Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

আলাপনে উৎপল দত্ত [দ্বিতীয় ও শেষ কিস্তি]

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

[সাক্ষাৎকারটি পুনর্মুদ্রণ করা হলো। কলকাতা থেকে প্রকাশিত পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত, শিল্প সাহিত্য বিষয়ক ত্রৈমাসিক ‘পর্বান্তর’- এর দ্বিতীয় বর্ষ, জানুয়ারি ১৯৯৫, প্রথম সংখ্যায় নাট্যব্যক্তিত্ব উৎপল দত্তের একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার ছাপা হয়। এই সাক্ষাৎকারটি ১৯৮৮ সালে গ্রহণ করা হয় এবং সম্পাদকের ভাষ্য অনুযায়ী এটি একটি অসম্পূর্ণ সাক্ষাৎকার, কেননা, নানা জটিলতায় সাক্ষাৎকারটি পূর্ণতা পাবার আগেই এই মহান নটরাজ প্রয়াত হন। তারপরও সাক্ষাৎকারটি পড়েই বোঝা যায়- এটি এক অমূল্য কাজ করেছেন পর্বান্তরের সম্পাদক। অনুমান হয়, বাংলাদেশের তো বটেই, কলকাতারও অনেক নাট্যজন এই বিশেষ সাক্ষাৎকারটির সাক্ষাৎ পাননি- বিশেষ করে নবীন নাট্যজনেরা। সাক্ষাৎকার গ্রহণকালে আরও উপস্থিত ছিলেন সুবীর মুখোপাধ্যয় এবং প্রবীণ অভিনেত্রী শোভা সেন। শোভা সেন আলাপচারিতার মাঝে-মধ্যে প্রবেশ করে সাক্ষাৎকারটিকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন নিঃসন্দেহে। কলকাতার সদ্যপরিচিত লেখক মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়ের কল্যাণে উক্ত সংখ্যাটি থিয়েটারওয়ালার হস্তগত হয়। মলয় দা’র মাধ্যমে সম্পাদক পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৌখিক অনুমতি নিয়ে এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটি দুই কিস্তিতে ছাপবার সুযোগ নিয়েছে থিয়েটারওয়ালা। এই সংখ্যায় থাকছে দ্বিতীয় তথা শেষ কিস্তি।- সম্পাদক]

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
একটা প্রশ্ন উঠছে যে- ষাট বা সত্তরের দশকে গ্রুপ থিয়েটারে দলগত অভিনয়ের যে মান আমরা দেখতাম, সত্তরের শেষ থেকে বা আশির দশক থেকে বলা যায় তার মান খানিকটা নেমে যাচ্ছে। এ সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?

উৎপল দত্ত
আমি তো অন্য দলের অভিনয় খুব কম দেখছি। আমার পক্ষে এ বিষয়ে কিছু বলা সম্ভব নয়।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
যদি পি.এল.টির অভিনয় প্রসঙ্গেই এই প্রশ্ন ওঠে?

উৎপল দত্ত
দলগত অভিনয় নিশ্চয়ই পড়ে যায় নি। দলগত অভিনয়ের মান অনেক উন্নত হচ্ছে প্রতিদিন। সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সে তো আমরা অভিনয়ের রিহার্সেল দেখেই বুঝতে পারি। তবে যারা সদ্য এসেছে দলে, পরের নাটকে বা তার পরের নাটকে তারা অনেক ভালো অভিনয় করতে পারে। ব্যক্তিগত ভালো অভিনয় বলি নি। অভিনয় দাঁড়িয়ে থাকে দলগতভাবে। অবশ্যই দলগত অভিনয় উন্নত হচ্ছে।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
সেদিন আপনি বলেছিলেন যে এন.এস.ডি থেকে যারা অভিনয় টভিনয় শিখে আসে, একজন পরিচালকের প্রথম কাজ হচ্ছে যা শিখে এসেছে তা প্রথম তাদের ভুলিয়ে দেয়া। আবার এন.এস.ডি থেকে নাসিরুদ্দিন শাহ-এরাও তো বেরিয়েছেন। আমি নাসিরুদ্দিন শাহ-এর নাটক বেশি দেখিনি। সিনেমার অভিনয় দেখেছি। তাতে বোঝা যায় যে, উনি শক্তিশালী অভিনেতা।

উৎপল দত্ত
তাতে কিছু প্রমাণ হলো না। আমার কথাটি একেবারেই মিথ্যা প্রমাণিত হলো না। এক-আধাজন বেরোতেই পারে। তার সঙ্গে এন.এস.ডি- এর কোনো সম্পর্ক নেই। এবং এন.এস.ডি-তে না গেলেও নাসির বেরোত। এন.এস.ডি-তে যাবার জন্য নাসির বোধহয় অসুবিধেয় পড়েছে। এন.এস.ডি ওর জীবনে না থাকলে নাসির ইতোমধ্যে আরও বড় অভিনেতা হতো। এই হচ্ছে আমার বক্তব্য।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
আমার আর একটা প্রশ্ন- থিয়েটারে এ্যাকটিং আর ফিল্ম এ্যাকটিং- এদের মূলগত মিল বা পার্থক্য কোথায়? প্রশ্নটা খুব আছে বলেই আপনাকে করছি।

উৎপল দত্ত
প্রথমে বলতে গেলে অভিনয়, অভিনয়ই। তা সে যাত্রায় হোক থিয়েটারে হোক ফিল্মেই হোক। অভিনয়ের মূল কথাগুলো একই। চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে গেলে স্তানিস্লাভস্কি যে ভুল প্রমাণিত হবে তা তো নয়। স্লানিস্লাভস্কি প্রযোজ্য নয়- এরকম নয়। প্রতিমুহূর্তে যিনি থিয়েটারের সবচেয়ে বড় অভিনেতা এবং পরিচালক হিসেবে পরিচিত সেই স্তানিস্লাভস্কির নিয়ম মেনে অভিনয় করলে ফিল্মের অভিনয়ও অনেক ভালো হয়। অভিনয়ের প্রিন্সিপলস দু জায়গায়ই সমান। পার্থক্যটা হচ্ছে এই- চলচ্চিত্রে অভিনয়টা টুকরো টুকরো করে অনেক খণ্ডে ছড়িয়ে যাচ্ছে। আর থিয়েটারে সবটা একসঙ্গে করতে হচ্ছে। থিয়েটারের অভিনয় করতে গেলে অভিনয়ের যে কন্টিনিউটি, যে ঐক্য, সেটা বজায় রাখা সহজ। কেননা দু’ঘন্টা-আড়াই ঘন্টার মধে জিনিসটা শেষ হয়ে যাচ্ছে। শুরু করলাম আর শেষ করলাম- এর মাঝখানে কোনো ছেদ পড়ছে না। চলচ্চিত্রে এই অভিনয়টুকু প্রথমত টুকরো টুকরো করে কাটা হবে। এক একটা শটে। অভিনেতা নিজেকে আর দেখতেই পাবে না। এমন কি ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে- সে কি করছে। আগের শটে কী করেছিল-পরের শটে কী করবে। একটা অভিনয়কে একশো টুকরো করার পরও যে অভিনেতা সেটা ধরে রাখতে পারেন- অভিনয়ের প্রবাহটাকে, অভিনয়ের সামগ্রিকতাকে- সে হচ্ছে বড় চলচ্চিত্র অভিনেতা। এইখানে থিয়েটার থেকে আসা এ্যাকটররাই সারা পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র এ্যাকটর হিসেবে পরিচিত। এই আমাদের দুর্ভাগা দেশ ছাড়া। যারা গ্রেটেস্ট ফিল্ম এ্যাকটর হিসেবে পরিচিত তারা সব এসেছেন থিয়েটার থেকে। হলিউডে দু-চারজন এসেছিলেন যারা থিয়েটার থেকে আসেন নি, এসেছিলেন স্রেফ চেহারার জোরে। তা দু’চারদিন বাদেই দেখা গেল যে, ইন দ্য ফাইনাল এনালাইসিস- শেষমেষ- থিয়েটারের অভিনেতারাই চলচ্চিত্রের সর্বশ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে পরিচিত হলেন। যেমন, পল মুনি। একজন প্রবাদপ্রতিম অভিনেতা, এসেছেন থিয়েটার থেকে। শার্ল বয়ের, চার্লস লটন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যারা সর্বশ্রেষ্ঠ যুগসৃষ্টিকারী অভিনেতা, চলচ্চিত্রে- সব এসেছেন থিয়েটার থেকে । আর ইয়োরোপে তো থিয়েটারের মধ্যে দিয়ে ছাড়া ফিল্মে আসার কোনো পথই রাখে নি। রাস্তা বন্ধ। চলচ্চিত্রের অভিনেতা খুঁজে বার করা হয় থিয়েটার থেকে, থিয়েটারে এসে বসে থাকে ট্যালেন্টস স্কাউটরা। থিয়েটারের অভিনয়তে যার নাম হয়েছে তাকে প্রথম তারা ইন্টারভিউ করে। তার থিয়েটারের অভিনয় দেখে তাকে সিলেক্ট করে। ব্রিটেনে থিয়েটারকে বাদ দিয়ে চলচ্চিত্রে ঢোকার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। সমাজতান্ত্রিক দেশে তো নেই-ই সোভিয়েট ইউনিয়নে অভিনেতা ক’জন লাগবে সেটা ফাইভ ইয়ার প্ল্যানে ঠিক হয়। আর ততগুলো অভিনেতা ওরা তৈরি করে সারা দেশে। ওরা থিয়েটারের জন্যই তৈরি করে। এবং জানে এরাই যাবে চলচ্চিত্রে সুতরাং এই কোটার মধ্য থেকে চলচ্চিত্রের অভিনেতা উঠছে। চলচ্চিত্রের অভিনেতা এবং থিয়েটারের অভিনেতা একই সঙ্গে তৈরি হচ্ছে- এটাই উপায়। প্রথমে থিয়েটার থেকে চলচ্চিত্রে যেতে পারে। তার ইলিজিবিলিটি হলে। তার মানেই যে তাকে চলচ্চিত্রে নেবে তার কোনো মানে নেই। চলচ্চিত্রের পরিচালকের ওপর সেটা নির্ভর করছে। তবে ওখানে কতো বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় এটা করছে- যাতে কোনো অভিনেতা বেকার না থাকে। বেকার অভিনেতা বসে থাকে সারা বছর। সোভিয়েট ইউনিয়ন ব্যবস্থা করেছে- যাতে একজন অভিনেতাও বেকার না থাকে। কেননা ওদের আইন আছে- কন্সটিটিউশনাল রাইট টু ওয়ার্ক। তার যদি কাজ না থাকে সে রাষ্ট্রের নামে মামলা করতে পারে। আর আদালতও তাকে সঙ্গে সঙ্গে কয়েক লক্ষ রুবল ক্ষতিপূরণ দিয়ে দেবে। সুতরাং সাবধানে ওদের এগোতে হয়। যতজন অভিনেতা লাগবে আগামী পাঁচ বছরে ওরা সেই অনুযায়ী হিসেব করে তত জনকেই ট্রেইন করবে। ওদের অনেক ড্রামা একাডেমি আছে- প্রত্যেক রাজ্যে আছে। মস্কো, লেলিনগ্রাদে চারটে চারটে করে ড্রামা একাডেমি। এইখানে তৈরি হবে ঠিক ততজনই, যতজনকে প্রয়োজন। এবং ট্রেনিঙের মধ্যেই তাকে এ্যাটাচ করে দেয়া হবে কোনো থিয়েটারে। সেই থিয়েটারে গিয়ে সে অভিনয় শুরু করবে। সেটা শিক্ষারই একটা অংশ-প্রাকটিকাল। তাকে এসে ঐ সার্টিফিকেট দেখাতে হবে যে, সে এতগুলো পারফরমেন্স, এত  রাত্তির ধরে অভিনয় করেছে। তবে তাকে ডিপ্লোমাটা দেবে একাডেমি। অর্থাৎ শিক্ষা যখন চলছে তখনই সে থিয়েটারে অভিনয় করতে শুরু করেছে। ওরা তো ভুল করে নি।

সুতরাং এই যে চলচ্চিত্রের অভিনয় আর থিয়েটারের অভিনয়ের মধ্যে একটা বিরাট পার্থক্য। এসব আরম্ভ করেছিলেন কিছুদিন আগে, সম্প্রতি, চলচ্চিত্রের কিছু পরিচালক। যারা অভিনয়ের কিছুই জানতেন না। কোনো অভিনয় করে দেখাতে পারবেন না। তারা ওসব হম্বিতম্বি করতেন। থিয়েটারে অভিনয় করলে নাকি চলচ্চিত্রে অভিনয় নষ্ট হয়ে যায়। তারা অনেক অভিনেতা অভিনেত্রীকে এইভাবে শাসাতেন; তাদের বলতেন যে- থিয়েটারের অভিনয় বন্ধ করতে হবে, নইলে চলচ্চিত্রে অভিনয় করা চলবে না। ওরা ভাবতেন- তাই তো এত বড় ডাইরেক্টর বলছে আমাকে এবং ওরা থিয়েটারের অভিনয় বন্ধ করে দিতেন। কথাটা একেবারে ডাহা মিথ্যা। দুটোর মধ্যে কোনো বিরোধ তো নেই-ই বরং থিয়েটারের অভিনয় চলচ্চিত্রের অভিনয়কে আরও মার্জিত, সংযত ইত্যাদি করে। যেমন ধরা যাক উচ্চারণ- আমাদের বর্তমানে চলচ্চিত্রাভিনেতাদের উচ্চারণ খুব একটা শোনার যোগ্য নয়, ভালো করে বাঙলা কথাই বলতে পারে না। আ-আ-আর- এটাতো বাঙলা ভাষা নয়। কিন্তু ইওরোপ বা আমেরিকায়- অভিনেতা হচ্ছেন ভাষার শ্রেষ্ট বক্তা। সবচেয়ে ভালো ভাষাটা বলতে পারে- যে সবসময়ই উঁচুতে থাকে। যদি ধরুন আগামীকাল মার্গারেট থ্যাচার মারা যান- তো তার ওখানকার রেডিও বা টেলিভিশনে নিজেদের কমেন্ট্রেটর রাখবেন না। তারা আমন্ত্রণ করে আনবেন দেশের শ্রেষ্ঠ অভিনেতা ও অভিনেত্রীদের। তারা বলবেন, কেননা ইংরেজি ওদের মুখেই খুলবে সবচেয়ে ভালো। আমেরিকানদের অবশ্য অত সুনাম নেই উচ্চরণের ব্যাপারে। কিন্তু রাশিয়ান বা ফ্রেঞ্চ এ্যাকটরদের বিরাট সুনাম। প্যারিসের,  ফ্রান্সের অভিনেতা- অভিনেত্রীরাই সর্বশ্রেষ্ট ফরাসী বলেন- এটাই সকলে জানেন। কেউ যদি ফরাসী শিখতে চায়- ফরাসী কী করে বলতে হয় তাকে যেতে হবে কমেডি ফ্রাঁসেসের নাটক দেখতে। সেখানে যে ফরাসী বলা হচ্ছে সেটা হচ্ছে স্ট্যান্ডার্ড ক্লাসিকাল ফ্রেঞ্চ। আর সব ফ্রেঞ্চ কোনো না কোনো দোষে দুষ্ট- আঞ্চলিকতা, শহর ঘেঁষা। যেটাকে ওরা বলে ফাস্ট ফ্রেঞ্চ । অর্থাৎ শহুরে সভ্যতার চাপে দ্রুতগতিতে কথা বলবার একটা ঝোঁক দেখা যাচ্ছে শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে, শহরবাসীদের মধ্যে। এসব দোষ থেকে মুক্ত ফরাসী অভিনেতা অভিনেত্রীরা।

কিন্তু আমাদের দেশে- কী বলবো- চলচ্চিত্রাভিনেতাদের মধ্যে অধিকাংশই সরলতম বাংলাও বলতে পারেননা। তার কারণ, আমাদের চলচ্চিত্রে যে সংলাপ লেখা হয় সেগুলো বাংলাই নয়। সেগুলো আড়ষ্ট কলকাত্তাই। সেদিন তো একটা ছবি হচ্ছিল, শরৎবাবুর- বিজয়া অর্থাৎ দত্তা। অজয় কর পরিচালনা করছিলেন। সুচিত্রা সেন, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং আমি অভিনয় করছিলাম। এবং সংলাপ তো শরৎচন্দ্রেরই লেখা- বিজয়া নাট্যরূপ দিয়েছিলেন শরৎচন্দ্র। সেই নাটকের সংলাপ ব্যবহার করেছেন অজয় কর এই চলচ্চিত্রে। আমরা বলতে গিয়ে বলতে পারছি না। এন.জি-র পর এন.জি হচ্ছে- শুধু ঐ বাংলার জন্য। কারণ, এই প্রথম আমরা বাঙলা বলছি। এরকম কনস্ট্রাকশন। অজয় কর বললেন এগুলো শরৎচন্দ্রের নিজের লেখা। ওটার ওপর আর কারেক্ট করবেন না। যেমন লিখেছেন ঠিক তেমনই বলে যান। এ একটা ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হচ্ছিল সেদিন। সেন্টেন্সগুলো দীর্ঘ এবং কমপ্লেক্স সেন্টেন্স। হবেই তো, শরৎচন্দ্র লিখেছেন।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
তা আপনার অসুবিধে হবে কেন উৎপল দা? আপনি এত সমস্ত নাটক করেছেন।

উৎপল দত্ত
এত সমস্ত চলচ্চিত্র করে নষ্ট হয়েছে। চলচ্চিত্রে কথাগুলো যে এত ইম্পরট্যান্ট-মানে কথাগুলোকে তো গুরুত্ব দিই নি কোনো দিন। কোনোদিন তো চলচ্চিত্রের সংলাপ মুখস্ত করি না। তক্ষুণি কিছুটা দেখে বলে দিই। খানিকটা ওখানে, খানিকটা বানিয়ে গোঁজামিল দিয়ে দাঁড়িয়ে এসে পড়তে হয়- এই তো হয়। ফ্লোরে যাবার সঙ্গে সঙ্গে যতগুলো গার্ড থাকে অর্থাৎ অভিনেতার যতগুলো আসল-নকল ক্ষমতাবলী- অস্ত্রগুলো- সেগুলো সব বাইরে অ্যাবানডন করে তবে ঢুকি।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
আমাদের দেশে সাধারণভাবে, সব-সময় অবশ্যই নয়- কমেডি অভিনেতাকে খুব বড় অভিনেতার সম্মান দেয়া হয় না। এ সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?

