক ট্রেনিং সেগুলো তো অভিনয় করতে আসার আগেই তৈরি হয়ে যাওয়ার কথা। নাটকের বিদ্যালয় আছে, প্রশিক্ষণকেন্দ্র আছে, সারা সোভিয়েট ইউনিয়ন জুড়ে। প্রত্যেক রাজ্যে তাদের ড্রামা স্কুল আছে। এবং ওদের ফাইভ ইয়ার প্লানে নির্ধারিত হয় যে, আগামী ৫ বছর পরে কতজন অভিনেতার দরকার হবে। সোভিয়েটে পেশাদার নাট্যধারায় ঠিক ততজনকেই ওরা ট্রেনিং দেয়। তারচেয়ে বেশি নয়। কেননা, কেউ বেকার থাকতে তো পারে না ওদের দেশে। কারণ, বেকারির বিরুদ্ধে তো আইন রয়েছে। কাজের অধিকার যেখানে সংবিধান স্বীকৃত। কেউ যদি বেকার থাকে রাষ্ট্রকে তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে তো। সেখানে কী হয়? তলোয়ার খেলা, মুষ্টিযুদ্ধ, সাঁতার, অশ্বারোহন- এই সব ফিজিক্যাল ট্রেনিং- ব্যালে, ইউরিমিকস বলে যাকে, অর্থাৎ সঙ্গীতের সাথে ছন্দোবদ্ধ চলাফেরা, আর তা ছাড়া কণ্ঠস্বর তৈরি, উচ্চারণ তৈরি। সারা সোভিয়েটের সব ডায়ালেক্ট সেখানে শেখানো হয়। হোয়াইট রাশিয়ানদের ডায়ালেক্ট, ইয়োলো রুশিয়ান ডায়ালেক্ট, ইউক্রেনিয়ান ডায়ালেক্ট- এতে করে উচ্চারণের উৎকর্ষ ভালো হয়। এইসব শেখানো হয় ড্রামা স্কুলে। এই প্রশিক্ষণের পর তখন তাদের দেহ এবং কন্ঠস্বর দুটোই নিজেদের আয়ত্বে চলে আসে। তারপরে তারা আসছে অভিনয় করতে। তখন আর পরিচালককে, এসব শেখাতে হয় না। পরিচালক ধরেই নেন যে, সে এগুলো জানে। তখন তিনি অভিনয়টা, চরিত্র বিশ্লেষণটা করতে পারেন। কিন্তু আমাদের দেশে তো তা নেই। আমাদের দেশে যে ড্রামা স্কুল আছে- সেই দিল্লীতে, অসহ্য! অখাদ্য! ওফ, ওরা যা শেখান, সেগুলো আগে অভিনেতার মন থেকে অপসৃত করতে হয়, এটা যা শিখেছেন, ভুল শিখেছেন, এটা ঠিক নয়। এবং এখন এমন অবস্থা হয়েছে যে, আমাদের অভিনেতারা ভার্স বলা ভুলে গেছেন। কাব্য আবৃত্তি করতে পারেন না। সেজন্য ‘বিসর্জন’ নাটকে অভিনয় করতে যাচ্ছে কলকাতার কোনো দল, তাঁরা সেটাকে গদ্যে আবার পুনর্লিখিত করে নিলেন। গদ্যে ‘বিসর্জন’ অভিনয় হচ্ছে! কেন? কেননা তাঁরা তাঁদের অভিনেতাদের সীমাবদ্ধতাগুলো জানেন। এ তো এক শোচনীয় অবস্থা, অভিনেতা ভার্স বলতে পারবেন না। সারা পৃথিবীতে অভিনয় বন্ধ হয়ে যেত যদি অভিনেতারা ভার্স বলতে না পারেন।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
তা আপনি যখন এল.টি.জি-তে অভিনেতাদের অভিনয় শেখাতেন, তখন কী পদ্ধতি নিতেন প্রথম থেকে? মানে ধাপে ধাপে কীভাবে শেখাতেন?

উৎপল দত্ত
আমাদের ধাপে ধাপে এগুবার সময় থাকতো না। রিহার্সেল শুরু করে দিতাম। তারপর রিহার্সেলের মধ্যেই চেষ্টা করতাম যথাসম্ভব। ধরা যাক, একটা কমেডিতে টাইমিঙের ব্যাপার। লোকে হাসবে না যদি না কারেক্ট টাইমিঙে কথাটা বলা হয়। পজটা- তারপর বলাটা। এটা বহু বছরের ট্রেনিং-এর পর অভিনেতার আয়ত্ব হয়। অভিনেতার নিজের সেন্সটা ডেভেলপ করে, এতখানি পজ দিলে পরে এটা কারেক্ট টাইমিঙে হবে- বেশিও না, কমও না। আমাদের এসব করার সময় থাকতো না, আমরা রিহার্সেলেই যতটা পারতাম, করতাম। তারা মধ্যে যে অভিনেতার নিজস্ব ক্ষমতা থাকতো তারা তুলে নিত চট করে। আর যারা পারতো না, তারা কয়েক বছর কৃচ্ছ্রসাধন করার পরে দল ছেড়ে চলে যেত।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
রিহার্সেল শুরুর আগে কি প্রথমে আপনাদের রিডিং হতো?

উৎপল দত্ত
একটা দুটো রিডিং হতো। প্রথমে রিডিং তারপর টেবলটপ রিহার্সেল। সেটের মডেল করে দেখানো হতো পজিশনগুলো। কেননা রিহার্সালগুলোকে একটা বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে আসা দরকার। এটা আমরা বুঝেছিলাম। আমি এসেছিলাম জেফরি কেন্ডেলের ট্রেনিং ধরে। জানি, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কী করে রিহার্সেল দিতে হবে। সবচেয়ে কম সময়ে, সবচেয়ে  বেশি এফেক্ট কী করে বের করা যায়। কিন্তু এখন ব্যাপার হচ্ছে, শেক্সপীয়রিয়ানা- কেন্ডেলের দলের সঙ্গে আমাদের একটু তফাৎ- তাতে কী দেখতাম? দেখতাম, এই এক একটি শহরে তো আমরা দু-তিনবার চলে গেছি। কিন্তু আবার এক একটা শহরে এসে- যেমন সিমলায় ছ-সপ্তাহের প্রোগ্রাম ছিল আমাদের। এখন ছ-সপ্তাহ একই প্লে না করে ওঁরা করলেন কি, প্রত্যেক সপ্তাহে নতুন প্লে নামালেন। সন্ধ্যাবেলায় একটা নাটকের অভিনয় হচ্ছে, আর সকাল থেকে অন্য নাটকের রিহার্সেল হচ্ছে। পরে যেটা নামবে আর কি। ছ’দিনের মাথায়, শনিবার-দিন হুকুম করত নতুন প্লের। তখন আমি এই সিস্টেমটা আয়ত্ব করতে পেরেছিলাম যে, কী করে এত কম সময়ে এত বড় একটা প্লে- ‘হ্যামলেট’ নেমেছিল। একটা জিনিস এ্যাক্টরদের গিলিয়ে নামিয়ে দেয়া যায় না। অবশ্য সেটাও সম্ভব যদি বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় চলে। যেসব ইংরেজ অভিনেতা অভিনেত্রী ছিলেন, তারা সবাই ট্রেইনড এ্যাক্টর ছিলেন। তাদের তো আর দুবার বলতে হয় না কিছু। কিন্তু আমরা কয়েকজন ছিলাম, যাদের মাথায় অত সহজে ঢুকতো না। কিন্তু ছ’দিনে ফুল টিম তো নামতে হবে, কেননা সাত দিনের দিন তো দর্শকের সামনে যেতে হবে। সেখানে তো আর কোনো ক্ষমা নেই। তাই ওইসব সিস্টেম এ্যাপ্লাই করে, সবচেয়ে যেটা বৈজ্ঞানিকভাবে- আবেগ টাবেগ বাদ দিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় অনুধাবন করতে হবে ব্যাপারটা কী ঘটেছে। আমাদের কোত্থেকে কোথায় যেতে হবে, কোথায় বসে বলতে হবে, কোথায় দাঁড়িয়ে বলতে হবে- ওগুলো যেন একটা রিহার্সেলের পরে দ্বিতীয় রিহার্সেলে দ্বিতীয়বার বলতে না হয়। একদম কণ্ঠস্থ’, আত্মস্থ হতে হবে। এরকম করে আমাদের নামাতে হতো। তবে এখানকার থিয়েটারে দু-তিন মাস রিহার্সেল দিতে হতো- তারপর দর্শকের সামনে আসা। তারপরও আমার মনে পরে মিনার্ভা থিয়েটারে আমরা যখন এলাম, তখন, ১০ দিনে ‘মানুষের অধিকার’ নামিয়েছি। যেটা বলা যেতে পরে বাঙালি পেটি- বুর্জোয়া অভিনেতা নিয়ে একটা কীর্তি। কী করে সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত রিহার্সেল দেব? সন্ধ্যের পর আবার হবে না, কেননা আমাদের থিয়েটার হল ভাড়া দেয়া থাকতো নানান দলকে। তাদের অভিনয় আছে সন্ধ্যেবেলায়। আমরা সকাল ন’টা থেকে বিকেল চারটে-সাড়ে চারটে পর্যন্ত রিহার্সেল দিতাম।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
তা, একটু আগে যে বললেন, অনেকে চাকরি করতেন- তাহলে ওই সময়টা তাঁরা কী করে রিহার্সেল করতেন? ছুটি নিতেন?

উৎপল দত্ত
ছুটি নিতে বাধ্য। নইলে দল ছেড়ে দাও। [হাসি]

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
না, এইগুলো জানতে চাইছি এই কারণে যে, আজকাল থিয়েটারে নানান ধরণের সমস্যা আছে তো, এইগুলো থেকে তারা যেন জানতে পারে, এইভাবে থিয়েটার হয়েছে বাংলাদেশে। এইভাবে করা সম্ভব।

উৎপল দত্ত
এখনো আমরা তাই করি। এখনো আমাদের কোনো প্লে-র রিহার্সেল হতে থাকে সন্ধ্যেবেলায়, তারপর যখন এগিয়ে আসে, তখন সারাদিন রিহার্সেল শুরু হয়। তখন সবাই ছুটি নিতে বাধ্য থাকে এবং নেয়।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
উৎপল দা, আপনি যাদের সঙ্গে, বিশেষ করে লিটল থিয়েটারে অভিনয় করেছেন, আপনার সহঅভিনেতা-অভিনেত্রীরা, তাদের সম্বন্ধে আপনি বিভিন্ন সময়ে কিছু কিছু জায়গায় মন্তব্য করেছেন। তাদের বিষয়ে যদি একটু বলেন- তাদের অভিনয় ক্ষমতা, তাদের নাট্যপ্রীতি। মানে তারা গোটা দলটাকে এগিয়ে নিতে কী ভূমিকা নিয়েছিল? আমরা তো ওই পর্বের নাটক প্রায় দেখতেই পারি নি, অনেক পর থেকে নাটক দেখেছি-

উৎপল দত্ত
এখন আমাদের তো পলিটিক্যাল থিয়েটার। রাজনৈতিক নাট্যশালায় অগ্নি পরীক্ষা তখনই আসে যখন রাজনৈতিক আক্রমণ শুরু হয়। এমনি সুখের দিনে অনেক অভিনেতা এসে জোটে। কিন্তু বিপর্যয়ের দিনে ক’জন থাকছেন, আমার মতে সেটাই হচ্ছে সত্যিকারের পরীক্ষা। যখন গু-াদের আক্রমণ হবে থিয়েটারে, সন্ধ্যেবেলায়। সকলে জানে, খবর পাওয়া গেছে। সেদিন কে কে এলো না, এ হচ্ছে একটা সিওর টেস্ট। যাতে বোঝা যাবে, কে রাজনৈতিক থিয়েটারকে জীবনের অঙ্গ করে নিয়েছে, কে পারে নি। তা সে সব পরীক্ষায় লিটল থিয়েটার গ্রুপ সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়ে এসেছে। আক্রমণের পর আক্রমণ ঠেকেয়েছি। সন্ধ্যেবেলায় নিজেরা ভেতরে অভিনয় করছে আবার ফাঁকে ফাঁকে রাস্তায় গিয়ে টহল দিচ্ছে। গু-ার দল এলো কিনা দেখছে, পাহারা দিচ্ছে। অবশ্য পেছনে বিরাট কমিউনিস্ট পার্টি এবং জনগণের সমর্থন না থাকলে এটা করা যায় না। কমিউনিস্ট পার্টি এসে দাঁড়িয়েছিল পাশে, মার্কসবাদী এবং ছাত্র ইউনিয়নগুলো। জেশপ কারখানার ইউনিয়ন, তারা সব দল পাঠাতেন। ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে তারা বিডন স্ট্রিটের এদিক-ওদিক টহল দিতেন এবং এটা দিতেন দিনের পর দিন, রাতের পর রাত। অন্যেরা পাহারা দিতেন, ‘কল্লোল’-র সময়ে বিশেষ করে, কেননা ‘কল্লোল’-কে উঠিয়ে দেবার জন্য ওরা একেবারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়েছিল। কিছুতেই যখন বন্ধ করা যাচ্ছিল না, কোনো আইন হাতে নেই, তখন ওরা স্থির করেছিল যে, এটাকে বাহুবলে বন্ধ করা হোক। কেননা, ওরা আগে ‘অঙ্গার’-এ সাকসেসফুল হয়েছিল। ‘অঙ্গার’-এ আক্রমণটা যখন এসেছিল তখন আমরা তৈরি ছিলাম না। সে বাষট্টি সাল। চীন-ভারত সীমান্ত সংঘর্ষ পাহারা দেওয়া, রক্ষা করা সম্ভব হয় নি। কিন্তু ‘কল্লোল’-এর সময় অন্য চেহারা। তখন কে কী করে কলকাতায় একটা থিয়েটারের ওপর হাত দেবে? সম্ভব ছিল না। তখন চেষ্টা করলো আমাকে গ্রেপ্তার করে-

