Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

আলাপনে সৈয়দ শামসুল হক

Written by সাক্ষাৎকার : বিপ্লব বালা ও হাসান শাহরিয়ার.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

[স্বাধীনতার পর নাট্যচর্চাটা আমাদেরকে বেশ এগিয়ে নিয়ে গেছে, সুস্থ ভাবনা-চিন্তার আগ্রহ তৈরি করেছে। আমরা শিল্পের এক বড় কর্মকাণ্ড, কর্মযজ্ঞ- মঞ্চনাটকের নিয়মিত সাক্ষাৎ পেয়েছি। আমরা বেশি বেশি নাট্যকার পেয়েছি, পেয়েছি সৃজনশীল প্রতিভাসম্পন্ন নাট্যনির্দেশক, অনেক ভালো অভিনেতৃ। আর পেয়েছি অনেক সংগঠক, যারা ক্রমশই মঞ্চনাটকের পরিধি বিস্তৃত করেই চলেছেন। এক কথায় এঁরা সবাই আমাদের মঞ্চনাটকের পুরোধা। আমরা মনে করি আমরা এঁদের সব ভালো কাজের উত্তরাধিকারী। তাই আমরা এঁদের কাজ এবং কাজের প্রক্রিয়া জানতে আগ্রহী।

এই প্রত্যাশায় থিয়েটারওয়ালা আলাপচারিতায় মগ্ন হয়েছে কয়েকজন নাট্যজনের। তাঁদের সাথে আলাপচারিতা অনুলিখন করে ধারাবাহিকভাবে ছাপা হচ্ছে থিয়েটারওয়ালায়। আমাদের এমনি এক সব্যসাচী নাট্যজন সৈয়দ শামসুল হক। সাক্ষাৎকার : ড. বিপ্লব বালা ও হাসান শাহরিয়ার আর অনুলিখন- সাইফ সুমন]


বিপ্লব বালা
আপনার ছোট বেলাটায় একটা ভিন্ন জগৎ ছিল, সেখান থেকে যদি শুরু করেন।

সৈয়দ শামসুল হক
আমি একটা দিক থেকে নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে করি ... মানে এটা আমার জন্মসূত্রের ভাগ্যের কথা বলছি- সেটা হচ্ছে আমি জন্মেছি খুব ছোট্ট একটা শহরে, প্রায় গ্রাম বলা যেতে পারে। বৃটিশ বাংলার সবচেয়ে পশ্চাৎপদ এলাকা- কুড়িগ্রাম। জায়গাটা হিন্দু প্রধান, জন্মেছি মুসলিম পরিবারে এবং তখন বৃটিশ রাজত্বকাল। এই তিনটার যে সমাহার- এটাকেই আমি মনে করি আমার জন্য সৌভাগ্য। এই জন্য আমি মনে করি যে, আমার একসেস টু থ্রি এলিমেন্ট সহজ হয়েছে এবং আমার মানসিক মানচিত্রটা খুব বিস্তৃত করতে পেরেছি। আমি যেমন এখন অক্লেশে হিন্দু পুরাণ থেকে বলতে পারি, ব্যবহার করতে পারি, তেমনি মুসলিম সংস্কৃতি থেকেও ব্যবহার করতে পারি এবং বৃটিশ রাজত্বে জন্মাবার জন্য অনেকটা স্কুল পাঠ্য থেকেও জানতে হয়েছে, সেগুলো ব্যবহার করতে পারি। বাঙালির চরিত্র কিন্তু অসাম্প্রদায়িক। অসাম্প্রদায়িক এই অর্থে যে- ধর্ম-বর্ণ- নির্বিশেষে আমরা মানবিকতাকেই সামনে আনি।

বিপ্লব বালা
মানে আপনি কি বাংলার গ্রামসমাজের কথা বলছেন?

সৈয়দ শামসুল হক
হ্যাঁ। তবে শহরেও কি সেটা এখন শুরু হয়ে যায় নি?

বিপ্লব বালা
আপনার বাবা কি কুড়িগ্রামেই লেখাপড়া করেছেন?

সৈয়দ শামসুল হক
না না, বাবার অনেক ঘটনা আছে। ওঁর জন্ম পীর পরিবারে। আমাদের পরিবারে সবাই আরবী, উর্দু, ফার্সীতে লেখাপড়া করতেন। বাবাই প্রথম ইংরেজী স্কুলে গেলেন এবং এর জন্য তাঁকে দাদা ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণা করলেন। পরে বাবা আর্থিকভাবে সমস্যায় পড়ে গেলেন। তখন তিনি দিনে কাজ করতেন আর রাত্রে পড়াশোনা করতেন।

বিপ্লব বালা
উনি ইংরেজি স্কুলে পড়ার ভাবনাটা কোথায় পেলেন?

সৈয়দ শামসুল হক
ঠিক বলতে পারবো না। আমার আঠারো বছর বয়সে বাবা মারা যান, তাই অনেক কিছুই জানা হয়ে ওঠে নি।

বিপ্লব বালা
তখন তো অনেক ইংরেজি স্কুল হয়েছে, সেগুলো দেখে হয়তো তিনি অনুপ্রাণিত হয়ে থাকবেন।

সৈয়দ শামসুল হক
অবশ্যই। বাবার জন্ম ১৮৯৬ সালে। কাজেই তখন সারা দেশে ইংরেজি লেখাপড়া খুব ভালোভাবেই শুরু হয়ে গেছে। আমাদের আদি বসতি কিন্তু সিরাজগঞ্জ।

বিপ্লব বালা
কুড়িগ্রামে কি আপনার দাদা এসেছিলেন?

সৈয়দ শামসুল হক
না, বাবা এসেছিলেন ... ঠিক আছে সেই কথাটাই তাহলে আগে বলি। সেটা হচ্ছে- বাবা ম্যাট্রিক পাশ করার পর কোলকাতায় গিয়েছিলেন ডাক্তারি পড়তে। কোলকাতাতে দিনে পড়াশোনা করতেন, রাতে বই বাঁধাইয়ের কাজ করতেন এবং ঐ দোকানেই রাতে থাকতেন। দিনে মেডিক্যাল কলেজে পড়াশোনা করতেন। ওখানে দু’বছর পড়ার পর দেখলেন নিজে উপার্জন করে ঐ পড়ার খরচ চালানো সম্ভব না। তখন উনি হোমিওপ্যাথি পড়তে শুরু করলেন এবং পাশ করলেন। তারপর কোলকাতাতেই একটি ছোট্ট চেম্বার করে প্র্যাকটিস শুরু করেন। এ সবই কিন্তু বাবার কাছ থেকে শোনা। একদিন বাবা বলছিলেন যে ... কোনো একদিনের কথা, সন্ধ্যার পর চেম্বারে কোনো রুগী নেই, বাইরে বেরিয়ে এসে দেখলেন আকাশটা লাল, আজান হচ্ছে। হঠাৎ ওঁর মনে হলো উনি কোলকাতায় কী করছেন? উনি গ্রামের ছেলে, তো তিনি মহানগরে কেন? সেই যে উনি চেম্বারে তালা লাগিয়েছিলেন আর খোলেন নি। উনি ওঁর হোমিওপ্যাথি কলেজের প্রিন্সিপালের কাছে গিয়ে বললেন- তিনি গ্রামে গিয়ে কাজ করতে চান। যেহেতু তিনি তার নিজের গ্রামে যাবেন না, মানে সিরাজগঞ্জ যাবেন না সেহেতু সবচেয়ে দরিদ্র একটি গ্রামে যেতে চাইলেন .. যেখানে গিয়ে তিনি কাজ করতে পারবেন। তখন সেই প্রিন্সিপাল বললেন যে- তুমি খুব ভালো সময়ে এসেছো, গতকাল কুড়িগ্রামের ভোগডাঙ্গা গ্রামের জমিদার এসেছিলেন, উনি একটি দাতব্য চিকিৎসালয় দিতে চান। সেখানে একজন ডাক্তার দরকার। বাবা বললেন- আমি যাবো। তো এভাবেই তিনি কুড়িগ্রাম এলেন। এসে তিনি আজীবন এখানেই প্র্যাকটিস করেছেন, চিকিৎসা করেছেন এবং এখানেই তিনি ১৯৫৪ সালে মারা যান। এই কুড়িগ্রামেই আমাদের সবার বাড়িঘর- আমার জন্ম ১৯৩৫ সালের ২৭ শে ডিসেম্বরে। আগেই বলেছি হিন্দুপ্রধান এলাকা, তবুও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ একেবারেই আপনার করে মিশতে দেখেছি। প্রত্যেক সৃষ্টিশীল মানুষের কাজ দেখলে বোঝা যাবে, সে কোন পটভূমি থেকে উঠে এসেছে। আমার লেখাতে বোধহয় এটা সনাক্ত করা যাবে। ঐ তিনটি সূত্র হিন্দু-মুসলিম এবং ইংরেজ, এই তিনটি সংস্কৃতির মধ্যে আমি সাচ্ছন্দ্য বোধ করি। এগুলো আমার জন্মসূত্রে পাওয়া। তারপরও কিছু বাস্তব সূত্রও আছে, যেমন- আমার নানী ছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ের।

হাসান শাহরিয়ার
আপনার মায়ের বাড়ি কোথায় ছিল?

সৈয়দ শামসুল হক
মানিকগঞ্জ।

হাসান শাহরিয়ার
আপনার বাবা তো পারিবারিক বৃত্ত থেকে বেরিয়ে ইংরেজি স্কুল শিক্ষায় ভর্তি হয়েছিলেন, আপনার যখন স্কুলে যাবার সময় হলো, তখন উনি কী অবস্থান নিয়েছিলেন?

সৈয়দ শামসুল হক
উনি তো আমাকে স্কুলে ভর্তিই করাতে চাইলেন না। উনি বললেন যে- ছেলেকে আমি পড়াবো। ফোর-ফাইভে গিয়ে কোথাও ভর্তি করাবো। ... উনি কিন্তু একটু অন্য মেজাজের লোক ছিলেন। আমার মায়ের সাথে যখন ওঁর বিয়ে হয়, তখন আমার মা কিন্তু নিরক্ষর ছিলেন। আমি মায়ের পেটে থাকাকালীন বাবার কাছে মা প্রথম ‘অ’ ‘আ’ চিনতে শুরু করেন এবং আমার জন্মের পর আমি যখন থেকে পড়া শুরু করি, তখন উনিও আমার সাথে পড়া করেছেন। আমি এবং আমার মা কিন্তু একই বই পড়তাম। ক্লাশ ফাইভ পর্যন্ত আমার সঙ্গে পড়াশোনা করেছেন। বাবা একই সঙ্গে আমাকে এবং মাকে পড়াতেন।

হাসান শাহরিয়ার
আপনি স্কুলে গেলেন কবে?

সৈয়দ শামসুল হক
আমার বয়স যখন ৬ বছর তখন বাবা আমাকে স্কুলে নিয়ে গেেেলন। উনি চেয়েছিলেন আমাকে ক্লাশ ফোরে ভর্তি করাতে, কারণ সেই সময় একটা রব ছিল যে, হুমায়ূন কবির ১৩ বছর বয়সে মেট্রিক পাশ করেছে ... তো নিজের ছেলেকেও যদি করানো যায়, কিন্তু আমাদের কুড়িগ্রাম মাইনর ইংলিশ স্কুলের হেড মাস্টার কালিপদ বিশ্বাস আমার মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে বাবাকে বললেন যে, একে ক্লাশ ফোরে ভর্তি করালে তো একে হত্যা করা হবে ... একে ক্লাশ থ্রি-তে ভর্তি করুন।

হাসান শাহরিয়ার
মাত্র ছয় বছরে ক্লাশ থ্রি-ও তো ...

সৈয়দ শামসুল হক
আমি ম্যাট্রিক পাশ করেছি ১৪ বছর ৩ মাস বয়সে। বাবা মৃত্যুর সময় বলে গিয়েছিলেন, আমি যেন কখনো সরকারি চাকুরি না করি। কারণ, সরকারি চাকুরি করলে আমি ক্রীতদাস হয়ে যাব।

হাসান শাহরিয়ার
আপনার বাবা নিশ্চয়ই আপনাকে পাঠ্যবইয়ের বাইরে অনেক বই তখন থেকেই পরিচিত করিয়েছেন?

সৈয়দ শামসুল হক
আমি এখন পেছন ফিরে যেটা দেখি সেটা হচ্ছে আমাদের সময়ের সিলেবাস, আমাদের সময়ে ক্লাস থ্রি-ফোরে যা যা পড়েছি, সেখানে অনেক কিছু ছিল যা আমি আজকালকার সিলেবাসে পাই না। ক্লাশ থ্রি থেকে সিক্সের মধ্যে আমি যেমন মহাভারতের গল্প পড়েছি, অর্জুনের গল্প পড়েছি, তেমনি আবার সোহরাব-রোস্তমের গল্পও পড়েছি। বাবার ঝোঁকটা ছিল হিন্দু পুরাণ আর পাশ্চাত্য পুরাণের দিকে, মুসলিম বেশ খানিকটা কম ছিল। তো বাড়িতে বাবা এগুলো আমাকে ফিড করতেন। আমি পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নাটকে যে মুসলিম কিংবদন্তীগুলো ব্যবহার করেছি এর সর্বাংশ আমার বাবার কাছ থেকে পাওয়া এবং বড় বাবার (বাবার বড়ভাই) কাছ থেকে পাওয়া।

বিপ্লব বালা
ছোটবেলা থেকেই পেয়েছেন?

সৈয়দ শামসুল হক
হ্যাঁ, বাড়িতে এগুলো শুনতাম। শোনাটা কিন্তু আমাদের সময়ে একটা রেওয়াজ ছিল, স্কুলেও এটার ওপর জোর দিত। স্কুলে মৌখিক পরীক্ষা দিতে হতো।

হাসান শাহরিয়ার
আপনি যে বছর স্কুলে গেলেন তার আগের বছর রবীন্দ্রনাথ মারা গেলেন। তো আপনার কি মনে পড়ে যে ওনার মৃত্যুর খবর পেয়েছেন বা ... মানে কিছু কি মনে পড়ে?

সৈয়দ শামসুল হক
হ্যাঁ, বাবা বাইরে থেকে এসে মাকে বলছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মারা গেছেন। আমি প্রথম বুঝি নি, ভেবেছি শহরের কেউ হয়তো হবে। বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম- কে মারা গেছেন? বাবা তখন বললেন- ঐ যে তুমি পড় ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে ...’ ওটা যিনি লিখেছেন উনি মারা গেছেন, উনি কিন্তু বড় কবি ছিলেন। তো এই প্রথম আমি আইডেন্টিফাই করতে পারলাম যে, যেটা আমি পড়ছি তার পেছনে একজন লেখক আছে। এর আগে ভাবতাম গাছের পাতা, পাখি যেমন আছে বা এমনি এমনি আছে, কবিতা বা গল্পও বুঝি এমনই। এগুলোর পেছনে যে একজন মানুষ কাজ করছে সেটা এই প্রথম বুঝলাম।

হাসান শাহরিয়ার
স্কুলের শিক্ষকদের কথা কিছু মনে পড়ে?

সৈয়দ শামসুল হক
আমি এখন যদি পেছনে ফিরে তাকাই তো দেখি যে আমার মনটাকে তৈরিই করেছে আসলে আমার শৈশবের স্কুল। আমাদের ইংরেজি পড়াতেন ফরিদ মাস্টার, উনি চোখের সামনে ছবি ভাসিয়ে দিতেন। গোপালবাবু ছিলেন, উনি ডেকে ডেকে স্কুল লাইব্রেরি থেকে বাছাই করে বই দিতেন পড়তে। প্রত্যেকটা বই-ই আমার মনে দাগ কাটতো। প্রদ্যোৎবাবু আমাকে দিয়ে প্রথম আবৃত্তি করালেন। শিখিয়েছেন কীভাবে আবৃত্তি করতে হয়- বলতেন কবিতা মুখস্থ নয় মনস্থ কর। এ সবই আমি অবশ্য লিখেছি ‘আমার স্কুল’ বইতে। পরে যখন রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা ভাবনার সাথে পরিচিত হলাম তখন এই ব্যাপারটাই দেখলাম যে, কৌতুহলী করে তোলাই হচ্ছে শিক্ষার কাজ। আরেকটা কাজ হলো বুদ্ধি বিকাশ। পড়ে পড়েই কিন্তু আমার মনে হয়েছে যে আমি লেখক হবো। ম্যাট্রিক পাশের পর বাবা বললেন ডাক্তারী পড়তে, আমি বললাম- না, আমি লেখক হবো।

বিপ্লব বালা
এতো ছোট সময় থেকেই?

সৈয়দ শামসুল হক
হ্যাঁ, বাবা বলতেন লেখক হলে তো তুমি অনাহারে থাকবে, তোমার পায়জামা ছেঁড়া থাকবে, তুমি মদ্যপান করে ড্রেনে পড়ে থাকবে ...

