Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

রাজা : এই দীর্ণ সময়ের দলিল

Written by সিদ্ধার্থ রায়.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

[সম্পাদকের জবানবন্দি:প্রবন্ধটি ছাপা হয়েছে বহু আগে, ১৯৮৭ সালে, কোলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘প্রতিক্ষণ’ পত্রিকায়।  যেকোনো শিল্পের বিকাশের জন্য চাই তার জ্ঞানগর্ভ সমালোচনা। আমাদের মঞ্চনাটকের বেলায় এই সমালোচনা গত ৩২ বছরেও তেমনভাবে গড়ে ওঠেনি বলে আমরা মনে করি। বাংলাদেশের মঞ্চনাটকের ক্রমবিকাশ যে ৩২ বছরেও হয়ে ওঠেনি, তার জন্য নানা সমস্যার মধ্যে এই প্রকৃত এবং অতিঅবশ্যই শিল্পীত সমালোচনার অভাবও দায়ী। আমাদের মঞ্চে বিশ্বের অনেক শ্রেষ্ঠ নাটকের মঞ্চায়ন হয়েছে। শেক্সপীয়র আর বুদ্ধদেব বসু আর মহাভারত আর সংস্কৃত নাটক আর ব্রেখট এবং আর রবীন্দ্রনাথ- সবই কিছু না কিছু তো হয়েছে। কিন্তু সেসব নাটকের সমালোচনা পড়লে কেবল ব্যক্তি আর দলের গুণকীর্তন ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। আমাদের বর্তমান পুনর্মুদ্রণেও অনেকে কারো কারো ‘গুণকীর্তন’ দেখতে পাবেন। কিন্তু তাঁদের জ্ঞাতার্থে বিনয়ের সাথে বলতে চাই এগুলো গুণকীর্তন নয়, শিল্পীর পারফরমেন্সের শৈল্পিক ব্যাখ্যা মাত্র। শিল্পের এধরনের ব্যাখ্যার বড় বেশি প্রয়োজন। নাটকের সমালোচনা করতে হলে টেকস্ট ও তার অভিনেতৃদের কার্যকলাপের শৈল্পিক ব্যাখ্যা যে কত গভীরতর ও বিশ্লেষণধর্মী হওয়া প্রয়োজন তা উপলব্ধি করবার জন্যই পাঠকদের হাতে তুলে দিলাম এই প্রবন্ধ।]

সম্পূর্ণ ভিন্ন এক প্রসঙ্গে ‘শব্দের অন্ধকার’-এর নিবিড় অভিজ্ঞতার কথা লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। চেতনায় আলোড়ন তুলে তিনি বুঝতে চেয়েছিলেন অন্ধকারের সেই শব্দময় ভাষা। তাঁর কাছ থেকে আমরা শুনেছি, অস্তিত্ব-মন্থন করা এমন উচ্চারণ, ‘যতদূর চেয়ে দেখি আমার সমস্ত জীবনের উপরে সঙ্গিহীন বিরহসন্ধ্যার নিবিড় অন্ধকার’। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যখন রাজা নাটকে লেখেন,‘এ অন্ধকার ডুবাও তোমার অতল অন্ধকারে,/ওহে অন্ধকারের স্বামী’ বা জীবনের শেষ দিকে মনে আসে ‘দুঃখের আঁধার রাত্রি’-র স্মৃতি, কিংবা একচল্লিশ বছর বয়সে বলে ওঠেন, ‘গভীর রজনী নামিল হৃদয়ে’, তখন আমাদের পড়ে নিতে হয় তাঁরই ভাষায়, যে, সেই অন্ধকার ‘একেবারে শূন্য নয়- সেই অন্ধকারের ... বুকের মধ্যে একটি নিবিড় রস অত্যন্ত গোপনে ভরা রয়েছে; একটি কোন বিকশিত বনের সজল গন্ধ আসছে; এমন একটি অনির্বচনীয় মাধুর্য যা যখনি প্রাণকে ব্যথায় কাঁদিয়ে তুলছে তখনি সেই বিদীর্ণ ব্যথার ভিতর থেকে অশ্র“সিক্ত আনন্দকে টেনে বের করে নিয়ে আসছে।’

শম্ভু মিত্র-র তত্ত্বাবধানে, পঞ্চম বৈদিক-এর রাজা নাটকের একেবারে শুরুতে, প্রায় রবীন্দ্রনাথের প্রতিধ্বনিতে, শম্ভু মিত্র যখন ভূমিকায় বলেন,‘রবীন্দ্রনাথ তাঁর নিজের কাহিনী বলেছেন। তাঁর অন্ধকার শূন্য নয়, অর্থহীন নয়। সেখানে রাজা আছেন, অন্ধকারের রাজা’, তখন শম্ভু মিত্র-র প্রয়াস থাকে ‘রাজা’র অন্ধকারের সঙ্গে, রবীন্দ্রনাথের সারাজীবনব্যাপী অন্ধকারের নানা উপলব্ধির সঙ্গে, আমাদের এই বর্তমানের বোধকে অন্বিত করে তোলা। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন, ‘দিনের প্রখর আলোকের কোলাহলের মধ্যে আমরা প্রত্যেকেই এক এক দুর্বেধ্য অন্ধকার মন্ডলের মধ্যে, একক। আমরা না জানি নিজেকে সম্পূর্ণ করে, না জানি এই বাইরের পৃথিবীকে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে। তবু ত বাঁচতে গেলে নিজেকে বোঝবার অক্লান্ত চেষ্টা আমাদের করতেই হয়। বাইরের এই পৃথিবীর সঙ্গে একটা সুছন্দ সম্পর্ক স্থাপনের প্রয়াস আমাদের আজীবন করে যেতেই হয়।’ অর্থময়, জীবনজোড়া ‘সেই অন্ধকারের কাছে নিজেকে নিবেদন করতে শিখতে হয়। বহু কষ্টের সেই শিক্ষা। কারণ, সে রাজার দ্বজায় মধুর পদ্মফুলের মধ্যে কঠিন বজ্র আঁকা। সেই কঠিন অন্ধকারের অনুভব না হলে বাইরের পৃথিবীর এই নিয়তচঞ্চল বসন্তোৎসবের মধ্যে নিজের অস্তিত্বের শিকড়, খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই জীবনের সেই ভীষণকে জানতেই হয়, যে ভীষণ কঠিন, নির্দয়, নৈর্ব্যক্তিক; যার কোনো মায়া নেই, মমতা নেই, কারো কান্নায়, ভাবনায় সে কখনো টলে না। সেই প্রচন্ড ভয়ঙ্কর অন্ধকারকে নিজের মধ্যে অনুভব করলেই তবে আলোকে বেরিয়ে এসে এই পৃথিবীর উৎসবকে বুঝতে পারা যায়, তার বাস্তবের লীলার মধ্যে নিজের বাঁচাকেও মিলিয়ে তোলা যায়। রাণী সুদর্শনার সেই তীর্থযাত্রার কাহিনীই এই নাটক।’ দেড় মিনিট টেপে এই ভূমিকাটির পরেই নাটক শুরু- টেপে বেজে ওঠে গম্ভীর কোরাস, ‘মম চিত্তে নিতি নৃত্যে কে যে নাচে তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ।’ জলদে।

