Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

আলাপনে আতাউর রহমান

Written by সাক্ষাৎকার : বিপ্লব বালা ও হাসান শাহরিয়ার.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

[স্বাধীনতার পর নাট্যচর্চাটা আমাদের বেশ এগিয়ে নিয়ে গেছে, সুস্থ ভাবনা-চিন্তার আগ্রহ তৈরি করেছে। আর তৈরি করেছে ‘মানুষ’ হবার আকাঙ্ক্ষা। আমরা শিল্পের এক বড় কর্মকাণ্ড, কর্মযজ্ঞ- মঞ্চনাটকের নিয়মিত সাক্ষাৎ পেয়েছি। আমরা বেশি বেশি নাট্যকার পেয়েছি, পেয়েছি সৃজনশীল প্রতিভাসম্পন্ন নাট্যনির্দেশক, অনেক ভালো অভিনেতৃ। আর পেয়েছি অনেক সংগঠক, যারা ক্রমশই মঞ্চনাটকের পরিধি বিস্তৃত করেই চলেছেন। এক কথায় এঁরা সবাই আমাদের মঞ্চনাটকের পুরোধা। আমরা মনে করি আমরা এঁদের সব ভালো কাজের উত্তরাধিকারী। তাই এঁদের কাজ এবং কাজের প্রক্রিয়া জানতে আগ্রহী, হতে আগ্রহী তাঁদের মতো বা তাঁদের চেয়ে বড় কিছু।

এই প্রত্যাশায় থিয়েটারওয়ালা আলাপচারিতায় মগ্ন হয়েছে কয়েকজন নাট্যজনের। তাঁদের সাথে আলাপচারিতা অনুলিখন করে ধারাবাহিকভাবে ছাপা হচ্ছে থিয়েটারওয়ালায়। আমাদের এমনি এক নাট্যজন আতাউর রহমান। সাক্ষাৎকার : বিপ্লব বালা ও হাসান শাহরিয়ার আর অনুলিখন- সাইফ সুমন।]

বিপ্লব বালা
আমরা খুব সহজ করে শুরু করতে চাই, আপনার ছোটবেলার কথা কিছু বলুন।

আতাউর রহমান
আমার ছোট বেলাটা নানার বাড়িতে কেটেছে, নোয়াখালীতে। আমার নানা বেশ অদ্ভুত মজার মানুষ ছিলেন। আমার মনে হয় যে, তাঁর কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আমি পেয়েছি, মানে স্ট্রেইট ফরওয়ার্ড কথা বলা বা অন্যের মুখের উপর কিছু বলে দেয়া বা মুখ খারাপ করা, এগুলো আমি আমার নানার কাছ থেকে পেয়েছি। ভড়ং, ভণ্ডামী আমার নানা পছন্দ করতেন না। আমিও করি না। উনি বেশ কিছু মানুষের অপ্রিয় ছিলেন, আমিও তা-ই।

বিপ্লব বালা
উনি কী করতেন?

আতাউর রহমান
উনি রেভিনিউ পেশকার ছিলেন। কিন্তু উনি ছিলেন আমাদের আনন্দের উৎস ... আমার কোনো মামা ছিল না, তাই আমাদের সমস্ত খালাতো ভাই-বোনদের সেন্টার অব এ্যাট্রাকশান ছিলেন আমার নানা। ... তো নানা এন্ট্রান্স পাশ করতে পারেননি, জিজ্ঞেস করলে বলতেন, আঞ্চলিক ভাষাতেই বলতেন- হেদ্দুর যাইতাম হারিনো। উনি বেশ ভালো ইংরেজি জানতেন ... আমার সাথে চিঠি চালাচালি হতো ... আমি ’৬৯ বা ’৭০ সালে মুস্তফা মনোয়ারের নির্দেশনায় মুক্তধারা করেছি, টিভিতে ... তখন টিভি ছিল ডিআইটি বিল্ডিং-এ। আমি মুক্তধারা নাটকে অভিনয় করছি, সেই রাতেই আমার নানা মারা যান, ঢাকাতেই। ওনার সাথে আমরা বেশ খোলামেলা ছিলাম, আমরা একসাথে সিগারেট খেতাম ... আমার মনে আছে একদিন মেজ খালু কী যেন নানার জন্য নোয়াখালীতে পাঠিয়েছিলেন, পরে জানতে পারি যে, ওটা ছিল ব্র্যান্ডির বোতল। আমার নানা বলতেন ওটা আমার ওষুধ। আমাদের বাড়িতে একটা কালচারাল এ্যাটমোসফিয়ার সব সময়ই ছিল।

বিপ্লব বালা
মানে আপনার পড়াশুনা শুরুর আগে থেকেই নানা বাড়ি যেতেন ...

আতাউর রহমান
হ্যাঁ, অনেক আগে থেকে ... নানা হেড়ে গলায় গান গাইতেন, আমরা বুঝতাম না যে, রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইছেন। আমার বাবার দিকের পরিবার কিন্তু কট্টর মুসলিম পরিবার ছিল। আমার এক কাকার বিয়েতে কলের গান বাজানো নিয়ে সমস্যা হয়েছিল। আমার বাবা একবার এক যাত্রা দলের সাথে ভেগে গিয়েছিলেন ... ওনার সখ ছিল অভিনয় করার ... উনি কিন্তু সিরাজউদ্দৌলা নাটকের ডিরেকশনও দিয়েছিলেন। আবার বিধায়ক ভট্টাচার্যের মাটির ঘর নাটকে ঢাকার ব্রিটিশ কাউন্সিল মঞ্চে অভিনয় করেছিলেন।

বিপ্লব বালা
নোয়াখালিতে কতদিন ছিলেন?

আতাউর রহমান
নোয়াখালিতে ছোটবেলায় ছিলাম, তবে এক নাগাড়ে বেশিদিন থাকিনি। তবে চার-পাঁচবার চট্টগ্রাম থেকে যেতাম। আমার ছোটবেলায় কয়েক বছর কোলকাতাতেও ছিলাম। পরে কোলকাতাতেও ছিলাম। আমরা বাবা ’৪৭-এ দেশ বিভাগের পরও কোলকাতায় ছিলেন। তারপর ’৪৮ সালে ট্রান্সফার হয়ে যান লাহোরে ... লাহোর কিন্তু তখন কালাপানি ... মানে ওখানে গেলে আর কেউ ফেরে না। তো আমরা কী করি আমরা আবার নোয়াখালিতে নানা বাড়িতে চলে আসি।

বিপ্লব বালা
’৪৮ সাল পর্যন্ত কোলকাতায় ... মানে সাত বছর বয়স পর্যন্ত কোলকাতায় ... তো দেশ বিভাগের কথা মনে আছে, অর্থাৎ ভারতের স্বাধীনতা লাভের বিষয়টি?

আতাউর রহমান
হ্যাঁ, আমার স্পষ্ট মনে আছে। ১৪ অগাস্ট, ১৯৪৭ সাল। চিৎকারে আমার ঘুম ভেঙে গেল ... ট্রাকে করে লোকজনের ছুটোছুটি ... হিন্দুরা মুসলমানদের শরবত খাওয়াচ্ছে। তার আগে গড়ের মাঠে জিন্নাহ সাহেবকে দেখতে গেছি ... বাবার কাঁধে চড়ে।

বিপ্লব বালা
আপনার বাবাতো সক্রিয়ভাবে রাজনীতি করতেন না?

আতাউর রহমান
না না, একেবারেই না, উনি সরকারি চাকুরে ছিলেন। ’৭১ সালের শেষের দিকে যখন পাকিস্তান মিলিটারী সৈন্যরা আমাকে বাড়ি থেকে ধরে জীপে তুলে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন আমার বাবা-মা, ভাই-বোন জীপটিকে ঘিরে ফেললো ... আমার বাবা বলতে লাগলো- বাবারা তোমরা ওকে ছেড়ে দাও, আমরাতো পাকিস্তানের জন্য অনেক ফাইট করেছি ... ইত্যাদি। আমার ছোটভাই মজিবুর রহমান দিলু, সে একজন মুক্তিযোদ্ধা, সে কিন্তু তখনো যুদ্ধে আছে।

বিপ্লব বালা
ছোটবেলায় যখন নানা বাড়িতে ছিলেন, তখনকার নাটক দেখা বা যাত্রা দেখার কথা কি কিছু মনে পড়ে?

আতাউর রহমান
দেখেছি, রাতকে রাত জেগে নাটক দেখার অভিজ্ঞতা আছে, চিটাগং-এ। রাত দশটার দিকে শুরু হতো, নাটকই ... সিরাজউদ্দৌলা, মীর কাশিম ... মাঠে দেখতে যেতাম। মাঝখানে ইন্টারভেল পড়তো, ছেলেরা মেয়ে সেজে গান গাইতো, নাচতো। এগুলো অহরহ দেখেছি ... চিটাগং-এ ওয়াজীউল্লাহ্ ইন্সটিটিউট ছিল, এখন যেটা রেলওয়ে ইন্সটিটিউট, সেটা ছিল নাটকের জায়গা। রুনু বিশ্বাস নামে খুব নামকরা একজন নৃত্যশিল্পী ছিলেন, এখন মারা গেছেন, অসম্ভব সুন্দর ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ নাচতেন। জারি-সারি গান হতো নিয়মিত, আমাদের গ্রামেই হতো। নোয়াখালিতে গুনাইবিবি বেশ পপুলার ছিল। পুঁথিপাঠ পপুলার ছিল ... মহররমের সময় তাজিয়ার কথা মনে আছে, ছোট ছোট তাজিয়া বানিয়ে লোকজনেরা বাড়িতে বাড়িতে আসতো পয়সা নিতে। কিছু হাস্যকর ব্যাপারও ছিল- ওরা বিভিন্নভাবে ‘হায় হাসান হায় হোসেন’ করতো আর গান গাইতো,  গাইতো- ‘পানি পানি করে পোসন (হোসেন), পানি দুরান্তর- সুরমা নদী কাছে আছে পানি একেশ্বর’ হাঃ হাঃ, সুরমা নদী কীকরে আরব দেশে গেল এটা একটা বিরাট কোশ্চেন। সবই দেখে যাওয়া আরকি! ছোটবেলা থেকেই আমি ফোক কালচারের সাথে পরিচিত ছিলাম, জানতাম... কিন্তু কাজে আমি ফোক বিষয়টি রপ্ত করতে পারিনি। আমি কোনো ফিক্সেশনে বিশ্বাস করি না। ফিক্সেশন অব মাইন্ড আমি পরিহার করে চলি। এজন্যই রবীন্দ্রনাথকে আমার সবচেয়ে বড় ক্রিয়েটিভ মানুষ মনে হয়, কারণ, ওনার কোনো ফিক্সেশন ছিল না ... উনি দু’হাত ভরে অন্য সংস্কৃতি থেকে নিয়েছেন এবং নিজের সংস্কৃতির সাথে এদের মিলিয়েছেন। আমি যাত্রাও কম-বেশি দেখেছি। তবে পরিণত বয়সে অমলেন্দু বিশ্বাসের মত যাত্রা অভিনেতা দেখিনি। তাঁর মাইকেল মধুসূদন যাত্রা পালা যতদিন বেঁচে আছি, মনে থাকবে।

বিপ্লব বালা
চট্টগ্রামে তো গণনাট্য সংঘ খুব এ্যাকটিভ ছিল?

আতাউর রহমান
হ্যাঁ, মনে আছে যেমন, কলিমভাইরা (কলিম শরাফী) খুব এ্যাক্টিভ ছিলেন, ডাক্তার কামাল বলে একজন কালচারাল এ্যাকটিভিস্ট ছিলেন এবং ওনারা তখন রক্তকরবী মঞ্চায়ন করেছেন, এটাও মনে আছে।

বিপ্লব বালা
আপনিতো তখন স্কুলে?

আতাউর রহমান
হ্যাঁ, স্কুলে। পরে কলেজে থাকতেও দেখেছি যে, গণনাট্য সংঘ বেশ এ্যাক্টিভ। চট্টগ্রামে শিল্প সাহিত্যের চর্চাটা খুব ছিল, অনেক গানের ওস্তাদ ছিলেন। চিটাগং-এর ল্যাংগুয়েজটা কিন্তু আমার কাছে বেশ পাওয়ারফুল মনে হয়। ভুলে গেলে চলবে কেন চট্টগ্রাম বিপ্লবী সূর্যসেন, প্রীতিলতার জায়গা। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সূত্রপাতও চট্টগ্রামে।

হাসান শাহরিয়ার
নানা বাড়ির পাড়ায় যখন নাটক হতো, তখন কোনো অভিনয় করতেন?

আতাউর রহমান
না, তবে দেখে খুব আনন্দ পেতাম। একবারতো একটা নাটক হচ্ছিল, সাজাহান, ... তো দারা আর আওরঙ্গজেবের সৈন্য যুদ্ধ করছে ... যুদ্ধ করছেতো করছেই, দারার সৈন্যের পড়ে যাওয়ার কথা, কিন্তু সে আর পড়ছে না। শেষে আওরঙ্গজেবের সৈন্য কাছে গিয়ে ফিস ফিস করে বললো যে, তোর তো পড়ে যাওয়ার কথা, পড়ছিস না কেন? তখন দারার সৈন্য বললো যে- আজকে সম্ভব না, কারণ, আমার খালাতো বোন আজকে নাটক দেখছে, কিছুতেই আমার পরাজয় সম্ভব না ... হাঃ হাঃ নোয়াখালিতে কিন্তু প্রাথমিক প্রেম খালাতো বোন, মামাতো বোন দিয়েই শুরু হয় হাঃ হাঃ।

বিপ্লব বালা
ছোটবেলায় খেলাধুলা করতেন?

আতাউর রহমান
হ্যাঁ, ফুটবল, ভলিবল, ক্রিকেট সবই খেলতাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েও ... ঢাকা হলের অনাবাসিক ছাত্র ছিলাম, তখন হলের হয়ে ক্রিকেট খেলেছি।

বিপ্লব বালা
আপনার কোনো রাজনৈতিক ইনভলভমেন্ট ছিল কি?

