Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

চে’র সাইকেল

Written by মামুনুর রশীদ.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

[একজন ৪০/৪৫ বছরের লোক মঞ্চে প্রবেশ করে। এদিক ওদিক তাকায়। লোকটির নাম রঞ্জন।]

রঞ্জন
কেউ দেখেছেন, কেউ? এখান দিয়ে গেছে কি? কেউ দেখেছেন? [দূরে গীটারের শব্দ শোনা যায়] ঐখানে কি হতে পারে? হ্যাঁ, পারে। সমুদ্র ওখানে। সমুদ্র পাড়ে এ সময় কি থাকতে পারে লোকটা?
[গীটারের শব্দ উচ্চকিত হয়। সেদিকে দ্রুত ধাবিত হয় রঞ্জন। আসে একটি মেয়ে, নাম সহেলি]

সহেলি
এদিক দিয়ে কেউ গেলো মনে হয়- কোন পথে? এই পথে? ঐ পথে? কোন পথে? নাকি- ঐ সমুদ্র পাড়ে কিসের বাজনা? হবে হয় তো- হ্যাঁ, পায়ের চিহ্ন দেখা যায়- ঐ দিকেই-
[সহেলী চলে যায়। শুভ্র আসে, হাতে মাউথ অর্গান বাজাতে বাজাতে আসে]

শুভ্র
সুরটা মিলছে না। গীটার? তার সাথে মাউথ অর্গান? না যেতে হবে- অত তাড়া অবশ্য নেই। মানুষটাকে খোঁজা দরকার, কোন পথে গেলো? কোথায় হারিয়ে গেলো? হ্যাঁ, বালির উপর দু’টো পা- আরো দু’টো- তাহলে কাকে খুঁজছি আমি? আরেকটু, আরেকটু দেখি-
[বাজাতে বাজাতে চলে যায়। আসে সহেলী]

সহেলি
কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা
মনে মনে ...

যার যেদিকে খুশি চলে যাক্। এই যে আমি কোথাও যাবো না। কিন্তু ঐখানে কিসের কোলাহল? তাহলে কি ঐ পথেই যাবো? ঐ-পথে- মাউথ অর্গান বাজছে, গীটার, কী সুন্দর সুর। যাই দেখি-
[সহেলী চলে যায়। সমুদ্রের উত্তাল গর্জন তার সাথে মাউথ অর্গান আর গীটারের শব্দ। রঞ্জন আসে]

রঞ্জন
নাহ! কিছু নেই, নির্জন সমুদ্র সৈকতে শুধু কিছু পদচিহ্ন। এত পদচিহ্ন কেন? এত হাজার বার লক্ষ-কোটি বার জোয়ার ভাটা হচ্ছে তারপরও পদচিহ্নগুলো মুছে যায় না কেন? হ্যাঁ, ঐ তো- আবার ঐ যে দেখা যায়-
[রঞ্জন চলে যায়। সহেলী প্রবেশ করে]

সহেলি
একটা লোক, বালির উপর হুমড়ি খেয়ে কী দেখছে? ওখানে- একাকী এই সমুদ্র সৈকতে কী দেখছে? যাবো- যাবো ঐ লোকটার ওখানে? না না যাবো না। যাবো কি যাবো না? যাবো কি যাবো না-
[দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সহেলি। রঞ্জন গান গাইতে গাইতে প্রবেশ করে]

রঞ্জন
সাইকেলটা পৌঁছে যাবে
আজকাল পরশুর প্রান্তে
আরহেনতিনা হয়ে বলিভিয়া
ঐ মরুর প্রান্তে-

সহেলি
এই যে শুনছেন?

রঞ্জন
কে?

সহেলি
আমি-

রঞ্জন
আমি কে?

সহেলি
দেখতেই তো পাচ্ছেন একজন মহিলা-

রঞ্জন
হ্যাঁ-
[রঞ্জন আবার গান ধরে]

সহেলি
আপনি তো একজন আচ্ছা অভদ্রলোক, জিজ্ঞাসা পর্যন্ত করলেন না আমি কে- কী আমার পরিচয়-

রঞ্জন
পরিচয় জেনে কী করবো, তার চেয়ে বলুন ধান্দাটা কী?

সহেলি
ধান্দা মানে?

রঞ্জন
ধান্দা মানেটা বোঝেন না- উদ্দ্যেশ্যটা কী? কী উদ্দেশ্যে আগমন?

সহেলি
সেটা গোপনীয়-

রঞ্জন
একথা বলবেন বলেই আমি পরিচয় জিজ্ঞেস করি নি। পরিচয়টা কাজেই প্রমাণ হোক-

সহেলি
আপনার ঐ যে কী যে বললেন ধান্দা- আপনার ধান্দাটা কী?

রঞ্জন
আছে বিরাট ধান্দা- সেও তো বলা যাবে না।
[আবার গান গাইতে শুরু করে। দ্রুত প্রবেশ করে শুভ্র]

শুভ্র
সর্বনাশ, যে যেখানে আছেন পালান- পালান-

রঞ্জন
কেন?

সহেলি
কেন কী হয়েছে? কেন পালাবো? কী জন্যে?

শুভ্র
বলতে পারবো না- উহু হু হু-

সহেলি
ভয় দেখাচ্ছেন না?

শুভ্র
কেন ভয় দেখাবো? আমার ভয় দেখানোর দরকারটা কী?

রঞ্জন
কোন ধান্দায় আসা বলুন তো-

শুভ্র
কী-সব কথা বলছেন? ধান্দা মান্দা বুঝি না, আমি ভাই বহুত ঝামেলায় আছি-

রঞ্জন
আমার চাইতেও বেশি?

শুভ্র
যার যার নিজেরটাই বেশি মনে হয়- ঐ যে- ঐ যে শব্দ শোনা যাচ্ছে-

রঞ্জন
আমার কান কি ঠসা হয়ে গেলো, আমি তো কিছুই শুনতে পাচ্ছি না।

শুভ্র
আমি শুনতে পাচ্ছি-

সহেলি
আমিও না-

রঞ্জন
এক কাজ করি আমি বরং একটু এগিয়ে দেখে আসি-

শুভ্র
আপনাকে অবশ্য চিনি না, তবে বয়সে একটু বেশি, এই বয়সে যদি মরতে চান তবে যান-

রঞ্জন
Cowards die many times before their death.
But valiant never taste of death but once.
It seems to me most strange that men should fear
Seeing that Death is a necessary and will come when it will come.
জুলীয়াস সীজার, by William Shakespeare, Place in front of Roman palace
-

শুভ্র
ওস্তাদ কোন লাইনের?

রঞ্জন
লাইন মানে?

শুভ্র
ঐ যে ধান্দা বললেন, লাইনও তাই-

রঞ্জন
ছিলাম এক লাইনে, এখন আবার লাইন হারিয়ে বে-লাইনের প্রান্তে দাঁড়িয়ে- To be or not to be that is the question ...

শুভ্র
ওস্তাদ ধরে ফেলেছি, নির্ঘাত পলিটিক্সে ছিলেন-

রঞ্জন
কী করে বুঝলে ইয়াং ফ্রেন্ড-

শুভ্র
গলার মধ্যে একটা হায়দারী হাঁক আছে।

সহেলি
আমি বরং একটু ঘুরে আসি-

শুভ্র
আমাদের কথাবার্তা একদম পছন্দ হচ্ছে না, তাই না?

সহেলি
না, তা হচ্ছে তবে ব্যাপারটা হচ্ছে-

রঞ্জন
অত জানতে চেয়ো না তো ভাই- যান ঘুরে আসুন-

শুভ্র
ঠিক ধরে ফেলেছি না ওস্তাদ? [রঞ্জন মাথা নাড়ে] তাহলে এই হায়দারী হাঁক দেন কী করে ওস্তাদ-

রঞ্জন
তুমি বলো তো ইয়াং ফ্রেন্ড তুমি কে?

শুভ্র
আমি? আমার নামটা বলবো? বলি-

রঞ্জন
নামে কী-বা আসে যায়?

শুভ্র
বলেন কী? নামই তো আসল- মানুষ তো নামেই সব-

রঞ্জন
কাজেই মানুষ- কর্মই সব- সবই কর্মফল-

শুভ্র
মানুষের বয়স বাড়তে থাকলে অবলীলায় কিছু বাণী বেড়িয়ে আসে তাই না ওস্তাদ-

রঞ্জন
এই ইয়াং ফ্রেন্ড- আমাকে ওস্তাদ ওস্তাদ ডাকছো কেন?

শুভ্র
জগতে সবাই ওস্তাদ না? সবার আমি ছাত্র-

রঞ্জন
আর আমি বুঝি সবার মাস্টার-

শুভ্র
অধিকাংশ লোক নিজেকে তাই মনে করে-

রঞ্জন
আচ্ছা এই মহিলা কোথায় গেলো-

শুভ্র
কোনো উৎসাহ নেই-

রঞ্জন
অদ্ভূত ইয়াং ফ্রেন্ড, নারীতে তোমার উৎসাহ নেই। এই ইয়াং বয়সে তুমি কি মনে করো ঋৎধরষঃু ঃযু হধসব রং ড়িসবহ.

শুভ্র
না তা নয়-

রঞ্জন
তাহলে অল্প বয়সেই ওথেলো- নাকি ইয়াগো, অথবা হ্যামলেট, ঞযব ঢ়ৎরহপব ড়ভ উবহসধৎশ-

শুভ্র
কলেজের মাস্টার নাকি ওস্তাদ- কথায় কথায় শুধু ইংরেজী ছাড়েন-

রঞ্জন
মহিলা কোথায় গেল?

শুভ্র
ওস্তাদ আপনার বয়সটা যত বেশি আপনার উৎসাহ তার চাইতেও বেশি- আপনি দেখেন গিয়ে- আমার ওসব নিয়ে কোনো ভাবনা চিন্তা নেই-

রঞ্জন
কিন্তু আমার আছে।
[মেয়েটি ভয় পেয়ে প্রায় চিৎকার করে মঞ্চে প্রবেশ করে]

সহেলি
আমি দেখলাম একটা ছায়া- হয়তো কোনো প্রেতচ্ছায়া হবে- ঝাউবন থেকে এদিকে আসছে। সাথে সাগরের শোঁ শোঁ বাতাস- মনে হচ্ছে ও ধ্বংস করে দেবে। ওর পেছনে দেখতে পেলাম এক অশ্বারোহী ধ্বংস করে করে এগিয়ে আসছে। সেই প্রেতের ছায়াটা বড় হতে হতে অনেক অনেক বড় হয়ে যাচ্ছে।
[ভয় পেয়ে শুভ্র মাউথ অর্গান বাজাতে শুরু করে।]

রঞ্জন
আচ্ছা বুঝলাম না, আপনারা ভয় পাচ্ছেন কেন?

