Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

রঙ্গমাতন সোলায়মান মেলা ২০০৭-এর বৈঠক : এই বাজারে কী নিয়ে কেন কীভাবে নাটক

Written by অনুলিখন.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

[২৮ সেপ্টেম্বর ২০০৭ তারিখে ঢাকার শিল্পকলা একাডেমীর ভেতর ও বাইরের প্রাঙ্গণ ঘিরে আয়োজিত হলো- রঙ্গমাতন সোলায়মান মেলা ২০০৭। প্রথমবারের মতো এই মেলার আয়োজন করেছিল নাট্যপত্রিকা ‘থিয়েটারওয়ালা’। দিনব্যাপী এই মেলায় বিভিন্ন নাট্যদল তাদের নিজস্ব স্টলে পরিবেশন করেছিল তাদেরই এতদিনকার কর্মযজ্ঞ। মেলায় সবার সরব উপস্থিতি ও অংশগ্রহণ আয়োজকদের উৎসাহিত করেছে নিঃসন্দেহে। মেলার অংশ হিসেবে দুপুরে আয়োজন করা হয়েছিল এক উন্মুক্ত বৈঠকের। বৈঠকের শিরোনাম ছিল- এই বাজারে কী নিয়ে কেন কীভাবে নাটক। বৈঠকটির সঞ্চালকের দায়িত্বে ছিলেন থিয়েটারওয়ালা সম্পাদক হাসান শাহরিয়ার। নাট্যজন-নাট্যদর্শক-সমালোকের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হওয়া বৈঠকের অনুলিখন ছাপা হলো পাঠকদের জন্য]

হাসান শাহরিয়ার
শুভেচ্ছা সবাইকে আজকের এই বৈঠকে অংশ নিতে আসায়। আমরা এটিকে বৈঠক বলছি, সেমিনার বলছি না, কারণ, এখানে মূলত কোনো প্রধান বক্তা নাই, কেউ পেপার পড়বে না। এখানে আজকের বিষয় ধরে সবাই নিজেদের মতামতগুলো জানাবো। আজকের বৈঠকের বিষয়- এই বাজারে কী নিয়ে কেন কীভাবে নাটক। তো কাউকে না কাউকে তো শুরু করতে হবে- তাই আমি প্রথমে মাইক্রোফোন দিতে চাই কামালউদ্দিন কবিরকে। মূলত আজকের এই রঙ্গমাতন সোলায়মান মেলার বৈঠকটির বিষয় নিয়ে ভাববার জন্য যাদেরকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল, তাদের মধ্যে কবির একজন। এবং এই শিরোনামটিও সে-ই ঠিক করেছে। তাই প্রথম বলাটা তাকে দিয়েই শুরু হোক।

কামালউদ্দিন কবির
আমরা আসলে একটু খোলামেলাভাবেই আলোচনা করতে চাই। এর আগেও থিয়েটারওয়ালা কিছু কিছু মুখোমুখি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল, দর্শক-নাট্যজন সবার সাথে সরাসরি কথা বলবার জন্য। তো সেগুলো ছিল নির্দিষ্ট নাটক ধরে ধরে। আজকের বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি এ কারণে যে, আজকে আসলে আমরা নিজেরাই নিজেদের সাথে কথা বলে বের করতে চাচ্ছি, আসলে আমরা করবোটা কী, কীভাবে, কেন। সে-জন্যই আমি অনুরোধ করবো যে, আপনারা একটু খোলামেলা কথা বলবেন। আমরা একটু নিজেরা বোঝার চেষ্টা করবো, আমরা যে নাটক করে যাচ্ছি, নানাবিধ বাস্তবতার মধ্যে থেকে, সেখানে ভাবনার দিক থেকে আমরা কতটুকু ভাবছি। আমরা যে মঞ্চে নাটক করছি, সেখানে বিষয় হিসেবে কোনটিকে ভাবছি। যদি নির্দিষ্ট বিষয় ভেবে থাকি তাহলে কেন ভাবছি। আর এই ভাবনাটা দর্শকের কাছে আজকের এই বাজারে উপস্থিত থেকে কীভাবে উপস্থাপন করবো। দেশ-কালের বিচারে যে সময়টাতে আমরা কাজটা করছি, তখনকার সামগ্রীক বাস্তবতাটা আসলে কী সেটা আমাদের মাথায় থাকে কিনা, সেগুলো বের করার চেষ্টা করবো।

তো শুরুতে একটা কিউ দিয়ে রাখতে পারি এভাবে, আজকের যে সময়, এই সময়টায়, দেশ-কালের মধ্যে থেকেও অনিবার্য কিছু বাস্তবতা অনবরত আমাদেরকে আক্রান্ত করছে। এবং এই যে বাস্তবতা, সেটির একটা নাম এখন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সিদ্ধ হয়েছে, সেটি হচ্ছে ‘বাজার’। বিশ্বব্যাপী মানুষের সব কর্মকাণ্ড, সেই কর্মকাণ্ডটা এখন বাজারী সংস্কৃতি দিয়ে নিয়ন্ত্রিত এবং পরিচালিত। আমাদের এই দেশ উপনিবেশিক শক্তি দ্বারা আক্রান্ত ছিল ২০০ বছর। সেই ২০০ বছরে আমাদের সব কিছু, চিন্তা-ভাবনা, সব কিছুই নিয়ন্ত্রণ করতো, প্রভাবিত করতো উপনিবেশিক শক্তি। তো আজকে দেখা যাচ্ছে দৃশ্যমান কোনো উপনিবেশিক শক্তি আমাদের সামনে নেই, কিন্ত আমরা সবাই নিশ্চয়ই অনুভব করছি, বুঝতে পারছি আজও আমরা কোনো না কোনো শক্তি বা প্রভাব বা ক্ষমতা দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার বাইরে না। এবং সেই ক্ষমতাটা কোনো ভৌগলিক সীমারেখা মানছে না। তাহলে সেই ক্ষমতাটা কার, কী দিয়ে হচ্ছে, সেই বিষয়গুলোই একটু বের করতে চাচ্ছি আজকের বৈঠক থেকে। সেই বাজারি সংস্কৃতির মধ্যে আজকে যে বিষয়টা আমরা উপস্থাপন করবো, মঞ্চে, যে নাটকটা উপস্থাপন করবো, সেটার সাথে আমার যোগসূত্র কতটুকু, কেনই-বা এই পারফরমেন্সটা করছি, এই সময়ে, সেই বিষয়টা নিয়ে নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করা দরকার।

আলী হায়দার
[নাট্যজন- সুবচন নাট্যসংসদ]
আমার মনে আছে, আমি প্রথম যখন সুবচনে যোগ দিই, ১৯৯১ সালে, তখন থেকেই দেখেছি দর্শক আনার ব্যাপারে আমাদের ভূমিকা ছিল যে, আমরা পুশিং সেল করতাম। পরে এক সময় সেটা বন্ধ করে দিই। বন্ধ করে দেয়ার পরে দেখা গেল দর্শক কমে যাচ্ছে। তো এখন যেটা করি যে, প্রত্যেক শো’র আগে প্রচুর এসএমএস করি, ই-মেইল করি। আমার কথা হচ্ছে, এই যে শিরোনামে আছে কী নিয়ে নাটক, তো যা নিয়েই নাটক হোক না কেন, দর্শককে সেটা দেখতে হবে বা দেখাতে হবে। কিন্তু সেই দর্শকতো কমে যাচ্ছে। কমে যাওয়া দর্শক বাড়াতে আমরা এই বাজারকে ব্যবহার করেত পারি কিনা? মানে এই যে মোবাইল ফোন, এসএমএস, ই-মেইল, এ-সব তো বাজারের কারণেই আমাদের হাতে এসেছে। এই বাজারটাকে ব্যবহার করা যায় কিনা। আমরা প্রত্যেকের নাটকের আগেই যদি বন্ধু-বান্ধব বা যার যার ই-মেইল আছে, তাদের কাছে মেইল পাঠাই তাহলে তারা আবার মঞ্চমুখি হতে পারে। শুরুতেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেল কিনা বুঝতে পারছি না। তবে আমি আমার একটা বিক্ষিপ্ত ভাবনার কথা বললাম। ধন্যবাদ।