আতাউর রহমান
চট্টগ্রামে থাকতে শুনতাম এটা সূর্য সেন, প্রীতিলতা আর কল্পনা দত্তের দেশ ... তখন কমরেড মোজাফফরের কথা শুনেছি ... কমিউনিস্ট আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকে ইত্যাদি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচিত হলাম হায়দার আকবর খান রনোর সাথে। অত্যন্ত ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র ছিল কিন্তু পরে সে অন্য পথের যাত্রী হল। রাশেদ খান মেননও ভালো ছাত্র ছিল ... আমরা তিনজন বেশ ঘনিষ্ট বন্ধু ছিলাম। এদের কাছে আমার বামপন্থী রাজনীতির হাতেখড়ি। কমিউনিস্ট পার্টির প্রাণপুরুষ কমরেড ফরহাদকেও ঘনিষ্টভাবে চিনতাম।

হাসান শাহরিয়ার
আপনি কী পড়তেন?

আতাউর রহমান
সয়েল সায়েন্স। আমার ইচ্ছা ছিল বাংলা সাহিত্য পড়া, আর ইংরেজি যারা ভালো পারতো তাদের প্রতি একটা দুর্বলতা ছিল আমার। আরো ছিল গণিতের প্রতি, ছোটবেলায় গণিতের টিচার দেখলে পা ধরে সালাম করতে ইচ্ছা করতো। শুনেছি- ম্যাথমেটিক্স ইজ দ্য মাদার অব অল সায়েন্স।

হাসান শাহরিয়ার
নাটকের আজকের এই অবস্থানে আসার শুরুটা কখন বলে মনে হয়?

আতাউর রহমান
আসলে ’৬০- এর দশকে একটা মনন তৈরি হয়েছিল, আড্ডায় হোক আর যেভাবেই হোক। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, আবদুল মান্নান সৈয়দ- এঁদেরকে জানতাম। মান্নান সৈয়দের যে একটা বই বেরুলো ‘শুদ্ধতম কবি’, জীবনানন্দ দাসের উপর, এই বইটা নিয়ে আমরা খুব আলোচনা করতাম। শুরুটা ছিল সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা থেকে ... ঠিক বলা যাবে না কেন থিয়েটারে আসলাম, হয়তো থিয়েটারকে অন্যান্য শিল্পকর্মের তুলনায় সহজ মনে হয়েছিল তাই।

বিপ্লব বালা
স্বাধীনতার পরও কিন্তু নাগরিক আড্ডা হতো সাহিত্য নিয়ে ...

আতাউর রহমান
হ্যাঁ হতো, তবে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদদের মতো স্ট্রাকচারড ওয়েতে না। এই আড্ডা একটা বোধ তৈরি করতে পেরেছিল, বিপদগামী হতে দেয়নি ... লাইফ বিকেইম ভেরি মিনিংফুল ... বুদ্ধদেব বসু যখন সুধীন দত্তের কাব্য সংগ্রহের ভূমিকা লেখেন যে- সুধীন বাবুর মতো মেরেটরিয়াস লোক যেকোনো কিছু হতে পারতেন। উনি চাইলে ভারতের প্রাইম মিনিস্টার বা প্রেসিডেন্টও হতে পারতেন, কিন্তু কিছুই না হয়ে উনি হলেন কবি। একথাটা কিন্তু খুবই মনে লাগার মতো কথা। এখন এই মূল্যবোধ বদলে গেছে, সেই সঙ্গে থিয়েটারও বদলে গেছে। এখন অনেক কিছু না হয়ে যে শুধু থিয়েটার করতে পারা, এটা কিন্তু সবাই মেনে নিচ্ছে না। তারা থিয়েটার থেকে পেতে চাচ্ছে ... কিন্তু আমাদের দেশে থিয়েটার করেতো কিছু পাওয়া যাবে না, তাই তারা থিয়েটারকে ব্যবহার করে পেতে চাইছে।

হাসান শাহরিয়ার
কারা? আপনাদের প্রজন্ম নাকি নতুন প্রজন্ম, নাকি সবাই?

আতাউর রহমান
অলমোস্ট সবাই। তবে থিয়েটারের প্রতি নতুন প্রজন্মের ডেডিকেশনটা আরও বেশি হলে ভালো হতো মনে হয়। কোলকাতাতে এটা আছে বা ছিল বললেই বোধহয় ভালো হয়, কারণ কোলকাতার নাট্যকর্মীরা আজকাল আমাদের মতোই হয়ে পড়েছে। নান্দীকারে একজন নাট্যকর্মী ডাক পিওনের কাজ করতো অথচ উনি অসাধারণ অভিনেতা, ডেডিকেটেড থিয়েটার কর্মী ছিলেন। ওখানে অনেকেই আছে, যারা প্রাণ দিয়ে থিয়েটার করে, পরে ট্রামে চেপে বাড়ি ফেরে। আমাদের এখানে কিন্তু ...

হাসান শাহরিয়ার
আমাদের এখানে যাদের হাত ধরে থিয়েটার এসেছে তারা কিন্তু মোটেই অসচ্ছল কেউ ছিলেন না- আলী যাকের, আতাউর রহমান, রামেন্দু মজুমদার, আবদুল্লাহ আল-মামুন, নাসির উদ্দীন ইউসুফ, ম. হামিদ ... এদের সংগ্রামতো অবশ্যই ছিল কিন্তু অর্থনৈতিক সংগ্রাম বোধহয় ততটা না। বরং এখনকার ছেলে-মেয়েদের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা একটু বেশি, তাই না?

আতাউর রহমান
হ্যাঁ, সেটা স্বীকার করতেই হবে ... কিন্তু আমি বলতে চাচ্ছি, আমরা সাহিত্যের আড্ডার জায়গা থেকে আসাতে, পড়াশুনাটা কিছু ছিল, সে জায়গায় বর্তমান প্রজন্মের কিছু ঘাটতি রয়ে গেছে ... সবার ভেতরে নিশ্চয়ই না, অনেকের ভেতরে। কিন্তু থিয়েটারের গভীরতা বেশি না হওয়ার পেছনে আমি আমাদের প্রজন্মের ব্যর্থতার কথাই বলবো। আমরা যখন নাটক শুরু করি তখন অনেকেই গাড়ি নিয়ে মহড়ায় আসতাম। ... মনিপুরীর বিখ্যাত নাট্যনির্দেশক রতন থিয়াম আশ্চর্য হয়েছিলেন যে, তোমাদের অনেকের বাসা এয়ারকন্ডিশনড, জাঁকজমকপূর্ণ, অথচ তোমাদের কোনো প্রপার থিয়েটার হল নেই। অথচ আমাদের দেশে আনাচে কানাচে থিয়েটার হল কিন্তু আমাদের বাসাবাড়ির অবস্থা ভালো না। আমরা শুনেছি যে, তৃপ্তি মিত্র একটা শাড়ি পাঁচবার রিপু করে পরেছেন, অর্থ কষ্ট ছিল, তবুও থিয়েটার ছাড়েননি, তো আমার মনে হয় আমাদের সংগ্রামটা প্রথম থেকেই তেমন ছিল না। এরই প্রভাব হয়তো এখনও রয়ে গেছে।

অনেকেই থিয়েটার থেকে কী পেলাম, এসব নিয়ে আফসোস করে কিন্তু আমার মনে হয় আমি অনেক পেয়েছি। বিশেষ করে লাইফটা ইন্টারেস্টিং করতে পেরেছি। রবীন্দ্রনাথকে কিছুটা হলেও পেয়েছি, এখনো সকালবেলায় রবীন্দ্রনাথের গান যদি একটু না শুনি দিনটাই মাটি হয়ে যায় ... ‘নিখিল ভুবনে অভাব কী আছে’ ... গানে এমন কথা শুনলে মনটা ভরে ওঠে। এই ভরে ওঠাটা বোধহয় থিয়েটার করেছি বলেই হচ্ছে।

হাসান শাহরিয়ার
আতাউরভাই, নাগরিক নাট্যসম্প্রদায় কবে থেকে কাজ করা শুরু করলো?

আতাউর রহমান
নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের জন্ম হয়েছে ১৯৬৮ সালে, কিন্তু তখন কেবল রেডিওতে নাটক করতাম। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ দিয়ে মঞ্চ নাটক শুরু। তার কিছুদিন আগে আলী যাকেরের সাথে পরিচয় হলো। আলী যাকের আরণ্যকে কাজ করতো। মামুনুর রশীদের নির্দেশনায় কবর নাটকে কাজ করেছে, ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশনে শো হয়েছিল। দেখতে গেলাম। এর আগেও দেখা হয়েছিল ... একেবারে প্রথমে যখন নাগরিকের মিটিং করি ... স্বাধীনতার পর, ফজলে লোহানী সাহেবের বাসায় ... সেখানে সৈয়দ আহসান আলী সিডনী ছিলেন, যাকের তার কাজিন হিসেবে সেখানে গিয়েছিলেন ... এরপর দেখা এই কবর নাটক দেখতে গিয়ে। মুক্তিযুদ্ধের সময় উনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে কাজ করেছেন। কালচারাল মাইন্ডেড, সত্যিকার অর্থেই শিক্ষিত। কবর দেখার পর দেখা করলাম, বললাম- আমরা একটা দল করি, নাম নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়, উনি জানতে চাইলেন- কারা কারা আছেন? আমি বললাম- আমি, জিয়া হায়দার, ইনামুল হক, লাকী ইনাম এরা আছেন। বললেন- ঠিক আছে আমিও আপনাদের সাথে কাজ করতে চাই। এভাবেই উনি আমাদের দলে যোগ দিলেন। সেই সময় আমার মনে আছে মুস্তাফা মনোয়ার সাহেব মুক্তধারা নাটক করলেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। তিনতলা হাইটের মঞ্চ এবং যখন মুক্তধারার বাঁধ ভাঙে, তখন উনি ছয়টা দমকলের গাড়ি রেখেছিলেন ... সেই গাড়ি থেকে পানি বের হওয়া শুরু করলো। একেবারে পাগলামী কারবার আর কি! উদ্যান ভর্তি লোক ...

বিপ্লব বালা
এটা কাদের আয়োজনে হয়েছিল?

আতাউর রহমান
ছাত্র ইউনিয়নের মনে হয়। আলী যাকেরও নাটক দেখতে এলেন, একশ চার ডিগ্রী জ্বর নিয়ে। এভাবে আলী যাকের আরেকটু ঘনিষ্ট হলেন। নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের প্রথম মঞ্চ-প্রযোজনা বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ নাটকে গদা চরিত্রে অভিনয় করলেন। আমার নির্দেশনায়। এটা কিন্তু দর্শনীর বিনিময়ে নয়।

বিপ্লব বালা
তখন আপনারা কী ভাবছিলেন, কীভাবে নাটক করবেন?

আতাউর রহমান
ভাবছিলাম কী করা যায় ... তো আলী যাকেরই প্রস্তাবটা দেয় ... সে স্বাধীনতার সময়ে কোলকাতা থেকেছে, অনেক নাটক দেখেছে ... তিন পয়সার পালা, অয়দিপাউস ... রুদ্রপসাদ, কেয়া চক্রবর্তীদের সাথে ভালো সম্পর্ক, তাদের বাসায় নিয়মিত যাতায়াত ছিল ... তো আলী যাকেরই বললো যে- আমরা টিকেট বিক্রি করে নিয়মিত নাটক করি না কেন? কনসেপ্টটা হলো যে, সিনেমা হলে টিকেট কেটে একই চলচ্চিত্র দর্শকেরা দিনের পর দিন দেখে, তাহলে আমাদের নাটক দেখবে না কেন? ঠিক করলাম, একটা নাটক নামাবো এবং প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতি রোববার সকালে নিয়মিতভাবে ওটার শো করবো। দেখাই যাক না কী হয়! আমরা ‘বাকী ইতিহাস’ নিয়ে কাজ শুরু করলাম।

বিপ্লব বালা
‘বাকি ইতিহাস’ সিলেক্ট করলেন কেন?

আতাউর রহমান
আসলে আমাদের করার মতো উপযুক্ত নাটক আমরা পাচ্ছিলাম না। দেশীয় নাট্যকারদের নাটক মনপুত হচ্ছিল না।

হাসান শাহরিয়ার
তখনতো সাঈদ আহমদ, মুনীর চৌধুরী, আনিস চৌধুরী বা নূরুল মোমেনের নাটক ছিল ...

আতাউর রহমান
হ্যাঁ, আনিস চৌধুরী তখন পপুলার নাট্যকার। তার মানচিত্র সর্বাধিক অভিনীত নাটক। আমি থিয়েটার স্কুলেও কয়েক বছর আগে নাটকটির নির্দেশনা দিয়েছি, ওনার এ্যালবাম-ও ভালো নাটক। আমরা এগুলো নিয়ে হয়তো ভাবতে পারতাম, আসলে আমরা ডিফারেন্ট কিছু করতে চাইলাম, আরো আধুনিক। তখন আমরা সার্ত্রে পড়ছি, একজিস্টিয়ালিজম সম্পর্কে জানি ... একজিস্টিয়ালিজমের পুরো রিফ্লেকশন ‘বাকী ইতিহাস’-এ আছে। আর তখন বাদল সরকার নাট্যকার হিসেবে খুবই খ্যাতিমান। নাটকটা পড়ে আমার খুবই ভালো লাগলো এবং আজও যদি বলা হয় আমার অন্যতম প্রিয় নাটক কী- আমি বলবো বাদল সরকারের ‘বাকি ইতিহাস’।

বিপ্লব বালা
তখন কি ভেবেছিলেন যে এই নাটকটা এই সময়ে বা রাজনৈতিকভাবে ...