সহেলি
ভয় পাবো না? গিয়ে দেখেন- আপনি ভয় পান কিনা?

রঞ্জন
অন্ধকার ঘনিয়ে আসে কিন্তু আমি জানি কুড়ি শত বছর পরে যীশুর জায়গায় আসছে এক দানব, কে সে? The second coming- W.B. Yeats- ঠিক আছে গেলাম- না না না- বিনা যুদ্ধে নাহি দেবো সূচ্যগ্র মেদেনী-

সহেলি
লোকটা বেশ নাটকীয়।

শুভ্র
কিছু বলছেন?

সহেলি
হ্যাঁ, ঐ লোকটা সম্পর্কে বলছিলাম। বেশ নাটকীয়।

শুভ্র
ভালো। তাহলে তাতে কী হল? একটা কিছুর খোঁজে এসেছিলাম। কিন্তু শুরুতেই এমন ভয় ঢুকে যাচ্ছে-

সহেলি
আমিও একটু আগে ভয় পেয়ে গেলাম। ভয় সব শেষ করে দেয়।

রঞ্জন
রাখ্ তুই, তোকে দেখাচ্ছি মজা- রাখ না- ভেবেছিস তোর ঐ রুদ্রমূর্তি দেখে আমি থরথর কম্পিত হৃদয়ে প্রস্থান করবো? না না না- বিনা যুদ্ধে নাহি দেবো সূচ্যগ্র মেদেনী-

শুভ্র
পুরা যাত্রা পার্টি-

রঞ্জন
ঠিক বলেছো-
ভয় কী মরণে, রাখিতে সন্তানে
মাতঙ্গী মেতেছে আজ সমর রঙ্গে-
কার গান?

সহেলি
মুকুন্দ দাসের-

রঞ্জন
হ্যাঁ, মুকুন্দকে ছাড়া কি ভারত স্বাধীন হত? তিতুমীর, ক্ষুদিরাম, সূর্যসেন, বোম্বাইয়ের নৌ-বিদ্রোহ এগুলো না ঘটলে ব্রিটিশ যায় এখান থেকে? বলে দিলে যাত্রা পার্টি। অবশ্য বলতেই পারো আমিও মুকুন্দের লাইনের লোক, লোকটা ভেবেছিলো যাত্রা-নাটক এসব দিয়ে কিছু করা যায় কিনা-

শুভ্র
কিন্তু কিছু কি হল? হল না-

রঞ্জন
তবু খুঁজতে দোষ কী?- ‘চেয়ে দেখুন বাংলার ভাগ্যাকাশে দূর্যোগের ঘনঘটা/ কে দেবে আশা কে দেবে ভরসা/ওঠো মা ওঠো ... সাত কোটি সন্তান তব হিন্দু-মুসলমান।

সহেলি
লোকটার বোধ হয় সাহস আছে-

শুভ্র
দেখা যাক বৃক্ষ তব নাম কী/ ফলে পরিচয়- আচ্ছা আপনি কে?

সহেলি
তাইতো, অনেকক্ষণ হয়ে গেলো আমাদের পরিচয়ই হল না।

শুভ্র
হ্যাঁ এরকম হয়। কাদের জানেন? এরকম হয় ব্রিটিশদের। এক দ্বীপে ১২ বছর দুই ব্রিটিশ থাকলো। তারপর আরেক ব্রিটিশ এলো- সে দু’জনেরই বন্ধু। দু’জন কেউ কারো সাথে কথা বলছে না। তখন তৃতীয় ব্রিটিশ জিজ্ঞাসা করলো- কথা বলছো না কেন তোমরা? দু’জনেই এক সাথে বলে উঠলো আমাদের সাথে কেউ পরিচয় করিয়ে দেয় নি। তারপর তাদের এতগুলো বছরের মাথায় পরিচয় হল।

সহেলি
তাই নাকি? বেশ কথা তো- আচ্ছা আপনি মেয়েদের মতো করে কথা বলেন কেন? নাচের ছেলেরা ওভাবে কথা বলে। আপনি কি নাচেন?

শুভ্র
না কখ্খনো না-

সহেলি
তাহলে?

শুভ্র
আমি একটা মানুষের প্রেমে পড়ে আছি যে-

সহেলি
ছিঃ ছিঃ ছিঃ পুরুষ হয়ে পুরুষের প্রেমে- মানে আপনি- আপনি-

শুভ্র
আপনার কথা বার্তায় ঢং ঢাংগে কিন্তু একটা পুরুষালি ভাব আছে, সেটা কি কখনো খেয়াল করেছেন-

সহেলি
হ্যাঁ, আমার বন্ধুরা বলেছে।

শুভ্র
তাহলে আপনিও কি পুরুষালি ভাব দেখিয়ে মেয়েদের সাথে প্রেমে পড়েছেন?

সহেলি
ছিঃ ছিঃ ছিঃ কী বলেন- আমি নারী-পুরুষের ব্যবধানকে ভেঙে দিতে চাই-

শুভ্র
ও বাবা! ডেঞ্জারাস!

সহেলি
বলুন এখন- কার প্রেমে?

শুভ্র
আপনি চিনবেন না-
[ঘোড়ার শব্দ]

সহেলি
দেখলেন একটা ঘোড়ার শব্দ হল। আর সঙ্গে সঙ্গে সূর্যটা টুপ করে ডুবে গেল। ঐ ঘোড়ার শব্দে কি সূর্যটা-ও ভয় পেয়ে গেল?

শুভ্র
হতে পারে।

সহেলি
এখনো বিকেল হয় নি, সূর্যটা লাল হল না। কিন্তু ডুবলো কীভাবে?

শুভ্র
ওটা ঐ যে ঝাউবনের প্রেতটা, সেই প্রেতটার কাজ- না না আমরা আর কেউ নিরাপদ নই।
[ঘোড়ার শব্দ]

সহেলি
ঐ নাটুকে লোকটাই বা গেল কোথায়? এতক্ষণ তবু একটা নির্ভরতা ছিলো, এখন কী হবে? অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটে চলেছে।
[জলোচ্ছ্বাসের শব্দ]

শুভ্র
ঐ যে দেখুন- দেখুন সাগরের হঠাৎ জলোচ্ছ্বাস- এবার বোধ হয় ভাসিয়ে নিয়ে যাবে-

সহেলি
চলুন সরে যাই আমরা-

শুভ্র
না। কোথায় যাবো? কেন যাবো? মরতেই তো এসেছি। মরতে মরতে যখন আধমরা হয়েছি তখন এসেছি এখানে। আমার কোনো সমস্যা নেই। আপনার প্রাণের ভয় থাকলে যান-

সহেলি
প্রাণের ভয় আমার আছে সত্য। কারণ, জীবনটা মূল্যবান হওয়ার আগেই আমি জীবন দিতে পারবো না।

শুভ্র
তাহলে এখানে এসেছিলেন কেন?

সহেলি
বাঁচার জন্যে।

শুভ্র
বাঁচার জন্যে এই সমুদ্র পাড়ে- কার কাছে?

সহেলি
জানি না- জীবন যখন একেবারেই অনর্থক হয়ে যাচ্ছে, চারিদিকের দেয়ালগুলো ক্রমশ আমাদের দিকে এগিয়ে এসে গলা টিপে ধরছিলো, কোথাও কোনো আশা খুঁজে পাই নি। এক অন্ধকার সুড়ঙ্গ পথে হাঁটছিই হাঁটছিই, কোথাও কোনো আলো নেই, সামনে কোনো মানুষ নেই-

শুভ্র
হ্যাঁ, একদিন পাখীরা সব উড়ে গেলো কোথায় যেন। আকাশটায় কালো ধোঁয়া, নীল একটুও দেখা যায় না। আমার ঘরটার সামনের ডালিম গাছটা আগুনে পুড়ে ছাই। শেষ রাতের দিকে আমার শ্বাস কষ্ট শুরু হল। আমি ছুটতে লাগলাম- মানুষজন কেউ নেই। শুধু কিছু পায়ের চিহ্ন খুঁজতে খুঁজতে এখানে এসে হাজির-

সহেলি
কিন্তু এখানেও যে মুক্তি নেই। একই ঘটনা এখানেও- তাহলে কী হবে?

শুভ্র
এত অনিশ্চয়তা সহ্য করতে পারবো না। যা হবার হবে-

সহেলি
মৃত্যুর কাছে সমর্পণ করা ছাড়া কোনো উপায় নেই।

শুভ্র
ধুর! আপনারা এই যে নারীকুল বড় সমর্পণ প্রিয় প্রজাতি-

সহেলি
আপনি কাকে কী বলছেন- আপনি কি জানেন আপনার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে কে?

শুভ্র
একজন চঞ্চলা চপলা হরিণী-

সহেলি
আপাতত তাই মনে হতে পারে, ওটা আবরণ, ভেতরে এক কঠোর নারী-

শুভ্র
বুঝতে পেরেছি নারকেলের ঠিক উল্টোটা-

সহেলি
কেমন?

শুভ্র
নারিকেলের বাইরে কঠিন ভেতরে কোমল-

সহেলি
ঠিক ধরেছেন- কিন্তু উদাহরণটা ঠিক হল কি?

শুভ্র
এর চেয়ে ভালো উদাহরণ আপনার মনে পড়ছে কি?

সহেলি
নাটুকে লোকটা কোথায় গেল? আবার নাটকীয় কোনো সংবাদ নিয়ে উপস্থিত হবে।

শুভ্র
হতে পারে-

সহেলি
হতে পারে কী? তাই হবে। আমার অনুমান মিথ্যে হয় না।

শুভ্র
এত নিশ্চিত আপনি?

সহেলি
হ্যাঁ-

শুভ্র
কী করে বলুন তো-
[সহেলি ব্যাগ থেকে ছোট্ট একটা অস্ত্র বের করে]

সহেলি
এর জন্যে-

শুভ্র
ওরে বাবা? ওটা কী?

সহেলি
একটা ছোট্ট পিস্তল!

শুভ্র
আপনার হাতে পিস্তল? কেন? আপনি সন্ত্রাসী নাকি? ওরে বাবা!