সুবীর মুখোপাধ্যায়
ভালো কমেডি নাটকও অনেকে বলতে চায় না। কমেডি ব্যাপারটাকেই যেন ছোট করে রাখা হয়েছে।

উৎপল দত্ত
এরকম একটা আছে- এব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। গোমড়ামুখো দেশে তাই হওয়া স্বাভাবিক। দেশটাই গোমড়ামুখোদের। হিন্দু ধর্ম যাদের সামাজিক জীবনের ভিত্তি, তারা গোমড়ামুখো না হয়ে যাবে কোথায়? এখন প্রশ্ন হচ্ছে- কমেডি অ্যাপ্রিসিয়েট করার ক্ষমতা চাই। কমেডি অ্যাপ্রিসিয়েট করতে পারে শুধু তারাই- যারা জীবন সম্বন্ধে একটা নৈর্ব্যাক্তিক বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গী নিতে পারে। তারাই অ্যাপ্রিসিয়েট করতে পারে, চ্যাপলিন। সব ব্যাপারেই যে হাসি সম্ভব, যুদ্ধের মধ্যেও হাসি সম্ভব। এটা শুধু তারাই বুঝতে পারে যারা জীবনের ঊর্ধ্বে উঠে জীবনকে দেখতে পারে। প্রতি মুহূর্তে জীবনের টানাপোড়েনোর মধ্যে নিজেকে জড়িয়ে না ফেললে আর কমেডি অভিনয় করবার ক্ষমতা হয় না। আর বিশেষ করে ভারতবর্ষের পাতিবুর্জোয়া শ্রেণী- যারা চলচ্চিত্র-টলচ্চিত্র সবকিছুরই প্রধান দর্শক এবং থিয়েটারেরও দর্শক তাদের মধ্যে একমাত্র বাঙালি পাতি-বুর্জোয়ারই কখনও কখনও একটু সেন্স অব হিউমার দেখতে পাওয়া যায়। আর বাদ বাকি সব- আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি- তা সে মহারাষ্ট্রে হোক বা পাঞ্জাবে হোক- যা কিছু সেন্স অব হিউমার সব আছে অন্য শ্রেণীর মধ্যে। কৃষকদের মধ্যে আছে, শ্রমিকদের মধ্যে আছে। কিন্তু এই পাতিবুর্জোয়া শ্রেণীর মধ্যে কিচ্ছু নেই। তারা শুধু একটা পোর্টফোলিও হাতে করে টাকার পেছনে দৌঁড়োচ্ছে। আর টাকাও পাচ্ছে কিনা- জানি না- দৌঁড়ে দৌঁড়ে হাঁপিয়ে যাচ্ছে। সুতরাং হাসবে কখন। হাসির কথা বললে তারা রাগ করে- বলে সময় নষ্ট করছে।

পার্থ বন্দোপাধ্যায়
আচ্ছা উৎপল দা, যারা কমেডি অভিনয় করেছে- যেমন ধরুন আমরা তো একটা অসাধারণ ছবি দেখেছি; তুলসী চক্রবর্তীর ‘পরশ পাথর’- এছাড়া যারা এই সব অভিনয় করেছে, আমরা তো সকলের অভিনয়- টভিনয় দেখি নি- তাদের অভিনয় সম্বন্ধে কিছু বলুন-

উৎপল দত্ত
ঐতো বাঙলা নাট্যশালার একেবারে গোড়ার দিকে অসাধারণ সব কমেডি হয়েছে। দীনবন্ধু মিত্রের মতো এরকম প্রচ- ডায়ালগ- হাসির সংলাপ লিখতে তো আর কেউ পারলো না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- তখনও কমেডির স্থান অনেক নিচে, প্রধানত হচ্ছে ট্র্যাজেডি। দীনবন্ধু ট্র্যাজেডি লিখতে পারলেন না। তথাপি প্রাণপণে ‘নীলদর্পন’ লিখে ফেললেন। তাতে সব ভয়াবহ সংলাপ সাজাবার চেষ্টা।- এ কি! আমার কি তাহা হইলে উদ্বন্ধনে মৃত্যু হইয়াছে। হঠাৎ সংলাপ সাধু ভাষায়। যদিও স্টেজে সেটা বলা হয় না। কারণ উনি মনে করলেন যে, এরকম না বললে ট্র্যাজেডি হয় না। ওর যে আসল ক্ষমতা- ‘বিয়ে পাগলা বুড়ো’ বা ‘সধবার একাদশী’-তে যেসব সংলাপ- দ্যুতি, চমক সে প্রায় অব্যবহৃত হয়ে আছে। আর আমরা যখন ছোটবেলায় থিয়েটার দেখেছি ভাদুড়ী মশায়ের, অহীন্দ্রবাবুর কোনো কমেডি দেখেছি বলে মনে হয় না। একটা আস্ত কমেডির অভিনয়ই ওরা করেন নি। ঐ সিরিয়াস নাটকের মধ্যে একটা জায়গায় হয়তো একটা ভৃত্য এসে হাসাবার চেষ্টা করছে। সে নিছক জোর করে হাসাবার চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়। হাসিও পেত না দর্শকের। তাও কিছুক্ষণ, আবার ট্র্যাজেডিতে ফিরে যেতে হবে। এই তো ছিল নিয়ম। আমরা পূর্ণাঙ্গ ভালো কমেডি দেখেছি খুব কম- হয়-ই নি আমাদের সময়ে। ওদেশে যেমন শেক্সপীয়র আস্ত আস্ত কমেডি লিখে গেছেন। মলিয়ের- হাসির চোটে পৃথিবী কাঁপিয়ে দিয়েছেন। আমাদের দেশে সেসব নেই। গোমড়োমুখো ফিউডাল, সেমি কলোনিয়াল। হাসিটাসি ওসব নেই। অ্যাডভান্স ক্যাপিটালিজম ছাড়া- অ্যাডভান্স ক্যাপিটালিজম ভুল বলেছি- ক্যাপিটালিজম যখন কলাপস করতে থাকে তখন কমেডি এ্যাক্ট হয়। যেটা বলেছেন কার্ল মার্কস- একটা সমাজব্যবস্থা যখন পড়ে যেতে থাকে, পতনোন্মুখ- যখন সব টুকরো টুকরো হচ্ছে, তখন গ্রেটেস্ট কমেডির আবির্ভাব হয়। রোমান সা¤্রাজ্য তেমনি লুকিয়ানদের আবির্ভাব সম্পর্কে এবং ফিউডালিজমের পতনের সময় তেমনি সেরভান্তেসের ডন কিহোতরে মতো। তেমনি আমাদের ধারনা ক্যাপিটালিজমের পতনের সময় চ্যাপলিন এগিয়ে আসছে। লুকিয়ান, সেরভান্তেস, চ্যাপলিন- এরা একই। এখানে তো শালা ক্যাপিটালিজমই প্রতিষ্ঠিত হলো না ঠিক করে। তারপর সে শালা কবে পড়বে, তারপর হবে কমেডি- এরকম অবস্থায় পড়ে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। তার মানে সমাজব্যবস্থার সঙ্গে কমেডির প্রশ্ন সম্পৃক্ত। একে আলাদা করে বিচার করা যায় না।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
আরেকটা প্রশ্ন- অভিনয় শিক্ষার বইপত্র- দুটি-তিনটি বইয়ের কথা আমরা জানতে পারছি। আপনি নিশ্চয়ই আরও অনেক বইয়ের কথা বলতে পারবেন। একটা হচ্ছে ভূপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘অভিনয় শিক্ষা’ তারপর ফণীভুষণ বিদ্যাবিনোদের ‘অভিনয় শিক্ষা’। আর সাম্প্রতিককালে একটা বই বেরিয়েছে নামটা পরে মনে করে বলছি। এ ছাড়া অভিনয় শিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীরা আর কী কী বই পড়তে পারেন?

উৎপল দত্ত
আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা বই পড়ে শিখতে পারে এমন কোন বই নেই। লেখা হয় নি- পৃথিবীর কোথাও লেখা হয় নি। ওদের অভিনয় শিক্ষার জন্য যে সব বই হয়- সেগুলো অ্যাডভান্স অভিনেতাদের জন্য। ওদের অ্যাডভান্সড অভিনেতার অভিনয়কে আরও ইম্প্রুভ করার জন্য। তিনি শুধু ভালো অভিনেতা হবেন না- গ্রেট এ্যাকটর হবেন। এই সীমারেখাটা অতিক্রম করার জন্য ওদেশের শ্রেষ্ঠ পরিচালকরা বই লিখছেন। আমাদের দেশে তা নেই। তা ছাড়া অভিনয় শিক্ষা আমাদের হয়তো বই থেকে হবেও না। আমাদের দেশে যা স্বাভাবিক স্টাইল তাই থেকেই করতে হবে। যা ঐতিহ্য- সেটা হলো পরিচালকের কাছে শিক্ষা। ইউরোপেও এটা মোটামুটি তাই। অভিনেতা মূলত অভিনয় শুরু করার আগেই দৈহিক তৎপরতা বাড়াবার একসারসাইজ করতে হবে। সাঁতার কাটা, তলোয়ার চালনা, নৃত্য, যোগব্যায়াম ইত্যাদি হচ্ছে প্রাথমিক। তারপর পুরো কণ্ঠনালীর ব্যবহার করার চেষ্টা, কণ্ঠনালী যাতে পুরোটা ব্যবহৃত হয়- যাতে মুখ দিয়ে কথা বার না হয়। পুরো ডায়াফ্রামকে কীভাবে কণ্ঠের পেছনে আনতে হবে- এগুলো প্রাকটিস করা। এর পরে তো অভিনয় শুরু। যেই অভিনয়ের ক্ষেত্র এলো- অমনি পরিচালকের হাতে ছেড়ে দিতে হবে। পরিচালকের উপর সব নির্ভর করছে। তিনি কতটা শেখাতে পারবেন- আর অভিনেতা কতটা তুলে নিতে পারবে।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
আমাদের দেশে যারা বড় অভিনেতা তাদের সম্বন্ধে আমরা নানারকম গল্প শুনি। তাদের অভিনয় কেন বড়? কেন তারা গ্রেট এ্যাকটর হয়েছেন? একজন সম্বন্ধে আমি প্রশ্ন করবো। আমরা তো তাঁর অভিনয় দেখি নি। আপনারা নিশ্চয়ই দেখেছেন এবং একাধিকবার দেখেছেন- শিশিরকুমার ভাদুড়ি। তাঁর অভিনয়ের বৈশিষ্ট্যগুলি কী কী? এই নিয়ে আমরা খুব লেখাপত্রও পড়ি নি।

উৎপল দত্ত
তা ঠিক। যেমন শিশিরবাবুরা লেখেন নি গিরিশবাবুদের সম্পর্কে। শিশিরবাবুরা মস্ত অবহেলার পরিচয় দিয়েছেন। ভাদুড়ি মশায়েরই উচিত ছিল, কারণ তিনি ছিলেন উচ্চশিক্ষিত। এবং তিনি গিরিশবাবুর অভিনয় দেখেছেন। দানীবাবুর সঙ্গে অভিনয় করেছেন এক স্টেজে। তার এসব বিস্তৃত লিখে যাওয়া উচিত ছিল। যেমন- গিরিশবাবু লিখে গেছেন তাঁর সময়কার সমস্ত অভিনেতা সম্পর্কে- অভিনেত্রী সম্পর্কে, মিউজিক ডিরেক্টর সম্পর্কে, ড্যান্স ডিরেক্টর সম্পর্কে। কখনও কলম থামান নি। তাঁর সমসাময়িক অভিনেতাদের পরিচয় আমরা তাঁর লেখাতেই পাই- অর্ধেন্দুশেখর কত বড় অভিনেতা ছিলেন তাই তার পক্ষে অভিনয় অ্যানালাইজ করা সম্ভব ছিল- বিশ্লেষণ। কিন্তু শিশিরবাবুরা তাঁদের পূর্বসূরীদের সম্পর্কে এই কর্তব্য পালন করেন নি। আমাদের উচিত- শিশিরবাবুদের সম্পর্কে লেখা। আমি চেষ্টাও করেছি। এই কথাটাই আমি বলেছি যেটা এখন বলছি- সেটা হচ্ছে যে ভাদুড়ি মশায়ের অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল- তিনি লিখতে পারতেন। একটা সময় যখন সব অভিনেতা হাঁকডাকে রঙ্গমঞ্চ কাঁপায়, সেই সময় শিশির ভাদুড়ি অভিনয় করতেন সম্পূর্ণ অবজেকটিভ দৃষ্টি দিয়ে এবং তাঁর চোখ হয়েছে তাঁর বইয়ে। উনি যেন নিজেকে দেখছেন এবং একটা আশ্চর্য বিশাল ছড়িয়ে থাকতো সমস্ত অভিনয় জুড়ে- তাঁর বলার ভঙ্গিতে। তাঁর চলাফেরার ভঙ্গিতে। এই মেলানকলি-এটাই ছিল তাঁর অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি। দর্শককে আচ্ছন্ন করে ফেলতো। কিছুক্ষণের মধ্যে ভদ্রলোক আমাদেরকে একটা গভীর বিষাদের মধ্যে এনে দাঁড় করিয়ে দিত। এবং যেকোনো নাটকে, এমনকি তাঁর ‘সধবার একদশী’-তে যখন তিনি নিমচাঁদ করছেন- নিমচাঁদের কথায় হাসতে সাহস পেতাম না। কারণ, বুঝতে পারছি যে লোকটা কী যন্ত্রণায় ভুগছে। কী অসম্ভব যন্ত্রণা, ভেতরে। আর বাইরে এত নিরুত্তাপ তার প্রকাশভঙ্গী। সে প্রবল ব্যক্তিত্ব, ভাদুড়ি মশায়ের যেটা ছিল- সেটাকে তিনি তাঁর অভিনয়ের পুরোপুরি ব্যবহার করতেন। এটা অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে প্রকাশিত হয় না। তার বেশিরভাগই থাকে সুপ্ত, লুপ্ত। সে নিজেকে পুরো প্রকাশ করতে পারে না চরিত্রের মধ্যে। নিজের যা ক্ষমতা আছে সেটাই সম্পূর্ণ প্রকাশিত হবে- এটাই করতে পারে না। এখন ভাদুড়ি মশায় ছিলেন টেকনিকের রাজা। অভিনেতার টেকনিক, অভিনেতার কৌশল- এই অভিনয়ের কৌশলের তিনি ছিলেন মাস্টার। সুতারাং তার ব্যক্তিত্বটা পুরোপুরি মেলে ধরা। সম্পূর্ণ আস্তমানুষ হিসেবে, জীবন্ত মানুষ হিসেবে স্টেজের ওপর উপস্থিত করে গেছেন- সেটা টেকনিক ব্যতীত হতে পারে না। হাইলি পারফেক্টেড টেকনিক। বহু বৎসরের অভিজ্ঞতার পরে তিনি এইটা শিখে নিতে পেরেছিলেন। এবং  অভিনয় তো একটা প্রক্রিয়া। প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে অভিনয় গড়ে ওঠে- গজিয়ে ওঠে। সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে প্রধান হচ্ছে, গ্যেটের মতে, দর্শক। যে বহু রকমের দর্শককে ফেস করেছে, সেই আস্তে আস্তে টেকনিকের মাস্টার হতে পারে। সে-ই পারে সামান্যতম আঙুল নেড়ে, সামান্যতম মুখের এক্সপ্রেসনে- একটা যন্ত্রণা, একটা অন্য মানুষের অন্তর্জীবনকে প্রকাশ করতে। আমরা যখন নিমচাঁদের সামনাসামনি বসে আছি- আমরা তো আর নিমচাঁদের ভেতরটা জানি না। আমরা শুনবো শুধু সংলাপ- দীনবন্ধু মিত্রের অসাধারণ সংলাপ। কিন্তু তার পেছনে একটা মানুষ কাজ করছে- তার চিন্তা রয়েছে। তার যন্ত্রণা আছে, হৃদয়াবেগ আছে, তার ব্যর্থতা, তার ক্ষোভ-শোক-এই সমেত মানুষটাকে বার করে আনতে হবে। এটা সে যুগ থেকে এ পর্যন্ত কোনো অভিনেতা পারে নি ভাদুড়ি মশায়ের মতো। এটা কোনো ঈশ্বরদত্ত ব্যাপার নয়- যেটা বারবার বলার চেষ্টা করছি- সেটা হচ্ছে মাস্টার অব টেকনিক।... কিন্তু দর্শকরা থিয়েটারের টেকনিকে সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত হচ্ছে। এটাই তো অভিনেতার কাজ। আমার টেকনিককে আমি এমনভাবে প্রয়োগ করবো যে দর্শক মনে করবে টেকনিক নেই। শিশির ভাদুড়ি সেটার পাস্ট মাস্টার