আতাউর রহমান
না, এটা আসলেই ভাবিনি। কারণ, নাগরিকের কথাই ছিল যে, আমরা কোনো ইজমভিত্তিক নাটক করবো না ... মানে আর্ট ফর আর্ট সেক হয়তো বা না, কিন্তু একেবারে জীবনের সাথে বা বর্তমান বাস্তবতা বা রাজনীতির সাথ মিল রেখে নাটক করতে হবে, এমন ধারণায় আমরা বিশ্বাস করিনি কখনো।

বিপ্লব বালা
তবু এই নাটকটি সেই সময়টাকে ...

আতাউর রহমান
সময়টা ধরেনি হয়তো, কিন্তু আমরা এটাকে একটা ভালো নাটক হিসেবেই নিয়েছি। বাস্তবতার রিফ্লেকশন অবশ্যই আছে এই নাটকে, ভিয়েতনামের যুদ্ধ, জীবন সংগ্রাম ইত্যাদি প্রসঙ্গ নাটকটিতে আছে, যা আমাদের টেনেছে ... কিন্তু ঐ যে- তোমরা কই যাইতাছ, চল একটা মিছিল করি ... এ ধরনের নাটক আমরা কখনো সিলেক্ট করিনি।

হাসান শাহরিয়ার
একেবারে শুরু থেকেই?

আতাউর রহমান
একেবারে শুরু থেকেই। ভালো নাটক ভালোভাবে করবো এবং ভালো নাটক দেশ-কালের সীমারেখার ঊর্ধে। রবীন্দ্রনাথের সম্পূর্ণ উত্তরাধিকার আমাদের, শেক্সপীয়ারের উত্তরাধিকারও আমাদের। একইভাবে আমাদের ভালো নাট্যকারদের উত্তরাধিকারও সারা বিশ্বের। এটা শুরু থেকেই ছিল ... উই ডোন্ট বিলিভ ইন এ্যানি ইজম, এ্যানি ফিক্সড আইডিয়া। রবীন্দ্রনাথের মতো লোক বলে গেছেন- দেশ দেশ করেই দেশটা গেল। তিনি আন্তর্জাতিকতাবাদী ছিলেন, সত্যজিৎ রায়, প্রিন্স দ্বারকানাথ, রাজা রাম মোহন এমনকি বিবেকানন্দও আন্তর্জাতিকতাবাদী ছিলেন। এইসব ধারণা আমাদের উপর প্রভাব ফেলেছিল। আমরা ঐ ধরনের লোকদের পছন্দ করি না যারা একটা ফিক্সড আইডিয়া নিয়ে বদ্ধ কুয়োতে পড়ে থাকে।

বিপ্লব বালা
হ্যাঁ, একেবারে স্বাধীনতার পরপর এমনটি ভাবা তো মুশকিলই ছিল বোধহয় ...

আতাউর রহমান
হ্যাঁ, তখন মানুষ ঐ সময়ের প্রত্যক্ষ সংগ্রামের চিত্র দেখতে চাচ্ছিল ... কিন্তু আমাদের ভাবনা ছিল- স্বাধীন হয়েছি সুতরাং এখনই সময় আর্টফুল কিছু করার।

হাসান শাহরিয়ার
দর্শক কীভাবে নিল আপনাদের প্রযোজনা?

আতাউর রহমান
আসলে অভিনয় ভালো হলে, নাটকের সাহিত্যগুণ থাকলে, আর  প্রোডাকশনটা ভালো হলে দর্শক দেখবেই।

হাসান শাহরিয়ার
তাহলে এই বাকি ইতিহাস দিয়েই বাংলাদেশে দর্শনীর বিনিময়ে নিয়মিত নাট্যচর্চার ইতিহাস তৈরি হলো। কয়টি শো করেছিলেন শুরুতে?

আতাউর রহমান
হ্যাঁ, রবিবার সকালে করতাম, একটানা আটটি শো করলাম ব্রিটিশ কাউন্সিলে ... তারপর ওরা বললো যে, হলটি তাদের লাগবে ... আমরা হল খোঁজা শুরু করলাম। একদিন সারা আমিন (পরে সারা যাকের) সংবাদ নিয়ে এলো যে, মহিলা সমিতির একটি পরিত্যক্ত মঞ্চ আছে, ব্যবহার করা যেতে পারে ... তো আমরা গেলাম, পরিষ্কার টরিষ্কার করে নাটক শুরু করলাম। দর্শনীর বিনিময়ে নাট্যচর্চা এগিয়ে যেতে লাগলো। পরে ঢাকা থিয়েটার করেছে, থিয়েটার করেছে ... আরো অনেকে শুরু করেছে এবং এখনো চলছে। শুরু থেকেই পত্র-পত্রিকা বেশ কাভারেজ দিয়েছে, হেল্প করেছে।

হাসান শাহরিয়ার
আপনাদের প্রায় সাথে সাথে কয়েকটি দলের কাজ শুরুর কথা বললেন ... তো তারাও কি দর্শনীর বিনিময়ে নিয়মিত নাটক করবে ভেবেই নাটক করা শুরু করলো? তাদের নাটকের প্রকৃতি কী ছিল?

আতাউর রহমান
হ্যাঁ, আসলে সবাই চাইলো যে নিয়মিত নাটক করবে। আর কয়েক বছরের মধ্যে দেখা গেল যে, যারা শুরু করেছিলাম তাদের প্রযোজনার মধ্যে আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য দেখা গেল, অর্থাৎ বোঝা যাচ্ছিল যে কে কোন ধরনের নাটক করে। যেমন, আমরা দেশ বিদেশের সেরা নাটক প্রযোজনায় আগ্রহী, আবার থিয়েটার শুরু করলো আশ-পাশের সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে, ঢাকা থিয়েটার বা সেলিম আল দীন শুরুতে সোস্যাল স্যাটেয়ার করলো। শকুন্তলা থেকে ওদের প্রযোজনা অন্যদিকে মোড় নিল। আবার মামুনুর রশীদ যেহেতু সমাজতন্ত্র ঘেঁষা সেহেতু নাটকে একটা রাজনীতির গন্ধ সব সময়ই ছিল, তবে প্রসঙ্গক্রমে আমি মনে করি মামুনুর রশীদের ডেপথ পাওয়া গেল ‘জয়জয়ন্তী’ তে এসে।

হাসান শাহরিয়ার
নাগরিকের পরের নাটক কি?

আতাউর রহমান
আমাদের দ্বিতীয় নাটক বিদগ্ধ রমনীকূল, মলিয়েরের নাটক আর রশীদ হায়দার লিখলেন তৈল সংকট, তখন কেরোসিন তেলের সংকট চলছিল দেশে ... দুটো নাটক ছোট তাই একসাথেই করলাম। তৃতীয় নাটক নিয়ে মহাসমস্যায় পড়লাম ... কোন নাটক করবো ভেবে পাই না, পরে ফেরেঙ্ক মলনারের লিলিয়াম আমার পছন্দ হলো। আমি আর আসাদুজ্জামান নূর এটার রূপান্তর করলাম। নাম দিলাম ভেঁপুতে বেহাগ ...নামটা জিয়া হায়দার দিয়েছিলেন। তারপর করলাম সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ’র ‘বহিপীর’। তবে মাঝখানে আমরা আবার সাঈদ আহমদের ‘মাইলপোস্ট’ মঞ্চায়ন করেছি। ‘মাইলপোস্ট’ আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন সময়েও করেছিলাম, বাংলা একাডেমী মঞ্চে- সৈয়দ আহসান আলী সিডনী, ইনামুল হক, আবদুল জলিল অভিনয় করেছিলেন। আমাদের মনে হলো সাঈদ আহমেদকে মেইন স্ট্রীম থিয়েটার সেভাবে নিচ্ছে না, তাই বোধহয় করলাম। তবে করে কিছু ক্রিটিক্যাল এ্যাপ্রিসিয়েশনও হয়েছে ... রিয়েলিস্টিক কিছু বানাতে গিয়ে ঠাটারীবাজার থেকে গরুর মাথা নিয়ে আসা হলো। দুর্ভিক্ষ হলে গরু মরে পড়ে থাকে ... তো আস্ত গরুতো আনা যাবে না, তাই গরুর মাথা আনা হয়েছিল ... মাথা হলেওতো তাজা মাথা, ঐ দুর্গন্ধে অভিনয় করতেই জান যায় আর কি, হাঃ হাঃ।

তারপর কোত্থেকে যে আলবেয়ার কাম্যুর ক্রসপারপাস হাতে এলো মনে পড়ছে না ... তখনতো কাম্যু আমাদের কাছে বিরাট ব্যাপার, ‘আউটসাইডার’ পড়ে ফেলেছি, ‘দ্যা প্লেগ’ পড়ে ফেলেছি ... কাম্যু একটা বিরাট ব্যাপার আমাদের কাছে ... কোলকাতার বিখ্যাত অভিনেতা সৌমিত্র চট্টপাধ্যায়ের অনুবাদ করা। তো সেটা করলাম। জিয়া হায়দারের নির্দেশনায় চারটি শো করলাম। এটা খুব কঠিন নাটক ছিল- আমরা কিন্তু কখনোই বক্স অফিসের দিকে তাকাইনি।

হাসান শাহরিয়ার
আপনারা কিন্তু ব্রেখটও করেছেন অত্যন্ত সফলভাবে। প্রথমে কি ‘সৎ মানুষের খোঁজে’?

আতাউর রহমান
হ্যাঁ। আসলে আলী যাকেরের ব্রেখটের প্রতি দুর্বলতা ছিল। সে কোলকাতায় ‘তিন পয়সার পালা’ দেখেছে। এটা নিয়ে অনেক লেখাও হয়েছে যে, অজিতেশ ব্রেখটকে অনেক ডায়লিউট করেছে ... পরে আমি অবশ্য পূর্ব জার্মানীর লাইপাজিগে ১৯৮০ সালে নাটকটা দেখলাম, নির্দেশনা ফ্রিৎস বেনিভিৎসের। উনি অনেক পরে ঢাকায় আইটিআই’র প্রযোজনা ব্রেখটের ‘লোক সমান লোক’- নির্দেশনা দিয়েছিলেন। আমি বলবো অজিতেশের ‘থ্রি পেনি অপেরা’ ইজ দা বেস্ট। যাক, তো যেহেতু আলী যাকের ব্রেখটের প্রতি দুর্বল ছিল ... সে  ‘গুড উইম্যান অব সেটজুয়ান’ রূপান্তর করে লিখলো ‘সৎ মানুষের খোঁজে’। ও নিজেই নির্দেশনা দিল ... অসাধারণ দর্শকপ্রিয়তা পেল, চাঁদপুর, কুমিল্লা কোত্থেকে কোত্থেকে লোক আসতো দেখার জন্য, এই নাটকে সারা যাকেরের অভিনয় ছিল অনন্য ... তখন থেকে ব্রেখট আমাদের পেয়ে বসলো।

বিপ্লব বালা
ব্রেখট কি আপনারা কোনো রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে করেননি?

আতাউর রহমান
না, সেদিক থেকে আমরা ব্রেখটকে বিবেচনায় আনিনি। আমাদের মধ্যে অনেকের মধ্যেই একটু ফ্যাশানেবল কমিউনিজম বসবাস করতো ... এখনো আমার মনে হয় আমি অনেকটা ফ্যাশানেবল কমিউনিস্ট হাঃ হাঃ ... আমাদের বুকের মধ্যে এ্যাতো শক্তি নেই যে, আমরা মাদার তেরেসার মতো মানুষের বিপদে নিজের স্বার্থ ভুলে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বো। কিন্তু সত্যিই মন খারাপ হয় যখন গাড়ি দিয়ে যাওয়ার সময় একটি ছোট বাচ্চার ক্ষধার্ত মুখ দেখি ... কিন্তু আবার সব ঠিক হয়ে যায়, আনন্দ ফূর্তি করি ... এটা আমাদের মধ্যবিত্ত সমাজের প্রতারণামূলক আচরণ আর কি! ক্লাস ক্যারেক্টর আর কি!

যাক এভাবে ব্রেখট শুরু হলো ... পরে আসাদুজ্জামান নূর অসাধারণ একটা এ্যাডাপ্টেশন করলো দেওয়ান গাজীর কিসসা। পুন্টিলা এন্ড হিজ সারভেন্ট মাট্টি-র  রূপান্তর। এটা যতবার করেছি, ঢাকায় হোক আর বাইরেই হোক, কেউ ভাবেইনি যে এটা বিদেশি নাট্যকারের নাটক। নূর অবশ্য আরেকটা ভালো কাজ করেছিল ব্রেখটেরই ‘দা রাইজ এ্যান্ড ফল অব দা সিটি অব মেহগোনী’-র রূপান্তর ‘মোহনগরী’, নির্দেশনাও দিয়েছিল সে। এটা মিউজিক্যাল প্লে ছিল। ওয়াহিদভাই সুর করেছিলেন, এবং অনেক ছেলে-মেয়ে নাচে অংশ নিত। বিভিন্ন দল থেকে গান ও নাচের মেয়েদের আনা  হয়েছিল বলে আর কন্টিনিউ করা যায়নি। ছয়টি মাত্র শো হয়েছিল ... নূরের লেখার হাত ছিল ভালো কিন্তু সে খুব কম কাজ করেছে।

বিপ্লব বালা
‘দেওয়ান গাজীর কিসসা’ নিয়ে কিন্তু অনেক সমালোচনা হয় যে, ব্রেখটকে হালকা করা হয়েছে, এসব ...

