Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

আলাপনে আলী যাকের

Written by সাক্ষাৎকার : বিপ্লব বালা ও হাসান শাহরিয়ার.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

[স্বাধীনতার পর নাট্যচর্চাটা আমাদের বেশ এগিয়ে নিয়ে গেছে, সুস্থ ভাবনা-চিন্তার আগ্রহ তৈরি করেছে। আর তৈরি করেছে ‘মানুষ’ হবার আকাঙ্ক্ষা। আমরা শিল্পের এক বড় কর্মকাণ্ড, কর্মযজ্ঞ- মঞ্চনাটকের নিয়মিত সাক্ষাৎ পেয়েছি। আমরা বেশি বেশি নাট্যকার পেয়েছি, পেয়েছি সৃজনশীল প্রতিভাসম্পন্ন নাট্যনির্দেশক, অনেক ভালো অভিনেতৃ। আর পেয়েছি অনেক সংগঠক, যারা ক্রমশই মঞ্চনাটকের পরিধি বিস্তৃত করেই চলেছেন। এক কথায় এঁরা সবাই আমাদের মঞ্চনাটকের পুরোধা। আমরা মনে করি আমরা এঁদের সব ভালো কাজের উত্তরাধিকারী। তাই এঁদের কাজ এবং কাজের প্রক্রিয়া জানতে আগ্রহী, হতে আগ্রহী তাঁদের মতো বা তাঁদের চেয়ে বড় কিছু।

এই প্রত্যাশায় থিয়েটারওয়ালা আলাপচারিতায় মগ্ন হয়েছে কয়েকজন নাট্যজনের। তাঁদের সাথে আলাপচারিতা অনুলিখন করে ধারাবাহিকভাবে ছাপা হচ্ছে থিয়েটারওয়ালায়। আমাদের এমনি এক নাট্যজন আলী যাকের। সাক্ষাৎকার: বিপ্লব বালা ও হাসান শাহরিয়ার আর অনুলিখন- সাইফ সুমন]

বিপ্লব বালা
শুরু থেকেই শুরু করা যাক। আপনার শৈশব নিয়ে কিছু বলুন।

আলী যাকের
আমার জন্মস্থান চট্টগ্রাম, বাবার কর্মস্থল হিসেবে, ১৯৪৪ সালের ৬ নভেম্বর। বাবা তখন এস.ডি.ও ছিলেন। আমার জন্মের সময় বাবা ওয়ার ডিউটিতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। বার্মা থেকে বাঙালিরা তখন ছুটে আসছিল, কারণ, জাপানিরা বার্মার দিকে ধেয়ে আসছে। বার্মা থেকে কক্সবাজার হয়ে বাঙালিরা যারা আসতো এদের ব্রিটিশ সরকার যে সাহায্য করতো আমার বাবা সেটা তত্ত্বাবধান করতেন। তো  আমার জন্মের সময়টায় জাপানিরা চট্টগ্রামে বোমা ফেলে, আমার জন্মের পনের মিনিট আগেও। তারপর দেশে একটা দুর্ভিক্ষও হয়েছে ... আমার আবার খাওয়ার খুব বাতিক ছিল, যার জন্য অনেকে বলতো যে দুর্ভিক্ষের সময় বুভুক্ষু আত্মা নিয়ে জন্মেছে।

বিপ্লব বালা
আপনারা ভাই-বোন ক’জন?

আলী যাকের
আমরা ছিলাম চার ভাই-বোন, আমার বড়ভাই এবং দিদি মারা গেছেন, অল্প বয়সে ... বড়ভাই ৪৯ বছর বয়সে আর দিদি ৩৮ বছর বয়সে। ... আমরা বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় মানুষ হয়েছি। চট্টগ্রামের কোনো স্মৃতিই আমার নেই। তারপর বাবা নীলফামারীতে বদলি হলেন ... কিছুদিন দার্জিলিং-এ ছিলেন ... কোনো কিছুই আমার মনে নেই। প্রথম স্মৃতি বলতে বাবা যখন মেহেরপুরে এসডিও হয়ে এলেন তখনকার একটা ক্ষীণ স্মৃতি মনে আছে, বাবার একজন পিয়ন ছিলেন উপেন দা’ ... তখন সেখানে একটা চিতা বাঘ ধরা পরেছিল, উপেন দা’র কোলে চড়ে সেই বাঘ দেখতে গিয়েছিলাম। বাঘ হালুম করে উঠতেই আমি কেঁদে দিয়েছিলাম।

বিপ্লব বালা
এটা কবেকার ঘটনা?

আলী যাকের
এটা ১৯৪৭ সালের ঘটনা। এরপর বাবা এসডিও হয়ে এলেন মাদারীপুরে ... তখন পাকিস্তান হলো। তখনকার একটা স্মৃতি মনে আছে ... বাবাকে পাকিস্তানী পুলিশ স্যালুট দিচ্ছে। এরপর বাবা বদলি হলেন ফেনীতে। ফেনীর স্মৃতি আমার কাছে খুব জ্বলজ্বলে। দৌড়-ঝাঁপ, খড়ের গাদার উপর ঝাঁপিয়ে পরা ...

বিপ্লব বালা
স্কুলে যাওয়ার আগে?

আলী যাকের
হ্যাঁ, আগে ... স্কুলে যাওয়ার বয়স যখন, তখন বাবা প্রমোশন পেয়ে খুলনায় এসেছেন।

বিপ্লব বালা
মামাবাড়ি বা দাদাবাড়ির কোনো স্মৃতি মনে আছে?

আলী যাকের
মামাবাড়ি কোলকাতায়, যদিও ছিলেন কুমিল্লার মানুষ। আমার নানা পাকিস্তান মেনে নেননি।

বিপ্লব বালা
নানা কী করতেন?

আলী যাকের
উনি কো-অপারেটিভ রেজিস্ট্রার ছিলেন। খান বাহাদুর খেতাবও পেয়েছিলেন ... ব্রিটিশদের ভালো তাবেদার ছিলেন বোধহয় হাঃ হাঃ ... উনি ১৯৬৬ সালে মারা গেছেন। কিন্তু তখনও পাকিস্তানে উনি আসেননি, মানে কখনোই তিনি পাকিস্তানকে মেনে নিতে পারেননি।

বিপ্লব বালা
আর বাবার বাড়ি?

আলী যাকের
আমার বাবারবাড়ি ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার নবীনগর থানার রতনপুর গ্রাম। বাবা যতদিন বেঁচে ছিলেন সেখানে বছরে অন্তত একবার যাওয়া হতো। এখন আমার প্রজন্মে এসে ১৯৯৬ সাল থেকে প্রতি তিন মাস অন্তর আমি যাই।

বিপ্লব বালা
ছোটবেলার পড়াশুনা কোথায়?

আলী যাকের
পড়াশোনা শুরু ঢাকাতেই। তার আগে কুষ্টিয়া ... কুষ্টিয়া আমার ছোটবেলার সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতিগুলোর সাক্ষী। গড়াই নদীতে আমি সাঁতার কাটা শিখি, আমার বড়ভাই শিখিয়েছেন। কুষ্টিয়া হয়ে তখন ঢাকা কোলকাতা ট্রেন চলতো। পথের পাঁচালীর অপু-দূর্গার মতো আমিও অবাক হয়ে ট্রেন যাওয়া দেখতাম। কোলকাতা তখন আমাদের স্বপ্নের নগরী। মায়ের সাথে গ্রীষ্মের ছুটিতে বেড়াতে যেতাম। প্রকৃতির প্রতি যে আমার একটা দুর্বলতা সেটা কুষ্টিয়া থেকেই হয়েছে। কুষ্টিয়ার পর বাবা বদলি হলেন ঢাকায়। প্রথম এসে ঢাকায় উঠলাম অভয় দাস রোড, ওয়ারীতে এক খালার বাসায়। পরে বাবা গেণ্ডারিয়াতে একটা বাড়ি কিনেছিলেন। গেণ্ডারিয়াতে আমার ১৪ বছরের স্মৃতি। এ বাড়িতেই আমার বাবা, মা, দিদি মারা গেছেন।

বিপ্লব বালা
তার মানে স্কুল জীবন পুরোটাই গেণ্ডারিয়াতে?

আলী যাকের
স্কুল, কলেজ তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ের সেকেন্ড ইয়ার পর্যন্ত গেণ্ডারিয়ায় ছিলাম।

বিপ্লব বালা
স্কুল জীবনে পড়াশোনার বাইরে আর কী করতেন?

আলী যাকের
খেলাধূলা করতাম আর গেণ্ডারিয়ায় পূজার সময় নাটক হতো, বইমেলা হতো ... খুব সুন্দর একটা পাড়াসমাজ ছিল। তোমরা নাম শুনেছ কিনা জানি না, তখন একজন নারী নেত্রী ছিলেন, আশালতা সেন ... আমরা তাঁকে আশা মাসীমা বলতাম ... তাঁর বাড়িতে গিয়ে যা খুশি করতাম। তখন ক্রিকেটের প্রতি আমার দারুণ ঝোঁক ছিল, নিয়মিত খেলতাম। ইস্ট এন্ড ক্লাবে আমি ফার্স্ট ডিভিশনে ক্রিকেট খেলেছি। শান্তিনগর ক্লাবে ক্রিকেট খেলেছি।

হাসান শাহরিয়ার
ক্রিকেট খেলায় ধারাভাষ্যও তো দিয়েছেন।

আলী যাকের
হ্যাঁ, সেটা অবশ্য আরো অনেক পরে, টেলিভিশনে ধারাভাষ্য দিয়েছি ... প্রসঙ্গত বলি, ঐ যে ছোটবেলায় প্রকৃতির প্রেমে পড়েছিলাম তা কিন্তু সব সময়ই আমাকে টেনেছে। যেদিন বিকেলে খেলতাম না, সেদিন বন্ধুরা মিলে হাঁটতে হাঁটতে যাত্রাবাড়ির দিকে চলে যেতাম। তখন যাত্রাবাড়ি কিন্তু বড় গ্রাম ছিল, তোমরা চিন্তাও করতে পারবে না কেমন গ্রাম ছিল ... সেখানে গিয়ে ক্ষেত থেকে গাজর তুলে খেতাম। তখন এক পয়সা বলে একটা ফুটো পয়সা ছিল, সেটা রেল লাইনে দিয়ে তার ওপর দিয়ে রেলগাড়ি চলে যাওয়ার পর চ্যাপ্টা ফুটো পয়সা সংগ্রহ করতাম। মার্বেল খেলতাম সাংঘাতিক ... পুরো গেণ্ডারিয়াটা ছিল একটা বাড়ি, একটা পরিবার। সবারই সবার বাড়িতে ঢুকে পড়ার অধিকার ছিল।

বিপ্লব বালা
কোলকাতার কী স্মৃতি মনে আছে আপনার?

আলী যাকের
মাকে নিয়ে গেলে কোনো রকমে স্যুটকেসটা বাড়িতে পৌঁছে দিয়েই এক দৌড়ে পার্ক সার্কাস ময়দানে। পার্ক সার্কাসে ট্রাম ডিপো ছিল একটা। ট্রামের পাদানীতে দাঁড়িয়ে শেষ স্টপ থেকে ডিপো অবধি হাওয়া খেতাম, কন্ডাক্টর কিছু বলতেন না। আসলে ছোটবেলায় আমরা যেভাবে কাটিয়েছি, সেটা এখন আর সম্ভব না।

বিপ্লব বালা
তাহলে গেণ্ডারিয়ায় নাটক কেবল পুজোর সময়ই হতো?

আলী যাকের
হ্যাঁ, আর গেণ্ডারিয়া হাই স্কুলে হতো স্বরস্বতী পুজোর সময়। আর সব পাড়ায়ই ক্লাব ছিল ওরাও করতো। আমরা মুকুলমেলা করতাম, আমাদের সাথে ছিল ইমরুল চৌধুরী। আমরা তখন কয়েকজন একটু আধটু লেখালেখিও করতাম। স্কুল জীবন শেষ করে নটরডেম কলেজ, তারপরতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। গেণ্ডারিয়ায় ১৯৬১ সালে বাবা, ১৯৬৪ সালে মা এবং ১৯৬৫ সালে দিদি একে একে মারা গেলেন, ঐ একই বাসায়। তখন একটা ভয় ঢুকে গেল যে এই বাসায় থাকলে বোধহয় সবাই মরে যাব। লোকজনও নানা কথাবার্তা বলা শুরু করলো। তখন বাসায় তালা দিয়ে আমি আর আমার বড়ভাই এবং ছোটবোনকে নিয়ে দিলু রোডে দুই রুম ভাড়া করে চলে এলাম। এটা ১৯৬৬ সালের কথা।

হাসান শাহরিয়ার
এবং সেটা হচ্ছে আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের থার্ড ইয়ারের কথা এবং তখনও আপনি নাটক বা থিয়েটার বলে কোনো কিছুর সাথে জড়াননি?

