Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

আলাপনে নাসির উদ্দিন ইউসুফ

Written by সাক্ষাৎকার : বিপ্লব বালা ও হাসান শাহরিয়ার.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

[স্বাধীনতার পর নাট্যচর্চাটা আমাদের বেশ এগিয়ে নিয়ে গেছে, সুস্থ ভাবনা-চিন্তার আগ্রহ তৈরি করেছে। আর তৈরি করেছে ‘মানুষ’ হবার আকাঙ্ক্ষা। আমরা শিল্পের এক বড় কর্মকাণ্ড, কর্মযজ্ঞ- মঞ্চনাটকের নিয়মিত সাক্ষাৎ পেয়েছি। আমরা বেশি বেশি নাট্যকার পেয়েছি, পেয়েছি সৃজনশীল প্রতিভাসম্পন্ন নাট্যনির্দেশক, অনেক ভালো অভিনেতৃ। আর পেয়েছি অনেক সংগঠক, যারা ক্রমশই মঞ্চনাটকের পরিধি বিস্তৃত করেই চলেছেন। এক কথায় এঁরা সবাই আমাদের মঞ্চনাটকের পুরোধা। আমরা মনে করি আমরা এঁদের সব ভালো কাজের উত্তরাধিকারী। তাই এঁদের কাজ এবং কাজের প্রক্রিয়া জানতে আগ্রহী, হতে আগ্রহী তাঁদের মতো বা তাঁদের চেয়ে বড় কিছু।

এই প্রত্যাশায় থিয়েটারওয়ালা আলাপচারিতায় মগ্ন হয়েছে কয়েকজন নাট্যজনের। তাঁদের সাথে আলাপচারিতা অনুলিখন করে ধারাবাহিকভাবে ছাপা হচ্ছে থিয়েটারওয়ালায়। আমাদের এমনি এক নাট্যজন নাসির উদ্দিন ইউসুফ। সাক্ষাৎকার : বিপ্লব বালা ও হাসান শাহরিয়ার আর অনুলিখন- সাইফ সুমন]

বিপ্লব বালা
আপনার ছোটবেলা থেকে যদি শুরু করি ... জন্ম, বেড়ে ওঠা, পরিবার ইত্যাদি ...

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
আমার জন্ম ১৯৫০ সালে ঢাকায়। কিন্তু আমাদের আদি বাড়ি চট্টগ্রামে। আমার বাবা ১৯২১ সালে চট্টগ্রাম ছেড়েছেন। ১৯২৩ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন। ১৯২৮ সালে বের হয়ে ১৯২৯ সাল থেকে ব্রিটিশ সিভিল সার্ভেন্ট হয়েছেন এবং সেই থেকে কোলকাতায়। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর ঢাকায় চলে আসেন। আমার জন্ম লালবাগ-নবাবগঞ্জের বাড়িতে, পরে পল্টনে চলে আসি। আমার জ্ঞান হওয়ার আগে থেকেই পল্টনে ... আমার মনে আছে, এখন যেখানে বায়তুল মোকাররম মসজিদ, সেখানে আমি নৌকা চালিয়েছি। এটা ১৯৫৬ সালের কথা। আমাদের দুটো বাসার পরেই ছিল ড্রামা সার্কেলের বজলুল করিমের বাড়ি। তাদের বাড়ির সামনে ছোট্ট কাঠের একটা বাংলো ছিল। সেই বাংলোতে তারা মহড়া করতেন।

মীর মকসুদ-উস-সালেহীন, বজলুল করিম মিলে ১৯৫৬ সালে ড্রামা সার্কেল গঠন করেন। ১৯৫৮ সালের কথা- আইয়ুব খানের মার্শাল ’ল শুরু এবং তখনই প্রথম বিদ্যুৎ এলো পল্টনে। তখন বিকেল বেলা খেলাধূলা শেষ করে যখন বাসায় ফিরতাম, তখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জানালা দিয়ে ওনাদের মহড়া দেখতাম। আমার ধারণা এই বাংলায় এই দুজনই আধুনিক থিয়েটারের প্রচলন করেন। তারা ঢাকা প্রেস ক্লাবের উল্টোদিকে আমেরিকান কালচারাল সেন্টার ছিল, সেখানে শো করতেন। বজলুল করিম এবং মীর মকসুদ-উস-সালেহীনের এই নাট্যতৎপরতার চিত্রটি ছোটবেলার স্মৃতি হিসেবে এখনও আমার চোখে ভাসে। তখন জানালা দিয়ে তাকিয়ে থেকেই বুঝতাম এটা খুব কঠিন একটা ব্যাপার এবং প্রচুর পড়াশোনার ব্যাপার। একবার এক সামার ভেকেশনে বাবার সাথে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গেলাম, চট্টগ্রামে ... সেখানে আমার এক চাচাতোভাই ছিলেন- কাশেম মাস্টার, স্কুলে শিক্ষকতা করতেন ... তো উনি খুবই নাটক পাগল ছিলেন। এবং অভিনেতা নির্দেশক হিসেবে ফেনী থেকে শুরু করে কক্সবাজার পর্যন্ত তার নাম-ডাক ছিল। তো বেড়াতে গিয়ে দেখি উনি টিপু সুলতান নাটক করছেন। আমি তখন ক্লাশ টু-তে পড়ি। আমাকে সেই নাটকে মাথায় পাগড়ি পড়িয়ে টিপু সুলতানের একটি ছেলের চরিত্রে উঠিয়ে দিলেন। এই আমার প্রথম নাটকের অভিজ্ঞতা। এরপর থিয়েটারের সাথে যোগাযোগটা ঠিক হয়ে ওঠেনি।

বিপ্লব বালা
ড্রামা সার্কেলের কোনো নাটক কি তখন দেখেছিলেন?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
হ্যাঁ, একটা দেখতে গিয়েছিলাম, সেটা হলো বনফুলের কবর। প্রথমে টেকনিক্যাল শো দেখতে গিয়েছিলাম, একা একা ... তো বজলুল করিম বললেন যে- মা-বাবার কাছ থেকে পারমিশন নিয়ে আসো, তা না হলে সন্ধ্যার পর থাকবে কেমন করে? পরে পারমিশন নিয়ে দেখতে গিয়েছিলাম।

বিপ্লব বালা
বজলুল করিম বা সালেহীনভাইরা এমনিতে কী করতেন?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
বজলুল করিম সম্ভবত আমেরিকান কালচারাল সেন্টারে চাকুরি করতেন আর সালেহীনভাই যে কী করতেন আমি ঠিক জানি না।

বিপ্লব বালা
তখন তারা এই আধুনিক থিয়েটারের ধারণাটা কোথা থেকে পেলেন জানেন কি?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
আমার ধারণা ওনাদের পশ্চিমা দুনিয়ার সাথে যোগাযোগ ছিল, আর কোলকাতার সাথে একটা যোগাযোগ ছিল। তারা কিন্তু কোলকাতায় একটা নাটক করতেও গিয়েছিলেন, বোধহয় রাজা ইডিপাস।

বিপ্লব বালা
তখন ঢাকায় আর যারা নাটক করতেন তাদের ব্যাপারে কোনো ধারণা আছে?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
না, একেবারেই নেই। তবে আমার এটি মনে আছে যে, ১৯৬২ সালের পর আমাদের পাড়ায়, পল্টনে নাটক হওয়া শুরু করলো এবং সেটা হতো বছর শেষে। আমরা তখন নটরডেম কলেজের মিলনায়তনে এধরনের নাটকগুলো করতাম। জাহাঙ্গীরভাই বলে একজন ছিলেন যিনি রেডিওতে ইদিপাস করে নাম করেছিলেন ... তো তিনিই আমাদের উৎসাহ দিতেন। আমার মনে আছে আমরা আনিস চৌধুরীর মানচিত্র করেছি। আসকার ইবনে শাইখের অনুবর্তন করেছি। তবে আজকের এই আমার ব্যাপারে এগুলোর বোধহয় কোনো ইম্পেক্ট পড়েনি। পরে কিন্তু আমি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ি, সেটা ১৯৬৪ সালের কথা।

বিপ্লব বালা
তখন কিসে পড়েন?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
এইটে। আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন তখন শুরু। শুরুটা হয়েছিল রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদের আন্দোলন থেকে। তখন আমি নবাবপুর হাই স্কুলের ছাত্র।

বিপ্লব বালা
আপনারা তো ছোট ছিলেন, তো আপনাদেরকে কারা উদ্বুদ্ধ করেছিল মনে আছে?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
এলাকার বড়ভাইয়েরা ... ওনারাই আমাদের অর্গানাইজ করেছিলেন। ১৯৬০ এ হলো রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধের বিরুদ্ধে আন্দোলন। আর ১৯৬৪-তে শিক্ষা আন্দোলন হয়েছিল, আমার মনে আছে আমি পুলিশের মার খেয়েছিলাম। সেই সময়েই আমি শেখ মুজিবকে প্রথমবারের মতো নেতা হিসেবে বুঝলাম। উনি গাড়ি করে সারা দেশে মিটিং করছেন, পত্রিকায় পড়ছি। আমার মনে হয় উনি কিন্তু পশ্চিমা বুর্জোয়াদের শোষণটাকে স্পষ্টভাবে বুঝতে পেরেছিলেন, যতটা না পেরেছিলেন কমিউনিস্টরা। যার ফলেই কিন্তু ১৯৬৬-র ৬ দফাটা উনি স্ট্রংলি তুলতে পেরেছিলেন। আমি ছাত্র রাজনীতি শুরু করি ছাত্র ইউনিয়ন দিয়ে। ১৯৬৭ সালে যখন জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হই, তখন ছাত্র ইউনিয়ন করতাম। মেননভাইয়ের সাথে যোগাযোগটা ছিল। আমার আবার একটু কবিতা লেখার দিকে ঝোঁক ছিল। আমার কবিতা কিন্তু পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে হাসান ইমামভাই পাঠ করেছিলেন। আমি শহীদ কাদরীর সংস্পর্শে এসে বিমোহিত হয়েছিলাম। তার পাণ্ডিত্য ছিল বিরাট। তখন আন্দোলনের পাশাপাশি শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, কামরুল হাসান এঁদের দেখার সৌভাগ্য ঘটলো। আর পাড়ার ছেলে হিসেবে জয়নুল আবেদীন আমাকে খুব আদর করতেন। ওনার ছেলে আমার বন্ধু ছিল। ওনার বাসায়ও যেতাম, ছবি আঁকা দেখতাম। আমার কিন্তু ইচ্ছা ছিল ছবি বানাবার। ১৯৬৭-৬৮ সালে সালাউদ্দিন জাকী বললেন- ছবি করতে হবে। আসলে সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক সাংঘাতিকভাবে বাঙালি যুব সমাজকে প্রভাবিত করেছে। আমি রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ পড়ছি। রবীন্দ্রনাথ আমি একটু কম বুঝতাম, নজরুল আমাকে টানতো বেশি ... মানে যেহেতু আন্দোলন করতাম, মিলে যেতো আর কি। সালাউদ্দিন জাকীসহ যারা ইন্টেলেক্চুয়েল গ্রুপ ছিলেন, তারা একদিন আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন- তুমি রেঁবো পড়েছ? উত্তর- না। বালজাক পড়েছ? - না, ভিক্টোর হুগো পড়েছ? - না, তুমি ইয়েটস পড়েছ? - না, হেগেল পড়েছ? - না। বাহঃ, তার মানে তো তুমি কিছুই পড়নি, তুমি কী করে কী করবে? ... তো সত্যিই বলছি তার আগে আমি দুটো নাটক পড়েছি- ডাকঘর আর মার্চেন্ট অব ভেনিস। যাক্, তবুও ছবি যে আমাকে টানলো সেটা হলো সত্যজিৎ রায়। আমি ১৯৬২ সালে বড় স্ক্রীনে পথের পাঁচালী  দেখেছি। দেখেছি আর কেঁদেছি, বিশেষ করে দূর্গার মৃত্যু দৃশ্যের সময়। ... ছবি বানানো তখন আর হয়ে ওঠেনি। তখন আন্দোলনটাই যেন বেশি টানলো। আর যেহেতু ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মেম্বার ছিলাম, সেখান থেকে কিছু দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। আমার মনে হয় ’৬৯-এর গণ অভ্যুত্থানই কিন্তু আমাদের বাঙালি হিসেবে নিজেদের আবিষ্কার করার একটা প্রবণতা তৈরি করেছিল। তারপর আর আসলে ঘরে ফিরতে ইচ্ছা হয়নি। মিটিং-এ বক্তৃতা না করলেও কবিতা আবৃত্তি করতাম। বিদ্রোহী কবিতা মুখস্ত করেছি, ‘আজি এ প্রভাতে রবির কর ...’ মুখস্ত করেছি ... এগুলো আবৃত্তি করতাম মানুষকে উদ্বুদ্ধ করবার জন্য। তখন কিন্তু একটা কালচার তৈরি হয়েছিল ... আলতাফ মাহমুদ, আব্দুল লতিফ এমন সব গান গাইতেন আবার সুখেন্দু দা, শেখ লুৎফর রহমান, মনু’দা সবাই মিলে কিন্তু তখন একটা রোল প্লে করেছেন সেই ১৯৬০ থেকে ’৭০ পর্যন্ত। এই ১০টি বছরই কিন্তু বাঙালির জন্য আন্দোলনের বছর ছিল, এবং এই ১০ বছরের এ্যাচিভমেন্ট হচ্ছে বঙ্গবন্ধু সবার সুরটাকে একটি সুরে রূপান্তর করে ’৭১-এ একটা চূড়ান্ত রূপ দিলেন। এর মধ্যে সিরাজ সিকদারের সাথে আমাদের যোগাযোগ হয়েছে ... উনি কিন্তু বিশাল জ্ঞানী লোক ছিলেন। ওনার সাথে মাঝে মাঝে আমরা বসতাম এস এম হলে।

