Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

থিয়েটার গেইমস্ : অভিনয় প্রশিক্ষণের নতুন ভাবনা [তৃতীয় কিস্তি]

Written by ক্লাইভ বার্কার.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

অনুবাদ : অসিত কুমার

থিয়েটার ক্রীড়া-তত্ত্বের উদ্ভব

আমার অভিনয় প্রশিক্ষণ পর্বের শুরুর দিকে খেলার প্রয়োগ সীমাবদ্ধ ছিল সহজ অঙ্গ সঞ্চালনের বাস্তব সমস্যা মোকাবেলার উদ্দেশ্যের মাঝে। ভূমিকায় যেমন বলেছি, কৌশলগত শরীরচর্চায় অভিনেতা যে সমস্যার মুখোমুখি হয়ে বিপর্যস্ত হয়, সেই অবস্থা থেকে তাকে বের করে আনার উদ্দেশ্যেই প্রশিক্ষণে খেলার প্রচলন।

আনাড়ি অভিনেতার প্রশিক্ষণ কর্মসূচির অভিজ্ঞতায় দেখা যায় যে, কৌশলগত অনুশীলনাদি শিক্ষানবিশ  অভিনেতাকে  আত্ম-সচেতন  করে  তোলে  এবং পরিণতিতে তার কর্ম-শক্তি প্রবাহ অন্তর্মুখি হয়ে পড়ে।

এই অবস্থার ধারাবাহিকতায় কর্মশালার ক্লাশগুলো দুঃস্বপ্নের মত হয়ে উঠতে শুরু করে। সেটা সামলাতে গিয়ে যাই করি তাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। একবার দুর্ঘটনাক্রমে একটা জায়গায় গিয়ে আমরা থমকে দাঁড়াই। আমরা কাজ করছিলাম ‘ক্রিয়াক্ষেত্রে সম্প্রসারণ’ বিষয় নিয়ে। কিন্তু দুই হাত দুই দিকে প্রসারিত করে থাকাটার মধ্যে আমরা ঠিক মজা পাচ্ছিলাম না। আমি বললাম, আমরা একটা কাজ করি- দেয়ালে একটা জায়গা জুড়ে ফুটবল খেলার মত গোল বার এঁকে নিই; একজন তার সামনে গোলরক্ষক হয়ে দাঁড়াবো; আমরা একটা টেনিস বল হাতে নিয়ে চিহ্নিত লক্ষ্য ভেদ করতে চাইবো; গোলরক্ষক তার দুই পা ছড়িয়ে গেড়ে দাঁড়ানো অবস্থান না ভেঙে কেবল দুই দিকে হাত সম্প্রসারিত করে বলটাকে ধরবে। ব্যাপারটা সবাইকে আকৃষ্ট করলো। আমরা থিয়েটার ক্রীড়ায় প্রবেশ করলাম। প্রশিক্ষণের ভাব-গাম্ভির্যের চাপ থেকে মুক্ত হয়ে সবাই আমোদের সাথে কাজ করতে লাগলো যার অন্তরালে অভিনেতার প্রস্তুতি প্রক্রিয়া সচল হল। আমি সুগভীর স্বস্তি বোধ করলাম।

এখন আমার কাজ হয়ে পড়লো একটার পর একটা খেলা সংযোজনের মাধমে প্রশিক্ষণ অধিবেশন চালিয়ে যাওয়া। আমি আমার স্মৃতির ভাণ্ডার তল্লাশি করে খেলা খুঁজতে লাগলাম এবং এর মধ্য দিয়ে বেরিয়ে এলো প্রশিক্ষণের একটি নতুন ক্রিয়াপদ্ধতি।

ধারাবাহিক ক্রীড়া

অভিনেতার চলনের সুনির্দিষ্ট সমস্যা সমাধানে থিয়েটার ক্রীড়া কার্যকর। যেমন, ‘হপস্কচ’ একটি খেলা। এর মধ্য দিয়ে শিশুরা একপায়ে ভর করে ভারসাম্য স্থানান্তরের কৌশলে সুদক্ষ হয়ে ওঠে। ‘স্কিপিং’ বা দড়ি লাফানি খেলা একটানা পরিশ্রম করার শক্তি বৃদ্ধি করে। অভিনেতাকে নিয়ে কাজের ক্ষেত্রে সাধারণত বিচ্ছিন্নভাবে একটি বা দুইটি খেলার পরিবর্তে কর্মপরিকল্পনা গড়ে তুলতে হয় ধারাবাহিক ক্রীড়া পরম্পরার সূত্রে। এর দুটো উদ্দেশ্য। প্রথমত- একই খেলার ধরন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে শরীরের একেকটি পেশীগুচ্ছকে ক্রিয়াশীল করে তোলা যায়। দ্বিতীয়ত- এই পরিবর্তনের ফলে অভিনেতার অবসাদের সম্ভাবনা দূর করে তার মনোযোগ দীর্ঘস্থায়ী করা যায়।


ষষ্ঠ অধ্যায়
সহজ অঙ্গ সঞ্চালনভিত্তিক খেলা

সাধারণ ছুটাছুটির খেলার মাধ্যমে অভিনেতার উপর থেকে চাপ অপসারণের পাঁচটি প্রধান উপায় আছে। এর সবক’টি পন্থাই অভিনেতার ভাবনাকে তার নিজের উপর থেকে সরিয়ে বাইরের দিকে ধাবিত করে। অর্থাৎ তার কর্ম-শক্তি (এনার্জি) প্রবাহকে অন্তর্মুখি অবস্থা থেকে বহির্মুখি করে। এই প্রক্রিয়া অভিনেতার আত্ম সচেতনতা ভেঙে তাকে তার শরীর-চিন্তন কৌশল থেকে মুক্ত করে।

লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

এই পদ্ধতিসমূহের প্রথমটিতে খুব সাধারণ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা হয় যা অভিনেতা খুব সহজেই অর্জন করতে পারে। এর মধ্য দিয়ে অভিনেতার মনকে তার অঙ্গ-সঞ্চালন ভাবনা থেকে সরিয়ে নেয়া যায়।