শহীদুল মামুন
[নাট্যজন- প্রাচ্যনাট]
প্রথম প্রশ্নটি জাগতে পারে যে, শিল্পের কি আসলে বাজার আছে? শিল্প তো আসলে বাজারের জন্য না। আবার কথা থাকে যে, যদি শিল্প বাজারি পণ্য হয়, তাহলে কি সে তার শৈল্পিক ব্যাপারটা হারিয়ে ফেলবে? দু-একটা তথ্য দিই। শেক্সপীয়র কিন্তু গ্লোব থিয়েটারের শেয়ার হোল্ডারদের মধ্যে একজন ছিলেন। ৩৫ ভাগ শেয়ার তাঁর হাতে ছিল। উনি নাট্যকার ছিলেন, জীবন বিমুখ ছিলেন না। টাকা-কড়ির হিসাবটা খুবই ভালো বুঝতেন। উনি কখনো কোনো অর্থকষ্ট পেয়েছেন বলে আমাদের জানা নেই।

আরেকটা তথ্য দিই উনবিংশ শতাব্দীর। বলা হয়ে থাকে, কবিদের পকেট নাকি ফাঁকা থাকে। কারো কারো থাকতে পারে, সবার না। যাদের ফাঁকা থাকে না, তাঁরাও বিশ্বখ্যাত কবিই ছিলেন। উদাহরণ- কবি বায়রন। বায়রনের একটি কবিতার বই ছাপা হওয়ার সাথে সাথে, ইংরেজি ভাষার পাশাপাশি ফরাসী, স্পেনীশ ভাষায় প্রকাশিত হতো। বিনিময়ে তিনি কী পরিমান অর্থ পেতেন তা সহজেই অনুমেয়। রবীন্দ্রনাথে চলে আসি। রবীন্দ্রনাথের গ্রন্থ স্বত্ব কিন্তু তিনি হাওয়ায় উড়িয়ে দেন নি। উনি যে বক্তৃতাগুলো দিতেন, সেগুলো অর্থমূল্যে বিক্রি হতো। তো এটা কোনো লজ্জার ব্যাপার না যে, শিল্পীরা নিজেদের পণ্যের বাজারটিকে চিনতে পেরেছিলেন। শিল্প একটি উন্নতমানের ভোগ্য পণ্য এবং এটার ভোক্তা সব কালেই বাজারে ছিল। সুতরাং শিল্প বাজারী হয়ে যাচ্ছে কিনা, এই ভয়ে ভীত হওয়ার কোনো কারণ দেখি না। এখন আপনাদের মতামত শুনতে চাই। ধন্যবাদ।

টুটুল
[নাট্যজন- সিরাজগঞ্জ থেকে আগত]
আমার মনে হয়, নাটক এবং বাজার দুটি পরষ্পর বিরোধী বক্তব্য। পৃথিবীতে কোনো সৃষ্টিই তার বাজার খোঁজে নি। বাজারই সৃষ্টিকে খুঁজেছে। নাটকের যে ট্রেন্ড আমরা দেখি, সেটা হলো, এখানে সবাই স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কাজ করি। নিজের গাঁটের পয়সা দিয়ে কাজ করি, মানুষের জন্য, দেশের জন্য। সেক্ষেত্রে আমার মত হচ্ছে, নাটকে বাজারের চেয়ে কমিটমেন্টটা বেশি থাকা দরকার। আজকের এই যে মেলা, সেই মেলা যাঁকে নিয়ে করা হচ্ছে, সেই এস.এম.সোলায়মান বাজারী নাটক করেন নি। ওনার ভেতরে রাজনৈতিক কমিটমেন্ট ছিল, সেই কমিটমেন্ট দিয়ে যখন উনি নাটক করেছেন, সেখানে দর্শক আন্দোলিত হয়েছে, বাজার আপনাতেই সৃষ্টি হয়েছে। তার মানে, নাটক করতে হবে দায়বদ্ধতা থেকে। মানুষের প্রতি, দেশের প্রতি, এই মাটির প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে। ইদানিং যারা নাটক লিখছেন, তাদের ভেতরে একটা প্রবণতা আমি লক্ষ্য করি, তারা লেখার আগেই বাজারটা নিয়ে চিন্তা করছেন। এই যে আজকের বিষয়ে আছে কী নিয়ে নাটক করবেন- আমি বলতে চাই, এই মাটি নিয়ে, এই মাটির মানুষ নিয়ে নাটক করলেই নাটক টিকবে, নতুবা নাটক আপনাতেই বাজারী হয়ে উঠবে। ধন্যবাদ।

সামিনা লুৎফা নিত্রা
[নাট্যজন- সুবচন নাট্যসংসদ]
বাজার, রাষ্ট্র, রাজনীতি এসব প্রসঙ্গ এসেছে। সেই প্রসঙ্গ ধরে বলছি- বাজারটা আসলে কী? আমরা কেউতো বাজারের বাইরে নই, যেমনটি কিনা এই মুহূর্তে রাষ্ট্রের বাইরেও আমরা কেউ নই। এখন কথা হচ্ছে রাষ্ট্রটা কার বা কাদের দ্বারা পরিচালিত? সেই পরিচালনার যে শক্তিগুলো তাদের দেখলে কি মনে হয় যে আমরা একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রে বাস করছি? আমার তো মনে হয় না। এই রাষ্ট্রটাও কিন্তু একটা বাজার দ্বারা পরিচালিত। সাদা চোখে আমরা এটা দেখতে পাই না। পুরো পৃথিবীতে এখন যে একচেটিয়া পূঁজির আধিপত্য, সেই বাজারের কবলে তো এই বাংলাদেশও। বাংলাদেশ কোন শক্তির দ্বারা পরিচালিত হবে, সেটার উপর যদি এই দেশের জনগণের কোনো হাত না থাকে, বিপরীতে বলতে হয় বিশ্ববাজারের হাতে যদি এই শক্তি পরিচালিত হয়, তাহলে সে এখানকার মানুষ যে শিল্প সৃষ্টি করবে, তার বিপক্ষেই দাঁড়াবে। এবং সব সময় দাঁড়িয়েছেও। তো এমন একটা অবস্থায় এখানে যারা আমরা নাটক করছি, তারা তো কোনোভাবেই বাজারের বাইরে যেতে পারবো না। আমার মনে হয় যারা নাটক করছি, তাদের আগে জানতে হবে আমাদের অবস্থানটা বিশ্বপূঁজির সাথে কীভাবে সম্পৃক্ত। এবং কোন অবস্থানে দাঁড়ালে এই পূঁজির বিপ্রতীপে দাঁড়ানো হবে। এখানকার মাটি মানুষের শোষিত হওয়ার ব্যাপারটা অনুধাবন করেই ফাইট দিতে হবে। সেখানে আমি বাজার খুঁজবো না, বাজারকে ফেইস করার উপায় খুঁজবো? এই খোঁজাখুঁজির ব্যাপারটা সফল হবে যদি আমি বুঝতে সক্ষম হই, বিশ্বপূঁজির কী ধরনের নিয়ন্ত্রণে আমাকে চলতে হয়। ভাসা ভাসা অবস্থানে থেকে, কেবল ঢাকা শহর বা বাংলাদেশ পর্যন্ত দেখে সফলতা আনা যাবে না। ধন্যবাদ।