আলী যাকের
ইউনিভার্সিটি পাশ করার পরও জড়াইনি। তবে নাটক দেখতাম। কোলকাতায় বছরে একবার যাওয়া হতো, তখন সেখানে নাটক দেখতাম। আর আমার মা যখন গুরুতর অসুস্থ, ক্যান্সারে আক্রান্ত, তখন ইউনিভার্সিটি বন্ধ রেখে প্রায় এক বছর মায়ের সঙ্গে কোলকাতায় থাকতে হয়েছে, তখনও মাঝে মধ্যে নাটক দেখতাম।

বিপ্লব বালা
সেটা কত সালে?

আলী যাকের
১৯৬৪ সালে। তখন বহুরূপীর অনেক নাটক আমি দেখেছি। ইডিপাস, রক্তকরবী, চারঅধ্যায়, রাজা- মানে ঐ সময়ে যা যা করেছে, প্রায় সবই আমি দেখেছি। আর উৎপল দত্তের নাটক দেখতাম- অঙ্গার, কল্লোল এগুলো তো সাংঘাতিক লেগেছিল, মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দেখেছি।

বিপ্লব বালা
নাটক দেখার এই আগ্রহ হলো কী করে?

আলী যাকের
কোলকাতায় আমার এক খালাতোভাই আছে, আমার দুবছরের বড়, কিন্তু বন্ধুর মতো। ওর নাটক দেখার দারুণ উৎসাহ ছিল। ও-ই আমাকে উৎসাহিত করেছে নাটক দেখতে।

হাসান শাহরিয়ার
কিন্তু তদ্দিনে তো ঢাকার ড্রামা সার্কেল হয়েছে বা বজলুল করিম নাটক করছেন, ওনাদের কোনো ব্যাপার আপনার জানা ছিল না?

আলী যাকের
না, সত্যিই বলছি, আমি জানতাম না। আমার সাথে বজলুলভাইয়ের আলাপ হয় ১৯৭২ সালে। তখন এতোটাই ঘনিষ্ট হলাম যে, শিল্পকলায় তখন ‘নাট্যশালা উপদেষ্টা উপসংহ’ বলে একটা উপসংহ হলো, বজলুলভাই আমাকে মেম্বার করলেন সেখানে।

বিপ্লব বালা
নাগরিক তো স্বাধীনতার আগেই হয়েছিল?

আলী যাকের
হ্যাঁ, ১৯৬৮ সালের নভেম্বর মাসে। তখন আমি আবার কীভাবে যেন ঐ মিটিংটায় ছিলাম।

হাসান শাহরিয়ার
কারা কারা ছিলেন তখন?

আলী যাকের
ফাউন্ডার হিসেবে জিয়া হায়দার ছিলেন প্রেসিডেন্ট, আতাউর রহমান ছিলেন জেনারেল সেক্রেটারি, ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন ফজলে লোহানী, সিডনীভাই আরো অনেকে।

হাসান শাহরিয়ার
আতাউরভাইয়ের সাথে কি তখনই পরিচয়?

আলী যাকের
হ্যাঁ, কিন্তু তখন আতাউর ‘ভাই’ বলতাম, কারণ তিনি আবার রাশেদ খান মেননভাইদের ব্যাচমেট, আপনি আপনি করতাম। এখনও অবশ্য মেননভাইকে ‘ভাই’ বলি কিন্তু আতাউরভাই এখন আর ‘ভাই’ নেই, তুই তোকারী সম্পর্ক হয়ে গেছে।

বিপ্লব বালা
রাজনৈতিক কোনো ইনভলবমেন্ট ছিল?

আলী যাকের
হ্যাঁ, ছাত্র ইউনিয়ন করতাম। আমাদের সময়েইতো ভাঙলো। আমি চলে গেলাম মতিয়া আপার সাথে আর আতাউর চলে গেল মেননভাইয়ের সঙ্গে।

বিপ্লব বালা
সরাসরিইতো জড়িত ছিলেন?

আলী যাকের
হ্যাঁ।

বিপ্লব বালা
সংস্কৃতি সংসদে ছিলেন?

আলী যাকের
না, ওটাতে আসাদুজ্জামান নূর ছিল।

হাসান শাহরিয়ার
নূরভাইয়ের সাথে পরিচয় কখন হয়?

আলী যাকের
স্বাধীনতার পর।

হাসান শাহরিয়ার
বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করলেন কখন?

আলী যাকের
১৯৬৬ সালে। বেরিয়েই চাকরি নিয়ে চলে গেলাম করাচি, এশিয়াটিকে। ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ পর্যন্ত করাচি ছিলাম।

বিপ্লব বালা
করাচিতে চাকরি ছাড়া আর কী করতেন?

আলী যাকের
রেডিও খবর পড়েছি, বাংলা খবর।

হাসান শাহরিয়ার
ওখানে থিয়েটারটা কেমন ছিল?

আলী যাকের
থিয়েটার বেশ ভালোই ছিল। ইংরেজি থিয়েটার ছিল ... এবং ইট ওয়াজ ভেরি রিচ ... আমি অনেক নাটক দেখেছি।

বিপ্লব বালা
নাগরিক তো স্বাধীনতার আগে রেডিও-টিভিতে নাটক করতো ...

আলী যাকের
হ্যাঁ, তারা তখন ইডিপাস করেছে টেলিভিশনে, গোগোলের দ্যা ম্যারেজ নাটকটি প্রজাপতি নির্বন্ধ নামে করেছে। আর স্বাধীনতার পর রেডিওতে আমি নাগরিকের ড. ফস্টাস নাটকে অভিনয় করেছি।

বিপ্লব বালা
তার মানে স্বাধীনতার পূর্বে আপনি অভিনয়ই করেননি!

আলী যাকের
করাচিতে ছিটেফোঁটা কিছু করেছি, কিন্তু উল্লেখযোগ্য কিছু না।

হাসান শাহরিয়ার
বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন পড়তেন তখন তো মুনীর চৌধুরী, আসকার ইবনে শাইখ, আবদুল্লাহ আল-মামুন বা আতাউর রহমান এনারা নাটক করতেন। তো সেসব নিশ্চয়ই কিছু কিছু শুনেছেন তখন?

আলী যাকের
হ্যাঁ, জানতাম বা শুনেছি, কিন্তু ... মানে একটা কথা বলি, সত্যিই সত্যিই বলি যে ঐ সময় আমরা, আমরা মানে আমি এবং আমাদের বন্ধুরা একটু সাহেব সাহেব ছিলাম।

হাসান শাহরিয়ার
কেমন?

আলী যাকের
যেমন ধরো, দেখা হলো, তো কথা হবে এমন যে- ফকনারের ওমুক বইটা পড়া হয়েছে কিনা বা কাম্যুর সিসিফাস পড়া হয়েছে কিনা এই সব কথা হতো। ... বিকেলে কোথাও গিয়ে নাটকের মহড়া দেয়া, এসব কেমন যেন লাগতো। তবে হ্যাঁ, মুনীর চৌধুরী তো তখনই বিখ্যাত কিন্তু ওভাবে কখনো ইন্টারেকশন হয়নি ... ড্রামা সার্কেল কালবেলা করলো, তখন সাঈদ আহমদের নাম শুনেছি, ড্রামা সার্কেলের রক্তকরবী-ও দেখেছি আমি।

বিপ্লব বালা
ষাটের দশকের কবি-সাহিত্যিকদের সাথে কি জানা-শোনা ছিল?

আলী যাকের
ইমরুলের মাধ্যমে দুয়েকজনের সাথে পরিচয় হয়। শামসুর রাহমানের সাথে, আল মাহমুদের সাথে পরিচয় হয়েছিল। আমরা একটা দেয়াল পত্রিকা বের করতাম গেণ্ডারিয়ায় থাকাকালীন সময়ে ‘কিশলয়’ নামে। সেখানে লেখালেখি করতাম ... লেখালেখি করার অভ্যাস আমার বাল্যকাল থেকেই ছিল।

হাসান শাহরিয়ার
কী লিখতেন?

আলী যাকের
বিভিন্ন ধরনের ছড়া, কবিতা, ছোটখাট গল্প, প্রবন্ধও লিখতাম।

হাসান শাহরিয়ার
কেবল ঐ দেয়াল পত্রিকার জন্যই?

আলী যাকের
হ্যাঁ, ওটাকে ভরার জন্যই, এর বেশি কিছু না।

হাসান শাহরিয়ার
করাচি থেকে ফিরেছিলেন ১৯৬৯ সালে। তখন তো দেশ উত্তাল ...

আলী যাকের
হ্যাঁ, এরপর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো, আমরা কোলকাতা চলে গেলাম।

বিপ্লব বালা
চলে গেলেন কেন?

আলী যাকের
অনেকেই এই প্রশ্নটি করে যে, তুমি দেশ ছেড়ে চলে গেলে কেন ... আমরা তখন রাজারবাগ থাকতাম। আমি, দাদা আর ভাবী। রাজারবাগে যখন আক্রমণ হলো, তখন আগুনের তাপে আমরা দিশেহারা হয়ে গেলাম। তুমি চিন্তাও করতে পারবে না, আমরা দ্য গান্স অব ন্যাভারোন বা ফল অব বার্লিন ছবি দেখেছি, কিন্তু ঐ দিনের ঘটনা ওসব ছবিকেও হার মানায়। ভয়াবহ একটা ব্যাপার। ... রাজারবাগ জ্বলছে, তার পরদিন কারফিউ। একটা কথা ভুলে বলা হয়নি যে, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমি ছায়ানটের সব প্রোগ্রামে যোগ দিতাম, টুকটাক কাজ করে দিতাম ... সেই সূত্রে ওয়াহিদভাই, সানজিদা আপার সাথে আমার বেশ সখ্য ছিল ... তো পরদিন কারফিউর ভেতর হাঁটতে হাঁটতে মৌচাক এলাম, সেখান থেকে কয়েকজন বন্ধু মিলে গেলাম ওয়াহিদভাইয়ের বাসায়। উনি বললেন যে, আমাদের কিছু একটা করা দরকার। আমি যেন দেখতে পেলাম সব বাংলা সাইনবোর্ড নেমে যাচ্ছে আর উর্দু সাইনবোর্ড উঠছে। আমার কাছে ব্যাপারটা এতোটাই অসহনীয় মনে হলো যে, ভাবলাম এদেশে আর থাকবো না। তখন ভাবতেও পারিনি যে মুক্তিযুদ্ধ হবে ... তখন মনে হয়েছিল যে, যাই হোক না কেন কোলকাতা চলে যাব, যা হোক একটা কিছু করবো কিন্তু এই পাকিস্তানে আর থাকবো না। এশিয়াটিকের মালিক আমার দাদার কাছে চিঠি লিখলো যে, প্লেনের টিকিট পাঠাচ্ছি, যাকেরকে পাঠিয়ে দাও করাচি, করাচিতে ওর কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু আমি স্ট্রেইট লিখে পাঠালাম- নো, ইটস টু লেট।

হাসান শাহরিয়ার
স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রে কী করতেন?

আলী যাকের
আমি ইংরেজি বিভাগের অনুষ্ঠান প্রযোজক ছিলাম। আর মামুনুর রশীদের লেখা দুটো নাটকেও অভিনয় করেছিলাম।

হাসান শাহরিয়ার
মামুনভাইয়ের সাথে পরিচয় ছিল?

আলী যাকের
তখনই পরিচয় হলো, ও কোলকাতায় ছিল, সেখানেই সখ্য ... যার ফলে স্বাধীনতার পর আমি কিন্তু প্রথম নাটক করি কবর- মামুনুর রশীদের নির্দেশনায়, আরণ্যকের প্রথম নাটক।

হাসান শাহরিয়ার
ওটাতো ১৯৭২ সালে বোধহয়?

আলী যাকের
হ্যাঁ, ’৭২ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি।

হাসান শাহরিয়ার
মুক্তিযুদ্ধের পর দেশে ফিরেছিলেন কবে?

আলী যাকের
একেবারে ঐতিহাসিক দিনে, ১০ জানুয়ারি ’৭২, যেদিন বঙ্গবন্ধুরও প্রত্যাবর্তন দিবস। আমি আগেই আসতে পারতাম, কিন্তু আমার কাছে কিছু টেপ এবং রেকর্ডার ছিল, ওসব জমা দিতে দিতে দেরি হয়ে গেল।

হাসান শাহরিয়ার
দেশে ফিরে মামুনুর রশীদভাইয়ের সাথে আবার মিললেন কীভাবে?