ছোঁয়াছুঁয়ি খেলাটা আমরা সবাই জানি। এতে একজন খেলোয়াড় অন্য সবাইকে ছোঁয়ার জন্য তাড়া করে যতক্ষণ না ছুঁয়ে দিয়ে সে অন্যজনকে তাড়াকারী বানায়। খেলার উদ্দেশ্য যেহেতু একপক্ষে ছুঁয়ে দেয়া এবং অন্যপক্ষে ছোঁয়া থেকে বাঁচা, খেলার জন্য নির্ধারিত সীমানার মধ্যে সবাই আনন্দের সাথে মরিয়া হয়ে ছুটতে থাকে। ফলে ভয়ানকরকম কর্ম-শক্তি বিচ্ছুরণ ও অপসারণ ঘটে।

শর্ত পরিবর্তন করে করে এই খেলাটার নানা রকমফের ঘটানো যায়। নিয়ম পরিবর্তনের মাধ্যমে খেলোয়াড়দের চলনের ধাচে পরিবর্তন নিয়ে আসা যায়। নিয়ম যদি এমন হয় যে মাটিতে পা থাকা অবস্থায় মাথায় ছুঁয়ে দিলে তবেই একজন মারা পড়বে তাহলে চলনটা হয় দৌড়ানো এবং লাফানো। যদি নিয়ম করা হয় যে মারা পড়া খেলোয়াড় তার শরীরের যে অংশে ছোঁয়া হয়েছে সেই অংশটা চেপে ধরে ছুটবে তাহলে এসে পড়ে নতুন প্রতিবন্ধকতা যা তাকে অতিক্রম করতে হবে। ইঁদুর-বিড়াল খেলায় তাড়াকারী কেবল একজন প্রতিপক্ষকে তাড়া করে; অন্যরা পরস্পরের হাত ধরে বর্তনী সৃষ্টি করে যার ফাঁক গলিয়ে আঁকাবাঁকা পথে চলে ধাওয়া। ইশারা পেলে বর্তনীর থামেরা দিক পরিবর্তন করে যাতে করে আঁকাবাঁকা পথের নিশানা পরিবর্তিত হয়ে যায়। ফলে ছোটা ও পশ্চাদ্ধাবনেরও দিক পরিবর্তন হয়।   

প্রারম্ভিক খেলা হিসেবে ছোঁয়াছুঁয়ি খুব কার্যকর, কারণ, এতে ভয়াবহরকম কর্ম-শক্তি অপসারণ ঘটে। কর্ম-শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ ও সুশৃঙ্খল করার কাজ শুরু করার আগে অন্তর্মুখি কর্ম-শক্তি  অপসারণ করতেই হবে।

খেলার মেয়াদ নির্ভর করবে খেলার পরের কার্যক্রমের উপর। খেলা শেষ করেই যদি কোনোরকম সুশৃঙ্খল কাজ শুরু করতে হয় তাহলে একটানা অনেকক্ষণ ধরে খেলা কার্যকর। কারণ, এতে অভিনেতার কিছুটা ক্লান্তি আসে, শরীরের উপরভাগের কর্ম-শর্ক্তি অপসারিত হয় যার দরুণ ধীর-স্থির হয়ে মনোসংযোগ করা সহজ হয়। দুই বৃত্তের আবার খেলাটার একটু ঠাণ্ডা একটা সংস্করণ। ফলে অতিরিক্ত চাপ অপসারণ না হলেও চলে এমন কাজের আগে এই খেলাটা আদর্শ। এই খেলায় খেলোয়াড়রা দুই ব্যাসের দুইটি বৃত্ত করে দাঁড়ায়। আবার শিকারী তার শিকারের পিছু নেয়। কিন্তু শিকার রক্ষা পেয়ে যেতে পারে যদি সে বৃত্তে অবস্থানকারী যেকোনো একজোড়া মানুষের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে পড়তে পারে। এই অবস্থায় তিনজনের যে এককটা তৈরি হয় তার একেবারে পেছনের লোকটা শিকারীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়ে বাঁচার জন্য ছুট দেয়। এই খেলায় ভয়ানক ছুটাছুটি আর বিশ্রাম পর্যায়ক্রমিকভাবে চলতে থাকে। পেছন দিক থেকে সরে গিয়ে সামনের দিকে লোক যুক্ত হবার প্রক্রিয়ায় বৃত্ত ছোট হয়ে আসে।

দলগত ছোঁয়াছুঁয়ি

এতে এমন ভয়াবহ চাপ অপসারণ ঘটে যে খেলোয়াড়দের কর্ম-শক্তি বলতে গেলে একেবারে শেষ হয়ে যায়। খুব বিশদ ও গভীর মনোসংযোগ দাবী করে এমন কার্যক্রমের পর যখন কর্ম-শক্তির বিমোক্ষণ প্রয়োজন হয় তখন এই খেলা আদর্শ। খেলোয়াড়রা দুই দলে বিভক্ত হয়। ঘরের দুই কোণে দুই দলের দুটো ঘাটি থাকে। খেলাটা হচ্ছে বিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দের মাথায় টোকা দিয়ে ‘টি-আক’ বলে মারা দিতে হবে। এইভাবে মারা পড়া ব্যক্তিটি শত্রু পক্ষের ঘাটিতে বন্দী থাকবে যতক্ষণ না তার দলের কেউ ‘টি-আক-ই-এলিও’ বলে ডাক ছেড়ে বিপক্ষ দলের ঘাটির মধ্য দিয়ে গিয়ে দৌড়ে যাবে। আর তবেই সে আবার খেলায় ফিরে আসবে। খেলা চলবে যতক্ষণ না একদল অন্য দলের সবাইকে পর পর পাকড়াও করে ফেলবে।