হাসান শাহরিয়ার
তখনও তো নিশ্চয়ই থিয়েটার বা কোনো ধরনের শিল্প ভাবনার ভেতরে ঢোকেননি।

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
না, তখন তো ভাবতাম রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্যেই বাঙালি জাতির মুক্তি। পরে বুঝেছি যে- স্বাধীন ভূখণ্ডই মুক্তি নয়, মানুষের মুক্তিই আসল মুক্তি।

হাসান শাহরিয়ার
স্বাধীনতার পর পরই তো থিয়েটার নিয়ে মাতলেন ... ব্যাপারটা কি তাহলে হঠাৎ করেই হলো?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
না, আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় একদিন ম. হামিদ বললো ... ম. হামিদ ডাকসুর কালচারাল সেক্রেটারি ছিল ... তো সে বললো চলো একটা নাটকের দল করি। এর আগে মাও সে তুং-এর বিপ্লবের উপর পড়াশোনা করেছি, তো তাঁর সাংস্কৃতিক বিপ্লব সম্পর্কে জানি, মনে হয়েছে যে স্বাধীন দেশে থিয়েটার করবো, এটা একটা কাজের কাজ হতে পারে। ম. হামিদই কিন্তু ‘নাট্যচক্র’ নামটা দিয়েছিল। সেলিম আল দীন ও আল মনসুরকে বলা হলো নাটক লিখতে। সেলিম আল দীন লিখলো এক্সপ্লোসিভ ও মূল সমস্যা আর আল মনসুর লিখল রোলার ও নিহত এল এম জি। এক্সপ্লোসিভ ও মূল সমস্যা-র লাইট করলাম, নির্দেশনা দিয়েছিল ম. হামিদ আর নিহত এল এম জি-র নির্দেশনা আল মনসুর নিজেই দিয়েছিল, সেটাতে শেখ কামাল অভিনয় করেছিল। তখন বাসন্তী গোমেজ, আখতার কমল এদের সাথে পরিচয় হলো।

হাসান শাহরিয়ার
এটা কবেকার কথা?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
১৯৭২ সালে কথা। ১৯৭২ সালে আরেকটি ঘটনা ঘটলো। আনোয়ার কবির ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশের প্রথম দর্শনীর বিনিময়ে নাটক করলেন। নাটকের নাম জনে জনে জনতা। এটার শো হয়েছিল ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউটে। পর পর চারটি শো করেছিল। ১৯৭২ সালে নাটক করেছে বহুবচন, সম্ভবত সাড়ে সাতশ সিংহ বা প্রজাপতির লীলা লাস্য। তারপর মামুনুর রশীদ আরণ্যক নাট্যদল নিয়ে প্রথম করলো পশ্চিমের সিঁড়ি, ওটাতে আমাদের রাইসুল ইসলাম আসাদ অভিনয় করেছিল। ১৯৭২ সালেরই ২১ ফেব্রুয়ারিতে মামুনুর রশীদ কবর করলো আর সেটাতে আলী যাকের, মোহাম্মদ জাকারিয়া দাদা অভিনয় করলেন।

হাসান শাহরিয়ার
স্বাধীনতার পর যখন নাটক করবেন ভাবলেন তখন আর কোন কোন দল নাটক করতো?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
নাট্যচক্র, আরণ্যক নাট্যদল, বহুবচন, পারাপার। ড্রামা সার্কেল তো ছিলই  ...

হাসান শাহরিয়ার
নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
না, নাগরিক তখনও মঞ্চনাটক করেনি যদিও গঠিত হয়েছে ’৬৮ সালে। কিন্তু পারাপার ’৭০ সালের দিকে নাটক করেছে পোস্টার নামে। বাংলা একাডেমীর বটতলায়। ’৭২ সালে নাট্যচক্র উল্লেখ্য নাটক দুটি করলো এবং ডিসেম্বরে ডাকসুর আয়োজনে ৭টি হলে আন্তঃহল নাট্যপ্রতিযোগিতা হলো। তখন সেলিম আল দীন, ম. হামিদ ওরা বললো যে- তুই নাটক করবি। আমার লেখালেখির উপর প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল। সাংস্কৃতিক আড্ডা দিতাম ... আখতারুজ্জামান ইলিয়াস স্যার, হাশেম খান, নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান, রফিকুন নবী, রফিক আজাদ আরো অনেকেই আসতেন সেই আড্ডায়। তো সেখান থেকে বেরিয়ে নাটক করা শুরু হলো। আমি এই আন্তঃহল নাট্য প্রতিযোগিতায় মহসিন হলের নাটক নির্দেশনা দিয়েছিলাম, সেলিম আল দীনের জণ্ডিস ও বিবিধ বেলুন। এই প্রতিযোগিতা কিন্তু সারা বাংলাদেশে বেশ সাড়া ফেলে দিয়েছিল। আমার নাটকটি ছিল এ্যাবসার্ডধর্মী। তখন তো বেকেট পড়ে ফেলেছি, কাম্যু পড়ে ফেলেছি ... ভাবতাম যে- খাপছাড়া খাপছাড়া কিছু হলেই বোধহয় আধুনিক হবে হাঃ হাঃ ... কবির স্যার, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যার, ওনারা ছিলেন বিচারক। ৫টি পুরস্কার ছিল, সেরা নাট্যকার, সেরা নির্দেশক এমন কী কী যেন ... তো সবগুলো পুরস্কারই পেল জণ্ডিস ও বিবিধ বেলুন। তখন যে খুব সচেতনভাবে কাজটি করেছি তা না, কেবল সেট ডিজাইনের একটা পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল। এই-ই যা ... ’৭২ সালের জুলাই মাসে বজলুল করিম একটা নাটক করেছিলেন আর্মস এন্ড দ্যা ম্যান, সেটার সেট ডিজাইন আমি করেছিলাম। যদিও সেটারও পুরো দেখাশোনা উনি করেছিলেন, আমাকে হাতে ধরিয়ে শিখিয়েছিলেন। তো এতটুকু অভিজ্ঞতা, আর মামুনুর রশীদের বা আরণ্যকের পশ্চিমের সিঁড়ি নাটকে আমি লাইট ডিজাইন করেছিলাম, ব্যস, এ দিয়েই নাটক শুরু। জণ্ডিস ও বিবিধ বেলুন করার পর কিন্তু বিরূপ মন্তব্যও হয়েছিল। যেমন, আজাদ পত্রিকায় লিখেছিল- উন্মাদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে বাংলা মঞ্চে, এদের পিটিয়ে বের করে দেয়া উচিত।

হাসান শাহরিয়ার
এই প্রতিযোগিতার পর কি ধরে নিয়েছেন যে, থিয়েটারটা করবেন?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
না, তারপরও যে ভেবেছি যে, থিয়েটারই করবো এমন হয়তোবা না। তখন অন্যান্য আড্ডা হতো। সত্তর দশকের শুরুর দিকে বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে এরা কিন্তু বেশ প্রভাবিত করেছে আমাদের। আর রবীন্দ্রনাথকে বোঝা বা জানার শুরুটা কিন্তু আমার স্বাধীনতার পর থেকে শুরু ... মানে সেই অর্থে আমি কিন্তু অন্যদের থেকে অনেক পরে রবীন্দ্রনাথ জেনেছি। তো প্রথম দিকে কিন্তু আমি কেবল সেট বা লাইট ডিজাইনারই ছিলাম। নাট্যচক্রে, আরণ্যকে, বহুবচনে। জণ্ডিস ও বিবিধ বেলুন দেখতে এসেছিলেন আতাউর রহমান, বাদল রহমান, আলী যাকের ... তো আলী যাকের বললেন যে- আমরা বাকী ইতিহাস করছি, তুমিও আমাদের সাথে আসো। তো পরে কাজ করা হয়নি, কিন্তু নাগরিকের শোতে গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখি প্রচুর দর্শক, রোববার সকাল বেলা ... আমি খুব বিস্মিত হলাম। দর্শনীর বিনিময়ে এর আগে কবির আনোয়ার প্রদর্শনী করেছে, কিন্তু এতো অর্গানাইজড ওয়েতে না। নাগরিক বিজ্ঞাপন দিয়েছে, কাউন্টারে লাইন দিয়ে টিকেট কাটতে হচ্ছে এবং টানা আটটি সকাল তারা শো করেছিল বাকী ইতিহাস নাটকের। মূলত এই নাটকের সাফল্যই দর্শনীর বিনিময়ে নাট্যচর্চার ভীত গড়ে দেয়।

হাসান শাহরিয়ার
তখন আপনার ভাবনার দিকটা একটু বলুন।

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
আমার মনে হয় এরপর থেকেই আমি ভাবতে শুরু করি যে, এভাবে ... মানে নাগরিক যেভাবে করলো, সেভাবে নাটক করা যায় কিনা। এবং নাট্যচক্র যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীক, তাই এর বাইরে এরকম দর্শনীর বিনিময়ে নিয়মিতভাবে নাটক করা যায় কিনা। তো তখন আমি, কাজী শাহজাহান ববী, পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, হাবীবুল হাসান, রইস খান, ফারুক শিয়র, কাজী আলী হাসান, আল মনসুর, রাইসুল ইসলাম আসাদ, আবদুল কাদের, সেলিম আল দীন, ম. হামিদ সবাই মিলে বিজয়নগরের ভোগ ফ্যাশন বিল্ডিং-এ বসে ২৯ জুলাই ১৯৭৩-এ একটি মিটিং করি। সেই মিটিং-এ ম. হামিদই প্রস্তাব করে ‘ঢাকা থিয়েটার’ নামটা ... এবং নামটা আমাদের সবারই পছন্দ হলো। প্রথম আহ্বায়ক আমি, ম. হামিদ আর সেলিম আল দীন- এই তিনজন। আর আগে যাদের নাম বললাম তারা সবাই ছিল সদস্য হিসেবে। তখন আমরা ঘোষণা করেছিলাম যে দর্শনীর বিনিময়ে আমরা প্রফেশনাল থিয়েটার করবো এবং মানুষের মুক্তির জন্য থিয়েটার করবো- এসব গালভরা কথা দিয়েই শুরু হয়েছিল ঢাকা থিয়েটার হাঃ হাঃ।

হাসান শাহরিয়ার
কী কী নাটক করলেন প্রথম দিকে?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
তখন কিন্তু বিভিন্ন দলে খুব ভালো ভালো কিছু নাটক হয়েছে। আমি মনে করতে পারি আখতার কমল একটি নাটক লিখলো রংহীন সিগনাল- অসাধারণ নাটক, শাহানূর খানকে আমি জোর করে লিখিয়েছিলাম পেণ্ডুলামে খুন। ’৭২-’৭৩ সালে খুবই জনপ্রিয় নাটকের একটি হলো শাহনুর খানের সভাপতি বলবেন, এটি বহুবচন করেছিল। আর ঢাকা থিয়েটার প্রথম নাটক করলো ... প্রথম নাটক মানে আমরা দুটো নাটক দিয়ে শুরু করেছিলাম। সেলিম আল দীনের সংবাদ কার্টুন আর হাবিবুল হাসানের সম্রাট ও প্রতিদ্বন্দ্বীগণ। প্রথমটি নির্দেশনা দিই আমি আর দ্বিতীয়টি হাবিবুল হাসান নিজে। মাঝখানে ১০ মিনিটের বিরতি দিয়ে আমরা দুটো নাটকের মঞ্চায়ন করতাম। ১৯৭৩ সালে আমরা ডিডিএসএ মিলনায়তনের খোঁজ পেলাম। তখন ক্রীড়া পরিষদ থেকে ডিডিএসএ মিলনায়তনটি আমরা নিলাম এবং পর পর ১৩টি শো করলাম ঐ দুটো নাটকের। প্রথম শো হয় ৩ নভেম্বর ১৯৭৩ সাল। টিকেটের দাম ছিল ২টাকা আর ১টাকা। আমার মনে আছে ঐ শোগুলো শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, ফজল শাহাবুদ্দিন, শওকত আলী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শাহাদত চৌধুরী, রফিক আজাদ, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা সহ অনেকে দেখতে গিয়েছিলেন। এবং বিচিত্রায় কোনো নাটক নিয়ে প্রথমবারের মতো কাভার স্টোরি করে ... এটা আমি মনে করি শামসুর রাহমান আর শাহাদাত চৌধুরীর কৃতিত্ব।

হাসান শাহরিয়ার
আপনারা মহিলা সমিতিতে নাটক করা শুরু করলেন কবে থেকে?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
১৯৭৪ সালে আমরা নাটক নিয়ে চট্টগ্রামে যাই। সম্ভবত ওটাই প্রথমবারের মতো কোনো দলের ঢাকার বাইরে যাওয়া। এই ১৯৭৪ সাল থেকেই আমরা মহিলা সমিতিতে নাটক করা শুরু করি। এর আগে নাগরিকের সদস্যরা মহিলা সমিতি পরিষ্কার করে মঞ্চায়ন উপযোগী করে প্রদর্শনী শুরু করে।

হাসান শাহরিয়ার
তখন আর কারা কারা ওখানে নাটক করতেন?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
নাগরিক তো করতোই, বহুবচন করতো, থিয়েটার আসলো। রামেন্দু দা’ আর মামুনভাইয়ের সাথে আমার আগেই পরিচয় ছিল। আমি ওনাদের প্রথম নাটকে আলোয় সাহায্য করেছি।

বিপ্লব বালা
সুবচন নির্বাসনে-র?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
হ্যাঁ, এছাড়াও আমরা বিভিন্ন কাজে তাদেরকে সাহায্য করতাম। ঐ নাটকে আমি, আসাদ, আল মনসুর, খায়রুল আলম সবুজ, আবদুল কাদের সবাই মিলে তাদেরকে হেল্প করেছি ... তবে হেল্প করতে গিয়েই পরে আবদুল কাদের আর সবুজ সহ অনেকেই  ঐ দলে থেকে যায়।

হাসান শাহরিয়ার
দর্শনীর বিনিময়ে নিয়মিত নাট্যচর্চা কি তাহলে নাগরিকের পর আপনারাই শুরু করলেন?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
হ্যাঁ, তারপর থিয়েটার আর ’৭৬ সাল থেকে আরণ্যক নাট্যদল।

বিপ্লব বালা
শুরুতে নাটক ও দর্শক প্রতিক্রিয়া এগুলো নিয়ে কিছু বলুন।

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
প্রতি রোববার সকালে দর্শক হতো। বাকী ইতিহাস দেখে দর্শক বলতো ভালো, জণ্ডিস ও বিবিধ বেলুন দেখে বলতো সুন্দর, কিন্তু এটা কেমন থিয়েটার হলো? মানে আমি তো শুরুতেই একটু এ্যাবসার্ড নাটকের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ি, মানে শুরুতেই বিপথগামী হয়ে পড়ি হাঃ হাঃ, তো আবার সুবচন নির্বাসনে দেখে দর্শক বলে খুব ভালো নাটক। আমাদের এখন যেমনই মনে হোক না কেন তখন কিন্তু সুবচন নির্বাসনে, সংবাদ কার্টুন বা এধরনের সামাজিক নাটক দিয়েই দর্শক আসা শুরু করলো।

বিপ্লব বালা
ঢাকা থিয়েটারের শুরুর দিকের চিন্তা-ভাবনা কেমন ছিল ... মানে নতুন দেশ, নতুন একটা শিল্পচর্চা, নিয়মিত নাটক করা ... এসব কিছু মাথায় রেখে আপনাদের ভাবনাটা কী ছিল?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
আমাদের মূল ভাবনা ছিল যে, আমরা মৌলিক নাটক করবো। আমি এবং সেলিম তখনই ভাবছিলাম যে বাংলা মৌলিক নাটকের যে দুর্দশা, তা থেকে ...