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
ভাদুড়ী মশায় আর একজন অভিনেতা সম্পর্কে বলেছেন। তার থিয়েটারের অভিনয় কিছুই দেখি নি। সিনেমায় কিছুটা দেখেছি। তিনি নাকি খুব বড় অভিনেতা ছিলেন। আপনি নিশ্চয়ই দেখেছেন- নরেশ মিত্র।

উৎপল দত্ত
ওরে বাব্বা। দি গ্রেটেস্ট।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
কিন্তু ওনার গলা অর্থাৎ ভয়েস তো ছিল ন্যাসাল।

উৎপল দত্ত
হি ওয়াজ দি গ্রেটেস্ট এ্যাকটর অব অল টাইম। ভাদুড়ি মশায়ও তাঁর কাছে দাঁড়াতে পারেন না।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
এই কথাটাই উনি বলেছেন। আমি ওর সাথে অভিনয় করতে ভয় পাই।

উৎপল দত্ত
নরেশ মিত্রের পাশে দাঁড়াতে পারেন এমন অভিনেতা ছিলেন না। ভাদুড়ী মশাইও না- অন্য অভিনেতা তো নয়ই। আশ্চর্য অভিনেতা এবং তার পুরো অভিনয় টেকনিকটাই গড়ে উঠেছিল- ইন ট্রাইং টু ফাইট এগেইনস্ট হিজ ওন উইকনেসেস। তাঁর গলা নেই, তাঁর হাইট নেই, তাঁর কিছুই নেই। এইগুলোর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে করতে তিনি একটা দাঁড় করিয়েছিলেন টেকনিক- যেটা অসাধারণ।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
সেকালের অভিনেত্রীদের সম্পর্কে আমরা অতটা জানতে পারি না। যেমন অভিনেতাদের সম্পর্কে অনেক আলোচনা হয়েছে- অভিনেত্রীদের সম্পর্কে আলোচনা তুলনামূলকভাবে কম।

উৎপল দত্ত
প্রভা দেবী-  পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীদের মধ্যে একজন, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ। শরৎবাবুর ‘নিষ্কৃতি’- রঙমহলে, তাতে বড় বউয়ের পার্ট করেছেন- প্র্যাকটিক্যালি পুরো অভিনয়টা একটা ইজিচেয়ারে বসে। সে যে কী আশ্চর্য ক্ষমতা- পুরো হাউজ কাঁদছে। আর বসে বসে বুড়ি বলে যাচ্ছে ডায়ালগ। মলিনা দেবী- শরৎবাবুর ‘বৈকুন্ঠের উইল’-এ- উফ্।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
এটা কি আপনার মনে হয় না যে এদের সম্পর্কে আলোচনা তুলনামূলকভাবে অনেক কম হয়েছে?

উৎপল দত্ত
অনেক কম।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
আপনি বলেছেন ‘কেন্ডেলের দলে মনটাকে প্রসারিত ও শিক্ষিত করতে শিখেছি- এটা বোধহয় থিয়েটারের খুঁটিনাটির চেয়েও বড় শিক্ষা।’ মানে, অভিনেতার মনটাকে প্রসারিত করার যে শিক্ষা- এই ব্যাপারে পরিচালকের অভিজ্ঞতা থেকে আপনি যা পেয়েছেন, সেটা আপনার থিয়েটারে কীভাবে প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছেন।

উৎপল দত্ত
প্রথমে হচ্ছে পড়াশোনা। পরিচালক দলকে উদ্বুদ্ধ করেন পড়াশোনায় এবং গাইড করেন। অনেক সময় পরিচালকদের নিজেদেরই পড়ার ব্যাপারে অনীহা থাকে। পড়াশোনা করা নেই, পড়েন না। তারা তাদের দলের ছেলেমেয়েদের কী করে উদ্বুদ্ধ করবেন পড়াশোনায়? ব্যাপক পড়াশোনা ব্যতীত একটা অভিনেতা তৈরি হতে পারে না। কেননা মানব চরিত্রের নানা জটিল বাঁক- তার সম্পর্কে খানিকটা জ্ঞান থাকলে তবে তো অভিনেতা হবে। আর এই মানব- চরিত্র একটা বিচিত্র ও জটিল জিনিস সেটা যাতে হৃদয়ঙ্গম হয়, ভালো বক্তা তৈরি হয়- এই অর্থেই বলতে চেয়েছিলাম যে মনটাকে প্রসারিত করতে হবে। পরিচালক সেটা করতে পারেন, তার দলের ছেলেমেয়েদের নিয়ে। তাছাড়া আমি বিশ্বাস করি যে, মার্কসবাদ-লেলিনবাদ অধ্যয়ন ছাড়া কেউ অভিনেতা হতে পারে না আজাকালকার দিনে। ব্রেখট সেই কথাটাই বলেছিলেন। কেননা জীবন আজকাল যেরকম জটিল- আগে শ্রেণীভিত্তিক বিশ্লেষণ না করলে কোনো চরিত্রই অভিনয় করা যাবে না- সমাজকেও বোঝা যাবে না। আর এই বিশ্লেষণ করাই যাবে না। যদি আমরা মার্কসবাদ-লেলিনবাদ অধ্যয়ন না করি। সুতরাং আমাদের দলে মার্কসবাদ-লেলিনবাদের অধ্যয়ন নিয়মিত করা হয়ে থাকে। ক্লাশ হয় নিয়মিত। তারা চেষ্টা করে এসব মতবাদ বুঝতে। এর ভিত্তিতে চরিত্রগুলো বিশ্লেষণ করতে, সমাজকে বিশ্লেষণ করতে। একটা নাটকে সমাজকে যেভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে- সে নাটকে অভিনয় করার আগে সেই নাটককে সমালোচনা করতে হবে। সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করবেন অভিনেতা। তারপরে সেই নাটকে অভিনয় করা সম্ভব। নাট্যকার যা বলেছেন তাই নতমস্তকে মেনে নেয়া অভিনেতার কাজ নয়তো। আগে নাটকটার সমালোচনা করতে হবে। এবং সেই সমালোচনা যদি মার্কসবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে না হয়, তাহলে ভালো সমালোচনা আশাই করা যায় না আজকালকার দিনে। শেক্সপীয়রকে আর কোন দৃষ্টিভঙ্গী থেকে সমালোচনা করা যেতে পারে আজকের দিনে, মার্কসবাদী দৃষ্টিকোণ ছাড়া? শেক্সপীয়র সম্পর্কে শত শত বই লেখা হয়েছে- সহস্র সহস্র বই লেখা হয়েছে। তাতে চর্বিতচর্বন ব্যতীত আর কিছুই পাওয়া যাবে না। কিন্তু একজন মার্কসবাদী পণ্ডিত যখন শেক্সপীয়রকে আলোচনা করেন তখন তার ভেতরে নতুন চিন্তার স্ফূরণ দেখতে পাওয়া যায়। সম্পূর্ণ নতুনভাবে শেক্সপীয়রকে বুঝতে পারে মানুষ।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
পরিচালকের সামনে আর একটা প্রশ্ন আসে- নাটক নির্বাচন। এই নির্বাচনের ব্যাপারে পরিচালকের ভূমিকা কী এবং সমগ্র দলের ভূমিক কী থাকে?

উৎপল দত্ত
আইডিয়ালি এটা হওয়া উচিত- সমাজতান্ত্রিক দেশে যা নিয়ত তা হচ্ছে বেস্ট। সেটা হচ্ছে প্রত্যেক থিয়েটারে দলের সঙ্গে অ্যাটাচড থাকে একজন লোক, যার নাম হলো- ড্রামাটুর। সে পরিচালক না। তার কাজ হচ্ছে সারা জীবন শুধু নাটক পড়া। দু-তিনজন থাকে এক একটা দলের। এবং যে নাটকগুলোকে ওরা মনে করবেন যে অভিনয় করা দরকার, সম্ভব, সেগুলোকে জড়ো করে নিয়ে আসবেন এবং এনে পড়াবেন দলে। প্রথমে পরিচালককে পড়তে দেবেন। তাঁর মধ্যে পরিচালকের যেটা পছন্দ হবে সেইটে দলের সামনে পড়া হবে। তারপর দলেরও মতামত নেয়া হবে, যে এটা হবে কি না। যদি মেজরিটি বলে করা হবে, তবেই সে নাটক সিলেক্টেড হয়। ড্রামাটুরের পোস্ট আমাদের দেশে নেই। আমাদের দেশে পরিচালকই সেই কাজটা করে থাকে। তিনি নাটক পড়েন। তিনিই নাটক সিলেক্ট করে এনে দলের সামনে পড়েন এবং দলের সম্মতি পেলে তবেই নাটক শুরু হয়। কিন্তু ড্রামাটুরের কাজ হলো নতুন যে সব প্রকাশিত হচ্ছে, পুরনো যে সব ক্লাসিকস আছে- সব কিছু পড়তে থাকা অনবরত। আর তার মধ্যে থেকে বেছে বেছে নিয়ে রাখা, নিজের দলের জন্য।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
নির্বাচনের পর পরিচালকের সামনে আর একটা সমস্যা- অভিনেতা-অভিনেত্রী নির্বাচন।

উৎপল দত্ত
কাস্টিং। সে তো পরিচালক একচ্ছত্র অধিপতি। ডিক্টেটর। যাকে যা বলবে সে তাই করবে। এবং তখন দেখবে প্রথমত চেহারা। কাকে কোনটা মানায়। তারপর অভিনয়ের ক্ষমতা। কার ক্ষমতার মধ্যে কোনটা আছে। কণ্ঠস্বর, দৈর্ঘ্য ইত্যাদি সব দেখার পর সে কাস্টিং করবে। এক লাইনের পার্টও ভীষণ ইম্পোর্টেন্ট। যার কোনো কথা নেই, একবার স্টেজের ওপরে হেঁটে যাবে- সেটাও ভীষণ ইম্পোর্টেন্ট। সেটাও ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। দেয়ার ইজ নো সাচ থিং এ্যাজ এ স্মল এ্যাক্টর- স্তানিস্লাভস্কি বলেছিলেন। ছোট পার্ট বলে কিছু নেই, ছোট অভিনেতা আছে। তাদের মন ছোট, সংকীর্ণ। পার্ট কখনোই ছোট নয়। তো এভাবেই কাস্টিং হয়- তারপর আরম্ভ হয় মহড়া।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
ধরুন কাস্টিং করার পর, মহড়া চলতে চলতে মনে হতে পারে কাস্টিং বদলানো দরকার। চেঞ্জ করতে হতে পারে।

উৎপল দত্ত
হু, হু। অনেক চেঞ্জ করে দেয়া হয়। ট্রায়ালে চেঞ্জ করে দেখা হয়- তুমি এটা কর তুমি ওটা করে দেখো তো। ইত্যাদি।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
মহড়া চলাকালীন নানারকম সমস্যা দেখা দেয়। এখানে অবশ্য আপনি চিরকালই স্ট্রিক্ট প্রিন্সিপ্যাল চালিয়েছেন। কিন্তু সাধারণত অনেক গ্রুপ থিয়েটারে দেখেছি একাধিক সমস্যা দেখা দেয়। এ সমস্যাগুলো পরিচালক কীভাবে মোকাবিলা করেন?

উৎপল দত্ত
আসলে তো দেখেছি- ডিসিপ্লিনের ভিত্তি হচ্ছে স্যাকরিফাইজ। নিজে ত্যাগ না করলে অন্যকে ডিসিপ্লিনড করা যায় না। অভিনেতারা যদি সবাই দেখেন যে পরিচালকই কিছু কিছু ছাড়ছে, ত্যাগ করছে, তাহলে তারপরেই তার আদেশ সবাই শোনে। আর সবাই যদি দেখেন যে পরিচালক নিজের বেলায় খুব রিলাক্সড- সে শ্যুটিং করে খুব আর অন্যকে চেপে ধরে- নিজে রিহার্সেলে আসে না, শ্যুটিং-এ চলে যান, তাহলে অন্যরা তাকে আর মানে না। কিন্তু পরিচালক নিজে যদি ছবি ছেড়ে দিয়ে, শুটিং ছেড়ে দিয়ে- মানে যখন মহড়া চলবে সে সময়গুলোতে- শ্যুটিং ছেড়ে দেন- তখন তার কথার গুরুত্ব ভীষণ বেশি হয়। আমার ধারণা এ ছাড়া পরিচালকের কর্তৃত্ব কায়েম করবার আর কোনো উপায় নেই। প্রথমত, প্রত্যেক অভিনেতারই এটা বিশ্বস থাকা দরকার যে এ লোকটা আমার চেয়ে বেশি জানে থিয়েটারে। এটাই তো হয়- প্রয়োজন। কেউ যদি থিয়েটার সম্পর্কে কিছু বলে তে সেটা মানা দারকার। এটা থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, শৃঙ্খলার ভিত্তি হচ্ছে ত্যাগ। ত্যাগের দু’একটা উদাহরণ সামনে স্থাপন না করলে অন্যদের ত্যাগে উদ্বুদ্ধ করা সম্ভব নয়। ডিসিপ্লিন মানেই তো ত্যাগ। কিছু কিছু তো ছাড়তে হবে সবাইকে। আপিসে ওভারটাইম করলে পয়সা পাওয়া যায়। সুতরাং রিহার্সেলে না এসে ওভারটাইম করবে, এটাই তো স্বাভাবিক। পেটি-বুর্জোয়া নাট্য আন্দোলোনের প্রধান সমস্যা হচ্ছে আমাশা। পেট খারাপ। কোথায় কী খায় না খায় আমি জানি না। পেট খারাপ- সব দলেই। শুয়ে পড়ে, দুদিন তিনদিন এবসেন্ট। রিহার্সেলে কিছু নিয়ম মানা দরকার- অন্য কোন বই পড়া বারণ, খবরের কাগজ পড়া বারণ, ধূমপান বন্ধ। অখ- মনোযোগে রিহার্সেল দেখাতে হবে। পার্ট থাকুক বা না থাকুক। এবং দীর্ঘ রিহার্সেল দেয়া। অনেক দলেই আমি দেখেছি বা শুনেছি- রিহার্সেলটা তাড়াতাড়ি শেষ করে দেয়ার ঝোঁক থাকে। বেশ ছড়িয়ে গুছিয়ে অনেক্ষণ ধরে রিহার্সেল দেয়ার ঝোঁকটা নেই। সকাল থেকে আরম্ভ করে সন্ধ্যে পর্যন্ত রিহার্সেল- এটা খুব কম দলেই হয়। সেখানে ছেলেমেয়েদের আগ্রহটা কমে যায়। তেমনভাবে দেখতে গেলে সিরিয়াস নয়। পরিচালক সিরিয়াস না হলে কেউই সিরিয়াস নয়। পার্ট মুখস্ত করা- ডিরেক্টরের সবচেয়ে আগে করতে হবে- যদি তিনি কোনো পার্ট করেন। ইত্যাদি  ইত্যাদি।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
এই পর্বটা যাওয়ার পর স্টেজ রিহার্সেল হচ্ছে। আপনি কি একাধিক স্টেজ রিহার্সেল করেন?

