Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

কাব্যনাটক ফণিমনসা : প্রসঙ্গ জেলেজীবনের সংগ্রাম

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

তিতাস পারের শৈশব-স্মৃতিকে অবলম্বন করে মালোপাড়ার জেলে জীবনের সংকট-সমস্যা নিয়ে ফণিমণসা (১৯৭৯) শীর্ষক কাব্যনাটক রচনা করেন সাজেদুল আউয়াল যা ঢাকা থিয়েটার ১৯৮০ সালে মঞ্চস্থ করে। তাঁর কাব্যনাটকে জেলেজীবনের সমাজবাস্তবতার প্রতিফলন লক্ষণীয়। নদীমাতৃক বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার তিতাস নদীর পারে সাজেদুল আউয়ালের জন্ম ও বেড়ে উঠা। শৈশবকাল থেকেই তিনি স্থানীয় সংস্কৃতির নানা শিল্পাঙ্গিক যেমন পদ্মাপুরাণ, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, যাত্রা, সার্কাস, পুতুল নাচের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। তিনি শিক্ষাব্যপদেশে জন্মশহর ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছেড়ে ঢাকায় এলেও তিতাস নদীর পারে ফেলে আসা শৈশবের স্মৃতি ভুলতে পারেন নি।

বস্তুত ফণিমনসায় সমাজজীবনের নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরেছেন নাটককার। এই কাব্যনাটকে বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে জেলে সমাজের অস্তিত্বের সংকট এবং তাদের সংগ্রামী জীবনচেতনার প্রকাশ ঘটেছে। কালের পরিক্রমায় ফণিমনসা নদী তার নাব্যতা হারিয়ে শুকিয়ে যাওয়ায় তীরবর্তী মালোপাড়ার জেলেদের জীবিকার্জনের একমাত্র উৎস বা উপায় বন্ধ হয়ে যায়। মৎস শিকার করেই চলতো মালোপাড়ার জেলেদের জীবিকা। এক সময় যে ফণিমনসায় অথৈ জলে মৎস শিকার করে স্বাচ্ছন্দ্যে জেলেরা জীবিকা-নির্বাহ করেছে; এখন সেই নদীর বুক জুড়ে ধূধূ বালুময় চর। এর ফলে জেলেদের যুগযুগ ধরে চলে আসা তাদের পূর্ব-পুরুষের পেশা ও জীবিকার্জনের উপায় মৎস শিকার বন্ধ হয়ে গেছে। অতএব তারা (জেলেরা) বাধ্য হয়ে নদীর বুকে জেগে ওঠা পলিময় চরে চাষাবাদ তথা কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহের স্বপ্ন দেখে। জেলেরা মূলত বাধ্য হয়েই পূর্ব-পুরুষের ঐতিহ্যগত পেশা ছেড়ে দিয়ে নতুন করে, নতুন উপায়ে বাঁচার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু জেলেদের এই নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ নির্বিরোধ নয়; তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়ায় নদীর অপর পারের ইটখোলার মালিক ও তার লোকজন। ফলে উভয় পক্ষের মধ্যে বেঁচে থাকার জন্য সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে পড়ে এবং শেষপর্যন্ত এই জীবনসংগ্রামে জেলেরা পরাজিত হয়। ফণিমনসা কাব্যনাটকে জেলে-সমাজ তাদের চিরদিনের পেশা ইতিহাস-ঐতিহ্য ত্যাগ করে নতুনভাবে বাঁচার যে সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছিল শেষপর্যন্ত তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এক অর্থে ফণিমনসা মালোপাড়ার জেলেদের জীবনসংগ্রামে পরাজিত হওয়ার ইতিকথা।     
 
ফণিমনসায় বিশাল-বিস্তৃত এক সামাজিক প্রেক্ষাপটে নদীমাতৃক বাংলাদেশের চিরপরিচিত ইতিহাস-ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার চিত্র উপস্থাপিত হয়েছে। ফণিমনসা যেভাবে নাব্যতা হারিয়ে মৃতবৎ চর বুকে নিয়ে পড়ে আছে, অনুরূপ এর পারের মালোপাড়ার জেলেরাও তাদের চিরদিনের পেশা ও ইতিহাস-ঐতিহ্য বিসর্জন দিয়ে নিষ্ফলা সময়ের ভেতর দিয়ে অনিশ্চয়তার পথে এগিয়ে গেছে। বিশেষত কাব্যনাটকে জেলে-সমাজের সংকটাপন্ন সামাজিক অস্তিত্বকে নাটককার অসাধারণ দক্ষতায় তুলে ধরেছেন।

ফণিমনসা কাব্যনাটকের শুরুতে দর্শকদের উদ্দেশ্যে কথক নাট্যকাহিনীর এই সামাজিক সংকটের চিত্র প্রস্তাবনায় উল্লেখ করে। কথক নাট্যদর্শকদের জানিয়ে দেয় চরজাগা মৃতবৎ ফণিমনসা নদীর আদ্যন্ত ইতিকথা। কাব্যনাটকে কথক কাহিনীকে গতিশীল করতে এবং কখনো কখনো চরিত্রের অন্তর্গত সংকট-সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে নাট্যঘটনায় উপস্থিত হয়েছে। এই কথক নাট্যঘটনা সম্পর্কে পূর্বে অবগত, সে-ই যেন এর নাট্যকাহিনী পরিচালনা করছে। গ্রীক নাটকের কোরাস চরিত্রের মতো ফণিমনসা কাব্যনাটকের কথক চরিত্র অভিজ্ঞ; কথক প্রয়োজনে নাট্যঘটনা সম্বন্ধে ভবিষ্যৎ মন্তব্যও করে । আবার সরাসরি নাট্যক্রিয়ায়ও অংশগ্রহণ করে । নাট্যকাহিনীর শুরুতে কথক চরিত্র এ-কাব্যনাটকের উপস্থাপন করেছে এভাবে-

ভাটি বাংলার এই
হাজার বছরী বহতা সমুদ্র পত্নী,
কি জানি কি কারণে যায় শুকিয়ে
তিনশো তিন বছর আগে।
তার অনাবৃত শরীর জুড়ে
ভরা রয় লীলা বালু -ধূসরিত।
ফণিমনসার নামাঙ্কিত ঝোঁপ,
এইখানে পেয়েছিল বিশ্রাম,
এখানে সুজলা জলবতী নদী
বইতো কুলু নিরবধি- একদা।
কে জানে কবে কে
রেখেছিল এ নির্জন নাম- ফণিমনসা।১

কথক চরিত্র কাব্যনাটকের কাহিনীর প্রস্তাবনায় আরো জানায় :

এরই কূলে অকূলে
কবে, সে কোন্ সুদূরে
বেঁধেছিল ঘর :
নমু মুসলমান, ধীবর,
কুমোর, বণিক, তাঁতী-
সে আজ দূরশ্রুত কোনো
শঙ্খস্বরের মতো মনে পড়ে।২

কথক নাট্যকাহিনীর প্রস্তাবনায় জেলে-সমাজ এবং কুমোর-সমাজ উভয়পক্ষের কথাই বলে । কথক চরিত্রের মূল উদ্দেশ্য ধীরে ধীরে নাট্যদর্শককে কাহিনীর অভ্যন্তরে নিয়ে যাওয়া। কথক নাট্যদর্শকদের নিয়ে প্রবেশ করে মূল মঞ্চে। যেখানে আছে ‘মৃত ফণীমনসা নদী-কূলের শ্মশানঘাট। ভাঙ্গা ভাঙ্গা স্মৃতিস্তম্ভ। কিছু ফণীমনসার ঝোঁপ, নদীর ওপারে হেলোনো ইটখোলার একটি চিমনী ও নৌকার একটি কঙ্কাল, কিছু ছেড়া জাল।’৩ এরপর নাট্যমঞ্চ থেকে আড়ালে যায় কথক আর মঞ্চে প্রবেশ করে মালোপাড়ার জেলে সম্প্রদায়ের লোকজন। জেলেরা এসেই জানায়, তাদের জীবন-জীবিকা নির্বাহের সংকট ও সমস্যার কথা। কারণ, ফণিমনসার বুকে চর জেগে ওঠায় তাদের জীবিকা নির্বাহের উপায় বন্ধ হয়ে গেছে। তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত এবং তারা  হতাশায় নিমজ্জিত। জেলেদের জীবনের নির্মম বাস্তবতা প্রকাশিত হয় লখাই-এর সংলাপে :

