Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিম

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

শাহ আবদুল করিম, সঙ্গীতের সেই মহান পুরুষ আর নেই। তাঁকে শতসহস্র প্রণাম। অযুথ কণ্ঠে তাঁকে তাঁর ভক্ত, শুভানুধ্যায়ী, শিল্পীসমাজ, সংস্কৃতিকর্মী-সংগঠক, বিদগ্ধ ও সাধারণ মন্ত্রমুগ্ধ শ্রোতৃমণ্ডলী শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। ৯৩ বছর বয়সে তাঁকে দীর্ঘদিন লড়াই করতে করতে অবশেষে চলে যেতেই হল।

কাঁদছে মানুষ। কাঁদছে হাওরের বিপুলজলরাশি। কাঁদছে নীরবে পশুপাখি, বৃক্ষরাজি, সব। মানুষের কান্না শুনতে পাচ্ছি, চোখে জল দেখছি। কিন্তু বাতাস স্তব্ধ শোকে। কালনী নদীর নিস্তরঙ্গ জলরাশি ভেঙ্গে কেঁদে আছড়ে পড়ছে শাহ আবদুল করিমের বসতভিটায়। কাঁদছে সেই সঙ্গীত বিদ্যালয়। কাঁদছে নূরজালাল। পুত্র তাঁর। শিষ্য ভক্ত আবদুর রহমান কাঁদছে বারেবারে। কাঁদছে ওই বাড়ির গৃহবধু থেকে সেবিকা নারী সবাই। কাঁদছে গ্রামবাসী, সুনামগঞ্জের অগুনতি মানুষ। সঙ্গে কাঁদছে সিলেটবাসী- শাহ আবদুল করিম যে গর্ব তাঁদের, অহংকারও। সেই সঙ্গে কাঁদছে, বাংলার বাউলকুল- এ যুগের সম্রাট যে মৃত্যুবরণ করেছেন। শোকাভিভূত বাংলার শুদ্ধসংস্কৃতির বিশুদ্ধ মানুষেরা, তারা যে আপনজন হারিয়িছেন ১২ সেপ্টেম্বর (২০০৯)। বাংলার গণমানুষের মনে দোলা দেয়া একটি মানুষ, যিনি তাঁর সঙ্গীতগুণে ধন্য করেছেন জগৎবাসীকে। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ এই গুণীজনের স্নেহে লালিত গুরুকুলের শিষ্য যত- এবার তাদেরই তুলে নিতে হবে বাউল ঘরানার শাহ আবদুল করিমের কৃতকর্মকে। এদেশের সঙ্গীতপিপাসু মানুষকে দিতে হবে সঙ্গীতের বিশুদ্ধ রসধারা, বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের পথনির্দেশ মান্য করে। মনে রাখতে হবে, প্রকৃত বিশুদ্ধতায় সঙ্গীতের যে রসধারাকে তিনি প্রচার ও বিস্তার করে গেছেন সারাটা জীবন, এখন সেই শুচিসিদ্ধ ধারায় যেন সিক্ত থাকে রাধারমণ, হাসন রাজা এবং শাহ আবদুল করিমের গীতমাধুর্য, কেউ যেন বিকৃত করতে না পারে সেদিকে প্রহরীর সর্তক দৃষ্টি নিয়ে সজাগ সতর্ক থাকতে হবে আমাদের সবাইকে।

দুই
বাউলসম্রাট কিংবদন্তি মহান শিল্পী, সুরস্রষ্টা গীতিকার শাহ আবদুল করিম জন্মগ্রহণ করেন ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ধলআশ্রম গ্রামে। নদী আর হাওরবেষ্টিত এ গ্রামে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সঙ্গীত জীবন। লালন করেছেন কত না গুণীশিল্পীকে, তাঁরই সান্নিধ্যে তৈরি হয়েছে ভক্তকুল, গোটা দেশ জুড়ে। তাঁরই মাহাত্ম্যে গুণকীর্তন উঠেছে সর্বত্র। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও তিনি তাঁর সৃষ্টি মাধুর্যে সঙ্গীত রসধারায় সিক্ত করেছেন পণ্ডিত, গুণীনদের।

