Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় লোকনাট্যরীতি [তৃতীয় কিস্তি]

Written by সাইদুর রহমান লিপন.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

 [শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় লোকনাট্যের উপাদান বৈশিষ্ট্য প্রয়োগের স্বরূপ বৈচিত্র্য বিশ্লেষণের জন্য চারটি নাটক নির্বাচন করেছি। এগুলো হচ্ছে প্রাচ্য (প্রযোজনা : ঢাকা থিয়েটার, ঢাকা), সঙক্রান্তি (প্রযোজনা : আরণ্যক নাট্যদল, ঢাকা), আবহমান বাংলা (প্রযোজনা : জিয়নকাঠি, ঢাকা) এবং শুরু করি ভূমির নামে (প্রযোজনা : বোধন থিয়েটার, কুষ্টিয়া)। গত দু’সংখ্যায় প্রাচ্য এবং সঙক্রান্তি নাটকে লোকনাট্যের উপাদান বৈশিষ্ট্য প্রয়োগের স্বরূপ বৈচিত্র্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসংখ্যায় আবহমান বাংলা নাটকের উপর আলোচনা করা হচ্ছে]

আবহমান বাংলা
রচনা ও নির্দেশনা : বিপ্লব বালা
প্রযোজনা : জিয়নকাঠি (সন্ধানে ক্রম সৃজ্যমান), ঢাকা

পাঁচ বছরের নবীন সংগঠন জিয়নকাঠি বর্তমান এই সময়কে দেখছে ভাঙন, বিনাশ আর অবক্ষয়ের কাল হিসেবে। মানুষ যেন ক্রমেই নিঃস্ব আর রিক্ত হতে চলেছে। চারদিকে শুধু স্বার্থের তাণ্ডব নৃত্য। বর্তমান সময় যেন ভোগ আর কামের এক বিশাল ভাণ্ড। এরকম একটি প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বাঁচনের মন্ত্র ‘প্রাণভোমরার’ সন্ধান করতে আগ্রহী ‘জিয়নকাঠি’। কেননা আজকের এই দুর্গতির বীজ নিহিত রয়েছে ইতিহাসের কালগর্ভে। কী কী সব ঘটনা পরম্পরার প্রক্রিয়ায় এই কালব্যাধি বর্তমানকে গ্রাস করছে, তারই এক অনুসন্ধান চিত্র তুলে ধরা হয়েছে আবহমান বাংলা নাটকে।

দেশের নাট্যাঙ্গনের বিশিষ্ট নাট্যসমালোচক, নাট্যকার এবং নির্দেশক বিপ্লব বালা নির্দেশিত আবহমান বাংলা, জিয়নকাঠির দ্বিতীয় প্রযোজনা। দলের প্রথম প্রযোজনা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা অবলম্বনে নাটক শিশুতীর্থ। এছাড়াও তাঁর নির্দেশিত আর একটি উল্লেখযোগ্য নাটক হায় বাংলা হায় বেহুলা গণসাহায্য সংস্থার নাট্য শাখা কর্তৃক পরিবেশিত হয়। কিন্তু বর্তমানে গণসাহায্য সংস্থার কার্যক্রম বন্ধ থাকায় নাটকটির প্রদর্শনীও বন্ধ রয়েছে।

আবহমান বাংলা নাটকের মূল বিষয়বস্তু বাংলার ইতিহাস। তবে নাটকে ইতিহাসের এই অন্বেষণে দুটো দৃষ্টিভঙ্গি মূলত সক্রিয়।

‘... আজকের এই যে অন্ধকারটা, এই যে ভয়াবহতা, যেন কোনো সমাধান নেই। কীভাবে এই বীজ এই অঞ্চলে এই সমাজের মানুষের মনের মধ্যে জাগ্রত হলো? ইতিহাসের নানা জায়গায়, নানা শাসনপর্বে, নানা বহির্শত্র“, ভিতর ও বাহিরের নানান দ্বন্দ্বপূর্ণ অবস্থায় কীভাবে এই ভীষণ মানসিক জায়গাটা তৈরি হয়েছে? সেইটা বোঝার জন্য ইতিহাসটায় তাকানো। এইটা একটা দিক, আর ... আমাদের পূর্ব পুরুষদের জীবনতো সুখের ছিল না। নানা রকম বিপদ আপদের মধ্যেই পার হয়েছে। কীভাবে তারা পার হয়েছে, কোন ব্যাপারগুলো তাদের বাঁচিয়েছে, কোনটা তাদের শক্তি দিয়েছে, সেইখানে জিয়নকাঠির একটা সূত্র আমরা ইতিহাসে পাই কি-না, পূর্ব পুরুষদের কাছ থেকে আমরা বুদ্ধি পাই কি-না - এই উত্তর খুঁজতে গিয়েই ইতিহাসের দিকে ফিরে চাওয়া।’১