বিপ্লব বালা
তখন কী কী বই পড়েছেন?

সৈয়দ শামসুল হক
আমি ক্লাশ এইটে মেঘনাদবধ কাব্য পড়েছি।

বিপ্লব বালা
পাঠ্য ছিল?

সৈয়দ শামসুল হক
আংশিক, আমি পুরোটাই পড়েছি, বুঝি নি কিছুই, কিন্তু পড়ে ফেলেছিলাম। বাবা কুড়িগ্রাম টাউন হল লাইব্রেরি থেকে এনে দিলেন, তখন আমার গরমের ছুটি। তো পাঠ্য ছিল বলে হয়তো আগ্রহটা বেশি ছিল আর আমাদের সময়ে কিন্তু অনেক কিছুই পাঠ্য ছিল। যেমন ক্লাশ সেভেনে আমি যে ব্যাকরণ পড়েছি তার অর্ধেকই ছিল ছন্দ ও অলংকার। এগুলো আমি খুব উৎসাহ নিয়ে পড়তাম।

বিপ্লব বালা
বঙ্কিম পড়েছেন কখন?

সৈয়দ শামসুল হক
ক্লাশ টেনে এসে পড়েছি। শরৎ পড়েছি কলেজে এসে। আমি বঙ্কিম আর রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি এবং রাশিয়ার চিঠি বাদে সবই পড়েছি কলেজে ওঠার পর থেকে।

বিপ্লব বালা
রাশিয়ার চিঠি স্কুলে থাকতেই পড়ে ফেলেছেন?

সৈয়দ শামসুল হক
হ্যাঁ, ক্লাশ এইটে যখন পড়ি তখন আমাদের এক শিক্ষক ছিলেন নৃপেন্দ্র সরকার। তখন দু-এক পদ কবিতা লিখি। একদিন ক্লাশে বন্ধুরা বলল যে- স্যার ও কবিতা লেখে। তখন তিনি বললেন- কবিতা লিখতে হলে পড়তে হবে। যদি কবিতা লিখতে চাস তবে দু’খানা বই পড়- রাশিয়ার চিঠি আর গীতাঞ্জলি। তখন কোলকাতা থেকে বাবাকে দিয়ে রাশিয়ার চিঠি আনিয়ে ছিলাম।

হাসান শাহরিয়ার
লেখালেখির শুরুটা কীভাবে হলো?

সৈয়দ শামসুল হক
বাবার কাছ থেকে। বাবা সাহিত্য লিখতেন না, হোমিওপ্যাথি সম্পর্কে সাতটি গ্রন্থ লিখেছেন। তিনি যাঁর কাছে হোমিওপ্যাথি পড়েছিলেন তিনি একটাই বই লিখেছিলেন। ওঁর নাম ছিল ডঃ এম খান, খুলনার লোক। ওঁর পর বাবাই হচ্ছেন বাঙালি মুসলিম যিনি পুরো হোমিওপ্যাথির সিস্টেম অব ট্রিটমেন্ট এর উপর ৭টি বই লিখেছেন এবং তখন হোমিওপ্যাথি কলেজে সেগুলো পাঠ্য ছিল। তো বাবাকে দেখতাম রাত তিনটা-চারটায় জেগে লিখছেন। আমার মনে হয় বাবার কাজটাকে আমার খুব ইম্পর্টেন্ট মনে হয়েছে এবং আমার ভেতরেও লেখার ব্যাপারটা এসে থাকবে সেখান থেকেই।

হাসান শাহরিয়ার
আপনার প্রথম লেখা, যেটাকে আপনি লেখা হিসেবে স্বীকৃতি দেন, সেটা কবে?

সৈয়দ শামসুল হক
ক্লাশ এইটে থাকতে মুখে মুখে কিছু পদ বানাতাম। একদিন শুয়ে শুয়ে দেখি একটা লাল পাখি। তো আমি দুটো পদ মিলিয়েছিলাম-‘আমার জানালার পাশে একটি গাছ রহিয়াছে, তাহার উপরে দুটি লাল পাখি বসিয়াছে’। এটাতে কিছুই নাই কিন্তু ‘আছে’ ‘আছে’ মিল আছে। কিন্তু তারচেয়ে বড় বিষয়টা আমার চোখে ধরা পড়ে, সেটা হলো- আমি দেখেছিলাম একটা পাখি, অথচ লিখলাম দুটি পাখি। এই যে একটির জায়গায় দুটি লিখলাম, এটাতে বেশ উত্তেজিত বোধ করলাম এবং আমার মনে হলো এই ঈষৎ পরিবর্তন করতে পারলাম, এটাই আমার সৃষ্টিশীলতা। বাবা আমাকে উৎসাহিত করতেন, আবার নিরুৎসাহিতও করতেন। যদিও মৃত্যুর আগে আমাকে টাকা দিয়েছিলেন যে- এই টাকাটা দিয়ে তুমি তোমার বই ছাপিও। বাবা মারা গেলেন ১৯৫৪ সালের এপ্রিলে, আমার প্রথম বই বের হয় ১৯৫৪ সালেরই নভেম্বরে।

হাসান শাহরিয়ার
তার মানে পারিবারিকভাবেই আপনি পরিবেশ পেয়েছিলেন লেখক হওয়ার ব্যাপারে।

সৈয়দ শামসুল হক
কেবল আমি না, আমার মনে হয় যেকোনো লেখকের জন্য পারিবারিক সাংস্কৃতিক পটভূমিটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সে কোন পটভূমি থেকে উঠে এসেছে এটা তার কাজের জন্য খুবই জরুরি। এই পটভূমিটা কে কতটুকু নিতে পারলো সেটা একটা ব্যাপার। ... আমার মা ছিলেন সিনেমার পাগল, আর বাবা ছিলেন যাত্রার পাগল। আমি মায়ের কোলে বসে সিনেমা দেখেছি। আর বাবার পাশে বসে দেখেছি যাত্রা। শীতকাল এলেই বাবা যাত্রা দেখা শুরু করতেন এবং একেবারে সামনের চেয়ারে টিকেট কেটে আমাকে পাশে বসিয়ে দেখতেন। এখন মনে হয় যে, হয়তো ডাক্তার মানুষ একা একা যাত্রা দেখছেন, এটাতে তিনি সংকোচ বোধ করতেন। তাই তিনি আমাকে সাথে নিয়ে দেখতে যেতেন। আমার মনে আছে ক্লাশ থ্রি থেকে শুরু করে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত, ঐ সালে আমি ঢাকায় আসি, সে পর্যন্ত প্রতি শীতে যাত্রা দেখেছি। এবং কেবল দেখেই শেষ না, পরদিন সুযোগ পেলে স্কুল ঘরে গিয়ে দেখতাম তারা কেউ মুখের মেক-আপ তুলছে বা ইত্যাদি ইত্যাদি সেগুলো বেশ ইন্টারেস্টিং লাগতো। বাবার ম্যাজিকেও খুব আগ্রহ ছিল। প্রফেসর বোস বলে একজন আসতেন আমাদের শহরে। স্কুল ঘরের মাঝের বেড়া খুলে বড় হল ঘর বানানো হতো, সেখানে ম্যাজিক দেখাতেন। বাবার সাথে সেটাও দেখতে যেতাম। তারপর পাড়ায় নাটক হতো, যারা নাটক করতেন তাদের মধ্যে অগ্রজ ছিলেন হেরম্ব বাবু- আমরা হেরম্ব দা’ ডাকতাম। উনি ছিলেন একজন নট। আর ছিলেন বড় খোকা দা’ আর ছোট খোকা দা’। বড় খোকা দা’র নাম অজয় বকসি আর ছোট খোকা দা’র নাম সঞ্জয় বকসি- দুই ভাই। এদের বাবা হচ্ছেন ব্যাঙ বকসি। ওঁর ভালো নাম আমার জানা নেই, ওই নামেই আমরা চিনতাম। উনি প্রথম জীবনে ম্যাজিশিয়ান ছিলেন- পাবনার লোক। গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে ম্যাজিক দেখাতেন। তো উনি একবার আমাদের গ্রামে এলেন। ওঁর ম্যাজিক দেখে অনেকে ভাবলো উনি দৈবশক্তির অধিকারী। তাকে আর যেতে দেয় না। বলে যে- বাবু আপনি আমাদের এখানে থেকে যান, জমি-জমা যা লাগে দেব। উনি থেকে গেলেন কুড়িগ্রামে। গ্রামের লোকজন তার কাছে সম্পদ গচ্ছিত রাখে আর তিনি সেগুলো খাটিয়ে ব্যবসা করেন। এভাবে তিনি বেশ বড়লোক হয়ে গেলেন। এই ব্যাঙ বাবুই কুড়িগ্রামে প্রথম প্রেস দেন। ফুটবল খেলার মাঠ করেছেন- সতীশ পার্ক, ওঁর বাবার নামে করা। কুড়িগ্রামে প্রথম নাট্যমন্দির করেছেন- বীণাপানি নাট্যমন্দির, ওঁর মা’র নামে করা। এখনো এই নাট্যমন্দির আছে এবং ব্যাঙ বাবুর এক নাতি এখনো নাটক করে- নাম আশিস। তো ঐ বীণাপানি নাট্যমন্দিরে আমি নাটক দেখতে যেতাম। সে কারণে আমার মনে হয় আমি যে লেখক হয়েছি সেটা মোটেই অপ্রত্যাশিত না। আমি আসলে ঐ রকম একটা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের মধ্যেই বেড়ে উঠেছি। তবে লেখক হতে গেলে যে ঝুঁকিটা নিতে হয়, আর্থিক অসচ্ছলতার ঝুঁকি, সেটা আমাকে নিতে হয়েছে।

হাসান শাহরিয়ার
আপনার বাবা যখন মারা যান তখন আপনার কতজন ভাই-বোন রেখে গেছেন?

সৈয়দ শামসুল হক
সাতজন।

হাসান শাহরিয়ার
তখন আপনার পরিবার কি অসচ্ছল ছিল?

সৈয়দ শামসুল হক
খুব টানাটানিতে চলছিল, এই টানাটানি চলছিল আমার ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত। অসচ্ছল বলবো না, তবে খুব পরিশ্রম করতে হয়েছে ভালো থাকবার জন্য। বাবার মৃত্যুর পর আমার প্রধান চিন্তাই ছিল ভাই-বোনদের লেখাপড়া শিখিয়ে জগতে ছেড়ে দেওয়া। বাবা আমাকে যেমন ঢাকা এনেছেন, ওদেরকেও আমি একের পর এক ঢাকা এনেছি।

হাসান শাহরিয়ার
ভাড়া বাসায় ছিলেন?

সৈয়দ শামসুল হক
না, বাবারই ছিল, পাকিস্তানের শুরুর দিকে উনি কিনেছিলেন। টায় টায় চলতো। সচ্ছলতার কথা বললে না? আমার মনে হয় বাংলা সাহিত্যে নজরুলই সবচেয়ে ভালো ব্যবহার করেছেন কথাটা- ‘আমি ঝরণার মতো চঞ্চল, প্রকৃতির মতো সচ্ছল’ ... আমার মনে হয় বাংলা সাহিত্যে সচ্ছলের একমাত্র লাগসই ব্যবহার ‘প্রকৃতির মতো সচ্ছল’। তো আমি টায় টায় চলেছি, বেঁচে থাকবার জন্য, ওদের লেখাপড়া চালানোর জন্য যতটুকু দরকার ঠিক ততটুকু জোগাড় করতে পেরেছি। প্রকৃতির মতো সচ্ছল ছিলাম।

বিপ্লব বালা
হকভাই, আমরা শুনেছিলাম আপনি বোম্বে চলে গিয়েছিলেন কোনো এক সময়ে।

সৈয়দ শামসুল হক
হ্যাঁ, সেটাতো আরেক গল্প। তবে অন্যান্যদের মতো অত রোমাঞ্চকর না, কারণ অন্যেরা যেতেন নায়ক হবার জন্য ... আমার কিন্তু ওরকম কিছু না, একেবারেই আকস্মিক। সেটা হচ্ছে বাবা ডাক্তার হতে গিয়ে দুবছর পর মূল ডাক্তারী পড়া বাদ দিয়ে হোমিওপ্যাথি শিখতে লাগলেন। কারণ পড়াশোনার খরচ চালাতে পারছিলেন না। তো সব বাবা-মার ইচ্ছা থাকে যে নিজে যা হতে পারেন নি, নিজের সন্তানকে সেটা বানাবেন। বাবাও চাইলেন আমাকে ডাক্তার বানাবেন। ম্যাট্রিক পাশের পর চাপাচাপি শুরু করলেন আইএসসি পড়ার জন্য। আমিতো এক বাক্যে ‘না’। তখন উনি বললেন যে- আসলে তুমি আইএসসি পড়তে ভয় পাচ্ছ। তখন আমার জেদ চাপল। পারবো না? জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হলাম আইএসসি-তে। ফার্স্ট ইয়ার পরীক্ষায় আমি ক্লাশে প্রথম হলাম। তারপর তো প্রমাণ হলো যে আমি পারি। ব্যস, এবার তো আমার নি®কৃতি নেই, পড়তেই হবে। পরিকল্পনা করলাম বাড়ি পালাবো। পালিয়ে কোলকাতায় চলে গেলাম। কোলকাতায় গিয়ে মনে হলো বাবাতো লোক পাঠাবে ... তখন আমার মাথায় এলো যে- বোম্বে চলে যাই। সিনেমা দেখার পোকা ছিলাম সেটাতো আগেই বলেছি। ঢাকায় এসেও মানসী, রূপমহল এসব সিনেমা হলে সিনেমা দেখতাম। দেখতে গিয়ে একটা ব্যাপার আমাকে টানতো, সেটা হলো, যে টাইটেলগুলো ওঠে তার শেষ নামটা হলো পরিচালকের নাম। আমি তখন বুঝতে পারছিলাম যে তাঁকে দেখা না গেলেও এই সিনেমার সে-ই সব। তো যখন বোম্বে যাব ঠিক করলাম, তখন ভাবলাম যে এই লাইনে কাজ করা যায় কিনা।

বিপ্লব বালা
লেখালেখির ব্যাপারটা তখনও অতটা দানা বাঁধে নি?

সৈয়দ শামসুল হক
না, সেরকম কিছু না। একটু আধটু লিখতাম। যেমন আমাদের বাড়ির পেছনে এক দারোগার মেয়ে ছিল, আমার সমবয়সী। সে একদিন বললো যে- যদি কবিতা লিখতে পারিস তাহলে তোকে একটা চুমু দেবো। তখন বোধহয় পৌনে দু’শর মতো পদ্য লিখেছিলাম হাঃ হাঃ।

বিপ্লব বালা
বম্বে কতদিন ছিলেন?

সৈয়দ শামসুল হক
একবছর।

বিপ্লব বালা
কাজ করেছিলেন কিছু?