সহেলি
না। এতো ছোট্ট একটা পিস্তল মাত্র। আমি অক-৪৭, চালাতে পারি, ঈযরহবংব জরভষব হালকা মেশিন গান সব-

শুভ্র
খবরের কাগজে ওসবের ছবি দেখেছি মাত্র। চর্ম চক্ষুতে কখনো দেখি নি- আপনি কে?

সহেলি
পরে বলবো- আপনার পরিচয়টা দিন-

শুভ্র
আমি একজন প্রেমিক-

সহেলি
কিসের প্রেমিক-
[শুভ্র এবার মাউথ অর্গান বাজায়]

সহেলি
বুঝলাম না কিছুই-

শুভ্র
বুঝলেন না, সঙ্গীত প্রেমিক- একটা লোক হঠাৎ করে বলে উঠলো- সঙ্গীতেই নাকি সব হয়- সঙ্গীত দিয়েই সমাজ পাল্টানো যায়- কত কিছু করা যায়-

সহেলি
তাই নাকি? আমি তো জেনে আসছি সবচেয়ে বড় সত্য অস্ত্র- অস্ত্রই সকল ক্ষমতার উৎস-
শুভ্র
এই বলেই তো সর্বনাশটা করলেন-

সহেলি
অস্ত্রের জোরেই কিছুক্ষণ আগে সূর্যটা টুপ করে ডুবে গেলো-

শুভ্র
সূর্য ডোবে নি- একটা কালো ভয়ঙ্কর মেঘ ওকে আড়াল করেছে-

সহেলি
না না, দেখবেন ও আর উঠছে না-

শুভ্র
আরে ধুর কী যে বলেন- সূর্য চির দিবসের, মেঘ ক্ষণিকের। ঐ যে অস্ত্র যারা একবার হাতে নেয়, চালাতে শেখে তারা মনে করে অস্ত্রই সব- ঐ ব্যাটা চে’ও তাই মনে করতো- গেরিলা যুদ্ধ করে সমাজটা পাল্টাবে-

সহেলি
হ্যাঁ, একেবারে সঠিক চিন্তা, আমরা যে এতগুলো বছর মিলিটারীর বুটের তলায় থাকলাম সে কিসের জন্যে? অস্ত্র না থাকলে অযথাই প্রেমের জোরে? এই আজকে সুমেরিয়ান সভ্যতার পাদপীঠে যে কালো ধোঁয়া উঠছে প্রতিদিন সেটা কিসের জোরে?

শুভ্র
ঐ যে বলেছি সে ক্ষণিকের। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন অনেক এসেছে আবার ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে- মানুষকে ভেতর থেকেই পাল্টাতে হয়।

সহেলি
হয়। কিন্তু অস্ত্র বাদ দিয়ে নয়-

শুভ্র
না ঠিক নয়-

সহেলি
এটাই ধ্রুব সত্য- এর চেয়ে বড় সত্য কিছুই নেই পৃথিবীতে-

শুভ্র
কিন্তু অস্ত্র আজ সারা পৃথিবীতে দুর্বত্তের হাতে দানবের হাতে চলে গেছে-

সহেলি
তার জন্য আপনার মতো শান্তিবাদীরাই দায়ী-
[এর মধ্যে ই-৫২ বিমানের শব্দ শোনা যায়। আর্ত-চীৎকার]

সহেলি
এই যে শুনুন ই-৫২ আবার বোমাবর্ষণ, উহ! আবার শিশুদের কান্না, নারীদের আর্তনাদ অসহ্য!

শুভ্র
এ জন্যেই বাঁচতে ইচ্ছে করে না।

সহেলি
এখন যদি একটা ধহঃর ধরৎ পৎধভঃ থাকতো। ফেলে দিতাম।
[আবার ই-৫২ বিমানের শব্দ। এ সময়ে আসে ‘রঞ্জনরূপী চে’’। স্প্যানিশ ভাষায় বলতে থাকে]

চে
 পেরোলা লুচা নোও তারমিনা- কে আবাং মিং নুত্রত্রেশ রেবেলদেস।

শুভ্র
ঐ যে- ঐ যে- সেই ঝাউবনের প্রেতটাকে আমি দেখেছি-

সহেলি
আমিও-

শুভ্র
না না- সেই প্রেতটার রঙ অদ্ভুত খয়েরি- চোখ দু’টো একেবারে বানরের মতো- চোয়ালটা ডাইনোসারের মতো। ও শুধু খেতে আসছে কিন্তু এতো অন্য রকম-
[চে’ এবার চুরুট ধরায়]

সহেলি
হ্যাঁ, এতো মানুষ-

চে
সান্তাকারা- সান্তিয়াগো-
[চে বেরিয়ে যায়]

শুভ্র
লোকটা একটা তীব্র নাটকীয়তা সৃষ্টি করলো কিছুই বুঝলাম না-

সহেলি
আমি অবশ্য একটা কথা বুঝতে পেরেছি তা হল সান্তাকারা- এটা একটা জায়গার নাম-

শুভ্র
হতে পারে, কিন্তু ভাষা তো বুঝলাম না-

সহেলি
চেহারায় একটা আদল আছে খুব চেনা-

শুভ্র    
একটা আবার অনিশ্চয়তায় পড়ে গেলাম। ঘোর অনিশ্চয়তা। কি যে হল! কেন এলাম-

সহেলি
শুনুন এ অবস্থায় মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হয়- আপনি তো গান জানেন- একটা গান ধরুন না-

শুভ্র
গান- সামনে মেশিনগান বসে আছে, আমার গানের স্বরলিপি না সব ভেঙে -চুরে চুরমার-

সহেলি
এখন বুঝুন অস্ত্র কত শক্তিশালী- ধরুন তো- ধরুন না-

শুভ্র
এভাবে বলছেন যে, আপনিও অস্ত্রের জোর দেখাচ্ছেন-

সহেলি
হ্যাঁ দেখাচ্ছি-

শুভ্র
তাহলে চেষ্টা করি-
[শুভ্র গান ধরে]

গান
সামনে বিস্তীর্ণ পারাবার
পেছনে ধুধু বালুচল
আকাশটা হঠাৎ কালো
মাঝে মাঝে বোমারুর শব্দ
সেই সাথে অশ্বের ধ্বনি।
কারা যেন কেঁদে কেঁদে কী কয়ে যায়।

সহেলি
বেশ তো- থামলেন কেন?

শুভ্র
সুরটা হতে হতে হচ্ছে না- মেলোডিটা খুঁজে পাচ্ছি না-

সহেলি
বুঝেছি ভয়- ভয় ঢুকেছে-

শুভ্র
ঢুকবে না। আপনার ভয় নেই? ভয় কে না পায়?

সহেলি
আমার ভয় কম! অস্ত্র থাকলে ভয় কাছে আসে না।

শুভ্র
অস্ত্রের কথা বলবেন না তো-
[শুভ্র আবার গান ধরে। গান গাইতে গাইতে ক্যামিলোতে রূপান্তরিত হয়]

গান
সামনে বিস্তীর্ণ পারাবার
পেছনে ধুধু বালুচল
আকাশটা হঠাৎ কালো
মাঝে মাঝে বোমারুর শব্দ
সেই সাথে অশ্বের ধ্বনি।
কারা যেন কেঁদে কেঁদে কি কয়ে যায়।

[চে’ আসে]
চে
আলেইদা, আলেইদা, আমার রাইফেলটা জ্যাম হয়ে গেছে, মাথার বাঁ দিক দিয়ে একটা গুলি চলে গেলো- হ্যাঁ দ্যাখো তো রক্ত ঝরছে নাকি? সান্তাকারা রেল স্টেশনের পাশে আমরা। ট্রেন লাইন উপড়ে দিয়েছি। বাতিস্তার সৈনিকরা অর্ধেক মারা গেছে। দ্যাখো তো রাইফেলটার কি অবস্থা- উহ! হঠাৎ করে আমার হাঁপানিটাও বেড়ে গেলো-
[সহেলি দ্রুত রূপান্তরিত হয় আলেইদায়]

আলেইদা
এরনেস্তো! তুমি বেঁচে আছো এরনেস্তো- এইমাত্র রেডিওতে বলেছে এরনেস্তো মারা গেছে। তার সহযোগী গেরিলাদের নিয়ে সে মারা গেছে।

চে
হ্যাঁ, মিথ্যে প্রচারনাই বুর্জোয়াদের প্রধান অস্ত্র-
[আলেইদা অস্ত্রটা দেয়]

আলেইদা
এই যে নাও, ম্যাগাজিনে একটা ছোট্ট সমস্যা হয়েছিলো এখন ঠিক হয়ে গেছে-

চে
চলো- ইতোমধ্যে হয়তো রেডিও স্টেশন দখল হয়ে গেছে- গেরিলাদের সামনে আমাকে কিছু বলতে হবে সেখানে- [ক্যামিলো আসে] কি সংবাদ ক্যামিলো?

ক্যামিলো
রেডিও স্টেশন দখল হয়েছে-

চে
সাবাস! কিন্তু তুমি বিষণ্ন কেন?