আতাউর রহমান
হালকার ব্যাপার না, ব্রেখট থেকে কিছুটা হয়তো ডেবিয়েট করেছি আমরা এইতো? হ্যাঁ এ্যাডাপ্টেশনের ক্ষেত্রে এটা হতেই পারে। আমিও শুনেছি যে, আমরা তরল করেছি ইত্যাদি ... এখন মূল নাটকেও এন্টারটেইনমেন্টের ব্যাপারটা আছে ... আর ব্রেখট যেভাবে করেছে সেভাবেই আমাদের করতে হবে এটার কিন্তু কোনো মানে নেই। রূপান্তরে এই স্বাধীনতা নেয়া যায়।

হাসান শাহরিয়ার
ঠিক ওভাবে না, আতাউরভাই, আপনি দেখুন যে, নাটকে একটা মেসেজ ছিল, সেটা হয়তো আমোদের মাধ্যমেই দর্শককে দিতে চেয়েছেন, কিন্তু আমোদের পরিমান যদি এমন হয় যে দর্শক কেবল মজাটাই নিল মেসেজটা ফেলে দিল তাহলে অসুবিধা হওয়ার কথা না?

আতাউর রহমান
এমনটা কি হয়েছে?

বিপ্লব বালা
আমার মনে হয় মাখনের চরিত্রটিতে একটা রাজনৈতিক ব্যাপার ছিল, কিন্তু নির্দেশনার আর অভিনয়ের ঝোঁক অন্যদিকে থাকার কারণে সেটা মিস হয়েছে।

আতাউর রহমান
হ্যাঁ, সেটা হতে পারে। একটা কথা কি, কমেডি বা স্যাটায়ারের সমস্যা হলো সেখানে কিন্তু অভিনেতারাও বেশ ফুরফুরে মেজাজে থাকে এবং একটু অতিরঞ্জিত করার টেনডেনসি থাকে ... তো সেখানে নির্দেশককে কিন্তু খুব স্ট্রং জায়গায় থাকতে হয়। নূর হলো নির্দেশক ... প্রথম দিকে হয়তো তার কথামতো চলেছি, আস্তে আস্তে দেখা গেল যাকের বেশি বেশি করছে আমিও বেশি করছি ... মানে জমে গেলে যা যা হয় আরকি!  গ্যালারী শো’র প্রবণতা বাড়ে হাঃ হাঃ ... আর নূরও কিছু বলছে না, সেও মজে যেত হয়তো হাঃ হাঃ ... তো এভাবে আসলে আমরা বোধহয় কিছুটা সরে গেছি, তবে যদি সরে গিয়ে থাকি তাহলে তা এই নাটকের একটা দুর্বল দিক সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই।

হাসান শাহরিয়ার
আপনারা প্রযোজনার ব্যাপারে প্রকৃত অর্থেই বৈচিত্র্যের সন্ধানে ছিলেন, তা কিন্তু পরীক্ষিত ... যেমন অনেক ধরনের এবং সেরা অনেক কিছু করেছেন। এমনকি গডোর প্রতীক্ষায়-ও করেছেন।

বিপ্লব বালা
হ্যাঁ, সত্যিই ‘ওয়েটিং ফর গডো’ ধরলেন কীভাবে?

আতাউর রহমান
‘ওয়েটিং ফর গডো’ অনুবাদ করেছেন কবীর চৌধুরী ... খুব কঠিন কাজ, ইংরেজী সাউন্ডের মেজাজ বাংলায় আনা ডিফিকাল্ট ... অনুবাদ করে স্যার আমাকে, আলী যাকেরকে, ফেরদৌসীকে, রামেন্দুকে ওনার বাসায় নাটকটি পড়ে শোনালেন। শুনিয়ে বললেন যে, আমি চাই তোমরা দু’দল মিলে এ নাটকটা কর ... যদিও ছোট কাস্ট ... মানে দু’দলের পার্টিসিপেশন থাকুক এটা উনি চাইলেন। পরে আমি রামেন্দুকে বলি, ও গা করে না ... কিছুদিন পর এক পার্টিতে কবীর স্যারের সাথে দেখা, বললাম যে, ওরাতো বোধহয় করবে না, আমি, মানে আমার দল নাটকটি করতে পারে? স্যার বললেন কেন করবে না বলে তুমি মনে করছো? বললাম- টিকেট বিক্রি হবেনাতো এজন্য বোধহয় ... তো উনি বললেন ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম। তো আমি দলকে বললাম যে আমি নাটকটি করতে চাই ... তখন আমাদের একটা পাঁচজনের কমিটি ছিল, নাটক এ্যাপ্রুভাল কমিটি বা প্রযোজনা কমিটি।

হাসান শাহরিয়ার
এখনো আছে?

আতাউর রহমান
আছে, কিন্তু আগের মতো অতো কড়াকড়ি নেই, আগেতো সবাই নাটক পড়তাম, আলোচনা করতাম ... তো নূর বললো যে, আতাভাই তুমি এই নাটক করো না, নাটকটি একেবারেই জীবনবিমুখ একটা নাটক, নিঃসঙ্গতার কথা বলে, একাকিত্বের কথা বলে, নাথিংনেসের কথা বলে। আমার জেদ চেপে গেল, আমি বললাম আমাকে এটা করতে দেয়া হোক, স্পেশাল কন্সিডারেশন ... তো ওরা বললো যে ঠিক আছে, আপনি দলে অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, যদিও এটা জীবনের সাথে সম্পৃক্ত নাটক নয়, তবুও কন্সিডার করলাম।

বিপ্লব বালা
দর্শকতো পরে, আগে আপনার অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নাটকটা বোঝালেন কীভাবে?

আতাউর রহমান
আমিও কী অত বুঝেছি প্রথমে? নূর বললো কীভাবে করবো ... কিছুইতো বুঝি না ... বললাম চলো শুরু করি করতে করতে কী বের হয় দেখি। আস্তে আস্তে আমরা করতে করতে অনেক কিছু আবিষ্কার করলাম এবং নাটকটি দাঁড়ালো।

বিপ্লব বালা
দর্শক কীভাবে নিল?

আতাউর রহমান
আশাতীত ভালোভাবে। আমরা একসময় আবিষ্কার করলাম যে এটি আসলে জীবনানন্দের কবিতার মতো ... কুয়াশা, ধোঁয়শা, প্রহেলিকা, কুহেলিকা সব মিলিয়ে কেমন যেন, বুঝি আবার বুঝি না এমন কিছু। এটার উপর কোলকাতার স্টেটসম্যান পত্রিকার জাঁদরেল ক্রিটিক ধরণী ঘোষের একটা রিভিউ ছিল- নাসির উদ্দিন শাহ’র চেয়ে আমাদের প্রডাকশন ভালো হয়েছে, এন্ড আই এম ট্রুলি আ বেকেটিয়ান ডিরেক্টর ... তো আমি কীভাবে বেকেটিয়ান ডিরেক্টর তা আমি নিজেই বুঝিনি হাঃ হাঃ, ধরনী ঘোষকে নামে চিনতাম, দেখাও হয়নি কখনো। বাইশটি শো করেছিলাম।

বিপ্লব বালা
দর্শক আসতো প্রতিটি শোতে?

আতাউর রহমান
আঠারোটি শো হাউজফুল গেছে ... আসলে আমার মনে হয় আমরা বাঙ্গালিরাও কিছুর জন্য, গডোর জন্য অপেক্ষা করছি ... সেদিক থেকে বোধহয় মিল খুঁজে পায় দর্শকেরা নিজেদের সাথে।

হাসান শাহরিয়ার
তদ্দিনে ঢাকার অন্যান্য দলের নাটক কেমন হয়ে উঠলো?

আতাউর রহমান
খুব ভালো কাজ হচ্ছিল। কিছু কিছু নাটক দেখে আমরা বিমোহিত হয়েছি। যেমন- সেলিম আল দীনের নাটক জণ্ডিস ও বিবিধ বেলুন, মুনতাসির ফ্যান্টাসী ... এগুলো বেশ মজা করে দেখেছি ... আর শকুন্তলা দেখেছি, কিন্তু কিছু প্রশ্ন নিয়ে দেখেছি। এরপর কিত্তনখোলা খুব ভালো লেগেছে। মামুনুর রশীদের নাটক ওরা কদম আলী আমার পছন্দের নাটক। একটা চিত্র পাই, আমাদের অনেক না বলা কথা যেন দেখতে পাই। আবদুল্লাহ আল-মামুনের মানে থিয়েটারের ‘এখন দুঃসময়’ ভালো লেগেছে।

হাসান শাহরিয়ার
তখন কাজের ধারাটা কি প্রতিযোগিতামূলক ছিল? মানে ওরা ভালো করছে, তাহলে আমাদেরও ভালো করতে হবে ... এমন কিছু?

আতাউর রহমান
হ্যাঁ, সাংঘাতিক প্রতিযোগিতামূলক ছিল।

বিপ্লব বালা
ততদিনে ‘নাট্যচক্র’ কেমন কাজ করছিল?

আতাউর রহমান
আমি বলবো যে, ‘নাট্যচক্র’ পুরোনো দল হলেও আজ পর্যন্ত এমন কাজ করেনি যেটা দিয়ে তাদের আলাদা করে চিনে নেয়া যায়। যেমন তুলনামূলকভাবে নতুন দল হয়েও জামিল আহমেদ নির্দেশিত বিষাদসিন্ধু দিয়ে কিন্তু ঢাকা পদাতিককে চিনে নেয়া গিয়েছিল।

হাসান শাহরিয়ার
একটা নাটক দিয়েই হয়তো একটা দলকে অনেকদিন মনে রাখা যায় ...

আতাউর রহমান
হ্যাঁ, ঠিক তাই। একটা ভালো লেখা লিখেও কিন্তু আর না লিখলেও চলে। যেমন ধরো- অরুন্ধতী রায়ের ‘গড অব স্মল থিংস’ -এর মতো বা সত্যজিৎ রায় যদি অপুর ট্রিলজি করে আর কিছু না-ও করতেন তবুও উনি বিশ্বনন্দিত হতেন, এমন আর কি।

হাসান শাহরিয়ার
তাহলে ‘বিষাদসিন্ধু’ আপনাকে নাড়া দিতে পেরেছে?

আতাউর রহমান
তাতো অবশ্যই, এই প্রযোজনা দিয়ে একটা দল কেমন সামনে চলে এলো, তাই না? তবে বিষাদসিন্ধু যে সবদিক থেকেই আমার কাছে অনন্য তা কিন্তু না, যেমন জামিল যেভাবে নির্দেশনা দেয় সেটা আমার পথ নয়। বিষাদসিন্ধু’র প্রযোজনা আমার খুব স্ট্রাকচার্ড মনে হয়েছে, খুব ডিসিপ্লিন্ড এন্ড রেজিমেন্টেড মনে হয়েছে ... যেটা আমি থিয়েটারের নির্দেশক হিসেবে করবো না, পারবোও না। একেকটা মানুষের একেকটা ধরন থাকে ... ঐ নাটকে ডিরেক্টরের উপস্থিতি কিন্তু পুরো প্রযোজনা জুড়েই ছিল। অর্থাৎ যারা জামিলকে চেনে তারা জানে যে প্রত্যেকটা মুভমেন্ট জামিল দেখিয়ে দিয়েছে ... কিন্তু আমি চাই ডিরেক্টর প্রযোজনায় মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে। কিন্তু একথা অনস্বীকার্য যে, জামিলের ঐ কাজের মাধ্যমে আমরা এই প্রথম একটা শ্রমসাধ্য কাজের সাথে পরিচিত হলাম, নিউ ইনোভেশান-এর সাথে পরিচিত হলাম। ঠিক এমনিভাবে জামিল আবির্ভূত হয়েছিল ঢাকা থিয়েটারের ফণিমনসা’র সেট নিয়ে। শিক্ষিত ছেলে, কাজ জানে, করে দেখায়, আবার জেদও আছে ... অচলায়তন’র সেট করতে গিয়ে আলী যাকেরের সাথে গণ্ডগোল ... মেটাল জাতীয় মেটেরিয়াল সেটে ছিল, সেটা পারফরমারদের ধূতিতে লেগে যাচ্ছিল ... তো আলী যাকের বললো যে, আমি এ্যাক্টরস ডিরেক্টর, ওদের মতো করে সেট বানাও, তো জামিল বললো যে, আপনার এ্যাক্টরদের আমার সেটের কথা মাথায় রেখে মুভ করতে বলেন, হাঃ হাঃ ... ইত্যাদি, ওর ব্যাপারে আমার ক্রিটিক্যাল এ্যাপ্রিসিয়েশন আছে, সেটাই কিন্তু মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

বিপ্লব বালা
আচ্ছা, নির্দেশক প্রসঙ্গে যেহেতু বললেন, তো আমাদের আরেক নির্দেশক বাচ্চুভাই সম্পর্কে কিছু বলুন।

হাসান শাহরিয়ার
এ’দুজনের কিন্তু একটা বিশাল মিল রয়েছে, তা হলো, দুজনই অভিনেতা নিয়ে নাড়াচাড়া করেন কিন্ত নিজেরা নড়েন না হাঃ হাঃ।

আতাউর রহমান
হাঃ হাঃ, হ্যাঁ, এই মিলটা দুজনের মধ্যে আছে, আর আমি নিজে একটু আধটু নড়ার চেষ্টা করি হাঃ হাঃ ... যাক, বাচ্চুর ব্যাপারে বলতে গেলে ... মানে প্রথম দিকে আমি ভাবতাম ও কী ডিরেকশন দেয়, পীযূষ, আসাদ আর আল মনসুরেরা মিলে দেখিয়ে দেয় আর ওতো মুক্তিযোদ্ধা, ওর পাওয়ার আছে, ওকে সবাই ভয়টয় করে, তাই বাচ্চুর নামে চালায় হাঃ হাঃ। এ ভাবনা অবশ্য ওর সাথে পরিচয় হবার আগে। এখনো সে এটা নিয়ে হাসাহাসি করে। কিন্তু পরিচয় হবার পর দেখলাম যে, না সে আসলে থরো ...

বিপ্লব বালা
প্রথম কোনটা আপনাকে ...