হায়রে, চরটা শেষাবধি
জাইগা উঠলোই-
চিরকাল্যা চেনা নদী
কুমরণী মরলই।৪

লখাই-এর বক্তব্যে ফণিমনসার তীরবর্তী জেলে সম্প্রদায়ের সামগ্রিক হতাশার প্রকাশ ঘটেছে। শুধু লখাই না, এই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে পুরো জেলে-সমাজ নিমজ্জিত । লখাই-এর বক্তব্যের প্রতিধ্বনি ও হতাশার কথা জেলেপাড়ার কৃষ্ণ, পরভুসহ সবার কণ্ঠেই উচ্চারিত হয়েছে। শুকিয়ে যাওয়া ফণিমনসা নদীর বুকে জেগে ওঠা চরের দিকে তাকিয়ে তাদের জীবিকার্জনের একমাত্র পথ বন্ধ হওয়ায় তারা উদ্বিগ্ন, ভবিষ্যৎ ভাবনায় কাতর । একটি সম্প্রদায়ের এই সামষ্টিক আত্ম-যন্ত্রণার অন্তর্গত সত্য প্রকাশের লক্ষ্যে সাজেদুল আউয়াল কাব্যনাটকের আঙ্গিক গ্রহণ করেছেন। টি.এস. এলিয়ট মনে করেন, সাধারণ নাটকের মতোই কাব্যনাটকের বাহ্যাবরণ থাকতে হবে। তবে নাটকীয় বাহ্যাবরণকে কাব্যনাটক অন্তরস্থ উপলব্ধিজাত গভীরতর জাগতিক বাস্তবতায় প্রকাশ করবে।৫ এলিয়ট প্রচারিত তত্ত্বকে সাজেদুল আউয়াল ফণিমনসায় সচেতনভাবে অনুসরণ করে কাব্যকে অতিক্রম করতে দেন নি নাট্যগুণকে।

সাজেদুল আউয়াল কাব্যনাটকে মালোপাড়ার জেলে সম্প্রদায়ের হতাশায় নিমজ্জিত জীবনকে প্রতীকায়িত করেছেন ফণিমনসার শুকিয়ে যাওয়ার সাথে। নদীর বুকে যেভাবে চর জেগে উঠে চারিদিকে শূন্যতার সৃষ্টি করেছে, একইভাবে জেলেদের জীবনেও শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। এই শূন্যতা এবং নৈরাশ্যে নিমজ্জিত হয়েও জেলেদের ভাগ্য পরিবর্তনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে লখাই। তার কণ্ঠে নতুন করে জীবন শুরু করার আশ্বাসবাণী ধ্বনিত হয় :

ও জলবতী নদী তোর
    এই ছিলো আশ
তোহারী গতরে হইক
    ধান, পাট চাষ- ৬

জেলেরা পূর্ব-পুরুষের পেশা ত্যাগ করে কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহের প্রয়াস গ্রহণ করে। তারা বিধাতার তথা প্রকৃতির অনিবার্য অপরিবর্তনীয় নিয়তিকে মেনে নেয়। কারণ, তাদের অন্য উপায়ও ছিল না। যেভাবে তারা সবাই মিলে নদীতে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করত একইভাবে তারা ফণিমনসার বুকে জেগে ওঠা চরে সম্মিলিতভাবে কৃষিকাজে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখে। প্রকৃতির অনিবার্য নিয়তিকে মেনে নিয়ে জেলেরা সিদ্ধান্ত নেয় :

মানিয়া তোমারি কথা
    মিটাইব জ্বালা-
অংগেতে বিন্ধাব তোমার
    লাঙলেরি ফলা।৭

ওপরের বক্তব্যে সমগ্র জেলে-সমাজের স্বপ্ন-আশা প্রতিবিম্বিত হয়ে উঠেছে। কাব্যনাটকে সাজেদুল আউয়াল ট্র্যাজেডির উৎসসূত্র হিসেবে নিয়তিকে গ্রহণ করেছেন। মালোপাড়ার জেলে সম্প্রদায়ের ভাগ্য-বিড়ম্বনাই ফণিমনসার ট্র্যাজেডি। এ কাব্যনাটকে সাজেদুল আউয়াল সামষ্টিক জীবনের ট্র্যাজেডি নির্মাণ করেছেন। জেলেদের এই ভাগ্য-বিড়ম্বনার পেছনে তাদের কোনো হাত ছিল না।৮ ফণিমনসার কাহিনী ক্রমশ অগ্রসর হলে জানা যায়, জেলেরা যেন লখাইর স্বপ্ন বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে নতুন করে বাঁচার এবং জীবিকা নির্বাহের স্বপ্ন দেখেছে। ফণিমনসা নাব্যতা হারালে ১৪৮ ঘর জেলের মধ্যে মাত্র ৮ ঘর জেলে অন্যত্র চলে যায়। বাকি ১৪০ ঘর জেলে ফণিমনসার বুকে জেগে ওঠা পলিসমৃদ্ধ জমিতে চাষাবাদ করার প্রস্তুতি নেয়। ফণিমনসার শুকনো বুকে কৃষিকাজ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে জেলেরা প্রকৃতপক্ষে চরের বুকে নিজেদের জীবনযাপনের বীজ বুঁনতে চেয়েছে নতুন করে। এই স্বপ্নকে সত্যি করে তুলতে জেলেরা একজোট হয়।

মালোপাড়ার জেলেরা ফণিমনসার পলিমাটিতে জীবনের নতুন বীজ বোঁনার আগেই তাদের মেয়ে পুঁটি ‘গঞ্জের কোটা ঘরে’ নারী জীবনের স্বপ্ন বিক্রি করতে বাধ্য হয় জীবিকার তাগিদে। পুঁটি দেহ বিক্রি করে নিজেকে ‘অশূচি’ করেছে ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে না পেরে। তার নারী জীবনের স্বপ্ন-সাধ ভেঙে গেছে, তবু পুঁটি গ্রামে ফিরে আসে ফণিমনসার বুকে জেগে ওঠা নতুন করে বেঁচে থাকার বাসনা নিয়ে। ‘অশূচি’ পুঁটিও গ্রামের অন্যদের মতো ফণিমনসার বুকে লাঙলের ফলায় নতুন জীবনের বীজ বোনার আকাঙ্ক্ষার সাথে একাত্মতা বোধ করে। কিন্তু ‘অশূচি’ পুঁটির মালোপাড়ায় প্রত্যাবর্তনকে জেলেরা সহজভাবে মেনে নিতে পারে না। পরভুর কথায়, ‘অশূচি জগতে তুই তোর সাথে সাথে/ অশনি আনলি গাঁয়ে কুক্কুরের রূপে।’৯ পরভুর ভাবনায় সামাজিক সংস্কার ছিল, কিন্তু পরিস্থিতির শিকার পুঁটি জীবননাট্যের এই নির্মমতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রকাশ করেছে জীবনসত্য :

সবার তো ছিলো সব কিছু।
পিতলের কলস, বাসন,
কাঁসার ঘণ্টা, নাকের বেঁসর,
রূপার হাসুলী- বেচনের বস্তু।
আমার কি ছিলো?
বুড়া বাপ,
তাও ছানি পড়া চোখ,
আমার কি ছিলো গঞ্জে বেচনের মতো আর?১০

