Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

জড়ো হও নন্দিনীরা, জাগিয়ে তোল রাজাদের

Written by হাসান শাহরিয়ার.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

স ম্পা দ কী য়

অতঃপর হুমায়ুন আজাদ বিদায় নিলেন।
প্রথমে সাময়িককালের জন্য বিদায় নিয়ে জার্মান গিয়েছিলেন, সেখান থেকে চিরকালের জন্য বিদায় নিয়েছেন। কোথায় গেছেন তিনি? সাধারণের ধারণামতে উনি যেখানে গেছেন, তাঁর সেই ধারণায় বিশ্বাস ছিলো না। সুতরাং বলা যায় উনি সেখানে যাননি। সাধারণের ধারণার কথা যে বলা হলো, সেই সাধারণেরা কারা? হয়তোবা অনেকেই, তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই সাধারণের দলে আছেন তাঁর পরিবারের সদস্যরাও। প্রগতিশীলতার অনেক প্রকাশ থাকে। কারো থাকে নমনীয়তা আর কারোবা থাকে তীক্ষ্ণতা-তীব্রতা। হুমায়ুন আজাদ প্রগতিশীল ছিলেনতো বটেই, তাঁর প্রকাশ ছিলো তীক্ষ্ণ-তীব্র। তীক্ষ্ণতার প্রয়োজন ছিলো। বৈরী পরিবেশে, আপনজনরাও যখন দোদল্যমান, ম্রীয়মাণ- সেখানে রাখঢাক না করাই ভালো। সত্য প্রকাশে রাখঢাককে উনি অশ্লীল ভাবতেন। এই যে ভাবনাটা, এই ভাবনাটা উনি বহুবার বহুভাবে প্রকাশ করেছেন তাঁর কথায় আর লেখায়। সেই ভাবনার সাথে তালমেলাতে পারেনি তাঁর সহযাত্রীরা এমনকি তাঁর পরিবারের সদস্যরাও। তাই তাঁর ‘পোড়া কপালে’ কাজী নজরুল ইসলামের পাশে কবর দেয়ার জন্য ‘ভিক্ষা’ চাওয়া জুটেছে, আরো জুটেছে নাস্তিক হওয়া সত্বেও মৃত্যুপরবর্তী নামাজে জানাজা।

মৃত্যু তাঁর আগেই হতে পারতো। ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০০৪ তারিখে। হয়নি। বলা যায় ওনার প্রচন্ড মানসিক শক্তি আর সুচিকিৎসা তা হতে দেয়নি। যারা তাঁকে মারতে চেয়েছিলো, তারা ব্যর্থ হয়েছিলো। এই ব্যর্থতাকে অবশ্যই মূল্যায়ন করা উচিত। এটা একটা প্রেরণা বটে যে, মৌলবাদিরা ইচ্ছা করলেই মুক্তবুদ্ধিকে শেষ করতে পারে না। পরে যখন তাঁর মৃত্যু হয়, আমাদের এই ভাবনাটাই আশাপ্রদ যে- তাঁর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ ‘ওরা’ যে মারতে চেয়েছিলো, সেই ‘ওরা’ তাঁকে মারতে পারেনি। তাই বিচক্ষণতার পরিচয় নয় যে, স্বাভাবিক মৃত্যুকে ‘ওদের হাতে মুত্যু’ ব’লে  নিজেদের পরাজিত হিসেবে দাঁড় করানো।