আতাউর রহমান
প্রথম কিত্তনখোলা, এটা আমার কাছে ভিন্ন ঘরানার মনে হয়েছে। এ্যাতোবড় ক্রাউড নিয়ে, অত সুন্দরভাবে হ্যান্ডল করা ... মানে আমার কাছে বিস্ময়কর লেগেছে। তারপর কেরামত মঙ্গল-ও ভালো লেগেছে, সুঅভিনীত নাটক। ঢাকা থিয়েটার কিন্তু সব সময় শ্রমসাধ্য কাজ করে ... সেলিম আল দীনের নাটক বোঝাইতো কঠিন, সেটা আবার বিভাজন করে মঞ্চে এনে দেখানো, বিরাট ব্যাপার। আমি সেলিম আল দীন করতে পারবো কিনা জানি না তবে ওরা যে বলে- বাংলাদেশের নাটককে আলাদা করে চেনাতে চায়, সেটাকে কিন্তু আমার সোনার হরিণ মনে হয় বা মনে হয় এটার কোনো প্রয়োজন নেই। নাটক দেখলেই চেনা যাবে যে এটা বাংলাদেশের নাটক- এই চেনাটার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না।

বিপ্লব বালা
না, তারা বলছে যে, নিজস্ব থিয়েটার ল্যাংগুয়েজ তৈরি করা ...

আতাউর রহমান
এটা কোথাও আছে কি? কোনো দেশে? ‘কাবুকি’ ‘নো’ সব ক্ল্যাসিক্যাল ফর্ম, ভেরি স্টাইলাইজড ফর্ম। এগুলোতো মিউজিয়াম পিস। সেলিম আল দীন যতই বলুক কেরামতমঙ্গল মঙ্গল কাব্যের ঢঙে লিখেছে, খণ্ড খণ্ড ভাগ করেছে। কিন্তু সেলিম অতীতকে দেখছে একজন আধুনিক মানুষের চোখ দিয়ে। অতীতের কিছু মণিকাঞ্চন নিয়ে এসেছে, নিয়ে সে কিন্তু আধুনিক মননে স্থাপন করেছে। চোখটা কিন্তু আজকের চোখ, এটা ভুললে চলবে না। কাজেই আমরা ব্যাক গিয়ারে যেতে চাই না। পিছন ফিরে তাকাবো, কিন্তু পেছনে যাব কেন? তবে তারা নিজেদের মতো করে কাজ করছে, লেট দেম ডু।

হাসান শাহরিয়ার
আচ্ছা স্বাধীনতার পর নাটক শুরু হওয়ার কিছুকাল পরে সৈয়দ শামসুল হকের নাটকের দেখা পেলাম ... তো ওনাকে কীভাবে এ মাধ্যমে পেলেন?

আতাউর রহমান
শামসুল হক টেলিভিশনে নাটক লিখেছেন ... নাম মনে নেই, এ্যাবসার্ডধর্মী নাটক ... কিন্তু ওনাকে আমরা চিনতাম ‘খেলারাম খেলে যা’ দিয়ে ... খুব পপুলার উপন্যাস, উনি ভালো কবিতা লিখতেন। বিবিসিতে চাকুরি করতেন। তার নাটকের প্রতি একটা দুর্বলতা ছিল। তো উনি নাগরিক প্রযোজিত সাঈদ আহমেদের মাইলপোস্ট দেখতে এলেন ... তারপর দেখলেন আমাদের কোপেনিকের ক্যাপ্টেন। দেখে বললেন আমাদের জন্য নাটক লিখতে চান। কোপেনিকের ক্যাপ্টেন-এ আলী যাকেরের ডিরেকশন আর আসাদুজ্জামান নূরের অভিনয় ভালো লেগেছে ... তো আমরা রাজী হলাম এবং উনি নূরলদীনের সারাজীবন-এ হাত দিলেন। এর আগেই তিনি থিয়েটারকে দিয়েছেন পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, রামেন্দুর সাথে ওনার সখ্য ছিল।

বিপ্লব বালা
‘ম্যাকবেথ’ কি অনুবাদ হয়ে গেছে ততদিনে?

আতাউর রহমান
না না, ওটা আরো পরে। অসাধারণ অনুবাদ, সৈয়দ শামসুল হক একেবারে টেক্সট এর কাছাকাছি চলে গেছেন। এই নাটকের ডিরেক্টর ছিলেন ক্রিস্টোফার স্যানফোর্ড, বৃটিশ, বৃটিশ কাউন্সিলের সৌজন্যে ইংল্যান্ড থেকে এসেছিলেন। আমি বলতাম যে তুমিতো ব্রিটিশ, তুমি ধর কীভাবে আমরা কী বলছি ... উনি বলতেন যে বাক্য গঠনের অনুপ্রাস থেকে বুঝি। এই নাটকটি নাগরিক ও থিয়েটারের যৌথ প্রযোজনা ছিল।

হাসান শাহরিয়ার
আতাউরভাই, একটু নূরলদীনে ফিরে যাই ...

আতাউর রহমান
হ্যাঁ, সৈয়দ শামসুল হক নূরলদীন আমাদেরকে দিলেন। আলী যাকের ডিরেকশন দিল এবং মুখ্যভূমিকায় অভিনয় করলো, আমিও অভিনয় করলাম। নূর অসাধারণ অভিনয় করলো আব্বাস মণ্ডলের ভূমিকায়, আলী যাকের ও সারা যাকের ভালো অভিনয় করলো। পরে অবশ্য আমি থিয়েটার স্কুলে বর্ষশেষ প্রযোজনা হিসেবে ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ নাটকের নির্দেশনা দিলাম। উনি আমার সম্পর্কে নির্দেশক হিসেবে সংবাদ পত্রিকায় তাঁর ‘হৃৎ কলামের টানে’ কলামে ভালো লিখলেন।

হাসান শাহরিয়ার
থিয়েটারের প্রযোজনা কি ওনার পছন্দ হয়নি?

আতাউর রহমান
উনি সেটা বলেননি। আমার সম্পর্কে দুটো কথা ওনার ‘হৃৎকলামের টানে’ কলামে লেখা আছে, একটা হলো আতাউর আমার পাশে এসে আবার নতুন করে নাটকটা লিখেছেন - উনি ডিরেক্টর না, উনি একজন আবিষ্কারক। তারপর থিয়েটারের প্রোডাকশনের সাথে তুলনা করায় থিয়েটার আপত্তি করলো। তখন উনি আবার লিখলেন যে, নিশ্চয়ই ফেরদৌসীর মতো ওই মেয়েটি অভিনয় করেনি, নিশ্চয়ই মামুনের মতো মাতব্বর অভিনয় করেনি। কিন্তু আতাউরের নির্দেশনা উঁচুমানের।

এবং আমি মনে করি এক অর্থে ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, ‘নূরলদীনের সারাজীবন’- এর চেয়েও ভালো নাটক।

বিপ্লব বালা
নূরলদীনের টেক্সট-এর কারণেই হয়তো তখনকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, নাটকটি একটা ভিন্ন মর্যাদা পেয়েছে ...

আতাউর রহমান
সময় এবং প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে কিন্তু আমার পরিষ্কার বক্তব্য আছে। সমকালীন নাটক ঐ সময় প্রাসঙ্গিক থাকে যেমন ‘সাতঘাটের কানাকড়ি’, যেমন ‘কোপেনিকের ক্যাপ্টেন’ সেই সময়ে সমকালীন ও প্রাসঙ্গিক, এখন কিন্তু নয়। কিন্তু সফোক্লিসের রাজা ইডিপাস কিন্তু হয়তো আড়াইহাজার বছর ধরে প্রাসঙ্গিক। কেন আমি ভাবছি যে, সোস্যাল প্লে আর করবো না ... কারণ, ক্ল্যাসিক্যাল প্লে আবহমানকাল ধরে প্রাসঙ্গিক থাকে। যেমন হ্যামলেট-এর প্রাসঙ্গিকতা কোনোদিন ম্লান হবে না। রাজা ইডিপাস ম্লান হয়নি। রবীন্দ্রনাথের রাজা, ডাকঘর কোনোদিনই বিবর্ণ হবে না। ঐ সব নাটক ইউনিভার্সেল ল্যাংঙ্গুয়েজে লেখা। সুতরাং, যেসব নাটক সব সময়ের জন্য প্রাসঙ্গিক এখন থেকে আমি সেসব নাটকই করবো বলে ঠিক করেছি।

হাসান শাহরিয়ার
তারপরতো এক সময় ‘ঈর্ষা’ করলেন।

আতাউর রহমান
আমি যে নাটকগুলো নিয়ে গর্ববোধ করি তার মধ্যে একটি হচ্ছে ‘ঈর্ষা’, আরেকটা ‘ওয়েটিং ফর গডো’।

বিপ্লব বালা
গ্যালিলিও?

আতাউর রহমান
গ্যালিলিও করতে যদিও আমি খুব একটা প্রিপেয়ার্ড ছিলাম না, কারণ ব্রেখট আমার মনের খোরাক নয়। আসলে ক্রিয়াপূর্ণ কাজ আমার মনকে কখনো টানে না। ডি. এল রায়ের ‘সাজাহান’ যখন করি তখন অনেক চেঞ্জ-টেঞ্জ করে করেছি। সব সময়ই নতুন কিছু করার ভাবনা আমার থাকে।

বিপ্লব বালা
‘সাজাহান’ করার সময় কি শেখ মুজিব মারা যাবার ব্যাপারটা ছিল ... মানে সময়টা কি ...

আতাউর রহমান
হ্যাঁ, প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের ব্যাপারটা মাথায় ছিল। দর্শকও ভালোভাবে নিয়েছিল ... ৫২টা শো হয়েছিল। বিরাট কাস্ট ছিল ৪৫/৫০, এমন অবস্থা যে দর্শক বসানোর লোকই থাকতো না। আওরঙ্গজেবের ভূমিকায় অভিনয় করেছিল জামালউদ্দিন হোসেন, তাকে খুব মানিয়েছিল ঐ চরিত্রে। সাজাহান করেছিল আলী যাকের, তাকে দৈহিক দিক থেকে অতটা মানায়নি কিন্তু তখন আমাদের দলে ওর মতো পাওয়ারফুল অভিনেতা ছিল না, দিলদার করেছিল নূর, খুব ভালো করতো।। যাক্ যেটা বলছিলাম যে, ব্রেখট কিন্তু আমার মনের খোরাক না। গ্যালিলিও আমার উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। বাইরের নির্দেশক করার কথা ছিল ... কিন্তু না পারায় যাকের আমাকে নির্দেশনা দিতে বললো। তবে করার পর কিন্তু আমি আশাতীত সাড়া পেলাম, মানে আমার নিজের কাছেই খুব ভালো লেগেছিল। তারপরও ঈর্ষা-ই আমাকে বেশি আনন্দ দিয়েছে। নাটকটি হকভাইও ভাবতে পারেননি যে, মঞ্চে আনা সম্ভব ... তো সেটাকে মঞ্চে এনে হাউজফুল শো করা চারটিখানি কথা না। শম্ভু মিত্র কোলকাতায় প্রযোজনাটি দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু জামালউদ্দিন হোসেন দল থেকে চলে যাবার পর প্রদর্শনী বন্ধ করে দিতে বাধ্য হলাম।

হাসান শাহরিয়ার
অন্য কাউকে দিয়ে চেষ্টা করতে পারতেন।

আতাউর রহমান
ঐ চরিত্র কে তুলবে বলো? আর ঠিক সাবস্টিটিউট দিয়ে কোনো নাট্য প্রযোজনার মান ধরে রাখা যায় না। তবুও নূর বা আবুল হায়াতকে বলেছিলাম ... অতো বড় সংলাপ মুখস্ত করা কঠিন কাজ। তাই বাদই দিতে হলো আরকি!

বিপ্লব বালা
আপনিতো ‘মাদার কারেজ’ বা ‘হিম্মতি মা’ করেছেন?

আতাউর রহমান
হ্যাঁ। ব্রেখটের মাদার কারেজ-কে আমি কিছুটা ভিন্নভাবে দেখেছি। নাটকের বোবা মেয়েটি, ক্যাটরিন কিন্তু আমাদের হেল্পলেসনেসের প্রতীক। আমাদের ‘না পারা’, আমাদের অপারগতার প্রতীক। মাদার কারেজ-র সবচেয়ে ইম্পর্টেন্ট জায়গাটা হচ্ছে যে, ইউনিভার্সেল মাদারহুড ক্যান নট বি ডেস্ট্রয়েড। যুদ্ধ এবং নির্দয়তা মায়ের মাতৃত্ব হরণ করতে পারেনি। সে অর্থে ইটস এ গ্রেট প্লে। একাধি বিদেশের প্রযোজনায় মা’কে কিছুটা ডিহিউমেনাইজড দেখানো হয়েছে।

হাসান শাহরিয়ার
আমরা যে সময়ের আলাপে আছি, সে সময়টায় আশির দশক পার হয়ে গেছে। তো ঐ সময়ে ঢাকার থিয়েটারে কিন্তু অনেক নতুন দল, বেশি বেশি নাটক মঞ্চায়িত হচ্ছে ... তখন কি মনে হয়নি যে, এই একটা দুটো মঞ্চ দিয়ে বা এমন সাধারণ মানের মঞ্চ দিয়ে আর নাটককে এগিয়ে নেয়া যাবে না বা ভালো নাটকের যেমন বহু মঞ্চায়ন জরুরী, তা আর কন্টিনিউ করা যাচ্ছে না? সুতরাং নতুন এবং আধুনিক মঞ্চের অভাব অনুভূত হয়নি?

আতাউর রহমান
হয়েছে, তবু করে চলেছি।

হাসান শাহরিয়ার
বিকল্প কিছু খুঁজেছেন কি?