সৈয়দ শামসুল হক
হ্যাঁ, করেছিলাম। আকস্মিক যোগাযোগ হয়ে যায় ... ট্রেনেই এক ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচয় হলো বম্বে যাওয়ার পথে। উনি সব শুনে বললেন- চট করেতো কিছু হবে না, তুমি আমার সাথে হোটেলে ওঠো তারপর দেখি কী করা যায়। আমার পরিচিত দুজন লোক আছে তাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেব। ঐ হোটেলেই একজন বোর্ডার ছিলেন- নির্মল গুপ্ত। তার সাথে কথা বলে পাকড়াশি মশাই জানলেন যে নির্মল বাবু ফিল্মে ক্যামেরার কাজ করেন। সাথে সাথে বললেন যে- আমার একটি ছেলে আছে, ঢোকানো যাবে কিনা? নির্মল বাবু ছিলেন কোলকাতার ক্যামেরাম্যান সুধীন মজুমদারের চিফ এসিস্টেন্ট। এই নির্মল দা আমাকে তুলে নিলেন, বললেন- আমার রাতে পায়ে একটু আধটু ব্যথা হয়, টিপে টুপে দিতে পারবে? আমি ভাবলাম ভালোই। তো উনি আমাকে নিয়ে গেলেন সুধীন মজুমদারের কাছে। সুধীন মজুমদারের সাথে পরিচয় হলো, উনি নিয়ে গেলেন কামাল আমরোহি-র কাছে। কামাল আমরোহি তখন আনারকলি ছবি বানাচ্ছেন। সুধীন বাবু ক্যামেরাম্যান। কামাল সাহেব সব শুনে বললেন ঠিক আছে। কী করে যেন আমার উপর ওঁর মায়া পড়ে গেল। এটা অবশ্য আমার জীবনে অনেকবার ঘটেছে যে- কিছু না জেনেও আমাকে প্রথম থেকেই মায়ার চোখে  অনেকে দেখেছেন। যেমন, ঢাকাতে কবি জসিম উদ্দীন আমাকে আদর করে কাছে ডাকতেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন  খুব আদর করতেন। যাই হোক কামাল আমরোহি বললেন- ঠিক হ্যায়, টাকা কড়ি কিছু পাবে না, যাতায়াত ভাড়া পাবে, খাওয়া দাওয়া পাবে। তোমার কাজ হচ্ছে স্ক্রীপ্ট, পেন্সিল এগুলো রাখবে। কাপড়ের একটা ঝোলার মধ্যে এগুলো থাকতো, উনি ডাকতেন- লাড়কে বলে হাত বাড়াতেন, আমি স্ক্রীপ্ট দিতাম, পেন্সিল দিতাম। কামাল সাহেবের চিফ এসিস্টেন্ট ছিলেন ফাসিহ্ আহমেদ- উর্দু সাহিত্যে এম এ, খুব শিক্ষিত মানুষ। তখন যত না কাজ শিখেছি তার চেয়ে বড় কথা হলো একটা পরিবেশের মধ্যে ছিলাম। ইচ্ছে ছিলো ওখানেই কাজ করবো। অনেক বড় বড় মানুষের সাথে পরিচয় হয়েছিল। সিলেটের একজন, একটু বয়সে বড় কিন্তু আমার বন্ধু, আশিক উদ্দিন চৌধুরী, কিন্তু ওখানে অশোক চৌধুরী নামে কাজ করতেন। তো ও আমাকে প্রথম ইংরেজি সাহিত্য পড়াতে শুরু করল। প্রথম ইংরেজি বইয়ের আদ্যোপান্ত পড়লাম- আর্থার কনান ডয়েলের লেখা হাউন্ড অব বাস্কারভিল - শার্লক হোমসের। ফিল্মেই থেকে যেতাম, মনটাও তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এরই মধ্যে একদিন ’৫২ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে সকালে ঘুম ভাঙলো। একটা ঘরে কয়েকজন মিলে বিছানা বিছিয়ে থাকতাম। আমি শুতাম দরজার কাছে। সকালে খবরের কাগজ দিয়ে যেত এবং সেটা আমি প্রথম পেতাম- টাইমস অব ইন্ডিয়া।  ঐদিন খুলে দেখি যে ঢাকায় গুলি হয়েছে, ছাত্র নিহত হয়েছে, পত্রিকা অফিস পোড়ানো হয়েছে। এই প্রথম আমার দেশের জন্য কেমন যেন করলো। কিছু কাজ পেয়েছিলাম, একটি নতুন ছবির সেকেন্ড এসিস্টেন্ট হিসেবে কাজ পেয়েছিলাম। কিন্তু এর মধ্যেই খবর এলো ভারত-পাকিস্তানের ভেতরে চলাচলের জন্য পাসপোর্ট লাগবে। এখন আমি তো বাড়ি পালানো ছেলে। থানায় এন্ট্রি করাতে হবে যে আমি পাকিস্তানী, দেশে ফিরে পরে পাসপোর্ট করবো। তখন মনে হলো যে বাবা তো টের পেয়ে যাবেন এবং নিশ্চিতভাবেই আমাকে নিয়ে যাবেন। তারচেয়ে বরং আমিই চলে যাই। তারপর চলে এলাম। তবে ঐ যে অশোক চৌধুরীর সঙ্গে স্যোসালিজম, কমিউনিজম সম্পর্কে জানা বা ইংরেজি বই পড়া, এর থেকে মনে হয়েছে আমি বরং দেশে গিয়ে লেখালেখির দিকেই মনোযোগ দিই।

বিপ্লব বালা
এখানে ফিরে ফিল্মের কাজ করবেন এরকম ভাবেন নি?

সৈয়দ শামসুল হক
একেবারেই না। বরং এসে আবার কলেজে ভর্তি হলাম। এবার আইএ-তে ভর্তি হলাম। এরমধ্যে পাকিস্তান সাহিত্য সংসদে যাতায়াত শুরু করেছিলাম ... ফজলে লোহানীকে খুঁজে বের করলাম। ফজলে লোহানীর সূত্রেই আনিস চৌধুরী, মুস্তাফা নূুরুউল ইসলামের সঙ্গে ওঠা-বসা শুরু। সাহিত্য সংসদে এসে হাসান হাফিজুর রহমান, বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আনিসুজ্জামান ... বড়দের মধ্যে কাজী মোতাহার হোসেন, অজিতকুমার গুহ, মুনীর চৌধুরী এঁদের সাথে পরিচয়। মনে হলো যেন একটা বিপুল বিশাল সংসারের ভেতর এক কোণায় একটু জায়গা পাচ্ছি। এই তখন লেখাটা শুরু করলাম।

বিপ্লব বালা
পাকিস্তান শুরুর সময়েও কি মনে হয়েছে যে- এটা একটা নতুন দেশ, সমাজ ... এটা একটা ভিন্ন ভূগোল, ফলে সেই সাথে লেখার যে একটা ভিন্ন অভিজ্ঞতা ... এই জায়গাটা কি সচেতনভাবে শুরু হয়েছিল?

সৈয়দ শামসুল হক
না, আসলে চারদিক থেকে বিষয়গুলো এসে নাড়া দেয়, ভাবায় এবং কাজ করি। যেমন, ভাষা আন্দোলন ... ’৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি হয়ে গেছে, ’৫৩ সালে যখন হাসান হাফিজুর রহমান সংকলন করছেন, আমিও লিখছি তাতে। আমার প্রথম কবিতা ছাপা হলো ... মানে যেটাকে কবিতা বলা যায় আর কি ... তো আসলে ভিন্ন ভূগোল বা এমন কিছু মাথায় আসে নি। বিষয় এসেছে এবং বিষয়ই আমাদের লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছে।

বিপ্লব বালা
কিন্তু এই যে একটা ভাষা পেলেন সেই ভাষায় লেখাটা লিখতে গিয়ে ভিন্ন কিছু করার আগ্রহটা তৈরি হয় নি?

সৈয়দ শামসুল হক
না, আমার নতুন ভাষা কোত্থেকে আসবে? এটাতো আমার ভাষা ছিলই। আর তাছাড়া একই ভাষায় লিখলে কি একই সাহিত্য হবে? ইংরেজিতে কত মানুষ কত জাতি লিখছে, তাদের সাহিত্য কি একই রূপ নিয়ে আসছে? আসছে না, তাই না? ভাষার ব্যাপারটা হলো যে আমরা যে ভাষাটা জানি সে ভাষাটার একটা ইতিহাস ঐতিহ্য আছে। বাইরে থেকে হুকুম দিয়ে এ ভাষাটাকে বদলানো যাবে না। তখন রাজনীতিতেও ভাষাটা একটা বড় প্রশ্ন কারণ, রাষ্ট্রভাষা তখনও মীমাংসিত হয় নি সরকারিভাবে। কাজেই বাংলাটাকে আমরা আরো বেশি করে চাচ্ছি।

বিপ্লব বালা
ভাষার প্রশ্নে আধুনিকতা বলে একটা ব্যাপার তো অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছে ... তিরিশের দশক থেকেই, তো সেখানে আপনাদের নিজেদের অবস্থানটা কী ছিল?

সৈয়দ শামসুল হক
আমরা নিজেদের মনে করতাম, বিশেষ করে কবিতার ক্ষেত্রে তিরিশের দশকে, যারা কোলকাতা থেকে চলে এসেছেন- আবুল হোসেন, আহসান হাবিব, ফররুখ আহমেদ ... এরাও তিরিশের দশকের ধারা থেকে এসেছেন এবং আমরাও মনে করি সেই ধারাবাহিক থেকেই কাজ করছি। আমাদের যে আলাদা একজন বখতিয়ার খিলজি দরকার তা না। একটা দেশের সাহিত্য, তার অর্থনীতি, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ইতিহাসের জন্য তার নিজস্বতা পায়। এগুলো তো তখন ঘটতে শুরু করেছে। একই ভাষায় লিখলেও আজকে দেখো কোলকাতা এবং ঢাকায় সম্পূর্ণ দু’রকমের সাহিত্য বেরুচ্ছে।

বিপ্লব বালা
হ্যাঁ, এবং এটাতো ইচ্ছা করে করতে হয় নি।

সৈয়দ শামসুল হক
ইচ্ছা করে করতে পারবেও না তুমি। এটা হয়ে ওঠে। আমি একবার কোলকাতায় উৎপল দত্তের সাথে দেখা করতে গিয়ে ছিলাম। উনি বললেন যে- আজকে আমার নাটক আছে দুঃস্বপ্নের নগরী- তুমি চলে এসো।

বিপ্লব বালা
ওঁর সাথে কি আগেই পরিচয় ছিল?

সৈয়দ শামসুল হক
লন্ডনে পরিচয় হয়েছিল, বিবিসি-তে। আমার গণনায়ক পাণ্ডুলিপির পেছনে ওঁর আঁকিবুকিও আছে। তখন এই নাটকে কাজ করছিলাম ... বললেন যে- দুঃস্বপ্নের নগরী দেখতে চলে এসো।

হাসান শাহরিয়ার
এটা কত সালের কথা?

সৈয়দ শামসুল হক
১৯৭৬ সালের কথা। প্রথমে লিখি আমি পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, তারপর এর শেষ পৃষ্ঠাতেই বড় করে লিখি গণনায়ক, লিখে কয়েক লাইন লিখেছিও।

বিপ্লব বালা
এটার সাথে কি বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পৃক্ত? মানে তখন তো ’৭৫-এর ১৫ আগষ্ট ঘটে গেছে ...

সৈয়দ শামসুল হক
না না, ঘটেনি। এটাতো মে মাসের কথা। এমনিতেই আমার শেক্সপীয়রের যে ক’টা নাটক পড়তে ইচ্ছা করে এর মধ্যে জুলিয়াস সিজার একটি। সেই কারণেই এটা লেখা ...

হাসান শাহরিয়ার
দুঃস্বপ্নের নগরী-র কথা বলছিলেন।

সৈয়দ শামসুল হক
হ্যাঁ, তো দেখে আমি কিছুই বুঝতে পারি নি। কারণটা হলো ওদের নিজস্ব রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক পরিস্থিতি ও অভিজ্ঞতা। ওরা যখন ‘জলগামছা’ বলে তখনতো আমি কিছু বুঝতে পারি না। যেমন আমার একটা গল্প অনুবাদ করবে কোলকাতার একজন। তো উনি আমাকে বললেন ‘কাফনের কাপড় পাঠালাম’- এটার মানে কী? অর্থাৎ এই পাশের দেশে একজনই কিন্তু এটা বুঝতে পারছে না।

বিপ্লব বালা
আপনি নাটক লেখা শুরু করলেন অনেক পরে তাই না?

সৈয়দ শামসুল হক
হ্যাঁ, এটা আমার শেষ সংসার।

বিপ্লব বালা
এই দেরিতে শুরু করার কারণটা কী?

সৈয়দ শামসুল হক
নাটকের দর্শক কিন্তু আমি সেই ছোটবেলার যাত্রা দেখা শুরু থেকে। তখন থেকে এই সব সাধারণ মঞ্চকে রাজপ্রাসাদ কিংবা অরণ্য কিংবা যুদ্ধ ক্ষেত্রকে কখনোই মেকি মনে হতো না।

বিপ্লব বালা
আধুনিক নাটক, গণনাট্য, রবীন্দ্রনাথের নাটক- এগুলো?

সৈয়দ শামসুল হক
ওগুলোর সাথে কোনো যোগসূত্র ছিল না, তবে ৫৪ সালে যখন ইউনিভার্সিটিতে পড়ি, তখন মুনীরভাইয়ের সাথে বেশ ওঠা-বসা ছিল। মুনীরভাই একদিন আমার একটা গল্প পড়ে বললেন- তোমার তো নাটক লেখার হাত। উনি তখন নাটক করেন। কেউ কিছু বলতে পারে না অনুবাদ করেছেন। প্রথম অভিনয় হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতি সংসদের উদ্যোগে। এটার রিহার্সেল থেকে শুরু করে সব সময় আমি ছিলাম।

বিপ্লব বালা
কখনো যুক্ত হতে ইচ্ছা হয় নি?

সৈয়দ শামসুল হক
না, একেবারেই না। বাবা মারা যাবার পর মাস পাঁচেক কুড়িগ্রামে গিয়ে থাকতেই হলো। সেখানে হেরম্ব দা’রা নাটক করেন, সে কথা আগেই বলেছি। তো আমাকে বললেন- তুই নাটক কর আমাদের সঙ্গে। তুই রাজধানীতে থাকিস, আমাদের সাথে থাকলে একটা মান হয়। আমার এখনো মনে আছে ওঁরা যে হ্যান্ডবিল ছাপিয়েছিলেন সেখানে আমার নাম ছিল সহকারি ব্যবস্থাপক। তো নাটকের সাথে যদি যুক্ত হওয়া বল তাহলে সেটাই প্রথম।

বিপ্লব বালা
আপনি এতগুলো মাধ্যমে কাজ করলেন, কিন্তু নাটকে এত পরে আসলেন কেন?

সৈয়দ শামসুল হক
কী জানি বিধাতা হয়তো বলেছেন যে- এখনো তোমার সময় হয় নি, আরো পরে হবে হাঃ হাঃ।

বিপ্লব বালা
১৯৫৬ সালে কোলকাতার বহুরূপী এলো রক্তকরবী নিয়ে, দেখেছিলেন?

সৈয়দ শামসুল হক
হ্যাঁ, দেখেছি।

বিপ্লব বালা
কিন্তু ঢাকায় যেগুলো তখন হচ্ছিল, ড্রামা সার্কেল করছিল সেগুলো দেখেছিলেন?

সৈয়দ শামসুল হক
কোথায় হচ্ছিল! ওগুলোতো সৌখিন নাটক। বজলুল করিম, মীর মকসুদ-উস-সালেহীন আমার ব্যক্তিগত বন্ধু ছিল, সালেহীন তো আমার পাড়ায় থাকতো ... তো এক সাথে রেষ্টুরেন্টে আড্ডা দিতাম। আমি কবিতা গল্প লিখছি, ছাপাচ্ছি, নাটকের কাজ কোথায় হচ্ছিল বলছো তুমি! ওগুলোতো সৌখিন নাটক। আর যা কিছু এক্সপেরিমেন্ট হচ্ছিল সেটার ভেতরে অনুবাদ যেমন- বার্নার্ড ’শ-র নাটক, আর্থার মিলারের নাটক অনুবাদ হচ্ছিল ... সেগুলোও আমাকে খুব একটা টানে নি। ওখানে মুনীরভাই-ও যদি খুব সচল থাকতেন তাহলে হয়তো একটা সম্ভাবনা ছিল।

বিপ্লব বালা
তবুও তখন ... ধরুন, নূরুল মোমেন, আনিস চৌধুরী ... ওঁরা তো মৌলিক নাটক লিখতেন।

সৈয়দ শামসুল হক
না না, ওগুলো আমার কাছে কোনো নাটকই মনে হয় না। এমনকি আমি এখনও মনে করি ওগুলোর একটাও মানসম্মত নাটক হয় নি। চলতি কাজ পুষিয়ে গেছে এই আর কি! আনিস চৌধুরীর মানচিত্র আর নূরুল মোমেনের নেমেসিস বা ধরো আসকার ইবনে সাইখ-র বিদ্রোহী পদ্মা ... এতো হতেই থাকবে। ফুটবল মাঠে প্রতিদিনই খেলা হচ্ছে, আমি তো হিমালয়ের দিকে তাকিয়ে। আমি সব সময়ই বলি নজর রাখবে ওপরে, তাহলে গারো পাহাড়ে অন্তত উঠতে পারবে।

হাসান শাহরিয়ার
সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ-র নাটক তো ঐ সময়ের লেখা।

সৈয়দ শামসুল হক
হ্যাঁ, ঐ সময়ের। পড়েছি কিন্তু আবিষ্কার করতে পারি নি যে এর ভেতরে কী আছে। এখনো মনে করি না যে ওর ভেতরে কিছু আছে। একটা কথা আমি বলি- নাটকের সাথে স্পোর্টের খুব মিল আছে, সেটা হচ্ছে গোল দিলে সবাই দেখতে পায়। গোল দিলে কিন্তু সাথে সাথে হাততালি পড়ে, কেউ এক শতাব্দী পরে হাততালি দেয় না। নাটকও কিন্তু যখনকার তখনকার, সেটা সফোক্লিস বলো কিংবা কালিদাসই বলো। আমাকে কিন্তু এখন শ্রেষ্ঠ নাট্যকার বলে। কিন্তু শ্রেষ্ঠ কবি বা গল্পকার বলে না, কারণ, এগুলো কিন্তু পঞ্চাশ বছর একশ বছর অপেক্ষার পর বলবে, যদি বলতে হয়। আমি আবার এটাও বলেছি যে- পরাধীন জাতির নাটক হয় না। রবীন্দ্রনাথকেও স্বাধীনতা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে।

বিপ্লব বালা
অন্যগুলো হয় কিন্তু নাটক হয় না- এটা কী অর্থে বলছেন?