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
সিক্সটি ফাইভে-

উৎপল দত্ত
হুঁ। গ্রেপ্তার করে যদি থামানো যায়। কিন্তু তখন আমাদের সদস্যদের মধ্যে মস্ত বড় পরীক্ষা এলো। আমি তো জেলে বসে বসে ভাবছি, ক’জন এখন থাকবে, ক’জন পালাবে। কেননা আমাকে যদি গ্রেপ্তার করতে পারে, তাহলে অন্যদের গ্রেপ্তার করতে কতক্ষণ?- তা কেউ দল ছাড়ে নি। একজনও ছাড়ে নি। সবাই যথাসময়ে মিনার্ভায় উপস্থিত হয়েছে এবং বাইরে ভয় দেখাবার জন্য পুলিশের ভ্যান এসে দাঁড়াতো, যেন আজকে দু-চার জনকে তুলবে, এরকম একটা ভাব। কিন্তু কেউ পিছু হটে নি। সেসব সময়ে বিশেষ করে শোভা, সত্য-এরা সব নেতৃস্থানীয়। এরা সবাই প্রবল দায়িত্ব সহকারে সব কিছু পালন করেছে-

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
এটাতে গেল আপনাদের পলিটিক্যাল কমিটমেন্টের দিক। এবার অভিনেতা-অভিনেত্রীদের কথা, মানে কী ধরণের স্ট্যান্ডার্ডের অভিনেতা-অভিনেত্রী আপনি পেয়েছেন, আপনার দীর্ঘ দিনের কাজের মধ্যে- একটু বলুন।

উৎপল দত্ত
প্রথমে যখন ওরা আসে তখন উৎসাহ প্রচুর থাকে। কিন্তু ক্ষমতা খুব সীমিত থাকে। থিয়েটার সম্পর্কে অনেক ভেবেছে, কল্পনা করেছে, স্বপ্ন দেখেছে। কিন্তু সেই স্বপ্ন বা কল্পনাগুলো অনেক ক্ষেত্রেই অবাস্তব। বেশিরভাগ ছেলেমেয়েরা এসব স্বপ্ন নিয়ে আসে, কিন্তু  প্রথম রিহার্সেল শুরু হবার সঙ্গে সঙ্গে সেসব স্বপ্ন গুড়ো হয়ে যেতে শুরু করে। যা ভেবেছিলাম, থিয়েটার তা তো নয়। এ-তো অসম্ভব একটা ডিসিপ্লিনড, মানে ভীষণ ব্যাপার! অনেকেই থিয়েটারে আসে নিজেকে প্রকাশ করবার জন্য। থিয়েটারের মঞ্চে, আলোতে, রঙ্গিন আলোয় অতগুলো দর্শকের চোখের সামনে নিজেকে মেলে ধরতে। এরকম সব আকাক্সক্ষা থাকে সুপ্ত মনের মধ্যে। কিন্তু এসে দেখে স্টেজে উঠতে গেলে যে পরিমান পরিশ্রম- এতো পোষাবে না বাবা। কেননা এমন একটা সময় এসেছিল আমাদের, তখন আমরা লিটল থিয়েটারে, মিনার্ভায়- রাত্রে রিহার্সেল দিতাম। কেননা অনেকের অসুবিধা হচ্ছিল দিনের রিহার্সেলে। তো সারারাত্তির রিহার্সেল হতো। আবার এক একটা রিহার্সেল এমন আরম্ভ হতো, যেটা আজকে সন্ধ্যেবেলা শুরু হয়ে কাল সকালে থামার কথা, কিন্তু থামলো না। সারাদিন চলার পর আবার সন্ধ্যে এগিয়ে এলো। এসবের পরে টলতে টলতে বাড়ি যাওয়ার পথে নিশ্চয়ই অনেকে মনে মনে ভেবেছে, পালিয়ে গেছে- পারেনি সহ্য করতে। কিন্তু কিছুদিন বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় রিহার্সেল এবং বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় অভিনয় করার পর যার কোনো ক্ষমতা নেই তার কিছুটা ক্ষমতা জন্মাতে বাধ্য। কেননা, অভিনয় এমন একটা শিল্প যেটা সব মানুষেরই আয়ত্বের মধ্যে। সে যে প্রকৃত অভিনেতা হয়ে গেছে তা না, কিন্তু অভিনয় শিল্পটা এমন নয় যে সেটা, ধরা যাক মার্গ সঙ্গীতের মতো, তেমন না। মার্গ সঙ্গীতে যেমন ছোটবেলা থেকে রেওয়াজ করে, আগে শিক্ষা করে, দীর্ঘ শিক্ষা না করা পর্যন্ত কেউ ব্যবহার করতে পারবে না, অভিনয়ের ক্ষেত্রে সেটা সত্য নয়। অভিনয়ের ক্ষেত্রে, যে কথা বলতে পারে, যার মুখ দিয়ে কথা বেরুচ্ছে তার মাতৃভাষায়, তারই অভিনেতা হওয়া উচিত। হওয়ার ক্ষমতা আছে। কিন্তু সে হতে পারবে কিনা বিচার সাপেক্ষ। আমি বলছি সেটা তার রিচের মধ্যে। সুতরাং আমাদের দলে যারা অভিনেতা হয়ে গিয়েছিলেন তাঁদের কণ্ঠস্বর উন্নত থেকে উন্নতর হয়েছে, কণ্ঠস্বরের রেঞ্জ বেড়েছে। আসল কথা, থিয়েটারটা হচ্ছে রেঞ্জ। যেমন একজন খুব ভালো করতো, সবাই বলতো কী অসাধারণ কণ্ঠস্বর! প্রথম রিহার্সেল শুনেই আমি বললাম, তোমার কণ্ঠস্বর থিয়েটারের পক্ষে অনুপযুক্ত। ওকে অপূর্ব কণ্ঠস্বরের বলে এসেছে সবাই, ওর ওই গলাটাই ছিল [কণ্ঠস্বর নকল করে শোনালেন], তারপর? তারপর থিয়েটার কীভাবে হবে? আর আমাদের এই মিনার্ভা থিয়েটার, ওখানে থ্রো না করলে কেউ শুনতেই পাবে না। তা থিয়েটারে যে কণ্ঠস্বর প্রয়োজন, সেটা মোটা কিনা, বেইজ আছে কিনা, এটা বড় কথা নয়, তার রেঞ্জ কতটা আছে সেটাই বড় কথা, উঠতে পারছে কতটা, নামতে পারছে কতটা, সেটাই হচ্ছে বড় কথা- অবলীলাক্রমে। তাকেই বলে থিয়েটারের কণ্ঠস্বর। যেমন আমাদের শিশির ভাদুড়ি মহাশয়ের ছিল। যেমন-হ্যাঁ, ওই পেশাদার রঙ্গমঞ্চের সবারই ছিল। তাদের কাছ থেকে আমাদের শিক্ষার প্রধান ব্যাপারটাই ছিল এইটে। কণ্ঠস্বরের ওঠা-নামার কী যে আশ্চার্য ম্যাজিক তারা দেখিয়ে গেছেন। একদম সপ্তম থেকে একেবরে নিচে নামাচ্ছে গলাটাকে। অথচ সবকিছু স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। এমন কেউই বলে নি যে শোনা যাচ্ছে না। এইগুলো আমাদের অভিনেতারা খানিকটা ডেভেলপ করেছিলেন কিন্তু এখন কথা হচ্ছে এখনকার নাটক আর সেভাবে লেখা হয় না তো, যেখানে কণ্ঠস্বর খেলানোর প্রয়োজন আছে। যেমন- আপনি কেমন আছেন?- আমি ভালো আছি- আপনি এখানে বসুন- আমি এখানে বসবো?- এই তো হচ্ছে সংলাপ। পিন্টারের নাটক বাংলায় অনুবাদ করলে তাই তো হবে। পিন্টার তো এই ইংরেজিই লেখেন। হোয়াট আর ইউ ড্রিংকিং?- সো, হোয়াট আর ইউ ড্রিংকিং?- সো হোয়াট আর ইউ ড্রিংকিং?- তিনবার। ‘বার্থ ডে পার্টি’-তে। আরে একবার বললেই তো বোঝা যায়- হোয়াট আর ইউ ড্রিংকিং?- তাই না? না, তিনবার বলতে হবে। কেন যে বলতে হবে তা কেউ বুঝতে পারে না। কেননা পিন্টার এগুলো ল-নে ঘুরতে ঘুরতে শুনেছেন। ওঁর নাকি কানে এই ইংরেজি, এই ছন্দ এসেছে। তা, উনি ইংরেজ বলেই হয়তো এটা ভাবেন। উনি দৈনন্দিন কথা-বার্তাকে নাটকের সংলাপ বলে চালালেন। এইগুলো চালাতে গেলে তো আমাদের অভিনেতাদের গলা কোনোদিনই তৈরি হবে না। [বেশ উচ্চস্বরে] হোয়াট আর ইউ ড্রিংকিং?- তো বলা যাবে না কখনো। তা বাংলাতেও সেই অবস্থা হচ্ছে।[খুব নিচু স্বরে] কী খাচ্ছ, কী খাচ্ছ? ওই প্লেটাই আমাদের অজিতেশ করেছে। যেটাকে আমি মনে করি দুনিয়ার সব চাইতে খারাপ নাটক লেখা হয়েছে। হ্যাারল্ড পিন্টারের ‘বার্থ ডে পার্টি’। সেটারও বাংলায় অনুবাদ হলো।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
কিন্তু অজিতেশ বাবুর নিজের কণ্ঠস্বর তো যথেষ্ট-

উৎপল দত্ত
জোর ছিল, কিন্তু ও ইচ্ছে করে নিজের ক্ষমতা খর্ব করলো এইসব নাটক করে।ওর তো ধরা উচিত ছিল গিরিশ ঘোষ। ব্যাপারটা কী হয়েছে, বাংলায় নাটক লেখা হয়নি- এটা আধুনিক পণ্ডিতেরা বলছেন। ড. সুকুমার সেন বলেছেন, সুতরাং তাঁকে অনুসরণ করে সব আধুনিক পণ্ডিতরা বলে থাকেন । আর সেটা নাট্যকর্মীরাও রিপিট করে গেলেন। নাট্যকর্মীরা যদি এটা না করতেন, তাহলে কী হতো, তাহলে কয়েকশত নাটক হাতে আসতো। যা আগে লেখা হয়েছে, আবার অনেকগুলো মাস্টার পিস লেখাও হয়েছে, মাস্টার পিস! সেগুলো রিভাইভ করা দরকার ছিল। সেগুলো নাট্য আন্দোলনের কর্মীরাই রিভাইভ করতে পারতো। তাহলে আর নাটকের অভাব বলে হ্যারন্ড পিন্টারের কাছে যেতে হতো না। এখানে ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ জন্মেছেন, গিরিশ ঘোষ জন্মেছেন, দিজেন্দ্রলাল জন্মেছেন। ওঁদের অনেকেই রেভলিউশনারি প্লে-জ লিখেছেন। সেগুলোকে কোনোদিনই করলো না। আর সেগুলো করলে অভিনেতা হিসেবেও এরা অনেক আগে বেড়ে যেত। কেননা ওদের কণ্ঠস্বর খেলানো যেত, ওদের সে সুযোগ ছিল।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
এখন তো আপনি খৈনিই খান।

উৎপল দত্ত
[হাসি] হ্যাঁ।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
এটা কি গলার জন্য নাকি অন্য কোনো কারণে?

উৎপল দত্ত
না না, যখন জেলের ভেতরে ছিলাম, চুরুট তো জেলের মধ্যে গিয়ে পৌঁছুতো না।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
তখন নেশা চেঞ্জ করে ফেললেন?

উৎপল দত্ত
হ্যাঁ, কেননা জেলের মধ্যে খৈনি তো সব ইজি এভেইলেবল, ওয়ার্ডেন, কয়েদী সক্কলের কাছে আছে। আমি ধরে নিলাম। এবং কমরেডরাও। কমরেডরা বিরাট সংখ্যক খৈনি খায়। সোমনাথ লাহিড়ী আমাকে বলেছিলেনও, এদেশে শ্রমিক আন্দোলন করতে গেলে খৈনিই ধরতে হবে। নইলে কী করে হবে!