মূল নাটকে যাবার আগে শম্ভু মিত্রের এ ব্যাখ্যাটি খুঁটিয়ে শুনলে হয়ত বোঝা যাবে, রাজা কে এই  এখন, আশি দশকের শেষদিকে শ্রীমিত্র কীভাবে দেখতে চান। অন্ধকারের উপলব্ধি রবীন্দ্র রচনায় ছড়িয়ে আছে গভীর বুনটে। রাজা লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ৪৯ বছরে পা দিয়ে, তাঁর আশি বছর ব্যাপ্ত জীবনের মধ্যপর্বে। এই নাটকের বিমূর্ত অন্ধকারের তাৎপর্য উপলব্ধি করা যায় আগে-পরের নানা অধ্যায়ে অন্ধকার সম্পর্কে তাঁর ভাবনার বিবর্তনে।

পঁচিশ বছরে যেমন লিখেছিলেন তিনি, ‘স্বামী তুমি এসো আজ অন্ধকারের হৃদয়মাঝে’, ৩৯-এ বদলে গেল সেই অন্ধকার চরিত্র, ‘পুড়িবে বলিয়া রয়েছে আশায় আমার নীরব হিয়া/ আপন আঁধার নিয়া’। একচল্লিশে তাঁকে লিখতে হল, ‘গভীর রজনী নামিল হৃদয়ে’। রাজা নাটকের রাণী সুদর্শনার যে অন্ধকারের দরজা খুলে আলোয় মিলন চেয়েছিল, তারই পূর্বাভাস ‘তিমিরদুয়ার খোলো- এসো, এসো নীরবচরণে’- সাতচল্লিশে লেখা। তারপর ৪৯- এ রাজা - অন্ধকারই এ নাটকের মুখ্য চরিত্র হয়ে ওঠে, শব্দের অন্ধকার। আর এই নাটকই যেন একটা মাইলস্টোন, যার পর অন্ধকারই আলোর মূল উৎস- ‘অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো’ (৫২), ‘তিমির কাঁপিবে গভীর আলোর রবে’ (৫২); অন্ধকারেই ভেঙে পড়ে সমস্ত দুয়ার- ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙল ঝড়ে’ (৫২)। রবীন্দ্রনাথ যাকে বলছেন ‘অন্ধকারের অন্তরধন’ (৫৪), যখন তাঁর ‘হিয়ায় হিয়ায় বাজে আকুল আঁধার যামিনী’ (৫৭), যে ‘আঁধার-ভরা গভীর বাণী’ (৫৮)- গভীর শব্দ ঝংকৃত সেই অন্ধকারের ভেতর থেকে শোনা যায়, ‘তোর ভিতরে জাগিয়া কে যে,/ তারে বাঁধনে রাখিলি বাঁধি/ হায় আলো পিয়াসী সে যে/ তাই গুমরি উঠিছে কাঁদি’ (৬৪)।

কেবলই আলোর জন্যে আর্তি- ‘আর রেখো না আঁধারে আমায় দেখতে দাও’ (৬৪); মানবিক সম্পর্কে নামে অন্ধকার, ‘তোমার আমার মাঝখানে হায় আসবে কখন আঁধার রাতি’ (৬৪); রবীন্দ্রনাথের অন্ধকার তখন ‘বিপুল’, ‘জীবনের ফুল ঝরে যায় সেই অন্ধকারের বিপুলতায়’ (৬৪)। প্রায় একই সময়ে লেখা ‘গোরা’ উপন্যাসে সিক্ত ‘অন্ধকার’- এর কথা পড়েছি আমরা; ‘অন্ধকারের মহাসমুদ্র’ বা ‘প্রকাণ্ড অন্ধকার’- এর মত শব্দবন্ধ উঠে আসে সে উপন্যাসে। ‘পূরবী’-র কবিতায় আমরা পেয়ে যাই ‘নিগূঢ় সুন্দর অন্ধকার’, ‘অন্ধকারের আলোকভাণ্ডার’- প্রকাশের এমন জটিল ভঙ্গি। রাজা-র ছ’বছর বাদে রচিত ‘চতুরঙ্গ’ উপন্যাসেই বোধহয় অন্ধকার তার সমস্ত বিক্ষুব্ধ আদিমতা নিয়ে ঘিরে আসে অস্তিত্বে, রবীন্দ্রনাথ যাকে বলবেন ‘সর্বনাশা অন্ধকার’-‘অন্ধকারটা যেন একটা আলোতন্তুর মতো- তার ভিজা নিশ্বাস যেন আমার গায়ে লাগিতেছে। ... সে যেন আদিম কালের প্রথম সৃষ্টির প্রথম জন্তু; তার চোখ নাই, কান নাই, কেবল তার মস্ত একটা ক্ষুধা আছে ... আমার জাগ্রত চৈতন্য এত বড় সর্বনাশা অন্ধকারের নিবিড় আলিঙ্গন সহিতে পারে না ...’। এমন আঁধারের বুকের ভেতর থেকে ঝড় আসে, ‘সেদিন সমস্ত দিন গুমট করিয়া হঠাৎ রাত্রে ভারী একটা ঝড় আসিল ... এই রকম রাতে আমাদের মনের জানলা-দরজার ছিটকিনিগুলা নড়িয়া যায়, ভিতরে ঝড় ঢুকিয়া পড়ে..’।

তাই রবীন্দ্রনাথ তাঁর একটি গানে যেমন বলেছেন, ‘এ আঁধার যে পূর্ণ’, সে কথা তাঁর সারা জীবনের ব্যাপ্তিতেই সত্য। আর এ কথা মনে করিয়ে দেবার জন্যই যেন, ভূমিকায় শম্ভু মিত্র রাজা-র অন্ধকারকে যুক্ত করে দিয়েছেন রবীন্দ্রজীবনেই, এটা বলে, যে, ‘রবীন্দ্রনাথ তাঁর নিজের কাহিনী বলেছেন। তাঁর অন্ধকার শূন্য নয়।’ আবার ‘চতুরঙ্গ’-এ যেমন বাইরের বিক্ষোভ হয়ে যায় মনের ভেতরকার ঝড়, তেমনি রাজা-র অন্ধকারও হয়ে ওঠে আমাদেরই অন্ধকার, উপলব্ধিহীন যে-অন্ধকারে আমরা প্রতিনিয়ত আবৃত। সেই অন্ধকারের যে আদিম ক্ষুধা, যে ক্ষুধা সুদর্শনার, আবার দামিনীরও, আমাদেরও, সেই লোভার্ত ব্যাকুলতায়, নিজেকে ভেঙে, পুনর্নির্মাণ করলেই আমরা ‘আঁধারের আলোকভান্ডার’- এর এর অর্থ বুঝতে পারব, বুঝতে পারব- ‘অন্ধকারের বুকের কাছে নিত্য আলোর আসন আছে,/ সেথায় তোমর দুয়ারখানি খোলো।’ এমনকি, ‘আলো, আলো কই’- সুদর্শনার এই প্রথম কথা কটি (রাজা নাটকটিরও), যেন এক অদৃশ্য যোগসূত্রে, রবীন্দ্রনাথ রাজা-র আগেই লিখেছিলেন অন্য একটি গানে, ‘কোথায় আলো কোথায় ওরে আলো।’ ফলে আজকে যখন রাজা দেখব আমরা, তখন একে বিচ্ছিন্ন কোনো নাটক হিশেবে না দেখে, বুঝতে হবে সমগ্রতার নিরীখে, সেই মন নিয়ে। পঞ্চম বৈদিক-এর দ্বিতীয় প্রযোজনা রাজা-র শুরুতেই শম্ভু মিত্র-র ভাষ্য আমাদের সেই সমগ্রতার বোধের দিকে নিয়ে যায়।

