Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

অন্ধের হস্তিদর্শন চলছে চলবে

Written by বিপ্লব বালা.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

কেহ কারে বুঝিতে নাহি পারে বুঝাতে নারে আপনায় কৃষ্ণ কেমন?- যে দেখে যেমন।
অন্ধের হস্তিদর্শন চলছে চলবে?

এ বড় মুশকিল! একজন কেউ তো তার মতোই দেখবে, বুঝবে। এটা যদিও অন্যের সঙ্গে প্রায়ই মেলে না। তাহলে কার দেখাটা ঠিক? চাইলেও তো আমরা অন্যের মতো ঠিক দেখতে পারি না। বেশিরভাগ সময় তো চাইও না আর কারো দেখাটাও দেখতে। ভাবতেও চাই না, কেন আর একজন অন্য রকম দেখছে। এ নিয়েই যত বিপত্তি। কাজেই আমরা ধরেই নিই আমি যা দেখছি তা-ই একমাত্র দেখা, ঠিক বোঝা। আর তাইতেই বুঝি আমাদের সব দেখা হয় অন্ধের হাতি দেখা। যে যেটা ধরে বুঝে নিয়েছি- হাতিটা আমার কাছে কেবল তেমনই। অথচ জৈন দর্শন বলে- সত্য যে একটা নয়, অনেক- অনেকান্ত। উপনিষদের কথা তো আরো মুশকিলের- সত্য ক্রমসৃজ্যমান। ক্রমেই নাকি সৃষ্টি হয়ে চলে কোনো সত্য। আগে থেকে তার একটা কোনো সত্যরূপ সৃজন হয়ে নাকি থাকে না। ক্রমে ক্রমেই তার রূপায়ণ সম্পূর্ণ হয়ে ওঠে।

নাটক দেখার বেলাও সেই ঘটনা ঘটে। একেক দর্শকের একেক রকম লাগে নাটকটি। আমরা তাতে বিপদে পড়ি। ক্ষেপে উঠি। ভাবতে চাই- আমি যা দেখছি তাই ঠিক দেখা, একমাত্র দেখা। এখানে কথা ওঠে অন্যের সঙ্গে কথা বলা, আলাপ আলোচনা করার। অথচ সেখানেও তো দেখা যায় প্রত্যেকে কেবলি নিজের দেখাটা, মতটা অন্যকে বোঝাতে চায়। যুক্তি দিয়ে বলতে চাই- আমার দেখাটাই দেখো, আমার মতো বুঝে নাও। অথচ আমি কিন্তু অন্যের মতটা আর বুঝে নিতে ঠিক চাই না। কেবল নিজেরটা ধরে রাখতে চাই। ধরে নিই অন্যে ঠিক বুঝছে না, সবাই সব বোঝে না। একবারও ভাবি না- আমি যেমন আমার মতো করে বুঝেছি, অন্যেও তো তেমনি তার মতো করেই বুঝেছে। অথচ একবার যদি ভাবি, আচ্ছা দেখিই না আর কেউ অন্যরকম ভাবছে কেন, বুঝছে কেন। আমার বুঝটা দশজনের সঙ্গে একটু মিলিয়ে দেখি না কেন। আমার দেখা তো আমার আছেই। তারপরও যদি অন্যেরটাও একটু বুঝে দেখি তাহলে তো আমারই লাভ। আমিও অন্যের মতটা, ভাবনাটা বুঝে নিলে আরেক রকমভাবে দেখতে পাই, বুঝতে পারি। তাতে তো আমার বুঝাটাই আরও একটু বাড়লো, যা আমি কেবল আমার মতো দেখতে গিয়ে বুঝতে পারিনি। এভাবেই একে অন্যের মত-ভাবনা, দেখা-বুঝটা বিবেচনা করতে চাইলে পরে সকলেই আরও একটু বেশি করে, ভালো করে দেখতে বুঝতে পারি। এভাবেই তো অন্যের সঙ্গে একটা সম্পর্ক হয়। যত বেশিজনের সঙ্গে তা হতে পারে, তত বেশি করে আমরা কোনো কিছু আরো ভালো করে দেখতে পাবো। অনেকের দেখা বুঝলে পরে আমিও আরো অনেক অন্যকিছু অন্যভাবে দেখতে বুঝতে ভাবতে পারবো। অন্যকে বুঝতে গিয়েই তো নিজের বুঝাটাও সম্পূর্ণ হয়ে উঠতে থাকবে। অনেকান্ত, ক্রমসৃজ্যমান সত্যের নাগাল তাহলেই হয়তো পেতে থাকবো। এভাবে বহুর দর্শনে সত্যের এক সমগ্রতা মিলবে।