তানসেন নিকলী
[নাট্যজন- দৃশ্যপট]
প্রথমেই বলে নিই যে, বাংলা ভাষার একটা আয়রনি আছে, আমরা ইন্ডাস্ট্রি-র বাংলা করেছি ‘শিল্প’ এবং আর্টেরও বাংলা করেছি ‘শিল্প’। এই দুই শিল্পের দ্বন্দ্বটা এই বাজারে, এই বর্তমান সময়ে আমাদেরকে ভোগাচ্ছে। নাটক আসলে কী করে? সমাজের যারা বাসিন্দা, তাদের সামনে সে উপস্থাপন করে বর্তমান সময়ে কী ঘটছে, কেন ঘটছে- এই সব। তো এসব দেখাতে গিয়ে মাঝে মাঝে কিছু নাটকের হয়তো শিল্পমান ক্ষুণ্ন হয়, স্লোগান হয়ে যায়, সেটা নির্মাতাদের ব্যর্থতা বলা যেতে পারে- কিন্তু নাটকের মূল উদ্দেশ্যই হলো সময়কে ধরে সময়ের দ্বন্দ্বকে তুলে ধরা। তাই যদি হয়,তাহলে আজকে আমরা কী নিয়ে নাটক করবো? আমাদের আজকের যে বাংলাদেশ বা বিশ্ব, বাংলাদেশ তো আর বিশ্ব থেকে আলাদা কিছু না, সেই বাংলাদেশে যা ঘটছে, বিশ্বে যা ঘটছে, তার প্রতিফলন থাকা চাই আজকের নাটকে। আজকে যারা দেশ চালান, বিগত ৩৬ বছরে যারা দেশ চালিয়ে গেছেন, তাদের কর্মকাণ্ডের ধরনই নাটকের বিষয় হওয়া উচিত ছিল। কেন? কারণ, সমস্ত সংকটের মূলে তো হলো এই চালিকা শক্তি। এখন কীভাবে করবো সেই নাটক? আমরা কি এই চার দেয়ালের ভেতরেই করবো নাকি ছড়িয়ে যেতে হবে? আমাদের সামনে মুক্ত নাটকের অভিজ্ঞতা আছে, গ্রাম থিয়েটারের অভিজ্ঞতা আছে, সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো যায় কিনা দেখতে হবে। নিজেদেরই বের করতে হবে কীভাবে পৌঁছাবো আমাদের বার্তা, দর্শকের কাছে। ধন্যবাদ।

খালিদ
[নাট্যজন- সুবচন নাট্যসংসদ]
প্রথম কথা হচ্ছে, বাজারটাকে আমরা কীভাবে দেখছি। থিয়েটারের বোধহয় একটা বাজার আসলেই প্রয়োজন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে। কারণ, স্বাধীন বাংলাদেশে থিয়েটার চর্চার শুরু থেকে এখন পর্যন্ত আমরা কিছু মৌলিক সমস্যা নিয়েই আছি। তখন বলতাম দর্শক সংকট, এখনও বলি দর্শক সংকট। তখন বলতাম মঞ্চ সংকট, এখনও বলি মঞ্চ সংকট। এখন কথা হচ্ছে, আবেগ দিয়ে নাটক করলে এক ধরনের আউটপুট আসবে, আবার প্রফেশনাল এ্যাটিচ্যুড নিয়ে করলে আরেক ধরনের কাজ হবে। এখানে আমার ক্লায়েন্ট যদি হয় দর্শক, সেক্ষেত্রে দর্শক বাড়ানোর ব্যাপারে আমরা প্রফেশনাল এ্যাটিচ্যুড নিয়েছি কিনা। আমার মনে হয় না নিয়েছি। আজকের যে বিষয়, আমরা কেন নাটক করবো, সেটা আমার মনে হয় নিজেদের মধ্যে আসলেই পরিষ্কার হওয়া দরকার। সব কিছু বাদ দিয়ে নাটক করতেই হবে, এমন দায় তো কেউ আমাদের দেয় নি। আর যদি নাটক করিই তখন প্রশ্ন আসবে কী নিয়ে নাটক করবো। আজকাল যেসব নাটক হয় সেগুলো দেখলে আসলে মনে হয় না যে, খুব ভেবে চিন্তে নাটকটা হাতে নেয়া হয়েছে। আমরা সেই নাটকই এখন করবো যে নাটক এখন না করলেই নয়। সেটা অবশ্যই বিষয়ের দিক থেকে। বিশ্ব প্রেক্ষাপটের দিক থেকে। তো আসলে আমি যা বলতে চাচ্ছি, যদি নাটক করতেই হয়, পরিশ্রমটাকে যদি সার্থক করতেই হয়, তাহলে মানসিকতার দিক থেকে হলেও আরেকটু প্রফেশনাল হতে হবে। ধন্যবাদ।

হাবিবুর রহমান খান
[চলচ্চিত্র প্রযোজক, নাট্যদর্শক]
আমি নিয়মিত নাটক দেখি, যদিও বলা যেতে পারে আমি চলচ্চিত্রের মানুষ। মূলত আমি প্রযোজক। তিতাস একটি নদীর নাম, পদ্মা নদীর মাঝি, হঠাৎ বৃষ্টি- এগুলো আমার প্রযোজিত ছবি। পদ্মা নদীর মাঝি-র কুবের চরিত্রের অভিনেতা রাইসুল ইসলাম আসাদের সাথে অনেকদিন কথা হয়েছিল যে, সোলায়মানের সাথে দেখা করবো। আজকে যে ডকুমেন্টারিটা দেখলাম, সোলায়মানের উপর, সেটা দেখার পর আমার চোখে পানি এসে গেছে।

আপনারা অনেকে কমিটমেন্টের অভাবের কথা বললেন। আমি একটা কথা বলি, আপনারা যা করছেন, সেটা অনেক বড় কাজ। আপনারা যে কাজটি করেন, দর্শকের সাথে সরাসরি কথা বলেন। দর্শক আপনার কথায় রিএ্যাক্ট করেন আবার আপনি দর্শকের কথায় রিএ্যাক্ট করেন। এটা কিন্তু অনেক বড় কাজ। আমাদের সিনেমায় কিন্তু এটা হয় না। কমিটমেন্ট আছে বলেই আপনারা মঞ্চে কাজ করেন, এত বড় আয়োজন করতে পারেন। এতগুলো মানুষকে এই সময়ে এক সাথে করা কী চাট্টিখানি কথা? আপনাদের কমিটমেন্টের অভাব নাই, আর কমিটমেন্ট থাকলে বাজার নিয়ে চিন্তা করার কিছু নাই। আপনারা আপনাদের কাজ করে যান। ধন্যবাদ।

ফিরোজ
[নাট্যদর্শক]
আমি এখন মূলত কেবল দর্শক। ছাত্রাবস্থায় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিলাম। আজকের বিষয়- এই বাজারে কী নিয়ে কেন কীভাবে নাটক, এর প্রেক্ষিতে আমি বলতে চাই, নাটকের মূল কাজ হলো সমাজটাকে এগিয়ে নেয়া। আর এই এগিয়ে নিতে হলে সমাজের অসংগতিগুলো দূর করতে হবে। তাহলে এখন যারা থিয়েটার করছেন, নির্মাতা আছেন, তারা সেই নাটকই করবেন, যে নাটকে সমাজের অসংগতি দূর করার ব্যাপারটা থাকবে। ধন্যবাদ।

আমিনুর রহমান মুকুল
[নাট্যজন- পালাকার]
আমি কিছু বিষয় শেয়ার করতে চাচ্ছি। আজকের বিষয়ের ‘বাজার’ এবং ‘কী নিয়ে’-টাকে আমরা আপাতত যদি না দেখি, তাহলে আমার মনে হয় ভালো হবে। আমাদের জানা দরকার ‘কেন’ করবো আর ‘কীভাবে’ করবো। আমরা দেখেছি স্বাধীনতা উত্তরকালে যখন নাগরিক থিয়েটার চর্চার শুরু হয়, তখনই ‘কেন’ নাটক করবেন, এই বিষয়টি পরিষ্কার ছিল না। আমরা একেকজন একেক ভিশন নিয়ে নাটক করি। কিন্তু কোনো ভিশনেরই স্থিরতা নাই। কেন নাটক করবো এটা কারো কাছেই পরিষ্কার না, ফলেই সংকটটা তৈরি হয়েছে। বাজারের জন্য করবো, নাকি শিল্পের জন্যই করবো এটা পরিষ্কার না। বা মুখে বলছি শিল্পের জন্য, আসলে করছি বাজারের জন্য- এধরনের হটকারিতাও বোধহয় কারো কারো মধ্যে আছে। তাই আগে ঠিক করি কেন করবো, আর যদি করি, কোন কৌশলে করবো অর্থাৎ কীভাবে করবো। আমরা তো আসলে একটা গ্লোবাল বাজারের ভেতরেই আছি, তাহলে এখানে কৌশলটাই হলো মূল। বাজারকে অস্বীকার তো করতে পারছি না। আর সব সময় বাজার খুঁজতে চাইলে নাটকটা আর করা হয়ে উঠবে বলে মনে হয় না। বরং আমরা কাজ করতে থাকি, বাজারই আমাদের খুঁজে নেবে। সুতরাং আজকের বিষয়ের পুরোটা না নিয়ে যদি ‘কেন’ করবো ঠিক করতে পারি, তাহলেই আপাতত একটা কাজ হবে। ধন্যবাদ।  