আতাউর রহমান
খুঁজেছি কিন্তু বিকল্প তৈরি করতে পারিনি, এটা আমাদেরই ব্যর্থতা বলবো। আমরা যদি সরকারের দিকে না তাকিয়ে চেষ্টা করতাম, চাঁদা ওঠাতাম, ব্যাংকের কাছে যেতাম লোনের জন্য, জায়গা যদি খুঁজতাম ... আমরা হয়তো পারতাম। আমরা একটু বেশি মাত্রায় ভোগবাদী হয়ে গেছি, আমাদের নামধাম হয়ে গেছে। অলরেডি উই বিকেইম সামথিং। কাজেই আমাদের মধ্যে ঐ তাড়নাটা ছিল না। পদক টদক পেয়ে গেছি সুতরাং প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে মঞ্চ নির্মাণের লক্ষ্যে লেগে থাকিনি।

হাসান শাহরিয়ার
‘কবর দিয়ে দাও’ নাটকটি কেমন হলো? এর সাথে মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ নিয়ে নাকি ...

আতাউর রহমান
হ্যাঁ, ভালো হয়েছে, ২৫টি শো করতে পেরেছিলাম। এই নাটকটির সেট ও লাইট করেছিলেন জামিল আহমেদ, খুবই চমৎকার কাজ! অনেকে বলে ‘কবর দিয়ে দাও’-এর সাথে ‘কবর’-এর মিল আছে। হ্যাঁ, আঙ্গিকের দিক থেকে মিল আছে কিন্তু সেটাতো হতেই পারে, আর তা ছাড়া মুনীর স্যার জেলে থাকতে আরউইন’শ-র দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে ‘কবর’  লিখেছেন। আমি এই নাটকটা করেছি, কারণ, এটা একটা গ্রেট এন্টি ওয়ার প্লে বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। আমাদের যেটা ভালো লাগে সেটাই করি। কোনো বাঁধা ধরা নিয়ম নেই যে, ওটা করলে এটা করবো না বা ওটা করা যাবে না। আমাদের কাজের বৈচিত্র্য দেখ, মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ, রশীদ হায়দার, সাঈদ আহমেদ, সৈয়দ শামসুল হক, স্যামুয়েল বেহেট, আরউইন’শ, শেক্সপীয়ার, আলবেয়ার কাম্যু, এডওয়ার্ড এলবি, মলিয়ের, বের্টল্ট বেখ্রট, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, বাদল সরকার, বনফুল, বুদ্ধদেব বসু, ফেরেঙ্ক মলনার, চেকভ এঁদের নাটক আমরা মঞ্চায়ন করেছি। এবং আমরা কিন্তু সব সময় বলি যে, আমরা ভাগ্যবান যে আমাদের কোনো নিজস্ব নাট্যকার নেই। তা না হলে আমার আমাদের কাজে এ্যাতো বৈচিত্র্য আনতে পারতাম না।

হাসান শাহরিয়ার
আমরা সব সময় বলতে শুনি যে, স্বাধীনতার শ্রেষ্ঠ ফসল হলো আমাদের মঞ্চ নাটক। আবার আমরা শুরু থেকেই মঞ্চ নাটক করাটাকে ‘নাট্য আন্দোলন’ বা ‘সমাজ পরিবর্তন’ এসব করা বুঝতে শিখেছি ... মানে নাটক করার সাথে একটা রাজনীতি রাজনীতি গন্ধ পেয়েছি, কেবলই শিল্পের জন্য করাটা বুঝিনি ... সেখানে আপনার মতামত কী?

আতাউর রহমান
আসলে স্বাধীনতার শ্রেষ্ট ফসল বলি আর যাই বলি, আমি মনে করি স্বাধীন দেশ পাওয়ার অর্থ হলো নিজের ভাবনা চিন্তার স্বাধীনতা পাওয়া। স্বাধীন দেশে নাটক করবো মানেই এই না, সব সময় কেবল দেশের ব্যবস্থাপনা, অর্থনীতি, রাজনীতি নিয়ে নাটক করতে হবে। যে সমস্ত বিষয়ের মধ্যে চিরন্তন সত্য আছে সেদিকে নজর দেয়াই ভালো। আর আমি কখনো মনে করি না যে, নাটক সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হতে পারে। নাটক শ্রম ও ঘামের ফসল বা নাটক সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার- এগুলো সবই গালভরা স্লোগান। তবে হ্যাঁ, নাটক সমাজ পরিবর্তনের সহায়ক শক্তি হতে পারে। মনে রাখতে হবে থিয়েটার ইজ প্রাইমারিলি এন আর্ট ফর্ম। এটা পল্টন ময়দানের বক্তৃতা নয়।

হাসান শাহরিয়ার
কিন্তু আপনারা কি এটা মানবেন যে, কোনো না কোনো আদর্শিক জায়গা থেকেই আমরা আপনাদের ব্যাপারে কিছু কিছু মিথ তৈরি করে ফেলেছি এবং সেই মিথ মাথায় রেখেই আপনাদের অধীনে থিয়েটার করে যাচ্ছি। কিন্তু বাস্তবে আপনারা কিন্তু অত ডেসপারেটলি থিয়েটারটা করছেন না, আপনারা অনেক বৈষয়িক জায়গা থেকে থিয়েটার করেছেন এবং করছেন। আপনি কি এক মত?

আতাউর রহমান
থিয়েটার আমাদের জন্য পেশন ও স্ট্রাগল এবং সর্বোপরি পাগল পারা ভালোবাসা। এক পয়সা রোজগার না করে এ্যাতোকাল ধরে ভুতের বেগার খেটে যাচ্ছি, এর চেয়ে ডেসপারেট এবং আদর্শিক প্রয়াস আর কী হতে পারে! বিদেশিরা আমাদের থিয়েটার দেখে বিস্মিত হয়ে বলেন, ইটস আ থিয়েটার অব ম্যাডনেস। ওরা এ ধরনের থিয়েটারের কথা ভাবতেই পারে না। অন্যেরা বৈষয়িক জায়গা থেকে থিয়েটার করছেন কিনা জানি না। থিয়েটারের প্রতিপত্তিকে বিক্রি করে অনেকে নিজেদের ভাগ্য ফিরিয়েছেন, তবে আমি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি কখনো আমি বৈষয়িক জায়গা থেকে থিয়েটার করিনি, করবোও না।

হাসান শাহরিয়ার
কামালউদ্দিন নীলুভাই বলছেন, আমাদের এখানে তিনিই একমাত্র প্রফেশনাল থিয়েটার চালান, আপনার কী মত?

আতাউর রহমান
শোনো প্রফেশনাল থিয়েটার হবে সেটাই যেটার ফান্ড হবে সেলফ জেনারেটিং। এখন আমার বাবার পয়সা আছে- দশ কোটি টাকা ব্যাংকে ফেলে রাখলাম আর থিয়েটারের দল চালালাম, সেটা কিন্তু প্রফেশনাল হলো না। থিয়েটারের টিকেট বিক্রি করা আয় থেকে খরচ চালিয়ে যদি কলা-কুশলী ও অভিনেতাদের ভাতা দেয়া যায় তবেই সেটাকে প্রফেশনাল বলা যায়। কিন্তু নীলুর থিয়েটার প্রফেশনাল নয়, ওটা বিদেশি অনুদানের টাকায় চলে। থিযেটার থেকে ফান্ড জেনারেটেড হয় না।

হাসান শাহরিয়ার
এটাকে কি পজেটিভ বলে মনে হয়?

আতাউর রহমান
অভিনেতারা কিছু টাকা পয়সা পায়, মন্দ কী! তবে ঐ দলে অভিনেতারা বেশিদিন টিকতে পারে না। টাকা কড়ি পেয়ে অভ্যাসটা খারাপট হয়ে যায়, অন্যদলে এসে বেগার খাটতে হয়। আমাদের দলে এসে সিএটি’র বেশ কয়েকজন ছেলে কাজ করে। আমরা ওদের কিছুই দিতে পারি না।

হাসান শাহরিয়ার
নাট্যচর্চার প্রথম দু’দশক, যখন কেউই মিডিয়াকে জীবিকার পথ হিসেবে নিতে পারেনি, তার বদলে বিভিন্ন জায়গায় কাজ করে পেট চালিয়েছে, আর এখন অনেকেই মিডিয়াকে প্রফেশন হিসেবে নিয়ে থিয়েটার করছেন। তো তখনকার থিয়েটার আর বর্তমানের থিয়েটারে কি কোনো পার্থক্য পান? মানে আগেই কি ভালো থিয়েটার হতো না?

আতাউর রহমান
এখন মিডিয়াকে অনেকে জীবিকার পথ হিসেবে নিয়েছে। ভবিষ্যতে আরো টিভি চ্যানেল তখন আমাদের অনেকে মিডিয়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। তবু থিয়েটার যেহেতু একটি সম্মানের জায়গা, থিয়েটারের জন্য সবাই কিছুটা সময় উদ্বৃত্ত রাখবে। তবুও থিয়েটার ব্যহত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে আরো বেশি হবে। সেক্ষেত্রে থিয়েটারকে আংশিকভাবে হলেও প্রফেশনাল হতে হবে।

হাসান শাহরিয়ার
আতাউরভাই আপনিতো নিজ দল ছাড়াও সাংগঠনিভাবে আরো অনেক কিছুর সাথে জড়িত, এক সময় গ্র“প থিয়েটার ফেডারেশানের চেয়ারম্যানও ছিলেন ... তো গ্র“প থিয়েটার ফেডারেশানের শুরুটা কীভাবে হয়েছিল বলবেন কি?

আতাউর রহমান
নাট্যচর্চা যখন বিস্তৃত হচ্ছিল তখন আমি, রামেন্দু মজুমদার, নাসির উদ্দীন ইউসুফ, মামুনুর রশীদ সবাই মিলে ভাবছিলাম একটা আমব্রেলা তৈরি করা যায় কি না। এই ভাবনার কিছু কারণও ছিল, কিছু সমস্যা আমরা ফেস করছিলাম নাটক করতে গিয়ে ... যেমন মহিলা সমিতির সংস্কার করা, নাটকের নতুন জায়গা তৈরি করা, অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন বাতিল করা ইত্যাদি; এসব ব্যাপার ফেস কিন্তু একা করা যায় না। তাই ভাবছিলাম কোনো ফেডারেট বডি তৈরি করা যায় কি না। একবার হলো কি, আমাদের দলের বহিপীর-র প্রদর্শনী করার সময় ... ১৯৭৪ সালে কথা, বঙ্গবন্ধু তখনও আছেন, আমি অভিনয় করছি জমিদারের ভূমিকায়, আবুল হায়াত বহিপীরের ভূমিকায়, নূর আছে, সারা যাকের আছে ... আলী যাকের ওটাতে অভিনয় করেনি, ও ইন্টারভেলের সময় এসে বললো- কোর্ট থেকে ম্যাজিস্ট্রেট এসেছে, উনি নাকি নাটক বন্ধ করে দেবেন ...

বিপ্লব বালা
নাটকের মধ্যেই?

আতাউর রহমান
হ্যাঁ, কারণ হলো যে, আমরা প্রমোদকর দিইনি, আর যে নাটক করছি তার কোনো সেন্সরশপি সার্টিফিকেট নেইনি।

বিপ্লব বালা
এর আগেতো এসব কথা ওঠেনি?

আতাউর রহমান
না কিন্তু আইন বলবৎ ছিল ... আমরা পরেরদিন কোর্টে গেলাম, কোর্ট পাঠালো থানায়, আমাদের কাগজের উপর দশ-বারটা সিল পড়লো কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না, আমরা বহুকষ্টে ৮টি প্রদর্শনী করার ছাড়পত্র পেলাম। ... এরপর একদিন বঙ্গবন্ধু রামপুরা টেলিভিশনের ভবন পরিদর্শনে গেলেন, সেখানে তখন আবদুল্লাহ আল-মামুনের সাথে দেখা, বঙ্গবন্ধু তাকে জিজ্ঞাসা করলেন- তোমাদের নাটক কেমন চলতাছে? মামুন বললেন- স্যার আপনার রাজ্যেতো নাটক করা যাবে না। কেন কী হইছে? তারপর মামুন সব খুলে বললো, বঙ্গবন্ধু শুনলেন। এরপর তিনি একটা অধ্যাদেশ জারি করলেন যে, মঞ্চনাটক করার জন্য দলগুলোকে কোনো প্রমোদকর দিতে হবে না এবং সেন্সরশীপ পুলিশ ও প্রশাসনের হাত থেকে চলে এলো বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর অধীনে। সেন্সরশীপ ঢাকা শহরে বলবৎ ছিল না, কিন্তু ঢাকার বাইরের জেলা শহরগুলোর জন্য প্রযোজ্য ছিল।

এ সব কিছু মিলিয়েই ভাবনা হলো যে, নাটকের উন্নয়নের জন্য, বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের জন্য সম্মিলিতভাবে কিছু করা যায় কি না। এভাবেই ফেডারেশান হলো। কিন্তু এখন ফেডারেশান আগের ইমেজ ধরে রাখতে পারছে বলে মনে হয় না। এখন এটা অনেক পলিটিসাইজড হয়ে গেছে। আগে ফেডারেশানের কর্মকর্তারা সিলেকশনের মাধ্যমে নির্বাচিত হতেন, এখন সরাসরি বেলট পেপারের মাধ্যমে নির্বাচিত হন।

হাসান শাহরিয়ার
আইটিআই কীভাবে হলো?

