Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

বাঙালির নাট্যচর্চা ও রবীন্দ্রনাথের নাটক

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

‘সমস্ত দিক বিবেচনা করে আমি একটা থিয়েটার হল তৈরির সিদ্ধান্ত নিলাম’ এই উক্তিটি একজন রুশ শিল্পী গেরাসিম (হেরাসিম) স্তেপানোভিচ লেবেদেফ এর। কোলকাতার কেন্দ্রের ২৫ নং ডোমতলায় জগন্নাথ গাঙ্গুলীর বাড়ি ভাড়া নেওয়া হলো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য। তাঁরই নক্সা এবং পরিকল্পনায় বাড়ীটি রুপান্তরিত হলো থিয়েটার হল এ। যার নাম দেয়া হলো ‘বেঙ্গলী থিয়েটার’। একদিকে যখন এই থিয়েটার তৈরীর কাজ চলছিল, অন্যদিকে সংস্কৃত পণ্ডিত গোলক নাথ দাশ, যিনি লেবেদেফকে উৎসাহিত করেছিলেন তাঁরই (লেবেদেফ) অনূদিত নাটক দুটির মঞ্চায়ণে- নেমে পড়লেন অভিনেতা অভিনেত্রী যোগাড় করতে। মাত্র তিন মাসে প্রেক্ষাগৃহ ও প্রযোজনা দুই-ই তৈরি। প্রথমে ‘দ্য ডিজগাইজ’ ‘কাল্পনিক সং-বদল’। এই নাটকে লেবেদেফ যোগ করেছিলেন তাঁর প্রিয় কবি ভারতচন্দ্রের কিছু কবিতা এবং ‘বিদ্যাসুন্দর’ পালার কিছু গান। গায়ক, বাদক, নর্তকদের উপস্থিতিতে, বারবার নাচ গান, রঙ্গরসের পসরা নিয়ে তিনি সাজিয়েছিলেন এ নাটককে সাধারণ বাঙ্গালি দর্শক শ্রোতাদের উপভোগ্য করে। ১৭৯৫ সালের ২৭ নভেম্বর মঞ্চস্থ হলো এই নাটক, তারপর ১৯৭৬ সালের ২১ মার্চ। দুটি প্রদর্শনীতেই দর্শক যেন উপচে পড়েছিল। এ নাটকের পূর্ব বিজ্ঞপ্তিতে তাঁর নতুন থিয়েটার সর্ম্পকে লেবেদেফ লিখেছিলেন- `Decorated in the Bangalee style` বিজ্ঞাপনে এ কথারও প্রকাশ ছিলো `The works of much admired poet shree Bharot Chandra Ray, are set to music`। দুই নাট্য ধারার ও সংস্কৃতির মিলনের জন্য লেবেদেফের ঔদার্য ও শৈল্পিক সমন্বয়ের ক্ষমতা আমাদের স্পর্শ করে। এরপরের ঘটনা বড়ই করুণ এবং মর্মান্তিক। মাত্র দেড় বছরের মাথায় চর্তুদিক থেকে আসা আক্রমণে বিপর্যস্ত লেবেদেফ, নিজের হাতে গড়া বেঙ্গলী থিয়েটারকে পার্থিব অস্তিত্ব থেকে টেনে নামিয়ে, ভেঙ্গে চুরমার করে ইতিহাসের পাতায় তাকে ছুঁড়ে দিয়েছিলেন ১৭৯৭ সালের ৮ জুন। অবশেষে ১০ ডিসেম্বর কোলকাতা ছেড়ে গেলেন লেবেদেফ। পেছনে রেখে গেলেন শুধু ১০টি বছর- যা এদেশের মানুষকে দিয়েছে অসীম সমৃদ্ধি, রচনা করেছে এক অন্য ইতিহাস, সূচনা করেছে এক অন্য সম্ভাবনার। বিনিময়ে যা এই শিল্পীকে দিয়েছে অসীম লাঞ্ছণা, অবর্ণনীয় অত্যাচার, চূড়ান্ত সহযোগিতা এবং শেষ পর্যন্ত অপমানজনক বিদায়। তবুও বাংলা নাটক নিয়ে সর্বপ্রথম প্রয়াস ও পরীক্ষায় এগিয়ে আসা এই রুশ সংগীতজ্ঞ ও নাট্যরসিক শিল্পীর নাম স্মরণ করেই শুরু করতেই হবে আধুনিক বাংলা নাটকের ইতিহাস।

এরপর বাংলা থিয়েটার আবর্তিত হতে থাকে প্রাশ্চাত্য রীতিতে ইংরেজী ভাষায় রচিত নাটক নিয়ে। শেক্সপিয়রীয় নাট্যাঙ্গিককেই ধ্রুবাদর্শ বলে শিক্ষিত নাট্যামোদীরা গ্রহণ করেছিল। বাংলাদেশে দীর্ঘকাল বাহিত একটি সজীব নাট্য- ঐতিহ্য বর্তমান থাকলেও তার এই নাট্য সংস্কারের কোন নাড়ীর যোগ ছিল না। দেশীয় নাট্য ব্যাপার- যার নাম ‘যাত্রা’ ছিল শিক্ষিত শ্রেণীর কাছে অত্যন্ত অন্ধকার বস্তু। ‘দুষ্য উৎসব’। ‘অশ্লীল বিনোদন। তাহাতে প্রমোদ প্রমত্ত ইতর লোক ব্যতীত ভদ্র সমাজের কদাপি সন্তোষ বিধান হয় না’। নতুন শিক্ষিত শ্রেণী স্বভাবতই আকৃষ্ট হয়েছিল বিদেশী নাট্যাভিনয়ের দিকে। মৌলিক বাংলা নাটকের অভাব ক্রমশ:ই  তীব্রভাবে অনুভূত হতে লাগল। আশুতোষ দেব (সতুবাবু) ছিলেন কোলকাতার প্রসিদ্ধ এক ধণাঢ্য ব্যক্তি। তাঁর দৌহিত্ররা তাঁর গৃহে মঞ্চ নির্মাণ করে ‘শকুন্তলা’ ও ‘কাদম্বরী’ অবলম্বণে বাংলা নাটক প্রযোজনা করেন ১৮৫৭ সালে। যে প্রয়াস শুরু হয়েছিলো ১৭৯৫ সালে এক রুশ সংগীতজ্ঞের শিল্প প্রেমে, তার পরিণতি পেল ১৮৫৮ সালে রামনারায়ণ তর্করত্নের রচিত প্রথম মৌলিক বাংলা নাটক ‘কুলীনকুলসর্বস্ব’র মধ্য দিয়ে। অভিনীত হলো রামজয় বসাক নামক এক বিত্তশালী ব্যক্তির গৃহে। এই দিনটির জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছিলো দীর্ঘ ৬২টি বছর।