উৎপল দত্ত
হ্যাঁ, নিশ্চয়ই, আশা করি সবাই করেন। আমাদের ড্রেস রিহার্সেল শুরু হয়ে যায় প্রথম থেকেই। আমাদের প্রথমে দুটো-তিনটে রিহার্সেলের পরই ড্রেস রিহার্সেল। সব রিহার্সেলই ড্রেস রিহার্সেল। কেননা যে পোশাক পরে অভিনেতা- অভিনেত্রীরা বাড়ি থেকে আসছে সে পোশাক পরে রিহার্সেল দেয়া উচিত নয়। যে রকম পোশাক পরে অভিনয়টা করবে সে রকমই পোশাক পরে রিহার্সেল দেয়া উচিত- কনস্ট্যান্ট। ধর, হেভি বুট পরে অভিনয় হবে, তাহলে সেই হেভি বুট গোড়া থেকেই পরে নেয়া উচিত। অকারণে সেটা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ফেলে রাখা ঠিক না।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
তখন তো আলো বা মিউজিক পাচ্ছেন না।

উৎপল দত্ত
আলো বা মিউজিক চলে আসে- ধর, প্রথম দশটা রিহার্সেলের পরই।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
এখন ধরুন, আপনি যে সুযোগটা পাচ্ছেন- ছোট ছোট অনেক দলই সে সুযোগটা পায় না। তারা ধরুন স্টেজটা সাতদিন নিতেই পারছে না। এক দুদিনের বেশি স্টেজ রিহার্সেল দিতে পারছে না। ফলে তাদের অসুবিধে ভোগ করতে হয়।

উৎপল দত্ত
ড্রেস রিহার্সেল বা স্টেজ রিহার্সেল যে স্টেজই দিতে হবে তার কোন মানে নেই। অনেক জায়গাতেই দেয়া যায়। স্টেজটা যত বড় তত বড় মাপের একটা জায়গা হওয়া চাই- দ্যাটস অল। আমরা তো ছেঁড়াতার বলে একটা জায়গা আছে সেইখানে করি। সেটার যে স্টেজ সেটা আমাদের পক্ষে বেশি ছোট। আমরা সেটা ব্যবহার করি না। ওর যে স্লোপটা, সেইখানে করি।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
আলো? সেখানে আলোর ব্যবস্থা আছে?

উৎপল দত্ত
হ্যাঁ, যখন আলোর প্রয়োজন হয়, সমর নাগ সেইখানে গিয়ে আলো করে। আসল কথা হচ্ছে নিজেদের সিরিয়াসনেস। এটাকে একটা শিল্প বলে মানলে এবং আমি কতখানি সিরিয়াস তার ওপরে নির্ভর করবে এগুলো গোড়া থেকে আয়োজন করতে পারি কি না? সে ছোট বড় দলের কোনো ব্যাপারই নেই। কেনই বা এরা ছোট থাকে তাও তো বুঝি না। ছোট কী আবার? এরা কি সারাজীবন শিশুই থাকবে। বাড়েন না কেন? বড় হন না কেন? অনেক দল আছে, বলে- আমরা ছোট দল। কেন, ছোট দল কেন? পি.এল.টির. বয়স কত? পি.এল.টি তো তৈরি হলো। উনসত্তর সালে।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
তাহলেও পি.এল.টি যখন তৈরি হয়েছে তার আগে পি.এল.টির অনেকেরই মধ্যে লিটল থিয়েটারের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ছিল তো-

উৎপল দত্ত
তা ছিল হয়তো। কিন্ত এল.টি.জি থাকাকালীন আমি শুনেছি- এল.টি.জির অনেক আগেই তৈরি এমন দলও নিজেদের বলে ছোট আর এল.টি.জি বড়। আসলে বড় হচ্ছে না ওরা মানসিক দিক থেকে ছোট হয়ে গেছে। ওরা খোকা। এই খোকামি আর যাবে না ওদের। আমরা ছোট দল, এটা না বলে এই ছোটমিটা কাটিয়ে বড় হন। বড় হওয়ার প্রথম লক্ষণ হচ্ছে নাটক সম্পর্কে একটা অ্যাডাল্ট, একটা প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের দৃষ্টিভঙ্গী অর্জন করা। এই অ্যামেচারের দৃষ্টিটা নিয়ে বহুদিন কাটানো হয়েছে। সমস্ত ব্যাপারটাই অ্যামেচার। থিয়েটারটা হলেও হয় আসল তো আমার কাজ হচ্ছে অফিসে। এই সন্ধ্যেবেলায় একটু সবাই আসি তার জন্য আর কতটা কষ্ট করা যায়। এই রকম এটা ভঙ্গী, এরকম একটা মনোভাব রয়ে গেছে।... টাকা নেই- আরে টাকা তো কারুরই নেই। আমার জন্য বড় বড় স্পন্সর এসে দাঁড়াবে নাকি? লক্ষ লক্ষ টাকা দেবে? তা তো হবে না। এর ভেতরেই থাকতে হবে। এর ভেতরেই হয়ে চলেছে। সব দলই এর ভেতরে কাজ করে যাচ্ছে। এই ছোট দলদের মুশকিল হচ্ছে- আমি ভেবে দেখেছি- এমনটা ঘটেনি ওদের জীবনে। তাই ছোট দলই থেকে গেছে। এমন ছোট না থেকে বরং থিয়েটার ছেড়ে দিলেই হয়।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
নাটক মঞ্চস্থ করবার সময় গ্রীনরুমে কী ধরনের ডিসিপ্লিন থাকা উচিত?

উৎপল দত্ত
নিথর নিস্তব্ধতা- একেবারে নিথর নিস্তব্ধতা। একটা আওয়াজ কোথাও হবে না। একটা কথাও কেউ বলবে না। একান্ত প্রয়োজনে নাটক সংক্রান্ত কোনো কথা থাকলে ফিসফিস করে বলতে হবে। সেটা হবে সাজঘরে। ব্যাকস্টেজে, উইংসের পেছনে কোনো কথা নেই। কোনো কথা বলার কোনো প্রয়োজন নেই।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
এক্ষেত্রে প্রপারটিজ যা থাকবে সেগুলো যথাস্থানে থাকবে, সেটা অভিনেতা-অভিনেত্রীরা এবং পরিচালক দু’তরফেই দেখে নেবে, সেগুলো ঠিক-ঠাক জায়গায় আছে কি না।

উৎপল দত্ত
এবং সেগুলো নীরবে নিয়ে ঢুকবে এ্যাকটর এবং বেরিয়ে আবার যথাস্থানে রেখে দেবে।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
এটা আমরা প্রায়ই দেখি- বাইরে আওয়াজ হচ্ছে, এ হচ্ছে, সে হচ্ছে, ভীষণ রকমের ক্যাওয়াজ হয়। বিশেষ করে ছোট ছোট গ্রুপের থিয়েটার দেখতে গেলে প্রায়ই হয়।

উৎপল দত্ত
তা না হলে আর ছোট কেন? আইডিয়াল ব্যাকস্টেজ হচ্ছে এখন ইয়েতে, একাডেমিতে। ‘চৈতালী রাতের স্বপ্ন’- বিশাল প্রোডাকশন। বিশাল। তাতে যদি সামান্যতম ইনডিসিপ্লিন হয় তাহলে, মানে লঙ্কাকা- হয়ে যাবে ব্যাকস্টেজে। অসাধারণ ডিসিপ্লিনের পরিচয় দিচ্ছে ছেলেমেয়েরা।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
যদিও আপনি আগে বলেছেন, তবুও এক দুই তিন করে বললে ভালো হয়। কণ্ঠস্বর তৈরি করার ব্যাপারে অভিনেতারা কী কী উপায় গ্রহণ করতে পারে, যার ফলে একটা ডেফিনিট ডেভলেপমেন্ট হয়?

উৎপল দত্ত
এটা বলা যায় না। এটা আমাদের রিহার্সেল কীভাবে হয় সেটা দেখলে পরে পরিষ্কার হবে। পর্দা, গলার পর্দা ওপরে তোলবার, ওপরের পর্দায় গলাটা পৌঁছে দেবার তরিকা। গলার ভল্যুম বাড়াবার সঙ্গে সঙ্গে গলাটার সুরটা চড়তে থাকবে। অনেকে আছে গলাটাকে নিচে রেখেই চেঁচাবার চেষ্টা করে। এই গলা ড্যামেজড হয় এবং আর গলা বাড়ে না। বেশিরভাগ দলে, এই রকমটা করতে গিয়ে গলা ভেঙ্গে যাচ্ছে। কিন্তু গলা যখন আমি তুলবো তখন অটোমেটিক্যালি যদি সুরও ওপরের দিকে উঠতে থাকে, তাহলে গলা একদম নিটোল থাকবে এবং গলার রেঞ্জ ক্রমশ বাড়তে থাকবে। এবং এখন দেখতে হবে একজন অভিনেতা কতখানি তুলতে পারছেন। প্রাকটিস করে করে আরও তুলতে হবে। তারপর আরও সুরটা তুলতে হবে- তারপর আরো আরো তুলতে হবে।  এইভাবে আস্তে আস্তে একদম তিনটে অকটেভ ছাড়িয়ে যাবে। মানুষের গলা পারে তা ইজিলি। ইজিলি না হোক উইথ প্রাকটিস। তিন সপ্তক ওপরে গলা সে পৌঁছে দিতে পারে। মানুষের গলা তা হওয়া উচিত নয়। তার সবটাতেই গলা খেলাতে পারা চাই, যথেচ্ছ। এভাবে শেখানো হয়।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
কণ্ঠস্বরের পাশাপাশি ধরুন শরীর গঠন। ব্যাপারটা আছেই, এক্ষেত্রেও কী কী সাধারণ মেথড আমরা নিতে পারি?

উৎপল দত্ত
এক্সারসাইজ আছে। বিশেষ করে এ্যাকটরদের এক্সারসাইজ। হাঁটা-চলা-ওঠা-বসা-পড়ে যাওয়া, স্টেজে পড়া তো খুব কঠিন জিনিস। একদম না লাগিয়ে, লাগবে না একদম অথচ ধপাস করে পড়া। ঘুষি মারা, ঘুষি খাওয়া। এগুলো সব রিহার্সেলেই আসে। কেননা, সব নাটকেই থাকে, বেশিরভাগ নাটকেই এগুলো থাকবেই তো। চলাফেরা ওঠা-ঢোকা-বেরো এসব তো থাকবেই, তাই না? তো রিহার্সেলে এগুলো শেখে। অনেক অভিনেতা আছে যখন আসেন প্রথম অভিনেতা যখন হন। তাদের ভীমবাহু সঞ্চারণে এবং তারা ঢুকতে বেরোতে চেয়ার টেবিলের সঙ্গে ধাক্ক খান। তারা ন্যাচারালি ব্যাকওয়ার্ড পিপল। কিন্তু কিছুদিন রিহার্সেলে এবং ট্রেনিং-এ থাকার পর ঠিক হয়ে যায়।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
আপনি একটা জায়গায় বলেছেন যে- আমাদের দেশে অনেকেই থিয়েটার করেছেন, থিয়েটার শিখিয়েছেন। কিন্তু অভিনয় শিল্পের তত্ত্ব বাংলাদেশে নেই। এখন, আপনার দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় আপনার কী মনে হয়, আপনি সেরকম কোনো তত্ত্বের কাছাকাছি পৌঁছাতে পেরেছেন?

উৎপল দত্ত
মাথার মধ্যে যে একেবারে পৌঁছুই নি, তা না। মানে থিয়োরিটিক্যালি চিন্তার দিক থেকে হয়তো পৌঁছেছি। কিন্তু সেটা লিপিবদ্ধ করার মতো ক্ষমতা হয় নি। যার জন্যে আবার অন্য স্কিল লাগে। সে স্তানিস্লাভস্কি, ব্রেখটরা করেছেন। লিখতে বসে অনেক সময় দেখা যায় যে আমি যা লিখলাম তাই আমার চিন্তা নয়। আর যা চিন্তা করছি, সেটা প্রকাশ করতে পারছি না। তাই ওভাবে তো হয় না। কারণ, বিষয়টা এতটাই এ্যাবস্ট্রাক্ট  একটা ব্যাপার। কেননা পরিচালক অভিনেতাকে শেখাতে শেখাতে, দেখিয়ে দিতে দিতে একটা জিনিস আয়ত্ত্ব করেন। সে নিজেও তো আর সব আগে থেকে জানে না। সে ডিরেক্ট করতে করতে একটা নাটকের হদিস পায়। চরিত্রের হদিস পায়। সুতরাং জিনিসটা লিখে তো প্রকাশ করতে হয় না সব, মানে খুব প্রভাবশালী পরিচালক না হলে- ব্রেখট-ট্রেখটরা ছাড়া গ্রটস্কি ছাড়া হয় না।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
এ প্রসঙ্গে আপনি আরেক জায়গায় বলেছিলেন যে, অভিনেতার মানস ধরে নাড়া দিতে পারে এমন চিন্তা বাংলাদেশের কেউ করতে পারে নি, এটা যদি একটু খুলে বলেন।

উৎপল দত্ত
মানে এমন একটা নাড়া দেবে অভিনেতাদের যে, অভিনেতারা বসতে পারবে না, শুতে পারবে না, অনবরত চিন্তা করতে বাধ্য হবে, তাদের স্বপ্নচূড়ার থেকে নেমে আসতে হবে, হঠাৎ মনে হবে এতদিন যা করেছি সব বাজে, ভুল, এরকমভাবে কেউ নাড়া দিতে পারে নি- যেমন দিয়েছিলেন স্তানিস্লাভস্কি, ইউরোপিয়ান অভিনেতাদের। কেউ চ্যালেঞ্জ করতে পারে নি। এমন কোনো চ্যালেঞ্জিং তত্ত্ব আসতে পারে নি আমাদের সামনে যে অভিনেতারা উদ্বিগ্ন হন, চঞ্চল হয়ে ওঠেন যে আমাদের আর্ট বাঁচাতে হবে, আমরা ভুল পথে চলেছি।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
আত্মপ্রত্যয় ছাড়া অভিনেতা হওয়া যায় না এবং আমাদের দেশে অভিনেতাদের অধিকাংশই হীনমন্যতায় ভোগে। নিশ্চয়ই সেটা কাটাবার একটা রাস্তা আছে।

উৎপল দত্ত
নিশ্চয়ই।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
একজন পরিচালক হিসেবে আপনি কীভাবে তাকে হেল্প করবেন। তার নিজস্ব চেষ্টা সে-তো আছেই, আর কিছু?

উৎপল দত্ত
এইটা সামগ্রিক মানসিকতার ব্যাপার। এটা পড়াশোনা, নিজেকে চেনা, সবের সঙ্গেই জড়িত। নিজেকে ঘৃণা না করে নিজেকে শ্রদ্ধা করতে শেখা। এটা তো বহুদিনের প্রসেস। নিজেকে নিয়ে গর্ব করুন। এটা একটা ফ্যাক্টর। অবশ্য এটা অহেতুক দম্ভের ব্যাপার নয়। অভিনেতার বাজে দম্ভ যদি উপস্থিত হয় তবে সেটা তার পক্ষে ক্ষতিকর। কিন্তু আত্মপ্রত্যয় অন্য জিনিস। তার বিশ্বাস থাকবে যে- আমি পারি। আমি পারি, বলতে গেলেই যার সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়ে- তাহলে আমি বুঝি, আমি চরিত্র বুঝি, আমি সমাজকে বুঝি, আমি আমার জীবন সম্পর্কে, রাজনীতি সম্পর্কে এসব কিছু সম্পর্কে আমার একটা বক্তব্য আছে। শুধুমাত্র তারই এরকম আত্মপ্রত্যয় থাকে, আজকের দিনে, জটিল জীবনে, তাই, আমি তো সেই অভিনেতাকে বলবো- তুমি পড়াশোনা কর, তুমি মার্কসবাদ-লেলিনবাদ অধ্যয়ন কর। তুমি শেক্সপীয়র পড়, তুমি উপন্যাস পড়। প্রচুর উপন্যাস পড় তুমি। ডিকেন্স পড়। পড়তে পড়তে ও আস্তে আস্তে বুঝবে আমি একেবারে জানি না তা নয়। আমি জীবন সম্পর্কে কিছু কিছু বুঝতে পারছি। আমি জানি-বুঝি। ইমিডিয়েটলি সব বুঝতে না পারলেও চরিত্র, কোনো নাটকের একটা চরিত্র যদি আমি দেখি তাহলে আমি বুঝতে পারি যে এই চরিত্রটা ভালো হয়েছে না খারাপ হয়েছে। এই চরিত্রটা ভালোভাবে ব্যাখ্যা করতে পেরেছেন নাট্যকার, নাকি পারেন নি- এইটুকু আমি বিশ্লেষণ করতে পারছি। যে মুহূর্তে তার এটা জন্মায় সঙ্গে সঙ্গে তার আত্মপ্রত্যয় আসে। এ্যান এ্যাকটর মাস্ট অলসো বি এ ক্রিটিক। ক্রিটিক অব দ্য প্লে-রাইট। এবং এই ক্রিটিসিজমের ক্ষমতা যেই অভিনেতার মধ্যে আসে, অমনি তার আতœপ্রত্যয় জন্মায়। এটাই হচ্ছে আমার অভিজ্ঞতা।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
আপনি স্তানিস্লাভস্কি থেকে ব্রেখট- এ বলেছেন- স্তানিস্লাভস্কি অভিনেতাদের তিনটে ভাগে ভাগ করেছেন- সৃষ্টিশীল অভিনেতা, অনুকরণশীল অভিনেতা এবং উৎকট, তার মানে তিন ধরনের অভিনেতা তো গ্রুপে থাকে। পরিচালকের তো টেষ্টা হবে যাতে সমস্ত লোককেই আমরা সৃষ্টিশীল অভিনেতাতে পরিণত করে তুলতে পারি। এই প্রসেসটা তো বেশ লং প্রসেস। এই প্রসেসটা কীভাবে চালান- যাতে এক একটা স্তর অতিক্রম করা যায়।