পুঁটির এই জীবনোপলব্ধি মধ্যেই আছে কাব্যনাটকের অন্তর্গত রহস্য প্রকাশের প্রয়াস। মানবহৃদয়ের অন্তর্গত রহস্য উন্মোচনে  কাব্যনাটক আধুনিক যুগে সার্থক মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। সুতরাং একটা বিষয় স্পষ্ট যে কাব্যনাটক যাত্রা শুরু করেছিল মানবজীবনের গূঢ়ার্থ প্রকাশের দায়ভার কাঁধে নিয়ে। যেকথা গদ্যে প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছিল না, তা কবিতার ভাষায় প্রকাশ করা সহজতর। ‘আধুনিক যুগে অতিবাস্তবতা মানুষকে ক্লান্ত করেছে, অথচ মানুষ বারবার নিজের অভ্যন্তরে এবং চেতনার গূঢ়মূলে তাকাতে চেয়েছে; মানবজীবনের এই অন্তর্বাস্তবতা প্রচলিত কবিতা কিংবা নাটকে প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছিল না; ফলশ্রুতিতে সমকালীন জীবনাভিজ্ঞতার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় মানব-জীবনের অন্তর্লোকের রহস্য উদ্ঘাটনে মূলত কবিগণ সাহিত্যের এক অভিনব আঙ্গিক আবিষ্কার করলেন যা ‘কাব্যনাট্য’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।১১

জেলেপাড়ার দুর্ভাগ্যপীড়িত পুঁটি জীবনের যে নির্মম রহস্য প্রকাশ করেছে, সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল জেলেপাড়ার সবাইকে। কাব্যনাটকে ব্যক্তিসত্তা সার্বিকসত্তায় প্রতীকী ব্যঞ্জনা লাভ করতে পারে। পুঁটির এই ব্যক্তিগত করুণ পরিণতির মধ্য দিয়ে সামগ্রিকভাবে নাটককার জেলেপাড়ার সামষ্টিক জীবনের চিত্র মূর্ত করে তুলেছেন।১২  কিন্তু সবাই পুঁটির মতো শরীর বিক্রি করে নি। প্রায় সবাই অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটিয়ে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখেছে। নীরবে সহ্য করেছে ক্ষুৎ-পিপাসার দুঃসহ যন্ত্রণা। তারপরও পুঁটির মতো কেউ গঞ্জের কোটা ঘরে জীবিকার অন্বেষণ করে নি। তাই পুঁটিকে কটাক্ষ করে পরভু বলে,

নদীতে পড়লে চর, দুই কূলে তার
আছে যতো জলদাস, জলদাসী আর
জোলা, কুমার, বেণে- বিপদ সবার।
তবুও সবাই রাখে জাত যার যার।
গাবর পাড়ার সবে আধ পেটা খায়
তবুও অখন তরি নাম না ভাড়ায়।
তুই পুঁটি কোন্ ভুলে কোটা ঘরে গেলি
কুলের কলঙ্ক হয়া বেবুশ্যে হইলি?১৩

পরভুর কথায় একাধারে জীবনের নির্মম সত্য এবং সামাজিক বাস্তবতা আছে। তবে একথাও সত্য যে, ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করা সহজ কথা নয়। পুঁটি মূলত ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে না পেরেই গঞ্জে গিয়ে দেহ বিক্রি করেছিল। জেলেপাড়ার অন্যদের ঘটিবাটি বিক্রি করার থাকলেও পুঁটির বিক্রি করার মতো ছিল না কিছুই, দেহ ছাড়া। তাই শরীর বিক্রি করে ক্ষুণ্নিবৃত্তির অন্ন জোগায় সে। একথাও সত্য যে সামাজিক সংস্কার পুঁটিরও ছিল, তাই ‘বেবুশ্যে’ পুঁটি যখন গ্রামে ফেরে তখন নদীর জলে ধুয়ে নেয় নিজের শরীর। শরীরিক অপবিত্রতা সে নদীর জলে ধুয়েই গ্রামে ফিরেছিল ‘জলদাসদের’ চর দখলের দিনে তাদের কপালে ‘চন্দন তিলক’ এঁকে দেয়ার বাসনায় এবং তাদের সাথেই নতুনভাবে জীবন শুরু করার স্বপ্ন বুকে নিয়ে। কিন্তু পুঁটি গঞ্জে শরীর বিক্রি করায় পরভু তাকে কুলটা বলে আখ্যায়িত করে চর দখলের দিনে জেলেদের কপালে ‘চন্দন তিলক’ দেয়ার অযোগ্য বিবেচনা করে জানায়, ‘সীমন্তনি পুরনারী আছে জাল্লা পাড়ায়/ এ কাজ তাদের সাজে তোরে না মানায়।’১৪ পুঁটিকে কুলটা বলে পরভু তাড়িয়ে দেয়। পরভুর এই আচরণের মধ্য দিয়ে কাব্যনাটকে সাজেদুল আউয়াল জীবনবাস্তবতা এবং সমাজ-সংস্কারের বিরোধ ফুটিয়ে তুলেছেন।১৫ তাই পুঁটি চলে যেতে যেতে জীবনের আরো এক অকথিত সত্য উচ্চারণ করে :

তোমরা দেও তাড়া।
যেমন অচিন্ গাঁয়ের কোন
পথ ভোলা কুক্কুর
ভিন্ গাঁয়ে ঢুকলে পরে
তারে দেয় তাড়া
সেই গাঁয়ের কুক্কুরেরা।
পাঁচ দশটা মিল্লা
করে সীমানা ছাড়া।
তবু, তারও আছে নিজ গাঁয়ে ঠাঁই।১৬

পুঁটিকে সামাজিকভাবে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতির বিষয়টি পরভুর সংলাপে জানিয়ে দিয়েছেন নাটককার। কাহিনীর শুরুতে প্রস্তাবনা করতে এসে কথক মৃতবৎসা ফণিমনসার ঐতিহ্যের বিবরণ দিয়ে ফিরে যাওয়ার পর মঞ্চে কৃষ্ণ-ধরিত্রীর প্রবেশের আগে পুনরায় মঞ্চে হাজির হয়ে পুঁটির মতোই আরেক দুঃখিনী নারী ধরিত্রীর সংক্ষিপ্ত জীবনগাথা নাট্যদর্শকদের সামনে উপস্থাপন করে। কাব্যনাটকে পুঁটি এবং ধরিত্রী দু’জনেই হতভাগ্য নারী। কথকের বিবরণে উঠে আসে ধরিত্রীর করুণ জীবনকাহিনী :

প্রখর, শ্রান্ত রৌদ্রের ভিতর
কোন এক লগ্নে
গঞ্জের গদিঘর নিয়ে গেল তারে-
যে ছিলো কৃষ্ণ প্রিয়া
সে হলো গদিঘরে সতীন,
আর আজ
দীর্ঘ দেড় বছর পর
মতিভ্রমা ধরিত্রী,
চিরদিনের জন্য এসেছে ফিরে।
ফুল কপির মতো
মাথার মগজে তার
ফুটেছে অসুস্থ ফুল-নীল কমল।১৭

ধরিত্রী, পুঁটির মতো শরীর বিক্রি করতে বাধ্য না-হলেও গঞ্জে সতীনের ঘর করতে যায় । কিন্তু পুনরায় ধরিত্রী ফিরে আসে তার চিরচেনা গ্রামে, বিশেষত প্রেমিক কৃষ্ণের কাছে। প্রসঙ্গত স্মরণীয় যে, কেন ধরিত্রী এবং পুঁটি পুনরায় গ্রামে ফিরে আসে তার যথোপযুক্ত কারণ নাটককার উপস্থাপন করেন নি। গ্রামে তখনো সুখ-শান্তি-সমৃদ্ধি ফিরে আসে নি, তথাপি তারা ফিরে আসে; কারণ পুঁটি-ধরিত্রীও নতুন জীবনসংগ্রামে শরীক হতে চেয়েছে। ধরিত্রী ও পুঁটির  জেলেপাড়ায় ফিরিয়ে এনে নাটককার মূলত তাদের জীবনেও নতুন দিনের সূচনা করতে চেয়েছেন। অর্থাৎ মৃত ফণিমনসার জেলেপাড়ার অন্যদের মতো পুঁটি-ধরিত্রীও নতুন করে শুরু করতে চেয়েছে সবকিছু।

