Bookmaker Bet365.com Bonus The best odds.

Full premium theme for CMS

ঝড়

Written by হাসান শাহরিয়ার.

Блогът Web EKM Blog очаквайте скоро..

ঝড় শুরু হলো-
[প্রচণ্ড ঝড় হয়। ঝড়ে অনেক কিছুই হয়। ভাঙে ঘর, ভাঙে গাছ গাছালি। মানুষের মনও ভাঙে। এমন একটা ঝড়ে যখন একবাড়ির টিনের চাল গিয়ে পড়ে অন্য বাড়ির গাছের চূড়ায় কিংবা এই বাড়ির কুকুরটি পড়ে থাকে অন্য বাড়ির উঠোনে, শব হয়ে, তখন কিছু মানুষও কূল কিনারা হারিয়ে দিকশূন্য দিকে অগ্রসর হয়।]

এক
(চারিদিকে শূন্যতা। তাকায় চারিদিক, চিৎকার করে ডাকে) কেউ কি আছেন নাকি? যদি কেউ চাপা পড়ে থাকেন কোনো গাছের তলায় কিংবা চালার নিচে, তবে আমার সাহায্য চান। আমাকে বলেন যে আমার সহায়তা আপনার প্রয়োজন। তখন না হয় আমি আপনাকে উদ্ধার করব। (নিরবতা, অনুসন্ধান, অতঃপর লুকানো বোতল থেকে মদ্যপান) এখন কোথায় আছি? ভাঙা চাল দেখে মনে হয় এক জায়গায়, কিন্তু এই গাছটিতো এখানে থাকার কথা না। আরে এ যে কুকুরের শব। কুকুরটিও পরিচিত, কিন্তু ওর বাসতো অনেক দূরে। এখানে এলো কিভাবে? থাক ওসব চিন্তা। ঝড়ে আমার কিছু না হলেই হলো। (মদ্যপান এবং শয়ন ও ঘুম)

[এমন ঝড়ে পথ হারায় আরো একজন]

দুই
(ব্যাগ খুলে দেখে নেয়) না। সব ভিজেনি। সব কখনো নষ্ট হয় না। হতে পারে এটা নষ্ট, হতে পারে ওটা নষ্ট কিন্তু সব কখনো নষ্ট হয় না। আশ্রয় দরকার। মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই বিশেষ প্রয়োজন। ঐ তো ভাঙা চাল দেখা যাচ্ছে। (ওঠানোর চেষ্টা চলে, কিন্তু ব্যর্থ হয়) না, আরো লোকের প্রয়োজন, সম্মিলিত প্রয়াস দরকার। ঐ তো একজন ঘুমিয়ে আছে। এই যে ভাই, আসেন। ঝড় পরবর্তী কর্মসূচীতে অংশ নিই। (নিকটে আগমন এবং মদ্যপান) বাঃ ভালো মাল। শালার আজকাল ভালো জিনিসও আছে নাকি? (সুর তুলে গান হয়)
    
ভালো মন্দ, ভালো মন্দ, সবই ভালো ভাই
ভালো মন্দ, ভালো মন্দ,  বিচার করা চাই।

[দূরে কোনো ‘তিন’-এর কণ্ঠ শোনা যায়]

তিন
আমি অসুস্থ, আমাকে সাহায্য করেন। উফ কী ব্যাথা! কেউ কি কোথাও আছেন? আমাকে সাহায্য করেন।

দুই
কার আবার সাহায্যর প্রয়োজন হলো! কে? আমি এখানে এবং আপনাকে সাহায্য করার মতো শক্তি আমার আছে। আসেন সাহায্য নিয়ে যান।

তিন
দিয়ে যান।

দুই
আপনার সাহসতো কম না। সাহসের কথা না হয় বাদই দিলাম, আপনিতো বেয়াদব কম না। বিনয়ের সাথে বললাম সাহায্যটা নিয়ে যেতে- অথচ বলে কিনা ‘দিয়ে যান’- অভদ্র।

তিন
সাহায্য কষ্ট করে দিয়ে যেতে হয় ভাই। ভদ্রলোকের মতো এসে সাহায্যটা দিয়ে যান, প্লিজ।

দুই     
ও! তাই নাকি! ঠিক আছে আসছি।

[প্রস্থান ও পুনঃপ্রবেশ- দুই ও তিন]

দুই    
দেখি এখানটায় বসেন। কোন জায়গায় চোট পেয়েছেন? ও আচ্ছা, কী করা যায়? চোটচা তো মারাত্মক মনে হচ্ছে। আপনি এক কাজ করেন, খাবেন? (মদ্য প্রদান) খান, খেয়ে চাঙ্গা হোন। (ব্যাগ থেকে কাপড়ের টুকরো বের করে নর্সিং এ মনোনিবেশন) আপনার নাম পরিচয়?

তিন     
প্রয়োজন নেই।

দুই     
কেন?

তিন     
নাম ধাম যা-ই হোক না কেন, নার্সিং তো করবেনই নাকি? (এক, এর দর্শন মেলে) ওটা কে? আপনার কী হয়?

দুই     
ভাই না চাচা কিংবা মামা জাতীয় কী যেন হয়।

তিন     
ও, তা হলেতো আমারও খালু কিংবা ছেলে জাতীয় কিছু একটা হবে।

দুই     
আমরা সবাই পরিচিত, আত্মীয় স্বজন।

তিন     
ডাকেন না।

দুই     
এই যে ওঠেন।

এক     
কেন?

দুই     
এমনি।

এক     
এমনি এমনি করইেতো দেশটা গেল। পরিকল্পনা থাকা দরকার বুঝলেন?

তিন     
বুঝলাম।

এক     
এত সহজে বুঝে যাওয়াটা না বোঝার নামান্তর বুঝলেন?

দুই     
বুঝলাম না।

এক    
এইতো বুঝেছেন। আরে আমার বোতল কই?

তিন     
এইতো।

এক     
খালি কেন?

দুই     
বোঝেন না?

এক     
ও।

দুই     
কাজের কথা বলি।

এক     
বলেন।

দুই     
আশ্রয়ের সন্ধান করা দরকার তাই না?

এক     
কেন?

দুই     
কেন মানে?

এক     
ও, আপনার, আপনাদের প্রয়োজন থাকতে পারে। আমার নেই। এখানে ঝড় হয়েছে তাকে কী। অন্য জায়গায় আমার আশ্রয় আছে।

তিন     
বাঃ আপনিতো বেশ বুদ্ধিমান।

এক    
আপনাকে খুব চেনা চেনা মনে হচ্ছে।

তিন     
আমরাতো সবাই পরিচিত।

দুই     
কিভাবে?