সৈয়দ শামসুল হক
এটা জীবন্ত, নাটক মানে মঞ্চ। নাটক লেখাটাও নাটক নয়, মহড়াও নাটক নয়- এটা দর্শকের চোখের সামনে হতে হবে।

হাসান শাহরিয়ার
নাটকের লিখিতরূপটা তাহলে কী?

সৈয়দ শামসুল হক
লিখিত রূপটা হচ্ছে বাড়তি পাওয়া। ইংরেজি সাহিত্যে অনেকে লিখেছেন, সেগুলো চেম্বার প্লে, শুধু পড়বার জন্যই লিখেছেন। নাটকের তিনটি পার্টি আছে- নাট্যকার, নাট্যজন আর দর্শক। নাটক একটি প্রযুক্ত ব্যাপার।

হাসান শাহরিয়ার
আচ্ছা সাঈদ আহমদের নাটকগুলোকে কী বলবেন?

সৈয়দ শামসুল হক
উনি লিখেছেন, কিন্তু আমি এখনও কিছু হয়েছে বলে মনে করি না। ... আসকার ইবনে সাইখের কথাও অনেকে বলে যে- নাটক পাগল লোক ছিলেন। তো এরকম নাটক পাগল লোক কিন্তু গাঁয়ে গ্রামে প্রচুর আছে ... এসব নতুন বা একমাত্র এমন কিছু না। ঐ যে বলছিলাম নাটকে তিনটি পার্টি আছে- নাট্যকার, নাট্যজন আর দর্শক, এই তিনজন না হলে নাটক বা থিয়েটার হয় না। এই তিনটির কম্বিনেশন ছিল না বলেই হয়তো আমার নাটক লেখা শুরু করতে হয়েছে অনেক পরে। আর তখন যে নাটকগুলো মহিলা সমিতি মঞ্চে হতো ... সত্তর বা আশির দশকে- তখন এমন নাটকও কিছু কিছু হয়েছে যেগুলো শত বছর টিকে থাকবে ... অ্যাজ টেক্স্ট্ টিকে থাকবে, নতুন লোকেরা করবে। এমনও প্রযোজনা আমি দেখেছি, যেটার মানের নাটক এখনও আমি দেখি না। মানে নাটক দেখে আমার ভেতরটা নেচে উঠেছে এমন ৬/৭ টা নাটকের নাম আমি বলতে পারবো। আজকে এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হল হয়েছে, মহিলা সমিতি এয়ার কন্ডিশানড হয়েছে- অথচ নাটকের আজকে এই অবস্থা কেন? আজকাল তো বেশিরভাগ নাটকই কাঁচা নাটক হয়। হল ভাড়া করে শো করলেইতো আর নাটক হয় না। নাটকের দলগুলোই বল আর ওয়ার্কশপই বলো, সবই এখন হচ্ছে মিডিয়ায় যাবার জন্য একটা মাধ্যম ...

হাসান শাহরিয়ার
এটা তো আপনি গত ৫/৬ বছরের কথা বলছেন, সামনের ৫/৬ বছরেতো এই চিত্র ভালো হয়ে যেতে পারে।

সৈয়দ শামসুল হক
আগামী ৫/৬ বছরে তো আরো খারাপ হতে পারে। কারণ, আরও ৫ টা চ্যানেল এসেছে ...

বিপ্লব বালা
তাই তো, মঞ্চে সময় দেবে কে?

সৈয়দ শামসুল হক
এখনই তো বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে অন্তত ৫০ টা নাটক লাগে সপ্তাহে।

বিপ্লব বালা
শাহরিয়ার, এখন তো মিডিয়া আগে পরে মঞ্চ ... আপনি কি ভাবছেন মঞ্চের জন্য ভিন্ন জায়গা তৈরি হচ্ছে?

হাসান শাহরিয়ার
না, আমি বলতে চাচ্ছি যে, মিডিয়ায় এমন নাট্যজনেরা ব্যস্ত হয়ে যায়নি, প্রবীণরা ছাড়া, যারা মঞ্চে খুব ক্রিয়েটিভ ছিল। এই প্রজন্মের যারা ক্রিয়েটিভ এবং মিডিয়ায় কাজ করে, তারা কিন্তু নিয়মিত মঞ্চেও কাজ করছে। আর এই প্রজন্মের যারা পুরোপুরি টিভি মিডিয়ায় কাজ করছে, মঞ্চে করছেই না, তাদের কারণে মঞ্চ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে আমি মনে করি না।

সৈয়দ শামসুল হক
এত ভদ্রভাবে কথা বলে লাভ নেই শাহরিয়ার, অবস্থা খুব খারাপ ...

বিপ্লব বালা
কোনো ক্রিয়েটিভ লোক তো মঞ্চে যুক্ত হচ্ছে না।

হাসান শাহরিয়ার
টেলিভিশন মিডিয়ায় ক্রিয়েটিভ লোক যুক্ত হচ্ছে বা ক্রিয়েটিভ কাজ হচ্ছে বলে আপনি মনে করেন?

সৈয়দ শামসুল হক
আজকে ড্রামা ডিপার্টমেন্টের কথা ধরো, সেখান থেকে পাশ করে হয় বিজ্ঞাপনী সংস্থায় যাচ্ছে না হয় মিডিয়ায় যাচ্ছে। তুমি পড়েছ নাটক, মিডিয়াটাকে জীবিকা হিসেবে নিলে না হয় মানা যায়, কিন্তু মিডিয়া হয়ে গেছে এম্বিশন। এটার কারণও আছে, দেশ গরীব হলে কী হবে, সবার পকেটে ফোন, রঙ্গিন কাগজে ছবি ছাপা হচ্ছে, রাস্তায় বেরুলেই লোকে সালাম দেয় ... এতকিছু দেখে তো মাথা খারাপ হবেই। এগুলো পেলে মঞ্চে যাবে কেন খামাখা পরিশ্রম করতে? আমাকে এই ব্যাপারটা খুবই পীড়িত করে। আমার ল্যাপটপে এখনো দুটো নাটকের পাণ্ডুলিপি, অথচ আমি ভাবি ...

বিপ্লব বালা
কারা করবে?

সৈয়দ শামসুল হক
না না, করার লোক আছে, কিন্তু কীভাবে করবে? সময় কোথায় মহড়া দেবার? আমি আতাউরকে বললাম ঈর্ষা নাটকটা রিভাইভ করতে। সে বলে- আমিও ভেবেছিলাম, কিন্তু কেউ সময় দেবে না। সিনিয়ররা না হয় সময় দেবে না, কিন্তু কোথায় ইয়ংগার জেনারেশন? আজকে তিনজন ইয়াং ছেলে-মেয়ে যদি বলে যে আমরা ঈর্ষা করবো, আমি তো হাসতে হাসতে অনুমতি দেব। কিন্তু কেউ আসবে না। তারা যাবে কোন চ্যানেলে কী করা যায়, তাই খুঁজতে।

বিপ্লব বালা
হ্যাঁ, সেই আবেগ এবং সময় কোনোটাই নেই। মঞ্চ শ্রদ্ধা, ভালোবাসা সবটাই হারিয়েছে।

হাসান শাহরিয়ার
আমরা একটু আগের প্রসঙ্গে ফিরে যাই। নাটকের সাহিত্যমূল্যের ব্যাপারে আপনার কাছ থেকে কিছু জানতে চাই।

সৈয়দ শামসুল হক
এটা হচ্ছে উপরি পাওয়া। এটা চায়ের কাপের পিরিচের মত ... তলাপাত্রটা বড় না, মহাপাত্রই বড় এবং সেটা হচ্ছে কাপ। এই তলাপাত্র হচ্ছে সাহিত্যমূল্য আর মহাপাত্র হচ্ছে থিয়েটার। আমি যেটা বিশ্বাস করি সেটা হলো, রবীন্দ্রনাথই হোক আর সফোক্লিসই হোক বা কালিদাসের নাটকই হোক, যেটা পড়ছি সেটা সাহিত্য পড়ছি এবং পড়ে তলাপাত্রের প্রশংসা করছি। এগুলোর মহাপাত্রটা হচ্ছে মঞ্চরূপটা। মঞ্চে না আনা পর্যন্ত আবার সেটা নাটক হয় নাকি?

হাসান শাহরিয়ার
আপনার এই শেষ সংসারে প্রবেশের শুরুটা একটু বলুন।

সৈয়দ শামসুল হক
আমি যখন লন্ডনে বিবিসি-তে ছিলাম, তখন একটা সাপ্তাহিক অনুষ্ঠান হতো ... কালচারাল ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান-‘শিল্পপ্রাঙ্গণ’ নামে। ওটা আমি করতাম, তো সে হিসেবে আমি বহু নাটকের টিকেট পেতাম। ’৭২ সাল থেকে ’৭৮ সাল পর্যন্ত আমি নিয়মিত নাটক দেখতাম। কম করে হলেও ৪’শ নাটক দেখেছি। লন্ডন হচ্ছে দ্য ক্যাপিটাল অব ওয়ার্ল্ড থিয়েটার। এর মধ্যে যখন দেশে আসতাম, তখন এখানের নাটকও দেখতাম। সবাই তো বন্ধু মানুষ, যদিও বয়সে ছোট ছিল ... তো এখানে নাটক দেখে আমার ভেতরে একটা নড়াচড়া হল।

হাসান শাহরিয়ার
মানে মাঠে নামবো কিনা, নাকি? হাঃ হাঃ

সৈয়দ শামসুল হক
হ্যাঁ, আমিও লিখবো কিনা, তো তখন আমার কাছে এই মাধ্যমটিকেও খুব ক্রিয়েটিভ মনে হলো।

হাসান শাহরিয়ার
ঢাকার কোন নাটকগুলো তখন আপনার মনে দাগ কেটেছিল?

সৈয়দ শামসুল হক
দাগ কাটা মানে হলো, তখন মাঝে মাঝে ঢাকায় আসতাম এবং আসলে ওরা যারা নাটক করে তারা বলতো যে- আসুন ওমুকদিন আমাদের নাটক আছে ... তো আমি দেখতে যেতাম। তখন সুবচন নির্বাসনে, মুনতাসির ফ্যান্টাসী, মাইলপোস্ট এগুলো দেখেছিলাম। তো আমাকে পার্টিকুলারলি কোনো প্লে আকৃষ্ট করেছে তা না, থিয়েটার ব্যাপারটা স্টার্টেড টকিং টু মি। এই সময় ’৭৩ সালে সেপ্টেম্বর মাস, মতিঝিল বাংলাদেশে ব্যাংকের সামনে দেখি একটা বাচ্চা ছেলে লোহার শিক দিয়ে এক বৃদ্ধকে খোঁচাচ্ছে আর বলছে- তুই ব্যাটা রাজাকার। এবং সেটা বেশ কিছু লোক দাঁড়িয়ে দেখছে। ... এবার তোমরা বল যে, আমি যদি এই দেশের লোক না হই, আমি যদি না জানি যে এই দেশে যুদ্ধ হয়েছিল বা ধরো আমি যদি নাইজেরিয়ার লোক হতাম তখন এই দৃশ্য দেখে আমার কী মনে হতো? সত্যিই এই দৃশ্য আমি ভুলতে পারি নি। এবং এটা নিয়ে ভাবতে ভাবতেই আমার মনে হলো আসলে পুরো ব্যাপারটা ছিল, মানে আমাদের মুক্তিযুদ্ধটা ছিল ধর্মান্ধতা থেকে মুক্তি। অথচ ঐ মুক্তিটা তো কেবল রাজনৈতিক মুক্তি ছিল না। ... তো এটা ’৭৩ এ ভাবলাম, ’৭৪ এ ভাবলাম এবং ’৭৫ এ এসে আমার মনে হলো এই বিষয়টাকে যদি আমি কমিউনিকেট করতে চাই তাহলে কবিতা লিখলে চলবে না, কবিতা লিখলে বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে থেকে যাবে। গল্প লিখলেও অল্প কয়েকজন পাঠক পড়বে, উপন্যাসও তাই। তখন আমার মাথায় এলো এই বিষয়টাকে নাটকের মাধ্যমে নিয়ে আসতে হবে। তখনই, মানে ’৭৫ এর মে মাসে আমি লিখে ফেললাম পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়। এই নাটকটিকে লোকে যখন বলে মুক্তিযুদ্ধের নাটক আমি তখন চুপ করে থাকি ... কারণ, আমি মনে করি মুক্তিযুদ্ধের চেয়ে অনেক বড় মুক্তির কথা এখানে বলা হয়েছে।

বিপ্লব বালা
হ্যাঁ, কিন্তু সেটা ডিরেক্টররা সেভাবে বের করতে পারে নি বলে মনে হয় নি?

সৈয়দ শামসুল হক
তবে আমি জানি দর্শককে ভেতরে ভেতরে কোথাও স্পর্শ করেছে বলেই এই নাটককে ভুলতে পারছে না। মুক্তিযুদ্ধের ওপরতো অনেক নাটক হয়েছে, কিন্তু এটার কথা কেন বলে? মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারটা বাইরে ও ভেতরে কোথাও লেগেছে বলেই তো?

বিপ্লব বালা
কথাটা আপনি বলছেন, আর কেউ কখনো বলেন নি যে, এটার বিষয় মুক্তিযুদ্ধ নয়। সেখানে ধর্মের ব্যাপারটা বলছেন অভিনেতৃ নিয়েছে ... যদি নিয়ে থাকে তবে সচেতনভাবে করতে সাহস করে নি।

সৈয়দ শামসুল হক
হ্যাঁ, সচেতনভাবে করে নি, ভেতরে কোথাও নাড়া দিয়েছে। পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়-এর প্রথম অভিনয় কিন্তু আমি দেখি নি। তখন আমি লন্ডনে। শুনছি যে ভালো হচ্ছে। আমি বোধহয় নাটকটা দেখি ’৭৭ সালে। এসে খোঁজ খবর নিয়ে প্রথম শুনলাম যে, ‘কাব্যনাটক’ ব্যাপারটা একটু ডিসকারেজিং ছিল। দর্শকরা কাব্যনাটক শুনলে ঠিক কীভাবে নেবে এটা নিয়ে সংশয় ছিল। আবদুল্লাহ আল-মামুন নাকি ভেবেছিল এটাকে ‘গীতিনাট্য’ বলবে ... কারণ গীতিনাট্যের সাথে দর্শকদের পরিচয় আছে। পরে ভাবলো যে না ‘কাব্যনাটক’-ই থাক। তো কাব্যনাটক যে এর আগে হয় নি তা কিন্তু না, ফররুখ আহমেদের নৌফেল ও হাতেম, আলাউদ্দিন আল আজাদের ইহুদির মেয়ে আছে, কিন্তু ঐ জিনিস ছিল না।

বিপ্লব বালা
ছিল না বলেই তো জন্মায় নি।

সৈয়দ শামসুল হক
পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়-ই সত্যিকার অর্থে প্রথম কাব্যনাটক। আই টেক প্রাইড যে, ‘কাব্যনাটক’ এই কথাটার সাথে আমি দর্শকদের মিলিয়ে দিতে পেরেছি।

হাসান শাহরিয়ার
কিন্তু এটার মধ্যে কিছু কিছু সংলাপ আছে যেগুলো দর্শক রিয়েক্ট করতে পারতো, আপনার কী মনে হয়?

সৈয়দ শামসুল হক
তখন থিয়েটারের (নাট্যদল) লোকজনই আমাকে বলেছে কিছু কিছু সংলাপের ব্যাপারে মঞ্চে তারা ভীত ছিল- দর্শক আবার রিয়েক্ট করে কিনা। যেমন একটা সংলাপ আছে- ‘পীরের মাজার হয় বড় কোনো চোরের মোকাম’ বা ‘আল্লাহ কী রকম দেখতে’ ... চিন্তা কর ’৭৫ সালের কথা। শাহরিয়ার এর আগে যে তুমি সাহিত্যমূল্যের কথা বলছিলে, এটাই হচ্ছে পাওয়ার অব টেক্স্ট্। এই কথায় দর্শক রিয়েক্ট করছে না পাওয়ার অব টেক্স্ট্-এর গুণেই। আর এই প্রথম সংলাপ চলে এলো একটা ডিসিপ্লিনের মধ্যে, অভিনেতৃরা কন্ডিশনড হয়ে গেল। এটাকে এক্সটেম্পর বলার স্কোপ নেই। এটা ছন্দে লেখা, নির্দিষ্ট মাত্রা আছে, তুমি বাড়াতেও পারবে না, কমাতেও পারবে না। কাব্যনাটক যে কেবল ফর্মেই এসেছে তা নয়, একটা গ্র“পের পারফর্মারদেরও এই ডিসিপ্লিন দিয়েছে যে, দেয়ার ইজ নো স্কোপ টু ক্রিয়েট এনি ডায়লগ। যেটা গদ্য নাটকে থাকে এবং করেও।

হাসান শাহরিয়ার
নিজেই নাট্যকার হয়ে যায় ...