আরেকটা আছে এক পায়ে ছোঁয়াছুঁয়ি। এতে একজন একপায়ে দাঁড়িয়ে অবস্থান নেবে কক্ষের মাঝখানটাতে। অন্যরা এক পাশের দেয়ালে লাইন করে দাঁড়াবে। ‘চলুক’ বলার সাথে সাথে সবাই এক পায়ে লাফাতে লাফাতে বিপরীত দেয়ালের দিকে যাবে। সাবধানতার বিষয় হল মাঝখানে এক পায়ে লাফাতে থাকা খেলোয়াড়টি যেন ছুঁয়ে না দেয়। যে মারা পড়বে সে এসে মাঝখানে যোগ দেবে। খেলা চলবে যতক্ষণ না সবাই মারা পড়ে মাঝখানে এসে জমা হয়। এই খেলার উদ্দেশ্য হচ্ছে এক পায়ে লাফাতে লাফাতে শূন্যে শরীরের ভারসাম্য স্থানান্তরের অভিজ্ঞতা লাভ। শিশুরা এভাবে অজান্তেই তাদের শরীরের ভারসাম্যসাধন ক্ষমতা আবিস্কার ও উন্নয়ন করে। খেলাটার কাঠামোয় প্রতিবন্ধকতা আরোপ করা হয় তা অতিক্রম করার মধ্য দিয়ে ভারসাম্য স্থানান্তরের দক্ষতা বৃদ্ধির স্বার্থে। এর আরেকটি সংস্করণে খেলোয়াড়েরা সবাই হাত ভাজ করে এক পায়ে লাফাতে থাকে। এখানে লক্ষ্য হচ্ছে মুক্ত খেলোয়াড়কে ধাক্কা দিয়ে ভারসাম্যচ্যূত করে ঘায়েল করা। এই প্রক্রিয়ার বহিঃশক্তির বিরোধীতার মুখে নিজের ভারসাম্য রক্ষার প্রয়োজন তীব্র হয়ে উঠে।

‘ব্রিটিশ বুলডগ’ নামে একটা খেলা আছে। এতে খেলোয়াড়েরা দুই পায়ের উপরই দাঁড়ায়। এই খেলার লক্ষ্য প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়কে জাপটে ধরে মাটি থেকে শূন্যে তোলা। অন্যদিকে নিজের মাধ্যাকর্ষ বলকে কাজে লাগিয়ে অন্যের মাধ্যাকর্ষ বলের বিপরীতে কাজ করার মধ্য দিয়ে একটা শক্তির পরীক্ষাও হয়ে যায়।

এইসব খেলার মধ্য দিয়ে যে উন্নতি সাধন করা সম্ভব তার উদাহরণ হিসেবে আমি এখানে তিনটি খেলার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার কথা বলবো এবং দেখাবো কী করে একজন অভিনেতা মানবিক সম্পর্কের জটিল ক্ষেত্রে বিচরণ করার সক্ষমতা অর্জন করে।

ক্রমটা শুরু হবে ‘এক পায়ে ছোঁয়াছুয়ি’ দিয়ে। এই খেলাটা বেশ খানিকটা দক্ষতা দাবী করলেও এর মাধ্যমে খুব সহজেই অবরুদ্ধ শরীর চাপ হ্রাস করা যায়। পরবর্তী ধাপে নিয়মটা শুধরে নিতে হবে যে, ছুঁয়ে দিয়ে নয় বরং বেল্টের পেছনে আটকানো একটা রুমাল চুরি করে নিতে পারলেই প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা যাবে। এতে স্থানিক চলাচলে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। এই খেলায় কেন্দ্রীয় মেরুদণ্ড বরাবর কেবল একদিকে ধাবিত হওয়ার চেয়ে তাকে ঘিরে সামনে পেছনে ডানে বায়ে শরীরকে আঁকিয়ে বাঁকিয়ে চলার অতিরিক্ত দক্ষতা প্রয়োজন হয়। পরের ধাপে প্রত্যেকের আলাদাভাবে এক পাশ থেকে অন্য পাশের দিকে যাওয়াটা বাদ দিয়ে খেলাটাকে দলীয় কাঠামোয় নিয়ে আসা হয়। এখানে খোলা পরিসরে সবাই সবাইকে তাড়া করবে। লক্ষ্য হচ্ছে কে কত বেশি রুমাল চুরি করতে পারে। যার রুমাল চুরি যাবে সে মারা পড়বে। এইভাবে শেষ পর্যন্ত যে নিজের রুমাল বাঁচিযে রাখতে পারবে সে-ই বিজয়ী হবে। আসলে সবচেয়ে ভালো হয় শেষ দুজনকে রেখে খেলাটা শেষ করা।  না হলে একজনের সাথে একজনের পাল্লায় বিজয়ী বের করে আনা দুরূহ। এইভাবে পুরো জায়গাটাকে পরিণত করা হয় একটা বিপদসংকুল অঞ্চলে, যেখানে প্রত্যেকে চোখ-কান খোলা রেখে সদা সজাগ থেকে বাহ্যিক সংবেদনের বিপরীতে চকিতে অত্যন্ত ভয়াবহ ধরনের ভারসাম্য স্থানান্তরে বাধ্য হয়।

যখন আর কেবল তিনজন খেলোয়াড় অবশিষ্ট তখন খেলাটা নতুন একটা স্তরে প্রবেশ করে। এই তিনজনের মধ্য থেকে একজনকে খেলা থেকে বের করে আনার উদ্দেশ্যে যেকোনো দুইজন তৃতীয়জনের বিরুদ্ধে অবশ্যই একটা চক্রান্ত করবে। তৃতীয়জন দুইজনের জোটটা ভেঙে দিতে পারে যদি সে এমনভাবে জায়গা বদল করে নিতে পারে যাতে শক্তির ভারসাম্য বদলে যাবার দরুন অপর দুইজনের একজন জুটি ভেঙে তার সাথে নতুন জোট তৈরি করতে বাধ্য হয়। ব্যাপারটা এখানেই থেমে থাকে না। নিজেকে বাঁচানোর জন্য শত্র“র সাথে মিত্রতা করে বন্ধুকে বিপদে ফেলার প্রবণতা পর্যায়ক্রমিকভাবে চলতে থাকে। খেলাটা তাই রূপান্তরিত হয় ক্রিয়াক্ষেত্রে মানব সম্পর্ককে বোঝার একটা গবেষণাগারে। খেলা যখন এই স্তরে উপনীত হয় তখন তার উপর নতুন নতুন খেলা ও নতুন সম্ভাবনার ভিত্তি তৈরি হয়। এমন অবস্থায় আসার পর আমি পুরো দলটাকে একসাথে খেলার মধ্যে না নিয়ে তাদেরকে পর্যায়ক্রমে খেলোয়াড় ও দর্শকে বিভক্ত করে দিই।

