Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

নির্মাণে প্রাচ্যনাটের রাজা

Written by অনুলিখন.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

[নাটকের লোক মাত্রই জানেন যে, একটি পাণ্ডুলিপি হাতে নেয়ার পর মঞ্চায়ন পূর্ব-মুহূর্ত পর্যন্ত ঐ পাণ্ডুলিপির উপস্থাপন পরিকল্পনায় ঘটে নানা শৈল্পিক সংগ্রাম। নির্দেশক-সহ প্রত্যেক অভিনেতৃগণ ও সংশ্লিষ্ট শিল্পীগণ তাদের পরিবর্তনশীল মননশীলতার প্রকাশ ঘটান নাটক নির্মাণে। তাদের ভেতর চলে নাটকটি নিয়ে শিল্পভাবনার নানা আদান-প্রদান। নির্মাণপর্বের যে পথ-পরিক্রমা, সেই পথ-পরিক্রমায় একটি দলকে মুখোমুখি হতে হয় নানা ঘাত-প্রতিঘাতের, নানা সংকটের। এ-সব সংকটের ভেতর দিয়েই একটি নাট্যদল দর্শকদের সামনে আনে তাদের নতুন নাটক।

‘প্রাচ্যনাট’ বাংলাদেশের থিয়েটার চর্চায় একটি অগ্রগণ্য নাট্যদল। নাট্যদলের প্রত্যেক সদস্যই মঞ্চনাটকের জন্য নিবেদিত প্রাণ। সার্কাস সার্কাস, এ ম্যান ফর অল সিজনস, কইন্যা, গণ্ডার-র মত শিল্পসম্মত নাটক তারা ইতোমধ্যেই দর্শকদের সামনে এনেছেন। প্রাচ্যনাট তাদের পরবর্তী প্রযোজনা হিসেবে বেছে নিয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রাজা নাটকটি। এর নির্দেশনার দায়িত্ব পালন করছেন আজাদ আবুল কালাম। রাজা ও অন্যান্য নাম নিয়ে শীঘ্রই মঞ্চে আসছে নাটকটি। থিয়েটারওয়ালার আয়োজনে নাটকটির নির্মাণপর্বের নানা শৈল্পিক ভাবনা-চিন্তা নিয়ে আড্ডায় বসা হয়েছিল। আড্ডায় ছিলেন- নির্দেশক আজাদ আবুল কালাম, আলোক পরিকল্পক সাইফুল ইসলাম, পোশাক পরিকল্পক কাজী তৌফিকুল ইসলাম ইমন। রাজা নাটক নিয়ে নিজেদের ভাবনা বিনিময়ের জন্য আরো উপস্থিত ছিলেন নাট্যজন, নাট্যশিক্ষক বিপ্লব বালা এবং শিক্ষক, লেখক আজফার হোসেন। নির্মাণপর্বের এই আলোচনাটি পাঠকদের জন্য অনুলিখন করে তুলে ধরা হলো বর্তমান সংখ্যায়।- সম্পাদক]

বিপ্লব বালা
আমি একটা প্রশ্নের উত্তর সেভাবে কারো কাছে পাই নি। সেটা হলো, একটা প্রোডাকশন ধরার আগে নিশ্চয়ই কোনো ভাবনা থাকে দলের, নির্দেশকের- কিন্তু কেউ কখনো স্পষ্ট করে বলতে পারে না, কোন ভাবনা থেকে কোনো একটা নির্দিষ্ট নাটক হাতে নেয়া হয়। তো আমি পাভেলকে এই প্রশ্নটা দিয়েই শুরু করতে চাই যে, যেহেতু দলটি হলো প্রাচ্যনাট, অনেক ভালো কাজের তারা নির্মাতা, পাভেল নিজে সচেতন নির্দেশক হিসেবে পরিচিত, সেখানে এখন এই সময়ে রবীন্দ্রনাথের রাজা করার ব্যাপারে তার ভাবনাটা কী, দলের ভাবনাটা কী?

আজাদ আবুল কালাম
আসলে আমরা যখন প্রাচ্যনাট শুরু করি তখন আমাদের ভাবনার ভেতরে ছিল যে, রবীন্দ্রনাথ করবো কী করবো না এবং আরেকটা হলো রবীন্দ্রনাথ করতে পারবো কী পারবো না। করবো কী করবো-নার-ই আরেক পিঠ হচ্ছে পারবো কী পারবো না। কারণ, তখন আমরা ১৫-১৬ জন ‘লোক’ ছিলাম। আমি ‘লোক’ বলতে চাচ্ছি, কারণ, কেউই তেমনভাবে প্রশিক্ষিত নাট্যকর্মী ছিলাম না। প্রথম দিকে যে প্রোডাকশনগুলো আমরা করেছি- সার্কাস সার্কাস বা আরো ছোট ছোট প্রোডাকশন করেছি, সেগুলোকে মূলত ওয়ার্কশপ প্রোডাকশন বলা যেতে পারে। মানে কাজ করতে করতে দাঁড়িয়ে গেছে। তখন আমরা ভাবতাম যে, আমরা রবীন্দ্রনাথ করবো কিনা, শেক্সপীয়র বা অন্য ক্ল্যাসিক প্রোডাকশন করবো কিনা। আমরা সচরাচর যে সমস্ত নাটক করতে ভয় পাই, বা যে নাটকগুলো সবার কাছে পরিচিত এবং কেউ কেউ হয়তো করেছেনও, সেসব নাটক করবো কিনা। এক-সময় আমাদের মাথায় রবীন্দ্রনাথ আসলো এবং আমরা ভাবলাম রবীন্দ্রনাথ এখন করবো কেন? অথবা রবীন্দ্রনাথের কোন কোন নাটকগুলো এখনও হয় নি?

আজফার হোসেন
এখানে আমি একটু বলি, শেক্সপীয়র করা যায় কিনা, ক্ল্যাসিক করা যায় কিনা, এর ধারাবাহিকতায় কি রবীন্দ্রনাথে এসে পড়লেন? নাকি ...

আজাদ আবুল কালাম
না ধারাবাহিকতা না, বিচ্ছিন্নভাবে ভেবেছি। আমরা আসলে যে কাজগুলো করছিলাম, সেগুলো একটা শেষ না হতে আরেকটা শুরু হয়ে যেত। যেমন, আমরা যখন সার্কাস সার্কাস করছিলাম, তখন হয়তো এ ম্যান ফর অল সিজনস অনুবাদ হয়ে গেছে। ফলে সার্কাস সার্কাস শেষ করেই আমরা এ ম্যান ফর অল সিজনস ধরে ফেলেছি। আবার ওটা হতে হতে কইন্যা-র প্রিপারেশন শুরু হয়ে গেছে। এরকম আর কি!

আজফার হোসেন
আমি কথাটা এজন্য বললাম যে, আমাদের ভেতর তো শেক্সপীয়র চলে আসে, আরো যারা বিখ্যাত, তারা চলে আসে। ঐ যে বললেন ক্ল্যাসিক, সেই ক্ল্যাসিক পষধংং তৈরি করে - ওগুলো বড়, অন্যরা ছোট। তো, যখন আমরা ওগুলোকে বড় ভাবতে থাকি তখন আসলে আমরা উপনিবেশবাদের একটা রিহার্সেলই আসলে করি কিনা? এবং যদি সেটাই হয় তাহলে তার বিরুদ্ধে দাঁড়াবার জন্য আমরা রবীন্দ্রনাথকে কতোটা ব্যবহার করতে পারি? এটা আমার প্রশ্ন, জিজ্ঞাসা। বেশি কিছু না।

আজাদ আবুল কালাম
এটা ভেবে রবীন্দ্রনাথ নিয়েছি তা হয়তো না। রাজা টেক্সট হিসেবে আমার কাছে সব সময়ই রহস্য মনে হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের আরো যত নাটক পড়েছি এবং দেখেছি, আমার মনে হয়েছে যে, এটাই রবীন্দ্রনাথ না। টেক্সটে আরো অনেক কিছু আছে, যা বের করে আনা দরকার। রাজা-কে মনে হয়েছে, এটার অনেক কিছু রিলেট করানো সম্ভব। তবে কীভাবে কী করা যায়, তা ভাবি নি। কিন্তু যখন আমেরিকায় ১১ সেপ্টেম্বর ঘটে গেল, তখন আমি হঠাৎ করেই রাজার-র আবছা একটা ইন্টারপ্রেটেশন তৈরি করতে পারলাম। যারা ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনা ঘটালো তাদেরকে সাথে সাথেই টেরোরিস্ট হিসেবে চিহ্নিত করা এবং আসলে টেরোরিস্ট কে, এটাকে ধামাচাপা দেয়া ... এসব কিছু আমার ভেতরে একটা কিছু কাজ করলো। বিশ্বে আমরা কাকে টেরোরিস্ট বলছি, যে বলছে সে আসল টেরোরিস্ট কিনা ইত্যাদি ভাবনাগুলো আসলো। এবং রাজা নাটকের যে ৭ জন রাজা আছে, আমার হঠাৎ করেই মনে হলো- ওরা আসলে জি-৭, যা এখন জি-৮। আমার মাথায় আসলো যে ১১ সেপ্টেম্বরের পর জি-৭ এর ৭ জন হোয়াইট হাউজের সামনে জড়ো হয়েছে, এবং বক্তৃতা দিচ্ছে- পৃথিবীর সব টেরোরিস্টদের এখন ধরে ফেলতে হবে।

আজফার হোসেন
এই ‘টেরোরিস্ট’ বর্গটা নিয়ে কিন্তু ভাববার আছে। আপনি যখনি বর্গটা ব্যবহার করছেন, তখনই আমার মনে হলো এর ইতিহাসটা কী? এটা কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জারি করা বর্গ। সে এটা দিয়ে বিভাজন তৈরি করেছে- তারা কারা আর অন্যরা কারা। অন্যরা এমনকি নিজেদের বেঁচে থাকার সংগ্রামে শরীক হলেও তারা টেরোরিস্ট হয়ে যাচ্ছে। এবং এই শব্দটা মবিলাইজ করে যুক্তরাষ্ট্র তার ক্ষমতার দাপট দেখাচ্ছে। এই ব্যাপারটা কিন্তু রাজা নাটকেও আছে। ষড়যন্ত্রের ব্যাপার আছে। প্রাসাদে আগুন লাগানোর ব্যাপার আছে, মানে দখলের ব্যাপার আছে। তো, আসলেই ১১ সেপ্টেম্বরের পর পৃথিবীর চেহারাটার সাথে এই নাটকের কোনো মিল খুঁজে পাওয়াটা চমৎকারই বলতে হবে। কিন্তু এই টেরোরিস্ট শব্দটিকে সাম্রাজ্যবাদ তাদের মতো করে ব্যবহার করে বোঝাতে চায় অন্যরা টেরোরিস্ট। কিন্তু রাজা নাটকে আপনি যাদের টেরোরিস্ট হিসেবে দেখাচ্ছেন বা দেখাবেন, তারা কি আসলেই টেরোরিস্ট, আমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে? তো ...

আজাদ আবুল কালাম
এই ব্যাপারে আমাদের ডিজাইন হচ্ছে এই টেরোরিজম শব্দটা যখন ওরা বলছে, তখন ভিজ্যুয়ালে দেখাচ্ছি, আসলে ওরাই টেরোরিস্ট। আমরা শুরুতেই ৭ জনকে দেখাচ্ছি যারা সাম্রাজ্যবাদ শক্তি।

আজফার হোসেন
১১ সেপ্টেম্বরের আগেই মাইকেল হার্ট ও টনি নেগ্রি একটা বই লিখেন, যার নাম এম্পায়ার। সেখানে তারা দেখাতে চেয়েছেন যে- সাম্রাজ্য, সাম্রাজ্যবাদ না, সাম্রাজ্যের কোনো কেন্দ্র নাই। এটার ব্যাপ্তি আছে। এটা এতই বিস্তৃত যে এটাকে খালি চোখে দেখা যায় না। সাম্রাজ্য অনেকটা ভুতুড়ে ব্যাপার। তো এই তত্ত্ব দিয়ে তারা যা বোঝাচ্ছেন, সেটার আবার প্রতিবাদ করেছেন তৃতীয় বিশ্বের অনেক তাত্ত্বিক। তারা বলছেন যে, বর্তমান সময়ে যদি আমরা সাম্রাজ্যকে অবয়বহীন, অদৃশ্য বলি, যদি বলি যে, সাম্রাজ্যবাদের কোনো কেন্দ্র নাই, তাহলে আসলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে ছাড় দেয়া হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে এটার কেন্দ্র, এটাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়। এবং যার কারণে ১১ সেপ্টেম্বরের পর তুতীয় বিশ্বে যত ডেমোনেস্ট্রেশন হয়েছে তার প্রায় সবগুলোতেই একটা স্লোগান ব্যবহৃত হয়েছে- ‘ইট’স নট জাস্ট ইমপিরিয়ালিজম/ বাট ইউ.এস ইমপিরিয়ালিজম, স্টুপিড’! সুতরাং সাম্রাজ্যবাদের কথা যদি এখন বলি তাহলে আমাদের ইউ.এস বলা দরকার, আমেরিকার নাম উল্লেখ করা দরকার। পাভেল আপনার কী মনে হয়?

আজাদ আবুল কালাম
অবশ্যই, এবং আমি নাটক শুরুই করছি, মানে বাইরে লেখাই থাকবে ‘ওয়েলকাম টু ইউ.এস’। এবং দর্শকদের যারা রিসিভ করছে তাদের গায়ে ইউ.এস আর্মি লেখা আছে। আপনি ঢুকবেন সেখানে লেখা থাকবে ‘ইমিগ্রেশন’, আপনার শরীর মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে পরীক্ষা করা হবে।

কাজী তৌফিকুল ইসলাম ইমন
টিকেটের গায়ে লেখা থাকবে ‘ভিসা’। আপনি ঢুকলেই ড্রপ সিনে দেখবেন হোয়াইট হাউজ আঁকা আছে।

আজাদ আবুল কালাম
আর নাটক শুরু হওয়ার একটু পরেই দেখবেন স্ক্রিনে দেখা যাবে একটা নাদুস নুদুস বাচ্চা ইউ.এস.এস.আর-এর ফ্ল্যাগ উড়াচ্ছে আর ছড়া বলছে .. হামটি ডামটি সেট অন এ ওয়াল ....

আজফার হোসেন
তাহলে একটা কথা বলতেই হচ্ছে এই ফ্ল্যাগ নিয়ে। সেটা হলো, আমার সাথে মার্কিন এক তাত্ত্বিকের কথা হচ্ছিল, তার নাম বার্তেল ওলমান। তো বলা হচ্ছিল যে, এখন যে সাম্রাজ্যবাদ দেখছি সেটা কিন্তু মোটেই অবয়বহীন না। ফ্ল্যাগ নির্ভর। ফ্ল্যাগ ফেটিশ ...

