Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

আলাপনে রামেন্দু মজুমদার

Written by সাক্ষাৎকার : বিপ্লব বালা ও হাসান শাহরিয়ার.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

[স্বাধীনতার পর নাট্যচর্চাটা আমাদের বেশ এগিয়ে নিয়ে গেছে, সুস্থ ভাবনা-চিন্তার আগ্রহ তৈরি করেছে। আর তৈরি করেছে ‘মানুষ’ হবার আকাঙ্ক্ষা। আমরা শিল্পের এক বড় কর্মকাণ্ড, কর্মযজ্ঞ- মঞ্চনাটকের নিয়মিত সাক্ষাৎ পেয়েছি। আমরা বেশি বেশি নাট্যকার পেয়েছি, পেয়েছি সৃজনশীল প্রতিভাসম্পন্ন নাট্যনির্দেশক, অনেক ভালো অভিনেতৃ। আর পেয়েছি অনেক সংগঠক, যারা ক্রমশই মঞ্চনাটকের পরিধি বিস্তৃত করেই চলেছেন। এক কথায় এঁরা সবাই আমাদের মঞ্চনাটকের পুরোধা। আমরা মনে করি আমরা এঁদের সব ভালো কাজের উত্তরাধিকারী। তাই এঁদের কাজ এবং কাজের প্রক্রিয়া জানতে আগ্রহী, হতে আগ্রহী তাঁদের মতো বা তাঁদের চেয়ে বড় কিছু।

এই প্রত্যাশায় থিয়েটারওয়ালা আলাপচারিতায় মগ্ন হয়েছে কয়েকজন নাট্যজনের। তাঁদের সাথে আলাপচারিতা অনুলিখন করে ধারাবাহিকভাবে ছাপা হচ্ছে থিয়েটারওয়ালায়। আমাদের এমনি এক নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার। সাক্ষাৎকার: বিপ্লব বালা ও হাসান শাহরিয়ার আর অনুলিখন- সাইফ সুমন]

বিপ্লব বালা
একেবারে ছোটবেলার কথা দিয়ে শুরু করি ... পারিবারিক জায়গা ... যা যা মনে আছে ...

রামেন্দু মজুমদার
আমার জন্ম ১৯৪১ এর ৯ অগাস্ট, রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর দুদিন পর। আমাদের বাড়িতে নাটকের একটা আবহ ছিল, আমার বাবা-কাকা সখের নাটক করতেন। আমার বড় দুই ভাই- আমরা তিনভাই, নাটক করতাম। আমার বড়  বোন অবশ্য অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে কোলকাতায় চলে যায়। ছোটবোন পরবর্তী সময়ে নাটক করেছে আমাদের সাথে। সুতরাং এই নাটকের মধ্য দিয়েই আমাদের বেড়ে ওঠা। আমি প্রথম নাটক করি ১৯৫৩ সালে। সেটা সিরাজউদ্দৌলা নাটক ছিল- স্কুলের বার্ষিক নাটক। সেখানে ইংরেজ সেনাপতি ওয়াটস-এর রোল, দু-চারটা ইংরেজি সংলাপ, কিন্তু সেকি উত্তেজনা, সেকি প্রস্তুতি। তখনকার দিনে আমাদের লক্ষ্মীপুর, লক্ষ্মীপুরে আমার জন্ম, লক্ষ্মীপুর তখন থানা শহর। একটা মুন্সেফ কোর্ট ছিল, কিন্তু আমাদের কোনো মঞ্চ ছিল না। আমাদের ওখানে বাঁশ পাওয়া যেত না, সুপারি গাছ দিয়ে আমরা মঞ্চের স্ট্রাক্চার বানাতাম খোলা মাঠে। প্রচুর পরিশ্রম ... নাটকের সময় প্রচুর মানুষ হতো, গোলমাল করতো ... তো আমরা আবার নাটক থামিয়ে বলতাম যে, গোলমাল করলে নাটক বন্ধ করে দেব, বলেই আবার সংলাপ শুরু করতাম। তখন দু-তিনটা নাটক করেছি। পরে আমি কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হই। সেখানেও নাটক করেছি। কিন্তু নাটকের প্রকৃত বোধ কিন্তু তখন তৈরি হয়নি। এই বোধ তৈরি হলো আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকে। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই ১৯৬১ সালে, ইংরেজি বিভাগে। জগন্নাথ হলের ছাত্র। ঢুকেই দেখি যে ... এখন যেটা অক্টোবর স্মৃতিভবন, আগে সেটা এ্যাসেমব্লি হাউজ ... সেখানে তখন একটা অডিটোরিয়াম ছিল, সেখানে রিহার্সেল হতো। প্রথমে  যে বার্ষিক নাটক হচ্ছিল সেখানে আমি হিট দিলাম। জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা ছিলেন, তিনি আমাকে পছন্দ করলেন। তিনিই একদিন আবার আমাকে এসে হঠাৎ বললেন যে- মুনীর চৌধুরী একটা নাটক করবে, উনি আমার কাছে ছেলে চেয়েছেন, তুমি কালকে গিয়ে ওনার সাথে দেখা করো।আমিতো খুব উত্তেজিত হয়ে পরের দিনই মুনীর চৌধুরীর সাথে দেখা করলাম। তিনি বললেন যে- আমার নতুন নাটক রক্তাক্ত প্রান্তর-এ অভিনয় করবে। বাসায় এসো। তখন ওনার বাসাতেই রিহার্সেল হতো। তো আমরা আরো অনেকে গেলাম। মুনীর চৌধুরীর স্ত্রী, লিলি ভাবী ছিলেন, ফেরদৌসী ছিল ... ফেরদৌসীর সাথে সেখানেই আমার প্রথম পরিচয়। রক্তাক্ত প্রান্তর-এ অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, রফিকুল ইসলাম, অধ্যাপক আসকার ইবনে সাইখ ও অধ্যাপক নূর মোহাম্মদ মিয়াও আমাদের সাথে অভিনয় করেছিলেন।

বিপ্লব বালা
ফেরদৌসী আপা তখন পড়তেন কিসে?

রামেন্দু মজুমদার
ও পড়তো বাংলায়। আমাদের কমন ক্লাশ ছিল স্যোসিওলজি- সাবসিডিয়ারি ক্লাশ। ১৯৬২ সালের ১৯ এবং ২০ এপ্রিল ইঞ্জিনিয়ারর্স ইন্সটিটিউটে মুনীর চৌধুরীর ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’ তাঁরই পরিকল্পনায় অভিনীত হলো। বাংলা একাডেমী তখন একটা নাট্য মৌসুম করতো। তখনতো ভালো নাটকের খুব একটা চর্চা হতো না, সেজন্য বাংলা একাডেমী উদ্যোগ নিয়ে কিছু নাটক প্রকাশ করতো এবং ড্রামা সিজন বলে ওরা দু-তিনটা নাটক একসঙ্গে অভিনয়ের আয়োজন করতো। কখনো ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটে আবার কখনো বাংলা একাডেমীর তেতলায় হতো। তেতলায় লম্বা একটা অডিটোরিয়ামের মতো ছিল, এখন বোধহয় গোডাউন হিসেবে ব্যবহৃত হয় ... তো সেখানে একই নাটকের দুটা-চারটা শো-ও হতো, রাতে। আর ’৬১-’৬২ সালে হলের নাটক করেছি। তখন মহিলা শিল্পী বাইরে থেকে আনা হতো। তখন কিছু আধা পেশাদার শিল্পী ছিল। যারা ভদ্রঘরের কিন্তু এটা তাদের পার্টটাইম পেশা ছিল ... যেমন আমাদের রওশন আরা মনি, উনিও ছিলেন ... ওনার সাথে আমার করার সুযোগ হয়নি। আমাদের এক ছাত্রী বন্ধু ছিল, দ্বিজেন শর্মার স্ত্রী, উনি আমাদের হলের নাটকে অভিনয় করেছিলেন। ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হলো। কেন্দ্রটা তখন কার্জন হলের দোতলার একটা রুমে ছিল। টিএসসি-র জামানসাহেব, ডিরেক্টর ছিলেন ... উনি উদ্যোগ নিলেন যে, ছাত্র-শিক্ষক নাট্য গোষ্ঠী, ছাত্র-শিক্ষক সংগীত গোষ্ঠী, ছাত্র-শিক্ষক সাহিত্য গোষ্ঠী করবেন। সব হল থেকে একজন করে ছাত্রকে নমিনেশন দিতে বললো, তো জগন্নাথ হল থেকে আমাকে নমিনেশন দেয়া হলো। আগে সেক্রেটারী বলতো না, বলতো তত্ত্বাবধায়ক ... ছাত্র তত্ত্বাবধায়ক ছিলাম আমি আর শিক্ষক তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন মুনীর চৌধুরী।

হাসান শাহরিয়ার
আপনারা কি ছাত্র-শিক্ষক নাট্যগোষ্ঠীর তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন?

রামেন্দু মজুমদার
হ্যাঁ। তো ঠিক হলো যে নাটক করতে হবে। এরমধ্যে আমরা আসকার ইবনে শাইখের সাথে যুক্ত হয়েছি ... এই আসকার ইবনে শাইখ ছিলেন সাংঘাতিক নাটক পাগল লোক। উনি পরিসংখ্যানের প্রফেসর ছিলেন। যেকোনো হলে নাটক হলে তিনি ব্যাক স্টেজে কাজ করবার জন্য আমাদের নিয়ে যেতেন ... আমরা ছিলাম ওনার চেলা-চামুণ্ডা হাঃ হাঃ ... তো আমি তত্ত্বাবধায়ক হবার পর উনি বললেন যে, শওকত ওসমানের ক্রীতদাসের হাসি নামে একটা উপন্যাস বেরিয়েছে, তুমি সেটার নাট্যরূপ দাও ... এটা অলমোস্ট নাটকের ফর্মেই আছে তুমি নাট্যরূপ দিয়ে কর। তখন আমি এটার নাট্যরূপ দিলাম। এটাই আমাদের প্রথম প্রযোজনা হয় ... ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক নাট্যগোষ্ঠীর। ২ ও ৩ মে ১৯৬৩ সালে আমরা কার্জন হলে এই নাটক করি। তখনতো টিকেটের ব্যবস্থা ছিল না ... কিন্তু অনেক দর্শক হলে হৈচৈ হবে, তাই ঠিক করলাম বিনে পয়সায় কার্ড সংগ্রহ করে নাটক দেখতে হবে ... যাতে করে ডিসিপ্লিন থাকে।

বিপ্লব বালা
কয়টা শো হলো?

রামেন্দু মজুমদার
দু’টা। পরপর দু’টা রাত।

বিপ্লব বালা
দর্শক রিয়েকশন কেমন হলো? মানে বিষয়ের দিক থেকে এটাতো ...

রামেন্দু মজুমদার
খুব ভালো রিয়েকশন হলো। এটার নির্দেশনা দিয়েছিলেন নাজমুল হুদা বাচ্চু। উনি কিন্তু খুব ভালো নাটক বুঝতেন। তখন হলে হলে উনি নাটক নির্দেশনা দিতেন।

হাসান শাহরিয়ার
উনি তখন কী পড়তেন?

রামেন্দু মজুমদার
উনি আমাদের সিনিয়র ছাত্র ছিলেন।

হাসান শাহরিয়ার
যেটা বলছিলেন ... রক্তাক্ত প্রান্তর নিয়ে বলছিলেন। সেটা কি এটার আগে না পরে?

রামেন্দু মজুমদার
আগে।

বিপ্লব বালা
ক্রীতদাসের হাসি-র যে একটা রাজনৈতিক তাৎপর্য আছে, আমরা দেখি ... তো সেটা কি কমিউনিকেট করতে পেরেছিল?

রামেন্দু মজুমদার
হ্যাঁ, অবশ্যই। নাটক হিসেবেও সেটা সাংঘাতিক বলিষ্ঠ ছিল ... ইকবাল বাহার চৌধুরী, আবদুল্লাহ আল-মামুন, রেজা চৌধুরী, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত (বর্তমানে সাংসদ), দিলীপ দত্ত, বদরুদ্দীন, রওশন নবী এরা সবাই অভিনয় করেছিল।

বিপ্লব বালা
আবদুল্লাহ আল-মামুন তখন কী করতেন?

রামেন্দু মজুমদার
আমাদের এক বছরের সিনিয়র ছিলেন। আমরা ১৯৬৪ সালের জানুয়ারিতে এই নাট্যগোষ্ঠীর ব্যানারে করি মাইকেলের কৃষ্ণকুমারী নাটক ... বাংলা একাডেমীর নাট্য মৌসুমে। আমাদের সাথে এই নাটকে মুনীর চৌধুরী, রাজিয়া খান আমিন অভিনয় করেছিলেন। আমরা সব সময় চাইতাম যে একটু সাহিত্য-নির্ভর নাটক করবো বা সামাজিকভাবে রিলেভেন্ট নাটক করবো ...

বিপ্লব বালা
তখনকার রাজনীতির সাথে মেলে এমন কিছু কি ...

রামেন্দু মজুমদার
তেমন না। ক্রীতদাসের হাসি-র সেটা ছিল। আমরা চাইতাম যে সাহিত্যমূল্য যেন থাকে। তারপর আমরা করলাম- ‘দণ্ড ও দণ্ডধর’ ... মুনীর চৌধুরীর দুটো একাঙ্কিকা। এখন যেটা ‘নাটমণ্ডল’, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ যেটাতে আবার নাটক করা শুরু করেছে, সেখানে করেছিলাম এই দুটো নাটক। এটা তখন পরিত্যক্ত ছিল, লাইব্রেরির জায়গা ছিল ... আমরা পরিষ্কার করলাম, বাইরে থেকে চেয়ার এনে বসালাম ... মঞ্চটা ছোট ছিল, কিন্তু আমাদের কাছে আদর্শ মঞ্চই মনে হলো। চার রাত করলাম দণ্ড ও দণ্ডধর। নাটকের সেটটা খুব ইম্পর্টেন্ট ছিল ... চিত্রালীর সম্পাদক ছিলেন এক সময় আহমেদ জামান চৌধুরী, তিনি আমাদের সহপাঠী ছিলেন ... তো তিনি একটা সাজেস্টিভ সেট বানালেন, কাঠের ফ্রেম দিয়ে, দড়ি-টড়ি দিয়ে।

একই বছর ২০, ২১, ২২ মে বাংলা একাডেমী শেক্সপীয়রের ৪র্থ জন্ম শতবার্ষিকী পালন করছিল। আমাদের গোষ্ঠীকে বললো যে তোমরা কিছু একটা কর। তখন আমরা বেছে নিলাম কমেডি অব এরর্স-কে। এর একটা গদ্য অনুবাদ আছে বিদ্যাসাগরের ... ভ্রান্তিবিলাস ... চমৎকার অনুবাদ, ভাবাই যায় না এ্যাতো চমৎকার, কিন্তু সেটা উপন্যাসরূপে ছিল ... আমি সেটাকে নাট্যরূপ দিলাম। ওটার একটা সমস্যা ছিল, নাটকটিতে দুই জমজভাই থাকে আর দুই জমজ কিংকর, মানে ভৃত্য থাকে ... তো ফরচুনেটলি আমার বড়ভাই রণেন মজুমদার ছিলেন আমার মতোই দেখতে, তাকে নাটকে নেয়া হলো ... সে আর আমি করলাম দুইভাইয়ের চরিত্র আর মেক-আপ নিয়ে মোটামুটি কাছাকাছি করা গেল দুই ভৃত্যকে। একজন ছিলেন রশীদ হায়দার আর অন্যজন আবদুল জলিল বলে আরেকজন ছাত্র। এটা প্রযোজনা করেছিলেন মুনীর চৌধুরী। ... তো আমি তত্ত্বাবধায়ক থাকাকালীন এই চারটি নাটকই করেছিলাম। আমি ১৯৬৫ সালে মাস্টার্স পাশ করি। ... ওহ্, একটা জিনিস বাদ গেল ... ১৯৬৪ সালে খুব বড় একটা ব্যাপার ঘটলো, সেটা হলো টেলিভিশন চালু হলো ঢাকাতে। তখন অনুষ্ঠান অধ্যক্ষ ছিলেন কলিম শরাফি। তিনি বললেন যে- দেখ, আমাদের যে সামাজিক সমস্যা ... তো এখানে যদি সিনেমার লোক ঢুকে যায় তাহলে কিন্তু শিক্ষিত ছেলে-মেয়েরা এখানে আর আসবে না। তিনি চাইলেন নাটকের মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলে-মেয়েরা যেন টিভিতে আসে। তিনি মুনীর চৌধুরীকে বললেন একটা নাটক লিখতে এবং ছেলে-মেয়েদের সুযোগ করে দিতে ... তিনি লিখলেন একতলা দোতলা। তখন কিন্তু লাইভ টেলিকাস্ট হতো ... রেকর্ডিং-এর ব্যবস্থা ছিল না। ফলে অনেকদিন রিহার্সেল করতে হয়েছিল। মহড়ার পর আমাদেরকে এনইসি কোম্পানীর একটা সুন্দর জীপ দিয়ে নামিয়ে দিত। আমি মেয়েদেরকে নামিয়ে শেষে নামতাম এবং গাড়িটা হল পর্যন্ত নিয়ে যেতাম যেন সবাই বোঝে আমি টেলিভিশনে অভিনয় করছি হাঃ হাঃ। তার আগে টেলিভিশনে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের অনুষ্ঠান আমি পরিচালনা করি ... তো এই নাটকটা আমরা করি ১৯৬৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে।

বিপ্লব বালা
১৯৬১ সালে তো রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করা হলো ... আপনার কোনো ভূমিকা ছিল?

