Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

সেলিম আল দীনের নাটকে রাজনৈতিক ভাবনার বিকাশ : অনিকেত অন্বেষণ থেকে কেরামতমঙ্গল

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সেলিম আল দীন আলোচিত নাট্যকার। তিনি দেশজ ভাবনায় জারিত নাট্যকার, যিনি বাঙালির নাট্য আঙ্গিক অনুসন্ধানে ব্যাপৃত থেকেছেন। এই অনুসন্ধানের পশ্চাতে থাকে দেশজ চেতনা ও জাতীয়তাবোধের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিকতায় উত্তরণ। তাঁর এই আন্তর্জাতিকতায় উত্তরণের ক্ষেত্রে মূল শক্তি দেশজ আঙ্গিক। যা সৃষ্ট হয়েছে এ ভূ-ভাগের দর্শনকে কেন্দ্র করে। প্রাথমিক পর্বের নাট্যকার সেলিম আল দীন আপন শিল্প দর্শন নির্মিতির ক্ষেত্রে ক্রম নিরীক্ষা করেছেন। কেরামতমঙ্গলের গঠনকাঠামো বদলে যায় চাকা১ নাট্যে এসে। আঙ্গিক বিষয়ে তাঁর এই নিরীক্ষা প্রবণতা সম্পর্কে নাট্য সমালোচক ও গবেষক ড. আফসার আহমদ রচনা করেন-

ঢাকা থিয়েটার প্রযোজিত সেলিম আল দীনের তিনটি মঞ্চনাটক কিত্তনখোলা, কেরামতমঙ্গল ও হাত হদাইকে আমরা নব্যকালের ট্রিলোজি আখ্যায় আখ্যায়িত করতে পারি। নাটক তিনটিকে ‘ফরমের ট্রিলোজি’ বলাটাই অধিকতর যুক্তিসঙ্গত। কারণ, কিত্তনখোলা নাটকের রচনারীতির পরিপূর্ণতা ঘটেছে হাত হদাই নাটকে।২

আঙ্গিকের ক্ষেত্রে সেলিম আল দীনের ক্রম নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে কথানাট্য, পাঁচালি আঙ্গিকে উপনীত হয় তার নাটক। আঙ্গিকের এ পরিবর্তনের পাশাপাশি বিষয়ের ক্ষেত্রেও তিনি ক্রমখননের কাজটি করেন। তাঁর মূল্যায়নে রচিত হয়-

সমাজ ও রাষ্ট্রের অসঙ্গতি- বিচ্যুতি, সভ্যতার স্খলন তাঁকে সাহিত্য-সংস্কৃতি, কৃষ্টির পাশাপাশি সমাজতত্ত্ব, রাষ্ট্রদর্শন, সরকার পদ্ধতি নিয়ে নিয়ত ভাবিত করেছে। সে কারণে তাঁকে কেবলই ‘নাট্যকার’ অভিধায় আখ্যায়িত করলে তাঁর খণ্ডিত মূল্যায়নের সম্ভাবনা থাকে। কবি, নাট্যকার, আখ্যান রচয়িতার পাশাপাশি তাই তাঁর রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, দার্শনিক ও মানবাধিকার কর্মীর অন্যরূপ দেখতে পাই।৩

নাট্যকার সেলিম আল দীনের বিকাশের সঙ্গে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের বদল ঘটেছে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তিনি এবং তাদের প্রজন্ম সমগ্র জাতির সাহিত্য নির্মাণে ব্রতী ছিলেন। ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমীতে অনুষ্ঠিত বাংলা সাহিত্য সম্মেলনে ড. মযহারুল ইসলাম বলেন-

আজকের বাংলাদেশ তার উত্তরাধিকার ও ঐতিহ্যের উৎস মুখে আত্ম সম্প্রসারণে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। একদিকে আমরা যেমন জ্ঞান-বিজ্ঞানের নব নব দিগন্ত উন্মোচনের জন্য বিশ্বসভায় এসে দাঁড়িয়েছি, অন্যদিকে তেমনি স্বদেশের গণমানসের বিচিত্র মর্মবাণীর রূপায়ণের এবং লোকায়ত জীবন চর্যা আহোরণে আমরা কৃত সংকল্প। একদিকে আকাশের বিচিত্র সৌন্দর্য, অন্যদিকে গৃহাঙ্গনের আকাশ প্রদীপ, এই উভয় ধারার মিলনে আমাদের জাতীয় জীবন আজ স্বদেশমুখীন ও বিশ্বমুখীন।৪

সেলিম আল দীনের রচনা ও নির্দেশনা কর্মের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ভাবনা বিশ্লেষণের প্রয়োজনে তাঁর কালে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে পর্যালোচনা করা যায়। তাঁর বড় হয়ে উঠা পাকিস্তান নামক ধর্মরাষ্ট্রে, যেখানে বাঙালি নানা শোষণ বঞ্চনার মধ্য দিয়ে জাতীয়তাবাদী চেতনায় স্ফূরিত হয়। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ সর্বপ্রথম পাকিস্তান বিরোধী প্রতিবাদী চেতনায় স্নান করে। একই সঙ্গে লিখে রাখা যায় যে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রে বারবার গণতন্ত্র আক্রান্ত হয়েছে সামরিক উর্দিধারীদের হাতে। এরই মাঝে স্বায়ত্ব শাসনের চেতনা৫ রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘ হয়। যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতার পথে পা রাখে। ৭০ এর নির্বাচনে জনগণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার বাঙালি নেতাদের হাতে তুলে দেয়। ফলে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়। কিন্তু ৭৫ পরবর্তী বাংলাদেশ নতুন রাজনৈতিক পথে হাটে। শাসক শ্রেণী চাপিয়ে দিতে চায় ৭১ এ হত্যা করা দ্বিজাতিতত্ত্বের বীজ।৬ যা কি না তৎকালীন রাষ্ট্র ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে রাখার একটি উপাদান। একই সঙ্গে বাঙালি ভাবনার স্বপ্ন ভঙ্গও হতে থাকে।৭ সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখল৮ গণতন্ত্রের চলমানতাকে ক্ষতিগ্রস্থ করে। একই সঙ্গে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের নামে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনও ক্ষতিগ্রস্থ  হলো। মার্কসীয় দৃষ্টিকোণে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের সুযোগ নেই। মার্কসের বন্ধু ভিলহেলম লিবক্লেখট [১৮২৬-১৯০০] এর স্মৃতিকথা থেকে জানা যায় মার্কস রাজনীতিকেই বিজ্ঞান৯ বলে মনে করতেন। রাজনীতি নিজেই যেখানে বিজ্ঞান সেখানে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের বিষয়টি রাজনৈতিক চমক ছাড়া আর কিছু নয়। এটিও পর্যবেক্ষণ করেছেন সেলিম আল দীন।১০