আশা করবো বর্ণিত শেষ খেলাটি মঞ্চে মানবিক সম্পর্কের স্বরূপ অনুধাবনে সহায়ক হবে এবং তা অভিনেতাকে সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্থানের গুরুত্ব বিষয়ে সজাগ করে তুলবে।

প্রতিযোগিতা

অভিনেতার   চাপ   মুক্তির   উদ্দেশ্যে   উদ্ভাবিত  পদ্ধতিসমূহের  দ্বিতীয়টিতে  অভিনেতার  কর্ম-শক্তিকে প্রতিযোগিতামুখি করা হয়। এটা সহজতম পদ্ধতি হলেও সম্ভবত সবচেয়ে ব্যাপকভাবে কার্যকর। কারণ, এর  কাঠামো  এতটাই  শিথিল  যে  এরমধ্যে  যেকোনো ধরনের শরীর চর্চা অন্তর্ভুক্ত করা যায়। তা সত্ত্বেও এই খেলাটা বেশিক্ষণ চালিয়ে নেয়া যায় না। একে চালিয়ে নিতে হলে ‘বেস্ট অব ফাইভ’ বা আরো বেশি আবর্তন যুক্ত করা যেতে পারে। কিন্তু তবু প্রতিদ্বন্দ্বিতার দলীয় সংবেদন খুব দ্রুতই পানসে হয়ে উঠে। সে কারণে এই পদ্ধতিকে শরীরের সেই ধরনের সঞ্চালনের জন্যই তুলে রাখা শ্রেয় যার সাথে এটা মানানসই। অথবা একে কাজে লাগাতে হয় যখন আর কোনো পথ থাকে না। অবশ্য সেটাও একটা বিরল ব্যাপার। যাই হোক, এই পদ্ধতিকে আমি ব্যবহার করি বিপরীতমুখি সঞ্চালনের তাগিদে।

‘চড়াই-উৎড়াই’ এর অন্যতম। এটা একটা সাধারণ দলীয় পরম্পরার খেলা। খেলোয়াড়রা লাইন ধরে দাঁড়াবে। একজন দৌড় দিয়ে গিয়ে তার দলের একজনকে মাথার উপর দিয়ে এবং অপরজনকে তার পায়ের ফাঁক দিয়ে অতিক্রম করে নিজের জায়গায় ফিরে এসে স্পর্শ করবে পরবর্তী জনের পিঠে। সেও যখন ‘চড়াই’ শুরু করবে তখন পুরো দলটাই অনবরত উঠাবসার ঢেউ তুলবে।

প্রায় একই রকম চলন সঞ্চালনের জন্য আমি বল ব্যবহার করে একটা খেলা করাই। একজন  তার দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে এবং মাথার উপর দিয়ে বলটা চালান করবে পরেরজনের কাছে যে-কিনা বসে দুই পায়ে বলটা গ্রহণ করবে এবং একই প্রক্রিয়ায় পরেরজনকে দেবে। এইভাবে ক্রমান্বয়ে দলের উপর ও নিচ দিয়ে বলটা চালান হতে থাকবে। বলটা যদি পড়ে যায় তাহলে নতুন করে খেলা শুরু করার জন্য সেটা চলে যায় সামনের মানুষের কাছে।

এই ধরনের পরম্পরাভিত্তিক খেলাগুলোকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে ক্ষেত্রে আমি প্রয়োগ করি তা হলো হাঁটার অনুশীলন। খেলাটাকে আমি এভাবে সাজাই: এক দেয়াল থেকে হেঁটে বিপরীত দিকের দেয়ালের দিকে গিয়ে ফিরে আসা। এই আসা-যাওয়ায় পা ফেলাকে এমনভাবে ছন্দবদ্ধ করে দিতে হবে যাতে বিপরীতমুখী ভারসাম্য স্থানান্তর দক্ষতা প্রয়োগের সুযোগ থাকে। যেমন, দুই পা সামনে এক পা পেছনে - এরকম একটা পদক্ষেপক্রম অনুসরণ করে খেলাটা খেলা যায়। ওয়ালট্জ নৃত্যের বিপরীত আবর্তনে যেমন এই পদক্ষেপক্রম বা গুচ্ছ পাওয়া যায়:
                
            বাম পা সামনে
            ডান পা সামনে
            বাম পা পেছনে
            ডান পা পেছনে তার সাথে মিলবে।
            বাম পা সামনে ....

অঙ্গ সঞ্চালনের এইরূপ ছক অভিনেতাকে সমস্যায় ফেলে দেয়। কি করছে তা নিয়ে সে ভাবতে শুরু করে। পায়ের দিকে তাকায় এবং তালগোল পাকিয়ে ফেলে। খেলোয়াড়দের বলা হয় প্রতিটি পদক্ষেপের সাথে মুখে আওয়াজ করে সেই পদক্ষেপের নাম বলতে। অর্থাৎ তারা যা করছে তা সাথে সাথে বলতে বলা হয়, ‘বাম পা, ডান পা, বাম পা পেছনে’ বা ‘সামনে, সামনে, এক সাথে পেছনে’ ইত্যাদি। এই প্রক্রিয়ায় তারা যা করছে তা ভাবছে কিন্তু তা নিয়ে ভাবছে না। শরীর ও মনের সমন্বয় সাধন প্রক্রিয়ায় এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

এরই বর্ধিত সংস্করণে আমি একটা দলীয় পরম্পরাও প্রয়োগ করি। এতে অসংলগ্ন হাঁটার যারপর নাই বৈচিত্র্যের সমাহার ঘটানো হয়। খেলার বুদ্ধিজীবী চলে মাথা ঝুকিয়ে, মাঝি চলে কাঁধ ঘুরিয়ে, দীর্ঘকেশী ক্রীড়াবিদ চলে বুক উচিঁয়ে, সহিস চলে হাঁটু বাড়িয়ে, ফ্যাশনের মডেল চলে পাছা ঠেলে ঠেলে। বিকৃত বা অসংলগ্ন হাঁটা কতরকম কী কী উদাহরণসহ উঠে আসে এই খেলাটার মধ্য দিয়ে। এর সাথে অভিনীতব্য চরিত্রের সম্পর্কও বোঝা যায়। আবার এর থেকে ভারসাম্যপূর্ণ হাঁটার রহস্য খতিয়ে দেখা যায়। ব্যাঙের লাফ বা ক্যাঙ্গারুর লাফ বা আকাশের দিকে পেট দিয়ে দুই পা দুই হাত দিয়ে চতুষ্পদের মত হাঁটা- এই জাতীয়  শিশুদের খেলা এতে কাজে লাগানো যেতে পারে।

