Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

আড্ডায় ক’জন নাট্যজন : লিয়াকত আলী লাকী, তারিক আনাম খান, বিপ্লব বালা আর মান্নান হীরা

Written by অনুলিখন.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

[এক আড্ডায় বসা হয়েছিল। যাদের প্রথম প্রজন্মের বলা যাবে না আবার যারা বর্তমান প্রজন্মেরও না, তাদের সাথেই আড্ডায় বসেছিল থিয়েটারওয়ালা। আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশে দর্শনীর বিনিময়ে নিয়মিত যে নাট্যচর্চাটা শুরু হয়েছিল, সেটার যারা সহায়ক ভূমিকায় থেকে আজ অব্দি থিয়েটার চর্চাটাকে বেগবান রেখেছেন, সেই গুরুত্বপূর্ণ এক প্রজন্মেরই ওনারা প্রতিনিধি। তাদের কাছ থেকে জানা গেল থিয়েটার চর্চার বর্তমান পর্যায়ে আসার প্রক্রিয়া এবং বর্তমানে তৈরি হওয়া কিছু সংকটের কথা। এসব সংকট নিয়ে ভাবনা-চিন্তার এক পর্যায়ে হয়তোবা মিলে যাবে সমাধানের উপায়। আপাতত এই প্রত্যাশায় থাকা যাক।

আড্ডায় অংশ নিয়েছিলেন চার নাট্যজন- লিয়াকত আলী লাকী, তারিক আনাম খান, বিপ্লব বালা আর মান্নান হীরা। আড্ডাটিতে সঞ্চালকের ভূমিকায় ছিলেন দু’নাট্যজন- আজাদ আবুল কালাম আর হাসান শাহরিয়ার। আড্ডাটি অনুলিখন করেছে- থিয়েটারওয়ালার সহকারি সম্পাদক সুমন নিকলী।]

আজাদ আবুল কালাম
আমরা এ রকম একটা জায়গা থেকে শুরু করতে পারি যে, স্বাধীনতার পর পর আমাদের দেশে একধরনের নাট্যচর্চা শুরু হয়েছে যাকে আমরা নাগরিক নাট্যচর্চা বলতে পারি এবং এটার মাধ্যমে আমাদের দেশে দর্শনীর বিনিময়ে নিয়মিত মঞ্চনাটক প্রদর্শনী শুরু হয়েছে। এবং এই মঞ্চনাটক করবার জন্য এক ধরনের থিয়েটার দল তৈরি হয়েছে যাদেরকে আমরা গ্রুপ থিয়েটার বলি। এভাবে চর্চা শুরুর পরের জেনারেশন হিসেবে আপনাদের উপস্থিতি আমরা দেখি। তো আপনাদের শুরুটা কীভাবে হলো সেটা একটু জেনে নিই।

তারিক আনাম খান
ব্যাপারটা তুমি যেটা বলছো, আমার মনে হয় টিপিক্যাল আরবান এবং ঢাকা বেইজড থিয়েটারের কথা বলছো। মানে এখন যে দর্শনীর বিনিময়ে নিয়মিত নাট্যচর্চা হচ্ছে সেটার ব্যাপারে বলছো। কিন্তু আমার মনে হয় না যে, আমি হুট করেই নাটকে এসেছি ... আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, আমি যখন স্কুলে পড়তাম তখন থেকেই প্রতিবছর নাটক করতাম। অন্তত দুটো নাটক এবং চার-পাঁচটা প্রদর্শনী করতে হতো। তো আমরা নাটক দেখেছি, করতে শুনেছি ... আমার মনে হয় না যে, নাটকটা আসলে আমাদের স্বাধীনতার জন্যই থেমে ছিল। আসলে ভেতরে ভেতরে এটার চর্চাটা ছিল। আমার মনে আছে আমরা অনেকে সকাল বেলা উঠে দৌড়াতাম, তারপর ব্যায়াম করতাম, কণ্ঠের চর্চা করতাম ... এখন যেটা আমরা কর্মশালায় শেখাই ‘ক চ ট ত প ....’, সেগুলো তখন আমরা করতাম। কোলকাতা থেকে বই এনে একসঙ্গে পড়তাম। আমাদের সিনিয়র অনেক লোকজন এটার সাথে জড়িত ছিলেন। এই যে বললাম বছরে অন্তত দুটো নাটক হতো, এগুলো তো ওনারাই করতেন। আমি এজন্যই বলছি যে, এই চর্চাটা আমার কাছে ধারাবাহিক প্রক্রিয়া বলে মনে হয়েছে।

লিয়াকত আলী লাকী
তারিকভাই যেটা বলতে চাচ্ছেন তার সাথে আমি একমত। মানে বিষয়টা এরকম না যে, একটা শিল্প শুরু হলো হঠাৎ করেই স্বাধীনতার পর। কেন, এর আগে কি এটার কোনো ট্র্যাডিশন ছিল না? ঐতিহ্য ছিল না? অবশ্যই ছিল। এই যে আমরা বলি প্রসেনিয়াম থিয়েটার ...

হাসান শাহরিয়ার
না, পাভেল ভাই বলতে চাইছে যে, এই চরিত্র নিয়ে ছিল না ... মানে নিয়মিত এবং দর্শনীর বিনিময়ে ছিল না। একটা সৌখিন মেজাজে হতো আগে।

লিয়াকত আলী লাকী
আমি বাহাত্তর-তেয়াত্তর সালে যখন ‘বাকি ইতিহাস’ বা ‘ভেপুতে বেহাগ’ দেখলাম, তখন আমি একটা দৃশ্যে নাটক মঞ্চায়ন হতে দেখে চমকে গেলাম। আমি নিজে নাটক করি ’৬৪ সাল থেকে। প্রতিবছর ৩-৪টি নাটক আমি করতাম। তো চমকে গেলাম মানে আমারো মনে হলো এভাবে থিয়েটার করা যাবে। এটা হঠাৎ করে পাওয়া কিছু আমার কাছে মনে হয় নি। আমি ’৬৪ সাল থেকেই প্রসাদ বিশ্বাস, কল্যাণ মিত্র, শম্ভু মিত্র, ভৈরবনাথ গঙ্গোপাধ্যায় ... এদের নাটক করতে শুরু করেছি। কীভাবে যেন আমি বাংলা বাজারে আসকার ইবনে শাইখের ‘অনেক তারার হাতছানি’ নাটকটি পেলাম, এবং সেই নাটকটিও করেছি। আমার প্রভাবটা মূলত পারিবারিক প্রভাব। কাজী বাটা, মুসা আহমেদ, আমার বড়ভাই মুরাদ আলী, তারা জগন্নাথ কলেজে নাটক করতো, সেই নাটক দেখার যে অভিজ্ঞতা ... এবং আরো অভিজ্ঞতা হলো আমার ঘুম ভাঙতো কীর্তনের সুরে এবং আমি থিয়েটার বলতে যা বুঝেছি সেটা যাত্রা, পালাগান, কীর্তন, নিমাই সন্নাসী পালা তারপর জারী-সারি, কবির লড়াই তো আছেই ...

হাসান শাহরিয়ার
এগুলোকে থিয়েটার মনে করতেন?

লিয়াকত আলী লাকী
হ্যাঁ, আমি থিয়েটার মনে করতাম, পারফর্মিং আর্ট হিসেবে আমি ...

হাসান শাহরিয়ার
না আমি বলছি এগুলোকে নাটক মনে করতেন কিনা?

লিয়াকত আলী লাকী
নাটক মনে করতাম না, কিন্তু ...

তারিক আনাম খান
আমি মনে করতাম।

হাসান শাহরিয়ার
আপনি কেন নাটক মনে করতেন?

তারিক আনাম খান
থিয়েটার মানেই তো পারফরমেন্স। রাত জেগে যাত্রা শোনা, রাস্তায় দাঁড়িযে পালা শোনা, মজমা শোনা, সঙ এর ঢঙ দেখা, সার্কাস দেখা, সবই পারফরমেন্স। সচেতন ভাবে না হলেও অবচেতনে ও সবই ছিল।

লিয়াকত আলী লাকী
আমার কাছে একটু আলাদা মনে হতো, এই কারণে যে, ১৯৬২ সালে আমার বড়ভাইয়েরা প্রসাদ বিশ্বাসের ‘গাঁয়ের ছবি’ ও ‘পরিণতি’ নাটক করলেন, তো সেটা দেখার পর মনে হলো এগুলোতে যাত্রার স্টাইলের যেমন প্রভাব আছে, তেমনি সিনেমারও প্রভাব আছে ...

আজাদ আবুল কালাম
কোন শহরের কথা বলছেন?

লিয়াকত আলী লাকী
শহর না, আমার নিজের গ্রাম, নবাবগঞ্জের আগলা গ্রামের কথা বলছি। সেখানে আমি মুসা আহমেদের সাথে দুটো নাটক করেছি ‘বৌদির বিয়ে’ এবং ‘অনন্যা’। কিন্তু যাই করি না কেন ১৯৭২ সালের আমাদের শহরের নাট্যচর্চার যে শুরুটা হলো সেটা কিন্তু আমাকে অবাক করে দিল। কারণ, আগের নাটকের চেয়ে এটা অনেক আধুনিক মনে হলো। একটা দৃশ্যের পর আরেকটা দৃশ্য আসছে অথচ পর্দা পড়ছে না। সেট সরানো হচ্ছে, দর্শক একটানা কেবল নাটকই দেখছে। আগে তো মাঝখানে গান দিতে হতো, নাচ দিতে হতো। এটাকে আধুনিক মনে হয়েছিল। তো পাভেল যে কথাটা দিয়ে শুরু করলো যে, আমাদের আগের প্রজন্ম এই ধারাটার প্রবর্তক ... আমি বলবো যে এটা ওনারা ঐতিহ্য থেকেই পেয়েছেন। আগে হয়তো অনেক সাজানো গোছানো ছিল না, অপরিশীলিত ছিল, ওনারা এটাকে পরিশীলিতভাবে উপস্থাপন শুরু করলেন।

মান্নান হীরা
প্রজন্মের কথাটা পাভেল যেটা বলেছে, সেটার ব্যাপারে আমার যেটা অবজার্ভেশন সেটা হলো, আমাদের আগের প্রজন্মের কেউ সরাসরি থিয়েটারের লোক নন। স্বাধীনতার পূর্বকালে কেউ ওভাবে থিয়েটার করেন নি। নানান কাজের ফাঁকে তাদের কেউ কেউ একটু আধটু সৌখিন মঞ্চনাটক করতেন। কিন্তু স্বাধীনতার পরে এঁরা এসে থিয়েটারে জায়গা করে নিয়েছেন। এই যে আলী যাকের ভাই, উনি প্রথম নাটকই করেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে ... মামুনুর রশীদের লেখা রেডিও নাটক। তো এরকম অনেকেই আছেন কিন্তু এঁদের যেটা সুবিধা ছিল, সেটা শিল্পের নানা শাখার মানুষগুলো এদের বন্ধু ছিল। সবার সাথে এদের মেলামেশা ছিল। কবি, পেইন্টার, গায়ক, আবৃত্তিকার ... এই যোগাযোগগুলো ছিল এবং এদের একটা শিল্পের আড্ডারও পরিমণ্ডল ছিল। কিন্তু আমাদের যে প্রজন্মটা, মানে যেটাকে আমাদের প্রজন্ম বলে আখ্যায়িত করতে পারি, আমাদের বেলায় দুর্ভাগ্য যে আমরা থিয়েটারের বাইরে কারো সাথে মেলামেশার, আড্ডা দেয়ার সুযোগটা পাই নি। আমাদের ক’জন কবি বন্ধু আছে? ক’জন চিত্রশিল্পী বন্ধু আছে? কিন্তু আজকের যে শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, নির্মলেন্দু গুণ, মোস্তাফা মনোয়ার, রফিকুন্নবী, শাহাবুদ্দিন, রফিক আজাদ, মোহাম্মদ রফিক ... এমন অনেক নাম আছে যাদের সাথে ওনাদের নিয়মিত আড্ডা হতো।

আজাদ আবুল কালাম
স্বাধীনতার পর কি তাদের এই আড্ডা ছিল?

মান্নান হীরা
কমে গেছে। অনেক কমে গেছে। এবং আমাদের সময় থেকে এমন ধারণা হয়ে গেছে যে, যে থিয়েটার করবে সে কেবল থিয়েটারই করবে।

তারিক আনাম খান
এটা কিন্তু নিয়মিত নাট্যচর্চার একটা নেগেটিভ দিক।

মান্নান হীরা
হ্যাঁ, আমি সেটাই উল্লেখ করতে চাচ্ছি। আমরা একেবারে কনফাইন্ড হয়ে গেলাম থিয়েটারের প্রতি। কবি কনফাইন্ড হয়ে গেলেন কবিতা লেখার প্রতি। পেইন্টার নিজেকে নিজস্ব গণ্ডির মধ্যে আটকে ফেললেন। এর সুবিধা হয়তো আছে কিন্তু ...

তারিক আনাম খান
আমরা কিন্তু প্রফেশনালিজম বা নিয়মিত মঞ্চায়ন যখন বলছি তখন কিন্তু ইউরোপকে মাথায় রেখে বলছি ... মানে একটা ফ্রেমের মধ্যে বেঁধে দিচ্ছে তোমার কাজ। তুমি এই এই করবে, এতটুকু করবে ...

মান্নান হীরা
শিল্পের যে ক্রশ ফার্টিলাইজেশন, এটা কিন্তু বন্ধ হয়ে গেল। এবং স্ব স্ব গণ্ডিটা উৎকর্ষ সাধন করতে থাকলো। আজকে থিয়েটারের লোকগুলো যার যার থিয়েটার করে থিয়েটারকে সমৃদ্ধ করতে চাচ্ছে।

বিপ্লব বালা
কিন্তু যেটা বলা হয় যে, থিয়েটার হলো মিক্সড মিডিয়া, সব শিল্পের সমন্বিত মিডিয়া ... সেক্ষেত্রে কিন্তু আমাদের প্র্যাকটিস এবং আমাদের বলাটা মিলছে না।

আজাদ আবুল কালাম
হীরা ভাই আমি একটু বলছি ... মানে আপনি যেটা বললেন যে, এই সমন্বিত ব্যাপারটা চলে গেলো, মানে নাটক যে করে সে কেবল নাটকই করে, তার কোনো কবি বন্ধু নেই, গল্পকার বন্ধু নেই অথবা এই ধরনের সিচুয়েশনগুলো যে হলো ... এই চিন্তাটাটা বা এই উপলব্ধিটা আপনার ভেতর কবে এসেছে? এখন না অনেক আগে থেকেই?