পুঁটি জাতকুল বিসর্জন দিয়ে দেহ বিক্রি করেছিল বলে তাকে যেভাবে অপমান করে পরভু গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে একইভাবে ধরিত্রীকেও প্রেমিক কৃষ্ণ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে কৃষ্ণ এবং পরভুর মধ্যে পার্থক্য এটুকু যে- পরভু চেষ্টা করে নি পুঁটিকে বোঝার; বরং নিষ্ঠুর ভাষায় পুঁটিকে আঘাত দিয়েছে। কিন্তু পরভুর মতো কৃষ্ণ আঘাত করতে পারে নি ধরিত্রীকে। কৃষ্ণও সামাজিক সংস্কারের বশবর্তী হয়েই ধরিত্রীর প্রেম প্রত্যাখ্যান করেছে। কৃষ্ণ বোঝার চেষ্টা করেছে ধরিত্রীর আত্মযন্ত্রণা, কিন্তু সামাজিক নিয়ম অস্বীকার করে তার প্রেমের স্বীকৃতি দিতে পারে নি। এ জন্য ধরিত্রী ফিরে এসে কালো-কৃষ্ণকে যখন গানে-গানে বলে: ‘ও কালো রূপ অপরূপ হয়ে/ দিলো যে ধরা/ আঁখির ঠাঁয়’ তখন আত্মযন্ত্রণায় দগ্ধ কৃষ্ণ অনুনয় করে ধরিত্রীর নিকট : ‘এই কালো হবে/ তোর তরে কাল/ ভুলে যা আমায়/ ধরি তোর পায়।’১৮ কৃষ্ণের কথায় ধরিত্রীর বুক ভেঙে গেছে, তা-ও উপলব্ধি করেছে কৃষ্ণ। এজন্য ধরিত্রীকে সান্ত্বনাও দিয়েছে কৃষ্ণ :

হবে মিলনে সুদূর
নিকটে মধুর
আর বার যদি জনম লই;
ঐ শঙ্খদ্বীপির তীরে
দুজনায় দুজনারে
সর্বজয়ার নীড়ে
চিনে লব সই।১৯

কৃষ্ণের এই সান্ত্বনাবাক্য ধরিত্রীকে উদ্দেশ করে হলেও এর মধ্যে তীব্রভাবে তার হৃদয়যন্ত্রণার প্রকাশ লক্ষণীয়। প্রিয়তমা ধরিত্রীর গঞ্জের কোনো এক ব্যবসায়ীর দ্বিতীয় স্ত্রী হওয়ার বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পেরেছিল বলেই কৃষ্ণ তার প্রতি পরভুর মতো নিষ্ঠুর আচরণ করতে পারে নি। অবশ্য এর পেছনে কৃষ্ণ-ধরিত্রীর গভীর প্রণয়ের বিষয়টি জড়িয়ে আছে। পরিস্থিতির নির্মমতায় ধরিত্রীর সাথে কৃষ্ণের বিচ্ছেদ অনিবার্য হয়েছে। প্রেমিক-প্রেমিকার মিলনের পথে এখানেও পরিস্থিতির অনিবার্যতা প্রধান অন্তরায়। লখাইয়ের সাথে কথোপকথনে কৃষ্ণের অন্তর্যাতনার প্রকাশ লক্ষ করা যায় :

গেরস্থের উঠানে যদি
কোন গাছে পাকে কোন পেয়ারা,
তইলে লাভ হয়,
সেই বাড়ীর কামরাঙা কিশোরীর :
আর যদি সেই কিশোরীরে
কোন এক লগ্নে,
পালকী আইসা লয়া যায় সুদূরে,
তইলে লাভ হয়-
কুঁচ বরণ কাকের।২০

নাটকের ঘটনায় কৃষ্ণ অধিক সময় অবশ্য ধরিত্রীর প্রেম ও বিরহ নিয়ে ভাবার অবকাশ পায় নি। কারণ, প্রিয়তমার সাথে বিচ্ছেদের চেয়ে তখন কৃষ্ণ-পরভু-লখাইর সামনে ফণিমনসার চর দখল করা প্রধান ব্যাপার। অর্থাৎ কাব্যনাটককার সাজেদুল আউয়াল সুকৌশলে ব্যক্তিসত্তার চেতনায় সামষ্টিকসত্তার স্বার্থকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছেন। তাই প্রিয়তমা ধরিত্রীকে ফিরিয়ে দিয়ে যখন কৃষ্ণ বিরহে কাতর, তখন লখাই এসে তাকে জানায় গোত্র প্রধান ছিদামের আশঙ্কার কথা- ইটখোলার লোকেরাও চরের দখল নিতে চায়। ফণিমনসার বুকে জেলেরা নতুন করে বাঁচার যে স্বপ্ন দেখছে, সেখানে ইটখোলার লোকজনের বাধা দেওয়ার কথা লখাইয়ের নিকট থেকে শোনার পর কৃষ্ণ তার ব্যক্তিগত বিচ্ছেদ-বিরহবেদনা মুহূর্তে ভুলে যায়। কৃষ্ণের যে হৃদয় কিছুক্ষণ পূর্বে ধরিত্রীকে সাথে নিয়ে ‘শঙ্খদ্বীপি’-তে যাওয়ার যে স্বপ্ন দেখেছে তা ফণিমনসার চর দখলকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়।

জেলেপাড়ার কুলিক (গোত্র প্রধান) বৃদ্ধ ছিদাম এবং লখাইয়ের কথোপকথনে নাটকের কাহিনী ধীরে ধীরে নদী-জল-চর ইত্যাদি সমস্যার আবর্তে গতিশীল হয়ে ওঠে। বৃদ্ধ ছিদাম বলে, নদীতে মাছ ধরে যারা জীবিকা নির্বাহ করেছে, যে নদীতে মাছ ধরা জেলেদের অধিকার তারাই নদীর বুকে জেগে ওঠা চরের জমির মালিক, এর ন্যায় সঙ্গত দাবিদার তারাই। বৃদ্ধ ছিদাম এসব কথা বললেও তার মনে চরের দখল পাওয়া নিয়ে সন্দেহ ঘনীভূত হয়ে ওঠে। সে উপলব্ধি করে সহজে এই পলিমাটির অধিকার তারা পাবে না। কারণ, ওপারের ইটখোলার লোকজনও চরের দখল নিতে চায়। বৃদ্ধ ছিদামের শঙ্কা-সন্দেহ অমূলক ছিল না। ছিদাম বুড়ো তাই জেলেদের সতর্ক করে দিয়ে জানায় :

হেপারের হগল ইটখোলা বানছে একজোট-
তারাও চায়,
সুফলা এই বালিয়ারীর চরে
সুবর্ণ পলির প্রসাদে
ফসল ফলাইতে- (একটু ভেবে)
আমরা এই চরের দখল চাই,
শুইন্যা তারা নাকি
বেবুশ্যের ঢংয়ে হাসে।২১

