Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

আলাপনে সেলিম আল দীন

Written by সাক্ষাৎকার : বিপ্লব বালা, সোহেল হাসান গালিব ও হাসান শাহরিয়ার.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

[স্বাধীনতার পর নাট্যচর্চাটা আমাদেরকে বেশ এগিয়ে নিয়ে গেছে, সুস্থ ভাবনা-চিন্তার আগ্রহ তৈরি করেছে। আমরা শিল্পের এক বড় কর্মকাণ্ড, কর্মযজ্ঞ- মঞ্চনাটকের নিয়মিত সাক্ষাৎ পেয়েছি। আমরা বেশি বেশি নাট্যকার পেয়েছি, পেয়েছি সৃজনশীল প্রতিভাসম্পন্ন নাট্যনির্দেশক, অনেক ভালো অভিনেতৃ। আর পেয়েছি অনেক সংগঠক, যারা ক্রমশই মঞ্চনাটকের পরিধি বিস্তৃত করেই চলেছেন। এক কথায় এঁরা সবাই আমাদের মঞ্চনাটকের পুরোধা। আমরা মনে করি আমরা এঁদের সব ভালো কাজের উত্তরাধিকারী। তাই আমরা এঁদের কাজ এবং কাজের প্রক্রিয়া জানতে আগ্রহী। এই প্রত্যাশায় থিয়েটারওয়ালা আলাপচারিতায় মগ্ন হয়েছে কয়েকজন নাট্যজনের। তাঁদের সাথে আলাপচারিতা অনুলিখন করে ধারাবাহিকভাবে ছাপা হচ্ছে থিয়েটারওয়ালায়।

আমাদের এবারের আলাপনে আছেন নাট্যকার সেলিম আল দীন। তাঁকে নিয়ে আলাপনে বসেছিলেন- বিপ্লব বালা, সোহেল হাসান গালিব ও হাসান শাহরিয়ার। আলাপনটি অনুলিখন করেছেন- সহকারী সম্পাদক- সাইফ সুমন। আলাপনটি সম্পাদক কর্তৃক সম্পাদিত]

বিপ্লব বালা
সেলিম ভাই, আমরা মনে হয় এভাবে শুরু করতে পারি, যেমন- প্রথমেই আমরা আপনার শৈশব-কৈশরের প্রতিবেশ আবহটা জানতে পারি, যার প্রভাব হয়তো পরবর্তী সময়ে আপনার সৃজনকর্মের  উপর পড়েছে।

সেলিম আল দীন
হ্যাঁ, সে তো বটেই। কর্মসূত্রে আমার বাবাকে নানা জায়গায়- চিটাগাং- সিলেট- কখনো বা রংপর-কুমিল্লা-আখাউড়া এসব অঞ্চলে যেতে হয়েছে। আবার নিজের গ্রামেও থেকেছি। এগুলোর প্রভাব আমি বলবো আমার পরবর্তী জীবনের উপর পড়েছে। আমার পিতৃভূমি অর্থাৎ ফেনীর সেনেরখিল কাজিরহাট বা উপকূলীয় অঞ্চলটা খুব প্রভাব ফেলেছে। তবে এ-সবই কিন্তু পরিণত বয়সের উপলব্ধির কথা।

বিপ্লব বালা
কিশোর বয়সে কোনো প্রভাব পড়ে নি?

সেলিম আল দীন
তেমনভাবে পড়ে নি। পরে পড়েছে। বাবা পাকিস্তান আমলে কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরি করতেন- কাস্টমস বিভাগে। এক জায়গায় তিন বছরের বেশি থাকা হতো না। আমার লেখার ভেতর যে বিভিন্ন অঞ্চল প্রসঙ্গ আসে, তার প্রধান কারণ হলো, আমি দেখেছি যে, আমার স্বজনরা যেন সেখানে আগে থেকেই আমার জন্য অপেক্ষা করছে। এমনকি তিন বছর পর পর যে ছেড়ে চলে এসেছি, সে সকল চিরকালের জন্য না ফেরার স্থান তাতে কখনোই মনে হয় নি যে, সেখানে আমি আর কখনো ফিরবো না। বালক মন বলতো যাচ্ছি তো কী হয়েছে, আবার তো আসবো- আসবো তো।

বিপ্লব বালা
কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা পেয়েছেন- সেরকম কিছু কি মনে পড়ে?

সেলিম আল দীন
সেটা আছে। যেমন- সিলেটের চা বাগান, পাহাড়, খাসিয়াদের জীবন- সেটা পরবর্তীকালে ট্রাইবাল থিয়েটারে, যেটা বাঙলা মঞ্চে মূলত আমারই বহন করে আনা, একটি মারমা রূপকথা দিয়ে, তো সেটার উৎপত্তিও তো আমার বাল্যকালের স্মৃতি থেকেই উৎসারিত, যদিও সেটা এখন, এই বয়সে বুঝতে পারছি। কারণ, আমার এখন মনে পড়ে যে, আমি যখন ১ম বা ২য় শ্রেণীতে পড়ি, তখন, বাবার সাথে খাসিয়া পল্লীতে গিয়েছিলাম। আমার বাবা ছিলেন এক বিরল ধার্মিক পুরুষ কিন্তু পাশাপাশি অসাধারণ অসাম্প্রদায়িক, মুক্ত মনের মানুষ। তিনি নিজে ফিল্ম দেখতেন না কিন্তু আমাদের দেখতে পাঠাতেন। আমি আগরতলায় একটি চলচ্চিত্র দেখেছিলাম, সম্ভবত সেটি সংলাপহীন ছবি।

বিপ্লব বালা
সিলেটের আর কোনো স্মৃতি?

সেলিম আল দীন
হ্যাঁ, বাবা পাখি শিকার করতেন, হরিণ শিকার করতেন। সেগুলো বেশ মনে পড়ে। তবে আমার ভাই, শাহিন, যখন তিন মাস বয়সে ধনুষ্টংকারে মারা গেল, তারপর কেন যেন শোকে আর তিনি বন্দুক হাতে নেন নি। হয়তো বাবার মনে হয়েছিল এই আকস্মিক মৃত্যু পাখি হত্যারই ফল। এটা আবার আমার একটি নাটক চাকা-তে আছে যে, পাখি হত্যা করতে নেই ইত্যাদি। আমার বাবা কিন্তু আমাকে লেখার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন, তবে লেখার যে সম্বল সেটা মায়ের দেয়া হয়তোবা গর্ভসূত্রেই তাঁর শিশুপুত্রে।

বিপ্লব বালা
সেটা কী রকম?

সেলিম আল দীন
আমার মা ছোটবেলায় কোলকাতার হুগলিতে ছিলেন। যদিও মামা বাড়ি আমার ফেনীতে, কিন্তু আমার বড় খালু কলকাতায় বড় চাকরি করতেন, পুলিশ বিভাগে। মা ওনার ওখানে থাকতেন। থাকতেন মানে ৫/৬ বছর থেকেছেন। তখন হুগলির কৃষ্ণনগরে কাজী নজরুল ইসলামকে দেখেছেন। আমি শুনেছি যে, মা তাঁকে দেখেছেন বাসার দোতলা থেকে- শিকল পড়া ছল মোদের এই শিকল পড়া ছল গানটি গাইতে গাইতে যাচ্ছিলেন। তো আমার মনে হয় কুমারী মা তখন কি ভাবেন নি যে, যদি তাঁর এমন একটি বিখ্যাত সন্তান থাকতো। মা বলেছিলেন- নজরুল ইসলামকে তিনি লাল চাদর পরা অবস্থায় মিছিলে দেখেছিলেন।

বিপ্লব বালা
আপনি কল্পনা করে বলছেন, নাকি পরে মা’র মুখে শুনেছেন যে, উনি এমনটি চাইতেন?

সেলিম আল দীন
না, বলেন নি, কিন্তু আমি শুনেছি যে, মামা আমাদের মা-খালাদের মধ্যে কবিতা লেখার কম্পিটিশান করিয়ে থাকতেন এবং সেখানে আমার মা প্রথম হতেন। তো ব্যাপারটা জেনেটিক্যালী আমার মধ্যেও আসতে পারে- তাই অনুমান করি। শুনেছি আমার বড় মামা কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিভাগে সম্ভবত ১৯২৯ সালে প্রথম বিভাগ, প্রথম স্থান পেয়েছিলেন।

বিপ্লব বালা
এমনিতে আপনাদের বাড়িতে বই বা সাহিত্য পড়ার অভ্যেস কেমন ছিল?

সেলিম আল দীন
তেমন ছিল না। বাসায় বই বলতে আনোয়ারা, বিষাদসিন্ধু এগুলো ছিল। পরবর্তী সময়ে আমিই পছন্দমতো বই সংগ্রহ করতাম।

হাসান শাহরিয়ার
আপনাদের সাথে মায়ের সম্পর্কটা কেমন ছিল?

সেলিম আল দীন
মা-ই আমাদের মানুষ করেছেন।

হাসান শাহরিয়ার
একটু আগে বললেন বাবার প্রভাব বেশি।

সেলিম আল দীন
না, কিন্তু লেখাপড়া বা ভরণপোষণ বা গাইডেন্স যেটা বলি, সেক্ষেত্রে বাবা একটু উদাসীনই ছিলেন। আর আমাদের অর্থকষ্টও ছিল। বাবা ঘুষের চাকরি করতেন কিন্তু ঘুষ খেতেন না, ফলে আমাদের ৬ ভাই-বোনকে সম্বৎসর খুব অল্পতেই তুষ্ট থাকতে হতো।

বিপ্লব বালা
আপনারা ক’ভাই-বোন ছিলেন?

সেলিম আল দীন
৯ ভাই-বোন। ২ জন জন্মেই মারা গেছে আর একজন তিনমাস মাত্র বেঁচেছিল।এখন ৬ জন জীবিত।

বিপ্লব বালা
হ্যাঁ, তাহলে তো বড় সংসার, অর্থকষ্ট থাকারই কথা।

সেলিম আল দীন
কিন্তু এ নিয়ে মাকে আমরা হা-হুতাশ করতে দেখি নি। খুব হিসাবের মধ্যে আমাদের চলতে হতো। তবে নানা বাড়ি অতটা অসচ্ছ্বল ছিল বলে মনে হয় না। নানা বোধহয় জমিদারবাড়ির কোনো ক্লার্ক ছিলেন। বড় মামার বড় মাপের সহায়তা ছিল আম্মার জন্য।

বিপ্লব বালা
আর দাদা?

সেলিম আল দীন
দাদা ছিলেন স্কুল মাস্টার।

বিপ্লব বালা
আপনি বলছেন গ্রামের বাড়ি বলতে যা বোঝায় সেখানে আপনার তেমন একটা থাকা হয় নি?

সেলিম আল দীন
তা ঠিক কিন্তু আমি ক্লাশ সেভেন থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা পর্যন্ত গ্রামে ছিলাম। বাবার বদলিজনীত কারণে মা ভাবলেন পড়ালেখার ক্ষতি হবে, ছেলে-মেয়েরা মানুষ হবে না, তাই একসময় আমাদের পরিবার গ্রামেই থেকে যায়, আর বাবা বিভিন্ন জায়গায় বদলি হতেন ২/৩ বছর পর পর। তখন আমাদের গ্রামগঞ্জের স্কুলগুলো ছিল খুবই সমৃদ্ধ। মঙ্গলকান্দি স্কুলে আমার বাবা পড়েছেন, দাদা শিক্ষকতা করেছেন। পুরো থানাতে তখন একটা স্কুল ছিল।

বিপ্লব বালা
প্রথম কবে কবিতা লেখা শুরু করেন?

সেলিম আল দীন
ক্লাশ থ্রিতে থাকতে। তবে সেগুলো ঠিক কবিতা হতো কিনা জানি না, তবে লিখতাম। এবং তারপর থেকে সব সময়ই লিখে গেছি।

বিপ্লব বালা
নিশ্চয়ই কারো না কারো অনুপ্রেরণা থেকে বা আপ্লুুত হয়ে লিখেছেন।

সেলিম আল দীন
হ্যাঁ, প্রথম দিকে জসীম উদদীন, তারপর ক্লাশ এইট নাইনে উঠে রবীন্দ্রনাথ কিছুটা বুঝতে শুরু করেছিলাম। রবীন্দ্রনাথ পড়ে শুরুতেই বুঝে ফেলেছিলাম যে, এক মহাসমুদ্রের কিনারে এসে দাঁড়ালাম। ব্যাপারটা বেশি করে বলা না, তখনই কিন্তু আমি গোরা, চার অধ্যায়, ঘরে বাইরে এবং কমপক্ষে ৫টি কাব্যগ্রন্থের ৫০টি কবিতা মুখস্ত করে ফেলেছি। সোনারতরী-র অর্ধেক কবিতা আমার মুখস্ত ছিল। আর মেঘনাদবধ কাব্য পড়ে শেষ করি অষ্টম শ্রেণীতেই।

বিপ্লব বালা
রবীন্দ্রনাথে যাওয়ার আগে একটু জেনে নিই, এই যে আপনি ম্যাট্রিক পর্যন্ত গ্রামে ছিলেন, তখন গ্রামসমাজ, মানুষের সাংস্কৃতিক নানা রীতি, মানুষজন এগুলো কতটা দেখেছেন?

সেলিম আল দীন
একটা কথা বলি, মানুষ বাল্যকালে যা দেখে শোনে তা বিবেচনা সে করে পৌঢ়তায় পৌঁছে বা জ্ঞানের একটা সীমায় পৌঁছে। এখন আমি দেখতে পাচ্ছি যে, আমাদের গ্রামটি যদি হিন্দু, বৈষ্ণব এবং মুসলমান অধ্যূষিত না হতো তাহলে লেখক হিসেবে আমার অসাম্প্রদায়িক হওয়া মুশকিল হয়ে পড়তো। যে সোসাইটিতে মিক্সড কালচার নাই, সেই সোসাইটি ডেভেলপ করে না। আমরা নাটক করেছি, কিন্তু কখনো ফতোয়া শুনি নি যে, এটা করা হারাম বা নাটক কারা, গান গাওয়া হারাম। আমরা কখনো ভাবি নি- আমার এই বন্ধুটা হিন্দু বা এই বন্ধুটা মুসলমান।

বিপ্লব বালা
আমি বলতে চাচ্ছি, তখন এগুলো আপনাকে কেমন প্রভাবিত করেছিল?

সেলিম আল দীন
আমি বললামই যে, তখন প্রভাবিত করেছে কিনা, সেটা বোঝবার সময়টা তো হলো ভবিষ্যতে আমি কী হলাম বা করলাম তার উপর। এখন যদি আমার কোনো নান্দনিক জায়গা যথার্থ্যরূপে তৈরি হয়ে থাকে, তার পেছনের ইতিহাসটা কী? নিশ্চয়ই আমার বাল্যকাল। আমি ক্লাশ এইটে ডিকশনারী দেখে দেখে মেঘনাদবধ কাব্য পড়ে ফেলেছি। সেটা তো রীতিমতো আলোড়িত করেছিল সবাইকে। আবার আমি রবীন্দ্রনাথ পড়ার কারণে, সেই বয়সে, আমার একটা খোলা চোখ পেয়েছি। মানে যা দেখছি বা সবাই দেখছে, তার বাইরে কিছু দেখার চোখ পেয়েছিলাম। শোনো, বুদ্ধদেব বসুর একটা লেখায় পড়েছিলাম- যা কিছু করবার-ভাববার, সেটা একজন সপ্তম-অষ্টম শ্রেণীতেই পেয়ে যায়। তো আমি বলতে চাই, আজকের সেলিম আল দীনের কোডগুলো, সংকেতগুলো তখনই তৈরি হয়ে গিয়েছিল।

বিপ্লব বালা
কিন্তু আপনি তো তারপরে এসে ইউরোপীয় নানা কবিতা বা অন্যান্য পড়াশোনা করে ...

সেলিম আল দীন
সেটা তো বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর বুঝতে পারলাম যে, নিজের দীনতা কতটুকু। সঙ্গত কারণেই রবীন্দ্রনাথ পড়া একটা লোক চেখভ পড়ে নি, টলস্টয়, দস্তয়ভস্কি পড়ে নি বা সার্ত্র আর শেক্সপীয়র ভালোভাবে পড়ে নি, এটা কি হতে পারে? পারে না। ফলে এগুলো পড়তে হবে। এবং যখন ভাবলাম যে পড়তে হবে, তখন এক ভয়ংকর পঠনে আমি নিজেকে সীমাবদ্ধ করলাম, এবং মনে মনে কামনা করলাম যে, আমার মাথায় যেন ফার্স্টক্লাশ পাওয়ার ভূত না চাপে। ফলে দেখা গেল সবাই কষ্ট করে নোট মুখস্ত করছে আর আমি হয়ত টি.এস. এলিয়ট পড়ছি। কবি বন্ধুরা হয়তো টি.এস.সিতে আড্ডা দিচ্ছে, আমি উঠে গিয়ে পড়ছি। এমনকি আমি এমন আবেগদীপ্ত ছিলাম যে, যেগুলো পড়া হতো না সেগুলোকে ছুঁয়ে দিতাম। পরবর্তী সময়ে কিন্তু একটু বেছে বেছে পড়া শুরু করলাম। কোনো উপন্যাস হয়তো অর্ধেক পড়ার পর মনে হয়েছে আর পড়ার দরকার নাই।

হাসান শাহরিয়ার
নাটকের বই বা নাটক সংক্রান্ত বই কেমন পড়েছেন, তখন?

সেলিম আল দীন
এক অর্থে আসলে নাটকের বই আমি সবচেয়ে কম পড়েছি।

হাসান শাহরিয়ার
কম মানে কত কম? ভালো ভালো নাটকগুলো নিশ্চয়ই পড়া হয়ে গিয়েছিল।

সেলিম আল দীন
তা হয়েছিল, তবে নাটক সংক্রান্ত যে-কোনো পড়াশোনাই আমি শুরু করি বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকে। তার আগে পড়ি নি। এমন কি রবীন্দ্রনাথের সব কিছু পড়লেও স্কুল জীবনে রবীন্দ্রনাথের কোনো নাটক পড়ি নি।

হাসান শাহরিয়ার
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই-বা নাটক পড়া শুরু করলেন কেন? কোনো কিছুর দ্বারা বা কারো দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে কি?