শামীম সাগর
[নাট্যজন- পালাকার]
এতক্ষণের কথা থেকে মনে হলো, থিয়েটারের সাথে ‘বাজার’ শব্দটা আসলেই আমরা হোঁচট খাচ্ছি। ভাবছি এই বুঝি সব গেল। আসলে এটা আমাদের এ্যামেচারি ভাব থেকেই এসেছে। আমাদের ‘বইয়ের বাজার’ আছে, ‘অডিও বাজার’ আছে, ‘চলচ্চিত্র বাজার’ আছে, তাহলে ‘থিয়েটার বাজার’ থাকলে অসুবিধা কোথায়? অনেক সময় মনে হচ্ছিল বাজারী বললে বোধহয় কমিটমেন্টের অভাব মনে হয়। আসলে কিন্তু ঠিক উল্টো। বরং বাজারকে মনে রাখলে কমিটমেন্ট আরও বাড়বে। এস.এম. সোলায়মানকেও আমার মনে হয়েছে বাজার দেখে নাটক করতেন। এই দেশে এই বেশে, ইঙ্গিত এসব নাটক ঐ সময়ের চাহিদা ছিল এবং সেই চাহিদা মতই তিনি এসব নাটক করেছেন। ‘কী নিয়ে’ নাটক করবো, এটা তো পরিষ্কার থাকার কথা। আমরা সময়কে ধরে নাটক করবো। ধন্যবাদ।

রতন দেব
[নাট্যজন- উদীচী]
অনেকের কথায় মনে হচ্ছে ‘এই বাজারে’ কথাটার অর্থ বুঝতে একটু সমস্যা হচ্ছে। আমি বিষয়টাতে যা বুঝেছি সেটা হলো এই বাজারে মানে- এই সময়ে, এই অবস্থায়, এই পরিস্থিতিতে। সেটা বিশ্ব প্রেক্ষাপটের ব্যাপারেও হতে পারে। কারও কারও কথায় মনে হচ্ছে নাটক বাজারকে ধরতে চাচ্ছে বা নাটককে বাজারে বিকাতে হবে সেটা বলা হচ্ছে। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে বিষয়টাতে বলা হয়েছে যে ‘এখন’ কী নিয়ে কেন কীভাবে নাটক- এটা বোঝানো হয়েছে। এই ‘এখন’টাই হলো বাজার, ‘এখন’টাই হলো রাজনীতি ইত্যাদি।

আজকের এই জরুরি অবস্থায় আমরা সোলায়মান মেলা করছি। কেন করছি? নিজেদের তাগিদ থেকেই করছি। আমরা থিয়েটার করি, থিয়েটারের মাধ্যমে অনেক মেসেজ আমরা দিই, এই মেলার আয়োজনের মধ্য দিয়েও আসলে আমরা মেসেজই দিচ্ছি। সেটা হলো যে-কোনো অবস্থাতেই আমরা দাঁড়াতে জানি। এই মেলার আয়োজনে ‘কেন’ ‘কী নিয়ে’ কীভাবে’ এই ৩ টা ব্যাপারই আছে। সোলায়মান কী নিয়ে নাটক করেছেন? কোর্টমার্শাল করেছেন। কারণ, এই সময়ে এমন নাটকই প্রয়োজন ছিল। কীভাবে করেছেন? তার দলের মাধ্যমে করেছেন। এখন প্রশ্ন হতে পারে আমরা কীভাবে করবো? এই গ্রুপ থিয়েটারের মাধ্যমেই করবো নাকি প্রফেশনাল দল তৈরি করে করবো নাকি স্টুডিও থিয়েটারের মাধ্যমে করবো? মঞ্চে করবো নাকি পথে করবো? ‘বাজার’ মানে আমার সামনে যে প্রতিকূলতা আছে সেটাকে বোঝানো হয়েছে। এবং সেই প্রতিকূলতা কীভাবে ফেইস করবো সেটা বলার জন্য এই বৈঠক। আমার কাছে অন্তত তাই মনে হয়েছে। ধন্যবাদ।

সেতু
[নাট্যজন- শব্দাবলী, বরিশাল]
এই বাজারে কী নিয়ে নাটক যদি বলতে হয় তাহলে বলবো, যেহেতু নাটক করছি, থিয়েটার করছি, তাই আমাদের অবশ্যই শিল্পবোধ থাকতে হবে, দর্শন থাকতে হবে, এবং একটা রাজনীতি থাকতে হবে। আর এই শিল্পবোধকে প্রকাশ করতে গিয়ে যদি প্রথমেই বাজারের কথা চিন্তা করি, তাহলে বোধহয় একটু সমস্যা দেখা দেবে। আমার মনে হয়, আগেও যারা বলে গেছেন, তাদের কথা ধরেই বলি, বাজার যেন আমাদের কাছে আসে, আমরা যেন বাজারকে নিয়ে চিন্তা না করি। এখন কথা হচ্ছে বাজার আমাদের কাছে কেন আসবে? আমাদের ভোক্তা হচ্ছেন আমাদের দর্শক। দর্শক যেন নাটক দেখতে আসে, সেই মানের নাটক আমরা তৈরি করতে পারছি কিনা সেটা দেখার বিষয় আগে। আমরা পারছি না বোধহয়। কেন পারছি না? তার কারণ হতে পারে, স্বাধীনতার পর থেকে যে নাট্যচর্চা শুরু হয়েছিল, সেটা কখনোই এ ব্যাপারটার দিকে নজর দেয় নি। মানে আমাদের যাত্রা শিল্প যেমন তার দর্শক খুঁজে নিয়েছিল এবং প্রফেশনাল হয়েছিল, আমরা সেটা করি নি। এখানে অনেকেই বলবেন যে, না থিয়েটারকে প্রফেশনালি নেয়া সম্ভব না। কিন্তু আমার কথা হচ্ছে, সম্ভব কি সম্ভব না, সেটা পরীক্ষাও করা হয় নি, দু-একটি বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ ছাড়া। ভারতের প্রবীর গুহের সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। তো তাঁরাও প্রথমেই বাজার খুঁজেছে তা না। তাঁরা প্রথমে থিয়েটারটাকে কমিউনিকেটিভ করতে চেয়েছেন। রুট লেভেলে গিয়ে, প্রান্তিক মানুষদের সাথে কাজ করেছেন। জেলে, ফেরিওয়ালা- এসব লোকদের নিয়ে কাজ করেছেন। গ্রামে গ্রামে থেকেছেন, থেকে নাটক করেছেন। এখন তাদের নাটক দেখার জন্য অনেক আগে থেকেই টিকেট কাটতে হয়। পিটার ব্র“ক তাদের নাটক দেখার জন্য ১ মাস আগে টিকেট কাটেন, এরকম উদাহরণও আছে শুনেছি। তো আমরা কী নিয়ে করবো, কেন করবো, কীভাবে করবো এর উত্তর বোধহয় এ কাজগুলোর দিকে নজর দিলেই পাওয়া যাবে। ধন্যবাদ।

ফয়েজ জহির
[নাট্যজন- আরণ্যক নাট্যদল]
আজকের দেশের যে অবস্থা বা পৃথিবীব্যাপী যে অবস্থা, সেখানে বাজার কেবল অর্থনীতি না, রাজনীতিও বটে। আজকে প্রতিনিয়ত যে সংকটের মুখোমুখি হচ্ছি আমরা, সেখানে কী নিয়ে নাটক করবো এটা কি বলে দিতে হবে? আমার দাঁড়াবার জায়গা দেখলেই তো হয়, কোথায় দাঁড়িয়ে আছি, আমার চারিপাশের পরিস্থিতি কী সেটা দেখার চোখ থাকলে কী নিয়ে নাটক করবো সেটা আর খুঁজতে হয় না।