ক্যামিলো
সুইসাইড স্কোয়াডের সেই কিশোর ভাকিরিতো নিহত হয়েছে-

চে
ভাকিরিতো-
[তিনজনই অবনত হয়]

ক্যামিলো
Viva la Vakirito-

আলেইদা
Viva la Revolution-
[চে একটা মাইক্রোফোনের সামনে। রেডিওতে তার কন্ঠস্বরও শোনা যাবে]

 চে
প্রিয় সান্তাকারাবাসী,
এই শহরে আমাদের যুদ্ধ প্রায় শেষ পর্যায়ে। আমরা শহরের সবগুলি স্থাপনা দখল করেছি। আমাদের গেরিলাদের সাহসিকতাপূর্ণ লড়াই, জনগনের অসামান্য সহযোগিতা এ জাতির মুক্তির ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

 প্রিয় বন্ধুগণ, আজ এই মুহূর্তে আমি দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলতে হচ্ছে, আমাদের সবার প্রিয় এক কিশোর বন্ধু- এই রেডিও স্টেশন দখল করার আগে সুইসাইড স্কোয়াডের নেতৃত্ব দিচ্ছিলো। বুকে গ্রেনেড নিয়ে সে অপেক্ষা করছিলো। গ্রেনেডটি এই স্টেশনের রক্ষীদের হত্যা করেছে বটে কিন্তু তার বক্ষ-পিঞ্জরও ছিন্নভিন্ন হয়েছে। শহীদ হয়েছে ভাকিরিতো। কিশোর ভাকিরিতো।

 ভাকিরিতোর স্বপ্নভরা চোখ দু’টো আমার মনে পড়ে। তার চোখে দেশ এবং জাতির মুক্তির স্বপ্ন। ভাকিরিতোর সেই আঁধফোটা স্বপ্নগুলি যেন সফল হয় সেই জন্যেই আমাদের লড়াই। ভাকিরিতো এখন আমাদের লড়াইয়ের প্রতীক। ভাকিরিতো-
[দ্রুত শুভ্র, সহেলি চরিত্রে ফিরে আসে]

 শুভ্র
এটা কী হল? ঐ নাটুকে লোকটার কাজ-

সহেলি
না না- এতো নাটক নয়- সত্য। এসব আমার জানা কথা।

শুভ্র
আমিও আবছা জানি- কেমন করে দাঁড়িয়ে গেলাম- ক্যামিলো হয়ে গেলাম-

সহেলি
আমিও আলেইদা-

শুভ্র
এবার কিন্তু কেমন যেন আমার গান গাইতে ইচ্ছে করছে।

সহেলি
ভয় বুঝি কাটছে-
[শুভ্র গান ধরে]

গান
একটু একটু করে
সমুদ্রের মতো হৃদয়খানি
ঐ দিগন্তে মেলে ধরি।
একটু একটু করে
আলো ফিরে আসে।
ঐ দূর ঝাউবনে
ঐ দূর সৈকতে।
কী মধুর এই জীবনখানা
কী মধুর এই স্বপ্নখানা।

[গান গাইতে গাইতে সহেলি আলেইদায় রূপান্তরিত হয়। চে আসে]
চে
আলেইদা- আলেইদা- [আলেইদা আসে] অনেক রাত যদিও চাঁদটা ঢলে পড়েছে। যাবে?

আলেইদা
যাবো। আবার কেন জিজ্ঞেস করছো-

চে
কোথায় যাচ্ছি তা জিজ্ঞেস করলে না?

আলেইদা
এরনেস্তো আমার কমান্দান্তে যেখানে যাবে সেখানেই তো লড়াই-

চে
এখন হাসপাতালে যাবো। অনেক আহত মানুষ তারপর যাবো ব্রীজটা ওড়াতে- চলো- [হঠাৎ জীপের শব্দ] এত রাতে কে এলো? কে? [স্প্যানিশ ভাষায়] সেন্ট্রি- সেন্ট্রি-
[দু’জনেই অস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত। শব্দ হয় বেশ কয়েকটা]

আলেইদা
এতো আমাদের শিবির- এখানে শত্রু ঢুকবে কি করে?

চে
শত্রু তো তোমার আশেপাশেও থাকতে পারে। বহুবার তা ঘটেছে। গেরিলা যুদ্ধের নিয়মই তো তাই। সর্বদা চলমান থাকা, সর্বদা বিশ্বাস না করা, সর্বদা সজাগ রক্ষী রাখা। নিজের ছায়াকেও বিশ্বাস না করা-
[রাউল আসে]

রাউল
আমি রাউল- রাউল ক্যাস্ট্রো-

চে
এসো বন্ধু- এসো-

রাউল
কে? ইলদা নাকি? মেক্সিকো থেকে এসে পড়েছে এখানে?

চে
না না- ও ইলদা নয় আলেইদা, এখানকার মেয়ে। গেরিলা-

রাউল
শুধু এখানকার মেয়ে- শুধু গেরিলা নাকি তোমার বন্ধুও-

চে
হ্যাঁ- প্রথম দুটো শব্দ ঠিক- তৃতীয়টা সময়সাপেক্ষ-

রাউল
একটা জরুরি কাজে, মানে সিদ্ধান্তের জন্যে তোমার কাছে আসা। আলেইদা কি থাকতে পারে?

চে
না। বন্ধুত্ব, যুদ্ধ রাজনীতি এ সবই এক আমার কাছে। তবুও কিছু বিষয় আছে যা সত্যিই গোপনীয়-

আলেইদা
বুঝতে পেরেছি সর্বদা বিশ্বাস না করা- ঠিক আছে।

রাউল
ইলদার সাথে যোগাযোগ আছে?
[চুরুট বিনিময়]

চে
আছে, মার সাথে যতটুকু আছে ততটুকু-

রাউল
মেক্সিকোতে ইলদার সাথে তোমার বিয়ের আমি সাক্ষী ছিলাম। সে এক চমৎকার স্মৃতি-

চে
আলেইদাকে দেখেই কি তা মনে পড়ল?

রাউল
হ্যাঁ- এর পরিণতিও সে দিকে যাচ্ছে?

চে
সান্তাকারা থেকে সান্তিয়াগো, যুদ্ধ চলছে, যুদ্ধের পরিণাম যেমন অনিশ্চিত, আলেইদার সাথে সম্পর্কের পরিণতিটাও তেমনি- থাক চলো হাসপাতালে যাই, আমার ছোটখাট অনেক অপারেশন আছে-

রাউল
ডাঃ এরনেস্তো, হাসপাতাল অপারেশন, শত্রুর ঘাঁটি অপারেশন, দু’টোতেই সমান দক্ষ- ডাঃ এরনেস্তো, কমান্দান্তে এরনেস্তো-

চে
আর কিছু বলতে ইচ্ছে করছে না?

রাউল
ডাঃ এরনেস্তো, কমান্দান্তে এরনেস্তো- রোমান্টিক এরনেস্তো চে গেভারা- শোন আমি কিছু আমেরিকানদের কব্জা করেছি। মুক্তিপণ হিসেবে চাইছি ই-৫২ বিমান দিয়ে নিরীহ মানুষকে এভাবে হত্যা করা চলবে না, আর আমাদের কিছু বন্দী ছেড়ে দিতে হবে-

চে
খুব ভালো কথা-

রাউল
কিন্তু ফিদেল বলছে ওদের ছেড়ে দিতে- কারণ ওরা সাধারণ আমেরিকান। আমেরিকার জনগণের আমাদের প্রতি যে সমর্থন আছে তা নাকি আমরা হারাবো-

চে
ফিদেল মানবতাবাদী, তার কথা ভাবতেই হবে। কিন্তু এ ঘটনায় হোয়াইট হাউজের টনক নড়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বোমারু বিমানগুলো বসে আছে। সেগুলো চালাচ্ছে এখানে। দু’চারটে দিন আমেরিকানরাও থাকুক না আমাদের কাছে-

রাউল
তুমি একটু বুঝিয়ে বলবে কি?

চে
প্রয়োজনে আমরা একসাথে যাই-

রাউল
ঠিক আছে- আমি একটু কফি খাই, ক্লান্ত লাগছে-
[চলে যায়]

চে
আলেইদা- আলেইদা- [আলেইদা আসে, চোখে ঘুম] প্রায় সকাল হয়ে আসছে, তুমি থাকো।

আলেইদা
কেন?

চে
তোমার চোখে ঘুম- সে এক ঘুমের দেশের গল্প তোমায় বলবো-

আলেইদা
তাহলে তো আরো ঘুম পেয়ে যাবে-

চে
ঘুমের দেশের গল্প তোমায় শোনাই- শোন, রূপকথা নয় কো নয়- সে এক ঘুমের দেশ। প্রজারা সব ঘুমিয়ে থাকে, রাজা অত্যাচারী, প্রজাদের সম্পদ লুন্ঠন করে খায়। সে ঘুমায় না। এক যুবক হঠাৎ চীৎকার করে প্রজাদের ঘুম ভাঙালো। প্রজারা ক্ষিপ্ত হয়ে ঐ যুবকের টুটি চেপে ধরলো- বললো, আমাদের অন্ন নেই, বস্ত্র নেই, শিক্ষা নেই। ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই মৃত্যুর ঘারে বরণ করবো আমরা।

কেন তুমি জাগালে? তরুণ বললো- এভাবে মরণও সম্ভব নয়। তার চেয়ে এসো লড়াই করে মরি। তাতে তো আমাদের ভাগ্য পাল্টেও যেতে পারে। কেউ কেউ রাজী হল। তারপর শুরু হল পথ চলা। রাজা যেখানে থাকে সে অনেক দূর, পাহাড় পর্বত, নদী-সমুদ্র পেড়িয়ে। মাঝখানে অনেক লড়াই হল। রাজার সৈনিকরা মারা পড়ল, মারা পড়ল প্রজারাও। প্রজাদের সংখ্যা বাড়তে শুরু করলো। ক্ষিপ্ত প্রজার দল রাজ সিংহাসন দখল করে নেয়, রাজা যায় পালিয়ে। লুন্ঠিত সম্পদ উদ্ধার করে প্রজার দল। কিন্তু কোথায় সেই যুবক তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। হ্যাঁ একসময় এক গভীর অন্ধকারে পথ হারিয়ে ফেলেছিলো প্রজাকূল, কোথাও আলো নেই, তখন সেই যুবক বুকটা চিরে হৃদপিণ্ডটা খুলে এনেছিলো। চারিদিক আলোকিত করেছিলো সেই যুবকের হৃদপিণ্ড। আলো ফুটতেই হৃদপিণ্ডটা নিভে গেলো। যুবক পড়ে রইলো পথের ধুলোয়। মানুষের ঘুম ভাঙলো-আমাদের লাতিন আমেরিকাও তাই ঘুমের দেশ-

আলেইদা
আর তুমি বুঝি সেই যুবক-

চে
না, আমার চেয়ে অনেক অনেক শক্তিমান যুবক-যুবতী এদেশে আছে আলেইদা।
[ওরা চলে যায়। রাউল রূপী শুভ্র আবার নিজের চরিত্রে ফিরে আসে। শুভ্র গান ধরে]

গান
সাইকেলটা পৌঁছে গেলো
সান্তাকারা থেকে সান্তিয়াগো
বন্ বন্ বন্ বন্ করে।

আলেইদা
এরনেস্তো এরনেন্তো- [বেড়িয়ে আসে চে-রূপী রঞ্জন] সেই কুখ্যাত কর্ণেল ধরা পড়েছে।

চে
কে? কর্ণেল এরনানদেজ-

আলেইদা
না-

চে
তাহলে ফারনান্দো সুয়েবো-

আলেইদা
না-

চে
তাহলে কে? কর্ণেল কার্সিয়াস-

আলেইদা
হ্যাঁ কার্সিয়াস-

চে
কোথায়?