সেলিম আল দীন
এটার কারণ মুনীর চৌধুরী স্যার।

বিপ্লব বালা
মুনীর চৌধুরী বা আপনার এ-জীবনের প্রসঙ্গের আগে একটু কবি জীবন সম্পর্কে জানতে চাই। মানে সেই সময়কার আপনার স্বপ্ন, কল্পনা।

সেলিম আল দীন
এক অর্থে আমি কবি আহসান হাবীবের কাছে ঋণী। আমি তাঁর কাছে কবিতা নিয়ে যাওয়ার পর উনি বললেন তোমরা সবাই কবিতা লেখ কেন, গদ্য লেখ না কেন? তখন উনি আমাকে উৎসাহ দিলেন, আমি চেখভের একটা গল্পের নাট্যরূপ দিলাম। সেটা ’৬৮ সালের কথা। তারপর রাইডার টু দ্য সী-র নাট্য-রূপান্তর করলাম। এটাকে সন্দীপের পটভূমিতে করেছিলাম। সিঙ্গেল এই নাটকটিকে অনেকে তখন শেক্সপীয়রের সমকক্ষ রচনা বলে অবিহিত করেছিল। বলেছিল আ পিজেন্ট ট্র্যাজেডি।

বিপ্লব বালা
কিন্তু এটাতো কেউ বোধহয় মঞ্চস্থ করে নি।

সেলিম আল দীন
না, সেটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা হল ম্যাগাজিনে বেরিয়েছিল। তখনও মঞ্চায়িত হতে হবে বা নাটক লিখবো, করবো, এমন ভাবনাটা আসে নি। তারপর টেলিভিশনে প্রথম নাটক লিখলাম ১৯৭০ সালে ‘ঘুম নেই’ নামে। আর রেডিওর জন্য লিখেছিলাম ‘বিপরীত তমসায়’। একটা নাটক লিখেই সবার নজর কেড়েছিলাম। গোলাম মুস্তাফা সাহেব পরদিন ডিআইটি-তে গিয়ে জানতে চাইলেন- এটা কে লিখেছে? মুনীর স্যার বললেন- ভালো হয়েছে তবে আরো ভালো লিখতে হবে। তখন আমার বয়স ১৮/১৯, ডিআইটি-তে যখন চেক আনতে গেলাম তখন আমাকে সন্দেহ করা হলো যে, আমিই প্রকৃত নাট্যকার কিনা। কারণ, আমার গোঁফ-দাড়িও তখন তেমনভাবে গজায় নি। পরে আতিকুল হক চৌধুরী গিয়ে উদ্ধার করলেন। আবদুল্লাহ আল-মামুন প্রশ্ন শুরু করলেন- তুমি কী কী পড়েছ? আমি তখন বললাম- চেখভ, আন্যুই, সার্ত্র এসব পড়েছি ... তখন কিন্তু ওয়েস্টার্ন লেখকদের বই পড়া গৌরবের ব্যাপার ছিল ... তো আতিকভাই বললেন যে- না এটা ফলস লোক না, জেনুইন। ব্যস, পেয়ে গেলাম চেক। ৪৫০ টাকা পেয়েছিলাম।

বিপ্লব বালা
‘অনিকেত অন্বেষণ’ কবেকার লেখা?

সেলিম আল দীন
এটা সুলতান মাহমুদ বিন তুঘলককে নিয়ে সেই ১৯৬৯/৭০-র দিকে লেখা অনিকেত অন্বেষণ। নামকরণে সমকালীন কবি নূরুল হুদা সাহায্য করেছিল। আমি যখন লিখি তার পরে দেখেছিলাম গিরিশ কারনাড-র তুঘলক নামে একটা নাটক আছে। এটাও আমার লেখা ওয়েস্টার্ন শিল্পতাড়না-জ্ঞাত, ফর্মটাও আদ্যিকালের অর্থাৎ সংলাপভিত্তিক। আমি তখন আলবেয়ার কাম্যুর ‘ক্যালিগুলা’ পড়েছিলাম। পড়ে তো ঘুমুতে পারি নি। পরে ভাবলাম, আরে এই ক্যালিগুলা- ব্যাপারটা তো তুঘলকের মধ্যেও আছে। পরে আমি ক্যামব্রিজ হিস্ট্রি অব অক্সফোর্ড ইত্যাদি ইতিহাসগ্রন্থ কষে পড়ে ওখান থেকে উপাত্ত সংগ্রহ করে কাজে লাগালাম।

বিপ্লব বালা
ঐ মাছ শিকারের ঘটনাটা কীভাবে আসলো অনিকেত অন্বেষণ -এ?

সেলিম আল দীন
এটা বাস্তব ঘটনা। থাট্টা অঞ্চলে তামিল বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে বিশাল একটা সামুদ্রিক মাছ পেয়ে যান তুঘলক। ওটা খাওয়ার পর জ্বর এবং আমাশাতে মারা যান তিনি, সিন্ধু অঞ্চলে। কিন্তু আমি ওটা দেখাই নি। আমি দেখিয়েছি যে, মাছটা যেমন নিঃসঙ্গ, তুঘলকও নিঃসঙ্গ ছিলেন। প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছি। আমার মনে হয় তুঘলক ঐ শতাব্দীতে না জন্মে যদি পরে জন্মাতেন তাহলে অনেক বড় রাষ্ট্রনায়ক হতে পারতেন।

হাসান শাহরিয়ার
নাটকে আসার অনুপ্রেরণা হিসেবে আপনি মুনীর স্যারকে নিয়ে কী যেন বলতে চেয়েছিলেন।

সেলিম আল দীন
হ্যাঁ, মুনীর চৌধুরী স্যার তো তখন আমাদের কাছে রাজপুত্র নন বরং রাজা। তাঁর লেখা, তাঁর পাণ্ডিত্য সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন মিথের মতো। তাঁর গলার স্বরটা খসখসে ছিল। ক্লাশে তিনি বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ পড়ালেন। আমি যে তখন ক্লাশে বসে আছি, সেটাই মনে থাকে নি। আমি বহু মহান মহান স্যার পেয়েছি কিন্তু মুনীর স্যারের মত করে কেউ পড়াতে পারেন, এটা আমি বিশ্বাস করি না। আমি তাঁর সব কিছুই রপ্ত করতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমি নিজেকে একজন সফল শিক্ষক ভেবেও বলতে পারি, মুনীর চৌধুরীর ধারে কাছেও যেতে পারি নি। তো প্রথম ক্লাশেই তিনি জিজ্ঞাসা করলেন কে কে কবিতা লেখ? সাথে সাথে আমরা ক’জন দাঁড়িয়ে গেলাম ...

হাসান শাহরিয়ার
কে কে?

সেলিম আল দীন
আমি, সাজ্জাদ কাদির, সাঈদ-উর- রহমান প্রমুখ তো দাঁড়িয়ে গেলাম, তারপর উনি বললেন- যাও তোমরা বেরিয়ে যাও। আমরা লজ্জায় লাল হয়ে বেরিয়ে গেলাম, ওদিকে মেয়েরা খিকখিক করে হাসছে। কেমন অপমান বোঝ! একটু পরেই উনি ডেকে নিলেন। ভেতরে বসার পর বললেন- কবিতা যদি লিখতে চাও তো জীবনানন্দ আর রবীন্দ্রনাথের মতো কবিতা লিখতে হবে, পারবে? পারবে না। এরচেয়ে ভালো করতে পারবে যদি নাটক লিখ। আর যে যে নাটক লিখবে, সে সে আমার সহযোগিতা পাবে। তারপর তিনি টি.এস.এলিয়টের সিলেক্টেড প্রোজ বইটি পড়তে বললেন। স্যারের এই কথাটি আমি রেখেছিলাম। এবং এখন এই সময়ে এসে আমার মনে হয় যে, একজন প্রকৃত শিক্ষকের কথা যদি মেনে চলা যায়, তবে তার একটা উচ্চতা তৈরি হবে বা সে একটা জায়গায় পৌঁছাবেই।

হাসান শাহরিয়ার
তাহলে নাটক লেখার ক্ষেত্রে আপনার কাছে মুনীর চৌধুরী স্যারই হচ্ছেন প্রথম প্রেরণা, এটা বলা যায়?

সেলিম আল দীন
অবশ্যই। তারপর আমি লক্ষ্য করলাম যে, একটা কথা প্রায়শই বলা হয়- বাঙালির জীবনে ট্র্যাজেডি নাই। কিন্তু কথাটা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হলো না। তখন তো দেশে অনেক আন্দোলন চলছে, ধুমধাম করে মানুষ মরে যাচ্ছে, অথচ বলা হচ্ছে কোনো ট্র্যাজেডি নাই। আমার মনে হলো, এটা নাটক লেখার অক্ষমতা থেকে বলা হয়। তাই আমার মনে হলো নাটক লেখার ব্যাপারে বাঙলা মঞ্চনাটকের মুদ্রাদোষগুলো বাদ দিয়ে সরাসরি ওয়েস্টার্ন আইডিয়াতে ঢুকতে হবে। কারণ, ওদের নাটক আর কবিতার মধ্যে কিন্তু কোনো পার্থক্য নাই। যেমনটি বাংলা ভাষায় নাটকে কবিতায় তৈরি হয়েছে।

বিপ্লব বালা
বাঙলা নাটকের দুর্বলতাগুলো কী কী বলে আপনি মনে করতেন?

সেলিম আল দীন
সেগুলো হলো- অপ্রয়োজনীয় বাস্তবতাবাদ, ভাষার অগোছাল ব্যবহার, জীবনের কোনো মহৎ প্রণোদনা থেকে নাটকের সৃষ্টি না হওয়া- ইত্যাদি মুদ্রাদোষগুলো প্রায় সব নাটকেই ছিল বলে আমার ধারণা। অবশ্য সব নাটকের কথা বলছি না। মধুসূদনের কৃষ্ণকুমারী বা তাঁর প্রহসনগুলো অবশ্যই মহান লেখা, আর রবীন্দ্রনাথকে তো আদ্যোপান্ত এক বিস্ময়ই বলতে হবে এবং স্বীকার করতে হবে যে, এঁরা মূলত কবি ছিলেন বলেই এই মহান সৃষ্টিগুলো সম্ভব হয়েছিল। এছাড়া বেশিরভাগ নাট্যকারের নাটকই আমার কাছে মনে হয়েছিল পরিকল্পনাহীন লেখা। এমন কী ডি.এল.রায়ের নাটকও ইতিহাসে টিকে থাকলেও শিল্পমূল্যে তেমন দাঁড়াচ্ছে বলে মনে হয় না।

হাসান শাহরিয়ার
মুনীর চৌধুরী স্যার যখন বললেন যে- নাটক লিখ, তখন কী আপনার রবীন্দ্রনাথের নাটক পড়া হয়ে গিয়েছিল?

সেলিম আল দীন
না, তখন আবার আমি রবীন্দ্রনাটকের বিরুদ্ধেই ছিলাম বলা যায়। এবং তারপরও অনেককাল আমি তাঁকে গভীরভাবে অনুধ্যানে অনুপ্রাণিত হই নি। অন্তত ১৯৭৬ সালে আগ পর্যন্ত বিরুদ্ধেই ছিলাম। আমার মনে হতো, নাটকে এতো গান কেন? এখন বুঝি যে, নিজের ভেতরে যখন শিল্পবোধ অসম্পূর্ণ থাকে, তখন মহৎ লেখার অনেক বিষয়কেই আমরা খুব সহজেই অবজ্ঞা করতে পারি। আমার অভিজ্ঞতা থেকেই বলতে পারি, তখন আমার মনে হতো গানটা বাঙলা নাটকের জন্য একটা ক্ষতিকর দিক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এটা মনে হওয়ার একটা কারণ থাকতে পারে, তখনকার যে-কোনো সাধারণ মানের নাটকেও গান ব্যবহৃত হতো। এর ফলেই হয়তো-বা আমি রবীন্দ্রনাথের নাটকগুলোকেও একই কাতারে ফেলেছিলাম। পরে অবশ্য ভুল বোঝার পর মনে মনে সাতবার ক্ষমা চেয়েছি, রবীন্দ্রনাথের কাছে। কী বিশাল সৃষ্টিকে কী ব্যাপক অবজ্ঞাই না করেছিলাম! তবে এখন বুঝি তখন আমি ঔপনিবেশীয় শিল্পশর্তে বাঁধা ছিলাম।

বিপ্লব বালা
মুক্তিযুদ্ধের আগে যে সমস্ত রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপ চলছিল, সেখানে আপনার ইনভলবমেন্ট বা রিয়েকশন কেমন ছিল?

সেলিম আল দীন
আমি বঙ্গবন্ধুর কট্টর সমর্থক ছিলাম।

বিপ্লব বালা
কিন্তু ছাত্ররাজনীতিতে তো সরাসরি জড়িত ছিলেন না?

সেলিম আল দীন
না, জড়িত ছিলাম এবং সেটা মুক্তিযুদ্ধের আগে। পরে অবশ্য সরে এসেছিলাম এবং রাজনীতি যারা করতো তাদেরকে আমরা বিশেষভাবে উপহাস করতাম, বিশেষ করে আমরা যারা কবি ছিলাম।

বিপ্লব বালা
কিন্তু তখনকার কবিতায় তো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রাজনীতি বিষয়টা আসছিল।

সেলিম আল দীন
হ্যাঁ, আসতো, গুণের কবিতায় এসেছে, আবুল হাসানের কবিতায় অতটা আসে নি, কিন্তু হাসান আজিজুল হকের লেখায় প্রচন্ড রকমের শিল্পবোধ যেমন ছিল তেমনি সামাজিক ক্ষোভের কারণগুলোও ছিল এবং এখনও আছে। কাঁদো নদী কাঁদো এবং উজানে মৃত্যু-র মতো সুমহৎ লেখা ছিল।

বিপ্লব বালা
বাইরের লেখার পাশাপাশি দেশি লেখাও নিশ্চয়ই পড়তেন?

সেলিম আল দীন
হ্যাঁ, তবে বাইরের লেখাই বেশি পড়তাম। দেশি লেখা পড়লে মনে হতো অযথা সময় নষ্ট করছি। এর চেয়ে রবীন্দ্রনাথের গান শুনলেই তো পারি।

সোহেল হাসান গালিব
আফ্রিকার কবিতাগুলোর অনুবাদ কি তখনই শুরু করেন?

সেলিম আল দীন
হ্যাঁ, ঐ সময় একটা বড় কাজে হাত দিয়েছিলাম, পরে বিবেচনা করে দেখলাম অবশ্য কাজটা অত বড় হয়ে ওঠে নি, তবু সেটা হলো এই যে, আমিই প্রথম ব্ল্যাক লিটারেচার নিয়ে বাংলা ভাষায় ১৯৬৯ সালেই আলোচনার সূত্রপাত করি। আমার আগে কেউ তখনো আমেরিকার ব্ল্যাকদের সাহিত্য বা সঙ্গীত নিয়ে কোনো লেখা লেখে নি।

বিপ্লব বালা
আপনার এ কাজে হাত দেয়ার পেছনের কারণগুলো কী ছিল?

সেলিম আল দীন
তখন পাকিস্তানের কর্মকান্ড দেখে, বাঙালির উপর নির্যাতন দেখে, নিজেকে ব্ল্যাকদেরই একজন মনে হতো। মনে হতো আমেরিকার ভার্জিনিয়া যেমন ক্রীতদাস, আমিও একজন ক্রীতদাস। তো ওদের ফোক লিটারেচারের এবং মডার্ন পয়েট্রি এই দুটোর উপর আমার একটা বেশ বড়-সড় আলোচনা আহসান হাবীব ছেপে আমার একটা জায়গা তৈরি করে দিলেন উৎসাহের সঙ্গে।

বিপ্লব বালা
কিন্তু আপনার নাটক রচনায় তো এই শিক্ষাগুলো তেমন কাজে লাগে নি।

সেলিম আল দীন
অবশ্যই লেগেছে। বিশ্বকে জানবার, দেখবার স্থানটাও তৈরি হয়েছে।

বিপ্লব বালা
না, আমি ঐ সময়ে কাজে লাগার কথা বলছি।

সেলিম আল দীন
ও, হ্যাঁ, সেই সময় কাজে লাগে নি। আসলে একটা ব্যাপার হচ্ছে, অপরিপক্কতা সব সময় একরোখা হয়, আর পরিপক্কতা হচ্ছে সর্বগ্রাহী। সবটা নেয় কিন্তু করার সময় আকাশ-পাতাল মিলিয়েই করে। ঐ সময়, এখন বুঝি, অপরিপক্ক ছিলাম, ফলে কোনো কিছু থেকে নেয়ার শিল্প-কৌশলটা গড়ে উঠে নি।

হাসান শাহরিয়ার
আপনি বাঙলা নাটকের মুদ্রাদোষের কথা বলছিলেন। তো তখন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ পড়ে কী মনে হয়েছিল? তাঁর সব রচনাই তো আলাদা কিছু, আপনার কী মনে হয়?

সেলিম আল দীন
ওয়ালীউল্লাহর গল্প পড়ে তো ভাবতাম এখনকার বাংলা সাহিত্যে এই মাপের লেখা হয় নাকি! আমি তো অবাক! চাঁদের অমাবস্যা আমার কাছে ততটা ভালো লাগে না, কারণ, এরকম লেখা ওয়েস্ট-এ ভুরিভুরি আছে, কিন্তু কাঁদো নদী কাঁদো-র মতো লেখা বিশ্বসাহিত্যে খুব কমই লেখা হয়েছে। আর বাঙালিদের জীবনে এমন উপন্যাস আর লেখা হবে কিনা আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

হাসান শাহরিয়ার
এগুলো তো পরের রিয়েলাইজেশন?

সেলিম আল দীন
তা তো বটেই।

হাসান শাহরিয়ার
কিন্তু আমি বলছি আপনি যখন মুক্তিযুদ্ধের পরে নাটক লেখা শুরু করলেন তখন অনেকটা এ্যাবসার্ডধর্মী নাটকই লিখেছিলেন, এবং তখন আপনার সামনে নিশ্চয়ই ওয়ালীউল্লাহ বা সাঈদ আহমদ ছাড়া কেউ ছিলেন না। তো আপনি কি তাঁদের দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিলেন, নাটকের মুদ্রাদোষগুলো দূর করার ব্যাপারে?

সেলিম আল দীন
না, তাঁরা সে-অর্থে অনুপ্রাণিত করে নি, কিন্তু একটা কথা সত্য, সাঈদ আহমদ আর সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ কিন্তু এধরনের নাটক রচনা করে প্রমাণ করেছিলেন যে, গৎবাঁধা কাহিনী ছাড়াও নাটক লেখা যায়। এবং আমি তো মাঝে মাঝে মনে করি রবীন্দ্রনাথের পর ওয়ালীউল্লাহর নাটক একটা উচ্চতায় পৌঁছতে পেরেছিল। আর আমার নাটক লেখার ব্যাপারে ধারণা হয়েছিল যে, কবিতার সমান উচ্চতার ভাষা এবং থিমকে নিতে হবে, এটা ছিল প্রথম চ্যালেঞ্জ। এটা করতে গিয়ে আমি ওয়েস্টের কাছে আত্মসমর্পণ করলাম। পরে রিয়েলাইজ করলাম যে, শুধু এটা দিয়ে পরিপূর্ণতাটা আসছে না। ঠিক মধুসূদনের ঘটনাটাই ঘটলো আরকি!

বিপ্লব বালা
এটা বোধহয় আমাদের ঔপনিবেশিক নিয়তি!

সেলিম আল দীন
অবশ্যই। তবে দেশ স্বাধীন না হলে আজকে এই জায়গায় দাঁড়াতে পারতাম না।  দাঁড়াবার প্রশ্নই আসে না।

বিপ্লব বালা
এটা মনে হয়?

সেলিম আল দীন
অবশ্যই। এবং প্রায় সেই সময়েই কিন্তু আমার মনে হয়েছিল, বাঙলা নাটকের হাজার বছরের ইতিহাসের মূল উদঘাটনের প্রয়োজন। যদিও কাজটা শুরু করেছি অনেক পরে। এবং এই আমি, যে কিনা মধ্যযুগ শুনলেই দৌড় দিতাম, সে-ই কাজ করলো মধ্যযুগের বাঙলা নাটক নিয়ে।

বিপ্লব বালা
আপনি বাংলা সাহিত্যে পড়তে গেলেন কেন?

