Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

রহমান রক্কু : ‘মফস্বলের’ জাতীয় নাট্যকর্মী

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

১৯৪৭ সালের দেশ-বিভাগের পর ব্যাপকসংখ্যক শিক্ষক, ডাক্তার, উকিল মোক্তারের সাথে সাথে বেশ বড় সংখ্যক অভিনেতা-অভিনেত্রী, নাটকের পরিচালকও দেশ ত্যাগ করেন। সেই শূন্যতা কাটাতে অনেকদিন লেগেছে। সেই দেশ-বিভাগের বছরই রহমান রক্কুর জন্ম। তার জন্ম এক রক্ষণশীল পরিবারে। যে পরিবারের ঐতিহ্যের মধ্যে ধর্মপালন আছে, ব্যবসা-বাণিজ্য, জোতদারী, রাজনীতি সবই আছে কিন্তু নাটক সঙ্গীত চিত্রকলা নেই। তাই বাল্যকালে রহমান রক্কুকে ভর্তি হতে হয় মাদ্রাসায়। পিতার আকাঙ্ক্ষা ছিল পুত্র কালক্রমে হয়ে উঠবে বিখ্যাত আলেম। ষাটের দশকে রহমান রক্কুর একটা সুযোগ এলো মওলানা ভাসানীর সংস্পর্শে আসার। পিতা কিছুটা নিশ্চিন্তই ছিলেন। কিন্তু মওলানা ভাসানীর প্রগতিশীল রাজনৈতিক ভাবনার মধ্যে শিল্পবিরুদ্ধতা ছিল না। তিনি ছিলেন উপন্যাস, গল্প, গান, কবিতার সমজদারও। তাই ১৯৫৭ সালের কাগমারী সম্মেলনে তিনি সাহিত্যিকদের অতিথি করে এনেছিলেন। তার মধ্যে ছিলেন তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বায়রন, শেলীর নামে তোরণও নির্মাণ করেছিলেন। রাজনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, লাঠিখেলা, এ-সবই ছিল। এসময় মওলানা ভাসানীর অনুসারী ব্যবসায়ী তরুণ লেখক বুলবুল খান মাহবুবের সাথে পরিচয় ঘটে। সে সময় টাঙ্গাইল শিল্প-সাহিত্যেও ছিল সমৃদ্ধ। ষাটের দশকের বেশ কয়েকজন কবি তখন এই শহরে, তার মধ্যে রফিক আজাদ, শায্যাদ কাদির, আবু কায়সার, মীর আবুল খায়ের উল্লেখযোগ্য। বুলবুল খান মাহবুবের সংস্পর্শে আসার পর রহমান রক্কু টাঙ্গাইল পাবলিক লাইব্রেরির গুপ্তধনের সন্ধান পেয়ে যায়। লাইব্রেরিটি ছিল বেশ সমৃদ্ধ। রাজনীতির প্রতি, সাহিত্যের প্রতি ঝোঁক তাকে মাদ্রাসা থেকে বের করে আনে।

টাঙ্গাইল বিন্দুবাসিনী স্কুলে ভর্তি হয়ে যায়। সেখান থেকে বিলম্বেই এসএসসি পাশ করে। এর মধ্যেই ছাত্র ইউনিয়নের সাথে যুক্ত হয়ে বিপুল উৎসাহ নিয়ে ষাটের দশকের রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়ে যায়।

এই সময়ে ষাটের দশকের মাঝামাঝিতে কখন যে নাটকের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ওঠে তা দিনক্ষণ ঠিক বলা যাবে না। তবে সম্ভবত তখনকার তারুণ্যের প্রতীক হিসেবে যে নাট্যদলটি গড়ে উঠেছিল তার পরিমণ্ডলেই তার যাত্রা শুরু। অধুনালুপ্ত দলটির নাম ‘নাট্যবিতান’। ঐ ১৭ বছর বয়সে আমিও ঐ দলের একটি পূর্ণাঙ্গ মঞ্চনাটকের নির্দেশনা দেয়ার সুযোগ পাই। ঘটনাক্রমে আমার সহকারী নির্দেশক ছিল রহমান রক্কু। তারপর আমরা ছিটকে পরি। রহমান রক্কুর সেই থেকে অব্যাহত নাট্যযাত্রা। আমার সাথে টাঙ্গাইলের নাট্য-কর্মকাণ্ডের সেই থেকে ইতি। আমার শহর হলেও আমি ঢাকা প্রবাসী। প্রবাস জীবন থেকে ছিটে ফোটা যোগাযোগ। ঢাকার দল যেমন জেলা শহরে নাটক করতে যায়, আমিও মাঝে মাঝে যাই।

