Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

ঢাকার থিয়েটারে নাট্যকার-নির্দেশক : সরাসরি দর্শকের মুখোমুখি

Written by অনুলিখন .

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

[গত ৪ মার্চ ২০০৫, শুক্রবার সকাল ১০:৪৫ মিনিটে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, ঢাকা’র এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে আয়োজন করা হয় এক মুখোমুখি অনুষ্ঠানের। উন্মুক্ত এই মুখোমুখির শিরোনাম ছিল ‘ঢাকার থিয়েটারে নাট্যকার-নির্দেশক : সরাসরি দর্শকের মুখোমুখি’। অনুষ্ঠানে সরাসরি দর্শকের মুখোমুখি হন বিশিষ্ট নাট্যকার ও নির্দেশকগণ। এঁরা হলেন- আবদুল্লাহ আল-মামুন, আতাউর রহমান, আলী যাকের, মামুনুর রশীদ, সেলিম আল দীন, নাসির উদ্দিন ইউসুফ আর সৈয়দ জামিল আহমেদ। অনুষ্ঠানে দেশের আরেক বরেণ্য নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক-এর মুখোমুখি হবার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তিনি উপস্থিত থাকতে অপারগতা প্রকাশ করেন এবং এর জন্য  দুঃখ প্রকাশ করেন। অনুষ্ঠানটি একটানা চলে দুপুর পৌনে ২ টা পর্যন্ত। থিয়েটারওয়ালা আয়োজিত এই উন্মুক্ত আয়োজনটি অনুলিখন করে ছাপা হলো এই সংখ্যায়। অনুলিখন- সাইফ সুমন, সহকারী সম্পাদক, থিয়েটারওয়ালা]

হাসান শাহরিয়ার
থিয়েটারওয়ালার আয়োজনে ‘ঢাকার থিয়েটারে নাট্যকার-নির্দেশক : সরাসরি দর্শকের মুখোমুখি’ এই উন্মুক্ত আলাপনে আপনাদের সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি। আজকের অনুষ্ঠান শুরুর সময় দেয়া হয়েছে সকাল ১০:৪৫ মিনিট, এবং ঠিক ১০:৪৫ মিনিটেই আমরা আমাদের অনুষ্ঠান শুরু করছি। আমাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হলভর্তি দর্শকের উপস্থিতি দেখে আমরা খুবই আপ্লুত। তাই শুরুতে আমাদের মঞ্চের সবসময়কার প্রধান পৃষ্ঠপোষক সেই দর্শকবৃন্দকে জানাই আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। আমি এবার মঞ্চে উঠে এসে নিজেদের আসন নেবার জন্য অনুরোধ করছি, আজকের অনুষ্ঠানের নির্ধারিত নাট্যকার ও নির্দেশকগণকে, যাঁরা সরাসরি মুখোমুখি হচ্ছেন দর্শকদের। আবদুল্লাহ আল-মামুন, আতাউর রহমান, আলী যাকের, মামুনুর রশীদ, সেলিম আল দীন, নাসির উদ্দিন ইউসুফ এবং সৈয়দ জামিল আহমেদকে অনুরোধ করছি মঞ্চে উঠে আসার জন্য। ... সুধি, আমাদের দেশের প্রধান নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক আজকের অনুষ্ঠানে আসবার কথা থাকলেও হঠাৎ জরুরি কাজে আজ সকালেই ওনাকে ঢাকার বাইরে যেতে হয়েছে বলে তিনি উপস্থিত থাকতে পারছেন না। এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির জন্য তিনি দর্শকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

সুধি দর্শক, আমরা অনুষ্ঠান শুরু করতে যাচ্ছি- তার আগে কিছু ভূমিকা দেবার প্রয়োজন বোধ করছি। থিয়েটারওয়ালা এই উন্মুক্ত আলাপনের আয়োজন করেছে যেসব কারণে তার মধ্যে একটি হচ্ছে, আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশের থিয়েটার চর্চার ৩২/৩৩ বছর পার হতে চলেছে। কিন্ত আমরা দেখেছি মঞ্চ নাট্য সমালোচনা ঠিক সেভাবে তৈরি হয়নি বা যাঁরা নাটক লিখছেন এবং নির্দেশনা দিচ্ছেন ... যাঁদেরকে মঞ্চে দেখা যাচ্ছে না, তাঁদের সাথে মিথষ্ক্রিয়ার জায়গাটা, দর্শকদের সাথে, হচ্ছে না। সেই মিথষ্ক্রিয়া ঘটানোই আমাদের অন্যতম উদ্দেশ্য।

সুধি দর্শক, আপনারা প্রশ্ন করবেন আমাদের মঞ্চে উপবিষ্ট ব্যক্তিত্বদের শিল্পকর্মের ব্যাপারে এবং তাঁরা চেষ্টা করবেন সেসব প্রশ্নের উত্তর দিতে। প্রশ্ন করবেন খুব সংক্ষেপে ... উত্তরদাতাদের প্রতি অনুরোধ উত্তরও দেবেন খুব সংক্ষেপে। একটা স্বাধীনতার কথা বলে নিই ... যদি আইন ঠিকমতো চলতে দেয়া হয় ... তাহলে, কথা আছে যে, একজন ট্রাফিক পুলিশের শীর্ণ হাত নাকি প্রেসিডেন্টের গাড়ি থামিয়ে দিতে পারে ... আজকে আমাদের এই অনুষ্ঠানে আইন মানাটা অত্যন্ত জরুরি। আমি এখানে যত ছোট মানুষই হই না কেন যেহেতু অনুষ্ঠানের সঞ্চালক আমি, তাই এখানে কিছুটা স্বৈরাচারী কাজ করবো ... আমি যদি কাউকে ফ্লোর না দিই তাহলে আপনারা ফ্লোর নেবেন না এবং যদি উত্তরদাতাদের বক্তব্য সংক্ষিপ্ত করতে বলি বা বিষয়ের মধ্যে থাকার ইঙ্গিত করি ... আমরা প্রায়শই দেখি বক্তা বলতে শুরু করলে বিষয়ের প্রতি আর খেয়াল থাকে না, বিষয়ছিন্ন হয়ে যান ... এই অল্প সময়ে বিষয়ের উপর উত্তর দেয়া খুবই জরুরি, বিষয় বিমুখ হওয়া চলবে না ... তো যদি অনুরোধ করি বিষয়ের মধ্যে থাকতে তাহলে আপনারা এটাকে সুন্দর দৃষ্টিতে বিবেচনা করবেন। এ-তো গেলো আমার স্বাধীনতার কথা। উত্তরদাতাদের একটি স্বাধীনতা আছে আজকে ... সেটি হলো যদি কোনো প্রশ্নের ব্যাপারে আপনাদের আপত্তি থাকে কিংবা নিজে বিব্রত বোধ করেন, তাহলে সেই প্রশ্নটির উত্তর দিতে আপনি বা আপনারা অপারগতা প্রকাশ করতে পারেন। আমরা তখন অন্য দর্শকের প্রশ্ন নেব।

তাহলে শুরু করছি ... প্রথম প্রশ্ন করবার জন্য ... যে-কেউ ...

বিপ্লব বালা
[নাট্যনির্দেশক, শিক্ষক, নাট্যকলা ও সংগীত বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়]
অনেকদিন ধরেই শুনছি যে এরকম একটা কিছু হচ্ছে, এবং নানা রকম জল্পনা-কল্পনা করছি যে, কি হবে না হবে ... এবং সত্যিই সত্যিই অনুষ্ঠানে আদৌ কোনো দর্শক হবে কিনা। বিশেষত আমাদের অভিজ্ঞতা এরকম যে আলোচনা ব্যাপারটা ঠিক নাটকের লোকেরা বা কোনো শিল্পমাধ্যমের লোকেরা ঠিকভাবে গ্রহণ করে না বা আলোচনা ব্যাপারটার সাথে ঠিক যুক্তবোধ করে না ... তো আজকের উপস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে যে, না আমরা আসলে আলোচনা করতে চাই। সত্যিইতো এ্যাতো লোক হবে আমরা কি ভেবেছি, তাও আবার একেবারে সঠিক সময়ে? আমরা বোধহয় একমত হবো যে,- না আমরা কেউই ভাবিনি। তবে প্রথমেই সঞ্চালক যেভাবে শুরু করলেন তাতে একটু টেনশন তৈরি হচ্ছে ... মানে শুরু অনেকটা টেলিভিশনের টক শো’র মতো হয়ে গেল ... আমাদেরকে একটা স্মার্ট জায়গায় নিয়ে যেতে চাইলেন এবং একটা টেনশন তৈরি করলেন যে, আমরা মুখোমুখি হচ্ছি। আমার মনে হয় যদি একটু হালকা মেজাজে আমরা চালিয়ে যাই ... যদি সহজ হতে পারি তবেই সকলে মিলে আলোচনার জায়গাটা তৈরি হবে। মানে আমরা ‘সংলাপ’ বলবো না ‘কথা’ বলবো, ‘আলাপ’ করবো। আমি প্রথমে আবদুল্লাহ আল-মামুনভাইকে প্রশ্ন করছি যে, আপনার সুবচন নির্বাসনে নাটকটি আমারা কেউ কেউ দেখিছি, যারা দেখেনি তারা শুনেছে হয়তো ... এই নাটকটি নাকি তখন মনে হয়েছে যে সময়-কাল এবং তখনকার দর্শকের রুচি চাহিদার জায়গা থেকেই তৈরি হয়েছিলো। তো নাট্যকার হিসেবে এই নাটকের প্রতিক্রিয়া সে সময়ে কেমন পেয়েছিলেন এবং দর্শকের সাথে নিজের কাজের এই রিয়্যাকশনের মাধ্যমে পরবর্তি কাজগুলোতে আপনি কি অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েছিলেন?

আবদুল্লাহ আল-মামুন
ধন্যবাদ। আমার সুবচন নির্বাসনে নাটক সম্পর্কে এ্যাতবছর পরে আবার নতুন করে বলার কিছু নেই। এটা যেরকম প্রশংসিত হয়েছে, সেরকম ধিকৃতও হয়েছে। অনেকে এটাকে নানা রকম নাটকের সাথে তুলনা দিয়েছে ... কিন্তু আমার একটা সান্ত্বনা হলো, ঐসময়ে এই ধরনের নাটকের প্রয়োজন ছিলো। যখন আমরা নাটকের কাজ শুরু করি ... কারণ নাটকটি লেখাই হয়েছিলো যাতে পয়সা কম লাগে এবং শিল্পী কম লাগে ... তো সেদিক থেকে দেখতে গেলে এটা একটা সময়ের দাবি মিটিয়েছে এবং পরবর্তীকালে সুবচন নির্বাসনে নাটক হিসেবে আদৌ স্বীকৃতি থাকবে কিনা বা বইতে লেখা থাকবে কিনা , এটা কাল-ই ঠিক করবে, তার জন্য আমার নিজস্ব কোনো দুর্ভাবনা নেই।

মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন
[নাট্যকর্মী, লাইট ডিজাইনার, শিল্পকলা একাডেমী, ঢাকা]
আমি কয়েকটি নাটক নির্দেশনা দিয়েছি। নির্দেশনা দিতে গিয়ে একটা সমস্যার সম্মুখিন হয়েছিলাম ... এটা হচ্ছে আমার নাট্যকারের সাথে। আমারই এক বন্ধু, তার নাটক নির্দেশনা দিতে গিয়ে কিছু জায়গা চেয়েছিলাম শিফট করতে ... অর্থাৎ একটা দৃশ্য চাইছিলাম পরে নিয়ে যেতে। এতে করে আমার মুভমেন্টের কিছু সুবিধা হয় ... সেটের কিছু সুবিধা হয়, তবে আমার মনে হয়েছে এতে করে নাটকের কোনো বড় ধরনের অঙ্গহানি হবে না। সেই পরিবর্তিত অবস্থাতেই এখন নাটকটি মঞ্চস্থ হচ্ছে। কিন্তু ব্যাপারটি নাট্যকার বন্ধুটি কিন্তু মেনে নিতে পারেননি। ফলে এখনো তার সাথে দেখা হলে আমাদের মধ্যে মনোমালিন্য হয়। আমিও খুব বিব্রত হই। তো এখানে অনেকেই নির্দেশক আছেন ... বাচ্চুভাই (নাসির উদ্দিন ইউসুফ) আছেন ... তিনি সেলিম আল দীন স্যারের নাটক নির্দেশনা দেন। আমি কাজ করতে গিয়ে ...

হাসান শাহরিয়ার
জসিম আপনি সোজাসুজি প্রশ্নটি করে ফেলুন।

মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন
আমার প্রশ্নটি হচ্ছে এরকম পরিস্থিতিতে আপনারা পড়েন কি না? পড়লে তখন কি করেন?

হাসান শাহরিয়ার
প্রশ্নটি কাকে করলেন?

মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন
বাচ্চুভাই আর সেলিম স্যার দু’জনকেই।

হাসান শাহরিয়ার
আপনাদের মধ্যে কে আগে বলবেন?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
আমি দিচ্ছি। আমার মনে হয় জসীমের কাজটি সঠিক ... একশতভাগ সঠিক। দৃশ্যের বা সংলাপের পরিবর্তন বা সামনে পিছনে করে যদি নাট্যমুহূর্ত তৈরি করতে চান, তাহলে আপত্তি কেন হবে আপনার বন্ধু নাট্যকারের? আমাদের কাজের ব্যাপারে আমি বলতে পারি সেলিমের নাটকে এসব আমি অহরহ করে থাকি ... জামিলও (সৈয়দ জামিল আহমেদ) আছে এখানে ... সে-ও সেলিমের নাটক করেছে এবং আমার মনে হয় তারও কোনো সমস্যা হয়নি। কারণটা বলছি ... কেরামতমঙ্গল নাটকটি প্রায় নয়ঘন্টার নাটক ... এটিকে আমি সাড়ে তিন ঘন্টায় নিয়ে এসেছিলাম। সেই ৮৫ সালের কথা এটি। তখন সেলিমকে বলেছিলাম যে সেলিম আমি এই এই জায়গাগুলো কেটে বাদ দিতে চাই। সেলিম কয়েক রাত ভাবলো এবং এক রাতে আমাকে টেলিফোনে বললো যে, বাচ্চ, সমুদ্র থেকে যদি কয়েক বাটি জল কেউ তুলে নেয় তাতে সমুদ্রের কোনো ক্ষতি হয় না। সুতরাং বাচ্চু তুই এটা করতে পারিস। আবার হাবিবুল হাসানের কথা আপনাদের মনে আছে নিশ্চয়ই। হাবিবুল হাসান ১৯৭৬ সালে কি ’৭৭ সালে একটা নাটক লিখেছিল উকিল রসুল আহমেদের মৎস্য শিকার। আমরা তখন টি.এস.সি তে তুখোড় আড্ডাবাজ। তো সেসময় নাটকটি নির্দেশনা দেয়ার আগে স্ক্রিপ্টটি পড়ে আমি বললাম, না হাবিব এটা পুরোপুরি পরিবর্তন করতে হবে। ভাবের দিক থেকে ঠিক আছে কিন্তু প্রয়োগের দিক থেকে লেখ্যরীতিটা আমার পছন্দ হচ্ছে না। তখন সে বলেছিল যে, এক লাইনও পরিবর্তন করা যাবে না এবং এটি এই মুহূর্তে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নাটক। সুতরাং এটি পরিবর্তনের প্রশ্নই আসে না। তো এমন পরিস্থিতিও হয়। কিন্তু আমার মতামত হচ্ছে নির্দেশকের যেকোনো ধরনের পরিবর্তন করার স্বাধীনতা পাওয়া উচিত। নাট্য রচনা এবং নাট্য প্রয়োগের মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে।

হাসান শাহরিয়ার
বাচ্চুভাইয়ে কথার সূত্র ধরে যাকেরভাই কিছু বলতে চাইছেন।

আলী যাকের
বাচ্চু বললেন, সেলিম আল দীন বলেছিলো যে সমুদ্র থেকে কয়েক বাটি জল ফেলে দিলে সমুদ্রের কিছু আসে যায় না। তো নয় ঘন্টার নাটককে সাড়ে তিন ঘন্টায় নামানো যদি কয়েক বাটি জল হয় ... হাঃ হাঃ ... তবেতো কিছু সমস্যা আছে মনে হয়।

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
হাঃ হাঃ, না আমি আবার একটু বলতে চাই, আজকে যে শেক্সপীয়ার আমরা করছি, এই শেক্সপীয়ার আর যখন শেক্সপীয়ার বেঁচে ছিলেন সেই শেক্সপীয়ার কি একই? এটি কি পুরোপুরি একটি পরিমার্জিত রূপ নয়? আজকে মার্লোর যদি ড. ফস্টাস -এর কথা বলেন ... সেটি আজকে যখন করবো, চারশ বছর আগের স্ক্রিপ্ট-এর মতোই হবে কি? আমার কিন্তু তা মনে হয় না। শেক্সপীয়ার, মার্লো বা চেকভ এর প্রায় প্রতিটি নাটকের আদিরূপ মঞ্চায়ন করতে গেলেতো প্রায় সারারাতের ব্যাপার হয়ে যাবে। কিন্তু বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বেতো প্রতিনিয়ত যে মঞ্চায়ন হচ্ছে তা দুই ঘন্টা বা আড়াই ঘন্টার পরিমার্জিত রূপ। তো সেখানেতো সমস্যা হচ্ছে না। বর্তমান সময়ের নির্দেশকরা তো মহৎ নাট্যকারদের নাটকগুলো কাটাকুটি করছেন, পরিমার্জনা করছেন। এটা করতেই হবে প্রযোজনার খাতিরে।

হাসান শাহরিয়ার
ধন্যবাদ। মুকুলভাই বলতে চাচ্ছেন ... বলুন প্লিজ।

আমিনুর রহমান মুকুল
[নাট্যকর্মী, সদস্য- পালাকার]
আমার প্রশ্নটি সবার জন্যই। যে কেউ উত্তর দিতে পারেন। বিষয়টি হচ্ছে যে, আমরা যে বর্তমান পরিস্থিতিটি পার করছি, এই পরিস্থিতিতে আপনারা জানেন যে, মৌলবাদের একটা বড় ধরনের ধংসাত্মক কাজ তারা চালাচ্ছে ... এ অবস্থায় আমরা নাট্যকাররা বা নির্দেশকরা নাটকের বিষয়বস্তুগত দিক থেকে কী ধরনের ভাবনা জরুরি এবং কী ধরনের কাজ মঞ্চে আসা জরুরী বলে মনে করছেন? যেহেতু আমরা আসলে আপনাদের কাজের দিকে তাকিয়ে থাকি ... সারা বাংলাদেশের মানুষ ... সারা বাংলাদেশের নাট্যকর্মীরা আপনাদের কাজের দিকে তাকিয়ে থাকে ... তো আপনাদের কাছে আমার জিজ্ঞাসা, এখন বিষয়বস্তুর দিক থেকে কেমন নাটক লেখা উচিত এবং দলগুলোরইবা কেমন নাটক করা উচিত?

হাসান শাহরিয়ার
ধন্যবাদ। আপনারা কে প্রশ্নটি নিচ্ছেন?