সেলিম আল দীন
কবি হবো বলে হাঃ হাঃ, প্রাথমিকভাবে একটা গ্রামের ছেলের ধারণা যা হয় আর কি। তাছাড়া আসলে মনে হয়েছে, বাংলা যেহেতু ভালো পারি, ফলে কম পড়তে হবে, অন্যান্য জিনিস বেশি পড়তে পারবো এবং আমি তা-ই করেছিলাম।

বিপ্লব বালা
মুক্তিযুদ্ধের সময়কার কথা একটু বলুন। আপনি কি যুদ্ধে গিয়েছিলেন?

সেলিম আল দীন
হ্যাঁ, মা-ই আমাকে পাঠিয়েছিলেন, সশস্ত্র সংগ্রামে। আগরতলা, দক্ষিণ ত্রিপুরার বিলুনিয়া, হেকিমপুরে ছিলাম।

হাসান শাহরিয়ার
সশস্ত্র্র সংগ্রামে গিয়েছিলেন, কিন্তু অরুন সেনের লেখায় পড়লাম সেখানে নাকি শুধু কবিতা লিখেছেন, যুদ্ধ অর্থে যা বোঝায় সেটাতে আপনার ইনভলবমেন্ট ছিল না।

সেলিম আল দীন
হ্যাঁ, সেটাও সত্যি। বন্ধুরা আমাকে বলেছিল- আপনি শুধু কবিতা আর নাটক লিখবেন। আমিও তাই করতাম। ওরা আমাকে যুদ্ধ করতে দিত না। হায়! আমার সেই অমৃত বন্ধুরা কোথায়? কী অবাক করা মানুষ ছিল তারা।

বিপ্লব বালা
কোলকাতায় যান নি?

সেলিম আল দীন
না, কোলকাতায় গেছি স্বাধীনতার ৭ বছর পর।

বিপ্লব বালা
তার মানে কোলকাতার থিয়েটার সব স্বাধীনতার পরে দেখা?

সেলিম আল দীন
হ্যাঁ, সবই পরে।

সোহেল হাসান গালিব
একটা ব্যাপার, আপনি কবিতা থেকে নাটকের দিকে এলেন কিন্তু আপনার নাটকের ভাষাভঙ্গি বা প্রকাশ, এগুলো তেমন কবিতাধর্মী হয়ে ওঠাটা কিন্তু অনেক পরে হয়েছে। প্রথমদিকের নাটকে এগুলো নাই।

সেলিম আল দীন
না না, শুরুতই ছিল। যেমন, বঙ্গবন্ধু শহীদ হলেন ১৯৭৫ সালে, আর আমি ’৭৩ সালেই লিখলাম সর্প বিষয়ক গল্প। আমাদের একটা বিশাল শহর, শহরে একটা বিশাল গনঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী নিহত হলেন এবং আর্মিরা চলে আসলো।

বিপ্লব বালা
এই ধারণাটা আপনি কীভাবে পেলেন?

সেলিম আল দীন
আমি গেজ করলাম। আমার মনে হলো বঙ্গবন্ধু বোধহয় আর বাঁচবেন না। কারণ, ইতোমধ্যেই সুকর্ণের পরিণতি দেখে আমার ভেতরে একটা ভয় ঢুকে গিয়েছিল।

হাসান শাহরিয়ার
তাই বলে এমনভাবে মিলে যাবে? মানে অনেকটা সেই ক’দিন আগে লেখা নিমজ্জন, যেখানে আপনি ফোর-রিয়েলিজম বা সম্মুখ বাস্তবতার কথা বলছেন, আর সেই ’৭৩ সালের সর্প বিষয়ক গল্প সেখানেও তো দেখি আগে থেকেই আপনি আন্দাজ করতে পেরেছিলেন।

সেলিম আল দীন
হ্যাঁ, অনেকটা তাই। মানে তখনকার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বা পরিবেশ কিন্তু এমন আভাসই দিচ্ছিল যে, একটা কিছু ঘটতে যাচ্ছে। আমার মনে হয় ঠিক এভাবে না হলেও তখনকার অনেক সচেতন মানুষই বুঝতে পারছিলেন, বঙ্গবন্ধুর পরিণতি এদিকেই যাচ্ছে।

বিপ্লব বালা
আপনি জণ্ডিস ও বিবিধ বেলুন, এক্সক্লুসিভ ও মূল সমস্যা, সংবাদ কার্টুন এবং তারপর মুনতাসির লিখলেন, যেগুলো কিনা রিয়েলিটিকেই ধরতে চেয়েছে। কিন্তু ওগুলোর উপস্থাপন ছিল ভীষণ স্যাটেয়ারধর্মী। তখন আপনি আসলে নাট্যরচনার ক্ষেত্রে কী চেয়েছিলেন?

সেলিম আল দীন
শোন, পাখির যখন চোখ ফোটে, তখন সে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করে ...

হাসান শাহরিয়ার
না না, আপনি কিন্তু এদিক ওদিক ছোটাছুটি করেন নি। পরে বরং একেবারেই ভিন্ন ধরনের লাইনে গেছেন। সেজন্যই জানতে চাচ্ছি যে, আপনি তখন এধরনের স্যাটেয়ারধর্মী নাটক লিখছিলেন কেন বা এর মাধ্যমে আপনি কী চাচ্ছিলেন?

সেলিম আল দীন
না, আমার কিন্তু তখন মনে হচ্ছিল যে, আমার জন্য শিল্পের প্রকৃত পথ কোনটি? যখন যা গভীরভাবে তাড়না করতো তখন তাই লিখতাম কিন্তু মনে হতো এটা আসলে আমার পথ না। বাঙলা নাটককে মুক্তি দিতে হলে আমাকে অন্য পথ ধরতে হবে। এবং তারপর আমি লিখলাম শকুন্তলা। আমি কালিদাসের বিপরীতে দাঁড়ালাম এবং গ্যাটের শকুন্তলা বিষয়ক একটি কবিতাকে অগ্রাহ্য করেছি এই ভেবে যে- এটা হতে পারে না, স্বর্গ-মর্ত্য কখনো মিলন হয় না। কেউ কেউ তখন বলেছে যে- হ্যাঁ, থার্ড ওয়ার্ল্ড এবং ডেভেলপড কান্ট্রিতে কোনো মিলন হয় না। যদি হয়ও সেটা অস্থির কিছু।

বিপ্লব বালা
শকুন্তলা-তে বোধহয় থার্ড ওয়ার্ল্ড, ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড বিষয়টা ছিল না।

সেলিম আল দীন
না ছিল না, কিন্তু একটা লেখা যখন ভালো হয়ে যায় তখন নানা রকম ব্যাখ্যা দাঁড় করানো যায় বা দাঁড় করানো সম্ভব।

বিপ্লব বালা
এখানে এসেই কিন্তু আপনি প্রথম রিয়েলিটি থেকে সরে গেলেন। শকুন্তলা কেন লিখলেন?

সেলিম আল দীন
শকুন্তলা আমি লিখেছি, কারণ আমি ক্ল্যাসিক ওয়ার্ল্ডের আনন্দ আস্বাদ করতে চেয়েছি।

বিপ্লব বালা
কেন? ক্ল্যাসিক ওয়ার্ল্ডের কেন?

সেলিম আল দীন
কারণ, আমার কাছে মনে হয়েছে যে, ওয়েস্ট থেকে স্কেপ করতে হবে। শকুন্তলা-য় আমি মুক্তির পথটা খুঁজলাম। আমি চাইলাম ওয়েস্টের ম্যাটাফোর বা ওয়েস্টের যে শিল্পের সুক্ষ্মতা সেগুলো অর্জন করে আধুনিক কবিতার গুনাবলীসহ শকুন্তলার উন্মোচন ঘটানো যায় কিনা। তবে এর আগে আমি মনে করি বুদ্ধদেব বসু তপস্বী ও তরঙ্গিনী-তে এই চেষ্টাটা করেছেন, কিন্তু তাঁর  গদ্যের মধ্যে কাব্যটাকে ধরার ব্যাপারে কিছুটা ল্যাকিংস আছে, যেটা আমার লেখা শকুন্তলা-তে নাই।

হাসান শাহরিয়ার
নির্দিষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে, বুদ্ধদেব বসুর কোন জায়গাগুলোর কথা বলছেন?

সেলিম আল দীন
সাধারণভাবে বলা যায়- ধ্রুপদী ভাষার সঙ্গে তিনি হঠাৎ করে প্রায় অকাব্যিক পন্থায় সমকালীন কোলাকাতাই শব্দের প্রয়োগ করেছেন। ফলে ভাষার হারমোনিটা নষ্ট করেছেন। ভাবের দিকের চেয়েও বুদ্ধদেব বসু তপস্বী ও তরঙ্গিনী-তে সহসা অস্তিত্ববাদের ঝংকার খুব বেমানান ঠেকে।

হাসান শাহরিয়ার
তারপর তো ‘কিত্তনখোলা’?

সেলিম আল দীন
হ্যাঁ, এরপরই দেখলাম আমার এপিকের ওয়ার্ল্ডটা ঘনিয়ে উঠেছে। কী পশ্চিম কী পূর্ব- আমার ভেতরে একটা গর্জনশীল সমুদ্রের শব্দ শোনলাম। গ্রীক, রোমান, সংস্কৃত পুরাণগুলো প্রচণ্ডভাবে পড়ে ফেললাম। এবং আমার কাছে মনে হতে লাগলো নাটকে অঙ্ক, দৃশ্য এসব কাল বিবেচনায় অনাবশ্যক রীতি থাকবে কেন? আমি কিত্তনখোলা রচনা করলাম। এবং যেহেতু এপিকের মর্যাদা দিতে যাচ্ছি, ফলে মহাকাব্যের সর্গ বিভাজনটাকেই নাটকে নিয়ে এলাম। এর অনুপ্রেরণা এসেছে মানুষের জীবনের মহাকাব্যিক চেতনা থেকে- কোনো বিশেষ মহাকাব্য থেকে না, মহাকাব্যিক চেতনা থেকে এবং সাধারণ মানুষের ভেতরে এই মহাকাব্য লুকিয়ে আছে।

হাসান শাহরিয়ার
সেই সময় নাট্যবোদ্ধরা এটাকে কীভাবে নিয়েছিলেন?

সেলিম আল দীন
শকুন্তলা দেখার পর রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহসহ অনেকেই বেশ আপ্লুত হলো, কিন্তু কিত্তনখোলা দেখার পরই বললো সেলিম ভাই এটা কী করলেন আপনি! কোনো নায়ক নাই, মেইন কোনো ক্যারেক্টর নাই, কিছুই বোঝা যায় না। কেউ কেউ বললেন এটা নাটক না উপন্যাস? আমার বয়োজ্যেষ্ঠ এক নাট্যকার বললেন- সেলিম তুমি এটা আবার লেখ, একটু পরিবর্তন করো। তখন আমি বুঝতে পারলাম যে- আমি যা-ই লিখে থাকি না কেন, আমি আলাদা কিছু লিখেছি। এবং এ-ও বুঝলাম নাসির উদ্দীন ইউসুফ এবং ঢাকা থিয়েটার যদি আমার পাশে থাকে আমার পথ চলায় আর কোনো বাধা আসবে না।

বিপ্লব বালা
আপনি পূর্ব-পশ্চিমের ক্ল্যাসিক মিলিয়ে নিজের একটা ভূমি পেয়ে যাচ্ছেন। এখানে লোকজীবন বা পারফরমেন্সরীতি, এগুলো কি কেবল মহাকাব্য থেকেই নিচ্ছেন?

সেলিম আল দীন
সেটা তো খুবই স্বাভাবিক যে, আমি ভূমিজ মানুষদের যখন আকাশ প্রমাণ করে দেখছি তখন অটোম্যাটিক্যালি তাদের জীবনাচরণের নানা দিকগুলো এসে পড়ে।

বিপ্লব বালা
সেই জীবনাচরণ জানার ব্যাপারটা কীভাবে হলো? কোনো নাগরিক লেখকের কাছে তো পাই না। আপনি পেলেন কীভাবে?

সেলিম আল দীন
আমার কাছে মনে হয়েছে মানুষগুলো যদি বনশ্রী বালা হয়, যদি ডালিমন হয়, যদি সোনাই হয়, তাহলে তাদের জীবন এবং পরিপার্শ ঐখানে ঐভাবেই আসবে। এপিকের একটা প্রতিনিধি হিসেবে আসছে। সেই সাথে তারা তাদের ছিন্নতা মলিনতা নিয়েই এসেছে। এবং সেখানে এই লোকায়ত জীবনের বিকাশটা যে আলোড়ন ঘটায়, মনে হচ্ছে সোনাই আর সোনাই থাকে না, এরা হচ্ছে চিরকালের ইদিপাস, আন্তিগোনে, কৃষ্ণা বা একিলিসের সমকক্ষ। আমি আমার নাটকের রীতিকে এই পথে মুক্তি দেবার চেষ্টা করেছি। বাঙলা নাটকের মুক্তিটাকে আমি আমার পথে এভাবেই অন্বেষণের চেষ্টা করেছি, আমার দেশের মতো করেই।

বিপ্লব বালা
কিন্তু নাগরিক দর্শকের কাছে দুটোই তো অনুপস্থিত- লোকজ আর মহাকাব্য। তো সেই দর্শকের সাথে কীভাবে কমিউনিকেট করলেন? এই ভাষা, ভাবনা তো তাদের কাছে অজানা।

সেলিম আল দীন
সেটা আমার দায়িত্ব না।

বিপ্লব বালা
কেন, নাট্যকার হিসেবে দর্শক আপনার মাথায় থাকবে না?

সেলিম আল দীন
মোটেই না। আমি ভেবেছি, কিত্তনখোলা লিখেছি, ব্যস। এখন দর্শক পছন্দ করলে করবে, না করলে তো আমার কিছু করার নাই। এটা আমার রিচ্যুয়াল যে, আমি বলবো এবং পাঠক দর্শক নিজের গরজে কমিউনিকেট করে নেবে।

হাসান শাহরিয়ার
দর্শককে পছন্দ করানোটাকে এতো হেয় করে ভাবছেন কেন? এটা তো একটা চ্যালেঞ্জও হতে পারে যে, আপনার ভাবনার সাথে আপনার ক্লায়েন্টের ভাবনার সমন্বয় ঘটবে।

সেলিম আল দীন
কখনো না, দর্শকের চাইতে শিল্পের বা কাজের পূর্ণতাটা আমার কাছে অধিকতর কাম্য।

হাসান শাহরিয়ার
দর্শকের পূর্ণতা বাদ দিয়ে?

সেলিম আল দীন
আমি লেখার সময় দর্শকের ব্যাপারে মাথাই ঘামাই না।

বিপ্লব বালা
তাহলে তো বর্ণনাত্মক নাটকের মূল ক্যারেক্টারটাই থাকে না। বর্ণনাত্মক নাটকের মূল কাজটা তো পারফরমেন্সের সাথে দর্শকের সম্বোধন যোগসূত্র তৈরি করা। তো এখানে তো মূল জিনিসটাকেই আপনি অস্বীকার করছেন।

সেলিম আল দীন
অস্বীকার নয়, আমি প্রকৃত দর্শনের জন্য অপেক্ষা করি। সেটা যদি তৈরি হয় তো ভালো, না হলে আমার কী করার আছে!

হাসান শাহরিয়ার
আপনি তো বলছেন যোগসূত্র তৈরি করার কথা মাথাতেই রাখেন না, তারপর যদি যোগসূত্র তৈরি হয়েই যায় সেটা তো আপনার ক্রেডিট হিসেবে আসবে না, তাই না? তা নির্দেশকের ক্রেডিট হতে পারে।

সেলিম আল দীন
আমি আসলে মনে করি, নাটকের ফর্মে লেখা হলেও সব নাটকই যে অভিনীত হতে হবে এমন কোনো কথা নাই। জীবনে ‘ডাকঘর’-এর ভালো অভিনয় দেখবো কিনা জানি না কিন্তু ডাকঘর পড়েই তৃপ্তি পাওয়া যায়।

হাসান শাহরিয়ার
কিন্তু সৈয়দ শামসুল হক তো বলেছেন, এই পড়ার মজাটা আসলে তলাপাত্র, উপরি-পাত্র হচ্ছে মঞ্চে দর্শকের সামনে যেটা হয়।

সেলিম আল দীন
এটার সাথে আমি একমত না। দৃশ্য কবিতার চেয়ে কম শক্তিশালী হয় না।

হাসান শাহরিয়ার
তার মানে তো আপনি দৃশ্যকাব্য তৈরি করতে পারার তৃপ্তির কথাই বরছেন।

সোহেল হাসান গালিব
আপনার মাথায় সব সময় থাকে প্রাচীন এপিক আর আধুনিক নাট্য-ঐতিহ্যের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন। অর্থাৎ এই মহাকালের মধ্যে আপনার নাটককে স্থাপন করার আকাক্সক্ষা থাকে, সে-কারণেই বোধহয় দর্শক মাথায় থাকে না?

সেলিম আল দীন
কার না ইচ্ছা করে যে, তার লেখায় মহাজগৎটা ঢুকে পড়–ক। রবীন্দ্রনাথের ছোট একটা গান শুনলেই তো বোঝা যায় যে, মহাজাগতিক আকাক্সক্ষাটা কী প্রচন্ডভাবে তার মধ্যে ছিল। তাঁর উত্তরসূরী হিসেবে তা আমাদের মধ্যে কেন থাকবে না? বাংলা কবিতায় জীবনানন্দ যে প্রশান্তিটা আমাকে দেয়, সেটা তো বাঙলা নাটকে পাওয়া যায় না। একমাত্র উজানে মৃত্যু ছাড়া তো বাঙলা নাটক পড়াই যায় না। আমার সমসাময়িক যারা লিখছেন, সেটা তাদের মতো করে লিখছেন, আর আমি যা লিখছি সেটা আমার পথ। এই পথ আমাকে সৃষ্টি করতে হয়েছে। আমাকে খাটতে হয়েছে।

হাসান শাহরিয়ার
এই খাটা-খাটনিটা কী রকম?

সেলিম আল দীন
লোকায়ত ভাষাকে সাংকেতিকতার স্তরে আনাটা খুব মুশকিল ছিল। যে জন্য হাত হদাই লিখতে আমার দেরি হলো। আমি কিছুতেই নোয়াখালীর ভাষাটাকে কবিতার ছন্দের সাথে মেলাতে পারছিলাম না। নোয়াখালীর ভাষার একটা সমস্যা ছিল এর গীতল দিকটি বুঝতে পারা। গীতল হচ্ছিল না। মনে রেখ, একমাত্র আব্দুল হাকিম ছাড়া ঐ ভূমি থেকে ঐ অর্থে তেমন বড় কোনো কবিও জন্ম নেয় নি। পরে আমার লালনকে উদাহরণ মনে হলো। ভেবে দেখলাম যে, লালন কুষ্টিয়ার ভাষাকে বাংলা ভাষার সর্বোচ্চ সুক্ষ্মতায় নিয়ে গেছেন। (অনেক আগে একবার এই নিয়ে এস.এম. সুলতানের সাথেও আলাপ করেছিলাম।) তো তারপর অনেক সময় নিয়ে শেষ করলাম হাত হদাই, লক্ষ্য করে দেখবে হাত হদাই আঞ্চলিক ভাষার নাটক হলেও একটা ছন্দ খুঁজে পাওয়া যাবে। যেটা মান বাংলা, সেটাই আঞ্চলিকে নিয়ে আসা হলো। মনে হবে নোয়াখালীর ভাষা আবার সবাই বুঝতেও পারবে।

হাসান শাহরিয়ার
সবার বোঝার কথা বলছেন, এই সবাই কারা?