আজাদ আবুল কালাম
আমরা কিন্তু প্রচুর ফ্ল্যাগ ব্যবহার করছি।

আজফার হোসেন
ফ্ল্যাগ হচ্ছে এখন সাম্রাজ্যবাদের একটি মোক্ষম দ্যোতক। ফ্ল্যাগ ছাড়া সাম্রাজ্যবাদ হবে না। এবং ১১ সেপ্টেম্বরের পর বার্তেল এটাকে ফেটিশ হিসেবে দেখছেন। পতাকা ফেটিশ। সব জায়গায় এখন পতাকার ব্যবহার হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আপনি কলা কিনতে গেলে দেখবেন সেখানে কলার গায়েও মার্কিন পতাকা লেপ্টে আছে, কমলা কিনলে পতাকা আছে, যেকোনো পণ্যে পতাকা, রাস্তায় পতাকা। এবং এই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাথে উগ্র মার্কিন জাতীয়তাবাদের একটা সম্পর্ক আছে। এবং তারা সেটা এই পতাকা ব্যবহারের মাধ্যমে দেখাতে চায়- আমরাই সেরা এবং আমরা আছি সর্বত্রই। তো আমার ভালো লাগলো, পাভেল, আপনার এই ভাবনাটা যে আপনি পতাকা ব্যবহার করছেন।

আজাদ আবুল কালাম
প্রচুর ফ্ল্যাগ ব্যবহার করছি এবং সেগুলো গেঁথে দেয়া হবে। আরেকটু পরেই দেখতে পাবেন- জি-৭ এর ৭ জন র‌্যাম্প করছে, মানে মডেলরা যেভাবে হাঁটে সেই ক্যাটওয়াক করছে, ভাবখানা এই যে, আমাকে দেখ, আমাকে দেখ। এই জি-৭ কিন্তু আগেই বলেছি রাজা নাটকের ৭ রাজা।  কিন্তু তাদের পোশাক থাকবে অন্য রকম। কাঞ্চি রাজা হয়তো পকেটে পিস্তল, মস্তান মস্তান ভাব। এবং তাদের কথা কিছুই বোঝা যাবে না- কেবল মাঝে মাঝে কিছু শব্দ বোঝা যাবে, শব্দগুলো হলো ‘টেরোরিস্ট’-‘আফগানিস্তান’-‘বিন লাদেন’-‘ইরাক’-নিউক্লিয়ার’ ইত্যাদি। তারপর কোরিওগ্রাফিটাই এমন যে এই ৭ জন প্লেনের মতো উড়ে যাবে। এবং দেখে মনে হবে যে, তারা একটা কিছু দখল করতে যাচ্ছে। আসলে রবীন্দ্রনাথ রাজা নাটকে প্রকৃত যে রাজার সন্ধান করেছেন, যিনি সর্বত্র, যাকে দেখা যায় না, সেই রাজার দেশে এই দখলকারীরা এসেছে। এবং তখন আমরা স্ক্রীনে দেখাবো ওরা পাখির মত, কুকুরের মত মানুষ মারছে। মানে মার্কিন বাহিনী যেভাবে নির্বিচারে গুলি করে, ওভাবে। একেবারে র‌্যাম্বো স্টাইলে।

বিপ্লব বালা
রাজা নাটকের সাথে এই চরিত্রগুলো যখন আপনি মেলাচ্ছেন, তখন রাজা-র মূল চরিত্রগুলোর কী অবস্থা হচ্ছে? মানে রবীন্দ্রনাথের রাজা-র কতটুকু আপনি রাখছেন?

আজাদ আবুল কালাম
এক অর্থে রবীন্দ্রনাথের রাজা আর আমরা যে রাজা করতে যাচ্ছি, তার মধ্যে অনেক ফারাক আছে। আমরা রাজা-র যতটুকু আমাদের দরকার ততটুকুই নিচ্ছি। আসলে সাধারণভাবে রাজা এমন হয় যে, সবাইকে তার হম্বিতম্বি না দেখালে তার চলেই না। কিন্তু রাজা নাটকের মূল যে রাজা তাকে দেখাই যায় না। রাজা সর্বত্র কিন্তু রাজা নেই।

আজফার হোসেন
মিশেল ফুকো কিন্তু দেখিয়েছেন যে এধরনের ব্যাপারে আবার বিপত্তিও আছে। সেটা হলো উপর থেকে বা বাইরে থেকে বা ভেতর থেকে কেউ একজন নিয়ন্ত্রণ করছেন যাকে আমরা দেখতে পাচ্ছি না, কিন্তু তার প্রভাবটা আমরা অনুভব করছি। তো যদি এমন হয় যে তাকে দেখছি না কিন্তু সে সর্বত্রগামী, তার কেন্দ্র নেই কিন্তু বি¯তৃতি আছে, তখন কিন্তু একধরনের আতংকেরও সৃষ্টি হয়। যেমন- পুলিশ নেই কিন্তু পুলিশি আছে। আমরা সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকি।

বিপ্লব বালা
কিন্তু রবীন্দ্রনাথের রাজা কিন্তু আতঙ্ক ছড়ায় না।

আজফার হোসেন
হ্যাঁ, সেটাই খেয়ালে রাখতে হবে নির্মাতাকে। মানে রাজাকে দেখা যাচ্ছে না কিন্তু রাজা সর্বত্র, এটার দুটো দিক আছে। রবীন্দ্রনাথে কোন দিকটি আছে সেটা যদি নির্মাতা খেয়ালে না রাখেন তাহলে গোল বাধবে। রবীন্দ্রনাথ কিন্তু সবাইকেই এক অর্থে রাজার পর্যায়ে নিয়ে যেতে চান। রাজা-প্রজার বিভেদ ভুলিয়ে দিতে চান। এমন একটি রাষ্ট্রের তিনি কল্পনা করছেন, যেখানে রাজায় প্রজায় ব্যবধান নেই। সুতরাং কেন্দ্রে না থেকেও রবীন্দ্রনাথের রাজার যে প্রভাব, তা কিন্তু পুলিশ নেই কিন্তু পুলিশি আছে-র সাথে মিলবে না। আমি সেটাই খেয়ালে রাখতে বলছি।

আজাদ আবুল কালাম
অবশ্যই সেটা খেয়ালে রাখা দরকার। আরেকটা কথা হচ্ছে, আমি রাজা-কে একজন আর্টিস্ট হিসেবে একভাবে ব্যাখ্যা করছি। এবং আমরা বলছি যে, গ্লোবাল সিচ্যুয়েশন মাথায় রেখে, গ্লোবাল পলিটিক্স মাথায় রেখে  রাজা- নাটকের কিছু কিছু জিনিস আমাদের মাথায় এসেছে যে, আমরা এভাবে চিন্তা করতে পারি। সেই চিন্তাগুলোই কিন্তু আমরা এখানে বলছি। আর আপনি একজন সোস্যাল এনালিস্ট হিসেবে বা পলিটিকেল এনালিস্ট হিসেবে, টিচার হিসেবে সমাজকে কীভাবে দেখেন সেটার সাথে মিলিয়ে কথা বলছেন। এটার প্রয়োজন আছে বলেই এই বসাটার আয়োজন করেছে থিয়েটারওয়ালা। আমাদের যে ভাবনা, যে ইন্টারপ্রেটেশন আমরা বলছি, সেটা কিন্তু প্রয়োগের দিক থেকে, থিয়েটারের প্রয়োগের দিক থেকে।

আজফার হোসেন
আপনি কিন্তু আমাকে আরও উস্কে দিচ্ছেন। হাঃ হাঃ। সেটা হলো আমরা যতই এনালিটিক্যাল কথা বলি না কেন, আপনার থিয়েটারের যে শক্তি, যে ক্ষমতা, তার সাথে কিন্তু আমরা ধোপে টিকবো না। কারণ, একটা থিয়েটারের ধারণ ক্ষমতা প্রচণ্ড হতে পারে। সে কবিতাকে ধারণ করতে পারে, বিভিন্ন আর্ট-ফর্মকেই ধারণ করতে পারে। সুতরাং আমাদের কথাগুলোকে, বিবেচনাগুলোকে আপনি কীভাবে থিয়েটারে আনবেন সেটা আপনার ক্ষমতার উপর নির্ভর করবে। কোন প্রক্রিয়ায় আনবেন, সেটাও আপনার ব্যাপার। থিয়েটারের যে কনসেপ্ট মাথায় ঢুকে আছে, সেই কনসেপ্ট ভাঙলেও কিন্তু আরেকটা থিয়েটারই হবে। সুতরাং সেদিকেও আপনি যাবেন কিনা, সেটা আপনার ব্যাপার। অর্থাৎ আমি বলতে চাচ্ছি, থিয়েটারের প্রকাশ-ক্ষমতার যে ব্যাপ্তি, সেটা আপনার কাজে লাগতে পারে বিভিন্নভাবেই।

আজাদ আবুল কালাম
হ্যাঁ, আর আমার সব সময়েই মনে হয়েছে, থিয়েটারের এই ক্ষমতার জন্যই মনে হয়েছে যে- থিয়েটার আসলে কী, সেটা আমি এক কথায় বলতে পারবো না। এবং থিয়েটারে যে কত কিছু করা যায় তা-ও একটা বিস্ময় আমার কাছে। যেমন আমাদের প্রোডাকশনটার নাম দিয়েছি আমরা মাল্টিমিডিয়া থিয়েটার। এখানে আমরা স্ক্রীন ব্যবহার করছি। প্রি-রেকর্ডেড জিনিস ব্যবহার করছি। দেখা যাবে যে দর্শক বসে আছে, সে পর্দায় রেকর্ডেড ছবি দেখছে। আবার মঞ্চের লাইভ জিনিস দেখছে।  মানে টোটালটা মিলে থিয়েটারে আসলে কত কিছু করা যেতে পারে, তারও একটা নিরীক্ষা হয়ত আমরা করছি এই নাটকের মাধ্যমে।

আরেকটা কথা আমি বলি রাজা-কে কেন এখন করছি, বিপ্লব দা’ এমন প্রশ্ন দিয়ে শুরু করেছিলেন ... তো আমার রাজা নাটক পড়তে পড়তে সব সময়ই মনে হয়েছে অনেক অনেক কনটেম্পোরারি জিনিস আছে এর মধ্যে। এই নাটকটি কিন্তু অনেক বড়। এবং আমার মনে হয় না যে, রবীন্দ্রনাথ এত বোকা ছিলেন যে তিনি ৭ ঘন্টা লাগবে, এমন একটা নাটক পুরোটা করার জন্য লিখেছেন। আমার মনে হয়েছে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, আর আমাদের বলে দিয়েছেন যে- যার যতটুকু লাগে এখান থেকে নিয়ে নাও। আর নাটকের অনেক জায়গায় দেখা যায় উনি কিছু একটা বলছেন এবং পরেই দেখা যায় সেটা তিনি দেখাচ্ছেনও। এটা তাঁর ঐ সময়ের বাস্তবতাও হতে পারে বা ঐ সময়ের দর্শকের কারণেও হতে পারে, বলেছেন আবার পরে দেখিয়েছেন। কিন্তু এখন আমার কাছে মনে হচ্ছে- না, অমুক অংশটার দরকার নাই, এটা না করলেও নাটকের প্রাসঙ্গিকতা হারায় না।

বিপ্লব বালা
এটা কিন্তু আমাদের রীতিতেই আছে। একবার বলা আবার দেখিয়ে দেয়া। ন্যারেটিভ স্টাইল বলতে পারেন। তো রবীন্দ্রনাথ কিন্তু একেবারে আমাদের রীতিটাকেই ব্যবহার করেছেন।

আজাদ আবুল কালাম
হ্যাঁ, কিন্তু আমি সে-রকম করতে চাচ্ছি না। আমার মনে হয়েছে একবার দেখালেই তো হয়, আর বলার প্রয়োজন নাই। আরেকটা কথা হলো আমার কাছে রাজা-কে টেক্সট মনে হয় না। মাঝে মাঝে মনে হয় প্রি-টেক্সট। এবং আমি রাজা-র যতটুকু রাখছি তাতে মনে হতে পারে যে, আমি রবীন্দ্রনাথকে এক্সপ্লোয়েট করেছি। কারণ, রবীন্দ্রনাথকে ব্যবহার করে আমি আসলে আমি যা বলতে চাচ্ছি সেটাই বলেছি। রাজা-র মধ্যে যতগুলো রাজা আমি দেখতে পাই, আমি ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে আমার আশে-পাশে সেই রাজাদেরই অস্তিত্ব অনুভব করি। তখন আমি আসলে আমার জানাশোনা ইতিহাসের বা বর্তমানের সেই রাজাদের কথা বলার জন্যই রবীন্দ্রনাথের রাজা-র উপর ভর করেছি।

বিপ্লব বালা
কিন্তু রাজা-য় তো দু-ধরনের রাজা আছে। যাদেরকে দেখা যায় আর একজন আছে যাকে দেখা যায় না। তো বাস্তবে বা ইতিহাসের জায়গা থেকে এই দু-ধরনের রাজার রিলেশনটা কীভাবে করতে চাচ্ছেন?

আজাদ আবুল কালাম
আমি একটাকে দেখাচ্ছি এন্টাগনিস্ট অন্যটা প্রোটাগনিস্ট। একেবারে সরলভাবেই আমি এই বিভাজন করেছি।

বিপ্লব বালা
হ্যাঁ, নাটকেও তো তাই।

আজফার হোসেন
রবীন্দ্রনাথের মধ্যে কিন্তু একটা ভয়ানক শেক্সপীয়র প্রীতি আছে। এবং আমরা যখন রাজা পড়ি সেখানে কিন্তু হ্যামলেট-র প্রভাব দেখি। এই যে দেখা যাচ্ছে না কিন্তু একটা ভুতুড়ে উপস্থিতি আছে, আবার হ্যামলেট তার বাবাকে দেখছে কিন্তু আদতে সে তার বাবা কিনা আমরা নিশ্চিত নই। রাজা নাটকে উপস্থিতি ও অনুপস্থিতির বা কায়া ও ছায়ার দ্বন্দ্ব বা টেনশন দেখি। সেখানে কিন্তু একভাবে রবীন্দ্রনাথের শেক্সপীয়র প্রীতিটা আমরা দেখতে পাই। এবং রবীন্দ্রনাথ ব্যক্তিগতভাবেও শেক্সপীয়রের ভীষণ ভক্ত ছিলেন।  

আজাদ আবুল কালাম
হ্যাঁ। আর সেটা আমি দেখাচ্ছিও এই নাটকে। রাণী সুদর্শনা যখন, নাটকে একেবারে শেষে, অন্ধকার ঘরে প্রবেশ করে, তখন আমি দেখাচ্ছি যে, কাঞ্চিরাজ চিৎকার করতে করতে বেরিয়ে আসে। সে চিৎকার করে- লাইট লাইট লাইট।

আজফার হোসেন
তাই! কিন্তু একটা বিষয় খেয়াল রাখাও দরকার, সেটা হলো শেক্সপীয়রের জন্মস্থানে কয়েক বছর আগে রবীন্দ্রনাথের একটা স্ট্যাচু বসানো হয়েছে। এবং শেক্সপীয়রকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথের লেখা এবং নিজের অনুবাদ করা একটা কবিতাও এঁটে দেয়া আছে সেখানে। তো, শাদারা দেখাতে চাচ্ছে- প্রাচ্যের এক দারুণ কবি পাশ্চাত্যের এক মহানাট্যকারের কাছে নত হয়ে আছে। ... তো এটা কিন্তু প্রয়োগের সময় মাথায় রাখা দরকার যে পাশ্চাত্যের কবিকে আমরা হয়ত সম্মান দিয়ে দেখি, কিন্তু ওরা ভাবে আমরা দুর্বল। আর আমাদের কাজের গুরুত্ব বা ‘মাহাত্ম্য’ বিচার করা হয় শাদাদের দেয়া মাপকাঠিতেই।

বিপ্লব বালা
আমি সাইফুলকে একটা প্রশ্ন করতে চাই। এই নাটকে আলো অন্ধকার তো একটা প্রধান ফ্যাক্টর। তো আপনি লাইটে এই ব্যাপারটা কীভাবে আনছেন?