আলেইদা
ভিক্তর তেরোজা নিয়ে এসেছে

চে
পাঠিয়ে দিতে বলো।
[কার্সিয়াস-রূপী শুভ্রকে আলেইদা নিয়ে আসে]

চে
আসুন কর্ণেল, আসুন। কি খাবেন? কফি না মাতে- মাতে হচ্ছে আরহেনতিনার পানীয়- চা, কফির মতোই। বসুন- আলেইদা দু’কাপ কফি দেবে?

আলেইদা
কফি! কার জন্যে?

চে
কর্ণেলের জন্যে-

আলেইদা
লোকটা ঠাণ্ডা মাথায় আমাদের কতো নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে। সান্তাকারার সব মানুষ তা জানে- চুরুট দিয়ে ও আমার এক বোনের ছেলেকে হত্যা করেছে। আমার বান্ধবীর মুখ ঝলসে দিয়েছে-

চে
ঠিক আছে কিন্ত এখন তো কর্ণেল আমাদের বন্দী- বন্দীরও মর্যাদা আছে।

আলেইদা
আমি পারছি না- লোকটাকে সহ্য করতে পারছি না-

চে
আলেইদা, বন্দীদের প্রতিও আমাদের নৈতিকতা আছে তা কিন্ত ওদের মতো নয়। ঠিক আছে তোমাকে দিতে হবে না। আমি নিজেই বানিয়ে নেবো- কর্ণেল এত সুনাম আপনার-

কার্সিয়াস
আমি জানতাম না। বাতিস্তা একটা শুয়োরের বাচ্চা। কি করেছে জানেন তো- ক্যাম্প কলম্বিয়ায় থার্টি ফাস্ট নাইটে আমাদের ডাকলো। এক ঘরে এসে বলে গেলো আমাদের সেনা প্রধান কান্তিয়োর হাতে ক্ষমতা দেবেন। ক্ষমতাটা দিলেই কিন্তু আপনাদের কাছে আমরা সারেন্ডার করি। অন্য ঘরে গিয়ে করলো কী? সুপ্রীম কোর্টের জর্জ কার্লোসকে প্রেসিডেন্ট করলো। আত্মীয়-স্বজন নিয়ে শালা ভেগে গেলো ডোমেনিকান রিপাবলিকে। আমার মনটা এতো খারাপ হয়ে গেলো যে আমিও সব কিছু ছেড়ে ছুড়ে চলে এলাম-
[কফি নিয়ে আসে আলেইদা]

আলেইদা
কর্ণেল কি সারেন্ডার করতেই এসেছেন-

কার্সিয়াস
হ্যাঁ তো-

আলেইদা
মিথ্যে কথা- ভিক্তর সব বলেছে। আপনিও বাতিস্তার মতো পালিয়ে যাচ্ছিলেন-

চে
ঠিক আছে বলুনতো কর্ণেল কতজনকে ঠাণ্ডা মাথায় সিগারেট খেতে খেতে হত্যা করেছেন?

কার্সিয়াস
ছিঃ:ছিঃ ছিঃ কী যে বলেন- আমি তো- একটা ফুলেও টোকাও দেই নি কাউকে- আমি ওরকম না কমান্দান্তে- আমার একটা পিঁপড়ে মারার ক্ষমতাও নেই-

চে
আপনার হাতটা দেখি- এখনো জমাট বাঁধা রক্ত দেখতে পাচ্ছি- ণড়ঁৎ যধহফং ধৎব ভঁষষ ড়ভ নষড়ড়ফ- ঠিক আছে যান, আপনি অপেক্ষা করুন, আমরা একটু পরেই বিচারে বসবো-

কার্সিয়াস
একটা অনুরোধ করি কমান্দান্তে, আমাকে ঐ বাচ্চা বাচ্চা গেরিলাদের হাতে দেবেন না- আমাকে ছিঁড়ে ফেলবে-

চে
আপনি ধরা পড়ার পর এখানে আশা পর্যন্ত কেউ আপনাকে মারধর করেছে?

কার্সিয়াস
না- তা করে নি- শুধু ধরা পড়ার সময় একটু আধটু ধস্তাধস্তি এই যা-

চে
অথচ আলহেন্দ্রো যখন ধরা পড়েছিলো কি করেছিলেন তাকে? চুরুট দিয়ে আপনি নিজে পা থেকে মাথা পর্যন্ত ঝলসে দিয়েছেন। রাইফেলের বাট দিয়ে অজ্ঞান না হওয়া পর্যন্ত মেরেছেন, নাকটা বেঁধে একটু একটু করে পানি ঢেলেছেন- কোনো সৈনিক নয়, এ কাজ আপনি নিজে করেছেন। এমনি একটা নয় হাজারটা। এবার বলুন কর্ণেল, মিয়ামিতে ক’টা বাড়ি কিনেছেন? ডিপার্টমেন্টাল স্টোর। আমরা সব জানি- তবে বিচার সে আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন- ফিদেল আইনের ছাত্র, কঠোর বিচারক- এখানে যদি আপনার মৃত্যুদণ্ডও হয় আপনি শান্তিতে মরতে পারেন, কারণ কোনো অবিচার হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
[কার্সিয়াস পায়ে পড়ে যায়]

কার্সিয়াস
আমাকে বাঁচান, সারা-জীবন আপনার গোলাম হয়ে থাকবো। মেক্সিকো, আরহেনতিনায় আপনার দেশেও আমার পাঁচটা ভিলা আছে সব দিয়ে দেবো আপনাকে-

চে
এবার কর্ণেল একটা থাপ্পড় সত্যিই পাওনা হয়ে গেলো- ভিক্তর নিয়ে যাও-
[চে-রূপী রঞ্জন চলে যায়]

গান
তারপর সাগর পাড়ি দিয়ে
তেপান্তরের মাঠ পেড়িয়ে
বন্ বন্ বন্ বন্ করে।

[পূর্ণিমা রাত। এবারও হাঁপানি হচ্ছে, জীপের পেছনে বসে চে আর আলেইদা]
চে
গ্রানমা জাহাজে জায়গা ছিলো মাত্র ১২ জনের, আমরা উঠেছিলাম ৮০ জন, সে কি ঢেউ সাগরের, তারপর একসময় চরায় আটকে গেলো। আমরা অর্ধেক অস্ত্র-সস্ত্র নিয়ে নামলাম। ভাগ্য ভালো ছিলো সমুদ্র সৈকত জুড়ে ছিলো আখ ক্ষেত সেখানে নামতেই শুরু হল বাতিস্তার সৈন্যবাহিনীর আক্রমণ। সে ভয়াবহ আক্রমণে আমরা সবাই ছিন্নভিন্ন। ভীষণ হাঁপানিতে আমি জর্জরিত। হাঁটতে পারছি না দৌঁড়াতে পারছি না। চারিদিকে গুলি। রক্তাক্ত মানুষ পড়ে আছে। আমার ডাক্তারি নৈতিকতায় লাগছে। সব অপরিচিত- শুধু মাত্র চাঁদটা ছাড়া। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে মনে হল চাঁদটা না থাকলেই ভালো হত। অন্ধকারে আমাদের আত্মাটা সহজ হতো হয়তো।

আলেইদা
হাভানা আর কত দূর-

চে
জানি না, আমি কখনো হাভানায় যাই নি-

আলেইদা
আমিও না, আমার জীবনে একটা শহরই দেখেছি সে হচ্ছে সান্তাকারা- প্রথম দেখা শহর, প্রিয় শহর, বাতিস্তার সৈনিকরা কেমন ছিন্নভিন্ন করে ফিরে গেলো শহরটাকে। আমরা রক্ষা করলাম আর সব জায়গায় বলা হচ্ছে আমরাই নাকি শহরটাকে ধ্বংস করেছি।

চে
আমরা ধ্বংস করি সৃজনের জন্যে- ওরা ধ্বংস করে একটা সভ্যতাকে ধ্বংস করার জন্যে।

আলেইদা
হাঁপানিটা বেড়েই চলেছে-

চে
আমাকে কম্বলটা দিয়ে চেপে ধরো-

আলেইদা
তোমার এত কষ্ট তাও তোমার মধ্যে ক্লান্তি নেই এরনেস্তো।

চে
এ কষ্ট আমার তিন বছর বয়স থেকে। ও আমার জীবনের অলংকার হয়ে গেছে। আমি যখন ডাক্তারি পড়ি তখন একটা শিশুকে দেখেছিলাম, মুহূর্তে মৃত্যুর পাশে তার শীর্ণকায় মা, স্তনে দুধ ছিলো না। অনেক পরীক্ষা করে দেখা গেলো শিশুটির কোনো রোগ নেই। রোগ দারিদ্র। আর সেই রাতেই বুয়েনস্ আয়ার্সের ধনকুবের রেবেলতো মার্কোসের বাড়িতে কুকুরের বিয়েতে যে খাদ্যের অপচয় হয়েছিলো তাতে ওরকম হাজার হাজার শিশুর খাবারের ব্যবস্থা হয়। ওহ্ পৃথিবীতে এতো অসাম্য-

গান
জানুয়ারির দুই তারিখে
এগিয়ে চলেছে এরনেস্তো।
যেতে হবে তাকে লা-কাবানিয়ায়
আর ঐ চলেছে ক্যামিলো।
ঐ যে এগিয়ে চলেছে
রাউল আর ফিদেল ক্যাস্ট্রো।
এগিয়ে চলেছে এরনেন্তো
আলেইদা তার সাথেই আছে।
পৌঁছে গেছে এরনেস্তো
লা-কাবানিয়ার দূর্গে।

[জানুয়ারির ৩, এর মধ্যে সারেন্ডার করেছে বাতিস্তা সেনা। এরনেস্তো দাঁড়াল শেখানে- বলল]
চে
কমরেড, তোমার সেনাবাহিনীর লোকেরা খুব ভালো জানে কীভাবে মার্চ করতে হয় কিন্তু আমার বাহিনীর গেরিলারা জানে কীভাবে লড়াই করতে হয়।

গান
চারিদিক থেকে গেরিলারা পৌঁছে গেছে হাভানা।
হাভানা- হাভানা- হাভানা।
ওরা চলে যায়। শুভ্র চাঁদের আলো দেখছে।

শুভ্র
এই যে কোথায় আপনি আসুন- আসুন- কী চমৎকার চাঁদের আলো- ‘চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে- উছলে পড়ে আলো- ও রজনীগন্ধা তোমার গন্ধ সুধা ঢালো’’
[এসময় সহেলি গান গাইতে গাইতে এসে দাঁড়ায়]

সহেলি
অনেক পূর্ণিমা রাতে যখন সব কিছু অচেনা হয় তখন চেনা যায় কী কী?