নাটকের বিষয়বস্তু সম্পর্কে নির্দেশকের এই ব্যাখ্যা থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, বর্তমান সময়ের এই দ্বন্দ্ব সংঘাত সংকুল পরিস্থিতি ইতিহাসের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। এর সমাধান অর্থাৎ ‘প্রাণভোমরা’ যেন ইতিহাসের গুহায় বন্দী। তাই আবহমান বাংলা নাটকের নায়ক ‘ডালিমকুমার’ ছুটে চলেছে ‘ইতিহাসের রাজ্যে’ এই প্রাণভোমরার অন্বেষণে।

নাটলিপি

আবহমান বাংলা নাটকটি বর্ণনাত্মকরীতিতে রচিত যেখানে সংলাপাত্মক উপাদান সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। আখ্যানের নির্দিষ্ট কিছু অংশে দু-একটি উক্তি-প্রত্যুক্তিমূলক সংলাপ ব্যতীত আখ্যানটি বর্ণনাত্মক গদ্য, কাব্য এবং গীত উপাদানে রচিত। নাটকটির ঘটনা-বিন্যাসে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ দিক হচ্ছে, এটি প্রচলিত নাটলিপির ন্যায় কাহিনী নির্ভর নয়। অর্থাৎ এই নাটকে নির্দিষ্ট কোনো চরিত্র নেই যার আশা-আকাঙ্খা ঘটনার সাথে দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে পরিণতিতে পৌঁছায়। কাহিনীতে ‘ডালিমকুমার’ নামে একটি রূপকথার চরিত্র রয়েছে যার দৃষ্টিতে ইতিহাস মূর্ত হয়। কিন্তু পরিবেশনায় এই চরিত্রটিকে তৃতীয় পুরুষে বর্ণনাত্মক অভিনয় ব্যতীত প্রথম পুরুষে চরিত্রাভিনয়ের মাধ্যমে উপস্থাপিত হতে দেখা যায় না। তাছাড়া কাহিনীর সূচনা ও সমাপ্তি অংশ ভিন্ন ঘটনার অন্য কোথাও এই চরিত্রটির উল্লেখও দেখা যায় না। আবহমান বাংলা’য় মূলত ‘বাংলা অঞ্চলে’র আদি থেকে ইংরেজ শাসন আমলে দেশ ভাগ (১৯৪৭) পর্যন্ত ইতিহাসের মূল বা প্রধান ধারাসমূহ তুলে ধরা হয়েছে। লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে যে দ্বান্দ্বিক উত্তরণ বা বিবর্তন দেখা যায় এখানে তা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনার ফলাফল বিবৃত বা বর্ণনাই এই নাটলিপির মূল বৈশিষ্ট্য।

নাটকের বিষয়বস্তু সম্পর্কে নির্দেশক যে ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন নাটলিপির ঘটনা বিন্যাসে সেই ব্যাখ্যা অনেকাংশেই অস্পষ্ট থেকে যায়। প্রথমত- চরিত্র, সংলাপ ও কাহিনী-সর্বস্ব আখ্যান রচনারীতির বাইরে এসে এই নাট্য যে চিত্র তুলে ধরে তা ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনার ফলাফল। অর্থাৎ ঘটনার অন্তরালের চরিত্র এবং ঘটনার দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক এখানে মুখ্য নয়, ফলাফলটাই মুখ্য। এ প্রসঙ্গে নাট্যকার-নির্দেশক বিপ্লব বালা বলেন- ‘এখানে দ্বন্দ্ব বিরোধের ফলে যা কিছু দাঁড়ালো সেটা আমরা তুলে এনেছি।’২  আর এই কারণে ঘটনা বিন্যাসে যে ইতিহাসের চিত্র উঠে আসে তা সাধারণ ইতিহাস অতিরিক্ত কৌতূহল সৃষ্টি করে না (উদাহরণ উদ্ধৃতি অংশে দ্রষ্টব্য)। দ্বিতীয়ত- ইতিহাসের নানা পর্বের ঘটনা চিত্র তুলে ধরতে যে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা হয়েছে কখনো তাতে পরস্পর বিরোধী ব্যাখ্যাও লক্ষ্য করা যায়। সেন আমলে বৌদ্ধ বিনাশের তাণ্ডব চিত্র তুলে ধরে, ধর্মের নামে বিভেদের রাজনীতি ব্যাখ্যা করতে বলা হচ্ছে-

বাংলা মনের কমল বনে মনসা নাগিনী দংশিয়া ফেরে
ছোবলে ছোবলে মনসা বাংলারে দংশায়,
কালনাগিনীর বিষে বাংলা নীল হইয়া যায়।
বিভেদের বিষ কেবল ছড়ায় বাঙ্গালিরও মনে
মতিচ্ছন্ন হইলো বাংলা মনসার দংশনে।৩

কিন্তু পরবর্তীকালে সুলতানী আমলে শিল্পসাহিত্যের বিকাশের চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে বলা হয়েছে-