রহমান রক্কুর এই সময়কার নাট্যজীবন সম্পর্কে তেমন ধারণা আমার নেই কিন্তু তখন, ঐ সময়ে সে রাজনীতির সাথেও প্রবলভাবে জড়িত। রাজনৈতিক কারণে কারাবরণও করে। তার কারাবাসের অনেক স্মৃতিকথা পরবর্তীকালেও শুনেছি। দেশ স্বাধীন হবার পর আরেক রক্কুকে দেখতে পাই। টাঙ্গাইলের নাট্য-সংস্কৃতিতে সে মধ্যমণি। তার এবং ফারুক কোরাইশির যৌথ নির্দেশনায় গোলাম আম্বিয়া নুরীর ‘কুমারখালির চর’ দেশে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে। এই সাফল্যের পর সে বসে আর থাকে নি।

‘নাট্যবিতান’ ছাড়াও টাঙ্গাইলের বেশ কয়েকটি নাট্যদলে সংযুক্ত হয়ে পড়ে রক্কু। এ সময় কলকাতার নাট্যচর্চা তাকে ভীষণভাবে আলোড়িত করেছিল। ‘চাক ভাঙা মধু' আর ‘টিনের তলোয়ার’ নির্দেশনা দিয়ে খ্যাতিও অর্জন করেছিল। ইতোমধ্যে টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী নাট্য-প্রতিষ্ঠান ‘করোনেশন ড্রামাটিক ক্লাব’-র সাথেও যুক্ত হয়ে পড়ে। অতীতে দলটির ভূমিকা রক্ষনশীল হলেও স্বাধীন হবার পর এর অর্গল কিছুটা খুলে যায়।

এই সময় রহমান রক্কুকে রাজনীতি থেকে একটু দূরে অবস্থান করতে দেখা যায় কিন্তু তার ভাবনায় একটু পরিবর্তনও লক্ষ্য করার মতো। মওলানা ভাসানীর রাজনীতি থেকে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে চলে আসে। সেখানে সে জেলা আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে।

করোনেশন ড্রামাটিক ক্লাবের সদস্যপদ প্রাপ্তি টাঙ্গাইলের সংস্কৃতিকর্মী ও সুধীজনের কাছে এক বিরল সৌভাগ্য। রহমান রক্কু সদস্যপদ লাভ করার পর তার কর্মকাণ্ড কিছুটা ক্লাব-কেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। এই সময় তার নাট্য-ভাবনায় ও কর্মকাণ্ডে জাতীয় নাট্যচর্চায় অংশ নেবার বিষয়টি চলে আসে। এ সময় ঢাকার দলগুলো নিয়ে টাঙ্গাইলে অনেক উৎসব করতে দেখা যায়। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি থেকে সেনা-আমলা শাসিত দেশে নানা ধরনের প্রদর্শনী হতে দেখা যায়। এই সব প্রদর্শনীতে ঢাকার দলগুলোকে নিয়ে অভিনয় করিয়ে বেশ একটা নাট্য-আবহ সৃষ্টি করার কাজে নিবেদিত হতে দেখা যায়।  