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
আচ্ছা উৎপল দা, এই ৫০/৬০ দশকে যাঁরা অভিনয় করেছেন, যাঁদের অভিনয় আজ আমাদের কাছে বেশ একটা কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে, তাঁদের পিক-পিরিয়ডের অভিনয় দেখার সুযোগ তো আমাদের হয় নি- যেমন ধরুন বিজন দা। আপনি একটা নাটক, জানি না গণনাট্যের পর একসঙ্গে কাজ করেছেন কিনা, পরবর্তীকালে ‘ তিতাস একটি নদীর নাম’ করেছেন। বিজন দা’র নাটক তো আপনি সে-সময়ে দেখেছেন-

উৎপল দত্ত
বেশি দেখি নি। ‘নবান্ন’ দেখেছিলাম, আবার ‘মরা চাঁদ’ এবং ‘কলঙ্ক’- এই দুটি একাঙ্ক নাটক একসঙ্গে করতেন- তা বিজনবাবুর সম্পর্কে কী জানতে চাওয়া হচ্ছে?

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
বিজন দা’র অভিনয় সম্পর্কে কিছু বলুন-

উৎপল দত্ত
একজন অভিনেতা, যিনি আবেগে কম্পিত থাকতেন। এবং সে সঞ্চারিত হতো অন্য অভিনেতাদের মধ্যে। এবং তারপর সে আবেগটা রঙ্গমঞ্চ থেকে প্রেক্ষাগৃহে সঞ্চারিত হতো। কিন্তু সেই সঙ্গে আমার বক্তব্য হচ্ছে একজন অভিনেতার এতো আবেগপ্রবণ হওয়া উচিত নয়। এই সঙ্গে আরেকটা জিনিসের দরকার হয়- ডিসিপ্লিন। যেটা হচ্ছে অবজেক্টিভ আই। বাইরে থেকে নিজেকে দেখার ক্ষমতা, যেটা ব্রেখট আজ চূড়ান্ত রূপ দিয়ে বলেছেন এলিয়েনেশন। অভিনেতার এলিয়েনেশন ফ্রম দি পার্ট, দূরত্ব স্থাপন। অভিনেতা এবং পার্টটার মধ্যে একটা দূরত্ব থাকা উচিত। অভিনেতা তো শুধু ব্যাখ্যা করবেন না। শুধু পার্টটা তুলে ধরবেন না। পার্টটার উপর মন্তব্যও করছেন। এদিকটা আমি বলবো বিজনবাবুর কম ছিল। ফলে পার্ট ভুলে যাওয়া থেকে শুরু করে যা যা অপরাধ, বৈজ্ঞানিক থিয়েটারে, সবই ঘটতো তাঁর জীবনে। কিছুই মনে রাখতে পারেন না। ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এ সবচেয়ে একটা জটিল ব্যাপার ছিল, কিশোর আর... কী যেন-

শোভা সেন
সুবল-

উৎপল দত্ত
সুবল। কিশোর এসে খবর দিচ্ছে যে, সে একা এসেছে, সুবল আসে নি। বিজনবাবু অভিনয়ের প্রথম সংলাপ বললেন- কী সুবল, কিশোর আসে নাই? বলা উচিত ছিল- কী কিশোর, সুবল আসে নাই? তো এই উল্টোটা বলার সাথে সাথে পুরো দর্শকের কিন্তু পুরো নাটকটা গুলিয়ে যাবে। কে সুবল আর কে কিশোর- এই নিয়েই তো ‘তিতাস’। প্রথম থেকেই দর্শকের একরকম মিস-লিড করার প্রচণ্ড ক্ষমতা বিজনবাবুর ছিল। এবং অভিনয় করতে করতে উনি পাশের অভিনেতাকে জিজ্ঞেস করতেন- হ্যাঁ রে, আমার পরের লাইনটা কী রে?- তো আমি বলবো একদিক থেকে উনি খুব রিল্যাক্সড এ্যাক্টর। এরকম এ্যাক্টর আমার খুব ভালো লাগে, যে অভিনয়ের মধ্যে সম্পূর্ণ অন্য কথা করতে পারে। দর্শককে না শুনিয়ে। কিন্তু তার পরমুহূর্তে এতো বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে যেতেন- একবার তো সত্য-কে গলা টিপে মারবার ব্যাপার ছিল। পেছন থেকে হাত দিয়ে এমনভাবে টিপে ধরেছিলেন যে, সত্য-র ব্রেইন অক্সিজেন বন্ধ হয়ে গেছিল, কিছুক্ষণের জন্য। এত কাণ্ডকারখানা, এত এ্যাকসিডেন্ট ফ্যাকসিডেন্ট তো ঘটা উচিত না থিয়েটারে, সবটা অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় অভিনয় করা উচিত। তো আমাদের পূর্বসূরী যাঁরা আরকি, পেশাদার রঙ্গমঞ্চের যাঁরা জায়েন্টস ছিলেন, তাঁদের মধ্যে যাঁরা টপ এ্যাক্টর, তারা কখনো এমন আবেগপ্রবণ হতেন না। এক একদিন মদ বেশি হয়ে গেলে, ড্রিংক-টা বেশি হয়ে গেলে ভুলভাল করতেন ঠিকই- কিন্তু সর্বোপরি ডিসিপ্লিনড ছিলেন। আমি ৪৩ সাল থেকে ওদের অভিনয় নিয়মিত দেখে এসেছি। অসম্ভব ডিসিপ্লিনড এ্যাক্টর ছিলেন সব। বিশেষ করে অহীন্দ্র চৌধুরী। সন্ধ্যে সাড়ে ছ’টায় যদি নাটক হয় তো আমি বেলা দুটোর সময়ে গিয়ে দেখেছি অহীনবাবু মেক-আপ করছেন। একটু একটু করে দাড়ি লাগাচ্ছেন। আজকাল যেরকম বানানো দাড়ি, টপ করে লাগিয়ে দেয়া হয়, উনি তা করতেন না। আলাদা আলাদা ক্লেপ। একটু একটু করে সমস্তটা লাগাচ্ছে। পারফেক্ট মেক-আপ, পারফেক্ট কস্টিউম। এইরকম ছিল তাঁদের সেন্স অব ডিসিপ্লিন। তা বিজনবাবু যে এসব কোত্থেকে পেলেন, বিশেষ করে গণনাট্যের ব্যানারে যিনি অভিনয় করেছেন, এখানে সবটাই হওয়া উচিত অত্যন্ত বৈজ্ঞানিক। এই আমার বক্তব্য। খুব বড় অভিনেতা, কিন্তু সঙ্গে ডিসিপ্লিনটা যোগ হলে তিনি একজন আন্তর্জাতিক মানের অভিনেতা হতে পারতেন।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
আরো একজনের কথা জিজ্ঞেস করবো- শম্ভু মিত্র।

উৎপল দত্ত
শম্ভুবাবু হচ্ছেন একজন অভিনেতা যিনি কণ্ঠস্বরের ওপরে খুব বেশি ঝোঁক দিয়ে এসেছেন সারাজীবন। নির্মলেন্দু লাহিড়ীর প্রচণ্ড প্রভাব পড়েছে তাঁর ওপরে। প্রভাবই বলবো, আমি এ বলবো না যে শম্ভুবাবু নকল করেছেন। নির্মলেন্দুবাবুর অভিনয়ের এটাই ছিল বৈশিষ্ট্য যে সবটাই গলা, কণ্ঠস্বরের কায়দা অসম্ভব মিষ্টি গলা ছিল তাঁর, এক জায়গায় দাঁড়িয়ে তিনি সংলাপ বলতেন। সে সংলাপ তো প্রায় কাব্য। সে সংলাপ দ্বিজেন্দ্রলালের গদ্য। প্রায় কবিতাই, সেটা কণ্ঠস্বরের জন্যই লেখা। যার ওরকম কণ্ঠস্বর সে-ই করতে পারে ওই রকম। কিন্তু শম্ভুবাবু সেই কণ্ঠস্বরের ওপরে অত্যাধিক গুরুত্ব আরোপ করে এসেছেন সারাজীবনই। অথচ নাটক যেটা করার চেষ্টা করেছিলেন, যখন বহুরূপী সংগঠন তৈরি হলো, ‘পথিক’ তারপর ‘ছেঁড়াতার’, এসব নাটকে তো আর সেরকম সংলাপও নেই, এ তো আধুনিক জীবনের দৈনন্দিন কথাবার্তাকে সংলাপের  স্থানে তুলে আনা হয়েছে। সেখানে আমার মনে হতো বিসদৃশ। কানে লাগছে।-তুমি কেমন আছ?- আমি ভালো আছি।- এটা ওভাবে বলা উচিত নয়। যে কণ্ঠস্বরে শম্ভুবাবু বলছেন, সে কণ্ঠস্বরে কাব্য আবৃত্তি করা যায়, মধুবংশীর গলি আবৃত্তি করা যায়। কিন্তু- কেমন আছ, আমি ভালো আছি- বলা যায় না। তাই আমি অত্যন্ত- কী বলবো, মানে অপূর্ব লাগলো যখন ‘রক্তকরবী’ হলো। হ্যাঁ, এই সংলাপের জন্যই শম্ভুবাবুর কণ্ঠস্বর তৈরি হয়েছে। তাই যে জালের আড়াল থেকে রাজা বলে যাচ্ছে, এ যেন ওইটে বলতো পারতো। তারপর তো রবীন্দ্রনাথকে ওরাই পপুলারাইজ করলেন। রবীন্দ্রনাথকেও তো বাদ দিয়ে রেখেছিল। গিরিশবাবু-টাবু তো বাদ বটেই। রবীন্দ্রনাথের নাটক নাটক নয়, এধরনের কথাও বলতো।

পার্থ বন্দ্যেপাধ্যায়
আপনি তো ‘অচলায়তন’ অনেক আগেই করেছেন-

উৎপল দত্ত
হ্যাঁ করেছি, ভালো করতে পারি নি। যাচ্ছেতাই হয়েছিল। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যাঁরা সত্যিই করতে পারেন, তাঁরা হচ্ছেন ‘বহুরূপী’। শম্ভু মিত্র। এবং তিনি তাঁর নিজের ক্ষমতা বুঝেছিলেন এবং তিনি একটা বিরাট কাজ করে দিয়ে গেছেন বাংলা নাটকে, সেটা হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথ যে অভিনয়যোগ্য, রবীন্দ্রনাথ যে থিয়েটারে একটা অত্যন্ত চমকপ্রদ সংযোজন, সেইটে তিনি প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন এবং প্রধানত ব্যবহার করেছেন তিনি তাঁর কণ্ঠস্বরকে। এবং প্রশ্ন হচ্ছে, অন্য দিকে বলতে গেলে তার দৈহিক তৎপরতার অভাব চিরদিন লক্ষ্য করেছি। তাঁর যখন যৌবন, তখন এবং এখন তো হবেই- বার্ধক্য এসে গেছে- তো যখন ‘চানক্য’ করছেন, ‘মুদ্রারাক্ষস’-এ চোখেই দেখতে পাচ্ছেন না। কিন্তু চোখ যখন খুব উজ্জ্বল ছিল তাঁর, যখন দৃষ্টি একেবারে ভালো ছিল, তখনও এরচেয়ে বেশি নড়াচড়া করতে দেখি নি কখনো। অভিনেতার যে আর একটা দিক আছে যেগুলো দিয়ে সে দর্শকের চোখকে কন্ট্রোল করে, দর্শকের চোখকে নিয়ন্ত্রিত করে। সেটা শম্ভুবাবুর বা বহুরুপীর অভিনয়তে দেখা যায় না। বহুরূপীর অভিনতোরা কম্পোজিশন এবং ব্লকিং-এর ব্যাপারে ভীষণ অপরিচ্ছন্ন, নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছ। তার কারণ হচ্ছে আমার ধারণায়, পরিচালকের প্রভাব। পরিচালক নিজে যদি দৈহিক অভিনয়ে তৎপর হন, তবে পুরো দলটা আস্তে আস্তে খুব স্মার্ট এবং  চটপটে হয়ে ওঠে। আর তিনি নিজে যদি একটু স্থবির ভাবের হন তাহলে পুরো দলটাই একটু ঢিমে হয়ে ওঠে। আর তারপর নানা রকম আর্টিস্টিক যুক্তি দিয়ে সেগুলোকে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করে, যে ওইটেই অভিনয়। একটা সময় এসেছিল যখন বিদেশী নাটকের অভিনয় খুব হতো টতো না। এক আমরা শেক্সপীয়র করেছিলাম বাংলায়। তা উনি বলতেন যে, বিদেশীদের অনুকরণটা আমাদের ক্ষেত্রে হনুকরণ হয়ে যায়। তারপর দেখে খুশি হলাম যে উনি ‘ইদিপাস’ করছেন।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
কিন্তু তার আগে তো উনি ইবসেন করেছেন-

উৎপল দত্ত
হ্যাঁ, তা ইবসেনকে উনি বোধহয় মনে করেন বাঙালি নাট্যকার কিন্তু ‘ইদিপাস’ ধরাতে আমি খুব প্রীত হয়ে বুঝলাম যে, তাহলে হনুকরণ নয়। বিদেশী নাটক করারও প্রয়োজন আছে। যাই হোক, শম্ভুবাবু একটা জিনিস করতে পারতেন, যেটা ওঁর থেকে শিক্ষা করা উচিত- চমক দিতে হয় মাঝে মাঝে। সবটাই যে রিয়েলিস্টিক্যালি অভিনয় করতে হবে তার কোনো মানে নেই। মাঝে মাঝে আনরিয়েলিস্টিক ব্যাপার ব্যবহার করেন উনি। অকারণে কণ্ঠস্বর একেবারে উচ্চগ্রামে তুলে ধাক্কা মেরে আবার নামিয়ে আনা, এগুলো দরকার দর্শককে চমকে দেবার জন্য। মাঝে মাঝে দর্শককে চমকে দেয়া দরকার। দর্শক ঘুমিয়ে পড়বে এটা আমাদের কাম্য না- এই যে মাপা চমক, লাগাম ছাড়া হবে না- এর শিক্ষক তো শম্ভু মিত্র। যেমন উল্টোটা হচ্ছেন গঙ্গাপদবাবু। রিয়েলিজমের নামে বিবর্ণ। উনি আছেন কি নেই, বোঝা যায় না মঞ্চে। এমন ফেইডেড রঙ দিয়ে আঁকা ওঁর চরিত্রগুলো, কোথাও একটা জোরালো লাল বা কালো রঙের ছাপ নেই। গঙ্গাবাবুর অভিনয়কে মনে রাখলে তবে শম্ভবাবুর পাওয়ারটা হৃদয়ঙ্গম করা যায়।- এ-ই আমার বক্তব্য আরকি!