প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলা নাটক আত্মনির্ভরশীল ছিল না। সংস্কৃত ও ইংরেজী নাটকের উপর ভিত্তি করেই সে দাঁড়িয়েছিল। মাইকেল মধুসূদন দত্তের আসার আগ পর্যন্ত যা পাই তাকে নাটক না বলে, নাটকের আভাস বলাই ভাল। তাঁদের মধ্যে হরচন্দ্র ঘোষ, রামনারায়ণ তর্করত্ন, কালী প্রসন্ন সিংহের নাম প্রসিদ্ধ। এরপরে এলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। শর্মিষ্ঠা, কৃষ্ণকুমারী, পদ্মাবতী- নায়িকারই ঐ নাটকগুলির প্রধান চরিত্র। বাংলায় প্রথম সার্থক ট্র্যাজেডি তাঁরই কৃষ্ণকুমারী। এই সময়ের অন্য আরেকজন নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্র। তাঁর ‘নীলদর্পন’ বাংলা নাটকের প্রথম প্রতিবাদী নাটক, একটা মাইল ফলক।

ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ  থেকে স্বাদেশিকতাবোধ সাহিত্যে প্রধান হয়ে উঠেছিল। এই সময়ে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বদেশের গৌরবময় ইতিহাস নিয়ে নাটক লেখেন। উনি বাংলা নাটককে খানিকটা সংস্কৃত প্রভাবমুক্ত করেছিলেন। তাঁর ভাষা ও পাত্রপাত্রীর আচরণ অনেকটাই বস্তুনিষ্ঠ ছিল। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে অন্যান্য জমিদারী বাড়িগুলোর মতই, তখনকার রীতি অনুসারে নাটক অভিনীত হতো। গুনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, অক্ষয় চৌধুরী, যদুনাথ মুখোপাধ্যায় এবং কৃষ্ণবিহারী সেনের কমিটি অব ফাইভ- এর আগে থেকেই পারিবারিক পরিবেশে সৌখিন নাট্যপ্রচেষ্টার পরিচয় দিয়েছিলেন দেবেন্দ্রনাথের ভ্রাতা গিরীন্দ্রনাথ। তিনি ‘বাবুবিলাস’ যাত্রা বা নাটকে বাড়ীর সবাইকে আসরে নামিয়েছিলেন। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির নাট্যগোষ্ঠী অভিনয় করেছিলো মাইকেলের ‘কৃষ্ণকুমারী’ এবং ‘একেই কি বলে সভ্যতা’। ঠাকুরবাড়ির আর একজন অন্যতম নাট্যকার, যাঁকে ঘিরে আজকে আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস- তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

‘মানুষ যদি শুধু মানুষের মধ্যে জন্মগ্রহণ করিত তবে লোকালয়ই মানুষের একমাত্র মিলনক্ষেত্র হইত। কিন্তু মানুষের জন্মতো কেবলমাত্র লোকালয়ে নহে। এই বিশাল বিশ্বে তাহার জন্ম। বিশ্বব্রহ্মা-ের সঙ্গে তাহার প্রাণের গভীর সম্বন্ধ আছে। তাহার ইন্দ্রিয়বোধের তারে তারে প্রতিমুহূর্তে স্পন্দন নানা রূপে রসে জাগিয়ে উঠিতেছে’- এই উক্তি রবীন্দ্রনাথের। যার অলোকসাধারণ প্রতিভা এদেশের নাটককে কেবলমাত্র ব্যবসায়ী রঙ্গমঞ্চ অবলম্বন করে বিস্তার লাভের পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে এক নতুন দিশা দেখিয়েছিলেন এবং বাংলা নাটককে সেই যুগে ব্যবসায়ী রঙ্গমঞ্চের অধীনতা শৃঙ্খল হতে মুক্ত করে এনেছিলেন- শুধু নাটক লিখে নয়, অভিনয় রীতি এবং মঞ্চ সম্পর্কে তাঁর মৌলিক চিন্তাচেতনায়। ইউরোপীয়দের নকল না করে, সমস্ত রকম বাহুল্য বর্জন করে মঞ্চকে অভিনয়ের যোগ্য করাই ছিলো তাঁর উদ্দেশ্যে।