মান্নান হীরা
আমি বিগত পাঁচ বছর যাবত এটা অনুভব করি এবং আমি মনে করি যে, কেবল আমাদের মতো নাটকের লোকদের বেলাতেই না শিল্পের বিভিন্ন শাখার লোকদের পরস্পরের সাথে যোগাযোগ থাকা উচিত। কবিদের সাথে এক-রকম একটি সম্পর্ক কম বেশি সবার আছে, সেটা দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ইতিহাসের কারণে হতে পারে বা সামাজিক আন্দোলনের কারণে হয়তো বা আছে। আর যতটুকু শেষ অংশ আছে সেটা আমাদের প্রজন্ম পর্যন্ত। আমাদের পরের প্রজন্মের তো এই টুকুও নেই।

লিয়াকত আলী লাকী
আমার মনে হয় হীরা ভাইয়ের কথাটা পুরোপুরি পরের প্রজন্মের বেলায় খাটে। আমাদের প্রজন্মের বেলায় না। আমাদের যোগাযোগটা আছে ... কিন্তু পরের প্রজন্ম শিল্পের অন্যান্য ব্যাপারে আগ্রহ দেখায় না। অনেক কমে গেছে।

মান্নান হীরা
আমি আগ্রহের কথা বলছি না।

তারিক আনাম খান
হীরা যেটা বলছে সেটা আগ্রহের কথা না, সেটা ইন্টারেকশনের কথা। আমি আপনি হয়তো রফিক আজাদ, শামসুর রাহমানের বা গুণ দা’র বই পড়ছি। কিন্তু তাদের সাথে আড্ডা কিন্তু দিচ্ছি না।

লিয়াকত আলী লাকী
না, আমি মনে করি না যে আমাদের প্রজন্মের কোনো দীনতা আছে।

তারিক আনাম খান
না, দীনতার কথা উঠছে না। বলা হচ্ছে আমাদের মধ্যে একটা কালচার আস্তে আস্তে চলে গেছে। যেটা আগের প্রজন্মের মধ্যে ছিল। সেটা হলো ইন্টারেকশন কমে গেছে, বিভিন্ন শিল্প মাধ্যমের সাথে জড়িত লোকদের মধ্যে। একটা উদাহরণ দিই ... সেলিম আল দীন হলেন মূলত কবি। সে নাটকে আসার আগে তার পরিচয় ছিল মূলত কবি হিসেবে। তার সঙ্গে আবুল হাসান সহ কত কবির ওঠা বসা ছিল। তো তিনি নাটকে আসার কারণে নাটক সমৃদ্ধ হলো। কিন্তু আমরা এখন কি কোনো নাট্যকার পাই যিনি কবি বা সাহিত্যিক? একমাত্র সৈয়দ শামসুল হক পরবর্তী সময়ে এসছেন, সেটার আবার অন্য একটা হিসাব আছে।

আজাদ আবুল কালাম
হিসাবটা কী?

তারিক আনাম খান
তিনি একজন বহুমুখি লেখক। গল্প, উপন্যাস,কবিতা, নাটক, চলচ্চিত্র বিস্তর বিষযে কাজ করেছেন। ইউরোপের কালচারটাও জানেন। ... তার মানে কী দাঁড়াচ্ছে ... স্পেনের কথা যদি চিন্তা করি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা ইজ বেসিক্যালি এ পোয়েট, শেক্সপীয়ার ইজ বেসিক্যালি এ পোয়েট। আমাদের রবীন্দ্রনাথ বেসিক্যালী এ পোয়েট। তো আসলেই তো ইন্টারেকশন না থাকার ফলে আমাদের নাটক বঞ্চিত হয়েছে বলে আমি মনে করি। সেট ডিজাইনের ক্ষেত্রে আমরা যদি খালেদ চৌধুরীর কথা ভাবি ... পশ্চিম বঙ্গের বা অন্যান্য অনেক জায়গার কথা ভাবি যেখানে তিনি সেট ডিজাইন করতেন ... এখন কিন্তু সেটা নেই। এখন দলে যে থাকে সে-ই সেট ডিজাইন করছে, লাইট ডিজাইন করছে। তো বলছি যে, ইন্টারেকশনটা দরকার ছিল। সেটা আমাদের নিয়মিত নাট্যচর্চার বা প্রফেশনাল থিয়েটার ... এসব মোড়কের কারণে আর এগুতে পারে নি। থিয়েটার নিয়ে যে ভিন্ন চিন্তা করবে, সেই চিন্তাটা আসবে কোত্থেকে? ডাইভারসিটি কমে গেছে।

মান্নান হীরা
এবং সেটা সৃজনশীলতাকেও একটা সংকটের মধ্যে নিয়ে যাচ্ছে, মানে নাট্যফর্মে ...

লিয়াকত আলী লাকী
সেটা কেবল নাটককেই দায়ী করছেন কেন? চলচ্চিত্রকেও আপনি টানতে পারেন। সেখানে কি এইসব ইন্টারেকশন আছে?

মান্নান হীরা
না, অবশ্যই নেই। আমরা তো প্রত্যেকটা মাধ্যমের কথাই বলছি। কিন্তু আমার ভাবনা তো আমাকে নিয়েই বেশি হবে তাই না? আজকে কবিতা নাটক ভুলে গেছে। নাটক তো কবিতাই- তাই না? পেস, রিদম এসব তো সংলাপে রাখতে গেলে কবিতা জানতে হবে। আজকে আমি আপনাকে, তারিক ভাইকে যদি প্রশ্ন করি গত ২/৩ বছরে আপনারা ক’জন কবি বন্ধুর সাথে কতটুকু সময় ব্যয় করেছেন? বা ক’জন ভালো গায়ক বন্ধুর সাথে গত ২/৩ বছরে আড্ডা দিয়েছেন?

তারিক আনাম খান
হ্যাঁ, আমি তাদের কবিতা পড়ছি, গান শুনছি, কিন্তু তাদের সাথে বসছি না।

মান্নান হীরা
নির্মলেন্দু গুণের কবিতা পড়া এক জিনিস আর তার সাথে আড্ডা মারা কিন্তু অন্য জিনিস।

লিয়াকত আলী লাকী
না, সেটা হয় কি, যেমন ধরুন সামাজিক একটা সময় আসে, একটা মুভমেন্ট আসে তখন একটা রাজনৈতিক জায়গা তৈরি হয়। স্বাধীনতার আগে আমাদের সামাজিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটই কিন্তু এসব বন্ধুত্ব তৈরি করে দিয়েছিল। রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে আন্দোলন হয়েছিল। এবং পরবর্তী জেনারেশনের কবিরা সেই ধারাতেই মুভমেন্ট করলো, যেমন রুদ্ররা ... তো সেটার সাথে কিন্তু আমরাও ছিলাম। এবং আমরা সবাই মিলে কিন্তু এরশাদ বিরোধী আন্দোলনও করলাম। এভাবে সময়, সমাজই আসলে সব শিল্পীদের মিলনের প্রেক্ষাপট তৈরি করে দেয়। সেটার জন্য তো আর প্রজন্মকে দায়ী করা যায় না।

আজাদ আবুল কালাম
প্রজন্মের কথাটা তুললাম এই জন্য যে- যাদের হাত ধরে আপনারা নাটকে এলেন, মানে আমি এই নাগরিক নাট্যচর্চার কথাই বলছি, নিয়মিত মঞ্চনাটক মঞ্চায়নের কথাই বলছি ... তো যাদের নেতৃত্বে এলেন, এখনো কিন্তু তারাই নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন, সেটা শহীদ মিনারে হোক বা সাংস্কৃতিক জোটের মাধ্যমেই হোক, তাহলে আপনারা নেতৃত্বে আসলে পারলেন না কেন?

বিপ্লব বালা
আসলে এটার, মানে নেতৃত্বদানের কোনো প্রয়োজন বোধ আমরা করি নি। আর ওনারা এখনও যে, যেকোনো আন্দোলন বা ইস্যুতে শহীদ মিনার যান বা জোটের প্রোগ্রাম করেন ... সেটা একটা রুটিন ওয়ার্কের মতো হয়ে গেছে তাদের কাছে। কিন্তু আমাদের কাছে নেতৃত্ব দেয়া ... এসব কিছু আমাদের হয়তোবা টানে নি।

তারিক আনাম খান
আসলে আমাদের কাছে নেতৃত্ব ব্যাপারটা অর্থহীন ঠেকে। মানে থিয়েটার করাটা আমাদের কাছে বেশি জরুরি। একটা কথা মনে রাখতে হবে, প্রথমে যারা শুরু করেছেন, তারা কিন্তু নাট্যকর্মী না হয়ে অন্য কিছুও হতে পারতেন। এবং আমরা দেখেছিও যে একেকজন একেক ব্যবসা নিয়ে পাশাপাশি নাটক করে গেছেন। কিন্তু আমাদের প্রজন্ম নাটক করবার জন্যই মাঠে নেমেছিলাম। নইলে নাটক পড়তে বাইরে যাব কেন? সুতরাং আমার মনে হয় নেতৃত্ব আমাদের তেমনভাবে টানে নি।

বিপ্লব বালা
ওনারা কিন্তু তারুণ্যের শক্তি কাজে লাগিয়ে থিয়েটার করেছেন, কিন্তু যখন তরুণদের জীবিকার প্রশ্ন আসলো, তখনই খটকাটা লাগলো। মানে আমরা ধরে নিয়েছিলাম নাটকই করবো, কিন্তু জীবিকার ব্যাপারটা কীভাবে মেটাবো সে-প্রশ্ন যখন সামনে এলো তখন কিন্তু আমরা আবার একা হয়ে গেলাম। কারণ, একসাথে থিয়েটার করলেও মূলত আমরা বিচ্ছিন্নই ছিলাম।

তারিক আনাম খান
আমরা যারা থিয়েটারে আসলাম, তারা মূলত কারা? নিশ্চয়ই নিম্ন মধ্যবিত্ত বা বেশি হলে মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা। আবার দেশের যেকোনো রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সাড়া দেয় কারা? এই নিম্ন মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্তরাই, তাই না? ফলে হয়েছে কি, আমরা যখন নাটক শুরু করি তখন কিন্তু স্বাধীন দেশ হলেও পরিস্থিতি ছিল রিএ্যাক্ট করার মতো। অর্থাৎ আগের প্রজন্ম বলে থাকে যে স্বাধীনতার পর তাদের কাছে মনে হয়েছে স্বাধীন দেশে থিয়েটার করবে। সেটা তাদের উত্তেজনা। কিন্তু আমরা যখন শুরু করি তখন কিন্তু দেশের রাজনৈতিক অবস্থা রিএ্যাক্ট করবার মতো। এবং তখন সচেতনভাবে কিন্তু আমরা দেখেছি যে, আমাদের ক্ষোভ প্রকাশের জন্যও একটা প্লাটফর্ম দরকার, এবং হয়তোবা ঐ ধরনের স্ফূরণ থেকেই আমরা ঢুকে পড়ি থিয়েটারে। কারণ, একসময় আমরা তো আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে সিম্বলিক স্বৈরাচার বিরোধী নাটক করেছি, নকশালপন্থী আন্দোলনও করেছি ... তো জীবিকার ব্যাপারটা আমরাও ঐভাবে মাথায় রাখি নি। ভেবেছিলাম একটা কিছু হয়ে যাবে।

বিপ্লব বালা
আপনি যে রাজনৈতিক সচেতনতার কথা বললেন, সেই বিশ্বাস কি এখনও আছে?

তারিক আনাম খান
হ্যাঁ, এখনো আছে, সেটা মজ্জার মধ্যে ঢুকে গেছে। কমেডি নাটক হোক কিংবা সিরিয়াস নাটক হোক, একটা স্রোত থাকে যা সমাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে ... এমনকি যদি মলিয়রের কমেডিও হয়, যোগাযোগটা কিন্তু আজকের সমাজের সঙ্গে হতে হবে। তা না হলে জনগণের পার্টিসিপেশনটা হয় না। আমার স্থির বিশ্বাস এই ভারতীয় উপমহাদেশে থিয়েটার ভীষণভাবে রাজনীতি নির্ভর ...

বিপ্লব বালা
সেই রাজনীতিটা তো ভীষণভাবে শূন্য হয়ে গেছে ... এই রাজনীতির কোনো মানে নেই এখন, তার ফলে আমাদের পায়ের নিচের মাটি সরে গেছে কিনা?

তারিক আনাম খান
হ্যাঁ, এক সময় তো সে-কারণেই আমরাও জীবিকার সন্ধান করতে থাকলাম। এবং কেমন যেন বঞ্চনার ভেতর পড়ে গেলাম। কেবল থিয়েটারই করবো এই জায়গা থেকে সরে গেলাম। ফলে আমাদের পড়াশোনা-মেধা কোনো কিছুই আর থিয়েটারের পেছনে ব্যয় করতে পারলাম না। কিন্তু এখনকার ছেলে-মেয়েদের সেই বঞ্চনার জায়গাগুলো কমে গেছে। এখন ওদের মাথায় দুটোই থাকে। থিয়েটারও করবে, টেলিভিশন নাটকও করবে। আবার একের পর এক চ্যানেল বাড়ছে, সুতরাং ওদের চাহিদা কিন্তু তৈরি হয়েই আছে। ফলে থিয়েটারকে কীভাবে আরও সমৃদ্ধ করা যায় সেদিকে কিন্তু তারা আর সময় দেবে না। আমরাও কিন্তু জীবিকার জন্য অন্য কিছু করেছি, কিন্তু আমাদের পরিকল্পনায় এমনটা ছিল না। ফলে নিজেদেরকে কিন্তু বঞ্চিত মনে হয়।

বিপ্লব বালা
হ্যাঁ, এখন সংকট তো কেবল ব্যক্তিগত পর্যায়ে, মানে নিজেকে বাঁচতে হবে, নিজের জন্যই সব ভাবনা ... ফলে একটা কিছু করবো, পাল্টাবো এই ব্যাপারটা তো থাকছে না।

তারিক আনাম খান
সেটা আমরা আশাও করতে পারি না।

লিয়াকত আলী লাকী
এটা পৃথিবীর সব দেশে সব সময়ই আসে যে, একটা আবেগ থাকে কিন্তু সেটা বেশিদিন থাকে না। পাভেল যে বিষয়টা নিয়ে শুরু করেছিল যে, যারা প্রথম প্রজন্মের ব্যক্তি ছিলেন তারা এখনো একটিভ আছেন, এবং ৫/৭ জন স্ব স্ব দল চালাচ্ছেন এবং এখনো তারা সৃজনশীল ... কিন্তু আমি বলবো, এটা কেবল ঢাকাতে কিছুটা দেখা যাচ্ছে। চট্টগ্রামে তো তাদের প্রজন্মের কেউ ছিল না। আজকে ৩৪ বছর পর যদি দেখি, তাহলে কী দেখি ... এই মঞ্চটা আলোকিত করে রেখেছে কারা? এই যে প্রায় ৩০০টি নাট্যদল আছে তার মধ্যে ১০০টি তো অবশ্যই সিরিয়াসলি নাটক করে, আর বাকি ২০০টি ধরলাম কম করে, কম জানে কিন্তু এই যে ’৭২ সালের পর থেকে নাটককে প্রসারিত করা এবং বাইরের সঙ্গে, মানে আন্তর্জাতিক আবহের সঙ্গে সুর মিলিয়ে ...