অগ্নি নির্বাপন কর্মীদের ‘হাতে হাতে মালমাল স্থানান্তর’ খেলাটাও দেখি খুব কার্যকর। এখানে দলের প্রথমজন দ্বিতীয়জনকে তোলা করে কক্ষের দূর প্রান্তে গিয়ে দাঁড়াবে। দ্বিতীয়জন ছুটে এসে তৃতীয়জনকে তুলে নিবে। এইভাবে খেলা চলতে থাকে। এটা অন্যের দেহের ভার বহনে প্রয়োজনীয় শক্তি ও কৌশলের এক প্রচণ্ড অনুশীলন। উপরন্তু, এর মাধ্যমে পারস্পরিক ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণের উচ্চতর উপলব্ধি লাভ করা যায়।  

বাহ্যিক উপকরণ: বল দিয়ে খেলা

অভিনেতার উপর থেকে চাপ অপসারণের তৃতীয় পদ্ধতিতে বাহ্যিক উপকরণ যেমন টেনিস বল ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়। একদিক থেকে এটা প্রারম্ভিক বা প্রাচীন পন্থা। মধ্যযুগে চিকিৎসাবিদ্যার অগ্রদূত গ্যালেন একটি ছোট বলকে ভিত্তি করে রোগ নিরাময় পদ্ধতির প্রবর্তন করেন। তার যুক্তি ছিল এই যে বল হচ্ছে একটা সহজলভ্য ও অতি সস্তা একটি বস্তু। হাত ও চোখের সমন্বয় সাধনের লক্ষ্যে শিশুদের যে প্রাথমিক খেলাগুলো খেলানো হয় তার মধ্যে বল লোফা অন্যতম। এতে শিশুরা নানা রকম নিয়ম আরোপ করে থাকে। একটা বলকে দেয়ালে ছোড়া হয়। ফিরতি বল ধরবার আগে দুই হাত নিতম্বের পেছনে নিয়ে তালি দিতে হবে; প্রথমে একবার, তারপর দুইবার, তারপর তিনবার ...। নিক্ষেপকারীকে কখনো কখনো ৩৬০ ডিগ্রী ঘুরে বলটা ধরতে হয়। আরেকটি খেলা আছে যেখানে বলটা দেয়ালে ছুড়ে একটা নাম ডাকা হয়; যার নাম ডাকা হল তার কাজ হচ্ছে বলের বাউন্স বুঝে নিয়ে দুই পায়ের মাঝখান দিয়ে বলটাকে বেরিয়ে যেতে দেয়া। দূরত্বভেদ নির্ণয় ও তার ছান্দিক সমন্বয়ে একই রকম কার্যকর ভূমিকা রাখে দড়ি লাফানি।

যে অনুশীলনটি শিশুদের খেলাকে কাজে লাগানোর বিষয়ে আমার বিশ্বাসকে সুদৃঢ় করেছে সেটি ৯-১২ চিত্রে দেখানো হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে কৌশলগত যে ব্যায়ামটিকে কোনো খেলা দিয়ে প্রতিস্থাপিত করতে পারিনি সেটা হচ্ছে ‘পেলভিক হুইপ’। এটা একটা অত্যন্ত কঠিন অনুশীলন যাতে পেলভিস্কে অত্যন্ত জটিলভাবে আবর্তন করতে হয়। কিন্তু দুই পা ছড়িয়ে দাঁড়ানোর পর হাত পেছনে এনে পায়ের ফাঁক দিয়ে দেয়ালে বল ছুঁড়ে ফিরতি পথে ধরা- এই প্রক্রিয়ায় পেলভিস্কে পর্যায়ক্রমে সামনের দিকে এবং পেছনের দিকে খোলা-বন্ধ করার প্রয়োজন হয়। এই খেলাটি বিন্দুমাত্র উদ্বিগ্ন না হয়ে ছেলে-বুড়ো সবাই একটানা খেলে যেতে পারে।

দ্বিতীয় খেলায় খেলোয়াড়রা সবাই দুই পা টান টান ছড়িয়ে এমনভাবে বসবে যেন একজনের পা তার দুই পাশের ব্যক্তির দুই পা’কে স্পর্শ করে (চিত্র: ১৩-১৪)। হাতের তালু থেকে বলটা এমনভাবে শূন্যে ভাসিয়ে দিতে হবে যেন সেটা গিয়ে পড়ে পাশেরজনের ছড়ানো দুই পা দিয়ে তৈরি হওয়া ত্রিভুজের সীমানায়। যার ত্রিভুজে বলটা পড়লো তার কাজ হবে বলটাকে মাটিতে পড়তে না দিয়ে সেটা লুফে নেয়া। বলটা পড়ে গেলে সে পয়েন্ট পাবে না, পাবে সে যে বলটা ছুঁড়েছিল। পয়েন্ট পাবার সবচেয়ে কার্যকর পন্থা হচ্ছে বলটাকে গোড়ালির কাছাকাছি ত্রিভুজের বাহু ঘেষে ফেলা। কারণ দুই পা মাটিতে ছড়ানো অবস্থায় গোড়ালি পর্যন্ত হাত সম্প্রসারিত করে বল ধরা অত্যন্ত দুরূহ। একই অঙ্গসংস্থিতিতে ব্যয়াম করার সময় পায়ের আঙ্গুল বা দুই পায়ের মাঝামাঝি জায়গায় মেঝে স্পর্শ করতে হলে শরীরে যতটা সম্প্রসারণ ক্রিয়া ঘটে এই খেলায়ও ততটা ঘটে।

