Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

নির্মাণে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের ‘রক্তকরবী’

Written by অনুলিখন.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

[নাটকের লোক মাত্রই জানেন যে, একটি পাণ্ডুলিপি হাতে নেয়ার পর মঞ্চায়ন পূর্ব-মুহূর্ত পর্যন্ত ঐ পাণ্ডুলিপির উপস্থাপন পরিকল্পনায় ঘটে নানা শৈল্পিক সংগ্রাম। নির্দেশক-সহ প্রত্যেক ডিজাইনার ও অভিনেতৃগণ তাদের পরিবর্তনশীল মননশীলতার প্রকাশ ঘটান নাটক নির্মাণে। তাদের ভেতর চলে নাটকটি নিয়ে শিল্পভাবনার নানা আদান-প্রদান। নির্মাণপর্বের যে পথ-পরিক্রমা, সেই পথ-পরিক্রমায় একটি দলকে মুখোমুখি হতে হয় নানা ঘাত-প্রতিঘাতের, নানা সংকটের। এ-সব সংকটের ভেতর দিয়েই একটি নাট্যদল দর্শকের সামনে আনে তাদের নতুন নাটক।

নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়, ঢাকা, মঞ্চে আনছে তাদের নতুন নাটক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’। নাটকটির নির্দেশনা দিচ্ছেন আতাউর রহমান। ‘থিয়েটারওয়ালা’র আয়োজনে নাটকটির নির্মাণপর্বের নানা শৈল্পিক ভাবনা-চিন্তা নিয়ে আড্ডায় বসা হয়েছিলো। আড্ডায় ছিলেন- এই নাটকের নির্দেশক আতাউর রহমান, মঞ্চ পরিকল্পক সাইফুল ইসলাম (প্রাচ্যনাট, ঢাকা-এর সদস্য), আলোক পরিকল্পক নাসিরুল হক খোকন, সরদার চরিত্রে রূপদানকারী অভিনেতা গাজী রাকায়েত এবং নন্দিনী চরিত্রে রূপদানকারী অভিনেত্রী ও পোশাক পরিকল্পক আফসানা মিমি (পরে অবশ্য নন্দিনী চরিত্রে অভিনয় করেন অপি করিম)। নির্মাণের সঞ্চালকের  দায়িত্ব পালন করেছেন তরুণ নাট্যনির্দেশক কামালউদ্দিন কবির।

নির্মাণপর্বের এই আড্ডাটি পাঠকদের জন্য অনুলিখন করে প্রকাশ করা হলো বর্তমান সংখ্যায়। আড্ডাটি সুমন নিকলী কর্তৃক অনুলিখিত- সম্পাদক]

কামালউদ্দিন কবির
আমরা জানি, যথার্থ অভিনয় এবং প্রকৃত নাট্যরস, বিশেষ করে ‘রক্তকরবী’র নাট্যরস আস্বাদনের জন্য অনেকটা সময় অপেক্ষা করতে হয়েছিলো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সময়েও এটির সার্থক অভিনয়ের কোনো তথ্য এ পর্যন্ত আমাদের জানা নেই। আমরা সর্বশেষ কলকাতার ‘বহুরূপী’তে এসে এটির সার্থক প্রযোজনার সংবাদ পাই। কিন্তু যখন ‘রক্তকরবী’ ছাপা হলো, তখন থেকে বলা বলা হলো যে, এখন পর্যন্ত বিবেচ্য বাংলা নাটকের শীর্ষ নাটকের মধ্যে শীর্ষতম নাটক হচ্ছে ‘রক্তকরবী’। তো নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় এই সময় নাটকটি প্রযোজনায় হাত দিলো কোন চিন্তা থেকে? এই কথা থেকেই আলোচনা শুরু হতে পারে, সেক্ষেত্রে আতাউরভাই বলা শুরু করুন...

আতাউর রহমান
শীর্ষতম নাটক, এই অভিধা কোনো নাটক সম্পর্কে বলাটা বোধহয় ঠিক না... মানে বাংলা নাট্য সাহিত্যে এটি অন্যতম প্রধান কাজ, এটা বলা চলে। কারণ ‘রাজা’ও পাশে এসে দাঁড়ায়... অনেকে ‘রাজা’কেও বলেন খুব বড় মাপের নাটক, আবার ‘ডাকঘর’কেও বলেন। আমি সেদিকে না হয় নাই গেলাম। এটা ঠিক যে শম্ভু মিত্র ‘রক্তকরবী’ করার পর... তাও বহুকাল আগের কথা, তারপর কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে এমনকি সারা ভারতে, অন্য ভাষায়ও হতে পারতো... এটা নিয়ে আর চেষ্টা করা হয়নি। শেক্সপীয়রের ‘ম্যাকবেথ’ পৃথিবীর কত জায়গায় হয়, কতভাবেই হয়, ‘হ্যামলেট’ও ক্রমাগত হচ্ছে, ‘অদিপাউস’ ক্রমাগত হচ্ছে। সেদিক থেকে ‘রক্তকরবী’ও ক্রমাগত হতে পারতো, কিন্তু আমরা দেখেছি একবারই-মাত্র হয়েছে। মাঝে মধ্যে বিচ্ছিন্ন প্রতিষ্ঠান করেছে। আমাদের টেলিভিশনে মুস্তাফা মনোয়ার সাহেব করেছেন। চট্টগ্রামের আহমেদ ইকবাল হায়দার প্রায় নিয়মিতভাবেই করেছেন।

কালামউদ্দিন কবির
তার মানে হয়নি তা কিন্তু  নয়...

আতাউর রহমান
হ্যাঁ করেছেন। কিন্তু... কী বলবো... মানে একেবারে মনের ভেতরের ছাপ ফেলার মতো নয়... শম্ভু মিত্রের ‘চার অধ্যায়’ বা ‘রক্তকরবী’ বা ‘রাজা’ যেমন মানুষের মনে দাগ কেটে গেছে, তেমনটি আর হয়নি। শম্ভু বাবুর সময় প্রোডাকশনটা পপুলার হয়েছিলো আবার শৈল্পীক উচ্চতায়ও পৌঁছেছিলো। এমন অনেক সময় হয় যে, খুব ভালো প্রোডাকশন, কিন্তু দর্শকপ্রিয়তা হয়ত পায় না। শম্ভু মিত্রের ‘রক্তকরবী’ এই দুটোই পেয়েছে। অ্যাসথেটিক্যালিও খুব হাই ডিগ্রিতে পৌঁছেছিলো এবং পপুলারও হয়েছিলো। এমনও হয়েছিলো, দিল্লিতে যখন ’শো হয় তখন এক বিদেশি দর্শক দেখে বলেছে যে, ‘রক্তকরবী’র সেট ডিজাইনার, লাইট ডিজাইনার এরা কি বিদেশে প্রশিক্ষণ নিয়েছে? অর্থাৎ বিদেশিরা সবসময় আমাদের প্রোডাকশনগুলোর ঢিলেঢালা ভাব দেখেছে। কিন্তু ‘রক্তকরবী’র লাইট-টা একদম যথার্থ জায়াগায় পৌঁছুচ্ছে... তাপস সেন এর লাইট, খালেদ চৌধুরীর সেট। আমরা হয় কী, কিছু করি, কিছু খেয়ে ফেলি, একটু ভাববাদ আছে, বিবাগী দর্শন আছে... মানে ঢিলেঢালা ব্যাপার আছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, শম্ভু বাবু... কেবল ‘রক্তকরবী’ই নয়, সামগ্রীক নাট্যচর্চার মধ্যে একটা প্রচণ্ড থিয়েট্রিক্যাল ডিসিপ্লিন এনেছিলেন, যেটা হয়ত ওয়েস্ট থেকে শিখেছিলেন বা কাকতালীয়ভাবে ওয়েস্টের সঙ্গে একটা যোগ সাজোশ হয়ে গেছে। এখন নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের এই নাটকটি সবারই খুব জানা, সংলাপ খুব রোমান্টিক, ছেলেমেয়েদের জানা... যারা নাটক ভালোবাসে, যারা সাহিত্য ভালোবাসে তাদের জানা। আমারও সে হিসেবে প্রিয় নাটক, আমি নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটিতে এই নাটকটি করার ব্যাপারে একটা ভাবনা-চিন্তা করছিলাম। শম্ভু বাবু প্রোডাকশন আমি দেখিনি কিন্তু বহুবার তার অডিও ক্যাসেট শুনেছি। শম্ভু বাবুর ‘অদিপাউস’ দেখেছি, কিন্তু মঞ্চে ‘রক্তকরবী’ দেখার সুযোগ হয়নি। সবকিছুর পরও ‘নাগরিক’কে দিয়ে করানোর কারণ হচ্ছে, আমি ১০/১৫ বছর ধরে থিয়েটার সম্পর্কে অন্যভাবে ভাবছি। আমি মনে করি থিয়েটার হচ্ছে গিয়ে... এনসাম্বল ওয়ার্ক, ডিরেক্টর এখানে ডিক্টেটর নয়। ডিরেক্টর এখানে একজন বন্ধু হিসেবে কাজ করবে, একজন হয়তো পথ প্রদর্শক, আর কিছু নয়। শম্ভু বাবুর প্রোডাকশনটা আমার কাছে অনেক সময় মনে হয়েছে... যখন কানে শুনছি, মনে হচ্ছে, একমাত্র তৃপ্তি মিত্রকেই শুনছি, একমাত্র রাজাকেই শুনছি। অর্থাৎ তৃপ্তি মিত্র বা নন্দিনীকে শুনছি, আর রাজাকে শুনছি। ফাগুলালকে আামদের খুব রিসাইট ক্যারেক্টর মনে হচ্ছে। বিশু যাকে আমি  ‘রক্তকরবী’র নায়ক বলতে দ্বিধা করবো না, তাকে আমার মনে হয়েছে রিসাইট ক্যারেক্টর। ‘রক্তকরবী’র যারা মূল শক্তি... আজকের আধুনিক বিশ্বের কনসেপ্টের সঙ্গে যাদের মিলে, যে মানুষ ডিজিট হয়ে গেছে, সংখ্যা হয়ে গেছে, মানুষকে মানুষের নামে চিনি না, ‘৬৯ এর ঙ’, ‘৪৭ এর ঘ’- এই চরিত্রগুলো শম্ভু বাবুর নাটকে আসে না। গোসাই যে রাম-নাম শোনায়, একদিকে সর্দারের চাবুক পড়ছে, অন্যদিকে রাম-নাম শোনাচ্ছে, সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ারের কথা মনে করিয়ে দেয়। বোমা ফেলে গেল একটা জায়াগাতে, তারপর গিয়ে যীশুর বাণী শুনিয়ে আসে। ল্যাংড়া, ক্ষুরা যারা আহত, এদের কাছে যীশুর বাণী শুনিয়ে আসে। এই ধারণাটা মাথায় রেখেই নাটকটা কখনই এমন হতে পারে না যে, রাজা বা বিশেষ করে নন্দিনীই সব। এটা যেন না হয়। শম্ভু বাবু করেছেন, তার ক্ষমতাও ছিলো প্রচণ্ড, লোকজন তাঁর কথা শুনেছে, তৃপ্তি মিত্র সহস্র কণ্ঠে কথা বলতেন, শ্রোতস্বিনী কলহাসিনী নদীর মতো কথা বলতেন। একটা ক্লাসিক্যাল নাটক তৈরি করেছেন। আমরাও একটা ক্লাসিক্যাল ঢঙেই করতে চাই কিন্তু ঐসব থেকে বেরিয়ে এসে ডাউন টু আর্থ, যেন আজকে চিনতে পারি এই নাটকটাকে, সহজ একটা ভাবনা থেকে। শম্ভু মিত্রকে যদি কপি করতে যাই তাহলে লাভটা কী? আমরা চেষ্টা করবো নতুন কিছু একটা করতে। হলে ভালো, না হলো লোকে হয়তো দোষারোপ করবে যে, হয়নি কিছুই।

কামালউদ্দিন কবির
রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেছেন যে, এটা কোনোভাবেই পৌরাণিক নাটক না। যদিও এখানে যক্ষপুরীর কথা আছে, কিন্তু এই যক্ষপুরীর সাথে বাস্তবের কোথাও মিলবে না। তিনিও  বলেছেন যে, সময়ের সাথে মিলিয়ে নেয়াটাই এ নাটকের একটা বড় ব্যাপার। আপনার কথাতেও আসলো যে, এই সময়ের সাথে ‘রক্তকরবী’ যায়...