বিপ্লব বালা
এই যে কথাটা বললেন- আন্তর্জাতিক আবহের সাথে সুর মিলিয়ে ... এর মানে কী? আমরা এর সাথে মেলাবো মানে, আমরা জানি কি যে আন্তর্জাতিক প্রবাহ কী? এটা একদম ফাঁকা কথা।

লিয়াকত আলী লাকী
না, ফাঁকা না।

বিপ্লব বালা
তাহলে আমরা যদি বলি যে- আন্তর্জাতিক থিয়েটারের সাথে তাল মিলিয়ে চলা, এই বিষয়টা কী?

লিয়াকত আলী লাকী
তাল মিলিয়ে মানে ... একটা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ জানাশোনা আমাদের আছে ... আমরা জানি আমেরিকায় কেমন থিয়েটার হয়, ইংল্যান্ডে কেমন থিয়েটার হয়, আমরা আন্তর্জাতিক সেমিনারগুলো সম্বন্ধে জানি, সেখানে আমরা প্রতিনিধিত্বও করি ... সেখান থেকে বলতে চাই যে- আন্তর্জাতিক নাটক সম্বন্ধে আমাদের ধারণা আছে এবং সেখান থেকেই আমরা নাটককে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। এখন বলতে পারেন যে সংকট আছে ... হ্যাঁ, সংকট তো আছেই কিন্তু এরই মধ্যে কিন্তু থিয়েটার প্রসারিতও হচ্ছে। বিপ্লব দা’ যেটা ভাবছেন সেটা কিন্তু একেবারেই সমসায়িক সমস্যা। এবং সঙ্গত কারণেই যখন আমরা গ্রুপ থিয়েটার বলি, তখন এটা এ্যামেচার হবে সেটা ধরে নিতেই হবে। তারপরও আমরা যে পরিমান প্রফেশনাল, কাজের ব্যাপারে, সিরিয়াসনেসের ব্যাপারে সেটাও কিন্তু কম না। আমরা তাহলে কীভাবে চলি? এটার জন্য আমরা কেউ কেউ আয়ের উৎস খুঁজে নিয়েছি, ইদানিং আবার টিভি মিডিয়াতে কাজ করেও আয় হচ্ছে ... কিন্তু মূল উদ্দেশ্য কিন্তু থিয়েটার করা। বিশ্বের সব ভালো থিয়েটারই কিন্তু সাবসিডাইজড, সে অর্থে আমাদের এখানে আমরা সাবসিডাইজড করে নিয়েছি, মানে নিজেরা আয় করে তা দিয়ে থিয়েটার চালাচ্ছি। যেমন তারিক ভাইয়ের এ্যাড ফার্ম আছে এবং মিডিয়াতে নাটক করে, পাভেল করে ... সেই টাকা দিয়ে ওরা থিয়েটার করে।

হাসান শাহরিয়ার
এটা কী বিক্ষিপ্ত উদাহরণ না? মানে এভাবে কি সবার করা সম্ভব? আর যদি সম্ভব হয় তাহলে কি থিয়েটারে সময় দিতে পারবে?

বিপ্লব বালা
অর্থাৎ থিয়েটারকে ভালো করতে হলে থিয়েটারটাকে পাল্টাতে হবে। সেই পাল্টানোতে তো সময় দিতে হবে থিয়েটারে। বাইরে আয় করতে তার সময় দিতে হয় না? তাহলে সে থিয়েটার নিয়ে কী ভাববে? কেবল নাটক নামানো মানেই তো থিয়েটার না, তাই না?

লিয়াকত আলী লাকী
হ্যাঁ, এ জন্যই আমাদের মধ্যে অনেকেই থিয়েটার করে যাচ্ছে। এভাবে থিয়েটার এগুচ্ছে না, তা বলতে আমি রাজি না, কিন্তু আরো এগুতে গেলে, এই যে সাবসিডির কথা বললাম, সেই সাবসিডিটা বাইরে থেকে আসতে হবে। হয় সরকার দিবে না হয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দেবে। এই যে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন আমাদেরকে বিভিন্নভাবে আর্থিক সহায়তা করেছে, এটাকে আমি মাইল ফলক হিসেবে দেখি। এ-রকম পৃষ্ঠপোষক আমাদের অনেক প্রয়োজন। তাহলে যারা ভালো থিয়েটার করতে চায়, থিয়েটার নিয়ে ভাবতে চায়, তাদের অন্য জায়গায় বা অন্য প্রফেশনে যেতে হবে না। সারা বিশ্বে এ্যামেচার থিয়েটারকে বাঁচিয়ে রেখেছে সরকার। সেখানে কালচারাল মিনিস্ট্রি বলেই দেয় যে- আপনারা থিযেটারের উপর প্রজেক্ট দিন, আমরা ফান্ড দেব। কিন্তু আমাদের দেশটা এরকম না। আমাদের দেশে এই খাতে তেমন কোনো বাজেট নাই। সরকারকে বলা হয়েছিল যে- সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য বাজেট বাড়াতে হবে, তো অর্থমন্ত্রী  বলেছেন- আমি বাঁশি বাজানোর জন্য টাকা দিতে পারবো না। যার কাছে সংস্কৃতি মানে হলো কেবল বাঁশি বাজানো, সেখানে আর কী বলার থাকে!

হাসান শাহরিয়ার
তার মানে আপনি যে বললেন আপনারা কোনো না কোনোভাবে অন্য জায়গার আয় এখানে ব্যয় করেন বা সাবসিডি দেন, এটা কী সারা বাংলাদেশের দ্বারা সম্ভব? ঢাকার বাইরের শহরে কি মিডিয়া আছে না এ্যাড ফার্ম আছে? ওরা কীভাবে থিযেটারকে বাঁচাবে?

লিয়াকত আলী লাকী
আমি মনে করি সংকটটা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে সমাধানের পথ খোঁজা উচিত। তারিক ভাই যে বললেন যে- আমরা যখন থিয়েটারে আসি তখন- দেশপ্রেম, কমিটমেন্ট, বাঙালি জাতি ... এসব শব্দগুলো আমাদেরকে উজ্জীবিত করেছিল। আমরা আসলেই শব্দগুলো দিয়ে তা-ই মিন করতাম। কিন্তু এখন সেটা নেই।

আজাদ আবুল কালাম
না, আমাদের কারো হাতেই কিন্তু এখন থিয়েটারের জন্য সময় নাই। মানে বিপ্লব দা’ যেটা বলছিলেন যে থিযেটারকে বাঁচাতে হলে সেখানে কিছু বাড়তি সময় দিতে হবে, কিন্তু বাড়তি সময়গুলো আমাদের হাতে নাই। তো আমি জানতে চাচ্ছি যে, প্রথম জেনারেশান যখন প্রফেশনালিজমের কিছু বের করতে পারলো না, এবং আপনারা এসেছিলেন কেবল থিয়েটার করতেই ... তো আপনারা সাবসিডি বলেন আর প্রফেশনাল হওয়াই বলেন, এটার জন্য বড় কী কী উদ্যোগ নিয়েছিলেন, বা আদৌ নিয়েছিলেন কিনা? সরকারের সাথে বড় কোনো মুভমেন্টে যাওয়া বা বিদেশি বড় কোনো ফান্ড জোগাড় করা? নাকি নিজেরা ব্যক্তিগত জীবনে বেশি ব্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন?

হাসান শাহরিয়ার
বিদেশি ফান্ড মানে, সব দলের যেন কাজে লাগে সেরকম ফান্ড। আমরা দেখেছি বিচ্ছিন্নভাবে হয় তো অনেকেই ফান্ড জোগাড় করতে পেরেছেন কিন্তু তা আমাদের থিয়েটার মুভমেন্টের কাজে লাগবার মতো না। সবার জন্য কিছু করার চেষ্টা কি হয়েছিল?

লিয়াকত আলী লাকী
আমি জানি এখানে যারা আছি তাদের জন্মই হয়েছে নাটক করতে এবং থিয়েটারটা করেই যদি তারা বেঁচে থাকতে পারতো, তাহলেই তাদের স্বপ্ন পূরণ হতো। এবং সেটা হচ্ছে না বলে কিন্তু একধরনের ক্ষোভ তাদের আছে। আমি জানি বিপ্লব বালাকে, তারিক আনামকে, মান্না হীরাকে বা তোমরাও আছ ... আমি এক্সক্লুসিভলি থিয়েটারের উপর পড়াশোনা করি নি, তারপরও আমি থিয়েটার করেই বেঁচে থাকতে পারলেই খুশি হতাম। আমাদের দেশে ৩৪ বছর গণতন্ত্রের টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে গিয়ে যখন তথাকথিত গণতন্ত্র পেলাম তখন আমরা বুঝতে পারলাম যে, থিযেটারের পক্ষে আমরা কী চাই। আমরা চেয়েছি থিয়েটারকে একটা প্রফেশনাল জায়গায় নেবার জন্য সরকারকে ভূমিকা রাখতে হবে, মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানীগুলোকে ভূমিকা রাখতে হবে। কিন্তু সেটা কে করবে? দলগুলো একা একা করবে? আমরা দেখেছি কেউ কেউ একা একা প্রফেশনাল দল তৈরির চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সেগুলো কি প্রফেশনাল হয়েছিল? কে না চায় যে যদি থিয়েটার করেই ইনকাম হতো তাহলে থিয়েটারটাই করতে?

মান্নান হীরা
লাকী ভাই যে কথাটা বললেন যে, আমরা থিয়েটার করে বেঁচে থাকতে চাই বা যারা অন্য কাজের সাথে যুক্ত তারা থিয়েটার করে বেঁচে থাকলে অন্য কাজ করতাম না ... এই কথাটার সাথে আমি দ্বিমত পোষণ করি। যে লোকটি থিয়েটার করে বেঁচে থাকতে চাই তার জীবনের ইকোনোমিক্সটা কী? কত টাকা হলে তিনি বেঁচে থাকতে পারেন বা পারতেন? এখন কত আয় করেন? এই দুয়ের মধ্যে ডিফারেন্স কত?

তারিক আনাম খান
পাশাপাশি আমি এটা বলি বিশ্বরূপা, রঙ্গনা, স্টার, মিনার্ভা ... কোলকাতায় তারা কিন্তু প্রফেশনাল থিয়েটার করতো। সপ্তাহে ৫ দিন। আমি ব্রডওয়ে-র কথা ধরে বলি, যেখানে সবচেয়ে বেশি পয়সা আছে, তো সেখানে ম্যাক্সিমামটা হলো সাবসিডি। ইংল্যান্ডের রয়েল শেক্সপীয়র কোম্পানী থেকে ন্যাশনাল থিয়েটার হচ্ছে সাবসিডাইজড। আপনি প্রফেশনাল থিয়েটার বলতে বোঝাচ্ছেন যে, বাইরের কোনো ডোনার বলবে- তোমরা থিয়েটার কর, আমি টাকা দেব? আর টাকা দিলেই বা কি? প্রফেশনালিজম যদি ডেভেলপ করতে চান, তখন ডিরেক্টর, এক্টর সবার স্বাধীনতাকে আপনার মেনে নিতে হবে। ব্রডওয়ের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সাথে কোম্পানীর কন্টাক্ট হচ্ছে। একবছর, দুবছর ... তো যখনই তাদের হলিউড থেকে ডাক আসে তখন কিন্তু তারা বলে দেয় যে- এবছরের পর আর আমি নেই, চলে যাব। তারপর আরো বলা যায় এন.এস.ডি-র ব্যাপারে, এন.এস.ডি থেকে পাশ করা অনেকেই বোম্বে ফিল্মে চলে গেছে। কেন? কারণ সে বড় কাজ করতে চায়। প্রফেশনালিজম আর আবেগ দুটোই থাকবে থিয়েটারে এমন হবে না। ফলে আপনাকে যদি তখন নাটক করতে হয় ৪/৫ জন নিয়ে করতে হবে, ৩০/৩৫ জন নিয়ে পারবেন না। তারা কেন আপনার পেছনে সময় দেবে? তাদেরকে স্বাধীনতা দিতে হবে। সে ভালো পারফরমেন্স করবে এবং সেটার পুরস্কার চাইবে। এটা দোষের কিছু না।

লিয়াকত আলী লাকী
মান্নান হীরা, আপনি, পাভেল এখনো নাটক করছেন ... মাসে আপনার কত টাকা লাগবে সেটা বড় কথা না, আমি বলছি যেটা আপনারা মিডিয়া থেকে পাচ্ছেন, সেই ফিডব্যাকটা যদি থিয়েটার থেকে পাওয়া যেত? এই যে ৩৪ বছর পর একটা জাতীয় নাট্যশালা হলো, তারপর চারটা বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা বিভাগ হয়েছে, সেখানে যারা চাকুরি করছেন, তারা তো প্রফেশনাল, নাকি? সেখান থেকে প্রতিবছর যারা পাশ করে বেরুচ্ছে তারা থিয়েটারের আশেপাশে থেকেই বেঁচে থাকবে, এবং এটাতো সত্য, থিয়েটার তার জায়গা করেই নেবে। থিয়েটার কখনো মরবে না। আমি মনে করি যদি সরকারকে চাপে ফেলা যায় বা বড় বড় কোম্পানীকে চাপে ফেলা যায় যে ভালো কাজ করলে তারা ফান্ড দেবে, তাহলে কিছুটা প্রফেশনালিজম হয়তোবা আসবে।

তারিক আনাম খান
পাভেল যে বললে আমাদের সময় কমে গেছে ... সেটা কেন জান? সেটা হলো আমরা আমাদের চাওয়াটা বড় করে ফেলেছি। আজকে মিডিয়াতে যাচ্ছি এম্বিশান নিয়ে এবং এম্বিশন ক্রিয়েটিভ না, ইনকাম করার এম্বিশন। তা না হলে এই এইযে কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ হচ্ছে টিভি মিডিয়ায়, কতজন দর্শক সেগুলো দেখছে? কয়টা কাজ হচ্ছে মিনিমাম মানসম্মত? হচ্ছে না। তার মানে সেখানেও প্রফেশনালিজম তৈরি হয় নি। আমার অভিনয়ের যে ক্ষুধা, সেটা সেখানেও মেটাতে পারছি না।

বিপ্লব বালা
অভিনেতার মধ্যে ক্ষুধা তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকছে কি মঞ্চে?