আতাউর রহমান
ওটা একেবারেই রামেন্দুর কাজ। একক কৃতিত্বই দেব তাকে। ওদের দল যখন পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নিয়ে কোরিয়াতে গেল, তখন আইটিআই-র প্রেসিডেন্টের সাথে রামেন্দুর আলাপ হয়। পরে অনেক অনেক চিঠি চালাচালি হয়। ওরা বলে যে, মেম্বার করা যাবে না কারণ তোমরা প্রফেশনাল থিয়েটার কর না। রামেন্দু বোঝাতে পেরেছে যে, আমরা যা করি সেটাই মেইন স্ট্রিম থিয়েটার ... তখন ওরা প্রথমে সহযোগী সদস্য এবং পরে পূর্ণ সদস্যপদ দিল। পরবর্তী সময়ে ওরা আমাদের বহু কাজ দেখেছে ... দেখে অবাক হয়েছে, বলে যে- তোমরা বলছো যে তোমরা প্রফেশনাল না, তোমরা সর্বঅর্থে প্রফেশনাল। যাক, আস্তে আস্তে আইটিআইতে আমাদের বেশ নাম হলো। এখনতো প্রায় দখলই করে ফেলেছি। নাসির উদ্দীন ইউসুফ একটা কমিটির চেয়ারম্যান, আমি একটা কমিটির প্রাক্তন চেয়ারম্যান ছিলাম, সারা যাকের ডিরেক্টর। রামেন্দু মজুমদার আইটিআই-র ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং আইটিআই মহলে খুব সমাদৃত। ... এইতো কিছুদিন আগে অনেকে মিলে এথেন্স ঘুরে আসলাম।

হাসান শাহরিয়ার
টাকা কে দিল, আইটিআই?

আতাউর রহমান
রামেন্দু আইটিআই-র নির্বাহী পরিষদের সদস্য, তথা সহ-সভাপতি, ফলে যাতায়াত ও খাওয়া থাকা ফ্রি পায়। যদিও এই সুবিধা সে আমাদের সাথে ভাগাভাগি করে নেয়।

হাসান শাহরিয়ার
নাটক করতে করতে নিজের দলের বাইরে অন্যান্য দলে নাটক কেমন লাগা শুরু করলো?

আতাউর রহমান
বেশ কয়েকটি ভালো নাটক দেখেছি। থিয়েটারের এখনও ক্রীতদাস ভালো লেগেছে, ওথেলো ভালো লেগেছে। তবে মৌলিক নাটকের দিক থেকে থিয়েটারের একটা গতানুগতিক ধারা তৈরি হয়েছিল। এটা হয় যদি নাট্যকার নিজস্ব হয়, আর তিনি যদি সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে লিখতে না পারেন। তবে আমার খুবই ভালো লাগলো যখন থিয়েটারকে দেখি মাধবী করছে, মুক্তি করছে। মানও ভালো এবং গতানুগতিকতা থেকে বের হতে পেরেছে এটাই বড় কথা।

হাসান শাহরিয়ার
নিজস্ব নাট্যকারের দলতো আরণ্যক ও ঢাকা থিয়েটারও। তাদের নাটকও কি গতানুগতিক মনে হয়েছে?

আতাউর রহমান
ঢাকা থিয়েটারের মঞ্চ প্রযোজনা আমি বিশেষভাবে পছন্দ করি, তাদের প্রোডাকশন দেখলে চেনা যায় না যে, এটা ঢাকা থিয়েটারের নাটক। তবে মাঝে মধ্যে পৌনঃপৌনিকতায় আবিষ্ট মনে হয়।

হাসান শাহরিয়ার
হ্যাঁ, যৈবতি কন্যার মন, বনপাংশুল, প্রাচ্য এসব দেখলে বাচ্চুভাইকে নির্দেশক হিসেবে চেনা যায়, তার মানে কিন্তু এই না যে, ওনার কাজ গতানুগতিক। কারণ, এগুলোর টেক্সট কিন্তু একই ধরনের না।

বিপ্লব বালা
টেকস্ট-এর কিন্তু অনেক ভেরিয়েশন আছে ...

আতাউর রহমান
হ্যাঁ, সবই সত্য, কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে খুব খুশি হতাম যদি ঢাকা থিয়েটারের মতো স্ট্রং দল নেরেটিভ থিয়েটারের বাইরে অন্য ধরনের প্রযোজনা নির্মাণেও সচেষ্ট হতো। আর আরণ্যক নিয়ে বলি যে, মামুনুর রশীদের নাটকে আমি ভেরিয়েশন কম পেয়েছি, তবে মামুনুর রশীদের ‘জয়জয়ন্তী’ আমার ভালো লেগেছে।

হাসান শাহরিয়ার
নিজেকে যে মামুনুর রশীদ ভাঙতে পারেন, সেটা কি বুঝতে পেরেছেন? জয়জয়ন্তী, সঙক্রান্তি, রাঢ়াঙ ইত্যাদি নাটক দেখে কী বলবেন?

আতাউর রহমান
হ্যাঁ, এটা অবশ্যই আমি স্বীকার করবো। আগে কিন্তু ওনার নির্মাণ একটু লাউড হয়ে যেত, এটা একটা বাঁক নিল জয়জয়ন্তী-তে এসে। কিন্তু সঙক্রান্তি অন্যধরনের হলেও হাই-টোনের মনে হয়েছে আমার কাছে। তবুও ভালো আরণ্যক ডায়নামিক, তারা কোরিওলেনাস-এর মতো নাটকও করেছে।

তবে আগের মতো পরিবেশ এখন আর নেই। আমরা কেবল নাটকের দিনে এক হই ... কোলকোতার বহুরূপী-তে এখনো প্রতি সন্ধ্যায় আড্ডা হয়, কাজ থাকুক বা না থাকুক।

হাসান শাহরিয়ার
কাজ করতে করতে আপনার কি কখনো মনে হয়েছে যে, প্রতিভার দিক থেকে আপনার দলটি ওভার লোডেড হয়ে গেছে? মানে আপনার দল কিন্তু ভেঙেছে এবং আশার ব্যাপার হলো সেই ভেঙে যাওয়া দলও কিন্তু নাটক আর নাটকের উৎসব করে যাচ্ছে ... মানে ওনারাও কিন্তু এ্যাকটিভ। আপনার মত কি?

আতাউর রহমান
একটা ব্যাপার কিন্তু আমি বলতে চাই যে, আমার দল যারা ভেঙে অন্য দল করেছে তারা কিছুটা হলেও অন্য নাম নিয়েছে। তবে পুরোপুরি অন্য নাম নিলে খুশি হতাম। ভাঙা দল যদি ভালো নাটক ও নাট্যোৎসব করে থাকে, সেটা আমাদের নাট্যাঙ্গনের জন্য খুবই স্বাস্থ্যকর। দলের সংখ্যা বাড়লো, কাজের সংখা বাড়লো। স্বামী-স্ত্রীর ঘরও-তো ভাঙে, তার জন্য কি জগৎ অচল হয়ে যায়? এটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু থিয়েটার যখন ভাঙলো ... মানে কবীর চৌধুরী স্যার, রামেন্দু মজুমদার, মামুন মিলে যে থিয়েটার করলো, পরে কেরামত মাওলা, তবিবুল ইসলাম বাবু, মমতাজ সাহেবরাও এলেন, পরবর্তী সময়ে যখন দল ভাঙলো তখন তারা কিন্তু নাম সহ নিয়ে ভাঙলো। এটা কেমন কথা! এটা হীনমন্যতা বলে আমি মনে করি। তারিক আনাম খান যখন দল ত্যাগ করলেন তখন কিন্তু সে নতুন নাম নিয়ে দল করেছে ... তার বুকে বল ছিল ‘নাট্যকেন্দ্র’ নাম দিয়ে সে নতুন দল করেছে। তো আমার প্রশ্ন, দল যদি ভাঙবে তো থিয়েটার নাম রাখবে কেন, নাগরিক নাম রাখবে কেন? নাগরিক বলো আর থিয়েটার বলো, ঐতিহাসিক কারণেই কিন্তু নামগুলো ঠিক রাখা উচিত ছিল। পরবর্তী প্রজন্ম এক নামের একাধিক দল দেখে বিভ্রান্ত হবে। ইতিহাস বিকৃতিরও সম্ভাবনা আছে। আর যেটা ওভার লোডেড হওয়ার কথা বললে ... না তা না, আমার দল প্রতিভার ওভার লোডের কারণে ভাঙেনি। ভেঙেছে কারণ, জামালউদ্দিন হোসেন, রওশন আরা হোসেন, ইনামুল হক, লাকী ইনাম বা আবুল কাশেমরা ভেবেছেন যে, আমরা দু-একজন নাগরিকের ক্রীমটা খাচ্ছি। আমরাই কেবল ডিরেকশন দিচ্ছি, আমেরিকা যাওয়ার সময় টিম সিলেকশন করছি, ডাণ্ডা ঘোরাচ্ছি ... মানে পারসোনালিটি ক্ল্যাশের কারণে দল ভেঙেছে। অথচ দেখ ভাঙার পর কিন্তু ওরা একবছরও এক সঙ্গে দল করতে পারেনি। আবার দুভাগ হয়ে গিয়েছে।  তবে এটা সত্য যে ওরা এখনও থিয়েটার করছে এবং থিয়েটারকে ওরা ভালোবাসে।

হাসান শাহরিয়ার
আপনি যেহেতু সোজা-সাপটা কথা বলতে পছন্দ করেন বলে বলছেন, তাই জিজ্ঞাসা করতে চাই যে, আপনার রক্তকরবী-র কাস্টিং নিয়ে কিন্তু অনেক ধরনের সমালোচনা আছে ... মানে জনপ্রিয় মডেল এনে কাস্টিং করেছেন ইত্যাদি ... তো এসব ব্যাপারে আপনার কিছু বলার আছে?

আতাউর রহমান
দেখ শাহরিয়ার, আমার কিছু দোষ আছে, আমি ট্যাক্টফুলি কোনো কথা বলতে পারি না। এজন্য অনেক ভুল বোঝাবুঝি হয়। আগের একটা কথা বলি, আমাদের দলে যখন জামালউদ্দিন হোসেন মধুসূদন করলো তখন আমি এর কাস্টিং নিয়ে তীব্র সমালোচনা করলাম ... মানে মধুসূদনের চরিত্রে সালেক খানকে নেয়া ঠিক হয়নি এটা নিয়ে আমি সরাসরি বলেছি, কিন্তু এভাবে সরাসরি বোধহয় বলা ঠিক না ... তো রক্তকরবী-তে যা ঘটলো তা হলো যে, আলী যাকের রাজা করবে ঠিক ছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে করলো না। নূরকেও বলেছিলাম রাজা করতে, রাজা ছোটখাট হলেও ক্ষতি নেই কিন্তু ওর কন্ঠস্বর চমৎকার, কিন্তু সে-ও করেনি। আমি কিন্তু রাজা করতে চাইনি। আর নন্দিনীর জন্য মিমিকে সিলেক্ট করেছিলাম, অনেকদূর এগোনোর পর হঠাৎ করেই ও অনিয়মিত হয়ে গেল, মোবাইলেও পাওয়া গেল না। আর যারা দলে ছিলো তাদের কাউকে নন্দিনী হিসেবে আমার পছন্দ হয়নি। এভাবেই অপি করিম দলে এলো এবং নন্দিনীর ভূমিকায় অভিনয় করছে। রক্তকরবী কিন্তু একটা সফল প্রযোজনা। অনেকে বলে স্টার দিয়ে সফল করেছি, এই ধরনের মনোভাব ঠিক নয়। আমাদের খাট্টা তামাশা সর্বাধিক সুপার স্টার সমৃদ্ধ নাটক ছিল কিন্তু সাংঘাতিক মঞ্চ সাফল্য পায়নি।

বিপ্লব বালা
আলী যাকের রক্তকরবী-তে অভিনয় করেনি কারণ নির্দেশক আর অভিনেতার মিলেমিশে কাজ করার ব্যাপারটা হয়নি, ত্-াই কি?

আতাউর রহমান
কিছুটা সত্য। আলী যাকের ও আমার মধ্যে ব্যাপারটা ঘটে। আমি কিন্তু বিনা প্রতিবাদে ডিরেক্টরের কথা শুনি। আলী যাকের যেহেতু আমার চেয়ে অনেক বেশি ট্যালেন্টেড ও বিরাট ব্যক্তিত্ব, সে কারণে সহজে ডিরেক্টর ওকে বাগ মানাতে পারে না।

বিপ্লব বালা
আমার যদ্দুর মনে পড়ে, আবদুস সেলিম ছাড়া অন্যান্য সব রিভিউইতো রক্তকরবী-র প্রশংসা করেছে, তাই না?

আতাউর রহমান
রক্তকরবী-র মতো এ্যাতো সুন্দর রিভিউ আমি আমার নির্দেশিত অন্য কোনো নাটকে পাইনি। শফি আহমেদের রিভিউ খুব এ্যানালাইটিক্যাল। যারা লেখেনি, তারাও মুখে বলেছে ... ফজলুর রহমান বাবু, আরণ্যকের, ওয়ান অব দা বেস্ট এক্টরস ... তো সে রক্তকরবী দেখার পর বলছে যে- আপনার বন্ধুরাতো বললো যে, আপনার অভিনয় কিছুই হয় না। কিন্তু আমিতো দেখছি ইউ আর কোয়াইট ফাইন। আরো আছে ড. মিজানুর রহমান শেলী লিখেছে ‘সান বিমস এট মিড নাইট’ ... এরচেয়ে বড় হেড লাইন আর কী হতে পারে!

বিপ্লব বালা
তারপরতো নাট্যত্রয়ী করলেন। আবারো রবীন্দ্রনাথ কেন?

আতাউর রহমান
রবীন্দ্রনাথ করতে গিয়ে ভালো লাগলো আর রক্তকরবী-র সাকসেসটা আমাকে সাহস জুগিয়েছে।

বিপ্লব বালা
তাহলে রবীন্দ্রনাথের চিত্রাঙ্গদা, চণ্ডালিকা করলেন না কেন, মিউজিক্যাল বলে?

আতাউর রহমান
হ্যাঁ, সেজন্যই ভাবিনি।

হাসান শাহরিয়ার
‘কর্ণকুন্তী সংবাদ’ কি বুদ্ধদেব বসুর ‘প্রথম পার্থ’-র চেয়ে স্ট্রংগার মনে হয়েছে?