আতাউর রহমান
আমারতো মনে হয়, প্রতি শব্দে শব্দে, অর্থে অর্থে প্রাসঙ্গিক। রবীন্দ্রনাথ বলেছে যে, আমি মানুষের সিম্পলিটিসিতে বিশ্বাস করি। আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে, এস্ট্যাবলিশমেন্টের বিরুদ্ধে ইঙ্গিত... আমি মনে করছি যে, আমি যে প্রাচীর তৈরি করেছি তা দুর্ভেদ্য, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমি নিজেই মরণকালটা বানিয়ে রাখছি। তো টর্চার এস্ট্যাবলিশমেন্ট, কায়েমী স্বার্থের যে এস্ট্যাবলিশমেন্ট, এর বিরুদ্ধে ‘রক্তকরবী’। এস্ট্যাবলিশমেন্ট চক্রের মধ্যে কিন্তু রাজা নিজেই ধরা পড়ে। নিজের যন্ত্রই কিন্তু নিজেকে আর মানে না। এবং সবশেষে বলছে যে নারীই একদিন তার প্রেমের শক্তি দিয়ে পৃথিবীকে আনহোলি স্পিরিট অব র‌্যাপাসিটি থেকে রক্ষা করবে, মানুষকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করবে। নারীর একটা ভয়ঙ্করী রূপ যে ‘কালী’ নয়, নারীর যে আরেকটি শক্তিময় রূপ আছে সেটা দেখতে পেয়েছেন এবং সেটা বিশ্বাস করতেন। নারীর শক্তিময় রূপটা একেবারেই আজকে প্রাসঙ্গিক, নারী কোনোক্ষেত্রে বুদ্ধিতে কম তা কিন্তু প্রমাণিত হচ্ছে না... তারা পাইলট হচ্ছে, কম্পিউটার ভালো চালায়, উপরন্তু তারা সন্তান প্রসব করে, সন্তান ধারণ করে। কষ্ট অনেক বেশি, অনেক বেশি সাসটেইন করতে পারে... কষ্ট সহিঞ্চু... এমনকি ফিজিক্যালি নারীকে উইক মনে করা হয়, তা-ও কিন্তু সঠিক নয়। দৌঁড়-ঝাঁপ সবই নারী করছে এবং পুরুষের সমান তালে করছে। এমনকি অনেকাংশে পুরুষ থেকে উপরে... সংসার করে, সন্তান ধারণ করে, কর্মজীবী, নারী প্রেমিকা, নারী মা, নারী বোন, নারীই কিন্তু সব। এটা রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন এবং নারী এবং প্রকৃতিকে তিনি মিলিয়ে দেখেছেন।

গাজী রাকায়েত
আমারও মনে হয় সেটাই, আতাভাই বলছিলেন যে, এইযে সিস্টেম, সবাই একটা যন্ত্রের স্বীকার হয়ে যাচ্ছি, আমরা মানুষ নই, ‘সংখ্যা’। আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে, আমার কাছে মনে হলো, এটা একটা প্রেমের নাটক, সম্পর্কটাও এতো মজার, এতো আধুনিক, এটা কখনো বোধহয় টাইম ফ্রেমে বেঁধে দেয়া যাবে না। সেজন্যই খুব প্রাসঙ্গিক।

কামালউদ্দিন কবির
প্রযোজনার অন্যান্য দিকে যাবার আগে আরেকটা বিষয় একটু পরিষ্কার হয়ে নিই... রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেই বলেছেন যে, ‘রক্তকরবী’ হচ্ছে ‘পালা’। এমনকি ‘রক্তকরবী’ নামের ব্যাপারে দেখা গেছে যে, শুরু থেকেই উনি খুব দ্বিধান্বিত ছিলেন।

আতাউর রহামান
রবীন্দ্রনাথ তো লিখেন আর পরিবর্তন করেন। খালি কাটা-ছেঁড়া, কাটা-ছেঁড়া, পরিবর্তন...

কামালউদ্দিন কবির
এই ব্যাপারটা লক্ষণীয় যে, এর আগে যে রচনারীতি ছিলো, রবীন্দ্রনাথের পূর্ব-পর্যন্ত, সেই রচনারীতির সাথে রবীন্দ্রনাথের রচনারীতির বিরাট একটা পার্থক্য তৈরি হলো। নতুন রীতি তৈরি হলো। এই রীতি কিন্তু ওনার পরে আর দেখা গেলো না। সে হিসেবে রবীন্দ্রনাথ কিন্তু নিঃসঙ্গ। তার অর্থ হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথ আমাদের নিজেদের নাট্য আঙ্গিক তৈরি করতে চেয়েছেন...

আতাউর রহমান
সাংঘাতিকভাবে রবীন্দ্রনাথ খুব চেষ্টা করেছেন। আর যেটা ‘ঢাকা থিয়েটার’ও চেষ্টা করছে যে আমাদের নিজস্ব নাট্য আঙ্গিক নির্মাণের। নিজস্ব নাট্য আঙ্গিক বলতে হয়ত এটাই বোঝাচ্ছি, যে নাটক দেখে চিনে নেয়া যাবে যে নাটকটি বাংলাদেশের নাটক। আর তখন রবীন্দ্রনাথ হয়তো ভেবেছেন... ভারতীয় নাটক কিনা জানি না, তবে রবীন্দ্রনাথ বঙ্গের নাটক তৈরির চেষ্টা করেছেন। যাত্রা, পালাগান, কবিগান... এই যে হাজারের উপরে আমাদের লোকাল ন্যারেটিভ ফর্ম আছে। বঙ্গ, আসাম, উড়িষ্যায় যে ফর্মগুলো আছে, এর একটা মিশ্রণ ঘটিয়ে ওয়েস্টার্ন থিয়েটার থেকে একেবারে আলাদা করে একটা নাট্য আঙ্গিক তৈরি করতে চেয়েছেন। মঙ্গলকাব্যের ঢংয়ে কিছুটা... দৃশ্য দৃশ্যান্তর ওভাবে ভাগ করেননি, তারপর ডিরেক্টরিয়াল সাজেশন বা নোটস একবোরেই নেই। ইমাজিনেশনের উপর ছেড়ে দিয়েছেন। যেমন, পালাগান অথবা কবিগান-এ ইম্প্রোভাইজেশনের বহু স্কোপ আছে- সেটা উনি করেছেন। উনি বোধহয় একটু বিরক্ত হয়েছেন ওয়েস্টার্ন থিয়েটার দ্বারা... আমার মনে হয়। ওনার বয়স যখন ১৬, প্রথমবার যখন বিলেত যান... হেনরি এয়ারভিনের ‘হ্যামলেট’ দেখার জন্য দূর দূরান্ত থেকে মানুষ আসতো... ইটালি থেকে রাশিয়া থেকে লোক আসছে। রবীন্দ্রনাথ দেখে বলছে... একে কি অভিনয় বলে? He is only making sound on stage. ভেতর থেকে কথা আসে না। এইযে হৃদয় থেকে আসা আর মেক বিলিফ এর ব্যাপারটা, যেটা ‘যাত্রা’তে আছে সেটা উনি পুরোটা আনতে চেয়েছেন। কিছুটা সংস্কৃত থিয়েটার থেকে, কিছুটা লোকাল রিজিওনাল ফর্ম থেকে... প্রচুর দেখবার অভিজ্ঞতা ছিলো। ওনার হয়তো ত্রিনয়ন ছিলো, সামান্য দেখলেই বুঝতেন। এখন কথা হচ্ছে যে, তিনি কতটুকু সাকসেসফুল হয়েছেন সেটা অবশ্য প্রশ্ন সাপেক্ষ হতেই পারে। রবীন্দ্রনাথের এই প্রচেষ্টাটা খুব সচেতনভাবে ছিলো, নিজস্ব ভারতীয় নাট্য আঙ্গিক তৈরি করা। আমি কিন্তু শুধু বঙ্গের বলতে চাই না। দেখে যেন মানুষ চিনতে পারে যে, এটা আমাদের কথা, পোশাক আমাদের । তবে হ্যাঁ, ডিসিপ্লিনটা ওয়েস্ট থেকে নেয়া। ওয়েস্ট অনেক ভালো জিনিসও দিয়েছে, দুই’শ বছর রাজত্ব করেছে, এই যে প্রিসাইসের ব্যাপারটা, এগুলো ওয়েস্ট থেকে নেয়া। রবীন্দ্রনাথের জীবন চর্চাতে আমরা কিন্তু এই ডিসিপ্লিনের প্রতিফলনটা পাই। এটা মূলত এসেছে, দ্বারকানাথ ঠাকুরের যেহেতু সাহেবদের সঙ্গে ওঠাবসা ছিলো সেখান থেকে।

কামালউদ্দিন কবির
আমরা যখন প্রথম পাঠ করতে যাই, তখন দেখি যে ‘রক্তকরবী’র সংলাপ ঠিক আমাদের... মানে আমরা যারা নগরে নাট্যচর্চা করছি বা নগরে বড় হচ্ছি এদের কথার মতো আটপৌরে মনে হয় না... কথাগুলো ঐভাবে ঠিক খুঁজে পাই না, আপন করে পাই না। কিন্তু আমরা আবার আবিষ্কার করে নিই যে, এই কথাগুলো সত্যি সত্যি সেই নন্দিনী বা ওদেরই কথা। এক্ষেত্রে আমাদের এখন যারা কাজ করছেন, এই প্রোডাকশনে, তাদের দিক থেকে কী রকম অভিজ্ঞতা হচ্ছে আপনাদের, এই সংলাপগুলো বলতে?

আফসানা মিমি
আমার তো সংলাপ বলতে... মানে আমার নিজের কিছু অক্ষমতা আছে, আমার কণ্ঠস্বরের উপর নিজের গ্রিপ কম কিন্তু ডায়লগের ক্ষেত্রে আমার অস্বভাবিক কিছু মনে হচ্ছে না... মনে হচ্ছে না যে আমি ইউজ টু না।

কামালউদ্দিন কবির
নন্দিনীর কথাগুলো আপনার নিজেরই মনের কথা মনে হয়?