দৈনন্দিন জীবন থেকে শুরু করে, শিল্পসাহিত্য দেখা বোঝা আস্বাদন করার বেলাও এটা করা যেতে পারে। এই যে আমরা কেউ কাউকে নিজের কথা, ভাবনা বলি- তাতে ধরেই নিই আমি যেমন যেমন বলছি অন্যেও ঠিক তেমন তেমনই বুঝছে। কেউ আপত্তি করলেই ধরে নিই সে কিছু বোঝে না। অথচ একবারও যদি বুঝে নিতে চাই, অন্যে আমার কথাটা ঠিক কী বুঝলো না বুঝলো- তাইলেই দেখবো অত সহজে কেউ কারো কথা যেমন সে চাইছে তেমন বোঝে না। সে তার মতোই বুঝছে। এই তার মতোটা বুঝতে চাইলেই কেবল জানা যাবে, আমার কথাটা কীভাবে বললে সে আমার বুঝটা ধরতে পারবে। অর্থাৎ নিজের বোঝা অন্যকে বলা বা বোঝানো নির্ভর করবে অন্যের স্বভাব-মন-মত বুঝে নিয়েই কীভাবে কতটা আমার কথা বলতে বোঝাতে পারবো। আমাদের কথাটা তখনি বুঝি ‘ডায়লগ’ হয়ে ওঠে যখন কিছু বলার আগে মনে রাখা যায়- কে কেমনভাবে বোঝে, ভাবে। কীকরে বললে পরে আমার কথাটা তার কাছে কী অর্থ পাবে তার হদিস মিলবে। তেমনি একটা কিছু অন্যে কীভাবে দেখছে, বুঝছে সেটা যতটা জানতে বুঝতে চাইবো বা পারবো ততই একটা বিষয় অনেকভাবে দেখা বোঝার মন-বুদ্ধি পাবো। নিজের অন্ধত্ব তত ঘুঁচবে। তত বেশি করে দেখতে পাবো এমন কোনো কিছু, যা কেবল নিজের দেখা বোঝা দিয়ে মেলে না।