আলী যাকের
তখন তো ঢাকা খুব ছোট, হাঁটতে বের হলেই দেখা হয়ে যায় যেকারো সঙ্গে। মামুনের সাথেও দেখা হলো। কবর করলাম। একটা ইনফরমেশন দিই, সেটা হলো ‘আরণ্যক’ নামটা কিন্তু আবদুল্লাহ আল-মামুন-এর দেয়া। একদিন মামুনুর রশীদ গেল টেলিভিশনে, মামুনকে (আবদুল্লাহ আল- মামুন) বললো যে, আমরা একটা নাটকের দল করতে চাই, আলী যাকেরও আছে আমাদের সঙ্গে, তো একটা নাম দেন। মামুন বললেন- ‘নাগরিক’ তো আছেই, তোমরা ‘আরণ্যক’ হয়ে যাও ... হাঃ হাঃ। তো আমরা কবর করলাম। সেই নাটক দেখলেন জিয়া হায়দার আর আতাউর রহমান, দেখে প্রস্তাব দিলেন যে আমি যেন নাগরিকে যোগ দিই। আরণ্যক অবশ্য তখন অত নিয়মিত কোনো কাজ করছিল না, তাই আমি মামুনকে বললাম যে, আমি নাগরিকে কাজ করতে চাই, তার কোনো ভিন্ন মত আছে কিনা। সে বললো যে- না কোনো আপত্তি নেই। ব্যস, নাগরিকে যোগ দিলাম। আসলে ‘আরণ্যক’ এর পর তো ‘নাগরিক’-এ-ই জয়েন করা যায়, তাই না? হাঃ হাঃ।

বিপ্লব বালা
তখন তো রমনা, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেও নাটক হতো বলে শুনেছি।

আলী যাকের
ও হ্যাঁ, সে কথাতো বলাই হয়নি। মুস্তাফা মনোয়ার মুক্তধারা করলেন ... সেখানে আমার রাজা চরিত্রটি করার কথা ছিল কিন্তু তখন আমার টাইফয়েড হয়ে গেল। আর করতে পারলাম না। কিন্তু শোর দিন একটা কাঁথা জড়িয়ে আমি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়েছিলাম, একশ চার ডিগ্রী জ্বর ...

হাসান শাহরিয়ার
কোন সময়ের কথা?

আলী যাকের
১৯৭২ সালের। এর মধ্যে একটা ব্যক্তিগত কথাও বলে নিই। দেশে ফেরার পর সবার মধ্যে একটা উদ্যম যে দেশটাকে গড়তে হবে। সেজন্য সরকারি চাকরি করতে হবে .. তো তাজউদ্দিন সাহেবের সাথে আমার সম্পর্ক ছিল। আমি সৈয়দ নজরুল ইসলামের বক্তৃতাগুলো ইংরেজি করে দিতাম এবং বেতারে পাঠ করতাম, বিদেশিদের জন্য। তাজউদ্দিন সাহেবের বক্তৃতাও ইংরেজিতে পাঠ করতাম। তো আমাকে বলা হলো সরকারি চাকুরি করতে। কিন্তু আমার মনে হলো যে না, অন্যভাবেও দেশ সেবা করা যাবে। যাক্, ঐ মুক্তধারা-র পর আমি আসলে নাগরিকে যোগ দিলাম। তারা তখন ‘বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ’ করলো, আমিও সেখানে একটা চরিত্র করেছিলাম। তারপর তো বাকি ইতিহাস।

হাসান শাহরিয়ার
‘বাকি ইতিহাস’ দিয়ে তো ঢাকার প্রসেনিয়াম থিয়েটারে দর্শনীর বিনিময়ে নিয়মিতভাবে নাট্যচর্চা শুরু হলো। শুরু করার ভাবনাগুলো একটু বলবেন?

আলী যাকের
হ্যাঁ, নিজের ঢোল একটু নিজেই বাজাতে চাচ্ছি, অন্য কেউ বাজালে ফেটে যেতে পারে হাঃ হাঃ ... এই দর্শনীর বিনিময়ে নাটক করার চিন্তাটা কিন্তু আমার নিজের। বাকি ইতিহাস যখন সবাই মিলে তৈরি করলাম, তখন ভাবছি যে এটা কীভাবে করবো! ব্রিটিশ কাউন্সিলে একনাগাড়ে তিন সন্ধ্যার বুকিং দেয়া যায়। তখন আমি বললাম যে পরের সপ্তাহেও বুকিং দিই। কেউ কেউ বললো শহরের অবস্থা ভালো না ... তখন মানুষের হাতে অস্ত্র ... তাই ভাবলো সন্ধ্যায় কেউ নাটক দেখতে আসবে না। আমি বললাম- রোববার সকালে বুকিং দিই, বন্ধের দিন (তখন রোববার সাপ্তাহিক বন্ধ ছিল) সকালে লোকজন হয়তো আসবে। তখন আমরা পরপর আট সপ্তাহ রোববার সকালে বুকিং দিলাম। সবাই বললো এটা কীভাবে সম্ভব! আমি বললাম- দেখি না কী হয়, কোলকাতায় তো হয়। এই শুরু হলো। প্রথম শো তে ৩৫ জন দর্শক, দ্বিতীয় শো থেকে হাউজফুল।

হাসান শাহরিয়ার
এটার প্রচারের ব্যাপারে কোনো ধরনের বিজ্ঞাপন বা এমন কিছু কি করা হয়েছিল?

আলী যাকের
হ্যাঁ, বিজ্ঞাপন দিতাম। এখনের চেয়ে বড় করেই দিতাম, কারণ সস্তা ছিল- ৪ ইঞ্চি ১ কলাম দিতাম। প্রথম শো করার পরই শাহাদৎ কভারস্টোরি করলো বিচিত্রায়, আমাদের চারজনের ছবি দিয়ে- আতাউরের, নায়লার, সারার আর আমার । এই শুরু হলো আর কি! আমাদের বন্ধু-বান্ধব বলতে লাগলো এরকম তো বাংলাদেশে দেখিনি- বেল পড়ার সাথে সাথে পর্দা যে উঠলো আর নামে না, একটার পর একটা দৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।

বিপ্লব বালা
তখন যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তঃহল নাট্যপ্রতিযোগিতা হলো সেটা কি দেখেছিলেন?

আলী যাকের
হ্যাঁ, অনেকগুলোই দেখেছি। কিন্তু এই যে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীক নাট্যচর্চা থেকে বের হয়ে একেবারে জনগণের জন্য নাটক শুরু করা, এটা কিন্তু বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় খুবই একটা তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার। আমরা আটটা শো করলাম। তারপর ব্রিটিশ কাউন্সিল বললো - তোমরা এখানে আর নাটক করতে পারবে না, আমাদের কাজ আছে। সারা আর নায়লা খান তখন বললো যে, মহিলা সমিতির একটা হল আছে এটা দেখতে পারেন। তখন আমি তাদের দায়িত্ব দিলাম যে দেখে মাপ-টাপ নিয়ে এসো। পরে একদিন রিহার্সেলে এসে খবর দিল, আমরা নাগরিকের সবাই তখন গিয়ে ওটাকে ঝেড়ে মুছে মহিলা সমিতির অথরিটির সাথে কথা বলে আবার শুরু করলাম বাকি ইতিহাস। রোববার সকালে বুকিং দিয়ে ৬টি শো করলাম। এই শো করতে করতেই দতৈল সংকট' এবং ‘বিদগ্ধ রমনীকুল’ তৈরি করে ফেললাম।

হাসান শাহরিয়ার
বাকি ইতিহাস করলেন ১৯৭৩ সালে। তখন অন্য কোনো দলও কাজ করতো কি?

আলী যাকের
আরণ্যক নাট্যদল ছিল কিন্তু তারা কবর করার পর কাজ প্রায় বন্ধই করে দিয়েছিল। নাট্যচক্র ছিল কিন্তু তারা ক্যাম্পাসে নাটক করতো, আর বহুবচন বোধহয় হবে হবে এই অবস্থায়।

হাসান শাহরিয়ার
ঢাকা থিয়েটার কি তখন হয়েছে?

আলী যাকের
সঠিক বলতে পারবো না। ওরাতো নাট্যচক্র থেকে বের হয়ে ঢাকা থিয়েটার করেছে।

হাসান শাহরিয়ার
তার মানে তখন কেবল আপনারাই ভাড়া নিয়ে নিয়মিত নাটক করছেন?

আলী যাকের
হ্যাঁ। তবে সেটা বছর খানেক ... তারমধ্যে অন্যরা এসে গেছে।

বিপ্লব বালা
যাকেরভাই, একটা ব্যাপার জেনে নিই। আপনারা বাকি ইতিহাস বাছাই করলেন কেন, কীভাবে?

আলী যাকের
এটা টোটালী গোলাম রব্বানীর ক্রেডিট। সে কোলকাতা থেকে নিয়ে এসেছিল। এনে জিয়া হায়দারকে দিল। তারপর আতাউর পড়লো। পড়ে আমাকে দিল, আমি পড়েই ভীষণ উত্তেজিত। এখন কেন এটা বাছাই করলাম তার উত্তরে বলা যায় যে, যে দেশে নাট্যচর্চা নেই, সে দেশে ভালো নাটকও লেখা সম্ভব হয় না। তাই আমরা দেখেছি তখন পূর্বপাকিস্তানে বা বাংলাদেশে যে ক’টা নাটক লেখা হয়েছিল তার দু-একটা বাদে কোনোটাই উল্লেখ করার মতো না। তাই আমরা দলগতভাবে সিদ্ধান্ত নিলাম যে- আমাদের থিয়েটারকে সমৃদ্ধির দিকে নিতে হলে অবশ্যই দরজা জানালা খুলে দিতে হবে। কিন্তু তখন এ-ও ভাবলাম যে শেক্সপীয়ার করা সম্ভব না। যেখানে নাটক শুরুই হয়নি সেখানে শেক্সপীয়ার করবো কীভাবে? আরেকটা হলো সার্ত্র করা সম্ভব নয় ... সার্ত্রকে বোঝাইতো মুশকিল হয়ে যাবে। তারপর আমেরিকায় তখন আর্থার মিলার ছিল বা তার একটু আগে ইউজিন ’ও নীল ছিল, তাদের নাটকও এই সমাজে এ্যাডাপ্ট করেও বোঝানো যাবে না বলে মনে হয়েছে। এখন হয়তো সম্ভব। এখন হচ্ছেও। যেমন তারিক আনাম খান করেছে ক্রুসিবল- অসাধারণ একটা প্রোডাকশন। কিন্তু তখন এটা সম্ভব মনে হয়নি। এরকম একটা সময়ে গোলাম রব্বানী বাকি ইতিহাস-র পাণ্ডুলিপিটা দিল। ও তখন নাগরিকে ছিল। আমাদের পছন্দ হলো। আমি একটা জিনিস তখন বুঝতে চাইছিলাম যে, বাংলাদেশের মানুষ কেন থিয়েটার দেখতে চায় না বা আসে না।

বিপ্লব বালা
ঐ সময়েই এটা চিন্তা করেছিলেন?

আলী যাকের
হ্যাঁ, ঐ সময়েই। ‘বাকি ইতিহাস’ করার সময় থেকেই চিন্তা করেছিলাম।

বিপ্লব বালা
কেন চাইতো না?