মামুনুর রশীদ
আমি নিচ্ছি। বিষয়টা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে যে, কোনো সমসাময়িক ঘটনাকে যখন আমরা নিয়ে আসি, আমাদের নাটকে, সেটার একটা বিপরীত প্রতিক্রিয়াও হয়। যেমন একবার ঢাকা পদাতিক সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী নাট্যোৎসব করেছিল, মহিলা সমিতিতে ... এবং সেদিনই সম্ভবত জামাতে ইসলামীর সবচেয়ে বড় মিছিলটি বেরিয়েছিল। এখন ব্যাপার হচ্ছে যে, মহিলা সমিতিতে আমরা মৌলবাদী শত্রুগুলো ধ্বংস করছি, এক্সপেরিমেন্টালেও ধ্বংস করছি কিন্তু পাশাপাশি তাদের উত্থান কিন্তু রোধ করা যাচ্ছে না। রাজনীতির সাথে আমাদের নাটকের কিন্তু একটা বিরোধ আছে ... সবসময়ই। এবং সে বিরোধিতা খুব তীব্র। একটা হচ্ছে যে, আমরা শৈল্পিকভাবে আমাদের যে অনুভবগুলো ... রাজনৈতিকভাবে আমাদের যে অনুভব, যেটা আমরা আমাদের শিল্পে প্রকাশ করে থাকি, সেটার একটা সমস্যা হচ্ছে যে,  রাজনীতিটা আজকে কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে? রাজনৈতিক এই স্খলন কিন্তু একটা সংকট। আশির দশকে ... পুরোটা দশকেই আমরা আমাদের নাটকগুলোতে ... পথনাটকগুলোতেও স্বৈরাচারী শাসনের এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলাম। পরে আমরা স্বৈরাচারকে হটালাম। কিন্তু তারপর কি দেখছি? তারপর এসে গেল গণতান্ত্রিক স্বৈরাচার ... মানে এখন মনে হয় যে, আগেরটাই ভালো ছিল। কিন্তু তারপরও কথা হলো এসবের বিরুদ্ধে আমাদের দাঁড়াতে হয় এবং হবে। এখন কথা হচ্ছে আমাদের এই দাঁড়ানোটা কি হবে? আমরা কি চারিদিকে যা ঘটছে তা-ই নিয়ে নাটক করবো, নাকি আগামীদিনের বা অনাগতদিনের যে সংকট ... একজন শিল্পী বা একজন নাট্যকার বা একজন নির্দেশকতো শুধু এখনকার সময়টা দেখে না  ... আগামী কালটাকেও দেখে। একসময় আমার কাছে মনে হতো যে, যা যা ঘটছে তা-ই একটা তীব্র উত্তেজনাকর অবস্থায় পরিবেশন করলে ভালো হবে। কিন্তু এখন আমার কাছে মনে হয় যে, আমাদের বোধহয় কিছু প্রতীকও ব্যবহার করা দরকার। যেমন বিসর্জন নাটকটি ... এখন যদি বিসর্জন নাটকটি সারা বাংলাদেশে অভিনীত হয়, তাহলে এটার একটা ইম্পেক্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আবার ধরুন, আমি আমার নিজেকে দিয়ে উদাহরণ দিই ... আমি চে গেভারাকে নিয়ে নাটক করেছি ... আমার মনে হয়েছে, আজকের তরুণদের সামনে, আজকের মানুষদের সামনে একটা বিস্মৃতপ্রায় নাম ... তাকে তুলে আনা দরকার। আমরা রবীন্দ্রনাথেরও অনেক নাটক এখন করতে পারি যেগুলো প্রাসঙ্গিক হবে। সুতরাং কী ধরনের নাটক করবো এটাকে কিন্তু বেধে দিলে চলবে না। দর্শক- নাট্যকার- নির্দেশক সবাইকে নাটকটি করার প্রাসঙ্গিকতার সাথে মিলতে হবে।

হাসান শাহরিয়ার
এ প্রসঙ্গের সূত্র ধরে সৈয়দ জামিল আহমেদ কিছু বলবেন।

সৈয়দ জামিল আহমেদ
খুব সংক্ষেপে দু’টো কথা বলবো। প্রথম কথা হচ্ছে ধর্ম সংস্কৃতির অংশ। আমার জন্ম একটা মুসলমান পরিবারে ... আমি হাসান-হোসেনকে চিনি ছোটবেলা থেকে। আবার আমার দরজাও বন্ধ না। আমি নমস্কার জানাতে পারি, একজন মানুষকে শ্রদ্ধার জন্য, কোনো মানুষ যদি মনে করেন এই কালচারাল সাইনটা অর্থপূর্ণ ... তিনি তা মনে করতে পারেন। একথাটা বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে ... আমি মনে করি না মৌলবাদ আমাদের শত্র“। যদি ‘মৌলবাদের উত্থান’ আজকে বাংলাদেশে হয়ে থাকে তার মানে দাঁড়ায় জনগণের কোথাও না কোথাও কিছু না কিছু সাপোর্ট আছে। তার মানে কিছু মানুষ মনে করছেন মৌলবাদে কিছু রয়েছে। সেই জায়গাটা যদি না বুঝতে চাই তাহলে এরা ... বাংলাভাইরা বাড়বে। আমি বলতে চাচ্ছি এখানে আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অনেক সমস্যা রয়েছে। একদিকে ওখানে  যদি বাবরি মসজিদ ভাঙে এখানে তাহলে মন্দির ভাঙবে। আমি নিশ্চয়ই বলছি না বাবরি মসজিদ ভাঙা উচিত ... কিন্তু আমাকে পুরো প্রেক্ষাপটটা বুঝে এখানটায় দাঁড়াতে হবে। দ্বিতীয় একটা কথা বলতে চাই ... জামাতে ইসলামী যা-ই হোক না কেন ... তাদের সাথে বসার মতো মানসিকতা আমাদের থাকা উচিত। আমরা কথা বলতে পারি যে, আপনাদের কি সমস্যা আর আমাদের কি সমস্যা ... আমি কী মনে করি আর আপনি কী মনে করেন ... আমি ধর্মটাকে কী মনে করি আর আপনি ধর্মটাকে কী মনে করেন।

আমি ছাত্র-ছাত্রীদের বলেছি যে, আমার মনে হয় আমরা যদি কোরান শরিফটা সিরিয়াসলি বুকপকেটে রাখি, তাহলে আমি চ্যালেঞ্জ করতে পারবো অনেক বেশি, কারণ  .. একটা সূরায় বলা আছে ... নাম মনে করতে পারছি না ... বলা আছে, ১. পুরুষদের বলা হচ্ছে- তোমরা মাথা নত করে হাঁটো রাস্তায়, আবার মহিলাদেরকেও বলা হচ্ছে- তোমরা মাথা নত করে হাঁটো রাস্তায়। এখন যদি কোনো ওয়াজ মাহফিলে কোনো মৌলভী বলেন যে, অমুক মহিলা এভাবে হেঁটে ছিলেন বা বে-পর্দা ছিলেন ... তখনতো পাল্টা প্রশ্ন করা যায় যে, আপনি দেখলেন কীভাবে? তো এমন অনেক ব্যাপার নিয়ে আলোচনা চলতে পারে। স্টুয়ার্ট হল- কালচারাল স্টাডিজের একজন বিখ্যাত ব্যক্তি ... আমি তাঁর কয়েকটি কাজ পড়েছি, আমি মুগ্ধ হয়েছি। হলের একটি কথা আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়- আর্টিকুলেশন। আর্টিকুলেশনের দু’টি অর্থ আছে, একটা হচ্ছে ‘প্রকাশ’ করা আরেকটি হচ্ছে ‘যুক্ত’ করা। এখন মৌলবাদ করছে ‘যুক্ত’ ... যেগুলো তার কাজে লাগবে এবং যেগুলো মানুষকে তার মত করে বোঝাতে সুবিধা হবে। এই যে কিছুদিন আগে একুশে ফেব্রুয়ারিতে ... আপনারা জানেন ... শহীদ মিনারে কোরআন তেলোয়াত হয়েছে, যেটা আমরা চিন্তাও করতে পারি না। তো জামাত আর্টিকুলেট করছে ... যুক্ত করছে ... বিভিন্ন কালচারাল ইলিমেন্টস যেগুলো আমাদের কাছে অর্থপূর্ণ করে। তো আমরা ডি-আর্টিকুলেট করতে পারি কি না? এই যুক্ত করার জায়গাটাকে খুলতে পারি কি না। আর এ জন্যই আমার কাছে মনে হয় না যে, সবসময় মৌলবাদ বিরোধী নাটক করতে হবে। যেমন আজকে যদি আপনি মনসা মঙ্গল করেন, মনসামঙ্গল করাটাও কিন্তু আমার কাছে মনে হয় একটা রাজনৈতিক অবস্থান নেয়া। বেহুলাকে নিয়ে নাটক করা ... ইত্যাদি, আমরা যদি বুদ্ধি করে সংলাপের প্রয়োগ করি এবং আর্টিকুশেন-ডিআর্টিকুলেশনের জায়গাটা বুঝতে পারি ... যুক্তি ও বিযুক্তির জায়গাটা বুঝি এবং কালচারাল যে সাইনগুলো আছে সেগুলো নিয়ে যদি আমরা বুদ্ধিমানের মতো কাজ করি ... তাহলে আমার মনে হয় না সমস্যাটা বিশাল। আরেকটা কথা বলা দরকার ... কাজতো সবাই করছেন ... এখন ছটলুভাই (আলী যাকের) যখন একটা নাটক করেন বা বাচ্চুভাই যখন একটা নাটক করেন ... তখন সেই নাটকে সরাসরি মৌলবাদের কথা  না থাকলেও আমার মনে হয় ... যখন কোপেনিকের ক্যাপ্টেন হয় বা মামুনুর রশীদের রাঢ়াঙ হয় ... তখন সরাসরি মৌলবাদ বিরোধী না হলেও একটা বড় বক্তব্য কি দাঁড়াচ্ছে না? একটা কথা মনে রাখা উচিত, প্রতিবাদ করা মানে কিন্তু সবসময় চিৎকার করা না। প্রতিবাদ মানে হচ্ছে দৈনন্দিন জীবনে ছোট ছোট জায়গায় আমরা যে ব্যাঙ্গ-র ভিতরে ... হাসি ঠাট্টার ভিতরে তির্যকভাবে, নানাভাবে আমরা যে প্রতিবাদ করে যাচ্ছি, সেই ক্ষুদ্র জায়গাগুলোকেই স্বীকার করা এবং সেগুলোকেই আরো শক্তিশালী করা।

হাসান শাহরিয়ার
ধন্যবাদ। এবার আবদুস সেলিম স্যার।

আবদুস সেলিম
[অনুবাদক এবং অধ্যাপক, ইংরেজী বিভাগ,নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি]
আমি আগে একটা ব্যাপার জানতাম না যে, শাহরিয়ার এরকম স্বৈরাচারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে ... বলেছে সরাসরি প্রশ্ন করতে। সরাসরি প্রশ্ন করা যাচ্ছে না, আসলে একটু ভূমিকা করতেই হচ্ছে। আর্টিকুলেশনের কথা, যেটা জামিল আহমেদ বললেন ... এটার খুবই সুন্দর ব্যাখ্যা হয়েছে কিন্তু এর সাথে আমি একটি কথা বলি যেটা আমার মনে হয় একটু বিবেচ্য বিষয়। সেটা হলো যে, যখন জামাত কোনো ব্যাপারে এই আর্টিকুলেশন করছে তখন নাট্যকার হিসেবে আমার ডিআর্টিকুলেশনটা কী হবে ... আমার ভূমিকাটা কী হবে, এটা একটু ব্যাখ্যা করার দরকার আছে। জামাততো রাজনীতি করছে। আমরা কিন্তু তা করছি না। পল্টন ময়দানে যারা আসে আর আমার নাটক দেখতে যারা আসে তারা তো এক জাতের মানুষ না .. তো এগুলোও কিন্তু বিবেচনার বিষয়। ব্যাপারটা আমার কাছে অত সরল মনে হচ্ছে না।

আমি আতাউর রহমানের কাছে জানতে চাই ... সেটি হলো ... একটু পেছনের প্রসঙ্গ ধরে বলছি, ঐ যে স্ক্রিপ্ট কেটে বাদ দেয়া বা সমুদ্র থেকে কয়েক বাটি জল ফেলে দেয়া ... তো আমার সবচেয়ে বেশি নাটক নির্দেশনা দিয়েছেন আতাউর রহমান। আমার মনে আছে আমার প্রথম নাটক গ্যালিলিও থেকে অনেক কিছু ফেলে দেয়া হয়েছিলো। তারমধ্যে একটি অংশ ফেলা হয়েছিলো যা আমি সারা জীবনের জন্য দুঃখ করবো .. সেটা হলো কার্নিভালের একটি দৃশ্য ছিল যে দৃশ্যটিকে আমি মনে করি যে ভীষণ প্রয়োজনীয় একটি দৃশ্য ছিলো। আমার প্রশ্নটি হলো যখন এগুলো বাদ দেয়া হয় তখন কোন বিবেচনায় বাদ দেয়া হয়? এটা কি শুধু সময় সংক্ষেপনের জন্য নাকি নির্দেশকের কোনো ফোকাস তুলে ধরবার জন্য? কারণ, আধুনিক যুগে বলা হচ্ছে নাটক আর নাট্যকারের নয়, নির্দেশকের। এর ব্যাখ্যাটা একটু জানতে চাই।

আতাউর রহমান
কথা সত্যি। নাটক এখন নির্দেশকেরই। নাট্যকাররা একটু নিচে পড়ে গেছেন। যদিও রিটেন ওয়ার্ক বেশিদিন টিকবে, এটাও আমি বিশ্বাস করি। আমরা তাৎক্ষণিকভাবে মঞ্চে লাফাই ঝাপাই, সে অর্থে আমরা মোর ইম্পর্টেন্ট। কিন্তু আপনি যে প্রশ্নটি করলেন, সেখানে মুশকিল হচ্ছে জীবিত নাট্যকারের নাটক করা এবং নাট্যকার যদি নির্দেশকের বন্ধু হন, সেখানেই মুশকিল। এটা যদি রবীন্দ্রনাথ করতে চাই ... কেটে-ছিঁড়ে দিই, কিচ্ছু হবে না। হয়তো দু’চারটা গালাগাল খাব ... এ বেটা রবীন্দ্রনাথকে সর্বনাশ করেছে। শেক্সপীয়ার করলে কোনো কথাই নেই- আরো পুরোনো। সফোক্লিসের ইডিপাস মেয়ে দিয়েও করাতে পারি। যা খুশি তাই করতে পারি ইডিপাস-কে নিয়ে। কিন্তু যেহেতু সেলিম সাহেব আমার বন্ধু, সমস্যাটা ওখানেই। গ্যালিলিও খুব দীর্ঘ আয়তনের নাটক ছিলো। আপনি ঠিকই ধরেছেন যে, সময় বাঁচানোর জন্য কার্নিভালের ... মানে আপনার উল্লেখিত দৃশ্যটি ... যেটি এ নাটকের একটি অন্যতম প্রধান দৃশ্য বলে সারা পৃথিবীতে স্বীকৃত, সেটি আমি বাদ দিয়েছিলাম। আমার স্পেসটা আপনি ভাবুন যে, জার্মান কালচারাল সেন্টারের একটি ছোট্ট অডিটোরিয়াম। এমন একটি স্পেসে অনেক সমস্যা ছিল। আমার কাছে মনে হয়েছিল ঐ স্পেসে নির্দেশক হিসেবে আমি ঠিক ... মানে দৃশ্যটিকে হ্যান্ডল করতে পারবো না। এটা একটা চমৎকার দৃশ্য ... আমি মেনে নিচ্ছি। কিন্তু আমি অপারগ ছিলাম। আর আমি ঐ সমুদ্র থেকে জল ফেলা-টেলার জন্য এটা করিনি। আমি প্র্যাক্টিক্যাল রিজনেই এটা ফেলেছি। এ প্রসঙ্গে আমি সৈয়দ শামসুল হকের ঈর্ষা নাটকের কথা বলি। ওনারটাতো মৌলিক নাটক, আপনারটা (আবদুস সেলিম) কিন্তু অনুবাদ নাটক ... তো সৈয়দ হক সাহেব আমাকে বললেন, আপনার যেমন খুশি আপনি করুন, আমার কোনো আপত্তি থাকবে না। আমি কিন্তু ওটাতেও আমার মতো করে কিছু পরিবর্তন করেই করেছি।

আবদুস সেলিম
আমি নাটকের ফোকাসটা সম্পর্কে জানতে চাইছিলাম।

আতাউর রহমান
হ্যাঁ, ফোকাসতো অবশ্যই গ্যালিলিও। এটা একটা মৌলবাদ বিরোধী নাটক। জামিল যেটা বললো একটু আগে যে, সরাসরি আসবার প্রয়োজন নেই। যুগে যুগে এভাবেই অসাধারণ নাটক তৈরি হয়েছে। গ্যালিলিও নাটকে ঈশ্বরকে নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে যে, ঈশ্বর কোথায়? আবার পোপকে দেখানো হয়েছে যে, কেবল পোষাকই পোপকে শক্তিশালী করছে। একজন জেনারেলকে ন্যাংটা করে ছেড়ে দিন, কেউ জিজ্ঞাসাও করবে না। সব শক্তি ঐ পোশাকে। তো গ্যালিলিও নাটকের মূল ফোকাস ঐ যুক্তিকে বড় করে দেখানো, বিজ্ঞানকে বড় করে দেখানো, সেটাই আমি করতে চেয়েছি।

সৈয়দ জামিল আহমেদ
আমি একটা কথা বলি। নাট্যকার অনেক কথাই লিখতে পারেন। তিনি কোনো কিছু বোঝাতে চার লাইন বা পাঁচ লাইন কিংবা দশ লাইন লিখতে পারেন। কিন্তু একজন নির্দেশক যদি সেই ভাবটা বা বিষয়টা যেকোনো মুভমেন্ট বা সাইলেন্স বা আলোর নিচে দাঁড়িয়ে যেকোনোভাবে প্রকাশ করতে পারেন, তবেতো ঐ লাইনগুলোর দরকার নেই। নাটকটা বিশ্লেষণ করে নির্দেশক নাট্যক্রিয়ার মাধ্যমে যত সহজভাবে কমিউনিকেট করতে পারবেন, সেভাবেই করবেন এতে করে নাট্যকারেরতো কষ্ট পাওয়ার কিছু দেখছি না।

হাসান শাহরিয়ার
ধন্যবাদ। প্রসঙ্গের সূত্র ধরে এবার সেলিম আল দীন স্যার কিছু বলবেন।

সেলিম আল দীন
বিষয়টি আমি খুবই ব্যক্তিগতভাবে নাসির উদ্দিন ইউসুফকে বলেছিলাম তার ড্রইং রুমে ... ঐ সমুদ্র থেকে জল ফেলে দেয়ার ব্যাপারটা ... তো সেটি যখন মার্কেটে ছড়িয়ে দেয়া হলো তখন আর আমার নিজের থাকলো না। এই জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি। ওটি নজরুলের একটি কথা ... আমি আমার নামে চালিয়ে দিয়েছিলাম। তো নাট্যকার নির্দেশকের সম্পর্কটা আমিতো মনে করি যে, এটা নিয়ে বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই। বাচ্চু এবং আমার জীবনে এ নিয়ে কোনো তর্ক কোনোদিনও ঘটেনি। এমনকি জামিল আমার চাকা নাটকের অনেকখানি ফেলে দিয়েছিল ... কিচ্ছু মনে করিনি। ওর প্রয়োজন অনুযায়ী ও চেঞ্জ করবে, এতে অসুবিধা কোথায়? কোনো মান-অভিমানের কিচ্ছু নেই। আমি লিখেছি লেখ্যরূপে, অন্যজনতো দৃশ্যায়ন করবে। এটা জামিল করেছে আর সবচেয়ে বেশি করেছে বাচ্চু আর শিমূল ইউসুফ। স্বামী-স্ত্রী হওয়াতে  সুবিধা হয়েছে, রাত জেগে পড়ে আর কাটে, রাত জেগে পড়ে আর কাটে। মাঝে মধ্যে আমাকেও বলে, পরামর্শ করে।

চাকা নাটকের একটা প্রসঙ্গ বলি। নাটকে একটা কথা ছিলো- হয়তো আকাশের নীলও ওরকম পাখা কাঁপায় কিন্তু নীলের মধ্যে নীল থেকে যায় বলেই নীলের আর ওড়া হয়ে ওঠে না। - এটা প্রথমে বাদ দিলাম। কারণ, এর অর্থ আমি বুঝতাম না। আমি লিখেছি, কিন্তু আমিই বুঝি না। কিন্তু জামিল বললো যে, না এটা রেখে দিন। পরে আমি অর্থ বের করলাম যে, আমি আমার খুব শান্ত মুহূর্তে এটা লিখেছিলাম এবং একটা অর্থ দাঁড়াচ্ছে এরকম যে, ইনফিনিটি কখনো ইনফিনিটির কাছ থেকে পালাতে পারে না। তো এখানে কী দাঁড়ালো? প্রথমে না বুঝে লিখলাম, ফেলে দিতে বললাম, নির্দেশক বললেন যে রেখে দিন, তারপর আমি অর্থ বের করলাম। তবে আমার মনে হয় এ কথাগুলো গ্রীক নাটকের বেলায়, বিশেষ করে গ্রীক ট্যাজেডির বেলায় একদম খাটে না। সেগুলো আমরা পড়লেই বুঝবো যে একটি লাইনও বাদ দেবার কোনো অবস্থা নেই। এর একটা কারণ হলো নাট্যকার অসম্ভভাবে মঞ্চটাকে বুঝতেন এবং সেভাবেই নাটক লিখতেন। তাঁরা হলেন মঞ্চের জন্মদাতা। তাঁরা এমনভাবে লিখতেন যে, ফেলবার মতো কিছু ছিল না। তা ছাড়া এরিস্টটলতো বলেই গেছেন যে, ট্র্যাজেডির মতো মহান জিনিস পাঠ করলেও চলে ... তো আমি বলছি যে, এগুলো নিয়ে দ্বন্দ্ব থাকবেই। কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছা যাবে না। পৌঁছা ঠিকও হবে না।

হাসান শাহরিয়ার
ধন্যবাদ। এবার জাহিদ রিপন হাত তুলেছেন। বলুন।

জাহিদ রিপন
[নাট্যকর্মী, নির্দেশক। সদস্য- স্বপ্নদল]
আমার দু’টো প্রশ্ন। একটা হচ্ছে, দর্শকদের যাদের ঘন ঘন মোবাইল বাজছে, তাদের কি এখানে আসার কোনো দরকার আছে? ... আর ...

হাসান শাহরিয়ার
এই প্রশ্নের উত্তর মঞ্চের কেউ দিতে পারবেন না। যাদের বলা হয়েছে তারা বুঝে নেবেন। হ্যাঁ, দ্বিতীয় প্রশ্ন ...