উৎপল দত্ত
সে চোখে দেখা যায় না।

পার্থ বন্দোপাধ্যায়
তবুও আপনার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে আপনি নিশ্চই কিছু বলতে পারেন। যার থেকে আন্যরা অল্পস্বল্প বুঝতে পারি। তারপর তো প্রাকটিসের ব্যাপার আছেই।

উৎপল দত্ত
আমার অভিজ্ঞতায়- হঠাৎ প্লেতে একজন অভিনেতা নিজেকে প্রমাণিত করেন। হঠাৎ একটা প্লেতে, একটা পার্টে। তার আগে পর্যন্ত সে একজন জাস্ট বেয়ারলি টলারেবল অভিনয় করতো। সে গলাটলা ঠিক রেখে, ব্যাপার হচ্ছে- ঐ যে বৈজ্ঞানিক প্রণালীতে রিহার্সেলের কথা আমরা বলেছি- সেখানে বাজে এ্যাকটর, খারাপ এ্যাকটর, উৎকট এ্যাকটর নাটকের সর্বনাশ ঘটাতে পারে না। এমনভাবে জিনিসটা বাধা হয় যে সে নাটকের সর্বনাশ ঘটাতে পারে না। সে ডিসটার্ব করে আশপাশের এ্যাকটরদের। কিন্তু দর্শকের চোখে সে এমন কিছু বিপর্যয় ঘটাতে পারে না যে নাটকটার বারটা বেজে যাবে। কিন্তু পরিচালক তো জানে যে এ বাজে এ্যাকটার। কিন্তু তারপরে একটা সময়- একটা কোনো পার্টে হঠাৎ সে নিজেকে বিকশিত করে। প্রত্যেকে- যতজন এখন আমাদের গ্রুপে ভালো অভিনয় করছে, প্রত্যেকের লাইফে এসেছে একটা পার্ট, একটা ফেজ- যেটার পর থেকে সে অভিনয় করছে। যেমন উদাহরণ ধরা যেতে পারে- কনক মৈত্র। সে এলো আমাদের এখানে থিয়েটার ওয়ার্কশপ থেকে। দম নেই, একটা সেন্টেন্স একদমে বলতে পারে না। কী রকম টেইল ড্রপ, একটা সেন্টেন্সের শেষটুকু শোনা যায় না। তারপর ‘ব্যারিকেড’-এ লান্টের পার্ট। তারপর থেকে সে আমাদের অন্যতম বেস্ট এ্যাক্টর। রজত- সে আবৃত্তি করতো, কিন্তু অভিনয়ের অ-ও জানতো না। ‘রামমোহন রায়’ করলো। তার পর থেকে অভিনয় ইমপ্রুভড হয়ে গেছে। রামমোহন রায় চরিত্রে ওকে সিলেক্ট করা হয়েছে চেহারা দেখে। গোঁফটা দিলে একদম রামমোহন রায়। কিন্তু রামমোহন রায়-এর থ্রু দিয়ে ও নিজেকে বিকশিত করলো। এরকম প্রত্যেকে। কোনো না কোনো পার্টে, প্রত্যেকে কখনো না কখনো নিজেকে তুলে ধরেছে ওপরে। রবি ঘোষ- ইয়েতে, অবশ্য ওর প্রথম পারফরমেন্সেই ওর ইয়েটা দেখা গেছিল, স্কিলটা দেখা গেছিল।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
হ্যাঁ, একটা হকারের রোলে।

উৎপল দত্ত
তারপরে ‘অঙ্গারদ-এ এসে এস্টাবলিস করলো নিজেকে। এবং একটা প্লে-ই কোয়াইট এনাফ টু ডেভেলপ দা এ্যাক্টর।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
এক্সপ্রেশনের প্রসঙ্গে আপনি বলেছিলেন যে, দৃষ্টি, মানে অভিনেতার চোখ, যাকে খুব ইম্পর্টেন্ট জিনিস বলা হয়- মানে...

উৎপল দত্ত
এই যে স্তানিস্লাভস্কির স্কুলিং। তাতো বটেই, চোখই তো আসল। চোখ পিটপিটি করলে কোনো রকম এক্সপ্রেশন দাঁড়াবে না, বোঝা যাবে না মনোভাবটা কী এই চরিত্রটার। বর্তমানে লোকটা কী ভাবছে, এই যে স্টেজের ওপর বসে আছে এর মনোভাবটা কী? চোখ পিটপিট করলে তো কিছুই বোঝা যাবে না। দর্শককে জানতে হবে তো যে লোকটার মানসিক ভাবটা এখন এই। তো সেটা, চোখ হচ্ছে একমাত্র পথ যা দিয়ে আমি জানতে পারি। মুশকিল হচ্ছে, চোখ বেশিদূর থেকে দেখা যায় না, অডিটোরিয়ামে। তাই আমার বডি পারে আমাকে হেল্প করতে। কিন্তু বডিটা নড়বেই না, যদি আমার চোখ পিটপিট করতে থাকে। চোখ যদি চঞ্চল হয়ে পড়ে। বডি রেসপন্ড করবে না আমার। আমি যদি চোখকে কন্ট্রোলে আনি, তাহলে দেখবো পুরো বডিটাই আমার কন্ট্রোলে আসছে। বড় পিকিউলিয়ার। চোখকে কন্ট্রোলে আনলে পরে দেখবেন পুরো বডিটা কন্ট্রোলে এসেছে। মায়ারহোল্ডের একটা রচনা আছে- ইউজ অব দ্য আই।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
তা এইসব তো অনুবাদও করা দরকার, বাঙলায়- আমাদের পড়ার জন্য।

উৎপল দত্ত
হ্যাঁ, তা তো দরকার। ইংরেজিতে তো পাওয়া যাচ্ছে না। এক সময়ে সব পাবলিস্ড হয়েছে।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
এবার আপনার নাটক পরিচালনার প্রসঙ্গে আসি। আপনি এ যাবৎ যত নাটক পরিচালনা করেছেন, সেই সিক্সটি ফাইভ থেকে আজ পর্যন্ত, কোন কোন নাটকে আপনার মনে হয়েছে যে আপনি পূর্ণ সাফল্য অর্জন করেছেন বা অন্তত কাছাকাছি যেতে পেরেছেন?

উৎপল দত্ত
কোনোটাই না।[হাসি]

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
তা সত্ত্বেও। কোনো একটাতে মনে হতে পারে, আমি অনেকটা পেরেছি।

উৎপল দত্ত
মানে আপেক্ষিক- ‘মানুষের আধিকার’-এ সাউদার্ন ইউএস-এর যে এ্যাটমোসফেয়ারটা তৈরি করা হয়েছিল, আলাবামা, ভীষণ কঠিন, অসম্ভব কঠিন ব্যাপার। অত কম উপকরণ দিয়ে দক্ষিণের, দক্ষিণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটা আবহাওয়া খানিকটা ধরে দেয়া কলকাতার স্টেজে, দুর্জয় কঠিন ব্যাপার ছিল। সেটা খানিকটা পেরেছিলাম। ওইটেই, যা চেয়েছিলাম, তার কাছাকাছি। তো ,আমি আবার তাতে অভিনয়ও করেছিলাম, সবটা দেখতে পাইনি তো। বাইরে থেকে না দেখলে আবার প্লে বোঝা যায় না। মুশকিল হচ্ছে, আমি তখন বেশিরভাগ প্লে-তেই অভিনয় করতাম। তাই আমি অনেক প্লে-ই দেখতে পাই নি।....আর বলা যেতে পারে বাংলা ‘ওথেলো’। পেশাদার রঙ্গমঞ্চে শেক্সপীয়র, খানিকটা আমরা পেরেছিলাম। এই তো, আর কী!

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
আর কোনো নাটকের নাম করতে পারছেন না?

উৎপল দত্ত
না না। আর কী! [হাসি]

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
‘টিনের তরোয়ার’?

উৎপল দত্ত
অনেক গলদ ছিল। অনেক গণ্ডগোল।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায
আপনি দুটো নাটক বললেন, যেখানে আপনি সাফল্যের কাছাকাছি যেতে পেরেছেন। আপনি আপনার সময়কালীন অন্য কোনো প্রযোজনা দেখেছেন যেখানে পরিচালকের কাজ সফল, সাকসেসফুল মনে হয়েছে?

উৎপল দত্ত
‘রক্তবরবী’। যদিও একটা সমালোচনা আছে। রক্তকরবী একটা ভীষণ নাটক- তার ভয়ঙ্করতাটা কখনো মনে হয় নি। মনে হচ্ছিল বড় কবিত্বময়, মনে হচ্ছিল চৈতালি রাতের স্বপ্ন। তার সেটে, তার আবৃত্তি, ভালো অভিনয়। আসলে গোটা পুঁজিবাদের ভয়াবহ চেহারা, শ্রমিকদের দুমড়ে-মুচড়ে, নিংড়ে দিচ্ছে- সেই ভয়ঙ্কর চেহারাটা যেন ছিল না, নইলে আসাধারণ প্রডাকশন। সবচেয়ে বড় কথা ছিল যেটা, রবীন্দ্রনাথ যে থিয়েটারে কত এফেকটিভ ও পাওয়ারফুল, থিয়েটারের জন্যই রবীন্দ্রনাথের লেখা- থিয়েটার যে রবীন্দ্রনাথ খুব ভালো বুঝতেন- সেটার প্রমাণ। রবীন্দ্রনাথের নাটক থিয়েটারে হয় না, এরকম বলে উড়িয়ে দেয়া হয়েছিল ওঁকে। শম্ভুবাবু রবীন্দ্রনাথের নাটক প্রতিষ্ঠিত করলেন থিয়েটারে। এটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার, বাঙলা থিয়েটারে। আরও আমাদের স্মরণ করা দরকার যে বাঙলা পেশাদার নাট্যশালাতেও রবীন্দ্রনাথ সাকসেসফুলি প্রোডিওসড হয়েছে, বহুদিন থেকে। সেই নৌকাডুবি- গিরিশবাবু একবার করেছিলেন। তার পাণ্ডুলিপি হারিয়ে গেছে- পাওয়া যায় নি। ইত্যকার একাধিক নাটক- শিশিরবাবু তো করেছেনই। রবীন্দ্রনাথ  সাকসেসফুলি বাঙলা পেশাদার নাট্যশালায় মঞ্চস্থ হয়েছে, অথচ রবীন্দ্রনাথকে কিছুতেই থিয়েটোরের সঙ্গে মিশতে দিতে চাইতো না।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
শিশির ভাদুড়ীর যে সব প্রযোজনা দেখেছেন সেখানে পরিচালক হিসেবে- অভিনেতা হিসেবে বলছি না- স্মরণীয় নাটক কোনগুলো?

উৎপল দত্ত
‘ষোড়শী’- প্রচণ্ড পাওয়ারফুল।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
এবার অন্য প্রশ্ন। থিয়েটার থেকে তো যাত্রা পরিচালনা করতে গেলেন। থিয়েটারে আপনি পরিচালনা করেছেন- তাদের সঙ্গে আপনার দীর্ঘদিনের পরিচয় এবং তারা আপনার একটা ট্রেনিং-এর মতো দিয়ে ডেভেলাপ করেছে। যাত্রায়, একদম অন্যধরনের অভিনেতা, পেশাদার অভিনেতা। তাদের সঙ্গে আপনার সেই যোগও নেই। তো সেখানে গিয়ে আপনি কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হলেন এবং সেগুলো কীভাবে মোকাবেলা করলেন?

উৎপল দত্ত
যাত্রার অভিনেতারা এত ভার্সাটাইল- যেহেতু ওরা পেশাদার এবং যেহেতু ওরা জনতার সঙ্গে গভীর বন্ধনে আবদ্ধ, সেহেতু  ওদের, নতুন জিনিস গ্রহণ করতে- ওরা সিদ্ধহস্ত। মানে আমাদের নাট্য আন্দোলনের অভিনেতা-অভিনেত্রীরা যেমন নানারকম পাতিবুর্জোয়া- পিছুটানে চিরদিন ভুগেছে, ওদের তো ওসব কিছু নেই। ওরা ছোটাবেলা থেকেই পেশাদার। আর পেশাদার অভিনেতার একটা অসামান্য গুণ থাকে। অ্যাডাপ্টিবিলিটি। সে অ্যাডাপ্ট করতে না পারলে না খেয়ে মরতে হবে। তাই তাকে প্রতি সিজনে ভালো করতে হয়। এই যে চরম তাগিদ থেকে ওদের যে আগ্রহ, যে প্রচণ্ড প্রতিজ্ঞার মধ্য দিয়ে যায়- তাতে ওদের আমার পালাটালা তুলে নিতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হতো না। বরং আমি তো বলবো, আমিই বরং ‘রাইফেল’ নাটকের শেষটা একটু চাপা অবস্থায় করেছিলাম- রাইফেল তুলে নিয়ে স্লোগান দিয়ে শেষ করতে চাই নি। শেষটা অন্যরকম ছিলো। পঞ্চু সেন এবং যাত্রার অভিনেতারা বললেন- না- না, শেষটায় আরও ইয়ে চাই, স্লোগান চাই। অথচ ওরা কেউই কমিউনিস্ট নন, কেউই বামপন্থী নন। কিন্তু এরা জনতার ভেতরই থাকেন এবং ওরা নাটক কিসে বেশি এফেকটিভ হয় এটা তো বোঝেন। এ নাটকের শেষটা যে ওভাবেই হতে হবে, এটা ওরা সঙ্গে সঙ্গে বুঝে ফেলেছিল। আমি রাইফেল নাটক যেভাবে ছাপা হয়েছে, সেভাবেই শেষ করি। আর তা ছাড়া পঞ্চু সেনের গাইডেন্স ছিল। প্রচুর হেল্প করেছিলেন। একচ্যুয়েলি উনিই তো আমাকে জোর করে নিয়ে গেলেন। ওই বছর আমার কোনো পালাই লেখার কথা ছিল না। সাত দিনে লিখেছিলাম বোধহয়।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
থিয়েটারের সঙ্গে তো ফর্মেরও ডিফারেন্স আছে। আপনি যেভাবে নাটক করেছেন- তার থেকে খোলা মঞ্চ, তিনদিক খোলা বা চারদিক খোলা যাই বলুন, তাছাড়া ধরুন আলোর ব্যবহার সেখনে ভিন্ন, পট তো থাকছেই না, প্লাস সেটসও থাকছে না। সঙ্গীতের ব্যবহারেও ভিন্নতা থাকার কথা- তো সব মিলে, দর্শক একদম অন্য ধরনের- এই ফর্মটাকে আয়ত্ব করতে বা যাত্রা পরিচালনা করতে আপনার কোনো অসুবিধে হয় নি প্রথম দিকে?

উৎপল দত্ত
মনে তো পড়ছে না। কী অসুবিধে হয়েছিল বলে আমার মনে পড়ছে না। ওইতো বলেছি, পঞ্চু সেনের সাহায্য ছিল অপরিহার্য। অত বড় অভিনেতা এবং যাত্রার অত এক্সপেরিয়েন্সড লোক। উনি সাহায্য করেছিলেন। দু-এক জায়গায় বলে-টলে দিয়েছিলেন। যেমন একবার একটা জায়গায় করেছিলেন- একদল পুলিশ বেরোল, তারপর নেক্সট সিনেই আবার ওরা ঢুকেছে। উনি শিখিয়ে দিলেন, যাত্রায় ওরকমভাবে হয় না। যারা বেরিয়ে গেল তার তক্ষুণি আবার ঢুকতে পারে না। ওরা বেরিয়ে যাবার পর কোনো কিছু একটা ঘটবে, তারপরে আবার ঢুকবে। এসব বিষয় শিখলাম- টেকনিক- যাত্রায় কীভাবে সিনের পর সিন সাজাতে হয় শিখলাম। আর এমনিতে বিশেষ কোনো অসুবিধে হয় নি। অসুবিধের কী আছে, একই তো ব্যাপার। শুধু পুরো জিনিসটা ঢের বেশি চড়া দাগের, মোটা দাগের। সেটা আমরা আই.পি.এল-এর শিক্ষা পেয়েছি আগেই। কেননা জানি, আমরা যখন পিপল-এর সামনে যাব তখন আমাদের অনেক জোরে অভিনয় করতে হবে। আমরা তার আগে বাইরে বাইরে অনেক নাটক করেছি। সেখানকার অডিয়েন্স আর কলকাতার অডিয়েন্স যে আকাশ-পাতাল ডিফারেন্ট, এটা আমরা অনেকেই জানি। সেজন্যই তেমন কোনো অসুবিধে হয় নি।

তাছাড়া আমি যাত্রা দেখেছি-টেখেছি এবং স্টাডি করছি সেই একান্ন সাল থেকে। এ যে একেবারে আচমকা গিয়ে পড়লাম তা-ও না। রেগুলার যাত্রা দেখতাম এবং পড়াশোনাও করেছি, বোঝবার চেষ্টা করেছি। এ-ও বুঝতে পেরেছি যে যাত্রা ফর্মটাকে কীভবে ভাঙা হয়েছে এবং এ-ও বুঝেছি ভেঙেছে বলেই বেঁচে গেছে। নইলে যাত্রা এতদিনে উঠে যেত। এবং একটা একজিস্টিং ফর্ম নিয়ে কিছু প-িত রিসার্চ করতেন ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে বসে। ওই, সেই যে যাত্রা নামে একটা জিনিস ছিল। পরিবর্তিত হয়েছে বলেই বেঁচে গেছে সময়ের সঙ্গে মুভ করে।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
এবার আপনার প্রিয় বিষয়- আপনি বহু জায়গায় বলেছেন- পথনাটিকা নিয়ে- সাধারণ নাটকের সঙ্গে পথনাটিকার মেক-আপ থেকে আরম্ভ করে সব কিছুর তো একটা পার্থক্য আছে। পথনাটিকা কী ধরনের বিষয়কে বেছে নিলে, মানে কীভাবে লিখলে সবচেয়ে সাকসেসফুল হতে পারে?