রামেন্দু মজুমদার
না, তখন আমি ইনভলব ছিলাম না। আমরা সবে ভর্তি হয়েছি ... ধারে কাছে ঘেষতে পারতাম না। তবে মনে আছে সাতদিন ধরে অনুষ্ঠান হয়েছিল। কেবল রবীন্দ্রনাথ করলে সমস্যা আছে, তাই একদিন রবীন্দ্রনাথ একদিন ইকবাল ... এভাবে মহাকবি স্মরণোৎসব হয়েছিল।

হাসান শাহরিয়ার
আপনি যে সময়কার কথা বলছেন তখনতো সাঈদ আহমদের আগমন ঘটে গেছে ... তো ওনার কোনো নাটক কি করেছেন?

রামেন্দু মজুমদার
হ্যাঁ, সাঈদ আহমদের একটা নাটকে আমিও কাজ করেছিলাম। বাংলা একাডেমীতে ‘মাইলপোস্ট’। এটা করেছিল ‘সাতরং’ বলে একটা দল। তো আমি সেখানে মিউজিক করতাম। আমি মিউজিক পারি না ... কিন্তু আমার যোগ্যতা হলো যে, আমার একটা রেকর্ড প্লেয়ার ছিল। তো সেটাতে নানা ধরনের বিদেশি রেকর্ড বাজিয়ে আমি লাইভ মিউজিক করতাম।

হাসান শাহরিয়ার
সেটা আপনি কোনোভাবেই হাতছাড়া করতেন না হাঃ হাঃ ..

রামেন্দু মজুমদার
না, হাতছাড়া করার তো উপায় নাই, ওটার মালিকানাইতো আমার যোগ্যতা হাঃ হাঃ ...

হাসান শাহরিয়ার
তখন কি কেবল মুনীর চৌধুরীই ছিলেন নাট্যকার হিসেবে?

রামেন্দু মজুমদার
না, আসকার ইবনে শাইখ ছিলেন, নূরুল মোমেন ছিলেন আরেক নাট্যকার। সাঈদ আহমদের কথাতো বললামই ...

হাসান শাহরিয়ার
সাঈদ আহমদ তো ইংরেজিতে লিখতেন ...

রামেন্দু মজুমদার
হ্যাঁ, বাংলায় অনুবাদ হতো। তবে তিনি বাংলায়ও লিখতেন। ... ‘মাইলপোস্ট’ অনুবাদ করলো বোধহয় আতাউর রহমান। এরমধ্যে একবার আমাদের নীলিমা আপা ... নীলিমা ইব্রাহিম, তিনি একটা নাটকের দল করলেন ... আমরা কয়েকদিন রিহার্সেল করেছি ... কিন্তু শেষ পর্যন্ত নাটক নামেনি। তিনি বুলবুল একাডেমীতে নাটক বিভাগে একটা নাটক করলেন ‘মনোনীতা’। আমি ও মতিয়া চৌধুরী (আজকের নেত্রী) অভিনয় করেছিলাম। নীলিমা আপা খুব ডেডিকেটেড মহিলা ছিলেন, নাটক করার ব্যাপারে। বাফাতে নাটকের বিভাগ খুলেছিলেন- সেখানে আমরা ছাত্র ছিলাম। তিনি নাটকের দলও গড়েছিলেন। আসকার ইবনে শাইখও দল করেছিলেন। তিনি ছিলেন একেবারে নাটক অন্তপ্রাণ মানুষ। বলতেন- নাটক করবা, যদি বাপের ওষুধ নিতে হয় তবে ওষুধ উইংসের পাশে রাইখা নাটক করবা, পরে ওষুধ নিয়া বাড়িতে যাবা। পরে তিনি অবশ্য আমাদের উপর একটু ক্ষীপ্ত হয়ে উঠলেন ... আমার আর মামুনের উপর ... আমরা কেন মুনীর চৌধুরীর সঙ্গে বেশি মিশি সেজন্য।

হাসান শাহরিয়ার
এ সময় কি আপনার মনে হলো যে ভবিষ্যতে নাটকই করবেন?

রামেন্দু মজুমদার
হ্যাঁ, তবে পেশার পাশাপাশি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তো লেখাপড়ায় মন না দিয়ে কেবল নাটক নিয়েই মেতে থাকতাম। আমার দাদার এক বন্ধু আমাকে দেখলেই জিজ্ঞেস করতেন, কিরে তোর এবেলায় রিহার্সেল নেই?

বিপ্লব বালা
বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনার রাজনৈতিক ইনভলবমেন্ট ছিল?

রামেন্দু মজুমদার
সংস্কৃতি সংসদ করতাম। ছাত্র ইউনিয়ন করতাম... কিন্তু খুব একটা এ্যাকটিভ ছিলাম না। বন্ধু-বান্ধবরা খুব এ্যাকটিভ ছিল। মেনন খুব ভালো বন্ধু ছিল যদিও পরে আলাদা গ্রুপে যায় ... আমরা মতিয়া গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। ১৯৬৫ সালে এম.এ পাশ করার পর আমি চৌমুহনী কলেজে যোগ দিই। এবং সেখানেও কিছু কিছু নাটকের সাথে যুক্ত হই।

হাসান শাহরিয়ার
স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত কি আপনি চৌমুহনী কলেজেই ছিলেন?

রামেন্দু মজুমদার
না। আমার জীবনের একটা দিক হলো সব জায়গাতেই দুবার করে চাকুরি করা। ’৬৫ থেকে ’৬৭ পর্যন্ত আমি ঐ কলেজে ছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়েই ফেরদৌসীর সাথে একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং আমরা সিদ্ধান্ত নিই যে আমরা বিয়ে করবো। তখনকার পরিচিত পরিবেশে এই বিয়ে করাটা একেবারেই অসম্ভব ছিল। তখন আমি ঠিক করলাম যে, আমি করাচি চলে যাব। একটা এ্যাডভারটাইজিং ফার্মে চাকুরি নিয়ে আমি করাচি চলে গেলাম। সেখানে গিয়ে বাবা-মাকে আমাদের বিয়ের সিদ্ধান্তের কথা জানালাম। জেনে মা এমন অসুস্থ হয়ে পড়লেন যে আমাকে ফিরে আসতে হলো। ফিরে এসে করাচির চাকুরি ছেড়েই দিলাম। আবার চৌমুহনী কলেজে ঢুকে পড়লাম। তারপর একটা মিথ্যাচার করলাম বাবা-মার সাথে। তাঁরা যখন জানতে পারলেন যে, আমি আমার বিয়ের পূর্ব সিদ্ধান্তে অটল আছি, তখন তাঁরা ঠিক করলেন যে- আমরা জায়গা জমি সব ছেড়ে দিয়ে কোলকাতা চলে যাব। তো আমি বললাম ঠিক আছে তোমরা যাও আমি আসছি ... এটা ’৭০ সালের ঘটনা ... মা-বাবা চলে গেলেন আর আমি বাবার পরিকল্পনা মতো নামমাত্র মূল্যে লক্ষ্মীপুরের বাড়ি ও জমি জমা আমাদের পারিবারিক চিকিৎসককে দিয়ে চলে গেলাম করাচিতে। পরে বাবা-মাকে খবর দিলাম যে আমি বিয়ে করেছি।

হাসান শাহরিয়ার
বিয়ের ব্যাপারে ওনার পরিবার থেকে কোনো সমস্যা ছিল না?

রামেন্দু মজুমদার
না, ওর পরিবারে কোনো সমস্যা ছিল না।

হাসান শাহরিয়ার
যদ্দুর জানি ওনারা খুব ধার্মিক পরিবার ছিল বা ওনার বাবাতো শুনেছি নাটকই করতে দিতে চাননি ... তো তিনিও মেনে নিলেন?

রামেন্দু মজুমদার
হ্যাঁ, তিনি সন্তানদের এ ব্যাপারে স্বাধীনতা দিয়েছিলেন।

বিপ্লব বালা
এমনিতে সামাজিক রিয়েকশন কেমন ছিল?

রামেন্দু মজুমদার
করাচিতো পরিচিত পরিবেশ না, তাই ঠিক সামাজিক রিয়েকশন আমাদের গায়ে লাগেনি।... করাচিতে আমি দুই দফায় তিন বছর ছিলাম। প্রথমে একা দেড় বছর আর পরের দেড়বছর ফেরদৌসীসহ।

বিপ্লব বালা
করাচিতে শুধু চাকুরি করতেন নাকি থিয়েটারও করতেন?

রামেন্দু মজুমদার
না শুধু চাকুরি ... আর তখন টেলিভিশনে নওয়াজেশ আলী খান ছিলেন, জামান আলী খান বলে আরেকজন পরিচিত ছিলেন, তিনি ঢাকা টেলিভিশনে চাকুরি করতেন ... তো তারা বললেন যে আপনারা কিছু করেন। তো তখন সেখানে বাংলা শেখার একটা আসর হতো, সেখানে দুজনেই অংশ নিতাম।

বিপ্লব বালা
কোনো নাটক করেননি?

রামেন্দু মজুমদার
একটা করেছি। মুজিবর রহমান খান সাহেবের সঙ্গে ... পাঠক মুজিবর রহমান খান, ওখানে নজরুল ইন্সটিটিউট ছিল সেখানে মুনীর চৌধুরীর জমা খরচ ইজা করেছিলাম। এই একটা লোক আমাকে তখন থেকেই খুব ইমপ্রেস করেছিল। খুব চমৎকার লোক। আমি অবশ্য করাচি রেডিওতে খবর পাঠ করবার জন্য অডিশন দিয়েছিলাম ... ফার্স্ট হয়েছিলাম ... কিন্তু পরে বললো বোঝইতো তোমার নামটা একটা সমস্যা ... পরে আর হলো না।

বিপ্লব বালা
কোলকাতার নাটকের কোনো খবর তখন রাখতেন?

রামেন্দু মজুমদার
না, একেবারেই না। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন সময়ে আমি দুবার কোলকাতা গিয়েছিলাম। নাটক দেখেছি ... উৎপল দত্তের নাটক দেখেছি, শম্ভু মিত্রের ‘রক্তকরবী’ দেখেছি, বিসর্জন দেখেছি ... দেখেতো আমি মানে ... শম্ভু মিত্রের সেই উচ্চারণ নকলের চেষ্টা করতাম। উৎপল দত্তের ‘কল্লোল’-এর কথা মনে আছে ... স্টার বা বিশ্বরূপার সেতু।

হাসান শাহরিয়ার
তারপরতো যুদ্ধকালীন সময়টা ...

রামেন্দু মজুমদার
হ্যাঁ, ’৭০ এর ডিসেম্বরেই আমি আর আমার বন্ধু রশিদ আমেদ ঠিক করলাম যে, ঢাকায় চলে আসবো, এসে বিজ্ঞাপনী এজেন্সী করবো। তো ১ মার্চ আমাদের আসার কথা ছিল ... কিন্তু ১ মার্চ থেকেতো পিআইএ-র যাত্রী আনা বন্ধ হয়ে গেল ... শুধু আর্মি পাঠাচ্ছে ... তো কী করি, এমন সময় সরকার কবির উদ্দিন, বিমানের, সে আমাদের দুটো টিকেটের ব্যবস্থা করে দিল। আমরা কলম্বো হয়ে ৯ মার্চ ঢাকা পৌঁছলাম। পৌঁছেতো দেখি উত্তাল অবস্থা ... ৭ মার্চের পর থেকেইতো ভিন্ন পরিবেশ। আমার পরিচিত ছিল বিটপী বিজ্ঞাপনী সংস্থার রেজা আলী ... উনি বললেন- কী আবার নতুন এজেন্সী খুলবেন, আমার সাথেই থেকে যান। তখন আমি কপিরাইটার হিসেবে বিটপীতে একমাস থাকলাম। তখনতো বিজ্ঞাপনের ট্রেন্ডই পাল্টে গেছে ... সব বিজ্ঞাপনের মধ্যেই কেবল স্বাধীনতার কথা, স্বাধীকারের কথা। সব কিছুতে  অ আ ক খ ... বাঙালি সংস্কৃতির যা যা আছে ... আমরা সুকান্তের কবিতাও কোট করা শুরু করলাম। তখন আমার একটা মেমোরেবল সুযোগ হয়েছিল ... ২৩ মার্চ ছিল পাকিস্তান দিবস ... তো আমরা ঠিক করলাম ২২ মার্চ একটা সাপ্লিমেন্ট বের করবো ‘বাংলার স্বাধীকার’ নাম দিয়ে। যাতে ২৩ মার্চ  পাকিস্তান দিবসের কিছু বের না হয়। তো সেটার জন্য বঙ্গবন্ধুর একটা বাণী দরকার ... আমার হাতেই একটা বাণী লিখলাম এবং বঙ্গবন্ধুর কাছে তা নিয়ে গেলে আমার হাতের লেখা সেই বাণীর নিচেই বঙ্গবন্ধু সই করে দিলেন। সেটা সেভাবেই পত্রিকায় তিন কলাম জুড়ে ছাপা হয়েছিল। এখনো অনেক জায়গায় ঐ বাণীটি ব্যবহৃত হয় ... অনেকেই ভাবে ওটা বঙ্গবন্ধুর হাতের লেখা, সেটা আসলে আমার হাতের লেখা।

হাসান শাহরিয়ার
যুদ্ধের সময় কি বাংলাদেশে ছিলেন?

