Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

অহরকণ্ডল ও জন্মসূত্রকথা

Written by কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

জন্মসূত্র নবজন্মলব্ধ এক নাটকের দল যার প্রথম প্রযোজনা অহরকণ্ডল। এটি লিখেছেন বদরুজ্জামান আলমগীর। এক ঘন্টা দশ মিনিটের এক দৃশ্যকাব্য। তাদের ঘোষণা থেকেই তাদের নান্দনিক কার্যক্রম স্পষ্ট হয়ে যায়। তা হচেছ- নাট্যবিশ্বের সমস্ত উজ্জ্বল প্রণোদনা, অনুসরণীয় শিল্পসৌকর্যের অবিকল্প সব মণিমুক্তো আহরণ করে দেশজ নাট্যআঙ্গিকের বিপুল বৈভবের ওপর দাঁড়িয়ে দেশকালঐতিহ্যসম্পৃক্ত থেকে ঋজুভাবে দাঁড়াতে চায় জন্মসূত্র। জন্মসূত্রের জাগ্রত ইচ্ছা মূলস্রোতের থিয়েটারচর্চায় অনন্য এক মাত্রা যুক্ত করা ও থিয়েটারচর্চাকে এদেশে, এক্ষণে পেশাদারিত্বের মর্যাদায় উন্নীতকরা। এ দূরযাত্রার রসদ সংগ্রহে জন্মসূত্র নিত্যশিক্ষণপ্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে যাত্রার যে রূপরেখা তৈরি করেছে তাতে নিষ্ঠ অধ্যয়ন, উষ্ণালাপ থেকে ক্ষেত্রসমীক্ষা পর্যন্ত বিবিধ আকাঙ্খা স্থান করে নিয়েছে। তাদের প্রথম দুটি প্রদর্শনী হয় ১৭ ও ১৮ সেপ্টেম্বর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটমণ্ডলে। নির্দেশনা আর মঞ্চ পরিকল্পনায় আছেন কামালউদ্দিন কবির, নির্দেশনা সহকারী ও পোষাক পরিকল্পনায় ফরিদা আকতার লিমা, আলোক পরিকল্পনায় নাসিরুল হক খোকন, সঙ্গীত পরিকল্পনায় অসিত কুমার, প্রযোজনা ব্যবস্থাপনায় অমিতাভ মহালদার। মিলনায়তন ব্যবস্থাপনায় থিয়েটারওয়ালা।

এ দৃশ্যকাব্যটি নানানভাবে দেখা যায়, মানে দেখার যথেষ্ট ধারণা এখানে বিবৃত হয়েছে। এটিতে আলাদা আলাদা চরিত্রমুখি নাটক বা দৃশ্যকাব্য বলা মুশকিল। এটিতে হয়তো দানিউল, আকমল, বাহার আলাদা বৈশিষ্ট নিয়ে থাকে- এ তিনজনকে ঘিরেই গল্প এগোয়। অথবা হতে পারে নিসর্গকে জড়িয়ে-পেঁচিয়ে রাখা জনপদের কতিপয় মানুষের এক আর্তচিৎকারের সমাহার হয়ে আছে এটি। এ তিনজন কর্মহীন যুবক। প্রত্যেকের আলাদা জীবন আছে। কিংবা তা দৃঢ়ভাবে আছেও বলা হয়তো ঝামেলারই। এমনি এক ঘোরের মিলিতরূপ এখানে আছে। রাতের প্রথম প্রহরে এরা আন্তির পাড় যায়। সাথে চলমান হয় ভয়ঙ্কর-কর্কশ প্রকৃতি, এবং তাদের অনুগামী হয় কিছু ছায়া। তা-ই তাদের কখনও এক করে, কখনও ভেঙে ভেঙে দেয়। আশ্চর্য-সব দৃশ্যময়তার ভিতর ওদের সময় পার হয়। দৃশ্যকাব্যটিতে সংলাপ, দৃশ্যময়তা, ঘটনার বিন্যস, অন্তর্র্নিহিত দ্বন্দ্ব এদের প্রকাশ্য কথকতায় একাকার হয়ে যেতে লাগল।