আফসানা মিমি
হ্যাঁ। ‘রক্তকরবী’র প্রত্যেকটা শব্দ এতো বেশি অর্থপূর্ণ, এই বোঝার ব্যাপারটা কিন্তু সম্পূর্ণ হয়নি এখনো, এখনো তো তৈরির মধ্যে আছি, একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে আছি। আমার নিজের যেমন মনে হয় যে, ‘রক্তকরবী’ আসলে মুখস্থ ঠোটস্থ না হওয়া পর্যন্ত আত্মস্থ হবে না। প্রতিবারই পড়ার সময় আমার কাছে ডাইমেনশনাল মনে হয়, প্রত্যেকটা শব্দকেই আমার ইম্পর্টেন্ট মনে হয়। যখন রিহার্সেল করেছি অনেক শব্দকে হাই-লাইট করে পড়া হয়নি। পরে আবার যখন মন দিয়ে পড়ি বা একটা জায়গায় যখন কনসেন্ট্রেট করি তখন দেখি যে প্রত্যেকটা জায়গা খুবই ইম্পর্টেন্ট, কঠিন কঠিন শব্দ আছে কিন্তু সংলাপের মধ্যে, কিন্তু গাঁথুনি এমন যে আমার সব সময় খুব সাবলিল মনে হয়, কখনও কিন্তু আটকায় না।

নাসিরুল হক খোকন
কবিরভাই যেটা বললেন আটপৌরে... মানে আমরা সাধারণত যেভাবে কথা বলি নাটকের সংলাপ সেরকম না। আমার মনে হয় রবীন্দ্রনাথ একটা নিজস্ব স্টাইল সেখানে প্রয়োগ করেছেন, সেখানে শব্দের কারুকাজ আছে, এই জন্য কখনও আটপৌরে ভাষার মতো মনে হবে না। কিন্তু তার মানে এটা না যে সংলাপ দুর্বোধ্য...

আফসানা মিমি
আরেকটা হতে পারে... আমাদের রবীন্দ্রনাথ পড়ার অভ্যাসটা কিন্তু অনেক বেশি। কবিতা পড়ার, গান শোনা বা পড়া বা গাওয়া বা গল্প পড়া বা নাটক পড়া... রবীন্দ্র চর্চা কিন্তু আমাদের মাঝে আছে, আমাদের প্রত্যেকেরই, আমার মনে হয় সেটা হেল্প করেছে। একদিন হঠাৎ করে ‘রক্তকরবী’ নাটকটা করতে হচ্ছে এমন না...

গাজী রাকায়েত
এখানে আরেকটা ব্যাপার আছে, ডিরেক্টরিয়াল নোটটা আমি এখানে উল্লেখ করছি। সেটা হলো যে, শম্ভু মিত্রের শ্রুতি নাটকটা রিহার্সেল করার সময় আমাদের অনেকের শোনা। তো অধ্যাপক চরিত্রটি অনন্ত হিরা করছে এবং যেটা হলো যে, হিরারও ঐ শ্রুতি নাটকটা অনেকবার শোনা, তো সে একটা ঢংয়ে অভিনয় করছিলো, একটা স্টাইলে করছিলো। কিন্তু আতাভাই  বললেন যে, তুমি এটাকে একদম নরমাল করে বলোতো, কথার ঢংয়ে বলো। এবং আমি সর্দার চরিত্রে একটা স্টাইলে বলছিলাম... কিন্তু আমাকে বলা হলো, ডু ইট ইজি এবং এখন এভাবে করতে গিয়ে মনে হচ্ছে যে, এটা প্রতিদিনের ব্যাপার... আমার কাছে মনে হলো এটা কোনো আটপৌরে বা ওরকম কিছু না।

নাসিরুল হক খোকন
হ্যাঁ, বিভিন্ন প্রসঙ্গে রিহার্সেলে আতাউরভাই ব্যাখ্যা করছেন... স্ক্রিপ্ট এ্যানালাইসিস করছেন, প্রথম থেকেই উনি বলে আসছেন, আমরা ‘রক্তকরবী’কে ডাউন টু আর্থ করতে চাচ্ছি। স্টাইলাইজড কোনো কিছু না। শম্ভু মিত্রের প্রোডাকশনের সংলাপ উচ্চারণে রীতিমত একটা স্টাইলাইজড ব্যাপার আছে কিন্তু। সেখানে আমার আছে মনে হয়েছে কিছু কিছু ক্যারেক্টার ডমিনেট করেছে, সেজন্য অন্য ক্যারেক্টারগুলো হারিয়ে গেছে। এর ফলে ‘বহুরূপী’র ‘রক্তকরবী’ কিন্তু কোথাও কোথাও আমাদের বিচ্ছিন্ন করে দেয়। আমরা প্রথম থেকেই এই ব্যাপারটাকে পরিহার করার চেষ্টা করেছি।

আফসানা মিমি
মজার ব্যাপার হলো সংলাপগুলো সহজ একটা ভঙ্গিতে বলছি, কোথাও কিন্তু ধাক্কা খাচ্ছি না। সংলাপগুলোকে খুব সহজ ভঙ্গিতে বলা যাবে না এরকম কিন্তু একবারও মনে হচ্ছে না।

আতাউর রহমান
আসলে ঘটনাটা এই যে, শম্ভু বাবুরও সময় লেগেছিলো দশ বছরের মতো, ‘রক্তকরবী’তে পৌঁছুতে, এটার ভিতরে ঢুকতে। তারপরও ওনার সময়ে ইট ওয়াজ রিলেভেন্ট, এখন আমরা তো মানুষ হিসেবে চেষ্টা করে যাবো নতুন কিছু করা। এটাকে সহজ করতে গেলেই যে আমি সহজ করতে পারবো এমনও না। কারণ আমি দেখেছি উৎপল দত্তের মতো বিরাট অভিনেতা, ‘বিসর্জন’ সিনেমা করতে গিয়ে... (‘বিসর্জন’ চলচ্চিত্রের কথা বলা হচ্ছে) এটাকে একেবারেই নিত্যকার সংলাপ হিসেবে বলছে। কিন্তু শব্দের গাঁথুনিতে আবার প্রবলেম আছে। যেমন একটা জায়গা আছে.. ‘এসো বৎস্য আরেক শিক্ষা দিই, কে বলে হত্যা মহাপাপ, জগৎ এক মহা হত্যাশালা, হত্যা জীবনের তরে, হত্যা খেলার ছলে, হত্যা বিহঙ্গের নীড়ে, হত্যা কীটের গহ্বরে, চলছে নিখিলবিশ্ব হত্যার তালে’... ইত্যাদি। এটাতো ছন্দময়, এখন উৎপল দত্ত এখানে বলছে একেবারেই আড্ডার মতো করে। তো একটা গাঁথুনিতো আছে, গাঁথুনিকে আমি কতক্ষণ ভাঙবো? এখন ‘রক্তকরবী’র রাজার এটা বিড়ম্বনা বা যাই বলি... একটা সমস্যা আছে। সেখানে কিন্তু সমস্যাটা হলো রাজাকে আমি কতটুকু সহজ করতে পারবো? এবং এটা করাটা উচিত হবে কিনা, সেটাও আমাদের বিবেচনা করতে হবে। যখন বলছে... ‘সামনে তোমার মুখে চোখে প্রাণের লীলা, পিছনে তোমার কালো চুলের ধারা মৃত্যুর নিস্তব্ধ ঝর্ণা, একদিন আমার হাত দুটো তাতে ডুব দিয়ে মরবার আরাম পেয়েছিলো’... মরবার আরাম হলো নিউ কনসেপ্ট, মরবার আবার আরাম আছে নাকি? তারপর বলছে... ‘সে গুচ্ছ গুচ্ছ চুলের নিচে মুখ ঢেকে ঘুমুতে ভারি ইচ্ছে করে, তুমি জান না আমি কত শ্রান্ত।’ এটা কতটুকু আমি ন্যাচারাল, নরমাল ডায়লগ করবো?... ‘নন্দিনী একদিন দূরদেশে আমারি মতো এক ভ্রান্ত পাহাড় দেখেছিলো’... এসব সংলাপ যতটুকু পারা যায় সহজ করা হবে। কিন্তু আমি এটাও বলি না স্টাইলাইজড হলে মানুষের হৃদয়ে স্পর্শ করবে না। তাহলে তো নির্মলেন্দু লাহিরীর ‘সিরাজউদ্দৌলা’ আমরা প্রত্যাখানই করতাম।

কামালউদ্দিন কবির
এবার সাইফুলভাইয়ের কাছে যাই... প্রযোজনার মূল যে আধার, মঞ্চ পরিকল্পনা সে ব্যাপারে জানতে চাইবো। এই নাটকেই আমরা লক্ষ্য করি, নাটককার বা রবীন্দ্রনাথ, উনি এই স্পেসের একটা বর্ণনা দিয়েছেন। বর্ণনা এমনভাবেই দিয়েছেন, রাজার ঘর, জালের আড়ালে থাকে রাজা। এখন এই জাল এবং জালের সামনেই পুরো ঘটনাটা ঘটে। এই প্রযোজনাতে দৃশ্যমান করার ক্ষেত্রে কী চিন্তাটা কাজ করেছে... জাল থেকে শুরু করে জালের সামনে যে স্পেসটা...

সাইফুল ইসলাম
মূল চিন্তাটা আসলে... মানে আমি যেটা ভেবেছিলাম, সেটা হচ্ছে যে, মানুষের যে ইন্টারনাল এবং এক্সটারনাল ফিলিংস-এর ব্যাপার রয়েছে... একটা মানুষ যখন চিন্তা করে, সেই চিন্তাটা সম্পর্কে নিজেই কখনো পুরো পরিষ্কার থাকে না। আমি অনেকটা এভাবে বলছি যে কখনও সে ট্রান্সপারেন্ট থাকে, কখনো সে নিজেকে বুঝতে পারে না। এই ভিত্তি থেকেই মেইনলি সেটটা আমি চিন্তা করেছি। আর একটা ব্যাপার হচ্ছে এখানে লোকেশনটা হচ্ছে যক্ষপুরী, ডার্ক এবং সলিড সামথিং। ওরকম একটা জায়গার মধ্যে মানুষের যে লাইফ, এর ইন্টারনাল যে ধোঁয়া, আধো বোঝা যায়, আধো বোঝা যায় না, নিজেই নিজের প্রতি কখনো পরিষ্কার না, এই অনুভূতিটা কিভাবে তৈরি করা যায়? তখন এটার জন্য চিন্তা করেছিলাম ট্রান্সপারেন্ট কিছু একটা করা, যেন এটাকে এ্যাট এ টাইম লাইট বা কোনো কিছু দিয়ে ব্লক করে দেয়া যাবে... দেখে ব্লক মনে হবে জায়গাটা, আবার এগেইনস্ট দ্য লাইট, ট্রান্সপারেন্ট মনে হবে। সেরকম একটা নেট, মাছ ধরার যে জাল সে জালগুলো দিয়ে লেয়ারগুলোকে সাজিয়ে এবং ওর মধ্যে হোল (গর্ত) ইউজ করে আবার হোলগুলোর মধ্যে যে ফিগার থাকবে এবং ঐ ফিগারগুলোর মধ্যে স্ট্রাগল থাকবে। ওভার-অল একটা পেইনটিংস ফিলিংস আসবে। পেইনটিংটার মধ্যে কখনও একজন দর্শক ইন করতে পারবে, সে পেইনটিংটা A to Z দেখতে পারবে। ভিতরে যা আছে লেয়ার বাই লেয়ার দেখতে পারবে। কখনো শুধু পেইনটিং-এর একটা লেয়ার দেখতে পারবে। তারমধ্যে সবসময়ই কনফিউশন তৈরি হবে... আমি যতবারই রবীন্দ্রনাথের লেখা পড়ি বা কেনো কিছু নিয়ে কাজ করি, প্রথমে একবার মনে হয় আমি পুরোটাই বুঝে গেলাম, আবার পড়লে মনে হয় কিছুই বুঝিনি। আমার মনে হচ্ছে রবীন্দ্রনাথ নিজেও সবসময় কনফিউজড ছিলো যার জন্য সে সবকিছু চেইঞ্জ করতে থাকতো। দেখা গেলো একটা লেখা লিখছে সেটা কাটতে কাটতে একটা ছবি হলো এবং রবীন্দ্রনাথের যে পেইনটিং বা ড্রইংগুলো আছে... এতো মডার্ন যে আমরা এখন যারা পেইনটিং-এর কাজ করছি, এখনও অনেকে সেধরনের ইমেজ নিয়ে কাজ করছি না। অথচ আজ থেকে না হলেও সত্তর/আশি বছর আগে উনি এই ধরনের ইমেজ নিয়ে কাজ করেছেন। কবিতা থেকে ছবি হয়েছে, ছবি থেকে কবিতা হয়েছে এবং কখনই কোনো ব্যাপারে উনি কন্সটেন্ট ছিলেন না যে, ওটাই ধ্রুব সত্য।