আসলে আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি সেটা নিয়েই ভাবছি না। কেউ কেউ ফাঁকা বুলিও আওড়াচ্ছি, কিন্তু আসল জায়গাটাতে যেতে চাই না। দাঁড়াবার সাহসও নেই। প্রথমেই হয়তো মনে হয় যে দাঁড়ালে তো রাষ্ট্রের বিপ্রতীপে দাঁড়াতে হবে। তাহলে কী কী প্রতিরোধের মুখোমুখি আমাকে হতে হবে। এই প্রতিকূল পরিস্থিতি, সেটাকেই বলা হচ্ছে ‘বাজার’। ‘বাজার’ মানে আমার নাটক কত টাকায় বিক্রি হলো সেটা না। একজন যাত্রা শিল্পের কথা বলেছেন। তারা তাদের বাজার খুঁজে নিয়েছিল। কিন্তু রাষ্ট্র তাদেরকে কী করেছে? তাদের পথ চলার জায়গাটাকে রুদ্ধ করে দিয়েছে। থিয়েটারের কী অবস্থা? আজকেও আমার সাথে মফস্বলের এক নাট্যজনের কথা হয়েছে। সেখানে নাটক করতে হলে প্রশাসন পাণ্ডুলিপি আগে জমা দিতে বলেছে। কেন? আমার তো অভিনয় নিয়ন্ত্রন আইন উঠে গেছে। তাহলে এখনো পাণ্ডুলিপি জমা দিতে হবে কেন? এই কেন বা কাকে জমা দিতে হবে, সেগুলোই হলো ‘বাজার’। এই বাজারকে মাথায় রেখে আমরা সব সময় এগিয়েছি, এখনো এগুতে হবে। তারপর কথা আসবে কীভাবে করবো। সেটা হলো শিল্পের জায়গা। নাটক যেহেতু করছি, শিল্পমান নিয়েই দর্শকের কাছে আসতে হবে, নয়তো বক্তৃতা হয়ে যাবে বা পোস্টার থিয়েটার হয়ে যাবে। সুতারং এই বাজারে মানে এই বন্ধ্যা সময়ে, এই বন্ধ্যা অস্থির সময়ে কী নিয়ে কেন কীভাবে নাটক করবো সেটা ভাবতে হবে। কাউকে দোষারোপ করে নয়, নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে, কতটুকু করলাম বা কতটুকু করতে পারবো। ধন্যবাদ।

মোহাম্মদ বারী
[নাট্যজন- থিয়েটার আর্ট ইউনিট]
কী নিয়ে নাটক হবে সেটা যদি বের করি, তাহলে পরের কথাই হলো কেন এই নাটক। আমি একবার মামুন ভাইয়ের (মামুনুর রশীদ) সাথে কথা বলেছিলাম। উনি নাকি একটা হিসাব বের করেছিলেন যে, একটা নাটক নামাতে একটা দলের প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা খরচ হয়। এই খরচটা প্রায় ৪০/৫০ জন কর্মীর প্রতিদিনের সময়ঘন্টা যে ব্যয় হয়, যাতায়াত ভাড়া লাগে, সেটাকে যদি ৪/৫ মাসের হিসাব করি সব মিলিয়ে এই টাকাটা লাগে একটা নাটক তৈরি করতে। তারপর প্রতি শো’তে যদি ৫ হাজার টাকাও উদ্বৃত্ত থাকে, তাহলে এই ৫০ লক্ষ টাকা তুলতে কতগুলো শো করতে হবে এবং সেটা কত বছরে! কথাটা বললাম এই জন্য যে, আমরা একটা কথা প্রায় মেনেই নিয়েছি যে, থিয়েটার করা মানে এই সময়ে সবচেয়ে বিলাসী একটা কাজ করা। বিলাসিতা করার সময় যেমন টাকার হিসাব করলে হয় না, তেমনি থিয়েটার করার সময় টাকার হিসাব করা যাবে না। কমিটমেন্ট তো পরের কথা। এই বাজারে আপনি এই বিলাসিতা করার জন্য প্রস্তুত কিনা সেটা আগে নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে। কেন থিয়েটার করবো? আমি তো জানি এই থিয়েটার আমাকে আর্থিকভাবে কিছু দেবে না। তারপরও যদি থিয়েটার করি তাহলে বুঝতে হবে জেনেশুনেই ঝাপ দিয়েছি, সুতরাং তখন কী নিয়ে এবং কীভাবে নাটক করবো সেটা বেরিয়ে আসবে। ধন্যবাদ।

আছাদুল ইসলাম আসাদ
[নাট্যজন- সুবচন নাট্যসংসদ]
অনেক ধরে চেষ্টা করছি। এবার সুযোগ পেলাম। আমার দিকে সুদৃষ্টি দেয়ায় মিষ্টি ভালোবাসা গ্রহণ করুন। এই যে ‘বাজার’ বলা হচ্ছে, সেটা হলো খোলা বাজার। খোলা বাজারের ধর্ম হচ্ছে, যে উপযুক্ত সে টিকে থাকবে। যদি তাই হয়, আমার বিবেচনায় আমাদের এই থিয়েটার টিকে থাকার কোনোই সম্ভাবনা নেই। এই বাজারটাকে যদি অর্থনৈতিক বাজার হিসেবেও কেবল দেখি, সেই বাজারে টিকতে হলে বিজ্ঞাপন প্রয়োজন। বিজ্ঞাপন ছাড়া আপনি আপনার পণ্যকে ক্লায়েন্টের কাছে নিতে পারবেন না। আমাদের থিয়েটারকে কেউ বিজ্ঞাপন দেয় না। টোপ দিয়ে দিয়ে পেছনে ঘোরায় কিন্তু শেষমেশ বিজ্ঞাপন দেয় না। প্রতি সেকেন্ডে লক্ষ লক্ষ টাকা আয় করছে, বিজ্ঞাপন দিচ্ছে বহু জায়গায়, কিন্তু থিয়েটারকে বিজ্ঞাপন দেয় না। বিপরীতে আমরাও বিজ্ঞাপন দিই না। অর্থাৎ প্রচারের জন্য পত্রিকায় বা অন্যান্য মিডিয়াতে যেভাবে বিজ্ঞাপন দেয়া দরকার আমাদের সাধ্যে তা কুলোয় না। যেহেতু সাধ্য নাই, তাই এটা টিকে থাকার কোনো সম্ভাবনা আমি দেখি না। আরেকটা জিনিসের প্রয়োজন, সেটা হলো অবকাঠামো। আমাদের থিয়েটারের সেটাও নাই। উপর থেকে ঢাকা শহরের ছবি তুললে দেখা যাবে, কেবল অট্টালিকা আর অট্টালিকা। কিন্তু একটি অট্টালিকাও থিয়েটারের জন্য না, নাটকের জন্য না। স্বাধীনতার পর অনেকের অট্টালিকা হয়েছে, নাটকের মানুষদেরও হয়েছে, কিন্তু নাটকের হয় নি। আমাদের থিয়েটারের ঘরবাড়ি নেই, তাই (আমাদের) থিয়েটারের টিকে থাকার কোনো সম্ভাবনাও নাই। কিন্তু আমরা যারা এখানে একত্রিত হয়েছি, তাদের জন্য ভরসার কথা হচ্ছে, থিয়েটারের নিজস্ব একটা শক্তি আছে। সেই শক্তি দিয়ে সে হাজার হাজার বছর ধরে টিকে আছে। এই হাজার বছরেও নানা রূপে নানাভাবে ‘বাজার’ ছিল। সেই বাজারকে ফেইস করেই সে যেহেতু টিকে এসেছে, এখনো সে টিকবে। থিয়েটার তার নিজের শক্তি দিয়েই টিকবে। সবাইকে ধন্যবাদ।