সৈয়দ শামসুল হক
হ্যাঁ, এটা যে ইচ্ছা ক’রে করে তা না, বিপদে পড়ে করে।

হাসান শাহরিয়ার
দর্শকের রিয়েক্ট না করাটা বলছিলেন। আমি অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে জানতে চাই ’৭৬ সালের দর্শকদের আপনি জানিয়েছিলেন ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি না করতে বা ধর্মকে ব্যবহার না করতে ... কিন্তু আজকের বাংলাদেশে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ, তো দর্শক কি নাটক থেকে কিছু নেয় না বা দেখার পরই সব ভুলে যায়?

সৈয়দ শামসুল হক
এটা নিয়ে ইদানিং আমি যে কী পরিমান চিন্তিত তোমরা ভাবতেও পারবে না। এই যে কথায় কথায় আমরা বলি নাটক সমাজ বদলের হাতিয়ার, কিন্তু কোন দিক থেকে? কত আগেই তো আমি বললাম ধর্ম থেকে দূরে থাকো বা বাড়াবাড়ি করো না, তো আজকে ৩০ বছর পর কী দেখছি! তার মানে দর্শক নাটক থেকে কিছু নেয় না? আবার আমার এ-ও মনে হয়েছে যে, নাটকগুলো আসলে বহুল অভিনীত হয় না, বেশি দর্শকের কাছে যেতে পারছে না। আজকে যদি ৬৪ টি জেলায় পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় হতো, যদি বেশি বেশি দর্শকের কাছে নেয়া যেত তাহলে কোনো ফলাফল পাওয়া যেতে পারতো।

বিপ্লব বালা
আচ্ছা পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নিয়ে একটা মন্তব্য আপনি শুনেছেন কিনা যে, এটা দেখার পর রাজাকারের প্রতি সহানুভূতি আসে।

সৈয়দ শামসুল হক
হ্যাঁ, একজন দর্শক, আমার খুব গুণী বন্ধু, ঢাকার লোক, উনি বললেন যে- আমার চোখে পানি আহে ক্যান রাজাকারের জন্য? আমি বললাম যে- পানি আসে এই জন্য যে, এই লোকটির এরকম হওয়ার কথা ছিল না। এই জন্যই ঈশ্বরের মতো আপনার চোখেও পানি আসে। একজন যখন পাপ করে এবং পাপের শাস্তি হিসেবে সে যখন দোযখে যাবে, ভাবার কোনো কারণ নেই যে ঈশ্বর তাকে হেসে হেসে দোযখে পাঠাবে। ঈশ্বরের অবশ্যই মায়া হবে, কারণ তার সৃষ্টির তো এমন হওয়ার কথা ছিল না। যেহেতু হয়ে গেছে তাই অনিচ্ছা সত্বেও সাজা দিতে হলো। তো আমি যখন লিখি তখন তো আমি ঈশ্বর। একেকটা চরিত্র সৃষ্টি করছি। আবার যখন দর্শক দেখে তখন কিন্তু সে-ও একজন ঈশ্বর। তাই তার সৃষ্টির পতন দেখে সে কাঁদে। সে ভাবে যে এই লোকটির তো এমন হওয়ার কথা ছিল না। তখন তার দায় হচ্ছে আর কাউকে না পারে, অন্তত সে নিজে কখনো এমন মানুষ হবে না। ... আরো অনেকে বলেছে যে- রাজাকারকে আপনি হিরো করলেন কেন? আমি বললাম যে- আমি আমার সৃষ্ট পাত্র-পাত্রী দিয়ে কথা বলিয়েছি। সেখানে রাজাকার একটা মেইন রোল পারফর্ম করছে। তাকে যদি আপনি হিরো মনে করেন, সেটা কিন্তু আপনার পারসেপশন। আমার কাছে সে বাহক।

হাসান শাহরিয়ার
সমসাময়িক ইতিহাস নিয়ে নাটক লিখলে কিন্তু দর্শকের কিছু প্রিকনসেপশন থাকে। যেমন আপনার নূরলদীনের সারাজীবন দেখতে গিয়ে কিন্তু আমরা ইতিহাসের সত্যকে খুঁজতে যাই না। আপনি যা দেখাচ্ছেন তার মধ্য থেকেই বুঝতে চেষ্টা করি। কিন্তু যখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে করছেন, তখন আমরা সঠিক ইতিহাস বা আবেগ খুঁজতে যাই। এটা কি আমরা ঐ ঘটনার উইটনেস বলে এমন হয়? আজ থেকে ৩০/৪০ বছর পর যদি দর্শক দেখে তাহলে কি এধরণের মন্তব্য করবে?

সৈয়দ শামসুল হক
দেখো, আমার ওই নাটকের কোথাও ‘রাজাকার’ বা ‘একাত্তর’ শব্দ নেই। তারপরও মানুষ ভাবছে এটা মুক্তিযুদ্ধের নাটক। আমার মনে হয় ৩০/৪০ বছর পর যদি দর্শক দেখে তখন বলবে- এন্টিপিপলকে হিরো বানিয়েছি। তুমি শেক্সপীয়রের হেনরি দ্য থার্ড দেখলে কী বলবে? তুমি তো ঐ যুদ্ধের সাথে জড়িত নও, তবুও তুমি দেশপ্রেম পাবে। আজকে মেঘনাদ বধ কাব্য যখন পড়া হয়, তখন লোকে অন্য পারসপেকটিভ থেকে দেখে, কিন্তু আমি দেখি একজন লোক তার দেশকে ডিফেন্ড করছে- রাম সেখানে এগ্রেসিভ। এটা কিন্তু সিপাহী বিদ্রোহের পরপরই লেখা, মাত্র চার বছর পর। এর সঙ্গে নিশ্চয়ই আইডেন্টিফাই করেছে, এবং লোকে সেটা বোঝে নি? অবশ্যই বুঝেছে। আমরাই বরং হারিয়ে ফেলেছি। যার জন্য কোলকাতার মেঘনাদ বধ কাব্য নিয়ে লোকে যতই লাফাক, আই ডোন্ট গিভ আ ড্যাম, মেঘনাদ বধ কাব্যের স্পিরিটই তো ধরতে পারে নি। প্রডাকশন ব্রিলিয়েন্ট হলে কী হবে... ওটাতো বিয়ের কনেকে বিউটি পার্লার থেকে সাজিয়ে আনার মতো। আমি বিয়ের আসরে কোনো মেয়েকেই কিন্তু অসুন্দর দেখি নি। কিন্তু ওটাই তো সব না, ওই প্রসাধনটুকু বাদ দিলে কী থাকে সেটা দেখার বিষয় আছে। আজকে দেখানো উচিত ছিল আগ্রাসন কীভাবে হচ্ছে। রাবণ লংকাকে ডিফেন্ড করছে, রাম ইজ এন এগ্রেসিভ, মেঘনাদ ইজ হিরো, বিভীষণ ইজ ট্রেইটর।

হাসান শাহরিয়ার
হকভাই, আমরা একটু নূরলদীনের সারাজীবন নিয়ে কথা বলি। পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় লেখার পেছনে মতিঝিলের এক বৃদ্ধ রাজাকারকে মারার ঘটনা আপনাকে ভাবিয়েছিল। নূরলদীনের সারাজীবন-এ এমন কিছু আছে? বা এই নাটকটি লেখার শুরুটা একটু জানতে চাই।

সৈয়দ শামসুল হক
নূরলদীনকে আমি আবিষ্কার করেছি। আবিষ্কার কী পর্যায়ে পৌঁছেছে দেখো, নূরলদীন ১৭৮৩ সালে সম্মুখ যুদ্ধে নিহত হন, আর আমার লেখা নূরলদীনের সারাজীবন ১৯৮৩ সালে এসে মঞ্চস্থ হয়। দু’শ বছর পর। নূরলদীনের কোনো নাম নিশানা ছিল না, আমাদের স্মৃতিতে ছিল না। আমি নিজেও জানতাম না। ব্যাপারটা হলো কী, বিলেতে আমি যে সাড়ে ছ’বছর কাজ করেছি বিবিসি-তে, ঐ সময়ে আমি দুটো বিষয়ে ছাত্রদের মতো পড়াশোনা করেছি- একটা হচ্ছে ভাষাতত্ত্ব, আরেকটি হচ্ছে ইতিহাস। বিবিসি-র লাইব্রেরি অত্যন্ত রিচ লাইব্রেরি। ইতিহাস বলতে আমি স্পেশালআইজ করেছি কলোনিয়াল হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া এবং বেঙ্গল, বিশেষ করে বঙ্গ প্রদেশ। এটা নিছক আগ্রহ- ভাবলাম যে-মাটিতে আমার জন্ম, যে-মাটির ভাষায় আমি মানুষের কথা বলছি, তাদের সম্পর্কে একটু জানি। ওখানে মস্কো থেকে প্রকাশিত দুখণ্ডে ভারতের ইতিহাস ছিল। এর ২য় খণ্ডের এক জায়গায় পেলাম যে, পলাশী যুদ্ধের মাত্র ১০/১২ বছর পরে কোম্পানীর যে দালাল ছিল, ওদের লেকি বলা হতো, তো ওদের বিরুদ্ধে একটা আন্দোলন হয় রংপুরে। আমি যেহেতু বৃহত্তর রংপুরের মানুষ, লন্ডনে বসে পড়ছি, তখন একেবারে বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো চমকে উঠলাম। তখন খোঁজ খবর করতে করতে সুপ্রকাশ রায়ের বই থেকে কিছু তথ্য পাওয়া গেল। তারপর আরো খোঁজ খবর নেওয়ার জন্য ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে গেলাম। সেখানেও তখনকার দিনের কিছু ডকুমেন্টস পেলাম। রংপুরে তখনকার কালেক্টর ছিলেন গুডল্যাড- আমার নাটকেও একটা চরিত্র আছে। তো এইগুলো পড়ছি কিন্তু তখনো জানি না যে নাটক লিখবো। কালেক্টর গুডল্যাড তার নিজের হাতে রিপোর্ট লিখেছিল, তাতে লিখেছে- এই ডেকোইটস ... দেখলাম তখন যাদের ডেকোইটস বলা হতো, পাকিস্তানীরা পরে তাদের মিসক্রিয়েন্ট বলতো। আমরা ওদের বলি বিপ্লবী। তখনকার শাসকদের ভাষায় ছিল ডেকোইটস। তো লিখেছে- ডাকাত দলে অর্থাৎ নূরলদীনের দলে মাদ্রাসা-মক্তব টোলের ছাত্ররা, জেলে-কামার-কুমারেরা যোগ দিয়েছে। প্যারালাল টু ১৯৭১ এ কলেজ ইউনিভার্সিটির ছাত্ররা, ওখানে জেলে-কামার-কুমার আর এখানে শ্রমজীবী সাধারণ মানুষ, কী আশ্চর্য মিল দেখো। ওয়ারেন হেস্টিংস যে মার্শাল ’ল জারি করেছিল তা এই নূরলদীনের আপরাইজিং-এর পরে। তার সঙ্গে আবার ইয়াহিয়া-টিক্কা খানের মিলিটারী ফর্মানের আশ্চর্য মিল পাবে ... তো এই যে প্যারালাল সিমিলারিটি, এটা আমাকে খুব টেনেছিল এবং ভাবিয়েছিল। একটা ধারণা কিন্তু আছে যে, ’৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ আমরা হঠাৎ করে ফেলেছি, বা বিশ্বে বুঝি এই একটিই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। কিন্তু যে সময়ে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি সেই একই সময়ে বিশ্বে বিভিন্নভাবে ৩৫ টা দেশে মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছিল ... আমার পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়-এর প্রথম সংস্করণের ভূমিকায় এটা লেখা আছে। বৃহত্তর মানুষের সাথে নিজেকে এক করে ভাবার বিষয় ওটাতে ছিল, যার জন্য পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নাটকে সরাসরি পাকিস্তান, রাজাকার এ ধরনের শব্দের উল্লেখ নেই। যেহেতু তোমরা বাংলাদেশে বসে দেখছো তাই ধরেই নিয়েছো যে এটা মুক্তিযুদ্ধের নাটক। যাক, নূরলদীন তৎকালীন বঙ্গ প্রদেশের পৌনে তিনকোটি মানুষের মধ্যে ৩৫ হাজার লোকের একটা বাহিনী গড়ে তুলেছিল ... এটা কালেক্টরের লেখায় আছে। তো তুমি নাটক লেখার কারণটা যদি জানতে চাও তাহলে আমি বলবো দুটো কারণ। এক- আমি আজকের যোদ্ধা নই, আমার একটা ঐতিহ্য আছে। আমরা যে ন’মাসের যুদ্ধ করেছি, সেটারও একটা পূর্ব ধারাবাহিকতা আছে। আর ...

বিপ্লব বালা
আরেকটা কি আমি বলবো? মানে আমার কাছে মনে হয়েছে ...

সৈয়দ শামসুল হক
হ্যাঁ, বলো।

বিপ্লব বালা
আমার কাছে মনে হয়েছে, এই নাটকটার মধ্যে কিন্তু একটা আত্মবিশ্লেষণের ব্যাপার আছে। জাতি হিসেবে আমাদের স্বভাবের দুর্বলতা, ব্যর্থতা এসবের একটা সন্ধান কিন্তু আছে।

সৈয়দ শামসুল হক
হ্যাঁ, ঠিকই বলেছো। আমি আসছি ঐ জায়গায়। আমি নূরলদীন নিয়ে যখন ভাবছি তখন আমার খুব মনে হয়েছে যে এই মানুষটাকে, তার ইতিহাসটাকে যদি আরো খানিকটা জানতে পারতাম, জানাতে পারতাম, তাহলে একটা কাজ হতে পারতো। আমরা একটা ইতিহাসের পথে দাঁড়াতে পারতাম। এখন ইতিহাস বিকৃতির কথা বলা হয় কিন্তু এই বিকৃতিরও আগে যে ইতিহাস রয়েছে সেটা আমরা জানি কিনা। এমনটা যেন মনে না হয় যে, এই জাতির ইতিহাস শুরুই হয়েছে ’৫২ তে বা ’৬৫ তে বা ’৭১ এ। বহু শিক্ষিত লোক আছে যারা ’৫২-এর আগের কিছু বলতেই পারবে না। বা কেউ কেউ পারলে হয়তো সিপাহী বিপ্লবের কথা বলতে পারবে তা-ও আবার সঠিকভাবে নয়। আরেকটা সমস্যা আছে ইংরেজি ভাষায় তারিখ বলা। যারা একাত্তর বলে আর যারা সেভেনটি ওয়ান বলে এদের মধ্যে কিন্তু বিরাট ফারাক আছে। তো আমি চেয়েছি একটা ইতিহাস সবার সামনে নিয়ে আসতে, এবং তা নাটকের মাধ্যমে। তখন আমার আবছা আবছা মনে পড়লো যে, বাবা যখন কুড়িগ্রামের বাড়িতে ওষুধ বানাতেন তখন এক কবিরাজ আসতেন, নাম- দেওয়ান খাঁ কবিরাজ। তো খাঁ কবিরাজের কাছে আমার মনে হলো শুনেছিলাম এক চাষী নবাবের কথা। আবার সুপ্রকাশ রায়ের বইতে পেলাম যে নূরলদীনকে নবাব উপাধি দেয়া হয়েছিল। আবার ইংরেজি ডকুমেন্টেও দেখলাম যে- এই ডাকাত নিজেকে নবাব ঘোষণা করেছে। ... তখন আমার মনে হলো যে, এই লোকটি সাধারণ মানুষ থেকে উঠে এসে ৩৫ হাজার মানুষের বাহিনী গড়ে তুলেছে. ইংরেজ, বণিক, রাজা-মহারাজাদের বিরুদ্ধে লড়ছে, সে নিজে কেন নবাব উপাধি নেবে? এটা তো সম্ভব না। আমি গণতন্ত্রের কথা বলে তো ডিক্টেটর হতে পারি না। এই প্রথম কিন্তু নাটকের বীজ আমার মাথায় ভেতরে ঢুকলো।

বিপ্লব বালা
কিন্তু এটার মধ্যে একটা অন্য জায়গাও আছে মনে হয়। তা-হলো সাধারণ জায়গা থেকে ওদের বিরুদ্ধে ফাইট করার জন্য নবাব হওয়া ... মানে কোথাও সমকক্ষতায় দাঁড়ানো।

সৈয়দ শামসুল হক
আমি বুঝতে পেরেছি তোমার পয়েন্টটা। আমি এভাবে দেখেছি যে, এই লোকটার ভেতরে নিশ্চয়ই কোনো প্রশ্ন এসেছে, একটা দ্বিধা এসেছে বা অস্থিরতা এসেছে যে নবাবের বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধ করছি, আমিই আবার সেই নবাব হবো? আর তুমি বলছো সে সমকক্ষতা চায় ...