জেলেপাড়ার কুলিক বৃদ্ধ ছিদামের এই আশঙ্কার মাধ্যমে ফণিমনসা কাব্যনাটকের নাট্যদ্বন্দ্ব এবং কাহিনীর সংঘাত ক্রম-পরিণতির দিকে অগ্রসর হয়। একদিকে ইটখোলার মালিকরা একজোট হয়ে চরের দখল নিতে চায় অন্যদিকে জেলেরা ফণিমনসার হারানো ঐতিহ্যের বুকে জেগে ওঠা পলিমাটিতে জীবনের নতুন বীজ বুঁনতে বদ্ধপরিকর। ফলে জেলে ও মালিকদের মধ্যে চরের দখল নিয়ে সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে পড়ে। সাজেদুল আউয়াল কাব্যনাটক রচনা করলেও নাট্যগুণকে পুরোপুরি ধারণ করতে চেয়েছেন ফণিমনসায়। যদিও কাব্যনাটকে প্রচলিত নাটকের মতো নাট্যসংকট, সংঘাত ও নাটকীয়তা চরিত্রের অন্তর্গত দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়ে থাকে।২২ ফণিমনসার বুকে জেগে ওঠা চর দখলকে কেন্দ্র করে জেলে এবং ইটখোলার লোকজনের সংঘর্ষ অনিবার্য করে তুলেছেন নাটককার। ছিদাম চর দখল নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করলে জেলেদের পক্ষে লড়াই করে বেঁচে থাকার দৃঢ় উচ্চারণ শোনা যায় লখাইয়ের কণ্ঠে :

আমরা হই জোয়ান।
তুমি খালি
কুলিকের কর্ম করো ছিদাম বুড়া,
বাকি ভার
জাল্লা পাড়ার
একশো আটচল্লিশ ঘরের জোয়ান মর্দ্দরার।২৩

লখাইর এই বক্তব্যের মাধ্যমে কাব্যনাটকের কাহিনী সংকটের আবর্তে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। কিন্তু কাব্যনাটককার নাটকীয় সংকটমোচন বা উত্তরণের পথে অগ্রসর হন নি। নাট্যিক এই সংকট সামনে রেখে সাজেদুল আউয়াল ধীরে ধীরে চরিত্রের মানস-বিশ্লেষণ ও অন্তর্লোকের প্রতি দৃষ্টি দিয়েছেন এবং কাহিনীকে ক্রম-পরিণতির দিকে টেনে নিয়ে গেছেন। কাব্যনাটকে চরিত্রের অন্তর্সত্য আবিষ্কার সম্বন্ধে টি.এস. এলিয়ট জানিয়েছেন,

A 'living' character is not necessarily ‘true to life’. It is a person whom we can see and hear, whether he be true or false to human nature as we know it. What the creator of character needs is not so much knowledge of motives as keen sensibility; the dramatist need not understand people; but he must be exceptionally aware of them.২৪

একথার মধ্য দিয়ে এলিয়ট সুস্পষ্টভাবেই কাব্যনাটকে চরিত্রের অন্তর্সত্য আবিষ্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। সাজেদুল আউয়াল কাব্যনাটকের এই তত্ত্বানুসরণ করেই ফণিমনসায় নাটকস্থ সংকটমোচনের চেয়ে চরিত্রের অন্তর্গত রহস্যাদি উপস্থাপনে সচেষ্ট হয়েছেন।২৫ অবশেষে জেলেদের সাথে ইটখোলার লোকজনের চর দখলকে কেন্দ্র করে মুখোমুখি সংঘর্ষের মাধ্যমে নাটকের সংকট চরম পরিণতি লাভ করে। নাটককার এই সংকটের মোচন ঘটিয়েছেন জীবনসংগ্রামে জেলেদের পরাজয়চিত্র এঁকে। ফণিমনসায় জেলে সম্প্রদায় এবং ইটখোলার লোকজনের মধ্যে ফণিমনসার চর দখলকে কেন্দ্র করে নাটকের কাহিনীতে চরম উত্তেজনা ও সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করে সেই নাটকীয় সংকটাপন্ন উত্তেজনাকে দীর্ঘসময় কৌশলে ধরে রেখেছেন। এই নাট্যিক উৎকণ্ঠা বা উত্তেজনা ফণিমনসা কাব্যনাটকটিকে মঞ্চসফল করে তুলেছে। সাজেদুল আউয়াল প্রথাগত নাটকের ন্যায় ফণিমনসায় দৃশ্য-অঙ্কের বিন্যাস করেন নি। তবে মঞ্চে আলোক প্রক্ষেপণ-রীতি ও প্রয়োগ-প্রকৌশলের বর্ণনা দিয়ে দৃশ্য বিন্যাসের বিষয়টি সুচারুভাবে সম্পন্ন করেছেন।

কাব্যনাটকে সংকট ঘনিয়ে আসে যখন ইটখোলা পক্ষের লোকজন মঞ্চে প্রবেশ করে। কারণ, তারা ফণিমনসার বুকে জেগে ওঠা চরের দখল নিতে চায়, যার ওপর জেলেদের ন্যায্য অধিকার, তা ইটখোলার বেনিয়া সম্প্রদায় গা’য়ের জোরে ছিনিয়ে নিতে চায়। কিন্তু জেলেদের দ্বিতীয় কোনো উপায় না থাকায় তারাও বিনা বাধায় ফণিমনসার পলিমাটি হাতছাড়া করতে রাজি নয়। কিন্তু ইটখোলা পক্ষের মালিকরূপী শোষক জেলেদের স্বপেশায় ফিরে যেতে বলে :

কিবা আশা
বাসা বেন্ধেছে তোমাদিগের বুকে গো,
যাও, যাওনা ক্যান্ সেখানে,
যেখানে নদী অখনও আছে
রাতভর উজাগড়? হে?
সেখানে জাতভাই পাইবা,
রকমারি জো’য়ে
রকমারি জাল ফালাইবা :
চান্দা, তিত্-পুঁটি
বোয়াল আর বইচা মাছে
ভরপুর হইবো তোমাদিগের খাড়ি।২৬

কৃষিকাজ তাদের জন্য নয়। কিন্তু ১৪৮ ঘর জেলে কোথায় যাবে? ইটখোলা মালিকের এই স্পর্ধিত ও উপহাসকর বক্তব্যের পরেও কৃষ্ণ-লখাই বিনয়ের সুরে তাদের অধিকার এবং দৈন্যদশার কথা ইটখোলা পক্ষকে জানায়। কৃষ্ণ অত্যন্ত বিনয়ের সাথে ইটখোলা পক্ষের মালিকের জবরদস্তিমূলক বক্তব্যের পরেও বলে, ‘হাজার বছরী বসত বাটি ছাইড়া/ কোন্ ধামে যাব কন?’২৭ কৃষ্ণের এ-প্রশ্নের জবাব ইটখোলার মালিক কেন, কারো কাছেই নেই। কেননা নদীমাতৃক বাংলাদেশের অসংখ্য নদী নাব্যতা হারিয়েছে ফলে জলের সাথে সাথে চরজাগা নদীর মীন-সন্তানও তাদের  পেশার পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। ফণিমনসা নদীতে যারা মৎস শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করত, তারা পায় নি চরের পলিময় উর্বর জমির দখল। অর্থাৎ নতুন করে জীবন শুরু করতে হলে যে অবলম্বন দরকার সেটাও তাদের জোটে নি। নিজস্ব পেশা-ঐতিহ্য হারিয়ে যারা নতুন করে ইতিহাস রচনা করতে চেয়েছিল, তাদেরকেও সে-অধিকার থেকে পেশী-শক্তির বলে বঞ্চিত করা হয়েছে। তাই জেলেদের পক্ষে কৃষ্ণের ‘কোন্ ধামে যাব কন?’ প্রশ্নের মধ্য দিয়ে এ দেশের স্বীয় ঐতিহ্য হারানো সকল পেশাজীবীর হাহাকার ধ্বনিত হয়েছে। ফণিমনসা কাব্যনাটকের কাহিনীর পরিণতিতে জেলে পক্ষ পরাজিত হয়েছে, তবে তাদের উত্থাপিত জীবিকার্জনের উপায় সম্পর্কিত সমস্যার সমাধান নাটককার করতে পারেননি। ফলে নাটকের ঘটনার সমাপ্তির পরও প্রশ্ন থেকে যায়, শেষ-পর্যন্ত জেলেপাড়ার একশ চল্লিশ ঘর মানুষের ভবিষ্যৎ কি? কথকও কাহিনীর পরিণতি মুহূর্তে মন্তব্য করে -