আতউর রহমান
এটা খুবই ইম্পর্টেন্ট যে রবীন্দ্রনাথের কোনো ব্যাপারেই কিন্তু ই=এম.সি স্কয়ার ধরনের সূত্র ছিলো না। শিল্পের ধোঁয়াশা কুয়াশা, এই জায়গাটা রবীন্দ্রনাথের যেমন ছিলো জীবনানন্দ দাশেরও ছিলো। আমরা কিছু কিছু বুঝি আবার কিছু বুঝি না, সেজন্যই তো মজাটা খুব বেশি।

সাইফুল ইসলাম
সেটের মধ্যে ঐধরনোই ইমেজ আনার একটা প্রাইমারি আইডিয়া আছে। এবং যেই দরজাগুলো বা হোলগুলো ব্যবহার করা হবে, সেগুলো দেখলে মনে হবে ফিগার এবং ফিগারের ভিতর দিয়ে ঢোকা যায়। একটা মানুষকে যদি কোনো কিছু দিয়ে ইন   করাতে পারি... মানে যতক্ষণ ইন করাতে না পারছি ততক্ষণ তার সাথে কিন্তু আমার পরিচয় হচ্ছে না। প্রতিদিন প্রচুর লোক দেখি কিন্তু আমি কারো সাথে কথা বলি না বা তার সম্পর্কে ইন্টারেস্ট ফিল করি না। কিছুক্ষণ পর ভুলে যাই। কিন্তু একটা লোকের সঙ্গে যখন কথা বলি, তার মানে তার মধ্যে আমি ইন করছি। ইন করার পরেই খারাপ খবর বা পজেটিভ জিনিস আসবে।

কামালউদ্দিন কবির
একটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার মনে হচ্ছে এই জন্য যে, এটা যক্ষপুরীর কাহিনী... মানে ঐভাবে বলা হচ্ছে, আবার পাশাপাশি বলা হচ্ছে সত্যমূলক ঘটনা। তো এখন এই যাবৎ আমার মনে হচ্ছিলো যে, আমরা দূর থেকে ব্যাপারটা দেখবো কিন্তু আপনার বর্ণনায় আমার কাছে যেটা একটু বেশি মজা লাগলো সেটা হচ্ছে যে, ঐ যে বলছিলেন যে ফিগার বা পেইন্টিং ইমেজ এমনভাবে তৈরি করা যাতে করে দর্শকরাও সেখানে প্রবেশ করতে পারে বা প্রবেশের অনুভূতি পায়। এটা আমার কাছে মনে হয়েছে যদি সত্যি সত্যি এটা তৈরি করা যায়, তাহলে আমরা সময়ের সাথে রিলেট করার জন্য প্রথমেই যে বলছিলাম... সেটা তাহলে এখানে বেশ...

নাসিরুল হক খোকন
আর একটা জিনিস এখানে উল্লেখ করতে চাই সেটা হচ্ছে যে, প্রথম যখন সেটের ভাবনাটা আমাদের মাথায় আসে... এটার খুব একটা ইন্টারেস্টিং ঘটনা আছে। সেটা হচ্ছে যে, আমরা সবাই মিলে সেট-এর উপর একটা ওয়ার্কশপ করছিলাম ব্রিটিশ কাউন্সিলে। তো সেই ওয়ার্কশপে সাইফুল একটা খুব চমৎকার সেট তৈরি করেছিলো। এই মেটেরিয়ালস, নেট এবং এই যে ফিগার নিয়ে ‘নাগমণ্ডল’র (গিরিশ কারনাডের) একটা সেট তৈরি করেছিলো। তখন আমাদের ‘রক্তকরবী’র কথা চলছে। তো সেট দেখতে দেখতে একদিন ঐ ওয়ার্কশপেই আমার কাছে মনে হয়েছে যে, ‘রক্তকরবী’র সেটটা এই ধরনের মেটেরিয়ালস বা এই স্টাইলে হলে মন্দ হয় না... মানে জাস্ট ইমেজটা দেখে মনে হচ্ছিলো। পরে যখন ‘রক্তকরবী’র বিভিন্ন বিষয় নিয়ে একটু ঘাঁটিঘাঁটি শুরু করলাম তখন আমার মনে হয়েছে যে, আসলেই সেটটা ওভাবে করা যায়। যেমন ধরুন, যক্ষপুরী যেটাকে বলা হয়েছে, পৌরাণিক একটা আবহ আছে পুরো বিষয়টার মধ্যে এবং যক্ষপুরীর শাব্দিক অর্থ যদি খুঁজি... যক্ষ মানে রাক্ষস এবং এই যক্ষ কারা? এই যক্ষটার সৃষ্টি হচ্ছে... ব্রহ্মা যখন সৃষ্টি করছে তখন একটা পর্যায়ে তার অসাবধানতাবশত কিছু কিছু সৃষ্টি ডিশেইপড হয়েছে বা বিকৃত আকারে সৃষ্টি হয়েছে। তাদেরকে নিয়েই যক্ষপুরী। তো সেখানেও ফিগারের এমন একটা ইমেজ আমরা পাই আর কি। তো সবকিছু মিলে তখন মনে হচ্ছিলো যে, আবহটা ‘রক্তকরবী’তে ডিমান্ড করে... যক্ষপুরীরর শাব্দিক দিক থেকে আর নাটকের কন্টেন্টের দিক থেকেও যদি আমরা চিন্তা করি। সবদিক থেকেই এটাকে খুব রেলিভেন্ট মনে হচ্ছিলো।

কামালউদ্দিন কবির
সাইফুলভাই আমি একটু বলি... স্ক্রিপ্ট আপনার মাথায় আছে এবং তখনই একটা সেট ডিজাইন করা কিন্তু সম্ভব। ‘নাগমণ্ডল’-এর সেট ডিজাইন যখন করেছেন তখন তো আপনি একক ব্যক্তি হিসেবেই করেছেন। সেখানে কোনো নির্দেশকের উপস্থিতি ছিলো না। কিন্তু যখন নির্দেশক উপস্থিত হন তখন কিন্তু ওনার ডিজাইনের সাথে সাথে আপনাকে চলতে হবে। এখানে কতটুকু আপনার প্রি-কন্সেপশন ছিলো এবং কতটুকু আপনারা দু’জনে মিলে গড়ে তুলছেন?

সাইফুল ইসলাম
হ্যাঁ, আমরা এখানে যে প্রক্রিয়ায় সেটটা করছি সেটা ঠিক এই মুহূর্তে সবচেয়ে আধুনিক প্রক্রিয়া। আগে আমরা যেটা করতাম, ডিরেক্টর আমাদের বলতেন, আমরা স্ক্রিপ্টটা পড়তাম, তারপর একটা সেট বানাতাম, ফাইনালি ফাইট হতো টেকনিক্যাল শো’তে। দেখা যেত উনি যা চাইলেন আর আমি যা দিলাম, কোনো মিল থাকতো না। কিন্তু এখন যেভাবে করি, প্রথমে স্ক্রিপ্টটা পড়ছি, ভালো করে পড়ছি, পড়ার পর আমার মাথার মধ্যে যে আইডিয়াগুলো খেলছে সেগুলো নিয়ে একটা রাফ স্কেচ করছি যেটার সাথে থিয়েটারের কোনো রিলেশন নাই। জাস্ট ইমেজ, তারপর ডিরেক্টরের সাথে আলাপ করলাম, কারণ ডিরেক্টরের আইডিওলজির উপর পুরো প্লে-টা ডিপেন্ড করে। তারপর নির্দেশকের সাথে কথা বলে নাটকের যে ঘটনাগুলো আছে, দৃশ্যগুলো আছে... সেগুলো কেমন হয়, মূল দৃশ্য দেখতে কেমন হয় সেটা ড্রইং করি। যেমন, মনে হচ্ছে একটা লোক একটা দরজা খুললো এই সলিড দৃশ্যটা, ফিল্মে যেরকম দেখা যাবে ওরকম করলাম। ওটাকে ‘স্টোরি বুক-১’ বলছি। লাইন বাই লাইন দৃশ্যগুলো করার পর... তাহলে আমার মাথায় নাটকটা এস্ট্যাবলিস্টড হয়ে গেলো... আমি এর মধ্যে রিহার্সেল দেখছি। এরই মধ্যে আমি আমার আইডিয়াগুলো; আগে যেগুলোকে আমি বিচ্ছিন্ন আইডিয়া বলছিলাম, সেগুলো নিয়ে ডিরেক্টরের সাথে আলাপ করলাম। আলাপ করার পর উনি ওনার কিছু কন্সেপ্ট বললো, কিছু ডিজাইন কন্সেপ্ট বললো। তারপর আমি রাফ একটা ড্রইং করি। এই রাফ ড্রইং দিয়ে ‘স্টোরি বুক-২’ তৈরি করছি। এভাবে (স্টোরি বুক-২ দেখানো হচ্ছে), এখানে ক্যারেক্টরগুলো ঐ রাফ ডিজাইনের মধ্যে বসাচ্ছি। বসিয়ে ক্লোজ শট, টু শট বা লং শটের ইমেজগুলো কী হবে সেগুলো দেখাচ্ছি। এর সাথে ব্লকিং কিন্তু শুরু হচ্ছে, কারণ, এখন ডিরেক্টর মোটামুটি জানেন যে সেট-টা কিরকম হতে পারে। এরপর...