তবে এই দুইয়ের মাঝে দুইটা তাৎপর্যপূর্ণ পার্থক্য আছে। খেলার ক্ষেত্রে বলটা ব্যবহার করা হয় বলে অভিনেতা একটা বাহ্যিক উপকরণকে উপলক্ষ করে শরীর সম্প্রসারণ ঘটায় এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার স্বার্থে দীর্ঘক্ষণ শরীরের কষ্ট সহ্য করতে প্রস্তুত থাকে। উপরন্তু, এই প্রক্রিয়ায় তার শরীরের কর্ম-শক্তি কেন্দ্র থেকে তার সাধ্যের সীমার দিকে এমনকি সীমাকে অতিক্রম করে বাইরের দিকে বিচ্ছুরিত হয়। কিন্তু ব্যাপারটা যখন কেবলই শরীর চর্চা তখন তার অভিলক্ষ্য শরীরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে অভিনেতার পিঠ কখনো কখনো এলিয়ে পড়ে (চিত্র: ১৫)। এতে করে শক্তি প্রবাহ বহির্মুখি না হয়ে উল্টো অন্তর্মুখি হয়। পরিণতিতে নিতান্ত শরীর চর্চায় অভিনেতা যতই জোর প্রয়োগ করবে ততই তাকে স্ব-আরোপিত ভয়াবহ কষ্ট সইতে হবে।

শরীরের ভরকেন্দ্র স্বাভাবিকের চেয়ে নিচের দিকে থাকা এবং প্রাংশু অবস্থানের অন্তরায় অন্যান্য সমস্যার সমাধানে একটি গুরুত্বপূর্ণ একটা খেলা আছে যেখানে বল ব্যবহার করা হয়। সেই খেলায় কাঁধ না উঁচিয়ে একদম স্বাভাবিক অবস্থায় রেখে একটা টেনিস বলকে যতটুকু সম্ভব হাত সম্প্রসারিত করে তুলে ধরতে হবে। কাঁধ স্বাভাবিক অবস্থায় রাখতে গেলে সাধারণত দেখা যায় হাতটা কপাল ছাড়িয়ে আর চুলের রেখা অতিক্রম করে না। এই অবস্থা থেকে বলটা ছেড়ে দেয়া হয়। বলটা যখন পড়ে তখন তার সাথে মেরুদণ্ডের গোড়া আর পেলভিস দুই গোড়ালির মাঝ বরাবর সোজাসুজি এলিয়ে পড়ে। পড়ন্ত বলটাকে ধরতে হবে গোড়ালির ঠিক উপর থেকে। বল পড়াটা কিন্তু চোখ দিয়ে অনুসরণ করা যাবে না; তাকে ধরতে হবে প্রতিবর্তী প্রতিক্রিয়া (reflex reaction)-র মাধ্যমে। মেরুদণ্ড যদি সোজাসুজি না নেমে আসে অর্থাৎ পেলভিস্ যদি পেছন দিকে হেলে পড়ে তাহলে হয় বলটা বুকে লাগবে অথবা শরীরের ঊর্ধ্বাংশ ভারসাম্যহীনভাবে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ফলে হাত দুটো বলের পতন রেখা ছােিড়য় যায় বলে বলটা আর ধরা যায় না। এই খেলার ভিতর আমি অভিনেতাকে মজিয়ে দিই যাতে সে তার শরীর কেন্দ্রকে নিস্তেজ করে মাধ্যাকর্ষ বলের অধীনে অসার হয়ে মাটিতে ঢলে পড়তে দিয়ে সহজাতভাবেই তার মাধ্যাকর্ষ-বিরুদ্ধ পেশীগুলোর চাপ মুক্তি ঘটায়।

বহিঃ অভিলক্ষ হিসেবে অন্য মানুষ

অভিনেতার উপর থেকে চাপ অপসারণের চতুর্থ উপায় হচ্ছে একজনের সাথে আরো এক বা একাধিকজনকে থিয়েটার ক্রীড়ায় অন্তর্ভুক্ত করা। যেমন, উপরে উল্লিখিত দ্বিতীয় খেলাটিতে একজনের জায়গায় দুইজনকে নিয়ে আসা যায়। সেক্ষেত্রে দুইজন মুখোমুখি বসে পা ছড়িয়ে পরস্পরের পায়ের পাতায় পাতায় মুখোমুখি জোড়া লাগাবে। এবার তারা পরস্পরের হাত ধরবে এবং দাঁড় বাইবার মত করে পর্যায়ক্রমে টানবে আর ছাড়বে। এটা বল দিয়ে খেলার মত ততটা উদ্দীপনাদায়ক না হতে পারে, কিন্তু এতে আছে আরাম করার সুযোগ। যখন একজন টানার ক্রিয়া করে তখন অপরজন শরীর ছেড়ে দিয়ে বিশ্রাম পায়।

অত্যন্ত তীব্র শক্তি আহরণমূলক অঙ্গ সঞ্চালন ক্রিয়ার চর্চা করা যায় অন্য একটা উপায়ে। কক্ষের মাঝ বরাবর একটা রেখা টেনে তার দুইপাশ থেকে মুখোমুখি দুইজনের একটি করে অনেকগুলো দলকে দাঁড় করিয়ে এটা খেলা যায়। এর লক্ষ্য হচ্ছে প্রতিপক্ষের হাত ধরে টেনে তাকে রেখা অতিক্রম করিয়ে নিজের দলে নিয়ে আসা। এইভাবে অনেকগুলো দল এক সঙ্গে রশিটানার কায়দায় বল আহরণ ক্রিয়ার অংশ নিতে পারে।

পতনের ভয় দূর করার কাজে ‘দ্বৈত ডিগবাজি’ (চিত্র: ১৬-১৮) ফলপ্রসু হয়ে থাকে। আবার পর্যায়ক্রমে টানা আর ছাড়ার মাধ্যমে পায়ের পেশীর আড়ষ্টতা ভাঙায় ‘শিয়াল-আঙুর’ খেলা যায়।  একজন খেলোয়াড় আরেকজনের মাথা থেকে অনেক উপরে কোনো একটা কিছু উঁচিয়ে ধরবে। যার মাথার উপর ধরা হল তার কাজ হচ্ছে দুই পা মাটিতে রেখে ঝুলন্ত বস্তুটাকে ধরার চেষ্ট করা। বস্তুটাকে নামিয়ে উঠিয়ে তাকে অস্থির করে তুলবে তার পার্টনার। ফলে বস্তুটিকে উপরের দিকে তার হাতের সম্প্রসারণ সীমার বাইরে সরিয়ে নেবার আগেই লক্ষ্য অর্জনে সে ব্যাকুল হয়ে উঠে।