জাহিদ রিপন
আমি ‘স্বপ্নদল’ নামে একটি দলের সাথে জড়িত। মূলত নির্দেশনার কাজ করি। আপনাদের অনেকের কাজই আমাকে খুব প্রভাবিত করেছে। বিষাদ সিন্ধু, চাকা, মারমার রূপকথা, গ্যালিলিও  এসব কাজ নির্দেশক হিসেবে আমার ভাবনাকে প্রভাবিত করেছে। কিন্তু আমি যখন এসব নাটক নিয়ে দলে কথা বলি তখন ওদের ব্যথিত চোখ আমি দেখতে পাই। কারণ, এই নাটকগুলো ওরা দেখতে পায় না। তো আমি জানতে চাই এই অসাধারণ নাটকগুলো আপনারা ধরে রাখলেন না কেন? এই নাটকগুলো কি বছরের পর বছর হওয়ার মতো নাটক না? নতুন নতুন নাট্যকর্মী আসে প্রতি বছর, তাদের এই নাটকগুলো দেখা থাকলে শিখতে পারতো তারা। উত্তরটা আমি জামিল স্যারের কাছে চাচ্ছি। ধন্যবাদ।

সৈয়দ জামিল আহমেদ
পারফরমেন্সের ব্যাপারে সেলিমভাইয়ের একটা কথা আছে ... অদৃশ্য কিছু সুতো গাঁথা হয় এবং এগুলো গাঁথা হয় মঞ্চে। মঞ্চের পারফরমেন্স শেষ হলে সেটা মিলিয়ে যায়। আবার পরেরদিন সুতোগুলো গাঁথতে হয়। তো এই গাঁথাটা কিন্তু একেবারে জীবন্ত ও বর্তমান। মঞ্চ নাটকটা ভাস্কর্যকর্ম নয় যে একবার করার পর বা বানাবার পর বছরের পর বছর একই আদলে থাকবে। আমার মনে হয় না যে পেছনে ফেরার দরকার আছে। তা ছাড়া আপনারা ... নতুন প্রজন্মের অনেকেই এখন অসাধারণ কিছু কিছু কাজ করছেন .. এবং সেটা ভিন্ন রকম কাজ হচ্ছে। তো সেই কাজটাই হয়তো পরের প্রজন্ম দেখবে না। এটা মনে রাখতে হবে যে, হাজার রজনী শো’ করলেও একসময় কিন্তু এটাকে বন্ধ করতেই হবে।

হাসান শাহরিয়ার
ধন্যবাদ। এবার সাইদুর রহমান লিপন, আপনি কিছু বলবেন বলে হাত উঠিয়েছেন। প্লিজ বলুন।

সাইদুর রহমান লিপন
[নাট্যকর্মী, নির্দেশক ও অভিনেতা]
আমি যখন থিয়েটারে আসি তখন আমার সামনে দু’টো আদর্শিক জায়গা ছিল। একটি হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আরেকটি হচ্ছে সমাজ পরিবর্তনের জায়গাগুলো। আমাদের আগে যারা থিয়েটার করেছেন ... যারা আজকে মঞ্চে আছেন, আমরা জানতাম যে বাংলাদেশে ঐ ইন্সপাইরেশন থেকেই আপনারাও শুরু করেছিলেন। কিন্তু এখন যে চর্চা চলছে তাতে করে বলা যাচ্ছে না যে, ঐ চেতনা বা ঐ লক্ষ্যকে সামনে রেখে আমরা কেউ নাটক করি। একেবারে শূন্য মনে হয়। তো আমার প্রশ্ন হচ্ছে। বাংলাদেশের থিয়েটার বর্তমানে কোনো ধারায় চলছে কী না? চললে ধারাটা কী? যে কেউ প্রশ্নটি নিতে পারেন।

আলী যাকের
প্রশ্নটি আমি নিচ্ছি। এই প্রশ্নটি একাধিকবার একাধিক তরুণের কাছ থেকে আমাদের শুনতে হয়। একটা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আরেকটা হচ্ছে সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার ... আমি ব্যক্তিগতভাবে এবং আমার দল ... আমার দলের সহকর্মী আতাউর রহমান এখানে আছেন, তিনি স্বীকার করবেন যে, আমরা কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট শ্লোগান নিয়ে নাটক শুরু করিনি। আমরা প্রথম থেকেই বুঝেছি ... নাটক করে যাওয়াই হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। এবং সেটা একধরনের নাটক নয় , নানা ধরনের নাটক, বহুবর্ণের নাটক। এটিই হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। যেকোনো একটি শিল্পকর্মের চর্চা স্বাধীনভাবে করার যে অধিকার ... সেই অধিকার আমরা পেয়েছি দেশ স্বাধীন হওয়ার ফলে। এটিই ধরে নেব সত্য। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, আমি বিশ্বাস করি না, ... কথাটাতে হয়তো আমার সমাজতান্ত্রিক বন্ধুরা আমার উপর ক্ষেপে যাবেন, ... তবু বলি, আমি বিশ্বাস করি যে, কোনো শিল্পকর্মই কোনো সমাজকে বদলে দিতে পারে না। সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে নাটককে কখনোই আমি ভাবিনি। আমরা ভিয়েতনামে দেখেছি যে, কাঁধে বন্দুক ঝুলিয়ে যেসব মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধ করেছেন, সন্ধে বেলায় তারা নিজেদের আনন্দের জন্য নাটক করেছেন। আমরা চে গেভারার কথাও শুনেছি .. তার আন্দোলনের সময় ... মামুনুর রশীদ ভালো বলতে পারবেন, তিনি তাঁর উপর নাটক করেছেন ... চে গেভারাও নাটক করেছেন। কিন্তু এই নাটকের কারণে সমাজটা বদলে গেছে তা কিন্তু নয়। আমাদের একটা রাজনীতি আছে, জামিল ঠিকই বলেছে ... এই যে মিথষ্ক্রিয়া হচ্ছে, আজকে, এটাই আমাদের রাজনীতি। আমাদের শিল্পকর্মই আমাদের রাজনীতি। আমাদের রাজনীতি হচ্ছে, কত সুন্দরভাবে, কত সুষমভাবে, কত সুকৃতি হিসেবে আমরা আমাদের চর্চিত নাটককে মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারছি এবং সেটা বহুবর্ণে রঞ্জিত নাটক। আমার এটুকুই বক্তব্য।

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
আমি একটু বলি শাহরিয়ার। জামিল এবং আলী যাকের দু’জনই যে কথাটা বললেন ... সেখানে আমার একটু জানার আছে। ব্যাপারটা হচ্ছে, অবশ্যই এই যে আমরা একসাথে বসেছি আজকে এখানে রাজনীতি আছে। রাজনৈতিক ভাবনাগুলো প্রকাশের ক্ষেত্রও হয়েছে এটা। যারা আমাদের কাছাকাছিও কিছু ভাবেন না, তারা অন্য জায়গায় বসেছেন। বা যারা সরাসরি রাজনীতি করেন, তারা মিছিল করছেন, জনসভা করছেন ... মানুষ হত্যা করছেন ... আর আমরা মঞ্চে কাজ করছি। কিন্তু আমার প্রশ্নটা হচ্ছে এই যে, আমরা এখানে বসেছি বা প্রত্যেক সন্ধ্যায় যে আমরা থিয়েটারটা করি, সেটা কী রাজনীতি অর্থাৎ পাওয়ার স্ট্রাগল-এ গিয়ে কী রোল প্লে করে বা আদৌ কোনো রোল প্লে করে কি না? যদি করে কীভাবে করে? আমাদের দেশে করছে কি না? ধর্মগ্রন্থের একটি ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে একটি রাজনৈতিক দল তার রাজনীতির প্রসার ঘটাতে সক্ষম। কিন্তু আমরা কি সক্ষম? আমার পয়েন্টা হচ্ছে জামাতে ইসলামের সাথে বিতর্কে (একসাথে বসে) যেয়ে লাভ কি? আচ্ছা না হয় বসলাম একসাথে ... কিন্তু হরকাতুল মুজাহিদের সাথে আপনারতো কথা বলার কোনো সুযোগ নেই। বাংলাভাইয়ের সাথে কথা বলারতো কোনো সুযোগ নেই। ওরাতো হত্যায় বিশ্বাস করে, যুক্তিতে নয়। আমি ইসলামকে দূরে ছুঁড়ে দিচ্ছি না, আমি নাসির উদ্দিন ইউসুফ, নাসির উদ্দিন ইউসুফই আছি ... আমার নামই তাই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে ... আমি সোস্যাল ইন্সটিটিউটশনগুলোকে বিশ্বাস করি। আমি মনেই করি ধর্ম একটা খুবই ইম্পোর্টেন্ট রোল প্লে করে সোসাইটিতে। আমি একদিকে ভারতীয়, একদিকে মুসলমান। এই দ্বান্দ্বিক ক্রিয়ার মধ্যেই আমি মনে করি আমার অবস্থান ... আমি না মুসলমান হতে পারছি, না ভারতীয় হতে পারছি। আমাদের সমমনা যেসব রাজনৈতিক দল আছে  তারা কিন্তু আমাদের থিয়েটার থেকে, আমাদের কাজ থেকে কিছু ক্যারি করছেন না। তাদের সাথে কোনো জোট হচ্ছে না, অন্যদিকে অন্যরা কিন্তু জোট বেঁধেই নেমেছে। এ অবস্থায় ডায়লগের বিকল্প নেই। ডায়লগের মধ্য দিয়ে সমস্যার সমাধান হতে পারে। কিন্তু সমমনাদের সঙ্গে। বাংলাভাইদের সঙ্গে নয়। কিছু সমস্যার ডায়লগের মাধ্যমে আবার কিছু সমস্যার যুদ্ধের মাধ্যমে সমাধান হতে পারে।

হাসান শাহরিয়ার
বাচ্চুভাই, এ প্রসঙ্গে মামুনভাই কিছু বলতে চাচ্ছেন।

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
ঠিক আছে আমি আবার পরে বলবো।

মামুনুর রশীদ
ডায়লগে বসার ব্যাপারে একটু বলে নিই। আমরা মৌলবাদ যাকে বলছি, তাহলো ধর্মের রাজনৈতিক অপব্যবহার। আমাদের স্বাধীন দেশটি কীভাবে পেয়েছি তা আপনারা জানেন, আমি জানি। সেখানে ঐ মৌলবাদিদের সাথে, ঐ বাংলাভাইদের সাথে সংলাপে বসে কোনো লাভ আছে? নাকি আমি আমার কাজটি করবো, আমার সেক্যুলার শক্তিকে বাড়াবো, আমার প্রগতিশীল শক্তিকে বাড়াবো?

যাহোক, দ্বিতীয় প্রসঙ্গে আসি। নাটক সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার কি না। এটা কিন্তু একটা আবেগী শ্লোগান। সারাদেশে আমি যত নাট্যদল দেখি সেগুলোর অনেকেরই স্যুভেনিরে লেখা থাকে - নাটক সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার। এখন একজন ইনডিভিজ্যুয়াল যদি মনে করে  ... কোনো একজন শিল্পী যদি মনে করে, সমাজ পরিবর্তনের লক্ষ্যে আমি কাজ করছি, এতেতো দোষের কিছু নেই। সমাজতো অনেকভাবেই পরিবর্তন করা যায় ... রাজনীতি সমাজ পরিবর্তন করে ... কবিতাও নাকি সমাজ পরিবর্তন করতে পারে, কবিতা নাকি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঠেকাতে পারে। এগুলো যদিও আবেগের শ্লোগান, তবুও সত্য যে সেই আবেগের মধ্যেওতো কিছু সত্য লুকিয়ে থাকে। আমরা উনবিংশ শতাব্দীর সোভিয়েতকে দেখি, সেই সময়ে টলস্টয় আসছে, চেখভ আসছে, তারাতো একটা বিপ্লবের ঘন্টাধ্বনি বাজাচ্ছে। আমাদের পাশের দেশ পশ্চিমবঙ্গে লেখকরা, শিল্পীরা এবং নাট্যদলগুলো এধরনের একটা সরকার এ্যাতো বছর ধরে রাখছে এবং তার আগেও উৎপল দত্ত ষাটের দশকের মঞ্চে যে ঘটনাগুলো ঘটিয়েছেন, সেগুলোওতো একধরনের আলোড়ন করেছিল ... সেই সমাজটা কিছুটা পরিবর্তনের জন্য। সুতরাং হাতিয়ার হিসেবে কেউ কেউ ভাবতে পারেন বলেই আমার মনে হয়। এতে দোষের কিছু নেই। ধন্যবাদ।

কামরুল আলম সবুজ
[সমাজকর্মী, তেল-গ্যাস ছাত্র যুব আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী]
আসলে আমার প্রশ্নটা লেম্যান হিসেবে ... এখানে যারা আছন সবার উদ্দেশ্যে। আসলে প্রশ্ন না দাবী ঠিক বুঝতে পারছি না ...

হাসান শাহরিয়ার
আপনি বলুন ... আমরা বুঝে নেব।

কামরুল আলম সবুজ
আমি তেল গ্যাস ছাত্র যুব আন্দোলনের সাথে জড়িত। বেশ কিছুদিন ধরে বিদেশীরা এখানে এসে আমাদের সম্পদ খুব নগ্নভাবে লুটপাট করছে, চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে নিতে চাচ্ছে। আমাদের ঘাড়ে চেপে আছে এক কালো দৈত্য হ্যারি কে টমাস। তো অনেক কিছুই ঘটছে। এর বিরুদ্ধে এখানকার গণতন্ত্রমনা অনেকেই আন্দোলন সংগ্রাম করছে। নাটকের মাধ্যমে অনেক স্বপ্ন দেখাবার কথা আপনাদের। এসবের বিরুদ্ধে আমাদের থিয়েটার বা আপনারা কি আমাদের কোনো স্বপ্ন দেখাবেন না? তাছাড়া ...

হাসান শাহরিয়ার
প্রশ্নটা হয়ে গেছে। কেউ একজন উত্তর দিবেন। বাচ্চুভাই দিবেন বোধহয় ...

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
হাঃ হাঃ ... না না আমি দিচ্ছি না। আচ্ছা ঠিক আছে একটু বলি। সেটা হলো ভাই, আমরাতো তেত্রিশ বছর ধরে স্বপ্ন দেখাচ্ছি, কিন্তু কেউতো স্বপ্ন দেখতে চাচ্ছে না। আজকে সন্ধ্যায়ও এখানে স্বপ্ন দেখানো হবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন যারা বাস্তবায়ন করবেন সেই রাজনীতিবিদরা কোথায়? তারাতো কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতায় যাবার জন্য আবার সেই জামাতকেই ধরবে ...

আতাউর রহমান
আমি একটু বলবো। আপনার প্রশ্নে আমরা খুব কষ্ট পেলাম। আমাদের তেত্রিশ বছরের নাট্যচর্চা তাহলে বৃথা ... তাইতো বলছেন আপনি? অর্থাৎ সৈয়দ শামসুল হকের পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, নূরলদীনের সারাজীবন, সেলিম আল দীনের কিত্তনখোলা, কেরামতমঙ্গল, মামুনুর রশীদের ওরা কদম আলী  ... এসব নাটক আপনাকে কোনো স্বপ্ন দেখাতে পারেনি। এটা বোধহয় আপনার অপারগতা। হ্যারি কে টমাসকে নিয়ে আমরা কি করবো আমিতো বুঝি না। আমি শাহরিয়ারকে বলেছিলাম ... এখানে আসার আগে ... যে, আমাদের কাজ মঞ্চে করে দেখাবো দর্শক বুঝলে বুঝবে না বুঝলে বা খারাপ লাগলে ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলে দেবে। মুখোমুখি হয়েতো লাভ নেই। তবে এটুকু বলি আপনি আমাদের আঘাত করেছেন কিন্তু আহত করতে পারেননি।

হাসান শাহরিয়ার
সেলিম স্যার কিছু বলবেন।

সেলিম আল দীন
আমি খুব বিব্রত বোধ করছি, কারণ কিছু সাদামাটা প্রশ্ন ঘুরেফিরেই আসছে ... মেধাবী আভাস পাচ্ছি না প্রশ্নগুলো মধ্যে। বারে বারেই সমকালীন প্রসঙ্গ আনা হচ্ছে এবং এগুলোর উত্তর আমরা কম-বেশি সবাই জানি। নাটক প্রতিদিনকার খবরের কাগজ নয়, সবসময় লেখার মধ্যে জোস থাকার দাবী করলেতো মুশকিল। নজরুল, রবীন্দ্রনাথ তাহলে এখন বাদ? আমরা ইডিপাস করবো না? আমরা ব্রেখট করবো না? এখনকার সমস্যা নিয়েই নাটক করতে হবে, তেল গ্যাস নিয়ে? শিল্প জিনিসটাকে এতটা সমসাময়িক করানোর মধ্যে অনেক সমস্যা আছে। আমারতো মনে হয় রবীন্দ্রনাথে দু-একটি কবিতা বা নজরুলের কবিতাই যেকোনো সময়ে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে। আমাদের হাজার বছরের নাট্য ঐতিহ্য আছে, সাহিত্য ঐতিহ্য আছে ... সেগুলোকে মাথায় রেখে প্রশ্নগুলো করলে ভালো হয়। কবিগুরু গ্যাটে বলেছেন- আমাদের নতুন কিছুই ভাববার নেই। আমাদের যা কিছু ভাবার তা আগেই ভাবিত হয়ে গেছে। আমাদের কাজ হচ্ছে সেগুলোকে নতুন করে ব্যাখ্যা করা মাত্র। ধন্যবাদ।

হাসান শাহরিয়ার
যাদের কাছে মাইক্রোফোন আছে তারা একটু লক্ষ্য রাখবে যেন অগ্রাধিকারভিত্তিতে দর্শক সুযোগ পান। এখান থেকে সবটা বোঝা যাচ্ছে না। হ্যাঁ বলুন।

গোলাম শফিক
[নাট্যকার ও নাট্যবিষয়ক প্রবন্ধ লেখক]
ধন্যবাদ। শাহরিয়ার আসলেই স্বৈরাচারী। কারণ, আমি অনেক আগেই অঙ্গুলি উত্তোলন করেছিলাম। এখনতো প্রশ্নটাই ভুলে গেছি। ... যাই হোক মনে পড়েছে ... প্রশ্নটি আমার একজন প্রিয় নাট্যকার মামুনুর রশীদকে তাঁর রাঢ়াঙ নাটক নিয়ে। রাঢ়াঙ দেখার সময় আমার মনে হয়েছে  যে, নাটকের গাঁথুনিটা বোধহয় মজবুত হয়নি। কোথায় যেন তেল-জলের মতো, বারবার আলাদা হয়ে যাচ্ছিল। আমি আমার অধিকার থেকেই প্রশ্নটা করছি, কারণ উনি আমার প্রিয় নাট্যকার। আমি তুষ্ট হতে পারিনি। এটার কারণ কী? আপনি বলেছিলেন, এটা আপনার ফরমায়েশি লেখা ছিলো ... এটা সে কারণে না অন্য কিছু?

মামুনুর রশীদ
না আমি কোনো সময়ই বলিনি যে, এটা ফরমায়েশি লেখা। ...

গোলাম শফিক
আপনি বলেছিলেন যে, শাঁওতালরা আপনাকে বলেছিল ... অনুরোধ করেছিলো ... সেই অনুরোধ রাখতে গিয়েই ...

মামুনুর রশীদ
না এটা ফরমায়েশি লেখা নয়। শাঁওতাল জনগোষ্ঠীতে যখন আমি যাই ... তাদের যুবক নেতা আলফ্রেড সরেন যখন মারা গেল, তখন এক প্রতিবাদ সভায় আমি গিয়েছিলাম ... তখন তারা আমাকে অনুরোধ করেছিল যে, আমি যেন তাদেরকে নিয়ে একটি নাটক লিখি। এ অনুরোধ ছিল আমার প্রেরণা ... আর এই প্রেরণা থেকে চার বছর ধরে নানা গবেষণা করে আমি এই নাটকটি লিখেছি এবং মঞ্চস্থ করেছি। এখন আপনার কাছে যদি নাটকটি অসম্পূর্ণ মনে হয়ে থাকেতো আমার কিছু করার নেই। তবে দর্শক হিসেবে এটা আপনার ব্যক্তিগত অভিমত, এটা অবশ্যই আপনার অধিকার আছে ... কিন্তু আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি ... আমার সীমাবদ্ধতা আছে ... সীমাবদ্ধতার মধ্যদিয়ে আমার সাধ্যমতো আমি চেষ্টা করেছি। আপনাকে ধন্যবাদ।

জনৈক দর্শক
সব কথা নাট্যকার নির্দেশকরা বললেইতো হবে না। আমরা দর্শকদের মধ্যেও অনেক গুণীব্যক্তিত্ব দেখতে পাচ্ছি। আমরা তাদেরকেও প্রশ্ন করতে চাই।

হাসান শাহরিয়ার
না ভাই। এক অনুষ্ঠানেতো সব ইচ্ছা পূরণ করা যাবে না। আজকে আপনাদের প্রশ্ন মঞ্চে বসা নাট্যকার-নির্দেশকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। পরে হয়তোবা আমরা অন্যরকম আয়োজনের চেষ্টা করবো। এবার বলছেন, এনাম তারা সাকী।

এনাম তারা সাকী
[প্রাক্তন ছাত্রী, নাট্যকলা ও সংগীত বিভাগ, ঢা.বি]
আমরাতো অনেক নাটক এডাপ্ট করে মঞ্চস্থ করি। দেশি নাটক বা বিদেশি নাটক। কিন্তু আমি দেখেছি এই এডাপ্টেশন যদি রবীন্দ্রনাথের কোনো গল্প বা কবিতাকে নাট্যরূপ দিতে গিয়ে করি তবে বাধার সম্মুখিন হতে হয়। কেন? আমরা কি রবীন্দ্রনাথকে সমকালীন করার প্রয়োজনে আমাদের মতো করে পরিবর্তন করতে পারি না? বাধাটা কোথায়?