বিপ্লব বালা
না, এই সমকক্ষতা চাওয়ার মধ্যে কি কোনো বৈপ্লবিক উপাদান নেই?

সৈয়দ শামসুল হক
আমি অনুভব করেছি যে, এই লোকটির ভেতরে একটা তীব্র সংকটের জন্ম হয় ...

বিপ্লব বালা
মানে একটা উচ্চাশার জায়গা তৈরি হয়?

সৈয়দ শামসুল হক
না, সংকটের জন্ম হয় ... এবং সেটা এই জন্য যে, আমি মানুষের জন্য যুদ্ধ করছি। আমি নেতা হবো ঠিক আছে কিন্তু আমি নবাব হবো না।

বিপ্লব বালা
কিন্তু এই রাজনৈতিক রিয়েলাইজেশন কি নূরলদীনের কাছ থেকে আশা করা যায়? এটা তো আপনি আরোপ করছেন তার ওপর।

সৈয়দ শামসুল হক
আমি আরোপ করেছি। আমি যেটা করেছি যে, ক্ষমতা কি মানুষকে নষ্ট করে না? নূরলদীন যতটা না বীরগাথা, তার চেয়ে বড় হচ্ছে ক্ষমতা মানুষকে নষ্ট করে কি করে না? বা কীভাবে করে?

বিপ্লব বালা
মানে সব সময়কে বোঝাতে গিয়েই আপনি এটা করেছেন?

সৈয়দ শামসুল হক
অবশ্যই। হাউ পাওয়ার করাপ্ট আস? এটা করতে গিয়ে আমি ভেবেছি যে, একটা চরিত্র আমাকে তৈরি করতে হবে, যে নূরলদীনের সঙ্গে আর্গু করতে পারবে ... অল্টার ইগো তৈরি করতে হবে এবং সেটা হলো আব্বাস। এটা সম্পূর্ণ আমার কাল্পনিক চরিত্র। নূরলদীনের মেক্সিমাম চরিত্রই ঐতিহাসিক ... ইতিহাসের কোথাও না কোথাও উল্লেখ আছে। শুধু উল্লেখ নেই আম্বিয়া আর আব্বাসের। আব্বাসকে আমি এমনভাবে রেখেছি যে কিনা অতীত এবং বর্তমানের মাঝে সাঁকো হিসেবে কাজ করবে। এই বর্তমান কিন্তু শুধু আজকের বর্তমান নয়। আজ থেকে যদি ৫০ বছর পরেও হয় সেই বর্তমানের সঙ্গেও নূরলদীনকে রিলেট করাবার একটা ব্যাপার আছে।

হাসান শাহরিয়ার
হকভাই, আপনি নাটক যে লেখেন তার প্রক্রিয়াটা কী? মাথায় যে ভাবনাটা আসে সে থেকে শুরু করে আমরা যখন পাঠ করি ...

সৈয়দ শামসুল হক
আমি জানি না অন্য নাট্যকারদের বেলায় কী হয়, আমি যে নাটকগুলোই লিখেছি তার একটা সেন্ট্রাল সিন কিন্তু আমার মাথায় থাকে। এবং সেটার আশেপাশে ... সেটাকে তৈরি করবার জন্য অন্যান্য দৃশ্যগুলো আসে। এমন কি আমার উপন্যাসের ক্ষেত্রেও একটা কেন্দ্রীয় দৃশ্য মাথায় থাকে। নূরলদীনের ক্ষেত্রে বীজদৃশ্যটা হচ্ছে- নূরলদীন যেখানে তার শৈশব বর্ণনা করছে। সেই দুর্ভিক্ষ, সেই বাবার কথা এবং সে নিজে জোয়াল টানছে। তো এই জোয়াল টানার দৃশ্যটার কথা বলি, এটার কিন্তু একটা বাস্তব ভিত্তি আছে। সেটা হচ্ছে- দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় আমি যখন থ্রি-ফোরে পড়ি অর্থাৎ আমার বয়স যখন ৭/৮, সেসময় একটা কথা শোনা গেল যে, জাপানিরা দেশ দখল করে নেবে। তো জাপানিরা ভারতবর্ষ দখল করলে আমাদের কী দুর্গতি হবে এটা বোঝানোর জন্য ব্রিটিশ সরকার বেশ কিছু পোস্টার ছেড়েছিল। আমাদের কুড়িগ্রামের দেয়ালে দেয়ালেও সেই পোস্টার ছিল। পোস্টারটা ছিল- গরুর জায়গায় মানুষ লাঙ্গল টানছে আর জাপানি সৈনিক চাবুক মারছে। এটা আমার মনে একটা স্থায়ী দাগ কেটেছিল ... মানে অতীতের অনেক স্মৃতি থাকে না যেটা ভেতরে গভীরতর রেখা হয়ে থাকে? আমার বেলায় এটা হলো এই পোস্টারটি। তো এটাকেই মডিফাই করে আমি এই কেন্দ্রীয় দৃশ্যটা লিখি, যেখানে গরুর বদলে নূরলদীন তার শৈশবের কথা বলছে।

বিপ্লব বালা
ভাষার ব্যবহার নিয়ে কিছু বলুন তো। মানে আঞ্চলিক ভাষা এবং তা কমিউনিকেট করানো ...

সৈয়দ শামসুল হক
ভাষার ক্ষেত্রে যে বিষয়টা ছিল যে, পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নাটকেও কিন্তু আমি প্রথমে ৬/৭ পৃষ্ঠা মান ভাষাতে লিখেছিলাম। পরে ওগুলো ছিঁড়ে ফেলে আঞ্চলিক ভাষায় লিখেছি। কিন্তু নূরলদীনের ব্যাপারে এই সংশয় আমার ভেতরে ছিল না। আমি জানি যে, নূরলদীনকে ঐ ভাষাতেই ঐখানে পৌঁছাতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, বাংলাদেশের নাটক লিখছি, বাংলাদেশের দর্শকদের জন্য লিখছি। আমি সব সময় মনে করি আমার আঞ্চলিক ভাষায় অনেক বেশি কমিউনিকেট করতে পারবো কোনো কোনো ক্ষেত্রে।

বিপ্লব বালা
কিন্তু ঐ বিপদটা নিশ্চয়ই আপনি ভেবেছেন যে, আঞ্চলিক ভাষায় সব জায়গায় কমিউনিকেট করাটা ...

সৈয়দ শামসুল হক
সেটা তো ছিলই নূরলদীনের ক্ষেত্রে। আমি তো ঐ এলাকারই লোক। আমি যদি ঐ এলাকার ভাষা বিশ্বস্তভাবে না করতে পারি, তাহলে তো দানা বাঁধে না। তবে যাতে করে অন্য দর্শকদের কাছে যেতে পারে সেজন্য সেই উপভাষা অনেক তরল করা হয়েছে, যা আমি ভূমিকাতেও বলেছি। যেমন আমরা ‘র’কে ‘অ’ বলি, এটা আমি এক্ষেত্রে করি নি। আমরা বলি ‘করিলং’ কিন্তু নাটকে ওভাবে দিই নি। তারপরও ভয়ে ভয়ে ছিলাম। বিশেষ করে কোলকাতায় যখন করতে গেলাম, একাডেমী মঞ্চে ১২’শ দর্শক দেখলো, ভয়ে ভয়ে ছিলাম। কিন্তু না অনেককেই জিজ্ঞেস করে দেখলাম যে, তাদের বুঝতে কোনো অসুবিধা হয় নি। পাওয়ার অব টেক্স্ট্- এর কথা বললাম না? এর সাথে পাওয়ার অব স্পীচেরও একটা ব্যাপার আছে। আমরা কবিতার কি সব বুঝি নাকি? কবিতার মান শব্দটাই কি বুঝি নাকি? তারপরেও ভেতরে কোথায় যেন একটা টান লাগে। আঞ্চলিক ভাষার ক্ষেত্রেও হয়তো একটা দুটো বুঝলাম না, তাই বলে কি টানবে না? যেমন ধরো- নূরলদীনের সারাজীবন নাটকের প্রথম প্রস্তাবনায় আব্বাস বলছে- ‘নীলক্ষা আকাশ নীল’ ... আমাদের কুড়িগ্রাম-রংপুরে কিন্তু নীলক্ষা মানে আকাশ। তাহলে এখানে রিপিটেশন হলো। কিন্তু আমি বোঝাতে গিয়ে যদি বলতাম-‘আসমান আকাশ নীল’- তাহলে কিন্তু টানে না। তো নীলক্ষা শব্দের অর্থ অনেকে বুঝবে না, কিন্তু আন্দাজ করতে পারবে যে- যাকে নির্ণয় করতে পারছি না বা লক্ষ্য করতে পারছি না এমন কিছু বলছি। তো শব্দের ভেতর মজাও আছে। তাই না?

বিপ্লব বালা
ও, আমি ভেবে আসছি যে আকাশের নীল চোখ হাঃ হাঃ ...

সৈয়দ শামসুল হক
তা-ও হতে পারে। এরকম অনেক শব্দ আমি ব্যবহার করেছি যেটা না বুঝলেও একটা আবেদন তৈরি হয়। যেমন আমাদের ওখানে সিল্কের কাপড়কে বলে আগুন পাটের কাপড়। তো আমার নাটকে আছে আম্বিয়া ভাবছে যে, যুদ্ধ থেকে ফিরে আমার স্বামী আমাকে আগুন পাটের শাড়ি এনে দেবে। তো এভাবে ব্যবহার করেছি আর কি!

হাসান শাহরিয়ার
আমরা অন্য একটা প্রসঙ্গে যাই। আপনি পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় লিখে থিয়েটারকে (নাট্যদল) দিলেন আর নূরলদীনের সারাজীবন লিখে নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়কে দিলেন ... এটা কিসের ভিত্তিতে দিলেন?

সৈয়দ শামসুল হক
থিয়েটারকে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় দিয়েছি তার একটা কারণ হচ্ছে রামেন্দু মজুমদার, আবদুল্লাহ আল-মামুন এদের সঙ্গে অনেক আগে থেকেই আমার পরিচয় ছিল। মুনীরভাইয়ের সূত্র ধরেও পরিচয় ছিল। তো ওদেরকে নাটকটা দিলাম, এর মানে এই নয় যে এরাই সব চেয়ে ভালো করতে পারবে। তবে আমার একটা ধারণা ছিল যে মাতব্বরের চরিত্রটা মামুন ভালো করতে পারবে।

বিপ্লব বালা
ফেরদৌসী মজুমদার?

সৈয়দ শামসুল হক
ওর সম্পর্কে আমার অতটা ধারণা ছিল না। মামুনের ব্যাপারে আমার ধারণা যে ভুল নয়, তা সে মাতব্বর চরিত্র করে প্রমাণ করে দিয়েছে। ও এমনভাবে করলো যে, তারপর থেকে এধরনের চরিত্রের সবাই ওর মতো করেই করা শুরু করলো। আর নূরলদীনের সারাজীবন কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখবে মোর কমপ্লেক্স প্লে। থিয়েটারের সুবচন নির্বাসনে, সেনাপতি এগুলো আমি দেখেছি। নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়কে বলা হতো সাহেবী দল ... আমি ভাবলাম এরাই পারবে, ওদেরই ক্ষমতা আছে এটাকে থিয়েটারের ভাষায় দাঁড় করানোর। থিয়েটারের (নাট্যদল) ওরা আঞ্চলিক ভাষায় অভ্যস্ত আর নাগরিক ছিল অনভ্যস্ত। কাজেই ওরা নতুন একটা ভাষা শিক্ষা করে একটা অন্য জিনিস করতে পারে।

বিপ্লব বালা
ওঁরা বোধহয় নাটক চেয়েওছিলেন আপনার কাছে, তাই না?

সৈয়দ শামসুল হক
হ্যাঁ, আলী যাকেরের কোপেনিকের ক্যাপ্টেন দেখে আমি খুবই ইম্প্রেসড হই। ওটাই আমাকে ডিটারমাইন্ড করে যে নূরলদীনের সারাজীবন আমি আলী যাকেরকে দেব। এই নাটকের প্রথম প্রস্তাবনাটা একটা পত্রিকার বিশেষ সংখ্যায় বের হয়েছিল। আলী যাকের সেটা নিয়ে এসে আমাকে আবৃত্তি করে শুনিয়েছিল। তখন থেকেই শুধু বলতো কবে লেখা শেষ হবে। লেখা শেষ হলে ... আমার অভ্যাসই হলো নাটক যাকেই দিই, প্রথমে আমি পাঠ করে শোনাবো।
শোনালাম এবং ওরা কাজ করলো। এই আরকি!

হাসান শাহরিয়ার
পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, নূরলদীনের সারাজীবন, গণনায়ক, যুদ্ধ এবং যুদ্ধ সব নাটকেই একটা রাজনৈতিক বিবেচনা বা বিশ্বমুক্তির ব্যাপারটা এসেছে। সেদিক থেকে ঈর্ষা একেবারে ভিন্ন মেজাজ এবং আঙ্গিকের নাটক ... কীভাবে হলো?

সৈয়দ শামসুল হক
আমি রাজনৈতিক নাটকও কিন্তু ইচ্ছা করে করতে চাইছি বা ঈর্ষা-র ব্যাপারে যদি বলো যে ব্যক্তিনির্ভর ব্যাপার নিয়ে লিখেছি, তা কিন্তু নয়। সবটা মিলিয়েই নাটক। মেয়েটি যেখানে ছেলেবেলার বর্ণনা করছে- কী করে কামরুল হাসান এলেন এবং কাজগুলো করছেন, তার ভেতর বাংলার যে রূপ ... সেটাকে কী বলবে, ব্যক্তিগত না রাজনৈতিক? সেটাও তো গভীর অর্থে রাজনীতি। তারপরেও বলবো ঈর্ষা লেখার পেছনে আমার ২/৩ টা জিনিস কাজ করেছে। যেমন- একটা হলো শেক্সপীয়রের ওথেলো তো ঈর্ষাভিত্তিক নাটক, সেখানে একজন আরেকজনের প্রতি ঈর্ষান্বিত। আমি ভেবেছি মানুষ নিজেই নিজের প্রতি ঈর্ষান্বিত হতে পারে। সেটাই বিশুদ্ধ ঈর্ষা। মেয়েটি যে তাকে ভালোবাসতো, সেটা ব্যক্তিকে না, শিল্পীকে। এবং ব্যক্তি প্রৌঢ়ও কিন্তু তার আগের শিল্পী সত্তার প্রতি ঈর্ষান্বিত। আরেকটা হচ্ছে ... এই নাটকে যেটা ‘অবাস্তব’  সেটা হচ্ছে- প্রতিটি চরিত্র সর্বক্ষণ কথা বলে। কিন্তু বাস্তবে আমরা এমন করি না। তো আমি ভাবলাম যে কতদূর সীমা পর্যন্ত একটানা কথা বলা যায় মঞ্চে ... হাউ লং ক্যান উই টক, এবং সেটা অবশ্যই মিনিংফুল্যি।

হাসান শাহরিয়ার
এই যে মাত্র সাতটি সংলাপ, সেটা কি আপনার আগে থেকেই স্ট্রাকচার করা?

সৈয়দ শামসুল হক
এটা আমার নিজের কাছে নিজেই একটু পরীক্ষা করে দেখা যে, কতদূর বলা যায়। একক অভিনীত নাটক কিন্তু অন্য জিনিস। কিন্তু আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যে যে ফর্ম আছে সেটা আমাকে ভাবিয়েছে ... কথক, ছোটবেলায় দেখেছি রামায়ণ হতো, কথক একাই সব চরিত্র হয়ে কথা বলছে। কিন্তু মঞ্চে যখন ২/৩ টি চরিত্র থাকে তখন কতটা টানতে পারবে, এগুলো নিয়েই ভেবেছিলাম। ঈর্ষা-র গল্পটা যখন মাথায় আসে তখন ভাবলাম এই গল্পটাই নেব আমার এক্সপেরিমেন্টের জন্য। তো যখন নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ে পাঠ করলাম, তখন ওদেরই কেউ কেউ বললো যে- এটা শ্র“তিনাটক হতে পারে, রেডিও নাটক হতে পারে কিন্তু মঞ্চনাটক কোনোভাবেই নয়। তখন আতাউর রহমান বলল যে- না মঞ্চে অবশ্যই সম্ভব। ও একটু বেশি জেদী এবং একরোখা... তো ও চ্যালেঞ্জটা নিল।

হাসান শাহরিয়ার
নূরলদীনের সারাজীবন-র নির্দেশক তো আপনিই ঠিক করেছিলেন। কিন্তু নূরলদীন চরিত্রটি আলী যাকের করবেন, এটাও কি আপনি ঠিক করে দিয়েছিলেন?

সৈয়দ শামসুল হক
না, আমি কাস্টিং-এর ব্যাপারে কখনো কিছু বলি না। নাটকের যখন নির্দেশনা শুরু হয়, তখন সেটাতে আমার কিছু বলার থাকে না। তবে কেউ জিজ্ঞেস করলে আমি সাজেশন দিতে পারি।

হাসান শাহরিয়ার
যাকেরভাই কি এমন কিছু পরামর্শ চেয়েছিলেন?