সাইফুল ইসলাম
আলোর ব্যাপারটি এখানে ক্ষেত্রবিশেষে সংকীর্ণ করা হয়েছে। সংকীর্ণ এই অর্থে যে, আলোটা ডেফিনিট, মানে আমি আপনাকে দেখতে পাচ্ছি ফলে এটা আপনিই। আপনাকে ছাড়া আর কিছু ভাবতে সে আমাকে দিচ্ছে না।

বিপ্লব বালা
মানে আলো আপনাকে লিমিটেড করে দিচ্ছে।

সাইফুল ইসলাম
হ্যাঁ, একেবারে লিমিটেড করে দিচ্ছে।

আজফার হোসেন
এই নাটকেও একটা ব্যাপার আছে যে, আলো কীভাবে অন্ধ করে দেয়। আলোতে যখন সুদর্শনা সুবর্ণকে দেখে মুগ্ধ হয়ে যায়, এটা তো এক অর্থে রবীন্দ্রনাথের বিবেচনায় অন্ধ হয়ে যাওয়া।

সাইফুল ইসলাম
আর পেইন্টিং-এ যেমন, আমি যদি একটা রিয়েলিস্টিক ছবি দেখি তো সেটা আমার ভালো লাগবে কিন্তু আর কোনো ভাবনার জায়গায় নিয়ে যাবে না। কিন্তু আমি যদি এবস্ট্রাক্ট পেইন্টিং দেখি তাহলে আমার ভাবনার জগত কিন্তু বি¯তৃত হয়ে পড়ে। আমার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আমি ওখান থেকে অনেক কিছু বের করার চেষ্টা করি। তো এই আলো এবং অন্ধকারের মধ্যেও এমন এটা ব্যাপার আছে। অন্ধকারকে আমি যে-কোনো কিছু ভাবতে পারি। আমার কল্পনায় নানা কিছু নির্মাণ করতে পারি, যদি সেটা অন্ধকার হয়। আলো আমাকে ফিক্সড করে দিচ্ছে। এই অন্ধকারের তাৎপর্যটা আমি মাথায় রেখেই ডিজাইন করছি। আমার আলো-আঁধারির খেলায় অন্ধকারকেই বেশি উজ্জ্বল মনে হবে।

আজফার হোসেন
আলো-অন্ধকারের যে সরল বিভাজন, সেই বিভাজনে কিন্তু রাজা নাটক আটকে থাকছে না। আলো ভালো আর অন্ধকার খারাপ- সেই অর্থে তিনি এখানে অন্ধকারকে আনেন নি। তিনি দেখাতে চাচ্ছেন, আলোর ভেতরে যেমন অন্ধকার আছে, অন্ধকারের ভেতরেও তেমনি আলো আছে। আলোর যেমন প্রয়োজন আছে, তেমনি অন্ধকারেরও প্রয়োজন আছে। সেটা কিন্তু এই না যে, অন্ধকার না থাকলে আমরা আলোর মর্যাদা বুঝতাম না; বরং অন্ধকার যে আলোর সমকক্ষ অথবা ক্ষেত্রবিশেষে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, যেটা সাইফুল বললেন যে, অন্ধকারে ভাবনাটা বরং প্রসারিত হয়, সেটাই বোধ করি বোঝাতে চেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ।

আরেকটা জায়গায় রাজা-কে এক ধরনের ক্রিটিক হিসেবে দেখা যায়। এই যে সুদর্শনা বলছে যে- আলো জরুরি এবং এই আলোয় যা দেখছি তাই সত্যি, আলোর বাইরে আর কিছুই সত্য হতে পারে না- অন্য দিকে রাজা বলছে, না, যা দেখছো তার বাইরেও আরও অনেক কিছু আছে- তো এর মাধ্যমে কি রবীন্দ্রনাথ পাশ্চাত্যের এনলাইটেনমেন্ট-কে ক্রিটিসাইজ করছেন? আলোর যে সনাতন আধিপত্য তাকে তিনি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছেন? এনলাইটেনমেন্ট যেমন বলে যা দেখছো তাই সত্যি, অন্ধকার বলছে, না, যা দেখছো তার বাইরেও পৃথিবী আছে। এবং এই বিশাল অস্তিত্বের সন্ধানে রবীন্দ্রনাথ অন্তত এই নাটকের অন্ধকারকে ব্যবহার করেছেন বলে আমার মনে হয়। তবে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে শেষ কথা বলাও মুশকিল। কারণ এই নাটকেই দেখুন, তিনি প্রশ্ন দিয়ে শুরু করেছেন। প্রথম বাক্যটিই কিন্তু ‘প্রশ্ন’ আর শেষ করেছেন প্রণাম দিয়ে। এত বড় বড় কথা ব’লে, প্রজাকে রাজার সমপর্যায়ে তুলেও, তিনি শেষ করছেন কিন্তু প্রণাম দিয়ে। বিষয়টি কিন্তু রাজনৈতিক ও মতাদর্শিকভাবে মোটেই নিরপেক্ষ বা নিরীহ না।

আজাদ আবুল কালাম
আমি কিন্তু প্রণাম রাখি নি।

বিপ্লব বালা
কেন?

আজাদ আবুল কালাম
আমার কাছে মনে হয়েছে এর আগেই নাটককে উনি যেখানে নিয়ে গেছেন তারপর আর প্রণাম বা সমর্পণ দিয়ে শেষ করা যায় না।

আজফার হোসেন
সমগ্র নাটকে রাজার হায়ারার্কির ব্যাপারটা উনি ভাঙতে চেয়ে শেষে প্রণাম মানে তো আবার সেই হায়ারার্কিকেই সমর্থন করা।

আজাদ আবুল কালাম
আমার কাছেও তাই মনে হয়েছে। আর আমার কাছে আরেকটা জিনিস মনে হয়েছে, এই নাটকটাতে অনেক ইঙ্গিত আছে। মানে একটা রাষ্ট্র ব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত তারও ইঙ্গিত আমি পাই। এটা যখন উনি লেখেন তখন ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। যদি স্বাধীনতা চাই তাহলে সেখানের রাজা কেমন আচরণ করবে? কেমন হওয়া উচিত মানুষের প্রকৃত রাজার আচরণ ইত্যাদি অনেক কিছুর ইঙ্গিত আমরা এই নাটকে পাই। কিন্তু কোনোটাকেই আমার মনে হয় না যে রবীন্দ্রনাথ কোনো নির্দিষ্ট কথা বলতে চেয়েছেন। নাটক এগুচ্ছে সেখানেও কেবল কিছু ইঙ্গিত পাই। এবং এই ইঙ্গিতের কিছু কিছু আবার তাঁর আগের ইঙ্গিতকেই ডিফার করছে। যেমন, তিনিই চাচ্ছেন- ‘আমরা সবাই রাজা আমাদেরই রাজার রাজত্বে’ হবেন, আবার তিনিই যখন সুদর্শনার সাথে কথা বলছেন, তখন মনে হচ্ছে রাজা ডমিনেট করতে চাচ্ছে, এক ধরনের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ছবি আসে। তারও বাহক থাকে ঠাকুর দা’ হোক আর যে-ই হোক। মানে এই অদৃশ্য রাজা ক্ষমতায় এলেও একধরনের রাজাগিরি করবেন বলেই মাঝে মাঝে মনে হয়। ফলে রাজা নাটকটাকে হুট করে বলা যাচ্ছে না যে, এটা অমুক ধরনের নাটক বা এটাতে উনি অমুকটা বলতে চেয়েছেন। কমপ্লেক্সে ঠাসা। তো সেই কমপ্লেক্সটাকেই আমি এক্সপ্লোয়েট করছি বলে আমার কাছে মনে হয়েছে।

আজফার হোসেন
সে-জন্যই আমি বলতে চাচ্ছি যে, রবীন্দ্রনাথের একটা বড় টানাপোড়েন আছে এই নাটক-টাতে, বক্তব্যের দিক থেকে। এই জন্য এটা থেকে কোনো কংক্রিট সল্যুশন আমরা কিন্তু পাব না। ফলে আপনি যে ইঙ্গিতগুলো নিয়ে নিজের মত করে কিছু করতে চাচ্ছেন, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

বিপ্লব বালা
আমরা অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা শুনলাম। তো নির্দেশনার সাথে নিশ্চয়ই পোশাক, মিউজিক এগুলোর ডিজাইনেও কিছু নিরীক্ষা হচ্ছে। সেগুলো সম্পর্কে একটু জানতে চাই। মানে এই যে রাজা-র রাজাদেরকে জি-৭ এর সাথে মেলানো, তাহলে পোশাকের ব্যাপারটা কী দাঁড়াবে?

কাজী তৌফিকুল ইসলাম ইমন
পাভেল ভাই যেমন বললেন যে- নাটকরে স্ক্রীপ্টের উপর কাজ করতে উনি অনেক স্বাধীনতা নিয়েছেন, ঠিক তেমনি আমরা যারা অন্যান্য ডিজাইনের সাথে জড়িত, আমরাও কিন্তু অনেক স্বাধীনতা নিচ্ছি। এবং স্বাধীনতা যদি ঠিক মত কাজে লাগানো যায় তাহলে নতুন কোনো মাত্রা যোগ করা সম্ভব হবে। প্রথমত- রবীন্দ্রনাথের নাটক মানে অমুক ধরনের পোশাক পরবে, এমন একটা প্রি-কনসেপশন আমাদের মধ্যে আছেই। রবীন্দ্রনাথের গানে মিউজিক ইন্সট্রুমেন্ট ব্যবহারের ব্যাপারে আমরা জানি এমনই হবে বা তেমনই হবে। কিন্তু এর বাইরে গিয়ে স্বাধীনতা নিয়ে কিছু কাজ করলে আমার মনে হয় থিয়েটারের মজাটা পাওয়া যেতে পারে। যেমন মিউজিকে আমরা এখন ইয়াং জেনারেশন যেগুলো শুনতে অভ্যস্ত- র‌্যাম্প, রক এসব গান ব্যবহার করছি।

আজাদ আবুল কালাম
আমরা যেমন একটা ইংরেজি গান ব্যবহার করেছি। হুবহু- ক্রস ফায়ার গানটা। যুদ্ধের সময় এটা হবে।

আজফার হোসেন
এখন যা নিয়ে কথা উঠতে পারে তা হল এই যে, স্বাধীনতা জরুরি, কিন্তু স্বাধীনতার ব্যবহারটা আমরা কেমন করে করছি তা দেখা দরকার। কী পরিপ্রেক্ষিতে করছি। আরেকটা কথা হচ্ছে- পাভেলের কথায় যেটা বুঝলাম যে তারা একটা র‌্যাডিকেল ডিমেনশন তৈরি করার চেষ্টা করছেন, সাম্রাজ্যবাদের একটা অবয়ব এবং আয়তন তৈরি করতে চাচ্ছেন। তো, যদি সেটা মাথায় থাকে তাহলে কিছু সমস্যাও তৈরি হতে পারে। সেটা হলো যাকে আমরা চ্যালেঞ্জ করছি, যদি তাদের দেয়া কিছু রক, র‌্যাম্প ব্যবহার করি, এগুলোর যে কমোডিফিকেশন হয়েছে, পণ্যায়ন ইতোমধ্যে হয়ে গেছে, সেগুলো ব্যবহার করে তাদের মতাদর্শকে আমরা কতটুকু চ্যালেঞ্জ করতে পারবো?

বিপ্লব বালা
স্বাধীনতার নামে ব্যাপারটাকে তরল করে ফেলছি কিনা?

আজফার হোসেন
হ্যাঁ। কিন্তু এর অর্থ এই না যে, আমরা পাশ্চাত্যকে অন্ধভাবে বর্জন বা অন্ধভাবে গ্রহণ করছি। বরং আমরা বলছি পাশ্চাত্য থেকে যা-ই আসুক, তা-ই ভালো বা পাশ্চাত্য থেকে যা-ই আসুক তা-ই খারাপ- এই দুই জায়গা থেকে সরে দাঁড়াতে। জ্ঞানের উৎপাদনে ও বন্টনে পাশ্চাত্যের যে আধিপত্য আছে, সে-বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার।

আজাদ আবুল কালাম
আমরা যে ইংরেজি গানের কথা বললাম, কনটেম্পরারী মিউজিকের কথা বললাম বা পপ কালচারের কথা বললাম- সেটা কিন্তু পুরো নাটক জুড়ে আছে বা ব্যাপকভাবে আছে তা না, খুব সীমিতভাবে আছে। আরেকটা কথা সেটা হলো রাজা নাটকে যে রাষ্ট্রের কথা চিন্তা করা হয়েছে, সেটা আসলে কোন রাষ্ট্র? আদতে এই রাষ্ট্র কোথাও একজিস্ট করে কিনা এসব ভাবনাগুলো মাথায় কাজ করেছে। তো আমার নাটকের শুরুতে একজনকে দেখে নিউইয়র্কার মনে হতে পারে, একজনকে দেখে হয়তো মনে হবে ইন্ডিয়ান কেউ। নিউইয়র্কার বেগার, ইন্ডিয়ান বেগার।

বিপ্লব বালা
কিন্তু আপনার এখানে তো রাজারা জি-৭ এর রিপ্রেজেনটেটিভ হয়ে আসছে না?

আজফার হোসেন
মানে আপনি যদি ‘হাইব্রিডের’ খপ্পরে পড়ে যান তাহলে কিন্তু সমস্যা হবে। মানে নিউইয়র্কের একজন ভিক্ষুক, হত দরিদ্র আর একজন আদিবাসী হত দরিদ্রকে আপনি কতোটা মেলাতে পারবেন?