এই যে নাটক নিয়ে আলাপন আয়োজন করছে ‘থিয়েটারওয়ালা’- সেখানেও কি এই বিপত্তি ঘটে না? প্রত্যেকে কেবল তার দেখা, তার বোঝাটাই একমাত্র দেখা বোঝা ভাবছে। অন্যেরটা ভাবতে বুঝতেও চাইছি না। তাহলে তো আলাপন, আলোচনা বা ডায়লগ করে কিছু হবে না। পারস্পরিক বিনিময়ের প্রক্রিয়াটা শুরুই হবে না। আমরা কি দেখি না, একেকটা নাটক সম্পর্কে একেকজন একেকভাবে বুঝছে, ভাবছে- তাহলে কারটা ঠিক? কেবল আমি যেমন ভাবছি সেটাই ঠিক? আর সব ভুল? এটা অঙ্ক বা বিজ্ঞানের মতো তো প্রমাণ করা যায়ও না। শিল্প সাহিত্যে তা হয়ও না। শিল্পের ভাষাটাই তো ইঙ্গিতের ভাষা। একটা কোনো স্পষ্ট, নির্দিষ্ট কিছু তাতে বলা হয় না। কেবলি নানা ইশারা-ইঙ্গিত, sign-signal দেয়া হয় যাতে দর্শকের নিজস্ব সৃজনসত্তায় ক্রিয়া ঘটে- তার মতো করে একটা কিছু রূপ পায়। যার পুরো হদিস, ব্যাখ্যা দর্শক নিজেও কি পুরোপুরি জানতে-বুঝতে-ধরতে পারে- বলা তো পরের কথা। অবাক্সমানসগোচর তার ক্রিয়াকলাপ- যদি সেটা সেই মানের শিল্প হয়। শঙ্খ ঘোষ তার এক লেখায় জানান- বন্ধুরা মিলে শান্তিনিকেতনে রামকিঙ্করের এক ভাস্কর্য নিয়ে মুশকিলে পড়েন। এটা তারা কী দেখছেন ? কারো মনে এটা এক নারীর শারীরভঙ্গি। কেউবা ভাবেন, বৃক্ষ এক আবার কারো কাছে তা আগুনের লেলিহান শিখা বুঝি। শিল্পীর কাছে জানতে চান তারা-কার দেখা ঠিক দেখা। রামকিঙ্কর একটু চুপ করে থেকে বলেন-সবার দেখাই ঠিক। বলে হন্তদন্ত করে চলে যান। এ ঘটনায় শঙ্খ ঘোষ শিল্পের দেখা বোঝার এক সূত্র পান। শিল্পী যে চান সকলেই যেন তার মতো করে নিজস্ব সৃজন রূপায়ণ করে উঠতে পারে। সেটাই শিল্পীর অন্বিষ্ট। এমন বহুরূপায়ণের সম্ভাবনা, তার ইশারা যেন শিল্পরূপে দিতে পারেন। একটা কোনো স্পষ্ট নির্দিষ্ট, একমাত্র অর্থের বদলে বহু হওয়ার শিল্পনন্দন ক্রিয়া শিল্পী তাহলে ঘটাতে চান দর্শক ভোক্তার মনে। কীকরে সেই বিচিত্রপ্রজ অভিঘাত ঘটানো যায় সেই জিয়নকাঠির সন্ধান করে চলেন। সেই লীলার ধ্যানে মগ্ন হন। শিল্পে কোনো এক কথা বা শেষ বলে তাই কিছু থাকে না বা প্রমাণও করা যায় না। আমরা কেবল একে অপরের বুঝটা বুঝে নিতে পারি। পরস্পরের বিনিময়ে আলাপ-আলোচনা-ডায়লগ করে একটা ধারণায় একরকম পৌঁছতে পারি। কেবল একদল, একমতের বন্ধু-বান্ধব একমত হয়েই কিছু নিশ্চিত হতে পারি না। বহুজনের, সাধারণ দর্শকের বহু-ভাবনা জেনে বুঝে মেনে একরকম একটা ধারণা পেতে পারি কেবল।

এখানেই আমাদের নাট্যজনদের বড় ব্যর্থতা। আমরা দর্শকের নানা মত-বুঝ-ভাবনা বিনীতভাবে, খোলামনে দেখতে ঠিক চাই না। নিজের বা নিজেদের একটা তৈরি ধারণা নিয়ে তৃপ্ত থাকি। যারা অন্যকিছু বলে, ভাবে তাদের শত্রুপক্ষ ভাবি- শিল্পনন্দন বোঝে না বলে রায় দিই। অথচ কোনো ‘ডায়লগ’ শুরু হতে পারে ত এই মনোভাব থেকেই: I may be wrong, you might be right.-এই যে সত্যিকারের কোনো ‘ডায়লগ’, মানে, অন্যেরটা বুঝে নেবার প্রাণপণ চেষ্টা করে বিনীতভাবে নিজেরটা বলার চেষ্টা, তা সমাজে যেমন নেই তেমনি থিয়েটারেও একই দশা। নাট্যরূপায়ণেও সেই ঘটনা ঘটে, দর্শকসাধারণের মন-মতি-স্বভাব-বোধ-অভ্যাস জেনে বুঝে নাট্যভাষা বা প্রয়োগরীতি রূপায়ণ করি না তো। নিজেদের ধারণা-ভাবনা-কল্পনা দিয়ে আত্মতুষ্ট অহংকারে নাট্যনির্মাণ করে চলি। দর্শকের মতামত, ভালোলাগা, মন্দলাগার তোয়াক্কাও করি না। আমার সঙ্গে মেলে এমন কিছু দর্শকের সায় নিয়েই খুশি, ধরে নিই এটাই সবার মত-ভাবনা। কেউ দ্বিমত করলে তার বুদ্ধি-রুচি নিয়ে প্রশ্ন তুলি।