বিপ্লব বালা
ও ওটা তখনই বুঝতে পেরেছিলেন?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
হ্যাঁ, আমাদের প্রথম মিটিং-এর রেকর্ড খাতাতেও উল্লেখ আছে- বাংলা নাটককে বিশ্ব নাট্যধারার সমপর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার অভিপ্রায় থেকেই দল তৈরি। মৌলিক নাট্যরচনার মধ্যেই বাংলা নাটকের মুক্তি। একটা ব্যাপার সত্য যে, আমরা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সাথে ছিলাম, সবার ভেতরেই কিন্তু মৌলিক নাটক করার একটা বাসনা ছিল... সেলিম আল দীন বা আখতার কমল বা শাহনূর খান বা হাবিবুল হাসান যার নামই বলি না কেন। এমনকি ভারতের বাংলা নাটকও এখানে হোক সেটার প্রতি আমাদের এক ধরনের অনীহা ছিল। আরেকটা কথা বলি- তখনকার ইয়াং জেনারেশন থিয়েটারটাকে বেছে নিয়েছিল একটা কারণে, তখন থিয়েটারটা আমাদের কাছে আশ্রয় মনে হয়েছিল ... ৩১ জানুয়ারি অস্ত্রটা সারেন্ডার করার পর নিজেকে উদ্বাস্তু মনে হয়েছে। আমাদের ঢাকা থিয়েটার কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদেরই দল, কাজেই নতুন দেশের ব্যাপারে আমাদের হতাশাটা একটু অন্যরকম ছিল ...

বিপ্লব বালা
কিন্তু তখন তো অনেকেরই রাজনৈতিক ভাবনাও ভিন্ন ছিল ...

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
হ্যাঁ, আমিও যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ে বাম রাজনীতির চর্চা করতাম- ছাত্র ইউনিয়ন করতাম।  কিন্তু আমার ভেতর একটা জিনিস সব সময়ই কাজ করতো যে- রাজনীতির বাইরেই শিল্প চর্চা বা বিকাশ লাভ করা উচিত, রাজনীতি থাকবে কিন্তু তা শিল্পকে ডমিনেট করবে না।

বিপ্লব বালা
এই ভাবনাটা আপনার মধ্যে কী করে এলো?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
এটা সম্ভবত বজলুল করিমের শিল্পচর্চাটা চোখের সামনে দেখেছি, আর রবীন্দ্রনাথ তো সবচেয়ে বড় শিক্ষক, সেই কারণে হয়তো এটা ঘটে থাকবে। আর একটা হলো আমার একজন জ্যাঠা আছেন, উনি ভালো পুঁথি পাঠ করতেন ... গ্রীষ্মের বন্ধে যখন বাড়ি যেতাম, তখন ওনার পুঁথিপাঠ শুনতাম। গ্রামের শত শত লোক সারা রাত বসে সেটা শুনতো। ওনার এই পুঁথিপাঠ তখন আমার কাছে অসাধারণ মনে হতো। সুতরাং আমার কাছে মনে হয়েছে- রাজনীতি নিজের অধিকার আদায়ের সচেতন প্রয়াস আর মানুষের মনের সুকুমার চিন্তার যে জায়গা থাকে সেটা শিল্প ছাড়া বের হওয়ার কোনো পথ নেই।

বিপ্লব বালা
তার মানে রাজনীতিটা যাদের ভাবনাকে ডমিনেট করছে, তারা শিল্প-সাহিত্য বুঝতে অনেক দেরি করছে। আপনার নেকটা শিল্প-সাহিত্যের প্রতি একটু বেশিই ছিল ...

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
হ্যাঁ, আমার একটু বেশিই ছিল ... এটা নিয়ে সিরাজ সিকদারের সঙ্গে আমার দীর্ঘ আলাপ হয়েছিল, যখন উনি রবীন্দ্রনাথকে প্রত্যাখ্যান করার একটা আহ্বান জানাবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তখন এটার আমি প্রতিবাদ জানিয়েছিলাম এবং উনি আমার বাসায় এসে এটা নিয়ে দীর্ঘ ডিবেট করেছিলেন ... আমি বলেছিলাম যে, ন্যাশনাল ট্রেজার আপনি বাদ দিয়ে বিপ্লবী সাহিত্য তৈরি করতে চান। জোয়ার ভাটা প্রকৃতিতে যেমন আছে, সমাজেও আছে। জোয়ারের সময় অনেক কিছুর প্রয়োজন হয় কিন্তু ভাটার সময় তো উন্মাদনার প্রয়োজন নেই। ভাটাও তো জীবনে একটা অনিবার্য জায়গা। আর জীবনের স্বাভাবিকতা এবং প্রাকৃতিক নিয়মেই রবীন্দ্রনাথের প্রয়োজন- রবীন্দ্রনাথ অনিবার্য।

বিপ্লব বালা
আপনারা প্রথম যে নাটক দুটো করলেন, সেগুলো কি দলের জন্যই লেখা হয়েছিল?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
হ্যাঁ, দলের প্রযোজনার জন্যই লেখা। আমরা প্রথমেই চাচ্ছিলাম না যে উৎকট রাজনৈতিক থিয়েটার করতে। সংবাদ কার্টুন-এ সেলিম রাজনৈতিক স্যাটেয়ারগুলো এনেছে কিন্তু স্লোগানের মতো করে আসেনি। তখন তো চারিদিকেই স্লোগান ... এ রকম সময়ে খুব সিরিয়াসলি তারা এই দুটো নাটকই লিখেছে। এমন কি ’৭৪-এর দুর্ভিক্ষের আগাম সংবাদও কিন্তু ঐ নাটকে আছে, ফলে ’৭৪-এ এই নাটক বন্ধও করে দেয়া হয়েছিল।

বিপ্লব বালা
তাই নাকি? এই তথ্য তো আগে পাইনি বা আমরা জানি না।

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
আমরা ওটাকে ইস্যু করতে চাইনি। পরে অবশ্য বঙ্গবন্ধুই আবার পারমিশন দিয়েছিলেন। আমরা ওটার ১৩টা শো করেছিলাম।

হাসান শাহরিয়ার
দর্শক সমাগম কেমন হতো?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
প্রচণ্ড! তখন আমরা ছোট নাটক করতাম ... দেশের অবস্থা ভালো ছিল না। আটটার মধ্যে শেষ করে দল বেঁধে শান্তিনগর মোড়ে চলে আসতাম। ওখান থেকে মেয়েদেরকে কারো সাথে পাঠিয়ে দেয়া হতো।

বিপ্লব বালা
পুরো নাট্যপাড়ায় তখন কোন কোন অভিনেত্রী ছিলেন?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
নাগরিকে নায়লা খান, সারা যাকের, লাকী ইনাম, সুলতানা কামাল, মিনু বিল্লাহ, থিয়েটারে ফেরদৌসী মজুমদার, রুবিনা আর আমাদের এখানে শিমূল, নুপুর, দীপা খন্দকার।

হাসান শাহরিয়ার
ঢাকা থিয়েটারে আমরা যাদের যাদের দেখছি তাদের আগমন কখন? মানে  ...

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
হ্যাঁ, বলছি। পীযূষ আর আসাদ তো ফাউন্ডার মেম্বার। ’৭৪-এ আফজাল আসলো, জামিল আহমেদ আসলো, শিমূল আসলো। তাদের আগমনটা কিন্তু দলে নতুন মাত্রা নিল। আফজালের পেইন্টিং-এর কনসেপ্ট, শিমূলের মিউজিক কনসেপ্ট। মাহবুব আলী, রফিক মাহমুদ, আনোয়ার ফারুক এরা সবাই ’৭৪-এ আসলো। আসলে যাদের নিয়ে তোমাদের প্রজন্ম ঢাকা থিয়েটারকে চেনে, ওদের বেশিরভাগই ’৭৪-এ জয়েন করেছে।

হাসান শাহরিয়ার
তখন নাটকের প্রচারটা কীভাবে করতেন?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতাম। কীভাবে বিজ্ঞাপন দেব, কোন সাইজের হবে এগুলো আলী যাকের, রামেন্দু মজুমদার ঠিক করে দিতেন ... ওনারা বিজ্ঞাপনী সংস্থার লোক, তাই ওনারাই এগুলোর ইনিসিয়েটর।

বিপ্লব বালা
ও তার মানে তখন এক দলের সাথে অন্য দলের বোঝাপড়াটা ভালোই ছিল।

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
খুবই ভালো ছিল। আমরা যখন ’৭৪ সালে চট্টগ্রাম শো করতে গেলাম, ফিরে এসে সব দলের লোকজনকে দাওয়াত দিলাম। ফখরুদ্দীনের বিরানী খাওয়ানো হলো আর চট্টগ্রামের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করা হলো। প্রায় ১৫০ জন নাট্যকর্মী উপস্থিত ছিল। সম্পর্কটা এমনই ছিল।

হাসান শাহরিয়ার
আচ্ছা, বাচ্চুভাই, ঢাকা থিয়েটার যখন ফর্ম করলেন বলেছিলেন যে- আপনারা পেশাদারী থিয়েটার করবেন? কিন্তু পরে তো এর কোনো উদ্যোগ দেখলাম না। কেন?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
আসলে তখন রাজনৈতিক অস্থিরতা একটা বড় ব্যাপার ছিল ... ওটা খুবই ক্ষতি করেছে। থিয়েটার করা থেকে অন্য কিছুই বেশি ভাবতে হয়েছে। সেটা ’৭৪-’৭৫ সালের কথা বলছি। এখনো কিন্তু থিয়েটারের চেয়ে অন্য কিছু বেশি ভাবছি বলেই থিয়েটারটা দুর্বল হয়ে পড়ছে। তবুও তখন থেকে চেষ্টা করেছি অন্তত ভালো নাটক যেন উপহার দেয়া যায়।

বিপ্লব বালা
আগে যাত্রা দেখতেন?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
না, ’৭০ সালে আমি প্রথম যাত্রা দেখি ...

বিপ্লব বালা
তখন তো যাত্রা-র ভীষণরকম রমরমা অবস্থা।

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
ভীষণ ... আমরা তখন অমলেন্দু বিশ্বাসের অন্ধ ভক্ত। উনি যে অভিনয় করতেন এর তুলনা হয় না ... অসাধারণ। ’৭৩-’৭৪ সালেও যখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যাত্রা দেখেছি তখন থেকেই ভাবতাম যে- এটাই তো আমাদের নিজস্ব ফর্ম। মুনতাসির ফ্যান্টাসী-তে যাত্রা’য় যেভাবে মিউজিকটা হয় অনেকটা সেভাবেই করেছি। শিমূল রেডিও থেকে লাল চাঁন মিয়াকে নিয়ে আসতো। মহিলা সমিতিতে বসে সানাই বাজাচ্ছে আর দর্শক ঢুকছে ... এবং একধরনের মুখোশও ব্যবহার করলাম এই নাটকে এবং প্রথমবারের মতো। মুনতাাসির ফ্যান্টাসী নাটকের সুরে কিন্তু ফোকের একটা ইনফ্লুয়েন্স আছে। ফোকটা কেন জানি আমাদের খুব টানে ... এই নাটকে নাচ ব্যবহার করেছি, নাচ অবশ্য সংবাদ কার্টুন থেকেই ব্যবহার করেছি, আমি নাচ জানি না কিন্তু নাচ আমাকে টানে।

হাসান শাহরিয়ার
আপনি যে সময়ের কথা বলছিলেন, তখন তো থিয়েটার বোধহয় পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় করছে। তো ঐ নাটকটা নিশ্চয় আমাদের একটা মাইল ফলক হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
অবশ্যই, আমি ’৭৫ সালে যখন টেলিভিশনে জয়েন করি, তখন একদিন সৈয়দ হকভাইয়ের সাথে কথা হয় ... আমি ছিলাম, সেলিম আল দীন ছিল ... তো দীর্ঘক্ষণ কথা হয়েছিল। উনি বলছিলেন যে- পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় লিখেছেন এবং সেটা থিয়েটার’কে দিয়েছেন। ওনার এই কাব্যনাটক সম্পর্কে শুনলাম এবং আমি খুব আগ্রহ বোধ করলাম। এই নাটকের পর ফেরদৌসী মজুমদারকে আমরা বিশালভাবে আবিষ্কার করি, আবদুল্লাহ আল-মামুনভাইও এটাতে অনেক ভালো করেছেন ...