তিন     
একটু আগে তো আপনিই বললেন আমরা সবাই পরিচিত।

দুই    
সেতো কথার কথা। কিন্তু ওনাকে তো ঠিক...

তিন    
কেন, মনে নেই? নাটকের প্রধান ডোনার উনি ছিলেন না? কি হলো, মনে নেই?

দুই     
তাইতো। সালাম সালাম, আপনিইতো সেই মহান সংস্কৃতিসেবক।

এক    
কী যে বলেন, আরে ভাই আপনারা সুন্দরের পূজা করেন, লালন করেন, আর অধম একটু সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিই।

দুই     
সেটাও কি কম কথা বলেন?

এক     
এখনতো তবুও আপনারা আসেন। এমনও সময় গেছে দেবার জন্য হাত বাড়াতাম কিন্তু আপনারা ঘৃণাভরে তা ফিরিয়ে দিতেন।

তিন     
তাই নাকি, আমাদের মধ্যে এমন বোকাও কখনো কেউ ছিলো নাকি? কখনকার ঘটনা?

এক     
এই তো গ-গোলের পরপরই।

দুই     
গণ্ডগোল মানে! ওটাকে আপনি গণ্ডগোল বলছেন?

তিন     
আপনার মতো সংস্কৃতিসেবীর কাছে এমন কথা আশা করিনি।

এক     
হাঃ হাঃ ভালোইতো। গণ্ডগোল করবেন, অথচ গণ্ডগোল বলা যাবে না, বাঃ আশ্চর্য!

দুই     
গণ্ডগোল করেছি মানে!

এক     
(তিরস্কারে ভরে ওঠে কণ্ঠস্বর) ও! যুদ্ধ করেছেন! মুক্তির জন্য? তা, এখন মুক্ত হয়েছেন তো?

দুই     
না। তা আর পারলাম কই। কী চেয়েছিলাম আর কী পাওয়া হল!

এক    
আচ্ছা আপনারাতো নাটক করেন, তা ঐ নাটকের মাধ্যমে কিছু করা যায় না?

[দুই আর তিন শুধু হাসে, কেবলই হাসে]

এক    
হাসির কথা বললাম বুঝি?

তিন    
তা হাসির কথাইতো। আপনি দেখি নাটকের পেছনে টাকা ঢালছেন কিন্তু নাটক সম্বন্ধে কোনো খোঁজ খবরই রাখেন না।

এক    
কেন, কী হয়েছে?

তিন     
আমরাতো তাই করছি। আমরা নাটকের মাধ্যমে ঐ চেতনা বাস্তবায়ন করছি। সমাজটাকে পুরোপুরি বদলিয়ে ফেলার জন্য নাটকটাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছি। (হাসে, কেবলই হাসে)

এক     
ও (হাসে আর হাসে)।

দুই     
তবে সমস্যা কি জানেন? আপানার মতে সবাই এগিয়ে আসে না। সহযোগিতা না করলে কি এমন মহৎ কাজ সম্ভব?
এক     
কোনোভাবেই না।

তিন     
(খালি বোতল নজরে পড়ে) আছে নাকি আর, হ্যাঁ?

এক     
থাকারতো কথা, কিন্তু কোথায় যে আছে।

দুই     
খুঁজে দেখি? (সমর্থন পেয়ে অন্বেষণ করে এবং সফল হয়) আগে আপনি চুমুক দিন।

এক     
কী যে করেন ভাই। এবাদতের সময় যেমন বয়সের সীমা নাই, এইটার বেলায়ও তাই। নিন আপনি চুমুক দিয়ে শুরু করেন।

[মদ্যপানের আসর বেশ জমে ওঠে, ক্লান্তি আসে এক-এর দেহে। শুয়ে পড়ে সে।]

দুই     
এই যে ভাই। আচ্ছা যে নাটকটা হাতে নিলাম তার থিমটা যেন কী?

তিন     
মুক্তিযুদ্ধ, বুঝলেন, মুক্তিযুদ্ধ।

দুই     
ও হ্যাঁ, মুক্তিযুদ্ধ, বড় কঠিন বিষয়। তা মুক্তিযুদ্ধের কোন দিকটা নিয়ে কাজ করছি? মানে, মুক্তিযুদ্ধতো অনেক বিশাল ব্যাপার, তার কোন অংশটা নিচ্ছি?

তিন     
এখনো ঠিক হয়নি। যে অংশটা বেশি দাগ কাটে সেটাই নেব।

দুই     
কিন্তু সমস্যা আছে। আমরা যারা যারা নাটক করবো, তাদের সবার কি একই অংশ দাগ কাটবে?

তিন     
না-ও হতে পারে। তবে এটা কোনো সমস্যা না, কারণ চেতনা এক থাকলে লক্ষ্যও এক থাকবে।

দুই     
ও, তা ঠিক, তা ঠিক। আচ্ছা আমরা সবাই বুঝি এক চেতনার লোক?

তিন     
তাইতো হওয়ার কথা।

দুই     
অন্যদের কথা বাদ দিয়ে বলতে পারি আমি কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করি, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো প্রতিটি কাজে আমি এর প্রমাণ দেখাতে পারি।

তিন     
গুড ভেরি গুড। তা হলে আপনাকে নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। আমাকে নিয়েও আপনার কোনো সমস্যা হবে না। দু’জন অন্তত একই চেতনার অভিসারি, তাই না?

দুই     
আমি কী করে বলব? আমি কি আপনাকে ভালো করে চিনি? জানি?

তিন     
কী বলছেন? চেনেন না মানে, আমাকে, আমরা কর্মকাণ্ড কখনো দেখেননি?

দুই     
কোন কর্মকা- বলুন দেখি?

তিন     
গত আন্দোলনে আমার অবদান দেখেননি? আমার বাবা’র কাছ থেকে এতবড় ডোনেশনটা না নিলে হতো?

দুই     
তাইতো, হ্যাঁ হ্যাঁ, অসম্ভব কাজ করেছিলেন। আপনারা বেশ বড় লোক তাই না?

তিন     
তা বলতে পারেন।

দুই     
আপনার বাবা কী করেন?

তিন    
টাকা আয় করেন।

দুই    
তাতো বুঝলাম। মানে, সোর্স অব ইনকামটা কী?

তিন     
ব্যবসা, দু’নম্বরি।

দুই     
আপনি দু’নম্বরির ছেলে?