একের পর এক রচিত হয় মঙ্গলকাব্য সকল ধর্মমঙ্গল,
চণ্ডীমঙ্গল আর মনসামঙ্গল।
পঁচিশ বছর ধরে বাঙ্গালা ও বাঙ্গালির বিশ্বকোষ ছিল যাহা
চাঁদবণিক ঘোষণা করে দেব-বিদ্রোহ।
সাধারণের দেবী মনসা আদায় করে ছাড়ে উচ্চ সমাজের স্বীকৃতি।৪

দুটি উদ্ধৃতিতে মনসাকে দুইভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই পরস্পর বিরোধী ব্যাখ্যা ‘মনসা’ সম্পর্কে কোনো গভীর সত্যকে নয় বরং বিভ্রান্তি তৈরি করে। তাছাড়া ‘চাঁদবণিকের দেব-বিদ্রোহী’ হয়ে ওঠা এবং দেবী মনসার ‘উচ্চ সমাজে স্বীকৃতি লাভ’ এই দুটি তথ্যের পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা না থাকার কারণে চাঁদবণিক এবং মনসা উভয়কে মহান প্রতিবাদী চরিত্র বলে মনে হয়। যা মনসা-চাঁদ সওদাগরের দ্বন্দ্বের গভীর সত্যকে জটিল করে তোলে। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বের ঘটনার এই সাধারণ বিবৃতির কারণে পূর্ব পুরুষদের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণের বিষয়টিও অস্পষ্ট থেকে যায়। নিুে আবহমান বাংলা’র ঘটনা বিন্যাসে গুপ্ত ও গুপ্ত-পরবর্তী ইতিহাসের যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে তার সম্পূর্ণ উদ্ধৃতিসহ আখ্যানের সার সংক্ষেপ তুলে ধরা হলো-

প্রারম্ভ সংগীত (বর্ণনাত্মক গীত, কোরাস)

হায় হায় হায় চান্দের বাজারে রাইত লাগাইলো কে?
হায় হায় গো
রূপের নগরে ঘুণ ধরাইল কে?
ওরে ফুলের বাগানে সাপ ঢুকাইল কে?
হায়রে দোয়েল পঙ্খির ডানা ভাঙ্গিলো কে?
হায় হায় হায় চান্দের বাজারে রাইত লাগাইলো কে?
হায় হায় গো
... ... ...

বর্ণনাত্মক গদ্য

এই দেশ যেন অভিশপ্ত এক রাজ্য। বাহিরে চোখ ধাঁধানো জৌলুষ।
অন্তর তার নিঃসাড়  ঘুমন্তপুরী। কালঘুমে বিবস তাই সোনার রাজ্যের রাজকন্যা।
না জানি কত যুগের, শত রাসের অভিশাপে নিথর প্রাণপাখি তার।
সবই ছিল, সব আছে শুধু তার জিয়নের মন্ত্র জানা নাই।

বর্ণনাত্মক গীত

ও তার জিয়নমন্ত্র কোথায় খুঁজে পাই
ও তার সবই ছিল সবই আছে প্রাণ পাখিটা নাই।

বর্ণনাত্মক গদ্য

বুকের মধ্যে তাই ধুকপুক ধুকপুক। কী হয় কী হয়। কী জানি কী হয়।
প্রাণভোমরা তার হারায়ে গিয়াছে না জানি কোন কালগর্ভে -
ইতিহাস রাজ্যের ওপারে।
সবে, রাজ্যের সবে বলে তাই যাই, রাজ্য ছেড়ে যাই অন্য কোথা।
ভয়াল এ রাজ্যে বন্ধ হয়ে আসে দম।

বর্ণনাত্মক গীত

যে তোমায় ছাড়ে ছাড়–ক আমি তোমায় ছাড়বো না মা।
আমি তোমার চরণ করব স্মরণ আর কারও ধার ধারবো না মা।

বর্ণনাত্মক গদ্য

ঘুমের ঘোর ভাঙবে কবে ? রাজকন্যায় জাগাবে কে?
পঙ্খিরাজের ঘোড়ায় চড়ে, মন পবনের নায়ে, ঘুমের অকুল পাথার ডিঙায়ে
আসি যদি রাজপুত্র, তার যে মরন নাই। মরিয়াও মরে না সে।
রাজপুত্র নীলকমল, লালকমল ডালিমকুমার।
নিশি পাওয়া ঘোর ভাঙাও রাজকুমার। রাজকন্যা উদ্ধার মাগে সেই কতকাল
তোমার পথ চাহিয়া। জিয়নকাঠির সন্ধানে যাত্রা করো, যাত্রা করো রাজপুত্র।

[রাজপুত্র ডালিমকুমার তাই যাত্রা করে ‘ইতিহাস রাজ্যে’। ডালিমকুমার তার এই যাত্রা পথে দেখে আদি বাঙলার ভৌগলিক অবস্থান-নদী-নালা আর বনাঞ্চল। দেখতে পায় বাঙলা অঞ্চলের আদিবাসী বা আজকের পূর্বপুরুষদের। কীভাবে তারা পরস্পর মিলিত হয়ে গড়ে তুলেছিল ‘জনপদ’। তারপর জনপদ থেকে অঞ্চল এবং অঞ্চলে অঞ্চলে জোট বেধে কীভাবে রাজ্য গড়ে তুলেছিল তারা। ডালিম কুমার দেখতে পেয়েছিল আদিযুগের বাঙলার শিল্প ব্যবসা বাণিজ্যে প্রসার যা সারা বিশ্ব জুড়ে বি¯তৃতি ছিল। সেই পূর্ব পুরুষদের মধ্যে ছিল সৌহার্দ আর আত্মীয়তার বন্ধন।]