বিচ্ছিন্নতা আমাদের জাপটে ধরেছে। অ-শিল্পের ঐক্যের বিপরীতে শিল্পের এই বিচ্ছিন্নতা পীড়াদায়ক বৈকি। কেবল পীড়াদায়কই নয়, অস্বিত্বের সংকটও বলে মনে হয়। যতই সময় যাচ্ছে, অসুন্দর সংগঠিত হচ্ছে, দখল করছে মননকে- সুন্দর তাই অসহায়। এই অসহায়ত্বের স্বরূপ উপলব্ধিটা জরুরি। মনে রাখতে হবে বৃটিশ আমলে আর পাকিস্তান আমলে আর এমনকি বাংলাদেশ আমলে বেছে বেছে সেই লোকগুলোকেই নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করা হয়েছে যারা মানুষে মানুষে সৌহার্দ চায়, সম্প্রীতি চায়। আবহমান বাংলা যুগ যুগ ধরে যে শৃঙ্খল ধারাবাহিকভাবে বহন করে এসেছে, সেই শৃঙ্খল ভাঙার কাজে যাঁরাই উদ্যোগী হয়েছেন, তাঁদের উপরই এসেছে এই আক্রমণ। একেবারেই ধর্মনিরপেক্ষ, আধুনিক আর বাঙালি সংস্কৃতির আবির্ভাব হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে সৃষ্ট স্বাধীন বাংলাদেশেও যে এই আক্রমণ অব্যাহত আছে তার কারণ হিসেবে শ্রদ্ধেয় সরদার ফজলুল করিমের ভাবনাই প্রণিধানযোগ্য। তাঁর ভাবনা স্পষ্ট- আমরা স্বাধীন দেশ পেয়েছি কিন্তু পাকিস্তানিজম রিজেক্ট করতে পারিনি। এই পাকিস্তানিজমকে তিনি বড় বেশি ‘ভয়ংকর’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে অনেক  প্রগতিশীল বোদ্ধাদের প্রাথমিক অনীহা থাকলেও একটা কারণেই তারা স্বাধীনতা যুদ্ধকে সমর্থন করেছিলেন, আর তা হলো সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়তে গেলে পাকিস্তানে যে ধর্ম সংক্রান্ত ভাঁড়ামি একজিস্ট করছে প্রথমে তাকে বিতাড়িত করতে হবে। ধর্ম সংক্রান্ত ভাঁড়ামি বলা হলো এই জন্য যে, পাকিস্তান সৃষ্টির শুরু থেকে তাদের জাতির পিতাসহ এমন কোনো রাষ্ট্র প্রধান পাওয়া যাবে না যারা আদৌ ধার্মিক ছিলেন। অথচ তাদের প্রত্যেককেই পাকিস্তানের জনগণ প্রথমত এবং প্রধানত ধার্মিক হিসেবে ট্রিট করতো। ফলে অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যর্থ সে সকল রাষ্ট্রপ্রধানরা তাদের ব্যর্থতা মোচনে ধর্মকে ব্যবহার করতো। একটা আধুনিক রাষ্ট্র গঠনে এই ‘ধর্ম ব্যবহার’ বিষয়টা দূর করা জরুরী ছিলো। এই জরুরি কাজটাই করেছিলেন তখনকার বাঙালি স্বপ্নদ্রষ্টাগণ। কিন্তু পরিতাপের বিষয় স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই নিজেদের অজান্তে ভুলে যাওয়া হলো বাংলাদেশ সৃষ্টির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। আর তাই এই কথাই সত্য- স্বাধীন বাংলাদেশেও যে একটি মানবিক সমাজ তৈরি করা গেল না, তার কারণ, আমরা পাকিস্তানিজম রিজেক্ট করিনি।

পাকিস্তানিজম রিজেক্ট না করার ফলে পঁচাত্তর থেকে শুরু করে দুহাজার চার পর্যন্ত অনেক মুক্ত বুদ্ধির নিঃশেষ প্রত্যক্ষ করেছি। অধার্মিক কিছু ব্যক্তির ধর্মভিত্তিক রাজনীতির অবসান না হওয়া পর্যন্ত এই পাকিস্তানিজম কিংবা এই হত্যাকান্ডের অবসান সম্ভব নয়। পাকিস্তানিজম পরিহারের একমাত্র পথ এখন একটি সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল তৈরি করা। এই সাংস্কৃতিক চর্চা আমাদের ভেতরে ‘অবচেতনভাবে জীবিত’ পাকিস্তানিজমকে ধংস করবে।

কিন্তু এই সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল তৈরির সম্ভাব্যতা কী?