রামেন্দু মজুমদার
২৫ মার্চ আমরা এই সেন্ট্রাল রোডে ফেরদৌসীদের পুরনো বাড়িতে ছিলাম। এ্যাতো কাণ্ড হবে তা আমরা বুঝতে পারিনি। তারপর ঠিক করলাম, না এখানে থাকা ঠিক না ... তারপরও সাময়িকভাবে ... যেহেতু তখনো আমাকে কেউ আজকালকার মতো চেনে না ... আমি একটা আইডেনটিটি কার্ড করলাম আবদুর রহিম না যেন কী নাম দিয়ে। তারপর ১১ মে আমি আর ফেরদৌসী আগরতলার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। যাক সে অনেক ইতিহাস ... তো আগরতলা থেকে আমরা পরে গেলাম কোলকাতা, বাবা-মার কাছে। এই প্রথম তাঁরা ফেরদৌসীকে দেখলেন। খুব ভালো ভাবেই গ্রহণ করেছিলেন।

বিপ্লব বালা
ওখানে ঐ সময়টাতে কী করতেন? স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে ছিলেন?

রামেন্দু মজুমদার
খুব চেষ্টা করেছি। সেখানে হাসান ইমাম ছিলেন, তিনি বললেন- নিজ নামে খবর পাঠ করতে ... কিন্তু আমার মনে হয়েছে তাতে বাংলাদেশে থেকে যাওয়া আমার আত্মীয়দের  অসুবিধা হবে ... তাই আর স্বাধীন বাংলা বেতারে ঢোকা হয়নি। কেবল একটা নাটক, আবৃত্তি ও কথিকায় অংশ নিয়েছি।

হাসান শাহরিয়ার
আলী যাকেরভাইতো স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে ছিলেন ... তখন কি আপনারা  পরস্পর পরিচিত ছিলেন?

রামেন্দু মজুমদার
না, তখনো পরিচয় ছিল না। তখন বাংলাদেশের জন্যে তেমন কিছুই করতে পারছিলাম না। একরকম হতাশই হলাম। পরে ঠিক করলাম ... তখনকার সময়ে বঙ্গবন্ধুর যত বক্তৃতা-বিবৃতি আছে সেগুলোকে সম্পাদনা করে ইংরেজিতে একটা বইয়ের মতো করবো। প্রায় প্রতিদিন বাংলাদেশ হাইকমিশনে যেতাম আমি আর ফেরদৌসী এবং ’৭০ এর নির্বাচনের পর থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য বক্তৃতা-বিবৃতির নোট নিতাম ... ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ...

বিপ্লব বালা
এটা কারা ছেপেছে?

রামেন্দু মজুমদার
এটা ছাপে দিল্লীতে ওরিয়েন্ট লংম্যানস। সেখানে একসময় ফেরদৌসীর একটা ফেলোশীপের ব্যবস্থা হয় এবং আমারও একটা বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কাজ জুটে যায়। এভাবে আমাদের দিল্লীতে থাকার একটা ব্যবস্থা হয়ে যায়। তো ঐ সময়েই ঐবক্তৃতার সংকলনটার ফাইনাল পাণ্ডুলিপি টাইপ করিয়ে এক বন্ধুকে দিলাম। তিনি ওরিয়েন্ট লংম্যানের কাছে নিয়ে যান ... তারা বললো যে, হ্যাঁ ছাপবো, বাংলাদেশের কাউকে দিয়ে প্রচ্ছদ করিয়ে দেন। তো আমি নিতুনদা’কে দিয়ে প্রচ্ছদ করিয়েছি।

হাসান শাহরিয়ার
দিল্লীতে বসে বাংলাদেশের কোনো খবর পেতেন?

রামেন্দু মজুমদার
হ্যাঁ, ঐ রেডিওর মাধ্যমে যতটুকু পাওয়া যায়। এভাবেই ডিসেম্বর চলে আসে ...

হাসান শাহরিয়ার
ডিসেম্বর চলে এলো ... তো মুনীর চৌধুরীর খবর কীভাবে পেলেন?

রামেন্দু মজুমদার
আমাদের পাড়ায় বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদ কাজী খলিকুজ্জামান থাকতেন। তিনি হঠাৎ রাত্রে এসে বেল টিপলেন ... আমি নিচে যেতেই বললেন যে- মুনীর চৌধুরীসহ আরো অনেককেতো মেরে ফেলেছে। তো এ খবর ফেরদৌসী কীভাবে দিই! পরে আস্তে ’ওকে প্রিপেয়ার করে খবরটা দিলাম ... খবর শুনেতো ’ও শয্যাশায়ী। পরে আবার শুনলাম যে, কবীর চৌধুরীকেও মেরে ফেলেছে ...

হাসান শাহরিয়ার
উনিতো তখন বাংলা একাডেমীতে, তাই না?

রামেন্দু মজুমদার
হ্যাঁ। পরে অনেক কষ্টে জেনেছি যে, না তিনি বেঁচে আছেন।

বিপ্লব বালা
দেশে ফিরলেন কবে?

রামেন্দু মজুমদার
২৫ জানুয়ারি, ১৯৭২। দিল্লী থেকে কোলকাতা আসি ১০ জানুয়ারি।

হাসান শাহরিয়ার
ওনাদের পরিবারের কেউ কি আঁচ করতে পেরেছিল যে ... এধরনের একটা হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে?

রামেন্দু মজুমদার
ঘুণাক্ষরেও না। আমার ধারণা, বাঙালি কেউই আঁচ করতে পারেনি যে, বুদ্ধিজীবীদের উপর আক্রমণ হবে ... তা-ও আবার এই শেষ সময়ে। কবীর চৌধুরীর সাহস ছিল ... তিনি তখন বাংলা একাডেমীতে ... তো তিনি একমাত্র ব্যক্তি যিনি সরকারের তৈরি করা একটা বিবৃতি যে- ‘সব কিছু ঠিকমতো চলছে’ ... সেটাতে স্বাক্ষর করেননি ...

হাসান শাহরিয়ার
হ্যাঁ, সরদার ফজলুল করিমের লেখায় এই সত্যটির উল্লেখ আছে। তো স্বাধীনতার পর নাটকের আসল স্রোতের সাথে কীভাবে মিশে গেলেন?

রামেন্দু মজুমদার
১৯৭২ সালে এসেই মাথার মধ্যে ঢুকলো, এবার তো নাটক করতে হবে ঠিক মতো। ততদিনে কোলকাতার গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনও তুঙ্গে উঠেছে ... তো আমরা বিচ্ছিন্নভাবে হলেও, ভাবতাম যে দেশ স্বাধীন হলে এরকম শুরু করবো। ইতোমধ্যে দিল্লীতে থাকার সময় তৃপ্তি মিত্রের সাথেও পরিচয় ঘটে ... যাক মনে হচ্ছিল যে, নাটক করবো ... ১৯৭২ সালে ফেব্রুয়ারিতেই বাংলা একাডেমীতে কবীর চৌধুরী সাহেবের রুমে ... তখন তিনি পরিচালক ... তাঁর রুমে বসে ঠিক করলাম যে, ‘থিয়েটার’ নামে একটা দল করবো।

হাসান শাহরিয়ার
এই ‘আমরা’ কারা কারা?

রামেন্দু মজুমদার
আমরা মানে আবদুল্লাহ আল-মামুন, ফেরদৌসী মজুমদার, ইকবাল বাহার চৌধুরী, আহমেদ জামান চৌধুরী ...

বিপ্লব বালা
মামুনভাই কি ঢাকাতেই ছিলেন?

রামেন্দু মজুমদার
হ্যাঁ, টেলিভিশনে চাকুরি করতেন। থিয়েটারের জন্মলগ্নে আরো ছিলেন ... মোতাহার হোসেন, ডলি আনোয়ার ... পরবর্তীসময়ে তবিবুল ইসলাম বাবুও যুক্ত হন। আমরা ঠিক করলাম যে, ‘থিয়েটার’ নামে নাট্যদল করবো, আর একটা নাটকের পত্রিকা বের করবো।

বিপ্লব বালা
তখনোতো ডাকসু নাট্য প্রতিযোগিতা হয়নি?

রামেন্দু মজুমদার
না, তখনো শুরু হয়নি ...

হাসান শাহরিয়ার
আচ্ছা, নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ই কি সবচেয়ে পুরোনো দল?

রামেন্দু মজুমদার
হ্যাঁ, ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ... তবে তারা তখন রেডিওতে নাটক করতো, মঞ্চে না। দল করার ব্যাপারে আমাদের দুটো উদ্দেশ্য ছিল ... নিয়মিত নাটক করবো আর একটা পত্রিকা বের করবো, নাটকের পত্রিকা বের করবো।

হাসান শাহরিয়ার
ঢাকায় তখন আর কী কী দল ছিল?

রামেন্দু মজুমদার
‘আরণ্যক’ ছিল। ’৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ওরা কবর নাটকটা করেছিল, মামুনুর রশীদের নির্দেশনায়। কবীর আনোয়ারের ‘পারাপার’ ছিল।

হাসান শাহরিয়ার
মামুনভাইয়ের (মামুনুর রশীদ) সাথে কি তখন আপনার ঘনিষ্টতা ছিল?

রামেন্দু মজুমদার
না, তেমনভাবে পরিচয়ও ছিল না।

বিপ্লব বালা
হ্যাঁ, দলের নাটকের কথা বলুন ...

রামেন্দু মজুমদার
আমরা হাতে নিলাম মুনীর চৌধুরীর ‘দণ্ডকারণ্য’। একটু ইন্টারেস্টিং মনে হয়েছিল। একই চরিত্র রাম সীতা সুপর্ণখা, আবার ইউনিভার্সিটির ছেলে-মেয়ে হয়ে যায় ...

বিপ্লব বালা
তখনকার দেশের সামাজিক রাজনৈতিক অবস্থার সাথে কি প্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে?

রামেন্দু মজুমদার
ওসব ভাবিনি। চরিত্র কম লাগে, ভালো নাটক এসব মাথায় ছিল। কিন্তু হলে কী হবে দু’বছরেও নাটক নামাতে পারিনি ... কেবল রিহার্সেল করেছি, নানা জনের নানা ব্যস্ততা ...

বিপ্লব বালা
তাহলেতো ততদিনে ডাকসু প্রতিযোগিতা হয়ে গেছে, নাগরিকের বাকি ইতিহাস হয়ে গেছে।

রামেন্দু মজুমদার
হ্যাঁ,‘বাকি ইতিহাস’ হয়ে গেছে ... আমরা খালি রিহার্সেল করছি ... তবে ১৯৭২ সালে নভেম্বরেই কিন্তু আমি ‘থিয়েটার’ পত্রিকাটির প্রথম সংখ্যা বের করে ফেলেছি।

বিপ্লব বালা
তাই নাকি?

রামেন্দু মজুমদার
হ্যাঁ, প্রথম সংখ্যা বের করি মুনীর চৌধুরী স্মারক সংখ্যা। সেটারও একটা ছোট ইতিহাস আছে। প্রথমে আমি ভাবলাম পত্রিকাটি বড় ফরমেটে ছাপাবো ... তো দুই ফর্মা ছাপিয়েছিও, এমন সময় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সাহেবের সাথে দেখা ... তো উনি শুনে বললেন- সর্বনাশ আপনিতো ওই ফরমেটে করলে মারা যাবেন, খরচ প্রচুর, এক কাজ করুন আমার ‘কন্ঠস্বর’-এর সাইজে করুন (বর্তমানে থিয়েটার যে সাইজে আছে)। তো আমিও মেনে নিলাম ... পত্রিকা বের হবার সাথে সাথে বেশ রেসপন্স পেলাম। কেউ ভাবতেই পারেনি যে, কেবল নাটক আর নাটক বিষয়ক প্রবন্ধ দিয়ে একটা পত্রিকা বের হতে পারে।

বিপ্লব বালা
স্বাধীন দেশে দর্শনীর বিনিময়ে প্রথম নিয়মিত নাট্যচর্চা শুরু হলো, কেমন লাগলো?

রামেন্দু মজুমদার
অসাধারণ! যদিও আমরাও চেয়েছিলাম দর্শনীর বিনিময়েই করবো, তবুও নাগরিক সবার আগে করলো। ব্রিটিশ কাউন্সিলে পরপর ১২ সপ্তাহ, তখনতো রোববার সকাল ছিল প্রাইম টাইম ... তো পরপর ১২টি প্রদর্শনী মানেতো ... মানে ভাবাই যায় না।

বিপ্লব বালা
রেসপন্স কেমন হয়েছিল?

রামেন্দু মজুমদার
খুবই ভালো। টিকেট ১০, ৫, ৩ টাকা। আমরা এরমধ্যে ১৯৭৪ সালের ২১ ফেব্র“য়ারিতে বাংলা একাডেমীতে কবর করেছিলাম। সেটি আমার নির্দেশনায় ছিল, তবে নিয়মিত নাটক মঞ্চে আনার জন্য আমাদের ’৭৪ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। চুয়াত্তরে সুবচন নির্বাসনে হলো, এটা আবদুল্লাহ আল-মামুনের রচনা ও নির্দেশনায় এলো ... তো এটি লেখার সময় মামুন দলের শক্তির কথা বিবেচনায় রেখেছিল, তখন দলে মেয়ে কেবল ফেরদৌসীই ছিল, নাটকেও একটি মাত্র মেয়ে চরিত্র।

হাসান শাহরিয়ার
কোথায় করলেন সুবচন নির্বাসনে?

রামেন্দু মজুমদার
মহিলা সমিতি মঞ্চে।

বিপ্লব বালা
মহিলা সমিতি মঞ্চে প্রথম কি নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় নাটক করেছিল?

রামেন্দু মজুমদার
হ্যাঁ, ওরাই খুঁজে বের করেছিল, পরিষ্কার করেছিল ... তবে ’৭৪-এ এসে অনেক দলই ওখানে নাটক করতো ... অবশ্য যদ্দুর মনে পড়ে  দলই ছিল চার-পাঁচটা। আমরা সপ্তাহে একদিন বুকিং পেতাম ... প্রায় সমস্ত টিকেটই আমরা পুশ সেল করতাম। নিজেরা ভাগ করে টিকেট নিতাম ... পরিচিতজনদের কাছে বিক্রি করার জন্য ... তো বিক্রি হোক বা না হোক, দলকে টাকা দিতেই হতো ... তাই পুশ সেলের ব্যাপারে মনোযোগী ছিলাম বেশি।

হাসান শাহরিয়ার
মিডিয়ার সাপোর্ট তখন কেমন পেতেন?

রামেন্দু মজুমদার
খুবই ভালো। প্রায় প্রত্যেকটা পত্রিকা ভালো কভারেজ দিত ... ভালো ভালো রিভিউ বের হতো ... চিন্ময় মুৎসুদ্দি, শাহরিয়ার কবির, জাহানারা ইমাম ... এনাদের মতো লোকেরা রিভিউ করতেন। একটা ব্যাপারে তাই খুব দুঃখ লাগে ... ’৭০ দশকে নাটক কম ছিল, নাট্যদল কম ছিল, অথচ ভালো ভালো রিভিউ হয়েছে ... আর ’৮০-র দশকে সব যখন বাড়তে লাগলো ভালো রিভিউ তখন কমতে শুরু করলো। সেদিন শাহরিয়ার তোমার মনে আছে কিনা ... যে, বলছিলাম- আমাদের এখানে এখন যারা রিভিউ লেখে তারা নিজেরাই নাটকের সাথে, নাট্যদলের সাথে যুক্ত ... ফলে ভালো নাটক হলে প্রশংসা করে কিন্তু খারাপ হলে লিখতে পারে না ... বলে যে, বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে যাবে।

হাসান শাহরিয়ার
জাকারিয়াভাই আপনাদের দলে কীভাবে যোগ দিলেন, সে সময়টা একটু বলুন ...