‘পূর্ব পুরুষ মোদের ফলায়ে তুলেছিল কোমল এক মন। উদার এক জীবন-সভ্যতা। মানব মনের চির মিলন সভ্যতা।’

এই সভ্যতার পথ ধরেই ‘খ্রীষ্টীয় বহু শতক পূর্বে পশ্চিম থেকে আসে আর্য গড়ে তোলে মৌর্য সাম্রাজ্য’। আর্য-অনার্যদের মিলন সংঘাতের মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলে শুরু হয় গুপ্ত সাম্রাজ্যের যুগ। মৌর্য আমলের পর গুপ্ত যুগ। আর্য গুপ্ত রাজগণও ছিলেন ব্র্রাহ্মণ। প্রজাগণ বৌদ্ধ। সাম্য মৈত্রী আর অহিংসর ধর্ম ছিলো বৌদ্ধ ধর্ম। উঁচু নিচু ভোদাভেদ কলুষিত আর্য ধর্মের প্রতিবাদে যে ধর্মের জন্ম। ভারতবর্ষের প্রথম সামাজিক বিপ্লব। তবে ব্রাহ্মণ্য গুপ্তরাজগণ প্রজাদের ধর্ম কর্মে বাধা দেয় না। জৈন আর বৌদ্ধ ধর্ম রাজরোষে পড়ে না তাই। বরং গড়ে ওঠে একের পর এক বৌদ্ধ বিহার। জ্ঞান চর্চার বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়। চীন দেশের হিউয়েন সাঙ সারা বাংলায় দেখেন জ্ঞানের উজ্জ্বল দীপাবলী।

বর্ণনাত্মক পদ্য

ব্দ্ধুং স্মরণং গচ্ছামি
ধর্মং স্মরণং গচ্ছামি
সংঘম স্মরণং গচ্ছামি
অন্ধকার ধ্বংসকার এই দীপদানে
পুজিতেছি পুজিতেছি বদ্ধভগবানে
দীপের আলোক যথা অন্ধকার হরে
জ্ঞানের আলোক তথা মোহ দূর করে।

বর্ণনাত্মক গদ্য

ব্রাহ্মণ্য রাজের আমলেও বাংলা ভূমি স্নাত হয় বুদ্ধের অপরও করুণায়। দেড় হাজার বছর আগেও গুপ্তরাজগণ এমনি সুবুদ্ধি দেখায়। যেমন দেখি নবীজির মদিনা সনদেও। যার ধর্ম তার কাছে রাষ্ট্রের চোখে সমান সবে। লাকুম দ্বীনুকুম ওয়ালী আদ্বীন। বড়ই আশ্চর্যের কথা। আরে এতো দেখি এ যুগের গণতন্ত্র আর ধর্ম নিরপেক্ষতা। মক্কা বিজয় করেও তাই কোনো রাষ্ট্র ধর্ম চাপান না নবীজী। আর আজ ইসলামের নামে চালু করতে চায় সবে যেন আইয়ামে জাহেলিয়ার যুগ। ধর্ম নিয়াও হয় রাজনীতি। লা ইকরাহা ফিদদ্বীন। ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি করিও না- বিদায় হজ্বে এই ছিলো নবীজির হুঁশিয়ারি- তাই করিতে গিয়া অতীতে ধ্বংস হয়েছে কত জাতি- বলেন নবীজি। ভাইরে, আমরা আগাইতেছি না পিছাইতেছি।

বর্ণনাত্মক পদ্য

যার ধর্ম তার কাছে, রাষ্ট্রের কিইবা বলার আছে
রাষ্ট্র তো ভাই মানুষ নয় যে ধর্ম লাগবে তার,
রাষ্ট্র হইল ঠিকানা ভাই সবাই মিলিবার।
চৌদ্দশত বছর আগে আল্লারও রসূল
মক্কা বিজয় করার পরও করলো না এ ভুল।
রাষ্ট্রধর্ম নামে কোনো ধর্ম চাপান নাই
গুপ্ত রাজ্যের কাছেও শুনি একই কথা ভাই।

বর্ণনাত্মক গদ্য

গুপ্ত আমল পর্যন্ত অর্থাৎ চৌদ্দশত বছর আগ পর্যন্ত ছিল বাংলা অঞ্চলের বাণিজ্যের জয়জয়কার। সারা ভারতের সাথে ছিল তার যোগাযোগ বিনিময়। শুধু কি তাই-বার্মা, নেপাল, সিংহল, থাইল্যান্ড, কম্পুচিয়া, ইন্দোনেশিয়া, লাওস পর্যন্ত ছিল লেনা-দেনা, মিল মহব্বত। ইরান, আরব, মধ্য এশিয়া ও কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চল পর্যন্ত ছিল বাংলা মায়ের ভুবন জোড়া আসন খানি।