শুভ্র
গাছপালা, সমুদ্র, পথ-ঘাট, পাহাড়-জঙ্গল।

সহেলি
এসবও অপরিচিত হয়ে যায়- কতবার আমি পথ হারিয়েছি-

শুভ্র
ঠিক- ঠিক-

সহেলি
কিন্তু অচেনা হয় না চাঁদটা, সূর্র্যটা- ঐ যে দেখুন নক্ষত্র-মণ্ডল

শুভ্র
হ্যাঁ, কারণটা কী?

সহেলি
কারণ হচ্ছে ওরা যে মানুষের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। ই-৫২ বিমান ওদের তাড়া করতে পারে না কিন্তু গাছ-পালা, পর্বতমালা এসব ধ্বংস করতে মানুষের একমুহূর্তও সময় লাগে না।

শুভ্র
আমাদের আজ কিসে কী হয়ে যাচ্ছে বলুন তো-

সহেলি
ঐ নাটুকে লোকটাই এসবের জন্যে দায়ী-
[চে’র জামাটা খুলতে খুলতে আসে রঞ্জন]

রঞ্জন
আমার বিরুদ্ধে লড়াই করতে, আমারই হাতে হাত রেখে। বুঝতে পারছো না? সেই লড়াই শুরু হয়েছে। এই আমার ধ্বজা, আমি ভেঙে ফেলি ওর দণ্ড, তুমি ছিঁড়ে ফেলো ওর কেতন। আমারই হাতের মধ্যে তোমার হাত এসে মারুক, মারুক সম্পূর্ণ মারুক- তাতেই আমার মুক্তি।- রক্তকরবী- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

শুভ্র
জানি তো কিন্তু আপনি কে?

রঞ্জন
আমি রঞ্জন-

শুভ্র
এতো নাটকের চরিত্র-

রঞ্জন
হ্যাঁ আমার অন্য কোনো নাম নেই আমি রঞ্জন, আমি জুলিয়াস সীজার, আমি শাজাহান, আমি মুকুন্দ দাস, আমি কমাদান্তো, এরনেস্তো, চে গেভারা সেরন-
[আবার বজ্রের শব্দ]

শুভ্র
ওস্তাদ বুঝলাম না আপনি চে’কে নিয়ে টানা হেঁচড়া করছেন কেন?

রঞ্জন
তোমার কি মনে হয় ইয়াং ফ্রেন্ড-

শুভ্র
চে’র নামে টি-শার্ট আছে, মগ আছে, এই যে আমার গলায় চেন আছে, এই তো যথেষ্ট-

রঞ্জন
মানে চে তোমাদের কাছে একটা ফ্যাশান-

শুভ্র
শুধু আমার কাছে কেন? সারা দুনিয়ার, এমন কি যাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে সেই খোদ সম্রাজ্যবাদী মার্কিনীদের কাছেও-

রঞ্জন
এই মোটা দাগের কথাবার্তা একদম পছন্দ না আমার- আচ্ছা আমেরিকাতে কি কোনোদিন বিপ্লব হবে না? সে দেশে বিপ্লবী নেই?

শুভ্র
নেই ওস্তাদ- থাকলে সারা দুনিয়ায় ওরা দাবড়ে বেড়াতো না- অসভ্য-বর্বর।

রঞ্জন
চে’কে একটা কারণেই দরকার-

সহেলি
একটা ছোট্ট গেরিলা দল নিয়ে একটা দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করা সম্ভব-

শুভ্র
এখন সম্ভব না-

রঞ্জন
আমি মনে করি তাও না। সারা পৃথিবীর এই যে ভাবনাটা এটা ভাবছে ‘কোলা’ গ্রুপ, মুনাফার জন্যে। আর চে কী ভাবতে পারে? এই যে সারা দুনিয়া, সারা দুনিয়ার কথা ভাবতে পারে, সে জন্যেই চে’কে ওরা ফ্যাশনের দোকানে বসিয়ে দিয়েছে। সারা দুনিয়ার মানুষ খাবে-

সহেলি
আমি একমত নই- চে’কে ওরা ভয় পায়। তাই পুজোর ঘরে তুলে রেখেছে-

রঞ্জন
সেটাও হতে পারে। মাও-কে যেমন চীনারা দেবত্বে নিয়ে গেছে। তবে চে’র ক্ষেত্রে এরকম হবার কথা নয়।

শুভ্র
ওস্তাদ সারা দুনিয়ার কথা ছেড়ে দিন। আমাদের দেশে ইতিহাসের চাকা যারা উল্টো দিকে নিয়ে যাচ্ছে মানে দুষ্ট মৌলভী-

রঞ্জন
এরাতো মুষ্টিমেয়- সমগ্র মানুষ এদের বিরুদ্ধে এমনকি ধার্মিক মানুষও-

সহেলি
চে ওদের দূর্গে গেরিলা হামলা চালাতো ওদের গ্রেনেড দিয়ে ওদেরই নির্মূল করে দিতো।

রঞ্জন
একটা চে থাকলে কি এই ধর্ম ব্যবসায়ীদের উত্থান হয়! [স্প্যানিশ ভাষায় একটি সংলাপ বলে]

সহেলি
কী ভাষায় বলছেন আমরা বুঝতে পারছি না।

রঞ্জন
স্প্যানিশ-

শুভ্র
বুঝলাম স্প্যানিশ ভাষা- আচ্ছা ওস্তাদ এর অর্থ কী?

রঞ্জন
আমরা পৌঁছে গেছি হাভানা উপকন্ঠে- যে লড়াই শুরু হয়েছিলো গ্রানমা জাহাজ থেকে তা আজ প্রায় শেষের দিকে। কিন্তু লড়াই কখনো শেষ হয় না।

গান
জীবনটা যেন এক জীবন্ত সাইকেল
বন্ বন্ বন্ বন্ করে ঘুরছে।
[রঞ্জন চে’তে রূপান্তরিত হয়]

চে
ফিদেল- আমি যা পারি তুমি তা পারো না- তুমি রাষ্ট্র নায়ক তুমি রাষ্ট্র গড় কিন্তু আমি আমার এখানে যা করবার ছিল আমি তা করে দিয়েছি। আমাকে যেতে হবে এখন কঙ্গো, যেতে হবে আর্জেন্টিনা, মেক্সিকো, এলসালভাদর, ইকুয়েডরের দেশে দেশে- এই যে তোমার মন্ত্রীত্ব রইলো- ফিরিয়ে দিচ্ছি তোমার নাগরিকত্ব। এবার আমাকে বিদায় দাও বন্ধু।

ফিদেল
নুয়াত্রেস্ রেবেলদেস্ নো তারমিনা- এ তুমি কি বলছো কমাদান্তে- এতবড় বিপ্লব আমি একা কী করে সামাল দেব- দেশের মানুষ যখন ঘুমিয়ে ছিলো তখন শাসকেরা আরামে দেশ শাসন করতো কিন্তু জেগে ওঠা একেকটা মানুষ একেকটা অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো- তারা দাবানলের মতো জ্বলে উঠেছে- সারা সম্রাজ্যটাকে তারা পাল্টাতে চাইছে। চেয়ে দেখ চারিদিকে কী-রকম কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে। এতো বড় বিপদ আমার একার পক্ষে সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। কিউবার জনগণের কাছে তুমি সবচাইতে প্রিয়, শুধু প্রিয় নও গ্রহণযোগ্য। তোমাকে হত্যা করার জন্যে ষড়যন্ত্রকারীরা যেদিন বোমা ফাটালো তখন তুমি দেখ নি সারা দেশের মানুষ কী রকম ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠলো। মাত্র নব্বই মাইল দূরে আমেরিকার মিয়ামি শহর সেখান থেকে আমাদের আন্দোলনকে স্তব্ধ করার জন্য প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে। আমার স্ত্রী, আমার কন্যা, এমনকি আমাদের জাতির পিতা হোসে মার্টিকে পর্যন্ত তারা ব্যবহার করছে। আর এই অসময় তুমি চলে যাবে চে।

চে
কিউবার বিপ্লবের চাকা ঘুরতে শুরু করেছে। আমার বিশ্বাস তা বন্ধ হবে না। কিন্তু তুমি ল্যাটিন আমেরিকার অন্য দেশগুলির দিকে তাকিয়ে দেখ- সেখানকার মানুষদের জাগাতে হবে।

ফিদেল
সে জাগানোর দায়িত্ব সে দেশের বিপ্লবীদের-

চে
হ্যাঁ- আমার মনে হয় কোথায় যেন একটা- হয়তো দেশলাইটা নেই- হয়তো দেশালাইটা আছে জ্বালাবার লোকটি নেই।

ফিদেল
কিন্তু চীন-রাশিয়া এরা তো যার যার মতো কাজ করছে।

চে
চীন তার যে সমস্যা তা নিয়েই বিব্রত- এই মাত্র সেদিন ভারতের সাথে তার সীমান্ত সংঘর্ষ আর রাশিয়ার সাথে তার সীমান্তের দ্বন্দ্ব লেগেই আছে।

ফিদেল
আর রাশিয়া-

চে
আর রাশিয়ায় বিপ্লবের চাকা উল্টোদিকে ঘুরতে শুরু করেছে। ভেবে দেখ এত পুরোনো কিউবার কমুনিস্ট পার্টি- আমরা সান্তাকারা দখল করার আগে তাদের সাথে আমরা কোনো আলোচনায় বসতে পেরেছি-

ফিদেল
ঠিক আছে- ঠিক আছে-আমার শিল্প বিপ্লবের কী হবে যার দায়িত্ব আমি তোমাকে দিয়েছি।