তিন     
তা বলতে পারেন।

দুই     
তা হলে আপনার চেতনা আর আমার চেতনা তো এক না। আপনার সাথে কী করে নাটক করি বলেন তো?

তিন     
কেন? আমার বাবা দু’নম্বর, আমি তো না। চোরের ছেলে বলে আমিও কি চোর?

দুই     
আপনিতো বড় চোর। চোরের টাকায় খাওয়া দাওয়া করবেন আর বদনামের ভাগিদার হবেন না? শালা চোরের বাচ্চা বড় চোর।

তিন     
আরে আরে গাল দিচ্ছেন কেন? বাপ জন্ম দিয়েছে, তারটা খাবো না?

দুই     
তারটা খাবেন আর তার বদনামের ভাগ নেবেন না?

তিন     
না। বাবার পয়সাকড়ি মেরে সৎ কাজ করবো। সুস্থ কিছু গড়ে তুলবো।

দুই    
গুড ভেরি গুড।

[হাসে, হাসিতে ভরে উঠে বাতাস। হাসি-তামাসার সাথে ক্ষীণকন্ঠে শোনা যায় গান। ক্ষীণকন্ঠ তীব্রতর হয় ক্রমশ]
    মানুষ আমি আমার কেন পাখির মতো মন
    তাইরে নাইরে নাইরে গেল সারাটা জীবন।
    তাইরে নাইরে  না...

[যদি পরিচিত হয় গানটি সবার, তা হলে সবাই গাইবে গান। গান গাইবে সবাই, ছন্দ-সুর-ছন্দ। চার-এর আগমন ঘটে]

চার     
কী ভাইয়েরা, গান গাইছেন কেন?

দুই     
আপনি গাইছেন তো, তাই আমরাও গাইলাম।

চার     
আপনাদেরও কি পাখির মতো মন?

তিন     
না, পাখির মতো মন হতে যাবে কেনো?

চার    
তাহলে গাইলেন যে?

তিন    
আপনি গাইলেন তাই গাইলাম।

চার     
ও আপনারা তাহলে অনুভব করে গান না? আপনাদের সাথে কথা বলে লাভ নেই, চলি।

দুই     
কেন? যাবেন কেন?

চার     
বাঃ যাবো না? আপনারা গান গাইবেন কিন্তু অনুভব করবেন না, কাজ করবেন কিন্তু বিশ্বাস করবেন না, ঘৃণা করবেন অথচ সঙ্গ ত্যাগ করবেন না- তারপরও আমি থাকবো?

দুই     
এটাতো ওর কথা, আমি তো আপনার মতো। আমার পাখির মতো মন।

চার     
তাই নাকি? আপনারা দু’জন তাহলে এক মনের না, না? তবে যে বললেন এক সাথে নাটক করবেন?

[চার-কে আমন্ত্রণ জানায়]

দুই     
খাবেন?

চার     
শুকনাটা নেই?

দুই     
না, আপাতত এটাই নিন।

চার     
আহ! পৃথিবীটা একেবারে নিজের নিজের মনে হয়।

এক     
(ঘুম ঘুম ভাব হয়তবা ছিলো কিন্তু ঘুমায়নি তাই কথা বলে) নিজের পৃথিবীকে তো নিজের মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক।

চার     
ওটা আবার কে?

তিন     
আমাদের নাটকের ডোনার।

চার     
তাই নাকি। আপনার মনটা কি ভাই পাখির মতো?

এক     
আপনি কি ভাই পাগল?

চার     
হতে পারি।

এক     
হতে পারি মানে? আপনি জানেন না?

চার     
সুস্থরাই নিশ্চিত হতে পরে না আর আমিতো পাগল। (কাছে যাওয়া হয়) কী ভাই আপনাকে পরিচিত মনে হচ্ছে কেন? কোথায় দেখেছি বলেন তো?

এক     
কী রূপে দেখেছেন বলেন তো?

তিন     
কী রূপে মানে?

এক     
মানে, খুনী রূপে না সদয় রূপে?

চার    
অনেক আগে দেখেছি। নিশ্চিত আমি, খুনী রূপে।

এক     
ও, বুঝেছি। তা, তখন আপনি কোথায় ছিলেন, কীভাবে দেখলেন?

চার     
কোথায়, কখন দেখেছি বললেন না তো।

এক     
হবে এক সময়, বায়ান্নতে, একাত্তরে কিংবা পঁচাত্তরে।

চার     
হ্যাঁ হ্যাঁ, তাই হবে। আপনিতো আরো রুক্ষ ছিলেন। এখন বেশ মোলায়েম লাগছে।

এক     
(হাসি আর তাচ্ছিল্য চলে। অতঃপর বলা হয়) প্রয়োজন ছাড়া রুক্ষ হয়ে লাভ কী বলেন?

চার     তা ঠিক। তা ঠিক।

[মদ্যপান চলছেতো চলছেই]

দুই     
এই যে ভাই, আমাদের নাটকে আপনি গান গাইতে পারবেন?

চার     
হ্যাঁ, আমাকে সুযোগ দিবেন?

তিন     
ভালো নাটক, মুক্তিযুদ্ধের উপর। সমাজটার জন্য কিছু করাতো দরকার কী বলেন?

চার     
কিন্তু একটু আগে বললেন, তিনি নাকি ডোনার (এক-কে দেখানো হয়)।

দুই     
হ্যাঁ, বড় সংস্কৃতিসেবক।

চার     
(এক-কে সতর্ককরণ) ভাই, এ কী করছেন! ঐ নাটকে আপনার বিরুদ্ধে অনেক কথা বলা হবে। আপনি টাকা পয়সা দিয়ে শত্রু কিনবেন?

এক     
তাই নাকি! কী ভাই বদনাম করবেন নাকি?

তিন     
আপনি কি মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে ছিলেন?

এক     
ছিলাম। আপনাদের শক্তিটা আঁচ করতে পারিনিতো তাই বিরুদ্ধেই ছিলাম। আল্লাহ খোদা না ডেকেও সামান্য লাঠিসোটা আর গোলা বারুদ নিয়েও যে এত শক্তি পাওয়া যায়, তাতো জানতাম না। শেষের দিকে ভয়ে ভয়ে ছিলাম। আপনাদের মতো অর্থবরাও যে এত শক্তিশালী হতে পারে- না সত্যি আন্দাজও করতে পারিনি। তাই- শেষের দিকে, ভয়ে ভয়ে ছিলাম।

দুই     
এখন?