বর্ণনাত্মক গীত

ভুবন জোড়া আসন খানি
হৃদয় মাঝে আমার হৃদয় মাঝে বিছাও আনি।

বর্ণনাত্মক গদ্য

সভ্যতা, নদীর পারে পারে গড়ে ওঠে সভ্যতা। সিন্ধু সভ্যতা, জানেন তো সারা বিশ্বের প্রাচীন এক সভ্যতা সিন্ধু সভ্যতা। হরপ্পা মহেঞ্জদারো।

: হাঁ হাঁ সিন্ধু সভ্যতা (কোরাস থেকে উক্তি)

এরপর এই উপমহাদেশে গড়ে ওঠে আরেক সভ্যতা, গাঙ্গেয় সভ্যতা-গঙ্গা,     করতোয়া পারের সভ্যতা। এই বাংলা অঞ্চল ছিল সেই সভ্যতার নির্মাতা, কারিগর।

সংলাপ গদ্য

: আরে কি বুলছিস তুই! মুখের কথায় কাজ কী? গানে গানে বুলে দে।
: তালে নানা তুই বুলে দে।
: নে, ধর ...

বর্ণনাত্মক গীত

সিন্ধুর পরে গঙ্গা পাড়ে গড়ে যে এক সভ্যতা
বাংলা অঞ্চলের মানুষজন ছিল তাহার নির্মাতা
গঙ্গা করতোয়ার খ্যাতি ছিল ভুবন জুড়িয়া
গৌরবের সেই ঐশ্বর্য্য হায় গেলো কোথায় হারাইয়া।

বর্ণনাত্মক গদ্য

ষষ্ঠ শতকে গুপ্ত সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়লে বিদ্রোহ করে রাজ শশাঙ্ক। বাংলা অঞ্চলের ছ্টো ছোট রাজ্য ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো একত্রে মিলিবার সুযোগ পায়। আর কেবলি কি বাংলা, উড়িষ্যা আর মগধও হয় শশাঙ্কের অধীন।

বর্ণনাত্মক গীত

শোন শোনরে শোন সবে শোন দিয়া মন
শশাঙ্ক নামে রাজা উড়াইলো কেতন।
ভিন্ন ভিন্ন ছিল বাংলা খণ্ড খণ্ড রাজ্যে
শশাঙ্ক আসিয়া তারে এক মালায় গাঁথে।
শোন শোনরে শোন সবে শোন দিয় মন
কর্ণ সুবর্ণ নামে শশাঙ্কের রাজধানী
ঐক্যবদ্ধ গৌড় বাংলা বিশাল দেশখানি।
শোন শোনরে শোন সবে শোন দিয় মন
বঙ্গ কঙ্গোদ কলিঙ্গ উৎকল মগধ ও রাজ্য
এই সব রাজ্য নিয়া হইল গৌড় সাম্রাজ্য।
শোন শোনরে শোন সবে শোন দিয়া মন

বর্ণনাত্মক গদ্য

শশাঙ্ক আমলে সারা বাংলা অঞ্চলে নাম হয় গৌড় - গৌড়বাংলা। এই পরিচয়ে সারা ভারতে ছিল তার নাম ধাম। উড়িষ্যা আর মগধ জোড়া ছিল তার পরিধি। যাকে বলে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার আদি মহান অধিপতি ছিলেন যেন তিনি। উপাধি ধারণ করেন গৌড়েশ্বর। তবে ছোট ছোট রাজ্য জয় করে বড় রাজ্য, সাম্রাজ্য গড়ার বিপদও কি নাই! আছে বিপদ আছে। খুবই আছে। আরো আরো রাজ্য জয়ের নেশায় পেয়ে বসে রাজ শশাঙ্ককে। তাই বুঝি বৌদ্ধ রাজা হর্ষবর্ধনকে শায়েস্তা করতে উন্মত্ত হয় সে বৌদ্ধ বিনাশে।

সেই হইলো বুঝি শুরু - আজ থেকে তেরশত বছর আগে - ধর্ম নিয়া রাজনীতি। রাজার ধর্ম গ্রাসিতে চায় প্রজার ধর্ম।

(এরপর ইতিহাসের মাৎস্যন্যায়, পাল সাম্রাজ্য, সেনরাজ্য হয়ে মধ্যযুগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পর্ব বা অধ্যায়সমূহ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে প্রথম মুসলিম আগমন, সুলতানী আমলপূর্ব অস্থিতিশীলতা, সুলতানী আমল ও শিল্প সাহিত্যের ব্যাপক প্রচার ও প্রসার, মুঘল আমল ও আঞ্চলিক চেতনার পুনর্জাগরণ এবং সবশেষে ইংরেজ শাসনামল এবং মীরজফরের বিশ্বাসঘাতকতার কথা বর্ণনার মধ্যে দিয়া আখ্যানের পরিসমপ্তি ঘটে।)