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাঙালির শিল্প সাহিত্যে দেশজ ভাবনার স্ফূরণ ঘটেনি। বরং মুক্ত স্বদেশে তারা যেন পথহীনতায় আবর্তিত হয়েছে। এর পেছনে ক্রিয়াশীল ছিল প্রস্তুতিহীনতা।১১ ধারণা করা যায়, এ কারণেই পাশ্চাত্য আঙ্গিকেই বাংলাদেশের নাট্যচর্চা পুষ্ট হয়েছে। প্রযোজনার ক্ষেত্রে অনুবাদ, রূপান্তর ও বিদেশী ভাবধারায় রচিত নাটকই প্রধান হয়ে উঠেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে সেলিম আল দীনও এর বাইরে নন। নাট্য কৌশলে প্রতীচ্য ধারায় অবগাহন করেছেন। কিন্তু বিষয় বিবেচনায় বাংলাদেশের মানুষের জীবনকে চিত্রায়িত করেন। মার্কসীয় নন্দনবিদের মতে, বিপ্লবী সাহিত্যের মূল উদ্দেশ্যই হলো বিপ্লবের প্রচার।১২ বাংলাদেশের কোনো নাট্যকার এ ধারণা প্রসূত হয়ে নাটককে শ্রেণী সংগ্রামের বাহন করতে চেয়েছেন। সেলিম আল দীন নাটকের পিঠে রাজনৈতিক তত্ত্বের বোঝা চাপিয়ে দিতে চাননি। নাটক ও রাজনীতি বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করেই রচনা করেন, ‘নাটকে সমাজ রাজনীতি থাকবে। কিন্তু কেবল সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যার বাহন হবে নাটক এবং ঐ উদ্দেশ্যে একটি অক্ষম হাত কেবলই নাটক লিখে যাবে- এটা অসহ্য।’১৩ তাঁর রচিত নাটক সমূহে দেখা যায় রাজনৈতিক তত্ত্বের কচকচানি নেই। বরং আছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠির প্রয়োজন মেটাতে যে রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রয়োজন সেই রাজনৈতিক সংগ্রামের আহ্বান। নিজকালের রাজনীতি ও সমাজ ভাবনা বিষয়ে সচেতন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন-

 আবার বৃহৎ একটা গণযুদ্ধে আমরা অংশ গ্রহণ করেছিলাম বলে পৃথিবীকে দেখার, বোঝার এবং স্বদেশের মাটিকে অন্বেষণ করার স্পৃহা আমাদের ছিল। পৃথিবীর সেই রুদ্র মূর্তিটা আমরা দেখেছি- যখন আমাদের মায়েরা, বোনেরা ধর্ষিত হচ্ছিল তখন পুঁজিবাদী দেশগুলো নির্বিকার। আমরা দেখেছি হাসতে হাসতে একটা বাচ্চা ছেলেকে পাথরের উপর আছড়ে মারা হচ্ছে। কী করে একটা গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে। .....আমাদেরটা সাকসেসফুল যুদ্ধ, প্রচুর রক্তক্ষয় এবং প্রচুর মূল্য দিয়ে আমরা স্বাধীন ভূমি অর্জন করেছি। আমাদের ভেতরে বোধটা একটু আলাদা।১৪

অনিকেত অন্বেষণ 

‘অনিকেত অন্বেষণ’ নাটকের কাহিনী আবর্তিত হয়েছে দিল্লির সুলতান মাহমুদ বিন তুঘলককে কেন্দ্র করে। সুলতানের বিরুদ্ধে তার সাম্রাজ্যে বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। এদের দমন করার জন্য তিনি কখনও দৃঢ় আবার কখনও নরম। বিদ্রোহ ঘোষণাকারী বাহাউদ্দিনের জন্য ক্ষমা প্রার্থণা করেন সুলতান পত্নী। তুঘলক জবাব দেন, ‘সস্তা অনুভূতির কথা বলো না। সময় যদি না কাটে তো হীরের মুকুট হাতে নেড়ে দেখ। কিংবা আর কজন বাঁদী চাই বলো।’১৫ এই উদ্ধৃতির মাধ্যমে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা মানুষের মনোভাব তুলে ধরেছেন। একজনের প্রাণ রক্ষার আবেদন সুলতানের কাছে সস্তা অনুভূতি হিসেবে বিবেচ্য। রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যক্তিগত আবেগ ও অনুভূতি মূল্যহীন। জনগণের কল্যাণ অথবা শাসকের ব্যক্তিগত লাভই প্রধান। সুলতান তাই হীরের মুকুট নেড়ে চেড়ে দেখার পরামর্শ দেন, এই স্পর্শ বেগমকে মনে করিয়ে দেবে ক্ষমতা সংশ্লিষ্টতা। রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন সময়ে নানা কৌশল অবলম্বন করা হয়। রাষ্ট্রে উদ্ভূত বিদ্রোহ দমনের জন্য প্রয়োজন অর্থ। অর্থ সংগ্রহের প্রয়োজনে মুদ্রা বদল করা হয়। সুলতান একে যৌক্তিক করেন এই বলে যে, ‘বলেছি সোনা রূপা তামা একটা প্রবল বিশ্বাস মাত্র। তাছাড়া বাস্তব প্রয়োজন দুটোতেই মেটে। আর এই মুহূর্তে আমাদের অর্থ ঘাটতি। এই পন্থাটা বেছে নিলে সহজেই প্রয়োজন মেটে। সৈন্যসংখ্যা ইচ্ছে মতো বাড়ানো যায়।’১৬ অর্থাৎ মুদ্রানীতির সাথে সম্পর্কিত রাষ্ট্রক্ষমতা দখল। সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধি করে বিদ্রোহীদের দমন কৌশল ঠিক করেন সুলতান। যেন তিনি মুদ্রা ও রাষ্ট্রের পারস্পরিক সম্পর্ক ঠিক করে নেন। এটি অনস্বীকার্য যে রাষ্ট্র ও মুদ্রা অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত।১৭