কাজী তৌফিকুল ইসলাম ইমন
[নাট্যজন- প্রাচ্যনাট]
বিষয়টা হচ্ছে- এই বাজারে কী নিয়ে কেন কীভাবে নাটক। এটাকে সবাই কেন এভাবে বিশ্লেষণ করছেন যে নাটককে বাজারী হতে বলা হচ্ছে? এই বাজারে, মানে এই সময়ে, এখন, এখন মানে প্রতিক্ষণ যে আমরা প্রতিকূল সময় পার করছি, সেই সময়ে আপনার নাটকটা কী নিয়ে হবে? সবাই হিসাব করছেন নাটকটা কত দামে বিক্রি করবেন। সেটাও হতে পারে, কিন্তু আজকের বিষয় সেটা না। বিষয়টাতে যেতে পারি নি বলে আসলে কিছু জানাই গেল না। আজকে আমরা একেকটা নাট্যদলের প্রতিনিধি এখানে আছি, আমরা ফিল করছি কিনা যে এই অস্থির সময়ে, কেবল দেশের বিবেচনায় না, বিশ্ব প্রেক্ষাপটেই অস্থির সময়, সেই সময়ে নাটক কী নিয়ে দাঁড়াবে, কীভাবে দাঁড়াবে।

একটা কথা হচ্ছে, যে সময় আমরা পার করছি, সেই সময় কি এর আগে কখনো আমরা পাই নি? অবশ্যই পেয়েছি। আমরা সব সময়েই এই বাজারের প্রতিপক্ষ হয়েই নাটক করেছি। বাজারটা আমাদের সামনে একেক সময় একেকভাবে এসেছে। এখন জরুরি অবস্থা মানে এই না যে, আগে খুব ভালো অবস্থায় ছিলাম। কোন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকাকালে আপনাদেরকে ৩/৪ টা অডিটোরিয়াম বানিয়ে দিয়েছে? কোন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকাকালে আপনাকে প্রশাসনের মুখোমুখি করে নি। একেবারে মসৃন সময় পার করে কবে আমরা থিয়েটার করেছি? কখনোই করি নি। এবং কখনোই ভাবি নি কী নিয়ে কেন কীভাবে নাটক করবো। প্রতিকূল শক্তিকে চিহ্নিত না করেই, বা বুঝতে না পেরেই থিয়েটার করে গেছি। আরেকটা কথা সব সময় ওঠে, আজকেও উঠেছে- কমিটমেন্টের কথা। পত্রিকা খুললেই দেখি আজকাল যারা টেলিভিশন মিডিয়ায় কিছু একটা হয়ে গেছে, তারা সাক্ষাৎকার দিচ্ছে- ‘আমার তো কমিটমেন্টের একটা জায়গা আছেই থিয়েটারে। এখন একটু ব্যস্ত আছি, তবে দেখি মনের টান যেহেতু থিয়েটারে, থিয়েটারে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করবো’। কিসের কমিটমেন্ট! কমিটমেন্টকে একটা হাস্যকর জায়গায় নিয়ে গেছে সবাই। যে চলে গেছে, থিয়েটার কি তার জন্য হা করে বসে আছে নাকি? থিয়েটার করছি, করবো এবং সারাদিন ধরে করবো। আমি অন্য যেকোনো কাজেই ব্যস্ত থাকি না কেন, ভাবনা চিন্তুা ঘোরপাক খাচ্ছে এই থিয়েটার নিয়ে। থিয়েটার করলে এভাবেই করতে হবে। তাদের এত স্পর্ধা হয় কী করে যে- সময় হলে আবার আসবে? সুতরাং এই আচরণ, এই স্পর্ধাগুলোও কিন্তু এই বাজার-র মধ্যে পড়ে। যারা থিয়েটার করছি, তাদেরকে এধরনের স্পর্ধাকেও ফেইস করে থিয়েটার করতে হচ্ছে। সুতরাং আপনারা অনেকেই আজকের বিষয়টা বুঝতে পারেন নি বলেই আমার মনে হয়েছে। কেন থিয়েটার করি আমরা? বড় বড় কথা যদি না বলি তাহলে বলতে হবে, প্রথমত আমার ভালো লাগে, সেজন্যই থিয়েটার করি। দেশের জন্য, সমাজের জন্য আমার আবেগ উথলে পড়ছে বলে থিয়েটার করছি তা না। সেসব আবেগ অনেক পরের কথা। প্রথম কথা হচ্ছে আমার নিজের কাছে থিয়েটার করতে ভালো লাগে, তাই থিয়েটার করি। ধন্যবাদ।

আজাদ
[নাট্যদর্শক]
এখানে ‘বাজার’ বলতে সময়কে বিবেচনা করা হয়েছে। সুতরাং আয়োজকরা যদি শিরোনামে ‘এই বাজারে’ না লিখে ‘এই সময়ে’ লিখতেন তাহলে আর এই সমস্যাটা থাকতো না।

হাসান শাহরিয়ার
অনেকের কাছে অস্পষ্ট মনে হতে পারে, কিন্তু কেউ কেউ তো তাদের বক্তব্যে দেখিয়েছেন যে, ‘এই বাজার’ বলতে প্রকৃত অর্থে কী বোঝানো হচ্ছে। যাদের মধ্যে বোঝার ঘাটতি আছে, তারাও কিন্তু থিয়েটারই করেন, এবং থিয়েটার করতে গিয়ে যদি কোনো শব্দের প্রকৃত অর্থ ধরতে ব্যর্থ হন, সেখানে আয়োজকদের দোষ দিলে হবে না। আরেকটা কথা হচ্ছে ‘এই সময়ে’ যদি ব্যবহার করতাম তাহলে অনেকে মনে করতে পারতেন যে, এই যে বর্তমানে বাংলাদেশে জরুরি অবস্থা চলছে, সেটাকে বোঝাচ্ছি। তা কিন্তু না। আমাদের এই মুক্তবাজার অর্থনীতি, বিশ্বসাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসন সব মিলিয়ে হচ্ছে ‘এই সময়’। এবং ‘এই সময়’ প্রকৃত অর্থেই ‘এই বাজার’ হিসেবে এসেছে এখানে। কামালউদ্দিন কবির প্রথমেই ব্যাপারটাকে পরিষ্কার করেছিল বলে আমার ধারণা। যাক, আমরা আবার কথায় ফিরে যাই।

খন্দকার এজাজ হোসেন
[নাট্যজন- গ্রন্থিক]
এতক্ষণ যে আলোচনা শুনলাম তাতে মনে হলো যে, অনেকেই বিষয়টা নিয়ে একটা অস্পষ্টতা নিয়ে আছি, যে কারণে বক্তব্যগুলো বিভিন্ন রকমের আসছে। ‘বাজার’ বলতে আমার কাছে মনে হয়েছে- একটা সময়, পরিবেশ বা অবস্থা। এখন কথা হচ্ছে এই সময়ে, এই কালে, এই পরিস্থিতিতে আমরা কী নাটক করবো বা করা উচিত। সেটা ব্যক্তিগত কোনো দ্বন্দ্ব হতে পারে, রাজনৈতিক হতে পারে বা অন্য কোনো বিষয় নিয়েও হতে পারে। বিষয় নির্বাচনের পর হলো সেটা কীভাবে উপস্থাপন করবো। কিন্তু মনে রাখা উচিত আমরা এ-সময়ে নাটক করছি, ফলে সময়টা যেন উঠে আসে। বারী ভাই একটা কথা বলেছিলেন- থিয়েটার করাটা বিলাসিতা। আমার কাছেও তাই মনে হয়। শিল্প চর্চা বোধহয় সব কালেই বিলাসিতার জায়গাতেই ছিল। সবাই এটা করতে পেরেছে তা না। উন্নত চিন্তার মানুষগুলোই তো এটার সাথে যুক্ত থাকে। আর যারা যারা যুক্ত থেকেছে, তাদেরকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে- অর্থনৈতিক ত্যাগ তো বটেই। তো আমার কথা হচ্ছে আগে উদ্দেশ্যটা ঠিক করবো, কী নিয়ে নাটক করবো, তারপর হলো কীভাবে করবো। যেভাবে করলে আমার উদ্দেশ্যটা বোঝাতে পারবো, সেভাবেই করবো। ধন্যবাদ।