অন্যদিক থেকে বিচার করলে কেউ একে বিংশ শতাব্দিরই শেষ পর্বে আমাদের দেশের দলিলচিত্র হিশেবে দেখতে পারেন। দেশজুড়ে যেন অভিনীত হচ্ছে রাজা-রই সাব-প্লট, যেখানে সুবর্ণ-কাঞ্চী-কোশল-অবন্তী রাজাদের মত ভন্ডরাজে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে আমাদেরই জীবনের একটা তল। সুবর্ণকে রাজা বানিয়ে কাঞ্চী-কোশল-অবন্তীরাজরা যখন বলেছিল, ‘তোমাকেই আমরা এখানকার রাজা করে দিচ্ছি- পরিহাসটা শেষ করেই যাওয়া যাক’, যখন বলেছিল, ‘তোমার সাধ্যের উপর ভরসা নেই , আমাদের বুদ্ধি মত চলতে হবে,’ তখন সেই সাব-প্লট, আমাদের এখনকার বাস্তবতার রণনে সমৃদ্ধ হয়ে, যেন অনেক বেশি অর্থময়। সমস্ত দেশটাকে ভন্ডরাজদের দলের লুটেপুটে নেবার ‘পরিহাস’- এর অনিবার্যতাই কি পঞ্চম বৈদিক-এর রাজা-য় এই সাব-প্লটের অভিনয় একটু উচ্চকিত?

এমন নাড়া দেওয়া ‘পরিহাস’- এর নাটকে সুদর্শনা তখন কেবল একজন নারীই থাকেন না মাত্র, তাঁর অন্ধকার ঘর শুধু ঘর থাকে না; সে ঘর যেন আমাদের এই অভাগা দেশ- দীর্ণ, অচেতন, আত্মবিস্মৃত, পরিচয়হীন। অন্ধকার যেন আমাদেরই অনুন্নয়নের স্মৃতিজোড়া বিষাদের অন্ধকার, প্রশাসনিক শূন্যতার অন্ধকার, কর্মহীনতার অন্ধকার। কলোনির লাঞ্ছনা শেষ হবার পর গত ৪০ বছর ধরে আমাদের দেশ আত্মপরিচয় আবিষ্কারের শারীরিক যন্ত্রণায় ছিঁড়ে গেছে, যাচ্ছে। উন্মূল অস্তিত্বের হাহাকারে আমাদের নানা প্রদেশ থেকে আজ ছুঁড়ে দেওয়া হচ্ছে হিংস্র, রক্তাক্ত স্বদেশজিজ্ঞাসার প্রশ্ন, এই দেশটাকে তারা পেতে চায়, তারা বেঁচে থাকার অর্থ বুঝতে চায় এই স্বাধীন দেশের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্কের চরিতার্থতায়। আত্মপরিচয়ের এমন তীব্র সংকটের সামনে আগে কখনো পড়েনি ভারতবর্ষ। এই সংকট নিরসন, তাই, আমাদের শারীরিক অস্তিত্ব রক্ষারই প্রসঙ্গে অত্যন্ত জরুরী। অন্ধকার থেকে আত্মআবিষ্কারের আর্তিতে ছিন্নভিন্ন সুদর্শনার চরিত্রায়নে শাঁওলী মিত্র যে শারীরিক অভিনয় করেন- ভালবাসায়, মোহভঙ্গের জান্তব বেদনায় ও পরে আত্মোপলব্ধির প্রশান্তিতে- সেই শারীরিক হাহাকারে আমরা, জাতি হিশেবে, আমাদেরও আত্মপিরচয়হীনতার তীব্র শারীরিক বেদনার আর্কিটাইপ খুঁজে পাই। এইভাবে সুদর্শনার অস্তিত্বের শিকড় খুঁজে ফেরার নাটক থেকে রাজা উত্তীর্ণ হয় আমাদের অস্তিত্বের শিকড়-সন্ধান নাটকে।

উত্তীর্ণ হয়। কিন্তু এই উত্তরণ কখনোই রবীন্দ্রনাথ থেকে দূরে সরে গিয়ে আসেনি। রবীন্দ্রনাথের বাক্যে, রবীন্দ্রনাথের শব্দে, দুই শব্দের মধ্যবর্তী বাক্সময় অবকাশে সম্পূর্ণ অবগাহন করেই এই উত্তরণ। আর সেই প্রক্রিয়ার ভেতরের সংঘাত থেকে গড়ে ওঠে রাজা-র নিহিত নানা নাটক- শব্দের নাটক, রঙের নাটক, শরীরের নাটক। এতগুলো স্তরের বিকাশ ঘটতে থাকে একই সঙ্গে, ফলে তৈরি হয় আবেগ, উপলব্ধি আর বোধের এক বিপুল সংশ্লেষ।

শব্দের নাটক বলতে আমরা নিশ্চয়ই বুঝব রবীন্দ্রনাথের ব্যবহৃত ভাষার নানা রকমফের আর তা বলবার, উচ্চারণ করবার ধরনকে। কোনো নিষ্ঠ দর্শককে এ কথা বলে দিতে হয় না যে সুদর্শনা-সুরঙ্গমা-রাজাকে ঘিরে যে কাহিনী বিন্যাস তার ভাষা আর কাঞ্চী-কোশল-রাজ্যের লোকজনকে ঘিরে যে ঘটনা পরম্পরা তার ভাষা সম্পূর্ণ আলাদা। আবার এই দুই বিপরীত মেরুর ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া পরস্পরের উপর নির্ভরশীল। এই ডায়লেকটিকসেই গোটা নাটকটা বাঁধা থাকে। এই দুই প্রান্তের মধ্যে কেবল যোগসূত্রের মত ছুটে বেড়ান ঠাকুর্দা- তাঁর এক একটি বাক্যেই যেন নিহিত এই দুই প্রান্তকে ছুঁয়ে থাকার অস্থিরতা।

সুদর্শনা-সুরঙ্গমা-রাজা এই ত্রিভূজের কথাবার্তার মধ্যেও নানা উপস্তর আছে। সুরঙ্গমাকে যদি ধরে নিই সুদর্শনারই দ্বিতীয় সত্তা, রাজা তাহলে হয়ে দাঁড়ায় সুদর্শনার সুরঙ্গমা হয়ে উঠবার নাটক। এবং এক অর্থে ত তাই-ই। নাটকটায় শাঁওলী যে অসামান্য দক্ষতায় প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত তাঁর স্বরপ্রক্ষেপের ব্যবহার করেন, তাঁর শারীরিক মুদ্রার ব্যবহার করেন, তাঁর প্রসাধন আর পোশাকের রং যেভাবে বদলায়- প্রথম থেকে শেষ অব্দি- তাতে দেখা যায়, তাঁর বাচনে শব্দের প্রাথমিক উচ্ছ্বাস, পরবর্তী হিংস্রতা, আর একেবারে শেষ দিকের আত্মস্থ উচ্চারণে তাঁর সুরঙ্গমা হয়ে ওঠারই প্রক্রিয়া গাঁথা। প্রথম দৃশ্যের প্রথম উচ্চারণ থেকে এই প্রক্রিয়া শুরু।