আলী যাকের
কারণ, একটি দেড় ঘন্টার নাটককে টেনে নিয়ে যেত তিন ঘন্টায়। একটি দৃশ্যের পর ১০ মিনিটের বিরতি ... এসব দেখে দর্শক বিরক্ত হতো এবং দর্শক ভাবতো যে মঞ্চনাটক মানে এ-ই। আসলে বাঙালি শহুরে জীবনে আনন্দ বলতে কি কিছু আছে? বস্তুতপক্ষে অনেক ধর্মসভায়ও বাঙালিরা যায় পিকনিক হিসেবে। এটা তার কাছে একটি বৈচিত্র্যের জায়গা। ধর্মসভা বা লঙ্গরখানা থেকে তাকে যে খিচুড়ী খেতে দেয়া হয় সেটাও কিন্তু একধরনের পিকনিক পিকনিক আমেজ থেকেই সে খায়।

হাসান শাহরিয়ার
এমনকি মৃত্যুবার্ষিকীতে যায়, সেটাও কিন্তু একধরনের গেট-টুগেদার করতে যায়। এসময়ে মৃত্যুর শোক কিন্তু বছরের পর বছর থাকা সম্ভব না।

আলী যাকের
হ্যাঁ, যায় কারণ, আমাদের সম্মিলনের জায়গা নেই। সেজন্যই পুজো পার্বণে যখনই পাড়ায় নাটক হতো সবাই দল বেঁধে আসতো। তখন শীত এলেই নাটক করার মৌসুম শুরু হয়ে যেত। আমাদের গেণ্ডারিয়াতেও ইস্ট এন্ড ক্লাবে প্রতি শীতে নাটক হতো। আমাদের হাসান ইমামভাই নায়কের রোল করতেন। ন’টায় শুরু হয়ে রাত একটা পর্যন্ত চলতো নাটক। তো যেটা বলছিলাম যে এগুলো কিন্তু থিয়েটার না। মঞ্চনাটক বলতে যা বোঝায় তা বোঝানোর জন্যই বাকি ইতিহাস থেকেই এই চিন্তাটা মাথায় ছিল যে, নিয়মিত চর্চাটা করতে হবে। এবং এটা করতে গেলে অনেক বাহুল্য বাদ দিতে হবে। এটা আমার প্রফেশনই শিখিয়েছে যে কনজিউমার পয়েন্ট অব ভিউ থেকে নাটকটাকে দেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, দর্শককে কীভাবে আটকানো যায়। তো আমরা নাটকটি এমনভাবে করবো যে- বেল দেয়ার পর নাটক শুরু হবে আর নাটক শেষ না হওয়া পর্যন্ত দর্শক দম ফেলার সময় পাবে না। তখন দর্শক নিশ্চয় ভাববে যে কী দেখলাম! যেমন আমি উদাহরণ হিসেবে নাম ধরেই বলতে পারি ... আমাদের দলেই সংগীত ও শব্দ পরিকল্পক হিসেবে ছিল, কে. বি. আল আজাদ ... সে বাকি ইতিহাস দেখেই বলেছিল- এরকমও নাটক হতে পারে! তো এগুলো আমি বলছি কেন বাকি ইতিহাস বেছে নিলাম সেটা বোঝাতে যে, কেবল ভালো জিনিস হলেই দর্শক বসে থাকবে না, ভালো জিনিসের ভালো প্রেজেন্টেশনও লাগবে। তো আমরা সফল হলাম। ঢাকায় দর্শক লাইন ধরে টিকিট কাটছে, এমন দৃশ্য কী চমৎকার ছিল তোমাদের বোঝাতে পারবো না। তবে হ্যাঁ, এখন ভাবলে হাসি পায় যে, কেমন সেট করলাম বা লাইট করলাম, মানে এখন যত ভালো হয় তখন নিশ্চয়ই এতোটুকু পারিনি, কিন্তু তখনকার জন্য ওটাই যথেষ্ঠ ছিল।

বিপ্লব বালা
আপনি বহুরূপী’র বাকি ইতিহাস দেখেছিলেন?

আলী যাকের
না, দেখা হয়নি।

হাসান শাহরিয়ার
যাকেরভাই, আপনিতো অভিনয় দিয়েই শুরু করেছিলেন, মামুনুর রশীদের নির্দেশনায় আবার নাগরিকেও তো আপনি অনেকের পরে জয়েন করেছেন। তো আপনাকে একেবারে শুরুতেই দলের নির্দেশনার দায়িত্ব দিয়ে দিল কীভাবে? তারা কীভাবে বুঝলো যে আপনি পারবেন?

আলী যাকের
আসলে, নাগরিকের প্রথম নাটক ‘বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ’ নির্দেশনা দিয়েছিল আতাউর। তারপর জিয়া হায়দার আর আতাউর বললো যে- পরের নাটকটি তুমি নির্দেশনা দাও।

হাসান শাহরিয়ার
স্ক্রীপ্ট ঠিক হওয়ার আগেই?

আলী যাকের
হ্যাঁ, আমিও রাজি হলাম। ওরা কীভাবে বুঝলো যে আমি পারবো সেটা তাদের ব্যাপার, তবে মনে হয় আমার যেহেতু কোলকাতায় নাটক দেখার অভিজ্ঞতা আছে, তাই হয়তবা তারা ভেবেছে যে আমি পারবো।

হাসান শাহরিয়ার
আপনাদের এই নিয়মিত দর্শনীর বিনিময়ে নাটক করার ব্যাপারটা অন্যদের মধ্যে সংক্রমিত হলো কীভাবে?

আলী যাকের
আমার মনে আছে বাকি ইতিহাস দেখে রামেন্দু মজুমদার আর ফেরদৌসী মজুমদার বলেছিল যে, আমরাও তাহলে নিয়মিত নাটক করবো। তখনও থিয়েটার দল কাজ শুরু করেনি।

হাসান শাহরিয়ার
নাগরিকের পরের কাজগুলো নিয়ে বলুন।

আলী যাকের
তারপর তৈল সংকট আর বিদগ্ধ রমনীকূল হলো, আমারই নির্দেশনায়।

হাসান শাহরিয়ার
আপনি অভিনয় করেছেন সেসব নাটকে?

আলী যাকের
হ্যাঁ, তবে ছোটখাট চরিত্রে।

হাসান শাহরিয়ার
নির্দেশনা দিতে গিয়ে অভিনয় করাটা অসুবিধা মনে হয়নি?

আলী যাকের
তখন যতটা না অসুবিধা মনে করেছি, তার চেয়ে এখন বেশি করি। এখন আমি মনে করি একজন নির্দেশক যদি আ গ্রুপ অব গুড এ্যাক্টর-এ্যাক্ট্রেস পায় তাহলে তার জন্য কাজ করা খুব ইজি হয়। আমাদের এখানেতো সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো অভিনেতা-অভিনেত্রীরা বাংলা উচ্চারণ জানে না। আমি বলি যে- আগে শুদ্ধ উচ্চারণ শেখ তারপর অভিনয়। অনেকে মনে করেন ডায়লেকট-এ অভিনয় করলে দর্শকের কাছাকাছি যাওয়া যায়। কিন্তু না। রবীন্দ্রনাথকে বলা হয়েছিল আপনি সাধারণ মানুষের ভাষায় নাটক লেখেন না কেন? তখন উনি বলেছিলেন- সাধারণ মানুষের ভাষা কোনটা? তো তারা বললো যে- আপনি যখন কুষ্টিয়ায় যান তখন তারা যেভাবে কথা বলে, রংপুরে গেলে তারা যেভাবে কথা বলে বা পাবনায় গেলে তারা যেভাবে কথা বলে সেটাইতো সাধারণ মানুষের ভষা। তখন রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন যে- আমি কুষ্টিয়ার ভাষায় বললে কি সেটা রংপুরের মানুষ বুঝবে? তো আমার কাছেও মনে হয় ভাষার ব্যাপারে একটি পরিশিলীত রূপ থাকা দরকার। আগে শুদ্ধটা শিখি তারপর সেটাকে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করা যাবে।

হাসান শাহরিয়ার
আমরা নির্দেশকের নিজের নির্দেশিত নাটকে অভিনয়ের ব্যাপারে কথা বলছিলাম।

আলী যাকের
হ্যাঁ, আমার কাছে মনে হয় ভালো অভিনেতা অভিনেত্রী থাকলে নির্দেশকের অভিনয় না করাই ভালো।

হাসান শাহরিয়ার
এদিক দিয়ে কেবল দুজনেরই নাম করা যায়- নাসির উদ্দিন ইউসুফ আর সৈয়দ জামিল আহমেদ।  ওনারাই কি তাহলে ঠিক কাজটি করতে পারছেন? আপনার কী মত?

আলী যাকের
অবশ্যই। তাঁরা নির্দেশনায় সম্পূর্ণ এবং একাগ্রভাবে কনসেন্ট্রেট করতে পারছেন। তাঁরা অবশ্যই অনেক সুবিধাজনক জায়গায় রয়েছেন।

হাসান শাহরিয়ার
আরেকটু পরের প্রসঙ্গে আসি। একবার শুনেছি আপনাদের নাটক অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইনের ফাঁদে পড়েছিল ... সেটা কী ধরনের?

আলী যাকের
সেটা ছিল জিয়া হায়দারের নির্দেশনায় সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’র ‘বহিপীর’ নাটক নিয়ে। কিন্তু নাটকটার কারণে যে হয়েছিল তা কিন্তু না। জেলা প্রশাসন থেকে একটা নোটিশ এসেছিল যে আপনারা যে নাটক করছেন ওটার পূর্ব অনুমতি নেয়া হয়েছে কিনা? আমরা বললাম না। তখন নাটক বন্ধ করতে বললো। আমি ঐ নাটকে অভিনয় করিনি, ব্যাক স্টেজে কাজ করছি। তো ইন্টারভেলের সময় বলা হলো নাটক বন্ধ করতে হবে। এরপর অনেক অনুরোধ করে শো শেষ করেছি কিন্তু তারপর বন্ধ। আমার আর আতাউরের অনেক দৌড়াদৌড়ি করতে হয়েছে। ঐ আদেশের ফটোকপি আমার কাছে আছে। কতজনের যে নোট আছে তার উপরে চিন্তা করতে পারবে না। একটি ডায়লগ এখনো আমার মনে আছে। ঢাকার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের সাথে দেখা করতে গেছি। তখন তার এক খাস চাপরাশি তাকে বলছে যে- স্যার এরা নাটক করে, এদের ভইরা ফেলেন ভেতরে ...

বিপ্লব বালা
বলেন কি, আপনারা কিছু বলেননি?

আলী যাকের
কিছু না কিছু বলেছি বলেই তো এখনও নাটক করতে পারছি তাই না? তো পরে বঙ্গবন্ধু গেলেন টিভি ভবনে, সেখানে আবদুল্লাহ আল মামুন ব্যাপারটা জানালেন যে- অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন আর প্রমোদকর আরোপের জন্য আমরা নাটক করতে পারছি না। তো প্রমোদকর উঠিয়ে দিলেন বঙ্গবন্ধু আর নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারটা দেখার জন্য ম্যাজিস্ট্রেটের বদলে শিল্পকলা একাডেমীর আন্ডারে সেন্সর বোর্ড হলো। সেই বোর্ডের আমিও একজন সদস্য ছিলাম।

হাসান শাহরিয়ার
সব স্ক্রীপ্ট কি আগে সেন্সর করিয়ে নিতে হয়? কই আমার দলের কোনো নাটকতো সেন্সর বোর্ডে পাঠাইনি।

আলী যাকের
আগে পাঠাতে হতো। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় আমরা নিজেরাই আর পান্ডুলিপি জমা দিতাম না।

হাসান শাহরিয়ার
যাকেরভাই, একটু মনে করে দেখুনতো যে আপনাদের বাকি ইতিহাস-এর পর দলের কোন নাটকটিকে মনে হয়েছে যে- এই নাটকটা একটা বাঁক নিল।

আলী যাকের
নিঃসন্দেহে ব্রেশট-এর সৎমানুষের খোঁজে। প্রথম ব্রেশট। জিয়াভাই একটি কাজ করেছিলেন, আলবেয়ার কাম্যু’র ক্রসপারপাস। আমি লাইট করেছিলাম। আমার অতি প্রিয় একটি নাটক। তারও পরে এখনকার গ্রুপ থিয়েটার চর্চায় প্রথম থিয়েটার ইন দ্য রাউন্ড কোপেনিকের ক্যাপ্টেন।

বিপ্লব বালা
স্বাধীনতার পর শিল্প-সাহিত্যে রাজনীতিটা একটা প্রধান ভূমিকা রেখেছিল ... আপনারা ওটা কীভাবে দেখতেন?