হাসান শাহরিয়ার
আমাদের আর কোনো নাট্যকার কিন্তু সাহিত্যের অন্যান্য ক্ষেত্রে ওনার মতো রিচ ছিলেন না। উনি এসেই কিন্তু দেখাতে পারলেন মঞ্চনাট্যসাহিত্যও কোথায় নিয়ে যাওয়া যায়, তাই না?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
কথা হচ্ছে কি ফরহাদ মযহার, সাজ্জাদ কাদির, শাহানূর খান এরা কিন্তু কবি-নাট্যকার হিসেবে এসেছিলেন। কিন্তু তারা আবার চলে গেলেন। কবিদের মধ্যে কেবল শাহানূর খানই উপস্থিত। কিন্তু উনি কাব্যনাটক লিখেননি। আমি মনে করি আমাদের আধুনিক বাংলা থিয়েটারে কাব্যনাট্যের প্রথম সাক্ষাৎ পাই এই পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নাটকের মাধ্যমে।

বিপ্লব বালা
হকভাইয়ের সাথে কী যেন আলাপের কথা বলছিলেন।

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
হকভাই তখন আমাদের থিয়েটার নিয়ে, থিয়েটার ভাবনা নিয়ে, থিয়েটারের প্রায়োগিক দিক নিয়ে কথা বললেন। উনি যেহেতু দীর্ঘদিন পশ্চিমে ছিলেন তাই প্রথম দিকে আমাদের সাথে ওনার দূরত্ব ছিল। উনি ওনার নাটকে পয়ার ছন্দের ব্যবহার করা নিয়ে আলোচনা করছিলেন। ওনার একটা বিশেষ গুণ আছে সেটা হলো ‘পাঠ’। উনি যে ভাবনা নিয়ে লিখেছেন, সেটা উনি পাঠ করে বুঝিয়ে দিতে পারেন। আমি অবশ্য অনেক সময় দুষ্টুমি করে বলতাম যে- আপনি তো অস্বর্ন দ্বারা প্রভাবিত, আপনার কাব্যনাট্যের সাথে আমাদের প্রাচ্যের কাব্যনাট্যের বা আমাদের পালাগানের কোনো সম্পর্ক নেই ... তো উনি বলতেন যে হ্যাঁ, নেই। বাংলা নাটক ওনার কাছ থেকে একটা বড় জিনিস পেয়েছে, তা হলো- নাটকে উনি আঞ্চলিক কোয়েনগুলোকে তুলে আনতে পেরেছেন ... নাট্যশরীর নির্মাণ করেছেন ওগুলোর সুব্যবহারে।

হাসান শাহরিয়ার
ওনার আগে আমরা নাট্যকার হিসেবে যাদের পেয়েছি তারা কিন্তু সরাসরি কোনো না কোনো নাট্যদলের সাথে জড়িত ছিলেন। এই প্রথম আমরা একজন নাট্যকার পেলাম যিনি সরাসরি কোনো নাট্যদলের সাথে জড়িত না। তারপরও এমন ভালো নাটক কীভাবে আসে?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
উনি কিন্তু পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় লিখেই বলেছেন এটা অভিনীত হওয়ার জন্য লিখেছেন। তবে আমি মনে করি প্লে-রাইট থাকাটা জরুরি, এবং প্লে-রাইট হচ্ছেন তিনি যিনি যেকোনো থিয়েটারের সাথে যুক্ত। তবে হকভাইকেও আমি প্লে-রাইট বলতে চাই, কারণ, উনি কিন্তু দুটো নাট্যদলকে নাটক দিয়েছেন- থিয়েটার আর নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়- সেই দুটো দল সম্পর্কে ওনার ভালো ধারণা আছে। এবং এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে- হকভাইয়ের আগমন আমাদের থিয়েটারে একটা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সেলিম আল দীন যেমন এবস্ট্রাকশন এবং সর্বোপরি বাঙলা লোকনাট্য আঙ্গিক ও শিল্পরীতি আশ্রিত আধুনিক নাটক নিয়ে কাজ করেছেন, আবদুল্লাহ আল-মামুন যেমন কাজ করেছেন সামাজিক নাটক নিয়ে, মামুনুর রশীদ কাজ করেছেন রাজনৈতিক থিয়েটার নিয়ে, মমতাজ উদদীন আহমেদ স্যাটেয়ার নিয়ে ... ঠিক সে সময় হকভাই নিয়ে আসলেন কাব্যনাটক।

বিপ্লব বালা
কিন্তু রাজনৈতিক বিষয়, মুক্তিযুদ্ধ নিয়েই কিন্তু কাব্যনাটকগুলো এনেছেন ...

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
অবশ্যই। আসলে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়-এর আগে কিন্তু এতো বিশাল ক্যানভাসে মুক্তিযুদ্ধের উপর নাটক কেউ লেখেননি। মমতাজ উদদীন আহমেদ লিখেছেন ফলাফল নিম্নচাপ, কিন্তু সেটা এতোটা বড় ক্যানভাসে না। ঐ সময়ে অন্যান্য সব দলের নাটকের মধ্যেই কিন্তু একটা কমন সুর লক্ষ্য করা যায়। সমাজ, রাজনীতি ... এসব। আমরা করছি মুনতাসির ফ্যান্টাসী, নাগরিক করছে সৎমানুষের খোঁজে, থিয়েটার করছে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়,  আরণ্যক করছে ওরা কদম আলী। কিন্তু প্রত্যেকটাই হচ্ছে একেকটা শিল্পের এক্সপ্রেশন। এটিই হচ্ছে সত্তর দশকের মধ্যভাগে থিয়েটারের একটা বড় অর্জন।

হাসান শাহরিয়ার
আপনারা তো পথনাটকও শুরু করেছিলেন।

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
হ্যাঁ, সেটা ১৯৭৭ সালে। সেলিম আল দীনের চর কাকড়ার ডকুমেন্টারী ...  ‘নাচাও রাস্তা নাচাও’ নামে একটা আন্দোলন শুরু করলাম এটা দিয়ে। যদিও আমরা দাবী করি যে ঢাকা থিয়েটার প্রথম পথনাটক শুরু করে, কিন্তু চট্টগ্রামে মিলন চৌধুরী যায় দিন ফাগুন যায় নামে একটি পথনাটক করেছিলেন ’৭৭-এর শুরুতেই। গণায়ন নাট্য সংস্থা এটি করেছিল, যদিও একটি শো করে এটি বন্ধ হয়ে যায়। সেদিক থেকে ঢাকা থিয়েটার নিয়মিত পথনাটক শুরু করে ’৭৭ সালে ‘চর কাঁকড়ার ডকুমেন্টারী’ দিয়ে।

বিপ্লব বালা
এরমধ্যে বজলুল করিমের আর কোনো কাজ হয়নি?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
হ্যাঁ, হয়েছে। ’৭৪ সালে উনি করেছিলেন দান্তে’স ডেথ, মহিলা সমিতিতে, অসাধারণ প্রযোজনা। আমাকে যদি ’৭৫ পর্যন্ত সবচেয়ে ভালো প্রযোজনা কোনটি প্রশ্ন করা হয়, আমি বলবো দান্তে’স ডেথ। ওনারা ’৭২ সালে করেছিল আর্মস এন্ড দ্য ম্যান, বার্নাড ’শ-র। এগুলোও কিন্তু দর্শনীর বিনিময়ে করা।

বিপ্লব বালা
আপনাদের কাজ দেখে ওনাদের প্রতিক্রিয়া বা মন্তব্য কী ছিল?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
উনি বলতেন কাজ করছ ঠিকই কিন্তু তোমাদের মধ্যে পরিমিতিবোধের অভাব আছে। এটা উনি বলতেই পারেন, কারণ, উনি ইউরোপ থেকে এসেছেন, ওনার জানার বহর ছিল বিশাল। আর আমরা তো একেবারেই শূন্য থেকে শুরু করেছি ... আমাদের মধ্যে একটা ’র ব্যাপার থাকতেই পারে।

হাসান শাহরিয়ার
আপনাদের পথনাটক নিয়ে বলছিলেন ...

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
হ্যাঁ, মুনতাসির ফ্যান্টাসি ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে করতে গিয়ে দেখলাম যে মানুষ ভেঙে পড়ছে ... হাজার হাজার মানুষের তবুও অদেখাই থেকে যায়। তখন আমরা ঠিক করলাম যে- আমরা রাস্তায় নাটক করবো। সেলিম আল দীন লিখে ফেললো- চর কাঁকড়ার ডকুমেন্টারী। এবং এখনও আমার মনে হয় এটি সেলিমের ওয়ান অব দ্য বেস্ট রাইটিংস। সেট-টাও ভালো হয়েছিল।

বিপ্লব বালা
পথনাটকেও সেট করেছিলেন?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
হ্যাঁ, আমি এবং আফজাল মিলেই করেছিলাম, পিছনে বিশাল একটা ক্যানভাস, তারমধ্যে বিভিন্ন পত্রিকা লাগানো, তার সামনে অভিনয়টা হতো। এটাতে সুরিয়েলিস্টিক একটা ব্যাপার ছিল।

বিপ্লব বালা
এধরনের নাটক রাস্তার মানুষদের সাথে কমিউনিকেট করতো?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
হ্যাঁ, করতো। আসলে আমি তো তাদের কথাই বলছি। কমিউনিকেট করবে না কেন? ঢাকায় যারা সমুদ্র চেনে না, গ্রাম চেনে না, তাদের সমস্যা হতে পারে। ... এটা করতে গিয়ে একটা কাণ্ড হয়েছিল- আমরা টিএসসি-তে নাটক করছি, তো আমাদের পুলিশ ধরে নিয়ে গেল ... তখন মার্শাল ’ল চলছিল, আমাদের মাঝে হাবিবুল হাসান, শিমূল এবং আমি সহ  ১২/১৩ জনকে পুলিশ গ্রেফতার করলো ... কারণ আমরা লোক জমায়েত করছি, কিন্তু কেন করছি, কী নাটক করছি, কিছুই তারা বুঝতে পারছিল না ... ওয়ারলেসে স্ক্রীপ্ট পড়ে শোনানো হচ্ছে, ওপাশ থেকে বলছে যে- ঐ যে প্রাণীটা মারা গেল নাটকে, সেটা কী শেখ মুজিবকে বোঝানো হয়েছে কিনা ইত্যাদি হাঃ হাঃ ... ’৭৭ সালে এভাবে নাটক করাটা কিন্তু খুব সাহসী পদক্ষেপ ছিল। আমাদেরকে অবশ্য ঐ দিনই ছেড়ে দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এস এম সোলায়মান এসে পথনাটককে আরো বেগবান করলো। আমরা ’৭৭ সালেই মঞ্চে আনলাম হাবিবুল হাসানের কসাই। এই প্রথম আমরা রিয়েলিজমের দিকে গেলাম।

হাসান শাহরিয়ার
নিজস্ব নাটক করবেন, এমন ঘোষণা দিয়ে শুরু করেছিলেন, তাহলে তখন তো আপনাদের সামনে রবীন্দ্রনাথও ছিল, ওদিকে যাননি কেন?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
তখন আসলে রবীন্দ্রনাথ বুঝতেই পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল ওটা কেবল পাঠই করা যায়, মঞ্চে আনা যায় না। তো কসাই রিয়েলিস্টিক মানে কিন্তু একেবারেই রিয়েলিস্টিক ... গাছ মানে আস্ত গাছ কেটে মঞ্চে বসিয়ে দিচ্ছি, ঘর মানে মঞ্চে ঘর বানিয়েছি হাঃ হাঃ ...

বিপ্লব বালা
আপনার দল এই নাটক নিয়ে কথা বলেনি যে- কেন এধরনের নাটক নেয়া হলো .. এসব?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
না, কসাই-এর মধ্যে কাব্যের এক ধরনের ভাব ছিল। একটা মানুষ গরু জবাই করতে করতে এক সময় নিজের সন্তান জবাই করছে ... সেসময় সবাই আমাকে বলছিল যে, আমি এ্যাবসার্ডের দিকে চলে যাচ্ছি, কোনো কিছুই সরাসরি বলছি না, তখনই আসলে এই নাটকটার কথা ভাবি। কিন্তু কসাই-কে কখনো আমাদের প্রযোজনা বলে মনে হয় না।

হাসান শাহরিয়ার
আরণ্যক যদিও ’৭২ সালের দল, কিন্তু তারা নিয়মিত কাজ শুরু করে ’৭৬-এ। তদ্দিনে আপনারাতো অনেক কাজ করে ফেলেছেন। তো ওনারা আপনাদের সাথে তাল মেলাতে পেরেছিল?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
হ্যাঁ, অবশ্যই। মামুনুর রশীদের ওরা কদম আলী দিয়ে তারা নিয়মিত নাট্যচর্চায় ঢুকলো। তাদের স্লোগানই হলো- নাটক শ্রেণী সংগ্রামের হাতিয়ার। সেদিক থেকে এই নাটক বিষয়বস্তু ও রাজনৈতিক দর্শনের দিক থেকে একেবারে ভিন্ন একটি মাত্রা যোগ করেছিল বাংলাদেশের নাট্যচর্চায়। যদিও প্রায়োগিক দিক থেকে খুব যে আধুনিক তা নয়, একেবারে রিয়েলিস্টিক ফর্ম। কিন্তু রিয়েলিজমের ভেতরের জায়গাটা মামুনুর রশীদ এবং তার দল আত্মস্থ করতে পেরেছিল, যেটা কসাই-তে আমি ফেল করেছি। ওরা কদম আলী-র আরেকটা দিক ছিল যে ওদের অভিনয়ের বিশ্বস্ততা।

হাসান শাহরিয়ার
আপনার কাজে এ্যাবসার্ডিটি বেশি আসছিল বলছিলেন ... তো আপনি সাঈদ আহমদ বা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ বা বাইরের এয়োনেস্কো বা বেকেটের কাজ নেননি কেন? নাগরিক তো মাইলপোস্ট করলো ওয়েটিং ফর গডো করলো ...