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
আমরা আরো দু-একজনের সম্বন্ধে জানতে চাইছি- কেননা তাঁদের তো আমরা অল্প একটু দেখেছি- যেমন, পরের দিকে জ্ঞানেশ মুখোপাধ্যায়। আমরা ছোটবেলায় একটা দেখেছিলাম, খুবই আকৃষ্ট করেছিল- যেটা হচ্ছে ‘রাহুমুক্ত পালা’। আপনি তো জ্ঞানেশদার অনেক অভিনয় নিশ্চয়ই দেখেছেন-

উৎপল দত্ত
কিছু কিছু দেখেছি। অনেক দেখেছি বলা যাবে না। মিনার্ভায় আমরা যখন ছিলাম, তখন ওরা মিনার্ভা ভাড়া নিয়ে অভিনয় করতো। সেগুলো সব দেখেছি। তো চাষী বলতে জ্ঞানেশ। বাংলার চাষী! আর কেউ নেই। এখন অবশ্য লেফ্ট ফ্রন্ট আমলের চাষীদের যেমন ভুঁড়ি হয়েছে, জ্ঞানেশও তেমন...[হাসি] আর আগে যখন রোগা ছিল, তখন কংগ্রেস আমলের চাষী, তার আগে বৃটিশ আমলের চাষী- জ্ঞানেশ ছিল একেবারে-

শোভা সেন
তবে শেখরও ছিল-

উৎপল দত্ত
আরে বাপরে! দেখেছ শেখরের ‘হানিফ’?

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
না শেখর দা’র ‘হানিফ’ আমরা দেখিনি। শেখর দা’র অভিনয় আমরা দেখতে শুরু করেছি যখন থিয়েটার ইউনিট গড়লো, তখন থেকে। ‘কল্লোল’ অবশ্য দেখেছি।

উৎপল দত্ত
অসাধারণ করেছিল হানিফ গাজী-

শোভা সেন
আজ পর্যন্ত অমন কেউ পারে নি। আর একটা ইন্টারেস্টিং অভিনয় ছিল তরুণ মিত্রের ‘অলীকবাবু’।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
‘অলীকবাবু’ আমরা দেখেছি। লিটল থিয়েটারের প্রোডাকশন দেখি নি, তবে তরুণ মিত্র যখন আলাদা করে করতেন, তখন দেখেছি। এবার উৎপল দা, একটু অন্যদের সম্বন্ধে, তাদের সঙ্গে তো আপনি দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। তাঁদের অভিনয় সম্বন্ধে আপনার নানা রকম প্রশংসা উক্তি আছে বিভিন্ন জায়গায়। একজনের সম্বন্ধে- আমি তাঁর অভিনয় দেখি নি- তাঁর একটা বই পড়েছি, এবং তিনি একজন লিজেন্ডারি অভিনেতা বলে শুনেছি- তিনি হচ্ছেন ফণীভূষণ বিদ্যাবিনোদ। ‘যাত্রা’র।

উৎপল দত্ত
আমি কোনোদিন তাঁর অভিনয় দেখি নি-

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
দেখেছেন বোধহয়-

উৎপল দত্ত
ফণীভূষণ বিদ্যাবিনোদের?

শোভা সেন
একটা যাত্রা উৎসবে, বিডন স্কোয়ারে হয়েছিল।

উৎপল দত্ত
সে ফণীভূষণ কি আর সেই ফণীভূষণ!

শোভা সেন
তাহলেও অসাধারণ!

উৎপল দত্ত
অসাধারণ তো বটেই। নইলে লক্ষ লক্ষ বাংলার গ্রামের মানুষকে-মানে এখনো পর্যন্ত লিজেন্ডারি হয়ে থাকে? আপনি যেখানেই অভিনয় করতে যাবেন, মানুষ বলবে ফণীবাবুর মতো হলো না। ফণীবাবু হচ্ছেন মাপকাঠি! তার মাপকাঠিতে বাকি সবাইয়ের বিচার হচ্ছে।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
পরে তো আপনি আরো একজন বিরাট অভিনেতার সঙ্গে কাজ করেছেন- সেটা তো দেখেছি। পঞ্চু সেন-

উৎপল দত্ত
পঞ্চু সেন- বিরট একটা- কী বলবো, মানে লোকের  একটা ধারণা আছে তো যে যাত্রায় খুব জোরে বলতে হয়। হ্যাঁ, বলতে হয়। আজকাল মাইক এসে গেছে। এরা মাইকের যুগের আগের অভিনেতা। মাইক আসার পরেও এঁদের অভ্যেস জোরে জোরেই বলার। বিড়বিড় করা এঁদের অভ্যেসে নেই, ধাতে নেই। কিন্তু জোরে বললে বোধ করি যেগুলো সুক্ষ্ণ ব্যাপার সেগুলো হারিয়ে যায়। সবটাই খুব ব্রড হয়ে যাবে। পঞ্চুবাবুর ‘বাঙ্গালী’ পালায় অভিনয়ের ক্ষেত্রে দেখেছি যে, যে লোকটা টপ ভলিউমে কথা বলছে অথচ মনে হচ্ছে যেন পাশের লোককে আস্তে করে কিছু বলছে। এটা একটা ইলিউশন ঘটে যায়, না যেন কী সৃষ্টি করে দেয়- মনে হচ্ছে যেন অত্যন্ত ইন্টিমেইট কথাবার্তা বলছে অথচ দেখতে পাচ্ছি গলার শিরা ফুলে উঠেছে, এত জোরে কথা বলছে। আমরা যেখানে দেখতে গেছিলাম, সেখানে মাইক ছিল না। জয়নগরের রাজবাড়ির মধ্যে। উঠোনে গমগম করছে। টপ ভলিউম একদম। ‘রাইফেল’-এ অবশ্য সব জায়গায় মাইক ছিল।

শোভা সেন
আর একটা জিনিস পঞ্চু সেনের বলা উচিত। যখন ‘রাইফেল’-এর কাস্টিং হচ্ছে-

উৎপল দত্ত
ও হ্যাঁ, ব্যাপার হচ্ছে কি, ওদের কোনো ফরমাল পলিটিক্যাল এডুকেশন বলতে যেটা বোঝায় সেটা নেই। কিন্তু মাও সে তুং একটা কথা বলেছিলেন না, জনতার কাছাকাছি থাকলে খুব তাড়াতাড়ি রাজনীতি শেখা যায়। আমরা ‘রাইফেল’ পালায় শেষে কোনো সিন ছিল না- যেখানে রাইফেলগুলো উপরে তুলে চাষীরা বিদ্রোহ ঘোষণা করছে। এটা শুরুতে ছিল না। কেননা আমি ভেবেছিলাম যে পুরো যাত্রাপালাটাই তার বক্তব্য ক্লিয়ার করেছে। সুতরাং শেষে এরকম একটা উস্কানিমূলক দৃশ্য বাংলার গ্রামে এখন দেবার দরকার নেই। আমি রাজনৈতিক সেইফটির কারণেই ওরকম কোনো সিন রাখিনি। পঞ্চুবাবু ইনসিস্ট করলেন শেষে একটা বিদ্রোহ না করলে এতক্ষণ ধরে যেটা চলছিল সেটার ক্লাইমেক্সটা হলো না। আমি লিখলাম আবার।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
উৎপল দা, তারপরেও তো আপনি বহু যাত্রা পরিচালনা করেছেন এবং যাত্রা জগতের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সঙ্গে কাজ করেছেন। তাদের অভিনয় সম্বন্ধে আপনার ধারণা কী?

উৎপল দত্ত
বাংলার শ্রেষ্ঠ অভিনেতা-অভিনেত্রীরা যাত্রাতেই আছে। তারা চলচ্চিত্রে নেই, তারা নাট্যশালায় নেই, আর নাট্য আন্দোলনে তো নেই-ই। তারা সব যাত্রায়। শ্রেষ্ঠ যে ট্যালেন্ট, তা ওরা সব নিয়ে গেছে। নেবেই তো, কেননা ওরা পুরোপুরি পেশাদার। এখানে এমেচারিজমের কোনো স্থান নেই। অবকাশ নেই। টপ টু বটম পেশাদার, প্রত্যেকে অভিনয় করছে, টাকাটি বুঝে নিয়ে বাড়ি যাচ্ছে। মালিক টাকা ফেলছে আর অভিনয় করাচ্ছে। কান ধরে। সেটা একদিক থেকে খুব নির্মম আবার অন্যদিক থেকে সেটাই হচ্ছে কারেক্ট ক্যাপিটিলিস্ট অরগানাইজেশন। আর এই যে আমাদের দোটানা, আধা ফিউডালিজম, আধা ক্যাপিটালিজম, সেমি কলোনিয়ালিজম এর এই হচ্ছে বৈশিষ্ট্য। ওরা হচ্ছে পুরোপুরি মডার্ন ক্যাপিটালিজমের ধারক এবং বাহক। এনটারটেইনমেন্ট ওয়ার্ল্ডে এরাই হচ্ছে ক্যাপিটালিস্ট। সুতরাং ওরা মোস্ট এ্যাডভান্সড হবেই। ক্যাপিটালিজম ইজ ফার ইন এডভান্স দ্যান ফিউডালিজম। সুতরাং দে গেট দ্য বেস্ট রেজাল্ট, দে গেট দ্য বেস্ট ট্যালেন্টস। এজন্য বম্বে চলচ্চিত্র-জগৎ সারা ভারত থেকে বেস্ট ট্যালেন্ট নিয়ে চলে গেছিলো। বিকজ অব দেয়ার ক্যাপিটালিস্ট অরগানাইজেশন। বাংলা চলচ্চিত্রে একটু চণ্ডমীণ্ডপ ভাব আছে। যে আসছে সেই ঢুকে পড়ছে, শ্যুটিং দেখছে, আড্ডা মারছে, টালীগঞ্জের বটগাছ তলায় বসে আড্ডা মারছে ইত্যাদি। বম্বেতে এসব নেই।

শোভা সেন
আউটডোরে বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজন নিয়ে-

উৎপল দত্ত
হ্যাঁ, বন্ধুবান্ধব নিয়ে যাচ্ছে তো যাচ্ছে, লোকজন বন্ধুবান্ধব নিয়ে হৈ হৈ করে থাকা যাবে বলে, ওখানে গিয়ে পিকনিক জমাচ্ছে। এসব বম্বেতে চলবে না। বম্বের অরগানাইজেশন হচ্ছে ক্যাপিটালিস্ট অরগানাইজেশন। এবং ক্যাপিটেলিজম ইজ ফার মোর প্রগ্রেসিভ দ্যান ফিউডালিজম। তো ক্যাপিটালিজমের পুরো এডভান্টেজটা বম্বে পেয়েছে এতদিন। তারা যেমন বেশি টাকা দিয়ে নিয়ে গেছে তেমনি কাজও আদায় করেছে সবার কাছ থেকে। দিবারাত্র খাটুনি ওখানেই হয়। মানে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলি, বাংলা ছবির শ্যুটিং থাকলে আমি মোটা বই নিয়ে যাই। কেননা শটের ফাঁকে ফাঁকে এত অপেক্ষা করতে হয় যে, আমার পুরো বইটাই শেষ হয়ে যায়। বম্বেতে কোনো কিছু নেওয়ার দরকার হয় না, কেননা আমি জানি আমাকে এক মিনিট সময় দেবে না। যতক্ষণ থাকবো স্টুডিওতে ততক্ষণ শট হবে। এবং বাকি সময়টা ডায়ালগ মুখস্ত করতে যায়। আর এখানে তো ডায়ালগ অভিনেতারা মুখস্ত করে না। দেখে-শুনে মোটামুটি নিজের ভাষায় বলে দেন। বম্বেতে তা এলাউ করে না, ধরে। একজন এসিস্টেন্ট দাঁড়িয়ে আছে স্ক্রিপ্ট নিয়ে।... তা না হলে ওদের জবাবদিহি করতে হয়। ক্যাপিটালিস্ট অরগানাইজেশন এতই স্ট্রং। লেখক অবজেক্ট করবে, আমি এ জিনিসটা লিখি নি, তুমি শ্যুট করলে কেন? এন.জি। তাই যারা কাজ করতে চায় তাদের পক্ষে ওই সিচ্যুয়েশনটাই বেটার এখানকার চেয়ে, এই রিল্যাক্সড অবস্থাটা শিল্পের পক্ষে ক্ষতিকারক। আবার এক দিক থেকে ভালোও বলা যেতে পারে, কেননা, কমার্শিয়ালিজম এখানে কম। কিন্তু বম্বেকে নকল করছে এখন। উফ! কিছুদিন আগে একটা ছবির ডাবিং করলাম, পুরোটা বোম্বের ছবি। হিন্দীতে বললেই হতো ডায়ালগ, কেন কষ্ট করে বাংলায় বল! [উচ্চ হাস্য]

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
উৎপল দা, আপনার যে নাটকগুলো, পালাগুলো হতো, সাধারণভাবে আমি যতটা দেখেছি, তা গতানুগতিক যাত্রার সাথে বেশ তফাৎ আছে, চিন্তা-ভাবনায় এবং তার প্রেজেনটেশনে, তা এঁরা যে ধরনের শিক্ষা থেকে আসতেন, তাতে আপনার কোনো অসুবিধে হতো না এঁদের সঙ্গে কাজ করতে?