বর্ণনাত্মক গদ্য

রাজপুত্র ডালিমকুমার দেখে বাংলা অঞ্চলে মুখোমুখি দুই বাঙ্গালি ইতিহাস জুড়িয়া। চিরকালের বীর বাঙ্গালির পাশাপাশি নাচিয়া-কুদিয়া ফেরে গৃহশত্রু বিভীষণ মীর জাফরের দল। স্বার্থ সুবিধায় প্রভুর পায়ে সর্বস্ব বিকায়ে দিতে বাঁধে না যাহাদের। বাংলামনের মানবধর্ম বিষে নীল হইয়া যায়।

বৌদ্ধ-ব্রাহ্মণ বিদ্বেষ বিকার সর্বনাশের প্রান্তে আনিয়া ছাড়িয়াছে হিন্দু মুসলমান, দুই বাঙ্গালিরে আজ। উপমহাদেশ তিনভাগ করিয়াও রেহাই নাইরে বাঙ্গালির। হায় বাংলা! বাংলারে! কে আছো কোথায়? পথ বলে দাও। জিয়নকাঠির সন্ধান মিলিবে আর কতো পথ পাড়ি দিয়া? রাজপুত্র নীলকমল, লালকমল, ডালিমকুমার- এখনও যে জাগে নাই রাজকন্যা। ভাঙে নাই ঘুমঘোর। জিয়নকাঠির সন্ধানে যাত্রা করো, সর্বস্ব নিয়া পুররায় যাত্রা করো রাজপুত্র। পাড়ি দাও। পাড়ি।

বর্ণনাত্মক গীত

জিয়নকাঠির ছোঁয়ায় ছোঁয়ায় জাগাও তার প্রাণপাখি
গড়িয়া ভেলা আলোর মালা জাগাতে হবে প্রাণ পাখি
আনতে হবে জিয়নকাঠি।
(সমাপ্তি)

অভিনয় উপাদান

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে এই নাট্য আখ্যানটি বর্ণনাত্মক গদ্য, গীত ও কাব্য এই তিনটি উপাদানের প্রয়োগে বিন্যস্ত। একদল কুশীলব দোহার সহযোগিতায় কখনো যৌথ বা কোরাস বর্ণনায় আবার কখনো একক বর্ণনার (গদ্য, গীত এবং কাব্য) মধ্যমে এই আখ্যানটি পরিবেশন করেন। অর্থাৎ পরিবেশনায় কথক কোনো একজন কুশীলব নয়। একাধিক কুশীলব বিভিন্ন ঘটনাংশ বর্ণনাত্মক অভিনয়ের মাধ্যমে উপস্থাপন করেন। এই বর্ণনাত্মক অভিনয়ের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বর্ণনার ভাব এবং অর্থ অনুযায়ী সকল কুশীলবের অংশগ্রহণের মাধ্যমে দৃশ্য রচনা করা। এই ধরনের দৃশ্য রচনায়, বিশেষত বর্ণনাত্মক গীত ও কাব্যাংশের দৃশ্য নির্মাণে, কখনো নৃত্য আবার কখনো ছন্দময় চলন বা Rhythmic movement পরিবেশনা করে থাকেন। এই নৃত্য ও ছন্দময় চলন পরিবেশনায় কখনো লোকনাট্যের উপাদান যেমন - বাঁশ নৃত্য, লাঠি খেলা ব্যবহার করতে দেখা গেলেও অন্য ক্ষেত্রে তা সম্পূর্ণই নির্দেশক  ও কুশীলবদের নাট্যচিন্তা দ্বারা উদ্ভাবিত।

এই নাটকের ‘গীত’ পরিবেশনা যথেষ্ট বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। গীত রচনার ক্ষেত্রে দুইটি ধারা লক্ষ্য করা যায়। প্রথমত- দলের উদ্ভাবিত কথা ও সুরের ব্যবহার এবং দ্বিতীয়ত- প্রসিদ্ধ এবং জনপ্রিয় গানের কথা ও  সুরের ব্যবহার। দ্বিতীয় ধারায় কখনো শুধুমাত্র গানের সুর ব্যবহার করা হয়েছে আবার কখনো কথা ও সুর দুটোই ব্যবহার করা হয়েছে। সমগ্র পরিবেশনায় এই দ্বিতীয় ধারার গীত ব্যবহারই প্রাধান্য পেয়েছে। পরিবেশনায় গীতাভিনয়ের ক্ষেত্রেও দুটি বিষয় লক্ষ্যণীয়। প্রথম এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঘটনার ভাব ও অর্থ অনুযায়ী দেশের জনপ্রিয় রবীন্দ্র সংগীত, দেশাত্ববোধক, লোকসংগীত, গণসংগীত প্রভৃতি ব্যবহার করা হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে নাট্যকারের রচিত কিছু খণ্ড পদ কাহিনীর বিভিন্ন ঘটনাসমূহকে বর্ণনাত্মক গীতাভিনয় বা কাব্যাভিনয়ের মাধ্যমে তুলে ধরে।