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
হ্যাঁ, তারা করেছে। মাইলপোস্ট প্রযোজনা হিসেবে আমার ভালো লেগেছিল কিন্তু আমার সব সময় মনে হয়েছে ‘মাইলপোস্ট’ কখনোই বাংলাদেশের বা তৃতীয় বিশ্বের মানুষের রেফারেন্স পয়েন্ট হতে পারে না ... বাঙালির জন্য একটা তালগাছ বা বট গাছ রেফারেন্স পয়েন্ট হতে পারে। যে জন্য আমার মনে হচ্ছিল ইউরোপ থেকে আমদানি করে সাঈদ আহমদ বাংলাদেশের কনটেক্সট-এ বসিয়েছেন।

হাসান শাহরিয়ার
আপনার কি প্রাসঙ্গিক মনে হয়নি?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
আমার কাছে খুব একটা প্রাসঙ্গিক মনে হয়নি।

বিপ্লব বালা
শকুন্তলা-র দর্শক রিয়েকশন কেমন পেয়েছিলেন?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
মারাত্মক! শকুন্তলা দেখতে তখন হলে দর্শক উপচে পড়তো। ’৭৭-এর শেষের দিকে সেলিম ওটা লিখলো, আর আমরা মঞ্চে আনলাম ’৭৮-এ। আমরা চিন্তা করছিলাম এটার প্রেজেন্টেশন কি করবো তা নিয়ে। সেলিমের ভাষাটা হচ্ছে ক্লাসিক বাংলা ল্যাঙ্গুয়েজ, যদিও আধুনিক কনস্ট্রাকশন ... কিন্তু গদ্যে লেখা, কাব্য নয়। শকুন্তলা দিয়ে সেলিম আমাদের একটা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয় ... ১৩/১৪ বছর বয়সের শকুন্তলায় কাকে পেতে পারি, গৌতমীর চরিত্রে কাকে পেতে পারি। আমাদের শিমূল, সুবর্ণা, দীপা ওদের বয়স তখন ১৮-১৯। আর দুনম্বর হচ্ছে ক্ল্যাসিক্যাল থিয়েটার এ্যাপ্রোচের সঙ্গে আমার খুব একটা পরিচয় ছিল না। মূল শকুন্তলাটা বাংলায় একবার পড়েছি কিন্তু ঐ শকুন্তলার সাথে এই শকুন্তলার কোনোই মিল নেই।

হাসান শাহরিয়ার
আপনি ডিজাইনটি শেষ পর্যন্ত করলেন কীভাবে? এটাতো বোধহয় সেলিম স্যার, আপনি এবং সর্বোপরি ঢাকা থিয়েটারের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা ছিল।

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
হ্যাঁ, সেলিম এটা কেন ঐ সময়ে লিখলো, সেটা বের করা জটিল ... আমার কাছে মনে হয়েছে এটার মাধ্যমেই সেলিমের নিজেকে ভাঙনের শুরু। আর ডিজাইনে আমি একেবারে সিম্পলিসিটির আশ্রয় নিয়েছিলাম। যারা স্বর্গ থেকে আসছে তাদেরকে আমার নীল মনে হয়েছে, আর যারা মর্তের লোক তাদেরকে গেরুয়া পোষাক দিয়েছি, অনেকটা মাটির কাছাকাছি। খুব সিম্পল লাইনে কাজ করেছি। তখন জীবন যাত্রা ছিল সিম্পল ... শকুন্তলা চরিত্রে সুবর্ণা অভিনয় করেছিল, যদিও ওর বয়স ছিল ১৮। শিমূল করেছে গৌতমীর চরিত্র, মাত্র ২০বছর বয়সে। আসাদ করেছিল বিশ্বামিত্র, পীযূষ কণ্ব, আফজাল নারদ, অনুতোষ ইন্দ্র ... সবাই ভালো অভিনয় করেছিল।

হাসান শাহরিয়ার
হুমায়ূন ফরীদি তখনো আসেননি?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
হ্যাঁ, ও এই নাটকের মাধ্যমেই ঢাকায় নাটক করা শুরু করলো। তক্ষকের ভূমিকায় অভিনয় করেছিল। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তো সে। আমি গিয়েছিলাম আন্তঃহল নাট্যপ্রতিযোগিতায়, বিচারক হিসেবে। ওর নিজের লিখিত, নির্দেশিত ও অভিনীত একটি নাটক দেখলাম, সে ফার্স্ট হয়েছিল ... তো বললাম যে- তুমি ঢাকায় অভিনয় করতে চাইলে আমাদের দলে আসতে পার। এভাবেই ও আসলো।

বিপ্লব বালা
শকুন্তলা-র পর থেকেই আমরা আপনাদের নাটকের একটা বাঁক খুজে পাই এবং সেটা দেশজ বা নিজস্ব নাট্য আঙ্গিক নির্মাণের প্রচেষ্টা। আপনারও কি তাই মনে হয়?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
না, স্পষ্টভাবে নয়। শকুন্তলা-র পর আমরা করি সাজেদুল আউয়ালের ফণিমনসা। এই নাটক দিয়েই আমরা প্রসেনিয়াম থেকে বের হয়ে এলাম। মহিলা সমিতি মিলনায়তনের ফ্লোরে এটার ডিজাইন করা হলো। জামিল আহমেদ সেট ডিজাইন করেছিল। আমরা এটাতে মাস্কের ব্যবহার করেছি এবং এই নাটকের পরেই আমরা করি কীত্তনখোলা। এবং আমরা শুনি যে আজকের যে সেলিম আল দীন, তার শুরুটা আসলে এই কীত্তনখোলা দিয়েই।

হাসান শাহরিয়ার
আমরা এ-ও শুনি যে আজকের সেলিম আল দীন, ঢাকা থিয়েটার এমনকি নাসির উদ্দিন ইউসুফও এই ‘কীত্তনখোলা’ থেকে শুরু।

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
উত্তর দেব না, নো কমেন্ট!

বিপ্লব বালা
শুরুটা কি তাহলে ফণিমনসা দিয়ে বলতে চাচ্ছেন?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
না, প্রাথমিকভাবে মনে হতে পারে ফণিমনসা দিয়েই শুরু। কিন্তু মঞ্চে আমরা যে মহাকাব্যিক এপ্রোচ আনার চেষ্টা করি বা করছি সেটা কীত্তনখোলা দিয়েই শুরু। এটাতে যুদ্ধ উত্তর বাংলাদেশের জনজীবনকে তুলে এনেছে যাদের সম্পর্কে আমরা জানি না, খোঁজ নিই না। বহুদিন পরে বাংলা থিয়েটারে এরকম একটা লেখা পাওয়া গেল। সেট ডিজাইন নিয়েও জামিল অনেক চিন্তা-ভাবনা করেছিল। আমাদের ভাবনা ছিল নন্দলাল বসুর একটা কাজের এক্সপ্রেশন নিয়ে সেট ডিজাইনটা করা। সেই ভাবনা থেকেই জামিল সেটটা করলো। এরই মধ্যে টি এস এলিয়টের ‘ওয়েস্টল্যান্ড’ পড়ে ফেলেছি। সেখান থেকে একটা ভাবনা এলো যে পোড়া মাটির একটা ইমেজ থাকলে ভালো হয়, কারণ এটাতো পোড় খাওয়া মানুষের গল্প। পরে জামিল সেভাবেই করলো।

হাসান শাহরিয়ার
জামিলভাই প্রসঙ্গে বলি, শোনা যায় উনি যখন সেট ডিজাইন করেন তখন তিনি এক্টর’স ডিজাইনার হতে চান না, ওনার ডিজাইনকে মাথায় রেখে এক্টরসদের চলতে বলেন। যাকেরভাই বলেছিলেন- ওনার অচলায়তন নাটকের সেটের সময় তুমুল তর্কও নাকি হয়েছিল। তো আপনার সাথে যখন কাজ করেন তখন ওনার ভাবনা আর আপনার ভাবনার মিলনটা কীভাবে ঘটান?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
আমার সাথে কোনো সমস্যা হয় না। ইনফ্যাক্ট ও-তো আমার সাথেই থিয়েটারে এসেছে, সুতরাং আমার ব্যাপারে ওর একটা আলাদা কনসিডারেশনতো থাকবেই। আমার কাছে মনে হয়েছে ও কোথাও রিজিড। কিন্তু আমার ভাবনাগুলোকে সে সব সময়ই প্রাধান্য দেয় বা দিত।

বিপ্লব বালা
কীত্তনখোলা-য় কি ন্যারেশন ছিল?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
না, তবে স্ক্রীপ্টে ছিল, আমি বাদ দিয়েছি। কারণ, তখনও ন্যারেটিভ স্কুল নিয়ে আমি শিওর ছিলাম না। সেলিম বলেছিল ন্যারেশনগুলো রাখতে ... ও বলেছিল যে- এমন অনেক কথা আছে যেগুলো সংলাপ দিয়ে বোঝানো যায় না, ন্যারেশন লাগে ... সেলিম আসলে আমাকে কনভিন্স করার চেষ্টা করেছিল। ও বলতো যে শেক্সপীয়ারের সংলাপ কিন্তু ন্যারেটিভ, ওনার সমস্ত ভালো সংলাপ ন্যারেটিভ। ম্যাকবেথ, লেডি ম্যাকবেথ, হ্যামলেট সবাই প্রচুর কথা বলছে এবং সবই স্বগত সংলাপ। এখন কথা হচ্ছে আমরা ন্যারেশন বলি, উনি বলেননি ... কিন্তু ন্যারেশন সব বিশ্বমানের নাটকেই আছে। কীত্তনখোলা কিন্তু সাতঘন্টার নাটক ছিল, আমি এটাকে করেছি পৌনে তিনঘন্টায়।

হাসান শাহরিয়ার
আপনি বললেন যে- সেলিমস্যার ন্যারেটিভ নাটক লিখে ফেলেছেন, কিন্তু আপনি তখনও বুঝে উঠতে পারেননি কীভাবে তা উপস্থাপন করবেন।

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
মানে আমার স্কুলিং তো হয়েছে ওয়েস্টার্ন ধাঁচে ... আমি দেখেছি বজলুল করিমকে, পরে দেখেছি নাগরিককে, আবদুল্লাহ আল-মামুনকে। সুতরাং আমার মনে হয় আমি সেলিমের চেয়ে একটু পরে ভেবেছি ন্যারেটিভ থিয়েটার সম্পর্কে ...

হাসান শাহরিয়ার
কিন্তু আপনার বিচরণ আর সেলিমস্যারের বিচরণ তো একই হওয়ার কথা। নাকি উনি সাহিত্যিক বলে বিশ্বসাহিত্যকে উনি যেভাবে ছুঁতে পারছিলেন, আপনি নির্দেশক বলে ওটা হয়ে ওঠেনি?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
একদম এ কথাটাই আমি বলতে চাচ্ছি। ইডিপাস তো পুরোটাই ন্যারেটিভ তাই না? কিন্তু ঐ টেক্সট তো সেলিমের জানা, শেক্সপীয়ার তো সেলিমের জানা বা আমারও জানা, কিন্তু এগুলোর দৃশ্যকাব্য কিন্তু ঐভাবে আমাদের জানা ছিল না।

বিপ্লব বালা
আপনাদের শুরুটা তো ওয়েস্টার্ন ট্রেন্ড দিয়েই, কিন্তু এই যে নিজস্ব আঙ্গিক নির্মাণ করতে চাইলেন, এর প্রয়োজনটা বোধ করলেন কীভাবে?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
আমাদের নিজেদের একটা ভাবনা জাগল যে- আমাদের নিজেদের কোনো আঙ্গিক বা রীতি নাই নাকি ... আমরা যেটা করছি বা দেখছি সেটা আমাদের থিয়েটার কিনা? আসলে আমরা তখন দেখলাম যে একমাত্র রবীন্দ্রনাথ বাংলা থিয়েটারটা ভেবে কাজ করেছিলেন ... এসব কারণে আমরা দেশজ নাট্য আঙ্গিক নির্মাণ করতে চেয়েছি এবং আমরা গ্রাম থিয়েটার করেছি।

হাসান শাহরিয়ার
গ্রাম থিয়েটার কবে থেকে শুরু করলেন?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
’৮০ সালে দিকে। সেলিম আল দীন বললো যে- আমাদের তো কেবল শহরে নাটক করলেই হবে না, গ্রামেও নাটক করতে হবে ...

বিপ্লব বালা
এটা কি রাস্তায় নাটক করার পর?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
হ্যাঁ, তার পরপরই। একদিন মানিকগঞ্জের আজার বয়াতীর মেলা দেখে এসে সেলিম বললো- বাচ্চু এখানে প্রচুর থিয়েটার ফর্ম আছে। পালাগান দেখেছিস? আমি বললাম- এটা তো ওদের, ওদের কাজ। সেলিম বললো- ওরা কারা? ওরাইতো আমরা আর আমরাই তো ওরা। তারপর থেকে আমরা গ্রামে গিয়ে গিয়ে কাজ দেখা শুরু করলাম। সেলিম যাচ্ছে, আমি যাচ্ছি- হাস্তর গান, পালা গান ... হাশেম বয়াতী হাস্তর গান করতেন, গাজীর গান করতেন হাকিম গায়েন ... লেটো দেখলাম গিয়ে ময়মনসিংহ। এগুলো দেখেই কিন্তু ভেতরে ভেতরে ভাবনা শুরু হয়ে গেল যে- এরাই বাংলার থিয়েটার করছে। তখন একদিন কবি রফিক আজাদ বললেন যে- তোমাদের ভাবনাগুলো ঠিক আছে কিন্তু এর সাথে একটা দার্শনিক ভাবনা লাগবে, তা না হলে হবে না। তখন আবার রবীন্দ্রনাথের কাছে যাওয়া ... উনি যা লিখেছেন, তাই তো আমাদের থিয়েটার। উনি ওয়েস্টার্ন ফর্ম মিশিয়েও কাজ করেছেন কিন্তু যখন ডাকঘর দেখি বা রাজা দেখি, রক্তকরবী দেখি তখন কিন্তু বুঝি যে এটা সম্পূর্ণ বাংলা থিয়েটার। বাংলা থিয়েটারে সংগীত, নৃত্য, সংলাপের মিশ্রিত রূপটি আমরা রবীন্দ্রনাথের মাঝে দেখি। আর আমরা প্রথম চেষ্টা করি কীত্তনখোলা দিয়ে। যদিও আমি মনে করি পুরোপুরি সফল তখন হইনি। কোনো কোনো দর্শক বললেন যে- আপনারা এটা কী ধরনের থিয়েটার করলেন, বিস্মিত হয়ে বললেন- থিয়েটার আবার এমন হয় নাকি?