সেলিম আল দীন
দর্শকের কথা বলছি।

হাসান শাহরিয়ার
তাহলে দর্শককে মাথায় রাখেন?

সেলিম আল দীন
দর্শক বলি বা পাঠক বলি, একটা খটখটা ভাষাকে গীতল করে উপস্থাপন না করলে তো শিল্পের জায়গায় পৌঁছাবে না। আমি সেটাই বলছি। আর খাটা-খাটনির ব্যাপারটাতে আরেকটু বলি আমি প্রথমেই বললাম, আমি আমার পথ খুঁজছিলাম। তো তোমরা দেখেছ যে, একজন লেখক জণ্ডিস ও বিবিধ বেলুন লিখছে, সংবাদ কার্টুন লিখছে, অনিকেত অন্বেষণ, মুনতাসির ফ্যান্টাসী লিখছে, সে-ই আবার শকুন্তলা, কীত্তনখোলা-য় এসে পৌঁছালো। তো এটা অনেকটা সমুদ্রের ঝড়ের মতো। ছুটতে ছুটতে কোন দিকে যাবে স্থির করতে পারে না। শকুন্তলা হলো আমার উপকূলের মতো, এরপর আর ভাবতে হয় নি। আমি এগিয়েছি সুনির্দিষ্টভাবে। একজন লেখকের ক্রমউত্তোরণ, একটা থেকে আরেকটা আলাদা করে ক্রমে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রচণ্ড চেষ্টাটা আমার মধ্যে ছিল এবং আছে। সফলতা বা বিফলতা সেটা পরের কথা। আমি মূলত রবীন্দ্রনাথের পথেই চলেছি বলে আমি মনে করি। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের জীবন-ভাবনার যে ক্রমস্তরগুলো এবং শিল্পের মধ্যদিয়ে রিচ্যুয়ালের জায়গাটায় পৌঁছানোর, শিল্পকে রিচ্যুয়াল করে জীবনের একেবারে অন্তিম পর্বে পৌঁছানোর যে চেষ্টাটা, একেবারে হুবহু এই বিষয়টাই আমি অনুকরণের চেষ্টা করেছি আমার লেখার মধ্যদিয়ে। আমার লেখায় সব সময় যে ঝোঁকটা থাকে, মহাজাগতিক যে অন্বেষণটা আমি করি, সেখানে মানুষের এক অবস্থান দেখার পর আবার নতুন অবস্থান অন্বেষণে বেরিয়েছি। এবং এখন আমার এটা সৌভাগ্য যে সাধারণ লোকও আমার ৫/৭ টা নাম বলে দিতে পারবে। আমার অন্বেষণ, আমার পথ চলার এক পর্যায়ে, অর্থাৎ কিত্তনখোলা পর্যন্ত আমি আমার রচনাকে নাটক বলেছি। পরের লেখাগুলোকে সে অর্থে আর নাটক বলি নি, এবং আমার মনে হয় পাশ্চাত্যের সংজ্ঞায় আমি নাটক লিখিও নি।

হাসান শাহরিয়ার
তারপরের রচনাগুলো দেখলেই তো বোঝা যায় যে, এগুলো মঞ্চকে মাথায় রেখে লেখা না। তারপরও আপনাকে নাট্যকার সেলিম আল দীনই বলা হয়। যে-কোনো টেক্সট নিয়ে যে কেউ কাজ করতে পারে, যেমন আপনি ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ মঞ্চে এনেছিলেন, কিন্তু ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ কে নিশ্চয়ই আপনি নাটক বলবেন না, সে-ক্ষেত্রে আপনার রচনাগুলোকে যদি কেউ নাটক না বলে আপনার তো আপত্তি থাকার কথা না?

সেলিম আল দীন
না, আমার কোনো আপত্তি নাই। আসলে নাটকহীনতার মধ্য দিয়েই আমার নাটক।

বিপ্লব বালা
নাটক বলতে কি তাহলে একটা নির্দিষ্ট ফর্মেট বা সংজ্ঞা মেনে নেয়া হচ্ছে?

সেলিম আল দীন
না, আমি আর কোনো ফর্ম মানছি না। কারণ কিত্তনখোলা থেকেই আমি মহাকাব্যের সর্গবিভাগ দিচ্ছি নাটকে। এখানে মজার ব্যাপার হলো আমি আমার চিন্তার মধ্য দিয়ে পুরো জাতিকে শেয়ার করতে চাচ্ছি। পুরো জাতির সহস্র বছরের যে জীবনযাত্রা এবং তার যে আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন, সেটা কোনদিকে যাবে, আমার লেখার মধ্য দিয়ে যেন হাজার হাজার বছরের বাঙালির চাওয়াটা একটা অর্থ দাঁড় করায়। তোমরা বিশ্বাস করো আমি এভাবেই লিখছি, দেখছি, কোনো বানিয়ে কথা বলছি না।

হাসান শাহরিয়ার
অবশ্যই স্বীকার করছি, কিন্তু এই প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে আপনি কী বেছে নিয়েছেন? নিশ্চয়ই নাটক না?

সেলিম আল দীন
সেটাকে আমি কখনো বলেছি নাটক, কখনো পাঁচালী, কখনো বলছি উপাখ্যান। মানে এমনকি এটাকে গল্প ভাবলে গল্প, কবিতা ভাবলে কবিতা। তোমাদের মনে রাখতে হবে, এই বিভাজনগুলো ওয়েস্টের। ওয়েস্ট কিন্তু বৈজ্ঞানিক বুদ্ধিতে তাদের সুবিধার জন্য নানা রকম বিভাজন করেছে। যেমন- একাঙ্ক, ছোটগল্প, পঞ্চাঙ্ক, উপন্যাস, কবিতা- অনেকটা সময়ের প্রয়োজনে। ট্রেন চালু হলো তো ছোটগল্প লেখা শুরু হয়ে গেল, যেন পাঠক অল্প সময়ের মধ্যে একটা পূর্ণাঙ্গ কিছু পড়তে পারে। ২-৩ ’শ বছর  আগে তো ছোটগল্পের অস্তিত্ব ছিল না। মহাকাব্যটা তৈরি হয়েছিল গোত্রের জন্য যে, তারা সারারাত ধরে শুনবে। পরে আধুনিক জীবনে মহাকাব্য আর চললো না। ছোটগল্পের অনুকরণে একাঙ্ক এলো। খুব হৈ চৈ পড়ে গেল। ৬০-৭০-১০০ বছর টিকলো। এখন পৃথিবীর কোনো শ্রেষ্ঠ একাঙ্ক লেখকের নাম বলতে পারবে? তো ওয়েস্টের এই বিভাজন বাঙালির শিল্প ভাবনার সঙ্গে সঙ্গতিহীন। আমি সেই জায়গাটা ধরতে চেয়েছি।

হাসান শাহরিয়ার
একটু বিশদ ব্যাখ্যা দিলে পরিষ্কার হতে পারতাম।

সেলিম আল দীন
তাহলে বলি, পাঁচালী-র কথা যদি বলো, তাহলে দেখবে, পাঁচালী-তে একদিকে থাকছে সামাজিক রীতি-নীতি, পুরাণ, ধর্মবিশ্বাস আবার থাকছে নাচ, গান- কাব্য আর আগাগোড়া কাহিনী তো থাকছেই। শিল্পের যতগুলো শাখা- গল্প, কাহিনী, ছন্দ, নৃত্য সবই থাকছে। শাহ মুহম্মদ সগীরের ইউসুফ জুলেখা-র কিছু অংশ চিত্রপটের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে, যেটাকে আমরা পটনাট্য নাম দিয়েছি। তো দেখা যাচ্ছে বাঙালিরা ‘বহু’কে ‘একের’ মধ্যে দেখেছে, আর ওয়েস্ট ‘এক’কে ‘বহু’ করেছে। আমাদের বহুকে একের মধ্যে নিয়ে আসার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলেন রবীন্দ্রনাথ। একজন রবীন্দ্রনাথই কিন্তু ছবি আঁকেন, কবিতা লেখেন, গান লেখেন, ছোটগল্প লেখেন। কিন্তু কালের যে শিল্প বিবেচনা সেখান থেকে তিনি বলছেন- এটা ছোটগল্প এটা অমুক-তমুক। কিন্তু সব মাধ্যমে তিনি কথা কিন্তু একটাই বলছেন।

হাসান শাহরিয়ার
তাহলে আপনার লেখাকে আপনি নাটক বলছেন না কেন? আপনার তো ইচ্ছাই যে এগুলো দৃশ্যকাব্য হোক।

সেলিম আল দীন
নাটক একেবারে বলি নি, তা কিন্তু না। তবে আমি বলছি এই বিশেষ লেখাটার পুরোটাই গাওয়া যেতে পারে আবার কবিতা আকারেও সাজানো যেতে পারে। আমি ‘কথানাট্য’ নাম দিয়েছি, যেমন চাকা- পুরোটাই নাটক, সেটা কবিতার আকারেও সাজানো যায়- আবার তা গীত হতে পারে। কিন্তু বলতে চেয়েছি যা, তা আসলো কিনা সেটাই বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত।

বিপ্লব বালা
স্বর্ণবোয়াল- কে আপনি উপন্যাস বলছেন কেন?

সেলিম আল দীন
আমি বলি নি। উপন্যাস বলেছে পত্রিকাওয়ালারা। ওরা কী না বলে? এ্যাবসার্ড ড্রামা যেটাকে বলা হয়, সেটা কি যে লিখেছে সে বলছে? না, ঐ পত্রিকাওয়ালারা বলছে। যেমন ‘অঙ্কিয়া’ নাটক বলে যে তোমরা ইউনিভার্সিটিতে পড়াও, আসামে অঙ্কিয়া বলে কোনো নাটকই নাই। এ নিয়ে অরুণ সেনের মাধ্যমে আমার সঙ্গে আসামের বিশিষ্ট কবি হীরেন্দ্রনাথের সঙ্গে কথা হয়েছে। তো দেখ শঙ্কর দেবের নাটককে অঙ্কিয়া বলা হচ্ছে অথচ তিনি নিজেও কোথাও এটাকে অঙ্কিয়া বলেন নি। অঙ্কিয়া বলা হয়েছে শংকর দেবের মৃত্যুর ২০ বছর পর। অথচ অঙ্কিয়া কিন্তু বিশুদ্ধ বাংলা পাঁচালী- যেখানে সংলাপ আছে, নাচ-গান আছে। গান দিয়ে শুরু হয়ে গান দিয়ে শেষ হয়।

হাসান শাহরিয়ার
আমরা স্বর্ণবোয়াল-কে কেন উপন্যাস বলছেন সেটা নিয়ে কথা বলছিলাম।

সোহেল হাসান গালিব
আরেকটা কথা জুড়ে দিই, স্বর্ণবোয়াল বেশ কিছুদিন আগে প্রকাশিত হয়েছে। আপনার শিল্পিসত্তা বা আত্মজৈবনিকতার সাথে স্বর্ণবোয়াল-র কোনো যোগসূত্র আছে? বা সম্পর্কটা আসলে কী ধরনের?

সেলিম আল দীন
লেখকের যে-কোনো প্রিয় লেখাটা তার আত্মজৈবনিক তো বটেই। মানে, সেটা পৃথিবীর যে-কারো সম্পর্কে বলা চলে। শেক্সপীয়র, গ্যেটে ও টলস্টয়ের বহু লেখাই বহু ক্ষেত্রে আত্মজৈবনিক। লেখককে মরমে-মিশে গিয়ে বা নিজের উপলব্ধিটাকে বা নিজের জীবনটাকে নানা ধাঁচে ঢেলে নানা চরিত্রের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করতে হয়। রবীন্দ্রনাথ সেটা সঙ্গীতে প্রকাশ করেন। স্বর্ণবোয়াল’র কথা বললে তো, সেক্ষেত্রে আমার বহু লেখাই আত্মজৈবনিক। যেমন, চাকা, হরগজ, স্বর্ণবোয়াল। একটা প্রচন্ড ট্র্যাজেডিবোধ তো আছেই আমার-সেটাই ঘুরে-ফিরে আসে হরগজ, চাকা, যৈবতী কন্যার মন কিংবা স্বর্ণবোয়াল-এ, এর মধ্যে স্বর্ণবোয়াল একটু Different, তা এই অর্থে যে, Western জয়-পরাজয়ের কনসেপ্টের যে জায়গাটা, সেখানে এ নাট্যে আমি প্রাচ্যকে প্রতিষ্ঠা করেছি। আমি মনে রেখেছি যে, মেলভিলের লেখা The White Whale-তে বিশাল মাছ শিকারের গল্প বা আর্নেস্ট হেমিংওয়ের মতো মহান লেখক বিশেষ করে তাঁর The Old Man and The Sea'র মতো লেখা পৃথিবীতে থাকার পরও আমি কেন স্বর্ণবোয়াল লিখেছি। আমার মনে হয় যে, তাদের লেখাকে শ্রদ্ধা জানিয়েই তাদের থেকে ভিন্ন মত পোষণ করি জীবনের নান্দনিক ও দার্শনিক ক্ষেত্রে। কাজেই মাছের গল্প হলেই যেমন একটা মাছ থাকে না, তেমনি স্বর্ণবোয়াল’র গল্প একটি মাছের গল্প মাত্র নয়। এটার সাথে অদ্ভুত মিল আছে চাকা’র।

হাসান শাহরিয়ার
ওয়েস্ট থেকে কীভাবে ভিন্ন এটা যদি একটু বলতেন ...

সেলিম আল দীন
আর্নেস্ট হেমিংওয়ের লেখায় মানুষের সাকসেস এবং ফেইলিওর দুটোই এসেছে প্রচন্ড মানবিক প্রণোদনায়। সেটা পাশ্চাত্য দর্শন সম্ভূত। আমার এখানে সাকসেসই সবকিছু নয়। আমার এখানে স্বর্ণবোয়ালটা ধরা যায় না। এর সঙ্গে ওদের জীবন-জীবিকার চিত্রতো আছেই এবং মাছের সাথে বিরল লড়াইয়ের কথাও আছে। হেমিংওয়ের গল্পে আছে কয়েকদিনের, আমার এখানে আছে একদিন একরাত্রির। কিন্তু কতটা ভিন্ন যে, বাবা মারা গেছে, বাবার শিয়রে এসে বলছে যে- বাবা তোমার বড়শিটা ঠিক আছে, সুতাও ছিঁড়ে নি, তবে বোয়াল মাছটা আমি তুলতে পারি নি। ... এটা কিন্তু মৃত বাবাকে শোনাচ্ছে। অর্থাৎ ইতিহাস এবং প্রেরণাটা ঠিকই রয়ে গেছে, কিন্তু সফলতা আসে নি। আমি মনে করি সাকসেসটা সবকিছু না।

বিপ্লব বালা
আমাদের পোষ্য বা পালিত এমন আরো অনেক কিছু নিয়েও তো আপনি লিখেছেন।

সেলিম আল দীন
হ্যাঁ, আমি দেখলাম আমাদের সাহিত্যে পশু-পাখি নিয়ে কোনো কিছু নাই। কেরামত মঙ্গল-এ একটা ষাঁড়ের গল্প আছে, যেখানে মানুষের সাম্প্রদায়িকতার পাপের বিরুদ্ধে যেনবা একটা ষাঁড় বিদ্রোহ করে বসে। ষাঁড় তো ওখানে সত্যের সিম্বল। হাজার হাজার বছর ধরে সে মানুষের পরিশ্রমের সঙ্গী। মানুষের শ্রমকে লাঘব করার সঙ্গী, কোনো দেবদূত নয়, একটা চারপায়ী পশু, সহস্র সহস্র বছর ধরে ঘাম, রক্ত ঝরিয়েছে, হাড্ডি, শিং দিয়েছে, মাংস, দুধ দিয়েছে ... অথচ একটা গল্পও তাদেরকে নিয়ে নাই। তাই আমি ধাবমান রচনা করলাম। ওটা সোহরাব নামে এক মোষ- সেই মোষের গল্প। আমি অদ্ভুতভাবে লিখলাম, একটা জায়গায় আছে মোষের মা হামেলাপাহাড়ী গয়াল দ্বারা গর্ভবতী হয়েছে। সুতরাং গারোরা ভাবছে যে, বাঙালিদের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের যে বোঝাপড়া সেটা সমাধানের জন্য সোহরাবের আগমন ঘটেছে, যাকে তারা পূজা করে। যখন মোষটাকে লিল্লাহর মোষ হিসেবে কসাইরা জবাই করতে এসেছে, তখন মোষটা বিদ্রোহ করলো। বিদ্রোহ করে পালাতে শুরু করলো, কয়েকটা মানুষ মেরে ফেললো। নদী পার হলো সীমান্ত অতিক্রম করার সাথে সাথে বি.এস.এফ গুলি করে, একটা গুলি লেগে গেছে, শেষ পর্যন্ত ব্যাক করেছে রক্ত ঝরিয়ে। মোষটা শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পন করে। আমি শেষে বৌদ্ধের বানী দিয়ে ধাবমান শেষ করেছি। কাজেই আমি আবারো বলছি, লেখা তো লেখাই, সেটার আবার নাটকত্ব কী, কাব্যত্ব কী বা উপন্যাসত্ব কী?

সোহেল হাসান গালিব
তাহলে আপনার শেষ লেখাটায় আপনিই কি আপনার কথার বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছেন না?

সেলিম আল দীন
কী রকম?