তারিক আনাম খান
ঐ যে, যদি সময় কম দেয়া হয় তাহলে হবে না। আমরা করেছি, আমাদের পরেও অনেকে করেছে, সেটা হলো কত দূর থেকে হেঁটে হেঁটে রিহার্সেলে এসেছি। কেন? থিয়েটার করবো বলে। এখনো অনেকে হেঁটে হেঁটে আসে। কেন? টিভি মিডিয়ায় কাজ করবে বলে।

মান্নান হীরা
অর্থ পাবে টিভিতে আর ট্রেনিংটা নেবে মঞ্চে। মঞ্চটাকে ইউজ করছে।

তারিক আনাম খান
আমি এমনও কয়েকটা দল সম্পর্কে জানি যে তারা বলছে- টিভি নাটক বা সিরিয়াল না ধরলে তারা দল ঠেকিয়ে রাখতে পারছে না।

মান্নান হীরা
অনেক দল থেকে বলা হয় যে, আমার দলের কিছু কিছু ছেলে-মেয়েকে কাজ দিন, নইলে দল টেকানো যাচ্ছে না। এটাই কিন্তু বাস্তবতা।

লিয়াকত আলী লাকী
আমরা গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় এসেছি, আমি একজন সংগঠক হিসেবে বলছি যে- একটা সময় ছিল, দলে সদস্য নেবো, সেখানে ৩০০/৪০০ আবেদন পড়ছে। এখন ১০০ আবেদনও পাই না। এবং এরা আবার খবর রাখে এই দলে গেলে মিডিয়ার কী কী সুবিধা পাবে। এখন এমনও হচ্ছে যে- কোনো নাটকে কেউ একজন কাজ করছে, কাজ করার সময়েই সে অন্য দলে চলে যাচ্ছে। আমার নাটক ‘সিদ্ধিদাতা’, এই নাটকে একটা মেয়ে অভিনয় করতো। হুট করেই সে অন্য দলে চলে গেল। তাই বলছি আমার মনে হয় সামনে এমন সময় আসবে, যার কাছে পুঁজি আছে সে-ই থিয়েটার দল চালাবে। পুঁজি দিয়ে প্যাকেজ নাটক বানাবে এবং ছেলে পেলে হুমড়ি খেয়ে পড়বে তার দলে কাজ করার জন্য। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হবে না। হবে কেবল প্যাকেজ নাটক। আমার কাছে ভয়ঙ্কর মনে হচ্ছে ভবিষ্যৎটা। মানে আমি যদি দল টেকানোর জন্য প্যাকেজ নাটক না বানাই তাহলে আমাকে অথর্ব বলবে। কী ভয়ঙ্কর ভেবে দেখেন! দর্শক এসে বলবে টিভি-র কে কে আছে এই নাটকে?

হাসান শাহরিয়ার
যদি কেউ থিয়েটার করতেও চায়, তাহলে থিয়েটার কি তার সময়টার প্রপার ব্যবহার করতে পারবে? মানে মাসে যদি তিন-চারটা নাটকের তিন-চারটা ক’রে শো কোনো দল করতে চায়-ও তাহলে এটা কি সেই দলের পক্ষে সম্ভব? আমি মঞ্চ সমস্যার কথা বলছি। আপনি বললেন ৩৪ বছর পর শিল্পকলার বিরাট মঞ্চ হযেছে, এটাই কি যথেষ্ট?

লিয়াকত আলী লাকী
নিশ্চয়ই না। ঢাকা শহরে একটা সমস্যা হলো মহিলা সমিতি বা শিল্পকলা একাডেমীর মঞ্চ ছাড়া আর কোনো হল নাই। তা-ও আবার মূল হলটি ব্যবহার করা সম্ভব না আর্থিক কারণে। গাইড হাউজ বন্ধ হয়ে আছে, পাবলিক লাইব্রেরিও তা-ই। তাহলে নাটকটা হবে কোথায়? লন্ডনে এক রাতে ৫০ থেকে ৬০ টি স্থানে নাটক হয়।

তারিক আনাম খান
তার মানে ভুলটা কোথায হযেছে? আপনি মূল জায়গায় আসুন, কেন হয়েছে এবং এর জন্য দায়ী কে? আমরা দর্শক কেন টানতে পারি নি বা কেন বাড়ে নি দর্শক? ভুলটা কোথায়?

আজাদ আবুল কালাম
একটা ভুল আমার কাছে মনে হয় যে, লাকী ভাই আন্তর্জাতিক মানের কথা বলেছিলেন ... আমি বলবো আমরা কি আমাদেরই আগের প্রযোজনার সাথে প্রতিযোগিতায় পারছি? ভালো নাটক না হলে কি দর্শক বাড়বে?

লিয়াকত আলী লাকী
আমি মনে করি আমরা এখনো ভালো থিয়েটার করি। কিন্তু মহিলা সমিতিতে বসে আপনি ক’জন দর্শক টানতে পারবেন? উন্নত দেশে সরকারই নাটকের দর্শক তৈরি করে দেয়। আমাদের এখানে রাষ্ট্র আমাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে সর্বক্ষণ। এর জন্য তো নাট্যদলগুলোকে দোষারোপ করলে চলবে না। আমি যে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীগুলোর কথা বললাম, তারা একটা ব্যান্ড শো করতে ২৫ লক্ষ টাকা দিবে কিন্তু থিয়েটারের বেলায় দিবে না।

তারিক আনাম খান
আপনাকে কেন দেবে, বলুন তো? ওরা ব্যান্ড শো করে পাবলিসিটি পাচ্ছে, ক্লোজ-আপ ওয়ান করে তরুণ প্রজন্মকে টানতে পারছে। আপনাকে ইকোনোমিক্সটা বুঝতে হবে, তারা কেন টাকা দেবে আপনাকে?

লিয়াকত আলী লাকী
কেন, বেঙ্গল ফাউন্ডেশন ১৩ লক্ষ টাকা দিয়ে মহিলা সমিতি এয়ারকন্ডিশানড করে দেয় নি? নিয়মিত তারা ১৩ লক্ষ টাকা দিচ্ছে না?

আজাদ আবুল কালাম
এটা তো একসেপশনাল। এটা তো উদাহরণ হতে পারে না।

তারিক আনাম খান
আর উদাহরণ হলেই বা কি? এখন এ/সি করার কারণে হলভাড়া দিচ্ছি ৪০২৫ টাকা। বিজ্ঞাপন, ঠেলা-গাড়ি, লাইট সব মিলিয়ে প্রত্যেকের প্রডাকশন খরচ ৭-৮ হাজার টাকা। দর্শক হচ্ছে ৫০-৬০ জন। তার মানে কী হলো?

হাসান শাহরিয়ার
বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের এ/সি-র বাতাস কিন্তু আমার গায়ে লাগছে না। বরং খরচের পর গরম আরো বেড়ে যাচ্ছে।

লিয়াকত আলী লাকী
আমি মনে করি এটা রাজনৈতিক কারণ। আমরা আপার মিডল ক্লাশ দর্শক হারিয়েছি। ৭০ দশকে আমরা নাটক দেখতে আসতাম গাড়ি নিয়ে। ৪০-৫০ টা গাড়ি এসে ভীড়তো এই মহিলা সমিতির সামনে। এ-মাথা থেকে ও-মাথা। এখন এভাবে পার্কিং করা সম্ভব? তো যে গাড়ি নিয়ে আসবে সে কোথায় গাড়ি রেখে এসে নাটক দেখবে। এভাবে আমরা আপার মিডল বা মিডল ক্লাশ দর্শক হারিয়েছি। সেটা স্বীকার করতে হবে।

মান্নান হীরা
গাড়ি পাকিং সমস্যা হতে পারে কিন্তু বড় সমস্যা থিয়েটার দেখার সংস্কৃতি তৈরি করতে পারি নি। এখানে বাঙালি মুসলমানদের এই ঐতিহ্য নাই যে, তারা থিয়েটার দেখবে। আগরতলায় বা কোলকাতায় যারা নাটক দেখতে আসে তারা দুপুর বেলা এসে বুড়োবুড়ি অডিটোরিয়ামের বাইরে বসে বাদাম খাচ্ছে ... আর আমাদের এখানে বেইলি রোডের ফ্ল্যাটগুলোতে খবর নিয়ে দেখুন তো কেউ কোনো দিন থিয়েটার দেখেছে কিনা? এই শান্তিনগর, মগবাজার, বেইলী রোড সব কিন্তু আবাসিক এলাকা।

তারিক আনাম খান
এটার জন্য গবেষণার দরকার হয়। নাটক করে যাব আর দর্শক দেখতে আসবে এটা হয় না। এখানেও একটা মার্কেটিং-এর ব্যাপার আছে। আমি শাহরিয়ারকে বলেছিলাম যে দর্শক কীভাবে খবর পায় যে আজ নাটক আছে, সেটা বের করতে হবে। আন্দাজে বললে হবে না যে, ইত্তেফাকে বিজ্ঞাপন দিলে দর্শক বেশি হয় বা এখন প্রথম আলো তে দিলে বেশি হয়। আমাদের যারা নাটক দেখতে আসে তাদের উপর রিসার্চ হতে হবে যে- আপনি কীভাবে খবর পেয়েছেন, বা আর কী করলে আপনি আরো সহজে খবরটা পাবেন ... ইত্যাদি ইত্যাদি। নাটক আবেগ দিয়েই অনেক দূর এসেছিল, কিন্তু তার ধারাবাহিকতা যদি আমরা চাই তা হলে কিছু কিছু গবেষণা অবশ্যই করতে হবে। কিন্তু সেটা কে করবে? দর্শককে যদি বুঝতে চেষ্টা না করি তাহলে কিন্তু মুখ থুবড়ে পড়তে হবে। এবং পড়েছি-ও। এখন থিয়েটারে রাজনীতিটা বেড়ে গেছে। যতটুকু এগিয়েছে থিয়েটার, সেখানে রেখেই এখন কেবল রাজনীতি করতে চায় থিয়েটার নিয়ে। হয়তো কেউ কেউ মাইন্ড করবেন, তবুও বলি আজকে গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশানের সম্মেলনকে কেন্দ্র করে যেই উত্তেজনা দেখি, অন্য কোনো নাটকের বেলায় কিন্তু তা দেখি না।

আজাদ আবুল কালাম
হ্যাঁ, কোনো বিখ্যাত নাটকের প্রিমিয়ার শো-তেও কিন্তু নিস্তেজ আবহ দেখি।

তারিক আনাম খান
ফেডারেশান অনেক ব্যাপারে ইনভলব হয়ে যাচ্ছে। এমনকি জাতীয় রাজনীতির সাথেও ইনভলব হয়ে যাচ্ছে।

লিয়াকত আলী লাকী
’৮০-র দশকে নতুন নাটক আসলে মনে হতো যে আমার একটি নাটক এসেছে, প্রথম শো থেকে প্রায় ২৫ টা শো পর্যন্ত ১৫/২০ জন নিয়মিত নাট্যকর্মীকে সব সময় পেতাম। আসলে সত্যি কথাই, গবেষণার প্রয়োজন, জরিপ করার প্রয়োজন আছে।

তারিক আনাম খান
আপনি ফেডারেশানে আছেন, আপনি করেন নি কেন? নাকি আপনারা রাজনীতি নিয়ে বেশি ব্যস্ত ছিলেন? একটা ফেডারেশান কোনো গবেষণা করলো না যে, দর্শক কেন কমছে বা দর্শক কী চায় বা কী করলে দর্শকের কাছে নাটকের সংবাদটা যাবে- কোনো জরিপ করতে পারলেন না? আমার মনে হয় থিয়েটারওয়ালা-ও করতে পারে। যদিও এখানে গবেষণা করতে হয়তো অর্থেরও প্রয়োজন হতে পারে। সেটা যদি থিয়েটারওয়ালা ম্যানেজ করতে পারে ...

লিয়াকত আলী লাকী
আমরা কেবল রাজনীতি নিয়ে ছিলাম, এটা মানতে আমি রাজি না। আমরা অনেক কাজ করেছি। অনেক অনুদানের ব্যবস্থা করেছি, নাট্যকার তৈরির কর্মশালার আয়োজন করেছি। ঢাকার বাইরে গিয়ে নাটক নির্দেশনা দেবার ব্যবস্থা করে দিয়েছি, ঢাকার বাইরের প্রযোজনা যেন ঢাকায় হতে পারে, প্রতি মাসে অন্তত একটি, সেটির ব্যবস্থা করেছি। তবে হ্যাঁ, আমি অবশ্যই স্বীকার করছি দর্শকের ব্যাপারে একটা গবেষণা হওয়া দরকার। আজকে গুলশান-বনানী এলাকাতে কোনো হল নাই ... হয়তো বলবেন তাতে কী হলো ...

তারিক আনাম খান
না, কেন বলবো? অবশ্যই থাকলে ভালো হতো। যাদের টাকা আছে তাদের কাছে যেতে পারছি না, অথচ যাদের বাজারের হিসাব করতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত তাদেরকে ধরার জন্য ব্যস্ত হয়ে আছি। আমাদের এখানে টাকাওয়ালারা নাটক দেখে না, প্রবীণরা নাটক দেখেন না, দেখে হলো ইয়াং ছাত্র-ছাত্রী বা থিয়েটারকর্মী যাদের কোনো আয় নেই। এটা কিছু হলো? আমি নাটকে ঠিক বলি বা ভুল বলি, যাদেরকে বলি বা যাদের মাধ্যমে বলি, তাদেরকে তো থিয়েটার দেখতে আনতেই পারছি না। আমি কোলকাতাতে দেখেছি, ব্রডওয়েতে দেখেছি, নাটকের আগে খুব হৈচৈ, কিন্তু যেই নাটক শুরু হলো পিনপতন নিরবতা। নাটকের সময় কাশলে পর্যন্ত অন্যরা বাঁকা চোখে তাকায়, তাকে তিরষ্কার করে। মানে হলো, নাটকের দর্শককে কালচার জানতে হয়। হাতে পায়ে ধরে এনে নাটক দেখালে সে সম্মান নাটককে করবে না।

হাসান শাহরিয়ার
হ্যাঁ, সে জন্যই গত ৩৪ বছরে হলের ভেতর বাদাম বা চিপস খাওয়া বন্ধ করতে পারি নি। আর গত ৫-৬ বছর ধরে তো মোবাইল ফোন বন্ধ রাখতে বলে পায়ে ধরেও কাজ হচ্ছে না। ওরা তো নাটক দেখতে আসে না, আপনাকে করুণা করতে আসে। সেজন্য হলের ভেতরেও তার ব্যস্ততা শেষ হয় না।

তারিক আনাম খান
একটু সময় নিয়ে ভাবলে বোঝা যায় যে চারদিক দিয়েই আমরা খুব বিপর্যয়ের মধ্যে আছি। আরো বিপর্যয়ের দিকেই যাচ্ছি। আমরা রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে বিতাড়িত হয়েছি, আমরা বিভাজিত হয়েছি বার বার।

আজাদ আবুল কালাম
দর্শকের প্রসঙ্গে একটা কথা বলি, আমরা যারা মঞ্চে যাচ্ছি, আমরা ধরে নিচ্ছি যে, এই নির্দিষ্ট পরিমান টাকা যে খরচ করতে পারবে, সে-ই আমাদের দর্শক হবে। কিন্তু আমরা যখন পথনাটক করি, পথনাটকে কিন্তু একটা সময় আমরা অভ্যস্ত হয়েছিলাম ... তো আমরা শহীদ মিনারে পথনাটক করবার সময় শত শত মানুষ দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে। নাটকের মধ্যে যখন গামছা পেতে টাকা তুলি তখন দেখা যায় যে ১০০০/১২০০ টাকা উঠে আসে। অর্থাৎ পথনাটকের জন্য ওই টাকা যথেষ্ট এবং ওই পরিমান টাকা উঠবেও, কিন্তু মঞ্চনাটক করতে হচ্ছে লস দিয়ে। এটা কেন?