অথচ নাট্যশিল্প নাকি দর্শকের সঙ্গে পারস্পরিক ক্রিয়ায়, বিনিময়ে রূপ লাভ করে। তাতেই আমাদের গভীর মিলন ঘটে। সামাজিক-ধর্মীয়-রাজনৈতিক কৃত্যে যেমন একটা জায়গায় প্রত্যেকে নিজের মতো করেই মেলে। তাতে মানবক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এমন একটা মিলন কী কী করে ঘটতে পারে নাট্যজন তার নানা পন্থা সন্ধান করে ফিরবে না কি? কেবলি নিজেদের অহং নিয়ে থাকবে? একই সঙ্গে অন্যকে আর নিজেকে ভুলিয়ে চলবে আত্মতৃপ্ত বিকারে? দর্শকের ওপর সব দায় চাপিয়ে চোখ-কান-মন-মুখ বুজে থাকবে চোখ বাঁধা কলুর বলদের মতো?

‘সরাসরি দর্শকের মুখোমুখি কলাকুশলীগণ’- এই শিরোনামে নাট্যপত্রিকা ‘থিয়েটারওয়ালা’-র নানা আয়োজন একটা শুভ সূচনা করেছে। আসেন, আমাদের নিজেদের স্বার্থে একে অন্যের আর দর্শকসাধারণের নানা ভিন্ন মত-ভাবনা-রুচি-আকাঙ্ক্ষা জেনে-বুঝে নিই- নিরন্তর সজীব এক ‘ডায়লগ’- এর উদ্বোধন যাতে ঘটে। মঞ্চে অভিনেতৃদের পারস্পরিক নাটুকে সংলাপ আওড়ালেই কোনো নাট্যক্রিয়া ঘটবে না। সমাজে, জীবনে, দৈনন্দিনে সকলের সঙ্গে পারস্পরিক বিনিময় চাই। তাহলেই কেবল দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগ ও ভাববিনিময়ের ভিত্তিভূমি গঠিত হয়ে উঠবে।