সোহেল হাসান গালিব
আপনি নাম দিচ্ছেন ‘গীতিনৃত্যনাট্য’, তখন তো আপনি একটা আঙ্গিককেই হাইলাইট করছেন।

সেলিম আল দীন
সেটা করছি এজন্য যে, এই মাধ্যমটি মৃত। আমি চিন্তা করে দেখলাম, মঞ্চে কেবল নক্সী কাঁথার মাঠ বা মাছ ধরাধরির পলো নিয়ে কতগুলো লাফ-ঝাঁপ হয়। আর নৃত্যনাট্য যদি করতেই হয়, তাহলে ঐ ৪-৫টা - শ্যামা, চন্ডালিকা, চিত্রাঙ্গদা ইত্যাদি। তাহলে আমাদের কালের, আমাদের দেশের হয়ে উঠছে না নৃত্যনাট্যটা। অথচ রবীন্দ্রনাথ অপেরা এবং ব্যালে থেকে পৃথক করে আলাদা একটা ফর্ম করলেন, নৃত্যনাট্য, সেটা হারিয়ে যাবে? আমি এই লেখাটায় নাট্যকার কবি এবং উপন্যাসিকদের চ্যালেঞ্জ করলাম যে, ইউ শুড গো, ইউ শুড ফলো দিস লাইন- এই রাস্তায় তোমাদের আসা উচিত। গান ছাড়া কি উপন্যাস হয়? যে গান জানে না, সে কি উপন্যাস লিখতে পারবে? আর লিখলেও সেটা ভালো হবে? চিত্রকলার সঙ্গে যার পরিচয় নাই সে কী করে নাটক লিখবে বা কবিতা লিখবে? তুমি কি মনে কর একজন অভিনেতা কেবল অভিনয় জানলেই অভিনেতা হতে পারে? না, তাকে চিত্রকলা জানতে হবে, কবিতা জানতে হবে। এবং এটাতো পৃথিবীর ইতিহাসেই আছে, যারা যত মহান, তাদের পড়াশোনার রেঞ্জ কত বিচিত্র! এসব কিছু মিলিয়েই আমার মনে হয়েছে, বিষয়গত দৈন্য যেখানে বাংলা সাহিত্যে আছে, সেই জায়গাগুলোয় যাওয়া উচিত।

হাসান শাহরিয়ার
সে-জন্যই একটা বিষয় আপনাকে বারবার বলছি যে, আপনার রচনা আমাদের কাছে নাটক মনে হয় না, কিন্তু তাতে কী আসে যায়? আপনার মনে পড়তে পারে, আমি নিমজ্জন পড়ে এতটাই অভিভূত হয়েছিলাম যে, আপনাকে টেলিফোনে বলেছিলাম- এটা নাটক না, নাটকোত্তর কিছু। অর্থাৎ এটা একটা উঁচুমানের সাহিত্যকর্ম হয়েছে। উপন্যাস না বলুন ক্ষতি নাই, কবিতা না বলুন ক্ষতি নাই। কিন্তু সেটাকে নাটক বলবেন সেখানে আবার আমার আপত্তি আছে। এটা একটা বড় সাহিত্য হয়েছে, সেটাই আমার কাছে মহান প্রাপ্তি বলে মনে হয়। আপনার মত কী?

সেলিম আল দীন
অবশ্যই, নাটক না বললে আমারও কিছু যায় আসে না। আমি কিন্তু নাসির উদ্দিন ইউসুফকে বলেছি এবং আরো অনেককেই বলেছি যে, শাহরিয়ার যে একজন যথার্থ সম্পাদক- পাঠক, সেটাও বোঝা গেল তার এই নিমজ্জন পাঠের প্রতিক্রিয়ায়। এবং তার শিল্পবোধও অনেক প্রগাঢ়। একজন লেখকের লেখা কী হয়ে উঠলো সেটা বিচার্য নয়, কতদূর হয়ে উঠলো সেটাই বিচার্য। এই জন্য ‘কালি ও কলম’-এ অরুণ সেন লিখলেন, সেলিমের লেখাগুলোকে আজকাল নাটক নামে সনাক্ত করা কঠিন হয়ে গেছে। তুমি যদি সোমদেবের কথাসরিৎসাগর পড় তাহলে দেখবে যে, সেটা বলার জন্য লেখা হয়েছে, ‘কথানাট্য’ বলার জন্য লেখা হয়েছে। আমিও তো বলছি, এটা পাঠ কর। কথাকবি যেভাবে আবৃত্তি করতো, মানে পুরাণ কথা আবৃত্তি করতো, একালের গল্পগুলো ঐভাবে আবৃত্তিযোগ্য করে যদি পড়, তাহলে একজন লোক দিয়েই চাকা, হরগজ করা সম্ভব। এবং আমি ভাগ্যবান যে- কথানাট্য ধারাটা মঞ্চকুসুম শিমূল ইউসুফ আর রাইসুল ইসলাম আসাদ- জামিলের নির্দেশনায় বাঙলা মঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে।

বিপ্লব বালা
কিন্তু বাচ্চু ভাই তো সেদিকে যাচ্ছেন না। তিনি কিন্তু একটা নির্দিষ্ট ফরমেটেই প্রেজেন্ট করছেন নাটকগুলো।

সেলিম আল দীন
না, আমার মনে হয় নাসির উদ্দিন ইউসুফ সেটা ভেঙেছে। যেমন- বনপাংশুলে আমরা দেখছি যে, ক্যারেক্টার বেইজড ফর্ম। আবার প্রাচ্য-এ এসে দেখছি যে, ক্যারেক্টরকে ডিএ্যাক্টারাইজড করা হয়েছে। ডিএ্যাক্টারাইজড মানে এ্যাক্টরকে ক্যারেক্টরের সঙ্গে যুক্ত করে তাকে আবার ক্যারেক্টর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। যেমন, প্রাচ্য-এ শিমূল কোন চরিত্রটি করেছে সেটা আমি বলতেই পারবো না। কারণ, ও গান গেয়েছে, কথা বলেছে, অভিনয় করেছে ইত্যাদি। ইউসুফের হাতে বাঙলা নাটকের নতুন একটা গ্রামার তৈরি হচ্ছে, সেটা হচ্ছে যে, অভিনেতার ডিএ্যাক্টারাইজড হয়ে যাওয়া। এ ধারায় একজন অভিনেতা হ্যামলেট করতে পারে আবার ওফেলিয়াও করতে পারে।

বিপ্লব বালা
সেটাতো তাহলে কথকের জায়গাতেই থাকলো।

সেলিম আল দীন
যেখানেই থাকুক কিন্তু ঘটনাটা প্রাচ্য-তে ঘটে গেছে।

হাসান শাহরিয়ার
কিন্তু আপনি যে ডিএ্যাক্টাইজেশনের কথা বলছেন, সেটা তো নতুন না। এগুলো আমাদের নিজস্ব ফর্মগুলোর মধ্যেই আছে।  

সেলিম আল দীন
সবই আছে, কিন্তু আমি আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছি, ইউসুফ দেখেছে।

হাসান শাহরিয়ার
কী রকম?

সোহেল হাসান গালিব
মানে, কুদ্দস বয়াতী বা ময়মনসিংহ অঞ্চলে যে কাহিনী বর্ণনা করা হয়, সেখানে তো এই ডিএ্যাক্টারাইজেশনটা আছে। যেমন- কুদ্দস বয়াতী নিজেই ছেলে হচ্ছে, মেয়ে হচ্ছে, এবং কেবল তা-ই না কাপড়ের বিভিন্ন ব্যাবহারের মাধ্যমে ঘোড়াও হচ্ছে, পশু-পাখি হচ্ছে। তো আপনারটা কীভাবে আধুনিক বলতে চাচ্ছেন?

সেলিম আল দীন
শোন, এখন তুমি একজন পল্লীকবির সঙ্গে যদি জীবনানন্দের কবিতার তুলনা কর তাহলে কোনটা খারিজ করবে? একটাও না নিশ্চয়ই? আমরা কুদ্দস বয়াতী দ্বারা অনুপ্রাণিত কিন্তু মঞ্চে তো কুদ্দুস বয়াতী করবো না। যদি কেউ করতে যায়, সেটা তো ভুল। কুদ্দুস বয়াতীর স্কেল তো মধ্যবিত্তের স্কেল না বা আমরা যেটাকে শিল্পীত স্কেল বলি সেটা না।

হাসান শাহরিয়ার
আবার সে যে স্পেসটা ব্যবহার করছে, আমাদের শহুরে থিয়েটারের স্পেসও তো সেটা না। কুদ্দুস বয়াতীর স্পেসে সে যেভাবে তার দর্শকদের সাথে কমিউনিকেট করে, আমাদের স্পেসে আমরা কি সেভাবে কমিউনিকেট করি?

সেলিম আল দীন
নিশ্চয়ই কর। তা না হলে এতো দর্শক দেখে কেন? আর আমাদের প্রতিটি নাটকেরই নিশ্চয়ই প্রশংসা হয়, এটা তো অস্বীকার করতে পারবে না।

হাসান শাহরিয়ার
এক ধরণের ভালো লাগে হয় তো। কিন্তু আপনার টেক্সটকে পাঠক হিসেবে যেমন আমাদের আলোড়িত করে নাটক বোধহয় সেভাবে করে না।

সেলিম আল দীন
নিশ্চয়ই করে।

হাসান শাহরিয়ার
না, বাচ্চু ভাই তার সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে, আপনার নাটক আপনার দলের অনেকেই না বুঝে করে। তো যে নিজে বোঝে না, সে আমাদের সাথে কমিউনিকেট করবে, এটা কি হয়?

সেলিম আল দীন
না, বোঝে না এটা ঠিক না। আমি, নাসির উদ্দিন ইউসুফ এবং শিমূল ইউসুফ- এরা একই পাত্রের জল। আন্তঃসম্পর্কের দিক থেকে আলাদা করতে পারবে না। ওরা আমাকে প্রণোদিত করে, আমার ভাবনাগুলোকে উস্কে দিতে সাহায্য করে, আলোচনার মাধ্যমে। আর কোনো একটি লেখা বুঝতে পারা না পারার বিষয়টি আপেক্ষিক। বাংলাদেশের সমগ্র জনগোষ্ঠীর একাংশতো বাংলা বর্ণমালাই চেনে না। একজন গাঁয়ের মানুষ রক্তকরবী দেখে এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বুঝবে এমন ভাবনা কল্পনারও অতীত। তো আমার নাটক কেউ বোঝে কেউ বোঝে না, তো তাতে কী হয়েছে বা আমার কী করণীয় আছে?

হাসান শাহরিয়ার
গাঁয়ের মানুষ রক্তকরবী না-ই বুঝতে পারে, কিন্তু যে বা যারা রক্তকরবী মঞ্চে করবে, তাদের বুঝতে হবে না? আমি আপনার নাটকের অভিনেতৃদের কথা বলেছি যে, অনেকে না বুঝেই পারফরম করে, বাচ্চু ভাই-ই বলেছেন, তাহলে কমিউনিকেট করতে অসুবিধা হওয়ারই কথা।

সেলিম আল দীন
আমি, ইউসুফ আর শিমূল ...

বিপ্লব বালা
আপনাদের তিনজনের কথা হচ্ছে না। গোটা দল ইনভলব হচ্ছে কিনা সেটা বলা হচ্ছে।

সেলিম আল দীন
আমি তো প্রধান তিনজনের নাম বললাম।

বিপ্লব বালা
অত বড় দলে এখন মাত্র তিনজনকে নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছেন?

সেলিম আল দীন
শম্ভু মিত্র এবং তৃপ্তি মিত্রের নামই এখন শোনা যায়, অন্যরা কোথায়?

বিপ্লব বালা
কিন্তু আপনার দলে আপনার সাথে শেয়ার করার মতো আরো অনেকেই কিন্তু ছিল। তারা সরে গেল কীভাবে?

সেলিম আল দীন
ঠিক শেয়ারিং অর্থে বললে আসলে শিমুল, বাচ্চু, আফজাল, আফসার হোসেন, লুৎফর রহমান এঁরা আমার লেখার ভাবনাটা শেয়ার করেন। এছাড়া আমার গ্রাম থিয়েটারের কর্মীরা তো আছেই। কিত্তনখোলা, চাকা, কেরামতমঙ্গল হয়ে হাত হদাই ও বনপাংশুল পর্যন্ত আসতে যে নিরীক্ষার প্রয়োজন হয়েছিল, সেখানে মূলত নাসির উদ্দিন ইউসুফ আর শিমূল ইউসুফ ছাড়া কাউকেই আমি শিল্পসঙ্গী হিসেবে পাই নি। এতে যদি কারো কারো সাথে দূরত্ব তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে সেই দূরত্ব কমানো আমার কাজ না। বন্ধুত্ব থাকতে পারে, কিন্তু শিল্পের শেয়ারিং তো অন্য জিনিস।

হাসান শাহরিয়ার
সৈয়দ জামিল আহমেদের কথা কিন্তু বললেন না।

সেলিম আল দীন
আমি বিনীতভাবেই তার নাম উল্লেখ করতে চাই। সাক্ষাৎকার তো প্রবন্ধ রচনা না, তাই অনেকের নাম হুট করে মনে আসে না। এটাকে এতো গুরুতর প্রমাদ মনে করার কারণ নাই। আমার রচনারীতি নিয়ে যখন আমি নিয়তই নিরীক্ষা করছি, ঠিক সেই সময়কার একটা নাটক হলো চাকা। জামিল যখন চাকা-র নির্দেশনা দিল, তখন তো আমার সাহস বেড়ে গেল। আমি তো তাহলে লেখার ব্যাপারে যেকোনো নিরীক্ষাই করতে পারি এবং সেটা মঞ্চে রূপায়ণ করা সম্ভব। এই শক্তিটা কিন্তু আমাকে জামিলই দিয়েছে। তাছাড়াও আমি যে শিল্পসঙ্গীর কথা বললাম, সেখানে বাচ্চু আর শিমূলের সাথে জামিলের নামটা আসতেই পারে। জামিল ওটা ইংরেজি অনুবাদ করেছে- ন্যূয়র্কে মঞ্চস্থ হয়েছে, ঢাকা থিয়েটার করেছে- সম্প্রতি হিন্দী ভাষাতেও চাকা করেছে দিল্লীতে।

হাসান শাহরিয়ার
আমরা একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি। নিমজ্জন-এ আপনি বাংলা ভাষার প্রচলিত যতি চিহ্নের মধ্যে কেবল দাড়ি (। ), হাইফেন (-) এবং কোলন (:) ব্যবহার করেছেন। আর সব জায়গায় আপনি তারকা চিহ্ন ব্যবহার করেছেন। সেটা কেন?

সেলিম আল দীন
খুবই ভালো প্রশ্ন। আমি মনে করি বিদ্যাসাগর যে কলোনিয়াল শৃঙ্খলগুলো বাংলা গদ্যে করে গেছেন, সেগুলো বাঙালিমাত্রই উচিত এই মুহূর্তে বর্জন করা। উচিত এই জন্য যে- বাংলা ভাষার যে রীতি এবং প্রকৃতি তাতে যতি, অর্ধযতি, পূর্ণযতিই যথেষ্ট। পৃথিবীর কোনো দেশেই এরকম লঙ্কাকান্ড ঘটে নি- দাড়ি, কমা, সেমিকোলন, হাইফেন, ড্যাস, প্রশ্নবোধক এসব দিয়ে ভরা। আমি পড়তে গেলেই তো বুঝবো এখানে কী বলা হয়েছে, এতো চিহ্নের প্রয়োজন কী? তুমি দেখ একসময় চন্ডীমঙ্গলের পুঁথি আর কবিরাজী শাস্ত্রের আকৃতি কিন্তু একই রকম ছিল। কিন্তু মুদ্রণযন্ত্রের আগমনের ফলে এখন কবিতা হয়ে গেছে লম্বাটে। এখন লম্বা কিছু দেখলেই বুঝি এটা কবিতা। আগে পড়ে বুঝতে হতো এটা কবিতা না কবিরারাজী শাস্ত্র। মানে, দেখ, যান্ত্রিকতা কীভাবে কবিতাকে ধ্বংস করেছে, কবিতার অবয়বকে ধ্বংস করেছে। বাংলা ভাষায় সেমিকোলনের ব্যবহার কেন হয়, আমি বহুবার চেষ্টা করেছি সেটা উদ্ধার করার জন্য। পারি নি। রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকেও বুঝতে চেষ্টা করেছি, পারি নি। কমা (,) কেন ব্যবহার করে?

বিপ্লব বালা
কথা বলার সময়ও তো আমরা নানা ধরনের পজ দিয়ে থাকি। এগুলোতো তাই, তাই না?

সোহেল হাসান গালিব
আপনি তো প্রশ্নবোধক চিহ্নও ব্যবহার করেন নি। কিন্তু এটার তো প্রয়োজন আছে।

সেলিম আল দীন
না, নাই। লেখাটা পড়লেই তো বোঝা যাবে এখানে প্রশ্ন করা হয়েছে কী হয় নি। সব বোধ তো আমি চিহ্ন দিয়ে সারবো না। পাঠের মাধ্যমে সারতে হবে। এখন যদি লিখি- ‘সে শান্ত হয়ে বসে রইলো’- তারপর শান্ত হওয়ার চিহ্ন কী দেব? বা ‘সে রেগে গেল’- এই রেগে যাওয়ার চিহ্ন কী দেব? ‘সে অট্টহাস্য করিল’- এই অট্টহাস্যের চিহ্ন কী দেব?

হাসান শাহরিয়ার
কিন্তু আপনি যা ব্যবহার করেছেন, সেগুলো কেন করেছেন?

সেলিম আল দীন
আমি কেবল দাড়ি, হাইফেন আর কোলন ব্যবহার করেছি। পূর্ণযতি হলো হাইফেন, অর্ধযতি হলো দাড়ি আর সংলাপ বোঝাবার জন্য দিয়েছি কোলন- ব্যস। আমার ওতেই হয়ে গেল।

হাসান শাহরিয়ার
কিন্তু এই নিরীক্ষা আপনি আপনার সব কাজে করেন নি। আমার কাছে মনে হয়েছে একটা বিশেষ সাহিত্য পড়বার জন্য পাঠককে আপনি আগে থেকেই একটু প্রস্তুত করে নিয়েছেন, যেন পড়তে গিয়ে সাধারণ বাস্তবতা বা গতানুগতিক ধারা খুঁজতে না যায়।

সেলিম আল দীন
সেটা তো অবশ্যই। আমি নিমজ্জন-কে বলছি- ‘বিশ্ব শিল্পধারায় ফোররিয়ালিজমের প্রথম উদ্ভাবন’- তো সেটা পড়বার আগে পাঠককে তো তৈরি হতেই হবে।

হাসান শাহরিয়ার
তারকা চিহ্ন কেন ব্যবহার করেছেন?

সেলিম আল দীন
আমি আমার ঐতিহ্য থেকে নিয়েছি। বাঙলার মুসলমানরা তাঁদের কাব্যে, বিশেষ করে উনিশ শতকের পুঁথি সাহিত্যে সব সময় তারকা চিহ্ন ব্যবহার করতো অর্ধযতি দেবার জন্য। এটা আমার পূর্ব পুরুষরা ব্যবহার করেছেন। মহররমের পুঁথি থেকে এটা নিয়েছি- কেন নেব না?

হাসান শাহরিয়ার
আমার যদ্দুর মনে পড়ে চাকা-তেও স্টার চিহ্ন ব্যবহার করেছেন, যদিও খুব কম।

সেলিম আল দীন
হ্যাঁ, প্রথম ব্যবহার করি চাকা-তে। আমি মৃত্যুটাকে একটা মহাজাগতিক জায়গায় নিতে চেয়েছিলাম। মানে বিশাল এক প্রান্তরের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে লোকটির শব- মনে হচ্ছে একটা চিত্রকলা যাচ্ছে। আর অন্য কোথাও যে ব্যবহার করি নি, সেটা হলো, আমি বলছি না যে, স্টার চিহ্ন ব্যবহার করতেই হবে। আমি বিশেষ সময়ে বাঙালিদের দ্বারাই উদ্ভাবিত একটি চিহ্ন ব্যবহার করে তাদেরকে সম্মান জানালাম এবং ঔপনিবেশিক বল্গা বাঁধন থেকে মুক্ত হলাম।

বিপ্লব বালা
আমি শুরুর দিকের একটা প্রসঙ্গ আবার তুলতে চাই। আপনার লেখার যে বাঁক একটা সময় আপনি পেলেন, এবং আপনি বলছেন আপনি বাঙলা নাটককে মুক্তি দিতে চেয়েছেন, সেটা আমার ধারণা কেবল বই পড়ে পড়ে হয় নি। আপনার নিজস্ব নাট্য-আঙ্গিকের ধারণা বা এর প্রয়োগ, ইত্যাদি ব্যাপারে কোনো জনপদের কোনো কিছু দেখে গ্রহণ করেন নি বলতে চাচ্ছেন?