গ্রামীণ এক ছড়ার মাধ্যমে দৃশ্যকাব্যটির শুরু। তিনজন মঞ্চে উঠে আসে। তারা ভিন্নদিক থেকে, মানে দর্শককে অনেকটা হতবিহ্বলতার মাঝে নিমজ্জিত করতে শুরু করে। শুরু হয় ভাষাচিত্রের এক জাদুকরী বিস্তার।  এই ধরনের বিষয়-আশয় সারাটি দৃশ্যকাব্যতেই আছে। মূল স্ক্রীপ্ট থেকে এর খানিকটা শোনা যাক।- ‘তখন সারা প্রকৃতি ভিজে যায় কাক জ্যোৎস্নায়। এই জ্যোৎস্নার ভিতরে কোরালিয়া বাজার, বাজারের অগ্নিকোণে এক সুপ্রাচীন বৌদ্ধ কেয়াং। বাজারের পুবমাথা থেকে বেশ কিছুটা আকস্মিক ঢালু পেরিয়ে খোলা জায়গা, তারপর কেয়াং। কেয়াং-এ এখন শুদ্ধোধনের পুত্র গৌতমের মূর্তি নেই। কিন্তু মনে হয়, পুরো এলাকাটায় গাছপালা খানিকটা নুয়ে থাকে। তারা কী জানে নির্বাণের গূঢ়? আজ রাতের জ্যোৎস্না যে-মত উড্ডয়নশীল, তাতে আকাশনীল ফেরেশতার ডানার গন্ধ এসে নাকে লাগে।’ নাটকটির একেবারে শেষদিকে দর্শকবৃন্দকে উদ্দেশ্য করে চরিত্রত্রয় জানায়- ‘প্রিয় দর্শক, আমরা প্রার্থনা করি, পূর্ব দিগন্তে সূর্য উদিত হোক, বা শিমুলপ্রতিমা বোনের মুখ- তার চৌদিকে পশর, তারা যে ভাবে, কপালের বলিরেখার মত ভাঁজে ভাঁজে আরো রাত্রি নামুক- এ-মত তারা রাত্রি ও দিবসের সংরাগে দাঁড়িয়ে ভাবে।’ লেখক ভাষাযোগে রীতিমত খেলায় মত্ত হতে জানেন। এক্ষেত্রে তিনি কমলকুমার মজুমদার, শাঁওলী মিত্র, সেলিম আল দীন প্রমুখের সহযাত্রী। এ-দৃশ্যকাব্য রচনায় অমর কথাশিল্পী কায়েস আহমেদের কাছে লেখক ঋণ স্বীকার করেছেন।

এটি মঞ্চায়নে লেখক তাঁর মনোভাব প্রকাশ করেছেন ঠিক এভাবে- ‘প্রকৃতপক্ষে ওরা তিনজন - আকমল, দানিউল আর বাহার কখোনই মাঠে গিয়ে জড়ো হয়নি, অথবা হয়েও থাকতে পারে। কে জানে, এ কেবল একটা স্বপ্ন, বা দুঃস্বপ্ন জানি সেও- তবু তাদের কররেখা যা অনুমান করেন গণক বাজিকর, কী কপালের বলিরেখা যা পাঠ করেন মা জননী, তার কোনো রকমফের হয় না। আমাদের হাতের বেড়ের ভিতর যথাসাধ্য অনুভব করি একালের তিন সহোদর যারা কখনোই এক মায়ের পেট থেকে নেমে আসে নি। কিন্তু তারা পিঠাপিঠি সোদ্দর ভাই- সংঘবদ্ধ আর বিচূর্ণ প্রবল পাষাণ এবং বৃষ্টির কোমল পিঠ। তারা এমত ছিন্নভিন্ন বহুদূর, ফলে তাদের মুখমণ্ডল আর দেখি না, দেখি একটা সমান্তরাল ভাইফোঁটা।

এ দৃশ্যকাব্যে- আকমল, দানিউল,বাহার অথবা উপেন্ড চামার চরিত্র, কী বলি ওরা কেনো চরিত্র নয়, তারা কেবল কালের সামান্য রঙের চিহ্ন।

এ নাটক কখনো এক জায়গায় দাঁড়ায় না, সময়ের কাঁধে হাত রেখে সমান পায়ে হেঁটে যায়, যে মত ঘাটে ভিড়িয়ে ডিঙ্গা একটু খিলিপান হাতে নিতে পারে না আকমল, দানিউল আর বাহার, তাদের পায়ের নিচে মটরদানা আছে। ... তাদের ভিতরেই আমাদের উৎকন্ঠা বরাবর অর্জুন আসে, সীমার এক জাগে।’