হাসান শাহরিয়ার
আমাদের জনগণের জন্য আমাদের থিয়েটার করলেন, দর্শক বিস্মিত হলো কেন? ওরা কি নিজেদেরকে শহুরে ভাবতে শুরু করে দিয়েছিল?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
শহরের দর্শকদের কাছে এটা নতুন ছিল। সে জন্যই এই নাটক গ্রামের দর্শকদের কাছে অনেক বেশি আদরণীয় হয়ে উঠলো। যখন ঢাকার বাইরে যেতাম, দেখতাম দর্শক খুব ইনভলবড হতো।

বিপ্লব বালা
কিন্তু আপনার দর্শক তো ঢাকার। তাদের তো আপনার সাথে মিশতে হবে।

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
আমি তো শুধু ঢাকার দর্শকের জন্য নাটক করছি না।

হাসান শাহরিয়ার
মূলত তো তাই করছেন। আপনার মূল দর্শক তো ঢাকার দর্শক। আমি ঢাকা থিয়েটারের কথা বলছি, গ্রাম থিয়েটারের দর্শকদের কথা বলছি না।

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
হ্যাঁ, মূলত তারাই, কিন্তু আমাকে তো ট্র্যাডিশনটা ভাঙতেও হবে, ধাক্কাটা তো দিতে হবে তাই না?

হাসান শাহরিয়ার
কীত্তনখোলা দিয়ে সেই ধাক্কাটা না হয় দিলেন, এদ্দিন পর কী মনে হয়, প্রথমে যে ধাক্কা দিলেন তারপর সম্বিৎ ফিরেছে নাকি সেই ধাক্কাতেই আছে?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
ধাক্কাতেই আছে। কারণ আমরা তো অনবরত পরিবর্তিত কাজই করি। যার ফলে এখন প্রাচ্য দেখেও কিছু দর্শক বলে- কিছুই বুঝি না।

হাসান শাহরিয়ার
আপনারা অনবরত পরিবর্তন কেন করতে থাকলেন। দর্শককে তার চেনা জিনিস চেনাতে পারছেন না, তো তাদেরকে একটু ধাতস্ত হওয়ার সুযোগ দিতে পারতেন। একই ফর্মের বা ভাবনার কয়েকটি নাটক কয়েক বছর ধরে করতে পারতেন। কারণ দর্শককে না নিয়ে কেবল আপনি এগিয়ে গেলে কি পারপাস সার্ভ হবে?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
সত্যি কথা বলতে শাহরিয়ার, দর্শকের কথা ভেবে নাটক তৈরি করিনি। এক্সপেরিমেন্টটা না করলে নূতন ধারা তৈরি হবে কেন? ভাঙন না হলে গড়ন হবে কেমন করে? আমরা ভেবেছিলাম যে- গ্রাম থিয়েটারের মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের লোক আঙ্গিকগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করবো এবং সারা দেশব্যাপী এটাকে নিয়ে কাজ করবো। এই কাজগুলো থেকে নানা আঙ্গিক বেরিয়ে আসবে ...

হাসান শাহরিয়ার
ঠিক আছে তাহলে আমরা গ্রাম থিয়েটার সম্পর্কে একটু জেনে নিই। গ্রাম থিয়েটারের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এগুলো নিয়ে একটু বলুন।

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
গ্রাম থিয়েটার দুটো কাজ করতে গেল- একটা হচ্ছে সমাজ সচেতনতা আনতে জনগণকে সংগঠিত করা, প্রতিক্রিয়াশীলদের বিরুদ্ধে। আমরা বললাম যে- কৃষক শ্রমিক মেহনতী মানুষের সংস্কৃতিই হচ্ছে আমাদের সংস্কৃতি। একাজ করতে গিয়ে কিছু অর্জন ভালো হয়েছে, যেমন- আমরা তৌফিক হাসান ময়না, সাইদ হোসেন দুলাল, শুভঙ্কর, আসাদুল্লাহ ফারুকীর মত লোক পেয়ে গেলাম। কিন্তু পাশাপাশি নন্দনতত্ত্বের বিচারে বাংলা শিল্পের রস নিতে চেয়েছিলাম, সেখানে একটা ক্ষতি হয়েছে। একটু বেশি রাজনৈতিক গ্রাম থিয়েটার হয়ে উঠেছে। সেলিম আল দীন, সৈয়দ জামিল আহমেদ, শিমূল ইউসুফ বা আমি হয়তো লাভবান হয়েছি ... বাংলা থিয়েটারের অভিজ্ঞতা নিতে পেরেছি, যার ভিত্তিতে আমরা পরের কাজগুলো করতে পারছি, কিন্তু গ্রাম থিয়েটারের কর্মকাণ্ড অনেকটা রাজনৈতিক হয়ে গেছে। আর দ্বিতীয় কাজটি হচ্ছে- নিজস্ব নাট্য আঙ্গিক, অভিনয়রীতি বিশ্লেষণ ও বিবেচনার মধ্য দিয়ে নিজস্ব জাতীয় নাট্য আঙ্গিক নির্মাণ।

হাসান শাহরিয়ার
আপনাদের সংগঠন মানে তো একেকটা নাট্যদল?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
হ্যাঁ।

হাসান শাহরিয়ার
দলগুলো যে কাজ করছে, স্ক্রীপ্ট কীভাবে তৈরি হয়?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
ওখানকার স্থানীয় যে সামাজিক সমস্যা সেগুলোকে তাদের নিজস্ব যে নাট্য আঙ্গিক আছে তার মধ্যে ঢুকিয়ে কাজ করতে বলা হয়।

হাসান শাহরিয়ার
আরণ্যকের মুক্ত নাটক কি একই সময়ের?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
না, তবে কাছাকাছি সময়ের।

হাসান শাহরিয়ার
দুটো কি একই রকম চিন্তা থেকে করা?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
না, ওরা গিয়ে থিয়েটারটা করতো, গ্রামের সমস্যাগুলোকে নিয়ে ... তাছাড়া আমাদের কাছে আঙ্গিক এবং বাঙলা নাট্যরীতির অন্বেষণ একটা বড় ব্যাপার ছিল, তাদের সেটা ছিল না।

হাসান শাহরিয়ার
আপনাদের মোট কয়টি গ্রাম থিয়েটার?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
প্রথম মানিকগঞ্জের আজহার বয়াতীর মেলাকে কেন্দ্র করে একটি থিয়েটার শুরু করি ... তালুকনগর থিয়েটার। এটাই প্রথম গ্রাম থিয়েটার। মানিক নামের একটি ছেলে এটির মূল উদ্যোক্তা ছিল। পরবর্তী সময়ে এটাকে আস্তে আস্তে ছড়িয়ে দিই। ’৮৪ সালের দিকে আমরা ১৫০টি গ্রাম থিয়েটার করতে পারি। এখন ২৬০ টি আছে কিন্তু সবগুলো এ্যাক্টিভ না। আমার ধারণা ২০০-র মতো দল এ্যাক্টিভ আছে।

হাসান শাহরিয়ার
ওরা কি শীতকালে পারফরমেন্স করে?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
একেবারে যারা গ্রামের তারা কেবল শীতকালেই করে আর যারা শহরের, যেমন- বরিশাল থিয়েটার, গাইবান্ধা থিয়েটার, রাজশাহী থিয়েটার, বা রংপুরে যারা আছে তারা অডিটোরিয়ামে করে এবং প্রায় সারা বছরই করে। এগুলোর সাথে কাজ করতে গিয়ে আমার নানা রকম অভিজ্ঞতা হয়েছে। এক সময় আমরা ইউনিসেফের সঙ্গেও গ্রাম থিয়েটার নিয়ে কাজ করেছি।

হাসান শাহরিয়ার
ফান্ডের ব্যাপার ছিল?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
হ্যাঁ, ফান্ড ছিল ... এটা নিয়ে গ্রাম থিয়েটারে অনেক বিরোধও হয়েছে। টাকাটা নেব কি নেব না, এসব নিয়ে।

হাসান শাহরিয়ার
টাকাটা কেন দিতে চেয়েছিল?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
আমরা ওদের কিছু প্রজেক্ট করে দিয়েছিলাম ... স্যানিটেশন, সেভ ওয়াটার, চাইল্ড রাইট, উইমেন রাইট, পাঁচ রকম ওষধের টিকা দিতে হয় ইত্যাদি প্রোগ্রাম করে দিতাম।

হাসান শাহরিয়ার
টাকাটা বন্টন হতো কীভাবে?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
নাটক তৈরির জন্য ৫০০ টাকা আবার শো প্রতি ১৫০টাকা ... এভাবে বাংলাদেশের প্রায় ৫০টি গ্রাম থিয়েটারের দল এটা শুরু করলো। কিন্তু তখন প্রশ্ন উঠলো, গ্রাম পর্যায় থেকে যে- টাকা তো আপনারা আরও বেশি পাচ্ছেন, কেন্দ্রে খরচ করছেন কিনা? কত পাচ্ছেন আর কত দিচ্ছেন ইত্যাদি ... ঐ টাকায় কম্পিউটার কিনবেন কেন ... ইত্যাদি ইত্যাদি ...

বিপ্লব বালা
নিজেদের লোকজন না বাইরের কেউ এধরনের প্রশ্ন তুলেছে?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
একেবারে নিজেদের লোকজন। আমি কিছুদিন একটা তত্ত্ব দাড় করিয়েছিলাম যে- আমরা মানব উন্নয়নের জন্য, সামাজিক সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য নাটক করছি। পরে অবশ্য ব্যাপারটা আরো খারাপ অবস্থায় যাওয়ার পর সেলিম আল দীন বললো যে- আমাদের সামাজিক থিয়েটার করার দরকার নেই। টাকা নেয়ার দরকার নেই। তারপর এটা বন্ধ করে দিই। তবুও আমি বলবো- গ্রাম থিয়েটারের অর্জন কিন্তু কম না, এখনো দু’শতাধিক দল কাজ করছে, আমরা ইচ্ছা করলেই এক মানসিকতার দশহাজার লোক জমায়েত করতে পারি।

বিপ্লব বালা
গণনাট্য সংঘ কি কোনোভাবে আপনাদের প্রভাব ফেলেছে?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
হ্যাঁ, নবান্ন থেকে শুরু করে শম্ভু মিত্রের লেখা এ সব কিছুই প্রভাবিত করেছে। এক সময় ভেবেছিলাম যে এখানকার কমিউনিস্ট পার্টির সাথে যোগাযোগ করবো কিনা ... কয়েক জায়গায় করেছিলামও।

হাসান শাহরিয়ার
আমার প্রশ্ন হচ্ছে- গ্রাম থিয়েটার কি আদতে বাংলার থিয়েটার করছে নাকি আমাদের মতো মিশ্র থিয়েটারই করছে?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
আমাদের মতো মিশ্র থিয়েটার করছে এবং বাঙলা থিয়েটারও করছে।

হাসান শাহরিয়ার
আপনি ঢাকা থিয়েটারের মাধ্যমে যে নিজস্ব নাট্য আঙ্গিক নির্মাণ করতে চাইলেন সেটা কি হচ্ছে? আপনি কিন্তু নিজেই বললেন যে- একটা বিশেষ রীতি দর্শককে সম্পৃক্ত করার আগেই আবার সেলিমস্যার জাম্প দিচ্ছেন অন্য স্তরে। তো দর্শক তো আপনার সাথে সাথে যেতে পারছে না, ফলে এখনো প্রাচ্য দেখে বলে যে- কিছুই বুঝি না। আপনার কাছে আমার প্রশ্ন- সেলিমস্যার যত নিরীক্ষাই করুক সেটা সাহিত্য নিয়ে করছেন, কিন্তু আপনিতো করছেন দৃশ্যকাব্য, সেলিমস্যারের কাজ হয়তো বহু বছর ধরে বেঁচে থাকবে, কিন্তু আপনার কাজ কিন্তু বর্তমান সময়ের দর্শকের জন্য ... তো সেখানে একই ঘরানার অন্যান্য নাট্যকারের কাজ নিয়ে যদি কাজ করতেন তাহলে দর্শকরা অভ্যস্ত হতে পারতো।

বিপ্লব বালা
আমি একটু যোগ করতে চাই, সেলিমভাই নাটক লিখলো কিন্তু ডিরেক্টর হিসেবে আপনার বিবেচনাটা তো দর্শকের সাথে। এই দর্শক সম্পর্কে আপনার ভাবনাটা কেমন?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
আমি কিন্তু এখনো মিশ্ররীতিতে আছি। আমি পুরোপুরি দেশীয় রীতিতে কাজ করছি না। আমার মনে হয় পৃথিবীর আরো যত ভালো রীতি আছে সবগুলো মিলিয়ে থিয়েটারটা করতে পারলে আরো ভালো থিয়েটার করা যেত। কিন্তু আমার যাত্রা বাঙলা নাট্যধারার পূর্ণ ব্যবহার।

বিপ্লব বালা
কিন্তু আপনি অন্য রীতিগুলো বা অভিজ্ঞতাগুলো কাজে লাগাবেন কেন?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
আমি মঞ্চে একটা কাব্য তৈরি করতে চাই সেজন্য।

বিপ্লব বালা
কিন্তু সেই কাব্যের লক্ষ্যটা কী? আপনার দর্শককে তো সেই কাব্যের সাথে রিলেট করতে চাইবেন ...