সেলিম আল দীন
না, এমনটা বলে থাকলে আমি ভুল বলেছি। মানে আমি একেবারে শৈশবের অভিজ্ঞতা থেকে তেমনভাবে সরাসরি কিছু পাই নি বলেছি। কিন্তু আমি যখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে ঢুকলাম, এবং তখনই আমি বিয়েও করলাম, এই বিয়ের সুবাদে আমার মানিকগঞ্জ এলাকার সাথে পরিচয় হলো। এই অঞ্চলে বিচরণের ফলে আমার শিল্পভূমির এক নতুন সন্ধান যেন আমি পেলাম।

বিপ্লব বালা
এর আগে আপনি এই এলাকায় আসেন নি?

সেলিম আল দীন
না। আমি এখানে প্রাকৃতিক কিছু সৌন্দর্য আবিষ্কার করলাম। ধরো, আমি যখন ঘিওর পেরোলাম, প্রায় ৫-৬ কিলোমিটার দিগন্ত জোড়া কেবল সর্ষেফুলের ক্ষেত দেখলাম। মনে হলোরঙের ঘোড়া দৌড়াচ্ছে। শীতকাল, কিছু কিছু মৌমাছি উড়ছে শর্ষে ফুলে ফুলে এবং মটর লতায়, দুপুরের আগে আগে, আমি হেঁটে চলেছি তো চলেছিই। একটা জামগাছ ছিল তার নিচে বসে বিশ্রাম নিতে গিয়ে যখন চারিদিকে তাকাতাম, দেখতাম, প্রায় ৩-৪ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো বসতবাড়ি নাই, কেবল রঙ আর রঙ। আমি কোনো একদিনের ঘটনা বলছি না। সেই দিনগুলোর কথা বলছি। ... কোনোদিন হয়তো বিস্তীর্ণ আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি, হঠাৎ একঝাঁক শীতচর পাখি উড়ে গেল- আর ওড়ার দিকে তাকিয়ে থাকলে মনে হয় কাঁচের ভেতর রশ্মি যেমন ঢেউ খেলে যায়, তাদের উপর রৌদ্র পড়েও তেমনি ঢেউ খেলে যাচ্ছে। আমি ওই অঞ্চলের যে বাড়িতেই যাচ্ছি, সেই বাড়িতেই হয় একটা ঢোল পাচ্ছি, না হয় বাঁশি পাচ্ছি, না হয় খোল পাচ্ছি। কেউ না কেউ গান বা শাস্ত্র পাঠ করছে। লোকায়ত যে ব্যাপারটা তার সন্ধান আমি এই প্রথম পাওয়া শুরু করলাম।

বিপ্লব বালা
আপনার নিজের বাড়িতে এগুলো কখনো পান নি?

সেলিম আল দীন
না, নোয়াখালিতে আমি কেবল গাজীর গান শুনেছি। আমি যখন দূর্গা পুজায় শশুর বাড়ি যেতাম, যে ক’টা দিন থাকতাম মনে হতো এক অপার শিল্পভুবনে দিন কাটাচ্ছি। সে গাঁয়ে কেবল গান বাজনাই না, শাশুড়ির হাতের নানা রকম পিঠা খাওয়া, নানা চালের গন্ধ পাওয়া, মাইলের পর মাইল হাঁটা, নানা রকম মানুষের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগটা এলো। নায়েব আলী বয়াতীর সাথে পরিচিত হওয়া, তারপর জামসা অঞ্চলে হাকিম আলী গায়েনের মতো মানুষের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ ঘটে এই ভ্রমণের কারণে। কালীগঙ্গায় জামসা যাওয়ার আগে, মানে আফসারদের (প্রফেসর আফসার আহমেদ, নাট্যকার, নাট্য-শিক্ষক ও গবেষক) বাড়িতে যাবার কারণেই হাকিম আলী গায়েনের সাথে পরিচয় ঘটে। তাঁর কাজ দেখে আমার মনে হলো আমরা যাকে থিয়েটার বলি, সে ক্ষেত্রে এটা কেন থিয়েটার নয়? এখানে কথকতা আছে-অভিনয় আছে-নৃত্য আছে- দোহার এবং গান আছে, তারপরও এটাকে রিচ্যুয়ালের কথা বলে, আমরা এটাকে নাটক না বলে অন্য কিছু বলছি। তখন আমি এক অফুরন্ত ধারণার সন্ধান পেলাম যে, না, এটাই আমাদের থিয়েটার। আমি কেরামত মঙ্গল লেখার সময়, আমার স্পষ্ট মনে আছে, আমাদের গ্রাম থিয়েটারের এক কর্মী, আর্মিতে চাকরি করতো- আর্টিলারীতে, তার নাম আমিনু রহমান মানিক। তো আর্টিলারীতে যারা কাজ করে তাদের আবার আকাশের তারার হিসাব রাখতে হয়, তো কেরামত মঙ্গল-এ আমি প্রথম থেকেই চেয়েছিলাম যে, চন্ডীমঙ্গলে যেমন সর্গ এবং মর্তের বিভাজন থাকে, আমার নাটকেও থাকবে। যেকোনো মঙ্গল কাব্যেরই একটা পার্ট থাকে সর্গের, একটা পার্ট থাকে মর্ত্যরে। তো আমি ভাবলাম এখানে তো দেব-দেবী নাই, কিন্তু সেই ফর্মটাতো আসতে পারে। সেজন্যই আমি কেরামতের সঙ্গী হিসেবে এনেছি কালপুরুষকে। সে তার সব অভাব, অভিযোগ, অনুযোগ কালপুরুষকে জানায়। এই তারাগুলোকে চিহ্নিত করার ব্যাপারে আমি, ঐ কর্মী, আমরা সবাই রাত ২-৩ টা পর্যন্ত জেগে জেগে তারার সন্ধান করেছি।   

বিপ্লব বালা
তাহলে এই সর্গ-মর্ত্যরে বিভাজনটা চন্ডী মঙ্গল থেকে পেয়েছেন?

সেলিম আল দীন
হ্যাঁ, ‘মঙ্গল’ নামটাই তো এই জন্য দিলাম। আর যেকোনো ‘মঙ্গল’ মানেই কিন্তু পাঁচালী। মানে কোনো কিছুর সাথে যদি ‘মঙ্গল’ যুক্ত হয়, তাহলে বুঝতে হবে এটা পাঁচালী রীতির। অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে নাটক লেখার শুরুটাই আমি বলবো, এই মানিকগঞ্জের সাথে পরিচিত হওয়ার পর বিস্তৃত আকারে তৈরি হয়েছে।

হাসান শাহরিয়ার
চাকা নাটকটিকে নাম দিয়েছেন, ‘কথানাট্য’। এধরনের রচনা মঞ্চে উপস্থাপিত হতে পারে, এমনটা ভাবনাটা আসলো কীভাবে?

সেলিম আল দীন
চাকা-র ভাবনা আর এটার রচনাকালের মধ্যে ব্যবধান কিন্তু প্রায় ৭-৮ বছর। ’৮০-’৮১ সালে গ্রাম থিয়েটারের কাজে যাচ্ছিলাম বগুড়া থেকে পাবনা- সাথে ছিল পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়। নাটোরের কাছাকাছি এসে হঠাৎ লক্ষ্য করলাম, দূরে বহুদূরে একটা অর্ধবৃত্তাকার রাস্তা- সেখানে অনেকগুলো গরুগাড়ি সার বেঁধে চলছে। দূর থেকে দেখে ভাবলাম এমন একটা চিত্র আমার মঞ্চে কেন আনা সম্ভব হবে না? পরে আর এটা নিয়ে ভাবি নি- কিন্তু ৭-৮ বছর পর, যখন নাটক লেখায় নিয়তই পরিবর্তন করছি ভাষা-আঙ্গিক- তখন লিখতে গিয়ে মনে হলো আমি আমার মতো করে লিখবো। যে যে চিত্র আমার মনে ভাসে- সেই চিত্র নিয়েই লিখবো। পরে এটা মঞ্চে আসবে কী আসবে না দেখা যাবে। এটা না হলে আমি আরো পরে যে লিখলাম হরগজ, সেটা কী? মানিকগঞ্জে যে টর্ণেডোটা হয়েছিল, সেখানে যখন আমি গেলাম, আমি যে ভয়াবহ চিত্র দেখেছি, সেগুলো মনে হয়েছে আমাদের মঞ্চে আনা যায়। আমি লিখলাম হরগজ। আমার কাছে সব সময় মনে হয়েছে বাংলা কবিতার চেয়ে নাটকের যে দীনতা, উপন্যাসের চেয়ে নাটকের যে সীমাবদ্ধতা সেটাকে ঘোচাতে হবে। সেটা ঘোচাতে যদি যাই তাহলে আমাকে নতুন ভূমি, নতুন মানুষ, নতুন শিল্প দর্শন আবিষ্কার করতে হবে। এই ভূমি আবিষ্কার করতে গিয়ে আমার কাছে প্রচলিত কাঠামোগুলোকে কঠোরভাবে বর্জন করতে হয়েছে। ফলে আমার লেখা পড়ে হুট করে নাটক মনে হয় না। কিন্তু এটাও তো সত্য যে, মূলত আমি নাটকই লিখতে চেয়েছি। আমার ভাষা নিয়ে কষ্ট করতে হয়েছে। আমি কিছুকেই কিন্তু অস্বীকার করি নি। আগে গ্রহণ করেছি, তারপর বর্জন করেছি, করে নিজের মতো করে ফর্ম বানিয়েছি। যে রূপে আমি পেয়েছি, সেই রূপে আমি রাখি নি। রূপ থেকে অরূপে যাওয়াটা কিন্তু প্রাচ্যেরই দর্শন। সব শিল্পীই সীমাবদ্ধতাকে ভেঙে অন্য রূপ প্রদান করতে চায়। চেখভের অনেক ছোটগল্প আছে যেগুলো পড়ে আমার কাছে মহাকাব্যের স্বাদ পেয়েছি, তো তখন সেটা ছোটগল্প নাকি মহাকাব্য নাকি নাটক সেটা ভাবার সুযোগ কোথায়? এটা আমার ভেতরে যে ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করেছে, বোধের জন্য সেটাই তো জরুরি তাই না?

হাসান শাহরিয়ার
আপনি নাটককে চেয়েছিলেন একটা উন্নত স্তরে নিয়ে যেতে, এবং নিতে গিয়ে, লিখতে গিয়ে যেখানে এসে পৌঁছলেন, সেটা আপাত দৃষ্টিতে একটা ফর্মলেস জায়গায় দাঁড়ালো। মানে আপনার কোনো নিয়ন্ত্রণ রইলো না ...

সেলিম আল দীন
এভাবে হুট করে আমার শিল্পরীতি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত টানা ঠিক হলো কি? প্রশ্ন না করে তুমি বোধহয় আক্রমণ করছো।

হাসান শাহরিয়ার
আপনি যেটাকে আক্রমণ বলছেন, সেটা আসলে আমার প্রশ্ন হাঃ হাঃ ... মানে আমি বলতে চাচ্ছি, এভাবে ছাড়া আপনি আপনাকে, আপনার শিল্প দর্শনকে ব্যক্ত করতে পারছিলেন না, ফলে ফর্মের চেয়ে জরুরি ছিল শিল্প দর্শনকে ব্যক্ত করার তাগিদ ...

সেলিম আল দীন
একেবারে সঠিক জায়গায় হাত দিয়েছ তুমি। প্রত্যেকেরই উচিত লেখার শুরুত ভুলে যাওয়া যে সে গান লিখছে, নাকি কবিতা লিখছে, নাকি গল্প লিখছে এবং বিশেষ ফর্মের চূড়ান্তে ঐ ফর্মটা আর অটল থাকে না।

বিপ্লব বালা
সৃষ্টির একটা নিয়মই হচ্ছে শূন্য থেকে শুরু করা ...

সেলিম আল দীন
হ্যাঁ, তারপরও আমি বলতে চাচ্ছি, যিনি ভালো কিছু লিখতে চান, তার উচিত, তিনি কী লিখছেন, সেটা শুরুতে নির্ধারণ না করা। মানে তিনি কবিতা লিখছেন, নাকি গান লিখছেন, নাকি গল্প লিখছেন, তার চেয়ে বড় কথা হলো, শাহরিয়ার যেটা বলেছিল যে- কী হয়ে উঠলো, সেটাই বড় কথা। কবিতা যদি কবিতার সীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকে তাহলে তো হবে না। গ্রামার থাকলেই তো শিল্প হয় না। বরং আমি মনে করি সব সময় গ্রামার মেনে চললে দ্বিতীয় শ্রেণীর শিল্পকর্ম হয়, সেগুলো পাঠককে টানে না। লংগিনুস শিল্পের একটা চূড়ান্ত জায়গা খুঁজেছেন। কোন জায়গা? সেটা দেখাতে গিয়ে উনি কখনো ইস্কাইলাসের নাটকে যাচ্ছেন, গিয়ে দেখাচ্ছেন শিল্পের উৎকর্ষ, আবার একই গুণে গুণান্বিত শিল্প দেখতে গিয়ে তিনি স্যাপো বলে এক কবি ছিলেন, প্রাচীন গ্রীসে, তাঁর কবিতাতে যাচ্ছেন, আবার তিনি ডেমোস্থিনিসের বক্তৃতার অংশ নিয়ে দেখাচ্ছেন যে- এই জায়গাগুলো সাবলাইম। তো টার্ম কিন্তু একটাই সাবলাইম, যেটাকে বলে পেরি হাইপসু, পেরি হাইপসু মানে একেবারে চূড়ান্ত শিল্পকর্ম। তো দেখ সাবলাইমের ৫/৭টা কোয়ালিটি, যেটা নাটকে পাওয়া যাচ্ছে, সেটা কবিতাতেও পাওয়া যাচ্ছে, আবার গল্পেও পাওয়া যাচ্ছে, ঠিক তেমনি বক্তৃতাতেও পাওয়া যাচ্ছে। তো তুমি যত নিজেকে পরিশীলিত করবে, বর্ণ বিভাজন তত কমে যাবে।

বিপ্লব বালা
অন্য একটা প্রসঙ্গে আসি। গ্রাম থিয়েটারের মাধ্যমে আপনারা কী চেয়েছিলেন?

সেলিম আল দীন
গ্রাম থিয়েটারটা আমরা শুরু করেছিলাম মূলত আমাদের নিজস্ব ডেভেলপমেন্টের জন্য। অর্থাৎ আমাদের শিল্পকর্মের মধ্যে যে জড়তা, যে ঔপনিবেশিক ছায়া সেগুলো থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য। আমরা তাদের কাছ থেকে তাদের থিয়েটার শিখতে গেছি এবং সেখানে বলেছি যে, তোমাদের নাচ কেমন, গান কেমন ... তোমরা নিজস্ব দল গড়ে তোলো এবং তোমাদের পারফরমেন্সগুলো কর। এবং সেই ফর্মগুলোর সাথে আধুনিক থিয়েটারের যোগসূত্রের চেষ্টা করেছি এবং সে প্রক্রিয়া এখনো চলছে।

বিপ্লব বালা
সেগুলো কতটুকু সফল হয়েছে।

সেলিম আল দীন
অনেকটাই হয়েছে। আমাদের প্রায় দুই শতাধিক গ্রাম থিয়েটার দল এখনো কাজ করছে। তবে, সমস্যা হয়েছে যখন এন.জি.ও-র খপ্পরে পড়লো পুরো দেশ। এন.জি.ও যখন চালু হলো তখন আমাদের অনেক মেধাবী কর্মীদের ওরা কিনে নিল। মনে রাখতে হবে আমাদের গ্রাম থিয়েটার এবং গ্রামীণ ব্যাংকের জন্মকাল কিন্তু প্রায় একই সময়ে। তখন অনেক আমাদেরকে টাকা দিতে চেয়েছে যে- গ্রাম থিয়েটারটাকে এন.জি.ও মডেলের মধ্যে নিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু আমরা তা করি নি।

বিপ্লব বালা
কিন্তু ফান্ড তো আপনারা নিয়েছিলেন, বিদেশি ফান্ড।

সেলিম আল দীন
নিয়েছি কেবল ইউনেস্কোর ফান্ড। এবং এটা তুমি ভালো করেই জান যে, ইউনেস্কোর ফান্ডে পৃথিবীর প্রত্যেকটা জনগণের অধিকার আছে।

বিপ্লব বালা
না, কিন্তু ওরা যে গ্রাম থিয়েটার করবে, সেখানে ওদের অর্থনৈতিক ভাবনাটা কী ছিল? মানে ওরা নিজেদের জীবনের আর্থিক দিকটা কীভাবে মেটাবে?

সেলিম আল দীন
আমার তো স্বপ্ন ছিল যে, সাংস্কৃতিক মুক্তি মানেই অর্থনৈতিক মুক্তি।

বিপ্লব বালা
সেটা তো কথার কথা। আপনারা যারা ঢাকা থেকে গেছেন, তারা কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা কেউ ব্যবসায়ী, কিন্তু ওরা চলবে কী করে?

সেলিম আল দীন
আমরা ওদেরকে নানা ধরনের ব্যবসা করতে বলেছিলাম। সমবায় গড়ে তুলতে বলেছিলাম।

হাসান শাহরিয়ার
সেটার কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছিল?

সেলিম আল দীন
প্রায় অনেকেই তখন সচ্ছ্বল হয়ে ওঠেছিল।

বিপ্লব বালা
কারণটা কী?

সেলিম আল দীন
সে এক চমৎকার ব্যাপার। দেখা গেল, থিয়েটার করতে গিয়ে সে যখন মানুষের সাথে, দর্শকের সাথে, শত শত দর্শকের সাথে কমিউনিকেট করতে শুরু করলো এবং সফল হতে শুরু করলো, তখন তার ভেতরে একধরনের আত্মবিশ্বাসের জন্ম নিল। এবং, ফলে, সে তারপর কৃষিকাজ করুক বা পুকুরে মাছ চাষ করুক, যা-ই করুক না কেন একধরনের সফলতা তার ভেতরে চলে এসেছে।

হাসান শাহরিয়ার
না, এটা খুব একটা যুক্তিযুক্ত বা নির্ভর করার মতো পদ্ধতি না। আমি এভাবে বলি, যে গ্রামে আপনি গেলেন, সেখানে আগে যাত্রা ছিল বা অন্যান্য ফর্মের থিয়েটার ছিল, যেগুলো আগে থেকেই প্রফেশনাল। কিন্তু আপনারা যখন সেখানে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মতো একটা কিছু করতে গেলেন, তখন থিয়েটারটাকে প্রফেশনালী নেয়া যায় কিনা সেটা ভাবেন নি, তাই তো?

সেলিম আল দীন
হ্যাঁ, সেটা ওভাবে ভাবা সম্ভবও না। উচিতও না। ধানের পাশে গান থাকবে, এতো চিরকালের বাঙালির মনের কথা। তাকে পাল্টাবো কেন? বরং ধ্বংসের হাত থেকে তাকে রক্ষা করাটাই আমাদের কাজ।

বিপ্লব বালা
সাংস্কৃতিক দিক থেকে আপনাদের এই চর্চা কতটুকু সফল হয়েছে? ধরুন বাসন নাটক করা মানেই তো বিরাট একটা কিছু করে ফেলা না?