হাসান শাহরিয়ার
উত্তরটা কার কাছ থেকে প্রত্যাশা করছেন?

এনাম তারা সাকী
যে কেউ বলতে পারেন।

সেলিম আল দীন
আমি দিচ্ছি। বাধাটা সম্পর্কে আমি জ্ঞাত নই। কে বাধা দেয় বা ... মানে আমার কাছে এধরনের কোনো তথ্য নেই। সত্যজিতের চারুলতা দেখার পর নষ্টনীড়ে-র সেই চিরকালের নারী হৃদয়ের অব্যক্ত কান্নাই চোখে পড়ে। এই চিরন্তনকে আমরা রবীন্দ্রনাথের গল্পে সবসময়ই পাই। রবীন্দ্রনাথ হচ্ছেন ... বিশ্বে, সাতজন গল্পকারের মধ্যে একজন, যাঁর শতকরা নব্বইটা গল্পই বিশ্বমানের। আর তাছাড়া, রবীন্দ্রনাথের গল্প-কবিতাকে নাট্যরূপ দিতে হবে কেন বুঝতে পারছি না। ওঁর তো পঞ্চাশের উপর নাটকই রয়েছে। তো মূল নাটক না করে অন্য কিছু নিয়ে টানাটানির দরকারই বা কী? আরেকটি কথা হচ্ছে সমকালীন করার ব্যাপারটা। রবীন্দ্রনাথকে সমকালীন করার মতো সাহিত্যিক কোথায়? রবীন্দ্রনাথ যে প্রাচীন হয়েছেন সেই তথ্যও আমার জানা নেই। হোমার কখনো পুরান হয় না, রবীন্দ্রনাথ কখনো পুরান হয় না, গ্যাটে কখনো পুরান হয় না। আমি একটা কথা বলি ... সংস্কৃত দর্শনে একটা কথা আছে- অতীত বলে কিছু নেই, যদি অতীত হতো তাহলে বর্তমান হলো কী করে? এটা নাটক সম্পর্কে বলা হয়েছে। আপনি এখন করছেন বা করতে চাচ্ছেন মানেই হলো এর প্রাসঙ্গিকতা বর্তমানে আছে। এই প্রাসঙ্গিতা যদি খুঁজে পান তাহলে বাধা বলুন আর সংকট বলুন কিছুই থাকবে না। ধন্যবাদ।

হাসান শাহরিয়ার
ধন্যবাদ। এবার বলুন আপনি বলুন।

তমাল শাহ আলম
আমি মূলত কবিতা লিখি। আমার প্রশ্ন তিন নাট্যকারের কাছে। আমরা স্বাধীনতার পর অনেক সংগ্রামী নাটক পেয়েছি। নূরলদীনের সারাজীবন, পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়  ইত্যাদি। এর কোনোটি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের নেতাকে নিয়ে কোনোটি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। কিন্তু আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের মহান যে সাতজন বীর শ্রেষ্ঠ আছেন তাঁদেরকে নিয়ে কোনো নাটক পাইনি, কেন? আমরা কি তাঁদেরকে নিয়ে নাটক লিখতে পারি না? সমস্যাটা কোথায়?

আবদুল্লাহ আল-মামুন
আসলে আমি অনেক্ষণ ধরে শুনছিলাম। কারো ভালো লাগুক বা না লাগুক ... আমার এধরনের সম্মিলন ভালো লাগে না। এগুলো হওয়া উচিত নয়। আমাদের দেশে গোলটেবিল বৈঠকের যে সংস্কৃতি চালু হয়েছে এটা কিন্তু আমাদের ধস নামার একটা কারণ। গোলটেবিল বৈঠক হয়ে যাবার পর একটা সেটিসফেকশন নিয়ে বাড়ি যাওয়া হয় যে- দেশের একটা বড় সমস্যার সমাধান বুঝি হয়ে গেলো। অপ্রাঙ্গিক হলেও বলি যে, এখানে থিয়েটারওয়ালার একটা বড় ভুল হয়েছে- নাট্যকার ও নির্দেশকদের এক জায়গায় বসানোটা। এই দুই সত্তাকে একসাথে করানো ঠিক না। ওরা ভাবে ওরা বড় আমরা ভাবি আমরা। যাই হোক, আপনারা অনেক না জেনেও প্রশ্ন করছেন। একটু আগে যে মেয়েটি প্রশ্ন করলো রবীন্দ্রনাথের নাটক নিয়ে, বাধার ব্যাপারে ... আমরা সবাই করেছি, অনেকেই করেছি রবীন্দ্রনাথের নাটক ... মঞ্চে টেলিভিশনে, কোনো বাধা আসেনি। পাকিস্তান আমলে একবার বাধা এসেছিলো কস্টিউম নিয়ে। সেটা হলো আমাকে এক কবি ও অফিসার বলেছিলেন যে, পাজামা পড়ালে যদি ধূতির কাজ হয় তাহলে আপনার অসুবিধা কোথায়? তো এটাতো সৃজনশীল বাধা। এমন বাধা আসতেই পারে। আর উনি প্রশ্ন করলেন বীরশ্রেষ্ঠদের নিয়ে নাটক হয়নি। উনি জানেনই না যে, বীরশ্রেষ্ঠদের নিয়ে অনেক নাটক টেলিভিশনে হয়েছে ...

তমাল শাহ আলম
আমি মঞ্চের কথা বলছি।

আবদুল্লাহ আল-মামুন
আপনি কী করে জানেন যে কালকেই আমি লিখবো না? আমাদের ভাবনায় কখন কী আসে সেটা আমরাই জানি না। আর আমাদেরই লিখতে হবে এমনওতো কোনো কথা নেই। আমিতো জানি না সেলিম কী ভাবছে বা আগামী নাটক কীসের উপর লিখছে বা মামুনুর রশীদ কী লিখছে তাই না? আপনারা জিজ্ঞাসা করতে পারেন আমরা কী ভাবছি ... এসব নিয়ে।

হাসান শাহরিয়ার
আলোচনার এ পর্যায়ে আমরা অনুরোধ করবো মঞ্চে যাঁরা বসে আছেন তাঁরা নিজেরাও যেন নিজেদের ব্যাপারে প্রশ্ন করেন। আপনাদেরও নিশ্চয়ই আপনাদের ব্যাপারে কোনো জিজ্ঞাসা থাকতে পারে। এবার আবদুস সেলিম স্যার।

আবদুস সেলিম
সেলিম আল দীন যখন ছাত্র ছিলেন, তখন একবার নিউমার্কেটে আড্ডার সময় বলেছিলেন ... আমার সাথে আবদুল মান্নান সৈয়দও ছিলেন ... আমরা অধ্যাপনা করতাম, সেলিম সাহেব ছাত্র ছিলেন ... তো আপনি বলেছিলেন, নাটক কেন কবিতার মতো পড়া হবে না? জানি না আপনার মনে আছে কি না। তো আপনি কি এখনো ভাবেন যে, নাটক কবিতার মতো পড়া দরকার? অন্য একটি প্রশ্ন করছি- আলী যাকের আর আতাউর রহমানকে। আপনারা দুজনই নির্দেশক, দুজনই অভিনেতা। যদিও আমি আলী যাকেরকে বেশি অভিনেতা মনে করি ... উনি বেশি অভিনয় করে থাকেন... আতাউর রহমানের নির্দেশনাতেও আপনি অভিনয় করেছেন। আবার আপনি নির্দেশনাও দেন ... তো আপনারা নির্দেশক হয়েও যখন নিজেদের অধীনে অভিনয় করেন ... কোনো শীতল দ্বন্দ্ব কি হয়? অর্থাৎ আপনারা কি আপনাদেরকে ঠিকমতো হ্যান্ডল করতে পারেন?

হাসান শাহরিয়ার
প্রথম প্রশ্ন সেলিম স্যারকে করেছেন।

সেলিম আল দীন
আবদুস সেলিমকে ধন্যবাদ। একসাথে অর্জুনের মতো সাতটি তীর নিক্ষেপের জন্য ...

আবদুস সেলিম
আর মাইক পাবো কি না সেই আশংকায় ...

সেলিম আল দীন
অতি কৈশরের বা যৌবনের দিকের কথা মনে করিয়ে দেবার জন্য ধন্যবাদ। ভারচুয়ালি আমার খেদটা ... যে খেদ থেকে আমি নাটক রচনা শুরু করি সেটা এই যে ... হ্যারল্ড পিন্টার বা টি.এস এলিয়ট বা ওরকম কেন আমাদের থিয়েটারে হয় না। তখন আমি থিয়েটারটা ভালো জানতাম না। আমার মনে হয়েছিল যে, সেখানকার আধুনিক কবিতার সঙ্গে ... একেবারে আধুনিকতম ইয়েটস্’র বা অডেনের কবিতার সাথে ওখানকার নাট্যকারদের পার্থক্য নেই। ভাষাগত, চিত্রকল্পগত, ভাবগত, দর্শনগত কোনো পার্থক্য নেই। কিন্তু আমাদের এখানে ... গরিব মাস্টারের বেকার ছেলে, মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না ... মানে অদ্ভুত অদ্ভুত দ্বন্দ্ব, মানে একেবারেই কল্পিত ব্যাপার স্যাপার। তো আমি ভাবতাম যে রবীন্দ্রনাথ কী করে একাজগুলো সফলভাবে করলেন? আমি ভাবলাম এট্ ওয়ান্স ওয়েস্টের দিকে মার্চ করা উচিত। কিন্তু দেখলাম ওয়েস্টে যেটা স্বাভাবিক ইস্টে সেটা অস্বাভাবিক। আবার আমি এট্ ওয়ান্স  আমাদের দিকে ব্যাক করলাম। দেখলাম এখানে মাইকেল মধুসূদন আছেন ... আমাদের পিতৃপুরুষ, রবীন্দ্রনাথ আছেন, তাঁদের নাটক কিন্তু পাঠযোগ্য ... একেবারে কবিতার মতোই পাঠযোগ্য ... তো আমাদের নাটক হওয়া উচিত পাঠযোগ্য। এবং আমাদের মতো করে নাটক লিখতে হবে। বাঙ্গালির স্বভাব ধর্মের মধ্যেই সংগীত এবং কবিতা ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। সব ধর্মেই এটা আছে ... চণ্ডী মঙ্গল পড়ি বা মনসা মঙ্গল পড়ি বা লাইলী মজনু পড়ি ... সব লেখার মধ্যে দেখা গেল যে, এটি একই সঙ্গে উপাখ্যান আবার একই সঙ্গে ঘটনার সংঘাত বা এসব নেচে গেয়ে পরিবেশন করতে হয়। আমাদের সংলাপ হতে হবে কাব্যিক ... যেমন ধরুন সুরা বাকারায় আছে- আমি বৈচিত্র্যকে সৃষ্টি করেছি ঐক্যকে অনুধাবন করার জন্য- আমার বিশালতাকে অনুধাবন করবার জন্য ... অসাধারণ লাইন। তো আমি মনে করি প্রাচীন দর্শনগুলো থেকেও আমরা অনুপ্রাণিত হতে পারি ... হতে পারি এজন্য যে, কবিতা এবং  গদ্যের মধ্যে কোনো ভেদ না করে একটি অদ্বৈত শিল্পরূপ দেয়। দ্বৈত থেকে অদ্বৈত। ধন্যবাদ।

হাসান শাহরিয়ার
ধন্যবাদ। আতাউর রহমানভাই, দ্বিতীয় প্রশ্নটি আপনার জন্য।

আতাউর রহমান
আবদুস সেলিম সাহেব একটি ভুল পরিসংখ্যান দিয়েছেন। ‘নাগরিক’র জন্ম থেকে আজ অব্দি ৩৭ টি প্রযোজনার মধ্যে আমি সংখ্যার দিক থেকে আলী যাকেরের চেয়ে অনেক বেশিবার মঞ্চে নেমেছি। কিন্তু যেহেতু আমি একজন দুর্বল অভিনেতা, সেজন্যই আলী যাকেরকে অনেক বেশি চোখে পড়েছে, আমাকে পড়েনি। এবার উত্তরে আসি। নির্দেশক হিসেবে ... আমি নিজে যেভাবে কাজ করি ... তাহলো আমি কোনো ব্লু প্রিন্ট মাথায় রেখে কাজ করি না। কাজ করায় বিশ্বাসও করি না। একটা ঝাপসা ছায়া থাকে, ওতে অস্থি-মজ্জা-মাংশ ইত্যাদি লাগাতে থাকি গ্র্যাজুয়েলি। যে ছেলেটি ভালোভাবে কথা বলতে পারে না, আমি মনে করি তার দুর্বলতাও কাজে লাগানো সম্ভব। আমার নির্দেশনা জীবনের একজন বড় অভিনেতা, আসাদুজ্জামান নূর এখানে সামনে বসে আছেন ... তো সে ওয়েটিং ফর গডো-তে চমৎকার অভিনয় করেছেন। তিনি অনেক সময় বলতেন যে, আতাভাই এটা কী হবে একটু বুঝিয়ে দিন। আমি বলতাম যে, আমিও ভালো বুঝি না, চলো কাজ শুরু করি ... কাজ করতে করতে ডিসকাশনের মাধ্যমে বের করবো কী হবে। আর আলী যাকেরের সাথে আমার রিলেশন হলো- ওর নির্দেশনায় আমি যখন কাজ করি, তখন সমস্ত অহংবোধ ডোবায় বিসর্জন দিয়ে কাজ করি ... আমি যে প্যাকেজ নাটক করি, যৎকিঞ্চিৎ যা করি, নির্দেশক যা বলে আমি মাথা নত করে স্কুলের ছেলের মতো শুনি। কারণ, আমি তাকে সুপ্রিম মনে করি। আলী যাকেরের সঙ্গে কাজ করতে গেলে ... ও হচ্ছে বিশাল ব্যক্তিত্ব ... খুব ডিফিকাল্ট ওকে হ্যন্ডল করা এবং ডিফিকাল্ট হয়েছেও বহুবার। আমি শুধু টেকনিক খাটাতাম কীভাবে আমার গোল এচিভ করা যায় ... দোস্ত এভাবে না, ওভাবে একটু করে দেখো ... ওর কথা শুনেছি, ওকে বুঝিয়েছি ... কিন্তু ওকেতো বোঝানো যায় না। হি ইজ নট ওপেন টু আরগুমেন্ট বা আমাকে অকিঞ্চিৎকর মনে করে বোধহয় কিন্তু আমি আমার কাজটা করার সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাই ... ওকে না রাগিয়ে না খাটিয়ে ... এবং এটাই নির্দেশকের কাজ বলে আমি মনে করি। ধন্যবাদ।

আবদুল্লাহ আল মামুন
দেখলেনতো, আমার কথায় কাজ হয়েছে না? এখন কিন্তু আস্তে আস্তে খোলা শুরু হয়েছে, ভেতরের কথাগুলো.. হাঃ হাঃ।

হাসান শাহরিয়ার
এবার যাকেরভাই, আপনি বলুন।

আলী যাকের
আমি আতাউরের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত, বিশেষ করে আমার প্রশংসার ব্যাপারে ... হাঃ হাঃ। তবে এই যে, দ্বন্দ্বটা ... নির্দেশক-অভিনেতার মধ্যে, এই দ্বন্দ্বটার প্রয়োজন আছে। না হলে নাটকের মতো একটি গতিশীল মিডিয়া স্থবির হয়ে যাবে। এই দ্বন্দ্ব থেকে কেবল আমরা ভালো কাজ পেতে পারি। অভিনেতা যদি কনভিন্সড না হন, তাহলে তিনি প্রশ্ন করবেনই। আর নির্দেশক যদি প্রশ্ন পছন্দ না করেন, তবে নির্দেশনা না দেয়াই উচিত। কাজেই আমি মনে করি আতাউর আমাকে অনেক উপকার করেছেন অনেক সময় ... আমাকে হ্যান্ডল করা ডিফিকাল্ট বলে যে বললো, ... সেকারণে আমাকে অনেক বোঝাতে হয়েছে  ... এবং তাতে  আমি উপকৃত হয়েছি এবং আমি মনে করি আমার অভিনয় দ্বারা সে-ও বেশ উপকৃত হয়েছে। এই প্রসেসটা বন্ধ হওয়া উচিত না। আর্ট মানেই হচ্ছে ডায়লেকটিক্স- এবিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আমার মনে হয় সেলিমের (আবদুস সেলিম) উত্তরটা দিতে পেরেছি।

আবদুল্লাহ আল-মামুন
আমার কথাটার একটা সত্য ছিলো ... তবে সেটা কিন্তু পরস্পরের পিঠ চুলকানো নয়, এটা সবাই একটু খেয়াল রাখবেন হাঃ হাঃ।

হাসান শাহরিয়ার
ধন্যবাদ। এবার তারিক আনামভাই।

তারিক আনাম খান
[নাট্যনির্দেশক, অভিনেতা, সংগঠক, অনুবাদক]
আমি আবদুল্লাহ আল- মামুনভাই ও মামুনুর রশীদভাইয়ের কাছে জানতে চাই ... এই যে একটা প্রসঙ্গ এলো নির্দেশক আর অভিনেতাকে হ্যান্ডল করা ... তো আপনাদের মধ্যে আমরা দেখি তিনটি সত্তা কাজ করছে। একাধারে আপনারা নাট্যকার-নির্দেশক এবং অভিনেতা। সেখানে আপনারা কী প্রক্রিয়ায় কাজটা বের করে আনেন? মানে নিজেরাইতো নিজেদেরকে হ্যান্ডল করছেন- সেটা কীভাবে? আবার আপনাদের নাটক যখন অন্য কেউ নির্দেশনা দেন ... এমনতো হয়েছে, তখন আপনি নাট্যকার ও অভিনেতা ... তো এটা , মানে তখন কী ঘটে বা কীভাবে ঘটে?

আবদুল্লাহ আল-মামুন
আপনারা সবাই উৎপল দত্তের নাম জানেন, শুনেছেন সব সময়। বিখ্যাত ব্যক্তি ... সব কিছুতেই বিখ্যাত ... অভিনয়ে, নির্দেশনায়, নাট্যরচনায়- সবকিছুতেই। উনি কেবল কালচারাল একটিভিস্টই ছিলেন না, পলিটিক্যাল একটিভিস্টও ছিলেন। আপনাদের অনেকের মনে আছে একসময় ‘সংবাদ’ পত্রিকায় কাজ করা মানে আমরা ধরে নিতাম মহান এক কাজ করতে ঢুকেছি। টাকা লাগবে না, কিছুই লাগবে না। কাজ করতে দিলেই হলো। উনিও কিন্তু নাটক করতেন এমন পাগলের মতো। তো উনি প্রথমে কেবল অভিনয়ই করতেন। করতে করতে একসময় তিনি বিমর্ষ হয়ে পড়লেন। ওনার বন্ধু-বান্ধবরা বলতো যে, কী ব্যাপার আর অভিনয় করবেন না নাকি? তখন উনি বলতেন যে, অভিনয় করবার মতো আসলে কোনো চরিত্র পাচ্ছি না। আনন্দ পাওয়ার মতো ক্যারেক্টর পাচ্ছি না। এন্ড দ্যাট একচুয়ালি মেড হিম এ রাইটার ... একজন নাট্যকার হওয়ার পিছনে এটাই কিন্তু ছিল তাঁর অনুপ্রেরণা। এবার আমার কথায় আসি। আমি কিন্তু লিখতেই বেশি সাচ্ছন্দ্য বোধ করি। বিকজ আই ক্যান ক্রিয়েট। আমি সৃষ্টি করতে পারি। এখন তারিক আনাম যে ম্যানেজের কথা বললো ... হ্যান্ডলের কথা বললো ... সেটা হলো নাটক লেখার সময়তো আগে জানতাম না যে, আমাকেই নির্দেশনা দিতে হবে। সেটা মাথায় রাখলেতো আর লেখা যায় না। আর অভিনয়? আমি অভিনয় করতে খুবই আগ্রহী কিন্তু নিজের নাটকে অভিনয় না করতে পারলেই ভালো হতো। এটা করেছি দলের প্রয়োজনে, দলের অভিনেতা সংকটের কারণে। এটা প্রবলেম তৈরি করে। আবার একটা সুবিধার দিকও পেয়েছি, সেটা হলো- নাট্যকার হিসেবে যে শর্টকামিংগুলো আছে, নির্দেশক হয়ে সেগুলো আবার কিছুটা পুষিয়ে দিতে পেরেছিলাম। ধন্যবাদ।

তারিক আনাম খান
আরেকটি প্রশ্ন নাসির উদ্দিন ইউসুফের কাছে। আমি অনেকের সঙ্গে কাজ করেছি ... জামিলের সঙ্গে কাজ করেছি, মামুনভাইয়ে সঙ্গে কাজ করেছি কিন্তু বাচ্চুভাইয়ের সাথে কাজ করিনি। তো আমাদের এখানে প্রচলন আছে যে, কাজ করতে করতে অভিনেতা যদি আটকে যান তাহলে নির্দেশক দেখিয়ে দেন ... মাঝে মাঝে এমন হয়। আমার জানার ইচ্ছা বাচ্চুভাই যখন নির্দেশনা দেন, তখন আপনার প্রক্রিয়াটা কী হয়? ধন্যবাদ।

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
আসলে ব্যাপারটা এরকম যে, নির্দেশক হিসেবে আমি প্রথমত নাটকটাকে কীভাবে দেখি এটিই বোধহয় এড্রেস হওয়া উচিত। এখানে নাট্যকাররা আছেন, কিছু মনে করবেন না ... কথাগুলো ভালো না-ও লাগতে পারে ... সেটা হচ্ছে যে, আমি মনে করি যে, আমি এটিকে টেক্সট হিসেবেই দেখি ... সিম্পলি টেক্সট হিসেবেই দেখি। এবং নাটককে মনে করি, মঞ্চে বিনির্মাণ করি। এবং সেটা যেকোনো রকম টেক্সট হতে পারে। ইদানীংকালে আমার ধারণাই হয়েছে যে, নাটক লিখতেই হবে এমন কোনো কথা নেই। দুটো পৃষ্ঠা যদি দিয়ে দেয়া হয়, সেখান থেকেও থিয়েটারটা তৈরি করা যেতে পারে। থিয়েটারটা মঞ্চে ঘটে, তাৎক্ষণিকভাবে ঘটে- তাৎক্ষণিকভাবে শেষ হয়। ভুল বলে কোনো শব্দ নেই থিয়েটারে। যা ঘটে সেটাই সত্যি এবং আগামীকাল সেই ভুলটি হবে না। আগামীকাল নতুন কোনো ভুল হবে যেটি কালকের জন্য সত্যি হবে। এ থেকেই বলতে পারি যে, নাট্যকার যে নাটকটি লিখেছেন সেটিই যে প্রতিদিন অভিনীত হচ্ছে তা ভাবা মুশকিল। এবার আমি অভিনেতাকে হ্যান্ডল করার বিষয়ে যাচ্ছি। একবার ... ৮৬ সালের দিকে আমি একটা পত্রিকায় বলেছিলাম, খুব রাগ করে ... জামিল সাক্ষী আছে ... আমি বলেছিলাম অভিনয় হচ্ছে তৃতীয় শ্রেণীর শিল্পকর্ম ... আমি বলেছিলাম ...