গীতিনাট্য, কাব্যনাট্য, নৃত্যনাট্য, হেঁয়ালিনাট্য, ঋতুনাট্য, তত্ত্বনাট্য, প্রহসন, রূপান্তর ও নামান্তর সব মিলিয়ে মোট সত্তরটির মত নাটক বা নাটক জাতীয় রচনার এক বিশাল ভাণ্ডার আমাদের সামনে রেখে গেছেন রবীন্দ্রনাথ। এবং একথা বলা বাঞ্চনীয় রবীন্দ্রনাথ যা কিছু Performed হবার জন্য লিখেছেন সবই নাটক। সেই অর্থে গীতিনাট্য বাল্মীকি প্রতিভা, মায়ার খেলা, নৃত্যনাট্য শাপমোচন, শ্যামা, ঋতুনাট্য নবীন, শ্রাবণগাথা সবই নাটক। বিচিত্র রসের বিচিত্র রূপের রবীন্দ্র নাটক। তাই আমরা দেখতে পাই বাঙালির নাট্যচর্চায় হোক সে পেশাদার মঞ্চে, ঘরোয় পরিবেশে, স্কুল কলেজের সংস্কৃতি চর্চার আসরে রবীন্দ্রনাথ উঠে এসেছেন বারে বারে এবং সফল ভাবে। প্রত্যেক নাট্যকার তাঁর সমকালীন দশকদের তৃপ্ত করেই কালজয়ী নাটক রচনা করে থাকেন। এলিজাবেখীয় দর্শকদের ভালোলাগার এবং দৈনন্দিন জীবনের বিষয়বস্তু শেক্সপীয়র তার নাটকে যেমন তুলে এনেছিলেন, তেমনি রবীন্দ্রনাথও। যদিও প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ভালোলাগা ও দৈনন্দিন জীবনের তারতম্য ব্যাপক। কিন্তু তার মধ্য থেকেই দুই নাট্যকারই স্বীয় প্রতিভায় মানব চরিত্রের জটিল দ্বন্দ্ব, অনন্ত জিজ্ঞাসা, অসীম উপলব্ধি ও অন্যান্য কাব্যিক রসে তাঁদের বিশ্বসাহিত্যে বিষ্ময় করে রেখেছেন। শুধু বাহ্য আড়ম্বর ও দৃশ্যময়তা এঁদের নাটককে Universal করে তোলেনি বরং সমকালকে তৃপ্ত করে তাঁরা শ্রেণী সীমানা অতিক্রম করতে পেরেছিলেন বলেই তাঁদের রচনা কালোত্তীর্ণ ও Universal।  মলিয়ের, শেক্সপীয়র, ইবসেন এঁদের তুলনায় সাধারণ রঙ্গমঞ্চের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের প্রত্যক্ষ সর্ম্পক ছিল না। কিন্তু সাধারণ রঙ্গমঞ্চে রবীন্দ্রনাথ মোটেই অপরিচিত ছিলেন না। তার প্রথম উপন্যাস ‘বৌঠাকুরানীর হাট’, বসন্ত রায় নামে অভিনীত হয় ১৮৮৬ সালের জুলাই মাসে এবং জনপ্রিয়তাও পায়। ১৯০১ এর এপ্রিলেও মিনার্ভায় তা অভিনীত হয়েছিলো। সাধারণ রঙ্গমঞ্চ আকস্মিক নতুন উদ্যমের আনুকূল্য লাভ করেছিল রবীন্দ্রনাথেরই নাটক থেকে। তিনি ১৮৮৯ তে লিখলেন ‘রাজা ও রানী’, এটি রবীন্দ্রনাথের প্রথম নাটক এবং শেক্সপীয়রীয় রীতিতে লেখা নাট্যকাব্য। তার এক বছর পরেই ‘বিসর্জন’। রবীন্দ্রনাথের এই দুটি নাটকই বাংলা নাটক সাহিত্যে সবচেয়ে শেক্সপীয়রনিষ্ঠ নাটক, যার চরিত্রের অন্তর রহস্য উদ্ঘাটিত হয়েছে বাইরের সংঘাতের মধ্য দিয়ে। দুটি নাটকেই, তুলনামুলকভাবে ‘বির্সজন’ এ কাব্যের ছন্দোবদ্ধ বিন্যাসে। সংলাপের গতিশীলতা এবং কাব্যিক গভীরতা- যা একান্তই শেক্সপীয়রীয়, বহুলাংশে রক্ষিত। সমগ্র বাংলা নাট্যসাহিত্যে একমাত্র ‘রাজা ও রানী’ এবং ‘বির্সজন’ এ দুটি নাটককে বিবেচনা করা হয় খাঁটি মহৎ ‘দৃশ্য-কাব্য’ যা দৃশ্য না হলেও কাব্য। যে দৃশ্যকাব্যের ব্যখায় অৎরংঃড়ঃষব বলেছেন ‘অভিনয় ছাড়াও যার আস্বাদ করা চলে। অভিনব গুপ্ত বলেছেন- অভিনয় ছাড়াই নাট্যের বাক্যাংশ থেকে রসের উপলব্ধি হয়।

‘রাজা ও রানী’ সাধারণ রঙ্গমঞ্চে অসাধারণ সাফল্য লাভ করেছিল। ১৮৯০ থেকে ১৯২৩ সাল পর্যন্ত সুদীর্ঘকাল এমারেল্ড, বেঙ্গল থিয়েটার, ক্লাসিক থিয়েটার, কোহিনুর, স্টার মঞ্চে, আট থিয়েটারে- প্রকৃতপক্ষে কোলকাতার প্রায় সমগ্র মঞ্চে সগৌরবে অভিনীত হয়েছে। নাটক হিসেবে ‘বিসর্জন’ উচ্চাঙ্গের হলেও ‘রাজা ও রানী’র মত সাধারণ রঙ্গমঞ্চে উপস্থাপন করার পক্ষে বাধা ছিল তার বিষয়বস্তু। তাই মূলত: বাড়ির ছেলেদের অভিনয় ছাড়া বাইরে সেই নাটকের অভিনয় অনেক পরে হয়েছিল। ১৯০০-র ডিসেম্বর এ ‘বিসর্জন’ অভিনীত হয়েছিল সংগীত সমাজে। অনুমান করা যায় রবীন্দ্রনাথের নাট্যবোধ তখন পাশ্চাত্যরীতি থেকে মোড় নিতে শুরু করে অন্যদিকে। নাট্যকাব্য চিত্রাঙ্গদা ও গোড়ায় গলদ- শেক্সপীয়রীয় রীতির কোন ছাপই এতে নেই। ‘গোড়ায় গলদ’ বাংলা নাট্যসাহিত্যে একটি সম্পূর্ণ পৃথক Genre, Wit, Humour. এই নাটকটি বাংলা প্রহসন বা কৌতুকনাট্যে একটি দিক চিহ্ন। সাধারণ রঙ্গমঞ্চে অভিনীত হয়েছিল ১৯১০ এ এবং ‘শেষরক্ষা’ নামে পরিবর্তিত আকারে শিশির কুমার ভাদুুড়ীর প্রযোজনায় নাট্যমন্দিরে ১৯২৭ এর সেপ্টেম্বরে।