আজাদ আবুল কালাম
বেগার না, মানে স্ট্রীট বয়।

আজফার হোসেন
হোক, কিন্তু আপনি কি ঐ জায়গায় যেতে চান যে- সর্বহারাদের কোনো জাতি নেই? প্রশ্নটি তলিয়ে দেখা দরকার। এখানে আমি আমার সাথে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের একটা ভাবনা বিনিময়ের উল্লেখ করতে চাই। সেটা হলো, উনি একটা গল্পের খসড়া আমাকে শুনিয়েছিলেন, কিন্তু গল্পটা আর লিখতে পারেন নি। গল্পটা হলো বাংলাদেশের একটা ভিক্ষুকের স্বপ্ন নিয়ে। দিবাস্বপ্ন। তার স্বপ্ন কী? তার স্বপ্ন হলো সে বড় কিছু একটা হবে- সে নিউইয়র্কের একজন ভিক্ষুক হবে। ... তো ওর দৌড় হলো ঐটুকুই। অর্থাৎ স্বপ্নেরও যে একটা শ্রেণী সীমাবদ্ধতা থাকে এটাই তিনি আনতে চেয়েছিলেন। নিউইয়র্কের ভিক্ষুক আর বাংলাদেশের ভিক্ষুকের মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। আমার মনে হয় আপনি কাজে স্বাধীনতা নিবেন ঠিক আছে, কিন্তু মেট্রোপলিটন ক্ষমতার সাথে প্রান্তস্থ দেশগুলোর যে অসম ক্ষমতা-সম্পর্ক এবং একটা অসম উৎপাদন-সম্পর্ক আছে, সে ব্যাপারে সচেতন থাকাটা জরুরি। মানে আমরা যেন নির্মাণের স্বাধীনতা নিতে গিয়ে আধিপত্যবাদী জ্ঞান ও ক্ষমতার খপ্পরে না পড়ি।

আজাদ আবুল কালাম
আসলে একটা থিয়োরী এবং ভিশন জরুরি। সেক্ষেত্রে যেটা বললাম যে, প্রথমেই ধাক্কা খেলাম যে রবীন্দ্রনাথ কোন রাষ্ট্রের কথা বলছেন রাজা নাটকে? যেমন নাটকটা শুরুই হয় উৎসব দিয়ে, আবার শেষেও উৎসবের আহ্বান আছে। তো কোন জাতি উৎসব করে? তাহলে যে রাষ্ট্রের কথা চিন্তা করা হয়েছে, সেটা একটা উৎসবপ্রবণ জাতি কিনা। এখানে কিছু লোক বাইরে থেকে আসে, তারা এক রকম করে কথা বলে। আবার কেউ কেউ কথা বলে একেবারে চেনা ভাষায়। গ্রামীণ ঝগড়া করার মত লোকও খুঁজে পাই।

কাজী তৌফিকুল ইসলাম ইমন
এখানে নারীরাও ভিন্ন। রাতে বাইরে থাকে, তারাও উৎসবে মেতে ওঠে।

আজফার হোসেন
হ্যাঁ, তা ওঠে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ এ নাটকে যে উৎসব দেখিয়েছেন এবং মূল ভাবনায় যে রাষ্ট্রটাকে চিন্তা করেছেন, সেখানেও কিন্তু ফারাক আছে। রবীন্দ্রনাথের এই নাটকে রাষ্ট্র চিন্তা হলো- আমরা সবাই রাজা। কিন্তু এই উৎসবে নিুবর্গ আছে, রাজবর্গ আছে। এবং সবাই তাদের অবস্থান থেকেই উৎসবটা করছে। এবং তাদের কথাবার্তাও তাদের শ্রেণীচরিত্রকেই নির্দেশ করে। ফলে এখানে কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বোধ করি তাঁর নিজের ভেতরের ‘রাজা’কেও ভাঙতে পারছেন না। উনি যে গণতন্ত্র চাচ্ছেন, সেটা কিন্তু আবার পুঁজিবাদের গণতন্ত্রও না। উনি চাচ্ছেন ধূলি-কণার গণতন্ত্র। তো সেটা কিন্তু ... একটু আগেও যে বলা হলো যে- প্রণামে শেষ হওয়া বা রাণীর সাথে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রতিনিধির মতো সংলাপ বলা ... ইত্যাদি কিন্তু ‘আমরা সবাই রাজা’ হওয়ার ব্যাপারটাকে খারিজ করে দেয় বলে আমার ধারণা। অন্যদের ভিন্ন মত থাকতে পারে।

আজাদ আবুল কালাম
কিন্তু একজন দরিদ্র লোক যখন বলে- মোদের কিছু নাই রে নাই।’ তখন কিন্তু তার দারিদ্র্য নিয়ে তার যে খুব হা-পিত্যেশ আছে তা মনে হয় না। আবার যে বলে- ‘আমার দুটি সন্তান মারা গেছে’। তখন আরেকজন বলে- ‘আমার পাঁচজন মারা গেছে’। - সেখানেও কিন্তু তারা যে খুব বেদনায় ব্যাকুল হয়ে আছে তা মনে হয় না। ফলে উৎসবে নিুবর্গ আছে উচ্চবর্গ আছে, কিন্তু সবার ভেতরে কিন্তু আনন্দ আছে। ফলে এই নাটকের রাষ্ট্র চিন্তার সাথে উৎসবটাকে আমার বেখাপ্পা মনে হয় নি কখনো।

বিপ্লব বালা
এটাতো বাস্তবতাকে তুলে ধরতে চেয়েছেন, কিন্তু তুলে ধরে তিনি যে বাস্তবতা তৈরি করতে চান সেভাবে বলিয়েছেন। বাস্তবতাকে চ্যালেঞ্জ করে আরেক বাস্তবতা নির্মাণ করতে চেয়েছেন। দুঃখকে জয় করা বা দুঃখকে ধারণ করার যে ক্ষমতা, স্ট্রাগল, মানে ...

আজাদ আবুল কালাম
এবং যখন সুরঙ্গমা বলছে বাবার কাছে তার অত্যাচারিত হওয়ার কথা এবং সেজন্য রাজা যে শাস্তি দিয়েছে তার বাবাকে ... এগুলো যখন বলছে, তখনও কিন্তু সে বলছে যে- রাজা ঠিকই করেছে। মানে অন্যায় করলে তার শাস্তি দেবে রাষ্ট্র এবং সেটা মেনে নিতে হবে সে ব্যাপারটাও আছে।

বিপ্লব বালা
এটা হলো যে, যদি নর্মসকে কেউ আঘাত করে, নষ্ট করতে চায়, তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়াটা যেন ঠিক আছে ... মানে এটা মেনে নিতে হবে। কিন্তু পাভেল যে বললেন- রাষ্ট্র দ্বারা করিয়েছে তা তো মনে হয় না। এটা রাজা নাটকে রবীন্দ্রনাথের রাজা করেছে।

আজাদ আবুল কালাম
এই রাজাও তো কোনো না কোনো রাষ্ট্রেরই রাজা। তাকে দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু যখন বাইরে থেকে  অন্যরা আসে, এসে বলে- তোমাদের রাজা কোথায়- তার মানে তো এই অদৃশ্য রাজার রাষ্ট্র আছেই তাই না?

আজফার হোসেন
আমরা এমন একটা অবস্থায় এখন আছি যে- রাজা আছে আবার রাজা নেই, এই যে ডায়ালেকটিক, এই ডায়ালেকটিক-কে আমরা রবীন্দ্রনাথের সুবাদে খানিকটা এক্সপ্লোর করতে পারি। এর আগে আমরা আলো-অন্ধকার নিয়ে কথা বলেছি। এবং বলেছি যে- অন্ধকার মানেই খারাপ সেটাকে রবীন্দ্রনাথ খারিজ করেছেন। আবার এখন বলা যায় যে, তিনি এমন একটা রাষ্ট্রের কথা বলছেন, যে রাষ্ট্রটা নেই। এবং নেই বলেই সেই রাষ্ট্র নিয়ে ভাবনার অবকাশ থেকে যায়। যা নেই তার দরকার হয়। যা আছে তার দরকার পড়ে না। এমন একটা অবস্থা তিনি কিছুটা তৈরি করেছেন বটে।

আজাদ আবুল কালাম
অন্ধকারকে আমার মনে হয়েছে আনএক্সপ্লোর্ড জগতের কথা বলতে চেয়েছেন। মানে আলোতে আমরা যা দেখছি তো দেখছি এবং সেটাকেই বাস্তবতা বলছি। কিন্তু যা নেই তা কী নেই তা কি আমরা জানি? জানার আগ্রহ কি আমাদের আছে? আরো কী কী বাস্তবতা আছে যা আমরা দেখতে পাই না বলে বলছি তার অস্তিত্ব নাই? যা দেখছি তার বাইরে কোনো সত্য নাই? রবীন্দ্রনাথ বলছেন- আছে। সেটাকেই রবীন্দ্রনাথ অন্ধকার বলছেন এবং বলতে চাচ্ছেন অন্ধকারকে বরণ করে নিতে। কারণ ওটা আনএক্সপ্লোর্ড।

বিপ্লব বালা
রাজা-কে কি মনে হয় না, যে, এটা নেচারের একটা টোটালিটি, সেই টোটালিটিকে ধারণ করছে?

আজফার হোসেন
অবশ্যই। আলো-অন্ধকার মিলিয়ে যে সামূহিক বাস্তবতা তার অন্বেষণ আছে। তারপরও আমি বলবো তিনি অন্ধকারকে গুরুত্ব দিতে চান। যদিও আলো-অন্ধকার মিলিয়েই নেচার, তবুও তিনি অন্ধকারের জয়গান করতে চান। কালো নিয়ে তার যে দুর্বলতা সেটা কোথায় নেই? ‘সে যতই কালো হোক দেখেছি তার কালো হরিণ চোখ’ থেকে শুরু করে অজস্র কালোর জয়গান আমরা তাঁর কাছ থেকে পেয়েছি।

বিপ্লব বালা
এবং এই রাজাও কিন্তু কালো, কুৎসিত।

আজফার হোসেন
হ্যাঁ, তথাকথিত কুৎসিত এবং কালো। আমি আরো পরের কথা বলি। ষাটের দশকে পৃথিবীব্যাপী যে বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন হয়েছে সেখানে কালোর একটা সেলিব্রেশন আমরা লক্ষ্য করি। এবং এক  কালো কবি আমিরি বারাকার একটা কবিতার নাম ‘ব্ল্যাক ইজ বিউটিফুল’। এবং এই কবিতাটা এক সময় ম্যানিফেস্টো হয়ে গেল, স্লোগানে রূপান্তরিত হয়ে গেল। তারও আগে যদি যাই- তিরিশের দশকে নিগ্রিচিউড, নিগ্রোবাদ একটা মুভমেন্ট ছিল। সেটা মূলত চিন্তার ক্ষেত্রে, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে মুভমেন্ট, পরে অবশ্য রাজনৈতিক মুভমেন্টে পরিণত হয়েছিল, আফ্রিকায় এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলে ... সেখানে কালোকে সুন্দর হিসেবে সামনে আনার চেষ্টা চলেছে। তো এই যে কালো মানে অসুন্দর, কালো মানে কুৎসিত, কালো মানে অশুভ, কলঙ্ক এই যে কালোর কিছু সনাতন অর্থ তৈরি হয়েছে, তার বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ খানিকটা দাঁড়াচ্ছেন।

বিপ্লব বালা
এবং আমাদের সৌন্দর্যবোধের প্রধান ইডিয়ম তো কালো- কৃষ্ণ। চিকন কালা। কালোর সেলিব্রেশন তো এই প্রাচ্য করেছে চিরকাল। এবং কালোকে সুন্দর বলাটা একেবারে এদেশীয়। সেটাকে রবীন্দ্রনাথ যেখানে পেরেছেন সেখানেই এনেছেন।

আজফার হোসেন
তাহলে বিপ্লব দা, পাভেল, আমরা একটা জায়গায় যেতে পারি কিনা যে, আমারা রাজা নাটকটাকে বলছি খানিকটা উপনিবেশবাদ বিরোধী, এই উপনিবেশবাদের বিরোধিতা রবীন্দ্রনাথ যে-কোনোভাবেই করতে পারতেন, কিন্তু তিনি করেছেন কালোকে সামনে এনে। তার মানে কি এই দাঁড়াচ্ছে না যে উপনিবেশবাদ বিরোধিতা করতে হলে যে বর্ণবাদ বিরোধিতাও গুরুত্বপূর্ণ, এটার একটা প্রকাশ আমরা রাজা নাটকে পেয়ে যাচ্ছি?

বিপ্লব বালা
অবশ্যই। এবং কত আগের ভাবনা এগুলো, ভাবা যায়!

আজফার হোসেন
এখনও কিন্তু শাদা-রা ভাবে যে, তারা হলো শুদ্ধ, সত্য, তারা আলো আর আমরা যারা কালো, তারা অন্ধকারে আছি। এবং তারা মনে করছে- আমাদেরকে বোঝাবার জন্য, সভ্য করবার জন্য পশ্চিম থেকে আলো নিয়ে আসতে হবে। পশ্চিম যেন আমাদের প্রমিথিউস। এবং এখন আমি রিলেট করতে চাচ্ছি- পশ্চিমের যে আলো, সেই আলোতে যে বর্বরতা থাকে, সেটা কাঞ্চির ভেতর দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সুবাদে আমরা এখন নতুন করে দেখতে পারি।

বিপ্লব বালা
কালান্তরে কিন্তু তিনি বলছেন যে- ‘সভ্যতার ভবিষ্যৎ ঊষালগ্নে পূর্ব থেকেই আলোটা উঠবে।’

আজাদ আবুল কালাম
কিন্তু ‘অন্ধকার’ বলতে আমার মনে হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ‘কালো’ বলতে চান নি। একটা আনএক্সপ্লোর্ড ওয়ার্ল্ড বোঝাতে চেয়েছেন।

আজফার হোসেন
আনএক্সপ্লোর্ড ওয়ার্ল্ড বললে আবার একটা উপনিবেশবাদী অভিক্ষেপ থাকে সেখানে।

আজাদ আবুল কালাম
না, আমি চিন্তার জগতের ক্ষেত্রে বলছি। মানে যা দেখছি তার বাইরে যে সত্য আছে সেখানে উনি যেতে চেয়েছেন। সুদর্শনা তাকে না দেখেই বলছে যে- না সে তো অসুন্দর হতেই পারে না।- এবং সে কিন্তু ট্র্যাপে পড়ে যাচ্ছে আপাত সুন্দর একটা মানুষকে দেখে। সুবর্ণের বাইরের দিকটা দেখেই ...

বিপ্লব বালা
আমাকে একটু বলেন তো, সুবর্ণের ব্যাপারটা কীভাবে আনছেন। মানে ...

আজফার হোসেন
সুবর্ণ তো হলো একেবারে ... কী বলবো, মাকাল ফল।

বিপ্লব বালা
হ্যাঁ, একেবারেই। কিন্তু পাভেল কী ভেবেছেন তাকে নিয়ে, মানে কীভাবে আনছেন?