সত্তরের দশকের শেষে দেশে একটা সাংস্কৃতিক জাগরণ উল্লেখযোগ্য। এ সময় বেশ কিছু নাটক আলোড়ন সৃষ্টি করে। বন্ধ্যা রাজনীতিতে নাটক একটা প্রেরণার সৃষ্টি করে। এই আন্দোলনের সাথেও রহমান রক্কু দ্রুত জড়িয়ে পড়ে। টাঙ্গাইল শহরের নতুন দলগুলোতে নির্দেশনার কাজ করা ছাড়াও গ্রাম পর্যায়েও তাকে সক্রিয় হতে দেখা যায়। এই ক্রিয়ায় তার অংশগ্রহণ লক্ষ্য করার মতো। আসলে তার রক্তের মধ্যেই একটা উপাদান ছিল, সেটি হচ্ছে সে বিষণ্ন অবকাশ যাপন করতো না। কোনো না কোনো কাজে সে ঝাঁপিয়ে পড়তোই। আর এ কাজে তার বড় সহায়ক ছিলেন তার স্ত্রী নাজমা রহমান। এ যেন এক সর্বংসহা ধরিত্রী। নিজে অভিনয় করতেন, বেশ ভালো অভিনেত্রীই ছিলেন। রহমান রক্কুর সাথে প্রণয় ও শুভ পরিণয় হয় সেই সূত্রেই। কিন্তু পরবর্তীকালে শ্বশুরকুলের রক্ষণশীলতার মুখে অভিনয় ছেড়ে দিতে হয়।- ‘আমার শিল্পের পরাজয়ের মুখেও পাদপ্রদীপের আলোটুকু জ্বলুক। রক্কুর কাজটা চলুক।’ তাই নাজমা বাড়িটিকে নাট্যচর্চার কেন্দ্র, ঢাকাসহ দেশের সব জায়গা থেকে আগত নাট্যকর্মীদের অতিথিশালায় পরিণত করেন। ঢাকার স্বনামধন্য অতিথিদের পদচারণায় মুখরিত হল মসজিদ রোডের বাড়িটি।

এভাবেই দিন চলছিল। সংসারের সাথে নাটক একই বৃন্তে এগিয়ে চলছিল। হঠাৎ ১৯৯৫ সালে নববিবাহিত কন্যা, জামাতা ও কন্যাত্রয় এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় পতিত হয়। জামাতা কাদের, কন্যা সাথী-বিথী কুমিল্লার অদূরে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করে। দুই কন্যা শিল্পী-শম্পাকে আহত অবস্থায় ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। সারা টাঙ্গাইলে শুধু নয়, সারা দেশেই পরিচিতজনের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। সবাই ছুটে যায় রহমান রক্কুর কাছে। এ শোক সইবার শক্তি কোনো পিতারই থাকবার কথা নয়। রক্কুরও ছিল না। এ সময় আমি তাকে ঢাকায় স্থানান্তরিত করি। আরণ্যক নাট্যদলে কাজ শুরু করে সে। আমার প্রযোজনা সংস্থা বাঙলা টেলিফিল্মের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দিয়ে তাকে ব্যস্ত রাখি। এই সময় আরণ্যক নাট্যদলের বিভিন্ন প্রযোজনায় সে নানাভাবে অংশ নেয়। বেশ দীর্ঘ সময়ই কাজ করার পর টাঙ্গাইলের হাতছানি সে উপেক্ষা করতে পারে না। টাঙ্গাইলে তো শুধু নাটক তাকে ডাকছে না। সেখানে রয়েছে সাধারণ পাঠাগার, সাংস্কৃতিক জোট, শিল্পকলা একাডেমী, কবিতা উৎসব; আরো রয়েছে স্বগ্রাম রামপুর, দড়ি খসিল্যা। সেখানকার নিত্যনৈমিত্যিক ঘটনার সাথেও সে জড়িত। সন্তোষ-কাগমারীর মওলানা ভাসানীর কবরও তাকে ডাকে। তার সহযোগীরাও হাতছানি দেয়। টাঙ্গাইল ফিরে গিয়ে  দ্রুত সে করোনেশন ড্রামাটিক ক্লাবের সাথে যুক্ত হয়ে পড়ে। সাংগঠনিক পদগুলোতে নির্বাচনে অংশ নেয়। নির্বাচনে তার প্রবল উত্তেজনা। জয়ীও হয় সে। এ সময় নাট্য-নির্দেশনা, সাংগঠনিক দায়িত্ব এসব সে প্রবল অস্থিরতার সাথে পালন করতে থাকে।