‘শারদোৎসব’ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের নতুন নাট্যপরিক্রমার শুরু। রবীন্দ্রনাথের নাট্যপরিনীতি প্রসঙ্গে ১৩০২ সালের পৌষে বঙ্গদর্শন ও প্রকাশিত তাঁর ‘রঙ্গমঞ্চ’ প্রবন্ধে- তিনি প্রথাসিদ্ধ বিলিত মঞ্চকে নাকচ করে দিয়েছেন। দৃশ্যপটের অনাবশ্যকতার উপর জোর দিয়ে ভরতের নাট্যশাস্ত্রের উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে ‘বিলাতের নকলে যে থিয়েটার তাহা একটা ভারাক্রান্ত স্ফীত পদার্থ। তাহাকে নড়ানো শক্ত, তাহাকে আপামর সকলের ঘরের কাছে আনিয়া দেওয়া দুঃসাধ্য’। এই জন্যে তাঁর স্বদেশী যাত্রার প্রতি টান। ‘যাত্রার অভিনয়ে দর্শক ও অভিনেতার মধ্যে কোনো গুরুতর ব্যবধান নেই। পরস্পরের বিশ্বাস ও আনুকূল্যের প্রতি নির্ভর করিয়া কাজটা বেশ সহৃদয়তার সহিত সুসম্পন্ন হইয়া উঠে। কাব্যরস, যেটা আসল জিনিস সেইটাই অভিনয়ের সাহায্যে ফোয়ারার মতো চারিদিকে দর্শকদের পুলকিত চিত্তের উপরে ছড়াইয়া পড়ে।’ অনেক পরে এই প্রসঙ্গে তিনি আবার বলেছিলেন, ‘যাত্রায় শুধু কথা ও সুরের সাহচর্য, কেউ কারুর অনুগত নয়। সুর যেমন বাক্যকে মানে, তেমনি বাক্যও সুরকে অতিক্রম করে না। বিদেশী অলংকারশাস্ত্র পড়বার বহু পূর্বেই আমাদের নাট্য, যাকে আমরা যাত্রা বলি, সে তো গানের সুরেই ঢালা। সে যেন বাংলাদেশের ভূ-সন্তানের মতো, সেখানের স্থলের মধ্যে জলের অধিকারই বেশি। কথকতা যেন অলংকার শাস্ত্রের Narrative শ্রেণীভুক্ত, তার কাঠামো গদ্যের হলেও গীতিকলা তার মধ্যে অসংকোচেই গমন করে’।

শারদোৎসবে রবীন্দ্রনাথের এই যাত্রাজাতীয় রীতিতে আত্মপ্রকাশ কোনো ভাবেই পশ্চাদপসরন নয়, আত্মরক্ষাতো নয়ই, বরং অগ্রগতির সবল পদক্ষেপ। আত্মমুক্তির সদুপায়। যার উদ্ভব শান্তিনিকেতনে প্রকৃতির ঔদার্যে, ঋতুর বৈচিত্র্যে এবং জটিল বস্তুর অপ্রাচুর্যে। এখানেই রবীন্দ্রনাথের নাটক রূপ নেয়- সংকেত, প্রতীকী বা রূপক নানা নামে। নাট্য উপস্থাপনায় ও প্রয়োগে মঞ্চ নামক জটিল কর্মকাণ্ডের সরলীকরণের প্রচেষ্টা।

এই পথেই আমরা পেলাম রাজা, অচলায়তন, ডাকঘর- যে সব রচনায় রবীন্দ্রনাথের অভিপ্রায় ছিল গদ্য দিয়ে কবিতার অন্তর্লোককে স্পর্শ করা। যার সার্থকতা লাভ করেছেন ডাকঘর এ। তাঁর নিজের কথায়- এর মধ্যে গল্প নেই। এই গদ্য লিরিক। আলংকারিকদের মতানুযায়ী নাটক নয় আখ্যায়িকা। Andor Orand Carious, নুপুর গাঙ্গুলী লাহিড়ীর রক্তকরবী নাটকের adaptation Preface এ বলেন- In his allegorical play, Togore uses a simple central metaphor, a symbolic setting and a small cast of main characters. In his sense there is also some similarity to Samuel Beckett’s play. But Beckett is the complete antipode to Tagore. He decomposes language to evoke meaninglessness. Unlike Beckett, Tagore builds layers to an extreme. As Beckett is inspired by nothing, Tagore by everything. ডাকঘরে ভাষা যে সমর্থ তার প্রমাণ, এতে রাজা বা অচলায়তনের মত গানের প্রয়োজন হয় নি। নাটকের ক্ষেত্রে গদ্যকেই একমাত্র বাহন করার চেষ্টায় কতদুর সমর্থ হয়েছিলেন তার প্রমাণ মিলবে মুক্তধারা ও রক্তকরবী-তে।