বর্ণনাত্মক গদ্যাভিনয়ে বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। কোনো একক ‘কথক’ এই আখ্যান বর্ণনা করেন না। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বের ঘটনাসমূহ একাধিক কথক অন্যান্য কুশীলবের সহযোগিতায় বর্ণনা করেন। এই কথক পরিবর্তন প্রক্রিয়াটি কুশীলবদের আসনে থেকেই পরিচালিত হয়। কুশীলবগণ মঞ্চের তিনদিকে আবদ্ধ করে সারিবদ্ধভাবে উপবেশন করেন (ছক চিত্র দেখুন)। ইতিহাসের ভিন্ন ভিন্ন পর্বে কথকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কুশীলব তার আসন ছেড়ে উঠে এসে কাহিনী বর্ণনা করেন। কথকের বর্ণনাত্মক গীত বা কাব্যাভিনয়ের সময় অন্যান্য কুশীলবগণ তাদের অবস্থান ছেড়ে যৌথভাবে দৃশ্য রচনা করে কথককে সহায়তা করেন। পুনরায় কোনো গীত বা কাব্য পরিবেশনা মাধ্যমে কথকসহ কুশীলবগণ তাদের আসন গ্রহণ করেন এবং অন্যকোনো কুশীলব কথকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

যেহেতু ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনার অন্তরালে অবস্থিত চরিত্রসমূহ কদাচিৎ মূর্ত হয়ে ওঠে, সে কারণে প্রযোজনায় বর্ণনাত্মক অভিনয়ই মুখ্য হয়ে ওঠে। ফলে ইতিহাস ভিন্ন ভিন্ন পর্বে বর্ণনার ভাব বা অর্থ অনুযায়ী দৃশ্য রচনা করার মধ্যে দিয়েই আবহমান বাংলা’র এই আখ্যানটি পরিবেশিত হয়।

নির্দেশক এই ধরনের একটি আখ্যান পরিবেশনারীতিকে ‘পালা নাটক’ বলে অভিহিত করেছেন। এ ক্ষেত্রে তার অভিমত হচ্ছে-

‘পালা বলার মূল বিষয়টি হচ্ছে যে, কথক বলছে- এর সাথে একটা উক্তি-প্রত্যুক্তি যা দোহার থেকেই আসছে। গানগুলো দোহার থেকেই আসছে। কথক পাল্টে যাচ্ছে বা কথক নানা জনে করছে। এই যে কথকতা-গল্প-কথন মানে এই বর্ণনা করাটা একটা মূল জায়গা যদি হয়, তার সাথে চরিত্র না হলেও অভিনয় করাটা- যা কথকই করছে, এই বিষয়গুলো মাথায় রেখে পালা বলছি।’৫

উক্তি-প্রত্যুক্তি প্রসঙ্গে বিপ্লব বালা যা বলেন, নাটলিপি রচনা ও পরিবেশনায় তা লক্ষ্য করা যায় না। সম্পূর্ণ আখ্যানের মাত্র দু একটি ক্ষেত্রে উক্তি-প্রত্যুক্তি দেখা যায়, যার একটি উদাহরণ উদ্ধৃতি অংশে তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে দোহার বা যন্ত্রীদল অথবা কোরাস কুশীলবের কিছু প্রশ্নবোধক উক্তি থাকলেও কথকের প্রত্যুক্তি অনুপস্থিত। উদাহরণ স্বরূপ নিচে উদ্ধৃত দুটো অংশ দেখা যেতে পারে।

ক. পরিবেশনার এক অংশে কথক বাংলা অঞ্চলের আদিবাসীদের সমাজ কাঠামো গড়ে তোলার প্রসঙ্গে বলেছেন-

: পূর্ব পুরুষেরা সেই যে গাহিয়াছিল ফসলের উৎসব গান আজিও তাহা হয় নাই শেষ। ডালিমকুমার দেখে ছোট ছোট গোত্র গোষ্ঠীতে ভাগ হয়ে বাস করে মানুষ। একেক বংশের  একেক সমাজ। এক সমাজের সঙ্গে আরেক সমাজের ছিল না কোনো ওঠা বসা।

যন্ত্রীদলের উক্তি
এতো ভাই কোনো কাজের কথা না, কেবল নিজেরা নিজেরা, খালি আমরা আর মামারা ভাল।- এই করলে চলে ?  সভ্যতা গড়ে?

কথক
হ্যাঁ, কালের নিয়মে তাই কয়েক গোষ্ঠীর সমাজ মিলিয়া গড়ে ওঠে জন, - জনপদ।

খ. রাজপুত্র ডালিম কুমার ভাবতে থাকে - আমাদের এই বাংলা অঞ্চলে স্থায়ী বসতির পত্তন
কবে হবে? কীভাবে?

যন্ত্রীদলের উক্তি
কবে ? কীভাবে?

কথক
শিকারের সন্ধানে মানুষ ঘুরে বেড়াতো একদিন এদিক ওদিক, এখানে সেখানে। সেই সে অদিযুগে ঠিকানা বিহীন যাযাবর ছিল মানুষ। ...