আলী যাকের
এই একটি কাজ তুমি একেবারেই পার না বলে হাঃ হাঃ ...

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
হাঃ হাঃ ... পারি না বলে না ... জামিল দুটো নাটকে অভিনয় করেছে, আমিও দুটো নাটকে অভিনয় করেছি। জামিল করেছে জণ্ডিস ও বিবিধ বেলুন আর ফণিমনসা- তে। আমি করেছিলাম নাট্যচক্রে- এক্সক্লুসিভ ও মূল সমস্যা আরেকটি হলো কেরামতমঙ্গল-এ ...

সেলিম আল দীন
আরে না না, ও অভিনয় করেনি। মঞ্চে ঢুকে একজনের কাছ থেকে বিড়ি চেয়ে নেয়, ব্যস ঐটুকুই ...

আলী যাকের
ঐটুকুতেই সে বুঝতে পেরেছে অভিনয় কত কঠিন হাঃ হাঃ ...

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
সেলিম যেটা বললো সেটা কিত্তনখোলা-র। ব্যাপারটা হলো অভিনেতা কীভাবে ট্যাকল করা হয় ... তো ৮০/৮১ সালের কথা। কিত্তনখোলা-য় মেলার দৃশ্যে দেখতে পেলাম মঞ্চে ২০/২৫ জন একসাথে বিড়ি টানছে। তো যারা দর্শক আছেন এবং অনেকেই সিগারেট খান না ... তাদেরতো পালিয়ে যাবার কথা। ... আমি কী করি ভাবছি, আমিতো মঞ্চের বাইরে ... তো আমি একটা লুঙ্গি পড়ে ঢুকে গেলাম, আর একেকজনের কাছ থেকে বিড়ি নিচ্ছি আর নিভিয়ে ফেলছি ... আর গাল দিচ্ছি, আস্তে আস্তে- বেটা, তোর বিড়ি টানার কথা ছিল? পাছায় লাত্থি দেব ... এই আর কি!

মামুনুর রশীদ
মানে সে কী রকম নাট্যবিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছিল বুঝতে পারছেন? হাঃ হাঃ ...

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
না না অভিনেতা হ্যান্ডল করছি  ... ও হ্যাঁ, আতাউর রহমানভাইতো এক সময় ভাবতেন যে, অন্য কেউ নির্দেশনা দেয় আর আমি আমার নাম বসিয়ে দিই। মুক্তিযোদ্ধাতো, শক্তি আছে অন্যেরটা নিজের বলে চালিয়ে নিই ... হাঃ হাঃ। যা হোক শিল্পীদের ট্যাকল করার ব্যাপারটাতে যাই ... খুব কঠিন, ডিফিকাল্ট এবং একই সাথে ইন্টারেস্টিং। এ কারণে যে, অনেক কনফ্লিক্ট হয়। একটি সংলাপে বা একটি ন্যারেশনের নানা রকম ব্যাখ্যা তৈরি হতে পারে। আমি মনে করি আমার যে ন্যারেটিভনেস ... থিয়েটারে ... কেবল থিয়েটারে না, আমি মনে করি যেকোনো শিল্পকর্মে ন্যারেটিভনেসটা হচ্ছে সবচেয়ে জরুরি এবং অন্যতম প্রধান উপাদান। সেটা পেইন্টিংও হতে পারে, চলচ্চিত্রও হতে পারে ... কবিতাও তা-ই। আমি প্রথমে একটি টেক্সট হাতে পাই। সেটা নিয়ে ভাবি ... টেক্সটটার স্থান-কাল-পাত্র এগুলো বিবেচনায় আনি। টেক্সটটা হাতে পেলে শতবার পাঠ করা হয়। পাঠের মধ্য দিয়ে একটি ইন্টিমেট স্পেস বা ঘনিষ্টভূমি খুঁজে পাই। একটা সুর খুঁজি - সুর, তাল, ছন্দ, লয় ইত্যাদি খুঁজি - সুরটা পেলে ভূমিটাকে ... ভূমির উপর চলমান চরিত্র এবং ঘটনাগুলো সুর দিয়ে বেঁধে ফেলি। সুরটা যেন প্রাণের মতো কাজ করে। চরিত্র করছেন যারা, অভিনেতারা, তাদের সাথে এ সব কিছু শেয়ার করি। চরিত্রের সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক অবস্থান, নাটকের জমিনে তার অবস্থান ... এসব নিয়ে শেয়ার করি। অন্য চরিত্রের সাথে তার দেয়া-নেয়া-বোঝার সেশন চলে দীর্ঘদিন।

অভিনেতাকে নিজের জীবনাভিজ্ঞতা, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, পেইন্টিং, চলচ্চিত্রসহ তাবৎ শিল্পমাধ্যমে মনোনিবেশ করে জটিল গ্রন্থি উন্মোচনের আহ্বান জানাই, রঙ ও সুরের সাথে ঘটনার মেলবন্ধ করার সূত্রগুলো ধরিয়ে দিই। রিহার্সেলে অভিনেতা নির্বাচনের পর ... যখন রিডিং করতে থাকি তখন তারাও অনেক ভাবনা আমাকে দেয়, আমি দিই ... এভাবেই বিভিন্ন মতামত একজন নির্দেশকের মাথায় নেয়াটা একটা বড় ব্যাপার। এসব ইন্টারেকশনে অভিনেতারা তাদের জানা কিছু রেফারেন্স আমাকে দেয়। আমি অনেক সময় বই পড়তে বলি, আর দশটি প্রাসঙ্গিক বই পড়তে বলি। এভাবে সে-ও তৈরি হতে থাকে। মঞ্চাভিনয়ের জন্য যে ঘনিষ্টভূমি বা ইন্টিমেট স্পেস আমরা ডিজাইনারদল তৈরি করি, সে স্থানে তাকে বিচরণ করতে দিই। পোষাকের রঙ, মিউজিকের সুর-তাল নিয়ে তাকে সেই ঘনিষ্টভূমিটাকে এক্সপ্লোর করতে বলি। কখনো নীরব, কখনো সরব এভাবেই ক্রিয়াটা চলে। অভিনেতা একধরনের শৃঙ্খলার মধ্যে বাঁধা পড়ে যায়। এটা ইচ্ছাকৃত। তারপর ধীরে ধীরে তাকে স্বাধীনতা দিই ... এটা নির্ভর করে তার প্রস্তুতির উপর। আমি যখন স্তানিস্লাভস্কির স্কুলে কাজ করতাম তখন ডেফিনিটলি বলতাম যে, এই চরিত্রটি অভিজ্ঞতা থেকে করবে ... মেক বিলিফ আছে, সবই আছে, বিভিন্ন রস আছে ... সব জেনে চরিত্রটি নির্মাণ করবে। কিন্তু এখন তা করি না। এখন আমি ডি-ক্যারেক্টারাইজেশনে বিশ্বাসী। আমি মনে করি নাট্যকার একটি চরিত্র আটসাটভাবে বেধে দেন, আমি সেটাকে ভেঙে মঞ্চে উপস্থাপন করি। সুতরাং আমার ভাবনাটা সম্পূর্ণ বিপরীত জায়গায় দাঁড়িয়ে গেছে।  ধন্যবাদ।

তারিক আনাম খান
আপনি যা বললেন ... আপনার মঞ্চনাটক দেখে কিন্তু তা মনে হয় না। বরং আপনার নাটকে টেক্সট অনেক বেশি চেপে থাকে বলে মনে হয় ...

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
তাই নাকি?

তারিক আনাম খান
অবশ্যই। টেক্সট-এর চাপ আছে। আপনার দীর্ঘ দীর্ঘ সব নাটকে মনে হয় যেন একটা টেক্সট আপনার উপর চেপে আছে, সেখান থেকে আপনি কিছু কাজ করতে চাচ্ছেন। জানি না, এটা আমার দেখাটার কথা বললাম, অন্যের সাথে না-ও মিলতে পারে।

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
আপনি যদি মূল বনপাংশুল বা কেরামত মঙ্গল বা কিত্তনখোলা পড়েন, তার সাথে মঞ্চের যে রূপটা ... ব্যাপক পার্থক্য দেখতে পাবেন। বনপাংশুল-এ গুণীনের মৃত্যুদৃশ্য-এর লেখ্যরূপ এবং মঞ্চ প্রয়োগরূপ কি আকাশ-পাতাল ফারাক নয়? গ্রামবাসির এবং সুকির সকল সংলাপ বাদ দিয়ে তার স্থলে সুকির কণ্ঠে মালকোষ রাগ ব্যবহার এবং সমান্তরালে গুণীনের শেষ ইচ্ছার কথা গুণীনের মুখ থেকে উচ্চারিত হচ্ছে। এতো ভিন্ন মঞ্চকাব্য যা স্ক্রীপ্ট থেকে নেয়া কিন্তু মঞ্চে কবিতাসম। আবার ধরুন হাত হদাই’র কাছিম শিকারের লেখ্যরূপ আর মঞ্চরূপ কি এক? প্রয়োগের মাধ্যমে তা-কি দৃশ্যকাব্যে পরিনত হয়নি? এরকম অনেক উদাহরণ দেয়া যায় আমার প্রযোজনা থেকে।

হাসান শাহরিয়ার
বাচ্চুভাই সেলিম স্যার কিছু বলতে চাচ্ছেন।

সেলিম আল দীন
আমার কথা হলো সংলাপের পর সংলাপ সাজিয়ে যদি নাটক হতে পারে তো সংলাপের পর সংলাপের বর্ণনা দিয়ে নাটক হলে অসুবিধাটা কোথায়? তিনহাজার বছর ধরে ... একজন সংলাপ বলে তো আরেকজন এর উত্তর দিচ্ছে- এভাবেইতো নাটক চলেছে। সেই জায়গায় বর্ণনাত্মকরীতিতে বর্ণনা এবং চরিত্র যদি অভিন্ন হয়ে যায় সেটা রিপিটেশন কেন মনে হবে?

এখন আমরা যদি মনসা মঙ্গল করতে চাই ... মুকুন্দ রামের টেক্সট কি পাল্টাবো? কতদূর পাল্টাবো? ভাষাররীতি, যেটা বা যেগুলোতে শিল্প সম্বন্ধযুক্ত শব্দ বা ঘটনা সম্বন্ধযুক্ত যে ভাষাটা তৈরি হয়ে গেছে, সে ভাষাটাকে আমরা কতদূর চেঞ্জ করবো? রবীন্দ্রনাথের নাটক যদি আমরা করি ... কেউ অন্য অর্থে নিবেন না ... রবীন্দ্রনাথের নাটক করতে কতদুর চেঞ্জ করবো? যদ্দুর চেঞ্জ করার তদ্দুরই বাচ্চু করে, তারপরও যদি আমার পরিচয় থাকে, সেটা আমার ক্ষমতা, আমার শক্তি। আরেকটা কথা হলো ডিরেক্টরের সাথে নাট্যকারের সম্পর্ক দ্বান্দ্বিক হবে কেন? আমি আমার লেখা লিখেছি, ও ওর কাজ করছে। শেক্সপীয়ার কি এসে বলবে যে,-
তারিক আনাম তুমি ঐ জায়গাটা বাদ দিও না। তোমার ইচ্ছা কোনটা রাখবে, কোনটা রাখবে না। কিন্তু শেক্সপীয়ারের ভাষারীতিটা ঠিক রাখতে হবে।

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
তবে আমি তারিক আনামকে বলতে চাই যে, যদি আমার প্রাচ্য নাটকটি দেখে থাকেন তো ... আমার মনে হয়েছে ওখানে আমি ডেফিনিটলি টেক্সট থেকে অনেক দূরে সরে কাজটি করেছি। মোর ন্যারেটিভ ... মঞ্চে আমি অনেক বেশি কাব্য আনতে পেরেছি বলে আমার মনে হয়েছে।

হাসান শাহরিয়ার
ধন্যবাদ। এবার বারীভাই বলতে চাচ্ছেন, বলুন।

মোহাম্মদ বারী
[অভিনেতা, নাট্যসংগঠক। সদস্য- থিয়েটার আর্ট ইউনিট]
আমার প্রশ্ন দুদিকে। নাট্যকারদের কাছে প্রশ্ন ... আপনাদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব দল আছে। তো নাটক রচনায় কোনো না কোনোভাবে দল আপনাদের প্রভাবিত করে কি না? অর্থাৎ চরিত্রগুলো দলের রিসোর্সকে সামনে রেখে ঐভাবে লেখেন কি না? আর দ্বিতীয় প্রশ্ন নির্দেশকদের কাছে- এখানে বাচ্চুভাই একই নাট্যকারের নাটক নির্দেশনা দিচ্ছেন আবার আতাভাই এবং যাকেরভাই-র দলে কোনো নাট্যকারই নেই, তো ... এ ব্যাপারে আপনাদের ব্যাখ্যা কী? তৃতীয় প্রশ্নটি তিনজনের কাছে- জামিল আহমেদ, আলী যাকের ও আবদুল্লাহ আল-মামুনভাইয়ের কাছে, সেটা হলো- দীর্ঘদিন ধরে আমরা আপনাদের নতুন কোনো নির্দেশিত নাটক পাচ্ছি না- কেন? ধন্যবাদ।

হাসান শাহরিয়ার
অনেক প্রশ্ন। কে আগে দেবেন?

মামুনুর রশীদ
আমি দিচ্ছি। দলের রিসোর্স দেখে নাটক লেখা এটা একটা মারাত্মক সীমাবদ্ধতা। এবং এতে করে দলের অভিনেতা অভিনেত্রীদের কোনো বিকাশ ঘটে না। যদি আমি লিখতে সময়ই ভাবি যে, আমার দলে এই এই অভিনেতা আছে এবং এরা এ্যাতো কঠিন করে লিখলে পার্টটা করতে পারবে না, তাহলেতো নাটক লেখার উপর একটা সাংঘাতিক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আমি লেখার সময় ভাবিই না যে, এই চরিত্রটি কে করবেন। আমি ওভাবে লিখি না। যখন নির্দেশক ঠিক করা হয়, তখন নির্দেশক দেখবেন কাকে কোন চরিত্র দেয়া যেতে পারে। আমি ঢাকার অনেক দলের কথা জানি, মফস্বলেতো সবসময়ই এটা হয় যে,- আমাদের দলেতো অভিনেত্রী নেই বা দলে ভালো অভিনেতা নেই, তাই নাটকটা এভাবে লিখতে হলো। তো এটা কিন্তু একেবারেই উচিত না। কোনো ...

হাসান শাহরিয়ার
আপনি কোনো অভিনেতা বা অভিনেত্রীকে সামনে রেখে লেখেন কি না?

মামুনুর রশীদ
না কোনো অভিনেতা বা অভিনেত্রীকে সামনে রেখে লিখি না। আমার দলেরতো নয়ই ...

সেলিম আল দীন
শুরুতে করতেন কি না?

মামুনুর রশীদ
শুরুতেও করিনি।

সেলিম আল দীন
না, আমাকে কিন্তু করতে হয়েছে।

মামুনুর রশীদ
সেটা করিনি, এবং সেকারণে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের একটা সুযোগ হয়েছে, তাদেরকে বিকশিত করানোর ক্ষেত্রে।

আবদুল্লাহ আল-মামুন
মামুন যে কথাটা বললো সেটা সব নাট্যকারেরই তীব্র বাসনা থাকে যে, আমার নাটক লেখাটাই প্রথম, দলের চিন্তা পরে। কিন্তু আপনারা সবাই জানেন বাংলাদেশে সবকিছুই উল্টোদিক থেকে শুরু হয়। আমি অন্য দলের কথা বলতে পারবো না ... নিজের ব্যাপারে বলতে পারি যে, আমি সুবচন নির্বাসনে থেকে শুরু করে প্রায় সব নাটকই দলের কথা ভেবে লিখতে হয়েছে। আমাদের দলে অভিনেত্রী বলতে ছিলেন কেবল ফেরদৌসী মজুমদার, দল থেকে বলে দেয়া হতো যে, সেটের জন্য খরচ করা যাবে এই পরিমান টাকা ... মানে যৎসামান্য টাকা, এখানে তারিক আনাম খান আছেন, দীর্ঘদিন আমাদের দলে থেকে কাজ করেছেন ... সেট. লাইটের কাজও করেছেন ... অনেক সীমাবদ্ধতাকে সামনে রেখেই আমি নাটক রচনা করেছি। আজকাল হয়তো এমনটা হয় না। অনেকেই নাটক করতে আসে কিন্তু শুরুতে এমনটা ছিলো না।

হাসান শাহরিয়ার
একই প্রশ্ন সেলিম আল দীন স্যারের জন্যও ছিলো। আপনি বলুন।

সেলিম আল দীন
সেটাতো বটেই, আমি ঢাকা থিয়েটারের জন্যই লিখি। একশভাগই ঢাকা থিয়েটারের জন্যই লিখি। এবং বাকী জীবন ঢাকা থিয়েটারের জন্যই লিখবো, যদি তারা মঞ্চস্থ করে। এব্যাপারে আমার কঠিন প্রতিজ্ঞা আছে। তবে শুরুতে ...

আবদুস সেলিম
আপনার এই পক্ষপাতিত্ব কেন?

সেলিম আল দীন
এই জন্য যে, আমার মনে হয়েছে যে, আর কেউ আমার নাটক করে না, করবেও না।

মামুনুর রশীদ
নাকি করার ক্ষমতা নাই?

সেলিম আল দীন
না সেটা আমি বলার স্পর্ধা রাখি না। করে না, কারণ আমি তারিক আনামকে হরগজ নাটকটি দিয়েছিলাম, করেনি।

তারিক আনাম খান
আমি ওটা কিছু বুঝিনি। কীভাবে করবো?