তিন
শনিবার সকালে বসেছিলাম কিংবদন্তি শিল্পী মহানায়ক শাহ আবদুল করিমকে নিয়ে কিছু লিখতে। তখন আমার এক প্রিয়জন সিলেটের দৈনিক যুগভেরী পত্রিকার সাংবাদিক অপূর্ব শর্মা পৌনে নয়টায় জানান যে, বাউলসম্রাট শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। আচানক এ খবরে একটু বিচলিত হয়ে গেলাম। সে মানুষটি অনেকদিন আরও বাঁচবেন বলে ভেবেছিলাম শত প্রতিবন্ধকতা কিংবা শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও। তাঁর তো এভাবে যাওয়ার কথা ছিল না। কেন তিনি চলে গেলেন? এই তো সেই মহান শিল্পী, যিনি মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ডাকে সাড়া দিয়ে হাজির হয়েছিলেন টাঙ্গাইলের সন্তোষে কাগমারীতে পূর্ব-পাকিস্তান কৃষ্টি সম্মেলনে। তাঁকে আমরা তো কেবল জানি একজন বাউল সঙ্গীতকার হিসেবে , অথচ তাঁর এই মাটির প্রতি টান এবং আনুগত্য সেদিন আমাদের প্রবলভাবে প্রভাবান্বিত করেছিল। এই মহান শিল্পীকে চিনেছিলাম জনগণের দরদী শিল্পী- গণনায়ক হিসেবে। তাঁর লেখা শতাধিক দেশাত্মবোধক ও গণসঙ্গীত তারই সাক্ষ্য বহন করে। অপূর্বর কাছে খবর পাওয়ার পর আমি সিলেট শিল্পকলা একাডেমীর সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা এবং বাউলসম্রাটের ঘনিষ্ট সহচর কবি শুভেন্দু ইমাম অর্থাৎ আবদুল হান্নানের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। তিনি জানালেন, সর্বক্ষণ যোগাযোগ রাখছেন। নূরজাহান হাসপাতালে শুক্রবার মধ্যরাত পর্যন্ত ওরা সংস্কৃতি জগতের মানুষ, সাংবাদিক, টিভির লোকজন, সংসারের মানুষ- যারা সবাই উদ্বুদ্ধ তাঁর লেখায়- তারা সবাই ছিলেন। যেন তাদের উপস্থিতি আর করুণা প্রার্থনা যমদূতকে প্রতিরোধ করতে পারবে। ঘটেছেও তাই। আসতে সাহস পায় নি।

আমি যে মাস দেড়েক আগে সিলেট হয়ে সুনামগঞ্জ গিয়েছিলাম তাঁকে দেখতে। শুনেছিলাম অসুস্থ হয়ে শিল্পী সিলেটের ক্লিনিকে ছিলেন। কিন্তু আমি পৌঁছতে পৌঁছতে তিনি দিরাইয়ে চলে গেছেন। সিদ্ধান্ত নিলাম, ওঁর গ্রামেই চলে যাব, যত কষ্টই হোক।

গিয়েছিলাম হাওর পেরিয়ে কালনী নদী তীরে বাউলের বসতভিটায়। হাওরে দু’তিনদিন আগেও নাকি সড়ক পথেই যাওয়া যেত। এই তো জলে ভরে গেছে বিস্তীর্ণ হাওর। নৌকা নিলাম। যুগভেরী পত্রিকার অপূর্ব তো ছিলেনই, সঙ্গে তার আলোকচিত্রশিল্পী অসীম কাপালী। দেখলাম, একটা কামরায় বাউলসম্রাট শয্যাগত। তিনি কথা বলতে পারছেন না। তাঁর পাশেই কাটালাম দেড়-দু ঘন্টা। মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম। নূরজালাল বারবার আমাকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন। কিন্তু তাঁর তো বোধশক্তি তখন আর নেই। তবু একবার তিনি চোখের ইশারায় বুঝি জবাব দিলেন। খাইয়ে দেওয়া হচ্ছিল তাঁকে, নরম খাবার, চামচে।

এমন পরিস্থিতিতে তাঁর পুত্র-পুত্রবধূ কিংবা উপস্থিত ভক্ত-শিষ্যরা আপ্যায়নের আয়োজনেও কম গেলেন না। কিন্তু অমন পরিবেশে কি কোনো খাবার মুখে রোচে? তবু নূরজালাল-আবদুর রহমানদের মন রাখতে সামান্য হলেও খেতে বাধ্য হলাম। মনে একটা পীড়ন নিয়ে ফিরলাম, কারণ একজন গুণী ব্যক্তির অসুস্থতায়, যিনি মরণশয্যায় শায়িত, তাঁকে সহযোগিতা করতে পারলাম না। অর্থকষ্ট ছিল তাঁর। শিল্পকলা একাডেমীতে এমন কোনো বিধান কিংবা কোনো কল্যাণ-তহবিলও নেই যে, তাঁকে সাহায্য করতে পারি। শুধু চোখের দেখা। শ্রদ্ধা আপ্যায়নে কোনো কার্পণ্য করলেন না নূরজালাল। ঘর থেকে বের হতেই সামনেই একটি বড় টিনের ঘর, তাতেই চিরনিদ্রায় শায়িত শিল্পী স্ত্রী সরলা। সযতনে রক্ষিত কবরের গায়ে একটি গিলাফ দেওয়া। ওইখানেই শাহ আবদুল করিমেরও চিরশয়ানশয্যা, এটা তিনিই নির্ধারণ করে গিয়েছিলেন। একুশে পদকপ্রাপ্ত এ মানুষটি গণমানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় গান বেঁধেছেন, গেয়েছেন। ১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনে তাঁর গান শুনে আজ থেকে ৫২ বছর আগে মওলানা ভাসানী তাঁর পিঠ চাপড়ে বলেছিলেন- তুমি ভবিষ্যতে গণমানুষের মহান শিল্পী হবি। মহান সেই নেতা নিশ্চয়ই সেই সঙ্গে আশির্বাদও করেছিলেন।