সৈয়দ শামসুল হক
না, আমার কাছে না মামুন, না যাকের, না আতা ... কেউ-ই কিছু জানতে চায় নি।

বিপ্লব বালা
নূরলদীনের সারাজীবন এর পূর্ববর্তী আর পরবর্তী প্রযোজনা সম্পর্কে আপনার অভিমত কী? ভিন্ন সময়, পরিবেশ, অভিনেতৃ ও দর্শকের কারণে ভিন্নতর অভিজ্ঞতা হয় কি?

সৈয়দ শামসুল হক
হ্যাঁ, হয়। দুটো প্রযোজনা দু’রকম মনে হতে পারে মঞ্চের বা অভিনয়স্থলের দুই ভিন্নতার জন্য। অভিজ্ঞতা বোধহয় একই থাকে। অন্তত একই হবার কথা। কী জানি!

বিপ্লব বালা
হকভাই, ঈর্ষা-র একটা সংলাপ তো নাট্যজনদের মুখেমুখে ফেরে-‘জীবনের প্রতারণা শিল্পে ছায়া ফেলে’। এটার সত্যতা কতটুকু?

সৈয়দ শামসুল হক
হ্যাঁ, এটা কিন্তু খুব সত্যি কথা। আর মঞ্চ এমন একটা জায়গা যেখান থেকে মিথ্যা কথা বলা যায় না। শুধু রাজনৈতিক মিথ্যা না ... কিছু জীবন্তু লোক করছে, কিছু জীবন্ত লোকের সামনে। এই জন্য নাটকে মিথ্যা বলা যায় না। আজকে মঞ্চে যত কাঁচা কাজই হোক তার মধ্যে একটা সততা আছে। সেই সততা একেবারে হরতকির মতো ... একেবারে খটখটে।

হাসান শাহরিয়ার
হকভাই, আমরা ঈর্ষা-র অনেক আগের একটি নাটক নিয়ে একটু কথা শুনতে চাই। সেটা হলো ম্যাকবেথ। নাগরিক নাট্যসম্প্রদায় ও থিয়েটার যৌথভাবে করেছিল, তো এটা কি আপনি নিজে থেকেই অনুবাদ করেছিলেন নাকি ওনারা করে দিতে বলেছিল?

সৈয়দ শামসুল হক
এটা একেবারেই ফরমায়েসী কাজ ছিল। তারা বলেছে ম্যাকবেথ অনুবাদ করে দেবেন।

হাসান শাহরিয়ার
এর আগে শেক্সপীয়র তো অনুবাদ করেন নি?

সৈয়দ শামসুল হক
অনুবাদ করি নি কিন্তু সমান্তরাল রচনা আছে গণনায়ক। ম্যাকবেথ আমি বলেছি অনুবাদ করে দেব, তবে ফরমায়েশী কাজ বলে মনে কোরো না যে একেবারে হালকাভাবে করেছি। একটা কমন উদাহরণ দিই। মাইকেল এঞ্জেলোর সব কাজই ছিল ফরমায়েশী। শেক্সপীয়র এই ম্যাকবেথ যে লিখেছেন, সেটাও ছিল ফরমায়েশী কাজ। এটা কিন্তু শেক্সপীয়রের সব চেয়ে ছোট নাটক, মাত্র আঠারো’শ সাড়ে-আঠারো’শ লাইনের এবং এটা উনি খুব কম সময়ের মধ্যে লিখেছিলেন।

হাসান শাহরিয়ার
আপনার কতদিন লেগেছিল?

সৈয়দ শামসুল হক
অনুবাদ করতে বেশিদিন লাগে নি। মাস তিনেক। কিন্তু এটা নিয়ে কথা হচ্ছিল প্রায় দেড় বছর ধরে। ব্রিটিশ নির্দেশক ক্রিস্টোফার স্যানফোর্ড আমাকে চিঠি লিখতেন ওঁর ভাবনা জানিয়ে, আবার আমিও লিখতাম আমার ভাবনা জানিয়ে। অনুবাদ করার সময়ে আমি চেষ্টা করেছি এক অর্থে আক্ষরিকই হবে, আবার যেন এমন হয়, আমি যেটাকে বলি ভাবনাটক, সেটা যেন হয়। এটা আমার তৈরি শব্দ।

বিপ্লব বালা
আক্ষরিক কি সাউন্ডের দিক থেকে?

সৈয়দ শামসুল হক
সাউন্ডের দিক থেকে, তারপর লাইন না বাড়িয়ে অর্থ ঠিক রেখে। তুমি অবাক হবে শুনে যে, আমি অনুবাদ করার আগে বাংলায় যিনি যিনি অনুবাদ করেছেন সেগুলো একটু দেখে নিলাম। আমি খুব শক্ড্ হলাম গিরীশ ঘোষের অনুবাদে। উনি বহু জায়গা বোঝেন নি পর্যন্ত। অনেক জায়গায় ভুল অনুবাদ করেছেন। আবার একটা ধ্বনির ব্যাপার আছে, এই ধ্বনিটা আমি কারো অনুবাদে পাই নি।

বিপ্লব বালা
ধ্বনির ব্যাপারটা কি একটু ব্যাখ্যা করবেন? আপনি তো বাংলায় করছেন।

সৈয়দ শামসুল হক
বিখ্যাত একটা সংলাপ-‘টুমোরো এন্ড টুমোরো এন্ড টুমোরো’। এখন সব অনুবাদে আছে- কল্য, কল্য এবং কল্য, কোনোটাতে আছে- আগামীকাল, আগামীকাল এবং আগামীকাল। এখন আমি ভাবতে লাগলাম কী করা যায়! তখন আমার মনে হলো রবীন্দ্রনাথ আমাকে সাহায্য করতে পারেন। তো ওঁরই একটা গান থেকে নিলাম- ‘দিন পরে দিন, পরে দিন’। এইভাবে ধ্বনি মিলিয়ে করেছিলাম বলেই ক্রিস্টোফার সহজে মেলাতে পারতো। আর তোমরা খেয়াল করবে শেক্সপীয়রের অনেক ধরনের নাট্যকৌশল আছে। যেমন প্রায় প্রতি দৃশ্যের শেষ দু-লাইন কি চার-লাইন সমিল- মিলযুক্ত। বাকীগুলো কিন্তু অমিত্রাক্ষর। এটার একটা রিজন অনুমান করা হয়- ঐ শেষ দু-চার লাইন মিলের ব্যাপারে যে- দৃশ্য যে শেষ হচ্ছে সেটা উইংসের অধিকারীরা যাতে বুঝতে পারে ... এটা একটা কৌশল। আমিও সেগুলো রেখেছি, যদিও আজকে এগুলোর প্রয়োজন নেই।

হাসান শাহরিয়ার
আপনার এই অনুবাদ নিয়ে তো উৎপল দত্ত-ও শুনেছি বেশ প্রশংসা করেছেন।

সৈয়দ শামসুল হক
হ্যাঁ, আমার জন্য এটা খুবই ভালো লাগার ব্যাপার ছিল। শেক্সপীয়র উনি ভালো বুঝতেন। উনি নিজে অনুবাদও করেছেন। বিশেষ করে মিড সামার নাইটস ড্রিম এর অনুবাদ করেছেন চৈতালী রাতের স্বপ্ন। খুবই সুন্দর অনুবাদ। উনি বলেছিলেন- খুব ভালো অনুবাদ হয়েছে, এবং এ-ও বলেছিলেন যে, আগামী এক’শ বছরেও এই অনুবাদকে কেউ ছুঁতে পারবে না। আমাদের দেশে শেক্সপীয়র প্রথম অনুবাদ করেন মুনীর চৌধুরী। টেমিং অব দ্য শ্রু-র স্বচ্ছন্দ অনুবাদ মুখরা রমনী বশীকরণ। ওনার অনুবাদে ওনার ব্যক্তিত্বটা রিফ্লেক্ট হয়েছিল। সেটা কী রকম বলি- মুনীর চৌধুরী, খুব তৎসম এবং এক ধরনের অনুপ্রাস-এর প্রবণতা ছিল, যেটা ওনার অনুবাদে এসেছে। আমি ম্যাকবেথ অনুবাদ করতে গিয়ে চেয়েছি যে, আমার ব্যক্তিগত শব্দ চয়ন, বাক্য গঠন এতে যেন ছায়া না ফেলে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে- ধ্বনি, যেটাকে আমরা ধ্বনি শাসন বলি ... এই ধ্বনি শাসনটা যেন থাকে। বাংলাদেশে যতগুলো অনুবাদ হয়েছে, স্বাধীনতা নিয়ে এক রকম হয়েছে বটে কিন্তু যারা ছন্দে করেছেন তাদের ছন্দটাই রয়ে গেছে, আবার যারা গদ্যে করেছেন তাদের গদ্যটাই রয়ে গেছে। যেটা শামসুর রাহমানের হ্যামলেট অনুবাদের ক্ষেত্রে হয়েছে। আবু শাহরিয়ার গদ্যেও করেছেন কিন্তু সেখানেও তার গদ্য চলে এসেছে। ফলে দু-ক্ষেত্রেই কিন্তু অভিনয় করা যায় না। তো আমি চেয়েছি এই ধ্বনিশাসন দিয়ে অভিনয়যোগ্যতাটা যেন থাকে।

হাসান শাহরিয়ার
অভিনয়যোগ্যতা যেন থাকে বলছেন, তার মানে তো এই যে যাই করুন না কেন দর্শকের সাথে কমিউনিকেট করতে হবে। কিন্তু আমরা অনেককেই বলতে শুনি যে, তারা দর্শককে মাথায় রেখে কিছু করেন না। নিজের ভালো লাগছে বলেই করেন। এবং অনেকে আবার দর্শকের বোঝা না বোঝাটাকে দর্শকের ব্যর্থতা বলে মনে করেন। তো আপনার মত কী?

সৈয়দ শামসুল হক
না না, তাহলে বলতে হবে ওরা কাজটাই বোঝেন না। নাটক লেখা হলেই তা নাটক হয় না বা মহড়াতেও নাটক হয় না। নাট্যকার-নাট্যজন-দর্শক এই তিনের মিলনেই হয় নাটক।

হাসান শাহরিয়ার
নাটকের ফর্ম নিয়েও অনেক কথা হয়। আপনি একবার বলেছিলেন- আপনার ৬০ তম জন্মদিনে সেলিম আল দীন একটা লেখায় আপনাকে পাশ্চাত্যের বা ঐ ফর্মের নাট্যকার বলেছেন ...

সৈয়দ শামসুল হক
হ্যাঁ, বলেছে, আমি প্রতিবাদ করি নি।

হাসান শাহরিয়ার
কেন করেন নি বা এটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

সৈয়দ শামসুল হক
প্রথমত প্রতিবাদ করি নি কারণ, ও আমাকে যদ্দুর বুঝেছে তদ্দুর বলেছে। আমার সমগ্র কবিতাতে, নাটকে, নাটকের বিষয়বস্তুতে কোনো ইউরোপীয় ইমেজ নেই। অথচ আমি সেখান থেকে অনেক অনেক কিছু নিয়েছি। দ্বিতীয়ত আমি এখনো শার্ট প্যান্ট পরি, পাঞ্জাবী পরি না। এজন্য সাহেব সাহেব মনে হতেই পারে!

হাসান শাহরিয়ার
না, এটা কী এ কারণে যে আপনি প্রসেনিয়াম থিয়েটার করছেন বলেই বলছেন?

সৈয়দ শামসুল হক
না, সব কিছু মিলিয়েই ... এটা একটা বলার কথা তাই বলে। আমি কিন্তু মতামতের ক্ষেত্রে যেটা বুঝি সেটা পরিষ্কার করে বলি বা একেবারেই বলি না। কিন্তু এই যে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলা-টলা, এটা আমি করি না। এটা কিন্তু তথাকথিত বাঙালিয়ানাও না। বললে স্ট্রেইট বলা আর না বললে ছেড়ে দাও। যে অর্থে বিদ্যাসাগর ইংরেজ ছিলেন- উনি যেটা ভালো বুঝতেন বলতেন, না হলে না। এসব কারণেই হয়তো আমাকে পাশ্চাত্য বলে।

হাসান শাহরিয়ার
একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি। খাট্টা তামাশা কি আপনার ফরমায়েশী কাজ ছিল?

বিপ্লব বালা
না বোধ হয় ...

সৈয়দ শামসুল হক
হ্যাঁ, ফরমায়েশী। তারা বলেছিল যে, আমরা কয়েকজনের টিম বাইরে যাব, কোনো নাটক দেয়া যাবে কিনা। আমি বললাম যে হ্যাঁ, আমি একটা নাটকের কাজ করছি। ইউ ক্যান ডু ইট। আমার নাটকে কিন্তু এমনিতেই চরিত্র কম থাকে, অন্যদের নাটকের চেয়ে। হয় চরিত্র কম, না হয় অনির্দিষ্ট। যেমন-পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নাটকে তুমি দু’শ লোকও নামাতে পারো গ্রামবাসীতে আবার নূরলদীনের সারাজীবন-এ লাল দলে অসংখ্য লোক নামানো যায়।

হাসান শাহরিয়ার
আপনার অন্যান্য নাটকের তুলনায় খাট্টা তামাশা একটু হালকা হয়ে গেছে, এমন কি আপনার মনে হয়?

সৈয়দ শামসুল হক
না, এমন মনে হলে আমি নাটকটা দিতাম না।

বিপ্লব বালা
আমার মনে হয় মূল সমস্যাটা প্রডাকশনের ক্ষেত্রে হয়েছে।

সৈয়দ শামসুল হক
খাট্টা মানে কিন্তু টক, মানে তামাশাটা টক। এখানে মহাযুদ্ধে হঠাৎ বড়লোক হয়ে যাওয়া মানুষের তৈরি দুর্ভিক্ষ আছে, তখনকার নারীর সমস্যা আছে, আমি মনে করি বিষয় এবং বাস্তবতাটা অনেক জটিল। সে কারণে এটা ধরাটাও খুব কঠিন।

বিপ্লব বালা
যুদ্ধ এবং যুদ্ধ নাটকের আগে উপন্যাস লেখা হয়। লেখা ও প্রযোজনায় বিষয়টি যেভাবে এলো তার অভিঘাত কেমন হলো দর্শকের মনে? একধরনের নাটুকে সেন্টিমেন্ট-ভঙ্গী হয়ে উঠলো কি? নাকি বাস্তবে বক্তৃতায়, নাটকে এই ধরন ব্যবহৃত হয়ে তেমন ক্রিয়া আর ঘটে না মানুষের কাছে- এই মেনে নেয়াটা এতই অনিবার্য হয়ে উঠেছিল সমাজ মনে?

সৈয়দ শামসুল হক
প্রথমেই বলি, উপন্যাস থেকে নাটক করেছি, আমার ‘স্মৃতমেধ’ উপন্যাস থেকে নাটক যুদ্ধ এবং যুদ্ধ। এ কাজটা এমন, উপন্যাস উপন্যাসই, নাটক নাটকই। একই বিষয় ঘটনা চরিত্র থাকলেও দুটো স্বতন্ত্র সৃষ্ট্ িরবীন্দ্রনাথ এমন অনেক করেছেন- উপন্যাস থেকে নাটক, নাটক থেকে নৃত্যনাট্য, গীতিনাট্য। আমিও আমার উপন্যাস আরো কিছু, যেমন ‘কালধর্ম’, একে কাব্যনাট্যে এনেছি- এখানে এখন। আমার লেডি উপন্যাস থেকে করেছি নাটক- কৃষ্ণপক্ষ। বহুদিন পরে রামেন্দুর নির্দেশনায় ‘থিয়েটার’ এটা করবে। আবার আগে নাটক লিখেছি- খাট্টা তামাশা, পরে উপন্যাসে রূপ দিয়েছি ‘নারীরা’।  যুদ্ধ এবং যুদ্ধ- এ নাটকের একটা ব্যাপার দেখো- এ দেশে ওটিই প্রথম ডকুড্রামা- প্রামাণ্য নাটক। এখন অনেকেই এ ফর্মটা নিয়েছেন। আমার ভাবতে ভালো লাগে, কাব্যনাট্েযর পর ডকুড্রামাও আমিই এ দেশে আনতে পেরেছি। না, নাটুকে সেন্টিমেন্ট আবার কী? সেন্টিমেন্ট শব্দটা এত নিচু পর্দায় দেখা ঠিক না- বিশেষ করে আমার ওই যুদ্ধ এবং যুদ্ধ- এর বেলায়। নাটকটা যখন হয়েছিল তখন একটা সাড়া পরে গিয়েছিল। সাড়া না বলে আলোড়ন বলা ভালো। স্মৃতির আলোড়ন। একাত্তর মূর্ত্ত হয়ে উঠেছিল, একাত্তর পরবর্তী দুঃশাসনের বর্তমানও স্পষ্ট হয়েছিল। আমি একটা ঘা দিতে চেয়েছিলাম শহীদ জায়া জীনাত মহলের একজন রাজাকারকে বিয়ে করবার ঘোষণায়। বাস্তবেই জীনাত বিয়ে করেছিল কীনা রাজাকারকে, সে পর্যন্ত নাটকে যাই নি। হয়তো সে করেছে, হয়তো করে নি। দর্শক কিন্তু চমকিত হয়েছে ঘোষণাতেই। এই চমকে দেয়াটুকুই নাটকে আমার অভিপ্রেত ছিল। এই ঘা দেয়ার দরকার ছিল। নাটকের এই ক্রিয়া দর্শকের মনে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। নিশ্চয় করেছিল।

হাসান শাহরিয়ার
নাটকে আপনি অলটার ইগো তৈরি করেন। যেমন করেছেন- নূরলদীনের অলটার ইগো আব্বাসকে। পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নাটকে রাজাকারের প্রতি করুণা নিয়ে যে প্রশ্নের মুখোমুখি আপনাকে হতে হয়েছে, তারই অলটার ইগো আমার কাছে মনে হয়েছে যুদ্ধ এবং যুদ্ধ  নাটকটি, যেখানে স্বাধীনতা বিরোধীকে স্বামী হিসেবে বরণ করার পক্ষে আপনাকে ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে। আপনি কী বলেন?