শম্ভু মিত্র-র ভাষ্যের পরই সমবেত গান ‘মম চিত্তে নিতি নৃত্যে কে যে নাচে তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ।’ যে নৃত্যময় অনির্বচনীয়কে, বিমূর্তকে নিজের ভেতর উপলব্ধি করতে চায় সুদর্শনা, তার সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে যা বেজে চলে মৃদঙ্গের মত, সেই নিনাদ ত এক অর্থে আমাদের বেঁচে থাকারই ধ্বনি, যে ধ্বনির ছন্দে আমরা যুক্ত হই ইতিহাসে, শব্দে, প্রকাশের বিহ্বলতায়, রোমাঞ্চে। মায়াকোভস্কি একেই বলেছেন ইতিহাসের ধ্বনিমালা, ‘gradually from this rumbling one begins to squeeze out single words.’ রবীন্দ্রনাথও জানিয়ে দেন আমাদের, অন্য একটি গানে, ‘কী ধ্বনি বাজে গহনচেতনা মাঝে!’ তাই কেবল শুরুতেই নয়, নাটকের বিভিন্ন পর্বে, কখনো দ্রুত লয়ে, কখনো লয় কমিয়ে, কখনো উচ্চারণে একটা চাপা আতংকের রেশ এনে, ভেঙে ভেঙে, বারে বারেই এই গান আমাদের জীবনজোড়া নৃত্যময় সেই অনির্বচনীয়ের অনুভবকে নাড়িয়ে দিয়ে যায়। গানে শুনি, ‘মম চিত্তে নিতি নৃত্যে কে যে নাচে তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ’, যেমন বসন্তোৎসবের দিন রাজাকে দেখবার আগে সুদর্শনা বলেন, ‘ভয় লজ্জা সুখ দুঃখ সব মিলে আমার বুকের মধ্যে আজ নৃত্য করছে- শরীরের রক্ত নাচছে, চারিদিকের জগৎ নাচছে।’ গানে আমরা শুনি ‘কী আনন্দ, কী আনন্দ, কী আনন্দ’- এর পুনরাবর্তন, যেমন অদৃশ্য রাজা বলেন সুদর্শনাকে, ‘দেখতে পাই যেন অনন্ত আকাশের অন্ধকার আমার আনন্দের টানে ঘুরতে ঘুরতে কত নক্ষত্রের আলো টেনে নিয়ে এসে একটি জায়গায় রূপ ধরে দাঁড়িয়েছে।’ গানে আমরা শুনি, ‘নাচে জন্ম, নাচে মৃত্যু পাছে পাছে’, যেমন সুদর্শনা বলেন রাজাকে, ‘এই যে কঠিন কালো লোহার মতো, মুর্ছার মতো, মৃত্যুর মতো, তোমার দিকে তার কিছুই নেই!’ আর একটু বড় অর্থে ভাবলে, রাজাকে যদি আমরা ডায়লেকটিকসের নাটক বলে ধরি, তাহলে ‘মম চিত্তে’ গানেও সেই একই দ্বান্দ্বিকতা- ‘হাসি কান্না’, ‘ভালো মন্দ’, ‘জন্ম মৃত্যু’, ‘মুক্তি বন্ধ’। নাটকের পরতে পরতে এমন ডায়লেকটিকসের প্রক্রিয়ায় বেজে যায় মৃদঙ্গ, ছন্দ ওঠে, ধ্বনি জাগে- ইতিহাসের গর্ভ থেকে ওঠা নাদধ্বনি।

গান শেষ হতে না হতেই সুদর্শনা ব্যাকুল হয়ে বলে ওঠেন, ‘আলো, আলো কই, আলো, আলো চাই আমার।’ রাজা-য় যদিও ‘আলো, আলো কই’ কথাটা দুবার আছে, শাঁওলি তাকে প্রলম্বিত করেন। নাটকের অনেক বাক্যেই এমন আছে। তাঁর উচ্চারণের স্বরলিপি করলে ব্যাপারটা  দাঁড়ায়, এইরকম- প্রথম ‘আলো’টাই উনি বলেন প্রায় তারসপ্তকের শুরু থেকে; ‘আলো কই’ আরও একটু উপরে ওঠে; ‘আলো’ ঐ সুরেই বলা হয়, আর ‘আলো চাই আমার’ নেমে আসে, ধীরে প্রথম ‘আলো’র জায়গায়। ফলে স্বরমালার এক স্পষ্ট উপবৃত্ত তৈরি হয়। এর পরই সুরঙ্গমা মধ্যসপ্তকের স্কেলে স্থিরভাবে বলে ওঠেন, ‘মা’। অর্থাৎ নাটকের শুরুতেই স্বরক্ষেপের এক তীব্র টেনশন তৈরি করা হয়- সুদর্শনার কথাগুলো ঢেউয়ের মতো এসে এসে আছড়ে পড়ে সুরঙ্গমার অকম্পিত আবেগের চাপা উপকূলে, ফলে দ্যুতিময় হয়ে ওঠে প্রায় প্রতিটি কথপোকথন তাদের নিয়ত সংঘর্ষে, একধরনের তীব্র সাংগীতিক চাপ ছড়িয়ে যায় নাটকের শরীরে। সুদর্শনার কথার মধ্যেও সুরের নানা খেলা, গলার স্বরপ্রক্ষেপের এক একটি মোচড়ে শাঁওলি বের করে আনেন প্রতিটি উচ্চারিত শব্দের নিহিত অর্থ, ভেতরের ব্যঞ্জনা। যেমন, রাজা সুদর্শনার কাছে জানতে চান, তাঁর রূপ সুদর্শনার কাছে কী রকমভাবে আসে- উত্তরে শাঁওলি সুদর্শনার সেই অসামান্য বর্ণনা যে গভীর আবেগের সঙ্গে বলে চলেন, তাতে আন্দ্রেই বেলি-র সেই কথাই মনে আসে, ‘Living speech is always the music of the inexpressible’. প্রথমে আমরা দেখে নেব, শাঁওলি কীভাবে এই বর্ণনাকে ভেঙে ভেঙে দেন তাঁর গলার কাজে, বাক্সময় যতিতে, এক টুকরো হাসি দিয়ে বা কখনো স্বরমাত্রাকে হঠাৎই উচ্চগ্রামে তুলে- ‘সে তো একরকম নয়’, এই বাক্যটি শাঁওলি ভরে তোলেন এক অস্ফুট হাসির ইলশেগুড়ি মিহি শব্দের কম্পনে, জলে মৃদু হাওয়া লাগলে যেমন তরঙ্গ দুলে ওঠে, সেরকমই বোঝা যায়, সুদর্শনার সমস্ত দেহ সেই অনির্বচনীয়ের বর্ণনার রোমাঞ্চে থরে থরে। সে রোমাঞ্চ আমাদেরও লাগে। তার হাসির অনির্দিষ্ট প্রবাহের মাঝখানে রাজা ফের জানতে চান, ‘ব-লো-ও, শুনি-ই’। সেই জিজ্ঞাসার শেষ সুরও শাঁওলি ছুঁয়ে দেন তাঁর শরীরময় পুলকের একটি দুটি আবেশমাখা ধ্বনিতে। তারপর আসে তার বর্ণনা। ‘নববর্ষার দিনে’ শাঁওলি উচ্চারণ করেন একটা সাধারণ বৃত্তান্তের সুরে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে নির্দিষ্ট করে আনেন অভিজ্ঞতার বিশিষ্টতা, গলায় যেন ভেসে আসে আনত মেঘমালার জমাট জলমগ্ন নিবিড়তা, ‘জল-ভরা মেঘে’।