উৎপল দত্ত
পথনাটিকার প্রধান প্রাক শর্ত হচ্ছে একটা তাৎক্ষণিক ইস্যু, যাতে দর্শক এবং অভিনেতা একান্ত হচ্ছে। দর্শক এবং অভিনেতা আগে থেকে রাজনৈতিকভাবে একমত। সে রকম ক্ষেত্রেই মাত্র পথনটিকা অভিনয় করা যেতে পারে। কখনও কখনও আমাদের কমরেডরা ভুল করে। আমাদের নিয়ে যায় এমন জায়গায় যেখানে শক্রপক্ষই প্রধান ফোর্স। ভাবেন, এই পথনাটিকার মাধ্যমে শক্রপক্ষের প্রভাবে যে সমস্ত মানুষ আছে তাদেরকে আমরা জয় করে নিয়ে আসবো আমাদের দিকে। পথনাটিকার সে ক্ষমতা নেই। পথনাটিকার যে ক্ষমতা আছে সেটা হচ্ছে যে, শক্রর বিরুদ্ধে যে ক্রোধ ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে সেই ক্রোধটাকে পুঞ্জীভূত করে এক জায়গায় নিয়ে এসে- আগুন দিতে পারা, সেটাতে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারা। কিন্তু যে আমাদের রাজনীতির লোক নয়, যে বিরোধী রাজনীতির লোক তাকে কনভিন্স করবে- এ ক্ষমতা পথনাটিকার আছে বলে মনে হয় না। তবে হয়তো দোনোমনা করছে এমন কোনো কোনো মানুষকে টেনে এনেছে আমাদের কাছে- তেমন লোক থাকতে পারে। কিছু কিছু চিঠি আমরা পেয়েছিলাম ‘দিন বদলের পালা’র পরে। আসলে তিনি আগে থেকেই দ্যেদুল্যমান ছিলেন। নইলে আসতে পারতেন না। তো পথনাটিকা গোড়ায় ছিল এরকম একটা স্লোগান। ক্রমশ তা পরিণত হয়েছে, রাজনৈতিক আর্গুমেন্টগুলো আমরা উপস্থিত করি, আমাদের আর্গুমেন্টগুলোও উপস্থিত করি। দুই আর্গুমেন্টের সংঘর্ষ উপস্থিত হয় মঞ্চে এবং কেন ওদের আর্গুমেন্টগুলো ঠুনকো আর কেন আমাদেরগুলো সঠিক সেইটে দেখানো হয়।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
পরিচালকের থিয়েটার- তার আগের যুগটা ছিল অভিনেতাদের থিয়েটার, এইটে ইউরোপে কোন সময়ে এসেছে, কীভাবে ডেভেলপ করেছে এবং তারপরে কাদের কাদের হাতে সম্পূর্ণতা পেয়েছে? তারপরে এটা আমাদের দেশে উপস্থিত হয়েছে?

উৎপল দত্ত
এগুলো অসংখ্য বই-এ লেখা আছে। এগুলো টেকস্ট বইয়ে সব পাওয়া যায়। এইগুলো তো কোনো ওপিনিয়নের ব্যাপার নয়। ডিউক অফ সাক্স-মাইনিঙ্গেন জার্মানীর। বলা হয় তিনি হচ্ছেন পরিচালকের থিয়েটারের জনক। কেননা প্রথম তিনি তার প্রজাদের নিয়ে- চাষীদের নিয়ে তিনি টিম ওয়ার্ক, দলগত অভিনয়ের সৃষ্টি করেন। তিনি মস্কো ট্যুরে গিয়েছিলেন। সেইটা স্তানিস্লাভস্কি তার অভিনয়ে দেখেন। তারপরে স্তানিস্লাভস্কিকে ধরা হয়। অ্যাডলফ আম্পিয়াকে তার আগে ধরা হয় জার্মানীতে। স্তানিস্লাভস্কি-নেমোরোভিচ ডানচেঙ্কোর দান সবেচেয়ে বেশি, যেখানে পরিচালক একেবারে ডিক্টেটরের পর্যায়ে উন্নীত হলেন। এমনকি কত সেকেন্ড পজ হবে, একটা পজের দৈর্ঘ্য কতটা হবে- সেটা অব্দি স্ক্রিপ্ট তৈরি হতো। তারপরে এলেন দোজার্মান জায়ান্টস মাক্স রাইনহার্ট। একটা সিাক্রপ্ট তৈরি হতো, তার নাম হতো- রেগিবোখ। এই রেগিবোখ আজকের সব পরিচালকদের স্ক্রিপ্টের মডেল। কিন্তু রেগিবোখের মতন ডিটেইল স্ক্রিপ্ট আর কেউই করতে পারেন নি রাইনহার্টের পরে। তাতে প্রত্যেকটি চরিত্রের বিশ্লেষণ থেকে শুরু করে যেই কালে, যেই পরিবেশে নাটকটা- সেই যুগ, সেই কাল এবং সেই পরিবেশের বিশ্লেষণ- তারপরে নাট্যকারের জীবনী, নাট্যকারের নানা নাটকের বিশ্লেষণ, এই বিশেষ নাটকের তাৎপর্য- এই বিশেষ নাটকের স্থান, সেই নাট্যকারের জীবনী ইত্যাদি বহু ব্যাপার উনি নোট করতেন এবং ঐ রেগিবোখ- এ লিখে রাখতেন। এই সবশুদ্ধ নিয়ে একটা বিপুলাকৃতি নোট বই ব্যবহৃত হোত রিহার্সেলে। মাক্স রাইনহার্ট- যিনি জার্মান বাণিজ্যিক নাট্যাশালা সবচেয়ে বড় জায়েন্ট বলে পরিচিত। তারপরে এলেন ব্রেখট-পিসকাটর। ব্রেখটের শুরু এরউইন পিসকাটর। তিনিও পরিচালকের থিয়েটারই করতেন। তিনি কমিউনিস্ট। তিনি এসে বাণিজ্যিক নাট্যশালার পাশাপাশি বিপ্লবী নাট্যশালা প্রতিষ্ঠা করলেন। কিন্তু সেই বিপ্লবী নাট্যশালায়, তিনি সজোরে ঘোষণা করলেন, একে বাণিজ্যিক দিক থেকে সফল হতে হবে। বাণিজ্যিক নাট্যশালাকে চ্যালেঞ্জ করতে গেলে বাণিজ্যিক দিক থেকে সফল হয়ে বিপ্লবী নাট্যশালাকে দাঁড়াতে হবে। এরকম হলে চলবে, না হলে আমাদেরটা হবে অ্যামেচার, সৌখিন আর পুরো বাণিজ্যিক নাট্যশালা কন্ট্রোল করবে থিয়েটার জগতকে- এ আমি হতে দেব না। তো তাই হলো। পিসকাটর যতদিন বার্লিনের থিয়েটারে ছিলেন ততদিন বিপ্লবী নাট্যশালা সমানে লড়াই করেছে বাণিজ্যিক নাট্যশালার সঙ্গে এবং শুধু তাই নয়, মাঝে একটা সময়ে এসেছিল যখন বাণিজ্যিক নাট্যশালা পরাস্ত। পিসকাটর একাই রাজত্ব করছিলেন বার্লিনে। তারপর তো হিটলারের অভ্যুথান। পিসকাটরের পালায়ন- প্রাণ নিয়ে পলায়ন। নইলে পিসকাটরকে হত্যা করা হতো। পিসকাটর চলে এলেন- প্রথমে এলেন সোভিয়েট ইউনিয়নে তারপর পালিয়ে গেলেন।

যুদ্ধের শেষে দুজনই ফিরে এলেন স্বদেশে। ব্রেখট গেলেন পূর্ব বার্লিনে। পিসকাটর গেলেন পশ্চিম বার্লিনে। কেননা তার থিয়েটার ছিল- এখন যেখানে পশ্চিম বার্লিনে- সেখানেই ছিল তার বিখ্যাত থিয়েটার ফলকস বিউনে অর্থাৎ পিপলস থিয়েটার। এখনও আছে সেটা। তা উনি ফিরে এসে পশ্চিম বার্লিনে ফলকস বিউনের পরিচালনার ভার গ্রহণ করলেন। এবং পুনরায় তাঁর থিয়েটার সারা পৃথিবীতে যশ অর্জন করলো এবং পশ্চিম জার্মানীর শ্রেষ্ঠ থিয়েটার হিসেবে পরিচিত হলো। পশ্চিম জার্মানী কেন, পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ থিয়েটার হিসেবে। এবং তখন বার্লিনের কী রকম একটা নামডাক দেখুন- পশ্চিম বার্লিনে পিসকাটর আর পূর্ব বার্লিনে ব্রেখট। দুজনে সমানে নাটক পরিচালনা করছেন। পরে ব্রেখটের নাটকের ব্যাপারতো আপনারা জানেন- সবাই জানেন। একের পর এক বিখ্যাত নাটক- ‘মাদার কারেজ’ থেকে আরম্ভ করে নাটকগুলো একের পর এক অভিনীত হচ্ছে পূর্ব বার্লিনে। পশ্চিম বার্লিনে তখন ‘দ্য ডেপুটি’ নাটক পিসকাটর পরিচালনা করলেন। দ্য ডেপুটি, পড়েছেন বোধহয়, খুবই বিখ্যাত নাটক। ন ঘন্টার নাটক। দুপুর এবং সন্ধ্যে- দুটো পারফরমেন্স হতো। পার্ট ওয়ান এবং পার্ট টু। পোপ- পোপের বিশ্বাসঘাতকতা। পোপ যে হিটলারের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল এবং ইহুদী হত্যায় সাহায্য করেছিল- এই হচ্ছে নাটকের বিষয়বস্তু। সারা পৃথিবীতে আলোড়ন তুলেছিল। বিশেষ করে শুধু তার বিষয়বস্তুর জন্য নয়, ফর্মের জন্যও পিসকাটরের বৈপ্লবিক মঞ্চায়ন, মঞ্চরীতি। আর আজকাল যে অনেকে খুব হাল্কাভাবে বলেন যে ব্রেখট হচ্ছেন এপিক থিয়েটারের জনক- এটা ঠিক নয়। এপিক থিয়েটারের কথা প্রথমে ব্যবহার করেন পিসকাটর। এপিক থিয়েটারের জনক বলতে পিসকাটারকে বোঝায়- ব্রেখট নয়। এরাই তে হচ্ছেন পরিচালকের থিয়েটারের সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা, আজ পর্যন্ত যা যা হয়েছে। আরও হয়তো আছেন- আমি ঠিক নাম বলতে পারছি না। গ্রাতস্কি- পুওর থিয়েটার তাঁর ফর্ম। পোলান্ডের গ্রাতস্কি, বলা যেতে পারে পরিচালকের থিয়েটারের চরম নিদর্শন। এদের সমকক্ষ আর নেই।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
এইটে আমাদের দেশে কীভাবে এসেছে?

উৎপল দত্ত
আসে নি। পরিচালকের থিয়েটার ওই পর্যায়ে আমাদের দেশে আসি নি। চেষ্টা করেছেন কেউ কেউ। পরিচালকের কর্তৃত্ব, আধিপত্য স্থাপিত করতে, কায়েম করতে। তবে সেভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় নি। তার কারণ আমাদের এখানকার যে সংগঠন, নাট্যশালার সংগঠন ততোটা তো সংগঠিত নয়, ইউরোপের মতন। কেননা এখানকার পুঁজিবাদটা ততটা বিকশিত নয়। কোনোদিন ইউরোপের পুঁজিবাদের মতো বিকশিত পুঁজিবাদ নয়। সুতরাং এ পুঁজিবাদী সংগঠনের ভিত দুর্বল। নাট্যশালার সংগঠনের ভিত দুর্বল। পরিচালকের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হতে পারে তখনই যখন অর্থনৈতিক ভিত্তি খুব শক্ত, দৃঢ়। নাট্যশালায়, যদি অর্থনৈতিক ভিত্তি দৃঢ়মূল হয় তার, তাহলে সে পরিচালককে নিয়োগ করে এবং সেই  পরিচালকের সর্বময় কর্তৃত্ব সকলে মেনে নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু আমাদের সর্বময় কর্তৃত্ব কারো হাতে আছে কিনা। এখানে থিয়েটারের মালিক খামখেয়ালী। সে উচ্ছৃঙ্খল, সে টাকা ওড়ায়। হিসাব দিতে পারে না। সে এসে বক্স অফিস থেকে টাকা নিয়ে চলে যায়। যেটা নিয়ম বিরুদ্ধ। বক্স অফিস থেকে কেউ টাকা নিতে পারে না। নিয়ম যেটা লেখা আছে সেটা হচ্ছে, প্রতিদিন সন্ধ্যায় বক্স অফিসের টাকা ব্যাংকে যাবে। ব্যাংকে জমা পড়বে। তারপরে ব্যাংক থেকে চেক দিয়ে তুলতে হবে। এটাই সারা পৃথিবীতে থিয়েটারের নিয়ম। এটা হচ্ছে ক্যাপিটালিস্ট নিয়ম- পুঁজিবাদী নিয়ম। সমাজতন্ত্রের দেশেও তাই। কিন্তু এখানে সবই উল্টো। এখানে মালিক এসে ড্রয়ার থেকে, একমুঠো টাকা নিয়ে চলে যায়। তিনি মদ খাবেন বোধহয়। তখন যিনি হিসাবরক্ষক তিনি লেখেন- বড়বাবু এক থাবা, মেজবাবু দেড় থাবা। এভাবে হিসাব মেলাতে হয়। এগুলো গিরিশবাবু আর শিশিরবাবুদের সময়ের কথা বলছি। অর্ধশিক্ষিত সব লোক আসতো। তাদের বেশিরভাগই আসতো অ্যাক্ট্রেস নিয়ে ফূর্তি করবার জন্য।

তথাপি চেষ্টা করেছেন- রবীন্দ্রনাথ নিজে চেষ্টা করেছিলেন। আমাদের পিতৃদেবের ভাগ্য যে রবীন্দ্রনাথকে অন্য কারো ওপর নির্ভর করতে হয় নি। তিনি নিজেই জোড়াসাঁকোতে থিয়েটার তৈরি করে সেইখানে থিয়েটার করতেন। এবং বাঙলা নাটকের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ কতগুলো প্রযোজনা তাঁর। তারপর গিরিশচন্দ্র ঘোষ। বাংলার শ্রেষ্ঠ পরিচালক। বাঙলা নাট্যশালায় অতবড় পরিচালক আর আসেন নি। তার ওপরে যে অত্যাচারটা হোত, আজকের দিনে অকল্পনীয়। তিনি একাধারে নাট্যকার, অভিনেতা এবং পরিচালক। নাট্যকার হিসেবে তাঁকে প্রতি সপ্তাহে নাটক লিখতে হতো। কেননা ঐ মালিকদের ধারণা বেশিদিন একটা প্লে চলবে না। চালিয়ে কেউ দেখেনি, তার নাটক চলে কিনা। যখন চালানোর চেষ্টা করেছে তখন দেখা গেছে একেকটা নাটক একশো রজনীর ওপরে অভিনয় হচ্ছে। কিন্তু বেশিরভাগ সময়েই মালিকরা চেষ্টা করতো প্রতি সপ্তাহে নতুন নতুন নাটক নামানোর। খরচ কিছুই করতো না তো। পুরনো কস্টিউমই ধুয়ে-মুছে আবার পরিয়ে দেবে। পুরনো সিন-সিনারি আছে, সেগুলোতেই আবার নতুন রঙ করে চালিয়ে দেবে। কিন্তু নতুন নাটক চাই। তাই গিরিশবাবুকে অনবরত, দিনরাত লিখতে হতো। এবং সেগুলোর আবার রিহার্সেল করতে হবে। কারণ পরের সপ্তাহেই তো আবার নতুন নাটক। অতএব তিনি সারা সন্ধ্যে অভিনয় করতেন, সারা রাত্তির রিহার্সেল দিতেন। এবং এই অসম্ভব পরিশ্রম করবার জন্য তিনি মদ্যপানও করতেন প্রচুর। সারারাত্রি মদ্যপান করতে করতে বিহার্সেল দিতেন। একটা নিয়মই ছিল- উনি এক বোতল ব্রান্ডি নিয়ে রিহার্সেল দিতে বসতেন। ব্রান্ডির বোতল যখন শেষ হোল, তখন রিহার্সেলও শেষ হতো। এবং তারপর গিয়ে শুয়ে পড়তেন।