রামেন্দু মজুমদার
আমাদের অন্যতম সহ-সভাপতি ইকবাল বাহার চৌধুরী আমাদের জানালেন যে টেলিভিশনে জাকারিয়া সাহেব আছেন, তিনি কোলকাতার ‘বহুরূপী’-তে কাজ করেছেন ... শম্ভু মিত্রের সাথে কাজ করা মানুষ ... তো তাঁকে বলে দেখা যায় আমাদের সাথে আসবেন কিনা। তিনি যেহেতু মামুনের কলিগ ছিলেন, ফলে আমরা অফার করার পর সহজেই রাজি হয়ে গেলেন।

বিপ্লব বালা
আমরা এখন চিনবো এমন কারা কারা ‘সুবচন নির্বাসনে’ -এ ছিলেন, বলতে পারেন?

রামেন্দু মজুমদার
জাকারিয়া দাদাতো ছিলেনই আর তবিবুল ইসলাম বাবু ছিলেন, সুজা খন্দকার, হায়দার রিজভী, আরিফুল হক ছিলেন ... আমি, মামুন, ফেরদৌসীতো ছিলামই।

বিপ্লব বালা
দর্শক রিয়েকশন কেমন ছিল?

রামেন্দু মজুমদার
দারুণ! দর্শকরা মনে করলো যে, তাদের মনের কথাটাই বলা হলো ... ভালো রিয়েকশন হয়েছে। তারপর যাদেরকে পুশিং সেল করেছি, তারা গিয়ে আবার দশজনকে বলেছে ... ফলে দর্শকও আস্তে আস্তে বেড়েছে। তারপর আমরা শেষরক্ষা ধরেছিলাম কিন্তু বন্যার কারণে সেটা তখন করাটা ঠিক মনে করলাম না। মামুন সাতদিনের মধ্যে আমাদের একটা নাটক লিখে দিল এখন দুঃসময়। ’৭৪ সালে ৩ সেপ্টেম্বর আমরা মঞ্চে আনি এখন দুঃসময়। এটার রিয়েকশনও ভালো। তখন আমরা ঠিক করলাম যে, আমাদের দল থিয়েটার নাটক করবে আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া জীবন কাহিনী নিয়ে। ঐ যে শুরুতে ভেবেছিলাম ক্লাসিক্যাল বা সাহিত্যনির্ভর নাটক করবো সেখান থেকে আপাতত সরে গেলাম। সে কারণে পরবর্তী প্রযোজনা ছিল আমাদের ‘চারিদিকে যুদ্ধ’। প্রফুল্ল রায়ের উপন্যাসের নাট্যরূপ দিয়েছিল আবদুল্লাহ আল-মামুন। নির্দেশনাও তারই ছিল। তারপর করি চোর চোর, সেটাতে মিতা চৌধুরী করেছিল প্রধান চরিত্রটি।

হাসান শাহরিয়ার
আপনাদের সাথে সৈয়দ হকভাইয়ের পরিচয় কীভাবে এবং পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়-এর ব্যাপারে কিছু বলুন।

রামেন্দু মজুমদার
ওনাকে চিনতামতো আগে থেকেই। তো ঐ সময় তিনি বিবিসি-তে কাজ করতেন। ছুটিতে দেশে আসার পর আমি আর মামুন তাকে ধরলাম যে একটা নাটক দিন ... তো তিনি দিলেন ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’। মুক্তিযুদ্ধের উপর। ঐ জিনিস পেয়েতো আমরা ’থ। এটা কেমন নাটক ... খালি কবিতা আর কবিতা! ছন্দ আর ছন্দ! কোনো চরিত্রভাগ ছিল না ... দীর্ঘ দীর্ঘ সংলাপ ... তো তখন মামুন স্ক্রীপ্টের উপর অনেক কাজ করলো, চরিত্রগুলো ভাগ করলো ... তারপর টানা রিহার্সেল করলাম তিনমাস। এটা মঞ্চে আসলো ২৫ নভেম্বর ১৯৭৬ সাল।

বিপ্লব বালা
দর্শক কীভাবে নিল?

রামেন্দু মজুমদার
সেতো সাংঘাতিক! একদিকে কাব্যনাটক, অন্যদিকে প্রোডাক্শন স্টাইলটা অন্যরকম, অভিনয়রীতি অন্যরকম ... তাছাড়া মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে নাটক ... তখন আবার ’৭৫, ১৫ অগাস্ট, এগুলো ঘটে গেছে ... মানে সব মিলিয়ে খুবই উচ্ছ্বসিতভাবে দর্শক নিল। পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়-র গান লিখেছিলেন আসকার ইবনে শাইখ।

বিপ্লব বালা
হকভাই লিখলেন না কেন?

রামেন্দু মজুমদার
উনি তখন ছিলেন না। উনি স্ক্রীপ্ট দেয়ার পরপরই আবার বিবিসিতে চলে গিয়েছিলেন। পরে এসে নাটক দেখেতো তাঁর চোখে পানি চলে আসে। কিছু সংলাপতো মারাত্মক- আল্লাহ কেমন তার চেহারা ... আমার সবসময়ই ভয় লাগতো যে এই বুঝি হৈচৈ শুরু হবে ... না পরে যুক্তির পর যুক্তি আসে দর্শকও সেটাকে গ্রহণ করে।

হাসান শাহরিয়ার
নাটকের কী ধরনের সেন্সরশীপ নাকি ঐ সময়ে ছিল, নাগরিকের কোন নাটক নাকি বন্ধ করে দিয়েছিল ... এ ব্যাপারে কিছু মনে পড়ে?

রামেন্দু মজুমদার
হ্যাঁ, যদ্দুর মনে পড়ে, কোনো এক সচিব নাটক দেখতে এসেছিলেন, নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের নাটক ... নাটকের নামটি মনে আসছে না ... দেখে এসে তিনি বললেন যে, এন্টারটেইনমেন্ট ট্যাক্স দেয়া হচ্ছে না, তাই নাটক বন্ধ। পুলিশ মহিলা সমিতিতে এসে জানিয়ে দিল সেন্সর না করালে ও ট্যাক্স না দিলে নাটক করা যাবে না। তারপর আমরা প্রায় ছয়মাস নাটক বন্ধ রাখলাম। কেবল ওর কাছে যাচ্ছি, এর কাছে যাচ্ছি ... সরকারের বক্তব্য যে, আমরা দর্শনীর বিনিময়ে নাটক করি ... সুতরাং আমাদের নাকি প্রচুর আয় হয়, তাহলে আমরা ট্যাক্স দেব না কেন। আমাদের কাছে খুবই হাস্যকর মনে হলো ... তো এমন এক সময় বঙ্গবন্ধু গেলেন রামপুরা টেলিভিশন সেন্টারে ... সেখানে মামুন ছিল, কাছে ডেকে বললেন- কী তোমাদের নাটক কেমন চলছে? তো মামুন বললো যে, নাটকতো আপনি বন্ধ করে দিয়েছেন। উনি বললেন- আমি বন্ধ করে দিয়েছি মানে? তখন মামুন সব বললো ... শুনে পাশে থাকা অর্থমন্ত্রী ড. এ আর মল্লিককে বঙ্গবন্ধু বললেন যে, এদের কাছ থেকে টাকা না নিলে সরকার চালানো যাবে না? মামুনকে পরের দিন গণভবনে দেখা করতে বললেন। ব্যস, পরদিনই আমি আর মামুন গিয়ে হাজির গণভবনে ... সেখানে তাঁর সেক্রেটারি ছিলেন ড. ফরাসউদ্দিন, মামুনের ক্লাশমেট ছিলেন উনি ... বঙ্গবন্ধু সব শুনে বললেন যে, ট্যাক্স মওকুফ করা যায়, সৌখিন নাট্যদল হিসেবে, কিন্তু সেন্সর একেবারে ওঠানো যাবে না ... বরং এটা পুলিশের হাত থেকে এনে একটা সেন্সর বোর্ড করে তার হাতে দেয়া যায়। মন্ত্রণালয়ে গেলে অনেক দেরি হবে, তাই রাষ্ট্রপতির আদেশ জারি করতে বললেন। তার পরদিনই রাষ্ট্রপতির আদেশ বের হলো যে, প্রমোদকর রহিত আর সেন্সর কমিটি হবে শিল্পকলা একাডেমীর অধীনে। তখন তথ্যমন্ত্রী ছিলেন কোরবান আলী ... তো তখন থেকে আমরা টিকেট বলতে শুরু করি, আগেতো বলতাম প্রবেশপত্র।

হাসান শাহরিয়ার
তাহলে সেন্সরের আর সমস্যা রইলো না?

রামেন্দু মজুমদার
একেবারেতো উঠে যায়নি, শিল্পকলা একাডেমীর সেন্সর বোর্ড থেকে পাশ করিয়ে নিতে হতো ... আর মফস্বল শহরে সমস্যা থাকতোই। পরে ... মানে ‘৭৫ এর পরে কুমিল্লা গিয়ে শুনলাম ‘এখন দুঃসময়’ করতে দেবে না ... বলে যে এখনতো দেশে দুঃসময় না, এ নাম পরিবর্তন করতে হবে হাঃ হাঃ ...

হাসান শাহরিয়ার
‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ দেখে আপনি বলছেন যে সৈয়দ শামসুল হক খুব আপ্লুত হয়েছেন ...

রামেন্দু মজুমদার
হ্যাঁ।

হাসান শাহরিয়ার
কিন্তু আমরা শুনেছি যে, থিয়েটার স্কুলে আতাউর রহমানভাইয়ের নির্দেশনা দেখে বলেছেন যে, আতাভাইয়েরটা বেটার-

রামেন্দু মজুমদার
হ্যাঁ, এমন একটা কথা উনি বলেছেন, তবে সেটার প্রসঙ্গ ভিন্ন ছিল। ... এতে করে একটু ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছিল।

বিপ্লব বালা
অন্যান্য দলের কাজের ব্যাপারে কিছু বলুন ... ‘মুনতাসির ফ্যান্টাসী’ বা এধরনের নাটকের কাছে ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ কি রিস্কি মনে হতো না?

রামেন্দু মজুমদার
একেবারেই না। আমাদের নাটক কিন্তু সে সময় প্রচুর দর্শকপ্রিয় হতো। সেটা যে কারণেই হোক। আমরা সামাজিক নাটক বেশি করতাম বলে কিনা জানি না, আমাদের দর্শক হতো। এমনকি আমি এখন গর্বে সাথে একটি মাইল ফলকের কথা বলতে পারি যে, ঢাকার থিয়েটারে কিন্তু আমাদের ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ প্রথম ৫০ প্রদর্শনী করা নাটক। এটা কিন্তু কম কথা নয়, পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়-র মতো নাটক, কাব্যনাটক, ফর্ম নতুন ... তো এই নাটকের ৫০ তম শো করতে পেরে আমরা বেশ উত্তেজিত ছিলাম। সবাই উত্তেজিত হয়েছিল ... কারণ ঢাকায়তো এর আগে আর হয়নি। অন্যান্য দলের মধ্যে নাগরিক করতো, তাদেরও দর্শক তৈরি ছিল, ঢাকা থিয়েটার করতো সেলিমের নাটক ... তাদের নাটক আমার মনে হয় বেশি দর্শকপ্রিয় হতে শুরু করেছে শকুন্তলা-র পর থেকে। বহুবচন কিছুদিন করলো, আরণ্যকতো করছেই ... নাট্যচক্র করেছে ... নাট্যচক্রের একটা দুর্ভাগ্য হলো যে প্রচুর অভিনেতা অভিনেত্রীর জন্ম তারা দিয়েছে, নির্দেশকের জন্ম দিয়েছে, কিন্তু নিজেরা তেমন বেশি উল্লেখযোগ্য নাটক করতে পারেনি।

বিপ্লব বালা
ঢাকা থিয়েটারওতো নাট্যচক্রের লোকজনই করেছে, তাই না?

রামেন্দু মজুমদার
হ্যাঁ, ওটাতো বিশ্ববিদ্যালয়ের দল ছিল। পরে বাইরে করার জন্য ওরা ঢাকা থিয়েটার নাম দিল। আমাদের দলের কাদের, সবুজ এরা প্রথমে ঐদলেই ছিল।

বিপ্লব বালা
আচ্ছা, একটা বিষয় একটু জেনে নিই। ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ নিয়ে নাকি অনেক বিরূপ মন্তব্য হয়েছে ... মানে এখানে রাজাকারকে বড় করা হয়েছে বা এমন কিছু ...

রামেন্দু মজুমদার
হ্যাঁ, মানে কেউ কেউ বলেছে যে, এটা আসলে মুক্তিযুদ্ধের নাটক না, শেষে রাজাকারের প্রতি দর্শকের সিম্প্যাথি চলে আসে ... রফিকুল ইসলাম স্যার বাংলা একাডেমীর অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, আরো কে কে যেন বলেছিলেন। কিন্তু আমি বলবো, এটি আসলে বৃহত্তর মুক্তির নাটক। রাজাকারের প্রতি যাতে সিম্প্যাথি না আসে সেভাবে আমরা প্রযোজনা করেছিলাম।

হাসান শাহরিয়ার
এবার একটু আবার পত্রিকা প্রসঙ্গে আসি। থিয়েটার পত্রিকাটিতো নাটকের পাশাপাশি নিয়মিত বের হতো তাই না?

রামেন্দু মজুমদার
হ্যাঁ। পত্রিকাটি কিন্তু ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছিল। কারণ তখন কোনো প্রকাশক কিন্তু নাটকের বই ছাপতো না। থিয়েটার পত্রিকা একেবারে নিয়মিতভাবে মঞ্চে আসা নাটকগুলো ছাপাতো ... আরো লেখা ছাপাতো, কিন্তু নাটক থাকতোই, দুটো না বেশিও থাকতো কোনো কোনো সংখ্যায়। ফলে নাটকের লোকজনের কাছে পত্রিকাটি আসলে একটা গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে গিয়েছিল।

হাসান শাহরিয়ার
থিয়েটার পত্রিকাটিতো আপনার দল থিয়েটারেরই প্রকাশনা ... তো খরচ কি দলই বহন করে?