স্বনির্মিত এক জীবনবিন্যাস এটিতে আছে। এর মূল স্ক্রিপ্ট থেকে শুরু করে মঞ্চবিন্যাস, নাট্যপ্রযোজনা- সবখানেই প্রথাগত চলমান নাট্যপ্রবাহকে ভাঙার দুর্দান্ত স্পৃহা লক্ষ্য করা যায়। নাটকটি শুরু হলে একেবারে পিছন থেকে কিংবা অনেকদূর থেকে শ্রাবণের মনসাবন্দনার ঢঙে বাদ্য শোনা যায়। ধীরে ধীরে মঞ্চের আলো আরও প্রকাশিত হয়। মঞ্চটি অনেকটাই খোলা, প্রসেনিয়াম থিয়েটারের আদল ভেঙে যায়, পালাগানের আদলও থাকে না এতে। কী থাকে তাহলে? থাকে জল-নদী-খাল, রুখু প্রকৃতিঘেঁষা ছায়া-ছায়া এক জায়গা। মঞ্চে গাছের তিনটি গুঁড়িকে শ্যামলা-গেরুয়া-বেগুনি কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে রাখতে দেখা যায়। মঞ্চেও মাঝে-মাঝে পড়ে থাকে অনাবৃত-ঢঙে কাপড়ের আবরণ। মাথার উপরে মানে মঞ্চটির ছাদে থাকে কতিপয় দড়ির আদলে সাপের ফনার বাস্তব সাজেশন। মঞ্চটির পিছন দিকেও কয়েকটা দড়ি দিয়ে বানানো সাপের ফুঁসফাঁস। এমনই এক আবছা চৈতন্যের ভিতর ওরা তিনজন দাঁড়ায়। তাদের যাপিতজীবন আর স্বপ্নভঙের কথা বলে যায়। এর ভিতর শেয়াল, উদ্বিড়াল, চামড়াখুলে নেয়া ষাঁড়ের আর্তনাদ কিংবা ভয়ঙ্কর দৃশ্যময়তার ভিতর দর্শকের সময় যেন আটকা পড়ে। প্রাণীর চলাফেরার ভিতর মানবিক আবহ প্রত্যক্ষ করা যায়। একধরনের জাদুময়তায় জব্দ হয় তারা। এর ভিতর অতিলৌকিক কিছু কথকতার বিস্তার হয়। মা মনসা, বাসকি, মানুষের জন্মবেত্তান্ত, অসহায়তা একে একে জানান দেয়। বহু গল্পের সমাহার ঘটেছে এতে। এক গল্পের ভিতর আরেক গল্প ঢুকে যায়। বা গল্পই গল্প টেনে আনে। জীবনের বহুবিধ বিস্তার আমরা স্বল্পসময়ে প্রত্যক্ষ করি এবং বিস্ময়ে হতবিহ্বল হই। এক দৃশ্যকাব্যে অতসব বিষয়-আশয়, সামাজিক, রাজনৈতিক, কিংবা ক্ষণভঙ্গুর নৈতিকতা ইতোপূর্বে প্রত্যক্ষ করেছি বলে মনে পড়ে না।