সেলিম আল দীন
আসাদুজ্জামান নূর এখানে বসা আছে, সে যখন বললো যে, একটা নাটক দে, আমি বললাম নে ... ব’লে আমি হরগজ দিলাম, তো আজকে পাঁচবছর-সাতবছর হয়ে গেল। জামিলেরও করার কথা ছিলো ... কী কারণে যেন করেনি।

আসাদুজ্জামান নূর
(অভিনেতা, সদস্য- নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়)
এটাতো ঊষা গাঙ্গুলীরও করার কথা ছিলো।

সেলিম আল দীন
করার কথা ছিলো করেন নাই। শুনলাম কৌশিক সেন করবেন। যাক গে, উত্তরে ফিরে আসি, শুরুতে দলের কথা মাথায় রাখতে হতো। দলে ছিলো বাসন্তী গোমেজ- একমাত্র অভিনেত্রী, রোকেয়া হল থেকে বের করা গেল তাকে। বান্ধবীদের চাইনিজ খাওয়াতাম, আমি, আল মনসুর বান্ধবীদের চাইনিজ খাওয়াতাম আর রাজি করাতাম। ওরা বলতো একটু দাঁড়াবো এর বেশি কিছু না কিন্তু, বেশি কিছু হলে বাসা থেকে বকা দেবে। যাই হোক কেবল বাসন্তী গোমেজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র মেয়ে, যে ম. হামিদের নেতৃত্বে যে নাট্য উৎসবটি হয়েছিলো সেখানে এসেছিল। তো সেই থেকে শকুন্তলা পর্যন্ত আমার লেখাগুলো সুবর্ণা মোস্তফা আর শিমূল ইউসূফকে মাথায় রেখেই লিখতে হতো। যদিও এটা অসহ্য ছিলো ... বাচ্চু তখন আবার আমেরিকা যাবে ... টেলিভিশনের কাজে ... তো আমি বললাম যাঃ শালা আর নাটকই লিখবো না। বাচ্চু বললো যে, কেন কী হয়েছে? বললাম- মাথার ভেতরে এই তিনটা ছেলে, দুটা মেয়ে রেখে কি নাটক লেখা যায়? তখন বাচ্চু বললো যে, তোর যা ইচ্ছা তুই লিখ- আমি স্টেজে আনবো, আমি ফিরে আসি। এরপর থেকে শুরু হলো লেখা। কিত্তনখোলা লিখলাম, মঞ্চে আসলো ... আপনারা জানেন যে, এখনো ঐ নাটক কোনো দলের আটানো সম্ভব না। তারপর ৯৬ চরিত্রের কেরামত মঙ্গল  লিখলাম। ঐ নাটকও মঞ্চে এলো। এরপর একবার কুষ্টিয়ায় মুনতাসির ফ্যান্টসী শো করে ফেরার সময় বাসের মধ্যে শিমূল, সুবর্ণা আর কে কে যেন আমার ঘাড়ে ধরে বললো যে, আমরা এ্যাতোগুলো মেয়ে, এবার তুই আমাদের জন্য, শুধু মেয়েদের জন্য লিখবি। তখনতো যৌবন ছিলো, মাথায় ঝাকড়া চুল ছিলো, প্রতিজ্ঞা ছিলো ... ব্যাস লিখলাম যৈবতী কন্যার মন। তো যে কথাটা বলা যে, শুরুতে দলের কথা মাথায় রেখে নাটক লিখতাম এটা যেমন সত্য, তেমনি সত্য যে, কিত্তনখোলা থেকে আজ পর্যন্ত কোনো একটি অক্ষরও দলের কথা মাথায় রেখে লিখিনি। এখন আমার আর বাচ্চুর মধ্যে প্রতিযোগিতা হয়। আমি বলি প্রাচ্য লিখলাম দেখি কর দেখি, সে করে ফেলে। আমি তারপর নিমজ্জন লিখলাম, বললাম দেখি কর দেখি। যদি করে তো আমি আরেকটা লিখবো।

আরেকটি কথা দলের হয়ে বলতে হচ্ছে, ঢাকা থিয়েটার কিন্তু কেবল আমার নাটকই করেনি। একাত্তরের পালা, ফণিমনসা, ধূর্ত উই, মার্চেন্ট অব ভেনিস ... আরো দুএকটি নাটক আছে, সেগুলো কিন্তু আমার না। আর আমার নাটক যদি করেও তাতে ক্ষতি কী? আপনারা সবাই কম বেশি দেখেন, ভবিষ্যতে আরও দেখবেন, দেখতে বাধ্য হবেন এ প্রত্যাশা আমার আছে। ধন্যবাদ।

হাসান শাহরিয়ার
ধন্যবাদ। নির্দেশকদের কাছেও প্রশ্ন ছিলো। প্রশ্নটি রিপিট করার দরকার আছে?

আতাউর রহমান
না, আমার মনে আছে। এখানে আমার দলের আলী যাকের, আসাদুজ্জামান নূর, সারা যাকের আছেন ... মানে বয়স্ক চারজন আছি ... আমরা কিন্তু মারাই যেতাম যদি এক নাট্যকারের নাটক করতে হতো। আমিতো থিয়েটার ছেড়েই দিতাম ... কারণ, বৈচিত্র্যের সন্ধানইতো শিল্পের লক্ষ্য। এখানে আবদুল্লাহ আল-মামুন আছেন, আমার বন্ধু ... থিয়েটার মানেইতো আবদুল্লাহ আল-মামুনের নাটক। সেখান থেকে আমি যখন থিয়েটারে মাধবী হতে দেখি, আমি যখন মুক্তি হতে দেখি, তখন বলি- আহঃ মুক্তি এলো। ঢাকা থিয়েটারকে যখন ধূর্ত উই করতে দেখি, তখন ভাবি- যাক্ বাঁচা গেল। আমি আমাদের ব্যাপারে খুব খুশি যে, আমাদের নিজস্ব কোনো নাট্যকার নেই। আমরা দেশজ হয়েও আন্তর্জাতিক। জগতের সমস্ত সুকৃতির উত্তরাধিকার আমরা নিজেরা। আমরা সব করেছি ... সৈয়দ শামসুল হক করেছি, রবীন্দ্রনাথ, সাঈদ আহমেদ করেছি, দারিয়ো ফো- ব্রেশ্ট-স্যামুয়েল বেকেট করেছি। আমি খুব খুশি যে, একজায়গায় স্থিত হতে হয়নি। তাই জীবনটা দুর্বিসহও হয়নি। যদিও আমি এটা বোঝাচ্ছি না যে, ঢাকা থিয়েটারের অবস্থা দুর্বিসহ ... এটা তাদের ব্যাপার ... তারা নাটক করবে, আমরা দেখতে যাব, ভালো লাগলে ভালো, না লাগলে চলে আসবো। তবে সেলিম আল দীনের জন্য আমার চিন্তা হয়, ওর নাটক ঢাকা থিয়েটার ছাড়া কেউ করতে পারে না, বিশেষ করে বাচ্চু ছাড়া, তো একদিনতো সে মারা যাবে, তারপর এই নাটকগুলোর কী হবে? সবশেষে একটা কথা বলি... সৈয়দ শামসুল হক যখন আমাদেরকে নূরলদীনের সারাজীবন নাটকটি দিলেন, তখন নাট্যকর্মীদের মধ্যে হৈচৈ পড়ে গেল। আরে একটা সাহেব ঘেঁসা দল, নাক উঁচা দল, এদের দিয়েছেন একটা দেশজ নাটক? আরে নূরলদীনতো রংপুরের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে, ওরা কী করবে, ঘোড়ার ডিম করবে ... এ সমস্ত কথা। কিন্তু তারপর নূরলদীনের সারাজীবন-র সাফল্য প্রমাণ করে আমরা সবই পারি। ধন্যবাদ।

আলী যাকের
নির্দেশক হিসেবে যেগুলো বলার কথা ... নিজস্ব নাট্যকারের ব্যাপারে ... আতাউর রহমানের কথাই আমার কথা। আমি সৌভাগ্যবান যে, আমার দলে কোনো নাট্যকার নেই। আর কেন কাজ করছি না এর উত্তরে বলছি যে, আমি অসুস্থ ছিলাম। দুবছর আগে খুব কঠিন অসুখে হাসপাতালে ছিলাম, সেখান থেকে বেরিয়ে খুব দুর্বল বোধ করছি ... এই মুহূর্তে। এজন্য নাটক করা হয় না, তবে অচিরেই করবো বলে আশা রাখি।

সৈয়দ জামিল আহমেদ
আমি গত বছর জুন-জুলাই মাসে নাটক করেছি, বেহুলার ভাসান। এর আগে ডিপার্টমেন্ট থেকে করেছি কমলারাণীর সাগর দীঘি। তার আগে করাচিতে করেছি আর ঢাকায় করেছি বিষাদ সিন্ধু আর চাকা। তো আপনি (মোহাম্মদ বারী) যদি গত বারো বছরের হিসাব নেন তো পাঁচটা নাটক করেছি, জীবনে করেছি কুড়িটার মতো নাটক ... তো এটা কিন্তু সংখ্যার হিসাব দিয়ে হবে না। আমি নাট্যকলা বিভাগের কিছু কাজ করেছি, পড়িয়েছি এবং এ থেকে কিছু শিখেছি। কাজ করতে গেলে কিন্তু আপনার একটা ইন্টিমেট স্পেস দরকার, যে স্পেসে আপনি অভিনেতাদের সাথে ইন্টারেক্ট করতে পারবেন, আলাপ আলোচনার মাধ্যমে কিছু বের করতে পারবেন ... ঐ জায়গাটা আমার পেতে হবেতো? তা না হলে কাজ করা যায় না ... থিয়েটারে অভিনেতা সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ, দর্শক গুরুত্বপূর্ণ- এটা ছাড়া থিয়েটার হয় না। কিন্তু আমি ওরকম অভিনেতাও দেখি না, ওরকম দর্শকও দেখি না। সেজন্য আমি বিভাগে ছাড়া কাজ করছি না। যদি এরকম জায়গা পাই, কোথাও গিয়ে ... ঠিক আছে, তখন করা যাবে।

আহসান খান
[শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়। ফ্রিল্যান্স নাট্যকর্মী]
আমি মামুনুর রশীদকে একটা প্রশ্ন করতে চাই ... একটু পেছনে গিয়ে। সেটা হলো আপনি যে বললেন জামাতে ইসলামী বা বাংলাভাইদের সাথে কেন যাব, গিয়ে লাভ কী? তো ঠিক আছে যাব না, কিন্তু যেভাবে একের পর এক বোমাবাজি হচ্ছে ... বগুড়া হলো, যাত্রা বন্ধ করে দেয়া হলো ... তো এভাবে চলতে থাকলে তারপর যখন আস্তে আস্তে মহিলা সমিতি বা এই এক্সপেরিমেন্টাল হলে এসে পড়বে তখন কার মুখোমুখি হবো আমরা?

মামুনুর রশীদ
এই যে বোমাবাজি হচ্ছে সারা দেশে, নাটক কি বন্ধ হয়েছে? আমরা শহীদ মিনারে অনুষ্ঠানমালা বন্ধ করেছি? আমাদের যাত্রা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে ... আবার গতরাতে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সেটা ওপেনও করে দিয়েছেন। নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়েছে। আমরাতো এর জন্য ওদের সাথে ডায়লগে বসিনি। নাসির উদ্দিন ইউসুফ, আমাকে, আরও অনেককে শহীদ মিনারে ঢুকতে দেয়নি, তো আমরা কি আপোষ করেছি- নাকি ফাইট করেছি? এখন এই পরিস্থিতিতে আমরাতো আর বলতে পারি না যে, নাট্যকার বা নির্দেশকরা টুপি কম দেখিয়ে নাটক করেন। রাজনীতিবিদরা পালিয়ে যেতে পারেন, আপোষ করতে পারেন, আমরা কখনো আপোষ করিনি। এখনতো ঠিকই গালিবকে গ্রেফতার করছে, বাংলাভাইকে গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েছে- ধরতে বাধ্য হবে। সংস্কৃতিকর্মী হিসেবে আমরা এরচেয়ে বেশি কিছু করতে পারবো বলে মনে হয় না।

সেলিম আল দীন
আমি এব্যাপারে একটু বলি। প্রশ্নটি বার বার ঘুরে ফিরে আসছে ... প্রশ্নটা আসছে যে, আমরা বিশেষ দলের সাথে বসবো কি না বা ফেস করবো কীভাবে? একটা কথা মনে রাখতে হবে যে, আমাদের রাষ্ট্র কাঠামো বা রাষ্ট্রের সংজ্ঞা, রাষ্ট্রের কার্যকারীতার মধ্যে আমাদের কোনো নিজস্ব ভূমিকা নেই। অর্থাৎ আমাদের রাষ্ট্রগুলো সয়ম্ভূ হয়ে ওঠেনি। ‘গুলো’ বললাম কারণ, পুরো ভারতবর্ষ কী দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো নিজের ভূমি থেকে নিজের রাষ্ট্র হিসেবে তৈরি হয়নি। এগুলো উপর থেকে চাপানো রাষ্ট্র। আমারা পাশ্চাত্যের ধারণা থেকে রাষ্ট্রের সংজ্ঞা সীমানা নির্ধারণ করছি, না হলে তিনশ বছর আগে যে রাষ্ট্রের ফয়সালা হয়ে গিয়েছিলো- পাশ্চাত্যে, ফ্রান্সে, আমেরিকায়, লন্ডনে- সেই জিনিসগুলো ঘুরে ঘুরে আমাদের এখানে কেন আসছে? আসছে তার কারণ হলো- রাষ্ট্রের যারা চালিকা শক্তি, যারা কাণ্ডারী, প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্র পরিচালনার, রাষ্ট্র দর্শনজ্ঞানের তাদের বড় অভাব। তা না হলে, আমি নাটক করবো এর নিরাপত্তা দিবে রাষ্ট্র, এটা নিয়েতো কোনো কথাই থাকতে পারে না। আমি আমার একটা প্রবন্ধে লিখেছিলাম- যে রাষ্ট্রে একটি মানুষও না খেয়ে মারা যাবে, তার রাষ্ট্রত্ব জাতি সংঘের খারিজ করে দেয়া উচিত। কিন্তু সরকার সব সময়ই এসব করতে ব্যর্থ হচ্ছে। সরকারের এমন পৌনঃপুনিক ব্যর্থতার জন্য রাষ্ট্রের শরীরে ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। ধন্যবাদ।

আবদুস সেলিম
আবদুল্লাহ আল-মামুন এবং মামুনুর রশীদের কাছে প্রশ্ন- আপনারা মঞ্চের পাশাপাশি যে টেলিভিশন নাটকও লিখেন, যদিও ওটাকে আমি নাটক মনে করি না, সেটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার... তো এই দুটো করা নিয়ে কোনো দ্বন্দ্ব তৈরি হয় কি না ... মানে এজন্য আপনাদের মধ্যে কোনো অপরাধবোধ তৈরি হয় কি না? আর সেলিম আল দীনের কাছে প্রশ্ন ... বাচ্চু অনেকদিন আগে আমাকে হরগজ নাটকটি দিয়েছিলো অনুবাদ করবার জন্য, কিন্তু অনুবাদ করবো কি আমিতো কিছু বুঝিইনি। নূরও বলছিলো যে, ওটা দুর্বোধ্য মনে হয়েছে ...

আসাদুজ্জামান নূর
না না আমি বলিনি, তারিক আনাম বলেছে, আমাকে ফাসাবেন না হাঃ হাঃ ...

আবদুস সেলিম
যাক, তারিক আনাম বলেছে ... আমিও কিছু বুঝতে পারিনি, আরেকটি কথা হলো আপনার নাটকের নাম এ্যাতো কঠিন হয় কেন? জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন, গ্রন্থিকগণ কহে, ... মানে এটা কি আপনি একজন কবি বলে না ইচ্ছাকৃতভাবে এমন কঠিন নাম দেন। আর একটা প্রশ্ন- আপনার নাটক নিয়েতো চলচ্চিত্রও হয়েছে, এব্যাপারে আপনার অনুভূতি কী?

আবদুল্লাহ আল-মামুন
আমার উত্তর খুব সংক্ষিপ্ত। না আমার ভিতরে কোনো অপরাধবোধ নেই। আমি বুঝতে পারছি না যে, মঞ্চনাটকের পাশাপাশি আমি যে টেলিভিশনের জন্য নাটক লিখি এতে অপরাধবোধ জাগবে কেন? আপনি বলছেন টেলিভিশন নাটককে আপনি নাটকই মনে করেন না ... সেটা আপনার মত, কিন্তু আমি অবশ্যই টেলিভিশন নাটককে নাটক মনে করি ... ভিন্ন ধরনের হতে পারে কিন্তু সেটাও নাটক।

সেলিম আল দীন
আবদুস সেলিমের প্রশ্নের উত্তর দেয়া খুবই কঠিন। হরগজ দুর্বোধ্য, কেউ করেনি বা করছে না। আবার শুনি কলকাতায় করার কথা উঠেছে, জানি না হবে কি না। অনুবাদের যে কথাটা বললেন, ...হরগজ কিন্তু সুইডিশ ভাষাতে অনুদিত হয়েছে, ৯৬ সালে ... আমাদের দেশের প্রধান এক কবি আবু জাফর ওবায়েদুল্লাহ এটা পড়ে একরাতে বাইশ পৃষ্ঠা অনুবাদ করেছিলেন ... অত কঠিন হলে কী করে করলেন? এটাও একটু বিবেচনায় রাখবেন। আর নাটকের নাম দেয়ার ব্যাপারে বলতে হয়, কিছু নাটক দাবীও করে। আমাদের উচিত সেইসব কালের কিছু  শব্দ ব্যবহার করা যা থেকে বোঝা যাবে যে, বাংলা ভাষা এবং সাহিত্য একদিনে তৈরি নয়। সহস্র বছরের চিহ্ন, জলকাদার চিহ্ন এর মধ্যে আছে।  সেই ধারণা থেকেই, ভাবনা থেকেই ... মানে আমিও চাই যে, কোনো কিছু পড়লে যেমন বোঝা যায় এটা রবীন্দ্রনাথ, এটা বঙ্কিমের ... ঠিক তেমনি যেন বোঝে যে এটা আমার। এতে কোনো কৃত্তিমতা নেই। আহমেদ শরীফ স্যারও আমাকে বলেছিলেন যে, তোমার ‘গ্রন্থিক’ ... তুমি ভুল অর্থ লিখেছ, আমি বলেছি- না আমি সঠিক ... রাজসভায় যে পুরাণ বিবৃত করে সে গ্রন্থিক, তো যে জীবনের কথা বিবৃত করে সে-ওতো গ্রন্থিক। আমি মনে করি এই দুর্বোধ্যতার অভিযোগ আমার ব্যাপারে তোলাটা ভুল।

মামুনুর রশীদ
আবদুস সেলিমভাই যে প্রশ্নটি করেছেন, তার উত্তরে বলতে পারি যে, আমার একেবারেই কোনো অপরাধবোধ নেই ... টেলিভিশনে কাজ করার ব্যাপারে। এবং আমি সততার সাথে মঞ্চে কাজ করি, একই সততার সাথে আমি টেলিভিশন নাটকেও কাজ করার চেষ্টা করি। বরং দুঃখের বিষয় যে, আমাদের চলচ্চিত্রে কোনো একসেস নেই। কারণ ওটা একটা বেনিয়া পুঁজির হাতে চলে গেছে। তো যেকোনো মিডিয়াতেই কাজ করা যায়। একটাই শুধু দেখার আছে সেটা হলো কাজটি শিল্প সম্মত হয়েছে কি না। এর পক্ষে আমি বলতে পারি যে, এখানে তিনজন নাট্যকার আছি, সেই তিনজনই কিন্তু টেলিভিশনের জন্য নাটক লিখেছি এবং এখনও লিখছি। আমার দু-একটি টেলিভিশন নাটক আছে যেগুলো ওখানে জনপ্রিয় এবং শিল্পমান সম্মত হওয়ায় পরবর্তী সময়ে সেগুলোকে আমি মঞ্চনাটকে রূপ দিয়েছি, যেমন- এখানে নোঙর, অববাহিকা ইত্যাদি। সুতরাং এখানে অপরাধবোধের প্রশ্ন কেন আসছে বুঝতে পারছি না।

একটি কথা মনে পড়াতে একটু বলে নিই, সেটা হলো সেলিম আল দীন বার বার বলছেন যে, তার নাটক কেবল ঢাকা থিয়েটার করছে এবং তিনি ঢাকা থিয়েটারের জন্যই নাটক লিখেন। এখানে আমার একটা আক্ষেপ যে, আমি, মামুনভাই, মমতাজ উদদীন আহমেদ ... আমরা যে সমস্ত নাটক লিখেছি সেগুলো সারা বাংলাদেশের নাট্যদলগুলো মঞ্চে এনেছে। তো আমাদের নাট্য আন্দোলনের কথা মাথায় রেখে বলতে চাই যে, এটা একজন নাট্যকারের দায়িত্বের মধ্যেও কিন্তু পড়ে, যেন তার লেখার মাধ্যমে আমাদের যে পাণ্ডুলিপি সংকট সেটা যেন নিরসন হয়। নাট্যকার কিন্তু প্রতিদিন বা প্রতিবছরই জন্মাবে না। সুতরাং আমাদের যাদের নাটক লেখার যোগ্যতা আছে তাদের কি উচিত না সারাদেশের পাণ্ডুলিপি সংকটটা সামাল দেয়া? এ বিষয়টি একটু ভেবে দেখবেন। ধন্যবাদ।

হাসান শাহরিয়ার
আমি একটা ঘোষণা দিচ্ছি, সেটা হলো আর আধঘন্টার মধ্যে আমরা অনুষ্ঠানটি শেষ করার কথা ভাবছি। সুতরাং আপনাদের প্রশ্ন এবং তার উত্তরগুলো যেন সময়কে মাথায় রেখে করা হয় এবং দেয়া হয়। এবার লিপন বলতে চাচ্ছেন, বলুন।