মানুষ যখন প্রকৃতির কোনো ঘটনাকে ব্যাখ্যাতীত মনে করে, তখন সে অলৌকিক অস্বিত্বের বন্দনা করে। নিজের অসহায়ত্বের বিপরীতে এটা যেন এক মোহ তৈরি করা। এই মোহ তৈরিই আসলে জাদু। ইলিয়্যূশন তৈরি করাইতো জাদু! দড়িকে সর্প ভাবা, কিংবা আলোছায়ার অন্ধকারে ভূতের অস্বিত্বকে মেনে নেয়া অথবা প্রকৃত অর্থে যা নেই, তার অস্বিত্ব তৈরি করা- এটাইতো জাদু! আর এই জাদুর বা মোহেরই সর্বপ্রাচীন রূপ হলো ধর্ম। সেই জাদুর অস্বিত্ব দুর্বল হয় যদি ঘটনার ব্যাখ্যা লৌকিক হয়। আর ঘটনার এই লৌকিক ব্যাখ্যার বিকাশ ঘটেছে বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার সঙ্গে সঙ্গে। তাই বিজ্ঞানের আবির্ভাবে ক্রমশই দুর্বল কিংবা পথ বদলেছে ধর্ম। এককালে যে মোহকে ধর্মীয় ব্যাখ্যায় বিশ্লেষণ করা হতো, পরবর্তীকালে সেই মোহই ধর্মীয় গোঁড়ামি বলে প্রমাণিত হয়। তাই আমরা যারা মোহে আচ্ছন্ন থাকার চেয়ে বাস্তব ব্যাখ্যায় আন্দলিত হই, তাদের উচিত কাজ হবে এদেশে একটি সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিবেশের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা। আর এই ক্ষেত্র বোধকরি শিল্পীদেরই তৈরি করতে হবে। প্রশ্ন থাকে সেই মেধাবী শিল্পী এদেশে আছেতো?

আছে বৈকি। স্বাধীন বাংলার অন্যান্য শিল্প মাধ্যমের কথা বাদ দিয়ে কেবল যদি মঞ্চনাটকের কথা ধরি তাহলেই জানা যাবে কতোনা মেধাবী শিল্পীর পদচারণা হয়েছে এই করিডোরে। স্বাধীন দেশে একেবারে বৈপ্লবিক চিন্তা- দর্শনীর বিনিময়ে নিয়মিত মঞ্চনাটক করা আর সুঅভিনয়ের মাধ্যমে নিজেদের মৌলিক নাটক দর্শকের সামনে আনা আর অসাধারণ বিশ্বসেরা নাটকের অনুবাদ করা আর হয়তবা কেউ কেউ, দেশজ নাট্য আঙ্গিক বিনির্মাণের চেষ্টা করা- আরও কত কি ঘটিয়ে ফেললো আমাদের মঞ্চপ্রতিভারা! এই মঞ্চপ্রতিভাদের বেশিরভাগই সম্পূর্ণ সচেতন তাঁদের দেশের ব্যাপারে, পাকিস্তানিজমের ভয়ংকরতার ব্যাপারে। জানা থাকা ভালো এই মঞ্চপ্রতিভাদের অনেকেই সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে যুক্ত ছিলেন। ফলে অচিরেই স্বাধীন বাংলায় রাজনীতির চেয়ে বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ালো আমাদের সংস্কৃতি চর্চা। সুশীল সমাজ গঠনের একটা আভাস পাওয়া যেতে থাকলো দেশের বাতাসে। কিন্তু রাজনীতি যেহেতু পাকিস্তানিজম ত্যাগ করতে পারেনি, তাই সুচিন্তিতভাবে দেশের রাজনৈতিক চিন্তায় মৌলবাদের অনুপ্রবেশ ঘটলো। আর এই অনুপ্রবেশের প্রথমকর্ম হিসেবে তারা সংস্কৃতিপ্রতিভাদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করলো। এক পর্যায়ে আবিষ্কার করা গেল মঞ্চপ্রতিভারা আর মঞ্চ নিয়ে ভাবছেন না, রাজনীতি নিয়েও ভাবছেন না- তারা হয়ে পড়েছেন বড় বেশি বৈষয়িক। এ-ও এক ধরনের বুদ্ধিজীবী হত্যা আর বুদ্ধিজীবীদের আত্মহত্যা- শারীরিকভাবে নয় মানসিকভাবে আর চেতনাগতভাবে। তাঁদের ভেতর থেকে বের করে নেয়া হলো তাঁদের মধ্যে আত্মস্থিত শক্তির ধারণা। তাঁরা বুঝতেই পারলো না যে, ক্রমশই নিজেদের প্রতিভা আর মননশক্তি আর সৃজনশক্তিকে তুচ্ছ জ্ঞান করে তাঁরা বৈষয়িক ভাবনাকে শ্রেষ্ঠতর ভাবতে শিখে ফেলেছে। তাঁরা বিচ্ছিন্নভাবে অন্ধকার কোঠরে বসে বিশ্বাস করতে থাকলো তাঁদের সৃষ্ট মঞ্চসংস্কৃতিই একদিন সমাজ বদল করবে। এ যেন রক্তকরবীর রাজার ভাবনা। সবকিছুকেই ভাবছে নিজের নিয়ন্ত্রণে। কিন্ত টের পায় না নিজের তৈরি যন্ত্রই ক্রমে ক্রমে তৈরি হচ্ছে তাঁকে ধংস করতে। নিজে নিজেই মিথ তৈরি করে চলেছে নিজের সৃষ্টির! ফাঁকা এই সৃষ্টির রক্ষকও যে হতে হবে তাঁর নিজেরই সেই জ্ঞান কে দেবে তাঁকে? কে তাঁকে বলে দেবে যে- তোমারই সর্দার তৈরি হচ্ছে তোমাকেই নিধনের জন্য? কে সেই নন্দিনী? যদিবা পাওয়া যায় নন্দিনী, আমাদের মঞ্চরাজারা কি বলবেন- চলো আমার সাথে আমারই বিরুদ্ধে লড়াই করতে?