কণ্ঠস্বরের বিকাশের প্রয়োজনেও আমি এমন খেলা প্রয়োগ করি যেখানে অভিনেতার জন্য একজন খেলার সাথী অন্তর্ভূক্ত করা হয়। উদ্দেশ্যহীন শব্দ উৎপাদন অভিনেতাকে অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে বেশি নিরুৎসাহিত করে। সঙ্গীকে উপলক্ষ করে প্রক্ষিপ্ত শব্দ বা তার প্রত্যুত্তরে প্রয়োজনীয় শব্দ উৎপাদন অনেক স্বাভাবিক এবং এইভাবে উৎপাদিত শব্দ নিয়ন্ত্রণ বা তা নিয়ে অনুশীলন করাও সহজ। এক্ষেত্রে যে কাজটা আমি প্রায়ই করে থাকি তা হলো দুইজনকে পিঠাপিঠি দাঁড় করাই। শিশুদের খেলার একটা দিক এখানে ব্যবহার করি। একজন খেলোয়াড় তার সঙ্গীর বগলের তল দিয়ে নিজের বাহু গলিয়ে দেয়; তার পিঠের নিম্নাংশ সঙ্গীর নিতম্বের নিচে নিয়ে যায়; এই অবস্থায় সামনের দিকে উবু হয়ে; সে তার সঙ্গীকে পিঠের উপর তোলে। পরস্পরের সুবিধার জন্য দুইজনকেই পিঠ চিতিয়ে রাখতে হবে। মাথা, ঘাড়, মেরুদণ্ড, পেলভিস-র পারস্পরিক সম্পর্কটা এমন হবে যে তাতে আর কোনো পেশীচাপ গুটি পাকিয়ে থাকতে পারে না। ফলে শব্দ উৎপাদক অঙ্গসমূহে আর কোনো চাপ থাকে না। পরিণতিতে দুইজন খেলোয়াড়েরই গলা খুলে যায়।

কল্পনা

অভিনেতাকে চাপমুক্ত করার পঞ্চম ও শেষ পন্থাটির জন্য এমন একটা কাঠামো তৈরি করতে হবে যেখানে অভিনেতা তার কল্পনা শক্তিকে কাজে লাগিয়ে নিজেই নিজেকে চাপমুক্ত করবে। পদ্ধতিসমূহের মধ্যে সম্ভবত এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং এর মধ্যেই রয়েছে শিশুতোষ ক্রীড়ার সেই ক্ষেত্র যেখানে অনেক উপাদান এবং প্রক্রিয়া এক সাথে আন্তসম্পর্কের মাধ্যমে ক্রিয়াশীল। শিশুদের ‘বরফের উপর হাঁটা’ খেলায় দ্রুত, হাল্কা ও সরাসরি চলনের দক্ষতা বাড়ে। কিছু কিছু ছায়া ক্রীড়া (mime games) যেমন কাল্পনিক ঘুড়ি উড়ানো বা উড়ন্তহিলিয়াম বেলুন ধরে ঝুলে থাকা ইত্যাদি বেশ কার্যকর। এই খেলাগুলোকে আমি কাজে লাগাই কিছু পর্যায়ক্রমিক সংযুক্তির মাধ্যমে। যেমন, নিজেই বেলুন হয়ে যাওয়া এবং তারপর মাতাল হওয়া এবং তা থেকে কালাহারি মরুতে দানাপানি ছাড়া দশদিন পার করা একজন মানুষ যার পক্ষে দাঁড়িয়ে থাকাও কঠিন অথচ সে জানে একবার পড়ে গেলে আর সে উঠতে পারবে না। এইসব খেলাগুলো মাধ্যাকর্ষ বলের বিপরিতে ক্রিয়াশীল পেশীসমূহ থেকে চাপ আপসারণের জন্য উপকারী। বিশেষ করে হাঁটুর উপরে উরুর ভিতরকার পেশীতে এগুলো দারুণ কার্যকর।

ক্রিয়াক্ষেত্রে অভিনেতার অবস্থান বলয়ের সম্প্রসারণের ধারণা দিতে এবং দেহকাণ্ডকে পুরো ৩৬০ ডিগ্রী আবর্তনের অনুশীলনের জন্য আমি মটর চালিত খেলনা এ্যারোপ্লেন ব্যবহার করি। এখানে একটা স্থিতিস্থাপক তারের এক প্রান্তে প্লেনটা বেঁধে অন্য প্রান্ত এক আঙ্গুলের মাথায় জড়িয়ে প্লেনকে একটি সম্প্রসারণশীল কক্ষপথে পরিভ্রমণ করাতে হবে। ঘূর্ণন যদি নিখুঁত না হয় তাহলে কক্ষপথে হিক্কা উঠবে। যার পরিণাম প্লেন ক্র্যাশ। প্রথম দিকে একটা দলের সাথে এই কাজটা করতে গিয়ে চমৎকার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। একেকজন একেক গতিতে একেক উচ্চতায় একেক ব্যসের কক্ষপথ সম্প্রসারণ করছিল। পাশাপাশি পরস্পরের ছন্দভেদ  সম্পর্কে তারা এমন সজাগ হয়ে কাজ করছিল যে অতি দৃষ্টিনন্দন একটা ব্যালে তৈরি হয়ে গিয়েছিল যার সাথে চৈনিক চিত্রকলার আশ্চর্য মিল লক্ষ্য করা গেছে।

কল্পনার প্রয়োগ আর বাহ্য উপাদান হিসেবে দ্বিতীয় ব্যক্তির অন্তর্ভুক্তি এই দুইয়ের মিশ্রণে ‘পর্বতারোহন’ এর মত একটা খেলা বেরিয়ে আসে। এতেও প্রতিযোগিতার আবহ তৈরি করা হয়। দুই দল পাল্লা দিয়ে কোনো পর্বতে দৌড়ে উঠবে। উপরে ওঠার প্রক্রিয়াটা হচ্ছে আগেরজনের পিঠ বেয়ে কাঁধে উঠে বসবে পরেরজন এবং সেখান থেকে তার পরেরজনকে টেনে তুলবে। এইভাবে চলতে থাকবে পর্বত আরোহন। যে দল তার শেষ আরোহীকে আগে শীর্ষে তুলতে পারবে সেই দলই জিতবে।