সেলিম আল দীন
এটাকে কোথাও কি আমি বিরাট কিছু বলেছি নাকি? এটা প্রশ্নকর্তা হিসেবে তোমার তৈরি। তাছাড়া বাসন নাটকটাকে তুমি যেভাবে বলছো, সবাই ঠিক সেভাবে বলছে না। অনেকেই এটাকে একটা পজেটিভ নাটক হিসেবেই দেখেছে। এ পর্যন্ত প্রায় দুই আড়াই হাজার শো হয়েছে। এমন কি, ভাস্কর রাশা আমাকে একবার বলেছিল, আপনার অনেক নাটক আমি বুঝি না, কিন্তু বাসন নাটকটি ভালো লেগেছে, মনে হয়েছে এটা প্রকৃত অর্থেই গণমুখী নাটক। আমার মনে হয় এটা আপনার শ্রেষ্ঠ নাটক- এটা বাস্কর রাশার কথা।

বিপ্লব বালা
বাসন-কে শ্রেষ্ঠ নাটক বললে আপনি কনভিন্সড?

সেলিম আল দীন
আমাকে এভাবে হার্ডটকের ধাঁচে প্রশ্ন না করাই ভালো। আমি একজন শিল্পীর ভালোবাসার কথা বলেছি। ওর ভালো লেগেছে।

বিপ্লব বালা
আপনি আমার প্রশ্ন করা নিয়ে ভুল বুঝছেন। ঠিক আছে আমি অন্য প্রসঙ্গে বলি, গ্রাম থিয়েটার চর্চার মাধ্যমে আপনরা কি কোনো সামাজিক শক্তি হয়ে উঠেছেন, গ্রামে? আপনাদের এতো কর্মী আছে, তারা কি স্বাধীনতা বিরোধী চক্র বা মৌলবাদী চক্র, এগুলোর বিপরীতে কোনো শক্তি হিসেবে দাঁড়িয়েছে?

সেলিম আল দীন
অবশ্যই দাঁড়িয়েছে। আর মৌলবাদ তো আমরা সৃষ্টি করি নি। সেটাতো আমেরিকার সৃষ্টি।

বিপ্লব বালা
যে-ই সৃষ্টি করুক, সেটা আমাদের প্রগতির জন্য তো বাধা হয়ে আছে, তাই না? আমি জানতে চাচ্ছি যে- সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ শুরু হয়েছে কিনা? মানে তাদের যেমন ভাষা আছে, মানুষকে কনভিন্স করার ভাষা আছে, তার বিপরীতে আমাদের গ্রামের লোকদের সংস্কৃতি শিক্ষা-দীক্ষা যে স্তরে আছে, সেখানে থিয়েটারের মাধ্যমে তার কোনো উত্তরণ ঘটেছে কিনা?

সেলিম আল দীন
সেই বাধা উত্তরণের পথও আবি®কৃত হচ্ছে। আমার ধারণা, এক ধরনের প্রতিরোধ শুরু হয়ে গেছে। বহু জায়গায় গ্রাম থিয়েটার কর্মীদের ঘরবাড়ি যেমন পুড়িয়েছে- আবার বহু জায়গায় মেয়ে মানুষরা পর্যন্ত রাতেও মেলায় থাকে। এই সেদিনও আমি ঘাটাইল গেলাম, সেখানে সকাল ৭টা থেকে রাত ১২/১ টা পর্যন্ত শত শত নারী মেলায় ঘুরেছে, আনন্দ করেছে, একটা পুলিশও লাগে নি। সেটা কি এমনি এমনি হয়েছে? সাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশ বলবে না, এটাকে? ৫জন মুক্তিযোদ্ধার নামে একটা মঞ্চ করে এলাম, গ্রাম থিয়েটারের মেলায়, কই, একজন পুলিশও তো লাগে নি। কীভাবে হলো এসব?

হাসান শাহরিয়ার
যেকোনো সাংস্কৃতিক বিকাশ, রাষ্ট্রীয় কিছু অসহযোগিতার ফলে বাধাগ্রস্থ হতে পারে, গ্রাম থিয়েটারের ব্যাপারে এটা কতটা সত্য?

সেলিম আল দীন
আসলে রাষ্ট্রীয়ভাবে যদি তুমি সন্ত্রাসকে লালন কর, পোষণ কর, তাহলে তার বিপরীতে গিয়ে কাজ করাটা কঠিনই হয়ে যায়। তারপরও ধরো গ্রামের যে লাঠি খেলা ছিল, তলোয়ার খেলা ছিল, সেগুলোও গ্রাম থিয়েটার মেলার মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত করেছি। কাজ হয় নি সেটা বলতে পারবে না। আমাদের ফেইল্যুর কোথায়? সেটা হলো জীবন এবং জীবিকার তাগিদে অনেকে এন.জি.ও-তে চলে গেছে। এন.জি.ও-ই আমাদের সর্বনাশটা করেছে।

হাসান শাহরিয়ার
আমরা মুক্ত নাটকের বেলাতেও শুনেছি যে এন.জি.ও মেধাবী কর্মীদের কিনে নিয়েছে, এখন আপনিও বলছেন এন.জি.ও-ই দায়ী, তো একজন সচেতন শিল্পী হিসেবে আপনার কাছে আমার জিজ্ঞাসা যে, এমন বড় ধরনের ক্ষতি করার পরও আপনাদেরকে কখনোই এন.জি.ও বিরোধী কোনো বক্তব্য দিতে দেখি নি। সেটা কেন?

সেলিম আল দীন
করেছি, আমাদের গ্রাম থিয়েটার সম্মেলনে এসব কথা সব সময়েই হয়। কিন্তু আমরা হয়তো পত্রিকায় এটা প্রচার করি না।

হাসান শাহরিয়ার
আমি উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি, অনেক অর্থনীতিবিদ বা বিবেকবান মানুষ আছেন যারা মনে করেন যে, জনগণকে বোঝতে হবে এন.জি.ও-র আসল রূপটা কী। তারা কিন্তু প্রথম থেকেই লিখেছেন, বিভিন্ন ফোরামে বলেছেন, এখনও বলছেন। এদের মধ্যে আনু মুহাম্মদ স্যার আছেন বা বদরুদ্দীন উমর স্যার আছেন। এধরনের কোনো প্রকাশ্য বিরোধীতা আপনাদের কাছ থেকে তো পাই নি।

সেলিম আল দীন
আমাদের প্রকাশভঙ্গি একরকম, তাদের প্রকাশভঙ্গি আরেক রকম। শিল্পের মৌলিক কাজ সচেতন করা- ঘাড়ে ধাক্কা দিয়ে প্রতিবাদ মিছিলে প্রেরণ করা নয়- প্রোপাগাণ্ডা করে, শিল্প পথ পরিহার করে, শিল্পস্পর্শহীন তৃতীয় পন্থা রাজনীতির খোলাপথে শ্লোগান তোলা নয়। শিল্পীদের কাজের সাথে রাজনৈতিককর্মীর কাজকে এক করে ফেললে তো হবে না। তুমি বলো কোন সফলতার পর সংস্কৃতিকর্মীদের ব্যর্থতার জন্য আবার আমরা পিছিয়ে গেছি। একটাও দৃষ্টান্ত নাই। এখন তোমার সমমনা রাজনৈতিক দল যদি ব্যর্থ হয়, সেটার দায় তুমি, আমি, আমরা কেউ নিতে পারবো না। কিন্তু তাই বলে আমি নিজেকে পরাজিত ভাবতে পারবো না। কারণ, পরাজিত হলে আমি নিশ্চয়ই কোনো কাজ করতাম না। আমি প্রতিনিয়তই আমার কাজ বাড়িয়ে দিচ্ছি, অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথা তুলে ধরছি লেখার মাধ্যমে। বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে, গণহত্যার প্রেক্ষাপটে নিমজ্জন লিখছি- এসব কি নিজেকে পরাজিত ভেবে লিখছি? কী বলো!

হাসান শাহরিয়ার
আমরা এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে কথা বলতে পারি কিনা, মানে আপনার লেখার ভাষার ব্যাপারে বিপ্লব দা’র সাথে আলাপ হচ্ছিল যে, আপনার ব্যবহৃত ভাষাটা যখন পড়ি, তখন বেশ কষ্ট লাগে। তবুও পড়ার সময় যেখানে বোঝা যায় না, সেখানে আমি বা আমরা আবার পাতা উল্টিয়ে চলে আসতে পারি। কিন্তু এই ভাষাটা যখন সংলাপাকারে মঞ্চে শুনছি, তখন আরো দুর্বোধ্য হয়ে উঠছে। কারণটা হলো তখন তো আর আমার সুযোগ নাই যে সংলাপটা আবার একটু শুনি, দ্বিতীয়ত হলো যারা এই সংলাপ প্রক্ষেপণ করছে, তাদের মধ্যে হয়তোবা কমজনই আছেন, যারা আপনার এই নতুন ভাষা রপ্ত করতে পারঙ্গম। এখন কথা হচ্ছে, আমাদেরকে ঐতিহ্যের দিকে নিতে গিয়ে ভাষাটাকে এতো জটিল করার অর্থ কী?

বিপ্লব বালা
হ্যাঁ, এ-প্রসঙ্গে আমার কথাটাও বলে নিতে চাই, সেটা হলো, মঙ্গলকাব্য বা গীতিকা, তার যে ভাষা, শব্দ, বর্ণনা তার থেকে আপনার ভাষা আধুনিক হওয়ার ফলেই কিনা বেশ দূরের ভাষা হিসেবে ঠেকে, মানে আমাদের সংযোগ স্থাপনে বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।

সেলিম আল দীন
এটাও উপনিবেশের সৃষ্টি। ইংরেজি ভালো বুঝি- বাংলাটা কম। এই তো। প্রথমত তুমি দেখ, আঞ্চলিক ভাষাকে যখন লালনের ভাষার সুক্ষতায় নিয়ে যাচ্ছে, তখন তোমার মন, কান সব কিছুই প্রাত্যহিকতার ঊর্ধে উঠে যেতে হবে। এটা মনে রাখবে বাংলার আঞ্চলিক ভাষার ভেতরে যে গীতল ব্যাপারটা আছে সেটার সাথেও তোমার একাত্মতা না ঘটতে পারে, যদি তুমি সেই ভাষাটা না জান। আমি আধুনিক লেখক হিসেবে, লক্ষ্য করলে দেখবে যে, আমার প্রবন্ধ বলো, নাটক বলো, বা কবিতা বলো যেকোনো লেখাতেই, লিখতে লিখতে হয়তো চর্যাপদ থেকে, আলাওল থেকে, মুকুন্দরাম থেকে বা ভারতচন্দ্র থেকে ভাষা শব্দ আহরণ করি, মানে আমি সমগ্র ঐতিহ্যের কাছ থেকে নিয়ে যে ভাষাটা তৈরি করতে চাচ্ছি, তাতো কখনোই দৈনন্দিন ভাষা হবে না। আমি বাস্তবতাকে যেভাবে উপস্থাপন করছি, সেটা মোটেই শাদা চোখে দেখা আমাদের দৈনন্দিন বাস্তবতা না। তো আমার কন্টেন্টের দিক থেকে বিবেচনা করে আমি এমন একটা ভাষা তৈরি করছি, যেখানে কোনো দৈনন্দিনের ব্যবহৃত ভাষা থাকবে না। কবিতায় যেদিন থেকে দৈনন্দিন ভাষার ব্যবহার শুরু হয়েছে, সেদিন থেকেই কবিতার মৃত্যু হয়েছে। আমার এই ধারণা তোমাদের কাছে ভুল মনে হতে পারে কিন্তু আমি সত্য বলে মানি। আমার লেখা হবে লালনের স্তরের, রবীন্দ্রনাথের কবিতার স্তরের, সেখানে আমি ...

বিপ্লব বালা
কিন্তু লালন, রবীন্দ্রনাথ তো দৈনন্দিন ভাষায় লিখেছে এমন বলবেন না?

সেলিম আল দীন
না।

বিপ্লব বালা
তো তাঁদের ভাষা তো ভীষণ চেনা ভাষা, ভীষণ ইন্টিমেট। কিন্তু আপনার ভাষা বেশ দূরের ভাষা, অচেনা ভাষা, অপরিচিত ভাষা মনে হয়। দুর্বোধ্য মনে হয়। আর সেটা পাঠে না হয় তবুও চলে, কিন্তু যখন শোনা হয় তখন তো একেবারে বিচ্ছিন্ন ঠেকে।

সেলিম আল দীন
দেখ, রবীন্দ্রনাথের রাজা যখন লেখা হলো, ইংল্যান্ডের পত্র-পত্রিকায় এটাকে অবসকিউর বলা হলো। কিন্তু আসলেই কি সেটা দুর্বোধ্য? রাজা দুর্বোধ্য, কিন্তু আসলেই কি দুর্বোধ্য? তখন তুমি কী বলবে? রবীন্দ্রনাথ তো তারপর চিঠি দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন যে রাজা দুর্বোধ্য না। তো তোমাদের মন হচ্ছে ঔপনিবেশিক ভূত-প্রেত আচ্ছন্ন, তাই যখন আমি আমার হাজার বছরের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় বাংলা ভাষা ব্যবহার করি, তোমাদের কাছে সেটা দুর্বোধ্য মনে হয়।

বিপ্লব বালা
হ্যাঁ, অবশ্যই, কিন্তু আপনি আমাকে হাজার বছরের বাংলা ভাষাকে চেনাতে গিয়ে তো আরো দূরে ঠেলে দিচ্ছেন। আপনি আসলে আধুনিকতার যে খারাপ দিক- বিচ্ছিন্ন করে দেয়া- সেদিকেই গেছেন।

সেলিম আল দীন
আচ্ছা তুমি আমাকে বলো, যদি শব্দ ব্যবহারের কথাই ধরো, তাহলে রবীন্দ্রনাথ-লালনের ভাষা নিশ্চয়ই সহজ সরল শিল্পের ভাষা?

বিপ্লব বালা
অবশ্যই।

সেলিম আল দীন
মোটেই না। এখন আমাকে বলো তো ক’জন মানুষ রবীন্দ্রনাথের কবিতা বোঝে, লালনকে বোঝে? রবীন্দ্র সংগীত যারা গায় তাদের শতকরা কতজন গানের অর্থ বোঝে? এই না বোঝার কারণটাও আমি বলি, সেটা হলো তাঁদের লেখার মধ্যে যে মহাজাগতিক জায়গাটা ধরার প্রয়াস আছে, তুমি, আমি এই ছা-পোষা ঔপনিবেশিক মন-মানসিকতার মানুষজন সেই মহাজাগতিকতা কী বা কেমন করে তা অন্তরে প্রবেশ করে, তার কিছুই জানি না। ফলে শাদা-মাটা লেখা পড়তে পড়তে, যখনই মহাজাগতিকে প্রবেশ করবার মতো লেখা হাতের কাছে আসে, সেগুলোকে দুর্বোধ্য মনে হয়। তবে আমি মনে করি, আমি শুরু করেছি, আমার লেখা পাঠে অভ্যস্ত হতে সবারই সময় লাগবে। তবে এক সময়ে আমার লেখার ভেতরে যখন সে প্রবেশ করতে পারবে, আজ না হোক, কয়েক বছর পরেও, তখন বুঝতে পারবে, আমি কেমন করে ঔপনিবেশিক জাল ছিন্ন করে মানুষকে হাজার বছরের ঐতিহ্যের কাছে নিয়ে যেতে চেয়েছি।

হাসান শাহরিয়ার
আমরা কিন্তু আপনার রচনার পাঠের দুর্বোধ্যতার কথা বলি নি, দৃশ্যকাব্য হিসেবে দুর্বোধ্যতার কথা বলেছি। সেখানে আপনার সাহিত্যের বাইরেও কিছু জীবন্ত মানুষ থাকে যারা এগুলোকে দর্শকের কাছে নিয়ে যায়। দুর্বোধ্যতার কারণ সেখানেও থাকতে পারে।

বিপ্লব বালা
আমাকে একটা কথা বলুন তো, আপনার হরগজ করেছে বিদেশে। আবার শুনছি কোলকাতার ঊষা দি’ হরগজ করবে। এই হরগজ-র ভাষা আমরা বুঝতেই হিমশিম খাচ্ছি, আর ভিনদেশিরা কী করে এর ভেতরকার চিত্র বের করবে? ঊষা দি’ একটা লাইন বুঝবে হরগজ-এর?

সেলিম আল দীন
আমি বুঝি নি বলে অন্য কেউ বুঝবে না এটা কেমন কথা? কৌশিক (ভারতের) তো বলে গেল যে, সে প্রাচ্য করেছে। এবং এই প্রাচ্য-র প্রায় ৮০-এর উপর শো করেছে। উপরন্তু দিল্লীর রঙ্গমঞ্চে মঞ্চস্থ হয়েছে। ওই হিন্দী ভাষারা ওটা বুঝলো কী করে?

বিপ্লব বালা
প্রাচ্য তবুও অনেক সহজ, কিন্তু হরগজ করা সম্ভব না।

সেলিম আল দীন
কোনটা সম্ভব আর কোনটা অসম্ভব সেটা নির্ভর করবে পাঠক দর্শকের যোগ্যতার ওপর। আমি হলফ করে বলতে পারি রবীন্দ্রনাথের গীতবিতানের ভূমিকা গীতিটার অর্থ নির্ণয়ে তোমার আমার মতো অনেকেই ব্যর্থ হবে- মানে ওর অর্থ বুঝে উঠতে পারবে না, অন্তত শাদা চোখে।

বিপ্লব বালা
আপনার একটা লেখা কোথায় যেন পড়েছিলাম, আপনি সেখানে এই দেশের শিল্পের ক্যাথারসিস বোঝাতে গিয়ে লিখেছিলেন- কথক বর্ণনা করছে, নানা চরিত্র হচ্ছে, গান গাইছে, নানাভাবে দর্শকদের সাথে রিলেট করছে- তো এই রিলেট করতে করতে একটা জায়গায় দর্শকের সাথে মিশে যাচ্ছে। যেটা আমাদের রিচ্যুয়ালে আছে, কীর্তনে আছে, মিলাদের সময় হয়- মানে সবাই একটা জায়গায় এসে পৌঁছায়, আবেগ দিয়ে, বোধ দিয়ে। তো এই এক জায়গায় পৌঁছানোর ব্যাপারটা তো প্রাচ্যে আছে এবং আপনি যেহেতু আমাদেরকে হাজার বছরের ঐতিহ্যের কাছে ফিরিয়ে নিতে চাচ্ছেন, সেখানে আপনার দৃশ্যকাব্যগুলো আমাদের নাগরিক মনকে কতটুকু একাত্ম করে, এক জায়গায় যোগ করে?