১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর থেকে যখন তিনি উপর্যুপরি বেশ কয়েকবছর ইউরোপ ও আমেরিকা ভ্রমণ করেছিলেন, তখন পশ্চিমা পুঁজিবাদের দানবিক চেহারাটা তাঁর কাছে অসহ্য ঠেকেছিলো। বিশেষত আমেরিকায় অবস্থান কালে শ্বাসরোধকারী অভিজ্ঞতা কবিমানসকে আর নিছক নৈতিক প্রতিবাদের স্তরে আবদ্ধ রাখতে পারলেন না। পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে প্রবল ঘৃণায় তিনি উত্তীর্ণ হলেন বুর্জোয়া উৎপাদন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিবাদের স্তরে। সেই প্রত্যাক্রমণের ফসল ‘রক্তকরবী’ কবির মতে যা একটি সত্যমূলক কাহিনী। রবীন্দ্রনাথের সমাজচেতনার অতি গুরুত্বপূর্ণ বহিঃপ্রকাশ। বুর্জোয়া ও শ্রমিকের দ্বন্দ্ব। শ্রমিকশ্রেণীর তার হতাশা, যন্ত্রণা, ক্রোধ, বিদ্রোহ সবকিছু মিলিয়ে। এবং উম্মোচিত হলো বুর্জোয়াশ্রেণীর আন্তর্জাতিক চেহারা। He envisioned that the western captalistic, utilitarian approach to society would eventually destroy universal human values. He predicted that progress in science, with the attendent regimentation of work and exploitation of technology, would lead to dehumanization, vast industrialization throughout the world would result in diminishing human compassion and cause an ecological imbalance. He conveyed this messege clearly in his play Raktokarabi and utilized his characters as metaphors of human instincts such as greed, power and envy, as well as love, trust and sacrifice. তারমানে এই নয় যে রবীন্দ্রনাথ সভ্যতার অগ্রগতির বিরুদ্ধে। শিল্পোন্নয়নের অপরিহার্যতার বিরুদ্ধে। তাইতো তিনি বলেছেন ‘যন্ত্রের বিষদাঁত যদি কোথাও থাকে, তবে সে আছে আমাদের লোভের মধ্যে। সে বিষদাঁত তাকে সজোরে উপড়ে ফেলতে হবে- কিন্তু সেই সঙ্গে যন্ত্রকে শুদ্ধ টান মেরে নয়। উল্টো যন্ত্রের সুযোগকে সর্বজনের পক্ষে সম্পূর্ণ সুগম করে দিয়ে লোভের কারণটাকেই ঘুচিয়ে দিতে হবে’। তিনি মানুষের ব্যবহার থেকে যন্ত্রগুলোকে একেবারে নির্বাসিত করার কথা বলেননি। বরং, মানুষের কর্মশক্তির বাহনযন্ত্রকে আয়ত্ব  করার কথা বলেছেন। অন্যথায় তার পরাভব অনিবার্য, যেমন অনিবার্য মানুষের কাছে পশুর পরাভব।

এই নাটকগুলোর প্রকৃতি, রূপ, শৈলী বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়-তাঁর অগ্রগতির সবল পদক্ষেপ এবং আত্মমুক্তির সদুপায়ের রূপকল্প। ‘মানুষের প্রধান সৃজনের ক্ষেত্র তার চিত্তমহল, এই মহলে যদি দ্বার খুলিয়া আমরা বিশ্বকে আহবান করিয়া না লই, তবে বিরাটের সঙ্গে আমাদের পূর্ণ মিলন ঘটবে না।’ অভিনয়ে নাচের ভাষা কথা ও সুরের সঙ্গে কতোখানি সুসামঞ্জস্য করে তুললে অখণ্ড ত্রিমাত্রিক নাট্যভাষা হয়ে উঠতে পারে, এ প্রশ্নটি বহুদিন রবীন্দ্রনাথের কাছে উত্তরহীন থেকেছে, নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে উত্তর সন্ধান করে ফিরেছেন তিনি।

জাভা যাত্রীর পত্রে তিনি বালি দ্বীপের নাচের বর্ণনা করেছেন- এদের প্রাণ যখন কথা কইতে চায় তখন সে নাচিয়ে তোলে। জাপানী নাচের প্রসঙ্গে কবি বলেছেন- জাপানে কিয়োটোর ঐতিহাসিক নাট্যের অভিনয় দেখেছি। তাতে  কথা আছে বটে, কিন্তু তার ভাবভঙ্গি, চলাফেরা, নাচের ধরনে বড়ো আশ্চর্যতর শক্তি। জাপানী থিয়েটার দেখার পর তাঁর মনে হয়েছিল থিয়েটার হওয়া উচিত ‘একটা বিশেষ আর্ট। ইউরোপে এ তা নয়, এখানে গ্রন্থ আর অভিনয়ের মধ্যে একটা আপোষ’। রবীন্দ্রনাথ তাঁর দেখা একটা নো-নাটকের বর্ণনান্তে বলেছিলেন- এটা একটা জগৎ। কোনো বাস্তব তুচ্ছতা নেই। এক মর্যাদাপূর্ণ চালচলন। এক স্বাভাবিক এবং কল্পকাহিনীর জাঁকজমক- বাদ্যবৃন্দ, মঞ্চের পাশ থেকে মাঝে মাঝে বিলাপ শুনিয়ে চলেছে, অথবা প্রচণ্ড আঘাতে ক্রিয়ার তালের সঙ্গে সঙ্গতি রাখছে’।

রবীন্দ্রনাথ থিয়েটার সর্ম্পকে তখন সিদ্ধান্তে পৌছেছেন এই বলে ‘থিয়েটারকে হতে হবে এক ধরনের নাচ, যার গতিভঙ্গীর তাল মিল রেখে চলবে কবিতার তালের পরে। বাস্তব বা প্রাত্যহিক জীবনের কাছাকাছি অঙ্গভঙ্গী এব চলাফেরার উপর নির্ভরশীল। পশ্চিমের নিয়মিত পদ্য- আবৃত্তি দেখার মতো কিম্ভুত আর কিছুই নেই’। নো-থিয়েটার ররীন্দ্রনাথকে কতোখানি প্রাণিত করেছিলো এবং তিনি যে কত দ্রুততায় তাঁর বিশিষ্টতা নিজের নাট্য পরিকল্পনায় আত্মীকৃত করে নিয়েছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁরই ব্যাখায়- কথা-সুর-নাচের সমন্বয়ে এক অভীষ্ট নাট্য আঙ্গিক করায়ত্ব করা।

রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্যগুলো (চিত্রঙ্গদা, শাপমোচন, চণ্ডালিকা, তাসের দেশ, শ্যামা ইত্যাদি) তত্ত্ব নাট্যের (ডাকঘর, রাজা, অচলায়তন, মুক্তধারা, রক্তকরবী) তুলনায় সার্থক সঞ্চায়ন মনে করি এই কারণেই, কথা- সুর ও নাচের সমন্বয়ের ফলে। এবং নাটকে সংগীতের ব্যাপক ব্যবহার তাঁর এই মতের স্বীকৃতি বললে বোধ হয় অত্যুক্তি হবে না। প্রায়শ্চিত্যে ২৩টি, রাজায় ২৮টি, অচলায়তনে ২৫টি গান এরই প্রমাণ। দুই বাংলারই রবীন্দ্র চর্চায় নৃত্যনাট্যগুলোর ব্যাপক মঞ্চায়নের বাস্তবতায় এটা অনস্বীকার্য। পাশাপাশি তাঁর সরস প্রহসন, হাস্যরসাত্মক নাটকগুলোর সফল মঞ্চায়ন- কী পেশাদারি বা সৌখিন নাট্যমঞ্চে।

২০ এর দশকের নাট্যচর্চায় রবীন্দ্রনাথ কে যদি কেউ সফল এবং সহজবোধ্য উপস্থাপনায় মঞ্চে আনেন, তিনি নট- নাট্যকার- নির্দেশক শম্ভু মিত্র। শরীর নয়, দৃশ্য নয়- কথা, কথার উচ্চারণে যিনি এক মাত্রা যোগ করেছিলেন অভিনয়ে- by the psychological readings of the characters. চরিত্রের কত গভীরে যাওয়া যায়, কথার পিছনে কী মানে আছে। ‘চার অধ্যায়’ প্রযোজনায় যার শুরু ‘রক্তকরবী’তে তার প্রতিষ্ঠা এবং ‘রাজা’তে তারই বিস্তার। রবীন্দ্রনাটকের সংলাপ রচনার অন্তর্নিহিত  শক্তিকে বাচিক অভিনয়ে মূর্ত করা সহজ নয়। তার ছন্দোস্পন্দ ও বাক্যের গঠন পরস্পর প্রতিস্পর্ধী। শম্ভু মিত্র এ অভিনবত্বকে অনুভব করে তাকে শিল্পিত অবয়ব দিলেন। তার ফলে প্রযোজনা এক আশ্চর্য Passion এ প্রস্ফুটিত হলো। শমীক বন্দোপাধ্যায় তাঁর এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন- ‘রক্তকরবী শম্ভু মিত্রের এক অসাধারণ প্রযোজনা। আমার মনে হয় রবীন্দ্রনাথের ভিতরে যদি কেউ যায় তাহলে সে কিন্তু রক্তকরবীর-র এই ইমেজে পৌঁছে যেতে পারে। যে জন্য খালেদদারাও যখন রং, ডিজাইন করতে গেছেন তার আগে তারা কিন্তু শান্তিনিকেতনে গিয়েছিলেন। রামকিঙ্করের কাছে গেলেন, নন্দলাল বাবুর কাছে গেলেন এবং সে Images, সেই vision সেগুলো এসেছে। তার মধ্যে রয়েছে গগনেন্দ্রনাথের ছবি। তাই যেটা রক্তকরবীর সবেচেয়ে Strong জায়গা তা হল visual composition or visual quality যেটা শিশির বাবু চেয়েছিলেন কিন্তু পারেন নি। রবীন্দ্রনাথের কাছে আসতে। রবীন্দ্রনাথও চেয়েছিলেন। যদি ওটা হতো তাহলে হয়তো অন্যরকম নাটক রবীন্দ্রনাথও লিখতেন।’

এবং আমরা যারা ‘রক্তকরবী’ প্রযোজনা সংক্রান্ত শম্ভু মিত্রের সেই বিশাল লেখনী পড়েছি বা জেনেছি, এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না এই নাটকটি বিশ্লেষনে তিনি কী পরিমাণে যত্নশীল ছিলেন এবং নাট্যাভিনয়ে কতটুকু সততা ছিল রক্তকরবী নাট্যপ্রস্তুতিতে নিযুক্ত সকলেরই। যে নাটকটি নিয়ে শম্ভু মিত্র বলেছিলেন ‘এটি অভিনেতাদের বা নির্দেশকদের লুব্ধ করার মত একটি নাটক’।

এরপরেও বাঙালির নাট্যচর্চায় সফলতা অসফলতা মিলিয়ে গত ৬ দশকে দ্ইু বাংলাতেই রবীন্দ্রনাথের অচলায়তণ, রাজা, মুক্তধারা, রক্তকরবী, ডাকঘর, বির্সজন যেমন মঞ্চে এসেছে বার বার তেমনি গোড়ায়গলদ, চিরকুমার সভা- এর মতো সরস নাটক এবং প্রচুর হাস্য ও ব্যঙ্গকৌতুকও।  ছোট গল্প ও উপন্যাসের নাট্যরূপকল্প- ঘরে বাইরে, চার অধ্যায়, দুই বোন, পোষ্টমাষ্টার, শেষের কবিতা, মুক্তির উপায় ইত্যাদি।

তাহলে কেন মঞ্চস্থ হচ্ছে এসব বিচিত্র রসের, বিচিত্র রূপের রবীন্দ্রনাটক ? শুধুই বিনোদনের জন্য, জলসার মেজাজে? নিশ্চয়ই কেউ না কেউ প্রাসঙ্গিক বা জরুরি মনে করে রচনাটি। তাই একজন নাটকটির প্রযোজনা  ও অভিনয় পর্যন্ত এগিয়ে যাবার পরিশ্রম ও কষ্ট স্বীকার করে। শুধু পরীক্ষা- নিরীক্ষা নয়। ১৯৬৪ সালে ‘অন্ধকারের নাটক’ বলে বিজ্ঞাপিত করে শম্ভু মিত্র যখন ‘রাজা’ নাটকটির মঞ্চায়ন করেন সার্থকভাবে, তখন নিশ্চয়ই তিনি অন্তত ব্যক্তিগতভাবে মানব অভিজ্ঞতার দিক থেকে সেই সময়ের জন্য নাটকটির প্রাসঙ্গিকতা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।
 