একটা প্রচলিত কথা আছে- শিল্পী অন্তর্যামী। মানে কী তার? যে অন্তর জানে, ভেতরটা জানে। কেবল নিজের নয়, অন্যের, অনেকের। যে যতজনের অন্তর জানে সে তত শিল্পী-পদবাচ্য হয়ে ওঠে। বাল্মিকী ব্যাধের বাণে বিদ্ধ পক্ষীর শোকে অভিভূত হয়ে শ্লোক রচনা করেন। কেবলি কি বিদ্ধ পক্ষীর শোকে? নাকি শোকগ্রস্ত সঙ্গী পক্ষীটিরও? তার ওপর ব্যাধের জীবিকাকর্মের বাধ্যতাও তার মনে রাখতে হয়। সর্বোপরি একটি ক্রিয়ার সামগ্রিক কাণ্ডের বহুবিধ ভিন্নতর অভিঘাতও। এই সব বাল্মিকী একটি মানস অভিভবে ধারণ করেই শ্লোক রচনা করেন বলে সেটি চিরায়ত শোকবাণীর নিত্যতা অর্জন করে। নাট্য যদি শিল্পকর্ম হয়ে উঠতে হয় তবে তাকে এমনই বহুজ্বনের অন্তর্যামিতা ধারণ করতে হয়। আপন অহং থেকে মুক্ত হয়ে, অন্যের, সমগ্রের মনের খবর তার জানতে হয়। সাধারণ দর্শকের বিচিত্র বহু মন-মত-ভাবনার অখণ্ডতা সাধ্যমতো আয়ত্ত করতে হয়- আপন হতে বাহির হয়ে। তার মধ্যেই তার সবিশেষ আমিটিও যুক্ত থাকে। আপনার এবং অন্যের অন্তর ‘নিজের মতো’ জেনে নিয়ে প্রকাশ করতে হয়। তার জন্যই দর্শকের নানা ‘নিজের মতো’ আত্মস্থ করা সবার আগে চাই। এই প্রক্রিয়ার বড় বাধা নাট্যজনের নান্দনিক সৃজন-অহং। এই অহংকার আটকে রাখে দর্শকের সঙ্গে মিলনে, তাদের জেনে বুঝে মেনে নেয়ার দায় থেকে। তেমনি দর্শকেরও থাকে অহং বিবর। নিজের বোধবুদ্ধিরুচি স্বভাবের কারাগারে প্রাণপণ আবদ্ধ থাকতে চাই। নিজেরটা আর সবাইকে মানাতে মরিয়া হই। সেই হয় যেন অস্তিত্বের স্মারক। অন্যেরটা জানা-মানা যেন আমার হার, পরাজয়। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের ভুল দর্প এভাবেই প্রত্যেককে বিচ্ছিন্ন করে। অথচ শিল্পক্রিয়া তো এর বিপরীত। এটা আপন অহং থেকে, ব্যক্তিস্বরূপের খণ্ডতা থেকে উত্তরণের প্রশ্ন। অন্যের সঙ্গে মিলতে গিয়ে, অন্য মনের ক্রিয়ায় পাষাণ গলে। আমি তবেই না- আমি’র সন্ধান পায়, তার সঙ্গে মেলে। মনে তাহলে শিল্পরসের উদ্গম হয়। এই প্রক্রিয়ায় নিজেকে আর অন্যকে পাই একই সঙ্গে। মিলন ঘটে মৌলিক মানবস্বভাবের, মনের মানুষের সঙ্গে। শিল্পের তাই তো অন্বিষ্ট। সকলের সঙ্গে একমনে মিলনের উদার এক রস-নন্দন। - একটু ভাবের কথা মনে হচ্ছে বুঝি? অথচ এই-তো প্রাচ্যের রসনিষ্পত্তি আর পাশ্চাত্যের ক্যাথারসিসের মৌলসূত্র।  একুশশতকীয় অমানবিক আধুনিক অহং বিচ্ছন্নতায় তার নাগাল মেলে না। কখনো মেলেনি।