‘আকাশের ঐ শেষ প্রান্তে বনের রেখা যখন’- এই পর্যন্ত সুরটা ক্রমশ ধীরে একটু একটু করে ওঠে, হঠাৎ খাদে নেমে আসে- ‘নিবিড় হয়ে ওঠে’। সেই গভীর ঘনমায়া থেকে আবার স্মৃতির দিকে ফেরা, ‘তখন আমি বসে বসে মনে করি’; আমরা প্রস্তুত হয়ে থাকি আর আমাদের সমস্ত ছিলাটান অপেক্ষাকে এক সংহত সুরের ধাক্কায় নাড়িয়ে দেন শাঁওলি- ‘আমার রাজার রূপটি বুঝি’- একটু যতি, ‘ওইরকম’। বর্ণনার ছড়ানো আদলে আরও মমতায়, যেন শারীরিক অনুষঙ্গে বিভোর সুদর্শনা, শাঁওলি ছুঁয়ে ছুঁয়ে যান নির্দিষ্ট অবয়ব,  ‘চোখের পল্লবটি ওমনি ছায়া মাখা’; চোখ থেকে মুখে, হাসিতে, ‘মুখের হাসিটি’- বলেই যেন খুঁজে নেন তার যোগ্য প্রতিতুলনা, ‘ওই, ওমনি’, মুহূর্তের বিরতির মধ্যে থেকেই উপমা জন্ম নেয়, ‘ওমনি গভীরতার মধ্যে ডুবে থাকা।’ এই পর্যন্ত সুরের একটা ধরন। তারপর একটু যতি দিয়ে, পাশ্চাত্য সঙ্গীতের কাউন্টারপয়েন্টের মত, যেন তীব্র নিখাদ থেকে কথা বলা, ‘আবার শরৎকালে’, দ্রুত দম নিয়ে, ‘আকাশের পর্দা যখন দূরে উড়ে চলে যায়’ হাওয়ার সেই পাখসাট যেন আমাদের গায়ে লাগে। ‘তখন আমার মনে হয়,’ যেন শরতের সেই চঞ্চলাতেই একটু ভেবে নেওয়া, ‘তুমি স্নান সেরে তোমার শেফালিবনের  পথ দিয়ে চলেছ’, সেই চলার গতি লাগে বাক্যে, গলা উঠে আসে ওপরে, যেন বনের পথ থেকে চলমান পথিকের গলায়, ‘তোমার গলায় কুন্দ-ফুলের মালা,’ গলা থেকে বুক, ‘তোমার বুকে শ্বেতচন্দনের ছাপ;’ বুক থেকে আবার মাথায়, গলাও উঠে আসে আবেগের ঊর্ধ্বমুখী টানে, ‘তোমার মাথায় খুব হালকা শাদা কাপড়ের উষ্ণীষ’; মাথা থেকে চোখ আর সেই চোখের দৃষ্টির ব্যাপ্তি ছড়িয়ে  যায় শাঁওলির কথার টানে, ‘আর তোমার দৃষ্টি দিগ-ন্তের পা-রে।’ ‘দিগন্ত’ শব্দটায় একটা মীড় ওঠে, মনে মনে আমরাও তাকিয়ে ফেলি নিজেদের অস্তিত্বের দিগন্ত রেখায়; ‘তখন আমার মনে হয়, তুমি বুঝি আমার পথিক বন্ধু।’ তার সঙ্গে চলার আকাঙ্খায় মন তখন পথে, ‘তোমার সঙ্গে’, বলেই ‘যদি’ শব্দে একটু বেশি জোর লাগে, ‘যদি চলতে পারি’, তখন কী হবে? শাঁওলিও যেন জানেন না। তাই ‘তাহলে, তাহলে’ উচ্চারিত হয় বার দুই, সংশয়ে, তারপরই যেন দেখা যায় দিগন্তের ঈপ্সিত বস্তু, ‘ঐ দিগন্তে দিগন্তে সোনার সিংহদ্বার খুলে খুলে যাবে, আর আমি ঐ শুভ্রতার ভিতর মহলে প্রবেশ করতে পারব।’ ‘দিগন্তে দিগন্তে কথাটি শাঁওলির উচ্চারণে এমন একটি কক্ষপথ রচনা করে যে মনে হয় যেন খুব দূর থেকে সমস্ত দিগন্তই একটা অস্পষ্ট বক্রতায় ধরা দিচ্ছে চোখে। এই পর্যন্ত সুরের আর এক ধরন। শাঁওলি যদি শব্দে জোর দিয়েছিলেন বোধহয় এর পরের বর্ণনার ‘যদি’-র ইঙ্গিতেই, কারণ পরের বাক্যের শুরুতেই শুনি, ‘আর যদি না পারি’। প্রথমবার এই বাক্যে এক আশংকার সুর আনেন শাঁওলি। একটু যতি আসে, তারপরেই যেন জেনে গেছেন সমাধান এমনি আত্মপ্রত্যয়ে স্বগতোক্তি করেন, ‘যদি না পারি’, ফের যতি, ‘তাহলে,’ ভেতরের গমকে কেঁপে ওঠে শব্দটা, ‘এই বাতায়নের ধারে বসে কোন এক দূরের জন্যে কেবলই দীর্ঘশ্বাস পড়তে থাকবে’; গলা রুদ্ধ হয়ে আসতে চায় উপলব্ধিতে,‘ দিনের পর দিন’, আরও সুক্ষ্ম হয়ে যায় গলা, ‘রাতের পর রাত’; শব্দের গভীর জুড়ে তখন অশ্রুপাত, ‘অজ্ঞাত বনের পথশ্রেণী  আর ঐ, ঐ অনাঘ্রাত ফুলের গন্ধের জন্যে আমার বুকের ভেতরটা কেঁ-দে কেঁদে, ঝুরে ঝুরে মরবে।’ বনময় এই ঝরে পড়া আলুথালু মনকে যেন হঠাৎ ফের জড়ো করে তোলেন শাঁওলি কোন আকর্ষণে, গলা চড়ে যায়, টুকরো টুকরো হাসির মুক্তোয় চমকে ওঠে উচ্চারণ, ‘আর এই যে বসন্তকালে, এই যে যখন সমস্ত বন রঙে রঙিন, এখন আমি তোমাকে দেখতে পাই- তোমার কানে কুন্ডল, হাতে অঙ্গদ, গায়ে বসন্তী রঙের উত্তরীয়, হাতে অশোকের মঞ্জরী;। ‘অশোকের মঞ্জরী’ উচ্চারণেই গলায় আসে ঝংকার আর সেই ঝংকৃত বর্ণনা হাত থেকে গিয়ে পড়ে বীণায়, যেন সবচাইতে উচ্চগ্রামে বীণা বাজছে, ‘তা-নে তা-নে তোমার বীণার স-ব কটি সোনার তার উতলা উ-ত-লা-আ’- শাঁওলি ভেঙে ভেঙে দেন হাসিতে, যেন বীণার তার বেয়ে নেমে আসছে সুরের সোপান।