গাজী রাকায়েত
এখানে তোকে একটু মনে করিয়ে দিই, প্লাটফর্মের ব্যাপারটা... ও প্রিলিমিনারি একটা চিন্তা করেছিলো, একটা প্লাটফর্ম দেয়ার, কিন্তু দেখা গেলো যে এটার উচ্চতা এতো বেশি হয়ে যায় যে, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অসুবিধা হবে বোঝা যাচ্ছিলো। এখন ব্লকিং-এ গিয়ে আতাভাই এটাকে বাদ দিচ্ছে।

আতাউর রহমান
সুবিধাটা এই যে, সাইফুল মডার্ন বলছে, খুব রাইটলি বলছে। আগে সেট ডিরেক্টররা এমনি একরোখা ছিলো যে অভিনেতা-অভিনেত্রীকে সেট অনুযায়ী চলতে হতো... সেট আমি বনালাম, আমার সেট এটাই। অভিনেতৃদের সুবিধা অসুবিধা দেখার বিষয় তাদের ছিলো না। আজকে মডার্ন সেট ডিজাইনার, দে আর এ্যাক্টরস’ ডিজাইনার। তারা অভিনেতৃর সমস্ত সুযোগ সুবিধা দেখে তারপর ডিজাইন করে।

কামালউদ্দিন কবির
সেট যেন ডমিনেট না করে... যেন প্রথম দেখেই মনে না হয় যে, বাহ্ সেট-টা দারুণ হয়েছে!

আতাউর রহমান
সেটাও এক নম্বর আর অভিনেতা-অভিনেত্রীকে যেন হেল্প করে। অভিনেতৃকে যেন কষ্ট করে সেট-এর সাথে নিজেকে মিলাতে না হয়।
 
সাইফুল ইসলাম
কারণ, সব কিছুই কিন্তু অভিনয়ের জন্য... লাইট ডিজাইন, সেট ডিজাইন সবকিছু।... সেট ডিজাইনটা আরেকটু বলি... তারপর একটা বড় বোর্ডে পুরো ড্রইং-টা এঁকে প্রত্যেককে দেখিয়েছি যে, এই হচ্ছে একটা রাফ ডিজাইন। ডিরেক্টরকেও বলেছি, আমি কোথায় কী ভেবেছি। তারপর উনি হয়ত কিছু পরিবর্তন করছেন কিংবা কিছু রাখছেন। তারপর পুরোটা ফাইনাল হয়ে গেলে আমি চলে যাবো একটা ফাইনাল মাস্টার ডিজাইনে। তারপর মডেলে যাবো। ওটাই হবে মোটামুটি চূড়ান্ত, এরপর যদি কোনো পরিবর্তন করতে হয় টেকনিক্যাল শো’তে গিয়ে পরিবর্তন হবে, তবে এটার খুব একটা প্রয়োজন হবে বলে মনে করি না।

আতাউর রহমান
একটা বিষয় খুব ইম্পর্টেন্ট, তোমরা বোধহয় জানো যে, শম্ভু মিত্রের প্রযোজনায় বা যেটা চট্টগ্রামের ‘তীর্যক’ করেছিলো, সেখানে কিন্তু রাজাকে দেখা যায় না কখনও। রাজা ভিতর থেকে কথাগুলো বলতে থাকে। যেমন আমি দেখেছিলাম ‘ড্রামা সার্কেল’-এ, বজলুল করিম সাহেব, সালেহীন সাহেব... সেই আমাদের বিখ্যাত ‘ড্রামা সার্কেল’, তাদের প্রযোজনায় কিন্তু পেছন থেকে একটা রেড লাইট জ্বলে উঠতো... ইন্সটিট্যুট অব ইঞ্জিনিয়ারস-এ, তখন এটাকে ‘ইসকান্দর মির্জা হল’ বলতো... তো রেড লাইট জ্বলে উঠতো আর রাজার কণ্ঠস্বর আমরা মাইক্রোফোনে শুনতাম। কিন্তু আমাদের প্রযোজনায় রাজা সামনে চলে আসবে, তার অবয়ব আমরা দেখতে পাবো, একটা বডি ল্যাঙ্গুয়েজ সে তৈরি করবে। হাঁটা চলার মধ্যে। এখানে একটা চেইঞ্জ আনছি... শম্ভু বাবুও রাজাকে দেখাননি, একসেপ্ট ইন দ্য লাস্ট সিন... কিন্তু এখানে রাজা থাকবে। এই কন্সেপ্টটা আনা হয়েছে। রাজাকে আরও বেশি মানুষ করার চেষ্টা করা হয়েছে।

কামালউদ্দিন কবির
তার মানে টেক্সট-এ বর্ণীত যে জাল সে জালটা তাহলে এভাবে আনা হয়েছে...

সাইফুল ইসলাম
জাল তো আছেই... পুরোটাই একটা জাল। পুরো সেট-টা...

কামালউদ্দিন কবির
সেট ডিজাইন সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ সুনির্দিষ্টভাবে একটা কথা বলেছেন... ‘রক্তকরবী’ প্রসঙ্গে না, অন্য কোনোখানে... সেটা হচ্ছে, মঞ্চকে যতটুকু শূন্য রাখা যাবে, ততটাই সার্থক মঞ্চ পরিকল্পনা হবে...

আতাউর রহমান
একদম রবীন্দ্রনাথ পরিষ্কারভাবে বলেছেন, মঞ্চ নিয়ে কোনো বাহুল্য আমার পছন্দ নয়, একেবারে বাহুল্য-বর্জিত হতে হবে... এটা কিন্তু ‘যাত্রা’র কনসেপ্ট এর চোখে দেখা।

সাইফুল ইসলাম
সেখানে লাইট যে ভূমিকাটা রাখবে সে ব্যাপারে আমি আর খোকন, আমরা দু’জন প্রতি নিয়ত কথা বলছি...

নাসিরুল হক খোকন
আমরা আমাদের ভাবানাটা শেয়ার করছি এবং সেখানেও আমরা যেটা চিন্তা করেছি যে, নাটকের কনটেন্টে প্রতি মুহূর্তে যে কন্ট্রাস্ট, ফসল কাটার গানের কথা বলা হচ্ছে, পৌষের যে গানের কথা বলা হচ্ছে, সেটার সঙ্গে সঙ্গে কিন্তু যান্ত্রিক সভ্যতার ব্যাপারটা আসছে... এই দুটো জিনিস কিন্তু আমাদের নাটকে খুব জোরালোভাবে তুলে ধরতে হবে, এবং কখনও কখনও দেখা যাবে যে প্রকৃতিই প্রধান, ঐ যান্ত্রিক সভ্যতার চেয়েও। তো সেখানে একটা মঞ্চের মধ্যে আমরা কিভাবে সেটাকে দেখাবো? সেক্ষেত্রে আমার মনে হয়েছে, নেট এবং যে স্ট্রাকচার এদু’টো আমাদের খুব হেল্প করবে। যখন আমরা সামনে থেকে দেখবো তখন এটার একটা সলিডিটি থাকবে... সেই আবহটা থাকবে, আবার যখন পেছন থেকে দেখবো... আমরা চিন্তা করছি যে একটা সাইক্লোরামা থাকবে পেইনটেড... তো পেছন থেকে বিভিন্ন এঙ্গেলে আলোগুলো যখন আসবে তখন দেখা যাবে যে, এটা একটা প্রান্তর, ল্যান্ডটাকে তখন প্রধান মনে হবে না, তখন অসংখ্য লেয়ারের মধ্যে দিয়ে নেটের ভিতর দিয়ে যখন শেষ প্রান্তটা দেখা যাবে, তখন মনে হবে দূর থেকে কেমন একটা প্রান্তর দেখছি। যেখানে ফসলের কথা, মাঠের কথা, প্রকৃতির কথা... এগুলো ভাবানয় আসেত থাকবে। আবার যখন পেছনের লাইটগুলো অফ হয়ে যাবে, সামনে থেকে যখন লাইট আসবে বা সাইড থেকে বিভিন্ন এঙ্গেল থেকে যখন লাইটগুলো আসবে তখন আমরা আবার একটা যান্ত্রিক সভ্যতা, একটা আবদ্ধ জায়গা, একটা চাপা ভাব... মানে ঐ যান্ত্রিক সভ্যতা, ঐ যক্ষপুরীর যে আবহ সেই আবহটাকে পাবো। এভাবে পুরো জিনিসটাকে সিনক্রোনাইজ করা হয়েছে।

আতাউর রহমান
আসলে ওরা এটাকে নিয়ে ভাবছে। প্রথমে আমি কবিরের কথার যেটা ওভাবে সমর্থন করিনি যে, ‘রক্তকরবী’ শ্রেষ্ঠ নাটক কিনা...

কামালউদ্দিন কবির
শ্রেষ্ঠগুলোর অন্যতম হলেও আপত্তি নেই...

আতাউর রহমান
কিন্তু এই রবীন্দ্রনাথের... সবকিছুতে মনে হয় কেবল আধুনিকতা। এখানে মনে পড়ে গ্রিক থিয়েটারের কথা। হয়তো রবীন্দ্রনাথ ভাবেননি, আমরাও ভাবিনি, ইউনিটি অব টাইম, স্পেস এ্যান্ড এ্যাকশন... ‘রক্তকরবী’ তে একটিই মঞ্চ, একজায়গায় অভিনয় হচ্ছে, একই সময়... কাজেই এটা কিভাবে যেন সব মিলে যায়। পৃথিবীর বড় কাজগুলোর মিল ওভাবেই হয়ে থাকে।

আমি একটা কথা বলি, এই নাটকের বেলায় যেটা মনে হচ্ছে যে, একটা কিছু করছি... ‘রক্তকরবী’ করছি... অনেক কিছু ভাবতে হবে... চরিত্র বিশ্লেষণ করতে হবে, ইত্যাদি ইত্যাদি... আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনো নাটকে এভাবে ভাবি না। ঢিলেঢালাভাবে কাজ করি। ঢিলেঢালাভাবে কারণ, এটা নিয়ে ভাবনার কিছু আছে বলে আমি মনে করি না। আমার কাছে মনে হয় যে, একসময় হয়ে যাবে, সবাই করতে করতে এমনিতে এমনিতে হয়ে যাবে। কিছু একটা বেরিয়ে আসবে। এমনকি এইযে আজকে বসলাম, আমার মনে হয় এটাই আমাদের প্রথম বসা, যেখানে নাটকটাকে এতোভাবে বিশ্লেষণ করছি। ‘ওয়েটিং ফর গডো’ যখন তৈরি করি তখনও কিন্তু এই কথা আসে। অনেকে জিজ্ঞেস করেছিলো, আবুল হায়াত বিভিন্ন ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছিলো, এটা কেনো? আমি বলতেও পারিনি। আমার ভালো লাগে, কোথায় যেন আমার ভালো লাগে তাই করি।

কামালউদ্দিন কবির
আপনার ভিতরে যে আপনি আছেন সেই হয়ত করিয়ে নিচ্ছে আপনাকে দিয়ে। আপনি একদম সময় নিরপেক্ষ কিছু করবেন, এটা কি মনে করতে পারি আমরা?