মান্নান হীরা
ঐ যে বললাম, থিয়েটার দেখার অভ্যাসটা গড়ে উঠছে না, বা গড়ে তুলতে পারি নি। তুমি যেটা বললে যে পথনাটকে শত শত মানুষ দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে ... তো সেটা কিন্তু এক ধরনের প্রিপারেশন, দেখা যায় নাটক দেখে আর বাদাম খায়। কিন্তু যে অর্থে নাগরিক নাট্যচর্চাটা শুরু হয়েছিল, সেটা কিন্তু মঞ্চে নাটক করবার জন্য। সুতরাং দর্শক সেটা দেখার জন্য প্রিপেয়ার্ড কিনা সেটা জরুরি।

লিয়াকত আলী লাকী
আসলে তারিক ভাইয়ের কথা ধরেই বলতে হয় যে, দর্শকের উপর বা তাদের রুচি, আচরণের উপর গবেষণাটা জরুরি। আমরা প্রচারণা চালিয়েছিলাম, স্লোগান দিয়ে যে- মঞ্চে নাটক দেখুন। কিন্তু আসলে গত সময়টা রাজনৈতিকভাবে যে অস্থিরতা গেলো এবং যে নির্যাতন দিয়ে সরকার তার যাত্রা শুরু করলো ... আপনারা জানেন ফরিদপুরের ৩৩ জন নাট্যকর্মীর জেল খাটতে হয়েছিল এবং ৩ জন মহিলা নাট্যকর্মীর উপর ...

আজাদ আবুল কালাম
হ্যাঁ, সারা দেশের মানুষ সেটা জানতে পেরেছে, কিন্তু গ্রুপ থিয়েটারগুলোর একটা ফোরাম আছে, পথনাটকের একটা ফোরাম আছে, তার মাধ্যমে কিন্তু ৫০ জন লোকও সেখানে যেতে পারি নি।

লিয়াকত আলী লাকী
আমরা যেটা করেছি আইন ও সালিশ কেন্দ্রের মাধ্যমে আইনি লড়াই করেছি। তাদের জামিন করিয়েছি। তবে এখানে আমাদের যে ইফেক্টিভ রোল প্লে করা উচিত ছিল, সেটা করি নি।

মান্নান হীরা
তবে এটাও বুঝতে হবে সরকার যদি আমাদের সরাসরি নাটক বিরোধী হয়, তাহলে সেটা সামলানো মুশকিল হয়। কিন্তু আমরা বরাবরই নাটক বিরোধী সরকারই পেয়েছি, কম বা বেশি।

লিয়াকত আলী লাকী
আজ যে জাতীয় নাট্যশালা হয়েছে, এর স্বরূপটা কী? এর চিন্তাটা কার? কাদের? নিশ্চয়ই আমাদের সবার, কিন্তু কোনো সরকারেরই না। তা না হলে, প্রথম দিনেই আমরা দাবি তুললাম যে, মূল হলটির ভাড়া ৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে, তা না করে এখন বরং নিচে একটা চাইনিজ রেস্টুরেন্ট বসানো হয়েছে। জাতীয় নাট্যশালার পরিবেশটাই তো নষ্ট হয়ে গেল। সব কিছুতেই পরিবেশ লাগে তাই না?

মান্নান হীরা
মহিলা সমিতিতে এখন গড় দর্শক সংখ্যা প্রতি সন্ধ্যায় ২৫/৩০/৩৫ এ ঠেকেছে। নামাজের সময় এমন কোনো রাস্তা নাই যেগুলো যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখতে হয় না, সেখানে কি জোর করে নিয়ে যাচ্ছে? না। কিন্তু রাষ্ট্রের কাঠামো এমন জায়গায় পৃষ্ঠপোষকতা করছে যে, মানুষ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে চলে যাচ্ছে।

তারিক আনাম খান
লাকী ভাই যে বললেন- মূল হলটি ৫ হাজার টাকা করবার জন্য ... তো তাতেই আমাদের কী লাভ হবে। দর্শক আসতে হবে না? হীরা যে কথাটা বললো যে, রাষ্ট্রীয়ভাবেই চাওয়া হচ্ছে এদেশে থিয়েটার হবে না, ধর্মীয় উন্মাদনা হবে, তো সেখানে আপনি পৃষ্ঠপোষক কোথায় পাবেন? আমাদের থিয়েটারটাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে না? কীভাবে নেবেন?

আজাদ আবুল কালাম
আচ্ছা ঠিক আছে, আমি এই প্রশ্নটাই করছি যে, স্বাধীনতার পর যেভাবেই হোক যতটুকুই হোক নাটক হয়েছে এবং আস্তে আস্তে দর্শক বেড়েছে। তারপর যে ঢাকায় লোক বাড়ছে আর দর্শক কমছে, সেটাকে আপনারা কে কীভাবে দেখছেন?

লিয়াকত আলী লাকী
একটা কারণ এটা হয় কিনা যে, আমরা মহিলা সমিতিতে গিয়ে একটা ভালো নাটক দেখলাম এবং সেই টানে আবার আমরা অন্য একদিন গেলাম কিন্তু দুর্বল কোনো নাটক দেখতে হলো ... তো তারপর সেই দর্শক আর রিস্ক নিতে চায় না। আগে শুনতে চায় যে, কোন কোন নাটক ভালো, তারপর সময় যদি করতে পারে নাটক দেখে। ফেডারেশান কেবল ২২ দিন বরাদ্দ দিতে পারে বাকি দিনগুলো দেয় মহিলা সমিতি। আগে ওরা নিয়ম করে দিত যে, ফেডারেশান দলভুক্ত না কিন্তু ভালো নাটক করে এমন দলকে বরাদ্দ দিত। কিন্তু এখন সেই নিয়ম উঠে গেছে, যাকে তাকে বরাদ্দ দিচ্ছে ...

হাসান শাহরিয়ার
আপনি বলতে চান যে, ফেডারেশানভুক্ত সব দল ভালো নাটক করছে?

লিয়াকত আলী লাকী
না, সেটা বলবো না। তবে অধিকাংশই ভালো নাটক করে।

হাসান শাহরিয়ার
তাহলে আপনাদের যে ২২ দিন হাতে আছে, সেগুলো কি ভালো নাটক দেখে দেন, না ইচ্ছা মতো বরাদ্দ দেন?

লিয়াকত আলী লাকী
না, ইচ্ছা মতো না। একটা নীতিমালা আছে।

হাসান শাহরিয়ার
আমি জানতে চাচ্ছি ভালো নাটক বাছাই করে বরাদ্দ দেবেন, এমন কোনো নীতিমালা আছে কিনা?

লিয়াকত আলী লাকী
না, সেটা নেই। কিন্তু দলগুলো যেন ঘুরে ফিরে নাটক করতে পারে সেই নীতিমালা আছে।

তারিক আনাম খান
এতে কী ফেডারেশানভুক্ত কিন্তু ভালো নাটক করে না, তারাও বরাদ্দ পায় না?

লিয়াকত আলী লাকী
তা পায়।

তারিক আনাম খান
এটা কি ফেডারেশানের ব্যর্থতা না?

আজাদ আবুল কালাম
আমি ব্যক্তিগত রেসপনসিবিলিটির কথা জানতে চাচ্ছিলাম। এই যে দর্শক বাড়াতে পারলাম না বরং কমে গেল, সেখানে আপনারা ব্যক্তিগতভাবে কোন দায় অনুভব করেন কিনা?

তারিক আনাম খান
আমি তো অবশ্যই নিজেকে দায়ী মনে করি। দায়িত্ব ছিল আমার, অথচ আমি কী করেছি? যেটা চালু জিনিস ছিল, সেটাকে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছি। ২-৩ টা শো এবং কল শো এবং কয়েকদিন রিহার্সেল ব্যস এটুকুই। কারণ আমার প্রফেশন আছে, আমি রিস্ক নেই নি। এক্ষেত্রে অবশ্যই আমি দায়ী। নইলে একটু রিস্ক নিলে বিয়ে বাড়িতে যে ব্যান্ড সঙ্গীত হয়, সেটার জায়গায় আমরা নাটক নিয়ে যেতে পারতাম, ছোট্ট নাটক। কিন্তু আমি যাই নি। হয়তো ভেবেছি, দলের যারা সিনিয়র আছেন তারা বাধা দিবেন বা ... মোট কথা, আমি রিস্ক নিতে চাই নি।

আজাদ আবুল কালাম
আচ্ছা যদি এভাবে জিজ্ঞাসা করি যে- আপনারা চালু জিনিসের বিপরীতে কিছু ভাবলেন না কেন? মানে আপনি তখন এনএসডি ফেরৎ এবং আপনার মতো হাতে গোনা কয়েকজন মাত্র এই মানের পড়াশোনা করে এসেছিলেন। সেদিক থেকে ভালো কাজ করা বা থিয়েটার নিয়ে নতুন ভাবনার জায়গাটা আপনাদের মাধ্যমেই হতে পারতো। হলো না কেন। কী মনে হয়?

তারিক আনাম খান
আসলে আমি এবং জামিল যখন আসলাম, এবং আমাদের আগে পরে আরো কয়েকজন আসলেন, আমরা কিন্তু তখন কোনো না কোনো দলের সাথে যুক্ত ছিলাম। তারপরও তখন যারা সিনিয়র ছিলেন ... এককভাবে কারো নাম বলার দরকার নেই, আমরা যাদেরকে প্রথম প্রজন্মের বলে থাকি ... তো তাদের সাথে কিন্তু আমরা বসেছিলাম। বসেছিলাম এই জন্য যে, কোনো ন্যাশনাল রেপাটরি করা যায় কিনা ... আমরা তো সীমিত সময়ে কাজ করছি, একটা নাটক ধরছি, সেই দলের ক্ষমতা অনুযায়ী করছি, তারপর শেষ। তো একটু অন্যভাবে করা যায় কিনা। বিভিন্ন দলে যে সমস্ত ক্রীম অভিনেতা-অভিনেত্রী বা নির্দেশক আছে তাদেরকে নিয়ে কিছু করা আর কি! দলে তো একটা ফরমেট থাকে, কমিটি থাকে ... অনেক কিছু, এ্যামেচার থিয়েটারে যেমন হয়, কিন্তু এর বাইরে গিয়ে রেপাটরি দল করা। একজন নির্দেশকের ভাবনায় ভালো কিছু আসলো, সে প্ল্যান করলো ওমুক ওমুককে লাগবে। তাদের সাথে সিডিউল হয়ে গেল যে, কে কবে আসবে ... সবারই সবদিন আসার হয়তো দরকার নেই। এটা কিন্তু প্রফেশনাল স্টাইল। ... তো কয়েকটা মিটিং হলো কিন্তু তারপর আর এগুনো গেল না। আমরা যারা এনএসডি থেকে ফিরেছি, তাদের তো তখন অনেক ক্ষুধা। ভালো কিছু, অন্যরকম কিছু করার জন্য মরিয়া হয়ে আছি। আমরা একটা কাজ করেছি, ঢাকা পদাতিকের হয়ে শুধুমাত্র যারা এনএসডি ফেরৎ তারা মিলে নাটক করলাম ‘তালপাতার সেপাই’। তারপর করলাম কঞ্জুস, শুধুমাত্র এনএসডি স্নাতকদের নিয়ে। এটা করার সময়ে যে ক্রাইসিস দেখা দিল, সেটা হলো জীবনের ক্রাইসিস। আর কিছু না। কী খাব, কীভাবে খাব? বয়স চলে যাচ্ছে, তারপর চাকুরি পাব কোথায়? এসব আর কি! তো এই যে সংকটটা, এটাকে বাদ দিয়ে তো থিয়েটারও করা যায় না, কিছুই করা যায় না। এখন বলতে পারো যে- গা বাঁচানো কথা বলছি, কিন্তু এটা বাস্তবতা ছিল, কিছু করার নেই।

আজাদ আবুল কালাম
আমি তাহলে সবার কাছেই একটু করে জানতে চাই যে, দর্শক কমে যাওয়ার ব্যাপারে যে দায়ের কথা বলা হচ্ছিল- লাকী ভাই আপনি কোনো দায় বোধ করেন কিনা?

লিয়াকত আলী লাকী
আমাদের নাটক কিন্তু যখন শুরু হয়েছিল, ’৭২ সালে, তখন কিন্তু পুশিং সেল ছিল। প্রত্যেকটা নাট্যদলকেই তাদের টিকেট নিয়ে বাসায় বাসায় যেতে হয়েছিল। এভাবেই দর্শক আসা শুরু হলো। কিন্তু তারপর এটা নিয়ে কোনো গবেষণা হয় নি। একটা নাটক দেখার পর দর্শক কী রিয়েক্ট করে, সেটা কিন্তু আমরা জানতে চাই না। বা যদি খারাপ বলে, তাহলে সহ্য করতে পারি না। আমাদের দেশে কিন্তু সমালোচনার ধারাটাও তৈরি হয় নি। আমরা হয় স্তুতি করি নয়তো নিন্দা করি। কিন্তু উচিত ছিল, আসলেই দর্শক কেন নাটক দেখবে, এ বিষয়ে গবেষণা করা। আর একটা কথায় আমি একদম বিশ্বাস করি যে, পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এই নাট্যচর্চা টিকবে না। এ্যমেচার থিয়েটার না প্রফেশনাল থিয়েটারও না। কেবল দর্শকের পয়সা দিয়ে ... হ্যাঁ, আমরা হয়তো গবেষণা করে দর্শক বাড়ালাম, কিন্তু টিকেটের টাকায় কি দল চলবে?