উৎপল দত্ত
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা হঠাৎ পালা ধরলাম ডিরোজিওর লাইফ নিয়ে ‘ঝড়’।- তা ডিরোজিওর ছাত্র-ছাত্রীরা তো কিছুটা ফরাসী-ইংরেজি বলবেই, নইলে কী করে জিনিসটার আবহটা গড়ে উঠবে। তো এসব ছেলেমেয়েদের দিয়ে ফরাসী বলানো হতো। ইংরেজিই যারা বলতে পারে না, ইংরেজি পড়তে পারে না, কোনো ইংরেজি ডায়ালগ এলে রোমান অক্ষরে লেখা চলবে না। বাংলা অক্ষরে ইংরেজি লিখতে হবে। নইলে ওরা পড়ে মুখস্ত করতে পারবে না। এখন, ওরা শুধু ইংরেজিই না, ইংরেজি তো মুহূর্তের মধ্যে মাস্টার করে ফেললেন, এবং রিহার্সেল যখন দিচ্ছে তখন চোখ বুঁজে মনে হচ্ছে মেমসাহেব বলছে। ফ্রেঞ্চ যা বলে গেল কোনো ফরাসী দর্শক ওখানে থাকলে মনে করতেন কোন ফ্রেঞ্চ বলছে! ঝড় উঠিয়ে চলে গেল স্রেফ। এবং এটা ছ’সাত দিন রিহার্সেলের মাথায়। আর তারপর শেখর গাঙ্গুলী ডিরোজিওর পার্ট করতেন। উনি বিখ্যাত হয়েছিলেন রামকৃষ্ণের পার্ট করে। এখন করতে আসছে ডিরোজিও। ঘোর নাস্তিক ছিলেন। আন্তরিকতাসহ তো অভিনয় করলেন। কোথায় কোন গ্রামে অভিনয় করেছিলেন, যেটা ওঁর জীবনে একটা স্মৃতির সঞ্চয় হয়ে আছে। অভিনয় শেষ করে ওরা ছিলেন সেই গ্রামে। পরদিন সকালে অন্য গ্রামে যাচ্ছেন। সকালে বেড়িয়েছেন, আর গ্রামের ওই পুকুরে মহিলারা বসে বাসন মাজছিল, তারা উঠে এসে পায়ে প্রণাম করছে আর পরস্পরকে বলছে- এই সাহেব আমাদের জন্য অনেক করেছেন। এই যে একটা অন্তরের যোগ সৃষ্টি হয়ে যাওয়া, একদম গভীর গ্রামের মধ্যে সাধারণ মানুষের সঙ্গে- এ তো আমাদের কখনো হয় না। এ ‘যাত্রা’র অভিনেতাদের হয়।

শোভা সেন
মৃনাল সেন বিশ্বাসই করে নি ‘ঝড়’-এর মতো পালা, ডিরোজিওর জীবনী গ্রামের লোক নিয়েছে। ও চ্যালেঞ্জ করে আমাদের সঙ্গে দেখতে গেল, গ্রামে। অবাক হয়ে দেখেছে, সেখানে দর্শক সে নাটক অন্তরের সঙ্গে নিয়েছে। তারা ঘন ঘন হাততালি দিচ্ছে।

উৎপল দত্ত
অর্থাৎ জনগণ যে ব্যাকওয়ার্ড তা নয়। অনেক সময় পিপলকে আমরা আমাদের জ্ঞান বিজ্ঞানের গরিমায় অবজ্ঞা করি। পিপল বুঝতে পারছে না আমাকে, পিপল পিছিয়ে আছে। আসলে পিপল মোটেই পিছিয়ে নেই। তুমি ভয়ের চোটে পিপলকে কিছু দাও না। তুমি মনে কর যে তুমি এত এডভান্সড, পিপল তোমার কথাটা বুঝতে পারবে না। আসলে তুমি এমন কিছুই এডভান্সড না।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
‘সমুদ্রশাসন’-এ আপনি যে ইন্টারপ্রেটশন দিয়েছিলেন- মানে আমাদের চলতি যাত্রায় সাধারণভাবে যে দর্শন প্রচার করা হয় তার বিরোধী। এ পালা-এ তো চলেছে, জমিয়ে চলেছে। অভিনেতা-অভিনেত্রীদের দুর্দান্ত কম্বিনেশন আমরা দেখেছিলাম।

শোভা সেন
থিয়েটার না যাত্রায়-

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
সমুদ্রশাসন, যাত্রায়।

শোভা সেন
কিন্তু কলকাতার এক শ্রেণীর দর্শক বলেছে, এ বড্ড বেশি হয়ে গেছে, এতো ড্রামা কেন? কিন্তু এটা তো দরকার, সাধারণ মানুষের জন্য। ওরা যখন নেয় খুব আন্তরিকতার সঙ্গে নেয়।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
এই পালায় আপনি নাস্তিকতার কথা তুলেছিলেন, মানে প্রচার করেছিলেন। যাত্রায় সাধারণত-

উৎপল দত্ত
আরে ব্যাপার হচ্ছে, নাস্তিকতা, ঈশ্ববিরোধিতা এটা কিন্তু পিপলের ট্রাডিশনের বিরোধী নয়। ভারতবর্ষের পিপলের ট্রাডিশনের মধ্যেই পড়ে। কেননা অনেক বিরাট বিরাট ফিগার যাত্রায় এবং পুরোনো নাটকে হয়ে গেছে যারা ঈশ্বরকে চ্যালেঞ্জ করেছে। রাবণ, পুরো মেঘনাদ-টা। মাইকেল তো এখানেই পিপল’স পোয়েট। এমন একটা থিম ধরেছেন যেটা এ দেশের মানুষের অন্তরের কথা বলেছে যে, রাম ভগবান তা মানি না। কিন্তু এদিকে রামায়ণটা হচ্ছে ইজিয়েস্ট ওয়ে আউট সেখানে রাম, রামায়ণ টিভি সিরিয়ালের কথা বলছি, তা সেটা কুসংস্কারের দিকটাকেই নাড়া দেবে। কিন্তু তার ঠিক উল্টো পথ ধরে শতবর্ষ আগে মাইকেল এচিভ করে দিয়ে চলে গেছেন। তার কারণ হচ্ছে পিপল এর আনুকূল্য। এদেশের মানুষ তো নাস্তিকতাকে, নাস্তিককে পাপী বলে মনে করে না। গৌতম বুদ্ধ নাস্তিক। তাকে শ্রদ্ধা করে সমস্ত মানুষ। এমন কেউ নেই সারা ভারতবর্ষে যে গৌতম বুদ্ধকে গাল দেবে। তিনি বিষ্ণুর দশম অবতার। আর তিনি ঈশ্বর মানেন না। সুতরাং এখানে সাম্যবাদ আসার জন্য প্রস্তুত ছিল সবাই। অবশ্য ভারতের চেয়ে চীন আরো বেশি প্রস্তুত ছিল, কেননা চীন বৌদ্ধ ধর্মের কাজটা আগেই করেছে। নাস্তিকতা, ঈশ্বরবিরোধিতা এইগুলোর ভিত চীনে অনেক বেশি তৈরি ছিল, এই জন্য ভারতের অনেক আগে চীনে বিপ্লব হয়ে গেছে। কিন্তু ভারতেও যে তৈরি নেই তা না, ভারতেও আছে। তাই আমাদের কাজ খুব সহজ হয়ে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা না হয়ে অকারণ জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। এবং তার একটা প্রধান কারণ হচ্ছে ভাষা। এমনকি কম্যুনিস্টরা যে ভাষায় কথা বলে থাকি, থাকেন সেটাও সমস্যা। দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ! কথাটা বললে ওরা বুঝতে পারে না। কী বলছে কী! কিন্তু সেটাকে হয়ত খুব সহজ করে বলা সম্ভব। সেইগুলো ওই যাত্রার অভিনেতা, যাত্রার পালাকার, তারপর পুরোনো বাংলা থিয়েটারের নাট্যকার- এদের কাছ থেকে শিক্ষা করা উচিত। কম্যুনিস্টরাও, কম্যুনিস্টনেতাদেরও বসে এগুলো শিক্ষা করা উচিত। কেননা এই লোকগুলো পিপলের মাঝখানে ছিল। এবং এই লোকগুলো যা বলেছে- গিরিশ ঘোষ, ফর এক্সাম্পল- এককালে তো দেবতা হয়ে গিয়েছিলেন। হি ওয়াজ গড টু দ্য পিপল। নট টু দ্য ইন্টেলিজেনশিয়ান, বাট টু দ্য পিপল। তিনি ‘নিমাই সন্ন্যাস’ লিখেছেন। সে-তো গিয়ে নিজের বৈঠকখানায় বসে ড্রিং করছেন। আর  এই সময়ে একদল নবদ্বীপের ভক্ত বৈষ্ণব, বৈষ্ণব শ্রেষ্ঠ গিরিশচন্দ্রকে দেখতে এসেছেন। কারণ, এরকম পালা যিনি লিখেছে তিনি বৈষ্ণব শ্রেষ্ঠ না হয়ে পারে না। আর উনি ওদের সামনেই মদ খেতে শুরু করে দিলেন। [উচ্চ হাস্য] আর সবাই তো শকড একেবারে। এ কী! এ লোক মদ খায়! কিন্তু এ লোকগুলো একচ্যুয়েলি পিপলের সঙ্গে কথা বলার টেকনিকটা শিখে ফেলেছিল এবং সে টেকনিকটা পরবর্তীকালে মানুষের জন্য লিখে রেখে গেছেন। এভাবে কথা বলতে হবে। তাদের কাছ থেকে শিক্ষা লাভ না করাটা আমাদের খুব অন্যায় হবে। ফলে আজকে বাজে বিদেশী নাটকের অনুবাদে দেশটা ছেয়ে গেল এবং সর্বনাশ উপস্থিত হয়েছে। একাডেমি খালি পড়ে থাকে। তাই ওর চেয়েও ছোট একটা হল বোধহয় খুঁজছে কেউ কেউ।

শোভা সেন
শিশির মঞ্চ।

উৎপল দত্ত
শিশির মঞ্চের পেছনটা বন্ধ করে দেবে। অতদূর হয় না। শুধু সামনের ছ’টা রো নিয়ে যদি একটা হল করতে পারে তাহলে রোজ হাইসফুল হবে। ক্রমশ অবস্থার অবনতি হচ্ছে।

শোভা সেন
এই বাংলা ভাষাটা যে কত মধুর, এ ভাষায় যে কী ঝংকার, যাত্রা না করলে ঠিক বোঝা যেত না। ফিল্ম দেখ, বাংলা উচ্চারণ এক জায়গায় রাখতে পারে না- সত্যজিৎবাবু বলেছেন। ভুল উচ্চারণ, চিবিয়ে চিবিয়ে, আরটিফিশিয়াল- কী বলবো! অথচ যাত্রার লোকদের উচ্চারণ দেখ, কী চমৎকার বাচনভঙ্গী। ভোলাবাবু-

উৎপল দত্ত
ভোলা পাল।

শোভা সেন
দু’জন ভোলা পাল ছিল।

উৎপর দত্ত
আমি ছোট ভোলা পালের কথা বলছি। বিজন মুখার্জী, স্বপনের (স্বপন কুমার) দাদা, দেখেছো এদের অভিনয়! এক ডিরেকশন দু’বার রিপিট করতে হয় না।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
বিজন মুখার্জীর অভিনয় দেখেছি। সমুদ্রশাসন-এ হয়গ্রীব চরিত্রে। ‘সন্ন্যাসীর তরবারী’- তে ছিল, ‘দিল্লী চলো’-তে।