আলী যাকের
আমাদের দলের নাটকে কিন্তু রাজনীতিটা মুখ্য হয়ে ধরা দেয়নি। পলিটিক্যাল থিয়েটার যাকে বলে আমরা সেটা করিনি ... করলেও রাজনীতির জন্য করিনি, করেছি থিয়েটারের জন্য। যেমন কোপেনিকের ক্যাপ্টেন- এটা কিন্তু আমাদের জন্যে ভীষণভাবে রেলিভেন্ট।

হাসান শাহরিয়ার
নাটকটি ঐ সময়েই পড়েছেন, নাকি আগে পড়া ছিল? মানে কখন মাথায় আসলো যে কোপেনিকের ক্যাপ্টেন করবেন।

আলী যাকের
আমি ব্রেশটের ভেতর যখন ঢুকতে গেলাম তখন তো ব্রেশটের সাথে যারা কাজ করেছে বা ব্রেশটের দ্বারা যারা অনুপ্রাণিত হয়েছে তাদেরকে জানতে পারলাম আস্তে আস্তে। সেভাবেই কোপেনিকের ক্যাপ্টেন এবং এর নাট্যকার স্যুখমায়ারকে জানলাম।

বিপ্লব বালা
ব্রেশটকে আপনি কীভাবে দেখেছেন? তার প্রধান পরিচয় তো উনি রাজনৈতিক নাট্যকার।

আলী যাকের
আমি মনে করি ব্রেশটকে যারা রাজনৈতিক নাট্যকার নামে আখ্যায়িত করেছে সেটা ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ডই করেছে। কিন্তু ব্রেশট নিজেকে নিজে কখনো রাজনৈতিক নাট্যকার বলেননি। উনি বলেছেন- আমার নাটক মানুষের কথা বলে, আমার নাটক শ্রেণী সংগ্রামের কথা বলে। এখন আমি বলি- আমি কীভাবে ব্রেশটে এলাম। আমার এক কথায় জবাব আছে, সেটা হলো- তিন পয়সার পালা। কোলকাতায় অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের তিন পয়সার পালা দেখে প্রথম আলোড়িত হলাম। এরপরই শুরু ব্রেশটকে নিয়ে পড়াশোনা। ব্রেশটের উপর প্রথম বইটি পাই আমার তরুণ বন্ধু মসিউদ্দিন শাকেরের কাছ থেকে। ও খুব উইটি ... বইটিতে লিখে দিয়েছিল- ‘যাকের কে শাকের’। তো আমি কখনোই ব্রেশটকে পলিটিক্যাল নাট্যকার হিসেবে ভাবিনি এবং কখনোই স্লোগান প্রধান নাটক করতাম না। আমরা যেগুলোকে মনে করেছি স্যোসিও-পলিটিক্যাল, রিলেভেন্ট ফর আওয়ার কান্ট্রি- সেগুলোই করেছি। আরেকটটি জিনিস সব সময়ই মাথায় রেখেছি যে দর্শক যেন কমিউনিকেট করতে পারে।

বিপ্লব বালা
কিন্তু আপনাদের সম্পর্কে একটা ধারণা আছে যে, আপনারা একটু সৌখিন, একটু উপরের ...

আলী যাকের
এটাতো পারসেপশন ... আমি নিজেই মার্কেটিং-এর লোক। কনজিউমার পারসেপশন বলে একটা জিনিস আছে।

বিপ্লব বালা
সেটা কীভাবে হয়?

আলী যাকের
কনজিউমার পারসেপন হচ্ছে ধারণা। যার কোনো কারণ বা যুক্তি থাকে না। আমাদের বাঙালির মধ্যে তো একটা চিরায়ত ব্যাপার আছে যে, একটি ঝোলা থাকবে, পায়জামাটা একটু ময়লা, পাঞ্জাবিটার একটু কোণা ছেঁড়া ... হাঃ হাঃ

বিপ্লব বালা
আপনারা তো একটু স্রোতের বিপরীতেই চলেছেন। সবাইতো রাজনীতি, জনগণ, দেশ, সমাজ নিয়ে নাটক করছে আর আপনারা ...

আলী যাকের
আমরা কী নিয়ে করছি?

হাসান শাহরিয়ার
হাঃ হাঃ ... ঠিক আছে আমি একটু পরিষ্কার করে নিই। আপনারা কোপেনিকের ক্যাপ্টেন করেছেন বা করছেন, গ্যালিলিও, নূরলদীনের সারাজীবন করেছেন এমনকি অচলায়তন করেছেন আর করেছেন রক্তকরবী, তারপরও আপনাদেরকে কেন যেন দর্শক ভাবে যে আপনারা উঁচু উঁচু ভাব নিয়ে নাটক করেন ... এটা কেন হয়, আপনার কী মনে হয়?

আলী যাকের
আমি প্রশ্ন করি ... একটি সমাজে সাম্প্রদায়িকতা ঢুকছে, মৌলবাদ ঢুকছে ... সেই সমাজে অচলায়তন নাটক করা মানে তো বিরাট প্রতিবাদ। আমি জানি না শাহরিয়ার তুমি যে ধারণাটির কথা বললে সেটার কোনো সমীক্ষা হয়েছে কিনা অথবা সেটা সর্বৈব সত্য কিনা। এটা কিছু দর্শকের ধারণা হতে পারে, সকল দর্শকের নয়।

বিপ্লব বালা
কিন্তু আপনাদের দেওয়ান গাজীর কিসসা নিয়ে তো সমালোচনা আছে সেটা নিশ্চয়ই অস্বীকার করবেন না?

আলী যাকের
সেটা কী রকম?

বিপ্লব বালা
এটা অনেক তরল এবং ব্রেশটের আসল জায়গা থেকে অন্য জায়গাগুলোকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে ...

আলী যাকের
আমি জানি না ব্রেশটের আসল জায়গাগুলো কী আর অন্য জায়গাগুলো কী!!

বিপ্লব বালা
ধরুণ, মাখনের রাজনৈতিক জায়গাটা এবং দেওয়ান গাজীর সাথে যে সম্পর্ক ... শ্রেণী সম্পর্ক এবং সেখানে একটা জাগরণ ঘটছে, এই বিষয়গুলো মাইনর হয়ে গেছে কিনা?

আলী যাকের
বস্তুতপক্ষে দেওয়ান গাজীর শেষে যে বক্তব্য ... মাখনের কাছ থেকে যে মেসেজটা আসে তারপর ... সখিনা যে বলে- আমি এখন কোথায় যাব? আমার বাপকে জানি না ... এই সংলাপগুলো ব্রেশটের কোথাও নেই। ব্রেশট আরো বেশি বিমূর্ত ছিল আমরা বরং এটাকে আরো অনেক বেশি রাজনৈতিক করে তুলেছি। আসাদুজ্জামান নূর তো এটা লন্ডনে দেখেছে। সেখানে তো আরো বেশি তরল ছিল ... দেওয়ান গাজী মানে পুন্টিলা তো প্যান্টের জীপার খুলে দর্শকের সামনে প্রশ্রাব করে দেয়। মূল ব্যাপার ছিল ক্লাশটা যে ক্ষণে ক্ষণে বদলায় এই সম্বন্ধে ব্রেশট সচেতনতা সৃষ্টি করতে চেয়েছেন। দেওয়ান গাজীর এই ইতর চরিত্রের কারণে অতিষ্ঠ হয়েই কিন্তু মাখন ওর সঙ্গে আর থাকতে চায় না।

বিপ্লব বালা
কিন্তু সেটা বোধহয় ততটা ... মানে অন্যসব মজার ব্যাপারটা দর্শক মনে রাখে ...

আলী যাকের
একটা জিনিস ঠিক যে দর্শকের একটা ব্যাপার আছে ... আর আমাদের দেশের দর্শকরা কিন্তু হাসিটাই নেয়, বাকিটা নেয় না। এখন যদি বেশি তরল মনে হয় সেটা আমাদের অভিনেতাদের দোষেও হতে পারে।

হাসান শাহরিয়ার
একটা ব্যাপার কাকতালীয়ভাবে হয়ে গেছে কিনা যে ... বাংলাদেশে যে দুটো নাটকের বহুল প্রদর্শনী হয়েছে ... একটা হচ্ছে ‘কঞ্জুস’ আর আরেকটা হলো ‘দেওয়ার গাজীর কিসসা’। তো কোনো এক জায়গায় কঞ্জুস-র কমেডিগুলো দেওয়ান গাজী-তেও চলে এসেছে কিনা যার কারণে দর্শক দুটো নাটককেই কেবল মজার নাটক হিসেবে ধরে মজা পেয়ে গেছে?

আলী যাকের
এটা অবশ্য একটা ভালো তথ্য। অবশ্য এই অভিযোগ প্রমাণ করতে হলে গবেষণার দরকার। কিন্তু এমন হয়ে থাকলে আমরা অভিনেতারাই ক্রমান্বয়ে এটাকে কমেডি বানিয়ে ফেলেছি ...,. সেজন্যই বলছি এমন হয়ে থাকলে এটা অভিনেতৃদেরই দোষ। নূরও আমাদেরকে বলে যে, আমি আর আতাউর মিলে এটাকে  হাল্কা করে ফেলেছি ... একবার শুরু করলে আর কেউ-ই কন্ট্রোল করতে পারি না।

বিপ্লব বালা
আপনাদের অন্য প্রযোজনাগুলো থেকে কিন্তু এটা একটু বেখাপ্পাই হয়েছিল।

আলী যাকের
কেন ‘সৎমানুষের খোঁজে’ কি এমন না?

বিপ্লব বালা
না, সেখানে কিন্তু এমন গোলমাল হয় না যে এটা কেবল একটা কমেডি নাটক।

আলী যাকের
সেটা হয়তো হয় না ওটার ল্যাঙ্গুয়েজের কারণে। সৎ মানুষের খোঁজে-তে অনেক কিছু রয়েছে। একটা এ্যাবস্ট্রাকশন আছে। এখানে কিন্তু টাইম এন্ড স্পেস ইজ নট ডিফাইন্ড, আর দেওয়ান গাজীর কিসসা তে টাইম এন্ড স্পেস ডিফাইন্ড এবং ভাষাটা ডায়ালেক্ট ... সেজন্য হয়তো অনেক বেশি বোধগম্য হয়েছে। সৎমানুষের খোঁজে-তে মেসেজটা অনেক সিরিয়াস।

হাসান শাহরিয়ার
এটাতে সারা আপা বোধহয় সেরা অভিনয় করেছেন। আপনার কী মনে হয়?

আলী যাকের
তা তো বটেই ...

হাসান শাহরিয়ার
নাটক নির্দেশনার ব্যাপারে আপনি কোনো চরিত্রের জন্য বিকল্প অভিনেতৃ কী প্রথমেই তৈরি করে রাখেন নাকি পরে কেউ কোনো কারণে করতে না পারলে তারপর তৈরি করেন?

আলী যাকের
বিদেশে এটাকে আন্ডার স্টাডি বলে ... যাই হোক আমি প্রথমেই তৈরি করে নিতে ইচ্ছুক কিন্তু সব সময় সম্ভব হয় না। পরে করলে সমস্যা হয়, কারণ প্রথম জনের ম্যানারিজমকে সে অনুকরণ করতে চায় বলে ঠিক নতুন কোনো চরিত্র ধরা দেয় না। তবে আমি একটা ব্যাপারে সৌভাগ্যবান ... কোপেনিকের ক্যাপ্টেন যখন রিমেক করলাম বর্তমান অভিনেতৃদের কেউ-ই আগের কোপেনিকের ক্যাপ্টেন দেখেনি, ফলে অনুকরণের বিষয়টা এখানে আসেনি। প্রথমে কারো ভালো অভিনয় দেখে ফেললে সেই চরিত্র ওঠানো বেশ কঠিনই হয়। যেমন আমিও মনে করি যে, নূরলদীনের চরিত্রটি যেভাবে আমার করার চিন্তা ছিল আমি সেভাবে করতে পারিনি। কেন? সৈয়দ হকভাইয়ের জন্য। ওনার একটা নিয়ম আছে যে, স্ক্রীপ্টের প্রথম পাঠ উনি নিজের কণ্ঠে দেন, সবাইকে উপস্থিত রেখে দেন। তো ওনার পাঠই এতো চমৎকার যে নূরলদীনের প্রথম পাঠের পর যখন আমি চরিত্র নির্মাণ করছি, তখন বার বার হকভাইয়ের কণ্ঠই আমার কানে বাজতে থাকলো এবং আমি আসলে ওনার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছি বলে আমি মনে করি।

হাসান শাহরিয়ার
আপনি গ্যালিলিও, নূরলদীন বা দেওয়ান গাজীর মতো চরিত্রে সফলতার সাথে অভিনয় করেছেন। তো এসব চরিত্রের কি কোনো বিকল্প অভিনেতা তৈরি ছিল যেন কোনো কারণে আপনি করতে না পারলে ওনারা করবেন, এমন কিছু?

আলী যাকের
না, ছিল না।

হাসান শাহরিয়ার
হকভাই যখন আপনাদের নূরলদীনের সারাজীবন করতে দিলেন তখন নাকি অনেকে বলেছে যে, ওরা এটা করবে কীভাবে, ওরাতো সাহেবি দল, নাক উঁচু দল ... হয়তো-বা মনে করেছে যে আপনারা গ্রামীণ পটভূমি ধরতে পারবেন না ... এমন কিছু কি হয়েছিল?

আলী যাকের
হ্যাঁ হয়েছিল কিন্তু আমরা বরাবরই এসব ইগনোর করেছি। আর নূরলদীনের সারাজীবন কিন্তু পুরোপুরি আঞ্চলিক ভাষায় লিখিত না, হকভাই সচেতনভাবেই এমন ভাষা ব্যাবহার করেছেন যেন সবাই বুঝতে পারে।

বিপ্লব বালা
অচলায়তন-এ আপনি ভাষা চেঞ্জ করে যেটা করলেন সেটাতো একটা ব্যাপক ঘটনা ...

আলী যাকের
হ্যাঁ, আমি লাইসেন্স নিয়েই করেছি। আমি যখন কুমার দা কে বললাম যে এটা করাটা কি খুব অন্যায় হয়েছে, তখন উনি চুপ করে থাকলেন। আমি বললাম যে- দেখুন কুমার দা, রবীন্দ্রনাথ কিন্তু কোথাও বলে যাননি যে শোন পাংশুরা সবাই ছেলে না মেয়ে নাকি উভয়ই। আমার মনে হয়েছে সমাজে ছেলে মেয়ে প্রায় ফিফটি ফিফটি। তাই আমিও শোন পাংশুদের অর্ধেক ছেলে করেছি অর্ধেক মেয়ে করেছি। আর ওরা তো আসে নিচু শ্রেণী থেকে ওরা রাবীন্দ্রিক ভাষায় কীভাবে কথা বলবে, তাই আমি ওদের মুখে সাঁওতাল ভাষা দিয়েছিলাম।

হাসান শাহরিয়ার
এক সময় তো থিয়েটারের সাথে যৌথ প্রযোজনা হিসেবে ম্যাকবেথ করলেন। সেটা কেমন করে?

আলী যাকের
ওটা রামেন্দুর ইনিসিয়েটিভ ছিল। ইনফ্যাক্ট আমাদের দুই দলের কারো কারো সাথে ব্রিটিশ কাউন্সিলের ভালো যোগাযোগ ছিল। আমরা ঐ সময় ওদের কাছ থেকে কিছু ওয়ার্কশপ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। লন্ডন একাডেমি অব মিউজিক এন্ড ড্রামাটিক আর্ট থেকে সময়ে সময়ে প্রশিক্ষক এনে সেট, লাইট, ফিজিক্যাল এক্সারসাইজের উপর ওয়ার্কশপ করিয়েছিলাম। তখন থেকেই ব্রিটিশ কাউন্সিলের স্পন্সরশীপে একটি নাটক করার চিন্তা ভাবনা করছিলাম। তখন থিয়েটারও আগ্রহ প্রকাশ করলো এবং রামেন্দুই ইনিসিয়েটিভ নিয়ে কাজটি করলো। দুদল কয়েকজন ভালো অভিনেতা ঠিক করলাম কিন্তু কে কোন চরিত্র করবে সেটা ঠিক করেছে ডিরেক্টর।

বিপ্লব বালা
আপনাদের কোনো প্রডাকশন বা অভিনয় কি উনি দেখেছিলেন?

আলী যাকের
হ্যাঁ, দেখেছেন। কিন্তু নানা কারণে ম্যাকবেথ- এর বেশি শো করতে পারিনি। দু-দলের নিজস্ব কাজ থাকে তার বাইরে একসাথে সময় করাটা বেশিদিন হয়ে ওঠেনি।

হাসান শাহরিয়ার
গ্যালিলিও কীভাবে ধরলেন?

আলী যাকের
গ্যালিলিও-র ইতিহাসটা খুব মজার। গ্যালিলিও নির্দেশনা দেয়ার কথা একজন আমেরিকানের। একজন আমেরিকান এসেছিলেন তিনি বাংলা বোঝেন এবং বলতে পারেন। তখন জার্মান কালচারাল ইনস্টিটিউশন অনুরোধ করেছিল তাকে গ্যালিলিও নির্দেশনা দেবার জন্য। তিনি তখন এ্যাক্টর খুঁজছেন, কাকে দিয়ে গ্যালিলিও চরিত্রটি করানো যায়। তখন জার্মান কালচারাল ইনস্টিটিউট থেকেই আমার কথা বলা হয়েছিল। তিনি আমাকে মাথায় রেখেই প্রডাকশন ডিজাইন করলেন। কিন্তু কোনো বিশেষ কারণে ওনাকে ঢাকা ত্যাগ করতে হয় ... ততদিনে আমিতো স্ক্রীপ্ট হাতে পেয়ে গেছি। তখন আমি আতাউরকে বললাম যে এটা তুমি কর, কারণ, আমার এই রোলটার ওপর বিশেষ দুর্বলতা আছে।

হাসান শাহরিয়ার
আতাউরভাই কিন্তু বলেন যে, আপনাকে হ্যান্ডল করা কঠিন ... সেক্ষেত্রে আপনি নির্দেশককে কতটা সমীহ করে এগিয়েছিলেন?

আলী যাকের
নির্দেশককে সমীহ করে এগুতে হবে কেন ... নির্দেশককে-ওতো আমার ইন্টারপ্রেটেশন বুঝতে হবে, ধরতে হবে। তবে এটা ঠিক যে আমাকে হ্যান্ডল করা কঠিন কারণ আমি তো আবার টেম্পারমেন্টাল হাঃ হাঃ ... দলের বাইরেও আমার ঝগড়া হয় এবং সেটা বেশি হয় জামিল আহমেদের সাথে অথচ আমার ধারণা ওর সাথেই আমার সম্পর্ক সবচেয়ে মধুর। অচলায়তন-এর ও সেট করেছিল, তখন ওর সাথে মারামারি ছাড়া আর সবই হয়েছিল হাঃ হাঃ। সে আমাকে বলেছে- ইউ আর আ ব্লাডি এ্যাক্টরস ডিরেক্টর, আমি বলেছিলাম- ইয়েস আই এম। যাক, তারপরও ওর সাথে আমার বন্ধুত্বের কারণেই আরেকটা নাটকের জন্য আমি ওকে সেট করতে বলেছিলাম, কিন্তু সে পারেনি তার ‘অচিন পাখি’র কাজের জন্য।

হাসান শাহরিয়ার
আশির দশকের মধ্যেইতো অনেক দল নাটক করা শুরু করলো। ইতোমধ্যে অনেক ভালো নাটকও হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা একই দলের দু-তিনটি রানিং প্রডাকশন কিন্তু তখন থেকেই ছিল। তো সবই বাড়ছে কিন্তু মঞ্চ বাড়ছে না, এটাকে কীভাবে দেখেছিলেন তখন?

আলী যাকের
শোনো একটি কথা আমি বহুবার বলেছি, বহুজনকে বলেছি এমনকি তখনকার সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী নূর মোঃ খানের কাছে লিখিতভাবে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছিলাম যে- ঢাকার যে কমিউনিটি সেন্টারগুলো আছে সেগুলোর পিছনে অল্প কিছু টাকা খরচ করলে সেখানে নাটক করা সম্ভব। দর্শক টানার কথা যে বলো, যে লোকটা মিরপুর থাকে, রামপুরা, বাড্ডায়, গেণ্ডারিয়ায় থাকে সে এতো টাকা খরচ করে কেন নাটক দেখতে আসবে? দর্শকের কাছাকাছি নাটককে নিয়ে যেতে হবে। থিয়েটারের জন্য নতুন হল তো দরকার হয় না ... ঢাকা শহরে আইয়ুব খানের সময়ে যে কমিউনিটি সেন্টারগুলো হলো সেগুলোর একুয়াস্টিক সিস্টেমটা ঠিক করে, স্টেজে কাঠ বসিয়ে নিলেই নাটক করা যায়। কিন্তু আমার মনে হয় ব্যক্তিগত স্বার্থে এগুলো করা হয়নি।

হাসান শাহরিয়ার
কী রকম?

আলী যাকের
বড় কন্ট্রাক্ট হলে বড় কমিশন পাওয়া যেতে পারে এই ধরনের ব্যবসায়িক স্বার্থ। তার ওপর নাটক তো একটু বেয়াদব আছেই, এর এতো প্রসার মনে হয় প্রশাসনের অপছন্দ।

হাসান শাহরিয়ার
আপনি নাগরিকের সভাপতি কবে থেকে হলেন?

আলী যাকের
সঠিক মনে নেই। তবে জিয়া হায়দার চলে যাবার পর অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী ছিলেন বছর দুয়েক। তারপর আতাউরই ইনিসিয়েটিভ নিয়ে আমাকে সভাপতি বানালো।

হাসান শাহরিয়ার
আশির দশকের শুরুতেই বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশান তৈরি হলো। এটার চাহিদাটা কেন অনুভব করলেন?

আলী যাকের
আমি মনে করি না সংগঠনের মাধ্যমে একটা শিল্পকর্ম খুব বেশি দূর এগিয়ে নেয়া যায়। সংগঠনগুলোর কিছু কমন ইন্টারেস্ট থাকে কিছু বার্গেনিং পয়েন্ট থাকে, সেগুলো সলভ করার জন্যই এমন একটা চাহিদা তৈরি হয়েছিল। সে হিসেবে এটার দরকার ছিল।

হাসান শাহরিয়ার
আপনাকে বোধহয় কখনো কোনো পোস্টে দেখিনি- কেন?

আলী যাকের
আমি সচেতনভাবেই দূরে থেকেছি।

হাসান শাহরিয়ার
সারা আপা তো চেয়ারম্যান ছিলেন।

আলী যাকের
হ্যাঁ, আমিই ওকে এনকারেজ করেছি। আমার মনে হয়েছে আমাদের দেশে শিল্প সংগঠন মানেই যেন পুরুষের কাজ। এটা হবে কেন? তাই ওকে আমি এনকারেজ করেছি বড় ধরনের দায়িত্ব নেবার জন্য।

হাসান শাহরিয়ার
একটা সময়ে এসে নাগরিক ভেঙে গেল। সে সময়টার কথা একটু বলুন।

আলী যাকের
দল তো ভাঙে না, দল গড়ে হাঃ হাঃ। দল থেকে কেউ হয়তো বেরিয়ে যায়। কেউ যদি নিজেকে প্রতিভাধর মনে করেন, তাহলে নিজেই দল তৈরি করে কাজ করতে পারেন ... এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমি কেবল বলবো যে - একই নাম নিয়ে আমি আরেকটা দল গড়বো এই মনোবৃত্তিটা সমর্থনযোগ্য না। আমি তারিক আনামের কথা প্রায়ই বলি। থিয়েটার থেকে বের হয়ে সে নিজে দল করলো ‘নাট্যকেন্দ্র’। প্রসঙ্গত বলে রাখি ‘নাট্যকেন্দ্র’ নামটা কিন্তু আমার দেয়া। তো যদি কারো বুকের পাটা থাকে তো এভাবে নতুন নাম নিয়ে দল তৈরি করা উচিত।

হাসান শাহরিয়ার
এটা কীভাবে আইডেন্টিফাই করবো, কারা বেরিয়ে গেল আর কারা মূল দল?

আলী যাকের
ভেরি সিম্পল। এটা সদস্য সংখ্যা দিয়ে বলা যায়। যদি কতিপয় ব্যক্তি বের হয়ে যায় আর সিংহভাগ সদস্য থেকে যায় তাহলে বেশি সদস্যেরটাই আসল দল। এখন নাগরিক নাট্যসম্প্রদায় থেকে না হয় নাগরিক নাট্যাঙ্গন নাম দিয়েছে, কিন্তু সেটাও তো টিকলো না। আবার দুভাগ হলো এবং আবার একই নাম নিয়ে। দর্শক দেখছে একই দিনে দুই হলে একই নামের দলের একই নাটক। এটা দর্শকের সাথে প্রতারণা ছাড়া আর কিছু না। তাই না? দল থেকে চলে যাবার ইচ্ছা আমারও কিন্তু বহুবার হয়েছে, সব সময় সবার সাথে যে ভালো থাকা যায় তাতো না, কাজটাই বড় ... তো আমার চলে যাবার ইচ্ছা হলেও আমি কখনোই ভাবিনি যে দলের একই নাম রাখবো। নতুন দল করলে নতুন নাম নিয়েই করবো।

হাসান শাহরিয়ার
আচ্ছা যাকেরভই, দল ভাঙার আগে আপনার কি মনে হয়েছিল যে আপনার দল প্রতিভার দিক দিয়ে ওভার লোডেড। মানে আপনার দলে কিন্তু অনেক ভালো নাট্যজনের ভীড় ... সুযোগ পাওয়া তো কঠিন তাই না?

আলী যাকের
কঠিন, কিন্তু আমি কখনো ফিল করিনি যে দল ওভার লোডেড ... তাই ভাঙার আগ মুহূর্তেও আমি ভাবিনি নাগরিক ভাঙছে।

বিপ্লব বালা
আপনার সর্বশেষ অভিনীত নাটক তো খাট্টা তামাশা, এই নাটকটি কিন্তু হকভাইয়ের অন্যান্য নাটকের তুলনায় একটু হালকাই বোধহয়, আপনি কী মনে করেন?

আলী যাকের
না, আমি একমত না। এটি একটি সুলিখিত নাটক। তবে নাটকটি লেখার সময় কিছু কন্সট্রেইন্টকে মাথায় রেখে লেখা হয়েছিল। সে কারণে কিছুটা সীমাবদ্ধতা হয়তোবা ছিল। সেটা হলো যে, আমাদের দলের ৮/৯ জন সদস্য আমেরিকা যাওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছিল। ঐ ক’জনই অভিনয় করতে পারবে এমন কিছু মাথায় রেখেই নাটকটি লেখা হয়েছিল। কিন্তু যদি আরো সময় নিয়ে এবং  আরো চরিত্র, দৃশ্য, ঘটনা নিয়ে লেখা হতো তাহলে এটা একটা পূর্ণাঙ্গ নাটক হতো। তবে এই মানের নাটক বাংলাদেশে কমই আছে। তবে হ্যাঁ, নিশ্চয়ই এটা নূরলদীনের সারাজীবন বা পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নাটকের সাথে তুলনীয় না।

হাসান শাহরিয়ার
আমরা রামেন্দু দা’র কাছে শুনেছি যে ওনারা যখন ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ নিয়ে সিউল গিয়েছিলেন তখন দল ছোট করবার জন্য কেউ কেউ একাধিক চরিত্রে অভিনয় করেছেন, ফলে অনেকে সিউল যাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছেন ... তো রামেন্দু দা’র ধারণা যে তখন থেকেই আসলে ‘থিয়েটার’ ভাঙনের শুরুটা হয়েছিল। তো আপনার দলও ৮/৯ জনকে মাথায় রেখে আমেরিকা যাবার জন্য নাটক করলো, দল ভাঙার পেছনে কি এটা কোনো কারণ মনে হয়?

আলী যাকের
হতে পারে, অস্বীকার করছি না।

হাসান শাহরিয়ার
নাটক নির্দেশনা বা মূল চরিত্রে অভিনয় করতে না পারা এগুলোও কি কাজ করেছে বলে মনে হয়?

আলী যাকের
তা-ও হতে পারে।

হাসান শাহরিয়ার
আপনার দলের নতুন নাটক হাতে নেয়ার পদ্ধতিটা কী? মানে কে নির্দেশনা দিবে, কোন নাটক দিবে এগুলো ঠিক করা হয় কীভাবে?

আলী যাকের
কেউ যদি ডিরেকশন দিতে চায় তাহলে সে প্রস্তাব দেয়। তারপর নাটক পড়া হয়। শুনে যদি মনে হয় যে হ্যাঁ করা যায়, তখন বলা হয় প্রডাকশন প্ল্যান দিতে। তারপর যারা যারা কাজ করতে চায় তাদেরকে নিয়ে স্ক্রীপ্ট রিডিং হয়।

হাসান শাহরিয়ার
ডিরেকশনের প্রস্তাব কি যে কেউ দিতে পারে?

আলী যাকের
হ্যাঁ, তবে সাধারণত আমরা সিনিয়র যারা তারাই দিই। হায়াত, আতাউর, আমি, নূর, সারা, যুবরাজ ... এরাই।

বিপ্লব বালা
আমি একটু অন্য প্রসঙ্গে যাই। থিয়েটারে দর্শক যেখানে মূল, সেখানে তাকে ভালো লাগিয়ে নাটক করার যে দায় শুরুর দিকে ছিল ... মানে দর্শককে ভালো লাগাতে হবে, তাকে আসতে হবে, সেই জায়গাটা পরবর্তী পর্যায়ে কেমন যেন হারিয়ে গেছে। মানে জীবিকার জায়গা থেকে যদি ধরেন তাহলে দর্শক ছাড়া তো আমি চলতে পারবো না, কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে, দর্শকের ব্যাপারটা কোনো তোয়াক্কা করা হচ্ছে না তাই নয় কি?

আলী যাকের
দর্শককে যদি ধরে রাখার কথা হয় তাহলে বরং নাটক তরলীকৃত হবে। দর্শক আসবে, এট দ্য সেইম টাইম ভালো নাটকও হবে, এটা একটু ডিফিকাল্ট। এটা শিল্পের বড় একটা চ্যালেঞ্জ। জীবিকার জন্য অভিনয়টাকে যদি এখন পেশা হিসেবে নেয়া হয় তাহলে তো সিনেমায় অভিনয় করতে হবে কিন্তু সেটাতো অভিনয় হবে না। যেটা ফরীদি এক সময় বলতো যে- আমি তো অভিনয় ছাড়া কিছু জানি না, অভিনয় করেই আমি খাবো। এটা বলে যখন সে সিনেমায় অভিনয় করা শুরু করলো, সেটাকে কি অভিনয় হিসেবে ধরে নিই? এখন তুমি যদি বৃটেন বা আমেরিকার দিকে তাকাও সেখানে কমার্শিয়াল থিয়েটার এবং সাবসিডাইজড থিয়েটার বলে দুটো ভাগ আছে। যেমন ধরো, রয়েল শেক্সপীয়ার কোম্পানী এবার ৪০ মিলিয়ন পাউন্ড এক বছরে বৃটিশ আর্টস কাউন্সিলের মাধ্যমে পেয়েছে যা তাদের ৭০ শতাংশ চাহিদা মেটাবে এবং বাকি ৩০ শতাংশ টিকেট থেকে তুলতে হবে। ফলে সেখানে ভালো থিয়েটার হচ্ছে। গোটা পৃথিবীতে যেখানে ভালো থিয়েটার হয় সেখানে সাবসিডি দিয়েই হয়।

হাসান শাহরিয়ার
আমাদের এখানে প্রফেশনাল থিয়েটার বলতে সেন্টার ফর এশিয়ান থিয়েটারকে মনে করছেন কেউ কেউ। আপনার কী মত?

আলী যাকের
আমার কথা হচ্ছে যে, রয়েল শেক্সপীয়ার থিয়েটার যে অর্থে সাবসিডাইজড থিয়েটার সিএটি সে অর্থে নয়। আমি জানি না মাইকেল মধুসূদনের কোনো নাটক করার জন্য সিএটি-কে নরওয়ে সাবসিডি দিবে কিনা।

হাসান শাহরিয়ার
রবীন্দ্রনাথের নাটকের জন্য তো দিয়েছে। ভাস-এর নাটক করবার জন্যও দিয়েছে ...

আলী যাকের
আমি জানি না তাদের আন্ডারস্টেন্ডিংটা কী- সেজন্যই কোনো মন্তব্য করতে চাচ্ছি না। অর্থ নেয়ার ব্যাপারে কোনো প্রি-কন্ডিশন আছে কিনা আমি জানি না।

বিপ্লব বালা
আচ্ছা, টেলিভিশনের নাটককে দর্শক তাদের নিজেদের নাটক ভাবে... মানে মনে করে তাদেরই জীবন নিয়ে কথা হচ্ছে, আর মঞ্চ নাটকের সাথে সে নিজের জীবনের কেমন যেন দূরত্ব অনুভব করে ... তাই কি মনে হয় আপনার?

আলী যাকের
থিয়েটার কিন্তু একটা মেধা সংক্রান্ত ব্যাপার। দর্শককে থিয়েটারে আসতে হবে নিজের জীবন দেখতেই কেবল নয়, জীবন কেমন হওয়া উচিত এবং অন্যদের জীবন কেমন এ সব কিছু নিয়ে তাকে ভাববার প্রস্তুতি থাকতে হবে। আর মিডিয়াগত কারণেই মঞ্চের প্রেজেন্টেশন এক রকম আর টেলিভিশনের এক রকম। দুজায়গায় একই জিনিস চাইলে বিপদ আছে। যেমন আশির দশকে আমাদের থিয়েটারে একটা ধস নেমেছিল। নামার কারণটা হচ্ছে, অকিঞ্চিৎকর কিছু নাট্যজন ভেবেছিল যে টেলিভিশনে যা করা হয় সেটা যদি স্টেজে তুলে ধরা যায় তাহলে দর্শক ভীড় করবে। কিন্তু ব্যাপারটা ফেল করেছে। এদিকেও হয়নি, ওদিকেও হয়নি।

হাসান শাহরিয়ার
আপনি প্রথমে বলেছিলেন যে বাকি ইতিহাস করেছেন যাতে দর্শক কমিউনিকেট করতে পারে, কারণ থিয়েটারের দর্শক তখনো তেমন মেচিউরড ছিল না। শেক্সপীয়ার বা রবীন্দ্রনাথের দিকে যাননি ... তো পরে যখন আপনারা গেলেন বা অন্যরাও গেল ততক্ষণে কি দর্শক মেচিউরড হয়েছে বলে আপনার মনে হয়?

আলী যাকের
হ্যাঁ, আমরা যখন মনে করলাম যে শক্ত নাটকও দেয়া যায়, তখন শুরুতে কিন্তু আমরা একটা শব্দ ব্যবহার করতাম, সেটা হলো নিরীক্ষাধর্মী হাঃ হাঃ। আমরা যখন সাঈদ আহমদের মাইলপোস্ট করি তখন বিজ্ঞাপনে লিখতাম নাগরিকের নিরীক্ষাধর্মী নাটক। মানে দর্শক না বুঝলে সরে আসবো এমন আর কি! তো দেখলাম যে, না দর্শক অনেক বোঝে। এমনকি আমাদের গডোর প্রতীক্ষায় নাটকে থ্রি ফোর্থ হল ভর্তি হয়ে যেত। তার মানে তারা নিশ্চয়ই নিজেকে দেখতে পাচ্ছে ... মানুষের সামগ্রীক অসহায়ত্বটা সে উপলব্ধি করছে।

হাসান শাহরিয়ার
ব্যক্তিগত মতামত চাই, দুটো বিষয়ে। একটি হলো ধর্ম, আরেকটি পানাহার ... মানে কোনো প্রেজুডিজ আছে কিনা?

আলী যাকের
আমি ধার্মিক নই নিঃসন্দেহে। আর আমি জানি যে পান করাটা স্বাস্থের জন্য ভালো নয়, আবার পরিমিত পান ভালো। এক সময় প্রচুর পান করেছি, মানে সোস্যাল ড্রিংকার। এখন সম্পূর্ণ পানহীন। কোনো কিছুরই এক্সট্রিম ভালো না। আর ধর্ম টর্ম আমি করি না। মুসলমানের যেমন নিজস্ব ধর্ম আছে- ইসলাম, ঠিক তেমনি আমার ধর্ম মানবিকতা।

হাসান শাহরিয়ার
আবার একটু পূর্বের প্রসঙ্গে যাই। মামুনুর রশীদভাই যখন বাঙলা থিয়েটার শুরু করলেন তখন তিনি একবার তার নাটকে বিপাশা হায়াতকে কাস্ট করে কিছু শো করেছিলেন। পরে আপনারা দল থেকে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে আপনাদের দলের কেউ বাইরে কাজ করতে পারবে না। কিন্তু এখন আপনি নিজেই বলছেন যে, এরকম চর্চা হওয়া উচিত যাতে একদলের কর্মী অন্য দলে কাজ করতে পারে। বিষয়টা একটু পরিষ্কার করবেন?

আলী যাকের
হ্যাঁ, এর কারণটা হচ্ছে যে, আমি মনে করি প্রফিটের জন্য আমি যার স্টার ভ্যালু আছে তাকে নিয়ে কাজ করবো এধরনের কাজের আমি বিরোধিতা করি। মামুন যেটা করেছিল সে বিপাশার স্টার ইমেজটা কাজে লাগাতে চেয়েছিল, যেটা কিনা থিয়েটার প্র্যাকটিসের সাথে যায় না বলে আমি মনে করি। আর আমি যেটা চাই সেটা হলো- ধরো আমার দল হ্যামলেট করবে, কিন্ত হ্যামলেট চরিত্রটি করবার মতো কেউ নেই, সেক্ষেত্রে আমি অন্য দলের কাছে তেমন যোগ্য কাউকে ধার চাইব। আমি এ ধরনের এক্সচেঞ্জ চাচ্ছি। বাট ইট মাস্ট নট বি কমার্শিয়ালি এক্সপ্লোয়েটেড।

হাসান শাহরিয়ার
স্টারিজমের কথা যখন উঠলো একটা বিষয়ে জিজ্ঞাসা করি। আপনাদের ‘রক্তকরবী’ নিয়ে কিন্তু অনেক কথা উঠেছে যে, আপনারা অপি করিমকে এনেছেন কেবল স্টার ভ্যালুর জন্য ...