জণ্ডিস ও বিবিধ বেলুন

মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে রচিত ‘জণ্ডিস ও বিবিধ বেলুন’ নাটকে পাওয়া যায় সংকটাপন্ন রাষ্ট্রের ভয়াবহ চিত্র। তাইতো নাটকের তৃতীয় জন বলে, ‘আজকাল জিনিসের দাম শুনে মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকতে হয়। কিন্তু ওই যে কোনো জিনিস কিনলেন- সঙ্গে পেলেন একতোড়া বেলুন- বিনি পয়সায়।১৮ অর্থনীতির সংকটে আপতিত মানুষের জন্য স্বপ্ন নিয়ে আসছে বেলুন। প্রতিবাদী চেতনা যেন স্ফূরিত হতে না পারে সেজন্য বেলুনের স্বপ্ন তাদের সামনে তুলে ধরা হলো। যুদ্ধ বিদ্ধস্ত দেশের ভঙ্গুর আর্থসামাজিক অবস্থাকে সেলিম আল দীন চিত্রায়িত করেন এই ভাবে, ‘চুপ করুন। দেখতে পান না। রাস্তায় ভিখেরী- বেকার বস্তিতে ক্ষুধার আগুন। সহস্র সহস্র মানুষের রক্ত শূণ্যতা।১৯ নির্যাতিত জনগণের কথা বলতে গিয়ে নাট্যকার বাংলাদেশের ভৌগলিক গণ্ডি ছাড়িয়ে ভিয়েতনামের কথাও বলেছেন। ভিয়েতনামের জনগণ এ সময় মার্কিন সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়ছিল। নাটকে রচিত হয়, ‘চমৎকার হবে। ভিয়েতনামে বোমা বর্ষণ- নিহতের সংখ্যা ১০০ এবং তারপরই রেডক্রস রিলিফ হা হা হা।’২০ এক গভীর অনুসন্ধানী চোখে তথ্য ও ক্রিয়া সংঘটিত হবার ফলাফল তুলে আনেন। সে সূত্রে রচনা করেন, ‘মিস ওয়ার্ল্ড কোনো ভিয়েতনামে যায়? গণহত্যার যোগান দিতে?’২১  নির্যাতিত মানুষের বেদনা যেন বৈশ্বিক। উপনিবেশিক শক্তির হাত ক্ষমতা দখলে লিপ্ত। কিন্তু তাতে আশা থামে না। তাইতো তিনি লিখেন, ‘...আমরা আশা করবো এবার বিশ্বে শান্তির পথ প্রশস্ত হবে। আমরা জানি ইউরোপের ক্ষুধিত হাত আফ্রিকার কালো মানুষের রক্তে এক গভীর অসুখ ঢেলেছে।’২২  

নীল শয়তান তাহিতি ইত্যাদি

একজন আমলা তার নিয়মবদ্ধ কাজের বাইরে যেতে চান। তিনি খুঁজে ফেরেন স্বপ্নের সমুদ্র ভ্রমণ। এ কারণেই সাগর ভ্রমণের বই পড়া, আড্ডায় বসে যাওয়া চলে। এরপরই আবার ফিরে যান চিরায়ত আমলার কাজে। আমলাতন্ত্রের বিধিবদ্ধ জীবন, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এসবই এ নাটকের মূল উপজীব্য। উল্লেখ জরুরি, রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যঙ্গ আমলাতন্ত্র। সরকারের সফলতার অনেকখানি নির্ভর করে দক্ষ ও দেশপ্রেমিক আমলাতন্ত্রের উপর। এই নাটকে দেখা যায়, বিধিবদ্ধ কাজে ব্যস্ত আমলা। মানবমঙ্গলের জন্য কোনো কর্মপন্থা তৈরি করে না।

এক্সপ্লোসিভ ও মূল সমস্যা

একটি বোমা বিস্ফোরণের গল্প নিয়ে রচিত নাটকে সমকালকে চিত্রিত করা হয়েছে। নাটকের চরিত্র ফারুক বলে, ‘আর কী! বাংলাদেশের সব জিনিসই এখন আন্ডার গ্রাউন্ডে। সারাদিন রোদে ঘামে শাওয়ার করে তবে মিলছে।’২৩ একটা বড় বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য এই দল নানাভাবে বোমার উপকরণ সংগ্রহ করে। কিন্তু এক্সপ্লোসিভের কারণে বোমা বিস্ফোরিত হয় না। কেননা এগুলো খাঁটি নয়। সে বেদনায় ফারুক বলে, ‘অসহায় প্রলেতারিয়েত! কে কবে ফিরে তাকিয়েছে।’২৪