চার
মাত্র আট দিন আনুষ্ঠানিকভাবে স্কুলছাত্র হয়েছিলেন কিংবদন্তি এই সুরস্রষ্টা শিল্পী। মানুষের বাস্তব জীবন আর গুরু নেত্রকোণার সাধক রশিদ উদ্দিনের কাছে তামিল নিয়েছিলেন সঙ্গীতের। সেই যে যাত্রা তাঁর, থামেন নি। ক্রমশ তাঁর গুণপনা, সৃষ্ট সুরের মাধুর্য ছড়িয়ে পড়েছে দেশবাসী ভক্ত-সঙ্গীতপিপাসু মানুষের মধ্যে। যে মানুষটি জীবন-সংগ্রামে এক সঙ্গীত সৈনিক ছিলেন, তাঁকে একুশে পদক ছাড়া কোনো রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানো হয় নি। শিল্পীরা, বিশেষ করে নিবেদিত প্রাণ যারা, তাদের কোনো দল থাকে না, তারা কেবলই মানুষে বিশ্বাস করেন। তাই বোধহয় মানুষের ওপর থেকে বিশ্বাস হারান নি তিনি, জীবনের কোনোদিনও।

মানুষও তাঁকে অপরিসীম সম্মান দিয়েছেন দেশে-বিদেশে। তিনবার তাই তাঁকে বিলেত যেতে হয়েছে। মানুষের ভালোবাসা-শ্রদ্ধায় সিক্ত হলেন সেদিন আনুষ্ঠানিকভাবে, যেদিন তাঁর প্রায় ৫০০ গানের একটি বিশাল সংকলন প্রকাশ করলেন সিলেট বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়-সংস্কৃতিকর্মী-সংগঠক মিলে। বিভাগীয় কমিশনার আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নিয়েছিলেন তাঁকে তাঁর প্রকাশনার মাধ্যমে সংবর্ধিত করতে। সিলেটবাসী, সংস্কৃতিসেবী, সাংবাদিক এমনকি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এ উদ্যোগে নির্দ্বিধায় শামিল হয়েছিলেন। যেখানে সিলেটের আরেক কৃতি সন্তান, এককালের তুখোড় ছাত্রনেতা, ভাষাসৈনিক, বর্তমানের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত উপস্থিত হয়ে মহান শিল্পীকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। শত ব্যস্ততা সত্ত্বেও সংস্কৃতিমনষ্ক মন্ত্রী মহোদয় হাজির হয়েছিলেন সিলেট তথা বাংলার গর্ব এবং সঙ্গীত শিরোমণি মহান শিল্পীর সম্মাননা ও গীত প্রকাশনায়।

এ প্রসঙ্গে একটি কথা চেপে রাখতে পারছি না, তা হলো আমরা দেশের সব সংস্কৃতি অঙ্গনের কর্মী, সংগঠক এবং দেশবাসীর দায়বোধ থেকে এ কিংবদন্তি শিল্পীর সৃষ্টিকে সুরক্ষার জন্য ইউনেস্কো ঢাকা অফিসের সার্বিক সহযোগিতায় একটি আকাঙ্ক্ষিত পরিকল্পনা ইতোমধ্যেই জমা দিয়েছি এবং ইউনেস্কোর শ্রদ্ধা ও তাগিদ আছে দারুণ এ শিল্পীর প্রতি। সুতরাং আশা করছি, বিশ্বসংস্থার শিক্ষা, সংস্কৃতি বিজ্ঞানবিষয়ক প্রতিষ্ঠানটি এগিয়ে এলে আমরা শিল্পকলা একাডেমীর মাধ্যমে ইতোমধ্যেই প্রকাশিত শিল্পীর রচিত ৫০০ গানের সংকলনটি ইংরেজিতে অনুবাদ, গানের সিডি এমনকি বিদেশে গ্রহণযোগ্য স্টাফ নোটেশনেও কিছু সংখ্যক গান তৈরি করে প্রকাশ করতে ইচ্ছুক।

[লেখাটি বাংলা একাডেমীর শাহ আবদুল করিম স্মরণ প্রকাশনা থেকে পুনর্মদ্রণ করা হলো- সম্পাদক]

কামাল লোহানী : বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। মহাপরিচালক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী