Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

থিয়েটার গেইমস্ : অভিনয় প্রশিক্ষণে নতুন ভাবনা [চতুর্থ কিস্তি]

Written by ক্লাইভ বার্কার.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

অনুবাদ : অসিত কুমার

সপ্তম অধ্যায়
ক্রীড়ার শ্রেণী বিন্যাস

শিশুদের বেশিরভাগ খেলাতেই কোনো না কোনোরকম হাত-পা ছোঁড়াছুঁড়ি যুক্ত থাকে। এবং সেই জায়গাটাই অভিনেতার কাজে লাগে। আনুষ্ঠানিক কোনোরূপ শ্রেণী বিন্যাসের দিকে না গিয়ে বরং শিশুতোষ খেলার যে উপাদানগুলো অভিনেতার কাজে আসে সেগুলোকে ব্যাখ্যার একটা চেষ্টা করা যাক।

চলন

শিশুদের অধিকাংশ খেলাতেই নড়ন-চড়নের বিষয় আছে বলেই তাতে অভিনেতার আগ্রহ বা প্রয়োগের অন্তত একটি উপাদান থাকে। যে খেলায় যেমন চলন প্রয়োজন, সেই খেলাটি খেলে অভিনেতা সেই চলনকৌশল রপ্ত করে নিতে পারে। এক্ষেত্রে মজার খেলা ‘ঠাকুরমার পায়ের আওয়াজ’। একজন খেলোয়াড় দেয়ালের দিকে মুখ দিয়ে দাঁড়াবে। অন্যরা পিছন থেকে চুপিচুপি হামাগুড়ি দিয়ে এসে তার পিঠ ছোঁয়ার চেষ্টা করবে। আর সে হঠাৎ হঠাৎ পেছন ঘুরে দাঁড়াবে। এই অবস্থায় যাকে সে সচল অবস্থায় দেখবে সে পড়বে মারা এবং ফিরে গিয়ে তাকে নতুন করে শুরু করতে হবে। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে হাল্কা অথচ চকিত চলন এবং চোখের পলকে নিশ্চল হয়ে পড়বার কৌশল রপ্ত করতে পারে অভিনেতা। ‘ডাকাতের গুপ্তধন’ এর উন্নত সংস্করণ। চোখ বাঁধা অবস্থায় একজন চেয়ারে বসে। তার চারিদিকে ছড়ানো ছিটানো ধাতব মুদ্রাসহ অন্যান্য জিনিস। অন্যরা নিঃশব্দে হামাগুড়ি দিয়ে এসে চুরি করে নিয়ে যেতে চাইবে এইসব ধন সম্পদ। চোখ বাঁধা ডাকু যদি কোনো শব্দ শুনতে পায় আর যদি সে হাতের ঈশারায় বুঝাতে পারে শব্দটা কোন দিক থেকে এলো তাহলে যে শব্দ করেছে সে মারা পড়লো। আমরা ছেলেবেলায় এই খেলাটা খেলতাম ডাকাতের হাতে জল-বন্দুক দিয়ে। ফলে সঠিক জনের গায়ে জল-গুলি পড়লে আর সন্দেহের অবকাশ থাকতো না। এই খেলাটা হাল্কা অথচ টানা শরীর সঞ্চালনের অনুশীলনে কার্যকর।

এমন অনেক খেলা আছে যার একেকটা একেক ধরনের শরীর সঞ্চালন প্রচেষ্টায় কার্যকর। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে একটার পর একটা খেলা জুড়ে ‘ক্রীড়া অধিবেশন’ গড়ার যে ব্যাপার তার আন্তঃসম্পর্ক বোঝাতে দুটো খেলার কথা বলবো যা ‘ডাকাতের গুপ্তধন’-র অনুগামী। ছেলেবেলায় কিছুকিছু জিনিস ‘পড়ে পড়ে’ এমন নাজুক অবস্থায় কোনোরকম দাড় করিয়ে গোলক ধাঁধা বানাতাম; চোখ বাঁধা অবস্থায় সেগুলোর ছোঁয়া বাঁচিয়ে নিঃশব্দে সেই গোলক ধাঁধার মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসতে পারাটাই ছিল খেলার অভীষ্ট। এতে সাফল্যের জন্য চাই ‘ডাকাতের গুপ্তধন’-র চেয়ে বেশি সূক্ষ্ম ও টানা আলতোভাবে চলনের দক্ষতা। পাশাপাশি শ্রবণ সংবেদনের সূক্ষ্মতার জায়গা থেকে খেলাটা মোড় নেয় স্পর্শ সংবেদনের সূক্ষ্মতার দিকে; পরিবর্তন আসে চোখ বাঁধা অবস্থায় ক্রিয়াতলে (space) পারিপার্শ্ব সাপেক্ষ অবস্থান চেতনায়। ফলে এই অনুশীলনটি হয়ে ওঠে পারিপার্শ্ব-সঞ্জাত শরীর সংবেদন এবং স্থানের শরীরী অনুভব লাভের একটি পন্থা। টানা পলকা চালের সাথে শ্র“তি উপাদানের মিশেল পেতে আমরা চলে যেতে পারি ‘সাদা ছড়ি’ খেলায়। এখানে অন্ধের ভূমিকায় একজনকে মাঝখানে দাড় করিয়ে বাকিরা তার চারিদিকে নিঃশব্দে ঘুরে বেড়ায়। কোনোরকম আওয়াজ-আলামত পেয়ে অন্ধ যদি সঠিকজনকে ঈঙ্গিত করতে পারে তাহলে দায়ী খেলোয়াড় শিকার হবে। এতে অন্ধ যেহেতু হাঁটাচলা করতে পারে, অন্য সকলকেও ছুটোছুটি করতে হয় যাতে সে তাদের কারো উপর হুমড়ি খেয়ে না পড়ে। যদি সে কাউকে খপ করে ধরে ফেলতে পারে এবং তার স্পর্শ অনুভব করে বলে দিতে পারে সে কে তাহলে সেও শিকার হবে। তবে নিয়ম বেঁধে দেয়া যেতে পারে শরীরের কোন কোন অংশ সে স্পর্শ করতে পারে। তো খেলাটা তাহলে আবার প্রবেশ করলো স্পর্শ সংবেদন প্রশিক্ষণের পর্যায়ে। এর সাথে গোলক ধাঁধা নির্মাণের একটা যোগসূত্রও পাওয়া গেল।

ইন্দ্রিয়

শিশুদের অনেক খেলা আছে যেগুলো ইন্দ্রিয়াদি ক্ষুরধারকরণে ফলপ্রসু। এর বেলায়ও ‘সাদা ছড়ি’ অবশ্যম্ভাবী। তবে, দৃষ্টিশক্তির প্রখরতা বৃদ্ধিতে কার্যকর একটি খেলা আছে। তাতে বৃত্ত করে দাঁড়ানো একদল খেলোয়াড় একটি ধাতব মুদ্রা হাত বদল করতে থাকবে। এক পর্যায়ে কোনো একজনের হাতে মুদ্রাটা জমা রেখে হাত বদল বন্ধ হবে। মাঝখানে দাঁড়ানো একজন পর্যবেক্ষণকারী বলবে কার কোন হাতে লুকানো আছে মুদ্রা এবং কেইবা হাতে মুদ্রা ধরে থাকার ভান করছে।

স্মৃতিশক্তি বর্ধনে বয়স্কাউটের একটা খেলা কাজে দেয়। একটা থালার উপর রাখা বিচিত্র ধরনের বস্তু কিছুক্ষণের জন্য দেখিয়ে চট করে সরিয়ে নেয়া হয়। খেলোয়াড়দের কাজ হচ্ছে একটু আগে চাক্ষুস করা বস্তুগুলোর একটা তালিকা স্মৃতি থেকে তৈরি করা। যে সবচে বেশি সংখ্যক বস্তুর তালিকা করবে সে-ই জিতবে। এটা এতটাই মজাদার একটা খেলা যে আজকাল টেলিভিশনের অনুষ্ঠানাদিতেও এটাকে উপজীব্য করে দর্শক মাতানো হয়। স্টুডিওর খেলোয়াড় স্মরণ করতে পারা সবগুলো জিনিসই পুরস্কার হিসেবে পেয়ে যায়। আর দর্শক পায় প্রতিদ্বন্দ্বিতার উত্তাপ - কে কতটা মনে রাখতে পারলো!

অভিনেতার শ্র“তিভেদ-বোধ সূক্ষ্ম করে তুলতে বহুল ব্যবহৃত একটি খেলার কথা বলি। এতে খেলোয়াড়দের জোড়ায় জোড়ায় আলাদা করে দেয়া হয়। একেক  জোড়া খেলোয়াড় একেক তাল-লয়-ছন্দে তালি বাজাবে। কিছুক্ষণ নানা রকম তালি বাজতে থাকে। এক পর্যায়ে প্রতি জোড়া থেকে একজন করে সরিয়ে আনা হয়। জোড়া বিচ্ছিন্নদের কাজ হচ্ছে চোখ বন্ধ করে  বিচিত্র সব তাল-লয়-ছন্দের তালির মাঝ থেকে নিজের দোসর খুঁজে বের করা।

চকিত সাড়া

নিমেষ প্রতিক্রিয়া এবং চকিত-চলন-সমন্বয় বিষয়ক খেলাগুলো যেন সারা মানব জাতির কাছে বিশেষ আকর্ষণের জায়গা জুড়ে আছে। অতি দ্রুত প্রতিক্রিয়া দাবি করে এমন খেলার  ক্লাসিক উদাহরণ ‘মিউজিক্যাল চেয়ার’। একই উপাদান মেলে খুব সহজ কিছু খেলায় যেমন, একজন  একটি বল বা দেশলাইয়ের বাক্স হঠাৎ শূন্যে টুকে দিলো অন্যজন মাটিতে পড়বার আগেই সেটা ধরে ফেলবে। তেমনি ‘গিড়া-টালা’ নামের এক খেলার বিচিত্র রকমফের পাওয়া যায়। প্রত্যেকটিতেই লক্ষ্য থাকে হাতকে স্থির অবস্থা থেকে এক নিমিষে সচল করে প্রতিপক্ষের হাঁটু বা হাতে মৃদু আঘাত করা; সেটা লক্ষ্য করে প্রতিপক্ষের কাজ হবে চকিতে নিজেকে সরিয়ে নেয়া। তেমনি, বন্দুক যুদ্ধ খেলায় দুই প্রতিপক্ষের প্রথমজন দুই হাত সামনের দিকে টান টান করে সম্প্রসারিত করবে এমনভাবে যে তার দুই হাতের দুই তালুর মাঝে সমান্তরাল ফাঁক থাকে; দ্বিতীয়জন দাঁড়াবে তার মুখোমুখি দুই হাতে বন্দুক ধরার ভঙ্গিমায়; দ্বিতীয়জনের লক্ষ্য হবে দেই-দিচ্ছি করতে করতে হঠাৎ নিজের বন্দুকরূপী হাত প্রথমজনের দুই হাতের মাঝ দিয়ে বিদ্যুৎ গতিতে গলিয়ে দেয়া।  সে যখনই এটা করতে যাবে তখন প্রথমজন চেষ্টা করবে  তার দুই হাতের মাঝের পথ তালি দিয়ে বন্ধ করে দেয়া। এইভাবে চলতে থাকে শেয়ানে শেয়ানে লড়াই।

প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ

‘চকিত প্রতিক্রিয়া’ বিষয়ক খেলার সাথে ‘প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ’ বিষয়ক খেলাগুলো গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। এই ধরনের খেলাগুলো কখনো হতে পারে শারীরিক এবং বাচনিক আবার কখনো হতে পারে আবেগিক। শারীরিক প্রতিক্রিয়াযুক্ত খেলাগুলো কতগুলো সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকাসূত্রে কাজ করে যা খেলোয়াড়দের অবশ্যই মেনে চলবে হবে। দলনেতা সেই মোতাবেক খেলা চালাতে চালাতে হঠাৎ কখনো সূত্র পরিপন্থি একটা নির্দেশনা দিয়ে ফেলবেন। কিন্তু খেলোয়াড়দের অবশ্যই নির্ধারিত সূত্রের আওতা বহির্ভূত নির্দেশনায় কোনোরকম প্রতিক্রিয়া করা থেকে বিরত থাকতে হবে। নীতিমালা বলে ‘এটা কর’। অথচ নেতা বললেন ‘ওটা কর’ এবং সেটা শোনার প্রতিক্রিয়ায় কেউ যদি নড়ে উঠে তবে সে খেলা থেকে বহিস্কৃত হবে।

এরকম বাচনিক নির্দেশনা তাড়িত ‘শরীরী-প্রতিক্রিয়া-নিয়ন্ত্রণ’ সম্পর্কিত খেলার একটি বহুল পরিচিত সংস্করণ সাফল্যের সাথে প্রয়োগ করা হচ্ছে টেলিভিশনের অনুষ্ঠানাদিতে। সেখানে একজনকে মেশিনগানের ছররা গুলির মত একটানা ক্রমাগত প্রশ্নের পর প্রশ্নবানে বিদ্ধ করা হয়। এরকম প্রশ্নের তোপের মুখে পড়া লোকটি সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলে উত্তর দিতে পারবে না। এই ধরনের খেলার তালিকায় পড়ে কিছু ছন্দভিত্তিক খেলা। যেমন, একজন খেলোয়াড়কে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে বলা হলো নির্দিষ্ট প্রকারের কোনো বস্তুর একটি অসম্পূর্ণ ফর্দকে সম্পূর্ণ করার জন্য। অথবা তাকে বলা হতে পারে পূর্ববর্তী খেলোয়াড়ের বলে যাওয়া কোনো কথার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে। উভয় ক্ষেত্রেই করতালির ছন্দে ছন্দে সময় বয়ে যাওয়ার চাপ সৃষ্টি করতে হবে।

‘রাম শ্যাম যদু মধু’ এরকম আরেকটি খেলা। খেলোয়াড়রা একটি বৃত্ত করে বসবে; বসে নিজেদের নাম পরিবর্তন করবে এইভাবে- রাম, শ্যাম, যদু, মধু, এক, দুই, তিন, চার ইত্যাদি। ধরা যাক, খেলোয়াড়ের সংখ্যা দশ। তাতে  রাম, শ্যাম, যদু, মধু - এই চতুষ্টয়ের পর স্বাভাবিকভাবেই সর্বোচ্চ নম্বরধারী ব্যক্তিটি হবে ‘ছয়’। তাহলে বৃত্ত শুরু হচ্ছে রামকে দিয়ে; শেষ হচ্ছে ‘ছয়’কে দিয়ে। খেলাটা নিয়ন্ত্রিত হয় একটা ছন্দ-অনুক্রমের পৌনঃপুনিক আবর্তনের মাধ্যমে। সকলে বাম হাতে বাম হাঁটু এবং ডান হাতে ডান হাঁটুতে চাপড় দিবে - বাম হাতে তুড়ি  দেবে - ডান হাতে তুড়ি দেবে। ফলে বাম-ডান-বাম-ডান এরকম চার মাত্রা  ছন্দের একটি আবর্তন তৈরি হলো। খেলা চলবে আর ছন্দের লয় ক্রমশ বাড়বে। তুড়ি-চাপড়ে তাল চলছে; কোনো এক আবর্তনের মাঝে সর্বোচ্চ নম্বরধারী বলবে ‘ছয় থেকে তিন’ (বা তার যা মনে আসে)। পরের আবর্তন শেষ হবার আগেই ‘তিন’ নামধারীর কাজ হবে ‘ছয়’ নামধারীর কাছ থেকে প্রাপ্ত ‘ট্যাগ’ অন্য কারো কাছে হস্তান্তর করা-ধরা যাক্ ‘তিন থেকে যদু’ (বা তার যাকে ইচ্ছা তাকে)। খেলার লক্ষ্য সিঁড়ি অরোহন করে স্বর্গে গমন। আবর্তন সীমার মধ্যে কোনো খেলোয়াড় যদি ‘ট্যাগ’ হস্তান্তরে ব্যর্থ হয় তবে সে অবস্থানচ্যূত হবে; তার অবনমন ঘটবে এবং পাশাপাশি তার নিচে যারা ছিল তাদের একধাপ উন্নতি ঘটবে। এরকমভাবে খেলা চলবে আর নাম নির্দেশক নম্বর পরিবর্তন ও পুনর্বিন্যস্ত হবে।

শরীর-চিন্তন প্রক্রিয়াদির প্রশিক্ষণে তাল-ছন্দের ব্যবহার পাওয়া যায় এমন আরো অনেক খেলা বা ক্রিয়ার কথা আমরা জানি। আমাকে টাইপ করতে শেখানো হয়েছিল সঙ্গীত অনুসংগের মাধ্যমে যাতে করে আমি হরফের চাবিগুলো নিয়ে দুর্ভাবনায় না থাকি।

নিয়ম-কানুনের বেড়াজালে শিশুদের খেলা যে কীরূপ জটিল হয়ে উঠতে পারে তা দেখাতে আমাদের চলে যেতে হবে ‘আবেগিক প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ’ সংশ্লিষ্ট খেলায়। এর প্রাথমিক স্তরে  পড়ে যে খেলাটি, সেটিতে অভিনেতাকে হাসি দমনের এক অগ্নি-পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। বিপরীতে, অতি জটিল পর্যায়ের খেলাটির নাম ‘রাজসভা’। এর নিয়ম-নীতি এত বিশদ যে তা বর্ণনা করার চেয়ে বরং ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা শ্রেয়:

১.    সকল খেলোয়াড় একটি বৃত্তে উপবেশন করবে। এদের একজনকে রাজা নির্বাচন করতে হবে। তার বাম পাশে বসবে মন্ত্রী। তারপর থেকে একে একে হবে সভাসদ-১, সভাসদ-২ ইত্যাদি। রাজার পায়ের সামনে পড়ে থাকবে সংবিধান (নলের মত করে প্যাঁচানো পত্রিকা)।

২.    ‘আমি পবিত্র ও সম্মানীত এই সভার অধিবেশনের উদ্বোধন ঘোষণা করছি’ - রাজার এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে রাজসভার কাজ শুরু হবে। এই মুহুর্ত থেকে সকল সভাসদগণ আসন করে বুকের কাছে হাতভাজ করে বসে থাকবে। রাজার অনুমতি ছাড়া কেউ সামান্য নড়াচড়া  এমনকি টু-শব্দটিও করতে পারবে না। অধিবেশন চলাকালে তারা হাসবে না, কাশবে না, হাঁচবে না বা অন্যকোনোরূপ ঈশারা-ইংগিত করবে না। সভা থেকে তারা চোখ সরাতে বা চোখ বুজতে পারবে না।

৩.    কোনো সভাসদ যদি এই সব নিয়ম-কানুনের কোনোটি ভঙ্গ করে তাহলে সভা তাকে শাস্তি দিতে পারে। এর জন্য যে সাধারণ প্রক্রিয়া তাতে একজন সভাসদ তার ডান হাত উঁচিয়ে ধরবেন। রাজা বলবেন ‘সভাসদ নম্বর অমুক আপনাকে কথা বলার অনুমতি দেয়া হলো’। সভাসদ বলবেন, ‘আমি দাঁড়াতে পারি?’ রাজা হয়তো তাকে অনুমতি দিলেন। অনুমতি ছাড়া সে উঠতেও পারবে না, কিছু বলতেও পারবে না। কারণ সেক্ষেত্রে নিয়ম ভঙ্গের দায়ে তার নিজেরও শাস্তি হয়ে যেতে পারে। দাঁড়াবার এবং কথা বলবার অনুমতি লাভের পর সভাসদ হয়তো রাজাকে বলবেন,‘মাননীয় রাজা, আমি কি পবিত্র দণ্ডখানা লইয়া আমাদের অযোগ্য সভাসদ নম্বর উমুককে উমুক আইন ভঙ্গের অপরাধে শাস্তি স্বরূপ প্রহার করিতে পারি?’ সবদিক বিবেচনা করে রাজা যদি বলেন ‘না’ তাহলে সভাসদকে বসবার জন্য অনুমতি প্রার্থনা করতে হবে; যদি বলেন ‘হ্যাঁ’ তাহলে সভাসদ বলবেন,‘আমি কি পবিত্র দণ্ডখানা হাতে তুলিয়া নিতে পারি?’ সম্মতি প্রদান করা হলে তিনি শাস্তির মাত্রা জানতে চাইবেন। রাজা হয়তো বলবেন, ‘পৃষ্ঠদেশে অত ঘা এবং পশ্চাদদেশে অত ঘা’। শাস্তি গ্রহণের উদ্দেশ্যে দাঁড়ানোর আগে অপরাধী অনুমতি প্রার্থনা করবেন।

৪.    সাজা প্রদান শেষে সাজা প্রদানকারী পবিত্র দণ্ড যথাস্থানে রাখার অনুমতি চাইবেন এবং যথাপোযুক্ত ভাব-গাম্ভীর্য ও মর্যাদার সাথে তা সম্পন্ন করবেন। স্ব স্ব স্থানে ফিরে গিয়ে আসন গ্রহণ করবার আগে উভয়কেই অনুমতি নিতে হবে।

৫.    এই প্রক্রিয়ায় খেলা চলবে। কোনো অপরাধ সংগঠিত হওয়ার পর কোনো সভাসদ শাস্তি প্রদানে উদ্যোগী না হলে বা গণ-অপরাধের ক্ষেত্রে রাজা মন্ত্রী মহোদয়কে শাস্তি কার্যকর করার আদেশ দেবেন।

৬.    মন্ত্রী বা স্বয়ং রাজাও শাস্তির অধীন। কিন্তু সেটা করা বা রাজার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রয়াস অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কারণ রাজার ক্ষমতা অপরিসীম এবং বিচার একপেশে।

৭.    যেকোনো সদস্য হাঁচি/কাশি/হাসি জাতীয় অপরাধ সংগঠনের অনুমতি চাইতে পারেন। রাজা সেটা বিবেচনা করবেন। এর মধ্য দিয়ে সভায় ব্যাপক হাস্যরস বা অন্যান্য অসদাচরণের সঞ্চার হতে পারে।

৮.    যেকোনো সভাসদ পবিত্র দণ্ড নিয়ে বিশেষ কোনো আচার-অনুষ্ঠান যেমন পবিত্র দণ্ড বহন করে সভার বাইরে গিয়ে শোভাযাত্রা করা ইত্যাদির অনুমতি প্রার্থনা করতে পারেন। সকল ক্ষেত্রেই উপরে বর্ণিত আচরণবিধি অনুসরণ বাধ্যতামূলক।

৯.    রাজার আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্তির ঘোষণা প্রদান করার আগ পর্যন্ত অধিবেশন চলবে।

খেলাটা তিনটি পর্যায়ের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়:

ক.    নিজের আবেগ ও সহজাত প্রবৃত্তিসমূহকে নিয়ন্ত্রণ করা
খ.    নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর অন্যের খুঁত বের করার জন্য শ্যেন দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করা
গ.    একটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল পরিবেশ কাঠামোর ভিতর হাস্যরসাত্মক ক্রিয়া আবিস্কার যার মধ্য দিয়ে স্ব-নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে অন্যের ভিতরটা উষ্কে দিয়ে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করার কৌশল রপ্ত করা

ফলে এই খেলাটা হয়ে উঠতে পারে কমেডিয়ান তৈরির একটা বিরল ক্ষেত্র।

শিশুদের বেশ কিছু খেলায় আবেগের বিষয়টা এসে যায়। এর একটা হলো ‘বাঘ মামা বেলা কত’ যা কিনা বড়দের মনেও অস্বাভাবিক আনন্দ জাগায়। একজন খেলোয়াড়কে ‘বাঘ মামা’ বানানো হয়। তো এই বাঘ মামা ভীষণ গাম্ভীর্য নিয়ে ঘরময় পায়চারি করে বেড়ান। বাকি সকলে তাকে অনুসরণ করে আর বার বার একই প্রশ্ন করে উত্যক্ত করার চেষ্টা করে, ‘বাঘ মামা বেলা কত হইলো?’ বাঘ মামা রাগত ভঙ্গিতে ফিরে ফিরে বলতে থাকে ‘একটা বাজে’, ‘দুইটা বাজে’ ইত্যাদি। কোনো এক অনির্দিষ্ট পর্যায়ে বাঘ মামা অপ্রত্যাশিতভাবে বলে উঠে, ‘এখন খাবার বেলা’। ব্যস্, সবাই হুড়মুড় করে নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে ছুটতে থাকে। এদের মধ্য থেকে বাঘ মামা একজনকে পাকড়াও করে খেতে শুরু করবে। যে পাকড়াও হল সেই হয় পরবর্তী বাঘ মামা। এক স্তরে এটা একটা ‘চকিত প্রতিক্রিয়া’ বিষয়ক খেলা যার মধ্য দিয়ে ক্ষিপ্র নিশানাভেদী জোড়ালো চলনের অনুশীলন হয়। অন্য তলে, এই খেলা মুক্ত ও নিরাপদ পরিস্থিতিতে স্নায়ুচাপ ও ভয়ের আবেগ সৃষ্টি করার একটা কাঠামো দেয় শিশুদের। একই ধারার আরো অনেক খেলা আছে।

টালমাটাল খেলা

শিশুদের অনেক খেলা বা বড়দের কিছু কিছু কাজ আছে যেগুলো এমন সাংঘাতিক মানসিক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে যাতে এক পর্যায়ে শরীরক্রিয়ার উপর নিয়ন্ত্রণ-ক্ষমতা হ্রাস পায়। এর সহজতম উদাহরণটা পাওয়া যায় যখন দুইজন মানুষ মুখোমুখি হাত ধরাধরি করে পা কাছাকাছি রেখে দাঁড়িয়ে পাক খেতে থাকে। এখানে দুইজনের চলনে একটি বৃত্ত সৃষ্টি হয়। এর একটা রকমফের আছে যেখানে দুইজন নিজ নিজ কেন্দ্রীয়-মেরুদণ্ড-রেখা আবর্তন করে দুইটি আলাদা বৃত্তে ঘুরতে থাকে পরস্পরের হাত না ছাড়িয়ে।

একই অনুভূতির সৃষ্টি হয় খেলার মাঠে বা মেলায় বা থিম পার্কের নানা যান্ত্রিক আয়োজন যেমন সুইংস, ম্যাজিক কার্পেট, নাগরদোলা বা রোলার-কোস্টারে চড়বার সময়। এই একই অভিজ্ঞতা সর্বোচ্চ সাংস্কৃতিক কৃত্যের রূপ লাভ করে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ধর্মীয় আচারের অংশ হিসেবে। নিউ হেব্রিডিসের বাসিন্দারা ১২০ ফুট উঁচু ভারা-বাঁধা মঞ্চ দাঁড় করিয়ে তার উপর থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে মাথা নিচের দিকে দিয়ে; মাটিতে আছড়ে পড়বার আগে টান পড়ে গোড়ালির সাথে বেঁধে রাখা পরগাছা লতায়। ঈগল-মানব নামে মেক্সিকোর প্রায় এমনই একটি লোকাচার নিষিদ্ধ করা হয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ বিধায়। কল্পিত ত্রাসে প্রায় চিৎকার করে উঠবার মতো অবস্থার দিকে নিয়ে যাবার উদ্দেশ্য নিয়ে নির্মিত রোমহর্ষক চলচিত্র আমাদের আতঙ্ক-লালসাকে পুঁজি করে ব্যবসা করে। সব সমাজেই মাদকের ব্যবহারের মাধ্যমে এই অভিজ্ঞতাকে সশরীরে না নিয়ে কল্পনাচ্ছন্নতার মধ্য দিয়ে পাবার চেষ্টা করা হয়।

শিকারের খেলা

এই ধরনের খেলাগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণীভুক্ত। খোদ থিয়েটারের যেখান থেকে উৎপত্তি সেখান থেকেই আদতে এই গোত্রের খেলার উদ্ভব। এই শিকারের খেলা নির্ভর করে দলের একজনের উপর যে ‘শিকার’ হতে রাজি হবে। এর মধ্য দিয়ে পীড়িত ও পীড়নকারীর বিপরীত ভূমিকার গভীরে যাওয়া যাবে। সবচে সহজ হচ্ছে ‘মধ্যখানে বৈদ্যনাথ’। দুইজন খেলোয়াড় একটি বল ছুঁড়বে-ধরবে। মাঝে একজন চেষ্টা করবে এই আদান-প্রদান ব্যহত করতে। এই খেলার কৌশলের মধ্যে আছে পর্যায়ক্রমে প্রলুব্ধ করা এবং ধোকা দেয়া যাতে করে তৃতীয় ব্যক্তিকে হতাশা আর অস্বস্তিবোধে কোনঠাসা করে ফেলা যায়।

‘অবরুদ্ধ ষাঁড়’-এ ষাঁড়টাকে বেরিয়ে আসতে হবে আর সব খেলোয়াড়ের তৈরি করা বৃত্তাকার বেড়ি ভেঙে। Andrzej Munk তার Passenger ছবিতে অবরুদ্ধ ষাঁড়ের এক শক্তিশালী চিত্রকল্প তৈরি করেছিলেন। চিত্রধারণকালে গঁহশ গাড়ি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন বলে ছবিটি অসম্পূর্ণই থেকে গেছে। তার ফেলে যাওয়া ধারণকৃত কিছু খণ্ডাংশ এক করে তার সহযোগীরা ছবিটার একটা সংস্করণ দাড় করিয়েছিলেন। ছবির প্রথম অংশ কেবল স্থিরচিত্রের গ্রন্থনা। দ্বিতীয় অংশ চলচ্ছবি। কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের প্রহরীর কাজ করা এক মহিলা যুদ্ধের পর বিয়ে করে দীর্ঘ আমেরিকা প্রবাসের পর জাহাজে চড়ে ইউরোপে ফিরে আসে। সাউথাম্পটনে জাহাজ থেকে সিঁড়ি বেয়ে নামতে গিয়ে সে চিনতে পারে আরেক মহিলাকে যে ছিল ক্যাম্পে তার সহকর্মী। ছবির দ্বিতীয়াংশে তুলে ধরা হয় ক্যাম্প জীবনে এই দুইজনের সম্পর্ক। প্রথম ভাগের স্থির ছবিগুলোর কয়েকটাতে দেখা যাচ্ছে  জাহাজের ডেকে পার্টির দৃশ্য; সেখানে কয়েকজন আমুদে লোক ঠাট্টার বসে ঐ মহিলার উপর চড়াও হয়। এই চিত্রকল্পটি আবার ফিরে আসে দ্বিতীয় অংশে যেখানে হত্যার উদ্দেশ্যে বন্দিদের বাছাই করা হয়; তারপর তাদের উলঙ্গ অবস্থায় উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত একটি পথ ধরে দৌড়াতে বাধ্য করা হয়; সেখান থেকে তাদের উঠিয়ে নিয়ে ফেলা হয় এস.এস. সেনা ও কেপসদের তৈরি করা বেড়ির মাঝখানে যেখান থেকে পালাবার ব্যর্থ চেষ্টা করে তারা।

সমাজের শিকারে পরিণত হওয়া মানুষদের অবস্থান এই অর্থে নাটকের উৎপত্তির সাথে জড়িত যে নাটকের উৎপত্তির সাথে অবিচ্ছেদ্য লোক-ধর্মীয় কৃত্য যেখানে গোত্রের পুরাতন রাজাকে নির্মমভাবে তাড়িয়ে মেরে নতুন রাজার অভিষেক হতো সামাজিক সমৃদ্ধির উদ্দেশ্যে। একে কেন্দ্র করেই ট্র্যাজিডির ধারণার বিস্তার ঘটেছে।

ক্রীড়া তত্ত্ব

খেলা কেবল শিশু মনোরঞ্জনের বিষয় নয়; তা সমাজ জীবনের প্রয়োজন-অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের একালে খেলাধুলা কেমন যেন প্রতিষ্ঠানমুখি হয়ে যাচ্ছে এবং তাতে সৃজনশীলতার সুযোগ কমে যাচ্ছে। দর্শক উপস্থিতিতে এবং প্রচার মাধ্যমে পেশাদার ক্রীড়ার বিকাশ আমাদের সামাজিক সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের বর্তমান অবস্থার পরিচায়ক।

Roger Caillois-র গবেষণায় একটা দারুণ ব্যাপার বেরিয়ে এসেছে। তিনি দেখিয়েছেন ইতিহাসের নানা পর্যায়ে কীভাবে সমাজ কাঠামো এবং মূল্যবোধ খেলাধুলোর উপাদান-সমন্বয়-বিন্যাসে প্রভাব ফেলেছে। তিনি চারটি উপাদানকে চিহ্নিত করেছেন: ঘূর্ণন, ভান, লড়াই-সংগ্রাম-প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং দৈব। ঘূর্ণন এবং ভান এই দুয়ের মিশ্রণকে তিনি দেখছেন সব ধরনের নিয়ম নীতি সংগঠনের বিরুদ্ধে দ্রোহের প্রকাশ রূপে। অন্যদিকে লড়াই-প্রতিযোগিতা বিষয়ক খেলায় হিসাব-নিকাশ, নিয়ন্ত্রণ ও সমাজ কাঠামো সংরক্ষণের চেতনা প্রকাশ পায়।

Caillois খেলাধুলার অন্তরালে যে উদ্দীপনাসমূহ ক্রিয়া করে সেগুলোকে চিহ্নিত করেছেন এইভাবে:

- নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ
- প্রতিবন্ধকতাকে অতিক্রম করে দৃষ্টান্ত স্থাপন
- দৈবের আনুকূল্য অন্বেষণ
- গোপনীয়তা বা ভান বা ছদ্মবেশে আমোদ লাভ
- ভীতি সঞ্চার ও ভীত হওয়া
- পুনরাবৃত্তি ও পূর্বাপর ক্রিয়াদির মাঝে সামঞ্জস্য সন্ধান অথবা একেবারেই উল্টো অর্থে তাৎক্ষণিক উদ্ভাবনের এবং সমস্যা সমাধানের সীমাহীন বৈচিত্র আবিস্কারের আনন্দ লাভ
-রহস্য উন্মোচন বা ধাঁধার সূত্র অন্বেষণ
-ফন্দি-ফিকির-ছল-চাতুরির তাবৎ শৈলি থেকে আত্মতৃপ্তি লাভ
-নিজের শক্তি, দক্ষতা, গতি, সহ্যশক্তি, ভারসাম্য ও মৌলিকতা পরীক্ষা করে দেখার বাসনা
-নিয়ম-কানুনের সাথে নিজেকে মানিয়ে নেয়া, তার প্রতি শ্রদ্ধা পোষণের দায়িত্ববোধ এমনকি তাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার প্রলোভন
-এবং মাদকতা, মহানন্দ লাভের বাসনা এবং আতঙ্ক লালসা

Caillois দেখান যে উপরের এই মনোভাব ও প্রণোদনা (যদিও তারা পরস্পর ‘সদা সামঞ্জস্যপূর্ণ’ নয়) উঠে আসে সমাজ জীবনের অরক্ষিত অসীম রাজ্য থেকে যেখানে প্রতিটি ক্রিয়ারই সাধারণত পরিণতি থাকে; কম করে হলেও ততোটা যতোটা থাকে খেলার প্রান্তিক ও বিমূর্ত জগতে। যদিও সেখানে এরা সমান প্রয়োজনীয় নয় বা একই ভূমিকা রাখে না বা সমান প্রভাব বিস্তার করে না।

Caillois-র সংজ্ঞায় খেলার উপাদানগুলো নাট্যের বীজও বটে। কারণ, এগুলো মানবের ব্যক্তিগত ও সামাজিক আচরণের বিবিধ রূপকে প্রকাশ করে। তাছাড়া নাটক নিজেই একটি খেলা বা আমোদ ক্রিয়া। অভিনেতার প্রশিক্ষণে তাই থিয়েটার ক্রীড়ার প্রবর্তন কেবল কৌশলগত প্রশিক্ষণ বা মানব আচরণ ও অভিনয় শৈলী  বিশ্লেষণের পন্থা হিসেবেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সেটা হয়ে ওঠে নাটক ও থিয়েটারের স্বরূপ ও প্রকৃতি অনুসন্ধানের ভিত্তি। এর মধ্য দিয়েই  নির্মিত হয় উদ্ভাবিত ক্রীড়া থেকে নির্মিত নাটক মঞ্চায়নের মধ্যবর্তী সেতু। সেই সেতুর একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে যাবার অনুশীলনই মহড়ার তাৎপর্য।

তাৎক্ষণিক উদ্ভাবন

অনেক নির্দেশকই অভিনেতাকে নির্দিষ্টকৃত পাণ্ডুলিপিবদ্ধ নাটকীয় পরিস্থিতির চাপ থেকে সরিয়ে এনে ‘তাৎক্ষণিক উদ্ভাবন’ প্রক্রিয়ায় পরিচালিত করার গুরুত্ব উপলব্ধি করেন। তাতে অভিনেতা পাণ্ডুলিপির সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে নিজেকে রুদ্ধ না করে বরং চরিত্র ও পরিস্থিতির নানা দিক স্বাধীনভাবে অনুসন্ধান করতে পারেন।

তাৎক্ষণিক উদ্ভাবনের জন্য নির্মিতব্য নাটকের পাণ্ডুলিপির সমান্তরালে সাদৃশ্যপূর্ণ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে নিতে অনেক নির্দেশকই ভীষণ দক্ষ। কেউ কেউ আছেন যারা তাৎক্ষণিক উদ্ভাবন পদ্ধতিকে সকল রোগের নিরাময়ে এক ও অদ্বিতীয় অব্যর্থ বটিকা জ্ঞান করেন। তরুণ নির্দেশক এমনকি কখনো কখনো অভিনেতার কাছেও এটা যেন প্রকৃত দক্ষতার ঘাটতি লুকানোর একটা কৌশল। ‘তাৎক্ষণিক উদ্ভাবন পদ্ধতি’ যেন এক যাদুমন্ত্র যা সব সমস্যার সমাধান করে দিবে, আলাদাভাবে ব্যক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধির চেষ্টা না করলেও - এমন একটা বিশ্বাস কাজ করে।

আমি বিশ্বাস করি ‘তাৎক্ষণিক উদ্ভাবন পদ্ধতি’র প্রয়োগ ফলপ্রসু ও সৃজনশীল হলেও তা কিছু কিছু সমস্যার সৃষ্টি করে। এর মধ্যে প্রধান সমস্যাগুলো হচ্ছে:

১.    উদ্ভাবিত ক্রিয়া ও পাণ্ডুলিপির মহড়ার মধ্যে প্রায়শ কোনো সেতু গড়ে ওঠে না। ফলে উদ্ভাবনে যা অর্জিত হলো তাকে মূল মহড়ায় পরিবহন করা যায় না সহজে। এতে অভিনেতার মনে ‘গেল গেল’ একটা ভাব তৈরি হয়ে তার সমস্যাকে বাড়িয়ে তোলে।

২.    উদ্ভাবনে যা শেখা হলো সেটাকে একটা সমগ্র অর্জন জ্ঞান করে তাকেই আবার মহড়ার অভীষ্ট বলে চিহ্নিত করা হয়। সেটা হতে পারে না। সেটা করতে গিয়ে আমরা পড়ি সেই সমস্যায় যেখান থেকে আমরা শুরু করেছিলাম - পশ্চাৎ-মস্তিস্কের শরীর-চিন্তন প্রক্রিয়ার উপর অগ্র-মস্তিস্কের ধ্বংসাত্মক ও সংবাধক প্রভাব।
৩.    ‘তাৎক্ষণিক উদ্ভাবন পদ্ধতি’কে দেখা হয় সমস্যার সমাধানসমগ্র হিসেবে। এক অর্থে এটা তাই, যদি আমরা ‘তাৎক্ষণিক উদ্ভাবন’ বলতে বুঝি পশ্চাৎ-মস্তিষ্ককে সহজাতভাবে কাজ করার জন্য সংবব্ধ বা সংকেতাবদ্ধ করার পদ্ধতি যার মাধ্যমে সে অন্য অভিনেতা ও পরিবেশের সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় সমন্বয় সাধন করে নিতে পারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। ভ্রান্তিটা নিহিত এই বিশ্বাসের মাঝে যে ‘তাৎক্ষণিক উদ্ভাবন’ বিশুদ্ধ অনুপ্রেরণা ও সজ্ঞা লাভের অব্যর্থ পদ্ধতি। শরীর-চিন্তন ঠিক সেভাবেই প্রতিক্রিয়া করবে যেভাবে করার পূর্বলেখ তাকে দেয়া হয়েছে।  যদি তাকে নাটকের পরিস্থিতি, বিভিন্ন চরিত্র ও তাদের আন্তঃসম্পর্কসমূহ সম্পর্কে বিস্তর তথ্য-মসলা না দেয়া হয়ে থাকে তাহলে সে ভিন্ন পরিস্থিতিলব্ধ গতবাঁধা সংকেতের মাধ্যমে অভিনেতার বর্তমান পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করবে।

একে ‘তাৎক্ষণিক উদ্ভাবন’ বলে না। এটা অন্ধকারে পথ হাতরানো বা বোকার স্বর্গে বসবাস করার মত কাজ। এর একটা সর্বোচ্চ বিধান আছে যেটা সঙ্গীতজ্ঞরা ভালো জানেন। কৌশল, মৌল উপাদানের উপর দখল এবং বিনির্মাণের বিচিত্র-বিকল্প-জ্ঞান যত শক্তিশালী উদ্ভাবন ততো সমৃদ্ধ হয়। এটা পাণ্ডুলিপিবদ্ধ পরিস্থিতির সীমায় কাজ করার চেয়ে অনেক বেশি কঠোর পরিশ্রম দাবি করে অভিনেতার কাছে। ‘তাৎক্ষণিক উদ্ভাবন’ দাড় করাবার জন্য নির্দেশকের প্রয়োজন এমন একটা কাঠামো নির্মাণের দক্ষতা যা অভিনেতাকে একই সঙ্গে মুক্ত হয়ে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করে আবার তার কাজের লক্ষ্য নির্দেশ করার পাশাপাশি তার মনোসংযোগ নির্দেশ করবে। ‘অতিরিক্ত স্বাধীনতা’ অভিনেতার পরিস্থিতি সংক্রান্ত ভাবনাকে  দিকভ্রান্ত ক’রে কাজের সময় ও শক্তি নষ্ট করে।

Caillois-র ভাবনা ও আমাদের বিশদ আলোচনার পর আমরা যদি থিয়েটার ক্রীড়ার গুরুত্ব স্বীকার করি, তাহলে বলতে পারি এই সব খেলাধূলা ‘তাৎক্ষণিক উদ্ভাবন’-র জন্য একটি সীমিত অথচ শক্তিশালী কাঠামো দিতে পারে। জটিলতর উদ্ভাবন কাঠামো নির্মাণের আত্মবিশ্বাস ও সামর্থ অর্জনের আগ পর্যন্ত তরুণ নির্দেশকের কাছে এটাই হতে পারে থিয়েটার ক্রীড়ার সর্বোচ্চ গুণ। নিয়ম-কানুন ও শৃঙ্খলা বিধানের মাধ্যমে কীভাবে একটি সাধারণ খেলাকে পাণ্ডুলিপিবদ্ধ নাটকীয় পরিস্থিতির স্তরে উন্নীত করা যায় তা এই বইয়ের শেষ দিকে কয়েকটি উদাহরণের মাধ্যমে বোঝাবার চেষ্ট করবো। যেহেতু আমি ইতোমধ্যেই ‘শিকার ক্রীড়া’র প্রসংগ এনেছি, এই বিনির্মাণের একটি উদাহরণের মধ্য দিয়ে বলতে চাই যে অভিনেতার অন্তর্নিহিত চাপকে নির্গমনের জন্য এই খেলাগুলো অত্যন্ত মূল্যবান। Woyzeck এর মহড়ায় পাণ্ডুলিপির সমান্তরালে ‘উদ্ভাবন’র ভিত্তি হিসেবে ‘অবরুদ্ধ ষাঁড়’ খেলাটাকে কাজে লাগানো যেতে পারে। ম্যাকবেথ বলে,‘ওরা আমাকে খুঁটির আগায় বেঁধে ফেলেছে; পালাতে আমি পারি না, বরং ভাল্লুকের মত শেষ লড়াইটা আমাকে করে যেতে হবে।’  ‘অবরুদ্ধ ষাঁড়’ থেকে বিদ্রুপাত্মক কোনো খেলার দিকে যেতে হলে খুব সামান্য রূপান্তর প্রয়োজন হয়।

অষ্টম অধ্যায়
শারীরিক নিগ্রহ মুক্তি

শিশুতোষ তথা সামাজিক ক্রীড়ার একটা বড় দিক হচ্ছে মনো-দৈহিক উত্তেজনা দূর করার মাধ্যমে শক্তি প্রবাহকে অবাধ করা। এর সব থেকে পরিচিত রূপ হলো ‘অশ্ব ক্রীড়া’। এটা বলতে গেলে শিশুদের প্রায় সব খেলা এবং প্রাপ্ত বয়স্কদের অনেক ক্রিয়ার মূলে অবস্থান করে। কোন কোন খেলায় এটা প্রধান উপাদান। এটার মধ্যে প্রকাশ পায় সেই চালিকা শক্তি বা লক্ষ্য-অভিসারী-তাড়না যার বলে শিশু সকল বাধা-বিগ্রহ ছাপিয়ে যেতে আত্ম-অ-সচেতনভাবে শরীর ক্রিয়ায় প্রবৃত্ত হয়, অসফলতার মর্মবেদনা জেনেও।

যে কারো ক্ষেত্রেই সংকোচ-সংবাধ-নিগ্রহের কারণ বলা অসম্ভব। কারণগুলো সাধারণত যাপিত জীবনের অন্তরালে লুকানো থাকে এবং সেগুলো ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ক্রিয়া করে যেতে থাকে। সাধারণত সেই কারণগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে না। যা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো অভিনেতার আড়ষ্টতার জায়গাগুলো চিনিয়ে দেয়া যাতে করে সে সচেতনভাবে নিজেকে পরিবর্তনের বা প্রতিবন্ধকতা দূর করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তবে দমীত অবস্থার কয়েকটা বড় ক্ষেত্র আছে যেগুলো উঠে আসে ইতিহাসের সেই জায়গাগুলো থেকে যেগুলোর আমরা সমান ভাগীদার। এটাকে চিহ্নিত করা যায় ‘ভয়’ হিসেবে। যে ক্রিয়া বা পরিস্থিতি আমরা সামাল দিতে পারবো না তার পরিণতি-ভয় আমাদের দমন করে।

পরিণামটাকে ভয় পাই বলে আমরা ক্রিয়ায় সামিল হতে দ্বিধা বোধ করি। কারো ক্ষেত্রে এটা বাড়তে বাড়তে এমন চরম অবস্থায় চলে যায় যে, সে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে বসে। অনেক ক্ষেত্রেই এর পরিণামে শরীরে বিপরীত চাপ সৃষ্টি হয়। মানুষ উদ্যোগ নেয়, কাজে নামে, আবার একই সঙ্গে তা থেকে পিছিয়েও আসে। ফলে কাজের পুরো উদ্যোগ এবং দিকনির্দেশনা দুর্বল ও দমীত হয়ে পড়ে বা এর পরিণামে শরীরের পেশীতে বিপরীতমুখি চলনের শিকার হয়। এটা ব্যর্থতা মোকাবেলায় ‘বীমা পলিসি’র সমার্থক। তাই দমন/সংবাধ/নিগ্রহের চেয়ে এখন থেকে আমি এই পরিভাষাটাই ব্যবহার করবো। কারণ দমন/সংবোধ/নিগ্রহ শব্দগুলো এতটাই বিমূর্ত যে শারীরিক ক্রিয়ার বর্ণনায় যুতসই হয় না। শরীরের পেশীতে বিপরীতমুখি চাপই যেকোনো জোড়ালো শারীরিক ক্রিয়ায় আঘাত প্রাপ্তির প্রধান কারণ।

শারীরিক বিপর্যয় মোকাবেলায় ‘বীমা পলিসি’

প্রত্যেকের জীবনেই শরীর প্রয়োগের এমনসব ক্ষেত্র আছে যেগুলো ঝুঁকিপূর্ণ। যেকোনো একদল লোককে ডেকে নিয়ে বলুন দৌড়ের উপর লাফ দিতে। দেখবেন এদের কেউ একজন হয়তো বিশাল জায়গা নিয়ে ভয়ানক বেড়ে একখান লাফ দিয়ে ফেললো। বাকিরা করবে কি যে-পায়ের উপর ভর করে লাফ দেবে শূন্যে থাকা অবস্থায় সেই পা’টাকে শরীরের অন্য অংশের তুলনায় মাটি থেকে খুব কম উচ্চতায় পেছন পেছন টেনে আনবে। এই যে একটা পা’কে মাটি ছুঁই ছুঁই অবস্থায় রাখা - এটাই হচ্ছে আত্মরক্ষা প্রবৃত্তি বা ‘পতন-বীমা’। জুবোথুবো শরীরের লোকেরা বড়জোর জোড়া পায়ে ধপ করে ছোটখাট একটা লাফ দিবে। চাপের প্রভাবে এদের চলন সংরক্ষিত হয়।

এই অভিজ্ঞতার মধ্যে মানব বিবর্তনের একটি সমস্যা চূড়ান্তভাবে প্রকাশ পায়। আমার তর্কটা ছিল এখানেই যে, স্বাভাবিকের চেয়ে একটু নিচু ভরকেন্দ্র নিয়ে সটান অবস্থান মানুষের অবাধ চলনের অপরিহার্য শর্ত। উদ্ধৃতি দিয়ে একথাও আমি বলেছি যে, আদি পশ্চাৎ-মস্তিষ্কে আগমনরত বিপুল উদ্দীপনাপ্রবাহের বেশিরভাগটাই আসে মাধ্যাকর্ষ-বিমুখ সেই পেশীগুচ্ছ থেকে যেগুলো আমাদের সোজা হয়ে দাঁড়াতে সাহায্য করে। তাহলেই বোঝা যায় যে, চলনকালে মাধ্যাকর্ষ-বিমুখ-পেশীগুচ্ছ এবং শরীর-চিন্তন প্রক্রিয়ার উপর আস্থাহীনতাই শারীরিক আড়ষ্টতার মূল কারণ। তার মানে হচ্ছে এই যে, আমরা পড়ে যাবার ভয়ে ভীত থাকি এবং সেকারণেই পতনজনিত আঘাত-ভীতির বিপরীতে একটা বীমা-সুরক্ষা-ব্যবস্থা তৈরি করে চলি।

পণ্ডিতজনের উদ্ধৃতি দিয়ে Feldenkrais দাবি করেন যে এই পতনের ভয় মানুষের জন্মগত এবং মানব-পূর্বকাল উতরে আসা প্রাণীর মাঝে বিরাজমান পতন-ভীতির প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়েই মানবজাতির বিবর্তন হয়েছে।

এই পতনভীতি শিশুর সহজাত জন্মগত প্রতিক্রিয়া। এই প্রবৃত্তিই অন্যসব উদ্বেগ সঞ্চারী পরিস্থিতিতে তার আলোড়নকে প্রভাবিত করে। কারণ সব ভয় ও উদ্বেগের মূল ব্যাপারটাই হচ্ছে অষ্টম করোটি নালীতে আন্দোলন। শরীর সহজাত অঙ্গ-সংস্থিতি ধারন করে সেই পরিস্থিতিতে যখন সক্রিয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা প্রত্যাহৃত হয় এবং যখন মানুষ একটা অক্রিয় রক্ষণের উদ্দেশ্যে অবস্থান নেয়; কোটি, গলা এবং পরিপাকতন্ত্র রক্ষা করার উদ্দেশ্যে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংহত হয়ে দেহকাণ্ডে কাছাকাছি আসে। এই অবস্থায় যেতে মাথাকে নিচু করে সামনে ঠেলে দিতে হয়, কোটিসংযোগস্থলকে অস্বাভাবিকভাবে সামনে ঠেলে দিতে হয় এবং পেলভিস অসাড় করে দিতে হয়। এই অবস্থান ধরে রাখতে হয় পেশীসমূহে চাপ সঞ্চারের মাধ্যমে। এইরূপ সংস্থিতির  কাছাকাছি  অবস্থায় কাউকে দেখলে আমরা সম্ভবত তাকে ‘অন্তর্মুখি’ বলে চিহ্নিত করবো। শুয়ে থাকা অবস্থায় এমন ভঙ্গি করলে নিঃসন্দেহে এক ধরনের নিরাপত্তা বোধ জাগবে। এই অবস্থার তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর ও জটিল। এর মধ্য দিয়ে আমি যা বলতে চাই তা হলো এই যে, চলন-নিগ্রহ মোকাবেলায় পতনের ভয়কে জয় করা প্রধান নিয়ামক। তাছাড়া প্রাত্যহিক জীবনের চলাচলে সাচ্ছন্দ আনার জন্যও একে কাজে লাগানো যায়।

অভিনেতার ক্ষেত্রে জুডো খেলার গুরুত্ব এখানেই যে এর দ্বারা সে শিখে নিতে পারে কীভাবে দাঁড়ানো অবস্থা থেকে নিরাপদে মাটিতে পড়ে যাওয়া যায়। অন্যান্য আরো কিছু উপায়ে অভিনেতা ধাপে ধাপে পতনের অভিজ্ঞতা আহরণ করে নিতে পারে। এর একটা হচ্ছে জুডো খেলায় ব্যবহৃত রাবারের সতরঞ্চি। অভিনেতাকে প্রথমে অবনত অবস্থা থেকে পড়ে যাবার সুযোগ দেয়া হয়। পরে ক্রমশ সটান অবস্থা অর্থাৎ ভূমি থেকে পশ্চাতদেশের ব্যবধান বাড়িয়ে পড়বার জন্য উৎসাহিত করা হয়। তারও পরে আসে নানা ধরনের পতনের চর্চা যেমন দৌড়ের উপর পড়া এবং হাঁটতে হাঁটতে হুমড়ি খেয়ে পড়া ইত্যাদি। এক্ষেত্রে শিশুদের খেলার একটা কাজ আছে যেটা খুব কাজে আসে। খেলোয়াড় দুই পা জোড়া করে দেহকাণ্ড সোজা করে দাঁড়ায় এবং পেছন দিকে পড়ে যায়। তার একজন সাথী পেছনে থাকে এবং পড়তে থাকা অবস্থায় তার দুই বগলের তলা দিয়ে দুই হাত গলিয়ে দিয়ে তাকে বুকের উপর নিয়ে ফেলে তার পতন রোধ করে। খেলোয়াড় দু’জনের উচ্চতা সাপেক্ষে দু’জনের মাঝখানের দূরত্ব নির্ধারণ করে নেয়া খুবই জরুরি; খেয়াল রাখতে হবে যেন পেছনের জনের দুই পায়ের মাঝে অতিরিক্ত দূরত্ব তৈরি না হয় পাছে তার হাঁটু প্রতিবন্ধক হয়ে উঠতে পারে; সামনের জনের কাঁধ যেন পেছনের জনের হাতের অগ্রভাগে না পড়ে হাত-বাহু সংযোগ স্থলে পড়ে। এই অবস্থা থেকে ভারসাম্য বজায় রেখে পতনমুখি খেলোয়াড়কে নিরাপদে ভূমিতে নামিয়ে আনা যায়। পতনরেখার প্রথম ও শেষ বিন্দুর মাঝে দূরত্ব অর্থাৎ পতনের পরিধি বাড়তে থাকে যে পড়ছে তার নিরাপত্তাবোধ বৃদ্ধির সমান্তরালে। সর্বোচ্চ পতনের দৃষ্টান্ত দেখা যায় প্রহসনে যেখানে পতন রোধ করা হয় ভূমি থেকে সামান্য উপরে গ্রিবার নিচে দুই হাতের অগ্রভাগের নমনীয় কাঠামোর উপর। এর বিপরীতমুখি অনুশীলনটি তাদের জন্য যারা আটোসাটো হয়ে থাকে।

উপর থেকে নিচে পড়া বা প্রায় চিৎ হয়ে শোয়া অবস্থা থেকে সোজা দাঁড়িয়ে পড়া - দুই-ই  প্রহসনের উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে স্মরণাতীতকাল থেকে। তাহলে এটা দাবি করা কঠিন হবে না যে ‘পতন’ যে-কোনো অভিনেতার প্রশিক্ষণেই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

শরীরের নিরাপত্তার বিষয়ে নির্ভর করা যায় এমন দ্বিতীয় ব্যক্তির অন্তর্ভূক্তি দল গঠন করার কাজে একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। কয়েকটি উদাহরণ দেয়া যায়:

১.    মহড়া কক্ষের এক প্রান্তে ছয়জন খেলোয়াড় জোড়ায় জোড়ায় পরস্পরের মুখোমুখি দুইটি সমান্তরাল রেখা বরাবর দাঁড়াবে। তারা সামনাসামনি পরস্পরের হাত টেনে ধরবে যাতে করে তাদের শরীরের উর্ধাংশে তৈরি হয়ে যায় একটি সরু নির্গমন পথের আদল যার ভূমি হবে ছয় জোড়া হাতের সংযোগস্থলরেখা। এদিকে বাকিরা কক্ষের অন্য প্রান্ত থেকে পালা করে দৌড়ে এসে সামনে ঝুঁকে লাফ দিয়ে ডলফিনের মত শূন্যে শরীর ভাসিয়ে দিয়ে উড়ে এসে অবতরণ করবে সেই ‘ভূমি’র উপর। এরপর ছয়জন তাকে উপুড় হওয়া অবস্থা থেকে চিৎ করে নেয় এবং হাত সম্প্রসারিত করে তাকে তাদের মাথার উপরে তোলে। কোনো এক পূর্ব-সম্মত ইশারায় তারা তাকে উপর থেকে ছেড়ে দিয়ে আগের মত জোড়াবদ্ধ হাতে লুফে নেয়। উত্থান ও পতনকালে খেলোয়াড়কে চোখ বন্ধ রাখার পরামর্শ দেয়া হয়।

২.    দু’জন খেলোয়াড় পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড়ায়। এদের একজন সোজা শূন্যে লাফিয়ে ওঠে। এই অবস্থায় অপরজন পেছন থেকে সঙ্গীর দুই পা হাঁটু-বরাবর হাত দিয়ে বেড় দিয়ে জাপটে ধরে তাকে নিজের বুকের উপর নামিয়ে আনে।

৩.    হাঁটু ভাজ করে বসা খেলোয়াড়দের উপর পিরামিড গড়ে সার্কাসের কেরামতির দিকে অগ্রসর হওয়া যায়।

৪.    খেলোয়াড়দের শরীরকে ভার হিসেবে ব্যবহার করে নানা ধরনের ভারোত্তোলন জাতীয় খেলার চর্চা করা যায়। এগুলোর বর্ণনা দুরূহ। এই ধরনের অনুশীলন বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানেই হওয়া উচিত। তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি হচ্ছে যে, এর সবকটিই নির্ভর করে সটান অঙ্গসংস্থিতির উপর। মেরুদণ্ডের সর্পিল দশায় এগুলোর উপস্থাপন অসম্ভব। অর্থাৎ আমরা শরীরের যে অবস্থাকে শরীর-চিন্তন প্রক্রিয়ার অনুকূল বলে বোঝাতে চাই সেই অবস্থা ছাড়া ভারোত্তোলন-ক্রীড়া অসাধ্য।

এই খেলাগুলোর সবই চোখে দেখা বা চর্চা করার মত যথেষ্ট উত্তেজনাকর এবং আনন্দদায়ক। বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রেই এগুলো শক্তিপ্রবাহ অবাধকরণে এবং পতনভীতি দূরীকরণে বিস্ময়করভাবে কার্যকর। দলগত সংহতি সৃষ্টিতেও এরা সহায়ক।

এরকম আরো দুটি সূক্ষ্ম ও সংহত থিয়েটার ক্রীড়ার প্রয়োগও আমি করে থাকি। এর একটি হচ্ছে ‘আস্থা বলয়’ (চিত্র ১৯-২১)। এতে পাঁচ থেকে ছয়জন খেলোয়াড়ের সৃষ্টি করা একটি বৃত্তের কেন্দ্রে দাড় করানো হয় একজনকে। সে দুইপা জোড়া ও চোখ বন্ধ অবস্থায় সোজা অথচ নমনীয় অবস্থা থেকে বৃত্তে অবস্থানরত যেকোনো একজনের দিকে ঝুঁকে পড়বে। এই অবস্থা থেকে বলয়ের কাজ হবে তাকে পড়তে না দিয়ে অত্যন্ত মিহিভাবে একজনের কাছ থেকে ডানে-বামে-সামনে আরেকজনের কাছে স্থানান্তর করা।

একইভাবে পালা বদল করে একে একে সবাই মাঝখানে আসবে। কারো হাসি বা কথায় বা মাঝখানেরজনের চোখ খুলে ফেলা বা পা আলগা করে শরীর বাকিয়ে ফেলার কারণে মনোসংযোগ ব্যহত হলে তাকে সঙ্গে সঙ্গে সরিয়ে আনতে হবে এবং পর পর অন্য কয়েকজনের পালা বদল শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে মাঝখানে আসা থেকে বিরত রাখতে হবে।

‘র‌্যাফ্ট’ নামের অপর খেলাটিতে দুইজন খেলোয়াড় পিঠাপিঠি দাঁড়াবে (চিত্র ২২)। একজন উত্তোলক হয়ে অপরজনের দুই বগলের ভিতর দিয়ে তার দুই বাহু গলিয়ে দেবে এবং হাঁটু ভাজ করে এমনভাবে সামনে ঝুঁকেবে যেন তার পিঠের নিচের অংশ অপরজনের নিতম্বের নিচে গিয়ে ঠেকে।

এই অবস্থায় হাঁটু সোজা করে কোটিসংযোগস্থলের উপর নির্ভর করে সে তার সামনের ঝোঁক বজায় রাখবে যাতে তার সঙ্গী তার টান টান হয়ে ওঠা পিঠের উপর উঠে আসে। যাকে তুলে আনা হলো তার নিরাপত্তাবোধের স্বার্থে খেয়াল রাখতে হবে যেন দুজনের প্রাথমিক অবস্থান ভারসাম্যপূর্ণ হয়। উত্তোলিত খেলোয়াড় তার চোখ বন্ধ করবে এবং অন্য খেলোয়াড়রা তার দুই হাত ও পা এবং প্রয়োজনে তার মাথাও শূন্যে ভাসিয়ে রাখতে সাহায্য করবে এবং বিভিন্ন অংগে এমনভাবে ফুঁ দিবে যেন তার মনে হয় শরীরের উপর দিয়ে সাগরের মৃদু হাওয়া বইছে

উত্তোলক হাঁটু ব্যবহার করে এমন ধারাবাহিকভাবে তার শরীর উপরে উঠাবে এবং নিচে নামাবে যাতে মনে হয় যেন এক খণ্ড কাঠ ভাটির টানে সমুদ্রে ভেসে যাচ্ছে।

খেলাটার আদি লক্ষ্য ছিল সব থেকে আয়েশি স্বভাবের একটানা হালকা পরোক্ষ চলন- ভাসমানতার অভিজ্ঞতা লাভ। সেই থেকে আমার সাথে যারা কাজ করেছে তারা এই খেলাটাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখেছে। এটা থেকে পাওয়া সংবেদন দারুণ সুন্দর এবং তা দলীয় পরিসরে নিখাদ আনন্দ দেয়া-নেয়ার সুযোগ করে দিয়ে দলের সদস্যদের পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপনে উৎসাহিত করে।

অসিত কুমার ( This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it. ) : অনুবাদক, সদস্য- ঐকিক থিয়েটার, নারায়ণগঞ্জ।