শোভা সেন
কী অসাধারণ অভিনয় করেছিল।

উৎপল দত্ত
ব্রেনাম। অসাধারণ সব অভিনেতা, টপ গ্রেড এ্যাক্টরস, এরা সব যাত্রায়। আসল কারণটা হচ্ছে, মানে মার্কসীয়ান দৃষ্টিভঙ্গিতে বলতে গেলে হচ্ছে অর্থনৈতিক। যদি আমি আমার ভুল সংশোধন না করি তবে আমার মাইনে কেটে নেবে। আগামী বছর আমার মাইনে হাফ হয়ে যাবে, যদি প্রত্যেকটা পালায় আমার পার্টটা হিট করাতে না পারি- এবং এই অর্থনৈতিক কারণের ওপর তো কারণ নেই। এতে সকলে একেবারে এ্যালার্ট। ভিজিলেন্ট, মানে বাঘের মতো। একটা ডিরেকশান কোনোদিন রিপিট করতে হয় না।

শোভা সেন
আর একটা জিনিস, উৎপলকে পেয়ে ওদের একটা ধারণা হলো নতুন কিছু শিখবো তো। যেটা আমরা এতদিন পাই নি। এতদিন তো ওরা পরিচালক পায় নি। নিজেরাই যা পেরেছে, করেছে।

উৎপল দত্ত
হ্যাঁ, নাম্বার ওয়ান এ্যাক্টররাই ডিরেক্টর ওদের-

শোভা সেন
উৎপলকে পেয়ে... মানে একজন সত্যিকার গুরু পেয়েছে। একটা কিছু শিখে আবার নতুন কিছু দিতে পারবো। উৎপল তো যাত্রা প্রায় ছেড়েই দিচ্ছিল। গত বছরে কোনো নাটক লেখে নি। ওর কাজ, শরীরও দিচ্ছিল না, নানা কমিটমেন্ট। পায়ে ধরে, জোর করে ওকে নিয়ে যায়। বলে আমি তো মুছে যাচ্ছিলাম, শেষ হয়ে যাচ্ছিলাম, যদি না উৎপল দাকে নিয়ে যেতাম- শেখর।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
শেখর গাঙ্গুলী। দুর্দান্ত অভিনেতা। ওর অনেকগুলো পালা দেখেছি, দিল্লী চলো, সন্ন্যাসীর তরবারি, সমূদ্রশাসন-এ এখন তো ‘দামামা ওই বাজে’-তে করছেন।

শোভা সেন
একদিন শেখরের সাথে উৎপলের বিষয়ে কথা বলো তুমি।- ওই পঞ্চুবাবু, অত বড় একজন অভিনেতা, কী মন দিয়ে উৎপলের কথা শুনতেন, ডিরেকশন মানতেন। নতুন কিছু শেখার আগ্রটাই এতো বেশি- যা আমাদের এখানে এ্যাক্টর এ্যাক্ট্রেসরা পারে না।

উৎপল দত্ত
এরা ছোটবেলা থেকেই তো পিপলের মধ্যে। ওদের সঙ্গেই খাচ্ছে। ওদের সঙ্গেই শুচ্ছে গোয়ালঘরে ওদের থাকতে দিত, সেখানেই শুয়ে থাকতো। বিনয় হচ্ছে ওদের জীবনের মূলমন্ত্র।

শোভা সেন
একটা এক্সামপল দিই, সুমিত্রা মুখার্জী ‘ঝড়’ ছবিতে অভিনয় করতে এলো। কী সুন্দর রোলটা! মন দিয়ে উৎপলের কথাই শুনতো না। আরে ও জানে, সে বিরাট অভিনেত্রী। যদি ওর ডিরেকশান মানি ছোট হয়ে যাব।

উৎপল দত্ত
তারপর একটা স্বামী ছিল। সেটা খালি কানে কানে বলতো, এরকম কোর না, ইমেজ খারাপ হয়ে যাবে। [উচ্চ হাসি] সে এক সব্বানেশে কাণ্ড!

শোভা সেন
সেটা পরে বুঝেছে, ছবি যখন দেখল তখন বুজেছে- ইশ! আমি কী করেছি! কেঁদে, ভাসিয়ে, চিৎকার করে সে একটা কদর্য ব্যাপার করেছিল। মেলোড্রামা করে- সে এক যাচ্ছে-তাই। পরে বুঝেছিল-

উৎপল দত্ত
যাত্রার অভিনেতাদের মধ্যে যারা একটু কমজোরি, যারা ইনসিকিউরিটিতে ভুগছে, যাদের মাইনে কমে যাওয়ার আশঙ্কা বা ছিটকে যাওয়ার  আশঙ্কা, তাদের মাঝে মাঝে মাথায় চাপে যে কিছু একটা করে দেখাতে হবে। ইচ্ছে মতন হঠাৎ হটাৎ বেড়ে যায়, প্যাঁচ কষে। এরা ছাড়া কারোর মুখে একটা কোনো কথা নেই। কীভাবে পালাটার ডিরেকশান হবে, কীভাবে করতে হবে, কোথা দিয়ে কোথায় যেতে হবে- ডিরেক্টর ফাইনাল। যা বলছে তাই হবে। ওরা একটা ডিসিপ্লিনড আর্মির মতো। যেটা শিক্ষণীয়। নাট্য আন্দোলনে শিক্ষণীয়। ডিসিপ্লিনড না হলে রাতের পর রাত ট্রাভেল করে অভিনয় করা সম্ভব না। ডিসিপ্লিন ওদের মজ্জাগত। তারপর আমরা গিয়ে ওদের অনেক কিছু, ভুলগুলো- ফিউডাল রেনেন্ট যেগুলো ছিল, সেগুলো হটাবার চেষ্টা করেছি। যেমন- খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপার। ক্লাশ ডিসটিনশন ছিল। বড় এ্যাক্টররা বেশি খাবে।

শোভা সেন
তারপর বাসের সিট। বড় এ্যাক্টরা ভালো ভালো সিটে বসবে-

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
এখন কী এগুলো একটু বদলেছে উৎপল দা?

উৎপল দত্ত
অনেক। আমরা গিয়ে আরম্ভ করলাম আন্দোলন। বড় এ্যাক্টর বলে খিদে বেশি, তাতো হতে পারে না। বড় এ্যাক্টর মাইনেই তো বেশি পাচ্ছে।

শোভা সেন
নীলমণিবাবু এ বিষয়ে খুব সাহায্য করেছেন।

উৎপল দত্ত
উনি বুর্জোয়া, ফিউডাল না- উনি এগুলো বুজলেন। এবং চালু করলেন- সব লাইন করে দিলেন।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
আচ্ছা, একটা ব্যাপার যে এখন ঘটেছে যাত্রায়, এই যে সিনেমা থেকে অনেক অভিনেতা অভিনেত্রীরা যাচ্ছে, তাতে যাত্রার কী সত্যি কোনো ডেভেলপমেন্ট হচ্ছে।

উৎপল দত্ত
যাত্রার ডেভেলেপমেন্ট ফিল্ম এ্যাক্টর গিয়ে করবে- এ হতেই পারে না। ওটা মাত্র শত বছরের পুরোন আর্ট। এবং যারা যায় তারা বেশির ভাগই ফেইল করে। এক দেখলাম সম্ভু, খুব সাকসেসফুল হয়েছে। কারণ সম্ভুর মধ্যে সেই ব্যাপারটা ছিল। বিনয় এবং ডিটারমিনেশান। সে যাত্রার অভিনেতাদের কাছে গিয়ে শিক্ষা লাভ করার চেষ্টা করেছে। এরকম করলে ফিল্ম এর অভিনেতারা যাত্রায় সাকসেসফুল হতে পারেন। কিন্তু যদি প্রথমে গিয়ে ‘সব জানি’ এই ভঙ্গি নিয়ে- যে আমরা বাবা আসছি ফিল্ম থেকে, তোমাদের চেয়ে অনেক ওপরে। ফিল্মখ্যাত আমি, তাহলে গেছে, কিছু হবে না।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
এই যে যাত্রায় বড় বড় দলগুলোতে দেখছি, যেমন নট্টকোম্পানি ফিল্মের লোকদের নিয়ে যাচ্ছে, কী পারপাস সার্ভ হচ্ছে?

উৎপল দত্ত
এখন যাত্রার অভিনেতারা যেমন আমাদের বাংলার শ্রেষ্ঠ অভিনেতা অভিনেত্রী, যাত্রায় অন্যদিকে মস্ত বড় সংকট এসেছে। সে হচ্ছে পালা। পালা একেবারে জঘন্য হয়ে গেছে। দু’তিনজনের উপর পুরো নির্ভরশীল যাত্রার লাইন। তাঁরা চার পাতা করে লিখে দেন। ওই চার পাতা রিহার্সেল দিলে আবার চার পাতা- এইসব। পুরো পালাটা ওঁরা একসঙ্গে হাতে দেন না। এভাবে তো রিহার্সেল হতে পারে না। এইসব সংকট এসেছে যাত্রায়। সেটাকে কাটার উপায় হিসেবে মালিকরা ঠিক করেছে যে, কিছু ফিল্মখ্যাত অভিনেতাকে দেখিয়ে যদি পয়সা রোজগার করা যায়। তবে ফিল্মের অভিনেতাদের প্রভাব পিপল এর ওপর কোনো রকম পড়েনি।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
সেখানে তাহলে এখনো যাত্রার অভিনেতাদের আকর্ষণই প্রধান?

উৎপল দত্ত
স্টারস! সুপার স্টারস! সুপার স্টারস বলতে যাত্রার সুপার স্টারস। আমাদের বাংলা ফিল্মে কোনো সুপার স্টার নেই।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
আপনি তো ‘মাও সে তুং’ পালাটা পরিচালনা করেছিলেন। সেখানে তো আপনি আরও একজন বড় অভিনেতার সঙ্গে কাজ করেছিলেন- শান্তিগোপাল।

উৎপল দত্ত
হ্যাঁ, একটা করেছি। শান্তিবাবু একজন রিয়েলি পলিটিক্যাল ওয়ার্কার এইটেই আমার রাজনৈতিক চেতেনার কাছে সবচেয়ে এপিলিং ব্যাপার। উনি একজন ফুল্লি ডেডিকেটেড পলিটিক্যাল ফাইটার। যখন মাও-সে তুং উনি করতে চাইলেন, তখন অবস্থা খুব নিরাপদ ছিল না।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
আমরা দেখেছিলাম। বঙ্গ সংস্কৃতি সম্মেলনে মাও-সে-তুং একটা দল তো প্রায় বন্ধ করে দিচ্ছিল, এবং উনি দাপটের সঙ্গে সেটাকে কন্ট্রোল করলেন। সেটা আমাদের একটা অভিজ্ঞতা।

উৎপল দত্ত
ওই দলের ডিসকভারি তো হয়েছিল গৌতম সাধু খাঁ- চিয়াং কাই শেক! দেখেছিলে?

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
হ্যাঁ। এখন তো ‘দামামা ওই বাজেরে’-তেও করছেন। উৎপল দা এবারে একটু অন্য কথায় আসি। আপনি তো বললেন অভিনেতাদের বিনয়, আন্তরিক ইচ্ছা, ডিসিপ্লিন, এর বাদেও অভিনেতার ইন্টেলেকচুয়াল ফ্যাকাল্টি... মানে অভিনেতার কল্পনাশক্তি এবং পর্যবেক্ষণ যা স্তানিস্লাভস্কি প্রসঙ্গে আপনি বলেছেন, তা যদি আপনি একটু উদাহরণ সহযোগে বলেন, সেটা অভিনয় জীবনে কী পরিমাণে প্রয়োজনীয় এবং কেন ...