ঐ যারা মরে গেলো ভালবেসে মাটির বিভা,
তারা তো সকলেই মানব ছিলো,
সকলেরই ঋদ্ধ পরিচয় ছিলো
কোনো একদিন।
কোনো এক বিশ্বাস ভালোবেশে
ওরাও তো ছিলো
শিব ভক্ত মীন সন্তান।
চির বর্তমান নয় কোন কাল;
নয়, অসম্ভব পরিবর্তন
মানুষের অতীত কর্মযোগে-
এই বিশ্বাস ভালোবেসে
ওরাও তো দেখেছিলো :
হেমন্তের বিশ্রান্ত রদ্দুর-এ নাচ-রতা,
সুপক্ক নম্র ধান্য সভার স্বপ্ন
চেয়েছিলো- উৎকলিত শস্য,
আহারের দানা।২৮

ফণিমনসার তীরবর্তী জেলেরা পরাজিত হয়েছে পেশীশক্তির কাছে। তারা পারে নি নিজেদের জীবন-জীবিকা উপার্জনের উপায় হিসেবে নদীর বুকে জেগে ওঠা উর্বর জমির দখল নিতে। অথচ যখন ফণিমনসা নাব্যতা হারিয়ে ফেলে, তখন জেলে সম্প্রদায় স্বপ্ন দেখেছিল যে, জেগে ওঠা জমিতে তারা ফসল ফলাবে। এখন থেকে মাছ ধরার  পরিবর্তে তাদের জীবিকা হবে ফসলী জমিতে শষ্য আবাদ করা। যেভাবে তারা নদীতে সকলে মিলে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেছে, একইভাবে তারা জমিতেও সকলে মিলে ফসল ফলাবে। তাদের এই একতাবদ্ধ জীবনচেতনার মধ্যে রয়েছে, সাম্যবাদী সমাজের বীজ। প্রকৃতপক্ষে জেলেদের এই শ্রেণীহীন সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছেন কাব্যনাটককার সাজেদুল আউয়াল নিজেই। নাটককারের প্রকল্পিত সমাজ-ভাবনার প্রতিফলন ঘটেছে কথকের কথায় যেখানে চর দখলের পর জেলেরা আসলে কি করবে সেই ভাবনাটা ছিল। কথকের উচ্চারণ:

ভেবেছিলো:
আলের চিহ্ন দেয়া
অধিকারের কোন সীমানা,
আঁকবেনা- এই নাবাল পলিয়ারীর চরে।
ভেবেছিলো:
এই চর হবে- নবোঢ়া,-
হবে সকলের বাণিজ্য বস্তু,
সকলের বেসাতির বিত্ত।২৯

কাব্যনাটককার সাজেদুল আউয়াল জেলে সম্প্রদায়ের জীবনসংগ্রামে নতুন সমাজব্যবস্থার কথা বলেছেন। কিন্তু পুঁজিবাদী আগ্রাসনের মুখে জেলেদের নবতর সমাজ গড়ার স্বপ্ন ভেঙে গেছে। জেলেদের এই পরাজয়ে কাব্যনাটককার পুঁজিবাদের আগ্রাসনের মুখে সাম্যবাদী সমাজ গড়ে তোলার ব্যর্থতা মূর্ত করে তুলেছেন। ফণিমনসা কাব্যনাটকের প্রধান চরিত্রগুলো হচ্ছে কৃষ্ণ, লখাই, পরভু, ছিদাম, মুখপোড়া, ধরিত্রী, পুঁটি, বোস্টমী ও ইটখোলার মালিক। এছাড়া মঞ্চে ইটখোলা পক্ষ ও জেলে পক্ষের আরো কিছু লোকজনকেও দেখা যায়। আর আছে কথক, যে নাট্যকাহিনীর আদ্যন্ত সম্পর্কে অবহিত। এখানে ব্যক্তিসত্তাকে নাটককার সামষ্টিকসত্তায় উত্তীর্ণ করেছেন। জেলে সম্প্রদায়ের মানুষ ব্যক্তিগতভাবে নয় সামষ্টিকভাবেই নতুন করে বেঁচে থাকার তথা জীবনের বীজ বোনার সংগ্রামে ইটখোলা পক্ষের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। নাটককার জেলে সম্প্রদায় এবং ইটখোলা সম্প্রদায়কে সামষ্টিক চরিত্র হিসেবে তুলে ধরেছেন।

সাজেদুল আউয়ালের ফণিমনসার বিষয়বস্তু সামাজিক কিন্তু নাটককার এতে কাব্যনাটকের আঙ্গিক কৌশল ব্যবহার করেছেন। সুপরিসর এই নাট্যকাহিনীর সংলাপ তিনি কাব্যাঙ্গিকে রচনা করেছেন। কাব্যনাটকে জেলে পক্ষ ও ইটখোলা পক্ষ সামষ্টিক চরিত্র হিসেবে চিত্রিত; যারা বেঁচে থাকার জন্য মুখোমুখি সংগ্রামে লিপ্ত। সাজেদুল আউয়াল জেলেপাড়ার এই সমস্যা নিয়ে প্রথাগত সামাজিক নাটক রচনা করতে পারতেন, তা না করে কাব্যনাটক রচনা করেও তিনি যথেষ্ট সার্থকভাবে নাট্যঘটনায় কাব্যাঙ্গিক ব্যবহার করেছেন। এ কাব্যনাটকে নিম্নরূপ কাব্যালঙ্কার পাওয়া যায় :

উপমা :
ক.
এরই কূলে অকূলে
কবে, সে কোন্ সুদূরে
বেঁধছিলো ঘর:
নমু মুছলমান, ধীবর,
কুমোর,বণকি, তাঁতী-
সে আজ দূরশ্রুত কোনো
শঙ্খস্বরের মতো মনে পড়ে।৩০

খ.
সাঁইজ নামলে মনে হয়-
কালা মইষের নাখান আন্ধার
জাল্লা পাড়ায় আইসা
চুপচাপ বয়।৩১
দখলের লড়াই বাঁধবো যখন
তখন তো আমার কল্লাটাই
কলার কাঁদির নাখান-
এক কোঁপে নামাইবো আগে!৩২

ঘ.
ডব্কা মাইয়া লোকের নাখান
ভরা থাকবো- ধানের গোলা।৩৩

ঙ.
ফুল কপির মতো
মাথার মগজে তার,
ফুটেছে অসুস্থ ফুল-নীল কমল।৩৪

চ.
বাতাস লাগা পালের নাখান
ফুইল্যা উঠলো তার বুক!৩৫

ছ.
পোয়াঁতীর পেটের নাখান
ভরা চাই ধানের গোলা-৩৬

জ.
কেউ চায়্যা থাকে
মরা মাছের চোখের নাখান।৩৭

ঝ.
চিন্তামনি বড়ইয়ের নাখান
চিম্যা গেছে তার মন।৩৮
তুমিতো ছিদাম বুড়া
শিবায়ের পূজা দিলা এতো কাল
তবু তোমারি পেটে হুক্কার লাল
টিক্কার নাখান-
ক্ষুধা জ্বলে-কেনে আজ।৩৯

ট.
আশাপূর্ণ এই ভাষা তামসের কালে
চাপিলার পেটের মতো চিকচিক করে;৪০

উৎপ্রেক্ষা :
ক.
এখানে তখন
মানুষের মন,
যেনো -
মৃত কোনো বিজন বাবুই পাখি।৪১

খ.
না হয় বিষাদ তারে
সাজায় দিছে আপন হাতে,
য্যান্ মরা এক মৌমাছি-৪২

গ.
উদ্দাম- নাচিয়া গ্যাল্
য্যান আৎকা আশা বৈশাখী বাতাস।৪৩

ঘ.
উল্লাস- ফাটিয়া পড়ে
যেমুন তুলা গাছে ফাটে
ফাগুনের বাতাসে শিমুল।৪৪

রূপক :
ক.
উঠানের আন্ধার ঠুকরাইয়া খায়
গেরস্থের কালা মুরগী;
সিথানের পাশে দাঁড়ায়া
মরণ ফুটায় আঙুল।৪৫