আজাদ আবুল কালাম
আমরা দেখিয়েছি ও হচ্ছে কনটেম্পোরারী একটা পণ্যের মডেল হয় যে, সেই মডেল। ওর কাপড়-চোপড়ও মডেল টাইপের।

বিপ্লব বালা
আমাদের দেশি ভাষায় এগুলোকে বলে ভাউরা। এবং চাইবো সুবর্ণকে দেখলে যেন আমাদের নপুংশক ‘ভাউরা’ লাগে।- যাদের আজ সর্বত্র দেখি- বাস্তবে, মঞ্চে, মিডিয়ায়।

আজাদ আবুল কালাম
হ্যাঁ, আমাদের চিন্তাটাও ঐরকম। কিন্তু দেখে আবার মডেল বলে শনাক্তও করতে পারবেন না।  আমাদের কিছু দেখেই কিন্তু চট করে বলতে পারবেন না যে এটা ঐটাই। আমরা কৃষ্ণকে পর্যন্ত আনছি, যখন সুদর্শনা তাকে শেষ পযন্ত সমর্পণ করছে তখন পেছনে কৃষ্ণের একটা ছায়ার মতো দেখতে পাবো। কিন্তু এটা কৃষ্ণই এমন আপনি বলতে পারবেন না। বুঝে নিতে হবে। আমরা  ফ্ল্যাগ এনেছি, আমেরিকান-ব্রিটিশ ফ্ল্যাগ। কিন্তু হুবহু না, দেখে বুঝবেন যে এগুলো ঐ দেশের ফ্ল্যাগ।

বিপ্লব বালা
কীর্তনের সুর ব্যবহার করছেন?

আজাদ আবুল কালাম
হ্যাঁ, আমরা বাঁশি, একতারা ব্যবহার করছি আবার গীটারও ব্যবহার করছি। মানে কখনো কখনো মনে হতে পারে ... ইদানিং আমাদের শিল্পে শব্দটা ব্যবহার হয় ‘ফিউশন’, তো এটাকে কখনো ফিউশন মনে হতে পারে কখনো হাইব্রিড মনে হতে পারে, কিন্তু এটা ফিউশনও না, হাইব্রিডও না। বরং এটা হচ্ছে রাজা নাটকে যতগুলো সম্ভাবনা আছে, সেই সম্ভাবনাগুলোকে একটা সূত্রে গাঁথার চেষ্টা করেছি।এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমি চিন্তার স্বাধীনতা নিয়েছি। কখনো কখনো কারো কাছে মনে হবে আমি এক্সপ্লোর করেছি। এবং আমার এখন স্ট্রাগলটা কিন্তু এটাই যে- এটাকে যেন হাইব্রিড মনে না হয়।

বিপ্লব বালা
কিন্তু এখনকার যে মার্কেট মিডিয়া কালচার, তার যে ল্যাঙ্গুয়েজ, সেটার সাথে কি এটার একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে যাচ্ছে? কী সে সম্পর্ক?

আজফার হোসেন
নাকি এ বাজার বা পুঁজিবাদের ক্রিটিক হিসেবে আসছে?

আজাদ আবুল কালাম
অনেকটা ক্রিটিক হিসেবে আসছে। তবে মিডিয়াটাকে আমরা কখনো কখনো পরিপূরক হিসেবে ব্যবহার করেছি। যখন দেখেছি মঞ্চে আমার ব্যাপারটা বোঝাতে পারছি না, তখন সেটা পরিপূরক হিসেবে এসেছে।

বিপ্লব বালা
‘বহুরূপী’ দল যখন এটা করে তখন তাদের একটা বক্তব্য ছিল এমন যে- রিয়েলিটির সাথে ইনডিভিজ্যুয়েলের যে সম্পর্ক ... মানে রবীন্দ্রনাথের একটা কমেন্ট আছে যে- রহহবৎ ফৎধসধ ড়ভ যঁসধহ ংড়ঁষ ...

আজফার হোসেন
হ্যাঁ, আরেকটা কথা আছে তাঁর, সেটা হলো- ও ধস রহঃবৎবংঃবফ রহ ঃযব ঢ়ষধু ড়ভ বসড়ঃরড়হং, হড়ঃ বাবহঃং- ঘটনা বড় কথা নয়, আসল কথা আবেগ অভিজ্ঞতা। আচ্ছা আমরা যে এতক্ষণ আলাপ করলাম, আমাদের কি মনে হয় না, রবীন্দ্রনাথের নাটকে ভাবনার ক্ষেত্রে তাঁর দোদুল্যমানতা প্রকাশ পায়?

আজাদ আবুল কালাম
অবশ্যই। এবং তাঁর ভেতরকার কনফেশন বলেন বা কনফিউশন বলেন বা ভাবনা বলেন একেক চরিত্রকে দিয়ে বলাচ্ছেন এবং কোথাও কিন্তু ছকে বাঁধা চিন্তা ভাবনা মনে হয় না। রাজা নাটকেও যদি ধরেন রাষ্ট্র সম্পর্কে বা রিলেশন সম্পর্কে ভাবনাগুলো যে পরিষ্কার তা না।

বিপ্লব বালা
মানে কোনো শেপ পায় না, বিক্ষিপ্ত মনে হয়?

আজফার হোসেন
প্রথম দ্বন্দ্বটা যেমন ধরা যাক তত্ত্বে¡র সাথে অনুশীলনের যে সম্পর্ক, সেই জায়গায়। এবং রবীন্দ্রনাথের লেখায় কিন্তু তত্ত্ব থাকে, কারণ তিনি তত্ত্ব পছন্দ করতেন। বিপ্লবদা’র সাথে একটু আগেই এই নিয়ে কথা বলছিলাম। তো, তত্ত্ব যে শিল্পের বাইরের কিছু না, এবং শিল্পও যে তত্ত্বের জন্য জরুরি অর্থাৎ তত্ত্বে ও শিল্পে যে ডায়ালেকটিক, এই ডায়ালেকটিকের নিরিখেও রবীন্দ্রনাথকে খানিকটা দেখা চলে।

বিপ্লব বালা
শিল্পে তত্ত্ব থাকবে এটাতো একবারে আমাদের দেশি ভাবনা।

আজফার হোসেন
হ্যাঁ, আমাদের চর্যাপদে কিন্তু তত্ত্ব আছে। এবং তত্ত্বের জন্যই কিন্তু কবিতা, গান, পদ এগুলোর সৃষ্টি। এবং রবীন্দ্রনাথ প্রতিনিয়তই আমাদের তত্ত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। এবং এই তত্ত্বের কারণে তার রচনার শিল্পমান যে ক্ষুণœ হচ্ছে তা-ও বলা যাবে না। তিনি বলছেন- ‘আমরা সবাই রাজা আমাদেরই রাজার রাজত্বে’। এটার মধ্যে কিন্তু রাষ্ট্রটা কেমন হবে তার তত্ত্ব আছে। কিন্তু যেটা প্রসঙ্গ হিসেবে এসেছে, আমরা মনে করছি যে- তাঁর এই তত্ত্ব দেয়াটা কিছুটা বিক্ষিপ্ত বা বিপ্লবদা’র ভাষায় ‘শেপ পায় না’-র জায়গায় চলে যাচ্ছে। যেমন এই নাটকেই সবাই রাজা হবে এমন একটা রাষ্ট্রের তত্ত্ব দিয়ে উনি যে হায়ারার্কি ভাঙার কথা বলছেন, শেষে কিন্তু আবার বড় ধরনের হায়ারার্কি তৈরির দিকেই যাচ্ছেন। সেই অন্ধকারের রাজাকে উনি মহিমান্বিত করছেন কিন্তু রাজাকে ঠিক ‘রাজা’র জায়গাতেই রাখছেন এবং প্রজাকে তিনি ‘প্রজা’র জায়গায়ই রাখছেন। রাজা-প্রজার যে অসম-ক্ষমতা সম্পর্ক, সেই অসম ক্ষমতা-সম্পর্ককে কিন্তু চূড়ান্ত দৃষ্টান্তেটিকিয়েই দিচ্ছেন। তাহলে ঠিক এই জায়গায় রাজা নাটকের ক্ষেত্রে আমাদের কোনো রাজনৈতিক সমালোচনা থাকাটা জরুরি না? পাভেল কী বলেন?

বিপ্লব বালা
এটা কিন্তু ওনার জীবনের বাস্তবতাতেও পাই। যেমন উনি শান্তি নিকেতনের স্কুলটা যেভাবে ভেবেছিলেন, সমবায় ব্যাংক করেছিলেন, কৃষিযন্ত্র ব্যবহার করেছিলেন, শ্রীনিকেতনে গ্রাম-নগরের বিনিময় চেয়েছিলেন ... শেষ পর্যন্ত কিন্তু সবটা ফেল করেছে। বলা যাবে না যে, একটা ইউটোপিয়ার জায়গা থেকে ভেবেছেন, উনি কিন্তু চেষ্টাও করেছেন। কিন্তু আবার ফেলও করেছেন।

আজাদ আবুল কালাম
একটা ব্যাপার যেটা আমার কাছে মনে হয় একজন শিল্পী আর একজন রাষ্ট্র চিন্তাবিদ, তাদের মধ্যে কোথাও না কোথাও একটা ফারাক আছে। যার ফলে উনি যখন রাষ্ট্রের চিন্তা করছেন এবং ‘সবাই রাজা’ হবে এমন রাষ্ট্রের কথা লিখতে চাচ্ছেন, তখন একটা অবচেতনভাবেই একটা পর্যায়ে উনি যে রাজার বাস্তবতায় বাস করছেন, সেই রাজাকেই উপস্থিত করাচ্ছেন বা স্ট্যাবলিস্ট করাচ্ছেন। এটা হচ্ছে শিল্পী হিসেবে উনি চিন্তার ক্ষেত্রে যেখানে যাচ্ছেন, লিখতে গিয়ে ঐ স্তরের রাষ্ট্র তিনি আমাদের দেখাতে পারছেন না। এটা চিন্তার ক্ষেত্রে তাঁর সীমাবদ্ধতা কিনা এটা আমার প্রশ্ন। কারণ, নাটকের একেবারে শেষ লাইনে সুদর্শনা যখন বলছে- ‘যাবার আগে আমার অন্ধকারের প্রভুকে, আমার নিষ্ঠুরকে, আমার ভয়ানককে প্রণাম করি নিই।’- তখন আমার মনে হয়েছে, এতক্ষণ যে রাজাকে তিনি নির্মাণ করতে চাইলেন, বাস্তবের রাজার বাইরে গিয়ে সেই রাজাকে হঠাৎ করেই আবার সাধারণ রাজার চরিত্রই পাইয়ে দিলেন। এখন আমার কথা যদি বলেন, তো আমার ডিজাইন হলো, এই লাইনটা আমি কেটে দিয়েছি।  আবার দেখেন শেষ দৃশ্যে একটু আগেই সুদর্শনা বলছে, রাজাকে, যে- ‘আমি তোমার চরণের দাসী, আমাকে সেবার অধিকার দাও।’- এই সংলাপগুলোও আমি কেটে দিয়েছি। কারণ, আমি নাটক যেভাবে শুরু করেছি এবং অন্ধকারের রাজাকে যেখানে নিয়ে গেছি, তারপর আর এই সংলাপগুলো যায় না।

আজফার হোসেন
আমি সেই জায়গাতেই যেতে চাচ্ছি। এভাবে যদি আপনি না ভাবেন বা না ডিজাইন করেন, তাহলে রবীন্দ্রনাথের চিন্তার সীমাবদ্ধতার কথা যেটা বললেন, সেই সীমাবদ্ধতাকে প্রশ্রয় দেয়া হয়। আরেকটা বিষয় ভাবা যায় কিনা, রাজা নাটকে নারী কীভাবে এসেছে? এই নাটকে একটিমাত্র চরিত্র পুরোপুরি জার্নি শেষ করেছে- সুদর্শনা। সুদর্শনাকে কেন্দ্রে রেখেই রবীন্দ্রনাথ বোধ ও অভিজ্ঞতার একটি বিশেষ জায়গায় পৌঁছতে পেরেছেন। কিন্তু এই নারী একজন পুরুষতন্ত্র শাসিত নারী। কারণ, যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে তাতে পুরুষতান্ত্রিকতা প্রকাশ পায়। যেমন খারাপ মেয়ে বোঝাবার জন্য তাকে- ‘প্রগলভা’ বলা হচ্ছে ইত্যাদি ... তো ...

আজাদ আবুল কালাম
এই শব্দটাও বাদ দেয়া হয়েছে।

আজফার হোসেন
হ্যাঁ, আপনার ডিজাইনের কথা বা ইন্টারপ্রেটেশন কিন্তু আমি আশাবাদী। কারণ আমাদের আগের টেক্সটগুলোতে যে র‌্যাডিক্যাল কনফিগারেশনগুলো আছে- সেগুলোকে সামনে আনার চেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অর্থাৎ র‌্যাডিকেলাইজ করা। রবীন্দ্রনাথকে র‌্যাডিকেলাইজ করা। আরেকটা আছে তাঁর এলিটিজম। এই নাটকে আমরা দেখি যে ভিক্ষুককে তিনি মহিমান্বিত করছেন। সেটা উনি করবেনই কারণ ওনার দর্শনের ভেতরেই এটা আছে- ভিক্ষুককে মহিমান্বিত করা। কিন্তু আবার যখন ঠাকুর দা’ বলছেন- ‘ছোট ভিক্ষুক বড় ভিক্ষুককে দেখেই রাজা মনে করে।’- তখন কিন্তু ভিক্ষুক যে ভিক্ষুকই, সে বড় হোক বা ছোট হোক, ভিক্ষুক যে কখনো রাজার সমতুল্য না, সেটা কিন্তু বেরিয়ে আসে। ঠাকুর দা’কে কিন্তু রাজার বাণীবাহক বলতে পারি আমরা। তো, সেই বাণীবাহক যদি এই উক্তি করেন তখন আমরা বুঝতে পারি যে, নিুবর্গের মানুষের সঙ্গে উচ্চবর্গের মানুষের চূড়ান্ত দৃষ্টান্তে মিল হচ্ছে না সেটাই বেরিয়ে আসে।

বিপ্লব বালা
নিুবর্গের মানুষের ভেতর তো বৈপ্লবিক চেতনা নেই। কী দিয়ে বড় একটা কিছু ঘটাবে?

আজফার হোসেন
সেটা অন্য ব্যাপার। কিন্তু আমি বলছি ভাষার যে ব্যবহার, প্রচলিত ভাষার ব্যবহার, যার দ্বারা এলিটিজম প্রকাশ পায়, সেগুলোকে প্রশ্ন করার কথা। যেমন তিরিশের দশকের ‘আধুনিকতাবাদী’ কবিদের সমালোচনা করতে গিয়ে একজন ক্রিটিক গালি দিচ্ছেন ... যদিও আমিও তিরিশের দশকের কবিদের সমালোচক, তাঁদের ইউরোপীয়ান আধুনিকতাবাদের জন্য ... যাক্, তো তাদের গালি দিতে গিয়ে তিনি বলছেন- ‘ওরা তো কারণিক, ওরা তো ক্লার্কের মতো কবিতা লিখছে।’- এই যে আদার বেপারী জাহাজের খবর নিতে পারবে না জাতীয় কথাগুলো কিন্তু আমাদের ভাষার ভেতরে ভেতরে ঢুকে আছে। এগুলো দিয়ে এলিটিজম প্রকাশ পায়। এগুলোকে যেন আমরা প্রশ্ন করি, সেটা দেখার দরকার আছে।

বিপ্লব বালা
কিন্তু আমাদের বৌদ্ধদের ভেতর যে ভিক্ষুবৃত্তি আছে সেটা কিন্তু ঠিক ভিক্ষা অর্থেই না ...