সৈয়দ শামসুল হক
তুমি যা বলো তাই- আমি শুনছি। হবেও বা। হতেও পারে।

বিপ্লব বালা
মুখোশ রূপান্তরণ কতটা কার্যকর অভিঘাত হলো মঞ্চে? ভিন্ন সংস্কৃতির বাচন লাগসই গ্রাহ্যতা পেলো কি? যেভাবে মেয়েটি শোধ নিতে চায় তা কি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না? তার ঘৃণা-ক্রোধ অতিরেক লাগে- বিষয়ের গাম্ভীর্য অনভ্যস্ত রুচিতে তরল লঘু হয়ে ওঠে যেন?

সৈয়দ শামসুল হক
না। মোটেই না। অন্তত আমার কাছে নয়। এরিয়েল ডর্ফম্যান যে নাটকটি লিখেছিলেন, তার অন্তর সত্য শুধু নয়, বাস্তবতাও অবিকল মিলে যায় আমাদের ইতিহাসের সঙ্গে। শুধু আমাদের কেন, আফ্রিকা লাতিন আমেরিকার অনেক দেশের সঙ্গে মিলে যায় এবং ওই সব এলাকার নাট্যজনেরা এ নাটকের অনুবাদ মঞ্চস্থ করেছে, রূপান্তর মঞ্চস্থ করেছে। যতদূর খবর রাখি, সব জায়গাতেই দর্শক সত্য, বাস্তবতা,  এ সবের মুখোমুখি হয়েছে। এ দেশেও হয়েছে বলে আমার বিশ্বাস। বাংলা করতে গিয়ে, রূপান্তরণ করতে গিয়ে, আমি কিছু স্বাধীনতা নিযেছি। বিশেষ করে শেষ দৃশ্যে অনেকখানি করতে চেয়েছি। আমার মনে হয় মূল নাটকের উল্লেখ না যদি করতাম, তবে এটা তোমার কাছে মৌলিক বাংলা নাটক বলেই মনে হতো। না- লঘু যদি তোমার কাছে মনে হয়ে থাকে, তোমার মনে করাটাকে শ্রদ্ধা করবো, স্বীকার করবো না।

বিপ্লব বালা
টেম্পেস্ট এর টেক্স্ট্ এবং প্রযোজনা বিষয়ে আপনার বিবেচনা কেমন?

সৈয়দ শামসুল হক
অসাধারণ প্রযোজনা। ডেবোয়া ওয়ার্নার ছিলেন নির্দেশক। তিনি আমাদের নাট্য প্রযোজনার বাস্তব উপকরণ ও সীমাবদ্ধতার ভেতরেও কত অসাধারণ নাট্য প্রযুক্তি আনা যেতে পারে, দেখিয়েছেন। ওই টেক্স্ট্ শব্দটা ইদানিং খুব জনপ্রিয় হয়েছে বলে মনে হয়। আমি কিন্তু শব্দটা পছন্দ করি না- নাটকের বেলায়। মনে করি ওতে চালিয়াতি প্রকাশ পায়, ছদ্ম একটা গাম্ভীর্য যেন অর্জন করা যায়। যাক গে, টেম্পেস্ট-এ যে কথাগুলো শেক্সপীয়র আসলে বলতে চেয়েছেন সে বিষয়ে কিছু সংকেত আমি দিয়েছি আমার ‘শেক্সপীয়রের তিনটি নাটক’-এর ভূমিকায়। পড়ে দেখো। বইটা সদ্য বেরিয়েছে।

হাসান শাহরিয়ার
আমরা আমাদের আলাপনের শেষ পর্যায়ে এসে গেছি। এবার আপনার কাছে জানতে চাই আমাদের দেশের অন্যান্য নাট্যকারদের সম্বন্ধে, যারা এখনো কাজ করে যাচ্ছেন।

সৈয়দ শামসুল হক
এটার জন্য কিন্তু আলাদা একটা বড় সময় দরকার। দায়িত্ব নিয়ে বলতে হয় এসব ব্যাপার। তবে সাধারণভাবে বলতে পারি যে, এদের নাট্যভাবনার সাথে আমি নিজেকে মেলাতে পারি না- এই একটা দূরত্ব কিন্তু আমার সাথে তাদের আছে। সে মামুনুর রশীদ হোক বা আবদুল্লাহ আল মামুন হোক বা সেলিম আল দীন হোক কিংবা মমতাজউদদীন আহমেদই হোক। আমি কিন্তু এদের সবাইকে এক কাতারে ফেলছি না। আমি বলেছি, আমি বিশ্বাস করি টেক্সটে- নাটক আমার কাছে সেই ধারাবাহিকতা থেকে এসেছে, যেখান থেকে সফোক্লিস, ইস্কাইলাস, ইউরিপিডিস বা আরো অনেকে এসেছেন। এদের সবাই কিন্তু টেক্সট-এ বিশ্বাস করতেন। কিন্তু আমাদের নাট্যকারদের মধ্যে আমি এটা সংর্বাশে পাই না। সেলিম আল দীনের ব্যাপারে আমি বলতে পারি, সে দলটিকে তার রাফ কাগজ হিসেবে ব্যবহার করছে। অর্থাৎ সেখানেই কাটাকুটি হচ্ছে ...

বিপ্লব বালা
না, উনি তো পুরো টেক্সট তৈরি করেই দিয়ে দিচ্ছেন। কাটাকুটি যা করছে সেটা তো ডিরেক্টর করছেন।

সৈয়দ শামসুল হক
হ্যাঁ, কিন্তু এতে তো তাঁর সম্মতি আছে। আমি যে নাটকটা দেখছি সেটারই কিন্তু নাট্যকার সে। তার টেক্সট যদি কাটা যায়, চেঞ্জ করা যায়, এমন কি অর্ধেক করে ফেলা যায়, তাহলে সে লিখলো কী! একটা ব্যাপার সেলিম আল দীনের সঙ্গে খুব জড়িত, সেটা হলো বর্ণনাত্মক নাটক। আমি মনে করি সবকিছুই বর্ণনাত্মক। ইভেন সং ইজ অলসো বর্ণনাত্মক। বর্ণনাত্মক রীতির প্রচার প্রসার, এসব কিন্তু মারাত্মক ক্ষতি করেছে আমাদের নাটকের। আমি ঢাকা বা ঢাকার বাইরে অনেক দলের নাটক দেখেছি, যারা তাদের দুর্বলতা ঢাকবার জন্য বর্ণনাত্মক রীতি অবলম্বন করেছে। নাটক অন্য জিনিস- বর্ণনাত্মক রীতি নাটক না। আমার মনে হয় সেলিম আল দীন এক সময় বুঝতে পারবে যে, এই ধরনের কোনো একাডেমিক জিনিস চাপিয়ে দেয়া ঠিক না। আমি এমনও শুনেছি যে, ও বলে- আমাদের এটাই একমাত্র নাট্যরীতি ... এটাও হতে পারে না। সব দেশের নাটকই প্রচুর নেয় এবং দেয়। আমরা দিই নি? ভারতীয় নাট্যধারা থেকে পাশ্চাত্যকে দিই নি? জাপান থেকে পাশ্চাত্যরা নিচ্ছে না? আমি নিজে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়-এর ভেতরে পুরো গ্রীক স্ট্রাকচার ব্যবহার করেছি। তার ভিত্তিতে কেউ যদি বলে - না ওটা আমাদের নাট্যরীতি না, তাহলে বলুক। আমি শুধু বলবো, যে এমন বলবে সে একটা অস্বাস্থ্যকর কথা বলছে। বর্ণনাত্মকরীতি না হয় একটা ধারা হতে পারে, কিন্তু এটাকে যেভাবে একাডেমিক ব্যাকিং দেয়া হচ্ছে ইটস এ গ্রেট ডিসসার্ভিস টু আওয়ার ড্রামাটিক মুভমেন্টস। মঞ্চে দাঁড়িয়ে সূত্রধর বা প্রস্তাবক একটা বর্ণনা দিল, তারপর হৈ হৈ করে একদল আসলো, মাঝখানে জুড়ে দিলাম ধারাবর্ণনা- এটা নাটক না। রবীন্দ্রনাথের ডাকঘর ওয়ান অব দ্য ফাইনেস্ট প্লে এভার রিটেন বাই এ্যানি ওয়ান ইন দ্য ওয়ার্ল্ড। নাটকের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ যদি ৫ টি নাটকের নাম থাকে তার মধ্যে একটি ডাকঘর। ডাকঘর বর্ণনাত্মক? এই বর্ণনাত্মক বলে যা প্রচার করা হয়েছে, বিশেষ করে সেলিম আল দীনের ‘কল্যাণে’, এটা তরুণ প্রজন্মের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর হয়েছে- এটা আমি স্পষ্ট করেই বলি।

বিপ্লব বালা
এরা একটা কথা বলতে চায় যে- আমাদের একটা নিজস্ব রকম আছে সেটা ...

সৈয়দ শামসুল হক
সেটা আমার কাছে আরোপিত মনে হয়।

বিপ্লব বালা
মানে আমাদের যে নানা রকম দেশি ফর্ম আছে, সেগুলো নাটক অর্থে না, নানা রকম রিচ্যুয়াল অর্থে ... এর থেকে একটা বিষয় পাওয়া যায় যে আমাদের প্রকাশভঙ্গির একটা বৈশিষ্ট্য ...

সৈয়দ শামসুল হক
এটা হচ্ছে সিনথেটিক হ্যান্ডিক্র্যাফটসের মত। যেমন বাঙালির নাচ নেই কিন্তু একটা বানিয়ে নিলাম, বুলবুল একাডেমীতে নক্সিকাঁথার মাঠ করছি আর তুমি ভাবছো এটাই বোধহয় আমাদের নাচ ... না, আসলে ওটা তোমার বানানো, তুমি ওটা পাওনি। তুমি তৈরি করে বলছো যে- অতীতটা এরকম ছিল, এই ঐতিহ্যের মধ্যে আমরা আছি।

হাসান শাহরিয়ার
আপনি নাট্যকার রবীন্দ্রনাথকে কীভাবে দেখেন?

সৈয়দ শামসুল হক
ঐ যে বললাম একটু আগে ...

বিপ্লব বালা
ওনার তো আরো অনেক কাজ আছে, সেগুলোর ব্যাপারে ...

সৈয়দ শামসুল হক
হিমালয়ের এভারেস্টের কথা বললেই তো বোঝা যায় যে, মাটি থেকে এর উচ্চতা কত। বাকি পুরো পর্বতমালার আন্দাজ পাওয়া তো তখন কঠিন নয়!

হাসান শাহরিয়ার
আপনি একবার বলেছিলেন যে- নাটক বসে থাকবার জিনিস না বা ভবিষ্যৎ কোনো যুগের জন্য অপেক্ষায় থাকে না। বর্তমান দর্শকের কাছেই তা জনপ্রিয় হতে হয়। এক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই শুনি যে রবীন্দ্রনাথকে শম্ভু মিত্র পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে ... এটা কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

সৈয়দ শামসুল হক
ব্যাখ্যা হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের বেলায় এটা ছিল এক্সসেপশনাল। আমি আগেই বলেছি- পরাধীন জাতির নাটক হয় না। সেসময় পরাধীন প্রহর ছিল বলেই হয়নি ... হি হ্যাড টু ওয়েট ফর শম্ভু মিত্র। তবে একেবারে হয়নি তা কিন্তু না, সেসময় তাঁর উপস্থিতিতে যেখানে যেখানে মঞ্চস্থ হয়েছে, সেখানে সেখানে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। হয় তো বহুল প্রচার হয় নি।

হাসান শাহরিয়ার
আপনি যখন পরাধীন দেশে ছিলেন, আপনি নাটক লিখতে পারেননি। নাটক লিখতে আপনাকে স্বাধীনতার পর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে, দর্শক -থিয়েটার দল এসব না থাকাতে আপনি অনুপ্রাণিত হন নি ... তো আপনার কী মনে হয় রবীন্দ্রনাথের সময়েও তিনি নিজে পরাধীন জাতির বাসিন্দা ছিলেন এবং ওখানে নাটক তেমনভাবে হতোও না, তাহলে এতো উঁচুমানের নাটক উনি লিখলেন কীভাবে?

সৈয়দ শামসুল হক
উনি তো ‘রবীন্দ্রনাথ’ ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের এমন অনেক কীর্তিই আছে যেগুলো অবিশ্বাস্য, কোনো সূত্রে ফেলা যায় না। তারপরও বলবো ওঁর সময় যাত্রা, পালাগান এসব কিছুই তো ছিল। এ সব কিছু থেকে ছেঁকে উনি একটা নাটকের ধারা তৈরি করতে চেয়েছিলেন। তবে আবারো বলছি- উনি কিন্তু চাপিয়ে দিতে চান নি যে, এটাই বাংলা নাট্যরীতি। উনি চেষ্টা করেছিলেন একটা বাংলা নাট্যরীতি দাঁড় করাতে এবং আমরা তাঁরই উত্তরাধিকার বহন করছি। উনি অভিনয়রীতি নিয়েও কাজ করেছেন- তাঁর বিসর্জন নাটক খেয়াল করলে দেখবে এটাকে তুমি ‘যাত্রা’র মতোও করতে পারো। তার প্রহসন তুমি কমার্শিয়াল থিয়েটারেও করতে পারবে। উনি নৃত্যনাট্য বা গীতিনাট্যে যেটা করেছেন যে, উনি দেখলেন বাঙালির নিজস্ব কোনো নাচ নেই ... তখন উনি বললেন যে- আমি কথাকলিও নেবো না, ভরত নাট্টমও নেবো না, আমি মণিপুরী নাচ থেকে নেব। ... তো উনি মণিপুরীতে গেলেন কেন? কারণ বাঙালি সংস্কৃতির যে মানস-মানচিত্র তার সঙ্গে মণিপুরী নাচটা যায়। সংলাপে হয়তো উনি কৃত্রিম ভাষা ব্যবহার করেছেন, আবার এটাও ঠিক যে সাহিত্যের যেকোনো ভাষাই কিন্তু কৃত্রিম, এমনকি আঞ্চলিক ভাষাও কৃত্রিম ... যখন আমি এটা রচনার জন্য ব্যবহার করছি। তো এটা সত্য যে পরাধীন জাতির নাটক হয় না। তবে রবীন্দ্রনাথ এখানে ব্যতিক্রম এবং ব্যতিক্রম কিন্তু নিয়মকেই প্রমাণ করে। শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্ত তাঁর উত্তরাধিকারে ছিলেন, তবে আমি এ-ও মনে করি যে নাট্যকার রবীন্দ্রনাথের মূল্যায়ন এখনও হয়নি। বাংলাদেশেও না, পশ্চিম বঙ্গেও না। তাঁর নাটক হওয়াটাই যথেষ্ট না। তাঁর নাট্যভাবনার মূল্যায়ন হয় নি- যতটা তাঁর অন্য কাজ নিয়ে হয়েছে।

হাসান শাহরিয়ার
হকভাই, কয়েকদিন ধরে আপনার সাথে অনেক কথা হলো, আলাপ হলো। সব নাট্যজনেরাই এই আলাপন আনন্দের সাথে নেবে বলে আমাদের ধারণা। সবার পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ।

সৈয়দ শামসুল হক
তোমাদেরকেও ধন্যবাদ। অনেক কথা হলো, আবার অনেক কথা হলো-ও না, সব মিলিয়ে এই আলাপন নাট্যজনরা আনন্দের সাথে নিলে আমিও আনন্দিত হবো। সবাইকে ধন্যবাদ।