চিত্রকল্প :
ক.    
তুমি আজ ববুই পাখির ঠোঁটে
সেই উড়া খড়;
তাল পাতার শ্যামল ছায়ায়
যাতে বান্ধ্যা হয় সুনিবিড় ঘর।৪৬

খ.
সর্বনাশ পাখনা মেলে
পল্লীর সীমানা লয়া,
গাছ-গাছালীর নিশ্বাস জড়ায়া ধরে
শিকড়ে ডানা,
পাথরের উরপে উড়ে
হইল্দা প্রজাপতি-।৪৭

গ.
যদি হয় জয় আমাদিগের,
নিচ্চয় সুদিন হইবো চঞ্চল
সুরুযের আঁচে ওই চরে।
মাঠে মাঠে ভারা ভারা
কাটা হইবো শষ্য :
আহারের দানা।
দিবা নিশি
গৃহস্থের অঙনে
হাসি খুশী-শান্তি করবো খেলা।
পাথরের কোল ঘেইস্যা
জাগবো-সবুজ দুর্বা ঘাস।৪৮

ঘ.
মান কচু, মিষ্টি আলু, কলমীর লতা-
লয়না পেটে আর;
ভাতের গরম গন্ধ নিতে
নেশা জাগে নাকে।৪৯

ঙ.
এইখানে টলে জীবন,
টলে আমাদিগের ঈশ্বর।৫০

চ.
এইখানে বিষন্ন একা একা হাঁটে
লীলাময় বালুর তটে।৫১

নাটককার সাজেদুল আউয়াল একজন কবির সমস্ত দক্ষতা নিয়েই সার্থকভাবে সংলাপ রচনা করেছেন। তিনি সচেতনভাবে সংলাপে কাব্যালঙ্কার ব্যবহার যেমন করেছেন, তেমনি চরিত্রকে বাস্তবানুগ করে তোলার লক্ষ্যে সংলাপে আঞ্চলিক শব্দের প্রচুর ব্যবহার ঘটিয়ে এর নাট্যগুণ অক্ষুণ্ন রাখতে সক্ষম হয়েছেন। ফণিমনসায় ব্যবহৃত কতিপয় আঞ্চলিক শব্দের পাশে এর চলিতরূপ দেখানো হলো :
চিরকাল্যা > চিরকেলে, মইলা > মরলা, মোগো > আমাদের, তোহারী > তোমার, য্যান > যেন, কইরা > করে, আইসাছি > এসেছি, বেচনের > বিক্রির, সাঁইজ > সন্ধ্যা, কমুনা > বলবনা, শুইন্যা > শুনে, সঙরিয়া > স্মরণ করে, মাইয়া > মেয়ে, তিরাসে > তিয়াসে বা পিপাসায়, ঠিসারা > কটাক্ষ করা ,আউছি > ভেংচি কাটা প্রভৃতি।

সাজেদুল আউয়াল এ কাব্যনাটকের কথক চরিত্রের সংলাপে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করেন নি। তিনি মূলত কাব্যনাটকে উপস্থাপিত চরিত্রের ভৌগোলিক সত্যতা নিশ্চিত করতেই ফণিমনসার তীরবর্তী জেলেদের মুখের ভাষার প্রয়োগ করেছেন।

সাজেদুল আউয়ালের ফণিমনসা কাব্যনাটকে ধারাবাহিকভাবে কোন চরিত্রের বিকাশ ও পরিণতি লক্ষ করা যায় না। এর চরিত্রগুলো প্রত্যেকেই বিচ্ছিন্ন তবে সামগ্রিকভাবে তারা সকলেই তাদের বেঁচে থাকার আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সহায়তা করেছে। আপত-অর্থে এই বিচ্ছিন্ন চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে তিতাস পারের জেলেদের বেঁচে থাকার সংগ্রাম মূর্ত হয়ে উঠেছে। ছিদাম, পরভু, কৃষ্ণ, লখাই, পুঁটি, ধরিত্রী এরা সকলেই বিচ্ছিন্নভাবে নাটকের কাহিনীতে যুক্ত তবে তারা সকলেই ঐক্যবদ্ধ। বলাবাহুল্য, নাটককার এ কাব্যনাটকে সামাজিক সংকট চিত্রিত করে তুলেছেন বলেই একক কোন চরিত্রের বিকাশ বা পরিণতি ঘটে নি। লখাই নাটকের কাহিনীতে প্রথম থেকে শেষপর্যন্ত জেলেদের সংগ্রামের অগ্রভাগে থেকেছে এবং অন্যান্য চরিত্র যেন তাকে সহায়তার অর্থে তাদের আন্দোলনকে পরিণতির দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। কাব্যনাটকে সামাজিক-সংকট চিত্রিত করে, ব্যক্তিচরিত্রের অন্তর্গত রহস্য, সত্য উন্মোচন করা কঠিনতর কাজ; তথাপি পরভু-পুঁটি, কৃষ্ণ-ধরিত্রী, মুখপোড়া প্রভৃতি চরিত্রের কোন কোন সংলাপে তাদের ব্যক্তিচরিত্রের অন্তর্গত রহস্য নাট্যঘটনায় উদ্ভাসিত হয়েছে।

ফণিমনসা কাব্যনাটকের সমাপ্তিদৃশ্য থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, কাব্যনাটককার সাজেদুল আউয়াল আধুনিকতার সংকটে আবর্তিত একদল প্রান্তিক জনমানুষের অনিশ্চিত জীবনসংগ্রামের চিত্রই সন্মুখবর্তী করেছেন মাত্র। এখানে নাটককার নিমজ্জিত সংকট থেকে বেরিয়ে আসার কোন পথ দেখান নি জেলেদের। আধুনিক সভ্যতার বিকাশে একশ্রেণীর মানুষ যেমন লাভবান হয়, তেমনি একশ্রেণীর মানুষ হয় ক্ষতিগ্রস্ত। ফণিমনসার তীরবর্তী জেলে সম্প্রদায়ের সংকটাপন্ন জীবন কোন্ পথে আশার আলো খুঁজে পাবে তা নাটককার এড়িয়ে গেছেন। তিনি প্রান্তিক জেলে সম্প্রদায়ের সংকটাপন্ন অস্তিত্বের সংগ্রামের চিত্র বিবেকবান মানব সম্প্রদায়ের সামনে উপস্থাপন করেই শিল্পীর কর্তব্য সম্পাদন করেছেন মাত্র। জেলেপাড়ার কৃষ্ণ, লখাই, ছিদামের মৃত্যুর পর কথকের সংলাপে ভবিষ্যৎ নির্মাণের একটি ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও তা সংকট থেকে উত্তরণে সুনিশ্চিত কোন উপায় হিসেবে গণ্য করা যায় না। কৃষ্ণ, লখাই, ছিদাম মৃত্যুর পথ বেছে নিয়ে ‘আগামীর হাতে সুচারু স্বপ্ন’ বুঁনেছে সত্য; সেই স্বপ্নের ভবিষ্যৎ গন্তব্যহীন, অনিশ্চিত ও সংশয়পূর্ণ। এ-সত্য মেনে নিয়েই শান্তনু কায়সার ফণিমনসার কাব্যগুণ বিচারান্তে বলেছেন যে -‘সকল পরাজয় ও মৃত্যুর পরেও আখ্যানটি দাঁড়িয়ে যায় প্রাণ-প্রবাহের পক্ষে’।৫২