আজাদ আবুল কালাম
এই নাটকে যে ভিক্ষার কথা বলা হচ্ছে সেটা কিন্তু ক্ষমতা ভিক্ষা করা। আর দাদা যেটা বলছেন, সেই ভিক্ষাবৃত্তি আমাদের বাউল সমাজের ভিক্ষা। সেটা হলো একটা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সাথে মিশে যাওয়ার একটা ব্যাপার আছে।

বিপ্লব বালা
আচ্ছা লালনকে যদি ধরি, এই যে বাউলদের রিচ্যুয়াল, ছোট-বড় পরষ্পরকে প্রণাম করছে ... এই যে ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’ ... এই ভজনা কথাটাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

আজাদ আবুল কালাম
একটু আগে আজফার স্যার যে তত্ত্বের কথা বলছিলেন সেই সাথে যদি আমরা তত্ত্বের প্র্যাকটিসের কথা আনি তাহলে দেখা যাবে, লালন আমাদের কাছে অনেক বেশি স্পষ্ট। কোথাও কোনো ফাঁক খুঁজে পাবেন না। যেমন ধরুন, মানুষ ভজার কথা বলা হচ্ছে, আবার তার অন্যান্য সৃষ্টিতে এই ভজার জন্য কী কী প্র্যাকটিস করতে হবে তা-ও বলা আছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথে এটার কিছুটা অভাব আছে।

আজফার হোসেন
একটা আধিপত্যবাদবিরোধী তত্ত্ব ইন্টারনালাইজ করা এবং সেটা জীবন-যাপনের সাথে মিলিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে মনে হয় রবীন্দ্রনাথের বেলায় কিছুটা ঘাটতি ছিল।

বিপ্লব বালা
সেটা তো তাঁর পরিপার্শ্ব, এলিটিজম সব মিলিয়ে দেখতে হবে। সেখানে রবীন্দ্রনাথের কাছে সেটা আশা করা যায় না।

আজফার হোসেন
হ্যাঁ, আশা করা যায় না, কিন্তু প্রশ্ন তোলা যায়। আমরা সেই প্রশ্নটাই তুলছি। যেহেতু তত্ত্বের সাথে অনুশীলনের একটা ব্যাপার থেকে যায়। রবীন্দ্রনাথের যে বিশালত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেই প্রতিষ্ঠানের কাছে দু-একটা বিষয়ে প্রশ্ন বোধহয় করাই যায়।

আজাদ আবুল কালাম
আর যেহেতু লালনের প্রসঙ্গ আসলো, সেই জন্যই এই প্রশ্ন তোলা। কারণ লালনের বেলায় তত্ত্ব এবং সেই তত্ত্বের অনুশীলনের ছাপ আমরা পাই।

আজফার হোসেন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে দু-একটা কথা বলি। সেটি হচ্ছে, পৃথক রাষ্ট্রিক সত্তা হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর থেকে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে তা হলো- রাজনীতির সামরিকীকরণ ও সামরিক বাহিনীর রাজনীতিকীকরণ, রাজনীতির আমলাতান্ত্রিকীকরণ ও আমলাতন্ত্রের রাজনীতিকীকরণ, রাজনীতির সাম্প্রদায়িকীকরণ ও সাম্প্রদায়িক শক্তির রাজনীতিকীকরণ, রাজনীতির বাণিজ্যিকীকরণ ও বাণিজ্যের রাজনীতিকীকরণ- এধরনের ৪/৫ টা পরষ্পর-সম্পর্কিত ধারাই হচ্ছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। তো এই রাজনীতি-সংস্কৃতির সঙ্গে একটা অপজিশনাল সম্পর্কে কি রাজা নাটক আসতে পারে? আমরা যে শাসক শ্রেণীর উৎপাত লক্ষ্য করছি বছরের পর বছর, তো তারাও রাজা, শাসক। আবার রাজা নাটকের রাজারাও শাসক। কাঞ্চি আগেও ছিল এখনও আছে। তো কাঞ্চির কনটিনিউটিটা এখনো লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আপনার ডিজাইনে এই রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে কোনো অপজিশনাল সম্পর্ক কি আমরা পাব?

আজাদ আবুল কালাম
পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। কারণ, আমরা যে রাজা নাটকের অনেক কিছু কেটে-ছেঁটে ফেলেছি সেটা হয়তো এ কারণেই। আমরা যখন সুবর্ণকে দেখবো, তখন দেখা যাবে অল্প সময়ের মধ্যে সে একটা এলাহি কাণ্ড করে ফেলছে। স্টেজে এসেই দেখা যাবে- এই করে দেব, সেই করে ফেলবো ... সামনে পেছনে শান্ত্রীদের হুলুস্থূল ব্যাপার ... একে ধাক্কা দিচ্ছে, তাকে মারছে, মানে নাটকে যা আছে তার চেয়ে বাড়িয়ে দিচ্ছি আমরা। সুবর্ণকে দেখাচ্ছি যে, সে এসেই দেখিয়ে ফেলার ভাব করছে এবং আপনি যে রাজনীতি-সংস্কৃতির কথা বললেন, সেখানেও কিন্তু আমরা এই এসেই দেখিয়ে ফেলার ভাবটাই দেখেছি এতকাল।

আজফার হোসেন
কিন্তু সুবর্ণের চেয়ে কাঞ্চির ভূমিকাটা গুরুত্বপূর্ণ না? সুবর্ণ কিন্তু শেষমেশ কোনো আধিপত্যের জায়গায় যায় না, কিন্তু কাঞ্চি আমার ব্যাখ্যাত রাজনৈতিক সংস্কৃতির ধারাটা অনেকটাই রিপ্রেজেন্ট করে। কারণ, কাঞ্চির ভেতর সামরিকায়ন আছে, কাঞ্চির ভেতর আমলাতান্ত্রিক ব্যাপার আছে ... হায়ারার্কির ব্যাপার আছে- তুমি এটা করবে, তুমি সেটা করবে ... মানে লিড দেয়ার ব্যাপার আছে। কাঞ্চির ভেতর ষড়যন্ত্র আছে, তার ভেতর বাণিজ্য করার ব্যাপার আছে।

আজাদ আবুল কালাম
স্বয়ম্বর সভাটা তো বাণিজ্যই।

আজফার হোসেন
হ্যাঁ, পুরোপুরি বাণিজ্য।

বিপ্লব বালা
স্বয়ম্বর সভাটা কীভাবে করছেন, পাভেল?

আজাদ আবুল কালাম
আপাতত চিন্তা করেছি মিউজিক্যাল চেয়ার খেলাটা হবে। ৭ জন রাজা, চেয়ার থাকবে ৬ টা। সুদর্শনা হচ্ছে একেবারে বাণিজ্যের প্রতীক, একটা দেশের একটা পণ্য, দখল করার জন্য বা নিয়ে যাওয়ার জন্য আসছে। এটা হতে পারে তেল বা গ্যাস ... মানে এখনো ঠিক করি নি। কাঞ্চির ব্যাপারটা রবীন্দ্রনাথ শেষে যেটা করেছে, আমি সেটাও রাখতে পারি নি। কাঞ্চি সুদর্শনাকে ‘মা’ বলবে, এমন একটা জায়গায় আমি যেতে চাই নি।

আজফার হোসেন
আমি কাঞ্চির উপর এত জোর দিচ্ছি এজন্য যে, সুবর্ণ হচ্ছে কাঞ্চির অনেক রূপের মধ্যে একটা মাত্র রূপ। কাঞ্চির একটা এক্সটেনশন। কিন্তু শুধু সুবর্ণকে দিয়ে কাঞ্চিকে বোঝা যাবে না। কাঞ্চি অনেক পাওয়ারফুল। সে অনেক বেশি কিছু ধারণ করে এবং করেও দেখায়, এ্যাকশন আছে। আরেকটা কথা হলো রবীন্দ্রনাথের নাটক কিন্তু বেশ ডায়লগিক, ডিসকাস করা হয়, এ্যাকশন কম থাকে ...

বিপ্লব বালা
কিন্তু এই নাটকে বেশ এ্যাকশন আছে।

আজফার হোসেন
হ্যাঁ, আমি সেটা বলবো বলেই কথাটা টানলাম। এই নাটকে কিন্তু বেশ এ্যাকশন আছে- প্রাসাদে আগুন ধরানো, যুদ্ধ ইত্যাদি। এবং এগুলোতে মূল ভূমিকা পালন করে কাঞ্চি। ওর ভেতরে ক্যূ করার ব্যাপারও আছে। আরেকটা হচ্ছে, কাঞ্চিকে দিয়ে সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে তথাকথিত বুর্জোয়া জাতীয় শাসক শ্রেণীর যে যোগ, সেটা বোঝানো যেতে পারে। সাম্রাজ্যবাদ কিন্তু একা একা অপারেট করতে পারে না, তার ক্লাস-এলায়েন্স দরকার পড়ে, দেশে দেশে শাসক প্রয়োজন হয় যাদের দিয়ে সাম্রাজ্যবাদ কাজটা করবে। তাদেরকে ক্লাস-এলায়েন্স বা শ্রেণী জোট বলে। সেটা কাঞ্চির মাধ্যেমে দেখানো যেতে পারে।

বিপ্লব বালা
এ্যাক্টরদের সাথে আপনার ইন্টারেকশনটা কেমন হয়েছে? মানে আপনার ডিজাইনে তাদেরকে কনভিনস করানোর ব্যাপারটা কীভাবে করেছেন?

আজাদ আবুল কালাম
আমি একটা ওপেন জায়গা তৈরি করেছি। সব সময়ই ইন্টারেকশনের মধ্য দিয়েই যাচ্ছি। যেহেতু টেক্সট-টাকে অনেক কেটেছি, নতুন একটা ইন্টারপ্রেটেশন তৈরি করছি, সেহেতু পরস্পরের বোঝাপড়াটাও জরুরি। কারণ আমিও তো স্থির ছিলাম না যে কী করবো, কীভাবে করবো? একবার তো অনেক দিন রিহার্সেল বন্ধ ছিল, কারণ, আমার মনে হয়েছিল যা চিন্তা করেছিলাম সেখানে পৌঁছতে পারবো না। তো এজন্য বেশি ছাড় দিয়েছি ইন্টারেকশনের জায়গাটায়। না হলে এগুনো যাবে না। সব ব্যাপারে সবার ভাবনাকেই গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। প্রথমে ইন্টারপ্রেটেশনে যেখানে ছিলাম সেখান থেকে অনেক সরে এসেছি। এমন কি আজকে যে কথাগুলো হলো, সেগুলোও হয়তো আমি ইন-করপোরেট করবো আমার ডিজাইনে।

বিপ্লব বালা
আচ্ছা একটা বিষয় এখানে টানা যায় কিনা, সেটা হলো, আমরা নাটক ধরে কথা বলছি, তার নির্মাণে আপনার ভাবনাগুলো জানার চেষ্টা করছি ইত্যাদি। কিন্তু আমাদের দেশে থিয়েটার করতে গেলে কেবল ভাবনা-চিন্তা বা শৈল্পিক ব্যাপারটাই যথেষ্ট না। তার একটা সাংগঠনিক বা কী বলা যেতে পারে ... মানে এখানে টাকা-পয়সা জোগাড় করা, নিয়মিত সবাইকে জোগাড় করে মহড়া দেয়া ... এসবেরও একটা ধাক্কা আছে, সেটাকে কীভাবে দেখছেন? বা কীভাবে সামলাচ্ছেন?

আজাদ আবুল কালাম
আমার তো মনে হয় এতক্ষণ আমরা যা আলোচনা করলাম, সেখান থেকে আপনার প্রশ্নের পর এখন আসলে আমরা মূল আলোচনায় আসলাম হাঃ হাঃ। কারণ, ব্যাপারটা এক অর্থে ভয়ংকর। আমাদের ৫-৬ জন কর্মী এই টাকা-পয়সা কোত্থেকে জোগাড় হবে সেই কাজেই ব্যস্ত থাকছে সারাক্ষণ। তারা আবার পারফরমারও। আমার বাজেট প্রায় ৭ লাখ টাকা। কেউ যদি স্পনসর না করে তাহলে আমি যে ভিডিও-মিডিয়া ব্যবহার করবো ভাবছি, সেটাকে বাদ দিতে হবে। আর সেটাকে বাদ দিয়ে তার বিকল্প হিসেবে কী করবো সেটাও আমার মাথায় নাই। আমার এখানে পারফরমার আছে প্রায় ৩০ জন। এই ৩০ জনকে নিয়মিত রিহার্সেল রুমে আনা, রিহার্সেল করানো এগুলো আমাদের থিয়েটারে এখন সবচেয়ে বড় সংকট। সংকট এই অর্থে যে যদিও আমরা প্রফেশনাল থিয়েটারে যেতে পারি নি, তবু মানসিকতার দিক থেকে কিন্তু এখন এ্যামেচারও থাকতে পারি নি। মানে সারাদিন অফিস করবো আর অফিসের জামা-কাপড় পরেই সন্ধ্যায় একটু থিয়েটার করবো- এমন জায়গায় আমাদের দলের কেউ-ই নাই। তারা ভালো থিয়েটার করতে চায়। আমরা গত সপ্তাহে ৭ দিনই রিহার্সেল করেছি সকাল ১০ থেকে রাত ১০ টা পর্যন্ত। এখন এত পরিশ্রম করে যে প্রোডাকশনটা নামাবো, নামানোর পর দ্বিতীয় শো’ করার জন্য আমাকে আরো হয়তো ২ মাস বসে থাকতে হবে। কারণ, হল বরাদ্দের ব্যাপারটাই এমন যে, সেখানে একটা গণতন্ত্র মানা হয়- মানে সব দলকেই একটু একটু করে সুযোগ দেয়া হয়। সবাই চায় যে, বেশি কিছু করার দরকার নাই, একটু একটু কর। এই একটু একটু করতে করতে লক্ষ্য করবেন যে গত ১০/১৫ বছরে আমাদের থিয়েটারে কোনো বড় কাজ কিন্তু আসে নি।

বিপ্লব বালা
আমিও কিন্তু মাঝ মাঝে ভাবতাম যে আপনাদের নতুন নাটক নামছে না, বিশেষ করে আপনার নির্দেশনায় অনেক দিন হলো নাটক নামছে না। তো এটার কারণ কি সাংগঠনিক-অর্থনৈতিক যে সমস্যাগুলো ফেস করতে হয় সেই কারণে?