এক     
ধ্যৎ! খামাখা ভয় পেয়েছিলাম। আপনারা ক্ষমা করে দিবেন জানলে কি আর এত ভয় পেতাম?

দুই     
আরে ভাই অতীত বাদ দিনতো। এখন কোন পক্ষে তাই বলেন।

এক    
নাটক করেন টাকার অভাব হবে না। বাড়িতে যেন চোর ডাকাত না পড়ে তার জন্য এ্যালসেশিয়ান কুকুর রেখেছি। বাড়ির বাইরেও তো নিরাপত্তা দরকার। করেন, নাটক করেন, টাকার অভাব হবে না।

দুই     
তাহলেতো কোনো সমস্যাই নেই। শুরু করা যাক।

তিন     
গানটা ধরেনতো ভাই।

[গানের প্রস্তুতি চলে চারে’র ভিতর]

এক     
শুনুন, নাটক যে করবেন, ইতিহাস জানেন?

তিন      
না জানার কী আছে? গৌরবের ইতিহাস কে না জানে?

দুই     
এই যে, (তিন-কে) আপনি ইতিহাস জানলেন কীভাবে? আপনিতো তখন ছোট ছিলেন।

তিন     
বাঃ, এটা কোনো কথা হলো? আমার বাবা আমাকে ইতিহাস জানিয়েছেন।

দুই     
দু’নম্বর বাপ আপনাকে দু’নম্বর ইতিহাস জানিয়েছে।

তিন     
তাই নাকি? (চার-কে) এই যে ভাই, তাই নাকি?

চার     
তাইতো হওয়ার কথা, দু’নম্বরের ভেতর থেকে একনম্বর বের হওয়ার তো কথা না।

তিন     
তাহলে এখন উপায়!

দুই     
উপায় নিয়ে ভাববার কী আছে? আমি সঠিক ইতিহাস জানি।

চার     
আপনার বাবা কে?

দুই     
একজন মুক্তিযোদ্ধা।

চার     
ও, তা হলে ঠিক আছে।

তিন     
ঠিক আছে, আপনারা শুরু করেন, আমি আসছি।

এক     
কোথায় যাচ্ছেন?

তিন     
বাপটার সাথে বোঝাপড়া করে আসি।

এক     
কেন?

তিন     
কেন আবার? কত মারাত্মক কাজ করেছে দেখেছেন? আমাকে সঠিক ইতিহাস জানতে দেয়নি।

এক     
আরে তাকে কী। উনিতো জানেন।

চার     
আমিও জানি, কারণ আমি নিজেই একজন মুক্তিযোদ্ধা।

এক    
তার মানে তিনজন জানি, একজন কেবল জানি না।

তিন     
আপনিও জানেন নাকি?

এক     
জানি।

তিন     
কীভাবে?

এক     
সিরাজউদ্দৌলা ইতিহাস জানে মীরজাফর জানে না?

তিন     
ও।

এক     
তবে আপনার বাবার মতো আমিও আমার সন্তানদের আসলটা জানতে দিই না।

চার     
আপনার সন্তানরা কে কি করে?

এক     
যার যা ইচ্ছে, তবে দু’একজন আবার গল্প সাহিত্য করে।

তিন     
তাই!

এক     
ওরা বেশ নাম করেছে ইদানিং।

দুই     
আপনি রাজাকার হয়েও শিল্প সাহিত্য প্রেমিক, অবাক তো!

এক     
কী করবো? বাসার যে এ্যালসেশিয়ান কুকুরটার কথা বললাম, ওটার খাবার-দাবার ঠিক মতো দেয়ার জন্য লোক নিয়োজিত আছে। বাইরের এ্যালসেশিয়ানগুলোর খবরাখবর একা নিতে পারি না। তাই ওরাই খাবার-দাবার দিয়ে তাদের ঠাণ্ডা রাখে। পেটে ক্ষুধা থাকলে কুকুরগুলো বেশ চিৎকার করে।

[হাসির বন্যা বয়ে যায় যেন]

তিন     
বাঃ বেশ বলেছেন তো।

এক     
হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি বেশ করেই বলতে পারি। আগে বক্তৃতা দিতাম কিনা।

তিন     
তাই নাকি! আপনি বক্তৃতাও দিতেন?

এক     
হ্যাঁ, বেশ ভালো বক্তৃতা দিতাম। আপনারা যেমন নাটক করেন, মানুষের কাছাকছি যাওয়ার চেষ্টা করেন, আমরাও বক্তৃতা করি, জনসভার মাধ্যমে গণমানুষের কাছে যাই।

তিন     
তা হলে ওটাও তো শিল্প।

এক     
তাতো অবশ্যই।

তিন     
তার মানে আপনিও একজন শিল্পী।

এক     
তাতো অবশ্যই।

তিন     
আপনি অভিনেতা?

এক     
পাক্কা একনম্বর।

[হাসির ঢলে ভাসে এক, দুই, তিন/এক, দুই, তিন/ এক, দুই, তিন]

চার     
ভাই, আমাকে বিদায় দিন।

দুই     
কেন?

চার     
আপনাদেরকে কেমন যেন মাতাল মনে হচ্ছে।

এক     
ও, তাই? ঠিক আছে যান।

তিন     
ঝড় আবার আসতে পারে। চলুন এক সাথে ঘুমিয়ে থাকি।

চার     
ঠিক আছে। ঘুম আমার খুব প্রিয়। চলেন ঘুমাই।

[শয়নে সময় লাগে, ঘুমুতে নয়। অচেতন যেন ঝড়োত্তর পৃথিবী। সচেতন হয়, ক্ষণিক পর, চার। বিনিদ্র নেত্রে নিদ্রামগ্ন সকলকে দেখা হয়। এক এবং তিনের ঘুম খুব গাঢ়। অপরজনকে জাগ্রত করা হয়। কোনো এক সিদ্ধান্ত গ্রহণে পরস্পরের কাছে আসে তারা]

চার     
কিছু ঠিক করলেন?

দুই     
আপনি কি নিশ্চিত, আমরা সঠিক?

চার     
কেন, সন্দেহ হয়? বোঝেন না শালা রাজাকার, তাকে খুন করা আমাদের কর্তব্য।

দুই     
বোকার মতো কথা বলেন কেন? উনিতো বললেন এখন তিনি চেতনায় আমাদের পক্ষে।

চার     
উনি বললেন আর আপনি বিশ্বাস করলেন?