আনোয়ারুল হক
[নাট্যজন- উদীচী]
বিষয়টার শিরোনাম নিয়ে বিভ্রাট কেন হবে আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। আমাদের এখানে যে ব্যানারটা আছে, তার নিচে কিছু পেপার কাটিং আছে। সেই পেপার কাটিং-ইতো বলে দিচ্ছে এই বাজারে মানে কী। আমার দেশে এই সময়ে যখন সারের দাবীর জন্য ১৮ জন কৃষককে হত্যা করা হয়- সেই বিষয় নিয়ে আমরা নাট্যজনেরা কোনো নাটক করেছি বলে আমার জানা নাই। পেপার কাটিংগুলোর দিকে দৃষ্টি দিলে দেখবেন, লাক্স ফটোসুন্দরীদের ছবি দিয়ে লেখা আছে ‘এদের ভাগ্য এখন আপনাদের হাতে’ বা ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ অধ্যাপক ফের ৪ দিনের রিমান্ডে’। সেল ফোনের বিজ্ঞাপনে লেখা আছে- ‘রাঙিয়ে দিন আপনার জীবন’। মানে একটা মোবাইল ফোনের সীমকার্ড কিনলে আপনার জীবন রঙিন হয়ে যাবে। এই যে বিষয়গুলো বুর্জোয়া মিডিয়া এবং বাজার তৈরি করে রেখেছে, তার কবলে থেকে আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনি কী নিয়ে নাটক করবেন, কীভাবে করবেন। অর্থাৎ যে পত্রিকার পাতায় সারের জন্য কৃষকের হাত বাড়িয়ে দেয়ার করুণ আকুতির ছবি আছে, ঠিক সেই পত্রিকাতেই বিজ্ঞাপন যাচ্ছে ডিজুস ফোন মানে স্বপ্নকে ছোঁয়া। আপনার অবস্থানটা তাহলে কী হবে? ‘এই বাজার’ মানে তো ‘এই রাজনীতি’। যে রাজনীতির কবলে পড়ে প্রতিবাদ হারিয়ে গেছে। ভালো-মন্দের ভেদাভেদ হারিয়ে ফেলেছি, আমাদের বোধ-শক্তি হারিয়ে ফেলেছি। সেই বাজারে কী একটা দম ফাটানো হাসির নাটক করে ঢেকুর তুলবো নাকি সারের দাবীতে খুন হওয়া মানুষদের প্রতিবাদকে তুলে ধরবো? বাজার মানে তো এই সময়। এই সময়ে আমরা যারা মঞ্চে কাজ করি, পত্রিকাগুলো তাদের কোনো বক্তব্য দেয় না বা মতামত ছাপে না। কার ছাপে? যে কিনা মঞ্চে আসে না গত ৫ বছর। কী ছাপে? তার মতামত ছাপে, মঞ্চের প্রতি তার কমিটমেন্ট ছাপে- একটু আগে ইমন ভাই বেশ চমৎকারভাবে এটা বলেছে। তো এটাই তো বাজার। বাজার বলে দিচ্ছে কে কমিটেড, কে ফালতু। আপনি যতই কমিটেড হন না কেন, বাজারের স্বীকৃতি না পেলে আপনি শূন্য। আমার কাছে অবাক লাগছিল যে, আলোচনাটা ভিন্ন দিকে গেছে। মূলের দিকে থাকলে আরও কিছু শুনতে পেতাম। ধন্যবাদ।

হাসান শাহরিয়ার
ধন্যবাদ। আসলে এই বৈঠকের শিরোনামটা- এই বাজারে কী নিয়ে কেন কীভাবে নাটক- এটা বুঝতে না পারাটার ‘কৃতিত্ব’ও ‘বাজারের’। বাজার আমাদের মস্তিষ্ককেও নিজের মতো করে চালনা করে। কারণ, আমাদের মস্তিষ্ক আসলে এখন আর আমাদের নিয়ন্ত্রণে নাই, ‘বাজারের’ নিয়ন্ত্রনে আছে। যাক, আমরা একেবারে শেষের দিকে চলে এসেছি। সময় শেষ। সংক্ষিপ্তভাবে বলার জন্য রতন সিদ্দকীকে অনুরোধ করছি।

রতন সিদ্দিকী
[নাট্যজন- উদীচী]
আমি অন্য বিতর্কে যাব না, সময় নেই। বাজার মানে যদি অর্থনীতি হয়, বাজার মানে যদি মার্কেট হয়, বাজার মানে যদি সময় হয়, তাহলে এই ৩ টি মানেই কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। বাজার না জানলে শিল্প সৃষ্টি, বিপণন কোনোটাই হয় না। বাজার সবাই বুঝেছেন, সব কালের শিল্পীরাই বুঝেছেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, তিনি যখন ‘বর্ণ বোধদয়’ বইটি প্রকাশ করেছেন, তখন এটার কাটতি দেখে তিনি বিছানার নিচে লুকিয়ে রেখে বলেছেন- বই নেই, বই নেই। পরে ১ টাকা বাড়িয়ে বিক্রি করেছেন। রবীন্দ্রনাথও বাজার বুঝতেন। শিল্পে পুঁজি বিনিয়োগ হবেই। এখন সেই পুঁজির সাথে রুচির সম্পর্ক কে কতটা ঘটাচ্ছে সেটাই হলো আসল ব্যাপার। আইজেনস্টাইন চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন, পুঁজির যোগান কিন্তু দিয়েছে বুর্জোয়রা। কিন্তু সেই পুঁজি দিয়ে তিনি কোন চলচ্চিত্র নির্মাণ করলেন? যে চলচ্চিত্র নতুন সমাজ নির্মাণে সাহায্য করে। এই বাজারকে কেউ ইতিবাচকভাবে নিতে পারে, কেউ নেতিবাচকভাবে নিতে পারে। আমরা যদি ইতিহাসের দিকে তাকাই, দেখবো, রামনারায়ণ তর্করতœ নাটক করছেন আবার মনমোহন বসুও নাটক করছেন। একদল নাটক করছেন শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে আরেক দল করছেন অর্থের প্রতি অনুরক্ত হয়ে- অসুস্থ রুচি নিয়ে। সুতরাং বাজার হচ্ছে এ-ই। তাকে ব্যবহারের উপর নির্ভর করবে কে কী করছে। এখন দিন বদলে গেছে। এখনকার বাজারে কী নাটক হবে তা আপনাকেই নির্ধারণ করতে হবে। আগে ৬ নম্বর বাসে লেখা থাকতো ‘৫/১০ টাকার ভাংতি নাই’ আর এখন লেখা থাকে ‘১০০/৫০০ টাকার ভাংতি নাই’। বাজার চেঞ্জ হয়েছে। আপনাকেও চেঞ্জ হতে হবে। সুতরাং সময়ই নির্ধারণ করে দেবে আপনি কী করবেন বা আপনার কী করা উচিত। গোপাল হালদার খুব ভালো একটি কথা বলেছেন, কথাটা এরকম যে- ‘সময় এবং সময়কে ধারণ করেই সংস্কৃতি তার আপন গতিতে এগিয়ে যায়’। সবাইকে ধন্যবাদ।

কামালউদ্দিন কবির
আসলে বুঝতে পারছি যে, ‘সময় নেই কথাটা বলারও সময় নেই’। তবুও বলি, মানে, বাজারকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বা বিষয়টাকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে, একেক জন যেভাবে ভিন্ন দিকে দৌড়াদৌড়ি করলেন, তা আসলে কাম্য ছিল না। আমি শঙ্খ ঘোষের একটি কবিতার লাইন বলছি, কবিতার নাম ‘বোধ’- ‘যে লেখে সে বোঝে না/যে বোঝে সে লেখে না/কখনও কখনও এই দুজনের দেখা হয় কিনারে/ভাবে ঝাপিয়ে পড়বে কিনা/অর্থহীনতার পরপারে’। আজকে আমাদের আলোচনায় এটাও পরিষ্কার হয়েছে যে, আমাদের চিন্তা চেতনায় ‘বাজার’ কতটুকু প্রভাব বিস্তার করে আছে। আজকের কথাগুলো অনুলিখন করে ছাপা হবে নিশ্চয়ই, মানে আমি থিয়েটারওয়ালা সম্পাদককে অনুরোধ করবো যেন ছাপা হয়, তাহলে বোঝা যাবে যে, আমাদের বোঝার মধ্যেও কীভাবে ‘বাজার’ ঢুকে গেছে। আমি আর সময় নেব না। ধন্যবাদ।