তিনজনের চলাচল আমরা প্রত্যক্ষ করি। তবে তিনজনের আলাদা আলাদা গল্প আছে, আছে জীবন তা-ই নাট্যকার অত্যন্ত নিপুণতায় বুনন করেছেন। আকমলের কথায় শোনা যাক্, কিছুদিন ধরে সে একধরনের একাকীত্ব বয়ে বেড়াচ্ছে। চব্বিশ বছরের জীবন তার। ওর বাবা মারা গেল পাঁচ বয়সে রেখে। মাকে আকমল পেরিমা বলে ডাকে। ওর বাবা আব্বাস আলী ডাকত পিয়ারিমা বলে। হিসাব মতে, ওর মায়ের বিয়ে হয় হয়ত ১১ বছর বয়সে। এখন তার মায়ের আটত্রিশ বছরের শরীর বয়ে বেড়ায়। তা-ই গহীন রাতে হঠাৎ দেখে ফেলে আকমল। একধরনের মনোজাগতিক জটিলতা তৈরি হয় তার। সফোক্লিসের ইডিয়ম কমপ্লেক্সের এক জান্তব রূপ দেখি আমরা। বাসুকির ফণা প্রত্যক্ষজাত হয় ওর মায়ের শাড়ির পাড়ে। ফণা তোলে বা ফণা বয়ে বেড়াতে বাধ্য হয়। বাল্যবিবাহের নিষ্ঠুর যাতনা যেন দর্শককেও ম্পর্শ করে। বাহারের সঙ্কট তৈরি হয় কিংবা প্রবহমান থাকে ভালোবাসাজনিত ক্রিয়া থেকে। সে ভালোবাসতো সীতাকে, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা পড়ে হিন্দু হয়ে যেতে যায়, গরু খাওয়া পছন্দ করতে পারে না। এমনকী বাহার পারষ্পরিক ধর্মত্যাগের কথা জানায়। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠে না। সতী এখন আগরতলায় সংসার করছে। মুশকিল হচ্ছে, বাহার তাকে ভালো না বেসে থাকতে পারে না। দানিউল চাইত্যান গাছের তলায় যেতে যায়। সংস্কারজনিত ভয় থাকলেও সেখানে যেতে যায়, কারণ ওইখানেই তার আঙ্গুর কাকু গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। দানিউল আরো এক জটিলতায় বা সাংসারিক পীড়নে আক্রান্ত- কারণ, তার বোন পেটে বাচ্চাসহ ওদের বাড়িতে ফেরত এসেছে। তাই হামিদ মিয়ার কাছে তার উইভিং ফ্যাক্টরিতে একটা চাকুরির আব্দার জানায়। কিন্তু ধ্বড়িবাজ হামিদ মিয়া একজন সৎ-ইন্নোসেন্ট মানুষকে কেন চাকুরি দিবে? বরং নিয়ামুলকে হত্যার কথা বলে, ভ্যাকেন্সি নিজেরা তৈরি করার কথা জানায়। তাই একটা সময় দানিউল জানায়, তারা মূলত এক উইভিং ফ্যাক্টরির ছোট তরফের সুপারিনটেনডেন্ট হামিদ মিয়ার দূর সম্পর্কের ভাতিজা নিয়ামুলকে খুন করতে চায়। কারণ সে মালিকের বউয়ের সাথে অবৈধ সম্পর্ক করে নিয়েছে। কিন্তু নিয়ামুলকে হত্যার কোনো ক্রোধ তাদেরকে আক্রান্ত করে না। বরং তাদের ভিতর ভয়মিশ্রিত এক ধরনের অসহায়তা ভর করে। নিয়মুলকে মারার জন্য যে একলক্ষ টাকা দেয়ার কথা এর বদলে তাদেরকে যদি কেউ পাঁচলক্ষ টাকা দেয় তা হলে তারা কী করবে! এভাবে নিজেদের ভিতর নিজেরাই খণ্ড-বিখণ্ড হতে থাকে। নিয়ামুলের জন্য অপেক্ষাও চলে। একসময় সে আসে। এর আগেই তিনজন চোখ বেঁধে একজন ডামি নিয়ামুলকে হত্যা করে। সেই ক্রোধের ভিতরই সত্যিকার নিয়ামুল তাদের চোখের সামনে আসে। অসহায়তা জয় করার ভিতর, কিংবা অজানা এক জীবনতৃষ্ণার ভিতর এরা তিনজন ওকে কুপিয়ে ফালা ফালা করতে থাকে। আটাশটি আঘাত করা হয় তাকে। এর পরবর্তীতে নিয়ামুলের অবস্থা মূল গ্রন্থ থেকেই পাঠ করা যাক।- ‘ঘন্টাধ্বনির বেগুনী রঙের ওপর নিয়ামুলের মৃতদেহ ভাসে। মৃতদেহ যেন শরীর নয়, একটি রঙের রেখা। এ-রেখা হারিয়ে যায় না। স্তব্ধ যে দাঁড়িয়ে থাকে আরও তিনটি রেখা- দানিউল, আকমল, বাহার। মৃতদেহ নির্দিষ্ট দূরত্বে তাদের শরীরের সঙ্গে কি জোড়া লেগে যায়? ওরা তাকে কবর দিতেও ভুলে যায়। তখন আবিল-কাবিলের মৃতদেহ সৎকারের মিথ তাদের ভিতর জাগ্রত হয়। তাকে মাটির তলায় রেখে দিতে পারে। এরা হুহু করে কাঁদে। প্রকৃতি বুঝি এই প্রথমবারের মতো কান্না শোনে! তবে এমনও মনে হতে পারে যে, হয়তো তাকে পায় না ! আরেক জীবনের, আরেক ভাবনা বা ঘটনার আবর্তে তাদের সময় পাক খেতে থাকে। এমনই এক জাদুময়তার ভিতর, জীবন-আকাঙ্খার ভিতর দৃশ্যকাব্য শেষ কিংবা নতুন করে শুরু হয়। তারা ফিরে যাওয়ার ভাবনাকে বাদ দিতে পারে, কারণ তাদের মনে হয়, চাইত্যান গাছের আগায় আছে অহরকণ্ডল। তা-ই নিয়ামুলকে এখানে নিয়ে আসবে। কারণ অহরকণ্ডল সব পারে। এমনই এক জনপদ আশ্রিত মিথ নাটকটির অন্তর্প্রবাহে বিরাজ করে। এর বিচিত্র দৃশ্যপট, বর্ণনা, গল্প বলার ধরনে এটিকে শেষতক প্রথাগত নাটকের ধরন বলা যায় না। এ কি গল্পনাটক? গল্পথিয়েটার? নাকি নাট্যকাব্য?