দুই     
বাঃ, বিশ্বাস করবো না? বিশ্বাস করে ঠকাও ভালো।

চার     
তা হলে কিন্তু আমি আপনাকেও খুন করবো।

দুই     
আপনার মাতলামি দেখছি এখনো আছে। (তিন-কে ডাকা হয়) এই যে, ওঠেন, উনি আমাকে খুন করতে চাচ্ছেন।

তিন     
আমি ঘুমাচ্ছি। আপনাকে খুন করা হয়ে গেলে আমাকে জাগিয়ে দিবেন।

দুই     
শালা মাতাল। চিন্তা করেছেন, আমি যদি খুন হই, তা হলে ওকে জাগিয়ে দেওয়া সম্ভব?

চার     
সেটা নিয়ে আপনি ভাববেন না। আমি জাগিয়ে দেব। আসেন।

দুই     
আচ্ছা আমাকে খুন করার যথেষ্ট কারণ আপনার কাছে আছে?

চার     
অবশ্যই।

দুই     
কী কী কারণ বলেন দেখি।

চার     
কারণ একটাই, রাজাকার মারতে চাচ্ছি কিন্তু আপনি বাধা দিচ্ছেন।

দুই     
ও। কিন্তু আমি তো ঠিক বাধা দিতে চাচ্ছি না। আচ্ছা ঠিক আছে, আপনার কাছে একটা পরামর্শ চাই। এতোদিন পর তাকে মারা কি ঠিক হবে?

চার     
সুযোগতো সব সময় আসে না। আপনার মাকে আর বোনকে যখন ঐ শালা তুলে নিলো, ঠিক তখনই সুযোগ পেয়েছিলাম। মারতে যাব এমন সময় আপনার বাবা সামনে পড়লেন। আর ও ব্যাটা পালিয়ে গেলো। আপনার বাবাকে আমার কথা বলবেন। আমরা একই সেক্টরে ছিলাম।

দুই     
(তিন-কে লক্ষ্য করে) ওকে ডাকি? তিনজন মিলেই না হয় মারবো। শালাকে সম্মিলিতভাবে মারা দরকার।

চার     
ঠিক আছে ডাকেন।

দুই     
এই যে ভাই, রাজাকার মারবেন?

তিন     
এত ঘটা করে খুন খারাবি হয় নাকি? কোথায়?

দুই     
শশ্ আস্তে। ঐ যে।

তিন     
(মুখদর্শন, অতঃপর কথন) না তো এটা তো আমার বাবা না। মিথ্যে বলেন কেন?

চার     
আমরা আপনার বাবার কথা কিছু বলেছি নাকি?

তিন     
ঐ যে বললেন, রাজাকার মারবেন। (পরস্পর চাহনি) ধ্যৎ, কাঁচা ঘুমটা মাটি করলেন। কিছু মনে করবেন না, আরেকটু ঘুমাই। আপনারা যা সিদ্ধান্ত নেবেন আমার তাতেই সায় আছে।

দুই     
ব্যাটা ঘুমিয়ে গেল? আচ্ছা, মাকে যখন নিয়ে গেল, আমি তখন খুব ছোট, না?

চার     
আর দেরি করা ঠিক হবে? জেগে যেতে পারে।

দুই     
কিন্তু উনিতো আমাদের প্রধান ডোনার, ওনাকে মারলে নাটক করবো কিভাবে?

চার     
এখন নাটকের চিন্তা বাদ দিন তো। শত্রু মারা আপনার কর্তব্য।

দুই     
তা ঠিক, কিন্তু এক কাজ করলে হয় না? ধরুন ওনার সাহায্য নিয়ে যদি নাটক করি, এবং মানুষকে সচেতন করি, তারপর তাকে সবাই মিলে খুন করি।

চার     
তা হতে পারে কিন্তু সমস্যা কি জানেন? ওনার সাহায্য নিলে যদি আমরা ঋণী হয়ে যাই? তারপর ওনাকে খুন করা কি বেঈমানী হবে না?

দুই    
বরং এক কাজ করি। ওনাকে যেহেতু আমাদের বিশেষ প্রয়োজন, তা হলে খুন করার দরকার নেই। রাজাকার অনেক আছে তাদের খুন করি।

চার     
এটা অবশ্য ভালো বুদ্ধি, (আবারো মদ্যপান, অট্টহাসি) আচ্ছা, ঐ সব রাজাকাররা যদি অন্য কারো নাটকের ডোনার হয়? তবে তো সেই নাট্যকর্মীরা মারতে বাধা দিবে।

দুই     
আরে রাখেন। বাধা দিলেই হলো? তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করবো না? সমাজটাকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে প্রয়োজনে জীবন দেব।

এক     
(ঘুমায়নি কি এতক্ষণ?) আন্দোলন করতে টাকার প্রয়োজন। কোথায় পাবেন?

দুই     
কেন? আপনি আছেন না?

এক     
ও, আমি আছি নাকি? হ্যাঁ হ্যাঁ, অবশ্যই আছি। (দুই-কে) কী ব্যাপার ঘুম ঘুম চোখ কেন? যান একটু ঘুমিয়ে নিন। যদি আবার ঝড় আসে তবেতো ঘুমাতেই পারবেন না।

দুই     
হ্যাঁ হ্যাঁ, একটু ঘুমাই। (দুই ঘুমকে বরণ করে নেয়)

চার      
মানুষ আমি আমার কেন পাখির মতো মন
তাইরে নাইরে নাইরে গেল সারাটা জীবন
তাইরে নাইরে না...  

[চার গান গাইতে থাকে। অন্য দুজন ঘুমে বিভোর। এক আসে চারের কাছে]

এক    
দিন তো কয়েক ঢোক ভেতরে ঢালি। আহ! শরীরটা চাঙ্গা লাগছে। আপনার সাথে অনেকদিন পর দেখা। কেমন ছিলেন?

চার    
কখনো ভালো, কখনো খারাপ। আচ্ছা আমার বউকে কি আপনারা মেরেই ফেলেছিলেন?

এক     
বোধ হয়। জীবিত রাখারতো কথা না। অবশ্য আমি ঠিক জানি না।

চার     
কেন? জানেন না কেন? আপনি না আমার চোখের সামনে ধরে নিয়ে গেলেন?

এক     
ঐ পর্যন্তই, আমার দায়িত্ব ঐ পর্যন্তই ছিলো। বোঝেন না, আমার সামনেই তো আপনার বউকে নিয়ে ফূর্তি করলো, কিন্তু আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করতে পারলাম না। শালারা বর্বর ছিলো।

চার     
আচ্ছা ও কি আমরা নাম ধরে ডাকছিলো?