মান্নান হীরা
আমাদের আগে যারা থিয়েটার শুরু করেছেন, মানে যাদের মাধ্যমে আমাদের এই নিয়মিত নাট্যচর্চার শুরু বলি, তারা অবশ্যই নমস্য ব্যক্তি। এঁদের মধ্যে যাঁরা এখনো থিয়েটার করে যাচ্ছেন, তারা অনেকের চেয়ে বেশি ধন্যবাদ পাবার যোগ্য। তবে সব কিছু মেনে নিয়েও আমি বলতে চাই যে- নাটক একটা পর্যায়ে আসার পর, অর্থাৎ কিছু ভালো কাজ, ভালো দর্শক সৃষ্টির পর, থিয়েটারটা কোন পথে যাওয়া উচিত, কোন পথে গেলে এর ধারাবাহিকতা থাকবে, সেটা তারা বের করতে পারেন নি। এখানে শুধু আগের প্রজন্মই নয়, আমরা সবাই মিলে দায়ী এবং সে কারণেই একটা সময় থিয়েটারটা মুখ থুবড়ে পরে গেল। আমি বলতে চাই যে- একজন শিল্পপতিকেও ক্রমশই তার প্রফিট বাড়াতে হয়, নইলে সে পিছিয়ে যাবে। পুঁজির বিকাশের জন্য প্রতিনিয়তই প্রোডাকশন বাড়াতে হয়। এটা ভাবলে হবে না যে- অনেক হয়েছে, এখন সেটা ভেঙে ভেঙে খাব। তাহলে এক সময় সে দেখবে যে তার ‘মূল পুঁজি’-ই নাই। সুতরাং দর্শক বাড়তে বাড়তে এক সময় আমাদের অগ্রজরা মনে করেছেন কিনা যে অনেক হয়ে গেছে, আর লাগবে না ... ফলে কোনো নতুন ভাবনা তারা যোগ করেন নি। এবং ফলে দর্শক আর আগের জায়গায় না থেকে কমে গেছে। যতই আমরা মার্কেট ইকোনোমি বলি, সংকট বলি এর মধ্যেও কীভাবে নাটককে গতিশীল করা যায়, সে ব্যপারটি কিন্তু অনাবিষ্কৃতই রয়ে গেছে। এখন এসে যদি আমি আবিষ্কার করতে চাই যে, কেন দর্শক কমে গেছে, বা দর্শক কীভাবে বাড়ানো যায়- তাহলে আমি বলবো বিষয়টি বেশ জটিল আকার ধারণ করে ফেলেছে। কীভাবে? সেটা হলো আমি সব সময় মনে করি থিয়েটার ইজ ভেরি মাচ কনসার্নড উইথ দ্য স্যোসাইটি, এবং স্যোসাইটির যে অবস্থা এখন, এই স্যোসাইটিতে আমরা ভালো থিয়েটার বা দর্শক- আশা করতে পারি না। কারণ ভালো থিয়েটার বা দর্শক বাড়ানো, এসব সংস্কারের কোনো ধরনের আয়োজন সমাজে নেই।

লিয়াকত আলী লাকী
না, সেটা তো অনেক বড় জায়গা ...

তারিক আনাম খান
না, এটা মূল জায়গা ...

মান্নান হীরা
অবশ্যই। আজকে কোনো বুদ্ধিজীবী থিয়েটার দেখে না। কোনো রাজনীতিবিদ থিয়েটার দেখে না। শিক্ষকরা ... স্কুল কলেজের শিক্ষকদের কথা বাদ দিলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পর্যন্ত থিয়েটার দেখে না। গণিত জানেন, বিজ্ঞান জানেন এমন কেউ-ই আমাদের থিয়েটার দেখেন না। যারা দেখেন তারা আমাদের বন্ধু-বান্ধব।

লিয়াকত আলী লাকী
তারা দেখে না, এটা তাদের দুর্বলতা।

তারিক আনাম খান
না, হয়তোবা আমরা পৌঁছতে পারি নি তাদের কাছে। মানে কারণটা বের করতে হবে।

মান্নান হীরা
তাদের দুর্বলতা না আমাদের ব্যর্থতা সেটার চেয়ে বড় সত্য হলো ওনাদের কাছেই যদি থিয়েটারের মেসেজটা না পৌঁছাতে পারি, তাহলে ...

আজাদ আবুল কালাম
এ প্রসঙ্গে আমি একটু বলি, হীরা ভাই, আপনি এদিক থেকে খুব সৌভাগ্যবান যে আপনি মঞ্চনাটকের পাশাপাশি অনেক পথনাটকেরও কিন্তু জন্ম দিয়েছেন। পথনাটকের ব্যাপারে খেয়াল করেছেন যে- আপনাকে ডাকাডাকি করতে হয় না, এমনিতেই লোকজন ভরে যায়। কিন্তু যখন ময়ূর সিংহাসন’ করছেন বা আগুনমুখা’ করছেন, তখন দর্শক আনতে পারছেন না। আপনার কী মনে হয় পথের দর্শকদের সাথে আপনি বেশি কমিউনিকেট করতে পারেন আর মঞ্চের দর্শকদের সাথে পারেন না, এমন?

মান্নান হীরা
না, আসলে প্রসেনিয়াম থিয়েটারটা হলো অভিজাতদের জন্য। এখানে নাটক দেখতে একটা আর্থিক ব্যাপার জড়িত আবার একটা প্রিপারেশনও জড়িত। হকার, রিকশাপুলার, বাদামওয়ালা এরা কিন্তু প্রসেনিয়ামে আসে না। পথনাটক যেখানে হয় সেখানে ওরা যায়, প্রেমিক-প্রেমিকারা যায় ... এই যাওয়টা কিন্তু প্রস্তুতি নিয়ে ঐ নাটকটি দেখতে যায় তা নয়। তারা ঘোরাঘুরি করতে করতে দেখে এখানে নাটক হবে, আচ্ছা একটু বসা যাক- এমন আর কি! কিন্তু মিরপুর, ধানমন্ডি এমনকি বেইলী রোডের মানুষজনও কিন্তু ঘুরতে ঘুরতে এসে প্রসেনিয়ামে নাটক দেখে না। এখানে দেখতে হলে তাকে একটা পূর্ব প্রস্তুতি নিতে হয়। পারিবারিক প্রস্তুতি, আর্থিক প্রস্তুতি। সেই প্রস্তুতির জন্য তার চাই একটা জাতিগত সংস্কৃতি নির্মাণ করা।

তারিক আনাম খান
আমি পাভেলকেই একটা প্রশ্ন করি। তুমি যখন একটা পথনাটক দেখ আর পরে যখন প্রসেনিয়ামে নাটক দেখ, এ দুটার মধ্যে তুমি কী পার্থক্য দেখতে পাও?

আজাদ আবুল কালাম
আমি একেবারে শুরুর কথা বলতে পারি যে- আমি যখন মঞ্চে নাটক দেখেছি কিত্তনখোলা বা ঐ সময়ের নাটক দিয়েই আমার দেখাটা শুরু, তো আমি দেখে গেছি কিন্তু কখনো ভাবি নি যে, এটা করা সম্ভব। কিন্তু ঐ সময়ে যখন পথনাটক দেখতে গেলাম আর হঠাৎ করেই লক্ষ্য করলাম মামুনুর রশীদ আমার পাশ থেকে উঠে গিয়ে একটা পাগলের রোল করছেন, আমার মনে হয়েছে এটা বোধহয় করা যাবে। মানে নাট্যক্রিয়াটাকে আমার কাছে আপন মনে হয়েছে।

তারিক আনাম খান
কিন্তু একটা কথা হচ্ছে কী, মঞ্চের বেলায় কিন্তু দর্শকের একটা আলাদা কনসেন্ট্রেশন তৈরি হয়। সে যখন ৫০/১০০ টাকা দিয়ে নাটক দেখতে ঢোকে তখন সে একটা দায়িত্ব নিয়ে ঢোকে। পথনাটক কিন্তু তার ভালো লাগলে দেখে, না হলে উঠে চলে আসে ... মানে যতই বলা হোক যে পথনাটক পলিটিক্যাল থিয়েটার ... আমার কাছে মনে হয় দর্শক কিন্তু মোর রেসপন্সিবল থাকে মঞ্চনাটকের বেলায়।

মান্নান হীরা
যে কারণে আমি অন্য সাহিত্যকে বা শিল্পের অন্যান্য মাধ্যমের সাথে তুলনা দিচ্ছিলাম শুরুতে, সেটা হলো- আজকে বাংলা সাহিত্যে ছোটগল্প ক’টা লেখা হয়? গত ৫ বছরে ক’টা ভালো উপন্যাস লেখা হয়েছে?

বিপ্লব বালা
ছোট গল্প লেখা হচ্ছে।

মান্নান হীরা
ক’টা লেখা হচ্ছে?  লেখা ছাপবার মতো কাগজ কোথায়? কোনো সাহিত্য পত্রিকা আছে? লিটল ম্যাগাজিন, সেই আগের মানের লিটল ম্যাগাজিন বের হয়? যদি না হয় লেখা বেরুবে কীভাবে? এ সব কিছু থেকে আমার কেন যেন মনে হয় একটা স্যোসাল রিফরমেশন বা একেবারে রেনেসাঁ ধরনের কিছু একটা প্রয়োজন আমাদের।

বিপ্লব বালা
স্যোসাইটিতে কিন্তু একটা মনোজাগতিক পরিবর্তন হয়ে গেছে ইতোমধ্যে- বাজার, বিশ্বায়ণ এসব মিলিয়ে।

মান্নান হীরা
হ্যাঁ, সেটা হয়েছে। এবং আমাদের অজান্তেই হয়েছে। আমরা সবাই এখন একটা বিজ্ঞাপনের জগতের মধ্যে আছি।

আজাদ আবুল কালাম
কিন্তু এই যে সময়টা পার করছি, এটাকে কিন্তু আমরা অস্বীকারও করতে পারবো না। আবার আমরা কিন্তু এটার বিরুদ্ধে যুদ্ধও করছি না। আমরা কিন্তু বলছি না যে- এই সময়টাকে রুখে দিতে হবে। ... আমরা সব অনিয়ম মেনে, অনিয়মের ভালো-মন্দ নিয়ে টিকে থাকতে চাচ্ছি। এই অনিয়মের বাইরে রেভ্যুলেশনারী কেউ না কিন্তু আমরা।

বিপ্লব বালা
না, নিশ্চয়ই না।

আজাদ আবুল কালাম
হীরা ভাই একটা কথা বলছিলেন যে থিয়েটার দেখে অভিজাতরা। তাহলে আমরা কি ঐ মাপের অভিজাত নই? তা না হলে অভিজাতদের কাছে আমরা পৌঁছতে পারছি না  কেন? আজকাল তো অভিজাতরাও নাটক দেখছে না। তাহলে আমাদের সমস্যাটা কোথায়?

মান্নান হীরা
আমি মনে করি, অভিজাতদের মনোজগতের একটা পরিবর্তন হয়েছে। আমাদের অনেক ভালো ভালো কাজ না থাকার ফলে তারা সরে পড়েছে। বিপরীতভাবে মার্কেট ইকোনোমির অন্যান্য মজা, আধ্যাত্মবাদের মজা ... ইত্যাদি তাদেরকে এমনভাবে পেয়ে বসেছে যে তারা থিয়েটারের পথটা ভুলে গেছে। আর যা কিছু করলে তাদেরকে এই পথে আনা যেত, আমরা সেটা করি নি, করতে পারি নি। তাদেরকে একেবারেই আনা যাবে না, আমি সেটা বলছি না বা বিশ্বাস করি না।

তারিক আনাম খান
আসলে এক সময় গতিশীল ছিল, কিন্তু গতিটাকে আরো গতিশীল করার উদ্যোগটা নেয়া হয় নি।

বিপ্লব বালা
আমি বলতে চাই যে, নাটকের কনটেন্ট ও ফর্মের মধ্যেও কিন্তু আমরা একটা ফরমেটের মধ্যেই আছি। আমরা ধরেই নিয়েছি যে, মঞ্চনাটকে এরকম ফর্ম বা কনটেন্ট হবে, এটাও একটা ফরমেটে দাঁড়িয়ে গেছে কিনা? পরিবর্তিত সময়ে দর্শক কেমন যেন মাইনাস হয়ে গেছে। নতুন বাস্তবতাতে দর্শকের মানসিকতা চেঞ্জ হচ্ছে, ফলে আমার ফর্ম এবং কনটেন্ট পাল্টাতে হবে- এই ব্যাপারটা কিন্তু আমরা ভাবি নি, এখনো ভাবি না। আগের ফরমেটে যে এখন চলবে না, দর্শক যে পাল্টে গেছে- সেখানে আমার ফাইটটা কী হবে, মিডিয়ার পাশাপাশি থেকে, সেটা আমরা ভাবিই নি। অনেকে মনে করে ঐ তরল থিয়েটার কেন করবো? বা অনেকে এমনও ভাবেন যে, দর্শকও দরকার নেই। থিয়েটার হচ্ছে একেবারে একটা নান্দনিক, শিল্প ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার মনে হয় শুরুতেই এমনভাবে শুরু হয়েছিল কিনা যে, এটা একটা এলিটিস্ট ব্যাপার, এটা নান্দনিক ব্যাপার, এটা সকলের জন্য না। ফলে শুরু থেকেই দর্শককে আমরা সম্মানই করি নি। দর্শককে আমার ক্লায়েন্ট ভাবি নি। এ প্রসঙ্গে আমি একটা কথা তুলতে চাই। একটা টিভি অনুষ্ঠানে ত্রপা মজুমদারকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল নারীকে মিডিয়ায় কীভাবে দেখানো হবে, এটার ব্যাপারে যারা এসব নির্মাণ করে তাদের কী হাত থাকে? তো ত্রপা বলেছিল যে- হ্যাঁ, আমরা অবশ্যই চেষ্টা করি নারীকে যেন পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা না হয়। কিন্তু সব কিছুর উর্ধ্বে কিন্তু ক্লায়েন্ট আমার ফ্যাক্টর। সে যদি বলে যে- না এভাবে না, ওভাবে কর, তাহলে কিন্তু আমি সেভাবে করতে বাধ্য। তো ব্যবসায় যেখানে ক্লায়েন্ট ফ্যাক্টর হয়, থিয়েটারে সেই ক্লায়েন্ট বা দর্শক কিন্তু কোনো ফ্যাক্টরই না। কারণ এটাতো আমার জীবিকা না, কিন্তু ঐটাতো আমার জীবিকা। ওখানে ক্লায়েন্টকে না ভাবলে আমার ভাত হবে না, কিন্তু থিয়েটারে ক্লায়েন্ট না থাকলে বলতে পারবো যে- ও তো কিছু বোঝে না। আগে আমার কাজ বুঝুক, তবে তো আসবে সে।

হাসান শাহরিয়ার
দর্শককে যখন আপনি প্রমাণ করে দেন যে, সে মুর্খ, তারপর সে টাকা খরচ করে আপনার নাটক দেখতে আসবে কেন? মুর্খ সাজার জন্য?