যদি এই বর্ণনায় ব্যবহৃত স্বরপ্রক্ষেপের, উচ্চারণের কাঠামো এক সঙ্গে ব্যাখ্যা করে দেখি, তাহলে প্রথমেই মনে আসে এক সাঙ্গীতিক বিন্যাসের রূপ। যেন সম্পূর্ণ বর্ণনাটি ধ্রুপদী গানের সুরকাঠামোয় বাঁধা। প্রথমে আলাপের গম্ভীর বিস্তার, দ্বিতীয় স্তরে সুরের উচ্চকিত চঞ্চলতা আর শেষে ঝংকৃত তানের পরে সমে ফিরে আসা। আর কাঠামোয় শাঁওলি শুধুমাত্র গলারই সুরে, মীড়ে, তানে, বর্ণনার ভেতরেই ঘটিয়ে দেন ঋতুর বদল, জলদগম্ভীর বর্ষার স্তম্ভিত আবরণ ভেদ করে শরতের মুক্তি, আবার বসন্তের চপলতা। বৃষ্টিপাত থেকে আকাশের ঊর্ধ্বে ছেঁড়া মেঘ থেকে আবার বসন্তের রঙের ঝড়ে রঙের ধারাপাতে এ এক অদ্ভুত ভ্রমণ। অন্য স্তরে তেমনি গড়ে ওঠে এক শরীর, সুপুরুষের যিনি শ্রেষ্ঠ, তাঁর শরীর, বা, হতে পারে আমার এই দেশেরই আদল। শরীরের নির্দিষ্টতা ঘুরে ফিরে আসে- চোখ, মুখ, মুখের হাসি, গলা, বুক, মাথা, কান, হাত, আদুল গা, আবার হাত থেকে বীণার তারে সুর তোলে যে আঙুল, তারও আভাস অব্দি। আমরা যে ডায়লেকটিকসের কথা বার বার বলছি রাজা-র প্রসঙ্গে, পঞ্চম বৈদিকের প্রযোজনায় প্রতিটি উচ্চারণে সেই দ্বান্দ্বিকতা- যেমন শাঁওলির এই বর্ণনাতেও। রাজার কল্পনায় গলার স্বরে, সুরে শাঁওলি একই বাক্যের একাংশে চলে যান ব্যাপ্ত প্রাকৃতিকে, এই দেশেরই ভূগোলে, ঋতুতে ঋতুতে, আবার সেই বাক্যেরই অন্য অংশে গড়ে তোলেন এক ব্যক্তি শরীরের আদল, শরীরের নানা প্রত্যঙ্গকে বিশিষ্ট করে। কথার ভেতরে এই দ্বান্দ্বিকতার সচেতন প্রয়োগ; এই ডায়লেকটিকসই দেখি সুরঙ্গমা (বিজয়লক্ষ্মী বর্মন) আর সুদর্শনার সম্পর্কে। এই দুই চরিত্র যেন একই সত্তার দুই প্রান্ত। সুরঙ্গমা যে জীবন যাপন করে এসেছে, সুদর্শনাকে সেই যন্ত্রণার ভেতর দিয়েই যেতে হয়। ফলে, সুরঙ্গমার অবিচলিত নিষ্ঠা আর স্থিত বোধের পাশে পাশেই চলতে থাকে সুদর্শনার নিজেকে চিনবার সংগ্রাম। সুরঙ্গমা নষ্ট ছিল, শরীরের ভ্রষ্টতার ভেতর দিয়ে সে পৌঁছয় তার নিজের প্রকৃত সত্তার ভেতরমহলে। সুদর্শনাকেও বলতে হয়,- আমি অসুচি, আমি অসতি। আর সুদর্শনা যতই সুরঙ্গমা হয়ে উঠতে থাকে, সুরঙ্গমা নিজে ততই নিষ্প্রভ হয়ে যায়। আমরা খেয়ালই করি না, কখন যেন সুরঙ্গমা আর থাকেই না মঞ্চে। কারণ, তখন সুদর্শনা ত নিজেই দাসী হয়ে গেছে, মেটামরফসিস তখন সম্পূর্ণ, তাই সুরঙ্গমা মিশে যায়, এও সেই ডায়লেকটিকসেই দ্রবণ। দ্বান্দ্বিকতা দেখি রাজা-সুদর্শনার সম্পর্কে, দ্বান্দ্বিকতা রাজা-ঠাকুর্দার মধ্যে, দ্বান্দ্বিকতা কাঞ্চী-কোশল-অবন্তীরাজাদের মধ্যেও, তাদের সঙ্গে রাজাহীন অথচ রাজায় ঠাশা বিমূর্ততার। দ্বান্দ্বিকতা সুদর্শনার নিজেরই ভেতর। রাজাকে বসন্তোৎসবের মধ্যে দেখা পর্যন্ত তার এক চেহারা, স্বর, সুর; লাঞ্ছিত হবার পর অবিচলিত নিষ্ঠুরতায় ভরা রাজা যখন শীতল, তখন শাঁওলি এক জান্তব প্যাশন নিয়ে অভিনয় করেন। সুরঙ্গমা যেমন বলেছিল, ‘আমি কেবল খাঁচায় পোরা বুনো জন্তুর মতো, আঁচড়ে কামড়ে সবাইকে ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছা করত।’ এই বাক্যেরই ভিস্যুয়াল তৈরি হয়, যখন শাঁওলি, অগ্নিদাহের মধ্যে ভন্ডরাজাদের হাতে এঁটো হয়ে আছড়ে পড়েন রাজার অন্ধকার কক্ষে। তার গলা চিড়ে কেবল বেরয় এক পাশবিক আর্তনাদ। ‘ভয়? ভয় আমার নেই। কিন্তু লজ্জা, লজ্জা, লজ্জা। লজ্জা যে আগুনের মতো আমার সঙ্গে সঙ্গে এসেছে’, কিংবা ‘আমি পারলুম না- রাজা- আমি তোমাকে বাইরে দেখব বলে পতঙ্গের মতো এ কোন আগুনে ঝাঁপ দিলুম! আমিও মরি নে, আগুনও নেভে না, এ কী জ্বালা’, অথবা ‘ভয়ানক, তুমি ভয়ানক। তোমার মুখের উপর ঐ আগুনের আভা এসে লেগেছিল, আর আমার মনে হল, ঐ ধুমকেতু যে আকাশে ওঠে, সেই আকাশের মতো তুমি কালো, কালো। ঝড়ের মেঘের মতো তুমি কালো, কূলশূন্য সমুদ্রের মতো তুমি কালো। তুমি কালো, তুমি কালো’ বা ‘ কিন্তু পাপ- পাপ এসে সমস্ত ভেঙে দিলে’, ‘আমি অশুচি, আমি অসতি’, ‘তুমি কেশের গুচ্ছ ধরে আমাকে টেনে রেখে দাও না কেন? তুমি আমাকে মার না কেন? মার, মার, মার- আঃ’ - এই সমস্ত বাক্য শাঁওলি যে আদিমতা নিয়ে উচ্চারণ করেন, শরীরকে যেভাবে তিনি দুমড়ে-মুচড়ে ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলেন মঞ্চের নিরাভরণ পরিবেশে, তার সঙ্গে প্রথম দিকের অভিনয়ের অনুপম মাধুর্য এক দ্বন্দ্ব তৈরি করে।

‘দিগন্তে দিগন্তে সোনার সিংহদ্বার খুলে খুলে যাবে’-তে দুই হাত তুলে শাঁওলি হাওয়ায় তোরণ নির্মাণ করেন, এমন আর্তনাদে তা ছাড়খার হয়ে যায়। ‘কবে বিবাহ হয়েছিল মনেও নেই’- সুরঙ্গমাকে এই কাহিনী বলবার সময় পিছনের ওড়নাটাকে ঘুরিয়ে চকিতে নববধুর যে বিভ্রম তৈরি করেন শাঁওলি, যেন দীর্ণ করা চিৎকারে তা খান খান হয়ে গেল। যে আবেশে রাজার রূপ বর্ণনার ঋতুবদল ঘটান শাঁওলি, যে আবেগে রাজার কথাকে মনে হয় গানের মত, সেই শরীরকেই চুলের মুঠি ধরে নৃশংসতাব সে মারতে বলে রাজাকে। স্বর ও শারীরিক মুদ্রার এই দ্বান্দ্বিকতা মথিত করে তুলে আনে আসল সুদর্শনাকে। এই চিৎকার যেন এক প্রসববেদনার চিৎকার, সে বেদনার ভাষা থেকেই জন্ম হয় নতুন সুদর্শনার। শাঁওলির এতগুলো স্তরের অভিনয়ের সঙ্গে সঙ্গে মূল তারটিকে কিন্তু ধরে রাখেন বিজয়লক্ষ্মী বর্মন, সুরঙ্গমার চরিত্রে তাঁর গলার, অভিনয়ের অবিচলিত নিবেদন একবারও না টলিয়ে। রবীন্দ্রনাথ যেমন লিখেছিলেন, ‘শিল্পের নৈপুণ্য এই উদ্দামেরে শৃঙ্খলিত করা, অধরাকে ধরা,’ বিজয়লক্ষ্মী বর্মনের সুরঙ্গমা দেখে শিল্পের সেই নৈপুন্যের কথাই মনে পড়ে যায়। সুরঙ্গমা যেন পরশপাথর, তারই ছোঁয়া লেগে লেগে সুদর্শনা বদলে যেতে থাকে শিল্পীত সত্তায়। তাঁর গানগুলো মন্ত্রোচ্চারণের মত লাগে। অভিনয়ের দুই ভিন্ন মাত্রার দ্বান্দ্বিকতা কখনোই এমন বেজে উঠত না বিজয়লক্ষ্মীর শৈল্পিক নৈপুণ্য ছাড়া।