ইতোমধ্যে তার এবং তার স্ত্রীর দেহে বাসা বেঁধেছে নিরাময়হীন ব্যাধি ডায়বেটিস। কিন্তু সে তাতেও বিদ্রোহী। নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে এগিয়ে চলে তার খেয়ালখুশী মতো। ইতোমধ্যে স্ত্রী নাজমা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়। এ যেন সামনে এগিয়ে চলা কোনো সেনাপতির জন্য এক বড় দুঃসংবাদ। তবুও এগিয়ে চলেই সে। এক অপরাহ্নে চিরবিদায় নেয় নাজমা। দুই কন্যা ও জামাতার কবরের পাশে তাকে শায়িত করা হয়।

নিঃসঙ্গ রহমান রক্কু যেন এবার আরও বেপরোয়া। টাঙ্গাইলে সে করে চলেছে একের পর এক অনুষ্ঠান। মাথায় ঢুকেছে মঞ্চ করতে হবে। ক্লাবের ছাদে একটি আধুনিক মঞ্চ নির্মাণ করতে হবে। রাত-দিন একই ভাবনা। তাও সে করে ফেলে।

প্রথমত অনিয়মে অভ্যস্ত রহমান রক্কু এক রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়। তাকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। বড় ধরনের হার্টএ্যাটাক থেকে ফিরে এলেও তার মঞ্চ নিয়ে উৎকণ্ঠা কমে না। নাট্যেৎসব নিয়ে উদ্বেগও কমে না।

এরপর বুকে পেসমেকার লাগানোর পর হৃদয়ে কিছুটা সুস্থিতি এলেও তার ঝড়োজীবনে কোনো স্থিতি আসে না। ক্লাবের নির্বাচন, প্রতিপক্ষের তৎপরতা, তার স্বপ্ন ভাঙার আশঙ্কা তাকে বেপরোয়া করে তোলে। অকস্মাৎ এক সন্ধ্যায় তার জীবনেও সন্ধ্যা নেমে আসে।

তার জীবনের বিশাল কর্মকাণ্ডের বর্ণনা-ব্যাখ্যা বা মূল্যায়ন করার ক্ষমতা আমার নেই। মাদ্রাসা থেকে স্কুলে, রাজনীতি থেকে নাটকে, আবার নাটকের রাজনীতি, সংসার-ধর্ম, সাহিত্য অনুরাগ এসব নিয়ে নিরন্তর ছুটে চলা মানুষের ভেতরের ক্রিয়া অনুধাবন করা কাছ থেকে দেখা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। অনাগত কোনো গবেষক হয়তে তা আবিষ্কার করবেন।

আমার আরেক বন্ধু প্রয়াত সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিনকে ‘মফস্বল সাংবাদিক’ বললে ভীষণ ক্ষুব্ধ হত। যদিও তার কর্মকাণ্ড ছিল রংপুর। সেই বিচারে রহমান রক্কুকেও কি মফস্বল নাট্যকর্মী বলা যায়? দুজনেই জেলা শহরে থাকলেও হয়ে উঠেছিল ‘জাতীয়’। ঢাকায় অবস্থানরত অনেক নাট্যকর্মীর চেয়েও জাতীয়, আধুনিক, বিশ্বনাটকের খবরাখবরও ছিল তার নখদর্পণে।

অগনিত মানুষ, নাট্যকর্মী, নাট্যানুরাগীদের বন্ধু হবার সৌভাগ্য সে অর্জন করেছিল, যা ক’জনেরই বা ভাগ্যে ঘটে!

রহমান রক্কু তাই অমর হয়ে থাকবে দেশের মঞ্চে-নেপথ্যে, মানুষের স্মৃতিতে, গ্রাম-বাংলার পথে-পথে, লোকালয়ে- যেখানেই সে পৌঁছেছে নাটকের বার্তা নিয়ে।

মামুনুর রশীদ : নাট্যব্যক্তিত্ব