সর্প বিষয়ক গল্প

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে অন্ধকারময় ঘটনা সপরিবারে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হত্যা। তাঁর এই হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক ভাবনা পরিবর্তনের কাজটি সাধিত হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পরই সাড়ে তিন বছরের সরকার নানা জটিলতা ও সংকটের মধ্য দিয়ে আবর্তিত হয়। ৭২এর রাজনৈতিক অবস্থার মধ্যেই সেলিম আল দীন রচনা করেন ৭৫-এর পরিস্থিতির। তাইতো ফর্হাদের স্ত্রী বলে, ‘এখনকার লোকগুলো যে কী- সে আমার দেখা গেছে। লোকটা যখন মিছিলে যেত- পেছনে হাজার হাজার লোক- অথচ জানাযায় তো ছ’জনের বেশি যায়নি।’২৫ নেতার মৃত্যুর সাথে উঠতি পুঁজিপতিদের যোগ পাওয়া যায়। জাতীয়তাবাদী নেতার অর্থনৈতিক সংগ্রামের সাথে ব্যবসায়ীদের যোগ কম। ফর্হাদ যেন সে ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি, তিনি বলেন, ‘...দেশী মালের কারখানা বন্ধ। অথচ বিদেশী মাল বয়কট। নেতার কথায় চললে তো ব্যবসা চলে না। রাজনীতি দিয়ে আমাদের কি?’ ২৬ নেতার এই হত্যাকে যৌক্তিক করে তুলেন ফর্হাদ তার সংলাপে, ‘মিছেমিছি খুন করবে কেন। কোন একটা কারণ ছিল। এদিকে শহরের লোকজন যেভাবে ক্ষেপে উঠেছিল। ব্যবসা মাটি হয় আর কি।- এখন তবু চলছে ভালো।’২৭ কিন্তু সব ভাবনাই এক পথে অগ্রসর হয়নি। কেননা সেলিম আল দীন ইস্যুকে প্রধান করে তোলেননি। তাঁর নাটকে ঘটনার কার্যকারণ অন্বিষ্ট সামাজিক অবস্থা, রাষ্ট্রকাঠামো এবং অর্থনীতির সঙ্গে। নেতার মৃত্যুর প্রতিক্রিয়া সব জায়গায় এক রকম নয়। ফর্হাদ নেতার হত্যাকে যৌক্তিক মনে করলেও তার স্ত্রীর ভাবনা বিপ্রতীপ। তার মতে, ‘যাই বলো না কেনো- ঘুমের মধ্যে ওভাবে কাউকে মেরে ফেলা।’২৮ তবে ফর্হাদের বন্ধু কলিম রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী সময়ে নাগরিক মানুষের মানসিক অবস্থাকে ব্যক্ত করে, ‘আসলে কোনো না কোনোভাবে শহরে এখন আর শান্তি নেই।- নেতা মরবার পর থেকে আমার একটুও ভালো ঘুম হয়নি। তাঁর গুলি খাওয়া লাশটা দেখেছিলাম [দেয়ালের দিকে তাকিয়ে]- ছবিটা নামিয়ে ফেললেন। তাই না?’২৯ নিহত নেতার জন্য শোকে মূহ্যমান, শোকের প্রধান কারণ হত্যাকা-। একটি অস্বাভাবিক মৃত্যু যন্ত্রণা। এর সমান্তরালে পাওয়া যায় নেতার ছবিহীন দেয়াল।

সেলিম আল দীনের কাছে রাজনীতি মানে শ্লোগান সর্বস্বতা নয়। বরং অর্থনীতি , সামাজিক অবস্থা, রাজনৈতিক ভাবনা সকলের অন্বয়। সুন্দরবনের বাওয়ালীদের জীবনও তাঁর নাট্যবিষয় হিসেবে বিচার্য। তাঁর নাট্য ভাবনায় রাজনীতির অবস্থান অনুসন্ধানে তাঁর উদ্ধৃতির আশ্রয় নেয়া গেল, ‘শিকড়হীন রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ও সমাজতাত্ত্বিকরা কি করছেন আমরা তার থোড়াই তোয়াক্কা করি। আমরা চাই- বাংলাদেশের মঞ্চ ও বাংলাদেশের রাস্তাগুলো নিজস্ব ভঙ্গিতে নেচে উঠুক।’৩০

মুনতাসীর

১৯৭৬ সালে রচিত হয় মুনতাসীর। এ নাটকে দেখা যায় ব্যবসায়ী কেমন করে খাদক হয়ে উঠে। নাটকের শুরুতে প্লাকার্ডে লেখা থাকে, ‘তুমুল শ্রমিক আন্দোলনের মুখে পাঁচদিন উন্নিদ্র থেকে ক্রুদ্ধ শিল্পপতি জনাব মুনতাসীর খুব ভোরে চিৎকার করে বললেন ইতিহাস ও হাঙরের দাঁতের শপথ আমি আজ সবকিছু খাবো।’৩১ স্বাধীনতার পর পরই জাতীয়করণ কর্মসূচী ঘোষণা করে তৎকালীন সরকার। জাতীয় করণের ফলে কোথাও কোথাও ব্যক্তি মালিকানাধীন সম্পত্তি বদলে রাষ্ট্রের সম্পদে পরিণত হয়। ৭৫ পরবর্তী বাজার অর্থনীতির পুনঃপ্রচলনের কারণে রাষ্ট্রীয় সম্পদ পুনরায় ব্যক্তি মালিকানায় পরিণত হয়। সম্পদ গলাধকরণের প্রচেষ্টা সম্পর্কে জানা যায় মুনতাসীরের সংলাপে, ‘আচ্ছা আমি কি খাচ্ছি, এখন। মৃত্যুক্ষুধা-মহামারী-ক্যান্ডি-চকলেট-ন্যাশনালাইজেশন-চুইংগাম-প্রাইভেট সেক্টর।’৩২ বিরাষ্ট্রীয়করণ কর্মসূচীর বিরুদ্ধে শ্লোগান তোলেননি বরং উঠতি শিল্পপতিদের লুটপাটের চিত্র তুলে ধরেন। এই প্রক্রিয়াকে শিল্প সম্মতভাবে উপস্থাপনই প্রধান করে নিয়েছেন। রাজনৈতিক শ্লোগানের আড়ালে একে উদ্দেশ্যমূলক করে তোলেননি। একে মার্কসবাদী নন্দনতাত্ত্বিকের দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা করা যায় এভাবে যে, ‘মার্কস সমাজের বস্তুভিত্তি ও অর্থনীতিকে শিল্পসাহিত্যের ক্ষেত্রে skeleton’ বলেছেন, দেহ নয়। দেহে skeletonটা নিঃসন্দেহে প্রধান বস্তু, কিন্তু সেটাই সব নয়।’৩৩ সমাজকে তিনি চিত্রিত করতে চেয়েছেন তবে তা করতে গিয়ে উদ্দেশ্যবাদী হয়ে ওঠেননি। বরং সামাজিক মানুষের তথা গণের [যাকে বলা হয় Peoples] ভাবনাকেই উপজীব্য করেছেন। সেলিম আল দীনের মূল অভিপ্রায় সামাজিক মানুষের বিশ্লেষণ। প্রচলিত সমাজের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিজাত উপস্থাপন হয়। সে কারণে রাজনৈতিক শ্লোগানের চেয়ে এর অভ্যন্তরীণ অভিপ্রায়কে তুলে এনেছেন। জামার মাপ নিতে আসা দর্জিকে মুনতাসীর বলেন, ‘সত্যি করে বলো তোমরা কারা দরজি না মার্কসিস্ট।’ ৩৪