চে
তুমি আমাকে মানুষ তৈরি করতে বলেছিলে আমি তা করেছি-

ফিদেল
না- না- কমান্দান্তে- আমি মানতে পারছি না- কত রাত অন্ধকারে বাঙ্কারে বসে কত স্বপ্নের কথা বলেছি- সেই সব স্বপ্ন এখন হাতের মুঠোয় কমান্দান্তে। ভাকিরিতো মারা যাবার পর তুমি ঘুমোতে পারতে না। আলহেন্দ্রকে যখন নৃশংসভাবে হত্যা করা হল তখন তুমি প্রায় অর্ধ উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলে। ভিক্তর- গঞ্জালেস- আলেইদা কেউ তোমাকে সামাল দিতে পারছিলো না- আমি গেলাম তোমার কাছে তোমাকে স্পর্শ করলাম আমি আর তুমি কেমন শিশুর মতন কেঁদে উঠলে। কিউবার জনগণের জন্য এত ভালোবাসা তোমার চে, আর তাদের ছেড়ে তুমি-

চে
কিউবার জনগণের আমার জন্যে ভালোবাসা- তোমার কার্লিতোসকে মনে পড়ে কার্লিতোস- কার্লিতোসের সারা শরীরে বুলেট। রক্ত ঝরছে অবিরাম। তাকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা যখন ব্যর্থ হল তখন কার্লিতোসকে আমার বুকে জড়িয়ে ধরলাম। বীর কার্লিতোস একবারও তার প্রিয়জনের কথা বললো না। শুধু আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বললো- চে চে আমার চেয়ে কিউবার জনগণের তোমার প্রয়োজন বেশি। তুমি জীবিত থাকো। এমনি এমনি অনেক কার্লিতোস। আমি কার কথা শুনবো। তুমি ভেবে দেখ এলসালভাদর- ইকুয়েডর সেখানকার মানুষ জাগছে না।

ফিদেল
আমি তোমাকে বাধা দেবো না কমান্দান্তে- তোমাকে বাধা দেবার ক্ষমতা বা অধিকার কোনোটাই আমার নেই। ল্যাটিন আমেরিকার প্রতিটা দেশে বিপ্লবের জন্য আমিও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। কিন্তু বন্ধু একটি কথা ধৈর্য- অপেক্ষা-

চে
তুমি জানো এসবই আমার দুর্বলতা। আমি ধৈর্য ধরতে পারি না- আমি অপেক্ষা করতে পারি না কিন্তু আমি জানি বন্ধু লড়াইয়ের ময়দানে যে বন্ধুটি আমার পাশে সব সময় দাঁড়িয়ে আছে সে হচ্ছে আমার সব চাইতে ঘনিষ্ট বন্ধু ফিদেল ক্যাস্ত্রো। বিদায়- বিদায় বন্ধু।

চে
আলেইদা তোমাকে সাথে নিতে পারছি না। আমাকে ক্ষমা করো-

আলেইদা
কমান্দান্তে, মনে পড়ে সান্তাকারার সেই লড়াইয়ের রাত- সেদিন বলেছিলাম- যেখানে লড়াই সেখানেই কমান্দান্তে, আমিও তো তোমার একজন সৈনিক হয়ে থাকতে চাই। আমি লড়াইয়ে যেতে পারবো না, তাহলে এ জীবন যে আমার কাছে অর্থহীন-

চে
না আলেইদা, তুমি এ দেশের এক বীরাঙ্গনা, স্বদেশের জন্যে অনেক কিছু করার আছে তোমার। আমি এসেছিলাম তোমার দেশের বিপ্লবের প্রাণটা দিতে। কিন্তু প্রাণটা যখন বেঁচে গেলো, সেটুকু না হয় ব্যয় করি অন্য দেশের জন্যে-

আলেইদা
আমিও তো তাই করতে চাই, কিউবার মানুষ জেগে গেছে কিন্তু লাতিন আমেরিকার অন্য দেশ, তোমার সেই ঘুমের দেশের মতোই। তাদের জাগানোর জন্যে যে স্বপ্ন তুমি দেখিয়েছিলে তার জন্যে দিনের পর দিন আমি যে তৈরি হয়েছি।

চে
খুব ভালো। খুব আমার হৃদয় পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে কিন্তু গেরিলা যুদ্ধে একসাথে সে সব প্রাণ ব্যয় করা যাবে না। আমি না থাকলে তুমি থাকবে, তুমি প্রাণ দিলে ক্যামিলো থাকবে, ক্যামিলো চলে গেলে রাউল ফিদেল থাকবে। পৃথিবীতে সত্যকে ধরে রাখার মানুষ যে খুব বেশি নেই।

আলেইদা
কমান্দান্তে, বুঝতে পারছি তুমি স্বার্থপরের মতো একাই প্রাণ দেবে, সেখানে আমাকে সাথী করতে চাচ্ছো না। জানো সারাক্ষণ শুধু কী স্বপ্ন দেখি- শুনবে?

চে
বলো- শুনবো-

আলেইদা
আমি স্বপ্ন দেখি লা-কাবানিয়ার সেই মুহূর্তটি যখন আমাদের সামনে বাতিস্তার সেনাবাহিনীর জেনারেলরা একে একে আত্ম সমর্পণ। বিজয় গর্বে আমরা সকল গেরিলারা গান গাইতে গাইতে যার যার ঘরে ফিরে গেলাম। কবে সেদিন আসবে যেদিন পৃথিবীর সকল অত্যাচারী নিপীড়ক এমনভাবে আত্মপক্ষ সমর্পণ করবে বিপ্লবীদের কাছে?

চে
করবে, একদিন করবে।

আলেইদা
ইস! সেদিন হয়তো আমরা থাকবো না, যদি বেঁচে থাকতাম-

চে
কী বলছো থাকবো না- আমাদের এই দেহটা ক্ষণস্থায়ী ছোট্ট কিন্তু জীবন সেতো দীর্ঘ, সকলের জীবনগুলিকে জড়ো করেই তো আমাদের জীবন- সে জীবন কত বড়- কত বড় সে জীবন- আলেইদা বিদায় দাও- হয়তো ফিরে আসবো আর যদি না ফিরে আসি তাহলে আমার অনাগত সন্তানকে বলবে আমি রণাঙ্গনে আছি এমনকি আমার মৃত্যুর পরেও।
[আলেইদাকে আলিঙ্গণ করে বিদায় নেয় দু’জনের কাছ থেকে। দ্রুত ফিদেল ও আলেইদা শুভ্র ও সহেলিতে রূপান্তরিত হয়]

শুভ্র
পুতুল পুতুল পুতুল-

সহেলি
কি পুতুল পুতুল করছেন?

শুভ্র
নয়তো কি? পুতুল নাচের মতো দড়ি ধরে আমাদের নাচাচ্ছেন আর আমরা নেচেই চলেছি-

সহেলি
কথাটা কিন্তু সত্য হল না

শুভ্র
বন্ধু! না না আমার কোনো বন্ধু নেই-

সহেলি
বন্ধু নেই? আমারও নেই- ওটাই তো আমাদের রোগ, সারা দুনিয়ার মানুষ আমাদের বন্ধু হবার কথা। কিন্তু একটাও নেই।

শুভ্র
কথাটা একটু খোলাসা করে বলুন না-

সহেলি
আপনি বলুন তো এখানে আমরা যারা এসেছি কেন এসেছি-

শুভ্র
ভালো লাগে নি, কোথাও ভালো লাগে নি-

সহেলি
কেন?

শুভ্র
সে তো আগেই বলেছি-

সহেলি
গান গেয়ে জগতটা পাল্টাতে চান কিন্তু শ্রোতা নেই-

শুভ্র
অস্ত্র দিয়ে পাল্টাতে চান, জনগণ নেই-
[রঞ্জন আসে]

রঞ্জন
আমি তো একেবারে দেবতার মতো, ঘৃণার মতো, অবজ্ঞার মতো একা, আমার চারপাশে কেউ কখনো ছিলো না, কেউ কখনো নেই- টিনের তলোয়ার, উৎপল দত্ত।

সহেলি
তাহলে নিষ্ঠুর কথাটা এবার বলি-

শুভ্র
বলুন-

সহেলি
আমরা আসলে নিজেদের ছাড়া কাউকে ভালোবাসি নি- একটাই চেয়েছি তা হল আত্ম-প্রতিষ্ঠা-

শুভ্র
মিথ্যে কথা!

রঞ্জন
না না তোমার কথা সবটা ঠিক নয়, আমি তা চাই নি- ভালোবাসতে চেয়েছি কিন্তু সবাই সরে গেছে আমার কাছ থেকে-

সহেলি
সেটা কেন? এরনেস্তোর চার পাশে এত মানুষ কেন? এরনেস্তোর কাছে দ্যাখো দেশ নেই, জাতি নেই, ধর্ম নেই, বর্ণ নেই সবাই বন্ধু- এমন কি এক বৃদ্ধা হাঁপানিতে মারা যাচ্ছে তার পাশে সারা রাত চিকিৎসা করলো মারা যাবার পরে তাকে নিয়ে কবিতা লিখছে সে-

গরীব বুড়ি মারিয়া/ প্রার্থনা করো না ঐ নির্মম ইশ্বরের কাছে/যে তোমার বাঁচার আশা কেড়ে নিয়েছে সারা জীবন/ মৃত্যু থেকে মুক্তি চেয়ো না/ সারাটা জীবন ক্ষুধা তোমার শরীরের/ পরতে পরতে জড়িয়ে ছিলো/ জীবনের শেষে জুটলো হাঁপানি
আমি তোমার কাছে বলতে চাই/ নিচু স্বরে বীর্য্য দৃপ্ত আশা নিয়ে/ গাঢ় লাল প্রতিহিংসা নেব এর।/ শান্তিতে বিশ্রাম করো বৃদ্ধা মারিয়া/ শান্তিতে বিশ্রাম করো হে প্রাচীন যোদ্ধা/ তোমার সন্তানেরা সূর্যোদয় দেখবে দেখবেই।

সহেলি
কিন্তু এই হৃদয় আমাদের আছে?

রঞ্জন
এই যে অগ্নিকন্যা এত বড় বড় কথা যে বলছো তারপর তুমিও একা কেন?

সহেলি
আমি নারী-

শুভ্র
অবলা-

সহেলি
না অবলা নই কিন্তু বলুন কোথায় নারীর গুরুত্ব আছে?