পাশাপাশি কাঞ্চী-কোশল-অবন্তীরাজদের অভিনয়ের সুরই আলাদা। এরা কথা বলে ব্যবসার ভাষায়, সওদার ভাষায়, সাপ্লাই-সাইড অর্থনীতির ভাষায়। ভন্ডরাজদের পার্থিব আকাঙ্খার প্রকাশভঙ্গিও তাই খুবই বাজারি, মদ্যপানে চুর, দেশটা লুটেপুটে খাবার ধান্দায় মুখ থেকে লালা ঝরে। এরা প্রত্যেকেই প্রশ্রয়ের লোভের অন্ধকারে আত্মবিস্মৃত। নিজেরাই নিজেদের রাজা বানিয়েছে বলে সামন্তপ্রভুদের মত এরা দেশটাকেই বাজি ধরে। দেশটাকে কে ভোগ করবে, তার জন্য স্বয়ম্বর ডাকতেও তারা দ্বিধা করে না। প্রভাত বন্দ্যোপাধ্যায় (কাঞ্চীরাজ), সুিপ্রয় সিংহ (অবন্তীরাজ),পরিতোষ পাল (কোশলরাজ) বা সুব্রত মজুমদার (সুবর্ণ) এই সাব-প্লটের লালাসিক্ত আদিম ইন্দ্রীয় প্রবৃত্তির লোভাতুর বেলেল্লাপনা প্রতিষ্ঠা করে যান মঞ্চে। এঁদের অভিনয়ের সুর ও ভঙ্গি আবার সুদর্শনা-সুরঙ্গমা-রাজা কাহিনী বিন্যাসের সুর ও ভঙ্গির সম্পূর্ণ বিপরীত। এই দ্বান্দ্বিকতারও এক তীব্র টেনশন আছে। আর এই দুই মেরুর মাঝখানে এক আশ্চর্য সিন্থেসিস হয়ে যান ঠাকুর্দা (কালীপ্রসাদ ঘোষ) তাঁর সমস্ত রাবীন্দ্রিক অনুষঙ্গ নিয়ে।

শব্দের, ভাষার, উচ্চারণের, বাচনের এমন নাটক, মুদ্রা, নানা ভঙ্গি, বিভিন্ন গতিময়তার নাটকের পাশাপাশি আরও এক নাটক আছে রাজা-য়- রঙের নাটক, পঞ্চম বৈদিকের প্রযোজনায় সেই রঙের নাটক ঢুকে থাকে তুমুল এক সুক্ষ্ম স্তরে। সেই রঙের বদলেও নিহিত আছে গভীর দ্বান্দ্বিকতা।

প্রথমে সুদর্শনাকে দেখা যায় রাণী হিশেবে- নীল বেনারসী, খয়েরি ব্লাউজ, হাতায় নীল বর্ডার, শাড়ীতে নীলের আভাও থাকে, মাথার পেছনে ঝুলে থাকে ছাইরঙের কাপড়ের ঢল। যখন প্রাসাদশীর্ষ থেকে এই পৃথিবীর নিয়তচঞ্চল বসন্তোৎসবের মধ্যে রাজাকে দেখতে ব্যস্ত, প্রগলভ রোহিনীর সঙ্গে, তখন শাঁওলির গায়ে দেখি হলুদ শাড়ি, লাল পাড়ে সেই হলুদ আরও উজ্জ্বল, যেন আগুন লেগেছে। মাথায় লাল ওড়না। ব্লাউজ খয়েরি, তার প্রান্তদেশ জরি দিয়ে মোড়া। রোহিনীরও গায়ে রক্তিমাভা, ম্যাজেন্টা ব্লাউজের সঙ্গে। রাণীর মহিমা ধুলিসাৎ করে  পিতৃগৃহে সুদর্শনা যখন ‘শনিকে সঙ্গে করে নিয়ে আসে’, যখন সে তার ত্যাগকেই বড় করে দেখে, আবার ভেতরে ভেতরে ভাঙেও, শাঁওলির গায়ে তখন দেখি খয়েরি রঙের শাড়ি, ব্লাউজ। কেবল এক অসামান্য ইঙ্গিতে তাঁর ব্লাউজের দুই হাতের প্রান্তে মোটা কালো বর্ডার। সুরঙ্গমার কালো রং তাঁর গায়ে লেগেছে। সুরঙ্গমা হয়ে উঠবার প্রক্রিয়া তখন প্রকাশ্য যেন, মেটামরফসিসের শুরু। কিন্তু তখনো দোলাচলতা থাকে। তাই অশ্বক্ষুরধ্বনিতে সে ভাবে, বুঝি রাজা তাকে নিতে এল। শাঁওলি আয়নায় দেখে দেখে সাজেন- লাল টিপ, লাল ওড়না। হাতের আয়নাও যেন রাজার সেই কথারই প্রতিধ্বনি ‘নিজের আয়নায় দেখা যায় না।’ আত্মবিম্বের সেই খন্ডিত রূপ তাই ভেঙে যায়। যখন সে শোনে, তার রাজা নয়, এসেছে সুবর্ণ, তখন খুলে ফেলে সেই শেষ রক্তিমাভা। তখন শাঁওলির গায়ে উঠে আসে কালো- কালো রঙের টিপ, কালো রঙের ওড়না। হৃতগর্ব মহিষীর অভিমানে সে নানা কথা বলে, কিন্তু রং বলে দেয়, ভেতরে ভেতরে তার সুরঙ্গমা হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া এক চূড়ান্ত পর্বে পৌঁছেছে। সুদর্শনা সুরঙ্গমা হয়ে গেল। রঙ বদলের, সেই সঙ্গে চরিত্রের সম্পূর্ণ রূপান্তরণের এই নাটক মূল কাহিনীবিন্যাসের ভেতরেই এমন নিঃসাড়ে হতে থাকে. যে, বুঝতে পারি, সুদর্শনার মন তৈরি হল। রঙের এই নাটক যেন সুদর্শনার জীবনে এক বিপুল, নিঃশব্দ বিপ্লবের মত হয়ে আসে, বৈপ্লবিক রঙের ঝড়ে আলোড়িত হতে থাকে আমাদেরও অস্থির বোধ।