আজাদ আবুল কালাম
অবশ্যই। আর ধরুন এর মধ্যে নাটক নির্দেশনা দিই নি তা না। অন্য দলে দিয়েছি, গাইবান্ধায় দিয়েছি। সেখানে ঝামেলা কম। লোড কম নিতে হয়। শুধু কাজটার দিকে মনোযোগ দিলেই হয়। কে পোস্টার ছাপাবে, কে হল বুকিং দেবে এগুলোর ঝামেলা নাই। আর দলের ব্যাপার হচ্ছে- যদি ভালো কাজের কথা বলেন, তাহলে নাটক করা এখন আমি বলবো মুশকিলই হয়ে পড়েছে। মনে রাখবেন আমি ‘ভালো কাজ’ বলছি। ভালো কাজ করতে গেলে, এমন কি উদাহরণ হিসেবে ধরতে গেলে রাজা-কে যদি আমি ভালো কাজের মধ্যে ফেলি, তাহলে কত কিছু ফেস করতে হচ্ছে আমাকে। আমি যে ৭ লাখ টাকার কথা বললাম সেটা যদি বেশি মনে হয়, তাহলে সেটা অন্তত ৬ লাখ তো হবে? কোত্থেকে জোগাড় হবে? এত বড় একটা প্রোডাকশনের মান যদি আমি ধরে রাখতে চাই, তাহলে প্রতি মাসে অন্তত ৪-৫ টা শো করতে হবে। দর্শক আসুক না আসুক। আমার তো টানা ৭ দিন শো করা উচিত প্রথমেই। তাহলে আমাকে হল দেবে কে? এখন য্যানত্যান একটা প্রোডাকশন তো আমরা নামাবো না। এখানে প্রাচ্যনাট জড়িত, আমি জড়িত, রবীন্দ্রনাথ জড়িত। তো এই যে এত দিন নাটক নামাই নি, আমার মনে হয়েছে যে, কেন নামাবো, কে দেখবে নাটক? কয়টা শো হবে নাটকের? আমাদের কাজকে তো কাজ বলেই মনে করে না। এই যে এতগুলো ছেলে-মেয়ে এত দিন ধরে সময় দিচ্ছে, এবং কেবল গায়ে গতরে খেটে সময় দিচ্ছে তা তো না, মেধা দিচ্ছে ... বা এই যে ধরুন আজকে আমরা যে আলোচনাটা করছি, সেটা তো বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা- তো এই চর্চাটা অন্য কোনো প্রফেশনাল কাজ থেকে কম নাকি? একটা নাটক যেন ভালো হয় সেজন্য এই চর্চাগুলোও তো করতে হয়। এখনকার বাজারে এই চর্চার কী মূল্য আছে বলেন? তো কেন করবো নাটক, সেটাই তো এখন প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আজফার হোসেন
তাহলে এ মুহূর্তে প্রোডাকশন করতে গিয়ে আপনি মূল সমস্যা হিসেবে কী কী চিহ্নিত করতে চান?

আজাদ আবুল কালাম
একটা হলো স্পনসর পাওয়া। এটা এখন অনেক বড় সমস্যা। আরেকটা বড় সমস্যা হলো হল সমস্যা। হল সমস্যাটা মানে হলো, আমি চাই উদ্বোধনী শো-র পর টানা ৭ দিন আমি শো করবো। পরের মাস থেকে অন্তত টানা ৩-৪ দিন শো করবো। এটা একটা নাটকের, বিশেষ করে এমন বড় নাটকের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমি এতদিন হল পাবো না। আগেই বলেছি কীভাবে হল বরাদ্দ দেয়া হয়। আরেকটা সমস্যা আছে, কিন্তু এটা সব দলেরই দলীয় সমস্যা এবং হয়তো-বা বাস্তবতাও যে, অনেক পারফরমার নিয়ে নাটক করলে সবাইকে নিয়মিত মহড়ায় হাজির করানোটা কঠিন। সবাই ব্যস্ত। তবু এটা হয়তো ম্যানেজ করা যায় কিন্তু আগের দুটো সমস্যার সমাধান তো আমাদের হাতে না।

বিপ্লব বালা
আমি নাটক প্রসঙ্গে ফিরে যাই। আমার একটা জানতে চাওয়া যে, এই নাটক দেখার পর কি আমরা অন্য এক রবীন্দ্রনাথকে দেখতে পাবো, যেটা আপনার বানানো না, একটা আবিষ্কারও বটে? এভাবে দেখবো?

আজাদ আবুল কালাম
এটা আমি এক কথায় বলতে পারবো না। তবে এটুকু বলতে পারি, আমরা যেটা করছি সেটা রবীন্দ্রনাথের বাইরে কিছু না। দর্শক হয়তো গতানুগতিক রবীন্দ্রনাথের বাইরে কিছু দেখবে। কিন্তু আমি বলবো রবীন্দ্রনাথের ভেতরে এগুলো ছিল, আমি আমার মত করে তাঁকে প্রকাশ করেছি।

আজফার হোসেন
আপনি যদি রবীন্দ্রনাথের প্রতি বিশ্বস্তও থাকেন, তাহলেও সম্ভব অন্য এক রবীন্দ্রনাথ বেরিয়ে আসা। কারণ, টেক্সটের সাথে পারফরমেন্সের যে সম্পর্ক, সেই সম্পর্কের কারণে ... মানে যেহেতু পারফরমেন্স টেক্সটকে রি-ক্রিয়েট করে, সেহেতু নতুন কিছু বেরিয়ে আসাটাই সম্ভব। যদি নির্দেশক স্বয়ং নাট্যকারও হন, তাহলেও পারফরমেন্সের পর নাটকটি টেক্সট হিসেবে বদলে যেতে পারে।  

এ নাটক সম্পর্কে বলতে গেলে বলবো পাভেল এখনও একটা প্রসেসের মধ্যে আছে। রাজা নিয়ে তার ইন্টারপ্রেটেশন বিভিন্ন সময় বাঁক নিচ্ছে। পারফরমারদের সঙ্গে যখন সে আলোচনায় বসে, তখনও বাঁক নিচ্ছে। এভাবে চলতে চলতে এক সময় নাটকটা দাঁড়াবে। কিন্তু দাঁড়াবার পর যখন মঞ্চে আসবে, তখন দর্শক একটা প্রি-কনসেপশন নিয়ে ঢুকবেন। প্রি-কনসেপশন মানে, দর্শক হয়তো রাজা নাটকের পাঠক ছিলেন এদ্দিন। এবং একেক দর্শক নাটক পাঠের পর একেকটা ইন্টারপ্রেটেশন দাঁড় করিয়েছেন। এখন দর্শক এসে পাভেলের ইন্টারপ্রেটেশনের সাথে যাবেন কিনা বা সবাই যাবেন কিনা এটা বলা মুশকিল। সুতরাং বিপ্লবদা’ যে বললেন যে, এটা পাভেলের আবিষ্কার হবে কিনা বা পাভেল যে বললেন- দর্শক রবীন্দ্রনাথকেই পাবে- আমার মনে হয় এভাবে শেষ কথা বলা যাবে না।

বিপ্লব বালা
কস্টিউমের ব্যাপারে আলোচনাটা শেষ হয় নি। একটু শুনি?

কাজী তৌফিকুল ইসলাম ইমন
আসলে নাটকের ডিজাইনটা তো একদম প্রথাগত রবীন্দ্রনাথ হচ্ছে না। প্রথাগত মিউজিক হচ্ছে না, নাচ হচ্ছে না, সেখানে কস্টিউমেও প্রথাগত ডিজাইনের বাইরেও কিছু করছি। যেমন যখন আমরা ৭ রাজাকে জি-৭ এর রিপ্রেজেন্ট করাচ্ছি, তখন আসলে বিভিন্ন দেশের একটা ছাপ থাকবে। আবার যখন কাঞ্চিরাজ কাঞ্চিরাজের ভূমিকায় থাকবে তখন রাজার কস্টিউম। গ্রামবাসীদের প্রথাগত গ্রামীণ পোশাক- এসব আর কি। মানে একটা মিশ্রণ থাকবে। তবে উৎসবের জায়গাগুলোতে বেশ রঙ ব্যবহার করা হবে।

বিপ্লব বালা
সেট ডিজাইন?

আজাদ আবুল কালাম
মূল মঞ্চ আমরা যেটা পাই সেখান থেকে সোজা দর্শকের মাঝখান দিয়ে একটা স্পেস তৈরি হবে, যেখানে ক্যাটওয়াক করবে, র‌্যাম্প করবে। দর্শক বসবে তিন দিকে। কিছু কাজ মূল মঞ্চে হবে, কিছু কাজ সামনে ফ্লোরে বেরিয়ে আসা স্পেসটাতে হবে। অনেক কাপড়ের ব্যবহার আছে।  

বিপ্লব বালা
নাটক নিয়ে যে কথাগুলো বলা হলো এবং মহড়া যা দেখলাম, তাতে বোঝা যায় যে রাজা-র একটা রাজনৈতিক ইন্টারপ্রেটেশন থাকছে। কিন্তু আমার মনে হয়েছে- এন্টাগনিস্টরা একেজন যে চরিত্র পাচ্ছে, বিপরীতে প্রোটাগনিস্টরা কোনো চরিত্রই হয়ে উঠছে না। না রাজা, না সুরঙ্গমা না কোনো গ্রামবাসী। মানে, মনে হচ্ছে এন্টাগনিস্টদেরকে চড়া করতে গিয়ে প্রোটাগনিস্টদের দিকে তেমন নজরই দেয়া হয় নি।

আজফার হোসেন
মূল নাটকে, আমরা চরিত্র বলতে যা বুঝি, সনাতন অর্থে- সেটা হলো সুদর্শনার চরিত্র। সুদর্শনার ভেতরে আমরা পরিবর্তন লক্ষ্য করি। সুদর্শনার এক ধরনের অভিযাত্রা আমরা নাটকে লক্ষ্য করি। এই নাটকে একাধিক ফ্ল্যাট ক্যারেক্টরও আমরা দেখি। মানে চরিত্রগুলো পরিবর্তনহীন।  তারা বিশেষ বিশেষ বৈশিষ্ট্য নিয়ে একই অবস্থায় বিরাজ করে। পাভেল আপনি এ বিষয়ে কী ভাবছেন?

আজাদ আবুল কালাম
আমি মনে হয় আপনাদের দুজনের কথা ধরেই বলি। প্রথমত আপনারা ২ দিন যে রিহার্সেলের অংশ বিশেষ দেখেছেন তা খুবই খণ্ড খণ্ড। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত যে সুতোয় গাঁথার ব্যাপারটা আছে সেটা নিয়ে তো প্রতিনিয়তই ভাবছি। ভাবনার পরিবর্তনও হচ্ছে। তারপরও পুরো নাটকটার কোন কোন অংশের রিহার্সেল দেখানো যেতে পারে সেটাও আমি ঠিক জানি না। ফলে আপনারা যা দেখেছেন, সেখান থেকে প্রশ্ন ওঠাটা স্বাভাবিক যে আমি আসলে চরিত্রগুলো তৈরি করছি কিনা, বা করলে ব্যাখ্যা কী দাঁড় করাচ্ছি ইত্যাদি।

বিপ্লব বালা
না, মহড়া পুরোটা দেখানোর দরকার নাই। আপনার ভাবনাটা শুনতে চাচ্ছি। রাণী সুদর্শনার বেলায় আপনার ভাবনাটা কী?

আজাদ আবুল কালাম
নাটকে ওরই একমাত্র জার্নি আছে। এই জার্নিটাকে আমি গুরুত্ব দিয়েছি ...

বিপ্লব বালা
সেটা কী এ সময়ের রিয়েলিটির উপর দাঁড়িয়ে কিনা?

আজাদ আবুল কালাম
হ্যাঁ। জার্নিটা হচ্ছে- একটা মিথ্যা থেকে একটা সত্যের কাছে যাওয়া বা সত্য নামে কিছু আছে কিনা সেদিকে যাওয়ার চেষ্টা করা। সেখানে মূলা নাটকের সাথে আমি কিছুটা ডিফার করেছি, যেটা আগেও বললাম যে, সত্যের দিকে যেতে পরে যখন রবীন্দ্রনাথ আবার তাকে দিয়ে প্রণাম করান বা কাঞ্চিকে দিয়ে ‘মা’ ডাক শোনান, সেটা আমি রাখছি না। জার্নির প্রথমেই আছে যে সে ক্যাট ওয়াক করছে। এমন কি রবীন্দ্রনাথও যে রহস্য সুদর্শনাকে দিয়ে করান নি আমি সেটা করিয়েছি। সে প্রথমেই একজন কন্টেম্পরারী মহিলা হয়ে যায়- যার কিনা সব কিছু প্রয়োজন।

বিপ্লব বালা
কীসের অর্থে?

আজাদ আবুল কালাম
ভোগের অর্থে। চোখের দেখাকে যে গুরুত্ব দেবে। সুবর্ণকেই যার ভালো লাগবে কারণ, সুবর্ণ দেখতে তথাকথিত সুন্দর। ভোগের জায়গা থেকে সুদর্শনার যে লালসা, সেটাকে এখনকার ভোগ বিলাসী কোনো মানুষের সাথে মেলানোটা কঠিন কিছু না।

আজফার হোসেন
কিন্তু নারী ও পুরুষের মধ্যে যে অসম ক্ষমতা- সম্পর্ক, সেই অসম ক্ষমতা-সম্পর্ককে যদি সামনে না আনি তাহলে এই ভোগবাদী নারী তৈরি করাটা ...

আজাদ আবুল কালাম
না, সেখানে আবার রাজা ও সুদর্শনার যে সম্পর্ক, একটা এক্সটেন্ডে রাজা কিন্তু ভীষণ পুরুষ। এবং সেই পুরুষকে আমি পুরুষ হিসেবেই দেখিয়েছি।

বিপ্লব বালা
তাহলে অন্যান্য যে রাজারা আছে, কাঞ্চিরাজ বা আরো ৬ জন, তাদের সাথে এই রাজার রিলেশন কী? ঐ পুরুষ আর এই পুরুষের মধ্যে রিলেশনটা কী?

আজফার হোসেন
আমাদের আগের আলোচনাতেই কথাটা এসেছে যে, রাজা নাটকের রাজা বাস্তবতার এক ধরনের টোটালিটিকে সামনে আনার চেষ্টা করেছেন, যদিও এ-টোটালিটি মোটেই সর্বগ্রাসী নয়। আমরা বলেছি যে, এই রাজাকে অন্ধকারে রাখা হয়েছে, কালো দেখানো হয়েছে, ভয়ংকর বলা হয়েছে ইত্যাদি। রাজার এ-ধরনের চিত্রায়নে রবীন্দ্রনাথ কিছু কিছু সনাতন ধারণার বৃত্তকে ভাঙতে পেরেছেন বটে। কিন্তু এখন যদি আপনি এই রাজাকে পুরুষতান্ত্রিক হিসেবে উপস্থিত করেন- আর পুরুষতন্ত্র তো বিভিন্নভাবেই কাজ করে যাচ্ছে- তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়ায়?

আজাদ আবুল কালাম
পুরুষতান্ত্রিক কিন্তু যখন সুদর্শনার সাথে তার আচরণ হচ্ছে কেবল তখন।

আজফার হোসেন
তাহলে আপনার ব্যাখ্যা কি এই যে, এই রাজা অন্যান্য রাজার চেয়ে আলাদা হলেও, উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে হলেও, এমন কি বর্ণবাদের বিরুদ্ধে হলেও, শেষ পর্যন্ত পুরুষতন্ত্রকে অতিক্রম করতে পারছে না?

বিপ্লব বালা
তাহলে এ নাটক ভীষণ জটিলতায় ফেলে দেবে না?