শুভ্র
সব জায়গায়।

সহেলি
আসলে কোথাও নেই-

শুভ্র
নেই মানে! তানিয়া-

সহেলি
তানিয়া- কোন তানিয়া

রঞ্জন
ইস্পাত-র তানিয়া- গোর্কির তানিয়া-

শুভ্র
চে’র বন্ধু-

সহেলি
তারপর কত সন্দেহ তাকে নিয়ে, ইতিহাসের পোস্ট মর্টেমে সে কখনো কেজিবি’র চর কখনো যাকগে-

রঞ্জন
তবে মাল একটা পাওয়া গেছে বলিভিয়ার কম্যুনিস্ট পার্টির সেক্রেটারী জেনারেল-

শুভ্র
হ্যাঁ দেশের কাজ ফেলে সে ঘুরে বেড়ায়- আজ হাভানা, কাল বুলগেরিয়া- নাকের ফোড়া কাটাতে যাচ্ছে মস্কো- চে’র কাছে চেয়ে বসলো- যতদিন বলিভিয়াতে সংগ্রাম চলবে ততদিন সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব তার হাতে থাকবে-

রঞ্জন
নাম মনে পড়েছে মোন হে-

সহেলি
আগেই আমার ভাগটা বুঝে নিতে হবে-

শুভ্র
চে ব্যাটা কি করলো-

রঞ্জন
প্রত্যাখ্যান- গেরিলাদের সাথে কথা বললো সে- গেরিলারাও প্রত্যাখ্যান করলো গেরিলা যুদ্ধ শুরু করলো-

শুভ্র
চেনা চেনা লাগে- তবু অচেনা- এতো আমাদের দেশের কিছু সাদা পাঞ্জাবী আর শখের কমরেডের সাথে মিলে যাচ্ছে। কোথায় জনগণ, কোথায় কী? নিজেরটা বোঝেন তারপর-

সহেলি
নাহলে একটা ভেঙে দশটা, আমি তো শেষে বেবী ট্যাক্সী পার্টিতে নেমে এলাম-

শুভ্র
মানে?

সহেলি
তিনজনের পার্টি- এক সময় আমাদের কট্টর নেতা দেখলাম স্বৈরাচারের ঝাড়ুদার-

রঞ্জন
পয়লাই ঝামেলাটা যে বেঁধে গেলো- ব্যাটা এরনেস্তো এখন কী করবে?

গান
মাত্র সতের জন গেরিলা নিয়ে
এগিয়ে চলেছে এরনেস্তো।
ওষুধ ফুরিয়ে যায়
তবু হৃদয়ের সাইকেল।
বিপ্লবের সাইকেল পৌঁছে গেলো
লা-ইগেরায়।

[হাত বাঁধা অবস্থায় ছেচড়াতে ছেচড়াতে নিয়ে আসে চে-কে। শিক্ষিকা কোর্তেস-রূপী সহেলি প্রবেশ করে। সহেলি আর্তনাদ করে ওঠে]
কোর্তেস
আপনার না মাথায় গুলি লেগেছে, রক্ত ঝরছে একটা ব্যান্ডেজও কেউ বেঁধে দেয় নি-

চে
তার আগে আমার গ-২ কারবাইনে গুলি লেগেছে, তারপর পায়ে। এত তাড়াতাড়ি সেনাবাহিনী কী করে জানলো? এ জায়গাটা কোথায়?

কোর্তেস
এটা একটা স্কুল-

চে
জায়গাটার নাম?

কোর্তেস
লা-ইগেরা-

চে
ওঃ, তা ব্ল্যাকবোর্ডে এত বানান ভুল কেন? এত নোংরা কেন? এটা স্কুল না জেলখানা? আপনি কে?

কোর্তেস
আমি কোর্তেস- এখানকার খ্রীষ্টান মিশনরী স্কুলের শিক্ষিকা-

চে
আমাকে আপনি চেনেন?

কোর্তেস
না। শুনেছি আপনারা খুনী- ডাকাত- সেনাবাহিনীর সাথে লড়াই করেছেন। আপনি একজন বিদেশী- আমাদের সেনাবাহিনীর সোনার ছেলেদের হত্যা করতে এসেছেন-

চে
হু- খুব ভালো পরিচয়ই পেয়েছেন- আমার পরিচয়টা বলি- একটা দেশ আছে জানেন নাম তার কুবান-

কোর্তেস
হ্যাঁ সে তো এক স্বপ্নের দেশ, সেখানে মানুষ নাকি এখন পেট ভরে খেতে পারে। সেখানকার কত মানুষের নাম জানি-

চে
কার নাম জানেন-

কোর্তেস
ফিদেল ক্যাস্ট্রো, এরনেস্তো চে গেভারা, রাউল ক্যাস্ট্রো-

চে
ঐ তিনজনের মাঝখানের নামটা আমার-
[আঁৎকে ওঠে কোর্তেস]

কোর্তেস
চে গেভারা!

চে
আপনাকে বিশ্বাস করে একটা কাজ দিতে পারি আমি?

কোর্তেস
দিন আমি করবো-

চে
একটা চিঠি- ঠিকানা লেখা আছে। পাঠিয়ে দেবেন কি?

কোর্তেস
দেবো- দেবো-

চে
চিঠিটা পড়তেও পারেন- গোপনীয় নয়-
[চিঠিটা নিয়ে প্রেমপত্রের মতো বুকের ভেতরে রেখে দেয়। রোদরিগেজ প্রবেশ করে]

রোদ
কমান্দান্তে- আপনাকে কিছুটা বিমর্ষ মনে হচ্ছে, কেন মনে হচ্ছে?

চে
আমি আপাতত ব্যর্থ তাই-

রোদ
নিজের দেশে যুদ্ধ না করে আপনি বলিভিয়াকে বেছে নিলেন কেন?

চে
সেটা হয়তো এর থেকে ভালো ছিল।

রোদ
আপনি তো বলিভিয়া আক্রমণ করেছেন বিদেশি সৈন্য নিয়ে-

চে
এদের দিকে তাকান। কিউবাতে তারা যা চাইত তাই পেতো, এখানে এরা কুকুরের মতো মরল-

রোদ
অন্য গেরিলারা কোথায়? বলুন?

চে
আবার মারবেন? মারুন, আমার স্মৃতি শক্তি খুবই কম। আমি জানি না আমি কীভাবে আপনার প্রশ্নের জবাব দেব-

রোদ
আপনি কিউবান না আরহেনতিনো?

চে
পরে জবাবটা দিই-

রোদ
আমার দেশে গেরিলা যুদ্ধটা করলেন কেন?

চে
আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন না কীভাবে আপনার দেশে কৃষকেরা বেঁচে থাকে। জংলীর মতো এত দারিদ্র যে দেখতে কষ্ট হয়-

রোদ
আপনি একটা শান্তিপূর্ণ দেশে কেন যুদ্ধ এনেছেন-
[কোনো জবাব দেয় না চে]

কোর্তেস
কর্ণেল- চে কে কখন মারা হবে?

রোদ
কেন?

কোর্তেস
রেডিওতে খবর প্রচারিত হয়েছে এরনেস্তো চে গেভারা নাকি যুদ্ধক্ষেত্রে মারা গেছেন।

রোদ
ওঃ, এই নিয়ে আমরা তিনবার মারলাম চে’কে। একবার গ্রানমায়, একবার সান্তাকারায়, আরেকবার মৃত্যুর আগে এখানেই-

কোর্তেস
একজনকে এতবার মারতে হয়?

রোদ
তারপরেও যে মরে না শালারা। আচ্ছা আপনি আর্তনাদ করে উঠলেন কেন?

কোর্তেস
লোকটাকে দেখে আমার যীশুর মতো মনে হয়েছিলো-
[রোদ জোড়ে একটা থাপ্পড় মারে কোর্তেসকে]

রোদ
চে আমি আপনাকে বাঁচাবার চেষ্টা করেছিলাম- বলিভিয়া সরকারের উচ্চতম নেতৃত্ব হত্যার নির্দেশ দিয়েছে।

চে
তাই ভালো- জীবিত অবস্থায় আমার গ্রেপ্তার বরণ ঠিক হয় নি-

রোদ
আপনি কোনো বার্তা রেখে যেতে চান?

চে
ফিদেলকে বলবেন আমেরিকাতে বিপ্লব জয়যুক্ত হবে। আর আমার স্ত্রী আলেইদাকে বলবেন সে যাতে আবার বিয়ে করে সুখি হয়। শুনুন জিজ্ঞেস করলেন না আমি কোন দেশের নাগরিক-

রোদ
হ্যাঁ বলুন-

চে
আমি আরহেনতিনার, বলিভিয়ার, কিউবার, পেরুর, একুয়েদরের, আফ্রিকার, এশিয়ার সব দেশের নাগরিক- সব দেশের প্রতি আমার নাগরিক দায় সমান-
[অন্ধকার হয়, গুলির শব্দ। কোর্তেসের কাছে দেয়া চে’র চিঠি’টি বুকের ভেতর থেকে বের করে পড়তে থাকে কোর্তেস নিজেই]

চিঠি
প্রিয় সন্তানেরা,
যদি কখনো এ চিঠি তোমরা পড় তাহলে হয়তো আমার কথা মনে পড়বে, ছোট্টটি আমাকে দেখেই নি, কোনো স্মৃতিই নেই তার।

তোমার পিতা এরকম একজন মানুষ যে তার বিশ্বাসের এবং আদর্শের প্রতি অনুগত ছিলো আজীবন।

ভালো একজন বিপ্লবী হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলো। পড়াশুনা করবে যাতে প্রকৃতির উপর তোমাদের নিয়ন্ত্রনের বিষয়গুলো জানা হয়ে যায়।

সবার উপরে, গভীরভাবে অনুভব করার চেষ্টা কোরো পৃথিবীর যে-কোনো জায়গায় যে-কোনো অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার। এটাই একজন বিপ্লবীর সবচেয়ে সুন্দর গুণ।

প্রিয় সন্তানেরা,
এখনো আমার আশা আছে তোমাদের সাথে দেখা হবে- দীর্ঘ চুম্বন এবং সুদীর্ঘ আলিঙ্গন।
     
ইতি
তোমাদের পিতা
এরনেস্তো।

সহেলি
এভাবেই শেষ হয় জীবনগুলো-

রঞ্জন
না শেষ হয় না শুরু হয়- এই তো সেদিনের কথা। বাগদাদের উপকন্ঠে মসুলে, কারবালায় যে তরুণটি সুইসাইড স্কোয়াডে প্রাণ দিচ্ছে অথবা আদিবাসি লড়াইয়ে যে যুবকটি প্রাণ দিচ্ছে সে কে?

শুভ্র
সেও তো ভাকিরিতো-

গান
সাইকেলটা পৌঁছে যাবে ...


মামুনুর রশীদ ( This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it. ): নাট্যব্যক্তিত্ব