আতাউর রহমান
অবশ্যই। বুদ্ধদেব বসুর নাটকের কাব্যগুণ অসাধারণ কিন্তু দৃশ্যগুণে তাঁর নাটক অবশ্যই রবীন্দ্রনাথের নাটকের পাশে দাঁড়ায় না। রবীন্দ্রনাথের যেকোনো লেখায় কাব্যগুণের পাশাপাশি দৃশ্যগুণ অসাধারণভাবে ধরা দেয়, চোখের সামনে ভেসে ওঠে। এরপর আমি রবীন্দ্রনাথের রাজা করার কথাও ভাবছি। ... কিছুদিন আগে পদার্থবিদ স্টিফেন হকিং সম্পর্কে পড়ছিলাম, তিনি বলছেন যে- ব্ল্যাক হোলে পড়লে আর কিছু ফিরে আসে না। কিন্তু তার এক বন্ধু বলছেন যে- না, ব্ল্যাক হোলে নক্ষত্র-টক্ষত্র পড়লে সেটা ব্ল্যাক এনার্জি হয়ে ফিরে আসে। তো ‘রাজা’ নাটকে রাজার ব্ল্যাক কমপ্লেকশন, ব্ল্যাক চেম্বার, ব্ল্যাক এনার্জি এসব মিলিয়েই মাথায় কিছু ভাবনা এসেছে, দেখা যাক কী হয়!

হাসান শাহরিয়ার
আমরা আলোচনার শেষের দিকে চলে এসেছি ... তো আপনার সমগ্র থিয়েটার জীবনের দিকে ফিরে তাকালে বর্তমানের অবস্থান আপনাকে কী অনুভূতি দেয়?

আতাউর রহমান
হ্যাঁ, খুবই ভালো অনুভূতি। অনেক কিছুই জীবনে হয়তো হয়নি ... সরকারি আমলা হয়নি, বিদেশি কোম্পানীর বড় অফিসার হয়নি ... ফলে অনেক টাকা পয়সা হয়নি ... কিন্তু থিয়েটার করার ফলে এখন জীবনটাকে অনেক মিনিংফুল বলে মনে হয়।

হাসান শাহরিয়ার
ধর্মীয় অনুভূতি কেমন?

আতাউর রহমান
খুবই পরিষ্কার। আমার স্ত্রী নামায পড়ে, আমার ছেলে নামাজ পড়ে। আমি ওদের বিশ্বাসের মূল্য দিই। আমি ধর্মের ব্যাপারে নির্লিপ্ত থাকতে চাই। কোনো দুর্বল মুহূর্তে কী হবে জানি না, আমার মধ্যে অদ্ভুত কন্ট্রাডিকশনস আছে। আমার বাবা-মা-র কবর কোথায় তা-ও জানি না। জানি না মানে কবর দিয়ে আসার পর আর যাইনি। কিন্তু তাদেরকে আমি স্মরণ করি, আমার মন তাঁদের খুঁজে বেড়ায়। কাঁদতে হলে নিজে নিজে কাঁদি। কোনো সোস্যাল ভড়ং আমি করতে জানি না। যখন রামেন্দু মজুমদার তার মেয়ের বিয়েতে কোনো অনুষ্ঠান করেনি, তখন সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছি আমি। কারণ একটি অর্থহীন সময় ও স্বাস্থ্য নষ্টকারী লোকাচার ভাঙতে পারে বড় মানুষেরাই।

বিপ্লব বালা
আপনি কি কখনো বলেছেন যে- দর্শকদের আপনি তোয়াক্কা করেন না, আপনি নিজের জন্য থিয়েটার করেন বা এমন কোনো কিছু?

আতাউর রহমান
না, তা হয় কী করে? থিয়েটার ইজ এ কোঅপারেটিভ আর্ট। দর্শক এখানে ঈশ্বর। নিজের জন্য থিয়েটার করলেতো ঘরে বসে নাটক পড়লেই হয়। আমার মনে হয় না, আমার ব্যাপারে এই ধারণাটা ঠিক।

বিপ্লব বালা
আপনি কি জানেন যে- আপনার কিন্তু একটা ইমেজ আছে, ভালো না, মানে অনেকেরই ধারণা আপনি খুব অহংকারী, নাক উঁচু স্বভাবের ... আপনি কী মনে করেন?

আতাউর রহমান
হাঃ হাঃ, এটা কেন মনে হয় জানি না। অথচ চিরকালই আমি এগুলোর বিরোধিতা করে এসেছি। আমি নিজেকে অতি সাধারণ মনে করি। বড় মানুষদের বিপদ আছে, একা হয়ে যান।

হাসান শাহরিয়ার
না না, ব্যাপারটা এমন যে, আপনি আপনার চেয়ে কম পড়া-শোনা করা মানুষদের ব্যাপারে খুব চড়াও হন ... বিশেষ করে আমাদের প্রজন্ম আপনার কাছে ঘেঁষতেই কেমন যেন বোধ করে, মানে, মনে করে যে আপনি অস্বস্তি বোধ করছেন, আমাদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করছেন ... এমন কিছু কী?

আতাউর রহমান
না না, এটা একেবারেই ভুল ধারণা। যদিও আমার বন্ধু-বান্ধব অনেকেই মনে করে আমি অহংকারী, কিন্তু আমি নিজেও অহংকারকে ঘৃণা করি। আমি যদিও কমিউনিস্ট নই, কিন্তু আমার মানবতাবোধ নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। আমি যেকোনো শ্রেণীর লোকদের ভালোবাসতে জানি কাছে টানতে পারি। তোমাদের প্রজন্মেই বরং আমার বন্ধু এখন বেশি ... মানে তোমাদের সাথেই এখন আমার মেলামেশাটা বেশি। তবে হ্যাঁ, বলতে পারো যারা আমার চেয়ে বড় কিছু, বা উপরের, তাদেরকে বরং আমি তোয়াক্কা করি না। আমি মর্মে মর্মে রবীন্দ্রনাথের কবিতার এই লাইনটি উপলব্ধি করি- ‘নিজেরে করিতে গৌরবদান/ নিজেরে করি কেবলই/ করি অপমান’।

বিপ্লব বালা
একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি। বাংলাদেশের মঞ্চে আপনি কাকে কাকে বড় মাপের অভিনেতা মনে করেন?

আতাউর রহমান
খুব বড় মাপের অভিনেতা-অভিনেত্রী কিন্তু আমি আমাদের মঞ্চে দেখি না। সাধারণ মানেরই বেশি ... আমাদের কিন্তু একজনও শম্ভু মিত্র নেই, তৃপ্তি মিত্র নেই, উৎপল দত্ত নেই, লরেন্স অলিভিয়ের নেই, তাই না? নিজেই একটা ইন্সটিটিউশন হয়ে যাওয়া, সেটা কিন্তু নেই। তবে ভালো অভিনেতা আছেন যেমন- আসাদুজ্জামান নূর নিশ্চিতভাবে মঞ্চের অন্যতম ভালো অভিনেতা, তারপর হুমায়ূন ফরীদি ভালো করতে পারতো যদি কন্টিনিউ করতো। আলী যাকের বড় অভিনেতা ছিলেন, কিন্তু গত কয়েক বছর আর অভিনয় করছেন না। নিঃসন্দেহে ‘গ্যালিলিও’ আর ‘দেওয়ান গাজী’-তে উনি ভালো অভিনয় করেছেন। ফেরদৌসী মজুমদার, রাইসুল ইসলাম আসাদ, পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, খালেদ খান, শিমূল ইউসুফ এরা নিশ্চিতভাবে মঞ্চের শক্তিশালী কুশীলব। সুবর্ণা মোস্তফা কন্টিনিউ করলে খুব ভালো অভিনয় করতে পারতো।

হাসান শাহরিয়ার
নূরলদীনে আলী যাকের কেমন করেছে?

আতাউর রহমান
হ্যাঁ, নূরলদীনে-ও আলী যাকের ভালো অভিনয় করেছে। তবে নাট্য নির্দেশক হিসেবে আমি চরিত্রটিকে অন্যভাবে দেখি। গ্রামের খেটে খাওয়া কৃষক, দেখতে সাধারণ, ধীরে ধীরে উন্মুক্ত হবে মানুষটি, ধীরে ধীরে উন্মুক্ত হবে তার ব্যক্তিত্ব।

বিপ্লব বালা
নির্দেশকদের মধ্যে কার কাজ ভালো লাগে?

আতাউর রহমান
নাসির উদ্দীন ইউসুফ তো নিশ্চিতভাবে ভালো, জামিল আহমেদ ভালো। এস এম সোলায়মান মিউজিক্যাল প্লে ভালো ডিরেকশন দিতেন।

হাসান শাহরিয়ার
নাটকের বাইরে সমসাময়িক বাংলা সাহিত্য বা একেবারে বাংলাদেশের কার কার সাহিত্য ভালো লেগেছে?

আতাউর রহমান
সমসাময়িক কারো লেখা ঠিক ওভাবে পড়া হয়ে ওঠেনি। মানে সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ বা তারও পরে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসতো পড়া আছেই। এছাড়া মাহমুদুল হক, শওকত আলী বা আনিসুজ্জামান স্যারের লেখাও বেশ পড়া আছে।

হাসান শাহরিয়ার
নবীণদের মধ্যে? যেমন- শহীদুল জহির, শাহাদুজ্জামান, মামুন হুসাইন বা কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর ... এদের পড়া আছে?

আতাউর রহমান
না, আসলে নতুনদের মধ্যে নাসরিন জাহান কিছু পড়া আছে, আর ভাবছি একটু সময় করে অন্যদের সাহিত্যের সাথেও পরিচিত হয়ে নেব।

হাসান শাহরিযার
একেবারে শেষের দিকে আছি আমরা ... তো একটা কথা জানতে চাই যে, আপনি কিন্তু শুরু করেছিলেন যে- আপনি খুব সোজসুজি কথা বলতে ভালোবাসেন। আপনার চরিত্রের এটা একটা বিশেষ দিকও বটে। এবং আমাদের আলোচনায় অনেক সোজাসুজি কথা এসেছিলও, কিন্তু বেশিরভাগই ‘অফ দ্যা রেকর্ড’ বলে ছাপতে পারছি না। তো আমার জানার বিষয়টা হলো, এই ‘অফ দ্যা রেকর্ড’ বলতে হয় কেন, আপনি কি মনে করেন সমালোচনা গ্রহণ করার ব্যাপারে আপনার বন্ধুরা স্পোর্টিং না?

আতাউর রহমান
না, মোটেই স্পোর্টিং না। আমি যদি ‘ওঁদের মানুষ’ হই, আমি তখন খুব ভালো। যেই আমি ওঁদের স্বার্থসিদ্ধি করতে পারলাম না, আমি তখন খুব খারাপ। বাংলাদেশের রাজনীতির মতো এ ক্ষেত্রেও ‘আমার’ বা ‘আমাদের’ লোক না হলে বিপদ। আমি তোমাকে তুললে খুব ভালো, আর তোমাকে সামান্য নিচে নামালে আমি খুব খারাপ।

হাসান শাহরিয়ার
নাট্য প্রযোজনার ক্ষেত্রে কোন ধরনের প্রবণতা আপনার খারাপ লাগে?

আতাউর রহমান
নাটককে জোর করে কনটেম্পোরারী বানাবার প্রয়াস দেখলে আমার রাগ হয়। যেমন, ... বিপ্লব বালার সামনেই বলছি, বিষাদসিন্ধু-তে কাসেমের মা’কে জাহানারা ইমামের সাথে তুলনা করা হলো। একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। কোনো এক প্রযোজনায় ট্রয়ের হেলেনকে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সাথে তুলনা করা হয়। এই সমান্তরাল টানার ব্যাপারটা দর্শকদের উপর ছেড়ে দিন। ওঁদের টহফবৎ বংঃরসধঃব করে যেন অপমান না করা হয়। আরেকটি প্রবণতা আমার খুব খারাপ লাগে ... বড় বড় কাজকে রূপান্তর বা পরিবর্তন করে নিজেদের করে নেয়া। যেমন- জীবনানন্দ দাশের ‘আমি বাংলার মুখ দেখিয়াছি’কে যখন গান বানানো হল ... কবিতাটি এ্যাতোই বিখ্যাত যে ওটাকে গান বানিয়ে কিছুই যোগ হলো না। রবীন্দ্রনাথের বিশ্ববিখ্যাত নৃত্যনাট্য ‘শ্যামা’ কে ‘শ্যামাপ্রেম’ বানাবার কী অর্থ হতে পারে! চিত্তরঞ্জনবাবু এ কাজটি করে রবীন্দ্রনাথের সৃজনশীলতায় কিছু কি যোগ করতে পেরেছেন? রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, তাঁর গান তাঁর গানের মতো করেই গাওয়া উচিত, যারা অন্য কিছু করতে চায় তারা নিজের গান নিজে লিখে নিলেই পারে। দেখ শাহরিয়ার, তুমি আবার নব ব্যাখ্যার সাথে ব্যাপারটা গুলিয়ে ফেলো না। শিল্প কাজ নব ব্যাখ্যায় আলোকিত হয়, কিন্তু তার জন্য যোগ্য লোকের প্রয়োজন। যেমন- জাঁ আনুই-এর আন্তিগোনে অথবা ‘কিং ইদিপাস’ অবলম্বনে জাঁ ককতোর ‘দ্য ইনফরমাল মেশিন’। ভালো কাজ নিয়ে অযোগ্য লোকের মাতব্বরী করাটা জ্যাঠামী ছাড়া আর কিছুই হয় না।

হাসান শাহরিয়ার
আতাউরভাই, আমরা কয়েকদিন আপনার সাথে বসে অনেক কিছু জানতে পারলাম, আপনার সম্পর্কে এবং আমাদের নাট্যচর্চা সম্পর্কে। আমি থিয়েটারওয়ালার পক্ষ থেকে আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই।

আতাউর রহমান
আমিও তোমাদের ধন্যবাদ জানাই, বিপ্লব বালা সহ সব নাট্যজনদের জানাই শুভেচ্ছা। ধন্যবাদ।