শকুন্তলা

দেবতা ও মানুষের লড়াইকে উপজীব্য করা হয়েছে শকুন্তলা নাটকে। প্রাচীন মিথের কাছে তিনি আত্মসমর্পন করেননি বরং সমকালীন ভাবনায় তাকে বিশ্লেষণ করেছেন। নাটকটি প্রাচীন ফসিল হিসেবে উপস্থাপিত হয়নি। এটি একই সঙ্গে প্রাচীন সাহিত্যের আধুনিক সমাজ ভাবনাজাত বিশ্লেষণ হয়ে উঠেছে। মাও সেতুং এর ইয়েনেন ভাষণ উদ্ধৃত করা যেতে পারে যেখানে তিনি বলেন, ‘প্রাচীন ও বিদেশী সাহিত্যকে নির্বিচারে গ্রহণ করা ও নকল করা হলো সাহিত্য ও শিল্পে সর্বাধিক বন্ধ্যা ও ক্ষতিকর গোঁড়ামীবাদ।’৩৫ প্রাচীন সাহিত্যের অন্ধ অনুসরণের মধ্য দিয়ে পশ্চাতের দিকেই দৃষ্টিপাত হয়। বিশ্লেষণ প্রবণতা হ্রাস পায় অথচ সমকালের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে প্রাচীন সাহিত্যকে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। শকুন্তলা নাটকে মিথকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন। শকুন্তলার বেদনা তখন মানবজন্মের কষ্ট ও ক্লেদের বেদনা। একই সঙ্গে সংঘাত কৌশলও জানা যায় সেখানে জয়ী হবার জন্য ইন্দ্রসহ স্বর্গের দেবতারা নানা কূট কৌশল করেন। রাষ্ট্রগত অবস্থান থেকে প্রথম বিশ্ব [First World] এর ক্ষমতাবানরা কেমন করে তৃতীয় বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করে সেটিও এ নাট্যের অভ্যন্তরে পাওয়া যায়। বিশ্বামিত্র সেন তৃতীয় বিশ্বের জাতীয়তাবাদী নেতা, যাকে পরাস্ত করার মধ্য দিয়ে লক্ষ্য সাধন সম্ভবপর। তাইতো ইন্দ্র বলে, ‘...শুধু স্বর্গই নয়- এই নদী কৌশিকীও বিশ্বমিত্রের মন্ত্রের বলে মন্দাকিনীর মতো অক্ষয়বহো হবে। আর তা হলে মানুষের কাছে দেবতারা হবে হাস্যকর। আজ তাই গোপন যুদ্ধ স্বর্গের সঙ্গে পৃথিবীর। তাই বিশ্বমিত্রের বিরুদ্ধে আমরা একতাবদ্ধ।’৩৬

কেরামতমঙ্গল

কেরামতমঙ্গল নাটক সম্পর্কে ড. আফসার আহমদ রচনা করেন, ‘১৯৪৬ থেকে শুরু করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী জনপদের মূল্যবোধের অবক্ষয় কাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ের ব্যবচ্ছেদ হয়েছে কেরামতমঙ্গল নাটকে।’৩৭ এই দীর্ঘ জীবনচিত্রের বর্ণনায় পাওয়া যায় সমাজের নিচুতলার মানুষের জীবন ও জীবিকার সংগ্রামচিত্র। সেখানে তার ভাবনা অবর্তিত হয় স্থানীয় জনজীবনকে কেন্দ্র করে। আমদানীকৃত রাজনৈতিক ভাবনায় অবগাহন করেন না । বরং সামাজিক মানুষ তার প্রয়োজনেই প্রতিবাদ করে, বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। এর উল্লেখযোগ্য প্রমাণ হাজং খণ্ড। পাকিস্তানী পুলিশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে হাজংরা। জেলে যায় কেরামত। ১৯৫৮ সালে মার্শাল ল এর মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন আইয়ুব খান। সে সময় প্রচুর রাজনীতিবিদকে আটক করা হয়। আজমত ডাক্তার আর রাজনীতিবিদের কথোপকথনের মধ্য দিয়ে সামরিক রাষ্ট্র বিষয়ক ধারণার বিপরীতে জনগণের চিন্তন পাওয়া যায়। এই কথোপকথন নিম্নরূপ-

রাজনীতিবিদ
রাজনীতি করি দশ বছর-তা ছাড়া আমি ঢাকার ফাসকেলাস কনট্রাকটর। এই জঘন্য হাজত ঘরে আমাকে আটকে রাখাটা কত বড় অন্যায়। বাপ রে বাপ কী মার্শাল ল। আমাদের রাস্তা ঘাট পানা পুকুর রাতারাতি সাফ। সাধে কি বলে পাকিস্তানের মিলিটারিরা পৃথিবীর সেরা। - দেখুন তো আমার পালস্।

আজমত
নিচ্চয় সেরা। কিন্তুক যুদ্দু বাদ দিয়া মিলিটারিরা যুদি আবর্জনা রাস্তাঘাট সাফ শুরু করে- তয় নিচ্চিত অওন ভালা যে কপালে দুকখ আছে আমাগো।৩৮

সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখল পরবর্তী সংকট বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে দেখা গেছে। একই সঙ্গে সামরিক বাহিনীর দায়িত্ব পালন সম্পর্কে তিনি সচেতন।

সেলিম আল দীন জাতীয়তাবাদী নাট্যকার। তাঁর রচনায় বাংলাদেশের জনমানুষের চিত্রই অঙ্কিত হয়েছে। ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট পাওয়া যায় কেরামতের সংলাপে। সে বলে, ‘পাকিস্তান ভাঙবো কি- আজমত সারে কয় খোদ জেন্না সাবেই মালটারে দুই টুইকরা কইরা রাখছে গিলা কলিজা ভাগাভাগি- হে হে। আর দেরী না -গরিলা হয়া যামু।’৩৯
 
কেরামতমঙ্গলে বাঙালির স্বাধীকার আন্দোলনের প্রসঙ্গ যেমন আছে তেমনি স্বাধীনতার পর পরই স্বপ্নভঙ্গের বেদনাও চিত্রিত হয়। মুক্তিযোদ্ধা রফিকের সংলাপ যেন যুদ্ধপরবর্তী মুক্তিযোদ্ধাদের ভাষ্য হয়ে উঠে-