সেইজন্য ওঁর যে মৃত্যু, তার জন্য দায়ী ঐ মালিকরা। ভগ্নস্বাস্থ্য হয়ে তারপর মৃত্যু। এবং তার ওপর আছে অভিনয়ের পরিশ্রম। সবচেয়ে বড় পার্টগুলোই করতে হোত ওঁকে। এবং তিনি দুটো অভিনয়ও করতেন। এই সমস্ত দায়িত্ব একা সামলে গিরিশ ঘোষ মহাশয় আমাদের নাট্যশালাকে দাঁড় করিয়েছিলেন- স্বাবলম্বী করে তুলেছিলেন এবং তাঁর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হচ্ছে এই যে, তাঁর আগে নাট্যশালা ছিল এই বড়লোকদের খামখেয়ালীর ওপর নির্ভরশীল। উনি সেটাকে পাবলিক থিয়েটারে পরিণত করলেন। অর্থাৎ টিকিট বিক্রি করে নাটক হবে। পাবলিক টিকিট কিনবে। সেই টাকায় থিয়েটার চলবে। মানে বড়লোক টাকা দিল কি না দিল তাতে কিছু এসে যায় না। এতে করে থিয়েটারের স্বাধীনতা ঘোষিত হলো। একদল বখে যাওয়া বড়লোক ছোঁকড়া- ফিউডাল কোটিপতির হাত থেকে মুক্ত হয়ে পাবলিকের ওপর নির্ভরশীল হলো। ফলে পাবলিকের চাহিদাকেই রিফ্লেক্ট করতে শুরু করলো, ফলে আমরা দেশাত্মবোধক নাটক পেতে শুরু করলাম, নইলে হোত না। ‘সিরাজদ্দৌলা’ নাটক হলো। ‘মীরকাশিম’, ‘ছত্রপতি’, ‘শিবাজী’ নাটক হোল। তিনটেই অবশ্য বেআইনী হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বেআইনী হবার আগেই সেগুলোর শত রজনী অভিনয় হয়ে গেছে। লোক ভেঙে পড়েছিল। এবং সেই সিরাজদ্দৌলাকে ইংরেজ ঐতিহাসিকদের কুৎসা থেকে রক্ষা করে. সিরাজদ্দৌলাকে ন্যাশনাল হিরো করে উপস্থিত করলেন গিরিশবাবু। এবং বাঙলায় হিন্দু-মুসলিমের ঐক্যের প্রতিচ্ছবি উপস্থিত করলেন। এই অ্যাচিভমেন্ট বড় কম নয়। ১৯০৫ সালে। এই তো গিরিশবাবুর অ্যাচিভমেন্ট এবং অবশ্যই সেটা পরিচালকের থিয়েটার করারই চেষ্টা করেছিলেন। সঙ্গীত, নৃত্য, এসবের তো একেবারে উৎকর্ষতা লাভ করেছিল বাঙলা থিয়েটার, যা এখনও পর্যন্ত আর হয় নি। একমাত্র জোড়াসাঁকোর থিয়েটার তাকে অতিক্রম করে গিয়েছিল। তাছাড়া কেউই এ থিয়েটারের একশো মাইলের মধ্যে আসতে পারে এমন নৃত্য-গীতের ব্যাপারে, এরকম কোনো জিনিস বাঙলা থিয়েটারে হয় নি। একমাত্র রবীন্দ্রনাথের থিয়েটার ছাড়া। তো, সেইজন্য বলছি যে, গিরিশবাবু হচ্ছেন সবচেয়ে বড়, মানে টোটাল থিয়েটার- পরিচালকের থিয়েটার সৃষ্টি করার আদিপুরুষ, আমাদের দেশে। তারপর আধুুনিককালে এসে এর চেষ্টা হয়েছে। আমরা সবাই চেষ্টা করেছি পরিচালকের থিয়েটার প্রতিষ্ঠিত করতে। শম্ভুবাবু করেছেন, আমিও চেষ্টা করেছি- কতটা সফল হয়েছি সেটা অন্য প্রশ্ন।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
শিশির ভাদুড়ী করেছেন।

উৎপল দত্ত
মাঝে মাঝে অসাধারণ। মাঝে মাঝে প্রচণ্ড অসতর্ক। তাই বলি, আমার সব সময় মনে হয়েছে যে গিরিশবাবুরা যে রকম শৃঙ্খলাপরায়ন ছিলেন খুব সম্ভব ভাদুড়ীমশায় সে রকম ছিলেন না। তাঁর নিজস্ব মুডের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করত। খুব মুডি ছিলেন। তারপর আমার মনে হয়, গিরিশবাবু তাঁর সঙ্গে যারা অভিনয় করেছেন, তাঁর পূর্বে যারা অভিনয় করেছেন, প্রত্যেকের সম্পর্কে ডিটেলে লিখতেন। শিশিরবাবু লেখেন নি। খুব কম। শিশিরবাবু লেখা লিখবেন- এইটুকু লিখবেন। কারণ কী? কারণ আলস্য। সেই তাগিদ নেই যে আমি একটা নাট্যশালার কাজ করছি- সেই নাট্যশালার সমস্যা, কীভাবে সেই সমস্যার মোকাবিলা করা হয়েছে- সেটা ভবিষ্যৎকে জানানো প্রয়োজন। এই নাট্যশালার ইতিহাসটা থাকা দরকার। এই বোধ ছিল না। অথচ ইনি ছিলেন অধ্যাপক মানুষ। ওঁরই লেখার কথা ছিলো। গিরিশবাবু তো কেলাস এইট পর্যন্ত পড়েছিলেন । উনি তো স্কুলে ড্রপ-আউট। অথচ উনি অসাধারণ বাঙলা শিক্ষা করে নিজে নিজে, নিজেকে শিখিয়ে উনি সব্বাইর সম্পর্কে লিখে গিয়েছেন। বিনোদিনী তো বটেই, অর্ধ্বেন্দুশেখর মুস্তাফী সম্পর্কে অত সুন্দর লেখা তো আর পাওয়া যাবে না। এবং প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে তৎকালীন থিয়েটার সম্পর্কে সব লেখে গেছেন। কিন্তু ভাদুরীমশায় লেখেন নি। ভাদুড়িমশাইয়ের সময়ে কারা তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী- উদার প্রতিদ্বন্দ্বী অহীন্দ্র চেীধুরীমশাই সম্পর্কে একটা লেখা থাকা উচিত ছিল। কখনই লিখবেন না। এটা আমার ধারণা আলস্য। এবং এটা শৃঙ্খলার দীনতা। যেমন, মেক-আপে অনীহা। বড়বাবু স্পিরিটগাম লাগাবেন না। সাজাহানের পার্ট করেন-দাড়িটা স্পিরিটগাম দিয়ে সাঁটবেন না। দড়ি দিয়ে বাঁধা থাকবে। স্পষ্ট দেখা যাবে। এ তো আমার্জনীয় অন্যায় নাট্যশালায়। আর তাঁর থেকে বহুপূর্বে গিরিশবাবুরা কী করেছেন? তাঁদের সময়ে স্পিরিটগামও ছিল না- তাঁরা আঠা, দিশি আঠা গঁদ দিয়ে জুড়তেন। কিন্তু কখনো কেউ ভাবে নি যে কেউ দড়ি দিয়ে বাঁধা দাড়ি পরে নেমে যাবে। গিরিশবাবু পদাঘাতে ফেলে দেবেন স্টেজ থেকে। তাই এসব পড়ে-টড়ে আমরা ধারণা হয়েছে যে গিরিশবাবুর একটা বিরাট দখল ছিল নাটক সম্বন্ধে। শিশিরবাবু সম্পর্কে বলতে গেলে- মানে, অমার্জনীয় রিগ্রেট- থিয়েটারের সেটে, লাইটে- একটা প্রচ- ঔদাসিন্য, হতাশা ধীরে ধীরে শিশিরবাবুকে গ্রাস করে ফেলেছিল। ছেঁড়া সিন ঝুলছে, ময়লা এবং লাইটের কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। কখনও জ্বলে, কখনও জ্বালাতে ভুলে যায়। কথা বলে ব্যাকস্টেজ থেকে। হট্টগোল হয়। এসব নিয়ে কোনো মতে নাটকটা হয়ে যাচ্ছে।

একদিন বড়বাবুর দাড়ি খুলে গেল। বড়বাবুর দাড়িটা খনিকটা খুলে ঝুলছিল- তিনি সবটা খুলে ফেললেন, তারপর অভিনয় করলেন। এ তো আমার্জনীয় অপরাধ, একজন অভিনেতার। অপেশাদার মনোভাব। তবু মাঝে মাঝে এক একটা নাটকে এক একটা জায়গায় এমন অসাধারণ পরিচালনা ক্ষমতা দেখিয়েছেন যা অকল্পনীয়।... কিন্তু মাঝে মাঝে এমন টাচ দিয়ে তো পরিচালকের থিয়েটার গড়ে ওঠে না। সেটা একটা সামগ্রীক ব্যাপার। তাই বলতে বাধ্য হচ্ছি, ভাদুড়ীমশায়ের কাজ প্যাচি ছিল, ব্রিলিয়ান্ট মাঝে মাঝে, একেক সময়, কিন্তু অনেক সময়ই অত্যন্ত অমার্জনীয়ভাবে অসতর্ক এবং খারাপ। সামগ্রীক চেতনার অভাব। এবং শুনেছি তারও কারণ হচ্ছে ভেতরের বিশৃঙ্খলা। তবে এটা স্বীকার করতেই হবে যে, শিশিরবাবু যেটা করেছেন সেটা পরিচালক হিসেবে নন, সেটা নাটক নির্বাচনের ক্ষেত্রে। অন্য সব জায়গায় যেখানে অত্যন্ত সস্তা নাটক অভিনীত হচ্ছে তখন শিশিরবাবুর থিয়েটারে অভিনীত হচ্ছে ‘মাইকেল’, অভিনীত হচ্ছে শরৎচন্দ্র। অভিনীত হচ্ছে সব সিরিয়াস নাটক- ‘সধবার একদশী’, ‘ষোড়শী’ ইত্যাদি। অবশ্য শিশিরবাবুর যুগেই শ্রেষ্ঠ পরিচালক ছিলেন মহেন্দ্র গুপ্ত মহাশয়- স্টার থিয়েটারে, পরিচালক হিসেবে। এতে অনেক দ্বিমত হবে জানি, কেননা ওদের কাছে ‘মহারাজা’, ‘নন্দকুমার’, ‘টিপু সুলতান’ এসব নাটকের নাটক হিসেবে কোনো মূল্য নেই। কিন্তু সে কথা ঠিক নয়। নাটক হিসেবে মূল্য আছে। এরা একটা দেশপ্রেমিক সংগ্রামে একটা বিশেষ ভূমিকা পালন করে গেছেন। এরা মেলোড্রামাটিক ছিলেন- এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। সব নাটক যে প্রচ- ইন্টেলেকচুয়াল স্তরে উঠে ডিসকাসনের প্লে হবে- তার তো কোন মানে নেই। নানা ধরনের নাটক থাকে এক একটা দেশে। আমি বলছি পরিচালক হিসেবে সেই সময় স্টার থিয়েটারে মহেন্দ্রবাবুর এক্সপেরিমেন্টগুলোই হলো শ্রেষ্ঠ। তাঁর নাটকের পরিচালনায় সামগ্রীক- সেটা প্রত্যেকের অভিনয়ে লক্ষ্য করার মতো, তার কস্টিউম, সেট, লাইটিং সব কিছুর দিকে পরিচালক নজর দিয়েছেন। বেশ স্পষ্ট বোঝা যায় পরিচালক হাউসে বসে নাটক দেখে দেখে রিহার্সেল দিয়েছেন- স্পষ্ট বোঝা যায়। অনেক সময় দিয়েছেন, এটাও বোঝা যায়। দিনরাত রিহার্সেল দিয়েছেন। তখন বড়বাবুর অভিনয় দেখলে মনে হোত আদৌ পরিচালক এ নাটকটা অভিনীত হতে দেখেছেন হাউস থেকে? তাহলে কী করে এসব অভিনেতাকে তিনি এলাউ করেন! ওঁর পাশে এইসব কারা? আমাদের শ্রেষ্ঠ যিনি অভিনেতা- শিশিরকুমার ভাদুড়ি মহাশয়, তাঁর পাশে এইসব কারা? একেবারে, মানে বাঙলা নাট্যশালার কোনো রঙ্গমঞ্চে ওদের কোথাও স্থান হয় নি। তারা গিয়েছে আমাদের বড়বাবুর সঙ্গে। তো ন্যাচারালি অভিনয়ের স্ট্রান্ডার্ড সবচেয়ে খারাপ হতো। আলটিমেটলি গিয়ে কী দাঁড়াতো- শুধু শিশিরবাবুকে দেখতে যেত লোকে। আর কী হতো- নাটক কেটে কেটে করা হতো- ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাটক দেখতে গিয়ে যদি আমি দেখি যে সিকান্দার নেই, আলেকজান্ডার নেই- যেটা দিয়ে নাটকটা শুরু এবং বিশেষ উদ্দেশ্যেই দ্বিজেন্দ্রলাল প্রথমে সিকান্দারের সিন আনে- সে জায়গায় বাদ যেত। কারণ, উদ্দেশ্য তো কোনো রকমে চাণক্যতে গিয়ে পড়া- বড়বাবু অভিনয় করবেন। আর যে দর্শক এসেছে, তারাও চাণক্যকেই দেখতে এসেছে। তারা জানে যে অন্য চরিত্র যারা করবে, তাদের অভিনয় দেখা যাবে না। এই তো ছিল অবস্থা। সুতরাং পরিচালক হিসেবে খুব তিনি ইম্পর্টেন্ট নন। অভিনেতা হিসেবে অবশ্যই শ্রেষ্ঠ অভিনেতা।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
টোটাল থিয়েটার মানে যেখানে আমরা দেখাই মঞ্চ, আলোকসম্পাত, সঙ্গীত, মেকআপ- মানে সমস্ত কিছুর কম্বিনেশন। এ্যাকটিং ছাড়াও এদের যে নির্দিষ্ট ভূমিকা, যেমন ধরুন পারস্পরিক সম্পর্ক, যার ওপরে টোটাল থিয়েটারটা গড়ে ওঠে এইটে সম্বন্ধে বলুন।

উৎপল দত্ত
অনেকগুলো একসঙ্গে এলিমেন্ট...