 টীকা ও তথ্যসূত্র :
 ১.সাজেদুল আউয়াল, ফণিমনসা , মনজুরে মওলা সম্পাদিত, উত্তরাধিকার, ১৩শ বর্ষ : ১ম-সংখ্যা, ঢাকা : বাংলা একাডেমী , ১৯৮৫ ; পৃ. ১২৪, ২. তদেব, পৃ. ১২৪, ৩. তদেব, পৃ. ১২৩, ৪. তদেব, পৃ. ১২৬, ৫. 'It is possible that what distinguishes poetic drama from prosaic drama is a kind of doubleness in action, as if it took place on two planes at once. In this it is different from allegory, in which abstraction is something conceived, not something differently felt, and from symbolism (as in the plays of Maeterlinck) in which the tangible world is deliberately diminished- both symbolism and allegory being operations of the conscious planning mind.' -T.S. Eliot, Selected Essays, 1st Paperback edition, London : Faber and Faber, 1999; p. 229, ৬. সাজেদুল আউয়াল, ফণিমনসা , পূর্বোক্ত, পৃ. ১২৭, ৭. তদেব, পৃ. ১২৮, ৮. গ্রীক ট্র্যাজেডির ক্ষেত্রে যেমন মানুষ নিয়তির হাতের ক্রীড়নক, একইভাবে ফণিমনসার জেলে সম্প্রদায়ও নিয়তির অনিবার্যতার হাতে বলী হয়েছে। অর্থাৎ সাজেদুল আউয়াল তাঁর কাব্যনাটকের চরিত্রগুলোকে নিয়তির হাতে বন্দী দেখিয়েছেন গ্রীক ট্র্যাজেডি অনুসরণে। ৯. সাজেদুল আউয়াল, ফণিমনসা , পূর্বোক্ত, পৃ. ১৩০, ১০. তদেব, পৃ. ১৩১, ১১. অনুপম হাসান, ‘কাব্যনাটকের সংজ্ঞার্থ এবং বাংলা কাব্যনাটকের স্বরূপ ও উৎস পর্যালোচনা’, প্রফেসর খন্দকার ফরহাদ হোসেন সম্পাদিত, সাহিত্যিকী, বর্ষ : ৪৮, সংখ্যা ৩৮, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় : বাংলা গবেষণা সংসদ, বাংলা বিভাগ, জুন ২০০৭;  পৃ. ৯৬, ১২. ব্যক্তিসত্তার এই সার্বিকসত্তায় উত্তরণ প্রক্রিয়া প্রকৃতপক্ষে কাব্যের অনুষঙ্গ। আর এ কারণেই কাব্যনাটক মহত্তর সাহিত্য মাধ্যম। টিএস. এলিয়ট এ প্রসঙ্গে যথার্থ বলেছেন, 'Poetry is essentially dramatic and the gretest poetry always moves toward drama; drama is essentially poetic and the greatest drama moves towards poetry.'- T.S. Eliot, On Poetry and Poets, London : Faber and Faber, 1961; p. 74, ১৫. পেটের দায়ে পুটি ‘গঞ্জের কোটা ঘরে’ শরীর বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিল। পরভু তাকে সামাজিকভাবে কুলটা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কিন্তু যেদিন পুটি বাধ্য হয়েছিল শরীর বিক্রি করতে সেদিন তাকে ক্ষুণ্নিবৃত্তির অন্ন জোগাতে পারে নি। ১৬. সাজেদুল আউয়াল, ফণিমনসা , পূর্বোক্ত, পৃ. ১৩২, ১৭. তদেব, পৃ. ১৩৯, ১৮. তদেব, পৃ. ১৪০, ১৯. তদেব, ২০. তদেব, পৃ. ১৪২, ২১. তদেব, পৃ. ১৩৫, ২২. নাটকের এ্যাকশন বা ক্রিয়াত্মক গুণের শর্ত কাব্যনাটকের ক্ষেত্রে শিথিল। কাব্যনাটকে এই নাট্যগুণ (ক্রিয়াত্মক) সংলাপের মাধ্যমেও উপস্থাপন করা হতে পারে। কারণ, কাব্যনাটকে মানবচরিত্রের অর্ন্তসত্তাকে মঞ্চে তুলে আনা বা দর্শনযোগ্য করাই প্রধান ব্যাপার। কাব্যনাটকে এ্যাকশন সবক্ষেত্রেই কাহিনীর হতে হবে এমন সুনির্দিষ্ট নিয়ম নেই। কাব্যনাটকে শব্দ, চিত্রকল্প এ্যাকশন ও নাট্যসংকটের মাত্রা পেতে পারে। বস্তুজগতের স্থূল বাস্তবতা কিংবা নিতান্ত নৈর্ব্যক্তিক বিষয়ও কাব্যনাটকে প্রতীকী ব্যঞ্জনায় মূর্ত হয়ে উঠতে পারে। -দ্র. অনুপম হাসান, ‘কাব্যনাটকের সংজ্ঞার্থ এবং বাংলা কাব্যনাটকের স্বরূপ ও উৎস পর্যালোচনা’, প্রফেসর খন্দকার ফরহাদ হোসেন সম্পাদিত, সাহিত্যিকী, পূর্বোক্ত, পৃ. ১০৩, ২৩.  সাজেদুল আউয়াল , ফণিমনসা , পূর্বোক্ত, পৃ. ১৩৫, ২৪.  T.S. Eliot , Selected Essays , Ibid , p. 212, ২৫.  ‘কাব্যনাটক মূলত এবং সার্বিকভাবে অন্তর্নাটক; তাই সংলাপ সেখানে মানুষের অন্তর্সত্যকে প্রকাশ করবে। অন্তরলোক উন্মোচনের অনিবার্য তাড়নায় সেখানে সংলাপ যখন নাটকীয় পরিস্থিতির এক গভীরতায় প্রবেশ করে, তখন কবিতাকে স্বাভাবিকভাবে কথ্যভাষার মতই অবলীলাক্রমে ব্যবহার করা যায়, অর্থাৎ, সেই সংলাপ তখন নিছক কবিতা থাকে না, নাট্যগুণ সমন্বিত এক কাব্যভাষা হয়ে ওঠে।’ ড. কণিকা সাহা, আধুনিক বাংলা কাব্যনাট্য : উদ্ভব ও বিকাশ, ১ম-প্র, কলকাতা : সাহিত্যলোক, ১৯৯৪; পৃ. ২৫ ২৬.  সাজেদুল আউয়াল, ফণিমনসা, পূর্বোক্ত, পৃ. ১৪৪, ২৭.  তদেব, পৃ. ১৪৫, ২৮.  তদেব, পৃ. ১৭৫, ২৯.  তদেব, ৩০.  তদেব, পৃ. ১২৪, ৩১.  তদেব, পৃ. ১৩৪, ৩২.  তদেব, পৃ. ১৩৫, ৩৩.  তদেব, পৃ. ১৩৬, ৩৪.  তদেব, পৃ. ১৩৯, ৩৫.  তদেব, পৃ. ১৪৩, ৩৬.  তদেব, পৃ. ১৬১, ৩৭.  তদেব, পৃ. ১৪৫, ৩৮.  তদেব, পৃ. ১৪২, ৩৯.  তদেব, পৃ. ১৪৯, ৪০.  তদেব  পৃৃ. ১৩৭, ৪১.  তদেব, পৃ. ১২৫, ৪২.  তদেব, পৃ. ১৫৪, ৪৩.  তদেব, পৃ. ১৫৭, ৪৪.  তদেব , ৪৫.  তদেব, পৃ. ১৩৫, ৪৬.  তদেব, পৃ, ১২৬, ৪৭.  তদেব, পৃ. ১৩৭, ৪৮.  তদেব, পৃ, ১৬৭, ৪৯.  তদেব, পৃ. ১৭১, ৫০.  তদেব, পৃ. ১৪৬, ৫১.  তদেব, পৃ. ১৬৫, ৫২.  শান্তনু কায়সার, ফণিমনসা: জল ও মৃত্তিকার আখ্যান , অপ্রকাশিত প্রবন্ধ

অনুপম হাসান, পিএইচ.ডি. গবেষক ; বাংলা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।