বিপ্লব বালা
সে-ই-তো। দর্শককে আমরা হেয় করেছি সব সময়।

আজাদ আবুল কালাম
আপনার কি মনে হয় যে, আমরা থিয়েটারের মানুষেরা সময়টাকে বুঝতেই পারছি না?

বিপ্লব বালা
আমার একটা ধারণা হলো, ঐ যে একাট স্লোগান আছে না যে- থিয়েটার হলো সমাজের দর্পণ বা থিয়েটার সমাজ বদলের হাতিয়ার ইত্যাদি ইত্যাদি ... তো সেগুলো যারা বলেছি, সেটা নিজেদের কথা ছিল না। ফাঁকা বুলি ছিল। অনেকে বলেন যে- না, থিয়েটার দিয়ে সমাজ পরিবর্তন হয় না ... আমি সেদিকে যাচ্ছি না, আমি বলতে চাচ্ছি, যে বলে- থিয়েটার আমার দর্পণ, আসলে এটা সে নিজেই বিশ্বাস করে না। সে বানোয়াট বিশ্বাস দেখাতে চায় দর্শককে। নাটক হলো নিজেকে প্রকাশ করা, নিজের বিশ্বাস থেকে শুরু করে সব কিছুকে প্রকাশ করা। তো আমরা কিন্তু নিজেকে প্রকাশ করি নি, লুকিয়েছি। নিজেকে লুকিয়ে একটা বানোয়াট কথবার্তা দর্শককে বলতে চেয়েছি। দর্শক সেটা বুঝে ফেলেছে। বুঝে ফেলেছে কারণ, আপনি আপনাকে বাদ দিয়ে যখন কিছু এক্সপ্রেস করতে চান, সেটা ধরা পড়ে যায়। একসময় বলতাম রাজনৈতিক, এখন বলি নান্দনিক। কিন্তু দুটোর কোনোটাই আমি বিলং করি না। যেহেতু এটা দৃশ্যকাব্য, সেহেতু দর্শকেরও মনে হয় নি যে, এটা তার থিয়েটার হচ্ছে। কারণ, দর্শকের মধ্যে তো লুকোচুরির ব্যাপার নেই। সে যখন টের পেল যে বানোয়াট এসব গল্প, তার গল্প নয় বা সামাজিক আর আর বাস্তবতার সাথে এসব কন্টেন্ট যায় না, তখন সে সরে পড়েছে।

হাসান শাহরিয়ার
হ্যাঁ, কারণ আমরা তো কেবল নাটক করি। কিন্তু একই দর্শক কিন্তু বাজারে যায়, অফিসে যায়। রাস্তাঘাটের বহু পরিস্থিতির মোকাবেলা করছে সে। আমাদের কাছে থিয়েটার যেমন খেলা খেলা, দর্শকের কাছে কিন্তু এসব খেলা খেলা দেখার সময় নেই। সে এই নোংরা জীবন থেকে মুক্তি চায়, তার কিছুই সে নাটকে এসে পায় না। ফলে সে নাটকের কাছে আসে না।

বিপ্লব বালা
মানে আমি দেখাচ্ছি আমার বাইরের জিনিস। আমি যা না তা দেখাচ্ছি। আমার লক্ষ্য হলো থিয়েটারটা নান্দনিক হচ্ছে কিনা। আগে ছিল রাজনৈতিক হচ্ছে কিনা, এখন হলো নান্দনিক হচ্ছে কিনা। এসব কিন্তু সৌখিন ব্যাপার তাই না? এই সৌখিন জিনিসের পেছনে ছোটার সময় দর্শকের নেই।

হাসান শাহরিয়ার
আমার নিজের জীবনে, চলাফেরায় কখনো নান্দনিকতার ছাপ নেই, কিন্তু আমি মঞ্চে নান্দনিকতা ফুটাচ্ছি। আমি আমার সব আদর্শ বিসর্জন দিয়ে মার্কেট ইকোনোমিতে গড়াগড়ি খাচ্ছি আর মঞ্চে রাজনীতির আদর্শ ফুটাচ্ছি। দৃশ্যকাব্যে এগুলো ধরা পরে। ফলে দর্শক বলে আপনারা থাকেন আপনাদের বানোয়াট জিনিস নিয়ে আমরা যাই।

লিয়াকত আলী লাকী
আসলে আমরা যে সময়টা পার করছি, মানে গ্লোবালাইজেশনের যে কুফলগুলো আছে সেটা আমাদের রাজনীতি ফেস করতে পারছে না। আমাদের দেশে একটা রাজনৈতিক সংস্কৃতি কিন্তু গড়ে ওঠে নি। ফলে একজন নাট্যকর্মী হিসেবে আপনি যা করতে পারবেন, সেটা কেবল আপনার সৃজনশীলতা দিয়েই হবে না। আপনি রাষ্ট্রের চিন্তা-ভাবনার কাছেও কিন্তু জিম্মি। আমি আপনার (বিপ্লব বালা) কথায় একমত হয়েও বলছি যে, এত সংকটের মধ্যেও আমাদের কাজের মধ্যে যে টেনডেনসিগুলো এসেছে, সেটাও কিন্তু কম কথা নয়। যেমন আমাদের লোকনাট্য, নিজস্ব সংস্কৃতির কাছে ফিরে যাওয়া বা সেটা নিয়ে কাজ করা ... এগুলো কিন্তু থিয়েটারে হচ্ছে। আজকের যত জঙ্গি-বোমাবাজি, এসবের বাইরে কিন্তু আমাদের একটা অসাম্প্রদায়িক চরিত্র আছে, যেগুলো লোকফর্মে পাওয়া যায়। সেগুলোকে নিয়ে কিন্তু আমরা কাজ করছি। এগুলো কিন্তু সমাজে প্রভাব ফেলছে।

বিপ্লব বালা
না, না, আমরা এগুলো জনগণের প্রয়োজনে করি নি, এগুলো করেছি আমার কাজের এক্সপেরিমেন্ট হিসেবে। এটার এক্সপেরিমেন্ট শেষ হলে দেখবেন আরেকটা ধরবে।

হাসান শাহরিয়ার
লাকী ভাই, আপনার কি মনে হয় যে, আমরা লোকফর্মে গেছি দর্শক বাড়াবার জন্য? দর্শক কিসে বাড়বে না বাড়বে তাতে আমার কী আসে যায়? আমি দেখবো আমার অভিজ্ঞতায় কী কী পালক যুক্ত হলো। ব্যস, ‘আমি’ থাকলেই তো হয়। এত কষ্ট করে স্বাধীন দেশে নাট্যচর্চা শুরু করেছি কি সবার জন্য? এক সময় দর্শকের কথা ভাবে নি, এখন নিজের দলের কর্মীদের কথাও ভাবার দরকার নেই। তাই লোকফর্ম নিজের দলের নাট্যকর্মীরাও বুঝুক না বুঝুক আমাকে করতেই হবে। তো নিজের দলের অভিনেতৃরাই যুক্ত হতে পারছে না, দর্শক যুক্ত হবে কীভাবে?

লিয়াকত আলী লাকী
তার মানে আমরা আসলে সাহসের সাথে সত্যকে ফেস করতে পারছি না। তারপরও আমরা যারা থিয়েটারটা করে যাচ্ছি, তারা কিছু কিছু সংকটের মুখোমুখি হচ্ছি। যেমন আগে আমরা থিয়েটার করেছি, যে সততা ছিল এখন সেটা নেই। সামাজিক বিভিন্ন খারাপ জিনিস তো নতুন নাট্যকর্মীর ভেতরেও ঢুকে গেছে। আজকে একটু দেরি করে রিহার্সেলে আসলেই বলে জ্যাম ছিল। বা সেল ফোনে বলে- বাবা অসুস্থ আসতে পারছি না। আসলে কিন্তু সে কোনো নাটকের স্যুটিং-এ ব্যস্ত-

হাসান শাহরিয়ার
এগুলো কিন্তু সে বড়দের দেখে দেখে শিখেছে। বড়দের মধ্যে কিন্তু এখন প্রবণতাই নেই যে সঠিক সময়ে রিহার্সেলে আসতে হয়। নতুনরা মিথ্যা বলে, এটা দিয়ে প্রমাণ হয় যে তাকে মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়েছে। কিন্তু প্রবীণরা মনেই করে না যে, এটার ব্যাপারে কোনো জবাবদিহিতার প্রয়োজন আছে, ফলে তাকে মিথ্যা বলতে হয় না।

লিয়াকত আলী লাকী
আমাদের হতাশার কিন্তু অনেক কারণ আছে, সেটা মেনেই বলছি, আমাদের বোধহয় ভালো সময় আসার সময়ও হয়ে গেছে। মানে আমরা নব্বুয়ের দশকের শেষের দিকে যেমন ছিলাম, থিযেটারের দর্শকদের প্রেক্ষিতে বলছি, দলের প্রোডাকশনের প্রেক্ষিতে বলছি, তার চেয়ে বোধহয় একটু ভালোর দিকে যাচ্ছি। যেমন ধরুণ- গত বছর কিন্তু প্রায় ৩৫ টি নতুন নাটক মঞ্চে এসেছে এবং এর প্রায় ২৫ টি মানসম্মত নাটক।

তারিক আনাম খান
তাতে কী হলো? আমরা শো করতে পারবো ক’টা? সুতরাং আমাকে নাম্বার অব শো’জ এবং নাম্বার অব দর্শক দিয়ে বলতে হবে ভালোর দিকে যাচ্ছি কিনা, তাই না? আমি আরেকটা সংকটের কথা বলতে চাই সেটা হলো মানসিকতার সংকট। আমি যখন বিচ্ছু’ করলাম, প্রথম কয়েকটি শো কিন্তু তেমনভাবে দর্শক আসে নি। এবং এই নিয়ে জ্ঞানী মহলে কোনো কথাও হয় নি। কিন্তু তারপরই দর্শক আসা শুরু হলো এবং সমালোচনার ঢেউ শুরু হয়ে গেল। অর্থ দাঁড়াচ্ছে, ভালো নাটক মানে দর্শক কম হবে, দর্শক উপচে পড়া মানেই সন্দেহ ... এই বুঝি থিয়েটারটা গেল। আমি তারপর তুঘলক’ করেছি। দর্শক পেয়েছি কিন্তু বিচ্ছু-র মতো না। পরে আমি নিজেও শংকিত হয়ে গেলাম, যে আসলেও কি কমেডি নাটক করা ঠিক না?

বিপ্লব বালা
এমন একটা আইডিয়া কিন্তু আমরা ছড়িয়েছি যে, হাসির নাটক করা যাবে না। আর যে সব নাটক দর্শক উপচে পড়বে, বুঝতে হবে সেখানে গোলমাল আছে।

তারিক আনাম খান
তখন কিন্তু আমারও মনে হচ্ছিল যে- তাহলে কি আমি ট্র্যাকে নেই? আমি কি খারাপ কিছু করছি?

হাসান শাহরিয়ার
এটা হয়েছিল কিন্তু অন্য কারণে। তারিক ভাই আপনি স্মরণ করে দেখবেন যে, বিচ্ছু, কঞ্জুস জনপ্রিয় হয়ে যাবার পর একটা বন্যা বয়ে গেল মলিয়রের নাটক করবার জন্য। আপনাদের নাটকের মান, অভিনয়-ডিজাইন সব কিছু মিলিয়ে যে স্তরে গেছে, অন্যদেরগুলো কিন্তু ধারে-কাছেও ছিল না। ওরা ভেবেছিল মলিয়রের নাটক মানেই দর্শক উপচে পড়বে। ফলে কেউ কেউ লিখলো ‘দম ফাটানো হাসির নাটক’ ইত্যাদি ইত্যাদি। সেগুলো দেখার পর দর্শক আসলে সরতে শুরু করেছে।

তারিক আনাম খান
হ্যাঁ, সেটা হতে পারে। কিন্তু আমার তখন হঠাৎ করেই মনে হলো যে, অধিক পপুলারিটি বোধহয় ঠিক না। থিয়েটার মানে সরাসরি রাজনীতি থাকতে হবে ... এসব। কিন্তু মলিয়রে কি রাজনীতি নেই?

বিপ্লব বালা
কিন্তু কমেডির সমস্যা হলো মজা দিতে গিয়ে বক্তব্য আর স্পষ্ট হয় না। দর্শক মজাটাই নেয়।

তারিক আনাম খান
কমেডির ডিজাইনই-তো এমন তাই না? এখন কমেডির রাজনৈতিক বক্তব্য যদি আমি সিরিয়াসলি দিই, তাহলে তো কমেডির চরিত্র থাকবে না। কমেডিকে ফর্ম হিসেবে আদর্শ ভাবছি, অথচ ওটা যখন করছি, তখন সবাই বাঁকা চোখে তাকাচ্ছি। এটা কেমন কথা!

হাসান শাহরিয়ার
আমি এবার বিপ্লব দা’র কাছে একটু জানতে চাই। সেটা হলো এই যে আমাদের এত কথা হলো, তাতে করে একটা সত্য বের হয়ে এসেছে যে আমাদের দর্শক কমে গেছে। সেটা যদি হয় যে গ্রুপ থিয়েটার আর এভাবে চলবে না, প্রফেশনাল থিয়েটার করতে হবে- সেটা হতে পারে বা ভিন্ন কোনো চিন্তাও থাকতে পারে। আমি জানতে চাইছি, আপনাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যে সমস্ত শিক্ষার্থীরা পড়ছে তারা কি এসব ব্যাপারে কোনো মৌলিক ভাবনা ভাবছে বলে মনে করেন?

বিপ্লব বালা
আসলে এখানে ভর্তির পদ্ধতির মধ্যে একটু গোলমেলে ব্যাপার আছে। এখানে অনেকেই যে ইচ্ছে করে, স্বপ্ন নিয়ে ভর্তি হচ্ছে তা না। বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই কোথাও সুযোগ না পেয়ে এখানে আসে। তবে এখানে পড়তে গিয়ে অনেকেই খুব সিরিয়াসলি নিচ্ছে বিষয়টিকে। তবে ওরা বের হয়ে কীভাবে কী করবে এমন কিছু নিয়ে মৌলিক ভাবনা ভাবছে, বলা যাবে না। কিন্তু কেউ কেউ খুব ভালো কাজ করছে।

হাসান শাহরিয়ার
আমি জানতে চাচ্ছি বাংলাদেশের থিয়েটারের যে বাস্তব চিত্র, আজকের আমাদের আলাপচারিতাতেও বের হলো, সেই বাস্তবতাকে নিয়ে আপনারা তাদের সাথে আলাপ করেন কিনা?