উৎপল দত্ত
পর্যবেক্ষণ মানে  জীবনকে পর্যবেক্ষণ করা। অভিনেতা কোত্থেকে পাবেন তার মালমসলা বা প্রেরণা- সেটা কি কোনো বই থেকে পড়ে নেবেন নাকি হোমার থেকে শুরু করে সমস্ত সাহিত্য পড়ে? কীভাবে চলাফেরা করেন- এগুলো ভাববেন, কল্পনা করে নেবেন? যেখানে স্তানিস্লাভস্কি বলেছেন- তা নয়, জীবনকে পর্যবেক্ষণ কর, দেখ, তোমার চার পাশের মানুষকে দেখ এবং সেটাই হচ্ছে তোমার একমাত্র উৎসস্থল যেখান থেকে তুমি প্রেরণা পাবে, মালমসলা পাবে। অন্য কিছুর ওপর নির্ভর না করতে বলছেন স্তানিস্লাভস্কি। জীবনকে অবজারভ কর। সেটাই তুমি তোমার অভিনয়ে প্রয়োগ কর। মানুষ কত রকম হতে পারে; মানষের হাঁটাচলা, মানুষের কথা বলার ভঙ্গী সেটা জীবন থেকেই নাও। এই তো গেল অবজার্ভেশন। আর ড্রামাটিক ইমাজিনেশন যা ছাড়া কিছুই এগোতে পারে না। কোনো অভিনেতাই তৈরি হতে পারে না। আমি দেখলাম- সেটাকে নকল করলাম আর অভিনয় হয়ে গেল- তা হয় না। আমাকে নাটকে কল্পনাশক্তি প্রয়োগ করতে হবে এবং এটা কী করে তৈরি হবে সে বিষয়ে অনেক রকম মতভেদ আছে, অনেকে এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। ড্রামাটিক ইমাজিনেশন একমাত্র ড্রামা পড়ে পড়ে হয়- অনেকে বলেন। আমি যেমন জীবনকে একদিকে অবজার্ভ করবো, আরেক দিকে ড্রামা বা নাটক কাকে বলে- সেটা আমাকে ভালো করে জানতে হবে। তাহলেই আমার নাটকে কল্পনা শক্তি বিস্তারলাভ করবে। শেক্সপীয়র- শেক্সপীয়র তো জীবনকে দেখেই করেছেন। কিন্তু তারপর প্রয়োগ করেছেন তাঁর ড্রামাটিক ইমাজিনেশন। ফলে এসব চরিত্র সৃষ্টি হতে পেরেছেন। এবং তার ড্রামাটিক ইমাজিনেশন খুবই শক্তিশালী। সব যে দেখাতেই হবে অভিনেতাকে- তার তো কোনো মানে নেই। কোনো একটা বিশেষ অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে না এলে অভিনেতা সেটা অভিনয় করতে পারবেন না- এটা তো ঠিক নয়। অভিনেতার নাটকীয় কল্পনাশক্তি যদি যথেষ্ট পরিপক্ক হয় তাহলে বাকিটা তিনি জীবনকে অবজার্ভ করার ফলে কল্পনাশক্তির দ্বারা পূরণ করে নিতে পারবেন। মানে একজনকে পাগলের ভূমিকায় অভিনয় করতে গেলে কি আগে পাগল হতে হবে?- তা নয়।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
আচ্ছা, উৎপল দা- আমরা যদি ব্যাপারটাকে আর একটু বিশ্লেষণ করি, মানে ধরুন, একটি পৌরাণিক চরিত্রে কেউ অভিনয় করছে- তখন তো ব্যাপারটাকে সম্পূর্ণ ইমাজিনেটিক জায়গায় নিয়ে গিয়ে দেখতে হবে তাকে- কারণ সেই চরিত্র দেখবার কোনো সুযোগই তার নেই-

উৎপল দত্ত
কিন্তু ছোটখাট ব্যাপারগুলো সব মানুষেরই এক। তা সে কংসই হোক আর পাশের বাড়ির হারাণবাবুই হোক। এইসব ছোটখাট জিনিস মিলে যে আস্ত মানুষ সৃষ্টি হচ্ছে তাতে কংস আর হারাণবাবুর মধ্যে পার্থক্য হয়ে গেছে বটে, কিন্তু অনেক ব্যাপারে কংস আর হারাণবাবু একই। সেগুলো অভিনয়কে জীবন্ত করে তোলে কংসকে একেবারে অন্য জাতের মানুষ- পৌরাণিক চরিত্রের মানুষ মনে করে যদি আমি অভিনয় করি, তাহলে সেই কংস কখনো বাস্তব হয়ে ওঠে না- সেই কংস কোনো চমক সৃষ্টি করে না- সে দর্শকের চোখে একটা বিজাতীয় কিছুু হয়েই থাকে। কিন্তু ওই কংসকে একেবারে অন্য জাতের মানুষ- পৌরাণিক চরিত্রের মানুষ মনে করে যদি আমি অভিনয় করি, তাহলে সেই কংস কখনো বাস্তব হয়ে ওঠে না- সেই কংস কোনো চমক সৃষ্টি করে না- সে দর্শকের চোখে একটা বিজাতীয় কিছু হয়েই থাকে। কিন্তু ওই কংসকে সৃষ্টি করার ফাঁকে ফাঁকে যদি আমি পাশের বাড়ির হারাণবাবুর মধ্যে দেখা ব্যাপারগুলোকে নিয়ে আসি তাহলে প্রতি মুহূর্তে নাটকীয় চমক সৃষ্টি হয়। দর্শক কংসের মধ্যে সাধারণ মানুষকে দেখতে পান। হারাণবাবুকে দেখতে পান। সেজন্যই তো কংসরা এখনো বেঁচে আছে। শেক্সপীয়রের চরিত্ররাও তাই। আমাদের আজকের জগৎ অনেক পাল্টে গেছে। শেক্সপীয়রের চরিত্ররা অমর হয়ে আছে, কেননা তারা তাদের বিপুল কর্মকাণ্ডের মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ এক্কেবারে আমাদের চোখে দেখা প্রতিবেশীর মতো আচরণ করে। আশ্চর্যভাবে মিলে যায় বলেই ওথেলো যখন ডেসডিমোনোর প্রতি নানা ঈর্ষায় ভুগছেন, তখন বিরাট সংখ্যক মানুষ অনুভব করতে পারেন যে, এরকম অবস্থা আমারও হয়েছে। পাশের বাড়ির হারাণবাবুরও হয়েছে- সেজন্যই ওথেলো ‘ওথেলো’। আর সেটা করতে  পারেন না বলে অনেক নাট্যকারের পৌরাণিক নাটক বা ঐতিহাসিক নাটক মৃত হয়ে থাকে। একবারও বিরাট বিরাট চরিত্রগুলোর সঙ্গে আজকের সাধারণ মানুষের কোথায় চারিত্রিক মিল- সেটা দেখাতে পারেন না।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
এই কথা তো আসছে অভিনেতার কল্পনা ও পর্যবেক্ষণ শক্তির পাশাপাশি সাধারণভাবে একটা জ্ঞানচর্চা যাকে আমরা বলি- নানাবিধ বিষয়ে জানা-বোঝা- এটা প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে বলে। এটা কতদূর প্রয়োজনীয়- মানে বড় অভিনেতা হতে গেলে?

উৎপল দত্ত
শিক্ষিত মন ব্যতীত বড় অভিনেতা হওয়া যায় না। বিশেষ করে আজকের যুগে যখন জীবন এত জটিল হয়ে উঠেছে। তখন এই আজকের সমাজজীবনকে বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা না থাকলে কী করে অভিনেতা অভিনয় করবেন- আমি তো বুঝতে পারি না। যে চরিত্র উনি করতে যাচ্ছেন- সেই চরিত্রটি কোনো একটি বিশেষ শ্রেণীর মানুষ, কালের মানুষ, কেনো বিশেষ সমাজের মানুষ। সেই শ্রেণী- সেই সমাজ এবং কালকে ভালো করে অধ্যয়ন করার ক্ষমতা অভিনেতার থাকা প্রয়োজন। নইলে তো চরিত্রটাকে ভাসা ভাসা বা বিমূর্তভাবে উপস্থিত করবে। তাকে কংক্রিট করে তুলতে পারবে না- তাকে তার সমসাময়িক সময়ে প্লেস করে উঠতে পারবে না। সুুতরাং একটা শিক্ষিত মন থাকা প্রয়োজন। তার জন্য মিনিমাম শিক্ষা-দীক্ষা প্রয়োজন। গিরিশবাবু কোনো স্কুলে-টিস্কুলে- মানে উনি কিন্তু ড্রপ-আউট। ক্লাশ এইট থেকে উনি আর স্কুলে যান নি। কিন্তু ওনার মতো শিক্ষিত মানুষ সে যুগে আর ছিল না বললেই চলে। তৎকালীন ইউরোপীয় দর্শন বলতে যা বোঝায়- সমস্ত বই পড়া ছিল। টিন্ডেল, হাকসলি, ডাউনিং- সব পড়া ছিল। এবং তাই নিয়ে তারা আলোচনা করতেন। তাদের আলোচনার বৈঠক হোত, যেটা অবশ্য রামকৃষ্ণের ভালো লাগতো না। কথামৃতে আছে। কিন্তু বিবেকানন্দ, গিরিশ ঘোষ এরা উত্তেজিত হয়ে আধুনিক ইউরোপীয় দর্শন নিয়ে আলোচনা করতেন এবং হিন্দু দর্শনের সঙ্গে তার তুলনা করতেন, তাকে গ্রীক দর্শনের মাপকাঠিতে ফেলে বিচার করার চেষ্টা করতেন এবং এই রকম উচ্চশিক্ষিত দল ছিল বলেই গিরিশবাবু অতবড় অভিনেতা এবং অতবড় নাট্যকার। সে তো সারা পৃথিবীতেই। যেমন বের্টোল্ট ব্রেখট বললেন না- জীবন এতো জটিল হয়েছে যে , নাট্যকার এখন মার্কসবাদী না হলে নাটকই লিখতে পারবেন না। শেক্সপীয়রের সময় সম্ভব ছিল। কিন্তু এখন আর সম্ভব নয়। ১৯১৭ সালের পর থেকে আর সম্ভব নয়। মার্কসবাদ না জেনে, মার্কসবাদ অধ্যয়ন না করে নাটক লিখতে বসার কোন মানে হয় না। কেননা এই সমাজব্যাবস্থা এত জটিল হয়ে উঠেছে- একে বিশ্লেষণ করতে গেলে মার্কসবাদ হচ্ছে আমাদের হাতিয়ার। সেই মার্কসবাদ প্রয়োগ করে সমাজকে বুঝতে পারলে তবেই সমাজ সম্পর্কে নাটক লেখা সম্ভব।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
একটা কথা আজকাল খুব শুনি- এক ধরনের অভিনেতা রয়েছেন যাদের বলা হয় ‘ইনটুইটিভ এ্যাক্টর’, আর এক ধরনের রয়েছেন যাদের বলা হয় ‘সেরিব্রাল এ্যাক্টর’। এর আন্তঃসম্পর্কটা কী? এরকম একপেশে ব্যাপার, অর্থাৎ ‘ইনটুউটিভ এ্যাক্টর’- তার মাথা আজ করে না বা ‘সেরিব্রাল এ্যাক্টর’ অর্থাৎ তার ইনটুইশন কাজ করে না, এরকম কী হতে পারে? এরকম শব্দ আজকাল অনেকে প্রয়োগ করছেন।

উৎপল দত্ত
এটা খুব খোলা ব্যাপার। এমন কোনো সেরিব্রাল অভিনেতা আছেন যার ইনটুইশন কাজ করে না বা এমন কোনো ইনটুইটিভ আছেন যার মাথা কাজ করে না? না না, দুটো মিলিয়েই তো হয়। চিরদিনই হয়ে এসেছে। আজ সাত হাজার বছর ধরে তাই হয়ে আসছে। এগুলো হচ্ছে সদ্য আলোকপ্রাপ্ত কিছু কিছু মানুষ বলেন। কারণ, এইসব বলে তারা মনে করেন যে, অভিনয় সম্পর্কে নতুন কোনো আলোকপাত করতে যাচ্ছেন। আসলে এগুলো চর্বিতচর্বন বলতে যা বোঝায় তা-ই। ‘শো, রসিয়াস ওয়াজ এ্যান এ্যাক্টর ইন রোম’- পোলেরিয়াস বলে ‘হ্যামলেট’-এ। তখন থেকেই এসব আলোচনা চলে আসছে দুটোই অভিনেতার কাছে ভীষণ ইম্পর্টেন্ট। অভিনেতাকে যেমন মাঝে মাঝে আবেগে কম্পিত হতে হবে, আবার পরমুহূর্তে নিজের উপর অবজেকটিভ চোখ রাখতে হবে। নিজেকে বাইরে থেকে দেখতে হবে যে এই মুহূর্তে কেমন দেখাচ্ছে। দুটো মিশিয়েই অভিনয়।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
ডায়েলেক্টিক্সের দিক থেকে দেখতে গেলে- এটাই তো বিশ্লেষণ। আর একটি প্রশ্ন হচ্ছে, সামগ্রিক মিলিয়ে- স্তানিস্লাভস্কি এক জায়গায় বলেছেন- অভিনেতাকে একজন মহান মানুষ হতে হয়- নোবল ম্যান। এটা অভিনেতার চরিত্র গঠনের প্রশ্ন। এটা একজন অভিনেতা কী কী পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে আহরণ করবার চেষ্টা করতে পারে?