উপমহাদেশীয় নন্দনশাস্ত্র তাই বুঝি নাট্যজন আর দর্শকের এক মানস প্রস্তুতির কথা বলে। মনের রসিক সাত্ত্বিকসত্তার জাগরণই শিল্প উপভোগের প্রাথমিক শর্ত। শিল্পক্রিয়াদি এই রসায়ণটি ঘটাতে চায়। দুই পক্ষের একই সঙ্গে তাতে যুক্ত হতে হয় যদি শিল্পবস্তুর প্রকাশ প্রক্রিয়ায় পেতে চায় নন্দন-অভিভাব। তাহলেই আনন্দের মিলনভূমিতে আস্বাদ পাই সুন্দরের, শিল্পের। তাতে নাট্যের বিচিত্র বিপরীত ভাবও একই রসে আপ্লুত করে মন। ভয়, ক্রোধ, জুগুপ্সাও তার বিকৃত স্বরূপ পাল্টে হয়ে ওঠে একই রস পারমিতা। এতখানি পরাক্রম শিল্পনন্দনের। তার জন্যই মনের তামসিক, রাজসিক অহংবিকার উত্তীর্ণ হয়ে স্বভাবের এক স্বাত্ত্বিকতায পৌঁছতে হয়। দৈনন্দিনের প্রতিযোগিতা, লাভালাভ, স্বার্থ-ধান্ধার ধূর্ততার বাইরে না যেতে পারলে তো চলবে না। যতই কেন নান্দনিক শিল্পসৃজন বলে চ্যাঁচাতে থাকি। নিশ্চয় বর্তমানকার কুৎসিত, কলুষিত দেশ-বিশ্বের বীভৎস বাস্তবতায় সে বড় সহজ কাজ নয়। অমৃত কোনোদিনই বলহীনের লভ্য নয় যে।

সবাইকে তাই নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে হবে- কী আসলে পেতে চাই নাট্যক্রিয়া থেকে। তাহলেই প্রশ্ন করতে হবে নিজেকে- কী আসলে হতে চাই, কেমন করে বাঁচতে চাই। এই আত্মজিজ্ঞাসা ছাড়া মুক্তি নাই, যদি নাট্য শিল্পনন্দন থেকে কিছু চাওয়ার থাকে।