রামেন্দু মজুমদার
না, সেভাবে না। এটার খরচ আমাকেই সংগ্রহ করতে হয়। এটা প্রথমে কিন্তু দলের মুখপত্র হিসেবে বের করতাম, পরে সিদ্ধান্ত নিলাম যে, এটা আর কেবল আমাদের দলের মুখপত্র থাকবে না, এটা আলাদা স্বত্ত্বায় বাংলাদেশের নাট্যচর্চার সহযোগী হয়ে থাকবে।

হাসান শাহরিয়ার
গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশান গঠনে আপনার প্রধান ভূমিকা ছিল ... তো ঐসময়ের কাজগুলো একটু বলুন।

রামেন্দু মজুমদার
আসলে ’৮০ -র আগেই অনেকের মনে হচ্ছিল যে একটা ফেডারেশান করা যায় কিনা। কিন্তু অনেকেই আবার সন্দেহ করছিল যে, গণ্ডগোল হবে, মনোমালিন্য হবে ... তাই কেউ আর এগোয়নি। কিন্তু এরই মধ্যে আমরা সব দল মিলে একটা ঢাকা নাট্যোৎসব করেছিলাম এবং সেটা বেশ সফলও হয়েছিল। তখন আমার মনে হলো যে, না একটা ফেডারেশান করা যায়। তখন আমি থিয়েটার পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে ১৯৮০ সালে ২৯ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে সবাইকে এক মতবিনিময় সভায় আহ্বান করলাম ... যে আলোচনা করে দেখি, ফেডারেশান করা উচিত কি উচিত না। সেদিন সভায় ঢাকার ২১ টি দলের প্রতিনিধি এবং জেলা শহরের ১৫টি দলের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। তো এর আগের বিভিন্ন কথাবার্তায় আমার মনে হয়েছিল যে, মামুনুর রশীদ ফেডারেশান গঠনের ব্যাপারে বিরোধিতা করতে পারেন ... তাই ট্যাক্টফুলি তাঁকে আমরা ঐ সভার সভাপতি বানিয়ে দিই। তো ঐ সভায় নীতিগত সিদ্ধান্ত হয় যে, আমরা ফেডারেশান গঠন করবো ... পরে আরেকটি সভায় আমরা বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশান গঠন করার সিদ্ধান্ত নিই। আমাদের প্রথম সম্মেলন হলো ২৩ অগাস্ট ১৯৮১।

হাসান শাহরিয়ার
প্রথম সভাপতিতো আপনিই?

রামেন্দু মজুমদার
প্রথম দুই টার্ম আমি সভাপতি আর নাসির উদ্দীন ইউসুফ ছিল সেক্রেটারী জেনারেল।

হাসান শাহরিয়ার
আপনাকে কিন্তু অভিনতার চেয়ে সংগঠক হিসেবেই বেশি দেখছি ... কেন?

রামেন্দু মজুমদার
আসলে প্রথম থেকেই দেখতাম যে, ছেলে-মেয়েরা দলে আসে কেবল অভিনয় করার জন্য, পারুক বা না পারুক ... তো আমি দেখলাম যে নেপথ্যে কাজ করার আগ্রহ কারোই তেমন নেই। তাই অন্যদের উৎসাহ দেবার জন্যই নিজে ব্যাকস্টেজে কাজ করা শুরু করি। প্রথম দিকে অভিনয়ও করতাম ছোট খাট ভূমিকায়।

বিপ্লব বালা
খবর পাঠ কবে থেকে শুরু করলেন?

রামেন্দু মজুমদার
সেটাতো সেই ’৭২ সাল থেকেই।

বিপ্লব বালা
আপনারা শেক্সপীয়রের নাটক ধরলেন কেন, কীভাবে?

রামেন্দু মজুমদার
এর আগে আমরা মামুনের সেনাপতি নাটকটা করি। তো সেখানেও একটা ব্যাপার ঘটলো যে, বিচিত্রায় মাহমুদ শফিক লিখলেন যে, ওটা উৎপল দত্তের এবার রাজার পালা-র নকল। হাস্যকর একটা লেখা লিখলো। আমিতো ‘এবার রাজার পালা’ দেখেছি কোনো মিলই নেই। পরে থিয়েটার পত্রিকায় ‘সেনাপতি’ আর ‘এবার রাজার পালা’ একসাথে ছাপিয়ে দিলাম।

হাসান শাহরিয়ার
প্রসঙ্গক্রমে কি জানতে পারি, যে মুনীর চৌধুরীর কবর এবং আরউইন ’শ-র বেরি দা ডেড নিয়েও কিন্তু এমন হয়েছিল ... নকল বলা হতো। তো কেউ কি কোনো তীব্র সমালোচনা করেছিল?

রামেন্দু মজুমদার
হ্যাঁ, অনেকেই বলেছে, তবে তীব্রভাবে সম্ভবত বলেছেন সাঈদ আহমদ। মুনীর চৌধুরী কিন্তু নিজেই বলেছেন যে, কবর নাটক লেখার সময় অবচেতন মনে শ’র নাটক ছায়া ফেলেছে। কিন্তু কবর সম্পূর্ণ মৌলিক চিন্তার ফসল।

বিপ্লব বালা
পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নিয়ে তো বাইরে গিয়েছিলেন ... সে সময়টার কথা একটু বলবেন?

রামেন্দু মজুমদার
আমেরিকার একটা ইন্টারন্যাশনাল ভিজিটার্স প্রোগ্রাম আছে, তার আওতায় ওরা বিভিন্ন দেশের লোকজনদের আমন্ত্রণ জানায় ... সেখানে যাওয়ার জন্য। মামুন গিয়েছিল ফিল্মের জন্য, পরের বছর ১৯৮০ সালে আমাকে আমন্ত্রণ করলো নাটকের ক্ষেত্র থেকে ... তো সেখানে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বিভিন্ন থিয়েটার দেখায় ... সেখানে আমার সাথে পরিচয় হলো লামামা থিয়েটারের এলেন স্টুয়ার্টের সঙ্গে ... পরে তিনি আমাদের দেশেও এসেছিলেন ... তিনি জানালেন যে, আইটিআই বলে একটা প্রতিষ্ঠান আছে এবং তাদের একটা ফেস্টিভাল হচ্ছে ... থার্ড ওয়ার্ল্ড ফেস্টিভাল। তো আমি যোগাযোগ করলাম ... বললাম যে, আমরা নাটক করি, পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নাটকটি করতে চাই। ওরা রাজি হলো কিন্তু বললো যে, যাতায়াত ভাড়া আমাদের দিতে হবে। এতো ভারী মুশকিলে পড়া গেল, আমি বললাম যে, যাওয়ারই দরকার নেই, বাদ দেন ... কিন্তু আমাদের তবিবুল ইসলাম বাবু ছিল একেবারে নাছোড়বান্দা, তার যেকোনো কাজে নামলে তা করেই ফিরতে হবে ... সে বললো- চলেন আমরা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সাথে দেখা করি, তাকে ধরলে ফল হতে পারে। বাবু বিএনপি অফিসে নিয়ে গেল, রাত ১টা বাজে প্রেসিডেন্টের তখনো দেখা নাই, আমিতো বললাম- চলো বাড়ি ফিরে যাই ... বাবু বললো- এতোটা এসে ফিরে যাব না। ... তো তখন অলি আহমেদ ছিলেন ওনার সেক্রেটারী, জিয়াউর রহমান এলে, অলি আহমেদ সব বললেন ... তো রাত দুটার সময় জিয়াউর রহমান ফোন করলেন সংস্কৃতি মন্ত্রীকে, হাতিয়ার লোক ছিলেন নামটা মনে করতে পারছি না ... রাত দুটার সময় ফোন করে বললেন- আপনি ঘুমাচ্ছেন, এ্যাতো সকাল সকাল ঘুমান কেন? শুনুন নাটকের দল যাবে সিউলে, ১৫ জনের দল, ওদের এ্যাম্বেসীকে বলেন একদিকের ভাড়া দিতে আর আমরা একদিকের ভাড়া দেব। ব্যস হয়ে গেল। ওহ্ না, সমস্যা রয়ে গেল আমরা পরে দেখি যে, আমাদের ১৬ জনের নিচে দল নেয়া যাচ্ছে না। এমনিতে কাট ছাট করে ১৫ তে আনা হয়েছিল, কিন্তু টেকনিক্যাল হ্যান্ড একজন না নিলেই নয় ... তখন তারিক আনাম খান ছিল, সে মাত্রই এনএসডি থেকে এসেছে ... তো কী করি, পরে বিজ্ঞাপন ম্যানেজ করে ওকে নিয়ে গেলাম।

ঠিক এই জায়গায় আমার একটা রিয়েলাইজেশনের কথা বলি ... পরে যে আমাদের দল ভাঙলো, আমার মনে হয় যে, তার বীজ বপন করা হয়েছে এই ঘটনার মধ্যে। কারণ এই যাওয়া নিয়ে দলে তখন বেশ অসন্তোষের জন্ম হয়েছিল। যেহেতু বড় কাস্টিং-এর নাটক, কিন্তু সবাইকে নেয়া যাবে না, তাই একজনকে দিয়ে একাধিক চরিত্র করিয়েছিলাম ... যেমন কাজী তামান্না ছিল, সে একটা বৃদ্ধার চরিত্র করতো, ভাবলাম ঐ অংশে ফেরদৌসী নাই, তো তাকে মেক-আপ দিয়ে করে নেব ... এসব আরো অনেক, যেমন তারিক আনাম মাত্র দলে এসেছে, এসেই বিদেশ যাচ্ছে, এসব আর কি! যাক পরে যে দল ভাঙলো তার শুরুটা বোধহয় এখান থেকেই শুরু। ওহ্ আমরা কিন্তু এই প্রথম কোনো নাটকের পোস্টার ছাপালাম, আমরা মানে কিন্তু বাংলাদেশেই এই প্রথম।

হাসান শাহরিয়ার
আইটিআই-র সদস্য হওয়াটা কি তখন থেকেই শুরু?

রামেন্দু মজুমদার
অনেকটা। কারণ সিউলে আমি আইটিআই-র সেক্রেটারী জেনারেলের সাথে বৈঠক করলাম। তাঁকে জানালাম যে, আমরা সদস্য হতে চাই ... পরে তারা লিখলো যে- তোমাদের কি প্রফেশনাল থিয়েটার আছে? আমি লিখলাম না ... তো বললো- তাহলেতো হবে না, এটা প্রফেশনাল থিয়েটারের ফোরাম ... তাদের বোঝালাম যে- এটাই আমাদের মেইন স্ট্রীম থিয়েটার, আমরা প্রফেশনাল এ্যাটিচিউড নিয়েই কাজ করি। তো এক সময় ১৯৮১ সালের নভেম্বরে আমাদেরকে ...

হাসান শাহরিয়ার
এই কাজগুলো তখন বাংলাদেশের কে কে শেয়ার করেছেন?

রামেন্দু মজুমদার
কেউ না, আমি একাই এই পত্রযুদ্ধ করছিলাম। আমার ইচ্ছা ছিল যে, দেখিনা কদ্দুর কী হয় ... শেষে ওরা বললো হ্যাঁ এদের সদস্য করা যায়। তখন ’৮২ সালের জানুয়ারিতে আতাউর রহমানের বাসায় অনেককে ডেকে আইটিআই-র ব্যাপারটা জানালাম এবং আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে, আমরা আইটিআই বাংলাদেশ কেন্দ্র খুলবো। প্রথম সভাপতি নির্বাচিত করলাম কবীর চৌধুরীকে আর আমি সাধারণ সম্পাদক।

হাসান শাহরিয়ার
যখন ফেডারেশান করলেন, তখন সদস্যপদ দেয়ার কি কোনো ক্রাইটেরিয়া ছিল, নাকি যারাই আবেদন করতো তারাই পেয়ে যেত?

রামেন্দু মজুমদার
প্রথমে আমাদের কাছে ১০১ টি আবেদন পড়েছিল ... তো তারমধ্যে আমরা ৬৭টিকে সদস্যপদ দিই। যেকোনো ২টি নাটকের কমপক্ষে ১০টি করে শো থাকতে হবে, এটাই ছিল প্রাথমিক ক্রাইটেরিয়া।

হাসান শাহরিয়ার
ঐ সময়টাতে নাট্যদলতো অনেক বেড় গেছে, তাই না? তো মহিলা সমিতি মঞ্চে কি তখন সাতদিনই শো হতো?

রামেন্দু মজুমদার
হ্যাঁ হ্যাঁ। তখন রোববার সকাল ছিল প্রাইম টাইম। এখন যেমন শুক্রবার সন্ধ্যা। আর সবচেয়ে খারাপ দিন ছিল মঙ্গলবার সন্ধ্যা ... বাংলাদেশ টেলিভিশনে ধারাবাহিক নাটক হতো ... তো ঐদিন যার বরাতে হল ছিল, তার টিকেট বিক্রি কম হতো।

হাসান শাহরিয়ার
হল বন্টন কে করতো, মহিলা সমিতি? তাহলে ফেডারেশান কবে থেকে হল দেয়া শুরু করলো?

রামেন্দু মজুমদার
বন্টন মহিলা সমিতিই করতো। ফেডারেশান নিয়েছে অনেক পরে।

হাসান শাহরিয়ার
একটা কথা একটু পরিষ্কার হয়ে নিই, একটা কথা বলা হয় যে, আগে নাট্যজনেরা টেলিভিশনে কাজ করতো মঞ্চে দর্শক বাড়াবার জন্য ... অর্থাৎ টেলিভিশনের তারকাটিকে দেখার জন্য দর্শক মঞ্চে আসবে এবং তাতে মঞ্চে দর্শক সংখ্যা বাড়বে ... এমন একটা ইথিক্যাল জায়গা থেকে নাকি পূর্বে আপনারা টিভি মিডিয়ায় কাজ করতেন। কিন্তু এখন ছেলেমেয়েরা মঞ্চে আসে তার একমাত্র কারণ, টিভিতে সুযোগ পাওয়ার জন্য .. . এটাকে আপনি মানেন কিনা?

রামেন্দু মজুমদার
ঠিক তা নয়। আগে মঞ্চের দর্শক বাড়াবার জন্যেই যে সবাই টিভি নাটক করতো তা কিন্তু নয়। তবে মঞ্চটা প্রায়রিটি ছিল। এখন আর সেটা তেমন নেই।

হাসান শাহরিয়ার
আচ্ছা মামুনভাইতো টিভি’র প্রযোজক ছিলেন ... তো উনিকি আপনার দলের জন্য এধরনের কোনো সুযোগ করে দিয়েছেন যাতে করে দলের তারকা দেখে দর্শক সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে?