এক     
হ্যাঁ, সে কী কান্না আর চিৎকার।

চার     
আপনার মায়া লাগেনি?

এক     
একটু একটু।

চার     
ও।

এক     
মায়া মহব্বত তখন ছিলো না বুঝলেন? আপনার বউকে যে রাতে উঠিয়ে নিলাম তার দু’রাত আগে, বর্বর শালারা বললো আর একটা মেয়ে মানুষ চাই। অনেক খুঁজলাম পেলাম না। শেষে আর কী করি, আমরা ঘুমন্ত স্ত্রীকে ডেকে তুলে ওদের হাতে দিলাম।

চার     
একটুও মায়া হলো না? নিজের স্ত্রীকে...

এক     
কী করবো বলেন? আমাকে টিকে থাকতে হবে না?

চার     
স্ত্রী কি বেঁচেছিলো?

এক     
এত অত্যাচারের পর কি আর বাঁচে? তবুও বেঁচেছিলো, মুমূর্ষু হয়ে। গলাটিপে শেষ কাজটা আমিই করেছিলাম।

চার     
ছিঃ, জঘন্য! আপনিতো ওদের চেয়েও বর্বর।

এক     
আরে ভাই টিকে থাকতে হবে না?

চার     
ছিঃ, ছিঃ! সামান্য টিকে থাকার জন্য... ছিঃ আপনি ভাই ওদের চেয়েও বর্বর।

এক     
হ্যাঁ, হতে পারি। কিন্তু আপনারাতো আমার চেয়েও বর্বর।

চার     
কেন, আমরা কীভাবে?

এক     
এই যে, আমি রাজাকার জেনেও আমাকে খুন করছেন না, কারণ আমি আপনাদের নাটকের ডোনার।

চার     
তাই, না? দেখি আরেকটু দেখি- আপনাকে খুন করা যায় কিনা দেখি। ওরা উঠুক এক সাথে নিদ্ধান্ত নেয়া যাবে।

তিন     
(আরামের ঘুম শেষ হয়, কথার পিঠে কথা কয়) এক সাথে সিদ্ধান্ত নিতে নিতে আগাছাতো বৃক্ষ হয়ে যাচ্ছে।

এক     
ঠিক আছে আপনারা সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নিন। আমি একটু ঘুমিয়ে নিই। (ঘুমের কাছে চলে যায়-এক)

চার     
আপনার বাবার জন্যই তো তাকে খুন করা যাচ্ছে না।

তিন     
তাই নাকি? তা বাপ ব্যাটা আবার কী করলো?

চার     
ঐ যে দু’নম্বরি ব্যবসা করে। ওকে মারলেতো তাকেও মারতে হয়।

তিন     
তাই, না? এই যে ভাই, কত ঘুমাতে পারেন? ওঠেন না, একটা সিদ্ধান্ত দিন।

দুই     
(ঘুমই প্রধান্য পায়) আপনারা যা সিদ্ধান্ত নেবেন তাতেই রাজি আছি।

তিন     
আমিও একটুা আগে বলেছিলাম না, আপনারা যা সিদ্ধান্ত নেবেন তাতে আমিও রাজি?

চার     
হ্যাঁ।

তিন     
সিদ্ধান্তটা তা হলে নেবে কে শুনি?

চার     
কী জানি ভাই, আপনারা সিদ্ধান্ত নিন, আমি একটু ঘুমাই।

তিন     
ঘুমান। সবাই ঘুমান। একা একা জেগে থাকা সম্ভব?

[ঝড়ে সহজ পথ কঠিন হয়, পথে পড়ে থাকে বাধাস্বরূপ অনেক কিছু। তাতেই পদশব্দ ঘটে পথিক কিংবা আগন্তুকের। কে এই আগন্তুক কিংবা পথিক? নিঃশব্দে, আগন্তুকের চেষ্টা চলে অন্বেষণের। কাকে কিংবা কী অন্বেষণ? মানুষ অথবা বস্তু? ঘুমন্ত কাউকেই কি পরিচিত মনে হয় না?]

তিন     
কে আপনি?

পাঁচ     
আমাকে আপনি চিনবেন না। আমি যাকে খুঁজছি তাকে কি আপনি দেখেছেন?

তিন     
চিনবো না কেন? আপনাকে আমি চিনি না?

পাঁচ     
ও। হ্যাঁ হ্যাঁ। আপনিতো চিনবেনই। নাটকের খবর জানেন?

তিন     
নাতো, কী হয়েছে?

পাঁচ     
আন্দোলন করবে বোধ হয়। প্রগতিশীল কিছু করার চিন্তাভাবনা চলছে।

তিন     
তাই নাকি? খুব ভালো কথা।

পাঁচ     
কিন্তু সমস্যা আছে। জানেন, আমি কিন্তু এটার পক্ষে যেতে পারছি না।

তিন     
(মদ্যপানের আমন্ত্রণ জানায়) অভ্যাস আছে?

পাঁচ     
বলেন কী? দিন দিন। (সব শালা মাতাল) বুঝলেন আমি কিন্তু ওটার পক্ষে নই।

তিন     
কেন বলুন তো?

পাঁচ     
আগে বলুন, আপনি পক্ষে কিনা।

তিন     
অবশ্যই, প্রগতিশীল কিছু করবো বলেইতো এই লাইনে আসা।

পাঁচ     
আপনি দেখছি মাতালের মতো কথা বলছেন।

তিন     
তাই নাকি? নাতে আমিতো সব সময় এভাবেই কথা বলি।

পাঁচ     
সব সময়েই মাতাল থাকেন তো, তাই।

তিন     
হ্যাঁ হ্যাঁ, তা হতে পারে। কিন্তু আমাকে একটা কাজ যে করতেই হবে।

পাঁচ     
কী কাজ?

তিন     
বাপটাকে খুন করবো।

পাঁচ     
ধ্যৎ! তার উপর ভর করেইতো আপনি উঠবেন।

তিন     
না ভাই। ঐ ব্যাটার জন্য আমি শান্তিমতো সংস্কৃতি চর্চা করতে পারি না। সবাই বলে দু’নম্বরের ছেলে দু’নম্বরই হবে। যাদের সাথে চলি, আমি তাদের মতোই হতে চেষ্টা করি। কিন্তু ঐ যে এক সমস্যা, বাপ দু’নম্বর। ভাই, একটু অপেক্ষা করেন। ঠিক আছে নিন, এটা শেষ করতে থাকেন, আমি আসছি।

পাঁচ     
কোথায় যাচ্ছেন?