সাইদুর রহমান লিপন
আমি বাচ্চুভাইকে প্রশ্নটা করতে চাই। আমরা দেখছি যে, ঢাকা থিয়েটার প্রথম দিকে অন্য ধরনের নাটক করলেও অনেকদিন ধরে একটা নির্দিষ্ট রীতির নাটক করে আসছে ... সেটা হলো বর্ণনাত্মকরীতি। আপনারা বলছেন যে, বর্ণনাত্মকরীতি বা দেশজরীতি বা দেশজ আঙ্গিক আপনারা নির্মাণ করতে চাচ্ছেন। আমার প্রশ্ন হলো একমাত্র ঢাকা থিয়েটার বা দু-একটি দল বিচ্ছিন্নভাবে ... মূলত ঢাকা থিয়েটারই এই রীতির নাটক করছে কেন, অন্যরা করছে না কেন? গরমিলটা কোথায় বা গরমিল না থাকলে সেই ব্যাপারটাও একটু ব্যাখ্যা করবেন। ধন্যবাদ।

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
আসলে প্রত্যেকটা দলে বা মানুষেরই এক-একটা মিশন থাকে। আমরা ঢাকা থিয়েটার যেটা ভাবছি ... আমরা নিজস্ব নাট্যরীতি, দেশজ নাট্যরীতি, এমনকি প্রয়োগরীতি, অভিনয়রীতি- এগুলোকে বিবেচনায় এনে একটি নাট্যক্রিয়া মঞ্চে উপস্থাপন করে থাকি। এখন আমি বার বার বলছি যে, ন্যারেটিভনেসকে শিল্পের অন্যতম প্রধান উপাদান বলে আমি মনে করি। সেটা একটা পেইন্টিং-এর দিকে তাকালেও দেখবেন ওখানে একটা ন্যারেটিভনেস আছে ... চলচ্চিত্রেতো ডেফিনিটলি আছে ... সত্যজিৎ বলেন আর ঋত্বিক ঘটক বলেন। সাম্প্রতিককালে আমি একটি ইরানী ছবি দেখে অবাক হয়েছি, সাজেদ মাজেদীর একটি ছবি দ্যা কালার অব প্যারাডাইস।  তো আমার কাছে মনে হয়েছে এই কাজগুলোকে বিবেচনায় আনতে হবে। প্রাচ্যের যে রীতিটা আছে, এটি আপনি ইরান থেকে শুরু করে সেন্টার এশিয়া থেকে শুরু করে এখান পর্যন্ত আপনি দেখবেন যে, এখানে গল্প বলার ঢং থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারিনি। আমরা আসিনি কারণ এটি আমাদের জীবনের, সংস্কৃতির এবং আমাদের জীবনের যে অর্থনীতি আছে তার সাথে ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। আমরা ইদানীংকালে যে কথাটি বলার চেষ্টা করছি সেটা হলো, মঞ্চে আমরা কিছু ভিজ্যুয়াল দেখতে চাই যেগুলোর মধ্যদিয়ে একটি ন্যারেটিভ জায়গা দাঁড়াবে। সেটিই আমাদের লক্ষ্য এবং সেই মিশন নিয়ে আমরা কাজ করছি। ব্যর্থ হতে পারি ... তারিক একটু আগে বলছিল ... অনেকটা ব্যর্থ হয়েছি বলেই তার কাছে মনে হয়েছে ... কিন্তু আমরা চেষ্টা করছি। কারণ আমরা এই ন্যারেটিভ থিয়েটারটা করতে চাই,  এই বঙ্গে এই বাংলার যে সংস্কৃতি আছে, যে শিল্পবোধ আছে, শিল্পরুচি-ভাবনা আছে- সেটির প্রকাশ ঘটানোর চেষ্টা করছি। আর অন্যরা যা করছে ... উদাহরণ হিসেবে নাগরিক, থিয়েটার, আরণ্যক বা পদাতিক বা পালাকার যারা যে কাজই করুক না কেন সেটা তাদের ভাবনা থেকে করছে। এবং একেকজনের একেক ভাবনা থাকবে এটাই স্বাভাবিক। সেখানে আমার সাথে বা ঢাকা থিয়েটারের সাথে কোনো দ্বন্দ্ব নেই।

হাসান শাহরিয়ার
বাচ্চুভাই, আতাউর রহমানভাই একটা সম্পূরক প্রশ্ন করতে চাচ্ছেন ...

আতাউর রহমান
আমি পরিপূরক বা সম্পূরক এই শব্দগুলো বুঝি না। আমি পরিপূরক প্রশ্নই করি, সম্পূরক করি না। নাসির উদ্দিন ইউসুফের কাছে প্রশ্ন যে, ন্যারেটিভ থিয়েটার নিয়ে উনি বলছেন ... তো ন্যারেটিভ থিয়েটার পৃথিবীর সব জায়গায়ই আছে, সব দেশে সব কালে হয়েছে। পিটার ব্র“কের মহাভারত-ও ন্যারেটিভ। তো আমি প্রসঙ্গক্রমে বলি যে, লামামা থিয়েটারের একজন মহিলা, নাম এলেন স্টুয়ার্ট ... আমাদের গ্যালিলিও দেখলেন, থিয়েটারের খায়রুল আলম সবুজের আন্তেগোনে দেখলেন ... দেখে আমার সাথে আলী যাকেরের সাথে তর্ক শুরু করে দিলেন যে- আমি কি আমেরিকা থেকে এসে তোমাদের এখানে ওয়েস্টার্ন থিয়েটার দেখতে এসেছি? আমি তখন বললাম যে, তাহলে তুমি কি আমাদের নেংটি পড়ে অভিনয় দেখতে চেয়েছিলে? তো বাচ্চুর কাছে আমার প্রশ্ন যে, আমরা ম্যাকবেথ  যেভাবে করি, ওয়েটিং ফর গডো যেভাবে করি, গ্যালিলিও-কে যেভাবে আত্মস্থ করি ... এগুলো কীভাবে রেলিভেন্স খুঁজে পাচ্ছে ... এটা আমাদের কাজ নয়? এটা কি আমাদের থিয়েটারকে চিহ্নিত করতে বৈরি শক্তি হিসেবে কাজ করবে? রবীন্দ্রনাথ, যিনি সবচাইতে বেশি দেশজ ছিলেন, তিনিও কিন্তু সারা পৃথিবী থেকে আজলা ভরে সব কিছু নিয়েছেন। এবং তাতেই একটি দেশের সংস্কৃতি এন্রিচ হয়। খালি এক ধারায় চললে সেটাতো মিউজিয়াম পিস হয়ে যাবে।

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
তাতো অবশ্যই। আমি কিন্তু কখনোই বলিনি যে আপনারা যে কাজটি করছেন, সেকাজটি কাজ নয় বা প্রশংসার কাজ নয় বা সেটি কন্ট্রিবিউট করবে না আমাদের থিয়েটারে। আমি আমার কাজের কথা বলতে চাচ্ছি ... সেটা হলো আমি মনে করি থিয়েটার হচ্ছে পোয়েট্রি অন স্টেজ। এখন সেটা কীভাবে করা যাবে সেজন্য যদি সারা পৃথিবী থেকে সবকিছু এনেই করতে হয় তো আমার কোনো আপত্তি থাকবে কেন? কিন্তু এই ভাবনা থেকে আপনি শুধু দ্বান্দ্বিক থিয়েটারে চলে যাবেন, যেখানে শুধু সংঘাত আর সংঘাত ... তাহলে আপনাকে একধরনের উত্তেজনায় পেয়ে যাবে এবং এই উত্তেজনাটা আমার মনে হয় মূল ফোকাস থেকে সরিয়ে নেয়। শিল্পের এই জায়গাটায় আমি দ্বিমত পোষণ করি, দ্বান্দ্বিক থিয়েটারের সাথে, অন্য কোথাও নয়।

মামুনুর রশীদ
আমি একটু বলতে চাই। লিপনের একটা প্রত্যাশা যে, সবাই ন্যারেটিভ থিয়েটার করছে না কেন ... বা আরও স্পষ্ট করে বললে এটার প্রসার হচ্ছে না কেন, তা-ইতো? নাসির উদ্দিন ইউসুফ কিন্তু কেবল আজকে নয়, অনেক আগেই বলেছেন যে, এটা একটা এক্সপেরিমেন্ট, নিরীক্ষা। বাচ্চু এক জায়গায় বলেছেন, ... বহুজাতিক রাষ্ট্র ও ধর্মরাষ্ট্র সম্পর্কে ... আমি প্রশ্ন করি, আমরা যদি আমাদেরকে বহুজাতিক রাষ্ট্র বলি তাহলে আমাদের দেশজ যে ধারা ... এই ধারাটা কি শুধুমাত্র বাঙালি ধারা, বাঙালি সংস্কৃতি?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
না বহুজাতিক। তার জন্যই একটি মারমা রূপকথা বা বনপাংশুল বা রাঢ়াঙ হয়।

মামুনুর রশীদ
বহুজাতিক কথাটা যদি আমরা মেনে নিই, তাহলে আমাদের অন্য যেসব জাতিসত্তাগুলো আছে সেই জাতি সত্তার যে সংস্কৃতি ... সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, সেই সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকে কি আমরা ধারণ করছি- আমাদের ভাবনা চিন্তায়?

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
রাষ্ট্র করছে না। সেটা রাষ্ট্রের ব্যর্থতা।

মামুনুর রশীদ
না রাষ্ট্রের কথা বলছি না, আমি শিল্পের কথা বলছি।

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
হ্যাঁ, শিল্পে আমরা করছি বলে আমার ধারণা ... আমরা চেষ্টা করছি।

মামুনুর রশীদ
শিল্পে যদি আমরা করে থাকি, তাহলে কি বহুজাতিকতার একটা মুড আমাদের বর্ণনাত্মক ধারাতে বা আমাদের নাটকে অন্যভাবেও আনা যায় না? ডেফিনিটলি যায়। এবং আমি নিজে বিশ্বাস করি যে আমরা একটা উত্তর-জাতীয়তাবাদের জায়গায় আছি। এবং সেই জায়গা থেকে, আমাদের আঙ্গিকগত দিক থেকে আমরা জাতীয় আঙ্গিকের চর্চা করবো কিন্তু আমাদের বিষয়বস্তুর দিক থেকে একটা আন্তর্জাতিক জায়গায় যেতে হবে। এবং এই ধরনের একটা উত্তর-জাতীয়তাবাদের সময়ে আমি বিশ্বাসই করি যে, আমরা জাতীয়তাবাদের জায়গা থেকে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছি। সেই জায়গাটায় আমাদের থিয়েটারের ভাবনাটা কী হবে, এটা কিন্তু একটা সংকট এখন।

আতাউর রহমান
আমি একটু বলি যে, মামুনুর রশীদ বললেন যে, থিয়েটারের ভাবনাটা কী হবে ... এটাকে নির্ধারণের জন্য আপনি উঠে-পড়ে লেগেছেন কেন? থিয়েটারের ভাবনা ...

মামুনুর রশীদ
না না, এটা আমার ভাবনার কথা বলছি। আমার ভাবনা কী হবে সেটা আমার কাছে সংকট।

আতাউর রহমান
আমি বলি, ডাইভারসিটির অন্বেষণই হচ্ছে ভাবনা। আপনি একটা বিশেষ ধারায় কাজ করবেন, আমি একটা বিশেষ ধারায় কাজ করবো ... তো ওটাকে দেশজ বলে চিহ্নিত করবেন কেন আপনি? ডাইভারসিটিটাই হচ্ছে দেশজ বাংলা।

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
না আমার মনে হচ্ছে আতাভাই, মামুনভাই এ কারণে করছেন বা আমি এ কারণে করছি যে ... আপনার স্মরণে রাখা দরকার, আমরা কিন্তু পোস্ট কলোনিয়াল এরাতে আছি। সুতরাং আমরা কিন্তু কলোনিয়াল মাইন্ড সেট নিয়ে আছি। আমরা কিন্তু ভাবতেই শিখেছি যে, থিয়েটার অব কনফ্লিক্টই হচ্ছে একমাত্র থিয়েটার। দুজন লোক তর্ক করবে, ঝগড়া করবে- এটাই কি  থিয়েটার? কিন্তু এর বাইরেও যে থিয়েটার আছে, এটা কখনো ভাবিইনি। এটা কলোনিয়াল মাইন্ড সেট-এর কারণে ... আপনার আছে, আমারও আছে। আমাদের থিয়েটারটাকে ফেলে দিয়ে পশ্চিমের থিয়েটারকে গ্রহণ করেছিলাম বলেই কিন্তু দ্বন্দ্বটা তৈরি হয়েছে।

হাসান শাহরিয়ার
ধন্যবাদ। এবার বিপ্লব বালা কিছু বলবেন।

বিপ্লব বালা
একটু অন্য জায়গা থেকে প্রশ্ন করবো। থিয়েটার, অভিনয়, নাটক- এগুলো কিন্তু সময়ের সাথে ভীষণ সম্পর্কিত। তো কোনো নাটক, একই নাটক যখন ভিন্ন সময়ে মঞ্চস্থ হয় তখন আসলে রিয়েকশনটা কেমন হয়? সেটা জানার জন্য আমরা দুটো নাটকের নাম উল্লেখ করতে পারি কোপেনিকের ক্যাপ্টেন এবং নূরলদীনের সারাজীবন। এই দুটো নাটকই ঢাকার মঞ্চে একবার মঞ্চস্থ হওয়ার প্রায় বিশ বছর পর আবার মঞ্চে আসে, দুটো নাটকই ‘নাগরিক’র এবং দুটো নাটকের নির্দেশকই আলী যাকের। তো আমি যাকেরভাইয়ের কাছ থেকেই দু-সময়ের দর্শক রিয়েকশনটার পার্থক্যটা জানতে চাচ্ছি।

আলী যাকের
এটা কিন্তু কেবলই নাটক সম্পর্কিত প্রশ্ন নয়- এটার মধ্যে অনেক কিছু চলে আসে- সমাজবিজ্ঞানও চলে আসে। আমাদের থিয়েটারে অডিয়েন্স কম্পোজিশনটা খুব ইম্পোর্টেন্ট। আমি মনে করি সত্তরের দশক এবং আশির দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত ... এটা আমার ব্যক্তিগত মত যে, তখন যারা নাটক দেখতে আসতেন আর এখন যারা আসেন- তাদের মধ্যে একটা বিরাট ফারাক আছে। এটা একটা, আর একটা বিষয় হচ্ছে যদি সময়ের কথা বলি তাহলে ... রাজনৈতিক সময় আছে, সামাজিক সময় আছে ...

বিপ্লব বালা
নাটক দুটোই কিন্তু অসাধারণ নাটক এবং প্রথমটিতো অনুবাদ নাটক হয়েও দারুণ রিলেভেন্ট মনে হয়েছিলো সেই সময়ে ... তো এখন সেটাকে দর্শক কেমনভাবে নিয়েছে?

আলী যাকের
দর্শক কিন্তু কেউ কেউ ভাবছেন যে, দারুণ রিলেভেন্ট ... কেন, আমাদের কি মনে হয় যে সেই সময়টা এখন আর নেই? মানে এরশাদের পতনের পর কি আমরা সেই ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছি? যদি এরশাদের সময় কোপেনিকের ক্যাপ্টেন রিলেভেন্ট হয় তাহলে আওয়ামীলীগের সময়ে কেন হবে না, বিএনপি-র সময় কেন আরও বেশি হবে না?

বিপ্লব বালা
না মানে হয়েছে কি না?

আলী যাকের
আমার মনে হয় দর্শকরা এটাকে সমস্যা মনে করে না। তবে আবার এটাও সত্য, দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এখনকার দর্শকরা তাকিয়ে থাকতে ভালোবাসেন, দেখতে ভালোসেন না। না হলে হয়তো আরও বেশি টাচি হতে পারতো।

ইশরাত নিশাত
[নাট্যকর্মী। সদস্য-দেশ নাটক]
আমার প্রথম প্রশ্নটা মামুনুর রশীদের কাছে। আপনি ৮৫ সালে বলেছিলেন যে, ‘গিনিপিগ’-র পপি চরিত্রটি আমাকে দেখে লেখা হয়েছে, এখন সবার সামনে আবার বলছেন কোনো চরিত্র কাউকে দেখে লেখেননি- কোনটা সত্য?

মামুনুর রশীদ
আপনারটা ভুল। আমি একটা চরিত্র লিখেছি, লিখে তারপর মনে হয়েছে আপনি এটা করতে পারেন।

ইশরাত নিশাত
না ঐ সময়ে অন্যটা বলেছিলেন ...

মামুনুর রশীদ
না অন্যটা বলিনি। আমার মনে হয় এটা আপনার স্মৃতির ভ্রম হতে পারে।

ইশরাত নিশাত
যাই হোক, আরেকটি প্রশ্ন আতাউর রহমানভাইয়ের কাছে। আপনি কী মনে করেন-  রবীন্দ্রনাথের নাটক কতটা আধুনিকায়ন করা যায়, কীভাবে করা যায়? আর দ্বিতীয় কথা হচ্ছে- আপনি কি মনে করেন যে, নাটক না দেখে সেই নাটকে কী ধরনের নির্দেশনার ভাবনা প্রয়োগ করা হলো, এটা বোঝা সম্ভব হয় কারো পক্ষে? ধন্যবাদ।

আতাউর রহমান
আমি নিশাতের দ্বিতীয় প্রশ্নে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেছি। এটা কী করে হয় যে, না দেখে নির্দেশনার ভাবনা নিয়ে কথা বলবে? না দেখে কীভাবে বুঝবে রক্তকরবী-র রাজা দাঁড়িয়ে আছে, নন্দিনী দাঁড়িয়ে আছে ... আর কেবল দেখলেই হবে না, নিরীক্ষণ করতে হবে ভালোভাবে। দেখতে গিয়ে যদি আবার ঘুমিয়ে পরেন তাহলেও হবে না। কাজেই এটা একেবারেই অসম্ভব, এবসার্ড- না দেখে কীকরে নাটকের ব্যাপারে সমালোচনা করবে? যাক, আর প্রথম প্রশ্নটা ছিল রবীন্দ্রনাথের নাটকের আধুনিকায়নের প্রশ্ন। না এ প্রশ্নই আসে না। আমার ব্যক্তিগত ধারণা, রবীন্দ্রনাথ তাঁর সময়কাল থেকে দুহাজার বছর এগিয়ে আছেন। চিরকালের আধুনিক। আমার ক্ষমতা নাই এটাকে আধুনিক করার।

বাচ্চুকে একটা কথা বলি। ন্যারেটিভ থিয়েটার খালি বাংলার সম্পদ নয়। আপনি জানেন ইউরোপে এমনকি আফ্রিকান কান্ট্রিতে ন্যারেটিভ থিয়েটার হচ্ছে। পৃথিবীর সবদেশেই হয় ... ন্যারেটিভ থিয়েটার শুধু বাঙালির সম্পদ কেন হলো সেটা কিন্তু আমি বুঝলাম না। এটা বাচ্চুর কাছে আমার প্রশ্ন।

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
না না, আমিতো বলছি না শুধু আমাদেরই ন্যারেটিভ থিয়েটার আছে। আমি বার বার বলছি এটা সারা পৃথিবীর। কিন্তু আমাদের প্রকাশভঙ্গি, উপস্থাপনা, শিল্পরীতি, শিল্পবোধ ডেফিনিটলি পশ্চিম থেকে আলাদা।

জনৈক
আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা ও সংগীত বিভাগের ছাত্র। আমার প্রশ্ন নাট্যকার ও নির্দেশকদের কাছে। নাট্যকার হিসেবে আপনাদের লেখার প্রক্রিয়াটা কী ধরনের? আপনারা কখন বুঝতে পারেন যে, এটা একটা নাটক হয়েছে, এটা এখন নির্দেশনা দেবার যোগ্য। আর নির্দেশক যদি নিজে না হন তবে নির্দেশক কীভাবে সিলেক্ট করেন? আর নির্দেশকদের কাছে প্রশ্ন- যদি আপনার বন্ধুদের মধ্যে কেউ নাটকটি লিখে না থাকেন তাহলে কীভাবে নাটক নির্বাচন করেন? মানে একটা নাটকের কী কী যোগ্যতার কারণে ভাবেন যে, এটাকে নির্দেশনা দেয়া যায়?

হাসান শাহরিয়ার
প্রথমটির উত্তর মামুনভাই দেবেন বোধহয়।

মামুনুর রশীদ
খুব কঠিন প্রশ্ন। একেক নাট্যকারের প্রক্রিয়া একেকরকম। কোনো একটা প্রেরণা থেকে, তার ভাবনা শুরু হয়, তারপর লিখতে থাকেন। লিখতে লিখতে একসময় মনে হয় যে, এটা একটা স্ট্রাক্চারে দাঁড়িয়ে গেছে। কেউ কেউ বন্ধুদেরকে খসড়া দেখান তারপর এটার একটা পূর্ণাঙ্গ রূপ দেন। আবার সেলিম আল দীন বলছিলেন যে, তিনি দীর্ঘ নাটক লিখেন তারপর তার বন্ধু নির্দেশকের সাথে ইন্টারেকশনে যান। তো এটা আসলে নির্দিষ্ট করে বলা যাবে না। আর নির্দেশক ঠিক করাটাও একেক রকম। আমাদের গ্রুপথিয়েটার চর্চায় দল নাটক আর নির্দেশক ঠিক করেন। কোনো কোনো দলে আবার নির্দেশক একজনই। সে-ই নির্দেশনা দেন। তো এটাতেও আসলে নির্দিষ্ট কোনো প্রক্রিয়া নেই। ধন্যবাদ।

হাসান শাহরিয়ার
ধন্যবাদ। নির্দেশকদের মধ্যে ...