অতিলৌকিক দৃশ্যপটের বিস্তার লেখাটিতে অধিক, অন্তত একজন দর্শক হিসেবে তা জানানো যায়। সেই কাজটিকে ব্যালেন্স করার নিমিত্তে নির্দেশক হয়ত মূল স্ক্রিপ্টের প্রতি তার খুব বেশি নজর না দিয়ে নিজস্ব রিস্ক বা দায়িত্বশীলতা বাড়াতে পারতেন। নাটকের মঞ্চ পরিকল্পনার সাথে সামঞ্জস্য রেখে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক আরও প্রাণবন্ত করা যেত। ফ্লাড লাইটের বাহুল্য কমিয়ে দৃশ্যকাব্যের সাঙ্কেতিক বিন্যাস আরও বহুমাত্রিক করা যেত হয়ত। এখানে কিছু বিসাদৃশ্যের কথাও বলা যায়- আকমল একসময় জানায় সতীকে ভালোবাসার তাগিদে সে হিন্দু হয়ে যাবে। এটি বোধ হয় ধর্মীয়-রাষ্ট্র-আশ্রিত বাস্তবতায় সঠিক হয় না। সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের কেউ নিজে না-ভাবতে চাইলেও রাষ্ট্র তাকে কিছু অতিরিক্ত বাসনা দেয়। সেখানে মুসলিম প্রধান এই দেশে একজন বাহার এভাবে ভাববে না যে সে হিন্দু হয়ে যাবে। তবে গ্রামীণ শ্লোক, ছড়া, জনপদ, নিসর্গ, রেল-স্টেশন, চর, মাঠ ইত্যাদি মিলেমিশে এক চমৎকার ধর্মমুক্ত লোকায়ত আবহ তৈরি করে। সমগ্র নাটকটিই এক নিজস্ব কথকতার সমাহার বলা যায়। তা নাট্যকারের নিজস্ব ঘরানার এক বিষয়-বৈচিত্র্য হয়ে যায়। কথা হচ্ছে, দানিউল, বাহার, আকমল প্রমুখ তো ধর্মীয় বিবেচনায় মুসলমান চরিত্রই। তাহলে বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড, বাসুকির ফণা, পেঁচা আখ্যান, বেহুলা-লখিন্দর, সুতানলী সাপ, সৃষ্টি-বৈচিত্র্য যখন সনাতনধর্ম ঘেঁষা হয়, তখন তা সোশ্যাল রিয়েলিটিকে ভিন্নভাবে দেখানোর প্রবণতা স্পষ্ট হয়। আবার এই দৃশ্যকাব্যে প্রত্যক্ষ করা যায় বুরাকের, ফেরেশতার, জিনের, আদিমানবগোষ্ঠীর মিথ। অন্তজ্য শ্রেণীর লৌকিক বিশ্বাসও এখানে জায়গা করে নেয়। এ যেন তাঁর নিজস্ব ঘরানার মিথ, যা তিনি নির্মাণের ক্ষমতা রাখেন।