আতাউর রহমান
রবীন্দ্রনাথের এটা টাইমলেস একটা প্লে। ‘অদিপাউস’ যেমন আড়াই হাজার বছর বেঁচে আছে, নিশ্চয় এটা টাইমলেস, না হলে কোথাও আমরা মিলাই কিভাবে? ইডিপাস তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি জেনেও সত্য আবিষ্কার করতে চায়, কেনো চায়? আমরাও কিন্তু বদমাশ হয়েও, শয়তান হয়েও ইডিপাসের মতো একটা সত্য সন্ধানী হওয়ার বাসনা মনে মনে লালন করছি। ‘ওয়েটিং ফর গডো’ যখন করি তখন দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের দর্শক কোথাও না কোথাও যেন... উই ওয়েটিং ফর সাম বডি টু কাম টু চেইঞ্জ আওয়ার ফেইথ। মনে হচ্ছে, আল্লাহ হয়তো হঠাৎ করে বদলাবে। তো ‘রক্তকরবী’র ব্যাপারেও আমরা তেমনভাবে কনশাসলি টাইমের কথা ভাবছি না, ইট ইজ আ গুড ওয়ার্ক অব আর্ট। সুন্দর সুন্দর চরিত্র আছে... এই ব্যাস, আমার ভাবনার মধ্যেও এসবই আছে। মানে আমি তো বেসিক্যালি পলিটিক্যাল না।

গাজী রাকায়াত
কিন্তু আমার কাছে এই নাটকটার... মানে অভিনয়ের ব্যাপারে সবচেয়ে মজা লাগে কী, সারাদিনতো বিভিন্ন কাজের সাথে জড়িত থাকি, যখন রিহার্সেলে ঢুকি... ‘রক্তকরবী’তে... আমার অংশ থাকলে করি বা যখন আমার অংশ থাকে না তখন... দেখি যে অদ্ভুত একটা ইয়ে হয়... মানে কিশোরের সাথে নন্দিনীর যে প্রেমটা, আবার রাজার সাথে প্রেম... এই যে সম্পর্কটা, এর মধ্যে প্রেমটাকে নিয়ে আসা, আমার কাছে এত মজার লাগে... যখন রিহার্সেল থেকে বের হই একটা পরিবর্তন আসে মনে, নিজেকে ফ্রেশ লাগে।

আতাউর রহমান
বেসিক্যালি প্রেমই। রবীন্দ্রনাথ বলছে দিস ইজ আ লাভ প্লে... লাইক আ লাভ স্টোরি। কারণ নন্দিনীর সাথে প্রত্যেকের প্রেমের সম্পর্ক। রাজার সঙ্গে এক লেভেলের প্রেম, বিশুর সঙ্গে একটা প্রেমের সম্পর্ক আমরা পাই। আবার অধ্যাপকের সঙ্গেও... একটা প্রশ্রয় আছে, প্রেম না থাকলেও একটা প্রশ্রয় আছে।

কামালউদ্দিন কবির
আচ্ছা, এখন আমরা একটু পোশাক পরিকল্পনার ব্যাপারে মিমির কাছে প্রশ্ন রাখছি। এই মানুষগুলো, এই যে এতক্ষণ বলা হলো, এদেরকে আমরা কিভাবে দেখবো? সেটাও কি এই সময়ের মানুষ দেখবো নাকি কোনো সময় নিরপেক্ষতা আছে?

আফসানা মিমি
এটা অবশ্য আমার জন্য এই মুহূর্তে বলাটা কঠিন, কারণ, পোশাক পরিকল্পনার ব্যাপারটা খুব বিচ্ছিন্নভাবে আমার মাথায় মাঝে মাঝে ঘোরাঘুরি করতো... তো আতাউরভাই দু/তিনদিন হলো আমাকে বলেছেন এটা নিয়ে ভাবতে। আমি আসলে এখনো... নাটকটা তৈরি চলছে... এখানে বসে বসে যখন রিহার্সেল দেখলাম এগুলো আসলে আমার কল্পনায় আঁকার চেষ্টা করি। আমার মনে হয় যে খুব একটা.... মানে কী বলবো... আমার কাছে কখনই মনে হয় না যে, কোনো পিরিয়ডকে, বা কোনো রিয়েলিস্টিক ফর্মকে ধরবো। আমি বসে বসেই বিচ্ছিন্নভাবে চিন্তা করি আর রাজাকেই শুধু কল্পনায় অনেক বেশি করে দেখতে পাই। আমি জানি না কেনো দেখতে পাই। আমি রাজাকে একভাবে দেখি, এটা নিয়ে খুব মজাও হয়েছে একদিন... আমি দেখি যে রাজা যখন আসবে, রাজাকে আমি দেখি একদম দুধ সাদা রঙের ধূতি পেঁচিয়ে... একদম সাদা একটা ধূতিতে। রাজাকে যখন নন্দিনী সম্পূর্ণ সামনে দেখবে, সেই দেখাটার সময় এতক্ষণ ধরে নন্দিনীর ভেতর যে মুগ্ধতা তৈরি হয়েছে সেটা যেন ভেঙে না যায়। ধরুন শম্ভু মিত্রের রাজা, রাজাকে যেভাবে দেখা হচ্ছে বা শোনা হচ্ছে, কল্পনাটা করা হচ্ছে, যখন রাজা বেরিয়ে আসবেন... এই দুটোর মধ্যে ক্র্যাশ ঘটে গেলে কিন্তু মজা লাগবে না, ঝামেলা হবে, সুতরাং রাজাকে শুনে শুনে কল্পনাটা আমার তৈরি হবে...

কামালউদ্দিন কবির
কিন্তু রাজা তার জায়গা থেকে নেমে আসেন, এই ব্যাপারটা যদি মনের মধ্যে...

আফসানা মিমি
হ্যাঁ নেমে আসেন, সেই আসার মধ্যেই কিন্তু.... এতক্ষণ তার যা বর্ণনা পেয়েছি, এর বিশালত্ব... সে অদ্ভুত, তার সৌন্দর্য, তার সবকিছু...

সাইফুল ইসলাম
সেই জায়গাটা ধরতে পারলে তাহলে তার নেমে আসাটা ভালো হয়...

আফসানা মিমি
হ্যাঁ, সেই জায়গাটাকেই কিন্তু আমাদের ধরে রাখতে হবে।

আতাউর রহমান
সেই জায়গাটা ধরে রাখতে হবে। কারণ, একজন মহান পুরুষ বা মহান চরিত্রের যখন পতন হয়, তখন সেই মহানেরই কিন্তু পতন হয়। ছোটখাটোর কিন্তু পতন হয় না। সে কিন্তু পতিত হলেও... but he maintains his personality, হিটলার যখন নিজের মাথায় গুলি করে, তখন হিটলার dies with his personality.

আফসানা মিমি
সেজন্য আমি বলেছিলাম যে, আমার কাছে মনে হয়- রাজাকে নন্দিনী যখন দেখবে, তখন তার ভাবনা যেন এতটুকু ধাক্কা না খায়। রাজাকে নিয়ে ভেবেছিলাম যে, রাজার একটা সাদা সিল্কের একট ধূতি বা ঊর্ণি থাকবে আর গহনার কিছু ব্যাপার হয়ত থাকবে। কিন্তু মুকুট-টুকুট পড়া না। তার কোমর-বন্ধনী থাকতে পারে। আমার মনে হয় রাজা খালি গায়ে থাকলে খুব ভালো হবে। শর্মী (নাগরিকের সদস্য) অবশ্য আমার বলেছে- না ছটলু কাকু (আলী যাকের) কিছুতেই এভাবে আসবে না। এটাতে আমার কল্পনা একটু ধাক্কা খাচ্ছে, হায়! হায়! আমি তো এভাবে দেখতে চাই।

আতাউর রহমান
খুব ঠিক কথা বলেছো। যেটা হয়েছে, যেমন রবীন্দ্রনাথ ‘রক্তকরবী’র নন্দিনীর ব্যাপারে বলেছেন ধানী রঙের শাড়ি। ধানী রঙের শাড়িতো বাজারে কিনতেই পাওয়া যায়। ধানী মানে পাকা ধান হবে বোধহয়, কারণ পৌষ যেহেতু- কাঁচা ধান হলে হবে না। আমরা বোধহয় সেই ধরনের কিছুতে যাবো। আরেকটা বিষয় হলো রবীন্দ্রনাথের যেকোনো নাটক বা কবিতা... মানে... রবীন্দ্রনাথ হুট করে করা যায় না। রবীন্দ্রনাথের ভাবনায় ও অনুভবে অনন্যতা আছে, যেটা বোধ হয় যেকোনো বড় পৎবধঃরাব লোকের মধ্যেই আছে। আমার মনে হচ্ছে ‘বিসর্জন’র গোবিন্দ্য মানিক্যকেও মুকুট পরানো ঠিক না, রবীন্দ্রনাথের রাজা তেপান্তরের মাঠে ঘোড়া ছুটিয়ে দেয়। রবীন্দ্রনাথের রাজা রাজর্ষি হন, যিনি একই সঙ্গে রাজা এবং ঋষি। এমনটি সহজে দেখা যায় না। অদ্ভুত সব রবীন্দ্রনাথের ব্যাপার। কাজেই রবীন্দ্রনাথের রাজাকে ঠিক আর দশটা রাজার মতো দেখলে চলে না।

কামালউদ্দিন কবির
কিন্তু তারপরও এই নাটকের চরিত্র বিন্যাসে আমরা লক্ষ্য করি যে, একদম পরিষ্কারভাবে শ্রেণী চরিত্রটা বলা আছে।

আফসানা মিমি
ঐটা থাকবে। অবশ্যই থাকবে। যেমন যারা যক্ষপুরীতে কাজ করছে তাদের পোশাকের একটা different type থাকবে, সেখানে হয়ত রঙের কিছু বৈচিত্র্য থাকতে পারে কিন্তু এটা আমি এখনো ওভাবে ভাবিনি, ভাবলে আমার সাইফুলভাই আর খোকনের সাথে কথা বলে নিতে হবে।

কামালউদ্দিন কবির
শ্রেণী চরিত্রের... এই যে সর্দার মোড়ল, খোদাইকর, খোদাইকর থেকে পরে যে মোড়ল হয়ে যাওয়া... যদিও আতাভাই বলছিলেন যে আপনি কোনোভাবেই পলিটিক্যাল না বিশেষ করে এক্ষেত্রে না...

আতাউর রহমান
পলিটিক্যাল না মানে কি... আমি হাইলি পলিটিক্যাল ফর এক্সিসটেন্স। কিন্তু আমি বলছি যে, ‘রক্তকরবী’কে বর্তমান পলিটিক্সের সঙ্গে বা...

কামালউদ্দিন কবির
কিন্তু বর্তমান আর্থ-সামাজিক চেহেরাটাকে রিলেইট করা... সেক্ষেত্রে দর্শক হিসেবে... এই যে সর্দার, মোড়ল এদের দেখে কোনোভাবে কমিউনিকেট করতে পরি কিনা আমাদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে? এটার কোনো সুযোগ আছে কিনা? মানে সর্দার যদি ডায়লগ না দেয় তাহলে কি বোঝা যাবে যে সে সর্দার? তার পোশাক দেখেই?

আফসানা মিমি
হ্যাঁ! সেটা বোঝা যাবে কারণ... স্ট্যাটাসগুলোকে পোশাকে এনে ধরবো...

কামালউদ্দিন কবির
না আমি অন্য কথা বলছি... আমার অভিজ্ঞতায় তো সর্দার আছে, রাজা আছে, এমন কী নন্দিনীও আছে আমাদের অভিজ্ঞতায়। এখন সেটাকে আমরা রিলেইট করতে পারবো কি না? কনসেপ্ট হিসেবে নন্দিনী মঝে মধ্যেই আমাদেরকে তাড়িত করে তো বা ঐ রকম এক শুভ সুন্দরের জন্যে...

আতাউর রহমান
সেটা নন্দিনী পড়ার পরে করে না এমনিই করে? হা হা...

কামালউদ্দিন কবির
হা হা... এমনিতেই আছে না?