রামেন্দু মজুমদার
না। আমাদের দলের কম সংখ্যক সদস্যই টিভিতে অভিনয় করতো, যারা করতো তারা আগে থেকেই করতো। মামুন সব দলের ছেলে-মেয়েদেরই যোগ্যতা অনুযায়ী টিভিতে সুযোগ দিত।

হাসান শাহরিয়ার
আপনার দলে বহুরূপী’র মতো দল করা বা শম্ভু মিত্রের সাথে থিয়েটার করা নাট্যপাগল ছিলেন, জাকারিয়াভাই, এপ্রজন্মের জন্য তাঁর উপর কিছু বলুন।

রামেন্দু মজুমদার
জাকারিয়া দাদা ছিলেন আমাদের দলে পিতার মতো। অসম্ভব নিয়মনিষ্ঠ ব্যক্তি ছিলেন। প্রায়ই তিনি বলতেন- ভালো অভিনেতা হবার আগে ভালো মানুষ হতে হবে। নাটকে ছোট রোল বলে কিছু নেই। আছে ছোট অভিনেতা, বড় অভিনেতা। তাঁর সঙ্গ সব সময়ই উপভোগ্য ও শিক্ষণীয় ছিল। আমাকে, মামুনকে ও ফেরদৌসীকে অসম্ভব স্নেহ করতেন। দলের কারো উচ্চারণের ত্রুটি একেবারেই সহ্য করতে পারতেন না। বাচিক অভিনয় ছিল তাঁর দারুণ। আমাদের মঞ্চে কারো এ্যাতো সুন্দর বাচিক অভিনয় আমি দেখিনি। আমাদের সুবচন নির্বাসনে নাটকে বাবা, চারিদিকে যুদ্ধ-তে মল্লিক সাহেব, পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়-তে পীর সাহেব, দুই বোন-এ মথুরদা, এখানে এখন-এ কোরাস, ম্যাকবেথ-এ চিকিৎসক- এসব অভিনয় এখনো আমাদের চোখের সামনে ভাসে। মহড়ায় বা অন্য উপলক্ষে সুযোগ পেলেই বহুরূপী ও শম্ভু মিত্রের গল্প ও আদর্শের কথা বলতেন। শেষ জীবনে অনেক বছর অসুস্থ হয়ে বাড়িতে থাকতেন। অভিনয় না করতে পারার বেদনার কথা বারবার আমাদের বলতেন। আমাদের গ্রুপ থিয়েটারে তাঁর মতো আরেকজন মানুষের দেখা পাওয়া যাবে না। খুব সঙ্গতভাবেই আমরা তাঁকে গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশানের প্রথম সম্মেলনে প্রধান অতিথি করেছিলাম এবং প্রথম মুনীর চৌধুরী সম্মাননা তাঁকে দিয়েছিলাম। তাঁর মৃত্যুর পর ‘থিয়েটার’ ‘জাকারিয়া স্মৃতি পদক’ নামে তরুণ নাট্যকর্মীদের জন্যে একটি পদক প্রবর্তন করেছে।

বিপ্লব বালা
বাংলাদেশে কি ওটাই প্রথম ছিল যে, যৌথভাবে ম্যাকবেথ করলেন?

রামেন্দু মজুমদার
হ্যাঁ, ব্রিটিশ কাউন্সিল আমাদের প্রস্তাব দিল যে, যদি শেক্সপীয়ারের কোনো নাটক কর তবে আমরা খরচ যোগান দিতে পারবো। তখন আমরা ঠিক করলাম যে, নাগরিক আর থিয়েটার যৌথভাবে একটি নাটক করতে পারি। আমরা ঠিক করলাম ম্যাকবেথ করবো। তো এটার নির্দেশনা দিয়েছিলেন ক্রিস্টোফার স্যান্ডফোর্ড ... তার আগে  ... রজার ক্রাউচার আমাদের ওয়ার্কশপ করালেন ... শেষে উনি বললেন যে, তোমরা কোন নাটক করতে চাও? আমরা বললাম ম্যাকবেথ ... তিনি বললেন যে, তাহলে ম্যাকবেথ করবে আলী যাকের এবং লেডি ম্যাকবেথ করবে ফেরদৌসী মজুমদার ... মানে এই দুই চরিত্র নির্বাচন করে বললেন- অন্য চরিত্র বন্টন করবেন তোমাদের যিনি নির্দেশনা দেবেন তিনি।

হাসান শাহরিয়ার
ম্যাকবেথ-এর অনুবাদ কি সৈয়দ শামসুল হক আগেই করেছিলেন নাকি ...

রামেন্দু মজুমদার
না না, আমরা এরপর সৈয়দ হককে ধরলাম যে- আপনাকে এটা অনুবাদ করে দিতে হবে। তো উনি করে দিলেন। আসাদুজ্জামান নূরকে করা হলো এসিসটেন্ট ডিরেক্টর এবং আমাকে করা হলো প্রডাকশন কো-অর্ডিনেটর ... তো ক্রিস্টোফারের সাথে আমরা দুজন আলাপ করে বাকী কাস্টগুলো ঠিক করলাম।

হাসান শাহরিয়ার
ম্যাকবেথ-র অনুবাদ নাকি খুব প্রশংসিত হয়েছিল?

রামেন্দু মজুমদার
খুবই চমৎকার অনুবাদ হয়েছিল। একেবারে ক্ল্যাসিক নাটকের ক্ল্যাসিক অনুবাদ। তৎসম শব্দের এ্যাতো ব্যাবহার করেছেন, অথচ সংলাপ উচ্চারণে কোনো অসুবিধা হয়নি।

হাসান শাহরিয়ার
আশির দশকের আগে পরে এনএসডি বা ঐ ধরনের প্রতিষ্ঠান থেকে পাশ করা নাট্যজনেরা ঢাকায় কাজ করা শুরু করলো ... তো তাদের প্রভাবটা কেমন ছিল, আমাদের থিয়েটারের উপর?

রামেন্দু মজুমদার
দারুণ! এক কথায়, দারুণ একটা প্রভাব ছিল। বিশেষ করে সেট ডিজাইনে ওরা বিপ্লব করে দিল ... এর অগ্রণী ভূমিকা পালন করলো জামিল, সৈয়দ জামিল আহমেদ ... বিভিন্ন নাটকে সেট ডিজাইন করে মাত করে দিল, নির্দেশনাও দিল। ওরা আরেকটা কাজ করলো, সেটা হলো বিভিন্ন দলের হয়ে কর্মশালা পরিচালনা করলো ... আমরা বুঝতে পারলাম যে, থিয়েটার করতে এধরনের কর্মশালার কতটা প্রয়োজন।

হাসান শাহরিয়ার
রামেন্দু দা’ একটা প্রসঙ্গ টানতে চাচ্ছি এভাবে যে, আপনারা যখন নাটক শুরু করলেন তার এক-দেড় দশকের মধ্যে প্রধান নাট্যদলগুলোর নাটকের নিজস্ব একটা ধরণ তৈরি হয়ে গেল ... যেমন ধরুন- আপনাদের নাটক মানে সামাজিক-আশপাশের জীবন নিয়ে তৈরি নাটক, নাগরিকের নাটক মানে দেশ বা দেশের বাইরের সেরা নাটক বা অনুবাদ নাটক, আরণ্যকের নাটক মানে সমাজ ও রাজনীতি সচেতন সমৃদ্ধ নাটক বা ঢাকা থিয়েটার মানে দেশীয়, নিজস্ব নাট্য আঙ্গিক নির্মাণের লক্ষ্যে লোকজ ফর্ম নির্ভর নাটক। তো দর্শক এ বিষটাকে কীভাবে নিল?

রামেন্দু মজুমদার
হ্যাঁ, এটা আমরাও লক্ষ্য করেছি ... তবে বিষয়টা হচ্ছে এমন যে, যেকোনো খেলার ব্যাপারে বিভিন্ন দলের সমর্থক থাকে না, নিজস্ব সমর্থক? এখানেও তাই ঘটেছে। একটা দীর্ঘ সময় ধরে নাটক করতে করতে দেখা গেল প্রধান দলগুলোর কিছু নিজস্ব দর্শক তৈরি হয়ে গেছে ... সেই দলের যে নাটকই হোক না কেন ঐ দর্শকরা সেটা দেখবেই। নাগরিকের দর্শক একটু আলাদা- উচ্চবিত্তের দর্শক, হাই-ফাই দর্শক ... ঢাকা থিয়েটারের নাটক মানে নিরীক্ষা ... তো তরুণ, নিরীক্ষাপ্রিয়, ইন্টেলেকচুয়াল দর্শক হলো তাদের, আবার আরণ্যক হলো বামঘেষা দর্শক বা যারা এখনও মনে করে নাটকের মাধ্যমে সমাজ বদল করা যায় ... আর আমাদের দর্শক হলো, মধ্যবিত্ত মানসিকতার, সমসাময়িক রাজনীতিতে আগ্রহী দর্শক ... মোটামুটি এই হলো মোটা দাগের ক্যাটাগরি। কিন্তু এতে করে দর্শকের কোনো অসুবিধা হয়নি বিশেষ করে আমাদের নাটক, আরণ্যকের নাটক বাংলাদেশের এমন কোনো জেলা বোধহয় নেই যেখানে প্রদর্শিত হয়নি।

হাসান শাহরিয়ার
আপনাদের পাইনিয়র দলগুলোর পর একটা দল বেশ বড় করেই সবার কাছে আসতে পেরেছিল- সেটা হলো ঢাকা পদাতিক ... তো ঢাকা পদাতিকের নাটক বা সোলায়মানভাই সম্পর্কে কিছু বলুন।

রামেন্দু মজুমদার
সোলায়মান খুবই প্রতিভাবান নাট্যকর্মী ছিল। বিশেষ করে ওর গান ... আমিতো বলবো একটু আগে যে একেক দলের নাটকের ধরণ বলছিলাম, সেখানে এটাও আসা উচিত যে, সোলায়মানের নাটক মানে গান-সমৃদ্ধ নাটক ... সে কারণে এই নাটকগুলো প্রকৃত অর্থেই ‘থিয়েটার’ হতো। আর ঢাকা পদাতিক যে কাজগুলো করলো তার সবগুলো ভালো প্রযোজনা, কিন্তু একটা নাটক এ সব কিছুকে ছাড়িয়ে যায় তাহলো- বিষাদসিন্ধু। ওফ্ ক্লাসিক প্রোডাকশন। এবং এর সিংহভাগ কৃতিত্ব কিন্তু আমি দেব জামিলকে। আমি সব সময় বলি যে, যখন বিষাদসিন্ধু হয়, তখন কিন্তু ঐ দলে কোনো টিভি স্টার ছিল না, কিন্তু দর্শক হুমড়ি খেয়ে পড়তো। আর কনটেন্টটা একবার ভাবো, এমন একটা সেন্সেটিভ বিষয়কে হ্যাণ্ডেল করা যা-তা কথা না। এর স্ক্রীপ্ট করাতেও বিপ্লব বালা দারুণ পারদর্শিতা দেখিয়েছে।

হাসান শাহরিয়ার
আমরা যে সময়টার কথা বলছি সে সময়ের আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল- এরশাদবিরোধী আন্দোলন ... সে সময় পথনাটক করা প্রায় অনেক দলের জন্যই অনিবার্য ঘটনা ছিল ... সে ব্যাপারে কিছু বলুন।

রামেন্দু মজুমদার
ঐ সময়ের দাবী ছিল যে, আমরাও রাজপথে থাকবো ... কিন্তু আমার মনে হয় তখন পথনাটক করতে গিয়ে একটা অকাজ হয়েছে- সেটা হলো প্রচুর নিম্নমানের নাটক প্রদর্শিত হয়েছে। খুবই নিম্নমানের ... মানে এমনও হয়েছে যে, শহীদ মিনারে নাটক হবে, আমরাই সেন্সর করছি যে এমন বিচ্ছিরি নাটক করা যাবে না ... আর একই থিম, এরশাদ, অঘোষিত স্ত্রী মেরী, কথিত সন্তান ইত্যাদি। তবে এর মধ্যেও দু’টো দল ছিল যারা প্রকৃত অর্থে পথনাটকেও শৈল্পিক জায়গাটা বজায় রাখতো- এরা হলো কারক, শংকর সাওজালের দল আরেকটা হলো দেশ নাটক।

হাসান শাহরিয়ার
তখন আইটিআই এবং ফেডারশান কী কী কাজ করছিল?

রামেন্দু মজুমদার
ফেডারেশান আসলে তৈরি হলো নাট্যদলগুলোর বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের জন্য ... মানে দলের স্বার্থ  দেখা ওর কাজ আর আইটিআই হলো সামগ্রিক উৎকর্ষতা বাড়াবার জন্য। যেমন আমরা চাই আর্ন্তজাতিক মানের সেমিনার হবে, ওয়ার্কশপ হবে এমনকি নাট্যোৎসব হবে ... এবং এগুলো করবে আইটিআই। দেশের ভাবনা চিন্তার গণ্ডি পার হয়ে আন্তর্জাতিক নাটক বা ভাবনার সাথে পরিচিত হওয়া। আমরা করেছিও, অনেক সেমিনার করেছি, প্রকাশনা করেছি ... ২০০১ সালেতো ঢাকার সাত জায়গা থেকে একসাথে ... মানে প্রতি সন্ধ্যায় সাত জায়গায় নাটক করে নাট্যোৎসব করেছি। বাইরের দল এসেছে, তাদের সাথে আমাদের ছেলে-মেয়েরা মিশতে পেরেছে ... ওরাতো অবাক হয়ে গেছে যে, বলছে যে তোমরা প্রফেশনাল দল না আবার যেভাবে, যে ডিভোশন নিয়ে কাজ করছো এটাকে এ্যামেচার বলি কী করে? সবতো প্রফেশনাল কাজ। আবার আমরা কিছু পাবলিকেশন করি- দা ওয়ার্ল্ড অব থিয়েটার এর মধ্যে একটা ... এটাতো বাইরে খুব নাম করেছে যে, বাংলাদেশ কেন্দ্র দুবছর পরপর এমন একটা উন্নতমানের প্রকাশনা করতে পারে।

হাসান শাহরিয়ার
আপনারা অনেকেই বিভিন্ন সম্মেলনে যান ... তো সেখানে যাওয়ার সুযোগটা কীভাবে দেন, মানে কে যাবে সেই সিলেকশনটা কে বা কীভাবে করেন?

রামেন্দু মজুমদার
হ্যাঁ, আমার ধারণা, এটা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি আছে, সেটা হলো আমরা নিজেরাই সুযোগ নিচ্ছি কিনা। তো ভালোই হলো পরিষ্কার করে নিই ... সেটা হলো ওদের যখন আমন্ত্রণপত্র আসে, বলা হয় যাওয়া-আসা এবং অনেক সময়ে সেখানে হোটেলে থাকা- এসব কিছুর খরচ বহন করতে হবে ব্যক্তিকে। ফলে যাওয়ার সময় মনে হয় যে, আমি যাচ্ছি বা আতাউর যাচ্ছে বা বাচ্চু যাচ্ছে ... আসলে কিন্তু আমরা আমাদের খরচেই যাচ্ছি। বরং বলে নেয়া ভালো অনেক সময় আমরা অফার করি কিন্তু খরচের কারণে অনেকে রিফিউজ করে। আমন্ত্রকদের টাকায় আমরা কেবল কয়েকজন তরুণ নাট্যকর্মীকে ওয়ার্কশপে পাঠাতে পেরেছিলাম। এই যে আমি গত দশবছর ধরে কেন্দ্রী নির্বাহী পরিষদে আছি, প্রতিবার প্যারিস বা অন্যকোথাও সভায় যেতে আমাকে নিজ খরচে যেতে হয় এবং সকল ক্ষেত্রে সেখানে থাকা-খাওয়ার খরচও নিজের পকেট থেকে যায়।

হাসান শাহরিয়ার
আপনার তৈরি করা ফেডারেশানের বর্তমান অবস্থাকে আপনি কীভাবে দেখেন? আপনার কি মনে হয় সঠিক পথে চলছে, নাকি মনে হয় অনেক কাজ আছে যেগুলো ফেডারেশানের করার দরকার নেই তবুও তারা সেগুলো করে ওভার লোডেড হয়ে যাচ্ছে?