তিন     
আরে ভাই, শুভ কাজে বাধা দিবেন না। বাপ ব্যাটাটাকে মেরে আসি।

পাঁচ     
আমার মনে হয় মাথা গরম করাটা ঠিক হবে না। মারতে চাচ্ছেন মারেন। কিন্তু একটু ভেবেচিন্তে মারেন।

তিন     
আপনাদের কথা শুনে শুনে না, কোন মহৎ কাজ করতে পারবো না। ভাবনা চিন্তা করতে করতে ঐ ব্যাটা নিজেই একদিন পটল তুলবে। তখন আমার আফসোস করা ছাড়া উপায় থাকবে না।

পাঁচ     
তাতো অবশ্যই, বাপ মরলে আফসোসতো লাগবেই।

তিন     
ধ্যৎ, তার ইন্তেকালের আফসোস না। তাকে খুন করতে না পারায় আফসোস।

পাঁচ     
আচ্ছা বললেন নাতে, আমি যাকে খুঁজছি তাকে দেখেছেন কি না?

তিন     
আচ্ছা আন্দোলনটা সাকসেসফুল হবে তো?

পাঁচ     
সবাই হয়তবা শেষ পর্যন্ত আন্দোলন করবে না।

তিন     
কেন?

পাঁচ     
এই যে আপনি করবেন না, কারণ আপনি বাপের পয়সায় চলেন। বাপ দু’নম্বর, তাই আপনি, দু’নম্বরের কাছাকছি। তারপর ধরেন আমিও করবো না।

তিন     
কেন, কেন?

পাঁচ     
আমার বাপতো রাজাকার। আমাকে এজেন্ট হিসেবে রাখা হয়েছে। যখনই তার বিরুদ্ধে কিছু বলা হবে, তখনই আমি তার প্রতিবাদ করবো। বাবার টিকিটিও কেউ নড়াতে পারবে না।

তিন     
আপনার মাথায় তো খুব বুদ্ধি।

পাঁচ     
আমার বাবার মাথায় আরো বেশি।

তিন     
আচ্ছা আমরা নতুন যে নাটকটি নামাচ্ছি তার প্রধান ডোনার তো রাজাকার। নাটকটি মুক্তিযুদ্ধের উপর, নাটকটি কি হবে না?

পাঁচ     
আপাতত বন্ধ।

তিন     
পরে?

পাঁচ     
হ্যাঁ, পরে করতে পারবেন। ঝড়ের সময় আমরা সব বন্ধ করে দিই। ঝড়টা থামুক। সব নাটক করতে পারবেন।

তিন     
ও।

পাঁচ     
কই, বললেন না তো, দেখেছেন?

তিন    
কাকে?

পাঁচ    
আমি যাকে খুঁজছি। বাবাকে।

তিন     
ওখানে একজন ঘুমিয়ে আছে, রাজাকার, দেখেন আপনার বাবা কিনা।

পাঁচ     
রাজাকার! আপনি নিশ্চিত?

তিন     
তাই তো বললো কিন্তু আপনার বাবা না-ও হতে পারেন।

পাঁচ     
কী যে বলেন ভাই, রাজাকার হবে আর আমার বাপ হবে না, সেটা কখনো সম্ভব? এই যে ওঠেন। এতো যে ঘুমাচ্ছেন, ঐদিকের খবর জানেন? সবাই উত্তপ্ত।

[ঘুমন্ত ‘এক’ জাগ্রত হয়]

এক     
খবর জানবো মানে? তা হলে তোমাকে রেখেছি কেন?

পাঁচ     
রেখেছেন বলেইতো খবরটা দিতে এলাম।

এক     
তা কতদূর জানো? কীভাবে জানো?

পাঁচ     
জানি সবটুকুই, প্রস্তুতি চলছে। আমাকে খবর দিয়েছে। যত কিছুই ঘটুক না কেন, চক্ষুলজ্জা বলে একটা কথা আছে না? আমাকে খবর দেয়।

এক     
(তিন-কে শাসায়) এই যে দাঁড়িয়ে দেখছেন কী? আপনার বাবাকে বলেন কিছু একটা করতে।

তিন     
কেন, আমার বাবা করবে কেন?

এক     
বাঃ তাকে এদ্দূর ওঠালাম, আর তিনি আমার জন্য কিছু করবে না?

তিন     
ও, আপনিই বাবাকে এদ্দূর উঠিয়েছেন বুঝি ? জানি নাতো।

এক      
অনেক কিছুই জানেন না। কেবল খান আর ঘুমানতো, এগুলো কীভাবে আসে তার কোনো খবর রাখেন না।

তিন     
আমাদের নাটক কিন্তু শেষের দিকে। ডোনেশনটা সময় মতো পাবো তো?

এক     
তা পাবেন। কিন্তু আপাতত অন্য একটা নাটক ধরেন, বর্তমানেরটা ঝড় থেমে গেলে তারপর করবেন। এর মধ্যে একটা হাসির নাটক করেন।

তিন     
ঠিক আছে। আপনি ঘুমিয়ে পড়েন। আমরা জাগিয়ে দেব।

পাঁচ     
আমরা মানে? আপনি আর কে?

তিন     
আপনি।

পাঁচ     
ও আপনি বুঝি আমার দলে?

তিন     
ওই বাপ ব্যাটাটার জন্য বুঝলেন, আপনাদের বিরুদ্ধে যেতে পারছি না। আচ্ছা এদিকে আসেন তো, একটা কাজ করলে কেমন হয়? ধরেন, অনেক তো করলেন, এখন পরিষ্কার হয়ে আমাদের হয়ে যান না। (কেন যে হাসির ঢল নামে কেউ জানে না) হাসির কথা বললাম বুঝি?

পাঁচ     
না, ঠিক হাসির কথা না। আচ্ছা, এক কাজ করেন, আপনারাই বরং ফিরে আসেন। সম্পূর্ণ সহযোগিতা পাবেন।

তিন     
সেটাও মন্দ প্রস্তাব না। সবার সাথে আলাপ করে নিই।

পাঁচ     
সবার সাথে মানে? কাদের সাথে?

তিন     
(দুই ও চারকে দেখানো হয়) ঐ যে, তাদের সাথে।

পাঁচ      
কারা এরা, দেখি (এই মুখ বড় ভয়ঙ্কর মুখে। পরাভব না মানা মুখ) না, না, কী বলছেন এসব! এদের সাথে আলাপ করবেন না।

তিন     
আপনি চেনেন?