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
হ্যাঁ, আমার পোয়েট্রির সাথে দর্শককে রিলেট করতে চাচ্ছি ... এখন সেটা দর্শকের পোয়েট্রি হচ্ছে কিনা, সেটাইতো জানতে চাচ্ছ? আমাদের নিজস্ব কিছু দর্শক কিন্তু তৈরি হয়েছে, তারা কিন্তু আমাদের নাটক দেখবেই।

বিপ্লব বালা
না, তা দেখুক, আমি বলতে চাচ্ছি একজন ডিরেক্টর হিসেবে আপনার ঐ চেষ্টাটা আছে কিনা যে- আরও বেশি দর্শকের কাছে আপনার কাজকে পৌঁছাতে হবে?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
কিন্তু আজকের একটা চিত্রকলার কথা যদি ভাবো ... ধরো, কিবরিয়ার পেইন্টিং কি সবাই বোঝে?

হাসান শাহরিয়ার
কিবরিয়ার পেইন্টিং বর্তমান দর্শক না বুঝলেও হয়তোবা ভবিষ্যতের দর্শক বুঝবে, কিন্তু আপনারটা তো বর্তমান দর্শককেই বুঝতে হবে।

বিপ্লব বালা
আর তা ছাড়া, পেইন্টিং-এর ভাষা আর থিয়েটারের ভাষা কিন্তু এক না। আপনি কি কিবরিয়ার ভাষা করতে চান থিয়েটারকে?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
হ্যাঁ, আমি চাই। আমার জীবনের লক্ষ্য হচ্ছে সেখানে পৌঁছানো।

বিপ্লব বালা
কিবরিয়ার ভাষায় কিন্তু এবস্ট্রাকশন আছে, আপনি কি সেই এবস্ট্রাকশন চান মঞ্চে?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
আমি মঞ্চে কাব্যচাই, আমি কবিতার সমকক্ষ হতে চাই। আমি চাই শামসুর রাহমানের একটা ভালো কবিতার সমকক্ষ আমার থিয়েটার হোক।

বিপ্লব বালা
আমাদের বাংলা কাব্য, পালাগান, লোকগান, দেহতত্ত্ব এগুলো পৃথিবীর অন্য যে কোনো কাব্য থেকে কম না কিন্তু।

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
গ্রামের লোক যে থিয়েটারটা করছে, শহরের লোক কিন্তু সেটা বুঝছে না। তাদের কাছে সেলিম আল দীন কিন্তু দূর্বোধ্য হয়ে যাচ্ছে ...

হাসান শাহরিয়ার
শহরের লোকই কিন্তু শহরের নাট্যকারকে দূর্বোধ্য ভাবছি। আমাদের পালাগান, মঙ্গলকাব্য নিয়ে কাজ করা থিয়েটার বুঝে ফেলছে লেখাপড়া না জানা দর্শকরা ... অথচ আপনি যখন শিক্ষিত দর্শকদের জন্য নাটক করছেন সেটা তার কাছে দূর্বোধ্য ঠেকছে। তার মানে কি আপনি আমার কথা ভেবে নাটক প্রেজেন্ট করেন না?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
দর্শকের কথা খুব কম ভাবি বলে আমার মনে হয় ...

বিপ্লব বালা
একটা সময় কিন্তু কেবল বলা হতো রাজনীতি, সমাজ ইত্যাদি ... আর এখন বলা হয় নন্দনতত্ত্ব, শিল্প, রীতি, আঙ্গিক এসব ... মানে যেন দর্শক কোনো ফ্যাক্টর না। আপনি একবার বোধহয় বলেওছিলেন যে- আপনি দর্শক নিয়ে ভাবেন না ...

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
হ্যাঁ, মহিলা সমিতিতে একদিন বলেছিলাম যে আমি আমার জন্য থিয়েটার করি ... আমার ভালো লাগে তাই করি। এখন দর্শক যদি দেখে আর তার ভালো লাগে, সেটা আমার বাড়তি পাওয়া। কারণ আমি কবিতা আর সংগীতের বিমূর্ততাকে ছুঁতে চাই থিয়েটার দিয়ে।

বিপ্লব বালা
কিন্তু ওগুলো আর পারফর্মিং আর্ট হিসেবে থিয়েটার কিন্তু এক না ...

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
কেন না, বিপ্লব (বালা)? রবীন্দ্রনাথ ডাকঘর লিখে তো তাঁর কবিতা, সংগীত সব কিছুকে অতিক্রম করে গেছে। এখনো কেউ ডাকঘর করে না কেন? উনি তো ওনার সময় থেকে অনেক অনেক অগ্রসরমান ছিলেন, দর্শক না বুঝলে সেটা তো রবীন্দ্রনাথের দায় না।

হাসান শাহরিয়ার
বাচ্চুভাই, আপনি কিন্তু নাট্যকার রবীন্দ্রনাথের কথা বলছেন ... আর আমরা কিন্তু আলাপ করছি নির্দেশনা নিয়ে। মানে লেখক তার সময় থেকে অনেক অগ্রসরমান কিছু লিখতে পারেন, কিন্তু আপনি এমন কিছু মঞ্চে দেখাতে পারেন না বা এমন থিয়েটার বানাতে পারেন না, যা কিনা বর্তমান দর্শকই বুঝবে না। আপনাকে অবশ্যই সমসাময়িক হতে হবে। কারণ আপনার দর্শক কিন্তু বর্তমানের দর্শক, কিন্তু লেখকের পাঠক কিন্তু বর্তমানের পাঠক না-ও হতে পারে।

বিপ্লব বালা
আপনি যখন শিল্প সৃষ্টি করেন তখন তো টেক্সট এবং দর্শক, এই দুটো নিয়েই কাজ করতে হবে ...

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
তাই কি? আমি তো কাজ করবো টেক্সট এবং আমার অভিজ্ঞতা দিয়ে ... দর্শক তো আরও পরের কথা।

বিপ্লব বালা
আপনি যখন তৈরি করছেন তখন দর্শক মাথায় নেই?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
না।

বিপ্লব বালা
তাহলে কী করে হয়? এটা তো ডায়লগ ... আপনি তো অন্যকে বলছেন ...

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
আমি তো কাউকে বলছি না ... আমি আরেকটা ক্যারেক্টারের সঙ্গে ইন্টারেক্ট করছি। তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে দর্শক দেখছে।

বিপ্লব বালা
বাচ্চুভাই, আপনার এই ভাবনাটা ইউরোপীয়। তারা কিন্তু দর্শক বাদ দিয়ে ভাবে। আমাদের রীতি কিন্তু দর্শককে প্রাধান্য দেয়া।

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
কিন্তু দর্শক তখনই আসে যখন পর্দাটা ওঠে বা আলো জ্বলে।

বিপ্লব বালা
না, তা নিশ্চয়ই না। আপনি নির্দেশক এবং একজন দর্শক হিসেবেই কাজটা শুরু করেন।

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
তুমি কি বলতে চাচ্ছ যে, আমাকে ভাবতে হবে দর্শকের কী দেখলে ভালো লাগবে?

বিপ্লব বালা
না, তা না ... আপনি আপনার বিষয়টা বা ভাবনাটা, চিন্তাটা কীভাবে এক্সপ্রেস করবেন সেটা ভাবতে হবে, তখনই প্রশ্ন আসবে কার কাছে এক্সপ্রেস করবেন।

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
হ্যাঁ, দর্শকের কাছে কিন্তু তার আগে আমি কনভিন্স হব না?

বিপ্লব বালা
হ্যাঁ, প্রথমে তো আপনাকেই হতে হবে। রবীন্দ্রনাথ যে লিখেছেন নানা রীতিতে, নানা বিষয়ে ... তো উনি কি চাননি দর্শকের সাথে, পাঠকের সাথে কমিউনিকেট করতে?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
কমিউনিকেট তো করতে চাইবেনই। আমার থিয়েটারও তো দর্শক দেখছে, দেখছে না?

বিপ্লব বালা
হ্যাঁ দেখছে। কিন্তু আপনি যদি আরও দেখাতে চাইতেন, আরেকটু খুঁজতেন তাহলে এটা আরেকটা চেহারা পেত না কি?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
তা হয়তো পেত।

বিপ্লব বালা
আমি সে কথাটাই বলতে চাচ্ছি।

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
আসলে আমি যতগুলো থিয়েটার করেছি, শুরুর দিকের কয়েকটি ছাড়া, আমি ফর্ম নিয়ে, কন্টেন্ট নিয়ে বেশি চিন্তাভাবনা করেছি ... আমাদের লোকফর্ম নিয়ে ... আমি লোকফর্মকে ব্যবহার করতে চেয়েছি আধুনিক থিয়েটার নির্মাণ করার জন্য। এখন কথা হচ্ছে আমার ল্যাঙ্গুয়েজটা তৈরি হয় কী দিয়ে? একটা হচ্ছে আমার টেক্সট- সেখানে একটা ভাষা আছে, যেটা কিনা উচ্চারিত ভাষা। এর বাইরে আছে ফিজিক্যাল জায়গাটা। আরেকটা হচ্ছে স্পেস ... স্পেসটা আমি বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে অভিনেতা-অভিনেত্রী দ্বারা একটা ইন্টারেকশন তৈরি করছি সেটা থেকেও একটা ল্যাঙ্গুয়েজ বের হয়ে আসছে।

বিপ্লব বালা
তা ঠিক আছে, কিন্তু আমি বলছি বাচ্চুভাই, আপনি অভিনয়ের জন্য যে পদ্ধতিটা ব্যবহার করছেন সেটা তো ইউরোপীয় মেথড।

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
তবে আমি যেভাবে ভাবি সেটা ইউরোপীয় কিনা আমি জানি না। আমার মঞ্চে যে চরিত্রটা দেখি সেটা একটা চরিত্র, নাট্যকার যে চরিত্র লিখেছে তাকে দেখছি না, অভিনেতা যে ব্যক্তি তাকে দেখছি না, দেখছি নির্দেশক-অভিনেতার ইন্টারেকশনে যে চরিত্রটি দাঁড়ালো সেটি।

বিপ্লব বালা
এই ইন্টারেকশনে কি দর্শক নেই?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
হ্যাঁ আছে। দর্শক মঞ্চে দেখে তার মতো করে হয়তো আরেকটা চরিত্র দাড় করায়।

হাসান শাহরিয়ার
বাচ্চুভাই, এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি। আপনারা যে নাট্য আঙ্গিক নির্মাণের কথা বলছেন, যেগুলো আমাদের লোক আঙ্গিক বা ফর্ম ... সেগুলো নিয়ে যারা কাজ করে,  সেগুলো কিন্তু প্রফেশনাল দল, আবার আপনারা প্রথম থেকেই ভাবলেন যে- মৌলিক নাটক করবেন আর প্রফেশনাল থিয়েটার করবেন। সেই ভাবনা থেকে তো নিশ্চয়ই সরে যাননি-

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
প্রফেশনালিজমের জায়গা থেকে সরেছি কিন্তু মৌলিক নাটকের জায়গা থেকে সরিনি।

হাসান শাহরিয়ার
সরে গেছেন, নাকি বুঝতে পেরেছেন যে, এটা সম্ভব না?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
আসলে এটা মধ্যবিত্তের রোমান্টিসিজম ছিল বলে এখন মনে হয় ... এটা স্বীকার করতে আমার কোনো দ্বিধা নেই। কিন্তু রোমান্টিসিজম ছাড়াও বাস্তবতা কী ছিল? সত্তর দশকের অর্থনৈতিক-সামাজিক অবস্থায় আদৌ প্রফেশনালিজমের দিকে যাওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না।

হাসান শাহরিয়ার
করার চেষ্টাটা ছিল কিনা?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
আমার মনে হয় না। আমরা থিয়েটারের এক্সপেরিমেন্ট নিয়েই বেশি ব্যস্ত ছিলাম।

হাসান শাহরিয়ার
তখনকার বাস্তবতায় করা যায়নি, তো এখনকার বাস্তবতায় কী ভাবছেন? প্রফেশনাল থিয়েটার গড়ে ওঠা সম্ভব?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
আমার মনে হয় না।

হাসান শাহরিয়ার
গ্রুপ থিয়েটার কি যেভাবে চলছে সেভাবে আর বেশিদিন চলা সম্ভব?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
সেখানেও আমার আশঙ্কা আছে। আসলে আমার মনে হয় প্রথমে দরকার একটা গণতান্ত্রিক, সম-অধিকারের কল্যাণকর রাষ্ট্র। সরকারের একটা সাপোর্ট লাগবেই, তারপর ফাউন্ডেশনগুলোর সাপোর্টও লাগবে। তা না হলে চলবে না। আমাদের এখানে কিন্তু কেউ কেউ চেষ্টা করেছিল, কিন্তু কেবল টিকেটের পয়সা দিয়ে প্রফেশনাল হওয়া যাবে না। যদিও আমরা ইদানিং ভাবছি যে বিনোদিনী নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় যাওয়া যায় কিনা। চট্টগ্রামে কিছু শো করছি। প্রতি মাসেই করছি ... তো সেখানে দেখা যাচ্ছে যে, খরচ-টরচ বাদ দিয়ে কিছু হাতে থাকে। তবে খুব পরিশ্রম হচ্ছে। এই বয়সে এতো পরিশ্রম করা কি সম্ভব?