রামেন্দু মজুমদার
আগে ফেডারেশানের কাজ খুবই সীমিত ছিল, এবং আমি মনে করি আবারো কিছুটা সীমিত করে ফেলা উচিত। তা না হলে ফেডারেশানের কাছে প্রত্যাশা কেবল বেড়েই যাবে। সে শুধু দেখবে নাট্যদলের কী কী অসুবিধা আছে ... তার কাজ না দিবস উদ্যাপন করা, টেলিভিশনে নাটক করানো ইত্যাদি। আর অর্থের ব্যাপারে সব কাজের জন্যে বেঙ্গল ফাউন্ডেশানের উপর নির্ভর করতে হবে কেন? নিজের টাকায় চলতে শিখতে হবে। তা না হলে ফেডারেশানের সংগ্রামী চরিত্রটি নষ্ট হয়ে যাবে। উন্নতমানের নাটকগুলো যেন বেশি অভিনয়ের সুযোগ পায়, তার চেষ্টা করা উচিত ফেডারেশানের। সদস্য সংখ্যা কেবল বাড়িয়ে লাভ নেই, মানটাই বিচার্য হওয়া উচিত।

হাসান শাহরিয়ার
সংগঠক হিসেবে আপনার ব্যাপারে আমাদের ধারণা কিন্তু আকাশচুম্বী। বেশি বেশি করেই আপনি আমাদেরকে এমন ধারণায় এনেছেন, আমাদের কোনো দোষ নেই হাঃ হাঃ ... তো একটা কথা আমি একটু জানতে চাই যে, নাট্যচর্চার পনের বিশ-বছর পার হওয়ার পর, দেশ বিদেশের অনেক ভালো ভালো মঞ্চ দেখার পর আপনাদের মনে হয়নি যে, এই এক মহিলা সমিতি মঞ্চে নাটক করে আসলে আমাদের নাট্যচর্চাকে বাঁচানো যাবে না? নিজস্ব ভালো মঞ্চ প্রয়োজন?

রামেন্দু মজুমদার
অবশ্যই নিজস্ব মঞ্চের প্রয়োজন শুরু হয়েছে অনেক আগেই। কিন্তু শাহরিয়ার একটা কথা একটু স্বীকার করে নিলে ভালো হয় যে, আমরা মঞ্চ চাই মঞ্চ চাই বলে যত রাস্তায় চিৎকার করেছি, সাংগঠনিকভাবে তা করতে পারিনি। সঠিক রাস্তায় না গিয়ে খামাকা দশ-বিশ টাকা চাঁদা তুলেছি আর বলেছি সরকারের উচিত নাট্যশালা নির্মাণ করে দেয়া। আমি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের উদাহরণটা সবাইকে দিই যে, অনেক বড় কাজও কিন্তু একেবারে একা করা সম্ভব- তার প্রমাণ হলো আবদুল্লাহ আবু সায়ীদভাই। ঠিক যেখানে যেখানে গেলে কাজ হবে তিনি কিন্তু সেখানে সেখানেই গেছেন, আবোল তাবোল ঘুরে বড় কাজ করা সম্ভব না।

হাসান শাহরিয়ার
আপনি তাহলে এখন কী ভাবছেন, এমন বড় কাজতো করতে হবে তাই না? একটু পেছনে ফিরে যাই ... হয়তো এন.এস. ডি-য়ানদের কাজ দেখে অনুপ্রাণিত হয়েই আপনি ‘থিয়েটার স্কুল’ করেছিলেন। তার প্রসার আর ব্যাপ্তি নিয়ে বলার কিছু নেই, আমরা সবাই জানি কত বড় আয়তনের আর কত বড় মাপের কাজ আপনি করছেন। আমি বলতে চাচ্ছি আপনার ‘থিয়েটার স্কুল’ নিয়ে কি স্থায়ীভাবে বড় কিছু ভাবতে পারেন না বা যদি ভেবে থাকেন তা কি আমাদের একটু জানাবেন?

রামেন্দু মজুমদার
আমার অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছি যে, এজাতীয় কোনো স্থায়ী বড় কাজ বেশি মানুষ নিয়ে হয় না। একা বা অল্প লোক নিয়ে করতে পারলে সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এখন আমার কেবল ‘থিয়েটার স্কুল’ নিয়ে একটা স্বপ্ন আছে ... এই স্কুলের জন্য একটা নিজস্ব ভবন তৈরি করতে চাচ্ছি। থিয়েটার স্কুলের যে প্রসার হয়েছে ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে সেটা চালাতে প্রচুর টাকার প্রয়োজন হচ্ছে। অনুদান নিয়ে নিয়ে আসলে ... মানে সুস্থিরভাবে কাজ করতে পারি না, তাই ভাবছি এককোটি টাকার একটা ফান্ড তৈরি করবো। ঐ টাকাটা ব্যাংকে রাখলে মাসে মাসে যা আসবে তাই দিয়ে চলে যাবে। ... তো প্রথমেই কবীর চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রী দশ লাখ টাকা দিয়েছেন, টেলিরিয়েলের ইউসুফ বাবু বছরে এক লাখ করে দিচ্ছেন। আর আমরা তিনটা ক্যাটাগরি করেছি- দশ লাখ, পাঁচ লাখ আর এক লাখ করে লোক জনের কাছে চাইবো ... আমার ধারণা এক কোটি টাকা তোলা সম্ভব হবে। আর আমাদের যে মহড়া কক্ষটা ছিল বেইলী রোডে ... সেটা ভেঙে ফ্ল্যাট বানানো হচ্ছে, তো আমরা তাদের বলেছি যে, গ্যারেজের উপরের ফ্ল্যাটটা যদি সম্ভব হয় আমরা কিনে নেব ...যদি তিন-চারটা রুম করতে পারি তাহলে সেখানে স্কুলের ক্লাশগুলো নেয়া যাবে। একটা জায়গা বরাদ্দ পেয়েছিলাম শেখ হাসিনা যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, বেইলী রোডেই একটা পরিত্যক্ত সম্পত্তি। ওটা এনএসআই’র অফিস, থিয়েটার স্কুলের নামে এলট করেছিল, কিন্তু এনএসআই-কে সরাতে পারিনি তাই সেটা আর পাওয়া হয়নি। বেশি ভালো জায়গায় হাত পড়াতে এমন হলো হাঃ হাঃ ... যাক আমার মনে হয় যদি কোনো পরিত্যক্ত জায়গা পাই তাহলে বিল্ডিং করার মতো টাকা জোগাড় করতে পারবো। সেখানে একটা স্টুডিও থিয়েটারও থাকবে।

যেটা বলতে চাচ্ছি, সেটা হলো এ সব কাজে সবার সহযোগিতা নেব কিন্তু উদ্যোগটা থাকবে সীমিত লোকের ... তা না হলে অতি সন্নাসীতে গাজন নষ্ট হবার সম্ভাবনা। এটা আমার অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি।

হাসান শাহরিয়ার
আপনি ইংরেজি সাহিত্যের লোক, কলেজে পড়িয়েছেন, নাটক বোঝেন ... তো আপনি নাটক অনুবাদে গেলেন না কেন?

রামেন্দু মজুমদার
কিছু কিছু করেছি, আগেই বলেছি। আসলে নাটক লেখায় আমি মানে ...

হাসান শাহরিয়ার
মৌলিক না হোক, অনুবাদ করতে পারতেন।

রামেন্দু মজুমদার
আসলে আমার কাছে মনে হয় জীবনে বাজে কাজে এ্যাতো সময় নষ্ট করেছি যে, ক্রিয়েটিভ কাজগুলো করা হয়নি। সাংগঠনিক কাজ যে কীভাবে ক্রিয়েটিভিটি নষ্ট করে ... তবে হ্যাঁ. একটা লোককে আমি ঈর্ষা করি তিনি হলেন- আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। এ্যাতো বড় একজন  সংগঠক তবুও ক্রিয়েটিভিটির কোনো ক্ষতি হতে দেননি।

হাসান শাহরিয়ার
দাদা, কথায় বলেছিলেন যে, আপনার মনে হয়েছে যে- দল যখন পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নিয়ে সিউল গেল, তখনই দল ভাঙার বীজ রোপিত হলো, বিষয়টা একটু পরিষ্কার করবেন কি?

রামেন্দু মজুমদার
পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নাটকে ২৫-৩০ জনের কাস্ট ছিল। কিন্তু যেহেতু ১৫-১৬ জনের বেশি যাওয়া যাবে না, তাই অনেককে বাদ দিয়ে অনেককে দিয়ে ডাবল ক্যারেক্টার তোলা হয়েছিল। তো এতে করে অনেকের মধ্যেই ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু যাওয়ার আগে ব্যস্ততার কারণে ঐদিকে নজর দিইনি ... পরে যখন ফিরে আসলাম, তখন অনেকের আচরণ দেখে আমি বুঝে ফেললাম যে, ব্যাপারটা বহুদূর গড়াতে পারে। পরে একদিন দেখা গেল যে একজন গুরুত্বপূর্ণ অভিনেতা না জানিয়ে শো’র দিন অনুপস্থিত থাকলেন। ইচ্ছা করেই অনুপস্থিত থাকলেন।

বিপ্লব বালা
শো’র দিন!

রামেন্দু মজুমদার
হ্যাঁ, তখন আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে, কিছু ডিসিপ্লিনারী এ্যাকশন নিতে হবে। তো তখন আমাদের সাতজনের একটা নির্বাহী কমিটি ছিল ... বলা হলো যে, সাতজনের মেম্বারশীপ ছাড়া সবার মেম্বারশীপ বাতিল করা হলো এবং যে যে দল করতে চায় সে যেন আবার নতুন করে ফর্ম পূরণ করে জমা দেয়। তো এটা অনেকে মেনে নেননি ... তারা কবীর চৌধুরী সাহেবের কাছে আবেদন করলো যে, না কোনো কারণ ছাড়া মেম্বারশীপ বাতিল করার কোনো ক্ষমতা কারোর নেই। আপনারা এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করুন। কিন্তু আমরা আমাদের সিদ্ধান্তে অনড় রইলাম। ... একটা কথা বলি শাহরিয়ার আর বিপ্লব, যে আমার কাছে কিন্তু মনে হয় এই অনড় থাকাটা আমাদের উচিত হয়নি, কারণ ওদের  সাথে কথা বলে একটা সমঝোতায় আসা যেত এবং শৃঙ্খলা আরোপের হয়ত ভিন্ন পন্থা নেয়া যেত।

হাসান শাহরিয়ার
ঐ সাতজন কে কে ছিলেন?

রামেন্দু মজুমদার
গোলাম রাব্বানী, কাজী তামান্না, আরিফুল হকের কথা কেবল এখন মনে পড়ছে। তারপর দেখা গেল চারভাগের তিনভাগই আবার পরে মেম্বার হলো আর কেউ কেউ হলো না। তারপর ১৯৮২ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর একটা সাধারণ সভা হলো সেখানে দেখলাম ১৭জন অনুপস্থিত। পরে দেখলাম যে, আরিফুল হকের নেতৃত্বে ঐ ১৭জন রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানীতে ‘থিয়েটার’ নামে একটা সংগঠন তারা রেজিস্ট্রি করে ফেলে। এর আগে কিন্তু কোনো রেজিস্ট্রি করার প্রয়োজন ছিল না। তো আমরাতো বেকায়দায় পড়ে গেলাম ... ওরা বলছে যে ওরা লিগ্যাল দল, আর ওরা দেখিয়েছে যে, ১৯৭২ সালে ওরা দল করেছিল তারই ধারাবাহিকতায় এখন এসে রেজিস্ট্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ... তো সেখানে কিন্তু তারানা হালিমের নামও ছিল এবং ১৯৭২ সালে ওর বয়স কত হবে, ধরো চার কি পাঁচ ... তো ব্যাপারটা হাস্যকর না? তো আমরাও কোর্টে গেলাম ... এরমধ্যে একদিন ওথেলো করার সময় ওরা সমন নিয়ে এলো যে শো বন্ধ করতে হবে। এভাবে অনেকদিন চললো। আমরা কী করি ... তখন আমাদের যে লোগোটা আছে ‘থিয়েটার’ নাম দিয়ে, সেটা আবার আমি আমার নামে কপিরাইট করে ফেললাম। তখন কিন্তু আমি আবার বলতে পারতাম যে, তারা যেন এই লোগো ব্যবহার না করে ... কিন্তু আমি আর ওপথে গেলাম না। এরপর তারা আরেকটা কাণ্ড করেছিল ... আমাদের ওথেলো-র শো হবে আমরা বিজ্ঞাপন দিয়েছি, ওরা আবার ঠিক শো’র আগের দিন ইত্তেফাকে  গিয়ে থিয়েটারের পরিচয় দিয়ে বিজ্ঞাপনের কপি বদলে দিল যেখানে লেখা হলো- ‘অনিবার্য কারণে আজকের ওথেলো’র প্রদর্শনী হবে না’- হাতের লেখায় দিল, আমরা বুঝতে পারলাম এটা কার হাতের লেখা ... যাক এভাবে আস্তে আস্তে দুই থিয়েটার-ই কাজ করা শুরু করলাম। এসময় মমতাজ উদদীন আহমেদ পত্রিকায় লিখলেন যে- আমি, ফেরদৌসী আর আবদুল্লাহ আল-মামুন যেদিকে আছি উনিও সেদিকে থাকবেন ... কিন্তু পরে দেখি যে উনিও আরিফুল হকের সাথে ভিড়েছেন। পরে কিন্তু আরিফুল হকও দল করেননি, তিনি ওখান থেকে চলে গেলেন। আইপিটিএ করা আরিফুল হক জাতীয়তাবাদী প্রতিক্রিয়াশীল বুদ্ধিজীবী হলেন, ইনকিলাবের লেখক হলেন এবং এখন বোধহয় বিদেশে চলে গেছেন।

হাসান শাহরিয়ার
পরেতো আবারও ভাঙলো।

রামেন্দু মজুমদার
হ্যাঁ, দ্বিতীয়বার ভাঙনের মুখে পড়ি আমরা ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ করার সময়। তখন আমাদের দল আনঅফিসিয়ালী দুটা দল হয়ে গেছে, ভেতরে ভেতরে। তো কৃষ্ণকান্তের উইল-র সময় বলা হলো যে, সবাইকে সমান সুযোগ দিতে হবে ... কেউ কেউ সবসময় বয়স্ক চরিত্র করবে আর কেউ কেউ ... মানে অনেক কথা। তো একদিন মিটিং-এ অপমানজনক কিছু কথাবার্তা বলে ফেললো, তখন আমিই প্রস্তাব দিলাম যে, এভাবে আর হয় না ... সমঝোতার মাধ্যমে আমরা দল ভাগ করে ফেলি। দলের কিছু চেয়ার টেবিল ছিল এগুলো ভাগ করে বলা হলো যে যে যার মতো দল করো, একসাথে থাকার দরকার নেই। তখন খায়রুল আলম সবুজ, সুরুজ ওরা আলাদা হয়ে গেল।

হাসান শাহরিয়ার
তখনকার দলে কোনদিকের সদস্য বেশি ছিল?