মানস চৌধুরী
[শিক্ষক, লেখক]
আজকে এখানে আমার আসলে কিছু বলার কথা না। নাটকের উপর বলার মতো ক্ষমতাও আমি রাখি না। শাহরিয়ার ভাই, কবির ভাই, এরা আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু, তাদের জন্যই এখানে আসা। একটা কথা বলতে হয় যে, আমার আর্ট-কালচারের চেয়ে বেশি উৎসাহ এর তৎপরতা নিয়ে। অর্থাৎ যা সৃষ্টি করলেন তা কতটুকু মানসম্মত বা শিল্প সম্মত, তার চেয়ে আমার কাছে মূল্যবান হলো এগুলো নির্মাণের তৎপরতা। আমার আগ্রহ হচ্ছে তৎপরতাগুলো কী কী অর্থ বহন করে, একটা বিশেষ সময়ে। সেক্ষেত্রে আজকের বিষয় হিসেবে ‘বাজার’কে আনাটা আমাকে আগ্রহী করে তুলেছে। সম্পর্কের যে পরিপূর্ণ মুদ্রাকরণ, সেটা তো আমি চোখ বুঁজে থাকলেই বদলে যাচ্ছে না। তো যদি সময়টা বদলে যেতে থাকে এবং নিরন্তর বদলমান হয়, তাহলে যারা কিনা ‘তৎপর’ সেটা সংস্কৃতিকর্মীই হন আর মৎস্যজীবীই হন, তাহলে এই বদলমান সম্পর্করাজীর ভেতরে প্রতিক্রিয়াগুলো কী হবে। এখন যারা নাটক করেন, তারা সবচেয়ে ভালো জানেন কেন নাটক করেন। এবং তাদের মধ্যকার ভিন্নতাগুলোও তারা ভালো জানেন, তাদের মকসুদ কী এবং তরিকাগুলো কীভাবে তারা নির্ধারণ করেন। যদি এই হয় যে, মকসুদের দিক থেকে নাট্যকর্মীরা কেউ কেউ পাশাপাশি দাঁড়াতে পারেন, তাহলে একটা বড়সড় কাউন্টারএ্যাক্টিভ জায়গা তৈরি হওয়া সম্ভব। আমার সন্দেহ নাই, এখানে অনেক মিত্রদের আমি দেখছি, আমি জানি তারা এই কাজটা করে যাবেনই। আর বাজারটা আসলে সংকট না, এটা তো অবভিয়াস। বরং একত্রে নিজেরা যদি মকসুদ ঠিক করে কোনো তরিকা বের করেন, তাহলেই কাজ এগিয়ে যাবে। ধন্যবাদ।

হাসান শাহরিয়ার
ধন্যবাদ। আজকের বৈঠক শেষ করতে হচ্ছে। থিয়েটারওয়ালা আয়োজিত রঙ্গমাতন সোলায়মান মেলার অংশ হিসেবে এই বৈঠকে যারা আসলেন, কথা বললেন, কথা শুনলেন, তাদের সবাইকে আয়োজকদের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ। আমাদের শেষ বক্তা হিসেবে কথা বলবেন আজাদ আবুল কালাম, এবং সেই সাথে শেষ হবে আজকের বৈঠক। সবাই ভালো থাকবেন।

আজাদ আবুল কালাম
[নাট্যজন- প্রাচ্যনাট]
আমাদের আলোচনায় অন্তত এটুকু মনে হয়েছে যে, আমরা আসলে অনেক কথা বলতে চাই। সেটা হয়তো প্রাসঙ্গিক হচ্ছে না বা কেউ কেউ ভালো বলেছেনও, কিন্তু বলার আগ্রহটা সবার ভেতরেই আছে।

কিন্তু হাতে সময় নেই, এটা একটা সমস্যা। ভবিষ্যতে যেন চেষ্টা করা হয় সময় বেশি নিয়ে শুরু করা। এখানে চলচ্চিত্রের সাথে জড়িত ব্যক্তি আলোচনা করেছেন, শিক্ষক করেছেন, সমাজকর্মী করেছেন, ঢাকার বাইরে থেকে আসা নাট্যজন আলোচনা করেছেন। এই যে অংশ নেয়া এটা প্রমাণ করে যে, আমরা একধরনের মত বিনিময় করতে চাই। এই মত-বিনিময় কিন্তু থমকে আছে, এই সময়ে। আমাদের বৈঠক সুযোগ করে দিয়েছে সেই থমকে যাওয়া পরিস্থিতি ভেঙে জীবন্ত পরিবেশ তৈরি করতে। সুতরাং আমি বলবো যে, আলোচনা যতই বিক্ষিপ্ত হউক না কেন, যতই বলা হোক যে কিছুটা বিষয়ের বাইরে গিয়ে কথা হয়েছে- আমার কাছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ না, আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই যে সবাই বলতে পারছি, সেই বলার পরিবেশ যে আজকের বৈঠক তৈরি করতে পারলো সেটা। এখানে শব্দাবলীর এক বন্ধু বলেছেন যে, পিটার ব্রুক ১ মাস আগে টিকেট কেটে প্রবীর গুহের নাটক দেখেন। তো আমাদের যদি হাতে সময় থাকতো তাহলে হয়তো আরেক বন্ধু আবার ব্যাখ্যা দিতে পারতেন যে, পিটার ব্রুক কোলকাতায় প্রবীর গুহের নাটক দেখতে আসে কিন্তু ঢাকায় প্রাচ্যনাটের নাটক হয়তো তাঁকে দাওয়াত দিয়েও দেখানো যাবে না। অর্থাৎ কথার পিঠে কথা আমরা বলতে পারতাম সময় থাকলে। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে কথার পিঠে কথা হয়তো বলা যায় নি, কিন্তু কথা শুরু তো হয়েছে- সেটা বেশ ইতিবাচক জায়গা। এই বাজারে বলতে যে ‘সময়’টাকে বোঝানো হয়েছে, সেই বাজার বা সময় হচ্ছে একটা আততায়ীর নাম। যে আপনাকে খুন করার জন্য ওৎ পেতে আছে। সুতরাং এই আততায়ী আমার আপনার শত্রু, কিন্তু তার অস্তিত্ব আমরা অস্বীকার করতে পারবো না। তাই এখন আমাদের কাজ এই আততায়ীর বিপরীত স্রোতে দাঁড়িয়ে আমাদের কর্তব্য স্থির করা। এই কর্তব্য স্থির করার জন্য কী ধরনের নাটক করবো-র চেয়ে এভাবে মুখোমুখি বসাটা হচ্ছে বেশি জরুরি। এখানে পেশাদারী থিয়েটারের কথা বলা হয়েছে। পেশাদারী থিয়েটারটা কী? থিয়েটার করে টাকা পেলেই কি পেশাদারী থিয়েটার হয়ে যাবে? টেলিভিশনে নাটক করেতো প্রচুর টাকা উপার্জন করছে অনেকে, তাই বলে কি সে পেশাদার অভিনেতৃ? না-ও হতে পারে। আবার পেশাদারী মনোভাব নিয়েও অনেক ক্ষতি করা সম্ভব। যারা ভেজাল পণ্য তৈরি করে, বাজারজাত করে, তারা কিন্তু পেশাদারী মনোভাব নিয়েই তা করে, কিন্তু সেটা সবার জন্য ক্ষতিকর হয়ে পড়ে। কেউ কেউ নাটকের বিষয় কী হবে সেটা নিয়ে কথা বলেছেন। নাটকের বিষয় তো এমন হবে না যে, আমরা বসে ঠিক করে দেব যে এই বিষয়ে নাটক হবে। নাটকের বিষয় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আপনার আমার চারপাশে। যার চোখ আছে সে দেখছে, যার চোখ নাই সে দেখতে পাচ্ছে না। তো সব শেষে আমি আন্তরিকভাবে বলতে চাই, এই থমকে যাওয়া সময়ে সোলায়মান মেলা হয়েছে, সবার ভেতরে প্রাণের সঞ্চার ঘটেছে এবং সেই মেলার অংশ হিসেবে এভাবে বৈঠক করে বুকের ভেতরে চাপা পড়া কথাগুলো আমরা বলতে পেরেছি, সেটাই আমাদের সাফল্য। আমি সবাইকে ধন্যবাদ দিয়ে আজকের বৈঠক শেষ করছি।