এক আশ্চর্য একরোখা প্রতিভা ছিলেন হুমায়ুন আজাদ। নিজেই রাজা আবার নিজেই যেনবা নন্দিনী। কিন্তু রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যেখানে পাকিস্তানিজমের বীজ পোঁতা, সেখানে টিনের তলোয়ার নিয়ে কত আর একা লড়াই করা যায়? তাইতো নিজের পরিবারের চন্দ্রা আর ফাগুলালদের রক্তেও ঢোকাতে পারেননি মোহহীন বা জাদুহীন লৌকিক মনস্তত্ব। নইলে তাঁরই ঘৃণিত গোষ্ঠী তাঁকে নিয়ে ‘মশকরা’ করার সাহস পায় কোথায়? এই সাহস ভাঙার সময় এসেছে। এই মুহূর্তে প্রকৃত অর্থেই তাই নন্দিনীকে বড় বেশি প্রয়োজন। আমাদের রাজারা ভুলে থাকেন যে তাঁদের এই রাজত্ব মোটেই গৌরবের নয়। তাঁদের যে সৃজনশীলতা তা দিয়ে তাঁরা পণ্য উৎপাদনের বদলে সংস্কৃতি বিনির্মাণ করতে পারেন। তাই তাঁদের অন্তর্নিহিত শক্তিকে স্মরণ ও পুনরুজ্জীবিত করতে নন্দিনীদের প্রয়োজন। নন্দিনীরা সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা চায় না, অন্য কারো মঞ্চে দাপাদাপি করতে চায় না। চায় নিজেদের মঞ্চ নিজেরাই তৈরি করে উৎসব করতে। এরাই রাজাদেরকে আগল ভেঙে বের করে আনবে। তাঁদের মননে আঘাত করে করে জানান দিবে- এতো যে সোনার পিন্ড তাঁরা জড়ো করছে তা কি তাঁদের হাতের আশ্চর্য ছন্দে সাড়া দেয়, যেমন সাড়া দিত তাঁদের মঞ্চে তৈরি ফসল?

হ্যাঁ, আশেপাশে চারিদিকে প্রায়শই নজরে পড়ে নন্দিনীদের। এ্যাতো যে প্রতিকূলতা, এ্যাতো যে অস্থির আর অসম্মানজনক হয়ে উঠেছে মঞ্চকর্ম তাতেও তাদের কোনো ক্লান্তি চোখে পড়ে না। এদেরকেই বিপ্লব বালা বলেছেন ‘নট গোপালের দল’। হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুকে প্রতিরোধ করতে, বিদ্রোহ করতে এদেরকেই দেখি সামনের কাতারে। এরাই বোধ করি আজকের নন্দিনী।

জড়ো হও নন্দিনীরা, জাগিয়ে তোল রাজাদের।

ইতি
হাসান শাহরিয়ার
মিরপুর-ঢাকা
০৯-১১-২০০৪ খ্রিঃ