উদ্ধৃতি দুটিতে উক্তি থাকলেও প্রত্যুক্তি স্পষ্ট নয়। তাই এই ধরনের অভিনয়কে উক্তি-প্রত্যুক্তিমূলক সংলাপ বলার কোনো কারণ রয়েছে বলে মনে করি না। এই পরিবেশনায় কথকের তৃতীয় পুরুষে গল্প কথন ব্যতীত পালা পরিবেশনারীতির অন্যান্য সকল উপাদান বৈশিষ্ট্যের প্রয়োগ সুষ্পষ্ট নয়। পক্ষান্তরে ১ম অধ্যায়ের ‘পালাগান’ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনায় দেখা যায়, গায়েন তাঁর সহ-অভিনেতা ‘ডায়না’র সাথে সুস্পষ্ট সংলাপাত্মক অভিনয় করছেন। মূলগায়েন এ সময়ে পোষাকের পরিবর্তন বা দ্রব্যসমগ্রী ব্যবহারের মাধ্যমে প্রথম পুরুষে চরিত্রাভিনয় করেন। কিন্তু আবাহমান বাংলা’য় কথককে বর্ণনাত্মক অভিনয় ভিন্ন প্রথম পুরুষে চরিত্রাভিনয় করতে দেখা যায় না।

মঞ্চ পরিকল্পনা

আহমান বাংলা’র মঞ্চ পরিকল্পনায় লোকনাট্যের উন্মুক্ত অভিনয় স্থান ব্যবহারের রীতি অনুসরণ করা হয়েছে। মঞ্চের পিছনে সারিবদ্ধ সমান্তরাল রেখায় অবস্থান করেন দোহার এবং যন্ত্রীদল। তার সামনে অভিনয় স্থানের তিনদিকে উপবেশন করেন কুশীলববৃন্দ। তারা তাদের অবস্থান থেকে উঠে এসে আখ্যান পরিবেশন করেন। অভিনয়ের জন্য লোকনাট্য অনুসৃত উন্মুক্ত অভিনয় স্থান ব্যবহার করা হলেও সামগ্রিক ডিজাইনটি প্রসেনিয়াম মঞ্চকে কেন্দ্র করে নির্মাণ করা হয়। ফলে কুশীলবদের অভিনয়ে একটি সাধারণ প্রবণতা হচ্ছে একমুখী, অর্থাৎ দর্শক অভিমুখী হয়ে অভিনয় করা।

[মঞ্চ পরিকল্পনার চিত্র দেয়া হবে]

আবহমান বাংলা পালা নাটকটির এই সামগ্রিক পরিবেশনায় লোকনাট্য উপাদান হিসেবে বর্ণনাত্মক অভিনয় এবং অন্যান্য কিছু উপাদান যেমন, লোকসংগীত, লোকক্রীড়া, লোক ছড়া প্রভৃতির ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। নির্দেশকের আধুনিক নাট্যচিন্তার সাথে সমন্বিত করা হয়েছে এই সকল উপাদান এবং তুলে ধরা হয়েছে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্ব। তবে লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, ইতিহাসের এই বর্ণনায় চরিত্র বা ঘটনার চেয়ে ফলাফল বর্ণনার প্রতি অধিক গুরুত্বারোপ করতে দেখা যায়। ফলে সামগ্রিক পরিবেশনায় কিছু সীমাদ্ধতা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমত- একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর তিন হাজার বছরের জীবনকে মাত্র দুই ঘন্টায় উপস্থাপন করতে হয়। যার কারণে এই দীর্ঘ ইতিহাসকে অনেক সরলীকরণ করতে হয়েছে। দ্বিতীয়ত- এই সরলীকরণকৃত ইতিহাসের যে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ আবাহমান বাংলা’য় দেখা যায় তা একান্তই নাট্যকারের একমুখী চিন্তা বা বিবৃতি। ঘটনার দ্বান্দ্বিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এখানে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। তৃতীয়ত- কুশীলবদের যৌথ অংশগ্রহণে যে সকল দৃশ্য রচনা করতে দেখা যায় তা মূলত নাট্যকার প্রদত্ত বিবৃতির-ই ‘অনুবাদ’ হয়ে ওঠে। আর এ সকল কারণেই আবহমান বাংলা’য় পরিবেশিত ইতিহাস কোনো কৌতূহল উদ্রেক করে না বরং অধিকমাত্রায় উপদেশমূলক হয়ে ওঠে।

সূত্রতথ্য : ১.বিপ্লব বালা, সাক্ষাৎকার থেকে উদ্ধৃত, ২. প্রাগুক্ত, ৩. বিপ্লব বালা : আবহমান বাংলা, পৃ-১৪, ৪. প্রাগুক্ত পৃ-১৬, ৫. প্রাগুক্ত সাক্ষাৎকার।
[চলবে]

সাইদুর রহমান লিপন ( This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it. ) : অভিনেতা, নির্দেশক, নাট্যশিক্ষক।