‘রবীন্দ্রনাটকের অভিনয় যোগ্যতা’ প্রবন্ধে প্রমথনাথ বিশী রবীন্দ্রনাথের নাটককে বিশ্লেষণ করেন এই বলে- ‘রবীন্দ্রনাথের দ্বারা পেশাদার রঙ্গমঞ্চ প্রভাবিত হইয়াছে সত্য, কিন্তু ভুলিলে চলবে না যে, তিনি নিজে কখনো পেশাদার রঙ্গমঞ্চ দ্বারা অর্থাৎ গণচিত্তের আশা-আকাঙ্ক্ষার সংস্কার দ্বারা প্রভাবিত হন নাই। ইহা গৌরব করিবার বিষয় নয়, নাট্যকারের পক্ষে ইহা একটি অবাঞ্চিত অপূর্ণতা। শেক্সপীয়র সমকালীন রঙ্গমঞ্চকে যেমন প্রভাবিত করিয়াছিলেন, তেমনি নিজেও প্রভাবিত হইয়াছিলেন। তিনি রঙ্গমঞ্চনিরপেক্ষ নাট্যকার হইলে শেক্সপীয়রীয় মহত্ত্ব লাভ করিতে পারিতেন কিনা সন্দেহ। গীতিকবি বা উপন্যাসিক গণ-সংঘাত হইতে দূরে অবস্থান করিয়া শিল্পসৃষ্টি করিতে পারে, কিন্তু নাট্যকারের পক্ষে তেমন বিভক্তভাবে অবস্থান সম্ভব নয়, তেমন ব্যবধান ঘটিলে তাঁহার শিল্পসৃষ্টি অপূর্ণ হইতে বাধ্য’। কীরূপ বৈপরীত্য আমার একটু আগের বর্ণনা এবং রবীন্দ্রনাটকের অভিনয় যোগ্যতা নিয়ে প্রমথনাথ বিশীর এই বিশ্লেষণ। তবে এই মত যে সর্বাংশে গ্রহণযোগ্য তাও নয়।

গণচিত্তের আশা-আকাঙ্ক্ষার সংস্কার দ্বারা রবীন্দ্রনাথ প্রভাবিত নন- বিশ্লেষণটি বেশ সত্য কি ? রবীন্দ্রনাথ তার সাহিত্যে সবসময় এটা দেখিয়ে এসেছেন যে, মানুষে মানুষে সর্ম্পকের ক্ষেত্রে একটি অর্থলোভী অমানবিক সমাজ ব্যবস্থার কী প্রতিফলন ঘটে সেটাই মূল বিচার্য। তাঁর ভাষায় ‘মান্ধাতার আমলে হাল লাঙ্গল নিয়ে আলবাঁধা টুকরো জমিতে ফসল ফলানো আর ফুটো কলসিতে জল আনা একই কথা’। শিলাইদহে জমিদারী দেখার সময়ে জমিদার রবীন্দ্রনাথ লিখছেন- ‘আমার এ দরিদ্রচাষী প্রজাগুলোকে দেখলে আমার ভারী মায়া হয়। এরা যেন বিধাতার শিশু সন্তানের মতো- নিরূপায়- তিনি এদের মুখে নিজের হাতে তুলে না দিলে এদের আর গতি নেই। পৃথিবীর স্তন যখন শুকিয়ে যায় যখন এরা কেবল কাঁদতে জানে। কোনোমতে একটুখানি ক্ষিদে ভাঙ্গলেই আবার তখনি সমস্ত ভুলে যায়’। যান্ত্রিক সভ্যতার সঞ্চয়গর্বের ঔদ্ধত্যে- গাঁয়ের সহজসরল মানুষগুলো- খনিতে এসে নিজের অস্তিত্ব বিলোপ করে কিভাবে দশ পঁচিশের ছকে পরিণত হয় এবং বুকের উপর দিয়ে নিরন্তর জুয়া খেলা চলতে থাকে- তাকে অবলোকন করলেন তিনি কোন অন্তর্দৃষ্টিতে। চণ্ডালিকা- an untouchable girl, which was modeled on an ancient Buddhist legend describing how ‘Ananda’- The Gautama Buddh’s disciple- asks water of an Adivasi- an untouchable girl. এ ধরণের হাজারো উদাহরণ বেরিয়ে আসবে তার প্রত্যেকটি সৃষ্টিকর্ম থেকে। গণচিত্তের আকাংখা বুঝতে হলে থিয়েটারে সাধারণ জনতার কাতারে বসে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় খুব জরুরি নয়। জরুরি অর্ন্তদৃষ্টিতে- মানসচক্ষে তা অবলোকন করা।  এই মানবতাবাদী কবি যাতে ব্রত ছিলেন আজীবন।