আমার ঠাঙের ঘাও এর মধ্যে নালি অইছে। আবার ঢাকা গিয়া হাসপাতালে ভর্তি হওন লাগবো। হারাটা দিন ঘুরছি। এট্টা পয়সা ধার পাইলাম না- মজলিশরা মশকরা কইরা কয় তোমার আবার টেকার অভাব কী। জমি গিরাপি করবার চাইলাম, মানুষ কয় মুক্তির জমি গিরাপী নুইয়া কি জেল ফাঁস খামু।৪০

সেলিম আল দীনের রাজনৈতিক ভাবনায় নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের তত্ত্ব উপস্থাপন নয়। বরং আপন অভিজ্ঞতার অধিষ্ঠানে বাস্তব পৃথিবীর পথে চলা। প্রাসঙ্গিক ভাবে মাও সেতুংয়ের বক্তব্য উদ্ধৃত করা যেতে পারে সেখানে তিনি স্পষ্টই বলেছেন, ‘আমরা যুগপৎভাবে বিরোধীতা করি, ভুল রাজনৈতিক দৃষ্টি সম্পন্ন সাহিত্য সৃষ্টির প্রবণতার এবং প্রচারপত্র ও শ্লোগান সর্বস্ব রীতিতে রচনা করার প্রবণতার- যা রাজনৈতিক ভাবে সঠিক হলেও শৈল্পিক ক্ষমতা বর্জিত।৪১ সেলিম আল দীনের রচনা রাজনৈতিক তত্ত্বের ভারে ভারাক্রান্ত নয় বরং এর অন্তস্রোতে সুগভীর রাজনীতি বহমান। সেখানে প্রচলিত রাষ্ট্র কাঠামো নয় এক নতুনতর রাষ্ট্র ভাবনায় তিনি উপনীত হতে চান। রাষ্ট্র তার কাছে একটা ভৌগলিক সীমানা নয়। এর বাইরে অধিকতর কিছু। সেখানে মাঙ্গলিক শব্দাবলী উচ্চারিত হবার পাশে প্রয়োগও ঘটে।  জনগণকে শাসন করা রাষ্ট্রের কাজ নয় বরং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কল্যাণ সাধনে সে ব্যাপৃত থাকবে। কিন্তু বর্তমান সময়ের রাষ্ট্রকাঠামো এমন নয়, বিশ্বব্যবস্থায় কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের প্রচলন হয়নি। রাষ্ট্র সকল সময়েই নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত। নিমজ্জন নাটকে তিনি রচনা করেন-

রাষ্ট্র রাষ্ট্রের শক্তির সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে আবার সীমান্ত রেখার ভেতর সার্বভৌমত্ত্বের আস্ফালনে *জনগণের মেরুদ-ে ক্ষুর চালিয়ে দিচ্ছে* তাছাড়া সামরিক শাসকরা নানাস্থানে তাঁদের সুবর্ণ পোশাকে ফানুস ও উর্দির ঘুড়ি উড়াচ্ছেন।’৪২
রাষ্ট্রের কাঠামোগত এই বেদনাই যেন তাঁর প্রথম পর্বের নাটকগুলোর সঙ্গী হয়েছে। ক্রম বিকাশের মধ্য দিয়ে ভাবনাটির সংহত রূপ লাভ হয়। বাংলাদেশে দেখা গেছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলি কখনও দৃঢ় হয়নি। তাইতো নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে রাজনীতিবিদরা নির্বাচন কমিশনের উপর আস্থাহীনতায় ভোগেন। ১৯৯১ সালের পর থেকে একটি অনির্বাচিত সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যা কি না রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনের দৌর্বল্য। রাষ্ট্রের দুর্বল কাঠামো থেকেই তিনি নিমজ্জন নাটকে রচনা করেন, ‘কিছু রাষ্ট্র গুবরে পোকার ডানা লাগিয়ে হাটছে। বিশ্ব মানচিত্রের ভেতর একটা খোড়ল খুঁজছে পালাবার জন্য।’৪৩
 
সেলিম আল দীন রচিত নাটক সমূহের অন্তঃস্রোতে যে রাজনীতি বা রাষ্ট্রভাবনা তা সমাজের নিম্নবর্গের জনগোষ্ঠীর। তার পাশাপাশি নানা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের আভরণে যে সভ্যতার সাথে আমাদের সম্পর্ক সে সভ্যতার সংকট। তার রাজনৈতিক ভাবনা অনেক বেশী স্পষ্ট হয়ে উঠে নিমজ্জন নাটকে। কথাপুচ্ছে তিনি রচনা করেন-
 
নিমজ্জন বিশেষ কোনো একটি দেশ বা নগরকে নির্দিষ্ট করে রচিত নয়। সামগ্রিক অর্থে মানবসৃষ্ট সভ্যতা * বিশেষত বর্তমান সঙ্কটকূল বিশ্বকে এ কাব্যে নগররূপে দেখতে চেয়েছি। তবে এটি কোনো অর্থেই রূপক নয়। কারণ ইতিহাস* ভূগোল* রাজনীতি* সাহিত্য* চিত্রকলা* সমাজ* প্রত্মতত্ত্বের বাস্তব প্রসঙ্গসমূহ এ কাব্যের অন্তর্গত। আমার মনে  হয়েছে মানুষ যেন তার অমৃত গন্তব্যে পৌছাবার পথটি রূদ্ধ করে না দেয়।’৪৪

বাস্তব সমাজকে চিত্রিত করতে গিয়েই তিনি একটি রাজনৈতিক ভাবনায় অবগাহন করেছেন। রাজনৈতিক ভাবনাজাত হয়ে শিল্প সৃষ্টির চেষ্টা করেননি। বাস্তব সমাজই যেন রাজনৈতিক তত্ত্বের ভিত্তি ভূমি হয়ে উঠেছে। এখানেই সেলিম আল দীন একক এবং বিশেষ হয়ে উঠেন। তার নাটকের বিষয় ও আঙ্গিক বিশ্লেষণে লেখা যায়, বি-উপনিবেশিকরণ চিন্তাজাত হয়ে তার নাট্য দেশজ রাজনীতির অলিগলি সন্ধান করার পাশাপাশি বিশ্বরাজনীতির দলিল হয়ে উঠে।