বিপ্লব বালা
ওদের মধ্যে কেউ কেউ আছে যারা পাশ করার পরও থিয়েটারটাই করতে চাইবে। কিন্তু সত্য হলো, সেই বাস্তবতা তো নেই। ফলে কেউ কেউ এনজিওতে যোগ দিচ্ছে কেউ কেউ অন্যান্য দলে কাজ করতে চাইছে। এভাবেই আপাতত আছে।

হাসান শাহরিয়ার
দলে কাজ করতে গেলেও কিন্তু সংকট আছে। আপনি বেহুলার ভাসান করতে গিয়ে যে ইফোর্ট দিচ্ছেন, সেটা তো বাইরের কোনো দল দিতে পারবে না। এত সময় দিয়ে এখন কেউ থিয়েটার করে না। তো যদি ঐ মানের বা ঐ পদ্ধতিতে কাজ করতে চান, তাহলে বর্তমান থিয়েটারের যে বাস্তবতা তার বাইরে নতুন কিছু ভাবনা আপনাকে ভাবতে হবে। নইলে আপনি কোনো কাজ করতে পারবেন না। আর কাজ করতে না পারলে এভাবে অনার্স, মাস্টার্স করার কোনো মানে আছে কি?

তারিক আনাম খান
শাহরিয়ার খুব ভালো একটা প্রসঙ্গ তুলেছ। বেহুলার ভাসান করবার সময় তার মাথায় কী থাকে? ভালো করতে হবে, রাতদিন খাটতে হবে। কারণ সামনে সার্টিফিকেটের ব্যাপার আছে। তার ধ্যান-জ্ঞান সব সে ঢেলে দিয়ে কাজটা করে। আর বাইরে আসলে সে খাবে কী, পড়বে কী, থাকবে কোথায়- এসব প্রশ্নের যখন মুখোমুখি হবে, তখন তার বাস্তবতা কী হবে?

বিপ্লব বালা
এক সময় ওরা অনেকেই বসেছিল যে, একটা রেপাটরি জাতীয় কিছু করা যায় কিনা। পরে বেশ একটা অগ্রগতি কিন্তু সেখানেও হয় নি। আসলে বাইরে এসে, সংগ্রাম করে থিয়েটার করবে এমন ছেলে-মেয়ে কিন্তু কমই পাওয়া যাবে।

হাসান শাহরিয়ার
কিন্তু একাডেমিকভাবে শিক্ষিত হওয়ার ফলে তাদের ভেতর একটা ব্যাপার তৈরি হয় যে তারা প্রফেশনালি কাজ করবে। সেক্ষেত্রে সাংগঠনিকভাবে আমরা যে ক্রাইসিসগুলোর মুখোমুখি হই, সেই অভিজ্ঞতা কিন্তু ওদের ভেতর থাকে না। যেমন অর্থ জোগাড় করা, ছেলে-মেয়ে জোগাড় করা ইত্যাদি। সেখানে একটা নির্দেশনা দিয়ে দশ হাজার টাকা পেল, বা ডিজাইন করে পাঁচ হাজার টাকা পেল, এটাকেই তারা ভাবে প্রফেশনালিজম। কিন্তু ঐ দল যে প্রত্যেকটা শো-তেই লস দিচ্ছে বা দর্শক পাচ্ছে না, সেটা কিন্তু তাদের মাথায় থাকে না। ফলে আজকের আলোচনায় যে সংকটের কথা বের হলো, দর্শক সংকট- সেটার ব্যাপারে কিন্তু তারা উদাসিনই থেকে গেল বা থেকে যাবে। তাহলে তাদের কাজের ভবিষ্যত কী হবে?

তারিক আনাম খান
বিপ্লব বলার আগে আমি একটু বলি। এটা কিন্তু একটা বড় প্রশ্ন তুলেছ। যদি দল না টেকে, তাহলে ওরা কাজ করবে কোথায়? তার মানে আমাদের আগে যারা কাজ শুরু করেছেন, তারা যদ্দুর করার করে গেছেন। তারপর আমাদের কথা যদি ধরি যে আমরা দর্শক ধরে রাখতে পারি নি বা বাড়াতে ব্যর্থ হয়েছি, সেটাও মেনে নিলাম। কিন্তু ভবিষ্যতের ওরা কী করবে? তাদের কোনো নতুন চিন্তাভাবনা আছে কিনা থিয়েটার নিয়ে, একেবারে মৌলিক চিন্তা-ভাবনা?

হাসান শাহরিয়ার
হ্যাঁ, আর হচ্ছে আপনারা যেহেতু বাস্তবতাটা জানেন, সেটা তাদেরকে ভাবতে বলেন কিনা, নাকি স্বপ্ন দেখান যে- তোমরা অনেক ভালো অভিনয় করছো, কাজ করছো, তোমাদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল- এধরনের কিছু?

বিপ্লব বালা
ঠিক এমন না, তবে আমার মনে হয়েছে, ওদের অনেকেই বুঝে নিয়েছে যে, অন্য কোনো চাকুরি করবে এবং পাশাপাশি থিয়েটার করবে। সাইদুর রহমান লিপন এক সময় গিয়েছিল আহসানিয়া মঞ্জিল, শিশুপার্ক- এসব জায়গায়। সে ভাবছিল ওখানে থিয়েটার করা যায় কিনা। মানে আমাদের মহিলা সমিতি বা শিল্পকলার বাইরেও ভেন্যু খুঁজছিল। পরে বোধহয় সেটাও হয় নি।

তারিক আনাম খান
ওদের এখন ভাবা উচিত, প্রয়োজনে সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে গিয়ে ছোট ছোট নাটক করতে হবে। ক্লাবে গিয়ে করতে হবে। এভাবে ভেন্যু বাড়াতে হবে। সব জায়গায় একই নাটক করতে হবে তা না। এটা ছাড়া প্রফেশনাল বা সেমি প্রফেশনাল চিন্তা করা সম্ভব না। আর তারা যদি মনে করে যে কিছু কিছু টিভি মিডিয়তে কাজ করে আয় করবে এবং থিয়েটার করবে, আমি মনে করি সেটাও সম্ভব। সেদিক থেকে যারা মিডিয়ার নাটক নির্মাতা তাদেরকেও প্রফেশনাল হতে হবে। যদি মনে হয় শিক্ষিত ছেলে-মেয়ে দিয়ে কাজ করালে ভালো কিছু করা সম্ভব, তাহলে তাদের সাথে যোগাযোগ করবে, তাদের সিডিউল নেবে, এবং সিডিউল মত স্যুটিং করবে। টিভি মিডিয়াও কিন্তু প্রফেশনাল এটিচিউডে চলছে না। সেখানে কেউ স্ক্রীপ্ট মুখস্থ করে যায় না। ন’টার সময় স্পটে থাকার কথা, দেখা যায় এসেছে বারটায়। ফলে অনেকের এমনও হয় যে একটা মাত্র দৃশ্য স্যুটিং হবে, কিন্তু তার সারাদিন মাটি হয়ে গেছে। অনেক কিছুই হতে পারে কিন্তু এই ভাবনাগুলো ওদেরই ভাবতে হবে। ভারতে কিন্তু এটা হয়েছে। এখন যাদেরকে আমরা চলচ্চিত্রে দেখি তাদের অনেকেই কিন্তু এনএসডি থেকে বেরিয়েছে।

লিয়াকত আলী লাকী
তার মানে কী এনএসডি বা আমাদের নাট্যকলা বিভাগগুলো টেলিভিশন বা চলচ্চিত্রকে ফিডআপ করার জন্যই বেঁচে থাকবে?

তারিক আনাম খান
হোক না, ক্ষতি কী? কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, সেখানেও তো প্রফেশনাজিম তৈরি হচ্ছে না। আজকাল টেলিভিশন কি কেউ দেখে? মনে তো হয় না। যারা কাজ করছে, তাদের মূল উদ্দেশ্য হলো টাকা পাওয়া। কোনো সততা নেই। নয়টার গাড়ি এগারোটায়-ও ছাড়ে না। ইচ্ছে মতো স্যুটিং হচ্ছে ... তো সেসব জিনিস মানসম্মত হবে? হবে না।

হাসান শাহরিয়ার
তাহলে লাকী ভাই প্রথমেই যেটি বলেছিলেন যে, মঞ্চ যদি বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা দিত, তাহলে সবাই মঞ্চ নিয়েই থাকতো। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি, মিডিয়া তার বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা দিচ্ছে, কিন্তু সে সেটাকে সম্মান করছে না, অসততা দেখাচ্ছে। সেটাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

লিয়াকত আলী লাকী
হ্যাঁ, আমি বলেছি, কিন্তু এটা মানতে হবে যে, অর্থ পেলেই আমি প্রফেশনাল হবো না। আমরা যখন নাট্যকলার শিক্ষার্থীদের নিয়ে বলছি, তখনও কিন্তু আয়ের কথাটাই বলছি। কিন্তু আমার কথা হলো ওরা জানে কিনা যে আমাদের মেইন স্ট্রীম থিয়েটার ... মানে শহুরে থিয়েটার চর্চার মেইন স্ট্রীম কিন্তু এই গ্রুপ থিয়েটার চর্চা, এটা মানতে হবে, এটার বর্তমান অবস্থা, সংকট- এসব ব্যাপারে ঐ শিক্ষার্থীরা সচেতন কিনা? কারণ আমরা এমনও শুনি যে আমরা যা করি সেটা তাদের কাছে কেমন যেন মনে হয় ... মানে যেহেতু সে একটা ডিসিপ্লিনের মধ্যে কাজ করে আর দলগুলো অগোছালো ... কিন্তু তাকে যদি থিয়েটার করতে হয় তাহলে কিন্তু বর্তমান অবস্থাটার হাত ধরেই কাজ করতে হবে আর প্রতিভা থাকলে সে এই অবস্থার পরিবর্তন করবে।

বিপ্লব বালা
কিন্তু এই থিয়েটার নিয়ে তাদের কিন্তু একটা সমালোচনার জায়গা তৈরি হয় এবং এটাই স্বাভাবিক। বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন সে সিরিয়াসলি মেথড মেনে থিয়েটার চর্চাটা শেখে, সেটা চরিত্র নির্মাণ হোক বা ডিজাইন হোক সব কিছুতেই সে খুব গভীরে গিয়ে কাজ করার সুযোগ পায় এবং শেখে। সেখান থেকে সে যখন এই বাইরের থিয়েটার চর্চাটা দেখে, তার কাছে একটা সমালোচনার জায়গা তৈরি হয়। এই যে বানানো অভিনয়, কমন ফর্মূলা ... মানে মঞ্চে থিয়েটার ল্যাঙ্গুয়েজ তৈরি করার খুব অভাব দেখে সে গ্রুপ প্রোডাকশনগুলোতে। এবং আগে তো তবুও থিয়েটারে ডেডিকেশনের ব্যাপার ছিল, সেটা তো এখন মাইনাস। তো সেখান থেকে একটা সমালোচনার জায়গা তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক।

তারিক আনাম খান
এটা কিন্তু আমাদের বেলাতেও হয়েছিল। আমরাও কিন্তু এনএসডি থেকে ফিরে এসে যখন দলগুলোতে কাজ করতাম, কেমন যেন মেলাতে পারতাম না ... ঠিক সময়ে আসছে না, কনসেনট্রেশন দিচ্ছে না, ইত্যাদি। পরে আস্তে আস্তে মেনে নিতে হলো যে এখানে কিছু বাস্তবতাও আছে।

বিপ্লব বালা
হ্যাঁ, এটা বোধহয় তাদের ক্ষেত্রেও হবে। কারণ, ডিপার্টমেন্টে একটা সুযোগ আছে, ভালো কাজ করার, এনালাইসিস করার, পরীক্ষা নিরীক্ষা করার বা অনেক লম্বা সময় ধরে কাজ করার। কিন্তু বাইরে তো এটা নেই। ফলে সত্যিই এখানে হয়তো একটা আদর্শের জায়গা, কল্পনার জায়গা তৈরি হয়। তো সেদিক থেকে যারা বেরিয়ে এসে দলে কাজ করতে চাইবে, তারা বোধহয় কিছুটা সংকটে পড়তেও পারে।  

তারিক আনাম খান
কিন্তু তাদেরকে এই সংকটকে ওভারকাম করতে হবে। আমি তো বললাম যে, যখন এনএসডি থেকে ফিরে আসলাম, এসে একেবারে হতাশ হয়ে গেলাম। কারণ আমি তো একটা মেথডের মধ্য দিয়ে শিক্ষিত হয়েছি, ডিসিপ্লিন শিখেছি। এখানে এস দেখি স্ক্রীপ্ট সিলেকশন থেকে শুরু করে কাস্টিং দেয়া, মহড়া দেয়া সব কিছুই কেমন যেন হেলা ফেলা করে হচ্ছে। তবুও মেনে নিলাম। কিন্তু যখন দেখলাম যে, এই নাটকই দর্শক গ্রহণ করছে, দেখছে, তখন বুঝলাম এখানের কাজের মধ্যেও একটা ম্যাজিক আছে। ম্যাজিক না থাকলে দর্শকপ্রিয়তা পাচ্ছে কেমন করে? সেই ম্যাজিকটা কিন্তু আমি মেনে নিয়েছিলাম যে, এই থিয়েটার দলগুলোর কাজের ধারাতেও কিন্তু শেখার মতো কিছু আছে। ফলে আমার মেথড, একাডেমিক শিক্ষা এবং পাশাপাশি এই দলগুলোর ডিজাইন সব মিলিয়েই কিন্তু নতুন ভাবনা তৈরি করতে হবে।

হাসান শাহরিয়ার
হ্যাঁ, মেলাতে হবে। কারণ, সে যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে, আপনি যে এনএসডি-তে পড়েছেন সবই কিন্তু আমাদের এই গ্রুপ থিয়েটার চর্চার ধারাবাহিকতা, সেটা বুঝতে হবে। আপনি যে মেথডের কথা বললেন, তা স্বীকার করেই বলছি, আমাদের এখানে যে চর্চাটা হয়, সেটা যতই গোলমেলে মনে হোক না কেন, সেটাই আমাদের মেথড। আপনার শিক্ষা দিয়ে, মেধা দিয়ে এটাকে উন্নত করবেন আপনি। আপনার মতো করে আধুনিক করবেন, কিন্তু এটাকে অস্বীকার করে নতুন মেথড কিন্তু আপনি বানাতে পারবেন না, সম্ভবও না।

আমরা আর কথা চালাবো না। কিছুক্ষণ কথা বলে এখানে কিছু সমস্যা হয়তো চিহ্নিত করা গেছে। কিন্তু সমাধান অবশ্যই এক বৈঠকে হবে না। এগুলো নিয়ে ভাবতে হবে। ভাবতে হবে নতুন-পুরোনো সব প্রজন্মকেই। আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।