আতাউর রহমান
সেই অর্থে- যেই অর্থে হ্যামলেট আমাদের মাথায় আছে- যেই অর্থে ‘পথের পাচালী’র অপু আমাদের মাথায় আছে- সেই অর্থে নিশ্চয় হবে।

আফসানা মিমি
নন্দিনীর ক্ষেত্রে যাওয়াটা খুব ইজি, কিন্তু বাকি চরিত্রগুলো নিয়ে কনফিউশন আছে।

কামালউদ্দিন কবির
যেমন বিশু, বিশুকে অনেক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে আপনাদের প্রযোজনায়। এখন... আসলেও তাই, আমরা যখন এই সময়ের মানুষ, আমরা যখন আলোচনায় এসে পড়ি... বিশুকে মনে হয় সেই পাগলভাইটা আরকি, এটা এই সময়েও মেলানো যাবে না... এই সময়ে এই মানুষটা খুব বেখাপ্পা একটা মানুষ, উন্নতির জায়গা নেই, পড়ে পড়েই যায়...

আফসানা মিমি
দেখেন মজার ব্যাপার কী নন্দিনীর কসটিউমটা আমার কাছে অনেক ইজি মনে হয়। কারণ নন্দিনী হলো সেই রক্তকরবীর গহনা আর শাড়ি, ধানী রঙের হোক আর যাই হোক, নন্দিনীর কসটিউমটা আমার কাছে অনেক সহজ মনে হয়। কিন্তু আপনি যে বলছেন বিশুর... সেই পাগলভাইটা... এখন সেই পাগলভাই কি জিন্স পরা পাগলভাই হবে, নাকি পাঞ্জাবীপরা পাগলভাই হবে, নাকি ধূতিপরা হবে, এটা নিয়ে অনেক কনফিউশন... এই জন্য আমি নিজেই কিন্তু...

আতাউর রহমান
এই বিশু চরিত্রটা আমার কাছেও খুব... মানে কখনো মনে হচ্ছে যে, সে আমাদের চেনা, গান গায়- ‘তোমায় গান শোনাবো’, বা ‘চোখের জলে লাগলো জোয়ার’- যে লোকটি বলছে ‘চোখের জলে লাগলো জোয়ার’- সে কি সহজ মানুষ? যুগ যুগ ধরে এমন লোকের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। কী কী সব কথা বলে, সাংঘাতিক কথা বলে। এই মানুষ কোথায়, এই মানুষ তো অর্ধেক কল্পনায়। বিশুর কষ্টও তো আছে। কখনও কখনও মনে হচ্ছে সাধারণ লোক কথা বলছে, আমাদের মতো, আবার...

নাসিরুল হক খোকন
কবিরভাই যেটা বলছেন, আমাদের চারপাশের চরিত্র থেকে মেলানো যাবে কিনা... সেই অর্থে বলা যায় যে, এখানে যে পাঁচ/ছয়জন লোক আছি তাদের ইমাজিনেশনের কোথাও গিয়ে হয়ত একই রকম... হুবহু হবে না কিন্তু কোথাও একটা বিশুকে খুঁজে পাওয়া যাবে।

আতাউর রহমান
কবির যেটা বলতে চাচ্ছে যে, আমরা চিনবো কিনা। সেটা নিশ্চয় পাওয়া যাবে। বিশুর প্রতি আমাদের যে একটা স্নেহবোধের ধারণা, আমাদের কাব্যের ধারণা, আমাদের ভালোবাসার ধারণা, এই সবকিছু মিলেই... বিশুতো আমাদের প্রাণের মানুষ সেটাই যদি সবাই চিনতে না পারলো...

আফসানা মিমি
কিন্তু আতাউর ভাই- বিশুকে আমি কী রূপ দিবো? বিশুর কিন্তু বাইরের রূপটা চিনবে কম, ভিতরের রূপটাই কিন্তু প্রকাশিত হচ্ছে, তাই না? যেহেতু সে তার স্ট্যাটাস ফেলে এই মানুষগুলোর কাছে নেমে আসছে, কাজেই ঐ মানুষগুলোর সাথে তার পোশাকের কিন্তু মিল থাকবে। আজ ফাগুলালের সাথে বিশুর পোশাকে খুব বেশি পার্থক্য থাকার কথা নয়, শুধু ’নাম্বারের’ পার্থক্য। সে নেমে আসছে কিন্তু এই মানুষগুলোর মাঝখানে।

কামালউদ্দিন কবির
সে তাদেরই লোক।

আফসানা মিমি
তাদেরই তো মানুষ সে। কিন্তু পোশাকে বিশুকে আলাদা করে পরিচিত করতে পারবো না।

আতাউর রহমান
সবার চোখে লাগবে। যেমন গান্ধী যদি নেংটি না পড়তো... ছোট্ট খাট্টো মানুষ, যদি নরমাল পোশাক পরতো তাহলে চোখে পড়তো না। হয়ত সে কারণেই গান্ধী এভাবে খালি গায়ে... হাঃ হাঃ। আবার জাস্টিস আমীর আলী মাহমুদের একটি বিখ্যাত বই আছে, ইন্ডিয়াতে, হযরত মোহাম্মদ (সঃ) এর উপর... যে, ‘এই লোকটি আরবের রাস্তা দিয়ে চলছে। না লম্বা, না খাটো, না মোটা, না হাল্কা- আনমনা হয়ে একদিকে চলছে। হাজারো মানুষের মধ্যে তাকে চিনে নেয়া যায়। চরম সত্যবাদী।’ ঐযে একটা অদ্ভুত বর্ণনা দিচ্ছে, লম্বাও না ছোটও না, মোটাও না, চিকনও না, কিন্তু হাজারো লোকের মাঝখানে তাকে চিনে নেয়া যায়। একটা লোকের ব্যক্তিত্ব যদি থাকে তাহলে চিনে নেয়া যাবে, তাকে বিশেষ করে চেনা যাবে। বিশুকে আমার মনে হয় বিশেষ করে চিনিয়ে দেয়াটা আরোপিত হয়ে যেতে পারে।

কামালউদ্দিন কবির
একদম শেষ দিকে এসে আমি আতাভাইকে একটি কথা জিজ্ঞেস করছি। এমনিতে আমরা সবাই জানি ‘রক্তকরবী’ একটি রাজনৈতিক নাটক। আবার রবীন্দ্রনাথই কিন্তু বলছেন যে, নন্দিনীকে ঘিরে যা যা দেখা যায় তা-ই যদি কেউ দেখে, তাহলেও আমার কোনো আপত্তি নেই। রাজনৈতিক ব্যাপারগুলোকে যদি খুঁড়ে খুঁড়ে না দেখতে চায় তাতেও কোনো আপত্তি নেই। কারণ হৃদপি- পাঁজরের ভিতরে থাকে এবং ওখানে থাকলেই সে কাজ করে, কিন্তু কেউ যদি বের করে দেখা শুরু করে, তাহলে আর তার কাজটা থাকে না।... তো আপনি প্রযোজনার ডিজাাইনে কোন দিকটা দর্শকের কাছে পৌঁছাতে চাইবেন? প্রেমের দিকটা নাকি রাজনৈতিক দিকটা? নাকি উভয়কে মিলিয়ে?

আতাউর রহমান
আমি কিন্তু এটার রাজনৈতিক দিকটা যেটা দেখি... আমি একটু আগে যেটা বললাম- রাজনৈতিক নয়, আমি দেখাতে চাই পুরো বিশ্বজুড়ে কী হচ্ছে। প্রশাসনের যন্ত্র, কায়েমী স্বার্থের যন্ত্র... আজকের অস্ত্র ব্যবসায়ী, এরা কিভাবে পৃথিবীটাকে চালাচ্ছে... এগুলো কিন্তু বিচ্ছিন্ন কিছু না, কাজেই এসব কথা ‘রক্তকরবী’তে সাংঘাতিকভাবে আছে। টর্চার মেশিন, সর্দাররা হচ্ছে রাজার এস্ট্যাবলিশমেন্টের অঙ্গ, যেমন থাকে একটা মিলিটারি স্টেটে জেনারেল... এটাতো মাথার মধ্যে আবছা আবছা আছেই। তারপর ঐ গোসাইকে নিয়ে আসেন, ধর্মকে চিরকাল ব্যবহার করা হয়েছে। একাত্তরে আমাদেরকেও বলা হয়েছিলো আমরা কম মুসলমান, আমরা হিন্দু ঘেঁষা। রাজতন্ত্র এবং ধর্মতন্ত্র এক ধারায় চলছে। একজন আরেকজনের সম্পূরক, বাঁচে না, চলতে পারে না, কাজেই সর্দারও নিয়ে আসে গোসাইকে। গোসাই কিন্তু সর্দারই, বরং গোসাই সর্দারের চেয়েও এক ডিগ্রী উপরে। এই ব্যাপারগুলো আছে। এটা এখনও আছে, যুগে যুগে চলছে, আমাদের দেশে চলছে। এই করাপশন আমরা দেখতে পাই ‘রক্তকরবী’তে। এইগুলো কিন্তু চলে আসছে, এইগুলো কিন্তু ইম্পোজ করছি না। দর্শক যা বুঝবে, দর্শককে বোকা ভাবার কোনো কারণ নেই।

কামালউদ্দিন কবির
আচ্ছ... শেষ দিকে একটু বলি, আমাদের মঞ্চ নাটকে দর্শকের আনুকূল্যের অবস্থাটা যদি বিচার করি সেক্ষেত্রে ‘রক্তকরবী’ প্রযোজনাটি কেমন ভূমিকা রাখতে পারে?

আতাউর রহমান
ভালো লাগবে। আমাদেরতো মঞ্চ হয়ে গেছে। ন্যাশনাল থিয়েটার, খুব আরামের জায়গা, সুন্দর হল, খুব মডার্ন। আসলে দর্শকতো এমনিতে আসে। ‘রক্তকরবী’ আলাদাভাবে কিছু করবে কিনা আমি এ-ব্যাপারে নিশ্চিত নই এবং এ-ব্যাপারে কিছু বলতেও চাই না।

কামালউদ্দিন কবির
আতাভাই, রিহার্সেলের ব্যাপারটা... কবে থেকে শুরু করেছেন, কবে নাগাদ নামবে...

আতাউর রহমান
নাগরিকের (নাগরিক সম্প্রদায়) একটা সমস্যা হলো নাগরিকের কাজে খুব কড়াকড়ি নেই, এসময় কিছুটা রেজিম্যানটেশন ছিলো, গত বিশ বছর ধরে কোনো কড়াকড়ি নেই। খুব ঢিলেঢালা, ক্যাজুয়েল... কোনো সময় ভালো নাটক হয়... আগে বেশ ভালো নাটক হতো, এখন বেশ খারাপ নাটকও হয়। মাঝে মাঝে ভালো নাটক দু’কয়েকটা হয়। তো এটা এখন নাগরিকের (দলের) বর্তমান অবস্থা। কারণ নাগরিকের যারা সিনিয়র তারা নানারকম ব্যস্ততার মধ্যে আছে, বয়সের ধকল আছে। আর নতুন জেনারেশান, যারা বেশ অনুসন্ধিৎসু... তাদের ভেতরে চেষ্টা আছে। এই অবস্থায় নাগরিক চলছে। নাগরিক যেহেতু প্রফেশনাল থিয়েটার না, আমাদের এখানে এখনও হয়নি, আমরা খুব কড়াকড়ি করতেও পারি না। বরাবরই আমাদের অনেক দেরি করে নাটক নামে। ‘গ্যালিলিও’, ‘মাদার কারেজ’ খুব লম্বাচূড়া- রিহার্সেল টাইম। এটা আমরা দু’মাস হলো শুরু করেছি। তারপরও আশা করছি এটা অগাষ্ট মাস নাগাদ পারবো। আমাদেরতো দেড় ঘন্টা করে রিহার্সেল চলে। কারণ অনেকের অনেক ধরনের সমস্যা আছে, অফিস আছে... ইত্যাদি...