উৎপল দত্ত
স্তানিস্লাভস্কি এই কথা বলেছিলেন। কারণ তিনি মনে করেন, যে অভিনেতা হ্যামলেটের অভিনয় করবে তাকে তো প্রায় হ্যামলেটের সমকক্ষ হতে হবে। এক বিশাল হৃদয় থাকলে পরেই এত রকমের চরিত্রে সে একের পর এক অভিনয় করে যেতে পারে। প্রতি মুহূর্তে সে সেইসব চরিত্রগুলোর সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে নেবে। তবে কথাটাকে একেবারে আক্ষরিক অর্থে ধরা ঠিক হবে না। স্তানিস্লাভস্কির অনেক কথাই তার সমালোচকদের বিরুদ্ধে পলেমিকাল- তাকে বেশি জোর দিয়ে বলতে হয়েছে। তার সব কথাগুলোকে আক্ষরিক অর্থে না ধরে আমরা যদি মূল কথাটা ধরি- যে অভিনেতার চরিত্রে থাকবে এমন গুণ যে সে উদার হবে। যে হৃদয় কারো কাছে বন্ধ নয়- খোলা, প্রশস্ত। যাতে সে পৃথিবীতে যা দেখছে সব থেকে ইম্প্রেশনগুলোকে নিজের মধ্যে নিয়ে নিতে পারে, আত্মস্থ করতে পারে। মানুষের শ্রদ্ধার চোখে দেখলে তবেই সে মানুষকে অবজার্ভ করবে। মানুষের নানা চারিত্রিক দুর্বলতা, বৈষম্য প্রভৃতি সবগুলোকে ভালোবাসতে হবে। নইলে সে মানুষে ইন্টারেস্ট হবে কেন? আর শেক্সপীয়রের নাটক করে আমাদের মনে হয় শেক্সপীয়র মানুষের পাপকেও ভালোবাসতেন। কেননা পাপ মানুষই করে। একটা কুকুর তো পাপ করতে পারে না। রেনেসাঁসের সেই যে বক্তব্য- মানুষ যখন পাপ কাজ করে তখনও সে মহান। তখনও সে মানুষ, তখনও সে তার মানবিকতারই প্রকাশ করছে। সে কুকুর নয়- এইটিই প্রকাশ করছে। ইয়াগো- এডমন্ড বা ইয়াগোকে অত্যন্ত গভীরভাবে ভালো না বাসলে ওরকম চরিত্র সৃষ্টি করা যায় না। ম্যাকবেথ- যেন জীবন্ত পাপের প্রতিমূর্তি। কিন্তু কী গভীর সমবেদনা- কী গভীর মমত্ব সহকারে শেক্সপীয়র সাজিয়েছেন ম্যাকবেথের চরিত্রকে। এবং যিনি ম্যাকবেথের চরিত্রে অভিনয় করবেন তারও সেরকম সংবেদনশীল মন না থাকলে এবং তিনি যদি পাপকে পুরোহিতের মতো ঘৃণা করেন তাহলে সে জীবনে কোনোদিন অভিনেতা হতে পারবে না। ব্রেখট যেমন বলেছিলেন- একজন অভিনেতা অভিনয় করতে গেলে সে শুধু ঐ পার্টটাকে তুলে ধরবে না, পার্টের সঙ্গে একাত্ম হবে না; ঐ পার্টের ওপরে তার যে কমেন্ট সেটাও অভিনেতার করতে পারা চাই। ম্যাকবেথ যে অত্যন্ত ঘৃণিত- এটাও প্রতি মুহূর্তে প্রকাশ করে দেওয়ার ক্ষমতা থাকা চাই। যে ম্যাকবেথ হয়ে ম্যাকবেথের পাপকার্যগুলোকে নমনীয় করে তুলতে পারে। অবশ্য শেক্সপীয়রের ব্রেখটীয় কায়দা প্রয়োগ করতে গিয়ে অনেক দুর্ঘটনা ঘটেছে। ব্রেখটের নিজের নাটকে- তিনি প্রতি মুহূর্তে ‘আর্টরো উই’ এর সমালোচনাও করছেন এবং এটা বাস্তবে প্রয়োগ করে দেখিয়েছেন। স্তানিস্লাভস্কিরা এসবে বিশ্বাস করতেন না। যে অভিনেতা আর্টরো উই-এর পার্টে অভিনয় করবে সে আর্টরো উইকে ভালোবাসবে- আর্টরো উই-এর সঙ্গে সম্পূর্ণ  সিমপ্যাথাইজ করলেই সে আর্টরো উইতে অভিনয় করতে পারবে, নইলে পারবে না- এই ছিল স্তানিস্লাভস্কির মত। এবং শেক্সপীয়রেরও তাই মত ছিল মনে হয়। এবং এই ক্ষেত্রে আমরা যদি হিসাব করে দেখি- এডমন্ড, ম্যাকবেথ বা ক্লডিয়াস, ইয়াগো এইসব বিশাল বিশাল ভিলেন চরিত্রে যে এক ভয়াবহ ধ্বংসাত্মক দিক আছে সেগুলোকে টেনে বার করে রৌদ্রালোকে যেন দাঁড় করানো হয়েছে বলে মনে হয়। এতে পাপ বা এভিল সম্বন্ধে মানুষ সচেতন হয়, দেখতে পায়। তাই ব্রেখটের মেথডের চেয়ে শেক্সপীয়রের মেথড কোনো অংশে কম তো নয়ই। বরং আজকে জার্মানীতে নাৎসীদের ঠিক সেভাবে আঁকতে পারেন নি। নাৎসীরা যে কী ভয়াবহ সেটা মানুষ বোঝেন নি। বোঝাতে পারেন নি ব্রেখট। শেক্সপীয়র অনেক দক্ষ হাতে তাদের যুগের, রেনেসাঁসের যুগের পাপকে তুলে ধরেছিলেন।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
এল.টি.জি থেকে পি.এ.টি পর্যন্ত দীর্ঘদিন অর্থাৎ ৪৭ থেকে ৮৭, প্রায় ৪ দশক- যেসব অভিনেতা অভিনেত্রীদের আপনি পরিচালনা করেছেন, আপনার সঙ্গে যারা কাজ করেছেন- পরিচালক হিসেবে তাঁদের কাছ থেকে আপনি কতটা পেয়েছেন এবং অভিনেতা হিসেবে তাঁরা কতটা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন? কিছু কিছু কথা আছে টুয়ার্ডাস আ রেভ্যুলিউশনারি থিয়েটারে।

উৎপল দত্ত
অসংখ্য ছেলে-মেয়ে আমাদের দলে অভিনয় করেছে। আবার চলেও গিয়েছে। অনেকে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে, অনেকে করে নি। যারা করে নি তাদের সংখ্যাই ঢের বেশি হবে। পরিচালনা করতে গিয়ে এই অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে যে, আমরা সব পাতি-বুর্জোয়া শ্রেণীর লোক- অর্থাৎ মধ্যবিত্ত। এই মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ছেলে-মেয়েরা- এরা বেস্ট এলিমেন্ট নয়, অভিনয়ের জন্য। এরা বড় বেশি সুবিধাবাদী- জেনারেলি। এদের মধ্যে অনেকে আছেন যারা জান লড়িয়ে দিয়েছেন- যারা অভিনয়কে জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলে গ্রহণ করেছেন। কিন্তু বেশিরভাগ ছেলে-মেয়েরাই তা করতে পারে নি। তারা বড্ড কাপুরুষ। তারা এটা বিশ্বাস করে না যে, পেশাদার অভিনেতা হওয়া প্রয়োজন। তারা মনে করে যে একটা চাকরি-বাকরি রেখেই যদি বাকি সময়টুকু একটু অভিনয় করা যায়। কখনও এটা ভাবে না যে, অভিনেতা হতে গেলে আগে সবকিছু ছাড়তে হবে। তাহলেই এরা প্রশ্ন করে- খাব কী? খাওয়ার অভাব কখনোই হয় না- এটা ঠিক জুটে যায়। আর বলে, আগে পেশাদার হই, তারপর চাকরি ছাড়বো। এই ভিসিয়াস সার্কেলের মধ্যে পড়ে। এদের বোঝানো যায় না যে, আগে সব না ছাড়লে পেশাদার হওয়াই যায় না। এ করলে জীবনে হবে না। বেশিরভাগ ছেলে-মেয়েই এরকম। কী বলবো- দোদুল্যমানতায় ভোগে। বেশিরভাগ এনার্জি নষ্ট হয়ে যায় উভয়-সংকটের মধ্যে পড়ে। অভিনয়ের জন্য বিশেষ কিছু বাকি থাকে না। এবং  সুযোগ পেলেই পলায়ন করে- কোথাও যদি দুটো পাওয়া যায়। এটি হচ্ছে পেটি-বুর্জোয়াদের একেবারে মজ্জাগত। তাই মার্কস-টার্কসরা ঠিকই বলেছেন- এই ক্লাশ দিয়ে কিছু হবে-টবে না। এই শ্রেণী মুমূর্ষু। বুর্জোয়াদের জন্মবস্থা থেকেই পেটি-বুর্জোয়ারা মুমূর্ষু। বুর্জোয়াদের যা হয় পেটি-বুর্জোয়াদের জীবনে ঠিকই তা হবে। লোডশেডিং হলে এদের রাজনীতি চেঞ্জ হয়ে যায়। লোডশেডিং-এর জন্য বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারে। বিকেলবেলা অফিস থেকে বাড়ি ফিরে আলো জ্বলে নি, ফ্যান চলে নি। আলো জ্বলার চেয়েও এদের কাছে বেশি ইম্পর্টেন্ট হচ্ছে ফ্যান। কেননা আলো জ্বলুক বা না জ্বলুক, ওদের বিশেষ কিছুই যায় আসে না। কারণ, পড়াশোনা কেউই করে না। খুব কম ছেলে-মেয়েই পড়াশোনা করে। যাদের জন্য আলো দরকার। ফ্যান চলছে না- এই যে সামান্য শারীরিক কষ্ট এটাও মেনে নিতে পারে না। তো থিয়েটার মুভমেন্ট- নাট্য আন্দোলন করতে গেলে প্রচুর কষ্ট করতে হবে। আমাদের সবচেয়ে অসুবিধা হয় কখন- যখন আমরা বাইরে বের হই। কলকাতার নাট্যশালায় আলোও রয়েছে, ফ্যানও রয়েছে। খুব আরামে হচ্ছে। কিন্তু মাঝে মাঝেই ওদের বাইরে যেতে হয়। সেই তখন হচ্ছে ওদের কষ্ট সহ্য করবার পরীক্ষা আসে। অবশ্য মুষ্টিমেয় কয়েকজন থাকে। এদের প্রথমেই চিনে নেওয়া যায় যে এরা থাকবে। এরা সারাজীবনই থাববে। এ থিয়েটার যদি উঠে যায় তবে অন্য থিয়েটারে গিয়ে- থিয়েটারই করবে। হঠাৎ অফিসের বড়বাবু হয়ে বসবে না। বড়বাবু হবার কোনো লোভও নেই। আবার আর একরকম আছে- ছেলে-মেয়ে। ছেলে- যারা বলে, বেশ গর্বের সাথেই, যে, আমি একটা অফিসে চাকরি করি। থিয়েটারের জন্য আমার সব দিতে পারি। আমি অবশ্য এটা মানতে পারি না। কারণ জীবন ও কর্তব্যবোধ অখণ্ড। যেখান থেকে তুমি মাইনে নিচ্ছ সেখানে কাজ করছো না, অথচ আমি নাট্য আন্দোলন করবো এটা বলা শোভা পায় না। কারণ যে ওখানে ঠকায়, সে এখানেও ঠকাবে। ওখানে তো প্রতারিত করছো- অফিসের মালিকদের, কর্তৃপক্ষকে। তাহলে এই প্রতারিত করা তোমার অভ্যেস রয়েছে- মজ্জায় মজ্জায়। তাহলে থিয়েটারকে প্রতারিত করতে মুহূর্তের জন্যেও দ্বিধাবোধ করবে না। স্তানিস্লাভস্কি যে মহৎ মহৎ মানুষের কথা বলেছিলেন, এটা সেই মহৎ মানুষের কাজ নয়। এটা কুটিল যারা হয় তাদের কাজ। ওখান থেকে শুধু মাইনেটা নেবার জন্য সই করে কেটে পড়া- রিহার্সেল আছে বলে। রিহার্সেল তো আছেই। যখন রিহার্সেলের সময় ঘোষণা করা হবে, তখনই বলতে হবে- আমার অফিস আছে, আমি পারবো না। অফিসেও নামটা থাকবে আবার এখানে অভিনেতা হিসেবে নামটা থাকবে- এ হয় না।

তাই আমি মনে করি যে (এ অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে)- এ শ্রেণীর থেকে অভিনেতা অভিনেত্রী জড়ো করে নাট্য আন্দোলন করা পণ্ডশ্রম ছাড়া কিছু নয়। এখানে একটা থিয়েটার দাঁড়াতে পারে- শুধু দু’তিনজন লোক প্রায় একনায়কত্ব কায়েম করলে তবে। তারা যদি সজোরে টেবিল চাপড়ে সর্বপ্রকার বাধা অতিক্রম করতে পারে তবে হবে। আর নইলে- সবাই মিলে খুঁজবে কী করে একটু অন্নসংস্থান হয়। অথচ অন্নসংস্থানের জন্য যে কঠোর পরিশ্রমের দরকার- সেটা না করেই। এই তো হচ্ছে ব্যাপার। সুতরাং পরিচালক হিসেবে এই সবগুলোকে সামাল দিয়ে চলতে হয়। আর এসব সামাল দিতে গেলে যেটা আসল কাজ- নাটক করা- সেটা বিঘ্নিতি হয়। অর্থাৎ যতটা করতে পারা উচিত ছিল- ততটা করতে পারি নি। শুধু আমি না- সব পরিচালকেরই একই অভিজ্ঞতা- সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ আমার নেই। অন্য সব সমস্যা সামাল দিতে দিতে জান বেরিয়ে যায়। তবে যে দলে ভালো সংগঠক আছে- তারা পরিচালককে এই সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে পারে। তবে সংগঠকেরই তো অভাব। কারণ, যে শ্রেণী থেকে আমরা এসেছি সেই শ্রেণীতে সংগঠন বা সাংগঠনিক প্রতিভা স্বীকৃত নয়। সেখানে সাংগঠনিক প্রতিভার কোনো মূল্য নেই। অথচ সাংগঠনিক প্রতিভা হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সংগঠন- আ পেটি-বুর্জোয়া ইজ প্রবাবলি এন্টি-ডিসিপ্লিন। তাই মার্কস-এঙ্গেলসরা ঠিকই বলেছেন- এ শ্রেণীর সৃজনীশক্তি বলে কিছু নেই।

[আগামী সংখ্যায় সমাপ্য]