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
আপনি একটা একটা করে বলুন।

উৎপল দত্ত
একটি সম্পর্কে বললেই বাকি সবগুলো সম্পর্কে বলা হবে। ধরা যাক সঙ্গীত। থিয়েটারের সঙ্গীত। থিয়েটারের সঙ্গীত বিশুদ্ধ সঙ্গীত নয়। বিশুদ্ধ সঙ্গীত তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে এবং থিয়েটারের সঙ্গীত যেহেতু থিয়েটারের প্রয়োজনেই সীমিত, থিয়েটারের নিজের চেহারা নিয়ে যত কম আত্মপ্রকাশ করে ততই ভালো। ইনফ্যাক্ট যতো সে তার স্বধর্ম ত্যাগ করবে ততো ভালো। থিয়েটারের সঙ্গীত, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ থিয়েটারের সঙ্গীত সৃষ্টি করেছেন ফিলিপ মেন্ডলসন। ‘মিডসামার নাইটস ড্রিম’ নাটকের অভিনয় হচ্ছিল ড্রেসডেনে। সেই ১৮৪২ সালে। সে যা আবহসঙ্গীত সৃষ্টি করেছিলেন তা ইমর্টাল মিউজিক হয়ে আছে। এখন সে সঙ্গীত ইমর্টাল মিউজিক হয়ে গেছে বটে কিন্তু আমি এটা খুব দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি নাটকটা বাদ দিয়ে যদি কেউ এই মিউজিকটা শোনে, তার মাথায় যদি নাটকটা না থাকে, তাহলে সে পুরো মিউজিকটা উপভোগ করতে পারবে না। একান্তভাবেই নাটকটার উপর নির্ভরশীল। নাটকটা আর ঐ মিউজিকটা এমন ওতপ্রোতভাবে জড়িত যে এটাকে বাদ দিয়ে ওটা হয় না। আবার ওটাকে বাদ দিয়ে এটা হয় না। অনেকে ভাব করেন- শুনছেন। কিন্তু আমার মতে, হয় তারা ভান করছেন আর না হয় তারা সঙ্গীত বোঝেন না। দুটো এমন ওতোপ্রতোভাবে জড়িত যে, শেক্সপীয়রের নাটকটা ভালোভাবে পড়া না থাকলে- চোখের সামনে না ভাসলে ও মিউজিকটা পুরোপুরি বুঝতেই পারবে না কেউ। এটা হচ্ছে আদর্শ থিয়েটারের মিউজিক। অর্থাৎ কিনা চিরকালের জন্য ঐ সঙ্গীত এবং ঐ নাটক একত্রে চলবে। ওই নাটক থেকে ঐ মিউজিক আলাদা করলে অর্থহীন হয়ে পড়বে। এমনকি এমনও বলা যেতে পারে যে, ঐ মিউজিক ছাড়া ঐ নাটক অভিনয় করতে গেলে নাটকটা ন্যাড়া লাগবে। এখন শেক্সপীয়র যখন ঐ নাটকটা লিখেছিলেন তখন তো মেন্ডলসনের জন্মও হয় নি। মেন্ডলসনের পিতা-মাতাও জন্মাননি। ওটা ১৮৪২ সালে- ড্রেসডেনে একটা অভিনয়ের জন্য মেন্ডলসনকে ভার দেয়া হয় মিউজিকটার জন্য। কিন্তু তারপর থেকে আজ পর্যন্ত ‘মিডসামার নাইটস ড্রিম’ কোথাও অভিনীত হয় নি ওই মিউজিক ছাড়া। পিটার ব্রুক বাদ দিয়েছেন। উনি সব ব্যাপারেই নতুন নতুন জিনিস করার চেষ্টা করেন। তা উনি বাহুল্য জ্ঞানে বাদ দিয়েছেন। পিটার ব্রুকের নাটক যে এত খারাপ হয়েছে তার অন্যতম কারণ হচ্ছে মেন্ডলসনের সেই অসাধারণ স্বপ্নময় সঙ্গীতকে বাদ দিলেন। যাই হোক, সঙ্গীত, নাটকের সঙ্গীত- নিজেকে মিলিয়ে দেবে নাটকের সঙ্গে। আত্মসমর্পন করবে নাটকের কাছে। নাটক সেখানে সুপ্রিম। সেখানে সঙ্গীত যদি নিজের কেরামতি দেখাতে থাকে তাহলে পরে সেখানে সে ব্যর্থ হচ্ছে।

পাশ্চাত্য মিউজিকে ভিভিড মিউজিক বলে একটা কথা আছে। ভিভিড মিউজিক মানে হচ্ছে, কী বলবো- বাস্তব ধ্বনিকে অনুকরণ করা। যেমন আমরা শুনতে পাই বেঠোফেনের ষষ্ঠ সিম্ফনি, প্যাস্টোরাল সিম্ফনি এসব। একটা মুভমেন্ট আছে- স্টর্ম। সেটাতে সঙ্গীতের ইন্সট্রুমেন্ট দিয়ে ঝড় সৃষ্টি করা হয়েছে। অবিকল ঝড়। সঙ্গীতের ঝড়। হঠাৎ মনে হবে ঝড় হচ্ছে, বাতাস বইছে, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, বাজ পড়ছে। একে বলা হয় ভিভিড মিউজিক।... তবে ভারতীয় সঙ্গীতে ভিভিড মিউজিক বস্তুটি নেই। যদিও চেষ্টা করলে পাখির ডাক-টাক করা যায় না তা নয়। মোটামুটি পাখির ডাক- কোকিল ডাকছে- এই অ্যাটমোসফেয়ারগুলো এনে দেয়া যায়। ভিভিড হিসেবে ইমিটেট করা যায় না বা করা হয় না। ওটা রেওয়াজ নয়- ট্রাডিশনের বিচ্যুতি। তবে আমাদের সঙ্গীতে সবচেয়ে বড় করে ধরা যায় সময়। প্রাতঃগেয় রাগ, সান্ধগেয় রাগ। এগুলো আমাদের প্রচ- সাহায্য করে। যেগুলো ওদের নেই। যেমন ধরুন- ভৈঁরো। ভৈঁরোর একটু সুর দিলেই এটা যে ভোর সেটা বুঝিয়ে দেয়। আর কিছু লাগে নাতো। এটা হচ্ছে ভারতীয় সঙ্গীতের ট্রেন্ড, থিয়েটারে। বা একটা দরবারের সিনে দরবারী কানাড়ার জাস্ট একটু মুখটা কোনো ইন্সট্র্রুমেন্টে বাজালেই পরিষ্কার- আর কিছুর দরকার হয় না। এইখানে ভারতীয় মার্গ সঙ্গীতের ট্রেন্ড। থিয়েটারের প্রেক্ষিতে ভারতীয় মার্গসঙ্গীতের অ্যাডভান্টেজ।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
এগুলো আপনি ব্যবহার করেছেন?

উৎপল দত্ত
করেছি। এটার আরও মজা আছে। থিয়েটারে উল্টোপথে গেলে আরও মজা। থিয়েটারে ঠিক যে মিউজিকটা এখন প্রয়োজন তার উল্টো মিউজিকটা দিলে পরে অনেক সময় দেখেছি- আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা থেকে যে, অনেক বেশি ইফেক্ট হয়। যেখানে খুব করুণ একটা ঘটনা  ঘটেছে তখন সঙ্গীত যদি আনন্দের সঙ্গীত হয় তাহলে পরে এফেক্টটা দশগুণ বৃদ্ধি পায়। ডায়ালেক্টিসের আইনেই বোধহয় এটা হয়। ‘ব্যারিকেড’-এ বারবার ইউজ করেছিলাম। ব্যারিকেড নাটকে একজন মা খবর পান যে ছেলে মারা গেছে। ছেলেকে মেরেছে নাৎসীরা। তখন একদম আনন্দের মিউজিক। স্প্যানিস মিউজিক। তার আগে পর্যন্ত চলছিল জার্মান ক্ল্যাসিকাল। সবই আমরা ব্যবহার করেছি। একদম ওদের ফেস্টিভ মিউজিক- ট্রম্পেড। কিন্তু ইফেক্ট হয়েছে সাংঘাতিক। অনেক সময় এরকম হয়। কিন্তু আমরা আবার ব্যর্থ হয়েছি, সাংঘাতিকভাবে ব্যর্থ হয়েছি ইয়ে নাটকে- কী যেন নাম- ‘দাঁড়াও পথিকবর’-এ। যখন মাইকেল মামাবাড়িতে গেছে আর তারপর সৎমা বার করে দিচ্ছে বাড়ি থেকে, তখন ইউজ করা উচিত ছিল কোনো আনন্দের মিউজিক- এইটে ভেবেছিলাম। ইউজও করেছিলাম, কিন্তু দর্শকের ভালো লাগে নি। ভারতীয় সঙ্গীত ব্যবহার করতে আমরা বাধ্য ছিলাম। কারণ ইউরোপিয় সঙ্গীত তো ঐ নাটকে আসতে পারে না। তাও এসেছে, ফ্রান্সের সিনে এসেছে। কিন্তু ভারতীয় আনন্দসঙ্গীত এত কম- রাগ ছাড়া ভারতীয় মার্গ সঙ্গীতে আনন্দে হেসে উঠেছে- মানে পৃথিবী হেসে উঠেছে- এরকম এফেক্ট দেয়া খুব কঠিন। তাই আমরা বাধ্য হয়ে শেষে ওখানে স্যাড মিউজিক দিলাম। দর্শকের ভালো লেগেছে, কিন্তু আমার খুব খারাপ লেগেছিল। আমার আর হেনরিয়েটার হেঁটে পুরো স্টেজটা অতিক্রম করে বেরিয়ে যাওয়া আছে- হাঁটতে হাঁটতে লজ্জা করতো ঐ মিউজিক শুনে। কারণ, সে একেবারে কুৎসিত। যাই হোক, দর্শককে তবু কাঁদতে দেখেছি জায়গা বিশেষে। কাঁদছেন, কাঁদুন- কিন্তু এমনটি হওয়া উচিত নয়। কাউন্টারপয়েন্টস দেয়া উচিত। ঠিক যা ঘটেছে তার উল্টো দিকে চলবে।... আমি অনেক মিউজিক ব্যবহার করেছি- উল্টাপাল্টা মিউজিক। জগাখিচুড়ি করতে আমার বিন্দুমাত্র আটকায় না। একই নাটকে ইন্ডিয়ান মিউজিকের মধ্যেও- যেমন আমরা ‘স্তালিন নাইনটিন থারটিফোর’ বলে একটা নাটকে ক্লাসিকাল মিউজিক দিয়ে শুরু করে অবলীলাক্রমে স্যাটারডে নাইট ফিভারে গেছলাম। এতে অবশ্য কোনো কোনো ভদ্রলোক বলেছেন, চিঠি লিখেছেন যে- কানে ভীষণ খারাপ লেগেছে, এসব সস্তা সঙ্গীত ইত্যাদি। সস্তা সঙ্গীত- কনসার্ট হলে সস্তা হতে পারে, কিন্তু থিয়েটারে নয়।

...যাই হোক প্রশ্নটা ছিল- এসব মিলে এক জায়গায় এসে থিয়েটার হয়। এখন এ সম্পর্কে পৃথিবীতে থিয়েটার সম্পর্কে যত বই, আজকাল যত বই লেখা হচ্ছে, সবগুলোতেই একটা কথাই বলা হয়- সেটা হলো সবগুলো মিলে একটাই জিনিস হয়- নাটক। নাটকটি সুপ্রিম। অন্য সবগুলো আদৌ আসলে মেলে কিনা- এটাই হচ্ছে প্রশ্ন। খুব বড় পরিচালকের কাজ দেখলে মনে হয়- নিশ্চয়ই সবগুলো এসে মেলে, এক জায়গায় মেলে। যে রঙের সেটটা করেছে, তার সাথে মিউজিকের রঙ, মিউজিকেরও তো রঙ আছে- এই সব মিললো কিনা। এবং মিলে যেটা হয়, সেটা হলো- নাটক। রঙ, সেট ডিজাইন- মানে হচ্ছে নাট্য পরিচালকের রঙের সেন্স থাকতে হবে। শুধু রঙের সেন্স কেন- তার পিকাসোর ছবি দেখে থাকা উচিত। তার পিকাসো, অরি, দেগা- এ সব কিছু তার জানা থাকা উচিত। এবং সে যখন তার সেট ডিজাইনারের সাথে কাজ করবে, তখন বিখ্যাত পেইন্টিংস- এর ছবি দিয়ে, প্রিন্ট দিয়ে বুঝিয়ে দেবে যে আমি এই জিনিসটা চাই।... তাই, এই যে প্রশ্নটা করছেন, এটার কোনো উত্তর হয় না। এটা হাতে কলমে করা যায়।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
পথনাটিকা লেখা খুব সহজ, এরকম একটা ধারণা চালু আছে। যদি এ প্রসঙ্গে কিছু বলেন, ভালো হয়।

উৎপল দত্ত
পথনাটিকা অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথার একটা ব্যাপার। আলোচনার ব্যাপার- খুব ব্রেখটিয়ান হয়ে উঠেছে। এর সঙ্গে ৫২-৫৩ সালে আমরা যখন করতাম- তার, সেই পথনাটিকার কোনো সাদৃশ্য নেই। তখন প্রচণ্ড ইমোশোনাল একটা ব্যাপার ছিল। জাস্ট নাড়া দেওয়া, একটা স্লোগান তোলা। এখনও শেষের দিকে এসে স্লোগানের আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু মূল প্লে-টা খুব ঠাণ্ডা মাথায় ডিসকাসনের মধ্যে দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এই তো পথনাটিকা।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
এমনি, মানে নাটকে যেমন এক একটা চরিত্রকে নানান ডাইমেশন থেকে দেখতে পাই, পথনাটিকায় তো...

উৎপল দত্ত
ওয়ান ডাইমেনশনাল। এবং ওরা সবাই নানা রাজনৈতিক মতবাদের প্রতীক মাত্র। কংগ্রেসের রাজনৈতিক মতবাদটা তুলে ধরবার জন্য একটা লোক আসছে। কমিউনিস্ট পার্টির মতবাদটা তুলে ধরবার জন্য লোক আসছে। শ্রমিকশ্রেণীর মতবাদকে তুলে ধরবার জন্য একজন লোক আসছে। এই রকম আরকি। তারা কেবল প্রতীক মাত্র। তারা কথা কইছে শুধু মতবাদগুলোকে পৌঁছে দেবার জন্য। তাদের নিজস্ব কোনো চরিত্র-টরিত্র নেই। অবশ্যই ভাঁড়ামি করে হাসানোর চেয়ে উইট-অ্যাকচুয়াল কংগ্রেসীদের কথাবার্তায় যদি লোক হাসে তাহলে সেটা এফেকটিভ হাসি হয়, এটা আমরা বিশ্বাস করি। কোনো রকম ভাঁড়ামি না করে ওদেরই কথা থেকে ওদেরকে হাস্যস্পদ করে তোলা, ওরা যে পেপার টাইগার এইটা প্রতিপন্ন করা। এটা আমাদের অন্যতম টাস্ক বলে আমরা মনে করি। অনেক সময় আমাদের কমরেডরাই আমাদের সমালোচনা করে বলেছেন যে, শত্রুকে এত দুর্বল করে দেখানো উচিত নয়। শত্রুরা আসলে দুর্বল নয়। শত্রুরা আসলে খুব শক্ত। আমি বলেছিলাম যে, চিয়াং কাই সেকও খুব শক্ত ছিল। তাকে পেপার টাইগার বলতেন মাও সে তুং। স্ট্রাটেজিক্যালি আমরা তাদের যত শক্তই দেখি না কেন, ট্যাকনিকালি তাদেরকে দুর্বল মনে করতে হবে। নইলে তাদের সঙ্গে লড়াই করা যায় না। যাই হোক, চরিত্র বিশ্লেষণ-টিশ্লেষণ করবার জায়গা পথনাটিকা নয়। এটা রাজনৈতিক ডিসকাশনের জায়গা।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
একটা কথা, আপনি বিভিন্ন সময়ে আলোচনা করেছেন এবং লেখালেখিও করেছেন, সেইটে একটু সুনির্দিষ্টভাবে জানতে চাইছি- মানস গঠন বলুন, দিকদর্শন বলুন যে, মার্কসবাদ-লেলিনবাদের অধ্যয়ন করা অবশ্য প্রয়োজন নাট্যকর্মীদের, সাধারণভাবে সাংস্কৃতিক কর্মীদের। এখন, মার্কসবাদ তো বিশাল, ব্যাপক- তার তিনটে দিক আছে, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং দার্শনিক। কোন দিকটার প্রতি বিশেষভাবে আমাদের নাট্যকর্মীদের বা সংস্কৃতি চর্চাকে রিয়েল সেন্স-এ পথ দেখাবে?

উৎপল দত্ত
দার্শনিক। মানে ডাইলেক্টিকাল মেটিরিয়ালিজম, হিস্টোরিকাল মেটিরিয়ালিজম।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
আমাদের দেশের নাট্যকর্মীদের আপনি দীর্ঘদিন ধরে দেখেছেন, এবং আপনার গ্রুপেতো দেখছেনই বটে- আপনার কী মনে হয়, এ ব্যাপারে তারা সত্যিই খুব ভাবনাচিন্তা করেছে, বা তাদের চেতনা অনেক পরিচ্ছন্ন হয়েছে, যার প্রকাশ আমরা দেখতে পাচ্ছি নাটকে?

উৎপল দত্ত
কি, মার্কবাদ-লেলিনবাদ সম্বন্ধে?

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
মানে দার্শনিক দিক থেকে তারা ধরতে পেরেছেন কিনা? মার্কসবাদ-লেলিনবাদ মানে ওই গোদা গোদা স্লোগান নয়-

উৎপল দত্ত
না না। মার্কসবাদ-লেলিনবাদ তারা একেবারেই আয়ত্ব করতে পারেন নি। না-না প্রশ্নই ওঠে না। মার্কসবাদ-লেলিনবাদ পড়ানোই হচ্ছে না- অধ্যয়নই হচ্ছে না। আয়ত্ত্ব করবে কী করে! এই যে দিনরাত নাটক নিয়ে খাটছে, এর সঙ্গে যদি মার্কসবাদ-লেলিনবাদ অধ্যয়ন করতো তাহলে এত দিনে অনেক এগিয়ে যেত। ওরা নাটক নিয়ে যে পরিশ্রমটা করে সেটার পেছনে এসে যদি দাঁড়াতো মার্কসবাদ-লেলিনবাদের থিয়োরি, তাহলে পরে ওরা বহুদূর অগ্রসর হয়ে যেতে পারতো- ওরা পড়াশোনা করে না। খুব কম করে- যারা করে তারা ব্যক্তিগত উদ্যোগে- তারা এমনিই পড়–য়া লোক। তাদেরকে কেউ আটকাতেই পারবে না- তাঁরা পড়বেনই। তাদের কেউ যদি ইনফেক্ট নিষেধ করে, তবুও তাঁরা পড়বেন। কিন্তু সংগঠিতভাবে- সুসংগঠিতভাবে যে ক্লাশ করা উচিত, সবাই এক সঙ্গে বসে যে পড়া উচিত- কালেক্টিভলি, সেটা হয় না।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
আজকের মতো এইখানেই শেষ।

উৎপল দত্ত
বেশ। [হাসি]