সেলিম আল দীন
তুমি এনসিয়েন্ট গ্রীস বা এনসিয়েন্ট পাহলভি, যে দিকেই তাকাবে দেখবে, সবসময় মানুষের মধ্যে শিল্পরস পিপাসা বা জীবনের গভীর বক্তব্যগুলো সামাজিক ভাবনা থেকে উঠে এসেছে। সেকারণে, তারপর যে যাই করেছে, মূলত প্রচলিত বিষয়েরই নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেছে। নিজের প্রতিভা দিয়ে নতুন দর্শন তৈরি করেছে, ভাবনা তৈরি করেছে। কিন্তু মূল ব্যাপারটা কিন্তু প্রাচীন, যেটাকে আমরা পুরাণ বলি। ধরো ভাস যখন ঊরুভঙ্গম লেখে, তখন সেটা দেখতে এসে দর্শক কিন্তু জানে ভীম আর দুর্যোধনের যুদ্ধের কথা। ফলাফলও জানে। জেনেই বসেছে। তারপরও ভাস যে নতুন মাত্রা যোগ করে, তাতে আস্তে আস্তে দর্শক দুর্যোধনের প্রতি দুর্বল হতে থাকে। কৃষ্ণের মতো ব্যক্তির ইশারায় ভীম এমন একটা কাজ করতে পারে, সেটা কিন্তু মহাভারত পড়ে কেউ দুর্যোধনের প্রতি দুর্বল হয় না। আবার ইডিপাস-র কথা ধরো। এটা কিন্তু মূলত মিশরীয় মিথ। যাই হোক, তো যখন দর্শক দেখতে যাবে, তখন কিন্তু সবাই এই নাটকের ঘটনা জানে। তাহলে তাদের ভেতরে ক্যাথারসিস তৈরি করার ঝুঁকিটা বোঝ! অথচ নাটকের শেষে যখন ইডিপাস বলে- কবর অবধি যে সুখি নয়- তবে সে যে সুখি এই নামে অভিধানিত হতে পারে না।  ঠিক তখনই দর্শক একটা নতুন দর্শন নিয়ে বাড়ি ফেরে। এভাবে ট্রাডিশনের ভেতর থেকে রিচ্যুয়ালের ছদ্মাবরণে একটা জায়গায় নিয়ে যেত নাট্যকাররা। নাট্যকার কেন, গল্পকার, উপন্যাসিক, কবি সবাই একাজটা করেছে। আধুনিক লেখকের সমস্যা হলো সে মাঝে মাঝে মিথের ব্যবহার করে, কিন্তু সে মূলত নিজস্ব ব্যক্তিসত্তার ভাবনার উপর দিয়ে গড়াতে চায়। একারণে আধুনিক লেখক, যারাই নতুন কিছু সৃষ্টি করেছে, তাদের লেখা দুর্বোধ্য ঠেকে। রবীন্দ্রনাথের অধিকাংশ চিন্তাই উপনিবেশ ভেঙে, দৃশ্যমান বিশ্ব ভেঙে, জীবনের অস্থিরতা ভেঙে আলাদা একটা জায়গায় পৌঁছতে  চেয়েছে। সেকারণে বুঝতে খুবই অসুবিধা হয়। সেকালে তো আরও অসুবিধা হতো। আর এই যে অসুবিধা হতো, এটার জন্য কিন্তু দায়ী করা হতো রবীন্দ্রনাথকেই। অজস্র ব্যঙ্গ বিদ্রুপের শিকার-তীরে বিদ্ধও হয়েছিলেন তিনি। পাঠক বোঝে না বলে মনে করতো আসলে রবীন্দ্রনাথের লেখা লেখাই হচ্ছে না। এ-ব্যাপারে একটা কথা প্রচলিত আছে যে, দীলিপ রায়, ডি.এল. রায়ের ছেলে, তখন লন্ডনে ছিল, সেখানে বড় লেখকদের অভিমত পেয়ে ডি.এল. রায়কে চিঠি লিখেছিল যে- বাবা, রবীন্দ্রনাথের লেখা নিয়ে তুমি কিছু বলো না। তিনি যে কত বড় লেখক সেটা বোঝার ক্ষমতা তোমাদের নাই। ... তো আধুনিক কবির সমস্যা হলো, সে বর্তমান বিশ্বের যে সমস্ত সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে, সেগুলো এই পৃথিবীতে কখনোই ছিল না। আধুনিকতার চরম সংকট হচ্ছে বিচ্ছিন্নতাবাদ। প্রত্যেকে প্রত্যেকের থেকে আলাদা। বিজ্ঞান, টেকনোলজি তোমাকে একা করে দিচ্ছে। শ্রম বিভাজনের ফলে, নিজের তৈরি পণ্যের তৈয়ার প্রক্রিয়াই সে পুরোপুরি জানে না। শিক্ষা ব্যবস্থাও বিচ্ছিন্ন হওয়ার শিক্ষা ব্যবস্থা। যে সাহিত্য পড়ে, সে বিজ্ঞান জানে না। যে দর্শন পড়ে, সে ভাবে গণিত কোনো সাবজেক্টই না। যে মেডিকেল পড়ে, পরবর্তী সময়ে সে মানুষের কোনো একটা নির্দিষ্ট অংশের হয়তো চিকিৎসা করতে পারে। একজন রুগীকে সে পুরোপুরি সুস্থ করতে পারে না। এটা কিন্তু খারাপ বলছি না, আমি বলছি আধুনিকতার অনিবার্যতা। এই যে বিচ্ছিন্নকরণ, সেই বিচ্ছিন্নকরণের সময়ে একজন লেখক যখন তার কাব্য তৈরি করে, তখন তার পাঠক কীভাবে সংযোগ স্থাপন করবে? আমার এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আমি যে মহাজাগতিক জায়গা ধরতে চাই তার সাথে পাঠকের সংযোগ স্থাপনে সময় তো লাগবেই। তুমি ইডিপাস বোঝ, কিন্তু আমার নিমজ্জন বোঝ না। কেন বোঝ না? কারণ, ইডিপাস তুমি বারবার পড়েছো বা বাধ্য হয়েছো পড়তে। কিন্তু আমার নিমজ্জন একেবারেই আধুনিক সময়ে দাঁড়িয়ে। আমার নিমজ্জন-এ যে গণহত্যার কথা আছে, তাতে আমি একে একে দেখিয়েছি যে, এভাবে যে গণহত্যা হচ্ছে, হতে হতে শেষ মানুষটি যখন বেঁচে থাকবে এবং আর মানবের অস্তিত্বের কোনো সম্ভাবনা থাকবে না, তখন তার মৃত্যুর পর এই গ্রহ থেকে মানুষ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। কত বড় ভয়াবহ! এই ভয়াবহতা সৃষ্টি যারা করছে, তারা নিজেরাই কিন্তু নিশ্চিহ্ন হবে। তারপর দেখ, আধুনিককালে বাড়ি, গাড়ি, জৌলুস এসবের বাড়াবাড়ি করতে গিয়ে তুমি তোমার বিশ্বের বাতাসের যে ওজন স্তর আছে, সেই ওজন স্তর ফুটো করে দিচ্ছ। তারপর কী হবে? পৃথিবী ধ্বংস হবে। পৃথিবীটা কী? আমাদের মা। সেই মাকে আমরা ধর্ষণ করছি। হয়তো না জেনেই করছি। সেটার সাথে ইডিপাসের ট্র্যাজিডি কি একই না? কিন্তু আমি যখন আধুনিক লেখক হিসেবে লিখবো, তখন এই বক্তব্য আনার পরও তোমার কাছে বিচ্ছিন্ন মনে হবে, দুর্বোধ্য মনে হবে। কারণ, আধুনিক বিজ্ঞান, সমাজ, শিক্ষা ব্যবস্থা কিছুই তোমাদেরকে এসব বিষয়কে এভাবে শিখতে শেখাচ্ছে না, ভাবতে শেখাচ্ছে না। তো তোমার শেষ কথাটার জবাব দিই, সেটা হলো আমার নাটকের যে নাগরিক দর্শক, তাদের বেড়ে ওঠাটা হলো গতানুগতিক, শাদা চোখ দিয়ে দেখে দেখে বেড়ে ওঠা। তাদের মধ্যে ক্যাথারসিস তৈরি করাটা প্রায় অসম্ভবই বলা চলে।

হাসান শাহরিয়ার
আমরা প্রায় শেষের দিকে চলে এসেছি। স্যারকে আমার একটা প্রশ্ন, আপনি এক সময় আপনার স্বপ্ন হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যতত্ত্ব বিভাগ চালু করলেন। আজ, ২০ বছর পর এসে কী মনে হয়, আপনার স্বপ্নটার বর্তমান অবস্থা কী?

সেলিম আল দীন
আমি আমার শিল্প-অভিজ্ঞতা থেকে, গ্রাম থিয়েটারের অভিজ্ঞতা থেকে একসময় ভাবলাম যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিষয়ের উপর, নাট্যকলার উপর কোনো বিভাগ খোলা যায় কিনা। এটা নিয়ে অনেক সংগ্রাম করেছি। সেগুলো বিপ্লব বালা জানে, শাহরিয়ার তুমিও জান, তুমি তখন এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্র ছিলে, অনেক সময় উপহাসের পাত্রও হয়েছি। কিন্তু আমার একটা রোখ ছিল। এবং সেই রোখ ধরে রাখতে গিয়ে অনেকের অপ্রিয়ও হতে হয়েছে। যাক, এতো বছর পর এসে আমার ভালো লাগে যখন দেখি আমার ছাত্ররা বিভিন্ন জায়গায় কাজ করছে।

বিপ্লব বালা
বেশিরভাগ কিন্তু মিডিয়াতে কাজ করছে। মঞ্চে আপনার ছাত্রদের অবদান কতটুকু?

সেলিম আল দীন
হ্যাঁ, এটা অবশ্য আমাকে পীড়া দেয়। জীবিকার তাগিদে বেশিরভাগই মিডিয়াতে কাজ করছে। তবে বিভিন্ন দলেও কিন্তু আমাদের ছেলে-মেয়েরা আছে। নাগরিকে আছে, ঢাকা থিয়েটারে আছে, নাট্যজনে আছে, আরণ্যকে আছে। অর্থাৎ এখান থেকে পাশ করে নতুন ভাবনা নিয়ে মঞ্চে কাজ না করে তারা অনেকটা প্রচলিত যে থিয়েটার চর্চাটা আমাদের দেশে আছে, সেখানেই যোগ দিচ্ছে।

হাসান শাহরিয়ার
আপনার এতোক্ষণের কথার মধ্য দিয়ে যেটা বের হয়ে এলো যে, আপনি বাঙলা নাটককে মুক্তি দিতে চেয়েছেন, এবং সেটা নাট্যরচনা শৈলীর মাধ্যমে, সেই কাতারে কিন্তু আপনার কোনো শিক্ষার্থীকে আমরা পাই নি।

সেলিম আল দীন
এর দায়িত্ব আমি নিতে পারি না। এ দায়টা পরবর্তী প্রজন্মের। ধরা যাক আমি সনেটের প্রবর্তক। তো আমি পরবর্তী প্রজন্মকে বলতে পারি না যে- তোমরা সনেটই লেখো। তারপরও উপনিবেশীয় নাট্যশিল্পরীতির বিপরীত শিল্পধারায় অনেকেই দাঁড়িয়েছেন- লিখছেন। মাসুম রেজা, গোলাম শফিক, বদরুজ্জামান আলমগীর, আনন জামান ওরা লিখছে। চমৎকার লিখছে।

বিপ্লব বালা
ওরা কেউই কিন্তু আপনার ছাত্র না।

সেলিম আল দীন
না, তা না। কিন্তু অনেক সময় ছাত্র না হয়েও দেখা যায় কেউ যৌক্তিকভাবে কবুল করে নিতে পারে। আর আমার ছাত্র হলেই তাকে নাটক লিখতে হবে এমনও কোনো কথা নাই। মহাভারতের একলব্য যেমন দ্রোণাচার্যের শিষ্য ছিল। সরাসরি শিষ্য হতে পারে নি, পরে দেখা গেল, সে-ই দ্রোণকে বেশি বুঝতে পেরেছিল।

বিপ্লব বালা
নাট্যরচনারীতি বা নাট্যকার তৈরির ব্যাপারে কোনো কোর্স কি আপনার বিভাগের সিলেবাসে আছে?

সেলিম আল দীন
আছে। এবং নাট্যরচনায় এম. এ ডিগ্রী এ বিভাগেই দেয়া হয়। তবে আনন্দের খবর হলো এই, এ-বছর থেকে নাটক লেখার ব্যাপারটা প্রথম বর্ষ থেকেই সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

বিপ্লব বালা
আপনার দল নিয়ে এখন কী ভাবছেন? ঢাকা থিয়েটার, সেই জমজমাট ঢাকা থিয়েটার আর এখনকার ঢাকা থিয়েটার আপনার কাছে কেমন লাগে?

সেলিম আল দীন
জমজমাট কথাটার মানে কী স্পষ্ট নয়। এটা পিটার ব্রুকের হলি থিয়েটারের ধারণা হয়ে গেল না? আসলে আমার ভালো লাগা না লাগা দিয়ে তো কেউ থিয়েটার করবে না। ইতিহাসের ধারায় আমরা দেখতে পাই, সংগঠনভিত্তিক একাত্মতা ২৫ বছরের বেশি টেকে না। এবং যে-কোনো মতবাদ ৫০ বছরের বেশি নয়। তো আমার মনে হয় আমরা যেভাবে শুরু করেছিলাম, একাট্টা হয়ে, একই মন-মানসিকতা নিয়ে, সেটা তো অনেকদিন চললো। এখনো অব্যাহত আছে। অনেকে গেছে, অনেকে আবার এসেছেও।

সোহেল হাসান গালিব
একজন লেখকের কাছে তার ভাষার ও কালের সাহিত্যের মূল্যায়ন সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে আপনি কী বলবেন?  

সেলিম আল দীন
সমকালে বেঁচে থেকে সমকালের মূল্যায়ন খুব কঠিন। তবে এটা ঠিক যে, কবিতার ক্ষেত্রে তিন-চার ধাপে কয়েকজন বিশিষ্ট কবির নাম আমি বলতে পারি। পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক ধারার ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে স্বাধীন বাংলাদেশে নতুন শিল্প-ভূমি তৈরি করাটা আমাদের জন্য দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। নাটকের ক্ষেত্রে আমি সে-চেষ্টাটা করেছি। নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, কবিতার ক্ষেত্রে মোহাম্মদ রফিক, রফিক আজাদ এবং বেলাল চৌধুরী, ফরহাদ মযহার সেটা করেছেন। উপন্যাসের ক্ষেত্রে সে-কাজটা শওকত আলী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এবং খানিকটা সেলিনা হোসেন। পরবর্তীকালের কবিতার ধারায় নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান কিংবা হেলাল হাফিজ ভালো করেছেন। ক্ষণকালের জন্য উদিত হয়ে মিলিয়ে গেল আমাদের রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ- সেটা ভারী কষ্টের। তবে মাসুদ খান, মজনু শাহ, শামীম রেজা, রায়হান রাইন, মাদল হাসান, টোকন ঠাকুর, সুব্রত অগাষ্টিন, তুমি (গালিব)- ভালো কবিতা লিখতে গিয়ে যে নতুন বাঁকের বা ফর্মের অন্বেষণ করা, সে চেষ্টাটা তোমাদের মধ্যে আছে।

তরুণরা ইদানীং প্রভাবিত হতে পছন্দ করে। আমরা যেখানে ঔপনিবেশিক শিল্পধারার প্রভাব মুক্ত হবার জন্য লড়াই করছি- কী স্বাধীনতা যুদ্ধে, কী লেখার মধ্য দিয়ে। সেখানে দেখা যায় তরুণ লেখকদের একটা বিশাল অংশ আমাদের হাজার বছরের সাহিত্যের সাথে নিবিড়ভাবে পরিচিত নন এবং পাশ্চাত্য ধাঁচটাই অনুসরণ পছন্দ করছে। তারা এটা নিয়ে চিন্তিতও নয়। ফরাসি দেশে কী হলো, সিন নদীতে কত কিউসেক পানি গড়িয়ে পড়লো- সেটা নিয়েই তাদের যত মাতামাতি। আর পপুলার বিষয়ের দিকেই যেন তাদের মনোযোগ। নাটক, কবিতা এবং উপন্যাসে একটা নতুন চিন্তা ও আঙ্গিকের ভূমি আবিষ্কার করাটা খুব জরুরি। আমাদের সাহিত্য আমরা বলি আধুনিক অথচ উপকূলীয় অঞ্চল নিয়ে কোনো নাটক বাংলা সাহিত্যে নাই। আমার কাছে মনে হলো, বাংলা সাহিত্য এত বড় এত বিশাল অথচ এ সাহিত্যে সত্যিকার অর্থে একটা মাছ শিকারের গল্প নেই। অথচ মাছে-ভাতে বাঙালি বলছি। এই যে প্রতারণা, এর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে, আমি দাঁড়ানোর কিছুটা চেষ্টা করেছি, অন্যদেরও দাঁড়াতে হবে। রবীন্দ্রনাথই প্রথম ধান নিয়ে এলেন। ধান তো কৃষকের ব্যাপার ছিলো। এখনকার তরুণ লেখকরা বিশটি ধানের নাম জানে না। শিকড় থেকে বিচ্যুত হওয়াতেই আত্মপ্রকাশের ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না তারা। এটা আমার অভিযোগ নয়; দাবি যে, তারা এমন কিছু লিখবে যা আমাদের জাতিসত্তাকে স্বতন্ত্রভাবে বিশ্বের কাছে তুলে ধরবে।

আমাদের নাগরিক জীবনের অনুষঙ্গ তো পাশ্চাত্যের অপঘাতের আলো। এটাকে অবলম্বন করে যদি শিল্পচর্চা করি তাহলে সেটা নিশ্চিতভাবেই ভুল দিকে ধাবিত হবে। কারণ, ইউরোপে রিয়েলিজম-কিউবিজম ছাড়া আর কোনো আন্দোলন পজিটিভ কিছুর জন্ম দেয় নি। এক্সপ্রেশানিজম, ইম্প্রেশানিজম, দাদাইজম- ক্ষয়িষ্ণু সমাজ থেকে উঠে আসা এইসব শিল্পতত্ত্ব আমাদেরকে যেন গ্রাস না করে। ক্ষয়রোগীর কাশি-তো আর গান হয় না। ওদের গলিত সমাজ থেকে যে তত্ত্বটা উঠে এসেছে, আমরা সেটাতে বেড়াল-নখে আঁচড় দিচ্ছি- সম্ভবত নিমজ্জন-এ এরকম একটি কথা আছে। তার মানে আমি বলছি না যে, ওয়েস্টকে বন্ধ করে দাও। ডোন্ট শাট দা ওয়েস্ট। আমি বলছি, ওয়েস্টের যে জায়গায় মানব-মহিমার সমুজ্জ্বল দিকগুলো, শিল্প-কৌশলের অভিনব দিকগুলো আছে- সেগুলো গ্রহণ করে তার দ্বারা অনুপ্রাণিত হওয়া।

হাসান শাহরিয়ার
আমরা এবার শেষ করতে চাই। স্যার একাধিক দিন এতো ব্যস্ত সময়েও আপনি আমাদের সময় দিলেন, আমরা ঋদ্ধ হলাম। আপনাকে ধন্যবাদ।

সেলিম আল দীন
তোমাকেও ধন্যবাদ। বিপ্লব বালা আর গালিব তোমাদেরকেও ধন্যবাদ। আর থিয়েটারওয়ালার মাধ্যমে আমি সবাইকে আমার শুভেচ্ছা জানাই।