আলী যাকের
অপি করিম ‘রক্তকরবী’ করতে করতে স্টার হয়েছে।

হাসান শাহরিয়ার
না, সে আগে থেকেই স্টার ছিল এবং সে আগে কখনো মঞ্চে তেমন কাজও করেনি। মিমি ফেল করাতে ওকে নেয়া হয়েছে। আপনি কি মনে করেন তখন নাগরিকে নন্দিনী করার মতো আর কেউ ছিল না?

আলী যাকের
না, ছিল না।

হাসান শাহরিয়ার
আপনার দলের বর্তমান প্রযোজনা কালসন্ধ্যা আর নাট্যত্রয়ী দেখা হয়েছে?

আলী যাকের
কালসন্ধ্যা অর্ধেক দেখেছি, নাট্যত্রয়ী-ও অর্ধেক মানে এক তৃতীয়াংশ দেখেছি।

হাসান শাহরিয়ার
মন্তব্য করা যাবে?

আলী যাকের
নাট্যত্রয়ী-তো ঠিক নাটক না, এটাতো একধরনের এক্সপেরিমেন্ট। এটা কবিতা। তো কবিতা নাটক হতেই পারে, তবে আমি করবো না।

হাসান শাহরিয়ার
লেগেছে কেমন?

আলী যাকের
সকলের অভিনয় সমান না। কাব্যে অভিনয় করাটাও ডিফিকাল্ট।

হাসান শাহরিয়ার
আপনার মতো সিনিয়র নাট্যজন যদি দলের নাটক পুরোটা না দেখেন, এটার কোনো খারাপ প্রভাব দলে পড়ে না?

আলী যাকের
তা পড়ে, কিন্তু আমি আসলে শারীরিকভাবে গত কয়েকবছর একটু অসুস্থ, তাই দেখা হয়নি।

হাসান শাহরিয়ার
আপনি এ পর্যন্ত যে সব চরিত্রে অভিনয় করেছেন তারপর তো আর আফসোস থাকার কথা না ... তবু আপনার কী মনে হয় আমাদের সাহিত্যের বা বিশ্বসাহিত্যের এমন কোনো চরিত্র আছে যা না করতে পারার অতৃপ্তি নিয়ে আছেন?

আলী যাকের
কিংলিয়র চরিত্রটি করতে এখনও মন চায়। দেখা যাক কখনো যদি পেরে উঠি তো করবো।

হাসান শাহরিয়ার
আপনার দলের বাইরে আপনার দেখা এমন কোনো প্রযোজনা আছে যেগুলো দেখে বলেছেন- আহা, কী চমৎকার!

আলী যাকের
আরণ্যকের নানকার পালা দেখে আহাঃ বলেছি, জয়জয়ন্তী দেখে আহাঃ বলেছি। ঢাকা থিয়েটারের ফণিমনসা দেখে বলেছি আহাঃ, আনফরচুনেটলি ওটা সেলিম আল দীনের না। শকুন্তলা দেখে বলেছি, ভালো লেগেছে। অনেক পরে নাট্যকেন্দ্রের ক্রুসিবল দেখে বলেছি আহাঃ, কেবল আহাঃ-ই নয় আমি বলবো- ওয়ান অব দ্যা ফাইনেস্ট প্রডাকশনস্ আই হেভ সিন এনি হোয়্যার। তারপর আহাঃ না বললেও দেশনাটকের নিত্যপুরাণ ভালো লেগেছে।

হাসান শাহরিয়ার
অভিনয় কার কার আপনার ভালো লেগেছে?

আলী যাকের
অভিনেতা হিসেবে অবশ্যই আসাদুজ্জামান নূর ভালো, যুবরাজ ভালো, তাছাড়া সুবর্ণা আর ফরীদির অভিনয় আমার ভালো লাগে।

হাসান শাহরিয়ার
আপনাদের নিজস্ব নাট্যকার নেই, এটাতেই আপনারা নাকি বেঁচে গেছেন। কেন?

আলী যাকের
আমরা একজনের লেখা নাটকে সীমাবদ্ধ নই। আমরা বৈচিত্র্যে বিশ্বাসী।

হাসান শাহরিয়ার
দেশ-বিদেশের নাট্যকারদের বহু নাটক করেছেন। আমাদের দেশের নাট্যকার আর অন্যান্য নাট্যকারদের মধ্যে একটু তুলনা করা যাবে? মানে আমাদের কেউ কি আছেন যিনি বিশ্বমানের নাট্যকার বলে মনে হয়?

আলী যাকের
রবীন্দ্রনাথ অবশ্যই আন্তর্জাতিক মানের। আর অন্যদের মূল্যায়নের সময় এখনও হয়নি। তবে সৈয়দ শামসুল হক এবং সেলিম আল দীন হয়তো কোনোদিন সেই মানের নাট্যকার হিসেবে মূল্যায়িত হতে পারেন।

হাসান শাহরিয়ার
সবাইকে যে সব কিছু করতে হবে এমন কোনো কথা নেই, তবু জিজ্ঞাসা করি- নাট্যদল ‘থিয়েটার’ নাট্যচর্চার বাইরেও স্কুল খুলেছে, নাট্যচক্র খুলেছিল, প্রাচ্যনাট স্কুল খুলেছে, নাগরিক নাট্যাঙ্গনও এবার খুললো আর ঢাকা থিয়েটার ‘গ্রাম থিয়েটার’ করেছে, আরণ্যক ‘মুক্ত নাটক’ করেছে ... তো আপনারা নাটক করার বাইরে কিছুই করলেন না, কিছু করার স্বপ্ন কি আছে?

আলী যাকের
এই মুহূর্তে এই প্রশ্নটির জবাব দেবো না।

হাসান শাহরিয়ার
বাংলাদেশের এই ৩৩ বছরের থিয়েটার অগ্রযাত্রার একটু মূল্যায়ন করুন। মানে অনেক নাটক হলো, নাট্যকার হলো, অভিনেতৃ হলো ... কিন্তু তারপরও ব্যক্তিপ্রতিষ্ঠান কেউ বোধহয় হয়ে ওঠেননি, মানে একজন শম্ভু মিত্র, একজন উৎপল দত্ত বা তৃপ্তি মিত্র আমরা পাইনি ... আপনার মত কি?

আলী যাকের
ভবিষ্যতই বলে দেবে আমাদের কেউ আছে কি নেই।

হাসান শাহরিয়ার
আমাদের নাট্যপ্রয়োগরীতি পাশ্চাত্যমুখী। প্রাচ্যমুখী হওয়া উচিত- আপনার কী মত?

আলী যাকের
বাংলা নাট্যরীতি নিয়ে কিছু কিছু নাট্যজন নিরন্তর গবেষণা করে যাচ্ছেন। লেখালেখি করছেন এবং বাংলা থিয়েটারের সোনালী অতীত সম্বন্ধে বক্তব্য দিচ্ছেন। আমি এই পর্যন্ত তাঁদের সাথে আছি অর্থাৎ তাঁদের মতামতের সাথে একমত আছি। কিন্তু যখনই তাঁরা এমত কথা বলেন যে, আমাদের নাট্যকলার কাজকর্মে কোনো বিশেষ রীতির প্রতিফলন অনিবার্য, তখন আমার দ্বিমত পোষণ করা ছাড়া উপায় থাকে না। প্রায়োগিক শিল্পকলা কি কোনো বিশেষ রীতির দ্বারা আবদ্ধ হতে পারে বা হওয়া উচিত? থিয়েটারে আমরাতো প্রতিদিনই নতুন কিছু আবিষ্কার করছি। এবং এই আবিষ্কারে সমৃদ্ধ হয়ে আমাদের কাজকে আরও সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই লক্ষ্য হওয়া উচিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন কিংবা ফ্রান্স অথবা আমাদের পাশের দেশ ভারতেও প্রতিনিয়ত নাটক নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হচ্ছে। এবং এই পরীক্ষা-নিরীক্ষায় কোনো বিশেষ রীতি অনুসরণ করা হচ্ছে না। এর মধ্যে যেমন ন্যারেটিভ থিয়েটার রয়েছে তেমনি বাচিক কথোপোকথন নির্ভর থিয়েটার আছে, আবার ফিজিক্যাল থিয়েটারও আছে। আমি মনে করি যে, যেকোনো সৃজনশীল শিল্পকলার চর্চায় সনাতন মনোবৃত্তি আমাদেরকে পশ্চাদমুখি করে রাখে।

হাসান শাহরিয়ার
স্বাধীনতার পর নাট্যচর্চা ৩৩ বছর পার হচ্ছে। বিশ্বনাটকের সাথে আমরা কতদূর যেতে পেরেছি?

আলী যাকের
এ কথা তো অনিবার্য যে আমাদের পৃথিবীটা অনেক ছোট হয়ে এসেছে। এখন আমরা সারা বিশ্বের মানুষের কর্মকাণ্ডকে জানতে পারছি অতি সহজেই। এমন কী আজ থেকে তেত্রিশ বছর আগে যখন আমাদের নিয়মিত নাটকাভিনয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তখনও বিশ্ব নাটকের সাথে আমাদের একটা ব্যবধান ছিল। আজ আমরা যেমন ভিন্ন দেশের থিয়েটারকে জানছি, তাদেরও সুযোগ এসেছে আমাদের কাজকে জানার। এই প্রক্রিয়া আরো ব্যাপ্তীলাভ করবে এবং সংস্কৃতি চর্চায় সকল দেশ, ভাষা এবং জাতির মাঝে একটা সেতুবন্ধ তৈরি করবে। ফলে নিজের ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে বড় মাপের কোনো কাজ করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। ইতোমধ্যেই আমরা আন্তর্জাতিক নাট্যাঙ্গন থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নাটক করছি। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি যে, আমি বিশ্ব মানবসমাজেরই একজন এবং বহির্বিশ্বের বৈচিত্র্যময় আলো-হাওয়া আমাকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করছে।

হাসান শাহরিয়ার
আপনার ঘনিষ্ট বন্ধু আসাদুজ্জামান নূর পুরোদস্তুর রাজনীতিবিদ হয়ে গেছেন। আপনিও দেখি প্রায় বৃহস্পতিবারই বাড়ির দিকে রওনা দিচ্ছেন। ব্যাপার কী, আপনিও রাজনীতিতে নামছেন নাকি?

আলী যাকের
আমি সরাসরি এবং দলগত রাজনীতি কখনোই করবো না। আমি একেবারে নিজস্ব সময় চাই নিজের মতো করে। রাজনীতিবীদদের নিজস্ব কোনো সময় নেই।

হাসান শাহরিয়ার
শিল্পীর রাজনৈতিক সচেতনতা নিয়ে যদি প্রশ্ন করি যে, বর্তমানে বাংলাদেশে ... বিশ্বের কথা না হয় না-ই বললাম ... বাংলাদেশে যে জঙ্গি তৎপরতা চলছে, এর ব্যাপারে আমাদের ভূমিকাটা কী হওয়া উচিত বলে মনে করেন?

আলী যাকের
একজন মুক্তমনা মানুষ হিসেবে আমি সকল চরমপন্থী আচরণের বিরুদ্ধে।

হাসান শাহরিয়ার
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সাথে আপনার সংশ্লিষ্টতা এবং ঐ প্রতিষ্ঠানটির উদ্দেশ্য নিয়ে আমাদের কিছু বলুন।

আলী যাকের
আমরা কে, আমরা কীভাবে স্বাধীন হলাম, আমাদের ইতিহাস কী- এব্যাপারে নতুন প্রজন্মকে সচেতন করবার প্রয়াস থেকেই মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সৃষ্টি। আমি এই জাদুঘরের আটজন ট্রাস্টির একজন।

হাসান শাহরিয়ার
যাকেরভাই, আমরা অনেকদিন আপনার সাথে বসলাম। আপনার সম্পর্কে অনেক কিছু জানলাম, আমাদের থিয়েটার নিয়ে অনেক তথ্য আর আপনার নিজস্ব ভাবনা জানলাম। আশা করি সবাই উপকৃত হবে। আমাদেরকে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে থিয়েটারওয়ালার পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

আলী যাকের
তোমাকে ধন্যবাদ, বিপ্লব বালাকে ধন্যবাদ। আর তোমাদের মাধ্যমে সব নাট্যজনদেরকে শুভেচ্ছা।