তবে নাটক তো এক দৃশ্য-মাধ্যমও। যার ফলে একে দর্শকের সম্পৃক্ততার জন্য আরও কিছু করা যেত কিনা ভাবা যেতে পারে। যেমন, পেরীমা, দানিউলের বোন, উপেণ্ড চামার, চামড়া-খসিয়ে-ফেলা গরু ইত্যাদি আলাদা চরিত্র হতে পারতো। অহরকণ্ডল বিষয়টাও দশৃকের কাছে খুব বেশি স্পষ্ট হলো কিনা বলা মুশকিল। তাই নিজ-উদ্যোগে (!) তৈরি করা সেই পাখিটিকে নাট্য-আবহে আনা যেত কি? এমনকি নিয়ামুলও প্রত্যক্ষ চরিত্র হতে পারতো। তাহলে হয়ত একজন দর্শক একধরনের রিলিফ পেত। মূল স্ক্রীপ্ট-এ যে রঙের ব্যবহার দেখি তা বোধহয় পুরো ব্যঞ্জনা নিয়ে আসে নি।

দানিউল, আকমল আর বাহারে চরিত্রে অভিনয় করেছেন যথাক্রমে রতন দেব, দিলীপ চক্রবর্তী ও আনোয়ারুল হক। প্রতিমুহূর্তে তারা একধরনের দ্বন্দ্বময়তার ভিতর তাঁদের সময় পার করেন। একজন অভিনয় করে যাচ্ছেন তো, অন্যজন এমন এক শারীরবৃত্তীয় দৃশ্যময়তায় নিমগ্ন থাকেন যাতে দর্শকের শ্বাস ফেলারও যেন সময় থাকে না। এতে অভিনয়ের সমন্বয় সত্যি অপূর্ব হয়ে ওঠে। তা-ও নিশ্চয়ই সম্ভব হয়েছে নির্দেশকের দারুণ মেধা আর নান্দনিক স্পৃহার দরুণ। এধরনের অনির্ধারিত জীবনের অনির্ধারিত সব র্দশ্যকল্পের ভিতর এক-একটা চরিত্রের দাবি মেটানো সহজ কাজ নয়। অথচ সেই কাজটি অতি দক্ষতায় তাঁরা করতে পারলেন। এরা দুইধরনের কাজের ধরনে থাকেন- একই সাথে কথক আবার পরবর্তীতে যৌথনাট্যপ্রবাহে নিজেদের নিয়োজিত রাখেন। নিজেকে গড়ে ভাঙার এই নাট্যলীলা সুসম্পন্ করা খুবই প্রতিভাময় শিল্পীর নিপুণ প্রয়াস। একধরনের দশাপ্রাপ্ত অবস্থার ভিতরেই তাদের সময় পার হয়েছে। নির্দেশক কামালউদ্দিন কবির সামগ্রিকভাবে এক নতুন কাজ সম্পন্ন করতে পারলেন। একধরনের শৈল্পীক নেশা জাগ্রত রাখতে পারলেন। এমনকি এও বলা যায়, মঞ্চনাটকের ভুবনে এটি নির্দিষ্ট অবস্থান নিয়ে থাকার মতো এক অবয়ব দাড় করাতে সক্ষম হলেন তিনি; যা প্রথাগত নাট্যচর্চার নানাবিধ আদল ভেঙে এক নবতর নাট্যজোয়ারের স্পষ্ট ইঙ্গিতও প্রবহমাণ থাকল।

জন্মসূত্র তার পরিকল্পনায় জানাচ্ছে, এরা গ্রুপ থিয়েটারের প্রথাগত ধারণায় থাকবে না, পেশাগতভাবে নাট্য-আন্দোলনকে ধারণ করবে। এটা তো সত্যি যে, নাট্যজনরা হাওয়া খেয়ে তাদের জাগতিক অস্তিত্ব বহাল রাখতে পারবে না। এর জন্য একটা পরিকল্পনার দরকার অবশ্যই থাকতে পারে। কিন্তু আমাদের, মানে দর্শকদের এধরনের ভয় বা শঙ্কা থাকতেই পারে যে, এ দলটি একসময় কি বিদেশি লগ্নিপুঁজির কাছে আত্মসমর্পণ করবে? কারণ আমরা তো দেখছি, কেউ কেউ প্রফেশনের নামে, উন্নয়ন থিয়েটারের কতধরনের ডিগবাজি দেখাচ্ছে। যাই হোক, আমরা আশা করতে পারি সামাজিকত্ত্বাকে জাগ্রত করার পক্ষেই কাজ করবে জন্মসূত্র।

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর ( This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it. ) : গল্পকার, সম্পাদক- কথা (কথাসাহিত্যের ছোট কাগজ