টীকা ও তথ্য নির্দেশ
১.    চাকাকে সেলিম আল দীন কথানাট্য বলেছেন। নাট্যগ্রন্থের কথাপুচ্ছে সেলিম আল দীন রচনা করেন, ‘আমি কথার শাসনে নাটক রচনা করেছি তাই এর নাম দিয়েছি কথানাট্য।’  আফসার আহমদ, মঞ্চের ট্রিলোজি ও অন্যান্য প্রবন্ধ, গ্রন্থিক, ৫০ পুরানা পল্টন লাইন, ঢাকা-১০০০, ফেব্রুয়ারি ১৯৯২, পৃ:৭১
২.    গোলাম শফিক, সেলিম আল দীন : রাষ্ট্রচিন্তা ও অন্যান্য প্রসঙ্গ, থিয়েটার, সম্পা: রামেন্দু মজুমদার , বাড়ি ১০৩, রোড ২৫এ, বনানী, ঢাকা, ৩৭তম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, মে ২০০৮ খৃষ্টাব্দ, পৃ:১১৫
৩.    একুশের নির্বাচিত প্রবন্ধ [১৯৬৩-১৯৭৬], সংকলন ও সম্পাদনা : মোবারক হোসেন, বাংলা একাডেমী, রমনা ঢাকা-১০০০, জুন-১৯৯৫ খৃষ্টাব্দ, পৃ:৩০৬
৪.    পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার কিছুকাল থেকেই আওয়ামী লীগ এবং ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির নেতৃত্বে পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসনের জন্য অব্যাহত আন্দোলন হয়েছে। ১৯৬৫-র পাক ভারত যুদ্ধের পর জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে লাহোরে অনুষ্ঠিত গোল টেবিল বৈঠকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা অংশগ্রহণ করেন। সেই বৈঠকে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান আঞ্চলিক স্বায়ত্ব শাসনের লক্ষ্যে একটি ’ছয়দফা’ কর্মসূচী পেশ করেন। -সৈয়দ আবুল মকসুদ, বিশ শতকের বাংলাদেশঃ রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও রাষ্ট্রচিন্তার ক্রমবিকাশ, একুশের প্রবন্ধ, সংকলন উপবিভাগ, বাংলা একাডেমী, রমনা, ঢাকা-১০০০, জুন ২০০০ খৃষ্টাব্দ, পৃ: ৪৩
৫.    ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধু নিহত হবার পর থেকে এদেশের রাজনীতিতে একটি গুনগত পরিবর্তন আসে : একটি মুসলিম জাতীয়তাবাদী চেতনা আবার জেগে ওঠে। বহুদিন দেশের মানুষ আবার সামরিক শাসনের মধ্যে অতিবাহিত করে। রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্র। প্রাগুক্ত, পৃ: ৪৪
৬.    বাঙালি চেয়েছিল গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা- এই সময়ে সে পেল সামরিক শাসন, সে চেয়েছিল শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা- এই সময়ে সে পেলো বৈষম্যমূলক পুঁজিবাদী ব্যবস্থা, সে চেয়েছিল একটি উন্নত সংস্কৃতি এবং ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার অবসান- সে আক্রান্ত হলো মৌলবাদী ধর্মন্ধতায়। প্রাগুক্ত, পৃ: ৪৪
৭.    ৭৫-এর ১৫ই আগস্টের সামরিক অভ্যূত্থানের পর আরো দুটো সামরিক অভ্যূত্থান একই বছর কয়েক মাসের ব্যবধানে সংঘটিত হয়। এই সামরিক অভ্যূত্থানে রাজনীতিবিদসহ সেনাবাহিনীর প্রচুর সদস্য মৃত্যবরণ করেন। একই সঙ্গে সামরিক অভ্যূত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখলকারী রাষ্ট্রপ্রধান  জিয়াউর রহমান মৃত্যুবরণ করেন। ৭৫ থেকে ৯০ পর্যন্ত সুদীর্ঘ কাল সামরিক বাহিনীর প্রধানরা প্রতক্ষ্য ও পরোক্ষ ভাবে দেশ পরিচালনা করেছেন।
৮.    রাজনীতিকে মার্কস বিজ্ঞান হিসেবে গণ্য করতেন। শুঁড়ির দোকানের রাজনীতির ব্যাখ্যা ও রাজনীতি নিয়ে হৈ হল্লা ছিল তাঁর অশ্রদ্ধার বস্তু। বস্তুত, এই শেষোক্ত জাতের রাজনীতির চেয়ে অর্থহীন আর কিছু কি কল্পনা করা যায়? ইতিহাস হল গিয়ে মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে সক্রিয় সকল শক্তির, মানবিক চিন্তা, মানবিক আবেগও মানব প্রয়োজনের সৃষ্ট ফল। কিন্তু তত্ত্ব হিসেবে রাজনীতি হলো ’সময়ের চরকা’য় বোনা হচ্ছে এমন লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি উপাদান সম্পর্কিত জ্ঞান এবং প্রয়োগনীতি হিসেবে তা হল এই জ্ঞানভিত্তিক ক্রিয়াকর্ম। ফলত রাজনীতি হল বিজ্ঞান এবং এক ফলিত বিজ্ঞান।
৯.    ভিলহেলম লিবক্লেখট, মার্কসের কথা, মার্কস এঙ্গেলস স্মৃতি, অনুবাদ: মঙ্গলাচরণ চট্টপাধ্যায়, প্রগতি প্রকাশন, সোভিয়েত ইউনিয়ন, ১৯৭৬ খৃষ্টাব্দ, পৃ: ৭৯
১০.    ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় সেলিম আল দীন এমন ভাবনার কথা জানিয়েছিলেন।