কথাটা তো আসলে সহজই। শিল্পের কাছে, নাটক থেকে আমরা অন্য কিছু, ভিন্ন কিছুই তো চাই। দৈনন্দিন জীবনে যা আমরা ঠিক পাই না, চাই-ও না। তাহলে তো অভিনেতৃ-দর্শকের অন্যরকম হয়ে উঠতে হবে। অন্য আমি’র জাগরণ যাতে ঘটে। প্রতিদিনের ছোট, ক্ষুদ্র অহংসত্তা পার হতে হবে। রোজকার স্বার্থ-ধারণা-ভাবনার একটা উত্তরণ ঘটতে হবে। তার দায় প্রথমত অভিনেতৃর, নাট্যজনের। দর্শক তো অভিনেতৃর ছোট আমি’র অহং আস্ফালন দেখতে আসেনি। সে-ও তো এক বড় কিছু পাবার জন্য এসেছে। নিজের বড় ‘আমি’ জাগিয়ে বিশেষ কিছু পেতে এসেছে। সেটা না পেলে, না হলে কেন আসবে সে এতো ঝঞ্ঝাট পেরিয়ে নাটক দেখতে? নাটকটা রবীন্দ্রনাথের হলেই তো আর পাওয়া যায় না রবীন্দ্রনাথ। যদি না অভিনেতৃ নিজেরা পান, পাওয়ার যোগ্য হয়ে প্রকাশ করেন রবীন্দ্রনাথ। গ্রামদেশে দেখি না কি সাধারণ, নিঃস্ব যত অসহায় মানুষজন যখন মঞ্চে আসেন, মুহূর্তেই কীরকম হয়ে ওঠেন তারা? কেমন একটা দৈব ঘোর ভর করে যেন তাদের। তারা আর তখন রিক্ত নিঃস্ব, অসহায় থাকেন না- একটা বড় কিছুর ঘোরে যেন আকাশ ছুঁয়ে ফেলেন। প্রকৃতি, দৈবীশক্তি আর আসর বন্দনায় দীন নত হয়ে ধারণ করেন এক মহিমা। ছোট অহংয়ের গ্লানি ধুয়ে মুছে নেন বিনয়ে গলে গিয়ে। হাজার দর্শকের সামনে কিছু করার, বলার যোগ্য হয়ে ওঠেন। জীবনে একজন দুজনের সামনেও কি আমরা থাকতে পারি, হতে পারি আমার নিজেরও সমান? তাহলে মঞ্চে হাজারো মানুষের সামনে দাঁড়াবো কী সম্বল হাতে করে? এতগুলো মানুষ আমার কথা শুনবে, আমায় দেখবে যে- সে কোন আমায় দেখবে? প্রতিদিনের তুচ্ছ ছোট স্বার্থান্ধ বামনটিকে? কেন দেখবে এমন ক্ষুদ্রজনকে- মনুষ্যপদবাচ্য যে নয়? কোন সাহসে সে মঞ্চে এসে দাঁড়ালো? তার কি এমন কিছু আছে যা নিয়ে সবার সামনে দাঁড়ানো যায়। কারো হয়তো অনেক ক্ষমতা, অনেক নাম, অনেক টাকা- তাকে দেখতে কি কেউ মঞ্চে আসে? তেমন অহংমত্ততা রোজই তো দেখে সে জীবনের বাস্তবে। তাহলে আমরা কি মঞ্চে এতোজনের সামনে ঠিক দাঁড়াই না? আপনার অহংমত্ততায় কেবল বুঁদ হয়ে থাকি? তোয়াক্কা করি না সামনে মানুষ আছে কি নেই? নাকি জীবনে সুযোগ পাই না বলে মঞ্চে দাঁড়িয়ে এতো মানুষ দেখে পায়ের নিচের মাটি সরে যায়, আস্ফালনের ঘোরে দাপিয়ে চলি? ক্ষমতার এক মহড়ায় নেচে কুঁদে ফিরি? এতগুলো মানুষজন সামনে আছে, তা মনে রাখলে কি আমরা দৈনন্দিন জীবনের মতো এতো সহজে লম্ফ-ঝম্ফ করতে পারতাম? একজন মানুষও আমার ভেতরে বড় কিছু চাইছে, যদি জানতে পারি, তাহলে মনে অন্যরকম এক প্রক্রিয়া ঘটে না কি? যেন আমার সর্বস্ব দিয়ে, সত্য গভীর সহজ হতে পারি তারই জন্য তাহলে প্রাণপাত করি না কি? ছোট আমিকে তাহলে অন্যের সামনে মেলে ধরতে পারতাম কি? নিজেকে তার এতো ছোট করে রাখতে চাইতাম কি? জীবনে কেউ কাউকে কেয়ার করি না বলেই তো সহজে যা ইচ্ছে তাই করে বেড়াই। যদি একজনকেও কেয়ার করতাম, যদি জানতাম কতজন আমাকে কেয়ার করছে, আমার কাছ থেকে বড় কিছু চাইছে, তাহলে কী করতাম আমরা? নিজের জীবনের অভিজ্ঞতায় ভেবে দেখি না একবার- কেউ আমাকে মূল্য দিলে, আমিও তো তাকে মূল্য দিতে চাই না কি? নাকি কেউ মূল্য দিলে আমার ক্ষুদ্র অহং ফুলে হয় ঢোল, ভাবি আমি বড় বলেই কেউ এমন করছে, তাই তাকে ছোট করেই যেন আমাকে আমার বড়ত্বের প্রমাণ দিয়ে চলতে হবে। জীবনের এই ক্ষমতা, লাভলোভ স্বার্থের হিসাব দিয়েই কি মঞ্চে আসবো? সেতো প্রতিক্ষণেই করছি- তা করে কি কেউ আমরা আর ভালো থাকি? মঞ্চে কি অন্যরকম হতে আসিনি? অন্য কিছু, সত্য গভীর কিছু পেতে, হতে, দিতে আসিনি কি? তাহলেই কি প্রেমের দায়ে অহং গলিয়ে শুদ্ধ হয়ে যা কিছু আমার দামী আছে তাই দিতে চাইবো না- জীবনে যার সুযোগ পাই না। সেই সুযোগ মঞ্চে শিল্পে মেলে বলেই এমন আকুল হয়ে হেথা আসা নয় কি?

ড. বিপ্লব বালা : শিক্ষক ও সমালোচক।