কল্পনা আশ্রিত খেলার সাথে বাহ্য উপাদানভিত্তিক খেলার মিশেলে দারুণ কার্যকারিতা পাওয়া যায়। যেমন, বাস্তবের বলটা রেখে দিয়ে কল্পনা দিয়ে তৈরি করা বলটা ছুঁড়ে দেয়া। বলটাকে কখনো সীসার তৈরি কামানের গোলা, কখনো বাচ্চাদের খেলার পলকা বল, কখনো টাইম বোমা বলে কল্পনা করিয়ে আমি সেই সব অনুশীলন বা খেলার প্রারম্ভে কাজে লাগাই যেখানে একটানা অনেকক্ষণ গভীর মনোসংযোগের প্রয়োজন হয। সচরাচর আমি এই খেলাগুলোর সাথে গলা দিয়ে আওয়াজ করার ক্রিয়া মেলানোর চেষ্টা করি যাতে করে অন্য কিছু একটা ভাবনারত অবস্থায়ও অভিনেতার মধ্যে তার শরীর ক্রিয়া ও কণ্ঠ প্রক্ষেপন ক্রিয়ার সমন্বয় বোধ জাগানো যায়।

এই খেলাগুলোর সবকটিতেই পেশীক্রিয়া আব্যশ্যক। কিন্তু এই সব ক্রিয়ার সুনির্দিষ্ট শৃঙ্খলা থেকে অভিনেতার মনোযোগ অন্য দিকে সরিয়ে নেয়া হয়। এটা লক্ষ্যণীয় যে এই খেলাগুলোতে ফাঁকি দেয়া বা চোরা পথ ধরার সুযোগ থাকে। এও সত্যি যে এগুলোর মাধ্যমে অভিনেতার ক্রটিপূর্ণ অঙ্গস্থিতির জন্য দায়ী যেসব অভ্যাসগত শরীর-চাপ তা সামান্যই দূর করা যায়। শিক্ষণ প্রক্রিয়ায়, একটি খেলা কয়েকবার খেলা হয়ে যাবার পর যদি সেটাকে বিশ্লেষণ করা যায় এবং তার মধ্য দিয়ে যদি খেলাটার প্রকৃত উদ্দেশ্য ও সাধনপদ্ধতি উন্মোচিত হয় তাহলে পরেরবার সেটা খেলতে গিয়ে বেশিরভাগ অভিনেতারই অনুশীলনের কৌশলগত বিশুদ্ধতা খেলায় প্রয়োগ করতে সমস্যা হয় না। প্রশিক্ষকও পরবর্তী অধিবেশনগুলোতে অভিনেতার শরীর বিন্যাস সংশোধন করে খেলাটাকে আরো কার্যকর করে তুলতে পারেন। সেই ধারায় অভিনেতা তার চলনের বা অঙ্গ সঞ্চালনের প্রতিবন্ধকতাগুলো প্রায়োগিক ক্রিয়ার মাধ্যমে মোকাবেলা করতে প্রয়াসী হয়। ফলে সে সমস্যা সম্পর্কে আত্ম-সচেতন হয়ে পড়া থেকে বিরত থাকে। অথচ তাকে যদি বলে দেয়া হয় ‘তুমি কাঁধ কুঁজ করে থাক বা তোমার উচিত কাঁধ আনত করা’ তাহলে সে সঙ্গে সঙ্গে তার কাঁধ সম্পর্কে আরো বেশি সচেতন হয়ে উঠে। পরিণতিতে তার শরীরে চাপ বেড়ে যায়। অসম্ভব না হলেও শরীরের কোনো পেশী গুচ্ছকে আলাদাভাবে শিথিল করা দুঃসাধ্য।

থিয়েটার ক্রীড়ায় কৌশলগত শৃঙ্খলা বিধানের প্রক্রিয়াটি প্রয়োজন কারণ নিতান্ত শিশুতোষ খেলায় অভিনেতার মন বেশিক্ষণ ধরে রাখা যায় না এবং তার কর্ম-শক্তি প্রবাহকে চিরসচল করা যায় না। খেলার ধাপে ধাপে শৃঙ্খলা আরোপ করার মাধ্যমে খেলাকে ক্রমশ উচ্চতর দক্ষতার দিকে নিয়ে যাওয়া যায় এবং এই প্রক্রিয়াতেই কেবল একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির উদ্দীপনা বজায় থাকে। কিন্তু এটাও গুরুত্বপূর্ণ যে প্রথমত খেলাটাকে কেবল খেলার জন্যই খেলতে হবে; খেলতে খেলতে চাপ মুক্ত হয়ে যে আমোদটা পাওয়া যায় তার জন্য খেলতে হবে। না হয় থিয়েটার ক্রীড়ার ‘কৌশলগত উদ্দেশ্য’কে বেকার মনে হবে। বলা যায় এটা প্রায় সব সময়ই সত্য যে খেলাটা অভিনেতার কাছে যতক্ষণ না পানসে বা একঘেয়ে হয়ে উঠছে ততক্ষণ তাতে নিয়ম আরোপ করা কঠিন। কারণ ঐ পর্যায়ের আগ পর্যন্ত খেলাটা নিজ গুণেই আনন্দদায়ক। বিষয়টা যখন এমনই তখন এমনিতেই আনন্দদায়ক কোনো কিছুকে পরিবর্তন করতে যাওয়া কি উচিত?  খেলাটার কৌশলগত ব্যায়ামের স্তরে উন্নীত হয়ে ওঠার জন্য সময়ের প্রয়োজন। তড়িঘড়িতে অভিষ্ট নষ্ট হয়। কোনো একটি খেলায় যখন কর্ম-শক্তি ক্ষীণ হতে থাকে, বুঝতে হবে তখনই সময় তার উপর শৃঙ্খলা বা শর্ত আরোপের।
[চলবে]

 অসিত কুমার: অনুবাদক, সদস্য- ঐকিক থিয়েটার, নারায়ণগঞ্জ।