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
আমি বলছি। নাটক নির্বাচনে আমার মনে হয়েছে তাৎক্ষণিক কিছু ভাবনা কাজ করে। এটির জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো তত্ত্ব নেই। আসলে একটা টেক্সট পড়লে ... পড়ে যদি ভালো লাগে ... তখন এটাকে মঞ্চে আনার প্রাথমিক আগ্রহটা প্রকাশ করি। কে কে অভিনয় করবে কিংবা কাকে কাকে দিয়ে অভিনয় করাবো, এসব প্রক্রিয়া চলতে থাকে। ধরুন আমার বর্তমান প্রডাকশনটার কথা যদি ধরি, বিনোদিনী, তো বিনোদিনীর উপর, নটী বিনোদিনীর উপর কাজ করবো এটা আমার অনেক দিনের ইচ্ছা ছিল ... তো প্রথমে ভাবলাম কী করা যায় ... বিনোদিনীর উপর অনেক গল্প আছে, পশ্চিমবঙ্গে অনেক নাটক হয়েছে ওর উপর ... কিন্তু আমরা ... আমরা মানে সেলিম, আমি, শিমূল ইউসুফ ... আমরা চাচ্ছিলাম অন্যধরনের কিছু একটা করতে, একেবারে নতুন ... তো আমরা একটা পর্যায়ে ঠিক করলাম যে বিনোদিনীর নিজের লেখা ডায়েরী, আত্মজীবনীটাই করবো। কেবল সময় ঠিক রাখার জন্য (ডিউরেশন) ... কিছু কিছু জায়গা ছেটে ফেলেছি। এবং সেটাই এখন মঞ্চস্থ হচ্ছে। তো এগুলো হলো প্রক্রিয়া। একেক নাটকে একেক প্রক্রিয়া।

হাসান শাহরিয়ার
যাকেরভাই আপনি কিছু বলবেন?

আলী যাকের
না, মানে আমি অন্য কথায় যেতে যাচ্ছি। কথাটি হচ্ছে ... সত্তরের গোড়ার দিকেই আমরা নাট্যচর্চা শুরু করি এবং আমাদের ফরমেট গ্রুপ থিয়েটার ফরমেট ... এটা কোলকাতা থেকে এসছে। সেই ধরনের একটা ফরমেট নিয়ে আমরা নাট্যচর্চা শুরু করলাম। তারপর নাটক এগিয়ে যাচ্ছে। আজকে খুব ভালো লাগে দেখতে যে, অনেক তরুণ-তরুণী নাট্যকলায় পড়াশোনা করে নাটকের অঙ্গনে আসছেন। তারা মঞ্চে অভিনয় করছেন, কেউ কেউ টেলিভিশনে কেউ বা চলচ্চিত্রেও অভিনয় করছেন। তো এতো কিছু হয়ে যাবার পর আমাদের নাট্যচর্চার যে স্ট্রাক্চার, গ্রুপথিয়েটার ফরমেট, সেই ফরমেটের ব্যাপারে আমার বন্ধুরা কী ভাবছেন? মানে এই ফরমেট কি এভাবেই থাকবে নাকি এখন সময় এসছে এটাকে উন্মুক্ত করে দেবার? আমরা কি এখন একদলের অভিনেতা অন্যদলে বা যে কোনো দলই বিলং করে না, সে-ও কোনো না কোনো দলের হয়ে কাজ করবে ... তো এমন কোনো ব্যবস্থায় যাওয়ার কি সময় এসছে বা ... অর্থাৎ এবিষয়ে আমি গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশানের চেয়ারম্যানকে মন্তব্য করার জন্য অনুরোধ করছি।

মামুনুর রশীদ
গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশানের চেয়ারম্যান হিসেবে বর্তমান ফরমেট ভাঙার কথা বলা বিব্রতকর। কিন্তু আমি এটার পরিবর্তনের পক্ষে এবং আমি দৃঢ়ভাবে বলতে পারি এই পরিবর্তনের সূচনা আমি নিজেই করেছিলাম। সেটা হচ্ছে ... আমি বাঙলা থিয়েটার করেছি ১৯৯১ সালে। আমরা চেয়েছি বাইরের বিভিন্ন দলের ছেলে-মেয়েরা যাতে একসঙ্গে কাজ করতে পারে। আমরা আদিম করেছি,  সেখানে ‘নাগরিক’র ছেলেমেয়েরা কাজ করেছে, ‘নাট্যকেন্দ্র’র ছেলেরাও কাজ করেছে। এখন চে’র সাইকেল করছি। তো এতে করে বছরের পর বছর একই নির্দেশকের সাথে, একই অভিনেতার সাথে কাজ করার একঘেয়েমীটাও চলে যায়। এখন আমার কাছে মনে হয় বিভিন্ন স্মল স্পেস খুঁজে বের করে সেখানে অভিনয়ের কাজটা শুরু করা উচিত।

জনৈক
মামুনভাই আপনি কিন্তু আরণ্যকে এ কাজটি করেননি। আরণ্যকের বাইরে এসে এ কাজটি করেছেন। আরণ্যকে করেননি কেন?

মামুনুর রশীদ
না, আরণ্যক হচ্ছে একটি গ্রুপ থিয়েটার। আমরা কিন্তু এটা মেনে নিচ্ছি যে, গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলন বা বাংলাদেশে গ্রুপ থিয়েটারের যে প্রসার ঘটেছে এটা থাকতেই হবে। এই স্ট্রাক্চারটা রেখে তার মধ্য থেকে বাইরে গিয়ে কাজ করা যেতে পারে। যেমন, ‘নন্দন’ নামে একটা দল হয়েছিল আরও হয়েছে ... তো আমি একা করেছি তা কিন্তু নয় অনেকেই চেষ্টা করেছেন। কোলকাতায় যারা গ্রুপ থিয়েটারের জন্ম দিল, শম্ভু মিত্রের নাম করা যেতে পারে, উনিও কিন্তু পরে অনেকটা সরে এসছেন ফরমেট থেকে। আমার মনে হয় আমাদের এখানেও অনেক রিপার্টরী গড়ে উঠতে পারে ...

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
এখানে আমি একটু বলি, মামুনুর রশীদের কথার সূত্র ধরে। আমি কিন্তু মনে করি না যে, আলাদাভাবে দল করে এই বিনিময়টা হওয়া উচিত ... আমি যাকেরভাইয়ের সাথে সম্পূর্ণ একমত, আমার মনে হয় বিভিন্ন দলের মধ্যেই এই বিনিময়টা হওয়া উচিত। বর্তমানে এটা ডিজাইনারস লেভেলে আছে, সেটা শিল্পী, মানে অভিনেতাদের লেভেলেও হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।

মামুনুর রশীদ
আমি একটু দ্বিমত পোষণ করি, বাচ্চুর কথায়, সেটা হলো এধরনের বিনিময় করে কিন্তু কিছু নাটক হয়েছে ... ব্রিটিশ কাউন্সিলের সহযোগিতায়, আইটিআই’র উদ্যোগে ইত্যাদি ... তো সেগুলো কিন্তু বেশিদূর এগুয়নি।

নাসির উদ্দিন ইউসুফ
না ওগুলো কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো দলীয় কাঠামোর মধ্যে হয়নি। নাগরিক যদি কোনো নাটকের জন্য মনে করে যে, অন্যদলের ‘ক’ কে তাদের লাগবে তখন কিন্তু ‘ক’ এসে নাগরিকের ডিসিপ্লিনের মধ্যেই কাজ করবে। এমন নাটক হয়েছে, আলী যাকেরই দর্পনে শরৎশশী (দেশনাটক) নাটকে মিমিকে দিয়ে কাজ করিয়েছেন এবং সফলও হয়েছেন, আমি বলবো।

তাসবীন
আমি একজন নাট্যকর্মী। নাট্যতত্ত্বের উপর পশ্চিমবঙ্গে পড়াশুনা করেছি। আমি এখানে যারা বসে আছেন ... সবাই আমাদের নাট্য আন্দোলনের পথিকৃৎ, তাদের কাছে আমার প্রশ্ন, আমরা কি আমাদের একটা নিজস্ব প্লাটফর্ম তৈরি করতে পারি না? নাকি সরকার নিয়ন্ত্রিত প্লাটফর্মেই আমরা কাজ করে যাব? ...

মামুনুর রশীদ
আমাদের নিজস্ব প্লাটফর্মতো আছেই। গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশানে এখন ২৭০ টি দল আছে ...

তাসবীন
না, নাটক করতেতো মঞ্চ লাগবে। তো আমাদেরতো কোনো নিজস্ব মঞ্চ নেই। আমরা সবাই কি একটা নিজস্ব মঞ্চ বানাতে পারি না? আমাদের বাধাটা কোথায়?

হাসান শাহরিয়ার
আপনার প্রশ্নটি ছোট, কিন্তু উত্তর অনেক বড় হবে মনে হচ্ছে। সেটা দেবার মতো প্লাটফর্ম এখানে নেই। এটা নিয়ে আলাদাভাবেই কোনো সেশন করা যেতে পারে।

আতাউর রহমান
শাহরিয়ার, খোকনকে দাও, খোকন বোধহয় কিছু বলবে।

হাসান শাহরিয়ার
হ্যাঁ, খোকনভাই, বলুন।

নাসিরুল হক খোকন
[নাট্যকর্মী, লাইট ডিজাইনার। সদস্য- নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়]
আমার প্রশ্নটি মামুনভাইয়ের প্রতি। সম্প্রতি আপনি একটা লেখায় লিখেছেন যে, আমাদের নাট্যচর্চা, যেটা বক্স অফিসকে কেন্দ্র করে নিবেদিত হয়, সেই চর্চাকে আপনি নিন্দা করেন। তো আমি একটু জানতে চাচ্ছি যে, আপনি আসলে কী মিন করছেন? আমরা কি বক্স অফিস হিট হোক বা নাটক দর্শকপ্রিয়তা পাক বা বিক্রি বেশি হোক- সেটা কি আমরা চাইবো না?

মামুনুর রশীদ
খুব সহজ উত্তর। আমি কেবল একটি প্রবণতার কথা উল্লেখ করেছি। একটি নাট্য প্রযোজনার ক্ষেত্রে যদি এইটা মুখ্য প্রবণতা হয় যে, বক্স অফিস হিট করাবে ... তাহলে সেই প্রবণতাকে আমি নিন্দা করবো।

নাসিরুল হক খোকন
সেই প্রবণতা কি বা কোনো উদাহরণ কি আপনি দিতে পারেন?

মামুনুর রশীদ
সেটাতো একটা দীর্ঘ ব্যাপার এই মুহূর্তে এখানে সময় হবে বলে আমি মনে করি না।

নাসিরুল হক খোকন
তবুও যদি একটা উদাহরণ দিতেন ...

মামুনুর রশীদ
আমিতো এককথাতেই বলে দিলাম যে, মুখ্য উদ্দেশ্য যদি হয় বক্স অফিস হিট করানো, তাহলে আপনিও নিন্দা করবেন না?

নাসিরুল হক খোকন
হ্যাঁ, তাহলেতো নিন্দা করবোই। কিন্তু আপনি কি এমন কোনো প্রবণতা দেখেছেন, নির্দিষ্টভাবে?

মামুনুর রশীদ
আমিতো পার্টিকুলার কোনো নাটকের কথা বলিনি ...

নাসিরুল হক খোকন
এটা কি ক্ষতির কিছু? মানে আমরা যদি বক্স অফিস হিট করতে চাই ...

মোহাম্মদ বারী
আমি একটু বলতে চাই। বক্স অফিস মাথায় রেখে হিট করার জন্য কোনো নাটক যদি করতে চান, তাহলেতো অবশ্যই ক্ষতিকারক আর তাছাড়া, আপনিইতো বললেন যে, আপনিও তাহলে নিন্দা করবেন।

হাসান শাহরিয়ার
আমার মনে হয় এ প্রসঙ্গে থাকার আর প্রয়োজন নেই। অন্য কেউ প্রশ্ন করুন।

সুমন
[নাট্যকর্মী। সদস্য- দেশ নাটক]
আমার একটা জিজ্ঞাসা, সবার কাছে। সেটা হলো গাইড হাউস কবে খুলে দেবে? আমরা এখনই সিদ্ধান্ত নিতে চাই যে, যদি গাইড হাউস কর্তৃপক্ষ রাজি না হন, তাহলে কাল থেকেই গাইড হাউজ অবরোধ করা হবে ...

হাসান শাহরিয়ার
ধন্যবাদ আপনাকে, আপনার বিদ্রোহী মনোভাবের জন্য ... ঠিক আছে এটা যথাসময়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষ দেখবেন। হাত উঠিয়েছেন যিনি, আপনার প্রশ্ন করুন।

ফিরোজ সুজন
নাট্য উন্নয়নের ক্ষেত্রে দর্শকদের কী ভূমিকা  বা দর্শক কীভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে? জামিল আহমেদের কাছে আমার প্রশ্ন।

সৈয়দ জামিল আহমেদ
ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা- ভারতে, সেখানে আমাদের একজন শিক্ষক ছিলেন, তিনি বলতেন ... আমরা অবশ্য খুব হাসতাম, কথাটা শুনে ... তিনি বলতেন, অডিয়েন্স ইজ ভার্জিন, অডিয়েন্স ইজ ইন্নোসেন্টলী ভার্জিন। দর্শক এমন একটা গোষ্ঠী যাদের কোনো দোষ নেই, এজন্যই ভার্জিন শব্দটা ব্যবহার করা হয়েছে। আমিও কিন্তু মনে করি যে, দর্শকের কোনো দোষ নেই ... আমরা নাটকে আমাদের কথা পরিষ্কার করতে পারি না, তাই দর্শক বোঝে না। এবং একারণে দর্শক আসছে না, ওখানটায় অত ঘোরপ্যাঁচের কিছু দরকার নেই। আমি যদি কথাটা বলতে পারি, তাহলে আপনি কথাটা শুনবেন ... না বলতে পারলে শুনবেন না। তারপর যদি কেউ বলেন যে, আদর্শের জায়গা আছে, রাজনীতির জায়গা আছে ... আমি বলবো যে, আমার বলার ভেতরেই সেটা থাকতে হবে। আমার বলার দক্ষতার উপর নির্ভর করবে, নির্ভর করবে ভাষার উপর দখল কেমন, মঞ্চে উপস্থাপনার দক্ষতা কেমন ... এসব দক্ষতা দিয়ে যদি দর্শককে বোঝাতে পারি, তবেই দর্শক বুঝবে। যেমন আমার এক সময় মনে হয়েছে, আবদুল্লাহ আল-মামুনভাই’র ব্যাপারে যে, ৭০ দশকে উনি মধ্যবিত্ত মানুষকে বা দর্শককে বুঝতে পারতেন কিন্তু এখন সেভাবে বোঝেন না। তো শেষ কথা হচ্ছে, আপনার রান্না কেমন হয়েছে তা বোঝা যাবে খাওয়াতে। যদি খেতে ভালো লাগে মানুষ প্রশংসা করবে না লাগলে প্রশংসা করবে না। ধন্যবাদ।

হাসান শাহরিয়ার
ধন্যবাদ। আজকে আর কোনো প্রশ্ন নিচ্ছি না। কোনো অতৃপ্তি থাকলে সেটা থাকুক। আমরা আবার এধরনের কিছু আয়োজন করলে তখন আবার প্রশ্ন করতে পারবো। আমি ইতি টানতে চাচ্ছি, ইতি টানার আগে একটু কথা না বললেই নয়। সেটা হলো দেশের প্রধান ৮ নাট্যকার-নির্দেশককে (যদিও সৈয়দ শামসুল হক উপস্থিত হননি) মাত্র তিনঘন্টার সময় নিয়ে মুখোমুখি দাঁড় করানো হলে অনেক অতৃপ্তি নিয়েই ঘরে ফিরতে হয়। এটা থিয়েটারওয়ালা আগে টের পায়নি তা কিন্তু নয়, তবুও আমরা চেয়েছি এধরনের মুখোমুখি অনুষ্ঠানের একটা সংস্কৃতি শুরু করতে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে, বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের সাথেও মুখোমুখি হলে দর্শক আসবেন, এমন একটা আভাস অন্তত আজকের অনুষ্ঠান থেকে পাওয়া গেল। সেই প্রেক্ষিতেই এখন একটা পরিকল্পনার কথা আপনাদের জানাতে চাই, সেটা হলো জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত যেসব প্রযোজনা ঢাকায় হবে ... ফেডারেশানভুক্ত বা ফেডারেশানের বাইরের ... সেসব প্রযোজনাগুলো থেকে ভালো কিছু প্রযোজনা বিবেচনায় এনে, সেসব প্রযোজনার নাট্যকার-নির্দেশক ও ডিজাইনারদেরকে দর্শকদের সরাসরি মুখোমুখি করবার চেষ্টা করা হবে। থিয়েটারওয়ালা এ ধরনের একটি মুখোমুখি অনুষ্ঠান করতে চাচ্ছে আগামী অগাস্ট মাসের কোনো এক শুক্রবার সকালে। আশা করি আপনারা, যারা দর্শক হিসেবে এখানে উপস্থিত আছেন তারা আবারো সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে সঠিক সময়ে উপস্থিত হবেন সেই মুখোমুখি অনুষ্ঠানে। থিয়েটারওয়ালা আশা করে এ ধরনের মুখোমুখি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে একটি সুস্থ ও শৈল্পিক নাট্যসমালোচনার ক্ষেত্র তৈরি হওয়া সম্ভব।

আতাউর রহমান
শাহরিয়ার, আমি এক মিনিট কথা বলবো।

হাসান শাহরিয়ার
হ্যাঁ, আতাউর রহমানভাই এক মিনিট কথা বলবেন।

আতাউর রহমান
আমি এক মিনিট কথা বলবো। নাসিরুল হক খোকন মামুনুর রশীদকে একটি প্রশ্ন করেছিলো। আমি জামিল আহমেদের কথার প্রসঙ্গ ধরে এর জবাব দিচ্ছি। জামিল বলেছে- দর্শক হচ্ছে শেষ বিচার। অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় যখন থ্রি পেনি অপেরা করেন, তখন দর্শক ভেঙে পড়ে কোলকাতায় ... আমরা বহুবার দেখেছি। কোলকাতার দর্শক বলেছে উনি সত্যিকারের ব্রেশ্ট করছেন কি না সেটা কথা নয়, কথা হচ্ছে উনি (অজিতেশ) ঐ সমাজের কাছে, ঐ মানুষের কাছে ব্রেশ্ট কে কমিউনিকেট করতে পেরেছেন কি না। তো একটি নাটক যদি দর্শকপ্রিয় হয় এবং সেটা যদি হয় কোনো অশ্লীলতা বা বাইজী না নাচিয়ে ... তাতে যদি বক্স অফিস হিট করে সেটা মনে হয় স্বাস্থ্যকর। নাট্যকারের সংলাপকে বিকৃত না করে বা বাইজী নাচ না নাচিয়ে যদি আমি দর্শকের সাথে কমিউনিকেট করতে পারি তবে তো আমি সার্থক। তবে হ্যাঁ, যদি অশ্লীল কিছু করি যেমন ‘বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা করে নিন’ জাতীয় সংলাপে পূর্ণ নাটককে আমরা এক সময় ডিসকারেজ করতাম, সেটা ছিল খারাপ প্রবণতা ... মামুনুর রশীদ বোধহয় ঐসব প্রবণতার কথা বলতে চেয়েছেন। ধন্যবাদ।

হাসান শাহরিয়ার
ধন্যবাদ। আমি শেষ করবো। শেষ করার আগে আমরা উপস্থিত নাট্যকার-নির্দেশকদের হাতে ছোট-খাট স্মারক তুলে দিতে চাই। এ অনুষ্ঠানকে সামনে রেখে থিয়েটারওয়ালা একটি পোস্টার ছাপিয়েছে। আমাদের শুভেচ্ছার স্মারক হিসেবে তাঁদের হাতে পোস্টার বাঁধাই তুলে দেবেন মঞ্চে বসা দুই গুণী নাট্যজন- আসাদুজ্জামান নূর এম.পি এবং সারা যাকের। আমি থিয়েটারওয়ালার দুই সহকারি সম্পাদক সুমন নিকলী ও সাইফ সুমনকে অনুরোধ করবো পোস্টার বাঁধাইগুলো মঞ্চে আনার জন্য।

এরই সাথে শেষ করছি অনুষ্ঠান। দর্শক-শ্রোতা যারা আজকে উপস্থিত হয়ে অনুষ্ঠানটিকে প্রাণবন্ত করেছেন এবং যারা দীর্ঘদিন আমাকে সহযোগিতা করেছেন কীভাবে অনুষ্ঠানটি সফল করা যায় সেই ডিজাইন তৈরি করতে, আমি থিয়েটারওয়ালার পক্ষ থেকে তাদের সবাইকে জানাচ্ছি কৃতজ্ঞতা। ধন্যবাদ।