রামেন্দু মজুমদার
ওরাই বেশি ছিল। প্রথম যখন ভাঙে, আমরা বেশি ছিলাম আর এবার ওরা বেশি ছিল। তো এভাবেই ওরা তৃতীয় থিয়েটার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলো হাঃ হাঃ।

হাসান শাহরিয়ার
না কিন্তু যেহেতু সবুজভাইরা কমিটিতে বেশি ছিলেন, তাহলেতো ওনারা বলবেন যে, আপনারা ‘তৃতীয় থিয়েটার’ হাঃ হাঃ-

রামেন্দু মজুমদার
হ্যাঁ, তা ঠিক। সবার নাম এক, লোগো এক ... বিব্রতকর অবস্থা। তারপরও যদি প্রতিষ্ঠাতাদের দিকে তাকানো যায় তাহলে কেবল তবিবুল ইসলাম বাবু এক থিয়েটারে কাজ করতো ... মানে সে-ও কিন্তু এখন নতুন দল করেছে, ‘নাট্যজন’ ... নতুন দল করলে নতুন নাম দিয়ে করাটাই হলো যোগ্যতা ... তো ওকে বাদ দিলে আর সবাই কিন্তু আমাদের দলের, মানে আমি কবীর চৌধুরী, মামুন আর ফেরদৌসী ... যাই হোক তারপরও আমি একবার উদ্যোগ নিলাম যে, আমাদের দলের নামটা পরিবর্তন করে ফেলবো ... ইতোমধ্যে আমরা আবার ঐ থিয়েটার কমপ্লেক্সটা ভাড়া নিয়ে কাজ করছি ... তো নাম পরিবর্তন করবো, তাই প্রেস কনফারেন্স ডাকলাম। তার আগের দিন আমাদের মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর, একেবারেই রাজী না, সে বলে এটা কোনোভাবেই সম্ভব না, আমরা সবাই তার কথায় সম্মত হলাম, ফলে আর পরিবর্তন করা হয়নি।

বিপ্লব বালা
তারিক আনাম খানের ব্যাপারটা কী ছিল?

রামেন্দু মজুমদার
তারিক দলে আসার পরপরইতো সিউল গেল ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ করতে, তারপর ওথেলো-র প্রধান চরিত্র করলো, তারপর এখনও ক্রীতদাস করলো, ‘যুদ্ধ এবং যুদ্ধ’ নির্দেশনা দিল ... তো ’ও কিন্তু দলের অবলম্বন হয়ে উঠলো। এরপর সে একটা হাসির নাটকের নির্দেশনার কাজে হাত দিল ‘বিচ্ছু’। ঐ সময় সে রিহার্সেলের সময় নিয়ে এবং আরো কিছু কিছু ব্যাপারে কিছু সিদ্ধান্ত নিচ্ছিল যা দলকে জানাচ্ছিল না। ফলে আমরা এক সময় বললাম যে, তুমি যেসব সিদ্ধান্ত নাও সেগুলো আগে দলের সাথে আলাপ করে নিও। এতে করে ও খুব মনোক্ষুণœ হয়েছিল। এবং একদিন দেখি যে, বড় এক চিঠি নিয়ে হাজির যে- আমি ব্যক্তিগত কারণে থিয়েটার থেকে পদত্যাগ করছি। পরে অবশ্য ঝুনা চৌধুরী আর মেঘনাও পত্র দিল, তৌকীরও দিল। তারিকের ভেতর সেই শক্তি ছিল সে কারণে সে দল ত্যাগ করে নতুন নাম দিয়ে দল করলো ‘নাট্যকেন্দ্র’।

বিপ্লব বালা
শুনেছি আপনি যখন থিয়েটার স্কুল করেন, তারিক বোধহয় চেয়েছিল যে, স্কুলটাতে ভালোভাবে জড়িত থাকতে, কারণ ’ও এনএসডি-তে পড়াশুনা করেছে ’ও হয়তো ভেবেছে যে, এধরনের বড় কাজে সে ইনভলব থাকবে ...

রামেন্দু মজুমদার
হ্যাঁ, আমি ভুলে গিয়েছিলাম, তারিকের মূল ক্ষোভটা ছিল থিয়েটার স্কুল নিয়ে (প্রকাশ্যে ’ও অধ্যক্ষ বা উপাধ্যক্ষ হবার কথা বলেনি)। কিন্তু আমাদের ওটা সম্ভব ছিল না। আমরা কবীর চৌধুরীকে অধ্যক্ষ এবং আবদুল্লাহ আল-মামুনকে উপাধ্যক্ষ করলাম। যাই হোক, তারিক কাজ করছে ... এখনো ভালো ভালো কাজ করছে ... কিন্তু সবুজ আর সুরুজ অনেকটা জেদের বশেই দলটা ভেঙেছে বলে আমি মনে করি। এখন কিন্তু ওদের থিয়েটার সেভাবে চলছে না, তাই না? এবং যারা ওদের সাথে গিয়েছিল, অনেকে নাটকই ছেড়ে দিয়েছে।

হাসান শাহরিয়ার
আচ্ছা দাদা, আমরা একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি ... একজন নব্য সম্পাদক হিসেবে বলছি ... মানে আমি যেহেতু একটা পত্রিকা বের করি, তা যত ছোটই হোক না কেন, শত-হলেও সম্পাদকতো হাঃ হাঃ ... তো আপনি এ্যাতো বছর ধরে কীভাবে এই পত্রিকাট বের করেই যাচ্ছেন, বের করেই যাচ্ছেন? আর একটি প্রশ্ন হলো যে, এর মধ্যে কি আপনি হতাশায় পড়েননি যে, যাহ্ আর পত্রিকা বের করবো না?

রামেন্দু মজুমদার
প্রথমে অবশ্য খুবই রেগুলার ছিল, বছরে চারটা সংখ্যা বের করতাম। কিন্তু পরবর্তীকালে খরচ বেড়ে গেল ... এমনিতে লেখা পাওয়ার ব্যাপারে কিন্তু আমাদের তেমন বেগ পেতে হয়নি ... কারণ, যারাই লিখতো, তারাই অন্তত এটা ভাবতো যে, এই পত্রিকায় লেখা ছাপলে নিজেরও সুনাম হবে ... এবং বিশেষ করে নাটকতো বটেই ... যদিও দুঃখজনক ব্যাপার হলো আমরা কিন্তু সম্মানী দিতে পারিনি। তারপরও বলি যে বিজ্ঞাপন জোগাড় করা যে কী পরিমান ডিফিকাল্ট ভাবাই যায় না ... আমি এটা বলতে পারি যে, আজ পর্যন্ত ‘থিয়েটার’ পত্রিকায় যতগুলো বিজ্ঞাপন বেরিয়েছে তার সব ক’টির জন্য ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজে গিয়েছি ... খুবই কঠিন কাজ, তো এখন কেউ কেউ সহানুভূতিশীল হয়ে রেগুলার বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। এটা হচ্ছে আমি একজন বিজ্ঞাপনী সংস্থার প্রধান হয়েও এই অবস্থা ... সে জায়গা থেকে আমি স্পষ্টই টের পাচ্ছি যে, তোমরা যারা এই পেশার নও, তাদের বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করা কত কঠিন কাজ। তবে শত হতাশার মধ্যেও কখনো মনে হয়নি যে পত্রিকাটা বন্ধ করে দেব।

হাসান শাহরিয়ার
আপনার কী মনে হয়, বিগত দিনের অনেক কাজের মধ্যে ব্যর্থতার জায়গাগুলো কী কী?

রামেন্দু মজুমদার
ব্যর্থতার সংখ্যাইতো বেশি- হাঃ হাঃ। একটা কথা আমার ইদানিং মনে হয় যে, আমি যদি জীবনটা আবার প্রথম থেকে শুরু করতে পারতাম তাহলে অনেক কাজ বাদ দিতাম ... যেমন আমি যৌথভাবে অনেক কাজ করতাম না, মঞ্চ চাই মঞ্চ চাই বলে রাস্তা-ঘাটে চিৎকার করতাম না। সায়ীদভাইয়ের মতো নীরবে সঠিক জায়গায় গিয়ে কাজটা করতাম। ... এসবে অযথা অনেক সময় নষ্ট হয়েছে ...

হাসান শাহরিয়ার
আপনারতো আবার শুরু করা সম্ভব না, তো আমরা যদি ঠিক একই ভুল করতে থাকি তাহলে আপনার কাজ হবে আমাদের বাধা দেয়া ... তো এমনকি কারো ভেতরে দেখেন?

রামেন্দু মজুমদার
যেমন আমি লিয়াকত আলী লাকীকে বলি যে তুমি এ্যাতোগুলো দোকান খুলে বসে আছ কেন? তোমার জায়গায় আমি হলে কেবল ঐ যে শিশুদের একটা সংগঠন আছে ... ‘চিল্ড্রেন্স থিয়েটার’ ... শুধু ঐটাই নিয়ে থাকতাম। ওটা যে কী বিশাল কাজ, সারা দেশে শাখা আছে ওরা উৎসব করে ... মানে এলাহি কাণ্ড! তো এমন একটা কাজ করলেইতো হয়।

হাসান শাহরিয়ার
কিন্তু লাকীভাই যদি বলে যে- আপনার দোকানের সংখ্যাওতো কম না, হাঃ হাঃ ... মানে নাট্যদল, ফেডারেশান, আইটিআই, সাংস্কৃতিক জোট, থিয়েটার স্কুল আর সর্বোপরি ‘থিয়েটারে’র মতো একটা পত্রিকার সম্পাদক ... তখন আপনার জবাব কী হবে?

রামেন্দু মজুমদার
হাঃ হাঃ ... তা ঠিক, সেজন্যইতো আমার রিয়েলাইজেশন হচ্ছে আমি ভালোভাবে কোনোটাই করতে পারিনি। তবুও আমাদের সময়টা অনেক সহজ ছিল ... তোমরা আরো কঠিন সময় পার করছো, তাই আমার কথা হচ্ছে- তোমরা যারা নতুন আছো, তোমরা সব কাজ করার চেষ্টা করো না। একটা দুটা কাজ করবে কিন্তু সফলভাবে করবে। আধা-আধি কাজের কোনো মূল্য নেই।

হাসান শাহরিয়ার
আপনার কাজের স্বীকৃতি কতটুকু পেয়েছেন বলে আপনি মনে করেন?

রামেন্দু মজুমদার
কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির প্রত্যাশা করে আমি কাজ করি না। সেজন্য আমার হতাশা কম। আমি কেবল কাজ করে যেতে চাই। সময়ই বিচার করবে, আমি কিছু করতে পেরেছি কিনা। রাষ্ট্রীয় কোনো স্বীকৃতি আমি পাইনি এবং সেটা পাবার কোনো সম্ভাবনা নেই। একুশে পদকের জন্য অনেক প্রার্থী যেভাবে তদবির করেন, তা দেখলে লজ্জাই লাগে। এসব পদক আসবে অপ্রত্যাশিতভাবে, তবেই সত্যিকারের আনন্দ হবে। তবে সহযোগী দলগুলোর বেশ কয়েকটি স্বীকৃতি আমি লাভ করেছি। যেমন- ঢাকা থিয়েটারের মীর মকসুদ-উস-সালেহীন-বজলুল করিম সম্মাননা, লোক নাট্যদল পদক, বহুবচন থিয়েটারের ইকবাল হোসেন স্মৃতি পদক, কোলকাতার অচিন্ত্য স্মারক সম্মান এবং আমাদের দলের মুনীর চৌধুরী সম্মাননা ইত্যাদি।

হাসান শাহরিয়ার
একটা কথা প্রায় প্রচলিতই আছে যে- বিনোদিনী বা গিরিশ বাবুরা পাগলের মতো থিয়েটার করেছে, তারপর বলা হয়- শম্ভু বাবু বা উৎপল দত্ত বা বিজন বাবুরা পাগলের মতো থিয়েটার করেছে, তারপর আমরা শুনছি যে- আপনারা স্বাধীনতার পর পাগলের মতো থিয়েটার করেছেন ... তো এই পাগলদের উত্তরসূরী হিসেবে আমাদের প্রজন্মে কী কোনো পাগল খুঁজে পান?

রামেন্দু মজুমদার
অবশ্যই, চট্টগ্রামের আহমেদ ইকবাল হায়দার পাগলামী করছে, আজাদ আবুল কালাম, মানে পাভেল পাগলামী করছে, মুকুল পাগলামী করছে, আশীষ খন্দকার পাগলামী করছে ... অনেকেই আছে এ-মুহূর্তে ... আসলে নাম মনে আসছে না ... পাগলামী করছে বলেই আগামীতে আমাদের থিয়েটারটা এগিয়ে যাবে বলে আমার বিশ্বাস। পাগলামী না করেও ধীরস্থিরভাবে মাসুম রেজা কী চমৎকার নাটক লিখছে। খোকন কী সুন্দর আলো করছে। আবদুল্লাহ আল-মামুন, মামুনুর রশীদ, আতাউর রহমান, নাসির উদ্দীন ইউসুফ, তারিক আনাম খান বা লিয়াকত আলী লাকীর মতো পুরনোদের কথা তো বলার অপেক্ষা রাখে না।

হাসান শাহরিয়ার
সেন্টার ফর এশিয়ান থিয়েটার বা সিএটি’র কাজগুলো কতটুকু প্রফেশনাল থিয়েটারের কাজ বলে আপনার মনে হয়?

রামেন্দু মজুমদার
সিএটি-র প্রযোজনা অবশ্যই প্রফেশনাল এবং উন্নতমানের। তবে তারা যে সবসময় দাবি করে তারাই একমাত্র প্রফেশনাল থিয়েটার করছে, সে সম্পর্কে আমার আপত্তি আছে। সম্পূর্ণ বিদেশি দাতা সংস্থার অনুদানের উপর ভিত্তি করে প্রফেশনাল থিয়েটার করা যায় না। নোরাডের টাকা বন্ধ হয়ে গেলে তাদের প্রফেশনাল থিয়েটারের কী হবে? আরেকটা ব্যাপারে আমার আপত্তি আছে। নোরাড সিএটিকে একটি প্রযোজনার জন্য ১৫ লাখ টাকা না দিয়ে ১০টি দলকে দেড় লাখ টাকা করে দিলে তাদের দিক থেকে আরো বেশি ফল পেতে পারতো। সিএটির সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ব্যয়বহুল প্রযোজনার জন্য দাতা সংস্থার (প্রধানত নোরাড) অনুদান জোগাড় করা।

হাসান শাহরিয়ার
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেতো সাবজিডাইজড থিয়েটার হয় ... আমাদের দেশেও আছে, যেমন- যে শিল্পকলা একাডেমীর মঞ্চ আমরা ৩৪০০ টাকায় ব্যবহার করি নিশ্চয়ই এটা এ্যাতো শস্তা হওয়ার কথা না, আবার পত্রিকায় বিজ্ঞাপনের ব্যাপারেও মালিক সাবসিডি দেন ... তো নীলুভাই যদি বলেন যে, নরওয়ে সরকার তাকে সাবসিডি দেন, ফলে বেশি খরচ করা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে, তখন কী বলা যাবে? মানে ওনার নাটকের মান নিশ্চয়ই ভালো?

রামেন্দু মজুমদার
নীলু একটা নাটকে যত ইচ্ছা খরচ করতে পারে তাতে আমার বলার কিছু নেই। তবে রোজার মাসে যখন কেবল প্রদর্শনী সংখ্যা বাড়াবার জন্য খালি হলে একের পর এক প্রদর্শনী করে, তখন আমরা যারা প্রচণ্ড কষ্ট করে টাকা সংগ্রহ করে প্রযোজনা করি তাদের খারাপ লাগে বৈ কি। সিএটি-র সাথে অন্যান্য গ্রুপ থিয়েটারের দলগুলোর প্রতিযোগিতা একই বাস্তবতার জায়গা থেকে হচ্ছে না।

হাসান শাহরিয়ার
এ পর্যায়ে আসলে আমরা বোধহয় শেষ করতে পারি। রামেন্দু দা’, আপনি আমাদেরকে অনেক সময় দিয়েছেন, অনেকদিন ধরে দিয়েছেন,  থিয়েটারওয়ালার পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ।

রামেন্দু মজুমদার
তোমাকে, বিপ্লব বালাকে আর সব নাট্যজনকেও আমার শুভেচ্ছা। ধন্যবাদ।