হ্যাঁ- বলা যায়- তাঁর নাটকের ভাষা নিয়ে- যা কোথাও কোথাও, কখনো কখনো অতিমাত্রায় কাব্যিক ও  রূপকাশ্রিত, নিত্য ব্যবহৃত ভাষার অনেক উর্ধ্বে। শম্ভু মিত্রের রক্তকরবী নিয়ে লেখাটির  প্রস্তবনায় তিনি লিখছেন- অল্পবয়সীরা- তারা নাটকটা ঠিক করে পড়তে পারে না। এমনকি একথাও তাদের কেউ কেউ বলেছেন যে, দেখবার সময়ে কথাগুলো বেশ স্বাভাবিক এবং জীবন্ত কথোপকোথনের মত লেগেছিল বটে, কিন্তু বাড়ী ফিরে যখন পরের দিন বই খুলে পড়বার চেষ্টা করেছে তখন আবার সেই পুরোনো কাব্যি কাব্যি ধরণের টান এসে যায়। তাঁর আক্ষেপ- এমন অবস্থাটাই বা হলো কেন? বোকা ছেলেরাই বা এখন এতো বেশি করে আসছে কেন বাংলা থিয়েটারে? এ তাঁর ৭০ এর দশকের বোকা থিয়েটার কর্মীদের নিয়ে আক্ষেপ। আর এখন-এই গতির যুগে, একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বায়ণের পসরায়, World Wide Web এর বিড়ম্বনায়- কর্মী অকর্মী নির্বিশেষে কার-ই বা অত সময় আছে খুঁটিয়ে পড়ার- যখন- Tagore’s play is charged with too many figurative references and comparisons? চেখভ যেমন গোগোল-কে নিয়ে বলেছিলেন- ‘গোগোল-কে দর্শকদের স্তরে নামিয়ে এনো না, বরং দর্শকদেরই উন্নীত করো গোগোলের স্তরে’। সুতরাং আজকের সময়ে বিশেষ করে When the Gobal village has become the digital bazar এবং মানুষে মানুষে তড়িৎ যোগাযোগ যেভাবে দ্রুত অবনতি ঘটাচ্ছে মানুষে মানুষে সর্ম্পকের, এবং মানুষ যেভাবে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে তার শেকড় থেকে, তখন মঞ্চ নাটককে নির্ধারণ করতে হবে, কী হবে তার Production Process. সে নাট্যকারের ভাষাকে সহজ Translation (Simple Transfer) করবেন রূপকল্পে? নাকি, সাথে সাথে Transculturation, Transtemporation এবং Transliteration ও করবেন। যা অতীব প্রয়োজনীয় আজকের এই জগৎ জোড়া জালের race এ টিঁকে থাকতে গেলে। আজকের থিয়েটার কেমন হওয়া উচিৎ- এই প্রসঙ্গে Nemichandra Jain এর একটি উদ্ধৃতি আপনাদের বলতে চাই- যা আমারও খুবই প্রিয়- `Theatre is an interaction, constantly making links, connections with people, ideas and reality. There is no one single Theatre and there cannot be one Theatre for all people, because different types of people comes to it. A Variety of approaches- of meaning, quality, force is necessary. In the theatre everything is a special case. The general classification like ‘European’ or ‘Asian’ theatre, ‘Classical’ ‘Traditional’ or ‘Modern’ theatre, mean nothing. It is always your theatre, your theatre, your theatre`- ইউরোপ আমেরিকার অর্থনৈতিক মন্দা-অবস্থায় যখন আমার ভাতের হাঁড়িতেও চাল ছাড়া শুধু পানি টগ্বগ্ করে, আমার সন্তানদের সান্তনা দেওয়ার জন্য যে, ভাত হচ্ছে- তখন কীসের এতো সংস্কার?

সুতরাং, প্রাণ চাঞ্চল্যের যে ক্রমাবণতি বর্তমান সমাজে তা পুনরুদ্ধার এবং এ বন্ধ্যা সময়ে প্রাণের সঞ্চার করতে রবীন্দ্রনাথ-তাঁর কর্ম, দর্শন, সমাজনীতি, মানবতার চর্চা একটা বড় মাধ্যাম হতে পারে। এখন আশা সেই আগামীর পরিচালকটির জন্য, যিনি নাট্যকারের সমকক্ষের মতো রবীন্দ্রনাটকে হাত দেবেন। ভয় পাবেন না, ভক্তিতে নূয়ে পড়বেন না, রবীন্দ্রনাথকে ভাঙ্গচুর করে তাঁকেই পরিপূর্ণ মহত্বে প্রতিষ্ঠিত করাবেন। যেমনটি নুপুর গাঙ্গুলী লাহিড়ী তাঁর রক্তকরবীর ইংরেজি রুপান্তরে করেছেন। যেখানে গোঁসাই, ছোট সর্দার, মেজো সর্দার, দ্বিতীয় মোড়ল এবং দলের লোক যারা মদ, অস্ত্র ইত্যাদি নিয়ে আসেন সব চরিত্র একেবারেই বাদ। সহজবোধ্য করে সংলাপের পূণর্গঠন, কিছূ গান বাদ, আবার তাতে একটা নতুন গানের সংযোজন। তাঁর মতে- My dream is perhaps this version of Red Oleanders will be presented on mainstrean stages everywhere and today’s viewers will appreciate Rabindranath Tagore, predicting the future of mankind in the context of contemporary civilization some eighty years ago. যেমনটি রবীন্দ্রনাথের স্কলার ড. আনন্দ লাল তাঁর বইতে বলেছিলেন- I hope that future translators might prepare freer versions or adaptations . সুতরাং আমার বিশ্বাস, আজকের থিয়েটার অবশ্যই রাজার রূপে, সমস্ত অচলায়তণ ভেঙ্গে, সকল হীনতা, নীচতা, দীনতা বিসর্জন দিয়ে, এই সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পৌঁছে, দেবে রক্তকরবীর মঞ্জুরী এবং হয়তো কোনো এক সুদূর অচিন ডাকঘরে। ততদিন আমাদের পথ চলুক কালের যাত্রায়।

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জী :
১।    গেরাসিম স্তেপানোভিচ লেবেদেফের আত্মকথা- কোলকাতায় আমি ও আমার থিয়েটার। সংগ্রহ ও সম্পদনা- তদ্রা চক্রবর্ত্তী।
২।    নাট্যকলায় জীবন শিল্প- সুমিতা চক্রবর্ত্তী।
৩।    থিয়েটারের জল হাওয়া- শমীক বন্দোপাধ্যায়।
৪।    বিশ্বায়ণ ও রবীন্দ্রনাথ- শঙ্কর শীল।
৫।    প্রবন্ধ- রবীন্দ্রনাটকের অভিনয়যোগ্যতা- প্রমথনাথ বিশী।
৬।    কবির অভিনয়- অবন্তী কুমার সান্যাল
৭।    রক্তকরবী- শম্ভু মিত্র।
৮।   Preface of Nupur Gangopadhyay Lahiri’s a new translation and adaptation of Rad Oleanders.
৯।    Form the wings- notes on Indian Theatre by Nemichandra Jain.

অসীম দাশ : থিয়েটার ডিরেক্টর ডিজাইনার