কামালউদ্দিন কবির
আমরা অবশ্যই চাচ্ছি যে, আমাদের দর্শকের ‘রক্তকরবী’র মাধ্যমে নতুন একটা অভিজ্ঞতা হবে।

আতাউর রহমান
এই আলোচনা আয়োজনের জন্য ‘থিয়েটারওয়ালা’কে ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়’এর পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ।

[উপরের ‘নির্মাণ’ পর্বটি রেকর্ড করা হয়েছিলো ২০০১ সালের জুলাই মাসে। ‘রক্তকরবী’র মহড়াদৃষ্টে অনুমান করা যায়, নভেম্বরের শুরুতে দর্শক নাটকটি দেখার সুযোগ পাবেন। পাঠকের কথা বিবেচনা করে নাটকটির বর্তমান পর্যায় নিয়ে নির্দেশকের সাথে ‘থিয়েটারওয়ালা’ সম্পাদকের যে বৈঠক হয় তার অনুলিখন প্রকাশ করা হলো]

হাসান শাহরিয়ার
আতাভাই, আমরা রক্তকরবী নিয়ে জুলাই মাসে একটি বৈঠকে বসেছিলাম। তখন নাটকটি একেবারেই সূচনাপর্বে ছিলো। সেট ডিজাইন ড্রইং-এর পর্যায়ে ছিলো, লাইট ডিজাইন প্রাথমিক পর্যায়ে ছিলো। যার যার প্রাপ্ত চরিত্র নিয়ে নিজেরা চিন্তা ভাবনা করছিলো। আপনিও নাটকটির শৈল্পীক দিক নিয়ে নানা চিন্তা ভাবনা করছিলেন। এবং তখন মোটামুটি টার্গেট ছিলো যে, ‘রক্তকরবী’ সেপ্টেম্বর নাগাদ মঞ্চে আসবে। তো আপনাকে একটু আলোকপাত করতে বলছি নাটকটির বর্তমানের বিভিন্ন পর্যায় নিয়ে।

আতাউর রহমান
প্রথমেই আমি বলবো যে, আমাদের দেশে মঞ্চ নাটক এখনো প্রফেশনাল হয়নি। আমরা কেউই নাটকটাকে প্রফেশনালি নিতে পারিনি। ফলে দেখা গেছে কোনো নাটক নির্মাণের সময় আমরা যে টার্গেট দিই, সেই টার্গেট রাখতে পারি না। যেখানে নাটক প্রফেশনাল সেখানে একটি পাণ্ডুলিপি নিয়ে বলে দেয় যে আমরা নাটকটি আগামী... ধরো, কথার কথা যে, ছয় সপ্তাহ পর নাটকটি মঞ্চে চলে আসবে। কিন্তু আমরাতো দিন-রাত কাজ করতে পারি না। আমাদের খাওয়া জোগাড় করতে হয় সারাদিন ধরে। এবং সন্ধ্যায় দেড় বা দুই ঘন্টা... তাও আবার সপ্তাহে প্রতিদিন না... সময় দিচ্ছি থিয়েটারে। সুতরাং এক্ষেত্রে সিডিউল ঠিক রাখা যায় না।

এখন, নাটকটি যে পর্যায়ে আছে... সেদিক থেকে বলা যায়, সেট তৈরি হচ্ছে, পোশাকের মাপ নেয়া হয়ে গেছে। আবহ সঙ্গীতের ব্যাপারে আইডিয়া দেয়া হয়ে গেছে- উনি মিউজিক পিস সিলেক্ট করছেন। লাইট যিনি করছেন তিনিতো আমাদের দলের সক্রিয় সদস্য, কাজেই উনি সারাক্ষণ সাথে সাথেই থাকছেন। এবার এই ‘রক্তকরবী’তে একটু ভিন্নতা আছে, ডিজাইনারদের দিক থেকে... সেটি হচ্ছে কেবল লাইট ডিজাইনার ছাড়া, নাসিরুল হক খোকন ছাড়া, বাদবাকি সব ডিজাইনারই কিন্তু আমাদের দলের বাইরের শিল্পী।

হাসান শাহরিয়র
পাঠক যখন আমাদের ‘নির্মাণ’ পর্বটি পড়বেন তখন জানতে পারবেন যে, আফসানা মিমি নাটকের নন্দিনী চরিত্রে অভিনয় করছেন এবং নাটকের পোশাক পরিকল্পনাও তিনি করছেন। কিন্তু আমরা জানতে পারলাম বর্তমানে তিনি কোনো বিশেষ কারণে এই দুটোর কোনটিই করছেন না। তো পোশাক পরিকল্পনা অন্য একজন করছেন, কিন্তু নন্দিনী চরিত্রে কে অভিনয় করছেন এবং এই চরিত্র নির্বাচন আপনি কিভাবে করলেন?

আতাউর রহমান
আসলে কোনো বিশেষ কারণে নয়, ব্যাপারটা হচ্ছে যে, মিমি আমাদের জানিয়েছে, তার প্রফেশনাল ব্যস্ততা এবং পারিবারিক কারণে সে এই নাটকে থাকতে পারছে না। প্রায় সাতটি মহড়ায় আমরা তাকে অনুপস্থিত পেলাম, তার সাথে মোবাইলেও যোগাযোগ করা যাচ্ছিলো না। আমরা কয়েকদিন অপেক্ষা করলাম তার বক্তব্য শোনার জন্য। তো সেটা যখন হলো না, তখন আমি কয়েকজন সহকর্মীর সাথে আলাপ করলাম করণীয় সম্পর্কে। গ্রুপের কিছু সমস্যা আছে, গ্রুপে নন্দিনী করার মতো কোনো মেয়ে নেই। বিপাশা ছিলো কিন্তু সে এখন মঞ্চে কাজ করছে না, মিমি ছিলো সে ও চলে গেলো... সুতরাং আমি কাউকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না।

হাসান শাহরিয়ার
নূনা আফরোজ ছিলো...

আতাউর রহমান
হ্যাঁ, নূনা আফরোজ আছে, সে অত্যন্ত দক্ষ অভিনেত্রী। আমাদের প্রযোজনা ‘স্বপ্নবাজ’-এ সে খুব কষ্ট করে ধীরে ধীরে তার চরিত্রটিকে ফুটিয়ে তুলেছিলো। মিমি যখন আসছিলো না, তখন আমার ওর কথা মনে হয়েছিলো। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছিলো, নূনার এই চরিত্রটির ব্যাপারে কিছু প্রি-কন্সেপশন তৈরি আছে। সে বহুবার ‘বহুরূপী’র ক্যাসেটটি শুনেছে। সুতরাং তাকে ভাঙতে আমার সময় লাগবে। আমি চাচ্ছিলাম একেবারে... এই চরিত্রটি নিয়ে আগে কখনো ভাবেনি, পূর্বে মঞ্চায়িত এই চরিত্রটি নিয়ে আবিষ্ট, আশ্লিষ্ট নয় এমন একজনকে। সেজন্য একজন ফ্রেশ অভিনেত্রী চাচ্ছিলাম। আরেকটি কথা হচ্ছে, নন্দিনীকে কি প্রকৃত অর্থেই দেখতে সুন্দরী হতে হবে? এটাও আমাকে ভাবাচ্ছিলো। কেননা আমরাতো ব্রেখটের সেই বিখ্যাত কথাটি জানি যে, যখন একজন কুৎসিত মানুষ কোনো কাজ সুন্দরভাবে সম্পাদন করতে পারে, তখন সেই মানুষটিও সুন্দর হয়ে ওঠে। ব্রেখট আরেকটা কথা বলেছিলো যে, মঞ্চে যদি খুব সুন্দরী মেয়ে অভিনয় করে তখন সে তোমার মন অন্য দিকে নিয়ে যায়, অভিনয়ে তোমার আর মন থাকে না। এসব কিছু জেনেও, আমার দলে যারা তরুণী আছে, তারা যে নন্দিনী করতে পারবে না তাও নয়... এসব আমি ভাবছিলাম। তখন আমাকে জানানো হলো যে, অপি করিম নামে একজন মেয়ে আছে... মূলত মডেলিং করে। টেলিভিশনে অভিনয়ও করে... আর বাড়তি একটি সুবিধা হলো যে, অপি করিম নৃত্যশিল্পী। তো সে আমাদের অফারটা নিলো। আমি মনে করছি সে ভালো করবে।

হাসান শাহরিয়ার
থিয়েটার সে করেনি। আপনার দলের সে সদস্য ছিলো না। তবুও তাকে এতো বড় একটি চরিত্র দিয়ে শুরু করালেন, এতে দলে কোনো নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হবে নাতো?... মানে যদি নাটকটির একটি পর্যায়ে অপিও ব্যস্ততার কারণে বা অন্য কোনো কারণে সময় দিতে অপারগ হয়, তখন দলে সেটার প্রভাব পড়বে না?

আতাউর রহমান
এখনো পর্যন্ত ও খুব ভালোভাবে সময় দিচ্ছে। আর কয়টা দিন। নাটক নেমে গেলেতো পরে আর সময় দেয়া নিয়ে সমস্যা হয় না। তবে আমি বুঝতে পারছি যে এটা নিয়ে কথা উঠতে পারে। কেননা, একটি মেয়ে মঞ্চ থেকে টেলিভিশনে যাচ্ছে, মঞ্চ থেকে সিনেমায় যাচ্ছে, অথচ যে মেয়েটি কোনোদিন মঞ্চে অভিনয় করেনি... কেবল মডেলিং করেছে টিভিতে... তাকে এনে এমন একটি প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ করে দেয়া হলো... এটা ব্যতিক্রম, আমি অস্বীকার করবো না। আমি নাম প্রকাশ করবো না, শুধু জানানোর জন্য বলি... ঢাকার আরেকটি বড় দলেও এমনটি হয়েছে যে, তারা টেলিভিশনের তারকাকে তাদের মঞ্চ নাটকে অভিনয় করাতো, টেলিভিশনের তারকা বলতে আমি বোঝাচ্ছি যে টেলিভিশনেই অভিনয় করতো পরে মঞ্চ আনা হয়েছে... তো এমন একজন তারকা শো’র দিন জানালো যে তার একটি পুরস্কার গ্রহণ অনুষ্ঠানে যেতে হবে। তবে সবাইকে এই বলে নিশ্চিন্ত করলো যে মঞ্চে তার এন্ট্রি নেয়ার আগেই সে চলে আসবে। ভেবে দেখ কত বড় ঝুঁকির কাজ! তো হলো কী... ঐদিন পুরস্কার নেয়ার পর ফটো সেশনে যোগ দিল আর শো’ করতো আসতেই পারলো না। কী ভয়াবহ দায়িত্বজ্ঞানহীনতা একবার ভেবে দেখ! কিন্তু আমি যেটা বলতে চাচ্ছি যে, ঐ দল কিন্তু তার বিরুদ্ধে কোনো বড় ধরনের পদক্ষেপ নেয়নি। আসলে আমরা বোধহয় কারো কারো কাছে জিম্মি হয়ে গেছি।