রং আছে আরও, বাইরের রং। সাধারণ প্রজাদের হলুদ বসনে, ঠাকুর্দার ছাইরঙা পাঞ্জাবি, শাদা কাপড়, বাঁ কাঁখে গেরুয়া উত্তরীয়ের লালচে পাড়ে, শাদা চুলে, ভণ্ডরাজদের মেকি রঙিন পোশাকে, সুরঙ্গমার কালো শাড়িতে, রোহিনীর উচ্ছল সাজে রঙের নানা স্তর মিশে যায় চরিত্রদের কথায় নিহিত নানা রঙে, সে নিহিত রং আমরা দেখি না, সে রং আমরা শুনি। যেমন, সুদর্শনা-সুরঙ্গমার কথায় অন্ধকারের রং, নানা প্রসঙ্গে আগুনের রং, কিংশুক ফুলের রং, জ্যোৎøার রং, নেশার রং, অনুপম প্রেমোপলব্ধির রং। আর এমন বর্ণনার রঙের পেছনে অধিকাংশ সময়ই ঝুলে থাকে রাজার বিমূর্ত কালো, মঞ্চের পেছনে; এমনই সে কালো যেন মনে হয়, পেছনে মাইল মাইল শূন্যতার এক অন্ধকার মঞ্চের উপরকার সমস্ত রং এক অনিবার্য টানে শুষে নিচ্ছে। নেয়ও। সুদর্শনার ভাষায়, সুদর্শনার কথায়, সুদর্শনার উচ্চারণে, সুদর্শনার বর্ণনায়, সুদর্শনার আচরণে, সুদর্শনার শরীরে, সুদর্শনার চোখের সমস্ত রং মিশে যায় বিমূর্ত এক অন্ধকারে, সুদর্শনা সেই সমস্ত রং আত্মস্থ করে এক উদ্ভাসিত অন্ধকারের প্রতিমূর্তি হয়ে ওঠেন। শাঁওলির অভিনয়ে, অন্ধকারের সেই মুখর বিচ্ছুরণ তুলনাহীন। শাঁওলি নিজের ক্ষেত্রেও এটা চ্যালেঞ্জ ছিল। গালিলেওর জীবন- এ ভার্জিনিয়া বা রাজা-তে সুরঙ্গমার চরিত্রে একটা চাপা অভিনয় করতে দেখেছি তাঁকে। নিজেকে আড়ালে রাখাই সেখানে মুখ্য। সেই মুক্তির প্রথম পদক্ষেপ ছিল নাথবতী অনাথবৎ,  সেখানে একাধারে প্রকাশ-অপ্রকাশ, ভেতর-বাইরে মিলে একাকার। রাজা-র সুদর্শনাও সে অর্থে নাথবতী অনাথবৎই। শেষে দ্রৌপদী যেমন বলেছিল নাথবতী- তে ‘এই জটিল জীবনকে একবার গড় হয়ে প্রণাম করি,’ রাজা-তে সুদর্শনা একইভাবে জানায়, ‘অন্ধকারের প্রভুকে, আমার নিষ্ঠুরকে, আমার ভয়ানককে প্রণাম করে নিই।’

আবার অন্য দিক থেকে যদি দেখি, যেমন মনে হয়েছে এক নিষ্ঠ দর্শকের, পুরো নাটকটাই যেন এক ধ্রুপদী নাচের কাঠামোতে গড়ে তোলা, মঞ্চে যেন চলচ্ছবির মতো নানা মুহূর্তের জন্ম দেয় এই অসামান্য কোরিওগ্রাফি। নিরাভরণ মঞ্চসজ্জায় স্তর হিশেবে কাজ করে কেবল সিঁড়ির দুটি ধাপ ও পেছনের কখনো কালো কখনো শাদা পরিপ্রেক্ষিত। আর ঐ দুটি এপ্রান্ত ওপ্রান্ত ছড়ানো সিঁড়িতে অভিনীত হতে থাকে রাজা-রও বিভিন্ন স্তর। শুরুতে রাণী সুদর্শনাকে আমরা দেখি উপর তল থেকে নেমে আসছেন সুরঙ্গমার কাছে- নীচের তলে, কিন্তু বারবারই তিনি ফিরে যান সেই ওপরেই। আর একেবারে শেষে সুদর্শনাকে যখন দেখি রূপান্তরিত এক সত্তা হিশেবে, তখন তিনি নীচের তলে, সেখানেই গড় হয়ে প্রণাম করেন ওঁর প্রভু, ওঁর ভয়ানক, ওঁর নিষ্ঠুরকে, যেন শুরুর সেই ওপরের তল থেকে নীচের তলে নেমে আসবার পদক্ষেপই আয়ত্ব করছিলেন রাণী গোটা নাটক জুড়ে, যেন সেই সামান্য পাদবিক্ষেপেই সমস্ত জীবনেরই বদল। কাঞ্চীরাজাকে আত্মগরিমার প্রথম দম্ভে দেখি ওপরে, আর যখন সেও বদলে গেছে, নিরাভরণ দেহে সেও তখন নীচেই। আর এই মেটামরফসিসে সুদর্শনা, আর আমাদেরও সেই সঙ্গে, জীবনের বোধ পালটে যায়, তারই উদ্ভাসিত, উচ্ছ্রিত এক রূপ চলচ্চিত্রের মত বয়ে যায় ওপরের তলা দিয়ে, এক নীলাভ আকাশের অসীমতায়।

এই এতগুলো স্তরের নাটক, এতগুলো পরতের দ্বান্দ্বিকতা ঘটে যেতে থাকে একই সঙ্গে, ক্রমান্বয়িক উত্তরণে। ফলে, রাজা-র বিন্যাসে দেখি এক গভীর, জটিল কাঠামো। এই এতগুলো স্তরের নাটককে না ‘দেখলে’, উপলব্ধি না করলে, আত্মস্থ না করলে, রাজা-র অন্ধকারে আমাদের অবগাহন সম্পূর্ণ হয় না। তাই আত্মবোধনে খামতি থেকে যায়।

উপলব্ধির এরকম অসম্পূর্ণতা থেকেই এমন একটি নাট্য প্রযোজনাকে সস্তা সমালোচনার ভাষায় খারিজ করতে উৎসাহিত হয়েছেন অনেকেই। প্রায় ব্যক্তিগত আক্রমণের স্তরে নেমে গেছে সে লেখাগুলো। এইসব পন্ডিমন্য সমালোচকরা, রাজা নাটকের কুম্ভ-র মতই যেন, শম্ভু মিত্রকে ঢেলা মেরে যান। সে সব লেখা নিয়ে ইংরেজি সব সাপ্তাহিক পাক্ষিকে খবরও বেরিয়েছে- সচিত্র। শম্ভু মিত্রের সুবাদে দৈনিক কাগজের নাটকের ৮ কলাম সেন্টিমিটারের আলোচকও ক্রিটিকের মর্যাদা পান। অনিবার্যভাবে আমাদের মনে পড়ে যায় দশচক্র নাটকের শেষ দৃশ্যের কথা- ডাক্তারের ঘরে এসে পড়ছে একের পর এক ডেলা, পাথর। শম্ভু  মিত্র একটা কাপড়ে সেগুলো জড়ো করে তুলেছেন। তারপর একসময় বুকভর্তি প্রশ্বাস নিয়ে কাঁধে ঢেলার পোঁটলা আর একটা ভারি ট্রাঙ্ক ঘষতে ঘষতে, টেনে নিতে নিতে, নিশ্বাস ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, ঢেলার পুঁটুলিটা দেখিয়ে, বলে ওঠেন, ‘এগুলো সব আমি রেখে দেব। এই তো আমাদের কালচারাল হেরিটেজ।’

আমাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের সেই ক্লীব হিংস্রতার বিকার এখনো যায়নি! সেই স্থায়ী সব বিকার সত্ত্বেও এমন শিল্পসৃষ্টি আজও হয়- আত্মবিশ্বাসের সেটাই কারণ।

সিদ্ধার্থ রায় : লেখক, সাংবাদিক, কোলকাতা।