১১.    ১৯৭১এর সার্বিক তোলপাড় ও নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশ আত্মপ্রকাশ করলো তখন দেশের বুদ্ধিজীবী মহল সংস্কৃতির একটি মৌল দিগদর্শন দেয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। বস্তুত স্বাধীনতা আকাঙ্খিত হলেও ছিল অপ্রত্যাশিত ভাবে দ্রুত ও আকস্মিক। অপ্রস্তুত শিল্পীমহল একটি নবজাগ্রত গর্বিত জাতির আত্মোপলোব্ধিকে চিত্রে ও ভাস্কর্যে রূপায়নের জন্য আত্মিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন না। আবুল মনসুর, শিল্পী, দর্শক, সমালোচক, মুক্তধারা, ৭৪ ফরাসগঞ্জ, ঢাকা-১০০০, ৫ ফাগুন, ১৩৯৩ বঙ্গাব্দ, পৃ: ১০০
১২.    সত্য বন্দোপাধ্যায়, আমাদের থিয়েটার মার্কসবাদ ও নন্দনতত্ত্ব, সম্পাদনা: শ্রী সুহাস চট্টোপাধ্যায়, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, নভেম্বর ১৯৯০ খৃষ্টাব্দ, পৃ: ১৬৩
১৩.    সেলিম আল দীন, সমকালীন নাট্যচর্চা বিষয়ে, সেলিম আল দীন রচনাসমগ্র ১, সম্পাদনা: সাইমন জাকারিয়া, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, প্রকাশকাল: ২০০৬, পৃ: ৩৭১
১৪.    মাহবুব মোর্শেদ, সেলিম আল দীন: সফল নাট্যকার ও শিক্ষকের বিদায়, থিয়েটার, সম্পাদনা: রামেন্দু মজুমদার, বাড়ি ১০৩, রোড ২৫এ, বনানী, ঢাকা, ৩৭৩তম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, মে ২০০৮ খৃষ্টাব্দ, পৃ: ১১০
১৫.    সেলিম আল দীন, অনিকেত অন্বেষণ, সেলিম আল দীন রচনা সমগ্র ১, সম্পাদনা: সাইমন জাকারিয়া, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, ২০০৬ খৃষ্টাব্দ, পৃ: ৪০
১৬.    প্রাগুক্ত, পৃ: ৪১
১৭.    মুদ্রা তৈয়ারী রাষ্ট্রের কার্য। জাতীয় মুদ্রা এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রার বিভিন্নতা হইতে ইহাই প্রতীয়মান হয় যে পণ্য চলাচলের গন্ডী দুই রকম- জাতীয় ও আন্তর্জাতিক। কার্ল মার্কস, ক্যাপিটেল, সার সংক্ষেপ: রেবতী বর্মণ, চলন্তিকা বইঘর, ১৪ বাংলা বাজার, ঢাকা- ১, বৈশাখ ১৩৯২ বঙ্গাব্দ, পৃ: ৩২
১৮.    সেলিম আল দীন, জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন, সেলিম আল দীন রচনা সমগ্র ১, সংকলন ও সম্পাদনা: সাইমন জাকারিয়া, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, প্রকাশকাল: ২০০৬, পৃ: ৭২
১৯.    প্রাগুক্ত, পৃ: ৭৪
২০.    প্রাগুক্ত, পৃ: ৮১
২১.    প্রাগুক্ত, পৃ: ৮৩
২২.    প্রাগুক্ত, পৃ: ৭৭
২৩.    সেলিম আল দীন, এক্সপ্লোসিভ ও মূল সমস্যা, প্রাগুক্ত, পৃ: ১০২
২৪.    প্রাগুক্ত, পৃ: ১০৫
২৫.    প্রাগুক্ত, পৃ: ১২৯
২৬.    প্রাগুক্ত, পৃ: ১২৬
২৭.    প্রাগুক্ত, পৃ: ১২৯
২৮.    প্রাগুক্ত, পৃ: ১২৯
২৯.    প্রাগুক্ত, পৃ: ১৩২
৩০.    প্রাগুক্ত, পৃ: ৩৭২
৩১.    সেলিম আল দীন, মুনতাসীর, সেলিম আল দীন রচনা সমগ্র ২, সংকলন ও সম্পাদনা: সাইমন জাকারিয়া, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, প্রকাশকাল: মার্চ ২০০৬ খৃষ্টাব্দ, পৃ: ১৩
৩২.    প্রাগুক্ত, পৃ: ২৩
৩৩.    বিমল কুমার মুখোপাধ্যায়, মার্কসীয় নন্দনতত্ত্ব: মূল সূত্রের সন্ধানে, মার্কসবাদ ও নন্দনতত্ত্ব, সম্পাদনা: শ্রী সুহাস চট্টোপাধ্যায়, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, নভে: ৯০, পৃ: ৫০
৩৪.    সেলিম আল দীন রচনা সমগ্র ২, পৃ: ২৫
৩৫.    মাও সেতুং, সাহিত্য শিল্পকলা সম্পর্কে ইয়েনেনের আলোচনা সভায় প্রদত্ত ভাষণ: মে ১৯৪২, মার্কস ও মার্কসবাদীদের সাহিত্যচিন্তা, সংকলন ও অনুবাদ: সাঈদ-উর রহমান, একাডেমিক পাবলিশার্স, ১৯৮৫ খৃষ্টাব্দ, পৃ: ১০৯
৩৬.    সেলিম আল দীন রচনা সমগ্র ২, পৃ: ৫০
৩৭.    আফসার আহমদ, মঞ্চের ট্রিলোজি, মঞ্চের ট্রিলোজি ও অন্যান্য প্রবন্ধ, গ্রন্থিক, ফেব্রুয়ারী ১৯৯২ খৃষ্টাব্দ, ৫০ পুরানা পল্টন লাইন, পৃ: ৮৬
৩৮.    সেলিম আল দীন রচনা সমগ্র ২, পৃ: ২৬৭
৩৯.    প্রাগুক্ত, পৃ: ২৭৭
৪০.    প্রাগুক্ত, পৃ: ২৯৩-২৯৪
৪১.    মাও সেতুং, পৃ: ১১৮
৪২.    সেলিম আল দীন, নিমজ্জন, ক্রান্তিক, ১৬৬ বিশ্ববিদ্যালয় মার্কেট, কাটাবন, ঢাকা, ফেব্রুয়ারী ২০০৩ খৃষ্টাব্দ, পৃ: ১৩
৪৩.    প্রাগুক্ত, পৃ: ১৩
৪৪.    প্রাগুক্ত, পৃ: ১৮৮

মুহাম্মদ কামাল উদ্দীন : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যতত্বে গবেষণারত শিক্ষার্থী