আজফার হোসেন
জটিলতার ব্যাপারে আমার কথা হচ্ছে- আমরা আলোচনাতে পেয়েছি যে, রবীন্দ্রনাথও ব্যাপারটাকে অতিক্রম করতে পারেন নি। ফলে শেষে প্রণাম আসে, নারীকে প্রগলভা বলা হচ্ছে ... কিন্তু আমার কথা পাভেলের কাছে, সেটা হলো আমরা কি ডিজাইনের সময় এগুলোকে প্রশ্ন করবো না? না হলে আপনি শেষে যে প্রণাম আছে, সেটাকে বাদ দিচ্ছেন কেন?

আজাদ আবুল কালাম
রাজার এই ব্যাপারটা ভিজ্যুয়ালি যে খুব হাইলাইটেড হবে তা না। যদি কেউ বুঝে ফেলে তাহলে বুঝে ফেলবে। পুরো নাটকের একটা ক্ষুদ্র অংশের কথা বললাম, রাজাকে সুদর্শনার সাথে মাঝে মাঝে পুরুষ মনে হতে পারে। আরেকটা হচ্ছে, সুদর্শনাকে আমি দেখাচ্ছি একেবারে এখনকার ভোগবাদী চরিত্র। এবং একারণে তার অনেক আচরণ অন্যান্য রাজাদের, কাঞ্চিরাজাদের কাছাকাছি। কাঞ্চিরা যেমন ক্ষমতা চায়, দখল চায়, যেকোনো উপায়ে। তেমনি সুদর্শনাও সনাতন আলো চায়, এবং সেই আলো পাওয়ার জন্য সে ঘর থেকে বেরিয়ে একটা মাকাল ফলকে মালা দেয়।

বিপ্লব বালা
কিন্তু অন্ধকারের রাজাকে আপনি কীভাবে নির্মাণ করবেন, যেন এই সময়ের কিছু মনে হয়। রাণীকে দেখলে এই সময়ের ভোগবাদীদের কথা মনে হবে, কাঞ্চিরাজাদের দেখলে সাম্রাজ্যবাদ বা সন্ত্রাসী মনে হবে, সেখানে প্রকৃত রাজার মধ্যে আপনি কী রাখছেন যেন দেখে বুঝি এ হলো সবাইকে রাজা তৈরি করবার রাজা, এমন রাষ্ট্র সে তৈরি করতে চায় যেখানে সবাই রাজা হবে। কিছু একটা বের করতে হবে না, তার কথার ভেতর দিয়ে বা যেভাবেই হোক? কারণ আমাদের ভেতরেও তো সেই রাজাটা আছে, না হলে আমরা এত বিশ্লেষণে যেতাম না। তাহলে কী করে অন্ধকারের রাজা আমাদের মনের ভেতরকার রাজা হবে? এই সময়ের কোনো আর্কেটাইপ বের করতে হবে না?

আজাদ আবুল কালাম
একটা ব্যাপার হচ্ছে, যা বাস্তবতায় দেখতে পাচ্ছেন, কোনো চরিত্রকে সেই রূপ দিলে সহজে বোঝা যাবে। কিন্তু যে চরিত্র আপনার অভিজ্ঞতায় নাই তার আর্কেটাইপ বের করা মুশকিল। আমাদের ইন্টারপ্রেটেশনে এখনো মাঝে মাঝে প্রশ্ন ওঠে যে, আদতে কোনো রাজা আছে কিনা? নাকি সব কথাই আসলে আমরা অবচেতনভাবেই বলছি? কেন কথাটা বললাম, সেটা হলো- এমন একটা রাষ্ট্র তো আমাদের কামনার মধ্যে আছে, প্রসেসের মধ্যে নাই। প্রসেসের মধ্যে না থাকলে চেনা আর্কেটাইপ আপনি কোথায় পাবেন? সেই জন্যই প্রথমে যে বলা হলো যে এন্টাগনিস্ট আর প্রোটাগনিস্ট, সেখানে আমার প্রোটাগনিস্ট কিন্তু কেবল রাজা, ঠাকুর দা’-ই না, জনগণও। এবং জনগণই আসলে মূল প্রোটাগনিস্ট।

বিপ্লব বালা
আমার কিন্তু একটা সংশয় আছে, সেটা হলো এখন বাজার দ্বারা সব কিছু যখন এবিউজড হচ্ছে, আমার চাল-চলন, মিউজিক সব কিছু যেভাবে ওয়েস্টার্নাইজড হচ্ছে, সেখানে আপনার ডিজাইন দেখে মনে হচ্ছে আপনি এগুলোর বিরুদ্ধে ফাইট দেয়ার কোনো জায়গা তৈরি করছেন না।

আজফার হোসেন
আমি আমার প্রতিক্রিয়াটা এভাবে ব্যক্ত করতে চাই যে, আজকে আমি রিহার্সেলের যে খণ্ড খণ্ড অংশ দেখলাম, মিউজিকের কিছু বিট দেখলাম, নাচ দেখলাম- সেগুলো দেখে কিন্তু আমার কাছে ওয়েস্টার্নাইজড মনে হয় নি। এখানে একটা এক্সপেরিমেন্ট আছে ...

বিপ্লব বালা
এক্সপেরিমেন্ট করে কারো সাথে তো ফাইট দিতে হবে, আপনি নিজেই যদি এবিউজড হয়ে যান তাহলে তো চলবে না।

আজফার হোসেন
না, নাটক কার সাথে ফাইট দেবে, সেটা কিন্তু সমগ্র নাটকের মধ্য দিয়ে আসবে। খণ্ড খণ্ড-ভাবে দেখলে সেটা বোঝা যাবে না। এখন আমি মিউজিক আর নাচে যেটা পেয়েছি, সেটা হলো একটা ইলাস্ট্রেশন আছে, বাস্তবতাকে ইলাস্ট্রেট করার ব্যাপার আছে এবং এই বাস্তবতাকে ইলাস্ট্রেশনের ভেতর দিয়ে বাস্তবতাকে ভাঙতে চাইছেন, বাস্তবতাটাকে বদলাতেও চাচ্ছেন।

বিপ্লব বালা
কিন্তু বদলানোর তো কোনো কাউন্টার পয়েন্ট লাগবে।

আজাদ আবুল কালাম
এখানে আমার কথা হলো- আমার ভাবনাটা কিন্তু টোটালিটি নিয়ে। আমি প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত কী হবে সেটা ভাবছি। কোনো একটা মিউজিক বা নাচ যখন খণ্ডিতভাবে আপনি দেখছেন, সেখানে আমি জানি যে এটার পরম্পরাটা কোথায়, আপনি হয়তো দেখছেন না। এখানে যে ইন্সট্রুমেন্টের কথা বললেন- আমার কথা হচ্ছে সেখানে আজকে যা যা ছিল তার বাইরেও অনেক কিছু আছে। একতারা আছে, বাঁশি আছে, খঞ্জরি-মন্দিরা আছে, ইন্ডিয়ান একটা ইন্সট্রুমেন্ট আছে- মাটিতে বানানো, তাল দেয়া যায় ... তো এগুলো কিন্তু মিউজিকের মূল ইনস্ট্রুমেন্ট। আমার মিউজিকও কিন্তু প্রোটাগনিস্ট।

বিপ্লব বালা
আমার কাছে কিন্তু তা মনে হলো না। আপনার বিট থেকে শুরু করে সবই ওয়েস্টার্ন।

আজাদ আবুল কালাম
আমি আবারো বলছি- আপনি খণ্ডিত অংশের কথা বলছেন। যেখানে ওয়েস্টার্ন মনে হয়েছে সেটার পরে কী আছে আগে কী আছে সেটাতো দেখাতে পারি নি। যেমন আমি বলি- যুদ্ধের সময় আমি একটা ইংরেজি গান ব্যবহার করেছি যেটার কথা আগেই বলেছি, ক্রস ফায়ার গানটা, তো সেই গানটা গাইছে ঠাকুর দা’। এবং গানটার অর্থ হচ্ছে - আমরা এমন একটা পরিস্থিতিতে বাস করছি, যেখানে আমরা ক্রস ফায়ারের শিকার।

বিপ্লব বালা
কিন্তু ঠাকুর দা’-কে দিয়ে এই গান গাওয়ালে কেমন হবে, সে তো একবারে আমাদের চেনা বাউল, একটা ইডিয়ম আছে না?

আজাদ আবুল কালাম
সময় সময় তাকে বাউল মনে হবে, সময় সময় তাকে নাগরিক মনে হবে। আমি নিজেও যখন খণ্ড খণ্ড দৃশ্য করি তখন আমার কাছে মনে হয়- না, এ দৃশ্যটা এভাবে করলে হবে না, কারণ এর আগে বা পরে আমার যে ভাবনা আছে সেটার সাথে এটা যাচ্ছে না। তখন আমি কেটে দেই। এখন তো আমি এই কাটা-ছেঁড়ার মধ্যেই আছি। নাটক আসলে তৈরি হয় শেষ ১৫ দিনে। এবং আমার মনে হয় টেকনিক্যাল শো-র পরে বোঝা যায় নাটকটা আসলে কী দাঁড়ালো।

বিপ্লব বালা
সুদর্শনার ইন্টারপ্রেটেশন আপনি যেভাবে বললেন, আলোচনায়, মহড়ায় কিন্তু তার ছাপ নাই। সে যে অহঙ্কারী, সে যে এই বাজারে একজন ভোগ-প্রিয় নারী- তা কিন্তু আসে নি।

আজাদ আবুল কালাম
তা আসে নি কারণ, মিমি মাত্র ঢুকছে তার চরিত্রে। এই চরিত্র কিন্তু আমাদের দলে ঋতু নামে একজন অভিনেত্রী আছে সে-ও করবে, অলটারনেটিভ। কিছু শো মিমি করবে, কিছু শো ঋতু করবে।

বিপ্লব বালা
মিমিকে যে আনলেন দলের কোনো ক্ষতি হবে না?

আজাদ আবুল কালাম
মনে হয় না। মিমি আসলে অনেক দিন ধরে চাচ্ছিল আমার সাথে একটা কাজ করবে। আমাদের দলের সাথে তার একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিং-ও আছে। যদি চরিত্রটা ধারণ করতে পারে তাহলেই করবে, দেখা যাক।

বিপ্লব বালা
সুরঙ্গমা যে করছে, তাকেও কিন্তু কিছুটা বেখাপ্পা লাগছে। মানে সুরঙ্গমা করতে একটু ম্যাচিউরড হতে হবে না? সেই চরিত্রটা ধরার জন্য বিভিন্ন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাওয়া কাউকে লাগবে তো।

আজাদ আবুল কালাম
যাকে দেখেছেন সে করবে না। করবে পিপ নামের অভিনেত্রী।

বিপ্লব বালা
আমি আপনাকে কয়েকটা ব্যাপার লক্ষ্য রাখতে বলবো- রাজাকে, অন্ধকারের রাজাকে যেন আমরা চিনতে পারি, প্রোটাগনিস্ট হিসেবে, আমাদের ভেতরে যে প্রোটাগনিস্ট ক্যারেক্টার লুকিয়ে আছে সেটা যেন রাজার সংলাপ প্রক্ষেপণ, বাচন সব কিছুতে পাই। আর হচ্ছে, সুদর্শনাকে

অনেক স্মার্ট হতে হবে। সে এই বাজারের একজন মক্ষীরাণী, ভোগ চায় কেবল- এমন হতে হবে। সুবর্ণের মতো একটা আলু-পটলকে পছন্দ করে ফেলে, বোঝেন না কী চায় সে? চোখের দেখা সৌন্দর্য চায় সে- এমন একজন হতে হবে। সে ধরনের চরিত্র কিন্তু আমাদের চেনা-জানার মধ্যে আছে। সেখান থেকে নিতে পারেন আপনি।

আজাদ আবুল কালাম
অবশ্যই। সুদর্শনা সুবর্ণকে দেখে পটে যায়, কত অল্পতে সে পটে যায়! এটা আমার মাথায় আছে। আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে, নাটকটা এখন একটা প্রসেসের মধ্যে আছে। এই যে আপনারা কথা বলছেন, মতামত দিচ্ছেন, সেগুলোর যা যা মনে হবে আমার ডিজাইনকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, সেগুলোও কিন্তু এখন ঢুকাবো, ভাবনায়, কাজে।

আজফার হোসেন
সুদর্শনা সুবর্ণকে দেখে কেন পটে যায়? সেটা একটা প্রশ্ন। সেটা কি সুদর্শনার একারই দোষ?

আজাদ আবুল কালাম
না। আসলে মার্কেট সমাজকে বোঝায় যে এটা হলো সৌন্দর্য। সুবর্ণ হলো সুন্দর, এটাই তোমাদের মানতে হবে, তাহলে তোমাদের ভালো হবে। ব্যস, রাণীও মার্কেটের কাছেই পটে যায়।

বিপ্লব বালা
পাভেল আপনি মিউজিকের দিকেও আরেকটু নজর দেবেন। মানে ওয়েস্টার্ন মিউজিক বেশি ভর করছে। আপনাকে দেশি মিউজিক দিতে হবে, দেশি বিট। এগুলোর তো তুলনা হয় না।

আজফার হোসেন
আমি আজকে যদ্দুর দেখলাম, আমার কিন্তু নাচ এবং গান মিলে যে রিচ্যুয়ালটা তৈরি চেষ্টা করেছেন, সেটা বেশ লিবারেটিং মনে হয়েছে। আমরা শুনেছি যে- ‘আমরা সবাই রাজা’ কিন্তু যখন দেখছি, যে মোমেন্টটা তৈরি হচ্ছে, সেই মোমেন্টটা লিবারেটিং ফোর্স হিসেবে কাজ করছে। দেহ প্রসারিত হচ্ছে, দেহ সেলিব্রেট করছে। একটা সমস্যা এর মধ্যে আছে কিনা একটু দেখবেন যে, একটা ডিসক্রিপেনসির মতো মনে হতে পারে- সেটা হলো- সবাই রাজা হচ্ছে, এটা একটা র‌্যাডিক্যাল আইডিয়া। এই র‌্যাডিক্যাল আইডিয়াকে ইলাস্ট্রেইট করার জন্য পেশির ব্যবহারটা বিবেচনায় রাখা যায় কিনা।

বিপ্লব বালা
আরেকটা কথা, সেটা হলো আপনি এত কিছু পরিবর্তন করছেন, কিন্তু ‘গেলুম’, ‘খেলুম’- এই শব্দগুলো রেখেছেন কেন? এই রাবীন্দ্রিক কায়দায় সংলাপ বললে এই নাটকের ডিজাইনের সাথে যায়? এগুলো একেবারে বাদ দেবেন।

আজাদ আবুল কালাম
হাঃ হাঃ, কিছু কিছু দিয়েছি, কিন্তু ‘গেলুম’, ‘খেলুম’ কি বেশি খারাপ লাগে? হাঃ হাঃ । ঠিক আছে, অবশ্যই বিবেচনায় রাখবো। তো ঠিক আছে, আমার মনে হয় আমরা এখন শেষ করি। দেখি রাজা-র ভবিষ্যৎ কী হয়।