হাসান শাহরিয়ার
‘বিনোদিনী’ করা যাচ্ছে, ছোট টিম। কিন্তু ঢাকা থিয়েটারের অন্যান্য প্রযোজনা নিয়েতো এমনটা ভাবা সম্ভব না।

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
কোনোভাবেই সম্ভব না। সেকারণেই প্রফেশনাল থিয়েটারের কথা ভাবতে গেলে কম কাস্টিং নিয়ে কাজ করতে হবে। ১০/১২ জনের একটা টিম থাকবে এবং প্রতিটি জেলায় অন্তত দুটো করে শো করার চিন্তা থাকতে হবে।

হাসান শাহরিয়ার
আরেকটা ব্যাপার একটু জেনে নিই। গ্রাম থিয়েটার যে নাটকগুলো করছে সেগুলোতেও সর্বক্ষেত্রে নিজস্ব নাট্য আঙ্গিকগুলোর প্রয়োগ হচ্ছে না, কেন?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
এটা হচ্ছে আমাদের দীর্ঘদিনের কলোনিয়াল মাইন্ড সেট-আপের ফসল ... এটা গ্রামেও আছে। একারণে ওরাও শহুরে থিয়েটারটাকেই আধুনিক থিয়েটার ভাবছে। আমাদের লোকনাট্যরীতিকে বোঝার মত মানসিকতা আমাদের নেই এবং এটাকে এপ্রিসিয়েটও করতে পারছি না। সেলিম যে কাজটা করেছে সেটা হলো উপাদান ও রীতি- এই দুটোকে এক করে ফেলতে পেরেছে ... ফর্ম এন্ড কনটেন্ট ... এটা খুব মুশকিল, অন্যদের পক্ষে করা।

বিপ্লব বালা
এটা অনেক জটিল, অন্তত অন্যকে বোঝাতে। বাচ্চুভাই, একটা কথা জিেেজ্ঞস করি ... কাউকে অশ্রদ্ধা করে না ... কেবল জানার জন্য যে, আপনি যে কাজগুলো করছেন, সেলিমভাই সহ, সেগুলো আপনার দলের নাটকর্মীরা, যারা অভিনয় করছেন তারা কতটুকু বুঝে-শুনে করছে?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
না, সবাই তো সমানভাবে বোঝে না, কেউ কেউ হয়তো না বুঝেই করছে।

বিপ্লব বালা
তারাই যদি না বোঝে তাহলে দর্শক বুঝবে কীকরে?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
এটার সমস্যা কী বিপ্লব, এটা কঠিন একটা প্রক্রিয়া। একটা নতুন ঘরানা তৈরির চেষ্টা তো ... তো দুইশ বছর ধরে যেটা চলে আসছিল অন্তত নগর থিয়েটারে, সেটা আমরা যখন এই নগর জীবনেই আমাদের নিজস্ব থিয়েটারটা নির্মাণ করতে গেছি, তখন তো প্রশ্নই চলে আসলো যে, এটা কি থিয়েটার নাকি? আমরা বললাম, হ্যাঁ এটাই আমাদের নিজস্ব থিয়েটার।

বিপ্লব বালা
কেবল ফর্ম না ... ঐ যে হাতহদাই-তে কাছিম শিকারের যে দৃশ্যটা, সেটা যে করেছে সেকি রিএ্যাক্ট করতে পেরেছে ... দর্শক তো পরে ... আগে আপনারা রিএ্যাক্ট করতে পেরেছিলেন তো?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
আমার মনে হয় পেরেছে। আর কথা হচ্ছে আমাদের সবার অভিজ্ঞতা তো আর এক না। সুতরাং সেলিম যখন এই জটিল জায়গাগুলোকে দাড় করিয়ে সবার সামনে এনে দেয় তখন হয় কী, এই ছেলেগুলোর সেগুলো বুঝতে একটু অসুবিধাই হয়। এবং এই বোঝার তারতম্যের কারণে প্রযোজনারও ক্ষতি হয়েছে।

হাসান শাহরিয়ার
একটু আগে নাট্য আঙ্গিক নির্মাণের কথা বলছিলেন। আপনারা এই ‘নির্মাণ’ শব্দটি ব্যবহার করছেন কেন? আমাদের কি নিজস্ব নাট্য আঙ্গিক নেই বলতে চান?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
অবশ্যই আছে। আমরা সেগুলো নিয়েই কাজ করছি।

হাসান শাহরিয়ার
তাহলে যে ফর্মগুলো ইতোমধ্যেই একজিস্ট করছে সেগুলো নিয়ে কাজ করে সেটাকে ‘নির্মাণ করছি’ বলা কি ঠিক হচ্ছে?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
আমাদের মেইন স্ট্রীম আঙ্গিক কিন্তু যাত্রা, পালাগান, হাস্তর, গাজীর গান ইত্যাদি ... তো সেগুলোই আমাদের ন্যাশনাল থিয়েটার। এই লোকনাট্যরীতিগুলোকে পুনর্বিবেচনা করে আধুনিক থিয়েটারে প্রয়োগ করার অভিপ্রায় থেকেই ‘নির্মাণ’ শব্দটা ব্যবহার করেছি। আসলে সেটা বোধহয় ‘নির্মাণ’ না বলে ‘পুনর্বিবেচনা’ বললে ভালো হতো। তখন তো একটা আবেগ কাজ করেছে, সেই আবেগের জোরে বোধহয় ‘নির্মাণ’ ব্যবহার করেছি হাঃ হাঃ ...

হাসান শাহরিয়ার
এবার আরেকটি বিষয় জানতে চাই। আপনি সেলিম স্যারের নিরীক্ষার প্রতি দুর্বল। কিন্তু ওনার ঘরানার আরো অনেক নাট্যকার আছে, আপনি জানেনও সেটা ... তো তাদের নাটক করার ব্যাপারে আগ্রহী হলেন না কেন?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
আমি মনে করি এটা আমার করা উচিত হয়নি। কয়েকদিন আগে বদরুজ্জামান আলমগীরের অহরকণ্ডল নাটকটি করেছে কামালউদ্দিন কবির। আমি দেখেছি। ভালো প্রযোজনা। অনেক জায়গায় সেলিমের ছায়া আছে ... এছাড়াও আমরা সাইমন জাকারিয়ার ন নৈরামণি করেছি, গোলাম শফিকের বাইচাল করতে চেয়েছিলাম ...


হাসান শাহরিয়ার
সাইদুর রহমান লিপনকে দিয়ে নামিয়েছিলেন, সাইমন জাকারিয়ার ‘ন নৈরামণি’, আমরা কিন্তু দেখতে পেলাম না, বন্ধ হয়ে গেল, কেন?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
আসলে এটা একেবারেই ওদের ব্যাপার ছিল। ব্যাপারটা হলো, স্ক্রীপ্টটা নিয়ে লিপনের একটু আপত্তি ছিল, আমাদেরও ছিল। এই প্রডাকশনটা করতে আমাদের ১ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে ...

বিপ্লব বালা
তাই নাকি? এতো!

হাসান শাহরিয়ার
এই রীতিতে নাটক করতে অত টাকা খরচ করেন কেন?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
এটার সেটটা খালেদ খুব ভালো করেছিল। কস্টিউমটা অনেক এক্সপেনসিভ হয়েছে, লিপন কাজটাও ভালো করেছিল। কিন্তু আমরা দেখলাম টেক্সটটা ঠিক হয়নি। আমরা ভাবলাম এভাবে আমরা চর্যাপদ রচয়িতাদের উপস্থাপন করতে পারি কিনা। তাদেরকে কোথাও গিয়ে খাটো করছি বলে মনে হলো। আমরা ভীত হয়েই সাইমন জাকারিয়াকে আবার লিখতে বললাম। কিছুদূর লেখার পর ও সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হলো ... পরে সুস্থ হয়ে শেষ করলো। শেষ হলে লিপন এসে বললো যে- বাচ্চুভাই, এটাতো পুরো নতুন নাটক। এটা কেমন করে করবো? তারপর লিপনও অন্য জায়গায় ব্যস্ত হয়ে পড়লো আর ঢাকা থিয়েটারও নতুন নাটকের কাজ ধরলো ...

হাসান শাহরিয়ার
আপনি তো একটা নাটক লিখেছিলেন ‘একাত্তরের পালা’ ... তারপর আর লিখলেন না কেন?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
এখন লিখছি আলতাফ।

হাসান শাহরিয়ার
আপনরা এক সময় বিশ্ব নাট্যধারা শুরু করেছিলেন ...

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
হ্যাঁ, ধূর্ত উই, মার্চিন্ট অব ভেনিস, ভূত করেছিলাম। তারপর আর করা হয়ে ওঠেনি।

হাসান শাহরিয়ার
আপনার দলে প্রচুর ভালো অভিনেতা অভিনেত্রী ছিল বা এখনো আছে। কিন্তু নির্দেশনায় কেউ আসলেন না ... আপনার কী মনে হয় ঐ রকম মেধা কারো ছিল না?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
আমি আর জামিল ছাড়া আর কাউকে দেখিনি যারা নির্দেশনা দিতে পারে।

হাসান শাহরিয়ার
পীযূষ দা’ তো দলের বাইরে নির্দেশনা দিয়েছেন ...

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
দিয়েছে, কিন্তু নির্দেশনা দেবার জন্য যে ইনার আই থাকা দরকার এটার অভাব ছিল। নির্দেশকের একটা তৃতীয় নয়ন থাকা দরকার ... এটা সবার থাকে না। আমার দলে এখন পর্যন্ত ওরকম কাউকে দেখিনি ... তবে সাইদুর রহমান লিপন ভালো করতে পারবে, নির্দেশনায়।

হাসান শাহরিয়ার
নতুনদের কাজ ভালো লাগছে আপনার?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
ভালো, কামালউদ্দিন কবিরের নির্দেশনায় অহরকণ্ডল দেখলাম। রতন, দিলীপ, আনোয়ার ভালো অভিনয় করেছে। কবিরের নির্দেশনাও আমাকে ইম্প্রেস করেছে। কাজ কিন্তু করছে অনেকেই। পাভেলও (আজাদ আবুল কালাম) ভালো কাজ করছে, এছাড়াও মোহাম্মদ বারীর নির্দেশনায় ‘সময়ের প্রয়োজনে’ দেখলাম ... সমালোচনার জায়গা হয়তো আছে, কিন্তু থিয়েটার হিসেবে আমাকে মুক্তিযুদ্ধের ওখানে নিতে পেরেছে। আমিনুর রহমান মুকুলের নির্দেশনায় ‘মানগুলা’ দেখেছি। ওটার এফোর্টটা সাংঘাতিক কিন্তু ফসলটা কোথাও গিয়ে যেন ঠিক ওঠে না। কিন্তু ওদের মঞ্চশৈলী, শারিরীক ল্যাংগুয়েজ ... এসব পুরো ব্যাপারটা মিলিয়ে কিন্তু একটা চমৎকার জিনিস দাঁড়ায়। আমাদের রিচুয়েলিস্টিক থিয়েটারের একটা আধুনিক প্রকাশ।

বিপ্লব বালা
নির্দেশনার ব্যাপারে একটু বলি ... জামিল আহমেদ চাকা-র পর আর কোনো নির্দেশনা দিল না কেন? কোনো সমস্যা না তো?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
না, ওটা একেবারে ওর প্রফেশনাল ব্যস্ততার কারণে। ও কিন্তু বিষাদসিন্ধু-র পর আর তেমন কাজই করেনি। আমরা দল থেকে তাকে বলেছিলাম প্রাচ্য-টা করার জন্য। কিন্তু প্রফেশনাল ব্যস্ততার কারণে সে করতে পারেনি।

বিপ্লব বালা
সাজেদুল আউয়ালকে আমরা ফণিমনসা-র পর আর পেলাম না ...

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
সেটাও পেশাগত কারণে ... তবে সে এখন আবার নাটক লিখছে। মতাদর্শগত কারণে কিছু কিছু অমতের কারণে হাবিবুল হাসান, আল-মনসুর এরা দলে থাকেনি। সেটা হলো তারা মৌলিক নাটকের ব্যাপারে একমত ছিল কিন্তু লোকনাট্যরীতি এবং অন্যান্য ব্যাপারে একমত ছিল না। আর কেউ কেউ টিভিতে ব্যস্ত  হয়ে গেল। ফলে এখন আর মঞ্চে কাজ করছে না।

হাসান শাহরিয়ার
আমরা আলোচনার শেষ পর্যায়ে আছি। আমরা আপনার দলের সাংগঠনিক কাঠামোটার ব্যাপারে জানতে চাই।

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
কোনো সাংগঠনিক কাঠামো নেই। প্রথমে তিনজনের একটা আহ্বায়ক কমিটি ছিল- আমি, ম. হামিদ এবং সেলিম আল দীন। আর সবাই ছিল সদস্য। কিন্তু দেখা গেল এই তিনজনকে এক সাথে মিটিং-এ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে আমি বললাম একটা ফরমাল কমিটি করার জন্য। কিন্তু কেউ তা মানলো না।

বিপ্লব বালা
কেন?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
ফরমাল কমিটি করলে পেসিডেন্ট হবে, সেক্রেটারি হবে ... দেখা যাবে থিয়েটারে ব্যস্ততা কমে যাবে, তাই বলা হলো যে প্রডাকশনভিত্তিক কাজ বন্টন করা হবে। নাটকের নির্দেশকের কথাতেই সে সময়টায় দল পরিচালিত হবে। এভাবেই ঢাকা থিয়েটার চলছে। সে কারণেই বোধহয়, অনেকেই আমাদের দল ছেড়ে চলে গেলেও ‘দল ভাঙা’ যেটাকে বলে সেটা হয়নি।

হাসান শাহরিয়ার
দল ছাড়ার কথা প্রসঙ্গে বলি ... সুবর্ণা আপার চলে যাওয়াটাকে কীভাবে দেখেছিলেন?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
গত ৩৩ বছরে অনেকে দল ত্যাগ করেছে। কেউ পেশাগত ব্যস্ততার জন্য কেউবা ব্যক্তিগত কারণে।

হাসান শাহরিয়ার
বাচ্চুভাই, অনেকদিন বসা হলো, অনেক কিছু জানা হলো। সব নাট্যজনদের পক্ষ থেকে আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ।

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
বিপ্লবকে, তোমাকে এবং থিয়েটারওয়ালার মাধ্যমে সব নাট্যজনদের আমি ধন্যবাদ জানাচ্ছি।