পাঁচ     
ভাই, আমি আসি, পরে কথা হবে।

[কেন এত ভীত সন্ত্রস্ত প্রস্থান?]

তিন     
শালা তাদের ভয় পায় অথচ আমাকে ভয় পায় না। নাঃ বাপ ব্যাটাকে খুন না করা পর্যন্ত রেহাই নেই। ঐ ব্যাটাই আমার যত পিছুটান।

[ঘুমিয়ে পড়া হলো। অচেতন ঘুমে সবাই। যদি ডাকে পাখি, শুনবে না কেউ। জেগে নেই- তাই। বড্ড আরামের ঘুম, নিস্তেজ পৃথিবী তেজী হয়। ঝড় হয়। ঝড় যারা সৃষ্টি করে, তারা জেগে ওঠে। যেন শেষ ঝড় হয় সেই মতো কাজ করতে শুরু করে ওরা- এক আর দুই]

দুই     
সিদ্ধান্ত নিয়েছেন?

চার     
হ্যাঁ, এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে, আর না।

দুই     
আচ্ছা আমার বাবা কোনো কথা বলেন না কেন?

চার     
কোনো কথা নেই- তাই।

দুই     
আচ্ছা, আপনার গায়ে কোনো গুলি লাগেনি?

চার     
হ্যাঁ, অনেক জায়গায়। আপনার বাবার যেখানে যেখানে লাগেনি, আমার সেখানে সেখানে লেগেছিলো।

দুই     
ও, তাহলেতো দু’জনেই বেশ চোট পেয়েছিলেন।

চার     
কখন?

দুই     
এটা কোনো প্রশ্ন হ’ল? কখন? কখন আবার যুদ্ধের সময়।

চার     
না ভাই, যুদ্ধের সময় চোট পেলাম কই! চোট যা পাওয়ার তাতো পরে পেলাম। আচ্ছা, একটা নাটকতো করার কথা ছিলো। করবেন না?

দুই     
না।

চার     
কেন?

দুই     
ঝড়টা আগে শেষ করি তারপর অন্য কিছু।

চার     
ঠিক আছে। ওকে জাগাই?

দুই     
ওতো দু’নম্বরির ছেলে। ও শালা ঝড়ে অংশ নেবে না।

চার     
না না, আমরা মনে হয় নিবে। ওর বাপকে খুন করতে যদি সাহায্য করি তাহলে সে অংশ নিবে।

দুই     
তাই নাকি? এই যে ভাই, আপনার বাপকে খুন করবেন?

তিন     
একা?

চার     
না, আমরাও সাথে থাকছি।

তিন     
নিশ্চিত কীভাবে হই যে আপনারা থাকবেন? পরে যদি সরে পড়েন। অনিশ্চয়তার মধ্যে বাপ হারানো ঠিক হবে না।

দুই     
আমরা থাকবো। তাছাড়া তাকে যদি খুন না করেন তবে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আপনাকেই খুন করবো।

তিন     
তাই নাকি। না না, তাহলে চলেন।

চার     
দাঁড়ান এখনি না। আগে তাকে মারতে হবে না?

তিন     
এক কাজ করেন। আমার বাপ এবং তার মধ্যে যে বেশি ভয়ঙ্কর তাকে মারেন।

চার     
দু’জনই সমান ভয়ঙ্কর।

তিন     
ও, তাহলে?

দুই     
যে সামনে আছে তাকেই মারি না কেন?

এক     
(হায়রে ঘুম, এতো কিছুর মধ্যে কি ঘুমানো যায়?) আমাকে মারলে ডোনেশন পাবেন কোথায়?

দুই     
আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আগে আপনাকে খুন করব তারপর নাটক। সিদ্ধান্তটা কেমন?

এক     
মাতালের মতো।

দুই     
আপনাকে না মারাটা বেশি মাতলামি হবে।

এক     
ও,  তাই বুঝি? ঠিক আছে তাহলে মারেন।

চার     
আপনি চিন্তা করছেন, সেই আপনাকেতো মারছিই মাঝে কতগুলো সময় শুধু শুধু ব্যয় করলাম। তাই না?

এক     
আপনাদের জন্য শুধু শুধু। কিন্তু আমার অনেক কাজ হয়েছে।

চার     
তাই নাকি? কী রকম?

এক     
একটু আগে আমার ছেলে এসেছিল। আপনারা ঘুমিয়ে ছিলেন বোধহয়। সে বললো, এখন থেকে আমার  কাজগুলো সে করবে। তার জন্য অবশ্য একটা বাড়তি সুবিধা আছে। সে আপনাদের মধ্যে থেকেই কাজগুলো করবে। (তিন-এর চোখেমুখে হাসি) কী ব্যাপার, হাসছেন যে?

তিন     
আমার সাথে কথা হচ্ছিল আপনার ছেলের। তারপর ওদের কাছে গেল। ঘুমের মধ্যেই ওদেরকে চিনতে পেরেছিলো আপনার ছেলে। তারপর সে কী ভয়। ভয়ে দৌড়।

চার     
কিন্তু আমরাতো ঘুমিয়েছিলাম।

তিন     
তাতে কী? ঘুমিয়ে থাকেন কিংবা জেগেই থাকেন, আপনাদের খুব ভয় পায় ওরা।

চার     
তাই নাকি? জানতাম না তো। এই যে আপনি জানতেন?

দুই     
হ্যাঁ, অনেক আগে থেকেই জানতাম।

চার     
এতোদিন বললেন না কেন?

দুই     
বলেছিতো অনেকবার। বললেইতো সবাই বলে মাতাল। এই যে আপনি শুয়ে পড়েন। আপনাকে খুন করবো।

এক     
আমাকে খুন করবেন আর আমি শুয়ে থাকবো? বাধা দিব না?

দুই     
দেখছেন না প্রচণ্ড ঝড় হচ্ছে। শুধু শুধু শক্তি ক্ষয় করে লাভ নেই। শক্তিগুলো রেখে দিন আখেরাতে কাজে লাগতে পারে।

এক     
ঠিক আছে। এই যে শুয়ে পড়লাম। করেন, খুন করেন।

[খুন হয়ে গেল। মাতাল যখন সমীরণ, খুন হলো তখন। ঝড় না হলে এমনটি বোধহয় হতো না]    

বি. দ্র. ঝড় থেমে যায়নি, ঝড় শুরু হলো কেবল।

ইতি
হাসান শাহরিয়ার
সম্পাদক- থিয়েটারওয়ালা
১৯৯৬ইং। শুক্রাবাদ, ঢাকা